দূষণ নিয়ন্ত্রণ

।। দূষণ নিয়ন্ত্রণ দিবস স্মরণে নিবেদন ।।


[2রা ডিসেম্বর, 1984-এর ভয়ঙ্কর রাতে, ভোপালে ইউনিয়ন কার্বাইড ইন্ডিয়া লিমিটেড কীটনাশক প্ল্যান্ট থেকে একটি গ্যাস লিক হওয়ার ফলে হাজার হাজার মানুষ মারা যায় এবং অর্ধ মিলিয়নেরও বেশি লোক আক্রান্ত হয়। এই বিপর্যয় শিল্প অবহেলার গুরুতর পরিণতি এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে । জাতীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ দিবস এই ইভেন্টের স্মরণ হিসাবে কাজ করে এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের বিপর্যয় এড়াতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার গুরুত্বের উপর জোর দেয়।

  1. সচেতনতা এবং শিক্ষা: এই দিনটি ক্রমবর্ধমান দূষণের মাত্রা সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এবং তাদের কার্বন পদচিহ্নগুলি হ্রাস করার পদ্ধতি এবং অনুশীলনগুলি সম্পর্কে জনসাধারণকে শিক্ষিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি তথ্য প্রচারের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসাবে কাজ করে, একটি আরও পরিবেশ সচেতন সমাজকে উত্সাহিত করে৷
  2. পলিসি রিইনফোর্সমেন্ট: এটি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি উপলক্ষ যাতে তারা নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাগুলিকে পুনর্বিবেচনা করে, যাতে শিল্পগুলি পরিবেশগতভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ অনুশীলনগুলি মেনে চলে। দিবসটি শিল্পগুলিকে তাদের পরিবেশগত প্রভাব হ্রাস করে টেকসই এবং সবুজ প্রযুক্তি গ্রহণ করার আহ্বান জানায়।
  3. জনসাধারণের সম্পৃক্ততা: এই দিনে বিভিন্ন কর্মসূচি, কর্মশালা এবং প্রচারণার মাধ্যমে জনসাধারণকে দূষণ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের জন্য নিযুক্ত ও উৎসাহিত করা হয়। পরিবেশ নীতির সফল বাস্তবায়নের জন্য এই ধরনের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
    স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের উপর প্রভাব
    দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব বহুগুণ। বায়ু দূষণের ফলে শ্বাসযন্ত্রের রোগ, হৃদরোগ, এমনকি ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। জল দূষণ জলজ জীবনকে প্রভাবিত করে এবং দূষিত জল গ্রহণ করলে মানুষের জন্য উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে। মাটি দূষণ কৃষিকে প্রভাবিত করে, যার ফলে ফসলের ফলন এবং গুণমান হ্রাস পায়।
    তদ্ব্যতীত, অনিয়ন্ত্রিত দূষণ বিশ্ব উষ্ণায়নে অবদান রাখে, যা অনিয়মিত আবহাওয়ার ধরণ, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির দিকে পরিচালিত করে। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধি এবং কৃষি উৎপাদনশীলতা হ্রাসের সাথে অর্থনৈতিক প্রভাবগুলিও উল্লেখযোগ্য।
  4. কঠোর প্রবিধান: ভারতের জন্য কঠোর দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রবিধান থাকা অপরিহার্য। নিয়মিত পরিদর্শন, খেলাপিদের জন্য জরিমানা এবং সবুজ অনুশীলনের জন্য প্রণোদনা কার্যকর হতে পারে।
  5. প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন: সবুজ প্রযুক্তি গ্রহণ করা, যেমন নবায়নযোগ্য শক্তির উত্স, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং টেকসই কৃষি অনুশীলন, উল্লেখযোগ্যভাবে দূষণ কমাতে পারে।
  6. জনসাধারণের অংশগ্রহণ: সম্প্রদায়, এনজিও এবং ব্যক্তিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। বৃক্ষ রোপণ, বর্জ্য পৃথকীকরণ, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করা এবং পানির অপচয় কমানো সহজ কিন্তু কার্যকর উপায় যা নাগরিকদের অবদান রাখতে পারে।
  7. বিশ্বব্যাপী সহযোগিতা: দূষণ একটি বিশ্বব্যাপী সমস্যা। দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতামূলক প্রচেষ্টা কার্যকরভাবে দূষণ মোকাবেলায় ভাগ করা জ্ঞান, সম্পদ এবং প্রযুক্তির দিকে পরিচালিত করতে পারে।
  8. অবিচ্ছিন্ন শিক্ষা: স্কুল, কলেজ এবং পাবলিক প্ল্যাটফর্মগুলিকে পরিবেশগত শিক্ষা, সংরক্ষণের মূল্যবোধ এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে টেকসই জীবনযাপনকে একীভূত করা উচিত।
    উপসংহারে, জাতীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ দিবস শুধু স্মরণের দিন নয়, কর্মের আহ্বান। এটি দূষণ মোকাবেলা, আমাদের পরিবেশ রক্ষা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যত নিশ্চিত করার জরুরি প্রয়োজনের ওপর জোর দেয়।
    ভারত, তার বিশাল জনসংখ্যা এবং দ্রুত শিল্পায়ন সহ, একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আজকে করা পছন্দগুলি ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া পরিবেশগত উত্তরাধিকার নির্ধারণ করবে।
    এই দিনটি আমাদের দায়িত্ব এবং ভারতকে আরও সবুজ, পরিচ্ছন্ন এবং স্বাস্থ্যকর জাতি হিসাবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সম্মিলিত প্রচেষ্টার স্মারক হিসাবে পরিবেশন করুন।]

।। এ বিষয়ে করণীয় কর্তব্য ।।
দূষণ নিয়ন্ত্রণে আমাদের ভূমিকা হলো দৈনন্দিন জীবনে কিছু সহজ অভ্যাস পরিবর্তন করা, যেমন— গণপরিবহন ব্যবহার করা, বর্জ্য পৃথকীকরণ করা, বিদ্যুৎ ও জল ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া এবং প্লাস্টিক ও অন্যান্য দূষণকারী পদার্থ ব্যবহার কমানো। এছাড়াও, ‘3Rs’ ধারণা, অর্থাৎ হ্রাস (reduce), পুনর্ব্যবহার (reuse) এবং পুনর্ব্যবহার (recycle) করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের ভূমিকা
‘3Rs’ নীতি অনুসরণ: বর্জ্য উৎপাদন কমানো (reduce), জিনিসপত্র পুনরায় ব্যবহার করা (reuse) এবং রিসাইকেল করা (recycle)।
যাতায়াত: ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন (যেমন বাস, ট্রেন) ব্যবহার করা।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: বর্জ্যকে সঠিকভাবে পৃথক করা এবং একটি সঠিক পদ্ধতিতে তা নিষ্পত্তি করা।
শক্তি সাশ্রয়: বাড়ির বা অফিসের লাইট, ফ্যান এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারের সময় সাশ্রয় করা।
প্লাস্টিক বর্জন: প্লাস্টিক এবং অন্যান্য অপচনশীল বর্জ্য উৎপাদন ও ব্যবহার কমানো।
বৃক্ষরোপণ: গাছ লাগানো এবং সবুজায়ন বাড়ানো, কারণ গাছ বাতাসকে বিশুদ্ধ করতে সাহায্য করে।
সচেতনতা তৈরি: পরিবার, বন্ধু এবং সমাজে দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

আইন মেনে চলা: দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত সরকারি আইন ও নিয়মকানুন মেনে চলা। (সংগৃহীত)

।। পরিবেশের এবং মনুষ্যত্বের দূষণ প্রতিরোধে করণীয় কর্তব্য ।।


বিশ্ব-প্রকৃতির পরম দান, পঞ্চ-মহাভূত—ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-এর অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই পৃথিবী নামক সবুজ গ্রহটি। নগর-সভ্যতার ধারক-বাহকেরা আসুরিক ক্ষমতার বলে, ভোগবাদের ছাড়পত্রের বলে, আদর্শহীনতার বলে ভারতীয় ধর্মের অঙ্গীভূত পঞ্চ-মহাযজ্ঞ, সদাচার এবং বর্ণাশ্রমকে বিদায় জানিয়ে বসুন্ধরার পরিবেশকে যে ধ্বংসাত্মক পথে এগিয়ে দিয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘নাসা’-র গবেষণা। উদ্বেগ প্রকাশ করে গিয়েছিলেন কবিগুরু, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর’-এর প্রতিবাদী বাণীতে।
ভারতবর্ষের বৃহত্তম নদী গঙ্গাকে আমরা মা বলি, যাঁর পূত স্রোতধারায় স্নাত হয়ে পবিত্র হই, সেই মায়ের শরীরে নগর-সভ্যতার পুর-বিভাগ যখন পরিকল্পিতভাবে পূতিগন্ধ ক্লেদ নিক্ষেপ করে, ধর্মের ধ্বজাধারীরা তথাকথিত পূজা-পার্বনের বর্জ্য নিক্ষেপ করে পুণ্য অর্জন করে, তখন মনে হয় না যে আমরা কোন উন্নত সভ্যতার সভ্য, প্রগতি বাদের বাদী, আর্য্য সংস্কৃতির ধারক বাহক ধার্মিক।
পরিবেশ সম্বর্দ্ধনার সেই পরম অনুশীলন কি ভাবে বিকৃত হয়েছে সে বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই। বরং বসুন্ধরার পরিবেশকে রক্ষা করার ব্রতে কিভাবে ব্রতী হওয়া যায় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের উপদেশ মেনে আমাদের প্লাস্টিক-সভ্যতার কর্ণধারেরা যাতে পরিবেশ বান্ধবের ভূমিকা গ্রহণ করেন। রাষ্ট্র নায়কেরা যা’তে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, ভূমিদূষণ, ভূ-স্তরদূষণ, জলদূষণ প্রতিরোধ করে গ্লোবাল-ওয়ার্মিং বা বিশ্ব-উষ্ণায়ন-ভ্রূকুটি থেকে সভ্যতাকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হন, সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে, জনমত গঠন করতে হবে, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের লাগামহীন ভোগের চাহিদা মেটাতে যে হারে ভূ-গর্ভস্থ তেল, গ্যাস, কয়লা, বিবিধ আকরিক উত্তোলন করতে গিয়ে ভূ-স্তরের অবক্ষয়কে আহ্বান করে চলেছি, ধ্বংস করে চলেছি ‘রেন ফরেস্ট’কে। এর বিরুদ্ধে সরব না হলে কোন মূল্যেই বাঁচানো যাবে না মানব সভ্যতাকে!
আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর পূর্বে পরম বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরব হয়েছিলেন এই ভয়াবহ পরিস্থিতি প্রতিরোধ মানসে। প্রাতঃ-স্মরণীয় পদার্থবিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যকে উৎসাহ দিয়ে হিমাইতপুরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র। বিজ্ঞান-বিষয়ক অত্যাশ্চর্য্য বহুকিছুর সাথে সন্ধান দিয়েছিলেন সহজলভ্য আবহাওয়া বিদ্যুতের। ভূ-গর্ভস্থ প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন পরবর্তী শূন্যগর্ভ অবস্থাকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে কিভাবে পুণঃ-পূর্ণকরণ বা রিফিলিং করলে ভূ-স্তরের ক্ষতি হবে না সে বিষয়েও তিনি বলে গেছেন। তাঁর প্রদত্ত ওইসব ফরমূলাকে বাস্তবায়িত করতে পারলে ভূ-স্তরকে বিনষ্ট না করে, পরিবেশকে দূষিত না করেই প্রাকৃতিক দৌ-শক্তিকে কাজে লাগিয়ে শক্তি-সম্পদে সমৃদ্ধ হতে পারত আমাদের সভ্যতা।
আমরা জানি, ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। আমাদের অস্তিত্বের ধারক, পালক-পোষক পরমাপ্রকৃতির পঞ্চ-মহাভূত। উক্ত পঞ্চ-মহাভূতের অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই বসুন্ধরা—নীল-সবুজ গ্রহ। ধারণ করতে হবে ওই প্রাকৃতিক উপাদানসমূহকে, ওঁদের বিনাশ করলে আমরাও বিনাশ হবো। নচেৎ বিশুদ্ধ জলের বোতলের মত অক্সিজেন সিলিণ্ডার পিঠে বয়ে ঘুরতে হবে একদিন নিকট ভবিষ্যতে।
পল-বিপল, দণ্ড-প্রহর, অহোরাত্র, আহ্নিকগতি, বার্ষিকগতির দিনরাত, মাস, বছর হয়েই চলেছে আদিকাল থেকে, প্রাকৃতিক নিয়মে। দিন-মাস-বছর আসে যায়, রেখে যায় কিছু স্মৃতি মনের মণিকোঠায়। ওই স্মৃতির মালাগুলোকে স্মৃতিবাহীচেতনার ভল্টে অনন্তকাল জমা করে রাখার জন্য আর্য্য-ঋষিরা প্রতিটি মুহূর্তের জীবন ধারণের আহরণ শুদ্ধির মাধ্যমে ধ্রুবাস্মৃতির সন্ধান দিয়ে গেছেন ‘‘আহারশুদ্ধৌ সত্তাশুদ্ধি, সত্তাশুদ্ধৌ ধ্রুবাস্মৃতি’’ মন্ত্রে । শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র স্বস্ত্যয়ণী ব্রতের ‘নিয়তং স্মৃতিচিদয়ুতে’ মন্ত্রে য়াকে সমৃদ্ধ করেছেন। য়ে মুহূর্ত চলে যাবে তা আর ফিরে আসবে না। চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা সমৃদ্ধ সবুজ গ্রহ পৃথিবীর প্রতিটি মুহূর্তকেই যাতে চিরনবীনতায় আস্বাদন করতে পারি, উপভোগ করতে পারি সেজন্যই আর্য্য সভ্যতার ঊষা লগনে পরমপিতার প্রতিভূ আর্য্য ঋষিগণ ‘‘মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ……..’’ মন্ত্রে বন্দনা করে বসুন্ধরার মধুময় পরিবেশকে রক্ষা অর্থাৎ পূজা করতে শিখিয়েছিলেন। পূজা শব্দের অর্থ পূরণ করা, সম্বর্দ্ধনা, সম্যকভাবে বর্দ্ধনার লক্ষ্যে এগিয়ে চলা। যেমন-যেমন আচরণে, পরিবেশের অজৈব উপাদানসমূহকে রক্ষা করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া যায় তাই ছিল আর্য্য ভারতের পূজা, যজ্ঞ, হোম, উৎসবের তাৎপর্য্য।
আমরা যে ৩৩ কোটি দেবতার কথা শুনেছি সে সংখ্যাটা ৩৩,০০০০০০০ নয়, শুধুই ৩৩। কোটি অর্থে (piece) বোঝান হয়েছে, যথা, জীবকোটি, ঈশ্বরকোটি একক অর্থে ব্যবহৃত হয়।
বাস্তবে আমাদের এই সবুজ গ্রহের জীবকূলের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জৈবাজৈব রসদের যোগানদাতার মূল মালিক সূর্য। সূর্যর আর এক নাম আদিত্য। আদিত্য মানে দেবতা। দেদীপ্যমান যা তাকে দেবতা বলে। দেবতা মানে দ্যুতি বিশিষ্ট সত্তা। সব দেবতাই মূলতঃ পরব্রহ্মের প্রতীক। যেমন পৃথিবীর অধিপতি অগ্নি, অন্তরীক্ষে ইন্দ্র বা বায়ু ও দ্যুলোকে সূর্য। পৃথিবী, অন্তরীক্ষ এবং দ্যুলোক-এর প্রতিটি স্থানে ১১টি করে বেঁচে থাকার আবশ্যিক উপাদান সরবরাহকারী দেদীপ্যমান উৎস রয়েছে। উক্ত ৩৩টি জীবনীয় উৎস-সমূহকে দেবতা বলা হয়েছে উপনিষদে।
বৃহদারণ্যক উপনিষদ (৩য় অধ্যায়, ৯ম ব্রাহ্মণ)-এর ঋষি শাকল্য, ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য সমীপে দেবতার সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি অষ্টবসু, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্যাদি ৩১ সংখ্যক দ্যুতিবিশিষ্ট প্রাকৃতিক সত্তা এবং ইন্দ্র ও প্রজাপতি মিলিয়ে ৩৩ সংখ্যক দেবতার উল্লেখ করেছিলেন। ওই ৩৩ কোটি (33 pieces) দেদীপ্যমান উৎসসমূহকে রক্ষা করার প্রশ্নে আমরা প্রবৃত্তি পরবশ হয়ে যাতে দুর্বৃত্ত না হই তারজন্য উপনিষদের ঋষিগণ ‘আত্মানং বিদ্ধি’-র শপথ বাক্যের পাঠ দিলেন।—পরমপিতার সন্তান তুমি, নিজেকে জানো, নিজের প্রতিরূপ মনে করে পরিবেশকে বাঁচাও, নিজে বাঁচ। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’—জীবনবিধ্বংসী আচরণ ত্যাগ করে জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলো। ‘মা গৃধ’—লোভ করো না। সদাচার এবং বর্ণাশ্রম মেনে চলো। পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে নিজে সমৃদ্ধ হও। এই ছিল ভারতবর্ষের বিধি-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠনের, ধর্মের, পূজার, উৎসবের বাস্তব রূপ। ওই হৃত-গৌরব যুগোপযোগী করে পুণঃ-প্রতিষ্ঠিত করে গেলেন সব দেবতার সমাহারের প্রতীকস্বরূপ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। যার প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয় তাঁর প্রদত্ত ‘আর্য্য সন্ধ্যা’ প্রার্থনা মন্ত্রে।
আমরা, ভারত রাষ্ট্রের অধিবাসীরা ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের পবিত্র মন্ত্র মূণ্ডকোপনিষদের ‘সত্যমেব জয়তে’-র মধ্যে নিহিত সত্যের সন্ধান করার চেষ্টা করতে হবে। ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টি রক্ষার পবিত্র কর্তব্য ভুলে, ধর্মের নামে কতগুলো কু-সংস্কারে, আর বিজ্ঞানের নামে ভোগবাদে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছি। অথচ বিশ্বের পরিবেশ বিজ্ঞানীরা প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে, ভারতীয় পঞ্চ-মহাযজ্ঞের বিধানকে, সমাজ বিজ্ঞানীরা সমাজ-বন্ধনের দৃঢ়তার অবক্ষয় রোধে, শ্রেণী-বিন্যস্ত বর্ণাশ্রমানুগ সমাজ ব্যবস্থার বিধানকে এবং প্রজনন বিজ্ঞানীরা সুস্থ মানবজাতি গঠনের জন্য সুবিবাহ ও সুপ্রজনন বিধিকে মেনে চলতে পরামর্শ দিয়েছেন।
বেদ-উপনিষদ-গীতা. ঋষি এবং মহাপুরুষদের নিদেশে কোথাও প্রচলিত পূজার নামে, অনিত্য বস্তুর উপাসনার নামে, হৈ-হুল্লোর করে পরিবেশ দূষণ করার অনুমোদন নেই। ব্যক্তি চরিত্র গঠনের নিমিত্ত সাধন-ভজন-আরাধনা বাদ দিয়ে যে তন্ত্রমতে আমরা পরিবেশ দূষণ করতে প্রতিমা পূজায় মেতে উঠি, সেই তন্ত্র-ই প্রতিমা পূজাকে ‘‘বাহ্যপূজা অধমাধম’’ বলে বর্ণনা করেছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও, ‘‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’’ ছন্দের ডালিতে প্রতিমা পূজার অসারতার বার্তা রেখে গেছেন।
বসুন্ধরার পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, এক বিপ্লব নিয়ে এলেন। ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে, ধর্ম বলে জানিস তাকে। বাঁচা-বাড়ার মর্ম যা, ঠিকই জানিস ধর্ম তা। Upholding urge of existence is Dharma.’……..ইত্যাদি বাণীর মাধ্যমে। অতএব, চাঁদার জুলুম, ফুল, বেলপাতা, ধূপহীন ধূপকাঠি, নৈবেদ্য, দশ-(অ)কর্মার ফর্দ, ঢাক, ঢোল, বাজি, হৈ-হুল্লোর, তার শব্দে মাইকের ডালি দিয়ে নয়— তোমাকে ধার্মিক হতে হলে আগে পরিবেশকে বাঁচাতে হবে। সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বাস্তব কর্মে ব্রতী হতে হবে। পরিবেশ হিতৈষী হতে হবে, তবেই তুমি ভারতীয় মতের ‘ধার্মিক’ অভিধায় ভূষিত হতে পারবে।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের অনুগামীদের নিত্য ইষ্টভৃতি করতে হয়। ইষ্টভৃতি মানে ইষ্ট কর্মের ভরণ। ইষ্টকর্ম মানে পূর্ত্তকর্ম—পরিবেশের উপাদানকে,পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখার বাস্তব কর্ম। যা প্রকৃত ইষ্টভৃতির মন্ত্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ ।” এর সরলার্থ খুব সহজ। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুযায়ী সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন বর্দ্ধনার বিধি মেনে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে চলেন যিনি, এমন গুরুভাই-ই প্রকৃত ইষ্টভ্রাতা।–যাঁর আপদে-বিপদে সাধ্যানুগ সাহায্য করতে হবে। ভূত মানে,–ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা পরিবেশের অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। সেগুলোকে প্রাণ পণ করে রক্ষা করতে হবে। প্রতিনিয়ত এই শপথ মেনে চলার নাম ইষ্টভৃতি। অতএব প্রতিটি আমি যদি প্রকৃত ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের যাজ্ঞিক হবার শপথ পালন করতে পারি তাহলেই অনেকাংশে রক্ষা করা যাবে সুজলা-সুফলা-মলয়জ-শীতল বসুন্ধরার পরিবেশকে।
এ যুগের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমাদের সচেতন করে দিতে বাণী দিয়ে বললেনঃ
‘‘ইষ্টভরণ, পিতৃপোষণ,
পরিস্থিতির উন্নয়ন,
এ না করে, যাই না করিস
অধঃপাতেই তোর চলন।’’
ওই অধঃপতন থেকে মধুময় বসুন্ধরার পরিবেশকে, মানব সভ্যতাকে, মানবতার অপমৃত্যুকে রক্ষা করতে কৃপা পরবশ হয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর ‘পঞ্চবর্হি’ এবং ‘সপ্তার্চ্চি’ পালনের অনুশাসন দিলেন। দলীয় প্রীতির কবলে পড়ে মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার সেই অনুশাসন বিধিকে অবজ্ঞা করার স্পর্দ্ধা যেসব তথাকথিত সৎসঙ্গীরা দেখাচ্ছেন, তাদের অধঃপতনকে প্রতিরোধ করতে হলে, তাদেরও সামিল করতে হবে উক্ত ইষ্ট-ভরণের অনুশাসন পালনে। তা যদি না করি আমরাও কিন্তু বঞ্চিত হব ‘ইষ্ট ভরণের’ পবিত্র কর্ম থেকে।
জয়গুরু, বন্দে পুরুষোত্তমম্!


