d

।। দুর্গাপূজা ও ধর্ম ।।

                         

।। দুর্গাপূজা ও ধর্ম ।।

                                                            নিবেদনে—তপন দাস

—————————————————————————————-

বাঙালী মননশীলতা দিয়ে দুর্গাপূজার বিষয়টাকে বাস্তববোধে চিন্তা করলে দেখা যাবে, আমাদের আলোচ্য মা-দুর্গা পূজ্য তাঁর চরিত্রগুণে। মা দুর্গার সমার্থক, মা উমাকে আমরা
কন্যা জ্ঞান করি। তাইতো ফি বছর কৈলাস থেকে নিয়ে আসি। যদিও তাঁকে আনতে এবং
দিতে কে বা কারা যান। কোন রুটে দোলায়, নৌকায়, ঘোটকে এবং গজে যাতায়াত
করেন, সে খবর দেবার দায়িত্ব তথ্যাধিকারীদের, আমার নয়! তবে আমি এবং আমরা
দশভুজার চাইতেও দ্বিভুজা উমাকে বেশী পছন্দ করি বলেই না উমাকে নিয়ে কতই না
আগমনী গানের ডালি সাজিয়ে তাঁকে বরণ করে নিতে চাই। কামনা করি, ঘরে ঘরে
উমার মত আদর্শ  মেয়ে  যেন জন্মায়। উমাই তো আমাদের মা দুর্গা! ভারতেই শুধু
নয়, সারা বিশ্বের সংস্কৃত মনীষায় নারীজাতির আদর্শরূপে স্বীকৃত, পূজিত।
স্বীকৃতি পাবেনই না বা কেন, পূজিত হবেনই না বা কেন,–কারো কান-ভাঙানিতে
কান না দিয়ে পরমভক্ত, পরমজ্ঞানী শিবকে পতিরূপে বরণ করে, স্বামীর
মনোবৃত্ত্যানুসারিণী স্ত্রী হয়ে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীদের ন্যায়
কৃতি সন্তানদের জননী হয়েছেন। তিনি একজন আদর্শ সংসারী নারী হয়েও অসৎ
নিরোধী তৎপর,–অশুভ শক্তিকে সমুচিত দণ্ড দেবার জন্য রণসাজে সজ্জিত
হয়েছেন।  পশুরাজকে করেছেন বাহন। পারস্পরিক শত্রু খাদ্য-খাদক সম্পর্কের
পেঁচা-ইঁদুর, ময়ুর-সাপকে মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ করেছেন। দুটি হাত দিয়েই
বৃহত্তর সংসারের দশদিক সামলাতেন। তাই তো তিনি দ্বিভূজা হয়েও দশ
ইন্দ্রিয়কে বশ করে হতে পেরেছেন দশভূজা। তাই তো তিনি দশপ্রহরণধারিণী।  তাই
তো তিনি পূজ্য। –এহেন চরিত্র ‘দেবী’ জ্ঞানে, ‘জগজ্জননী’ জ্ঞানে স্বীকৃতি
তো পাবেনই।  তাই তো আমাদের ঋষিরা দেবতাদের সম্মিলিত শক্তিতে সৃষ্ট দেবী
দুর্গা কাত্যায়ন অঙ্গনে মহিষাসুরকে বধ করার পর তাঁর প্রদর্শিত শক্তিকে
দৃষ্টান্ত স্বরূপ চিরস্থায়ী একটা আদর্শে রূপ দিয়েছিলেন। দেবী দুর্গাকে
স্ত্রীজাতির এক আদর্শ প্রতীক রূপে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁরা দেবী দুর্গার ওই
অসৎ-নিরোধী তৎপরতাকে দৃষ্টান্ত রূপে তুলে ধরে  নারীসাধারণকে  দেবী রূপে,
জগন্মাতা রূপে   মর্যাদা দিয়েছেন,  কামিনীরূপে নয়। তাইতো বর্তমানেও
সম্ভ্রান্ত হিন্দু নারীদের মধ্যে দেবী পদবি প্রচলিত।  ঋষিরা ছিলেন
বিজ্ঞানী। তাই তো তাঁরা দুর্গাপূজার  বিধান দিলেন বাস্তব অনুশাসনের
মাধ্যমে। আত্মবিস্তার কল্পে গর্ভাধান-সংস্কারের সময় স্বামী, নিজের
স্ত্রীকে জগন্মাতা জ্ঞানে স্ত্রীর নাভিমূল স্পর্শ করে বলবেন, প্রসীদ মা
জগজ্জননী,–হে  জগন্মাতার প্রতীকস্বরূপা চিন্ময়ী মা, তুমি প্রসন্ন হয়ে
আমাকৃত গর্ভাধান মাধ্যমে দেদীপ্যমান আত্মাকে আকর্ষণ কর।–ওই স্বীকৃতির
মাধ্যমে স্ত্রীকেও মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েছেন, কামিনীজ্ঞানে নয়।
এর কারণ, স্বামী, স্ত্রীর মাধ্যমে নিজেকে জন্মান, তাই তিনি জায়া।
    জীববিজ্ঞান অনুসারে প্রজনন-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আত্ম-প্রতিলিপি গঠন করা
হয়। পুরুষ-বীজ ধারণ করে, বীজের প্রতিলিপি গঠন করে ভূমি-স্বরূপা নারী। জনন
করেন বলে জননী। তাই কৃষকেরা ফসল ফলাতে জমি কর্ষণ করে, কর্ষণ মানে আকর্ষণ,
যাতে জমি বীজ থেকে ভালো সন্তান (ফসল) আকর্ষণ করতে পারে। জমি অনুযায়ী
উপযুক্ত শুদ্ধ-বীজ বপনের আগে ভূমিকে আগাছা মুক্ত করে, সার দেয়, জল দেয়,
জমি জননক্ষম হলে জো বুঝে বীজ বোনে।–জমিকে মাতৃজ্ঞানে পোষণ দিয়ে ভূমিকে
পূজা করে—যাতে জমি বীজের অন্তর্নিহিত সত্তাকে ভালোভাবে পুষ্ট করতে পারে,
বীজের সত্তাকে ধারণ করে আদর্শ মা হয়ে ভালো ফসল ফলাতে পারে। ফসল ফলাতে যদি
গর্ভাধান প্রক্রিয়া থাকতে পারে, মানুষ ফলাতে তো আরও বেশী বিধি-নিয়ম থাকা
উচিত!  আমাদের ঋষিরা ছিলেন প্রকৃত বিজ্ঞানী। বিজ্ঞান শব্দটিও উপনিষদ থেকে
উৎপত্তি হয়েছে। তাই ঋষিরা নারীদের জগন্মাতাজ্ঞানে ব্যবহার (treat) করতে,
শ্রদ্ধা  (honour) করতে  শিখিয়েছেন।–যার নাম প্রকৃত পূজা। যার মাধ্যমে
স্বভাবের স্ফূরণ হয়ে সব অভাবের পূরণ হয়।

                              
        ভারতের আর্য্য-ঋষিগণ, অবতার-বরিষ্ঠগণ প্রত্যেকেই সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির
উপাসনার কথা বলেছেন ধর্মের নামে, পূজার নামে। বর্তমান পুরুষোত্তম
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আরও একটু সহজ করে দিয়ে বললেন, ‘‘ধর্ম্মে সবাই
বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম্ম না-রে। অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম্ম
বলে জানিস্ তাকে। পূর্বতনে মানে না যারা/জানিস্ নিছক ম্লেচ্ছ তা’রা।’’
‘‘পূজা-আর্চ্চা মানেই কিন্তু /দৈবগুণ যা সেধে নেওয়া। হাতে-কলমে মক্স
করে/বাস্তবে তার রূপটি দেওয়া।।’’ ইত্যাদি ছড়াবাণীগুলো সহজ, সরল, ওজস্বী
আবেদনে সমৃদ্ধ হলেও একটা নির্দিষ্ট গণ্ডীর ভাষা-ভাষীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
ওই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দিতে বললেন,
‘Upholding urge of existence is Dharmma.’ বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্তা বা
অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করে উৎকর্ষতায় রক্ষা করার নাম ধর্ম। তথাপিও
আমরা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতার, কু-সংস্কারের, অজ্ঞানতার আবরণ ভেদ করে
শুদ্ধ আমিটাকে বের করতে ব্যর্থ হলাম। তথাকথিত ইনটেলেকচ্যুয়াল হওয়া সত্বেও
ধর্মের নামে ফুল, বেলপাতা, ধূপবিহীন ধূপকাঠি, ফল-মিষ্টান্নাদির অঢেল
আয়োজনে, মাইক বাজিয়ে, শব্দবাজির আওয়াজ দিয়ে পরিবেশবিদদের চিন্তার
বলিরেখায় ভাঁজ ফেলে দিতে ইন্ধন যোগাচ্ছি। আর আমাদের গর্বের রবীন্দ্রনাথ
আমাদের দ্বিচারিতা দেখে কষ্ট পাচ্ছেন আর ভাবছেন, যে মানুষগুলো ‘তোমার
পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার
তলে’ ইত্যাদি ছন্দের ডালি সাজিয়ে ভক্তির আবেদন জানায়, তারাই আবার পূজার
নামে কু-সংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে বিশ্বাত্মাকে দূষিত করে চলেছে।
        আমাদের বর্তমান যুগ যে যুক্তিবাদী সে কথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি
অস্বীকার করবেন না আশাকরি। যেমন, সন্তানের হয়ে মা খেলে সন্তানের পেট ভরবে
না। ছাত্রের হয়ে শিক্ষক লেখাপড়া করলে ছাত্র পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে
না।–তেমনি প্রচলিত পূজার আয়োজকদের হয়ে কোন পুরোহিত পূজা করলে আয়োজকদের
কিছু ফললাভ হবে কি ?


        অবশ্য পুরোহিতও  জানেন না ফললাতের বিষয় সম্পর্কে। যদি জানতেন বিসর্জন
মন্ত্রে বলতেন না—ওঁ আবাহনং ন জানামি, নৈব জানামি পূজনম্। বিসর্জনং ন
জানামি ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি।–অর্থাৎ আমি আবাহনও জানিনা,
বিসর্জনও জানিনা, আমাকে ক্ষমা করুন। (দ্রঃ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)
        বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী পূজ্য-প্রতিমা চঞ্চল চিত্তের
ধারণের জন্য একটি অবলম্বন। প্রতিমাকে ব্রহ্মের রূপ কল্পনা করে উপাসনা,
সংযম, সাত্তিক আহার, সাত্তিক বিহার ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে পূজা
করা হয়।–যাতে পূজক বা উপাসক মনসংযোগ দ্বারা প্রতিমাকে হৃদয়ে ধারণ করে
প্রতিমার গুণে গুণান্বিত হতে পারে। এই হলো প্রতিমা পূজার মূল কথা। তাহলে তো যার পুজো তাকেই করতে হবে। পূজ্যর সাথে পূজকের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে।
       যাই হোক,  এ থেকে এটুকু  বোঝা গেল যে  সততা, সংযম, ন্যায়নীতি ইত্যাদি মানবিক
গুণগুলোর প্রবহমানতাকে নবীকরণ করার মাধ্যম, পূজা
উদযাপনের উদ্দেশ্য। অথচ বাঙালীর সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার আয়োজন
বিশ্লেষণ করলে এর বিপরীত চিত্রটাই আমাদের বোধে ধরা পড়ে।
        বিজ্ঞানের বিধি অনুযায়ী একটা নির্ভুল অংক কষতে গেলেও একটা শান্ত পরিবেশ
প্রয়োজন, একাগ্রতার প্রয়োজন।  কিন্তু পূজার নামে, বেশীরভাগ
বারোয়ারী পূজা-প্রাঙ্গনগুলোতে ঢাকের আওয়াজ, মাইকের আওয়াজ, আয়োজকদের অহংকারের আওয়াজে কোন সুস্থ মানুষের একটি ঘণ্টার জন্যও একাগ্রভাবে, স্থিরচিত্তে বসে
থাকতে পারার কথা নয়! অবশ্য দেবদেবীর ব্যাপারটা আলাদা। মাটির পুতুল বলেই
আমাদের সব অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করতে পারে! তাই কবিগুরুর ভাষার—  

“তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি

বুঝতে নারি কখন্‌ তুমি

দাও’ যে ফাঁকি॥

তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি–

ফুলের মালা দীপের আলো ধূপের ধোঁওয়ার

পিছন হতে পাই নে ‘সুযোগ চরণ-ছোঁওয়ার,

স্তবের বাণীর আড়াল টানি

তোমায় ঢাকি॥

তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি—

দেখব ব’লে এই আয়োজন মিথ্যা রাখি

আছে তো মোর তৃষা’ কাতর আপন আঁখি

কাজ কী আমার মন্দিরেতে

আনাগোনায়—

পাতব আসন আপন মনের একটি কোণায়

সরল প্রাণে’ নীরব হয়ে

তোমায় ডাকি॥

তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি”—-

বাণীগুলো এক নির্মম সত্যের বার্তা  দেয় না কি?

