SARASWATI POOJA

।। প্রসঙ্গ : দেবী সরস্বতী, বিদ্যা, পূজা ও আমরা ।।

                                                নিবেদনে—তপন দাস

      অবক্ষয় আমাদের দরজায় যতই কড়া নাড়াক না কেন লর্ড মেকলে সাহেবের দাক্ষিণ্যের দৌলতে  আমাদের সমাজে শিক্ষিত হবার প্রবণতার হার কিন্তু ক্রমশঃ বর্দ্ধমান। মুখে বুলি ফুটতে না ফুটতেই সন্তান-সন্ততিদের লেখাপড়া শেখাতে এতটুকু কার্পণ্য করি না আমরা। এ বিষয়ে বাবাদের চাইতে মায়েদের আগ্রহ একটু বেশীই।  লেখাপড়া শেখাতে স্কুলে ভর্তি করে, একাধিক প্রাইভেট টিউটর রাখে,  পাশাপাশি হোম-ওয়ার্ক না করতে পারলে  ‘মাথা ফাটিয়ে ঘিলু বার করে দেব, মেরে ফেলব, কেটে ফেলব’ ইত্যাদি বিশেষণের শাসনবাক্যে যুগধর্মের শিক্ষায় সন্তানদের শিক্ষিত করতে মায়েরা যেভাবে পরিশ্রম করে চলেছেন তার তুলনা হয় না! লেখাপড়া মানেই বিদ্যার্জন করা। বিদ্যার্জন করতে স্কুল, টিচার, বই-খাতা-কলম ইত্যাদি আনুসঙ্গিকের পাশাপাশি বিদ্যাদেবীর আরাধনাটাও আবশ্যিক! তাই উত্তরায়ন-সংক্রান্তি পরবর্তী শুক্লা-পঞ্চমী বা শ্রীপঞ্চমী তিথিকে কেন্দ্র করে ঘরে-ঘরে, বিদ্যালয়ে-বিদ্যালয়ে, পাড়ার ক্লাবে, রাস্তাঘাটে সরস্বতী পুজোর সাড়া পড়ে যায়। এমনিতে একটু বেলা পর্যন্ত শুয়ে থাকা পড়ুয়ারাও সেদিন সকাল-সকাল উঠে নিম-হলুদ মেখে স্নান সেরে নেয়।  (নিম-হলুদ মাখলে শরীরের রোগ-প্রতিরোধী শক্তি বৃদ্ধি পায়।) তারপর সেজেগুজে যে-যেখানে সুবিধা পায় আগেভাগে অঞ্জলি দেবার কাজটা সেরে নিতে বিদ্যাদাত্রী সরস্বতীর প্রতিকৃতির সামনে কঠিন বিষয়ের বইপত্রগুলো জমা দিয়ে অপেক্ষায় থাকে কতক্ষণে পুরুতঠাকুর অঞ্জলি দেবার জন্য ডাকবেন। অঞ্জলি দেওয়া শেষ করে সরস্বতী-ঠাকুরের কাছে পাশ করার আর্জিটা জানিয়ে, প্রসাদ খেয়ে পুজোর মুখ্যপর্বটা শেষ করে গৌণপর্বে প্রবেশ করে। কচিকাচারা পরিজনদের হাতধরা হয়ে, কিশোর-কিশোরীরা বন্ধু-বান্ধবদের সাথে বিদ্যালয়ে  যায়, খাওয়া-দাওয়া হয়। খাওয়া-দাওয়া সেরে  ঘুড়ি ওড়ানো,  দল বেঁধে ঘুরে ঘুরে  প্রতিমা দেখে বেড়ানো।   বড় হয়ে ওঠার সোপানে পা-রাখা হেটেরো-সেক্সুয়াল কমপ্লেক্সের অবদানের টেস্টোটেরন হরমোন-প্রপীড়িত ওভারস্মার্ট ছাত্ররা, ফলিকল-স্টিমুল্যাটিং হরমোন-প্রপীড়িত ওভারস্মার্ট ছাত্রীরা পছন্দের জনকে প্রপোজ করার সুযোগ খোঁজে, কেউ আবার একটু ঘনিষ্ট সান্নিধ্য পেতে চায় ভ্যালেনটাইন-উইক কালচারে সমৃদ্ধ হতে। পাড়ায় রাতে হবে মাংস-ভাতের পিকনিক। শুধু পাড়াতেই  নয় সরকার পরিপোষিত অনেক প্রাথমিক বিদ্যোলয়েও (যেখানে হিন্দু শাস্ত্রমতে বিদ্যালাভের পরিপন্থী, অভক্ষ্য ডিম সহযোগে ছাত্রদের মিড-ডে মিল খাওয়ান হয়।)  পুজোর দিনটির পবিত্রতা বজায় রেখে পরেরদিন মাংস-ভাতের পিকনিক করা হয়েছে। আসছে বছর আবার হবে!—কি হবে ?

