স্বাধীনতা দিবসের ভাবনা

         স্বাধীনতা দিবসের ভাবনা

নিবেদনে—তপন দাস

        সংবিধানের ৩৭০ ধারার বিলোপ পরবর্তী সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের আশঙ্কা নিয়েই জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখসহ সমগ্র ভারতে মহা সমারোহে পালিত  হলো ভারত যুক্তরাষ্ট্রের ৭৩তম স্বাধীনতা দিবস। অফিসে ক্লাবে, বিদ্যালয়ে, সরকারী ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলিত  হয়েছে। হস্তে, শকটে, রজ্জুমালায় সজ্জিত হয়েছে জাতীয় পতাকা।  রাষ্ট্রীয় স্তোত্র, জাতীয় সংগীত বৃন্দকণ্ঠে ধ্বনিত হলো, ব্যাণ্ড  বাজল, প্যারেড হলো, জাতীয় পতাকা সম্বলিত  শোভাযাত্রা গ্রাম-শহর-নগর  পরিক্রমা করল। মাঠে-মাঠে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা।  স্বাধীনতা-দিবসের ছুটির আমেজের রসনার তৃপ্তির জন্য মাংসের দোকানে, বিরিয়ানীর দোকানে লাইন দিয়েছে,  কেউ কেউ। ১৫ আগস্টের দিনটাকে সব দিক দিয়ে আমরা উপভোগ ঠিক নয়, ভোগ করলাম। স্বাধীন ভারতের নাগরিক হিসাবে জাতীয় পতাকাকে সম্মান জানালাম। আমাদের কর্তব্য ইতি।  যদিও পরের দিন কাগজে নির্মিত অনেক জাতীয়-পতাকা অভিভাবকত্বের অভাবে ভুলুন্ঠিত হতে দেখা গেছে !

গণপ্রজাতন্ত্রী আধুনিক ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ধর্মকে রক্ষা করে চলার কর্তব্যকে। রাষ্ট্রীয় মন্ত্র ‘সত্যমেব জয়তে’ স্মরণ করিয়ে দেয় উপনিষদীয় আচার্য অনুসরণের  শাশ্বত অবলম্বনকে। স্মরণ করিয়ে দেয় ‘‘আত্মবৎ  সর্বভূতেষু, মাতৃবৎ পরদারেষু, লোষ্ট্রবৎ পরদ্রব্যেষু…..’’-এর আদর্শের কথা। রাষ্ট্রের কর্ণধার রাষ্ট্রপতিসহ মন্ত্রীবর্গ প্রত্যেকেই ঈশ্বরের নামে শপথ গ্রহণ করে ঈশ্বরসৃষ্ট জীবগণের কল্যাণ সাধনে ব্রতী হয়। ঈশ্বরের প্রতিভূস্বরূপ জাগতিক ন্যায়দণ্ডধারী বিচারকেরা ধর্মাধিকরণ নামে চিহ্নিত। বিচারালয়কে বলা হয় ধর্মস্থান। তথাপি স্বাধীনতা দিবসের দিনেও প্রাণী-হত্যার ছাড়পত্র! কেন নিরীহ প্রাণীগুলোর সুস্থভাবে বেঁচে থাকার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষ !—এ প্রশ্নের জবাব দেবে কে?

        স্বাধীনতা মানে সু-এর অধীনতা, সত্তার অধীনতা। স্বাধীন যে, সে কখনোই স্বেচ্ছাচারী হয়ে কোন সত্তাবিধ্বংসী অসৎ কাজ তো করবেই না বরং সে অসৎ নিরোধে তত্‍পর হবে। মানুষ যখন প্রবৃত্তির অধীনতা থেকে মুক্তি পেতে পরমপিতাকে আশ্রয় করে বিবেককে অবলম্বন করে চলতে শেখে তখনই সে প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করে। তখন সে অন্যায়, অধর্ম, দুর্নীতি, ভ্রষ্টাচারকে আশ্রয় করে “সত্যমেব জয়তে”র সীলমোহরের দখল নিতে চাইবে না, উৎকোচ নিয়ে ন্যায়কে অন্যায়, অন্যায়কে ন্যায় বানাবার জন্য “সত্যমেব জয়তে”র সীলমোহরের ব্যবহার করবে না। অসৎ বলে ওগুলোকে ঘৃণা করবে। মেয়েদের মাতৃভাবে দেখবে। কামনার বস্তু রূপে নয়। কি ঘরে, কি বাইরে, কোন অসতের সাথে, অন্যায়ের সাথে আপোষ করবে না।

        ভারতীয় অনুশাসনের সাম, দান, ন্যায়, দণ্ড, নীতি ও ভেদ-এর রাজধর্ম রক্ষার পবিত্র কর্তব্যে যাতে এতটুকু অন্যায়, অধর্ম প্রবেশ করতে না পারে তার জন্যই ওইসব মহাভারতীয় নীতির অনুসরণ। বিধিবৎ প্রকৃষ্ট-জাতক সৃষ্টি করে প্রজা পালনের স্বার্থেই  ওই অনুশাসনকে আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি। তথাপি যখন ভারতীয় শাসন সংহিতা বা সংবিধান ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ না করে, ধর্ম এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়কে এক করে ফেলে ‘ধর্ম-নিরপেক্ষতাবাদ’,––অর্থাৎ রাষ্ট্র ধর্মের অনুবর্তী নয়’-এর মতবাদকে প্রতিষ্ঠা দেয়, তখন কি মনে হয় না, আমরা জাতীয়তাবাদের আদর্শের প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েও এক পরস্পর বিরোধী আচরণ করে চলেছি !  

  বর্তমান যুগ-পুরুষোত্তম কথিত ধর্মের যুগান্তকারী সংজ্ঞা ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম বলে জানিস তাকে। ধর্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম না-রে।’ সমন্বয় বার্তাবহ বাণীকে গুরুত্ব না দিয়ে ধর্মের নামে, ভারতীয় সংহিতার নীতি বহির্ভূত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তি পরায়ণতার  আস্ফালনকে, কতগুলো অনিত্য, অসার, পৌত্তলিক কু-সংস্কারকে যদি ‘ধর্ম’ নামে প্রতিষ্ঠা দিতে চাই, তা’ কি বিচক্ষণতার পরিচায়ক হবে, না ভারতবর্ষের কৃষ্টির পরিপূরক হবে? ওই ভুলের বোঝা কি আমাদের চিরদিন বইতে হবে? আমাদের বুদ্ধি, বোধ কি নিরেটই থেকে যাবে?

যে নীতি-বিধি পদার্থের অস্তিত্ব রক্ষার সহায়ক তাই তো ধর্ম। পদার্থের স্বকীয়তা ধারণ করে রাখার সহায়ক যা’ তাই ধর্ম। ধর্ম পালন করলেই পদার্থ টিঁকে থাকবে, নচেৎ থাকবে না। সংসদ প্রকাশিত ইংরেজী অভিধানে ধর্মের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘It is an action, one is bound to  do.’ সেই ধর্মের আবার পক্ষ আর নিরপেক্ষ কি? বেঁচে থাকার অজৈব উপকরণ বায়ু, জল, মাটি ইত্যাদির যদি ধর্ম থাকতে পারে, এবং তা’ যদি বিজ্ঞানের বইতে পাঠ্য হতে পারে, তাহলে মানুষের অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার নীতিবিধি-সমন্বিত ভারতের নিজস্ব সংহিতাগুলোর বিধানসমূহ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের সংহিতায় স্থান পাবে না কেন, প্রজাদের শিক্ষা দিতে পাঠ্য করা  হবে না কেন?    

রাষ্ট্রের সৃষ্টিই তো প্রজাদের অধর্ম বা দুর্নীতি থেকে মুক্ত করে ধার্মিক, অর্থাৎ সু-নীতি পরায়ণ করে তোলার জন্য। সেই রাষ্ট্র যদি তার প্রজাবর্গকে, তাদের পিতৃ-পিতামহের আদর্শ অনুসারী ধর্ম-পরায়ণ, কৃষ্টি-পরায়ণ হতে উৎসাহ না দিয়ে, প্রবৃত্তি-পরায়ণতায় উৎসাহ দেয়, সেটা ভারতবর্ষের জাতীয়  উত্তরাধিকারত্বের অস্তিত্বকে বিপন্ন করার বার্তা ভিন্ন আর কিছু নয়।

আর্য্য ভারতবর্ষের আদি সংবিধান ‘ব্রহ্মসূত্র’-এর নবীন সংস্করণ ‘কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র’ অনুযায়ী–-

‘‘সুখস্য মূলম্ ধর্ম্মম্

ধর্ম্মস্য মূলম্ অর্থম্

অর্থস্য মূলম্ রাষ্ট্রম্

রাষ্ট্রস্য মূলম্ ইন্দ্রিয় বিজয়ম্

ইন্দ্রিয় বিজয়স্য মূলম্ জ্ঞানবৃদ্ধ সেবয়া

জ্ঞানবৃদ্ধ সেবয়া বিজ্ঞানম্।’’

অর্থাৎ সুখী হতে হলে ধর্ম পালন করতে হবে। প্রকৃত ধার্মিক হতে হলে পুরুষার্থের চতুর্বর্গ সমন্বিত আশ্রমধর্ম পালন করতে হবে। নির্বিঘ্নে আশ্রমধর্ম পালন করার জন্য রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী প্রজাদের দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী হবার জন্য গুরু গ্রহণ করতে হবে। গুরুর আদেশ-নিদেশ পালন করলে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করা যাবে। তবেই জীবনে সুখী হওয়া যাবে, প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হওয়া যাবে।

——–

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সংক্ষিপ্ত দিব্য জীবনী

।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সংক্ষিপ্ত দিব্য জীবনী ।।

—ডাঃ তপন দাস

ভগবানের আবির্ভাব

নারী ও  পুরুষ  উভয়ের সংঘাতে যখন  উভয়ে নিজ-নিজ বৈশিষ্ট্যে উদ্দাম ও অবাধ হয়, উভয়ের উভয়ের প্রতি আকর্ষণ যেখানে উভয়কে মূঢ় করিয়া না তুলিয়া উদ্বুদ্ধ হইয়া আদর্শে আপ্রাণ হইয়া ওঠে—তেমনতর প্রকৃতি ও পুরুষেই ভগবান মূর্ত্ত  হইয়া আবির্ভূত হন, আর, জীব ও জগৎকে সংবৃদ্ধির পথে আকর্ষণ করিয়া অমৃতকে পরিবেশন করেন ! ১৮৪। (চলার সাথী)

যে প্রকৃতি ও  পুরুষকে অবলম্বন করে বর্তমান পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আবির্ভূত হয়েছিলেন, এই ধরাধামে—সেই লীলা-কাহিনী বর্ণনা করার মত সাধ্য এবং সাধনা আমার নেই। তথাপি অপটু  লেখনীতে বিধৃত করার চেষ্টা করলাম। লেখনীর ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরিয়ে  দিলে সহৃদয় পাঠকদের কাছে চিরঋণী থাকব।

                         নিবেদনে—তপন দাস, চলভাষ ৭০০৩৪১০০৭৬   

                      *    *    *                                                              
        অবিভক্ত বাংলার পাবনা শহরের কমবেশী তিন  কি. মি. পশ্চিমে পদ্মার উত্তর তীরের জঙ্গলে পরিপূর্ণ জনবিরল গ্রামটির নাম  হিমাইতপুর। ঊনিশ শতকের প্রথমদিকের ঘটনা। ওই গ্রামে কমলাকান্ত বাগচী নামে একজন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ বাস করতেন। তাঁর সাথে বিবাহ হয় ঈশ্বরভক্তি পরায়ণা রমণী  কৃপাময়ী দেবীর। তিনি নিজেকে শ্রীহরির পাদপদ্মে সমর্পণ করে সবসময় হরিনামে মেতে থাকতেন বলে গ্রামের  সকলে শ্রদ্ধার সাথে ‘হরিবোলা বাগচী মা’ বলে তাঁকে সম্বোধন করতেন। ওই  কৃপাময়ী দেবীর গর্ভে কেশব,  উমাসুন্দরী, হরনাথ এবং কৃষ্ণসুন্দরী নামে চারজন সন্তান জন্মগ্রহণ করে।

ওই হিমাইতপুর গ্রামে কাশ্যপ গোত্রীয় চৌধুরী পরিবারের স্বনামধন্য পণ্ডিত রামেন্দ্রনারায়ণ ভাদুড়ী চৌধুরীর প্রথমা স্ত্রী নিঃসন্তান ছিলেন। কৃপাময়ী দেবী তাঁর কন্যা কৃষ্ণসুন্দরী দেবীর বিবাহ দেন রামেন্দ্রনারায়ণ ভাদুড়ী চৌধুরীর সাথে।  কৃষ্ণসুন্দরী দেবীর গর্ভে রামেন্দ্রনারায়ণের তিন পুত্র সন্তান ও তিন কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। তারমধ্যে রামেন্দ্রনারায়ণের জীবদ্দশায় প্রথম ও তৃতীয় পুত্র শৈশবেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। অপর চার সন্তান কন্যা নিস্তারিণী দেবী, মনোমোহিনী দেবী, গোবিন্দমণি দেবী এবং পুত্র যোগেন্দ্রনারায়ণ (ডাক নাম লোহা)। তারমধ্যে কৃষ্ণসুন্দরী দেবীর জীবিতাবস্থায় নিস্তারিণী দেবী চল্লিশ বছর বয়েসে এবং যোগেন্দ্রনারায়ণ (লোহা) ষোড়শ বছর বয়েসে পরলোকগমন করেন। রামেন্দ্রনারায়ণ বাংলা ১২৯০ সালে এবং কৃষ্ণসুন্দরীদেবী ১৩৩২ সালে পরলোক গমন করেন।

মনোমোহিনী দেবীর আবির্ভাব—১২৭৭ বঙ্গাব্দের ১৮ই জ্যৈষ্ঠ। বাল্যকালে একজন জ্যোতিষী মনোমোহিনী দেবীর হস্তরেখা  বিচার করে বলেছিলেন,  এই বালিকার অল্প বয়সে বিয়ে হবে এবং ইনি লোক-পালয়িত্রী হবেন। শৈশবকাল থেকেই  দিদিমা কৃপাময়ী দেবীর প্রত্যক্ষ ইষ্টনিষ্ঠার প্রভাবে ভক্তি  এবং পিতৃদেব রামেন্দ্রনারায়ণের কাছে লেখাপড়া শিখে তিনি সমস্ত বিষয়েই জ্ঞান অর্জন করেন।

তিনি পিতার কাছে আদর্শ মানুষ হবার গুণ জানতে চাইলে রামেন্দ্রনারায়ণ বলেছিলেন—

১। যারা  সর্বদা সত্য কথা বলে।

২। পরের দ্রব্য যে কখনো চুরি করে না।

৩। যে গুরুজনের কথামত চলে।

৪। অন্য মানুষের প্রতি যে দরদী হয়।

৫। যে নরনারায়ণ সেবা করে।

৬। যে ঈশ্বরকে ভক্তি করে এবং ভালবাসে।

ওই গুণগুলো অর্জন করতে পারলে ঈশ্বর সুপ্রসন্ন হয়ে দীক্ষা দানও করেন।

মনোমোহিনী দেবী ওইসব গুণে গুণান্বিত ছিলেনই। তাই বাবার কথা শুনে দীক্ষা পাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলে রামেন্দ্রনারায়ণ মেয়েকে বললেন—‘‘মা তুমি এক কাজ কর, রোজ ঠাকুর ঘরে গিয়ে দেবতার সামনে বসে মন্ত্র পাওয়ার জন্য প্রার্থনা কর, ঠাকুর অবশ্যই তোমার প্রার্থনা মঞ্জুর করে তোমাকে মন্ত্র বলে দেবেন।’’

        সরলপ্রাণা মনোমোহিনী দেবীর তখন  আট বছর  বয়স।  পিতার কথা মেনে ছোটভাই লোহাকে সাথে নিয়ে ঠাকুর ঘরে  বসে প্রার্থনা করতে শুরু করেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রার্থনায় গুরুর আসন  টলে যায়।  হঠাৎ আলোকিত হয় ঠাকুর ঘরটি। মনোমোহিনী দেবী স্পষ্ট দেখতে পান, সিংহাসনের  পিতলের   মূর্তির স্থানে  বসে আছেন মাথায় টুপি, মুখে কাঁচা-পাকা দাড়ি, সুঠাম দেহের এক পুরুষ মূর্তি।  মনোমোহিনী দেবীকে একটি মন্ত্র বলে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। মন্ত্র লাভের আনন্দে আত্মহারা হয়ে যান মনোমোহিনী দেবী। পিতার কাছে ঘটনাটি খুলে বললে, পিতা  বলেন, ‘‘মা তুমি এখন থেকে ওই মন্ত্র জপ কর, আর ওই মূর্তি ধ্যান করতে থাক।’’

        পিতার উপদেশ মেনে তিনি নিয়মিত জপ-ধ্যান করতে থাকেন।

 *   *   *

নবকৃষ্ণ চৌধুরী  নামে রামেন্দ্রনারায়ণের এক  জ্ঞাতি প্রতিবেশী ছিল। তাঁর জামাতার নাম ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তী। পিতার নাম গোবিন্দ চন্দ্র চক্রবর্তী। ওরা  বাস করতেন পাবনা জেলার মথুরা ডাকঘরের অধীন ধোপাদহ গ্রামে।  তিনি কার্যোপলক্ষ্যে হিমাইতপুরে ডাঃ বসন্ত চৌধুরীর বাড়ীতে এসেছেন। মনোমোহিনী দেবীও কার্যকারণে সেখানে গিয়েছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র একজন সাধক পুরুষ ছিলেন। তিনি প্রতিদিন স্নান করে বাক্স থেকে কাপড়ে মোড়া একটি পট ও গ্রন্থ বের করে পুজোপাঠ করে আবার কাপড়ে মুড়ে বাক্সে রেখে দিতেন। মনোমোহিনী দেবীর মনে  বিষয়টি সম্পর্কে জানার কৌতুহল জাগে। একদিন ঈশ্বরচন্দ্র পদ্মায় স্নান করতে গেলে মনোমোহিনী দেবী তার বাল্যসখী বিপদনাশিনীর সাহায্যে বাক্স খুলে পটমূর্তি দেখে বিস্ময় ও আনন্দে মূর্ছিত হয়ে পড়েন। ঈশ্বরচন্দ্র স্নান সেরে ফিরে এলে মনোমোহিনী দেবীর কাছে তাঁর দীক্ষা প্রাপ্তির ঘটনার বিবরণ শুনে বলেন, তুমি মা ভাগ্যবতী। স্বপ্নে যিনি তোমাকে মন্ত্র দিয়েছিলেন তিনি আগ্রা দয়ালবাগ সৎসঙ্গের বর্তমান গুরু, আমার গুরুদেব হুজুর মহারাজ।

        ঈশ্বরচন্দ্রের সহযোগিতায় মনোমোহিনী দেবী তাঁর স্বপ্নের গুরুদেবকে পত্র লিখলে তিনি ‘সুশীলে’ সম্বোধনে পত্রের উত্তর দেন সাথে সাথে সাধন-ভজনের  নিমিত্ত কিছু পুস্তকাদিও পাঠিয়ে দেন।

 *    *     *

নয় বছর বয়সে পাবনা জেলার অধীন চাটমোহর গোয়াখাড়া গ্রামের পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তীর পুত্র শিবচন্দ্র চক্রবর্তীর সাথে বিবাহ হয় মনোমোহিনী দেবীর। বিবাহের পর  ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তী মহোদয়ের সাহায্যে ধ্যানযোগে প্রাপ্ত গুরুদেব হুজুর মহারাজ (রায় সালিগ্রাম সিংহ বাহাদুর) মহোদয়কে কলকাতায় দর্শন করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দীক্ষা গ্রহণ করেন।

        তারপর থেকে সময় সুযোগ পেলেই এলাহাবাদ, কাশী, আগ্রায় গিয়ে গুরুদেবের সাক্ষাত করতেন। মনোমোহিনী দেবী একবার গুরুর কাছে প্রার্থনা জানিয়ে বলেছিলেন, ‘‘আশীর্বাদ করুন, যেন আপনার মত সন্তান লাভ করতে পারি।’’

        উত্তরে তাঁর গুরুদেব বলেছিলেন, আমার মত কেন, আমার চেয়ে মহৎ সন্তান তোমার গর্ভে জন্মাবে। তার আলোয় পৃথিবী আলোকিত হবে।

*      *     *

        বিবাহের চার বছর পরে, ১২৯০ বঙ্গাব্দে মনোমোহিনী দেবীর পিতা রামেন্দ্রনারায়ণ ঋণগ্রস্ত অবস্থায় ইহলোক ত্যাগ করেন। সুযোগ বুঝে শরিকরা কৃষ্ণসুন্দরী দেবীকে মিথ্যা মামলায় উচ্ছেদ  করার চক্রান্ত করেন। বিষয়-সম্পত্তি, জমিদারী রক্ষা করতে একের পর এক মামলা  করতে গিয়ে সংসারের কত্রী প্রজাদের প্রিয় কর্তামা,—কৃষ্ণসুন্দরী দেবী ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কোন উপায় না দেখে  জামাতা শিবচন্দ্রের শরণাপন্ন হলে শিবচন্দ্র শাশুড়ি মায়ের সম্পত্তি রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গুয়াখারার বাড়ী ছেড়ে সহধর্মিনী মনোমোহিনী দেবীকে নিয়ে হিমাইতপুর চলে আসতে বাধ্য হন। শিবচন্দ্রকে বেশিরভাগ সময় কোর্ট-কাছারির কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হতো। ফলে সংসারের অন্যান্য সব দায়িত্বভার, যেমন, রান্নাবান্না থেকে শুরু করে, গোরু-বাছুর, ক্ষেত-খামার, প্রজাদের ভালোমন্দ সবটাই দেখতে হতো মনোমোহিনী দেবীকে। এতকিছু করেও মা এবং স্বামীর সেবাযত্নতেও কোন ত্রুটি রাখতেন না।

*      *     *

        মনোমোহিনী দেবী আঠারো বছর বয়সে প্রথম অন্তঃসত্ত্বা হন। একদিন দুপুরে  একজন সন্ন্যাসী মনোমোহিনী দেবীর কাছে সেবা নিতে চাইলে তিনি ভক্তিভরে অতিথিকে সেবা করেন। সন্ন্যাসী বাড়ী ছেড়ে যাবার সময় বলেন, এই বাড়ির  একমাত্র পুত্রের মৃত্যু হবে। এবং এই বাড়িতে একজন মহাপুরুষ জন্মাবেন, যিনি বহুলোকের অধীশ্বর হবেন এবং জগতের প্রভুত কল্যাণ সাধন করবেন।

        তার কিছুদিন পরেই কৃষ্ণসুন্দরীর পুত্র যোগেন্দ্রনারায়ণ অসুস্থ হয়ে পড়েন, রোগভোগে মারা যান। ওদিকে মনোমোহিনী  দেবীর গর্ভ-ধারণের স্বাভাবিক কাল ১০ চান্দ্রমাস পেরিয়ে আরো ১ মাস হয়ে গেল ! এখনো প্রসব-বেদনার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না ! সকলে চিন্তিত। অবশেষে সব-চিন্তার চিন্তামনি ১১টি সৌরমাস গর্ভবাসের লীলা সেরে মাটির পৃথিবীতে ভূমিষ্ট হলেন কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে—সকলের অজান্তে।              

         সাধারণ জীবকোটির মানুষেরা জ্যোতির্ময়ের জ্যোতির আলোকরশ্মির ছটার মহিমা বা স্বরূপের সাথে তো পরিচিত নয়! তাই ভুল করে পদ্মানদীর মাঝিরা, পাড়া-প্রতিবেশীরা, অনেকেই হাতে জলের বালতি নিয়ে, জ্যোতির ছটা-কে আগুন ভেবে,  আগুন নেভাতে চলে এসেছে কর্তামার বাড়ীতে! লোকজনের ভীড়, শঙ্খ বাজছে, হুলু দিচ্ছে,— কোথায় আগুন!  কর্তামার মেয়ে ‘মনো’-র ছেলে হয়েচে, জন্মাবার সময়  সেই ছেলের গা থেকেই নাকি আলো   বেরোচ্ছিল! কি অলুক্ষণে ব্যাপার বলো দিকিনি! জন্মের সাথে সাথে  সব বাচ্চারা কাঁদে, এ ছেলে নাকি খিল খিল করে হাঁসচে! তার ওপর আবার মাথায় নেই চুল! মুণ্ডিত মস্তক !

       হ্যাঁ, ঠিক তাই।  শাস্ত্র-নির্দিষ্ট সব লক্ষণ নিয়েই অসীম মানবদেহে সীমায়িত হয়ে জন্ম নিয়েছিলেন বারেন্দ্র শ্রেণীর ব্রাহ্মণ পিতা শিবচন্দ্র চক্রবর্তী এবং  মাতা মনোমোহিনীর সন্তানরূপে। অবিভক্ত বাংলার পাবনা জেলার হিমায়েতপুর গ্রামে। বাংলা ১২৯৫ সনের  ৩০শে ভাদ্র, সংক্রান্তির শুভ সকালে, চার দণ্ড বিশ পল্-এ।

*      *       *

।। পুরুষোত্তম লক্ষণ।।

আজানুলম্বিত বাহু, চোখের সরলরেখার নীচে কানের অবস্থান। দেহসৌষ্ঠবে হিরণ্যগর্ভ জ্যোতি।  সমগ্র ঐশ্বর্য্য, বীর্য্য, যশ, সৌভাগ্য জ্ঞান, বৈরাগ্য ইত্যাদি  ষড়ৈশ্বর্য্যের অধিকারী।

৩২টি দৈহিক লক্ষণঃ

৫টি দীর্ঘ—নাসিকা, হস্ত, হনু বা কপোল, নেত্র, জানু

৫টি সূক্ষ্ম—ত্বক, কেশ, অঙ্গুলীপর্ব, দন্ত, রোম

৭টি রক্তাভ—নেত্রান্ত, পদতল, করতল, তালু, ওষ্ঠধর, জিহ্বা, নখ

৬টি উন্নত—বক্ষ. স্কন্ধ, নাসিকা, কটি, মুখ, নখ

৩টি  হ্রস্ব—গ্রীবা, জঙ্ঘা, মেহন

৩টি বিশাল—কটি, ললাট, বক্ষ

৩টি গম্ভীর—নাভী, স্বর, জ্ঞান।     

*      *       *                              

       ভুবনমোহিনী হাসির ডালির মুখে আধো আধো কথাও ফুটেছে সাত মাসে। হাঁটি-হাঁটি, পা-পা করে হাঁটতেও শিখে গেছে। নবম মাসের এক শুভদিন দেখে দৌহিত্রের অন্নপ্রাশন দিলেন মাতামহী কৃষ্ণসুন্দরী দেবী।

                     ‘‘অকূলে পড়িলে দীন হীন জনে

                     নুয়াইও শির, কহিও কথা।

                     কূল দিতে তারে সেধো প্রাণপণে

                     লক্ষ্য করি তার নাশিও ব্যথা।’’

—উপরোক্ত চার পংক্তির আশীর্বাণীর আদ্যাক্ষর মিলিয়ে অ-নু-কূ-ল নামকরণ করলেন বিশ্বজননী মাতা মনোমোহিনী দেবী।

       ছেলের বয়স ১০ মাস। হরিপুর গ্রামের আত্মীয় নিষ্ঠাবান সাত্ত্বিক  ব্রাহ্মণ উমেশচন্দ্র লাহিড়ী মহোদয়ের বাড়ীতে বেড়াতে গেছেন। তিনি গৃহদেবতা গোপাল-বিগ্রহের  পূজা-ভোগরাগ সম্পন্ন না করে কিছু খেতেন না। সেদিনও পুজোয় বসেছেন। চোখ বন্ধ করে, ‘‘ওঁ নারায়ণঃ পরাবেদা নারায়ণঃ পরাক্ষরঃ।/নারায়ণঃ পরামুক্তি নারায়ণঃ পরাগতিঃ।।’’ মন্ত্র জপ করে ধ্যান করতে বসেছেন। ‘টুং’ শব্দে ধ্যান যায় ভেঙে। চোখ মেলে দ্যাখেন, পিতলের গোপাল নীচে গড়াগড়ি দিচ্ছে, আর আসনে বসে আছে মনো-র ছেলে অনুকূল, মিটি-মিটি হাসছে। কি অলক্ষুণে ব্যাপার!  মনো-কে ছেলে আগলাতে বলে, অসন্তুষ্ট মনে বিগ্রহকে শোধন করে আবার পুজোয় বসেন। আবারও সেই ‘টুং’। বিগ্রহ মাটিতে, অনুকূল আসনে বসে।  না, এই দুষ্টু ছেলেকে বেশী আমল দেওয়া যাবে না! এই ছেলের জন্য আমার নিত্যপূজা পণ্ড হচ্ছে, কূলদেবতার কোপে পড়তে না হয়!  হে ঠাকুর আমায় ক্ষমা করো ঠাকুর। বিগ্রহের কাছে  মনে মনে ক্ষমা প্রার্থনা করে পূজারী এবার একটু কড়া ব্যবস্থা নিলেন। মনো-কে বলে ওই দুষ্টু  ছেলেকে ঘরে তালাবন্ধ করে রাখার ব্যবস্থা করে, ঠাকুর ঘরের দরজায় পাহারাদার বসিয়ে পুজোয় বসলেন। ঠাকুরঘরে একটা পোকাও যেন না ঢুকতে পারে।  কি আশ্চর্য! ভোগ নিবেদন করার সাথে সাথে আবার সেই ‘টুং’! তালাবন্ধ ঘর থেকে বেরিয়ে পাহাড়াদারকে ফাঁকি দিয়ে কিভাবে ঠাকুরঘরে ঢুকলো ওই দস্যি ছেলে!  ক্ষোভে, দুঃখে বিলাপ করছেন উমেশচন্দ্র। বাড়ীশুদ্ধ লোক জড়ো হয়েছে ঠাকুরঘরে। মাতা মনোমোহিনী দেবী রেগে গিয়ে গালে একটা চড়্ মেরে বললেন,—‘‘তুই কেন বার বার এসে এভাবে পূজা পণ্ড করিস ?’’ ছেলে কাঁদতে কাঁদতে আধো আধো স্বরে বলে, ‘‘ও আমায় দাকে কেন ?’’       

       ডাকার মত ডাকলে তিনি কি আর থাকতে পারেন ? তাইতো তালাবদ্ধ ঘর, সব পাহারাকে তুচ্ছ করে নাগালের বাইরের উঁচু আসনে জীবন্ত গোপাল নিবেদিত ভোগ নিতে চলে এসেছেন। এতক্ষণে সম্বিৎ ফিরে পেলেন পূজারী। বললেন, কি! তুমি আমার ডাক শুনতে  পেয়েছ! হে ঠাকুর! শুনতেই যখন পেয়েছ, তোমাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে যে অপরাধ আমি করেছি, সেই সব অপরাধ  ক্ষমা কর প্রভু‍!  আমার সাধনা,  আরাধনা এতদিন পর সার্থক হয়েছে। স্বয়ং শ্রীহরি অনুকূল রূপে নব-কলেবরে ধরায় এসেছেন! ওরে, কে কোথায় আছিস্, শঙ্খ বাজা, হুলুধ্বনি কর, কুঞ্চিত কেশদাম, কুন্তল অলক, শান্ত, গৌরবর্ণ দেহ, মায়াময় বুদ্ধিদীপ্ত নয়ানযুগল, উন্নত বক্ষ, দীর্ঘ নাসিকা, আজানুলম্বিত বাহুযুগল, বিস্তৃত কর্ণলতিকা, রক্তাভ অধরে মৃদু মৃদু হাসি ঝরছে! এ কে! এর মধ্যে নারায়ণ, রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, যীশু, রসুল, না গৌরাঙ্গ না রামকৃষ্ণ! সব দেবতা একাকার রূপে আমাকে দর্শন দিলেন। আমি ধন্য হলাম নবীন কুরুক্ষেত্রের বিশ্বরূপ দর্শনে! আজ আমি ধন্য, ধন্য আমার মানব-জনম।

       মুহূর্তে হুলুধ্বনি-শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত  হয়। প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। আনন্দে আত্মহারা হয়ে,  পূজারী উমেশচন্দ্র লাহিড়ি ‘‘ওঁ অনুকূলঃ পরাবেদা অনুকূলঃ  পরাক্ষরঃ।/অনুকূলঃ পরামুক্তি অনুকূলঃ পরাগতিঃ।।’’ মন্ত্র জপ করে জ্যান্ত গোপালের কচিমুখে ভোগ নিবেদন করে সবাইকে ডেকে ডেকে ভোগের প্রসাদ দিচ্ছেন। আর বলছেন, সবাই দেখে নাও মানুষ-রূপী ভগবানকে! দেখে  মানব জনম সফল কর।

       সত্যিই ধন্য হয়েছিলেন উমেশচন্দ্র লাহিড়ি মহোদয়। শ্রীশ্রীঠাকুরের এই বাল্য-লীলা প্রত্যক্ষ করে। ধন্য হয়েছিলেন বোসমা-ও।

       মনোমোহিনী দেবীর প্রতিবেশী বোসমা, নিজের সন্তানের অকাল বিয়োগ-ব্যথার শোকে পাগলিনী প্রায় হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁকে সুস্থ করতে পিতা শিবচন্দ্র তাঁর প্রথম পুত্র অনুকূলকে তাঁর কোলে দিয়ে বলেছিলেন—‘‘মা, আজ থেকে এই অনুকূলই তোর সন্তান, অনুকূলকে আমি তোকেই দিয়ে দিলাম। নিজের সন্তান ভেবে কোলে-পিঠে করে ওকে মানুষ কর্, তোর সব দুঃখ ঘুচে যাবে। ’’

        কি আশ্চর্য! অনুকূলকে কোলে পাওয়ামাত্র শোকাতুরা জননীর হাহাকার মুহূর্তে শান্ত হয়। সেই থেকেই বোসমা অনুকূলকে সন্তানস্নেহে লালন-পালন করতেন। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত তিনি শ্রীশ্রীঠাকুরকে নিয়েই মশগুল ছিলেন।     

       একদিনের ঘটনা।

       সংসারের কাজকর্ম সেরে মাতা মনোমোহিনী দেবী সকল মায়েদের  ডেকে নিয়ে সদগ্রন্থাদি পাঠ করে শোনাতেন, ঘরে-বাইরের সব সমস্যার কথা শুনতেন এবং সমাধান দিতেন। এভাবেই হিমাইতপুরের  প্রত্যেককে আদর্শ গৃহিনী করে গড়ে তুলেছিলেন তিনি। (ওটাই ছিল তখনকার মাতৃ-সম্মেলন।) 

       একদিন দুপুরে সবাই মায়ের কাছে বসে পাঠ শুনছেন। সেই সময় বোসমা  দেড় বছরের অনুকূলকে কোলে নিয়ে বসে ফুল দিয়ে হাতে বালা, মাথায় চুড়ো, গলায় মালা তৈরি করে সাজাচ্ছেন, আর তাঁর ভুবন-ভোলানো রূপ দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন আর ভাবছেন, এত রূপ কি মানুষের পেটে হয়! এই রূপ ছিল কৌশল্যার ছেলের,—এই রূপ ছিল যশোদা মায়ের কোলে,—এই রূপ এসেছিল শচীমায়ের কোলে। সাজাতে সাজাতে যখন যে রূপের কথা ভাবছেন তখনই দেখছেন অনুকূলের রূপ পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। —কখনো নীল, কখনো শ্যামবর্ণ, কখনো গৌরবর্ণ। তিনি অবাক বিস্ময়ে ভীত হয়ে পড়লে অনুকূল স্বাভাবিক রূপে ফিরে আসেন। তিনি আর দেরী না করে মাতা মনোমোহিনীর কোলে ছেলেকে দিয়ে বলেন,—এই নাও তোমার ছাওয়াল। এ কেমন ছাওয়াল!—এক এক বার এক এক রকম রং ধরতিছে! তোমার ছাওয়াল তুমি নাও। বলে আপন মায়ের কাছে ছেলেকে দিয়ে দিলেন।

       মাতা মনোমোহিনী দেবী বোসমা-র কাছে সব বৃত্তান্ত শুনে বলেন,—তবে তো ঠিকই আছে। তুই যা যা ভাবছিলি—সেই সেই রূপ চোখে দেখালো।

*      *       *

        বয়স বাড়ার সাথে সাথে দুরন্তপনা বেড়েই চলেছে।

নররূপে যখন তিনি প্রকট তখন আর প্রতীকি বিগ্রহের প্রয়োজন কেন?—এই সত্যটুকু বোঝাতে, পূজারীদের আকূল আহ্বানে সাড়া দিতে, মন্দিরের বিগ্রহের চন্দন নিজ অঙ্গে লেপন করেন।  নারায়ণ-শিলার আর প্রয়োজন নেই। লুকিয়ে রাখেন বাঁশ-পাতার স্তূপে, পুকুরের কাদায়। ‘‘ভগবান-পূজার একমাত্র চিজ্ই হ’চ্ছে  জ্যান্ত পুতুল ঐ পয়গম্বর, পীর, ঋষি, আদর্শ বা ইষ্ট।’’ (ই. প্র. পৃঃ ১২)-এই সত্যকে বাস্তবে রূপ দিতে।

        সন্তানবিরহে মা গোরুর হাম্বা ডাক শুনতে পেলেই বাছুর ছেড়ে দিতেন। জেলেদের জালে ধরা-পড়া মাছেদের মুক্ত করতে ছুট্টে গিয়ে মায়ের কাছ থেকে দুটো টাকা এনে জেলেদের দিয়ে  জলের মাছ জলে ফিরিয়ে দেন।   

       বছর তিনেক বয়স, মা এবং কর্তামা-র সাথে নৌকা করে ফিরছেন কুষ্ঠিয়া থেকে। মাঝ-নদীতে উঠল ঝড়! উত্তাল তরঙ্গে ফুঁসছে পদ্মানদী। মাঝিরা প্রাণ বাঁচাতে ঝাঁপ দিয়েছে জলে। যে-কোন মুহূর্তে  ডুবে যেতে পারে কাণ্ডারী-বিহীন নৌকা। মা-দিদিমা ইষ্ট-নাম জপছেন। টলে উঠল স্বয়ং ইষ্ট-দেবতার আসন। ইষ্ট-দেবতা-স্বরূপ কোলের ভগবান বললেন, ‘মা, ছিগগির নাম্।’

 ‘মা, ছিগগির নাম্।’ এ নিশ্চয়ই কোন দৈববাণী। ইষ্টদেবতা অনুকূলের মুখ দিয়ে বলছেন। সেই দৈববাণী শুনে, আগে-পাছে চিন্তা না করেই, গুরুর নাম স্মরণ করতে করতে  ভগবান কোলে ভগবানের মা, নিজের মায়ের হাত ধরে নেমে পড়লেন মাঝনদীতে। উন্মত্ত পদ্মার মাঝে পেয়ে গেলেন পায়ের নীচে মাটির পরশ।  চলতে চলতে পৌঁছে গেলেন   এক চরে।  থেমে গেল ঝড়। অন্য এক নৌকা করে নির্বিঘ্নে পৌঁছলেন হিমায়েতপুরের বাড়ীতে।

       দৈববাণী সম্পর্কে ঠাকুর পরবর্তীকালে বলেছিলেন — ‘‘বাণীর মত শোনা যায়। অন্তরে feel (অনুভব) করা যায়। আসলে সেটা কিন্তু আমারই  voice (কণ্ঠস্বর)। যদিও তা’ আমি আমার ব’লে জানি না। যাঁকে আমরা একান্ত ক’রে ভাবি, invoke (আহ্বান) করি, সেই হয়তো, মূর্তি ধ’রে দাঁড়াল আমার সামনে, বলল, Awake, do, follow me, I am ever for you.” ….. “ওগুলি সবই হ’ল,  inner —অন্তরের আদেশ, bid of curative urge.  আরোগ্য লাভের অনুজ্ঞা।’’  (আঃ প্রঃ ২০, পৃঃ ১০৭ও দীপরক্ষী ৬, পৃঃ ৪ ) 

       এর ক’দিন বাদেই মা বললেন, ‘‘অনুকূল, ও বাড়ীতে একটি  ছেলে হয়েছে, চল্  যাই তাকে একটু দেখে আসি।’’ মার কথা শুনে ছেলে বললেন, ‘‘না মা, যাবো না। ওকে দেখে কি হবে? ও তো আঠারো দিনের বেশী বাঁচবে না।’’ 

       কি অলুক্ষণে কথা‍! ওসব কথা বলতে নেই বাবা। মা বলেন ছেলেকে। কিন্তু যে ছেলের হাতে রয়েছে জন্ম-মৃত্যুর জাবেদা খাতা, তিনি তো সময় বুঝে হিসেবটা ধরিয়ে দেবেনই। বাস্তবে ঘটেছিলও তাই। আঠারো দিনের বেশী ওই ছেলে বাঁচেনি।

মৃত্যু বিষয়ে ঠাকুর পুণ্য-পুঁথি গ্রন্থে (ত্রিষষ্ঠিতম দিবস) বলছেন :

“Contraction, Stagnation, Expansion. এমনি করে এক-একটা মন্ডল তৈরী হচ্ছে। সোহহংপুরুষ পর্য্যন্ত চৈতন্যের সৃষ্টি।

Integration of ‘I’. Universal consciousness of ‘I’.

 জগতের যাবতীয় জিনিষ তাই অমন করে পরিবর্তন হচ্ছে। একটা আণবিক প্রসারণ—এর চরমেই সঙ্কোচন, তাই মৃত্যু ক্ষতি নয়। তাই জগতের প্রত্যেক-প্রত্যেক জাতির আয়ু-সংখ্যা ঐরূপে নির্ধারিত হয়। চেতন আমির ধারা, তাই সবের ভিতর চেতনা। অখণ্ডের চেতনা প্রত্যেক শরীরের ভিতর। সব কুড়িয়ে আান্ দিকিনি একবার।’’  

*      *       *

        এমন অসংখ্য বাল্যলীলার লীলাময় পাঁচ বছরে পদার্পণ করেছেন। যথাবিধি হাতেখড়ি দেন পণ্ডিত সূর্যকুমার শাস্ত্রী ও ভগবানচন্দ্র শিরোমণি। কাশীপুর হাটের কৃষ্ণচন্দ্র বৈরাগী গুরুমহাশয়ের পাঠশালায় বিদ্যারম্ভ করেন। সেখানে দু’-বছর অধ্যয়ন করার পর কাশীপুর গ্রামের ব্রজনাথ কর্মকার ও ভবানীচরণ পাল নামের দুই প্রবীণ শিক্ষকের কাছে তিন-বছর অধ্যয়ন করার পর ১৩০৫ বঙ্গাব্দে অধ্যক্ষ গোপাল লাহিড়ী মহোদয় প্রতিষ্ঠিত উচ্চ ইংরাজী বিদ্যালয় ‘পাবনা ইনষ্টিটিউশন্’-এ ভর্তি হন।                                                                                                                                          

       হাতেখড়ির পর পাঠশালা যেতে শুরু করেছেন। ঠাকুরের তখন বছর পাঁচেক বয়স। সংসারে নেমে আসে এক বিপত্তি।  পিতা শিবচন্দ্র অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘ পাঁচ বছর শয্যাশায়ী ছিলেন। ওই দুঃসময়ে সান্ত্বনা দেবার মতও কেউ ছিল না। দুরন্ত বালক অনুকূল বালসুলভ সব চপলতা ভুলে একজন অভিজ্ঞ অভিভাবকের মতো মাকে সান্ত্বনা দিতেন, সব কাজে সাহায্য করতেন, ভাইবোনদের কান্নাকাটি সামলাতেন। শুধু তাই নয়, পিতার চিকিৎসার জন্য  নির্জন পথে তিন মাইল রাস্তা পায়ে হেঁটে পাবনা শহরে যেতেন ওযুধ আনতে। আবার পাঠশালাতেও যেতেন। সংসারের আর্থিক সংকট দূর করতে মাকে ভরসা দিয়ে বলতেন, ‘‘মা, ভয় করিসনে, তুই খুব মুড়ি ভাজবি আর আমি বেচবো, দেখিস্ তখন তোর কত টাকা হবে।’’

       পরমপিতার দয়ায়, পরমপিতার প্রতিভূকে যদিও কোনদিন অপরের বৃত্তিহরণ কর্মস্বরূপ মুড়ি বিক্রী করতে হয়নি। তবে অ-মূল্যে বিক্রী করেছেন তাঁর অহৈতুকী অমূল্য প্রেম—সারা জীবন ধরে।

       বালক বয়সের তাঁর ওই মনোবল, চারিত্রিক দৃঢ়তা, কষ্ট সহিষ্ণুতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে পরবর্তীকালে তিনি বলেছিলেন—‘‘আমি ছিলাম rejected son (পরিত্যক্ত ছেলে)। আচার্যি ঠাকুরও আমার সম্বন্ধে কখনও কোন আশার কথা বলে নি। কি আর করব? আপন মনে এৎফাকি করতাম। হয়তো চাঁদের দিকে চেয়ে তন্ময় হয়ে নাম করছি। আর একটা রোখ্ ছিল—কিছুই না বুঝে ছাড়তাম না। Pursue (অনুসরণ) করতাম। ভাঁটির পাতা খেয়ে পেট ব্যথা হয়, তাই দেখে মনে হ’ল ভাঁটির পাতা না খেয়ে যদি ঐ রকম পেটের ব্যথা হয়, তবে ভাঁটির পাতায় তা সারতে পারে। বাস্তবে করে দেখলাম—সত্যি তাই হয়। ঐ রকম কত রকম যে করেছি।……. ’’ 

       ‘‘ছেলেবেলায় ঘাসের বুকে শিশির বিন্দুকে দেখতাম, যেন গোটা সূর্য্যকে প্রতিফলিত করছে সে। দেখতাম আর মনে হ’তো, শিশির বিন্দু যদি জগৎ প্রসবিতা সূর্য্যকে বুকে বহন করে বেড়াতে পারে, তবে আমি যতই ক্ষুদ্র হই, আমি বা পারবো না কেন পরম কারুণিক পরমপিতাকে বুকে বহন করে বেড়াতে শিশির বিন্দুর মত তাঁকেই ঠিকরে দিতে আমার সারাটা জীবন দিয়ে?’’