                                         * * *

     বাঙালিদের মানস-দেবী মা দুর্গা। ‘যা দেবি সর্বভূতেষু’ মন্ত্রে যাঁর
অস্তিত্বের স্বরূপ প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ দেবী সর্বভূতের প্রাণশক্তি
স্বরূপা, সর্বভূতে দেবী অধিষ্ঠিতা। এবার প্রশ্ন, যে দেবী সর্বভূতে
অধিষ্ঠিতা সেই পঞ্চ-মহাভূত পরিপোষিত স্বেদজ, ক্লেদজ, অণ্ডজ, জরায়ুজ-জাত
ভূত(জীব/প্রাণী)গুলোকে, বেঁচে থাকার জৈবাজৈব  আবশ্যক উপাদানগুলোকে দেবীর প্রতিভূ  মনে করে সম্বর্দ্ধিত না করে, সুস্থভাবে টিঁকিয়ে রাখার  চেষ্টা না করে, কোন
যুক্তিতে মাটির প্রতিমা পূজার নামে প্রাণী হত্যা (মাংসের দোকানে লাইন, তার প্রমাণ।) করে, নানাভাবে পরিবেশকে দূষিত  করার জন্য বিশেষ করে কলকাতায়, (দ্রঃ পুজোর আগের এবং পরের দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের রিপোর্ট।) কোটি কোটি টাকা অপচয় করা হয়!
     ভাষা-বিজ্ঞান অনুযায়ী পূজা মানে পূরণ করা, সম্বর্দ্ধিত করা। যে
আচার-আচরণ পরিবেশের সাত্তিক জীবন-বর্দ্ধনার অভাবকে পূরণ করে, জৈবাজৈব
সবকিছুকে সম্যকরূপে বর্দ্ধিত করে, তার নাম পূজা।  উৎকৃষ্ট প্রসব করে যা,
তার নাম উৎসব। আর যে আচার-আচরণ জীবনবৃদ্ধিকে নন্দিত করে তার নাম আনন্দ।
এখন প্রশ্ন,  আমাদের প্রচলিত পূজা, উৎসবের উদযাপনকে কেন্দ্র করে আনন্দের
প্রকাশ বৃহত্তর পরিবেশকে কতখানি নন্দিত করে  ‘পূজা’ শব্দের যথার্থতাকে
উপহার দিতে পেরেছে? —এইসব বিষয়ে সত্তাপিয়াসী চিন্তাশীলদের চিন্তা করে
দেখা উচিত। বিশেষ করে যাঁরা কুসংস্কার বিরোধী রূপে নিজেদের বোধ ও বোধিকে
প্রতিষ্ঠিত করতে চান।
     বাহ্য পূজাবাদীদের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী পূজা শুরুর আগে মৃন্ময়ী
মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়।  আয়োজকদের বিশ্বাস, পুরোহিতের
মন্ত্রবলে নিষ্প্রাণ মূর্তিগুলো প্রাণবন্ত হয়। তর্কের খাতিরে বিষয়টাকে
সত্য বলে যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে একটা  প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে,
জীববিজ্ঞান অনুযায়ী জীবন্ত প্রাণীদের চলন, গমন, ইত্যাদি অভিব্যক্তি থাকা
আবশ্যিক।  অতএব বিজ্ঞানসম্মত  কারণেই পুরোহিতের মন্ত্রবলে দুর্গাঠাকুরের
চালচিত্রের দেবদেবী, অসুর, সিংহ, ময়ূর, সাপ, পেঁচা, ইঁদুরেরা জীবন্ত হয়ে নিজ
নিজ অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে। কেউ চুপচাপ স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে পারবে
না। ফলে শুরু হয়ে যাবে মহিষাসুর মর্দিনীর বাস্তব উপস্থাপনা—যুদ্ধ। অসুর,
দুর্গাকে আক্রমণ করবে, সিংহ গর্জন করতে করতে দেবীকে নিয়ে অসুরের দিকে
ধাবিত হবে, বাহনসহ অন্যান্য দেবদেবীরাও যোগদান করবে যুদ্ধে।–-এবার
প্রশ্ন–ওই অবস্থায় পুরোহিত, আয়োজকেরা, ভক্তেরা,  উদ্বোধন করতে আসা
সেলিব্রিটিরা, নেতা-মন্ত্রীরা কোন পক্ষে যোগদান করবেন? দেবীর পক্ষে না
অসুরের পক্ষে ?
         আর একটা প্রশ্ন, যে পুরোহিত আদ্যিকালের দেবদেবীদের কল্পিত মাটির
মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম, তিনি মানুষের প্রাণহীন দেহে আরো
সহজে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন বা পারা উচিত। কারণ,  বিজ্ঞান মতে,
মাটির মধ্যে থাকা অণু-পরমাণুর তুলনায় সদ্য মৃতদেহের অণু-পরমাণু বেশী
সক্রিয় থাকে, বেশী জীবন্ত থাকে।  মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী সরকারের স্বাস্থ্য
বিভাগ এ বিযয়টা নিয়ে ভেবে দেখতে পারেন। তাহলে অনেক অকালমৃত্যু সহজে রোধ
করা যাবে।
        সনাতন ধর্মীয় মতবাদ অনুযায়ী মানুষ অমৃতের পুত্র, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’
বলা হয়েছে।  সেই মানুষ যাতে দশবিধ-সংস্কারে সংস্কৃত হয়ে প্রকৃষ্ট জাতক বা
প্রজা হয়, অকালে নিষ্প্রাণ না হয়, সন্ত্রাসবাদী না হয়, রেপ-কেসের আসামী
না হয়, নারীদের মা-দুর্গার প্রতীক জ্ঞানে সম্মান জানায়, ‘অসতো মা সদ্গময়,
তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়’-এর আদর্শ অনুসরণে সমৃদ্ধ
হয়,–সমাজের পুরোভাগে থেকে, ওইসব বিষয়ে মানুষকে সচেতন করে পরিবেশের
হিতসাধন যাঁরা করতেন তাঁদের বলা হতো পুরোহিত।
   সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পুরোহিত ঋষি বশিষ্ঠ রামচন্দ্রের রাজসভায়
অকালমৃত্যু-দেহে প্রাণ সঞ্চার করার স্পর্দ্ধা দেখান নি।  বিজ্ঞান-যুগের
পুরোহিতেরা যদি পুতুলে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন, মৃতদেহেও পারা
উচিত! যদি না পারেন, ততঃ কিম্!
   ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি, ‘পূজা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সম্বর্দ্ধনা।
পূজ্য ব্যক্তিত্বের গুণে গুণান্বিত হয়ে নিজেকে এবং পরিবেশকে সম্বর্দ্ধিত
করা।  এতদিন ধরে হাজার-হাজার দুর্গাপূজা করে আমাদের চিন্ময়ী নারীরা
কতখানি সমৃদ্ধ হয়েছে মা দুর্গার ন্যায় অসৎ-নিরোধী-তৎপর আদর্শ চরিত্রের চরিত্রায়নে ? আমাদের চিন্ময় পুরুষেরা নারী সাধারণকে কতটা মা-দুর্গার প্রতীক মনে করে শ্রদ্ধা
করতে বা পূজা করতে শিখেছে ? আমরা সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির পথে কতটা এগিয়েছি?
আমাদের কতখানি দুর্গতি নাশ হয়েছে? আমাদের সার্বিক জীবন-চলনা দুর্গ-সম
পরিরক্ষিত হয়েছে কতটা?—তথ্য জানার অধিকার বলে এ বিষয়ে জানতে চাওয়াটা
নিশ্চয়ই অপরাধ হবে না! যদিও প্রচলিত তথ্য এর বিপরীত মত প্রকাশ করে চলেছে
দীর্ঘদিন ধরে। পূজাকে কেন্দ্র করে সাত্তিকতা বৃদ্ধি না পেলেও, তামসিকতা
বেড়ে যায় বহুগুণ।  পুজোকে কেন্দ্র করে ভক্তদের অনিত্য দেহটাকে
পূজা-বিপরীত সাধের  নানা বেশভূষায় সাজিয়ে দিতে বিকিকিনির পসরা সাজিয়ে
যারা বসেন, তারা কি পূজা-সদৃশ সততার দৃষ্টান্ত  উপহার দেন সমাজকে ? পূজাই
যদি উদ্দেশ্য তবে ইভটিজিং, আদমটিজিং কেন হবে ? অপরাধ কেন  বৃদ্ধি পাবে ?
দূষণ কেন বৃদ্ধি পাবে পূজাকে কেন্দ্র করে ?— এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে
?
        এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, “Accident-এ (আকস্মিকভাবে) যা’ জন্মে, তা বুনো, বিহিত সুফলপ্রদ চাষে যা’ জন্মে তা’ পুণো (পুণ্য)। প্রবৃত্তি লালসায়
অবিধিপূর্বক উপগতি হয়ে যে সন্তান জন্মে, তার চরিত্রের কোন ঠিক ঠিক থাকে
না। গর্ভাধান সংস্কারের ভিতর দিয়ে উন্নত চিন্তাপ্রসূত বিধিমাফিক পবিত্র
যে জন্ম, তার রকমই আলাদা। ঘরে ঘরে ভগবান জন্মে। তেমনি ছিল আমাদের
বিধান।’’ (আঃ প্রঃ ১৮/১৩)

অতএব আমাদের ঘরের মা দুর্গারা যেদিন আবার ঘরে
ঘরে লক্ষ্মী-সরস্বতী, কার্তিক-গণেশ সদৃশ ভগবান জন্মাতে পারবেন সেদিন সার্থক হবে আমাদের দুর্গাপূজা।

   দুর্গাপূজার বাস্তবতা তুলে ধরতে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেনঃ

       

 “….যে মৃন্ময় মূর্ত্তি
                আমরা পূজা করি—
                কল্পনায় প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করে,–
                        তিনি দশভূজা,
                                দশপ্রহরণ-ধারিণী—
                                ঐ আমাদের মায়েরই প্রতীক—
                        আমাদের ঘরে ঘরে
                                যে মা অধিষ্ঠিতা
                                তাঁরই বিনায়িত সুসঙ্গত প্রতীক;
        তাই ঐ মায়ের পূজা মানেই হচ্ছে—
                যে মা আমার,
                যে মা তোমার,
                যে মা ঘরে ঘরে
                        দুর্গা হয়ে অধিষ্ঠিতা,
        দুর্গতিনাশিনী হয়ে
        দশপ্রহরণ ধারণ করে
                সন্তান-সংরক্ষণায় নিয়োজিতা,
সেই মায়েরই পূজা;………..”
(আশীষ বাণী, ৬২/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)

“মা আমাদের দশভুজা,
        প্রতি ঘরে ঘরে
                যদিও তাঁকে
                        দ্বিভুজাই দেখতে পাই,
                        তিনি
দশদিক্ আবরিত করে রেখেছেন—
        তাঁর স্নেহ-উৎসারিত
স্বস্তি-উৎসারিণী উদাত্ত অনুচর্য্যায়,
        কায়মনোবাক্যে
                প্রতিটি কর্ম্মের ভিতর-দিয়ে
                        ব্যষ্টির পথে
                                সমষ্টিকে আন্দোলিত করে,
        সাত্বত উৎসর্জ্জনায়
                আপূরিত করে সবাইকে,
        কৃতি-উদ্দীপনার অনুপ্রেরণায়—
                তাই মা আমার দশভূজা;……”
(আশীষ বাণী, ৫৯/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)

উক্ত বাণীর মাধ্যমে পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র রক্ত-মাংসের মানবীদের মা দুর্গা রূপে সম্বোধন করলেন!