      ‘‘ওঁ ভদ্রকাল্যৈ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈ নমো নমঃ।

      বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ-বিদ্যাস্থান্যেভ্যঃ এব চ।। ……’’ পুরোহিতের বলা ইত্যাদি মন্ত্র অনুসরণ করে পুষ্পাঞ্জলি দিতে হবে।

      ‘‘জয় জয় দেবী চরাচর সারে কুচযুগ শোভিত  মুক্তাহারে।

      বীণা রঞ্জিত পুস্তক হস্তে ভগবতী ভারতি দেবী নমোহস্তুতে।।

(কোন পণ্ডিত উক্ত মন্ত্র রচনা করেছিলেন আমি জানি না । তবে এটুকু বুঝি, যে স্তনযুগল মাতৃত্বকে সমৃদ্ধ করার জন্য সৃষ্ট, বৃত্তিতন্ত্রীদের সুড়সুড়ি দিতে তাকে মুক্তার হারের আভরণে সজ্জিত না করলেই ভাল করতেন। কারণ বিদ্যালাভ  মস্তিকের মেধানাড়ীতে সুপ্ত মানবিক-সাত্ত্বিক গুণের অনুশীলনে সম্পাদিত হয়, বক্ষ-সৌন্দর্যের সজ্জিত বিজ্ঞাপনে নয়।) 

ওঁ সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে।

বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্বি বিদ্যাং দেহী নমোহস্তুতে।।’’— পুরোহিতের বলা ইত্যাদি মন্ত্র অনুসরণ করে প্রণাম জানাতে হবে। …….তারপর সেই,—খাওয়া-দাওয়া, হৈ-হুল্লোর— ছোটদের বড় হবার রিহার্সাল, বড়দের নস্টালজিয়ার স্মৃতিচারণ ……. আসছে বছর আবার হবে!  

      ওইসব  উচ্চারিত মন্ত্র অনুযায়ী দেবী সরস্বতীই বিদ্যাদাত্রী, তাকে সাধনা করতে পারলেই বিদ্যার সিলেবাস বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ জ্ঞাত হওয়া যাবে। খুব ভালো কথা। সাধনা দিয়েই তো সিদ্ধি পেতে হবে।

*    *    *

      মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী আমরা যা বলি বা সংকল্প করি বাস্তবে তা যদি না করি স্নায়ুমন্ডলীতে জটিলতার সৃষ্টি হয়, আধ্যাত্মিক জগতে যাকে অনাগত প্রারব্ধ কর্মফল বলে।  অথচ আমাদের শিক্ষকেরা এই পূজার দিনটিতে অঞ্জলিমন্ত্র, প্রণামমন্ত্র আওড়ানো ব্যতীত বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ শিক্ষা বিষয়ে ছাত্রদের  উৎসাহ না দিয়ে প্রচলিত সিলেবাসের বিষয়ভিত্তিক খাতাবই কেনা, নোট কেনা, কোচিং-করানোর দিকে উৎসাহ দেয়। বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ জিনিসটা যে কি বেশিরভাগ পড়ুয়ারা জানেই না, অথচ শিক্ষার আবশ্যিক বিষয় জ্ঞানে বাধ্যতামূলকভাবে বছর-বছর আবৃত্তি করে চলে, সরস্বতী পূজার দিনটিতে। এর নাম দ্বন্দ্বীবৃত্তি, অর্থাৎ মুখে যা বলছি, কাজে তা করছি না। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতে যা মহাপাপের কারণ।

