BE VEGETERIAN

** আহারশুদ্ধৌ সত্তাশুদ্ধিঃ সত্তাশুদ্ধৌ ধ্রুবাস্মৃতি। **

।। আমিষাহার প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বিধান ।।

প্রশ্ন—আমাদের শরীরের পক্ষে যা’ প্রয়োজন তা’ যদি আমিষ-আহার থেকে নিই, তাতে দোষ কী?
শ্রীশ্রীঠাকুর—‘‘আমারও ছেলেবেলায় ঐ ধারণা ছিল। তাই, মাছ আমি নিজে খেয়ে দেখেছি। কিন্তু দেখতাম, যখনই মাছ খেতাম তারপর অন্ততঃ ১২-১৪ দিন পর্য্যন্ত finer vision (সূক্ষ্ম দর্শন)-গুলি কেমন যেন obscure (অস্পষ্ট) হ’য়ে যেত। মনের একাগ্রতাও ব্যহত হ’তো। ছেড়ে দিলে কিছুদিন পরে ঠিক হতো। পরে ভাবলাম, আমি আর কতটুকুই বা জানি। বহুদর্শন থেকে মহানরা যে নিরামিষ-আহারকে শ্রেয় বলেছেন, তাই মেনে চলা ভাল। আর-একটা জিনিস আমি নিজে বোধ করেছি। আমিষাহারী অবস্থায় কোন অসুখ বিসুখ হ’লে শরীর যত vitally affected (গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত) হ’তো, নিরামিষাহারী অবস্থায় তজ্জাতীয় অসুখ-বিসুখে শরীর কিন্তু অতখানি বিপন্ন হয় না। মনুষ্যেতর প্রাণীর দেহ এবং মনুষ্য দেহ সবই জীবদেহের মধ্যে পড়ে, ওরা-আমরা অনেকাংশে এক, অবশ্য বৈশিষ্ট্যানুপাতিক ব্যতিক্রম আছে। যা’ হোক, animal diet (আমিষ-আহার) যে সহজপাচ্য নয়, এটা খুব ঠিক। তার দরুণ শরীরে যে টক্সিনের সৃষ্টি হয়, তাতে মানুষের nerve (স্নায়ু) irritate (উত্তেজিত) ক’রে তোলে, ফলে, সওয়া-বওয়ার ক্ষমতা ক’মে যায়। যে কোন কারণেই হোক, স্নায়ু যার যত অপটু ও সাম্য-সঙ্গতিহারা, তার অহমিকা, ক্রোধ, হিংসা, অসহিষ্ণুতা তত বেড়ে ওঠে। অবশ্য জন্মের থেকে অনেকে হয়তো সুপটু, স্বস্থ স্নায়ু পায়, আমিষ-আহার সত্বেও তাদের স্নায়ুর সওয়া-বওয়ার ক্ষমতা অনেক নিরামিষাশীর থেকে বেশী দেখা যায়, তার মানে কিন্তু এ নয় যে, আমিষ-আহারে তাদের আদৌ কোন ক্ষতি হচ্ছে না এবং নিরামিষ-আহারে তাদের আদৌ কোন উপকার হ’চ্ছে না। প্রত্যেকটার সূক্ষ্ম প্রভাব হ’তেই থাকে।’’ 
(আলোচনা প্রসঙ্গে ৮ম খণ্ড, ১৪-৮-১৯৪৬)
 ★শচীনবাবু—তবে তো অনেক জীবের সংখ্যা অসাধারণ বেড়ে যাবে! সেও তো আর-একটা সমস্যা!
শ্রীশ্রীঠাকুর—পরমপিতার economy (অর্থনীতি)-তে excess (বাহুল্য) হয় না। যে-কোন সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলে, তাকে দিয়ে আবার আমাদের বেঁচে থাকার ব্যাপারে সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শূকরগুলি এমনি কোন কাজে লাগে না, কিন্তু ওগুলি normal (স্বাভাবিক) মেথর-মুদ্দফরাসের কাজ করে। এরও কি একটা দাম নেই? পাহাড়-পর্ব্বতে, বনে-জঙ্গলে কত গাছপালা আছে, যা’ হয়তো এমনি বিশেষ কাজে লাগে না, কিন্তু সেই গাছগুলি হয়তো বৃষ্টি টেনে আনার ব্যাপারে সাহায্য করে। ওর মধ্যে কত গাছের medicinal and other values (ভেষজ এবং অন্যান্য গুণ) আজও হয়তো আবিষ্কার হয়নি। মানুষ অনেক জেনেছে, তবু তার বিশেষ কিছুই জানা হয়নি। অজস্র জানার বাকী আছে, অজস্র করার বাকী আছে। আজ যে পশুটাকে খেয়ে ফেলেছি, একদিন হয়তো দেখতে পাব, তাকে বাঁচিয়ে রেখে তার সুষ্ঠু ব্যবহারে অভাবনীয় জীবনীয় রসদ পেতে পারি।
(সুত্র—আলোচনা প্রসঙ্গে ৮/৫.৬.১৯৪৬)