।। পূজা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের অনুভবী দিব্যবাণী ।।
“পূজা মানে সম্বর্দ্ধনা। শুধু নিরিবিলি মূর্ত্তি বা পটের সামনে ফুল-বিল্বপত্র দিয়ে মন্ত্রপাঠ করলে পূজা হয় না। গুরু ও গণের অর্থাৎ পারিপার্শ্বিকের বাস্তব সম্বর্দ্ধনা যাতে হয়, তাই করা চাই। তাতে শান্তি সুনিশ্চিত।  (আঃ প্রঃ ৭ম খণ্ড, পৃঃ ১৯৬)

       আমি আপনার পূজা করছি মানে, আপনার গুণ চিন্তা করছি এবং নিত্য অনুশীলনের
মাধ্যমে ঐ গুণগুলি আমার চরিত্রগত করে তুলছি, আমার ভিতরে বাড়িয়ে তুলছি।
স্তব করি মানে গুণ বর্ণনা করি। তা কিন্তু শুধু মুখে বা মনে-মনে করলেই
হবে না, প্রতিদিনকার অভ্যাস ও অনুশীলনের ভিতর দিয়ে ঐ গুণগুলি আমার
চরিত্রে মূর্ত্ত করে তোলা চাই।’’ (দীপরক্ষী ৪/১৮২)

      আদর্শ যদি থাকে, আর তাতে ভাবমুগ্ধ সক্রিয় অনুরাগ যদি হয়, তবে তার ভিতর দিয়েই মানুষগুলির প্রবৃত্তির একটা সার্থক বিন্যাস হতে পারে। নচেৎ শুধু একটা হাওয়ার উপর দাঁড়িয়ে এ জিনিসটা হয় না।   …গুরুগত প্রাণ না হলে মূর্তিতে বা নিজের ভিতর প্রকৃত প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয় না। তাই পূজার ফলও তাতে মেলে না। ব্রহ্মবিদকে উপেক্ষা করে যখন ব্রহ্মকে উপাসনা করতে চাই, তখন আমরা তমসাচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। কারণ, বোধ থাকে না, বাদ থাকে। তার থেকে বোধবন্ধ্যা বাদব্যাহৃতির উদয় হয়।… বাদব্যাহৃতি মানে তথাকথিত অনুভূতিহীন বাগাড়ম্বর।    (আলোচনা প্রসঙ্গে ১৮তম খণ্ড)


।। পূজা কেমন করে করতে হবে ।।

      “দেবতার পূজা-অর্চনা করতে গেলে আগে ইষ্টের ভাব অন্তরে জাগ্রত করে সেই
ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে, দেবতার স্মরণ মনন করতে হয়। তাঁকে স্মরণ করা
মানে—তাঁর চলন-চরিত্র ও গুণ গরিমা স্মৃতিতে এনে অনুশীলনের ভিতর দিয়ে
আয়ত্ব করা। চরণ-পূজা মানে চলন পূজা। ইষ্টের চলনাকে নিজের জীবনে আয়ত্ত
ক’রে ঐ চলনের প্রসারতা ও সম্বর্দ্ধনা যদি না ঘটাই বাস্তবে, তাহলে তাঁর
চরণ-পূজা সার্থক হয় না। আমরা ফাঁকতালে কাম সারতে চাই, কিন্তু বিধি বড়
কঠিন বান্দা, কোন চালাকি চলে না তাঁর কাছে।”  (আ. প্র. ২৯. ১২. ১৯৪২)


      “প্রশ্ন। হিন্দুরা দেবদেবীর পূজা করেন কিন্তু মুসলমানেরা একমাত্র
খোদাতায়ালার পূজা ক’রে থাকেন। হজরত ত’ ছবি ও পুতুল-পূজা একেবারেই নিষেধ
ক’রে গেছেন, কিন্তু আপনি এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য করছেন কেমন-ক’রে ?


      শ্রীশ্রীঠাকুর। ধর্ম্ম-আচরণের দিক দিয়ে হজরত রসুলও যা’ ব’লে গেছেন,
আর্য্যদের ধর্ম্মশাস্ত্র চিরকালই ঋষির নিদেশরূপে তাই বহন ক’রে আসছে।
আর্য্য-ধর্ম্মশাস্ত্র ছবি বা পুতুল-পূজা এমনতর বিকট তাচ্ছিল্যের সহিত
নিরস্ত করতে ঘোষণা ক’রেছেন—এমন-কি অধমাধম বলতেও ক্ষান্ত হন নি। তবে
আর্য্য-ঋষিদের প্রত্যেক মানুষকে উন্নতির পথে নিয়ন্ত্রণ করবার এমনতর একটা
ঝোঁক ছিল—যা-নাকি হজরত রসুলের ভিতর দেখতে পাওয়া যায়–………..” যারা পুতুল-পূজা নিয়ে পুতুলকে ভগবান করে একটা বেপরোয়া জড়ত্বের আরাধনায় মশগুল হয়ে আছে—কায়দা-কলম করে তাদিগকে ঐ পুতুল বা ছবি-পূজার অনিষ্টকারিত্ব বুঝিয়ে ঐগুলি যে নিরেটই অধম, তাদের তা বিবেচনার ভিতর দিয়ে এনে,  অন্তর থেকে তা যাতে মুছে যায় তারই মতলব কত কথার ভিতর-দিয়ে কত রকমে দিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। ………. (ইসলাম-প্রসঙ্গে/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র/পৃঃ ২৮-৩০)

       ।। পুরুষোত্তমের দৃষ্টিতে প্রতিমা পূজা ।।

              কোন্ বেকুব শিখিয়ে দেছে

                     আর্য্য যা’রা পৌত্তলিক,

              পুতুল-পুজো করে না তা’রা

                     পূজক আপ্তবীর-প্রতীক; ……… ১১।

                   (অনুশ্রুতি, ১ম খণ্ড/ আর্য্যকৃষ্টি)


সাধক রামপ্রসাদ তাঁর স্বরচিত গানের ভেতরেই তো
বলেছেন—
‘‘ধাতু-পাষাণ মাটির মূর্ত্তি
কাজ কি রে তোর আরাধনে
তুই মনোময় প্রতিমা গড়ি’
বসা হৃদি-পদ্মাসনে।।’’
এমন কত কি যে আছে, তার ইয়ত্তা নেই।’’
(কথা প্রসঙ্গে, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৭৬, ১৭-১০-১৩৪২)

* * *
        এবার আমরা এক়টু দেখে দেখে নেব, পূজা প্রসঙ্গে মেরা ভারত মহান’-এর
অন্যান্য মহানেরা এবং মহান গ্রন্থগুলো কি নিদেশ রেখে গেছেন।


পূজা বিষয়ে মহানির্ব্বাণতন্ত্র নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ
‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ।
অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’
মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ভারতে বিবেকানন্দ গ্রন্থের ৩৩৬
পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট।
ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’
‘‘যে-ব্যক্তি সর্ব্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ
প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে।’’ –শ্রীমদ্ভাগবত। ৩-২৯-২২
“ঈশ্বরঃ সর্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জ্জুন তিষ্ঠতি।
ভ্রাময়ন্ সর্ব্বভূতানি যন্ত্ররূঢ়ানি মায়য়া।।’’
(গীতা, ১৮। ৬৫)
“যিনি এই সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার নিজের স্বধর্মানুরূপ
নিষ্কাম কর্মাচরণ দ্বারা (বাক্য বা ফুলজল দ্বারা নহে) পূজা করিয়া মানুষ
সিদ্ধি লাভ করে। স্বধর্মানুরূপ (বর্ণানুগ সত্তাধর্ম পালন) নিষ্কাম কর্মই
পরমেশ্বরের পূজার ডালি। (গীতা ১৮। ৪৬)

      বৈদিকযুগে বেদের কোন দেবতাই শরীর গ্রহণ করেন নাই। বেদে বিগ্রহ বা দেবমন্দিরের উল্লেখ নাই। পৌত্তলিকতার চিহ্ন পর্য্যন্তও নাই। পুরাকালে বিগ্রহ বা মন্দির ছিল না।

কোন বেদে বা মূল পুরাণেও প্রতিমাপূজার প্রসঙ্গ নাই।

(ঋগ্বেদসংহিতা, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১১১)

সূত্রঃ সৎসঙ্গ পাব্লিশিং-এর গ্রন্থ, ইসলাম প্রসঙ্গে, পৃঃ ১১

        তাই, শাস্ত্র বর্ণিত অধমের চাইতেও অধম পূজায় মেতে উঠে আমাদের যাতে
ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে না হয়, তাই, শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্র আমাদের নিত্য বাস্তব দুর্গাপূজার পূজারী করে তুলতে
সৎসঙ্গীদের নিত্যপাঠ্য ‘সত্যানুসরণ’ নামক মহাগ্রন্থে নারীকে জগজ্জননী
জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত করতে নিদেশ দিয়ে বললেন, ‘‘প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী ।
প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয় ।’’
  এবং
পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, ‘‘স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যে-জন, তাহার হয়
না ভবের বন্ধন মোচন । …..স্ত্রী চিন্ময়ী মা।’’—এই শিক্ষার ধারাকে
বাস্তবায়িত করার নাম প্রকৃত দুর্গাপূজা ।


        শ্রীশ্রীঠাকুর শুধু পুরুষদেরই প্রতিনিয়ত দুর্গাপূজা করার বিধান দিয়েই
ক্ষান্ত হননি,   নারী-সাধারণের মধ্যেও দেবী দুর্গার এক স্থায়ী আসন পেতে
দিতে অনুশ্রুতি গ্রন্থের ১ম খণ্ডের বাণীতে বললেন—


‘‘শার্দ্দুলেরে বাহন করে
সাপের ফণার মালা পরে
কালবোশেখী ঝঞ্ঝাবেগে
ছোটরে নারী ছোটরে ছোট্ ।
দত্যিদানার নীচ বাহানা
আর্য্যাবর্তে দিয়ে হানা
ঘূর্ণিপাকের বেতাল গাঁথায়
হুলিয়ে ভুলিয়ে দিচ্ছে চোট্ ।
দশ প্রহরণ দশ হাতে ধর
বক্ষবিদরি ধ্বংসি ইতর
সূর্য্যরাগী বজ্রতেজে
আর্য্যনারী শত্রু টোট্ ।” (পুরুষ ও নারী/৮৩)


        তিনি নারীকে অবলা নয়, সবলারূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন । নারীর সতীত্বই
নারীকে সবলা করে তোলে। তাই তিনি কত আশা নিয়ে বললেন—
‘‘সতীর তেজে ঝলসে দে মা
        নিঠুর কঠোর অন্ধকারে
মদনভস্ম বহ্নিরাগে
        বৃত্তি-রিপু দে ছারখারে ।
প্রণবতালে ইষ্টমন্ত্র
        ঝঙ্কারি তোল সকলতন্ত্রে
বিষাণ হাঁকে রুদ্র দোলায়
        বজ্রে হানি মৃত্যুদ্বারে।’’ (পুরুষ ও নারী/৮৯)

        তাই আসুন, পূজার নামে অনিত্য-বস্তুর প্রতিযোগিতায় না মেতে, সব দেবতার
সমাহার-স্বরূপ যুগ-পুরুষোত্তমের বিধি মেনে, মা দুর্গার নিত্য-সিদ্ধ
দেদীপ্যমান আদর্শের আলোকে, আমাদের ঘরের মেয়েরা যাতে রাষ্ট্রপূজার
অর্ঘ্যস্বরূপ সুজননে সুসন্তানের উপহার সাজিয়ে,
শক্তিরূপিণী-দশপ্রহরণধারিণী সাজে সজ্জিত হয়ে নরাসুরদের কিভাবে দমন করে
অস্তিত্ব রক্ষার পূজার পূজারী হতে পারে,—সেই চেষ্টায় যত্নবান হই।


অসুরনাশিনী মা দুর্গার ন্যায় অসৎ-নিরোধী তৎপর হয়ে ওঠা যদি আমাদের কাম্য হয়,  তাহলে সবার আগে ইষ্টপ্রাণতায় সমৃদ্ধ হতে হবে।   তাহলে সব পূজার আগে আমাদের ইষ্টপূজায় সমৃদ্ধ হতে হবে। ইষ্টপূজায় সমৃদ্ধ হতে গেলে যা’ যা’ করতে হবে, বরং তা’ তা’ শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণী থেকে  জেনে নেওয়া যাক।

।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের দৃষ্টিতে প্রকৃত ইষ্টপূজা ।।
        ইষ্টস্বার্থ ও প্রতিষ্ঠার অনুকূলে
                প্রবৃত্তি ও চাহিদাগুলিকে নিয়ন্ত্রিত ক’রে
        সৎ অর্থাৎ ইষ্টানুকূল জীবনবৃদ্ধিদ
                যা’-কিছু চিন্তাকে
        বাস্তবতায় পরিণত করবার প্রচেষ্টার সঙ্গে
                যথাযথ সেবা ও যাজনে
        পারিপার্শ্বিককে আকৃষ্ট ও উদ্বুদ্ধ ক’রে
                প্রতি প্রত্যেককে ইষ্টে অনুরক্ত ক’রে তোলাই হচ্ছে
                        প্রকৃত ইষ্টপূজা। ২৪ (পথের কড়ি)

