Featured

যোগীর সাথে যোগাযোগ

যোগীর সাথে যোগাযোগ : ‘‘যোগাৎ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধ’’                                                           –তপন দাস

বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, “যোগী মানেই বুঝবেন—যে যুক্ত, যার যোগ আছে অর্থাৎ কিছু বা কাহাতেও টান আছে,—এক-কথায় আসক্ত, কোন-কিছু বা কাহাতেও আসক্ত।  আসক্তি থাকলে ভাবা, করা, কওয়ায় মানুষের যেমন-যেমন যা’-যা’ হয়, তাই করাই হচ্ছে যোগী বা যুক্ত বা অনুরক্ত মানুষের লক্ষণ। ……তাই, শাস্ত্রে যেখানেই যোগ বলে কথা আছে সেখানেই বুঝতে হবে, সে-কথা বাস্তব কিছুতে যুক্ত হওয়ারই কথা। আর, এই যোগ হলেই মানুষের চিত্তবৃত্তিনিরোধ হতে সুরু করে, কারণ, যাতে আমার টান যত বেশী, আমার সাধারণ প্রবৃত্তিই হয় আমার সমস্ত বৃত্তি দিয়ে তাকে উপভোগ করি—আর তার বাধা যেগুলি, সেগুলিকে এমনতরভাবে বিনিয়ে আমার এই উপভোগের পথের কোনরকম বাধা না সৃষ্টি করে বরং তার সাহায্য করে এমনতরভাবে নিয়ন্ত্রিত করতে একটা স্বতঃ-উৎসারিত ঝোঁক আমাদের থাকেই। তাই শাস্ত্রে আছে “যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ’’। (কথাপ্রসঙ্গে, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৩)

      আধ্যাত্মিক চেতনায় একনিষ্ঠ না হলে যোগের সাথে নিত্য-যুক্ত থাকা যায় না। সে বিষয়েও শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের সচেতন করার জন্য বললেন, ‘‘গীতায় আছে, ‘তেষাং জ্ঞানী নিত্যযুক্ত একভক্তির্বিশিষ্যতে’………একভক্তি না হলে হবে না । পঁচিশ ঠাকুর করলেই মুস্কিল, বহু-নৈষ্ঠিক যারা তাদের জীবনে কোন সঙ্গতি থাকে না, তারা আস্তে আস্তে পাগলাটে হয়ে ওঠে । বহু-নৈষ্ঠিক মানে মূলতঃ তার কিছুতেই নিষ্ঠা নেই, নিষ্ঠা আছে রকমারি প্রবৃত্তি-স্বার্থে, তাই আত্মনিয়ন্ত্রণ বলে জিনিসটা তাদের জীবনে ঘটে ওঠে না, ফলে অভিজ্ঞতা বা জ্ঞানের উন্মেষ হয় না । ভক্তি ছাড়া, একানুরক্তি ছাড়া জ্ঞান ফোটে না । …..একভক্তি যার আছে… তার জ্ঞানের নাড়ী হয় টনটনে । কথায় বলে প্রহ্লাদমার্কা ছেলে. ……আগুনে, জলে, পাহাড়ে, পর্ব্বতে, অন্তরীক্ষে কোথাও ডরায় না ।…. তাই ভক্তির চাইতে বড় কামনার বস্তু আর নেই  ……।’’ ( আ. প্র. ২য় খন্ড, ২০. ১২. ১৯৪১)

      নিজেকে যোগযুক্ত রাখতে  শ্রীশ্রীঠাকুর সর্বদা সচেতন থাকতেন।  একদিন একটা সুপুরীর টুকরো মুখে দিতে গিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে নীচে পড়ে যায়। ঠাকুর খাট থেকে নেমে সুপুরীর টুকরোটাকে খুঁজে পিকদানিতে ফেলে হাত ধুয়ে খাটে উঠে বসেন।   আর একটা সুপুরীর টুকরো মুখে দেন। সামান্য এক টুকরো সুপুরী, তা-ও আবার খুঁজে নিয়ে ফেলে দিলেন। এই সামান্য কাজটা তো যে কেউ করতে পারত, তার জন্য  খাট থেকে নেমে কষ্ট করে সুপুরী খুঁজতে গিয়ে  অমূল্য সময় নষ্ট করার পেছনে কোন লাভজনক যুক্তির খোঁজ না পেয়ে উপস্থিত যুক্তিবাদীরা অনুযোগ করলে ঠাকুর বলেছিলেন, তোমাদের হিসাবে  আমি বেকুব, আমার হিসাবে আমি কিন্তু চালাক।   আমার হাতের সাথে মুখের স্নায়বিক যোগসূত্র ছিন্ন হবার ফলে আমি যোগভ্রষ্ট হই, সুপুরীটা নীচে পড়ে যায়। প্রারব্ধ কর্মফলে ওই অপারগতা যাতে যোগ না হয় তাই একটু সময় নষ্ট করে নিজের ত্রুটি নিজেই সংশোধন করে নিলাম।    

      যোগ বোঝাতে গিয়ে ঠাকুর একদিন   গল্পচ্ছলে বলেছিলেন, এক গোয়ালার অনেকগুলো গোরু ছিল। ওই গোরুগুলোর দুধ এবং দুগ্ধজাত ছানা, দৈ, ঘোল, মাখন, ঘি নিজেরা খেত, পাড়াপড়শীদেরও দিত। গোয়ালার বয়স হওয়াতে ছেলেকে একদিন একটা পাঁচন হাতে দিয়ে গোরু চরাবার ভার দেয়। ছেলে মাঠে নিয়ে গোরুগুলোকে চরতে দিয়ে দেখল, একটা পাঁচনের লাঠি দিয়ে কিছুতেই গোরুগুলোকে বাগে আনতে পারছে না। এদিক-ওদিক চলে যাচ্ছে। তাই সে ভাবল, একটা পাঁচন দিয়ে সব গোরু সামলানো যাবে না। সে তখন  একমনে এক-একটা গোরুর জন্য আলাদা আলাদা পাঁচন বানাতে শুরু করলো। পাঁচন বানানো শেষ করে গোরু সামলাতে গিয়ে দেখে নির্দিষ্ট স্থানের কাছাকাছি গোরুগুলো নেই, চরতে চরতে অনেক দূরে দূরে জঙ্গলে চলে গেছে। ওদিকে বেলা গড়িয়ে গোধূলি-প্রায়। ছেলে নিরুপায় হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে গিয়ে সব কথা খুলে বললে বাবা কোন তিরস্কার না করে ছেলেকে বুঝিয়ে বলেন, “বাপু, এক পাঁচনেই লাখ গোরু ঠেকানো যায়। যার যেমন দরকার, তেমনতর ঠক্কর মারলেই তো হয় ! তোমার এই অতিবুদ্ধি সব বেসামাল করে ফেলেছে।’’ (কথাপ্রসঙ্গে, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৪) অবশেষে বাবার কাছ থেকে গোরুর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী  ঠক্কর মারার কায়দা শিখে ওই এক পাঁচনের সাহায্যেই গোরুগুলোকে বাগে আনতে শিখে যায়।

      ওই ঠোক্কর মারার কায়দা যিনি শেখাতে পারেন তিনিই ঠাকুর, তিনিই যোগসিদ্ধ গুরু। যোগসিদ্ধ গুরুর কাছ থেকে কাকে, কখন, কতটুকু ঠোক্কর কিভাবে মারতে হবে সেই কায়দা একবার শিখে নিতে পারলে আমাদের বিশৃঙ্খল ইন্দ্রিয়গুলোকে একমুখী আসক্তির সাথে যুক্ত করে যোগ-কে উপলব্ধি করা যায়। তাহলে পালের গোরুগুলো পালেই থাকবে, বেশী কায়দা করতে গেলে গোরুগুলো পালছাড়া হয়ে যাবে।

      যোগসিদ্ধ গুরু শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর নিত্যলীলায় যোগশাস্ত্রে বর্ণিত আসন-মুদ্রাদি তিনি কোন কালেই অভ্যাস করেন নি। তিনি ছোটবেলা থেকেই নামধ্যান করতেন। তিনি তাঁর ভাগবত আন্দোলন কীর্তন দিয়ে শুরু করেছিলেন। কীর্তন করতে করতে সমাধিস্থ হতেন। সেই সময় যোগশাস্ত্রে বর্ণিত সকল ধরণের আসন-মুদ্রাদি অবলীলায় করতেন। তিনি কীর্তনের মাধ্যমে অনেকানেক পালছাড়াদের পালে ভেড়ালেন। তারা আবার যাতে পালছাড়া না হয়ে পড়ে তারজন্য কাজে মাতিয়ে দিয়ে গড়ে তুললেন ভারতীয় আর্য্য ভাবধারার নিদর্শন স্বরূপ এক আদর্শ প্রতীকী রাষ্ট্র—হিমাইতপুর সত্সঙ্গ আশ্রমে। ব্যক্তি, দম্পতি, গৃহ, সমাজ ও রাষ্ট্র জীবনকে শুদ্ধ-বুদ্ধ-পবিত্র করে এক যোগে বাধতে দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ, কৃষি ও শিল্পের নবীকরণ করলেন। 

      শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাগবত আন্দোলনের কীর্তনযুগের সাধকেরা কীর্তনের এবং নামের শক্তি সঞ্চারণা করে রোগ-শোক-ব্যাধি-জরা-য় জর্জরিত, প্রবৃত্তি-পীড়িত মানুষদের স্বাভাবিক জীবনে অধিষ্ঠিত করে অমৃতের সন্ধান দিয়েছিলেন। অনুরূপভাবে তাণ্ডবনৃত্যে কীর্তন, আর নিয়ম করে নামধ্যান করতে পারলে নিজেকে এবং পরিবেশকে সবদিক দিয়ে যে সুস্থ রাখা সম্ভব, তা বলাই বাহল্য। 

      জীবাত্মাকে পরমাত্মার সাথে প্রতিনিয়ত যোগযুক্ত রাখতে শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর অনুগামীদের একটা ছোট্ট নিদেশ-বাণীতে সব বুঝিয়ে দিলেন।

      ঊষা-নিশায় মন্ত্রসাধন

            চলাফেরায় জপ

      যথাসময়ে ইষ্টনিদেশ

            মূর্ত্ত করাই তপ।

      মন্ত্র সাধনের জন্য সকাল-সন্ধ্যায় নিয়ম করে ধ্যানাভ্যাস করা। প্রতিবার ধ্যানান্তে ‘আমি অক্রোধী, আমি অমানী’ ইত্যাদি স্বতঃ-অনুজ্ঞার অর্থগুলোকে আয়ত্ত করতে পারলে প্রবৃত্তির নিগ্রহ থেকে সহজেই মুক্তি লাভ করা যায়। ধ্যান করার পর দিগন্তের দিকে, সবুজের দিকে তাকালে চক্ষুর দৃষ্টি ভাল থাকে। চলাফেরায়, কাজেকর্মে, শয়নে-স্বপনে ইষ্টে অনুরাগ সমন্বিত হ’য়ে নামজপ করার অভ্যাসে পরমাত্মিক শক্তির স্বারূপ্য লাভ হয়। নিয়মিত শবাসন করলে হৃদরোগ হবার আশঙ্কা থাকে না। নিয়মিত থানকুনি পাতা খেলে শরীর বিধানের রেচনক্রিয়া সুস্থ থাকে। সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার, মাসান্তে কমকরে একটি দিন, হবিষ্যান্ন গ্রহণ, পাতিত্য কর্ম থেকে ত্রাণ পেতে শিশু প্রাজাপত্য, প্রাজাপত্য এবং মহাসান্তপন ব্রত পালনে শরীর-মনের অসঙ্গতি দূর হয়, শরীর নিরোগ থাকে।

      নাম জপ করা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন—নাম করলে অনেক সময় জ্বর কমেও যায়। কারণ, ব্যাকটেরিয়াগুলি পুড়ে যায়। রোগীর শরীর ছুঁয়ে নাম করলে তাতেও রোগ ভাল হয়। ঐ জন্য কুষ্টিয়াতে একটা দালানে ত্রিশটা bed (শয্যা) ছিল। রাধারমণ প্রভৃতি ছিল। রোগী আসলে শুশ্রূষা করত, ছুঁয়ে নাম করত। ডবল নিউমোনিয়া ৩/৪ দিনে, এমনকি রাতারাতি সেরে যেত।
                                              (সুত্র—আলোচনা প্রসঙ্গে ১৮ খণ্ড)

আমাদের আর্য্যহিন্দু-শাস্ত্র এবং যোগশাস্ত্র অনুসারে সূর্যোদয়ের পর শয্যাত্যাগ করলে পাতিত্যদোষে দুষ্ট হতে হয়। এবং প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ উপবাসী থাকার নিদেশ দেওয়া আছে। শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের ওই পাতিত্যদোষ থেকে মুক্ত করে নিয়ত যোগযুক্ত রাখতে দিনচর্যার এক সহজ নিদেশ দিলেন অনুশ্রুতি গ্রন্থের বাণীতে। 

      ঊষার রাগে উঠবি জেগে শৌচে শীতল হবি,

      সন্ধ্যা–আহ্নিক জপ সাধনায় ঈশের আশিস লবি।

      কুতুহলে পড়শি ঘুরে দেখবি সযতনে,

      আছে কেমন কোথায় কে জন মন দিবি রক্ষণে।

      তারপরেতে বাড়ী এসে শৌচে যথাযথ,

      গৃহস্হালীর উন্নয়নী অর্জ্জনে হ’ রত।

      স্নানটি সেরে আহ্নিক করে ক্ষুধামতন খাবি,

      একটু চলে বিশ্রাম নিয়ে আগুয়ানে ধাবি।

      এমনি তালে সচল চালে চলে সন্ধা এলে,

      শৌচে শুদ্ধ হয়ে করিস আহ্নিক হৃদয় ঢেলে।

      উন্নয়নের আমন্ত্রনী গল্প-গুজব শীলে,

      হৃষ্টমনে আলোচনায় কাটাস সবাই মিলে।

      পড়শী দিগের অভাব-নালিশ থাকেই যদি কিছু,

      তার সমাধান যেমন পারিস করিস লেগে পিছু।

      করন-চলন ধরন-ধারন যজন যাজন কিবা,

      সকল কাজেই ইষ্টস্বার্থে চলিস রাত্রি-দিবা।

      আদর-সোহাগ উদ্দীপনী কথায় কাজে ঝুঁকে,

      স্বার্থ-কেন্দ্র সবার হবি ধরবি ইষ্টমুখে।

      বিশ্রামেরই সময় গা-টি ঘুমল হয়ে এলে,

      ইষ্ট-চলন মনন নিয়ে ঘুমে গা দিস ঢেলে।

      (অনুশ্রুতি গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)

      শ্রীশ্রীঠাকুর আহ্বানীসহ পূর্ণাঙ্গ প্রার্থনা মন্ত্রে আচমন, বাংলা সমবেত প্রার্থনা ও বাংলা সমবেত প্রার্থনার অবশিষ্টাংশ সন্দর্ভে কতগুলো সহজ আসন এবং প্রাণায়ামের নিদেশ রেখে গেছেন। সেই নিদেশ মেনে আমরা যদি সঠিক অনুশীলন করতে পারি তাহলে সহজ-যোগে ব্যাধিমুক্ত হয়ে পরমাত্মার সাথে যোগযুক্ত থাকতে পারব।  (দ্রঃ ঋত্বিগাচার্য্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য প্রণীত অনুসৃতি, যতি-ঋত্বিক শ্রীশরত্চন্দ্র হালদার প্রণীত যুগবাণী এবং সত্সঙ্গ পাব্লিশিং কর্তৃক প্রকাশিত প্রার্থনা শিরোনামের গ্রন্থাবলী।)

      শ্রীশ্রীঠাকুরের এক অনন্য দৈবী অবদানের নাম ইষ্টভৃতি। ইষ্টের প্রীতির জন্য কাউকে পীড়িত না করে, নিজে পীড়িত না হয়ে, বর্ণানুগ কর্মের সেবার মাধ্যমে, বৃহত্তর পরিবেশে, ঘটে ঘটে ইষ্ট স্ফূরণের বা মঙ্গল প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত থাকার বিনিময়ে অযাচিত প্রাপ্ত অর্থ বা সম্পদকে বলা হয়েছে অনুগ্রহ অবদান । ওই অনুগ্রহ অবদানকে ঠাকুর ‘দিন গুজরানী আয়’ অভিধায় ভূষিত করেছেন। ওই ‘দিন গুজরানী আয়’-এর অগ্রভাগ প্রতিদিন পানাহার করার পূর্বে ইষ্ট-নীতি ভরণের শপথ করে নিবেদন করার নাম ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ। যা নিখুঁতভাবে পালন করলে শরীর-মন-আত্মার অসঙ্গতি দূর হয়। আর্য্যকৃষ্টির সদাচার এবং বর্ণাশ্রম ধর্ম রক্ষিত হয়।

      শ্রীশ্রীঠাকুরের  আর একটি অনন্য দৈবী অবদানের নাম স্বস্ত্যয়নী ব্রত। প্রবৃত্তির সব বিপাক এবং গঞ্জনা থেকে মুক্ত করে আমাদের স্মৃতিবাহী চেতনায় সমৃদ্ধ রাখতে প্রবর্তন করলেন পঞ্চনীতি সমন্বিত স্বস্ত্যয়নী ব্রতের। জড়-পদার্থে নির্মিত মন্দিরের পরিবর্তে নিজ-নিজ দেহটাকেই শ্রীবিগ্রহ মন্দির জ্ঞানে পবিত্রতার সাথে রক্ষা করতে নিদেশ দিয়েছেন এই ব্রতের মাধ্যমে, যেহেতু এই দেহের মধ্যেই রয়েছে পরমাত্মার আবাসস্থল। ভোগ, দুর্ভোগ, উপভোগ, মুক্তি, পরামুক্তি, পরাগতি সবকিছুই এই দেহের মধ্যেই। যা নাই ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে এই দেহভাণ্ডে।  আমাদের আর্য্য শাস্ত্রাদিতেও একথার উল্লেখ রয়েছে। শ্রীশ্রীঠাকুর জীবাত্মার মধ্যে সুপ্ত পরমাত্মাকে জাগাতে বলেছেন নামের মাধ্যমে। ৫টি কর্মেন্দ্রিয়, ৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয়, মন, বিবেক, জীবাত্মা, পরমাত্মাদির সমন্বয়ে সৃষ্টি এই দেহমন্দিরকে পবিত্র রাখার, সুস্থ-স্বস্থ রাখার ভাগবত-বিধির পালন-পদ্ধতি সহজভাবে বিধায়িত করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর এই ব্রতের মাধ্যমে।  

      শ্র্রীশ্র্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রবর্তিত যজন, যাজন, ইষ্টভৃতি, স্বস্ত্যয়নী, সদাচারাদি নিখুঁতভাবে পালন করার নাম ইষ্টকর্ম। ইষ্টকর্ম ব্যতীত কর্ম অনিষ্টকর্ম। সেই ইষ্টকর্মে যুক্ত থাকলে সহজেই যোগসিদ্ধ হওয়া যায়।  

      কাম-আবেশে স্ত্রী-পুরুষে

            যেমন করে উপভোগ,

      ইষ্টকাজে বাস্তবতায়

            তেমনি হলে তবেই য়োগ। 

      সব প্রবৃত্তি রত থাকে

      ইষ্টকর্ম লয়ে,

      সেই তো যোগী, সে-ই সন্ন্যাসী

      কাল নত যার ভয়ে।

      কালাধীশ ঠাকুরের চাহিদামত ইষ্টকর্ম করে একবার যোগী হতে পারলে চিরতরে নিশ্চিন্ত, কালের কবলে পড়ে ভীত হতে হবে না, কাল হবে যোগীর অধীন।

      পরিশেষে জীবনপিয়াসী মানুষদের কাছে, ইষ্টপ্রাণ দাদা ও মায়েদের কাছে পরমপিতার এই দীন সন্তানের কাতর আবেদন, আমরা যেন নিত্য ইষ্টকর্মের মাধ্যমে পরমপিতার সাথে যোগযুক্ত থেকে পরিবেশের সব্বাইকে জীবনের জয়গানে যুক্ত করে নিতে পারি। সবাই যেন মুক্তকণ্ঠে বলতে পারে, ‘আমি সবার, আমার সবাই।’