*    *    *

      সংস্কৃত বিদ্ִ ধাতু থেকে বেদ এবং বিদ্যা শব্দের উৎপত্তি। যার অর্থ জ্ঞান, বিচরণা, অস্তিত্ব, প্রাপ্তি।  বিদ্যা লাভ যার হয়, অস্তিত্ব বজায় রাখার জ্ঞান তার হয়। তার বিচারশক্তি হয়, জীবনচলনায় ভালটাকে বেছে নিয়ে সে এগিয়ে চলে মূল প্রাপ্তি বা গন্তব্যের দিকে। যার চরম ঈশ্বরপ্রাপ্তি। ভাষাবিদ জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস মহোদয় কৃত অভিধানানুসারে, ‘‘যদ্দারা ব্রহ্ম হতে ব্রহ্মান্ড পর্য্যন্ত যাবতীয় পদার্থের সত্যবিজ্ঞান লাভ হইয়া যথাযোগ্য উপকার প্রাপ্ত হওয়া যায় তাহাই বিদ্যা ; যদ্দারা অক্ষর পুরুষকে জানা যায়।’’ ওই বিদ্যায় বিদ্বান হয়ে ছাত্রদের জানাবার কাজটি যিনি করেন তিনি শিক্ষক বা আচার্য্য।

বেদ বা জ্ঞান-এর দুটো দিক, আধ্যাত্মিক ও জাগতিক। যা জানলে মানুষের জীবনের পূর্ণতা লাভ হয়, বিদ্যা লাভ হয়।  বেদের বিদ্যা দু প্রকার পরা ও অপরা।  শিক্ষা (phonetics), কল্প, ব্যাকরণ, ছন্দ, জ্যোতির্বিদ্যা (astronomy)  ও নিরুক্ত (শব্দতত্ত্ব) ইত্যাদি নামের বেদের ৬টি শাখার নাম বেদাঙ্গ। সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ্  নামে বেদকে চারভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। যার অন্ত ভাগের নাম বেদান্ত বা উপনিষদ।  ‘আত্মানং বিদ্ধি’  (Know Thyself,— who am ‘I’ ?) অর্থাৎ নিজেকে জানার  চেষ্টার পাঠক্রমকে বলা হয়েছে পরাবিদ্যা। পরাবিদ্যার পাঠক্রমে আমাদের শিক্ষক আর্য-ঋষিগণ বলেছেন, ‘‘যস্তু সর্বাণি ভূতান্যাত্মন্যেবানুপশ্যতি।/সর্বভূতেষু চাত্মানং ততো ন বিজুগুপ্সতে।।’’  (ঈশোপনিষদ) অর্থাৎ,  যিনি নিজের আত্মাকেই সর্বাত্মারূপে উপলব্ধি করেন, তিনি কাহাকেও ঘৃণা করেন না। সর্বভূতে নিজেকে, নিজের মধ্যে সর্বভূতকে উপলব্ধি করেন। কেন‍না, আর্য্য হিন্দু শাস্ত্রমতে আমরা মানুষেরা ঐহিক জগতে দ্বৈত ভাবে অসম্পৃক্ত হয়েও সেই এক পরমাত্মার সাথে সম্পৃক্ত।