                                             —————–

।। ইষ্টপূজার উপাচার ।।

সব দেবতার সমাহারে পুরুষোত্তমের সৃষ্টি।

সহজ মানুষ নর রূপে করেন ধৃতি বৃষ্টি।।

( অনুশ্রুতি প্রথম খন্ড )

আমাদের  এই আধুনিক সভ্যতার সদস্য জ্ঞানী-গুণী-বুদ্ধিজীবিগণ জগৎ সম্পর্কে অনেককিছু জানলেও, মানব জীবনের উদ্দেশ্য ও গন্তব্য বিষয়ে সুস্পষ্ট কোন ধারণা দিতে পারেন নি। এ-বিষয়ে যুগ-পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, “জীবনের উদ্দেশ্য অভাবকে একদম তাড়িয়ে দেওয়া ……” —অভাবকে তাড়াতে হলে ভাবীর সাথে ভাব করতে হবে। আর সেই ভাবী হলেন সর্বজ্ঞত্ত্ববীজের আধার, পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।  আর,  “আমাদের গন্তব্য হলো ঈশ্বরপ্রাপ্তি—ঈশ্বরকে আপ্ত করতে হলে, ধারণ-পালন-সম্বেগসিদ্ধ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হওয়া প্রয়োজন….. তার উপায় হচ্ছে আচার্য্যে সক্রিয় অনুরতি।” সেই আচার্য্যের নাম যুগ-পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।

তাই, জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে হলে, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানব-জীবনকে পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে হলে বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের দীক্ষা বা আদর্শ জীবনচলনার নিয়ম গ্রহণ করতেই হবে।

পুরুষোত্তমের দীক্ষা সবারই নিতে হয় কেন ?

শ্রীশ্রীঠাকুর—দীক্ষা সবারই নেওয়া প্রয়োজন এবং নানাজনের নানা জায়গায় দীক্ষা নেওয়া হয়তো আছে। হিন্দুদের কথা, মহাপুরুষ বা পুরুষোত্তম যখন আসেন, তখন তাঁকেই গ্রহণ করাই লাগে। তাঁকে গ্রহণ করলে সবগুলির পুরশ্চরণ হয়। আর,  তাঁকে কেন্দ্র ক’রেই সব দীক্ষার integration (সংহতি) আসে। কেউ হয়তো তান্ত্রিক দীক্ষা নিয়েছে, কেউ হয়তো শৈব মতে দীক্ষা নিয়েছে। সেগুলির অনুষ্ঠান ক’রে বা না ক’রে যদি মহাপুরুষ বা পুরুষোত্তম-নির্দেশিত পন্থায় সাধন করে, ওতেই তাদের দীক্ষা সার্থক হবে। সাধু নাগ মহাশয় তো আগে দীক্ষা নিয়েছিলেন। কিন্ত রামকৃষ্ণদেবকে পেয়ে তাঁর কাছ থেকে দীক্ষা নিতে দ্বিধা করেননি। তাতে ওই (আগের) দীক্ষারই পুরশ্চরণ হয়েছিল। এইভাবে পুরুষোত্তমকে গ্রহণের রীতি যদি না থাকে, বিভিন্ন দীক্ষাপদ্ধতি ও তাতে দীক্ষিত লোকগুলো বিচ্ছিন্ন হ’য়ে থাকে। লোকসংহতি বলে জিনিষটা আসে না। ভাবগুলি integrated (সংহত) হয় না। নানা মত ও পদ্ধতির solution (সমাধান) হয় না। বিভিন্ন রকমগুলির solution (সমাধান) না হ’য়ে যে-দীক্ষাতেই মানুষ দীক্ষিত হোক না কেন, তাতে পরম solution (সমাধান) অর্থাৎ meaningful adjustment (সার্থক বিন্যাস) হয় না, নানা সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়। তাদের কেউ কাউকে দেখতে পারে না, বিরোধ থেকেই যায়, consolidation (দৃঢ়ীকরণ) হয় না।

আমাদের হিন্দুদের মধ্যে ধারণা আছে “সর্ব্বদেবময়ো গুরু”। গুরুর মধ্যে সমস্ত দেবতাকে দেখতে চাই আমরা। অর্থাৎ, তিনি তেমনি সর্ব্বপরিপূরক হওয়া চাই বাস্তবে। তা’ না হ’লে ব্যষ্টি ও সমষ্টির সর্বাঙ্গীণ বিকাশ সম্ভব নয়। তাঁর কাছে দীক্ষা first and foremost (প্রথম ও প্রধান)। আর, যা কিছুকে সঙ্গতিশীল অন্বয়ী তাৎপর্য্যের ভিতর দিয়ে সত্তাপোষণী ক’রে তোলাই হ’ল তপস্যা। তাকেই বলে শিক্ষা। (আলোচনা প্রসঙ্গে, খণ্ড ২২/৪. ৯. ১৯৫৩)

       শ্রীশ্রীঠাকুরঃ সদ্‌গুরু বা পুরুষোত্তমকে পেয়েও যারা দীক্ষা না নেয় তারা কিন্তু ঠকে যায়। তিনি তো আর নিত্য আসেন না। পেয়েও ছেড়ে দেওয়া মানে মন, মায়া, কাল ও প্রবৃত্তির ঘানিতে আরো শত সহস্রবার ঘোরা। (আ. প্র. ৩/১৩৫)

যাঁরা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৎমন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছেন, তাঁরা অবশ্যই জানেন,— শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শ-নির্দিষ্ট দীক্ষাপদ্ধতিতে প্রথমে আচমন করে সংবেদনী পাঠ করতে হয়। তারপর আসন করে বসা শিখতে হয়। তারপর প্রণাম মন্ত্র পাঠান্তর  আজ্ঞাচক্রে ধ্যান করা  শিখতে হয়। যে ধ্যানকে ঊষানিশায় কমপক্ষে আধঘণ্টা থেকে ৪৫ মিনিট সাধন করতে হয়। ধ্যানান্তে পুনরায় প্রণাম মন্ত্র পাঠপূর্বক *স্বতঃ-অনুজ্ঞা পাঠ করিয়ে চরিত্রায়িত করার শিক্ষা দেওয়া হয়। যথা—

আমি অক্রোধী

আমি অমানী

আমি নিরলস

কাম-লোভজিৎ-বশী

আমি ইষ্টপ্ৰাণ

সেবাপটু

অস্তি-বৃদ্ধি-যাজন-জৈত্র

পরমানন্দ

উদ্দীপ্ত শক্তি-সংবৃদ্ধ

তোমারই সন্তান

প্রেমপুষ্ট, চির-চেতন,

অজর, অমর

আমায় গ্রহণ কর,

প্ৰণাম লও।

      * স্বতঃঅনুজ্ঞা (auto-suggestion) —নিজেই নিজেকে আদেশ করে অন্তস্থঃ চৈতন্যের জাগরণ ঘটানোর বা আত্মসমবর্দ্ধনার অনুশীলন যা প্রতিবার ধ্যানান্তে করতে হয়।

      তারপর শবাসন ধ্যান শিখিয়ে দিনে ৩-৪ বার অভ্যাস করতে বলা হয়। তারপর থানকুনি পাতা খাওয়ার উপদেশ দেওয়া হয়। তারপর সংকল্প পাঠ করতে হয়। তারপর দক্ষিণা বাক্য পাঠ করতে হয়। তারপর জপ ও সিদ্ধি বিষয়ে উপদেশ নিয়ে ধ্যানের পদ্ধতির উপদেশ নিতে হয়। সবশেষে ইষ্টভৃতির উপদেশ প্রদান করা হয়।

                                   * * *

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের আবশ্যিক পালনীয় প্রাথমিক বিষয়সমূহ—অভক্ষ্যভোজী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুনাদি তামসিক আহার করা যাবে না। যারা করেন, আর্য্য হিন্দুমতে তাদের অভক্ষ্যভোজী বলা হয়েছে। অগম্যাগামী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ যারা প্রতিলোম, সগোত্র এবং সপিণ্ড সম্বন্ধীয়দের সাথে অবিধি পূর্বক ধর্মবিরুদ্ধ বিবাহের মাধ্যমে কামাচার করে, হিন্দুমতে তাদের অগম্যাগামী বলা হয়েছে। এরা কদাচারী, এদের প্রদত্ত আহার ও পানীয় অশুদ্ধ। (দ্রঃ সম্বিতী)

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের শিষ্যদের প্রাথমিকভাবে আবশ্যিক পালনীয় বিধিসমূহ— ঊষানিশায় মন্ত্রসাধন করা। সকালে ও সন্ধ্যায় আহ্বানীসহ সন্ধ্যা ও প্রার্থনা করা। ইষ্টভৃতি (ইষ্টনীতির ভরণ) করা।  পরিশ্রান্ত হলে শ্রান্তি কাটাতে কমপক্ষে ৩ বার ৫-৭ মিনিট শবাসন নিত্য-সাধন করা। বর্ণধর্মানুযায়ী সদাচারী হতে হবে। বর্ণাশ্রম মেনে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে। আপদ্ধর্ম ব্যতীত অন্য বর্ণের বৃত্তিহরণ করা চলবে না। ‘পঞ্চবর্হিঃ’ এবং ‘সপ্তার্চ্চিঃ’-র বিধান মেনে চলতেই হবে, যদি আদর্শ মানুষ হতে হয়। ওইসব  বিধানসমূহকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার নাম দীক্ষা গ্রহণ করা।

যাঁরা এস. পি. আর., পি. আর. উপাধির বলে দীক্ষা সঞ্চারণা করেন, তাঁরা যজমানদের দিয়ে ‘‘এই দীক্ষা গ্রহণ করিয়া আমি সর্বান্তকরণে শপথ করিতেছি যে—মানুষের জীবন ও বৃদ্ধির পরম উদ্ধাতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রকে প্রতিষ্ঠা করাই এইক্ষণ হইতেই আমার জীবনের যজ্ঞ হউক। ……’’ ইত্যাদি উচ্চারণ করিয়ে সংকল্প-শপথ গ্রহণ করান। এবং দীক্ষাপত্রের ২টি স্তবকে স্বাক্ষর করিয়ে নেন। এর উদ্দেশ্য যজমান যা’তে শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ মেনে চলেন তারজন্য একেবারে পাকাপোক্ত ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থাপত্র স্বয়ং শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত। দীক্ষাদাতার কর্তব্য, দীক্ষা গ্রহিতাকে শ্রীশ্রীঠাকুরের উপরোক্ত আদর্শের বিষয়ে সম্যকভাবে অবগত করিয়ে দীক্ষা দান করা। তা’ না করিয়ে দীক্ষাদাতা যদি তড়িঘড়ি করে যেনতেন প্রকারেণ মন্ত্র দিয়ে, সই-সাবুদ করিয়ে নেয়, তাহলেই মুশকিল। কপটাচার এবং দ্বন্দ্বীবৃত্তি দোষে দুষ্ট হতে হবে। অনেকক্ষেত্রে সেই প্রবহমানতা চলছে। যারফলে বেশিরভাগ দীক্ষিতগণ মনে করেন, সকালবেলা উঠে ঠাকুরের নামে কিছু টাকা-পয়সা নিবেদন করে, শুক্রবার নিরামিষ খেলেই শ্রীশ্রীঠাকুরের শিষ্য হওয়া যায়। অথচ, সত্যানুসরণ গ্রন্থের প্রথমেই তিনি এ বিষয়ে সাবধান বাণী দিয়ে রেখেছেন। “অর্থ, মান, যশ ইত্যাদি পাওয়ার আশায় আমাকে ঠাকুর সাজিয়ে ভক্ত হ’য়ো না, সাবধান হও—ঠকবে ; তোমার ঠাকুরত্ব না জাগলে কেহ তোমার কেন্দ্রও নয়, ঠাকুরও নয়–ফাঁকি দিলেই পেতে হবে তা’।” অর্থাৎ, আমার মধ্যে যদি তাঁর আদর্শের প্রকাশ না পায়, আচার-আচরণের মধ্যে ঠাকুরত্বকে না জাগাতে পারি, তাহলে তিনি আমার ঠাকুর নন, তিনি আমার কেন্দ্রও নন। সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছেন। সেই হিসেবে বিচার করে দেখলে দেখা যাবে, তাঁর আদর্শ মেনে চলেন যাঁরা, যজনসিদ্ধ যাঁরা, একমাত্র তাঁদেরই অধিকার রয়েছে, যাজন করার, প্রচার করার। অথচ, আমরা এসব মূল বিষয়টিকে অনেক সময় উপেক্ষা করে, নিত্য সাধন-পদ্ধতির  নামধ্যান, শবাসন, সদাচার, বর্ণাশ্রম, ঠাকুরের বলা অনুযায়ী পরিচ্ছদ, ইত্যাদিতে ছাড় দি‌য়ে, নিয়মের শিথিল করে অধিবেশন করে চলেছি, পূজা করে চলেছি। এ বিষয়ে সকলকে সচেতন হতে হবে, নচেৎ দ্বন্দ্বীবৃত্তি দোষে দুষ্ট হতে হবে।