                              ——

SARASWATI POOJA

।। প্রসঙ্গ : দেবী সরস্বতী, বিদ্যা, পূজা ও আমরা ।।

                                                নিবেদনে—তপন দাস

      অবক্ষয় আমাদের দরজায় যতই কড়া নাড়াক না কেন লর্ড মেকলে সাহেবের দাক্ষিণ্যের দৌলতে  আমাদের সমাজে শিক্ষিত হবার প্রবণতার হার কিন্তু ক্রমশঃ বর্দ্ধমান। মুখে বুলি ফুটতে না ফুটতেই সন্তান-সন্ততিদের লেখাপড়া শেখাতে এতটুকু কার্পণ্য করি না আমরা। এ বিষয়ে বাবাদের চাইতে মায়েদের আগ্রহ একটু বেশীই।  লেখাপড়া শেখাতে স্কুলে ভর্তি করে, একাধিক প্রাইভেট টিউটর রাখে,  পাশাপাশি হোম-ওয়ার্ক না করতে পারলে  ‘মাথা ফাটিয়ে ঘিলু বার করে দেব, মেরে ফেলব, কেটে ফেলব’ ইত্যাদি বিশেষণের শাসনবাক্যে যুগধর্মের শিক্ষায় সন্তানদের শিক্ষিত করতে মায়েরা যেভাবে পরিশ্রম করে চলেছেন তার তুলনা হয় না! লেখাপড়া মানেই বিদ্যার্জন করা। বিদ্যার্জন করতে স্কুল, টিচার, বই-খাতা-কলম ইত্যাদি আনুসঙ্গিকের পাশাপাশি বিদ্যাদেবীর আরাধনাটাও আবশ্যিক! তাই উত্তরায়ন-সংক্রান্তি পরবর্তী শুক্লা-পঞ্চমী বা শ্রীপঞ্চমী তিথিকে কেন্দ্র করে ঘরে-ঘরে, বিদ্যালয়ে-বিদ্যালয়ে, পাড়ার ক্লাবে, রাস্তাঘাটে সরস্বতী পুজোর সাড়া পড়ে যায়। এমনিতে একটু বেলা পর্যন্ত শুয়ে থাকা পড়ুয়ারাও সেদিন সকাল-সকাল উঠে নিম-হলুদ মেখে স্নান সেরে নেয়।  (নিম-হলুদ মাখলে শরীরের রোগ-প্রতিরোধী শক্তি বৃদ্ধি পায়।) তারপর সেজেগুজে যে-যেখানে সুবিধা পায় আগেভাগে অঞ্জলি দেবার কাজটা সেরে নিতে বিদ্যাদাত্রী সরস্বতীর প্রতিকৃতির সামনে কঠিন বিষয়ের বইপত্রগুলো জমা দিয়ে অপেক্ষায় থাকে কতক্ষণে পুরুতঠাকুর অঞ্জলি দেবার জন্য ডাকবেন। অঞ্জলি দেওয়া শেষ করে সরস্বতী-ঠাকুরের কাছে পাশ করার আর্জিটা জানিয়ে, প্রসাদ খেয়ে পুজোর মুখ্যপর্বটা শেষ করে গৌণপর্বে প্রবেশ করে। কচিকাচারা পরিজনদের হাতধরা হয়ে, কিশোর-কিশোরীরা বন্ধু-বান্ধবদের সাথে বিদ্যালয়ে  যায়, খাওয়া-দাওয়া হয়। খাওয়া-দাওয়া সেরে  ঘুড়ি ওড়ানো,  দল বেঁধে ঘুরে ঘুরে  প্রতিমা দেখে বেড়ানো।   বড় হয়ে ওঠার সোপানে পা-রাখা হেটেরো-সেক্সুয়াল কমপ্লেক্সের অবদানের টেস্টোটেরন হরমোন-প্রপীড়িত ওভারস্মার্ট ছাত্ররা, ফলিকল-স্টিমুল্যাটিং হরমোন-প্রপীড়িত ওভারস্মার্ট ছাত্রীরা পছন্দের জনকে প্রপোজ করার সুযোগ খোঁজে, কেউ আবার একটু ঘনিষ্ট সান্নিধ্য পেতে চায় ভ্যালেনটাইন-উইক কালচারে সমৃদ্ধ হতে। পাড়ায় রাতে হবে মাংস-ভাতের পিকনিক। শুধু পাড়াতেই  নয় সরকার পরিপোষিত অনেক প্রাথমিক বিদ্যোলয়েও (যেখানে হিন্দু শাস্ত্রমতে বিদ্যালাভের পরিপন্থী, অভক্ষ্য ডিম সহযোগে ছাত্রদের মিড-ডে মিল খাওয়ান হয়।)  পুজোর দিনটির পবিত্রতা বজায় রেখে পরেরদিন মাংস-ভাতের পিকনিক করা হয়েছে। আসছে বছর আবার হবে!—কি হবে ?

      ‘‘ওঁ ভদ্রকাল্যৈ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈ নমো নমঃ।

      বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ-বিদ্যাস্থান্যেভ্যঃ এব চ।। ……’’ পুরোহিতের বলা ইত্যাদি মন্ত্র অনুসরণ করে পুষ্পাঞ্জলি দিতে হবে।

      ‘‘জয় জয় দেবী চরাচর সারে কুচযুগ শোভিত  মুক্তাহারে।

      বীণা রঞ্জিত পুস্তক হস্তে ভগবতী ভারতি দেবী নমোহস্তুতে।।

(কোন পণ্ডিত উক্ত মন্ত্র রচনা করেছিলেন আমি জানি না । তবে এটুকু বুঝি, যে স্তনযুগল মাতৃত্বকে সমৃদ্ধ করার জন্য সৃষ্ট, বৃত্তিতন্ত্রীদের সুড়সুড়ি দিতে তাকে মুক্তার হারের আভরণে সজ্জিত না করলেই ভাল করতেন। কারণ বিদ্যালাভ  মস্তিকের মেধানাড়ীতে সুপ্ত মানবিক-সাত্ত্বিক গুণের অনুশীলনে সম্পাদিত হয়, বক্ষ-সৌন্দর্যের সজ্জিত বিজ্ঞাপনে নয়।) 

ওঁ সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে।

বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্বি বিদ্যাং দেহী নমোহস্তুতে।।’’— পুরোহিতের বলা ইত্যাদি মন্ত্র অনুসরণ করে প্রণাম জানাতে হবে। …….তারপর সেই,—খাওয়া-দাওয়া, হৈ-হুল্লোর— ছোটদের বড় হবার রিহার্সাল, বড়দের নস্টালজিয়ার স্মৃতিচারণ ……. আসছে বছর আবার হবে!  

      ওইসব  উচ্চারিত মন্ত্র অনুযায়ী দেবী সরস্বতীই বিদ্যাদাত্রী, তাকে সাধনা করতে পারলেই বিদ্যার সিলেবাস বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ জ্ঞাত হওয়া যাবে। খুব ভালো কথা। সাধনা দিয়েই তো সিদ্ধি পেতে হবে।

*    *    *

      মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী আমরা যা বলি বা সংকল্প করি বাস্তবে তা যদি না করি স্নায়ুমন্ডলীতে জটিলতার সৃষ্টি হয়, আধ্যাত্মিক জগতে যাকে অনাগত প্রারব্ধ কর্মফল বলে।  অথচ আমাদের শিক্ষকেরা এই পূজার দিনটিতে অঞ্জলিমন্ত্র, প্রণামমন্ত্র আওড়ানো ব্যতীত বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ শিক্ষা বিষয়ে ছাত্রদের  উৎসাহ না দিয়ে প্রচলিত সিলেবাসের বিষয়ভিত্তিক খাতাবই কেনা, নোট কেনা, কোচিং-করানোর দিকে উৎসাহ দেয়। বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ জিনিসটা যে কি বেশিরভাগ পড়ুয়ারা জানেই না, অথচ শিক্ষার আবশ্যিক বিষয় জ্ঞানে বাধ্যতামূলকভাবে বছর-বছর আবৃত্তি করে চলে, সরস্বতী পূজার দিনটিতে। এর নাম দ্বন্দ্বীবৃত্তি, অর্থাৎ মুখে যা বলছি, কাজে তা করছি না। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতে যা মহাপাপের কারণ।

*    *    *

      সংস্কৃত বিদ্ִ ধাতু থেকে বেদ এবং বিদ্যা শব্দের উৎপত্তি। যার অর্থ জ্ঞান, বিচরণা, অস্তিত্ব, প্রাপ্তি।  বিদ্যা লাভ যার হয়, অস্তিত্ব বজায় রাখার জ্ঞান তার হয়। তার বিচারশক্তি হয়, জীবনচলনায় ভালটাকে বেছে নিয়ে সে এগিয়ে চলে মূল প্রাপ্তি বা গন্তব্যের দিকে। যার চরম ঈশ্বরপ্রাপ্তি। ভাষাবিদ জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস মহোদয় কৃত অভিধানানুসারে, ‘‘যদ্দারা ব্রহ্ম হতে ব্রহ্মান্ড পর্য্যন্ত যাবতীয় পদার্থের সত্যবিজ্ঞান লাভ হইয়া যথাযোগ্য উপকার প্রাপ্ত হওয়া যায় তাহাই বিদ্যা ; যদ্দারা অক্ষর পুরুষকে জানা যায়।’’ ওই বিদ্যায় বিদ্বান হয়ে ছাত্রদের জানাবার কাজটি যিনি করেন তিনি শিক্ষক বা আচার্য্য।

বেদ বা জ্ঞান-এর দুটো দিক, আধ্যাত্মিক ও জাগতিক। যা জানলে মানুষের জীবনের পূর্ণতা লাভ হয়, বিদ্যা লাভ হয়।  বেদের বিদ্যা দু প্রকার পরা ও অপরা।  শিক্ষা (phonetics), কল্প, ব্যাকরণ, ছন্দ, জ্যোতির্বিদ্যা (astronomy)  ও নিরুক্ত (শব্দতত্ত্ব) ইত্যাদি নামের বেদের ৬টি শাখার নাম বেদাঙ্গ। সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ্  নামে বেদকে চারভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। যার অন্ত ভাগের নাম বেদান্ত বা উপনিষদ।  ‘আত্মানং বিদ্ধি’  (Know Thyself,— who am ‘I’ ?) অর্থাৎ নিজেকে জানার  চেষ্টার পাঠক্রমকে বলা হয়েছে পরাবিদ্যা। পরাবিদ্যার পাঠক্রমে আমাদের শিক্ষক আর্য-ঋষিগণ বলেছেন, ‘‘যস্তু সর্বাণি ভূতান্যাত্মন্যেবানুপশ্যতি।/সর্বভূতেষু চাত্মানং ততো ন বিজুগুপ্সতে।।’’  (ঈশোপনিষদ) অর্থাৎ,  যিনি নিজের আত্মাকেই সর্বাত্মারূপে উপলব্ধি করেন, তিনি কাহাকেও ঘৃণা করেন না। সর্বভূতে নিজেকে, নিজের মধ্যে সর্বভূতকে উপলব্ধি করেন। কেন‍না, আর্য্য হিন্দু শাস্ত্রমতে আমরা মানুষেরা ঐহিক জগতে দ্বৈত ভাবে অসম্পৃক্ত হয়েও সেই এক পরমাত্মার সাথে সম্পৃক্ত।

      আবার তৈত্তরীয় উপনিষদের বিদ্যা দানের শান্তি পাঠে রয়েছে, ‘‘ওঁ সহ নাববতু। সহ নৌ ভুনক্তু। সহ বীর্য করবাবহৈ। তেজস্বি নাবধীতমস্তু মা বিদ্বিষাবহৈ। ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।।’’ যার মর্মার্থ হলো, আমরা (আচার্য্য ও বিদ্যার্থী উভয়ে) সহমত হয়ে চলব, প্রকৃতির উপাদান সকলে স-মান (Equitable) ভাবে ভাগ করে জীবন ধারণ করব। কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করব না। আর অপরাবিদ্যার বিষয় ছিল জাগতিক শিক্ষা, যা ৬৪ কলা বিদ্যার মধ্যে নিহিত ছিল। (অন্তরাসীজন ৬৪ কলাবিদ্যার সিলেবাস জানতে আগ্রহী হলে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস মহোদয়ের অভিধানে ‘কলা’ সবিশেষ পাঠ করে দেখতে পারেন। তা হলেই বুঝতে পারবেন বিদ্যা কাকে বলে।)   পরাবিদ্যার শিক্ষকদের বলা হতো আচার্য্য আর অপরাবিদ্যার শিক্ষকদের উপাচার্য্য (তৈত্তিরীয় উপনিষদ)।  বর্তমানের শিক্ষা ব্যবস্থায় সরস্বতী আরাধনা মন্ত্রক্তো বেদ-বেদান্ত-বেদান্তের সাথে বাস্তব সখ্যতা না থাকলেও বিদ্যার সাথে সম্পৃক্ত আচার্য্য এবং উপাচার্য্য শব্দদ্বয়কে এখনো বিদায় দেওয়া যায় নি।

*    *    *

      আমাদের বর্তমান যুগ যে যুক্তিবাদী সে কথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি অস্বীকার করবেন না আশাকরি। যেমন, সন্তানের হয়ে মা খেলে সন্তানের পেট ভরবে না। ছাত্রের হয়ে শিক্ষক লেখাপড়া করলে ছাত্র পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে না। তেমনি বিদ্যালাভের জন্য বিহিত সাধনা না করে পুরোহিতের বলে দেওয়া দেবী সরস্বতীর অঞ্জলিমন্ত্র আওড়ালে বিদ্যার্থীদের  বিদ্যা বা ঈপ্সিত ফললাভ হবে কি ?

      অবশ্য পুরোহিতও  জানেন না ফললাভের বিষয় সম্পর্কে। যদি জানতেন প্রতিমা-বিসর্জন মন্ত্রে বলতেন না—ওঁ আবাহনং ন জানামি, নৈব জানামি পূজনম্। বিসর্জনং ন জানামি ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি ।–অর্থাৎ আমি আবাহনও জানিনা, বিসর্জনও জানিনা, আমাকে ক্ষমা করুন। (দ্রঃ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)

      বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী পূজ্য-প্রতিমা চঞ্চল চিত্তের ধারণের জন্য একটি অবলম্বন। প্রতিমাকে ব্রহ্মের রূপ কল্পনা করে উপাসনা, সংযম, সাত্তিক আহার, সাত্তিক বিহার ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে পূজা করা হয়।–যাতে পূজক বা উপাসক মনসংযোগ দ্বারা প্রতিমাকে হৃদয়ে ধারণ করে প্রতিমার গুণে গুণান্বিত হতে পারে। এই হলো প্রতিমা পূজার মূল কথা।   

*    *    *

      আমাদের আলোচ্য দেবী সরস্বতী প্রতিমার চরণ পদ্মের উপর ন্যস্ত, এর দ্বারা সৃষ্টির বিবর্ত্তনের কথা রূপকে বর্ণিত হয়েছে। মা সরস্বতী হংসের উপর উপবিষ্ট। হংস পরমাত্মার প্রতীক। বীণা থেকে  নাদ বা ধ্বনি উৎপন্ন হয়, তাই বীণা সুরত-শব্দযোগের প্রতীক । পুস্তক বা গ্রন্থ বিদ্যা অর্জনের মাধ্যমের প্রতীক। দেবীর শুক্লবর্ণ সাত্তিকতার প্রতীক। পদ্ম, হংস, বীনা, পুস্তকাদি সজ্জিত শ্বেতবসনা দেবী সরস্বতীর উপাসনার বিষয় তাহলে  বিদ্যা, ব্রহ্ম, পরব্রহ্ম, সৃষ্টিতত্ত্ব ইত্যাদি হওয়া উচিত।   প্রতিমার অলঙ্কারের ওই গুণগুলোর সিলেবাস জানার পরে তো উপাসনার দ্বারা গুণান্বিত হবার প্রশ্ন! সেই সিলেবাসগুলো দেবী সরস্বতী কোন্ পুস্তকে, কোন্ সংহিতায় লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন, সে বিষয়ে বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকা কোথাও কিছু বলে গেছে কিনা আমি জানি না। যদি কেউ জানেন দয়া করে জানালে বাধিত হব। তবে এটুকু জেনেছি, পরব্রহ্মের ব্যক্ত-প্রতীক ‘‘শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা’’ —‘‘তমসার পার অচ্ছেদ্যবর্ণ মহান পুরুষ ইষ্টপ্রতীকে আবির্ভূত’’ হয়েছেন যিনি, তিনি ওই সব বিষয়ের খুঁটিনাটি জানেন এবং সবাইকে জানিয়েও দিয়েছেন বিবিধ স্মৃতি এবং শ্রুতি বাণীর মাধ্যমে।  যিনি মানুষের জীবনের বেঁচে থাকা ও বৃদ্ধি পাওয়ার জীবন্ত আদর্শ স্বরূপ। যিনি পঞ্চবর্হি ও সপ্তার্চ্চি মাধ্যমে সব দেবতার, সব আরাধনার, সব পূজার, সব বিদ্যার সূত্র সন্নিবেশিত করেছেন। যাঁর উপাসনা বাদ দিয়ে কোন  পুতুল পূজা করে কোন কিছুই জ্ঞাত হওয়া সম্ভব নয়। তাঁর নাম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।  যারজন্য সদদীক্ষার শুভ মুহূর্তে ‘‘ওঁ ব্রহ্ম পরব্রহ্ম ও কুলমালিক ……’’ মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে বাহ্যপূজার বিষয়ে উল্লেখ্য পরব্রহ্ম-এর প্রকৃত তত্ত্বকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।

*    *    *

          বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী   সততা, সংযম, ন্যায়নীতি ইত্যাদি মানবিক গুণগুলোর প্রবহমানতাকে বৎসারান্তিক নবীকরণ করার জন্যই বাহ্যপূজা বা মূর্তিপূজা উদযাপনের উদ্দেশ্য। বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ  করলে দেখা যাবে, সরস্বতী পূজাই শুধু নয়, সব পূজার নামে হুজুগে মেতে আহার-বিহারে একটু বেশী করে অসংযমী হয়ে পড়ি আমরা।  নাহলে সরস্বতী পূজা উপলক্ষ্যেও মাংসের দোকানে লাইন পড়ে যায়, যা হিন্দু শাস্ত্রে অভক্ষ্য, নিষিদ্ধ খাবার। যা খেলে আয়ুক্ষয় হয়। হিন্দুদের প্রামাণ্য গ্রন্থ মনু সংহিতা অনুযায়ী ‘মাং’ মানে আমাকে ‘স’ মানে সে,  অর্থাৎ আমাকে সে খেলে আমিও তাকে খাব।  আর আমরা ধর্ম পালনের অজুহাতে, পূজার অজুহাতে শাস্ত্রবিরোধী আচরণ করে হিন্দুত্বের বড়াই করতে চাইছি। এরফলে অহিন্দুরা আমাদের ওপর আঙুল তুলতে সাহস পাচ্ছে।

*    *    *

ভাষা-বিজ্ঞান অনুযায়ী পূজা মানে পূরণ করা, সম্বর্দ্ধিত করা। যে আচার-আচরণ  সাত্তিক জীবন-বর্দ্ধনার অভাবকে পূরণ করে, পরিবেশের জৈবাজৈব সবকিছুকে সম্যকরূপে বর্দ্ধিত করে, তার নাম পূজা।  ‘শ্রেয়-সৃজনী সংহতি ও সমাবেশ’  যা, তার নাম উৎসব। আর যে আচার-আচরণ জীবনবৃদ্ধিকে নন্দিত করে তার নাম আনন্দ। এখন প্রশ্ন,  আমাদের প্রচলিত পূজা, উৎসবের উদযাপন বৃহত্তর পরিবেশকে কতখানি নন্দিত করে  ‘পূজা’ শব্দের যথার্থতাকে উপহার দিতে পেরেছে ? –এইসব বিষয়ে সত্তাপিয়াসী চিন্তাশীলদের চিন্তা করে দেখা উচিত। বিশেষ করে যাঁরা কুসংস্কার বিরোধী রূপে নিজেদের বোধ ও বোধিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান।

*    *    *

      পূজা বিষয়ে হিন্দুদের প্রামাণ্য গ্রন্থগুলো কি বিধান রেখে গেছে, বাহ্য-পূজাবাদীদের তা একবার জেনে নেওয়া দরকার।

       ‘মহানির্ব্বাণতন্ত্র’ নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ  
      ‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ।
      অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’
      ওই মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ‘ভারতে বিবেকানন্দ’ গ্রন্থের  ৩৩৬  পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট। ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’

      ‘‘যে-ব্যক্তি সর্ব্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে।’’ –শ্রীমদ্ভাগবত। ৩-২৯-২২