(আঃ প্রঃ ৪ম খন্ড)

       তাঁর উপরোক্ত আত্মকথা থেকে এটুকু বোঝা গেল, তিনি কোনদিন কোন আনুষ্ঠানিক বা লোক-দেখানো সাধন-ভজন করেন নি।  কোন উপাচার ছাড়াই নামধ্যান করেছেন।  তাঁর মতে ‘‘শব্দ সাধন পূর্ণাঙ্গ সাধন। জ্যোতির চেয়েও নাদ সূক্ষ্মতর। নাদ সাধনের প্রকৃষ্ট পন্থাযুক্ত সাধনই প্রকৃত পূর্ণাঙ্গ সাধন। বাহ্যাড়ম্বর কম বলে পূর্ণ সৎটিকে যত  সোজাসুজিভাবে নেওয়া সম্ভব, তা এই শব্দযোগে নেওয়া হয়েছে—এ-ই বর্তমান যুগধর্ম বা পূর্ণাঙ্গ সাধন।’’

              ‘‘১ আর ১এ ১ই হয়, ২ কভু নয়……।’’

       পাঠশালাতে একদিন অঙ্কের শিক্ষক বোঝাচ্ছিলেন, ‘১ আর ১=২ হয়।’’ শুনে ছাত্র অনুকূল মনে মনে ভাবলেন, ‘‘তা’ কি করে সম্ভব? জগতের সব বস্তুই পরস্পর পৃথক, কোন একটির সঙ্গে আর একটির তো পুরোপুরি মিল কোথাও নেই। ঠিক একই রকমের দুটো জিনিষ যখন এ দুনিয়ায় কোথায়ও দেখতে পাওয়া যায় না—সবই যখন পরস্পর অসমান, তখন একের সঙ্গে কেমন করে একের যোগ হয়ে দুই হবে!’’ (বর্তমানের বিজ্ঞান গবেষণাতেও ওই সিদ্ধান্ত প্রমাণিত। জীবদেহের কোষাণুপুঞ্জের অতি ক্ষুদ্র ক্রোমোজোমগুলোও একটার মতো আর একটা নয়, পৃথক বৈশিষ্ট্য রয়েছে।)

       শিক্ষক মহাশয়কে বললেন, —‘‘স্যার! কোন দুটো জিনিষ তো একরকম দেখিনা, তবে এক আর এক দুই হলো কি করে?’’

       সব শিক্ষকের শিক্ষক যিনি, তাঁর কথার  গূঢ় রহস্য বুঝতে না পেরে মারের পর মার দিয়েছিলেন ঠাকুরকে, অঙ্কের ওই শিক্ষক মহাশয়।

       এ বিষয়ে ঠাকুর পরবর্তীকালে বলেছিলেন, ‘‘ওই যে মার খেলাম, সেই থেকে অঙ্কের প্রতি আমার যেন কেমন একটা ভয় হয়ে গেল। (আ. প্র. ৩য় খন্ড)’’

*      *       *

       ১৩০৬ বঙ্গাব্দ। ১১ বছরে পা দিয়েছেন। উপনয়ন সংস্কারে সংস্কৃত হয়েছেন। এমনিতেই তো কনকচাঁপা গায়ের রং, তার ওপর গৈরিক বসনের আচ্ছাদন, মুণ্ডিত মস্তক, যজ্ঞসূত্র, মেখলাদি ধারণ করেছেন গৌর-অঙ্গে। ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে। যেন এক স্বর্গীয় দেবদূত ব্রহ্মচারীর বেশে আচার্য্যের জন্য ভিক্ষা করতে বেড়িয়েছেন। আগে দিলেন দিদিমা, তারপর মা, তারপর দিলেন জ্ঞাতি-কুটুম্বেরা, দিলেন সমাগত ব্রাহ্মণেরা, দিলেন গ্রামবাসীরা। ভিক্ষা-গ্রহণ পর্ব শেষ। দিদিমা কৃষ্ণসুন্দরী দেবী বললেন, এবার ক’দিন তোকে একলা থাকতে হবে, মেয়েদের দিকে তাকাতে পারবি না, অব্রাহ্মণের মুখ দেখতে পারবি না, বুঝলি তো‍?  

       যা বোঝার তা তিনি বুঝে গিয়েছেন। সাথে সাথে তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েদের, মায়েদের সাথে শলা করে সবাইকে শুনিয়ে বলে দিলেন, ওগো, তোমরা আর আমার সামনে থেকো না, যদি মুখ দেখে ফেলি! এখন যাও, ওই দাওয়ায় গিয়ে বসো। তারপর একটু নীচু গলায় বললেন,  আর একান্তই যদি আমাকে দেখতে সাধ জাগে, ভোর থাকতে থাকতে, সুয্যি ওঠার আগে, দি-মা যখন পদ্মায় চান করাতে নিয়ে যাবেন, তখন তোমরা আগে থাকতে গিয়ে পথের পাশের বুড়ো নিমতলায় দাঁড়িয়ে থাকবে, লুকিয়ে দেখা করবে। বেশ!

       দিদিমার কান এড়াতে পারেনি নাতিছেলে অনুকূলের কথা।  অবতার যা বলবে, যা করবে, তাই বিধি, তাই নিয়ম হলেইবা। তাই বলে দিদিমা তো আর সংস্কারের গন্ডি পেরোতে পারে না। নাতির কথা শুনে মেয়েকে ডেকে বললেন, শুনলি মনো, তোর ছেলের ফন্দীর কথা! পৈতে হয়েছে, ও এখন ব্রহ্মচারী, নারীর, শূদ্রের মুখ দেখা বারণ, ও কি-না গ্রামের মেয়ে-বৌ-ঝি-দের লুকিয়ে দেখা করতে শলা দিল?

       মেয়ে মনোর কাছ থেকে তেমন কোন সাড়া না পেয়ে, সকলের সামনেই কৃষ্ণসুন্দরী নাতিকে  বললেন, ছি! ছি! ছি! এ কেমন বেহায়া হয়েছিস রে তুই? তুই না ব্রহ্মচারী হয়েছিস্! এই ক’টা দিন তুই ওদের মুখ না দেখে থাকতে পারবি না, যার জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করার কথা বলে ব্রহ্মচর্য্যের নিয়মটাকে নষ্ট করে ফেলতে চাইছিস্? বড় হয়েছিস, এখন একটু বিবেচনা করে চলতে শেখ্।

       যিনি শাশ্বত-সনাতন ব্রহ্মজ্ঞপুরুষ তাঁর আচরণই ব্রহ্মচর্য্য—ব্রহ্মে বিচরণ করার তুক্। যারা তাঁর নিত্য ভক্ত, নিত্যদর্শনকামী, তাদের দেখা না দিয়ে তিনি কি থাকতে পারবেন?  তাই তো এই নিয়মভঙ্গ। যে নিয়মভঙ্গ করেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণদেব অবতারে। উপনয়নান্তে নিয়ম ভেঙে শূদ্রাণী দাইমা ধনী কামারনীর হাতে প্রথম ভিক্ষা নিয়েছিলেন।

*      *       *

       বারো বছর বয়স। পাবনা ইনষ্টিটিউশন্’-এ পাঠরত। সকাল-সন্ধ্যায় বাজিতপুর স্টীমার ঘাটে বেড়াতে যেতেন। মোটবাহক কুলিদের কষ্ট  দেখে তিনি কুলিদের সাথে মিশে মোট  বইতেন। একবার এক ভদ্রলোকের একটা ভারী ট্রাঙ্ক ও বালতি নিয়ে ডেকের উপর উঠতে গিয়ে টাল সামলাতে না পেরে হাত থেকে বালতিটি পড়ে গেলে ভদ্রলোক রেগে গিয়ে ভর্ৎসনা করে এবং লাথি মারতে উদ্যত হয়। তথাপি তিনি কোন প্রতিবাদ না করে তার মালপত্র ঠিকভাবে স্টীমারে তুলে দিয়েছিলেন।  তিনি সখের কুলিগিরির বিনিময়ে কারো কাছে কোন মজুরী নিতেন না। তথাপি জোর করে কেউ  দিলে অভাবী কুলিদের  দিয়ে  দিতেন। একবার কিছু বিপন্ন লোকদের সাহায্য করার জন্য কয়েকজন সহপাঠিদের নিয়ে কুলিগিরি করে অর্থ সংগ্রহ করতে থাকেন। পাবনা ইনষ্টিটিউশন্’-এর প্রধান শিক্ষক মহাশয় খবরটা জানতে পেরে ছাত্র অনুকূলচন্দ্র ও তাঁর সাথিদের স্কুলে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সম্বর্দ্ধনা দিয়েছিলেন।   

*      *       *

        তিনি তখন পাবনা ইনষ্টিটিউশন্’-এ তৃতীয় শ্রেণীতে (বর্তমানের অষ্টম মান) ছাত্র। দিদিমা কৃষ্ণসুন্দরী দেবী, অন্যান্য গুরুজনদের সাথে কথা বলে  আদরের  দৌহিত্রের জন্য পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমার ধোপাদহ গ্রামের রামগোপাল ভট্টাচার্যের প্রথমা কন্যা সরসীবালা দেবীকে নাতবৌ করে ঘরে আনার পাকাপাকি করে ফেলেছেন।   কর্তামা-র নাতবৌ দেখার আতিশয্যের কারণে  পাঠরত অবস্থায় উদ্বাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হন ১৩১৩ বঙ্গাব্দের ২৮শে শ্রাবণ।  

       বিয়ের কিছুদিন পর বাবা, তাঁর কর্মস্থল ঢাকা জেলার আমিরাবাদে নিয়ে যান, সেখানে  রাইপুরা হাইস্কুলে ভর্তি করে দেন। কিন্তু বেশীদিন সেখানে পড়াশোনা করতে পারেন নি।

       আমিরাবাদে থাকার জন্য নির্দিষ্ট বাড়ীতে ঢোকামাত্রই ঠাকুর এক বীভৎস অশরীরী আত্মার অস্তিত্ব টের পান ঘরের ভিতর। আসন্ন বিপদ বুঝতে পেরে তিনি বাড়িতে ঢুকেই  অশরীরী আত্মার কথা না বলে বাড়িটিকে পরিত্যাগ করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু তাঁর রাশভারী নায়েব-বাবা এবং মা-দিদিমা কেউ তাঁর কথায় গুরুত্ব দেন নি। সেইদিন রাতেই পিতা শিবচন্দ্রের জ্বর  শুরু হয়। ডাক্তার-বদ্যি করেও জ্বর কমছে না। সবাই মিলে সেবা-শুশ্রূষা করছে, জ্বর কমার নাম নেই। অবশেষে ঠাকুর কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে বলেন, ‘বাবা, এ বাড়ী না ছাড়লে তোমার মারাত্মক অসুখ হবে।’ ছেলের কান্নার কাছে হার মেনে ওই বাড়ি ছেড়ে অন্য বাড়িতে যেতেই পিতা শিবচন্দ্র সুস্থ হন।

       বিদ্যার প্রতি তীব্র অনুরাগী হওয়া সত্বেও অনুকূলচন্দ্রের ছাত্রজীবন নানাপ্রকার বিশৃঙ্খলা ও বাধাবিপত্তির মধ্য দিয়ে কেটেছে। নিয়মিত পড়াশোনা তিনি করতে পারেন নি। তার ওপর কোন কোন শিক্ষকের চরিত্রদোষ, দরদশূন্য কঠোর শাসন এবং অবসাদকর তীব্র কটুক্তি তাঁর কোমল মনের ওপর যে আঘাত হেনেছিল, তারফলে প্রথাগত শিক্ষার প্রতি তিনি বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। স্কুলে যেতেও তাঁর ইচ্ছা করত না।

       তথাপি তিনি স্কুলে যেতেন। হয়তো পিতামাতার ইচ্ছাকে সম্মান জানাতে। নইলে সর্বজ্ঞ যিনি, তাঁর তো পদ্ধতিগত ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণের কোন প্রয়োজন ছিল না। এবং পরবর্তীকালে সে শিক্ষাকে তিনি গুরুত্বও দেন নি। দিলে, একেবারে নতুন ধারায় তপোবন বিদ্যালয় গড়ে তুলতেন না এবং শান্ডিল্য বিশ্ব বিদ্যালয়ের স্থাপনের পরিকল্পনা করতেন না।            

        ছাত্র জীবনে অনুকূলচন্দ্র স্কুল-ছুটির দিনগুলিতে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে কৃষ্টিমূলক আমোদ-প্রমোদ করতেন। গান রচনা করে, সুর দিয়ে, হারমোনিয়াম বাজিয়ে নিজে গাইতেন এবং বন্ধুবান্ধবদেরও শেখাতেন। যাত্রা-থিয়েটারের পালা রচনা করে নিজে প্রধান প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করতেন এবং সাথীদেরও অভিনয় শিখিয়ে অভিনয় করাতেন।

       তিনি সদগুরু পরিচয়ে খ্যাত হবার পর থেকে জগতের কল্যাণ সাধনের জন্য ২২ বছর বয়স থেকে শুরু করে ৮০ বছর পর্য্যন্ত অসংখ্য শ্রুতিবাণী, স্মৃতিবাণী, ভাববাণী প্রদান করেছেন। এছাড়া ছাত্রজীবনেও তিনি বহু কবিতা, সঙ্গীত ও নাটক রচনা করেছিলেন। তাঁর বাল্য রচনার সব পান্ডুলিপি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।  বহু চেষ্টার ফলে তাঁর স্বহস্ত লিখিত যে পান্ডুলিপির সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল, তা’তে ২২টি কবিতা, ঊনত্রিশটি সঙ্গীত, ‘দেবযানী’ শিরোনামে একটি পূর্ণাঙ্গ নাটক ও অপর একটি নাটকের অংশবিশেষ লিপিবদ্ধ রয়েছে। পাবনা ইনষ্টিটিউশনে ৪র্থ শ্রেণীতে পড়ার সময় অমিত্রছন্দে রচিত উক্ত ‘দেবযানী’ নাটক তিনি বয়স্যদের নিয়ে অভিনয় করেছিলেন।

       ছাত্রজীবনে তিনি খাগের কলমে কালি ভরে, নিব লাগিয়ে দিব্যি একটা ফাউন্টেন পেন তৈরি করে ফেলেছিলেন। বাবলা কাঁটা দিয়ে কলের গানের রেকর্ড বাজাবার পিন তৈরি করেছিলেন। বাবার সাথে স্টীমারে চেপে আমিরাবাদ যাওয়ার সময় স্টীমারের গঠন কৌশল দেখে একটা খেলনা স্টীমার বানিয়ে সবাইকে তাক্ লাগিয়ে দিয়েছিলেন।

       অভিভাবকদের অভিপ্রায় অনুযায়ী আমিরাবাদের স্কুল ছেড়ে দিয়ে প্রথাগত শিক্ষাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে ১৩১৫ বঙ্গাব্দে তাঁকে চলে আসতে হয় ২৪ পরগণার নৈহাটি শহরে, মাসতুতো ভগ্নীপতি শশীভূষণ চক্রবর্তী মহোদয়ের বাড়ীতে।   ভর্তি হন মহেন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ে। ওই স্কুল থেকেই প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু পরীক্ষায় বসতে পারেন নি। বাবার পাঠানো পরীক্ষার ফি-এর টাকা নিজের নামে জমা না দিয়ে দরিদ্র এক সহপাঠিকে দিয়ে দেন। উক্ত সহপাঠী কৃতিত্বের সাথে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল।

       অভিভাবকদের পরামর্শক্রমে আত্মীয় শশীভূষণ চক্রবর্তী মহোদয়ের  সাহচর্যে অর্থকরী বিদ্যা উপার্জনের উদ্দেশ্যে কলকাতায় যান । বাবু শরৎচন্দ্র মল্লিক স্থাপিত বৌবাজারের ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুলে ভর্তি হবার জন্য। প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হবার ফলে কর্তৃপক্ষ প্রথমতঃ কিছুতেই ভর্তি করতে রাজী হন না। অবশেষে শিক্ষার্থীর অধ্যবসায়, যুক্তির কাছে হার মেনে অধ্যক্ষ মহোদয় কঠোর-কঠিন পরীক্ষা নিয়ে ভর্তি করে নেন ১৩১৭-১৩১৮ বঙ্গাব্দ শিক্ষাবর্ষের প্রথম ব্যাচে।

       কঠোর-কঠিন পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি তো হয়েছেন, সম্মুখীন হলেন আর এক কঠিনতম পরীক্ষার। যার নাম দারিদ্রতা।  তাই তাঁর থাকার ঠিক ছিল না, খাওয়ার ঠিক ছিল না। কলকাতার ফুটপাথে, শিয়ালদহ স্টেশনে ‘হিতবাদী’ সংবাদপত্র পেতে এবং গায়ে দিয়েও দিনযাপন করতে হয়েছিল। দিনের পর দিন শুধু কলের জল পান করেও ক্ষুধা নিবারণ করতেন। 

       পিতার কাছ থেকে কলকাতার এক আত্মীয় কিছু টাকা ধার নিয়েছিলেন। অনেক অনুরোধ-উপরোধ করার পর তিনি মাসে মাসে ১০টি করে টাকা দিতে স্বীকৃত হন। অবশেষে গ্রে স্ট্রীটের এক কয়লার গুদামে আশ্রয় পান। ওখান থেকে পাদুকাবিহীন পদব্রজে বৌবাজার ক্লাস করে এবং বৌবাজার থেকে মানিকতলার মুরারীপুকুরে ‘ডিসেকসন’-এর প্রাকটিক্যাল সেরে ক্লান্ত দেহে  কয়লার গুদামের আশ্রয়ে ফিরতেন। সেই টাকার মধ্যে বিদ্যালয়ের পড়াশোনা খরচ, থাকা-খাওয়ার সব খরচ চালানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। যদিও কিছুদিন পরে সেই টাকাও বন্ধ হয়ে যায়।

       সেই সময়ে গ্রে-স্ট্রীট ও চিৎপুর সংযোগস্থলে ‘লাহিড়ী কোম্পানী’ নামে একটি হোমিওপ্যাথী ঔষধের দোকান ছিল। দোকানের কর্ণধার হেমন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সাথে  ঠাকুরের সখ্যতা হয়েছিল। সখ্যতার নিদর্শন-স্বরূপ তিনি ঠাকুরকে এক বাক্স হোমিওপ্যাথিক ঔষধ ও মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য প্রণীত একটি পারিবারিক চিকিৎসা গ্রন্থ উপহার দিয়েছিলেন। তার সাহায্যে তিনি কয়লার গুদামের কুলিদের এবং আশেপাশের কারখানার কুলিদের  চিকিৎসা শুরু করেন। কুলিরা আরোগ্য হবার ফলে কুলিদের মুখে মুখে সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। সন্নিহিত অঞ্চলের ভদ্র  সজ্জনেরাও ঠাকুরের রোগী-তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। রোগীদের যদৃচ্ছা দানে মাসে ৩০-৪০ টাকা পর্যন্ত উপার্জন হতে থাকে। তা থেকে  তিনি নিজের জন্য যথাসম্ভব কম খরচ করে কুলিদের এবং আশেপাশের দরিদ্রদের দারিদ্র মোচন করতেন, নানাভাবে সেবা করতেন। ওইসব গরীব মানুষেরা তাঁকে ভগবান তুল্য মনে করতেন, ভরসা করতেন, ওদের অকূলের কূল ছিলেন অনুকূল। ছুটিতে যখন হিমাইতপুর যেতেন কুলিরা সজল নয়নে স্টেশনে এসে বিদায় দিতেন। ছুটি কাটিয়ে ফিরে এলে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে আনন্দ-উল্লাসে বরণ করে আনতেন।  ওদের আনুগত্য প্রকাশ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর উত্তরকালে বলেছিলেন, ‘‘এরা আমার এত অনুগত হয়ে পড়েছিল যে, আমি যদি তাদের দিয়ে ধর্মঘট করাতে চাইতাম, তবে একদিনে ওখানকার সব কারখানা বন্ধ করে দিতে পারতাম।’’

       ডাক্তারী স্কুলে তৃতীয় বার্ষিক শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে অনুকূলচন্দ্র এক সময় গ্রে-ষ্ট্রীটের কয়লার গুদামের বাসস্থান ছেড়ে স্কুলের সন্নিকটে ১৫০বি, আমহার্ষ্ট ষ্ট্রীটের এক মেসে এসে ভর্তি হন। অর্থাভাবে নিয়মিত মেসের টাকা দিতে পারতেন না বলে ম্যানেজারের নানা কটুক্তি শুনতে হতো। একবার মাত্র একমাসের সীট-ভারা বাকি রেখে পুজোর ছুটিতে বাড়ী যান।  বাড়ী থেকে ফিরে এসে দেখেন তাঁর ব্যবহারের তক্তপোষটি বারান্দায়, বিছানাপত্র উধাও, বই-খাতাপত্রসহ ট্রাঙ্কটিও নেই! ম্যানেজার মহোদয়ের কাছে জানতে চাইলে বলেন, ‘‘টাকা না দিয়ে গেলে এইরূপ হয়।’’ তথাপি তিনি কোনরূপ বিদ্বেষ পোষণ  করেন নি।

       এত প্রতিকূলতা সত্বেও তিনি কারো  সাহায্যপ্রার্থী হননি। কলকাতা এবং সন্নিকটে অবস্থাপন্ন সহৃদয় আত্মীয়স্বজন থাকা সত্ত্বেও কারো অনুগ্রহ প্রত্যাশা না করে পরমপিতাকে আশ্রয় করে  সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করেছেন। তবে সাহায্য তিনি গ্রহণ করেছিলেন একজনের—বাল্যবন্ধু অনন্তনাথ রায়ের।

       লোকমুখে বন্ধু অনুকূলের ওই দুরাবস্থার সংবাদ শুনে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। শিয়ালদহ ষ্টেশনের কাছে ‘হোয়াইট হল ফার্মেসি’-তে কম্পাউণ্ডারির চাকুরি করে শ্রীশ্রীঠাকুরকে অর্থ সাহায্য করে সেদিন একজন বড় মাপের মানুষের পরিচয় দিয়েছিলেন।   

       নাম তাঁর অনুকূল হলে কি হবে প্রতিকূলতা ছিল তাঁর সাথী। ডাক্তারির ফাইনাল পরীক্ষা সব বিষয়ে তিনি খুব ভালোভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। ধাত্রীবিদ্যার মৌখিক পরীক্ষা নিচ্ছেন তিনজন শিক্ষক।  ঠাকুরের যুক্তিপ্রদ উত্তর হৃদয়ঙ্গম করতে না পেরে অবশেষে ঠাকুরকে ওই বিষয়ে উত্তীর্ণ করলেন না। তাঁর প্রতি সব অন্যায়,  সব বাধা-বিপত্তির প্রতিকূলতাকে জয় করে ডাক্তারী পড়া শেষ করে ১৯১২ সালে ফিরে আসেন হিমাইতপুরে।

*        *       *

       ছোটবেলা থেকেই অনুকূলের বিবিধ আধিদৈবিক কার্যকলাপ, অত্যাশ্চর্য ব্যাপার প্রত্যক্ষ করে মাতা মনোমোহিনী দেবী বিশেষ চিন্তিত ছিলেন। ডাক্তারি পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরে আসার পরও তার ব্যতিক্রম নেই। হিতৈষীদের পরামর্শ মেনে অনেক কিছু করেও ছেলেকে অন্যান্য দশজন ছেলের মত স্বাভাবিক করতে পারলেন না। অবশেষে সব বৃত্তান্ত জানিয়ে হুজুর মহারাজ পরবর্তী  তৎকালিন সদগুরু বাবু কামতাপ্রসাদ ওরফে সরকার সাহেবের কাছে ছেলের দীক্ষা প্রার্থনা করে চিঠি লেখেন গাজিপুরে। সরকার সাহেব তখন অন্তিম শয্যায়। চিঠি পেয়ে খুব আনন্দিত হন। চিঠির উত্তরে তিনি লিখেছিলেন, ‘মেরা কাম হো গয়া, তুমি ছেলেকে দীক্ষা দিয়ে দাও।’ ওই পত্র মারফৎ অনুমতিই ছিল মাতা মনোমোহিনী দেবীর পাঞ্জা। ওই অধিকারবলে মা, ছেলেকে  সাধক-পরম্পরার সন্তমতে দীক্ষা দিলেন ১৯১৩ সালের ৭ই ডিসেম্বর। ওই দিনই সরকার সাহেব গাজীপুরে দেহ ত্যাগ করেন। 

যাইহোক, সরকার সাহেবের অনুমতি ক্রমে মাতা মনোমোহিনী দেবী অনুকূলচন্দ্রকে সত্‍মন্ত্র দিলে ঠাকুর বলেছিলেনঃ এ তুই কি দিলি ? এ নাম তো আমি তোর পেটে থাকতেই করি। অর্থাৎ উনি যে ওই নামের নামী-পুরুষ সেই তত্ত্বই তিনি ব্যক্ত করলেন তাঁর মায়ের কাছে।

       অধ্যাত্মশাস্ত্রবিদূষী সাধিকা মনোমোহিনী দেবী পুত্র অনুকূলচন্দ্রের নামধ্যান সংক্রান্ত সমস্ত অনুভূতির বর্ণনা শুনে বিস্মিত ও আনন্দিত হয়ে পুত্র অনুকূলচন্দ্রকে বলেছিলেন, ‘‘এই নামই তো আদি সৎ-নাম। তুই এই নাম করতে থাক।’’

 *       *       *

এবার আমরা সন্তমতের গুরুদের বিষয়ে কিছু জানবার চেষ্টা করব।

সন্তমতের আদি সাধক কবীরদাস জন্মেছিলেন 1440C বারানসীতে। তিনিই প্রথম সত্‍মন্ত্রের রহস্য ভেদ করে বলেছিলেনঃ
       “কবীর ধারা অগমকী সদগুরু দয়ী লখায়,
       উলট তাহি সুমিরন করে স্বামী সংগ লাগায়।” অর্থাৎ ধারা উল্টে স্বামী যোগ করে জপ করতে নিদেশ দিলেন।  কবীরের পর গুরু নানক জন্ম গ্রহণ করেন 15. 4. 1469 C পঞ্জাব প্রদেশের তালবণ্ডীতে। তিনিও ওই সত্‍নাম প্রচার করেছেন। কবীরের জন্মের প্রায় সাতশো বছর পর আগ্রাতে ২৪ শে আগস্ট ১৮১৮ তে জন্মগ্রহণ করেন শিবদয়াল সিং,  তিনি স্বামীজী মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ১৫ জুন ১৮৭৮ আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। পরবর্তী গুরু হন রায়  সালিগ রাম। তিনি ১৪ মার্চ, ১৮২৯ আগ্রার পীপল মাণ্ডিতে জন্মগ্রহণ করেন। ৬ ডিসেম্বর ১৮৯৮তে আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। তিনি হুজুর মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ওই সৎনাম সাধন করে চরম ও পরম পথের সন্ধান পান। তিনি তাঁর গুরু স্বামীজী  মহারাজের অনুমতি ক্রমে ওই সৎনাম সর্বসাধারণে প্রচার করেন। পরবর্তী গুরু হন পণ্ডিত ব্রহ্মশঙ্কর মিশ্র। ২৮শে মার্চ, ১৮৬১ তে ব্রাহ্মণ পরিবারে, বারানসীতে জন্মগ্রহণ করেন। ১২ অক্টোবর ১৯০৭ সালে দেহত্যাগ করেন। তিনি মহারাজ সাহেব নামে খ্যাত ছিলেন। মহারাজ সাহেব দেহত্যাগের পূর্বে একটি কাউন্সিল গঠন করে বাবু কামতা প্রসাদ ওরফে সরকার সাহেবকে পরবর্তী গুরু রূপে নির্বাচন করেন।  শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরকার সাহেবকে সন্ত বলে উল্লেখ করেছেন, ভাববাণীতে।  অন্তর্ধানের পর সত্‍সঙ্গের প্রধান গুরু হন সরকার সাহেব।
        পুরুষোত্তম জননী মাতা মনোমোহিনী দেবী হুজুর মহারাজের দীক্ষিত ছিলেন । হুজুর মহারাজ বিগত হবার পর সরকার সাহেবের কাছে মা তাঁর ছেলের সম্পর্কে জানালে সরকার সাহেব “মেরা কাম ফতে।” বলে দেহ ত্যাগ করেন। পুরুষোত্তমরূপী সদগুরু অবতীর্ণ হয়েছেন জানতে পারে সাধ্যায়ী গুরু তাঁর দায়িত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন। সরকার সাহেব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গাজীপুরে। তারপর থেকেই মাতা মনোমোহিনী দেবী সন্তমতের সৎনামে দীক্ষা দিতে শুরু করেছিলেন।

        মাতা মনোমোহিনী দেবী তাঁর গুরুদেব সাধক পুরুষ হুজুর মহারাজের কাছ থেকে যে বিনতী প্রার্থনা করতে শিখেছিলেন, সেই শিক্ষার  ধারাটাকে প্রাধান্য দিয়ে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন পাবনার সৎসঙ্গ  আন্দোলন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র  পুরুষোত্তম রূপে স্বীকৃত হবার পরও আগ্রা সৎসঙ্গের ধারায় (যে ধারায় বীজমন্ত্রের উচ্চারণ স্বীকৃত, বীজমন্ত্রের মাধ্যমেই পারস্পরিক সম্ভাষণ প্রচলিত। আর্যকৃষ্টির দশবিধ সংস্কার অবহেলিত।) পাবনা সৎসঙ্গকে পরিচালনা করতে  চেয়েছিলেন বলেই আগ্রা সৎসঙ্গের বিনতী-র শিক্ষা দেওয়া হয় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের  আদর্শের অনুসারীদের। যার ফলে, আজও বিনতীর মাধ্যমে বীজমন্ত্র উচ্চারিত হয়ে চলেছে। নিত্য সাধ্যায়ের জন্য আবশ্যিক, শ্রীশ্রীঠাকুর রচিত ‘জাগরণী’ সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দীক্ষিতরা যতটা না জানে, তার চেয়ে বেশি মানে মাতা মনোমোহিনী দেবী রচিত তাঁর গুরুদেবের প্রশস্তির প্রভাতী গীতি ‘প্রভাত যামিনী উদিত দিনমনি’-কে।

       পরবর্তীকালে দৈনন্দিন জীবনে আর্য্যকৃষ্টিকে উপস্থাপিত করতে শ্রীশ্রীঠাকুর যে সান্ধ্য-প্রার্থনা মন্ত্র রচনা করেছিলেন, মাতা মনোমোহিনী  দেবী সেই প্রার্থনাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন, ‘‘সন্ধ্যা মন্ত্রটা মা মারা যাবার তিনদিন আগে লেখা হয়। মা শুনে বড় খুশি হয়েছিলেন। সেইজন্য ও জিনিসটার উপর আমার খুব প্রীতি আছে। মা শুনেছিলেন তাই ওটা আমার অর্ঘ্য হয়ে আছে।’’ (আঃ প্রঃ ২১ খণ্ড, ৭. ১১. ১৯৫২)

 শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে কারো কাছে দীক্ষা গ্রহণ না করলেও বার বার তিনি বলেছেন, ‘আমার মা-ই যেন সরকার সাহেব, হুজুর মহারাজ ও অন্যান্য অন্যান্য মহাপুরুষদের  প্রতীক—মা-ই আমার আদর্শ—মা-ই আমার জীবত্ব।’ তথাপি তিনি সরকার সাহবকে নিজের গুরু হিসেবে এবং হুজুর মহারাজকে মাতৃদেবীর গুরু হিসেবে মান্য করতেন, তাঁদের প্রতিকৃতিতে প্রণাম নিবেদন করতেন।   

*        *        *

       পারিবারিক আর্থিক সংকট তখন চরমে। পারিবারিক স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে   আনতে অন্যান্য সফল সংসারী মানুষদের মত চাকুরি করার সিদ্ধান্ত নেন অনুকূলচন্দ্র। দরখাস্ত করেন শিলাইদহের ঠাকুর বাড়ীর এস্টেটে। কিছুদিনের মধ্যেই নিয়োগ-পত্র পেয়ে যান। মাসিক বেতন ৫০ টাকা। আসবাবপত্রসহ থাকার ঘর। প্রাইভেট প্র্যাকটিশের  সুবিধা। নিয়োগ-পত্র পড়ার সাথে সাথে আনন্দের পরিবর্তে এক অপরাধবোধের বিষাদে ঠাকুরের দেহমন অবসন্ন হয়ে পড়ল। নিজেকে নিজে ধিক্কার দিলেন। অর্থের বিনিময়ে সেবাদান করবেন! গোলামি করে, নিজেকে বিকিয়ে দিয়ে উপার্জন করবেন! তা কিছুতেই তিনি পারবেন না। তাই বাড়ীর কাউকে না জানিয়ে নিয়োগ-পত্রটি ছিঁড়ে ফেলে স্বস্তি ফিরে পান । কারণ বাড়ির লোক, বিশেষতঃ বাবা জানতে পারলে অমন প্রলোভনের চাকুরি নিতে বাধ্য করতেন। তাই স্থির করলেন স্বাধীন চিকিৎসাবৃত্তিকে আশ্রয় করে সাধারণ পীড়িত মানুষদের সেবা করবেন।

১৩১৮ সাল। কিশোরীমোহন তখন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক। আর অনুকূলচন্দ্র চিকিৎসা ব্যবসায় প্রবেশ করতে চাইছেন। তাই ভাবছেন কিশোরীমোহনের সহকারী চিকিৎসক হিসেবে শুরু করতে পারলেই ভাল হয়। ডাক্তার কিশোরীমোহনকে গিয়ে জানালেন তাঁর মনের ইচ্ছা। কিশোরীমোহনকে রাজী করিয়ে সাহাপাড়ার রাধারমণ সাহার বাড়িতে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে তাঁরা ডিস্পেনসারি খুললেন। তাঁরা ওই দুই ডাক্তার মিলে বছর খানেক যৌথ ডাক্তারি করার পর রমন সাহার কাছ থেকে নানা বাধা পেয়ে ডাক্তারখানা বন্ধ করে দেন। কিশোরীমোহন নিজের বাড়ির ডাক্তারখানায় ডাক্তারি করতে থাকেন। অনুকূলচন্দ্র প্রতিবেশী বসন্তকুমার সাহাচৌধুরীর সাহায্যে তাঁরই বাড়ীতে একটি চিকিৎসালয় খোলেন। তিনি এলোপ্যাথী চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে পঠন-পাঠন করলেও এলোপ্যাথী ও হোমিওপ্যাথী দুটো শাস্ত্রেই ছিলেন পারদর্শী। যেখানে যেমন প্রয়োজন  তেমন ওষুধ প্রয়োগ করতেন। তাঁর পর্য্যবেক্ষণ, রোগ নির্ণয়, ওষুধ নির্বাচন, হৃদ্য ব্যবহারে রোগীরা সহজেই রোগমুক্ত হতো। ফলে অচিরেই তাঁর নামযশ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। দরিদ্র রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনে দিতেন, পথ্যের ব্যবস্থা করে দিতেন, কোন রোগীর আরোগ্য সংবাদ না পেলে রোগীর বাড়ীতে গিয়ে খবর নিতেন। নিজেই ঘোরাঘোরি করতেন রোগীর বাড়ীর আশেপাশে খবর নেবার জন্য।

       একবার তো এক রোগীর বাড়ী থেকে খবর না দেওয়াতে ঠাকুর উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছিলেন। তিনদিন পর রোগীর বাড়ীর লোক এলে ঠাকুর এমন বকা বকলেন, বকা খেয়ে সে বলে,—‘‘বাবু আপনি আর একটু গালান। আমার ঘাট হইছে বাবু, আর এমন করব না। ….গাল-মন্দ যে এত মিঠে লাগে আমার জানা ছিল না।…..’’

       তাঁর দরদভরা ব্যবহার এবং চিকিৎসার গুণে দুরারোগ্য রোগ আরোগ্য হতে লাগল। কলকাতার বিখ্যাত ডাক্তারদের হাত ফেরৎ রোগীদেরও তিনি আরোগ্য করতেন। অবস্থাপন্ন রোগীরা স্বেচ্ছায় একশত টাকা পর্যন্ত ভিজিট দিয়ে ঠাকুরের কাছে চিকিৎসিত হতেন। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসকেরা ঈর্ষা-পরবশ হয়ে ঠাকুরের বদনাম করতে শুরু করলে ঠাকুর তাঁদের সুনাম করতেন। রোগীরাই সেইসব চিকিৎসকদের সমুচিত জবাব দিয়ে নিরস্ত করেছিলেন।

       নির্দিষ্ট কোন ভিজিট নয়, নির্দিষ্ট মূল্যও নয়, রোগী সাধারণের স্বতঃস্বেচ্ছ সাম্মানিক দক্ষিণায় মাসিক উপার্জনের মাত্রা কখনো কখনো হাজার টাকার বেশীও হতো। ঠাকুর ওই উপার্জিত অর্থ শ্রীশ্রীমায়ের চরণে নিবেদন করে ধন্য হতেন।

       বর্তমানের চিকিৎসা পদ্ধতির সাথে তুলনা করলে দেখা যাবে, ঠাকুরের ডাক্তারির সময়ে ম্যালেরিয়া, বসন্ত, কলেরা প্রভৃতি সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধে জনমানসে স্বাস্থ্য সচেতনতা, সংক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা, এবং মহামারীর প্রকোপ থেকে মানুষকে রক্ষা করার কোনো পরিকাঠামোই ছিল না গ্রামেগঞ্জে। ছিল না কোন এন. জি. ও., ছিলনা কোন সরকারী নজরদারী।

       ঠাকুর কিন্তু স্থির থাকতে পারলেন না। কলেরা মহামারীর সময়, প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে, কিছু সঙ্গীসাথী নিয়ে হিমাইতপুরসহ কাশীপুর, প্রতাপপুর, ছাতনি, পৈলানপুর, নাজিরপুর ইত্যাদি পার্শ্ববর্তী গ্রামের কলেরা আক্রান্ত রোগীদের বাড়ী বাড়ী ঘুরে সেবায়, শুশ্রূষায়, চিকিৎসায় শত শত রোগীর জীবন দান করেছিলেন। কাউকে মরণের কাছে অকালে আত্মসমর্পণ করতে দেন নি। অজ্ঞ মানুষদের স্বাস্থ্যবিধি পালনে উৎসাহিত করে, মনোবল বৃদ্ধি করে, সংক্রমণ প্রতিরোধ করেছিলেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে অনুরূপ দৃষ্টান্ত খুব বেশী একটা নেই।

     ।। কীর্তন প্রচারের মাধ্যমে সৎসঙ্গ আন্দোলনের সূচনা ।।

শতাব্দী পূর্বের ঘটনা। এ-সময়ের মত সে-সময়ে অবসর বিনোদনের জন্য দর্শ-শ্রুত বৈদ্যুতিন মাধ্যম ছিল না। সন্ধের অন্ধকার নেমে এলে প্রবৃত্তিপরায়ণ মানুষেরা চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, নারী-হরণ ইত্যাদির ন্যায় নিন্দিতকর্মে মেতে উঠত।  জীবনপিয়াসী মানুষেরা,  কীর্তন করে অবসর বিনোদন করতেন।

ঠাকুর নিজের ডিসপেনসারির দায়িত্ব পরম সুহৃদ বন্ধুবর অনন্তনাথ রায়ের ওপর দিয়ে মনোনিবেশ করলেন মানুষের রোগের কারণের মূলোৎপাটন করতে। কীর্তন আন্দোলনের মাধ্যমে।

       তৎকালিন হিমাইতপুর ও আশেপাশের গ্রামের বেশীরভাব মানুষদের ছিলনা কোন নৈতিক শিক্ষা, ছিল না সদাসদ্ জ্ঞান, সত্তাধর্মী চিন্তা। প্রবৃত্তির প্রলোভনে পড়ে তারা চুরি, ডাকাতি, খুন, লুণ্ঠন, নারীহরণের মত সত্তাবিরোধী  অধর্ম করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ঠাকুর মেলামেশা করতে শুরু করেন ওইসব সত্তাহিংস প্রবৃত্তিদুষ্ট লোকগুলোর সাথে। একেবারে বন্ধুর মত। তারাও ঠাকুরকে দলে নিয়ে নেয়। চুরি করতে গেলে, নারী অপহরণ করতে গেলে  ঠাকুরও সাথে যান। নানা কায়দা করে, নানা ফন্দী এঁটে, নানা গল্প ফেঁদে, মনে প্রেমের আগুণ জ্বালিয়ে  চতুর চুড়ামনি বানচাল করে দেয় ওদের সব পরিকল্পনা। ঠাকুরের সহজ-সরল দরদী ব্যবহারের আকর্ষণে ওরাও ঠাকুরের সাথে গল্পগুজব করতে চলে আসে। আসতে শুরু করেন অভাবে পরিশ্রান্ত সাধারণ মানুষেরাও। ঠাকুর তাদের মন বুঝে, মনের অভাব বুঝে  কখনো রামায়ণ, মহাভারতের গল্প বলতেন। কখনো হজরত রসুল, চৈতন্যদেব, কবীর সাহেব, গুরু নানক, হুজুর মহারাজ, রামকৃষ্ণদেব, ঠাকুর হরনাথ প্রমুখ মনীষীদের জীবন ও বাণীর গল্প বলতেন।  কখনো পাঠ করে শোনাতেন ‘চৈতন্য-চরিতামৃত’, ‘রামকৃষ্ণ কথামৃত’, ঠাকুর হরনাথের ‘কৃষ্ণলীলা’, কুমারনাথের ‘গীতা’ ইত্যাদি গ্রন্থরাজি থেকে। আলোচনা করতেন সৎনাম, সদগুরু, সৎসঙ্গের মহিমার কথা। বলতেন, সদগুরুই ভগবানের সাকার মুর্তি। তিনি যুগে যুগে নররূপে অবতীর্ণ হয়ে সাধুজনদের রক্ষা করেন, পাপীদের পরিত্রাণ করেন। তিনি নিজের শরীরকে নির্দেশ করে বলতেন, এটিই হলো পরমপিতার আবাসস্থল। আমাদের সকলেরই উচিত সৎগুরুর আদর্শে এই দেহটাকে ভগবানের মন্দির জ্ঞানে, সদাচারে পুষ্ট করে, গীতার জ্ঞানমিশ্রিত ভক্তির সাহায্যে নিয়ত অভ্যাসে, চঞ্চল মনকে স্থির করে,  প্রাণের স্বরূপ, আত্মার স্বরূপ উপলব্ধি করা। এইভাবে  জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলা, সকলকে জীবনবৃদ্ধির পথের সন্ধান দেওয়া। এই ভিন্ন জগতের প্রকৃত কল্যাণ করার আর কোন পথ নেই।   

       ওইসব তত্ত্বকথা আলাপ-আলোচনার পর  হাতে তালি দিয়ে হরিনাম সংকীর্তন শুরু করতেন। সমবেত সঙ্গীসাথীরাও অনুসরণ করতে শুরু করেন ঠাকুরকে। নতুন এক নেশায় পেয়ে যায়  ওদের। এখন আর কাউকে ডাকতে  হয় না। প্রেমাহুতের প্রেমের আকর্ষণে বিকেল হতে না হতেই চলে আসে সকলে, সাথে করে নিয়ে আসে নতুন কাউকে। ওদের আনন্দ-বর্ধনের জন্য জোগাড় করে দেন খোল, করতাল। আলাপ-আলোচনার পর কীর্তন আনন্দে মেতে ওঠেন সঙ্গীসাথীদের নিয়ে। ক্রমে আহার-নিদ্রা ভুলে দিবারাত্র চলতে থাকে তুমুল কীর্তন। গড়ে তোলেন কীর্তনের দল।  