      আবার তৈত্তরীয় উপনিষদের বিদ্যা দানের শান্তি পাঠে রয়েছে, ‘‘ওঁ সহ নাববতু। সহ নৌ ভুনক্তু। সহ বীর্য করবাবহৈ। তেজস্বি নাবধীতমস্তু মা বিদ্বিষাবহৈ। ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।।’’ যার মর্মার্থ হলো, আমরা (আচার্য্য ও বিদ্যার্থী উভয়ে) সহমত হয়ে চলব, প্রকৃতির উপাদান সকলে স-মান (Equitable) ভাবে ভাগ করে জীবন ধারণ করব। কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করব না। আর অপরাবিদ্যার বিষয় ছিল জাগতিক শিক্ষা, যা ৬৪ কলা বিদ্যার মধ্যে নিহিত ছিল। (অন্তরাসীজন ৬৪ কলাবিদ্যার সিলেবাস জানতে আগ্রহী হলে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস মহোদয়ের অভিধানে ‘কলা’ সবিশেষ পাঠ করে দেখতে পারেন। তা হলেই বুঝতে পারবেন বিদ্যা কাকে বলে।)   পরাবিদ্যার শিক্ষকদের বলা হতো আচার্য্য আর অপরাবিদ্যার শিক্ষকদের উপাচার্য্য (তৈত্তিরীয় উপনিষদ)।  বর্তমানের শিক্ষা ব্যবস্থায় সরস্বতী আরাধনা মন্ত্রক্তো বেদ-বেদান্ত-বেদান্তের সাথে বাস্তব সখ্যতা না থাকলেও বিদ্যার সাথে সম্পৃক্ত আচার্য্য এবং উপাচার্য্য শব্দদ্বয়কে এখনো বিদায় দেওয়া যায় নি।

*    *    *

      আমাদের বর্তমান যুগ যে যুক্তিবাদী সে কথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি অস্বীকার করবেন না আশাকরি। যেমন, সন্তানের হয়ে মা খেলে সন্তানের পেট ভরবে না। ছাত্রের হয়ে শিক্ষক লেখাপড়া করলে ছাত্র পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে না। তেমনি বিদ্যালাভের জন্য বিহিত সাধনা না করে পুরোহিতের বলে দেওয়া দেবী সরস্বতীর অঞ্জলিমন্ত্র আওড়ালে বিদ্যার্থীদের  বিদ্যা বা ঈপ্সিত ফললাভ হবে কি ?

      অবশ্য পুরোহিতও  জানেন না ফললাভের বিষয় সম্পর্কে। যদি জানতেন প্রতিমা-বিসর্জন মন্ত্রে বলতেন না—ওঁ আবাহনং ন জানামি, নৈব জানামি পূজনম্। বিসর্জনং ন জানামি ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি ।–অর্থাৎ আমি আবাহনও জানিনা, বিসর্জনও জানিনা, আমাকে ক্ষমা করুন। (দ্রঃ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)

      বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী পূজ্য-প্রতিমা চঞ্চল চিত্তের ধারণের জন্য একটি অবলম্বন। প্রতিমাকে ব্রহ্মের রূপ কল্পনা করে উপাসনা, সংযম, সাত্তিক আহার, সাত্তিক বিহার ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে পূজা করা হয়।–যাতে পূজক বা উপাসক মনসংযোগ দ্বারা প্রতিমাকে হৃদয়ে ধারণ করে প্রতিমার গুণে গুণান্বিত হতে পারে। এই হলো প্রতিমা পূজার মূল কথা।   