      “ঈশ্বরঃ সর্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জ্জুন তিষ্ঠতি।
      ভ্রাময়ন্ সর্ব্বভূতানি যন্ত্ররূঢ়ানি মায়য়া।।“
                                    –গীতা, ১৮। ৬৫
      “যিনি এই সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার নিজের স্বধর্মানুরূপ নিষ্কাম কর্মাচরণ দ্বারা (বাক্য বা ফুলজল দ্বারা নহে) পূজা করিয়া মানুষ সিদ্ধি লাভ করে । স্বধর্মানুরূপ (বর্ণানুগ সত্তাধর্ম পালন) নিষ্কাম কর্মই পরমেশ্বরের পূজার ডালি ।”  (গীতা ১৮।৪৬)
       “যে ব্যক্তি সর্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে ।“ (শ্রীমদ্ভাগবত ৩।২৯।২২)

*    *    *

      তাই একটা  প্রশ্ন স্বভাবতঃই জাগে, বিদ্যার্জনের জন্য আমরা যদি বাহ্যপূজার ডালি সাজিয়ে দেবী সরস্বতীর উপর সত্যিসত্যিই নির্ভরশীল হতে পারতাম, তাঁকে বিশ্বাস করতাম, তাঁর প্রতি নিষ্ঠা থাকত, তাহলে বিদ্যা লাভের জন্য তাঁকে নিয়েই পড়ে থাকতাম। প্রভূত অর্থ ব্যয় করে, একে-ওকে ধরাধরি করে স্কুল-কলেজে ভর্তি হয়ে, বিষয় ভিত্তিক প্রাইভেট টিউটরের কাছে টুইশন নিতে যেতাম না, পরীক্ষার হলে অসদুপায়ের আশ্রয় নিতাম না। কারণ, এ-তো দ্বন্দ্বীবৃত্তি, বিশ্বাসকে অপমান করা। অবশ্য না করে উপায়ও তো নাই!  বর্তমানের মোবাইল প্রীতির যুগে, প্রতিমা-পূজায় বিশ্বাসী এমন কি কাউকে পাওয়া যাবে,— যিনি পুরোহিতকে কিছু দক্ষিণা দিয়ে তার সাধের মোবাইলের প্রতিকৃতি বা প্রতিমার পুজো করিয়ে মোবাইলের সব ফিচার উপভোগ করতে পারবে, ডাউনলোড-আপলোড করতে পারবে, হোয়াটস্ অ্যাপে ছবি পাঠাতে পারবে?   প্রতিমা-পূজায় বিশ্বাসী  এমন কোন মেয়ে পাওয়া যাবে, যে তার পছন্দের বর-এর ছবি বা কাট্-আউট পুজো করিয়ে মা হতে পারবে, সুখের দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করতে পারবে?  যদি পারে তাহলে পুরোহিতকে দক্ষিণা দিয়ে সরস্বতী প্রতিমার পূজা করিয়ে বিদ্যা লাভ সম্ভব! নচেৎ কোন পুতুল পুজো করার আগে একটু বোধ-বিবেককে কাজে লাগাতে হবে।

*    *    *  

      বাস্তব বোধের দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে বিচার-বিবেচনা করলে দেখা যাবে, সরস্বতী পূজার ওই মন্ত্রগুলোই শুধু নয়, আমাদের সব কথাই বাক্ হয়ে স্ফূরিত হয় বলে সরস্বতী  বাগ্দেবী রূপে কল্পিত হয়েছেন। অতএব যুক্তি বা বিজ্ঞান অনুযায়ী দেবী সরস্বতী মেধানাড়ীতে সুপ্ত, কণ্ঠে এবং কলমে ব্যক্ত। একাগ্রতার অনুশীলনে মেধানাড়ী জাগ্রত না  করতে পারলে, অর্থাৎ স্মৃতি যদি কাজ না করে মুখস্থ বলা যাবে না, লেখাও যাবে না। মেধানাড়ী ধ্রুবাস্মৃতির কাজ করে। উপনিষদে বর্ণিত আছে, আহার শুদ্ধৌ সত্ত্বাশুদ্ধিঃ, সত্ত্বাশুদ্ধৌ ধ্রুবাস্মৃতি …… । তাই, বিদ্যা লাভ করতে হলে মেধানাড়ীকে জাগ্রত রাখতে হবে। আর, মেধানাড়ীকে জাগ্রত রাখতে  হলে সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন-যাপন—আহার-বিহার, জৈবিক তাগিদ পূরণ, জীবিকার্জন ইত্যাদি ইত্যাদি আহরণসমূহকে শুদ্ধ রাখতে হবে খেয়ালখুশীর প্রবৃত্তি-পরায়ণতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে।    

      বেদবিৎ আচার্য্যের বিধানকে উপেক্ষা করে শিক্ষার নামে, বিদ্যার নামে প্রবৃত্তি-পরায়ণতার বিধি-ব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থায় বা  সরস্বতীর মূর্তি পূজা করে যদি  প্রকৃত বিদ্যা লাভ হতে পারতো, তাহলে তথাকথিত বিদ্যালয়গুলো থেকে অনেক অসৎ-নিরোধী আদর্শবান, বিদ্বান, শ্রদ্ধাবান, চরিত্রবান মানুষের সৃষ্টি হতে পারতো।   বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উপাচার্যকে ঘেরাও করে  ‘হোক কলরব’ সংগঠিত হতো না। ‘মা বিদ্বিষাবহৈ’-এর দেশের বিদ্যালয়ে ছাত্র-রাজনীতির নামে মানুষের প্রতি মানুষের বিদ্বেষ দেখতে হতো না। এসব উল্লেখ করার কারণ, বর্তমানে দুর্নিতীপরায়ণ মানুষদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যাঁরা একসময় বিদ্যাদেবীর আরাধনা করে সমাবর্তন মাধ্যমে আচার্য্য বা উপাচার্য্য স্বাক্ষরিত বিদ্বান আখ্যা বা শংসাপত্র বা ডিগ্রী নিয়েছেন! তাঁদের কি বিদ্বান বলা যাবে ?    

      অথচ এই ভারতবর্ষের রত্নাকর দস্যু সরস্বতীর কোন মূর্তি-পূজা না করেই, আহত-নাদ মর্যাদা-পুরুষোত্তম ‘রাম’-নামের (ম-রা, ম-রা, ম-রা ……..=রাম) সাধন করে দেবী সরস্বতীকে মেধানাড়ীতে জাগ্রত করে হয়েছিলেন বাল্মীকি।

*    *    *

      একদা তমসা নদী থেকে স্নান সেরে ফিরছিলেন। এক তরুশাখে ক্রৌঞ্চ-জুটি পরস্পর খেলছিল। এক ব্যাধ পুরুষ পাখিটিকে তীর মেরে হত্যা করলে স্ত্রী পাখিটি করুণ বিলাপ করতে থাকে। বাল্মীকি বিচলিত হয়ে ‘কোনদিন প্রতিষ্ঠা পাবে না’ বলে ব্যাধকে অভিসম্পাত করেন। সেই অভিশাপ বাণী স্বতঃস্ফূর্ত শ্লোকবদ্ধ হয়ে নির্গত হয়েছিল :–‘‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতী সমাঃ/যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকম্ অবধী কামমোহিতম্।’’ এই শ্লোকটিকে পৃথিবীর সারস্বত সাধকেরা আদি শ্লোক বলে মান্য করেন। অতএব, সারস্বত সাধনার মূল বিষয় মস্তিষ্কে সুপ্ত থাকা মেধানাড়ী বা স্মৃতিবাহী চেতনার জাগরণ।

*    *    *

      মেধানাড়ীকে জাগ্রত করতে হলে লাগে অনাহত-নাদ বা সৎমন্ত্র সাধন। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের বিদ্বান করার জন্য দীক্ষার মাধ্যমে আজ্ঞাচক্রে অনাহত-নাদের সৎমন্ত্র সাধন, স্বতঃ-অনুজ্ঞার অনুশাসন এবং সদাচার মাধ্যমে আমাদের মেধানাড়ীকে জাগ্রত করার সহজ উপায় দান  করেই ক্ষান্ত হন নি, ‘নিয়তং স্মৃতিচিদযুতে’-বাণীতে স্বস্ত্যয়নী ব্রতের মন্ত্রের মাধ্যমে স্মৃতিবাহী চেতনাকে জাগ্রত করার বিধান দিয়ে দেবী সরস্বতীর আরাধনার নিমিত্ত স্থায়ী একটা আসন পেতে দিলেন।   যা’তে আমরা প্রতিনিয়ত সরস্বতী পূজায় ব্যাপৃত থাকতে পারি। আমরা একটু চেষ্টা করলেই সেই বিধিগুলোকে অনুশীলন মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে দেবী সরস্বতীকে সম্বর্দ্ধিত করে, প্রকৃত অর্থে পূজা করে নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ,পবিত্র হতে পারব, বিদ্বান হতে পারব।

      এবার আমরা একটু দেখে নেব বর্তমান বেদবিৎ আচার্য্য শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরস্বতী বিষয়ে কি নিদান রেখে গেছেন।

‘‘বিকাশ-ব্যাকুল গতিই যাঁর সংস্থিতি—

            তিনিই সরস্বতী,

আর, বাক্ বা শব্দই

      যাঁর সত্তা—

                  তিনিই বাগ্দেবী‍;

তাই, যিনিই বাগ্দেবী

                  তিনিই সরস্বতী। ২ ।

বাস্তব উপলব্ধিসম্ভূত

      সার্থক অন্বিত-সঙ্গতিশীল জ্ঞানকেই

                              বিদ্যা বলে। ৩ ।

      সার্থক সর্ব্বসঙ্গতিশীল জ্ঞানই

                              বিজ্ঞান,

                  আর, তা’ই বেদ,

                                    প্রজ্ঞাও তা’ই। ১০ ।’’

                                                              (সংজ্ঞা সমীক্ষা)

       শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রদত্ত উপরোক্ত বাণীতে এটুকু বোঝা গেল যে সরস্বতী আরাধনার মাধ্যম বাক্ বা শব্দ সাধন। শ্রীশ্রীঠাকুর ভাব-সমাধিতে বাক্ বা শব্দের সন্ধান দিতে গিয়ে  ব্যক্ত করলেন,—‘‘নাম-নামী অভেদ, ….. স্থূলে আমার প্রকাশ, সূক্ষ্মে আমার বাস।’’ মহাগ্রন্থ পুণ্যপুঁথির উক্ত বাণীকে স্বীকার করলে বাক্ বা শব্দের অস্তিত্বের আধারও শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। এবং সব দেবতার সমাহারে সৃষ্ট একমাত্র তিনিই ভগবানের অখন্ড সাকার মূর্তি। তিনি ইষ্ট, তিনি ধ্যেয়, তিনি জ্ঞেয় এবং তিনিই পূজ্য। তাঁর আদর্শ মেনে চলে ইষ্টপূজা করতে পারলে সব দেবতার পূজা করা হয়।

——

UTTARADHIKAR

বিপন্ন উত্তরাধিকার

                                      ––ডাঃ তপন দাস

‘‘অভাবে পরিশ্রান্ত  মনই ধর্ম্ম বা  ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা করে, নতুবা করে না।’’

      পরম প্রেমময় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র লিখিত সত্যানুসরণের চিরন্তন ওই বাণীর অমোঘ টানে নরেন দত্ত গেলেন পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের দরবারে––জাগতিক অর্থাভাব ঘোচাতে। অন্তর্যামী ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব দেবোপম চরিত্রের উত্তরাধিকারীকে সচেতন করিয়ে দিলেন, আত্মসুখ নয়, ভারতবর্ষের শাশ্বত দর্শন, ‘‘বহুজন হিতায় চ, বহুজন সুখায় চ’’-এর আদর্শের উত্তরাধিকারী হয়ে পরমার্থ লাভ করার জন্য তোমাকে আত্ম নিবেদন করতে হবে।

       শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ঐশী শক্তিতে শক্তিমান হয়ে নরেন্দ্রনাথ হলেন বিবেকানন্দ। এঁকে দিলেন মহান ভারতবর্ষের পূর্ণাঙ্গ এক চিত্র। শিকাগো ধর্ম্ম মহাসভার ক্যানভাসে।

       ‘আব্রহ্মস্তম্বভৃদ্ধাতা’–তৃণলতা থেকে ব্রহ্ম, সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বার্তাবহ বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, সংহিতা, পুরুষোত্তমবাদ নিয়ে বিশ্বজনমানস নতুন করে ভাবতে শুরু করলো।  হৃত উত্তরাধিকার ফিরে পেতে ভারতবর্ষ ‘‘উত্তিষ্ঠত জাগ্রত, প্রাপ্য বরান্ নিবোধত।।’’ মন্ত্রে আবার নতুন করে জেগে উঠলো।………

       ‘‘কর্ম্মণ্যেবাধিকারেস্তু মা ফলেষু কদাচন।…….’’ ––কর্মেই তোমার অধিকার ফলে নয়। ––শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতার ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার আদর্শ আঁকড়ে নবযুগের অভিমন্যু ক্ষুদিরাম, দেশরক্ষার ধর্ম পালন করতে গিয়ে ফাঁসির আসামী হলেন। ‘‘ন জায়তে ম্রিয়তে কদাচিৎ…….বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়………নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ।…….’’। বাণীর অমৃত আদর্শে স্থিতপ্রজ্ঞ, মৃত্যুঞ্জয়ী ক্ষুদিরাম হাসিমুখে ফাঁসির দড়ির মালা পড়লেন গলায়। একটা ক্ষুদিরামের আত্মাহুতি জন্ম দিল হাজারো ক্ষুদিরামের। ফাঁসিরজ্জু আর ইংরেজ রাজশক্তির বুলেটের আলিঙ্গনে জীবনের জয়গান গাইতে গাইতে অকালে হাসিমুখে বিদায় নিল উত্তরাধিকারের স্বপ্নদেখা কতশত বীর ভারত-সন্তানেরা। অবশেষে একদিন গ্যালন গ্যালন রক্তের বিনিময়ে আমরা ফিরে পেলাম উত্তরাধিকার। অপূর্ণ, খণ্ডিত। অখণ্ড ভারতবর্ষ হিন্দুস্তান, পাকিস্তান আখ্যা পেল। কিন্তু পূর্ব পশ্চিমে প্রসারিত ভারতমাতার কর্তিত দুটো বাহুর ক্ষত আজও শুকলো না। সৃষ্ট হলো জাতীয় ম্যালিগন্যাণ্ট সমস্যার। বর্তমান যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের প্রদত্ত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার নিমিত্ত রক্ষাকবচ ‘পপুলেশন এক্সচেঞ্জ’ বিধি না মানার জন্য।

তা’ সমস্যা যতই থাকুক, তথাপি জাতীয়তাবাদের পরিচয়ের নিরিখে আমরা ভারতবাসী। আর্য্যজাতির বংশধর। বাল্মীকি, বেদব্যাস আমাদের জাতীয় কবি। রাম, কৃষ্ণ, চৈতন্য, রামকৃষ্ণ প্রমুখ আর্য্য ভারতবর্ষের জাতীয় মানবতাবাদের পূজারী পুরুষোত্তমগণের সাথে ‘‘দিবে আর নিবে মেলাবে মিলিবে’’-র আদর্শ মেনে বুদ্ধ, যীশু, হজরত রসুলকেও দ্রষ্টাপুরুষরূপে চিহ্নিত করিয়ে দিলেন বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। জাতীয় জীবনে সাম্প্রদায়িক সমন্বয়ের বাস্তব সেতুবন্ধন রচিত না হলেও, ভারতীয় হিন্দু, ভারতীয় মুসলমান, ভারতীয় খৃষ্টান, ভারতীয় বৌদ্ধ, ভারতীয় শিখ প্রত্যেকেই যে আর্য্যজাতির বংশধর আমরা বুঝতে শিখলাম, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের কাছে আনত হয়ে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আসমুদ্র হিমাচল পর্যন্ত বিস্তৃত ভারতবর্ষের মহিমা বন্দনা করলেন ‘আর্য্য ভারতবর্ষ আমার জ্ঞান-গরিমা-গরবিনী …….’ সঙ্গীতের ছন্দে।

এই সবকিছু নিয়েই তো আমরা জোর গলায় বলতে পারছি,  ‘মেরা ভারত মহান, India is  great.’ আচ্ছা ওই শ্লোগানগুলো বলার সাথে সাথে করার যদি মিল না থাকে, ইতিহাসে আমাদের পরিচয় কি হবে? ভারতীয় ঐতিহ্য, ভারতীয় কৃষ্টি, ভারতীয় অনুশাসনের উত্তরাধিকার আমরা প্রকৃত অর্থে বহন করে চলছি কি?

গণপ্রজাতন্ত্রী আধুনিক ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ধর্মকে রক্ষা করে চলার কর্তব্যকে। রাষ্ট্রীয় মন্ত্র ‘সত্যমেব জয়তে’ স্মরণ করিয়ে দেয় উপনিষদীয় আচার্য অনুসরণের  শাশ্বত অবলম্বনকে। রাষ্ট্রের কর্ণধার রাষ্ট্রপতিসহ মন্ত্রীবর্গ প্রত্যেকেই ঈশ্বরের নামে শপথ গ্রহণ করে ঈশ্বরসৃষ্ট জীবগণের কল্যাণ সাধনে ব্রতী হয়। ঈশ্বরের প্রতিভূস্বরূপ জাগতিক ন্যায়দণ্ডধারী বিচারকেরা ধর্মাধিকরণ নামে চিহ্নিত। বিচারালয়কে বলা হয় ধর্মস্থান। কেন?

ভারতীয় অনুশাসনের সাম, দান, ন্যায়, দণ্ড, নীতি ও ভেদ-এর রাজধর্ম রক্ষার পবিত্র কর্তব্যে যাতে এতটুকু অন্যায়, অধর্ম প্রবেশ করতে না পারে তার জন্যই ওইসব মহাভারতীয় নীতির অনুসরণ। বিধিবৎ প্রকৃষ্ট-জাতক সৃষ্টি করে প্রজা পালনের স্বার্থেই  ওই অনুশাসনকে আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি। তথাপি যখন ভারতীয় শাসন সংহিতা বা সংবিধান ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ না করে, ধর্ম এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়কে এক করে ফেলে ‘ধর্ম-নিরপেক্ষতাবাদ’,––অর্থাৎ রাষ্ট্র ধর্মের অনুবর্তী নয়’-এর মতবাদকে প্রতিষ্ঠা দেয়, তখন কি মনে হয় না, আমরা জাতীয়তাবাদের আদর্শের প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েও এক পরস্পর বিরোধী আচরণ করে চলেছি !

বর্তমান যুগ-পুরুষোত্তম কথিত ধর্মের যুগান্তকারী সংজ্ঞা ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম বলে জানিস তাকে। ধর্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম না-রে।’ সমন্বয় বার্তাবহ বাণীকে গুরুত্ব না দিয়ে ধর্মের নামে, ভারতীয় সংহিতার নীতি বহির্ভূত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তি পরায়ণতার  আস্ফালনকে, কতগুলো অনিত্য, অসার, পৌত্তলিক কু-সংস্কারকে যদি ‘ধর্ম’ নামে প্রতিষ্ঠা দিতে চাই, তা’ কি বিচক্ষণতার পরিচায়ক হবে, না ভারতবর্ষের কৃষ্টির পরিপূরক হবে? ওই ভুলের বোঝা কি আমাদের চিরদিন বইতে হবে? আমাদের বুদ্ধি, বোধ কি নিরেটই থেকে যাবে?

যে নীতি-বিধি পদার্থের অস্তিত্ব রক্ষার সহায়ক তাই তো ধর্ম। পদার্থের স্বকীয়তা ধারণ করে রাখার সহায়ক যা’ তাই ধর্ম। ধর্ম পালন করলেই পদার্থ টিঁকে থাকবে, নচেৎ থাকবে না। সংসদ প্রকাশিত ইংরেজী অভিধানে ধর্মের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘It is an action, one is bound to  do.’ সেই ধর্মের আবার পক্ষ আর নিরপেক্ষ কি? বেঁচে থাকার অজৈব উপকরণ বায়ু, জল, মাটি ইত্যাদির যদি ধর্ম থাকতে পারে, এবং তা’ যদি বিজ্ঞানের বইতে পাঠ্য হতে পারে, তাহলে মানুষের  কি ধর্ম নেই? মনুষ্যত্ব প্রকাশের মাধ্যমেই তো মানুষ ধার্মিকতার পরিচয় দেয়। মানুষের মনুষ্যত্বের অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার নীতিবিধি-সমন্বিত ভারতের নিজস্ব সংহিতাগুলোর বিধানসমূহ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের সংহিতায় স্থান পাবে না কেন, প্রজাদের শিক্ষা দিতে পাঠ্য করা  হবে না কেন?    