।। ভাবধারা প্রচারের সূচনা—প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ ।।

       হিমাইতপুর লাগোয়া বাজিতপুর স্টীমার ঘাটে জলপথ পরিবহনের  একজন পদস্থ কর্মী ছিলেন শ্রীঅতুল চন্দ্র ভট্টাচার্য্য। তিনি নেশা করতেন, আর, প্রায় প্রতিদিনই বাড়ীতে গিয়ে স্ত্রীর সাথে অশান্তি করতেন। স্ত্রীকে ধরে মারতেন, আসবাবপত্র ভাঙচুর করতেন। অনুকূলচন্দ্র সুযোগ বুঝে তার মনোরাজ্যেও প্রবেশ করেন। তার সাথেও বন্ধুর মত  মিশে তার ওই বদভ্যাসগুলো হরণ করেন। অনুকূলের সংস্পর্শে এসে আমূল পরিবর্তন আসে অতুলচন্দ্রের জীবনে। ক্রমে সব বদভ্যাসগুলো ত্যাগ করেন। ঠাকুরের সান্নিধ্যে তিনি হয়ে ওঠেন এক নতুন মানুষ। নতুন এক নেশায় মত্ত হন তিনি। প্রতিদিন ঠাকুরের সঙ্গ লাভ করার জন্য  উন্মুখ  হয়ে থাকতেন। ওই সঙ্গসুধা  তিনি বেশিদিন উপভোগ করতে পারলেন না। কর্তৃপক্ষ অন্যত্র বদলীর আদেশ করেন। অবিলম্বে তাকে ঠাকুরের মত দেব-মানবের সঙ্গ ত্যাগ করে বাজিতপুর ছেড়ে চলে যেতে হবে ভেবে ব্যথিত হন। ব্যাকুল হয়ে ঠাকুরকে বলেন, বদলীর চাকরীর  জন্য আপনার মত দেবতাকে ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হবে।  এই বিরহ-বেদনা আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারব না। আপনি দয়া করে এমন কিছু উপদেশ আমাকে দিন, যা’তে আমি আপনার সঙ্গসুধা লাভ করতে পারি। ঠাকুর  তার কাতর প্রার্থনা শুনে, ‘ভাই অতুল ! সর্বপ্রথমে আমাদের দুর্বলতার বিরুদ্ধ যুদ্ধ করতে হবে। ….’ সম্বোধনে সূচিত করে ইষ্টপথে  চলার পাথেয় স্বরূপ পত্রাকারে কিছু উপদেশ লিখে দিয়েছিলেন। ওই উপদেশের বাণীগুলোই ছিল ঠাকুরের  দেওয়া স্বহস্ত লিখিত সর্বপ্রথম উপদেশ। পরবর্তীকালে ওই উপদেশের বাণীগুলো শ্রীঅতুল চন্দ্র ভট্টাচার্য্যের  কাছ থেকে সংগ্রহ করে বিশিষ্ট সাধক সুরেশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায় ’সত্যানুসরণ’ শিরোনামে মুদ্রণ করে বিতরণ করলে ঠাকুর বলেছিলে, ওটা ছাপাবেন জানলে আরও কিছু  লিখে দিতে পারতাম। সুরেশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায় সুযোগ বুঝে ‘আরও কিছু’ লিখিয়ে নেন ঠাকুরকে দিয়ে। পরবর্তীকালে শ্রীঅতুল চন্দ্র ভট্টাচার্য্য  মহোদয়  পরবর্তী উপদেশগুলোকে সংযুক্ত করে পূর্ণাঙ্গ সত্যানুসরণ প্রকাশ করেছিলেন।  

।।বাল্যসাথী অনন্তনাথ রায় ।।

            শ্রীশ্রীঠাকুরের সৎসঙ্গ  আন্দোলনের ছিলেন প্রথম সেনাপতি ছিলেন কাশীপুরের বাল্যসাথী অনন্তনাথ রায়। সাত বছর বয়সে পিতৃহারা হওয়ার জন্য সপ্তম  শ্রেণীর বেশিলেখাপড়া করতে পারেন নি। মাত্র ষোল বছর বয়সে ঠাকুরের বাড়ীর সংলগ্ন  হিমাইতপুরের ডাঃ বসন্তকুমার চৌধুরীর কাছে কম্পাউণ্ডারী শিখে তাঁর ডাক্তারখানাতেই কম্পাউণ্ডারী করতেন।  সেই সুবাদে দু’জনের অন্তরঙ্গতা বেড়ে যায়।  মাতৃদেবী অকালে বিদেহী হলে  মুষড়ে পড়ে অনন্তনাথ।

             ঠাকুরের সঙ্গ,  সান্ত্বনা পেয়ে পুনরায় স্বাভাবিক জীবনের ছন্দে ফিরে আসেন। বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে  কুপথে পা বাড়াতে গেলেই আগলে রাখতেন ঠাকুর। মা দেহ রাখার দু’-বছর পর বিয়ে করে সংসারী হন। তিন বছরের মাথায় স্ত্রী বিগত হন পুত্র-সন্তান প্রসব করতে গিয়ে। ছেলেটিও ২২ দিন পরে ইহলোক ত্যাগ করে। পর পর এতগুলো শোক পেয়ে ডাক্তারি ছেড়ে  আধ্যাত্মিকতায় মন দেয়। ঠাকুর সাথে নিয়ে ঘোরেন, কীর্তন করেন, কিশোরী বৈরাগীর কীর্তনের আসরে সাথে করে নিয়ে যান। তাতে তাঁর মন ভরে না।  রংপুরে গিয়ে আপন ভগ্নীপতি রাধারমণ গোস্বামীর কাছ থেকে বৈষ্ণব-মতে দীক্ষা  নিয়ে  মাঠের ধারে নিরিবিলি জায়গায় গাছপাতা দিয়ে তৈরি একটা সাধন-কুটির নির্মাণ করে কঠোর সাধন-ভজন করতে সুরু করেন। পাঁচ ছ দিন অন্তর একবার করে বের হয়ে নাম মাত্র ফলাহার সেরে আবার প্রবেশ করতেন সাধনগৃহে। সাধনা করতে করতে  জ্যোতি-দর্শন, শব্দ-শ্রবণ, অদ্বৈত-অনুভূতি লাভ করেও তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেন না। নররূপী ভগবান তার চাই। তা’ যখন পাওয়াই গেল না, এ জীবন আর রাখবেন না। পরজন্মে নতুন করে সাধনা করে ভগবান লাভ করবেন।  এই ভেবে, ভগবানকে শেষ বারের মত স্মরণ করতে করতে, এক বৃষ্টিপড়া রাতে সাধন-গৃহের কড়িকাঠের সাথে কাপড়ের দড়ি বেঁধে  প্রস্তুত হচ্ছেন  গলায় ফাঁস লাগাবার জন্য।

       শ্রীশ্রীঠাকুর তখন সঙ্গীদের নিয়ে বাড়িতে বসে আলাপ আলোচনা করছিলেন। হঠাৎ তাঁর কি ভাবান্তর ঘটল। বারান্দা থেকে লাফ দিয়ে পড়ল মাটিতে। প্রবল বর্ষণ মাথায় নিয়েই সোজা দৌড়তে লাগলেন কাশিপুরের মাঠের দিকে।  যেখানে অনন্তনাথের সাধনগৃহ অবস্থিত। সেখানে পোঁছেই অবিরাম দরজায় আঘাত করতে করতে বলতে লাগলেন, ‘অন্তা, অন্তা রে, দরজা খোল, বৃষ্টিতে ভিজে গেলাম।’  গলায় ফাঁস পড়তে উদ্যত অনন্তনাথ  থমকে গেলেন । বললেন , তুমি কে? কেন এসেছ এখানে ? শ্রীশ্রীঠাকুর উত্তর দিলেন, ডাক্তার, আমি অনুকুল, তোমার বন্ধু।

অনন্তনাথ বিরক্ত হয়ে রাগতস্বরে সাড়া দিয়ে  বললেন, আমি তো তোমাকে ডাকিনি, ডেকেছি ভগবানকে। তুমি কেন এসেছ ?

           বিরক্ত যতই হোক না কেন, স্মরণ করছেন তো ভগবানকে। আসন তো টলিয়েছেন ভগবানের। ভক্ত কল্পতরু ভগবান কি ভক্তের ডাকে সাড়া না দিয়ে পারেন! তাই তো বৃষ্টি মাথায় ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এসেছেন হিমাইতপুর থেকে কাশীপুরে। ভক্তকে বাঁচাতে। আঘাতে আঘাতে ভেঙে ফেলেন দরজা। কিংকর্তব্যবিমূঢ় চিত্রার্পিতের ন্যায় দণ্ডায়মান অনন্তনাথকে জড়িয়ে ধরে বলেন,—‘আমি কী অপরাধ করেছি যে তুই আমাকে ফেলে রেখে চলে যাচ্ছিলি?  তুই ভগবান-ভগবান বলে পাগল, আর ভগবান যে তোর পেছন পেছন দৌড়ে বেড়াচ্ছে তা বুঝতে পারছিস না।

          তাই তো,— সেই বাল্যকাল থেকে যে  ছায়াসঙ্গীর মত আমাকে সবসময় রক্ষা করে চলেছে, সেই অন্তর্যামীকে  আমি চিনতে পারলাম না! ধিক্কার দেয় নিজেকে।  মাথা নীচু করে মুখ লুকোয়। ঠাকুর সাথে করে নিয়ে সমর্পণ করেন মায়ের শ্রীচরণে। ঠাকুরের প্রশ্রয় তো ছিলই, এবার পেল জগন্মাতা মনোমোহিনীর আশ্রয়।  মা তাঁকে সন্তমতে দীক্ষা দিয়ে আপন করে নেন। দ্বিজত্ব লাভ করেন অনন্তনাথ। ঠাকুরের পরামর্শে  আবার শুরু করেন ডাক্তারি। পসার জমতে থাকে। রাজকীয় সাজে তাঁকে সজ্জিত করেন। এখন আর পায়ে হেঁটে নয়, ঘোড়ায় চেপে রুগীর বাড়ীতে যান। ঠাকুর নাম দিয়েছেন মহারাজ। সাধন-জগতের মহারাজ—অনন্ত মহারাজ। ঠাকুরের সাথে কীর্তনও করেন। ভাবসমাধির সময় ঠাকুরের চুরাশী প্রকারের আসন-মুদ্রাদি প্রত্যক্ষ করে তিনি স্তম্ভিত হয়ে যান। গুরু পদে বরণ করেন ঠাকুরকে। 

।।  ভক্তবীর কিশোরীমোহন ।।

       শ্রীশ্রীঠাকুরের সৎসঙ্গ  আন্দোলনের দ্বিতীয় সেনাপতি ছিলেন প্রতাপপুরের মাঝিপাড়ার কেশবদাস বৈরাগীর ছেলে কিশোরীমোহন। ১২৮৭ সালের ১৪ই চৈত্র, শনিবার, দোলপূর্ণিমার দিন জন্ম। বয়সে ঠাকুরের চাইতে সাত বছরের বড়। পাবনা সদর হাসপাতালের কম্পাউণ্ডারির চাকরি ছেড়ে বাড়ীতে চিকিৎসালয় খুলেছেন। এলোপ্যাথী, হোমিওপ্যাথী দুই মতেই চিকিৎসা করেন। তাঁর সাথে কিছুদিন যৌথভাবে ডাক্তারিও করেছেন।  ভালো-মন্দ সকলের সাথেই তাঁর মেলামেশা। সাধন-ভজনে বহুনৈষ্ঠিক। কখনো কর্তাভজা, কখনো পঞ্চরসিক, কখনোবা বৈষ্ণবীয় শুদ্ধমতে  সাধনা করেন,—মেতে ওঠেন কীর্তনে। ভালোয়-মন্দয় মেশানো এই বিচিত্র চরিত্রের মানুষটির সাথে অন্তরঙ্গভাবে মিশতে শুরু করেন ঠাকুর। কাশীপুর গ্রামের বাল্যবন্ধু অনন্তনাথ রায়কে সাথে নিয়ে কিশোরীমোহনের কীর্তনের আসরে যোগদান করতে শুরু করলে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে কীর্তন। ঠাকুরের আকর্ষণে কীর্তনে ক্রমশঃই ভীড় বাড়তে থাকে।

       মুকুন্দ ঘোষ, তরণী, কোকন, যদু পাল, হারাণ মিস্ত্রী প্রমুখরা হাততালি দিয়ে পদ্মার পাড়ে বসে প্রায়ই কীর্তন করত। ঠাকুর ওঁদের উৎসাহ দিতে গান লিখে দেন, ওঁদের দিয়েই লাউয়ের খোল দিয়ে একতারা বাদ্যযন্ত্র বানাবার ব্যবস্থা করেন। শিকারপুর থেকে খোল কিনে আনান। কীর্তনের একটা দল করে দেন। সেই দল দিয়ে নগর পরিক্রমা করাতেন। গৃহস্থদের বাড়ীতে বাড়ীতে কীর্তন করাতেন। ঠাকুরের আদেশে ওই দলটি গিয়েও কিশোরীমোহনের ডাক্তারখানার কীর্তন-আঙিনায় তুমুল কীর্তন করতেন।

       কিশোরীমোহনের ডাক্তারখানার পরিসর এমন কিছু বড় ছিল না। ৭-৮ জন মিলে কীর্তন শুরু করত। ঠাকুর যেদিন কীর্তনে যোগ দিতেন ঠাকুরের আকর্ষণে একের পর এক কীর্তনপ্রিয় ভক্তের দল কীর্তনে এসে যোগ দিত। কখনো-কখনো সারারাত ধরেও কীর্তন চলত। কীর্তন শেষ হলে দেখা যেত  ঘরের আয়তনের তুলনায় বহুগুণ ভক্তের  বহির্গমন। অর্থাৎ ভক্ত সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সমানুপাতিক হারে ঘরের আয়তনও বেড়ে যেত।

        ঠাকুরের অন্তরঙ্গ সান্নিধ্যে কিশোরীমোহন এখন অন্যমানুষ। ব্যাকুল হয়েছেন দীক্ষালাভের জন্য। কিশোরীমোহনের ভগ্নিপতি ছিলেন ঠাকুর হরনাথের ভক্ত। ভগ্নিপতির মুখে হরনাথ ঠাকুরের কথা শুনে আকৃষ্ট হন কিশোরীমোহন। হরনাথ ঠাকুরের কাছে দীক্ষা প্রার্থনা করলে হরনাথ ঠাকুর দীক্ষা না দিয়ে বলেন, ‘‘তোমার বাড়ীর কাছেই আছেন পরমগুরু। খুঁজে নাও।’’

       বিফল মনোরথ নিয়ে ফিরে আসেন কিশোরীমোহন। কীর্তনের সাথে সাথে খুঁজতে থাকেন ঈপ্সিত গুরুকে। ঠাকুরের পরামর্শে গুরুর সন্ধানে নগর কীর্তন করতে শুরু করেন কিশোরীমোহন। হিমায়েতপুর, নাজিরপুর, কাশীপুর পরিক্রমা করতে সুরু করেন কীর্তনদল নিয়ে। 

       নাজিরপুর গ্রামে সম্ভ্রান্ত গৃহস্থ কীর্তন-রসিক দুর্গানাথ সান্যালের বাস।  তাঁর পিতৃভূমি ফরিদপুর জেলার রাজবাড়ী মহকুমার অন্তর্গত সোনারপুর গ্রামে। পিতার নাম ছিল যাদবচন্দ্র সান্যাল। নাজিরপুর তাঁর মামাবাড়ী। তিনি মাতুলালয়েই জন্মগ্রহণ করেন ১২৮৮ সনের ১লা বৈশাখ। মাতামহের মাতা ব্যতীত আর কোন সন্তান ছিলনা। তাই তিনি মাতামহের উত্তরাধিকারী স্বরূপ নাজিরপুরেই বসবাস করতে থাকেন। তিনি কঠিন আমাশয় রোগ থেকে মুক্তি পেতে বাবা বৈদ্যনাথ ধামের বৈদ্যনাথ ধামে হত্যা দিলে স্বপ্নাদেশ পান। তদনুযায়ী হিমায়েতপুর গিয়ে ১৩২০ সনের ফাল্গুন মাসে মাতা মনোমোহিনী দেবীর মাধ্যমে সৎমন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ করেন।  তাঁরও একটি কীর্তনদল আছে।  চতুর চূড়ামনি অনুকূল তাঁকে গোপনে গিয়ে বলেন, ‘‘দাদা, কিশোরী বৈরাগী আপনাদের গ্রামে এসে কীর্তনে মাতিয়ে দিয়ে গেল, আর আপনি চুপচাপ বসে থাকবেন, এর জবাব দেবেন না? যান্, পাল্টা গেয়ে আসুন। ওদের ওপরে টেক্কা দেওয়া চাই।’’

            ‘‘সান্যালমশাই এক বিরাট দল নিয়ে কীর্তন করে গেলেন মাঝিপাড়া পর্যন্ত। আবার ঠাকুরের উদ্দীপনায় আরও বড় দল নিয়ে কিশোরী গেল কীর্তন করতে নাজিরপুরে। এইভাবে দৈনিক কীর্তনের প্রতিযোগিতায় ৪-৫ খানা গ্রাম পাগল হয়ে উঠলো। প্রতিযোগিতাকে জীইয়ে রাখতে ঠাকুর গোপনে উভয় দলকে গান লিখে দিয়ে, সুর দিয়ে  উৎসাহিত করে। অন্য সব চিন্তা ভুলে মানুষ কীর্তনের চিন্তায় মেতে উঠলো।   ইষ্টার্থে লোকসংগ্রহের ঝুলি ভরতেই  প্রতিযোগিতার প্রবৃত্তি থামিয়ে দিলেন ঠাকুর। সব দলকে একত্রিত করে  নিয়ে এক অভিনব কীর্তনদল প্রবর্তন করলেন তিনি। মাঝে মাঝে নগর কীর্তন হয়, আর প্রতি সন্ধ্যায় কাশীপুর, নাজিরপুর, হিমাইতপুর ও মাঝিপাড়ার কীর্তনপ্রিয় জনগণ কিশোরীর গৃহে একত্র হয়ে শ্রীশ্রীঠাকুরের সঙ্গে কীর্তন করেন। কীর্তনে সমাধিস্থ হয়ে পড়েন ঠাকুর।’’ (সৎসঙ্গ আন্দোলন)  সমাধি বা ভাবাবস্থার সময়   ঠাকুরের যে অভিনব আসন-মুদ্রাদি প্রকাশ পেত, বিভিন্ন ভাষায় যে অমৃতময় বাণী নির্গত হতো, উপস্থিত ভক্তদের মনের ভাব ব্যক্ত করে দিত,— সেসব প্রত্যক্ষ করে কিশোরীমোহন ঠাকুরের প্রতি আরো বিশেষ করে আকৃষ্ট হয়। কিন্তু, সন্দেহের একটা কিন্তু কিন্তু ভাব লেগেই থাকে। শুরু করলেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা। একদিন কীর্তন আসরে একটা টুল পেতে রেখে মনে মনে সংকল্প করলেন, অনুকূল যদি কীর্তন করতে করতে ওই টুলটার ওপর দাঁড়িয়ে সমাহিত হয়  তাহলে  নিঃশংসয় হওয়া যেতে পারে।  ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূরণ করতে ওই দিনই কীর্তন করতে করতে ঠাকুর টুলের ওপর ঊর্দ্ধবাহু করে স্তব্ধভাবে  দাঁড়িয়ে থাকেন। তথাপি সংশয়! আবার পরীক্ষার আয়োজন। সমাধির সময় জ্বলন্ত টিকে উরুতে চেপে ধরে পরখ করে দেখেন, এ সমাধি না ভেলকি! তাতেও ঠাকুর পাশ করে যান। এবার, কোকনের সাথে পরামর্শ করে নবান্নের দিন ঠাকুর হরনাথের নামে ও অনুকূলের নামে দুটো পৃথক পাত্রে ভোগ নিবেদন করেন। ঠাকুর তাঁর নামে নির্দিষ্ট ভোগ খান। এতেও সংশয় কাটেনি। আর একদিন নলেনগুড়ের সন্দেশ লুকিয়ে রেখে পরীক্ষা করেন, সে পরীক্ষায়ও ঠাকুর পাশ করে যান। এত বার পরীক্ষা করার পরও কিশোরীমোহনের সংশয় কাটে না। অথচ ভগবান লাভ করার তীব্র আকাঙ্খাও আছে।

       কিশোরীমোহন ঠিক করলেন ঘোর অমাবস্যার রাত্রি নির্জন শ্মশানে  বসে সাধনা চালাবেন। হয় প্রাপ্তি, না হয় মৃত্যু । তবুও তাঁর দর্শন বিনা ফিরে যাব না। একখানি আসন পেতে বসলেন কিশোরীমোহন। তারপর চিৎকার করে ডাকতে শুরু করলেন, ঠাকুর তুমি যদি সত্যিই থেকে থাক তাহলে দেখা দাও । কিছুক্ষণ থামেন, আর চিৎকার করেন । কালিতলার নির্জন অন্ধকার শ্মশানও কেঁপে ওঠে তাঁর চিৎকারে। এমন সময় হঠাৎ কিশোরীমোহন শুনতে পান মানুষের কণ্ঠ। কে যেন তাঁর নাম ধরেই ডেকে বলছে, ডাক্তার ওঠো, ওঠো । আমি এসেছি। কিশোরীমোহন ভাবলেন, আমিতো কাউকে বলে আসিনি ।  বললেন কে তুমি ?

       — আমি, আমি গো আমি, শিবচন্দ্র চক্কোত্তির ছাওয়াল  অনুকূল। সেই ‘আমি’র গম্ভীর স্বরধ্বনিতে সেখানকার আকাশ বাতাস গম্ গম্ করে ওঠে । মায়াবী এক মধুর সুরধ্বনি । কিশোরীমোহন বললেন, তা তুমি কি মনে করে ?

       পুরুষ কণ্ঠ বললেন, তুমি যে দরকারে এসেছ আমিও সেই দরকারেই এসেছি । কিশোরীমোহন সত্যিই ভয় পেয়ে যান । ভাবেন, এ নিশ্চয় কোন মায়াবী আত্মার কাজ, আমার সাধনায় ব্যাঘাত ঘটাতে এসেছে । এবার খুব জোরে জোরে ‘রাম’ নাম করতে লাগলেন। শুনেছেন, রাম নাম করলে নাকি ভুতেরা পালায়। কিন্তু একি, সেই কণ্ঠের মালিকও দ্বিগুণ জোরে রাম-নামের মহড়া দিচ্ছে । কিশোরীমোহন হতবাক হয়ে পড়েন । ভাবেন, না এ তো ভুত হতে পারে না। কিছুক্ষণ বাদে পুরুষ কণ্ঠ বলেন, আর কতক্ষণ এইভাবে শ্মশানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাত কাটাব। এবার ফিরে চল বাড়ি যাই। কিশোরীমোহন ভয়ে ভয়ে বলেন, আচ্ছা, তুমি আগে আগে চল, আমি তোমার পিছন পিছন যাচ্ছি। এবার দু’জন হাঁটা শুরু করলেন। কিশোরীমোহন মনে মনে ভাবলেন, দেখি তো এই লোকটার মাটিতে পা পড়ে কিনা ? পুরুষ কণ্ঠ সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, হ্যাঁ, হ্যাঁ দেখতে হবেনা ওসব ঠিকই আছে ।  পা মাটিতেই পড়ছে। চিন্তার কোন কারণ নাই। শ্মশান থেকে অনেকখানি বাইরে চলে এসেছে দুজনে। হঠাৎ শ্রীশ্রীঠাকুর কিশোরীমোহনের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লেন। কিশোরীমোহন লক্ষ্য করলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের সর্বাঙ্গ থেকে আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে। শ্রীশ্রীঠাকুরের কপালে স্বেদ বিন্দুর মত কি যেন চিক চিক করছে। কিশোরীমোহন সহ্য করতে পারলেন না দুরন্ত আলোর তেজ। চিৎকার করে বলে ওঠেন,  থামাও, থামাও তোমার ঐ রূপ আমি আর সহ্য করতে পারছি না। অনন্ত রূপ সান্ত করে ঠাকুর সংবৃত করে নেন নিজেকে। আবার চলতে থাকেন।  কিশোরীমোহন পিছু পিছু চলেন আর ভাবেন, তুমি যদি সত্যিকারের ভগবান হও তাহলে নদীতে স্নান করে আসতে পার কিনা দেখি ? চলতে চলতে ঠাকুর বলে উঠলেন এই-রে, বোধহয় গুয়ে পা দিয়েছি , যাই পদ্মায় একটা ডুব দিয়ে আসি। বলেই জামাকাপড় সহ পদ্মায় ডুব দিয়ে এলেন। তথাপিও সংশয়, কিশোরীমোহন ভাবলেন, অনুকূল যদি এখনই আর একবার পদ্মায় ডুব দেয়,তাহলে আমার মনে আর কোন সন্দেহ থাকবে না।

       সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুর বলে ওঠেন, দেখ ডাক্তার, গায়ের ময়লা একবার ধুলেই যায়, কিন্তু মনের ময়লা বার বার ধুতে হয়।  যাই আর একটা ডুব দিয়ে আসি। বলেই আর একটা ডুব দিলেন পদ্মায় নেমে।

       ঠাকুরের পেছন পেছন যাচ্ছেন আর ভাবছেন, আজ আমি নিঃশংসয় হলাম যে অনুকূলই পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণ, কিন্তু একথা তাঁকে কি করে জানাই! কাল যখন লোকে জানবে আমি শিবচন্দ্র চক্রবর্তীর ছাওয়াল অনুকূলের পায়ে পড়ে ‘ভগবান, ভগবান’ বলে কেঁদেছি, তখন লোকে আমাকে উপহাস করবে। আবার ভাবছেন, যিনি কালাধীশ, পরমপুরুষ, তাঁকে ভগবান বললে যদি উপহাসের পাত্র হতে হয়, হোক না! এইসব ভাবতে ভাবতে আবেগকে আর ধরে রাখতে না পেরে ঠাকুরের পায়ে ধরে ‘ভগবান ভগবান’ বলে কাঁদতে থাকেন। ঠাকুর দাঁড়িয়ে পড়ে হাসতে হাসতে বলেন, ডাক্তার, তুমি আমাকে ‘ভগবান’ বলে পায়ে পড়ে কাঁদছো—কাল আমি সবাইকে একথা বলে দেব। কিশোরীমোহন বললেন, তাই যদি হয়, সেটাই হবে আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কণ্ঠমালা।

       তিনি ঠাকুরের সাথে তাঁর বাড়ীতে যান, সেখান থেকে একটা লণ্ঠন নিয়ে নিজের বাড়ীতে ফিরে আসেন। আপাততঃ সাঙ্গ হয় তাঁর ভগবান খোঁজার পালা।  

       কিশোরীমোহন তথাপিওঅনুকূলচন্দ্রকে গুরুপদে বরণ করতে দ্বিধা করছেন। সব দ্বিধার অবসান অনুকূলচন্দ্রই করে দিলেন।

        ‘‘কীর্তনানন্দে হিমায়েতপুর এবং তার  আশেপাশের গ্রামগুলি যখন চব্বিশ ঘণ্টা মুখরিত সেই সময় একদিন অনুকূলচন্দ্র তাঁর সঙ্গীদের বললেন, ‘পাগল হরনাথ  ঠাকুর নামে একজন মহাপুরুষ আছেন। বাঁকুড়া জেলার সোনামুখীতে তাঁর আশ্রম। তোরা সকলে মিলে একবার সেখানে গিয়ে হরনাথ ঠাকুরের শ্রীচরণ দর্শন করে আয়।’ শ্রীশ্রীঠাকুরের আদেশে কোকন, তরণী, হারাণ, যদু পাল, তারক পাল, মেদনা ভৌমিক, মুকুন্দ ঘোষ প্রমুখ ১৫/১৬ জনের এক কীর্তনদল নিয়ে কীর্তন করতে-করতে কিশোরীমোহন একদিন সোনামুখী রওনা হয়ে গেলেন। তাঁরা সন্ধ্যাবেলা সেখানে পৌঁছালেন। পরদিন সকালবেলা তাঁরা ঠাকুর হরনাথের দর্শন পেলেন। গ্রামবাসীরা এঁদের পরিচয় জানতে চাইলে ঠাকুর হরনাথ বললেন—‘এরা আমার পূর্ববঙ্গের ভক্তবৃন্দ।’ তারপর কিশোরীমোহন দলবল নিয়ে ঠাকুর হরনাথের সম্মুখে ঠাকুর হরনাথেরই রচিত দু’খানি গান—‘আমার হরিবোল বলা হ’ল না, /আমি মুখে বলি হরি, মনে অন্য করি/তাই প্রেমবারি চোখে আসে না।’ এবং ‘ভবে ভোলার ধনে ভুলে থেকো না,/যা’ গেছে তা গেছে, যে ক’টা দিন আছে/একবার হরেকৃষ্ণ হরি বল না।’

        কীর্তন চলতে লাগল। ঠাকুর হরনাথও কীর্তনে যোগ দিলেন। তিনি প্রেমানন্দে মত্ত হয়ে দুই হাত তুলে নাচতে লাগলেন এবং আগত ভক্তদের স্নেহালিঙ্গনে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। দুপুরবেলায় কীর্তন শেষ হলে সকলে তাঁর সঙ্গে স্নানে গেলেন এবং প্রসাদ গ্রহণ করলেন। দলবল নিয়ে কিশোরীমোহন তিন দিন সোনামুখীতে ছিলেন। এই তিন দিন ঠাকুর হরনাথ ধর্ম্ম, মানবজীবনে কর্তব্য প্রভৃতি বিষয়ে নানা আলোচনা করেন। আলোচনাকালে তিনি অনুকূলচন্দ্রের গুণকীর্তন করেন এবং তাঁকে সর্বতোভাবে অনুসরণ করার জন্য আগতদের উপদেশ দেন। কিশোরীমোহনকে একান্তে ডেকে তিনি বলেন—‘দ্যাখ, তোদের যিনি এখানে পাঠিয়েছেন তাঁর কাছেই সব পাবি। তিনিই প্রকৃত সদগুরু। তিনিই পুরুষোত্তম। স্বয়ং অবতারী। অচিরেই তিনি প্রকট হয়ে সর্বত্র পূজিত হবেন। এই যুগগুরুকে মনপ্রাণ দিয়ে তোরা ভজনা করবি।

        ‘‘দলবলনিয়ে কিশোরীমোহন ফিরে  এলেন হিমাইতপুরে। বাল্যবন্ধু সম্বন্ধে কিশোরীমোহনের চোখ খুলে গেছে। এতকাল তিনি কি ভুলই না করে এসেছেন। কতভাবে পরীক্ষা করেছেন বন্ধুকে। ‌না, আর নয়। আর পরীক্ষা নয়। এখন প্রয়োজন আত্মসমর্পণ। বাল্যবন্ধুকে বন্ধু, সখা, প্রভু বলে ডেকে এখন আর  মন ভরে না। কিশোরীমোহন অনুকূলচন্দ্রকে ডাকেন ‘ঠাকুর’ বলে। অন্যান্য সবাইও অনুকূলচন্দ্রকে ‘ঠাকুর’ বলে সম্বোধন করতে শুরু করলেন। কিন্তু আত্মপ্রতিষ্ঠাসূচক ‘ঠাকুর’ সম্বোধনটিতে অনুকূলচন্দ্রের ঘোর আপত্তি। তিনি সবাইকে নিষেধ করলেন….কিন্তু কেউ সে-কথা শুনতে রাজী নয়। সবাই নাছোড়বান্দা। ….তখন অনন্যোপায় হয়ে নিজের মনকে … প্রবোধ দিলেন যে, লোকে পাচক ব্রাহ্মণকেও তো ‘ঠাকুর’ বলে ডাকে। এরা যদি আমায় ‘ঠাকুর’ সম্বোধন করে আনন্দ পায় তো পাক।’’  (পরমপ্রেমময়, কুমারকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য/৩৩-৩৪)

        অবশেষে ১৩২০সালের শেষের দিকে কিশোরীমোহন শ্রীশ্রীমায়ের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করে অনুকূলচন্দ্রকে গুরু পদে বরণ করেন।

            ঠাকুরের ভাষায় কিশোরীমোহন  ছিলেন কীর্তনের ঋষি।  একবার কীর্তন করতে করতে দলবল নিয়ে হাজির হন কাশীধামের বিশ্বনাথ মন্দিরে। বিশ্বনাধ মন্দিরে চামড়ার বাদ্যযন্ত্র নিয়ে প্রবেশ নিষেধ। পাণ্ডাদের প্রতিরোধের সব দুর্গ ভেঙ্গে দলবলসহ চামড়ার জয়ঢাক নিয়ে শিব-আবেশে তাণ্ডবনৃত্যে কীর্তন করতেকরতে স্বয়ং বিশ্বনাথের মাথার উপর উঠে পড়েন! ওই দৈবীভাবের আবেশ দেখে হাজার পাঁচেক ভক্ত হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকেন।

            নেতাজী সুভাষচন্দ্রের পিতৃদেব স্বনামধন্য জানকীনাথ বসুর আহ্বানে ২৫০ জন ভক্তসহ পুরীধামের আর্মষ্ট্রং রোডের সুভাষচন্দ্রের পিতামহের নামাঙ্কিত ‘হরনাথ লজে’ অবস্থানকালে  প্রতিদিন ভোরবেলা কীর্তনদল নিয়ে পরিক্রমায় বের হতেন কিশোরীমোহন। ওই সময়কালে ঠাকুরের ইচ্ছায় অন্যান্য কীর্তনদলেরাও বিবিধ বাদ্যযন্ত্রের ঐকতানিক মূর্ছনায় নব-নব ছন্দের কীর্তনের আঙ্গিক পরিবেশন করে সমগ্র পুরীধামকে মাতিয়ে তুলেছিলেন।

        ঠাকুরকে ঠাকুর হিসেবে মেনে নেবার পর থেকে কিশোরীমোহন ছিলেন ঠাকুর অন্ত প্রাণ। ঠাকুরের আদেশ পালনই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত। ১৩৪৯-১৩৫০ সনের দুর্ভিক্ষের সময় তিনি ঠাকুরের আদেশ পালনের জন্য ধামা নিয়ে বাড়ী বাড়ী ঘুরে ভিক্ষে করে হিমাইতপুর সংলগ্ন প্রায় ৪০টি গ্রামের নিরন্ন মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিয়েছিলেন। নিজেকে অর্ধাহারে, অনাহারে রেখে দুর্ভিক্ষ-পীড়িত মানুষদের বাঁচাতে গিয়ে যে অমানুষিক পরিশ্রম তিনি করেছিলেন সেই কারণে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

        মন্বন্তরের দুর্দিন কেটে যেতেই আর এক দুর্দিনের ঝড় আছড়ে পড়লো হিমাইতপুরের ঠাকুরবাড়ীর আশ্রমে। ১৮ই বৈশাখ ১৩৫১।  সকাল থেকেই শরীরটা খারাপ। ঠাকুরও সেদিন অসুস্থ ছিলেন।  ডাঃ প্যারীমোহন নন্দী দুজনকেই প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র দিচ্ছেন। সারাদিন কোনভাবে কাটল। সন্ধ্যা প্রার্থনার পর সকলের সাথে পূজনীয়া বড়মাও এলেন কিশোরীমোহনকে দেখতে। বড়মাকে প্রণাম জানিয়ে উপস্থিত স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদি পরিবারের উদ্দেশ্য বললেন, ‘‘আমি চললাম, তোমাদের ঠাকুর আছেন—কোন ভাবনা নেই। তোমাদের অভাবও নেই, মজুতও নেই। অতিথি এলেও ফিরে যাবে না,—আর চোর এলেও চুরি করার কিছু পাবে না।’’

        ভক্তবীর কিশোরীমোহন ধ্যানাসনে বসে পরমপিতার পরমআশ্রয়ের মহাচেতনসমুত্থানে বিলীন হন।            

।। আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী ।।

            শ্রীশ্রীঠাকুরের সৎসঙ্গ  আন্দোলনের তৃতীয়তম সেনাপতি এবং প্রথম প্রচারক,  চৈতন্য মহাপ্রভুর লীলাপার্ষদ অদ্বৈত মহাপ্রভুর পঞ্চদশতম  বংশধর সতীশচন্দ্র গোস্বামী পাবনা জেলার অন্তর্গত শালগাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন ১২৮১ বঙ্গাব্দে।  ইংরেজী শিক্ষা সমাপন করে ভর্তি হয়েছেন পাবনার টোলে। অনুকূল তখন পাবনা ইনস্টিটিউশনের ছাত্র। বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথে কিশোর ঠাকুরকে দেখতেন। কোন এক সম্মোহনী আকর্ষণে বার বার দেখতে ইচ্ছে করত। সেই ইচ্ছেটা মনে পুষে রেখেই আপাত-বিচ্ছেদ  হয়। গুরু বংশের সন্তান।  টোল থেকে বিদ্যারত্ন উপাধি পেয়ে আধ্যাত্মিক ভাবনায় ডুবে যান। সাধন-ভজন করেন। বংশানুক্রমিক শিষ্যদের ভালোমন্দ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। তাদের বাড়ীতে বাড়ীতে যেতে হয়।  বৈরাগী মন নিয়ে কিছুতেই সংসারে বদ্ধ হতে চাইছেনা। দেখতে দেখতে বয়স ত্রিশের কোঠায় পা দিল। অনেক হয়েছে ! না আর কোন বাঁধাই মানবেন না দাদা মুকুন্দচন্দ্র। ভেতরে ভেতরে ঠিক করে ফেলেছেন। কাশীপুরের মহানন্দ চৌধুরীর কনিষ্ঠা কন্যা ইন্দুবাসিনীর সঙ্গে সতীশচন্দ্রের বিয়ের।

        শিষ্য বাড়ী পরিক্রমা সেরে সতীশচন্দ্র বাড়ী ফিরছেন। আঙিনায় সামিয়ানা। নহবৎ বসেছে। অনুসন্ধান করে জানতে পারেন পরের দিন তাঁর বিয়ে। তিনি বিয়ে করবেন না ঠিক করেই রেখেছিলেন। তাকে না জানিয়ে এই বিয়ের আয়োজন কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারছিলেন না। পারিবারিক ঐতিহ্যের মানসম্মানের কথা চিন্তা করে অভিভাবকদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধাচরণও করতে পারছেন না। এক উভয় সংকটের চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। অনেকদিন পর দেখা পেলেন পাবনার টোলে পড়ার সময়ে দেখা সেই কিশোরের। অপূর্ব জ্যোতির্ময় রূপে অবচেতনে দর্শন দিয়ে গভীর মমতায় মাথায় হাত রেখে বললেন,—‘ভোগের দ্রব্য সম্মুখে রেখে ত্যাগই ত্যাগ। নতুবা ত্যাগ ভ্রান্তিমাত্র।’ চকিতে ঘুম ভেঙে যায়।   মনের মণিকোঠায় জমে থাকা সকল দ্বন্দ্বের অবসান হয়ে এক চরম প্রাপ্তির আনন্দে মন ভরে ওঠে সতীশচন্দ্রের। ভোর হতেই নহবতে বেজে ওঠে বসন্ত বাহারের সুর লহরী। বিয়ের সকল মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সমাপন হয়। অভিভাবকেরা দুশ্চিন্তা মুক্ত হন।

         বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেও ক্ষুদ্র সংসারের বন্ধনে আবদ্ধ হননি।  বৃহত্তর পরিবেশের সেবা নিয়েই তিনি ব্যস্ত। পারিবারিক শিষ্যদের বিপদে-আপদে ছুটে যেতে হয় দূরদূরান্তে। মাঝেমধ্যেই । তার ওপর বাড়ীতে বারো মাসে তেরো পার্বন লেগেই আছে। শ্রীকৃষ্ণের দ্বাদশ যাত্রার রাস, রথ, দোল, ঝুলন ইত্যাদি উৎসব উদযাপন করতে হয়।  অগণিত শিষ্য সমাগম লেগেই থাকে। এই সব হুড়হাঙ্গামা নিয়ে দেখতে দেখতে কেটে গেল ছ-ছটি বছর। এত চাপ  থেকে বিরাম নিতে এবার একটু তীর্থ যাত্রায় বেরোতে মনস্থ করেন।

            ১৩১৯ বঙ্গাব্দের কার্ত্তিক মাসে তীর্থ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে বাজিতপুর ঘাটে আসেন স্টীমার ধরতে। স্টীমার আসতে দেরি আছে শুনে শিষ্য পুলিন ঘোষ তার বাড়ীতে নিয়ে যান বিশ্রামের জন্য। পুলিনের ঘরে ঢ়ুকেই দেখতে পান বেড়ার গায়ে টাঙানো একটি বাণী। ‘ভোগের দ্রব্য সম্মুখে রেখে ত্যাগই ত্যাগ। নতুবা ত্যাগ ভ্রান্তিমাত্র।’ বাণীটি তরঙ্গ তোলে তাঁর অন্তর্জগতে। মনে পড়ে যায় বিয়ের আগের রাতের স্বপ্নের কথা। শিষ্যকে জিগ্যেস করলে পুলিন ইতস্তত করে জবাব দিতে যাবেন এমন সময় সৌম্য দর্শন ২৩-২৪ বছরের এক তরুণ সব ইতস্ততার অবসান করে সতীশচন্দ্রকে পরম আবেগে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, কেন দাদা, কথাটা কি ভুল বলেছি‍?  ‍‍‌‍‍

       দাদা আর কি বলবেন, দাদার তখন বাকরুদ্ধ অবস্থা।  এ তো সেই আকর্ষণকারী পাবনার কিশোর! টোলে যাতায়াতের পথে যার সাথে মাঝে মাঝে দেখা হতো!  এ তো সেই স্বপ্নে সমাধানদাতা জ্যোতির্ময় মানুষটি! এক স্বর্গীয় আনন্দের বিহ্বলতায় একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন সতীশচন্দ্র। শিষ্য পুলিন বলে ওঠে, এঁর নাম অনুকূলচন্দ্র চক্রবর্তী, হিমাইতপুরে থাকে, আশেপাশের গ্রামের অনেকেই ঠাকুর বলে ডাকে, অসীম ভক্তি করে। ঠাকুর আবদারের সুরে সতীশচন্দ্রকে বলেন, দাদা, আমার তো মনে হয় আপনি আমার জন্ম-জন্মান্তরের বড় ভাই ছিলেন। যাবেন নাকি একবার আমাদের কীর্তনের আসরে, কিশোরী বৈরাগীর বাড়ীতে ?  সতীশচন্দ্র অনুকূলচন্দ্রের মধুর আবদারের উত্তরে বলেন, আমি তো তীর্থযাত্রার সঙ্কল্প নিয়ে বেড়িয়েছি, আজ আর যাওয়া হবে না, তীর্থ সেরে ফেরার পথে কীর্তনের আসরে যাব। ঠিক আছে দাদা, আমার কথা ভুলে যাবেন না কিন্তু।   

            মনকে  কিছুতেই বাগ মানানো যাচ্ছে না। তীর্থে গিয়ে তীর্থপতি দেবতার ধ্যান করতে গেলেই ভেসে ওঠে অনুকূলচন্দ্রের জ্যোতির্ময় অবয়ব, অঞ্জলি দিতে গিয়ে দেখেন অঞ্জলি দিচ্ছেন তাঁরই পাদপদ্মে।  শ্রবণে ঝঙ্কৃত হয় আবেগ ভরা আকূল আহ্বানের  সুর, ‘দাদা, আমার কথা ভুলে যাবেন না কিন্তু’।

            না, তীর্থে আর মন বসছে না। সমস্ত মনটাকে দখল করে নিয়েছে ওই অনুকূলচন্দ্র। তীর্থযাত্রা অসমাপ্ত রেখেই ফিরে আসেন। বাজিতপুর স্টীমার ঘাটে নেমে দেখেন পুলিনেরভাই মুকুন্দ দাঁড়িয়ে। অনুকূলচন্দ্র তাঁকে পাঠিয়েছেন কিশোরীমোহনের বাড়ীতে নিয়ে যাবার জন্য। ‘অনুকূলচন্দ্র জানলেন কি করে যে আমি এই স্টীমারেই ফিরব!’ সতীশচন্দ্র স্তম্ভিত! মুকুন্দকে অনুসরণ করতে করতে অগ্রসর হতে থাকেন, দূর থেকে ভেসে আসছে সংকীর্তনের সুর, ‘‘এসো গৌরাঙ্গ নদীয়ার চাঁদ হে——’’ শুনতে শুনতে পৌঁছে যান কিশোরী বৈবাগীর কীর্তনের আঙিনায়।  সন্ধ্যা সমাগত। তখনও সান্ধ্যদীপ জ্বলেনি।

       সতীশচন্দ্র ঘরে ঢুকতেই সবাই উঠে দাঁড়লো। অনুকূলচন্দ্র এগিয়ে এসে সতীশচন্দ্রকে পাশে বসান। বলেন, এসেছেন দাদা, চলুন এবার কীর্তন করা যাক, কীর্তনের আগুন জ্বালিয়ে দিন। কিশোরীমোহন ‘শ্যামগরবেগরবিণী রাধা রাধা………….’ বাণী সহযোগে গান ধরেন। ঘরে বসে নিবিষ্ট মনে শুনছিলেন সতীশচন্দ্র। হঠাৎ অনুকূলচন্দ্র হাত ধরে ঠেলে দেন আঙিনার কীর্তনের আসরে। নিজেও ঝাঁপিয়ে পড়েন কীর্তনে। গোঁসাইয়ের হাত ধরে শুরু করেন নৃত্য। কিশোরীমোহনও ঊর্দ্ধে বাহু তুলে শুরু করেন তাণ্ডব-নৃত্য। কীর্তনের আবেশে অপূর্ব ভঙ্গিমায় নেচে চলেছেন অনুকূলচন্দ্র। মুহুর্মূহু শরীরের রঙ পরিবর্তন হচ্ছে। রামধনু রঙের সাতটি রঙে রঞ্জিত হচ্ছে দেহখানি। তুমুলবেগে কীর্তন চলছে। ভাববিহ্বল অনুকূলচন্দ্র অবিরাম নৃত্য করতে করতে ভূমিতে পড়ে যান। বাহ্যজ্ঞানশূন্য।ভক্তরা ধরাধরি করে শুইয়ে দেন। দেহে জীবনের লক্ষণ নেই। তাঁর ভাবসমাধি হয়েছে বুঝতে পেরে ভক্তের দল তন্ময় হয়ে প্রচণ্ড বেগে কীর্তন করতে থাকেন। তাঁর নিস্পন্দ দেহে হঠাৎ স্পন্দন শুরু হয়। ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটি থর্ থর্ করে কেঁপে ওঠে। ক্রমে ক্রমে হাত-পায়ের চারিটি বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দ্রুতবেগে কাঁপতে শুরু করে। ধীরে ধীরে স্তিমিত হয় কম্পন। শুরু হয় আসন।  অভিনব মুদ্রায়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অপূর্ব বিন্যাসে  আসন হয়ে চলেছে ।  দেখে মনে হলো দেহে অস্থি-র কোন অস্তিত্ব নেই। শ্রমসাধ্য, আয়াসসাধ্য, প্রায় শতাধিক রকমের  আসন হবার পরে পুনরায় নিথর-নিশ্চল  মৃতবৎ হয়ে ভূমিতে পড়ে থাকেন। উচ্চারিত হতে থাকে গভীর তাৎপর্য্যপূর্ণ অসংখ্য বাণী। অনেকক্ষণ ধরে বাণী প্রদান করার পর ধীরে ধীরে লীলাথেকে প্রত্যাবর্তন করেন নিত্য জগতে। নিষ্প্রাণ দেহে ফিরিয়ে আনেন প্রাণের স্পন্দন। উচ্চকণ্ঠে চীৎকার করে বলেন,—‘জল—জল—আমি জল খাব, গোঁসাইর হাতে পদ্মার জল খাব। গোস্বামী সতীশচন্দ্র পদ্মায় ডুব দিয়ে ঘটি করে জল নিয়ে আসেন। জল পান করে তৃপ্ত হন তাঁর প্রাণের দেবতা অনুকূলচন্দ্র। সহজভাবে কথাবার্তা বলতে শুরু করেন। সেদিনের মত কীর্তনের আসর সাঙ্গ হয়। যে যার বাড়ীতে ফিরে যায়। অনন্তনাথেরসাথে গোঁসাই গেলেন কাশীপুরের শ্বশুর বাড়ীতে। সারারাত ঘুমাতে পারেন নি। তাঁর দেহমনপ্রাণ জুড়ে রয়েছেন অনুকূলচন্দ্র। পরমপুরুষ ব্যতীত অমন নির্বিকল্প সমাধি তো কোনো সাধকের হয় না! একমাত্র অবতার পুরুষই নিত্য হতে লীলা, লীলা হতে নিত্যে সহজ আগম-নিগম করতে পারেন। গোঁসাই উল্লসিত পরম আরাধ্য পুরুষোত্তমের সন্ধান পেয়ে।    

            ভোরে উঠে পুকুরে স্নান সেরে স্বহস্তে মাটির শিবমূর্তি গড়ে পুজো করে অঞ্জলি দিতে গিয়ে দেখেন, অঞ্জলি গ্রহণ করছেন দয়াল ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। বাড়ী ফিরে রাধাগোবিন্দেরধ্যান করতে গিয়ে ধ্যানে ভেসে ওঠে অনুকূলচন্দ্রের মূর্তি। কৃষ্ণ নাম জপ করতে গিয়ে জপ হচ্ছে অনুকূল নাম। যেদিকে তাকায় সেদিকেই অনুকূল। কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না, পাছে অনুকূল ঢুকে পড়ে মুখের মধ্যে!—সেই আশঙ্কায়!