.
 ★আমিষ আহার প্রসঙ্গে—★

★একটি মা বললেন—বাবা! আমি বাপের বাড়ী গিয়েছিলাম ভাই-এর বিয়েতে, সেখানে আমার অগোচরে ছেলেকে কাকিমা মাছ খাইয়ে দিয়েছে। তারপর থেকে ওর পেট খারাপ করেছে। তা’ আর সারছে না।
শ্রীশ্রীঠাকুর গভীর উদ্বেগের সাথে বললেন—কাম করিছ একখান। ছেলের পেট হয়তো ভাল হ’য়ে যাবে। কিন্তু মগজ ও স্নায়ুর মধ্যে একটা খুঁত ঢুকায়ে দিলে। জীবনে সম্পূর্ণ নিরামিষাশী থাকা ও একদিনের জন্যও মাছ খাওয়া এ দুইয়ের মধ্যে ঢের তফাৎ হ’য়ে যায়। শরীর-মনের মধ্যে একটা adverse factor (প্রতিকূল উপাদান) অনুপ্রবেশ লাভ করে, যার প্রভাব ক্ষীণ হ’তে ক্ষীণতর হতে হ’তেও সারা জীবন ব’য়ে চলে।
(সুত্র—আলোচনা প্রসঙ্গে ৮/২১.৫.১৯৪৬)

।। আমিষ আহার প্রসঙ্গে ।।
একটি মা বললেন—বাবা! আমি বাপের বাড়ী গিয়েছিলাম ভাই-এর বিয়েতে, সেখানে আমার অগোচরে ছেলেকে কাকিমা মাছ খাইয়ে দিয়েছে। তারপর থেকে ওর পেট খারাপ করেছে। তা’ আর সারছে না।
শ্রীশ্রীঠাকুর গভীর উদ্বেগের সাথে বললেন—কাম করিছ একখান। ছেলের পেট হয়তো ভাল হ’য়ে যাবে। কিন্তু মগজ ও স্নায়ুর মধ্যে একটা খুঁত ঢুকায়ে দিলে। জীবনে সম্পূর্ণ নিরামিষাশী থাকা ও একদিনের জন্যও মাছ খাওয়া এ দুইয়ের মধ্যে ঢের তফাৎ হ’য়ে যায়। শরীর-মনের মধ্যে একটা adverse factor (প্রতিকূল উপাদান) অনুপ্রবেশ লাভ করে, যার প্রভাব ক্ষীণ হ’তে ক্ষীণতর হতে হ’তেও সারা জীবন ব’য়ে চলে।
(আলোচনা প্রসঙ্গে ৮ম খণ্ড, ২১. ৫. ১৯৪৬)

