যোগীর
সাথে যোগাযোগ : ‘‘যোগাৎ
চিত্ত-বৃত্তি নিরোধ’’ –তপন দাস
বর্তমান
পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, “যোগী মানেই বুঝবেন—যে যুক্ত, যার
যোগ আছে অর্থাৎ কিছু বা কাহাতেও টান
আছে,—এক-কথায় আসক্ত, কোন-কিছু বা কাহাতেও আসক্ত। আসক্তি থাকলে ভাবা, করা, কওয়ায় মানুষের
যেমন-যেমন যা’-যা’ হয়, তাই করাই হচ্ছে যোগী বা যুক্ত বা অনুরক্ত মানুষের লক্ষণ। ……তাই, শাস্ত্রে যেখানেই
যোগ বলে কথা আছে সেখানেই বুঝতে হবে, সে-কথা বাস্তব কিছুতে যুক্ত হওয়ারই কথা। আর,
এই যোগ হলেই মানুষের চিত্তবৃত্তিনিরোধ হতে সুরু করে, কারণ, যাতে আমার টান যত বেশী,
আমার সাধারণ প্রবৃত্তিই হয় আমার সমস্ত বৃত্তি দিয়ে তাকে উপভোগ করি—আর তার বাধা
যেগুলি, সেগুলিকে এমনতরভাবে বিনিয়ে আমার এই উপভোগের পথের কোনরকম বাধা না সৃষ্টি
করে বরং তার সাহায্য করে এমনতরভাবে নিয়ন্ত্রিত করতে একটা স্বতঃ-উৎসারিত ঝোঁক
আমাদের থাকেই। তাই
শাস্ত্রে আছে “যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ’’। (কথাপ্রসঙ্গে, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৩)
আধ্যাত্মিক চেতনায় একনিষ্ঠ না হলে যোগের
সাথে নিত্য-যুক্ত থাকা যায় না। সে বিষয়েও শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের সচেতন করার জন্য
বললেন, ‘‘গীতায় আছে, ‘তেষাং জ্ঞানী নিত্যযুক্ত একভক্তির্বিশিষ্যতে’………একভক্তি
না হলে হবে না । পঁচিশ ঠাকুর করলেই মুস্কিল, বহু-নৈষ্ঠিক
যারা তাদের জীবনে কোন সঙ্গতি থাকে না, তারা আস্তে আস্তে পাগলাটে হয়ে ওঠে । বহু-নৈষ্ঠিক মানে মূলতঃ তার
কিছুতেই নিষ্ঠা নেই, নিষ্ঠা আছে রকমারি
প্রবৃত্তি-স্বার্থে, তাই আত্মনিয়ন্ত্রণ বলে
জিনিসটা তাদের জীবনে ঘটে ওঠে না, ফলে অভিজ্ঞতা
বা জ্ঞানের উন্মেষ হয় না । ভক্তি ছাড়া,
একানুরক্তি ছাড়া জ্ঞান ফোটে না । …..একভক্তি যার আছে… তার
জ্ঞানের নাড়ী হয়
টনটনে । কথায় বলে প্রহ্লাদমার্কা ছেলে. ……আগুনে, জলে,
পাহাড়ে, পর্ব্বতে, অন্তরীক্ষে কোথাও ডরায় না
।…. তাই ভক্তির চাইতে বড় কামনার বস্তু আর
নেই ……।’’ ( আ. প্র. ২য় খন্ড, ২০. ১২. ১৯৪১)
নিজেকে যোগযুক্ত রাখতে
শ্রীশ্রীঠাকুর সর্বদা সচেতন থাকতেন। একদিন একটা সুপুরীর টুকরো মুখে দিতে গিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে নীচে পড়ে
যায়। ঠাকুর খাট থেকে নেমে সুপুরীর টুকরোটাকে খুঁজে পিকদানিতে ফেলে
হাত ধুয়ে খাটে উঠে বসেন। আর একটা সুপুরীর টুকরো
মুখে দেন। সামান্য এক টুকরো সুপুরী, তা-ও আবার
খুঁজে নিয়ে ফেলে দিলেন। এই সামান্য কাজটা তো যে কেউ করতে
পারত, তার জন্য খাট থেকে নেমে কষ্ট
করে সুপুরী খুঁজতে গিয়ে অমূল্য সময় নষ্ট
করার পেছনে কোন লাভজনক যুক্তির খোঁজ না পেয়ে উপস্থিত যুক্তিবাদীরা অনুযোগ করলে
ঠাকুর বলেছিলেন, তোমাদের হিসাবে আমি
বেকুব, আমার হিসাবে আমি কিন্তু চালাক। আমার হাতের সাথে মুখের স্নায়বিক যোগসূত্র ছিন্ন
হবার ফলে আমি যোগভ্রষ্ট হই, সুপুরীটা নীচে পড়ে যায়।
প্রারব্ধ কর্মফলে ওই অপারগতা যাতে যোগ না হয় তাই একটু সময় নষ্ট করে নিজের ত্রুটি
নিজেই সংশোধন করে নিলাম।
যোগ বোঝাতে গিয়ে ঠাকুর একদিন
গল্পচ্ছলে বলেছিলেন, এক গোয়ালার অনেকগুলো গোরু ছিল। ওই গোরুগুলোর দুধ এবং
দুগ্ধজাত ছানা, দৈ, ঘোল, মাখন, ঘি নিজেরা খেত, পাড়াপড়শীদেরও দিত। গোয়ালার বয়স
হওয়াতে ছেলেকে একদিন একটা পাঁচন হাতে দিয়ে গোরু চরাবার ভার দেয়। ছেলে মাঠে নিয়ে
গোরুগুলোকে চরতে দিয়ে দেখল, একটা পাঁচনের লাঠি দিয়ে কিছুতেই গোরুগুলোকে বাগে আনতে
পারছে না। এদিক-ওদিক চলে যাচ্ছে।
তাই সে ভাবল, একটা পাঁচন দিয়ে সব গোরু সামলানো যাবে না। সে তখন একমনে এক-একটা গোরুর জন্য আলাদা আলাদা পাঁচন
বানাতে শুরু করলো। পাঁচন বানানো শেষ করে গোরু সামলাতে গিয়ে দেখে নির্দিষ্ট স্থানের
কাছাকাছি গোরুগুলো নেই, চরতে চরতে অনেক দূরে দূরে জঙ্গলে চলে গেছে। ওদিকে বেলা
গড়িয়ে গোধূলি-প্রায়। ছেলে নিরুপায় হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে গিয়ে সব কথা খুলে বললে
বাবা কোন তিরস্কার না করে ছেলেকে বুঝিয়ে বলেন, “বাপু, এক পাঁচনেই লাখ গোরু ঠেকানো
যায়। যার যেমন দরকার, তেমনতর ঠক্কর মারলেই তো হয় ! তোমার এই অতিবুদ্ধি সব বেসামাল
করে ফেলেছে।’’ (কথাপ্রসঙ্গে, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৪) অবশেষে বাবার কাছ থেকে গোরুর
বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ঠক্কর মারার কায়দা শিখে
ওই এক পাঁচনের সাহায্যেই গোরুগুলোকে বাগে আনতে শিখে যায়।
ওই ঠোক্কর মারার কায়দা যিনি শেখাতে পারেন তিনিই ঠাকুর, তিনিই
যোগসিদ্ধ গুরু। যোগসিদ্ধ গুরুর কাছ থেকে কাকে, কখন, কতটুকু ঠোক্কর কিভাবে মারতে
হবে সেই কায়দা একবার শিখে নিতে পারলে আমাদের বিশৃঙ্খল ইন্দ্রিয়গুলোকে একমুখী
আসক্তির সাথে যুক্ত করে যোগ-কে উপলব্ধি করা যায়। তাহলে পালের গোরুগুলো পালেই
থাকবে, বেশী কায়দা করতে গেলে গোরুগুলো পালছাড়া হয়ে যাবে।
যোগসিদ্ধ গুরু শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর নিত্যলীলায়
যোগশাস্ত্রে বর্ণিত আসন-মুদ্রাদি তিনি কোন কালেই অভ্যাস করেন নি। তিনি ছোটবেলা থেকেই
নামধ্যান করতেন।
তিনি তাঁর ভাগবত আন্দোলন কীর্তন দিয়ে শুরু করেছিলেন। কীর্তন করতে করতে সমাধিস্থ
হতেন। সেই সময় যোগশাস্ত্রে বর্ণিত সকল ধরণের আসন-মুদ্রাদি অবলীলায় করতেন। তিনি কীর্তনের মাধ্যমে
অনেকানেক পালছাড়াদের পালে ভেড়ালেন। তারা আবার যাতে পালছাড়া না হয়ে পড়ে তারজন্য
কাজে মাতিয়ে দিয়ে গড়ে তুললেন ভারতীয় আর্য্য ভাবধারার নিদর্শন স্বরূপ এক আদর্শ
প্রতীকী রাষ্ট্র—হিমাইতপুর সত্সঙ্গ আশ্রমে। ব্যক্তি, দম্পতি, গৃহ, সমাজ
ও রাষ্ট্র জীবনকে শুদ্ধ-বুদ্ধ-পবিত্র করে এক যোগে বাধতে দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ,
কৃষি ও শিল্পের নবীকরণ করলেন।
শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাগবত আন্দোলনের কীর্তনযুগের সাধকেরা কীর্তনের
এবং নামের শক্তি সঞ্চারণা করে রোগ-শোক-ব্যাধি-জরা-য় জর্জরিত, প্রবৃত্তি-পীড়িত
মানুষদের স্বাভাবিক জীবনে অধিষ্ঠিত করে অমৃতের সন্ধান দিয়েছিলেন। অনুরূপভাবে তাণ্ডবনৃত্যে
কীর্তন, আর নিয়ম করে নামধ্যান করতে পারলে নিজেকে এবং পরিবেশকে সবদিক দিয়ে যে সুস্থ
রাখা সম্ভব, তা বলাই বাহল্য।
জীবাত্মাকে পরমাত্মার সাথে প্রতিনিয়ত
যোগযুক্ত রাখতে শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর অনুগামীদের একটা ছোট্ট নিদেশ-বাণীতে সব বুঝিয়ে
দিলেন।
ঊষা-নিশায় মন্ত্রসাধন
চলাফেরায় জপ
যথাসময়ে ইষ্টনিদেশ
মূর্ত্ত
করাই তপ।
মন্ত্র সাধনের জন্য সকাল-সন্ধ্যায় নিয়ম করে ধ্যানাভ্যাস করা। প্রতিবার ধ্যানান্তে ‘আমি অক্রোধী, আমি
অমানী’ ইত্যাদি স্বতঃ-অনুজ্ঞার অর্থগুলোকে আয়ত্ত করতে পারলে
প্রবৃত্তির নিগ্রহ থেকে সহজেই মুক্তি লাভ করা যায়। ধ্যান
করার পর দিগন্তের দিকে, সবুজের দিকে তাকালে চক্ষুর দৃষ্টি ভাল থাকে। চলাফেরায়,
কাজেকর্মে, শয়নে-স্বপনে ইষ্টে অনুরাগ সমন্বিত হ’য়ে নামজপ করার অভ্যাসে
পরমাত্মিক শক্তির স্বারূপ্য লাভ হয়। নিয়মিত শবাসন করলে হৃদরোগ হবার আশঙ্কা
থাকে না। নিয়মিত থানকুনি পাতা খেলে শরীর
বিধানের রেচনক্রিয়া সুস্থ থাকে। সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার, মাসান্তে
কমকরে একটি দিন, হবিষ্যান্ন গ্রহণ, পাতিত্য কর্ম থেকে ত্রাণ পেতে শিশু প্রাজাপত্য,
প্রাজাপত্য এবং মহাসান্তপন ব্রত পালনে শরীর-মনের অসঙ্গতি দূর হয়, শরীর নিরোগ থাকে।
নাম জপ করা প্রসঙ্গে
শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন—নাম করলে অনেক সময় জ্বর কমেও যায়। কারণ, ব্যাকটেরিয়াগুলি
পুড়ে যায়। রোগীর শরীর ছুঁয়ে নাম করলে তাতেও রোগ ভাল হয়। ঐ জন্য কুষ্টিয়াতে একটা
দালানে ত্রিশটা bed (শয্যা) ছিল। রাধারমণ প্রভৃতি ছিল। রোগী
আসলে শুশ্রূষা করত, ছুঁয়ে নাম করত। ডবল নিউমোনিয়া ৩/৪ দিনে,
এমনকি রাতারাতি সেরে যেত।
(সুত্র—আলোচনা প্রসঙ্গে ১৮ খণ্ড)
আমাদের আর্য্যহিন্দু-শাস্ত্র
এবং যোগশাস্ত্র অনুসারে সূর্যোদয়ের পর শয্যাত্যাগ করলে পাতিত্যদোষে দুষ্ট হতে হয়। এবং
প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ উপবাসী থাকার নিদেশ দেওয়া আছে। শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের ওই
পাতিত্যদোষ থেকে মুক্ত করে নিয়ত যোগযুক্ত রাখতে দিনচর্যার এক সহজ নিদেশ দিলেন
অনুশ্রুতি গ্রন্থের বাণীতে।
ঊষার
রাগে উঠবি জেগে শৌচে শীতল হবি,
সন্ধ্যা–আহ্নিক জপ সাধনায় ঈশের আশিস লবি।
কুতুহলে
পড়শি ঘুরে দেখবি সযতনে,
আছে
কেমন কোথায় কে জন মন দিবি রক্ষণে।
তারপরেতে
বাড়ী এসে শৌচে যথাযথ,
গৃহস্হালীর
উন্নয়নী অর্জ্জনে হ’ রত।
স্নানটি
সেরে আহ্নিক করে ক্ষুধামতন খাবি,
একটু
চলে বিশ্রাম নিয়ে আগুয়ানে ধাবি।
এমনি
তালে সচল চালে চলে সন্ধা এলে,
শৌচে
শুদ্ধ হয়ে করিস আহ্নিক হৃদয় ঢেলে।
উন্নয়নের
আমন্ত্রনী গল্প-গুজব শীলে,
হৃষ্টমনে
আলোচনায় কাটাস সবাই মিলে।
পড়শী
দিগের অভাব-নালিশ থাকেই যদি কিছু,
তার
সমাধান যেমন পারিস করিস লেগে পিছু।
করন-চলন
ধরন-ধারন যজন যাজন কিবা,
সকল
কাজেই ইষ্টস্বার্থে চলিস রাত্রি-দিবা।
আদর-সোহাগ
উদ্দীপনী কথায় কাজে ঝুঁকে,
স্বার্থ-কেন্দ্র
সবার হবি ধরবি ইষ্টমুখে।
বিশ্রামেরই
সময় গা-টি ঘুমল হয়ে এলে,
ইষ্ট-চলন মনন নিয়ে ঘুমে গা দিস ঢেলে।
(অনুশ্রুতি গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্রের বাণী)
শ্রীশ্রীঠাকুর
আহ্বানীসহ পূর্ণাঙ্গ প্রার্থনা মন্ত্রে আচমন, বাংলা সমবেত প্রার্থনা ও বাংলা সমবেত
প্রার্থনার অবশিষ্টাংশ সন্দর্ভে কতগুলো সহজ আসন এবং প্রাণায়ামের নিদেশ রেখে গেছেন। সেই নিদেশ মেনে আমরা যদি
সঠিক অনুশীলন করতে পারি তাহলে সহজ-যোগে ব্যাধিমুক্ত হয়ে পরমাত্মার সাথে যোগযুক্ত
থাকতে পারব। (দ্রঃ ঋত্বিগাচার্য্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য প্রণীত
অনুসৃতি, যতি-ঋত্বিক শ্রীশরত্চন্দ্র হালদার প্রণীত যুগবাণী এবং সত্সঙ্গ পাব্লিশিং
কর্তৃক প্রকাশিত প্রার্থনা শিরোনামের গ্রন্থাবলী।)
শ্রীশ্রীঠাকুরের এক
অনন্য দৈবী অবদানের নাম ইষ্টভৃতি। ইষ্টের
প্রীতির জন্য কাউকে পীড়িত না করে, নিজে পীড়িত না হয়ে, বর্ণানুগ
কর্মের সেবার মাধ্যমে, বৃহত্তর
পরিবেশে, ঘটে ঘটে ইষ্ট
স্ফূরণের বা মঙ্গল প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত থাকার বিনিময়ে অযাচিত প্রাপ্ত অর্থ বা
সম্পদকে বলা হয়েছে অনুগ্রহ অবদান । ওই অনুগ্রহ
অবদানকে ঠাকুর
‘দিন গুজরানী আয়’ অভিধায় ভূষিত করেছেন। ওই ‘দিন গুজরানী আয়’-এর
অগ্রভাগ প্রতিদিন পানাহার করার পূর্বে ইষ্ট-নীতি ভরণের শপথ করে নিবেদন করার নাম
ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ। যা নিখুঁতভাবে পালন করলে
শরীর-মন-আত্মার অসঙ্গতি দূর হয়। আর্য্যকৃষ্টির সদাচার এবং
বর্ণাশ্রম ধর্ম রক্ষিত হয়।
শ্রীশ্রীঠাকুরের আর একটি অনন্য দৈবী অবদানের নাম স্বস্ত্যয়নী ব্রত।
প্রবৃত্তির সব বিপাক এবং গঞ্জনা থেকে মুক্ত করে আমাদের স্মৃতিবাহী চেতনায় সমৃদ্ধ
রাখতে প্রবর্তন করলেন পঞ্চনীতি সমন্বিত স্বস্ত্যয়নী ব্রতের। জড়-পদার্থে
নির্মিত মন্দিরের পরিবর্তে নিজ-নিজ দেহটাকেই শ্রীবিগ্রহ মন্দির জ্ঞানে পবিত্রতার
সাথে রক্ষা করতে নিদেশ দিয়েছেন এই ব্রতের মাধ্যমে, যেহেতু এই দেহের মধ্যেই রয়েছে
পরমাত্মার আবাসস্থল। ভোগ,
দুর্ভোগ, উপভোগ, মুক্তি, পরামুক্তি, পরাগতি সবকিছুই এই দেহের মধ্যেই।
যা নাই ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে এই দেহভাণ্ডে। আমাদের
আর্য্য শাস্ত্রাদিতেও একথার উল্লেখ রয়েছে। শ্রীশ্রীঠাকুর
জীবাত্মার মধ্যে সুপ্ত পরমাত্মাকে জাগাতে বলেছেন নামের মাধ্যমে। ৫টি
কর্মেন্দ্রিয়, ৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয়, মন, বিবেক, জীবাত্মা, পরমাত্মাদির সমন্বয়ে
সৃষ্টি এই দেহমন্দিরকে পবিত্র রাখার, সুস্থ-স্বস্থ রাখার ভাগবত-বিধির পালন-পদ্ধতি
সহজভাবে বিধায়িত করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর এই ব্রতের মাধ্যমে।
শ্র্রীশ্র্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রবর্তিত যজন, যাজন, ইষ্টভৃতি,
স্বস্ত্যয়নী, সদাচারাদি নিখুঁতভাবে পালন করার নাম ইষ্টকর্ম।
ইষ্টকর্ম ব্যতীত কর্ম অনিষ্টকর্ম। সেই ইষ্টকর্মে যুক্ত থাকলে
সহজেই যোগসিদ্ধ হওয়া যায়।
কাম-আবেশে স্ত্রী-পুরুষে
যেমন করে উপভোগ,
ইষ্টকাজে বাস্তবতায়
তেমনি হলে তবেই য়োগ।
সব প্রবৃত্তি রত থাকে
ইষ্টকর্ম লয়ে,
সেই তো যোগী, সে-ই সন্ন্যাসী
কাল নত যার ভয়ে।
কালাধীশ ঠাকুরের চাহিদামত ইষ্টকর্ম করে একবার যোগী হতে পারলে
চিরতরে নিশ্চিন্ত, কালের কবলে পড়ে ভীত হতে হবে না, কাল হবে যোগীর অধীন।
পরিশেষে জীবনপিয়াসী মানুষদের কাছে, ইষ্টপ্রাণ দাদা ও মায়েদের কাছে
পরমপিতার এই দীন সন্তানের কাতর আবেদন, আমরা যেন নিত্য ইষ্টকর্মের মাধ্যমে পরমপিতার
সাথে যোগযুক্ত থেকে পরিবেশের সব্বাইকে জীবনের জয়গানে যুক্ত করে নিতে পারি। সবাই
যেন মুক্তকণ্ঠে বলতে পারে, ‘আমি সবার, আমার সবাই।’
অপটু লেখনীতে শ্রীশ্রীঠাকুরের অপার মাতৃভক্তির কাহিনী প্রকাশের প্রারম্ভে, শ্রীশ্রীঠাকুর সৃষ্ট সৎসঙ্গ আন্দোলন বিষয়ে দু-চার কথা না বললে ইষ্ট প্রতিষ্ঠা কর্মে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যেতে পারে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সৃষ্ট সৎসঙ্গ আন্দোলন ব্যক্তি নির্মাণের আন্দোলন, শুদ্ধাত্মা সৃষ্টির আন্দোলন। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, ধনী, দরিদ্র, মুর্খ, পণ্ডিত, সৎ, অসৎ নির্বিশেষে সব্বাইকে ধারণ-পালন-সম্বেগসিদ্ধ ব্যক্তিত্বের অধিকারী করে ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর—‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চি’-র আদর্শের সোপান-পথের মাধ্যমে। সেই পথের দিশারী স্বয়ং তিনি এবং তাঁর আদর্শ। আমরা আর্য্য-ভারতবাসীরা যখন থেকে পূর্বাপূর্ব পুরুষোত্তমদের আদর্শের পথ ভুলে প্রবৃত্তি-পোষিত আদর্শের জীবন-চলনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, তখন থেকে আমাদের জাতীয় জীবনে কৃষ্টিগত অধঃপতনের সূত্রপাত হয়েছে। তাই তো বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুরকে আক্ষেপ করে বলতে হয়েছিল— “ভারতের অবনতি (degeneration) তখন থেকেই আরম্ভ হয়েছে, যখন-থেকে ভারতবাসীর কাছে অমূৰ্ত্ত ভগবান্ অসীম হ’য়ে উঠেছে—ঋষি বাদ দিয়ে ঋষিবাদের উপাসনা আরম্ভ হয়েছে। ভারত! যদি ভবিষ্যৎ-কল্যাণকে আবাহন ক’রতে চাও, তবে সম্প্রদায়গত বিরোধ ভুলে জগতের পূর্ব্ব-পূর্ব্ব গুরুদের প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হও—আর তোমার মূর্ত ও জীবন্ত গুরু বা ভগবানে আসক্ত (attached) হও, —আর তাদেরই স্বীকার কর—যারা তাঁকে ভালবাসে। কারণ, পূর্ব্ববর্ত্তীকে অধিকার করিয়াই পরবর্ত্তীর আবির্ভাব।” শ্রীশ্রীঠাকুরের এই আক্ষেপ-বাণী শতবর্ষ অতিক্রম করলেও আমরা তাঁর আবেদনকে বাস্তবায়িত করতে ব্যর্থ হয়েছি। ব্যর্থ হয়েছি অবিকৃতভাবে পুরুষোত্তমের আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে সাধারণ জনমানসে!
তিনি বার-বার বলেছেন, “পঞ্চবর্হিঃ, সপ্তার্চ্চি, হলো আর্য্যকৃষ্টির মেরুদণ্ড ……. এগুলির রোজ স্মরণ করতে হয়। স্মরণ করা মানে শুধু চিন্তা করা নয়।” (আঃ প্রঃ ১৪/৬২)
“হিন্দুমাত্রেরই পঞ্চবর্হি বা পঞ্চাগ্নি স্বীকার্য্য—তবেই সে সনাতন হিন্দু, হিন্দুর হিন্দুত্বের সর্ব্বজনগ্রহনীয় মূল শরণ-মন্ত্র ইহাই ! পঞ্চবর্হি যেমন প্রত্যেক হিন্দুর স্বীকার্য ও গ্রহনীয়,সপ্তার্চ্চিও তেমন প্রতি মানবের অনুসরণীয় ও পালনীয়”! (পুণ্য-পুঁথি, ১ম সংস্করণ) * পরমপিতার ওই ঐকান্তিক আবেদনকে অগ্রাহ্য করে, তাঁর আদর্শকে নিত্যদিনের উপাসনা থেকে বহিষ্কার করে, ইষ্ট প্রতিষ্ঠা নামের অজুহাতে সংগঠন-সৃষ্ট তথাকথিত আচার্য্য-পরম্পরা প্রতিষ্ঠার জন্য যে বিকৃতধারায় সৎসঙ্গ আন্দোলন জনমানসে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে, তার প্রতিকার না করতে পারলে তাঁর ঈপ্সিত ‘আর্য্যকৃষ্টির তুর্য্যধ্বনি’ পল্লীর নিকেতনে নিকেতনে পৌঁছানো সম্ভব হবে কি? তাঁর ঈপ্সিত—“পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠন”-এর-ই বা কি হবে? আমাদের গুরুভক্তির গন্তব্য ঈশ্বরপ্রাপ্তির-ই বা কি হবে? তিনি যদি অবচেতনে আবির্ভূত হয়ে জবাবদিহি চান, এই প্রশ্নগুলোর, উত্তর কি দেব তাই ভাবছি! !!!!!!!!! * যাইহোক, এবার নির্ধারিত আলোচ্য বিষয় “শ্রীশ্রীঠাকুরের মাতৃভক্তি” নিয়ে আমার সাধ্যমত আলোকপাত করার চেষ্টা করব। প্রাকৃতিক নিয়মেই সব সুস্থ শিশুরাই দুষ্টুমি করে। জিনিসপত্র ভাঙে, তছনছ করে। সমবয়সীদের সাথে মারামারি করে, ঝগড়া করে, অন্যায় করে মার খাওয়ার ভয়ে সবসময় সত্যিটা স্বীকারও করে না। ফলে মায়ের কাছে, পরিজনদের কাছে মার খায়, বকুনি খায়। কিন্তু আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শিশু অনুকূলের দুষ্টুমির ধরণটাই ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি কার্যকারণ ভিন্ন কখনো কোন অন্যায্য দুষ্টুমি করতেন না। আর কখনো তা অস্বীকারও করতেন না। অকপটে সব স্বীকার করতেন। তথাপিও তাঁকে মা-সহ পরিজনেরা অযথা শাসন করতে ছাড়তেন না। তারাই বা কি করবেন, প্রতিবেশীদের নালিশ শুনতে শুনতে নাজেহাল হতে হয় যে। তাই ইচ্ছে না থাকলেও, লোকের মন রাখতে জননীদেবীকে অযথা তিরষ্কার, শাসন করতেই হত। একদিন মায়ের শাসনের ভয়ে লুকিয়ে ছিলেন। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে তবুও বাড়ী ফেরেনি দেখে কর্তামা (মাতামহী কৃষ্ণসুন্দরী দেবী) বাড়ীর আনাচে-কানাচে কোথাও খুঁজে না পেয়ে কিছুটা দূরে বনের মধ্যে এক গাছতলায় বসে থাকতে দেখতে পান। প্রশান্ত বদনে বসে আছেন, তাঁর দেহ থেকে গোলাপী রঙের উজ্জ্বল জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয়ে চারিদিক আলোকিত করে ফেলেছে এবং কতগুলো ছায়ামূর্তি বালক অনুকূলকে ঘিরে আনন্দে নৃত্য করছে। ওই দৃশ্য দেখে কর্তামা ভয় পেয়ে ‘রাম নাম’ জপতে জপতে দৌড়ে গিয়ে দৌহিত্রকে কোলে করে নিয়ে ছুটে বাড়ীতে ফেরেন। আর একদিন কোন এক দুষ্টুমির জন্য জননীদেবী ছেলেকে শাসন করার জন্য ধরতে যাবেন বুঝতে পেরে অনুকূল দৌড়ে পালাতে গেলে জননীদেবীও পিছন পিছন ছুটতে শুরু করেন। কিছুতেই ধরতে পারছেন না। দৌড়তে দৌড়তে হাঁপিয়ে পড়েছেন। মায়ের কষ্ট হচ্ছে দেখে নিজেই ধরা দেন মায়ের হাতে। মায়ের সব শাসন তিনি আশীর্বাদ মনে করে মাথা পেতে নিতেন। মায়ের কোন কষ্টই তিনি সহ্য করতে পারতেন না। মায়ের সব কথা তিনি মেনে চলতেন।তিনি তখন পাবনা ইনস্টিটিউশনে তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র (বর্তমানের অষ্টম শ্রেণী)। অঙ্ক পরীক্ষার দিন। দেরি করে খেতে বসেছেন। স্কুলে যেতে দেরি হবে মনে করে মা বললেন, দেখিস্, আজ তুই অঙ্কের পরীক্ষা পারবি না।
যথারীতি স্কুলে গেছেন। পরীক্ষা শুরু হয়েছে। সব সহপাঠীরা অঙ্ক কষছেন, কিন্তু অনুকূলকে প্রশ্নপত্র হাতে নিয়ে চুপ করে বসে থাকতে দেখে শিক্ষক মহাশয় জিগ্যেস করেন, কি, চুপচাপ বসে কেন, অঙ্কগুলো কি কঠিন লাগছে? অনুকূল শিক্ষক মহাশয়কে বলেন, না স্যর, অঙ্কগুলো সব আমি কষতে পারবো, কোন অসুবিধাই হবে না। কিন্তু কষতে পারছি না মায়ের কথার জন্য। আজ দেরি করে খেতে বসেছিলাম দেখে মা বলেছিলেন, দেখবি আজ একটাও অঙ্ক করতে পারবি না। তাই, আমি যদি অঙ্কগুলো কষে ফেলি, তাহলে মায়ের কথা মিথ্যা হয়ে যাবে। আপনি আমায় ক্ষমা করবেন, অঙ্ক কষে মাকে মিথ্যেবাদী বানাতে পারব না! তাঁর ওই মাতৃভক্তির দৃষ্টান্ত দেখে সহপাঠি এবং শিক্ষকেরা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। পরে পৃথকভাবে অঙ্কের পরীক্ষা নিয়েছিলেন। (সতীশচন্দ্র জোয়ারদার প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ৩৯ পৃঃ) *** মায়ের প্রতি ঠাকুরের এমন একটা প্রাণকাড়া টান ছিল যে, কখনো কোন কারণে মায়ের কাছ থেকে অযথা কঠোর শাসন-তিরস্কার পেলেও তিনি হাসিমুখে মেনে নিতেন, কোন প্রত্যুত্তর করতেন না।—পাছে মা কষ্ট পায়, তাঁর প্রতি রুষ্ট হয়!—এই ভেবে! সর্বদা মায়ের আদর, সোহাগ, সান্নিধ্য, একটু বাহবা পাবার আশায় উন্মুখ হয়ে থাকতেন।
অথচ মা যে তাঁর প্রতি কতটা নির্দয় ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া তাঁর একটি বাল্যকালের রচনা থেকে। It was written when my mother chid me. কেন গো মা হেন ভাব সন্তানের প্রতি, কি দোষ করেছি মাগো চরণ কমলে ? সদাই কেন গো হেন কোপ মম প্রতি, সদা গালাগালি কেন কর বরিষণ? আমি কি গো পুত্র নয় তোমার জননী, গর্ভে কি গো ধরনি মা অভাগা সন্তানে ? আর আর যত তব পুত্রদের প্রতি, সদাই সন্তোষ ভাব দেখাও জননী। তারা যদি কাছে এসে ডাকে মা মা বলি, প্রশান্ত হৃদয়ে মাগো উত্তর প্রদান। আমি যদি কাছে এসে ডাকি মা মা বলি, মোর ভাগ্যে শুধু ছাই দন্ত কড়মড়ি। পিতার নিকটে যদি যাই গো জননী, মিষ্ট কথা শুনিবারে মনের উল্লাসে, তিনিও কঠোর বাক্য প্রয়োগি আমারে, দূর ক’রে দেন মোরে সে স্থান হইতে। মিষ্ট কথা ভালবাসি আমি গো জননী, তাই সাধ যায় মম মিষ্ট শুনিবারে যেই গো জননী মোরে বলে মিষ্ট ভাষ, অমনি তাহার আমি হই পদানত। ঈশ্বরের কেন গো মা এ কঠিন রীতি যে-জন যাহা চায় তাহা নাহি পায় কেন? (ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থ, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১০৭-১০৮)