*    *    *

      আমাদের আলোচ্য দেবী সরস্বতী প্রতিমার চরণ পদ্মের উপর ন্যস্ত, এর দ্বারা সৃষ্টির বিবর্ত্তনের কথা রূপকে বর্ণিত হয়েছে। মা সরস্বতী হংসের উপর উপবিষ্ট। হংস পরমাত্মার প্রতীক। বীণা থেকে  নাদ বা ধ্বনি উৎপন্ন হয়, তাই বীণা সুরত-শব্দযোগের প্রতীক । পুস্তক বা গ্রন্থ বিদ্যা অর্জনের মাধ্যমের প্রতীক। দেবীর শুক্লবর্ণ সাত্তিকতার প্রতীক। পদ্ম, হংস, বীনা, পুস্তকাদি সজ্জিত শ্বেতবসনা দেবী সরস্বতীর উপাসনার বিষয় তাহলে  বিদ্যা, ব্রহ্ম, পরব্রহ্ম, সৃষ্টিতত্ত্ব ইত্যাদি হওয়া উচিত।   প্রতিমার অলঙ্কারের ওই গুণগুলোর সিলেবাস জানার পরে তো উপাসনার দ্বারা গুণান্বিত হবার প্রশ্ন! সেই সিলেবাসগুলো দেবী সরস্বতী কোন্ পুস্তকে, কোন্ সংহিতায় লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন, সে বিষয়ে বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকা কোথাও কিছু বলে গেছে কিনা আমি জানি না। যদি কেউ জানেন দয়া করে জানালে বাধিত হব। তবে এটুকু জেনেছি, পরব্রহ্মের ব্যক্ত-প্রতীক ‘‘শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা’’ —‘‘তমসার পার অচ্ছেদ্যবর্ণ মহান পুরুষ ইষ্টপ্রতীকে আবির্ভূত’’ হয়েছেন যিনি, তিনি ওই সব বিষয়ের খুঁটিনাটি জানেন এবং সবাইকে জানিয়েও দিয়েছেন বিবিধ স্মৃতি এবং শ্রুতি বাণীর মাধ্যমে।  যিনি মানুষের জীবনের বেঁচে থাকা ও বৃদ্ধি পাওয়ার জীবন্ত আদর্শ স্বরূপ। যিনি পঞ্চবর্হি ও সপ্তার্চ্চি মাধ্যমে সব দেবতার, সব আরাধনার, সব পূজার, সব বিদ্যার সূত্র সন্নিবেশিত করেছেন। যাঁর উপাসনা বাদ দিয়ে কোন  পুতুল পূজা করে কোন কিছুই জ্ঞাত হওয়া সম্ভব নয়। তাঁর নাম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।  যারজন্য সদদীক্ষার শুভ মুহূর্তে ‘‘ওঁ ব্রহ্ম পরব্রহ্ম ও কুলমালিক ……’’ মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে বাহ্যপূজার বিষয়ে উল্লেখ্য পরব্রহ্ম-এর প্রকৃত তত্ত্বকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।

*    *    *

          বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী   সততা, সংযম, ন্যায়নীতি ইত্যাদি মানবিক গুণগুলোর প্রবহমানতাকে বৎসারান্তিক নবীকরণ করার জন্যই বাহ্যপূজা বা মূর্তিপূজা উদযাপনের উদ্দেশ্য। বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ  করলে দেখা যাবে, সরস্বতী পূজাই শুধু নয়, সব পূজার নামে হুজুগে মেতে আহার-বিহারে একটু বেশী করে অসংযমী হয়ে পড়ি আমরা।  নাহলে সরস্বতী পূজা উপলক্ষ্যেও মাংসের দোকানে লাইন পড়ে যায়, যা হিন্দু শাস্ত্রে অভক্ষ্য, নিষিদ্ধ খাবার। যা খেলে আয়ুক্ষয় হয়। হিন্দুদের প্রামাণ্য গ্রন্থ মনু সংহিতা অনুযায়ী ‘মাং’ মানে আমাকে ‘স’ মানে সে,  অর্থাৎ আমাকে সে খেলে আমিও তাকে খাব।  আর আমরা ধর্ম পালনের অজুহাতে, পূজার অজুহাতে শাস্ত্রবিরোধী আচরণ করে হিন্দুত্বের বড়াই করতে চাইছি। এরফলে অহিন্দুরা আমাদের ওপর আঙুল তুলতে সাহস পাচ্ছে।

*    *    *

ভাষা-বিজ্ঞান অনুযায়ী পূজা মানে পূরণ করা, সম্বর্দ্ধিত করা। যে আচার-আচরণ  সাত্তিক জীবন-বর্দ্ধনার অভাবকে পূরণ করে, পরিবেশের জৈবাজৈব সবকিছুকে সম্যকরূপে বর্দ্ধিত করে, তার নাম পূজা।  ‘শ্রেয়-সৃজনী সংহতি ও সমাবেশ’  যা, তার নাম উৎসব। আর যে আচার-আচরণ জীবনবৃদ্ধিকে নন্দিত করে তার নাম আনন্দ। এখন প্রশ্ন,  আমাদের প্রচলিত পূজা, উৎসবের উদযাপন বৃহত্তর পরিবেশকে কতখানি নন্দিত করে  ‘পূজা’ শব্দের যথার্থতাকে উপহার দিতে পেরেছে ? –এইসব বিষয়ে সত্তাপিয়াসী চিন্তাশীলদের চিন্তা করে দেখা উচিত। বিশেষ করে যাঁরা কুসংস্কার বিরোধী রূপে নিজেদের বোধ ও বোধিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান।

