Featured

যোগীর সাথে যোগাযোগ

যোগীর সাথে যোগাযোগ : ‘‘যোগাৎ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধ’’                                                           –তপন দাস

বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, “যোগী মানেই বুঝবেন—যে যুক্ত, যার যোগ আছে অর্থাৎ কিছু বা কাহাতেও টান আছে,—এক-কথায় আসক্ত, কোন-কিছু বা কাহাতেও আসক্ত।  আসক্তি থাকলে ভাবা, করা, কওয়ায় মানুষের যেমন-যেমন যা’-যা’ হয়, তাই করাই হচ্ছে যোগী বা যুক্ত বা অনুরক্ত মানুষের লক্ষণ। ……তাই, শাস্ত্রে যেখানেই যোগ বলে কথা আছে সেখানেই বুঝতে হবে, সে-কথা বাস্তব কিছুতে যুক্ত হওয়ারই কথা। আর, এই যোগ হলেই মানুষের চিত্তবৃত্তিনিরোধ হতে সুরু করে, কারণ, যাতে আমার টান যত বেশী, আমার সাধারণ প্রবৃত্তিই হয় আমার সমস্ত বৃত্তি দিয়ে তাকে উপভোগ করি—আর তার বাধা যেগুলি, সেগুলিকে এমনতরভাবে বিনিয়ে আমার এই উপভোগের পথের কোনরকম বাধা না সৃষ্টি করে বরং তার সাহায্য করে এমনতরভাবে নিয়ন্ত্রিত করতে একটা স্বতঃ-উৎসারিত ঝোঁক আমাদের থাকেই। তাই শাস্ত্রে আছে “যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ’’। (কথাপ্রসঙ্গে, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৩)

      আধ্যাত্মিক চেতনায় একনিষ্ঠ না হলে যোগের সাথে নিত্য-যুক্ত থাকা যায় না। সে বিষয়েও শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের সচেতন করার জন্য বললেন, ‘‘গীতায় আছে, ‘তেষাং জ্ঞানী নিত্যযুক্ত একভক্তির্বিশিষ্যতে’………একভক্তি না হলে হবে না । পঁচিশ ঠাকুর করলেই মুস্কিল, বহু-নৈষ্ঠিক যারা তাদের জীবনে কোন সঙ্গতি থাকে না, তারা আস্তে আস্তে পাগলাটে হয়ে ওঠে । বহু-নৈষ্ঠিক মানে মূলতঃ তার কিছুতেই নিষ্ঠা নেই, নিষ্ঠা আছে রকমারি প্রবৃত্তি-স্বার্থে, তাই আত্মনিয়ন্ত্রণ বলে জিনিসটা তাদের জীবনে ঘটে ওঠে না, ফলে অভিজ্ঞতা বা জ্ঞানের উন্মেষ হয় না । ভক্তি ছাড়া, একানুরক্তি ছাড়া জ্ঞান ফোটে না । …..একভক্তি যার আছে… তার জ্ঞানের নাড়ী হয় টনটনে । কথায় বলে প্রহ্লাদমার্কা ছেলে. ……আগুনে, জলে, পাহাড়ে, পর্ব্বতে, অন্তরীক্ষে কোথাও ডরায় না ।…. তাই ভক্তির চাইতে বড় কামনার বস্তু আর নেই  ……।’’ ( আ. প্র. ২য় খন্ড, ২০. ১২. ১৯৪১)

      নিজেকে যোগযুক্ত রাখতে  শ্রীশ্রীঠাকুর সর্বদা সচেতন থাকতেন।  একদিন একটা সুপুরীর টুকরো মুখে দিতে গিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে নীচে পড়ে যায়। ঠাকুর খাট থেকে নেমে সুপুরীর টুকরোটাকে খুঁজে পিকদানিতে ফেলে হাত ধুয়ে খাটে উঠে বসেন।   আর একটা সুপুরীর টুকরো মুখে দেন। সামান্য এক টুকরো সুপুরী, তা-ও আবার খুঁজে নিয়ে ফেলে দিলেন। এই সামান্য কাজটা তো যে কেউ করতে পারত, তার জন্য  খাট থেকে নেমে কষ্ট করে সুপুরী খুঁজতে গিয়ে  অমূল্য সময় নষ্ট করার পেছনে কোন লাভজনক যুক্তির খোঁজ না পেয়ে উপস্থিত যুক্তিবাদীরা অনুযোগ করলে ঠাকুর বলেছিলেন, তোমাদের হিসাবে  আমি বেকুব, আমার হিসাবে আমি কিন্তু চালাক।   আমার হাতের সাথে মুখের স্নায়বিক যোগসূত্র ছিন্ন হবার ফলে আমি যোগভ্রষ্ট হই, সুপুরীটা নীচে পড়ে যায়। প্রারব্ধ কর্মফলে ওই অপারগতা যাতে যোগ না হয় তাই একটু সময় নষ্ট করে নিজের ত্রুটি নিজেই সংশোধন করে নিলাম।    

      যোগ বোঝাতে গিয়ে ঠাকুর একদিন   গল্পচ্ছলে বলেছিলেন, এক গোয়ালার অনেকগুলো গোরু ছিল। ওই গোরুগুলোর দুধ এবং দুগ্ধজাত ছানা, দৈ, ঘোল, মাখন, ঘি নিজেরা খেত, পাড়াপড়শীদেরও দিত। গোয়ালার বয়স হওয়াতে ছেলেকে একদিন একটা পাঁচন হাতে দিয়ে গোরু চরাবার ভার দেয়। ছেলে মাঠে নিয়ে গোরুগুলোকে চরতে দিয়ে দেখল, একটা পাঁচনের লাঠি দিয়ে কিছুতেই গোরুগুলোকে বাগে আনতে পারছে না। এদিক-ওদিক চলে যাচ্ছে। তাই সে ভাবল, একটা পাঁচন দিয়ে সব গোরু সামলানো যাবে না। সে তখন  একমনে এক-একটা গোরুর জন্য আলাদা আলাদা পাঁচন বানাতে শুরু করলো। পাঁচন বানানো শেষ করে গোরু সামলাতে গিয়ে দেখে নির্দিষ্ট স্থানের কাছাকাছি গোরুগুলো নেই, চরতে চরতে অনেক দূরে দূরে জঙ্গলে চলে গেছে। ওদিকে বেলা গড়িয়ে গোধূলি-প্রায়। ছেলে নিরুপায় হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে গিয়ে সব কথা খুলে বললে বাবা কোন তিরস্কার না করে ছেলেকে বুঝিয়ে বলেন, “বাপু, এক পাঁচনেই লাখ গোরু ঠেকানো যায়। যার যেমন দরকার, তেমনতর ঠক্কর মারলেই তো হয় ! তোমার এই অতিবুদ্ধি সব বেসামাল করে ফেলেছে।’’ (কথাপ্রসঙ্গে, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৪) অবশেষে বাবার কাছ থেকে গোরুর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী  ঠক্কর মারার কায়দা শিখে ওই এক পাঁচনের সাহায্যেই গোরুগুলোকে বাগে আনতে শিখে যায়।

      ওই ঠোক্কর মারার কায়দা যিনি শেখাতে পারেন তিনিই ঠাকুর, তিনিই যোগসিদ্ধ গুরু। যোগসিদ্ধ গুরুর কাছ থেকে কাকে, কখন, কতটুকু ঠোক্কর কিভাবে মারতে হবে সেই কায়দা একবার শিখে নিতে পারলে আমাদের বিশৃঙ্খল ইন্দ্রিয়গুলোকে একমুখী আসক্তির সাথে যুক্ত করে যোগ-কে উপলব্ধি করা যায়। তাহলে পালের গোরুগুলো পালেই থাকবে, বেশী কায়দা করতে গেলে গোরুগুলো পালছাড়া হয়ে যাবে।

      যোগসিদ্ধ গুরু শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর নিত্যলীলায় যোগশাস্ত্রে বর্ণিত আসন-মুদ্রাদি তিনি কোন কালেই অভ্যাস করেন নি। তিনি ছোটবেলা থেকেই নামধ্যান করতেন। তিনি তাঁর ভাগবত আন্দোলন কীর্তন দিয়ে শুরু করেছিলেন। কীর্তন করতে করতে সমাধিস্থ হতেন। সেই সময় যোগশাস্ত্রে বর্ণিত সকল ধরণের আসন-মুদ্রাদি অবলীলায় করতেন। তিনি কীর্তনের মাধ্যমে অনেকানেক পালছাড়াদের পালে ভেড়ালেন। তারা আবার যাতে পালছাড়া না হয়ে পড়ে তারজন্য কাজে মাতিয়ে দিয়ে গড়ে তুললেন ভারতীয় আর্য্য ভাবধারার নিদর্শন স্বরূপ এক আদর্শ প্রতীকী রাষ্ট্র—হিমাইতপুর সত্সঙ্গ আশ্রমে। ব্যক্তি, দম্পতি, গৃহ, সমাজ ও রাষ্ট্র জীবনকে শুদ্ধ-বুদ্ধ-পবিত্র করে এক যোগে বাধতে দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ, কৃষি ও শিল্পের নবীকরণ করলেন। 

      শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাগবত আন্দোলনের কীর্তনযুগের সাধকেরা কীর্তনের এবং নামের শক্তি সঞ্চারণা করে রোগ-শোক-ব্যাধি-জরা-য় জর্জরিত, প্রবৃত্তি-পীড়িত মানুষদের স্বাভাবিক জীবনে অধিষ্ঠিত করে অমৃতের সন্ধান দিয়েছিলেন। অনুরূপভাবে তাণ্ডবনৃত্যে কীর্তন, আর নিয়ম করে নামধ্যান করতে পারলে নিজেকে এবং পরিবেশকে সবদিক দিয়ে যে সুস্থ রাখা সম্ভব, তা বলাই বাহল্য। 

      জীবাত্মাকে পরমাত্মার সাথে প্রতিনিয়ত যোগযুক্ত রাখতে শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর অনুগামীদের একটা ছোট্ট নিদেশ-বাণীতে সব বুঝিয়ে দিলেন।

      ঊষা-নিশায় মন্ত্রসাধন

            চলাফেরায় জপ

      যথাসময়ে ইষ্টনিদেশ

            মূর্ত্ত করাই তপ।

      মন্ত্র সাধনের জন্য সকাল-সন্ধ্যায় নিয়ম করে ধ্যানাভ্যাস করা। প্রতিবার ধ্যানান্তে ‘আমি অক্রোধী, আমি অমানী’ ইত্যাদি স্বতঃ-অনুজ্ঞার অর্থগুলোকে আয়ত্ত করতে পারলে প্রবৃত্তির নিগ্রহ থেকে সহজেই মুক্তি লাভ করা যায়। ধ্যান করার পর দিগন্তের দিকে, সবুজের দিকে তাকালে চক্ষুর দৃষ্টি ভাল থাকে। চলাফেরায়, কাজেকর্মে, শয়নে-স্বপনে ইষ্টে অনুরাগ সমন্বিত হ’য়ে নামজপ করার অভ্যাসে পরমাত্মিক শক্তির স্বারূপ্য লাভ হয়। নিয়মিত শবাসন করলে হৃদরোগ হবার আশঙ্কা থাকে না। নিয়মিত থানকুনি পাতা খেলে শরীর বিধানের রেচনক্রিয়া সুস্থ থাকে। সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার, মাসান্তে কমকরে একটি দিন, হবিষ্যান্ন গ্রহণ, পাতিত্য কর্ম থেকে ত্রাণ পেতে শিশু প্রাজাপত্য, প্রাজাপত্য এবং মহাসান্তপন ব্রত পালনে শরীর-মনের অসঙ্গতি দূর হয়, শরীর নিরোগ থাকে।

      নাম জপ করা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন—নাম করলে অনেক সময় জ্বর কমেও যায়। কারণ, ব্যাকটেরিয়াগুলি পুড়ে যায়। রোগীর শরীর ছুঁয়ে নাম করলে তাতেও রোগ ভাল হয়। ঐ জন্য কুষ্টিয়াতে একটা দালানে ত্রিশটা bed (শয্যা) ছিল। রাধারমণ প্রভৃতি ছিল। রোগী আসলে শুশ্রূষা করত, ছুঁয়ে নাম করত। ডবল নিউমোনিয়া ৩/৪ দিনে, এমনকি রাতারাতি সেরে যেত।
                                              (সুত্র—আলোচনা প্রসঙ্গে ১৮ খণ্ড)

আমাদের আর্য্যহিন্দু-শাস্ত্র এবং যোগশাস্ত্র অনুসারে সূর্যোদয়ের পর শয্যাত্যাগ করলে পাতিত্যদোষে দুষ্ট হতে হয়। এবং প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ উপবাসী থাকার নিদেশ দেওয়া আছে। শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের ওই পাতিত্যদোষ থেকে মুক্ত করে নিয়ত যোগযুক্ত রাখতে দিনচর্যার এক সহজ নিদেশ দিলেন অনুশ্রুতি গ্রন্থের বাণীতে। 

      ঊষার রাগে উঠবি জেগে শৌচে শীতল হবি,

      সন্ধ্যা–আহ্নিক জপ সাধনায় ঈশের আশিস লবি।

      কুতুহলে পড়শি ঘুরে দেখবি সযতনে,

      আছে কেমন কোথায় কে জন মন দিবি রক্ষণে।

      তারপরেতে বাড়ী এসে শৌচে যথাযথ,

      গৃহস্হালীর উন্নয়নী অর্জ্জনে হ’ রত।

      স্নানটি সেরে আহ্নিক করে ক্ষুধামতন খাবি,

      একটু চলে বিশ্রাম নিয়ে আগুয়ানে ধাবি।

      এমনি তালে সচল চালে চলে সন্ধা এলে,

      শৌচে শুদ্ধ হয়ে করিস আহ্নিক হৃদয় ঢেলে।

      উন্নয়নের আমন্ত্রনী গল্প-গুজব শীলে,

      হৃষ্টমনে আলোচনায় কাটাস সবাই মিলে।

      পড়শী দিগের অভাব-নালিশ থাকেই যদি কিছু,

      তার সমাধান যেমন পারিস করিস লেগে পিছু।

      করন-চলন ধরন-ধারন যজন যাজন কিবা,

      সকল কাজেই ইষ্টস্বার্থে চলিস রাত্রি-দিবা।

      আদর-সোহাগ উদ্দীপনী কথায় কাজে ঝুঁকে,

      স্বার্থ-কেন্দ্র সবার হবি ধরবি ইষ্টমুখে।

      বিশ্রামেরই সময় গা-টি ঘুমল হয়ে এলে,

      ইষ্ট-চলন মনন নিয়ে ঘুমে গা দিস ঢেলে।

      (অনুশ্রুতি গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)

      শ্রীশ্রীঠাকুর আহ্বানীসহ পূর্ণাঙ্গ প্রার্থনা মন্ত্রে আচমন, বাংলা সমবেত প্রার্থনা ও বাংলা সমবেত প্রার্থনার অবশিষ্টাংশ সন্দর্ভে কতগুলো সহজ আসন এবং প্রাণায়ামের নিদেশ রেখে গেছেন। সেই নিদেশ মেনে আমরা যদি সঠিক অনুশীলন করতে পারি তাহলে সহজ-যোগে ব্যাধিমুক্ত হয়ে পরমাত্মার সাথে যোগযুক্ত থাকতে পারব।  (দ্রঃ ঋত্বিগাচার্য্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য প্রণীত অনুসৃতি, যতি-ঋত্বিক শ্রীশরত্চন্দ্র হালদার প্রণীত যুগবাণী এবং সত্সঙ্গ পাব্লিশিং কর্তৃক প্রকাশিত প্রার্থনা শিরোনামের গ্রন্থাবলী।)

      শ্রীশ্রীঠাকুরের এক অনন্য দৈবী অবদানের নাম ইষ্টভৃতি। ইষ্টের প্রীতির জন্য কাউকে পীড়িত না করে, নিজে পীড়িত না হয়ে, বর্ণানুগ কর্মের সেবার মাধ্যমে, বৃহত্তর পরিবেশে, ঘটে ঘটে ইষ্ট স্ফূরণের বা মঙ্গল প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত থাকার বিনিময়ে অযাচিত প্রাপ্ত অর্থ বা সম্পদকে বলা হয়েছে অনুগ্রহ অবদান । ওই অনুগ্রহ অবদানকে ঠাকুর ‘দিন গুজরানী আয়’ অভিধায় ভূষিত করেছেন। ওই ‘দিন গুজরানী আয়’-এর অগ্রভাগ প্রতিদিন পানাহার করার পূর্বে ইষ্ট-নীতি ভরণের শপথ করে নিবেদন করার নাম ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ। যা নিখুঁতভাবে পালন করলে শরীর-মন-আত্মার অসঙ্গতি দূর হয়। আর্য্যকৃষ্টির সদাচার এবং বর্ণাশ্রম ধর্ম রক্ষিত হয়।

      শ্রীশ্রীঠাকুরের  আর একটি অনন্য দৈবী অবদানের নাম স্বস্ত্যয়নী ব্রত। প্রবৃত্তির সব বিপাক এবং গঞ্জনা থেকে মুক্ত করে আমাদের স্মৃতিবাহী চেতনায় সমৃদ্ধ রাখতে প্রবর্তন করলেন পঞ্চনীতি সমন্বিত স্বস্ত্যয়নী ব্রতের। জড়-পদার্থে নির্মিত মন্দিরের পরিবর্তে নিজ-নিজ দেহটাকেই শ্রীবিগ্রহ মন্দির জ্ঞানে পবিত্রতার সাথে রক্ষা করতে নিদেশ দিয়েছেন এই ব্রতের মাধ্যমে, যেহেতু এই দেহের মধ্যেই রয়েছে পরমাত্মার আবাসস্থল। ভোগ, দুর্ভোগ, উপভোগ, মুক্তি, পরামুক্তি, পরাগতি সবকিছুই এই দেহের মধ্যেই। যা নাই ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে এই দেহভাণ্ডে।  আমাদের আর্য্য শাস্ত্রাদিতেও একথার উল্লেখ রয়েছে। শ্রীশ্রীঠাকুর জীবাত্মার মধ্যে সুপ্ত পরমাত্মাকে জাগাতে বলেছেন নামের মাধ্যমে। ৫টি কর্মেন্দ্রিয়, ৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয়, মন, বিবেক, জীবাত্মা, পরমাত্মাদির সমন্বয়ে সৃষ্টি এই দেহমন্দিরকে পবিত্র রাখার, সুস্থ-স্বস্থ রাখার ভাগবত-বিধির পালন-পদ্ধতি সহজভাবে বিধায়িত করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর এই ব্রতের মাধ্যমে।  

      শ্র্রীশ্র্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রবর্তিত যজন, যাজন, ইষ্টভৃতি, স্বস্ত্যয়নী, সদাচারাদি নিখুঁতভাবে পালন করার নাম ইষ্টকর্ম। ইষ্টকর্ম ব্যতীত কর্ম অনিষ্টকর্ম। সেই ইষ্টকর্মে যুক্ত থাকলে সহজেই যোগসিদ্ধ হওয়া যায়।  

      কাম-আবেশে স্ত্রী-পুরুষে

            যেমন করে উপভোগ,

      ইষ্টকাজে বাস্তবতায়

            তেমনি হলে তবেই য়োগ। 

      সব প্রবৃত্তি রত থাকে

      ইষ্টকর্ম লয়ে,

      সেই তো যোগী, সে-ই সন্ন্যাসী

      কাল নত যার ভয়ে।

      কালাধীশ ঠাকুরের চাহিদামত ইষ্টকর্ম করে একবার যোগী হতে পারলে চিরতরে নিশ্চিন্ত, কালের কবলে পড়ে ভীত হতে হবে না, কাল হবে যোগীর অধীন।

      পরিশেষে জীবনপিয়াসী মানুষদের কাছে, ইষ্টপ্রাণ দাদা ও মায়েদের কাছে পরমপিতার এই দীন সন্তানের কাতর আবেদন, আমরা যেন নিত্য ইষ্টকর্মের মাধ্যমে পরমপিতার সাথে যোগযুক্ত থেকে পরিবেশের সব্বাইকে জীবনের জয়গানে যুক্ত করে নিতে পারি। সবাই যেন মুক্তকণ্ঠে বলতে পারে, ‘আমি সবার, আমার সবাই।’

                              ——

।। সুখের ঘরের চাবি।।

।। সুখের ঘরের চাবিকাঠি ।।


“সবাই তো সুখী হতে চায়,
তবু কেউ সুখী হয় কেউ হয় না ।”
‘সুখ’ নামের ‘সুখ’-পাখিটাকে পোষ মানানো বেশ মুশকিল! আমরা তো জীবকোটির সাধারন মানুষ, দ্রোণ, কৃপ, ধৌম্য নামের তিন-তিন জন আচার্যের শিষ্য হওয়া সত্বেও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রাক্কালে অর্জুনের ন্যায় বীরের কাছ থেকেও ওই সুখ পাখিটা একটু হলেই উড়ে পালাচ্ছিল । ধরার মন্ত্র শিখিয়েছিলেন প্রকৃত আচার্য শ্রীকৃষ্ণ ।
नास्ति बुद्धिरयुक्तस्य न चायुक्तस्य भावना।
न चाभावयतः शान्तिरशान्तस्य कुतः सुखम्।। 2.66।।
“নাস্তি বুদ্ধিরযুক্তস্য ন চাযুক্তস্য ভাবনা ।
ন চাভাবয়তঃ শান্তিরশান্তস্য কুতঃ সুখম্ ॥” ২/৬৬॥
(অর্থাত্‍, পরমাত্মার প্রতিভূ সদগুরু বা ইষ্টের সাথে যোগযুক্ত না থাকলে মঙ্গল ভাবনা ভাবতে পারে না । ফলে শান্ত হতে পারে না । অশান্ত লোক সুখী হতে পারে না ।) শ্লোকের মাধ্যমে ।
তাই, এযুগের শ্রীকৃষ্ণ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রও আমাদের সকল প্রকার অনিষ্টের হাত থেকে বাঁচাতে বললেন,
“ইষ্টিচলন থাকে যদি তোর
রুখবে না তোয় দুর্গতি,
দুর্গতি সব দুর্গ হয়ে
আনবে জয়ে উন্নতি ।”
আর এর বিপরীতের “সদগুরুই ভগবানের সাকার মূর্ত্তি, আর তিনিই অখণ্ড ।” আপ্তবাণী ভুলে যদি খেয়ালমাফিক বহুনৈষ্ঠিকতার চলনে চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি তাহলে দুর্ভোগের আর শেষ থাকবে না !
“ইষ্টের চেয়ে থাকলে আপন
ছিন্নভিন্ন তার জীবন।”
সুখী হতে হলে পরমপিতার বিধি : সপ্তার্চ্চির ষষ্ঠতম স্তবক— “সদাচারা বর্ণাশ্রমানুগজীবনবর্দ্ধনা নিত্যং পালনীয়া।……”
(জীবনকে বর্দ্ধনার পথে চালনা করতে হলে প্রতিনিয়ত শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক সদাচার বিধি মানতে হবে। বর্ণাশ্রমের বিধি মেনে উপার্জন করে আহার, নিদ্রা, অপত্যোৎপাদনাদি জৈবিক চাহিদা পূরণ করে জীবন যাপন করতে হবে।)
“নান্যপন্থাঃ বিদ্যতে হয়নায়।”
এছাড়া কোন বিকল্প পথ নেই সুখী হবার জন্য!

।। শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব তিথি স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।

।। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যদেবের আবির্ভাব তিথি স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি ।।

“ধর্ম যখনই বিপাকী বাহনে
ব্যর্থ অর্থে ধায়,
প্রেরিত তখন আবির্ভূত হন
পাপী পরিত্রাণ পায় ।”
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের উপরোক্ত বাণীর সাথে শ্রীকৃষ্ণ প্রদত্ত
“যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লাণির্ভবতি ভারতঃ।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মনম্ সৃজাম্যহম্
পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম্।
ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে॥”
প্রায় সমার্থক বাণীটির যুগোপযোগী সংস্করণ করেছেন বর্তমান পুরুষোত্তম।
শ্রীকৃষ্ণ যুগ সংস্কারের প্রয়োজনে দুষ্কৃতি বা পাপীদের বিনাশের কথা বলেছেন আর ঠাকুর পাপীদের পরিত্রাণের কথা বলেছেন। এইটুকুই পার্থক্য।
ব্যষ্টি জীবন এবং সমষ্টি জীবনের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে কর্ম করে যাওয়ার নামই ধর্ম পালন করা। অন্যের বাঁচা এবং বৃদ্ধি পাওয়াকে অব্যাহত রেখে মানুষ বাঁচার জন্য, আনন্দের জন্য যা’ যা’ করে, তাই ধর্ম। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কোন ভারী তাত্ত্বিক কথা না বলে প্রাঞ্জল ভাষায় বাণী দিয়ে বললেনঃ
‘‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে
ধর্ম বলে জানিস তা’কে।’’

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র চৈতন্যদেবের আবির্ভাব প্রসঙ্গে ভাবাবস্থায় বললেন, ‘‘বুদ্ধ ‘লয়’ শিক্ষা দিয়ে গিয়েছিল। শঙ্করাচার্য্য পরিষ্কার ক’রে দিয়েছিল। বুদ্ধের উত্তর শঙ্করাচার্য্যের কাছে, জ্ঞানী ছাড়া বুঝত না কিনা? তাই চৈতন্যের আবির্ভাব। ধর্ম্ম নিয়ে হিংসা হয়েছিল কিনা, তাই একত্ব দেখাতে এসেছিলেন রামকৃষ্ণ। থাক্ ধর্ম্ম-কর্ম্ম, আমার আমিত্ব পেলেই বাঁচি এখন।’’ (ভাববাণী, ষষ্ঠ দিবস)

কিছু গবেষকদের মতে শ্রীচৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষ উৎকল প্রদেশের জাজপুরের আদি বাসিন্দা ছিলেন। (বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতে আসাম প্রদেশ।) তাঁর পিতামহ মধুকর মিশ্র বাংলাদেশের শ্রীহট্টে এসে বসতি স্থাপন করেন। শ্রীহট্টে জন্মগ্রহণ করেন জগন্নাথ মিশ্র। পণ্ডিত নীলাম্বর চক্রবর্তীর কন্যা শচীদেবীর সাথে বিবাহ হয়। শচীদেবীর গর্ভে পর পর সাতটি কন্যা হয়। কেহই জীবিত ছিলেন না। তারপর জন্মগ্রহণ করেন প্রথম পুত্র বিশ্বরূপ। বিশ্বরূপের যখন আট বছর বয়স তারপর শচীমাতা অন্তর্বতী হন। দ্বাদশ মাস গর্ভকাল অতিবাহিত করে ১৪০৭ শকাব্দ, (১৮-২-১৪৮৬) ২৩ ফাল্গুন, দোলপূর্ণিমা চন্দ্রগ্রহণের রাতে নিমবৃক্ষের নীচে ভূমিষ্ঠ হন শচীদেবীর দ্বিতীয় পুত্র নদীয়া জেলার নবদ্বীপে। নিম গাছের তলায় ভূমিষ্ঠ হবার কারণে মা নামকরণ করেছিলেন নিমাই, কোষ্ঠী বিচারের নাম বিশ্বম্ভর।
চৌদ্দশত সাত শকে মাস যে ফাল্গুন
পৌর্ণ মাসী সন্ধ্যাকালে হৈল শুভক্ষণ।
সিংহ রাশি, সিংহ লগ্ন উচ্চ প্রহসন
ষড়বর্গ অষ্টবর্গ সর্ব্ব শুভক্ষণ।।


তৎকালিন ভারতবর্ষের শিক্ষা-সংস্কৃতির এক অন্যতম পীঠস্থান ছিল বাংলার নদীয়া জেলার নবদ্বীপ। মহাপ্রভুর পিতৃদেব শ্রীহট্ট থেকে নবদ্বীপে এসেছিলেন অধ্যয়ন ও শাস্ত্রচর্চার জন্য। সে কারণেই মায়াপুরে আর একটি নতুন বসতি স্থাপন করতে হয়েছিল। শচীদেবীর স্বাভাবিক গর্ভকালের সময় উত্তীর্ণ হলে শ্বশুর মশাই জ্যোতিষাচার্য পণ্ডিত নীলাম্বর চক্রবর্তীর আদেশক্রমে স্ত্রী-পুত্রকে শ্রীহট্ট থেকে নবদ্বীপের বাড়িতে নিয়ে আসেন জগন্নাথ মিশ্র। সেখানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন বিশ্বম্ভর। তবে গার্হস্থ্যাশ্রমে নিমাই নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন। তাই রচনার প্রয়োজনে অবতারবরিষ্ঠ চৈতন্য মহাপ্রভুকে কখনো নিমাই, কখনোবা নিমাই পণ্ডিত নামে উল্লেখ করতে হয়েছে। সেজন্য প্রথমেই পাঠকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে রাখলাম।
শচীমাতার দুলাল নিমাই বাল্যকাল থেকেই দুরন্ত ছিলেন। তাঁর দুরন্তপনার নালিশ শুনতে শুনতে অস্থির হয়ে পড়েছিলেন তাঁর পিতামাতা। দাদা বিশ্বরূপকেই যা একটু সমীহ করে চলতেন। দুরন্তপনায় রাশ টানতে পিতৃদেব ১৪৯১ খ্রীষ্টাব্দে আচার্য্য গঙ্গাদাস পণ্ডিতের মাধ্যমে উপনয়ন সংস্কারে সংস্কৃত করান। সাবিত্রীমন্ত্রে দীক্ষিত করাবার পর আচার্য্য নিমাইকে গৌরহরি নামকরণ করেন। সংস্কৃত শিক্ষার জন্য গঙ্গাদাস পণ্ডিতের টোলে ভর্তি করে দেন পিতা। সেখানে ব্যাকরণ, কাব্য, অলঙ্কারশাস্ত্র, তর্কশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। তাঁর মধ্যে অসাধারণ পাণ্ডিত্যের প্রকাশ পায়। ১৪৯২ খ্রীষ্টাব্দে দাদা বিশ্বরূপ সন্ন্যাস নিয়ে গৃহত্যাগী হন। দাদার বিরহ-ব্যথায় শান্ত হন নিমাই। দাদা বিশ্বরূপ নিত্য গৃহদেবতা বিষ্ণুর পূজা করতেন। দাদার অবর্তমানে নিজে থেকে সেই পূজার ভার গ্রহণ করেন নিমাই। ১৪৯৭ খ্রীষ্টাব্দে পিতা জগন্নাথদেব সবাইকে শোকসাগরে ভাসিয়ে বিষ্ণুর পরমপদে আশ্রয় নেন। পিতার দেহান্তর হবার পর জাগতিক সংসারের সব দায়িত্ব তাঁর ওপর এসে পড়ে। নিমাই লোকপালী উপার্জনে মন দেন। মুকুন্দ-সঞ্জয়ের চণ্ডীমণ্ডপে টোল খুলে ছাত্র পড়াতে শুরু করেন। শিষ্যদের এবং বিদ্যানুরাগীদের কাছে নিমাই পণ্ডিত নামে খ্যাত হন। ভারতখ্যাত কেশবাচার্য নিমাই পণ্ডিতের কাছে পরাজয় স্বীকার করলে ভারতের পণ্ডিত সমাজে শ্রেষ্ঠ স্থান লাভ করেন নিমাই পণ্ডিত। মাতা শচীদেবীর আদেশে ১৫০২ খ্রীষ্টাব্দে বল্লভ আচার্যের কন্যা লক্ষীপ্রিয়া সাথে উদ্বাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হন। (চৈঃ চঃ অনুসারে কৈশার লীলায় প্রথমে উদ্বাহ বর্ণিত হয়েছে।) উদ্বাহের পর ১৫০৬ খ্রীষ্টাব্দে স্ত্রীকে নিয়ে পূর্ববঙ্গের শ্রীহট্টের বাড়িতে যান। সেখানে সর্প দংশনে (মতান্তরে বিরহ-সর্প দংশন) মৃত্যু হয় লক্ষীপ্রিয়ার। এই ঘটনায় নিমাই মর্মাহত হন। শচীদেবী পুণরায় নিমাইয়ের বিবাহ দিতে চাইলে, নিমাই কিছুতেই পুণর্বার দার পরিগ্রহ করতে চান নি। মায়ের পীড়াপিড়িতে সনাতন পণ্ডিতের কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়ার সাথে বিবাহ হয় ১৫০৭ খ্রীষ্টাব্দে।
১৫০৮ খ্রীষ্টাব্দে পিতৃদেবের পিণ্ডদান করতে গয়াতে যান। পরিচিত হন ঈশ্বরপুরীর সাথে। ১০ অক্ষর গোপাল মন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ করেন নিমাই। নবদ্বীপে ফিরে বৈষ্ণব আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র নাম প্রচার মাধ্যমে।
১৫১০ খ্রীষ্টাব্দের ১০ই জানুয়ারী কাটোয়ার কেশব ভারতীর কাছে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। গুরু তাঁকে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নামে অভিহিত করেন। সন্ন্যাস গ্রহণের পর থেকে তিনি লোক-সংগ্রহ উদ্দেশ্যে প্রায় পাঁচ বছর দক্ষিণ-ভারত, পশ্চিম-ভারত ও মথুরা-বৃন্দাবন পরিভ্রমন করেন। ১৫১৫-১৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দ, এই আঠারটি বছর পুরীর রাজা প্রতাপ রুদ্রের রাজগুরু কাশী মিশ্রের বাড়ী গম্ভীরায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে কৃষ্ণনাম প্রচার করেন। ১৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দে পুরীতে ইহলীলা সম্বরণ করেন।
চৈতন্যদেব তাঁর অনুগামীদের জন্য নিজের হাতে সংস্কৃতে লেখা ‘শিক্ষাষ্টক’ নামে আটটি শ্লোকে উপদেশামৃত রেখে গেছেন, সব শ্লোকেই কৃষ্ণের প্রতি শুদ্ধাভক্তির কথা রয়েছে। রাধা-নামের কোন উল্লেখ পর্যন্ত নেই। ‘শিক্ষাষ্টক’ শ্লোকের মধ্যে তৃতীয়তম শ্লোকটি ভক্তজন কণ্ঠে বহুল উচ্চারিত। যথাঃ
তৃণাদপি সুনীচেন তরোরিব সহিষ্ণুনা।
অমানিনা মানদেন কীর্তনীয়ঃ সদা হরিঃ॥
যার ভাবার্থ—তৃণকে মাড়িয়ে গেলে তৃণ যেমন প্রতিবাদ করে না, গাছ কাটলে গাছ যেমন প্রতিবাদ করে না, তুমি তাদের চাইতেও সহিষ্ণু হবে। সমাজে যারা অবহেলিত তাদেরও তুমি মান দিয়ে সদা হরির গুণকীর্তন করবে। তাহলে সারমর্ম হলো, তুমি তোমার নিজের জীবনের ক্ষুদ্র মান-অপমান, চাওয়া-পাওয়া সবকিছু উপেক্ষা করে সবাইকে হরি অর্থাৎ কৃষ্ণের প্রদত্ত আদর্শের গুণকীর্তন করবে।
* * *
চৈতন্যদেবের স্নেহধন্য মুরারী গুপ্ত সংস্কৃত ভাষায় যে লীলা কাহিনী রচনা করেছিলেন সেই গ্রন্থ ‘মুরারী গুপ্তের করচা’ নামে সুপ্রসিদ্ধ। মহাপ্রভুর বিশেষ স্নেহভাজন, যাঁকে তিনি ‘কবিকর্ণপুর’ আখ্যা দিয়েছিলেন তাঁর নাম ছিল পরমানন্দ। তিনি সংস্কৃত ভাষায় ‘চৈতন্যচরিতামৃতম্’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। চৈতন্যদেবের লীলাবসান পরবর্তীকালে তথ্য সংগ্রহভিত্তিক বাংলা ভাষায় ‘চৈতন্যভাগবত’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন বৃন্দাবন দাস। সমসাময়িক কালে কবি লোচন দাস ‘চৈতন্যমঙ্গল’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন। পরবর্তীকালে কবি জয়ানন্দও ‘চৈতন্যমঙ্গল’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন। ওইসব জীবনীগ্রন্থ থেকে বৃন্দাবনের গোস্বামীগণ নাকি পরিপূর্ণরূপে চৈতন্যদেবকে আস্বাদন করতে পারেন নি, তাই রূপ গোস্বামীর শিষ্য বর্ধমান জেলার ঝামটপুরের বিখ্যাত বৈদ্য, অকৃতদার কৃষ্ণদাস কবিরাজকে নতুন করে এক জীবনীগ্রন্থ রচনা করতে উদ্বুদ্ধ করলে তিনি পূর্ববর্তী জীবনীকারদের গ্রন্থ এবং অন্যান্য সংস্কৃত গ্রন্থের সাহায্য নিয়ে নয় বছর ধরে ‘শ্রীশ্রীচৈতন্য চরিতামৃত’ শিরোনামে গ্রন্থটি রচনা করেন। যে গ্রন্থটি বৈষ্ণব মহলে প্রামাণ্য রূপে স্বীকৃত হলেও সবক্ষেত্রে ঘটনাপঞ্জীর সন-তারিখ উল্লেখিত হয়নি। গবেষকগণও সকল ঘটনাপঞ্জীর সন-তারিখ নিয়ে একমত হতে পারেন নি। তাই আমিও বিভিন্ন গ্রন্থ পঠন-পাঠন ও গুগল সার্চ করা তথ্যভিত্তিক আনুমানিক সন-তারিখ উল্লেখ করেছি মাত্র।