রাষ্ট্রের সৃষ্টিই তো প্রজাদের অধর্ম বা দুর্নীতি থেকে মুক্ত করে ধার্মিক, অর্থাৎ সু-নীতি পরায়ণ করে তোলার জন্য। সেই রাষ্ট্র যদি তার প্রজাবর্গকে, তাদের পিতৃ-পিতামহের আদর্শ অনুসারী ধর্ম-পরায়ণ, কৃষ্টি-পরায়ণ হতে উৎসাহ না দিয়ে, প্রবৃত্তি-পরায়ণতায় উৎসাহ দেয়, সেটা ভারতবর্ষের জাতীয়  উত্তরাধিকারত্বের অস্তিত্বকে বিপন্ন করার বার্তা ভিন্ন আর কিছু নয়।

আর্য্য ভারতবর্ষের আদি সংবিধান ‘ব্রহ্মসূত্র’-এর নবীন সংস্করণ ‘কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র’ অনুযায়ী–-

‘‘সুখস্য মূলম্ ধর্ম্মম্

ধর্ম্মস্য মূলম্ অর্থম্

অর্থস্য মূলম্ রাষ্ট্রম্

রাষ্ট্রস্য মূলম্ ইন্দ্রিয় বিজয়ম্

ইন্দ্রিয় বিজয়স্য মূলম্ জ্ঞানবৃদ্ধ সেবয়া

জ্ঞানবৃদ্ধ সেবয়া বিজ্ঞানম্।’’

অর্থাৎ সুখী হতে হলে ধর্ম পালন করতে হবে। প্রকৃত ধার্মিক হতে হলে পুরুষার্থের চতুর্বর্গ সমন্বিত আশ্রমধর্ম পালন করতে হবে। নির্বিঘ্নে আশ্রমধর্ম পালন করার জন্য রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী প্রজাদের দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী হবার জন্য গুরু গ্রহণ করতে হবে। গুরুর আদেশ-নিদেশ পালন করলে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করা যাবে। তবেই জীবনে সুখী হওয়া যাবে। এই হলো ভারতবর্ষের ধর্মের মূল কথা।

ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টি অনুসারে, ‘‘যেনাত্মন্ স্তথান্যেষাং জীবনংবর্দ্ধাঞ্চপি ধ্রীয়তে য স ধর্ম্মঃ।’’ অর্থাৎ, অন্যের বাঁচা এবং বৃদ্ধি পাওয়াকে অক্ষুন্ন রেখে, মানুষ বাঁচার জন্য, বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য যা’ যা’ করে, তাই ধর্ম। ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা।  ধর্ম আচরণের মাধ্যমে পালন করার জিনিস, অনুভব করার জিনিস, যা’তে প্রতিটি সত্তা তার অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করতে পারে, তার অনুশীলন করা।

অথচ বাস্তব চিত্রটার সাথে মেলানো যাচ্ছে না ধর্মকে। বর্তমানে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্মের নামে চলছে বাহ্যপূজা, পৌত্তলিকতার প্রকাশ, হৈ-চৈ, পরিবেশ-দূষণ, রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায়। রাস্তা  আটক করে, চাঁদার জুলুম করে, জনজীবন বিপর্যস্ত করে, তারস্বরে মাইক বাজিয়ে, বাজি ফাটিয়ে, অবধ্য, নিরীহ প্রাণীদের হত্যা করে ধর্ম উদযাপন করার বিধি কোন মহাপুরুষ, কোন সাধক, কোন  নবী, কোন ঋষি, প্রবর্তন করেছেন কি? যদি না করে থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রের কর্তব্য সব সম্প্রদায়কে প্রকৃত ধর্ম পালনে উৎসাহিত করা।  ধর্মের নামে বিধি-বহির্ভূত অসদাচারের অনুষ্ঠানের উদযাপনকে কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা।

ভারতের আর্য্য-ঋষিগণ, অবতার-বরিষ্ঠগণ প্রত্যেকেই সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির উপাসনার কথা বলেছেন ধর্মের নামে, পূজার নামে। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আরও একটু সহজ করে দিয়ে বললেন, ‘‘ধর্ম্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম্ম না-রে। অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম্ম বলে জানিস্ তাকে। পূর্বতনে মানে না যারা/জানিস্ নিছক ম্লেচ্ছ তা’রা।’’ ‘‘পূজা-আর্চ্চা মানেই কিন্তু /দৈবগুণ যা সেধে নেওয়া। হাতে-কলমে মক্স করে/বাস্তবে তার রূপটি দেওয়া।।’’ ইত্যাদি ছড়াবাণীগুলো সহজ, সরল, ওজস্বী আবদনে সমৃদ্ধ হলেও একটা নির্দিষ্ট গণ্ডীর ভাষা-ভাষীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ওই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দিতে তিনি  বললেন, ‘Upholding urge of existence is Dharmma.’  বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্তা বা অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করে উৎকর্ষতায় রক্ষা করার নাম ধর্ম। তথাপিও আমরা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতার, কু-সংস্কারের, অজ্ঞানতার আবরণ ভেদ করে শুদ্ধ আমিটাকে বের করতে ব্যর্থ হলাম। তথাকথিত ইনটেলেকচ্যুয়াল হওয়া সত্বেও ধর্মের নামে ফুল, বেলপাতা, ধূপবিহীন ধূপকাঠি, ফল-মিষ্টান্নাদির অঢেল আয়োজনে, মাইক বাজিয়ে, শব্দবাজির আওয়াজ দিয়ে পরিবেশবিদদের চিন্তার বলিরেখায় ভাঁজ ফেলে দিতে ইন্ধন যোগাচ্ছি। আর আমাদের গর্বের রবীন্দ্রনাথ আমাদের দ্বিচারিতা দেখে কষ্ট পাচ্ছেন আর ভাবছেন, যে মানুষগুলো ‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তলে’ ইত্যাদি ছন্দের ডালি সাজিয়ে ভক্তির আবেদন জানায়, তারাই আবার পূজার নামে কু-সংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে বিশ্বাত্মাকে দূষিত করে চলেছে।
       আমাদের বর্তমান যুগ যে যুক্তিবাদী সে কথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি অস্বীকার করবেন না আশাকরি। যেমন, সন্তানের হয়ে মা খেলে সন্তানের পেট ভরবে না। ছাত্রের হয়ে শিক্ষক লেখাপড়া করলে ছাত্র পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে না।–তেমনি প্রচলিত পূজার আয়োজকদের হয়ে কোন পুরোহিত পূজা করলে আয়োজকদের কিছু ফললাভ হবে কি ?

       অবশ্য পুরোহিতও  জানেন না ফললাতের বিষয় সম্পর্কে। যদি জানতেন বিসর্জন মন্ত্রে বলতেন না—ওঁ আবাহনং ন জানামি, নৈব জানামি পূজনম্। বিসর্জনং ন জানামি ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি (পরমেশ্বর)।–অর্থাৎ আমি আবাহনও জানিনা, বিসর্জনও জানিনা, আমাকে ক্ষমা করুন। (দ্রঃ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)   

বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী পূজ্য-প্রতিমা চঞ্চল চিত্তের ধারণের জন্য একটি অবলম্বন। প্রতিমাকে ব্রহ্মের রূপ কল্পনা করে উপাসনা, সংযম, সাত্তিক আহার, সাত্তিক বিহার ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে পূজা করা হয়।–যাতে পূজক বা উপাসক মনসংযোগ দ্বারা প্রতিমাকে হৃদয়ে ধারণ করে প্রতিমার গুণে গুণান্বিত হতে পারে। এই হলো প্রতিমা পূজার মূল কথা।

পূজা বিষয়ে মহানির্ব্বাণতন্ত্র নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ  
       ‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ।
       অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’
       মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ভারতে বিবেকানন্দ গ্রন্থের  ৩৩৬  পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট। ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’

       আমরা এমনই অধম যে, ধর্মের নামে প্রাণী হত্যা পর্যন্ত করতে আমাদের  বিবেকে বাধে না। আমাদের প্রামাণ্য হিন্দু শাস্ত্রে  কোথাও প্রাণী হত্যার অনুমোদন নেই। উপনিষদে ‘আত্মবৎ সর্ব্বভূতেষু’ মন্ত্রে প্রতিটি প্রাণের স্পন্দনকে রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে।

সর্বশ্রেষ্ঠ হিন্দু ধর্মগ্রন্থ মহাভারতের অনুশাসনপর্ব ১১৪ অধ্যায়ে  বলা হয়েছে—
“যে ব্যক্তি মোহ প্রভাবে পুত্র-মাংস-তুল্য অন্যজীবের মাংস ভক্ষণ করে, সে অতি জঘন্য প্রকৃতির এবং তার সেই জীবহিংসা বহুবিধ পাপযোনিতে জন্মগ্রহণ করবার একমাত্র কারণ বলে নির্দিষ্ট হয়।“

শুধু হিন্দু মতেই নয়, কোন ধর্মীয় মতবাদে জীবহত্যা স্বীকৃত নয়।  

কোরানে, আর্য্য হিন্দু-শাস্ত্রে এবং পুরুষোত্তমদের বাণীতে কোথাও ‘বলিদান’ বা ‘কোরবাণী’-র নামে প্রাণী হত্যার অনুমোদন নেই।

       ‘কোরবাণী’ কথাটির উৎপত্তি  আরবীর ‘কুরবান’ থেকে। ‘কুরবান’ মানে উৎসর্গ, বলি। আবার বলি মানে দান। তন, মন, ধন কর কুরবানী অর্থাৎ কায়, মন, ধন পরমেশ্বরের জন্য উৎসর্গ কর। এই আত্মোৎসর্গ বা আত্ম-বলিদানই প্রকৃত বলি বা কোরবাণী।

মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ আল-কোরানে বলা হয়েছে, “এদের মাংস আর রক্ত আল্লাহর কাছে পৌছায় না, কিন্তু তোমার ভক্তি তার কাছে পৌছায়।”  (সুরা ২১/৩৭)

“আল্লার নিকট তাহার মাংস ও তাহার রক্ত কখন পৌঁছে না বা তিনি তাহা ইচ্ছা করেন না। বরং তোমরা অসৎকর্ম্ম হইতে নিজেকে রক্ষা কর ইহাই তিনি ইচ্ছা করেন। তিনি  আমাদের অধীনে থাকিয়া কার্য্যনির্বাহের জন্য পশু সৃষ্টি করিয়াছেন—সেজন্য তোমরা খোদার নিকট নম্র ও নিরীহ হইতে শিক্ষালাভ করিবে। এই সৎপথ-প্রাপ্তির অর্থাৎ সৎ-শিক্ষার জন্যই খোদা এই ব্যবস্থা করিয়াছেন। যাহারা অন্যের মঙ্গল সাধন করে, তাহাদের মঙ্গল করিয়া থাকেন  ……..”  (কোর-আণ—২২ হজ ৩৭ র, ৫) অথচ কোরবানীর নামে অবাধে নিরীহ পশুদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়!

ভগবান বুদ্ধদেব বলেছেন, “আমি কখনই কাউকে মাংস খাওয়ার অনুমোদন করি নি, করি না এবং করব না।” (লঙ্কাবতার সূক্ত)

প্রভু যিশু বলেন, “তুমি হত্যা করিও না” । (এক্সোডাস – 20:13)
“যে একটি ষাড়কে হত্যা করলো, সে যেন একটি মানুষকে হত্যা করলো।”  (ইসা – 66:33)

উক্ত অনুশাসনবাদ আমাদের  স্মরণ করিয়ে দেয়, যে নিজেকে পরমেশ্বরের সন্তান  বা খোদাতাল্লার বান্দা মনে করবেন তিনি কখনই কোন প্রাণী হত্যা করবেন না এবং প্রাণীর রক্ত-মাংসে ক্ষুধার নিবৃত্তি করবেন না।

ধর্ম পালনের জন্য নির্দিষ্ট ওইসব অনুশাসনাবলী মেনে চলা স্বভাবতই নাগরিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। রাষ্ট্রের কর্ণধারগণ যদি ওই নাগরিক কর্তব্য  পালনে উদাসীন হয়ে ধর্মের নামে ‘যেমন খুশি তেমন’ উদযাপনের ছাড়পত্র দেয়, তাহলে, তথাকথিত ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষজন ধর্মের নামে প্রবৃত্তি-প্ররোচিত অধর্মের আচরণ করার সুযোগ পেয়ে যায়, পরিবেশ দূষণ হয়, জনজীবন বিপর্যস্ত হয়। এই তো ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ-এর বাস্তবতা!  

                                         *    *    *

আমরা আমাদের ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদে আর্য্যজাতির মহান গ্রন্থ ‘মহাভারত’-কে স্বীকৃতি দিয়েছি। সেই স্বীকৃতির অধিকারে স্বীকৃতি পেয়েছে ‘শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতা’। সেই সূত্রে স্বীকার করে নিতে হয় মহান রাজনীতিবিদ্ পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণকে। স্বীকার করে নিতে হয় ‘শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতা’ প্রদত্ত––‘গতির্ভর্ত্তা প্রভুঃ প্রেষ্ঠ ঈশ্বরঃ পুরুষোত্তমঃ।/আব্রহ্মস্তম্বভৃদ্ধাতা সদগুরুস্ত্বং নমহোস্তুতে।।’ বাণীর শাশ্বত বার্তাকে। অতএব, আমাদের প্রকৃত উত্তরাধিকার প্রাপ্তির সূত্রই হলো সদগুরুর দীক্ষা গ্রহণ করে তাঁর নীতি-নিদেশ মেনে চলা। তাঁর আদর্শের প্রতি আনতি সম্পন্ন হয়ে চলা।

আমরা ‘মেরা ভারত মহান’ বলে চিৎকার করবো অথচ ভারতীয় কৃষ্টির ধারা অনুসরণ করবো না, পরিপালন করবো না, প্রচার করবো না, তা’-তো হতে পারে না! যদি আমরা সত্যিসত্যিই ওই মহান অনুশাসন মেনে নিতাম তাহলে কি ভারতীয় টিভিতে, সিনেমাতে, পুস্তকে, রাস্তাঘাটে ভারতীয় কৃষ্টির অনুশাসন পরিপন্থী, প্রবৃত্তি-প্ররোচিত স্পর্শকাম, দর্শকাম, শ্রুতিকাম, হিংসা-দ্বেষ প্রদর্শিত এবং প্রচারিত হয়ে মনুষ্যত্বকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারতো? ওইসব প্রবৃত্তি-প্ররোচিত আদর্শের কবলে পড়ে আমরা ভুলতে বসেছি আমাদের জাতীয় আদর্শ, আমাদের প্রকৃত উত্তরাধিকারের তত্ত্বকে।

চিদানন্দ সম্পদের অধিকারী আমার, আপনার, আমাদের প্রাথমিক পরিচয় কি, একটু ভেবে বলুন তো? না, না, নার্ভাস হবার কিছু নেই। এককথায় এর উত্তর যে ‘মানুষ’, তা’ প্রগতিশীল, প্রতিক্রিয়াশীল প্রত্যেকেই স্বীকার করবেন। আর  এ-ও স্বীকার করবেন যে, আমরা আকাশ থেকে শিলাবৃষ্টির সাথে একদিন হঠাৎ এই মহীতলে পতিত হইনি কোন গ্রহান্তরের প্রাণী হিসেবে। অযোনী-সম্ভূতও নয়। আমরা প্রত্যেকেই মাতৃদেবীর গর্ভবাসকাল শেষ করে অপত্যপথে, না হয় নিম্ন-উদরচেরা হয়ে পৃথিবীর আলো-হাওয়ার সাথে পরিচিত হয়েছি। পুরুষ-পরম্পরাগত জৈবী-সত্তার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দেহ-মন-প্রাণ নিয়ে। প্রত্যেকের বৈশিষ্ট্য আলাদা আলাদা। যেহেতু পৃথক পৃথক  বংশের ধারা নিয়ে আমরা জন্মেছি। এই তথ্যকে অস্বীকার করলে জীব-বিজ্ঞানকেও অস্বীকার করতে হয়।

বিজ্ঞানের মানদণ্ডে, পিতৃ-মাতৃ বংশের ধারার সাথে নিজেদের অর্জিত দোষ-গুণ মিলেমিশে তৈরি genetic code Meiotic cell division-এ বিভাজিত হয়ে প্রস্তুতি নেয় উত্তর পুরুষ সৃষ্টির। মায়ের আকুতি, ভাবাবেগ  সম্বর্দ্ধিত Ectoplasmic body বা লিঙ্গ-শরীর বা আত্মা আশ্রয় গ্রহণ করে পিতার পুং-জননকোষের কোষাণুপুঞ্জে। দৈবরূপী বীজকে পুরুষাকাররূপী প্রকৃতি বা ডিম্বাণু করে বরণ। পিতার এবং মাতার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সংস্করণ, দুটি অর্দ্ধ কোষাণু (y+x, or, x+x chromosome) এক হয়ে সৃষ্ট হয় একটি পূর্ণাঙ্গ কোষ। একটা প্রজন্মের ভ্রূণ। পিতামাতার আত্ম-প্রতিলিপির প্রতিনিধি স্বরূপ।

কোন ভ্রূণ বিস্তৃতি লাভ করে জীবনবাদের গান গেয়ে যায়। কেউ ধ্বংসকে ডেকে আনে। কেউ ঝরে যায় অকালে। আমরা কেউ চাই না আমাদের উত্তরাধিকার অকালে ঝরে যাক, বিকৃত হয়ে জন্মাক। তবুও জন্মে যায় আমাদের অজ্ঞতার জন্য। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জাগতিক সম্পদ, ভোগের  উপকরণ ম্লাণ হয়ে যায় যদি থ্যালাসেমিয়া, স্কিজোফ্রেনিয়া, হিমোফিলিয়ার ন্যায় দুরারোগ্য বংশগত রোগে আক্রান্ত হয় চিদানন্দ শক্তির অংশ কোনো উত্তরপুরুষ।

বিকৃত উত্তরাধিকার সমস্যা সৃষ্টির মূলে কিন্তু আমরাই। ভারতীয় বর্ণাশ্রমধর্ম্ম, ভারতীয় দশবিধ সংস্কারের অনুশাসন না মেনে তথাকথিত প্রগতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে সংগতি রাখতে পারিনা জীবনধর্মের সাথে। ফলে বিপর্যয় এসে যায় ব্যষ্টি, সমষ্টি এবং রাষ্ট্র জীবনে।

 আমাদের জাতীয় জীবনের উত্তরাধিকারকে সুরক্ষিত রাখতে আমাদের ভারতীয় ঋষিগণ ‘বর্ণাশ্রম ধর্ম্ম’, ‘দশবিধ সংস্কার’ নামে কতগুলো জীবনীয় সংস্কার প্রবর্তন করেছিলেন। বর্তমানের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী প্রগতিবাদীরা ওইসব বিধান শুনে যারা মনে মনে ‘বিজ্ঞানের যুগে কুসংস্কার’ শীর্ষক সমালোচনার জন্য তৈরি হচ্ছেন, তাদের জন্য গুটি কয়েক বিজ্ঞানের তথ্য নিবেদন করছি Davidson’s Practice of Medicine, 16th edition, Genetic Factor of Disease Chapter থেকে।

“In survey carried out in Edinburgh a few years ago, no less than 50% of childhood deaths could be attributed to  genetic disease. The contribution of genetic factors to mortality and morbidity in adults is mere difficult to assess but is also increasing.”…..

“…..Several extensive studies have shown that  among the offspring of consanguineous matings there is an increase of perinatal mortality rate together with an increased frequency of both congenital abnormalities and mental retardation………”

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ওই তথ্য অনুযায়ী বর্তমান বিশ্বে শতকরা ৫০টি শিশু মৃত্যুর কারণ পোলিও নয়, উত্তরাধিকারে প্রাপ্ত জেনেটিক ডিজিজ। বিসদৃশ যৌনমিলনজাত ওই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবার একমাত্র উপায় হিসেবে বলা হয়েছে, বিশ্বস্ত বংশে সদৃশ বিবাহ এবং সুপ্রজনন নীতির পরিপালন।––যা’  ভারতীয় বর্ণাশ্রমধর্ম ও দশবিধ সংস্কার পালনের মধ্যে নিহিত রয়েছে। বর্ণাশ্রমধর্ম ও দশবিধ সংস্কার পালনের মাধ্যমে প্রতিটি বংশের কুলপঞ্জীর মর্যাদা রক্ষা করে যারা নির্মল, নিষ্কলুষ উত্তরাধিকারীদের সৃষ্টি করতে পারবেন, তাদের বংশধরগণ দুরারোগ্য ব্যাধি এবং অকাল মৃত্যুর কবল থেকে সুরক্ষিত থাকবেই। নচেৎ উত্তরাধিকারীদের নিয়ে নানা সমস্যায় জর্জরিত হতে হবে।

তাই বলছিলাম কি, সদগুরুর দীক্ষা নিয়ে, বিধিবৎ বৃত্তি নিয়ন্ত্রণ মাধ্যমে তাঁর প্রদত্ত সংস্কারে সংস্কৃত হতে পারলে উত্তরাধিকারে পাওয়া বিকৃত রূপটাকে সযত্নে পরিহার করে, বৃদ্ধি পেতে না দিয়ে, উত্তরাধিকারে পাওয়া ভালোটুকুকে সুস্থ পরিষেবা দিয়ে যদি একটা সুস্থ প্রজন্ম উপহার দিয়ে যেতে পারি ভারতমাতাকে, তবেই বোধহয় মানুষ হিসেবে সঠিক পরিচয় রেখে যেতে পারবো। তাই নয় কি?