এখানে একটা লক্ষণীয় বিষয়—শ্রীশ্রীঠাকুর এই রচনার মাধ্যমে মায়ের বিরুদ্ধে কোন নালিশ না জানিয়ে, মা-কে দোষারোপ না করে, ঈশ্বরের ওই-ধরণের বৈষম্যমূলক রীতি কেন, তা মায়ের কাছে জানতে চেয়েছেন! শ্রীশ্রীঠাকুর পরবর্তীকালে পরিণত বয়সে কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, — “আমার জীবনের একমাত্র নেশা ছিল মাকে খুশী করা। আমার বুদ্ধি-বিবেচনা-শক্তিমত বরাবর সেই চেষ্টা করেছি। আমার লোভ ছিল, মার কাছ থেকে বাহবা পাওয়ার, তাঁর আদর পাবার। কিন্তু মা ছিলেন আমার প্রতি বড় কড়া, তাঁর শাসন ও ভর্ৎসনা পেয়েছি অজস্র, তাঁর সোহাগের জন্য ক্ষুধা থাকলেও তেমন পাইনি তা’। তাহ’লে কি হবে ? মা ছাড়া যে আমার অচল। মা যতই অসন্তুষ্ট হউন, রুষ্ট হউন, কেবল এৎফাক খুঁজতাম, কেমন ক’রে মাকে তুষ্ট করব। ঐ ছিল আমার ধান্ধা। প্রতিকূল অবস্থায় ছেড়ে দেবার আমার কোনকালে হয় না। তখন আমার গোঁ চেতে যায়, কেমন ক’রে সেটাকে আয়ত্তে আনব। ছেলেবেলায় পাড়ার সকলেই ছিল আমার অভিভাবক। খানাকা কতজনে কান চেপে ধ’রে দুটো চড় দিয়ে ছেড়ে দিত। সেখানে দোষ হয়ত আমার কিছুই নেই। অন্য কারও দোষের কথা যে কব, তাও আমার কখনও মন চাইত না। অনেকে আজেবাজে কথা মার কাছে এসে লাগাত। মাও চালাতেন একচোট। এই রকম যতই ঘটুক, আমি কখনও হতাশ হতাম না, নিরাশ হতাম না। ভাবতাম, আমি আমাকে এমনভাবে তৈরী করব, এমনভাবে চলব, যা’তে এর অবকাশ না ঘটে।” (আলোচনা-প্রসঙ্গে, ৩য় খণ্ড)
“আমি বড় হব, আমাকে মানুষ বড় কবে—সে কল্পনা আমার কোন দিনই নাই। ওই ধারণায় আমি ব্যক্তিগতভাবে কোন সুখ পাই না। তবে হ্যাঁ। মার কাছে মানুষে সুখ্যাতি করলে মা সুখী হবেন, মা আমাকে বাহাদুর ছেলে ব’লে বাহবা দেবেন, সে লোভ আমার ছিল। লোভ থাকলে কি হবে, মা যেন. কিছুতেই আমার উপর প্রসন্ন হতেন না। আমি যেন অপরাধ ক’রেই আছি তাঁর কাছে৷ কিন্তু তবু, আমি হাল ছাড়তাম না, নাছোরবান্দা হয়ে লেগে থাকতাম মাকে খুশী করবই। মার হয়ত আমাকে না হ’লে চলতে পারতো, আমার কিন্তু মা ছাড়া চলারই উপায় ছিল না। তাই মার খুশীর ধান্ধায় ঘুরতেই হ’তো আমাকে।” (সূত্রঃ ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থ, ১ম খণ্ড) *** পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জন্মদাত্রী বিশ্বজননী মনোমোহিনী দেবী বাংলা ১২৭৭ সালের ১৮ই জ্যৈষ্ঠ পাবনা জেলার হিমাইতপুরের বিখ্যাত চৌধুরী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম রামেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী, মাতার নাম কৃষ্ণসুন্দরী। আট বছর বয়সে ধ্যানের মাধ্যমে সৎনাম পান। নয় বছর বয়সে পাবনা জেলার অধীন চাটমোহর গোয়াখাড়া গ্রামের পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তীর পুত্র শিবচন্দ্র চক্রবর্তীর সাথে বিবাহ হয়। বিবাহের পর আগ্রা সৎসঙ্গের দীক্ষাপ্রাপ্ত শিষ্য ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তী মহোদয়ের সাহায্যে ধ্যানযোগে প্রাপ্ত গুরুদেব হুজুর মহারাজ (রায় সালিগ্রাম সিংহ বাহাদুর) মহোদয়কে কলকাতায় দর্শন করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দীক্ষা গ্রহণ করেন।
পুরুষোত্তম জননী মাতা মনোমোহিনী দেবীর দীক্ষাগুরু ছিলেন হুজুর মহারাজ। তিনি সন্তমতের যে সাধনা করতেন, সেই সাধনার ধারা সে-সময় বাংলাদেশে প্রচলিত ছিল না। সন্তমতের আদি সাধক কবীরদাস জন্মেছিলেন 1440C বারানসীতে। তিনিই প্রথম সত্মন্ত্রের রহস্য ভেদ করে বলেছিলেনঃ “কবীর ধারা অগমকী সদগুরু দয়ী লখায়, উলট তাহি সুমিরন করে স্বামী সংগ লাগায়।” —অর্থাৎ ধারা উল্টে স্বামী যোগ করে জপ করতে নিদেশ দিলেন। কবীরের পর গুরু নানক জন্ম গ্রহণ করেন 15. 4. 1469 C পঞ্জাব প্রদেশের তালবণ্ডীতে। তিনিও ওই সত্নাম প্রচার করেছেন। কবীর সাহেবের পর আগ্রাতে ২৪ শে আগস্ট ১৮১৮ তে জন্মগ্রহণ করেন শিবদয়াল সিং, তিনি স্বামীজী মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ১৫ জুন ১৮৭৮ আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। পরবর্তী গুরু হন রায় সালিগ রাম। তিনি ১৪ মার্চ, ১৮২৯ আগ্রার পীপল মাণ্ডিতে জন্মগ্রহণ করেন। ৬ ডিসেম্বর ১৮৯৮তে আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। তিনি হুজুর মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ওই সৎনাম সাধন করে চরম ও পরম পথের সন্ধান পান। তিনি তাঁর গুরু স্বামীজী মহারাজের অনুমতি ক্রমে ওই সৎনাম সর্বসাধারণ্যে প্রচার করেন। পরবর্তী গুরু হন পণ্ডিত ব্রহ্মশঙ্কর মিশ্র। যিনি ২৮শে মার্চ, ১৮৬১ তে ব্রাহ্মণ পরিবারে, বারানসীতে জন্মগ্রহণ করেন। ১২ অক্টোবর ১৯০৭ সালে দেহত্যাগ করেন। তিনি মহারাজ সাহেব নামে খ্যাত ছিলেন। মহারাজ সাহেব দেহত্যাগের পূর্বে একটি কাউন্সিল গঠন করে বাবু কামতা প্রসাদ ওরফে সরকার সাহেবকে পরবর্তী গুরু রূপে নির্বাচন করেন। (শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরকার সাহেবকে সন্ত বলে উল্লেখ করেছেন, ভাববাণীতে।) * * * মাতা মনোমোহিনী দেবী সময় সুযোগ পেলেই এলাহাবাদ, কাশী, আগ্রায় গিয়ে গুরুদেবের সাথে সাক্ষাত করতেন। তিনি একবার গুরুর কাছে প্রার্থনা জানিয়ে বলেছিলেন, ‘‘আশীর্বাদ করুন, যেন আপনার মত সন্তান লাভ করতে পারি।’’ উত্তরে তাঁর গুরুদেব বলেছিলেন, আমার মত কেন, আমার চেয়ে মহৎ সন্তান তোমার গর্ভে জন্মাবে। তাঁর আলোয় পৃথিবী আলোকিত হবে। তাঁর গুরুদেবের বলা কথা নিষ্ফল হয়নি। সব গুরুদের গুরু ইষ্টগুরু পুরুষোত্তমের জননী হন মাতা মনোমোহিনী দেবী। স্বামী, সন্তান ও বৃহত্তর পরিবেশের সেবা করে, অসৎ-নিরোধী তৎপর থেকে সব রকমের প্রতিকূল পরিস্থিতিকে সামাল দিয়ে ত্রিসন্ধ্যা নামধ্যান ও উপাসনায় অতিবাহিত করতেন। তাঁর গুরুদেবের মাহাত্ম্য-আলোচনা করতেন, বিপুল সমারোহে গুরুদেবের জন্মতিথি পালন করতেন। গুরুদেবের ইচ্ছা-পূরণ, প্রীতি সম্পাদনের জন্য তিনি সর্বদা উন্মুখ থাকতেন। তৎকালীন ও তৎপূর্বতন রাধাস্বামী-মতের সন্তগুরুগণের পুণ্য লীলাভূমি — কাশী, আগ্রা, এলাহাবাদ প্রভৃতি স্থানে প্রায়শ তীর্থ-পর্যটনে গমন করে তিনি অন্তরে প্রভূত আনন্দ ও শান্তি লাভ করতেন। গুরুর আরাধনা করার জন্য তিনি পদ্মাতীরের একটা নিমগাছতলায় সুন্দর মন্দির নির্মাণ করে গুরুদেবের একখানি পূর্ণাবয়ব বৃহদায়তন প্রতিকৃতি স্থাপন করেছিলেন। গুরুদেবকে নিয়ে অনেক বন্দনা-গীতিও তিনি রচনা করেছিলেন। তার একটি উদ্ধৃত করছি। দয়া কর গুরুদেব আঁধার অবনী’পরে বিতরি করুণা-কণা জাগাও নিদ্রিত নরে । করিবে দয়া যখনি জাগিবে সকল প্রাণী পালাবে সংশয় যত তব আগমন হেরে ।৷ তুমি হে পরমপিতা তুমি সর্বসুখদাতা তব প্রেমে কত মধু বুঝাও যতন করে ৷। পাইলে তব আস্বাদ ঘুচবে সব অবসাদ দূরে যাবে সব পরমাদ নাচিবে আনন্দ ভরে।।” (ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ১ম খণ্ড, পৃঃ ৪২-৪৩) *** ।। শ্রীশ্রীঠাকুরের আবির্ভাব ও দীক্ষা। । মাতা মনোমোহিনী দেবী আঠারো বছর বয়সে প্রথম অন্তঃসত্ত্বা হন। একদিন দুপুরে একজন সন্ন্যাসী মনোমোহিনী দেবীর কাছে সেবা নিতে চাইলে তিনি ভক্তিভরে অতিথিকে সেবা করেন। সন্ন্যাসী বাড়ী ছেড়ে যাবার সময় বলেন, এই বাড়ির একমাত্র পুত্রের মৃত্যু হবে। এবং এই বাড়িতে একজন মহাপুরুষ জন্মাবেন, যিনি বহুলোকের অধীশ্বর হবেন এবং জগতের প্রভুত কল্যাণ সাধন করবেন। তার কিছুদিন পরেই মনোমোহিনী দেবীর ভাই যোগেন্দ্রনারায়ণ, (ডাকনাম ছিল লোহা) অসুস্থ হয়ে পড়েন, রোগভোগে দেহত্যাগ করেন। ওদিকে মনোমোহিনী দেবীর গর্ভে ১১টি সৌরমাস অতিক্রম করে, গর্ভবাসের লীলা সেরে, মাটির পৃথিবীতে ভূমিষ্ট হয়েছিলেন মনোমোহিনী দেবীর ১ম সন্তান। শাস্ত্র-নির্দিষ্ট সব লক্ষণ নিয়েই মানবদেহে সীমায়িত হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন পিতার-পিতা পরমপিতা। বারেন্দ্র শ্রেণীর ব্রাহ্মণ পিতা শিবচন্দ্র চক্রবর্তী এবং মাতা মনোমোহিনীর সন্তানরূপে। অবিভক্ত বাংলার পাবনা জেলার হিমাইতপুর গ্রামে। বাংলা ১২৯৫ সনের ৩০শে ভাদ্র, সংক্রান্তির শুভ সকালে, চার দণ্ড বিশ পল্-এ। ‘‘অকূলে পড়িলে দীন হীন জনে নুয়াইও শির, কহিও কথা। কূল দিতে তারে সেধো প্রাণপণে লক্ষ্য করি তার নাশিও ব্যথা।’’ —উপরোক্ত চার পংক্তির আশীর্বাণীর আদ্যাক্ষর মিলিয়ে অ-নু-কূ-ল নামকরণ করেছিলেন বিশ্বজননী মাতা মনোমোহিনী দেবী। অন্নপ্রাশন সংস্কারের শুভলগ্নে। ছোটবেলা থেকেই পুত্র অনুকূলের বিবিধ আধিদৈবিক কার্যকলাপ, অত্যাশ্চর্য্য ব্যাপার-স্যাপার প্রত্যক্ষ করে মাতা মনোমোহিনী দেবী বিশেষ চিন্তিত ছিলেন। কলকাতার বৌ-বাজারে ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুলে অ্যালোপ্যাথী মতে ডাক্তারি পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরে আসার পরও তার ব্যতিক্রম ছিল না। হিতৈষীদের পরামর্শ মেনে অনেক কিছু করেও নিজের ছেলেকে নিজের মনের মত, অন্যান্য দশজন জীবকোটির ছেলের মত আচার-আচরণে স্বাভাবিক করতে পারলেন না। অবশেষে সব বৃত্তান্ত জানিয়ে হুজুর মহারাজ পরবর্তী তৎকালিন সদগুরু বাবু কামতাপ্রসাদ ওরফে সরকার সাহেবের কাছে ছেলের দীক্ষা প্রার্থনা করে চিঠি লেখেন গাজিপুরে। সরকার সাহেব তখন অন্তিম শয্যায়। চিঠি পেয়ে খুব আনন্দিত হন। চিঠির উত্তরে তিনি লিখেছিলেন, ‘মেরা কাম হো গয়া, তুমি ছেলেকে দীক্ষা দিয়ে দাও।’ ওই পত্র মারফৎ অনুমতিই ছিল মাতা মনোমোহিনী দেবীর পাঞ্জা। ওই অধিকারবলে মা, ছেলেকে সাধক-পরম্পরার সন্তমতে দীক্ষা দিলেন ১৯১৩ সালের ৭ই ডিসেম্বর। ওই দিনই সরকার সাহেব গাজীপুরে দেহ ত্যাগ করেন।
যাইহোক, সরকার সাহেবের অনুমতি ক্রমে মাতা মনোমোহিনী দেবী অনুকূলচন্দ্রকে সত্মন্ত্র প্রদান করার পর ঠাকুর বলেছিলেনঃ এ তুই কি দিলি ? এ নাম তো আমি তোর পেটে থাকতেই করি। অর্থাৎ উনি যে ওই সৎ নামের নামী-পুরুষ সেই তত্ত্বই তিনি ব্যক্ত করলেন তাঁর মায়ের কাছে। অধ্যাত্মশাস্ত্রবিদূষী সাধিকা মনোমোহিনী দেবী, পুত্র অনুকূলচন্দ্রের নামধ্যান সংক্রান্ত সমস্ত অনুভূতির বর্ণনা শুনে বিস্মিত ও আনন্দিত হয়ে পুত্র অনুকূলচন্দ্রকে বলেছিলেন, ‘‘এই নামই তো আদি সৎ-নাম। তুই এই নাম করতে থাক।’’
* * ।। সৎসঙ্গ আন্দোলনে মাতা মনোমোহিনী দেবীর ভূমিকা ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সৎসঙ্গ আন্দোলনের সূচনা করেন কীর্তন প্রচারের মাধ্যমে। কীর্তন করতে করতে তিনি অচৈতন্য হয়ে পড়ে যেতেন, কাৎলা মাছের মত লাফাতেন, থর্ থর্ করে কাঁপতো তাঁর পায়ের বুড়ো আঙুল ! দেহ থেকে শ্বেতবর্ণের স্বেদ নির্গত হতো! রোমকূপ দিয়ে রক্ত ঝরতো পিচকিরি দিয়ে! যোগশাস্ত্রের পুঁথিতে যে-সমস্ত আসনের কথা উল্লেখ নেই অক্লেশে নতুন নতুন আয়াসসাধ্য সব আসন করতেন! আসন করতে করতে উঠে পড়তেন ৫-৬ হাত উপরে, শূন্যে! আবার নিথর-নিষ্পন্দ হয়ে ভূমিতে শুয়ে পড়তেন। তাঁর শ্রীমুখ থেকে নির্গত হতো মানব জীবনের জটিল সব সমস্যার সহজ সমাধানী বাণী। নানা ভাষায়। উপস্থিত কোন মানুষের মনের কথার, প্রাণের ব্যথার উত্তর দিতেন। এমন সব সাধারণের বুদ্ধির গণ্ডীর বাইরের সব ঘটনা প্রত্যক্ষ করে নানা মানুষ নানা মত প্রকাশ করেছেন। কেউ বলছেন মৃগী রোগ, কেউ বলছেন নির্ঘাৎ কোন দানোতে ধরেছে। কেউ আবার পরীক্ষা করার জন্য জ্বলন্ত অঙ্গার চেপে ধরতেন। পরীক্ষা করার জন্য সূঁচালো শলাকা ঢুকিয়ে দিতেন শরীরে! মানুষ কত বীভৎস হলে এসব কাজ করতে পারে!— ব্যথা ভারাক্রান্ত মনে অনুকূলচন্দ্রের অন্তরঙ্গ কীর্তন পার্ষদ কিশোরীমোহন, অনন্তনাথ রায় ও মুকুন্দচন্দ্র ঘোষ প্রমুখগণ পাবনা জেলা-কোর্টের লব্ধপ্রতিষ্ঠ উকিল পরম-বৈষ্ণব বৃন্দাবনচন্দ্র অধিকারীর কাছে সব নিবেদন করেন। সব শুনে, তিনি পরম কৌতূহলী হয়ে পর পর কয়েকদিন কীর্তনে যোগদান করেন। প্রত্যক্ষ করেন অপূর্ব কীর্তনের দৈবীলীলা। তাঁর শ্রীমুখ নিঃসৃত বাণীসমূহের ভাব-গাম্ভীর্য ও সার্বজনীনতা উপলব্ধি করে একান্ত বিস্মিত হন। ঠাকুরের অন্তরঙ্গ সঙ্গীদের ডেকে বলেন, শাস্ত্রাদিতে যে সমস্ত সমাধির কথা জানা যায় সেসবের তুলনায় অনেক উচ্চস্তরের নির্বিকল্প সমাধি। “এ সকল শ্রীমন্মহাপ্রভুর ভাব—বিশ্বহিতের জন্য পরমাত্মার মহাবাণী—মানব জাতির পরম সম্পদ। বহু-যুগ অন্তে পরমপিতার বিশেষ ইচ্ছায় কদাচিৎ এরূপ ঘটিয়া থাকে। সুতরাং আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ, তোমরা এখন হইতে ঠাকুরের শ্রীকণ্ঠোচ্চারিত এই সকল মহাবাণীর একটি অক্ষরও বাদ না দিয়া সমুদয়ই যথাশক্তি নিঃশেষে লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিবার ব্যবস্থা করিবে। আমি আশা করি, তোমরা ইহা অবশ্যকরণীয় পরম-পবিত্র কর্তব্য বলিয়া মনে করিবে।” বৃন্দাবনবাবুর ওই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের অন্তরঙ্গ ভক্তেরা। হিমাইতপুর, প্রতাপপুর, কাশীপুর, কুষ্টিয়া, বাড়াদি, খলিলপুর, বরইচারা, ধুশণ্ডু (নদীয়া), কণ্ঠ গজরা (নদীয়া), ধলহরাচন্দ্র (যশোহর), খোকসাজানিপুর (নদীয়া), রাতুলপাড়া (নদীয়া), কমলাপুর (নদীয়া), মদাপুর (নদীয়া) হরিণাকুণ্ডু (নদীয়া) চক্রতীর্থ (২৪ পরগণা) প্রভৃতি স্থানে, যেখানেই ঠাকুর কীর্তনদলের সাথে যেতেন, সাথে লিপিকারেরাও যেতেন। প্রস্তুত থাকতেন শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাববাণীসমূহ লিখে রাখার জন্য। তাঁরা সাংসারিক সব কাজকর্ম ফেলে সযত্নে সেগুলো ধরে রেখেছিলেন বলেই ওই দৈবী-লীলার সাথে পরিচিত হতে পেরেছে জগৎবাসী। ওই অবদানের জন্য জগদ্বাসী চিরঋণী হয়ে থাকবে পরমবৈষ্ণব বৃন্দাবনচন্দ্র অধিকারী, ভক্তবীর কিশোরীমোহন, মহারাজ অনন্তনাথ রায়, আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী প্রমুখ পুরুষোত্তম-পার্ষদ ঋদ্ধি-সেনানীদের কাছে।
কুষ্টিয়া অনুষ্ঠিত বিশ্বগুরু উৎসবের পর থেকেই ঠাকুর দর্শনে হিমাইতপুরে নানা স্থানের ভক্ত-সমাগম হতে থাকে। ঠাকুরের কথা জানতে পেরে কলকাতার ব্যারিষ্টার চন্দ্রশেখর সেন হিমাইতপুর আসেন ঠাকুর দর্শনে। ঠাকুরের সাথে আলাপচারিতায় মুগ্ধ হয়ে দীক্ষা গ্রহণ করেন। ঠাকুরের মহান আদর্শ কলকাতার সম্ভ্রান্ত মহলে প্রচারিত হওয়ার ফলে বিদগ্ধ মহলে সাড়া পড়ে যায়। তাঁর যাজনে অনুপ্রাণিত হয়ে সম্ভ্রান্ত মানুষেরা শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ গ্রহণ করেন। সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ মহামহোপাধ্যায় পন্ডিত কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন মহোদয়ের দ্বিতীয় পুত্র বিজ্ঞান গবেষক কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য ১৩৩০ বঙ্গাব্দের প্রথমদিকে স্থায়ীভাবে হিমাইতপুর চলে আসেন। ১৩৩০ সালের অগ্রহায়ণ মাসে স্থায়ীভাবে চলে আসেন বঙ্কিমচন্দ্র রায়। ১৩৩০ সালের ২৪শে অগ্রহায়ণ শ্রীশ্রীঠাকুরের পিতৃবিয়োগ হয়। একই সময়ে বিজ্ঞান গবেষক কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য মহোদয়েরও পিতৃবিয়োগ হয়। তথাপি তিনি ঠাকুরকে ছেড়ে বাড়ী না গিয়ে আশ্রমেই পিতৃদেবের শ্রাদ্ধাদি ক্রিয়া করেছিলেন। ১৩৩০ সালের ফাল্গুন মাসে ময়মনসিংহের উকিল শ্রীব্রজগোপাল দত্তরায় সপরিবারে আশ্রমে চলে আসেন এবং তপোবন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। আশ্রম সংগঠনকে গড়ে তুলতে প্রকাশচন্দ্র বসু, প্রবোধচন্দ্র বাগচী, চারুচন্দ্র সরকার, অনুকূল ব্রহ্মচারী, তারাপদ বাগচী, অধ্যাপক পঞ্চানন সরকার, ডাঃ গোকুলচন্দ্র মন্ডল প্রমুখ ভক্তবৃন্দসহ অনেকেই ঠাকুরের নিরবচ্ছিন্ন সান্নিধ্য লাভের আশায় স্থায়ীভাবে চলে আসেন হিমাইতপুরে। শ্রীযুক্ত সুশীলচন্দ্র বসু, তাঁর পত্নী রাণীমা, নফরচন্দ্র ঘোষ, যতীন্দ্রনাথ সরকার, হরিদাস ভদ্র প্রমুখ ভক্তগন তখন ঠাকুর বাড়ীতেই থাকতেন। ক্রমশঃ স্থায়ী বাসিন্দা বৃদ্ধি পেতে থাকলে কতগুলো খড়ের ও টিনের ঘর তৈরি করা হয়। পদ্মার ধারে বাঁশঝাড়ের মধ্যে কয়েকটা খাটা পায়খানা তৈরি হয়। এইভাবে প্রয়োজন অনুপাতে কুটিরের পর কুটির নির্মিত হতে থাকে। ক্রমে ক্রমে গড়ে ওঠে আশ্রম। প্রথম পত্তনকালীন তখনকার লোকেরা হিমাইতপুরের আশ্রমকে বলতো অনুকূল ঠাকুরের আশ্রম। পরে শ্রীশ্রীঠাকুরের মা আগ্রা সৎসঙ্গের অনুকরণে ‘সৎসঙ্গ আশ্রম’ এবং দীক্ষিতদের ‘সৎসঙ্গী’ নামে অভিহিত করেছিলেন। মূর্খ-পণ্ডিত-ধনী-নির্ধন-জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষ একে একে সমবেত হতে শুরু করলো হিমাইতপুরে। শুরু হলো লোকসংগ্রহ পর্ব। শুরু হলো কর্মযজ্ঞ।
এক এক করে গড়ে ওঠে আনন্দবাজার, কেমিক্যাল ওয়ার্কস, তপোবন বিদ্যালয়, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র, প্রেস, পাব্লিশিং হাউস, কলাকেন্দ্র, কুটীর শিল্পাগার প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান। সব কর্মকাণ্ডের সাথে মায়ের অগ্রণীর ভূমিকা ছিল। তাঁর চরিত্র ছিল, কুসুমের ন্যায় কোমল, পাথরের ন্যায় কঠিন। আধ্যাত্ম জগতের সাথে সাথে জাগতিক জগতেও তিনি ছিলেন সকলের অভিভাবক স্বরূপা। নিজের, নিজের পরিবারের সব বিপদ-আপদকে তুচ্ছ করে অন্যকে রক্ষা করতেন জগজ্জননী-স্বরূপিণী হয়ে। হিমাইতপুর সৎসঙ্গ আশ্রমের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী। আশ্রমিকদের খাওয়া-দাওয়া, শিক্ষা, স্বাস্থ্য রক্ষা, প্রতিরক্ষা ইত্যাদি সব বিষয়ে তিনি সজাগ থাকতেন। দুর্বৃত্তদের অত্যাচার থেকে আশ্রমিকদের রক্ষা করতে লাঠি হাতে সারারাত জেগে পাহারা দিতেন। তাঁর ভয়ে আশ্রমে কেহ অন্যায় কাজ করতে সাহস পেত না।
মহাত্মাগান্ধী হিমাইতপুর আশ্রম পরিদর্শন করে আশ্রমের ভুয়সী প্রশংসা করার পর বলেছিলেন, “I have never seen a masterly woman of such wonderful personality in my life.”
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৃষ্ট সৎসঙ্গ আন্দোলন বিশ্ব পরিবার সংগঠনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রূপে একসময় প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল হিমাইতপুরে। সুদূর আমেরিকার খ্রিস্টান সম্প্রদায়ভুক্ত শ্রদ্ধাভাজন স্পেনসারদা, হাউজারম্যানদা, ইসলাম সম্প্রদায়ের খলিলুর রহমান, ব্রাহ্মণ পরিবারের বিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য মহোদয়ের ন্যায় পণ্ডিত ব্যক্তি প্রমুখদের পাশাপাশি খুব সাধারণ মাপের, অভাবে পরিশ্রান্ত মানুষদের পরিবার নিয়ে গড়ে তোলা পরিবারের নাম ছিল বৃহত্তর সৎসঙ্গীদের একটা পরিবার। দিনান্তে একবার আনন্দবাজারে আশ্রমমাতা জননী মনোমোহিনী দেবীর মাখা “দলা” প্রসাদ খেয়ে পরমানন্দে আশ্রম সংগঠনের ইষ্টের ঈপ্সিত কর্মে মত্ত থাকতেন—বিনা ওজরে, বিনা আপত্তিতে। ওই একবেলা খেয়েই নামধ্যান, কীর্তন, পঠন-পাঠন, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, সংস্কৃতি, বিজ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন থাকতেন। সকল পরিবার ছিল একে অপরের পরিপূরক পরিবার। সে এক স্বর্ণালি যুগ ছিল সৎসঙ্গের। প্রতিটি পরিবারের অভিভাবক ছিলেন মাতা মনোমোহিনী দেবী। সেই সৎসঙ্গ পরিবারের সদস্য আমরা। ব্যক্তি, দম্পতি, গৃহ, সমাজ, রাষ্ট্র জীবনকে অখণ্ড রেখে, প্রাচ্য-প্রতীচ্যকে বর্ণাশ্রমানুশাসনে নিয়ন্ত্রণ করে পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন আমাদের জীবন দেবতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। আমরা যদি ঠাকুরের আদর্শের পরিপালনে, পরিবার থেকে, সমাজ থেকে ডিভোর্সকে, বৃদ্ধাশ্রমকে বিদায় জানিয়ে, পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি মিলেমিশে এক ছাদের নীচে জীবন যাপন করে এক-একটা আদর্শ পরিবারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি—সার্থক হবে শ্রীশ্রীঠাকুরের সৎসঙ্গ আন্দোলন।
মাতা মনোমোহিনী দেবী তাঁর গুরুদেব সাধক পুরুষ হুজুর মহারাজের কাছ থেকে যে বিনতী করতে শিখেছিলেন, সেই শিক্ষার ধারাটাকে প্রাধান্য দিয়ে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন পাবনার সৎসঙ্গ আন্দোলন। যে ধারায় বীজমন্ত্রের উচ্চারণ স্বীকৃত, বীজমন্ত্রের মাধ্যমেই পারস্পরিক সম্ভাষণ প্রচলিত। আর্য্যকৃষ্টির দশবিধ সংস্কার অবহেলিত—যা শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শের পরিপন্থী! যার ফলে, আজও বিনতীর মাধ্যমে বীজমন্ত্র উচ্চারিত হয়ে চলেছে। নিত্য সাধ্যায়ের জন্য আবশ্যিক, শ্রীশ্রীঠাকুর রচিত ‘জাগরণী’ সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দীক্ষিতরা যতটা না জানেন, তার চেয়ে বেশি মানেন মাতা মনোমোহিনী দেবী রচিত তাঁর গুরুদেবের প্রশস্তির প্রভাতী গীতি ‘প্রভাত যামিনী উদিত দিনমনি’-কে। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শের অনুগামীদের ঊষা-নিশায় মন্ত্রসাধন করা এক আবশ্যিক সাধনা। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সেকথা তিনি বার-বার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এ বিষয়ে একটা উদ্ধৃতি তুলে ধরছি। শ্রীশ্রীঠাকুর কয়েকজনকে লক্ষ্য ক’রে বললেন—খুব সকালে উঠে ভোর চারটের মধ্যে প্রাতঃকৃত্যাদি ও নামধ্যান সেরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাগরণী গান গেয়ে সবাইকে জাগিয়ে দিতে হয়। তাড়াতাড়ি যাতে নামধ্যানে বসে তা’ করতে হয়। ওতে লোকে আনন্দ পায়, স্ফূর্তি পায়, তাদের শরীরও ভাল থাকে। আগে যতদিন ভোরে সবাইকে জাগিয়ে দিয়ে নামধ্যান করিয়েছি, ততদিন মানুষ অকালে মরেনি। তাই প্রত্যেককে এটা করানো লাগে। (আ. প্র. ১৬/ ১৫. ৪. ১৯৪৯)
তপো-বিধায়না গ্রন্থ থেকে— “প্রার্থনা বা তপঃ-উপাসনার পক্ষে ঊষা বা ব্রাহ্মমুহূর্ত্ত, মধ্যাহ্ন ও সায়ংকাল— এই তিনই শ্রেষ্ঠ, তা’র ভিতর আবার ব্রাহ্মমুহূর্ত্তই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ; মানসিক জপ সর্ব্বকালেই শ্রেয়; আবার, প্রসন্ন, নির্দ্বন্দ্ব, হৃদ্য-প্রীতি-প্রবুদ্ধ-যাজন যা’ চিন্তন ও কথনের ভিতর-দিয়ে উভয়কেই উদ্যোগী-উৎফুল্ল ক’রে তোলে,— তা’ কিন্তু সর্ব্বকালেই শ্রেষ্ঠ।” ৯৩।
এখনও পর্য্যন্ত তাঁর ওই নিদেশকে উপেক্ষা করে শ্রীশ্রীঠাকুরের উৎসব-অনুষ্ঠানে সূর্য ওঠার আগেই, ঊষা-কীর্তনের নামে পুরুষোত্তম-জননী মাতা মনোমোহিনী দেবী রচিত—তাঁর গুরুদেবের প্রশ্বস্তি-গীতি— “প্রভাত যামিনী উদিত দিনমনি ঊষারাণী হাসিমুখে চায় রে— জাগি বিহগ সব তুলি নানা কলরব রাধা রাধা রাধাস্বামী গায় রে। নবীন বৃন্দাবনে তুলসী কাননে ভ্রমরী রাধাস্বামী গায় রে। সেই সে মধুর গান বাঁশিতে তুলিতে তান আপনি যে রাধাস্বামী গায় রে।। যে নামে নন্দের কানু সেধেছিল মোহন বেণু সেই রাধা রাধা নাম গাও রে।। আজি মধু জাগরণ শুনে সবে নরগণ জয় জয় রাধাস্বামী গাও রে। মথিয়া সকল তন্ত্র রাধাস্বামী মহামন্ত্র আদিগুরু জগতে বিলায় রে।। রাধাস্বামী গুণগানে আনন্দ বাড়িবে প্রাণে চরমে পরম গতি হয় রে।। রোগ-শোক ব্যাধি-জরা দূরে পালাবে তারা আনন্দে রাধাস্বামী গাও রে। জয় রাধাস্বামী জয় রাধাস্বামী জয় জয় রাধাস্বামী গাও রে।।” কীর্তন করতে এবং করাতে অভ্যস্ত উৎসবের আয়োজকগণ!—-ব্রাত্য হয়ে আছে শ্রীশ্রীঠাকুর রচিত জাগরণী!
