দুর্গাপূজা নিয়ে জিজ্ঞাসা

।। মাদুর্গার আসা-যাওয়ার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন।।
প্রচলিত আছে এবং পঞ্জিকাতে উল্লেখিত থাকে যে, মাদুর্গা ফি বছর কৈলাস থেকে আসা-যাওয়া করেন। এখন প্রশ্ন—(১) তাঁকে আনতে এবং দিতে কে বা কারা যান ?
এবং (২) কোন রুটে দোলায়, নৌকায়, ঘোটকে কিম্বা গজে যাতায়াত করেন ? পূজারীরা সঠিক উত্তর দিয়ে বাধিত করবেন আশাকরি।

।। দুর্গাপূজার বাস্তব চিত্র।।
‘পূজা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সম্বর্দ্ধনা। পূজ্য ব্যক্তিত্বের গুণে গুণান্বিত হয়ে নিজেকে এবং পরিবেশকে সম্বর্দ্ধিত করা। এতদিন ধরে হাজার-হাজার দুর্গাপূজা করে আমাদের চিন্ময়ী নারীরা কতখানি সমৃদ্ধ হয়েছে মা দুর্গার আদর্শ চরিত্রের চরিত্রায়নে ? আমাদের চিন্ময় পুরুষেরা নারী সাধারণকে কতটা মা-দুর্গার প্রতীক মনে করে শ্রদ্ধা করতে বা পূজা করতে শিখেছে ? আমরা সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির পথে কতটা এগিয়েছি ? আমাদের কতখানি দুর্গতি নাশ হয়েছে ? আমাদের সার্বিক জীবন-চলনা দুর্গ-সম পরিরক্ষিত হয়েছে কতটা ?—তথ্য জানার অধিকার বলে এ বিষয়ে জানতে চাওয়াটা নিশ্চয়ই অপরাধ হবে না ! যদিও প্রচলিত তথ্য এর বিপরীত মত প্রকাশ করে চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। পূজাকে কেন্দ্র করে সাত্তিকতা বৃদ্ধি না পেলেও, তামসিকতা বেড়ে যায় বহুগুণ। পুজোকে কেন্দ্র করে ভক্তদের অনিত্য দেহটাকে পূজা-বিপরীত সাধের নানা বেশভূষায় সাজিয়ে দিতে বিকিকিনির পসরা সাজিয়ে যারা বসেন, তারা কি পূজা-সদৃশ সততার দৃষ্টান্ত উপহার দেন সমাজকে ? পূজাই যদি উদ্দেশ্য তবে ইভটিজিং, আদমটিজিং কেন হবে ? অপরাধ কেন বৃদ্ধি পাবে ? দূষণ কেন বৃদ্ধি পাবে পূজাকে কেন্দ্র করে ?— এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে ?

।। দুর্গাপূজা বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাসা ।।

তথাকথিত যে পুরোহিতগণ আদ্যিকালের দেবদেবীদের কল্পিত মাটির মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম, তিনি বা তাঁরা মানুষের প্রাণহীন দেহে আরো সহজে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন বা পারা উচিত। কারণ, বিজ্ঞান মতে, মাটির মধ্যে থাকা অণু-পরমাণুর তুলনায় সদ্য মৃতদেহের অণু-পরমাণু বেশী সক্রিয় থাকে, বেশী জীবন্ত থাকে। মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ এ বিযয়টা নিয়ে ভেবে দেখতে পারেন। তাহলে অনেক অকালমৃত্যু সহজে রোধ করা যাবে।

।। দুর্গাপূজা বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাসা ।।
ইদানীংকালে সংযোজিত খুঁটি-পুজো (!)-র কথা বাদ দিলেও বাহ্য পূজাবাদীদের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী পূজা শুরুর আগে মৃন্ময়ী মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। আয়োজকদের বিশ্বাস, পুরোহিতের মন্ত্রবলে নিষ্প্রাণ মূর্তিগুলো প্রাণবন্ত হয়। তর্কের খাতিরে বিষয়টাকে সত্য বলে যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে একটা প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, জীববিজ্ঞান অনুযায়ী জীবন্ত প্রাণীদের চলন, গমন, ইত্যাদি অভিব্যক্তি থাকা আবশ্যিক। অতএব বিজ্ঞানসম্মত কারণেই পুরোহিতের মন্ত্রবলে দুর্গাঠাকুরের চালচিত্রের জীবন্ত দেবদেবী, অসুর, সিংহ, ময়ূর, সাপ, পেঁচা, ইঁদুরেরা নিজ নিজ অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে। কেউ চুপচাপ স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে পারবে না। ফলে শুরু হয়ে যাবে মহিষাসুর মর্দিনীর বাস্তব উপস্থাপনা। অসুর তার অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দেবী দুর্গাকে আক্রমণ করবে, সিংহ গর্জন করতে করতে দেবীকে পিঠে নিয়ে অসুরকে ধাওয়া করবে, অন্যান্য দেবদেবীরাও যার যার বাহন নিয়ে যোগদান করবে যুদ্ধে। —এবার প্রশ্ন–ওই অবস্থায় পুরোহিত, আয়োজকেরা, ভক্তেরা, উদ্বোধন করতে আসা সেলিব্রিটিরা কোন পক্ষে যোগদান করবেন ?

