মহালয়া ও পিতৃতর্পন

।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের দৃষ্টিতে মহালয়া।।

—তপন দাস

আশ্বিন মাসের অমাবস্যা তিথিতে পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের শুরুর দিনটি মহালয়া।  পিতৃযান বা পিতৃলোক থেকে আত্মারা মর্ত্ত্যলোকের মহান আলয়ে সম্মিলিত হন, সেই বিশ্বাসে পিতৃ-মাতৃহারা আর্য্য হিন্দুরা তাঁদের তৃপ্তির জন্য তিল-জলসহ মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক বিগত ঊর্দ্ধতন পিতৃ-মাতৃ পুরুষদের গোত্র উল্লেখ করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন,–যাতে তাঁরা লিঙ্গদেহের  নিরাশ্রয় নিরালম্ব বায়ুভূতের কষ্টদায়ক ভোগ কাটিয়ে অচিরেই পিণ্ডদেহ ধারণ করতে পারেন।–সাথে ‘আব্রহ্মভুবনল্লোকা’ মন্ত্রে সকল জীবের তৃপ্তির প্রার্থনা জানান হয়। এক্ষেত্রে স্মরণে রাখা উচিত বংশে যদি সগোত্রে,  সপিণ্ডে এবং প্রতিলোম বিবাহ হয়, তাহলে কোন মন্ত্রে, কোন দানে পিতৃ পুরুষদের আত্মা তৃপ্ত হবে না। তাঁরা পিণ্ডদেহ ধারণ করতে পারবেন না।

হিন্দুদের প্রামাণ্য স্মৃতিগ্রন্থ মনু সংহিতার বিধান অনুযায়ী ব্রহ্মযজ্ঞ, দেবযজ্ঞ, ঋষিযজ্ঞ, পিতৃযজ্ঞ ও নৃযজ্ঞ ইত্যাদি নামের পঞ্চ মহাযজ্ঞ অর্থাৎ বিশ্বাত্মার অন্তর্ভূক্ত সকলের মঙ্গল স্থাপনের লক্ষ্যে বাস্তব কর্মের নিত্য-উদযাপনের যে নিত্য তর্পনের বিধান  বিদ্যমান, তার মধ্যে পিতৃযজ্ঞ অন্যতম। আমরা সারাবছর সেসব ভুলে এই একটি দিন বিগত আত্মাদের স্মরণ করে হিন্দুত্ব রক্ষা করতে চেষ্টা করি। উক্ত ব্রাত্যদোষ থেকে মুক্তি পাবার বিধান দিলেন যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ পালনের মাধ্যমে। শ্রীশ্রীঠাকুর  প্রদত্ত ইষ্টভৃতি নিবেদন মন্ত্রের ‘‘…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপারর্শ্বিকাঃ ।।’’ উচ্চারণ করার সাথে সাথে বৃহত্তর পারিপার্শ্বিকের জীবনবৃদ্ধির দায়ভারের শপথ নিতে হয় আমাদের । সব অবস্থাতে বাস্তব কর্মে বৃহত্তর পরিবেশের জৈবাজৈব সবকিছুকে পালন-পোষণে সমৃদ্ধ করে রাখার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সার্থক হয় পঞ্চ-মহাযজ্ঞ বা ইষ্টভৃতি পালন ।

শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের মধ্যে আর্য্যত্বকে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বললেনঃ

‘‘পঞ্চবর্হি যা‘রা স্বীকার করে, আর সপ্তার্চ্চি অনুসরণ করে, তারা যেই হোক আর যা’ই হোক– আর্য্য বা আর্য্যীকৃত৬০১ ’’

(শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৭)

‘‘আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে গেল সেইদিন যেদিন থেকে আমরা পঞ্চবর্হির মূল নির্দ্দেশ অবজ্ঞা করতে শুরু করলাম । তখন থেকে আমরা অপরের খোরাক হলাম কিন্তু নিজেদের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখে পরকে আপন ক’রে নেবার সামর্থ্য হারিয়ে ফেললাম ।’’ (আঃ প্রঃ ১১। ১০০)