            চিত্রার্পিতবৎ এক পা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ঠাকুরঘরে।

            ওদিকে অগণিত ভক্তের দল তাদের কুলগুরুকে দর্শন প্রত্যাশায় অপেক্ষা করছেন। ঠাকুরঘর থেকে বেরোচ্ছেন না দেখে চিন্তিত হয়ে পড়েন শ্বশ্রূমাতা রাধারাণী দেবী। ডেকে ডেকেও কোন উত্তর পাচ্চেন না। ‘অতিরিক্ত সাধন-ভজন করে পাগল-টাগল হয়ে গেল না তো জামাই বাবাজীবন!’— অজানা এক আশঙ্কা নিয়ে ছুটে যান দূর সম্পর্কীয় ভাই অনন্তনাথের কাছে। সেও তো সাধন-ভজন করে, সে হয়তো ভাল বুঝবে, সেই আশা নিয়ে! অনন্তনাথ রায় সব শুনে উৎফুল্ল হয়ে চলে আসেন রায়চৌধুরী বাড়ী। গোঁসাই তখনও নিশ্চলভাবে দণ্ডায়মান। অনন্তনাথ ওইঅবস্থা দেখে জড়িয়ে ধরে নাচতে থাকেন  মহানন্দে। বললেন, ‘‘হয়েছে তো ? এবার চল, জায়গামত যাওয়া যাক্।’’ বলে গোঁসাইকে নিয়ে এলেন নিজের বাড়ীতে । দুজনেই স্বপাকী। একবেলা করে খান।  মহারাজের হবিষ্যান্নের রান্না করাই ছিল। দুজনে মিলে তাই খেয়েছেন। হাত-মুখ ধুয়ে ঠাকুরের কাছে যাবেন মনস্থ করেছেন। এমন সময় শুনতে পান মধুর সুরে ধ্বনিত হচ্ছে—

                    ‘‘সর্ব্ব ধর্ম্মান্পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ

                        অহং ত্বাং সর্ব্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচ।’’

আবৃত্তি করতে করতে ঠাকুর এসে ঢুকলেন অনন্তনাথের বাড়ীতে। গোঁসাই জড়িয়ে ধরেন তাঁর শ্রীপাদপদ্ম। ঠাকুর গোঁসাইকে বুকে তুলে জড়িয়ে ধরেন। ঠাকুরের আদেশে আবার আহারের আয়োজন করেন অনন্তনাথ।   দুধ, চিড়ে, মুড়কি, কলা, বাতাসা, রসগোল্লা সহযোগে তিনজনে মিলে একসঙ্গে খেলেন।

            ওদিকে দলবল নিয়ে কীর্তন করতে করতে হাজির হয়েছেন কিশোরীমোহন, অনন্তনাথের আঙিনায়।    সেই কীর্তনীয়াদের ফলারের সেবা দিয়ে তুষ্ট করে ঠাকুর দুজনকে নিয়ে যোগ দেন কীর্তনে।  জমে ওঠে কীর্তন।  ঠাকুর সেদিন দু-বার সমাধিস্থ হয়েছিলেন।

            কীর্তনানন্দ সাঙ্গ হলে গোঁসাইকে সাথে করে নিয়ে আসেন ঠাকুর। মাতা মনোমোহিনী দেবী সাদরে বরণ করে নেন তাঁর আর একটি ছেলেকে। পাশাপাশি বসিয়ে দু’-জনকে খাওয়ান।  আহারাদি পর্ব মিটিয়ে গোঁসাইকে নিয়ে বসলেন পদ্মার ধারে নিমতলায়। গভীর রাত। চারিদিকে দুর্ভেদ্য বন, দুর্ভেদ্য অন্ধকার। ঝিঁ-ঝিঁ-র কলরব, রাত্রিচরা খেচর, শ্বাপদ ভূচরদের নানা অভিব্যক্তির ধ্বনি, মহাকাশে নক্ষত্ররাজিদের সাক্ষী রেখে কালীপূজায় সিদ্ধ গোঁসাইকে দশমহাবিদ্যার স্বরূপ বর্ণনা করেন। তন্ত্রমতের বীরাচার, দিব্যাচার, পঞ্চ-ম’কার, ষটচক্রের সব রহস্য ভেদ করে যখন উন্মোচন করে দিচ্ছেন ঠাকুর। গোঁসাই তন্ময় হয়ে শুনছেন, আর দেখছেন, জ্যোতির্ময়ী রূপে স্বয়ং জগজ্জননী স্বয়ং তাঁর সাধনার স্বরূপ বর্ণনা করছেন। গোঁসাই যে যে মন্ত্র জপ করতেন সব মন্ত্রের নিগূঢ় তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে দেন ঠাকুর। ঠাকুরের আদেশে জপধ্যান শুরু করেন গোঁসাই। ঠাকুর অপলকে তাকিয়ে থাকেন গোঁসাইয়ের মুখের দিকে। মুহূর্তের মধ্যে ঊর্দ্ধগামী হয় সুরত।  ষট্চক্র সপ্তস্বর্গ ভেদ করে ‘‘কত নাদ, কত ধ্বনি পার হয়ে গেল, কত অপরূপ জ্যোতিঃ তরঙ্গের খেলা…….সম্মুখে ক্ষীরোদাবর্ণশায়ী হিরণ্যগর্ভ পুরুষ—যাঁর অঙ্গজ্যোতিঃ দিকে-দিগন্তে বিচ্ছুরিত হ’য়ে কোটি ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি করছে—যাঁর প্রতি রোমকূপে হিরণ্যবর্ণ জ্যোতিষ্ক-মণ্ডলী—যাঁর চতুষ্পার্শ্বে ধ্বনিত হচ্ছে এক অশ্রুতপূর্ব নাদব্রহ্ম—এ কি! এই পুরুষই তো অনুকূলচন্দ্র! বাহ্য সম্বিৎ হারিয়ে ফেলেছেন গোঁসাই!’’ ঠাকুর ডাক দিয়ে তাঁর সম্বিৎ ফিরিয়ে দেন। জপ-ধ্যান তখনও চলছে। কিন্তু রকমটা ভিন্ন। শুরু করেছিলেন নিজের ইষ্টমন্ত্র জপ, আর কৃষ্ণ-মূর্তি ধ্যান দিয়ে। আর এখন জপ করছেন এক নতুন অজানা নাম, ধ্যান করছেন অনুকূলচন্দ্রের মূর্তি। ঠাকুর গোঁসাইকেনিয়ে গেলেন বাড়ীর ভিতরে।

            ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৩২১ বঙ্গাব্দ। ঠাকুর এই প্রথম নিজে সৎমন্ত্রে দীক্ষা দান করেন গোঁসাইকে। সাধন জগতে নবজন্ম লাভ করেন গোঁসাই। ঠাকুর  তাঁর ভাগবৎ আন্দোলনের তৃতীয়তম সেনাপতিকে যূথবদ্ধ করলেন।

*      *     *

            সতীশচন্দ্র গোস্বামী দীক্ষা নিয়ে ফিরে এলেন নিজগৃহে শালগাড়ীয়ায়। ঠাকুর প্রদর্শিত পদ্ধতিতে সাধন-ভজন করছেন। কিন্তু কোথায় গেল সেই আনন্দ, সেইদর্শণ, শ্রবণ, অখণ্ড জ্যোতির রাজ্য—দীক্ষা গ্রহণের আগের রাতে পদ্মাপাড়ের নিমতলায় বসিয়ে যা দেখিয়েছিলেন পরম দয়াল!—সেখানে তো আর পোঁছান যাচ্ছে না! কঠোর সাধনা শুরু করলেন গোঁসাই। জ্যৈষ্ঠ শেষ হয়ে আষাঢ়ও চলে গেল। চলছে বিরতিহীন তপশ্চর্যা।  ওদিকে ঠাকুর ব্যাকুল। লোকের পর লোক পাঠাচ্ছেন। সবাই ফিরে এসে বলছেন তাঁর নাম-ধ্যানে ডুবে থাকার কথা।

            ৬ই শ্রাবণ, ১৩২১। কিশোরীমোহনের কীর্তনের আঙিনায় সমবেত হয়েছেন ভক্তবৃন্দ। গোঁসাই আসেন নি।  অন্তরঙ্গ ভক্ত যতীশ ঘোষের কাছে সন্ধান নিয়ে জানলেন যে, গোঁসাই কঠোর সাধনায় মগ্ন। গোঁসাইয়ের জন্য ঠাকুরের কেন এত ব্যাকুলতা, অদ্বৈতবংশের সন্তান বলে—সে কি অদ্বৈত প্রভু— ভক্ত কিশোরীমোহন মনের এই জিজ্ঞাসার উত্তরে সেদিনের সমাধি অবস্থায় ঠাকুর বলেছিলেন—‘‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাই। অদ্বৈত মহাপ্রভু। ও ঝাঁপ দিলে প্রকৃত প্রচার আরম্ভ।’’

            পরদিন মহারাজ, কিশোরীমোহন এবং কীর্তনদল সাথে নিয়ে ঠাকুর নিজেই গেলেন গোঁসাইয়ের বাড়ীতে। ‘‘গোঁসাইবাড়ীতে কীর্ত্তন জমে উঠলো। প্রবল বিক্রমে নৃত্য করছেন কিশোরীমোহন। উড়ছে মাথার চুল—তরঙ্গায়িত হচ্ছে গোঁফদাড়ি। কখনও সামনে এগিয়ে আসছেন, কখনও পিছিয়ে যাচ্ছেন, কখনও হুঙ্কার করে ঢাকের উপরে লাফিয়ে উঠে নৃত্য করছেন। নৃত্য করছেন মহারাজ—তালে-তালে প্রতি উল্লম্ফনে মানুষের বুক পর্য্যন্ত উঁচুতে উঠছেন, অথচ হাঁটু ভাঙ্গছে না, পা বেঁকে যাচ্ছে না, রবারের মূর্ত্তির মত মাটিতে ঠেকার সঙ্গে-সঙ্গে শূন্যে লাফিয়ে উঠছেন, ধ্যান স্তিমিত নেত্র, হাস্যময় প্রশান্ত মুখ। গোঁসাইও যোগ দিয়েছেন কীর্ত্তনে—তুমুল তাণ্ডব নৃত্য, কণ্ঠে প্রলয়ের হু-হুঙ্কার, কখনও ঢাকশুদ্ধ ঢাকীকে বন্ বন্ করে ঘোরাচ্ছেন, কাউকে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে আবার লুফে ধরছেন, কারও কাঁধে উঠছেন, কাউকে কাঁধে করছেন—শিবতাণ্ডবের দুরন্ত রূপ। হেলে দুলে’ নাচছেন ঠাকুর। দেহে জ্যোতিঃ তরঙ্গের খেলা, সর্ব্ব অবয়বে লক্ষ বীচিমালা­—অস্থিহীন, গ্রন্থিহীন অপরূপ ছন্দোময় মনোহর নৃত্য। ভক্তগণ বাহ্যশূন্য—নামরোলে দিগন্ত প্রকম্পিত। সমাধিস্থ হয়ে পড়লেন দয়াল ঠাকুর। মহা ভাববাণী উচ্চারিত হ’ল—‘‘কর্ম্ম, কর্ম্ম চাই, কর্ম্ম। যত কর্ম্ম, তত অগ্রসর। তোরা কি জানিস্ ? ভগবানের বাহু। প্রচার করতে তোদের তৈরী, কুড়িয়ে নিতে। ঐ শোন্, ঐ দ্যাখ, পূর্ণত্ব প্রাপ্তি অতি নিকটে।’’ (১২শ দিবস, ৭ই শ্রাবণ, ১৩২১)

            সেদিনের সেই সমাধির বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তেই শালগাড়িয়াসহ পার্শ্ববর্তী গ্রাম সিংগা-র অগণিত নরনারী ভুলুণ্ঠিত হলো দয়াল ঠাকুরের চরণকমলে। ঠাকুর গোঁসাইকে সাথে নিয়ে সদলবলে ফিরে এলেন হিমাইতপুরে।

            ঠাকুরগত প্রাণ গোঁসাই, ঠাকুরের চরণে সৎনাম ও সদগুরুর মহিমা প্রচার করার অনুমতি প্রার্থনা করলে ঠাকুর বলেন, প্রথম প্রচারকের দায়িত্ব কিন্তু অনেক, বহু সইতে হয় প্রথম পথিকৃৎকে। উত্তরে গোঁসাই বলেন, সদগুরু, পুরুয়োত্তমের  মাহাত্ম্য প্রচারের বিনিময়ে রোগ-শোক-দারিদ্র্য-যন্ত্রণা সারাজীবন মেনে নিতে আমি প্রস্তুত।  ঠাকুর গোঁসাই ও মহারাজের দীক্ষা দেওয়ার অনুমতি আনিয়ে দেন আগ্রা সৎসঙ্গ থেকে। তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার নিরিখে পরমপুরুষ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রকে এ যুগের মানুষের একমাত্র ধ্যেয়, সাধ্য, আরাধ্য নররূপী ভগবানরূপে প্রচার শুরু করেন গোঁসাই। পূর্বে নিজে গুরু হয়ে দীক্ষা দিতেন, এখন জগদ্গুরু অনুকূলচন্দ্রের প্রতিনিধি স্বরূপ দীক্ষা দিতে শুরু করেন।  বংশগত শিষ্য বাড়াদি গ্রামের জমিদার ও ব্যবসায়ী কুণ্ডুবাড়ীর বরোদাবাবুর ভাই গোপেন্দ্রনাথ সাহা (খোকা ডাক্তার)-কে প্রথম দীক্ষা দান করেন। ক্রমশঃ ছোট উপেন, বড় উপেন, ভোলা, দয়াল, মন্মথ, জগ, নন্দ, পতিত হরিপদ সহ কুণ্ডুবাড়ীর নারী-পুরুষ  নির্বিশেষে আরো অনেকে। দীক্ষা গ্রহণ করেন বাড়াদীর অন্যতম ধনী ব্যবসায়ী কুঞ্জ রায়চৌধুরী, কৃষ্ণ রায়চৌধুরী ও বসন্ত রায়চৌধুরী। সূত্রপাত হয় বহুধাবিস্তৃত সৎসঙ্গ আন্দোলনের।

            ঠাকুরগত প্রাণ সতীশচন্দ্র শুরু করলেন প্রচার পরিক্রমা। জগতী, বাড়াদী, চোরাহাঁস, বারখাদা, ঘোড়ামারা প্রভৃতি অঞ্চলে দীক্ষা দান করে প্রচার সেরে পাবনায় ফিরে আসেন গোঁসাই। প্রতাপপুরের শিষ্যদের দীক্ষা দান করে মেতে ওঠেন কীর্তনানন্দে। পাবনা জেলার হিমাইতপুর, মাঝিপাড়া, ছাতনী, কাশীপুর, নাজিরপুরের মানুষ ইতিপূর্বে ঠাকুরের অনুরাগী হয়েছেন। এবার সদগুরুর নাম প্রচারের কীর্তনের প্লাবনে   রাধানগর, সিঙ্গা, শালগাড়ীয়া, কুলনীয়া, দোগাছি, চিথলিয়া, ভাঁড়ারা, সুজানগর, সাতবাড়িয়া, কামারহাট, নাজিরগঞ্জ প্রভৃতি গ্রামগুলোকে প্লাবিত করতে শুরু করেন। কখনো এককভাবে কীর্তনদল নিয়ে বেরোতেন। কখনো কিশোরীমোহন, অনন্তনাথ দলবল নিয়ে যোগ দিতেন। আবার কখনো কখনো ভক্তদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতে বাঞ্ছাকল্পতরু দয়াল ঠাকুর নিজেও যেতেন। শত শত মানুষ শ্রীশ্রীঠাকুরের চরণে আত্মসমর্পণ করে ধন্য হন। বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে পুরুষোত্তমকেন্দ্রিক-গণ-আন্দোলন।

  *      *      *

        ১৩২২ সালের শীতকাল। কুষ্ঠিয়ার বাড়াদিতে প্রচারে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন  সতীশচন্দ্র গোস্বামী। দেখতে দেখতে ৪২দিন হয়ে গেল। খোকা ডাক্তার নিজে তো দেখছেনই, কুষ্ঠিয়ার বিশিষ্ট চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্রও বিফল হতে বসেছে। হাত নাড়ানোর শক্তি পর্যন্ত নেই গোঁসাইয়ের। হিমাইতপুরে সংবাদ গেল ঠাকুরের কাছে। খবর পাওয়ার সাথে সাথে চলে আসেন অনন্তনাথ, কিশোরীমোহন ও শ্রীশ্রীঠাকুর কীর্তনের দলবল নিয়ে। ষ্টীমার থেকে নেমেই কিশোরীমোহন কীর্তন নিয়ে রওনা হলেন বাড়াদীর উদ্দেশ্যে। খোল, করতাল, শিঙ্গা, ঢাকের বাদ্যি সহযোগের কীর্তনের আওয়াজ কানে যেতেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন গোঁসাইয়ের পরিচর্যাকারী শিষ্যের দল। এই প্রচণ্ড শব্দে গুরুদেবের হৃদস্পন্দন যদি বন্ধ হয়ে যায়! সবাই মিলে থামাতে চেষ্টা করে কীর্তন। কিন্তু বহু কণ্ঠের নামধ্বনি, কিশোরীমোহনের সিংহবিক্রমে হুঙ্কার গর্জনকে থামাবে সাধ্য কার !

            গোঁসাইয়ের ঘরের সামনের উঠানে শুরু হলো তুমুল কীর্তন। বাড়ির লোকেরা গোঁসাইকে ঘিরে বসে। হঠাৎ, কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে গোঁসাই এক লাফে চৌকি থেকে নেমে দৌড়ে কীর্তনদলের মাঝখানে ঢুকে দু-হাতে দুজন  ঢাকীসহ ঢাক উঁচুতে তুলে ধরে বন্ বন্ করে ঘোরাতে শুরু করেন। কণ্ঠে ভীম গর্জন। সবাই ভাবলো রোগবিকারে বুঝি এরকম করছেন। এবার আর রক্ষা করা যাবে না। পড়বেন আর মরবেন। কিন্তু গোঁসাই পড়লেনও না, মরলেনও না।    ইতিমধ্যে অনন্ত মহারাজও উপস্থিত হয়েছেন ঠাকুরকে নিয়ে ঘোড়ার গাড়ীতে করে। তাঁরাও যোগ দিলেন। যেন হিরণ্যগর্ভ পুরুষকে ঘিরে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের আনন্দ-উল্লাস! যেন মহাপ্রভু গৌরাঙ্গসুন্দরকে আবেষ্টন করে অদ্বৈত-নিত্যানন্দ-হরিদাস প্রমুখ ভক্তদের বিচিত্র কীর্তনলীলা ! কীর্তনের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তেই মূর্খ-পণ্ডিত-ধনী-নির্ধন-জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে কীর্তনের আসরে সমবেত হয়ে মেতে উঠল কীর্তনানন্দে। ছুটে এল গৃহপালিত পশুর দল। কীর্তনীয়াদের সাথে তালে তালে নাচতে লাগলো। গাছের ডালগুলোও আনন্দে আত্মহারা। নুয়ে পড়ে স্পর্শ করছে কীর্তনীয়াদের দিব্যতনু। কীর্তন শেষ হলে সকলেই লুটিয়ে পড়েন শ্রীশ্রীঠাকুরের রাতুল চরণে। ঠাকুর তাঁর গোঁসাইদার গলা ধরে প্রদক্ষিণ করেন বাড়ীটাকে। পূর্ণ সুস্থ হলেন গোঁসাই দয়ালের অঙ্গস্পর্শে। 

।। কুষ্টিয়ায় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ভাবধারার প্রচার ।।

         হিমাইতপুরের সেই স্বনামধন্য ডাক্তার অনুকূলচন্দ্র ডাক্তারী ছেড়ে কীর্তনে মাতোয়ারা হয়ে নিজেকে প্রকাশ করলেন বিশ্বের সেরা চিকিৎসক রূপে। অনুকূলরূপী বিশ্বাত্মার নিত্য হতে লীলায়, লীলা হতে নিত্যে, আগম-নিগমের বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল কুষ্টিয়ার চারিদিকে। কুষ্টিয়ার স্বনামধন্য শ্রীহরিশ্চন্দ্র রায়, উকিল। ডাঃ গোকুলচন্দ্র মণ্ডল, এল-এম-এস। শ্রীত্রৈলোক্যনাথ সেন, উকিল। শ্রীবীরেন্দ্রনাথ রায়, মোক্তার। ডাঃ সতীশচন্দ্র জোয়ারদার, এল-এম-পি। শ্রীঅশ্বিনীকুমার বিশ্বাস, মোক্তার। শ্রীযোগেন্দ্রনাথ সরকার, এম-এ, বি. এল। শ্রীপ্রমথনাথ শিকদার, বি. এল.। শ্রীপূর্ণচন্দ্র সাহা, উকিল। শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র দাস। শ্রীসুশীলচন্দ্র বসু, বি. এ.। শ্রীপূর্ণচন্দ্র কবিরাজ, বি. এ. প্রমুখরা ঠাকুরের সৎমন্ত্রে গোঁসাইবাবার মাধ্যমে দীক্ষা নিলেন। দীক্ষা নিলেন আপামর সাধারণ মানুষেরা।

       ১৩২২ সাল। কুষ্টিয়া শহরের ভক্তরা মেতে উঠেছেন কীর্তন আনন্দে ।  ডাঃ সতীশচন্দ্র জোয়ারদারের আগ্রহ আতিশয্যে তাঁর কলাবাগানের বাগানবাড়িতে স্থাপিত হয় প্রথম আশ্রম। ঠাকুরের আদেশক্রমে গোঁসাইবাবা  সেই আশ্রমে থেকে নাম প্রচার করে চলেছেন। চড়াইখোল, কুমারখালি, খোকসা, জানিপুর, বরৈচারা, আামলাবাড়িয়া, মাচপাড়া, ব্রহ্মপুর—গ্রামের পর গ্রাম কীর্তনের দল নিয়ে ঘুরছেন। আপামর সাধারণ মানুষেরা দীক্ষা গ্রহণ করেছেন। দীক্ষা গ্রহণ করেছেন কুষ্টিয়ার রেলের ইঞ্জিনীয়ার শ্রীশ নন্দী, ওভারশিয়ার প্রমথ গাঙ্গুলী। 

       শুধু দীক্ষা নিয়ে কীর্তন করলেই তো আর হবে না! কীর্তনের যে একটা শক্তি আছে, সৎ নামেরও যে একটা শক্তি আছে, সেটা তো সবার চোখের সামনে তুলে ধরতে হবে।

       কুষ্টিয়ার অশ্বিনী বিশ্বাসের বাড়ীতে কীর্তন চলছে।  খবর পেয়ে দীর্ঘদিন ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত কুষ্টিয়ার ডাকপিওন লক্ষণ ঘোষকে চারজন বাহক খাটিয়ায় করে এনে নামালো কীর্তনের আসরে, গোঁসাইদার পায়ের কাছে। লক্ষণকে বুকে জড়িয়ে ধরে কীর্তন করতে লাগলেন গোঁসাইদা। কিছুক্ষণ পর এক ধাক্কা দিয়ে বাড়ী যেতে বললেন। দিব্যি হাঁটতে হাঁটতে বাড়ী চলে যান লক্ষণ ঘোষ।          বরৈচারার জানকী হালদারের উত্থানশক্তি নেই। আমলা পাড়ার রামকৃষ্ণ বিশ্বাসকে পাঠালেন ঠাকুর জানকী হালদারের চিকিৎসার জন্য। এহেন কঠিন দায়িত্ব পেয়ে ঘাবড়ে যায় রামকৃষ্ণ বিশ্বাস। ঠাকুর তাকে স্পর্শ করে বললেন, “নিশ্চয়ই পারবি তুই। কোন চিন্তা নাই।” ঠাকুরের আদেশে ওই রামকৃষ্ণ বিশ্বাসই বরৈচারার জানকী হালদারের বাড়ীতে গিয়ে রোগীকে ছুঁয়ে নাম করতে করতে রোগীকে আরোগ্য করে ফিরে এসেছিলেন কুষ্টিয়ায়। প্রসঙ্গত বলে রাখি, ওই রামকৃষ্ণ বিশ্বাসই কীর্তন করার অপরাধে গোঁসাইদাকে লাঠি দিয়ে মারতে গিয়ে বিপদে পড়ে যান। গোঁসাইদাকে ছোঁয়ার সাথে সাথে বন্-বন্ করে মাথা ঘুরতে থাকলে হাতের লাঠি ফেলে উন্মাদের মতো চীৎকার করে নাম করতে থাকে। তারপর কাজকর্ম ছেড়ে দীক্ষা নিয়ে গোঁসাইদার সাথে সাথেই কীর্তন করে বেড়াতো।

       তাই, এবার ঠাকুর ঠিক করলেন, আলাদা করে একটা নাম চিকিৎসালয় গড়ে তোলার। কুষ্টিয়ায় একটি দোতালা পাকা বাড়ীতে ১৫-১৬ শয্যাবিশিষ্ট “সৎসঙ্গ প্রাণতত্ত্বানুসন্ধান সমিতি’’ (Life Research Society) শিরোনামে  চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠিত করা হলো। ঠাকুরের বিশেষ প্রশিক্ষণে সতীশচন্দ্র গোস্বামী, রামকৃষ্ণ প্রামাণিক, রাধারমণ জোয়ারদার, সুশীলচন্দ্র বসু, মহম্মদ গহরআলি বিশ্বাস প্রমুখ ভক্তগণ রোগীর শরীরে সৎনামের সঞ্চারনার মাধ্যমে রোগ আরোগ্যকারী শক্তিকে জাগিয়ে অসুস্থদের সুস্থ করে তুলছেন।    সর্পদংশনে মৃত, মেনিঞ্জাইটিসে অচৈতন্য, পক্ষাঘাতগ্রস্ত—এমন অনেক, প্রচলিত চিকিৎসায় ফেরত দুরারোগ্য রোগীদের নাম-সঞ্চারণার মাধ্যমে আরোগ্য করে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিস্ময় সৃষ্টিকারী এক নবীন ধারাকে সংযোজিত করে রেখে গেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।

*      *      *

অবতার বরিষ্ঠমাত্রেই পূর্বাপূর্ব অবতারদের পরিপূরণকারী হন।   ‘‘যেই রাম সেই কৃষ্ণ, এক দেহে রামকৃষ্ণ’’ রূপে এসে বিভিন্ন ধর্মমতের মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য স্থাপনের জন্য গীর্জায় গিয়ে যীশুর, মসজিদে গিয়ে রসুলের আরাধনা করেছিলেন। তিনি লোকশিক্ষার জন্য বহু ধর্মীয় মতবাদের  গুরুদের কাছে দীক্ষাও নিয়েছিলেন গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুন্ন রেখেই। তথাপিও সাধারণ মানুষেরা মনের মণিকোঠায় জমে থাকা  সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ একেবারে মুছে ফেলতে পারে নি। এবার অনুকূলচন্দ্র রূপে এসে ‘‘ঈশ্বর এক, ধর্ম এক, প্রেরিতগণ সেই এক-এরই বার্তাবাহী’’ বাণীর মর্মার্থ বোঝাতে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে ভেদাভেদ ঘোচাতে, এক অভিনব ব্যবস্থা করলেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপনের জন্য কুষ্টিয়ার ভক্তদের  শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীবুদ্ধ, প্রভু যীশু, হজরত রসুল, শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ প্রমুখ পূর্ববর্তী অবতার-বরিষ্ঠদের জন্মোৎসব পালন করতে উৎসাহিত করলেন। ঠাকুরের নির্দেশ মেনে  কুষ্টিয়ার ভক্তরা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয়  ব্যক্তিদের থেকে শুরু করে সাধারণ অনুরাগীদের শ্রদ্ধার সাথে আমন্ত্রণ জানিয়ে আলাপ-আলোচনা-কথকতা ও অন্নব্যঞ্জনাদির সেবার ব্যবস্থা করলেন। এইভাবে পূর্বাপূর্ব অবতার বরিষ্ঠদের জন্মোৎসব পালন করার ফলে সারা কুষ্টিয়ায় এক অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে যায়। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে শ্রদ্ধা-প্রীতির বন্ধন গড়ে ওঠে।

       অন্তরালে থেকে ঠাকুর যে সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতি সংস্থাপনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তার কার্যকারণ বিষয়ে  আলাপ-আলোচনা করতে গিয়ে  কুষ্টিয়ার ভক্তদের  মনে একটা প্রশ্ন জাগে—তাই তো! যার নির্দেশে পূর্ব পূর্ব গুরুদের জন্মোৎসব পালন করছি, যার নির্দেশ মেনে  সমাজে প্রীতি, শান্তি ক্রম-বর্ধমান,  অথচ তাঁর—‘পূবর্তনী পূরণম্ শাশ্বত বর্তমানম্’   যিনি, সেই বর্তমান পুরুষোত্তম, যিনি সব গুরুদের গুরু—বিশ্বগুরু, তাঁর জন্মোৎসব তো পালন করা হয়নি ? এবার তাই করতে হবে ।

       সবাই একবাক্যে রাজী। অতএব আর দেরী নয়, যেই ভাবা, সেই কাজ । ঠাকুরকে না জানিয়ে রচিত হলো আমন্ত্রণ পত্র—‘‘শ্রীশ্রীবিশ্বগুরু-আবির্ভাব মহামহোৎসব’’ শিরোনাম দিয়ে।

।। শ্রীশ্রীবিশ্বগুরু-আবির্ভাব মহামহোৎসব ।।

        “……….বর্তমানকালে ত্রিতাপক্লিষ্ট জগত শান্তি শান্তি করিয়া ব্যাকুল হইয়াছে। সর্বধর্মের সাধক মনীষিগণ এমন এক মহাপুরুষের আবির্ভাব প্রতীক্ষা করিতেছেন যিনি এই ধরাধামে শান্তি-বারি সিচন করিবেন । খৃষ্টান বলিতেছেন যীশু আসিতেছেন, মুসলমান বলিতেছেন ইমাম মেহেদি আসিবেন, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বলিতেছেন মৈত্রেয়ী আসিবেন, হিন্দু বলিতেছেন কে আসিবে জানি না—তবে এক মহাপুরুষের আগমনের পূর্ব লক্ষণসমূহ প্রকাশ পাইতেছে বটে।……..

শ্রীবিবেকানন্দ সর্বধর্ম-সমন্বয়কারী শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকে ‘যে শক্তির উন্মেষমাত্রে দিগ্-দিগন্তব্যাপিনী প্রতিধ্বনি জাগরিতা’ দেখিয়া তাঁহার পূর্ণাবস্থা কল্পনায় অনুভব করিতে বলিয়াছিলেন,–আজি বিশ্বমানবের সেই পরিপূর্ণ মহাশক্তির পূর্ণ লীলা-দর্শনের সময় উপস্থিত। ………..আমরা নগণ্য, ক্ষুদ্র, সাধনসম্পদহীন জীব হইয়াও তাঁহার অহেতুকী কৃপা লাভে ধন্য হইয়াছি বলিয়া উচ্চৈস্বরে ঘোষণা করিতেছি যে যাঁহার সাধনশক্তি যত অধিক, তিনি শ্রীশ্রীবিশ্বগুরুকে তত অধিক পরিমাণে চিনিতে ও জানিতে পারিবেন। অতএব আইস ভাই সকল, আইস বন্ধু সকল, যাহার যেভাবে ইচ্ছা আইস,……..একবার তাঁহার সমীপস্থ হও এবং মহাভাব বা সর্ব্বোচ্চ সমাধি অবস্থা দর্শন ও তদ্বস্থায় ঘোষিত ভাববানী শ্রবণ কর, তৎপর যেরূপ অভিরুচি হয় করিও। ………… (সংক্ষিপ্ত)

               ইতি—

       মহোৎসবের স্থান—কুষ্টিয়া, ই. বি. আর. (নদীয়া)

       তারিখ—২৮ ও ২৯শে ভাদ্র ১৩২৫

       কার্য-বিবরণী—কীর্তন, ধর্মবক্তৃতা, আলোচনা, আবৃত্তি এবং ভোজ্য, পানীয় ও বস্ত্রাদি দ্বারা নর-নারায়ণ সেবা।

                  বিনীত নিবেদকগণ—  
শ্রীহরিশ্চন্দ্র রায়, উকিল । শ্রীগোকুলচন্দ্র মণ্ডল, এল-এম-এস । শ্রীত্রৈলোক্যনাথ সেন, উকিল । শ্রীবীরেন্দ্রনাথ রায়, মোক্তার । শ্রীসতীশচন্দ্র জোয়ারদার, এল-এম-পি । শ্রীঅশ্বিনীকুমার বিশ্বাস, মোক্তার । শ্রীযোগেন্দ্রনাথ সরকার, এম-এ, বি. এল । শ্রীপ্রমথনাথ শিকদার, বি. এল. । শ্রীপূর্ণচন্দ্র সাহা, উকিল । শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র দাস । শ্রীসুশীলচন্দ্র বসু, বি. এ. । শ্রীপূর্ণচন্দ্র কবিরাজ, বি. এ. । (তথ্য সূত্র—ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩১১-৩১২)

       উৎসবের আহ্বায়ক ভক্তগণ শ্রীশ্রীঠাকুরকে বিশ্বগুরু রূপে প্রচার করতে তাঁর ৩০তম আবির্ভাব তিথি স্মরণে কুষ্টিয়ায় ২৯শে ও ৩০শে ভাদ্র ১৩২৫ বঙ্গাব্দে বিশ্বগুরুর বিবরণ দিয়ে উৎসবের আয়োজন সংক্রান্ত মুদ্রিত উক্ত আমন্ত্রণ পত্র বিভিন্ন স্থানে বিতরণ করতে শুরু করেছেন । দেশের জনবহুল স্থানে হোর্ডিং, প্রাচীরপত্র এবং বহুল প্রচারিত পত্র-পত্রিকায় বিজ্ঞাপন মাধ্যমে প্রচার চলছে। ভক্তরা উৎসবকে সফল করতে দিবারাত্র পরিশ্রম করে চলেছেন।

       কিন্তু যাঁকে কেন্দ্র করে উৎসবের আয়োজন, তাঁকেই তো আমন্ত্রণ জানানো হয়নি! চলো সবাই মিলে হিমাইতপুরে। সবাই বললে, চলো, এক্ষুনি চলো।

        কুষ্টিয়ার দাদারা গিয়ে ঠাকুরের কাছ জানালেন সবকিছু।  কুষ্টিয়ার দাদাদের কাছে সব শুনে বাদ সাধলেন ঠাকুর।

        ভক্তদের উৎসাহ বাড়াতে ভক্তদের আয়োজিত কিছু উৎসব-অনুষ্ঠানে ইতিপূর্বে ঠাকুর যোগদান করলেও এবার তিনি গররাজী হলেন। ভক্তদের বললেন—‘‘সে কি কথা ! আমাকে ‘বিশ্বগুরু’ ‘অবতার’ ইত্যাদি বলে প্রচার করা কেন ? আমি কি কোন দিন আপনাদের কাছে বলেছি যে, আমি ‘বিশ্বগুরু’ ‘অবতার’ ইত্যাদি ? আপনারা আমাকে যে ঠাকুর বলেন, তাতেও আমি কত আপত্তি করেছি।  তাও আপনারা গ্রাহ্য করেন নি। শেষে ভেবে নিলাম,–লোকে রাঁধুনি বামুনকেও তো ঠাকুর বলে। আমি বরং সে রকমই একজন। ……আমার জন্মোৎসব বলে প্রচার না করে বরং জনসেবার নামে একটা ধর্মোৎসবের মত করুন। তাহাতে অন্নহীনকে অন্ন, বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দান করে নরনারায়ণের সেবা করুন। ধর্মসভা, কীর্তন, কথকতা প্রভৃতির ব্যবস্থা করুন। সৎ নামের মাহাত্ম্য প্রচার করে মানুষের মনের অজ্ঞান অন্ধকার দূর করুন। ইহাতে আমার আপত্তি নাই, সে তো ভালো কথা, মঙ্গলের কথা, আনন্দের কথা। কিন্তু আমার নামে বা আমার জন্মোৎসব বলে প্রচার করে কোন কিছু করা আমি মোটেই পছন্দ করি না।’’

       ‘‘আপনারা যে আমাকে বিশ্বগুরু বলে প্রচার করতে যাচ্ছেন, বুকে হাত দিয়ে বলুন তো কে আমাকে বিশ্বগুরু বলে উপলব্ধি করেছেন ? ফাঁকির বেলায় লাভ হয় ফাঁকি। আপনাদের কেউ একজন বলুন তো যে আমাকে বিশ্বগুরু বলে বুঝেছেন ?’’

       ঠাকুরের কথা শুনে সকলেই নির্বাক। এ, ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। নিস্তব্ধতা কাটিয়ে ঠাকুর বললেন, ‘‘আজ না জেনে, না বুঝে, তত্ত্ব উপলব্ধি না করে আামাকে যে প্রচার করতে যাচ্ছেন, কালই এই আপনারাই আমাকে নানা অপবাদে বিভূষিত করবেন।’’

       ঠাকুরের কথা শুনে আয়োজকদের তো মাথায় হাত, সর্বত্র প্রচার করা হয়েছে, নির্দিষ্ট দিনে উৎসব না হলে আর্থিক ক্ষতি ও লোকনিন্দার একশেষ হবে। তাই সকলে মিলে  গেলেন মহারাজ অনন্তনাথের কাছে। অনন্তনাথ সব শুনে সকলকে হিমাইতপুর থাকতে বলে সোজা চলে গেলেন কাশীপুরে তাঁর সাধন মন্দিরে। দরজা বন্ধ করলেন সাধন মন্দিরের। একটানা পাঁচদিন সাধন করে দরজা খুললেন। হিমাইতপুর ফিরে কুষ্টিয়ার দাদাদের ডেকে বললেন, ‘‘যান উৎসব করুন। আমি আবার দেখে এলাম—এই তিনি সেই তিনি। ‘বিশ্বগুরু’, ‘পুরুষোত্তম’ যা খুশী বলুন। এ প্রণয়ের ডাক নয়, বিধিসম্মত নাম। এর পিছনে প্রমাণ আছে।

       প্রমাণ তো আছেই। নিত্য হতে লীলা, লীলা হতে নিত্যে সহজ বিচরণ যিনি করতে পারেন। যিনি নির্বিকল্প সমাধিতে অনর্গল বাণী দিতে পারেন। এগুলো কি যথেষ্ট প্রমাণ নয়!  সত্য দত্ত, অশ্বিনী বিশ্বাস, বীরু রায়, সতীশ জোয়ারদার, গোকুল মন্ডল-রা প্রমাণ না পেয়েই কি এতদিন পেছন পেছন ঘুরেছেন! তাঁরা হয়তো অনন্তনাথের মত সাধন করে চরমধামে পৌঁছে সান্তের অরূপ-স্বরূপ-স্বগুণ-নির্গুণ—  অনন্ত রূপ দর্শন করার চেষ্টা করেন নি। তাই অনন্তনাথের কথায় উল্লসিত সকলেই। এবার ঠাকুর যেতে রাজী হবেন।  উপস্থিত হয়েছেন ঠাকুরের কাছে, প্রত্যক্ষ প্রমাণকারী অনন্তনাথকে নিয়ে।

       তা প্রমাণ যতই থাক, প্রামাণিক স্বয়ং নিজেকে প্রামাণ্য-স্বরূপ অভিধায় ভূষিত করতে রাজী নয়।   এ-সব কি লোকের কাছে বলার কথা!

       উপায় না দেখে সকলে মিলে মায়ের শ্রীচরণ ধরে কেঁদে পড়লো।

       না, মা-ও রাজী নয় তাঁর ছেলেকে বিশ্বগুরু সাজিয়ে মহোৎসব  করার ছেলেমানুষীতে মত দিতে।

       কুষ্টিয়ার দাদারাও নাছোড়। মায়ের শ্রীচরণতলে ধর্ণা দিয়েছে। অনুমতি না নিয়ে যাবেন না। ওঁরা জানেন, মা-কে রাজী করাতে পারলেই হবে, মায়ের কথা ঠাকুর ফেলতে পারবেন না।

       মায়ের মুখ গম্ভীর। অনেকক্ষণ ধরে চুপচাপ রয়েছেন। কোন কথাই বলছেন না। তিনিও দোটানায় পড়ে গেছেন। অবশেষে অনন্তনাথ চেপে ধরলেন মায়ের চরণ। অনুমতি দিতেই হবে। ওঁরা তো আর অন্যায়-অধর্ম কিছু করছে না। অনেকক্ষণ পরে মা বললেন, ‘হুঁ’। মা রাজী! মায়ের অনুমতি পাওয়া গেছে!   