পরবর্তীকালে দৈনন্দিন জীবনচলনায় আর্য্যকৃষ্টির অনুশাসনকে প্রতিষ্ঠা করতে শ্রীশ্রীঠাকুর যে সান্ধ্য-প্রার্থনা মন্ত্র রচনা (দ্রঃ সৎসঙ্গ পাব্লিশিং-এর প্রার্থনা নামের পুস্তিকা।) করেছিলেন, মাতা মনোমোহিনী দেবী সেই প্রার্থনাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন, ‘‘সন্ধ্যা মন্ত্রটা মা মারা যাবার তিনদিন আগে লেখা হয়। মা শুনে বড় খুশি হয়েছিলেন। সেইজন্য ও জিনিসটার উপর আমার খুব প্রীতি আছে। মা শুনেছিলেন তাই ওটা আমার অর্ঘ্য হয়ে আছে।’’ (আঃ প্রঃ ২১ খণ্ড, ৭. ১১. ১৯৫২) শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে কারো কাছে দীক্ষা গ্রহণ না করলেও বার বার তিনি বলেছেন, ‘আমার মা-ই যেন সরকার সাহেব, হুজুর মহারাজ ও অন্যান্য অন্যান্য মহাপুরুষদের প্রতীক—মা-ই আমার আদর্শ—মা-ই আমার জীবত্ব।’ তথাপি তিনি সরকার সাহবকে নিজের গুরু হিসেবে এবং হুজুর মহারাজকে মাতৃদেবীর গুরু হিসেবে মান্য করতেন, তাঁদের প্রতিকৃতিতে প্রণাম নিবেদন করতেন।
।। মায়ের মাধ্যমে পুরুষোত্তম রূপে আত্মপ্রকাশ ।। শ্রীশ্রীজননী একদিন আমাকে (ডাঃ সতীশ জোয়ারদার) বলিলেন—“হ্যাঁ রে, তোরা অ……র মূর্ত্তি ধ্যান করিস কেন?” আমি বলিলাম—“শ্রীকৃষ্ণ-মূর্ত্তি বা অন্য সদ্গুরুমূর্ত্তি ধ্যান করতে আপনার ছেলের মূর্তি যে এসে উপস্থিত হন তা আমরা কি করব।” তিনি বলিলেন—“তা যদি সত্যি হয় তবে কর।” কথাটা যেন অনিচ্ছার সহিত বলিলেন। মধ্যাহ্নে শ্রীশ্রীজননীর পূর্ব্বদ্বারী বড় টিনের ঘরে শ্রীশ্রীঠাকুরসহ আমরা অনেকে ভোজন করিতে বসিলাম। শ্রীশ্রীঠাকুর বলিলেন—“মা, তুই আমার থালায় ব’সে নিবেদন করে দে না, তুই নিবেদন ক’রে দে আমি প্রসাদ খাই।” মা বলিলেন—“আমি এখন পারি না।” তিনি পঞ্চমবর্ষীয় বালকবৎ যেন আবদার করিয়া বলিলেন—“না মা, তুই নিবেদন ক’রে দে, তুই নিবেদন করে না দিলে আমার ভাল লাগবে না। তুই বেশ ক’রে ভাত মাখিয়ে দে, নিবেদন ক’রে দে, আর একটু খেয়ে প্রসাদ ক’রে দে না মা।” তখন শ্রীশ্রীজননী তাঁহার আবদার রক্ষা না করিয়া পারিলেন না। তিনি ভোজ্যসমীপে শ্রীশ্রীঠাকুরের নিকট বসিয়া তাঁহার ইষ্টমূৰ্ত্তিকে সেই ভোজ্যসামগ্রী নিবেদন করিতে লাগিলেন, ধ্যানে বসিলেন। ধ্যান করিতে করিতে দেখিলেন, তাঁহারই পুত্র আজ তাঁহার ইষ্টস্থলে অধিষ্ঠিত হইয়া ভোজ্য ভোজন করিলেন। তখন শ্রীশ্রীজননী (পূর্ব্বেও কিছু জানিতেন বোধহয়) বলিলেন—“এখন কি তোর এঁটো আমার খেতে হবে নাকি?” শ্রীশ্রীঠাকুর বলিলেন—“ওমা, সেকি কথা!” শ্রীশ্রীজননী বলিলেন— “নিবেদন করলাম, দেখলাম তুই-ই তো খেয়ে গেলি।” শ্রীশ্রীঠাকুর বলিলেন— “ওমা, সেকি কথা!” তখন সকলেই নীরব হইলেন! ব্যাপার বুঝিতে কাহারও আর বাকী থাকিল না। শ্রীশ্রীজননী তদবধি তাঁহার পুত্রকে সদ্গুরুরূপে ধ্যান করিতে আমাদিগকে আর নিষেধ করেন নাই। (সূত্র : ডাঃ সতীশচন্দ্র জোয়ারদার রচিত গ্রন্থ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকচলচন্দ্র, পৃঃ ২৩৬-২৩৭)
কেন জানি, প্রথম জীবনে মাতা মনোমোহিনী দেবী পুত্র অনুকূলকে সব গুরুদের গুরু পরমগুরু রূপে মেনে নিতে পারেন নি। এমনকি ভাবসমাধি যাতে না হয় সেজন্য নফর আর রাধিকাকে দিয়ে কীর্তনের আঙিনায় জল ঢেলে কীর্তন বন্ধ করিয়েছিলেন! (দ্রঃ ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীর জীবনী গ্রন্থের ১ম খণ্ড, দ্বাদশ অধ্যায়।) উপরোক্ত ঘটনা উপলব্ধি করার পর থেকেই হয়তো পুত্রের ভগবৎ সত্তা সম্বন্ধে নিজে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। মাতা মনোমোহিনী দেবী একবার কলকাতায় ১/১ সি হরিতকী বাগান লেনের বাড়িতে তাঁর পুত্র অনুকূলচন্দ্র, প্রভাসচন্দ্র, কুমুদচন্দ্র ও গুরুপ্রসাদীকে নিয়ে সপরিবারে ছিলেন। ঐ বাড়িতে থাকাকালীন গুরুপ্রসাদী দেবী বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল। গুরুপ্রসাদী দেবীর জীবনের আশা রইল না। মনোমোহিনী দেবী পুরুষোত্তমরূপী সন্তান অনুকূলের শরণাপন্ন হলে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন, — ‘ভয় নেই মা তোর গুরুপ্রসাদী সেরে উঠবে।’ পরদিন সকালে দেখা গেল শ্রীশ্রীঠাকুরের শরীরটা গুটি বসন্তে ভরে গেছে। এদিকে গুরুপ্রসাদী দেবী ধীরে ধীরে আরোগ্য লাভ করলেন। শ্রীশ্রীঠাকুর বেশ কয়েকদিন রোগ ভোগ করে সুস্থ হয়ে উঠলেন। এই বাড়িতেই শ্রীশ্রীঠাকুরে মেজ ভাই প্রভাসচন্দ্র কঠিন টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হন। রোগ উপশম হওয়া দূরে কথা ক্রমশঃ ব্যাধির প্রকোপ বেড়েই চলল। চিকিৎসকের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে রোগীর দেহ ঠাণ্ডা হতে লাগলো। জননী মনোমোহিনী তখন প্রথম পুত্র অনুকূলচন্দ্রের হাত দুটি ধরে আর্তকণ্ঠে বললেন — “অনুকূল, তুমি আমার ছেলেই হও আর যাই হও, তুমি সাক্ষাৎ ভগবান। আমার খ্যাপাকে (প্রভাসচন্দ্র) ফিরিয়ে দাও বাবা।” শ্রীশ্রীঠাকুর কিছুক্ষণ মৌন থেকে বললেন— ‘আচ্ছা যাও’। প্রভাসচন্দ্র ধীরে ধীরে আরোগ্যলাভ করলেন। একই ঘটনা ঘটেছিল বিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যের জীবনে। তিনি একবার গুরুতর রোগে আক্রান্ত হলেন। রোগের কোন উপশম হল না। চিকিৎসকের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল। তখন কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যের বয়স মাত্র উনত্রিশ বছর। কোষ্ঠিতে এই সময় তাঁর মৃত্যুযোগ নির্ধারিত ছিল। মাতা মনোমোহিনী দেবী কৃষ্ণপ্রসন্নের শিয়রে শুশ্রূষায় ব্যস্ত ছিলেন। রোগীর অন্তিম দশা দেখে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে তিনি ঠাকুরকে বলেন, – ‘অনুকূল রে, কেষ্ট বুঝি আমাদের ছেড়ে চলে গেল। কেষ্টকে বাবা তুই এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দে নইলে আমি মারা যাব।’ শ্রীশ্রীঠাকুর মায়ের এই আর্জি মঞ্জুর করেছিলেন। কৃষ্ণপ্রসন্নের দেহে প্রাণ ফিরে এসেছিল। তিনি নিরাময় হয়ে উঠলেন। প্রত্যেকের ব্যথার ব্যথী ছিলেন মাতা মনোমোহিনী দেবী। হিমাইতপুর আশ্রমটা ছিল তাঁর কাছে একটা পরিবার স্বরূপ। আশ্রম ছাড়াও আশেপাশের গ্রামের মানুষের অসুখ-বিসুখ, অভাব-অভিযোগ, বিপদ-আপদ সবকিছুতেই তিনি ছিলেন সকলের ত্রাতা, অসৎ নিরোধে তৎপর। তাঁর ছিল দুর্জয় সাহস ও অসামান্য ব্যক্তিত্ব! নিজের জীবনের মায়া তুচ্ছ করে সব্বাইকে আগলে রাখতেন। না, বেশিদিন আর আগলে রাখতে পারলেন না।
লোক-সংগ্রহের প্রয়োজনে শ্রীশ্রীঠাকুরকে মাঝে-মাঝেই কলকাতায় যেতে হতো। প্রায়শই মা সাথে যেতেন। বাংলা ১৩৪৪ সালের মাঝামাঝি। লিভারের পীড়ায় পীড়িত জননীদেবীকে আশ্রমে থাকতে বলে শ্রীশ্রীঠাকুর কলকাতা চলে যান। ঠাকুর যাবার পর ঠাকুরের নিষেধ অমান্য করে মা কলকাতা চলে এলে ঠাকুর ব্যথিত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তার ব্যাধি বৃদ্ধি পেতে থাকে। কলকাতার ডাক্তারদের চিকিৎসাতে কোন উপশম হচ্ছিল না দেখে ঠাকুর মা-কে নিয়ে হিমাইতপুর ফিরে আসেন। অসুস্থতার অন্তিম অবস্থায় ডাঃ কেদারনাথ ভট্টাচার্য্যকে উদ্দেশ্য করে জননীদেবী বলেছিলেন—‘দ্যাখ্ কেদার, তোরা আর আমার কি করবি? আমার এই কষ্টভোগ আমারই সৃষ্টি। অনুকূলকে আমি ছেলের বেশি ভাবতে পারিনি—তাই আমার ব্যারাম। সে যা বলে তাই সত্য হয়। ভূত ভবিষ্যত সবই ও জানে। ওর কথা না শুনে আজ আমার এই দুর্ভোগ। অনুকূল আমাকে বারবারই এখানে (কলকাতায়) আসতে নিষেধ করেছিল, আমি তা শুনিনি। যেখানে বাৎসল্য সেখানেই তাচ্ছিল্য, পদে পদে ভুল হয়ে যায়। কর্মফল আর এড়াতে পারলাম না।’ ১৩৪৪ বঙ্গাব্দের ৬ই চৈত্রর দিনটিতে বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে সর্বগুণের গুণান্বিতা মাতৃমূর্তি স্বরূপিণী বিশ্বজননী মাতা মনোমোহিনী দেবী সকলকে শোকসাগরে নিক্ষিপ্ত করে ইহলীলা সম্বরণ করেন। মায়ের নিথর দেহকে আগলে ঠাকুর ‘নিরাশ্রয়, নিরাশ্রয়’ ….. ‘কোথায় আমার মা, কোথায় আমার মা’ বলে কপালে করাঘাত করতে থাকেন। পদ্মার তীরে সৎকার করা হয়। সৎকার করার পরেও ঠাকুর উন্মত্তের ন্যায় কখনো মায়ের ঘরে, কখনো চিতাভূমিতে, কখনো শ্মশানের দিকে তাকিয়ে,—“মা তুই এলিনা—ওমা, মা গো তোর অনুকূলের কি দশা হয়েছে একবার দেখে যা!” …. বলে আকূল আর্তনাদ করতে থাকেন। যথাবিধি শ্রাদ্ধক্রিয়া সমাপন করে কুল পুরোহিতের নির্দেশে একটি বছর ধরে জামা, জুতো, ছাতা ব্যবহার না করে কালাশৌচ পালন করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। মায়ের অসুস্থতার সময়ে মাকে সবদিক থেকে স্বস্তিতে রাখার জন্য মায়ের বসবাসের জন্য একটা ঘর তৈরি করিয়েছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। ঘরটিকে খাট, ইজিচেয়ার, টেবিল, আলনা, আয়না, বৈদ্যুতিক আলো, পাখা প্রভৃতি নিত্য ব্যবহার্য্য সরঞ্জামে সাজিয়েছিলেন। স্যানিটারী পায়খানার ব্যবস্থা করেছিলেন, মায়ের যাতে কোন অসুবিধা না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে। পরিতাপের বিষয়, জীবদ্দশায় মায়ের আর ওই ঘরে বাস করা হয়ে ওঠে নি। মায়ের তিরোভাবের পর সেই গৃহটিকে ‘মাতৃমন্দির’ নামে সংরক্ষিত করে যে স্মৃতিফলক স্থাপন করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর, তাঁর প্রতিলিপি সংযোজিত করলাম।
মা! বড় আকুল আগ্রহ উদ্গ্ৰীৰ উৎকণ্ঠা নিয়েই এই ঘর আর তার আসবাব যা কিছুর কাজ সমাধা ক’চ্ছিলাম—আশা ছিল তুমি থাকবে—ব্যবহার করবে— ধন্য হ’ব আমি—তা হল না— তুমি চ’লে গেলে—পার্থির শরীরের পতন হ’ল—আমার হতভাগ্য অদৃষ্ট কালের নিষ্ঠুর শ্লেষমলিন ধিক্কারে—মৃত্যুর মত জীয়ন্ত হ’য়ে রইল। মনীষীরা ব’লে থাকেন, মানুষ পার্থিব শরীর ছেড়ে গেলেও আবার যেমন ছিল সূক্ষ্ম শরীরে তেমনই প্রাণ নিয়েই বেঁচে থাকে, আবার জাতিস্মর হ’য়েও নাকি সেই মানুষই জন্মাতে পারে— মা! মা আমার ! দয়াল যদি তাই করেন—তুমি যদি কখনও জাতিস্মর হ’য়ে এ দুনিয়ায় আবার ফিরে এস—তোমার অনুকূলকে মনে পড়ে—নিরাশ্রয় ব’লে যদি বেদনা অনুকম্পাজড়িত হৃদয় তোমার আমাকে খোঁজই করে—তুমি এসো— এসে এখানেই থেকো— এসবই ব্যবহার কো’রো— তোমারই হতভাগ্য দীন সন্তান, অনুকূল ——————————————————————————————– তথ্যঋণ : ১. ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ১ম খণ্ড। ২. শ্রীসচ্চিদানন্দ গোস্বামী প্রণীত, ‘আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী ও সৎসঙ্গ আন্দোলন’।
।। বশীকরণ ।। পান্ডবদের এটা দ্বিতীয় বারের বনবাস। এর আগে, পিতৃব্য বিদুরের পরামর্শে বারাণাবতের জতুগৃহ দাহ থেকে রক্ষা পেয়ে আত্মরক্ষার্থে তপস্বীর ছদ্মবেশে বারোটি বছর বনবাসে কাটিয়েছেন। তখন সাথে ছিল মাতা কুন্তী। এবারের সাথী দ্রৌপদী। প্রতিবিন্ধ্য, সুতসোম, শ্রুতকর্ম্মা, শতানীক ও শ্রুতসেনাদি পঞ্চ-পুত্রকে সুভদ্রার দায়িত্বে রেখে দ্রৌপদীও পঞ্চ-পান্ডবদের সাথে বনানুগমন করেছেন। কাম্যকবন থেকে দ্বৈতবনে এসে তাঁরা কুটীর বেঁধেছেন। * * * শ্রীকৃষ্ণ সৌভরাজ শাল্ব দমনে ব্যস্ত ছিলেন বলে তিনি কপট পাশাখেলার সময় হস্তিনাপুরে উপস্থিত হতে পারেন নি। যদি থাকতেন, ইতিহাস অন্য আঙ্গিকে রচিত হতো। যাইহোক, সৌভরাজ শাল্বকে সমুচিত শিক্ষা দিয়ে দ্বারকা নগরীতে ফিরে পান্ডবদের বনবাসের ওই দুঃসংবাদ শুনতে পান। তাই, আর বিলম্ব না করে ধৃষ্টকেতু, কৈকয়, ভোজ, অন্ধক ও পাঞ্চাল দেশের প্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে পান্ডবদের সাথে সাক্ষাত করতে ছুটে এসেছেন দ্বৈতবনে। *** শ্রীকৃষ্ণ পাঞ্চালীকে নানাভাবে সান্ত্বনা দিয়ে শান্ত করে পান্ডবদের সাথে ভবিষ্যতের করণীয় কর্তব্য বিষয়ে পরামর্শ দান করে পুণরাগমনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফিরে যান দ্বারকায়। তারপর বেশিদিন হয়নি। শ্রীকৃষ্ণের দেওয়া উপদেশ মত ভবিষ্যত কর্মসূচী ঠিক করতে পাঁচভাই একত্রে মার্কন্ডেয় ঋষি ও ব্রাহ্মণদের সাথে বসে শলা-পরামর্শ করছিলেন। দ্রৌপদী রয়েছেন নিজের কুটিরে। এমন সময় কুটিরের সামনে একটি রথ এসে দাঁড়ালে পান্ডবেরা স্বাগত জানাতে কুটির থেকে বেরিয়ে দেখেন আগন্তুক আর কেউ নয়, তাদের একান্ত আপনজন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। রাণী সত্যভামাকে সাথে নিয়ে এসেছেন। যুধিষ্ঠির শ্রীকৃষ্ণকে যথোচিত মর্যাদায় কুটিরের অভ্যন্তরে নিয়ে বসান। দ্রৌপদী সত্যভামাকে নিয়ে যান তাঁর নিজস্ব কুটীরে। অনেকদিন বাদে দুই সখীর দেখা। কুটীরে ঢুকে সত্যভামা দ্রৌপদীকে আলিঙন করে নানাবিধ সান্ত্বনা বাক্যে আশ্বস্ত করার পর একসময় হাস্য পরিহাস ছলে দ্রৌপদীকে বলে ফেলেন, বনে থাক আর যেখানেই থাক, স্ত্রী হিসেবে তুমি কিন্তু খুব সুখী, তোমার সুখ দেখে, আমার ঈর্ষা হয়। —আমার সুখ দেখে তোমার ঈর্ষা হয়! ভরা রাজসভায় কুরুবৃদ্ধদের সামনে, কুরু-আচার্য্যদের সামনে দুর্যোধন, দুঃশাসন, সুতপুত্র কর্ণ আমার নারীত্বের যে অপমান করেছে, সেই অপমানের জ্বালা নিয়ে শ্বাপদসঙ্কুল বনে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছি, এটা যদি তোমার বিচারে সুখ হয়, তাহলে একটা কাজ করলে হয়না,— সখা কৃষ্ণের সাথে দ্বারকায় না ফিরে আমার সাথে বনবাসে থেকে আমার সুখের ভাগীদার হলেই তো হয়! দুই সখীতে মিলে সুখের জোয়ারে ভাসা যাবে!—দ্রৌপদী বলেন। দ্রৌপদীর কথার উত্তরে সত্যভামা বলেন, অত সুখ কি আমার ভাগ্যে আছে সখী ? —ভাগ্যে না থাকার কি হয়েছে ? সখা কৃষ্ণ দ্বারকায় চলে যাবেন, সখাকে বলে তোমাকে রেখে দেব, তুমি আমার সাথে থাকবে ? —সুখের আকরই যদি কাছে না থাকে, সুখের স্বাদ কি পাওয়া যাবে ? সত্যভামা বলেন। —কেন আমরা কি এতই অযোগ্য যে তোমার সুখের আকর হতে পারব না? —ওঃ, তুমি এতক্ষণে এই বুঝলে! আমার অস্তিত্ব যিনি তাঁকে বিনা সুখ ভোগ!— তা কি কখনো হতে পারে ? সে তো বিনি-সুতোর মালার মতো হবে,— ক্ষণস্থায়ী। —তোমার অস্তিত্ব তো তোমার অন্তর্যামী জীবনদেবতা, তিনি তো তোমার সাথে সাথেই থাকবেন! দ্রৌপদী বলেন। —দ্যাখ সখী, আমি অতশত বুঝি না বাপু, আমি জানি আমার আমিত্ব যাঁর কাছে বাঁধা পড়েছে, সে-ই আমার অন্তর্যামী, আমার জীবন-দেবতা। তিনি হলেন তোমার সখা বৃষ্ণিসিংহ, আমার স্বামী। তিনি থাকবেন দ্বারকায়, আর আমি থাকব এখানে? তাঁকে ছেড়ে সুখ! তাঁর শ্রীমুখ দর্শন বিনে সুখ! সে তো কল্পনাও করা যায় না! বরং তোমাদের অনুরোধে তিনি যদি এখানে থাকেন, তাহলে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে রাজী আছি এই বনবাসে। তারপর একটু থেমে বলেন, —আচ্ছা সখী পাঞ্চালি, একটা কথা বলবো, রাগ করবে না তো ? —স্বচ্ছন্দে বলতে পার সখী, এতটুকুও রাগ করব না। দ্রৌপদী বলেন। —তুমি কোন্ ব্রত, কোন্ উপবাস, কোন। তপ-জপ-হোম, কোন্ তীর্থে স্নান, কোন্ মন্ত্র, কোন্ ওষুধ, কোন বশীকরণ বিদ্যা দিয়ে লোকপালসদৃশ, মহাবীর পাঁচ-পাঁচটা স্বামীকে বশ করে রেখেছ, যে, তাঁরা কখনো তোমার উপর রাগ করেন না, তোমাকে ছাড়া কাউকে মনে করেন না, তোমাকে ভিন্ন তাঁদের চলে না, তুমি তাঁদের কাছে এমনই অপরিহার্য্য যে এই বনবাসেও তোমাকে সাথে নিয়ে এসেছে! আর, আমাদের অবস্থা দ্যাখ, আমরা আট-আটজন সপত্নী মিলে হাজারো চেষ্টা করে কেউই একটা স্বামীকে বশে রাখতে পারি না। তাই তোমার হাত ধরে অনুরোধ করছি ভাই, একটিবার শিখিয়ে দাও না, তোমার ওই স্বামী বশীকরণ বিদ্যাগুলো। যাতে আমি আমার স্বামী কৃষ্ণকে নিরন্তর আমার বশে রাখতে পারি। সত্যভামার কথা শেষ হলে যাজ্ঞসেনী কিছুক্ষণ মৌন থেকে গম্ভীরভাবে বলেন, হে সখী সত্যভামা! তুমি যে সব বিষয়ের অবতারনা করলে অসৎ স্ত্রীলোকেরাই ওইসব আচার করে থাকে। আর স্বামী যদি একবার জানতে পারেন যে, তার স্ত্রী তাকে ওযুধপত্র, মন্ত্রতন্ত্র দিয়ে তুক্-তাক্ করে বশ করার চেষ্টা করছে, সেই স্বামী কখনোই তার স্ত্রীকে সুনজরে দেখবে না। একটা বিষধর সর্পের সাথে বাস করছে মনে করবে। কখনোই তাকে বিশ্বাস করবে না। তার সঙ্গ পরিহার করে চলার চেষ্টা করবে। শুনতে পাই, অনেক স্ত্রীলোক ওইসব তুক্-তাক্ করে স্বামীদের বশ করতে গিয়ে স্বামীদের সারা জীবনের মতো অথর্ব, পঙ্গু করে ফেলেছে। স্বামীর বিপ্রিয়াচরণ করতে গিয়ে স্বামীর সত্তাটাকেই বশ-এর বদলে অ-বশ করে মেরে ফেলেছে। তোমার ন্যায় বুদ্ধিমতী, বিশেষতঃ কৃষ্ণের মহিষীর কাছ থেকে এমন প্রশ্ন আমি আশা করি নি। অতএব, তুমি যে বিষয়ে আমার কাছে জানতে চাইলে তার উত্তর দিতে আমি অক্ষম সখী। * * * দ্রৌপদীর কথায় সত্যভামা নিজের ভুল বুঝতে পেরে বলেন, দ্যাখো সখি, আমি না বুঝে কি বলতে কি বলে ফেলেছি মনে কিছু করোনা ভাই। আসলে স্বামীকে নিজের মত করে কাছে না পাওয়ার জ্বালায় জ্বলছি তো ভাই, তাই প্রগলভতার প্রকাশ করে ফেলেছি। ঠিক আছে, আমার ঘাট হয়েছে, এবার বল তো তুমি, কোন উপায়ে পাঁচ-পাঁচটা স্বামীর কাছে তুমি অপরিহার্য হয়ে উঠেছ, যে তোমাকে না হলেই তাঁদের চলে না ? সত্যভামার প্রশ্নের উত্তরে এবার পাঞ্চালী বলেন, হে সত্যভামে! শুনবে আমার বশীকরণ করার তুক্? সত্যভামা সম্মতিসূচক ঈঙ্গিত করলে, দ্রৌপদী বলেন, আমি সকলের আগে শয্যাত্যাগ করি এবং সকলের শেষে শুতে যাই। নিজে হাতে ঘরদোর পরিষ্কার করি। ঘরদোর সাজিয়ে রাখি। পাকশালার রান্নাবান্না নিজে হাতে সামলাই। আলস্য ত্যাগ করে সকলের সাথে সৎ ভাব বজায় রাখার চেষ্টা করি। তিরস্কার বাক্য মুখেও আনি না। আমি কাম, ক্রোধ, অহঙ্কার পরিহার করে সবসময় মহাত্মা পান্ডবদের এবং তাঁদের অন্যান্য স্ত্রীদের পরিচর্যা করে থাকি। অভিমানশূন্য হয়ে পতিদের মনোবৃত্ত্যানুসারিণী হয়ে চলি। তাঁরা যে সমস্ত খাওয়া-দাওয়া বসন-ভূষণ আচার-আচরণ অপছন্দ করেন, আমিও সেসব সযত্নে পরিহার করে থাকি। কখনো কটুবাক প্রয়োগ করি না, দ্রুতপদসঞ্চারে মন্দছন্দে গমন বা কুৎসিতরূপে উপবেশন করি না। সতত ভর্ত্তাদের ইঙ্গিত বুঝে তাঁদের সেবা করি। কি দেব, কি গন্ধর্ব, কি কন্দর্পকান্তি অলঙ্কৃত কোন যুবা পুরুষকে মনে স্থান দিই না। অসৎ স্ত্রীলোকদের সঙ্গ পরিহার করে চলি, সত্তাধর্মী হাস্যপরিহাস ছাড়া কোন প্রবৃত্তিধর্মী হাস্যপরিহাসে কখনোই প্রবৃত্ত হই না। স্বামীরা নিজের নিজের কাজে বেরোবার সময় নিজে হাতে সব গুছিয়ে দিয়ে বিদায় সম্বর্দ্ধনা জানাই। এবং গৃহে প্রত্যাগমনের সময়টা জেনে নিয়ে সাদরে বরণ করে সেবা দ্বারা শ্রান্তি দূর করার জন্য প্রস্তুত থাকি। কোন দাসীকে দিয়ে করাই না। তাঁরা উপবেশন না করা পর্যন্ত আমি উপবেশন করি না। তাঁরা আহার না করা পর্যন্ত আমি আহার করি না। স্বামীরা কোন কর্তব্যকর্মে বহির্দেশে গেলে ফিরে না আসা পর্যন্ত ব্রত পালন করি। আমার মতে পতিই নারীর দেবতা ও একমাত্র গতি। হে সত্যভামে! আমি প্রতিদিন আমার শ্বাশুড়ী বীরপ্রসবিনী আর্য্যা কুন্তীকে নিজে হাতে স্নান-পান-ভোজন করাই, তাঁর সেবা করি। কখনো ওঁর নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক সামগ্রীর তুলনায় উৎকৃষ্ট ভোজন করি না, বা বসন-ভূষণ পরিধান করি না এবং প্রাণান্তেও শ্বাশুড়ীর নিন্দা করি না। তাঁর নিদেশ মেনে সতত চলতে চেষ্টা করি। তিনিও আমাকে পুত্রীবৎ স্নেহ করেন। ইন্দ্রপ্রস্থে মহারাজ যুধিষ্ঠিরের নিকেতনে সহস্রাধিক ব্রাহ্মণ, গৃহমেধী স্নাতক প্রতিপালিত হতেন, আমি স্বয়ং তাঁদের সৎকার করতাম। মহারাজ যুধিষ্ঠিরের রাজত্বকালে যে-সমস্ত অমাত্য, দাসদাসী, হাতী, ঘোড়া, গোরু, মেষ, মাহুত, সহিস, সারথী, গোপালক, মেষপালক, যোদ্ধা, অসংখ্য রাজ-কর্মচারী ছিল, আমি তাদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান করতাম। নির্দিষ্ট রাজ-কর্মচারী থাকা সত্ত্বেও আমি নিজে নিত্য কোষাগারের আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখতাম। আয় বহির্ভূত ব্যয় সংকট দেখা দিলে যথাসময়ে মহারাজকে অবগত করতাম। মহারাজ যথাযথ ব্যবস্থা নিতেন। পান্ডবগণ আমার উপর সমুদয় ভার অর্পণ করে নিশ্চিন্ত চিত্তে ধর্মানুষ্ঠানে নিরত থাকতেন, প্রজাহিতে ব্রতী থাকতেন, আর আমি, আমার আহার, নিদ্রা, বিশ্রামাদি সমস্ত সুখ বিসর্জন দিয়ে, দিন ও রাতকে সমান জ্ঞান করে ইন্দ্রপ্রস্থের মর্যাদা রক্ষা করার সব দায়দায়িত্ব পালন করতাম। এই বনবাসকালেও কোন কষ্টকে কষ্ট মনে না করে সতত স্বামী সেবায় নিরত থাকি। স্বামীদের সাক্ষাৎ প্রার্থীদের সেবা করি। স্বামীদের সৎ সংসর্গে উৎসাহ দিই এবং অসৎ জন দেখতে পেলে সাথে সাথে স্বামীদের সাবধান করে দিই। এইসবই হলো আমার বশীকরণের সামগ্রী।–তুমিও যদি কৃষ্ণের প্রতি অনুরূপ হৃদয়রঞ্জনী সেবার ডালি সাজাতে পার, দেখবে সখা কৃষ্ণও তোমার অনুবর্তিনী হবেন। দ্রৌপদীর বাক্যের প্রত্যুত্তরে সত্যভামা বলেন, তুমি একটু বলে দাও না সখী, আমি কেমন চলনে চললে কৃষ্ণ একান্ত আমার অনুবর্তিনী হবেন। দ্রৌপদী বলেন, সখা কৃষ্ণ বাইরে থেকে ঘরে ঢোকার পূর্বেই তুমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা করবে, নিজ হাতে সেবা করে শ্রান্তি দূর করার ব্যবস্থা করবে। কোন কাজে দাসীকে নিয়োগ করতে গেলে নিজ হাতে সেই কাজ সম্পাদন করবে। কৃষ্ণ তোমার কাছে যেসব কথা প্রকাশ করবেন তা গোপনীয় না হলেও কারো কাছে প্রকাশ করবে না। স্বামীর হিতকারী প্রণয়পাত্রদের অন্তরালে থেকে সমাদর করবে এবং অহিতাচারী দ্বেষ্যদের সঙ্গ ত্যাগ করাতে প্রযত্নবান হবে। প্রদ্যুম্ন ও শাম্ব তোমার ছেলে হলেও স্বামীর অসমক্ষে কখনো একত্রে বাস করবে না। সৎকুলজাত পুণ্যশীলা পতিব্রতা স্ত্রীদের সাথে সখ্যতা করবে, কুটিল, ঝগড়াটে, পেটুক, চোর, দুষ্ট ও চপল স্ত্রীদের সঙ্গ সতত পরিহার করবে। সতীন-বিদ্বেষী না হয়ে সদাসর্বদা সদাচার পরায়ণ থেকে স্বামীকে সেবা-শুশ্রূষা করার চেষ্টা করবে। এইভাবে স্বামীর মনোবৃত্ত্যানুসারিণী হয়ে উঠতে পারলে দেখবে ক্রমে ক্রমে তোমার স্বামীর কাছে তুমি অপরিহার্য্য হয়ে উঠবে। সার্থক হবে তোমার স্ত্রী-জীবন। * * * ওদিকে শ্রীকৃষ্ণ মার্কন্ডেয়াদি ঋষি, ব্রাহ্মণ ও পান্ডবদের সাথে প্রয়োজনীয় আলাপ-আলোচনা সেরে প্রত্যাগমনের অনুমতি চেয়ে সকলের কাছ থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। ফিরে যাবার জন্য সত্যভামাকে আহ্বান করলে, সত্যভামা বিবিধ সান্ত্বনাবাক্যে দ্রৌপদীকে আশ্বস্ত করে বিদায় সম্ভাষণ সেরে রথের দিকে এগিয়ে যান। শ্রীকৃষ্ণ সত্যভামাকে সাথে নিয়ে রথারুঢ় হন। শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ পেয়ে সারথী দারুক প্রগ্রহ হাতে নিয়ে তাঁর একান্ত অনুগত অশ্বদের চলার অনুমতি দিলে রথ ছুটে চলে দ্বারকাভিমুখে—পুরুষোত্তমের লীলা-আঙিনায়। ——– কলমে—তপন দাস
[ ১৫ মে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস। ১৯৯৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রসংঘ সাধারণ পরিষদের এক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৫ মে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস হিসেবে ঘোষিত হয়। রাষ্ট্রসংঘ ১৯৯৪ সালকে আন্তর্জাতিক পরিবার বর্ষ ঘোষণা করেছিল।
নৃবিজ্ঞানী ম্যালিনোস্কির মতে – “পরিবার হল একটি গোষ্ঠী বা সংগঠন আর বিবাহ হল সন্তান উৎপাদন ও পালনের একটি চুক্তি মাত্র”। সামনার ও কেলারের মতে- ‘পরিবার হল ক্ষুদ্র সামাজিক সংগঠন, যা কমপক্ষে দু’ পুরুষকাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে”- এ সংজ্ঞার প্রেক্ষিতে বোঝা যায়, বিবাহপ্রথার আগেও সমাজে পরিবারের সৃষ্টি হয়েছিল- কারণ এ সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়ার আগে থেকেই মানুষ দলবদ্ধ জীবনযাত্রা করত যা পারিবারিক জীবনযাপনের স্বাক্ষরবহ।
তবে বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন সংস্কৃতির পরিবারের ভূমিকা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে পরিলক্ষিত হয়। এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বৈচিত্র্যপূর্ণ নানামুখী ধারা যে কারণে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে এর গঠন ও অন্যান্য অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে এবং হচ্ছে।
শিল্প বিপ্লবের পরে পরিবারের ধরন ও ভূমিকা পাল্টাতে থাকে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে পিতৃতান্ত্রিক পারিবারিক ব্যবস্থা থেকে ক্রমশ ব্যক্তিকেন্দ্রিক গণতান্ত্রিক পরিবার বা যৌথ পরিবার ব্যবস্থা থেকে একক বা নিউক্লিয়ার পরিবার। সমাজবিজ্ঞানী ফলসমের মতে ‘একক’ পরিবারের অন্যতম তিনটি কারণ যেমন স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েরই প্রয়োজন ও চাহিদা সম্পর্কে সচেতনতা, অলাভজনক শিশুশ্রম এবং জন্ম নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার। এরই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর্থিক অনটন, ব্যক্তিত্বের সংঘাত এবং ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের উন্মেষ।
তবে পরিবারের মৌলিক কাজ অনেক। এক দিকে জৈবিক, অপর দিকে মনস্তাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষাদান ইত্যাদি। তবে সব চাইতে বড় দায়িত্ব শিশুর সামাজিকীকরণ এবং সংস্কৃতির সংরক্ষণ। যে শিশুটি ভবিষ্যতের নাগরিক, তার মনোজগত প্রস্তুত হয় পরিবারে। পরিবারের ধারা কেমন, কী ধরনের প্রথা-রীতিনীতি, এ সবের উপর ভিত্তি করে তার জীবনভঙ্গি গড়ে ওঠে। তাই শিশুর সুষ্ঠু পারিবারিক শিক্ষা শৈশব তথা শিশুর মন তথা সাদা কাগজের পাতায় যে ছাপ রাখে, তা ওর পরবর্তী জীবনে অসাধারণ ভূমিকা রাখে। তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় যেমন কিছু সংবিধান আছে তেমনি পারিবারিক সংবিধানও থাকা দরকার। যেমন পরিবারের সবার সঙ্গে সদ্ভাব গড়ে তোলা, সাংসারিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা, মিথ্যে না বলা, গুরুজনদের শ্রদ্ধা করা, নির্দিষ্ট সময়ে ঘরে ফেরা, নিজের কাজ নিজে সম্পন্ন করা, মিথ্যেকে ঘৃণা করা এবং মানবিক মূল্যবোধগুলোর চর্চার মাধ্যমে অন্তরকে বিকশিত করা।] (সূত্র: suprovat.com)
।। আদর্শ পরিবার গঠনে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্য অবদান ।।
পরিবারের একক ব্যক্তি। স্ত্রী আর পুরুষ দোঁহে মিলে এক হলে একটা আদর্শ ব্যক্তি নির্মাণ হয়। পুংবীজ আর ডিম্বকোষের দুটি অর্ধ-কোষের শুদ্ধ আকূতিতে জন্ম নেয় শুদ্ধাত্মার। ওই একটা কোষ, কোষ-বিভাজনের মাধ্যমে নানা বৈচিত্র্য এবং বৈশিষ্ট্যের কোষের উৎপাদন করে ক্রমে মাথা, বুক, পেট, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সমন্বয়ে পরিপূর্ণ একটা ব্যক্তিতে পরিণত হয়—গর্ভে। গর্ভবাস পরিপূর্ণ হলে কেহ জননীর জননদ্বার দিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়, আবার কাউকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বের করতে হয়। একজন পূর্ণ, সুস্থ ব্যক্তি নানা-বৈচিত্র্যর কোষ, কলার, অস্থি, মজ্জার সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়। ওই ব্যক্তি-নির্মাণ পদ্ধতি যত শুদ্ধ হবে, ততই এক-একটা শুদ্ধ পরিবার গঠিত হবে। ব্যক্তির আর্য্য নাম প্রজা। প্রজা মানে প্রকৃষ্ট জাতক। প্রকৃষ্ট জাতক নির্মাণ পদ্ধতির মাধ্যম প্রকৃষ্ট যৌনজীবন। উপযুক্ত সুস্থ বিবাহের মাধ্যমে, বিহিত গর্ভাধান সংস্কার দ্বারা ভালো ব্যক্তি নির্মাণ হয়। বর্তমান সভ্যতায় যে বিষয়টি রাষ্ট্রীয়ভাবে উপেক্ষিত। যেমন খুশি তেমন বিবাহের ছাড়পত্র দিয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্র। এবং ডিভোর্সের ছাড়পত্র দিয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্র। যারফলে আমাদের ঈপ্সিত ভালো পরিবারের খুব অভাব। মহানগরের বাড়বাড়ন্ত, মহান নাগরিকের অমিল! শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র এখান থেকে তাঁর সৎসঙ্গ আন্দোলন সুরু করতে চাইলেন। শাসন সংস্থা যেমনই হোক যা’তেই মাথা ঘামাও না যৌন ব্যাপার শুদ্ধ না হলে দেশের জীবন টিঁকবে না। ……….