পবিত্র সদদীক্ষা সঞ্চারণা-কালে  ইষ্ট প্রতিষ্ঠার সপক্ষে যে শপথবাক্য পাঠ করানো হয়, সেই  শপথের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের   আদর্শ  প্রতিষ্ঠা বা  ইষ্ট-প্রতিষ্ঠাই দীক্ষিত-জীবনের একমাত্র *যজ্ঞ। যজ্ঞ শব্দের অর্থ লোকসম্বর্দ্ধনী অনুচর্য্যা—ব্যক্তি, দম্পতি, গৃহ, সমাজ ও রাষ্ট্রের লোকসম্বর্দ্ধনী অনুচর্য্যা।  ওই ইষ্টপ্রতিষ্ঠা নামক যজ্ঞের বা লোকসম্বর্দ্ধনী অনুচর্য্যার  প্রাথমিক ধাপ,  ব্যক্তিগত জীবনে ইষ্টনীতির পরিপালন  করে  নিজের চলন-বলন, খাওয়া-দাওয়া, জৈবিক তাগিদের কাজকর্মগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা। যাকে আমরা  যজন বলতে পারি।

——————————————————————————————

*শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র যজ্ঞ প্রসঙ্গে বলেছেন—  

যজ্ঞ মানে বুঝলি কি তুই?

      আদরে-সেবায়-যত্নে পালা

আর্য্য ছেলের নিত্য নীতি—

      পঞ্চযজ্ঞে জীবন ঢালা,

ব্রহ্মযজ্ঞ, দেবযজ্ঞ

      নৃযজ্ঞ আর পিতৃযজ্ঞ,

ভূতযজ্ঞে পরিস্থিতির

      সেবাবর্দ্ধন করে প্রজ্ঞ। ৭০ ।

(অনুশ্রুতি, ১ম খণ্ড/সাধনা)

      এবং আলোচনা প্রসঙ্গে বিস্তারিতভাবে বললেন—

      শ্রীশ্রীঠাকুর— প্রথম হ’লো ঋষিযজ্ঞ বা ব্রহ্মযজ্ঞ। ঋষিরাই হলেন জ্ঞানবিজ্ঞানের উৎস। তাঁরা যে জ্ঞান দিয়ে গেছেন, তা’ আয়ত্ত করতে হবে এবং অন্যকেও তা’ আয়ত্ত করাতে হবে। একে বলে অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা। আর, জীয়ন্ত ঋষি যিনি, সঙ্গ ও সেবায় তাঁকে তুষ্ট-পুষ্ট ক’রে জ্ঞান আহরণ করতে হবে। এ সবই ঋষিযজ্ঞের মধ্যে পড়ে। তোমরা যে যজন-যাজন কর তা’ও প্রকারান্তরে ব্রহ্মযজ্ঞ। ব্রহ্মযজ্ঞ মানে, যার ভিতর-দিয়ে মানুষ বৃদ্ধি পায়। জ্ঞানের অনুশীলনের ভিতর-দিয়েই মানুষ বৃদ্ধি পায়। যে লোক সংসারে ঢুকে কেবল উদর-চিন্তা নিয়ে থাকে, জ্ঞান-আহরণের চেষ্টা করে না, তার উন্নতি খতম হ’য়ে যায়।

      তারপর দেবযজ্ঞ। দেবতা মানে, যাঁরা নিজেদের চরিত্র, গুণপনা, ঐশীবিকাশ ও ভাবৈশ্বর্য্যের ভিতর-দিয়ে লোকসমক্ষে দেদীপ্যমান হ’য়ে আছেন। দেবযজ্ঞ মানে, ঐ দেবতাদের অনুধ্যান ক’রে তাঁদের ভাব নিজের ভিতর সম্বর্দ্ধিত ক’রে তোলা এবং বাস্তব উৎসর্গে তাঁদেরও পরিতুষ্ট করা। শাস্ত্রে আছে, “সর্ব্বদেবময়ো গুরুঃ”—অর্থাৎ সদগুরুর মধ্যে সমস্ত দেবতারই অধিষ্ঠান আছে। তাই ইষ্টচিন্তা, ইষ্টের ইচ্ছানুযায়ী নিজেকে নিয়ন্ত্রিত করা, ইষ্টকে বাস্তব নিবেদন ইত্যাদি দেবযজ্ঞের মধ্যে পড়ে।

       আবার আছে পিতৃযজ্ঞ। পিতৃপুরুষের দৌলতেই আমরা দুনিয়ার মুখ দেখি ও দুনিয়ায় ক’রে খাই। তাঁদের দয়া ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। তাঁদের দেওয়া রক্ত ও গুণপনার জোরেই আমরা চলি। তাই তাঁদের তৃপ্তি যা’তে হয়, তা’ আমাদের অবশ্যকরণীয়। পিতামাতা বেঁচে থাকলে জীবন্ত গৃহদেবতা বোধে নিত্য তাঁদের সর্ব্বপ্রকারে সেবা করা উচিত। নয়তো নিত্য তর্পণ করার বিধি আছে। এতে পিতৃপুরুষের স্মরণ-মননের ভিতর-দিয়ে তাঁদের গুণগুলি আমাদের ভিতর সঞ্জীবিত থাকে। একটা আত্মপ্রসাদও লাভ করা যায়।………….

………….আর আছে নৃযজ্ঞ ও ভূতযজ্ঞ। অতিথি-সৎকার ও দুঃস্থ পরিবেশের বাস্তব সেবা-সাহায্যকে বলা যায় নৃযজ্ঞ। পরিবেশকে বাদ দিয়ে আমরা বাঁচতে পারি না, তাই তাদের সর্ব্বপ্রকার সেবা আমাদের করতে হবে। গৃহীর কর্তব্য হ’লো আগে অতিথিকে খাইয়ে তারপর সে খাবে। অতিথিকে নারায়নজ্ঞানে সেবা করার রীতি আছে আমাদের দেশে। কথা হ’চ্ছে, আমার দ্বারস্থ হ’য়ে কেউ যেন অভুক্ত না থাকে, বিমুখ না হয়, আমি ঘর বেঁধেছি সবার সেবার জন্য। ভূতযজ্ঞ বলতে ইতর জীবজন্তু থেকে আরম্ভ ক’রে গাছপালার পর্য্যন্ত সেবা করা বুঝায়। একটা গরুকে দেখছ জল না খেয়ে কষ্ট পাচ্ছে, তুমি কলের থেকে এক বালতি জল তুলে তাকে খেতে দিলে, সেটাও ভূতযজ্ঞের মধ্যে পড়বে। সাধারণতঃ নিজ আহার্য্যের অগ্রভাগ সশ্রদ্ধভাবে তাদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করার রীতি আছে। আদত কথা হ’লো, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবার সঙ্গে নিজের যোগসূত্রটা বোধ করতে অভ্যস্ত হওয়া। এগুলি যদি ভাবায় থাকে, করায় না থাকে, তাহ’লে হবে না। (আলোচনা-প্রসঙ্গে, ৩য় খণ্ড, ইং ৮-৬-১৯৪২)

       উপরোক্ত আর্য্যকৃষ্টির মহান বিধানসমূহকে ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের আদর্শের মাধ্যমে নবীকরণ করে পঞ্চ-মহাযজ্ঞের যুগপোযোগী বাস্তবায়ন করলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত ইষ্টভৃতি নিবেদন-মন্ত্র ‘‘ইষ্টভৃতির্ম্ময়াদেব কৃতাপ্রীত্যৈ তব প্রভো, ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ।।’’—উচ্চারণ করার সাথে সাথে বৃহত্তর পারিপার্শ্বিকের জীবনবৃদ্ধির দায়ভারের শপথ নিতে হয় আমাদের। সব অবস্থাতে বাস্তব কর্মে বৃহত্তর পরিবেশের জৈব এবং অজৈব সবকিছুকে পালন-পোষণে সমৃদ্ধ করে রাখার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সার্থক হয় ইষ্টভৃতি পালন। ইষ্টাদর্শের পঞ্চবর্হিঃ ও সপ্তার্চ্চি-র বিধি মেনে শারিরীক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক সদাচার পালনে, ইষ্টপ্রোক্ত বিধি অনুসরণ করে বিবাহ ও সুপ্রজনন নীতি পালনে অভ্যস্ত না হতে পারলে—‘আমি ইষ্টভৃতি করি’ এই কথা বলা বোধহয় সমীচীন হবে না। ইষ্টভৃতি করা মানে, বাস্তবে ইষ্টনীতি মেনে চলা, ইষ্টনীতির ভরণ করা।

                                      * * *

শ্রীশ্রীঠাকুরের নিদেশ অনুযায়ী, সৎমন্ত্রে দীক্ষিতদের ব্যক্তিগত জীবনে যজনশীল থাকার  জন্য ঊষা-নিশায় নিয়মিত কমপক্ষে ৪৫ মিনিট করে মন্ত্রসাধন করতে হয়। ৫ থেকে ৭  মিনিট করে কমপক্ষে তিনবার শবধ্যান করতে হয়। প্রাতঃকালিন ধ্যান, ইষ্টভৃতি, আর্য্যসন্ধ্যা ও প্রার্থনাদির অনুশাসন অনুশীলন করার পর পরিবারের বড়দের প্রণাম এবং ছোটদের প্রীতি-সম্ভাষন করতে হয়। তারপর  ইক্ষুগুড়সহ থানকুনি পাতা সেবন করতে হয়।

শ্রীশ্রীঠাকুরের বলা অনুযায়ী তিথি, ঋতু, সুস্থতা, অসুস্থতা, ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের জন্য নিদেশিত আহারবিধি মেনে সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার গ্রহণ করতে হয়। এতদ্ব্যতীত প্রার্থনা মন্ত্রে প্রদত্ত পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চির অনুশাসন মেনে সদাচার এবং বর্ণাশ্রম ধর্ম পালন করা আমাদের জীবনবৃদ্ধির জন্য  নিত্য করণীয় কর্ম।  এইসব ইষ্টবিধির নিত্য নিয়মিত অনুশীলন করার মাধ্যমে যজনশীল হতে হয়। যজনশীলতার মুখ্য বিষয়, বর্ণধর্ম পালন, দ্বন্দ্বীবৃত্তি ও প্রতিলোম আচরণ ত্যাগ করা। সবর্ণ অনুলোম বিবাহের নীতি পালন করা। কারো  বৃত্তিহরণ না করে, সেবা-কর্ম মাধ্যমে অর্জিত দিন গুজরানি আয়ের অগ্রভাগ ইষ্টের উদ্দেশ্যে নিবেদন করার শপথ পালনের নাম ইষ্টভৃতি বা ইষ্টনীতির ভরণ করা। জীবনকে সম্বর্দ্ধিত করার জন্য এর অতিরিক্ত আর কোন প্রচলিত পূজার প্রয়োজন থাকতে পারে কি?   