       অনুমতি পাবার আনন্দে নেচে উঠলেন সত্য দত্ত। মায়ের কাছে তার আবদার, অনুমতি যখন দিয়েছেন, ঠাকুরসহ  সবাইকে নিয়ে উৎসবে যেতে হবে।

       মা তো আর সন্তানের মনে ব্যথা দিতে পারেন না। তাই সানন্দে মত দিলেন।

       সকলে বিজয়ীর হাসি হাসতে হাসতে ঠাকুরের কাছে বিদায় নিতে গেলে ঠাকুর বললেন, মা যখন রাজী হয়েছেন, আপনারা আমার জন্মোৎসবটুকু বাদ দিয়ে একটা ধর্মোৎসব করুন নরনারায়ণ সেবা করুন, সেই তো আনন্দের হবে।

       মুখে বললেন, হ্যাঁ, তাইতো করবো, ধর্মোৎসব করবো, নরনারায়ণ সেবা করবো……. মনে মনে বললেন, ধর্মাধিকারীকে বাদ দিয়ে তো আর ধর্মোৎসব করা যায় না! নারায়ণের মূর্তপ্রতীককে বাদ দিয়ে তো আর নরনারায়ণ সেবা করা যায় না!

        ঠাকুরকে প্রণাম জানিয়ে একরাশ আনন্দ নিয়ে ফিরে গেলেন কুষ্টিয়ার দাদারা।

       দু-দিন আগে থেকেই লোকজনের আসা শুরু হয়েছে। উৎসবের আগের দিন থেকেই কুষ্টিয়ার বাজারপাড়ায় লোকে লোকারণ্য। ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে।‘ এক নব আনন্দে মেতে উঠতে চলেছে কুষ্টিয়া। ওদিকে হিমাইতপুরের ঠাকুর বাড়ীতে কুষ্টিয়ার ভক্তরা চলে গেছেন,  ঠাকুরবাড়ীর সবাইকে আনতে।

       মা তো রাজী, ঠাকুর যেতে রাজী হচ্ছেন না তাঁর আত্মপ্রচারের উৎসবে যেতে।

অগত্যা মায়ের শরণাপন্ন হন কুষ্টিয়ার দাদারা। মা গিয়ে ঠাকুরকে বলেন, ওদের যখন এত ইচ্ছে হয়েছে, চল্ যাই।

       মায়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে তো আর যাওয়া যাবে না, অগত্যা রাজী হতে হলো। মা, ঠাকুরসহ সকলকে নিয়ে স্টীমারে উঠলেন।   

       উৎসবের আগের দিন ২৭শে ভাদ্র রাত প্রায় এগারোটা। কাতারে কাতারে লোক এসে জুটেছে অনেক আগে থেকেই কুষ্টিয়ার স্টীমার ঘাটে। বিশ্বগুরুকে বরণ করতে, প্রণাম করতে ।  খোল, করতাল,  কাশি, ঢাক, জয়ঢাক, শিঙা,  বিবিধ বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বিভিন্ন দলের  কীর্তনীয়ারা   কীর্তন করছেন।  উদ্যোক্তারা ফুল আর ফুলের মালার ডালি সাজিয়ে  প্রস্তুত। মায়েদের হাতে হাতে শঙ্খ। যাদের হাতে শঙ্খ নেই তারা হুলুধ্বনি দিয়ে বরণ করে প্রণাম নিবেদন করবেন। সবাই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছেন অপেক্ষায়। ভক্তদের মনেপ্রাণে নবীন এক উন্মাদনা ভর করেছে বিশ্বগুরুকে বরণ করার, প্রণাম করার।

       ওই, ওই তো! স্টীমারের সার্চলাইট দেখা যাচ্ছে! তালবেড়ের বাঁক পার হয়ে আসছে স্টীমার। সার্চলাইটের আলোর ছটায় সমবেত ভক্তদের কারো কারো মুখ আলোকিত করে স্টীমার ঘাটে এসে ভিড়তে না ভিড়তেই সত্য দত্ত ডেক থেকে নিশান উড়িয়ে জানান দিতেই হরিধ্বনি, শঙ্খধ্বনি, হুলুধ্বনি, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের বাদ্যধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে স্টীমার ঘাটের আকাশ-বাতাস।   বীরু রায়, অশ্বিনী বিশ্বাস, সতীশ জোয়ারদার প্রমুখ উদ্যোক্তারা যে যার নির্দিষ্ট স্থানে প্রস্তুতি নেয় বিশ্বগুরুকে সাদর অভ্যর্থনায় বরণ করে নিতে। হুলুস্থূলু পড়ে যায় ভক্তদের মধ্যে, কে কার আগে বিশ্বগুরুকে বরণ করে, প্রণাম করে ধন্য হবেন। ধাক্কাধাক্কিতে ক্রমেই পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে পড়ছিল। এত লোক প্রণাম করবে কিভাবে ?

       যিনি সবকিছু সামালাবার জন্য ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছেন, তিনিই সামলে দিলেন। নাহলে কে জানে কি হতো!

       অনন্ত মহারাজ, মাতৃদেবী ও স্টীমার ভর্তি  ভক্ত সহযাত্রীসহ শ্রীশ্রীঠাকুরকে নিয়ে কুষ্টিয়ার ঘাটে স্টীমার ভিড়তেই সকলের অলক্ষ্যে ভীড় কাটিয়ে আগেভাগে স্টীমার থেকে নেমে পড়েন  শ্রীশ্রীঠাকুর। সকলের প্রণাম গ্রহণের পরিবর্তে সমাগত ভক্ত-জনতার উদ্দেশ্যে তাঁর ভুবনমোহিনি হাসির  ছটা ছড়িয়ে দিয়ে  মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে আভূমি প্রণাম নিবেদন করেন।  ঘটনার আকস্মিকতার বিহ্বলতা কাটিয়ে শান্ত হয়ে যায় সমবেত জনতা। তাঁরাও প্রতি-প্রণাম জানায় বিশ্বগুরুকে।   বাকরুদ্ধ হয়ে যায়  আয়োজকদের। তথাপিও আয়োজক ভক্তবৃন্দ সম্বর্দ্ধনা জানাতে গেলে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন, আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই, সমাগত অতিথি অভ্যাগতদের যথোচিত মর্যাদায় সেবা করার, সম্বর্দ্ধিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করুন।—লোক-ব্যবহারের মাধ্যমেই পরিচয় প্রদান করলেন ভক্তজন-ঘোষিত বিশ্বগুরু !

       তিনি তো মান নিতে আসেননি, মান দিতে এসেছেন। যাঁরা বরণ করে, প্রণাম নিবেদন করে জীবনকে ধন্য করতে এসেছিলেন, তাঁরা আশাতীত ধন্য হলেন বিশ্বগুরুর কাছ থেকে প্রণামের ওই মান পেয়ে। তাঁরা মনে মনে ভাবছেন, কত জন্মের পুণ্যফলে এমন দেবতার দর্শন পেলাম। এ কেমন মানুষ! এমন সহজ-সরল দেবতনু মাটির পৃথিবীতে! কেউ ভাবছেন, ইনিই  আমার আরাধ্যদেবতা শিব। কেউ ভাবছেন, ইনিই আমার আরাধ্যদেবতা  ব্রহ্মা। কেউ ভাবছেন, ইনিই আমার আরাধ্যদেবতা বিষ্ণু। কেউ ভাবছেন, ইনিই আমার আরাধ্যদেবতা  নবদুর্বাদলশ্যাম রঘুপতি শ্রীরামচন্দ্র। কেউ ভাবছেন, ইনিই আমার আরাধ্যদেবতা  পার্থসারথী শ্রীকৃষ্ণ। কেউ ভাবছেন, ইনিই আমার আরাধ্যদেবতা  শ্রীবুদ্ধ।  কেউ ভাবছেন, ইনিই আমার আরাধ্যদেবতা প্রভু যীশু। কেউ ভাবছেন, ইনিই আমার আরাধ্যদেবতা হজরত রসুল। কেউ ভাবছেন, ইনিই আমার আরাধ্যদেবতা গৌরহরি। কেউ ভাবছেন, ইনিই আমার আরাধ্যদেবতা শ্রীরামকৃষ্ণ……….। 

       আয়োজকদের প্রস্তাবিত জটিল প্রণাম-পর্বকে সরলীকরণ করে দিয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর মাকে সাথে নিয়ে সোজা চললেন উৎসব প্রাঙ্গনের উদ্দেশ্যে। স্টীমারঘাটের সংলগ্ন রেলওয়ে স্টেশন। স্টেশন পার হয়ে মোহিনী মিলের মাঠে আয়োজিত উৎসব প্রাঙ্গনে পৌঁছে যান শ্রীশ্রীঠাকুর।   উপস্থিত হন উৎসব কার্যালয়ে। সভামণ্ডপ, রন্ধনশালা, ভোজন-আঙ্গিনা, ভাণ্ডারগৃহ পরিদর্শন করেন।  রন্ধনশালা, ভোজনাগার, রান্নার প্রয়োজনে তেলের পিপা থেকে নলের সাহায্যে তেল সরবরাহ ব্যবস্থা, শ্রীশ নন্দীর ব্যবস্থাপনায় রেল লাইনের উপরে ট্রলির সাহায্যে খাদ্য পরিবেশন ব্যবস্থা, উৎসব প্যাণ্ডেল, বাসস্থান ব্যবস্থা, বহিরাগত অতিথিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা, আলোকসজ্জার ব্যবস্থা ইত্যাদি  সব কিছু দেখে বিশেষ আনন্দিত ও তৃপ্ত হন শ্রীশ্রীঠাকুর। 

       শ্রীশ্রীঠাকুর ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন কারো কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা। হঠাৎ তার নজর পড়ল উৎসব মন্ডপের বেদির উপরের সিংহাসনটির দিকে। বলে উঠলেন, ওটা কি করলেন ?

       —কোনটা ? ভক্তদের সবিস্ময় প্রশ্ন।
       শ্রীশ্রীঠাকুর হেসে বীরু রায়কে বললেন, সিংহাসন থেকে আমার ছবিটা সরিয়ে রেখে অন্য কোন মহাপুরুষের ছবি রাখুন।

       বীরু রায়, অশ্বিনী বিশ্বাসকে বলেন, ভাই শুনিছ, ঠাকুরের কথা ?

       —শুনিছি তো, বলুক গে ! কত কথাই তো তাঁর শুনি না। এই কথাটাও না হয় না শোনার মধ্যেই গেল। বিশ্বগুরুর আসনে যে ছবি বসিয়েছি তা আর নামাচ্ছি না, এতে গুরুর আদেশ যদি  অমান্য করা হয়, তা হোক। এই আদেশ অমান্য করে যদি নরকে যেতে হয় তা’ও যাব। বীরের মত বলে উঠলেন অশ্বিনী বিশ্বাস।

       অশ্বিনী বিশ্বাসের সিদ্ধান্তে সায় দিয়ে সকলে বলে ওঠেন, হ্যাঁ ভাই ঠিক, ঠিক বলেছ। আমরা হাজার বার, লক্ষ বার  সব্বাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলব,  ‘বিশ্বগুরুর আবির্ভাব হয়েছে।  He is the Lord, He is the saviour, He is God himself.—Come and see.’ —জয়! বিশ্বগুরুর জয়!

       যাঁর জয়ধ্বনি হচ্ছে তিনি নির্বিকার ! তিনি একজন সাধারণ শিশুর মত সব ঘুরে-ফিরে দেখছেন।

       ওদিকে আয়োজকদের সকল প্রকার হিসেব, নিকেশ করে দিয়ে অনুমানের দশগুণ বেশী লোক সমাগত হয়েছে। সারা কুষ্টিয়া শহরে তিল ধারণের স্থান নেই। উচ্চ-নীচ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সংসারী-সন্ন্যাসী, ধনী-দরিদ্র জাতিবর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর সহস্র সহস্র নরনারীর সে এক অপূর্ব মহাসম্মেলন। স্বেচ্ছাসেবকেরা সর্বত্র অনুসন্ধান করে আগন্তুকদের সযত্নে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করছেন ! বহু অন্নসত্র খোলা হয়েছে। শহরের হিন্দু-মুসলমান-জৈন নির্বিশেষে ব্যবসায়ীবৃন্দ ও গণ্যমান্য লোকেরা নিজেদের ঘরবাড়ী, সামর্থ্য উজাড় করে দিয়েছেন। যাতে আগন্তুক অতিথিদের সেবাযত্নে কোনরূপ ত্রুটি না হয়।

       শ্রীশ্রীঠাকুরের দৈবী সান্নিধ্যলাভ সহ উৎসবের দু’-দিন সুসজ্জিত প্যাণ্ডেলে অহোরাত্র কীর্তন, কথকতা, আলোচনা সভা, বিশিষ্ট বক্তাদের বক্তৃতা যেমন চলেছিল, পাশাপাশি সুবৃহৎ রন্ধনশালায় গব্যঘৃতের লুচি, ডাল, তরকারি, মিষ্টান্ন দ্রব্য প্রস্তুত, সেগুলোকে ভাণ্ডারশালায় সংরক্ষণ, ট্রলি সহযোগে পংক্তি-ভোজনে পরিবেশন । অগণিত দীন ও দুঃস্থদের ভোজন এবং ভোজনোত্তর ভোজন-দক্ষিণা স্বরূপ অর্থ-বস্ত্রাদি দান—সে এক অভিনব মহাযজ্ঞ সুচারুরুপে সম্পন্ন করেছিলেন কুষ্টিয়াব ভক্তবৃন্দ। কোনরূপ কোন অপ্রীতিকর ঘটনার সাক্ষী না রেখেই।

       কলকাতা শহর থেকেও এসেছিলেন অসখ্য মানুষ।  বিদ্বজ্জনদের প্রতিনিধি স্বরূপ এসেছিলেন বিখ্যাত ব্যারিষ্টার চন্দ্রশেখর সেন মহোদয়ের সুযোগ্য পুত্র সাহিত্যিক শাক্যসিংহ সেন। তিনিও ঠাকুরের আদর্শে মুগ্ধ হয়ে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।  

        সর্বাঙ্গসুন্দর বিশ্বগুরু উৎসব অন্তে স্থানীয় ভক্তেরা উৎসবের সফলতা বিষয়ে ঠাকুরের কাছে জানতে আগ্রহ প্রকাশ করলে শ্রীশ্রীঠাকুর আয়োজক ভক্তদের বলেছিলেন, আপনাদের এই মহা-মহোৎসব সর্বাঙ্গসুন্দর হলেও একটু ত্রুটি থেকে গেছে।

       আয়োজক ভক্তরা বিস্ময় প্রকাশ করে ত্রুটির বিষয়ে জানতে চাইলে ঠাকুর বলেন,   যে-সব দারিদ্র্যক্লিষ্ট নর-নারায়ণ সামর্থ্য অভাবে আপনাদের এই উৎসবে যোগদান করতে পারেনি, তাদের তো আপনারা সেবা করার সুযোগ পাননি।  তাদের সেবা করার সুযোগ পেতে তাদের সামর্থ্য বাড়াতে হবে। তাদের সামর্থ্য বাড়াতে হলে বছরে একবার নয়, নিত্য গুপ্ত উৎসব করতে হবে।

—গুপ্ত উৎসব, তা’ও আবার রোজ ?

—হ্যাঁ, রোজ।

যা উৎকৃষ্ট প্রসব করে তার নামই তো উৎসব। ঢাকঢোল না পিটিয়ে অজান্তে অপকৃষ্ট মানুষকে, অপকৃষ্ট পরিবেশকে উৎকৃষ্টে রূপান্তর করতে হলে নিতি নিতি প্রতিনিয়ত না করলে হবে—সেই উৎসব হবে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির উৎসব, প্রবৃত্তির ছোবল থেকে নিস্তার পাবার উৎসব, মানুষকে মনুষ্যত্বে প্রতিষ্ঠিত করার উৎসব, অনিত্য জগতের মোহপাশ কাটিয়ে নিত্যজগতে উত্তরণের উৎসব, দারিদ্রব্যাধির হাত থেকে নিস্তার পাবার উৎসব।—যাতে পরিবেশের কেহ অভুক্ত না থাকে, অসুস্থ না থাকে, অপারগ না থাকে, যাতে সকলে একে অপরের সুখে-দুঃখে সাথী হয়,  আপনাদের সেবা পেয়ে উৎসমুখীনতায় সমৃদ্ধ হয়ে পরিবেশের সবাই যেন বলতে শেখে—‘‘আমি সবার, আমার সবাই।’’ সকলের মনের মণিকোঠায় ওই নিত্য-উৎসবের মঙ্গলঘট স্থাপন করে দিন।………………….দেখবেন ‘মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ’-এর পরিবেশ আবার ফিরে আসবে এই ধরাধামে।  

       বিশ্বগুরু উৎসবকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত করে আমরা এবার ফিরে যাব  কলাবাগান আশ্রমকে বিদায় জানাতে।

*      *      *

        বিশ্বগুরু উৎসবের কিছুদিন পর আরও ব্যাপক প্রচারের উদ্দেশ্যে কমলাপুরের বিখ্যাত ধনী সুরেন্দ্রমোহন বিশ্বাস গোঁসাইবাবাকে গড়াইয়ের শাখানদী কালীগঙ্গার তীরে আশ্রম প্রতিষ্ঠার অনুরোধ জানান। ঠাকুরের অনুমতিক্রমে গোঁসাই কমলাপুরে আশ্রম করে প্রচার করতে শুরু করলেন। একটি জয়ঢাক, কয়েক জোড়া করতাল, দুটি কাঁসি ও ১৫-২০ জন ভক্তকে নিয়ে অবিভক্ত নদীয়া জেলার গোপালপুর, দুধকুমরা, হরিনারায়ণপুর এবং যশোহর জেলার শৈলকুপা, ঝিনাইদহ প্রভৃতি অঞ্চলে কীর্তনের দল নিয়ে ঘুরতেন। প্রতি গ্রামেই বহু লোক সৎমন্ত্রে দীক্ষিত হতে লাগলেন। সতীশচন্দ্র গোস্বামী বা গোঁসাইবাবার কীর্তন আন্দোলন স্থানীয় সুধি জনমানসে আনন্দের প্লাবন উপহার দিলেও একটি বিশেষ সম্প্রদায় শত্রুতা শুরু করেছিল।

       কুষ্টিয়ার বিশ্বগুরু উৎসবের কিছুদিন পর একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের অধ্যক্ষ ও তার দলবল সমাধি অবস্থায় শ্রীশ্রীঠাকুরকে অপহরণ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। ওই সম্প্রদায়ের একজন ধনী ব্যক্তি কমলাপুরে থাকতেন। তাকে কাজে লাগিয়ে সেই অধ্যক্ষ কমলাপুরে এসে গোঁসাইবাবার কীর্তনদলকে হেয় প্রতিপন্ন করে নিজের সম্প্রদায়ের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন স্থান থেকে শতাধিক খোল, করতাল, ঢোল, কাঁসর, ঘন্টা, জগঝম্প প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র, বাদক এবং সহস্রাধিক ভাড়াটে কীর্তনীয়া সংগ্রহ করে একটি দল তৈরি করেন।

       একদিন প্রত্যুষে গোঁসাইবাবা কীর্তনদল নিয়ে গ্রাম পরিক্রমায় বেরিয়েছেন। সেই অধ্যক্ষও ওর বিরাট দল নিয়ে বেরিয়েছে গ্রাম ঘুরতে। দুই দল মুখোমুখি হয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে। আর যায় কোথায়! গোঁসাইবাবা নটরাজমূর্তি ধারণ করে কীর্তন করতে করতে লাফিয়ে গিয়ে পড়লেন ওদের দলের মধ্যে। দলের প্রধান পান্ডা, সেই অপহরণকারী অধ্যক্ষকে বগলে চেপে ধরে আবার লাফিয়ে এসে পড়লেন নিজের দলে। দুই দল একাকার হয়ে গেল। বিরুদ্ধ দল তাদের কীর্তন ভুলে সত্যনাম কীর্তন করতে লাগলো। বেগতিক দেখে সেই অধ্যক্ষ গোঁসাইবাবার চরণতলে পড়ে তার কুকর্মের জন্য ক্ষমা চাইলে গোঁসাইবাবা তাকে মার্জনা করেন। তিনি ফিরে যান নিজের আশ্রমে, কমলাপুর ত্যাগ করে। আর তার দলবল গোঁসাইবাবার সাথে কীর্তন করতে করতে চলে আসে আশ্রমে। গোঁসাইবাবা তাদের আহারাদির ব্যবস্থা করে সেবা-যত্ন করেন। তারা সবাই সৎমন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।

       ওই ঘটনার পর বিশেষ আহ্লাদিত হয়ে সুরেন্দ্রমোহন বিশ্বাস গোঁসাইবাবাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দক্ষিণাসহ প্রণাম করার আগ্রহ প্রকাশ করলে গোঁসাইবাবা বলেছিলেন, ‘‘ টাকার আমার প্রয়োজন নেই, তোমরা ঠাকুরের মানুষ হও, তাহলেই আমি খুশি।’’  

       হিমাইতপুরে তখনও আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কমলাপুর আশ্রম ছিল শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত দ্বিতীয় আশ্রম। জনমানসে ওই দুটি আশ্রমই শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আশ্রম নামে খ্যাতি লাভ করেছিল। কমলাপুর আশ্রমে কুষ্টিয়ার সব ভক্তরা যেমন নিয়মিত আসা-যাওয়া করতেন, তেমনই হিমাইতপুর থেকে অনন্তনাথ রায়, কিশোরীমোহন এবং শ্রীশ্রীঠাকুরও এসেছিলেন। ওই কমলাপুর আশ্রমকে কেন্দ্র করে অসংখ্য সাধারণ মানুষ যেমন শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শে দীক্ষিত হয়েছিলেন, তেমনি তৎকালিন সমাজের প্রধান ব্যক্তিত্ব  নড়াল রাজ এস্টেটের সতীশচন্দ্র ঘোষের পরিবার এবং  আত্মীয়স্বজনসহ দারোগা সতীশচন্দ্র দত্তের পরিবার  দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন   গোঁসাইবাবার কাছে।

।। হিমাইতপুরে শ্রীশ্রীঠাকুরের জন্মোৎসবের সূচনা ।।

বিশ্বগুরু উৎসবের পরের বছর থেকে  হিমাইতপুরে সুরু হয় ‘মহারাজের উৎসব’। ভাদ্র মাসের সুরুতেই অনন্ত মহারাজ কয়েকজন  সঙ্গীসাথি নিয়ে সুমধুর  কণ্ঠে কীর্তন করতে করতে গৃহস্থের দ্বারে দ্বারে যেতেন গুরুর আবির্ভাব  মহোৎসবের আমন্ত্রণ জানাতে। চারজন ভক্ত কাপড়ের ভিক্ষাপাত্রের চার কোণা ধরে চলতেন। গৃহ থেকে গৃহান্তর, গ্রামান্তর—যেখানেই যেতেন সকলকেই মাতিয়ে তুলতেন প্রাণের সাড়া জাগানো উৎসবে। আনন্দের হিল্লোলে মেতে ওঠা পথচারি থেকে গৃহবাসী সকলে সাধ্যানুযায়ী টাকা-পয়সা তো দিতেনই, এমনকি অনেক মায়েরা গায়ের স্বর্ণালঙ্কার পর্যন্ত ভিক্ষাপাত্রে নিবেদন করতেন অর্ঘ্যস্বরূপ—বিশ্বগুরুর উদ্দেশ্যে।

এই উৎসবের কোন আমন্ত্রণ পত্র মুদ্রিত হতো না, মুখে মুখে প্রচারিত হতো উৎসবের বার্তা। দূর-দূরান্তের ইষ্টভ্রাতারা যোগদান করতেন ওই উৎসবে। ৩০ ভাদ্রের পবিত্র দিনটিতে নব আনন্দের হিল্লোলে মেতে উঠতো হিমাইতপুরের আশ্রম প্রাঙ্গণ। শ্রীশ্রীঠাকুরকে যথাবিধি স্নান করাবার পর নববস্ত্রে, নব-উপবীতে সজ্জিত করে প্রণাম নিবেদন করে, মায়ের কটেজে গিয়ে সকলে প্রণাম নিবেদন করে, সব গুরুজনদের প্রণাম নিবেদনের মাধ্যমে শুভ উদ্বোধন হতো উৎসবের। সারাদিন ধরে চলতো  কীর্তন, কথকতা, নানাবিধ আনন্দ উৎসব।

প্রথম বছরের উৎসব সংক্ষেপে হওয়াতে ভক্তজনদের মন ভরেনি। ভক্তজনদের আগ্রহ আতিশয্যে প্রতিবছর কলেবর বৃদ্ধি হতে হতে একটানা সতেরদিন ধরে শ্রীশ্রীঠাকুরের জন্মোৎসব পালিত হবার পর ঠাকুরের মধ্যম ভ্রাতা পূজনীয় প্রভাসচন্দ্র চক্রবর্তী মায়ের কাছে গিয়ে অভিযোগ করে বলেন,—‘‘শুধু বড়দার-ই  জন্মোৎসব প্রভৃতি পালিত হচ্ছে কেন, আমরাও কি তোমার সন্তান নই ?  আমাদের জন্মোৎসব হবে না কেন ? এতে কিছুকাল জন্মোৎসব বন্ধ থাকে।’’ (সূত্রঃ বাসুদেব গোস্বামী বিরচিত গ্রন্থ ‘পুরুষোত্তম-লীলাপার্ষদ মহারাজ অনন্তনাথ…..’ পৃঃ ৮৬)

‘মহারাজের উৎসব’ নামে খ্যাত অনন্ত মহারাজ আয়োজিত শ্রীশ্রীঠাকুরের জন্মোৎসব উপলক্ষ্যে ‘‘কীর্ত্তন, জারী গান, যাত্রা, থিয়েটার, শরীর-চর্চার প্রদর্শনী, গানের জলসা প্রভৃতি চলতো। বাংলার বিশিষ্ট শিল্পীগণ, যথা গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, শচীন দেববর্ম্মন ও অন্যান্য অনেকেই প্রতিবছরই আসতেন। কুস্তিগীর গোবর বাবু ও লাঠিয়াল পুলিনবিহারী দাস ও তাঁদের ছাত্র-ছাত্রীরা কুস্তি, লাঠিখেলা প্রভৃতি দেখাতেন। বাংলা ও ভারতের বহু বিদ্বান ও গুণী জনের সমাবেশ ঘটতো ঐ উৎসবে। তাঁরা বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ও বক্তৃতাও করতেন। হিন্দু, মুসলমান, খ্রীষ্টান প্রভৃতি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রচারকগণ উৎসবের বিভিন্ন দিনে যোগদান করে উপাসনা করতেন এবং বক্তৃতাও করতেন। এই উপলক্ষ্যে আয়োজিত কৃষি, যন্ত্র-শিল্প, সূচি-শিল্প, ভেষজ-শিল্প প্রভৃতি বিষয়ে প্রদর্শনীটি বিশেষ আকর্ষণীয় ও আগ্রহের বিষয় ছিল।’‘

(সূত্রঃ বাসুদেব গোস্বামী বিরচিত গ্রন্থ ‘পুরুষোত্তম-লীলাপার্ষদ মহারাজ অনন্তনাথ…..’ পৃঃ ৮৪-৮৫)

            ।। হিমাইতপুরে দোল উৎসবের সূচনা ।।

      বঙ্গাব্দ ১৩৩১। দোল-পূর্ণিমার পুণ্য প্রভাতে সাধক-প্রবর মহারাজ অনন্তনাথ রায় প্রাণের একতারার সুরটা মহাপ্রভুর আবির্ভাব তিথি উপলক্ষ্যে সাধতে গিয়ে অনুভব করলেন, মহাপ্রভু  তো নব-কলেবরে সন্নিকটে বিরাজমান। না, আর দেরি নয়, আজই। চৈতন্য মহাপ্রভুর নব-কলেবরকে নবীনভাবে রাঙাতে হবে। দোল উৎসব করতে হবে। মহারাজ গিয়ে গোঁসাইদাকে বলতেই আনন্দে নেচে ওঠেন গোঁসাইদা। আনন্দ-সন্দেশ পৌঁছে যায় কিশোরীমোহনের কাছে, হেমকবির কাছে।  ক্রমে ছড়িয়ে পড়ল  বার্তা সারা আশ্রমে।

       ‘‘পদ্মার ধারে বাবলা গাছের ডালে  কাপড় দিয়ে চৌকি বেঁধে দোল-মঞ্চ তৈরী হয়েছে। একটায় হুজুর মহারাজের ছবি, একটায় সরকার সাহেবের ছবি বসানো হয়েছে। আবাল-বৃদ্ধ নর-নারী ফাগুয়া উৎসবের আনন্দে মাতোয়ারা। মহারাজ গেলেন মায়ের কাছে, মাকে দোল উৎসবের  কথা জানালেন এবং দোল উৎসবে তাঁর আগমন ও যোগদানের প্রার্থনা জানালেন। মা রাজী হলেন। এই কথা জেনে মহারাজ শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে গিয়ে বললেন—‘‘ঠাকুর, আপনার দোল-উৎসবের আয়োজন হয়েছে।  আপনাকে মঞ্চে বসিয়ে সকলে সমবেত প্রার্থনা করি, এই আমাদের কামনা।’’

       মহারাজের সঙ্গে আগত সকলের সাগ্রহ প্রার্থনায় রাজী হয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর স্বর্গীয় পিতৃদেবের ফটোতে পায়ে আবির দিয়ে শ্রীশ্রীমায়ের পায়ে আবির দিলেন। তারপর মঞ্চের সামনে এসে একে একে হুজুর মহারাজের ও সরকার সাহেবের ফটোতে আবির দিয়ে ঝুলন্ত মঞ্চ দুটি দুলিয়ে দিলেন।

       ভক্তরা শ্রীশ্রীঠাকুরকে তৃতীয় মঞ্চে বসার জন্য প্রার্থনা জানালো, কিন্তু ঠাকুর প্রথমে দোলায় বসতে রাজী হলেন না। … মা ঠাকুরকে ডাকলেন—‘অনুকূল’। ঠাকুর নীরবে ছোট্ট শিশুর মত মায়ের সামনে এসে দাঁড়লেন। মাকে দোলায় বসানো হলো। ঠাকুর মায়ের আদেশে মায়ের কোলে বসলেন। ……’’

       স্বভাব কবি হেমচন্দ্র তাঁর তাৎক্ষণিক সঙ্গীতের ডালি সাজিয়ে  গাইতে সুরু করলেন,—

              ‘‘ধন্য দ্বাপর লীলা ফাগ দিলে আজ

                     তোমার পায়।

              কি দেব যায় তোমায় মানায়

                     প্রণাম যেথায় লজ্জা  পায়।।

              মধু মাসে মধুর খেলা

                     আজ আমাদের মধু উৎসব

              পদ্মাতীরে বাবলা তলার প্রাঙ্গণে

                     আজ মিলেছি সব।।’’

       ভক্তরা সারিবদ্ধভাবে মা ও ঠাকুরের রাঙা চরণ আরো রাঙিয়ে দিলেন আবির দিয়ে। ঠাকুর মায়ের কোলে বসেই আবির ছড়িয়ে রাঙিয়ে দিচ্ছেন ভক্তদের। সুরু হলো তুমুল কীর্তন। ‘মহারাজ, কিশোরীমোহন, গোঁসাই পরস্পরকে আবির মাখিয়ে দিলেন, সৎসঙ্গীরা তাঁদের পায়ে আবির দিয়ে প্রণাম করলো।’

‘‘তারপর আরম্ভ হলো উদ্দাম রঙের খেলা। কীর্ত্তনের দল নিয়ে গ্রাম পরিক্রমায় বের হলেন সৎসঙ্গের ত্রয়ী। মহারাজের হাতে বিরাট একটি পিতলের পিচকারি। দু’জন বাহক একটি শক্ত বাঁশের মাঝখানে বেঁধে বিরাট এক ড্রাম বোঝাই গোলা রং নিয় চলেছে সঙ্গে। হিন্দুপাড়া, বাগ্দি পাড়া, ব্রাহ্মণ পাড়া  সর্ব্বত্র ঘুরছে কীর্ত্তনের বিরাট দল। প্রতিটি গৃহের  সবাইকে রাঙ্গিয়ে দিচ্ছেন মহারাজ। পাকা বাড়ীর ছাদ থেকে মায়েরা লাজ, ফুল, আবির বৃষ্টি করছেন কীর্ত্তন দলের উপরে। আর মহারাজ নীচে থেকেই পিচকারীর রঙে তাঁদের রাঙ্গিয়ে দিচ্ছেন। এভাবে ৩/৪ খানা গ্রাম ঘুরে সবাইকে দোল উৎসবে মাতিয়ে রেখে বিকেলে কীর্ত্তন দল ফিরে এল আশ্রমে। সঙ্গে দোর্দ্দণ্ড উদ্দাম নৃত্য সহকারে কীর্ত্তন চলছেই।

এরপর পদ্মায় স্নানোৎসব চললো প্রায় সন্ধ্যা পর্য্যন্ত। সেও এক মহা-মহোৎসব যেন। সন্ধ্যার পর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে সবাই আনন্দবাজারে প্রসাদ পেয়ে ধন্য হ’ল।’’ (সূত্রঃ বাসুদেব গোস্বামী বিরচিত গ্রন্থ ‘পুরুষোত্তম-লীলাপার্ষদ মহারাজ অনন্তনাথ…..’)

।। কলকাতায় সৎসঙ্গ আন্দোলনের সূচনা ।।

       কুষ্টিয়ার বিশ্বগুরু উৎসবের পর থেকেই ঠাকুর দর্শনে হিমাইতপুরে নানা স্থানের ভক্ত-সমাগম হতে থাকে।  পুত্র শাক্যসিংহের কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁর পিতা ব্যারিষ্টার চন্দ্রশেখর সেন হিমাইতপুর আসেন ঠাকুর দর্শনে। ঠাকুরের সাথে আলাপচারিতায় মুগ্ধ হয়ে  দীক্ষা গ্রহণ করেন। ঠাকুরের মহান আদর্শ কলকাতার সম্ভ্রান্ত  মহলে প্রচার করার জন্য তিনি ঠাকুরকে তাঁর কলকাতার বাসভবনে পদার্পণ করতে অনুরোধ জানান।  যথাসময়ে যাবেন বলে শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁকে আশ্বস্ত করলে তিনি ফিরে যান কলকাতায়।

       তিনি  চলে যাবার পর  শ্রীশ্রীঠাকুর একদিন শ্রদ্ধেয়  সুশীলচন্দ্র বসুকে ডেকে বলেন, ‘‘চলুন, আপনার বাড়ীতে যেয়ে একবার ঘুরে আসি। এর পরে আমার আর হয়তো কোথাও যাওয়া হয়ে উঠবে না।’’ শ্রীশ্রীঠাকুর অনন্ত মহারাজ, কিশোরীমোহন, গোস্বামী সতীশচন্দ্র, বীরু রায়, অশ্বিনী বিশ্বাস, সত্য দত্ত, সতীশ জোয়ারদার প্রমুখ পার্ষদ ও কীর্তনদল নিয়ে ১৯১৮ সনের ১৮ই অক্টোবর যশোহরের হরিণাকুণ্ডু গ্রামে শ্রদ্ধেয় সুশীলচন্দ্র বসু-দার বাড়ীতে যান। কীর্তনে, আলাপ-আলোচনায় হরিণাকুণ্ডুসহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ভাগবতপ্রেমী মানুষদের আনন্দের জোয়ারে ভাসিয়ে ২৬শে  অক্টোবর প্রত্যাবর্তন করেন। আলমডাঙ্গা স্টেশন হয়ে বরানগরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ওখানে ঠাকুর সপার্ষদ হরনাথের শিষ্য শরৎচন্দ্র দে মহোদয়ের বাগানবাড়ীতে ৫ দিন অবস্থান করেন। কীর্তন ও সদালোচনায় সবাইকে মাতিয়ে সপার্ষদ নৈহাটিতে আসেন, আত্মীয় শশীভূষণ চক্রবর্তী মহোদয়ের বাসভবনে। তদঞ্চলের আধ্যাত্মপিপাসু মানুষেরা কীর্তন, আলাপ-আলোচনায় যোগদান করে আনন্দ লাভ করেন। সাধারণ মানুষের  পাশাপাশি সৎমন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ করেন অনেক বিশিষ্ট মানুষজন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বিখ্যাত গণিতজ্ঞ যোগেন্দ্রনাথ সেন ও বিখ্যাত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক বারিদবরণ মুখার্জি।

নৈহাটিতে কয়েকদিন অবস্থান করে কুষ্টিয়ায় আসেন। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করে শ্রীশ্রীঠাকুর ফিরে আসেন হিমাইতপুরে।

  *    *     *

ওদিকে  তর সইছে না আর ব্যারিষ্টার চন্দ্রশেখর সেন মহোদয়ের। বেশ কিছুদিন ঠাকুরের প্রতীক্ষা করার পর বিরহের বেদনাকে মধুর করতে পুত্র শাক্যসিংহকে পাঠান হিমাইতপুরে। ১৩২৫ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে। তিনি শ্রীশ্রীমা, অনন্ত মহারাজ, সুশীলচন্দ্র বসু সহ শ্রীশ্রীঠাকুরকে নিয়ে আসেন কলকাতার কারবালা ট্যাঙ্ক লেনের বাসভবনে। চন্দ্রশেখর সেনের আমন্ত্রণে কলকাতার বিশিষ্ট নাগরিকেরা ঠাকুর দর্শনে এসে, তাঁর সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে, বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে তাঁরা মোহিত হয়ে যান। তাঁরাও পরস্পর ঠাকুরের  মহত্বের কথা প্রচার করলে সম্ভ্রান্ত নরনারী সকলে ঠাকুরের সান্নিধ্য লাভে সমবেত হতে থাকেন চন্দ্রশেখর সেন মহোদয়ের গৃহাঙ্গনের আনন্দধামে। ঠাকুরের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে দীক্ষা গ্রহণ করেন ব্যারিষ্টার রজন রায়, সুপ্রসিদ্ধ এটর্নি হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, সেণ্ট্রাল কলেজের অধ্যক্ষ ক্ষুদিরাম বসু প্রমুখ বিশিষ্ট  ব্যক্তিগণ। কলকাতার সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষদের এক  অনাবিল আনন্দের সন্ধান দিয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর ফিরে আসেন হিমাইতপুরে।

ওদিকে ঋষি অরবিন্দের কনিষ্ঠ ভ্রাতা, স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন বিশিষ্ট বিপ্লবী আন্দামান থেকে কলকাতায় ফিরে লোকমুখে ঠাকুরের কথা শুনে চলে যান হিমাইতপুরে। ঠাকুরের সাথে আলাপ করে, তাঁর মতবাদ শুনে, আশ্রমবাসীদের সহজ-সরল ব্যবহারে, সেবায় উদ্বুদ্ধ  হয়ে ফিরে আসেন কলকাতায়। শ্রীশ্রীঠাকুরের জন-কল্যাণধর্মী আদর্শকে সর্বসমক্ষে প্রচারের উদ্দেশ্যে ‘পাবনার মধুচক্র’ শিরোনামে এক মনোজ্ঞ প্রবন্ধ প্রকাশ করেন  দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ কর্তৃক প্রকাশিত ‘নারায়ণ’ পত্রিকায়। ফলে শ্রীশ্রীঠাকুরের মাহাত্ম্য সর্বত্র প্রচারিত হয়। ওই প্রবন্ধ পাঠ করে দেশবন্ধুও অবগত হন শ্রীশ্রীঠাকুর সম্পর্কে।

কলকাতার ভক্তদের সাথে যোগাযোগ রাখতে ঠাকুরের বাসের জন্য ১৩২৬ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসে ৭নং ঈশ্বর মিল বাই লেনে ঘর ভাড়া করা হয়। ওই বাসাবাড়ীতে ঠাকুর মাতৃদেবী, অনন্ত মহারাজ, সতীশ জোয়ারদার, অশ্বিনী বিশ্বাস, সুশীল বসু প্রমুখদের সাথে কয়েকমাস বসবাস করেছিলেন।  সন্ধান পেয়ে সেখানে হঠাৎই একদিন উপস্থিত হন বিখ্যাত ব্যারিষ্টার জে. এন. দত্ত (নেতাজী সুভাষ বসুর  মাতুল), তাঁর স্ত্রী (দত্তমা), তাঁর কন্যা (স্যার বি. সি. মিত্রের পত্নী লেডি মিত্র) এবং ভগ্নী (নেতাজী সুভাষ বসুর মাতৃদেবী, প্রভাবতী দেবী)-দের সাথে নিয়ে। দত্তমা ঠাকুরকে দর্শন করার সাথে সাথে ভাব-বিহ্বল হয়ে করজোড়ে স্তব-স্তুতি করতে থাকেন।

কলকাতার  প্রথম শ্রেণীর নাগরিকেরা ঠাকুরের সান্নিধ্যে এসে শান্তি লাভ করছেন। দ্রুত সেই বার্তা ছড়িয়ে পড়তেই একের পর এক লোক সমাগম বৃদ্ধি পেতে থাকে ওই বাসা-বাটিতে। তারা তাদের সমস্যার সমাধানী সূত্র পেয়ে ধন্য হতেন। সে সময়, ওই বাসাবাটিতে থাকাকালীন  ঠাকুরকে গুরুপদে বরণ করেছিলেন, নেতাজী সুভাষচন্দ্রের মাতৃদেবী, পিতৃদেব, মাতুল, মাতুলানী, জ্যেষ্ঠভ্রাতা ব্যারিষ্টার সতীশচন্দ্র বসু ও তাঁর পত্নী কমলবাসিনী দেবী। দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন শ্যামাচরণ মুখার্জী (গোপালদা, যিনি পাবনা সৎসঙ্গের সম্পাদক হয়েছিলেন।)-র মাতা দুর্গাদেবী এবং দুই মাসীমা শেখরবাসিনী দেবী ও মায়া দেবী। দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের মেডিক্যাল স্কুলের অধ্যাপক ডাঃ শশিভূষণ মিত্র, ব্রহ্মদেশের উচ্চ রাজ-কর্মচারী নিবারণচন্দ্র দত্ত। দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন হুজুর মহারাজের দীক্ষিত এণ্টালীর সুরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও ঢাকা নিবাসী ইন্দুহরণ মুখার্জী।

শ্রীশ্রীঠাকুর ৭নং ঈশ্বর বাই লেনের ওই ঐতিহাসিক বাড়িতে বেশ কয়েকমাস থেকে সকলকে নিয়ে হিমাইতপুরে ফিরে আসেন।  কোন অনিবার্য্য কারণে গৃহস্বামী ওই বাড়ি ছেড়ে দিতে বললে কলকাতায় ঠাকুরের বাসের জন্য ১/১সি হরিতকী বাগান লেনে একটি বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়। ১৩২৭ বঙ্গাব্দের শরৎকালে শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর মাতৃদেবী, অনন্ত মহারাজ, কিশোরীমোহন ও কেষ্ট দাস প্রমুখদের সাথে ওই বাসাবাড়ীতে শুভ পদার্পণ করেন।

ওই বাড়িতে থাকাকালিন ঠাকুরের ডাক্তারি স্কুলের অধ্যাপক ডাঃ শশীভূষণ মিত্র প্রায়শই আসতেন ঠাকুরের সান্নিধ্য লাভ মানসে। তিনি বেলেঘাটার ২৯নং প্যারীমোহন সুর গার্ডেন লেনের বাড়ীতে থাকতেন।  ক্রমে তিনি  ঠাকুরের গুণমুগ্ধ হয়ে সকলকে ঠাকুরের বিষয়ে জানাতে শুরু করেন। তাঁর যাজনে মুগ্ধ হয়ে কলকাতার বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি সৎনামে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বেলেঘাটা অঞ্চলের যতীন  বোস, ক্ষেত্র বোস, সত্য কবি, বলাই ঘোষ, সুরেন রুদ্র, নরেন রুদ্র, অভিরাম খাঁ, ডাঃ সতীশ খাঁ প্রমুখ বিশিষ্ট জনেরা।