 ।। প্রতিমাপূজা কারে কয় ।।
বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার পণ্ডিতদের মত অনুযায়ী পূজ্য-প্রতিমা চঞ্চল চিত্তের ধারণের জন্য একটি অবলম্বন। প্রতিমাকে ব্রহ্মের রূপ কল্পনা করে উপাসনা, সংযম, সাত্তিক আহার, সাত্তিক বিহার ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে পূজা করা হয়। —যাতে পূজক বা উপাসক মনসংযোগ দ্বারা প্রতিমাকে হৃদয়ে ধারণ করে প্রতিমার গুণে গুণান্বিত হতে পারে। এই হলো প্রতিমা পূজার মূল কথা। 
এবার প্রশ্ন—বিজ্ঞানের বিধি অনুযায়ী একটা নির্ভুল অংক কষতে গেলেও একটা শান্ত পরিবেশ প্রয়োজন হয়, মনসংযোগ, একাগ্রতার প্রয়োজন হয়। অথচ, একটু নজর করলে দেখা যাবে পূজার নামে, বেশীরভাগ পূজা-প্রাঙ্গনগুলোতে ঢাকের আওয়াজ, মাইকের আওয়াজ, আয়োজকদের অহংকারের আওয়াজে কোন সুস্থ মানুষের পক্ষে একটি ঘণ্টার জন্যও একাগ্রভাবে, স্থিরচিত্তে বসে থাকতে পারার কথা নয়! তাহলে পূজক বা উপাসক মনঃসংযোগ করবে কোন উপায়ে ?

পূজা বনাম কমন সেন্স :
আমাদের বর্তমান যুগ যে যুক্তিবাদী সে কথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি অস্বীকার করবেন না আশাকরি। যেমন, সন্তানের হয়ে মা খেলে সন্তানের পেট ভরবে না। ছাত্রের হয়ে শিক্ষক লেখাপড়া করলে ছাত্র পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে না।–তেমনি প্রচলিত পূজার আয়োজকদের হয়ে কোন পুরোহিত পূজা করলে আয়োজকদের কিছু ফললাভ হবে কি ? আয়োজকেরা সত্যই কত মহান তাই না ! ফল লাভের কথা না ভেবেই কত কষ্ট করে পূজার আয়োজন করেন !
অবশ্য পুরোহিতও জানেন না ফললাতের বিষয় সম্পর্কে। যদি জানতেন বিসর্জন মন্ত্রে বলতেন না—ওঁ আবাহনং ন জানামি, নৈব জানামি পূজনম্। বিসর্জনং ন জানামি ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি (পরমেশ্বর)। —অর্থাৎ আমি আবাহনও জানিনা, বিসর্জনও জানিনা, আমাকে ক্ষমা করুন। (দ্রঃ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)

Top of Form


।। বিষয়—কুমারী পূজা ।।

কুমারী পূজা হলো তন্ত্রশাস্ত্রমতে অনধিক ষোলো বছরের অ-রজঃস্বলা কুমারী মেযে়র পূজা। বিশেষত দুর্গাপূজার অঙ্গরূপে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও কালীপূজা, জগদ্ধাত্রীপূজা এবং অন্নপূর্ণা পূজা উপলক্ষে এবং কামাখ্যাদি শক্তিক্ষেত্রেও কুমারী পূজার প্রচলন রয়েছে।