নিমাই পণ্ডিত, বৈষ্ণব-পণ্ডিত বংশে জন্ম নিয়ে শিক্ষা-সংস্কৃতির পীঠস্থানের পণ্ডিত পরিবেশে বড় হয়ে উঠলেও তৎকালিন নবদ্বীপে আচার্য্য শঙ্করের মায়াবাদের সিদ্ধান্তবাগীশদের শুষ্ক জ্ঞানচর্চা, শাক্ত মতবাদের পৌত্তলিকতার পঞ্চ-ম-কারের এবং বৈষ্ণব, শৈব, কিশোরীভজা, কর্তাভজা, পরকীয়া সাধনা ইত্যাদি সহজীয়া মতবাদের উপাসনার প্রাবল্যের মধ্যে সনাতন ধর্মের প্রচারক প্রকৃত বৈষ্ণবেরা প্রায় উপেক্ষিতই ছিলেন। শাক্তরা সুযোগ পেলেই বৈষ্ণবদের নানাভাবে যাতনা দিতেন, এমনকি ধর্মের নামে পশুবলি দিয়ে পশুর মাংস বাড়িতে ফেলে আসতেন।
বিষ্ণুর উপাসক বৈষ্ণবেরা নবদ্বীপের শ্রীবাস পণ্ডিতের আঙিনায় মিলিত হয়ে কীর্তন করতেন। আর শান্তিপুরের কমলাক্ষ মিশ্রের আঙিনায় বৈষ্ণবদের মিলনমেলা বসতো। বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণের উপাসক তৎকালিন বৈষ্ণব প্রধানগণ যথা, শ্রীনিবাস, শুক্লাম্বর, শ্রীমান, মুকুন্দ, বিশ্বরূপ প্রমুখ ভক্তগণ, সেকালের সাধকশ্রেষ্ঠ বৈষ্ণবাচার্য কমলাক্ষ মিশ্র (অদ্বৈত মহাপ্রভু)-এর কাছে তাদের অন্তরের বেদনার কথা বলতেন। অদ্বৈত মহাপ্রভু মথুরার গর্গাচার্যের ন্যায় সনাতন ধর্মের দীনতা থেকে ভক্তদের রক্ষা করতে গঙ্গাজল আর তুলসীমঞ্জুরির নিত্য সেবায় শ্রীকৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা জানাতেন। পণ্ডিতদের মতে মূলতঃ অদ্বৈত মহাপ্রভুর আরাধনায় শ্রীবিষ্ণু শুদ্ধাত্মা শচীদেবীর মাধ্যমে নিমাই রূপে ধরাধামে অবতীর্ণ হন।

বালক নিমাইয়ের চপলতা এবং তীক্ষ্ণ পাণ্ডিত্যের কাছে ম্লাণ হতে সুরু করে তার্কিক পণ্ডিতদের, শাক্ত পণ্ডিতদের, (অ)বৈষ্ণব পণ্ডিতদের ভ্রান্ত ধারণার পাণ্ডিত্য। তাঁদের দেখলেই শাস্ত্রের ধাঁধাঁ আর ব্যাকরণের ফাঁকি জিগ্যেস করতেন। একদিন ‘‘ওঁ সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম’’—মতবাদের তার্কিক পণ্ডিতকে শিক্ষা দিতে তার ভাতে প্রস্রাব করে দেন নিমাই, পণ্ডিত রেগে গিয়ে মারতে এলে নিমাই বলেন, আমার চপলতার জন্য দু’-ঘা মারবেন না হয়, তবুও আমি করজোড়ে বলছি, ব্রহ্মময় জগতে সবই যদি ব্রহ্ম, তবে আপনার ভাতে, আর আমার মুতে ব্রহ্ম কি নেই ! আপনার বিচারে ভাতের ব্রহ্ম আর মুতের ব্রহ্ম কি আলাদা? আলাদাই যদি হয়ে থাকে তাহলে আর আজ থেকে আপনার ওই সিদ্ধান্ত বদলে ফেলতে হবে। তবে আমার বুঝ মতে, ব্রহ্ম কারণ, জীব কার্য। ব্রহ্ম পূর্ণ, জীব অংশ। ব্রহ্ম উপাস্য, জীব উপাসক। ব্রহ্ম আর জীব সত্তায় অভেদ, স্বাদে পৃথক।
ব্রহ্মবিজ্ঞতা নিমাইয়ের মুখ থেকে ব্রহ্মকথা শুনে পণ্ডিত তখন বুঝতে পারেন ব্রহ্মের বিশিষ্টতা, বিশিষ্ট অদ্বৈতবাদের তত্ত্ব।
* * *
কিশোর নিমাই যখন টোলে ছাত্র পড়াতেন, সেই সময় কাশ্ম পণ্ডিত কেশবাচার্য দিগ্বিজয় করতে বেড়িয়ে ভারতের সব বিখ্যাত পণ্ডিতদের তর্কযুদ্ধে পরাজিত করে অনেক শিষ্য ও বাহনসহ নবদ্বীপে আসেন। নবদ্বীপের স্মার্ত্ত-পণ্ডিতগণ সুযোগ বুঝে নিমাই পণ্ডিতকে জব্দ করতে পণ্ডিত কেশবাচার্যকে নিমাইয়ের কাছে পাঠান। নিমাইয়ের কাছে গিয়ে কেশবাচার্য বলেন, তুমিই বুঝি নিমাই পণ্ডিত?
নিমাই যথোচিত মর্যাদার সাথে প্রণাম জানিয়ে বলেন, আজ্ঞে, লোকেরা বলেন, কিন্তু আমি নিজেকে পণ্ডিত মনে করি না, শিষ্যদের কিছু পাঠদান করার চেষ্টা করি মাত্র।
—তা’ কি পড়াও?
—কলাপ।
—‘কলাপ’! ও তো শিশুপাঠ্য!
—ওই শিশুপাঠ্যই সঠিক পড়াতে পারছি কি-না, জানি না।
—তাহলে তো আর তোমার সাথে তর্ক করা চলে না!
—শুনেছি আপনি ভারত বিখ্যাত পণ্ডিত, আপনার সাথে তর্ক করার স্পর্দ্ধা যেন না হয়। শুনেছি আপনি সরস্বতী-মাতার বরপুত্র। মুখে মুখে শ্লোক রচনা করেন। অনুগ্রহ করে যদি কিছু নিবেদন করেন, শুনে ধন্য হতাম।
—বলো, কি শুনতে চাও?
—সুরধনী গঙ্গার পবিত্র ধারা বয়ে চলেছে, সে বিষয়ে যদি কিছু নিবেদন করেন। নিমাই বিনীতভাবে বলেন।
পণ্ডিত কেশবাচার্য তৎক্ষণাৎ শত-শ্লোক রচনা দ্বারা গঙ্গার বন্দনা করে গর্বভরে নিমাইকে জিগ্যেস করেন, কি হে নিমাই পণ্ডিত! এতক্ষণ ধরে গঙ্গার মহিমা যা’ বর্ণনা করলাম, কিছু বুঝলে?
নিমাই বিনীতভাবে বললেন, আপনার রচনার অর্থ আপনি না বোঝালে বোঝে কার সাধ্য?
নিমাইয়ের বিনীত ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে কেশবাচার্য বলেন, বলো, কোন্ শ্লোকটা বুঝতে চাও?
নিমাই কেশবাচার্য পণ্ডিতের তাৎক্ষণিক রচনা থেকে—
‘‘মহত্ত্বং গঙ্গায়াঃ সততমিদমাভাতি নিতরাং,
যদেষা শ্রীবিষ্ণোশ্চরণকমলোৎপত্তিসুভগা।
দ্বিতীয় শ্রীলক্ষ্মীরিব সুরনরৈরর্চ্চ্যচরণা,
ভবানীভর্ত্তুর্ষা শিরসি বিভবত্যদ্ভুতগুণা॥’’
(চৈঃ চঃ আদিলীলা, পৃঃ ১২৬)
শ্লোকটি আবৃত্তি করে তার ভাবার্থ জানতে চাইলে পণ্ডিত কেশবাচার্য আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন, প্রায় ঝড়ের গতিতে বলা শ্লোক থেকে তুমি এই একটি শ্লোক কণ্ঠস্থ করলে কিভাবে?
নিমাই বিনীতভাবে বলেন, আপনি দৈববলে যেমন মাতা সরস্বতীর বরপুত্র, কবি, আমিও তেমনি একজন শ্রুতিধর।
নিমাইয়ের উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে কেশবাচার্য বলেন, তাহলে শোন, এই শ্লোকের ভাবার্থ হচ্ছে—‘‘গঙ্গা, শ্রীবিষ্ণুর চরণকমল থেকে উৎপন্ন হওয়ার কারণে সৌভাগ্যবতী। দ্বিতীয়া শ্রীলক্ষ্মীর ন্যায় দেব ও মানবেরা যাঁর চরণ-পূজায় রত এবং যিনি ভবানীপতি মহাদেবের মস্তকে বিরাজমানা হওয়ার জন্য অদ্ভুত গুণশালিনী হয়েছেন, সেই গঙ্গার এই মহত্ত্ব সর্বদাই নিশ্চিতরূপে প্রত্যক্ষীভূত হয়ে আছে।—বলো, আর কি জানতে চাও?’’
—এবার শ্লোকের দোষ-গুণ বলুন।
—বেদসদৃশ গুণসম্পন্ন অনুপ্রাসযুক্ত উপমারূপ শ্লোকে কোন দোষ নেই, সম্পূর্ণ নির্দোষ। তোমার ব্যাকরণের অলঙ্কার জ্ঞান থাকলে তো তুমি দোষ-গুণ বুঝবে?
—যথার্থই বলেছেন। আমি অলঙ্কার না পড়লেও শুনেছি তো, তা’ থেকেই মনে হচ্ছে আপনার শ্লোক দোষযুক্ত।
—তোমার স্পর্দ্ধা তো কম নয়! ‘কলাপ’ আর ‘ফাঁকি’ পড়া বিদ্যা দিয়ে তুমি আমার শ্লোকের দোষ ধরতে চাও?
—প্রভু, আপনি আমার প্রতি রুষ্ট হবেন না, আমার ন্যায় অর্বাচীন কি আপনার রোষের উপযুক্ত? মার্জনা করবেন, আমি কিন্ত্তু আপনার রচনায় ৫টি দোষ খুঁজে পেয়েছি, যদি অনুমতি করেন, তাহলে এক-এক করে বর্ণনা করি।
শিষ্যসামন্ত, স্থানীয় বিদ্বজ্জনের সামনে এমন কথা কেউ যে কোনদিন বলবে ভাবতেই পারেন নি কেশবাচার্য, তথাপি তর্কশাস্ত্রের নিয়ম মেনে নিমাইকে বলার জন্য অনুমতি দিলে নিমাই বলেন—-
পঞ্চ দোষ এই শ্লোকে পঞ্চ অলঙ্কার।
ক্রমে আমি কহ শুন করহ বিচার॥
অবিমৃষ্ট বিধেয়াংশ দুই ঠাঞি চিন।
বিরুদ্ধমতি ভগ্নক্রম পুনরাত্ত দোষ তিন॥
গঙ্গার মহত্ত্ব শ্লোকের মূল বিধেয়।
ইদং শব্দে অনুবাদ পশ্চাৎ অবিধেয়॥
বিধেয় আগে কহি পাছে কহিলে অনুবাদ।
এই লাগি শ্লোকের অর্থ করিয়াছে বাদ॥
……………………………………………………
গঙ্গাতে কমল জন্মে সবার সুবোধ।
কমলে গঙ্গার জন্ম অত্যন্ত বিরোধ॥
ইহা বিষ্ণু পাদপদ্মে গঙ্গার উৎপত্তি।
বিরোধালঙ্কার ইহা মহা চমৎকৃতি॥
ঈশ্বর অচিন্ত্য শক্ত্যে গঙ্গার প্রকাশ।
ইহাতে বিরোধ নাহি বিরোধ আভাষ॥
গঙ্গার মহত্ত্ব সাধ্য সাধন তাহার।
বিষ্ণুপাদোৎপত্তি অনুমান অলঙ্কার॥
স্থূল এই পঞ্চ দোষ পঞ্চ অলঙ্কার।
সূক্ষ্ম বিচারিলে যদি আছয়ে অপার॥
(চৈঃ চঃ আদিলীলা, পৃঃ ১২৭-১২৯)
—-হে পণ্ডিতপ্রবর! ‘‘আপনি বিধেয় অর্থাৎ জ্ঞাত আগে বলে পরে অনুবাদ অর্থাৎ অজ্ঞাত বলেছেন। এরফলে শ্লোকের অনুবাদ ঘটেছে, মূল অর্থ বাদ পড়েছে। ‘দ্বিতীয় শ্রীলক্ষ্মী’ রচনায় ‘দ্বিতীয়’ শব্দ বিধেয়, সমাসে গৌণ হওয়াতে শব্দার্থ ক্ষয় হয়ে শব্দটি অপ্রাধান্য রূপে নির্দিষ্ট হয়েছে। ‘ভব’ অর্থে মহাদেব বোঝালে ‘ভবানী’ অর্থে মহাদেবের স্ত্রীকে বোঝায়। এবং ভবানীর ভর্তা বললেও মহাদেবকে বোঝায়। ‘ভবানীভর্ত্তুর্ষা’ শব্দের প্রয়োগে ‘ভবানীর ভর্তা’-র অর্থ হয়, ভবের পত্নী যে ভবানী তার ভর্তা, যেন ভব ব্যতিরেকে আর একজন ভর্তা বোঝায়, তাই ওই শব্দের প্রয়োগ বিরুদ্ধমতিকারক। শ্রী অর্থে লক্ষ্মী বা শোভাময়ী বোঝায়। এক্ষেত্রে ‘শ্রীলক্ষ্মী’ প্রয়োগে পুনরুক্তবদাভাস অলঙ্কার হয়েছে। আপনি ‘শ্রীবিষ্ণুর চরণ-কমলে গঙ্গার জন্ম’ বোঝাতে চেয়ে ‘কমলে গঙ্গার জন্ম’ বলে ফেলে প্রচলিত সত্যের সাথে বিরোধ করে ফেলেছেন, যদিও তা বিরোধাভাস মাত্র, তাই বিরোধাভাস-অলঙ্কারের প্রয়োগ হয়েছে। ‘গঙ্গার এই মহিমা সর্বদা নিশ্চিতরূপে দেদীপ্যমান, যেহেতু এই গঙ্গা শ্রীবিষ্ণুর চরণকমল হইতে উৎপন্ন হওয়ার কারণে অত্যন্ত সৌভাগ্যবতী।’—এখানে গঙ্গার মহত্ত্বের সাধন ও সাধ্য দুই-ই পরিলক্ষিত হয়। ওই অনুমান অলঙ্কারের প্রয়োগের ফলে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব জড়ীভূত হয়ে গেল।’’
নিমাই পণ্ডিতের বলা ব্যাখ্যান শুনে কেশবাচার্য আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলেন, শাস্ত্র না পড়ে, অলঙ্কার না পড়ে আমার শ্লোকের এইরূপ ব্যাখ্যা তুমি কিভাবে করলে?
উত্তরে নিমাই পণ্ডিত বলেন, শাস্ত্রের বিচার আমি জানি না, মাতা সরস্বতী যা’ বলান, তাই বলি। আপনি মহাপণ্ডিত, কবি শিরোমণি, আপনি দুঃখ করবেন না। আপনার শিষ্য মনে করে আমার কিশোর-সুলভ চপলতা ক্ষমা করে দেবেন। আজ চলুন বাসায় ফিরে যাই, কাল আবার মিলিত হয়ে আপনার কাছে শাস্ত্রের বিচার শুনব।

এই মতে নিজ গৃহে গেলা দুই জন।
কবি রাত্রে কৈল সরস্বতী আরাধন॥
সরস্বতী রাত্রে তারে উপদেশ কৈল।
সাক্ষাৎ ঈশ্বর করি প্রভুরে জানিল॥
প্রাতে আসি প্রভুপদে লইল শরণ।
প্রভু কৃপা কৈল তার খণ্ডিল বন্ধন॥
ভাগ্যবন্ত দিগ্বিজয়ী সফল জীবন।
বিদ্যাবলে পায় মহাপ্রভুর চরণ॥

কাশ্মীরি পণ্ডিত নিমাই পণ্ডিতের মধ্যে ষড়ৈশ্বর্য্যের প্রকাশ উপলব্ধি করতে পেরে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তারপর থেকে নবদ্বীপের পণ্ডিতসমাজে শুধু নয়, ভারতবর্ষের পণ্ডিতসমাজে নিমাই পণ্ডিত একজন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।

নিমাই পণ্ডিত পিতৃদেবের পিণ্ডদান করতে গয়ায় গিয়ে ঈশ্বরপুরীর কাছে দীক্ষা নেবার পর পাণ্ডিত্য ছেড়ে ভক্তিরসে নিজেকে জারিত করলেন। শ্রীবাস অঙ্গনের বৈষ্ণব সভায় যোগদান করে কীর্তনানন্দে মেতে ওঠেন। কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা চৈতন্যদেব আর্য্যকৃষ্টি বিরোধী বৌদ্ধ-তান্ত্রিকতার পৌত্তলিকদের, শুষ্ক জ্ঞানচর্চাকারী তর্কবাগীশদের, তামসিক ধর্মাচ্ছন্নদের উদ্দেশ্যে পথ-নির্দেশ করলেন ‘হরেরাম হরেকৃষ্ণ’ কীর্তনের ফরমূলার মাধ্যমে।––তোমার পাপ, তাপ হরণ করতে, প্রবৃত্তির পাপ-তাপের জ্বালা জুড়াতে, সবকিছু ছেড়ে শ্রীরামচন্দ্রের আদর্শ, শ্রীকৃষ্ণের আদর্শের অনুসরণ কর।
তৎকালিন হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রাধান্য থাকা সত্বেও তিনি হরেকৃষ্ণ কীর্তনের মাধ্যমে ক্ষত্রিয় বংশজাত রামচন্দ্র এবং কৃষ্ণের জীবন্ত আদর্শে সবাইকে অনুপ্রাণিত করতে চাইলেন। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অবতারবাদের আদর্শ মেনে।
* * *
কীর্তনগান বাঙালি কবিদের এক অভিনব সৃষ্টি। কৃত্ ধাতু থেকে এসেছে কীর্তন। কৃত্ শব্দের অর্থ প্রশংসা। কীর্তন মানে কীর্তি আলাপন। কীর্তিকর কোন আদর্শের স্মরণ, মনন, গুণ বর্ণন কীর্তনের মূল উদ্দেশ্য। যা’ শ্রবণেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রবেশ করে মানুষের সাত্তিক গুণকে প্রকাশ করতে সাহায্য করে। তাই, মানুষকে সহজে প্রভাবিত করতে, কীর্তন এক সহজ প্রচার মাধ্যম।
কীর্তি-আলাপন দু’-ভাবেই হতে পারে। কথার আদান-প্রদান মাধ্যমে এবং সুরে, ছন্দে, নৃত্যে, যন্ত্রানুষঙ্গের ঐকতানের প্রকাশের মাধ্যমে।
প্রাক চৈতন্যযুগে, খ্রীঃ ১২ শতকে রচিত, শ্রীকৃষ্ণকে নায়ক করে, হ্লাদিনী শক্তিস্বরূপা রাধাকে একজন পরকীয়া নারী রূপে চিত্রণ করে কিছু অশাস্ত্রীয় আদিরসাত্মক পরকীয়া কাহিনী দিয়ে সাজানো, কবি জয়দেব গোস্বামী বিরচিত ‘গীতগোবিন্দম্ কাব্য’ বাংলার কীর্তনের প্রকৃত উৎস।
এ বিষয়ে হিন্দুধর্মের এনসাইক্লোপিডিয়া, ‘পৌরাণিকা’র রচয়িতা অমল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন— (দ্রঃ গীতগোবিন্দ) ‘‘রামায়ণ ও মহাভারতের কট্টর পটভূমিতে ব্লু-বুক হিসাবে বর্ষবরদের চরম ও পরম পরিতৃপ্তি দিয়েছিল; তন্ত্রাভিলাষী সমাজে তন্ত্রগুলি চেতন ও অবচেতন মনকে যেমন তৃপ্তি দেয়।’’ কবি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্যের মূল্যায়ন বিষয়ে বলছেন—‘‘গীতগোবিন্দে সুড়সুড়ি আছে আর আছে দুষ্পাচ্য যৌনতা। ….. সহজিয়া জয়দেব আবিল, অপাঠ্য।’’ রাধা সন্দর্ভে বলছেন— ‘‘…. রাধাবাদ শক্তিবাদেরই একটি ধারা; রাসলীলা নিরোধ ব্যবহারের বিশুদ্ধ বিজ্ঞাপন। তন্ত্রের মানসকন্যা রাধা। রস ও রতির মিলন বৈষ্ণব তত্ত্ব; সাধক ও ভৈরবীর সম্ভোগ শাক্ত তত্ত্ব এবং বজ্রযানে বজ্র ও পদ্মের মিলন এ সবগুলিই তান্ত্রিক তত্ত্ব; বজ্রযানে তাই বলা হয়েছে বুদ্ধত্বং যোষিৎ-যোনিপ্রতিষ্ঠিতম্। ….. ভাগবতে রাধা নাই। …. ভাগবত ও বিষ্ণু পুরাণে রাসলীলা আছে কিন্তু রাধা নাই। ….. ’’
তথাপি রাধার মানবী অস্তিত্ব কিছু-কিছু অ-বৈষ্ণবদের রিরংসায় বাসা বেঁধেছিল। সেই বিকৃত ধারার বাসাটাকে ভাঙতে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যদেব নিজেকে রাধা-কৃষ্ণের যুগলরূপ বলে প্রচার করলেন। যাতে ধর্মের অজুহাতে ধর্মবিরুদ্ধ পরকীয়া-প্রীতি প্রশ্রয় না পায়। তাই তিনি রাধাকে নারীদেহে নয়, সুরত-সম্বেগের ধারায় অন্বেষণ করতে পথ দেখালেন। রাধাকৃষ্ণের যুগলধারার আদর্শে, পরকীয়া-প্রীতির আদর্শে গড়ে ওঠা তৎকালিন প্রচলিত কীর্তনের ধারাটাকে গীতা গ্রন্থে বর্ণিত—
“যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লাণির্ভবতি ভারতঃ।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মনম্ সৃজাম্যহম্॥
পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম্ ।
ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ॥”–এর সূত্র মেনে,—অর্থাৎ ‘‘ঈশ্বর এক, ধর্ম এক, প্রেরিতগণ বিভিন্ন নামে সেই এক-এরই বার্তাবাহী’’র সনাতনী ধারা বা সনাতন ধর্মকে সংস্থাপিত করলেন। শ্রীরামচন্দ্র এবং শ্রীকৃষ্ণের আদর্শকে সামনে রেখে। হরেকৃষ্ণ, হরেরাম প্রচার মাধ্যমে। এর ফলে পরকীয়া-তত্ত্বের সহজীয়া মতবাদীরা বৈষ্ণবীয় মূলস্রোতে ফিরে আসার সুযোগ পেল এবং পৌত্তলিকতার নাগপাশ থেকে সনাতন ধর্মকে উদ্ধার করে এক সর্বজনীন রূপ দিলেন। মূলতঃ শ্রীকৃষ্ণকে কেন্দ্র করে। নিজেকে অন্তরালে রেখে।
‘অবতার নাহি কহে, আমি অবতার।’ তথাপি ধরা পড়ে গেলেন বৈষ্ণবাচার্য সাধক অদ্বৈত মহাপ্রভুর কাছে। অদ্বৈত মহাপ্রভুকে ফাঁকি দিতে পারলেন না। তাঁর সাধনার কাছে ধরা পড়ে গেলেন। নিত্যানন্দ মহাপ্রভুও বুঝতে পেরে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুকে কৃষ্ণের নব-কলেবর রূপে প্রচার করতে শুরু করলেন।
* * *
আসলে সমগ্র জগতের প্রাণনশক্তি বা প্রাণপঙ্ক বা প্রটোপ্লাজমকে পরমাত্মিক শক্তি বলা হয়, যা বিশ্ব ব্যাপিয়া বিদ্যমান, ‘‘যিনি সর্ব্ব ও প্রত্যেকের ভিতর বিশেষভাবে পরিব্যাপ্ত’’ তিনিই বিষ্ণু। যে পুরোহিতগণ প্রতিমা পূজা করেন, তাঁরাও সর্বাগ্রে ‘ওঁ শ্রীবিষ্ণু’ মন্ত্রে আচমন করেন। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পুরোহিত রঘুবংশের কৌলগুরু বশিষ্ঠদেব শ্রীরামচন্দ্রকে ‘‘ওঁ নারায়ণঃ পরাবেদা নারায়ণঃ পরাক্ষরঃ।/নারায়ণঃ পরামুক্তি নারায়ণঃ পরাগতিঃ॥’’ মন্ত্রে স্বস্তিবাচন করার সময় শ্রীরামচন্দ্রের মধ্যে পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণকে উপলব্ধি করলে তিনি নারায়ণের পরিবর্তে রামচন্দ্র শব্দ বসিয়ে মন্ত্রটিকে পরিমার্জিত করেন। নররূপী নারায়ণ পুরুষোত্তম রামচন্দ্রকে কেন্দ্র করে সবাইকে ধর্ম পালন করতে উদ্বুদ্ধ করলেন। অনুরূপভাবে কৃষ্ণনামের প্রচারক শ্রীগৌরাঙ্গদেবের মধ্যে বিষ্ণুত্ব বা কৃষ্ণত্ব-এর পরিপূর্ণতা সাধনদ্বারা উপলব্ধি করা মাত্রই নিত্যানন্দ প্রভু ‘‘ভজ গৌরাঙ্গ কহ গৌরাঙ্গ লহ গৌরাঙ্গের নাম রে …. ।’’ ‘‘প্রভু নিত্যানন্দ কহে দন্তে তৃণ ধরি। আমারে কিনিয়া লহ ভজ গৌরহরি॥ ইত্যাদি স্বস্তিবাচনে গীতার অবতারবাদকে সম্মান জানালেন। তৎকালিন পুরুষোত্তম চৈতন্যদেবকে কেন্দ্র করে সবাইকে চলতে বললেন। এই হচ্ছে সাজা-গুরুদের কবল থেকে সনাতন বৈষ্ণবধর্মের ধারাকে নবীকরণ মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখার ফরমূলা। গীতা গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণ বিষয়টিকে স্পষ্ট করে বিধৃত করেছেন।