                                             * * *

শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের জন্য দৈনন্দিন জীবনে সহজ সাধনার একটা অনুশীলন করতে নিদেশ দিলেন অনুশ্রুতি গ্রন্থের নিম্নোক্ত বাণী মাধ্যমে।  

‘‘ঊষার রাগে উঠবি জেগে

      শৌচে শীতল হ’বি,

সন্ধ্যা–আহ্নিক জপ-সাধনায়

      ঈশের আশিস্ ল’বি;

কুতূহলে পড়শি ঘুরে

      দেখবি সযতনে,

আছে কেমন কোথায় কে জন

      মন দিবি রক্ষণে;

তারপরেতে বাড়ী এসে

      শৌচে যথাযথ,

গৃহস্হালীর উন্নয়নী

      অর্জ্জনে হ’ রত;

স্নানটি সেরে আহ্নিক ক’রে

      ক্ষুধামতন খাবি,

একটু চ’লে বিশ্রাম নিয়ে

     আগুয়ানে ধাবি;

এমনি তালে সচল চালে

      চলে সন্ধ্যা এলে,

শৌচে শুদ্ধ হ’য়ে করিস

      আহ্নিক হৃদয় ঢেলে;

উন্নয়নের আমন্ত্রণী

      গল্প-গুজব শীলে,

হৃষ্টমনে আলোচনায়

      কাটাস্ সবাই মিলে;

পড়শীদিগের অভাব-নালিশ

      থাকেই যদি কিছু,

তা’র সমাধান যেমন পারিস্

      করিস্ লেগে পিছু;

করন-চলন ধরন-ধারণ

      যজন-যাজন কিবা

সকল কাজেই ইষ্টস্বার্থে

      চলিস্ রাত্রি-দিবা;

আদর-সোহাগ উদ্দীপনী

      কথায় কাজে ঝুঁকে,

স্বার্থ-কেন্দ্র সবার হ’বি

      ধরবি ইষ্টমুখে;

বিশ্রামেরই সময় গা’টি

      ঘুমল হ’য়ে এলে,

ইষ্ট-চলন মনন নিয়ে

      ঘুমে গা’ দিস্ ঢেলে।’’

(অনুশ্রুতি/১ম/স্বাস্থ্য ও সদাচার/৬৯)

জীবনকে সম্বর্দ্ধিত করার জন্য এর অতিরিক্ত আর কোন প্রচলিত পূজার প্রয়োজন থাকতে পারে কি?   

* * *

“Be concentric.”

আমাদের আদর্শপুরুষ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র  একজন বিদেশী ভক্তকে জীবনচলনার সহজসাধন পদ্ধতি বোঝাতে Be concentric’ বলে উপদেশ দিয়েছিলেন।  আমার তো মনে হয় ওই উপদেশ আমাদের সকলের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। আর সুকেন্দ্রিক তৎপর থাকতে হলে সাধনভজনের মাধ্যমে ইষ্টাদর্শের সাথে অবিচ্ছিন্নভাবে যোগযুক্ত থাকতে হবে। বিশাল কঠিন ব্যাপার! যাইহোক, এ প্রসঙ্গে বিস্তারিতভাবে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন। 

শ্রীশ্রীঠাকুর—‘‘মানুষ যদি কোন-কিছু অবলম্বন না ক’রে একাগ্র হ’তে চেষ্টা করে, complex (প্রবৃত্তি)-গুলি dormant, dull ও indolent (সুপ্ত, ভোঁতা ও অলস) হ’য়ে যায়। কিন্তু মানুষ যদি সুকেন্দ্রিক হয়, তাতে সেগুলি roused, active ও meaningful (জাগ্রত, সক্রিয় ও সার্থক) হয়, individuality grow করে (ব্যক্তিত্ব গজায়)। আমাদের শরীরে যতগুলি cell (কোষ) আছে, সেগুলি concentric (সুকেন্দ্রিক) না হ’লে ছিটিয়ে যেত, impuls (সাড়া) carry (বহন) ক’রতে পারত না, বিচ্ছিন্ন হ’য়ে থাকত। concentric (সুকেন্দ্রিক) হওয়াই হ’লো উন্নতিলাভের পরম পথ। …… Earth (পৃথিবী)-টা যদি sun- এ (সূর্য্যে) concentric (সুকেন্দ্রিক) না হ’তো তাহ’লে তা ভেঙে গুঁড়ো-গুঁড়ো হ’য়ে যেত। গ্রহগুলি যদি কোথাও নিবদ্ধ না থাকতো, তবে অস্তিত্ব বজায় রেখে চলতে পারত না। আমাদের প্রত্যেকের ভিতরেই একটা যোগাবেগ আছে। ভালবাসা ও টান জিনিসটা দেওয়াই আছে। বীজ ও ডিম্বকোষের মধ্যে টান না থাকলে conception  (গর্ভসঞ্চার) হয় না, ব্যক্তিই বেরোয় না। ঐ টানকে রক্ষা করার জন্য সুকেন্দ্রিক হওয়া লাগে। সেজন্য বামুন, ক্ষত্রিয়, বৈশ্যের ছোট বয়সেই দীক্ষা নিতে হ’তো। দীক্ষা এসেছে দক্ষ কথা হ’তে। দীক্ষা মানে তাই যা’ আমাদের দক্ষ ক’রে তোলে। ….. ধর্ম ও বিজ্ঞান পরস্পর জড়িত। ধর্মে যদি বিজ্ঞান না থাকে, তবে তা’ অন্ধ। আবার বিজ্ঞানে যদি ধর্ম না থাকে, তবে তা খোঁড়া।’’ (আলোচনা প্রসঙ্গে ১৪ই অগ্রহায়ণ, ১৩৬০, সোমবার।)

ওই সুকেন্দ্রিক থাকার জন্য তিনি আমাদের নাম, ধ্যান, ভজন, সদাচার, লীলাস্মরণ ইত্যাদি বিধির মাধ্যমে এক সহজ সাধন পদ্ধতি দিয়েছেন।

অমিয়বাণী গ্রন্থের প্রণেতা বরেণ্য শ্রীযুক্ত অশ্বিনী কুমার বিশ্বাস মহোদয়  পরমদয়ালের কাছে প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছিলেন—নানারকম সাধনপদ্ধতি জগতে আছে, কি-রকম সাধনকে পূর্ণাঙ্গ সাধন বলা যেতে পারে।

শ্রীশ্রীঠাকুর—শব্দ-সাধন যাঁরা জানেন না, তাঁদের সাধন পূর্ণাঙ্গ সাধন নয়।

আমি (অশ্বিনী বিশ্বাস)—ঠিক বুঝলাম না। এমন সাধক আছেন যাঁরা জ্যোতির সাধন করেন, কিন্তু শব্দ-সাধন বা নাদ-সাধনের বিষয়ও জ্ঞাত আছেন। শ্রীরামকৃষ্ণপন্থীরা কি সাধন করেন জানি না, তবে নাদ-সাধন-সম্বন্ধে শ্রীরামকৃষ্ণ স্বয়ং বলেছেন, “নাদ-ভেদ না হলে সমাধি হয় না।” বিবেকানন্দও অনাহত নাদের অনুভূতির কথা বলেছেন।

শ্রীশ্রীঠাকুর—জ্যোতিঃ নাদের বা শব্দের শরীর। জ্যোতির চেয়েও নাদ সূক্ষ্মতর। যারা নাদ-সাধনের যে পরিমাণ জানে, তাদের সাধন-পদ্ধতি সেই পরিমাণে উন্নত বলা যায়। নাদ-সাধনের প্রকৃষ্ট পন্থাযুক্ত সাধনই প্রকৃত পূর্ণাঙ্গ সাধন। এই সাধনে সব সাধনের সারভাগ গৃহীত, কিন্তু বহিরঙ্গ-ভাব বর্ত্তমান যুগে অনাবশ্যক ব’লে বাহ্যভাবগুলো অনেকাংশে পরিত্যক্ত। বর্ত্তমানে ঐ সব বহিরঙ্গ ভাবসাধনে অযথা কালক্ষেপের আবশ্যকও নেই, অবসরও নেই। বাহ্যাড়ম্বর কম ব’লে পূর্ণ সত্যটিকে যত সোজাসুজিভাবে নেওয়া সম্ভব, তা’ এই শব্দযোগে নেওয়া হয়েছে। ইহাই বর্ত্তমানের যুগধর্ম্ম বা পূর্ণাঙ্গ সাধন।  (সূত্র : অমিয়-বাণী, শ্রীঅশ্বিনী কুমার বিশ্বাস।)

।। পূর্ণাঙ্গ সাধন করা প্রসঙ্গে  শ্রীশ্রীঠাকুরের নিদেশ ।।

“ভোরে সন্ধ্যার mood আসে, তখন সন্ধ্যা করতে হয়—সে একটা জাগরণের ভাব। আবার সূর্য যখন ডোবে, তখনও সন্ধ্যার mood আসে, তখনও সন্ধ্যা করতে হয়। দুপুরের সময়ও, বিশেষতঃ গরমের সময় সন্ধ্যার mood আসে। তখনও সন্ধ্যার সময়। দিনের সব কাজ এমনভাবে করা লাগে—যাতে সন্ধ্যায় যেই সূর্য ডুবছে, তখন আপনিই তার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত কাজ যেন নিভে আসে, আর তখন সন্ধ্যায় বসতে হয়। সন্ধ্যা করে তারপর সৎসঙ্গে যেতে হয়। এ করলে আর কিছু হোক আর না হোক, অন্ততঃ শরীরের স্বাস্থ্য আর কিছুতেই খারাপ হতে পারে না— আজীবন।” (ঋত্বিগাচার্য্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যের দিনপঞ্জী, ১ম খণ্ড থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী।)

।। পুণ্যপুঁথি গ্রন্থ থেকে নামধ্যান সাধনার সহজ  পদ্ধতি প্রসঙ্গে  শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী ।।

ধ্যান করবি সকল সময়। চলতে বসতে খেতে শুতে সকল সময়। একটু অভ্যাস করলেই হয়, বেশী কঠিন কিছু নয়। আর মনে অনবরত নাম, এমনকি কথা বলতে পর্য্যন্ত মনের মধ্যে নাম হচ্ছে, এই রকম করতে করতে স্বারূপ্য লাভ হয়। ৯। ২৪

      দ্যাখ, নিঝুম হ’য়ে নাম কর, ডুবে নাম কর, বেশ তালে তালে নাম কর আর মনের চোখটি ঠিক জায়গায় রাখ।  নীলদাঁড়া সোজা ক’রে হাত দুটি ঘুরিয়ে মাজার উপর রাখ। কাজের সময় কাকেও কাছে রাখবি নে, একা। এমন ক’রে বসবি, যাতে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ না ঝুলে পড়ে, না গ’লে পড়ে। একটা ঘুমের অবস্থা আসবে, সেটা করিস নে। অন্য রকম স্মৃতি কিছু আসতে দিস না, আসলেও তাড়িয়ে দিবি। তিন বেলা প্রত্যেকবার এক ঘন্টা থেকে দেড়ঘন্টা। ৩৫। ৭

কর্ম না করলে ধ্যান হয় না। আসলে ধ্যানে অধিকারী হয় না। যে যত কর্মী সে তত ধ্যানী।  ঘুম বেশী করতে নেই। ঘুম বেশীতে লয় এনে দেয়। মাঝামাঝি থাকবি। ৪৫। ৫

       দ্যাখ, যেমন তেমন করে নাম কর্তে পাল্লেই আয়ু বৃদ্ধি হয়। নামের সঙ্গে সঙ্গে আয়ু বল  সব বেড়ে পড়ে। নামে মুক্তি।

অনবরত নাম করবি আর চলতে ফিরতে সব সময় নাসামুলে দৃষ্টি রাখবি। দ্যাখ, যে আপন গুরুকে ঐ জায়গায় জাগিয়ে নিতে পারে, তার সব হবে ২০। ২৪

তাঁকে ধ্যান করবি চব্বিশ ঘণ্টা। সব দেখবি—সব সেই। তা’কেই কয় সন্ধ্যারে বন্ধ্যা করা। ৩। ১৯

ঐ নামটি ও ধ্যানটি যদি চব্বিশ ঘণ্টা করতে পারিস,—এমন-কি অন্যের সাথে কথা কইতেও ধ্যানটি হওয়া দরকার। সন্ধ্যায় শব্দ শোনা যায়। সন্ধ্যাটা দিন যায় রাত আসে—ভোরেও। তাই দুই সময়ই প্রকৃত কাজের সময়। দুই সময়ই ভাল। ২৬। ৬১ (সূত্র : ভাববাণী পুণ্য-পুঁথি মহাগ্রন্থ।)

।। নিত্যসাধনার জন্য তপোবিধায়না গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী ।।

*”প্রার্থনা বা তপঃ-উপাসনার পক্ষে

ঊষা বা ব্রাহ্মমুহূর্ত্ত,

মধ্যাহ্ন ও সায়ংকাল—

এই তিনই শ্রেষ্ঠ,

তা’র ভিতর আবার

ব্রাহ্মমুহূর্ত্তই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ;

মানসিক জপ সর্ব্বকালেই শ্রেয়;