বর্তমানের ইঁদুড়-দৌড় প্রতিযোগিতার ক্যারিয়ারে চাপা প্রবৃত্তি-পীড়িত মানুষদের মাইক্রো-ফ্যামিলির কনসেপ্ট-এর কাছে সনাতনী পরিবার জীবন আজ মৃতপ্রায়। রাষ্ট্র স্বীকৃত আইনে মনের রঙীন নেশায় বিয়ে করলাম। ভালো লাগলো না ডিভোর্স করলাম। আবার বিয়ে করলাম। এর ফলে ছেলেমেয়ে বাবা-মা থাকা সত্বেও অনাথ-প্রায়! উপযুক্ত ছেলে থাকতেও বাবা-মা’কে বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে হয়! এই করুণ চিত্রকে ক্যানভাসে রেখে কোন ‘আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস’-এর ছবি আমরা আঁকব? আর সেই ছবি আঁকতে না পারার জন্য ব্যক্তি জীবন, দাম্পত্য জীবন, গৃহ জীবন, সমাজ জীবনগুলো অবিন্যস্তভাবে বিচ্ছিন্ন। পিতামাতা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি নিয়ে একটা আচ্ছাদনের তলায় মিলেমিশে বাস করতে না পারা আমিটি যখন “বিচ্ছিন্নতাবাদ নিপাত যাক” শ্লোগানে চিৎকার করে গলা ফাটাই, তখন মনের আয়নায় যদি নিজের চরিত্রটাকে একবার দেখতে পেতাম, তাহলে না হয় সংশোধনী পথ পাওয়া যেত। আসলে আয়না মানে তো আদর্শ। উচ্চ আদর্শে অনুপ্রাণিত হলেই আত্ম নিয়ন্ত্রণ হয়, অর্থাৎ নিজের প্রবৃত্তির লাগামটা টেনে ধরে সত্তাপ্রেমী হওয়া যায়। ব্যক্তিত্ব নির্মাণ হয়। দাম্পত্য জীবন সুখের হয়। ছেলেমেয়ে ভালো জন্মে। এইভাবে আদর্শ গৃহ জীবনগুলো সূত্রাকারে সমাজ নামের মালার আকার ধারণ করে। যে সমাজের ধনী-দরিদ্র-ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল-হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খৃষ্টান প্রমুখ নামের ফুলগুলো নিজ-নিজ বৈশিষ্ট্য মেনে পরস্পর নির্ভরশীল সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র নির্মাণ করে পরমরাষ্ট্রিক সমবায়ের পরিবার গঠন করবে। প্রাচীন ভারতের আশ্রম ধর্মের সমাজ ব্যবস্থা তাই ছিল। (দ্রঃ বিষ্ণু পুরাণ)
সেই ছবি সার্থক রূপে এঁকে দেখালেন যুগত্রাতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। এক ছাদের আশ্রয়ে পিতৃব্য, মাতৃব্য, মাতা-পিতা, স্বামী-স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, পৌত্র-পৌত্রাদি, পড়শি, বৃহত্তর পারিপার্শ্বিক নিয়ে বৃহত্তর পরিবার জীবন আমাদের সনাতনী ভারতের আদর্শ ছিল। ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা পরিবেশের অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। উক্ত উপাদানসমূহকে সমৃদ্ধ রাখার জন্য আর্য্যদের বাস্তব পূর্ত্ত-কর্মের মাধ্যমে নিত্য পঞ্চ-মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করতে হতো সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধিকে অক্ষুণ্ণ রাখতে। শ্রীশ্রীঠাকুর উক্ত বিধানের নবীকরণ করলেন। ইষ্টভৃতি, পিতৃ-মাতৃভৃতি, পরিবেশভৃতি ইত্যাদির প্রবর্তন করে এক বৃহৎ পরিবারের সদস্য করে তুলতে চাইলেন তাঁর কৃষ্টি সন্তানদের। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুশ্রুতি গ্রন্থে ইষ্টভৃতির বিষয়ে বললেন : ‘‘দিন গুজরানী আয় থেকে কর ইষ্টভৃতি আহরণ, জলগ্রহণের পূর্ব্বেই তা’ করিস্ ইষ্টে নিবেদন ; নিত্য এমনি নিয়মিত যেমন পারিস ক’রেই যা’ মাসটি যবে শেষ হবে তুই ইষ্টস্থানে পাঠাস্ তা’ ; ইষ্টস্থানে পাঠিয়ে দিয়ে আরো দু’টি ভুজ্যি রাখিস্, গুরুভাই বা গুরুজনের দু’জনাকে সেইটি দিস্ ; পাড়া-পড়শীর সেবার কাজে রাখিস কিন্তু কিছু আরো, উপযুক্ত আপদগ্রস্তে দিতেই হ’বে যেটুকু পার ; এসবগুলির আচরণে ইষ্টভৃতি নিখুঁত হয়– এ না-ক’রে ইষ্টভৃতি জানিস্ কিন্তু পূর্ণ নয় ।’’ (ইষ্টভৃতি মানে, যেনতেনভাবে উপায় করা পয়সা রেখে মাসে মাসে কোন সংগঠনে পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় কিন্তু। উপরোক্ত বাণীতে যা স্পষ্ট করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর।)
শুধু ইষ্টভৃতির মাধ্যমেই নয়, সত্যানুসরণে ‘‘তুমি তোমার, নিজ পরিবারের, দেশের ও দশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দায়ী ।’’ বাণীতেও অনুরূপ দায়ভার দিয়েই রেখেছেন ব্যষ্টি ও সমষ্টি উন্নয়নের দিকে লক্ষ্য রেখে । শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর জন্মভিটা হিমাইতপুরে সকলকে নিয়ে আশ্রম নির্মাণ করে যে বিশ্ব পরিবার রচনা করার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা নিয়ে একদিন অনেক ইতিহাস রচিত হবে। অপরদিকে, ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতির থাবায় ১৯৪৭ এর ১৫ আগষ্ট দ্বিজাতি-তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে দেশবিভাগের ফলে বহু ছিন্নমূল সৎসঙ্গী পরিবারের দল দেওঘরে চলে আসেন । দেওঘরে ঠাকুর তখন নবাগত । নিজেই পরিবার পরিজনদের নিয়ে প্রভূত কষ্ট স্বীকার করে ভাড়া বাড়ীতে থাকেন । নিদারুণ অর্থকষ্টের মধ্যেও প্রশাসন বা সমাজসেবী সংস্থাদের কাছ থেকে সাহায্য না নিয়ে, কাউকে বিব্রত না করে, আত্মত্যাগী ইষ্টভ্রাতাদের সাহায্যে দুর্গতদের আশ্রয়দান ও ভরণপোষণ করে এক বৃহৎ সৎসঙ্গী পরিবার রচনা করে এক আন্তর্জাতিক পরিবার গঠনের মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৃষ্ট সৎসঙ্গ আন্দোলন বিশ্ব পরিবার সংগঠনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রূপে একসময় প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল হিমাইতপুরে। সুদূর আমেরিকার খ্রিস্টান সম্প্রদায়ভুক্ত শ্রদ্ধাভাজন স্পেনসারদা, হাউজারম্যানদা, ইসলাম সম্প্রদায়ের খলিলুর রহমান, ব্রাহ্মণ পরিবারের বিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য মহোদয়ের ন্যায় পণ্ডিত ব্যক্তি প্রমুখদের পাশাপাশি খুব সাধারণ মাপের অভাবে পরিশ্রান্ত মানুষদের পরিবার নিয়ে গড়ে তোলা পরিবারের নাম ছিল বৃহত্তর সৎসঙ্গীদের একটা পরিবার। দিনান্তে একবার আনন্দবাজারে আশ্রমমাতা জননী মনোমোহিনী দেবীর মাখা “দলা” প্রসাদ খেয়ে পরমানন্দে আশ্রম সংগঠনের ইষ্টের ঈপ্সিত কর্মে মত্ত থাকতেন—বিনা ওজরে, বিনা আপত্তিতে। ওই একবেলা খেয়েই নামধ্যান, কীর্তন, পঠন-পাঠন, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, সংস্কৃতি, বিজ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন থাকতেন। সকল পরিবার ছিল একে অপরের পরিপূরক পরিবার। সে এক স্বর্ণালি যুগ ছিল সৎসঙ্গের। প্রতিটি পরিবারের অভিভাবক ছিলেন মাতা মনোমোহিনী দেবী। সেই সৎসঙ্গ পরিবারের সদস্য আমরা। ব্যক্তি, দম্পতি, গৃহ, সমাজ, রাষ্ট্র জীবনকে অখণ্ড রেখে, প্রাচ্য-প্রতীচ্যকে বর্ণাশ্রমানুশাসনে নিয়ন্ত্রণ করে পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন আমাদের জীবন দেবতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। আমরা যদি ঠাকুরের আদর্শের পরিপালনে, ডিভোর্সকে, বৃদ্ধাশ্রমকে বিদায় জানিয়ে, পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি মিলেমিশে এক ছাদের নীচে জীবন যাপন করে এক-একটা আদর্শ পরিবারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি—সার্থক হবে “পরিবার দিবস” পালন। বিচ্ছিন্নতাবাদ নিপাত যাক! শ্লোগান সার্থক হবে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ঈপ্সিত সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র গঠন করে পরমরাষ্ট্রিক সমবায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ‘প্রাচ্য-প্রতীচ্য নিয়ন্ত্রণে বর্ণাশ্রমানুশাসকম্ আর্য্য চিরায়ণম্’ ফর্মূলার সাহায্যে। এজন্য যজন খুব প্রয়োজন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র নিদেশিত সাধন পথ অনুযায়ী ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে শৌচাদি সমাপন করে নামধ্যান, ইষ্টভৃতি, প্রার্থনা সেরে নিয়ে ছেলেমেয়েরা পিতামাতাসহ অন্যান্য গুরুজনদের প্রণাম করবে। স্ত্রী, স্বামীকে প্রণাম করবে, বড়রা ছোটদের স্নেহের অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে। গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রী সবাইকে শ্রদ্ধা ও প্রীতির বন্ধনে আগলে রাখবে। সবসময়, চলাফেরায়, কাজকর্মে, শয়নে-স্বপনে নামজপ করার অভ্যাস করতে হবে বুদ্ধি বিপর্যয় থেকে বাঁচতে। শ্রান্ত হলে শবাসন করা সারাদিনে কম করে তিন বার, ৫-৭ মিনিট—বিশেষ করে সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার গ্রহণ করার আগে। সন্ধ্যায় সায়ন্তনী মাধ্যমে পরমপিতার কাছে সারাদিনের কার্য বিবরণী নিবেদন করে সান্ধ্য প্রার্থনা, নাম ধ্যান, পঠন-পাঠন মাধ্যমে খাওয়া-দাওয়া, উপার্জন, বিবাহাদি বিষয়ে ঠিকঠাক জেনে নেওয়া। শারিরীক স্বাচ্ছন্দ্য অটুট রাখতে হাতে তালি দিয়ে কীর্তন করা। সমস্যা সমাধানের জন্য পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শ অনুযায়ী, এইটুকু পরিবারের সকলের মধ্যে সঞ্চারিত করা প্রয়োজন। সুস্থ থাকার জন্য, সবাইকে সুস্থ রাখার জন্য, পরিবারকে একসূত্রে বেঁধে রাখার জন্য। তারপর যাজন মাধ্যমে পরিবেশে ওইসব জীবনীয় বিধি পরিবেশন করার অভ্যাস যজনে সাহায্য করে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র নিত্য প্রার্থনা মন্ত্রের অঙ্গীভূত ‘সপ্তার্চ্চি’র অনুশাসনের “সদাচারা বর্ণাশ্রমানুগ জীবন বর্দ্ধনা নিত্যং পালনীয়া”র বাস্তবায়ন করতে—- “যজন, যাজন, ইষ্টভৃতি, স্বস্ত্যয়ণী ও সদাচার” নামের পঞ্চশীলকে প্রবর্তন করেছেন। ওই অনুশাসনের মাধ্যমে শুধু পরিবার নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা করে এক পরমরাষ্ট্রিক সমবায় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। যুগধর্মের মাইক্রো-ফ্যামিলি কনসেপ্টকে পরিহার করে আমাদেরকে ম্যাক্রো-ফ্যামিলির সদস্য হয়ে উঠতে হবে। তাঁর ঈপ্সিত পরিকল্পনার “পরমরাষ্ট্রিক সমবায়”-কে সম্মান জানাতে। জয়গুরু!
।। পরমপুরুষ শ্রীবুদ্ধদেবের শুভ আবির্ভাব, বোধি লাভ ও তিরোভাব তিথি স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।
[আজ বুদ্ধ পূর্ণিমা। বুদ্ধ পূর্ণিমা বুদ্ধ জয়ন্তী নামেও পরিচিত। বিশ্বজুড়ে এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করা হয়। এই তিথিতে বুদ্ধদেবের আবির্ভাব হয়েছিল বলে ইতিহাসে জানা যায়। বৈদিক সাহিত্য মতে ভগবান বুদ্ধ বিষ্ণুর আরেকটি অবতারও। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর রচিত পুরুষোত্তম বন্দনা মন্ত্রে পূর্বাপর অবতার-বরিষ্ঠদের স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করতে শিখিয়েছেন। বৈদিক সাহিত্য মতে পৃথিবী থেকে হিংসা ও সহিষ্ণুতা চিরতরে মুছে দেওয়ার জন্যই বুদ্ধদেবের আবির্ভাব হয়েছিল। বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিটকে সেই কথা পরিষ্কার ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।]
পণ্ডিতদের মতে বুদ্ধদেব ভগবান বিষ্ণুর নবম অবতার। কপিলাবস্তুর লুম্বিনী উদ্যানে বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে (৫৬৩/৫৬৬ খৃষ্ট পূর্বে) আবির্ভাব। বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে বোধি লাভ। এবং ৮০ বছর বয়সে বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে মল্লদেশে শালবনে তিরোভাব। বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে আবির্ভাব, বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে বোধি লাভ এবং বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে তিরোভাব হওয়ার সুবাদে বুদ্ধদেবের নামের সাথে বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিটি স্মরণীয় হয়ে আছে এবং থাকবে। রাজার ঘরে জন্ম। রাজৈশ্বর্য্যের কোন আকর্ষণই তাঁকে ক্ষুদ্র সংসার মায়ায় আবদ্ধ করতে পারল না। রোগ-শোক-ব্যাধি-জরায় জর্জরিত হয়ে দেহত্যাগ না করে দেহাতীত আত্মার স্বরূপ সন্ধানে অনুচর ছন্দক ও অশ্ব কণ্ঠককে সাথে নিয়ে হলেন গৃহহারা। ২৯ বছর বয়সে। প্রথমে বৈশালীতে আসেন। অনেক সম্প্রদায়ের সাথে পরিচিত হন। তারপর শ্রাবস্তি। শ্রাবস্তি থেকে রাজগৃহ। পরে গয়ার কাছে কৌণ্ডিণ্য, অশ্বজিৎ, বপ্র, ভদ্রিয় ও মহানাম প্রমুখ সন্ন্যাসীদের সাথে মিলে তপস্য করতে থাকেন। তপস্যার পদ্ধতির সাথে মানিয়ে নিতে না পেরে ওই ৫ জন সন্ন্যাসী সিদ্ধার্থকে ত্যাগ করে চলে যান। ৬ বছর তপস্যা করার পর সুজাতা নামের এক শ্রেষ্ঠিকন্যা (মতান্তরে গোপনারী) পরমান্ন নিবেদন করেন। বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে পরমান্ন খেয়ে নৈরঞ্জনা নদীর তীরে, ঊরুবিল্ব নামক স্থানে এক অশ্বত্থ তলে তৃণাসনে বসে প্রতিজ্ঞা করেন, বোধি লাভ না করা পর্যন্ত আসন ত্যাগ করবেন না। ওই রাতেই সিদ্ধার্থ বোধি লাভ করে বুদ্ধদেব হন। ৩৫ বছর বয়সে। বোধি লাভের পর সারনাথ বা ঋষিপত্তনে এসে কৌণ্ডিণ্যাদি পূর্বের সঙ্গী তপস্বীদের সাথে দেখা করেন এবং উপদেশ দেন। এঁরাই ছিলেন প্রথম বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। বুদ্ধদেবের প্রথম গৃহশিষ্যের নাম শ্রেষ্ঠীপুত্র যশ। পরে যশের চার জন বন্ধু এবং আরো ৫০ জন মিলে প্রথম বৌদ্ধ সঙ্ঘ স্থাপন করেন। পরলোক, আত্মা ও ঈশ্বর সম্বন্ধে বুদ্ধদেব প্রত্যক্ষভাবে কোন উপদেশ দিয়ে যান নি। তিনি দিলেন চারটি আর্যসত্য।–– ১.দুঃখ, ২. দুঃখের উৎপত্তি, ৩. দুঃখ নিরোধ ও ৪. দুঃখ নিরোধগামী মার্গ। এই চার আর্য সত্যের উপর ভগবান বুদ্ধের সামগ্রিক ধর্ম-ভাবনা প্রতিষ্ঠিত। দুঃখ নিরোধগামী মার্গকেই অষ্টাঙ্গিক মার্গ বলা হয়েছে।–– ১. সম্যক দৃষ্টি (দৃষ্টি শুদ্ধতা)। ২. সম্যক সংকল্প—কাম, হিংসা, প্রতিহিংসা পরায়নতা ত্যাগ করে মৈত্রী ও করুণার সংকল্প। ৩. সম্যক বাক্য—মিথ্যা ও কটুবাক্য পরিহার করে সত্য, প্রিয়, মিষ্ট ও অর্থপূর্ণ বাক-বিনিময় করা। ৪. সম্যক কর্ম—প্রাণী হত্যা, চুরি, ব্যাভিচার ও মাদক দ্রব্য ত্যাগ করে, দয়া, বদান্যতা ও চরিত্র সৎ রাখার কর্ম। ৫. সম্যক জীবিকা—অসৎ জীবিকা ত্যাগ করে সৎ জীবিকার আশ্রয় গ্রহণ। ৬. সম্যক উদ্যম—ইন্দ্রিয় সংযম, কুচিন্তা ত্যাগ, সুচিন্তার আশ্রয়, সৎ চেষ্টার বৃদ্ধি। ৭. সম্যক স্মৃতি–কায়, বেদনা, চিত্ত ও মানসিক ভাবের অমলিন স্মৃতি। সম্যক সমাধি—প্রবৃত্তির দুষ্ট চিন্তা ত্যাগ করে সাত্তিক সাধনায় আত্ম-সমাহিত হওয়া।
বুদ্ধদেবের মতবাদ শ্রীকৃষ্ণের আদর্শের পরিপূরক হওয়া সত্বেও বুদ্ধ অনুগামীরা আর্য্যকৃষ্টির আশ্রমধর্মকে মান্যতা না দিয়ে সন্ন্যাস মাধ্যমে মোক্ষ লাভ করতে গিয়ে বর্ণাশ্রমানুগ বিন্যস্ত সমাজ ব্যবস্থার ক্ষতি হয়। হীনযান, মহাযান, তন্ত্র প্রভৃতি উপ-বিভাগের মতানৈক্যের ফলে সনাতনী আর্য্যকৃষ্টির প্রবহমানতার গতি রুদ্ধ হয়। বিবাহের উপযুক্ত শ্রেয় ঘরের, তুল্য বংশের পাত্রের অভাবে প্রতিলোম বিবাহ হতে থাকে।
বৌদ্ধধর্ম্ম প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন,—‘‘বৌদ্ধমত ও হিন্দুমতে পার্থক্য খুব কম । একই কথা রকমারি করে বলা । শুনেছি বুদ্ধদেবের কথার মধ্যে প্রকারন্তরে বর্ণাশ্রমের সমর্থন আছে । …… তিনি গৃহীদের বিয়ে-থাওয়া, চাল-চলন-সম্বন্ধে যে-সব নির্দ্দেশ দিয়েছেন, তার সঙ্গে বর্ণাশ্রমের কোন বিরোধ নেই । অশোক বৌদ্ধধর্মের যে রূপ দিলেন, তার মধ্যে বর্ণাশ্রম খুঁজে পাওয়া যায় না । বর্ণাশ্রম হ’লো একটা scientific social structure (বৈজ্ঞানিক সমাজ বিধান) । এই structure (কাঠামো) ভেঙ্গে দিলে মানুষের অন্তরে-বাহিরে একটা chaotic condition-এর (বিশৃঙ্খল অবস্থার) সৃষ্টি হয় ।’’ (আ. প্র. ৬ খণ্ড, ২৩. ১২. ১৯৪৫) ‘‘অশোকের হাতে পড়ে বৌদ্ধধর্ম্মের কিছু কিছু বিকৃতি দেখা দিল। বৌদ্ধদের সংখ্যা বাড়ল বটে, কিন্তু বর্ণাশ্রমের বাঁধন রইল না। তারপর এল শঙ্করাচার্য্যের মায়াবাদ---‘ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা’। মানুষ ভুলে গেল যে আধ্যাত্মিকতা সার্থক হয় সাত্বত বস্তুতান্ত্রিকতায়। বুদ্ধদেব ও শঙ্করাচার্য্য এই দুইজনের সময় থেকেই অসৎ নিরোধের উপর গুরুত্ব দেওয়া হল না। ‘সোহহং’ চর্চ্চার ফলে ব্যক্তিগত সাধনার উপরই জোর দেওয়া হল। একটা সর্ব্বাঙ্গীন ভাবধারা কোথাও রইল না। একটা মূল সূত্রের উপর দাঁড়িয়ে বৈশিষ্ট্যপালী রকমে সমাজ, রাষ্ট্র সব নিয়ে একটা সর্ব্বসঙ্গতিসম্পন্ন ধারা ফুটে উঠল না। এই সবের ফলে এসেছিল নির্ব্বীর্য্যতা। তোমরা যদি এই সর্ব্বতোমুখী কার্য্যক্রম নিয়ে তেমনভাবে তৈরী হও, তাহলে সব সম্প্রদায়ের সঙ্গে সঙ্গতি নিয়ে আবার তোমরা অসৎনিরোধী পরাক্রম-প্রবুদ্ধ হয়ে বৈশিষ্ট্যপালী আপূরয়মাণ আদর্শের উপর দাঁড়িয়ে জগতে অজেয় হতে পারবে।’’ (আ. প্র. ২১ খণ্ড, ১১. ০৫. ১৯৫২)
আজকের এই পুণ্য তিথিতে পরমপিতার উদ্দেশ্যে নিবেদন, শুদ্ধ বোধি দিয়ে আমরা যেন সব ধরনের বোধ-বিপর্যয় থেকে নিজেদের রক্ষা করে স্মৃতিবাহী চেতনায় সমৃদ্ধ হতে পারি। জয়গুরু।
।। প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্য অবদান ।।
[ ধরিত্রী দিবস (বা বিশ্ব বসুন্ধরা দিবস) হলো পরিবেশ রক্ষার জন্য সমর্থন প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে প্রতি বছর ২২শে এপ্রিল পালিত একটি অনুষ্ঠান। ধরিত্রী শব্দটি এসেছে ধরণী বা ধরা থেকে, যার অর্থ হলো পৃথিবী। পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য সর্বসম্মতিক্রমে ধার্য করা একটি দিবসই হলো ধরিত্রী দিবস। সর্বপ্রথম ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে দিবসটি পালিত হয়, এবং বর্তমানে আর্থ ডে নেটওয়ার্ক কর্তৃক বিশ্বব্যাপী সমন্বিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়, এবং ১৯৩ সংখ্যারও অধিক দেশে প্রতি বছর পালন করা হয়ে থাকে।
ধরিত্রী দিবস জন ম্যাককনেলের তৈরি অনানুষ্ঠানিক ধরিত্রী পতাকায় অ্যাপোলো ১৭-এর ক্রুদের তোলা ব্লু মার্বেল ছবিটি ব্যবহার করা হয়েছে তাৎপর্য পরিবেশ সুরক্ষায় সমর্থন শুরু ১৯৭০ তারিখ ২২ এপ্রিল সংঘটন বার্ষিক ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে মার্কিন সেনেটর গেলর্ড নেলসন ধরিত্রী দিবসের প্রচলন করেন। পৃথিবীর অনেক দেশেই সরকারিভাবে এই দিবস পালন করা হয়। উত্তর গোলার্ধের দেশগুলিতে বসন্তকালে আর দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলিতে শরতে ধরিত্রী দিবস পালিত হয়। এই দিবস ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয় এবং ১৪১ সংখ্যক জাতি দ্বারা আয়োজন করা হয়েছিল।একই ধরনের আরেকটি উৎসব হল বিশ্ব পরিবেশ দিবস। জাতিসংঘের উদ্যোগে ৫ জুন এটি বিশ্বের প্রায় সব দেশেই পালিত হয়।
২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের ধরিত্রী দিবসে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং অন্যান্য ১২০টি দেশ একটি দিকনির্দেশ প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। এই চুক্তি স্বাক্ষরের ফলস্বরূপ ঐতিহাসিক খসড়া আবহাওয়া রক্ষা চুক্তির একটা আসল প্রয়োজনীয় সক্রিয়তার মধ্যে প্রবেশ করতে স্বস্তি এসেছিল, যে সিদ্ধান্ত প্যারিসে ২০১৫ জাতি সংঘ আবহাওয়া পরিবর্তন সম্মেলন-এ উপস্থিত ১৯৫টা দেশের সম্মতিতে নেওয়া হয়েছিল।
১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে সানফ্রান্সিস্কোতে ইউনেস্কো সম্মেলনে শান্তি কর্মী জন ম্যাককনেল পৃথিবী মায়ের সম্মানে একটা দিন উৎসর্গ করতে প্রস্তাব করেন এবং শান্তির ধারণা থেকে, উত্তর গোলার্ধে বসন্তের প্রথম দিন হিসেবে ২১ মার্চ, ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম এই দিনটা উদযাপিত হয়। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এই দিনই পরে একটা পরিঘোষণায় অনুমোদিত হয়, যেটা লিখেছিলেন ম্যাককনেল এবং মহাসচিব উ থান্ট জাতি সংঘ সনদে স্বাক্ষর করেছিলেন। এক মাস পর একটা পরিবেশগত শিক্ষামূলক দিন হিসেবে একটা আলাদা ধরিত্রী দিবসের অবতারণা করেন যুক্তরাষ্ট্র সেনেটর গেলর্ড নেলসন, যেটা প্রথম সংঘটিত হয় ২২ এপ্রিল, ১৯৭০। এই নেলসন পরবর্তীকালে তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে প্রেসিডেন্সিয়াল মেডাল অফ ফ্রিডম পুরস্কারে পুরস্কৃত হন। যখন এই ২২ এপ্রিল ধরিত্রী দিবস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত, তখন ডেনিস হায়েস একটা সংগঠন চালু করেন, যিনি ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে আসল জাতীয় সমন্বয়সাধক ছিলেন; যেটা ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে আন্তর্জাতিক রূপ পেয়েছিল এবং ১৪১টা দেশে সংগঠিত ঘটনা হিসেবে দেখা দিয়েছিল।
এক বিরাট সংখ্যক সামাজিক গোষ্ঠী ধরিত্রী সপ্তাহ উদ্যাপন করে, বিশ্ব আজ যেসব পরিবেশগত বিষয়াদির সম্মুখীন হয় সেগুলো নিয়ে সারা সপ্তাহ জুড়ে নানা কার্যাবলি চলে। ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে ধরিত্রী দিবস সংঘটিত হয়েছিল বিজ্ঞানের জন্যে পদযাত্রা (২২ এপ্রিল, ২০১৭) এবং এর অনুসরণে মানুষের আবহাওয়া সরলীকরণ হয়েছিল (২৯ এপ্রিল, ২০১৭)। (সূত্র : উইকিপিডিয়া)
* * *
উফ্ কি গরম! বলে হা-হুতাশ করে লাভ নেই, অহঙ্কারের দেমাকে বেঁচে থাকার আশ্রয় পঞ্চ-মহাভুতকে যে-হারে অত্যাচার করে চলেছি, তার ফল তো ভুগতে হবেই।
“সবাই তো সুখী হতে চায়, তবু কেউ সুখী হয় কেউ হয় না ।” ‘সুখ’ নামের ‘সুখ’-পাখিটাকে পোষ মানানো বেশ মুশকিল! আমরা তো জীবকোটির সাধারন মানুষ, দ্রোণ, কৃপ, ধৌম্য নামের তিন-তিন জন আচার্যের শিষ্য হওয়া সত্বেও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রাক্কালে অর্জুনের ন্যায় বীরের কাছ থেকেও ওই সুখ পাখিটা একটু হলেই উড়ে পালাচ্ছিল । ধরার মন্ত্র শিখিয়েছিলেন প্রকৃত আচার্য শ্রীকৃষ্ণ । नास्ति बुद्धिरयुक्तस्य न चायुक्तस्य भावना। न चाभावयतः शान्तिरशान्तस्य कुतः सुखम्।। 2.66।। “নাস্তি বুদ্ধিরযুক্তস্য ন চাযুক্তস্য ভাবনা । ন চাভাবয়তঃ শান্তিরশান্তস্য কুতঃ সুখম্ ॥” ২/৬৬॥ (অর্থাত্, পরমাত্মার প্রতিভূ সদগুরু বা ইষ্টের সাথে যোগযুক্ত না থাকলে মঙ্গল ভাবনা ভাবতে পারে না । ফলে শান্ত হতে পারে না । অশান্ত লোক সুখী হতে পারে না ।) শ্লোকের মাধ্যমে । তাই, এযুগের শ্রীকৃষ্ণ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রও আমাদের সকল প্রকার অনিষ্টের হাত থেকে বাঁচাতে বললেন, “ইষ্টিচলন থাকে যদি তোর রুখবে না তোয় দুর্গতি, দুর্গতি সব দুর্গ হয়ে আনবে জয়ে উন্নতি ।” আর এর বিপরীতের “সদগুরুই ভগবানের সাকার মূর্ত্তি, আর তিনিই অখণ্ড ।” আপ্তবাণী ভুলে যদি খেয়ালমাফিক বহুনৈষ্ঠিকতার চলনে চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি তাহলে দুর্ভোগের আর শেষ থাকবে না ! “ইষ্টের চেয়ে থাকলে আপন ছিন্নভিন্ন তার জীবন।” সুখী হতে হলে পরমপিতার বিধি : সপ্তার্চ্চির ষষ্ঠতম স্তবক— “সদাচারা বর্ণাশ্রমানুগজীবনবর্দ্ধনা নিত্যং পালনীয়া।……” (জীবনকে বর্দ্ধনার পথে চালনা করতে হলে প্রতিনিয়ত শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক সদাচার বিধি মানতে হবে। বর্ণাশ্রমের বিধি মেনে উপার্জন করে আহার, নিদ্রা, অপত্যোৎপাদনাদি জৈবিক চাহিদা পূরণ করে জীবন যাপন করতে হবে।) “নান্যপন্থাঃ বিদ্যতে হয়নায়।” এছাড়া কোন বিকল্প পথ নেই সুখী হবার জন্য!