tapanspr@gmail.com

পাবনা সৎসঙ্গ আশ্রমের ইতিহাস

** সৎসঙ্গের পুরানো সেই দিনের কথা**
।। পাবনাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের অবদান।।
[এই নিবন্ধের লেখক ভক্তপ্রবর ধীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, যাঁর যাজনে উদ্বুদ্ধ হয়ে সৎমন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন ঋত্বিগাচার্য্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য মহোদয়। লেখাটি ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র গ্রন্থ-এর ২য় খণ্ড থেকে সংগৃহীত।]
সেই ইংরেজী ১৯২৫ খৃষ্টাব্দের কথা। হিন্দু মুসলমানের দাঙ্গায় তখন বাংলার মাটী রক্তাক্ত। পাবনা জেলার লোক-সংখ্যার ৭৫ ভাগ মুসলমান । বাদ বাকী অন্য ধর্মাবলম্বী—তন্মধ্যে হিন্দুর সংখ্যা খুবই অল্প। নগণ্য সংখ্যক হিন্দুদের মধ্যে কোন সংহতি নাই । প্রভাব ও প্রতিপত্তির মোহে হিন্দুগণ পরপর বিদ্বিষ্ট। ঈর্ষান্বিত হিন্দুগণ প্রতিদ্বন্দ্বী হিন্দুকে পর্যুদস্ত করবার জন্য মুসলমানগণের সাহায্য নিতেও দ্বিধা বোধ করেন না। মুসলমান দ্বারা কোন হিন্দু নারীর নারীত্বের লাঞ্ছনা হলেও হিন্দু প্রতিবেশী ক্ষুব্ধ হওয়া তো পরের কথা বরং সেই লাঞ্ছনার সুযোগ নিয়ে সেই গৃহস্থকে কি করে আরও বিপদে ফেলা যায় সে চেষ্টাতেও কুণ্ঠিত নন। সংখ্যালঘিষ্ঠ হিন্দুগণের আত্মরক্ষার জন্য যেখানে তাঁদের সংহতির একান্ত প্রয়োজন—ঈর্ষার নীচতায় সেখানে তাঁরা পরস্পর বিদ্বিষ্ট।
এই নিকৃষ্টতম পরিবেশে মহামানব শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আবির্ভাব। বাংলার প্রতি জেলায় জাতিধর্ম নির্বিশেষে অগণিত নরনারী তাঁর চরণাশ্রয়ে অভিনব চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে উঠল। প্রেমের বন্ধনে তারা হল একাত্ম।ক্রমে ক্রমে বহু বিদ্বজ্জন, বরেণ্য নেতাগণ, বৈজ্ঞানিক ও শিল্পবিদ মনীষিগণের আগমনে হিমাইতপুর সৎসঙ্গবাটী মুখর হয়ে উঠল। অত্যল্পকাল মধ্যেই সেই জঙ্গলাকীর্ণ শ্বাপদসঙ্কুল আশ্রমবাটী হর্ম্যসঙ্কুল নগরে হল পরিণত। নানাবিধ শিল্পবাটী, বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার, বিদ্যায়তন প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের জন্য সৎসঙ্গ আশ্রমের পরিধি বিস্তৃত হয়ে চলল। শ্রী ও সম্পদে এই তীর্থ অভিনব সৌন্দর্যে হল প্রস্ফুটিত। বাংলার লক্ষ লক্ষ নরনারী শ্রীগুরু দয়ালের জয়গানে হল মুখরিত। পাবনা জেলাতেও কিছু-সংখ্যক হিন্দু এই মহামন্ত্রে হলেন দীক্ষিত।
কিন্তু ঈর্ষা যাঁদের সহজাত, প্রভাব ও প্রতিপত্তির মোহ যাঁদের মনুষ্যত্ব বা বিবেককে পীড়িত করে রেখেছে — তাঁদের পক্ষে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ঐশী প্রভাব সহ্যের বাইরে! তাঁরা এই মহামানবের দেবচরিত্রের উপর নানাবিধ কলঙ্ক আরোপ করে তাঁর ও সৎসঙ্গের অপপ্রচারে হয়ে উঠলেন উন্মত্ত। বাংলার জেলায় জেলায় আশ্রমের অপপ্রচারের তাঁরা এজেন্সী খুলে দিলেন। তাঁদের মাত্রাতিরিক্ত নিন্দাবাদে কিন্তু বাংলার জনসাধারণ শ্রীশ্রীঠাকুরের বিষয়ে অতিশয় অনুসন্ধিৎসু হয়ে অবশেষে দীক্ষা গ্রহণ করে ধন্য হলেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস মহাশয় শ্রীশ্রীঠাকুরকে বলেছিলেন—‘আমি আপনার এতো নিন্দা শুনেছি যে তাতেই ধরে নিয়েছিলাম যে—এখানেই মিলবে সত্যের সন্ধান। এটা আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা।’
হিন্দু – মুসলমান সংঘর্ষ পল্লীগ্রামে তখনো বিস্তৃত হয় নি। পাবনার আতঙ্ক কেবল শহরেই সীমাবদ্ধ। আশ্রম-বিদ্বেষী হিন্দুগণের মনে এই সময়ে আশ্রমকে অবলুপ্ত করবার এক চক্রান্ত উঠল জেগে। এই সংঘর্ষের সুযোগে তাঁরা গ্রামস্থ মুসলমানগণকে আশ্রম আক্রমণের জন্য প্ররোচনা দিতে তৎপর হয়ে উঠলেন।
কিন্তু হিমাইতপুরের দরিদ্র মুসলমানগণ আশ্রমের দ্বারাই প্রতিপালিত, শ্রমের বিনিময়েই তাদের গ্রাসাচ্ছাদন। উপরন্তু অসুখে বিসুখে বিনা পয়সায় তাদের চিকিৎসা, পূজা পার্বণে তাদের পরিবারবর্গের সকলকেই পরিচ্ছদাদি বিতরণ, দায়-অদায়ে অর্থ সাহায্য হোত এই আশ্রম থেকেই। সর্বোপরি . শ্রীশ্রীঠাকুরের উপর তাদের শ্রদ্ধা ছিল নিবিড়। আশ্রমের ধ্বংস-সাধন ছিল তাদের স্বপ্নেরও অগোচর ।
আশ্রম-বিদ্বেষী হিন্দুগণ মুসলমানদের দিয়ে এই সংঘর্ষের সুযোগে আশ্রমের অবলুপ্তি ঘটাবার জন্য হয়ে পড়লেন উন্মত্ত। তাঁরা গ্রামস্থ মুসলমানদের একত্রিত করে গোপনে গোপনে উত্তেজিত করে তুলতে লাগলেন।
গ্রাম্য মুসলমানদের তাঁরা বোঝালেন—‘অনুকূলঠাকুর যে ভাবে এই হিমাইতপুর গ্রামে হিন্দু বসবাস আরম্ভ করাচ্ছেন, বাংলার নানাস্থানের বিত্তবান ও প্রভাবশালী হিন্দুরা যেভাবে এখানে স্থায়ী ঘরবাড়ী নির্মাণ করে আশ্রমের আয়তন বিস্তৃত করে চলেছে তাতে এখানে হিন্দুর সংখ্যা বেড়ে গিয়ে দরিদ্র মুসলমানদের এই গ্রাম থেকে উৎখাত হতে হবে। মুসলমানদের কল্যাণের জন্যই আশ্রম ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। আর যত নষ্টের মূল ঐ অনুকূল ঠাকুরকে নিকেশ করে সৎসঙ্গের একান্ত সমাধির প্রয়োজন।
আরও একটা কথা—আশ্রমে যাঁরা আছেন তাঁরা সকলেই সম্পন্ন ঘরের সস্তান। তাঁদের স্ত্রী-কন্যাগণ অভিজাত বংশসম্ভূতা। এই আক্রমণের সুযোগে আশ্রমবাসীদের ধনসম্পদ আর অনন্যা সুন্দরীদের অবাধ লুণ্ঠনেরও সুবিধা হবে।’
স্বল্পবুদ্ধি গ্রাম্য মুসলমানগণ হিমাইতপুরের হিন্দু গণের অসার বক্তৃতায় হয়ে পড়ল অভিভূত। আশ্ৰম আক্রমণের সুযোগ-সন্ধানে তারা রইল প্রতীক্ষায়। সে সুযোগ অচিরেই তাদের উপস্থিত হল অপ্রত্যাশিতভাবে।
আমাদের পরম পূজনীয়া বড়মায়ের এক সহোদরার অন্তিমকালে তাঁর তিনটি শিশু সন্তানের ভার দিয়ে গেলেন বড়মায়ের হাতে। সেই তিনটি সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠ পুত্র সন্তানটির সেদিন অকালে হল প্রাণবিয়োগ। তার ডাক নাম ছিল পচা। শব নীত হল শ্মশানে । নফরদা শবদাহের কাষ্ঠ প্রভৃতি নিয়ে গেলেন সেখানে ।
এই গ্রাম্য শ্মশানটি ছিল আশ্রমের অনতিদূরে পূর্বদিকে। বাঁধের উপর থেকে বেশ দেখা যায়। শবদাহের উদ্যোগপর্ব যখন চলছে সেই সময় কতিপয় অতিপরিচিত ঐ গ্রামেরই মুসলমান যুবক এসে দাহকার্য নিষেধ করে বললে যে, সে স্থানটি শ্মশান নয়, তাদের কবর স্থান। সুতরাং দাহকার্য সে স্থানে চলবে না। বিস্মিত শববাহিগণের প্রতিবাদে মুসলমান যুবকগণ অধিকতর উত্তেজিত হ’য়ে নফরদাকে প্রহারে করল জর্জরিত। যারা নফরদার তত্ত্বাবধানে আশ্রমের কাজে এতোদিন একান্ত অনুগত ছিল তারাই আজ তাঁকে প্রহারে করল জর্জরিত।
বাঁধের উপর থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর পরিস্থিতি দেখে আদেশ করে পাঠালেন শব আশ্রমে ফিরিয়ে আনতে। নির্বিচারে তাঁর আদেশ হল প্রতিপালিত, শব নিয়ে আসা হল আশ্রমে । এইখানেই পরিসমাপ্তি হওয়া উচিত ছিল ঐ পরিস্থিতির। কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মুসলমানগণ অন্যান্য মুসলমানগণকে উত্তেজিত করে তুলল এই বলে যে, আশ্রমবাসিগণ তাদের কবরস্থানকে শ্মশান বানিয়ে সেইখানে কাফেরের শবদাহ করতে চায় গায়ের জোরে। পাবনা শহরের সেই উত্তেজনার মুহূর্তে এই রটনায় মুসলমানগণ হল ক্ষিপ্তপ্রায়। তারা দলে দলে এসে সমবেত হতে লাগল সেই শ্মশানভূমিতে—আশ্ৰম আক্রমণ করে উপযুক্ত প্রতিশোধ নিতে। পাবনা শহরে হিন্দুগৃহ আক্রমণের কোন সুযোগ না পেয়ে তাদের আক্রোশ ছিল প্রবল। এখানে কোন পুলিশ প্রহরা না থাকাতে নিরীহ আশ্রমবাসীদের উপর তাদের প্রতিশোধ-স্পৃহা হল প্রবল। ‘আল্লা হো আকবর’ ধ্বনিতে স্তব্ধ শ্মশানভূমি হল মুখরিত — হিন্দু-নিধনের উল্লাসে।
আশ্রমের আজ মহাতঙ্কের দিন। মৃত্যুর বিভীষিকায় সকলেই বিহ্বল। আতঙ্কিত জননীগণের জন্যই সকলের চিন্তা, কখন কার হৃৎস্পন্দন স্তব্ধ হয়ে যায় সেই ভয়ে। অনন্ত মহারাজ, গোঁসাইদা, কিশোরীদা সকলেই ব্যস্ত হলেন জননীগণের সাহসসঞ্চারে। এদিকে পুরুষগণ ব্যস্ত হলেন পা, কুড়ুল, লাঠি প্রভৃতি সংগ্রহে।
শ্রীশ্রীঠাকুর সম্পূর্ণ একাকী। তাঁর ভাবগম্ভীর মৌন মূর্তির সন্নিকটে কারো যাওয়ার সাধ্য নাই। কি যেন এক অব্যক্ত নিষেধবাণী তাঁর শ্রীমুখকান্তিতে উদ্ভাসিত। সমস্ত দিন তিনি কখনো মায়ের কটেজের বারাণ্ডায়, কখনো বা সেই শ্মশানভূমি পরিদর্শন মানসে বাঁধের উপর অস্থিরভাবে পদচারণা করছেন।
বেলা গেল গড়িয়ে। বর্ষাকালের বেলা কিছু বোঝা যায় না, আকাশও মেঘাচ্ছন্ন। শ্মশান থেকে আশ্রমের রাস্তাটী পদ্মার স্ফীত জলে নিমজ্জিত। যে সময়ের কথা বলছি সে সময়টা ছিল বোধ হয় ১৯২৫ সালের শ্রাবণ মাস। আশ্রমের সম্মুখভাগে বাঁধ পর্যন্ত কারো উপস্থিতি শ্রীশ্রীঠাকুর পছন্দ করছেন না বরং নিষেধ করে দিলেন। শেষে স্বয়ং এসে দাঁড়ালেন সেই শ্মশানের দিকে বাঁধের উপর । এমন স্থানে দাঁড়ালেন যে আক্রমণকারীদের প্রথম বলি হবেন তিনিই । স্থির দৃষ্টে চেয়ে আছেন ক্রুদ্ধ মুসলমান জনতার দিকে। মুর্তি নিশ্চল—দৃষ্টি উদাস, নির্ভরতায় একাত নির্ভয়।
তিনি আদেশ করে পাঠালেন যেন কারো কাছে কোন অস্ত্র বা হাতিয়ার না থাকে। আসন্ন মৃত্যুর এই চরম মুহুর্তে অস্ত্র পরিত্যাগের এই আদেশে সৎসঙ্গিগণ হলেন বিচলিত। ডাঃ যতীন রায়, মনোহর বসু, প্রভৃতি কতিপয় বিশিষ্ট ভক্ত ক্ষুব্ধ অন্তরে কেষ্টদাকে বললেন ।—
“কেষ্টদা ! ঠাকুরের এ কী রকম আদেশ! ঐ সব দুর্বৃত্ত পিশাচদের প্রধান লক্ষ্যই হলেন তিনি। ঐ হিংস্র পশুর দলের তীক্ষ্ণধার ছুরিকায় তাঁর দেবদেহ হবে রুধিরালিপ্ত, আর আমরা থাকব নীরব দর্শকের ভূমিকায় দূর ব্যবধানে ! দেহে প্রাণ থাকা পর্যন্ত তাদের বাধা দিতে পারব না। না, না, এ হতে পারে না। হাতিয়ার আমরা ত্যাগ করব না।’ কেষ্টদা বললেন,’কী বলছেন আপনারা! এই অন্তিম মুহূর্তে তাঁর আদেশ বর্ণে বর্ণে প্রতিপালিত না হলে আমরাই হব তাঁর এবং আমাদের নিধনের কারণ। তাঁর দিকে চেয়ে দেখুন, কী একান্ত নির্ভরতায় তিনি নির্ভয় । আমাদেরও বলে দিলেন—মামেকং শরণং ব্রজ।’ কেষ্টদা (ভট্টাচার্য্য)র এই একটা মাত্র কথায় সকলের সম্বিৎ এলো ফিরে। নির্ভরতায় সকলেই হল মরণজয়ী নির্ভীক । সকল কণ্ঠে ধ্বনিত হল— “মামেকং শরণং ব্রজ।” মৃত্যুভয় সকলের অন্তর থেকে হল অন্তর্হিত।
ক্রমে সন্ধ্যার অন্ধকার এলো ঘনিয়ে। অটল ভাইকে শ্রীশ্রীঠাকুর আদেশ করলেন, হুজুর মহারাজের মন্দিরের সুউচ্চ চূড়ায় একগাছি লম্বা বাঁশ বেঁধে তারই ডগায় একটা হাজার বাতির বৈদ্যুতিক আলো জ্বেলে দিতে।
তখন আশ্রমে আমাদের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। অটল ভাই অচিরে তাঁর আদেশ প্রতিপালন করে বহুদূর পর্যন্ত করে দিল আলোকিত । আশ্রম আগমনের রাস্তাটী জলে নিমজ্জিত থাকাতে হয়ে আছে যেমন পিচ্ছিল তেমনি কর্দমাক্ত। শ্রীশ্রীঠাকুরের দয়ায় আক্রমণকারীদের আগমনপথ হয়ে গেল বেশ সুগম।
সমস্ত দিনের প্রস্তুতির পর আততায়িগণ আশ্রমের পথে হল অগ্রসর । মুহুর্মূহু আকাশ বাতাস হল মুখরিত ‘আল্লা হো আকবর’ ধ্বনিতে। স্রোতের মত ভেসে আসছে তাদের উল্লাসের কোলাহল। কিন্তু পথের পিচ্ছিলতায় তাদের গতি হল মন্থর ।
লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে আশ্রমবাসিগণ উৎকণ্ঠিত অন্তরে রদ্ধশ্বাসে অপেক্ষমাণ। সর্বনাশা মুহূর্ত আসছে ঘনিয়ে। বহুদিনের ঘটনা—স্মৃতির অন্তরালে ঝাপসা হয়ে গেলেও সে দিনের সেই রোমাঞ্চ কেউ ভুলতে পারবে না।
তারা আসছে অতি সন্তর্পণে পা টিপে টিপে, আছাড়ের আঘাত বাঁচিয়ে। অপরের জীবন হননে যারা উন্মত্ত—নিজের সামান্য আঘাতটুকুতেও তারা এমনই সতর্ক। ধীরে ধীরে তারা হল উপস্থিত আশ্রমের বাঁধের কাছে। আশ্রম বাটিকার সম্মুখভাগ উজ্জ্বল আলোকে উদ্ভাসিত। জনবহুল আশ্রমপ্রাঙ্গণে জনমানবের চিহ্নমাত্র নাই। কোলাহলমুখর আশ্রমে আজ মরণের স্তব্ধতা। সম্মুখভাগে দণ্ডায়মান দিব্যকান্তি শ্রীশ্রীঠাকুরের নিশ্চল মূর্তি— একাকী, সম্পূর্ণ অরক্ষিত।
এই বিসদৃশ পরিবেশ সন্দৰ্শনে অনিশ্চিত বিপদাশঙ্কায় আততায়িগণ হল নিশ্চল । পশ্চাতের জনতা ঠেলছে অগ্রবর্তী জনতাকে, কিন্তু অগ্রবর্তী জনতা দ্বিধাগ্রস্ত। এইখানে তাদের চলছে একটা হুড়োহুড়ি, একটা জটলা, একটা কোলাহল ।
আক্রমণকারীদের দ্বিধাগ্রস্ত নিশ্চলতা আর কতক্ষণই বা স্থায়ী হবে। ক্ষণকাল মধ্যেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়বে ঐ দেবদেহের উপর। কম্পিত অন্তর আশ্রমবাসিগণের শ্বাসরুদ্ধ, বিস্ফারিত নয়নের অপলক দৃষ্টি ঐ দেবদেহে নিবদ্ধ। সর্বনাশা মুহূর্তের ব্যবধান আর কতটকুই বা । চেতনার আর সাড়া নাই কোন দেহে—সম্বিৎহারা ভক্তবৃন্দ নিস্পন্দ ।কিন্তু এ কী! পিছনে এ কিসের শব্দ ! ছ্যাব্-ছ্যাব্ -ছ্যাব্। প্রায় দশ-বার জন গুর্খা মিলিটারী কুইক মার্চে এসে শ্রীশ্রীঠাকুরকে জানালো অভিবাদন— মিলিটারী কায়দায়। পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল বন্দুক উদ্যত করে আততায়ীদের দিকে। অপেক্ষায় রহিল শ্রীশ্রীঠাকুরের আদেশের জন্য।
অকস্মাৎ এই মিলিটারীর আবির্ভাবে সোরগোল পড়ে গেল আততায়িগণের মধ্যে। সকলের মুখে, মিলিটারী, মিলিটারী, পালাও পালাও । পরের প্রাণ হননের উল্লাসে যারা ছিল উন্মত্ত নিজের প্রাণের মমতায় তারা হল দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য। পথের কাদায় হল কর্দমাক্ত, আছাড় খেয়ে ভাঙ্গলো কারো হাত পা, নিজেদের অস্ত্রশস্ত্রে কেউ বা হল ক্ষতবিক্ষত — প্রাণরক্ষার-ব্যাকুলতায় ভ্রূক্ষেপের সময় নাই কারো। নিমেষের মধ্যেই সেই দল হল উধাও।
মিলিটারীগণ সমস্ত আশ্রম নিরীক্ষণ করে শ্রীশ্রীঠাকুরকে অভিবাদন জানিয়ে চলে গেল ।
আশ্রমবাসিগণের উৎকণ্ঠায় অবসন্ন মনে এতক্ষণে এলো প্রশান্তির স্বাচ্ছন্দ্য। সকলের মুখে ফুটে উঠল মুক্তির আনন্দ।
কিন্তু হঠাৎ ঐ মিলিটারীর আবির্ভাব এবং অন্তর্ধান প্রশ্নটা জেগে রইল সকলের মনে। পরে শ্রীশ্রীঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন—
‘কমু ক্যামনে, কনে থেকে এলো তারা’। প্রশ্নের জবাব আজো মেলেনি ।
সারাদিনব্যাপী আশ্রমের সেই চরম উৎকণ্ঠার সময় হিমাইতপুরের চক্রান্তকারী হিন্দু বাসিন্দাগণ উৎকর্ণ হয়ে স্ব-স্ব গৃহেই আছেন তাঁদের মনোরথ-সিদ্ধির আনন্দে। আশ্রম থেকে ওই বুঝি ভেসে আসছে মুহুর্মূহু অন্তিম আর্তনাদ ৷ মোক্ষম আঘাতের সার্থক চরিতার্থতায় সন্তুষ্ট অন্তরে তাঁরা নিশ্চিত। তাঁদের চক্রান্তের অব্যর্থ স্বপ্নে আজ তাঁরা গর্বিত।—পাবনা · শহরবাসী হিন্দুগণেরও স্বস্তিবোধ স্বতঃস্ফূর্ত। তাঁরাও চরম সংবাদের আশায় অপেক্ষমাণ।
কিন্তু শয়তানী চক্র ব্যর্থতায় হল ম্রিয়মাণ।
রাত্রি তখন বোধ হয় দশটা। পাবনা শহর থেকে উচ্চপদস্থ পুলিস কর্মচারি-গণ আশ্রমে হলেন উপস্থিত। শহর থেকে হিমাইতপুরের ব্যবধান মাত্র দু’মাইল । সৎসঙ্গের মত বিখ্যাত ধর্ম প্রতিষ্ঠানের আক্রমণ-সংবাদ পাবনার ঘরে ঘরে পড়েছে ছড়িয়ে। দলে দলে মুসলমান আসছে শহর থেকে এই গ্রামে। পুলিস কর্তৃপক্ষের তা না জানার কথা নয় । সমস্ত দিন ধরেই যেখানে চলছে প্রস্তুতি সেখানে তাদের বাধা দেবার সময় তো যথেষ্ট ছিল, কিন্তু তারা সমস্ত দিন রইলেন নিষ্ক্রিয়। পাবনার পুলিশ কর্মচারিগণ প্রায় সকলেই মুসলমান-সম্প্রদায়ভুক্ত। হয়ত সম্প্রদায়গত নীচতায় তাদেরও অন্তর ছিল কলুষিত। এখন বোধ হয় এসেছেন হতাহতের সংখ্যা ও সম্পত্তি লুঠতরাজের পরিমাণ ইত্যাদির তথ্য সংগ্রহে। যাই হোক, তাঁরা এসে উপস্থিত হলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে। এই ঘটনার সূত্রপাতের কথায় বললেন, এ কী অন্যায় আবদার, শ্মশানে শবদাহ হবে না ? আমরা উপস্থিত থেকে শবদাহ করিয়ে যাব। শব নিয়ে চলনে শ্মশানে। শ্রীশ্রীঠাকুর সহাস্যে বললেন, আপনাদের উপস্থিতিতে শবের দাহ হতে পারে বটে, কিন্তু তাতে কি ভ্রান্ত প্রতিবাসীদের মনের দাহ প্রশমিত হবে ? শবদাহ আশ্রমের মধ্যেই হবে— আপনারা সে জন্য চিন্তিত হবেন না।
পাবনার পুলিশ কর্মচারীদের সঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুরের বোধ হয় এই প্রথম পরিচয়। তাঁরা মুগ্ধ হয়ে গেলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের কথার সারবত্তায়। পুলিস-সুপার বললেন, এমন লোকের নিধন সাধনে যারা উদ্যত হয় তাদের উচিতমত শিক্ষার প্রয়োজন। আপনি অনুগ্রহ করে তাদের নামগুলো আমাদের দিন— আমরা তাদের উচিতমত শিক্ষা দেব।
একটু বিনীত হাসি হেসে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন, শারীরিক শাস্তি দিয়ে কি মানুষের পরিবর্তন করা যায় ? আমার শাসন হল ক্ষমার—ভালবাসার। এই অপ্রত্যাশিত উক্তিতে পুলিশ কর্মচারিগণ হলেন অধিকতর সশ্রদ্ধ।বললেন, আপনার সম্বন্ধে আমাদের পূর্বধারণার সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে। আপনি হিন্দুদের যাই হোন না কেন— আমাদের পীর। আশ্রমের কেশাগ্র যাতে স্পর্শ করতে কেউ সাহস না পায় সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি থাকবে। প্রলয়ের বিধ্বংসী দুর্যোগের পর আশ্রমে ফিরে এলো প্রশান্তির আনন্দ । একমাত্র শরণ শ্রীশ্রীঠাকুরের উপর সকলের শ্রদ্ধা নিবিড় হয়ে উঠল।
কথায় বলে, খাল কেটে কুমীর আনা । এখন পাবনাতে হয়েছে তাই। ঈর্ষান্বিত হিমাইতপুর-গ্রামবাসী হিন্দুগণের আশ্রম আক্রমণের প্ররোচনায় পাবনার উন্নত মুসলমানগণ এখন ঝাঁপিয়ে পড়ল গ্রামাঞ্চলের দিকে। পাবনা শহরে ইংরাজ কর্তৃপক্ষের শাসনে তাদের অবাধ উচ্ছৃঙ্খলতায় বাধা পেয়ে তারা গ্রামাঞ্চলের হিন্দু-নিধনে হল উন্মত্ত। বহু হিন্দু গৃহস্থ এখানে মুসলমান প্রতিবেশী দ্বারা পরিবেষ্টিত। প্রতিবেশিসুলভ সখ্য থাকা সত্ত্বেও তাদের পক্ষে প্রতিবেশী হিন্দুদের রক্ষার জন্য বহিরাগত মুসলমান ভাইদের বাধা দেবার কোন উপায় নাই। গ্রামের মুসলমান মণ্ডলগণেরও তাদের বাধা দানের সামর্থ্য নাই ।
… দিনের পর দিন সুদূর গ্রামাঞ্চল থেকে মর্মান্তিক ঘটনাবলীর সংবাদ শোনা গেল। ইতিমধ্যে হিমাইতপুর গ্রামের মুসলমানগণের অর্থাগমকেন্দ্র আশ্রমে অর্থোপার্জনের কোন উপায় না থাকাতে দুর্বিষহ দুর্দশার মধ্যেই তাদের চলেছে উপবাস। ক্রমে তারা প্ররোচনাদাতা হিন্দু অধিবাসীদের উপর হয়ে পড়ল ক্রুদ্ধ। গুজব শোনা গেল হিমাইতপুর গ্রামটাও আক্রান্ত হবে। ঈর্ষাপ্রসূত কর্মফল এখন হিমাইতপুর গ্রামের হিন্দুদের হবে ভোগ করতে। তাঁরা সকলেই হয়ে পড়লেন আতঙ্কিত। পাবনা শহর তখনো উত্তপ্ত — সুতরাং সেখানেও তাঁরা নিরাপদ নন—আবার ভিন্ন পল্লীতে ততোধিক দুরবস্থা। যাঁরা গ্রামস্থ মুসলমানগণকে আশ্রমধ্বংসের প্ররোচনা দিয়েছিলেন তাঁরা অত্যন্ত বিপন্ন বোধে অবশেষে হলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের শরণাপন্ন । বললেন, আজ আমরা সকলেই বিপদাপন্ন। হিমাইতপুর গ্রাম নাকি আক্রান্ত হবে। ছেলেপুলে নিয়ে যাই বা কোথায় ? আশ্রমে তবু পুলিশ প্রহরা আছে। আর কোথাও তো নিরাপদ মনে করি না । এখানে আমাদের একটা আশ্রয় দিতে হবে। এইজন্য আমরা এলাম ।
শ্রীশ্রীঠাকুর অত্যন্ত সহানভূতির সঙ্গে তাদের বক্তব্য শুনে বললেন, ‘শুধু আপনারা বিপন্ন নন । বিপন্ন আজ সমস্ত গ্রামাঞ্চল । পাবনার সকল হিন্দু আজ অসহায় । সকলের কথাই ভাবতে হবে।’ হিমাইতপুরের হিন্দুগণ শ্রীশ্রীঠাকুরের কথা উপলব্ধি করতে না পেরে তাঁকে ভুল বুঝলেন। তাঁরা মনে করলেন হিন্দু জনসাধারণের জন্য তাঁর প্রাণ কাঁদছে এই বলে তাঁদের আবেদন তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন। মনঃক্ষুণ্ণ হয়েই তাঁরা নিলেন বিদায় ।
গ্রামাঞ্চলের অসহায় হিন্দুদের জন্য শ্রীশ্রীঠাকুর ছিলেন খুবই উদ্বিগ্ন। সেদিন সকালেই তিনি শ্রদ্ধেয় কিশোরীদা আর আকুদাকে আদেশ দিলেন পাবনার গ্রামাঞ্চলের মুসলমান মোড়লদের কাছে সেইদিনই তাদের আমন্ত্রণ করে আশ্রমে নিয়ে আসতে !
আদেশ প্রাপ্তিমাত্র তাঁরা দুজন বহির্গত হলেন এই আদেশ প্রতিপালনে। সে সময়ে মুসলমান অধ্যুষিত জনপদ পরিক্রমা সাক্ষাৎ মৃত্যুর নামান্তর। কিন্তু শ্রীশ্রীঠাকুরের কণ্ঠনিঃসৃত আদেশই তাঁদের কর্ম । কারো সাধ্য নাই সেই রক্ষা-কবচ ভেদ করে তাঁদের কোন অনিষ্ট সাধন করতে পারে। তাঁরা নির্ভয়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরের মণ্ডলগণকে শ্রীশ্রীঠাকুরের আমন্ত্রণ বিজ্ঞাপিত করে চলেছেন। অকুতোভয় এই দুজন সম্মানীয় ব্যক্তির সাহসিকতায় মণ্ডলগণ হলেন মুগ্ধ। তাঁরা শ্রীশ্রীঠাকুরের উপর বরাবরই সশ্রদ্ধ। আমন্ত্রণ গ্রহণে তাঁরা আগ্রহী হলেন বটে, কিন্তু অন্তরায় হল মৌলভী-ভীতি। কারণ এ সময়ে যদি মৌলভীগণ জানতে পারেন যে তাঁরা শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে গেছেন পরামর্শে’র জন্য, তাহলে তাঁদের প্রাণসংশয়। অবশেষে ঠিক হল যে তাঁরা শেষ রাত্রের গভীরে সকলের অজ্ঞাতসারে আশ্রমে উপস্থিত হবেন। শ্রীশ্রীঠাকুরের উপদেশ শোনবার জন্য ।
মণ্ডলগণ একে একে আশ্রমে হলেন সমবেত। সৎসঙ্গ মন্দিরের বড় ঘরটায় তাঁদের সমাবেশের স্থান ছিল নির্দিষ্ট। সেই স্বল্পবিদ্য গ্রাম্য মণ্ডলগণেরসমাবেশে করুণাঘনবিগ্রহ শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর আসনে হলেন সমাসীন। তাঁর ব্যথাতুর মুখমণ্ডলের বর্ণনার ভাষা নাই ।
হন্তার মুষ্টিবদ্ধ তীক্ষ্মধার সংহারিকার মুখে আক্রান্তের আসন্ন মৃত্যুর বিভীষিকার ভয়ার্ত মুখখানি কি দেখেছেন ? দেখেছেন কি, ‘আমায় মেরো না, আমায় বাঁচাও—বাঁচাও’ বলে সে মুখে প্রাণভিক্ষার কী ব্যাকুল আবেদন ? যদি না দেখে থাকেন তাহলে আসুন মণ্ডলগণের এই নিশীথ-পরিবেশে। দেখুন শ্রীশ্রীঠাকুরের শ্রীমুখমণ্ডলে অসহায় হিন্দুগণের নিষ্ঠুরতম হত্যার সে কী পুঞ্জীভূত বেদনা বিগলিত ধারায় ঝরে পড়ছে তাঁর নয়নে! জীবনরক্ষার কী কাতর আবেদনের আকুতি ফুটে উঠছে তাঁর বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে। এ দৃশ্যে পাষাণেরও হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যায়। আবেগাপ্লুত কম্পিত কণ্ঠের সেই প্রাণবন্ত ভাষণটী কালের ব্যবধানে যদিও এখন ঝাপসা হয়ে গেছে তবু যতটকু স্মৃতিপথে টেনে আনতে পারি তাই সংক্ষেপে এখানে উদ্ধৃত করে যাই। ভাষণটী সংক্ষেপতঃ এইরূপে।—
“জীবনকে রক্ষা করে চলাই খোদার সৃষ্ট জীবমাত্রেরই সহজ ধর্ম । রক্ষার এই প্রচেষ্টা তার দুর্নিবার, নতুবা তার অস্তিত্বই থাকে না। শিশু ভূমিষ্ঠ হয়েই কেঁদে ওঠে প্রাণহানির আশঙ্কায়। যতই সে বড় হয়— জ্ঞান ও বুদ্ধিকে সজাগ করে রাখে জীবনটাকে ধরে রাখতে। খোদার আশীর্বাদপূত সেই জীবনের অস্তিত্বকে হননের উল্লাসে যারা নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে তারা শয়তানের সহচর তাতে সন্দেহ নাই। খোদার সৃষ্টিকে শয়তান ধ্বংস করতে চায়, তাতেই তার উল্লাস। জিঘাংসার উন্মত্ততায় শয়তানের সহচরগণ হয় নিষ্ঠুর, হিংস্রতায় তারা হয়ে ওঠে দুর্মদ। প্রাণরক্ষার কাতর আবেদনে জাগায় না কোন সাড়া— দয়া, স্নেহ, মমতা প্রভৃতি সুকুমার বৃত্তিগুলো তাদের মধ্যে নিরেট হয়ে যায়। এই সব হিংস্র পশুর দল যে জাতির মধ্যে গঙ্গাতে থাকে পরস্পর হানাহানিতে সে জাতি নিঃশেষ হয়ে যায়।
প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করলেই— সে নেবে তার প্রতিশোধ । উন্মত্ত হয়ে আমি আজ যা করব ভবিষ্যতে তাই তোলা থাকবে আমারই জন্য। খোদার দুনিয়ায় অবিচার নাই ।”
বিগলিত-অন্তর মণ্ডলগণ সাশ্রুলোচনে শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে করজোড়ে প্রতিজ্ঞা করলেন যে তাঁরা জীবন দিয়েও হিন্দু ভাইদের রক্ষা করবেন।
রাত্রির শেষযামে মণ্ডলগণ গেলেন চলে, পরদিন থেকেই পরিস্থিতির হল অদ্ভুত পরিবর্তন । আশ্রম থেকে পাকশী পর্যন্ত প্রায় ষোল মাইল ব্যাপী অঞ্চলে আর কোন অপ্রীতিকর সংবাদ পাওয়া যায়নি। হিন্দুমেধযজ্ঞের হল পরিসমাপ্তি। পাবনা শহরও হল শান্ত ।
কিন্তু হিমাইতপুর গ্রামের মুসলমানদের দুর্দশার আর অন্ত নাই । তাদের অর্থাগমের একমাত্র স্থান সৎসঙ্গ আশ্রম, সেখানে মুখ দেখানোর পথ নাই। গ্রামস্থ হিন্দুগণের ত সহানুভূতি তারা হারিয়েছে ।
আবার আশ্রম আক্রমণ-জনিত অপরাধে তারা যে দায়রা সোপর্দ হবে না তা কে বলতে পারে ? মোট কথা ধনে প্রাণে পুত্র পরিবার সহ তারা এখন মরতে বসেছে। কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত, মার্জনার কোন পথই খোলা নেই তাদের।
সে দিন সকালে অনন্ত মহারাজ গ্রামের পথ দিয়ে চলেছেন এক বাড়ীতে রোগী দেখতে। পথিমধ্যে ঘিরে ধরল বুভুক্ষিত মুসলমানগণ। ক্ষীণকণ্ঠেতারা বললে, ডাক্তার বাবু ! আমাগো মারি ফ্যালায়ে দ্যান। পাবনার ভাষায় তাদের বক্তব্য হল, তারা যে পাপকর্ম করেছে তার মার্জনা নাই। সারা জীবন তাদের জেলে পচতে হবে, পোলাপান অর্থাৎ ছেলে-পিলে গুলোর কি হবে সেই ভাবনা। তারা তো না খেতে পেয়ে শুকিয়ে মরে যাবে। তাদের প্রার্থনা ছেলেগুলোকে ঠাকুর যেন দেখেন। করে নি। তারা তো কোন অপরাধ করে নি।
বিশীর্ণদেহ গ্রামস্থ মুসলমানদের কাতর প্রার্থনায় মহারাজের চক্ষু সজল হয়ে উঠল, তিনি বললেন,’তোরা সকলে মিলে তাঁর কাছে ক্ষমা চা গা। তোদের অপরাধ তিনি মার্জনা করেছেন। পুলিশ তোদের শাস্তি দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি বললেন, ওরা যে আমার আশ্রিত। ওদের শাস্তি হলে ওদের পরিবারবর্গের সকলেই মরে যাবে।’
অনুতপ্ত মুসলমানগণ শ্রীশ্রীঠাকুরের অশেষ করুণার সংবাদে বিগলিত অন্তরে তাঁর পুরোভাগে লুটিয়ে পড়ে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে তাদের কৃতকর্মের জন্য চাহিল মার্জনা।
করুণাময় ঠাকুর তাদের আশস্ত করে বললেন,’অমন কাম আর কখ্খনো করিস নে বুঝলি তো ? কাল সকাল থেকে আশ্রমের কাজে লেগে যা। আর কিছু টাকা মহারাজের কাছ থেকে নিয়ে ছেলেপেলেগুলোকে বাঁচিয়ে তোল্। পরে না হয় খেটে শোধ করে দিস।’
জীবনবেদই যাঁর বেদ, সর্বপ্রকার দুঃখদুর্দশা থেকে মানবের উদ্ধারসাধনই যাঁর সাধনা আপামরে মৃত্যুঞ্জয়ী মহামন্ত্রদানে যিনি মুক্তহস্ত, তাঁর অপার করুণায় হিন্দুগণ সে যাত্রা হলেন নির্বিঘ্ন, নারীগণের মর্যাদা হল নিরাপদ, সকলের উৎকণ্ঠা-আতঙ্কের হল অবসান। কিন্তু তবু কি মানুষে দেয় তার সামান্যতম কৃতজ্ঞতার পরিচয়। ———