আবার, প্রসন্ন, নির্দ্বন্দ্ব,

হৃদ্য-প্রীতি-প্রবুদ্ধ-যাজন

যা’ চিন্তন ও কথনের ভিতর-দিয়ে

উভয়কেই উদ্যোগী-উৎফুল্ল ক’রে তোলে,—

তা’ কিন্তু সর্ব্বকালেই শ্রেষ্ঠ‌।” ৯৩।

——————————————————————

     *উপরোক্ত অনুশাসনসমূহ অনুশীলন করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে পূজা। পূজা শব্দের অর্থ—সম্মাননা, সংবর্দ্ধনা, গুরুত্ব আরোপ করা। যাঁকে পূজা করছি, তাঁকে আমার ভিতরে সম্বর্দ্ধিত করে তোলাই প্রকৃত পূজা, অর্থাৎ তাঁর গুণাবলী আমার মধ্যে বাড়িয়ে তোলা।

      “পূজার উপকরণ ও অর্ঘ্য হলো যোগ্যতা। যোগ্যতার পূজা-অর্ঘ্যে পরিবার, পরিবেশ-সহ বেঁচে থাক।” (সূত্রঃ শব্দরত্নকোষ/সৎসঙ্গ পাব্লিশিং)

।। মন্ত্রসাধন প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী ।।

১৯২৩ সালের মে মাস। কথাপ্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলিতেছেন—

“নামের উপর খুব stress দিতে হয়। তাহলে intellect at will কোথাও apply করা যায় আবার ছাড়াও যায় সহজে। আমি কখনও কিছু ছাড়িনি, ছাড়ার কথা কখনও আমার মনেই হয় নি। যখন যেটাতে মন লাগত তখন সেটাই করতাম। অন্য কাজে মন লাগলে করতাম। আর আমি কখনো বসে আসন করে নাম করিনি, দৌড়িয়ে বেড়াতুম, কখন হয়ত বসে পড়তাম, কিন্তু বুদ্ধি করে নয়। তাই বলে আপনারা যেন মনে না করেন বসার দরকার নেই। Regularly বসা (at least সকাল ও সন্ধ্যায়) খুবই দরকার। সকালে ও সন্ধ্যায় চাদরে শরীর ঢেকে (বাহিরের influence না আসার জন্য) দুবার অন্ততঃ বসা উচিত। তা ছাড়া ২ মিনিট ১০ মিনিট যখনই পারা যায় বসা দরকার। কিন্তু সকাল সন্ধ্যায় যেন আজীবন বসা থাকে। পথে ঘাটেও একখানা বড় রুমাল বা চাদর সঙ্গে রাখা ভাল। যখন সময় হবে তখনই বসা দরকার, মুসলমানদের নমাজ পড়ার মত। নতুন বিয়ের পর বৌয়ের কথা যেমন সর্বদা মনে থাকে, কত রাত্রি জাগরণে কেটে যায় কিন্তু কয়েক বৎসরের মধ্যেই এ-পাশ ফিরে ও-পাশ ফিরে শুয়ে থাকে, তেমন পুরাতন হতে দিতে নেই। আমার কাছে ত নাম কখন পুরাতন হয়নি—সব সময়েই নতুন মনে হয় ।

Succession of events যেখানে বেশী সেখানে সময় যেন তাড়াতাড়ি চলে, যেমন সুখের সময় তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়। আবার succession যেখানে কম, সেখানে সময় যেন ফুরোতে চায় না। ধ্যানের সময় প্রথম প্রথম মনে হয় এক ঘণ্টা হয়ে গেছে। উঠে ঘড়ি খুলে দেখা গেল মোট ১০ মিনিট হয়েছে। আবার attachment হলে ধ্যানে এক ঘণ্টা হয়ে গেলে, মনে হয় যেন মাত্র ১০ মিনিট হ’ল। তাহলে time এর perception শুধু succession of events এর ওপর নির্ভর করে না, আমাদের মনের attachment বা concentration এর উপর নির্ভর করে, অর্থাৎ মন যদি একটা idea তে attached হয় এবং তাতে যদি তার full concentration থাকে সেখানে মুহূর্তকালই অনন্তকালে পর্যবসিত হতে পারে। আর concentration না থাকলে মুহূর্তকাল অনেক সময় বলে বোধ হয়। unattached এর পক্ষে ধ্যানের সময় যেন কাটেই না। Attachment একে থাকলে beyond time যাওয়া যায়, attachment বহুতে হলেই time এর মধ্যে এসে পড়ে। ছেলেদের time খুব তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়, activity খুব বেশি, কারণ succession of ideas খুব বেশি। যত বড় হয় তত যেন মনের ভিতর ফাঁক বেড়ে যেতে থাকে।”  (ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনী গ্রন্থের ২য় খণ্ড, পৃঃ ৩৫-৩৬)

     ।।  আমাদের আচার্য্য  শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আচরণদ্বারা যে সাধনভজন করতেন ।।

সব কাজের মধ্য দিয়ে সর্ব্বদা নাম চালাবার বুদ্ধি ছিল আমার। তাছাড়া যখনই ফাঁক পেতাম, নামধ্যান ও ভজন করতাম। কোন সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই হয়তো ধ্যানে ডুবে যেতাম। আর ঊষা-নিশায় তো করতামই। ধূঁ-ধূঁ হয়ে যেতাম। নাম করতে করতে চলেছি, হয়ত বেতবনের মধ্যে ঢুকে গেলাম। নাক বরাবর যেতে যেতে হয়তো পটলক্ষেতেই উপস্থিত হলাম। বাইরের দিকে খেয়ালই থাকত না। নামের নেশা পেয়ে বসে থাকত। (আ. প্র. ১৬/ ৫. ৪. ১৯৪৯)

।। নামধ্যানের তত্ত্ব প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী ।।

শ্রীশ্রীঠাকুর– নামই হ’ল বিশ্বচরাচরের প্রতিটি সত্তার মূল ভিত্তি। তাই, নামকে জানলে আত্মতত্ত্ব জানা যায়। নামকে জানতে গেলে নামীর শরণাপন্ন হ’তে হয়। নামী মানে যিনি নামস্বরূপ অর্থাৎ নামের মূর্ত্ত বিগ্ৰহ। তিনি হ’লেন দয়ীপুরুষ। জীবের প্রতি করুণাবশে তিনি মানুষ হ’য়ে আসেন, যাতে মানুষ তাঁকে ধ’রে দয়ালদেশে পৌঁছাতে পারে। নামে প্রেরণা জোগায় আর ধ্যান মানুষকে ধ্যেয়ের ভাবে ভাবিত ক’রে তঁদভিমুখী ও তঁৎচলনপরায়ণ ক’রে তোলে। যারতার ধ্যান করতে নেই, কারণ তাতে ধ্যেয়ের মধ্যে যদি কোন imperfection (অপূর্ণতা) বা unsolved knot (অসমাহিত গ্ৰন্থি) থাকে, তবে তা’ ধ্যানীর মধ্যে transmitted (সঞ্চারিত) হ’য়ে যেতে পারে। উপর থেকে যিনি perfection (পূর্ণতার) তকমা নিয়ে আসেন, তিনিই ধ্যেয়। কারণ, He is the highest and best guide and goad to human evolution (তিনি হলেন মানববিবর্ত্তনের সর্ব্বোচ্চ ও সর্ব্বশ্রেষ্ঠ পরিচালক ও অনুপ্রেরক) পুরুষোত্তমকে যারা জীবদ্দশায় পায়, তাঁরা যদি তাঁর প্রতি অনুরক্ত হ’য়ে তাঁর সঙ্গ, অনুসরণ, অনুচর্য্যা ও তীব্র কর্ম্মসহ নিষ্ঠাসহকারে নামধ্যান করে, তবে অল্প সময়ের মধ্যে ঢের এগিয়ে যেতে পারে। পুরুষোত্তমই ইষ্ট, পুরুষোত্তমই ধ্যেয়। তাঁর অন্তর্ধানের পরও তিনিই মানুষের ইষ্ট ও ধ্যেয় হয়ে থাকেন, যতদিন পর্য্যন্ত তাঁর পুনরাবির্ভাব না ঘটে। তাঁর অনুগামীদের কাজ হল তাঁকেই লোকসমক্ষে তুলে ধরা। মানুষের প্রাপ্তব্য হলেন ঈশ্বর এবং পুরুষোত্তমই হলেন রক্তমাংসসঙ্কুল আমান ঈশ্বর। আবার, পুরুষোত্তমকে নিজ জীবন দিয়ে যিনি যতখানি অবিকৃতভাবে ধারণ, বহন, প্রতিষ্ঠা ও প্রকাশ করেন, যাঁর চরিত্র ও ব্যাক্তিত্ব যতখানি ইষ্টানুরাগসন্দীপী, তিনি ততখানি পূজনীয় মানুষের কাছে।

(আঃ প্রঃ ১১ খণ্ড, ৬৭ পৃঃ থেকে সংগৃহীত)

।। প্রত্যেককে নামধ্যানে অভ্যাস করাবার  পদ্ধতি ।।

       শ্রীশ্রীঠাকুর কয়েকজনকে লক্ষ্য ক’রে বললেন—খুব সকালে উঠে ভোর চারটের মধ্যে প্রাতঃকৃত্যাদি ও নামধ্যান সেরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাগরণী গান গেয়ে সবাইকে জাগিয়ে দিতে হয়। তাড়াতাড়ি যাতে নামধ্যানে বসে তা’ করতে হয়। ওতে লোকে আনন্দ পায়, স্ফূর্তি পায়, তাদের শরীরও ভাল থাকে। আগে যতদিন ভোরে সবাইকে জাগিয়ে দিয়ে নামধ্যান করিয়েছি, ততদিন মানুষ অকালে মরেনি। তাই প্রত্যেককে এটা করানো লাগে। (আ. প্র. ১৬/ ১৫.  ৪. ১৯৪৯)

———————————————————————————————–

 (বিঃ দ্রঃ পরিতাপের বিষয়, লোকশিক্ষার জন্য উৎসবাদিতে শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত উক্ত নিদেশকে মেনে চলা হয় না।)   

মরো না, মেরো না, যদি পার মৃত্যুকে অবলুপ্ত কর।

।। মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার সহজ উপায় ।।

শ্রীশ্রীঠাকুর অমনি বললেন—অশ্বিনীদা, regular সাধন যে করে তার আর মৃত্যুভয় থাকে না। সে জীবন্তে ম’রে দেখে, death point এত বেশী দূর নয় যে কিছুকাল regular সাধন করলে তাহা না feel করা যায়। কিন্তু যে তাহা একবার feel করেই আবার সাধন ছেড়ে দেয় তারও কিন্তু অসুখে ভুগে মরতে হয়। আর, যে তা’ feel করেও regular সাধন করতে থাকে, তার শরীর ধ্বংসকারী অসুখ হলে ইচ্ছায় মনকে শরীর থেকে তুলে নিয়ে death point সহজে pass করে; বড় একটা কষ্ট পায় না—অভ্যাস রাখতে হয়। তবে একবারও যে জীবন্তে তা’ feel করেছে সেও রোগে ভুগতে-ভুগতে সেই point-এর কাছে গেলে তার সেই সংস্কার জেগে ওঠে এবং সেও তখন তাতে concentrate করে ভাল idea-তে absorbed হয়ে (যথা, সদ্গুরু ধ্যান ইত্যাদি) দেহত্যাগ করে; ফলে সদগতি হয়। আর, যার অভ্যাস আছে, সে তো কতবার death point অনুভব করে ফিরে আসছে, সে অসুখে বেশী ভোগে না; সে-রকম দেখলে তো ঐ point-এ concentrate করে সদগুরুর ধ্যানে absorbed হয়ে শরীর ছাড়ে। Death-টা হচ্ছে কর্মসংস্কারগত একটা idea-তে বেশী absorbed হ’য়ে এই ব্যক্তিত্ববোধ হারান। এই আমি অশ্বিনী রূপে যে আমিত্ব-বোধ-এর সঙ্গে সম্বন্ধরাহিত্য, এই আমিত্বের সঙ্গে যে connecting links আছে তাহা cut off হয়ে যায়। যে idea-টা তকালে predominant থাকে তাতে absorbed হয়ে যেন তাহাই আমি—এইভাবে তন্ময় হয়ে এই আমিত্বকে বিস্মৃত হওয়া। একপ্রকার লয় আর কি। সাধকেরও লয় বহুবার ঘটবার মত হয়, উচ্চ-উচ্চ ধামে (plane-এ) যখন গতি হয়, তখন তাতে absorbed হয়ে লয় হয়। যে যত তীব্র সাধক, সে লয় তত রক্ষা করে-করে উচ্চ হতে উচ্চতর লোকে যায়। আর, যেখানে গিয়ে লয় এসে যায়, সেই তার খতম। (সূত্রঃ  অমিয়বাণী)

।। মৃত্যুকালে নাম করার কি ফল হয়।।

 একজন জিজ্ঞাসা করলেন– মরার সময় নাম করে, তার ফল কী হয়?