‘ভারাক্রান্ত হৃদয়ের যা’ কিছু মলিনতা’ ইষ্টীপূত প্রবাহে ধুয়েমুছে রত্নগর্ভার আধার স্বরূপিণী কল্যাণীয়া মায়েরা, গুরুর নিদেশ মেনে, স্বামীর মনোবৃত্ত্যানুসারিণী হয়ে চলতে পারলেই হয়তো অচিরেই আগমন হতে পারে শুদ্ধাত্মাদের।

      ‘শুদ্ধাত্মাদের’ জন্ম দিয়ে জাতীয় উত্তরাধিকার রক্ষার দায়িত্ব কি শুধু মেয়েদের, ছেলেদের কি কোন দায়িত্বই নেই? ––বর্তমান প্রজন্মের কল্যাণীয়া মায়েদের মনে এই প্রশ্নটা জাগা স্বাভাবিক। হ্যাঁ, ছেলেদের অবশ্যই দায়িত্ব আছে,––

‘ইষ্ট ঝোঁকে ছুটলে পুরুষ প্রজ্ঞা অনুপমা

স্বামীর ঝোঁকে ছুটলে নারী শ্রেষ্ঠ ছেলের মা।’

পুরুষদের ইষ্টনিষ্ঠ হতে হবে, পূরণকারী হতে হবে, ‘‘প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী। প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ এমনতর ভাবতে হয়।’’-–বাণীকে মেনে চলতে হবে। এবং সে দায়িত্ব স্বয়ং বিধাতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রই দিয়েছেন। কিন্তু মায়েদের উপর দায়িত্ব একটু বেশি করে দিয়েছেন।

‘‘নারী হতে জন্মে জাতি
বৃদ্ধি লভে সমষ্টিতে
নারী আনে বৃদ্ধি ধারা
নারী হতেই বাঁচাবাড়া
পুরুষেতে টানটী যেমন
মূর্ত্তি পায় তা সন্ততিতে ।

অভ্যাস ব্যবহার যেমনতর
সন্তানও পাবি তেমনতর।
স্বামীতে যার যেমনি রতি
সন্তানও পায় তেমনি মতি ।

স্বামীর প্রতি যেমনি টান
ছেলেও জীবন তেমনি পান ।

যে ভাবেতে স্বামীকে স্ত্রী
করবে উদ্দীপিত
সেই রকমই ছেলে পাবে
তেমনি সঞ্জীবিত ।”

      ‘‘মা হ’লো মাটির মত। মা যদি স্বামীগতপ্রাণা হয়, নিজের প্রবৃত্তির উপর তার যে নেশা, তা’ থেকে যদি তার স্বামীনেশা প্রবলতর হয়, স্বামীকে খুশি করার জন্য নিজের যে কোন খেয়াল যদি সে উপেক্ষা করতে পারে, তাহ’লে তা’র ব্যক্তিত্বের একটা এককেন্দ্রিক রূপান্তর হয়। একে বলে সতীত্ব। তা’ থেকে তা’র শরীরের ভিতরকার অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিগুলির ক্ষরণ ঠিকমত হয় এবং সেগুলি আবার সত্তাপোষণী হয়। এইগুলি গর্ভস্থ সন্তানের শরীর-মনের ভাবী সুসঙ্গত বিকাশের পক্ষে যে-সব সারী উপাদান প্রয়োজন, সেগুলি সরবরাহ করে। এইসব ছেলেমেয়ে মাতৃভক্ত হয়, পিতৃভক্ত হয়, গুরুভক্ত হয়, সংযত হয়, দক্ষ হয়, লোকস্বার্থী হয়, চৌকস হয়, এরা সাধারনতঃ মোটামুটি সুস্থ, সবল ও দীর্ঘায়ুও হয়।’’ (আলোচনা প্রসঙ্গে পঞ্চদশ খণ্ড/৭৩)

      বর্তমান যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর  অনুকূলচন্দ্রের ওই সঞ্জীবনী মন্ত্রের বাস্তব প্রয়োগে আমাদের ঘরের মেয়েরা যদি উপযুক্ত বরণীয় বর-কে বরণ করে আদর্শ বধূ, মনোবৃত্ত্যানুসারিনী স্ত্রী, আদর্শ জায়া হয়ে তাদের ভাবী সন্তানদের ভালোমন্দ পরিমাপিত করে গর্ভে ধারণ করতে পারেন, তা হলেই জন্ম নেবে সুস্থ দাম্পত্যের সুস্থ শিশু। এবং সেই সন্তানদের সদাচারের প্রলেপনে আধো কথার সময় থেকেই করে করিয়ে সদগুণের শিক্ষা ধরিয়ে দিতে পারেন,— তা হলেই সংরক্ষণ করা যাবে আমাদের আর্য্য ভারতবর্ষের জাতীয় উত্তরাধিকার।

 প্রহ্লাদ, ব্যাসদেব, কৌটিল্য, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্রের ন্যায় কত-শত বিখ্যাত মনীষীদের শুদ্ধাত্মারা সেই আশায় পথ চেয়ে বসে আছেন। উপযুক্ত মা পেতে। এক বুক আশা নিয়ে, পথ চেয়ে বসে রয়েছেন মানুষ-পাগল পরমপিতাও। তাঁকে শুদ্ধাত্মার ডালির উপহার কে দেবে, সে-তো এক-একজন কয়াধু, সত্যবতী, কৌশল্যা, দেবকী, চন্নেশ্বরী, চন্দ্রমণি দেবী, ভুবনেশ্বরী দেবী, প্রভাবতী দেবীর ন্যায় মায়েদের দ্বারাই সম্ভব। আমাদের আর্য্য ভারতবর্ষের উত্তরাধিকারের দায়িত্ব  মায়েদেরই তো নিতে হবে। পরমপিতা যে পথ চেয়ে বসে আছেন আপনাদের দেওয়া উপহার পেতে।

জয়গুরু! ভালো থাকবেন, ভালো রাখবেন।  

                                  –––– 

।। ईश्वर को मानेंगे या गुरु को मानेंगे ? ईस बिषय पर श्रीश्रीठाकुर अनुकूलचन्द्रजी का सिद्धांत ।।
श्रीश्रीठाकुर—“हमलोग ईश्वर को नहीं देख पाते हैं । माता-पिता एवं गुरू को देखते हैं । यही लोग श्रेष्ठ है । इनलोगों का स्वार्थ है कि हमलोग बचें-बढ़ें । हमलोग जितना सुकेन्द्रिक होते हैं, जितना सदगुरू में केन्द्रायित होते हैं उतना ईश्वर का माहात्म्य हमलोगों में उद् भाषित होता है । mathematics ( गणित ) पढ़ने के लिए जिस प्रकार mathematician ( गणितज्ञ ) के पास जाकर शरणापन्न होते हैं उसी प्रकार भगवान को प्राप्त करने हेतु सदगुरू के यहाँ शरणापन्न होना होगा । ईश्वर रहें या नहीं रहें प्रथम हमलोग बचना, बढ़ना चाहते हैं। यह कैसे होगा ? बढ़ने के लिए एक प्रतीक स्वरूप कुछ चाहिए, उनमें संहत होना होगा, उनसे संगत कर अजाना को जानने का प्रयास करेंगे, इसके माध्यम से मनुष्य evolve ( विवर्तित ) होता है । बिजली का जब आविष्कार नहीं हुआ था तब क्या बिजली नहीं थी? किन्तु आविष्कार के पश्चात् इसे समझा गया । बिजली पूर्व से ही थी बाद में आविष्कार किया गया । ईश्वर का अस्तित्व हमलोगों के पकड़ में नहीं आता है किन्तु सदगुरू के माध्यम से वे पकड़ में आते हैं , सदगुरू की बातों पर विश्वास कर जितना चलेंगे उतना हमलोगों का बोध बढ़ेगा । हमलोग विस्तार चाहते हैं । यह विस्तार विच्छिन्न नहीं हो, इसके लिए इष्टमुखी होना होगा, ईश्वर निष्ठ होना होगा ।”
(आ० प्र०, 21 वाँ खण्ड, पृष्ठा 94 / 16.6.1952)������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������4

কুমারী পূজা

।। প্রসঙ্গঃ কুমারী পূজা ।।

শাস্ত্রানুসারে কুমারী পূজা না করলে দেবদেবীর পূজা ও হোম সফল হয় না। শক্তির আরাধনার নামে আদর্শ নারীশক্তির প্রতীক স্বরূপা দুর্গা, কালী, জগদ্ধাত্রী এবং বাসন্তী পূজার আয়োজন হয়ে চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। যার উদ্দ্যেশ্য চিন্ময়ী নারীদেরও আমরা যেন আদ্যাশক্তির প্রতীক মনে করে পরমার্থ দর্শন ও পরমার্থ অর্জন করতে অভ্যস্ত হই, শ্রদ্ধা জানাই, নারীকে যেন কামনার, ভোগের বস্তু মনে না করি, নারীকে ভোগ্যা নয়, পূজ্যা রূপে স্বীকৃত দেবার জন্যই কুমারী পূজা। আদ্যাশক্তির প্রতীক নারীরা যদি রুষ্ট হয় তাহলে সৃষ্টির ছন্দে পতন অবশ্যম্ভাবী। ওই আদর্শকে সমাজজীবনে প্রতিষ্ঠা দিতে মূর্ত্তিপূজার পাশাপাশি তন্ত্রশাস্ত্রকারেরা দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য দেবীজ্ঞানে কুমারী পূজারও প্রচলন করেছিলেন। ফলহারিনী কালীপূজার রাতে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নিজের স্ত্রীকে ষোড়শীজ্ঞানে পূজা করেছিলেন।
পূর্বের তুলনায় হ্রাস পেলেও বর্তমানেও শক্তিপীঠ কামরূপ কামাক্ষ্যা, বেলু়ড় মঠসহ প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মিশনগুলোতে, আদ্যাপীঠ প্রভৃতি বিখ্যাত স্থানসহ ভারত ও বাংলাদেশের অনেক স্থানে রক্ত-মাংস দিয়ে গড়া অনার্তবা অর্থাৎ অ-রজঃস্বলা—১৬ বছর সময়সীমার মধ্যে যে মেয়ে ঋতুমতী হয়নি এমন কুমারী মেয়েদের দেবীজ্ঞানে তন্ত্রমতে পূজা করা হয়।
শাস্ত্রমতে বয়স অনুযায়ী কুমারী মেয়েদের উপাধি—
১ বৎসরের কন্যাকে সন্ধ্যা
২ বৎসরের কন্যাকে সরস্বতী
৩ বৎসরের কন্যাকে ত্রিধামূর্তি
৪ বৎসরের কন্যাকে কালিকা
৫ বৎসরের কন্যাকে সুভগা
৬ বৎসরের কন্যাকে উমা
৭ বৎসরের কন্যাকে মালিনী
৮ বৎসরের কন্যাকে কুব্জিকা
৯ বৎসরের কন্যাকে কাল-সন্দর্ভা
১০ বৎসরের কন্যাকে অপরাজিতা
১১ বৎসরের কন্যাকে রূদ্রাণী
১২ বৎসরের কন্যাকে ভৈরবী
১৩ বৎসরের কন্যাকে মহালক্ষী
১৪ বৎসরের কন্যাকে পীঠনায়িকা
১৫বৎসরের কন্যাকে ক্ষেত্রজা
এবং
১৬ বৎসরের কন্যাকে অম্বিকা উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে।
ইদানীংকালে হিন্দুত্বের বড়াই করা ভক্তরা সরকার স্বীকৃত ‘শক্তির আরাধনা’য় যে হারে ব্যাপৃত হয়েছে, সেই হারে শক্তি আরাধনার আয়োজকদের মধ্যে কুমারীপূজার আদর্শ যদি প্রতিষ্ঠা পেত তাহলে নারীদের কেউ লালসার বস্তু মনে করতে পারত না, আর নারীরাও নিজেদের লাস্যময়ী রূপে নিজেদের বিজ্ঞাপিত করে পুরুষের কামনার আগুনে ইন্ধন দিত না। কারণ দুর্গাপূজা, কালীপূজার নামে যত মানুষ মেতে ওঠে তারা যদি প্রকৃতই শক্তির আরাধনার শিক্ষাটাকে পোলিও প্রচারের মত সমাজে চারিয়ে দিতে পারতেন তাহলে কি ইভটিজিং, ধর্ষণ, ডিভোর্স, নারী নির্যাতনের মতো জ্বলন্ত সমস্যায় কি জর্জরিত হতে হতো আমাদের এই ভারতবর্ষকে ?

শাস্ত্র বর্ণিত অধমের চাইতেও অধম পূজায় মেতে উঠে আমাদের যাতে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে না হয়, তাই, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের নিত্য-বাস্তবে কুমারীপূজার পূজারী করে তুলতে সৎসঙ্গীদের নিত্যপাঠ্য ‘সত্যানুসরণ’ নামক মহাগ্রন্থে নারীকে জগজ্জননী জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত করতে নিদেশ দিয়ে বললেন, ‘‘প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী । প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয় ।’’ এবং পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, ‘‘স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যে-জন, তাহার হয় না ভবের বন্ধন মোচন । …..স্ত্রী চিন্ময়ী মা।’’—এই শিক্ষার ধারাকে বাস্তবায়িত করার নাম প্রকৃত কুমারীপূজা ।
।। অভিভাবকদের উদ্দেশ্য শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত কুমারীপূজার মন্ত্র।।
কুমারী একটু বড় হলেই
পুরুষ ছুঁতে নেই,
যথা সম্ভব এর পালনে
উন্নয়নের খেই ।
পরের বাবা পরের দাদা
পরের মামা বন্ধু যত
এদের বাধ্যবাধকতায়
সম্বন্ধটি যাহার যত
অনুরোধ আর উপরোধে
ব্যস্ত সারা নিশিদিন
কামুক মেয়ে তাকেই জানিস
গুপ্ত কামে করছে ক্ষীণ ।
বিয়ের আগে পড়লে মেয়ে
অন্য পুরুষে ঝোঁকের মন
স্বামীর সংসার পরিবার
করতে নারে প্রায়ই আপন ।।
কুমারী পূজাকে বাস্তবায়িত করতে তিনি নারীকে অবলা নয়, সবলারূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন। নারীর সতীত্বই নারীকে সবলা করে তোলে। তাই তিনি কত আশা নিয়ে কুমারীদের উদ্দেশ্য করে বললেন—

‘‘মেয়ে আমার,
তোমার সেবা, তোমার চলা,
তোমার চিন্তা, তোমার বলা
পুরুষ-জনসাধারণের ভিতর
যেন এমন একটা ভাবের সৃষ্টি করে—
যা’তে তারা
অবনতমস্তকে, নতজানু হ’য়ে
সসম্ভ্রমে,
ভক্তিগদগদ কন্ঠে—
‘মা আমার,— জননী আমার’! ব’লে
মুগ্ধ হয়, বুদ্ধ হয়, তৃপ্ত হয়.কৃতার্থ হয়,—
তবেই তুমি মেয়ে.
—তবেই তুমি সতী।’’

‘‘সতীর তেজে ঝলসে দে মা
নিঠুর কঠোর অন্ধকারে
মদনভস্ম বহ্নিরাগে
বৃত্তি-রিপু দে ছারখারে ।
প্রণবতালে ইষ্টমন্ত্র
ঝঙ্কারি তোল সকলতন্ত্রে
বিষাণ হাঁকে রুদ্র দোলায়
বজ্রে হানি মৃত্যুদ্বারে।’’
তাই আসুন, পূজার নামে অনিত্য-বস্তুর প্রতিযোগিতায় না মেতে, সব দেবতার সমাহার-স্বরূপ যুগ-পুরুষোত্তমের বিধি মেনে, নিত্য-সিদ্ধ দেদীপ্যমান আদর্শের আলোকে, আমাদের ঘরের মেয়েরা যাতে রাষ্ট্রপূজার অর্ঘ্যস্বরূপ সুজননে সুসন্তানের উপহার সাজিয়ে, শক্তিরূপিণী-দশপ্রহরণধারিণী সাজে সজ্জিত হয়ে নরাসুরদের কিভাবে দমন করে অস্তিত্ব রক্ষার পূজার পূজারী হতে পারে,– সেই চেষ্টায় যত্নবান হই।
জয়গুরু ! বন্দে পুরুষোত্তমম্!

বাস্তব বোধে পূজা ও ধর্ম

                             ।। পূজা ও ধর্ম ।।

                                                                   –ডাঃ তপন দাস

সুখচর, কলকাতা-৭০০১১৫,

পঃ বঃ, ভারত

          ভারতের আর্য্য-ঋষিগণ, অবতার-বরিষ্ঠগণ প্রত্যেকেই সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির উপাসনার কথা বলেছেন ধর্মের নামে, পূজার নামে। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আরও একটু সহজ করে দিয়ে বললেন, ‘‘ধর্ম্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম্ম না-রে। অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম্ম বলে জানিস্ তাকে। পূর্বতনে মানে না যারা/জানিস্ নিছক ম্লেচ্ছ তা’রা।’’ ‘‘পূজা-আর্চ্চা মানেই কিন্তু /দৈবগুণ যা সেধে নেওয়া। হাতে-কলমে মক্স করে/বাস্তবে তার রূপটি দেওয়া।।’’ ইত্যাদি ছড়াবাণীগুলো সহজ, সরল, ওজস্বী আবদনে সমৃদ্ধ হলেও একটা নির্দিষ্ট গণ্ডীর ভাষা-ভাষীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ওই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দিতে বললেন, ‘Upholding urge of existence is Dharmma.’ বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্তা বা অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করে উৎকর্ষতায় রক্ষা করার নাম ধর্ম। তথাপিও আমরা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতার, কু-সংস্কারের, অজ্ঞানতার আবরণ ভেদ করে শুদ্ধ আমিটাকে বের করতে ব্যর্থ হলাম। তথাকথিত ইনটেলেকচ্যুয়াল হওয়া সত্বেও ধর্মের নামে ফুল, বেলপাতা, ধূপবিহীন ধূপকাঠি, ফল-মিষ্টান্নাদির অঢেল আয়োজনে, মাইক বাজিয়ে, শব্দবাজির আওয়াজ দিয়ে পরিবেশবিদদের চিন্তার বলিরেখায় ভাঁজ ফেলে দিতে ইন্ধন যোগাচ্ছি। আর আমাদের গর্বের রবীন্দ্রনাথ আমাদের দ্বিচারিতা দেখে কষ্ট পাচ্ছেন আর ভাবছেন, যে মানুষগুলো ‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তলে’ ইত্যাদি ছন্দের ডালি সাজিয়ে ভক্তির আবেদন জানায়, তারাই আবার পূজার নামে কু-সংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে বিশ্বাত্মাকে দূষিত করে চলেছে।
          আমাদের বর্তমান যুগ যে যুক্তিবাদী সে কথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি অস্বীকার করবেন না আশাকরি। যেমন, সন্তানের হয়ে মা খেলে সন্তানের পেট ভরবে না। ছাত্রের হয়ে শিক্ষক লেখাপড়া করলে ছাত্র পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে না।–তেমনি প্রচলিত পূজার আয়োজকদের হয়ে কোন পুরোহিত পূজা করলে আয়োজকদের কিছু ফললাভ হবে কি ?