“ধর্ম যখনই বিপাকী বাহনে ব্যর্থ অর্থে ধায়, প্রেরিত তখন আবির্ভূত হন পাপী পরিত্রাণ পায় ।” শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের উপরোক্ত বাণীর সাথে শ্রীকৃষ্ণ প্রদত্ত “যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লাণির্ভবতি ভারতঃ। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মনম্ সৃজাম্যহম্ পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম্। ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে॥” প্রায় সমার্থক বাণীটির যুগোপযোগী সংস্করণ করেছেন বর্তমান পুরুষোত্তম। শ্রীকৃষ্ণ যুগ সংস্কারের প্রয়োজনে দুষ্কৃতি বা পাপীদের বিনাশের কথা বলেছেন আর ঠাকুর পাপীদের পরিত্রাণের কথা বলেছেন। এইটুকুই পার্থক্য। ব্যষ্টি জীবন এবং সমষ্টি জীবনের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে কর্ম করে যাওয়ার নামই ধর্ম পালন করা। অন্যের বাঁচা এবং বৃদ্ধি পাওয়াকে অব্যাহত রেখে মানুষ বাঁচার জন্য, আনন্দের জন্য যা’ যা’ করে, তাই ধর্ম। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কোন ভারী তাত্ত্বিক কথা না বলে প্রাঞ্জল ভাষায় বাণী দিয়ে বললেনঃ ‘‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে ধর্ম বলে জানিস তা’কে।’’
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র চৈতন্যদেবের আবির্ভাব প্রসঙ্গে ভাবাবস্থায় বললেন, ‘‘বুদ্ধ ‘লয়’ শিক্ষা দিয়ে গিয়েছিল। শঙ্করাচার্য্য পরিষ্কার ক’রে দিয়েছিল। বুদ্ধের উত্তর শঙ্করাচার্য্যের কাছে, জ্ঞানী ছাড়া বুঝত না কিনা? তাই চৈতন্যের আবির্ভাব। ধর্ম্ম নিয়ে হিংসা হয়েছিল কিনা, তাই একত্ব দেখাতে এসেছিলেন রামকৃষ্ণ। থাক্ ধর্ম্ম-কর্ম্ম, আমার আমিত্ব পেলেই বাঁচি এখন।’’ (ভাববাণী, ষষ্ঠ দিবস)
কিছু গবেষকদের মতে শ্রীচৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষ উৎকল প্রদেশের জাজপুরের আদি বাসিন্দা ছিলেন। (বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতে আসাম প্রদেশ।) তাঁর পিতামহ মধুকর মিশ্র বাংলাদেশের শ্রীহট্টে এসে বসতি স্থাপন করেন। শ্রীহট্টে জন্মগ্রহণ করেন জগন্নাথ মিশ্র। পণ্ডিত নীলাম্বর চক্রবর্তীর কন্যা শচীদেবীর সাথে বিবাহ হয়। শচীদেবীর গর্ভে পর পর সাতটি কন্যা হয়। কেহই জীবিত ছিলেন না। তারপর জন্মগ্রহণ করেন প্রথম পুত্র বিশ্বরূপ। বিশ্বরূপের যখন আট বছর বয়স তারপর শচীমাতা অন্তর্বতী হন। দ্বাদশ মাস গর্ভকাল অতিবাহিত করে ১৪০৭ শকাব্দ, (১৮-২-১৪৮৬) ২৩ ফাল্গুন, দোলপূর্ণিমা চন্দ্রগ্রহণের রাতে নিমবৃক্ষের নীচে ভূমিষ্ঠ হন শচীদেবীর দ্বিতীয় পুত্র নদীয়া জেলার নবদ্বীপে। নিম গাছের তলায় ভূমিষ্ঠ হবার কারণে মা নামকরণ করেছিলেন নিমাই, কোষ্ঠী বিচারের নাম বিশ্বম্ভর। চৌদ্দশত সাত শকে মাস যে ফাল্গুন পৌর্ণ মাসী সন্ধ্যাকালে হৈল শুভক্ষণ। সিংহ রাশি, সিংহ লগ্ন উচ্চ প্রহসন ষড়বর্গ অষ্টবর্গ সর্ব্ব শুভক্ষণ।।
তৎকালিন ভারতবর্ষের শিক্ষা-সংস্কৃতির এক অন্যতম পীঠস্থান ছিল বাংলার নদীয়া জেলার নবদ্বীপ। মহাপ্রভুর পিতৃদেব শ্রীহট্ট থেকে নবদ্বীপে এসেছিলেন অধ্যয়ন ও শাস্ত্রচর্চার জন্য। সে কারণেই মায়াপুরে আর একটি নতুন বসতি স্থাপন করতে হয়েছিল। শচীদেবীর স্বাভাবিক গর্ভকালের সময় উত্তীর্ণ হলে শ্বশুর মশাই জ্যোতিষাচার্য পণ্ডিত নীলাম্বর চক্রবর্তীর আদেশক্রমে স্ত্রী-পুত্রকে শ্রীহট্ট থেকে নবদ্বীপের বাড়িতে নিয়ে আসেন জগন্নাথ মিশ্র। সেখানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন বিশ্বম্ভর। তবে গার্হস্থ্যাশ্রমে নিমাই নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন। তাই রচনার প্রয়োজনে অবতারবরিষ্ঠ চৈতন্য মহাপ্রভুকে কখনো নিমাই, কখনোবা নিমাই পণ্ডিত নামে উল্লেখ করতে হয়েছে। সেজন্য প্রথমেই পাঠকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে রাখলাম। শচীমাতার দুলাল নিমাই বাল্যকাল থেকেই দুরন্ত ছিলেন। তাঁর দুরন্তপনার নালিশ শুনতে শুনতে অস্থির হয়ে পড়েছিলেন তাঁর পিতামাতা। দাদা বিশ্বরূপকেই যা একটু সমীহ করে চলতেন। দুরন্তপনায় রাশ টানতে পিতৃদেব ১৪৯১ খ্রীষ্টাব্দে আচার্য্য গঙ্গাদাস পণ্ডিতের মাধ্যমে উপনয়ন সংস্কারে সংস্কৃত করান। সাবিত্রীমন্ত্রে দীক্ষিত করাবার পর আচার্য্য নিমাইকে গৌরহরি নামকরণ করেন। সংস্কৃত শিক্ষার জন্য গঙ্গাদাস পণ্ডিতের টোলে ভর্তি করে দেন পিতা। সেখানে ব্যাকরণ, কাব্য, অলঙ্কারশাস্ত্র, তর্কশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। তাঁর মধ্যে অসাধারণ পাণ্ডিত্যের প্রকাশ পায়। ১৪৯২ খ্রীষ্টাব্দে দাদা বিশ্বরূপ সন্ন্যাস নিয়ে গৃহত্যাগী হন। দাদার বিরহ-ব্যথায় শান্ত হন নিমাই। দাদা বিশ্বরূপ নিত্য গৃহদেবতা বিষ্ণুর পূজা করতেন। দাদার অবর্তমানে নিজে থেকে সেই পূজার ভার গ্রহণ করেন নিমাই। ১৪৯৭ খ্রীষ্টাব্দে পিতা জগন্নাথদেব সবাইকে শোকসাগরে ভাসিয়ে বিষ্ণুর পরমপদে আশ্রয় নেন। পিতার দেহান্তর হবার পর জাগতিক সংসারের সব দায়িত্ব তাঁর ওপর এসে পড়ে। নিমাই লোকপালী উপার্জনে মন দেন। মুকুন্দ-সঞ্জয়ের চণ্ডীমণ্ডপে টোল খুলে ছাত্র পড়াতে শুরু করেন। শিষ্যদের এবং বিদ্যানুরাগীদের কাছে নিমাই পণ্ডিত নামে খ্যাত হন। ভারতখ্যাত কেশবাচার্য নিমাই পণ্ডিতের কাছে পরাজয় স্বীকার করলে ভারতের পণ্ডিত সমাজে শ্রেষ্ঠ স্থান লাভ করেন নিমাই পণ্ডিত। মাতা শচীদেবীর আদেশে ১৫০২ খ্রীষ্টাব্দে বল্লভ আচার্যের কন্যা লক্ষীপ্রিয়া সাথে উদ্বাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হন। (চৈঃ চঃ অনুসারে কৈশার লীলায় প্রথমে উদ্বাহ বর্ণিত হয়েছে।) উদ্বাহের পর ১৫০৬ খ্রীষ্টাব্দে স্ত্রীকে নিয়ে পূর্ববঙ্গের শ্রীহট্টের বাড়িতে যান। সেখানে সর্প দংশনে (মতান্তরে বিরহ-সর্প দংশন) মৃত্যু হয় লক্ষীপ্রিয়ার। এই ঘটনায় নিমাই মর্মাহত হন। শচীদেবী পুণরায় নিমাইয়ের বিবাহ দিতে চাইলে, নিমাই কিছুতেই পুণর্বার দার পরিগ্রহ করতে চান নি। মায়ের পীড়াপিড়িতে সনাতন পণ্ডিতের কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়ার সাথে বিবাহ হয় ১৫০৭ খ্রীষ্টাব্দে। ১৫০৮ খ্রীষ্টাব্দে পিতৃদেবের পিণ্ডদান করতে গয়াতে যান। পরিচিত হন ঈশ্বরপুরীর সাথে। ১০ অক্ষর গোপাল মন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ করেন নিমাই। নবদ্বীপে ফিরে বৈষ্ণব আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র নাম প্রচার মাধ্যমে। ১৫১০ খ্রীষ্টাব্দের ১০ই জানুয়ারী কাটোয়ার কেশব ভারতীর কাছে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। গুরু তাঁকে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নামে অভিহিত করেন। সন্ন্যাস গ্রহণের পর থেকে তিনি লোক-সংগ্রহ উদ্দেশ্যে প্রায় পাঁচ বছর দক্ষিণ-ভারত, পশ্চিম-ভারত ও মথুরা-বৃন্দাবন পরিভ্রমন করেন। ১৫১৫-১৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দ, এই আঠারটি বছর পুরীর রাজা প্রতাপ রুদ্রের রাজগুরু কাশী মিশ্রের বাড়ী গম্ভীরায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে কৃষ্ণনাম প্রচার করেন। ১৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দে পুরীতে ইহলীলা সম্বরণ করেন। চৈতন্যদেব তাঁর অনুগামীদের জন্য নিজের হাতে সংস্কৃতে লেখা ‘শিক্ষাষ্টক’ নামে আটটি শ্লোকে উপদেশামৃত রেখে গেছেন, সব শ্লোকেই কৃষ্ণের প্রতি শুদ্ধাভক্তির কথা রয়েছে। রাধা-নামের কোন উল্লেখ পর্যন্ত নেই। ‘শিক্ষাষ্টক’ শ্লোকের মধ্যে তৃতীয়তম শ্লোকটি ভক্তজন কণ্ঠে বহুল উচ্চারিত। যথাঃ তৃণাদপি সুনীচেন তরোরিব সহিষ্ণুনা। অমানিনা মানদেন কীর্তনীয়ঃ সদা হরিঃ॥ যার ভাবার্থ—তৃণকে মাড়িয়ে গেলে তৃণ যেমন প্রতিবাদ করে না, গাছ কাটলে গাছ যেমন প্রতিবাদ করে না, তুমি তাদের চাইতেও সহিষ্ণু হবে। সমাজে যারা অবহেলিত তাদেরও তুমি মান দিয়ে সদা হরির গুণকীর্তন করবে। তাহলে সারমর্ম হলো, তুমি তোমার নিজের জীবনের ক্ষুদ্র মান-অপমান, চাওয়া-পাওয়া সবকিছু উপেক্ষা করে সবাইকে হরি অর্থাৎ কৃষ্ণের প্রদত্ত আদর্শের গুণকীর্তন করবে। * * * চৈতন্যদেবের স্নেহধন্য মুরারী গুপ্ত সংস্কৃত ভাষায় যে লীলা কাহিনী রচনা করেছিলেন সেই গ্রন্থ ‘মুরারী গুপ্তের করচা’ নামে সুপ্রসিদ্ধ। মহাপ্রভুর বিশেষ স্নেহভাজন, যাঁকে তিনি ‘কবিকর্ণপুর’ আখ্যা দিয়েছিলেন তাঁর নাম ছিল পরমানন্দ। তিনি সংস্কৃত ভাষায় ‘চৈতন্যচরিতামৃতম্’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। চৈতন্যদেবের লীলাবসান পরবর্তীকালে তথ্য সংগ্রহভিত্তিক বাংলা ভাষায় ‘চৈতন্যভাগবত’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন বৃন্দাবন দাস। সমসাময়িক কালে কবি লোচন দাস ‘চৈতন্যমঙ্গল’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন। পরবর্তীকালে কবি জয়ানন্দও ‘চৈতন্যমঙ্গল’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন। ওইসব জীবনীগ্রন্থ থেকে বৃন্দাবনের গোস্বামীগণ নাকি পরিপূর্ণরূপে চৈতন্যদেবকে আস্বাদন করতে পারেন নি, তাই রূপ গোস্বামীর শিষ্য বর্ধমান জেলার ঝামটপুরের বিখ্যাত বৈদ্য, অকৃতদার কৃষ্ণদাস কবিরাজকে নতুন করে এক জীবনীগ্রন্থ রচনা করতে উদ্বুদ্ধ করলে তিনি পূর্ববর্তী জীবনীকারদের গ্রন্থ এবং অন্যান্য সংস্কৃত গ্রন্থের সাহায্য নিয়ে নয় বছর ধরে ‘শ্রীশ্রীচৈতন্য চরিতামৃত’ শিরোনামে গ্রন্থটি রচনা করেন। যে গ্রন্থটি বৈষ্ণব মহলে প্রামাণ্য রূপে স্বীকৃত হলেও সবক্ষেত্রে ঘটনাপঞ্জীর সন-তারিখ উল্লেখিত হয়নি। গবেষকগণও সকল ঘটনাপঞ্জীর সন-তারিখ নিয়ে একমত হতে পারেন নি। তাই আমিও বিভিন্ন গ্রন্থ পঠন-পাঠন ও গুগল সার্চ করা তথ্যভিত্তিক আনুমানিক সন-তারিখ উল্লেখ করেছি মাত্র।
নিমাই পণ্ডিত, বৈষ্ণব-পণ্ডিত বংশে জন্ম নিয়ে শিক্ষা-সংস্কৃতির পীঠস্থানের পণ্ডিত পরিবেশে বড় হয়ে উঠলেও তৎকালিন নবদ্বীপে আচার্য্য শঙ্করের মায়াবাদের সিদ্ধান্তবাগীশদের শুষ্ক জ্ঞানচর্চা, শাক্ত মতবাদের পৌত্তলিকতার পঞ্চ-ম-কারের এবং বৈষ্ণব, শৈব, কিশোরীভজা, কর্তাভজা, পরকীয়া সাধনা ইত্যাদি সহজীয়া মতবাদের উপাসনার প্রাবল্যের মধ্যে সনাতন ধর্মের প্রচারক প্রকৃত বৈষ্ণবেরা প্রায় উপেক্ষিতই ছিলেন। শাক্তরা সুযোগ পেলেই বৈষ্ণবদের নানাভাবে যাতনা দিতেন, এমনকি ধর্মের নামে পশুবলি দিয়ে পশুর মাংস বাড়িতে ফেলে আসতেন। বিষ্ণুর উপাসক বৈষ্ণবেরা নবদ্বীপের শ্রীবাস পণ্ডিতের আঙিনায় মিলিত হয়ে কীর্তন করতেন। আর শান্তিপুরের কমলাক্ষ মিশ্রের আঙিনায় বৈষ্ণবদের মিলনমেলা বসতো। বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণের উপাসক তৎকালিন বৈষ্ণব প্রধানগণ যথা, শ্রীনিবাস, শুক্লাম্বর, শ্রীমান, মুকুন্দ, বিশ্বরূপ প্রমুখ ভক্তগণ, সেকালের সাধকশ্রেষ্ঠ বৈষ্ণবাচার্য কমলাক্ষ মিশ্র (অদ্বৈত মহাপ্রভু)-এর কাছে তাদের অন্তরের বেদনার কথা বলতেন। অদ্বৈত মহাপ্রভু মথুরার গর্গাচার্যের ন্যায় সনাতন ধর্মের দীনতা থেকে ভক্তদের রক্ষা করতে গঙ্গাজল আর তুলসীমঞ্জুরির নিত্য সেবায় শ্রীকৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা জানাতেন। পণ্ডিতদের মতে মূলতঃ অদ্বৈত মহাপ্রভুর আরাধনায় শ্রীবিষ্ণু শুদ্ধাত্মা শচীদেবীর মাধ্যমে নিমাই রূপে ধরাধামে অবতীর্ণ হন।
বালক নিমাইয়ের চপলতা এবং তীক্ষ্ণ পাণ্ডিত্যের কাছে ম্লাণ হতে সুরু করে তার্কিক পণ্ডিতদের, শাক্ত পণ্ডিতদের, (অ)বৈষ্ণব পণ্ডিতদের ভ্রান্ত ধারণার পাণ্ডিত্য। তাঁদের দেখলেই শাস্ত্রের ধাঁধাঁ আর ব্যাকরণের ফাঁকি জিগ্যেস করতেন। একদিন ‘‘ওঁ সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম’’—মতবাদের তার্কিক পণ্ডিতকে শিক্ষা দিতে তার ভাতে প্রস্রাব করে দেন নিমাই, পণ্ডিত রেগে গিয়ে মারতে এলে নিমাই বলেন, আমার চপলতার জন্য দু’-ঘা মারবেন না হয়, তবুও আমি করজোড়ে বলছি, ব্রহ্মময় জগতে সবই যদি ব্রহ্ম, তবে আপনার ভাতে, আর আমার মুতে ব্রহ্ম কি নেই ! আপনার বিচারে ভাতের ব্রহ্ম আর মুতের ব্রহ্ম কি আলাদা? আলাদাই যদি হয়ে থাকে তাহলে আর আজ থেকে আপনার ওই সিদ্ধান্ত বদলে ফেলতে হবে। তবে আমার বুঝ মতে, ব্রহ্ম কারণ, জীব কার্য। ব্রহ্ম পূর্ণ, জীব অংশ। ব্রহ্ম উপাস্য, জীব উপাসক। ব্রহ্ম আর জীব সত্তায় অভেদ, স্বাদে পৃথক। ব্রহ্মবিজ্ঞতা নিমাইয়ের মুখ থেকে ব্রহ্মকথা শুনে পণ্ডিত তখন বুঝতে পারেন ব্রহ্মের বিশিষ্টতা, বিশিষ্ট অদ্বৈতবাদের তত্ত্ব। * * * কিশোর নিমাই যখন টোলে ছাত্র পড়াতেন, সেই সময় কাশ্ম পণ্ডিত কেশবাচার্য দিগ্বিজয় করতে বেড়িয়ে ভারতের সব বিখ্যাত পণ্ডিতদের তর্কযুদ্ধে পরাজিত করে অনেক শিষ্য ও বাহনসহ নবদ্বীপে আসেন। নবদ্বীপের স্মার্ত্ত-পণ্ডিতগণ সুযোগ বুঝে নিমাই পণ্ডিতকে জব্দ করতে পণ্ডিত কেশবাচার্যকে নিমাইয়ের কাছে পাঠান। নিমাইয়ের কাছে গিয়ে কেশবাচার্য বলেন, তুমিই বুঝি নিমাই পণ্ডিত? নিমাই যথোচিত মর্যাদার সাথে প্রণাম জানিয়ে বলেন, আজ্ঞে, লোকেরা বলেন, কিন্তু আমি নিজেকে পণ্ডিত মনে করি না, শিষ্যদের কিছু পাঠদান করার চেষ্টা করি মাত্র। —তা’ কি পড়াও? —কলাপ। —‘কলাপ’! ও তো শিশুপাঠ্য! —ওই শিশুপাঠ্যই সঠিক পড়াতে পারছি কি-না, জানি না। —তাহলে তো আর তোমার সাথে তর্ক করা চলে না! —শুনেছি আপনি ভারত বিখ্যাত পণ্ডিত, আপনার সাথে তর্ক করার স্পর্দ্ধা যেন না হয়। শুনেছি আপনি সরস্বতী-মাতার বরপুত্র। মুখে মুখে শ্লোক রচনা করেন। অনুগ্রহ করে যদি কিছু নিবেদন করেন, শুনে ধন্য হতাম। —বলো, কি শুনতে চাও? —সুরধনী গঙ্গার পবিত্র ধারা বয়ে চলেছে, সে বিষয়ে যদি কিছু নিবেদন করেন। নিমাই বিনীতভাবে বলেন। পণ্ডিত কেশবাচার্য তৎক্ষণাৎ শত-শ্লোক রচনা দ্বারা গঙ্গার বন্দনা করে গর্বভরে নিমাইকে জিগ্যেস করেন, কি হে নিমাই পণ্ডিত! এতক্ষণ ধরে গঙ্গার মহিমা যা’ বর্ণনা করলাম, কিছু বুঝলে? নিমাই বিনীতভাবে বললেন, আপনার রচনার অর্থ আপনি না বোঝালে বোঝে কার সাধ্য? নিমাইয়ের বিনীত ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে কেশবাচার্য বলেন, বলো, কোন্ শ্লোকটা বুঝতে চাও? নিমাই কেশবাচার্য পণ্ডিতের তাৎক্ষণিক রচনা থেকে— ‘‘মহত্ত্বং গঙ্গায়াঃ সততমিদমাভাতি নিতরাং, যদেষা শ্রীবিষ্ণোশ্চরণকমলোৎপত্তিসুভগা। দ্বিতীয় শ্রীলক্ষ্মীরিব সুরনরৈরর্চ্চ্যচরণা, ভবানীভর্ত্তুর্ষা শিরসি বিভবত্যদ্ভুতগুণা॥’’ (চৈঃ চঃ আদিলীলা, পৃঃ ১২৬) শ্লোকটি আবৃত্তি করে তার ভাবার্থ জানতে চাইলে পণ্ডিত কেশবাচার্য আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন, প্রায় ঝড়ের গতিতে বলা শ্লোক থেকে তুমি এই একটি শ্লোক কণ্ঠস্থ করলে কিভাবে? নিমাই বিনীতভাবে বলেন, আপনি দৈববলে যেমন মাতা সরস্বতীর বরপুত্র, কবি, আমিও তেমনি একজন শ্রুতিধর। নিমাইয়ের উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে কেশবাচার্য বলেন, তাহলে শোন, এই শ্লোকের ভাবার্থ হচ্ছে—‘‘গঙ্গা, শ্রীবিষ্ণুর চরণকমল থেকে উৎপন্ন হওয়ার কারণে সৌভাগ্যবতী। দ্বিতীয়া শ্রীলক্ষ্মীর ন্যায় দেব ও মানবেরা যাঁর চরণ-পূজায় রত এবং যিনি ভবানীপতি মহাদেবের মস্তকে বিরাজমানা হওয়ার জন্য অদ্ভুত গুণশালিনী হয়েছেন, সেই গঙ্গার এই মহত্ত্ব সর্বদাই নিশ্চিতরূপে প্রত্যক্ষীভূত হয়ে আছে।—বলো, আর কি জানতে চাও?’’ —এবার শ্লোকের দোষ-গুণ বলুন। —বেদসদৃশ গুণসম্পন্ন অনুপ্রাসযুক্ত উপমারূপ শ্লোকে কোন দোষ নেই, সম্পূর্ণ নির্দোষ। তোমার ব্যাকরণের অলঙ্কার জ্ঞান থাকলে তো তুমি দোষ-গুণ বুঝবে? —যথার্থই বলেছেন। আমি অলঙ্কার না পড়লেও শুনেছি তো, তা’ থেকেই মনে হচ্ছে আপনার শ্লোক দোষযুক্ত। —তোমার স্পর্দ্ধা তো কম নয়! ‘কলাপ’ আর ‘ফাঁকি’ পড়া বিদ্যা দিয়ে তুমি আমার শ্লোকের দোষ ধরতে চাও? —প্রভু, আপনি আমার প্রতি রুষ্ট হবেন না, আমার ন্যায় অর্বাচীন কি আপনার রোষের উপযুক্ত? মার্জনা করবেন, আমি কিন্ত্তু আপনার রচনায় ৫টি দোষ খুঁজে পেয়েছি, যদি অনুমতি করেন, তাহলে এক-এক করে বর্ণনা করি। শিষ্যসামন্ত, স্থানীয় বিদ্বজ্জনের সামনে এমন কথা কেউ যে কোনদিন বলবে ভাবতেই পারেন নি কেশবাচার্য, তথাপি তর্কশাস্ত্রের নিয়ম মেনে নিমাইকে বলার জন্য অনুমতি দিলে নিমাই বলেন—- পঞ্চ দোষ এই শ্লোকে পঞ্চ অলঙ্কার। ক্রমে আমি কহ শুন করহ বিচার॥ অবিমৃষ্ট বিধেয়াংশ দুই ঠাঞি চিন। বিরুদ্ধমতি ভগ্নক্রম পুনরাত্ত দোষ তিন॥ গঙ্গার মহত্ত্ব শ্লোকের মূল বিধেয়। ইদং শব্দে অনুবাদ পশ্চাৎ অবিধেয়॥ বিধেয় আগে কহি পাছে কহিলে অনুবাদ। এই লাগি শ্লোকের অর্থ করিয়াছে বাদ॥ …………………………………………………… গঙ্গাতে কমল জন্মে সবার সুবোধ। কমলে গঙ্গার জন্ম অত্যন্ত বিরোধ॥ ইহা বিষ্ণু পাদপদ্মে গঙ্গার উৎপত্তি। বিরোধালঙ্কার ইহা মহা চমৎকৃতি॥ ঈশ্বর অচিন্ত্য শক্ত্যে গঙ্গার প্রকাশ। ইহাতে বিরোধ নাহি বিরোধ আভাষ॥ গঙ্গার মহত্ত্ব সাধ্য সাধন তাহার। বিষ্ণুপাদোৎপত্তি অনুমান অলঙ্কার॥ স্থূল এই পঞ্চ দোষ পঞ্চ অলঙ্কার। সূক্ষ্ম বিচারিলে যদি আছয়ে অপার॥ (চৈঃ চঃ আদিলীলা, পৃঃ ১২৭-১২৯) —-হে পণ্ডিতপ্রবর! ‘‘আপনি বিধেয় অর্থাৎ জ্ঞাত আগে বলে পরে অনুবাদ অর্থাৎ অজ্ঞাত বলেছেন। এরফলে শ্লোকের অনুবাদ ঘটেছে, মূল অর্থ বাদ পড়েছে। ‘দ্বিতীয় শ্রীলক্ষ্মী’ রচনায় ‘দ্বিতীয়’ শব্দ বিধেয়, সমাসে গৌণ হওয়াতে শব্দার্থ ক্ষয় হয়ে শব্দটি অপ্রাধান্য রূপে নির্দিষ্ট হয়েছে। ‘ভব’ অর্থে মহাদেব বোঝালে ‘ভবানী’ অর্থে মহাদেবের স্ত্রীকে বোঝায়। এবং ভবানীর ভর্তা বললেও মহাদেবকে বোঝায়। ‘ভবানীভর্ত্তুর্ষা’ শব্দের প্রয়োগে ‘ভবানীর ভর্তা’-র অর্থ হয়, ভবের পত্নী যে ভবানী তার ভর্তা, যেন ভব ব্যতিরেকে আর একজন ভর্তা বোঝায়, তাই ওই শব্দের প্রয়োগ বিরুদ্ধমতিকারক। শ্রী অর্থে লক্ষ্মী বা শোভাময়ী বোঝায়। এক্ষেত্রে ‘শ্রীলক্ষ্মী’ প্রয়োগে পুনরুক্তবদাভাস অলঙ্কার হয়েছে। আপনি ‘শ্রীবিষ্ণুর চরণ-কমলে গঙ্গার জন্ম’ বোঝাতে চেয়ে ‘কমলে গঙ্গার জন্ম’ বলে ফেলে প্রচলিত সত্যের সাথে বিরোধ করে ফেলেছেন, যদিও তা বিরোধাভাস মাত্র, তাই বিরোধাভাস-অলঙ্কারের প্রয়োগ হয়েছে। ‘গঙ্গার এই মহিমা সর্বদা নিশ্চিতরূপে দেদীপ্যমান, যেহেতু এই গঙ্গা শ্রীবিষ্ণুর চরণকমল হইতে উৎপন্ন হওয়ার কারণে অত্যন্ত সৌভাগ্যবতী।’—এখানে গঙ্গার মহত্ত্বের সাধন ও সাধ্য দুই-ই পরিলক্ষিত হয়। ওই অনুমান অলঙ্কারের প্রয়োগের ফলে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব জড়ীভূত হয়ে গেল।’’ নিমাই পণ্ডিতের বলা ব্যাখ্যান শুনে কেশবাচার্য আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলেন, শাস্ত্র না পড়ে, অলঙ্কার না পড়ে আমার শ্লোকের এইরূপ ব্যাখ্যা তুমি কিভাবে করলে? উত্তরে নিমাই পণ্ডিত বলেন, শাস্ত্রের বিচার আমি জানি না, মাতা সরস্বতী যা’ বলান, তাই বলি। আপনি মহাপণ্ডিত, কবি শিরোমণি, আপনি দুঃখ করবেন না। আপনার শিষ্য মনে করে আমার কিশোর-সুলভ চপলতা ক্ষমা করে দেবেন। আজ চলুন বাসায় ফিরে যাই, কাল আবার মিলিত হয়ে আপনার কাছে শাস্ত্রের বিচার শুনব।
এই মতে নিজ গৃহে গেলা দুই জন। কবি রাত্রে কৈল সরস্বতী আরাধন॥ সরস্বতী রাত্রে তারে উপদেশ কৈল। সাক্ষাৎ ঈশ্বর করি প্রভুরে জানিল॥ প্রাতে আসি প্রভুপদে লইল শরণ। প্রভু কৃপা কৈল তার খণ্ডিল বন্ধন॥ ভাগ্যবন্ত দিগ্বিজয়ী সফল জীবন। বিদ্যাবলে পায় মহাপ্রভুর চরণ॥
কাশ্মীরি পণ্ডিত নিমাই পণ্ডিতের মধ্যে ষড়ৈশ্বর্য্যের প্রকাশ উপলব্ধি করতে পেরে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তারপর থেকে নবদ্বীপের পণ্ডিতসমাজে শুধু নয়, ভারতবর্ষের পণ্ডিতসমাজে নিমাই পণ্ডিত একজন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।