  • * *
    অবতার-তত্ত্বের ধারা অনুসারে অবতার বরিষ্ঠ শ্রীরামচন্দ্র ছিলেন সত্যের পূজারী অথচ অসৎ নিরোধী। তৎকালীন যুগের অচ্ছুৎ অনার্য্যদের আর্য্যীকৃত করে আর্য্য-অনার্য্যদের মেলবন্ধন করলেন। অনার্য্য গুহক চণ্ডালকে করলেন মিত্র, আবার অকালমৃত্যুর দ্যোতক বর্ণাশ্রম-বিদ্বেষী প্রতিলোমাচারী বন্ধুবর শম্বুককে দিলেন চরম শাস্তি। ব্রাহ্মণ ঔরসজাত রাবণ যখন কিছুতেই সীতাকে বশে আনতে পারছিলেন না তখন সভাসদেরা মায়াবী-রাবণকে বলেছিলেন, আপনি রামরূপ ধারণ করে গেলেই তো সীতাকে সহজেই বশীভূত করতে পারেন। উত্তরে রাবণ বলেছিলেন, ওই রূপ স্মরণ করলেই আমার সব পাপ-প্রবৃত্তি মুছে গিয়ে আমি এক অন্য মানুষ হয়ে যাই। তথাপি প্রবৃত্তির ঊর্দ্ধে উঠে ওই বোধটাকে ধরে রাখতে পারল না, ফলে রামচন্দ্রের হাতে হত হতে হল। অথচ বিভীষণ রামচন্দ্রের আদর্শে প্রলুব্ধ হয়ে রাবণকে ত্যাগ করলেন।
    এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ……রাবণ তো আদর্শবান ছিল না। রামচন্দ্রকে দেখে সে একেবারে বিগলিত হয়ে গেল। রামচন্দ্রের ঊর্দ্ধে তার আর কেউ নেই। ভ্রাতার প্রতি কর্তব্যের চাইতে তার ইষ্টানুরাগই প্রবল। ভীষ্ম কিন্তু কেষ্টঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি নিয়েও, কর্তব্যবোধে কৌরবের পক্ষ ছাড়তে পারেন নি। তা কিন্তু ঠিক হয়নি। ইষ্টের জন্য, সত্যের জন্য, অন্য যে-কোন কর্তব্য ত্যাগ করতে হবে, যদি সে কর্তব্য ইষ্টের পথে অন্তরায় হয়। ‘‘সর্ব্বধর্ম্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ’’ । (আ. প্র. 21/2.6.1952)
    ……শ্রীরামচন্দ্রের খুব strong group (শক্তিমান দল) ছিল। হনুমান, সুগ্রীব, জাম্বুবান, অঙ্গদ, নল, নীল এরা সবাই ছিল একটা strong unit (শক্তিমান গুচ্ছ)। রামচন্দ্রের সাথে ওদের একজন না-একজন থাকতই। এক সময় বিভীষণকে সন্দেহ করেছিল লক্ষণ। বিভীষণ তাতে বলেছিল, ‘আমি জানি তোমরা আমাকে সন্দেহ করবে। কারণ, আমি রাবণের ভাই। আমি ভাই হয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে treachery (বিশ্বাসঘাতকতা) করেছি। কিন্তু করেছি অসৎ-এর বিরুদ্ধে। হজরত রসুলের group-ও (দলও) খুব strong (শক্তিমান) ছিল। তিনি বেঁচে থাকতে-থাকতেই অনেকখানি ভূখণ্ডের king (রাজা) হয়েছিলেন। (দীপরক্ষী 2/26.7.1956)
    রাজাকে কতখানি প্রজাস্বার্থী হতে হবে সেইটেই রামচন্দ্র দেখিয়েছেন। প্রজা প্রাণের চাইতেও বেশী না হলে রাজা হওয়া যায় না। …….সীতাও ছিলেন রামচন্দ্রের আদর্শে উৎসর্গীকৃত। আর এই ছিল আমাদের আর্য্যবিবাহের তাৎপর্য্য। (আ. প্র. 20/9. 8. 1951)
    অবতার বরিষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ‘‘শ্রীকৃষ্ণ সব সময়েই চেষ্টা করেছেন যুদ্ধবিগ্রহ avoid (পরিহার) করতে, কিন্তু তাঁর environment (পরিবেশ) তাঁকে সে scope (সুযোগ) দিল না। আর শ্রীকৃষ্ণের যুদ্ধ—মৃত্যুকে মারবার জন্য। Gangrene-affected part of the body (শরীরের দুষ্টক্ষতযুক্ত স্থান) আমরা যেমন কেটে ফেলি জীবন বাঁচাবার জন্য, তিনিও তেমনি মৃত্যু ও মারণের মূর্ত্ত প্রতীকস্বরূপ যারা ছিল তাদের মেরেছিলেন সমগ্র সমাজকে বাঁচাবার জন্য। (আ. প্র. খণ্ড ১, ৪. ১২. ১৯৪১)
    …… শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে বুঝিয়ে দিলেন যে devil (শয়তান) যদি রাজত্ব করে, তবে অর্জ্জুনের ঈপ্সিত ধর্ম্ম, জাতি, কুল, মান কিছুই রক্ষা পাবে না। তাই devil (শয়তান)-কে demolish (ধ্বংস) করা লোকমঙ্গলের জন্যই অপরিহার্য্য। এর মধ্যে দ্বেষ-হিংসার বালাই নেই। বরং অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধকে এড়িয়ে চলার বুদ্ধির পিছনে আছে দুর্ব্বলতা।’’ (আ. প্র. খণ্ড ৬, ৬. ১২. ১৯৪৫)
    কেষ্টদা (ভট্টাচার্য্য) প্রশ্ন করেন– গীতায় শ্রীকৃষ্ণ প্রথমে আত্মতত্ত্ব সম্বন্ধে এক বিরাট দার্শনিক আলোচনার অবতারণা করে তারপর ক্ষত্রিয়ের করণীয় নির্দ্দেশ করলেন অর্জুনকে। ওভাবে বললেন কেন ?
    শ্রীশ্রীঠাকুর– Divine Philosophy ( ভাগবত দর্শন ) দিয়ে শুরু করে তা থেকে Concrete – এ ( বাস্তবে ) আসলেন। আত্মিক ধর্ম প্রত্যেকে পালন করতে হয় তার Instinctive activity ( সহজাত সংস্কার-সম্মত কর্ম ) এর ভিতর দিয়ে। অর্জ্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ যা বলেছিলেন তার মর্ম্ম হল — You are a Kshatriya, born with Kshatriya instincts. And you must do your instinctive duty with all elevating urge ( তুমি ক্ষাত্র সংস্কার নিয়ে জাত ক্ষত্রিয়। এবং উন্নয়নী আকুতি নিয়ে তোমাকে অবশ্যই তোমার সহজাত সংস্কার-সম্মত কর্তব্য পালন করতে হবে )। অর্জ্জুন পন্ডিত কিনা তাই কেষ্টঠাকুর ঐভাবে অর্জ্জুনকে তাঁর বক্তব্য বলেছিলেন। Philosophy ( দর্শন ) না বললে অর্জ্জুন ধরত না।
    (আলোচনা প্রসঙ্গে, ১১দশ খন্ড, (ইং ২০-০৫-১৯৪৮)
    রামচন্দ্র এবং শ্রীকৃষ্ণ উভয়েই বৈষ্ণবধর্মের বা সনাতন ধর্মের মূল কাঠামো সদাচার এবং বর্ণাশ্রমকে রক্ষা এবং প্রতিষ্ঠা করার জন্যই জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। চৈতন্যদেবও ভারতীয় কৃষ্টির মূল, বর্ণধর্ম, আশ্রমধর্ম পালন করার পর লোকশিক্ষার জন্য সন্ন্যাস নিয়েছিলেন। তিনি বাস্তব জীবনে অসৎ-নিরোধে তৎপর ছিলেন। বর্ণাশ্রম বিরোধী কোন প্রতিলোম বিবাহ পর্যন্ত হতে দেন নি। দোর্দন্ডপ্রতাপ জমিদারের দুষ্কৃত ভাইপো মাধবের কবল থেকে চন্দনের বাগদত্তা চুয়াকে পার্ষদদের সাহায্যে চন্দনকে দিয়েই হরণ করিয়ে স্বয়ং পৌরহিত্য করে উপযুক্ত পাত্রে পাত্রস্থ করেছেন। (সূত্রঃ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত, চুয়াচন্দন উপন্যাস)
  • * *
    বাংলার বিশুদ্ধ কীর্তন-আন্দোলনের পথিকৃৎ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তিনি স্বভাবজ পাণ্ডিত্যের মাধ্যমে নবদ্বীপের স্মার্ত্ত পণ্ডিতদের, ভারতখ্যাত কাশ্মীরি-পণ্ডিতের দর্প চূর্ণ করেছেন। তিনি তামসিক গুণসম্পন্ন সমাজের প্রতিনিধি জগাই-মাধাইদের প্রেম দিয়ে সাত্তিক গুণের উদ্বোধন করেছেন। সনাতন ধর্ম বিদ্বেষী চাঁদ কাজীদের হরিনাম সংকীর্তনের মাধ্যমে চরমবার্তা দিয়ে তমোগুণ নাশ করে ইসলামের বিকৃতি প্রচারকে নস্যাৎ করে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বাহ্য জাতিভেদের বেড়াজাল অগ্রাহ্য করে, যবন হরিদাসের ভক্তিকে মর্যাদা দিয়ে ভক্ত হরিদাসে রূপান্তর করেছেন। তৎকালিন ভারতের বিখ্যাত তাত্ত্বিক পণ্ডিতদের, যেমন রায় রামানন্দ, প্রকাশানন্দ সরস্বতী, সার্ব্বভৌম প্রভৃতিদের ভুল ভাঙাতে তথ্যসমৃদ্ধ বাচনিক কীর্তি—
    ‘‘চণ্ডালোহপি দ্বিজশ্রেষ্ঠ হরিভক্তি পরায়ণঃ।’’
    ‘‘মুচি যদি ভক্তিসহ ডাকে কৃষ্ণধনে।
    কোটি নমস্কার করি তাহার চরণে॥’’—-প্রকাশ মাধ্যমে আপামর সবাইকে সনাতন ধর্মে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
    এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ‘‘চৈতন্যদেবও জগাই-মাধাইয়ের উপর কেমন উগ্রভাব ধারণ করে তাদের অন্তরে ত্রাস ও অনুতাপ জাগিয়ে তবে প্রেম দেখিয়ে তাদের অন্তর জয় করেছিলেন। তাদের উগ্রদম্ভ, দর্প ও প্রবৃত্তি-উন্মত্ততাকে স্তব্ধ না করে, আয়ত্তে না এনে গোড়ায় প্রেম দেখাতে গেলে সে-প্রেম তারা ধরতে পারত না। হয়তো ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করত।’’
    (আ. প্র. ৯/২৭. ১২. ১৯৪৬)
    প্রকাশানন্দ সরস্বতী, সার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্য প্রমুখগণ বৈদান্তিক পণ্ডিত ছিলেন। তাঁদের পাণ্ডিত্য বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন,—- বৈদান্তিক ভাব মানে record of experience (জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার দলিল)। ওরা হয়তো achieve (আয়ত্ত) করার পথ ঠিক অবলম্বন করেননি, সেইটে চৈতন্য মহাপ্রভু ধরিয়ে দিয়েছেন। ভক্তি লাগেই, ভক্তিপথ সহজ, সুষ্ঠু, accurate (যথাযথ), ভক্তির রাস্তা দিয়েই যেতে হয়, তার সঙ্গে বৈশিষ্ট্যানুযায়ী ঝোঁক থাকেই। অদ্বৈতবাদেও গুরুভক্তির উপর জোর দেওয়া আছে। নইলে এগোন যায় না। তাই আছে— ‘অদ্বৈতং ত্রিষু লোকেষু নাদ্বৈতং গুরুনা সহ’। নির্ব্বিকল্প সমাধিতে অদ্বৈতভূমিতে সমাসীন হ’লে জ্ঞান, জ্ঞেয়, জ্ঞাতা লয় পেয়ে যায়। তখন মানুষ বোধস্বরূপ হ’য়ে থাকে, সে অবস্থা মুখে বলা যায় না। অন্য সময় সে মানুষেরও সেব্য-সেবকভাব নিয়ে থাকা স্বাভাবিক! আমি না থাকলে তুমি থাকে না, তুমি না থাকলে আমি থাকে না। জীবজগতের সঙ্গে ব্যবহারে যে আমি-তুমি রূপ দ্বৈতভাব থাকে, তখনও তার মধ্যে একটা একাত্মবোধের চেতনা খেলা ক’রে বেড়ায়। ইষ্টই যে সব-কিছু হ’য়ে আছেন, এই স্মৃতি লেগে থাকে। আত্মাই কই আর ব্রহ্মই কই, তার মূর্ত্ত বিগ্রহ হলেন ইষ্ট। মানুষ যখন ইষ্টসর্ব্বস্ব হয়, ইষ্টপ্রীত্যর্থে ছাড়া যখন সে একটা নিঃশ্বাসও ফেলে না, তখনই সে একই সঙ্গে ভক্তিযোগ, কর্ম্মযোগ ও জ্ঞানযোগে সিদ্ধ হ’য়ে ওঠে। কর্ম্মযোগ, জ্ঞানযোগ যাই বল, ভক্তির সঙ্গে যোগ না থাকলে কাজ হয় না, সব যোগই আসে ভক্তিযোগ থেকে—
    “বহুনাং জন্মনামন্তে জ্ঞানবান্ মাং প্রপদ্যতে, বাসুদেবঃ সর্ব্বমিতি স মহাত্মা সুদুর্লভঃ”। এই জ্ঞানী একাধারে জ্ঞানী, ভক্ত ও কর্ম্মী। গোড়া থেকেই অদ্বৈতবাদ mathematically (গাণিতিকভাবে) সম্ভব হ’তে পারে, practically (বাস্তবে) সম্ভব হয় কমই। (আলোচনা প্রসঙ্গে, ত্রয়োদশ খণ্ড, তাং ১-৮-১৯৪৮)
  • * *

চৈতন্যদেব অসি নয়, তীর-ধনুক-বল্লম লাঠি দিয়েও নয়—খোল, করতালাদি বাদ্যযন্ত্রের অনুষঙ্গে ‘হরেরাম হরেকৃষ্ণ’ নামকীর্তনের মাধ্যমে এক ধর্মীয় প্লাবন সৃষ্টি করেছিলেন। ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ অতিক্রম করে, পুরুষার্থের পঞ্চম-বর্গ প্রেমের সাহায্যে সাম্প্রদায়িক কায়েমী-স্বার্থীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ভাগবত আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে ভাগবত ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্ণাশ্রমানুগ সামাজিক বিন্যাসকে সমৃদ্ধ করতে সর্ববর্ণে হরিনাম প্রচার করে বাহ্য জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। কিছু স্বার্থান্বেষী স্মার্ত্ত-পণ্ডিতদের অভিসন্ধিমূলক অভিযোগের ভিত্তিতে তৎকালিন শাসক চাঁদকাজী হরিনাম সঙ্কীর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। শ্রীবাস অঙ্গনের কীর্তনের আসরে গিয়ে বৈষ্ণবদের ওপর অত্যাচার করে, শ্রীখোল ভেঙ্গে দেয়। শান্ত মহাপ্রভু ওই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে কোন বিরোধ না করেই দুর্বার নিরোধ করেছিলেন। ১৪টি কীর্তনদল সংগঠিত করে উদ্দাম কীর্তন করতে করতে চাঁদকাজির বাড়িতে যান। চাঁদকাজী ভয় পেয়ে গেলে মহাপ্রভু তাকে আশ্বস্ত করতে কৃষ্ণপ্রেমের কথা বলেন। হরিনাম-সংকীর্তনের উপযোগিতা বিষয়ে বিস্তৃত ব্যাখ্যা করেন। তার পরে আপনকরা ভাব নিয়ে বলেন, তুমি আমার মামার গ্রামের লোক হবার সুবাদে তুমি আমার মামা হও, মামা হয়ে ভাগ্নের প্রতি এমন কঠোর হয়ো না। কীর্তন বন্ধ করার আদেশ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত আমরা তোমার বাড়ী ছেড়ে যাচ্ছি না। ধর্ম প্রতিষ্ঠার কর্তব্যে অটল মহাপ্রভুর কীর্তন আন্দোলনের কাছে আনুগত্য স্বীকার করতে বাধ্য হয় চাঁদকাজি। তিনিও মহাপ্রভুর সাথে গলা মিলিয়ে হরিনাম সঙ্কীর্তন করেন। সবাইকে হরিনাম সঙ্কীর্তন করতে আদেশ জারী করেন।
চৈতন্য আজ্ঞায় স্থির হইল কীর্তন
কহে আপনার তত্ত্ব করিয়া গর্জন।
কলিযুগে মুঞি কৃষ্ণ নারায়ন
মুঞি সেই ভগবান দেবকীনন্দন।।
অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড কোটি মাঝে মুই নাথ
যত গাও সেই মুঞি তোরা মোর দাস।।’’
(শ্রীচৈতন্য ভাগবত পৃষ্ঠা ১৪৬, মধ্যখণ্ড ৮ম অধ্যায়।)
“গৌড়েশ্বর নবাবের দৌহিত্র চাঁদকাজী কে ভগবান শ্রীমন্ মহাপ্রভুর কৃপা”– (৩)

  • প্রভু কহে – প্রশ্ন লাগি আইলাম তোমার স্থানে।
    কাজী কহে-আজ্ঞা কর যে তোমার মনে।। ১৪৬
    অনুবাদ :- শ্রীমন্ মহাপ্রভু বললেন, মামা! আমি আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করার জন্য আপনার বাড়িতে এসেছি।
    তার উত্তরে চাঁদকাজী বললেন – হ্যা, তোমার মনে কি প্রশ্ন আছে তা তুমি বল।
  • প্রভু কহে – গোদুগ্ধ খাও গাভী তোমার মাতা।
    বৃষ অন্ন উপজায় তাতে তেঁহো পিতা।। ১৪৭
    অনুবাদ :- শ্রীমন্ মহাপ্রভু বললেন – আপনি গরুর দুধ খান; সেই সূত্রে গাভী হচ্ছে আপনার মাতা। আর বৃষ অন্ন উৎপাদন করে, যা খেয়ে আপনি জীবন ধারন করেন; সেই সূত্রে সে আপনার পিতা।
  • পিতা মাতা মারি খাও এবা কোন্ ধর্ম।
    কোন্ বলে কর তুমি এমত বিকর্ম।। ১৪৮
    অনুবাদ :- যেহেতু বৃষ ও গাভী আপনার পিতা ও মাতা, তা হলে তাদের হত্যা করে তাদের মাংস খান কি করে ? এটি কোন্ ধর্ম ? কার বলে আপনি এই পাপকর্ম করছেন ?
  • কাজী কহে – তোমার যৈছে বেদ পুরাণ।
    তৈছে আমার শাস্ত্র কেতাব কোরাণ।। ১৪৯
    অনুবাদ :- কাজী উত্তর দিলেন, তোমার যেমন বেদ, পুরাণ আদি শাস্ত্র রয়েছে, তেমনই আমাদের শাস্ত্র হচ্ছে কোরান।
  • সেই শাস্ত্রে কহে প্রবৃত্তি নিবৃত্তি মার্গ-ভেদ।
    নিবৃত্তি-মার্গে জীব মাত্র বধের নিষধ।। ১৫০
    অনুবাদ :- কোরন অনুসারে উন্নতি সাধনের দুটি পথ রয়েছে – প্রবৃত্তিমার্গ ও নিবৃত্তিমার্গ। নিবৃত্তিমার্গে জীবহত্যা নিষিদ্ধ।
  • প্রবৃত্তি-মার্গে গোবধ করিতে বিধি হয়।
    শাস্ত্র আজ্ঞায় বধ কৈলে নাহি পাপ ভয়।। ১৫১
    অনুবাদ :- প্রবৃত্তিমার্গে গোবধ অনুমোন করা হয়েছে। শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে যদি বধ করা হয়, তাহলে কোনম পাপ হয় না।
  • তোমার বেদেতে আছে গোবধের বাণী।
    অতএব গোবধ করে বড় বড় মনি।। ১৫২
    অনুবাদ :- চাঁদকাজী শ্রীমন্ মহাপ্রভু বললেন – তোমার বৈদিক শাস্ত্রে গোবধের নির্দেশ রয়েছে। সেই শাস্ত্র-নির্দেশের বলে বড় বড় মুনিরা গোমেধ-যজ্ঞ করেছিলেন।
  • প্রভু কহে – বেদে কহে গোবধ নিষেধে।
    অতএব হিন্দুমাত্র না করে গোবধে।। ১৫৩
    অনুবাদ :- চাঁদকাজীর উক্তি খণ্ডন করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন – বেদে স্পষ্টভাবে গোবধ নিষধ করা হয়েছে। তাই যে কোন হিন্দু, তা তিনি যেই হোন না কেন, কখনোও গোবধ করেন না।
  • জীয়াইতে পারে যদি তবে মারে প্রাণী।
    বেদ-পুরাণে আছে হেন আজ্ঞাবাণী।। ১৫৪
    অনুবাদ :- বেদ ও পুরাণে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, কেউ যদি কোন প্রাণীকে নবজীবন দান করতে পারে, তাহলে গবেষণার উদ্দ্যেশে সে প্রাণী মারতে পারে।
  • অতএব জরদগব মারে মুনিগণ।
    বেদমন্ত্রে শীঘ্র করে তাহার জীবন।। ১৫৫
    অনুবাদ :- তাই মুনি-ঋষিরা অতি বৃদ্ধ জরদগব (জরাগ্রস্ত বা বৃদ্ধ) পশুদের কখনও কখনও মেরে, বৈদিক মন্ত্রের সাহায্যে তাদের নবজীবন দান করতেন।
  • জরদগব হঞা যুবা হয় আর বার।
    তাতে তার বধ নহে হয় উপকার।। ১৫৬
    অনুবাদ :- এই ধরনের জরদগব (জরাগ্রস্ত বা বৃদ্ধ) পশুদের যখন এভাবেই নবজীবন দান করা হত, তাতে তাদের তাতে তাদের বধ করা হত না, পক্ষান্তরে তাদের মহা উপকার সাধন করা হত।
  • কলিকালে তৈছে শক্তি নাহিক ব্রাহ্মণে।
    অতএব গোবধ কেহো না করে এখনে।। ১৫৭
    অনুবাদ :- পূর্বে মহা শক্তিশালী ব্রাহ্মণেরা বৈদিক মন্ত্রের সাহায্য এই ধরনের কার্য্য সাধন করতে পারতেন, কিন্তু এখন এই কলিযুগে সেই রকম শক্তিশালি কোন ব্রাহ্মণই নেই। তাই গাভী ও বৃষদের নবজীবন দান করার যে গোমেধ-যোজ্ঞ, তা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।
  • তোমরা জীয়াইতে নার বধ মাত্র সার।
    নরক হৈতে তোমার নাহিক নিস্তার।। ১৫৮
    অনুবাদ :- তোমরা মুসলমানেরা পশুকে নবজীবন দান করতে পার না, তোমারা কেবল হত্যা করতেই পার। তাই তোমরা নরকগামী হচ্ছ; সেখান থেকে তোমরা কোনভাবেই নিস্তার পাবে না।
  • গরুর যতেক রোম, তত সহস্র বৎসর।
    গোবধী রৌরব মধ্যে পচে নিরন্তর।। ১৫৯
    অনুবাদ :- গরুর শরীরে যত লোম আছে তত হাজার বছর গোহত্যাকারী রৌরব নামক নরকে অকল্পনীয় দুঃখ-যন্ত্রণা ভোগ করে।
  • তোমাসভার শাস্ত্রকর্তা-সেহো ভ্রান্ত হৈল।
    না জানি শাস্ত্রের মর্ম ঐছে আজ্ঞা দিল।। ১৬০
    অনুবাদ :- তোমাদের শাস্ত্রে বহু ভুলভ্রান্তি রয়েছে। শাস্ত্রের মর্ম না জেনে, সে সমস্ত শাস্ত্রর প্রণয়নকারীরা এমন ধরনের নির্দেশ দিয়েছে, যাতে যুক্তি বা বুদ্ধির দ্বারা বিচারের কোন ভিত্তি নেই এবং প্রমাণও নেই।
  • শুনি স্তব্ধ হৈল কাজী না স্ফুরে বাণী।
    বিচারিয়া কহে কাজী পরাভব মানি।। ১৬১
    অনুবাদ :- শ্রীমন্ মহাপ্রভুর এই কথা শুনে কাজীর সমস্ত যুক্তি স্তব্ধ হল, তিনি আর কিছু বলতে পারলেনা। এভাবেই পরাজয় স্বীকার করে কাজী বিচারপূর্বক বললেন—
  • তুমি যে কহিলে পণ্ডিত সেই সত্য হয়।
    আধুনিক আমার শাস্ত্র, বিচার-সহ নয়।। ১৬২
    অনুবাদ :- নিমাই পণ্ডিত! তুমি যা বললে তা সবই সত্য। আমাদের শাস্ত্র আধুনিক এবং তাই তার নির্দশগুলি দার্শনিক বিচার বা যুক্তিসঙ্গত নয়।
  • কল্পিত আমার শাস্ত্র আমি সব জানি।
    জাতি-অনুরোধে তবু সেই শাস্ত্র মানি।। ১৬৩
    অনুবাদ :- আমি জানি যে, আমাদের শাস্ত্র বহু ভ্রান্ত্র ধারনা ও কল্পনায় পূর্ণ, তবুও যেহেতু আমি মুসলমান, তাই সম্প্রদায়ের খাতিরে আমি সেগুলি স্বীকার করি।
    (শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত সপ্তদশ পরিচ্ছেদ।)

সনাতন ধর্মকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করতে এত কিছু করা সত্বেও নবদ্বীপের কিছু স্মার্ত্ত পণ্ডিতেরা মহাপ্রভুর বিরোধিতা করেছেন। তাই তিনি অনিচ্ছা সত্বেও বাধ্য হয়ে বৈষ্ণব আন্দোলনকে নবদ্বীপে বা নদীয়াতে সীমাবদ্ধ না রেখে ভারতব্যাপী বিস্তার করার মানসে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নামে ভুষিত হয়ে লোক-সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পরিব্রাজক হয়ে বেরিয়ে পড়েন।
“সন্ন্যাস লইনু যবে ছন্ন হইল মন।
কী কাজ সন্ন্যাসে মোর প্রেম প্রয়োজন॥”
—এই বাণীর মধ্যে যা’ স্পষ্টরূপে প্রকাশিত।
* * *
চৈতন্যদেবের লীলাবসান পরবর্তীকালে কিছু প্রবৃত্তিমার্গী অনুগামীরা চৈতন্যদেব কথিত অবতারবাদের মূলমন্ত্র—
“আত্মেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা তারে বলি কাম।
কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা, ধরে প্রেম নাম।
কামের তাৎপর্য্য নিজ সম্ভোগ কেবল।
কৃষ্ণসুখ তাৎপর্য্য প্রেম মহাবল।।”
একটু বোধী তাৎপর্যে বিচার করলে দেখা যাবে, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-র আদর্শের অনুশাসন অনুশীলন ভিন্ন “কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা” উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
‘‘কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা’’-র সদাচার, বর্ণাশ্রম ও চতুরাশ্রম-ধর্মের তাৎপর্য্য বোঝার চেষ্টা না করে, কৃষ্ণের আদর্শ চরিত্রগত করার অনুশীলন না করে, সাধনদ্বারা চৈতন্যদেবের পরবর্তী অবতারকে অন্বেষণ না করে, প্রবৃত্তি পরবশতার “আত্মেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা”-কে গুরুত্ব দিলেন তথাকথিত শ্রীকৃষ্ণ-চৈতন্য-প্রেমীরা। শ্রীকৃষ্ণের সাথে রাধাকে জুড়ে নিয়ে মুখে ‘কৃষ্ণ-কৃষ্ণ’ বলে খোল-করতাল সহযোগে কীর্তন করতে অভ্যস্ত হলেন। রাধা-কৃষ্ণের পরকীয়া প্রীতির সহজিয়া গোষ্ঠী তৈরি করে সগোত্র এবং প্রতিলোম বিবাহাদি সমর্থন করে আশ্রমধর্মকে অশ্রদ্ধা করেছেন। ফলে বিকৃত হয়েছে শ্রীকৃষ্ণ-চৈতন্যদেবের আদর্শ। যার প্রবহমানতা বর্তমানেও বিদ্যমান। চৈতন্যদেব প্রদত্ত ‘শিক্ষাষ্টক’ উপদেশামৃত, যার মধ্যে ‘রাধা’ নামের উল্লেখ পর্যন্ত নেই, ওই উপেদেশামৃতকে গুরুত্বের সাথে বিচার-বিশ্লেষণ না করেই ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থেও রাধাকে মানবী রূপে চিত্রিত করা হয়েছে। রাধাকে কৃষ্ণের বল্লভা বলা হয়েছে। বল্লভা শব্দের অর্থ প্রণয়িণী। যে কৃষ্ণকে সবকিছুর স্রষ্টা মনে করেন যারা, যে কৃষ্ণ অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখান বলে প্রচার করা হয়, সেই কৃষ্ণের প্রাণধন, প্রাণশক্তি বা জীবনীশক্তির উৎস একজন নারী ! ভাবা যায় ! না মেনে নেওয়া যায় ? যদি রাধাকে কৃষ্ণের একজন ভক্ত হিসাবে দেখাতেন, তাহলে মেনে নেওয়া যেত।
রাধা সহ ক্রীড়ারস বৃদ্ধির কারণ।
আর সব গোপীগণ রাসোপকরণ॥
কৃষ্ণের বল্লভা রাধা কৃষ্ণ প্রাণধন।
তাঁহা বিনু সুখ হেতু নহে গোপীগণ॥
(চৈঃ চঃ পৃঃ ৬৪)
শুধু তাই নয়, শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে গবেষণা করেন যারা, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাকে নিয়ে গবেষণা করেন যারা, তারাও পার্থসারথী কৃষ্ণের আদর্শকে পাশ কাটিয়ে, বর্ণাশ্রমধর্মকে উপেক্ষা করে, বাঁশী হাতে নিয়ে রাধাকে জড়িয়ে ধরা রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তির উপাসনা করেন। ‘আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সঙ্ঘ’, সংক্ষেপে ইসকনের ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথি স্মরণে জন্মাষ্টমীর দিনটিতেও রাধাকে সাথে রাখেন, যেন রাধাকে সাথে নিয়েই কৃষ্ণ জন্মেছিলেন! বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন—‘‘শুনেছি ভাগবতে রাধা ব'লে গোপিনী নেই। আমি বুঝি, রাধা মানে সেরা সৃষ্টি-রচয়িতা শক্তি। শব্দের থেকেই সব। কতরকমের শব্দ শোনা যায়। ওঁ-অনুভূতির পূর্বে দারুণ বম্ বম্ বম্ শব্দ হয়। দুনিয়াটা যেন ফেটে চৌচির হ'য়ে যাবে। কিছু থাকবে না, সব ধ্বংস হ'য়ে যাবে। সত্তাকেও বিলুপ্ত ক'রে দেবে। এমন শব্দ, সব যেন টুকরো টুকরো হ'য়ে, রেণু রেণু হ'য়ে উড়ে যাবে। সে কী ভীষণ অবস্থা! ভয় বলি, সত্তার ভয় যে কী তখন বোঝা যায়! সত্তা বুঝি এই মুহূর্তে গুঁড়িয়ে দিল। তখন বোঝা যায় দয়ালের দয়া, যে দয়ায় টিকে আছি এই দুনিয়ায়। ওঁ-অনুধাবনে রং আসে। রং-এ মনোনিবেশ করলে পিকলু বাঁশীর মত শব্দ হয়। দোল আসে। এক অবস্থায় motion and cessation (গতি এবং বিরতি)-এর মত বোধ হয়। স্বামীর অনুভূতি যেন to and from (একেবার সামনে একবার পেছনে হচ্ছে)-এমনতর বোধ করা যায়। ইলেকট্রিক ব্যাটারি দিলে যেমন শব্দ পাওয়া যায় না, ভিতরে বোধ হয়, রাধাও ঐ রকম সত্তা দিয়ে মানুষ হয়। শেষ দিকে আসে একটা পরম শান্ত অবস্থা। আমাদের এই সৎনাম সব মন্ত্রের বীজস্বরূপ। সব বীজের সত্তা হ'লো কম্পন। আর কম্পনের গঠনতন্ত্র অনুভব করা যায় এই নামের মধ্যে। রেডিওর যেমন শর্ট ওয়েভ, মিডিয়াম ওয়েভ এবং নানা মিটার আছে, অনুভূতির রাজ্যেও সেই রকম সব আছে। এগুলি ফালতু কথা না, এগুলির সত্তা আছে। যে সাধন করে সেই বুঝতে পারে। হ্রীং ক্রীং ইত্যাদির স্তরে-স্তরে কত শব্দ এবং তার সঙ্গে-সঙ্গে জ্যোতি ভেসে ওঠে। আর একটা কথা, পরীক্ষা করতে গেলে সদগুরুকে ধরা যায় না। কামনা নিয়ে গেলেও তাঁকে পাওয়া হয় না। কামনা ত্যাগ ক'রে ধরলে তখন তাঁকে পাওয়া যায়। কামনা নিয়ে তাঁতে যুক্ত হ'তে গেলে কামনার সঙ্গে যুক্ত হই, তাঁতে যুক্ত হ'তে পারি না। নিষ্কামের কথা কয়, তার মানে গুরুই আমার একমাত্র কাম্য হবেন, অন্য কোন কামনা থাকবে না। তখনই তাঁকে পাওয়া যাবে।’’ (আ. প্র. ১৫শ খণ্ড, পৃঃ ২০০-২০১ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী)