ডাঃ শশীভূষণ মিত্র মহোদয়ের ঐকান্তিক চেষ্টাতে কলকাতার বেলেঘাটাতে গড়ে ওঠে প্রথম সৎসঙ্গ অধিবেশন কেন্দ্র। ঠাকুর কলকাতায় শুভ পদার্পণ করলে জননীদেবীসহ সপার্ষদ ওই অধিবেশন কেন্দ্রে গিয়ে  সকলকে কীর্তন ও সদালোচনায় মাতিয়ে রাখতেন।  ঠাকুরের আদেশে সতীশচন্দ্র গোস্বামী (গোঁসাইদা) কিছুদিন  বেলেঘাটাতে থেকে ওই অঞ্চলকে মাতিয়ে তোলেন কীর্তনে। বহু মানুষ সৎমন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁদের  মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মানিকতলার হীরালালদাস ও যোগেন দাস দুই ভাই (যে হীরালাল দাস বিখ্যাত মনমোহন থিয়েটারকে হিমাইতপুর নিয়ে যাবার জন্য শ্রদ্ধেয় সুশীলচন্দ্র বসুকে ৫০০ টাকা দিয়েছিলেন।),  সিঁথি অঞ্চলের কুঞ্জলাল ও ধীরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য। ক্রমে সিঁথি অঞ্চলে দীক্ষিতদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলে  ঠাকুরের  নির্দেশে কুঞ্জদা, লালভাইকে সাথে নিয়ে শ্রদ্ধেয় ধীরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য নিজের বাড়ীতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সৎসঙ্গের দ্বিতীয় অধিবেশন কেন্দ্র।

সিঁথির কুঞ্জদার পিতৃদেব ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ভক্ত ও চিকিৎসক। ওই ঐতিহাসিক পুণ্য বাটিতে এবং সিঁথির অধিবেশন কেন্দ্রে শ্রীশ্রীঠাকুর পদার্পণ করেছিলেন।  প্রয়াত ধীরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য-এর সুযোগ্য পুত্র শ্রদ্ধেয় গুরুপদ ভট্টাচার্য্যের ইষ্টপ্রাণতায় ওই ঐতিহাসিক,  শ্রীশ্রীঠাকুরের পদরজঃ ধন্য সৎসঙ্গের দ্বিতীয় অধিবেশন কেন্দ্র আজও প্রাণবন্ত।

সৎসঙ্গের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে মুদ্রিত থাকবে ১/১সি হরিতকী বাগান লেনের বাসাবাড়ীর স্মৃতি। যেখানকার আকাশ-বাতাস একদা  মুখরিত হয়ে থাকত ঠাকুরের কীর্তনানন্দে এবং সদালোচনায়।  শ্রদ্ধেয় শ্রীধীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর যাজনে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওই বাড়ীতেই  ১৩২০ বঙ্গাব্দে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন বিজ্ঞানসাধক কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য, তৎপর দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন তাঁর ভ্রাতা-ভগ্নীসহ পরিবারের অন্যান্যরা। ওই বাড়িতে বসেই  ১৩৩১ বঙ্গাব্দের ৩১শে জ্যৈষ্ঠ সৎনামে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ।

।। হিমাইতপুরে আশ্রম প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট ।।

সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ মহামহোপাধ্যায় পন্ডিত কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন মহোদয়ের দ্বিতীয় পুত্র বিজ্ঞান গবেষক কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য ১৩৩০ বঙ্গাব্দের প্রথমদিকে স্থায়ীভাবে হিমাইতপুর চলে আসেন। ১৩৩০ সালের অগ্রহায়ণ মাসে স্থায়ীভাবে চলে আসেন বঙ্কিমচন্দ্র রায়। ১৩৩০ সালের ২৪শে অগ্রহায়ণ শ্রীশ্রীঠাকুরের পিতৃবিয়োগ হয়। একই সময়ে বিজ্ঞান গবেষক কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য মহোদয়েরও পিতৃবিয়োগ হয়। তথাপি তিনি ঠাকুরকে ছেড়ে বাড়ী না গিয়ে আশ্রমেই পিতৃদেবের শ্রাদ্ধাদি ক্রিয়া করেছিলেন।  ১৩৩০ সালের ফাল্গুন মাসে ময়মনসিংহের উকিল শ্রীব্রজগোপাল দত্তরায় সপরিবারে আশ্রমে চলে আসেন এবং তপোবন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। আশ্রম সংগঠনকে গড়ে তুলতে প্রকাশচন্দ্র বসু, প্রবোধচন্দ্র বাগচী, চারুচন্দ্র সরকার, অনুকূল ব্রহ্মচারী, তারাপদ বাগচী, অধ্যাপক পঞ্চানন সরকার, ডাঃ গোকুলচন্দ্র মন্ডল  প্রমুখ ভক্তবৃন্দসহ  অনেকেই ঠাকুরের নিরবচ্ছিন্ন সান্নিধ্য লাভের আশায় স্থায়ীভাবে চলে আসেন হিমাইতপুরে। শ্রীযুক্ত সুশীলচন্দ্র বসু, তাঁর পত্নী রাণীমা, নফরচন্দ্র ঘোষ, যতীন্দ্রনাথ সরকার, হরিদাস ভদ্র প্রমুখ ভক্তগন তখন ঠাকুর বাড়ীতেই থাকতেন। ক্রমশঃ স্থায়ী বাসিন্দা বৃদ্ধি পেতে থাকলে কতগুলো খড়ের ও টিনের ঘর তৈরি করা হয়। পদ্মার ধারে বাঁশঝাড়ের মধ্যে কয়েকটা খাটা পায়খানা তৈরি হয়। এইভাবে প্রয়োজন অনুপাতে কুটিরের পর কুটির নির্মিত হতে থাকে। ক্রমে ক্রমে গড়ে ওঠে আশ্রম।  প্রথম পত্তনকালীন তখনকার লোকেরা হিমাইতপুরের আশ্রমকেও বলতো অনুকূল ঠাকুরের আশ্রম। পরে শ্রীশ্রীঠাকুরের  মা আগ্রা সৎসঙ্গের অনুকরণে ‘সৎসঙ্গ আশ্রম’ এবং দীক্ষিতদের ‘সৎসঙ্গী’ নামে অভিহিত করেছিলেন। হিমাইতপুরে আশ্রম প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে  ঠাকুরের নির্দেশ মেনে কমলাপুর আশ্রম ছেড়ে গোঁসাইবাবাও হিমাইতপুরে  চলে আসেন।

       মূর্খ-পণ্ডিত-ধনী-নির্ধন-জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষ একে একে সমবেত হতে শুরু করলো হিমাইতপুরে। শুরু হলো লোকসংগ্রহ পর্ব। ধীরে ধীরে গড়ে উঠল সৎসঙ্গ আশ্রম। শুরু হলো কর্মযজ্ঞ।

       অখ্যাত পল্লী হিমাইতপুরে বায়ু থেকে বিদ্যুত উৎপাদন করে পরম বিস্ময় সৃষ্টি করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। গড়ে তুলেছিলেন—তপোবন ও মাতৃ বিদ্যালয়—যা শিক্ষাক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। গড়ে তুলেছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত ‘মনোমোহিনী ইনষ্টিউট অফ সায়েন্স এণ্ড টেকনোলজি’ নামের বিজ্ঞান কলেজ। কেমিক্যাল ওয়ার্কসের জীবনদায়ী ঔষধসমূহ দেশে এবং বিদেশে সমাদৃত হয়েছিল। বৈদ্যুতিক এবং যন্ত্রশিল্পের আধুনিক সব ধরণের কাজ হতো ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল ওয়ার্কসপে। যথা,–ঢালাই, ঝালাই, লেদের কাজ, ডাইস, ইলেক্ট্রোপ্লেটিং, ইলেক্ট্রিক্যাল ফিটিং, আরমেচার, ব্যাটারি প্লেট তৈরি ও মেরামত, ডায়নামো মেরামত ইত্যাদি। ছিল—ময়দার কল, আটার কল, চালের কল, তেলের কল, চিনির কল, মেডিকেটেড ওয়াটার মেশিন, স্পাইস পাউডারিং, সুতার গুটি তৈরি, টেলারিং, বোতাম তৈরি, গ্লাস ব্লোয়িং, পটারী ওয়ার্কস্, বেকারী, লজেন্স তৈরি, গ্রোসারী প্রোডাক্ট ইত্যাদির শিল্প। ছিল—কার্ডবোর্ড কারখানা, স্টীমলণ্ড্রী, কটন ইণ্ডাস্ট্রিজ, হোশিয়ারী শিল্প, ব্যাঙ্ক, ইঞ্জিনীয়ারিং ওয়ার্কস্, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র, স্বাস্থ্য বিভাগ, গৃহনির্মাণ বিভাগ, কলাকেন্দ্র, প্রেস (যেখানে বাংলা, হিন্দী, সংস্কৃত, উর্দু, আরবী, ফারসী হরফের কাজ হতো, দেশ ভাগের পর পাকিস্তান সরকার জবরদখল করে ঢাকাতে নিয়ে যায়।), পাব্লিশিং হাউস, ফিলানথ্রপি, মাতৃসঙ্ঘ ইত্যাদি।

হিমাইতপুর আশ্রমে শ্রীশ্রীঠাকুরের ইষ্টপ্রতিষ্ঠামূলক কর্মকাণ্ড থেকে দু-একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

                     ।। তপোবন বিদ্যালয়।।

শ্রীশ্রীঠাকুর শিক্ষাক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তপোবন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা মাধ্যমে।

       একজন ছাত্র ও একজন শিক্ষক নিয়ে অস্থায়ী এক কুটিরে সূচনা হয় তপোবন বিদ্যালয়ের । দেখতে দেখতে বাংলাসহ বিহার, আসাম, ব্রহ্মদেশ থেকে শিক্ষার্থী সমবেত হতে লাগল । ইংরেজ সরকারের নির্ধারিত পাঠ্যক্রম অনুশীলনের পাশাপাশি অধ্যাপক ও ছাত্ররা দিনরাত ইঁট টেনে, লোহা টেনে, কাঠ কেটে, মিস্ত্রীর কাজে যোগান দিয়ে, কঠোর পরিশ্রম করে গড়ে তোলে বিদ্যালয় গৃহ ও ছাত্রাবাস । বাংলা ও ইংরেজীর অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন বারো-তেরো বছরের ছেলেদের সাধারণ জ্ঞানের উপর ভিত্তি করেই ভর্ত্তি করে নেওয়া হত ম্যাট্রিক পরীক্ষার তিন বছরের পাঠ্যক্রমে । অঙ্ক, বিজ্ঞান, সাহিত্য এবং সিলেবাসভিত্তিক পড়াশোনার সাথে সাথে আশ্রমের ঘরদোর পরিস্কার, বাসনমাজা, কাপড়কাচা, তরিতরকারির বাগান করা, উৎপন্ন ফসল হাটে বিক্রি করা, কুটির শিল্পে বিভিন্ন কাজ শেখা, ছোটখাট অসুখ-বিসুখ সারিয়ে তোলার টোটকা চিকিত্সা-বিদ্যা শেখা,  নানাবিধ খেলাধুলা, সাঁতার শেখা, কুস্তি লড়া, নিয়মিত নামধ্যান, প্রার্থনা ইত্যাদিও শেখান হত বিদ্যার্থীদের। প্রতিটি ছাত্রই কৃতিত্বের সাথে পাশ করে সাবলম্বী হত । পরিবার, পরিজনদের বোঝা না হয়ে তাদের বোঝা অক্লেশে বহন করতে পারত ।

       তখন গ্রাম বাংলায় নারী শিক্ষার তেমন একটা চল ছিল না । ঠাকুর, আশ্রমে সমাগত সব বয়সের নিরক্ষরা, স্বাক্ষরা মায়েদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন । তারা সংসারের সবকিছু সামলে খেয়ে, না খেয়ে, ঠাকুরের বিশেষ তত্ত্বাবধানে উক্ত তিনবছরের (দশ বছরের সিলেবাসকে তিন বছরে সংক্ষিপ্ত করছিলেন ঠাকুর ।) পাঠ্যক্রমে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন । ভুষণদা, রত্নেশ্বরদা, ঈষদাদা, পঞ্চাননদা, ব্রজগোপালদা প্রমুখ কৃতিমান শিক্ষকদের প্রচেষ্টায় প্রথাগত লেখাপড়া শিক্ষার সাথে সাথে ইষ্টগুরু নিযুক্ত বিভাগীয় শিক্ষাগুরুদের সাহচর্য্যে উক্ত মায়েরা রাত জেগে ইঁট কাটা, পাওয়ার হাউসের জন্য পদ্মা থেকে জল আনা থেকে শুরু করে বাগিচা পরিচর্যা, খাদ্যবিজ্ঞান, পুষ্টিবিজ্ঞান, টোটকা চিকিত্‍সা, সুপ্রজনন বিজ্ঞান, ধাত্রী বিদ্যা, সংগীত, নৃত্য, অভিনয়, আত্মরক্ষার কৌশল, ইত্যাদিও শিখতেন,– যা’ বর্তমানের প্রগতি-নারীবাদীরা যদি আয়ত্ব করতে পারেন, নিজ নিজ প্রকৃতির বৈশিষ্ট্যকে উচ্ছল করে প্রকৃত অর্থে ‘প্রগতি’ শব্দের প্রকৃষ্ট গতিকে আবাহন করতে পারবেন । গড়ে তুলতে পারবেন নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ । পরমশিক্ষক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র এক দেবজাতি গঠনের নিমিত্ত পরা-অপরা বিদ্যার সব রসদ রেখে গেছেন ।

                ।। জনস্বাস্থ্য রক্ষা ।।

শ্রীশ্রীঠাকুর জনস্বাস্থ্য রক্ষার লক্ষ্যে গড়ে তোলেন আয়ুর্বেদিক, হোমিওপ্যাথী, এলোপ্যাথী চিকিৎসালয়, ধাত্রীবিদ্যা শিক্ষালয়।  একটি প্রত্যন্ত গ্রামকে কেন্দ্র করে  জনস্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রে শুরু হয় নবজাগরণ। স্বাস্থ্যবিধিসম্মত পূর্তকর্ম, পরিবেশ পরিচর্যা, জন সচেতনতা বৃদ্ধি, টীকাকরণ। মুষ্টিযোগ, আয়ুর্বেদিক, এলোপ্যাথিক, হোমিওপ্যাথিক প্রভৃতি চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করে সংক্রামক মারণ ব্যাধিগুলোকে প্রতিহত এবং প্রতিরোধ করে বঙ্গদেশ তথা সন্নিহিত প্রদেশগুলোতে সাড়া জাগিয়ে তুলেছিল ঠাকুরের প্রচেষ্টা।

স্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসকেরা অসংখ্য নরনারীকে রোগমুক্ত করেছেন।  গ্রামের দুঃস্থ মানুষদের জন্য ভ্রাম্যমান চিকিৎসা পরিষেবার ব্যবস্থা ছিল। ধাত্রীরা সঙ্কটাপন্ন প্রসূতিদের বাড়ীতে গিয়ে সুখপ্রসব করাতেন। গর্ভ-পরিচর্যা এবং সন্তান পরিচর্যার শিক্ষা দিতেন। ফলে শিশুমৃত্যু ছিল না বললেই চলে। আশ্রম পত্তনের প্রথম যুগে প্রায় আঠার বছর পর্যন্ত রোগ-ভোগ-অকালমৃত্যু হয়নি ঠাকুরের নিদেশিত আনন্দবাজারের প্রসাদ পেয়ে।   আর ছোটখাট অসুখ করলে নিজেরাই সারিয়ে নিতেন ভেষজ উদ্যানের ভেষজ প্রয়োগে। ভেষজ উদ্যানের প্রতিটি ভেষজের পরিচয় এবং ব্যবহার বিধির বর্ণনা দেওয়া থাকত।

ঠাকুরের জনস্বাস্থ্য রক্ষার পরিকল্পনায় যাঁরা আত্মনিবেদন করেছিলেন তাঁদের মধ্যে কৃতি বিজ্ঞানী রসায়নশাস্ত্রবিদ শ্যামাচরণ মুখোপাধ্যায়ের নাম প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকবে সৎসঙ্গের ইতিহাসে। শ্রীশ্রীঠাকুরের ফরমূলাকে বাস্তব রূপদান করেছিলেন তিনি। দুষ্প্রাপ্য সব ভেষজ গুণসম্পন্ন গাছগাছ্ড়া সংগ্রহ করে একের পর এক আশ্চর্য ফলপ্রদ সব ঔষধাবলী প্রস্তুত হতে থাকে ছোট ছোট খড়ের ঘরে, টিনের ঘরের  রসৈষণা মন্দিরে। যার শুভযাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯২৫ বঙ্গাব্দে।

  বর্তমান সৎসঙ্গ সমাজে সুপরিচিত ‘প্রিভেনটিনা’ ও ‘নবরঞ্জিনী তৈল’ দিয়ে যাত্রা সুরু করে কলেরাসহ তরুণ উদরপীড়া আরোগ্যের জন্য জন্ম নেয় ‘মিষ্ট এজামনজিট’ (নিম্বমঞ্জিষ্টকষায়)। সৎসঙ্গ স্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসকেরা কিছুতেই একটি মায়ের সূতিকা রোগ আরোগ্য করতে পারছিলেন না। শ্রীশ্রীঠাকুর তৎক্ষণাৎ ফরমূলা দিয়ে তৈরি করান ‘পিওর-পেরো-ডাইরিন’ (সূতিকা-নিসূদনী)। এভাবেই একের পর এক সৃষ্টি হতে থাকে অশোকাদিকষায়, উশীর শর্করা, উৎপলাদিকষায়, যকৃৎ-শোধক, হৃদবল, দন্তপ্রিয়ঙ্গু, বাসকার্জুন ইত্যাদি অত্যাশ্চর্য আরোগ্যক্রিয়া সম্পন্ন ঔষধাবলী। তৈরি হয় টিংচার, এক্সট্রাক্ট, ভ্যাকসিন, ইঞ্জেকশনাদি—বৃহত্তর জনস্বার্থ রক্ষার স্বার্থে।

সে সময়ে সৎসঙ্গ কেমিক্যাল ওয়ার্কস্-এর ওষুধপত্র বঙ্গদেশের সীমা অতিক্রম করে বিহার, উড়িষ্যা, এমনকি ব্রহ্মদেশে পর্যন্ত পাড়ি দেয়। ভারতীয় প্রাচীন সার্থক চিকিৎসা পদ্ধতির সরলীকৃত ব্যবহারিক উপস্থাপনা বিদেশীয় ঔষধের সাথে প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা পেয়েছিল শুধু নয়, তৎকালিন দেশ-বিদেশের চিকিৎসক ও সুধী সমাজের কাছে সমাদৃত হয়েছিল। এর কারণ ছিল, রোগ আরোগ্যে অব্যর্থ, সহজ ব্যবহার্য, বিনিময় মূল্যও ছিল সকলের সাধ্যের মধ্যে।

তখনও আবিস্কৃত হয়নি যক্ষ্মারোগের অ্যাণ্টিবায়োটিক স্ট্রেপ্টোমাইসিন। প্রচলিত চিকিৎসায় আরোগ্য হতো না। তাই শ্রীশ্রীঠাকুর বাসকাদি ভেষজ সহযোগে SCHIZOMYCETIN injection   প্রস্তুত করিয়ে পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াহীন যক্ষ্মারোগের সফল চিকিৎসা পদ্ধতির আবিস্কার করেন।

বর্তমানে ক্যানসার নিয়ে অনেক গবেষণা হচ্ছে। প্রচলিত কেমো-থেরাপি, রেডিও-থেরাপিতে তেমন সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। শ্রীশ্রীঠাকুর কিন্তু স্বনামধন্য চিকিৎসক ডাঃ সুবোধ চক্রবর্তীর কর্কটরোগ আরোগ্য করেছিলেন দেশীয় ভেষজের তৈরি ওষুধের সাহায্যে।

ঠাকুর ছিলেন কিওরোপ্যাথ চিকিৎসক। আয়ুর্বেদ, এলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, মুষ্টিযোগ, অবদমন প্রতিস্থাপন বিশেষজ্ঞ, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, কাউন্সেলিং বিশেষজ্ঞ, আকুপ্রেসার, মেসমেরিজিম, স্পর্শ-চিকিৎসা এবং নাদ-চিকিৎসায় পারদর্শী এক চিকিৎসা বিজ্ঞানী। তাঁর এক্স-রে’র সমান দৃষ্টিশক্তি, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ শক্তি দিয়ে রোগীর অন্তর-বাহিরের সবকিছু জানতে-বুঝতে পারতেন এবং তদনুগ আরোগ্য ক্রিয়ার উপযোগী পদ্ধতির প্রয়োগ করতেন। তিনি তাঁর অনুগামী চিকিৎসকদের মধ্যেও ওই প্রতিভা সঞ্চারিত করতে চেয়েছিলেন। তাঁরাও প্রাণপণে ঠাকুরের নিদেশ ও নিদেশাবলি পালন করতেন। দুঃখের বিষয়, ওইসব কৃতী চিকিৎসকদের উত্তরসূরীদের ঠিকানা আমার জানা নেই।

মানুষ যা’তে ওষুধের দাস না হয়ে পড়ে সেজন্য তিনি নামের দ্বারা মৃতপ্রায় ষট্পদী পতঙ্গের দানের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। গড়ে তুলেছিলেন নাম-চিকিৎসালয়। যা ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী সৎসঙ্গের প্রাতঃস্মরণীয় ঋত্বিগাচার্য্যদেবও নামের স্পন্দন সাহায্যে অন্তর্নিহিত আরোগ্যকারী শক্তি (curative force) জাগ্রত করে নিজের অনেক অসুখের চিকিৎসা করেছিলেন।

শ্রদ্ধেয় শ্যামাচরণ মুখোপাধ্যায়ের (গোপাল দা) সুযোগ্য পুত্র ডাঃ অরুণাদিত্য মুখোপাধ্যায় মহোদয়কে বিনা ওষুধে, শরীরের স্পন্দনমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে অকালমৃত্যু রোধ করার নিমিত্ত Vibrometer  তৈরি করার নক্শা দিয়েছিলেন। বর্তমানে পূজনীয় ডাঃ প্রচেতা রঞ্জন চক্রবর্তী (কাজলদা) ওই বিষয়ে গবেষণায় রত। সার্থক হলে চিকিৎসা ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ঘটনা ঘটবে।

।। বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র।।

শ্রীশ্রীঠাকুরের সবচাইতে প্রিয় স্থান ছিল বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র। অনেক আশায় বুক বেঁধে তিনি তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলেন তাঁর প্রিয় কেন্দ্রটিকে। আশ্রমের কর্মীদের তখন দুবেলা খাবার জোটাই মুশকিল ছিল। সেই অভাব অনটনের মধ্য দিয়েই তিনি ভিক্ষে করে বহু মূল্যের বিজ্ঞান গবেষণার যন্ত্রপাতি কিনে বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র স্থাপন করে অখ্যাত পল্লী গ্রামটিকে বিশ্বের দরবারে বিখ্যাত করে তুলেছিলেন।

বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্রে কৃষি থেকে মহাকাশ গবেষণা বিষয়ের সবকিছু নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা হয়েছে। কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের উন্নয়নের জন্য জমি সংগ্রহ, প্রাকৃতিক এবং জৈবিক উপায়ে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি। যথা, কোন ফসলের পর কতটুকু বিশ্রাম দিয়ে পরবর্তী ফসল ফলালে এবং কেমন জৈব সার, জৈব কীটনাশক প্রয়োগ করলে জমির উর্বরতা ও উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। একবার এক কৃষক কিছুতেই পোকার আক্রমণ থেকে বেগুন টেঁকাতে পারছিল না। ঠাকুরের পরামর্শে দুটো বেগুন গাছের মাঝখানে ভাট গাছ লাগিয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে কীট আক্রমণ নাশ করেছিল সেই কৃষক। কৃষি এবং শিল্পকে রক্ষা করতে তিনি ব্যাঙ্ক স্থাপন করেছিলেন। তাঁর পরিকল্পিত চাষের ফসল ১২৫০-এর মন্বন্তরে মানুষকে বাঁচাতে সাহায্য করেছিল। ভবিষ্যতের মন্বন্তর থেকে বাঁচতে তিনি পেঁপে এবং কাঠালি কলার সংমিশ্রণে সহনশীল সংকর পেঁপের উৎপাদনের ফরমূলা দিয়েছিলেন।  সহনশীল ব্রেডফ্রুট বা রুটি-ফলের গাছ আমদানী করে প্রতিটি অঞ্চলে চাষ করতে বলেছিলেন।   খাদ্যগুণ সমৃদ্ধ ওই ফলটি  নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে অনেক গবেষণা চললেও বেশিরভাগ সৎসঙ্গী ওই নামের সাথেও এখনো পরিচিত হতে পারে নি! পরমাণু তেজষ্ক্রিয়তা থেকে মানুষকে বাঁচাতে আসামের জঙ্গল থেকে ‘থৈকল’ ফল সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করতে বলেছিলেন।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনেক আবিস্কারের  ফরমূলা রেখে গেছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণার জন্য। বর্তমানে bio-technology–র সাহায্যে চিকিৎসা-বিজ্ঞানের উন্নতি সাধনে যে প্রচেষ্টা চলছে, ১৯২৫ খ্রীঃ তার সূচনা করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। সদাচার অভ্যাস মাধ্যমে mind plexus–কে concentrated করে সুস্থ, নীরোগ, উন্নততম মস্তিষ্কের অধিকারী সন্তান জননের জৈবী প্রক্রিয়ার কথা যেমন বলেছেন, তেমনি পরীক্ষাগারে bio-technology–র সফল প্রয়োগ মাধ্যমে ‘artificial production of a living being’ grow করে উন্নততর প্রজাতি সৃষ্টির সব ফরমূলা রেখে গেছেন। দেহ-ত্যাগের অব্যবহিত পরে rigor mortis শুরু হবার পূর্বে cerebro-spinal fluid vaccine push করে পুণর্জীবন লাভের বিষয় সম্পর্কেও বলে গেছেন। তিনি আশা করেছিলেন গবেষণাগার মাধ্যমে জগতের সৃষ্টি রহস্যের matter থেকে spirit, spirit  থেকে matter–এর আবর্তন রহস্য, পিণ্ডদেহ থেকে সূক্ষ্মদেহে, সূক্ষ্মদেহ থেকে পিণ্ডদেহে আগম-নিগম রহস্য উন্মোচন করে মানুষের স্মৃতিবাহী চেতনাকে সমৃদ্ধ করে মানুষকে অনন্ত জীবনের অধিকারী করে তুলবেন।   সেই উদ্দেশ্যে তিনি দূতদীপ্তি হাসপাতাল, শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা করেছিলেন।  সেগুলি বাস্তবায়িত না করা পর্যন্ত ইষ্টস্বার্থ প্রতিষ্ঠা অধরাই থেকে যাবে।

।। গ্রহান্তরের বিজ্ঞানীদের সাথে ভাব-বিনিময় প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।।

        শ্রীশ্রীঠাকুর বলিলেন—এমন একটা যন্ত্র আবিষ্কার করতে পারেন না যাতে জীবজন্তু, পশু-পক্ষী সবারই সঙ্গে কথা কওয়া যায়। কেষ্টদা বলিলেন—সে কি রকম ? উত্তরে শ্রীশ্রীঠাকুর বলিতে লাগিলেন—পশু-পাখীদের voice record করে তার থেকে alphabet  বের করলেই হয়। এতে যদি কৃতকার্য্য হতে পারেন তাহলে আমরা এই গ্রহ-উপগ্রহের প্রাণীদের সঙ্গেও কথাবার্তা বলতে পারি। মঙ্গলগ্রহ পৃথিবীর খুব কাছেওখানকার অধিবাসীরা সবসময় আমাদের সঙ্গে ভাবের আদান প্রদান করতে চায় এবং messageও পাঠায়। কিন্তু আমাদের এখানে বিজ্ঞানের ততদূর উন্নতি না হওয়ায় আমরা তার প্রত্যুত্তর দিতে পারি না।

প্রশ্নঃ আপনি কি মঙ্গল গ্রহে গিয়েছেন ?

 শ্রীশ্রীঠাকুর—হ্যাঁ, গিয়েছি বৈকি। শুধু কি যাওয়া ! তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলা, মেলা-মেশা—এই আপনাদের সঙ্গে যেমন করছি—এই রকমই আর কি। ………তাদের মধ্যে খুব বড় বড় বৈজ্ঞানিকও আছে। আমাদের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান হলে সেখানেও যেমন নূতন সৃষ্টি গজাবে এখানেও তাঁর ব্যত্যয় হবে না। কেষ্টদা বলিলেন—আমরা কিভাবে তাদের বার্তা জানাব ? শ্রীশ্রীঠাকুর বলিলেন—আমরা এখান থেকে বার্তা পাঠাব ইথারের মধ্য দিয়ে যেমন wireless  করছে, ঐখানে গিয়ে সেটা হবে শব্দে পর্যবসিত। তাই বলছিলাম একটা Universal language করতে। (সূত্রঃ ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থ ২য় খণ্ড, পৃঃ ১১৮)

।। আবহাওয়া বিদ্যুৎ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।।

       বিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য প্রতিদিনই বিজ্ঞান বিষয়ক বিবিধ আলোচনা করতেন     শ্রীশ্রীঠাকুরের সাথে। বিজ্ঞানকে জগতের কল্যাণে কিভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে সে বিষয়ে ঠাকুরের ব্যাখ্যা শুনে তিনি হতবাক হয়ে যেতেন । প্রসঙ্গক্রমে একদিন ঠাকুর সৌরবিদ্যুতের চাইতেও সহজলভ্য আবহাওয়া বিদ্যুত (atmospheric electricity) প্রসঙ্গে বললে তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। কয়েকদিন পর কেষ্টদাকে কিছু না জানিয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর সুতোর বদলে তামার তারের সাহায্যে ঘুড়ি ওড়াবার ব্যবস্থা করেন। পদ্মার তীরে ঠাকুর ঘুড়ি ওড়াচ্ছেন। সাথে অনেক ভক্তবৃন্দ। ঘুড়ি উড়ছে। ঠাকুর কেষ্টদাকে লাটাইটা হাতে দিয়ে ঘুড়ি ওড়াতে বললে কেষ্টদা লাটাই ধরতেই ছিটকে পড়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুর তাঁকে ধরে ফেলে বলেন, বিজ্ঞানী কেষ্টদা একটা লাটাই ধরে রাখতে পারলেন না। কেষ্টদা লজ্জিত হয়ে বলেন, আপনার লাটাইয়ের বিদ্যুত তরঙ্গ আমাকে শক্ দিয়ে ফেলে দিল। তাই ধরে রাখতে পারি নি । তখন ঠাকুর বললেন, ঘুড়ির তারের সুতোর মধ্য দিয়ে যদি বিদ্যুত প্রবাহিত হতে পারে তাহলেই বুঝুন আবহমণ্ডলে কি পরিমাণ বিদ্যুত রয়েছে।
ওই বিষয়ে ৪ঠা বৈশাখ, ১৩৩০ সালে যেসব আলোচনা হয়েছিল সেগুলো ক্রমশঃ তুলে ধরছিঃ
       Earth-কে একটা Pole করে আর atmosphere-এ একটা conducting pole ঝুলিয়ে অনন্ত electric current পাওয়া যেতে পারে। এ সম্বন্ধে নূতন experiment নিষ্প্রয়োজন, কারণ বজ্রপাত প্রভৃতি নানা ঘটনা দ্বারা ইহা স্বতঃই প্রমাণিত যে atmosphere-এ electricity বর্তমান। আবার যত উচ্চে অর্থাৎ সূর্যমণ্ডলের নিকট conducting Pole রাখা যাইবে তত বেশী Current পাওয়া যাবে। তিনটি insulated magnet–এর সাহায্যে একটি লোহার চাকতিওয়ালা Copper rod atmosphere–এ ঝুলাইয়া রাখিবার arrangement করিতে পারিলে ইহা সম্ভব হইতে পারে। এইরকম ভাবে electric energy–র দ্বারা পৃথিবীতে বিনা পরিশ্রমে কত কাজের সম্ভব হইবে। কয়লার আর প্রয়োজন হইবে না। কুলীর পরিশ্রমেরও আর আবশ্যক হইবে না।
       Electric Current-এর উদ্ভব হয় Cell-এ। Cell-এCu ও H2র energy particles-এর interaction-এ Cu-plate হইতে energy particle-এর এক particular arrangement-এর flow হয় বাহিরের wire-এ। এই flow কিন্তু spiral flow. যখনই দুই vibrating particle পরস্পর পরস্পরকে ধাক্কা দেয়, তখনই ঐ particle দুটি flow করেspirally Dum Dum bullet-এর মত। Zn-plate হইতেও এই রকমেরই অথচ একটি বিভিন্ন current বাহিরের wire-এ opposite direction-এ flow করে। এই উভয়ের ঘাত প্রতিঘাতে যে resultant flow হয়, তাহাই electric current. এই electric current আর কিছুই নয়–a spiral motion of the energy particles. এইটিই really হয়–magnetic effects of a current in a wire মানে ইহা হইতে বুঝা যায়। Electro-magnetic motion-এ যেন একটি current-এর মধ্যে আর একটি current-এর effect-এ whirl pool-এর সৃষ্টি ছাড়া আর কিছু নয়। (ঋত্বিগাচার্য্য দিনপঞ্জী ১ম খন্ড পৃঃ ১৬-১৭)

৪ঠা জুলাই ১৯২৩  সাল।  রাত্রি ১২টা। শ্রীশ্রীঠাকুর বিজ্ঞান-সাধক কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যকে বলছেন,—‘‘Wind power dynamoটা successful হলেই clouds–এর experiment করা দরকার। তাতে atmospheric electricityর final experiment সম্বন্ধে সাহায্য করবে। এ দুটো আমাদের first steps …..।’’

Botanical experiments সম্বন্ধে বললেন—‘‘অনেক species of plants যোগাড় করে বাগান করতে হবে। Seeds-এর ভিতর electricity electrons কিংবা Radium emanation pass করে দেখতে হবে। কোন seedsএ current pass করে এমন কয়েক generation বাদে কি রকম speciesএ change হবে তাও দেখতে হবে। যে সমস্ত plants বুনো আছে তাদের খাদ্যে পরিণত করা যায় কিনা দেখতে হয়। শুনতে পাই কপিও নাকি ঐ রকম বুনো ছিল। জগতে মানুষের দ্বারা এমন সব সত্য আবিষ্কৃত হবে, যখন মানুষ আর মিথ্যা কথা বলতেই পারবে না। এক সময় ছিল, যখন মানুষ হয়ত মিথ্যা করে বলত—‘আকাশ দিয়ে জাহাজ উড়ে যাচ্ছে দেখে এলাম।’ তখন সেটা মিথ্যা থাকলেও, এখন কিন্তু সেটা আর  মিথ্যা নয়। এক সময় সকল ভাবের realisation ও satisfaction আসবে।’’

বিজ্ঞান-সাধক শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপ্রসন্ন  ভট্টাচার্য্য মহোদয়কে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছিলেন,—Universal alphabet ও Atmospheric electricity successful হলেই আপনার মুক্তি। এই করে মরে গেলেও আপনি মুক্তি পাবেন।  জগতের মহা পরিবর্তন সংগঠিত হবে।’’ (সূত্র : ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থ, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৫০-৫১)                       

উক্ত আলোচনার পর থেকে এই সময় পর্যন্ত বিজ্ঞান গবেষণায় যথেষ্ট অগ্রগতি হলেও তাঁর ইচ্ছাগুলোকে আমরা কতটুকু বাস্তবায়িত করতে পেরেছি, সে বিষয়ে একটু আত্ম-বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন, আমাদের সকলেরি।   

  ঠাকুর চেয়েছিলেন, বিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমে উক্ত তাত্ত্বিক দিকগুলোকে তথ্যসমৃদ্ধ করে ঋত্বিক সংঘ পরিচালিত অধিবেশন কেন্দ্র মাধ্যমে দিকে দিকে পরিবেষণ দ্বারা এক পরম রাষ্ট্রিক সমবায় গঠন করতে। তা করতে পারলে সাধারণ মানুষকে পোলিও-সচেতন-এর মত ইষ্ট-নিয়মনা সচেতন করা সম্ভব হতে পারত। অথচ খাতায়-কলমে সৎসঙ্গের মেমোরান্ডামে এগুলোর কথা উল্লেখিত হয়েছিল! কিন্তু অজ্ঞাত কোন কারণে বাস্তবায়িত হয়নি।

।। ভারতবর্ষের অখণ্ডতা রক্ষা বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের চেষ্টা ।।

       কীর্তন, পল্লী সংগঠন, তপোবন বিদ্যালয়, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র ইত্যাদি কর্মসংগঠনের মাধ্যমে আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের নমুনার কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করে চলেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর হিমাইতপুরে। সেই সময় কিছু স্বাধীনতাকামী বিপ্লবী ঠাকুরকে ওইসব ছেড়ে তাদের সাথে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেবার আহ্বান জানালে ঠাকুর বলেন, ভারত তো পরাধীন ছিল না। আর্য্যযুগ থেকে শুরু করে দীর্ঘদিনের স্বাধীনতা আমাদের হারাতে হলো কেন ?
বিপ্লবী : সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্তে।
ঠাকুর : সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্ত যদি থেকেই থাকে সে চক্রান্তের ফাঁদে আমরা পা দিলাম কেন ?
বিপ্লবী : আমাদের জাতীয় চরিত্রের দুর্বলতার জন্য ।
ঠাকুর : তাহলে দেখুন আপনিই স্বীকার করলেন যে পরাধীনতার মূল কারণ চরিত্রগত দুর্বলতা। আমি তো দাদা সেই কাজটাই করছি, মানুষ যাতে লোভ, কাম, ক্রোধ এইসব রিপুর,  প্রবৃত্তির অধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে সু বা সত্তার অধীন হতে পারে। তাই আপনাদের উচিত আমার সাথে যোগ দেওয়া।   
       তাই তো, শ্রীশ্রীঠাকুর সর্বপ্রথমে আমাদের দুর্বলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সু অর্থাৎ সত্তার অধীন হতে উপদেশ দিলেন যাতে আমরা আর কোন চক্রান্তের শিকার না হই। 
শ্রীশ্রীঠাকুরের মতে, FREEDOM মানে প্রিয়ের বাড়ী । In born we are inter-dependent not independent. জন্ম নিতেও বাবা মা লাগে অধীনতা মানতেই হয়। সু পিতামাতার অধীনেই সুসন্তান অর্থাৎ স্বাধীন সন্তান বা প্রকৃষ্ট জাতক বা প্রজা জন্মায়। এই হলো প্রকৃত স্বাধীনতার তাৎপর্য।

*      *      *

মানবসভ্যতার এক পরম বিস্ময় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র জ্ঞান গরিমায় গরবিনী আর্য্য ভারতবর্ষের অখণ্ডতা রক্ষার কথা জনে জনে বলেছেন। মুসলিম লীগ ও হিন্দু মহাসভার নেতাদের সাথে কথা বলেছেন সাম্প্রদায়িকতার ব্যাধি নিরসনের জন্য। হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে পরামর্শ দিয়েছিলেন হিন্দু মহাসভার নাম বদলে আর্য্য মহাসভা রাখতে। মুসলমানরাও আর্য্য। তাদেরও আর্য্য মহাসভার সদস্য করতে হবে। আরবী শিখে কোরান পাঠ করতে হবে। মুসলীম লীগ যদি ইসলাম বিরোধী কিছু করে প্রীভি কাউন্সিলে শত শত কেস করতে হবে মহানবীর আদর্শ বাঁচাতে। আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে মুসলমানদের, মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে হিন্দুদের স্থানান্তর করে সাম্প্রদায়িক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। এই যদি করে ফেলতে পারেন দেখবেন দেশ ভাগ হবে না। এজন্য টাকার অভাব হবে না। বড় বড় জমিদারদের বোঝান। তাদের সাহায্যে এ কাজ আপনি করতে পারবেন । অত বড় বাবার ছেলে আপনি। আমি আমার সব কিছু দিয়ে আপনাকে সহায়তা করব। আমাদের চেষ্টার ত্রুটিতে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে যদি দেশ ভাগ হয়, তা’তে হিন্দু মুসলমান উভয়ের ক্ষতির সম্ভাবনা।

শ্রীশ্রীঠাকুর হিন্দু-মুসলমানের ভারসাম্য ঠিক রাখার জন্য দেশ নেতাদের  এবং বড় বড় জমিদারদের সাথে আলাপ-আলোচনা যেমন করেছেন, তেমনি নিজ-উদ্যোগে বাংলা থেকে পারশবদের এবং বিহার থেকে হৈ-হৈ ক্ষত্রিয়দের পাবনাতে এনে বসতি স্থাপন এবং কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করেছিলেন।

      ।। স্বস্ত্যয়নী ও ইষ্টভৃতি প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট ।।
       প্রায়শই কথাচ্ছলে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র পূর্ববর্তী অবতার পুরুষদের জীবনী বর্ণনা করতেন, বাণী বলতেন। প্রভু যীশুর একটি  বাণীর উপমা  দিয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর প্রায়ই বলতেন,  “Be a Philanthropist, you will see all are philanthropist.” (লোকহিতৈষী হও, দেখবে সকলেই লোকহিতৈষী হয়েছে।) উক্ত বাণী বাস্তবায়নের মহাসুযোগ এসে গেছে হাতের সামনে। আর্য্যকৃষ্টির বর্ণাশ্রমানুগ মহান ঐতিহ্যের অনুশাসনের নবীকরণ করে বৃহত্তর আর্যাবর্তের প্রজাদের সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ এক রাষ্ট্রের মধ্যে নিরাপদে রাখার প্রচেষ্টায় দৈনন্দিন জীবনে আর্য্য-রীতির পঞ্চমহাযজ্ঞের প্রবর্তন করলেন ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের মাধ্যমে। যার উদ্দেশ্য ছিল ইষ্টভরণ, পিতৃপোষণ, পরিস্থিতির উন্নয়ন। অর্থাৎ ইষ্ট ঈপ্সিত মঙ্গল কর্মের মাধ্যমে বৃহত্তর পরিবেশকে রক্ষা করে পিতৃপুরুষের গৌরবকে অক্ষুণ্ণ রাখার শপথ গ্রহণ। 

       আর্য্য শাস্ত্র মনু সংহিতায় বর্ণিত “ইদং স্বস্ত্যয়ন” সু-অস্তি-অয়ন (সুন্দরের বা সতের বিদ্যমানতাকে ধারণ করে রাখার পথ।) মন্ত্রকে নবীকরণ করতে প্রবর্তন করলে স্বস্ত্যয়নী ব্রতবিধির। যদিও স্বস্ত্যয়নীর প্রবর্তন করেন প্রথমে, ১৯৩৭ খ্রীস্টাব্দে। ইষ্টভৃতি ১৯৩৮ খ্রীস্টাব্দে। সৎসঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী মর্মার্থের সাথে পরিচিত নাহলেও ‘স্বস্ত্যয়নী’র তুলনায় ‘ইষ্টভৃতি’ নামের সাথে বেশীরভাগ সংঘকেন্দ্রিক জনেরা যেমন পরিচিত, তেমনি সাধারণ লোকেরা ঠাকুরের নামে টাকাপয়সা রাখার মাধ্যম হিসেবে ‘ইষ্টভৃতি’ শব্দকে জানেন।