          অবশ্য পুরোহিতও  জানেন না ফললাতের বিষয় সম্পর্কে। যদি জানতেন বিসর্জন মন্ত্রে বলতেন না—ওঁ আবাহনং ন জানামি, নৈব জানামি পূজনম্। বিসর্জনং ন জানামি ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি (পরমেশ্বর)।–অর্থাৎ আমি আবাহনও জানিনা, বিসর্জনও জানিনা, আমাকে ক্ষমা করুন। (দ্রঃ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)

          বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী পূজ্য-প্রতিমা চঞ্চল চিত্তের ধারণের জন্য একটি অবলম্বন। প্রতিমাকে ব্রহ্মের রূপ কল্পনা করে উপাসনা, সংযম, সাত্তিক আহার, সাত্তিক বিহার ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে পূজা করা হয়।–যাতে পূজক বা উপাসক মনসংযোগ দ্বারা প্রতিমাকে হৃদয়ে ধারণ করে প্রতিমার গুণে গুণান্বিত হতে পারে। এই হলো প্রতিমা পূজার মূল কথা।

          এ থেকে এটুকু  বোঝা গেল যে  সততা, সংযম, ন্যায়নীতি ইত্যাদি মানবিক গুণগুলোর প্রবহমানতাকে বৎসারান্তির নবীকরণ করার মাধ্যম বাহ্য-পূজা উদযাপনের উদ্দেশ্য। অথচ বাঙালীর সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার আয়োজন বিশ্লেষণ করলে এর বিপরীত চিত্রটাই আমাদের বোধে ধরা পড়ে।   

          বিজ্ঞানের বিধি অনুযায়ী একটা নির্ভুল অংক কষতে গেলেও একটা শান্ত পরিবেশ প্রয়োজন, একাগ্রতার প্রয়োজন।  কিন্তু পূজার নামে, বেশীরভাগ পূজা-প্রাঙ্গনগুলোতে ঢাকের আওয়াজ, মাইকের আওয়াজ, আয়োজকদের অহংকারের আওয়াজে কোন সুস্থ মানুষের একটি ঘণ্টার জন্যও একাগ্রভাবে, স্থিরচিত্তে বসে থাকতে পারার কথা নয়! অবশ্য দেবদেবীর ব্যাপারটা আলাদা। মাটির পুতুল বলেই আমাদের সব অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করতে পারে! তাই কবিগুরুর ভাষার ‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’ বাণীগুলো এক নির্মম সত্যের বার্তা  দেয় না কি ?

          বাঙালিদের মানস-দেবী মা দুর্গা। ‘যা দেবি সর্বভূতেষু’ মন্ত্রে যাঁর অস্তিত্বের স্বরূপ প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ দেবী সর্বভূতের প্রাণশক্তি স্বরূপা, সর্বভূতে দেবী অধিষ্ঠিতা। এবার প্রশ্ন, যে দেবী সর্বভূতে অধিষ্ঠিতা সেই পঞ্চ-মহাভূত পরিপোষিত স্বেদজ, ক্লেদজ, অণ্ডজ, জরায়ুজ-জাত  ভূতগুলোকে, বেঁচে থাকার জৈবাজৈব  আবশ্যক উপাদানগুলোকে দেবীর প্রতিভূ  মনে করে সম্বর্দ্ধিত না করে, সুস্থভাবে টিঁকিয়ে রাখার  চেষ্টা না করে, কোন যুক্তিতে মাটির প্রতিমা পূজার নামে প্রাণী হত্যা করে, নানাভাবে পরিবেশকে দূষিত করার জন্য কোটি কোটি টাকা অপচয় করা হয়!

          ভাষা-বিজ্ঞান অনুযায়ী পূজা মানে পূরণ করা, সম্বর্দ্ধিত করা। যে আচার-আচরণ পরিবেশের সাত্তিক জীবন-বর্দ্ধনার অভাবকে পূরণ করে, জৈবাজৈব সবকিছুকে সম্যকরূপে বর্দ্ধিত করে, তার নাম পূজা।  উৎকৃষ্ট প্রসব করে যা, তার নাম উৎসব। আর যে আচার-আচরণ জীবনবৃদ্ধিকে নন্দিত করে তার নাম আনন্দ। এখন প্রশ্ন,  আমাদের প্রচলিত পূজা, উৎসবের উদযাপনকে কেন্দ্র করে আনন্দের প্রকাশ বৃহত্তর পরিবেশকে কতখানি নন্দিত করে  ‘পূজা’ শব্দের যথার্থতাকে উপহার দিতে পেরেছে ? –এইসব বিষয়ে সত্তাপিয়াসী চিন্তাশীলদের চিন্তা করে দেখা উচিত। বিশেষ করে যাঁরা কুসংস্কার বিরোধী রূপে নিজেদের বোধ ও বোধিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান।  

          বাহ্য পূজাবাদীদের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী পূজা শুরুর আগে মৃন্ময়ী মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়।  আয়োজকদের বিশ্বাস, পুরোহিতের মন্ত্রবলে নিষ্প্রাণ মূর্তিগুলো প্রাণবন্ত হয়। তর্কের খাতিরে বিষয়টাকে সত্য বলে যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে একটা  প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, জীববিজ্ঞান অনুযায়ী জীবন্ত প্রাণীদের চলন, গমন, ইত্যাদি অভিব্যক্তি থাকা আবশ্যিক।  অতএব বিজ্ঞানসম্মত  কারণেই পুরোহিতের মন্ত্রবলে দুর্গাঠাকুরের চালচিত্রের জীবন্ত দেবদেবী, অসুর, সিংহ, ময়ূর, সাপ, পেঁচা, ইঁদুরেরা নিজ নিজ অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে। কেউ চুপচাপ স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে পারবে না। ফলে শুরু হয়ে যাবে মহিষাসুর মর্দিনীর বাস্তব উপস্থাপনা। অসুর, দুর্গাকে আক্রমণ করবে, সিংহ গর্জন করতে করতে দেবীকে নিয়ে অসুরের দিকে ধাবিত হবে, বাহনসহ অন্যান্য দেবদেবীরাও যোগদান করবে যুদ্ধে।–এবার প্রশ্ন–ওই অবস্থায় পুরোহিত, আয়োজকেরা, ভক্তেরা,  উদ্বোধন করতে আসা সেলিব্রিটিরা, নেতা-মন্ত্রীরা কোন পক্ষে যোগদান করবেন? দেবীর পক্ষে না অসুরের পক্ষে ?

           আর একটা প্রশ্ন, যে পুরোহিত আদ্যিকালের দেবদেবীদের কল্পিত মাটির মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম, তিনি মানুষের প্রাণহীন দেহে আরো সহজে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন বা পারা উচিত। কারণ,  বিজ্ঞান মতে, মাটির মধ্যে থাকা অণু-পরমাণুর তুলনায় সদ্য মৃতদেহের অণু-পরমাণু বেশী সক্রিয় থাকে, বেশী জীবন্ত থাকে।  মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ এ বিযয়টা নিয়ে ভেবে দেখতে পারেন। তাহলে অনেক অকালমৃত্যু সহজে রোধ করা যাবে।   
          সনাতন ধর্মীয় মতবাদ অনুযায়ী মানুষ অমৃতের পুত্র, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ বলা হয়েছে।  সেই মানুষ যাতে দশবিধ-সংস্কারে সংস্কৃত হয়ে প্রকৃষ্ট জাতক বা প্রজা হয়, অকালে নিষ্প্রাণ না হয়, সন্ত্রাসবাদী না হয়, রেপ-কেসের আসামী না হয়, নারীদের মা-দুর্গার প্রতীক জ্ঞানে সম্মান জানায়, ‘অসতো মা সদ্গময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়’-এর আদর্শ অনুসরণে সমৃদ্ধ হয়,–সমাজের পুরোভাগে থেকে, ওইসব বিষয়ে মানুষকে সচেতন করে পরিবেশের হিতসাধন যাঁরা করতেন তাঁদের বলা হতো পুরোহিত। 

          সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পুরোহিত ঋষি বশিষ্ঠ রামচন্দ্রের রাজসভায় অকালমৃত্যু-দেহে প্রাণ সঞ্চার করার স্পর্দ্ধা দেখান নি।  বিজ্ঞান-যুগের পুরোহিতেরা যদি পুতুলে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন, মৃতদেহেও পারা উচিত! যদি না পারেন, ততঃ কিম্!

          ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি, ‘পূজা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সম্বর্দ্ধনা।  পূজ্য ব্যক্তিত্বের গুণে গুণান্বিত হয়ে নিজেকে এবং পরিবেশকে সম্বর্দ্ধিত করা।  এতদিন ধরে হাজার-হাজার দুর্গাপূজা করে আমাদের চিন্ময়ী নারীরা কতখানি সমৃদ্ধ হয়েছে মা দুর্গার আদর্শ চরিত্রের চরিত্রায়নে ? আমাদের চিন্ময় পুরুষেরা নারী সাধারণকে কতটা মা-দুর্গার প্রতীক মনে করে শ্রদ্ধা করতে বা পূজা করতে শিখেছে ? আমরা সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির পথে কতটা এগিয়েছি? আমাদের কতখানি দুর্গতি নাশ হয়েছে? আমাদের সার্বিক জীবন-চলনা দুর্গ-সম পরিরক্ষিত হয়েছে কতটা?—তথ্য জানার অধিকার বলে এ বিষয়ে জানতে চাওয়াটা নিশ্চয়ই অপরাধ হবে না! যদিও প্রচলিত তথ্য এর বিপরীত মত প্রকাশ করে চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। পূজাকে কেন্দ্র করে সাত্তিকতা বৃদ্ধি না পেলেও, তামসিকতা বেড়ে যায় বহুগুণ।  পুজোকে কেন্দ্র করে ভক্তদের অনিত্য দেহটাকে পূজা-বিপরীত সাধের  নানা বেশভূষায় সাজিয়ে দিতে বিকিকিনির পসরা সাজিয়ে যারা বসেন, তারা কি পূজা-সদৃশ সততার দৃষ্টান্ত  উপহার দেন সমাজকে ? পূজাই যদি উদ্দেশ্য তবে ইভটিজিং, আদমটিজিং কেন হবে ? অপরাধ কেন  বৃদ্ধি পাবে ? দূষণ কেন বৃদ্ধি পাবে পূজাকে কেন্দ্র করে ?— এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে ?  

          দুর্গাপূজার বিষয়টাকে বাস্তববোধে চিন্তা করলে দেখা যাবে, আমাদের আলোচ্য মা-দুর্গা পূজ্য তাঁর চরিত্রগুণে। মা দুর্গার সমার্থক, মা উমাকে আমরা কন্যা জ্ঞান করি। তাইতো ফি বছর কৈলাস থেকে নিয়ে আসি। যদিও তাঁকে আনতে এবং দিতে কে বা কারা যান। কোন রুটে দোলায়, নৌকায়, ঘোটকে এবং গজে যাতায়াত করেন, সে খবর দেবার দায়িত্ব তথ্যাধিকারীদের, আমার নয়! তবে আমি এবং আমরা দশভুজার চাইতেও দ্বিভুজা উমাকে বেশী পছন্দ করি বলেই না উমাকে নিয়ে কতই না আগমনী গানের ডালি সাজিয়ে তাঁকে বরণ করে নিতে চাই। কামনা করি, ঘরে ঘরে উমার মত আদর্শ  মেয়ে  যেন জন্মায়। উমাই তো আমাদের মা দুর্গা! ভারতেই শুধু নয়, সারা বিশ্বের সংস্কৃত মনীষায় নারীজাতির আদর্শরূপে স্বীকৃত, পূজিত। স্বীকৃতি পাবেনই না বা কেন, পূজিত হবেনই না বা কেন,–কারো কান-ভাঙানিতে কান না দিয়ে পরমভক্ত-পরমজ্ঞানী শিবকে পতিরূপে বরণ করে, স্বামীর মনোবৃত্যানুসারিণী স্ত্রী হয়ে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীদের ন্যায় কৃতি সন্তানদের জননী হয়েছেন। তিনি একজন আদর্শ সংসারী নারী হয়েও অসৎ নিরোধী তৎপর,–অশুভ শক্তিকে সমুচিত দণ্ড দেবার জন্য রণসাজে সজ্জিত হয়েছেন।  পশুরাজকে করেছেন বাহন। পারস্পরিক শত্রু খাদ্য-খাদক সম্পর্কের পেঁচা-ইঁদুর, ময়ুর-সাপকে মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ করেছেন। দুটি হাত দিয়েই বৃহত্তর সংসারের দশদিক সামলাতেন। তাই তো তিনি দ্বিভূজা হয়েও দশ ইন্দ্রিয়কে বশ করে হতে পেরেছেন দশভূজা। তাই তো তিনি দশপ্রহরণধারিণী।  তাই তো তিনি পূজ্য। –এহেন চরিত্র ‘দেবী’ জ্ঞানে, ‘জগজ্জননী’ জ্ঞানে স্বীকৃতি তো পাবেনই।  তাই তো আমাদের ঋষিরা দেবতাদের সম্মিলিত শক্তিতে সৃষ্ট দেবী দুর্গা কাত্যায়ন অঙ্গনে মহিষাসুরকে বধ করার পর তাঁর প্রদর্শিত শক্তিকে দৃষ্টান্ত স্বরূপ চিরস্থায়ী একটা আদর্শে রূপ দিয়েছিলেন। দেবী দুর্গাকে স্ত্রীজাতির এক আদর্শ প্রতীক রূপে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁরা দেবী দুর্গার ওই অসৎ-নিরোধী তৎপরতাকে দৃষ্টান্ত বূপে তুলে ধরে  নারীসাধারণকে  দেবী রূপে, জগন্মাতা রূপে   মর্যাদা দিয়েছেন,  কামিনীরূপে নয়। তাইতো বর্তমানেও সম্ভ্রান্ত হিন্দু নারীদের মধ্যে দেবী পদবি প্রচলিত।  ঋষিরা ছিলেন বিজ্ঞানী। তাই তো তাঁরা দুর্গাপূজার  বিধান দিলেন বাস্তব অনুশাসনের মাধ্যমে। আত্মবিস্তার কল্পে গর্ভাধান-সংস্কারের সময় স্বামী, নিজের স্ত্রীকে জগন্মাতা জ্ঞানে স্ত্রীর নাভিমূল স্পর্শ করে বলবেন, প্রসীদ মা জগজ্জননী,–হে  জগন্মাতার প্রতীকস্বরূপা চিন্ময়ী মা, তুমি প্রসন্ন হয়ে আমাকৃত গর্ভাধান মাধ্যমে দেদীপ্যমান আত্মাকে আকর্ষণ কর।–ওই স্বীকৃতির মাধ্যমে স্ত্রীকেও মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েছেন, কামিনীজ্ঞানে নয়।  এর কারণ, স্বামী, স্ত্রীর মাধ্যমে নিজেকে জন্মান, তাই তিনি জায়া।

          জীববিজ্ঞান অনুসারে প্রজনন-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আত্ম-প্রতিলিপি গঠন করা হয়। পুরুষ-বীজ ধারণ করে, বীজের প্রতিলিপি গঠন করে ভূমি-স্বরূপা নারী। জনন করেন বলে জননী। তাই কৃষকেরা ফসল ফলাতে জমি কর্ষণ করে, কর্ষণ মানে আকর্ষণ, যাতে জমি বীজ থেকে ভালো সন্তান (ফসল) আকর্ষণ করতে পারে। জমি অনুযায়ী উপযুক্ত শুদ্ধ-বীজ বপনের আগে ভূমিকে আগাছা মুক্ত করে, সার দেয়, জল দেয়, জমি জননক্ষম হলে জো বুঝে বীজ বোনে।–জমিকে মাতৃজ্ঞানে পোষণ দিয়ে ভূমিকে পূজা করে—যাতে জমি বীজের অন্তর্নিহিত সত্তাকে ভালোভাবে পুষ্ট করতে পারে, বীজের সত্তাকে ধারণ করে আদর্শ মা হয়ে ভালো ফসল ফলাতে পারে। ফসল ফলাতে যদি গর্ভাধান প্রক্রিয়া থাকতে পারে, মানুষ ফলাতে তো আরও বেশী বিধি-নিয়ম থাকা উচিত!  আমাদের ঋষিরা ছিলেন প্রকৃত বিজ্ঞানী। বিজ্ঞান শব্দটিও উপনিষদ থেকে উৎপত্তি হয়েছে। তাই ঋষিরা নারীদের জগন্মাতাজ্ঞানে ব্যবহার (treat) করতে, শ্রদ্ধা  (honour) করতে  শিখিয়েছেন।–যার নাম প্রকৃত পূজা। যার মাধ্যমে স্বভাবের স্ফূরণ হয়ে সব অভাবের পূরণ হয়।        

          এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন, “Accident-এ (আকস্মিকভাবে) যা’ জন্মে, তা বুনো, বিহিত সুফলপ্রদ চাষে যা’ জন্মে তা’ পুণো (পুণ্য)। প্রবৃত্তি লালসায় অবিধিপূর্বক উপগতি হয়ে যে সন্তান জন্মে, তার চরিত্রের কোন ঠিক ঠিক থাকে না। গর্ভাধান সংস্কারের ভিতর দিয়ে উন্নত চিন্তাপ্রসূত বিধিমাফিক পবিত্র যে জন্ম, তার রকমই আলাদা। ঘরে ঘরে ভগবান জন্মে। তেমনি ছিল আমাদের বিধান।’’ (আঃ প্রঃ ১৮/১৩) অতএব আমাদের ঘরের মা দুর্গারা যেদিন আবার ঘরে ঘরে ভগবান জন্মাতে পারবেন সেদিন সার্থক হবে আমাদের দুর্গাপূজা।  

   দুর্গাপূজার বাস্তবতা তুলে ধরতে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেনঃ

          “….যে মৃন্ময় মূর্ত্তি

                   আমরা পূজা করি— 

                   কল্পনায় প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করে,–

                             তিনি দশভূজা,

                                      দশপ্রহরণ-ধারিণী—

                                      ঐ আমাদের মায়েরই প্রতীক—

                             আমাদের ঘরে ঘরে

                                      যে মা অধিষ্ঠিতা

                                      তাঁরই বিনায়িত সুসঙ্গত প্রতীক;

          তাই ঐ মায়ের পূজা মানেই হচ্ছে—

                   যে মা আমার,

                   যে মা তোমার,

                   যে মা ঘরে ঘরে

                             দুর্গা হয়ে অধিষ্ঠিতা,

          দুর্গতিনাশিনী হয়ে

          দশপ্রহরণ ধারণ করে

                   সন্তান-সংরক্ষণায় নিয়োজিতা,

সেই মায়েরই পূজা;………..”