আচার্য্য পরম্পরা

।। আচার্য্য পরম্পরা ।‌।
[ভালোই সব চলছিল। সৎসঙ্গ নিয়ে বেশ আনন্দেই মেতে ছিলাম। হঠাৎ তালটা যেন
কেটে গেল। দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রম থেকে প্রকাশিত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র
লিখিত ‘সত্যানুসরণ’ নামক গ্রন্থের ৪৫তম সংস্করণের ৬৫তম পাতার প্রথম
অনুচ্ছেদের বাণীর উপদেশটা আমাকে বেশ বিপাকে ফেলে দিয়েছে। আমার নাম দিবাকর
বৈদ্য। আমি অকপটে সব ‘খ্যাপন’ করলাম। দয়া করে আমার কথাগুলো একটু
শুনবেন। বলা যায় না, আপনাদেরও কাজে লেগে যেতে পারে।]
* * *
একজন দাদা, নাম অনিমেষ চৌধুরী। দেখা হলেই ‘জয়গুরু’ দিয়ে সম্ভাষণ
করেন। ভালো-মন্দ খোঁজখবর নেন। মাঝে-মাঝে ঠাকুরের কথা বলেন। বাড়িতে যেতে
বলেন। একদিন সন্ধ্যা-প্রার্থনার আগে ওঁর বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম।
ভাবলাম, ওনার বাড়ীতেই না-হয় আজকের প্রার্থনাটা করে নেব। উনি দু’জন মা’কে
নিয়ে বসে তখন ধ্যান করছিলেন। পরে জেনেছিলাম ওই দু-জনা ছিলেন ওঁর স্ত্রী
ও কন্যা। সামনে ঠাকুরের একটা মাত্র প্রতিকৃতি। আমার উপস্থিতি বুঝতে পেরে
বসতে বললেন। অনিচ্ছা সত্বেও বসলাম। অনিচ্ছা সত্বেও বলতে বাধ্য হলাম,
কারণ, ওনার বাড়িতে ঠাকুরের ফটো ছাড়া জগজ্জননী বড়মা, শ্রীশ্রীবড়দা,
বর্তমান আচার্য্যদেব পূজ্যপাদ বাবাইদা, পূজ্যপাদ অবিনবাবু-দের কোন
ছবি নেই।— যা’ কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারছিলাম না। আচার্য্য-পরম্পরাকে
যে বা যারা মানে না, তারা ‘ইষ্টদ্রোহী’, আমি তাদের সঙ্গ সবসময় এড়িয়ে চলার
চেষ্টা করি। তেমন শিক্ষাই পেয়েছি আমাদের ঋত্বিক দাদাদের কাছ থেকে। নতুন
পরিচয়, তাই আগে থেকে বুঝতে পারিনি, যে দাদাটি ইষ্টদ্রোহী।
আচার্য্য-পরম্পরা মানে না। মনে যাইহোক, ভদ্রতার খাতিরে মুখে বললাম,
দাদা, সময় তো পার হয়ে গেল, প্রার্থনা করবেন না।
—‘এই তো করবো।’ বলেই উঠে দাঁড়ালেন।
পাশে বসে থাকা মায়েদের দিকে ইশারা করতেই শঙ্খধ্বনি, হুলুধ্বনি বেজে
উঠল। অমনি দাদাটি ডান হাতটি উপরে তুলে, বাম হাতটিকে ঝুলন্ত রেখে কি-সব
বলতে লাগল। সবটা মনে নেই। তবে প্রথমদিকের শব্দগুলো— তমসার পার
অচ্ছেদ্যবর্ণ মহান পুরুষ … গোছের এইরকম কিছু। (যা আমাদের উপাসনা বইতে
লেখা আছে দেখেছি।) তারপর প্রার্থনা শুরু করলেন। প্রথম দুটো বিনতির পর
‘গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু’ না করে আবার কীসব বলতে শুরু করলেন। বাংলা আর
সংস্কৃতে। তারপর শুরু করলেন ‘গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু’। তারপর আবার
কতগুলো সংস্কৃত মন্ত্র আওড়াতে লাগলেন।—যা আমি কোনদিন কোন সৎসঙ্গ
অধিবেশনে করতে দেখিনি। আমার ধৈর্য্যের, রাগের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছিল। তবুও
কৌতুহল বশে নিজেকে সংযত করে নিলাম। ওনার মনগড়া প্রার্থনা শেষে আমাকে
সত্যানুসরণ-এর একটি নির্দিষ্ট অংশ থেকে পাঠ করতে বললেন, আমি পাঠ
করলাম—‘‘কোন-কিছু ‘আজ বুঝেছি আবার কাল বুঝা যায় না—হেঁয়ালি’ ইত্যাদি
ব’লে শৃগাল সেজো না—কারণ, ইতর জন্তুরাও যা’ বোঝে তা’ ভোলে না। তাই, এই
প্রকার বলাটাই দুষ্ট বা অস্থির-বুদ্ধির পরিচায়ক।’’
আমার পড়া শেষ হতেই উনি ‘চলার সাথী’ গ্রন্থ থেকে ‘সন্ধ্যা ও প্রার্থনা’ অংশটি পাঠ করলেন। পাঠ শেষ করে আমাকে একটা কীর্তন করতে বললে,
আমি কিছুটা অনিচ্ছা সত্বেও ‘জয় রাধে রাধে’ কীর্তনটা করলাম। কীর্তনটা শেষ
হলে উনি আমার খুব প্রশংসা করে বললেন, খুব ভাল লাগল তোমার
কীর্তন,—‘ছাড়োরে মন কপট চাতুরি, বদনে বলো হরি হরি!’—কি অপূর্ব কথা!
তাই না ভাই ?—তারপর যেন অনেকটা আক্ষেপের সুরেই বললেন, ‘কোথায় আর পারলাম
কপটতা ত্যাগ করে ধর্মরাজ্যে প্রবেশ করতে!’ —ঠিক আছে! তাহলে ধ্বনি দিয়ে
দি। কি বলো?
আমার সম্মতি পেয়ে উনি ‘বন্দে পুরুষোত্তমম্! বন্দে আর্য্য পিতৃন!
বন্দে মাতৃবর্গান্! বন্দেহংকৃষ্টি দৈবতান্!— ইত্যাদি ধ্বনি দিয়ে
প্রার্থনা-পর্বের ইতি টানলেন। বড়মা এবং আচার্য্যদেব-দের নামে কোন ধ্বনি
দিলেন না। আমার মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। —এ তো অন্যায়! অন্যায়কে
প্রশ্রয় দেওয়াও তো অন্যায়। তাই আমি সহ্য করতে না পেরে বলেই
বসলাম,—দাদা! আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি ?
—অনায়াসে করতে পার।
—আপনি চলার সাথী থেকে ‘সন্ধ্যা ও প্রার্থনা’-র বাণীটা পড়লেন, অথচ
আপনি প্রার্থনার সময়সূচী মেনে প্রার্থনাটা করলেন না। আর প্রার্থনাটাকেও
বিকৃত করে করলেন। যেগুলো ঠাকুর করতে মানা করে গেছেন। আর একটা কথা, আপনি
আপনার বাড়ীতে শ্রীশ্রীবড়মা, শ্রীশ্রীবড়দা, শ্রীশ্রীআচার্য্যদেব, পূজনীয়
বাবাইবাবা, পূজনীয় অবিনবাবুদের কোন ছবি রাখেন নি, তাঁদের নামে কোন ধ্বনিও
দিলেন না!—কেন, জানতে পারি কি?
আমার কথা শুনে হা-হা করে হেসে উঠে বললেন, তোমার কথাটা ঠিক সোনার
পাথরবাটির মত হয়ে গেল না-কি?
—তার মানে?
—তার মানে হলো এই, শ্রীশ্রীঠাকুর চলার সাথী গ্রন্থে ‘সন্ধ্যা ও প্রার্থনা’ শিরোনামে যে বাণীটি লিপিবদ্ধ করেছেন, তার মধ্যে তিনি তাঁর
রচিত ‘আর্য্যসন্ধ্যা’ ও ‘প্রার্থনা’-র কথা বলেছেন। উক্ত প্রার্থনার
অস্তিত্ব যেখানে বিলুপ্ত করা হয়েছে, সেখানে প্রার্থনা না করে
প্রার্থনার-সময়সূচী দিয়ে কি হবে? আর ইষ্টাসনে সদগুরু ছাড়া অন্যান্য ছবি
রাখতে গেলে তো সত্যানুসরণ থেকে ‘‘গুরুই ভগবানের সাকার মূর্ত্তি, আর তিনিই
Absolute (অখণ্ড)।’’—লেখাটি বাদ দিতে হবে।
—প্রার্থনার অস্তিত্ব বিলুপ্ত করা হয়েছে মানে!— আপনি কি বোঝাতে
চাইছেন? দেওঘরে, অসংখ্য কেন্দ্র-মন্দিরগুলোতে সকাল-সন্ধ্যায় তাহলে কি
করা হয়?
—যা করা হয় সেগুলো শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র রচিত এবং নিদেশিত
প্রার্থনা নয়। তুমি এ বিষয়ে যদি জানতে চাও, প্রার্থনা বিষয়ক প্রামাণ্য
গ্রন্থ ঋত্বিগাচার্য্য প্রণীত ‘অনুসৃতি’ এবং ‘সৎসঙ্গ পাব্লিশিং প্রকাশিত
‘প্রার্থনা’ শিরোনামের গ্রন্থটি ভাল করে পড়ে নিও।
—দেখুন ওসব পড়ার আমার দরকার নেই। ওসব এখন অচল। আমরা
আচার্য্যদেবের নির্দেশে ‘উপাসনা’ বইটাকে মেনে চলি। উপাসনা বইয়ের প্রথমেই
লেখা আছে ১৯৬৫ সালে শ্রীশ্রীঠাকুর ওসব বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন।
আমার কথা শুনে দাদাটি ‘হো-হো’ করে আবার পাগলের মত হেসে উঠে বলল,
তোমার কথার উত্তরটা ঠাকুর সত্যানুসরণের ৬৫ সংখ্যক পাতায় দিয়েছেন, যেটা
আজকে তুমি পাঠ করলে। আমার প্রতি রাগ না করে, বাড়িতে গিয়ে বাণীটা ভাল করে
বোঝার চেষ্টা করবে।
যাইহোক, লোকটার ব্যবহারে আন্তরিকতার সুর ছিল। ফেরার সময় আমাকে ৫টা
ফল এবং কিছু ভ্রাতৃভোজ্যও দেয়। আমি স্থান ত্যাগ করে বাড়ি না ফিরে আমাদের
কেন্দ্র-মন্দিরে চলে যাই। এ বিষয়ে একটা হেস্তনেস্ত করার জন্য। ভাগ্য ভাল, দেখা
পেয়ে যাই বিভাস সরকারদার। প্রবীণ ঋত্বিক-দেবতা। ঠাকুর দেখা মানুষ,
আচার্য্যদেবের কাছের লোক, তাঁর কাছে গিয়ে ঘটনাটা খুলে বলি। তিনি সব শুনে
বললেন, ঠিক আছে তুমি বাড়ি চলে যাও, দেখি কি করা যায়।