নিমাই পণ্ডিত পিতৃদেবের পিণ্ডদান করতে গয়ায় গিয়ে ঈশ্বরপুরীর কাছে দীক্ষা নেবার পর পাণ্ডিত্য ছেড়ে ভক্তিরসে নিজেকে জারিত করলেন। শ্রীবাস অঙ্গনের বৈষ্ণব সভায় যোগদান করে কীর্তনানন্দে মেতে ওঠেন। কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা চৈতন্যদেব আর্য্যকৃষ্টি বিরোধী বৌদ্ধ-তান্ত্রিকতার পৌত্তলিকদের, শুষ্ক জ্ঞানচর্চাকারী তর্কবাগীশদের, তামসিক ধর্মাচ্ছন্নদের উদ্দেশ্যে পথ-নির্দেশ করলেন ‘হরেরাম হরেকৃষ্ণ’ কীর্তনের ফরমূলার মাধ্যমে।––তোমার পাপ, তাপ হরণ করতে, প্রবৃত্তির পাপ-তাপের জ্বালা জুড়াতে, সবকিছু ছেড়ে শ্রীরামচন্দ্রের আদর্শ, শ্রীকৃষ্ণের আদর্শের অনুসরণ কর। তৎকালিন হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রাধান্য থাকা সত্বেও তিনি হরেকৃষ্ণ কীর্তনের মাধ্যমে ক্ষত্রিয় বংশজাত রামচন্দ্র এবং কৃষ্ণের জীবন্ত আদর্শে সবাইকে অনুপ্রাণিত করতে চাইলেন। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অবতারবাদের আদর্শ মেনে। * * * কীর্তনগান বাঙালি কবিদের এক অভিনব সৃষ্টি। কৃত্ ধাতু থেকে এসেছে কীর্তন। কৃত্ শব্দের অর্থ প্রশংসা। কীর্তন মানে কীর্তি আলাপন। কীর্তিকর কোন আদর্শের স্মরণ, মনন, গুণ বর্ণন কীর্তনের মূল উদ্দেশ্য। যা’ শ্রবণেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রবেশ করে মানুষের সাত্তিক গুণকে প্রকাশ করতে সাহায্য করে। তাই, মানুষকে সহজে প্রভাবিত করতে, কীর্তন এক সহজ প্রচার মাধ্যম। কীর্তি-আলাপন দু’-ভাবেই হতে পারে। কথার আদান-প্রদান মাধ্যমে এবং সুরে, ছন্দে, নৃত্যে, যন্ত্রানুষঙ্গের ঐকতানের প্রকাশের মাধ্যমে। প্রাক চৈতন্যযুগে, খ্রীঃ ১২ শতকে রচিত, শ্রীকৃষ্ণকে নায়ক করে, হ্লাদিনী শক্তিস্বরূপা রাধাকে একজন পরকীয়া নারী রূপে চিত্রণ করে কিছু অশাস্ত্রীয় আদিরসাত্মক পরকীয়া কাহিনী দিয়ে সাজানো, কবি জয়দেব গোস্বামী বিরচিত ‘গীতগোবিন্দম্ কাব্য’ বাংলার কীর্তনের প্রকৃত উৎস। এ বিষয়ে হিন্দুধর্মের এনসাইক্লোপিডিয়া, ‘পৌরাণিকা’র রচয়িতা অমল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন— (দ্রঃ গীতগোবিন্দ) ‘‘রামায়ণ ও মহাভারতের কট্টর পটভূমিতে ব্লু-বুক হিসাবে বর্ষবরদের চরম ও পরম পরিতৃপ্তি দিয়েছিল; তন্ত্রাভিলাষী সমাজে তন্ত্রগুলি চেতন ও অবচেতন মনকে যেমন তৃপ্তি দেয়।’’ কবি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্যের মূল্যায়ন বিষয়ে বলছেন—‘‘গীতগোবিন্দে সুড়সুড়ি আছে আর আছে দুষ্পাচ্য যৌনতা। ….. সহজিয়া জয়দেব আবিল, অপাঠ্য।’’ রাধা সন্দর্ভে বলছেন— ‘‘…. রাধাবাদ শক্তিবাদেরই একটি ধারা; রাসলীলা নিরোধ ব্যবহারের বিশুদ্ধ বিজ্ঞাপন। তন্ত্রের মানসকন্যা রাধা। রস ও রতির মিলন বৈষ্ণব তত্ত্ব; সাধক ও ভৈরবীর সম্ভোগ শাক্ত তত্ত্ব এবং বজ্রযানে বজ্র ও পদ্মের মিলন এ সবগুলিই তান্ত্রিক তত্ত্ব; বজ্রযানে তাই বলা হয়েছে বুদ্ধত্বং যোষিৎ-যোনিপ্রতিষ্ঠিতম্। ….. ভাগবতে রাধা নাই। …. ভাগবত ও বিষ্ণু পুরাণে রাসলীলা আছে কিন্তু রাধা নাই। ….. ’’ তথাপি রাধার মানবী অস্তিত্ব কিছু-কিছু অ-বৈষ্ণবদের রিরংসায় বাসা বেঁধেছিল। সেই বিকৃত ধারার বাসাটাকে ভাঙতে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যদেব নিজেকে রাধা-কৃষ্ণের যুগলরূপ বলে প্রচার করলেন। যাতে ধর্মের অজুহাতে ধর্মবিরুদ্ধ পরকীয়া-প্রীতি প্রশ্রয় না পায়। তাই তিনি রাধাকে নারীদেহে নয়, সুরত-সম্বেগের ধারায় অন্বেষণ করতে পথ দেখালেন। রাধাকৃষ্ণের যুগলধারার আদর্শে, পরকীয়া-প্রীতির আদর্শে গড়ে ওঠা তৎকালিন প্রচলিত কীর্তনের ধারাটাকে গীতা গ্রন্থে বর্ণিত— “যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লাণির্ভবতি ভারতঃ। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মনম্ সৃজাম্যহম্॥ পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম্ । ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ॥”–এর সূত্র মেনে,—অর্থাৎ ‘‘ঈশ্বর এক, ধর্ম এক, প্রেরিতগণ বিভিন্ন নামে সেই এক-এরই বার্তাবাহী’’র সনাতনী ধারা বা সনাতন ধর্মকে সংস্থাপিত করলেন। শ্রীরামচন্দ্র এবং শ্রীকৃষ্ণের আদর্শকে সামনে রেখে। হরেকৃষ্ণ, হরেরাম প্রচার মাধ্যমে। এর ফলে পরকীয়া-তত্ত্বের সহজীয়া মতবাদীরা বৈষ্ণবীয় মূলস্রোতে ফিরে আসার সুযোগ পেল এবং পৌত্তলিকতার নাগপাশ থেকে সনাতন ধর্মকে উদ্ধার করে এক সর্বজনীন রূপ দিলেন। মূলতঃ শ্রীকৃষ্ণকে কেন্দ্র করে। নিজেকে অন্তরালে রেখে। ‘অবতার নাহি কহে, আমি অবতার।’ তথাপি ধরা পড়ে গেলেন বৈষ্ণবাচার্য সাধক অদ্বৈত মহাপ্রভুর কাছে। অদ্বৈত মহাপ্রভুকে ফাঁকি দিতে পারলেন না। তাঁর সাধনার কাছে ধরা পড়ে গেলেন। নিত্যানন্দ মহাপ্রভুও বুঝতে পেরে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুকে কৃষ্ণের নব-কলেবর রূপে প্রচার করতে শুরু করলেন। * * * আসলে সমগ্র জগতের প্রাণনশক্তি বা প্রাণপঙ্ক বা প্রটোপ্লাজমকে পরমাত্মিক শক্তি বলা হয়, যা বিশ্ব ব্যাপিয়া বিদ্যমান, ‘‘যিনি সর্ব্ব ও প্রত্যেকের ভিতর বিশেষভাবে পরিব্যাপ্ত’’ তিনিই বিষ্ণু। যে পুরোহিতগণ প্রতিমা পূজা করেন, তাঁরাও সর্বাগ্রে ‘ওঁ শ্রীবিষ্ণু’ মন্ত্রে আচমন করেন। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পুরোহিত রঘুবংশের কৌলগুরু বশিষ্ঠদেব শ্রীরামচন্দ্রকে ‘‘ওঁ নারায়ণঃ পরাবেদা নারায়ণঃ পরাক্ষরঃ।/নারায়ণঃ পরামুক্তি নারায়ণঃ পরাগতিঃ॥’’ মন্ত্রে স্বস্তিবাচন করার সময় শ্রীরামচন্দ্রের মধ্যে পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণকে উপলব্ধি করলে তিনি নারায়ণের পরিবর্তে রামচন্দ্র শব্দ বসিয়ে মন্ত্রটিকে পরিমার্জিত করেন। নররূপী নারায়ণ পুরুষোত্তম রামচন্দ্রকে কেন্দ্র করে সবাইকে ধর্ম পালন করতে উদ্বুদ্ধ করলেন। অনুরূপভাবে কৃষ্ণনামের প্রচারক শ্রীগৌরাঙ্গদেবের মধ্যে বিষ্ণুত্ব বা কৃষ্ণত্ব-এর পরিপূর্ণতা সাধনদ্বারা উপলব্ধি করা মাত্রই নিত্যানন্দ প্রভু ‘‘ভজ গৌরাঙ্গ কহ গৌরাঙ্গ লহ গৌরাঙ্গের নাম রে …. ।’’ ‘‘প্রভু নিত্যানন্দ কহে দন্তে তৃণ ধরি। আমারে কিনিয়া লহ ভজ গৌরহরি॥ ইত্যাদি স্বস্তিবাচনে গীতার অবতারবাদকে সম্মান জানালেন। তৎকালিন পুরুষোত্তম চৈতন্যদেবকে কেন্দ্র করে সবাইকে চলতে বললেন। এই হচ্ছে সাজা-গুরুদের কবল থেকে সনাতন বৈষ্ণবধর্মের ধারাকে নবীকরণ মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখার ফরমূলা। গীতা গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণ বিষয়টিকে স্পষ্ট করে বিধৃত করেছেন।
* * অবতার-তত্ত্বের ধারা অনুসারে অবতার বরিষ্ঠ শ্রীরামচন্দ্র ছিলেন সত্যের পূজারী অথচ অসৎ নিরোধী। তৎকালীন যুগের অচ্ছুৎ অনার্য্যদের আর্য্যীকৃত করে আর্য্য-অনার্য্যদের মেলবন্ধন করলেন। অনার্য্য গুহক চণ্ডালকে করলেন মিত্র, আবার অকালমৃত্যুর দ্যোতক বর্ণাশ্রম-বিদ্বেষী প্রতিলোমাচারী বন্ধুবর শম্বুককে দিলেন চরম শাস্তি। ব্রাহ্মণ ঔরসজাত রাবণ যখন কিছুতেই সীতাকে বশে আনতে পারছিলেন না তখন সভাসদেরা মায়াবী-রাবণকে বলেছিলেন, আপনি রামরূপ ধারণ করে গেলেই তো সীতাকে সহজেই বশীভূত করতে পারেন। উত্তরে রাবণ বলেছিলেন, ওই রূপ স্মরণ করলেই আমার সব পাপ-প্রবৃত্তি মুছে গিয়ে আমি এক অন্য মানুষ হয়ে যাই। তথাপি প্রবৃত্তির ঊর্দ্ধে উঠে ওই বোধটাকে ধরে রাখতে পারল না, ফলে রামচন্দ্রের হাতে হত হতে হল। অথচ বিভীষণ রামচন্দ্রের আদর্শে প্রলুব্ধ হয়ে রাবণকে ত্যাগ করলেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ……রাবণ তো আদর্শবান ছিল না। রামচন্দ্রকে দেখে সে একেবারে বিগলিত হয়ে গেল। রামচন্দ্রের ঊর্দ্ধে তার আর কেউ নেই। ভ্রাতার প্রতি কর্তব্যের চাইতে তার ইষ্টানুরাগই প্রবল। ভীষ্ম কিন্তু কেষ্টঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি নিয়েও, কর্তব্যবোধে কৌরবের পক্ষ ছাড়তে পারেন নি। তা কিন্তু ঠিক হয়নি। ইষ্টের জন্য, সত্যের জন্য, অন্য যে-কোন কর্তব্য ত্যাগ করতে হবে, যদি সে কর্তব্য ইষ্টের পথে অন্তরায় হয়। ‘‘সর্ব্বধর্ম্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ’’ । (আ. প্র. 21/2.6.1952) ……শ্রীরামচন্দ্রের খুব strong group (শক্তিমান দল) ছিল। হনুমান, সুগ্রীব, জাম্বুবান, অঙ্গদ, নল, নীল এরা সবাই ছিল একটা strong unit (শক্তিমান গুচ্ছ)। রামচন্দ্রের সাথে ওদের একজন না-একজন থাকতই। এক সময় বিভীষণকে সন্দেহ করেছিল লক্ষণ। বিভীষণ তাতে বলেছিল, ‘আমি জানি তোমরা আমাকে সন্দেহ করবে। কারণ, আমি রাবণের ভাই। আমি ভাই হয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে treachery (বিশ্বাসঘাতকতা) করেছি। কিন্তু করেছি অসৎ-এর বিরুদ্ধে। হজরত রসুলের group-ও (দলও) খুব strong (শক্তিমান) ছিল। তিনি বেঁচে থাকতে-থাকতেই অনেকখানি ভূখণ্ডের king (রাজা) হয়েছিলেন। (দীপরক্ষী 2/26.7.1956) রাজাকে কতখানি প্রজাস্বার্থী হতে হবে সেইটেই রামচন্দ্র দেখিয়েছেন। প্রজা প্রাণের চাইতেও বেশী না হলে রাজা হওয়া যায় না। …….সীতাও ছিলেন রামচন্দ্রের আদর্শে উৎসর্গীকৃত। আর এই ছিল আমাদের আর্য্যবিবাহের তাৎপর্য্য। (আ. প্র. 20/9. 8. 1951) অবতার বরিষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ‘‘শ্রীকৃষ্ণ সব সময়েই চেষ্টা করেছেন যুদ্ধবিগ্রহ avoid (পরিহার) করতে, কিন্তু তাঁর environment (পরিবেশ) তাঁকে সে scope (সুযোগ) দিল না। আর শ্রীকৃষ্ণের যুদ্ধ—মৃত্যুকে মারবার জন্য। Gangrene-affected part of the body (শরীরের দুষ্টক্ষতযুক্ত স্থান) আমরা যেমন কেটে ফেলি জীবন বাঁচাবার জন্য, তিনিও তেমনি মৃত্যু ও মারণের মূর্ত্ত প্রতীকস্বরূপ যারা ছিল তাদের মেরেছিলেন সমগ্র সমাজকে বাঁচাবার জন্য। (আ. প্র. খণ্ড ১, ৪. ১২. ১৯৪১) …… শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে বুঝিয়ে দিলেন যে devil (শয়তান) যদি রাজত্ব করে, তবে অর্জ্জুনের ঈপ্সিত ধর্ম্ম, জাতি, কুল, মান কিছুই রক্ষা পাবে না। তাই devil (শয়তান)-কে demolish (ধ্বংস) করা লোকমঙ্গলের জন্যই অপরিহার্য্য। এর মধ্যে দ্বেষ-হিংসার বালাই নেই। বরং অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধকে এড়িয়ে চলার বুদ্ধির পিছনে আছে দুর্ব্বলতা।’’ (আ. প্র. খণ্ড ৬, ৬. ১২. ১৯৪৫) কেষ্টদা (ভট্টাচার্য্য) প্রশ্ন করেন– গীতায় শ্রীকৃষ্ণ প্রথমে আত্মতত্ত্ব সম্বন্ধে এক বিরাট দার্শনিক আলোচনার অবতারণা করে তারপর ক্ষত্রিয়ের করণীয় নির্দ্দেশ করলেন অর্জুনকে। ওভাবে বললেন কেন ? শ্রীশ্রীঠাকুর– Divine Philosophy ( ভাগবত দর্শন ) দিয়ে শুরু করে তা থেকে Concrete – এ ( বাস্তবে ) আসলেন। আত্মিক ধর্ম প্রত্যেকে পালন করতে হয় তার Instinctive activity ( সহজাত সংস্কার-সম্মত কর্ম ) এর ভিতর দিয়ে। অর্জ্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ যা বলেছিলেন তার মর্ম্ম হল — You are a Kshatriya, born with Kshatriya instincts. And you must do your instinctive duty with all elevating urge ( তুমি ক্ষাত্র সংস্কার নিয়ে জাত ক্ষত্রিয়। এবং উন্নয়নী আকুতি নিয়ে তোমাকে অবশ্যই তোমার সহজাত সংস্কার-সম্মত কর্তব্য পালন করতে হবে )। অর্জ্জুন পন্ডিত কিনা তাই কেষ্টঠাকুর ঐভাবে অর্জ্জুনকে তাঁর বক্তব্য বলেছিলেন। Philosophy ( দর্শন ) না বললে অর্জ্জুন ধরত না। (আলোচনা প্রসঙ্গে, ১১দশ খন্ড, (ইং ২০-০৫-১৯৪৮) রামচন্দ্র এবং শ্রীকৃষ্ণ উভয়েই বৈষ্ণবধর্মের বা সনাতন ধর্মের মূল কাঠামো সদাচার এবং বর্ণাশ্রমকে রক্ষা এবং প্রতিষ্ঠা করার জন্যই জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। চৈতন্যদেবও ভারতীয় কৃষ্টির মূল, বর্ণধর্ম, আশ্রমধর্ম পালন করার পর লোকশিক্ষার জন্য সন্ন্যাস নিয়েছিলেন। তিনি বাস্তব জীবনে অসৎ-নিরোধে তৎপর ছিলেন। বর্ণাশ্রম বিরোধী কোন প্রতিলোম বিবাহ পর্যন্ত হতে দেন নি। দোর্দন্ডপ্রতাপ জমিদারের দুষ্কৃত ভাইপো মাধবের কবল থেকে চন্দনের বাগদত্তা চুয়াকে পার্ষদদের সাহায্যে চন্দনকে দিয়েই হরণ করিয়ে স্বয়ং পৌরহিত্য করে উপযুক্ত পাত্রে পাত্রস্থ করেছেন। (সূত্রঃ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত, চুয়াচন্দন উপন্যাস)
* * বাংলার বিশুদ্ধ কীর্তন-আন্দোলনের পথিকৃৎ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তিনি স্বভাবজ পাণ্ডিত্যের মাধ্যমে নবদ্বীপের স্মার্ত্ত পণ্ডিতদের, ভারতখ্যাত কাশ্মীরি-পণ্ডিতের দর্প চূর্ণ করেছেন। তিনি তামসিক গুণসম্পন্ন সমাজের প্রতিনিধি জগাই-মাধাইদের প্রেম দিয়ে সাত্তিক গুণের উদ্বোধন করেছেন। সনাতন ধর্ম বিদ্বেষী চাঁদ কাজীদের হরিনাম সংকীর্তনের মাধ্যমে চরমবার্তা দিয়ে তমোগুণ নাশ করে ইসলামের বিকৃতি প্রচারকে নস্যাৎ করে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বাহ্য জাতিভেদের বেড়াজাল অগ্রাহ্য করে, যবন হরিদাসের ভক্তিকে মর্যাদা দিয়ে ভক্ত হরিদাসে রূপান্তর করেছেন। তৎকালিন ভারতের বিখ্যাত তাত্ত্বিক পণ্ডিতদের, যেমন রায় রামানন্দ, প্রকাশানন্দ সরস্বতী, সার্ব্বভৌম প্রভৃতিদের ভুল ভাঙাতে তথ্যসমৃদ্ধ বাচনিক কীর্তি— ‘‘চণ্ডালোহপি দ্বিজশ্রেষ্ঠ হরিভক্তি পরায়ণঃ।’’ ‘‘মুচি যদি ভক্তিসহ ডাকে কৃষ্ণধনে। কোটি নমস্কার করি তাহার চরণে॥’’—-প্রকাশ মাধ্যমে আপামর সবাইকে সনাতন ধর্মে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ‘‘চৈতন্যদেবও জগাই-মাধাইয়ের উপর কেমন উগ্রভাব ধারণ করে তাদের অন্তরে ত্রাস ও অনুতাপ জাগিয়ে তবে প্রেম দেখিয়ে তাদের অন্তর জয় করেছিলেন। তাদের উগ্রদম্ভ, দর্প ও প্রবৃত্তি-উন্মত্ততাকে স্তব্ধ না করে, আয়ত্তে না এনে গোড়ায় প্রেম দেখাতে গেলে সে-প্রেম তারা ধরতে পারত না। হয়তো ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করত।’’ (আ. প্র. ৯/২৭. ১২. ১৯৪৬) প্রকাশানন্দ সরস্বতী, সার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্য প্রমুখগণ বৈদান্তিক পণ্ডিত ছিলেন। তাঁদের পাণ্ডিত্য বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন,—- বৈদান্তিক ভাব মানে record of experience (জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার দলিল)। ওরা হয়তো achieve (আয়ত্ত) করার পথ ঠিক অবলম্বন করেননি, সেইটে চৈতন্য মহাপ্রভু ধরিয়ে দিয়েছেন। ভক্তি লাগেই, ভক্তিপথ সহজ, সুষ্ঠু, accurate (যথাযথ), ভক্তির রাস্তা দিয়েই যেতে হয়, তার সঙ্গে বৈশিষ্ট্যানুযায়ী ঝোঁক থাকেই। অদ্বৈতবাদেও গুরুভক্তির উপর জোর দেওয়া আছে। নইলে এগোন যায় না। তাই আছে— ‘অদ্বৈতং ত্রিষু লোকেষু নাদ্বৈতং গুরুনা সহ’। নির্ব্বিকল্প সমাধিতে অদ্বৈতভূমিতে সমাসীন হ’লে জ্ঞান, জ্ঞেয়, জ্ঞাতা লয় পেয়ে যায়। তখন মানুষ বোধস্বরূপ হ’য়ে থাকে, সে অবস্থা মুখে বলা যায় না। অন্য সময় সে মানুষেরও সেব্য-সেবকভাব নিয়ে থাকা স্বাভাবিক! আমি না থাকলে তুমি থাকে না, তুমি না থাকলে আমি থাকে না। জীবজগতের সঙ্গে ব্যবহারে যে আমি-তুমি রূপ দ্বৈতভাব থাকে, তখনও তার মধ্যে একটা একাত্মবোধের চেতনা খেলা ক’রে বেড়ায়। ইষ্টই যে সব-কিছু হ’য়ে আছেন, এই স্মৃতি লেগে থাকে। আত্মাই কই আর ব্রহ্মই কই, তার মূর্ত্ত বিগ্রহ হলেন ইষ্ট। মানুষ যখন ইষ্টসর্ব্বস্ব হয়, ইষ্টপ্রীত্যর্থে ছাড়া যখন সে একটা নিঃশ্বাসও ফেলে না, তখনই সে একই সঙ্গে ভক্তিযোগ, কর্ম্মযোগ ও জ্ঞানযোগে সিদ্ধ হ’য়ে ওঠে। কর্ম্মযোগ, জ্ঞানযোগ যাই বল, ভক্তির সঙ্গে যোগ না থাকলে কাজ হয় না, সব যোগই আসে ভক্তিযোগ থেকে— “বহুনাং জন্মনামন্তে জ্ঞানবান্ মাং প্রপদ্যতে, বাসুদেবঃ সর্ব্বমিতি স মহাত্মা সুদুর্লভঃ”। এই জ্ঞানী একাধারে জ্ঞানী, ভক্ত ও কর্ম্মী। গোড়া থেকেই অদ্বৈতবাদ mathematically (গাণিতিকভাবে) সম্ভব হ’তে পারে, practically (বাস্তবে) সম্ভব হয় কমই। (আলোচনা প্রসঙ্গে, ত্রয়োদশ খণ্ড, তাং ১-৮-১৯৪৮)
* *
চৈতন্যদেব অসি নয়, তীর-ধনুক-বল্লম লাঠি দিয়েও নয়—খোল, করতালাদি বাদ্যযন্ত্রের অনুষঙ্গে ‘হরেরাম হরেকৃষ্ণ’ নামকীর্তনের মাধ্যমে এক ধর্মীয় প্লাবন সৃষ্টি করেছিলেন। ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ অতিক্রম করে, পুরুষার্থের পঞ্চম-বর্গ প্রেমের সাহায্যে সাম্প্রদায়িক কায়েমী-স্বার্থীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ভাগবত আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে ভাগবত ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্ণাশ্রমানুগ সামাজিক বিন্যাসকে সমৃদ্ধ করতে সর্ববর্ণে হরিনাম প্রচার করে বাহ্য জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। কিছু স্বার্থান্বেষী স্মার্ত্ত-পণ্ডিতদের অভিসন্ধিমূলক অভিযোগের ভিত্তিতে তৎকালিন শাসক চাঁদকাজী হরিনাম সঙ্কীর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। শ্রীবাস অঙ্গনের কীর্তনের আসরে গিয়ে বৈষ্ণবদের ওপর অত্যাচার করে, শ্রীখোল ভেঙ্গে দেয়। শান্ত মহাপ্রভু ওই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে কোন বিরোধ না করেই দুর্বার নিরোধ করেছিলেন। ১৪টি কীর্তনদল সংগঠিত করে উদ্দাম কীর্তন করতে করতে চাঁদকাজির বাড়িতে যান। চাঁদকাজী ভয় পেয়ে গেলে মহাপ্রভু তাকে আশ্বস্ত করতে কৃষ্ণপ্রেমের কথা বলেন। হরিনাম-সংকীর্তনের উপযোগিতা বিষয়ে বিস্তৃত ব্যাখ্যা করেন। তার পরে আপনকরা ভাব নিয়ে বলেন, তুমি আমার মামার গ্রামের লোক হবার সুবাদে তুমি আমার মামা হও, মামা হয়ে ভাগ্নের প্রতি এমন কঠোর হয়ো না। কীর্তন বন্ধ করার আদেশ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত আমরা তোমার বাড়ী ছেড়ে যাচ্ছি না। ধর্ম প্রতিষ্ঠার কর্তব্যে অটল মহাপ্রভুর কীর্তন আন্দোলনের কাছে আনুগত্য স্বীকার করতে বাধ্য হয় চাঁদকাজি। তিনিও মহাপ্রভুর সাথে গলা মিলিয়ে হরিনাম সঙ্কীর্তন করেন। সবাইকে হরিনাম সঙ্কীর্তন করতে আদেশ জারী করেন। চৈতন্য আজ্ঞায় স্থির হইল কীর্তন কহে আপনার তত্ত্ব করিয়া গর্জন। কলিযুগে মুঞি কৃষ্ণ নারায়ন মুঞি সেই ভগবান দেবকীনন্দন।। অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড কোটি মাঝে মুই নাথ যত গাও সেই মুঞি তোরা মোর দাস।।’’ (শ্রীচৈতন্য ভাগবত পৃষ্ঠা ১৪৬, মধ্যখণ্ড ৮ম অধ্যায়।) “গৌড়েশ্বর নবাবের দৌহিত্র চাঁদকাজী কে ভগবান শ্রীমন্ মহাপ্রভুর কৃপা”– (৩)
প্রভু কহে – প্রশ্ন লাগি আইলাম তোমার স্থানে। কাজী কহে-আজ্ঞা কর যে তোমার মনে।। ১৪৬ অনুবাদ :- শ্রীমন্ মহাপ্রভু বললেন, মামা! আমি আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করার জন্য আপনার বাড়িতে এসেছি। তার উত্তরে চাঁদকাজী বললেন – হ্যা, তোমার মনে কি প্রশ্ন আছে তা তুমি বল।
প্রভু কহে – গোদুগ্ধ খাও গাভী তোমার মাতা। বৃষ অন্ন উপজায় তাতে তেঁহো পিতা।। ১৪৭ অনুবাদ :- শ্রীমন্ মহাপ্রভু বললেন – আপনি গরুর দুধ খান; সেই সূত্রে গাভী হচ্ছে আপনার মাতা। আর বৃষ অন্ন উৎপাদন করে, যা খেয়ে আপনি জীবন ধারন করেন; সেই সূত্রে সে আপনার পিতা।
পিতা মাতা মারি খাও এবা কোন্ ধর্ম। কোন্ বলে কর তুমি এমত বিকর্ম।। ১৪৮ অনুবাদ :- যেহেতু বৃষ ও গাভী আপনার পিতা ও মাতা, তা হলে তাদের হত্যা করে তাদের মাংস খান কি করে ? এটি কোন্ ধর্ম ? কার বলে আপনি এই পাপকর্ম করছেন ?