(আশীষ বাণী, ৬২/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)

“মা আমাদের দশভুজা,

          প্রতি ঘরে ঘরে

                   যদিও তাঁকে

                             দ্বিভুজাই দেখতে পাই,

                             তিনি

দশদিক্ আবরিত করে রেখেছেন—

          তাঁর স্নেহ-উৎসারিত

স্বস্তি-উৎসারিণী উদাত্ত অনুচর্য্যায়,

          কায়মনোবাক্যে

                   প্রতিটি কর্ম্মের ভিতর-দিয়ে

                             ব্যষ্টির পথে

                                      সমষ্টিকে আন্দোলিত করে,

          সাত্বত উৎসর্জ্জনায়

                   আপূরিত করে সবাইকে,

          কৃতি-উদ্দীপনার অনুপ্রেরণায়—

                   তাই মা আমার দশভূজা;……”

(আশীষ বাণী, ৫৯/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)

“পূজা মানেই হল বর্দ্ধনা। (আঃ প্রঃ ১২-১২-১৯৪১)

          আমি আপনার পূজা করছি মানে, আপনার গুণ চিন্তা করছি এবং নিত্য অনুশীলনের মাধ্যমে ঐ গুণগুলি আমার চরিত্রগত করে তুলছি, আমার ভিতরে বাড়িয়ে তুলছি।  স্তব করি মানে গুণ বর্ণনা করি।  তা কিন্তু শুধু মুখে বা মনে-মনে করলেই হবে না, প্রতিদিনকার অভ্যাস ও অনুশীলনের ভিতর দিয়ে ঐ গুণগুলি আমার চরিত্রে মূর্ত্ত করে তোলা চাই।’’    (দীপরক্ষী ৪/১৮২)

।। পূজা কেমন করে করতে হবে ।।

“দেবতার পূজা-অর্চনা করতে গেলে আগে ইষ্টের ভাব অন্তরে জাগ্রত করে সেই ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে, দেবতার স্মরণ মনন করতে হয়। তাঁকে স্মরণ করা মানে—তাঁর চলন-চরিত্র ও গুণ গরিমা স্মৃতিতে এনে অনুশীলনের ভিতর দিয়ে আয়ত্ব করা। চরণ-পূজা মানে চলন পূজা। ইষ্টের চলনাকে নিজের জীবনে আয়ত্ত ক’রে ঐ চলনের প্রসারতা ও সম্বর্দ্ধনা যদি না ঘটাই বাস্তবে, তাহলে তাঁর চরণ-পূজা সার্থক হয় না। আমরা ফাঁকতালে কাম সারতে চাই, কিন্তু বিধি বড় কঠিন বান্দা, কোন চালাকি চলে না তাঁর কাছে।” —শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র

                                                                             (আ. প্র. ২৯. ১২. ১৯৪২)

“প্রশ্ন। হিন্দুরা দেবদেবীর পূজা করেন কিন্তু মুসলমানেরা একমাত্র খোদাতায়ালার পূজা ক’রে থাকেন। হজরত ত’ ছবি ও পুতুল-পূজা একেবারেই নিষেধ ক’রে গেছেন, কিন্তু আপনি এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য করছেন কেমন-ক’রে ? 
শ্রীশ্রীঠাকুর । ধর্ম্ম-আচরণের দিক দিয়ে হজরত রসুলও যা’ ব’লে গেছেন, আর্য্যদের ধর্ম্মশাস্ত্র চিরকালই ঋষির নিদেশরূপে তাই বহন ক’রে আসছে। আর্য্য-ধর্ম্মশাস্ত্র ছবি বা পুতুল-পূজা এমনতর বিকট তাচ্ছিল্যের সহিত নিরস্ত করতে ঘোষণা ক’রেছেন—এমন-কি অধমাধম বলতেও ক্ষান্ত হন নি। তবে আর্য্য-ঋষিদের প্রত্যেক মানুষকে উন্নতির পথে নিয়ন্ত্রণ করবার এমনতর একটা ঝোঁক ছিল—যা-নাকি হজরত রসুলের ভিতর দেখেত পাওয়া যায়–………..” 
(ইসলাম-প্রসঙ্গে/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র/পৃঃ ২৮-২৯)

          ‘‘ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ, ভক্ত রামপ্রসাদ, সাধক রামকৃষ্ণ, সর্ব্বানন্দ ঠাকুর প্রভৃতি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ প্রতিমা পূজা করেছেন বটে, তাঁদের ঐ পূজার পিছনে ছিল গুরু-পূজা, ইষ্ট-আরাধনা ; ঐ প্রতিমার পরিকল্পনার ভেতর দিয়ে ছিল অশেষ ও অঢেলভাবে ইষ্টানুরক্তি। তাই, ঐ অধম অবলম্বনও তাঁদিগকে অধমভাবে আটকে রাখতে পারে নি। তাঁদের ঐ চলনার পথে একটা সময় এসেছিল, তখন তাঁদের ঐ প্রতিমা তাঁদের দর্শনের সম্মুখে আর ও-রকম ছিল না। ভগবান রামকৃষ্ণদেবেরও শোনা গিয়েছে—তাঁর এমনতর সময় এসেছিল, যখন মূর্ত্তি-টুর্ত্তি তাঁর সাধনার পথে বাধাই সৃষ্টি করতো। তিনি এমন-কি তাঁর ঘরে যে-সমস্ত ছবি-টবি ছিল, সেগুলিকেও সরিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি না-কি এই বলেছিলেন—‘মেয়েরা ততদিন পুতুলখেলা করে, যতদিন তার বে’ না হয়, স্বামী-সহবাস না করে।’ সাধক রামপ্রসাদ তাঁর স্বরচিত গানের ভেতরেই তো বলেছেন—

                                      ‘‘ধাতু-পাষাণ মাটির মূর্ত্তি

                                                কাজ কি রে তোর আরাধনে

তুই মনোময় প্রতিমা গড়ি’

বসা হৃদি-পদ্মাসনে।।’’

এমন কত কি যে আছে, তার ইয়ত্তা নেই।’’

(–শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, কথা প্রসঙ্গে, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৭৬, ১৭-১০-১৩৪২)

          এবার আমরা এক়টু দেখে দেখে নেব, পূজা প্রসঙ্গে ‘মেরা ভারত মহান’-এর অন্যান্য মহানেরা এবং মহান গ্রন্থগুলো কি নিদেশ রেখে গেছেন।

          পূজা বিষয়ে মহানির্ব্বাণতন্ত্র নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ  
          ‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ।
          অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’
          মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ভারতে বিবেকানন্দ গ্রন্থের  ৩৩৬  পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট। ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’

          ‘‘যে-ব্যক্তি সর্ব্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে।’’ –শ্রীমদ্ভাগবত। ৩-২৯-২২

          “ঈশ্বরঃ সর্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জ্জুন তিষ্ঠতি।
          ভ্রাময়ন্ সর্ব্বভূতানি যন্ত্ররূঢ়ানি মায়য়া।।“
                                                          –গীতা, ১৮।৬৫
                   “যিনি এই সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার নিজের স্বধর্মানুরূপ নিষ্কাম কর্মাচরণ দ্বারা (বাক্য বা ফুলজল দ্বারা নহে) পূজা করিয়া মানুষ সিদ্ধি লাভ করে । স্বধর্মানুরূপ (বর্ণানুগ সত্তাধর্ম পালন) নিষ্কাম কর্মই পরমেশ্বরের পূজার ডালি ।”
                                                                                      (গীতা ১৮।৪৬)
           “যে ব্যক্তি সর্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে ।
                                                                             (শ্রীমদ্ভাগবত ৩।২৯।২২)

                   ।।  শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দৃষ্টিতে প্রকৃত দুর্গাপূজা ।।

পূজা বিষয়ে মহানির্ব্বাণতন্ত্র নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ  
          ‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ।
          অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’
          মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ভারতে বিবেকানন্দ গ্রন্থের  ৩৩৬  পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট। ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’

          তাই, শাস্ত্র বর্ণিত অধমের চাইতেও অধম পূজায় মেতে উঠে আমাদের যাতে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে না হয়, তাই, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের নিত্য বাস্তব দুর্গাপূজার পূজারী করে তুলতে সৎসঙ্গীদের নিত্যপাঠ্য ‘সত্যানুসরণ’ নামক মহাগ্রন্থে নারীকে জগজ্জননী জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত করতে নিদেশ দিয়ে বললেন, ‘‘প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী । প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয় ।’’  এবং পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, ‘‘স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যে-জন, তাহার হয় না ভবের বন্ধন মোচন । …..স্ত্রী চিন্ময়ী মা।’’—এই শিক্ষার ধারাকে বাস্তবায়িত করার নাম প্রকৃত দুর্গাপূজা ।

          শ্রীশ্রীঠাকুর শুধু পুরুষদেরই প্রতিনিয়ত দুর্গাপূজা করার বিধান দিয়েই ক্ষান্ত হননি,   নারী-সাধারণের মধ্যেও দেবী দুর্গার এক স্থায়ী আসন পেতে দিতে অনুশ্রুতির বাণীতে বললেন—
‘‘শার্দ্দুলেরে বাহন করে
সাপের ফণার মালা পরে
কালবোশেখী ঝঞ্ঝাবেগে
ছোটরে নারী ছোটরে ছোট্ ।
দত্যিদানার নীচ বাহানা
আর্য্যাবর্তে দিয়ে হানা
ঘূর্ণিপাকের বেতাল গাঁথায়
হুলিয়ে ভুলিয়ে দিচ্ছে চোট্ ।
দশ প্রহরণ দশ হাতে ধর
বক্ষবিদরি ধ্বংসি ইতর
সূর্য্যরাগী বজ্রতেজে
আর্য্যনারী শত্রু টোট্ ।”
          তিনি নারীকে অবলা নয়, সবলারূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন । নারীর সতীত্বই নারীকে সবলা করে তোলে। তাই তিনি কত আশা নিয়ে বললেন—
‘‘সতীর তেজে ঝলসে দে মা
          নিঠুর কঠোর অন্ধকারে
মদনভস্ম বহ্নিরাগে
          বৃত্তি-রিপু দে ছারখারে ।
প্রণবতালে ইষ্টমন্ত্র
          ঝঙ্কারি তোল সকলতন্ত্রে
বিষাণ হাঁকে রুদ্র দোলায়
          বজ্রে হানি মৃত্যুদ্বারে।’’
মা দুর্গার আদর্শে অনুরঞ্জিত উক্ত বাণীগুলো যাতে তার সন্তানদের মননশীলতায় মা দুর্গার   
          তাই আসুন, পূজার নামে অনিত্য-বস্তুর প্রতিযোগিতায় না মেতে, সব দেবতার সমাহার-স্বরূপ যুগ-পুরুষোত্তমের বিধি মেনে, মা দুর্গার নিত্য-সিদ্ধ দেদীপ্যমান আদর্শের আলোকে, আমাদের ঘরের মেয়েরা যাতে রাষ্ট্রপূজার অর্ঘ্যস্বরূপ সুজননে সুসন্তানের উপহার সাজিয়ে, শক্তিরূপিণী-দশপ্রহরণধারিণী সাজে সজ্জিত হয়ে নরাসুরদের কিভাবে দমন করে  অস্তিত্ব রক্ষার পূজার পূজারী হতে পারে,– সেই চেষ্টায় যত্নবান হই।
                                                          জয়গুরু ! বন্দে পুরুষোত্তমম্!

।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দৃষ্টিতে বাস্তব ইষ্টপূজা ।।

          ইষ্ট স্বার্থ ও প্রতিষ্ঠার অনুকূলে

                   প্রবৃত্তি ও চাহিদাগুলিকে নিয়ন্ত্রিত ক’রে

          সত্ অর্থাত্ ইষ্টানুকূল জীবনবৃদ্ধিদ

                   যা’-কিছু চিন্তাকে

          বাস্তবতায় পরিণত করবার প্রচেষ্টার সঙ্গে

                    যথাযথ সেবা ও যাজনে

          পারিপার্শ্বিককে আকৃষ্ট ও উদ্বুদ্ধ ক’রে

                   প্রতি প্রত্যেককে ইষ্টে অনুরক্ত ক’রে তোলাই হচ্ছে

                             প্রকৃত ইষ্টপূজা।২৪ 

                                                —পথের কড়ি  

 
                                     
                                               

দুর্গাপূজা নিয়ে জিজ্ঞাসা

।। মাদুর্গার আসা-যাওয়ার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন।।
প্রচলিত আছে এবং পঞ্জিকাতে উল্লেখিত থাকে যে, মাদুর্গা ফি বছর কৈলাস থেকে আসা-যাওয়া করেন। এখন প্রশ্ন—(১) তাঁকে আনতে এবং দিতে কে বা কারা যান ?
এবং (২) কোন রুটে দোলায়, নৌকায়, ঘোটকে কিম্বা গজে যাতায়াত করেন ? পূজারীরা সঠিক উত্তর দিয়ে বাধিত করবেন আশাকরি।

।। দুর্গাপূজার বাস্তব চিত্র।।
‘পূজা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সম্বর্দ্ধনা। পূজ্য ব্যক্তিত্বের গুণে গুণান্বিত হয়ে নিজেকে এবং পরিবেশকে সম্বর্দ্ধিত করা। এতদিন ধরে হাজার-হাজার দুর্গাপূজা করে আমাদের চিন্ময়ী নারীরা কতখানি সমৃদ্ধ হয়েছে মা দুর্গার আদর্শ চরিত্রের চরিত্রায়নে ? আমাদের চিন্ময় পুরুষেরা নারী সাধারণকে কতটা মা-দুর্গার প্রতীক মনে করে শ্রদ্ধা করতে বা পূজা করতে শিখেছে ? আমরা সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির পথে কতটা এগিয়েছি ? আমাদের কতখানি দুর্গতি নাশ হয়েছে ? আমাদের সার্বিক জীবন-চলনা দুর্গ-সম পরিরক্ষিত হয়েছে কতটা ?—তথ্য জানার অধিকার বলে এ বিষয়ে জানতে চাওয়াটা নিশ্চয়ই অপরাধ হবে না ! যদিও প্রচলিত তথ্য এর বিপরীত মত প্রকাশ করে চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। পূজাকে কেন্দ্র করে সাত্তিকতা বৃদ্ধি না পেলেও, তামসিকতা বেড়ে যায় বহুগুণ। পুজোকে কেন্দ্র করে ভক্তদের অনিত্য দেহটাকে পূজা-বিপরীত সাধের নানা বেশভূষায় সাজিয়ে দিতে বিকিকিনির পসরা সাজিয়ে যারা বসেন, তারা কি পূজা-সদৃশ সততার দৃষ্টান্ত উপহার দেন সমাজকে ? পূজাই যদি উদ্দেশ্য তবে ইভটিজিং, আদমটিজিং কেন হবে ? অপরাধ কেন বৃদ্ধি পাবে ? দূষণ কেন বৃদ্ধি পাবে পূজাকে কেন্দ্র করে ?— এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে ?

।। দুর্গাপূজা বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাসা ।।

তথাকথিত যে পুরোহিতগণ আদ্যিকালের দেবদেবীদের কল্পিত মাটির মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম, তিনি বা তাঁরা মানুষের প্রাণহীন দেহে আরো সহজে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন বা পারা উচিত। কারণ, বিজ্ঞান মতে, মাটির মধ্যে থাকা অণু-পরমাণুর তুলনায় সদ্য মৃতদেহের অণু-পরমাণু বেশী সক্রিয় থাকে, বেশী জীবন্ত থাকে। মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ এ বিযয়টা নিয়ে ভেবে দেখতে পারেন। তাহলে অনেক অকালমৃত্যু সহজে রোধ করা যাবে।

।। দুর্গাপূজা বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাসা ।।
ইদানীংকালে সংযোজিত খুঁটি-পুজো (!)-র কথা বাদ দিলেও বাহ্য পূজাবাদীদের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী পূজা শুরুর আগে মৃন্ময়ী মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। আয়োজকদের বিশ্বাস, পুরোহিতের মন্ত্রবলে নিষ্প্রাণ মূর্তিগুলো প্রাণবন্ত হয়। তর্কের খাতিরে বিষয়টাকে সত্য বলে যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে একটা প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, জীববিজ্ঞান অনুযায়ী জীবন্ত প্রাণীদের চলন, গমন, ইত্যাদি অভিব্যক্তি থাকা আবশ্যিক। অতএব বিজ্ঞানসম্মত কারণেই পুরোহিতের মন্ত্রবলে দুর্গাঠাকুরের চালচিত্রের জীবন্ত দেবদেবী, অসুর, সিংহ, ময়ূর, সাপ, পেঁচা, ইঁদুরেরা নিজ নিজ অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে। কেউ চুপচাপ স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে পারবে না। ফলে শুরু হয়ে যাবে মহিষাসুর মর্দিনীর বাস্তব উপস্থাপনা। অসুর তার অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দেবী দুর্গাকে আক্রমণ করবে, সিংহ গর্জন করতে করতে দেবীকে পিঠে নিয়ে অসুরকে ধাওয়া করবে, অন্যান্য দেবদেবীরাও যার যার বাহন নিয়ে যোগদান করবে যুদ্ধে। —এবার প্রশ্ন–ওই অবস্থায় পুরোহিত, আয়োজকেরা, ভক্তেরা, উদ্বোধন করতে আসা সেলিব্রিটিরা কোন পক্ষে যোগদান করবেন ?

 ।। প্রতিমাপূজা কারে কয় ।।
বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার পণ্ডিতদের মত অনুযায়ী পূজ্য-প্রতিমা চঞ্চল চিত্তের ধারণের জন্য একটি অবলম্বন। প্রতিমাকে ব্রহ্মের রূপ কল্পনা করে উপাসনা, সংযম, সাত্তিক আহার, সাত্তিক বিহার ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে পূজা করা হয়। —যাতে পূজক বা উপাসক মনসংযোগ দ্বারা প্রতিমাকে হৃদয়ে ধারণ করে প্রতিমার গুণে গুণান্বিত হতে পারে। এই হলো প্রতিমা পূজার মূল কথা। 
এবার প্রশ্ন—বিজ্ঞানের বিধি অনুযায়ী একটা নির্ভুল অংক কষতে গেলেও একটা শান্ত পরিবেশ প্রয়োজন হয়, মনসংযোগ, একাগ্রতার প্রয়োজন হয়। অথচ, একটু নজর করলে দেখা যাবে পূজার নামে, বেশীরভাগ পূজা-প্রাঙ্গনগুলোতে ঢাকের আওয়াজ, মাইকের আওয়াজ, আয়োজকদের অহংকারের আওয়াজে কোন সুস্থ মানুষের পক্ষে একটি ঘণ্টার জন্যও একাগ্রভাবে, স্থিরচিত্তে বসে থাকতে পারার কথা নয়! তাহলে পূজক বা উপাসক মনঃসংযোগ করবে কোন উপায়ে ?

পূজা বনাম কমন সেন্স :
আমাদের বর্তমান যুগ যে যুক্তিবাদী সে কথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি অস্বীকার করবেন না আশাকরি। যেমন, সন্তানের হয়ে মা খেলে সন্তানের পেট ভরবে না। ছাত্রের হয়ে শিক্ষক লেখাপড়া করলে ছাত্র পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে না।–তেমনি প্রচলিত পূজার আয়োজকদের হয়ে কোন পুরোহিত পূজা করলে আয়োজকদের কিছু ফললাভ হবে কি ? আয়োজকেরা সত্যই কত মহান তাই না ! ফল লাভের কথা না ভেবেই কত কষ্ট করে পূজার আয়োজন করেন !
অবশ্য পুরোহিতও জানেন না ফললাতের বিষয় সম্পর্কে। যদি জানতেন বিসর্জন মন্ত্রে বলতেন না—ওঁ আবাহনং ন জানামি, নৈব জানামি পূজনম্। বিসর্জনং ন জানামি ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি (পরমেশ্বর)। —অর্থাৎ আমি আবাহনও জানিনা, বিসর্জনও জানিনা, আমাকে ক্ষমা করুন। (দ্রঃ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)

Top of Form


।। বিষয়—কুমারী পূজা ।।

কুমারী পূজা হলো তন্ত্রশাস্ত্রমতে অনধিক ষোলো বছরের অ-রজঃস্বলা কুমারী মেযে়র পূজা। বিশেষত দুর্গাপূজার অঙ্গরূপে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও কালীপূজা, জগদ্ধাত্রীপূজা এবং অন্নপূর্ণা পূজা উপলক্ষে এবং কামাখ্যাদি শক্তিক্ষেত্রেও কুমারী পূজার প্রচলন রয়েছে।

      শাস্ত্রানুসারে কুমারী পূজা না করলে দেবদেবীর পূজা ও  হোম সফল হয় না। শক্তির আরাধনার নামে আদর্শ নারীশক্তির প্রতীক স্বরূপা দুর্গা, কালী, জগদ্ধাত্রী এবং অন্নপূর্ণা পূজার আয়োজন হয়ে চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। যার উদ্দ্যেশ্য চিন্ময়ী নারীদেরও আমরা যেন আদ্যাশক্তির প্রতীক মনে করে পরমার্থ দর্শন ও পরমার্থ অর্জন করতে অভ্যস্ত হই,  শ্রদ্ধা জানাই,  নারীকে যেন কামনার, ভোগের বস্তু মনে না করি, নারীকে ভোগ্যা নয় পূজ্যা রূপে স্বীকৃত দেবার জন্যই কুমারী পূজা।  আদ্যাশক্তির প্রতীক নারীরা যদি রুষ্ট হয় তাহলে সৃষ্টির ছন্দে পতন অবশ্যম্ভাবী। ওই আদর্শকে সমাজজীবনে প্রতিষ্ঠা দিতে মূর্ত্তিপূজার পাশাপাশি তন্ত্রশাস্ত্রকারেরা দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য দেবীজ্ঞানে কুমারী পূজারও প্রচলন করেছিলেন। ফলহারিনী কালীপূজার রাতে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নিজের স্ত্রীকে ষোড়শীজ্ঞানে পূজা করেছিলেন।   

      পূর্বের তুলনায় হ্রাস পেলেও বর্তমানেও শক্তিপীঠ কামরূপ কামাক্ষ্যা, বেলু়ড় মঠসহ প্রতিষ্ঠত রামকৃষ্ণ মিশনগুলোতে, আদ্যাপীঠ প্রভৃতি  বিখ্যাত স্থানসহ ভারত ও বাংলাদেশের অনেক স্থানে রক্ত-মাংস দিয়ে গড়া অনার্তবা অর্থাৎ অ-রজঃস্বলা—১৬ বছর সময়সীমার মধ্যে যে মেয়ে ঋতুমতী হয়নি এমন কুমারী মেয়েদের দেবীজ্ঞানে তন্ত্রমতে পূজা করা হয়।

বয়স অনুযায়ী কুমারী মেয়েদের উপাধি—

১ বৎসরের কন্যাকে সন্ধ্যা

২   বৎসরের কন্যাকে  সরস্বতী

৩ বৎসরের কন্যাকে ত্রিধামূর্তি

৪ বৎসরের কন্যাকে কালিকা

৫ বৎসরের কন্যাকে সুভগা

৬ বৎসরের কন্যাকে উমা

৭ বৎসরের কন্যাকে মালিনী

৮ বৎসরের কন্যাকে কুব্জিকা

৯ বৎসরের কন্যাকে কাল-সন্দর্ভা

১০ বৎসরের কন্যাকে অপরাজিতা

১১ বৎসরের কন্যাকে রূদ্রাণী

১২ বৎসরের কন্যাকে ভৈরবী

১৩ বৎসরের কন্যাকে মহালক্ষী

১৪ বৎসরের কন্যাকে পীঠনায়িকা

১৫ বৎসরের কন্যাকে  ক্ষেত্রজা

১৬ বৎসরের কন্যাকে অম্বিকা  

ইদানীংকালে হিন্দুত্বের বড়াই করা ভক্তরা সরকার স্বীকৃত ‘শক্তির আরাধনা’য় যে হারে ব্যাপৃত হয়েছে, সেই হারে কিন্তু  নারী-সাধারণকে পূজ্যা রূপে  প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। শক্তি আরাধনার আয়োজকদের মধ্যে কুমারীপূজার আদর্শ যদি প্রতিষ্ঠা পেত তাহলে নারীদের কেউ লালসার বস্তু মনে করতে পারত না আর নারীরাও নিজেদের লাস্যময়ী রূপে নিজেদের বিজ্ঞাপিত করে পুরুষের কামনার আগুনে ইন্ধন দিত না। কারণ দুর্গাপূজা, কালীপূজার নামে যত মানুষ মেতে ওঠে তারা যদি প্রকৃতই শক্তির আরাধনার শিক্ষাটাকে পোলিও প্রচারের মত সমাজে চারিয়ে দিতে পারতেন তাহলে কি ইভটিজিং, ধর্ষণ, ডিভোর্স, নারী নির্যাতনের মতো জ্বলন্ত সমস্যায় কি জর্জরিত হতে হতো আমাদের এই ভারতবর্ষকে ?