  • * *
    তারপর বেশিদিন কাটেনি। সুভাসদার সাথে সৎসঙ্গ সেরে ফিরছিলাম।
    ভাগ্যক্রমে দেখা হয়ে যায় অনিমেষদার সাথে। আমি সুভাসদার সাথে অনিমেষদার
    পরিচয় করিয়ে দিলে, সুভাসদা অনিমেষদাকে বলেন আপনি আমাদের গুরুভাই অথচ
    মন্দিরে আপনাকে দেখি না, কি ব্যাপার?
    —‘আমি কি ওখানে ভণ্ডামি করতে যাব?’ অনিমেষদার অনভিপ্রেত উত্তর
    শুনে সুভাসদা বলেন—ভণ্ডামি বলছেন কেন, আমরা কি ওখানে ভণ্ডামি করছি?
    —ওটা আমার কথা নয়, ঠাকুরের কথা।
    —ঠাকুরের কথা! প্রমাণ দিতে পারবেন?
    —অবশ্যই। তবে রাস্তায় নয় বাড়িতে চলুন, ঠাকুরের বই খুলে প্রমাণ দেব।
    —দেখুন, এখন তো আপনার বাড়িতে যাওয়া সম্ভব না, বরং কাল সকালে
    প্রেয়ারের আগে মন্দিরে আসুন, প্রেয়ারের পর না হয় যুক্তিতর্ক করা যাবে।
    —দেখুন, মনে কিছু করবেন না, আবার আমাকে অপ্রিয় কথা বলতে বাধ্য করলেন।
    —এমন কি বললাম, যাতে আপনাকে অপ্রিয় কথা বলতে হবে?
    —ওই যে প্রেয়ারের কথা বললেন না, আপনারা কি প্রেয়ার করেন, যে
    প্রেয়ার করতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন!
    —এ আপনি কি বলছেন! দেওঘর থেকে নির্ধারিত প্রেয়ারের সময়সূচী মেনে
    রীতিমত মাইকের মাধ্যমে আমাদের মন্দিরে প্রেয়ার করা হয়, আপনি বলছেন, আমরা
    প্রেয়ার করি না! আপনি প্রমাণ করতে পারবেন তো?
    —অবশ্যই।
    —তাহলে কাল আসুন আপনার প্রমাণপত্র সব নিয়ে।
  • * *
    মন্দিরের কাছে বাড়ী হবার সুবাদে প্রায় প্রতিদিনই মন্দিরে গিয়ে
    সকালের প্রার্থনাটা করি। সেদিন প্রার্থনা শেষে দেখি অনিমেষদা এসেছেন।
    বিভাসদা ওনাকে নিয়ে গিয়ে বসালেন।
    এবার বলুন আপনার বক্তব্য। ঠাকুরের বলা অনুযায়ী আমরা যে ভণ্ডামি করছি,
    প্রেয়ার করছি না, প্রমাণ করে দেখান।
    অনিমেষদা সত্যানুসরণ গ্রন্থটি বের করে বলেন, আপনারা এই বইটিকে যদি
    মানেন, তাহলে দেখুন ৩১ পৃষ্ঠায় রয়েছে, ‘‘গুরুই ভগবানের সাকার মূর্ত্তি,
    আর তিনিই Absolute (অখণ্ড)।’’ আবার ৫৭ পৃষ্ঠায় ঠাকুর আত্ম-প্রচারকদের
    ভণ্ড বলেছেন।
    —ঠাকুর, আত্ম-প্রচারকদের ভণ্ড বলেছেন, আমরা তো আর আত্ম-প্রচারক নই!
    —গুরুর পাশে শিষ্যদের ছবি রেখে প্রচার করা কি সত্য প্রচারের নামে
    আত্ম-প্রচার করা নয়?— আপনারা প্রার্থনার নামে দয়ালবাগ সৎসঙ্গের যে
    বিনতি করেন, সেই বিনতিতে বলেন :
    “তুম্ বিন কোই সমরথ নহী জাসে মাঁগু দানা”
    “রাধাস্বামী গুরু সমরথ তুম বিনা আউর্ ন দুসরা ।”
    আবার শঙ্করাচার্য্য রচিত গুরু বন্দনায় বলি—
    “গুরোঃ পরতরং নাস্তি…..”
    “কেবলং জ্ঞানমূর্ত্তিম্ ।”
    ওই মন্ত্রগুলো একমাত্র গুরুকে উদ্দেশ্য করেই যদি বলা হয়ে থাকে তাহলে
    গুরুর আসনের পাশে কি গুরুর শিষ্যদের ছবি রাখা যায়? একটা প্রাইমারি
    স্কুলেও হেড্ স্যরের চেয়ারের একটা আলাদা মর্যাদা থাকে, আপনারা
    দাদা-প্রীতির নামে সে মর্যাদাটুকুও ক্ষুণ্ণ করে চলেছেন, এগুলোকে কি
    আত্মপ্রচার বলে না?
    সুভাসদাকে নিরুত্তর থাকতে দেখে অনিমেষদা বললেন, আপনারা যারা
    ঠাকুরের সাথে ঠাকুরের শিষ্যদের প্রচার করতে গিয়ে তাদের প্রতিকৃতিরও পূজা
    করছেন, তা ভণ্ডামি নয় কি? এই গেল ভণ্ডামির উত্তর। এরপর রয়েছে প্রেয়ার।
    এই দেখুন সৎসঙ্গ পাব্লিশিং প্রকাশিত ২ খানি গ্রন্থ। এটি শ্রীশ্রীঠাকুরের
    ইংরেজী ভাষায় লিখিত ‘লর্ডস্ প্রেয়ার’। ভাল করে দেখে বলুন তো এই প্রেয়ার
    আপনারা করেন কি-না?’
    সুভাসদা বইটা নেড়েচেড়ে দেখে বললেন, ‘না করি না’।
    —‘তাহলে দেখুন ‘প্রেয়ার’ না করেই মিথ্যা প্রেয়ারের গর্ব করে
    চলেছেন। ঠাকুরের ভাষায় এর নাম দ্বন্দ্বীবৃত্তি। সবচাইতে বড় পাপ। ঠিক আছে,
    ইংরেজীর কথা বাদই না হয় দিলাম, প্রেয়ার-এর বাংলা প্রার্থনা। বাংলা ভাষায় ঠাকুরের লেখা ‘প্রার্থনা’
    নামে একটা বই আছে এবং সেই বইটাও সৎসঙ্গ পাব্লিশিং থেকে প্রকাশিত। হিমাইতপুরে প্রথমে প্রথমে প্রকাশিত হয়। দেওঘরে প্রথম
    প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে। ভাল করে দেখুন তো, এই বইয়ের নিদেশ মেনে আপনারা
    প্রার্থনা করেন কি-না?’
    সুভাসদা বইটা ভাল করে নেড়েচেড়ে দেখে বললেন, ‘না, করি না’।—তবে এই
    প্রার্থনা করতে তো ঠাকুরই নিষেধ করে গেছেন ১৯৬৫ সালে, উপাসনা বইতে যা
    স্পষ্ট করে লেখা রয়েছে।
    —মনে কিছু করবেন না দাদা, যাকে আমরা ঠাকুর বলে মানি, সেই তিনিই
    যদি তাঁর রচিত প্রার্থনা করতে নিষেধ করেন, তাহলে তাঁর নাম করে দীক্ষার
    সঞ্চারণা করাও তো আর একটা ভণ্ডামি! কোন সাবজেক্ট নেই, সিলেবাস নেই অথচ
    ধরে ধরে এনে ছাত্র ভর্তি! কোন বুদ্ধিমান মানুষ কি মেনে নেবেন? আপনি যদি
    সত্যি-সত্যিই নিজেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের শিষ্য বলে মনে করেন
    তাহলে একটা কাজ অবশ্যই করা উচিত, আপনাদের আচার্য্যদেবকে বলে সত্যানুসরণ
    থেকে ‘‘কোন-কিছু ‘আজ বুঝেছি আবার কাল বুঝা যায় না—হেঁয়ালি’ ইত্যাদি
    ব’লে শৃগাল সেজো না—কারণ, ইতর জন্তুরাও যা’ বোঝে তা’ ভোলে না। তাই, এই
    প্রকার বলাটাই দুষ্ট বা অস্থির-বুদ্ধির পরিচায়ক।’’ এই অংশটা বাদ দিতে বলে
    বলে দিন।
    —কেন, প্রার্থনার সাথে সত্যানুসরণের বাণীর সম্পর্ক কি?
    —কারণ, পুরুষোত্তম যদি অভ্রান্ত হয়েই থাকেন, তাঁর নিদেশিত কোন
    বিধির পরিবর্তন তিনি কখনোই করেন না, কেউ করুক, তা-ও তিনি অনুমোদন করেন
    না, এমনকি কাউকে পরিবর্তন করার অধিকারও দেন না। তাই তিনি সত্যানুসরণের ওই
    বাণীতে বললেন, ‘ইতর জন্তুরাও যা’ বোঝে তা’ ভোলে না।’ তাই আমার তো মনে হয়,
    ঠাকুর তাহলে ভুল করে ওই বাণীটা দিয়েছিলেন, না হলে আপনারা তাঁর রচিত এবং
    নিদেশিত আহ্বানী, সন্ধ্যা ও প্রার্থনা-র সবটা বাদ দিয়ে, তাঁর নিদেশকে
    অমান্য করার ধৃষ্টতা দেখাতে পারতেন না!
    —দেখুন, আপনি আমাদের যতই যুক্তি দেখান, আমাদের ভোলাতে পারবেন না।
    এতক্ষণে বুঝতে পারলাম, আপনারা ঠাকুরের নির্দেশের আচার্য্য-পরম্পরা মানেন
    না। সে আপনারা না মানুন, আমরা কিন্তু আচার্য্যদেবের নির্দেশের বাইরে এক
    পা-ও চলতে রাজী নই।
    —খুব ভাল কথা, আপনি আমাকে বললেন, ‘‘আপনারা ঠাকুরের নির্দেশের
    আচার্য্য-পরম্পরা মানেন না।’’ একটা প্রশ্নের উত্তর দিন তো, আপনারা
    উপাসনা, অধিবেশন বা সৎসঙ্গ করার সময় আসনে আচার্য্য-পরম্পরার নামে বা
    অজুহাতে যাঁদের প্রতিকৃতি রাখেন, তাঁদের দেওয়া কোন প্রার্থনা, উপাসনা
    করেন কি?—অতএব আপনারা যে পদ্ধতিতে আচার্য্য-পরম্পরা মেনে চলছেন, ওইভাবে
    মেনে চলার কথা ঠাকুর কোথায় বলেছেন, তাঁর বলা প্রামাণ্য শ্রুতিবাণী থেকে
    প্রমাণ দেখাতে পারবেন?
    কেন জানি সুভাসদা কোন উত্তর দিতে পারলেন না দেখে অনিমেষদা বললেন,
    অভিধান মতে আচরণসিদ্ধ ব্যক্তিকেই ‘আচার্য্য’ বলে। যিনি যে বিষয়ের
    আচার্য্য হবেন, তাঁকে সে বিষয়ে আচরণসিদ্ধ হতে হবে। যেমন, আমরা নিউটন,
    আর্কিমিডিস, আইনস্টাইন প্রমুখ বিজ্ঞান-আচার্য্যদের কেউ দেখিনি। তাঁরা
    বিগত হবার পর তাঁদের আবিষ্কৃত সূত্র বা জ্ঞানের সাথে পরিচিত হই তাঁদের
    লিখে রাখা বইয়ের মাধ্যমে, তাঁদের বংশধরদের মাধ্যমে নয়। সেই বইগুলো বাজারে
    সহজলভ্য হলেও আমরা বই পড়ে সেগুলো নিজে নিজে আয়ত্ত করতে পারি না বলেই
    শিক্ষকদের মাধ্যমে শিখতে হয়। এবার কোন শিক্ষক যদি ওই বিজ্ঞান-আচার্য্যদের
    মূল সূত্রগুলো বাদ দিয়ে ভুল শেখাতে শুরু করেন এবং প্রতিপত্তির জোরে
    বংশানুক্রমিকভাবে জ্যেষ্ঠ-সন্তান-পরম্পরা চালাতে থাকে, মূলসূত্র জানা কোন
    ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছাত্র কি তা মেনে নেবেন?
    —তা কি করে হয়!
    —তাই যদি না হয়, তাহলে আপনারা কোন্ হিসেবে শ্রীশ্রীঠাকুর
    অনুকূলচন্দ্রের মূলসূত্র অর্থাৎ আদর্শকে সযত্নে পরিহার করা শ্রীশ্রীঠাকুর
    অনুকূলচন্দ্রের জ্যেষ্ঠ সন্তান পূজনীয় অমরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এবং
    পরবর্তী বংশানুক্রমিকভাবে জ্যেষ্ঠ-সন্তান-পরম্পরাদের ছবি পুজো করতে শুরু
    করেছেন? এঁরা কিসের আচার্য্য এবং কোন্ আচরণ দ্বারা আপনাদের শ্রীশ্রীঠাকুর
    অনুকূলচন্দ্রের অবিকৃত আদর্শ অনুসরণ বিষয়ে শিক্ষিত করেছেন বা করছেন?
    —দেখুন কিসের সাথে কিসের তুলনা করছেন? আমাদের দেশে আচার্য্য প্রথা কুলগুরু প্রথা কি চালু নেই?
    —আপনি যখন বলছেন, থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু ঠাকুর এ বিষয়ে কোন
    বাণীতে কি বলে গেছেন, সে সম্পর্কে যদি কিছু জানা থাকে বলুন।
    —না, ওগুলো আমার শোনা কথা, কোন বাণীতে কি বলে গেছেন তা বলতে পারব
    না। তবে—
    “ইষ্টগুরু পুরুষোত্তম
    প্রতীক গুরু বংশধর,
    রেতঃ শরীরে সুপ্ত থেকে
    জ্যান্ত তিনি নিরন্তর।”
    এই বাণীটা যদি ঠাকুরের দেওয়া হয় তাহলে বংশধররা কি প্রতীক-গুরু নয়?
    —অবশ্যই। তাহলে তো আপনাদের আচার্য্যদেবদের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে যে!
    —তার মানে?
    —তার মানে অতি সহজ। সত্যানুসরণ গ্রন্থের শুরুতেই তা লিপিবদ্ধ করা আছে।—
    “ভারত! যদি ভবিষ্যৎ-কল্যাণকে আবাহন ক’রতে চাও, তবে সম্প্রদায়গত বিরোধ ভুলে
    জগতের পূর্ব্ব-পূর্ব্ব গুরুদের প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হও—আর তোমার মূর্ত ও জীবন্ত গুরু বা ভগবানে আসক্ত (attached) হও, —আর তাদেরই স্বীকার কর—যারা তাঁকে ভালবাসে। কারণ, পূর্ব্ববর্ত্তীকে অধিকার করিয়াই পরবর্ত্তীর আবির্ভাব।” এই হচ্ছে প্রকৃত আচার্য্য পরম্পরার মূল সূত্র।
    শ্রীশ্রীঠাকুরের ওই আক্ষেপ-বাণী শতবর্ষ অতিক্রম করলেও আমরা তাঁর আবেদনকে বাস্তবায়িত করতে ব্যর্থ হয়েছি। ব্যর্থ হয়েছি অবিকৃতভাবে পুরুষোত্তমের আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে সাধারণ জনমানসে!
    তার পরও যদি “ইষ্টগুরু পুরুষোত্তম প্রতীক……” বাণীকে আঁকড়ে ধরে চলতে চান তাহলে তো মুশকিল!
    কারণ— শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র
    পূর্বাপূর্ব অবতার বরিষ্ঠদের তাঁর পূর্বাচার্য্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের পূর্বাচার্য্য শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীস্ট, হজরত মহম্মদ, চৈতন্যদেব,
    রামকৃষ্ণদেব-দের রেত-শরীরের সাথে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের পরিবারের কি কোন সম্পর্ক
    আছে?
    —তা’ কি করে থাকবে! তাছাড়া চৈতন্যদেব ও রামকৃষ্ণদেবের তো কোন সন্তানই ছিল না।
    —ঠিক তাই। তাহলে চৈতন্যদেবের পূর্ববর্তী পুরুষোত্তম যিনি ছিলেন
    বলে আপনার মনে হয়, তাঁর সর্বশেষ বংশধরদের মধ্যে প্রতীক গুরু খুঁজে দীক্ষা নিয়ে ধর্ম পালন করা উচিত। তাই নয় কি? তা করতে পারা কি আপনাদের দ্বারা সম্ভব হবে?
  • * *
    পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের পবিত্র সৎসঙ্গ আন্দোলন অব্যাহত রাখতে
    তাঁর স্পষ্ট নিদেশ দেওয়া আছে—‘‘আগত যিনি, উপস্থিত যিনি, তাঁর বিগতিতে বা তিরোভাবে তাঁর বংশে যদি তাঁতে অচ্যুত সশ্রদ্ধ আনতিসম্পন্ন, প্রবুদ্ধ সেবাপ্রাণ, তৎবিধি ও নীতির সুষ্ঠু পরিচারক ও পরিপালক, সানুকম্পী চর্য্যানিরত, সমন্বয়ী সামঞ্জস্য প্রধান, পদনির্লোভ, অদ্রোহী, শিষ্ট-নিয়ন্ত্রক, প্রীতিপ্রাণ—এমনতর কেউ থাকেন, তাঁরই অনুগমন করো—কিংবা তাও যদি না পাও—তবে তাঁর কৃষ্টি সন্ততির ভিতর অমনতর গুণসম্পন্ন যিনি তাঁরই অনুগমন করো পারম্পর্য্যে—যতক্ষণ আবার আগতের অভ্যুত্থান না হয়, ঠকবে না—শিষ্ট সমন্বয়ে সম্বর্দ্ধনাও এই পাবে।’’ (সম্বিতী, আদর্শ, ৩৯)
    তাঁর বিগতি পরবর্তী উপরোক্ত ওই বাণীকে অবলম্বন না করে তড়িঘড়ি আচার্য্য সেজে সৎসঙ্গের অধিকার গ্রহণ করলেন কোন্ যুক্তিতে?—
    * * *
    সুভাসদাকে নিরুত্তর থাকতে দেখে অনিমেষদা বলেন, তা যদি না হয়, তাহলে
    ওই বাণীর উপর ভিত্তি করে আচার্য্য-পরম্পরার নামে কুলগুরুগিরির ব্যবসা
    চালানো থেকে অবিলম্বে বিরত হওয়া উচিত।
    শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুসারে পিতা থেকে পুত্র জন্মায়। পুত্র,
    পিতার অছি (trustee) মাত্র। যে পুত্র পিতার অছি-কে বহন করে সমৃদ্ধ করে
    তাকেই পিতার আদর্শ পুত্র বলবে সবাই। তাই বলে পুত্র কখনো পিতা হতে পারে
    না। তাই যদি হতো বিশ্বশ্রবা ঋযির পুত্র বিভীষণকে আদর্শ পুত্র না বলে
    রাবনকে তো বলতে পারতেন শ্রীশ্রীঠাকুর। আপনারা ওই বাণীকে ভিত্তি করে,
    ঠাকুরের মূল আদর্শ বাদ দিয়ে বংশানুক্রমিকভাবে জ্যেষ্ঠ-সন্তান-পরম্পরার
    চতুর্থ পুরুষকে পর্যন্ত ঠাকুর বানিয়ে ছেড়েছেন। অথচ ঠাকুরের প্রথম
    বংশধরদের মধ্যে একমাত্র জীবিত সন্তান—পূজনীয় কাজলদা যখন জীবিত ছিলেন তাঁকে আপনারা বংশধর বলে গণ্য
    করতেন না। আপনারা সত্যিই যদি উপরের ওই বাণীকে মর্যাদা দিতেন তাহলে
    সর্বাগ্রে তাঁর পুত্রকে সম্মান দিয়ে, তাঁর মতামত নিয়ে নিদেশিত বাণীর উপযুক্তকে কীলকেন্দ্রে বসাতেন। অন্যথায় উপযুক্ত কৃষ্টি সন্তানকে। যুক্তিসঙ্গত যা’, তা’ না করে
    আপনারা মনগড়া আচার্য্য-পরম্পরায় মেতে উঠে সৎসঙ্গের মূল আচার্য্যের
    অনুশাসনকে নিকেশ করে দিলেন! ইতিহাস কি আপনাদের কোনদিন ক্ষমা করবে?
    শাস্ত্রের ব্যাখ্যা অনুযায়ী পরাবিদ্যায় আচরণসিদ্ধ ব্রহ্মজ্ঞ
    ইষ্টগুরুকে আচার্য্য এবং অপরাবিদ্যায় আচরণসিদ্ধ শিক্ষাগুরুকে উপাচার্য্য
    বলা হয়। বীরশ্রেষ্ঠ অর্জুনের কৃপাচার্য্য, দ্রোণাচার্য্য, ধৌম্য নামে
    তিনজন উপ-আচার্য্য থাকা সত্বেও পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণকে আচার্য্য পদে বরণ
    না করা পর্য্যন্ত তিনি দুর্বলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারেন নি।
    শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রও পূর্ববর্তী পুরুষোত্তমদের আচার্য্য হিসেবে
    মেনে চলতেন। এবং মেনে চলতে বলেছেন। তাঁর বলা অনুযায়ী—
    সত্তার মূলই হ’ল আত্মা,
    আর, এই আত্ম-সমীক্ষুই আত্মবিৎ—
    আর, তিনিই আচার্য্য ;
    তদন্বিতবৃত্তি ও তৎসমাহিতচিত্ত যিনি—
    তিনিই বোধ করেন তাঁ’কে অখণ্ড সচ্চিদানন্দ—
    আত্মার মূর্ত্ত প্রতীক। ৩৩১ । (সম্বিতী)
    পুরুষোত্তম আসেন যখন
    ইষ্ট, আচার্য্য তিনিই গুরু,
    তিনি সবার জীবন-দাঁড়া
    তিনিই সবার জীবন-মেরু।
    তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর ওই নিদেশ অমান্য করা শুরু হয়েছিল বলেই তিনি
    অমান্যকারীদের উদ্দেশ্যে বাণী দিয়ে বললেন—
    আচার্য্য ছেড়ে আচার্য্য ধরলি
    মূর্খতাতে দিলি পা,
    জ্ঞানের বুকে মারলি ছুরি
    লাভ হ’ল তোর ধৃষ্টতা।
    আর কুলগুরু অর্থাৎ কৌলগুরু-পরম্পরার কথা যদি বলেন, তাহলে
    শুনুন—আর্য্যকৃষ্টির রক্ষক সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পুরোহিত রঘুবংশের
    কৌলগুরু ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠদেব শ্রীরামচন্দ্রকে ‘‘ওঁ নারায়ণঃ পরাবেদা
    নারায়ণঃ পরাক্ষরঃ।/নারায়ণঃ পরামুক্তি নারায়ণঃ পরাগতিঃ॥’’ মন্ত্রে
    স্বস্তিবাচন করার সময় শ্রীরামচন্দ্রের মধ্যে পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণকে
    উপলব্ধি করলে তিনি নারায়ণের পরিবর্তে রামচন্দ্র শব্দ বসিয়ে মন্ত্রটিকে
    পরিমার্জিত করেন। নররূপী নারায়ণ পুরুষোত্তম রামচন্দ্রকে কেন্দ্র করে
    সবাইকে ধর্ম পালন করতে উদ্বুদ্ধ করলেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর
    বললেন—-গুরু মানেই সদগুরু–আচার্য্য। গুরু-পুরুষোত্তমই সচ্চিদানন্দের
    মূর্ত্ত বিগ্রহ, তিনিই রূপায়িত ঈশ্বর প্রেরণা, তিনিই আত্মিক শক্তির
    প্রোজ্জ্বল প্রকাশ, অস্তিবৃদ্ধির পরম অমৃতপথ। দুনিয়ার যত দ্বন্দ্বের মাঝে
    অন্বয়ী সার্থকতার সারকেন্দ্র তিনিই। তাঁকে ভালবেসে, তাঁর ইচ্ছা পরিপূরণ
    ক’রে, তদনুগ আত্মনিয়ন্ত্রণে, তাঁরই সঙ্গ, সাহচর্য্য ও সেবার ভিতর-দিয়ে
    মানুষ ঈশীস্পর্শ লাভে ধন্য হয়। আর গুরু-পুরুষোত্তমকে direct (সরাসরি)
    যারা না পায়, তারা তঁদনুবর্ত্তী আচার্য্য-পরম্পরার ভিতর দিয়ে তাঁর ভাবটাই
    কিছু না কিছু পায়।…….. (আঃ প্রঃ ১/৪. ১২. ১৯৪১) তাঁর অবর্তমানে তাঁর আদর্শের ধারার প্রবহমানতা রক্ষা করার জন্য তঁদনুবর্ত্তী আচার্য্য-পরম্পরা বজায় রাখতে আচার্য্য হবার যোগ্যতাও
    নির্ধারণ করে বাণী দিলেন।
    ‘‘চরিত্র ও চর্য্যার
    নিষ্ঠা-বিনায়িত ইষ্টার্থবাহী
    বাস্তব সঙ্গতিশীল
    সার্থক অনুচলন যা’র নাই—
    বাক্য ও ব্যবহারে উদ্ভিন্ন হ’য়ে,—
    সে কিন্তু আচার্য্য হ’তে পারে না ;
    আচার্য্য হওয়ার ন্যূনতম ভূমিই এই। ১৯ ।’’ (আদর্শ-বিনায়ক)
    উপরোক্ত বাণীতে কোথাও কি তাঁর বংশধরদের কথা, জ্যেষ্ঠ-পরম্পরার কথা
    উল্লেখ করেছেন? তথাপি ওই নিদেশ-বাণীকে যদি আপনাদের আচার্য্যদেব মানতেন
    এবং সব্বাইকে মানাতে উৎসাহিত করতেন, তাহলে সৎসঙ্গের নীতি ও আদর্শ নিয়ে এত
    দলাদলি, ভেদাভেদ হবার কোন সুযোগই থাকত না। তাঁরা যদি তাঁদের মধ্যে
    ঠাকুরত্বকে জাগ্রত রাখার সদিচ্ছা পোষণ করতেন, তাহলে ইষ্টগুরু পুরুষোত্তম
    প্রদত্ত নিত্যকর্মের আবশ্যিক অনুশাসন, যেমন আহ্বানী, আচমণ, পুরুষোত্তম
    বন্দনা, আর্য্য-সন্ধ্যা, পঞ্চবর্হিঃ ও সপ্তার্চ্চিঃ মন্ত্রগুলো
    প্রার্থনা থেকে বাদ দিয়ে ‘প্রার্থনা-সময়সূচী’-র প্রচার করে নিত্য
    প্রার্থনা নামের পরাকাষ্ঠা দেখাতেন না। ঠাকুরের রচিত ইষ্টভৃতির মন্ত্র
    “ইষ্টভৃতির্ময়াদেব কৃতা প্রীতৈ তব প্রভো। ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু
    পারিপার্শ্বিকাঃ॥” বাদ দিয়ে অন্য মন্ত্র চালু করা হতো না! এ বিষয়েও তিনি
    আমাদের সচেতন করে দিতে বলে গেছেন—
    মতবাদ যাই হোক না,—
    আর, যে-কোন সম্প্রদায়ই হোক,
    যা’ মুখ্যতঃ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’কে
    স্বীকার করেনিকো—
    কোন-না-কোন রকমে,—
    তা’ কখনও অনুসরণ করতে যেও না,
    তা’ কিন্তু জঘন্য—অসম্পূর্ণ,
    সত্তা-সম্বর্দ্ধনার পরিপন্থী তা’ ;
    আর, ঐ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’ই হ’চ্ছে
    সেই রাজপথ—
    যা’কে স্বীকার ও গ্রহণ ক’রে চললে
    ক্রমশঃই তুমি সার্থকতায় সমুন্নত হ’তে পার। ২৩৪ । (সম্বিতী)
    ওই বাণী অনুসারে আপনারা জঘন্য পথে চলছেন চলুন। তাই বলে আমাকেও কি
    চলতে হবে? দেখুন দাদা, ঠাকুরের বলা বাণীকে অমান্য করে, ঠাকুর-বিরোধী চলনে
    চলার অধিকার আপনার বা আপনাদের যেমন আছে, তেমনি মান্য করার অধিকার তো
    আমার থাকা উচিত। তাই আমার একটা অনুরোধ আপনাদের বিচারে কোন গোষ্ঠীদ্বারা
    ঘোষিত বা নির্বাচিত আচার্য্যদেব(গণ) যদি সবই হয়, তাঁরাই যদি আপনাদের
    একমাত্র উপাস্য হয়, তাহলে শ্রীশ্রীঠাকুরের নাম না নিয়ে, তাঁর প্রতিকৃতি
    না রেখে, আপনাদের আচার্য্যদেবের প্রতিকৃতির উপাসনা করুন,—আমার কোন
    আপত্তি নেই, কিন্তু ঠাকুরের নামে মন্দির করে, ঠাকুরবাড়ি নাম দিয়ে ঠাকুরের
    আদর্শবিরোধী চলনে চলতে দেখলে প্রতিবাদ হবেই। আমরা শ্রীশ্রীঠাকুরের
    কৃষ্টিসন্তান, আমাদের উপর তিনি কাতর আবেদনে কিছু দায়িত্ব দিয়ে গেছেন—
    ‘‘আর্য্যকৃষ্টির যা’ ব্যাঘাত
    খড়্গে তোরা কর নিপাত। ভণ্ড ঠগী দেখবে যেথায়
    করো সামাল সবায়,
    কেউ যেন না ঠকে পড়ে
    ওদের ভাঁওতায়।’’
    ‘‘বড়খোকাই হো’ক—, মণিই হো’ক—বা কাজলই হো’ক— বা আপনারাই
    হোন— আপনাদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই আমি আশা করি যে আপনারা নিজেদের
    জীবনে ও চরিত্রে আমাকে বহন ক’রে নিয়ে বেড়াবেন এবং অন্যের কাছেও আমাকে
    পৌঁছে দেবেন—অবিকৃতভাবে, অবশ্য প্রত্যেকে তার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী। আর
    আমাকে বহন করা ও পৌঁছে দেওয়া মানে, আমার mission (আদর্শ ও উদ্দ্যেশ্য)-কে
    বহন করা ও পৌঁছে দেওয়া, আর আমার mission (আদর্শ ও উদ্দেশ্য) মানে সকলের
    mission (আদর্শ ও উদ্দেশ্য)। জীবনীয় প্রতিটি যা’-কিছুর ইষ্টানুগ
    সত্তাসম্বর্দ্বনাই আমার mission (আদর্শ ও উদ্দেশ্য)।’’ (আ. প্র. ৩/১৭. ১.
    ১৯৪২)
    ‘‘মানুষ, গোরু, পোকা-মাকড়, এমনকি একটা পিঁপড়া পর্য্যন্ত বাঁচতে
    চায়। মরতে চায় না কেউ। আমিও না। কিন্তু মানুষের শরীর চিরকাল থাকে না, এও
    ঠিক। তাই আমি বেঁচে থাকতে চাই আপনাদের মধ্যে। আপনারাই আমাকে ব’য়ে নিয়ে
    বেড়াবেন যুগ যুগ ধরে, ………….. আমাকে এইভাবে বাঁচিয়ে রাখার
    দায়িত্ব আপনারা গ্রহণ করুন। নইলে আমার কথাগুলি প্রাণ পাবে না। সেগুলি
    শূন্যে হাহাকার করে ফিরবে।’’ (আ. প্র. খণ্ড ১৮, পৃঃ ২৫০)
    এবার আমার প্রশ্ন, আপনাদের আচার্য্যদেব শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ
    পালনের মৌলিক ব্যাপারটা তো বিকৃত করে রেখেছেনই, আদর্শ প্রচারের জন্য কি
    কি করেছেন?
    —কেন, কত মন্দির তৈরি করেছেন, গণদীক্ষা দেওয়া চলছে।
    — ঠিক বলেছেন, মন্দির অবশ্যই হয়েছে বা হচ্ছে তা’ কিন্তু ঠাকুরের
    ঈপ্সিত মন্দির নয়, আপনাদের আচার্যদেবদের ঈপ্সিত।
    —এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত কোন প্রামাণ্য তথ্য দেখাতে পারবেন?
    —তাহলে মনোযোগ দিয়ে শুনুন—মন্দির, শ্রীমন্দির ও সৎসঙ্গ
    বিহার-এর গঠনতন্ত্র প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন—‘‘সব
    মন্দিরই শ্রীমন্দির। জায়গায় জায়গায় মন্দির বা সৎসঙ্গ বিহার ঠিক করা ভাল,
    যাতে লোকে meet (সাক্ষাৎ) করতে পারে। সেখান থেকে মানুষকে সবভাবে infuse
    (উদ্বুদ্ধ) করতে হবে। ধর্ম্ম কী, কৃষ্টি কী, সদাচার কী, বিবাহের নীতি
    কী, যোগ্যতার অনুশীলন কিভাবে করতে হয়, সেবানুচর্য্যার ভিতর দিয়ে সবাই
    পারস্পরিকভাবে সম্বন্ধান্বিত হয় কিভাবে ইত্যাদি কথা সেখান থেকে চারাতে
    হবে। মানুষকে practically educated (বাস্তবভাবে শিক্ষিত) করে তুলতে হবে।
    তাছাড়া মানুষের জন্য যতখানি যা করা যায় তাও বাস্তবভাবে করতে হবে
    মন্দিরগুলিকে কেন্দ্র করে। মন্দির থাকলে, ঋত্বিক থাকবে, dispensary
    (চিকিৎসাকেন্দ্র), হাসপাতাল, গবেষণাগার, তপোবনের শাখা ইত্যাদি থাকবে।
    হয়তো ঐ মন্দিরগুলিই এক একটা university (বিশ্ববিদ্যালয়) বা সর্ব্বতোমুখী
    শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।’’ (আলোচনা-প্রসঙ্গে, ২১ খণ্ড, পৃঃ ৩১, ৪ঠা
    বৈশাখ, ১৩৫৯, বৃহস্পতিবার, ইং ১৭-০৪-১৯৫২) এই বইটাও কিন্তু আপনারা
    প্রকাশ করেছেন। এবার বলুন কি বলবেন, ঠাকুরের ঈপ্সিত মন্দির আপনারা কোথায়
    কোথায় করেছেন?
    অনিমেষদার প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারলেন না সুভাসদা।
    তাই কিছুক্ষণ থেমে অনিমেষদাই বললেন, দেখুন দাদা, শ্রীশ্রীঠাকুর
    মূলতঃ মানবদেহটাকেই শ্রীবিগ্রহ মন্দির করে গড়ে তুলতে বলেছেন। আমাদের
    মনগড়া মন্দির-নির্মাণ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন—‘‘আমার নামে দেখবে
    অনেক মন্দির হবে | কিন্তু আমার ইচ্ছা করে তোমাদের হৃদয়টা, চলমান জীবনটা
    আমার জাগ্রত মন্দির হোক | এবং আমাকে তোমরা সর্বত্র বয়ে নিয়ে বেড়াও | ধর্ম
    মানুষের জীবনের মধ্যে না থাকলে, আচরণের মধ্যে না থাকলে, ধর্মসঙ্ঘ থাকা
    সত্ত্বেও ধর্ম লোপ পায় | এবার সে ব্যাপারটা ঘটতে দিও না | আমার কথাগুলি
    মনে রেখো | এবং আমার কথাগুলি পৃথিবীর লোকে যাতে জানতে পারে, সময়মত তার
    ব্যবস্থা ক’রে যেও | কে কখন উপযুক্ত লোক আসবে, ঠিক কি? তবে আমার কাজটা
    হ’লো ঈশ্বরকোটি পুরুষের কাজ | যুগে যুগে তারা আসে | ঈশ্বর ছাড়া আর কিছুই
    তাদের মজাতে পারে না |’’
    ‘‘আমি নগণ্য মানুষ, কিন্তু পরমপিতা আমাকে দিয়ে যা বলালেন, যা
    করালেন, মনুষ্যসমাজ তার উপর না দাঁড়ালে, সব জ্ঞানগুণ সত্ত্বেও পৃথিবী
    মারামারি, হানাহানি, কাটাকাটির হাত থেকে রেহাই পাবে না। মানুষের সব শক্তি
    নিয়োজিত হবে সপরিবেশ আত্মহননে এবং জীবনের ভিত্তিভূমির ধ্বংসসাধনে। আমার
    বিশ্বাস, তোমরা যদি না কর, হয়ত বাইরের লোক এসে এ কাজ করবে। তোমরা যেই হও
    আর যাই হও না, বিকৃত হ’লে এ কাজ করবার অধিকার ও
    যোগ্যতা হারিয়ে ফেলবে। কামিনী-কাঞ্চনাসক্ত কতকগুলি ওঁছা লোক তোমাদের কাছে
    ভীড় জমাবে এবং আত্মস্বার্থের জন্য পরস্পর শকুনের মত কামড়াকামড়ি করবে।
    সৎসঙ্গে একদিন বৃষ্টির জলের মত টাকাবৃষ্টি হবে। সেই দিনই সৎসঙ্গের
    বিপদের দিন। ঐশ্বর্য ও ক্ষমতায় মাথা ঠিক থাকে খুব কম লোকেরই। যারা মনে
    করে ঐশ্বর্য্য ও শক্তি পরমপিতার, তিনিই মালিক, আমি এর
    অছিমাত্র, কাজলের ঘরে থাকা সত্ত্বেও তাদের গায়ে কালি লাগে না। নইলে মুস্কিল আছে।’’
    (‘আলোচনা-প্রসঙ্গে’-র সংকলক প্রফুল্ল কুমার দাস, এম.এ, প্রতি-ঋত্বিক প্রণীত
    ‘স্মৃতি-তীর্থে’ গ্রন্থের পৃষ্ঠা ১০২-১০৫ থেকে নির্বাচিত বাণী।)
    শ্রীশ্রীঠাকুরকে যদি মেনেই থাকেন তাহলে ঠাকুরের নিদেশ মেনে চলা
    উচিত। তাহলে কোন্ নিদেশ মেনে আপনাদের আচার্য্যদেব(গণ) ঠাকুরের নামে একের
    পর এক মন্দির নির্মাণ করে ইষ্ট প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে আত্ম প্রতিষ্ঠা করে
    চলেছেন!—এর কি উত্তর দেবেন বলুন?
    আর গণদীক্ষার কথা বলেছিলেন তো? তাহলে শুনুন—ঠাকুরের মতে, দীক্ষা
    হলো, কোন আদর্শকে সঞ্চারণা করার মাধ্যম। ঠাকুরের মূল আদর্শ—ঈশ্বর এক,
    ধর্ম এক, প্রেরিত-পুরুষ সেই এক-এরই বার্তাবাহী-র বার্তায় সবাইকে উদ্বুদ্ধ
    করা। দীক্ষার মাধ্যমে নাম-ধ্যান, শবাসন, থানকুনি পাতা সেবন, সত্তাপোষণী
    নিরামিষ আহার গ্রহণ, পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চিঃ-র অনুশাসন মেনে সদাচার
    এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন যাপন বিষয়ে উপদেশ দান এবং নিয়মনাগুলো শিখিয়ে
    দেওয়া। ওই নিয়মনাকে স্বীকৃতি দান করার মাধ্যম হল ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ
    পালন—যা দীক্ষাপত্রে উল্লেখ থাকে। এর জন্য কম করে ৩০ মিনিট সময় লাগা
    উচিত। অথচ গণদীক্ষার নামে যে ভাবে, যে হারে দীক্ষা দেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে
    তা নিয়ে একটা কর্মশালার মাধ্যমে সমীক্ষা চালালেই দেখা যাবে, তথাকথিত
    বেশিরভাগ দীক্ষিতগণ, ইষ্টাসনে একাধিক ফটো রেখে তার সামনে বসে বিনতি করা
    (যদিও তা’ সংখ্যায় নগণ্য), ইষ্টভৃতি এবং আচার্য্যভৃতির নামে পয়সা রাখা
    এবং মাস গেলে ‘উপযোজনা কেন্দ্রে’ পৌঁছে দেওয়া ভিন্ন কিছুই তারা জানে না।
    শ্রীশ্রীঠাকুরের জীবদ্দশায় একসাথে শতাধিক লোককে বসিয়ে দীক্ষা দান
    করার কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনার কথা জানা যায় নি। তৎকালিন ঋত্বিক দেবতারাও
    ছিলেন শ্রদ্ধা আকর্ষণী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তথাপিও শ্রীশ্রীঠাকুরকে
    আক্ষেপ করে বলতে হয়েছিল, —‘‘বৃত্তিতে তেল মালিশ করে বা
    স্বার্থপ্রত্যাশাকে উসকে দিয়ে মানুষকে দীক্ষিত করতে নেই। তা’তে মানুষ
    asset (সম্পদ) হয় না।’’ (আ. প্র. ৫ম খন্ড, ২৯. ১২. ১৯৪৩)
    —‘‘দ্যাখেন, (বীরেন ভট্টাচার্য্যের প্রতি) আজকাল আপনারা কতলোক
    দীক্ষা দিচ্ছেন, কিন্তু তার বেশীরভাগই বাজারী। ……ধর্ম্ম বলতে আমি যে
    সর্ব্বতোমুখী সঙ্গতিশীল কেন্দ্রানুগ কর্ম্মময় সার্থক জীবনের কথা বলি, তা
    অনেকেরই মাথায় ঢোকে না। ভাবে, আমাকে দিয়ে পরকালের পথ করে নেবে। কিন্তু
    পরিবার, দেশ, সমাজ, জাতি ও জগতকে …..দুনিয়াটাকে স্বর্গ করে তুলবে সে
    কথা আর ভাবে না।’’ (আলোচনা প্রসঙ্গে ৩য় খণ্ড, ১৩ই চৈত্র, শনিবার, ১৩৪৮,
    ইং ২৮। ৩। ১৯৪২)
    পরিবার, দেশ, সমাজ, জাতি ও জগতকে …..দুনিয়াটাকে স্বর্গ করে
    তোলার জন্য একদা দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রম থেকে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল,
    আলোচনা পত্রিকার, মাঘ সংখ্যার, ১৫০ পৃষ্ঠা থেকে তার একটা ক্ষুদ্র চিত্র
    তুলে ধরছি।
    “সৎসঙ্গের বর্তমান সর্বপ্রধান লক্ষ্যবস্তু হইল বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার,
    দেশীয় ঔষধপত্র প্রস্তুতের রসায়ণাগার ও কারখানা, হাসপাতাল, প্রসূতিসদন,
    বালক-বালিকাদের শিক্ষার জন্য উচ্চ বিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্র,
    কুটির-শিল্প ভবন, কৃষিপরীক্ষা-ক্ষেত্র প্রভৃতি স্থাপন পূর্বক পাবনার
    ন্যায় একটি আদর্শ পল্লী-উন্নযন কেন্দ্রের পুণঃ প্রতিষ্ঠা করা। প্রসঙ্গতঃ
    ইহা উল্লেখযোগ্য যে, অতীতের সেই পাবনা-সৎসঙ্গ পল্লী সংগঠনের উজ্জল
    আদর্শরূপে অদ্যাপি সারা ভারতে প্রসিদ্ধ হইয়া আছে. আর শুধুমাত্র বিহারেই
    নয়, পরন্তু ভারতের সকল প্রদেশেই এইরূপ আদর্শ কেন্দ্র স্থাপন করাই
    সৎসঙ্গের অভিলাষ।
    শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি আবাসিক পল্লী-বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন
    পূর্বক শ্রীশ্রীঠাকুরের পরিকল্পনাগুলির বাস্তব রূপায়নের উচ্চাকাঙ্খাও
    সৎসঙ্গ পোষণ করিয়া চলিয়াছে।……” (আলোচনা, মাঘ, ১৩৬৫/পৃঃ ১৫০)
    উক্ত দলিল থেকে প্রাপ্ত সংবাদে এটুকু বোঝা গেল যে, পাবনার হিমাইতপুর
    আশ্রমে শ্রীশ্রীঠাকুর যথেষ্ট প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে যে-সব
    কর্ম-প্রতিষ্ঠানসমূহ গড়ে তুলেছিলেন, তদনুরূপ কেন্দ্র ভারতের প্রতিটি
    প্রদেশে স্থাপন করা হবে। এবং একটি শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা
    হবে,—যা শ্রীশ্রীঠাকুরের এক অন্যতম ইচ্ছা।
    এবার দেখে নেওয়া যাক পাবনার হিমাইতপুর-আশ্রমের কর্ম-প্রতিষ্ঠানসমূহের এক
    সংক্ষিপ্ত বিবরণ।
    অখ্যাত পল্লী হিমায়েতপুরে বায়ু থেকে বিদ্যুত উত্পাদন করে পরম বিস্ময়
    সৃষ্টি করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। গড়ে তুলেছিলেন—তপোবন ও মাতৃ বিদ্যালয়—যা
    শিক্ষাক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। কলকাতা
    বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত মনোমোহিনী ইনষ্টিউট অফ সায়েন্স এণ্ড টেকনোলজি
    নামের বিজ্ঞান কলেজ। কেমিক্যাল ওয়ার্কসের জীবনদায়ী ঔষধসমূহ দেশে এবং
    বিদেশে সমাদৃত হয়েছিল।
    বৈদ্যুতিক এবং যন্ত্রশিল্পের আধুনিক সব ধরণের কাজ হতো ইলেকট্রিকাল ও
    মেকানিক্যাল ওয়ার্কসপে। যথা,–ঢালাই, ঝালাই, লেদের কাজ, ডাইস,
    ইলেক্ট্রোপ্লেটিং, ইলেক্ট্রিক্যাল ফিটিং, আরমেচার, ব্যাটারি প্লেট তৈরি ও
    মেরামত, ডায়নামো মেরামত ইত্যাদি। ছিল—ময়দার কল, আটার কল, চালের কল, তেলের
    কল, চিনির কল, মেডিকেটেড ওয়াটার মেশিন, স্পাইস পাউডারিং, সুতার গুটি
    তৈরি, টেলারিং, বোতাম তৈরি, গ্লাস ব্লোয়িং, পটারী ওয়ার্কস্, বেকারী,
    লজেন্স তৈরি, গ্রোসারী প্রোডাক্ট ইত্যাদির শিল্প। ছিল—কার্ডবোর্ড
    কারখানা, স্টীমলণ্ড্রী, কটন ইণ্ডাস্ট্রিজ, হোশিয়ারী শিল্প, ব্যাঙ্ক,
    ইঞ্জিনীয়ারিং ওয়ার্কস্, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র, স্বাস্থ্য বিভাগ,
    গৃহনির্মাণ বিভাগ, কলাকেন্দ্র, প্রেস (যেখানে বাংলা, হিন্দী, সংস্কৃত,
    উর্দু, আরবী, ফারসী হরফের কাজ হতো, দেশ ভাগের পর পাকিস্তান সরকার জবরদখল
    করে ঢাকাতে নিয়ে যায়।), পাব্লিশিং হাউস, ফিলানথ্রপি, মাতৃসঙ্ঘ ইত্যাদি।
    (তথ্যসূত্রঃ ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনী গ্রন্থ)
    শুধু আশ্রমবাসীরাই নয়, জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায়-ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে সকলেই
    ওইসব প্রতিষ্ঠানের সুলভ সেবা পেতেন। তথাপিও পাকিস্তান সরকার ওই সর্বজনীন
    কল্যাণধর্মী প্রতিষ্ঠানসমূহ দখল করে কেন বিনষ্ট করেছিলেন তার উত্তর আমার
    জানা নেই।
    যেমন জানা নেই, আলোচনা পত্রিকাতে বর্ণিত শ্রীশ্রীঠাকুরের একান্ত
    ইচ্ছাগুলোর বাস্তবায়ন দেওঘর সৎসঙ্গ কর্তৃপক্ষ করেছেন কি-না। যদি করে
    থাকেন কোথায় করেছেন, তার উদাহরণ দিন। ওই ইষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দেখার পর
    আপনার সাথে গলা মিলিয়ে ‘আচার্য্যদেব কি! —জয়!’ ধ্বনি দিয়ে মানব
    জীবনটাকে ধন্য করব। না, না, আপনার এক্ষুনি জানাতে হবে না, আপনাকে এক মাস
    সময় দিচ্ছি। আশাকরি এই সময়ের মধ্যে আপনি সব তথ্য সংগ্রহ করে আমাকে
    জানাতে পারবেন। আর যদি অনিবার্য্য কোন কারণে জানাতে না পারেন, তাহলে
    পরমপিতার একটা ভয়াল বাণী শুনে নিন।
    সবাই ক্ষমা পাবে—
    তা’ তা’রা যেমনতর অপরাধেই
    অপরাধী হোক না কেন,
    কিন্তু ক্ষমা পাবে না তারাই—
    যা’রা পবিত্র সত্তাকে
    অবমানিত করে,
    অবলাঞ্ছিত করে,
    —তা’ কখনও নয়।
    (ধৃতি-বিধায়না, ২য় খণ্ড, বাণী সংখ্যা ১১৬)           *  * *
    যদিও অনিমেষদা, সুভাসদাকে কথাগুলো বলেছিলেন। তবুও কেন জানি আমার ভয়
    ভয় করছে। দেওঘরের আচার্য্যদেবদের পাল্লায় পড়ে এ কোন্ বিপদে আবার পড়লাম!
    আমার আবার কিছু হবে না তো! আমি ক্ষমা পাব তো ? হে দয়াল! তুমি রক্ষা কোরো।

tapanspr@gmail.com

ছট্ পূজা

।। প্রসঙ্গ : ছট্ পূজা বা সূর্য্য পূজা—একদিন প্রতিদিন ।।
ছট্ বলতে আমাদের বেঁচে থাকার মূল উৎস সূর্য্যের ছটা বা রশ্মি বোঝায়। পুরান কাহিনী অনুসারে সূর্যের রশ্মিচ্ছটার যথাযথ তাপ বিকীরণে বসুন্ধরা যাতে শস্যশ্যামলায় পরিপূর্ণ হয় সেই আর্তি বা তপস্যার উদযাপন। এই উৎসবের সাথে আমাদের অন্নদাত্রী মা অন্নপূর্ণা, গঙ্গাদেবী, কৃষি অঙ্গাঙ্গীভাবে সম্পৃক্ত। কার্তিক মাসের শুক্লাষষ্ঠীতে সূর্যাস্তকালে এবং পরদিন সূর্য্য উদয়কালে গঙ্গাতীরে এই উৎসব বা পূজা করা হয়। পূজা মানে সম্বর্ধনা। যে ওজন স্তর ভেদ করে সূর্য রশ্মি আমাদের পৃথিবীতে আসে, সেই স্তর ক্ষতিকর রশ্মিকে বন্দী করে সবুজ গ্রহের জীবদের বাঁচতে সাহায্য করে। বায়ু দূষণের কারণে সেই স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে আমাদের বাঁচাটাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই, আমরা যাতে পরিবেশের অজৈব উপাদানসমূহকে যথাবিধায় রক্ষণাবেক্ষণ করে এই সবুজ গ্রহটিকে টিঁকিয়ে রাখতে পারি, তাই হচ্ছে সূর্য পূজার প্রতিপাদ্য বিষয়। আমাদের পৃথিবীর অভিভাবক আদিত্য বা সূর্য্য যেন দ্বাদশ মাসের দ্বাদশ রূপের স্বমহিমা প্রকাশ করে আমাদের রক্ষা করেন। অর্থাৎ আমাদের পৃথিবীর অভিভাবক স্বরূপ সূর্য যেন আমাদের এই সবুজ গ্রহটাকে বাঁচিয়ে রাখে। সকল জীবনের বাঁচার অজৈব উপাদান পঞ্চ মহাভূত,—ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজকে রক্ষা করা, সম্বর্ধনা করার নাম পূজা। এবং পরিবেশের অজৈব উপাদান সমূহের উৎসকে অবিকৃতভাবে বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টার নাম উৎসব। সেই আঙ্গিকে বিচার করলে দেখা যাবে আমাদের ঋষিরা নিত্য পঞ্চ মহাযজ্ঞ করার বিধানের মাধ্যমে নিত্য ছট্ পূজার প্রবর্তন করে গেছেন। সেই বিধানকে আরো সাবলীলভাবে বাস্তবায়িত করলেন সব দেবতার সমাহারে সৃষ্ট বর্তমান যুগ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। তাঁর প্রদত্ত ইষ্টভৃতি মন্ত্র “ইষ্টভৃতির্ময়াদেব . . .” পঞ্চযজ্ঞের নবীকরণ স্বরূপ এবং তাঁর প্রদত্ত আর্য্যসন্ধ্যা প্রার্থনা মন্ত্রে সূর্য্য থেকে জাত এবং পোষণপ্রাপ্ত পঞ্চ মহাভূতকে বন্দনা করতে বিধান দিয়েছেন।
* * *
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শ অনুসারে দৈনন্দিন জীবনে অবশ্য পালনীয় আর্য্যসন্ধ্যা মন্ত্রে সূর্য পূজার মন্ত্র লিপিবদ্ধ করেছেন স্বয়ং শ্রীশ্রীঠাকুর ।—

“হে সূর্য !
হে আমাদের জীবন ও বৃদ্ধির উদগাতা !
আবশ্যকীয় যজ্ঞ !

হে মহান্
আচরণপ্রতিষ্ঠ
শ্রেষ্ঠ যজ্ঞকর্তৃগণ !
আমাদের অনভিধ্যাত অসাঙ্গযজ্ঞকৃত
অভিনিঃসৃত পাপ হইতে রক্ষা করুন !

আমরা আমাদের
প্রবৃত্তিস্বার্থ-সম্পাদন-প্রলুব্ধ হইয়া
অহোরাত্রিতে
আদর্শবিমুখ-ইন্দ্রিয়-বশবর্তিতায়
মন, বাক্য, হস্ত, পদ,
উদর ও শিশ্নদ্বারা
যে সমস্ত
জীবন-ক্ষয়কারী
দুরিতকর্ম করিয়াছি,
আলোক তাহা অবলুপ্ত করিয়া দিউক,—
এই আমি—আমাকে
পরম-অমৃত-যোনিসম্ভূত ধ্বান্তারি
সূর্য-জ্যোতিতে আহুতি দিলাম !