*    *    *

      পূজা বিষয়ে হিন্দুদের প্রামাণ্য গ্রন্থগুলো কি বিধান রেখে গেছে, বাহ্য-পূজাবাদীদের তা একবার জেনে নেওয়া দরকার।

       ‘মহানির্ব্বাণতন্ত্র’ নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ  
      ‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ।
      অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’
      ওই মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ‘ভারতে বিবেকানন্দ’ গ্রন্থের  ৩৩৬  পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট। ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’

      ‘‘যে-ব্যক্তি সর্ব্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে।’’ –শ্রীমদ্ভাগবত। ৩-২৯-২২

      “ঈশ্বরঃ সর্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জ্জুন তিষ্ঠতি।
      ভ্রাময়ন্ সর্ব্বভূতানি যন্ত্ররূঢ়ানি মায়য়া।।“
                                    –গীতা, ১৮। ৬৫
      “যিনি এই সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার নিজের স্বধর্মানুরূপ নিষ্কাম কর্মাচরণ দ্বারা (বাক্য বা ফুলজল দ্বারা নহে) পূজা করিয়া মানুষ সিদ্ধি লাভ করে । স্বধর্মানুরূপ (বর্ণানুগ সত্তাধর্ম পালন) নিষ্কাম কর্মই পরমেশ্বরের পূজার ডালি ।”  (গীতা ১৮।৪৬)
       “যে ব্যক্তি সর্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে ।“ (শ্রীমদ্ভাগবত ৩।২৯।২২)

*    *    *

      তাই একটা  প্রশ্ন স্বভাবতঃই জাগে, বিদ্যার্জনের জন্য আমরা যদি বাহ্যপূজার ডালি সাজিয়ে দেবী সরস্বতীর উপর সত্যিসত্যিই নির্ভরশীল হতে পারতাম, তাঁকে বিশ্বাস করতাম, তাঁর প্রতি নিষ্ঠা থাকত, তাহলে বিদ্যা লাভের জন্য তাঁকে নিয়েই পড়ে থাকতাম। প্রভূত অর্থ ব্যয় করে, একে-ওকে ধরাধরি করে স্কুল-কলেজে ভর্তি হয়ে, বিষয় ভিত্তিক প্রাইভেট টিউটরের কাছে টুইশন নিতে যেতাম না, পরীক্ষার হলে অসদুপায়ের আশ্রয় নিতাম না। কারণ, এ-তো দ্বন্দ্বীবৃত্তি, বিশ্বাসকে অপমান করা। অবশ্য না করে উপায়ও তো নাই!  বর্তমানের মোবাইল প্রীতির যুগে, প্রতিমা-পূজায় বিশ্বাসী এমন কি কাউকে পাওয়া যাবে,— যিনি পুরোহিতকে কিছু দক্ষিণা দিয়ে তার সাধের মোবাইলের প্রতিকৃতি বা প্রতিমার পুজো করিয়ে মোবাইলের সব ফিচার উপভোগ করতে পারবে, ডাউনলোড-আপলোড করতে পারবে, হোয়াটস্ অ্যাপে ছবি পাঠাতে পারবে?   প্রতিমা-পূজায় বিশ্বাসী  এমন কোন মেয়ে পাওয়া যাবে, যে তার পছন্দের বর-এর ছবি বা কাট্-আউট পুজো করিয়ে মা হতে পারবে, সুখের দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করতে পারবে?  যদি পারে তাহলে পুরোহিতকে দক্ষিণা দিয়ে সরস্বতী প্রতিমার পূজা করিয়ে বিদ্যা লাভ সম্ভব! নচেৎ কোন পুতুল পুজো করার আগে একটু বোধ-বিবেককে কাজে লাগাতে হবে।