তাই বাধ্য হয়ে এ-যুগের শ্রীকৃষ্ণ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বিকৃতাচারী ধর্মের ধ্বজাধারীদের উদ্দেশ্যে বললেন—
“ভগবান, ইষ্ট বা ধর্ম্মের মৌখিক স্তুতির ভিতর-দিয়ে যা’রা ধর্ম্মবিরোধী কাজ করে, তা’রা হ’ল সব চাইতে বড় শয়তানের দূত–প্রকৃষ্ট লোক-দূষক। ১২৫ । (শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭)’’
‘‘অনেকে শ্রীকৃষ্ণকে মানে, গীতা মানে, অথচ বর্ণাশ্রম মানে না। গীতার কে কি ব্যাখ্যা করেছেন সেই দোহাই দেয়। কিন্তু গীতার বক্তা শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও বাণী দেখে চতুর্বর্ণ সম্বন্ধে তাঁর মত আমরা কি বুঝি? এ সম্বন্ধে কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না, গীতা শ্রীকৃষ্ণের জীবনেই জীবন্তভাবে পরিস্ফুট। গীতায় প্রত্যেক বর্ণের স্বভাবজ কর্ম সম্বন্ধে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। (আ. প্র. ১৪/১১৮)
কেষ্টঠাকুরের জীবনটা দেখেন, ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত সবাই তাঁকে পুরুষোত্তমজ্ঞানে পূজা করতেন, কিন্তু তাঁর এত বিয়ের মধ্যে একটাও বামুনের মেয়ে নেই। সমাজ-সংস্থিতির জন্য তিনি বর্ণাশ্রমের বিধান কাঁটায়-কাটায় মেনে গেছেন। (আ. প্র. ৭/৫০)’’
* * * যারা শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে গবেষণা করেন, তাদের তো জানা উচিত যে, শ্রীকৃষ্ণ, বৃহত্তর রাষ্ট্রকে অধর্মের গ্যাংগ্রীন থেকে বাঁচাতেই সুকৌশলে কংস, জরাসন্ধ, শিশুপাল, শাল্ব কৌরবাদির ন্যায় আততায়ীরূপী গ্যাংগ্রীনদের অপারেশন করেছিলেন।---হিংসাকে হিংসা দ্বারা প্রতিরোধ করে অহিংসার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন! কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সনাতনী আর্য্যকৃষ্টির মূলতত্ত্ব, সদাচার ও বর্ণাশ্রমধর্মভিত্তিক পরমরাষ্ট্রিক সমবায়। শ্রীকৃষ্ণের লীলাবসান পরবর্তী শ্রীকৃষ্ণের গীতা-আদর্শের প্রচারক ঋত্বিক সংঘ সক্রিয় থাকার ফলে প্রজাগণ সহজাত-সংস্কার অনুযায়ী সবাই জীবিকা অর্জন করতেন। কেহ কাহারো বৃত্তি-হরণ করতেন না। সকলে আর্য্যকৃষ্টির বিবাহাদি দশবিধ সংস্কার মেনে চলতেন। জনন বিপর্যয় হয় নি, আশ্রমধর্ম ঠিক ছিল। ফলে তিন হাজার বছর পর্যন্ত বৃহত্তর আর্যাবর্তে আগ্রাসন করতে সাহস পায়নি অধার্মিক দুষ্কৃতিরা ! যখন থেকে বর্ণাশ্রম-ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের শিক্ষা ভুলে, প্রবৃত্তিরূপী শয়তানের প্ররোচনার ফাঁদে পড়ে আমরা ক্লীব হয়েছি, তখন থেকে আমরা আগ্রাসনের শিকার হয়েছি। বোধ বিপর্য্যয়ের কারণে, সনাতন ধর্মের অনুশাসন ভুলে, এক আত্মঘাতী উদারতা দেখাতে গিয়ে শক-হুণ-পাঠান-মোগলদের স্বাগত জানিয়েছি। তারা সুযোগ পেয়ে আমাদের জাতীয়তাবোধ, জাতীয়কৃষ্টি অবদলিত করেছে! অনেকদিন পরে, যখন আগ্রাসনের চরম বিপর্যয়, তখন ইংরেজদের অপশাসন থেকে আর্যাবর্তকে মুক্ত করতে আমরা মেরুদণ্ড সোজা করে ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করলাম। সেই শ্রীকৃষ্ণের গীতার আদর্শকে অবলম্বন করে। "যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লাণির্ভবতি ভারতঃ। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মনম্ সৃজাম্যহম্।। পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম্ । ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ।।"---বাণীর অনুসরণে। গীতার ওই সূত্র অবলম্বনে, চৈতন্যদেব ‘‘যেই রাম সেই কৃষ্ণ, এক দেহে রামকৃষ্ণ’’ রূপে এসে আমাদের ভুল ভাঙিয়ে দিলেন। গীর্জায় গিয়ে যীশুর, মসজিদে গিয়ে রসুলের আরাধনা করলেন। পঞ্চমুণ্ডির আসন সাজিয়ে কোনো তান্ত্রিক-গুরু বসালেন তো বসে পড়লেন। তিনি লোকশিক্ষার জন্য বহু ধর্মীয় মতবাদের গুরুদের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুন্ন রেখেই। তিনি দক্ষিণেশ্বরে পূজারী হয়ে এসেও প্রচলিত পূজা-পদ্ধতি অনুসরণ করেন নি। মৃন্ময়ী জগন্মাতাকে প্রাণবন্ত করে দেখালেন এবং কালী মায়ের আদেশক্রমে নিজে খেয়ে মাকে খাওয়ালেন। ফলহারিনী কালী পূজার শুভলগ্নে সারদাদেবীকে আরাধনা করে চিন্ময়ী মাতৃশক্তিকে আদ্যাশক্তি রূপে শ্রদ্ধা করতে শেখালেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব শিষ্য নরেন্দ্রনাথকে শেখালেন, ভারতবর্ষের শাশ্বত দর্শন, ‘‘বহুজন হিতায় চ, বহুজন সুখায় চ’’-এর আদর্শের উত্তরাধিকারী হয়ে পরমার্থ লাভ করার জন্য তোমাকে আত্ম নিবেদন করতে হবে। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ঐশী শক্তিতে শক্তিমান হয়ে নরেন্দ্রনাথ হলেন বিবেকানন্দ। এঁকে দিলেন মহান ভারতবর্ষের পূর্ণাঙ্গ এক চিত্র। শিকাগো ধর্ম্ম মহাসভার ক্যানভাসে। ‘আব্রহ্মস্তম্বভৃদ্ধাতা’–তৃণলতা থেকে ব্রহ্ম, সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বার্তাবহ বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, সংহিতা, পুরুষোত্তমবাদ নিয়ে বিশ্বজনমানস নতুন করে ভাবতে শুরু করলো। সনাতন ধর্মের হৃত উত্তরাধিকার ফিরে পেতে ভারতবর্ষ উপনিষদের ‘‘উত্তিষ্ঠত জাগ্রত, প্রাপ্য বরান্ নিবোধত।।’’ মন্ত্রে আবার নতুন করে জেগে উঠলো।......... ‘‘কর্ম্মণ্যেবাধিকারেস্তু মা ফলেষু কদাচন।.......’’ ––কর্মেই তোমার অধিকার ফলে নয়। ––শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতার ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার আদর্শ আঁকড়ে নবযুগের অভিমন্যু ক্ষুদিরাম, দেশরক্ষার ধর্ম পালন করতে গিয়ে ফাঁসির আসামী হলেন। ‘‘ন জায়তে ম্রিয়তে কদাচিৎ.......বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়.........নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ।.......’’। বাণীর অমৃত আদর্শে স্থিতপ্রজ্ঞ, মৃত্যুঞ্জয়ী ক্ষুদিরাম হাসিমুখে ফাঁসির দড়ির মালা পড়লেন গলায়। একটা ক্ষুদিরামের আত্মাহুতি জন্ম দিল হাজারো ক্ষুদিরামের। ফাঁসিরজ্জু আর ইংরেজ রাজশক্তির বুলেটের আলিঙ্গনে জীবনের জয়গান গাইতে গাইতে অকালে হাসিমুখে বিদায় নিল উত্তরাধিকারের স্বপ্নদেখা কতশত বীর ভারত-সন্তানেরা।

স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম শহীদ ক্ষুদিরাম ‘গীতা’-বর্ণিত ‘‘হতো বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং/জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম্’’-এর বাণীর অনুসরণে অমরত্ব লাভের অনুশাসন মেনে মৃত্যু বরণ করে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মৃত্যুঞ্জয়ী হতে শিখিয়েছিলেন। গীতা গ্রন্থের সেইসব বীরগাঁথা ভুলে আমরা তাঁর ঋণ শোধ করছি, ‘কৃষ্ণ করলেই লীলা, আমরা করলেই বীলা’ গানের ডালি সাজিয়ে! যদিও ওই গান রচনা করার সাহস আমরাই দিয়েছি,—যারা ধর্মের ধ্বজা ধরে প্রবৃত্তিকে পোষণ দিয়ে চলেছি।–-পার্থসারথী শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমদ্ভাগবতগীতার আদর্শ ভুলে, হ্লাদিনি শক্তিরূপিনী রাধা-তত্ত্ব ভুলে, মনগড়া প্রবৃত্তি-প্ররোচিত মানবী রাধা, শ্রীকৃষ্ণের মামীর সাথে পরকীয়া কামুক-রূপে, গোপিনীদের বস্ত্রহরণকারী-রূপে শ্রীকৃষ্ণকে চিত্রিত করে!
‘রাই জাগো রাই জাগো বলে শুক-সারি বলে, কত নিদ্রা যাওগো রাধে শ্যাম-নাগরের কোলে।…..’ এবং ‘রাই জাগোরে, জাগো শ্যামের মনমোহিনী বিনোদিনী রাই/শ্যাম অঙ্গে অঙ্গ দিয়া আছোরে রাই ঘুমাইয়া তোমার কি লোকলজ্জা নাই….’ ওই প্রভাতী গান দুটো বৈষ্ণব মহলে শুধু নয়, কীর্তন হিসেবেও সমাদৃত, জনপ্রিয়। গান দুটোর ভাষা বিশ্লেষণ করে একবার দেখুন।
শাস্ত্র অনুযায়ী আর্য্য হিন্দুদের ব্রাহ্মমুহূর্তে শয্যাত্যাগ করে ঈশ্বরোপাসনা করতে হয়। আর প্রাকৃতিক নিয়মে ব্রাহ্মমুহূর্ত কালে সব পাখিরা জেগে যায়। স্বভাবতই শুক-সারি পাখি জেগে গিয়েছে। রাধা তখনো নাগর কৃষ্ণের অঙ্কশায়িনী হয়ে শুয়ে আছে। নগরবাসীরা যদি জানতে পারে তাহলে লজ্জায় পড়তে হবে। তাই শুক-সারী পাখি ওদের ভাষার জাগরণী গান গেয়ে রাধাকে সাবধান করে দিচ্ছেন। আর কৃষ্ণ ভক্তেরা ভালোমন্দ বিচার না করে, ওই গানকেই জাগরণীর জন্য আদর্শ গান হিসেবে নির্বাচন করে গেয়ে চলেছেন। এবার বিচার করে দেখুন, কাম-রসাত্মক চটুল কথায় প্রভাতী সুর লাগিয়ে শ্রীকৃষ্ণের নামে ওই আরাধনা আর্য্যকৃষ্টি বিরোধী প্রবৃত্তি-প্ররোচিত পরদারাসক্ত ব্যতীত কোন্ আধ্যাত্মিক আবেদনে সমৃদ্ধ ? ওইসব জাগরণী গান শুনে, এবং কবি জয়দেব বিরচিত গীতগোবিন্দের ছত্রে ছত্রে বর্ণিত কামবিলাসী, ‘দেহি পদপল্লব মুদারম্’ বলে রাধার মানভঞ্জন করা, পরকীয়া নিয়ে ব্যস্ত শ্রীকৃষ্ণের কীর্তিকলাপ পড়ে, যদি কোন তথাকথিত নাস্তিক্যবাদী শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রে কালিমালিপ্ত করে, —সেই ধর্মবিরোধী, ইষ্টবিরোধী প্রচারের জন্য দায়ী কারা?
শ্রীকৃষ্ণ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ‘‘ …….. ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এলেন। ব্রাহ্মণ্যধর্ম্ম অর্থাৎ বৃদ্ধির ধর্ম্ম প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি প্রাণপাত করলেন। অথচ ব্রাহ্মণকুলতিলক দ্রোণাচার্য্যই তাঁর বিরুদ্ধে গেলেন। ভীষ্ম অন্নের কৃতজ্ঞতার দোহাই দিয়ে কৌরবপক্ষে গেলেন। কিন্তু যে-অন্ন তিনি খেয়েছিলেন সে-অন্নের অর্দ্ধেক মালিক পাণ্ডবরা। যা হোক, ধর্ম্ম কোথায়, ন্যায় কোথায়, লোকহিত কোথায়, কৌরবপক্ষ তা না বোঝার ফলে যুদ্ধ অনিবার্য্য হয়ে উঠলো। এতসব বিপর্য্যয় সত্ত্বেও কেষ্টঠাকুর ঘরে-ঘরে ঋত্বিক, অধ্বর্য্যু, যাজক পাঠিয়ে লোকের মনন ও চলনের ধারা দিলেন বদলে। করলেন ধর্ম্মের সংস্থাপনা। বুদ্ধদেব আসবার পর বৌদ্ধভিক্ষুরা দেশ ছেয়ে ফেললো, যার পরিণাম অশোক। অশোকের ভুলত্রুটি যাই থাক, শোনা যায়, অমনতর সম্রাট ও অমনতর সাম্রাজ্য নাকি কমই হয়েছে। রসুল আসার পর ইসলামের যাজনের ঢেউ কী রকম উঠেছিল তা কারও অজানা নয়। বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, মুসলমান সবাই তাদের যাজনের রেশটা কম-বেশী ধরে রেখেছে। প্রচারক আছে, প্রচেষ্টা আছে। অবশ্য, আচরণহীন প্রচারণায় যতটুকু হতে পারে ততটুকুই হচ্ছে। তবু মানুষের কানের ভিতর কথাগুলি ঢুকছে। কিন্তু আমাদের ঘরে ঘরে হানা দেবার কেউ নেই। তারা কেউ জুটলো না। অথচ হুজুগ করার এত লোক জুটছে। হুজুগ করে দল বেঁধে জেলে গেলে তাতে মানুষ কতখানি গড়ে উঠবে তা বুঝতে পারি না। (আ. প্র. ৮ম খণ্ড, ২৬. ০৬. ১৯৪৬)
“আলেকজাণ্ডারের আগে পর্য্যন্ত কোন আক্রমণকারী আমাদের দেশে ঢুঁ মেরে কিছু করতে পারেনি । অশোকের Buddhism (বৌদ্ধবাদ)-এর পর থেকে বর্ণাশ্রম ভেঙ্গে পড়ে এবং সেই থেকেই সমাজ ও জাতি দুর্ব্বল হয়ে পড়ে । বুদ্ধদেব গৃহীর জন্য বর্ণাশ্রম রক্ষা করতে বলেছেন । আর ভিক্ষু, শ্রমণ ইত্যাদির বেলায় ওটার ওপর জোর দেননি । আর, সে ক্ষেত্রে ওর প্রয়োজনও ছিল না । কারণ, ভিক্ষু বা শ্রমণদের কোন যৌন সংশ্রব ছিল না । কিন্তু ভিক্ষুণীপ্রথা প্রবর্তনে সে বাঁধনও ভেঙে গেল । বুদ্ধদেব যে স্বর্ণযুগ আনতে চেয়েছিলেন তা আর সম্ভব হ’ল না ।”
(আ. প্র. ২১/৬. ৮. ১৯৫২)

  • * * আর একবার কৃষ্ণকথায় ফিরে আসছি। বিচার করে দেখব, কৃষ্ণ-রাধার আজগুবী তত্ত্বের অস্তিত্ব আদৌ আছে কি-না। পণ্ডিতদের মতে কংসের দূত হয়ে মহামতি অক্রুর, বলরামসহ শ্রীকৃষ্ণকে বৃন্দাবন থেকে মথুরায় নিয়ে যান কংস আয়োজিত ধনুর্যজ্ঞে অংশগ্রহণ করাতে। কংসের উদ্দেশ্য ছিল শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করার। পরিবর্তে শ্রীকৃষ্ণ অত্যাচারী কংস-মামাকে হত্যা করে পিতামহ উগ্রসেনকে রাজ্য প্রত্যর্পণ করেন। তারপর ঘোর আঙ্গিরসের সান্নিধ্যে পরাবিদ্যা এবং সান্দিপনী কাশ্যের সান্নিধ্যে অপরাবিদ্যা লাভ করেন আর বৃন্দাবনে ফিরে যান নি।
    পণ্ডিতদের এই সাক্ষ্য থেকে প্রমাণিত, শ্রীকৃষ্ণ ১১ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে কংসকে বধ করেন। অথচ বেশীরভাগ কৃষ্ণভক্তগণ বৃন্দাবন লীলার, রাসলীলার নামে যে যুবক কৃষ্ণকে মানবী রাধার সাথে যুগলবন্দী করে পরকীয়া কামুক রূপে চিত্রিত করে চলেছেন, সে কৃষ্ণ কোন কৃষ্ণ? সে কি বৃষ্ণিসিংহ দেবকীনন্দন, না অন্য কেউ ? সে কি গীতার প্রবক্তা পার্থসারথী, না অন্য কেউ? কারণ, বৈষ্ণবদের প্রামাণ্য গ্রন্থ ভাগবতে রাধা-কৃষ্ণের ওইসব অবৈধ পরকীয়া-লীলার কোন কাহিনী লিপিবদ্ধ নেই। অথচ কৃষ্ণের প্রচারকেরা গীতার কথা বলেন, ভাগবতের কথা বলেন, অথচ আয়ান ঘোষের ঘরণী রাধাকে শ্রীকৃষ্ণের সাথে এক অবৈধ সম্পর্কের সাথে জুড়ে নিয়ে কৃষ্ণনাম করতে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণের যে বদনাম করে চলেছেন, সেটাও তাদের বোধে ধরা পড়ে না, এমনই ধার্মিক তা’রা !
    কৃষ্ণকে একমাত্র ভগবান বলে মানেন যারা, তারা আবার শ্রীকৃষ্ণের সাথে রাধারও উপাসনা করেন, কোন্ যুক্তিতে? তাদের অনেকেই আবার শ্রীকৃষ্ণের নব-কলেবর জ্ঞানে চৈতন্যদেবের প্রতিকৃতির উপাসনাও করেন। তা’রা বলেন, চৈতন্যদেব রাধা-কৃষ্ণের যুগল অবতার। খুব ভাল কথা। তাই যদি হয়, তাহলে তো একঅঙ্গে দুই-রূপ যুগল অবতার-স্বরূপ চৈতন্যদেবেরই আরাধনা করতে হয়। আলাদা করে রাধা-কৃষ্ণের যুগলমূর্তির আরাধনার প্রয়োজন নেই। কারণ গীতার বাণী ‘‘তেষাং জ্ঞানী নিত্যযুক্ত একভক্তি র্বিশিষ্যতে।’’ (৭ম অধ্যায়) অনুসারে পুরুষোত্তম ব্যতীত একাধিক আদর্শকে মনে স্থান দিলেও ব্যভিচার করা হয়, যা ইষ্টলাভের বা ঈশ্বরলাভের পথে অন্তরায়। ইসকন ভক্তদের এ বিষয়টা একবার ভেবে দেখা উচিত। কারণ, আমরা জীবনপিয়াসী যারা, তারা যদি এভাবে জীবনদেবতার অপমান করে চলি, আমাদের জীবন কিভাবে সমৃদ্ধ হবে? —————————————-
    নিবেদনে— তপন দাস@tapandasd

ভাষা দিবসের শ্রদ্ধার্ঘ্য

** ভাষা দিবসের শ্রদ্ধার্ঘ্য **
।। সত্তাপোষণী ভাষায় সাহিত্য নির্মাণে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্য অবদান ।।


সত্তাপোষণী ভাষায় সাহিত্য নির্মাণে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র যে বিশিষ্ট অবদান রেখে গেছেন মানব সভ্যতাকে সবদিক দিয়ে সমৃদ্ধ করতে, তার কিছু দৃষ্টান্ত উপহার স্বরূপ তুলে ধরছি।
‘‘ভাব, ভাষা, যুক্তি,
ছন্দ ও অনুরণন
যতই সৌষ্ঠবমণ্ডিত হ’য়ে
আদর্শ-উল্লোল হ’য়ে ওঠে—
জীবনীয় সাত্তিক সম্বর্দ্ধনায়,—
রচনা জীবন্ত হ’য়ে ওঠে সেখানে তেমনি,
এই হলো রচনার পঞ্চপ্রাণ।’’ ২৩৯ (শিক্ষা-বিধায়না)
‘‘সমস্ত রসের সমবায়ে
সন্দীপনার বোধ-পরিবেষণী
সাত্বত সম্বেদনাই হ’চ্ছে
সাহিত্যের প্রাণনদীপ্তি।’’ ২৪০ (শিক্ষা-বিধায়না)
‘‘পরিস্থিতির ভাল-মন্দ পরিচলনকে
আলোড়ন-বিলোড়ন ক’রে
সার্থক সঙ্গতিশীল সাত্বত পন্থায়
সাত্তিক মর্যাদায়
সুদীপ্ত ক’রে তোলাই হ’চ্ছে
সাহিত্যের সমীচীন তাৎপর্য,
আর তাই-ই হচ্ছে
জনগণের জীবনীয় সম্বর্দ্ধনা।’’ ২৪১ (শিক্ষা-বিধায়না)

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র অনুশ্রুতি নামক গ্রন্থে  ছোট্ট ছোট্ট ছড়াবাণীতে যে সম্পদ আমাদের দান করে গেলেন, তা’ থেকে সামান্য কিছু উদ্ধৃত করলাম (অনুশ্রুতি ১ম খণ্ড থেকে)।
আদব-ভরা ফুল্লবাণী
আশার পিনাক হাতে,
প্রাপ্তিটাকে আনবি ডেকে
তপের আলোকপাতে। ৭৮। (সাধনা)

মান-গরবে অহংবশে
ধরলি রে ধাঁজ বেকুব চতুর,
চলনে তোর দিগ্গ্জী ভাঁজ
দেখতে যেন ক্ষিপ্ত কুকুর। ১২২। (বৃত্তিধর্ম)

পথ ভেবেই তুই শ্রান্তিভরে
ক্ষান্ত হ’য়ে যাসনে দমে,
মানুষ কি রে চলতে পারে
না ক’রে ভর স্ব-উদ্যমে ? ২৬ । (বৃত্তি নিয়ন্ত্রণ)

শঙ্খ ফুঁকে অমর হাঁকে
উচ্চরোলে পুরুষ-বুক,
তাথৈ থিয়ায় নাচাও নারী
বর্মে ঢেকে মৃত্যুমুখ। ৮৭। (পুরুষ ও নারী)

সব দিতে তুই করলি গুরু
পেতে পরিত্রাণ,
দিলি কিন্তু নব ঘণ্টা
নিতেই লেলিহান! ৪৩। (কপট টান)

বাসতে ভাল এসে রে তুই
বাসলি ভাল কা’রে,
প্রতিদানেও তাই পাবি তুই
মজলি নিয়ে যা’রে। ৭৫। (কপট টান)

এমন অসংখ্য ঋদ্ধ-বাণীতে সমৃদ্ধ রচনা পাঠ করে তাঁকে কবি, ছান্দসিক, সাহিত্যিক, সাহিত্যদ্রষ্টা ঋষি বললেও বোধহয় অত্যুক্তি হবে না।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সব ঝড়ঝঞ্ঝা থেকে মানব সভ্যতাকে আগলে রাখতে ওজস্বী ভাষায় ‘দেবভিক্ষা’ শিরোনামে যে কাতর আবেদন রেখেছিলেন, সে আবেদনের, সে ভাষার, মর্যাদা যদি পেত, বিশেষ করে সাহিত্যিকগণ যদি তাদের গুটি কেটে বেরিয়ে এসে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করতেন, তাহলে অবক্ষয়ের রাশ কিছুটা হলেও টেনে ধরা যেত।

।। দেবভিক্ষা ।।
‘‘ওগো ভিক্ষা দাও!–
ঝাঁঝাল ঝঞ্ঝার পিশাচী জৃম্ভন শুরু হয়েছে,
বাতুল ঘুর্ণি বেভুল স্বার্থে
কলঙ্ক কুটিল ব্যবচ্ছেদ
সৃষ্টি করতে আরম্ভ করে দিয়েছে,
প্রেত-কবন্ধ-কলুষ
কৃষ্টিকে বেতাল আক্রমণে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে,
অবদলিত কৃষ্টি অজচ্ছল অশ্রুপাতে
ভিক্ষুকের মতো তাঁরই সন্তানের দ্বারে
নিরর্থক রোদনে রুদ্যমান,
অলক্ষ্মী-অবশ প্রবৃত্তি-শাসিত বেদস্মৃতি–
ঐ দেখ–মর্মান্তিকভাবে নিষ্পেষিত,
ত্রস্ত দোধুক্ষিত দেবতা আজ নতজানু–তোমাদেরই দ্বারে
তোমাদেরই প্রাণের জন্য তোমাদেরই প্রাণভিক্ষায়
তোমাদেরই সত্তার সম্বর্দ্ধনার জন্য
ব্যাকুল হয়ে ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়াচ্ছেন ;
কে আছ এমন দরদী আর্য্য-আত্মজ সন্তান!–
তাঁকে মানুষ ভিক্ষা দেবে, তাঁকে অর্থ ভিক্ষা দেবে—
সব হৃদয়ের সবটুকু উৎসর্গ করে
তোমাদেরই জন্য
সেই দেবোজ্জল প্রচেষ্টাকে সার্থক করে তুলতে ?
যদি থাক কেউ
ওগো ধী-ধুরন্ধর উৎসর্গপ্রাণ
নিরাশী নির্ম্মম!
এস,—উৎসর্গ কর—আত্মাহুতি দাও—
জীবন নিঙড়ানো যা-কিছু সঙ্গতি
তাঁকে দিয়ে সার্থক হয়ে ওঠ,
নিজেকে বাঁচাও, মানুষকে বাঁচাও, কৃষ্টিকে বাঁচাও ;
আর, বাঁচাও দুর্দ্দশাদলিত মহা-ঐশ্বর্য্যশালিনী
আর্য্যস্তন্যদায়িনী, পরম-পবিত্রা
ভিখারিণী মাতা ভারতবর্ষকে,
ধন্য হও, নন্দিত হও,
ঈশ্বরের অজচ্ছল আশীর্ব্বাদকে
মাথা পেতে লও,
শান্ত হও, শান্তি দাও,
অস্তি ও অভ্যুত্থানকে
অনন্তের পথে অবাধ করে রাখ ;

স্বস্তি! স্বস্তি! স্বস্তি!

এবার আমি সাহিত্যের উৎস বিষয়ে বলা শ্রীশ্রীঠাকুরের কিছু রচনার উপর আলোকপাত করার চেষ্টা করব।--- সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী পরমপিতা এক থেকে বহুতে পরিণত হবার প্রাক্কালে যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনাহত-নাদ উৎপন্ন হয়েছিল, সেই আদিধ্বনিস্পন্দিত শব্দ বা ধ্বনি বা পরাবাক্ ওঁ সব সৃষ্টির আদি উৎস। "ব্যাপ্ত প্রাক, প্রথম বাক্।" পুণ্যপুঁথিতে বর্ণিত শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাষায় ‘‘এক বিরাট ধ্বনি সোঽহং পুরুষ ভেদ করে সৃষ্টি করতে চলে এল---সেই ওম্।’’

আবার অনুশ্রুতি গ্রন্থে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন—
‘‘স্পন্দন়টার সংবেদনা
যেমনতর যেথায় হয়,
শব্দটাও তো মূর্ত্তি নিয়ে
বিশেষ হয়ে তাতেই রয়।’’ এই নিয়মনা বা বিধির মধ্য দিয়েই সৃষ্টি হয়েছে সব ভাষার।

শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাষায়— ‘‘ভাষা তার /পরিস্থিতি ও পরিবেশ অনুগ/ব্যক্তির ভাব-সন্দীপনী ব্যক্ত বিবর্তন/ছাড়া আর কিছুই নয়কো।’’ (শিক্ষা-বিধায়না, ১১৮)

এই বিবর্তন পরিলক্ষিত হয় রামায়ণ রচনার প্রেক্ষাপটে।
যেমন, রাম-নামের নাদ-সাধন করে রত্নাকর দস্যু মেধানাড়ীকে জাগ্রত করে হয়েছিলেন বাল্মীকি। একদা তমসা নদী থেকে স্নান করে ফিরছিলেন। এক তরুশাখে ক্রৌঞ্চ-জুটি পরস্পর খেলছিল। এক ব্যাধ পুরুষ পাখিটিকে তীর মেরে হত্যা করলে স্ত্রী পাখিটি করুণ বিলাপ করতে থাকে। বাল্মীকি বিচলিত হয়ে ‘কোনদিন প্রতিষ্ঠা পাবে না’ বলে ব্যাধকে অভিসম্পাত করেন। সেই অভিশাপ বাণী স্বতঃস্ফূর্ত শ্লোকবদ্ধ হয়ে নির্গত হয়েছিল :— সৃষ্টি করেছিলেন দেব-ভাষার আদি শ্লোক— ‘‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতী সমাঃ/যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকম্ অবধী কামমোহিতম্।’’ অতএব, বলা চলে, নাদরূপী বা শব্দরূপী ব্রহ্ম থেকেই ভাষার সৃষ্টি।
সেই ভাষার সমন্বয়ের রচনা যখন সত্তাপোষণী রূপে জগতের হিতসাধনে ব্রতী হয়, তখনই সৃষ্টি হয় সাহিত্যের। শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর শ্রীমুখ নিঃসৃত ভাষায় চলার সাথী গ্রন্থে বলছেন—‘‘যার আলোচনায় মানুষ হিতে অধিষ্ঠিত বা উন্নীত হতে পারে, তাই যে সাহিত্য।’’
শিক্ষা-বিধায়না গ্রন্থের ২৪৫ সংখ্যক বাণীতে বলছেন, ‘‘ঈশ্বরই সুসঙ্গত, সর্ববিভান্বিত/ সুসমাবিষ্ট, প্রাজ্ঞ জীবন-সাহিত্য,/ তাই তিনি রসো বৈ সঃ।’’
তাইতো, যুগের প্রয়োজনে, ঈশ্বর, অবতার-বরিষ্ঠরূপে নরবপু ধারণ করেন। হিতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে সৃষ্ট হয় নব-নব সাহিত্য। বেদ-বেদান্ত, রামায়ণ, গীতা, ত্রিপিটক, বাইবেল, কোর-আন্, চৈতন্য-ভাগবত, চৈতন্য চরিতামৃত, রামকৃষ্ণ কথামৃত ইত্যাদি নামে সংকলিত এবং লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাহিত্যিকদের যে-সব জীবন-সাহিত্যের সাথে আমরা পরিচিত হয়েছি, সেই সব সাহিত্যের প্রকৃত মূল্যায়ন করে অনেক ভুল শুধরে দিয়েছেন, জীবনীয় উদ্ধৃতিগুলো নানাভাবে জনমানসে তুলে ধরে জীবন-সাহিত্যের রূপ দান করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর। যার মাধ্যমে অবতারবরিষ্ঠ পরম্পরাকে, ঋষিবাদকে, জীবনবাদী সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। তাঁর শ্রীহস্ত লিখিত রচনা, স্মৃতি-বাণী, শ্রুতি বাণীসমূহ এক অভিনব বর্ণ-বিন্যাসে, শব্দ-বিন্যাসে, ব্যাকরণ-বিন্যাসে, পংক্তি-বিন্যাসে, ভাব-বিন্যাসে সমৃদ্ধ হয়ে সৃষ্টি করেছে এক সুসমাবিষ্ট, প্রাজ্ঞ জীবন-সাহিত্যের সম্ভার। তাঁর বাণী সাহিত্যে আমরা অনেক নবীন মৌলিক ভাষার সন্ধান পেয়েছি এবং আরও পেতে পারতাম যদি বর্তমানের ন্যায় দর্শ-শ্রুতি বৈদ্যুতিন মাধ্যমের সাহায্য পাওয়া যেত। যার অভাবে মহাসমাধির ভাববাণীর সময় প্রোক্ত অনেক বিদেশী ভাষাকে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তথাপি তাঁর সৃষ্ট বাণীসাহিত্যে সংস্কৃত, বাংলা, ইংরেজী ভাষার যে অনবদ্য প্রয়োগের সাথে আমরা পরিচিত হতে পেরেছি, তা’ সমৃদ্ধ করেছে মানবজীবনের একান্ত প্রয়োজনীয় প্রতিটি আঙ্গিককে। উপাসনা, সাধনা, লোক-ব্যবহার, দর্শন, কৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, বিজ্ঞান, পরিবেশ-পরিচর্যা, বাণিজ্য, সমাজ, সমাজ-সংস্কার, দশবিধ-সংস্কার, বিবাহ, প্রজনন, রাষ্ট্র, পরমরাষ্ট্রিক সমবায়, ইত্যাদি সব কিছুই স্থান পেয়েছে তাঁর রচনায়। ওইসব বিধিবদ্ধ অনুশাসনগুলো জীবনকে জীবনীয়ভাবে উপভোগ করার রসদে পরিপূর্ণ। যা' আমাদের জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক সকল অভাবকে তাড়িয়ে দেবার ব্যবস্থা করে জীবনকে পূর্ণতার আস্বাদে ভরিয়ে দিতে এক নিশ্চিত নির্ভরশীল দিগদর্শন। সেই পূর্ণতার আস্বাদের স্বাদের নেশা ধরাতে,--- তাঁর সুললিত ভাষার বাণী-সাহিত্যের সাথে জগদ্বাসীকে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য শত বাধা-বিপত্তি, অভাব-অনটনকে অতিক্রম করে শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর ভক্তদের কাছ থেকে কাগজ ভিক্ষা করেছেন, টাকা ভিক্ষা করেছেন পত্র-পত্রিকা মাধ্যমে এবং পুস্তকাকারে তাঁর বাণীগুলোকে সুলভ মূল্যে পৌঁছে দেবার মানসে। শুধু তাই নয়, তিনি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের জন্যও জনে জনে বলেছেন। অনেক আত্মোৎসর্গকৃত ভক্ত ও প্রতিষ্ঠান পত্র-পত্রিকা, সাময়িকী, পুস্তক-পুস্তিকা তাঁর বলা কথাগুলো অবিকৃতভাবে প্রকাশ করে তাঁর চাহিদা পূরণ করেছেন এবং এখনো করে চলেছেন। তাঁদের উদ্দেশ্যে প্রণাম নিবেদন করেই বলতে হয়, তাঁর সব চাহিদা পূরণের লক্ষ্যমাত্রাকে এখনো ছুঁতে পারিনি আমরা। গড়ে তুলতে পারিনি জীবনবাদী সত্তাপিয়াসী পাঠকসমাজ। একথা ঠিক যে, সাধারণ মানুষেরা অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে, প্রকৃত জীবনবাদী সাহিত্যের আস্বাদ নিতে, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দেবভাষার দেবসাহিত্য চর্চায় একদিন না একদিন এগিয়ে আসবেই। সেই শুভাগমনকে ত্বরান্বিত করতে, তাঁর বাণী-সাহিত্যকে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক, বার্ষিক পত্র-পত্রিকা মাধ্যমে উপঢৌকন রূপে সাজিয়ে তো রাখতে হবে, না কি ? ক্ষুদ্র আত্মস্বার্থ প্রতিষ্ঠাকে উপেক্ষা করে যদি দীক্ষাকালীন প্রতিজ্ঞা পূরণের শপথ স্মরণ করে ইষ্টস্বার্থ প্রতিষ্ঠায় আমাদের ইচ্ছাটাকে বিনিয়োগ করতে পারি, তবে---হবে, হবে, হবেই জয়। হাসি ফুটবে তাঁর মুখে। অন্তর্যামী পরমপিতার পরম করুণার প্রস্রবনের অমৃত ধারায় স্নাত হয়ে ভাল থাকবেন।

‘বিধি-বিন্যাস’ গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত পরমপিতার স্তবগাঁথা দিয়ে ইতি টানলাম।
“হে পূণ্য! পরাক্রান্ত! পরাৎপর!
প্রচণ্ড মার্ত্তণ্ডবরেণ্য!
এক! অদ্বিতীয়!
তোমারই বিনিষ্কাষিত কিরণবীচি
তাপন প্রতিক্রিয়ায়
অযুত জ্যোতিষ্কের সৃষ্টি করেছে;
বৈধী মিতিচলনে চলেছে তা’রা
তোমারই প্রাণদ গতিপথে
বোধি-বিজৃম্ভী বিসৃষ্ট পরাক্রমে
সৃজন-সম্বেগে–
দৃপ্ত জীবনের অদম্য আবেগে,–
নভোমণ্ডলে সজ্জিত স্থালীর স্থল-সর্জ্জনে
দ্যৌঃ ও পৃথিবীর জীবন-দীপালি
সজ্জিত করে নাদ নিক্কণে —
অভ্যুদয়ী, আরুদ্র পরিক্রমায়;–
তোমাতেই আমার অযুত নমস্কার!”
—বন্দে পুরুষোত্তমম্ ! জয়গুরু ! প্রণাম !