(পাঠ বিধি — বীরাসনে বসিয়া গােকর্ণাকৃতি দক্ষিণ হস্তে বায়ু লইয়া মন্ত্র পাঠ করিয়া জল-কল্পনায় ঐ বায়ু পান করিতে-করিতে মনে করিবে—ঐ বায়ু সূর্য-জ্যোতিতে মহান জ্যোতিষ্মান হইয়া উঠিয়াছে—উহা পান করিয়া আমার সমস্ত পাপ উহাতে নিঃশেষে আহুতি হইয়া অন্তঃস্থ প্রতি-কণা মহতী জ্যোতিষ্মতায় পরিণত হইতেছে।)


“ঐ
দেবহিতব্রতী
পরমপবিত্র
বিশ্বপ্রকাশী চক্ষু
প্রাক্ ভাগে
ক্রমোর্ধ্বগতিতে
উদিত হইতেছে !—

হে সূর্য !
তোমারই
উদ্ভাসিত পবিত্র প্রসাদে
আমরা যেন
শতবর্ষব্যাপী
দৃষ্টিক্ষম হই,
শতাব্দ্যবধি
জীবনযাপী হই,
শতবর্ষ ধরিয়া
শ্রুতিমান্ হই !
আমাদের বাক্ যেন শতবর্ষ ধরিযা অস্খলিত থাকে,
দৈন্যবিহীন হইয়া শতাবধিবর্ষ বাঁচিয়া থাকি !
আরো
হে দেব !
হে জগৎজ্যোতি !
শতবর্ষের পরেও বহু বহুতর বর্ষ ধরিয়া
আমরা এই সকলের
সম্যকভাবে
অধিকারী থাকিতে পারি !”
(দাড়াইয়া দুই হাত কনুই পর্যন্ত তুলিয়া বাকী অংশ পার্শ্বে সংলগ্ন রাখিয়া আকাশে দৃষ্টি নিবন্ধ করিয়া উক্ত মন্ত্র পাঠ করিবে ও মন্ত্রার্থ চিন্তা করিতে-করিতে ভাবিতে হইবে—আমি ঐ সমস্তের অধিকারী হইলাম।)
* * *
।। সায়ন্তনী ।।
(দৈনন্দিন সাধনার সায়ংসন্ধ্যা প্রার্থনার নিমিত্ত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্য অবদান।)
“সূর্য্য পাটে বসেছে—
সন্ধ্যা তার তামসী বিতানে
ঘাটে-বাটে ছড়িয়ে পড়েছে—
স্নিগ্ধ ক’রে—
বিশ্রামে ভুবনকে আলিঙ্গন করে,
তাপস! শান্ত হও!
বরেণ্য যিনি—
তোমার সব মন দিয়ে
তাঁতে ছড়িয়ে পড়,
উপাসনা কর তাঁর—
দিনের সব কর্ম্মের সাথে
যা’-কিছু করেছ—স্মরণে এনে
নিবেদন কর তাঁকে—সার্থকে,
বিশ্রামের সুষুপ্তি-অঙ্কে
এলিয়ে দিয়ে—
তোমার সসত্ত্ব শরীর,
উন্মাদনার সৎমন্ত্রী সোমরস পান ক’রে
সুপ্তি পাও—তৃপ্তি পাও—
সুস্থি পাও—
উদাত্ত জীবনে আবার জেগে উঠতে।” (সম্বীতি)
* * *
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্য অবদানের উপরোক্ত বিধান মেনে নিত্য ছট্ পূজাকে বাস্তবায়িত করার সুযোগ পেয়ে আমরা ধন্য। তাই পূজার নামে, উৎসবের নামে, আমরা যেন বীভৎস উল্লাস প্রকাশ করতে গিয়ে পরিবেশ দূষণ না করে ফেলি, সে বিষয়ে সকলকে সচেতন হতে হবে।
জয়গুরু ।
বন্দে পুরুষোত্তমম্ !


tapanspr@gmail.com

কালিপূজা ও শক্তির আরাধনা

শক্তির আরাধনা ও কালীপূজা।।


শক্তি মানে সমর্থ হওয়া, আর আরাধনা মানে আয়ত্ত করা। সাত্তিক দৈবীশক্তির বিহিত প্রয়োগে মানুষ কাঙ্খিত জীবনবৃদ্ধির পথে অগ্রসর হতে এবং হওয়াতে পারে। আবার, প্রবৃত্তির আসুরিক শক্তির অবিহিত প্রয়োগে সপার্ষদ জীবনহানির পথে অগ্রসর হওয়াটাও স্বাভাবিক।–রাবন, দুর্যোধন যার সহজ দৃষ্টান্ত।
শুম্ভ-নিশুম্ভদের অবস্থাও তাই হয়েছিল। প্রবৃত্তির শক্তির দম্ভের যবনিকা পতন ঘটালেন আদ্যাশক্তির প্রতীকস্বরূপা নারীশক্তি মাকালী। তাই হ্লাদিনী শক্তিরূপিনী নারী জাতিকে আদ্যাশক্তির প্রতীক জ্ঞানে সম্মান, শ্রদ্ধা বা পূজা (সম্বর্দ্ধনা) না করলে পুরুষের শক্তি খর্ব হয়।
আমরা যে মা-কালীর পূজা করি, তিনি তো দিগম্বরী! বাস্তবে আমরা সকলেই আমাদের দিগম্বরী মায়েদের অপত্য পথ বেয়ে একদা ভূমিষ্ট হয়েছিলাম। ভারতীয় আর্য্য মনীষা যে পথকে যজ্ঞকুণ্ড, যজ্ঞবেদী বলে বর্ণনা করেছেন, শুধুমাত্র কাম ভোগের যন্ত্রস্বরূপ নয়! সৃষ্টি প্রকরণের আগম-নিগম দ্বার। অতএব যে যোনী আমার জন্মস্থান, যে স্তনযুগলের অমৃতধারা পান করে আমি শক্তিশালী হয়েছি, সেই যোনী এবং সেই স্তনযুগল তো আমার শক্তির আরাধনার প্রতীকস্বরূপ!—এই ভাবে ভাবিত না হতে পারলে মা কালীর সাধনা করা সম্ভব না!
আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় পুরুষোত্তম শ্রীরামকৃষ্ণ, সাধক রামপ্রসাদ প্রমুখগণ প্রচলিত তন্ত্রমতের পঞ্চ ম-কারের পূজা-পদ্ধতিকে অগ্রাহ্য করেই শুধু শুদ্ধাভক্তি দিয়েই মা-কালীকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। আর শ্রীরামকৃষ্ণদেব তো ফলহারিণী কালী পূজার পুণ্য লগ্নে সারদা দেবীকে সাত্তিক শুদ্ধাভক্তির উপাচারে সারদাদেবীকে পূজা করে চিন্ময়ী নারী শক্তিকে আদ্যাশক্তি রূপে প্রতিষ্ঠিত করলেন! মাতৃ-সাধনাকে ধরে রাখতে ঠাকুর কামিনী-কাঞ্চন থেকে তফাত্—তফাত্—খুব তফাত্ থাকতে বলেছেন।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সত্যানুসরণে বললেন, “প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী । প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয় ।”
এবং পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, “স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যে-জন, তাহার হয় না ভবের বন্ধন মোচন । স্ত্রী চিন্ময়ী মা ।”
তিনি নারী-সাধারণকে মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েই ক্ষান্ত হন নি, স্ত্রীকেও চিন্ময়ী মা জ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শেখালেন । কারণ, স্ত্রীর মাধ্যমে স্বামী নিজেকে জন্মান, তাই স্ত্রীকে জায়া বলা হয়েছে । আর্য্য বিধির গর্ভাধান কালে স্ত্রীর নাভিমূল স্পর্শ করে “প্রসীদ মা জগজ্জননী” মন্ত্রে অভিষিক্ত করে স্ত্রীর গর্ভে নিজেকে প্রবেশ করাতে হয় । আর্য্য ভারতের প্রজা-সৃষ্টি প্রকরণের কি অপূর্ব ব্যঞ্জনা । যৌন জীবনে পুরুষদের শিব, আর নারীদের শক্তি জ্ঞানে অভিষিক্ত করে কাম (lust) কে আসুরিক প্রবৃত্তির কবল থেকে মুক্ত করে দৈবীপ্রেমে (love) রূপান্তরিত করলেন । ব্যবহারিক ক্ষেত্রের বাস্তব জীবনে শুদ্ধভাবের কালী পূজা করতে শেখালেন। তাই, পুরুষ এবং নারী সাধারনকে প্রবৃত্তি-প্ররোচিত শিক্ষার অঙ্গন থেকে মুক্ত করে, এই সত্তাধর্মী ব্যবহারিক কালীপূজার তুক না শেখাতে পারলে কিছুতেই ট্রিট্ করা যাবে না কুতসিত যৌবন-উন্মত্ততার ফলস্বরূপ নারী নির্যাতন, ডিভোর্স, ধর্ষণ নামের সামাজিক ব্যাধিদের! যে নারীশক্তি শুম্ভ-নিশুম্ভকে দমন করেছিলেন, সেই নারীরা যদি অসুর-পুরুষদের কামনার বলি হয় এর চাইতে সভ্যতার সংকটের আর কিছু হতে পারে না!
তাই আসুন আমরা আমাদের অন্তরের কালিমা থেকে নিজেদের মুক্ত করে যথার্থতায় সার্থক করে তুলি সমাগত কালী পূজাকে।
‘পূজা’ মানে তো সত্তা বা অস্তিত্বের অভাব পূরণ করার সম্বর্দ্ধিত করার একটা মাধ্যম । এর সাথে সাধনা, উপাসনা, সংযম জড়িয়ে আছে । যাতে আমরা সুস্থ শরীর, সুস্থ মানসিকতা অর্জন করে পরিবেশকে বাঁচিয়ে রেখে নিজেরা সুস্থভাবে বাঁচতে পারি, বৃদ্ধি পেতে পারি । কালিপুজোর অজুহাতে বাজি, শব্দবাজি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে আকাশ, বাতাস, ইন্দ্রিয়সকল কলুষিত করার অনুষ্ঠান কোন অস্তিত্বের পরিপোষক ? কোন শাস্ত্র, কোন মহাপুরুষ পূজার নামে এ ধরণের অবৈজ্ঞানিক তাণ্ডবের বিধি দিয়েছেন ? ‘সত্যমেব জয়তে’র আধিকারিকেরা জানালে বাধিত থাকবো ।
“খাওয়া-দাওয়া, বাজী পোড়ানো,
অঢেল ঢালা আয়োজনে,
পূজা সার্থক হয় না,
বিনা দৈব গুণের সংসাধনে ।
(শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)


tapanspr@gmail.com

কোনটা খাব, আমিষ না নিরামিষ

।। কোনটা খাব, আমিষ না নিরামিষ।।
আসলে আমিষ বা প্রোটিন ছাড়া কোন খাদ্য নেই। তাই আমিষ-বিহীন নিরামিষ খাদ্যের ধারণার উৎপত্তি সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই। তথাপিও শিরোনাম দিয়েছি বলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
অনেকে মনে করেন মাছ-মাংস একমাত্র প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য। বিষয়টি কিন্তু তা’ নয়। উদ্ভিজ্জ খাদ্যে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার অপ্রতুল নয়। যারা মনে করেন, মাছ-মাংস ব্যতীত মানবদেহ সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারে না, তারাও জানেন যে, মৃত্যু পথযাত্রী রোগীকে বাঁচাবার জন্য যে তরল শিরার মাধ্যমে প্রবেশ করানো হয় তার মধ্যে উদ্ভিজ্জ উপাদান বিদ্যমান থাকে, মাছ-মাংসের উপাদান থাকে না। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, মাছ-মাংস ইত্যাদি প্রাণীজ খাদ্য ব্যতীত উদ্ভিজ্জ খাদ্যের সাহায্যে মানুষ সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকতে পারে। এমন অনেক প্রমাণ রয়েছে।

।। মৎস্য মাংস আহারে অপকারিতা সম্পর্কিত কিছু তথ্য ।।
মহাভারতের অনুশাসন পর্ব্বে—১১৪ ও ১১৫ অধ্যায়ে—“মাংস আহার অবিধি” ব’লে উল্লেখ করা হয়েছে। মাছ-মাংস খেলে যে জাত্ যায়–তা নয়। উহা খেতে নিষেধ করার কারণ এই যে— উহা খেলে দেহের ভিতর একটা টকসিন নামক বিষ সৃষ্টি হয়, তাতে দেহের অনিষ্ট করে। মস্তিষ্কের কোষগুলিকে চঞ্চল করে তােলে এবং অবসাদগ্রস্ত করে। কাজেই সাধনার বিঘ্ন হয়, নাম ও ধ্যান ভাল হয় না এবং মন বহির্ম্মুখী হয়। তা ছাড়া আর একটা বিশেষ কথা এই যে মানুষের দেহের cells—কোষগুলি হ’লাে animal cells—জৈব-কোষ। আর আমরা যদি অপর animal cells—জৈবকোষ (মাছ-মাংসাদি) ভােজন করি, তাহলে বাহিরের animal cells—জৈবকোষগুলি ভিতরে গিয়ে ভিতরের animal cells—জৈবকোষগুলিকে attack (আক্রমণ) করে—একটা বিরােধ উপস্থিত করে। তার ফলে দেহের কোষগুলি—যা পুষ্ট ও পূর্ণ (developed ও complete) হতে—মনে করুন ৫০ বৎসর লাগতাে—তা ধাক্কা খেয়ে হয়তাে ৩০ বৎসরের মধ্যেই পুষ্ট ও পূর্ণ হ’য়ে গেল, সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয় আরম্ভ হ’লাে। এই ক্ষয় আরম্ভ হ’তাে কিন্তু ৫০ বৎসর পরে। কাজেই এখানে ২০ বৎসর পরমায়ু ক’মে গেল—এই বুঝতে হবে। আপাত দৃষ্টিতে মাছ, মাংস, আহারে দেহের পুষ্টতা দেখা গেলেও উহার পরিণাম খারাপ।
মহাত্মা কবীর বলেছেন:—
“তিলভর কি মচ্ছি খায়কর কোটী গজ দে দান।
কাশী করবট লে মরে তােভী নরক নিদান।।”
অর্থাৎ তিল প্রমাণ মৎস্য ভক্ষণ ক’রে যদি কোটি কোটি গজ দান করে এবং কাশী ও দ্বারকা প্রভৃতি স্থানে দেহ ত্যাগ করে, তাহলেও নরক গমন করতে হয়।
আমরা ব্যবহারিক জীবনে দেখতে পাই যে কোন শুভকাৰ্য্য (বিবাহ, উপনয়ন, ব্রত, পূজা ও শ্রাদ্ধাদি) করবার সময় অন্ততঃপক্ষে একদিনের জন্যও সংযম করতে হয়, নিরামিষ হবিষ্যান্ন আহার করতে হয়। তাহলে নিজের আত্মার কল্যাণ অপেক্ষা আর শ্রেষ্ঠ শুভকাৰ্য্য কি আছে? আত্মার কল্যাণের জন্যই তাে সাধনা, ধ্যান ও ভজনাদি। তা প্রত্যহই—এমনকি সদাসর্ব্বদা করা প্রয়ােজন তাহলে এই শুভকার্য্যের জন্য প্রত্যহই সংযম আবশ্যক। তা ছাড়া আমরা যা আহার করি, তা নিজ নিজ ইষ্টকে নিবেদন ক’রে খাওয়ার বিধি। সেক্ষেত্রে মৎস্য মাংসাদি অপবিত্র বস্তু কি ক’রে ইষ্টকে নিবেদন করবে? শাস্ত্রে আছে অনিবেদিত কোন কিছু ভােজন বিষ্ঠা-ভােজন তুল্য। আমিষ দ্রব্য নিবেদন করা চলে না, সুতরাং খাওয়াও উচিৎ নয়।
পশু, পক্ষী ও মৎস্যাদির মাংস আহার যে মনুষ্য দেহের অনুপযুক্ত, সে সম্বন্ধে কতকগুলি পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিকের মত নিম্নে উদ্ধৃত করা হলাে।
(১) “The natural food of man judging form his structure consists of fruits, roots and vegetable.” Prof. Baron Cuvier– মানুষের দেহের গঠনাদি দ্বারা দেখা যায় যে ফল-মূল শাকাদিই তার স্বাভাবিক খাদ্য।
(২) “No physiologist would dispute with those who maintain that man ought to live on vegetarian diet.” Dr. Spencer Thompson—কোন শরীর-তত্ত্ববিদ্ আপত্তি করতে পারেন না যে উদ্ভিদ-ভােজনই মানুষের কর্ত্তব্য।
(৩) “Certainly man was never made to be a carnivorous animal.”—Prof. Ray—কিছুতেই মানুষ মাংসাশী জীবরূপে সৃষ্ট হয় নাই।
(😎 “It is a vulgar error to regard meat in any form is necessary to life.”-Sir Henry Thompson—ইহা একটি ভ্রান্ত ও হীন ধারণা যে দেহরক্ষার জন্য মাংসাদি ভােজন আবশ্যক।
(৫) “We can maintain that science & practice prove that vegetables and fruits can in every sense take the place of meat, even all of animal products.”—Dr. Alfed J. H. Crespi—আমরা সমর্থন করতে পারি যে বিজ্ঞান ও ব্যবহারের দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে ফল-মূল সব রকমে মাংস, দুগ্ধ ও ঘৃত প্রভৃতি সর্ব্ববিধ জৈবাহারের স্থান অধিকার করে।
(৬) ডাক্তার আলেকজাণ্ডার হেগ্ এম.ডি., এফ.আর.সি.এস. বলেন যে—গবেষণা দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে উদ্ভিদ দ্বারা সহজে দেহ তাে রক্ষা হয়েই থাকে, উপরন্তু উহা সর্ব্বপ্রকারে শ্রেয়স্কর, যেহেতু ইহাতে দেহ, মনের উচ্চ শক্তি
সমূহের স্ফূর্ত্তি হয়ে থাকে।
(৭) ডাক্তার ই, গুডেল স্মিথ বলেন যে, যে-কোন প্রকার কাৰ্য্যে হােক, মাংসাশী অপেক্ষা উদ্ভিদভােজী বেশী পরিশ্রম ক’রতে অনায়াসে সমর্থ। মাংসাশীর মত তারা সৰ্ব্বদা রােগ ভােগ করে না এবং ক্ষুধা, তৃষ্ণা সহ্য করবার শক্তিও আছে। এক বেলা আহার না জুটলেও তাদের দেহে কোন গােলযােগ উপস্থিত হয় না।
(৮) নিউ-ইয়র্কের ডাক্তার বোল উইভিল্ বলেন যে—সকল প্রকার আমিষের মধ্যেই শরীর-পুষ্টির অনুকূল লাবণিক পদার্থ এবং ধাতব পদার্থের কতকটা অভাব আছে, প্রকৃতপক্ষে আমিষ অতি অপদার্থ জিনিষ। কেবল রােগের আকর এবং আবর্জ্জনার মত অখাদ্য। ডিম মানুষের স্বাভাবিক খাদ্য নহে। বাসি সিদ্ধ মাংস কুকুরের আহারের উপযুক্ত নয়। আমিষ আহারে স্নায়বিক দৌর্ব্বল্য ঘটে। যে-সকল রোগে আমাদের আংশিকভাবে বা সম্পূর্ণরূপে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে এবং যে-সকল রোগে রক্তসঞ্চালন ক্রিয়ায় ব্যাঘাত করে।
আহার বিষয়ে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের বাণী


**মানুষ তাহার খাদ্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করুক | নিশ্চয়ই আমি সুবর্ষণে বারিবর্ষণ করিয়াছি। তৎপর আমি ভুলকে সুবিদারণে বিদীর্ণ করিয়াছি, পরে তার মধ্যে শস্য উৎপাদন করিয়াছি এবং আঙ্গুর ও শাক-সবজি এবং জয়তুন ও খর্জুর এবং নিবিড় উদ্যান সমূহ এবং ফল ও তার, উহা তোমার জন্য ও তােমাদের পশু সমূহের জন্য উপকারী।
(আল-কোরান সুরা আবাসা’র ২৪-৩২ আয়াত।)
**পৃথিবী পৃষ্ঠের শাক- পাতা ফলমূল মানুষের জন্য উৎকৃষ্ট ও স্বাভাবিক খাদ্য।
(বাইবেল)
**কায়িক দুষ্কার্য -প্রাণী হত্যা, চুরি, ব্যাভিচার পরিত্যাগ করিয়া কায়িক কুশল সাধন করিবে।
(ত্রিপিটক)
**অপুত্রক রাজা বিম্বিসা পুত্র লাভের আশায় সহস্র ছাগ বলি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে বুদ্ধদেব তার প্রতিরোধ করেন। (বুদ্ধচরিত)
**কাঁচা কিমা রান্না মাংস আহার করে যারা / ভ্রুণ হত্যায় পাপে জেনাে ধ্বংস হবে তারা। ।
(অথর্ববেদ-৪-৬-২৩)
**বৈদিক যুগের প্রথম দিকে মাংসাহারের প্রচলন থাকলেও পরে প্রাণী হত্যা ও মাংসাহার খুব কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ হয়।
**প্রাণী হত্যাকারী কিম্বা হত্যার অনুমােদক/ ক্রেতা-বিক্রেতা-রাধুনী আর পরিবেশক আহার করে আহার করায় সর্বকালে যারা / হত্যার দায়ে অপরাধী বিশ্বমাঝে তারা।
(মনু সংহিতা ৫-৫১)
**আমি তােমাদের দুইটি শস্য খাইতে নিষেধ করিতেছি একটি পিয়াজ অপরটি রসুন।
(হাদীস)
** যে কেহ পিঁঁয়াজ রসুন ভক্ষন করিবে তাহারা যেন আমাদের মসজিদের সমীপবর্তী না হয়।
*আল হাদিস, মিশকাত শরীফ।)
**মহানবী (সাঃ) এর নিকট কিছু মাংস আনা হলে তিনি তার ঘ্রাণ পেয়ে বললেন, ইহা তোমার কোন বন্ধুর নিকট লইয়া যাও এবং খাও, কেননা আমি এমন জনের সহিত আলাপ করি যাহার সহিত তােমরা আলাপ কর না।
(হাদীস, বােশারী ও মােসলেম)
** মনে রাখিও আমাদের (পশুর) রক্ত মাংস আল্লাহর কাছে কখনো পৌঁছাবে না, কিন্তু তোমাদের সংগম সততা অবশ্যই পৌঁছাবে।
(কুরআন ২২/৩৭)
**কু-দৃষ্টিকারীর খাদ্য ভোজন করিও না, তাদের সুস্বাদু ভক্ষ্যে লালসা করিও না; কেননা সে অন্তরে যেমন ভাবে, নিজেও তেমনি। সে তােমাকে বলে, তুমি ভােজন পান কর, কিন্তু তাহার চিত্ত তােমার সহবৰ্ত্তী নয়।
(বাইবেল)
**বেনামাজীর (সাধনশীল নয় এমন ব্যক্তির) হাতে খাদ্য গ্রহণ করিও না।
(আল হাদীস)
**বিষয়ীর অন্ন খাইলে মলিন হয় মন।
(শ্রীশ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু।)
**জিহ্বার লালসে জীব ইতিউতি ধায়
শিশ্নোদর পরায়ন কৃষ্ণ নাহি পায়।
(শ্রীশ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু।)
অন্নে জানিস মন বয়
অন্ন মাফিক প্রবৃত্তি হয়।
(শ্রীশ্রীঠাকুর অনুুকূলচন্দ্র।)
সদাচারী নয়কো যে জন
ইষ্ট বিহীন রয়
পান ও ভোজন তাহার হাতে
বিষ বহনই হয়।
(শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)
**প্রত্যেকের মানসিক অবস্থা-অনুযায়ী তার থেকে একটা Radiation (বিকিরণ) নির্গত হয়, সেই Radiation (বিকিরণ) আবার অন্যকে Influence (প্রভাবিত) করে । সেই জন্য শুধু খাওয়া কেন, সবাইকে সব সময় ছোঁয়াও ভাল নয়। বিশেষতঃ মানুষ যখন সাধন-ভজন ব্রত প্রায়শ্চিত্ত ইত্যাদি নিয়ে ব্যাপৃত থাকে। এগুলি কোন কুসংস্কারের কথা নয়। সাদা চোখে দেখা যায়। আবার সূক্ষ্ম যন্ত্র আবিষ্কার করলে তাতেই ধরা পড়তে পারে।
(শ্রীশ্রীঠাকুর অনুুকূলচন্দ্র, আঃ প্রঃ-৩/২৮০)

আন্তর্জাতিক কন্যাসন্তান দিবস উদযাপন স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি

** আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য **

।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের আলোকে আদর্শ কন্যা-সন্তান নির্মাণ ।।


[বিশ্বজুড়ে মেয়েরা তাদের শিক্ষা, তাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা এবং হিংসাবিহীন জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। প্রতিবন্ধী মেয়েরা সহায়তা এবং পরিষেবাগুলি পাওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বাধার সম্মুখীন হচ্ছে,’ রাষ্ট্রসংঘের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে এই কথা বলা হয়েছে।
রাষ্ট্রসংঘের কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারকরা বিনিয়োগ করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন যা মেয়েদের দ্বারা অনুভূত বৈষম্য মোকাবেলা করবে।
এই দিনটি পালনের ইতিহাস:
২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদ ১১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক কন্যা সন্তান দিবস হিসাবে ঘোষণা করে। যাতে সারা বিশ্বে মেয়েদের অধিকার এবং মেয়েরা যে অনন্য চ্যালেঞ্জগুলির মুখোমুখি হয় সেটিকেই স্বীকৃতি দেয়।
আন্তর্জাতিক কন্যা সন্তান দিবসের তাৎপর্য:
সারা বিশ্বে মেয়েরা যে সমস্যাগুলির সম্মুখীন হন, যেমন শিক্ষা, পুষ্টি, জোরপূর্বক বাল্যবিবাহ, আইনি অধিকার এবং চিকিৎসার অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা না থাকা— এই জাতীয় সমস্যা সম্পর্কে সকলকে সচেতন করে। প্রতি বছর দিনটির থিম পরিবর্তিত হয়।
রাষ্ট্রসংঘের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘এখন সময় এসে গিয়েছে, মেয়েদের কাজ, তাঁদের অধিকার সম্পর্কে আমাদের সকলের দায়বদ্ধ হতে হবে। তাঁদের নেতৃত্বে বিশ্বাস রাখতে হবে।’ এটিই সব মিলিয়ে এই দিনটির গুরুত্ব।] (সূত্রঃ গুগল)


কোন দার্শনিক তত্ত্ব না জানলেও চলবে। প্রাকৃতিক নিয়মে একটি মেয়ের চরম প্রাপ্তি ভালো সন্তানের মা হওয়া।
তাই শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রতিটি কন্যা সন্তানকে আদর্শ মা হবার উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে, অবলা নয়, সবলারূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন । নারীর সতীত্বই নারীকে সবলা করে তোলে। তাই তিনি কত আশা নিয়ে কন্যাদের উদ্দেশ্য করে বললেন—
‘‘মেয়ে আমার,
তোমার সেবা, তোমার চলা,
তোমার চিন্তা, তোমার বলা
পুরুষ-জনসাধারণের ভিতর
যেন এমন একটা ভাবের সৃষ্টি করে—
যা’তে তারা
অবনতমস্তকে, নতজানু হ’য়ে
সসম্ভ্রমে,
ভক্তিগদগদ কন্ঠে—
‘মা আমার,— জননী আমার’! ব’লে
মুগ্ধ হয়, বুদ্ধ হয়, তৃপ্ত হয়.কৃতার্থ হয়,—
তবেই তুমি মেয়ে.
—তবেই তুমি সতী।’’
অর্থাৎ প্রতিটি মেয়েকে শ্রদ্ধা-আকর্ষণী চরিত্রে অধিষ্ঠিত করতে চাইলেন। সাথে সাথে একটা কুমারী মেয়ের বাস্তব চলনের মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়ে বললেন —

“তুমি মানুষের
মায়ের মত আপনার হইতে
চেষ্টা কর,—
তাহা কথায়, সেবায় ও ভরসায়,
কিন্তু মেশায় নয়;
দেখিবে—
কতই তোমার হইয়া যাইতেছে। ১ ।
(নারীর নীতি) * * * *

আমরা যে, যা বলিনা কেন, একটা মেয়ের চরম প্রাপ্তি সার্থক মাতৃত্বে। আমার ব্যক্তিগত ভাবনায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সে-বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করলেই কন্যা-দিবস উদযাপন যথার্থতায় সার্থক হবে।

বর্তমান যুগে মেয়েরা লেখাপড়া, শিক্ষা-সংস্কৃতি, কর্মক্ষেত্রে, অভিযানে, বিজ্ঞান গবেষণায় প্রভৃতি কোন ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নেই। এমন অনেক নারীদের কথা আপনারা জানেন, আমিও জানি। আবার এ-ও দেখেছি, বাহ্য জগতের সবক্ষেত্রে কৃতি নারীদের অন্তর্জগতের হাহাকার। মনের মত সন্তান না পাওয়ার জ্বালায়, সন্তানকে মনের মত করে মানুষ করতে না পারার জ্বালায়, থ্যালাসেমিয়া, স্কিজোফ্রেনিয়া, লিউকোমিয়া প্রভৃতি নামের দুরারোগ্য ব্যাধির জ্বালায় জ্বলতে গিয়ে জীবনের সুখ-শান্তির অনুভূতিটা হারিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছে।—যেন, ‘সব আছে তবু নেই’। মাতৃত্ব-পিয়াসী একজন সন্তানহীনা নারীর যে কি কষ্ট, কি বেদনা, তা ভুক্তভোগী ভিন্ন কেউ উপলব্ধি করতে পারবে না। একটি সন্তান পেতে সব-রকমের চিকিৎসা করার পরও যখন সন্তান-লাভে ব্যর্থ হয়, তখন অনেক টাকা খরচ করে গর্ভ ভাড়া নেয়, দত্তক সন্তান নেয়।—এমন অনেক কিছু করেন। ওই সব সমস্যার স্রষ্টাও কিন্তু নারী। ‘আত্মানং বিদ্ধি।’-র শিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে সব কিছুকে জেনেছে, নিজেকে জানতে পারেনি। নিজের নারীত্বের-পূর্ণতার বিষয়ে জানা হয়ে ওঠেনি।
প্রাকৃতিক নিয়মে নারী হতে জন্মে জাতি। নারীই গৃহ, সমাজ ও রাষ্ট্রের ধাত্রী ও পালয়িত্রী। প্রাকৃতিক নিয়মে একজন নারীর চরম পরিণতি মাতৃত্বে। মুখে আমরা যতই নারী-স্বাধীনতার কথা বলি না কেন, এক্ষেত্রে কিন্তু পুরুষের উপর নির্ভরশীল হতেই হয়। (অবশ্য লেসবিয়ান আদর্শে বিশ্বাসীদের কথা আলাদা। তারা অবশ্যই ব্যতিক্রমী।) সেই পুরুষটি মাতৃত্বকামী নারীর তুলনায় শারীরিক-মানসিক-আত্মিকভাবে যত উন্নত হবে,— স্বাস্থ্যবান হবে, ভালো চরিত্রের হবে, নারীটির দাম্পত্য জীবন তত সুখের হবে, সন্তানও ভালো হবে। এটাই তো স্বাভাবিক নিয়ম। তাই নয় কি? আর সেগুলো পেতে গেলে বর্ণে, বংশে, বয়সে, স্বাস্থে, শিক্ষায়-দীক্ষায়—সবদিক থেকে উন্নত সম-বিপরীত সত্তার একটা পুরুষকে, ভাবী সন্তানটির বাবাকে খুঁজে নিতে হবে, বিবাহের মাধ্যমে। বিবাহ মানে পুরুষের সত্তাকে বিশেষরূপে বহন করা। যে পুরুষটির কাছে নারীত্বকে সমর্পণ করে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে। তাই নির্ঝঞ্ঝাট সুখের দাম্পত্য জীবন পেতে গেলে, ভালো সন্তানের মা হতে গেলে, লেখাপড়া শেখার পাশাপাশি, কুমারী অবস্থা থেকেই একটা পরিকল্পনা করে নিতে হবে। কারণ প্রত্যেক নারীই চায় তার সন্তানটি সুস্থ থাকুক, ভালো হোক, কৃতী হোক। সেগুলো তো আর রেডিমেড পাওয়া যাবে না, আর স্টেজ মেক-আপও দেয়া যাবে না। নিয়ম মেনে অনুশীলন করতে হবে। মা-কেই মেপে মেপে সঞ্চয় করতে হবে ভবিষ্যতের সন্তানের ভালামন্দের সব উপকরণ। মা মানে মেপে দেওয়া। সন্তানের ভালো-মন্দ মেপে দেয় বলেই মা। ভাবী মায়ের চলন-চরিত্র দ্বারা প্রভাবিত হয় নারী-জননকোষ, অপত্য-কোষ। সেইজন্যই সন্তান ধারন-পালন-লালন-এর জন্য আবশ্যিক প্রত্যঙ্গগুলোকে সযত্নে মেপে মেপে লালন-পালন করতে হবে, সংরক্ষণ করতে হবে ভবিষ্যতের সন্তানের মঙ্গলের জন্য। তা না করে ‘হেটেরো-সেক্সুয়াল’ কমপ্লেক্সের প্রলোভনে পড়ে ওগুলোকে যদি আম-পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করে ফেলা হয়, তাহলে তো ভাবী সন্তানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। যার জন্য সংরক্ষিত জিনিস, আত্মঘাতী উদারতার বশে অন্যকে ভাগ দেবার অপরাধে। এজন্য রোগ-ভোগেও ভুগতে হয়। Oncologist, Gynaecologist, Sexologist, Psychologist-দের শরণাপন্ন হতে হয়।