*    *    *  

      বাস্তব বোধের দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে বিচার-বিবেচনা করলে দেখা যাবে, সরস্বতী পূজার ওই মন্ত্রগুলোই শুধু নয়, আমাদের সব কথাই বাক্ হয়ে স্ফূরিত হয় বলে সরস্বতী  বাগ্দেবী রূপে কল্পিত হয়েছেন। অতএব যুক্তি বা বিজ্ঞান অনুযায়ী দেবী সরস্বতী মেধানাড়ীতে সুপ্ত, কণ্ঠে এবং কলমে ব্যক্ত। একাগ্রতার অনুশীলনে মেধানাড়ী জাগ্রত না  করতে পারলে, অর্থাৎ স্মৃতি যদি কাজ না করে মুখস্থ বলা যাবে না, লেখাও যাবে না। মেধানাড়ী ধ্রুবাস্মৃতির কাজ করে। উপনিষদে বর্ণিত আছে, আহার শুদ্ধৌ সত্ত্বাশুদ্ধিঃ, সত্ত্বাশুদ্ধৌ ধ্রুবাস্মৃতি …… । তাই, বিদ্যা লাভ করতে হলে মেধানাড়ীকে জাগ্রত রাখতে হবে। আর, মেধানাড়ীকে জাগ্রত রাখতে  হলে সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন-যাপন—আহার-বিহার, জৈবিক তাগিদ পূরণ, জীবিকার্জন ইত্যাদি ইত্যাদি আহরণসমূহকে শুদ্ধ রাখতে হবে খেয়ালখুশীর প্রবৃত্তি-পরায়ণতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে।    

      বেদবিৎ আচার্য্যের বিধানকে উপেক্ষা করে শিক্ষার নামে, বিদ্যার নামে প্রবৃত্তি-পরায়ণতার বিধি-ব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থায় বা  সরস্বতীর মূর্তি পূজা করে যদি  প্রকৃত বিদ্যা লাভ হতে পারতো, তাহলে তথাকথিত বিদ্যালয়গুলো থেকে অনেক অসৎ-নিরোধী আদর্শবান, বিদ্বান, শ্রদ্ধাবান, চরিত্রবান মানুষের সৃষ্টি হতে পারতো।   বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উপাচার্যকে ঘেরাও করে  ‘হোক কলরব’ সংগঠিত হতো না। ‘মা বিদ্বিষাবহৈ’-এর দেশের বিদ্যালয়ে ছাত্র-রাজনীতির নামে মানুষের প্রতি মানুষের বিদ্বেষ দেখতে হতো না। এসব উল্লেখ করার কারণ, বর্তমানে দুর্নিতীপরায়ণ মানুষদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যাঁরা একসময় বিদ্যাদেবীর আরাধনা করে সমাবর্তন মাধ্যমে আচার্য্য বা উপাচার্য্য স্বাক্ষরিত বিদ্বান আখ্যা বা শংসাপত্র বা ডিগ্রী নিয়েছেন! তাঁদের কি বিদ্বান বলা যাবে ?    

      অথচ এই ভারতবর্ষের রত্নাকর দস্যু সরস্বতীর কোন মূর্তি-পূজা না করেই, আহত-নাদ মর্যাদা-পুরুষোত্তম ‘রাম’-নামের (ম-রা, ম-রা, ম-রা ……..=রাম) সাধন করে দেবী সরস্বতীকে মেধানাড়ীতে জাগ্রত করে হয়েছিলেন বাল্মীকি।