       যাইহোক ‘ইষ্টভৃতি’কে উপস্থাপনা করার চেষ্টা করে, পরে ‘স্বস্ত্যয়নী’ নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব।
শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাষায়–
“ঈশ্বর-অনুধ্যায়িতা নিয়ে
গণহিতী অনুচর্য্যায়
তাদের যে অনুগ্রহ-অবদান অর্জ্জন কর,
সেই অবদান হ’তে
শ্রদ্ধানুস্যূত অন্তঃকরণে
স্বতঃস্বেচ্ছায় তোমার ইষ্টকে যা নিবেদন কর,
তাই-ই কিন্তু তোমার শ্রেষ্ঠ ইষ্টভৃতি ।” 
(ধৃতি-বিধায়না, ১ম খণ্ড, বাণী সংখ্যা ৩০৬)
       অর্থাৎ, বর্ণানুগ কর্মের সেবার মাধ্যমে, বৃহত্তর পরিবেশে, ঘটে ঘটে ইষ্ট স্ফূরণের বা মঙ্গল প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত থাকার বিনিময়ে অযাচিত প্রাপ্ত অর্থ বা সম্পদকে বলা হয়েছে অনুগ্রহ অবদান।   ওই অনুগ্রহ অবদান আর্য্য হিন্দুদের সাধু উপায়। তা থেকে শ্রদ্ধার্ঘ্য স্বরূপ অগ্রভাগ ইষ্টের উদ্দেশ্যে নিবেদন করতে হবে। নচেৎ ব্রাত্যদোষে দুষ্ট হতে হবে। গীতাতে এই নিবেদন সম্পর্কে স্পষ্ট নিদেশ রয়েছে যে, ইষ্টকে নিবেদন না করে কিছু খেলে চোর হতে হয়। আবার অশুদ্ধ আমিষ বা অসাধু উপায়ের কোন কিছু তো আর ইষ্টকে নিবেদন করা যায় না তাই সাধু উপায়ের অগ্রভাগ নিবেদন করার বিধি প্রবর্তন করে আমাদের ব্রাত্যদোষ থেকে মুক্ত করে প্রকৃত আর্য্যত্বে উত্তরণ ঘটালেন। মানুষকে দেবতায় পরিণত করতে চাইলেন।   
        “জীবে প্রীতি বিতরণ করে যেই জন,
        সেই জন সেবিছে ঈশ্বর ।”—এই হল ঈশ্বর অনুধ্যায়িতার স্বরূপ।
        ঠাকুরের বলা অনুযায়ী বর্ণানুগ কর্ম এবং ঈশ্বর অনুধ্যায়িতা ব্যতীত ইষ্টভৃতি বাস্তবায়িত হয় না ।Top of FormBottom of Form ইষ্টের প্রীতির জন্য কাউকে পীড়িত না করে, নিজে পীড়িত না হয়ে বর্ণানুগ কর্মের সেবা মাধ্যমে আহরিত অর্থ ‘দিন গুজরানী আয়’-কেই ইষ্টভৃতির অর্ঘ্য হিসেবে নিবার্চিত করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর। ওই নির্দেশ অনুসারে ইষ্টার্ঘ্য আহরণ করার মধ্যেই প্রীতি, মৈত্রী ও ঐক্যের বীজ বপন করে দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন আর্য্যকৃষ্টির সদাচার এবং বর্ণাশ্রম ধর্মকে। ইষ্টের উদ্দেশ্যে নিবেদিত ওই অর্ঘ্য হলো ইষ্টার্ঘ্য, যা’ ইষ্টকেই দিতে হবে। তিনি তা দিয়ে PHILANTHROPICAL WORK অর্থাৎ, সব্যষ্টি সমষ্টির মধ্যে ভাগবত ঐক্য স্থাপন দ্বারা গণহিতৈষণা কর্ম করবেন। (প্রসঙ্গতঃ জেনে রাখা ভালো, ঠাকুর কস্মিনকালেও ইষ্টার্ঘ্যের টাকা-পয়সা ইষ্টকর্ম ব্যতীত  নিজের ভোগে লাগান নি। ঠাকুর  নিজে টাকা স্পর্শ করতেন না। টাকা-পয়সাকে তিনি বলতেন devil’s dung (শয়তানের বিষ্ঠা)।)   ইষ্টভৃতির দাতা এবং গ্রহীতার মেলবন্ধনে গড়ে উঠবে পরম রাষ্ট্রিক সমবায়। এই ছিল ঠাকুরের পরিকল্পনা। সেই উদ্দেশে স্থাপন করেছিলেন ফিলানথ্রপি কার্যালয়। মাসান্তে ওই অর্ঘ্য পাঠাতে হবে ইষ্টসকাশে। ইষ্টের নামে প্রেরিত ওই অর্ঘ্য গৃহীত হতো ফিলানথ্রপিতে। ইষ্টভৃতি পাঠাবার পর দুজনকে ভ্রাতৃভোজ্য দিতে হবে। এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যেই শুধু নয়, পরিবেশের সবকিছুর মধ্যে প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করতে চেয়েছিলেন। দেশের অর্থনীতিকে  সমৃদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। 

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুশ্রুতি গ্রন্থে ইষ্টভৃতির বিষয়ে বললেন :
“দিন গুজরানী আয় থেকে কর
ইষ্টভৃতি আহরণ,
জলগ্রহণের পূর্ব্বেই তা’
করিস্ ইষ্টে নিবেদন ;
নিত্য এমনি নিয়মিত
যেমন পারিস ক’রেই যা’
মাসটি যবে শেষ হবে তুই
ইষ্টস্থানে পাঠাস্ তা’ ; 
ইষ্টস্থানে পাঠিয়ে দিয়ে
আরো দু’টি ভুজ্যি রাখিস্,
গুরুভাই বা গুরুজনের
দু’জনাকে সেইটি দিস্ ;
পাড়া-পড়শীর সেবার কাজে
রাখিস কিন্তু কিছু আরো,
উপযুক্ত আপদগ্রস্তে
দিতেই হ’বে যেটুকু পার ;
এসবগুলির আচরণে
ইষ্টভৃতি নিখুঁত হয়–
এ না-ক’রে ইষ্টভৃতি
জানিস্ কিন্তু পূর্ণ নয়।”

       ইষ্টভৃতিকেন্দ্রিক পূর্বোক্ত বাণী এবং উপরোক্ত বাণীর মাধ্যমে পরিস্ফূট হয়েছে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধিদ ভাগবত ঐক্যের পরমবার্তা। 
       শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত ইষ্টভৃতি নিবেদন মন্ত্র আসলে একটি দৈনন্দিন জীবনে শপথ গ্রহণের এবং পালনের মন্ত্র। যে মন্ত্রের    ‘‘…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপারর্শ্বিকাঃ।।’’ উচ্চারণ করার সাথে সাথে বৃহত্তর পারিপার্শ্বিকের জীবনবৃদ্ধির দায়ভারের শপথ নিতে হয় আমাদের। ঠাকুরের আদর্শ অনুযায়ী বাস্তব কর্মের দ্বারা বৃহত্তর পরিবেশের জৈবাজৈব সবকিছুকে পালন-পোষণে সমৃদ্ধ করে রাখার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সার্থক হয় ইষ্টভৃতি পালন। 
       যদিও ইষ্টভৃতি প্রচলনের বহু পূর্বে সত্যানুসরণের “তুমি তোমার, নিজ পরিবারের, দেশের ও দশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দায়ী।” বাণীর মাধ্যমে অনুরূপ দায়ভার দিয়েই রেখেছিলেন ব্যষ্টি ও সমষ্টি উন্নয়নের দিকে লক্ষ্য রেখে। 
       এ তো গেল ইষ্টভৃতি আহরণ ও নিবেদনপর্ব। এর পর রয়েছে প্রেরণপর্ব। প্রেরণ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর স্পষ্ট নির্দেশ করে দিয়ে বলেছেন :
ইষ্টভৃতি ইষ্টকেই দিস
করিসনা তায় বঞ্চনা। 
অন্যকে তা দিলেই জানিস
আসবে বিপাক গঞ্জনা।।

       অর্থাৎ ইষ্টভৃতি ইষ্টেরই প্রাপ্য, অন্য কারও নয়। ওই অর্ঘ্য দিয়ে ইষ্টকর্ম করা হবে। ইষ্টকর্ম মানে পূর্ত্তকর্ম। যা প্রকৃত ইষ্টভৃতির মন্ত্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে।   “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ।।” এর সরলার্থ খুব সহজ। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুযায়ী সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন বর্দ্ধনার বিধি মেনে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে চলেন যিনি এমন গুরুভাই-ই প্রকৃত ইষ্টভ্রাতা।–-যাঁর আপদে-বিপদে সাধ্যানুগ সাহায্য করতে হবে। ভূত মানে,—ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা পরিবেশের অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। উক্ত উপাদানসমূহকে সমৃদ্ধ রাখার জন্য আর্য্যদের বাস্তব পূর্ত্ত-কর্মের মাধ্যমে নিত্য পঞ্চ-মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করতে হতো সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধিকে অক্ষুণ্ণ রাখতে।  শ্রীশ্রীঠাকুর ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের মাধ্যমে ওই প্রক্রিয়াকে নবীকরণ করলেন। শ্রীশ্রীঠাকুর হিমাইতপুর আশ্রম সংগঠনের মাধ্যমে  ইষ্টভৃতির বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আমাদেরও তাই করতে হবে।   ইষ্টের অবর্তমানে, ইষ্টাদর্শের পরমরাষ্ট্রিক সমবায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ, কৃষি ও শিল্পের বাস্তবায়ন করতে যিনি সক্ষম তিনিই ইষ্টার্ঘ্য গ্রহণের উপযুক্ত ব্যক্তি।–-যাঁর মধ্যে ঠাকুরত্ব জাগ্রত থাকতে হবে।–-সেই ব্যক্তিটিকে সংহত চরিত্র, বোধিসম্পন্ন, সানুকম্পী চর্য্যানিরত, সমন্বয়ী সামঞ্জস্য-প্রধান, পদনির্লোভ, অদ্রোহী, শিষ্ট-নিয়ন্ত্রক, প্রীতিপ্রাণ হতে হবে।  এক-কথায় যাঁর মধ্যে ঠাকুরত্ব জাগ্রত, ইষ্টাদর্শ জীবন্ত, তাঁকেই ইষ্টার্ঘ্য দিতে হবে। অন্যথায় বিপাক-গঞ্জনাকে মেনে নিতে হবে।   

       প্রবৃত্তির সব বিপাক এবং গঞ্জনা থেকে আমাদের মুক্ত করতে—

‘‘স্বস্ত্যয়নী মুক্তি আনে/রাষ্ট্রসহ প্রতি জনে।’’—বাণীর ভরসা দিয়ে

পঞ্চনীতি সমন্বিত স্বস্ত্যয়নী ব্রতের প্রবর্তন করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। 

                     ১।  শ্রীবিগ্রহের মন্দির ভেবে

                                  যত্ন করিস শরীরটাকে,

                       সহনপটু সুস্থ রাখিস

                                   বিধিমাফিক পালিস তাকে ;

                     ২। প্রবৃত্তি তোর যখন যেমন

                                  যেভাবেই উঁকি মারুক,

                        ইষ্টস্বার্থ প্রতিষ্ঠাতে ঘুরিয়ে দিবি

                                  তার্ সে ঝোঁক। 

                     ৩। যে-কাজে যা ভাল বলে

                                   আসবে মনে তৎক্ষণাৎ

                        হাতে-কলমে করবি রে তা’

                                  রোধ করে তার সব ব্যাঘাত। 

                     ৪। পাড়াপড়শীর বাঁচা-বাড়ায়

                                   রাখিস রে তুই স্বার্থটান,
                        তাদের ভালয় চেতিয়ে তুলিস

                                  ইষ্টানুগ করে প্রাণ। 

                     ৫।  নিজের সেবার আগেই রোজই

                                  শক্তি মত যেমন পারিস,

                        ইষ্ট অর্ঘ্য ভক্তিভরে

                                  শুচিতে নিবেদন করিস ;

                        এই নিয়মে নিত্যদিন

                                  প্রতি কাজেই সর্ব্বক্ষণ

                        স্বস্ত্যয়নীর নিয়মগুলি

                                  পালিস দিয়ে অটুট মন ;

                        ত্রিশটি দিন পুরে গেলে

                                  মাসিক অর্ঘ্য সদক্ষিণায়

                        ইষ্টভোজ্য পাঠিয়ে বাকি

                                  মজুত রাখবি বর্দ্ধনায় ;

                        চিরজীবন এমনি করে

                                  ইষ্টস্থানে হয় নিরত,

                        তাকেই বলে স্বস্ত্যয়নী

                                  সবার সেরা মহান ব্রত। 

        শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রদত্ত উক্ত বাণী থেকে একটা জিনিস স্পষ্ট হলো, যে জড়-পদার্থে নির্মিত মন্দিরের পরিবর্তে নিজ-নিজ দেহটাকেই শ্রীবিগ্রহ মন্দির জ্ঞানে পবিত্রতার সাথে রক্ষা করতে হবে, যেহেতু এই দেহের মধ্যেই পরমাত্মার আবাস। ভোগ, দুর্ভোগ, উপভোগ, মুক্তি, পরামুক্তি, পরাগতি সবকিছুই এই দেহের মধ্যেই। যা নাই ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে এই দেহভাণ্ডে।  আমাদের আর্য্য শাস্ত্রাদিতেও একথার উল্লেখ রয়েছে। শ্রীশ্রীঠাকুর জীবাত্মার মধ্যে সুপ্ত পরমাত্মাকে জাগাতে বলেছেন নামের মাধ্যমে। ৫টি কর্মেন্দ্রিয়, ৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয়, মন, বিবেক, জীবাত্মা, পরমাত্মাদির সমন্বয়ে সৃষ্টি এই দেহমন্দিরকে পবিত্র রাখার, সুস্থ-স্বস্থ রাখার ভাগবত-বিধির পালন-পদ্ধতি সহজভাবে বিধায়িত করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর এই ব্রতের মাধ্যমে। তিনি কোনদিন ভুলেও তাঁর নামে মন্দির নির্মাণের কথা বলেন নি, বলেছিলেন ঘরে ঘরে গার্হস্থ্যাশ্রমের প্রতিষ্ঠার কথা। গার্হস্থ্যাশ্রমের সম্মিলিত রূপ হবে অধিবেশন কেন্দ্র। যা’ ‘সৎসঙ্গ চায় মানুষ’ বাণীতে স্পষ্ট করে দিয়েছেন।  ‘কথা-প্রসঙ্গে’, ‘নানা-প্রসঙ্গে’ গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনাও করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর।

*   *   *

        ভবিষ্যতদ্রষ্টা ঋষি শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র মন্দির বিষয়ে বলেছেন—‘‘আমার নামে দেখবে অনেক মন্দির হবে | কিন্তু আমার ইচ্ছা করে তোমাদের হৃদয়টা, চলমান জীবনটা আমার জাগ্রত মন্দির হোক | এবং আমাকে তোমরা সর্বত্র বয়ে নিয়ে বেড়াও | ধর্ম মানুষের জীবনের মধ্যে না থাকলে, আচরণের মধ্যে না থাকলে, ধর্মসঙ্ঘ থাকা সত্ত্বেও ধর্ম লোপ পায় | এবার সে ব্যাপারটা ঘটতে দিও না | আমার কথাগুলি মনে রেখো | এবং আমার কথাগুলি পৃথিবীর লোকে যাতে জানতে পারে, সময়মত তার ব্যবস্থা ক’রে যেও | কে কখন উপযুক্ত লোক আসবে, ঠিক কি? তবে আমার কাজটা হ’লো ঈশ্বরকোটি পুরুষের কাজ | যুগে যুগে তারা আসে | ঈশ্বর ছাড়া আর কিছুই তাদের মজাতে পারে না |’’

      ‘‘আমি নগণ্য মানুষ, কিন্তু পরমপিতা আমাকে দিয়ে যা বলালেন, যা করালেন, মনুষ্যসমাজ তার উপর না দাঁড়ালে, সব জ্ঞানগুণ সত্ত্বেও পৃথিবী মারামারি, হানাহানি, কাটাকাটির হাত থেকে রেহাই পাবে না। মানুষের সব শক্তি নিয়োজিত হবে সপরিবেশ আত্মহননে এবং জীবনের ভিত্তিভূমির ধ্বংসসাধনে। আমার বিশ্বাস, তোমরা যদি না কর, হয়ত বাইরের লোক এসে এ কাজ করবে। তোমরা যেই হও আর যাই হও না, বিকৃত হ’লে এ কাজ করবার অধিকার ও
যোগ্যতা হারিয়ে ফেলবে। কামিনী-কাঞ্চনাসক্ত কতকগুলি ওঁছা লোক তোমাদের কাছে ভীড় জমাবে এবং আত্মস্বার্থের জন্য পরস্পর শকুনের মত কামড়াকামড়ি করবে। সৎসঙ্গে একদিন বৃষ্টির জলের মত টাকাবৃষ্টি হবে।  সেই দিনই সৎসঙ্গের বিপদের দিন। ঐশ্বর্য ও ক্ষমতায় মাথা ঠিক থাকে খুব কম লোকেরই। যারা মনে করে ঐশ্বর্য্য ও শক্তি পরমপিতার, তিনিই মালিক, আমি এর
অছিমাত্র, কাজলের ঘরে থাকা সত্ত্বেও তাদের গায়ে কালি লাগে না। নইলে মুস্কিল আছে।’’

(‘আলোচনা-প্রসঙ্গে’-র সংকলক প্রফুল্ল কুমার দাস, এম.এ, প্রতি-ঋত্বিক প্রণীত
‘স্মৃতি-তীর্থে’ গ্রন্থের পৃষ্ঠা ১০২-১০৫ থেকে  নির্বাচিত বাণী।)    

       তথাপিও কেন জানি আমরা বহুনৈষ্ঠিক-মন্দিরকেন্দ্রিক হয়ে স্বস্ত্যয়নী-বিধি অপলাপী চলনে চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।

       যাইহোক, স্বস্ত্যয়নীর পঞ্চম নীতিতে দৈনন্দিন অর্ঘ্য নিবেদনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জমা অর্ঘ্য থেকে সদক্ষিনায় ৩ টাকা (১৯৩৭ খ্রীষ্টাব্দের ৩টাকা, বর্তমানে কত হতে পারে আন্দাজ করে নিতে হবে।) ইষ্ট-সকাশে পাঠিয়ে অবশিষ্ট নিজের কাছে মজুত রেখে তা দিয়ে ইষ্টোত্তর সম্পত্তি করতে হবে। ওইসব সম্পত্তির আয়ের এক-পঞ্চমাংশ সেবায়েত হিসাবে ব্রতধারী ভোগ করতে পারবে, কিন্তু রাষ্ট্র বিপন্ন হলে ওইসব সম্পত্তি রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতি রক্ষার্থে বিনিয়োগ হবে।

শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে প্রেরিত ইষ্টার্ঘ্য থেকে একটি পয়সাও তিনি নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করেন নি।  আদর্শ রাষ্ট্রের মডেল হিসেবে হিমায়েতপুর আশ্রমকে গড়ে তুলতে এবং রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতি রক্ষার কাজে ব্যয় করেছেন।  তৎকালীন নেতৃবর্গ কথা দেওয়া সত্বেও শ্রীশ্রীঠাকুরের নির্দেশিত পথে দেশের ঐক্য ও সংহতি রক্ষায় আত্মনিয়োগ করেন নি, তিনি কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেননি।  কোন মন্দির নির্মাণ না করেই ‘স্বস্তিসেবক বাহিনী’ মাধ্যমে পাবনা সংলগ্ন সব্বাইকে সেদিন রক্ষা করেছিলেন। ১৩৪৮ সালে বৃহত্তর বাংলা জুড়ে  যে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল সে সময় বন্যা-পীড়িতদের উদ্ধার এবং পুনর্বাসনের জন্য ঠাকুরের অবদান সৎসঙ্গ আন্দোলনের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বন্যা পরবর্তী ১৩৪৯-১৩৫০ সালের মহা-দুর্ভিক্ষের সময়েও  আশেপাশের গ্রামের কাউকে অনাহারে মরতে দেন নি। স্বস্ত্যয়নীর ইষ্টোত্তর জমি এবং সোনার বিনিময়ে মাটি কিনে রাখা জমির ফসল দিয়ে, চাল ভিক্ষা করে রক্ষা করেছিলেন বৃহত্তর পাবনার ক্ষুধাপীড়িত মানুষদের।

*     *     *       

প্রকৃত অর্থে হিমাইতপুর আশ্রম ছিল সর্বতোমুখী জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান। শুধু আশ্রমবাসীরাই নয়, ঠাকুরের আদর্শে দীক্ষিত ছিলেন না, তারাও জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায়-ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে সকলেই আশ্রমের সব প্রতিষ্ঠানের সুলভ সেবা পেতেন।    আশেপাশের সব গ্রামের মানুষেরা জানতো, অনুকূল ঠাকুর নামে একজন ফেরেস্তা আছে, যে আমাদের আপদে-বিপদে সহায় হয়, মায়ের মতো আগলে রাখে।

এ বিষয়ে  সুভাষচন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধী, বিপিন চন্দ্র পাল প্রমুখ নেতৃবৃন্দ হিমাইতপুর আশ্রমের কর্মকাণ্ডের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। 

তৎকালিন বাংলা গভর্মেণ্টের প্রধানমন্ত্রী, মৌলভী এ. কে. ফজলুল হক আশ্রম পরিদর্শন করে বলেছিলেন, ‘‘….. সৎসঙ্গের আদর্শ প্রকৃত  মুশ্লিমেরই আদর্শ। …. প্রত্যেক মুসলমানের পক্ষেই সৎসঙ্গের এই আদর্শে নিজের চরিত্র গঠন করা উচিত। …. আমি সামান্য একজন সৎসঙ্গের সেবককে যতখানি সম্মান করি, একজন গভর্ণমেণ্টের  খেতাবীযুক্ত লোককে ততটা পারি না। …’’ 

তৎকালিন কলিকাতা হাইকোর্টের একজন আইনজ্ঞ, ওয়াহেদ হুসেন আশ্রম  পরিদর্শন করে বলেছিলেন, “….. It aims at establishing peace and unity between the Hindus and Mohamedens. ….  I am glad to note that  the efforts of Pabna Asram are appreciated by both the communities.”

তৎকালিন  অবিভক্ত বাংলার রাজ্যপাল সৎসঙ্গ সম্পর্কে বলেছিলেন—

“The Satsang is doing excellent  work in Education, Art, Social Service  and Religion.

….   As far  as it  may lie in my power to do so I shall be glad to assist in this connection.” (JOHN ANDERSON, Governor of Bengal)

।। হিমাইতপুর থেকে দেওঘরে আগমনের প্রেক্ষাপট ।।

পরিবেশের জন্য এতকিছু করা সত্বেও  আশ্রমের ভেতরে-বাইরে উপকৃত মানুষেরাই ঠাকুরের সাথে শত্রুতা করেই চলেছিল, এমনকি ঠাকুরকে অপহরণ করতে চেয়েছিল, বিষ প্রয়োগ করে মারতেও চেয়েছিল।  খুন হয় আশ্রমের কর্মী, তপোবনের ছাত্র। পিতৃ-বিয়োগ, দেশবন্ধু-বিয়োগ, মাতৃ-বিয়োগ, আবাল্যের সাথী নফর ঘোষ, অনন্ত মহারাজ, কিশোরীমোহন-দের বিয়োগ-ব্যথায় ব্যথাহারী হলেন ব্যথিত।  ১৩৫৩ সালের প্রথম দিকে মুসলিম লীগের  ‘ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে’ ঘোষিত হবার সাথে সাথে কলকাতায় যে পৈশাচিক হত্যালীলা হয়েছিল সে সংবাদ শুনে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন ঠাকুর।  দেশ-নেতাদের আগাম সতর্ক করা সত্ত্বেও, প্রতিরোধী-ব্যবস্থাপত্র দেওয়া সত্ত্বেও তাঁরা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি।  বিপন্ন দেশবাসীদের রক্ষা করতে না পারার বেদনায় বিপর্যস্ত তিনি।  বেড়ে গেল রক্তচাপ, হয়ে পড়লেন অসুস্থ।  খবর শুনে পাবনার বিশিষ্ট মুসলমান নেতৃবৃন্দ ঠাকুরকে দেখতে আসেন, পাবনায় সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াতে দেবেন না বলে আশ্বস্ত করেন।  একটু সুস্থ বোধ করেন, আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন।  ঠাকুরের প্রিয় কলকাতার বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ গুপ্ত প্রয়োজনীয় ঔষধ এবং সম্পূর্ণ বিশ্রামের ব্যবস্থাপত্র দিয়ে যান।  বাঁধের ধারে নিভৃত নিবাসের মনোরম পরিবেশে ঠাকুরের বিশ্রামের ব্যবস্থা করেন ঋত্বিগাচার্য্য।  চাপমুক্ত রাখতে দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষেধ করে দেন।  কিন্তু ঠাকুর রাজী হন না।  মনের কথা, প্রাণের ব্যথা নিয়ে যারা যারা আসবে, তাদের তিনি কিছুতেই ফেরাতে নারাজ।  আগন্তুকদের দুঃখ-বেদনার কথা শুনতে শুনতে আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন।  সংবাদ পেয়ে ডাঃ গুপ্ত আসেন, ঠাকুরকে দূরে কোথাও বায়ু পরিবর্তনের জন্য নিয়ে যাবার পরামর্শ দেন।    

অবশেষে আশ্রম কর্তৃপক্ষ ঠাকুরকে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।  ঠাকুর বিহার প্রদেশের দেওঘরে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।  

 “৩০শে আগষ্ট (১৯৪৬) শ্রীশ্রীঠাকুর পাবনা শহরের হিন্দু-মুসলমান নেতৃবর্গকে ডেকে অনুমতি চান দেওঘর যাওয়ার. তখন সবার কাছ থেকে, বিশেষতঃ মুসলিম নেতা হাকিম সাহেবের কাছে অনুমতি নেন ও কথা কাড়িয়ে নেন যাতে তিনি আশ্রমের সামগ্রিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন।  প্রসঙ্গতঃ ঠাকুর বলেন—হাকিম সাহেব! এখন আমার বাইরে যাবার সময় নয়।  আমার মার নামে– ‘মনমোহিনী ইনস্টিটিউট্ অফ্ সায়েন্স য়্যাণ্ড টেকনোলজি’ কলকাতা ইউনিভার্সিটির অধীনে নূতন কলেজ হয়েছে আমার।  কলেজ এবং ইউনিভার্সিটির পরিকল্পনা আমার আজন্মের। সেই সুযোগ হাতে এসে গেছে আমার। কেষ্টদা (ভট্টাচার্য্য) হচ্ছেন কলেজের প্রিন্সিপাল। কেষ্টদা সঙ্গে না থাকলে তো আমি কানা, তাই কেষ্টদাকে সঙ্গে নিয়ে যাব।  আমার এই বাচ্চা প্রিন্সিপাল থাকবে প্রফুল্ল দাস।  বাচ্চা দেখালে কি হয়, এলেম আছে। আপনি ওকে দেখবেন যাতে আমার মার নামের বিজ্ঞান কলেজ ভাল করে চলে।

হাকিম সাহেব বললেন—আপনি নিশ্চিন্ত মনে যান।  কখনও কোনও অসুবিধা হলে বঙ্কিমবাবু (রায়) ও প্রফুল্লবাবু যেন আমাদের জানান। ফোনে একটা খবর পেলেও যা করার করতে পারি। খোদাতালার দয়ায় আপনি সুস্থ হয়ে সদলবলে তাড়াতাড়ি ফিরে আসুন।  আপনি ফিরে আসা না পর্য্যন্ত আমরা শান্তি পাব না।

পরিবেশটা তখন আবেগে ও মমতায় থরথর করে কাঁপছে।  শ্রীশ্রীঠাকুরের চক্ষু অশ্রুভারাক্রান্ত। বেদনাহত দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন সবার পানে। পূজনীয় খেপুদার বাইরের ঘরে বসে এই ঐতিহাসিক শেষ বৈঠক।“ (তথ্যসূত্রঃ কুমারকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য প্রণীত মহামানবের সাগরতীরে/১ম/৩)

ঠাকুরের নির্দেশমত, “রওনা হলেন সুশীলচন্দ্র, সঙ্গে রাজেন্দ্রনাথ ও  বীরেন্দ্রলাল।  কলকাতা এসে ভোলানাথ সরকারের সঙ্গে রাজেন্দ্রনাথ আপ্রাণ চেষ্টা করে ৩১শে আগষ্ট বগী রিজার্ভ করলেন।  ঠিক হল ১লা সেপ্টেম্বর সকালে ঈশ্বরদী থেকে আসাম মেলের সঙ্গে বগী দেওয়া হবে। ৩১শে আগষ্ট আশ্রমে পৌঁছে রাজেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জানালেন সমস্ত সংবাদ।  বীরেন্দ্রলাল মিত্রকে সঙ্গে নিয়ে সুশীলচন্দ্র ৩১শে আগষ্ট রাত্রে রওনা হলেন দেওঘরে বাড়ী ঠিক করার জন্য। 

 আশ্রমে বিদ্যুত বেগে প্রস্তুতি পর্ব্ব চলতে থাকলো। খবর রাখা হল বিশেষ গোপনে, যাতে জনসমুদ্র এসে কেঁদে কেটে ঠাকুরের মত বদলে না ফেলে।  পূজনীয় বড়দা বিভিন্ন বিভাগের কর্ম্মীদের দিলেন যথোপযুক্ত উপদেশ ও নির্দ্দেশাদি—যাতে তাঁদের অনুপস্থিতি কালেও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয় সমস্ত কাজ।  নির্দ্ধারিত দিনে যথাসময়ে রওনা হলেন শ্রীশ্রীঠাকুর আশ্রম ছেড়ে—সঙ্গে ঠাকুর পরিবারের সবাই, শ্রীশ্রীঠাকুরের পরিচর্য্যাকারিগণ প্রত্যেকে নিজ নিজ পরিবারবর্গসহ, সপরিবারে স-সহচর ঋত্বিগাচার্যদেব, রাজেন্দ্রনাথ এবং আশ্রমের আরও কতিপয় বিশিষ্ট কর্মী। বিষণ্ণ বদনে যাত্রা করলেন শ্রীশ্রীঠাকুর—অত্যন্ত কষ্ট হচ্ছে তাঁর প্রিয়জনদের ছেড়ে যেতে—ছেড়ে যেতে জনক-জননীর পবিত্র স্মৃতিতীর্থ। ব্যথাতুর চিত্তে সজল নেত্রে নির্ব্বাক নিস্তব্ধ হয়ে পাষাণ মূর্ত্তির মত দাঁড়িয়ে থাকল আশ্রমবাসী নরনারী—আবাল-বৃদ্ধ-শিশু-যুবা ঠাকুরের এই ঐতিহাসিক যাত্রাপথের দিকে তাকিয়ে। সূচনা হল পুরুষোত্তমের নবতর দ্বারকা-লীলার।” (তথ্যসূত্রঃ শ্রীমৎ আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী ও সৎসঙ্গ আন্দোলন, পৃঃ ১৪৩) 

“এর আগেও কয়েকবার শ্রীশ্রীঠাকুরের বায়ু-পরিবর্তনের জন্য বাইরে যাওয়ার কথা হয়েছিল । কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানা কারণে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। এবারেও শেষ পর্যন্ত তাঁর যাওয়া হবে কিনা তা নিয়েও সংশয় ছিল। কিন্তু ১লা সেপ্টেম্বর সকালে মাতৃমন্দিরের সামনে গিয়ে দেখি শ্রীশ্রীঠাকুর যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। তাঁকে ঈশ্বরদী ষ্টেশনে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ী প্রস্তুত। বেলা দশটা নাগাদ তিনি রওনা হবেন। শ্রীশ্রীঠাকুর গাড়ীতে ওঠার আগে তাঁর পিতা ও মাতার প্রতিকৃতির সামনে প্রণাম নিবেদন করলেন। তারপর আশ্রম প্রাঙ্গণে মন্দিরে গিয়ে হুজুর মহারাজ এবং সরকার সাহেবের প্রতিকৃতির সামনে প্রণাম নিবেদন করলেন। …..তাঁর চোখে জল। চোখের জল ফেলতে ফেলতে ফেলতে তিনি মোটরে উঠলেন। ….চোখের জল ফেলতে ফেলতে তিনি জন্মভূমি থেকে শেষ যাত্রা করেছিলেন।” (তথ্যসূত্রঃ কুমারকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য প্রণীত মহামানবের সাগরতীরে/১ম/৩-৪)  

“২রা সেপ্টেম্বর বেলা ১০টা নাগাদ শ্রীশ্রীঠাকুর বৈদ্যনাথধাম স্টেশনে পৌঁছলেন। সঙ্গে পরিবার-পরিজন, পার্ষদগণ এবং সেবকগণ। তাঁর বাসের জন্য প্রথমে ‘বড়াল-বাংলো’ বাড়ীটি ভাড়া নেওয়া হয়। পরে ‘ওয়েস্ট এণ্ড হাউস’ (মনোমোহিনী ধাম), গোলাপবাগ, রঙ্গনভিলা , অশোক-আশ্রম, হিলস ওয়ে , শশধর-স্মৃতি (শিবতীর্থ), দাস-ভিলা, প্রসন্ন-প্রসাদ প্রভৃতি বাড়ী ভাড়া করা হয় । রঙ্গনভিলায় শ্রীশ্রীঠাকুরের মধ্যমভ্রাতা পূজনীয় প্রভাসচন্দ্র চক্রবর্তী (ক্ষেপুকাকা) হিলস্ ওয়েতে শ্রীশ্রীঠাকুরের কনিষ্ঠ ভ্রাতা পূজনীয় শ্রীকুমুদরঞ্জন চক্রবর্তী (বাদলকাকা) এবং গোলাপবাগে পূজ্যপাদ বড়দা সপরিবারে বাস করতে থাকেন।” (মহামানবের সাগরতীরে, ১ম পৃঃ ৪)

শ্রীশ্রীঠাকুরের দেওঘর আগমনের সংবাদ জানতে পেরে, নিরাপত্তার কারণে, পূর্ববঙ্গের অনেক সৎসঙ্গী পরিবার ভিটেমাটি ছেড়ে ঠাকুরের শরণাপন্ন হন। ওদিকে, ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতির থাবায় ১৯৪৭ এর ১৫ আগষ্ট দ্বিজাতি-তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে দেশবিভাগের ফলে আরো ছিন্নমূল সৎসঙ্গী পরিবারের দল দেওঘরে চলে আসেন। দেওঘরে ঠাকুর নবাগত। নিজেই পরিবার পরিজনদের নিয়ে প্রভূত কষ্ট স্বীকার করে ভাড়া বাড়ীতে থাকেন। নিদারুণ অর্থকষ্টের মধ্যেও প্রশাসন বা সমাজসেবী সংস্থাদের কাছ থেকে সাহায্য না নিয়ে, কাউকে বিব্রত না করে, আত্মত্যাগী ইষ্টভ্রাতাদের সাহায্যে দুর্গতদের আশ্রয়দান ও ভরণপোষণ করেছিলেন।

শ্রীশ্রীঠাকুর সমাগত সর্বহারাদের মনোবল বাড়াবার উদ্দেশ্যে বাণী দিলেনঃ—

“বাস্তুহারা হওয়া নিদারুণ

কিন্তু যোগ্যতাহারা হওয়া সর্বনাশা,

এই যোগ্যতাকে সর্ব্বাঙ্গসুন্দর ক’রে

অর্জ্জন করতে হলেই

আদর্শে কেন্দ্রায়িত হতেই হবে সক্রিয়তায়,

…তাই আজ যারা বাস্তুহারা

সর্ব্বনাশের ঘনঘটা যাদের

চারিদিকেই ঘিরে ধরেছে

আগ্রহ আকুল কণ্ঠে তাদের বলি…..

সাবধান থেকো,

যোগ্যতাকে হারিও না,

এই যোগ্যতা যদি থাকে

লাখ হারানকে অতিক্রম ক’রে

বহু পাওয়ার আবির্ভাব হতে পারে

বিধিমাফিক শ্রমকুশল

সৌকর্য্যে……”

(সূত্রঃ মহামানবের সাগরতীরে ১ম/১৫)

সেদিন যারা ঠাকুরের উক্ত নিদেশ অমান্য করে খয়রাতি সাহায্য গ্রহণ করেছিলেন, তারা হয়েছিলেন সংকুচিত, আর, যাঁরা ঠাকুরের নিদেশ মেনে চলেছিলেন তাঁরা জীবনের কল্যাণপ্রবাহকে প্রসারিত করতে পেরেছিলেন।

দেওঘরে আগত উদ্বাস্তুদের আশ্রয়, ভরণপোষণ, চিকিৎসাদি পরিষেবার ব্যবস্থা করতে অনেক বাড়ী ভাড়া করতে হয়েছিল শ্রীশ্রীঠাকুরকে। যা ক্রমে ক্রমে সৎসঙ্গ প্রতিষ্ঠানের রূপ পরিগ্রহ করে। তিলে তিলে গড়ে তোলা হিমায়েতপুরের ঐতিহ্যমণ্ডিত সেই আশ্রম শত্রু সম্পত্তি ঘোষণা করে পাকিস্তান সরকার দখল করে নেয়।

।। দেশভাগ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকুলচন্দ্রের আক্ষেপ ।।

‘‘চেষ্টা করেছিলাম প্রাণপণ যাতে হিমাইতপুর না ছাড়তে হয়, কিন্তু অত্যাচারিত হলাম ভীষণ, পারলাম না কিছুতেই। বাড়ী আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিল, মানুষ খুন করে ফেল্ল। ওখানকার সব লোকের বিরুদ্ধতার জন্য পারলাম না। সকলের ভাল করতে গিয়ে আমি একেবারে জাহান্নামে গেলাম।’’

‘‘আমরা হিন্দুরাই  পাকিস্তানের স্রষ্টা। আমরা আরো চেষ্টা করেছি, যাতে আমরা সকলে মুসলমান হয়ে যাই। আমরা মুসলমান মেয়ে বিয়ে করতে পারি না। কিন্তু মুসলমানরা হিন্দুর মেয়ে বিয়ে করতে পারে। আমরা materialise   করেছি তাই যাতে পাকিস্তান হয়, আর materialise করি নাই তা যাতে পাকিস্তান না হয়। ….. কিন্তু আগে যদি হায়দ্রাবাদের দিক থেকে বাংলায় হিন্দুদের নিয়ে আসা যেতো, তবে পাকিস্তান হতো না। কিন্তু তা তো হলো না। পাকিস্তান হওয়ায় হিন্দু মুসলমান উভয়েরই কী ভীষণ ক্ষতিই না হল। …….. ’’ (ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থ, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৯৪)

                            *      *      *

দেওঘরে এসে শ্রীশ্রীঠাকুর পুণরায় নবোদ্যমে সূচনা করেন ঋত্বিক সম্মেলন, উৎসবের। প্রতিষ্ঠা করেন কেমিক্যাল ওয়ার্কস, তপোবন বিদ্যালয়, কুটিরশিল্প, প্রেস, মুখপত্র ‘আলোচনা’ পত্রিকা, প্রকাশনা বিভাগ, হাসপাতাল, যতি আশ্রম। তিলে তিলে গড়ে তোলা পাবনা আশ্রমের ফেলে আসা স্মৃতিকে আবার নতুন করে দিকে দিকে গড়ে তুলতে উদ্যোগ নিলেন।

‘আলোচনা’ পত্রিকায় প্রকাশিত নিম্ন প্রদত্ত তথ্য পাঠ করলেই বোঝা যাবে শ্রীশ্রীঠাকুরের প্রতিষ্ঠানিক জনকল্যাণমুখী কর্ম প্রচেষ্টার বাস্তব রূপায়নের সুদূরপ্রসারী কল্যাণ প্রতিষ্ঠার প্রতিচ্ছবি।

“সৎসঙ্গের বর্তমান সর্বপ্রধান লক্ষ্যবস্তু হইল বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার, দেশীয় ঔষধপত্র প্রস্তুতের রসায়ণাগার ও কারখানা, হাসপাতাল, প্রসূতিসদন, বালক-বালিকাদের শিক্ষার জন্য উচ্চ বিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্র, কুটির-শিল্প ভবন, কৃষিপরীক্ষা-ক্ষেত্র প্রভৃতি স্থাপন পূর্বক পাবনার ন্যায় একটি আদর্শ পল্লী-উন্নযন কেন্দ্রের পুণঃ প্রতিষ্ঠা করা। প্রসঙ্গতঃ ইহা উল্লেখযোগ্য যে, অতীতের সেই পাবনা-সৎসঙ্গ পল্লী সংগঠনের উজ্জল আদর্শরূপে অদ্যাপি সারা ভারতে প্রসিদ্ধ হইয়া আছে. আর শুধুমাত্র বিহারেই নয়, পরন্তু ভারতের সকল প্রদেশেই এইরূপ আদর্শ কেন্দ্র স্থাপন করাই সৎসঙ্গের অভিলাষ।

শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি আবাসিক পল্লী-বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন পূর্বক শ্রীশ্রীঠাকুরের পরিকল্পনাগুলির বাস্তব রূপায়নের উচ্চাকাঙ্খাও সৎসঙ্গ পোষণ করিয়া চলিয়াছে।……” (আলোচনা, মাঘ, ১৩৬৫/পৃঃ ১৫০)

      উক্ত দলিল থেকে প্রাপ্ত সংবাদে এটুকু বোঝা গেল যে, পাবনার হিমাইতপুর আশ্রমে শ্রীশ্রীঠাকুর যথেষ্ট প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে যে-সব কর্ম-প্রতিষ্ঠানসমূহ গড়ে তুলেছিলেন, তদনুরূপ কেন্দ্র ভারতের প্রতিটি প্রদেশে স্থাপন করা হবে। এবং একটি শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে,—যা শ্রীশ্রীঠাকুরের এক অন্যতম ইচ্ছা।

আলোচনা পত্রিকাতে বর্ণিত শ্রীশ্রীঠাকুরের  ইচ্ছার বাস্তবায়ন দেওঘর সৎসঙ্গ কর্তৃপক্ষ করেছেন কি-না আমার জানা নেই। কেহ জানালে বাধিত হব। কারণ, ইষ্টভৃতি মানে ইষ্টভরণ, ইষ্টভৃতির অর্ঘ্যাদি  ইষ্টকর্মে,–ঠাকুরের ইচ্ছার পূর্ত্তিতে ব্যবহৃত হবে, এবং সেটাই স্বাভাবিক!

তবে এটুকু জানতে পেরেছি, ঠাকুরকে প্রীত করার, সুস্থ রাখার অজুহাতে শনির দশা কাটাবার ব্যবস্থা করা হয়, যাগযজ্ঞ করা হয়, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখান হয়। “কিন্তু যা করলে তিনি সুস্থ থাকেন এবং তাঁর মন প্রফুল্ল থাকে সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়নি। তাঁর আবাল্যের স্বপ্ন শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, যাজন-পরিক্রমার জন্য গাড়ী সংগ্রহ, গঙ্গা-দারোয়া পরিকল্পনা, হাসপাতাল স্থাপন, দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ প্রভৃতি বিষয়ে কর্তৃপক্ষের প্রচেষ্টা আন্তরিক ছিল না।……… ” (তথ্যসূত্রঃ কুমারকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য প্রণীত মহামানবের সাগরতীরে/২য়/৩২৭)

       শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর গোত্রপিতার নামাঙ্কিত একান্ত ইচ্ছার শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয়  স্থাপনের প্রয়োজনে প্রচুর জমির প্রয়োজন পূরণে সংশ্লিষ্টরা অসফল হলে পূজ্যপাদ ছোড়দা অমূল্য ঘোষকে সাথে নিয়ে প্রভূত পরিশ্রম করে সবধরণের জটিলতা কাটিয়ে রামকানালিতে অবিচ্ছিন্নভাবে সাড়ে পাঁচশো বিঘা জমি সংগ্রহ করেন। ওই জমিতে বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের প্রয়োজনে শ্রীশ্রীঠাকুর বাস করতে ইচ্ছা প্রকাশ করলে শ্রীশ্রীঠাকুরের ইপ্সিত বাসগৃহ পর্যন্ত নির্মিত হয় । কিন্তু ইষ্টবিরোধী ষড়যন্ত্রের কারণে সবকিছু ভণ্ডুল হয়ে যায়। বাস্তবায়িত হয়নি শ্রীশ্রীঠাকুরের আবাল্যলালিত স্বপ্ন গোত্রপিতার নামাঙ্কিত বিশ্ববিদ্যালয়! সেখানে বর্তমানে দেওঘর সৎসঙ্গের অধীনে ‘নব-হিমাইতপুর’ নামে এক কেন্দ্র-মন্দির রয়েছে।

ঠাকুরের স্বপ্নের শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয়সহ শ্রীশ্রীঠাকুরের ঈপ্সিত কর্মযজ্ঞের রূপরেখা বিষয়ে জানতে আগ্রহীরা ইচ্ছে করলেই আলোচনা পত্রিকার ১৩৬৬ থেকে ১৩৭৫ এর সংখ্যাগুলোতে উল্লেখিত ‘ঋত্বিক অধিবেশনের কার্য্য বিবরণী’ এবং ‘আশ্রম সংবাদ’ পাঠ করলেই সবিশেষ জানতে পারবেন, বিশ্বগুরু কি চেয়েছিলেন, আর কতদূর কি আমরা করেছি। জানতে পারবেন, ঋত্বিক অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বিষয়ক দ্বন্দ্বীবৃত্তির চূড়ান্ত ইতিহাস। ……………..