নারীত্বের বিশুদ্ধতা সংরক্ষিত করে সুসন্তান লাভ করা বিষয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘জন্মকথা’ কবিতায় লিখছেন—
খোকা মাকে শুধায় ডেকে, ‘এলেম আমি কোথা থেকে
কোনখেনে তুই কুড়িয়ে পেলি আমারে ?’
মা শুনে কয় হেসে কেঁদে খোকারে তার বুকে বেঁধে—
‘ইচ্ছা হয়ে ছিলি মনের মাঝারে।।
ছিলি আমার পুতুল খেলায়, ভোরে শিবপূজার বেলায়
তোরে আমি ভেঙেছি আর গড়েছি।
তুই আমার ঠাকুরের মনে ছিলি পূজার সিংহাসনে,
তাঁরি পূজায় তোমার পূজা করেছি।।
আমার চিরকালের আশায়, আমার সকল ভালোবাসায়,
আমার মায়ের দিদিমায়ের পরাণে,
পুরানো এই মোদের ঘরে গৃহদেবীর কোলের ’পরে
কতকাল যে লুকিয়ে ছিলি কে জানে।।’

একটু বোধি-তাৎপর্য দিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, কবিগুরু তাঁর ওই কবিতায় জেনেটিক্সের, ইউজেনিক্সের, সুরত-সম্বেগের চরম এক তত্ত্বের অবতারণা করেছেন।
একটা উন্নত প্রজাতির আমগাছ লাগাতে গেলেও কিছু প্লান-প্রোগ্রাম নিতে হয়। আগে থেকে জমি নির্বাচন করতে হয়, উপযুক্ত সার দিয়ে জমি তৈরি করতে হয়, তারপর মাটির উপযুক্ত বীজ বা চারা বসাতে হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় বর্তমান যুগের বেশিরভাগ লেখাপড়া শিখতে যাওয়া নারীরা, পুরুষের সাথে পা-মিলিয়ে, গলা-মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ‘হোক-কলরব’ আন্দোলনে পারদর্শী হলেও, নিজের আত্ম-বিস্তারের জন্য আবশ্যিক আত্ম-সম্পোষণ, আত্ম-সংরক্ষণ করার জন্য নির্দিষ্ট নারীত্বের অস্তিত্ব রক্ষার জমিটুকুকে সংরক্ষণ করা বিষয়ে উদাসীন। যারফলে কালেক্রমে মনুষ্যত্ব সম্পন্ন অসৎ-নিরোধে তৎপর সন্তান থেকে সভ্যতা বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব রামকৃষ্ণদেব, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নেতাজী সুভাষচন্দ্র প্রমুখ মনীষীদের জন্মদাত্রীগণ ক্যাম্পাসে, অফিসে, মিটিংয়ে, মিছিলে কোন ‘কলরব’ না করেই, সনাতনী নারীধর্ম পালন করে রত্নগর্ভা হয়েছিলেন। ভারতীয় কৃষ্টি প্রদত্ত প্রকৃষ্ট-গতির পথ ভুলে, তথাকথিত প্রগতির নামে ছুটে চলা নারীবাদিরা বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে দেখতে পারেন।

পরিবারকে উন্নতি বা অবনতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী প্রধানতঃ নারী। কথায় আছে, ‘সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে। গুণবান পতি যদি থাকে তার সনে।।’ আদর্শ একজন পুরুষের সাহচর্যে নারীর হাতেই গড়ে ওঠে আদর্শ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র। নারীই হচ্ছে জাতির বল ও ভরসা। লক্ষী নারীদের উপরেই রয়েছে মহান জাতি গঠনের বিরাট দায়িত্ব। মহান আদর্শকে চরিত্রায়িত করে নারী যদি পরিবারকে সুন্দর ও সার্থক করে সাজিয়ে তুলতে পারে তবেই জগত-সংসার সুখের হয়। আদর্শ জাতি গঠন করার দায়িত্ব নারীদের উপর থাকার জন্য তাদের শিশুকাল থেকেই ভালো মা হবার সাধনায় অগ্রসর হতে হবে। নারী জীবনের বিভিন্ন পর্যায় আছে। ওই পর্যায়গুলো ভগ্নি, বধূ, স্ত্রী, জায়া, জননী ও গৃহিনী ও জননীত্ব। ওগুলোকে সমৃদ্ধ নারীরাই করতে পারেন, পুরুষেরা নয়। স্নেহ, মায়া, মমতা ও ভালবাসার দ্বারা পূর্ণ নারীর হৃদয়। নারীরা ইচ্ছা করলেই তাঁর অন্তর্নিহিত বিভিন্ন শক্তির দ্বারা জাগিয়ে তুলতে পারেন বিশ্বকে। নারীর মধ্যে সুপ্তভাবে থাকা গুণরাজিকে ইচ্ছে করলেই ব্যক্ত করা যায় ভালোবাসা বা ভালোতে বাস করার বিজ্ঞানসম্মত পাঠ নিয়ে।

আমাদের ঘরের কন্যা মা উমা-র বাপের বাড়িতে আগমনকে কেন্দ্র করে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার আয়োজন অনেকগুণ বৃদ্ধি পেলেও, অনেক মাতামাতি হলেও, দেবীদুর্গার দশপ্রহরণধারী আদর্শ কিন্তু আমাদের চরিত্রে তেমন রেখাপাত করতে পারেনি। যদি করতো, কন্যারূপী দুর্গা মায়েরা অসুররূপী পুরুষদের লালসার স্বীকার হতে পারত না। একটা মেয়ে কিভাবে দুর্গাশক্তিকে আয়ত্ত করে আত্মরক্ষায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে, যুগধর্ম সেই শিক্ষায় মেয়েদের শিক্ষিত করতে ব্যর্থ হয়েছে! পুরুষ-সাধারণ, মেয়ে-সাধারণকে কামনার বস্তু হিসেবে না ভেবে, দেবী দুর্গাজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখবে, সেই শিক্ষার প্রচলন করা হয়নি। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কিন্তু ঘরে ঘরে সেই শিক্ষার বীজ বপন করলেন দীক্ষার মাধ্যমে।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র নারীর মধ্যে দেবী দুর্গার আসন পেতে দিতে অনুশ্রুতির বাণীতে বললেন :
“শার্দ্দুলেরে বাহন করে
সাপের ফণার মালা পরে
কালবোশেখী ঝঞ্ঝাবেগে
ছোটরে নারী ছোটরে ছোট্ ।
দত্যিদানার নীচ বাহানা
আর্য্যাবর্তে দিয়ে হানা
ঘূর্ণিপাকের বেতাল গাঁথায়
হুলিয়ে ভুলিয়ে দিচ্ছে চোট্ ।
দশ প্রহরণ দশ হাতে ধর
বক্ষবিদরি ধ্বংসি ইতর
সূর্য্যরাগী বজ্রতেজে
আর্য্যনারী শত্রু টোট্ ।”
তিনি নারীকে অবলা নয় সবলারূপে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন । নারীর সতীত্বই নারীকে সবলা করে তোলে। তাই তিনি কত আশা নিয়ে বললেন—
সতীর তেজে ঝলসে দে মা
নিঠুর কঠোর অন্ধকারে
মদনভস্ম বহ্নিরাগে
বৃত্তি-রিপু দে ছারখারে ।
প্রণবতালে ইষ্টমন্ত্র
ঝঙ্কারি তোল সকলতন্ত্রে
বিষাণ হাঁকে রুদ্র দোলায়
বজ্রে হানি মৃত্যুদ্বারে ।

শুধুমাত্র কন্যাদের জন্যই নয়, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র পুরুষ-সাধারণের উদ্দেশ্যে সত্যানুসরণ গ্রন্থে বললেন, “প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী। প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয়।”
এবং পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, “স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যেজন, তাহার হয় না ভবের বন্ধন মোচন। স্ত্রী চিন্ময়ী মা ।”
তিনি নারী-সাধারণকে মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েই ক্ষান্ত হন নি, স্ত্রীকেও চিন্ময়ী মা জ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শেখালেন । কারণ, স্ত্রীর মাধ্যমে স্বামী নিজেকে জন্মান, তাই স্ত্রীকে জায়া বলা হয়েছে । আর্য্য বিধির গর্ভাধান কালে স্ত্রীর নাভিমূল স্পর্শ করে “প্রসীদ মা জগজ্জননী” মন্ত্রে অভিষিক্ত করে স্ত্রীর গর্ভে নিজেকে প্রবেশ করাতে হয় । প্রজা-সৃষ্টি প্রকরণের কি অপূর্ব ব্যঞ্জনা । যৌন জীবনে পুরুষদের শিব, আর নারীদের দুর্গা জ্ঞানে অভিষিক্ত করে কাম (lust) কে আসুরিক প্রবৃত্তির কবল থেকে মুক্ত করে দৈবীপ্রেমে (love) রূপান্তরিত করলেন ।
শ্রীশ্রীঠাকুর মেয়েদের মা এবং ছেলেদের দাদা সম্বোধনের বিধান প্রবর্তন করে নারীপুরুষের সুপ্ত যৌন সম্বেগের রাশ টেনে ধরলেন। ঘরে ঘরে বাস্তব কন্যা বা মাতৃপূজার এক স্থায়ী আসন প্রতিষ্ঠা করলেন। সেই আসনকে পবিত্র-আচরণে শুদ্ধ রাখতে কন্যার মায়েদের এ বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে ।
গুরুত্ব দিতে হবে নিজ-নিজ মেয়েদের পবিত্রতার দিকে । যুগধর্মের প্রভাব থেকে মুক্ত করে শ্রীশ্রীঠাকুরের নারীর নীতি, নারীর পথে, দেবী-সূক্ত ইত্যাদি গ্রন্থের বিধান অনুসারে মেয়ে যা’তে বয়সে, বর্ণে, বংশে, স্বাস্থ্যে, শিক্ষায় তুলনামূলক সমবিপরীত বৈশিষ্ট্যের সমুন্নত বরণীয় পুরুষকে বরণ করে একজন আদর্শ বধূ, মনোবৃত্যানুসারিনী স্ত্রী, জায়া, পরিমাপনি মা হয়ে শুদ্ধাত্মার জন্ম দিতে পারে ।
আজকের মেয়েই তো ভবিষ্যতে মা হবে।
আদর্শ মা হতে গেলে বর্তমানের মায়েরা তাদের কন্যাদের অবশ্যই শেখাবেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের নিম্নোক্ত নিদেশ-বাণীগুলো।

“ছেলেমেয়ে এক-যোগেতে
করলে পড়াশোনা
পড়ার সাথে বাড়ে প্রায়ই
কামের উপাসনা।
কুমারী একটু বড় হলেই
পুরুষ ছুঁতে নেই,
যথা সম্ভব এর পালনে
উন্নয়নের খেই ।
পরের বাবা পরের দাদা
পরের মামা বন্ধু যত
এদের বাধ্যবাধকতায়
সম্বন্ধটি যাহার যত
অনুরোধ আর উপরোধে
ব্যস্ত সারা নিশিদিন
কামুক মেয়ে তাকেই জানিস
গুপ্ত কামে করছে ক্ষীণ ।
বিয়ের আগে পড়লে মেয়ে
অন্য পুরুষে ঝোঁকের মন
স্বামীর সংসার পরিবার
করতে নারে প্রায়ই আপন ।।
পুরুষ নষ্টে যায় না রে জাত
নারী নষ্টে জাত কুপোকাত ।
নারী হতে জন্মে জাতি
থাকলে জাত তবেই জাতি ।”
যুগধর্মের প্রভাবের আকর্ষণে ওই বিধান উপেক্ষা করলে হবেই ক্ষতি।
কারণ, “নারী হইতেই জাতি জন্মে ও বৃদ্ধি পায়, তাই নারী যেমন ব্যষ্টির জননী তেমনই সমষ্টিরও ;– আর, এই নারী যেমন ভাবে আবিষ্ট থাকিয়া যেমন করিয়া পুরুষকে উদ্দীপ্ত করে পুরুষ হইতে সেই ভাবই নারীতে জন্মগ্রহণ করে ; তাই, নারী মানুষকে প্রকৃতিতে মূর্ত্ত ও পরিমিত করে বলিয়া জীব ও জগতের মা ;–তাহ’লেই বুঝিও– মানুষের উন্নতি নারীই নিরূপিত করিয়া দেয় ; তাই নারীর শুদ্ধতার উপরই জাতির শুদ্ধতা, জীবন ও বৃদ্ধি নির্ভর করিতেছে– বুঝিও, নারীর শুদ্ধতা জাতির পক্ষে কতখানি প্রয়োজনীয়!” ১৭৬ ।
(চলার সাথী গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)
হে কন্যারূপী মেয়েরা! ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক ভাবনায় তোমাদের দেবীজ্ঞানে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। তাই তো কুমারী পূজা না করলে দেবীর পূজা ও হোম সফল হয় না। শক্তির আরাধনার নামে আদর্শ নারীশক্তির প্রতীক স্বরূপা দুর্গা, কালী, জগদ্ধাত্রী এবং বাসন্তী পূজার আয়োজন হয়ে চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। যার উদ্দ্যেশ্য চিন্ময়ী নারীদেরও আমরা যেন আদ্যাশক্তির প্রতীক মনে করে পরমার্থ দর্শন ও পরমার্থ অর্জন করতে অভ্যস্ত হই, শ্রদ্ধা জানাই, নারীকে যেন কামনার, ভোগের বস্তু মনে না করি, নারীকে ভোগ্যা নয়, পূজ্যা রূপে স্বীকৃত দেবার জন্যই কুমারী পূজা। আদ্যাশক্তির প্রতীক নারীরা যদি রুষ্ট হয় তাহলে সৃষ্টির ছন্দে পতন অবশ্যম্ভাবী। ওই আদর্শকে সমাজজীবনে প্রতিষ্ঠা দিতে মূর্ত্তিপূজার পাশাপাশি তন্ত্রশাস্ত্রকারেরা দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য দেবীজ্ঞানে কুমারী পূজারও প্রচলন করেছিলেন। ফলহারিনী কালীপূজার রাতে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নিজের স্ত্রীকে ষোড়শীজ্ঞানে পূজা করেছিলেন। সেই আদর্শকে পাথেয় করে তোমাদের কন্যা-জীবন সার্থক হোক—আদর্শ অনুচলনের সার্থক চলায় গার্গী, মৈত্রেয়ী, অপালা, লোপামুদ্রা, খনা, সীতা, দ্রৌপদীর মতো প্রাতঃ স্মরণীয়া প্রণম্যা হয়ে ধন্য করো আর্য্য স্তন্যদায়িনী মাতা ভারতবর্ষকে। প্রার্থনা জানাই পিতার পিতা পরমপিতা সমীপে। জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!



tapanspr@gmail.com

ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ

।। ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রদত্ত নিত্য অনুসর্তব্য ছড়াবাণী—-
“অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে
ধর্ম্ম বলে জানিস্ তা’কে।”-র মধ্যে ইষ্টভৃতির মূল তত্ত্ব সুপ্ত।—জীবনবাদের মূল কথা।
অর্থাৎ আমার বাঁচা অন্যের ওপর নির্ভরশীল। এখানে অন্য বলতে আমার পারিপার্শ্বিক। পারিপার্শ্বিক মানে পরিবেশ। সব কিছু বেঁচে থাকার উৎস পরিবেশের অজৈব— ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ , ব্যোম ও তেজ ইত্যাদি উপাদান পঞ্চ মহাভূতকে বাঁচিয়ে না রাখলে জীবজন্তু, গাছপালা, মানুষ কিছুই বাঁচতে পারবে না। তাই প্রথম ইষ্ট কর্ম হচ্ছে আমি ব্যক্তিটির দ্বারা যেন পরিবেশের জৈবাজৈব কোন কিছু ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে চলা। অন্যের বেঁচে থাকা এবং বৃদ্ধি পাওয়াকে ব্যাহত করে আমি যদি বাঁচার রসদ বা উপকরণ সংগ্রহ করি, তাহলে ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ করা হবে। আমার বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু প্রয়োজন, ঠিক ততটুকু পরিবেশ থেকে নিতে হবে। জীবন ধারণের আহরণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গ্রহণ করলেই জীবন বৃদ্ধির বিরুদ্ধাচরণ করা হবে। যার জন্য শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, বাঁচতে নরের যা’ যা’ লাগে/তাই দিয়ে তো ধর্ম জাগে। অপচয় করাটাও অধর্ম। ধারণ-পালনের বিপরীতে ক্রিয়াশীল। যাকে পাপ বলা হয়েছে। আমরা সেই কাজটাও করে ফেলি ধর্ম পালনের নামে। নিজেদের খেয়াল চরিতার্থ করার জন্য অন্যকে মেরে ধর্ম পালন করি। ইষ্ট পূজার নামে, উৎসবের নামে ফুলের নৈবেদ্য সাজিয়ে ফুলের জীবনগুলো নষ্ট করে ফেলি! উৎসবের মূল সূত্র সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির প্রাণনে, ব্যাপনে, বর্দ্ধনের ফর্মূলাকে পাশ কাটিয়ে! অথচ যাঁর পুজো করছি, যাঁর উৎসব করছি, তিনি কিন্তু ফুল ছিঁড়তে নিষেধ করেছেন। বলেছেন, ওদের ক্ষুদ্র জীবনটাকে উপভোগ করতে দাও। Let them enjoy their little days. এসব ছোটখাটো জিনিস উপেক্ষা করলে কিন্তু ধার্মিক হওয়া যাবে না। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের অনুশাসন মেনে। তাই, বাস্তব চলনায় ইষ্ট অর্থাৎ মঙ্গল কর্মের ভরণ, পরিপূরণ বাদ দিয়ে ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ পালন সম্ভব নয়। ইষ্ট মানে পূর্ত। পূর্ত মানে পরিবেশ। পরিবেশের রক্ষণাবেক্ষণ বাদ দিয়ে টাকার মাপকাঠিতে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ইষ্টভৃতি করা যায় না।
* * *
সৎসঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কথিত ‘সৎসঙ্গ চায় মানুষ’ বাণীতে বর্ণিত সৎসঙ্গের আদর্শের সাথে, ‘ইষ্টভৃতি’ শব্দের মর্মার্থের সাথে পরিচিত নাহলেও ‘ইষ্টভৃতি’ নামের সাথে বেশীরভাগ সংঘকেন্দ্রিক জনেরা যেমন পরিচিত, তেমনি সাধারণ লোকেরা শ্রীশ্রীঠাকুরের নামে টাকাপয়সা রাখা এবং নির্দিষ্ট সংস্থায় জমা দেওয়াকেই ‘ইষ্টভৃতি’ মনে করেন। অনেকানেক দীক্ষিত জনেরা শুক্রবার বাদে অন্যান্য দিন মাছ-মাংস-পেঁয়াজ-রসুনাদি অভক্ষ্য ভোজন করেন, বর্ণাশ্রমধর্মের প্রতি মুখ ফিরিয়ে বৃত্তিহরণ কর্মাদি করেন, প্রতিলোম-বিবাহ বিলাসে অগম্যাগামী হয়েও গর্ব করে বলেন, ‘আমি রোজ ১০/২০/৩০ ……… টাকা করে ইষ্টভৃতি করি।’ শ্রীশ্রীঠাকুর অসদুপায়ে উপার্জন (সদাচার এবং বর্ণাশ্রম বিধি না মেনে যে উপার্জন।) দিয়ে ইষ্টভৃতি করার নিদেশ কোথাও দেন নি। তিনি বলেন,—
“সত্য পথে চললে রোজগার বেশি হয়। সাধু রোজগার হয়। ……. ফাঁকির পয়সা আর ভালোবাসার পয়সায় ঢের তফাৎ। ফাঁকির পয়সা খেলে শরীর-মন প্রবৃত্তিঝোঁকা হয়। সাত্বত সম্বেগ স্তিমিত হতে থাকে।” (আঃ প্রঃ ১৫শ খণ্ড, পৃঃ ১৯৭)

শ্রীশ্রীঠাকুরকে প্ৰশ্ন করা হয়েছিল আপনি ইষ্টভৃতির উপর এত জোর দেন, কিন্তু কেউ যদি জেলে আটকা পড়ে এবং সেখানে কোন সুযোগ না পায়, তখন কী করবে?
শ্রীশ্রীঠাকুর—ভাতের গ্রাসটা দেবে, ভাত যদি না পায় তবে জল নিবেদন করবে, জল যদি না পায় তবে সীতা যেমন বালির পিণ্ডি দিছিলেন, অগত্যা সেই রকমভাবে বালি বা মাটি দিয়ে ইষ্টভৃতি করবে, তা’ও যদি না পায়, পরমপিতার দান বাতাস তো কেউ কেড়ে নিতে পারবে না, আর সর্বশেষে মানস-উপচারে নিবেদন তো আছেই। সেখানেও চেষ্টা করতে হবে সক্রিয়ভাবে ইষ্টের ইচ্ছা পরিপূরণের ভিতর দিয়ে যাতে তাঁকে তৃপ্ত ও তুষ্ট করা যায়।
(আলোচনা প্রসঙ্গে ৪র্থ, ২৬। ১২। ১৯৪২, পৃষ্ঠা ২০২)
উপরোক্ত বাণীতে বোঝা গেল যে, টাকা-পয়সা নয়, ইষ্টের ইচ্ছা পরিপূরণ করা ইষ্টভৃতির মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। যা পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চি-র অনুশাসনের মধ্যে নিহিত রয়েছে। যুক্তি অনুযায়ী ওই অনুশাসন যারা মানছেন না, তারা তাহলে ইষ্টভৃতি করছেন না।
আমরা আমাদের প্রিয়জনের জন্য কোন কিছু কিনলে সেরা বা শ্রেষ্ঠ জিনিসটাই কিনি। এ বিষয়ে কারো কোন দ্বিমত থাকতে পারে না। তাহলে আমরা যাঁকে আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ আদর্শ মনে করি, সেই প্রিয়পরম প্রেষ্ঠকেও শ্রেষ্ঠ জিনিস নিবেদন করতে হয়। তাই ইষ্টভৃতিকে যারা সবচাইতে বেশি গুরুত্ব দেন, তাদের অবশ্যই শ্রেষ্ঠ ইষ্টভৃতি বিষয়টা জেনে রাখা উচিত।
শ্রেষ্ঠ ইষ্টভৃতি প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন।—
“ঈশ্বর-অনুধ্যায়িতা নিয়ে
গণহিতী অনুচর্য্যায়
তাদের যে অনুগ্রহ-অবদান অর্জ্জন কর,
সেই অবদান হ’তে
শ্রদ্ধানুস্যূত অন্তঃকরণে
স্বতঃস্বেচ্ছায় তোমার ইষ্টকে যা নিবেদন কর,
তাই-ই কিন্তু তোমার শ্রেষ্ঠ ইষ্টভৃতি।”
(ধৃতি-বিধায়না, ১ম খণ্ড, বাণী সংখ্যা ৩০৬)
* * *

‘ঈশ্বর অনুধ্যায়িতা’……..বাণীর নিদেশ ব্যতীত ইষ্টভৃতি বাস্তবায়িত হয় না। ইষ্টভৃতির নামে শুধুমাত্র ইষ্টের প্রীতির জন্য, কাউকে পীড়িত না করে, নিজে পীড়িত না হয়ে বর্ণানুগ কর্মের সেবা মাধ্যমে আহরিত অর্থ ‘দিন গুজরানী আয়’। এই *‘দিন গুজরানী আয়’-কেই ইষ্টভৃতির অর্ঘ্য হিসেবে নিবার্চিত করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর। ওই নিদেশ অনুসারে ইষ্টার্ঘ্য আহরণ করার মধ্যেই প্রীতি, মৈত্রী ও ঐক্যের বীজ বপন করে দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন আর্য্যকৃষ্টির সদাচার এবং বর্ণাশ্রম ধর্মকে। ওই ইষ্টার্ঘ্য ইষ্টকে দিতে হবে। তিনি তা দিয়ে PHILANTHROPICAL WORK বা সব্যষ্টি সমষ্টির মধ্যে ভাগবত ঐক্য স্থাপন দ্বারা গণহিতৈষণা কর্ম করবেন। ইষ্টভৃতির দাতা এবং গ্রহীতার মেলবন্ধনে গড়ে উঠবে পরম রাষ্ট্রিক সমবায়। এই ছিল শ্রীশ্রীঠাকুরের পরিকল্পনা। পরিবেশের সকলকে নিয়ে বাঁচা এবং বৃদ্ধি পাওয়ার বাস্তুতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক বিন্যাস-ব্যবস্থার সরলীকরণ অবদান ইতিপূর্বে পরিলক্ষিত হয়নি।—মানবসভ্যতার সার্বিক উত্তরণের জন্য। সেই উদ্দেশ্যে স্থাপন করেছিলেন ফিলানথ্রপি কার্যালয়। মাসান্তে ওই অর্ঘ্য প্রেরিত হত ইষ্টসকাশে। ইষ্টের নামে প্রেরিত ওই অর্ঘ্য গৃহীত হতো ফিলানথ্রপিতে। ইষ্টভৃতি পাঠাবার পর দুজনকে ভ্রাতৃভোজ্য দিতে হয়। এর মাধ্যমে পারস্পরিক প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করলেন। দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে চাইলেন। ইষ্টভৃতি গ্রহীতারা এ বিষয়টিকে ইষ্টানুগ-বোধ দিয়ে বিবেচনা করলে কিছুটা কাজের কাজ হবে।

*”দিন গুজরানী আয় থেকে কর
ইষ্টভৃতি আহরণ,
জলগ্রহণের পূর্ব্বেই তা’
করিস্ ইষ্টে নিবেদন ;
নিত্য এমনি নিয়মিত
যেমন পারিস ক’রেই যা’
মাসটি যবে শেষ হবে তুই
*ইষ্টস্থানে পাঠাস্ তা’ ;
ইষ্টস্থানে পাঠিয়ে দিয়ে
আরো দু’টি ভুজ্যি রাখিস্,
গুরুভাই বা গুরুজনের
দু’জনাকে সেইটি দিস্ ;
পাড়া-পড়শীর সেবার কাজে
রাখিস কিন্তু কিছু আরো,
উপযুক্ত আপদগ্রস্তে
দিতেই হ’বে যেটুকু পার ;
এসবগুলির আচরণে
ইষ্টভৃতি নিখুঁত হয়–
এ না-ক’রে ইষ্টভৃতি

জানিস্ কিন্তু পূর্ণ নয়।”

*ইষ্টস্থান বলতে শুধু ইষ্ট বা প্রিয়পরমের বসতবাটিই নয়। ইষ্টস্থান মানে, যেখানে থেকে আমরা মঙ্গল-অভিগমনে চলি। সে-হিসেবে পরমপিতার এই সারা দুনিয়াটাই ইষ্টস্থানে পরিণত হ’তে পারে।
(আলোচনা প্রসঙ্গে, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ইং ১৮-১০-১৯৪৫)

ইষ্টভৃতি নিবেদন করার পর শ্রীশ্রীঠাকুর নিম্নোক্ত বাণীর মাধ্যমে অগ্নিহোত্র করতে নিদেশ দিলেন।
“তুমি যখন তোমার ইষ্টে বা আচার্য্যে
ইষ্টার্ঘ্য বা ইষ্টভৃতি নিবেদন কর,
সে নিবেদন-সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই
শ্রদ্ধোৎসারিণী অন্তঃকরণে
অন্তর-আবেগ নিয়ে বল —
“হে দেবতা !
হে আমার আচার্য্য !
হে আমার প্রিয়পরম !
আমি আমার শ্রদ্ধাকে
তোমাকে আহূতি দিতেছি।”
—ইহাই অগ্নিহোত্রের তাৎপর্য্য,
কারণ, অগ্নিই হ’চ্ছেন
ইষ্টদেবতা ও ব্রহ্মবিৎ আচার্য্যের
প্রতীক,
তা’দেরই অগ্নিমুখ বলা হয়,
তাই অগ্নিহোত্র
নিত্য করণীয়,
কখনই পরিত্যাজ্য নয়। ১৫ ।
(ধৃতি-বিধায়না ১ম খন্ড)

শ্রীশ্রীঠাকুর পথের কড়ি গ্রন্থে ইষ্টভৃতির বিষয়ে বললেন :
❝ইষ্টভৃতি মানে হ’চ্ছে—সাংসারিক কোন কর্মে হস্তক্ষেপ করিবার পূর্ব্বেই ইষ্টপোষণার্থ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ পূর্ব্বক অন্ততঃ নিজের আহার্য্য পরিমিত ভোজ্য নিবেদন করা।❞
* * *
“ইষ্টভৃতি ভোজ্যই রীতি
অনুকল্পে জোটে যা’
বিনিময়ে তাই পাওয়া যায়
এমনি দিয়ে রাখিস্ তা।”

শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত ইষ্টভৃতি নিবেদন মন্ত্রের ‘‘ইষ্টভৃতির্ম্ময়াদেব কৃতাপ্রীত্যৈ তবো প্রভো, ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ।’’ উচ্চারণ করার সাথে সাথে বৃহত্তর পারিপার্শ্বিকের জীবনবৃদ্ধির দায়ভারের শপথ নিতে হয় আমাদের। সব অবস্থাতে বাস্তব কর্মে বৃহত্তর পরিবেশের জৈবাজৈব সবকিছুকে পালন-পোষণে সমৃদ্ধ করে রাখার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সার্থক হয় ইষ্টভৃতি পালন। ইষ্টাদর্শের পঞ্চবর্হিঃ ও সপ্তার্চ্চি-র বিধি মেনে শারিরীক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক সদাচার পালনে, ইষ্টপ্রোক্ত বিধি অনুসরণ করে বিবাহ ও সুপ্রজনন নীতি পালনে অভ্যস্ত না হতে পারলে—‘আমি ইষ্টভৃতি করি’ এই কথা বলা বোধহয় সমীচীন হবে না। ইষ্টভৃতি করা মানে, বাস্তবে ইষ্টনীতি মেনে চলা, ইষ্টনীতির ভরণ করা।

যদিও ইষ্টভৃতি প্রচলনের পূর্বে সত্যানুসরণের “তুমি তোমার, নিজ পরিবারের, দেশের ও দশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দায়ী।”—বাণী-মাধ্যমে অনুরূপ দায়ভার দিয়েই রেখেছিলেন ব্যষ্টি ও সমষ্টি উন্নয়নের দিকে লক্ষ্য রেখে।
এ তো গেল ইষ্টভৃতি আহরণ ও নিবেদনপর্ব। এর পর রয়েছে প্রেরণপর্ব। প্রেরণ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর স্পষ্ট নিদেশ দিয়ে বলেছেন :
ইষ্টভৃতি ইষ্টকেই দিস্
করিসনা তা’য় বঞ্চনা।
অন্যকে তা’ দিলেই জানিস
আসবে বিপাক গঞ্জনা ।।
অর্থাৎ ইষ্টভৃতি ইষ্টেরই প্রাপ্য, অন্য কারও নয়। ওই অর্ঘ্য দিয়ে ইষ্টকর্ম করা হবে। ইষ্টকর্ম মানে পূর্ত্তকর্ম। যা প্রকৃত ইষ্টভৃতির মন্ত্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ ।।” এর সরলার্থ খুব সহজ। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুযায়ী সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন বর্দ্ধনার বিধি মেনে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে চলেন যিনি এমন গুরুভাই-ই প্রকৃত ইষ্টভ্রাতা।––যাঁর আপদে-বিপদে সাধ্যানুগ সাহায্য করতে হবে। ভূত মানে,—ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা পরিবেশের অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। উক্ত উপাদানসমূহকে সমৃদ্ধ রাখার জন্য আর্য্যদের বাস্তব পূর্ত্ত-কর্মের মাধ্যমে নিত্য পঞ্চ-মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করতে হতো সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধিকে অক্ষুণ্ণ রাখতে। শ্রীশ্রীঠাকুর ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের মাধ্যমে ওই প্রক্রিয়াকে নবীকরণ করলেন। শ্রীশ্রীঠাকুর হিমাইতপুরে সপারিপার্শ্বিক জীবন বৃদ্ধিদ আশ্রম সংগঠনের মাধ্যমে, ইষ্টভৃতি প্রবর্তনের পূর্বেই ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আমাদেরও তাই করতে হবে, বাস্তবে।
ইষ্টের অবর্তমানে, ইষ্টাদর্শের পরমরাষ্ট্রিক সমবায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অবিচল থেকে দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ, কৃষি ও শিল্পের বাস্তবায়ন করতে নিবেদিত-প্রাণ যিনি, তিনিই ইষ্টার্ঘ্য গ্রহণের উপযুক্ত ব্যক্তি।
এ বিষয়ে পরম দয়ালের সুস্পষ্ট নির্দেশ :-
“আগত যিনি, উপস্থিত যিনি—
তাঁর বিগতিতে বা তিরোভাবে
তাঁর বংশে যদি
তাঁ’তে অচ্যুত—সশ্রদ্ধ—আনতি-সম্পন্ন,
প্রবুদ্ধ-সেবাপ্রাণ,
তঁৎবিধি ও নীতির সুষ্ঠু পরিচারক
ও পরিপালক,
সানুকম্পী-চর্য্যানিরত,
সমন্বয়ী সামঞ্জস্য-প্রধান,
পদনির্লোভ, অদ্রোহী,
শিষ্ট-নিয়ন্ত্রক,
প্রীতিপ্রাণ—এমনতর কেউ থাকেন—
তাঁরই অনুগমন ক’রো,
কিম্বা তা’ও যদি না পাও—
তবে, তাঁর কৃষ্টি-সন্ততির ভিতর
অমনতর গুণসম্পন্ন যিনি
তাঁরই অনুগমন ক’র পারম্পর্য্যে—
যতক্ষণ আবার
আগতের অভ্যুত্থান না হয়,
ঠকবে না—
শিষ্ট-সমন্বয়ে সম্বর্দ্ধনাও পাবে।” ৩৯ । (সম্বিতী)

১) তাঁতে অচ্যুত-সশ্রদ্ধ-আনতিসম্পন্ন,
২) প্রবুদ্ধ-সেবাপ্রাণ,
৩) তঁৎবিধি ও নীতির সুষ্ঠু পরিচারক ও পরিপালক,
৪) সানুকম্পী-চর্য্যানিরত,
৫) সমন্বয়ী-সামঞ্জস্য প্রধান,
৬) পদনির্লোভ,
৭) অদ্রোহী,
৮) শিষ্ট নিয়ন্ত্রক,
৯) প্রীতিপ্রাণ।
তাঁর সন্তান-সন্ততিগণের মধ্যে এই নয়টি বিশেষ গুণসম্পন্ন যিনি—অভাবে তাঁর কৃষ্টি সন্ততির অর্থাৎ শিষ্যবর্গের মধ্যে অমন গুণ সম্পন্ন যিনি তাঁরই অনুগমন কর !”