কাজী কহে – তোমার যৈছে বেদ পুরাণ। তৈছে আমার শাস্ত্র কেতাব কোরাণ।। ১৪৯ অনুবাদ :- কাজী উত্তর দিলেন, তোমার যেমন বেদ, পুরাণ আদি শাস্ত্র রয়েছে, তেমনই আমাদের শাস্ত্র হচ্ছে কোরান।
সেই শাস্ত্রে কহে প্রবৃত্তি নিবৃত্তি মার্গ-ভেদ। নিবৃত্তি-মার্গে জীব মাত্র বধের নিষধ।। ১৫০ অনুবাদ :- কোরন অনুসারে উন্নতি সাধনের দুটি পথ রয়েছে – প্রবৃত্তিমার্গ ও নিবৃত্তিমার্গ। নিবৃত্তিমার্গে জীবহত্যা নিষিদ্ধ।
প্রবৃত্তি-মার্গে গোবধ করিতে বিধি হয়। শাস্ত্র আজ্ঞায় বধ কৈলে নাহি পাপ ভয়।। ১৫১ অনুবাদ :- প্রবৃত্তিমার্গে গোবধ অনুমোন করা হয়েছে। শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে যদি বধ করা হয়, তাহলে কোনম পাপ হয় না।
তোমার বেদেতে আছে গোবধের বাণী। অতএব গোবধ করে বড় বড় মনি।। ১৫২ অনুবাদ :- চাঁদকাজী শ্রীমন্ মহাপ্রভু বললেন – তোমার বৈদিক শাস্ত্রে গোবধের নির্দেশ রয়েছে। সেই শাস্ত্র-নির্দেশের বলে বড় বড় মুনিরা গোমেধ-যজ্ঞ করেছিলেন।
প্রভু কহে – বেদে কহে গোবধ নিষেধে। অতএব হিন্দুমাত্র না করে গোবধে।। ১৫৩ অনুবাদ :- চাঁদকাজীর উক্তি খণ্ডন করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন – বেদে স্পষ্টভাবে গোবধ নিষধ করা হয়েছে। তাই যে কোন হিন্দু, তা তিনি যেই হোন না কেন, কখনোও গোবধ করেন না।
জীয়াইতে পারে যদি তবে মারে প্রাণী। বেদ-পুরাণে আছে হেন আজ্ঞাবাণী।। ১৫৪ অনুবাদ :- বেদ ও পুরাণে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, কেউ যদি কোন প্রাণীকে নবজীবন দান করতে পারে, তাহলে গবেষণার উদ্দ্যেশে সে প্রাণী মারতে পারে।
অতএব জরদগব মারে মুনিগণ। বেদমন্ত্রে শীঘ্র করে তাহার জীবন।। ১৫৫ অনুবাদ :- তাই মুনি-ঋষিরা অতি বৃদ্ধ জরদগব (জরাগ্রস্ত বা বৃদ্ধ) পশুদের কখনও কখনও মেরে, বৈদিক মন্ত্রের সাহায্যে তাদের নবজীবন দান করতেন।
জরদগব হঞা যুবা হয় আর বার। তাতে তার বধ নহে হয় উপকার।। ১৫৬ অনুবাদ :- এই ধরনের জরদগব (জরাগ্রস্ত বা বৃদ্ধ) পশুদের যখন এভাবেই নবজীবন দান করা হত, তাতে তাদের তাতে তাদের বধ করা হত না, পক্ষান্তরে তাদের মহা উপকার সাধন করা হত।
কলিকালে তৈছে শক্তি নাহিক ব্রাহ্মণে। অতএব গোবধ কেহো না করে এখনে।। ১৫৭ অনুবাদ :- পূর্বে মহা শক্তিশালী ব্রাহ্মণেরা বৈদিক মন্ত্রের সাহায্য এই ধরনের কার্য্য সাধন করতে পারতেন, কিন্তু এখন এই কলিযুগে সেই রকম শক্তিশালি কোন ব্রাহ্মণই নেই। তাই গাভী ও বৃষদের নবজীবন দান করার যে গোমেধ-যোজ্ঞ, তা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।
তোমরা জীয়াইতে নার বধ মাত্র সার। নরক হৈতে তোমার নাহিক নিস্তার।। ১৫৮ অনুবাদ :- তোমরা মুসলমানেরা পশুকে নবজীবন দান করতে পার না, তোমারা কেবল হত্যা করতেই পার। তাই তোমরা নরকগামী হচ্ছ; সেখান থেকে তোমরা কোনভাবেই নিস্তার পাবে না।
গরুর যতেক রোম, তত সহস্র বৎসর। গোবধী রৌরব মধ্যে পচে নিরন্তর।। ১৫৯ অনুবাদ :- গরুর শরীরে যত লোম আছে তত হাজার বছর গোহত্যাকারী রৌরব নামক নরকে অকল্পনীয় দুঃখ-যন্ত্রণা ভোগ করে।
তোমাসভার শাস্ত্রকর্তা-সেহো ভ্রান্ত হৈল। না জানি শাস্ত্রের মর্ম ঐছে আজ্ঞা দিল।। ১৬০ অনুবাদ :- তোমাদের শাস্ত্রে বহু ভুলভ্রান্তি রয়েছে। শাস্ত্রের মর্ম না জেনে, সে সমস্ত শাস্ত্রর প্রণয়নকারীরা এমন ধরনের নির্দেশ দিয়েছে, যাতে যুক্তি বা বুদ্ধির দ্বারা বিচারের কোন ভিত্তি নেই এবং প্রমাণও নেই।
শুনি স্তব্ধ হৈল কাজী না স্ফুরে বাণী। বিচারিয়া কহে কাজী পরাভব মানি।। ১৬১ অনুবাদ :- শ্রীমন্ মহাপ্রভুর এই কথা শুনে কাজীর সমস্ত যুক্তি স্তব্ধ হল, তিনি আর কিছু বলতে পারলেনা। এভাবেই পরাজয় স্বীকার করে কাজী বিচারপূর্বক বললেন—
তুমি যে কহিলে পণ্ডিত সেই সত্য হয়। আধুনিক আমার শাস্ত্র, বিচার-সহ নয়।। ১৬২ অনুবাদ :- নিমাই পণ্ডিত! তুমি যা বললে তা সবই সত্য। আমাদের শাস্ত্র আধুনিক এবং তাই তার নির্দশগুলি দার্শনিক বিচার বা যুক্তিসঙ্গত নয়।
কল্পিত আমার শাস্ত্র আমি সব জানি। জাতি-অনুরোধে তবু সেই শাস্ত্র মানি।। ১৬৩ অনুবাদ :- আমি জানি যে, আমাদের শাস্ত্র বহু ভ্রান্ত্র ধারনা ও কল্পনায় পূর্ণ, তবুও যেহেতু আমি মুসলমান, তাই সম্প্রদায়ের খাতিরে আমি সেগুলি স্বীকার করি। (শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত সপ্তদশ পরিচ্ছেদ।)
সনাতন ধর্মকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করতে এত কিছু করা সত্বেও নবদ্বীপের কিছু স্মার্ত্ত পণ্ডিতেরা মহাপ্রভুর বিরোধিতা করেছেন। তাই তিনি অনিচ্ছা সত্বেও বাধ্য হয়ে বৈষ্ণব আন্দোলনকে নবদ্বীপে বা নদীয়াতে সীমাবদ্ধ না রেখে ভারতব্যাপী বিস্তার করার মানসে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নামে ভুষিত হয়ে লোক-সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পরিব্রাজক হয়ে বেরিয়ে পড়েন। “সন্ন্যাস লইনু যবে ছন্ন হইল মন। কী কাজ সন্ন্যাসে মোর প্রেম প্রয়োজন॥” —এই বাণীর মধ্যে যা’ স্পষ্টরূপে প্রকাশিত। * * * চৈতন্যদেবের লীলাবসান পরবর্তীকালে কিছু প্রবৃত্তিমার্গী অনুগামীরা চৈতন্যদেব কথিত অবতারবাদের মূলমন্ত্র— “আত্মেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা তারে বলি কাম। কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা, ধরে প্রেম নাম। কামের তাৎপর্য্য নিজ সম্ভোগ কেবল। কৃষ্ণসুখ তাৎপর্য্য প্রেম মহাবল।।” একটু বোধী তাৎপর্যে বিচার করলে দেখা যাবে, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-র আদর্শের অনুশাসন অনুশীলন ভিন্ন “কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা” উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। ‘‘কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা’’-র সদাচার, বর্ণাশ্রম ও চতুরাশ্রম-ধর্মের তাৎপর্য্য বোঝার চেষ্টা না করে, কৃষ্ণের আদর্শ চরিত্রগত করার অনুশীলন না করে, সাধনদ্বারা চৈতন্যদেবের পরবর্তী অবতারকে অন্বেষণ না করে, প্রবৃত্তি পরবশতার “আত্মেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা”-কে গুরুত্ব দিলেন তথাকথিত শ্রীকৃষ্ণ-চৈতন্য-প্রেমীরা। শ্রীকৃষ্ণের সাথে রাধাকে জুড়ে নিয়ে মুখে ‘কৃষ্ণ-কৃষ্ণ’ বলে খোল-করতাল সহযোগে কীর্তন করতে অভ্যস্ত হলেন। রাধা-কৃষ্ণের পরকীয়া প্রীতির সহজিয়া গোষ্ঠী তৈরি করে সগোত্র এবং প্রতিলোম বিবাহাদি সমর্থন করে আশ্রমধর্মকে অশ্রদ্ধা করেছেন। ফলে বিকৃত হয়েছে শ্রীকৃষ্ণ-চৈতন্যদেবের আদর্শ। যার প্রবহমানতা বর্তমানেও বিদ্যমান। চৈতন্যদেব প্রদত্ত ‘শিক্ষাষ্টক’ উপদেশামৃত, যার মধ্যে ‘রাধা’ নামের উল্লেখ পর্যন্ত নেই, ওই উপেদেশামৃতকে গুরুত্বের সাথে বিচার-বিশ্লেষণ না করেই ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থেও রাধাকে মানবী রূপে চিত্রিত করা হয়েছে। রাধাকে কৃষ্ণের বল্লভা বলা হয়েছে। বল্লভা শব্দের অর্থ প্রণয়িণী। যে কৃষ্ণকে সবকিছুর স্রষ্টা মনে করেন যারা, যে কৃষ্ণ অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখান বলে প্রচার করা হয়, সেই কৃষ্ণের প্রাণধন, প্রাণশক্তি বা জীবনীশক্তির উৎস একজন নারী ! ভাবা যায় ! না মেনে নেওয়া যায় ? যদি রাধাকে কৃষ্ণের একজন ভক্ত হিসাবে দেখাতেন, তাহলে মেনে নেওয়া যেত। রাধা সহ ক্রীড়ারস বৃদ্ধির কারণ। আর সব গোপীগণ রাসোপকরণ॥ কৃষ্ণের বল্লভা রাধা কৃষ্ণ প্রাণধন। তাঁহা বিনু সুখ হেতু নহে গোপীগণ॥ (চৈঃ চঃ পৃঃ ৬৪) শুধু তাই নয়, শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে গবেষণা করেন যারা, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাকে নিয়ে গবেষণা করেন যারা, তারাও পার্থসারথী কৃষ্ণের আদর্শকে পাশ কাটিয়ে, বর্ণাশ্রমধর্মকে উপেক্ষা করে, বাঁশী হাতে নিয়ে রাধাকে জড়িয়ে ধরা রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তির উপাসনা করেন। ‘আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সঙ্ঘ’, সংক্ষেপে ইসকনের ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথি স্মরণে জন্মাষ্টমীর দিনটিতেও রাধাকে সাথে রাখেন, যেন রাধাকে সাথে নিয়েই কৃষ্ণ জন্মেছিলেন! বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন—‘‘শুনেছি ভাগবতে রাধা ব'লে গোপিনী নেই। আমি বুঝি, রাধা মানে সেরা সৃষ্টি-রচয়িতা শক্তি। শব্দের থেকেই সব। কতরকমের শব্দ শোনা যায়। ওঁ-অনুভূতির পূর্বে দারুণ বম্ বম্ বম্ শব্দ হয়। দুনিয়াটা যেন ফেটে চৌচির হ'য়ে যাবে। কিছু থাকবে না, সব ধ্বংস হ'য়ে যাবে। সত্তাকেও বিলুপ্ত ক'রে দেবে। এমন শব্দ, সব যেন টুকরো টুকরো হ'য়ে, রেণু রেণু হ'য়ে উড়ে যাবে। সে কী ভীষণ অবস্থা! ভয় বলি, সত্তার ভয় যে কী তখন বোঝা যায়! সত্তা বুঝি এই মুহূর্তে গুঁড়িয়ে দিল। তখন বোঝা যায় দয়ালের দয়া, যে দয়ায় টিকে আছি এই দুনিয়ায়। ওঁ-অনুধাবনে রং আসে। রং-এ মনোনিবেশ করলে পিকলু বাঁশীর মত শব্দ হয়। দোল আসে। এক অবস্থায় motion and cessation (গতি এবং বিরতি)-এর মত বোধ হয়। স্বামীর অনুভূতি যেন to and from (একেবার সামনে একবার পেছনে হচ্ছে)-এমনতর বোধ করা যায়। ইলেকট্রিক ব্যাটারি দিলে যেমন শব্দ পাওয়া যায় না, ভিতরে বোধ হয়, রাধাও ঐ রকম সত্তা দিয়ে মানুষ হয়। শেষ দিকে আসে একটা পরম শান্ত অবস্থা। আমাদের এই সৎনাম সব মন্ত্রের বীজস্বরূপ। সব বীজের সত্তা হ'লো কম্পন। আর কম্পনের গঠনতন্ত্র অনুভব করা যায় এই নামের মধ্যে। রেডিওর যেমন শর্ট ওয়েভ, মিডিয়াম ওয়েভ এবং নানা মিটার আছে, অনুভূতির রাজ্যেও সেই রকম সব আছে। এগুলি ফালতু কথা না, এগুলির সত্তা আছে। যে সাধন করে সেই বুঝতে পারে। হ্রীং ক্রীং ইত্যাদির স্তরে-স্তরে কত শব্দ এবং তার সঙ্গে-সঙ্গে জ্যোতি ভেসে ওঠে। আর একটা কথা, পরীক্ষা করতে গেলে সদগুরুকে ধরা যায় না। কামনা নিয়ে গেলেও তাঁকে পাওয়া হয় না। কামনা ত্যাগ ক'রে ধরলে তখন তাঁকে পাওয়া যায়। কামনা নিয়ে তাঁতে যুক্ত হ'তে গেলে কামনার সঙ্গে যুক্ত হই, তাঁতে যুক্ত হ'তে পারি না। নিষ্কামের কথা কয়, তার মানে গুরুই আমার একমাত্র কাম্য হবেন, অন্য কোন কামনা থাকবে না। তখনই তাঁকে পাওয়া যাবে।’’ (আ. প্র. ১৫শ খণ্ড, পৃঃ ২০০-২০১ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী)
তাই বাধ্য হয়ে এ-যুগের শ্রীকৃষ্ণ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বিকৃতাচারী ধর্মের ধ্বজাধারীদের উদ্দেশ্যে বললেন— “ভগবান, ইষ্ট বা ধর্ম্মের মৌখিক স্তুতির ভিতর-দিয়ে যা’রা ধর্ম্মবিরোধী কাজ করে, তা’রা হ’ল সব চাইতে বড় শয়তানের দূত–প্রকৃষ্ট লোক-দূষক। ১২৫ । (শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭)’’ ‘‘অনেকে শ্রীকৃষ্ণকে মানে, গীতা মানে, অথচ বর্ণাশ্রম মানে না। গীতার কে কি ব্যাখ্যা করেছেন সেই দোহাই দেয়। কিন্তু গীতার বক্তা শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও বাণী দেখে চতুর্বর্ণ সম্বন্ধে তাঁর মত আমরা কি বুঝি? এ সম্বন্ধে কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না, গীতা শ্রীকৃষ্ণের জীবনেই জীবন্তভাবে পরিস্ফুট। গীতায় প্রত্যেক বর্ণের স্বভাবজ কর্ম সম্বন্ধে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। (আ. প্র. ১৪/১১৮) কেষ্টঠাকুরের জীবনটা দেখেন, ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত সবাই তাঁকে পুরুষোত্তমজ্ঞানে পূজা করতেন, কিন্তু তাঁর এত বিয়ের মধ্যে একটাও বামুনের মেয়ে নেই। সমাজ-সংস্থিতির জন্য তিনি বর্ণাশ্রমের বিধান কাঁটায়-কাটায় মেনে গেছেন। (আ. প্র. ৭/৫০)’’ * * * যারা শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে গবেষণা করেন, তাদের তো জানা উচিত যে, শ্রীকৃষ্ণ, বৃহত্তর রাষ্ট্রকে অধর্মের গ্যাংগ্রীন থেকে বাঁচাতেই সুকৌশলে কংস, জরাসন্ধ, শিশুপাল, শাল্ব কৌরবাদির ন্যায় আততায়ীরূপী গ্যাংগ্রীনদের অপারেশন করেছিলেন।---হিংসাকে হিংসা দ্বারা প্রতিরোধ করে অহিংসার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন! কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সনাতনী আর্য্যকৃষ্টির মূলতত্ত্ব, সদাচার ও বর্ণাশ্রমধর্মভিত্তিক পরমরাষ্ট্রিক সমবায়। শ্রীকৃষ্ণের লীলাবসান পরবর্তী শ্রীকৃষ্ণের গীতা-আদর্শের প্রচারক ঋত্বিক সংঘ সক্রিয় থাকার ফলে প্রজাগণ সহজাত-সংস্কার অনুযায়ী সবাই জীবিকা অর্জন করতেন। কেহ কাহারো বৃত্তি-হরণ করতেন না। সকলে আর্য্যকৃষ্টির বিবাহাদি দশবিধ সংস্কার মেনে চলতেন। জনন বিপর্যয় হয় নি, আশ্রমধর্ম ঠিক ছিল। ফলে তিন হাজার বছর পর্যন্ত বৃহত্তর আর্যাবর্তে আগ্রাসন করতে সাহস পায়নি অধার্মিক দুষ্কৃতিরা ! যখন থেকে বর্ণাশ্রম-ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের শিক্ষা ভুলে, প্রবৃত্তিরূপী শয়তানের প্ররোচনার ফাঁদে পড়ে আমরা ক্লীব হয়েছি, তখন থেকে আমরা আগ্রাসনের শিকার হয়েছি। বোধ বিপর্য্যয়ের কারণে, সনাতন ধর্মের অনুশাসন ভুলে, এক আত্মঘাতী উদারতা দেখাতে গিয়ে শক-হুণ-পাঠান-মোগলদের স্বাগত জানিয়েছি। তারা সুযোগ পেয়ে আমাদের জাতীয়তাবোধ, জাতীয়কৃষ্টি অবদলিত করেছে! অনেকদিন পরে, যখন আগ্রাসনের চরম বিপর্যয়, তখন ইংরেজদের অপশাসন থেকে আর্যাবর্তকে মুক্ত করতে আমরা মেরুদণ্ড সোজা করে ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করলাম। সেই শ্রীকৃষ্ণের গীতার আদর্শকে অবলম্বন করে। "যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লাণির্ভবতি ভারতঃ। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মনম্ সৃজাম্যহম্।। পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম্ । ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ।।"---বাণীর অনুসরণে। গীতার ওই সূত্র অবলম্বনে, চৈতন্যদেব ‘‘যেই রাম সেই কৃষ্ণ, এক দেহে রামকৃষ্ণ’’ রূপে এসে আমাদের ভুল ভাঙিয়ে দিলেন। গীর্জায় গিয়ে যীশুর, মসজিদে গিয়ে রসুলের আরাধনা করলেন। পঞ্চমুণ্ডির আসন সাজিয়ে কোনো তান্ত্রিক-গুরু বসালেন তো বসে পড়লেন। তিনি লোকশিক্ষার জন্য বহু ধর্মীয় মতবাদের গুরুদের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুন্ন রেখেই। তিনি দক্ষিণেশ্বরে পূজারী হয়ে এসেও প্রচলিত পূজা-পদ্ধতি অনুসরণ করেন নি। মৃন্ময়ী জগন্মাতাকে প্রাণবন্ত করে দেখালেন এবং কালী মায়ের আদেশক্রমে নিজে খেয়ে মাকে খাওয়ালেন। ফলহারিনী কালী পূজার শুভলগ্নে সারদাদেবীকে আরাধনা করে চিন্ময়ী মাতৃশক্তিকে আদ্যাশক্তি রূপে শ্রদ্ধা করতে শেখালেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব শিষ্য নরেন্দ্রনাথকে শেখালেন, ভারতবর্ষের শাশ্বত দর্শন, ‘‘বহুজন হিতায় চ, বহুজন সুখায় চ’’-এর আদর্শের উত্তরাধিকারী হয়ে পরমার্থ লাভ করার জন্য তোমাকে আত্ম নিবেদন করতে হবে। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ঐশী শক্তিতে শক্তিমান হয়ে নরেন্দ্রনাথ হলেন বিবেকানন্দ। এঁকে দিলেন মহান ভারতবর্ষের পূর্ণাঙ্গ এক চিত্র। শিকাগো ধর্ম্ম মহাসভার ক্যানভাসে। ‘আব্রহ্মস্তম্বভৃদ্ধাতা’–তৃণলতা থেকে ব্রহ্ম, সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বার্তাবহ বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, সংহিতা, পুরুষোত্তমবাদ নিয়ে বিশ্বজনমানস নতুন করে ভাবতে শুরু করলো। সনাতন ধর্মের হৃত উত্তরাধিকার ফিরে পেতে ভারতবর্ষ উপনিষদের ‘‘উত্তিষ্ঠত জাগ্রত, প্রাপ্য বরান্ নিবোধত।।’’ মন্ত্রে আবার নতুন করে জেগে উঠলো।......... ‘‘কর্ম্মণ্যেবাধিকারেস্তু মা ফলেষু কদাচন।.......’’ ––কর্মেই তোমার অধিকার ফলে নয়। ––শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতার ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার আদর্শ আঁকড়ে নবযুগের অভিমন্যু ক্ষুদিরাম, দেশরক্ষার ধর্ম পালন করতে গিয়ে ফাঁসির আসামী হলেন। ‘‘ন জায়তে ম্রিয়তে কদাচিৎ.......বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়.........নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ।.......’’। বাণীর অমৃত আদর্শে স্থিতপ্রজ্ঞ, মৃত্যুঞ্জয়ী ক্ষুদিরাম হাসিমুখে ফাঁসির দড়ির মালা পড়লেন গলায়। একটা ক্ষুদিরামের আত্মাহুতি জন্ম দিল হাজারো ক্ষুদিরামের। ফাঁসিরজ্জু আর ইংরেজ রাজশক্তির বুলেটের আলিঙ্গনে জীবনের জয়গান গাইতে গাইতে অকালে হাসিমুখে বিদায় নিল উত্তরাধিকারের স্বপ্নদেখা কতশত বীর ভারত-সন্তানেরা।
স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম শহীদ ক্ষুদিরাম ‘গীতা’-বর্ণিত ‘‘হতো বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং/জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম্’’-এর বাণীর অনুসরণে অমরত্ব লাভের অনুশাসন মেনে মৃত্যু বরণ করে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মৃত্যুঞ্জয়ী হতে শিখিয়েছিলেন। গীতা গ্রন্থের সেইসব বীরগাঁথা ভুলে আমরা তাঁর ঋণ শোধ করছি, ‘কৃষ্ণ করলেই লীলা, আমরা করলেই বীলা’ গানের ডালি সাজিয়ে! যদিও ওই গান রচনা করার সাহস আমরাই দিয়েছি,—যারা ধর্মের ধ্বজা ধরে প্রবৃত্তিকে পোষণ দিয়ে চলেছি।–-পার্থসারথী শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমদ্ভাগবতগীতার আদর্শ ভুলে, হ্লাদিনি শক্তিরূপিনী রাধা-তত্ত্ব ভুলে, মনগড়া প্রবৃত্তি-প্ররোচিত মানবী রাধা, শ্রীকৃষ্ণের মামীর সাথে পরকীয়া কামুক-রূপে, গোপিনীদের বস্ত্রহরণকারী-রূপে শ্রীকৃষ্ণকে চিত্রিত করে! ‘রাই জাগো রাই জাগো বলে শুক-সারি বলে, কত নিদ্রা যাওগো রাধে শ্যাম-নাগরের কোলে।…..’ এবং ‘রাই জাগোরে, জাগো শ্যামের মনমোহিনী বিনোদিনী রাই/শ্যাম অঙ্গে অঙ্গ দিয়া আছোরে রাই ঘুমাইয়া তোমার কি লোকলজ্জা নাই….’ ওই প্রভাতী গান দুটো বৈষ্ণব মহলে শুধু নয়, কীর্তন হিসেবেও সমাদৃত, জনপ্রিয়। গান দুটোর ভাষা বিশ্লেষণ করে একবার দেখুন। শাস্ত্র অনুযায়ী আর্য্য হিন্দুদের ব্রাহ্মমুহূর্তে শয্যাত্যাগ করে ঈশ্বরোপাসনা করতে হয়। আর প্রাকৃতিক নিয়মে ব্রাহ্মমুহূর্ত কালে সব পাখিরা জেগে যায়। স্বভাবতই শুক-সারি পাখি জেগে গিয়েছে। রাধা তখনো নাগর কৃষ্ণের অঙ্কশায়িনী হয়ে শুয়ে আছে। নগরবাসীরা যদি জানতে পারে তাহলে লজ্জায় পড়তে হবে। তাই শুক-সারী পাখি ওদের ভাষার জাগরণী গান গেয়ে রাধাকে সাবধান করে দিচ্ছেন। আর কৃষ্ণ ভক্তেরা ভালোমন্দ বিচার না করে, ওই গানকেই জাগরণীর জন্য আদর্শ গান হিসেবে নির্বাচন করে গেয়ে চলেছেন। এবার বিচার করে দেখুন, কাম-রসাত্মক চটুল কথায় প্রভাতী সুর লাগিয়ে শ্রীকৃষ্ণের নামে ওই আরাধনা আর্য্যকৃষ্টি বিরোধী প্রবৃত্তি-প্ররোচিত পরদারাসক্ত ব্যতীত কোন্ আধ্যাত্মিক আবেদনে সমৃদ্ধ ? ওইসব জাগরণী গান শুনে, এবং কবি জয়দেব বিরচিত গীতগোবিন্দের ছত্রে ছত্রে বর্ণিত কামবিলাসী, ‘দেহি পদপল্লব মুদারম্’ বলে রাধার মানভঞ্জন করা, পরকীয়া নিয়ে ব্যস্ত শ্রীকৃষ্ণের কীর্তিকলাপ পড়ে, যদি কোন তথাকথিত নাস্তিক্যবাদী শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রে কালিমালিপ্ত করে, —সেই ধর্মবিরোধী, ইষ্টবিরোধী প্রচারের জন্য দায়ী কারা? শ্রীকৃষ্ণ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ‘‘ …….. ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এলেন। ব্রাহ্মণ্যধর্ম্ম অর্থাৎ বৃদ্ধির ধর্ম্ম প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি প্রাণপাত করলেন। অথচ ব্রাহ্মণকুলতিলক দ্রোণাচার্য্যই তাঁর বিরুদ্ধে গেলেন। ভীষ্ম অন্নের কৃতজ্ঞতার দোহাই দিয়ে কৌরবপক্ষে গেলেন। কিন্তু যে-অন্ন তিনি খেয়েছিলেন সে-অন্নের অর্দ্ধেক মালিক পাণ্ডবরা। যা হোক, ধর্ম্ম কোথায়, ন্যায় কোথায়, লোকহিত কোথায়, কৌরবপক্ষ তা না বোঝার ফলে যুদ্ধ অনিবার্য্য হয়ে উঠলো। এতসব বিপর্য্যয় সত্ত্বেও কেষ্টঠাকুর ঘরে-ঘরে ঋত্বিক, অধ্বর্য্যু, যাজক পাঠিয়ে লোকের মনন ও চলনের ধারা দিলেন বদলে। করলেন ধর্ম্মের সংস্থাপনা। বুদ্ধদেব আসবার পর বৌদ্ধভিক্ষুরা দেশ ছেয়ে ফেললো, যার পরিণাম অশোক। অশোকের ভুলত্রুটি যাই থাক, শোনা যায়, অমনতর সম্রাট ও অমনতর সাম্রাজ্য নাকি কমই হয়েছে। রসুল আসার পর ইসলামের যাজনের ঢেউ কী রকম উঠেছিল তা কারও অজানা নয়। বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, মুসলমান সবাই তাদের যাজনের রেশটা কম-বেশী ধরে রেখেছে। প্রচারক আছে, প্রচেষ্টা আছে। অবশ্য, আচরণহীন প্রচারণায় যতটুকু হতে পারে ততটুকুই হচ্ছে। তবু মানুষের কানের ভিতর কথাগুলি ঢুকছে। কিন্তু আমাদের ঘরে ঘরে হানা দেবার কেউ নেই। তারা কেউ জুটলো না। অথচ হুজুগ করার এত লোক জুটছে। হুজুগ করে দল বেঁধে জেলে গেলে তাতে মানুষ কতখানি গড়ে উঠবে তা বুঝতে পারি না। (আ. প্র. ৮ম খণ্ড, ২৬. ০৬. ১৯৪৬) “আলেকজাণ্ডারের আগে পর্য্যন্ত কোন আক্রমণকারী আমাদের দেশে ঢুঁ মেরে কিছু করতে পারেনি । অশোকের Buddhism (বৌদ্ধবাদ)-এর পর থেকে বর্ণাশ্রম ভেঙ্গে পড়ে এবং সেই থেকেই সমাজ ও জাতি দুর্ব্বল হয়ে পড়ে । বুদ্ধদেব গৃহীর জন্য বর্ণাশ্রম রক্ষা করতে বলেছেন । আর ভিক্ষু, শ্রমণ ইত্যাদির বেলায় ওটার ওপর জোর দেননি । আর, সে ক্ষেত্রে ওর প্রয়োজনও ছিল না । কারণ, ভিক্ষু বা শ্রমণদের কোন যৌন সংশ্রব ছিল না । কিন্তু ভিক্ষুণীপ্রথা প্রবর্তনে সে বাঁধনও ভেঙে গেল । বুদ্ধদেব যে স্বর্ণযুগ আনতে চেয়েছিলেন তা আর সম্ভব হ’ল না ।” (আ. প্র. ২১/৬. ৮. ১৯৫২)
* * আর একবার কৃষ্ণকথায় ফিরে আসছি। বিচার করে দেখব, কৃষ্ণ-রাধার আজগুবী তত্ত্বের অস্তিত্ব আদৌ আছে কি-না। পণ্ডিতদের মতে কংসের দূত হয়ে মহামতি অক্রুর, বলরামসহ শ্রীকৃষ্ণকে বৃন্দাবন থেকে মথুরায় নিয়ে যান কংস আয়োজিত ধনুর্যজ্ঞে অংশগ্রহণ করাতে। কংসের উদ্দেশ্য ছিল শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করার। পরিবর্তে শ্রীকৃষ্ণ অত্যাচারী কংস-মামাকে হত্যা করে পিতামহ উগ্রসেনকে রাজ্য প্রত্যর্পণ করেন। তারপর ঘোর আঙ্গিরসের সান্নিধ্যে পরাবিদ্যা এবং সান্দিপনী কাশ্যের সান্নিধ্যে অপরাবিদ্যা লাভ করেন আর বৃন্দাবনে ফিরে যান নি। পণ্ডিতদের এই সাক্ষ্য থেকে প্রমাণিত, শ্রীকৃষ্ণ ১১ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে কংসকে বধ করেন। অথচ বেশীরভাগ কৃষ্ণভক্তগণ বৃন্দাবন লীলার, রাসলীলার নামে যে যুবক কৃষ্ণকে মানবী রাধার সাথে যুগলবন্দী করে পরকীয়া কামুক রূপে চিত্রিত করে চলেছেন, সে কৃষ্ণ কোন কৃষ্ণ? সে কি বৃষ্ণিসিংহ দেবকীনন্দন, না অন্য কেউ ? সে কি গীতার প্রবক্তা পার্থসারথী, না অন্য কেউ? কারণ, বৈষ্ণবদের প্রামাণ্য গ্রন্থ ভাগবতে রাধা-কৃষ্ণের ওইসব অবৈধ পরকীয়া-লীলার কোন কাহিনী লিপিবদ্ধ নেই। অথচ কৃষ্ণের প্রচারকেরা গীতার কথা বলেন, ভাগবতের কথা বলেন, অথচ আয়ান ঘোষের ঘরণী রাধাকে শ্রীকৃষ্ণের সাথে এক অবৈধ সম্পর্কের সাথে জুড়ে নিয়ে কৃষ্ণনাম করতে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণের যে বদনাম করে চলেছেন, সেটাও তাদের বোধে ধরা পড়ে না, এমনই ধার্মিক তা’রা ! কৃষ্ণকে একমাত্র ভগবান বলে মানেন যারা, তারা আবার শ্রীকৃষ্ণের সাথে রাধারও উপাসনা করেন, কোন্ যুক্তিতে? তাদের অনেকেই আবার শ্রীকৃষ্ণের নব-কলেবর জ্ঞানে চৈতন্যদেবের প্রতিকৃতির উপাসনাও করেন। তা’রা বলেন, চৈতন্যদেব রাধা-কৃষ্ণের যুগল অবতার। খুব ভাল কথা। তাই যদি হয়, তাহলে তো একঅঙ্গে দুই-রূপ যুগল অবতার-স্বরূপ চৈতন্যদেবেরই আরাধনা করতে হয়। আলাদা করে রাধা-কৃষ্ণের যুগলমূর্তির আরাধনার প্রয়োজন নেই। কারণ গীতার বাণী ‘‘তেষাং জ্ঞানী নিত্যযুক্ত একভক্তি র্বিশিষ্যতে।’’ (৭ম অধ্যায়) অনুসারে পুরুষোত্তম ব্যতীত একাধিক আদর্শকে মনে স্থান দিলেও ব্যভিচার করা হয়, যা ইষ্টলাভের বা ঈশ্বরলাভের পথে অন্তরায়। ইসকন ভক্তদের এ বিষয়টা একবার ভেবে দেখা উচিত। কারণ, আমরা জীবনপিয়াসী যারা, তারা যদি এভাবে জীবনদেবতার অপমান করে চলি, আমাদের জীবন কিভাবে সমৃদ্ধ হবে? —————————————- নিবেদনে— তপন দাস@tapandasd
** ভাষা দিবসের শ্রদ্ধার্ঘ্য ** ।। সত্তাপোষণী ভাষায় সাহিত্য নির্মাণে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্য অবদান ।।
সত্তাপোষণী ভাষায় সাহিত্য নির্মাণে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র যে বিশিষ্ট অবদান রেখে গেছেন মানব সভ্যতাকে সবদিক দিয়ে সমৃদ্ধ করতে, তার কিছু দৃষ্টান্ত উপহার স্বরূপ তুলে ধরছি। ‘‘ভাব, ভাষা, যুক্তি, ছন্দ ও অনুরণন যতই সৌষ্ঠবমণ্ডিত হ’য়ে আদর্শ-উল্লোল হ’য়ে ওঠে— জীবনীয় সাত্তিক সম্বর্দ্ধনায়,— রচনা জীবন্ত হ’য়ে ওঠে সেখানে তেমনি, এই হলো রচনার পঞ্চপ্রাণ।’’ ২৩৯ (শিক্ষা-বিধায়না) ‘‘সমস্ত রসের সমবায়ে সন্দীপনার বোধ-পরিবেষণী সাত্বত সম্বেদনাই হ’চ্ছে সাহিত্যের প্রাণনদীপ্তি।’’ ২৪০ (শিক্ষা-বিধায়না) ‘‘পরিস্থিতির ভাল-মন্দ পরিচলনকে আলোড়ন-বিলোড়ন ক’রে সার্থক সঙ্গতিশীল সাত্বত পন্থায় সাত্তিক মর্যাদায় সুদীপ্ত ক’রে তোলাই হ’চ্ছে সাহিত্যের সমীচীন তাৎপর্য, আর তাই-ই হচ্ছে জনগণের জীবনীয় সম্বর্দ্ধনা।’’ ২৪১ (শিক্ষা-বিধায়না)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র অনুশ্রুতি নামক গ্রন্থে ছোট্ট ছোট্ট ছড়াবাণীতে যে সম্পদ আমাদের দান করে গেলেন, তা’ থেকে সামান্য কিছু উদ্ধৃত করলাম (অনুশ্রুতি ১ম খণ্ড থেকে)। আদব-ভরা ফুল্লবাণী আশার পিনাক হাতে, প্রাপ্তিটাকে আনবি ডেকে তপের আলোকপাতে। ৭৮। (সাধনা)
পথ ভেবেই তুই শ্রান্তিভরে ক্ষান্ত হ’য়ে যাসনে দমে, মানুষ কি রে চলতে পারে না ক’রে ভর স্ব-উদ্যমে ? ২৬ । (বৃত্তি নিয়ন্ত্রণ)
শঙ্খ ফুঁকে অমর হাঁকে উচ্চরোলে পুরুষ-বুক, তাথৈ থিয়ায় নাচাও নারী বর্মে ঢেকে মৃত্যুমুখ। ৮৭। (পুরুষ ও নারী)
সব দিতে তুই করলি গুরু পেতে পরিত্রাণ, দিলি কিন্তু নব ঘণ্টা নিতেই লেলিহান! ৪৩। (কপট টান)
বাসতে ভাল এসে রে তুই বাসলি ভাল কা’রে, প্রতিদানেও তাই পাবি তুই মজলি নিয়ে যা’রে। ৭৫। (কপট টান)
এমন অসংখ্য ঋদ্ধ-বাণীতে সমৃদ্ধ রচনা পাঠ করে তাঁকে কবি, ছান্দসিক, সাহিত্যিক, সাহিত্যদ্রষ্টা ঋষি বললেও বোধহয় অত্যুক্তি হবে না।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সব ঝড়ঝঞ্ঝা থেকে মানব সভ্যতাকে আগলে রাখতে ওজস্বী ভাষায় ‘দেবভিক্ষা’ শিরোনামে যে কাতর আবেদন রেখেছিলেন, সে আবেদনের, সে ভাষার, মর্যাদা যদি পেত, বিশেষ করে সাহিত্যিকগণ যদি তাদের গুটি কেটে বেরিয়ে এসে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করতেন, তাহলে অবক্ষয়ের রাশ কিছুটা হলেও টেনে ধরা যেত।
।। দেবভিক্ষা ।। ‘‘ওগো ভিক্ষা দাও!– ঝাঁঝাল ঝঞ্ঝার পিশাচী জৃম্ভন শুরু হয়েছে, বাতুল ঘুর্ণি বেভুল স্বার্থে কলঙ্ক কুটিল ব্যবচ্ছেদ সৃষ্টি করতে আরম্ভ করে দিয়েছে, প্রেত-কবন্ধ-কলুষ কৃষ্টিকে বেতাল আক্রমণে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে, অবদলিত কৃষ্টি অজচ্ছল অশ্রুপাতে ভিক্ষুকের মতো তাঁরই সন্তানের দ্বারে নিরর্থক রোদনে রুদ্যমান, অলক্ষ্মী-অবশ প্রবৃত্তি-শাসিত বেদস্মৃতি– ঐ দেখ–মর্মান্তিকভাবে নিষ্পেষিত, ত্রস্ত দোধুক্ষিত দেবতা আজ নতজানু–তোমাদেরই দ্বারে তোমাদেরই প্রাণের জন্য তোমাদেরই প্রাণভিক্ষায় তোমাদেরই সত্তার সম্বর্দ্ধনার জন্য ব্যাকুল হয়ে ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়াচ্ছেন ; কে আছ এমন দরদী আর্য্য-আত্মজ সন্তান!– তাঁকে মানুষ ভিক্ষা দেবে, তাঁকে অর্থ ভিক্ষা দেবে— সব হৃদয়ের সবটুকু উৎসর্গ করে তোমাদেরই জন্য সেই দেবোজ্জল প্রচেষ্টাকে সার্থক করে তুলতে ? যদি থাক কেউ ওগো ধী-ধুরন্ধর উৎসর্গপ্রাণ নিরাশী নির্ম্মম! এস,—উৎসর্গ কর—আত্মাহুতি দাও— জীবন নিঙড়ানো যা-কিছু সঙ্গতি তাঁকে দিয়ে সার্থক হয়ে ওঠ, নিজেকে বাঁচাও, মানুষকে বাঁচাও, কৃষ্টিকে বাঁচাও ; আর, বাঁচাও দুর্দ্দশাদলিত মহা-ঐশ্বর্য্যশালিনী আর্য্যস্তন্যদায়িনী, পরম-পবিত্রা ভিখারিণী মাতা ভারতবর্ষকে, ধন্য হও, নন্দিত হও, ঈশ্বরের অজচ্ছল আশীর্ব্বাদকে মাথা পেতে লও, শান্ত হও, শান্তি দাও, অস্তি ও অভ্যুত্থানকে অনন্তের পথে অবাধ করে রাখ ;
স্বস্তি! স্বস্তি! স্বস্তি!