।। কোনটা খাব, আমিষ না নিরামিষ ।।

সংকলক—তপন দাস

জনার্দ্দনদা—ডাক্তাররা তো মানুষের ভাল চায়। তবুও তারা flesh diet-এর (আমিষ-আহারের) opinion (মত) দেয় কেন?
      শ্রীশ্রীঠাকুর—Opinion (মতামত) আসে understanding (বুঝ) থেকে।
যার যেমন বুঝ, তার তেমন Opinion (মত) হ’য়ে থাকে। তা’ছাড়া দেখ, তুমি হয়তো ডাক্তার আছ। লোভ ছাড়তে পার না। সেইজন্য ঠিক ক’রে নেছ, মুরগী খাওয়া ভাল। ভাল হওয়ার চাওয়াটা আছে। তাহলে যে-পথে ভাল হয় সেটা ধরা লাগবে তো। কিসে ভাল হয় তা’ যতদিন মানুষ না বুঝবে ততদিন এ-সব থাকবেই। সেইজন্য আমি অত ক’রে যাজনের কথা কই। Existence-কে (অস্তিত্বকে) যা’ energetic push (উদ্যমী প্রেরণা) দেয় তেমনতর চিন্তা-চলন-বলন সবার মাথায় ঢুকিয়ে দিতে হয়।
      জনার্দ্দনদা—অনেক ডাক্তার vegetables (নিরামিষ) ভাল বলেন, কিন্তু meat (মাংস) খাওয়া খারাপ বলেন না। আমাদের তো প্রমাণ দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে কেন meat diet (আমিষ আহার) খারাপ।
      শ্রীশ্রীঠাকুর–প্রমাণ দেব কেমন ক’রে? আমি যা’ দেব, তার against-এও (বিরুদ্ধেও) কত কথা আছে। আবার তুমি যদি নিরামিষ আহারের support-এ (সমর্থনে) বই লেখো, দেখো নে, তোমার support-এ (সমর্থনে) আবার কত volume (খণ্ড) বই বেরিয়ে যাবেনে। Vegetable diet (নিরামিষ আহার) আমাদের system-এর (শরীর-বিধানের) পক্ষে compatible (সঙ্গতিশীল)। Meat diet (আমিষ আহার) কিন্তু তা’ নয়।
      পূজনীয় কাজলদা—পেঁয়াজ খেলে কী হয়?
      শ্রীশ্রীঠাকুর—Undue heat (অবৈধ উত্তাপ) সৃষ্টি হয়। আমি একদিন পেঁয়াজ খেয়েছিলাম। খাওয়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমার জ্বর এসে গেল। কী যন্ত্রণা! পায়খানা ক’ষে গেল। পরে, ভাল হওয়ার পর আমার মনে হ’ল, সবারই এই রকম হয়, মানে undue heat (অবৈধ উত্তাপ) বাড়ায়। খেতে-খেতে শেষকালে সহ্য হ’য়ে যায়। মাংস আমি খেয়েছি কিনা আমার মনে নেই।
      কাজলদা—মাংসকে বলে first class (প্রথম শ্রেণীর) প্রোটিন।
      শ্রীশ্রীঠাকুর (ব্যঙ্গের স্বরে)—First class না last class (প্রথম শ্রেণীর না নিকৃষ্ট শ্রেণীর)?
      কাজলদা—Stomach-এ (পাকস্থলীতে) অন্য প্রোটিন যখন নিতে পারে না, তখনই ডাক্তাররা মাংস দেয়।
      শ্রীশ্রীঠাকুর—System- এ (শরীর-বিধানে) চায় না অথচ তুমি জোর ক’রে দিয়ে যাচ্ছ। এইভাব দিতে-দিতে পঞ্চাশ-ষাট বছরের মধ্যে stomach-এর (পাকস্থলীর) কাম একেবারে সারা হ’য়ে যাবে। যা’ হবার তা’ ওর মধ্যেই হ’য়ে যায়। সত্যি কথা যা’ তা’ এই। যার ইচ্ছা হয় মানবে, যার ইচ্ছা না হয় মানবে না। যেমন প্রতিলোমের কথা আছে। অনেকে এটা মানে, আবার অনেক পণ্ডিত লোকও মানে না। কিন্তু না মানলেও ফল যা’ হবার তা’ হবেই। ওর ফলে, issue-ও (সন্তানও) খারাপ হয়, প্রসূতিও খারাপ হ’য়ে যায়। সেইজন্য আমাদের পূর্ব্বপুরুষরা, বামুনের ঘরে যদি কায়েতের মেয়ে আসত, তার হাতে খেত। কিন্তু যে বামুনের মেয়ের সাথে কায়েতের বিয়ে হত, তার হাতে কোনদিন খেত না। আবার দেখ, আজকাল ডাইভোর্স করে লোক, কিন্তু Christ (খ্রীষ্ট) এটা vehemently oppose (কঠোরভাবে নিষেধ) ক’রে গেছেন। হজরত মহম্মদ support (সমর্থন) করেননি কোথাও। তিনি আরো বলেছেন, গোমাংস সর্ব্বরোগের আকর, গোদুগ্ধ অশেষ উপকারী। মহাপুরুষদের কথা সকলেরই এক।