*    *    *

      একদা তমসা নদী থেকে স্নান সেরে ফিরছিলেন। এক তরুশাখে ক্রৌঞ্চ-জুটি পরস্পর খেলছিল। এক ব্যাধ পুরুষ পাখিটিকে তীর মেরে হত্যা করলে স্ত্রী পাখিটি করুণ বিলাপ করতে থাকে। বাল্মীকি বিচলিত হয়ে ‘কোনদিন প্রতিষ্ঠা পাবে না’ বলে ব্যাধকে অভিসম্পাত করেন। সেই অভিশাপ বাণী স্বতঃস্ফূর্ত শ্লোকবদ্ধ হয়ে নির্গত হয়েছিল :–‘‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতী সমাঃ/যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকম্ অবধী কামমোহিতম্।’’ এই শ্লোকটিকে পৃথিবীর সারস্বত সাধকেরা আদি শ্লোক বলে মান্য করেন। অতএব, সারস্বত সাধনার মূল বিষয় মস্তিষ্কে সুপ্ত থাকা মেধানাড়ী বা স্মৃতিবাহী চেতনার জাগরণ।

*    *    *

      মেধানাড়ীকে জাগ্রত করতে হলে লাগে অনাহত-নাদ বা সৎমন্ত্র সাধন। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের বিদ্বান করার জন্য দীক্ষার মাধ্যমে আজ্ঞাচক্রে অনাহত-নাদের সৎমন্ত্র সাধন, স্বতঃ-অনুজ্ঞার অনুশাসন এবং সদাচার মাধ্যমে আমাদের মেধানাড়ীকে জাগ্রত করার সহজ উপায় দান  করেই ক্ষান্ত হন নি, ‘নিয়তং স্মৃতিচিদযুতে’-বাণীতে স্বস্ত্যয়নী ব্রতের মন্ত্রের মাধ্যমে স্মৃতিবাহী চেতনাকে জাগ্রত করার বিধান দিয়ে দেবী সরস্বতীর আরাধনার নিমিত্ত স্থায়ী একটা আসন পেতে দিলেন।   যা’তে আমরা প্রতিনিয়ত সরস্বতী পূজায় ব্যাপৃত থাকতে পারি। আমরা একটু চেষ্টা করলেই সেই বিধিগুলোকে অনুশীলন মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে দেবী সরস্বতীকে সম্বর্দ্ধিত করে, প্রকৃত অর্থে পূজা করে নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ,পবিত্র হতে পারব, বিদ্বান হতে পারব।

      এবার আমরা একটু দেখে নেব বর্তমান বেদবিৎ আচার্য্য শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরস্বতী বিষয়ে কি নিদান রেখে গেছেন।

‘‘বিকাশ-ব্যাকুল গতিই যাঁর সংস্থিতি—

            তিনিই সরস্বতী,

আর, বাক্ বা শব্দই

      যাঁর সত্তা—

                  তিনিই বাগ্দেবী‍;

তাই, যিনিই বাগ্দেবী

                  তিনিই সরস্বতী। ২ ।

বাস্তব উপলব্ধিসম্ভূত

      সার্থক অন্বিত-সঙ্গতিশীল জ্ঞানকেই

                              বিদ্যা বলে। ৩ ।

      সার্থক সর্ব্বসঙ্গতিশীল জ্ঞানই

                              বিজ্ঞান,

                  আর, তা’ই বেদ,

                                    প্রজ্ঞাও তা’ই। ১০ ।’’

                                                              (সংজ্ঞা সমীক্ষা)

       শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রদত্ত উপরোক্ত বাণীতে এটুকু বোঝা গেল যে সরস্বতী আরাধনার মাধ্যম বাক্ বা শব্দ সাধন। শ্রীশ্রীঠাকুর ভাব-সমাধিতে বাক্ বা শব্দের সন্ধান দিতে গিয়ে  ব্যক্ত করলেন,—‘‘নাম-নামী অভেদ, ….. স্থূলে আমার প্রকাশ, সূক্ষ্মে আমার বাস।’’ মহাগ্রন্থ পুণ্যপুঁথির উক্ত বাণীকে স্বীকার করলে বাক্ বা শব্দের অস্তিত্বের আধারও শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। এবং সব দেবতার সমাহারে সৃষ্ট একমাত্র তিনিই ভগবানের অখন্ড সাকার মূর্তি। তিনি ইষ্ট, তিনি ধ্যেয়, তিনি জ্ঞেয় এবং তিনিই পূজ্য। তাঁর আদর্শ মেনে চলে ইষ্টপূজা করতে পারলে সব দেবতার পূজা করা হয়।

——

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s