।। আমাদের শিব আরাধনা ।।

** শিবরাত্রির শ্রদ্ধার্ঘ্য **
।। আমাদের শিব-আরাধনা।।


ওঁ নমঃ শিবায় শান্তায় কারণত্রয় হেতবে।
নিবেদয়ামি চাত্মানং ত্বং গতি পরমেশ্বর।।
সত্যম্-শিবম্-সুন্দরম্। সত্যই শিব, শিবই সুন্দর। সত্য মানে অস্তিত্ব। পরিবেশের সব অস্তিত্বের পালন-পোষণ করে এই সুন্দর পৃথিবীর সুন্দরত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার বাস্তব প্রক্রিয়ার নাম শিবপূজা। পূজা মানে সম্বর্দ্ধনা—সম্যকরূপে বর্দ্ধনার পথে চলা।
শিব একাধারে সার্থক যোগী, সন্ন্যাসী, নটরাজ। আবার গৃহস্থরূপে দেবী পার্বতীর স্বামী। গণেশ এবং কার্তিক দুই পুত্রের পিতা। সে-সব দিকগুলো বিচার করে শিবকে যোগ, ধ্যান ও শিল্পকলার দেবতা মনে করা হয়। কিছু গবেষণায় জানা যায় শিব নাকি চিকিৎসা বিদ্যার জনক ছিলেন। সেইজন্য বোধহয় বৈদ্যনাথ বলা হয়। তিনি কৃষিবিদ্যার আবিষ্কারকও ছিলেন। নট-নটীরা শিবকে নটরাজ বলে পূজা করেন। রামায়ণে বর্ণিত, সংস্কৃতে রচিত শিব-বন্দনার ‘তাণ্ডব-স্তোত্র’ আর্য্যকৃষ্টিতে বন্দিত। পরমপুরুষ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর ভাববাণীতে বলেছেন।—‘‘তাণ্ডব-স্তোত্র মুখস্থ করিস্, এ্যাজমা সারবে।’’
শিবের পূজা বা আরাধনার নিমিত্ত যতগুলো প্রতিষ্ঠিত মন্দির রয়েছে, সে-সব মন্দিরগুলোতে শিবলিঙ্গকেই পূজা করা হয়। শিবলিঙ্গ সৃষ্টির বিষয়ে শাস্ত্রগুলোতে নানা মতভেদ রয়েছে। সবগুলোতেই রিংরসার নীলজল মেশানো আছে। সেগুলো থেকে নারদ পঞ্চরাত্রে বর্ণিত কাহিনী যেন একটু ফিকে, গ্রহণযোগ্য। নারদ পঞ্চরাত্র মতে শিব-পার্বতির প্রথম মিলনের সম্মিলিত তেজ থেকে উৎপন্ন হয় শিবলিঙ্গ। শিবলিঙ্গ-এর বেষ্টনীকে বলে গৌরীপট্ট। গৌরীপট্ট শিবলিঙ্গের আধার, জগতের যোনি। যোনি-সম্ভূত সৃষ্টি প্রকরণের প্রতীক হিসেবে মানা হয় শিবলিঙ্গকে। এর অন্তর্নিহিত অর্থ, পুরুষেরা শিবলিঙ্গকে প্রতীক রূপে মেনে, শিবের ন্যায় আদর্শ পিতা হবার নিমিত্ত তাদের প্রজন্ম সৃষ্টির উপাঙ্গ জননেন্দ্রিয়কে ব্যবহার করবেন, অর্থাৎ বৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে সংযমী হবেন। আর নারীরা গৌরীপট্টকে প্রতীক রূপে মেনে, গৌরীর ন্যায় আদর্শ মাতা হবার নিমিত্ত প্রজন্ম সৃষ্টির উপাঙ্গ জননেন্দ্রিয়কে ব্যবহার করবেন। অর্থাৎ মাতা পার্বতীর ন্যায় সতীত্বকে আরাধনা করবেন। এই বিজ্ঞান ঋষি বাৎস্যায়নের কামসূত্রে বর্ণিত হয়েছে। পুরুষ ও নারীকে চারটি শ্রেণিতে উল্লেখ করে।
আমাদের ভারতীয় আধ্যাত্মবাদের সাথে শিব অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামেও একটা না একটা শিবমন্দির দেখা যায়। যারা দৈনন্দিন জীবনে আর্য্যকৃষ্টির নিত্যকর্ম পদ্ধতির সদাচার, বর্ণাশ্রমধর্ম পালনে অভ্যস্ত নয়, তারাও সোমবার, শ্রাবণ মাস, চৈত্র মাস-এর পার্বনের দিনগুলোতে শিবলিঙ্গে ফুল-জল-বেলপাতা দিয়ে তথাকথিত পুজো করেন। শ্রাবণ মাস শিবের জন্মমাস হিসেবে পালন করেন অনেক ভক্ত। বাঁকে করে জল নিয়ে প্রতিষ্ঠিত শিবমন্দিরগুলোতে গিয়ে অনেক কসরৎ করে শিবলিঙ্গে জল ঢালতে যান। তাদের সেবা করার জন্য রাস্তার ধারে ধারে প্যাণ্ডেল করে, তারস্বরে মাইক বাজানো হয়। অনেক সাধকেরা আবার ‘ভোলে-ব্যোম’ ধ্বনি দিয়ে গঞ্জিকা, ভাঙ্-এর মৌতাতে শিবত্ব লাভ করতে চান। টিভি সিরিয়ালগুলোতেও শিবকে সিদ্ধিখোর, গাঁজাখোর হিসেবে তুলে ধরা হয়। শিব ছিলেন একজন পরমবৈষ্ণব, সিদ্ধ-পুরুষ, তাঁকে সিদ্ধিখোর, গাঁজাখোর না বানালেই কি চলছিল না!
তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া চলে আমাদের হিন্দু নারীদের শিবরাত্রির উপবাসকে। শুনেছি অনূঢ়া বা কুমারী মেয়েরা শিবের মতো স্বামী পাবার আশায় (অবশ্য বাস্তবে আমাদের কল্পনার শিবের মত,—বাঘছাল পরে, গলায় সাপ জড়িয়ে, ষণ্ডের পিঠে চেপে, কোন পুরুষ যদি স্বামীরূপে উপস্থিত হয়, তখন কি হবে?), কুমার পুরুষেরা (যদিও সংখ্যায় অনেক কম) গৌরীর মতো স্ত্রী লাভের আশায় শিবরাত্রির উপবাস করেন। অথচ বাস্তবে শিব পূজার সাথে সম্পৃক্ত “গৌরী দান” প্রথা ব্রাত্য। শৈব উপাসকগণ ব্রাত্য করে রাখলেও বিবাহিতা গৌরীরূপী নারীরা কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীর ন্যায় সন্তান লাভ করে সুখে-শান্তিতে ঘর-সংসার করার আশায় শিবরাত্রির উপবাস করেন।
এবার আমরা এর বাস্তব দিকটা বোঝার চেষ্টা করব।
যে যতই কৃতিত্বের অধিকারী হোক না কেন, বাস্তব জীবনে একটা নারী, তার সমবিপরীত সত্তার উপযুক্ত বরিষ্ঠ পুরুষকে পতিত্বে বরণ করে আদর্শ বধূ হতে চায়। সেই পুরুষটি নারীর তুলনায় বর্ণে, বংশে, বয়সে, স্বাস্থ্যে, শিক্ষায়, স্বভাব, অভ্যাস, ব্যবহারে শিবের ন্যায় বরেণ্য হলেই সার্থক হবে শিব পূজা। আবার সেই বধূ, স্বামীর মনোবৃত্ত্যানুসারিণী হলে স্ত্রী নামের অধিকারিণী হবে। সব স্ত্রীই চান তাঁদের আরাধ্য দেবতা শিবের পুত্র ও কন্যার ন্যায় তাঁদের সন্তান জন্ম গ্রহণ করুক। ভারতীয় আদর্শ অনুযায়ী গর্ভাধান সংস্কারের মাধ্যমে স্বামীকে দেবতা জ্ঞানে আরাধনা করে সন্তান লাভ করতে হয়। স্বামীর কাছ থেকে লব্ধ স্ত্রীর ভাব সন্তানে মূর্ত্ত হয়। স্বামী নামের পুরুষটি স্ত্রীর মাধ্যমে নিজেকে জন্মান বলে স্ত্রী, স্বামীর চিন্ময়ী মা রূপে সম্মানিত। তাই শাস্ত্রমতে স্ত্রীকে জায়া বলে । সন্তান মানে স্বামী এবং স্ত্রীর সমতান । আর মা মানে মেপে দেওয়া । বীজকে সঠিক রূপ দিতে যেমন মেপে মেপে সঠিক পদ্ধতিতে জমি প্রস্তুত করতে হয় তেমনি স্ত্রীকেও ভাল সন্তান গর্ভে ধারণ করতে গর্ভাধান সংস্কারে সংস্কৃত হতে হয় । সাত্তিকতায় গর্ভ পরিচর্যা করার সংস্কার পালন করতে হয় । তাহলে আর গর্ভকালীন এবং প্রসবকালীন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় না । টবে একটা ফুলগাছ লাগাতে গেলে যে পরিকল্পনা করতে হয় যতটুকু প্রযত্ন নিতে হয় সেটুকুও যদি উপেক্ষিত হয় মা হবার ক্ষেত্রে তাহলে তো সমস্যার সম্মুখীন হতেই হবে । উনো জমিতেই ভাল ফসল ফলে বুনো জমিতে নয় ! এই হচ্ছে শিবপূজার বাস্তব তাৎপর্য। একটি মেয়ে মাতা পার্বতীর ন্যায় তাঁর সতীত্বের সাধনার ডালি সাজিয়ে শিবের ন্যায় শ্রেষ্ঠ যোগী পুরুষকে স্বামীত্বে বরণ করে শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মা হবে।
এই প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র মায়েদের উদ্দেশ্যে বলেছেন :—
“সতীর তেজে ঝলসে দে মা
নিঠুর কঠোর অন্ধকারে
মদনভস্ম বহ্নিরাগে
বৃত্তি-রিপু দে ছারখারে ।
প্রণবতালে ইষ্টমন্ত্র
ঝঙ্কারি তোল সকলতন্ত্রে
বিষাণ হাঁকে রুদ্র দোলায়
বজ্রে হানি মৃত্যুদ্বারে ।”
* * *
আমরা যে শিবলিঙ্গ পূজা করি সেটাকে বলে সিম্বোলিক অর্ধ-নারীশ্বর প্রতীক। গৌরীপট্ট দ্বারা বেষ্টিত শিবলিঙ্গ। একজন নারী গৌরীর ন্যায় সাধ্বীমাতা, একজন পুরুষ শিবের ন্যায় সাধক পিতা হয়ে সুসন্তানের জনক-জননী হতে পারলেই আমাদের শিবপূজা সার্থক হবে। শুধু নির্দিষ্ট দিনের জন্য, মাসের জন্য, শিবমন্দিরে শিবমন্দিরে এই শিব আরাধনা সীমাবদ্ধ নয়, এ আমাদের জীবনের নিত্য সাধনা—শিবশক্তিকে দেহমন্দিরে প্রতিষ্ঠা করে, স্থাপন করে, সত্য, শিব এবং সুন্দরকে প্রতিনিয়ত আস্বাদন করা।
ওই আশাগুলোকে পূরণ করতে হলে শুধুমাত্র শিবরাত্রির উপবাস করলেই তো আর হবে না। উপ মানে নিকটে, বাস মানে অবস্থান। শিব-পার্বতীর আদর্শে নিত্য অবস্থান করতে হবে। আর সেজন্য সদগুরু গ্রহণ করতে হবে। শাস্ত্রানুসারে গুরু গ্রহণ না করা পর্যন্ত কোন দেবদেবীর পূজা করার অধিকার জন্মায় না।
পুরাণ অনুসারে গিরিরাজ দুহিতা উমা ছোটবেলা থেকেই ভক্তিমতী। শিবের ভক্ত। পণ করেছেন, শিবকে ছাড়া অন্য কাউকেই বিয়ে করবেন না। বাবা-মা-পরিজনেরা কত করে বোঝাল, শিবকে বিয়ে করলে আর কষ্টের শেষ শেষ থাকবে না। বাপের বয়সী, কাজকর্ম করে না। নারায়ণের ভুতের বেগার খেটে মরে। (অর্থাৎ, নারায়ণী-বার্তা যাজন করে প্রাণী নামক ভুতদের উন্নয়ন করে বেড়ান।) তথাপি উমা কিন্তু কারোর কথায় কান না দিয়ে, সৎ-স্বভাবে পরান পাগল, জ্ঞানবৃদ্ধ, বয়োবৃদ্ধ শিবকেই পতিত্বে বরণ করেন।

উমা বা পার্বতী, স্বামীকে মাথায়, অর্থাৎ জীবনের কেন্দ্রে রেখে, স্বামীর মনোবৃত্ত্যানুসারিনী স্ত্রী হয়ে সুসন্তানের মা হয়েছেন, মা হয়েছেন আমাদের, জগতের। উমা-মাকে আমরা দেবীর চাইতে অনেকটা বেশি করে ঘরের মেয়ে হিসেবে বরণ করে নিয়েছি। এই মর্ত্ত্যধামের প্রতিটি ঘর তাঁর বাপের বাড়ি। তাই বাস্তব জীবন-চলনায় যদি শিব-গৌরীর ন্যায় আমাদের ভালোবাসার পবিত্র দাম্পত্যের পূজা-জাত কন্যারূপী সন্তানটিকে উমার মত করে, পুত্ররূপী সন্তানটিকে শিবের মত করে সৃষ্টি করতে পারি, তা হলেই তো ষোল-কলায় পূর্ণ হবে আমাদের শিব আরাধনা।
tapanspr@gmail.com

Valentine Special

*** VALENTINE SPECIAL ****।। ‘প্রেম’ ব্যাপারটা কি ।।


আমরা কথাবার্তায় প্রেম-পূজারী হলেও, বিশ্ব প্রেমদিবস উদযাপন করলেও, বাস্তবে কিন্তু প্রেমের বিপরীত চিত্রটাই কানে-চোখে ধরা দেয়! টিভিতে সংবাদ দেখতে গেলেই বেশিরভাগই হিংসার সংবাদ দেখতে পাওয়া যায়। রাজনৈতিক নেতারা, যারা নিজেদের দেশসেবক ভাবেন, তারা যদি একটু প্রেমিক হতেন, জনগণকে প্রকৃতই ভালোবাসতেন, তাহলে নির্বাচনের ন্যায় একটা সহজ-সরল বিষয়ে হিংসার চাষ হতে দিতেন না, হিংসার নিরসন করতে সচেষ্ট হতেন। ভোট করাতে পুলিশ, আধাসেনার প্রয়োজন হতো না। স্বভাবতই একটা প্রশ্ন জাগে, এত হিংসা কেন? এর কারণ কি? সমাজতত্ত্ববিদেরা, মনস্তত্ববিদেরা কি বলবেন জানি না, তবে, হিংসার কারণ সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন, “অহঙ্কার আসক্তি এনে দেয় ; আসক্তি এনে দেয় স্বার্থবুদ্ধি ; স্বার্থবুদ্ধি আনে কাম; কাম হতেই ক্রোধের উৎপত্তি; আর, ক্রোধ থেকেই আসে হিংসা।” হিংসা ভুলে যা’রা প্রেম নিয়ে চর্চা করছেন, প্রেম দিবস পালন করছেন, তাদের শ্রদ্ধা জানাতেই হয়। সেই প্রেমের উৎস সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলছেন, “ভক্তি এনে দেয় জ্ঞান; জ্ঞানেই সৰ্ব্বভূতে আত্মবােধ হয় ; সর্বভূতে আত্মবােধ হলেই আসে অহিংসা; আর, অহিংসা হতেই প্রেম। তুমি যতটুকু যে-কোন একটির অধিকারী হবে, ততটুকু সমস্তগুলির অধিকারী হবে।” কিন্তু বাস্তবে, ভারতীয় সংস্কৃতির শব্দ-ভাণ্ডারের ‘প্রেম’ শব্দটিকে বোধহয় সবচাইতে বেশি অপমানিত হতে হচ্ছে অপব্যবহারের জন্য। বহুল ব্যবহৃত ওই শব্দটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারী-পুরুষের যৌন আকর্ষণের পরিচয়-জ্ঞাপক। শিক্ষাঙ্গনে, টিভি-সিনেমা কালচারে, সাহিত্যে ‘প্রেম’ শব্দটি ‘love’-এর পরিবর্তে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ‘lust’ পরিচয় বহন করে চলেছে। এটা সভ্যতার পক্ষে গৌরবের নয়। প্রীতি বিতরণ, প্রীতি উৎপাদন করে যা’ তাই প্রেম। জীবনকে প্রীত করে যে সম্পর্ক, তাকে বলা চলে প্রেমের সম্পর্ক। চৈতন্য মহাপ্রভু প্রেমকে পুরুষার্থের পঞ্চমবর্গ রূপে অভিহিত করেছেন।আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা তারে বলি কাম।কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা ধরে প্রেম নাম।।বিবেকানন্দও জীবের প্রতি প্রীতিজনক আচরণকে প্রেম আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’ আজ সর্বজনবিদিত। লেখাপড়া জানা মানুষ যখন বলে, ‘প্রেম করে বিয়ে করে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল।’—তখন কি প্রেম বিচ্ছেদের প্রতীক স্বরূপ চিহ্নিত হয়ে গেল না! প্রেম করে বিয়ে করার পর স্বামী-স্ত্রী ডিভোর্স নিয়ে আলাদা হবে। সন্তান বঞ্চিত হবে মা-বাবার প্রেম থেকে। সন্তানের প্রেমে বঞ্চিত হয়ে বৃদ্ধাশ্রমে মা-বাবা অশ্রুপাত করবে। আর আমরা প্রচার মাধ্যমে সেক্সি সেলিব্রিটিদের দিয়ে ‘বিশ্ব প্রেমদিবস’ উদযাপন করব সাড়ম্বরে, ওদিকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ নিপাত যাক’ শ্লোগানে পার্টি-রাজনীতি হবে সমৃদ্ধ! বাঃ! বাঃ! ‘সত্য সেলুকস, কি বিচিত্র এই দেশ!’ যাকগে, আমাদের আদর্শ পুরুষ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, শুধুমাত্র মানুষের নয়, একটা পিঁপড়ারও ব্যথা নিরাকরণ করে প্রেমের প্রদর্শন করতে বলেছেন। আর তা’ যদি না করি, তাহলে আমার চাইতে হীন আর কেউ নেই! এমন প্রেমের জয়গান গাইতে হবে আমাদের। সবাইকে জয়গুরু ও প্রণাম। বন্দে পুরুষোত্তমম্!

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর জন্ম দিন উপলক্ষ্যে শ্রদ্ধাঞ্জলি

** নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর শুভ জন্মদিন উপলক্ষ্যে শ্রদ্ধার্ঘ্য **
।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ও নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ।।


শুধুমাত্র বাঙালীই নয়, সমগ্ৰ ভারতবর্ষ এবং আন্তর্জাতিক স্তরের সুধীজন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর আপোষহীন সংগ্রাম ও তাঁর বীরত্বের আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে থাকেন। ভারত সরকার এবং প্রাদেশিক সরকারের নানাবিধ সমাজ সংগঠনের পক্ষ থেকে তাঁর জন্মদিন উপলক্ষ্যে অনেক কর্মসূচী গৃহীত হয়ে চলেছে। তাঁর আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়েছে।
নেতাজীর জীবন কাহিনীর অনেক সুপ্ত গৌরবময় ঘটনা রয়েছে, যা হয়তো সকলে জানেন না। সেই অজানা কাহিনীর কিয়দংশ নিবেদন করার চেষ্টা করছি।
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর মামা তৎকালিন খ্যাতনামা ব্যারিষ্টার জে. এন. দত্ত শ্রীশ্রীঠাকুরের আশ্রিত হয়েছেন শুনে নেতাজীর পিতৃদেব জানকীনাথ বসু ও মাতৃদেবী প্রভাবতী দেবী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শে দীক্ষিত হন। তাঁরা ঠাকুরের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। হিমাইতপুর আশ্রম নির্মাণে তাঁদের আর্থিক অবদান এবং নিজ হস্তে শ্রমদান সৎসঙ্গের ইতিহাসের এক স্বর্ণালী অধ্যায় রূপে নন্দিত হয়ে আছে।
শ্রীক্ষেত্র পুরী ধামের আর্মস্ট্রং রোডে নেতাজীর পিতামহ হরনাথ বসুর স্মৃতি রক্ষার্থে নেতাজীর পিতৃদেব জানকীনাথ বসু ‘হরনাথ লজ’ নামে যে গৃহ নির্মাণ করেছিলেন সেই অঙ্গনকে পুরুষোত্তম পদার্পণে ধন্য করতে প্রায় ২০০ জন ভক্তসহ ঠাকুরকে পুরীতে নিয়ে গিয়েছিলেন নেতাজীর পিতৃদেব । সেদিনটি ছিল ১৯২২ সালের ৩১শে ডিসেম্বর। ভক্তপার্ষদসহ প্রায় দুমাস পুরীসহ সন্নিহিত অঞ্চলকে কীর্তনানন্দের ভক্তিরসের অমৃত ধারায় নিমজ্জিত করে আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামীকে উ়ড়িষ্যা প্রদেশে প্রচারের জন্য থাকতে বলে সপার্ষদ হিমাইতপুরে ফিরে এসেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর।
এই আদর্শ সৎসঙ্গী পরিবারের সন্তান নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু মা-বাবার কাছেই ঠাকুরের অমৃত জীবন কথা শুনে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু তিনবার ঠাকুর দর্শনে আসেন। প্রথমবার আসেন I.C.S পাশ করার পর। ঠাকুর তখন কলকাতায় ছিলেন। তারপর আরো দুবার হিমাইতপুরে এসেছিলেন ঠাকুর দর্শনে। নেতাজী ঠাকুর দর্শনে হিমাইতপুর, পাবনা সৎসঙ্গ আশ্রমে এলে ঠাকুরের অন্যতম পার্ষদ পূজনীয় কর্মবীর শ্রীসুশীলচন্দ্র বসু তাঁকে আশ্রমের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখান। ঠাকুরের মতাদর্শ ও তাঁর পরিকল্পনার বিভিন্ন বিষয় নেতাজীর কাছে তুলে ধরেন সুশীলদা। আশ্রম ঘুরে নেতাজী ভাবলেন যে, ঠাকুরের অধিকাংশ প্রচারকেরা বিবাহিত এবং সংসারী। ঠাকুরকে মাথায় নিয়ে, সংসার ঠিক রেখেও বিশ্বসংসারের মাঙ্গলিক-ব্রতে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন এঁরা। তারপর আশ্রম ঘুরে দেখে নেতাজী সুশীলদাকে বলেছিলেন– “সাধারণতঃ আশ্রম বলতে লোকে সন্ন্যাসী বা গৃহত্যাগীদের আশ্রমই বোঝে। গৃহী হয়ে পরিবারসহ আশ্রম জীবন-যাপন করবার দৃষ্টান্ত আপনারাই প্রথম দেখালেন। পরিবার, পরিজন এবং পরিবেশের সবরকম দায়দায়িত্ব বহন করে, দৈন্য অভাব অভিযোগের মধ্য দিয়ে আপনারা এগিয়ে চলেছেন। তাই আমার মনে হয়, আপনারা দেশ গঠনের একটা বড় গুরুদায়িত্ব নিয়েছেন। আপনারা যদি সত্যি সত্যি এভাবে আশ্রম গড়ে তুলতে পারেন তাহলে আপনারা দেশের কাছে একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন। গৃহী হয়েও যে আশ্রমজীবন যাপন করা যায়, একথা লোকের কাছে আর অবিশ্বাস্য বলে বোধ হবে না। তারপর নেতাজী ঠাকুরের কাছে এসে ভক্তি ভরে প্রণাম করলেন। নেতাজীকে বসবার জন্য যে চেয়ার দেওয়া হয়েছিল সেখানে তিনি বসলেন না। মাতৃভক্ত নেতাজী বলেছিলেন– “ঠাকুর আমার মায়ের ইষ্ট, তাঁর সামনে আমি চেয়ারে বসতে পারি না।” বলে ঠাকুরের পদপ্রান্তেই বসে পড়েছিলেন নেতাজী। ঠাকুর সস্নেহে নেতাজীর মা-বাবা এবং পরিবারের অন্যান্য সকলের কুশল সংবাদ নিলেন। তারপর নেতাজী ঠাকুরকে বললেন– “দেশের তো নানা কাজই করবার আছে। তা দেশের প্রকৃত সেবা করতে হলে কোথা থেকে আরম্ভ করতে হবে? এ বিষয়ে আপনার মত কি?” শ্রীশ্রীঠাকুর নেতাজীর দিকে গভীর স্নেহল দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর ভাব বিভোর কন্ঠে বললেন—“আমার কথা হচ্ছে দেশের কাজ করতে হলে প্রথম মানুষ তৈরীর কর্মসূচী নিতে হবে। ভাল মানুষ পেতে হলেই বিবাহ-সংস্কার আশু প্রয়োজন। আর এটা এমনভাবে করতে হবে যাতে সব বিয়েগুলিই Compatible (সুসঙ্গত) হয়, আর Compatible বিয়ে মানেই বিহিত সঙ্গতি। বর্ণ, বংশ, আয়ু, স্বাস্থ্য ইত্যাদি সব হিসাব করে দেখে শুনে কাজ করতে হবে। বিহিত বিবাহ হলেই ভাল সন্তানাদি জন্মাবে আর তখন তাদের দ্বারাই দেশের, দশের সবারই মঙ্গলব্রতের কাজ করা যাবে। সেইজন্য মানুষ তৈরীর ব্যবস্থা আগে করা প্রয়োজন। দাশদা (দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ) যখন আমায় বললেন যে, তিনি মানুষ খুঁজে পাচ্ছেন না, যার উপর ভার দিয়ে তিনি একটু বিশ্রাম নিতে পারেন। —তার উত্তরে আমি একথাই বলেছিলাম।”
ঠাকুরের কথা শুনে নেতাজীর চোখেমুখে গভীর চিন্তার ছাপ পড়ল। তাঁর চিন্তা জগত নতুন আলোড়ন সৃষ্টি হলো যেন।
নেতাজী ঠাকুরকে বললেন, —“বিবেকানন্দও মানুষ তৈরীর কথা বলেছেন, এবং তা যে আশু প্রয়োজন তা ভেবেছি, কিন্তু তা করতে হলে যে বিবাহ সংস্কার প্রয়োজন তা ভেবে দেখিনি।…. এখন ভেবে দেখছি ভাল সংস্কার-সম্পন্ন শিশু যদি না জন্মায় শুধু শিক্ষা তাদের বিশেষ কি করতে পারে ? বীজ থেকেই তো গাছ হয়, বীজ ভাল হলেই গাছ ভাল হবে। এটা আপনার কথা শুনে বুঝতে পারছি। কিন্তু এতে দীর্ঘসময় সাপেক্ষ।”
ঠাকুর দৃপ্তকন্ঠে বললেন—“দীর্ঘ সময় তো নেবেই—আমরা তো এতদিন পর্যন্ত জাতির বা সমাজের স্থায়ী কল্যাণের জন্য কিছুই করিনি। বহু গলদ জমে গেছে। সাফ করতে সময় নেবে বৈকি ? কোন Shortcut Programme (সংক্ষিপ্ত কর্মসূচী) এ জাতির সত্যিকার কল্যাণ হবে বলে আমার মনে হয় না।”
উপরোক্ত ঐতিহাসিক আলাপচারিতার পর অনেকদিন অতিবাহিত হয়েছে, কিন্তু মানুষ তৈরির মূল বিষয়টি নিয়ে তেমন অগ্রগতি হয়নি। তাই আজকের এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার স্বার্থে আমাদের সকলকে বিবাহ সংস্কারের উপর গুরুত্ব দিতেই হবে।

এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত কিছু অনুভব নিবেদন করছি।
১. প্রতিটি পরিবারের কুলপঞ্জীকরণ।
২. বর্ণ চিহ্নিত করণ এবং বর্ণানুগ কর্মে উৎসাহিত করা।
৩. দীক্ষাপত্রে সংরক্ষিত তথ্যগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষিত করে অঞ্চলভিত্তিক পাত্র এবং পাত্রীদের যোটক নির্বাচন করে বিবাহ সম্পাদন করা।
৪. প্রতিটি অধিবেশনে বিবাহ বাস্তবায়ন বিষয়ে আলোচনা করা এবং তথ্য সংগ্রহ করে পারস্পরিক আদান-প্রদান করা, যা’তে সহজেই পাত্র-পাত্রী নির্বাচন করা যায়।
শ্রীশ্রীঠাকুর ম্যারেজ ব্যুরো গঠন করে বিবাহ আন্দোলন বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। পঞ্চবর্হি এবং সপ্তার্চ্চি-র আদর্শের উপর ভিত্তি করে আমরা যদি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করি, তাহলে সম্ভব।
এ বিষয়ে আপনাদের সুচিন্তিত মতামত জানালে ভালো হয়। জয়গুরু।
সবাইকে আমার জয়গুরু ও প্রণাম।
——————-+++—————

সরস্বতী পূজা উপলক্ষ্যে শ্রদ্ধাঞ্জলি

।। প্রসঙ্গ : দেবী সরস্বতী, বিদ্যা, পূজা ও আমরা ।।


অবক্ষয় আমাদের দরজায় যতই কড়া নাড়াক না কেন লর্ড মেকলে সাহেবের দাক্ষিণ্যের দৌলতে আমাদের সমাজে শিক্ষিত হবার প্রবণতার হার কিন্তু ক্রমশঃ বর্দ্ধমান। মুখে বুলি ফুটতে না ফুটতেই সন্তান-সন্ততিদের লেখাপড়া শেখাতে এতটুকু কার্পণ্য করি না আমরা। এ বিষয়ে বাবাদের চাইতে মায়েদের আগ্রহ একটু বেশীই। লেখাপড়া শেখাতে স্কুলে ভর্তি করে, একাধিক প্রাইভেট টিউটর রাখে, পাশাপাশি হোম-ওয়ার্ক না করতে পারলে ‘মাথা ফাটিয়ে ঘিলু বার করে দেব, মেরে ফেলব, কেটে ফেলব’ ইত্যাদি বিশেষণের শাসনবাক্যে যুগধর্মের শিক্ষায় সন্তানদের শিক্ষিত করতে মায়েরা যেভাবে পরিশ্রম করে চলেছেন তার তুলনা হয় না! লেখাপড়া মানেই বিদ্যার্জন করা। বিদ্যার্জন করতে স্কুল, টিচার, বই-খাতা-কলম ইত্যাদি আনুসঙ্গিকের পাশাপাশি বিদ্যাদেবীর আরাধনাটাও আবশ্যিক! তাই উত্তরায়ন-সংক্রান্তি পরবর্তী শুক্লা-পঞ্চমী বা শ্রীপঞ্চমী তিথিকে কেন্দ্র করে ঘরে-ঘরে, বিদ্যালয়ে-বিদ্যালয়ে, পাড়ার ক্লাবে, রাস্তাঘাটে সরস্বতী পুজোর সাড়া পড়ে যায়। এমনিতে একটু বেলা পর্যন্ত শুয়ে থাকা পড়ুয়ারাও সেদিন সকাল-সকাল উঠে নিম-হলুদ মেখে স্নান সেরে নেয়। (নিম-হলুদ মাখলে শরীরের রোগ-প্রতিরোধী শক্তি বৃদ্ধি পায়।) তারপর সেজেগুজে যে-যেখানে সুবিধা পায় আগেভাগে অঞ্জলি দেবার কাজটা সেরে নিতে বিদ্যাদাত্রী সরস্বতীর প্রতিকৃতির সামনে কঠিন বিষয়ের বইপত্রগুলো জমা দিয়ে অপেক্ষায় থাকে কতক্ষণে পুরুতঠাকুর অঞ্জলি দেবার জন্য ডাকবেন। অঞ্জলি দেওয়া শেষ করে সরস্বতী-ঠাকুরের কাছে পাশ করার আর্জিটা জানিয়ে, প্রসাদ খেয়ে পুজোর মুখ্যপর্বটা শেষ করে গৌণপর্বে প্রবেশ করে। কচিকাচারা পরিজনদের হাতধরা হয়ে, কিশোর-কিশোরীরা বন্ধু-বান্ধবদের সাথে বিদ্যালয়ে যায়, খাওয়া-দাওয়া হয়। খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুড়ি ওড়ানো, দল বেঁধে ঘুরে ঘুরে প্রতিমা দেখে বেড়ানো। বড় হয়ে ওঠার সোপানে পা-রাখা হেটেরো-সেক্সুয়াল কমপ্লেক্সের অবদানের টেস্টোটেরন হরমোন-প্রপীড়িত ওভারস্মার্ট ছাত্ররা, ফলিকল-স্টিমুল্যাটিং হরমোন-প্রপীড়িত ওভারস্মার্ট ছাত্রীরা পছন্দের জনকে প্রপোজ করার সুযোগ খোঁজে, কেউ আবার একটু ঘনিষ্ট সান্নিধ্য পেতে চায় ভ্যালেনটাইন-উইক কালচারে সমৃদ্ধ হতে। পাড়ায় রাতে হবে মাংস-ভাতের পিকনিক। শুধু পাড়াতেই নয় সরকার পরিপোষিত অনেক প্রাথমিক বিদ্যোলয়েও (যেখানে হিন্দু শাস্ত্রমতে বিদ্যালাভের পরিপন্থী, অভক্ষ্য ডিম সহযোগে ছাত্রদের মিড-ডে মিল খাওয়ান হয়।) পুজোর দিনটির পবিত্রতা বজায় রেখে পরেরদিন মাংস-ভাতের পিকনিক করা হয়েছে। আসছে বছর আবার হবে!—কি হবে ?
‘‘ওঁ ভদ্রকাল্যৈ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈ নমো নমঃ।
বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ-বিদ্যাস্থান্যেভ্যঃ এব চ।। ……’’ পুরোহিতের বলা ইত্যাদি মন্ত্র অনুসরণ করে পুষ্পাঞ্জলি দিতে হবে।
‘‘জয় জয় দেবী চরাচর সারে কুচযুগ শোভিত মুক্তাহারে।
বীণা রঞ্জিত পুস্তক হস্তে ভগবতী ভারতি দেবী নমোহস্তুতে।।