উক্ত বাণীর সরলার্থ,—যিনি অর্থ-মান-যশ ইত্যাদির নাগপাশ থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিজের চরিত্রে ঠাকুরত্বকে জাগ্রত করেছেন, তাঁকে কেন্দ্র করে চলতে হবে, তাঁকেই ইষ্টার্ঘ্য দিতে হবে। অন্যথায় বিপাক-গঞ্জনাকে মেনে নিতে হবে।
ওই বাণীর মর্মার্থ অনুযায়ী ১. ইষ্ট পরিবারের সব সদস্যরা মিলে যাঁকে উপযুক্ত নির্বাচন করবেন তাঁকে কেন্দ্র করে চলতে হবে। ২. ইষ্ট পরিবারের সদস্যরা যদি অমনতর গুণসম্পন্ন উপযুক্ত কাউকে নির্বাচিত না করতে পারেন তাহলে কৃষ্টিসন্তানদের মধ্য থেকে নির্বাচিত করতে হবে এবং তাঁর অনুগমন করে কেন্দ্রায়িত চলনে চলতে হবে।—অন্যথায় শ্রীশ্রীঠাকুরের নিদেশ অনুযায়ী বিপাক-গঞ্জনাকে মেনে নিতে হবে। এই বাণীতে বংশানুক্রমিক জ্যেষ্ঠ-পরম্পরার বিষয় কিন্তু উল্লেখ করেন নি।
———————

প্রসঙ্গ : লক্ষ্মী পূজা

।। আমাদের লক্ষ্মীপূজা ।।


।। লক্ষী মানে শ্রী, লক্ষ্মীর সম্মান রক্ষা কিভাবে করতে হবে ।।
“যে বংশে ভগিনী ও গৃহস্থের স্ত্রী (নারীকূল) পুরুষদের কৃতকর্মের জন্য দুঃখিনী হয়, সেই বংশ অতি শীঘ্র ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। আর যে বংশে স্ত্রীলোকেরা সন্তুষ্ট থাকে, সেই বংশ নিশ্চিতভাবেই শ্রীবৃদ্ধি লাভ করে”। (মনুসংহিতা ৩/৫৭)


।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রদত্ত লক্ষ্মী হয়ে ওঠার বিধি ।।

‘লক্ষ্মী’ মানে শ্রী
আর
এই ‘শ্রী’ কথা আসিয়াছে
সেবা করা হইতে;
তুমি
যথোপযুক্তভাবে
তোমার সংসার
ও সংসারের পারিপার্শ্বিকের,
যেখানে যতটা সম্ভব,
বাক্য, ব্যবহার, সহানুভূতি, সাহায্য দ্বারা
অন্যের অবিরোধভাবে
মঙ্গল করিতে চেষ্টা করিও,
তোমার লক্ষ্মী-আখ্যা খ্যাতিমন্ডিত হইবে—
দেখিও। ৩৫ । (নারীর নীতি)

দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে মাদুর্গার সাথে লক্ষ্মীদেবীও পূজিতা হন। তথাপিও দুর্গাপূজার অঙ্গনগুলোতে দুর্গাদেবীর কন্যাজ্ঞানে লক্ষ্মীদেবীর পৃথকভাবে আর একবার পূজা করা হয় কোজাগরি পূর্ণিমাতে, কেন বলতে পারব না। মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী হিন্দু-গৃহস্থদের ঘরে ঘরে পট, প্রতিমা, কলাবৌ, আখবৌ ইত্যাদির মাধ্যমে তথাকথিত পুরোহিত নামের মূর্তি-পূজারীদের এনে পূজা করার রীতি প্রচলিত। অনেক পরিবার আবার লক্ষ্মী-পূজার দিনে নিয়ম মেনে মৎসাহারে রসনা তৃপ্তি করেন। কিন্তু কে, কোন লক্ষ্মীদেবীকে পুজো করেন, তা আমি বলতে পারব না। তবে এটা ঠিক, ‘লাভানাং শ্রেয় আরোগ্যম্’ অর্থাৎ লাভের মধ্যে শ্রেষ্ঠ লাভ হলো আরোগ্য লাভ।-এর তত্ত্ব না জেনেই হয়তো ধন-সম্পদ লাভের আশায় বন্ধ্যাপূজা স্বরূপ ‘চলন-হারা চরণ-পূজা’—লক্ষ্মীপূজার আয়োজন করেন। ‘গিভ অ্যাণ্ড টেক’ পলিসি মেনে।
শাস্ত্রমতে মা লক্ষ্মীর অপর নাম শ্রী। ঋক্ ও অন্যান্য সংহিতাতে লক্ষ্মী নাই কিন্তু শ্রী আছেন। অন্যান্য বেদে লক্ষ্মী বা শ্রী শব্দ দেবী অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। বৌধায়ন ধর্মসূত্রে, শুক্ল যজুর্বেদে ও তৈত্তিরীয় আরণ্যকে শ্রী-কে দেবী বলা হয়েছে। মহাভারত অনুসারে সমুদ্র মন্থনে উৎপন্ন শ্রী-কে লক্ষ্মী বলা হয়েছে। মহাভারত ও পুরাণে বিষ্ণুর শক্তি বা স্ত্রীর নাম লক্ষ্মী। (সূত্রঃ পৌরাণিকা)

লক্ষ্মীদেবী যিনিই হোন না কেন, আমরা ‘লক্ষ্মী’ শব্দটিকে মনেপ্রাণে মেনে নিয়েছি। একটা মেয়ের চালচলন. বাক্, ব্যবহার সত্তানুরঞ্জনী হলে আমরা লক্ষ্মী মেয়ে বলি। আবার অসুস্থ কাউকে দেখলে, অসুন্দর কিছু দেখলে মুখ দিয়ে অজান্তেই ‘শ্রীহীন’ শব্দটি বেরিয়ে আসে। তাহলে দেখা যাচ্ছে শরীরে, মনে, প্রাণে, সামাজিকতায়, বাক-ব্যবহারে সমৃদ্ধ মানুষকে আমরা শ্রীবৃদ্ধিসম্পন্ন বা লক্ষ্মীমন্ত মানুষ বলি। শ্রী লাভ মানেই লক্ষ্মী লাভ। এই শ্রী লাভ করতে হলে শ্রী লাভের বিধি বা নিয়ম মেনে চলতে হবে। শ্রী লাভের বিধি না মেনে যদি লক্ষ্মী লাভ হতো তাহলে বছর বছর লক্ষ্মীমূর্তির পূজা করে গৃহলক্ষ্মীরা ডিভোর্স নিয়ে গৃহহীন হতো না। সন্তানেরা থ্যালাসেমিয়া, হিমোফিলিয়া প্রভৃতি নামের দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগতো না। বছর বছর লক্ষ্মীপূজা করা মায়েদের সন্তানদের অকালমৃত্যু হতো না।

ভগবানের আর এক বিধি। সুস্থ জীবন-যাপনের বিধি বা নিয়মাবলী যিনি দিতে পারেন তিনি হলেন আদর্শ ভগবান। শাস্ত্রমতে ষড়ৈশ্বর্য্যশালী শ্রীমন্ডিত মহাজ্ঞানী মহাজন রক্তমাংসের মানুষকে, নারায়ণ-স্বরূপ নরশ্রেষ্ঠ উত্তম পুরুষকে সদগুরু বা জীবন্ত ভগবান বলা হয়েছে। একমাত্র তিনিই পারেন আমাদের শ্রীমণ্ডিত করে তোলার বিধি দান করতে। সব দেবতার সমাহার স্বরূপ বর্তমানের নররূপী নারায়ণ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের প্রকৃত অর্থে শ্রীমণ্ডিত করে তোলার জন্য দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ, কৃষি ও শিল্পের প্রবর্তন করলেন।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, ‘‘করা যদি থাকে, তবে সঙ্গে থাকে লক্ষ্মী। লক্ষ্মী কথার মানে আলোচনা, দর্শন. জ্ঞান, চিহ্নী-করণ ইত্যাদি। এগুলি না থাকলে লক্ষ্মী পাওয়া যায় না।’’ (আঃ প্রঃ ৭ম খণ্ড, ২১. ০৩. ১৯৪৬)

নররূপী নারায়ণের ওই বিধান উপেক্ষা করে, তথাকথিত প্রচলিত লক্ষ্মীপূজা করে প্রকৃত অর্থে লক্ষ্মী লাভ অসম্ভব।


চলনহারা চরণপূজা
বন্ধ্যাপূজা সেই জানিস
আদর্শেতে অটুট চলন
বর্দ্ধনা তোর তাই মানিস ।
আজ কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা । সংসারের সার্বিক শ্রীবৃদ্ধি কামনায় আমরা ঘরে ঘরে লক্ষ্মীপূজা করি । প্রথাগত লক্ষীপূজা করা সত্বেও আমরা আমাদের অভাব দূর করতে পারছি না । শান্তির অভাব, সুখের অভাব, ধৈর্য্য, সহ্য, স্থিতধী থাকার অভাব, টাকাপয়সার অভাবে আমরা জেরবার । অভাব থেকে ‘অ’-কে বাদ দিতে হলে সদগুরুর ভাবের সাথে ভাব করতে হয় । শ্রীশ্রীঠাকুর সেই ‘ভাব’ অর্জনের নিদানে বললেন ‘লক্ষ্মী’ মানে শ্রী, শ্রী মানে সেবা, আর পূজা মানে বর্দ্ধনা। দেবী লক্ষ্মীরূপিণী গৃহিনীরা সদাচার পালন করে কীর্ত্তি, শ্রী, বাক্, স্মৃতি, মেধা, ধৃতি ও ক্ষমা-র ভাবে সিদ্ধ হতে পারলেই লাভ হবে লক্ষ্মী । নারায়ণের প্রতীকস্বরূপ স্বামীকে, সংসারকে, পরিবেশকে, সদাচারী সেবায় সন্তুষ্ট করতে পারলেই শ্রীবৃদ্ধি হয়ে লক্ষ্মী লাভ হবে । তাড়ালেও যেতে চাইবে না । অসদাচারে ঘরের গৃহিনী নিজেকে অশুদ্ধ করলে সংসার হয় লক্ষ্মীছাড়া ।
সদাচারে বাঁচে বাড়ে
লক্ষ্মী বাধা তার ঘরে । *
tapanspr@gmail.com

পূজা ও ধর্ম্ম

“অস্তিত্বের নাই উপাসনা
      সে-ও কি সতী সে-ও কি সৎ
সবাই কি তাই হয়ে আছে
      বেঁচে থেকেও মৃতবৎ!”

“অস্তিত্বের নাই উপাসনা
সে-ও কি সতী সে-ও কি সৎ
সবাই কি তাই হয়ে আছে
বেঁচে থেকেও মৃতবৎ!”

।। পূজা ও ধর্ম ।।


পূজা মানে সম্বর্ধনা, পূজ্য চরিত্রের গুণ অনুশীলন করে নিজেকে সম্বর্ধিত করা। আর ধর্ম মানে ধারণ করা। নিজের এবং অপরের অস্তিত্বের ধারক, পালক ও পোষক হবার জন্য যা যা করা হয়, তাই ধর্ম। অনিত্যকে ত্যাগ করে নিত্য-এর উপাসনা করা, আরাধনা করা। যার যার, তার তার, পালনীয়। কোনো ভায়া-মিডিয়া দিয়ে হবে না। যার ক্ষিদে তাকেই খেতে হবে, ক্ষুধার্তের হয়ে অন্য কেউ খেলে ক্ষুধার্তের কি পেট ভরবে? ছাত্রের হয়ে শিক্ষক পরীক্ষা দিলে কি তা’ গ্রহণযোগ্য হয়! অথচ পুজোর নামে আমরা এই কাজটাই করে চলেছি। যাঁর পুজোর নামে মেতে উঠছি, তাঁর আদর্শ কি, তাও জানিনা, সাধন-ভজন কিভাবে অনুশীলন করতে হয়, তাও জানি না। আমাদের কাজ চাঁদা তোলা / চাঁদা দেওয়া, মৃৎশিল্পীর কাছ থেকে মূর্তি আনা, নতুন পোশাক পরা, ধুপহীন ধুপকাঠি, ফল-মিষ্টি মণ্ডপে দিয়ে প্রতিমার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে, পুরোহিতের মাধ্যমে পুষ্পাঞ্জলি (যদিও সকলে পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে পারেন না, দূর থেকেই প্রণাম সেরে নেয়।) দিয়ে “রূপং দেহি, ধনং দেহি, যশ দেহি ….”—অর্থ-মান-যশ ইত্যাদি সমস্যার সমাধান চাওয়া। আর চব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় আদি লোভনীয় তামসিক, রাজসিক খাওয়া দাওয়া নিয়ে মেতে ওঠা!
ভিড় ঠেলে চেঁচামেচি, মাইকের আওয়াজ, হৈ-হট্টগোলকে সাথী করে এ প্যাণ্ডেল থেকে ও প্যাণ্ডেলে পর্যটন করা!
বিয়ে যেমন-তেমন হোক না কেন! দৈনন্দিন জীবন চলনায় সিঁদুরকে আপনার করে না নিলেও, স্ত্রী ধর্মের স্বাধ্বী-চলার প্রতীক-স্বরূপ সিঁথির সিঁদুর অক্ষয় রাখার মানসে দশমীতে সিঁদুর খেলা, বিসর্জনে হৈচৈ করা, একটু হার্ড-সফ্ট ড্রিঙ্কসের সাহায্যে মায়ের বিসর্জনের বিরহ-বেদনা ভোলার চেষ্টা করা!।—ইত্যাদি ইত্যাদি হচ্ছে আমাদের মত সাধারণ মানুষের পুজো।—ব্যস্! আসছে বছর আবার হবে! এই হলো পূজার নামে মেতে ওঠা সংখ্যাগরিষ্ঠ মা দুর্গার ভক্তদের পূজা বিষয়ে অভিব্যক্তি। কতিপয় জীবন পিয়াসী মানুষেরা পূজাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় কৃষ্টির চৌষট্টি কলার অন্তর্ভুক্ত সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি ইত্যাদি কলা-শিল্প পরিবেশন করে ভারতীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে ধরে রাখার চেষ্টা করেন।


যাইহোক এবার একটু গভীরে প্রবেশ করার চেষ্টা করি।

ভারতের আর্য্য-ঋষিগণ, অবতার-বরিষ্ঠগণ প্রত্যেকেই সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির
উপাসনার কথা বলেছেন ধর্মের নামে, পূজার নামে। বর্তমান পুরুষোত্তম
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আরও একটু সহজ করে দিয়ে বললেন, ‘‘ধর্ম্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম্ম না-রে। অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম্ম
বলে জানিস্ তাকে। পূর্বতনে মানে না যারা/জানিস্ নিছক ম্লেচ্ছ তা’রা।’’
‘‘পূজা-আর্চ্চা মানেই কিন্তু /দৈবগুণ যা সেধে নেওয়া। হাতে-কলমে মক্স
করে/বাস্তবে তার রূপটি দেওয়া।।’’
ইত্যাদি ছড়াবাণীগুলো সহজ, সরল, ওজস্বী
আবদনে সমৃদ্ধ হলেও একটা নির্দিষ্ট গণ্ডীর ভাষা-ভাষীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
ওই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দিতে বললেন,
‘Upholding urge of existence is Dharmma.’ বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্তা বা
অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করে উৎকর্ষতায় রক্ষা করার নাম ধর্ম। তথাপিও
আমরা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতার, কু-সংস্কারের, অজ্ঞানতার আবরণ ভেদ করে
শুদ্ধ আমিটাকে বের করতে ব্যর্থ হলাম। তথাকথিত ইনটেলেকচ্যুয়াল হওয়া সত্বেও
ধর্মের নামে ফুল, বেলপাতা, ধূপবিহীন ধূপকাঠি, ফল-মিষ্টান্নাদির অঢেল
আয়োজনে, মাইক বাজিয়ে, শব্দবাজির আওয়াজ দিয়ে পরিবেশবিদদের চিন্তার
বলিরেখায় ভাঁজ ফেলে দিতে ইন্ধন যোগাচ্ছি। আর আমাদের গর্বের রবীন্দ্রনাথ
আমাদের দ্বিচারিতা দেখে কষ্ট পাচ্ছেন আর ভাবছেন, যে মানুষগুলো ‘তোমার
পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার
তলে’ ইত্যাদি ছন্দের ডালি সাজিয়ে ভক্তির আবেদন জানায়, তারাই আবার পূজার
নামে কু-সংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে বিশ্বাত্মাকে দূষিত করে চলেছে।
আমাদের বর্তমান যুগ যে যুক্তিবাদী সে কথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি
অস্বীকার করবেন না আশাকরি। যেমন, সন্তানের হয়ে মা খেলে সন্তানের পেট ভরবে
না। ছাত্রের হয়ে শিক্ষক লেখাপড়া করলে ছাত্র পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে
না।–তেমনি প্রচলিত পূজার আয়োজকদের হয়ে কোন পুরোহিত পূজা করলে আয়োজকদের
কিছু ফললাভ হবে কি ?
অবশ্য পুরোহিতও জানেন না ফললাতের বিষয় সম্পর্কে। যদি জানতেন বিসর্জন
মন্ত্রে বলতেন না—ওঁ আবাহনং ন জানামি, নৈব জানামি পূজনম্। বিসর্জনং ন
জানামি ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি (পরমেশ্বর)।–অর্থাৎ আমি আবাহনও জানিনা,
বিসর্জনও জানিনা, আমাকে ক্ষমা করুন। (দ্রঃ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)
বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী পূজ্য-প্রতিমা চঞ্চল চিত্তের
ধারণের জন্য একটি অবলম্বন। প্রতিমাকে ব্রহ্মের রূপ কল্পনা করে উপাসনা,
সংযম, সাত্তিক আহার, সাত্তিক বিহার ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে পূজা
করা হয়।–যাতে পূজক বা উপাসক মনসংযোগ দ্বারা প্রতিমাকে হৃদয়ে ধারণ করে
প্রতিমার গুণে গুণান্বিত হতে পারে। এই হলো প্রতিমা পূজার মূল কথা।
এ থেকে এটুকু বোঝা গেল যে সততা, সংযম, ন্যায়নীতি ইত্যাদি মানবিক
গুণগুলোর প্রবহমানতাকে বৎসারান্তির নবীকরণ করার মাধ্যম বাহ্য-পূজা
উদযাপনের উদ্দেশ্য। অথচ বাঙালীর সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার আয়োজন
বিশ্লেষণ করলে এর বিপরীত চিত্রটাই আমাদের বোধে ধরা পড়ে।
বিজ্ঞানের বিধি অনুযায়ী একটা নির্ভুল অংক কষতে গেলেও একটা শান্ত পরিবেশ
প্রয়োজন, একাগ্রতার প্রয়োজন। কিন্তু পূজার নামে, বেশীরভাগ
পূজা-প্রাঙ্গনগুলোতে ঢাকের আওয়াজ, মাইকের আওয়াজ, আয়োজকদের অহংকারের
আওয়াজে কোন সুস্থ মানুষের একটি ঘণ্টার জন্যও একাগ্রভাবে, স্থিরচিত্তে বসে
থাকতে পারার কথা নয়! অবশ্য দেবদেবীর ব্যাপারটা আলাদা। মাটির পুতুল বলেই
আমাদের সব অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করতে পারে! তাই কবিগুরুর ভাষার ‘তোমার
পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’ বাণীগুলো এক নির্মম সত্যের বার্তা দেয় না
কি ?
বাঙালিদের মানস-দেবী মা দুর্গা। ‘যা দেবি সর্বভূতেষু’ মন্ত্রে যাঁর
অস্তিত্বের স্বরূপ প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ দেবী সর্বভূতের প্রাণশক্তি
স্বরূপা, সর্বভূতে দেবী অধিষ্ঠিতা। এবার প্রশ্ন, যে দেবী সর্বভূতে
অধিষ্ঠিতা সেই পঞ্চ-মহাভূত পরিপোষিত স্বেদজ, ক্লেদজ, অণ্ডজ, জরায়ুজ-জাত
ভূত(ভৌত, জীবন)গুলোকে, বেঁচে থাকার জৈবাজৈব আবশ্যক উপাদানগুলোকে দেবীর প্রতিভূ মনে
করে সম্বর্দ্ধিত না করে, সুস্থভাবে টিঁকিয়ে রাখার চেষ্টা না করে, কোন
যুক্তিতে মাটির প্রতিমা পূজার নামে প্রাণী হত্যা করে, নানাভাবে পরিবেশকে
দূষিত করার জন্য কোটি কোটি টাকা অপচয় করা হয়!
ভাষা-বিজ্ঞান অনুযায়ী পূজা মানে পূরণ করা, সম্বর্দ্ধিত করা। যে
আচার-আচরণ পরিবেশের সাত্তিক জীবন-বর্দ্ধনার অভাবকে পূরণ করে, জৈবাজৈব
সবকিছুকে সম্যকরূপে বর্দ্ধিত করে, তার নাম পূজা। উৎকৃষ্ট প্রসব করে যা,
তার নাম উৎসব। আর যে আচার-আচরণ জীবনবৃদ্ধিকে নন্দিত করে তার নাম আনন্দ।
এখন প্রশ্ন, আমাদের প্রচলিত পূজা, উৎসবের উদযাপনকে কেন্দ্র করে আনন্দের
প্রকাশ বৃহত্তর পরিবেশকে কতখানি নন্দিত করে ‘পূজা’ শব্দের যথার্থতাকে
উপহার দিতে পেরেছে ? –এইসব বিষয়ে সত্তাপিয়াসী চিন্তাশীলদের চিন্তা করে
দেখা উচিত। বিশেষ করে যাঁরা কুসংস্কার বিরোধী রূপে নিজেদের বোধ ও বোধিকে
প্রতিষ্ঠিত করতে চান।
বাহ্য পূজাবাদীদের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী পূজা শুরুর আগে মৃন্ময়ী
মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। আয়োজকদের বিশ্বাস, পুরোহিতের
মন্ত্রবলে নিষ্প্রাণ মূর্তিগুলো প্রাণবন্ত হয়। তর্কের খাতিরে বিষয়টাকে
সত্য বলে যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে একটা প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে,
জীববিজ্ঞান অনুযায়ী জীবন্ত প্রাণীদের চলন, গমন, ইত্যাদি অভিব্যক্তি থাকা
আবশ্যিক। অতএব বিজ্ঞানসম্মত কারণেই পুরোহিতের মন্ত্রবলে দুর্গাঠাকুরের
চালচিত্রের জীবন্ত দেবদেবী, অসুর, সিংহ, ময়ূর, সাপ, পেঁচা, ইঁদুরেরা নিজ
নিজ অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে। কেউ চুপচাপ স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে পারবে
না। ফলে শুরু হয়ে যাবে মহিষাসুর মর্দিনীর বাস্তব উপস্থাপনা। অসুর,
দুর্গাকে আক্রমণ করবে, সিংহ গর্জন করতে করতে দেবীকে নিয়ে অসুরের দিকে
ধাবিত হবে, বাহনসহ অন্যান্য দেবদেবীরাও যোগদান করবে যুদ্ধে।–এবার
প্রশ্ন–ওই অবস্থায় পুরোহিত, আয়োজকেরা, ভক্তেরা, উদ্বোধন করতে আসা
সেলিব্রিটিরা, নেতা-মন্ত্রীরা কোন পক্ষে যোগদান করবেন? দেবীর পক্ষে না
অসুরের পক্ষে ?
আর একটা প্রশ্ন, যে পুরোহিত আদ্যিকালের দেবদেবীদের কল্পিত মাটির
মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম, তিনি মানুষের প্রাণহীন দেহে আরো
সহজে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন বা পারা উচিত। কারণ, বিজ্ঞান মতে,
মাটির মধ্যে থাকা অণু-পরমাণুর তুলনায় সদ্য মৃতদেহের অণু-পরমাণু বেশী
সক্রিয় থাকে, বেশী জীবন্ত থাকে। মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী সরকারের স্বাস্থ্য
বিভাগ এ বিযয়টা নিয়ে ভেবে দেখতে পারেন। তাহলে অনেক অকালমৃত্যু সহজে রোধ
করা যাবে।
সনাতন ধর্মীয় মতবাদ অনুযায়ী মানুষ অমৃতের পুত্র, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’
বলা হয়েছে। সেই মানুষ যাতে দশবিধ-সংস্কারে সংস্কৃত হয়ে প্রকৃষ্ট জাতক বা
প্রজা হয়, অকালে নিষ্প্রাণ না হয়, সন্ত্রাসবাদী না হয়, রেপ-কেসের আসামী
না হয়, নারীদের মা-দুর্গার প্রতীক জ্ঞানে সম্মান জানায়, ‘অসতো মা সদ্গময়,
তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়’-এর আদর্শ অনুসরণে সমৃদ্ধ
হয়,—সমাজের পুরোভাগে থেকে, ওইসব বিষয়ে মানুষকে সচেতন করে পরিবেশের
হিতসাধন যাঁরা করতেন তাঁদের বলা হতো পুরোহিত।
সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পুরোহিত ঋষি বশিষ্ঠ রামচন্দ্রের রাজসভায়
অকালমৃত্যু-দেহে প্রাণ সঞ্চার করার স্পর্দ্ধা দেখান নি। বিজ্ঞান-যুগের
পুরোহিতেরা যদি পুতুলে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন, মৃতদেহেও পারা
উচিত! যদি না পারেন, ততঃ কিম্!
ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি, ‘পূজা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সম্বর্দ্ধনা।
পূজ্য ব্যক্তিত্বের গুণে গুণান্বিত হয়ে নিজেকে এবং পরিবেশকে সম্বর্দ্ধিত
করা। এতদিন ধরে হাজার-হাজার দুর্গাপূজা করে আমাদের চিন্ময়ী নারীরা
কতখানি সমৃদ্ধ হয়েছে মা দুর্গার আদর্শ চরিত্রের চরিত্রায়নে ? আমাদের
চিন্ময় পুরুষেরা নারী সাধারণকে কতটা মা-দুর্গার প্রতীক মনে করে শ্রদ্ধা
করতে বা পূজা করতে শিখেছে ? আমরা সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির পথে কতটা এগিয়েছি?
আমাদের কতখানি দুর্গতি নাশ হয়েছে? আমাদের সার্বিক জীবন-চলনা দুর্গ-সম
পরিরক্ষিত হয়েছে কতটা?—তথ্য জানার অধিকার বলে এ বিষয়ে জানতে চাওয়াটা
নিশ্চয়ই অপরাধ হবে না! যদিও প্রচলিত তথ্য এর বিপরীত মত প্রকাশ করে চলেছে
দীর্ঘদিন ধরে। পূজাকে কেন্দ্র করে সাত্তিকতা বৃদ্ধি না পেলেও, তামসিকতা
বেড়ে যায় বহুগুণ। পুজোকে কেন্দ্র করে ভক্তদের অনিত্য দেহটাকে
পূজা-বিপরীত সাধের নানা বেশভূষায় সাজিয়ে দিতে বিকিকিনির পসরা সাজিয়ে
যারা বসেন, তারা কি পূজা-সদৃশ সততার দৃষ্টান্ত উপহার দেন সমাজকে ? পূজাই
যদি উদ্দেশ্য তবে ইভটিজিং, আদমটিজিং কেন হবে ? নারী নির্যাতন, দাম্পত্য কলহ, ডিভোর্স, যৌন অপরাধ কেন বৃদ্ধি পাবে ?
দূষণ কেন বৃদ্ধি পাবে পূজাকে কেন্দ্র করে ?— এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে
?
দুর্গাপূজার বিষয়টাকে বাস্তববোধে চিন্তা করলে দেখা যাবে, আমাদের আলোচ্য
মা-দুর্গা পূজ্য তাঁর চরিত্রগুণে। মা দুর্গার সমার্থক, মা উমাকে আমরা
কন্যা জ্ঞান করি। তাইতো ফি বছর কৈলাস থেকে নিয়ে আসি। যদিও তাঁকে আনতে এবং
দিতে কে বা কারা যান। কোন রুটে দোলায়, নৌকায়, ঘোটকে এবং গজে যাতায়াত
করেন, সে খবর দেবার দায়িত্ব তথ্যাধিকারীদের, আমার নয়! তবে আমি এবং আমরা
দশভুজার চাইতেও দ্বিভুজা উমাকে বেশী পছন্দ করি বলেই না উমাকে নিয়ে কতই না
আগমনী গানের ডালি সাজিয়ে তাঁকে বরণ করে নিতে চাই। কামনা করি, ঘরে ঘরে
উমার মত আদর্শ মেয়ে যেন জন্মায়। উমাই তো আমাদের মা দুর্গা! ভারতেই শুধু
নয়, সারা বিশ্বের সংস্কৃত মনীষায় নারীজাতির আদর্শরূপে স্বীকৃত, পূজিত।
স্বীকৃতি পাবেনই না বা কেন, পূজিত হবেনই না বা কেন,–কারো কান-ভাঙানিতে
কান না দিয়ে পরমভক্ত-পরমজ্ঞানী শিবকে পতিরূপে বরণ করে, স্বামীর
মনোবৃত্ত্যানুসারিণী স্ত্রী হয়ে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীদের ন্যায়
কৃতি সন্তানদের জননী হয়েছেন। তিনি একজন আদর্শ সংসারী নারী হয়েও অসৎ
নিরোধী তৎপর,—অশুভ শক্তিকে সমুচিত দণ্ড দেবার জন্য রণসাজে সজ্জিত
হয়েছেন। পশুরাজকে করেছেন বাহন। পারস্পরিক শত্রু খাদ্য-খাদক সম্পর্কের
পেঁচা-ইঁদুর, ময়ুর-সাপকে মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ করেছেন। দুটি হাত দিয়েই
বৃহত্তর সংসারের দশদিক সামলাতেন। তাই তো তিনি দ্বিভূজা হয়েও দশ
ইন্দ্রিয়কে বশ করে হতে পেরেছেন দশভূজা। তাই তো তিনি দশপ্রহরণধারিণী। তাই
তো তিনি পূজ্য। –এহেন চরিত্র ‘দেবী’ জ্ঞানে, ‘জগজ্জননী’ জ্ঞানে স্বীকৃতি
তো পাবেনই। তাই তো আমাদের ঋষিরা দেবতাদের সম্মিলিত শক্তিতে সৃষ্ট দেবী
দুর্গা কাত্যায়ন অঙ্গনে মহিষাসুরকে বধ করার পর তাঁর প্রদর্শিত শক্তিকে
দৃষ্টান্ত স্বরূপ চিরস্থায়ী একটা আদর্শে রূপ দিয়েছিলেন। দেবী দুর্গাকে
স্ত্রীজাতির এক আদর্শ প্রতীক রূপে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁরা দেবী দুর্গার ওই
অসৎ-নিরোধী তৎপরতাকে দৃষ্টান্ত বূপে তুলে ধরে নারীসাধারণকে দেবী রূপে,
জগন্মাতা রূপে মর্যাদা দিয়েছেন, কামিনীরূপে নয়। তাইতো বর্তমানেও
সম্ভ্রান্ত হিন্দু নারীদের মধ্যে দেবী পদবি প্রচলিত। ঋষিরা ছিলেন
বিজ্ঞানী। তাই তো তাঁরা দুর্গাপূজার বিধান দিলেন বাস্তব অনুশাসনের
মাধ্যমে। আত্মবিস্তার কল্পে গর্ভাধান-সংস্কারের সময় স্বামী, নিজের
স্ত্রীকে জগন্মাতা জ্ঞানে স্ত্রীর নাভিমূল স্পর্শ করে বলবেন, প্রসীদ মা
জগজ্জননী,—হে জগন্মাতার প্রতীকস্বরূপা চিন্ময়ী মা, তুমি প্রসন্ন হয়ে
আমাকৃত গর্ভাধান মাধ্যমে দেদীপ্যমান আত্মাকে আকর্ষণ কর।–ওই স্বীকৃতির
মাধ্যমে স্ত্রীকেও মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েছেন, কামিনীজ্ঞানে নয়।
এর কারণ, স্বামী, স্ত্রীর মাধ্যমে নিজেকে জন্মান, তাই তিনি জায়া।
জীববিজ্ঞান অনুসারে প্রজনন-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আত্ম-প্রতিলিপি গঠন করা
হয়। পুরুষ-বীজ ধারণ করে, বীজের প্রতিলিপি গঠন করে ভূমি-স্বরূপা নারী। জনন
করেন বলে জননী। তাই কৃষকেরা ফসল ফলাতে জমি কর্ষণ করে, কর্ষণ মানে আকর্ষণ,
যাতে জমি বীজ থেকে ভালো সন্তান (ফসল) আকর্ষণ করতে পারে। জমি অনুযায়ী
উপযুক্ত শুদ্ধ-বীজ বপনের আগে ভূমিকে আগাছা মুক্ত করে, সার দেয়, জল দেয়,
জমি জননক্ষম হলে জো বুঝে বীজ বোনে।–জমিকে মাতৃজ্ঞানে পোষণ দিয়ে ভূমিকে
পূজা করে—যাতে জমি বীজের অন্তর্নিহিত সত্তাকে ভালোভাবে পুষ্ট করতে পারে,
বীজের সত্তাকে ধারণ করে আদর্শ মা হয়ে ভালো ফসল ফলাতে পারে। ফসল ফলাতে যদি
গর্ভাধান প্রক্রিয়া থাকতে পারে, মানুষ ফলাতে তো আরও বেশী বিধি-নিয়ম থাকা
উচিত! আমাদের ঋষিরা ছিলেন প্রকৃত বিজ্ঞানী। বিজ্ঞান শব্দটিও উপনিষদ থেকে
উৎপত্তি হয়েছে। তাই ঋষিরা নারীদের জগন্মাতাজ্ঞানে ব্যবহার (treat) করতে,
শ্রদ্ধা (honour) করতে শিখিয়েছেন।–যার নাম প্রকৃত পূজা। যার মাধ্যমে
স্বভাবের স্ফূরণ হয়ে সব অভাবের পূরণ হয়।
এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন, “Accident-এ (আকস্মিকভাবে) যা’ জন্মে, তা
বুনো, বিহিত সুফলপ্রদ চাষে যা’ জন্মে তা’ পুণো (পুণ্য)। প্রবৃত্তি লালসায়
অবিধিপূর্বক উপগতি হয়ে যে সন্তান জন্মে, তার চরিত্রের কোন ঠিক ঠিক থাকে
না। গর্ভাধান সংস্কারের ভিতর দিয়ে উন্নত চিন্তাপ্রসূত বিধিমাফিক পবিত্র
যে জন্ম, তার রকমই আলাদা। ঘরে ঘরে ভগবান জন্মে। তেমনি ছিল আমাদের
বিধান।’’ (আঃ প্রঃ ১৮/১৩) অতএব আমাদের ঘরের মা দুর্গারা যেদিন আবার ঘরে
ঘরে ভগবান জন্মাতে পারবেন সেদিন সার্থক হবে আমাদের দুর্গাপূজা।