এবার আমি সাহিত্যের উৎস বিষয়ে বলা শ্রীশ্রীঠাকুরের কিছু রচনার উপর আলোকপাত করার চেষ্টা করব।--- সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী পরমপিতা এক থেকে বহুতে পরিণত হবার প্রাক্কালে যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনাহত-নাদ উৎপন্ন হয়েছিল, সেই আদিধ্বনিস্পন্দিত শব্দ বা ধ্বনি বা পরাবাক্ ওঁ সব সৃষ্টির আদি উৎস। "ব্যাপ্ত প্রাক, প্রথম বাক্।" পুণ্যপুঁথিতে বর্ণিত শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাষায় ‘‘এক বিরাট ধ্বনি সোঽহং পুরুষ ভেদ করে সৃষ্টি করতে চলে এল---সেই ওম্।’’
আবার অনুশ্রুতি গ্রন্থে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন— ‘‘স্পন্দন়টার সংবেদনা যেমনতর যেথায় হয়, শব্দটাও তো মূর্ত্তি নিয়ে বিশেষ হয়ে তাতেই রয়।’’ এই নিয়মনা বা বিধির মধ্য দিয়েই সৃষ্টি হয়েছে সব ভাষার।
শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাষায়— ‘‘ভাষা তার /পরিস্থিতি ও পরিবেশ অনুগ/ব্যক্তির ভাব-সন্দীপনী ব্যক্ত বিবর্তন/ছাড়া আর কিছুই নয়কো।’’ (শিক্ষা-বিধায়না, ১১৮)
এই বিবর্তন পরিলক্ষিত হয় রামায়ণ রচনার প্রেক্ষাপটে। যেমন, রাম-নামের নাদ-সাধন করে রত্নাকর দস্যু মেধানাড়ীকে জাগ্রত করে হয়েছিলেন বাল্মীকি। একদা তমসা নদী থেকে স্নান করে ফিরছিলেন। এক তরুশাখে ক্রৌঞ্চ-জুটি পরস্পর খেলছিল। এক ব্যাধ পুরুষ পাখিটিকে তীর মেরে হত্যা করলে স্ত্রী পাখিটি করুণ বিলাপ করতে থাকে। বাল্মীকি বিচলিত হয়ে ‘কোনদিন প্রতিষ্ঠা পাবে না’ বলে ব্যাধকে অভিসম্পাত করেন। সেই অভিশাপ বাণী স্বতঃস্ফূর্ত শ্লোকবদ্ধ হয়ে নির্গত হয়েছিল :— সৃষ্টি করেছিলেন দেব-ভাষার আদি শ্লোক— ‘‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতী সমাঃ/যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকম্ অবধী কামমোহিতম্।’’ অতএব, বলা চলে, নাদরূপী বা শব্দরূপী ব্রহ্ম থেকেই ভাষার সৃষ্টি। সেই ভাষার সমন্বয়ের রচনা যখন সত্তাপোষণী রূপে জগতের হিতসাধনে ব্রতী হয়, তখনই সৃষ্টি হয় সাহিত্যের। শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর শ্রীমুখ নিঃসৃত ভাষায় চলার সাথী গ্রন্থে বলছেন—‘‘যার আলোচনায় মানুষ হিতে অধিষ্ঠিত বা উন্নীত হতে পারে, তাই যে সাহিত্য।’’ শিক্ষা-বিধায়না গ্রন্থের ২৪৫ সংখ্যক বাণীতে বলছেন, ‘‘ঈশ্বরই সুসঙ্গত, সর্ববিভান্বিত/ সুসমাবিষ্ট, প্রাজ্ঞ জীবন-সাহিত্য,/ তাই তিনি রসো বৈ সঃ।’’ তাইতো, যুগের প্রয়োজনে, ঈশ্বর, অবতার-বরিষ্ঠরূপে নরবপু ধারণ করেন। হিতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে সৃষ্ট হয় নব-নব সাহিত্য। বেদ-বেদান্ত, রামায়ণ, গীতা, ত্রিপিটক, বাইবেল, কোর-আন্, চৈতন্য-ভাগবত, চৈতন্য চরিতামৃত, রামকৃষ্ণ কথামৃত ইত্যাদি নামে সংকলিত এবং লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাহিত্যিকদের যে-সব জীবন-সাহিত্যের সাথে আমরা পরিচিত হয়েছি, সেই সব সাহিত্যের প্রকৃত মূল্যায়ন করে অনেক ভুল শুধরে দিয়েছেন, জীবনীয় উদ্ধৃতিগুলো নানাভাবে জনমানসে তুলে ধরে জীবন-সাহিত্যের রূপ দান করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর। যার মাধ্যমে অবতারবরিষ্ঠ পরম্পরাকে, ঋষিবাদকে, জীবনবাদী সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। তাঁর শ্রীহস্ত লিখিত রচনা, স্মৃতি-বাণী, শ্রুতি বাণীসমূহ এক অভিনব বর্ণ-বিন্যাসে, শব্দ-বিন্যাসে, ব্যাকরণ-বিন্যাসে, পংক্তি-বিন্যাসে, ভাব-বিন্যাসে সমৃদ্ধ হয়ে সৃষ্টি করেছে এক সুসমাবিষ্ট, প্রাজ্ঞ জীবন-সাহিত্যের সম্ভার। তাঁর বাণী সাহিত্যে আমরা অনেক নবীন মৌলিক ভাষার সন্ধান পেয়েছি এবং আরও পেতে পারতাম যদি বর্তমানের ন্যায় দর্শ-শ্রুতি বৈদ্যুতিন মাধ্যমের সাহায্য পাওয়া যেত। যার অভাবে মহাসমাধির ভাববাণীর সময় প্রোক্ত অনেক বিদেশী ভাষাকে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তথাপি তাঁর সৃষ্ট বাণীসাহিত্যে সংস্কৃত, বাংলা, ইংরেজী ভাষার যে অনবদ্য প্রয়োগের সাথে আমরা পরিচিত হতে পেরেছি, তা’ সমৃদ্ধ করেছে মানবজীবনের একান্ত প্রয়োজনীয় প্রতিটি আঙ্গিককে। উপাসনা, সাধনা, লোক-ব্যবহার, দর্শন, কৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, বিজ্ঞান, পরিবেশ-পরিচর্যা, বাণিজ্য, সমাজ, সমাজ-সংস্কার, দশবিধ-সংস্কার, বিবাহ, প্রজনন, রাষ্ট্র, পরমরাষ্ট্রিক সমবায়, ইত্যাদি সব কিছুই স্থান পেয়েছে তাঁর রচনায়। ওইসব বিধিবদ্ধ অনুশাসনগুলো জীবনকে জীবনীয়ভাবে উপভোগ করার রসদে পরিপূর্ণ। যা' আমাদের জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক সকল অভাবকে তাড়িয়ে দেবার ব্যবস্থা করে জীবনকে পূর্ণতার আস্বাদে ভরিয়ে দিতে এক নিশ্চিত নির্ভরশীল দিগদর্শন। সেই পূর্ণতার আস্বাদের স্বাদের নেশা ধরাতে,--- তাঁর সুললিত ভাষার বাণী-সাহিত্যের সাথে জগদ্বাসীকে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য শত বাধা-বিপত্তি, অভাব-অনটনকে অতিক্রম করে শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর ভক্তদের কাছ থেকে কাগজ ভিক্ষা করেছেন, টাকা ভিক্ষা করেছেন পত্র-পত্রিকা মাধ্যমে এবং পুস্তকাকারে তাঁর বাণীগুলোকে সুলভ মূল্যে পৌঁছে দেবার মানসে। শুধু তাই নয়, তিনি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের জন্যও জনে জনে বলেছেন। অনেক আত্মোৎসর্গকৃত ভক্ত ও প্রতিষ্ঠান পত্র-পত্রিকা, সাময়িকী, পুস্তক-পুস্তিকা তাঁর বলা কথাগুলো অবিকৃতভাবে প্রকাশ করে তাঁর চাহিদা পূরণ করেছেন এবং এখনো করে চলেছেন। তাঁদের উদ্দেশ্যে প্রণাম নিবেদন করেই বলতে হয়, তাঁর সব চাহিদা পূরণের লক্ষ্যমাত্রাকে এখনো ছুঁতে পারিনি আমরা। গড়ে তুলতে পারিনি জীবনবাদী সত্তাপিয়াসী পাঠকসমাজ। একথা ঠিক যে, সাধারণ মানুষেরা অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে, প্রকৃত জীবনবাদী সাহিত্যের আস্বাদ নিতে, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দেবভাষার দেবসাহিত্য চর্চায় একদিন না একদিন এগিয়ে আসবেই। সেই শুভাগমনকে ত্বরান্বিত করতে, তাঁর বাণী-সাহিত্যকে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক, বার্ষিক পত্র-পত্রিকা মাধ্যমে উপঢৌকন রূপে সাজিয়ে তো রাখতে হবে, না কি ? ক্ষুদ্র আত্মস্বার্থ প্রতিষ্ঠাকে উপেক্ষা করে যদি দীক্ষাকালীন প্রতিজ্ঞা পূরণের শপথ স্মরণ করে ইষ্টস্বার্থ প্রতিষ্ঠায় আমাদের ইচ্ছাটাকে বিনিয়োগ করতে পারি, তবে---হবে, হবে, হবেই জয়। হাসি ফুটবে তাঁর মুখে। অন্তর্যামী পরমপিতার পরম করুণার প্রস্রবনের অমৃত ধারায় স্নাত হয়ে ভাল থাকবেন।
‘বিধি-বিন্যাস’ গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত পরমপিতার স্তবগাঁথা দিয়ে ইতি টানলাম। “হে পূণ্য! পরাক্রান্ত! পরাৎপর! প্রচণ্ড মার্ত্তণ্ডবরেণ্য! এক! অদ্বিতীয়! তোমারই বিনিষ্কাষিত কিরণবীচি তাপন প্রতিক্রিয়ায় অযুত জ্যোতিষ্কের সৃষ্টি করেছে; বৈধী মিতিচলনে চলেছে তা’রা তোমারই প্রাণদ গতিপথে বোধি-বিজৃম্ভী বিসৃষ্ট পরাক্রমে সৃজন-সম্বেগে– দৃপ্ত জীবনের অদম্য আবেগে,– নভোমণ্ডলে সজ্জিত স্থালীর স্থল-সর্জ্জনে দ্যৌঃ ও পৃথিবীর জীবন-দীপালি সজ্জিত করে নাদ নিক্কণে — অভ্যুদয়ী, আরুদ্র পরিক্রমায়;– তোমাতেই আমার অযুত নমস্কার!” —বন্দে পুরুষোত্তমম্ ! জয়গুরু ! প্রণাম !
** শিবরাত্রির শ্রদ্ধার্ঘ্য ** ।। আমাদের শিব-আরাধনা।।
ওঁ নমঃ শিবায় শান্তায় কারণত্রয় হেতবে। নিবেদয়ামি চাত্মানং ত্বং গতি পরমেশ্বর।। সত্যম্-শিবম্-সুন্দরম্। সত্যই শিব, শিবই সুন্দর। সত্য মানে অস্তিত্ব। পরিবেশের সব অস্তিত্বের পালন-পোষণ করে এই সুন্দর পৃথিবীর সুন্দরত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার বাস্তব প্রক্রিয়ার নাম শিবপূজা। পূজা মানে সম্বর্দ্ধনা—সম্যকরূপে বর্দ্ধনার পথে চলা। শিব একাধারে সার্থক যোগী, সন্ন্যাসী, নটরাজ। আবার গৃহস্থরূপে দেবী পার্বতীর স্বামী। গণেশ এবং কার্তিক দুই পুত্রের পিতা। সে-সব দিকগুলো বিচার করে শিবকে যোগ, ধ্যান ও শিল্পকলার দেবতা মনে করা হয়। কিছু গবেষণায় জানা যায় শিব নাকি চিকিৎসা বিদ্যার জনক ছিলেন। সেইজন্য বোধহয় বৈদ্যনাথ বলা হয়। তিনি কৃষিবিদ্যার আবিষ্কারকও ছিলেন। নট-নটীরা শিবকে নটরাজ বলে পূজা করেন। রামায়ণে বর্ণিত, সংস্কৃতে রচিত শিব-বন্দনার ‘তাণ্ডব-স্তোত্র’ আর্য্যকৃষ্টিতে বন্দিত। পরমপুরুষ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর ভাববাণীতে বলেছেন।—‘‘তাণ্ডব-স্তোত্র মুখস্থ করিস্, এ্যাজমা সারবে।’’ শিবের পূজা বা আরাধনার নিমিত্ত যতগুলো প্রতিষ্ঠিত মন্দির রয়েছে, সে-সব মন্দিরগুলোতে শিবলিঙ্গকেই পূজা করা হয়। শিবলিঙ্গ সৃষ্টির বিষয়ে শাস্ত্রগুলোতে নানা মতভেদ রয়েছে। সবগুলোতেই রিংরসার নীলজল মেশানো আছে। সেগুলো থেকে নারদ পঞ্চরাত্রে বর্ণিত কাহিনী যেন একটু ফিকে, গ্রহণযোগ্য। নারদ পঞ্চরাত্র মতে শিব-পার্বতির প্রথম মিলনের সম্মিলিত তেজ থেকে উৎপন্ন হয় শিবলিঙ্গ। শিবলিঙ্গ-এর বেষ্টনীকে বলে গৌরীপট্ট। গৌরীপট্ট শিবলিঙ্গের আধার, জগতের যোনি। যোনি-সম্ভূত সৃষ্টি প্রকরণের প্রতীক হিসেবে মানা হয় শিবলিঙ্গকে। এর অন্তর্নিহিত অর্থ, পুরুষেরা শিবলিঙ্গকে প্রতীক রূপে মেনে, শিবের ন্যায় আদর্শ পিতা হবার নিমিত্ত তাদের প্রজন্ম সৃষ্টির উপাঙ্গ জননেন্দ্রিয়কে ব্যবহার করবেন, অর্থাৎ বৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে সংযমী হবেন। আর নারীরা গৌরীপট্টকে প্রতীক রূপে মেনে, গৌরীর ন্যায় আদর্শ মাতা হবার নিমিত্ত প্রজন্ম সৃষ্টির উপাঙ্গ জননেন্দ্রিয়কে ব্যবহার করবেন। অর্থাৎ মাতা পার্বতীর ন্যায় সতীত্বকে আরাধনা করবেন। এই বিজ্ঞান ঋষি বাৎস্যায়নের কামসূত্রে বর্ণিত হয়েছে। পুরুষ ও নারীকে চারটি শ্রেণিতে উল্লেখ করে। আমাদের ভারতীয় আধ্যাত্মবাদের সাথে শিব অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামেও একটা না একটা শিবমন্দির দেখা যায়। যারা দৈনন্দিন জীবনে আর্য্যকৃষ্টির নিত্যকর্ম পদ্ধতির সদাচার, বর্ণাশ্রমধর্ম পালনে অভ্যস্ত নয়, তারাও সোমবার, শ্রাবণ মাস, চৈত্র মাস-এর পার্বনের দিনগুলোতে শিবলিঙ্গে ফুল-জল-বেলপাতা দিয়ে তথাকথিত পুজো করেন। শ্রাবণ মাস শিবের জন্মমাস হিসেবে পালন করেন অনেক ভক্ত। বাঁকে করে জল নিয়ে প্রতিষ্ঠিত শিবমন্দিরগুলোতে গিয়ে অনেক কসরৎ করে শিবলিঙ্গে জল ঢালতে যান। তাদের সেবা করার জন্য রাস্তার ধারে ধারে প্যাণ্ডেল করে, তারস্বরে মাইক বাজানো হয়। অনেক সাধকেরা আবার ‘ভোলে-ব্যোম’ ধ্বনি দিয়ে গঞ্জিকা, ভাঙ্-এর মৌতাতে শিবত্ব লাভ করতে চান। টিভি সিরিয়ালগুলোতেও শিবকে সিদ্ধিখোর, গাঁজাখোর হিসেবে তুলে ধরা হয়। শিব ছিলেন একজন পরমবৈষ্ণব, সিদ্ধ-পুরুষ, তাঁকে সিদ্ধিখোর, গাঁজাখোর না বানালেই কি চলছিল না! তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া চলে আমাদের হিন্দু নারীদের শিবরাত্রির উপবাসকে। শুনেছি অনূঢ়া বা কুমারী মেয়েরা শিবের মতো স্বামী পাবার আশায় (অবশ্য বাস্তবে আমাদের কল্পনার শিবের মত,—বাঘছাল পরে, গলায় সাপ জড়িয়ে, ষণ্ডের পিঠে চেপে, কোন পুরুষ যদি স্বামীরূপে উপস্থিত হয়, তখন কি হবে?), কুমার পুরুষেরা (যদিও সংখ্যায় অনেক কম) গৌরীর মতো স্ত্রী লাভের আশায় শিবরাত্রির উপবাস করেন। অথচ বাস্তবে শিব পূজার সাথে সম্পৃক্ত “গৌরী দান” প্রথা ব্রাত্য। শৈব উপাসকগণ ব্রাত্য করে রাখলেও বিবাহিতা গৌরীরূপী নারীরা কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীর ন্যায় সন্তান লাভ করে সুখে-শান্তিতে ঘর-সংসার করার আশায় শিবরাত্রির উপবাস করেন। এবার আমরা এর বাস্তব দিকটা বোঝার চেষ্টা করব। যে যতই কৃতিত্বের অধিকারী হোক না কেন, বাস্তব জীবনে একটা নারী, তার সমবিপরীত সত্তার উপযুক্ত বরিষ্ঠ পুরুষকে পতিত্বে বরণ করে আদর্শ বধূ হতে চায়। সেই পুরুষটি নারীর তুলনায় বর্ণে, বংশে, বয়সে, স্বাস্থ্যে, শিক্ষায়, স্বভাব, অভ্যাস, ব্যবহারে শিবের ন্যায় বরেণ্য হলেই সার্থক হবে শিব পূজা। আবার সেই বধূ, স্বামীর মনোবৃত্ত্যানুসারিণী হলে স্ত্রী নামের অধিকারিণী হবে। সব স্ত্রীই চান তাঁদের আরাধ্য দেবতা শিবের পুত্র ও কন্যার ন্যায় তাঁদের সন্তান জন্ম গ্রহণ করুক। ভারতীয় আদর্শ অনুযায়ী গর্ভাধান সংস্কারের মাধ্যমে স্বামীকে দেবতা জ্ঞানে আরাধনা করে সন্তান লাভ করতে হয়। স্বামীর কাছ থেকে লব্ধ স্ত্রীর ভাব সন্তানে মূর্ত্ত হয়। স্বামী নামের পুরুষটি স্ত্রীর মাধ্যমে নিজেকে জন্মান বলে স্ত্রী, স্বামীর চিন্ময়ী মা রূপে সম্মানিত। তাই শাস্ত্রমতে স্ত্রীকে জায়া বলে । সন্তান মানে স্বামী এবং স্ত্রীর সমতান । আর মা মানে মেপে দেওয়া । বীজকে সঠিক রূপ দিতে যেমন মেপে মেপে সঠিক পদ্ধতিতে জমি প্রস্তুত করতে হয় তেমনি স্ত্রীকেও ভাল সন্তান গর্ভে ধারণ করতে গর্ভাধান সংস্কারে সংস্কৃত হতে হয় । সাত্তিকতায় গর্ভ পরিচর্যা করার সংস্কার পালন করতে হয় । তাহলে আর গর্ভকালীন এবং প্রসবকালীন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় না । টবে একটা ফুলগাছ লাগাতে গেলে যে পরিকল্পনা করতে হয় যতটুকু প্রযত্ন নিতে হয় সেটুকুও যদি উপেক্ষিত হয় মা হবার ক্ষেত্রে তাহলে তো সমস্যার সম্মুখীন হতেই হবে । উনো জমিতেই ভাল ফসল ফলে বুনো জমিতে নয় ! এই হচ্ছে শিবপূজার বাস্তব তাৎপর্য। একটি মেয়ে মাতা পার্বতীর ন্যায় তাঁর সতীত্বের সাধনার ডালি সাজিয়ে শিবের ন্যায় শ্রেষ্ঠ যোগী পুরুষকে স্বামীত্বে বরণ করে শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মা হবে। এই প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র মায়েদের উদ্দেশ্যে বলেছেন :— “সতীর তেজে ঝলসে দে মা নিঠুর কঠোর অন্ধকারে মদনভস্ম বহ্নিরাগে বৃত্তি-রিপু দে ছারখারে । প্রণবতালে ইষ্টমন্ত্র ঝঙ্কারি তোল সকলতন্ত্রে বিষাণ হাঁকে রুদ্র দোলায় বজ্রে হানি মৃত্যুদ্বারে ।” * * * আমরা যে শিবলিঙ্গ পূজা করি সেটাকে বলে সিম্বোলিক অর্ধ-নারীশ্বর প্রতীক। গৌরীপট্ট দ্বারা বেষ্টিত শিবলিঙ্গ। একজন নারী গৌরীর ন্যায় সাধ্বীমাতা, একজন পুরুষ শিবের ন্যায় সাধক পিতা হয়ে সুসন্তানের জনক-জননী হতে পারলেই আমাদের শিবপূজা সার্থক হবে। শুধু নির্দিষ্ট দিনের জন্য, মাসের জন্য, শিবমন্দিরে শিবমন্দিরে এই শিব আরাধনা সীমাবদ্ধ নয়, এ আমাদের জীবনের নিত্য সাধনা—শিবশক্তিকে দেহমন্দিরে প্রতিষ্ঠা করে, স্থাপন করে, সত্য, শিব এবং সুন্দরকে প্রতিনিয়ত আস্বাদন করা। ওই আশাগুলোকে পূরণ করতে হলে শুধুমাত্র শিবরাত্রির উপবাস করলেই তো আর হবে না। উপ মানে নিকটে, বাস মানে অবস্থান। শিব-পার্বতীর আদর্শে নিত্য অবস্থান করতে হবে। আর সেজন্য সদগুরু গ্রহণ করতে হবে। শাস্ত্রানুসারে গুরু গ্রহণ না করা পর্যন্ত কোন দেবদেবীর পূজা করার অধিকার জন্মায় না। পুরাণ অনুসারে গিরিরাজ দুহিতা উমা ছোটবেলা থেকেই ভক্তিমতী। শিবের ভক্ত। পণ করেছেন, শিবকে ছাড়া অন্য কাউকেই বিয়ে করবেন না। বাবা-মা-পরিজনেরা কত করে বোঝাল, শিবকে বিয়ে করলে আর কষ্টের শেষ শেষ থাকবে না। বাপের বয়সী, কাজকর্ম করে না। নারায়ণের ভুতের বেগার খেটে মরে। (অর্থাৎ, নারায়ণী-বার্তা যাজন করে প্রাণী নামক ভুতদের উন্নয়ন করে বেড়ান।) তথাপি উমা কিন্তু কারোর কথায় কান না দিয়ে, সৎ-স্বভাবে পরান পাগল, জ্ঞানবৃদ্ধ, বয়োবৃদ্ধ শিবকেই পতিত্বে বরণ করেন।
উমা বা পার্বতী, স্বামীকে মাথায়, অর্থাৎ জীবনের কেন্দ্রে রেখে, স্বামীর মনোবৃত্ত্যানুসারিনী স্ত্রী হয়ে সুসন্তানের মা হয়েছেন, মা হয়েছেন আমাদের, জগতের। উমা-মাকে আমরা দেবীর চাইতে অনেকটা বেশি করে ঘরের মেয়ে হিসেবে বরণ করে নিয়েছি। এই মর্ত্ত্যধামের প্রতিটি ঘর তাঁর বাপের বাড়ি। তাই বাস্তব জীবন-চলনায় যদি শিব-গৌরীর ন্যায় আমাদের ভালোবাসার পবিত্র দাম্পত্যের পূজা-জাত কন্যারূপী সন্তানটিকে উমার মত করে, পুত্ররূপী সন্তানটিকে শিবের মত করে সৃষ্টি করতে পারি, তা হলেই তো ষোল-কলায় পূর্ণ হবে আমাদের শিব আরাধনা। tapanspr@gmail.com
*** VALENTINE SPECIAL ****।। ‘প্রেম’ ব্যাপারটা কি ।।
আমরা কথাবার্তায় প্রেম-পূজারী হলেও, বিশ্ব প্রেমদিবস উদযাপন করলেও, বাস্তবে কিন্তু প্রেমের বিপরীত চিত্রটাই কানে-চোখে ধরা দেয়! টিভিতে সংবাদ দেখতে গেলেই বেশিরভাগই হিংসার সংবাদ দেখতে পাওয়া যায়। রাজনৈতিক নেতারা, যারা নিজেদের দেশসেবক ভাবেন, তারা যদি একটু প্রেমিক হতেন, জনগণকে প্রকৃতই ভালোবাসতেন, তাহলে নির্বাচনের ন্যায় একটা সহজ-সরল বিষয়ে হিংসার চাষ হতে দিতেন না, হিংসার নিরসন করতে সচেষ্ট হতেন। ভোট করাতে পুলিশ, আধাসেনার প্রয়োজন হতো না। স্বভাবতই একটা প্রশ্ন জাগে, এত হিংসা কেন? এর কারণ কি? সমাজতত্ত্ববিদেরা, মনস্তত্ববিদেরা কি বলবেন জানি না, তবে, হিংসার কারণ সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন, “অহঙ্কার আসক্তি এনে দেয় ; আসক্তি এনে দেয় স্বার্থবুদ্ধি ; স্বার্থবুদ্ধি আনে কাম; কাম হতেই ক্রোধের উৎপত্তি; আর, ক্রোধ থেকেই আসে হিংসা।” হিংসা ভুলে যা’রা প্রেম নিয়ে চর্চা করছেন, প্রেম দিবস পালন করছেন, তাদের শ্রদ্ধা জানাতেই হয়। সেই প্রেমের উৎস সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলছেন, “ভক্তি এনে দেয় জ্ঞান; জ্ঞানেই সৰ্ব্বভূতে আত্মবােধ হয় ; সর্বভূতে আত্মবােধ হলেই আসে অহিংসা; আর, অহিংসা হতেই প্রেম। তুমি যতটুকু যে-কোন একটির অধিকারী হবে, ততটুকু সমস্তগুলির অধিকারী হবে।” কিন্তু বাস্তবে, ভারতীয় সংস্কৃতির শব্দ-ভাণ্ডারের ‘প্রেম’ শব্দটিকে বোধহয় সবচাইতে বেশি অপমানিত হতে হচ্ছে অপব্যবহারের জন্য। বহুল ব্যবহৃত ওই শব্দটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারী-পুরুষের যৌন আকর্ষণের পরিচয়-জ্ঞাপক। শিক্ষাঙ্গনে, টিভি-সিনেমা কালচারে, সাহিত্যে ‘প্রেম’ শব্দটি ‘love’-এর পরিবর্তে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ‘lust’ পরিচয় বহন করে চলেছে। এটা সভ্যতার পক্ষে গৌরবের নয়। প্রীতি বিতরণ, প্রীতি উৎপাদন করে যা’ তাই প্রেম। জীবনকে প্রীত করে যে সম্পর্ক, তাকে বলা চলে প্রেমের সম্পর্ক। চৈতন্য মহাপ্রভু প্রেমকে পুরুষার্থের পঞ্চমবর্গ রূপে অভিহিত করেছেন।আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা তারে বলি কাম।কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা ধরে প্রেম নাম।।বিবেকানন্দও জীবের প্রতি প্রীতিজনক আচরণকে প্রেম আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’ আজ সর্বজনবিদিত। লেখাপড়া জানা মানুষ যখন বলে, ‘প্রেম করে বিয়ে করে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল।’—তখন কি প্রেম বিচ্ছেদের প্রতীক স্বরূপ চিহ্নিত হয়ে গেল না! প্রেম করে বিয়ে করার পর স্বামী-স্ত্রী ডিভোর্স নিয়ে আলাদা হবে। সন্তান বঞ্চিত হবে মা-বাবার প্রেম থেকে। সন্তানের প্রেমে বঞ্চিত হয়ে বৃদ্ধাশ্রমে মা-বাবা অশ্রুপাত করবে। আর আমরা প্রচার মাধ্যমে সেক্সি সেলিব্রিটিদের দিয়ে ‘বিশ্ব প্রেমদিবস’ উদযাপন করব সাড়ম্বরে, ওদিকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ নিপাত যাক’ শ্লোগানে পার্টি-রাজনীতি হবে সমৃদ্ধ! বাঃ! বাঃ! ‘সত্য সেলুকস, কি বিচিত্র এই দেশ!’ যাকগে, আমাদের আদর্শ পুরুষ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, শুধুমাত্র মানুষের নয়, একটা পিঁপড়ারও ব্যথা নিরাকরণ করে প্রেমের প্রদর্শন করতে বলেছেন। আর তা’ যদি না করি, তাহলে আমার চাইতে হীন আর কেউ নেই! এমন প্রেমের জয়গান গাইতে হবে আমাদের। সবাইকে জয়গুরু ও প্রণাম। বন্দে পুরুষোত্তমম্!