ওঁ সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে।
বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্বি বিদ্যাং দেহী নমোহস্তুতে।।’’— পুরোহিতের বলা ইত্যাদি মন্ত্র অনুসরণ করে প্রণাম জানাতে হবে। …….তারপর সেই,—খাওয়া-দাওয়া, হৈ-হুল্লোর— ছোটদের বড় হবার রিহার্সাল, বড়দের নস্টালজিয়ার স্মৃতিচারণ ……. আসছে বছর আবার হবে!
ওইসব উচ্চারিত মন্ত্র অনুযায়ী দেবী সরস্বতীই বিদ্যাদাত্রী, তাকে সাধনা করতে পারলেই বিদ্যার সিলেবাস বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ জ্ঞাত হওয়া যাবে। খুব ভালো কথা। সাধনা দিয়েই তো সিদ্ধি পেতে হবে।
* * *
মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী আমরা যা বলি বা সংকল্প করি বাস্তবে তা যদি না করি স্নায়ুমন্ডলীতে জটিলতার সৃষ্টি হয়, আধ্যাত্মিক জগতে যাকে অনাগত প্রারব্ধ কর্মফল বলে। অথচ আমাদের শিক্ষকেরা এই পূজার দিনটিতে অঞ্জলিমন্ত্র, প্রণামমন্ত্র আওড়ানো ব্যতীত বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ শিক্ষা বিষয়ে ছাত্রদের উৎসাহ না দিয়ে প্রচলিত সিলেবাসের বিষয়ভিত্তিক খাতাবই কেনা, নোট কেনা, কোচিং-করানোর দিকে উৎসাহ দেয়। বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ জিনিসটা যে কি বেশিরভাগ পড়ুয়ারা জানেই না, অথচ শিক্ষার আবশ্যিক বিষয় জ্ঞানে বাধ্যতামূলকভাবে বছর-বছর আবৃত্তি করে চলে, সরস্বতী পূজার দিনটিতে। এর নাম দ্বন্দ্বীবৃত্তি, অর্থাৎ মুখে যা বলছি, কাজে তা করছি না। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতে যা মহাপাপের কারণ।
* * *
সংস্কৃত বিদ্ִ ধাতু থেকে বেদ এবং বিদ্যা শব্দের উৎপত্তি। যার অর্থ জ্ঞান, বিচরণা, অস্তিত্ব, প্রাপ্তি। বিদ্যা লাভ যার হয়, অস্তিত্ব বজায় রাখার জ্ঞান তার হয়। তার বিচারশক্তি হয়, জীবনচলনায় ভালটাকে বেছে নিয়ে সে এগিয়ে চলে মূল প্রাপ্তি বা গন্তব্যের দিকে। যার চরম ঈশ্বরপ্রাপ্তি। ভাষাবিদ জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস মহোদয় কৃত অভিধানানুসারে, ‘‘যদ্দারা ব্রহ্ম হতে ব্রহ্মান্ড পর্য্যন্ত যাবতীয় পদার্থের সত্যবিজ্ঞান লাভ হইয়া যথাযোগ্য উপকার প্রাপ্ত হওয়া যায় তাহাই বিদ্যা ; যদ্দারা অক্ষর পুরুষকে জানা যায়।’’ ওই বিদ্যায় বিদ্বান হয়ে ছাত্রদের জানাবার কাজটি যিনি করেন তিনি শিক্ষক বা আচার্য্য।
বেদ বা জ্ঞান-এর দুটো দিক, আধ্যাত্মিক ও জাগতিক। যা জানলে মানুষের জীবনের পূর্ণতা লাভ হয়, বিদ্যা লাভ হয়। বেদের বিদ্যা দু প্রকার পরা ও অপরা। শিক্ষা (phonetics), কল্প, ব্যাকরণ, ছন্দ, জ্যোতির্বিদ্যা (astronomy) ও নিরুক্ত (শব্দতত্ত্ব) ইত্যাদি নামের বেদের ৬টি শাখার নাম বেদাঙ্গ। সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ্ নামে বেদকে চারভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। যার অন্ত ভাগের নাম বেদান্ত বা উপনিষদ। ‘আত্মানং বিদ্ধি’ (Know Thyself,— who am ‘I’ ?) অর্থাৎ নিজেকে জানার চেষ্টার পাঠক্রমকে বলা হয়েছে পরাবিদ্যা। পরাবিদ্যার পাঠক্রমে আমাদের শিক্ষক আর্য-ঋষিগণ বলেছেন, ‘‘যস্তু সর্বাণি ভূতান্যাত্মন্যেবানুপশ্যতি।/সর্বভূতেষু চাত্মানং ততো ন বিজুগুপ্সতে।।’’ (ঈশোপনিষদ) অর্থাৎ, যিনি নিজের আত্মাকেই সর্বাত্মারূপে উপলব্ধি করেন, তিনি কাহাকেও ঘৃণা করেন না। সর্বভূতে নিজেকে, নিজের মধ্যে সর্বভূতকে উপলব্ধি করেন। কেননাক, আর্য্য হিন্দু শাস্ত্রমতে আমরা মানুষেরা ঐহিক জগতে দ্বৈত ভাবে অসম্পৃক্ত হয়েও সেই এক পরমাত্মার সাথে সম্পৃক্ত।
আবার তৈত্তরীয় উপনিষদের বিদ্যা দানের শান্তি পাঠে রয়েছে, ‘‘ওঁ সহ নাববতু। সহ নৌ ভুনক্তু। সহ বীর্য করবাবহৈ। তেজস্বি নাবধীতমস্তু মা বিদ্বিষাবহৈ। ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।।’’ যার মর্মার্থ হলো, আমরা (আচার্য্য ও বিদ্যার্থী উভয়ে) সহমত হয়ে চলব, প্রকৃতির উপাদান সকলে স-মান (Equitable) ভাবে ভাগ করে জীবন ধারণ করব। কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করব না। আর অপরাবিদ্যার বিষয় ছিল জাগতিক শিক্ষা, যা ৬৪ কলা বিদ্যার মধ্যে নিহিত ছিল। (অন্তরাসীজন ৬৪ কলাবিদ্যার সিলেবাস জানতে আগ্রহী হলে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস মহোদয়ের অভিধানে ‘কলা’ সবিশেষ পাঠ করে দেখতে পারেন। তা হলেই বুঝতে পারবেন বিদ্যা কাকে বলে।) পরাবিদ্যার শিক্ষকদের বলা হতো আচার্য্য আর অপরাবিদ্যার শিক্ষকদের উপাচার্য্য (তৈত্তিরীয় উপনিষদ)। বর্তমানের শিক্ষা ব্যবস্থায় সরস্বতী আরাধনা মন্ত্রক্তো বেদ-বেদান্ত-বেদান্তের সাথে বাস্তব সখ্যতা না থাকলেও বিদ্যার সাথে সম্পৃক্ত আচার্য্য এবং উপাচার্য্য শব্দদ্বয়কে এখনো বিদায় দেওয়া যায় নি।
* * *
আমাদের বর্তমান যুগ যে যুক্তিবাদী সে কথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি অস্বীকার করবেন না আশাকরি। যেমন, সন্তানের হয়ে মা খেলে সন্তানের পেট ভরবে না। ছাত্রের হয়ে শিক্ষক লেখাপড়া করলে ছাত্র পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে না। তেমনি বিদ্যালাভের জন্য বিহিত সাধনা না করে পুরোহিতের বলে দেওয়া দেবী সরস্বতীর অঞ্জলিমন্ত্র আওড়ালে বিদ্যার্থীদের বিদ্যা বা ঈপ্সিত ফললাভ হবে কি ?
অবশ্য পুরোহিতও জানেন না ফললাভের বিষয় সম্পর্কে। যদি জানতেন প্রতিমা-বিসর্জন মন্ত্রে বলতেন না—ওঁ আবাহনং ন জানামি, নৈব জানামি পূজনম্। বিসর্জনং ন জানামি ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি ।–অর্থাৎ আমি আবাহনও জানিনা, বিসর্জনও জানিনা, আমাকে ক্ষমা করুন। (দ্রঃ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)

বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী পূজ্য-প্রতিমা চঞ্চল চিত্তের ধারণের জন্য একটি অবলম্বন। প্রতিমাকে ব্রহ্মের রূপ কল্পনা করে উপাসনা, সংযম, সাত্তিক আহার, সাত্তিক বিহার ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে পূজা করা হয়।–যাতে পূজক বা উপাসক মনসংযোগ দ্বারা প্রতিমাকে হৃদয়ে ধারণ করে প্রতিমার গুণে গুণান্বিত হতে পারে। এই হলো প্রতিমা পূজার মূল কথা।
* * *
আমাদের আলোচ্য দেবী সরস্বতী প্রতিমার চরণ পদ্মের উপর ন্যস্ত, এর দ্বারা সৃষ্টির বিবর্ত্তনের কথা রূপকে বর্ণিত হয়েছে। মা সরস্বতী হংসের উপর উপবিষ্ট। হংস পরমাত্মার প্রতীক। বীণা থেকে নাদ বা ধ্বনি উৎপন্ন হয়, তাই বীণা সুরত-শব্দযোগের প্রতীক । পুস্তক বা গ্রন্থ বিদ্যা অর্জনের মাধ্যমের প্রতীক। দেবীর শুক্লবর্ণ সাত্তিকতার প্রতীক। পদ্ম, হংস, বীনা, পুস্তকাদি সজ্জিত শ্বেতবসনা দেবী সরস্বতীর উপাসনার বিষয় তাহলে বিদ্যা, ব্রহ্ম, পরব্রহ্ম, সৃষ্টিতত্ত্ব ইত্যাদি হওয়া উচিত। প্রতিমার অলঙ্কারের ওই গুণগুলোর সিলেবাস জানার পরে তো উপাসনার দ্বারা গুণান্বিত হবার প্রশ্ন! সেই সিলেবাসগুলো দেবী সরস্বতী কোন্ পুস্তকে, কোন্ সংহিতায় লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন, সে বিষয়ে বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকা কোথাও কিছু বলে গেছে কিনা আমি জানি না। যদি কেউ জানেন দয়া করে জানালে বাধিত হব। তবে এটুকু জেনেছি, পরব্রহ্মের ব্যক্ত-প্রতীক ‘‘শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা’’ —‘‘তমসার পার অচ্ছেদ্যবর্ণ মহান পুরুষ ইষ্টপ্রতীকে আবির্ভূত’’ হয়েছেন যিনি, তিনি ওই সব বিষয়ের খুঁটিনাটি জানেন এবং সবাইকে জানিয়েও দিয়েছেন বিবিধ স্মৃতি এবং শ্রুতি বাণীর মাধ্যমে। যিনি মানুষের জীবনের বেঁচে থাকা ও বৃদ্ধি পাওয়ার জীবন্ত আদর্শ স্বরূপ। যিনি পঞ্চবর্হি ও সপ্তার্চ্চি মাধ্যমে সব দেবতার, সব আরাধনার, সব পূজার, সব বিদ্যার সূত্র সন্নিবেশিত করেছেন। যাঁর উপাসনা বাদ দিয়ে কোন পুতুল পূজা করে কোন কিছুই জ্ঞাত হওয়া সম্ভব নয়। তাঁর নাম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। যারজন্য সদদীক্ষার শুভ মুহূর্তে ‘‘ওঁ ব্রহ্ম পরব্রহ্ম ও কুলমালিক ……’’ মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে বাহ্যপূজার বিষয়ে উল্লেখ্য পরব্রহ্ম-এর প্রকৃত তত্ত্বকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।
* * *
বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী সততা, সংযম, ন্যায়নীতি ইত্যাদি মানবিক গুণগুলোর প্রবহমানতাকে বৎসারান্তিক নবীকরণ করার জন্যই বাহ্যপূজা বা মূর্তিপূজা উদযাপনের উদ্দেশ্য। বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সরস্বতী পূজাই শুধু নয়, সব পূজার নামে হুজুগে মেতে আহার-বিহারে একটু বেশী করে অসংযমী হয়ে পড়ি আমরা। নাহলে সরস্বতী পূজা উপলক্ষ্যেও মাংসের দোকানে লাইন পড়ে যায়, যা হিন্দু শাস্ত্রে অভক্ষ্য, নিষিদ্ধ খাবার। যা খেলে আয়ুক্ষয় হয়। হিন্দুদের প্রামাণ্য গ্রন্থ মনু সংহিতা অনুযায়ী ‘মাং’ মানে আমাকে ‘স’ মানে সে, অর্থাৎ আমাকে সে খেলে আমিও তাকে খাব। আর আমরা ধর্ম পালনের অজুহাতে, পূজার অজুহাতে শাস্ত্রবিরোধী আচরণ করে হিন্দুত্বের বড়াই করতে চাইছি। এরফলে অহিন্দুরা আমাদের ওপর আঙুল তুলতে সাহস পাচ্ছে।
* * *
ভাষা-বিজ্ঞান অনুযায়ী পূজা মানে পূরণ করা, সম্বর্দ্ধিত করা। যে আচার-আচরণ সাত্তিক জীবন-বর্দ্ধনার অভাবকে পূরণ করে, পরিবেশের জৈবাজৈব সবকিছুকে সম্যকরূপে বর্দ্ধিত করে, তার নাম পূজা। ‘শ্রেয়-সৃজনী সংহতি ও সমাবেশ’ যা, তার নাম উৎসব। আর যে আচার-আচরণ জীবনবৃদ্ধিকে নন্দিত করে তার নাম আনন্দ। এখন প্রশ্ন, আমাদের প্রচলিত পূজা, উৎসবের উদযাপন বৃহত্তর পরিবেশকে কতখানি নন্দিত করে ‘পূজা’ শব্দের যথার্থতাকে উপহার দিতে পেরেছে ? –এইসব বিষয়ে সত্তাপিয়াসী চিন্তাশীলদের চিন্তা করে দেখা উচিত। বিশেষ করে যাঁরা কুসংস্কার বিরোধী রূপে নিজেদের বোধ ও বোধিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান।
* * *
পূজা বিষয়ে হিন্দুদের প্রামাণ্য গ্রন্থগুলো কি বিধান রেখে গেছে, বাহ্য-পূজাবাদীদের তা একবার জেনে নেওয়া দরকার।
‘মহানির্ব্বাণতন্ত্র’ নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ
‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ।
অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’
ওই মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ‘ভারতে বিবেকানন্দ’ গ্রন্থের ৩৩৬ পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট। ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’

‘‘যে-ব্যক্তি সর্ব্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে।’’ –শ্রীমদ্ভাগবত। ৩-২৯-২২

“ঈশ্বরঃ সর্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জ্জুন তিষ্ঠতি।
ভ্রাময়ন্ সর্ব্বভূতানি যন্ত্ররূঢ়ানি মায়য়া।।“
–গীতা, ১৮। ৬৫
“যিনি এই সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার নিজের স্বধর্মানুরূপ নিষ্কাম কর্মাচরণ দ্বারা (বাক্য বা ফুলজল দ্বারা নহে) পূজা করিয়া মানুষ সিদ্ধি লাভ করে । স্বধর্মানুরূপ (বর্ণানুগ সত্তাধর্ম পালন) নিষ্কাম কর্মই পরমেশ্বরের পূজার ডালি ।” (গীতা ১৮।৪৬)
“যে ব্যক্তি সর্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে ।“ (শ্রীমদ্ভাগবত ৩।২৯।২২)


তাই একটা প্রশ্ন স্বভাবতঃই জাগে, বিদ্যার্জনের জন্য আমরা যদি বাহ্যপূজার ডালি সাজিয়ে দেবী সরস্বতীর উপর সত্যিসত্যিই নির্ভরশীল হতে পারতাম, তাঁকে বিশ্বাস করতাম, তাঁর প্রতি নিষ্ঠা থাকত, তাহলে বিদ্যা লাভের জন্য তাঁকে নিয়েই পড়ে থাকতাম। প্রভূত অর্থ ব্যয় করে, একে-ওকে ধরাধরি করে স্কুল-কলেজে ভর্তি হয়ে, বিষয় ভিত্তিক প্রাইভেট টিউটরের কাছে টুইশন নিতে যেতাম না, পরীক্ষার হলে অসদুপায়ের আশ্রয় নিতাম না। কারণ, এ-তো দ্বন্দ্বীবৃত্তি, বিশ্বাসকে অপমান করা। অবশ্য না করে উপায়ও তো নাই! বর্তমানের মোবাইল প্রীতির যুগে, প্রতিমা-পূজায় বিশ্বাসী এমন কি কাউকে পাওয়া যাবে,— যিনি পুরোহিতকে কিছু দক্ষিণা দিয়ে তার সাধের মোবাইলের প্রতিকৃতি বা প্রতিমার পুজো করিয়ে মোবাইলের সব ফিচার উপভোগ করতে পারবে, ডাউনলোড-আপলোড করতে পারবে, হোয়াটস্ অ্যাপে ছবি পাঠাতে পারবে? প্রতিমা-পূজায় বিশ্বাসী এমন কোন মেয়ে পাওয়া যাবে, যে তার পছন্দের বর-এর ছবি বা কাট্-আউট পুজো করিয়ে মা হতে পারবে, সুখের দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করতে পারবে? যদি পারে তাহলে পুরোহিতকে দক্ষিণা দিয়ে সরস্বতী প্রতিমার পূজা করিয়ে বিদ্যা লাভ সম্ভব! নচেৎ কোন পুতুল পুজো করার আগে একটু বোধ-বিবেককে কাজে লাগাতে হবে।
* * *
বাস্তব বোধের দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে বিচার-বিবেচনা করলে দেখা যাবে, সরস্বতী পূজার ওই মন্ত্রগুলোই শুধু নয়, আমাদের সব কথাই বাক্ হয়ে স্ফূরিত হয় বলে সরস্বতী বাগ্দেবী রূপে কল্পিত হয়েছেন। অতএব যুক্তি বা বিজ্ঞান অনুযায়ী দেবী সরস্বতী মেধানাড়ীতে সুপ্ত, কণ্ঠে এবং কলমে ব্যক্ত। একাগ্রতার অনুশীলনে মেধানাড়ী জাগ্রত না করতে পারলে, অর্থাৎ স্মৃতি যদি কাজ না করে মুখস্থ বলা যাবে না, লেখাও যাবে না। মেধানাড়ী ধ্রুবাস্মৃতির কাজ করে। উপনিষদে বর্ণিত আছে, আহার শুদ্ধৌ সত্ত্বাশুদ্ধিঃ, সত্ত্বাশুদ্ধৌ ধ্রুবাস্মৃতি …… । তাই, বিদ্যা লাভ করতে হলে মেধানাড়ীকে জাগ্রত রাখতে হবে। আর, মেধানাড়ীকে জাগ্রত রাখতে হলে সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন-যাপন—আহার-বিহার, জৈবিক তাগিদ পূরণ, জীবিকার্জন ইত্যাদি ইত্যাদি আহরণসমূহকে শুদ্ধ রাখতে হবে খেয়ালখুশীর প্রবৃত্তি-পরায়ণতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে।
বেদবিৎ আচার্য্যের বিধানকে উপেক্ষা করে শিক্ষার নামে, বিদ্যার নামে প্রবৃত্তি-পরায়ণতার বিধি-ব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থায় বা সরস্বতীর মূর্তি পূজা করে যদি প্রকৃত বিদ্যা লাভ হতে পারতো, তাহলে তথাকথিত বিদ্যালয়গুলো থেকে অনেক অসৎ-নিরোধী আদর্শবান, বিদ্বান, শ্রদ্ধাবান, চরিত্রবান মানুষের সৃষ্টি হতে পারতো। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উপাচার্যকে ঘেরাও করে ‘হোক কলরব’ সংগঠিত হতো না। ‘মা বিদ্বিষাবহৈ’-এর দেশের বিদ্যালয়ে ছাত্র-রাজনীতির নামে মানুষের প্রতি মানুষের বিদ্বেষ দেখতে হতো না। এসব উল্লেখ করার কারণ, বর্তমানে দুর্নিতীপরায়ণ মানুষদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যাঁরা একসময় বিদ্যাদেবীর আরাধনা করে সমাবর্তন মাধ্যমে আচার্য্য বা উপাচার্য্য স্বাক্ষরিত বিদ্বান আখ্যা বা শংসাপত্র বা ডিগ্রী নিয়েছেন! তাঁদের কি বিদ্বান বলা যাবে ?
অথচ এই ভারতবর্ষের রত্নাকর দস্যু সরস্বতীর কোন মূর্তি-পূজা না করেই, আহত-নাদ মর্যাদা-পুরুষোত্তম ‘রাম’-নামের (ম-রা, ম-রা, ম-রা ……..=রাম) সাধন করে দেবী সরস্বতীকে মেধানাড়ীতে জাগ্রত করে হয়েছিলেন বাল্মীকি।
* * *
একদা তমসা নদী থেকে স্নান সেরে ফিরছিলেন। এক তরুশাখে ক্রৌঞ্চ-জুটি পরস্পর খেলছিল। এক ব্যাধ পুরুষ পাখিটিকে তীর মেরে হত্যা করলে স্ত্রী পাখিটি করুণ বিলাপ করতে থাকে। বাল্মীকি বিচলিত হয়ে ‘কোনদিন প্রতিষ্ঠা পাবে না’ বলে ব্যাধকে অভিসম্পাত করেন। সেই অভিশাপ বাণী স্বতঃস্ফূর্ত শ্লোকবদ্ধ হয়ে নির্গত হয়েছিল :–‘‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতী সমাঃ/যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকম্ অবধী কামমোহিতম্।’’ এই শ্লোকটিকে পৃথিবীর সারস্বত সাধকেরা আদি শ্লোক বলে মান্য করেন। অতএব, সারস্বত সাধনার মূল বিষয় মস্তিষ্কে সুপ্ত থাকা মেধানাড়ী বা স্মৃতিবাহী চেতনার জাগরণ।
* * *
মেধানাড়ীকে জাগ্রত করতে হলে লাগে অনাহত-নাদ বা সৎমন্ত্র সাধন। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের বিদ্বান করার জন্য দীক্ষার মাধ্যমে আজ্ঞাচক্রে অনাহত-নাদের সৎমন্ত্র সাধন, স্বতঃ-অনুজ্ঞার অনুশাসন এবং সদাচার মাধ্যমে আমাদের মেধানাড়ীকে জাগ্রত করার সহজ উপায় দান করেই ক্ষান্ত হন নি, ‘নিয়তং স্মৃতিচিদযুতে’-বাণীতে স্বস্ত্যয়নী ব্রতের মন্ত্রের মাধ্যমে স্মৃতিবাহী চেতনাকে জাগ্রত করার বিধান দিয়ে দেবী সরস্বতীর আরাধনার নিমিত্ত স্থায়ী একটা আসন পেতে দিলেন। যা’তে আমরা প্রতিনিয়ত সরস্বতী পূজায় ব্যাপৃত থাকতে পারি। আমরা একটু চেষ্টা করলেই সেই বিধিগুলোকে অনুশীলন মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে দেবী সরস্বতীকে সম্বর্দ্ধিত করে, প্রকৃত অর্থে পূজা করে নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ,পবিত্র হতে পারব, বিদ্বান হতে পারব।
এবার আমরা একটু দেখে নেব বর্তমান বেদবিৎ আচার্য্য শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরস্বতী বিষয়ে কি নিদান রেখে গেছেন।
‘‘বিকাশ-ব্যাকুল গতিই যাঁর সংস্থিতি—
তিনিই সরস্বতী,
আর, বাক্ বা শব্দই
যাঁর সত্তা—
তিনিই বাগ্দেবী‍;
তাই, যিনিই বাগ্দেবী
তিনিই সরস্বতী। ২ ।
বাস্তব উপলব্ধিসম্ভূত
সার্থক অন্বিত-সঙ্গতিশীল জ্ঞানকেই
বিদ্যা বলে। ৩ ।
সার্থক সর্ব্বসঙ্গতিশীল জ্ঞানই
বিজ্ঞান,
আর, তা’ই বেদ,
প্রজ্ঞাও তা’ই। ১০ ।’’
(সংজ্ঞা সমীক্ষা)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রদত্ত উপরোক্ত বাণীতে এটুকু বোঝা গেল যে সরস্বতী আরাধনার মাধ্যম বাক্ বা শব্দ সাধন। শ্রীশ্রীঠাকুর ভাব-সমাধিতে বাক্ বা শব্দের সন্ধান দিতে গিয়ে ব্যক্ত করলেন,—‘‘নাম-নামী অভেদ, ….. স্থূলে আমার প্রকাশ, সূক্ষ্মে আমার বাস।’’ মহাগ্রন্থ পুণ্যপুঁথির উক্ত বাণীকে স্বীকার করলে বাক্ বা শব্দের অস্তিত্বের আধারও শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। এবং সব দেবতার সমাহারে সৃষ্ট একমাত্র তিনিই ভগবানের অখন্ড সাকার মূর্তি। তিনি ইষ্ট, তিনি ধ্যেয়, তিনি জ্ঞেয় এবং তিনিই পূজ্য। তাঁর আদর্শ মেনে চলে ইষ্টপূজা করতে পারলে সব দেবতার পূজা করা হয়।

তাই তো শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন,
“দেবতার পূজা-অর্চনা করতে গেলে আগে ইষ্টের ভাব অন্তরে জাগ্রত করে সেই ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে, দেবতার স্মরণ মনন করতে হয়। তাঁকে স্মরণ করা মানে—তাঁর চলন-চরিত্র ও গুণ গরিমা স্মৃতিতে এনে অনুশীলনের ভিতর দিয়ে আয়ত্ব করা। চরণ-পূজা মানে চলন পূজা। ইষ্টের চলনাকে নিজের জীবনে আয়ত্ত ক’রে ঐ চলনের প্রসারতা ও সম্বর্দ্ধনা যদি না ঘটাই বাস্তবে, তাহলে তাঁর চরণ-পূজা সার্থক হয় না। আমরা ফাঁকতালে কাম সারতে চাই, কিন্তু বিধি বড় কঠিন বান্দা, কোন চালাকি চলে না তাঁর কাছে।”

(আ. প্র. ২৯. ১২. ১৯৪২)

© tapanspr@gmail.com

।। সব তীর্থ বারবার/গঙ্গাসাগর একবার ।।

** সব তীর্থ বার-বার

গঙ্গাসাগর একবার। **

এই তীর্থ স্নানটি এক সময়ে এতোই দুর্গম স্থানে অবস্থিত ছিলো যে অন্যান্য তীর্থের মতো সব সময় বা ইচ্ছামতো যাওয়া সম্ভব হতো না। নদীনালা, বন- জঙ্গল অতিক্রম করে যেতে হতো। তা ছাড়া চোর, ডাকাত ও জলদস্যুর ভয় তো ছিলই, এমনকি বন্য জন্তুর আক্রমণে মৃত্যুও পর্যন্ত ঘটত। সাগর দ্বীপটা শহর কলকাতা থেকে বেশ অনেকটা দূরে। আগে যানবাহনের তেমন সুবন্দোবস্ত ছিলো না। ইদানিং যানবাহনের প্রভুত উন্নতি হয়েছে। তৈরী হয়েছে প্রচুর রাস্তা ঘাট।

এই দ্বীপে নদীপথ বা জলাপথ ছিলো এক মাত্র ভরসা। এই উন্নত যানবাহনের যুগেও জলপথে নৌকা, ভটভটি, লঞ্চ ও ভেসেল যোগে যাতায়াত চলছে। পৌষ মাসের একেবারে শেষ মকর সংক্রান্তির দিনে লক্ষ-লক্ষ নরনারী প্রচণ্ড শীতের দাপট উপেক্ষা করেও হাজির হয় এই সাগর সঙ্গমে। আজকাল অনেকেই যাচ্ছেন বত্‍সরের যে কোনো সময়ে। বলা যায় আগে মতো সেই ভয়াবহ দুর্গমতা আর নেই। প্রতিদিন নিত্য নতুন মানুষের পদার্পণে সাগর দ্বীপ এর তীর্থ স্নানটি কোলাহল মুখর হয়ে উঠে। তাই সারা বছর এখন অনেক জমজমাট।

তীর্থ স্নানের সন্নিকটে গড়ে উঠেছে জেলা প্রশাসনের সার্কিট হাউস, যুব আবাস, জেলা পরিষদ ভবন, দোকানপাট, হোটেল আরও কতো কি!