 শ্রীশ্রীঠাকুর—সেটা যদি তার সত্তাকে স্পর্শ করে তবে ভাল হয়। সত্তাকে স্পর্শ না করলে পরজন্ম নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ফলপ্রসূ হয় না। অর্জ্জিত সংস্কার যেমন সত্তাসঙ্গত না হ’লে সন্তানে বর্ত্তায় না। (আঃ প্রঃ ২০/১৭. ৭. ১৯৫১)

নামধ্যান ব্যতীত আমাদের, সৎসঙ্গীদের কমপক্ষে প্রতিদিন ৩ বার করে শবাসন করতে হয়। সে বিষয়ে একজন ভক্ত জিজ্ঞাসা করলেন—শবাসন কি মৃত্যুর ধরণ অভ্যাস করা?

শ্রীশ্রীঠাকুর — এটা শরীর-বিধানকে নিয়ন্ত্রিত করবার ক্ষমতা দেয়। এটা দ্বারা হার্ট ফেল ইত্যাদি আকস্মিক ব্যাপার এড়ান যায়। (আঃ প্রঃ ২০/৩০. ১২. ১৯৫১)

।। চক্রফটো ধ্যান ও শবাসন করা  বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী ।।

শৈলেনদা—আমাদের দীক্ষাদানের সময় যে চক্রফটো ধ্যান করার কথা বলতে হয় ……… ।

শ্রীশ্রীঠাকুর—ওটা আমি আগে করিনি। পরে হয়েছে। পি. সি. সরকার যখন আশ্রম ( পাবনায়) গেল, তখন তার সাথে কথায়-কথায় light reflection-এর (আলোর প্রতিফলনের) কথা উঠল। সে বলল, শাস্ত্রে এরকম যন্ত্রের কথা আছে। ঐরকম গোলাকার একটা যন্ত্রের মধ্যে যদি মনঃসংযোগ করা যায় তাতে একটা mechanical push (যান্ত্রিক প্রযোজনা) মতন হয়, আর তাতে brain power (মস্তিষ্কের শক্তি) বাড়ে। তখন আমি সাদা-কালো ক’রে এই ষোড়শদল চক্রের idea (পরিকল্পনা) দিই। পরে কেষ্টদা তন্ত্র থেকে খুঁজে বের করল, এরকম একটা যন্ত্রের কথা সেখানে আছে, তার নাম মহালক্ষ্মীযন্ত্র। ঐ সময় থেকে এ’টা চলে আসছে। এরপর শৈলেনদা শবাসন করা নিয়ে কথা তুললেন। সেই প্রসঙ্গে বললেন পরম দয়াল—শবাসন আমিও করতেম । ওতে শরীরটা soothed (ঠান্ডা) করে। *শবাসন নিয়মিত করলে সহজে হার্টফেল হতে দেয় না। (দীপরক্ষী, ষষ্ঠ খণ্ড, ইং ২৯-৪-১৯৬০)

                                       * * *

       শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শ গ্রহণ করে  আমরা জানতে পেরেছি, ধর্ম মানে ধারণ করা। অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম্ম বলে জানিস তাকে।  নিজের এবং অপরের অস্তিত্বের ধারক, পালক ও পোষক হবার জন্য যা যা করা হয়, তাই ধর্ম। জীবনবর্দ্ধনার অপচয়ী অনিত্যকে ত্যাগ করে, জীবনবর্দ্ধনার উপচয়ী নিত্য-এর উপাসনা করা, আরাধনা করা। জীবনবৃদ্ধির তাগিদে একটা ফুলকেও বাঁচতে সাহায্য করতে হবে। অযথা একটা ফুলকে মেরে ফুলের স্রষ্টার পূজা হতে পারে না। অতএব ধর্ম বা ধারণ করার বিধি  যার-যার, তার-তার পালনীয়। একে যদি আমরা পূজা মনে করি, তাহলেও যার পূজা তাকেই করতে হবে। কোনো ভায়া-মিডিয়া  প্রতিনিধি দিয়ে হবে না। যার ক্ষিদে তাকেই খেতে হবে, ক্ষুধার্তের হয়ে অন্য কেউ খেলে ক্ষুধার্তের কি পেট ভরবে? অথচ আমরা শ্রীশ্রীঠাকুরের পূজার নামেও  ওই কাজটাই করে চলেছি।  ইষ্টপ্রোক্ত নামধ্যানের অনুশীলন বাদ দিয়ে, ভক্তদের প্রতিনিধি স্বরূপ একজন পুরোহিত ফুল, ফল, মিষ্টি, কাসর, ঘণ্টা, চামর, ধূপ, দীপ প্রভৃতি উপাচার সহযোগে, মন্ত্র উচ্চারণ করে শ্রীশ্রীঠাকুরের প্রতিকৃতির  উদ্দেশ্যে ভোগ নিবেদন করেন।  ভক্তরা দর্শক-শ্রোতা হয়ে প্রতিকৃতির কাছে মনে মনে দুঃখ, কষ্ট, বেদনা, কামনা-বাসনার কথা জানান। পূজা অন্তে প্রতিকৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত খাদ্যদ্রব্য সকলের মাঝে প্রসাদ নামে বণ্টন করা হয়।

স্বভাবতই একটা প্রশ্ন জাগে, ওই পূজার নামে যে খাদ্যদ্রব্য নিবেদন করা হয়, সেগুলি কি প্রতিকৃতি খান, ঈশ্বর কি শুধুমাত্র প্রতিকৃতিতে আবদ্ধ থাকেন ?

এ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলছেন—

ঈশ্বর প্রতিটি অস্তিত্বে–

ব্যষ্টি ও সমষ্টিতে

বিকিরিত হ’য়েও

আরো হ’য়ে আছেন ;

অস্তিত্বের জীবনে ধারণ-পালনী সম্বেগ

সত্তা-পোষণায়

যেমন সমৃদ্ধ হ’য়ে চলে,

অমনি ক’রেই ঈশ্বর সবার ভিতর

সমৃদ্ধ হ’য়ে চলেন–

যেমনতর সামগ্রিকভাবে,

তেমনি ব্যষ্টিগতভাবে ;

তাই, গীতার কথা–

ঈশ্বরঃ সর্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জ্জুন তিষ্ঠতি।

ভ্রাময়ন্ সর্ব্বভূতানি যন্ত্রারূঢ়ানি মায়য়া।।

আর, ‘মায়য়া’ মানে

পরিমিত ও পরিণত হ’য়ে ;

আর, ঈশ্বর মানে

যা’তে ধারণ-পালনী সম্বেগ আছে

ও সমৃদ্ধি লাভ করেছে । ১১১ ।

(দর্শন বিধায়না)

ভগবানের খাওয়াদাওয়া প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন

      শ্রীশ্রীঠাকুর—মানুষকে যখন ভালবেসে খাওয়াই, তখন ভগবান একটু পান। যেমন প্রাণে দিই, তিনি তেমনি পান। বিশেষ ক’রে অশক্ত, ক্ষুধার্ত্ত, আপদগ্রস্ত, বিপাক-বিধ্বস্ত—এদের খাওয়ালে ভগবান খান। খাওয়ানো কেন, তাদের প্রতি যত্ন-আদর, সেবা-শুশ্রুষা-যা’ই করা হয়, সবই ভগবান পান। তাদের যোগ্যতায় যোগ্য ক’রে তুললে ভগবান আরও তৃপ্তি পান। যাকেই যোগ্য ক’রে তুলবে, ভগবান তাতেই তৃপ্ত হন। (আঃ প্রঃ খণ্ড ১৯/ পৃঃ ২৩৬/ তারিখঃ ২৫/০৮/১৯৫০)

       এছাড়াও, আমরা ভগবানের সেবক বা সেবাইত হয়ে, ভগবানকে সেবা করতে আমরা নানা উপাচারের নৈবেদ্য সাজিয়ে নিবেদন করে থাকি। তাতে কি ভগবান তুষ্ট হন ?

ভগবানের সেবা করা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন

“যা’রা তৃষ্ণার্তকে পানীয় দেয়,

ক্ষুধার্তকে অন্ন দেয়,

রুগ্নকে নিরাময় করে,

দুর্বলকে সাহায্যে সবল করে তোলে,

শোকার্তকে সন্দীপ্ত ক‍রে তোলে সান্ত্বনায়—

সুশীল-সৌজন্যে

ইষ্টানুগ সম্বোধি পরিচর্য্যায়,

গৃহহারা, আশ্রয়হারা অভ্যাগত যা’রা

তা’দিগকে যা’রা আশ্রয়ে সুস্থ

ও শ্রীমণ্ডিত ক’রে

ধর্মে অভিদীপ্ত করে তোলে,

যোগ্যতার যোগ্য অনুচর্য্যায়

আত্মনির্ভরশীল করে তোলে,

ঈশ্বরের সেবা করে তা’রা

প্রত্যক্ষভাবে।”

(সেবা-বিধায়না, ১৪২)

       এতক্ষণে আমরা বুঝতে পারলাম যে, ভগবান বা দেবতাকে পুজো করা সহজসাধ্য ব্যাপার  নয়।

আমরা তথাকথিত পূজা এবং অধিবেশন অন্তে কিছু খাদ্যবস্তুকে *প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করে প্রসাদভুক হয়ে থাকি। ওই প্রসাদ-এর অর্থ এবং ভাবার্থ এবার জেনে নেওয়া যাক।

 [প্র-সদ্ (হৃষ্ট হওয়া)]=যা গ্রহণ করলে দেহ-মন-প্রাণ হৃষ্ট (প্রফুল্ল হৃদয়) হয়, তার নাম প্রসাদ। শুধু সাত্তিক খাদ্যবস্তু নয়, ব্যবহারিক শ্রবণ, কথন, আলাপন, পঠন-পাঠন ইত্যাদি যা আমাদের দেহ-মন-আত্মাকে হৃষ্ট করে, তার নাম প্রসাদ। (অভিধান/জ্ঞানেন্দ্র মোহন দাস)

প্রসাদভুক [দীপরক্ষী ১ম, ০৩/০৬/১৯৫৩]— ঈশ্বরের আশীর্বাদ বা অনুগ্রহ লাভ, ঈশ্বরের প্রসন্নতা লাভ। [প্রসাদ—প্র-√সদ + ঘঞ্ (ভাবে)] অনুগ্রহ। “মানুষকে যে যত service সেবা দেয়, সে তত বড় প্রসাদভুক হয়।”  (শব্দরত্নকোষ)

*সৎসঙ্গের আনন্দবাজার নামক সর্বজনীন ভোজনালয়ে প্রদত্ত আহার্য্য দ্রব্যকে প্রসাদ বলা হয়। শ্রীশ্রীঠাকুরের লীলাকালিন সৎসঙ্গ অধিবেশন অন্তে প্রসাদ হিসেবে গুড়ের বাতাসা প্রদান করা হতো। 

        যাইহোক, প্রসাদরূপী খাদ্যদ্রব্য আমাদের জৈবিক ক্ষুধা নিবারণ করতে প্রয়োজন হলেও, আত্ম-বিস্তারের জন্য প্রসাদভুক হতে হলে  মানুষকে শুধু নয়, ব্রহ্মের প্রতীক-স্বরূপ, পরিবেশের সবাইকে সেবা দিয়ে অমঙ্গল দূর করে মঙ্গল প্রতিষ্ঠা করতে হবে—মরণকে স্তব্ধ করতে জীবনের জয়গান গাইতে হবে—নিম্নোক্ত বাণীতে প্রদত্ত ইষ্ট নিদেশ মেনে।

ঘটে-ঘটে ইষ্টস্ফূরণ

যখনই তোর হবে,

ব্রহ্মবোধের প্রথম ধাপটি

ঠিক পাবি তুই তবে। ৪৯।

ঘটে-ঘটে ইষ্টনিশান

বোধে দিলে হানা,

ব্রহ্মবোধের ধাপটিরে তোর

হবেই তখন জানা। ৫০।

‘তত্ত্ব’ (অনুশ্রুতি ১ম খণ্ড)।।

সবাইকে যথাবিহিত শ্রদ্ধা ও প্রণাম জানিয়ে বিদায় নিলাম। জয়গুরু। বন্দে পুরুষোত্তমম্!

tapanspr@gmail.com

Leave a comment