‘‘পঞ্চবর্হি ও সপ্তার্চ্চিই হ‘চ্ছে সেই রাজপথ–যা’কে স্বীকার ও গ্রহণ ক’রে চললে ক্রমশঃই তুমি সার্থকতায় সমুন্নত হ’তে পার । ২৩৪ ।’’ (সম্বিতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ১২১)

সর্বশাস্ত্রসার গীতা গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ইষ্টকে নিবেদন  না করে খাদ্য খেলে চোর হতে হয়। ইষ্টকে নিবেদন করার বাসনা নিয়ে শুদ্ধ বাজার করতে হবে, মন্দিরে ভোগ রান্নার ন্যায় শুচিশুদ্ধ ভাবে রান্না করতে হবে। শুদ্ধ চিত্তে নিবেদন করে প্রসাদ স্বরূপ তা খেতে হবে। না হলে চোর হতে হবে।

এ বিষয়ে আবশ্যিক পালনীয় বিষয়,— অভক্ষ্যভোজী,— অর্থাৎ মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুনাদি তামসিক আহার যাঁরা করেন, হিন্দুমতে তাদের অভক্ষ্যভোজী বলা হয়েছে। অগম্যাগামী, অর্থাৎ যারা সগোত্র এবং সপিণ্ড সম্বন্ধীয়দের সাথে অবিধি পূর্বক ধর্মবিরুদ্ধ কামাচার করে হিন্দুমতে তাদের  অগম্যাগামী বলা হয়েছে। এরা কদাচারী, এদের প্রদত্ত আহার ও পানীয় অশুদ্ধ। (দ্রঃ সম্বিতী) অতএব ইষ্টপ্রাণ বা ভক্ত উপাধি অর্জন করতে হলে প্রথমেই বর্ণধর্মানুযায়ী সদাচারী  হতে হবে।

শ্রীশ্রীঠাকুর তাই আমাদের খাদ্য গ্রহণের পূর্বে নিবেদন করার বিধান দিলেন।–নিবেদন-ভূমিতে খাদ্য এবং জল দিয়ে বলতে হয়—পরলোকগত পিতৃপুরুষ, আত্মীয়স্বজন, গুরুভাই ও আব্রহ্মস্তম্ব প্রত্যেকে যেন অন্ন পাকে পরিতৃপ্ত হয়ে, সন্দীপ্ত হয়ে জীবন-যশ ও বৃদ্ধিতে পরিপোষিত হয়ে স্মৃতিবাহী চেতনা লাভ করে পরমপিতা তোমারই চরণে যেন সার্থকতা লাভ করে।–এইভাবে গণ্ডুষ করতে হয়।

শ্রীশ্রীঠাকুর নিদেশিত উক্ত নিত্য তর্পণের বিধান মেনে চললে আত্মশুদ্ধি হয়, নিরালম্ব বায়ুভূতে কষ্ট পেতে হয় না। পূর্বপুরুষরাও তৃপ্ত হন।

এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন, ‘‘আপুরমান ইষ্টে কারও যদি প্রকৃত টান জন্মে, এবং তাই নিয়ে যদি সে বিগত হয় তবে সে মহান জীবন লাভ করবেই। আবার এ জীবনে যে যতই হোমরা-চোমরা হোক না কেন, সে যদি সুকেন্দ্রিক না হয়, প্রবৃত্তিই যদি তার জীবনের নিয়ামক হয়, তবে ঐ বিচ্ছিন্ন বিকেন্দ্রিকতা তার মৃত্যুকালীন ভাবভূমি ও পরজন্মকে যে অপগতিতে অপকৃষ্ট করে তুলবে, তাতে সন্দেহ কমই।’’  (আঃ প্রঃ ১১/১৮.০৩.১৯৪৮)

      তাই পিতৃপক্ষ, দেবীপক্ষ, দেবী আরাধনা, দেবতা আরাধনা, পূজা তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা একমাত্র ইষ্টকেন্দ্রিক চলনে পুরুষোত্তম প্রদত্ত নিত্য-তর্পণ বিধি মেনে জীবাত্মায় বিশ্বাত্মার উপলব্ধি নিয়ে আত্ম-পূজায় সার্থক হতে পারব।–আজ্ঞাচক্রে ইষ্টের ভাব নিয়ে মহাচেতন সমুত্থানের পথে পাড়ি জমাতে পারব।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s