ভারত সেবাশ্রমের বিশাল বাড়ি ও অনেক ধর্মশালা গড়ে উঠেছে এই দ্বীপে। সরকারের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে সুন্দর বৃহত্‍ মন্দির। এই দুর্গম স্নানে মহা ঋষি কপিল মুনির আশ্রম ছিলো। মুনিবর এখানে সাধনা করতেন। সাগর দ্বীপে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী পৌষ সংক্রান্তির পুণ্যলগ্নে স্নান করেন। এই মেলার অধীনে তিন শতাধিক বিঘা জমি রয়েছে। ভরা কোটালে সাগর এর জলোচ্ছ্বাস থেকে বাঁচাতে এক তলার সমান উঁচু থাম ওয়ালা বাড়ি তৈরী হয়েছে।

এই বাড়িটি কপিল মুনির মন্দির এখানে আছে ভগীরথের কোলে মা গঙ্গা, বীর হনুমান, সিংহবাহিনী, বিশালক্ষী ও ইন্দ্রদেব।
এক কালে সাগর দ্বীপ ছিলো ১৭০ বর্গ মাইলের এক সমৃদ্ধ জনপথ। ১৬৮৮ সালে সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে প্রায় দু লক্ষ মানুষ সমুদ্রে ভেসে যায়। সেই থেকে দ্বীপটি বহু কাল জনহীন হয়ে পড়ে। ইতিহাস ৪৩০ খ্রিস্টাব্দে রানী সত্যভামা প্রথম কপিল মুনির মন্দিরটি তৈরী করেন। সেই মন্দিরটি বিলীন হয়ে যাবার পর আরও ছয়টি মন্দির তৈরী হয়, পরে বিলীন হয়ে যায়। বর্তমান মন্দিরটি আদি মন্দির স্থল থেকে প্রায় ২ কিমি দূরে অবস্থিত। বর্তমানে এই কপিল মুনির মন্দির সংলগ্ন এলাকায় প্রভূত উন্নতি হয়েছে। কাকদ্বীপ, নামখানা ব্যতীত ডায়মণ্ড হারবার থেকে ক্রুজে করে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় গঙ্গাসাগরে।


উইকিপিডিয়া অনুসারে গঙ্গা ভারত ও বাংলাদেশে প্রবাহিত একটি আন্তর্জাতিক
নদী। এই নদী ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের জাতীয় নদী। গঙ্গার দৈর্ঘ্য ২,৭০৪
কিমি (১,৬৮০ মা); উৎসস্থল পশ্চিম হিমালয়ে ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যে।
দক্ষিণ ও পূর্বে গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গা
মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। এক্ষেত্রে এর দুটি ধারা বা শাখা লক্ষনীয়– একটি
ফারাক্কা বাঁধ থেকে এসে ভাগীরথী ও হুগলী নদী নামে মূলত দক্ষিণে প্রবাহিত
হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে; অপরটি বাংলাদেশ সীমান্তে মহানন্দার সঙ্গে মিলিত
হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে পদ্মা নামে গোয়ালন্দ পর্যন্ত প্রবাহিত
হয়েছে। পদ্মাকে মূলত গঙ্গার প্রধান শাখানদী বলা হয়। তবে ঐতিহাসিক
কারণবশত এর অববাহিকাকেও গাঙ্গেয় বদ্বীপের অন্তর্গত বিবেচনা করা হয়।
জলপ্রবাহের ক্ষমতা অনুযায়ী গঙ্গা বিশ্বের প্রথম ২০টি নদীর একটি।
গাঙ্গেয় অববাহিকার জনসংখ্যা ৪০ কোটি এবং জনঘনত্ব ১,০০০ জন/বর্গমাইল (৩৯০
/কিমি২)। এটিই বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নদী অববাহিকা।

গঙ্গা হিন্দুদের কাছে পবিত্র নদী। তারা এই নদীকে গঙ্গা দেবীজ্ঞানে পূজা
করেন। (পূজা মানে সম্বর্দ্ধনা, অথচ আমরা তথাকথিত অমূর্ত মূর্তিপূজার নামে
পূজাবশিষ্ট বর্জ্য গঙ্গায় নিক্ষেপ করে গঙ্গাকে দূষিত করে চলেছি! যা সনাতন ধর্মনীতির বিরোধী।) গঙ্গার
ঐতিহাসিক গুরুত্বও অপরিসীম। একাধিক পূর্বতন প্রাদেশিক ও সাম্রাজ্যিক
রাজধানী (যেমন পাটলিপুত্র, কনৌজ, কাশী, এলাহাবাদ, মুর্শিদাবাদ, মুঙ্গের,
নবদ্বীপ ও কলকাতা) এই নদীর তীরেই অবস্থিত।

পরিবেশ বিভাগের রিপোর্ট অনুসারে গঙ্গা বিশ্বের পাঁচটি সবচেয়ে দূষিত নদীর
একটি। বারাণসীর কাছে এই নদীতে ফেসাল কলিফর্মের পরিমাণ ভারত সরকারের
নির্ধারিত সীমার চেয়ে একশো গুণ বেশি। গঙ্গাদূষণ শুধুমাত্র গঙ্গাতীরে
বসবাসকারী কয়েক কোটি ভারতীয়দেরই ক্ষতি করছে না, ১৪০টি মাছের প্রজাতি,
৯০টি উভচর প্রাণীর প্রজাতি ও ভারতের জাতীয় জলচর প্রাণী গাঙ্গেয়
শুশুক-এরও ক্ষতি করছে।গঙ্গাদূষণ রোধে গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান নামে একটি
পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতি, প্রযুক্তিগত অদক্ষতা, সুষ্ঠু
পরিবেশ পরিকল্পনার অভাব, ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য ও বিশ্বাস এবং ধর্মীয়
সংগঠনগুলোর অসহযোগিতার কারণে এই প্রকল্প ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।কিন্তু
বর্তমানে সরকারের তৎপরতায় গঙ্গা নদী অনেকটাই দূষণমুক্ত হয়েছে এবং
ভবিষ্যতে পুরো নদী দূষণ মুক্ত হবে, সেই আশা রাখা যায়।

দেবপ্রয়াগ, অলকানন্দা (ডানে) ও ভাগীরথী (বাঁয়ে) নদীর সঙ্গমস্থল, এখান
থেকে মূল গঙ্গা নদীর শুরু।

ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের গাড়োয়াল অঞ্চলে গঙ্গার উৎস অঞ্চল।

মূল গঙ্গা নদীর উৎসস্থল ভাগীরথী ও অলকানন্দা নদীর সঙ্গমস্থল। হিন্দু
সংস্কৃতিতে ভাগীরথীকেই গঙ্গার মূল প্রবাহ বলে মনে করা হয়। যদিও
অলকানন্দা নদীটি দীর্ঘতর। অলকানন্দার উৎসস্থল নন্দাদেবী, ত্রিশূল ও কামেট
শৃঙ্গের বরফগলা জল। ভাগীরথীর উৎস গোমুখের গঙ্গোত্রী হিমবাহ (উচ্চতা ৩,৮৯২ মি (১২,৭৬৯ ফুট))।

গঙ্গার জলের উৎস অনেকগুলো ছোট নদী। এর মধ্যে ছয়টি দীর্ঘতম ধারা এবং
গঙ্গার সঙ্গে তাদের সঙ্গমস্থলগুলোকে হিন্দুরা পবিত্র মনে করে। এই ছয়টি
ধারা হল অলকানন্দা, ধৌলীগঙ্গা, নন্দাকিনী, পিণ্ডার, মন্দাকিনী ও ভাগীরথী।
পঞ্চপ্রয়াগ নামে পরিচিত পাঁচটি সঙ্গমস্থলই অলকানন্দার উপর অবস্থিত।
এগুলি হল বিষ্ণুপ্রয়াগ (যেখানে ধৌলীগঙ্গা অলকানন্দার সঙ্গে মিশেছে),
নন্দপ্রয়াগ (যেখানে নন্দাকিনী মিশেছে), কর্ণপ্রয়াগ (যেখানে পিণ্ডার
মিশেছে), রুদ্রপ্রয়াগ (যেখানে মন্দাকিনী মিশেছে) এবং সবশেষে দেবপ্রয়াগ
যেখানে ভাগীরথী ও অলকানন্দার মিলনের ফলে মূল গঙ্গা নদীর জন্ম হয়েছে।
হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে গঙ্গার দৈর্ঘ্য ২৫০ কিলোমিটার (১৬০ মা)।
হৃষীকেশের কাছে গঙ্গা হিমালয় ত্যাগ করে তীর্থশহর হরিদ্বারে গাঙ্গেয়
সমভূমিতে পড়েছে। হরিদ্বারে একটি বাঁধ তৈরি করে গঙ্গা খালের মাধ্যমে
গঙ্গার জল উত্তরপ্রদেশের দোয়াব অঞ্চলে জলসেচের জন্য পাঠানো হয়ে থাকে।
এদিকে গঙ্গার মূলধারাটি হরিদ্বারের আগে সামান্য দক্ষিণ-পশ্চিমমুখী হলেও
হরিদ্বার পেরিয়ে তা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বাঁক নিয়েছে।

এরপর গঙ্গা কনৌজ, ফারুকাবাদ ও কানপুর শহরের ধার দিয়ে একটি
অর্ধ-বৃত্তাকার পথে ৮০০-কিলোমিটার (৫০০ মা) পার হয়েছে। এই পথেই রামগঙ্গা
(বার্ষিক জলপ্রবাহ ৫০০ মি৩/সে (১৮,০০০ ঘনফুট/সে)) গঙ্গায় মিশেছে।[২২]
এলাহাবাদের ত্রিবেণী সঙ্গমে যমুনা নদী গঙ্গায় মিশেছে। সঙ্গমস্থলে যমুনার
আকার গঙ্গার চেয়েও বড়। যমুনা গঙ্গায় ২,৯৫০ মি৩/সে (১,০৪,০০০ ঘনফুট/সে)
জল ঢালে, যা উভয় নদীর যুগ্মপ্রবাহের জলধারার মোট ৫৮.৫%।

এখান থেকে গঙ্গা পূর্ববাহিনী নদী। যমুনার পর গঙ্গায় মিশেছে কাইমুর
পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন নদী তমসা (বার্ষিক জলপ্রবাহ ১৯০ মি৩/সে (৬,৭০০
ঘনফুট/সে))। তারপর মিশেছে দক্ষিণ হিমালয়ে উৎপন্ন নদী গোমতী (বার্ষিক
জলপ্রবাহ ২৩৪ মি৩/সে (৮,৩০০ ঘনফুট/সে))। তারপর গঙ্গায় মিশেছে গঙ্গার
বৃহত্তম উপনদী ঘর্ঘরা (বার্ষিক জলপ্রবাহ ২,৯৯০ মি৩/সে (১,০৬,০০০
ঘনফুট/সে))। ঘর্ঘরার পর দক্ষিণ থেকে গঙ্গার সঙ্গে মিশেছে শোন (বার্ষিক
জলপ্রবাহ ১,০০০ মি৩/সে (৩৫,০০০ ঘনফুট/সে)), উত্তর থেকে মিশেছে গণ্ডকী
(বার্ষিক জলপ্রবাহ ১,৬৫৪ মি৩/সে (৫৮,৪০০ ঘনফুট/সে)) ও কোশী (বার্ষিক
জলপ্রবাহ ২,১৬৬ মি৩/সে (৭৬,৫০০ ঘনফুট/সে))। কোশী , ঘর্ঘরা ও যমুনার পর
গঙ্গার তৃতীয় বৃহত্তম উপনদী।এলাহাবাদ থেকে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ পর্যন্ত।
গঙ্গা বারাণসী, পাটনা, গাজীপুর, ভাগলপুর, মির্জাপুর, বালিয়া, বক্সার,
সৈয়দপুর ও চুনার শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ভাগলপুরে নদী
দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্ব দিকে বইতে শুরু করেছে। পাকুড়ের কাছে গঙ্গার
ঘর্ষণক্ষয় শুরু হয়েছে। এরপর গঙ্গার প্রথম শাখানদী ভাগীরথী-হুগলির জন্ম,
যেটি দক্ষিণবঙ্গে গিয়ে হয়েছে হুগলি নদী। বাংলাদেশ সীমান্ত পেরোনোর কিছু
আগে হুগলি নদীতে গড়ে তোলা হয়েছে ফারাক্কা বাঁধ। এই বাঁধ ও ফিডার খালের
মাধ্যমে জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে হুগলি নদীকে আপেক্ষিকভাবে পলিমুক্ত রাখা
হয়। ভাগীরথী ও জলঙ্গী নদীর সঙ্গমের পর হুগলি নদীর উৎপত্তি। এই নদীর বহু
উপনদী রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় উপনদীটি হল দামোদর নদ (দৈর্ঘ্য্য
৫৪১ কিমি (৩৩৬ মা) অববাহিকার আয়তন ২৫,৮২০ কিমি২ (৯,৯৭০ মা২))। হুগলি
নদী সাগর দ্বীপের কাছে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে।

ঋক্ বেদে (১০৷৭৬।৫ ) গঙ্গা ও অন্য কয়েকটি নদীর স্তব আছে । গঙ্গার স্তব ঋক্

বেদে একবার মাত্র। গঙ্গা মকরবাহিনী শুক্লবর্ণাচতুর্ভূজা। এক হাতে একটি

পাত্র ও এক হাতে পদ্মফুল। জ্যৈষ্ঠ শুক্লাদশমীতে এর পূজা হয়। এই দিনে গঙ্গা

স্নানে দশ রকম পাপ নষ্ট হয় তাই এই তিথির নাম দশহরা । গঙ্গার জল স্নানে

পানে ও স্পর্শে পুণ্য এনে দেয় ৷ গঙ্গাতীরে বাস ও মৃত্যু গৌরব জনক। মৃতের

দগ্ধাবশিষ্ট অস্থি গঙ্গা জলে দেওয়ার নিয়ম আছে। গঙ্গার মাহাত্ম্য হিসাবে

কাহিনীর সীমা নাই । (সূত্র : পৌরাণিকা)

অদ্বৈত বেদান্তবাদের প্রবক্তা আচার্য্য শঙ্কর—

দেবি! সুরেশ্বরি! ভগবতি! গংগে ত্রিভুবনতারিণি তরলতরংগে ।

শংকরমৌলিবিহারিণি বিমলে মম মতিরাস্তাং তব পদকমলে ॥ 1 ॥

ভাগীরথিসুখদায়িনি মাতস্তব জলমহিমা নিগমে খ্যাতঃ ।

নাহং জানে তব মহিমানং পাহি কৃপাময়ি মামজ্ঞানম্ ॥ 2 ॥

হরিপদপাদ্যতরংগিণি গংগে হিমবিধুমুক্তাধবলতরংগে ।

দূরীকুরু মম দুষ্কৃতিভারং কুরু কৃপয়া ভবসাগরপারম্ ॥ 3 ॥

তব জলমমলং যেন নিপীতং পরমপদং খলু তেন গৃহীতম্ ।

মাতর্গংগে ত্বয়ি যো ভক্তঃ কিল তং দ্রষ্টুং ন যমঃ শক্তঃ ॥ 4 ॥

পতিতোদ্ধারিণি জাহ্নবি গংগে খংডিত গিরিবরমংডিত ভংগে ।

ভীষ্মজননি হে মুনিবরকন্যে পতিতনিবারিণি ত্রিভুবন ধন্যে ॥ 5 ॥

কল্পলতামিব ফলদাং লোকে প্রণমতি যস্ত্বাং ন পততি শোকে ।

পারাবারবিহারিণি গংগে বিমুখযুবতি কৃততরলাপাংগে ॥ 6 ॥

তব চেন্মাতঃ স্রোতঃ স্নাতঃ পুনরপি জঠরে সোপি ন জাতঃ ।

নরকনিবারিণি জাহ্নবি গংগে কলুষবিনাশিনি মহিমোত্তুংগে ॥ 7 ॥

পুনরসদংগে পুণ্যতরংগে জয জয জাহ্নবি করুণাপাংগে ।

ইংদ্রমুকুটমণিরাজিতচরণে সুখদে শুভদে ভৃত্যশরণ্যে ॥ 8 ॥

রোগং শোকং তাপং পাপং হর মে ভগবতি কুমতিকলাপম্ ।

ত্রিভুবনসারে বসুধাহারে ত্বমসি গতির্মম খলু সংসারে ॥ 9 ॥

অলকানংদে পরমানংদে কুরু করুণামযি কাতরবংদ্যে ।

তব তটনিকটে যস্য নিবাসঃ খলু বৈকুংঠে তস্য নিবাসঃ ॥ 10 ॥

বরমিহ নীরে কমঠো মীনঃ কিং বা তীরে শরটঃ ক্ষীণঃ ।

অথবাশ্বপচো মলিনো দীনস্তব ন হি দূরে নৃপতিকুলীনঃ ॥ 11 ॥

ভো ভুবনেশ্বরি পুণ্যে ধন্যে দেবি দ্রবমযি মুনিবরকন্যে ।

গংগাস্তবমিমমমলং নিত্যং পঠতি নরো যঃ স জযতি সত্যম্ ॥ 12 ॥

যেষাং হৃদযে গংগা ভক্তিস্তেষাং ভবতি সদা সুখমুক্তিঃ ।

মধুরাকংতা পংঝটিকাভিঃ পরমানংদকলিতললিতাভিঃ ॥ 13 ॥

গংগাস্তোত্রমিদং ভবসারং বাংছিতফলদং বিমলং সারম্ ।

শংকরসেবক শংকর রচিতং পঠতি সুখীঃ তব ইতি চ সমাপ্তঃ ॥ 14 ॥

ইতি উক্ত গঙ্গা-স্তোত্রম্-এর বন্দনা মাধ্যমে গঙ্গাকে বিবিধ বিভূষণে ভূষিত
করে শঙ্করাচার্য্য অমর হয়ে আছেন।

এই স্তোত্রে সর্বত্রই গঙ্গাকে সম্বোধন করে কবি তাঁর স্তুতি করেছেন। দেবী
গঙ্গা সুরেশ্বরী, ত্রিভুবনের ত্রাণকর্ত্রী, দেবাদিদেব শংকরের জটায় আবদ্ধ
থেকে হয়েছেন ‘শংকরমৌলিবিহারিণী’ এবং তিনিই পবিত্র তরঙ্গবিশিষ্টা
চিরপ্রবাহিনী স্রোতস্বিনী গঙ্গা।

তিনি ভগীরথ কর্তৃক স্বর্গ থেকে আনীতা হয়ে ‘ভাগীরথী‘ নামে প্রবাহিতা।
ইনিই শ্রীবিষ্ণুর চরণ থেকে নির্গত হয়ে ‘হরিপাদপদ্মতরঙ্গিণী‘ হয়েছেন।

দেবী গঙ্গাই ‘জাহ্নবী’ রূপে পরিচিতা কারণ জহ্নু মুনি গঙ্গাকে গ্রাস করে
পরে তাঁর কর্ণ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। ইনিই ছিলেন শাপভ্রষ্ট অষ্টবসু
ভীষ্মের জননী।

দেবী গঙ্গা কল্পলতার মতো ফলদায়িনী, সমুদ্র বিহারিণী, দেববধূগণ কর্তৃক
কটাক্ষে দৃষ্ট হয়ে থাকেন।

ইনিই নরকত্রাণকর্ত্রী, কলুষ বিনাশিনী, সর্বদা সুখদায়িনী,
মঙ্গলপ্রদায়িনী, আর্তজনের সেবক জনের আশ্রয়দাত্রী।

ইনিই উজ্জ্বল অঙ্গ বিশিষ্টা, ত্রিভুবন শ্রেষ্ঠা, কৃপাকটাক্ষময়ী। দেবরাজ
ইন্দ্র ও গঙ্গার চরণে চিরপ্রণত।

পরমানন্দ স্বরূপিণী, আর্তুজনের বন্দিতা, স্বর্গের অলকানন্দা যেন জ্ঞানহীন
শংকরের প্রতি করুণাঘন দৃষ্টিতে দেখেন।

তাঁর পবিত্র ধারায় স্নাত হয়ে যারা জন্মরহিত হয়, তাঁর তটে বাস করে যারা
বৈকুণ্ঠের শান্তি ভোগ করে যেন তাঁরা গঙ্গার কৃপাদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত না
হন।

তিনি যেন তাঁদের রোগ শোক তাপ পাপ কুমতি দূর করে সুমতি দেন, গঙ্গাদেবীর
মাহাত্ম্য বর্ণনায় সেই প্রার্থনা জানিয়েছেন কবি শংকরাচার্য।

শ্রীচৈতন্যদেব মহাপ্রভুর জন্মভূমি ও কর্মভূমি ছিল নবদ্বীপ গঙ্গাতীরে। ঠাকুর

শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সাধনভূমিও দক্ষিণেশ্বর গঙ্গা তীরেই। শাস্ত্রমতে, উভয়

সাধনভূমির ভূমিভাগ ছিল কূর্ম পৃষ্ঠাকৃতির এবং রম্য পুষ্পশোভিত।

বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রেরও জন্মভূমি ও কর্মভূমি
ছিল ভাগিরথী-গঙ্গার মূল প্রবাহ পদ্মা তীরের পাবনা জেলার হিমাইতপুরে।

গঙ্গানদীর সৃষ্টি ও সাগরমেলার সূত্রপাতের কাহিনী

কথিত আছে দানবীর রাজা হরিশচন্দ্রের বংশে সগর নামে একজন খুব বিখ্যাত রাজা
ছিলেন। আর তাঁর ছিল ষাট হাজার একজন পুত্র। সেই সগর রাজা ঠিক করলেন তিনি
অশ্বমেধ যজ্ঞ করবেন। সেই মতো একটি ঘোড়ার কপালে জয়-পতাকা লিখে তিনি
ছেড়ে দিলেন বিশ্ব ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। অপেক্ষা করতে লাগলেন ঘোড়াটি কবে
দেশ-বিদেশ ঘুরে ফিরে আসবে তারপর যজ্ঞ করে ইন্দ্রত্ব লাভ করবেন।

ওদিকে দেবরাজ ইন্দ্র ওই যজ্ঞের সংবাদ শুনে ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি
ভাবলেন, রাজা যদি রাজচক্রবর্তী হয়ে পুরো স্বর্গটাই চেয়ে বসেন, তখন কী হবে, তাই তিনি ফন্দি করে যজ্ঞের ঘোড়াটি পাতালে কপিল মুনির আশ্রমে বেঁধে রেখে এলেন।

ওদিকে ঘোড়াটিকে অনুসরণ করছিলেন রাজার ষাট হাজার পুত্র। (!) হঠাৎ ঘোড়াটি নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেই তাকে খুঁজতে শুরু করে দিলেন। আর খুঁজতে খুঁজতে তাঁরা পৌঁছে গেলেন কপিল মুনির আশ্রমে। ঘোড়াটিকে সেখানে দেখতে পেয়ে ক্রোধান্ধ হয়ে মুনিকে মারতে লাগলেন। মুনি যত বলেন ‘আমি ধ্যান করছিলাম, আমি জানি না
একে এখানে কে রেখে গেছে । ওঁর কথায় কর্ণপাত না করে সবাই মিলে আরও বেশি
করে মারতে লাগলেন। শেষে মুনি রেগে গিয়ে ক্রোধাবিষ্ট লোচনে তাঁদের দিকে
তাকাতেই তাঁরা সবাই ভষ্ম হয়ে গেলেন।
ওই সংবাদ পাওয়া মাত্র সগরের এক নাতি পাতালে গিয়ে মুনির পা ধরে
কান্নাকাটি শুরু করলেন। তাঁর চোখের জল দেখে মুনির মায়া হল। তিনি তখন
তাঁকে বললেন তোমার পৌত্র গিয়ে যদি স্বর্গ থেকে গঙ্গাকে নিয়ে আসতে পারে
তবে গঙ্গা দেবীর পবিত্র স্পর্শে এরা আবার জীবন ফিরে পাবে।

তিনি ফিরে এসে সব কথা খুলে বলতে তাঁর পৌত্র ভগীরথ তপস্যা করতে রাজি হয়ে গেলেন। হাজার বছর ধরে তিনি এমন তপস্যা করলেন যে বিষ্ণু খুশি হয়ে তাঁর হাতে একটি শঙ্খ দিয়ে বললেন, তুমি শঙ্খ বাজিয়ে আগে আগে যাও, গঙ্গা
দেবী তোমার পিছনে পিছনে পৃথিবীতে যাবেন।

কথামতো ভগীরথ শঙ্খ বাজাতে বাজাতে চললেন, আর পিছনে গঙ্গা। কিন্তু মুশকিল
হল স্বর্গ থেকে মর্ত্যে অবতরন করার সময়। গঙ্গার গতি এতটাই বেড়ে গেল
যে, সেই গতিতে পৃথিবী ধ্বংস

হবার উপক্রম। তাই সেই গতি ধারণ করার জন্য ভগীরথ শিবের তপস্যা শুরু করলেন।
শিব তপস্যায় তুষ্ট হয়ে জটা খুলে মাথা পেতে

দাঁড়ালেন। গঙ্গাও তাঁর মাথায় পড়লেন। অমনি পৃথিবী কেঁপে উঠল।

আসলে গঙ্গা চেয়েছিলেন তাঁর স্রোতে মহাদেবকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবেন। গঙ্গার মনের

কথা বুঝে তাঁর অহংকার চূর্ণ করতে শিব তাঁকে জটায় আবদ্ধ করলেন। সেই দেখে
ভগীরথ পড়লেন বিপদে। তিনি আবার তপস্যা শুরু করলেন। মহাদেব তাতে খুশি হয়ে
গঙ্গাকে দিলেন ছেড়ে। অমনি গঙ্গা কল-কল রবে পৃথিবীতে বইতে শুরু করলেন।

কিছুদূর গিয়েই জহ্নুমুনির আশ্রম। সেখানে তিনি তপস্যায় মগ্ন ছিলেন। গঙ্গার

স্রোতে তার আশ্রম গেল ভেসে। অমনি তিনি রেগে গিয়ে সমস্ত গঙ্গার

জল পান করে ফেললেন। এই দেখে ভগীরথ আবার পড়লেন চিন্তায়। তিনি মুনিকে

সাধ্যসাধনা করলেন। মুনিও তার কথায় খুশি হয়ে নিজের জানু চিরে গঙ্গাকে মুক্ত

করে দিলেন। এইজন্যই গঙ্গার আরেক নাম জাহ্নবী।

এরপর গঙ্গার স্রোত পৃথিবী অতিক্রম করে গিয়ে পড়ল পাতালে সগর মুনির
ছেলেদের ভষ্মের উপর। অমনি তাঁরা কপিল মুনির কথামতো আবার জীবন ফিরে পেলেন।
এইভাবে গঙ্গার জলে সগর-বংশ উদ্ধার হয়েছিল বলে হিন্দুরা গঙ্গাকে অতি
পবিত্র মনে করেন।

কিংবদন্তী অনুসারে মা গঙ্গা যখন ভগবান শিবের জটা থেকে পৃথিবীতে
পৌঁছেছিলেন তখন তিনি ভগীরথকে অনুসরণ করেছিলেন এবং কপিল মুনির আশ্রমে
গিয়ে সমুদ্রে যোগ দিয়েছিলেন সেই দিনটি ছিল মকর সংক্রান্তির দিন। রাজা
সগরের ষাট হাজার অভিশপ্ত পুত্ররা মা গঙ্গার পবিত্র জলের প্রবাহে
পুণর্জীবন লাভ করেছিলেন। সেই ঘটনার স্মরণে এই গঙ্গা নদীর সাগরের সাথে
মিলন স্থলটি

গঙ্গাসাগর তীর্থ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। সেই কাহিনীর স্মৃতিতে সেই
প্রাচীন কাল থেকে এখানে প্রতি বছর মকর সংক্রান্তিতে গঙ্গাসাগরে মেলার
আয়োজন করা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে এই শুভ দিনে স্নান করলে পুণ্য লাভ
হয়।

তথ্যঋণঃ পৌরাণিকা, উইকিপিডিয়া ও গোগুল।


tapanspr@gmail.com

জীবন-মৃত্যুর রহস্য

** “মরোনা, মেরোনা, পার তো মৃত্যুকে অবলুপ্ত কর।” **
(শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী।)

।। জীবন-মৃত্যুর রহস্য ।।


শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২য় অধ্যায়ে সাংখ্য-যোগে আত্মা সম্বন্ধে যে জ্ঞান আমরা পাই।
ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্
নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোঽয়ং পুরাণো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ৷৷ ২০ ॥
অনুবাদঃ আত্মার কখনও জন্ম হয় না বা মৃত্যু হয় না, অথবা পুনঃ পুনঃ তাঁর উৎপত্তি বা বৃদ্ধি হয় না। তিনি জন্মরহিত, শাশ্বত, নিত্য এবং পুরাতন হলেও চিরনবীন। শরীর নষ্ট হলেও আত্মা কখনও বিনষ্ট হয় না।।

বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়
নবানি গৃহ্ণাতি নরোঽপরাণি।
তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্য
ন্যানি সংযাতি নবানি দেহী ৷৷ ২২ ৷৷

অনুবাদঃ মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, দেহীও তেমনই জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে নতুন দেহ ধারণ করেন।

নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ ।
ন চৈনং ক্লেদয়ন্ত্যাপো ন শোষয়তি মারুতঃ ।। ২৩ ৷৷

অনুবাদঃ আত্মাকে অস্ত্রের দ্বারা কাটা যায় না, আগুনে পোড়ানো যায় না, জলে ভেজানো যায় না, অথবা হাওয়াতে শুকানোও যায় না।

অচ্ছেদ্যোঽয়মদাহ্যোঽয়মক্লেদ্যোঽশোষ্য এব চ। নিত্যঃ সর্বগতঃ স্থাণুরচলোঽয়ং সনাতনঃ ৷৷ ২৪৷

অনুবাদঃ এই আত্মা অচ্ছেদ্য, অদাহ্য, অক্লেদ্য ও অশোষ্য। তিনি চিরস্থায়ী, সর্বব্যাপ্ত, অপরিবর্তনীয়, অচল ও সনাতন।

অব্যক্তোঽয়মচিন্ত্যোঽয়মবিকাৰ্যোঽয়মুচ্যতে ৷৷
তস্মাদেবং বিদিত্বৈনং নানুশোচিতুমর্হসি ৷৷ ২৫ ৷৷

অনুবাদঃ এই আত্মা অব্যক্ত, অচিন্ত্য ও অবিকারী বলে শাস্ত্রে উক্ত হয়েছে। অতএব এই সনাতন স্বরূপ অবগত হয়ে দেহের জন্য তোমার শোক করা উচিত নয়।
(স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, পুরুষোত্তম উবাচ এতো সব তত্ত্ব জানা সত্ত্বেও আমরা মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তি কামনা করি সেটা কতটা যুক্তিযুক্ত?)


What is “DEATH POINT”?
শ্রীশ্রীঠাকুর অমনি বললেন—অশ্বিনীদা, regular সাধন যে করে তার আর মৃত্যুভয় থাকে না। সে জীবন্তে ম’রে দেখে, death point এত বেশী দূর নয় যে কিছুকাল regular সাধন করলে তাহা না feel করা যায়। কিন্তু যে তাহা একবার feel করেই আবার সাধন ছেড়ে দেয় তারও কিন্তু অসুখে ভুগে মরতে হয়। আর, যে তা’ feel করেও regular সাধন করতে থাকে, তার শরীরধ্বংসকারী অসুখ হলে ইচ্ছায় মনকে শরীর থেকে তুলে নিয়ে death point সহজে pass করে; বড় একটা কষ্ট পায় না—অভ্যাস রাখতে হয়। তবে একবারও যে জীবন্তে তা’ feel করছে সেও রােগে ভুগতে-ভুগতে সেই point-এর কাছে গেলে তার সেই সংস্কার জেগে ওঠে এবং সেও তখন তাতে concentrate করে ভাল idea-তে absorbed হয়ে (যথা সদ্গুরুধ্যান ইত্যাদি) দেহত্যাগ করে; ফলে সদগতি হয়। আর, যার অভ্যাস আছে, সে তাে কতবার death point অনুভব করে ফিরে আসছে, সে অসুখে বেশী ভােগে না; সে-রকম দেখলে তাে ঐ point-এ concentrate করে সদগুরুর ধ্যানে absorbed হয়ে শরীর ছাড়লে। Death-টা হচ্ছে। কর্মসংস্কারগত একটা idea-তে বেশী absorbed হ’য়ে এই ব্যক্তিত্ববােধ হারান। এই আমি অশ্বিনী রূপে যে আমিত্ব-বােধ এর সঙ্গে সম্বন্ধরাহিত্য, এই আমিত্বের সঙ্গে যে connecting links আছে তাহা cut off হয়ে যায়। যে idea-টা তকালে predominant থাকে তাতে absorbed হয়ে যেন তাহাই আমি—এইভাবে তন্ময় হয়ে এই আমিত্বকে বিস্মৃত হওয়া। একপ্রকার লয় আর কি। সাধকেরও লয় বহুবার ঘটবার মত হয়, উচ্চ-উচ্চ ধামে (plane-এ) যখন গতি হয়, তখন তাতে absorbed হয়ে লয় হয়। যে যত তীব্র সাধক, সে লয় তত রক্ষা করে-করে উচ্চ হতে উচ্চতর লােকে যায়। আর, যেখানে গিয়ে লয় এসে যায়, সেই তার খতম।
(অমিয়বাণী পৃঃ 106)


Psychical attachment বা ভক্তি যোগের মাধ্যমে সহজ ভাবে relax mood এ বডি stiff না করে মেরুদন্ড, ঘাড়, মাথা শক্ত না করে আজ্ঞা চক্রে বা তেসরা তিলে দুই ভ্রূর মাঝখানে একটু ভিতরের দিকে কোন pressure না দিয়ে নিঃশ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক রেখে মনস্থির করে খুব rhythmic ভাবে তালে তালে বীজমন্ত্র মানসজপ ও তদ্ বিষয়ক অর্থ ও ইষ্টস্বার্থ সহ ইষ্টকে একাগ্র চিত্তে ধ্যান করাটাই হচ্ছে শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত রাজ যোগের সহজ প্রক্রিয়া। এর সাথে সদাচার খুব জরুরি। বিশেষ করে মানসিক সদাচার ও আধ্যাত্মিক সদাচার। মনে কোন হিংসা বিদ্বেষ প্রতিহিংসা, জিঘাংসা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি রাখা চলবে না। তাহলে মন চঞ্চল হবে ও ধ্যানে বিঘ্ন ঘটবে। মন একাগ্র ও স্থির হতে চাইবে না। brain cell ও nervous system এ pressure পড়বে। sub conscious layer এ অর্থাৎ মনের গভীরে প্রবেশ করার ব্যাঘাত ঘটবে। তাড়াহুড়ো করা যাবেনা। আর কি হবে, কি পাবো, এই ভাবনা রাখা যাবেনা। কে কি করছে, বা করছেন না, ওটা দেখতে গেলে চলবে না। মন বিকেন্দ্রিক হয়ে যেতে পারে। তারপর ষটচক্র ভেদ পঞ্চভূত তত্ত্ব দর্শন বিভিন্ন স্তরের বীজমন্ত্রের sound ও light ও অধিষ্ঠাত্রী দেবদেবী দর্শন, শব্দকে অনুসরণ ও অনুসন্ধান এই উচ্চ স্তরের ব্যাপারগুলি ক্রমে ক্রমে আসবে সাধকের সংস্কার ও সাধনার একাগ্রতা অনুযায়ী। তারপর “ধাম ধাম নিরখত চলে পাওয়ে নিজ ঘর বাসা।” এখন এইগুলি কখন কার হবে তা পরমপিতাই জানেন। এইগুলি ধীরে ধীরে হওয়া মানেই হচ্ছে তার মস্তিষ্ক কোষের ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষন। যাতে তার সহজ অন্তর্দৃষ্টি, দূরদৃষ্টি, ভবিষ্যৎ দৃষ্টির, সূক্ষ্মচিন্তা ও পরিণাম দর্শীতা বেড়ে গিয়ে বাস্তব ক্ষেত্রে সমাধানী বোধ কাজ করে। সূক্ষ জগৎ সম্বন্ধে একটি অনুভূতি আসে। এই রকম বৈশিষ্ট্য ও সংস্কার অনুযায়ী হয়। ঠাকুর যোগ ও তন্ত্রের যত রকম সাধন পদ্ধতি আছে তার অদ্ভুত সমন্বয় করে এই যুগে সবচেয়ে সহজ শ্রেষ্ঠ রাজ যোগের বিধান দিয়েছেন। যোগ ও তন্ত্রের সব কঠিন ও বিপদজনক পদ্ধতি কে বাদ দিয়ে। এটা যার যার নিজের অভ্যাসের ব্যাপার। কাউকে দেখানোর কিছু নেই। যার আয়ত্ত হবে তার নিজেরই লাভ সাথে তার দ্বারা অপরের ও প্রেরণা সন্দীপ্ত লাভ। সবারই ইষ্টানুগ সিদ্ধি লাভ হোক, তাঁর রাতুল চরনে এই প্রার্থনা জানাই।


নামধ্যান ও সাধনকালে স্মরণীয়।।
শ্রীশ্রীঠাকুর প্রসঙ্গতঃ বললেন– নামধ্যানে nerve-system ( স্নায়ুতন্ত্র) strengt-hened ( শক্তিশালী) ও abler (সমর্থতর) হয়। হঠাৎ মাত্রা খুব চড়িয়ে দিতে নেই। Gradually (ক্রমশ) বাড়াতে হয়।স্নায়ুবিধান শান্ত থাকে এমনতর খাদ্য খেতে হয়, যেমন butter (মাখন), milk (দুধ), honey (মধু), plantain (কলা)। Association-ও (সঙ্গও) তপস্যার অনুকূল হওয়া চাই। নামধ্যানে nervous system (স্নায়ুতন্ত্র) অত্যন্ত sensitive ও recepetive (সাড়াপ্রবণ ও গ্রহণমুখর) হয়, Just like a powerful Camera (ঠিক একটি শক্তিশালী ক্যামেরার মত) যা’ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জিনিষ ধ’রে নিতে পারে। আ. প্র. ১৫/ ১৭.২.১৯৪৯ ;


"Contraction, Stagnation, Expansion. এমনি ক'রে এক-একটা মণ্ডল তৈরী হ’চ্ছে। সোঽহংপুরুষ পর্য্যন্ত চৈতন্যের সৃষ্টি।

Integration of ‘I’. Universal consciousness of ‘I’.
জগতের যাবতীয় জিনিস তাই অমন ক’রে পরিবর্তন হচ্ছে। একটা আণবিক প্রসারণ—এর চরমেই সঙ্কোচন, তাই মৃত্যু ক্ষতি নয়। তাই জগতের প্রত্যেক-প্রত্যেক জাতির আয়ু-সংখ্যা ঐরূপে নির্দ্ধারিত হয়। চেতন আমির ধারা, তাই সবের ভিতর চেতনা। অখণ্ডের চেতনা প্রত্যেক শরীরের ভিতর। সব কুড়িয়ে আন্ দিকিনি একবার।
(ভাববাণী, ৬৩তম দিবস, ২৯শে কার্ত্তিক, ১৩২৪)


** জড় ও চৈতন্য matter আর spirit প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতবাদ এবং তার সমর্থনে বিজ্ঞান। **


প্রশ্ন৷ তবে matter আর spirit—জড় আর চৈতন্য কি আলাদা নয় ?