–––––––––––

তথ্যঋণ :

১. ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থ।

২. আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী ও সৎসঙ্গ আন্দোলন।

৩. শ্রীনাথ প্রণীত ‘যেমন তাঁকে দেখি’।

পুরানো সেই দিনের কথা

    পুরানো সেই দিনের কথা     ।। কবিগুরু  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তিরোধান স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।                                              নিবেদনে—তপন দাস ‘প্রথম প্রভাত উদয় তব গগনে, প্রথম সাম রব তব তপোবনে, প্রথম প্রচারিত তব বন-ভবনে জ্ঞান-ধর্ম কত কাব্যকাহিনী…….’ বাণীর গাঁথায় বন্দনা করেছেন ভারত-জননীকে। ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।       বৈশিষ্ট্যপালী আপূরয়মাণ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সকলকে যথাযোগ্য মূল্যায়ণ করতেন, যথাযোগ্য সম্মান দিতেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে তিনি ‘ঋষি বলতেন’আলোচনা-প্রসঙ্গের সংকলনে কবিগুরুর রচনাকে নানা আঙ্গিকে তুলে ধরেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। বিষয়বস্তুকে সমৃদ্ধ করতে  মাঝে মধ্যেই উদাত্ত কণ্ঠে ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা তিনি  আবৃত্তি করতেনকবিগুরু রবীন্দ্রনাথের  পুণ্য জন্মদিন স্মরণে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আবৃত্তি করা ‘কথা ও কাহিনী’-র  ‘গুরু গোবিন্দ’ কবিতার  কটি লাইন উদ্ধৃত করলাম ‘‘কবে প্রাণ খুলে বলিতে পারিব—-
    ‘পেয়েছি আমার শেষ!
তোমরা সকলে এসো মোর পিছে,
গুরু তোমাদের সবারে ডাকিছে,
আমার জীবনে লভিয়া জীবন
    জাগো রে সকল দেশ
‘নাহি আর ভয়, নাহি সংশয়,
    নাহি আর আগু-পিছু

পেয়েছি সত্য, লভিয়াছি পথ,
সরিয়া দাঁড়াক সকল জগৎ—
নাই তার কাছে জীবন মরণ
    নাই নাই আর কিছু
‘হৃদয়ের মাঝে পেতেছি শুনিতে
    দৈববাণীর মতো—-
‘উঠিয়া দাঁড়াও আপন আলোতে,
ওই চেয়ে দেখো কত দূর হতে
তোমার কাছেতে ধরা দিবে ব’লে
    আসে লোক কত শত
‘ওই শোনো শোনো কল্লোলধ্বনি,
    ছুটে হৃদয়ের ধারা

স্থির থাকো তুমি, থাকো তুমি জাগি
প্রদীপের মতো আলস তেয়াগি,
এ নিশীথমাঝে তুমি ঘুমাইলে
    ফিরিয়া যাইবে তারা
‘ওই চেয়ে দেখো দিগন্ত-পানে
    ঘনঘোর ঘটা অতি।
আসিতেছে ঝড় মরণেরে লয়ে—
তাই বসে বসে হৃদয়-আলয়ে
জ্বালিতেছে আলো, নিবিবে না ঝড়ে,
    দিবে অনন্ত জ্যোতি
’’          ——            শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আবৃত্তি করা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিরচিত  ‘কৃপণ’ কবিতা।                               কৃপণ       আমি    ভিক্ষা করে ফিরতেছিলেম গ্রামের পথে পথে,            তুমি তখন চলেছিলে তোমার স্বর্ণরথে            অপূর্ব্ব এক স্বপ্নসম    লাগতেছিল চক্ষে মম            কি বিচিত্র শোভা তোমার, কি বিচিত্র সাজ            আমি মনে ভাবতেছিলেম  এ কোন্ মহারাজ।।     আজি   শুভক্ষণে রাত পোহালো. ভেবেছিলেম তবে,             আজ আমারে দ্বারে দ্বারে ফিরতে নাহি হবে             বাহির হতে নাহি হতে     কাহার দেখা পেলেম পথে,             চলিতে রথ ধনধান্য ছড়াবে দুই ধারে—             মুঠা মুঠা কুড়িয়ে নেব,  নেব ভারে ভারে।।     দেখি     সহসা রথ থেমে গেল আমার কাছে এসে,             আমার মুখ-পানে চেয়ে নামলে তুমি হেসে             দেখে মুখের প্রসন্নতা     জুড়িয়ে গেল সকল ব্যথা,             হেন কালে, কিসের লাগি তুমি অকস্মাৎ             ‘আমায় কিছু দাও গো’ বলে বাড়িয়ে দিলে হাত।।     মরি,     এ কী কথা রাজাধিরাজ! ‘আমায় দাও গো কিছু’—             শুনে ক্ষণকালের তরে রইনু মাথা-নীচু             তোমার কিবা অভাব আছে     ভিক্ষা চাও ভিখারির কাছে!             এ কেবল কৌতুকের বশে আমায় প্রবঞ্চনা             ঝুলি হতে দিলেম তুলে একটি ছোটো কণা।।     যবে      পাত্রখানি ঘরে এনে উজাড় করি,— একি,             ভিক্ষা-মাঝে একটি ছোটো সোনার কণা দেখি!             দিলেম যা রাজ-ভিখারিরে   স্বর্ণ হয়ে এল ফিরে,—             তখন কাঁদি চোখের জলে দুটি নয়ন ভ’রে,—             তোমায় কেন দিইনি আমার সকল শূণ্য করে?                                           ——–                সৎসঙ্গের তৎকালিন সভাপতি ঋত্বিগাচার্য্য শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য (এম. এ), শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের রচিত ‘সত্যানুসরণ’ পুস্তিকাটি  নিয়ে একবার কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বইটির কিছুটা অংশ পাঠ করেই জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘ইহার বয়স কত?’ ঋত্বিগাচার্য্য শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য তদুত্তরে বলেছিলেন, ‘তাঁর বয়স বেশী নয়, মাত্র ২২ বছর’  পুস্তকখানার আরও কিয়দংশ পাঠ করে কবিগুরু পুণরায় জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘কত বয়স বললে?’ ঋত্বিগাচার্য্য শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য  পূর্বপ্রদত্ত উত্তরেরই পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। পুস্তকের আরো কিয়দংশ পাঠ করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ আবার সেই একই প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কত বয়স বললে যেন?’ ঋত্বিগাচার্য্য শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য পুণরায় বলেছিলেন, ২২ বছর। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন,— ‘‘এত অল্প বয়সে এরূপ স্বচ্ছ সাবলীল ছন্দে, অপরূপ ভঙ্গিতে, গভীর তত্ত্বসমূহের এমন অপূর্ব প্রকাশ কি করিয়া সম্ভব হয়!’’

      এর কিছুদিন পর সৎসঙ্গের তৎকালিন সহ-সভাপতি শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত সুশীল চন্দ্র বসু (বি. এ.) কবিগুরুর সাক্ষাৎ করেন। কবিগুরু শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত সুশীলচন্দ্রের সাথে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৎসঙ্গ কর্মপ্রতিষ্ঠান সম্বন্ধে আগ্রহ সহকারে নানা আলাপ-আলোচনাদি করেছিলেন। সেই সাক্ষাৎকারের কথা বিবৃত করে সুশীলচন্দ্র লিখেছেন—

      “একবার শান্তিনিকেতনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম। নানা কথার পর শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ও তাঁর কর্মপ্রতিষ্ঠান সম্বন্ধীয় আলোচনা প্রসঙ্গ উঠিতেই, তিনি বললেন, ‘আমি শুনিয়াছি তোমরা কাজকর্ম খুব ভালই করিতেছ, তোমাদের কোন অভাব অভিযোগ নাই, কিন্তু দেখ, আমার এই বৃদ্ধ বয়সে অপটু শরীর লইয়া ছেলে মেয়ে নাচাইয়া আমার এই প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ সংগ্রহ করিতে হইতেছে!’ তাঁর কথা শুনে আমি অবশ্যই খুব দুঃখবোধ করিয়াছিলাম, তাহাকে বলিলাম, ‘অন্যের নিকট হইতে একথা শুনিলে বিস্মিত হইবার কোন কারণ ছিল না, কিন্তু আপনার নিকট হইতে শুনিয়া বিস্ময় বোধ না করিয়া পারিতেছি না। আপনি নিজে এ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলিয়াছেন। কর্ম প্রতিষ্ঠান গড়িতে দেশের লোকের সক্রিয় সহানুভূতি কিরূপ পাওয়া যায় তাহা আপনি বিলক্ষণ অবগত আছেন। আপনি ধনী পিতার সন্তান, আপনি বিশ্বকবি, জগৎজোড়া আপনার খ্যাতি, তথাপি প্রতিষ্ঠানটিকে চালাইতে ছেলে মেয়ে নাচাইয়া আপনাকে অর্থসংগ্রহ করিতে হইতেছে, বৃদ্ধ বয়সে এজন্য আপনার উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার সীমা নাই। আর আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রাণপুরুষ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র দরিদ্র ব্রাহ্মণের সন্তান
 আপনার ন্যায় খ্যাতি প্রতিপত্তি তো দূরের কথা, তিনি তাঁহার নিজের দেশবাসীর কাছেই এখনও একরূপ অপরিচিত এমতাবস্থায় আমাদের প্রতিষ্ঠানের কোন অভাব-অভিযোগ নাই, ইহা আপনি কিরূপে অনুমান করিতে পারিলেন?’       আমার কথা শুনিয়া তিনি নিরুত্তর রহিলেন।  বস্তুত যাঁহারাই কোন কর্ম প্রতিষ্ঠান (বিশেষত অভিনব ধরণের ) গড়িয়া তুলিয়াছেন তাহারাই জানেন যে, এই দেশে কোন প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিতে কি পর্বতপ্রমাণ বাধাবিঘ্নের সম্মুখীন হইতে হয়।” (সূত্র : মানসতীর্থ পরিক্রমা)       আজকের এই স্মৃতিচারণ-লগ্নে পরমপিতার রাতুল চরণে প্রার্থনা, ঋষিপ্রোক্ত ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টির সদাচার, বর্ণাশ্রম এবং বিবাহবিধি মেনে আমাদের ঘরের মায়েরা যেন রবীন্দ্রনাথের ন্যায় শুদ্ধাত্মাদের আবার ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। এই ধরাধামে। তবেই সার্থক হবে আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিকে চিরভাস্বর  করে রাখা। সবাইকে আমার জয়গুরু ও প্রণাম।

WHAT IS MEMORY

।। স্মৃতির উৎস সন্ধানে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।

                                                                    সংকলক—তপন দাস

        ‘‘আমাদের nerve-গুলি conducting wire-এর মত। Battery থেকে electric current যেমন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে, brain থেকে nerve fibres দিয়ে এই life current or vital current সমস্ত দেহে ছড়িয়ে পড়ছে। এই vital current এক রকমের subtle energy–র current ছাড়া আর কিছু নয়। তার conductor হচ্ছে nerve fibres. এই current চোখ দিয়ে, নাক দিয়ে, কান দিয়ে, হাত দিয়ে, পা দিয়ে, সারা গা দিয়ে, জিভ দিয়ে শরীরের থেকে নানা রকমে modified হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসছে। আবার এই current–এর সঙ্গে বাইরের জগতের ঘাত-প্রতিঘাতে nerve দিয়ে ভিতরের দিকে কতগুলি wave যাচ্ছে। তাহাই আমাদের বোধ বা perception.  সেগুলি ভিতরে গিয়ে brain cell–এ কতগুলি impression দিচ্ছে—Camera-র photographic plate–এ আলোর wave গিয়ে বাইরের একটা impression বা ছবি যেমনি করে আঁকে ঠিক তেমনতর। এই impression–গুলি যখন active হয়, তাকেই আমরা বলি স্মৃতি (memory).’’ (ঋত্বিগাচার্য্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যের দিনপঞ্জী, ১ম খণ্ড, পৃঃ  ৪১)

        “Universe-এ সূক্ষ্ম হইতে সূক্ষ্মতর energy-র প্রবাহ চলছেই। আর আমাদের brain cell-গুলি এই subtle energy-কে suck করে নেয় কিংবা accumulate করে—battery-র মত।”

(ঋত্বিগাচার্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য-এর দিনপঞ্জী, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৪১ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী)

        Brain-এর ওঁ layer, হ্রীং layer, ক্লীং layer প্রভৃতি আছে। সহস্রদল কমল মানে brain-এর complex-গুলি ভেঙে গিয়ে যে অবস্থা হয়, তার উপলব্ধি। (শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী)

——  

               

ATMOSPHERIC ELECTRICITY

     ।। আবহাওয়া বিদ্যুৎ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।।

                                           সংকলক—তপন দাস

     বিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য প্রতিদিনই বিজ্ঞান বিষয়ক বিবিধ আলোচনা করেন শ্রীশ্রীঠাকুরের সাথে। বিজ্ঞানকে জগতের কল্যাণে কিভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে সে বিষয়ে ঠাকুরের ব্যাখ্যা শুনে তিনি হতবাক হয়ে যান। প্রসঙ্গক্রমে একদিন ঠাকুর সৌরবিদ্যুতের চাইতেও সহজলভ্য আবহাওয়া বিদ্যুত (atmospheric electricity) প্রসঙ্গে বললে তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। কয়েকদিন পর কেষ্টদাকে কিছু না জানিয়ে তিনি সুতোর বদলে তামার তারের সাহায্যে ঘুড়ি ওড়াবার ব্যবস্থা করেন। পদ্মার তীরে ঠাকুর ঘুড়ি ওড়াচ্ছেন। সাথে অনেক ভক্তবৃন্দ । ঘুড়ি উড়ছে। ঠাকুর কেষ্টদাকে লাটাইটা হাতে দিয়ে ঘুড়ি ওড়াতে বললে কেষ্টদা লাটাই ধরতেই ছিটকে পড়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুর তাঁকে ধরে ফেলে বলেন, বিজ্ঞানী কেষ্টদা একটা লাটাই ধরে রাখতে পারলেন না। কেষ্টদা লজ্জিত হয়ে বলেন, আপনার লাটাইয়ের বিদ্যুত তরঙ্গ আমাকে শক্ দিয়ে ফেলে দিল। তাই ধরে রাখতে পারি নি। তখন ঠাকুর বললেন, ঘুড়ির তারের সুতোর মধ্য দিয়ে যদি বিদ্যুত প্রবাহিত হতে পারে তাহলেই বুঝুন আবহ মণ্ডলে কি পরিমাণ বিদ্যুত রয়েছে।
       

        ওই বিষয়ে যেসব আলোচনা হয়েছিল সেগুলো ক্রমশঃ তুলে ধরছি।


        ‘‘Earth-কে একটা Pole করে আর atmosphere-এ একটা conducting pole ঝুলিয়ে অনন্ত electric current পাওয়া যেতে পারে। এ সম্বন্ধে নূতন experiment নিষ্প্রয়োজন,কারণ বজ্রপাত প্রভৃতি নানা ঘটনা দ্বারা ইহা স্বতঃই প্রমাণিত যে atmosphere–এ electricity বর্তমান। আবার যত উচ্চে অর্থাৎ সূর্যমণ্ডলের নিকট conducting Pole রাখা যাইবে তত বেশী Current পাওয়া যাবে। তিনটি insulated magnet–এর সাহায্যে একটি লোহার চাকতিওয়ালা Copper rod atmosphere –এ ঝুলাইয়ারাখিবার arrangement করিতে পারিলে ইহা সম্ভব হইতে পারে। এইরকম ভাবে electric energy–র দ্বারা পৃথিবীতে বিনা পরিশ্রমে কতকাজের সম্ভব হইবে। কয়লার আর প্রয়োজন হইবে না। কুলীর পরিশ্রমেরও আর আবশ্যক হইবে না।’’


       ‘‘Electric Current-এর উদ্ভব হয় Cell-এ। Cell-এCu ও H2 র energy particles-এর interaction-এ Cu-plate হইতে energy particle-এর এক particular arrangement-এর flow হয় বাহিরের wire-এ। এই flow কিন্তু spiral flow. যখনই দুই vibrating particle পরস্পর পরস্পরকে ধাক্কা দেয়, তখনই ঐ particle দুটি flow করেspirally Dum Dum bullet-এর মত। Zn-plate হইতেও এই রকমেরই অথচ একটি বিভিন্ন current বাহিরের wire-এ opposite direction-এ flow করে। এই উভয়ের ঘাত প্রতিঘাতে যে resultant flow হয়,তাহাই electric current. এই electric current আর কিছুই নয়–a spiral motion of the energy particles. এইটিই really হয়–magnetic effects of a current in a wire মানে ইহা হইতে বুঝা যায়। Electro-magnetic motion-এ যেন একটি current-এর মধ্যে আর একটি current-এর effect-এ whirl pool-এর সৃষ্টি ছাড়া আর কিছু নয়।’’ (ঋত্বিগাচার্য্য দিনপঞ্জী ১ম খন্ড পৃঃ ১৬-১৭)

                          ——–

নাম-চিকিত্সা (SOUND THERAPY)

।। নাম চিকিত্সা ।।
                                                                             —তপন দাস
        দেহ ধারণ এবং দেহ ত্যাগ এই দুইয়ের মাঝে জীবন নামের প্রবাহ কিভাবে সৃষ্টি
হয়েছিল তা নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত। সৃষ্টিতত্ত্ব অনুসারে পিতার
পিতা পরমপিতা লীলার প্রয়োজনে নিজেকে এক থেকে বহুতে পরিণত হতে গিয়ে যে
সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম স্পন্দনের সৃষ্টি হয়েছিল তার নাম অনাহত নাদ বা আদিধ্বনি
বা প্রণব। সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী মানুষ, ব্রহ্মবিদ্ আচার্য্য মাধ্যমে
‘আত্মানং বিদ্ধি’র মার্গ অনুসরণ করে ‘মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়’—মৃত্যু হতে
অমৃত আহরণ করতেন। জীবাত্মাকে বিলীন করে দিতেন পরমাত্মায়। সোনার তাল
থেকে তৈরী গয়নাটাকে ব্যবহার করে আবার ফিরিয়ে দিতেন সেই সোনার তালে।
পরমপিতা সকলের পিতা আর আমরা হলাম আমাদের ভাগ্যবিধাতা। আকর্ষণ (attraction) সংকোচন,  (contraction), স্থিতি (stagnation) ও প্রসারণ (expansion)-এর লীলায়িত
ছন্দের বিধায়িত নিয়মে আমরা প্রত্যেকেই এক একজন স্রষ্টা। নারী-পুরুষের
সম্মিলিত জনন ক্রিয়াকালিন কোষ বিভাজন মাধ্যমে সংকুচিত ডিম্বাণু (ovum) ও
শুক্রাণু (sperm) নামের দুটি ভিন্ন সত্তা একটি কোষে এক হয়ে গর্ভে স্থিত
হয়। পুণরায় কোষ বিভাজন মাধ্যমে প্রসারিত হয়। ক্রমান্বয়ে সৃষ্টি হতে
থাকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। গর্ভবাসের স্থিতিকাল উত্তীর্ণ হলে ভূমিষ্ট হয়।
শুরু হয় জীবন যাপনের পালা। শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্দ্ধক্যের
পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রার ছান্দিক শকটে চড়ে ‘মহাচেতন সমুত্থানের’
গন্তব্যে পৌঁছান অথবা মাঝপথে নেমে পড়া, নির্ভর করে স্রষ্টা পিতামাতার
উপর। স্রষ্টা পিতামাতা যেমন ভাবের আত্মাকে আকর্ষণ করে তদুনুরূপ আয়ু লাভ
করে সন্তান। আবার উক্ত সন্তানের আত্মা যে ভাব নিয়ে বিগত হবে, সেই ভাব
নিয়েই ওই আত্মাকে পিণ্ডদেহ ধারণ করতে হবে। এই হ’ল জীবন-মৃত্যুর
আগম-নিগমের চরম সত্য ।
        ইহজন্ম ও পরজন্ম প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন, “আপূরমান ইষ্টে কারও
যদি টান জন্মে, এবং তাই নিয়ে যদি সে বিগত হয় তবে সে মহান জীবন লাভ
করবেই। আবার, এ জীবনে যে যতই হোমরা-চোমরা হোক না কেন, সে যদি
সুকেন্দ্রিক না হয়, প্রবৃত্তিই যদি তার জীবনের নিয়ামক হয়, তবে ঐ
বিচ্ছিন্ন বিকেন্দ্রিকতা তার মৃত্যুকালীন ভাবভূমি ও পরজন্মকে যে অপগতিতে
অপকৃষ্ট ক’রে তুলবে, তা’তে সন্দেহ কমই।’’ (আ. প্র. ১ম খণ্ড ১৯. ১১. ১৯৪১)
      এক্ষেত্রেও সেই নাম চিকিত্সার ব্যাপার। তবে পার্থক্য এই যে
অজপাসিদ্ধ সাধক স্পর্শদ্বারা নামের শক্তি কোন অসুস্থ ব্যক্তির দেহে
সঞ্চারিত করে আরোগ্যকারী শক্তিকে সঞ্জীবিত করে দুরারোগ্য ব্যাধির নিরাময়
করতে পারেন। কিন্তু এক্ষেত্রে নিজের চিকিত্সা  নিজেকেই করতে হবে। অজপা
জপের সাথে আজ্ঞাচক্রে ‘কেবলম্ জ্ঞানমূর্ত্তিম্’কে অর্থাৎ
ইষ্টমূর্ত্তিকে ধারণ করতে হবে। তাই, যারা বহুনৈষ্ঠিক, একাধিক মূর্ত্তিতে
কেন্দ্রায়িত, তাদের বিধায়িত পথে একমাত্র ইষ্টে কেন্দ্রায়িত হবার
অভ্যাস পাকা করে ফেলতে হবে।

        নাম সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর ভাববাণীতে বলেছেন :
        ‘‘শুধু নাম, নাম প্রণবের উপরে। প্রণবের আগে নাম, পাছেও নাম। বীজমন্ত্র
কিরে ? নাম। দ্যাখ, নাম নিয়ে। দ্যাখ, নাম নিয়ে যায় প্রণবে, আর প্রণব
নিয়ে যায় আমাতে। আমি পরমাত্মা, শুদ্ধ ব্রহ্ম । …… প্রণবে উঠে
পরব্রহ্ম।’’ ৪। ১৩
        ‘‘আলস্য জড়তা শয়তানের থানা করিস্ নে। নামে ডুবে থাক। নাম কর আর বিলিয়ে
দে ! ….. শান্তি শান্তি ক’রে ঘুরে বেড়াচ্ছিস ? নাম ক’রে জগত্‍ ভুলে
যেতে পারিস্ না ? শরীর ভুলে যেতে পারিস্ না ? তা না হ’লে শান্তি পাবি
কোথায় ? কি চাস্ ? আর কি চাস্ ? অমৃত ? দেবগণ যে অমৃত পান ক’রে অমর
হয়েছিল, তোদের সম্মুখেই সেই অমৃত। তোদের হাতে ধ’রে দিচ্ছে, মুখে তুলে
দিচ্ছে, তাও খেতে পারবি না ? অহঙ্কার করবি তো নামের । নাম কর । হনুমানের
মত বক্ষ বিদারণ ক’রে দেখাবি নাম। ….অন্তরে নাম ক’রে যা’ সব দিতে পারি
! অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড লয় করে দিতে পারিস্, তার একমাত্র উপায় নাম । নামই
সব।’’ ৩৫। ৩ (পুণ্য-পুঁথি)
        ‘‘ভগবানই সৎ বস্তু। নাম আর ভগবানে পৃথক নাই। নামকেই জানবি ভগবান ব’লে।’’ ১৭।২ (পুণ্য-পুঁথি)
        “সংসার যন্ত্রণা নিবারণের জন্য কুইনাইন নাম। মনে অনবরত নাম কথা বলতে
বলতে মনের মধ্যে নাম হচ্ছে । এই রকম করতে করতে সারূপ্য লাভ হয়।” (পুণ্য-পুঁথি)

        “ইষ্টে অনুরাগ সমন্বিত হ’য়ে নাম ক’রলে শরীরে অদ্ভূত energy আসে mental
advancement (মানসিক অগ্রগতি)-এর সঙ্গে-সঙ্গে কত রকম জ্ঞানের প্রত্যক্ষ
অনুভূতি হয়, তোদের পুঁথি পড়া জ্ঞানের মত নয় । এ জ্ঞান যেন সমস্ত
প্রকারের সঙ্গে বাঁধা । নাম জিনিসটা আর কিছুই নয়, highest stage (উচ্চ
স্তর)-এর যা’ কম্পন, সেই কম্পন ধারা, কথায় প্রকাশ করতে গেলে যে শব্দ
হয়, সেইটেই হচ্ছে নাম । এই শব্দটা করলে মনটাকে নানা অবস্থার ভিতর-দিয়ে
সেই অবস্থাতে নিয়ে যায় ।”
(ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনী গ্রন্থের ২য় ভাগ পৃঃ ১৮৭)
        পুণ্য-পুঁথি র ত্রিচত্বারিংশত্তম দিবসের ভাববাণীতে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন :
        “The vibration–Two currents–one downward, one motion. Tenth door from the pineal, extreme of Soham. The ‘I’, inexpresible ‘I’.
দ্যাখ, ব্রহ্মের চরম দশম দ্বারে । দশম দ্বারে সমস্ত বাসনা ছুটে গেছে,
একমাত্র আমির দিকে ছুটে গেছে । দ্যাখ ‘ভ্যানিস’ নয় । ভগবতের রাজ্য তেসরা
তিল হতে সোহহং। গীতা তেসরা তিল হতে মূলাধার । তেসরার পর আর
কর্ম্ম-টর্ম্ম নাই। কেবল প্রেমে পর্য্যবসিত হচ্ছে ।”
        শ্রীশ্রীঠাকুরের উপরোক্ত বাণীতে নামসাধন পদ্ধতির যে স্বরূপ পাওয়া গেল ।
তা একটু বুঝে নেবার চেষ্টা করব ।
        আধ্যাত্মিক সাধনায় কুলকুণ্ডলিনী জাগরণের বিষয় সব মতবাদের মধ্যে
বিদ্যমান। প্রবৃত্তিকে সত্তামুখী করার লক্ষ্যে। সেই লক্ষ্যে এবার পৌঁছবার চেষ্টা করব।
মস্তিষ্কের সম্মুখস্থ cerebrum-এর occipital lobe-এর পর cerebellum-এর
অবস্থান। ওই দুই লঘু ও গুরু মস্তিষ্কের সংযোগস্থল ব্রহ্মতালু।
মস্তিষ্কের প্রান্তভাগ medulla oblongata নাম নিয়ে মেরুদণ্ডের উপরিভাগ
থেকে শুরু হয়ে coccyx নামে কোমরের নীচে শেষ হয়েছে। ঠিক ওর নীচে
ব্রহ্মশক্তিরূপী মূলাধার চক্রের অবস্থান। মূলাধার থেকে ব্রহ্মরন্ধ্রে
মনকে নিয়ে যেতে পারলে অমৃতত্ব লাভ হয়। অমৃতের দেশের দ্বারদেশ দুই
ভ্রূর মাঝখানের দ্বিদল বা আজ্ঞাচক্র। (যেখানে শরীর বিজ্ঞানের pineal
gland-এর অবস্থান।) তারপর মনশ্চক্র, সোমচক্র ভেদ করে পৌঁছাতে হয়
ব্রহ্মরন্ধ্রের অমৃতের দেশে বা দয়ালদেশে। যা সদ্ দীক্ষার শবধ্যান
অনুশাসনে বর্ণিত আছে। নিয়মিত শবধ্যান করলে হৃদরোগ এবং মস্তিষ্কের রোগ
হয় না। এবং আজ্ঞাচক্রে পুরুষোত্তমরূপী ত্রিগুণাতীত পুরুষের ধ্যান করলে
ত্রিগুণের উপর আধিপত্য লাভ হয়।
        শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের সাধনার কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছেন। যারফলে আমাদের
১। মলদ্বার ও লিংগের মধ্যবর্তী চতুর্দল বিশিষ্ট মূলাধার ; ২। লিংগমূলের
ষটদল বিশিষ্ট স্বাধিষ্ঠান ; ৩। নাভিদেশের দশদল বিশিষ্ট মণিপূরক ; ৪।
হৃদয়ের দ্বাদশদল বিশিষ্ট প্রণবাকৃতির অনাহত ; ৫। কণ্ঠদেশের সরস্বতীর
আবাসস্থলের ষোড়শদল বিশিষ্ট বিশুদ্ধি এবং ৬। জিহ্বামূলে দ্বাদশদল বিশিষ্ট
ললনাদি চক্র ভেদ করে আজ্ঞাচক্রে পৌঁছাতে হবে না। অনাহত নাদে এবং
ইষ্টমূর্তি ধ্যানের মাধ্যমে আজ্ঞাচক্রের সত্ত, রজঃ ও তমো নামাঙ্কিত
ত্রিদল বিশিষ্ট চক্র পার হয়ে নিম্ন কপালে অবস্থিত ছয়দল বিশিষ্ট
মনশ্চক্র ও ঊর্দ্ধ কপালে অবস্থিত চন্দ্রকলাসম ষোড়শদল বিশিষ্ট সোমচক্র
পার হয়ে ব্রহ্মতালুর সহস্রদল বিশিষ্ট অমৃতের আধারে পৌঁছাতে পারলেই
“মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়”-র আস্বাদন। অমৃতত্ব লাভ। যা আস্বাদন করতে হলে
শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত “পঞ্চবর্হি” এবং “সপ্তার্চ্চি”র অনুশাসন মেনে
চলতেই হবে।
        শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র নিজে একজন কৃতী চিকিত্সক ছিলেন। আয়ুর্বেদ,
হোমিওপ্যাথী, টোটকার সাহায্যে অনেক অনেক দুরারোগ্য দেহের ব্যাধি আরোগ্য
করেছেন। পরবর্তীকালে প্রথাগত চিকিত্সাযর ভার বন্ধুবর অনন্তনাথ রায়ের
উপর অর্পণ করে রোগের কারণ নিরাকরণে মনোনিবেশ করেন। গড়ে তোলেন কীর্তনদল।
কীর্তনের ত্রিদোষ-নাশী ব্যাধিহরা সঞ্জীবনী আহতনাদধ্বনী পরিবেশের
প্রবৃত্তিদুষ্ট মানুষগুলোকে করে তোলে সত্তাপ্রেমী। কীর্তনের আঙিনায়
প্রকাশিত হয় তাঁর বিশ্বাত্মার পরিচয়–ভাব সমাধির মাধ্যমে। ক্রমে কীর্তন
দলের কলেবর বৃদ্ধি হতে থাকে। হিমায়েতপুর সংলগ্ন গ্রাম থেকে গ্রামান্তর,
ওদিকে কুষ্ঠিয়া মেতে ওঠে এক অভিনব কীর্তনের আনন্দে।
“এ যে আনন্দবাজার ! নাইরে দুঃখ নাইরে দৈন্য আনন্দ, আনন্দ সবার !'”
রোগ-শোক-ব্যাধি-জরা জর্জরিত মানুষেরা এক নবীন জীবনের স্বাদ আস্বাদন করে ধন্য
হয়। শুধু মানুষেরাই নয় পরিবেশের গাছপালা, পশুপাখিরা পর্যন্ত ওই
কীর্তনান্দের স্বর্গীয় সুখ উপভোগ করে জয় করেছিল সব দুর্ভোগ ।
        নাম বা নাদ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুশ্রুতি গ্রন্থে বলছেন :
        “অনুরাগে করলে নাম
        আপনিই আসে প্রাণায়াম।” 
        অনুরাগ মানসবৃত্তিয় একটি প্রকাশ। স্ত্রী, সন্তান, অর্থ, মান, যশ,
প্রভাব, প্রতিপত্তি ইত্যাদির উপর আমাদের এক সহজাত অনুরাগ থাকেই। সেই
অনুরাগ ইষ্টানুগ সত্তাধর্মী করে তুলতে সদগুরু আদর্শের প্রতি অনুরক্ত হতে
হবে নামের মাধ্যমে। নাম<নমঃ=আনতি সম্পন্ন হয়ে চলা। তাই নামীর আদর্শের
প্রতি আনতি সম্পন্ন হয়ে নাম অভ্যাস করার কথা শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন।
        ওই অভ্যাস কিভাবে করতে হবে সে বিষয়ে তিনি বলেছেন :
        ‘‘সৃষ্টি ধারা উল্টে নিয়ে
        স্বামীর সাথে মিল করে
        অর্থে ভেবে ঐ জপে যা’
        সদগুরুতে ধ্যান ধরে।’’
        এই নিদেশ মেনে যেসব সাধকেরা নিজেদের অজপাসিদ্ধ করে তুলতে পারবেন, তারা
নামের শক্তির বিকীরণে রোগশক্তিকে পরাভূত করে নিজেরা সুস্থ থেকে পরিবেশকেও সুস্থ করে তুলবেন।         শুধু দীক্ষা নিয়ে কীর্তন করলেই তো আর হবে না! কীর্তনের যে একটা শক্তি আছে, সৎ নামেরও যে একটা শক্তি আছে, সেটা তো সবার চোখের সামনে তুলে ধরতে হবে। ইদানীং স্বাস্থ্যসচেতন মানুষেরা ধ্যান বা প্রাণায়াম অভ্যাসে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। রেইকি নামের স্পর্শ চিকিত্সা পদ্ধতিও বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এ সব কিছুর লক্ষ্য শরীর, মন ও আত্মার সাথে সমন্বয় সাধন মাধ্যমে শারীরবৃত্তিয় আরোগ্যকারী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে
সুস্থ থাকা, সুস্থ করা।
        ধ্যানে কেন্দ্রায়িত লক্ষ্যবস্তুর আদর্শের অনুরূপ ধ্যানী নিজেকে স্থির ও
গ্রহণক্ষম করতে পারে। পূরক, কুম্ভক, রেচক সমন্বিত প্রাণায়াম পদ্ধতি
বিধিপূর্বক বিনিয়োগ করতে না পারলে আরামের পরিবর্তে ব্যারামও এনে দিতে
পারে।
        রেইকি চিকিত্সক মহাজাগতিক শক্তি সঞ্চারনা মাধ্যমে রোগ নিরাময় করেন। ওই
সব পদ্ধতির সম্মিলিত রূপ শ্রীশ্রীঠাকুর প্রবর্তিত উচ্চস্তরের নাদ এবং
মহালক্ষী যন্ত্রমধ্যে স্থাপিত সদগুরুর ধ্যান পদ্ধতি। যার সহজ অনুশীলনে
কঠিন সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, পীড়িতকে মুক্ত করাও যায়।        কুষ্টিয়ার অশ্বিনী বিশ্বাসের বাড়ীতে কীর্তন চলছে।  খবর পেয়ে দীর্ঘদিন ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত কুষ্টিয়ার ডাকপিওন লক্ষণ ঘোষকে চারজন বাহক খাটিয়ায় করে এনে নামালো কীর্তনের আসরে, গোঁসাইদার পায়ের কাছে। লক্ষণকে বুকে জড়িয়ে ধরে কীর্তন করতে লাগলেন গোঁসাইদা। কিছুক্ষণ পর এক ধাক্কা দিয়ে বাড়ী যেতে বললেন। দিব্যি হাঁটতে হাঁটতে বাড়ী চলে যান লক্ষণ ঘোষ।  ……. বরৈচারার জানকী হালদারের উত্থানশক্তি নেই। আমলা পাড়ার রামকৃষ্ণ বিশ্বাসকে পাঠালেন ঠাকুর জানকী হালদারের চিকিৎসার জন্য। এহেন কঠিন দায়িত্ব পেয়ে ঘাবড়ে যায় রামকৃষ্ণ বিশ্বাস। ঠাকুর তাকে স্পর্শ করে বললেন, “নিশ্চয়ই পারবি তুই। কোন চিন্তা নাই।” ঠাকুরের আদেশে ওই রামকৃষ্ণ বিশ্বাসই বরৈচারার জানকী হালদারের বাড়ীতে গিয়ে রোগীকে ছুঁয়ে নাম করতে করতে রোগীকে আরোগ্য করে ফিরে এসেছিলেন কুষ্টিয়ায়। প্রসঙ্গত বলে রাখি, ওই রামকৃষ্ণ বিশ্বাসই কীর্তন করার অপরাধে গোঁসাইদাকে লাঠি দিয়ে মারতে গিয়ে বিপদে পড়ে যান। গোঁসাইদাকে ছোঁয়ার সাথে সাথে বন্-বন্ করে মাথা ঘুরতে থাকলে হাতের লাঠি ফেলে উন্মাদের মতো চীৎকার করে নাম করতে থাকে। তারপর কাজকর্ম ছেড়ে দীক্ষা নিয়ে গোঁসাইদার সাথে সাথেই কীর্তন করে বেড়াতো।        তাই, এবার ঠাকুর ঠিক করলেন, আলাদা করে একটা নাম চিকিৎসালয় গড়ে তোলার। কুষ্টিয়ায় একটি দোতালা পাকা বাড়ীতে ১৫-১৬ শয্যাবিশিষ্ট “সৎসঙ্গ প্রাণতত্ত্বানুসন্ধান সমিতি’’ (Life Research Society) শিরোনামে  চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠিত করা হলো। ঠাকুরের বিশেষ প্রশিক্ষণে সতীশচন্দ্র গোস্বামী, রামকৃষ্ণ প্রামাণিক, রাধারমণ জোয়ারদার, সুশীলচন্দ্র বসু, মহম্মদ গহরআলি বিশ্বাস প্রমুখ ভক্তগণ রোগীর শরীরে সৎনামের সঞ্চারনার মাধ্যমে রোগ আরোগ্যকারী শক্তিকে জাগিয়ে অসুস্থদের সুস্থ করে তুলছেন। সর্পদংশনে মৃত, মেনিঞ্জাইটিসে অচৈতন্য, পক্ষাঘাতগ্রস্ত—এমন অনেক, প্রচলিত চিকিৎসায় ফেরত দুরারোগ্য রোগীদের নাম-সঞ্চারণার মাধ্যমে আরোগ্য করে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিস্ময় সৃষ্টিকারী এক নবীন ধারাকে সংযোজিত করে রেখে গেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।  
                                        ———

”মানুষ মানুষের জন্য”

।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ধর্ম-ভাবনা।।

                                              সংকলক—ডাঃ তপন দাস

অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে

ধর্ম বলে জানিস তা’কে।।

 

টাকা উপায় করবি কি রে

      মানুষ উপায় কর,

      শিষ্ঠ-সুধী তৎপরতায়

      উচ্ছলাতে ধর।।

 

।। প্রকৃত বড়লোক হতে গেলে কি করতে হবে ।।

      প্রশ্ন:— বড় হওয়া বলতে কেউ-কেউ বোঝেন, অনেক টাকার মালিক হওয়া এবং টাকা না থাকলে তারা নিজেদের ছোট মনে করেন।

      শ্রীশ্রীঠাকুরঃ–আমার ধারণা উল্টো, আমি বুঝি মানুষ-সম্পদ। টাকা থাকলেই প্রাণের উদ্বোধন ক’রে দেওয়া যায় না। কিন্তু ভালবাসায় তোমায় যদি প্রাণের উদ্বোধন হ’য়ে থাকে এবং তুমি যদি অন্যের প্রাণের উদ্বোধন ক’রে দিতে পার, মানুষ তোমার আপনজন হয়ে দাঁড়াবে। যীশু বলেছিলেন, “Come ye after me, and l shall make you fishers of men.” (তোমরা আমার সঙ্গে আস, তোমাদের মানুষ ধরতে শেখাব)। যার মানুষ আছে, মানুষকে যে জীবনের পথ দেখিয়েছে, বাড়িয়ে তুলেছে, তার টাকার অভাব হয় না। আমি টাকা পাই কোত্থেকে? আমায় মানুষ টাকা দেয় কেন? তাই বলি, নারায়ণ বাদ দিয়ে লক্ষ্মীর উপাসনা করলে লক্ষ্মীকে পাওয়া যায় না। নারায়ণ মানে জীবনের পথ, বৃদ্ধির পথ। যিনি যত মানুষকে জীবন-বৃদ্ধির পথে চালিয়ে নিতে পারবেন, তিনি তত বড় নারায়ণ। আর, যিনি যত বড় নারায়ণ, তত বড় লক্ষ্মী  তাঁর গৃহে অচলা। হিটলার, মুসোলিনী একদিন তোমার আমার মতই ছিল, খেতে পেত না, কিন্তু তারা ছিল মানুষ-স্বার্থী। আজ দেখো, তাদের অর্থের কুলকিনারা করতে পার না। আর, যতদিন তারা প্রকৃত মানুষ-স্বার্থী থাকবে, ততদিন তাদের এমনতরই চলবে—আশা করা যায়। টাকাকে মুখ্য ক’রে ভাবা একটা sign of idiocy (মূর্খতার লক্ষণ)। (আঃ প্রঃ ৪র্থ খণ্ড/১১)

।। মানুষ চেনার সহজ উপায় প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বিধান।।

বীরেনদা (ভট্টাচাৰ্য্য)— মানুষ চেনার সহজ উপায় কী ?

শ্রীশ্রীঠাকুর— দেখতে হয়, কথার সঙ্গে কাজ ও ব্যবহারের মিল আছে কিনা।  আর দেখতে হয়, কথাবার্তার মধ্যে-দিয়ে সে নিষ্ঠাকে অটুট রেখে মানুষকে প্রীত করে প্রীত হতে চায়, না, হামবড়ায়ী চালে নিজের প্রাধান্যকে জাহির করতে চায়। ভালো মানুষের একটি প্রধান লক্ষণ হলো, সে আদর্শে অটুট থেকে, পরিবেশকে আনন্দ দিয়ে আনন্দ পেতে চায়। নিজের অহমিকার বালাই নিয়ে সকলকে আঘাত করেনা। একরকম আছে ব্যক্তিত্বহীন বিনয়, সব কথাতেই সায় দিয়ে যায়, সে কিন্তু ভালো নয়। সৎ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন যারা, তারা হৃদ্য ব্যবহার ও সেবানুসন্ধিৎসা নিয়ে চললেও আদর্শকে কখনো বিসর্জন দেয় না বা অন্যায়ের সাথে আপোসরফা করে না।

বীরেনদা— যারা আদর্শ গ্রহণ করেনি ?

শ্রীশ্রীঠাকুর — কেউ আদর্শ গ্রহণ করুক বা না-করুক, ভালো মানুষ যে, তার মহতের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবেই কি থাকবে। একটা মানুষ যদি শ্রদ্ধাহীন হয়, সে যতই হোমরা-চোমরা হোক, ধরে নিতে পারো, তার ভিতরে গোলমাল আছেই।  (আলোচনা-প্রসঙ্গে, ২য় খণ্ড, ৮ই পৌষ, মঙ্গলবার, ১৩৪৮ (ইং ২৩/১২/১৯৪১)

 

 

          ।। Go-between (দ্বন্দ্বীবৃত্তি) ধর্ম্মরাজ্যের জিনিস নয় ।।

      শ্রীশ্রীঠাকুর— ‘‘Go-between (দ্বন্দ্বীবৃত্তি) ক‌‍‌‌‍‍‌‌‍’রে যদি দান-ধ্যান বা সৎকাজ করা যায়, তাতেও কিন্তু অপরাধ হয়। Go-between-এর নাম দেওয়া যায় মিথ্যাচার, কারণ, এটা সত্তা-সম্বর্দ্ধনাকে হনন করে। Go-between (দ্বন্দ্বীবৃত্তি) অসম্ভব ব্যাপার, এতে  treachery (বিশ্বাসঘাতকতা)-র vibgyor (সাতটি রং)  আছে। আর, যা’ হো’ক বা না হোক, go-between (দ্বন্দ্বীবৃত্তি) ধর্ম্মরাজ্যের জিনিস নয়। Go-between (দ্বন্দ্বীবৃত্তি) যার আছে—সত্তাপোষণী উপচয়ী চলনার ব্যাপারে, বিশেষ ক’রে personal profit (ব্যক্তিগত লাভ) হ’তে পারে এমন কোন কাজের বেলায়—সে blundering move  (ভুল চাল) নেবেই, হয়তো সেই মুহূর্ত্তে হাগা চেপে যাবে।

            ………. জমায়েৎ go-between-এর ফল যখন মানুষকে চেপে ধরে, তখন পদে-পদে সে ব্যর্থ ও ব্যাহত হ’তে থাকে। সে-চিত্র ভাবতে আমার গা শিউরে উঠছে (শ্রীশ্রীঠাকুরের চোখে-মুখে একটা আর্ত্ত আতঙ্কের চিহ্ন ফুটে উঠলো)। খুব সাবধান।

            ………….কেষ্টদা প্রশ্ন করলেন— Go-between (দ্বন্দ্বীবৃত্তি)-এর কোন প্রায়শ্চিত্ত নেই? Go-between (দ্বন্দ্বীবৃত্তি) আর না করা ছাড়া তো প্রায়শ্চিত্ত দেখি না।

            শ্রীশ্রীঠাকুর—দেখি না তো ! খুঁজে দেখবেন তো পান নাকি। শোনেননি এমন ভূত আছে যা’ ওঝা মানে না, এও সেইরকম। Shortcut (সহজ) প্রায়শ্চিত্ত আছে বলে মনে হয় না। (চিন্তিতভাবে বললেন) এ যে কি সর্ব্বনেশে জিনিস, ইহকাল-পরকাল ঝর-ঝরে ক’রে দিয়ে যায়, চরিত্রে একরত্তি বল থাকে না। Conviction (প্রত্যয়) ব’লে জিনিস থাকে না, সে যত ভাল কথাই কো’ক, মনে হয় ফাঁপা, ফাঁকা  আওয়াজ, কোন বস্তু  নেই তা’তে, তাই মানুষের অন্তরে গভীরভাবে, স্থায়ীভাবে দাগ কাটতে পারে না।’’ (আঃ প্রঃ ২য় খণ্ড, ৬ই পৌষ, রবিবার, ১৩৪৮/ইং ২১-১২-৪১)

                              —————