তাই, শাস্ত্র বর্ণিত অধমের চাইতেও অধম পূজায় মেতে উঠে আমাদের যাতে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে না হয়, তাই, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের নিত্য-বাস্তবে কুমারীপূজার পূজারী করে তুলতে সৎসঙ্গীদের নিত্যপাঠ্য ‘সত্যানুসরণ’ নামক মহাগ্রন্থে নারীকে জগজ্জননী জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত করতে নিদেশ দিয়ে বললেন, ‘‘প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী । প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয় ।’’  এবং পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, ‘‘স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যে-জন, তাহার হয় না ভবের বন্ধন মোচন । …..স্ত্রী চিন্ময়ী মা।’’—এই শিক্ষার ধারাকে বাস্তবায়িত করার নাম প্রকৃত কুমারীপূজা ।

মহালয়া ও পিতৃতর্পন

।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের দৃষ্টিতে মহালয়া।।

—তপন দাস

আশ্বিন মাসের অমাবস্যা তিথিতে পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের শুরুর দিনটি মহালয়া।  পিতৃযান বা পিতৃলোক থেকে আত্মারা মর্ত্ত্যলোকের মহান আলয়ে সম্মিলিত হন, সেই বিশ্বাসে পিতৃ-মাতৃহারা আর্য্য হিন্দুরা তাঁদের তৃপ্তির জন্য তিল-জলসহ মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক বিগত ঊর্দ্ধতন পিতৃ-মাতৃ পুরুষদের গোত্র উল্লেখ করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন,–যাতে তাঁরা লিঙ্গদেহের  নিরাশ্রয় নিরালম্ব বায়ুভূতের কষ্টদায়ক ভোগ কাটিয়ে অচিরেই পিণ্ডদেহ ধারণ করতে পারেন।–সাথে ‘আব্রহ্মভুবনল্লোকা’ মন্ত্রে সকল জীবের তৃপ্তির প্রার্থনা জানান হয়। এক্ষেত্রে স্মরণে রাখা উচিত বংশে যদি সগোত্রে,  সপিণ্ডে এবং প্রতিলোম বিবাহ হয়, তাহলে কোন মন্ত্রে, কোন দানে পিতৃ পুরুষদের আত্মা তৃপ্ত হবে না। তাঁরা পিণ্ডদেহ ধারণ করতে পারবেন না।

হিন্দুদের প্রামাণ্য স্মৃতিগ্রন্থ মনু সংহিতার বিধান অনুযায়ী ব্রহ্মযজ্ঞ, দেবযজ্ঞ, ঋষিযজ্ঞ, পিতৃযজ্ঞ ও নৃযজ্ঞ ইত্যাদি নামের পঞ্চ মহাযজ্ঞ অর্থাৎ বিশ্বাত্মার অন্তর্ভূক্ত সকলের মঙ্গল স্থাপনের লক্ষ্যে বাস্তব কর্মের নিত্য-উদযাপনের যে নিত্য তর্পনের বিধান  বিদ্যমান, তার মধ্যে পিতৃযজ্ঞ অন্যতম। আমরা সারাবছর সেসব ভুলে এই একটি দিন বিগত আত্মাদের স্মরণ করে হিন্দুত্ব রক্ষা করতে চেষ্টা করি। উক্ত ব্রাত্যদোষ থেকে মুক্তি পাবার বিধান দিলেন যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ পালনের মাধ্যমে। শ্রীশ্রীঠাকুর  প্রদত্ত ইষ্টভৃতি নিবেদন মন্ত্রের ‘‘…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপারর্শ্বিকাঃ ।।’’ উচ্চারণ করার সাথে সাথে বৃহত্তর পারিপার্শ্বিকের জীবনবৃদ্ধির দায়ভারের শপথ নিতে হয় আমাদের । সব অবস্থাতে বাস্তব কর্মে বৃহত্তর পরিবেশের জৈবাজৈব সবকিছুকে পালন-পোষণে সমৃদ্ধ করে রাখার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সার্থক হয় পঞ্চ-মহাযজ্ঞ বা ইষ্টভৃতি পালন ।

শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের মধ্যে আর্য্যত্বকে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বললেনঃ

‘‘পঞ্চবর্হি যা‘রা স্বীকার করে, আর সপ্তার্চ্চি অনুসরণ করে, তারা যেই হোক আর যা’ই হোক– আর্য্য বা আর্য্যীকৃত৬০১ ’’

(শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৭)

‘‘আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে গেল সেইদিন যেদিন থেকে আমরা পঞ্চবর্হির মূল নির্দ্দেশ অবজ্ঞা করতে শুরু করলাম । তখন থেকে আমরা অপরের খোরাক হলাম কিন্তু নিজেদের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখে পরকে আপন ক’রে নেবার সামর্থ্য হারিয়ে ফেললাম ।’’ (আঃ প্রঃ ১১। ১০০)

‘‘পঞ্চবর্হি ও সপ্তার্চ্চিই হ‘চ্ছে সেই রাজপথ–যা’কে স্বীকার ও গ্রহণ ক’রে চললে ক্রমশঃই তুমি সার্থকতায় সমুন্নত হ’তে পার । ২৩৪ ।’’ (সম্বিতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ১২১)

সর্বশাস্ত্রসার গীতা গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ইষ্টকে নিবেদন  না করে খাদ্য খেলে চোর হতে হয়। ইষ্টকে নিবেদন করার বাসনা নিয়ে শুদ্ধ বাজার করতে হবে, মন্দিরে ভোগ রান্নার ন্যায় শুচিশুদ্ধ ভাবে রান্না করতে হবে। শুদ্ধ চিত্তে নিবেদন করে প্রসাদ স্বরূপ তা খেতে হবে। না হলে চোর হতে হবে।

এ বিষয়ে আবশ্যিক পালনীয় বিষয়,— অভক্ষ্যভোজী,— অর্থাৎ মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুনাদি তামসিক আহার যাঁরা করেন, হিন্দুমতে তাদের অভক্ষ্যভোজী বলা হয়েছে। অগম্যাগামী, অর্থাৎ যারা সগোত্র এবং সপিণ্ড সম্বন্ধীয়দের সাথে অবিধি পূর্বক ধর্মবিরুদ্ধ কামাচার করে হিন্দুমতে তাদের  অগম্যাগামী বলা হয়েছে। এরা কদাচারী, এদের প্রদত্ত আহার ও পানীয় অশুদ্ধ। (দ্রঃ সম্বিতী) অতএব ইষ্টপ্রাণ বা ভক্ত উপাধি অর্জন করতে হলে প্রথমেই বর্ণধর্মানুযায়ী সদাচারী  হতে হবে।

শ্রীশ্রীঠাকুর তাই আমাদের খাদ্য গ্রহণের পূর্বে নিবেদন করার বিধান দিলেন।–নিবেদন-ভূমিতে খাদ্য এবং জল দিয়ে বলতে হয়—পরলোকগত পিতৃপুরুষ, আত্মীয়স্বজন, গুরুভাই ও আব্রহ্মস্তম্ব প্রত্যেকে যেন অন্ন পাকে পরিতৃপ্ত হয়ে, সন্দীপ্ত হয়ে জীবন-যশ ও বৃদ্ধিতে পরিপোষিত হয়ে স্মৃতিবাহী চেতনা লাভ করে পরমপিতা তোমারই চরণে যেন সার্থকতা লাভ করে।–এইভাবে গণ্ডুষ করতে হয়।

শ্রীশ্রীঠাকুর নিদেশিত উক্ত নিত্য তর্পণের বিধান মেনে চললে আত্মশুদ্ধি হয়, নিরালম্ব বায়ুভূতে কষ্ট পেতে হয় না। পূর্বপুরুষরাও তৃপ্ত হন।

এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন, ‘‘আপুরমান ইষ্টে কারও যদি প্রকৃত টান জন্মে, এবং তাই নিয়ে যদি সে বিগত হয় তবে সে মহান জীবন লাভ করবেই। আবার এ জীবনে যে যতই হোমরা-চোমরা হোক না কেন, সে যদি সুকেন্দ্রিক না হয়, প্রবৃত্তিই যদি তার জীবনের নিয়ামক হয়, তবে ঐ বিচ্ছিন্ন বিকেন্দ্রিকতা তার মৃত্যুকালীন ভাবভূমি ও পরজন্মকে যে অপগতিতে অপকৃষ্ট করে তুলবে, তাতে সন্দেহ কমই।’’  (আঃ প্রঃ ১১/১৮.০৩.১৯৪৮)

      তাই পিতৃপক্ষ, দেবীপক্ষ, দেবী আরাধনা, দেবতা আরাধনা, পূজা তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা একমাত্র ইষ্টকেন্দ্রিক চলনে পুরুষোত্তম প্রদত্ত নিত্য-তর্পণ বিধি মেনে জীবাত্মায় বিশ্বাত্মার উপলব্ধি নিয়ে আত্ম-পূজায় সার্থক হতে পারব।–আজ্ঞাচক্রে ইষ্টের ভাব নিয়ে মহাচেতন সমুত্থানের পথে পাড়ি জমাতে পারব।

স্বাধীনতা দিবসের ভাবনা

         স্বাধীনতা দিবসের ভাবনা

নিবেদনে—তপন দাস

        সংবিধানের ৩৭০ ধারার বিলোপ পরবর্তী সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের আশঙ্কা নিয়েই জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখসহ সমগ্র ভারতে মহা সমারোহে পালিত  হলো ভারত যুক্তরাষ্ট্রের ৭৩তম স্বাধীনতা দিবস। অফিসে ক্লাবে, বিদ্যালয়ে, সরকারী ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলিত  হয়েছে। হস্তে, শকটে, রজ্জুমালায় সজ্জিত হয়েছে জাতীয় পতাকা।  রাষ্ট্রীয় স্তোত্র, জাতীয় সংগীত বৃন্দকণ্ঠে ধ্বনিত হলো, ব্যাণ্ড  বাজল, প্যারেড হলো, জাতীয় পতাকা সম্বলিত  শোভাযাত্রা গ্রাম-শহর-নগর  পরিক্রমা করল। মাঠে-মাঠে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা।  স্বাধীনতা-দিবসের ছুটির আমেজের রসনার তৃপ্তির জন্য মাংসের দোকানে, বিরিয়ানীর দোকানে লাইন দিয়েছে,  কেউ কেউ। ১৫ আগস্টের দিনটাকে সব দিক দিয়ে আমরা উপভোগ ঠিক নয়, ভোগ করলাম। স্বাধীন ভারতের নাগরিক হিসাবে জাতীয় পতাকাকে সম্মান জানালাম। আমাদের কর্তব্য ইতি।  যদিও পরের দিন কাগজে নির্মিত অনেক জাতীয়-পতাকা অভিভাবকত্বের অভাবে ভুলুন্ঠিত হতে দেখা গেছে !

গণপ্রজাতন্ত্রী আধুনিক ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ধর্মকে রক্ষা করে চলার কর্তব্যকে। রাষ্ট্রীয় মন্ত্র ‘সত্যমেব জয়তে’ স্মরণ করিয়ে দেয় উপনিষদীয় আচার্য অনুসরণের  শাশ্বত অবলম্বনকে। স্মরণ করিয়ে দেয় ‘‘আত্মবৎ  সর্বভূতেষু, মাতৃবৎ পরদারেষু, লোষ্ট্রবৎ পরদ্রব্যেষু…..’’-এর আদর্শের কথা। রাষ্ট্রের কর্ণধার রাষ্ট্রপতিসহ মন্ত্রীবর্গ প্রত্যেকেই ঈশ্বরের নামে শপথ গ্রহণ করে ঈশ্বরসৃষ্ট জীবগণের কল্যাণ সাধনে ব্রতী হয়। ঈশ্বরের প্রতিভূস্বরূপ জাগতিক ন্যায়দণ্ডধারী বিচারকেরা ধর্মাধিকরণ নামে চিহ্নিত। বিচারালয়কে বলা হয় ধর্মস্থান। তথাপি স্বাধীনতা দিবসের দিনেও প্রাণী-হত্যার ছাড়পত্র! কেন নিরীহ প্রাণীগুলোর সুস্থভাবে বেঁচে থাকার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষ !—এ প্রশ্নের জবাব দেবে কে?

        স্বাধীনতা মানে সু-এর অধীনতা, সত্তার অধীনতা। স্বাধীন যে, সে কখনোই স্বেচ্ছাচারী হয়ে কোন সত্তাবিধ্বংসী অসৎ কাজ তো করবেই না বরং সে অসৎ নিরোধে তত্‍পর হবে। মানুষ যখন প্রবৃত্তির অধীনতা থেকে মুক্তি পেতে পরমপিতাকে আশ্রয় করে বিবেককে অবলম্বন করে চলতে শেখে তখনই সে প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করে। তখন সে অন্যায়, অধর্ম, দুর্নীতি, ভ্রষ্টাচারকে আশ্রয় করে “সত্যমেব জয়তে”র সীলমোহরের দখল নিতে চাইবে না, উৎকোচ নিয়ে ন্যায়কে অন্যায়, অন্যায়কে ন্যায় বানাবার জন্য “সত্যমেব জয়তে”র সীলমোহরের ব্যবহার করবে না। অসৎ বলে ওগুলোকে ঘৃণা করবে। মেয়েদের মাতৃভাবে দেখবে। কামনার বস্তু রূপে নয়। কি ঘরে, কি বাইরে, কোন অসতের সাথে, অন্যায়ের সাথে আপোষ করবে না।

        ভারতীয় অনুশাসনের সাম, দান, ন্যায়, দণ্ড, নীতি ও ভেদ-এর রাজধর্ম রক্ষার পবিত্র কর্তব্যে যাতে এতটুকু অন্যায়, অধর্ম প্রবেশ করতে না পারে তার জন্যই ওইসব মহাভারতীয় নীতির অনুসরণ। বিধিবৎ প্রকৃষ্ট-জাতক সৃষ্টি করে প্রজা পালনের স্বার্থেই  ওই অনুশাসনকে আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি। তথাপি যখন ভারতীয় শাসন সংহিতা বা সংবিধান ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ না করে, ধর্ম এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়কে এক করে ফেলে ‘ধর্ম-নিরপেক্ষতাবাদ’,––অর্থাৎ রাষ্ট্র ধর্মের অনুবর্তী নয়’-এর মতবাদকে প্রতিষ্ঠা দেয়, তখন কি মনে হয় না, আমরা জাতীয়তাবাদের আদর্শের প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েও এক পরস্পর বিরোধী আচরণ করে চলেছি !  

  বর্তমান যুগ-পুরুষোত্তম কথিত ধর্মের যুগান্তকারী সংজ্ঞা ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম বলে জানিস তাকে। ধর্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম না-রে।’ সমন্বয় বার্তাবহ বাণীকে গুরুত্ব না দিয়ে ধর্মের নামে, ভারতীয় সংহিতার নীতি বহির্ভূত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তি পরায়ণতার  আস্ফালনকে, কতগুলো অনিত্য, অসার, পৌত্তলিক কু-সংস্কারকে যদি ‘ধর্ম’ নামে প্রতিষ্ঠা দিতে চাই, তা’ কি বিচক্ষণতার পরিচায়ক হবে, না ভারতবর্ষের কৃষ্টির পরিপূরক হবে? ওই ভুলের বোঝা কি আমাদের চিরদিন বইতে হবে? আমাদের বুদ্ধি, বোধ কি নিরেটই থেকে যাবে?

যে নীতি-বিধি পদার্থের অস্তিত্ব রক্ষার সহায়ক তাই তো ধর্ম। পদার্থের স্বকীয়তা ধারণ করে রাখার সহায়ক যা’ তাই ধর্ম। ধর্ম পালন করলেই পদার্থ টিঁকে থাকবে, নচেৎ থাকবে না। সংসদ প্রকাশিত ইংরেজী অভিধানে ধর্মের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘It is an action, one is bound to  do.’ সেই ধর্মের আবার পক্ষ আর নিরপেক্ষ কি? বেঁচে থাকার অজৈব উপকরণ বায়ু, জল, মাটি ইত্যাদির যদি ধর্ম থাকতে পারে, এবং তা’ যদি বিজ্ঞানের বইতে পাঠ্য হতে পারে, তাহলে মানুষের অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার নীতিবিধি-সমন্বিত ভারতের নিজস্ব সংহিতাগুলোর বিধানসমূহ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের সংহিতায় স্থান পাবে না কেন, প্রজাদের শিক্ষা দিতে পাঠ্য করা  হবে না কেন?    

রাষ্ট্রের সৃষ্টিই তো প্রজাদের অধর্ম বা দুর্নীতি থেকে মুক্ত করে ধার্মিক, অর্থাৎ সু-নীতি পরায়ণ করে তোলার জন্য। সেই রাষ্ট্র যদি তার প্রজাবর্গকে, তাদের পিতৃ-পিতামহের আদর্শ অনুসারী ধর্ম-পরায়ণ, কৃষ্টি-পরায়ণ হতে উৎসাহ না দিয়ে, প্রবৃত্তি-পরায়ণতায় উৎসাহ দেয়, সেটা ভারতবর্ষের জাতীয়  উত্তরাধিকারত্বের অস্তিত্বকে বিপন্ন করার বার্তা ভিন্ন আর কিছু নয়।

আর্য্য ভারতবর্ষের আদি সংবিধান ‘ব্রহ্মসূত্র’-এর নবীন সংস্করণ ‘কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র’ অনুযায়ী–-

‘‘সুখস্য মূলম্ ধর্ম্মম্

ধর্ম্মস্য মূলম্ অর্থম্

অর্থস্য মূলম্ রাষ্ট্রম্

রাষ্ট্রস্য মূলম্ ইন্দ্রিয় বিজয়ম্

ইন্দ্রিয় বিজয়স্য মূলম্ জ্ঞানবৃদ্ধ সেবয়া

জ্ঞানবৃদ্ধ সেবয়া বিজ্ঞানম্।’’

অর্থাৎ সুখী হতে হলে ধর্ম পালন করতে হবে। প্রকৃত ধার্মিক হতে হলে পুরুষার্থের চতুর্বর্গ সমন্বিত আশ্রমধর্ম পালন করতে হবে। নির্বিঘ্নে আশ্রমধর্ম পালন করার জন্য রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী প্রজাদের দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী হবার জন্য গুরু গ্রহণ করতে হবে। গুরুর আদেশ-নিদেশ পালন করলে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করা যাবে। তবেই জীবনে সুখী হওয়া যাবে, প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হওয়া যাবে।

——–