শ্রীশ্রীঠাকুর । আমি বুঝি স্থূলের behind-এ যে কারণ আছে, যার effect স্থূল—তাই তার Spirit.*

*(“I make no difference between matter and spirit. They are differens degrees of fineness of the same thing. The one is becoming, the other through ascent and descent.”

‘My Philosophy of Industry’, P. 17-Henry Ford

“To see the universe from the physical or from the spiritual point of view is not considering something different, it is looking at the world by the two opposite ends.”

‘Pythagoras & The Delphic Mysteries’—Ednard Schare)

প্রশ্ন। যেমন বরফের পেছনে জল ?

শ্রীশ্রীঠাকুর। এই৷

প্রশ্ন। এগুলি তো স্থূলচক্ষে দেখা যায়— আমি এগুলির কথা বলিতেছি না। ইহার পশ্চাতে যাহা আছে—যেমন মানুষ মরিয়া কোথায় গেল—সেখানে সে করে কী, খায় কী ?—এসব সম্বন্ধে আপনার কোন অভিজ্ঞতা আছে কি?

শ্রীশ্রীঠাকুর। মরার আগে মানুষ কী ছিল তাহা জানিতে হইবে। মানুষটা আসিল কেমন করিয়া— মানুষ কতকগুলি idea-র সমষ্টি—সেই idea বাহিরের কতকগুলি জিনিসে attached হইয়া

পড়ে ৷

প্রশ্ন। কেমন?

শ্রীশ্রীঠাকুর ৷ ‘জায়া’ মানে পুরুষ যাহাতে জন্মে।*

(*”পতিঃ ভাৰ্য্যাং সম্প্রবিশ্য গর্ভো ভূত্বেহ জায়তে । জায়ায়াস্তদ্ধি জায়াত্বং যদস্যাং জায়তে পুনঃ ।।”
(মনু সংহিতা ৯।৯)

পুরুষ জন্মে কি করিয়া ? – যদি সে আবার জন্মিল, তবে বাঁচিয়া থাকিল কি করিয়া ?— তাহার মানেই হইতেছে পুরুষ যে-ভাবে অনুপ্রাণিত থাকে—জায়াতে যাইয়া তাহা মূর্ত্ত এবং প্রাণযুক্ত হয়। তারপর প্রসূত হইলে যে-ভাবে প্রাণ পাইয়া জন্মিল অর্থাৎ সন্তান—ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরই তাহার পারিপার্শ্বিক— বিশেষতঃ মা—তাহাকে নানাপ্রকারে সংঘাত করিতে লাগিল। ‘সংঘাত’ মানে impulse-এর প্রেরণা। তাহার ফলে মস্তিষ্কে ক্রমে-ক্রমে sen sation-এর ভিতর-দিয়া সেই impulse-গুলি recorded হইতে থাকিল। এমনি করিয়া ক্রমান্বয়ে শিশু শরীরে এবং ভাবে পুষ্ট হইতে লাগিল। তাহা হইলে যে-ভাবগুলি পিতা হইতে প্রাণ পাইয়া মায়ের ভিতর মূর্ত্ত হইয়া জন্মিল, পারিপার্শ্বিকের ভিতর হইতে নানা রকমের সংঘাতের ভিতর-দিয়া শিশু সেইগুলি সার্থক করিতে চলিল। এক-রকম ধরিতে গেলে তাহা সার্থক করাই যেন মানুষের life-এর mission—জীবনের ব্রত।**

(**”The mysterious fusion operates slowly but with perfect wisdom— organ by organ, fibre by fibre. Finally, a terrible pang compresses it in a voice; a bloody convulsion tears it from the mother soul and fastens it down into a throbbing palpitating body. The child is born, a pitiful image of earth, and he cries aloud with fright. The memory of the celestial regions has returned to the occult depths of the Unconscious; it will only be revived either by knowledge or by pain, by love or by death. Accordingly, the law of incarnation and disincarnation unfolds to us the real meaning of life and death.” —‘Pythagoras and the Delphic Mysteries’

“Terrestrial birth is death from the spiritual point of view and death is a celestial resurrection. The alternation of both lives is necessary for the development of the soul, and each of them is at once the consequence and the explanation of the other. Whosoever is imbued with these truths is at the very heart of the mysteries, at the centre of initiation.”

“I felt that order and progress were present in the mystery of life. I know that we continue to accumulate experience and continue to grow. (Aldeath). We are not all scrapped. The real thing, character, is not scrapped —the Queen Bee in the complicated hive which constitutes the individual. You may call it the master cell or you may call it the soul. The body by its instincts, the soul by its intuition, remember and utilise the experience of previous lives. But this is not essential; it is the essence, the gist, the results of experience that are valuable and remain with us.”
—Henry Ford)
(নানা-প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড থেকে সংকলিত।)

প্রশ্ন। ‘মুক্তি’ মানে কী?
শ্রীশ্রীঠাকুর। ‘মুক্তি’ মানে annihilation নয়কো,— বৃত্তি-ভেদ। আর, যাঁর বা যাঁদের যতটুকু এই বৃত্তিভেদ হইয়াছে, তিনি তিনি বা তাঁরই ততটুকু fit for every serviceable position to the environment হবেন। আর, এই ভেদ হইয়াছে— এমনতর বৃত্তির সংস্পর্শে পারিপার্শ্বিক যতই attached হয়, ততই পারিপার্শ্বিকের বৃত্তিগুলি adjusted হয়, আত্মপ্রসাদ লাভ করে— তাই, তাঁদের কাছে surrender মানুষকে মহীয়ান্, গরীয়ান্, জ্ঞানবান্ ও প্রেমিক করিয়া তোলে! তাই, মুক্তির তাৎপর্য্যই এইখানে— অর্থাৎ environment আমাদিগকে তার মত ক’রে বিশ্লিষ্ট ও বিভক্ত করিতে পারে না। প্রত্যেকের হইয়াও তাঁর বৈশিষ্ট্য অটুট থাকে; তাই সুতোর চারিদিকে যেমন মিছরির crystal-গুলি দানা বাঁধে, environment-ও তাদের চারিদিকে অমনতর একটা দানা বাঁধিয়া থাকে— as if সব নিয়ে যেন একটা person. তাই, তাঁতে মানুষের কাছে ভগবত্তার উদ্বোধন হয়—তাঁকে ভগবান্ বলে। এই জন্যই বোধহয় বৈষ্ণবেরা বলেন—ভগবান্ই একমাত্র পুরুষ, তা’-ছাড়া আর-সব প্রকৃতি।

(নানা-প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড থেকে সংকলিত।)

tapanspr@gmail.com

বর্ষ বিদায় বর্ষ বরণ

।। খ্রীস্টাব্দ ২০২৫কে বিদায় ও ২০২৬কে বরণ, তথা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত সৎসঙ্গের ঋদ্ধি-তপনার ঋত্বিক সম্মেলন বনাম যুগধর্মের উৎসব স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।


বর্তমানে প্রচলিত সময় পরিমাপক একক সেকেণ্ড, মিনিট, ঘণ্টা ইত্যাদির পূর্বে, পুরাকালে, পল, দণ্ড, কলা, মুহূর্ত, প্রহর প্রভৃতি কালনির্ণয় সূচক দিয়ে পৃথিবীর আহ্নিক গতিকে ১ অহোরাত্র ধরা হতো। ৩০ অহোরাত্রে ২ পক্ষ বা ১ মাস। ৬ মাসে ১ অয়ন। ২ অয়নে ১ বর্ষ। অপরপক্ষে উত্তরায়নে দেবতাদের ১ দিন, দক্ষিণায়নে ১ রাত। দেবতাদের ১ বছর সমান মানুষের ৩৬০ বছর ধরা হয়। বায়ুপুরাণে সৌর, সৌম্য, নাক্ষত্র এবং সাবন নামে চার প্রকার সময় নিরূপণ মাসের উল্লেখ আছে। ৩০ সূর্যোদয়ে সাবনমাস। সূর্যের রাশি পরিবর্তনে হয় সৌরমাস। কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ থেকে শুক্লপক্ষের পূর্ণিমা পর্যন্ত চান্দ্রমাস। চন্দ্রের নক্ষত্র ভোগকালকে বলা হয় নাক্ষত্রমাস। ৫ সৌরবর্ষে ১ নৈসর্গিক যুগ। (কোনো একটিমাসের আবর্তন কালকে একক ধরে নৈসর্গিক যুগের গণনা শুরু করা যেতে পারে।) ১ হাজার নৈসর্গিক যুগে ১ কল্প। সপ্তর্ষিরা ১০০ বছর করে এক একটি নক্ষত্রে কেন্দ্রীভূত থাকে। ২৭টি নক্ষত্র ভোগকাল ২৭০০ বছর—একটি সপ্তর্ষিযুগ। এই সপ্তর্ষিযুগের গণনা প্রাচীন ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল। ভারতের অন্যতম জ্যোতির্বিদ আর্য্যভট্ট নক্ষত্রাদির সাথে মেষরাশির অবস্থানকে কেন্দ্র করে কল্যব্দের সূচনা করেন ৩১০১ খৃঃ পূঃকে একক ধরে। সেই হিসেব এবং রাশির অবস্থান ধরে উত্তরায়নে ভীষ্মের দেহত্যাগ এর হিসেব কষে ২১৪২ খৃঃ পূঃ কে শ্রীকৃষ্ণের জন্মবর্ষ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
আমরা যে খৃষ্টাব্দ বলি এটা হচ্ছে গ্রেগরীয়ান ক্যালেণ্ডার। এটা একটি সৌর সন। নানা পরিবর্তন, পরিমার্জন, পরিবর্ধন, বিবর্তন এবং যোগ-বিয়োজনের মধ্য দিয়ে এ বর্তমান কাঠামো লাভ করেছে। উল্লেখ্য সৌর সনের সাথে ঋতুর সঙ্গে সম্পর্ক থাকে। বর্ষপঞ্জিকা প্রচলন অল্প পরিসরে প্রাচীন সুমের সভ্যতায় পরিলক্ষিত হয়। তবে মিশরীয় সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীনতম সৌর ক্যালেণ্ডার উদ্বোধন করে বলে জানা যায়। প্রাচীন মিশরীয় ক্যালেণ্ডার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, খৃস্টপূর্ব ৪২৩৬ অব্দ থেকে ক্যালেণ্ডার ব্যবহার গ্রহণ করে। রোমানরা তাদের প্রথম ক্যালেণ্ডার লাভ করে গ্রীকদের কাছ থেকে। রোমানদের প্রাচীন ক্যালেণ্ডারে মাস ছিল ১০টি এবং তারা বর্ষ গণনা করতো ৩০৪দিনে। মধ্য শীত মৌসুমের ৬০ দিন তারা বর্ষগণনায় আনতো না। রোমানদের বর্ষ গণনার প্রথম মাস ছিল মার্চ। তখন ১লা মার্চ পালিত হতো নববর্ষ উৎসব। শীত মৌসুমে ৬০ দিন বর্ষ গণনায়না আনার কারণে বর্ষ গণনায় যে দুটি মাসের ঘাটতি থাকতো তা পূরণ করবার জন্য তাদের অনির্দিষ্ট দিন-মাসের দ্বারস্থ হতে হতো। এই সব নানা জটিলতার কারণে জনসাধারণের মধ্যে তখন ক্যালেণ্ডার ব্যবহার করার প্রবণতা একেবারেই ছিল না। রোমের উপাখ্যান খ্যাত প্রথম সম্রাট রমুলাসই আনুমানিক ৭৩৮ খৃস্টপূর্বাব্দে রোমান ক্যালেন্ডার চালু করার চেষ্টা করেন। পরবর্তীকালে রোমান সম্রাট নূমা ১০ মাসের সঙ্গে আরো দুটো মাস যুক্ত করেন। সে দুটো মাস হচ্ছে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি। তিনি জানুয়ারিকে প্রথম মাস ও ফেব্রুয়ারিকে শেষ মাস হিসাবে যুক্ত করেন। জানুয়ারি মাস ধার্য করা হয় ২৯ দিনে এবং ফেব্রুয়ারি মাস ধার্য করা হয় ২৮ দিন। এ ছাড়াও তিনি মারসিডানাস নামে অতিরিক্ত একটি মাসেরও প্রবর্তন করেন। এই মারসিডানাস মাস গণনা করা হতো ২২ দিনে। এই অতিরিক্ত মাসটি গণনা করা হতো এক বছর অন্তর ফেব্রুয়ারি মাসের ২৩ ও ২৪ তারিখের মাঝখানে। খৃস্টপূর্ব ৪৩২ অব্দে সম্রাট নূমা কর্তৃক প্রবর্তিত মাসের হিসেব পরিমার্জন ও পরিবর্তন করা হয়। পরবর্তীকালে রোমানরা চার বছর অন্তর লীপ ইয়ারের হিসেব প্রবর্তন করে। এ হিসেবেও এক বছরের সঙ্গে অন্য বছরের দিন সংখ্যার হেরফের হতে থাকে। চার বছর অন্তর অতিরিক্ত একটি দিন যোগ করলে দেখা যেতো দিনের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সীজার মিশরীয় ক্যালেন্ডার রোমে চালু করেন। তিনি জ্যোতির্বিদদের পরামর্শে খৃস্টপূর্ব ৪৬ অব্দে সেই বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের মাঝখানে ৬৭ দিন এবং ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে ২৩ দিন এই মোট ৯০ দিন যুক্ত করে ক্যালেণ্ডার সংস্কার করেন। এই ক্যালেন্ডার জুলিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত হয়। এই ক্যালেন্ডারে মার্চ, মে, কুইন্টিলিস (জুলাই) ও অক্টোবর দিন সংখ্যা ৩১ দিন, অপরদিকে জানুয়ারি ও সেক্সটিনিস (আগস্ট) মাসের সঙ্গে দুইদিন যুক্ত করে ৩১ দিন করা হয়। ফেব্রুয়ারি মাস ২৮ দিনেই গণনা হতে থাকে। তবে প্রতি চার বছর অন্তর একদিন যুক্ত করা হয়। জুলিয়াস সীজারের নামানুসারে প্রাচীন কুইন্টিলিস মাসের নাম বদলিয়ে রাখা হয় জুলাই। ৪৪ খৃস্ট পূর্বাব্দের ১৫ মার্চ জুলিয়াস সীজার রোমনগরে নিহত হন। অন্যদিকে সম্রাট অগাস্টাসের নামানুসারে সেক্সটিনিস মাসের নাম পাল্টিয়ে অগাস্ট করা হয়। মিশরীয়রা সৌর বর্ষ গণনা করতো ৩৬৫ দিনে। কিন্তু জুলিয়াস সীজারের সংস্কারের ফলে তা তিনশ’ সাড়ে পঁয়ষট্টি দিনে এসে দাঁড়ায়। তখন থেকে বর্ষপঞ্জিতে ১ মার্চের পরিবর্তে ১ জানুয়ারীতে নববর্ষ প্রচলন হয়। খৃষ্টাব্দের সংখ্যাকে ৪ দিয়ে ভাগ করলে যদি মিলে যায়, তবে সে বছর ফ্রেব্রুয়ারী মাস ২৮ দিনের পরিবর্তে ২৯ দিন হবে। । যীশুখৃস্টের জন্ম বছর থেকে গণনা করে ডাইওনীসিয়াম এক্সিগুয়াস নামক একখৃস্টান পাদরী ৫৩২ অব্দ থেকে খৃস্টাব্দের সূচনা করেন। ১৫৮২ খৃস্টাব্দে রোমের পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরী জ্যোতির্বিদগণের পরামর্শে জুলিয়ান ক্যালেণ্ডার সংশোধন করেন। তার নির্দেশে ১৫৮২ খৃস্টাব্দের অক্টোবর ১০ দিন বাদ দেয়া হয়, ফলে ঐ বছরের ৫ তারিখকে ১৫ তারিখ করা হয়। পোপ গ্রেগরী ঘোষণা করেন যে, যেসব শত বর্ষীয় অব্দ ৪০০ দ্বারা বিভক্ত হবে সেসব শতবর্ষ লিপ ইয়ার হিসাবে গণ্য হবে। পোপ গ্রেগরীর বর্ষপঞ্জি সংস্কারের পর থেকে রোমান বর্ষপঞ্জি পন্ডিতদের কাছে গ্রেগরীয়ান বর্ষপঞ্জি হিসাবে খ্যাত হয়েছে। কিন্তু এ সংস্কার মানুষ সহজে মেনে নেয়নি। ইউরোপের দেশে দেশে এনিয়ে চলছিল দীর্ঘদিনের বাদ-প্রতিবাদ। তদুপরি খৃষ্টানদের রোমের ‘ক্যাথলিক’ বনাম ‘প্রোটেসটেন্ট’ বিরোধের কারণে গ্রেগরীয়ান সংস্কার গ্রহণে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছিল। অবশেষে ১৭৫২ সালে ইংল্যান্ডে ১৯১২ সালে চীনে ও আলবেনিয়াতে, ১৯১৮ সালে রাশিয়াতে ও ১৯২৭ সালে তুরস্কে সরকারীভাবে গ্রেগরীয়ান বর্ষপঞ্জি গৃহীত হয়। যীশুখৃষ্টের নামের সঙ্গে রোমানদের ধারাবাহিক বর্ষ গণনা বা খৃষ্টাব্দ অপেক্ষাকৃত পরবর্তীকালের সংযোজন। যীশুখৃষ্টের দেহত্যাগের ৭৫০ বছর পরে রোমের খৃষ্টান পাদ্রীগণ ধারাবাহিক বর্ষ হিসাবে যীশুর স্মরণে পশ্চাদ গণনার মাধ্যমে খৃষ্টাব্দ চালু করেন। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী যীশুর জন্ম বর্ষকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ‘খৃষ্টাব্দ’ চালু হয়েছে। সে হিসাবে বলা চলে যীশুখৃষ্টের জন্ম হয়েছিল ২০০৭ বছর আগে। আসলে কিন্তু তা নয়। যীশুর জন্ম বর্ষ পাবার জন্য প্রচলিত খৃষ্টাব্দের সঙ্গে আরও ৪ বছর যোগ করতে হবে। সম্ভবত তাঁর মৃত্যুবরণের ৭৫০ বছর পরে ‘খৃষ্টাব্দ’ চালু করার সময় রোমান পাদ্রীগণ প্রকৃত তথ্য খুঁজে পেতে ভুল করেছিলেন। তাছাড়া এ মহাপুরুষের প্রকৃত জন্মদিন বা তারিখ সম্পর্কেও বিভ্রান্তি রয়েছে। আজকাল সারা বিশ্বব্যাপী ২৫ ডিসেম্বর যীশুর জন্মদিন বা বড়দিন পালিত হয়। এক সময়ে খৃষ্টান পাদ্রীগণ জানুয়ারী মাসে যীশুর জন্মদিন পালন করতেন, তারও আগে ২০ মে তারিখ জন্মদিন উদ্যাপিত হত। ১ জানুয়ারী রোমান বর্ষপঞ্জির নববর্ষ; এদিনে খৃষ্টীয় সনের খৃষ্টাব্দের নববর্ষ শুরু হয়। কমবেশী সারাবিশ্বে দিবসটির একটি আবেদন রয়েছে। আমরা ১ জানুয়ারী থেকে নতুন ক্যালেণ্ডার ব্যবহার করি। এই গ্রেগরীয়ান নূতন বছর বা খৃষ্টীয় সনকে ইংরেজি বর্ষপঞ্জি তথা ইংরেজি সন বলার প্রবণতা দেখা যায়। অনেকেই ১ জানুয়ারিকে ইংরেজি নববর্ষ হিসাবে চিহ্নিত করেন। অথচ ইংরেজি বর্ষপঞ্জি বা ইংরেজি সন বলতে প্রকৃত প্রস্তাবে কিছুই নেই। (সূত্র : সংগৃহীত)


গণনার হিসেবের তারতম্য হলেও, দিনরাত-মাস-বছর হয়েই চলেছে আদিকাল থেকে প্রাকৃতিক নিয়মে। দিন-মাস-বছর আসে যায়, রেখে যায় কিছু স্মৃতি মনের মণিকোঠায়। ওইসব স্মৃতির মালাগুলোকে স্মৃতিবাহীচেতনার ভল্টে অনন্তকাল জমা করে রাখার জন্য আর্য্য-ঋষিরা প্রতিটি মুহূর্তের জীবন ধারণের আহরণকে শুদ্ধি করার মাধ্যমে ধ্রুবাস্মৃতির সন্ধান দিয়ে গেছেন। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র স্বস্ত্যয়ণী ব্রতের “নিয়তং স্মৃতিচিদযুতে” মন্ত্রে যাকে সমৃদ্ধ করেছেন। কেননা, যে মুহূর্ত চলে যাবে তা আর ফিরে আসবে না। চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা সমৃদ্ধ সবুজ গ্রহ পৃথিবীর প্রতিটি মুহূর্তকেই যাতে চিরনবীনতায় আস্বাদন করতে পারি, উপভোগ করতে পারি সেজন্যই আর্য্য সভ্যতার ঊষা লগনে পরমপিতার প্রতিভূ আর্য্য ঋষিগণ ‘‘মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ……..’’ মন্ত্রে বন্দনা করে বসুন্ধরার মধুময় পরিবেশকে রক্ষা অর্থাৎ পূজা করতে শিখিয়েছিলেন। পূজা শব্দের অর্থ সম্বর্দ্ধনা। যেমন যেমন আচরণে পরিবেশের অজৈব উপাদানসমূহকে রক্ষা করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া যায় তাই ছিল আর্য্য ভারতের পূজা, যজ্ঞ, হোম বা উৎসবের তাৎপর্য্য ।
আমরা যে ৩৩ কোটি দেবতার কথা শুনেছি সে সংখ্যাটা বাস্তবে ৩৩,০০০০০০০ নয়, শুধুই ৩৩। কোটি অর্থে piece বোঝান হয়েছে, যথা, জীবকোটি, ঈশ্বরকোটি শব্দ একক অর্থে ব্যবহৃত হয়।
এই সবুজ গ্রহের জীবকূলের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জৈবাজৈব রসদের যোগানদাতার মূল মালিক সূর্য। সূর্যের আর এক নাম আদিত্য। আদিত্য মানে দেবতা, দেদীপ্যমান যা’ তাকে দেবতা বলে। পৃথিবী, অন্তরীক্ষ ও দ্যুলোকের প্রতিটি স্থানে ১১টি করে বেঁচে থাকার আবশ্যিক উপাদান সরবরাহকারী দেদীপ্যমান উৎস রয়েছে। প্রাকৃতিক ওই ৩৩টি বা ৩৩কোটি উৎসকে রক্ষা করার প্রশ্নে আমরা প্রবৃত্তি পরবশ হয়ে যাতে দুর্বৃত্ত না হই তারজন্য উপনিষদের ঋষিরা স্মরণ করিয়ে দিলেন ‘আত্মানং বিদ্ধি’-র কথা। —পরমপিতার সন্তান তুমি, নিজেকে জানো, নিজের প্রতিরূপ মনে করে পরিবেশকে বাঁচাও, নিজে বাঁচ। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’—জীবনবিধ্বংসী আচরণ ত্যাগ করে জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলো। ‘মা গৃধ’—লোভ করো না। সদাচার এবং বর্ণাশ্রম মেনে চলো। পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে নিজে সমৃদ্ধ হও। এই ছিল ভারতবর্ষের বিধি-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠনের, ধর্মের, পূজার বা উৎকৃষ্ট প্রসবকারী আচরণ বা উৎসব উদযাপনের নিত্যবাস্তব রূপ। যার উপর প্রতিষ্ঠিত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৎসঙ্গ আন্দোলন। আমাদের নিত্য সাধনার আর্য্য-সন্ধ্যা বন্দনায় যা’ অনুশীলন করতে শিখিয়েছেন যুগ-বিধায়ক পরমবিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। অথচ আমাদের সৎসঙ্গের লোগো-বাহকেরা সেগুলোকে বাদ দিলন। “সত্যমেব জয়তের” ধারকেরা, ওই মহান মন্ত্রের ধ্বজাধারীরা সেইসব পবিত্র কর্তব্য ভুলে, বিজ্ঞানীদের সচেতন-বার্তাকে অগ্রাহ্য করে উৎসব পালনের নামে লোভাদি প্রবৃত্তি-পরায়ণতার উচ্ছৃঙ্খলতাকে উস্কে দিয়ে প্রাকৃতিক এবং আত্মিক পরিবেশকে যে হারে দূষিত করে চলেছি তা কতখানি উৎকৃষ্ট প্রসব করে উৎসব শব্দটিকে সমৃদ্ধ করবে সে হিসেব কষবে কবে সত্যমেব জয়তের আধিকারিকেরা?
যাইহোক, থেমে থাকলো তো আর চলবে না, চরৈবেতি-র নিদেশ মেনে এগিয়ে যেতেই হবে ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যে।
খ্রীষ্টাব্দের ২০২৫তম বর্ষের জাবেদা খাতায় লিপিবদ্ধ হওয়া মানবসভ্যতা-বিরোধী, অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, রেপ, হত্যা, ধর্ম প্রতিষ্ঠার অজুহাতে হত্যা—ইত্যাদি ইত্যাদি অমানবিক স্মৃতির সাথে জুড়ে গেল আর এক অকল্পনীয় বিভীষিকাময় স্মৃতি—বাংলাদেশে নির্মম হিন্দু হত্যা-কাণ্ড! বছরের শেষ প্রান্তে এসে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের ঘৃণ্য রাজনীতি, ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে, কোরান-বিরোধী, নবীর আদর্শ-বিরোধী অধার্মিক-বিধিতে, যেভাবে ওই দেশের ভূমিপুত্র হিন্দুদের প্রতি অত্যাচার চালাচ্ছে,—তা যেন কিছুতেই ক্যালেণ্ডারের পুরানো পাতার মত ছিঁড়ে ফেলা গেল না।—মন থেকে মুছে ফেলা যাবে না পশ্চিম বাংলা জুড়ে মানবতা-বিধ্বংসী সত্তাহিংসদের বাড়বাড়ন্ত—বিস্তার!
তথাপি, আশা-হতাশা, চাওয়া-পাওয়া, সুখ-দুঃখ, মিলন-বিচ্ছেদ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, প্রেম-হিংসার জাবেদা খাতার সঞ্চয় জমা রেখে সম্মুখের দিকে এগিয়ে চলার মাহেন্দ্রক্ষণ সমাগত। সমাগত পরমপুরুষ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রবর্তিত ঋত্বিক অধিবেশন মাধ্যমে আমরা প্রস্তুত ২০২৬তম বর্ষ-এর নতুন সূর্যকে স্বাগত জানাতে।
প্রাণের প্রাণ-স্পন্দন টিঁকিয়ে রাখার উৎস, আমাদের এই সবুজ গ্রহের
অভিভাবক, সকল শক্তির উৎস জ্যোতির্ময় সূর্যের তেজোময় দীপ্তিকে পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কৃত স্তব—
“হে সূর্য্য !
হে আমাদের
জীবন ও বৃদ্ধির উদগাতা !
আবশ্যকীয় যজ্ঞ !
হে মহান্
আচরণপ্রতিষ্ঠ
শ্রেষ্ঠ যজ্ঞকর্ত্তৃগণ !
আমাদের অনভিধ্যাত
অসাঙ্গযজ্ঞকৃত
অভিনিঃসৃত পাপ হইতে
রক্ষা করুন !
আমরা আমাদের
প্রবৃত্তিস্বার্থ-সম্পাদন-প্রলুব্ধ হইয়া
অহোরাত্রিতে
আদর্শবিমুখ-ইন্দ্রিয়-বশবর্ত্তিতায়
মন,
বাক্য,
হস্ত, পদ,
উদর ও শিশ্নদ্বারা
যে সমস্ত
জীবন-ক্ষয়কারী
দুরিতকর্ম্ম করিয়াছি,
আলোক
তাহা
অবলুপ্ত করিয়া দিউক,—
এই আমি—
আমাকে
পরম-অমৃত-যোনিসম্ভূত
ধ্বান্তারি
সূর্য্য-জ্যোতিতে আহুতি দিলাম !”-এর বন্দনা-মন্ত্রে নিত্যদিন নন্দিত হয়ে
আমরা যেন
সকল প্রকার কলুষতা ত্যাগ করে দীপ্তিমান চরিত্রের অধিকারী হতে পারি।
আমাদের মনুষ্যত্ব যেন দূষিত না হয়। আকাঙ্খার মোহে পড়ে আমরা যেন আমাদের
পঞ্চ-মহাভূত সম্ভূত পরিবেশকে দূষিত না করি। ভিনগ্রহের প্রাণীরা যেন
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ-প্রাণীদের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলতে না পারে, যে
আমরা অসভ্য, ভোগবাদের জোয়ারে ভাসতে গিয়ে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার, বাঁচিয়ে
রাখার অনুকূল পরিবেশকে বিনষ্ট করছি। তাহলে সেটা বড় লজ্জার ব্যাপার হবে।
হে অন্তর্যামী পরমপিতা! তুমি আমাদের শুভবুদ্ধি দাও, আমরা যেন “পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চি”-র আদর্শে মানব সভ্যতাকে জীবন-বাদের পথ প্রদর্শন করতে পারি।
সমাগত
২০২৬-এর নতুন সূর্যের কিরণে স্নাত হয়ে
নতুন প্রাণ, নতুন সুর, নতুন গান,
নতুন ঊষা,
নতুন আলোর নবীনতায় নতুন বছরকে সম্বর্দ্ধিত করতে পারি।
কেটে যাক
আমাদের সব বিষাদ, সব আতঙ্ক—
পরমপিতার আশীষধারায় এসে যাক হর্ষ, শুভ হোক ২০২৬-এর খ্রীষ্টিয় নববর্ষ।
আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক ও আধিভৌতিকাদি ত্রিতাপ জ্বালায় সদাচারের ইষ্টবারি সিঞ্চন করে ‘একদিন-প্রতিদিনের’ চিরনবীন সূর্যালোকের নবীন ছটায় পরমপিতার অনুশাসনের
আশীষধারায় অজর, অমর, চিরচেতনতার সাধনাকে আপ্ত করে আমরা যেন
ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যের চরৈবেতিতে নিরবচ্ছিন্ন থাকতে
পারি।—
বর্ষবিদায়-বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে সীমায়িত না থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্রের দিব্য-নিদেশের দিনচর্যার—
‘‘ঊষার রাগে উঠবি জেগে শৌচে শীতল হবি,
সন্ধ্যা-আহ্নিক জপ সাধনায় ঈশের আশিস লবি,
কুতুহলে পড়শি ঘুরে দেখবি সযতনে,
আছে কেমন কোথায় কে জন মন দিবি রক্ষণে,
তারপরেতে বাড়ী এসে শৌচে যথাযথ
গৃহস্হালীর উন্নয়নী অর্জ্জনে হ’ রত,
স্নানটি সেরে আহ্নিক করে ক্ষুধামতন খাবি,
একটু চলে বিশ্রাম নিয়ে আগুয়ানে ধাবি,
এমনি তালে সচল চালে চলে সন্ধ্যা এলে,
শৌচে শুদ্ধ হয়ে করিস আহ্নিক হৃদয় ঢেলে,
উন্নয়নের আমন্ত্রনী গল্প-গুজব শীলে,
হৃষ্টমনে আলোচনায় কাটাস সবাই মিলে,
পড়শী দিগের অভাব-নালিশ থাকেই যদি কিছু
তার সমাধান যেমন পারিস করিস লেগে পিছু,
করন-চলন ধরন-ধারন যজন যাজন কিবা
সকল কাজেই ইষ্টস্বার্থে চলিস রাত্রি-দিবা,
আদর-সোহাগ উদ্দীপনী কথায় কাজে ঝুঁকে,
স্বার্থ-কেন্দ্র সবার হবি ধরবি ইষ্টমুখে,
বিশ্রামেরই সময় গা-টি ঘুমল হয়ে এলে,
ইষ্ট-চলন মনন নিয়ে ঘুমে গা দিস ঢেলে।’’
(অনুশ্রুতি গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)-র আলোকে
বছরের প্রতিটি দিন হয়ে উঠুক অমৃত-তপনার উৎসব—খ্রীষ্টিয় নববর্ষ ২০২৬-কে
স্বাগত-স্মরণের প্রাক্কালে এই প্রার্থনা জানাই পরমপিতার রাতুল চরণে।