(‘দীপরক্ষী’ পঞ্চম খণ্ড থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)

।। কোনটা খাব, আমিষ না নিরামিষ ।।

সংকলক—তপন দাস

সর্বশ্রেষ্ঠ হিন্দু ধর্মগ্রন্থ মহাভারতের অনুশাসনপর্ব ১১৪ অধ্যায়ে  বলা হয়েছে—
“যে ব্যক্তি মোহ প্রভাবে পুত্র-মাংস-তুল্য অন্যজীবের মাংস ভক্ষণ করে, সে অতি জঘন্য প্রকৃতির এবং তার সেই জীবহিংসা বহুবিধ পাপযোনিতে জন্মগ্রহণ করবার একমাত্র কারণ বলে নির্দিষ্ট হয়।“

শুধু হিন্দু মতেই নয়, কোন ধর্মীয় মতবাদে জীবহত্যা স্বীকৃত নয়।  

কোরানে, আর্য্য হিন্দু-শাস্ত্রে এবং পুরুষোত্তমদের বাণীতে কোথাও ‘বলিদান’ বা ‘কোরবাণী’-র নামে প্রাণী হত্যার অনুমোদন নেই।

       ‘কোরবাণী’ কথাটির উৎপত্তি  আরবীর ‘কুরবান’ থেকে। ‘কুরবান’ মানে উৎসর্গ, বলি। আবার বলি মানে দান। তন, মন, ধন কর কুরবানী অর্থাৎ কায়, মন, ধন পরমেশ্বরের জন্য উৎসর্গ কর। এই আত্মোৎসর্গ বা আত্ম-বলিদানই প্রকৃত বলি বা কোরবাণী।

মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ আল-কোরানে বলা হয়েছে, “এদের মাংস আর রক্ত আল্লাহর কাছে পৌছায় না, কিন্তু তোমার ভক্তি তার কাছে পৌছায়।”  (সুরা ২১/৩৭)

“আল্লার নিকট তাহার মাংস ও তাহার রক্ত কখন পৌঁছে না বা তিনি তাহা ইচ্ছা করেন না। বরং তোমরা অসৎকর্ম্ম হইতে নিজেকে রক্ষা কর ইহাই তিনি ইচ্ছা করেন। তিনি  আমাদের অধীনে থাকিয়া কার্য্যনির্বাহের জন্য পশু সৃষ্টি করিয়াছেন—সেজন্য তোমরা খোদার নিকট নম্র ও নিরীহ হইতে শিক্ষালাভ করিবে। এই সৎপথ-প্রাপ্তির অর্থাৎ সৎ-শিক্ষার জন্যই খোদা এই ব্যবস্থা করিয়াছেন। যাহারা অন্যের মঙ্গল সাধন করে, তাহাদের মঙ্গল করিয়া থাকেন  ……..”  (কোর-আণ—২২ হজ ৩৭ র, ৫) অথচ কোরবানীর নামে অবাধে নিরীহ পশুদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়!

ভগবান বুদ্ধদেব বলেছেন, “আমি কখনই কাউকে মাংস খাওয়ার অনুমোদন করি নি, করি না এবং করব না।” (লঙ্কাবতার সূক্ত)

প্রভু যিশু বলেন, “তুমি হত্যা করিও না” । (এক্সোডাস – 20:13)
“যে একটি ষাড়কে হত্যা করলো, সে যেন একটি মানুষকে হত্যা করলো।”  (ইসা – 66:33)

উক্ত অনুশাসনবাদ আমাদের  স্মরণ করিয়ে দেয়, যে নিজেকে পরমেশ্বরের সন্তান  বা খোদাতাল্লার বান্দা মনে করবেন তিনি কখনই কোন প্রাণীকে ব্যথা দেবেন না, হত্যা করবেন না এবং প্রাণীর রক্ত-মাংসে ক্ষুধার নিবৃত্তি করবেন না।

——

Leave a comment