      শাস্ত্রানুসারে কুমারী পূজা না করলে দেবদেবীর পূজা ও  হোম সফল হয় না। শক্তির আরাধনার নামে আদর্শ নারীশক্তির প্রতীক স্বরূপা দুর্গা, কালী, জগদ্ধাত্রী এবং অন্নপূর্ণা পূজার আয়োজন হয়ে চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। যার উদ্দ্যেশ্য চিন্ময়ী নারীদেরও আমরা যেন আদ্যাশক্তির প্রতীক মনে করে পরমার্থ দর্শন ও পরমার্থ অর্জন করতে অভ্যস্ত হই,  শ্রদ্ধা জানাই,  নারীকে যেন কামনার, ভোগের বস্তু মনে না করি, নারীকে ভোগ্যা নয় পূজ্যা রূপে স্বীকৃত দেবার জন্যই কুমারী পূজা।  আদ্যাশক্তির প্রতীক নারীরা যদি রুষ্ট হয় তাহলে সৃষ্টির ছন্দে পতন অবশ্যম্ভাবী। ওই আদর্শকে সমাজজীবনে প্রতিষ্ঠা দিতে মূর্ত্তিপূজার পাশাপাশি তন্ত্রশাস্ত্রকারেরা দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য দেবীজ্ঞানে কুমারী পূজারও প্রচলন করেছিলেন। ফলহারিনী কালীপূজার রাতে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নিজের স্ত্রীকে ষোড়শীজ্ঞানে পূজা করেছিলেন।   

      পূর্বের তুলনায় হ্রাস পেলেও বর্তমানেও শক্তিপীঠ কামরূপ কামাক্ষ্যা, বেলু়ড় মঠসহ প্রতিষ্ঠত রামকৃষ্ণ মিশনগুলোতে, আদ্যাপীঠ প্রভৃতি  বিখ্যাত স্থানসহ ভারত ও বাংলাদেশের অনেক স্থানে রক্ত-মাংস দিয়ে গড়া অনার্তবা অর্থাৎ অ-রজঃস্বলা—১৬ বছর সময়সীমার মধ্যে যে মেয়ে ঋতুমতী হয়নি এমন কুমারী মেয়েদের দেবীজ্ঞানে তন্ত্রমতে পূজা করা হয়।

বয়স অনুযায়ী কুমারী মেয়েদের উপাধি—

১ বৎসরের কন্যাকে সন্ধ্যা

২   বৎসরের কন্যাকে  সরস্বতী

৩ বৎসরের কন্যাকে ত্রিধামূর্তি

৪ বৎসরের কন্যাকে কালিকা

৫ বৎসরের কন্যাকে সুভগা

৬ বৎসরের কন্যাকে উমা

৭ বৎসরের কন্যাকে মালিনী

৮ বৎসরের কন্যাকে কুব্জিকা

৯ বৎসরের কন্যাকে কাল-সন্দর্ভা

১০ বৎসরের কন্যাকে অপরাজিতা

১১ বৎসরের কন্যাকে রূদ্রাণী

১২ বৎসরের কন্যাকে ভৈরবী

১৩ বৎসরের কন্যাকে মহালক্ষী

১৪ বৎসরের কন্যাকে পীঠনায়িকা

১৫ বৎসরের কন্যাকে  ক্ষেত্রজা

১৬ বৎসরের কন্যাকে অম্বিকা  

ইদানীংকালে হিন্দুত্বের বড়াই করা ভক্তরা সরকার স্বীকৃত ‘শক্তির আরাধনা’য় যে হারে ব্যাপৃত হয়েছে, সেই হারে কিন্তু  নারী-সাধারণকে পূজ্যা রূপে  প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। শক্তি আরাধনার আয়োজকদের মধ্যে কুমারীপূজার আদর্শ যদি প্রতিষ্ঠা পেত তাহলে নারীদের কেউ লালসার বস্তু মনে করতে পারত না আর নারীরাও নিজেদের লাস্যময়ী রূপে নিজেদের বিজ্ঞাপিত করে পুরুষের কামনার আগুনে ইন্ধন দিত না। কারণ দুর্গাপূজা, কালীপূজার নামে যত মানুষ মেতে ওঠে তারা যদি প্রকৃতই শক্তির আরাধনার শিক্ষাটাকে পোলিও প্রচারের মত সমাজে চারিয়ে দিতে পারতেন তাহলে কি ইভটিজিং, ধর্ষণ, ডিভোর্স, নারী নির্যাতনের মতো জ্বলন্ত সমস্যায় কি জর্জরিত হতে হতো আমাদের এই ভারতবর্ষকে ?

তাই, শাস্ত্র বর্ণিত অধমের চাইতেও অধম পূজায় মেতে উঠে আমাদের যাতে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে না হয়, তাই, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের নিত্য-বাস্তবে কুমারীপূজার পূজারী করে তুলতে সৎসঙ্গীদের নিত্যপাঠ্য ‘সত্যানুসরণ’ নামক মহাগ্রন্থে নারীকে জগজ্জননী জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত করতে নিদেশ দিয়ে বললেন, ‘‘প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী । প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয় ।’’  এবং পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, ‘‘স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যে-জন, তাহার হয় না ভবের বন্ধন মোচন । …..স্ত্রী চিন্ময়ী মা।’’—এই শিক্ষার ধারাকে বাস্তবায়িত করার নাম প্রকৃত কুমারীপূজা ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s