দুর্গাপূজার বাস্তবতা তুলে ধরতে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেনঃ “....যে মৃন্ময় মূর্ত্তি আমরা পূজা করি— কল্পনায় প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করে,-- তিনি দশভূজা, দশপ্রহরণ-ধারিণী— ঐ আমাদের মায়েরই প্রতীক— আমাদের ঘরে ঘরে যে মা অধিষ্ঠিতা তাঁরই বিনায়িত সুসঙ্গত প্রতীক; তাই ঐ মায়ের পূজা মানেই হচ্ছে— যে মা আমার, যে মা তোমার, যে মা ঘরে ঘরে দুর্গা হয়ে অধিষ্ঠিতা, দুর্গতিনাশিনী হয়ে দশপ্রহরণ ধারণ করে সন্তান-সংরক্ষণায় নিয়োজিতা,

সেই মায়েরই পূজা;………..”
(আশীষ বাণী, ৬২/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)

“মা আমাদের দশভুজা,
প্রতি ঘরে ঘরে
যদিও তাঁকে
দ্বিভুজাই দেখতে পাই,
তিনি
দশদিক্ আবরিত করে রেখেছেন—
তাঁর স্নেহ-উৎসারিত
স্বস্তি-উৎসারিণী উদাত্ত অনুচর্য্যায়,
কায়মনোবাক্যে
প্রতিটি কর্ম্মের ভিতর-দিয়ে
ব্যষ্টির পথে
সমষ্টিকে আন্দোলিত করে,
সাত্বত উৎসর্জ্জনায়
আপূরিত করে সবাইকে,
কৃতি-উদ্দীপনার অনুপ্রেরণায়—
তাই মা আমার দশভূজা;……”
(আশীষ বাণী, ৫৯/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)

“পূজা মানেই হল বর্দ্ধনা। (আঃ প্রঃ ১২-১২-১৯৪১)
আমি আপনার পূজা করছি মানে, আপনার গুণ চিন্তা করছি এবং নিত্য অনুশীলনের
মাধ্যমে ঐ গুণগুলি আমার চরিত্রগত করে তুলছি, আমার ভিতরে বাড়িয়ে তুলছি।
স্তব করি মানে গুণ বর্ণনা করি। তা কিন্তু শুধু মুখে বা মনে-মনে করলেই
হবে না, প্রতিদিনকার অভ্যাস ও অনুশীলনের ভিতর দিয়ে ঐ গুণগুলি আমার
চরিত্রে মূর্ত্ত করে তোলা চাই।’’ (দীপরক্ষী ৪/১৮২)

পূজা কেমন করে করতে হবে, এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কি বলেছেন, একবার জেনে নেওয়া যাক।
“দেবতার পূজা-অর্চনা করতে গেলে আগে ইষ্টের ভাব অন্তরে জাগ্রত করে সেই
ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে, দেবতার স্মরণ মনন করতে হয়। তাঁকে স্মরণ করা
মানে—তাঁর চলন-চরিত্র ও গুণ গরিমা স্মৃতিতে এনে অনুশীলনের ভিতর দিয়ে
আয়ত্ব করা। চরণ-পূজা মানে চলন পূজা। ইষ্টের চলনাকে নিজের জীবনে আয়ত্ত
ক’রে ঐ চলনের প্রসারতা ও সম্বর্দ্ধনা যদি না ঘটাই বাস্তবে, তাহলে তাঁর
চরণ-পূজা সার্থক হয় না। আমরা ফাঁকতালে কাম সারতে চাই, কিন্তু বিধি বড়
কঠিন বান্দা, কোন চালাকি চলে না তাঁর কাছে।”
(আ. প্র. ২৯. ১২. ১৯৪২)
“প্রশ্ন। হিন্দুরা দেবদেবীর পূজা করেন কিন্তু মুসলমানেরা একমাত্র
খোদাতায়ালার পূজা ক’রে থাকেন। হজরত ত’ ছবি ও পুতুল-পূজা একেবারেই নিষেধ
ক’রে গেছেন, কিন্তু আপনি এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য করছেন কেমন-ক’রে ?
শ্রীশ্রীঠাকুর । ধর্ম্ম-আচরণের দিক দিয়ে হজরত রসুলও যা’ ব’লে গেছেন,
আর্য্যদের ধর্ম্মশাস্ত্র চিরকালই ঋষির নিদেশরূপে তাই বহন ক’রে আসছে।
আর্য্য-ধর্ম্মশাস্ত্র ছবি বা পুতুল-পূজা এমনতর বিকট তাচ্ছিল্যের সহিত
নিরস্ত করতে ঘোষণা ক’রেছেন—এমন-কি অধমাধম বলতেও ক্ষান্ত হন নি। তবে
আর্য্য-ঋষিদের প্রত্যেক মানুষকে উন্নতির পথে নিয়ন্ত্রণ করবার এমনতর একটা
ঝোঁক ছিল—যা-নাকি হজরত রসুলের ভিতর দেখেত পাওয়া যায়–………..”
(ইসলাম-প্রসঙ্গে/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র/পৃঃ ২৮-২৯)
‘‘ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ, ভক্ত রামপ্রসাদ, সাধক রামকৃষ্ণ, সর্ব্বানন্দ
ঠাকুর প্রভৃতি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ প্রতিমা পূজা করেছেন বটে, তাঁদের ঐ
পূজার পিছনে ছিল গুরু-পূজা, ইষ্ট-আরাধনা ; ঐ প্রতিমার পরিকল্পনার ভেতর
দিয়ে ছিল অশেষ ও অঢেলভাবে ইষ্টানুরক্তি। তাই, ঐ অধম অবলম্বনও তাঁদিগকে
অধমভাবে আটকে রাখতে পারে নি। তাঁদের ঐ চলনার পথে একটা সময় এসেছিল, তখন
তাঁদের ঐ প্রতিমা তাঁদের দর্শনের সম্মুখে আর ও-রকম ছিল না। ভগবান
রামকৃষ্ণদেবেরও শোনা গিয়েছে—তাঁর এমনতর সময় এসেছিল, যখন
মূর্ত্তি-টুর্ত্তি তাঁর সাধনার পথে বাধাই সৃষ্টি করতো। তিনি এমন-কি তাঁর
ঘরে যে-সমস্ত ছবি-টবি ছিল, সেগুলিকেও সরিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি না-কি এই
বলেছিলেন—‘মেয়েরা ততদিন পুতুলখেলা করে, যতদিন তার বে’ না হয়,
স্বামী-সহবাস না করে।’ সাধক রামপ্রসাদ তাঁর স্বরচিত গানের ভেতরেই তো
বলেছেন—
‘‘ধাতু-পাষাণ মাটির মূর্ত্তি
কাজ কি রে তোর আরাধনে
তুই মনোময় প্রতিমা গড়ি’
বসা হৃদি-পদ্মাসনে।।’’
এমন কত কি যে আছে, তার ইয়ত্তা নেই।’’
(—শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, কথা প্রসঙ্গে, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৭৬, ১৭-১০-১৩৪২) এবার আমরা এক়টু দেখে দেখে নেব, পূজা প্রসঙ্গে ‘মেরা ভারত মহান’-এর

অন্যান্য মহানেরা এবং মহান গ্রন্থগুলো কি নিদেশ রেখে গেছেন। পূজা বিষয়ে মহানির্ব্বাণতন্ত্র নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ ‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ। অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’ মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ভারতে বিবেকানন্দ গ্রন্থের ৩৩৬

পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট।
ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’ ‘‘যে-ব্যক্তি সর্ব্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ

প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে।’’ –শ্রীমদ্ভাগবত। ৩-২৯-২২ “ঈশ্বরঃ সর্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জ্জুন তিষ্ঠতি। ভ্রাময়ন্ সর্ব্বভূতানি যন্ত্ররূঢ়ানি মায়য়া।।“ --গীতা, ১৮।৬৫ "যিনি এই সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার নিজের স্বধর্মানুরূপ

নিষ্কাম কর্মাচরণ দ্বারা (বাক্য বা ফুলজল দ্বারা নহে) পূজা করিয়া মানুষ
সিদ্ধি লাভ করে । স্বধর্মানুরূপ (বর্ণানুগ সত্তাধর্ম পালন) নিষ্কাম কর্মই
পরমেশ্বরের পূজার ডালি । (গীতা ১৮।৪৬) তাই, শাস্ত্র বর্ণিত অধমের চাইতেও অধম পূজায় মেতে উঠে আমাদের যাতে

ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে না হয়, তাই, শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্র আমাদের নিত্য বাস্তব দুর্গাপূজার পূজারী করে তুলতে
সৎসঙ্গীদের নিত্যপাঠ্য ‘সত্যানুসরণ’ নামক মহাগ্রন্থে নারীকে জগজ্জননী
জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত করতে নিদেশ দিয়ে বললেন, ‘‘প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী ।
প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয় ।’’ এবং
পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, ‘‘স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যে-জন, তাহার হয় না ভবের বন্ধন মোচন । …..স্ত্রী চিন্ময়ী মা।’’—এই শিক্ষার ধারাকে
বাস্তবায়িত করার নাম প্রকৃত দুর্গাপূজা । শ্রীশ্রীঠাকুর শুধু পুরুষদেরই প্রতিনিয়ত দুর্গাপূজা করার বিধান দিয়েই

ক্ষান্ত হননি, নারী-সাধারণের মধ্যেও দেবী দুর্গার এক স্থায়ী আসন পেতে
দিতে অনুশ্রুতির বাণীতে বললেন—
‘‘শার্দ্দুলেরে বাহন করে
সাপের ফণার মালা পরে
কালবোশেখী ঝঞ্ঝাবেগে
ছোটরে নারী ছোটরে ছোট্ ।
দত্যিদানার নীচ বাহানা
আর্য্যাবর্তে দিয়ে হানা
ঘূর্ণিপাকের বেতাল গাঁথায়
হুলিয়ে ভুলিয়ে দিচ্ছে চোট্ ।
দশ প্রহরণ দশ হাতে ধর
বক্ষবিদরি ধ্বংসি ইতর
সূর্য্যরাগী বজ্রতেজে
আর্য্যনারী শত্রু টোট্ ।”
তিনি নারীকে অবলা নয়, সবলারূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন । নারীর সতীত্বই
নারীকে সবলা করে তোলে। তাই তিনি কত আশা নিয়ে বললেন—
‘‘সতীর তেজে ঝলসে দে মা
নিঠুর কঠোর অন্ধকারে
মদনভস্ম বহ্নিরাগে
বৃত্তি-রিপু দে ছারখারে ।
প্রণবতালে ইষ্টমন্ত্র
ঝঙ্কারি তোল সকলতন্ত্রে
বিষাণ হাঁকে রুদ্র দোলায়
বজ্রে হানি মৃত্যুদ্বারে।’’
মা দুর্গার আদর্শে অনুরঞ্জিত উক্ত বাণীগুলো যাতে তার সন্তানদের মননশীলতায়
মা দুর্গার
তাই আসুন, পূজার নামে অনিত্য-বস্তুর প্রতিযোগিতায় না মেতে, সব দেবতার
সমাহার-স্বরূপ যুগ-পুরুষোত্তমের বিধি মেনে, মা দুর্গার নিত্য-সিদ্ধ
দেদীপ্যমান আদর্শের আলোকে, আমাদের ঘরের মেয়েরা যাতে রাষ্ট্রপূজার
অর্ঘ্যস্বরূপ সুজননে সুসন্তানের উপহার সাজিয়ে,
শক্তিরূপিণী-দশপ্রহরণধারিণী সাজে সজ্জিত হয়ে নরাসুরদের কিভাবে দমন করে
অস্তিত্ব রক্ষার পূজার পূজারী হতে পারে,— সেই চেষ্টায় যত্নবান হই।
জয়গুরু ! বন্দে পুরুষোত্তমম্!


।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দৃষ্টিতে বাস্তব ইষ্টপূজা ।।
ইষ্ট স্বার্থ ও প্রতিষ্ঠার অনুকূলে
প্রবৃত্তি ও চাহিদাগুলিকে নিয়ন্ত্রিত ক’রে
সত্ অর্থাত্ ইষ্টানুকূল জীবনবৃদ্ধিদ
যা’-কিছু চিন্তাকে
বাস্তবতায় পরিণত করবার প্রচেষ্টার সঙ্গে
যথাযথ সেবা ও যাজনে
পারিপার্শ্বিককে আকৃষ্ট ও উদ্বুদ্ধ ক’রে
প্রতি প্রত্যেককে ইষ্টে অনুরক্ত ক’রে তোলাই হচ্ছে
প্রকৃত ইষ্টপূজা।২৪
—পথের কড়ি


tapanspr@gmail.com

   দুর্গাপূজার বাস্তবতা তুলে ধরতে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেনঃ

        “….যে মৃন্ময় মূর্ত্তি
                আমরা পূজা করি—
                কল্পনায় প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করে,–
                        তিনি দশভূজা,
                                দশপ্রহরণ-ধারিণী—
                                ঐ আমাদের মায়েরই প্রতীক—
                        আমাদের ঘরে ঘরে
                                যে মা অধিষ্ঠিতা
                                তাঁরই বিনায়িত সুসঙ্গত প্রতীক;
        তাই ঐ মায়ের পূজা মানেই হচ্ছে—
                যে মা আমার,
                যে মা তোমার,
                যে মা ঘরে ঘরে
                        দুর্গা হয়ে অধিষ্ঠিতা,
        দুর্গতিনাশিনী হয়ে
        দশপ্রহরণ ধারণ করে
                সন্তান-সংরক্ষণায় নিয়োজিতা,
সেই মায়েরই পূজা;………..”
(আশীষ বাণী, ৬২/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)

“মা আমাদের দশভুজা,
        প্রতি ঘরে ঘরে
                যদিও তাঁকে
                        দ্বিভুজাই দেখতে পাই,
                        তিনি
দশদিক্ আবরিত করে রেখেছেন—
        তাঁর স্নেহ-উৎসারিত
স্বস্তি-উৎসারিণী উদাত্ত অনুচর্য্যায়,
        কায়মনোবাক্যে
                প্রতিটি কর্ম্মের ভিতর-দিয়ে
                        ব্যষ্টির পথে
                                সমষ্টিকে আন্দোলিত করে,
        সাত্বত উৎসর্জ্জনায়
                আপূরিত করে সবাইকে,
        কৃতি-উদ্দীপনার অনুপ্রেরণায়—
                তাই মা আমার দশভূজা;……”
(আশীষ বাণী, ৫৯/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)

“পূজা মানেই হল বর্দ্ধনা। (আঃ প্রঃ ১২-১২-১৯৪১)
        আমি আপনার পূজা করছি মানে, আপনার গুণ চিন্তা করছি এবং নিত্য অনুশীলনের
মাধ্যমে ঐ গুণগুলি আমার চরিত্রগত করে তুলছি, আমার ভিতরে বাড়িয়ে তুলছি।
স্তব করি মানে গুণ বর্ণনা করি।  তা কিন্তু শুধু মুখে বা মনে-মনে করলেই
হবে না, প্রতিদিনকার অভ্যাস ও অনুশীলনের ভিতর দিয়ে ঐ গুণগুলি আমার
চরিত্রে মূর্ত্ত করে তোলা চাই।’’    (দীপরক্ষী ৪/১৮২)

পূজা কেমন করে করতে হবে, এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কি বলেছেন, একবার জেনে নেওয়া যাক।
“দেবতার পূজা-অর্চনা করতে গেলে আগে ইষ্টের ভাব অন্তরে জাগ্রত করে সেই
ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে, দেবতার স্মরণ মনন করতে হয়। তাঁকে স্মরণ করা
মানে—তাঁর চলন-চরিত্র ও গুণ গরিমা স্মৃতিতে এনে অনুশীলনের ভিতর দিয়ে
আয়ত্ব করা। চরণ-পূজা মানে চলন পূজা। ইষ্টের চলনাকে নিজের জীবনে আয়ত্ত
ক’রে ঐ চলনের প্রসারতা ও সম্বর্দ্ধনা যদি না ঘটাই বাস্তবে, তাহলে তাঁর
চরণ-পূজা সার্থক হয় না। আমরা ফাঁকতালে কাম সারতে চাই, কিন্তু বিধি বড়
কঠিন বান্দা, কোন চালাকি চলে না তাঁর কাছে।”
                         (আ. প্র. ২৯. ১২. ১৯৪২)
“প্রশ্ন। হিন্দুরা দেবদেবীর পূজা করেন কিন্তু মুসলমানেরা একমাত্র
খোদাতায়ালার পূজা ক’রে থাকেন। হজরত ত’ ছবি ও পুতুল-পূজা একেবারেই নিষেধ
ক’রে গেছেন, কিন্তু আপনি এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য করছেন কেমন-ক’রে ?
শ্রীশ্রীঠাকুর । ধর্ম্ম-আচরণের দিক দিয়ে হজরত রসুলও যা’ ব’লে গেছেন,
আর্য্যদের ধর্ম্মশাস্ত্র চিরকালই ঋষির নিদেশরূপে তাই বহন ক’রে আসছে।
আর্য্য-ধর্ম্মশাস্ত্র ছবি বা পুতুল-পূজা এমনতর বিকট তাচ্ছিল্যের সহিত
নিরস্ত করতে ঘোষণা ক’রেছেন—এমন-কি অধমাধম বলতেও ক্ষান্ত হন নি। তবে
আর্য্য-ঋষিদের প্রত্যেক মানুষকে উন্নতির পথে নিয়ন্ত্রণ করবার এমনতর একটা
ঝোঁক ছিল—যা-নাকি হজরত রসুলের ভিতর দেখেত পাওয়া যায়–………..”
(ইসলাম-প্রসঙ্গে/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র/পৃঃ ২৮-২৯)
        ‘‘ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ, ভক্ত রামপ্রসাদ, সাধক রামকৃষ্ণ, সর্ব্বানন্দ
ঠাকুর প্রভৃতি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ প্রতিমা পূজা করেছেন বটে, তাঁদের ঐ
পূজার পিছনে ছিল গুরু-পূজা, ইষ্ট-আরাধনা ; ঐ প্রতিমার পরিকল্পনার ভেতর
দিয়ে ছিল অশেষ ও অঢেলভাবে ইষ্টানুরক্তি। তাই, ঐ অধম অবলম্বনও তাঁদিগকে
অধমভাবে আটকে রাখতে পারে নি। তাঁদের ঐ চলনার পথে একটা সময় এসেছিল, তখন
তাঁদের ঐ প্রতিমা তাঁদের দর্শনের সম্মুখে আর ও-রকম ছিল না। ভগবান
রামকৃষ্ণদেবেরও শোনা গিয়েছে—তাঁর এমনতর সময় এসেছিল, যখন
মূর্ত্তি-টুর্ত্তি তাঁর সাধনার পথে বাধাই সৃষ্টি করতো। তিনি এমন-কি তাঁর
ঘরে যে-সমস্ত ছবি-টবি ছিল, সেগুলিকেও সরিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি না-কি এই
বলেছিলেন—‘মেয়েরা ততদিন পুতুলখেলা করে, যতদিন তার বে’ না হয়,
স্বামী-সহবাস না করে।’ সাধক রামপ্রসাদ তাঁর স্বরচিত গানের ভেতরেই তো
বলেছেন—
                                ‘‘ধাতু-পাষাণ মাটির মূর্ত্তি
                                        কাজ কি রে তোর আরাধনে
তুই মনোময় প্রতিমা গড়ি’
বসা হৃদি-পদ্মাসনে।।’’
এমন কত কি যে আছে, তার ইয়ত্তা নেই।’’
(—শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, কথা প্রসঙ্গে, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৭৬, ১৭-১০-১৩৪২)

        এবার আমরা এক়টু দেখে দেখে নেব, পূজা প্রসঙ্গে ‘মেরা ভারত মহান’-এর
অন্যান্য মহানেরা এবং মহান গ্রন্থগুলো কি নিদেশ রেখে গেছেন।

        পূজা বিষয়ে মহানির্ব্বাণতন্ত্র নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ
        ‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ।
        অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’

        মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ভারতে বিবেকানন্দ গ্রন্থের  ৩৩৬
পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট।
ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’

        ‘‘যে-ব্যক্তি সর্ব্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ
প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে।’’ –শ্রীমদ্ভাগবত। ৩-২৯-২২

        “ঈশ্বরঃ সর্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জ্জুন তিষ্ঠতি।
        ভ্রাময়ন্ সর্ব্বভূতানি যন্ত্ররূঢ়ানি মায়য়া।।“
                                                –গীতা, ১৮।৬৫
                “যিনি এই সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার নিজের স্বধর্মানুরূপ
নিষ্কাম কর্মাচরণ দ্বারা (বাক্য বা ফুলজল দ্বারা নহে) পূজা করিয়া মানুষ
সিদ্ধি লাভ করে । স্বধর্মানুরূপ (বর্ণানুগ সত্তাধর্ম পালন) নিষ্কাম কর্মই
পরমেশ্বরের পূজার ডালি ।                                                                     (গীতা ১৮।৪৬)
         
        তাই, শাস্ত্র বর্ণিত অধমের চাইতেও অধম পূজায় মেতে উঠে আমাদের যাতে
ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে না হয়, তাই, শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্র আমাদের নিত্য বাস্তব দুর্গাপূজার পূজারী করে তুলতে
সৎসঙ্গীদের নিত্যপাঠ্য ‘সত্যানুসরণ’ নামক মহাগ্রন্থে নারীকে জগজ্জননী
জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত করতে নিদেশ দিয়ে বললেন, ‘‘প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী ।
প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয় ।’’  এবং
পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, ‘‘স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যে-জন, তাহার হয় না ভবের বন্ধন মোচন । …..স্ত্রী চিন্ময়ী মা।’’—এই শিক্ষার ধারাকে
বাস্তবায়িত করার নাম প্রকৃত দুর্গাপূজা ।

        শ্রীশ্রীঠাকুর শুধু পুরুষদেরই প্রতিনিয়ত দুর্গাপূজা করার বিধান দিয়েই
ক্ষান্ত হননি,   নারী-সাধারণের মধ্যেও দেবী দুর্গার এক স্থায়ী আসন পেতে
দিতে অনুশ্রুতির বাণীতে বললেন—
‘‘শার্দ্দুলেরে বাহন করে
সাপের ফণার মালা পরে
কালবোশেখী ঝঞ্ঝাবেগে
ছোটরে নারী ছোটরে ছোট্ ।
দত্যিদানার নীচ বাহানা
আর্য্যাবর্তে দিয়ে হানা
ঘূর্ণিপাকের বেতাল গাঁথায়
হুলিয়ে ভুলিয়ে দিচ্ছে চোট্ ।
দশ প্রহরণ দশ হাতে ধর
বক্ষবিদরি ধ্বংসি ইতর
সূর্য্যরাগী বজ্রতেজে
আর্য্যনারী শত্রু টোট্ ।”
        তিনি নারীকে অবলা নয়, সবলারূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন । নারীর সতীত্বই
নারীকে সবলা করে তোলে। তাই তিনি কত আশা নিয়ে বললেন—
‘‘সতীর তেজে ঝলসে দে মা
        নিঠুর কঠোর অন্ধকারে
মদনভস্ম বহ্নিরাগে
        বৃত্তি-রিপু দে ছারখারে ।
প্রণবতালে ইষ্টমন্ত্র
        ঝঙ্কারি তোল সকলতন্ত্রে
বিষাণ হাঁকে রুদ্র দোলায়
        বজ্রে হানি মৃত্যুদ্বারে।’’
মা দুর্গার আদর্শে অনুরঞ্জিত উক্ত বাণীগুলো যাতে তার সন্তানদের মননশীলতায়
মা দুর্গার
        তাই আসুন, পূজার নামে অনিত্য-বস্তুর প্রতিযোগিতায় না মেতে, সব দেবতার
সমাহার-স্বরূপ যুগ-পুরুষোত্তমের বিধি মেনে, মা দুর্গার নিত্য-সিদ্ধ
দেদীপ্যমান আদর্শের আলোকে, আমাদের ঘরের মেয়েরা যাতে রাষ্ট্রপূজার
অর্ঘ্যস্বরূপ সুজননে সুসন্তানের উপহার সাজিয়ে,
শক্তিরূপিণী-দশপ্রহরণধারিণী সাজে সজ্জিত হয়ে নরাসুরদের কিভাবে দমন করে
অস্তিত্ব রক্ষার পূজার পূজারী হতে পারে,— সেই চেষ্টায় যত্নবান হই।
                     জয়গুরু ! বন্দে পুরুষোত্তমম্!
***************************************
।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দৃষ্টিতে বাস্তব ইষ্টপূজা ।।
        ইষ্ট স্বার্থ ও প্রতিষ্ঠার অনুকূলে
                প্রবৃত্তি ও চাহিদাগুলিকে নিয়ন্ত্রিত ক’রে
        সত্ অর্থাত্ ইষ্টানুকূল জীবনবৃদ্ধিদ
                যা’-কিছু চিন্তাকে
        বাস্তবতায় পরিণত করবার প্রচেষ্টার সঙ্গে
                যথাযথ সেবা ও যাজনে
        পারিপার্শ্বিককে আকৃষ্ট ও উদ্বুদ্ধ ক’রে
                প্রতি প্রত্যেককে ইষ্টে অনুরক্ত ক’রে তোলাই হচ্ছে
                        প্রকৃত ইষ্টপূজা।২৪
                                        —পথের কড়ি
__________________________________________
tapanspr@gmail.com