।। ১৯৪৬ খৃস্টাব্দের প্রেক্ষাপটে প্রত্যাগমনহীন আগমন ।।

** ২রা সেপ্টেম্বর ১৯৪৬ খৃস্টাব্দ দিনটির স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি **
।। প্রত্যাগমনহীন আগমন ।।
জ্ঞান গরিমায় গরবিনী আর্য্য ভারতবর্ষের অখণ্ডতা রক্ষার কথা জনে জনে বলেছেন । মুসলিম লীগ ও হিন্দু মহাসভার নেতাদের সাথে কথা বলেছেন সাম্প্রদায়িকতার ব্যাধি নিরসনের জন্য । হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে পরামর্শ দিয়েছিলেন হিন্দু মহাসভার নাম বদলে আর্য্য মহাসভা রাখতে । মুসলমানরাও আর্য্য । তাদেরও আর্য্য মহাসভার সদস্য করতে হবে । আরবী শিখে কোরান পাঠ করতে হবে । লীগ যদি ইসলাম বিরোধী কিছু করে প্রীভি কাউন্সিলে শত শত কেস করতে হবে মহানবীর আদর্শ বাঁচাতে । আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে মুসলমানদের, মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে হিন্দুদের স্থানান্তর করে সাম্প্রদায়িক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে । এই যদি করে ফেলতে পারেন দেখবেন দেশ ভাগ হবে না । এজন্য টাকার অভাব হবে না । বড় বড় জমিদারদের বোঝান । তাদের সাহায্যে এ কাজ আপনি করতে পারবেন । অত বড় বাবার ছেলে আপনি । আমি আমার সব কিছু দিয়ে আপনাকে সহায়তা করব । আমাদের চেষ্টার ত্রুটিতে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে যদি দেশ ভাগ হয়, তা’তে হিন্দু মুসলমান উভয়ের ক্ষতির সম্ভাবনা ।

কথাচ্ছলে পবিত্র বাইবেলের অনেকানেক বাণীর উপমা দিতেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র । প্রভু যীশুর একটি বাণী, “Be a Philanthropist, you will see all are philanthropist.”
(লোকহিতৈষী হও, দেখবে সকলেই লোকহিতৈষী হয়েছে ।)-কে বাস্তবায়নের মহাসুযোগ এসে গেছে হাতের সামনে । আর্য্যকৃষ্টির বর্ণাশ্রমানুগ মহান ঐতিহ্যের অনুশাসনের নবীকরণ করে বৃহত্তর আর্যাবর্তের লোকেদের সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ এক রাষ্ট্রের মধ্যে নিরাপদে রাখার প্রচেষ্টায় দৈনন্দিন জীবনে পঞ্চমহাযজ্ঞের প্রবর্তন করলেন ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের মাধ্যমে। যার উদ্দেশ্য ছিল ইষ্টভরণ, পিতৃপোষণ, পরিস্থিতির উন্নয়ন । অর্থাত্‍ ইষ্ট ঈপ্সিত মঙ্গল কর্মের মাধ্যমে বৃহত্তর পরিবেশকে রক্ষা করে পিতৃপুরুষের গৌরবকে অক্ষুণ্ণ রাখার শপথ গ্রহণ ।

আর্য্য শাস্ত্র মনু সংহিতায় বর্ণিত “ইদং স্বস্ত্যয়ন” সু অস্তি অয়ন (সুন্দরের বা সৎ-এর বিদ্যমানতাকে ধারণ করে রাখার পথ।) মন্ত্রকে নবীকরণ করতে প্রবর্তন করলে স্বস্ত্যয়নী ব্রতবিধির। যদিও স্বস্ত্যয়নীর প্রবর্তন করেন প্রথমে, ১৯৩৭ খ্রীস্টাব্দে । ইষ্টভৃতি ১৯৩৮ খ্রীস্টাব্দে ।

সত্‍সঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী মর্মার্থের সাথে পরিচিত নাহলেও ‘স্বস্ত্যয়নী’র তুলনায় ‘ইষ্টভৃতি’ নামের সাথে বেশীরভাগ সংঘকেন্দ্রিক জনেরা যেমন পরিচিত, তেমনি সাধারণ লোকেরা ঠাকুরের নামে টাকাপয়সা রাখার মাধ্যম হিসেবে ‘ইষ্টভৃতি’ শব্দকে জানেন । তাই ‘ইষ্টভৃতি’-অপলাপী অনুচিত কর্ম করে ফেলেছি । এজন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি ।
যাইহোক ‘ইষ্টভৃতি’কে উপস্থাপনা করার চেষ্টা করে, পরে ‘স্বস্ত্যয়নী’ নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব ।
শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাষায়—
“ঈশ্বর-অনুধ্যায়িতা নিয়ে
গণহিতী অনুচর্য্যায়
তাদের যে অনুগ্রহ-অবদান অর্জ্জন কর,
সেই অবদান হ’তে
শ্রদ্ধানুস্যূত অন্তঃকরণে
স্বতঃস্বেচ্ছায় তোমার ইষ্টকে যা নিবেদন কর,
তাই-ই কিন্তু তোমার শ্রেষ্ঠ ইষ্টভৃতি।”
(ধৃতি-বিধায়না, ১ম খণ্ড, বাণী সংখ্যা ৩০৬)
অর্থাত্‍, বর্ণানুগ কর্মের সেবার মাধ্যমে, বৃহত্তর পরিবেশে, ঘটে ঘটে ইষ্ট স্ফূরণের বা মঙ্গল প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত থাকার বিনিময়ে অযাচিত প্রাপ্ত অর্থ বা সম্পদকে বলা হয়েছে অনুগ্রহ অবদান । তা থেকে শ্রদ্ধার্ঘ্য স্বরূপ ইষ্টের উদ্দেশ্যে নিবেদন করতে হবে । এর মাধ্যমে জাতপাত ও সম্প্রদায়ের নামে পারস্পরিক অনৈক্য, ঘৃণা-বিদ্বেষ দূরীভূত হবে। যেহেতু ঈশ্বর-জ্ঞানে সেবা করে তার হিতসাধন করতে হবে, যার নামকরণ করলেন, ‘গণহিতী অনুচর্য্যা’। এরফলে বৈশিষ্ট্যের পালন ও পোষণের মাধ্যমে আর্য্য বিধানের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। পারস্পরিক সেবা-কর্মে নিয়োজিত থাকার জন্য বেকার সমস্যার সমাধান হবে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পারস্পরিক ঐকতানিক সমন্বয়ে সমৃদ্ধ হবার পাশাপাশি পরমরাষ্ট্রিক সমবায় প্রতিষ্ঠা পাবে।
“জীবে প্রীতি বিতরণ করে যেই জন,
সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।”
এই হল ঈশ্বর অনুধ্যায়িতার স্বরূপ ।
বর্ণানুগ কর্ম এবং ঈশ্বর অনুধ্যায়িতা ব্যতীত ইষ্টভৃতি বাস্তবায়িত হয় না।

ইষ্টভৃতির নামে শুধুমাত্র ইষ্টের প্রীতির জন্য কাউকে পীড়িত না করে নিজে পীড়িত না হয়ে বর্ণানুগ কর্মের সেবা মাধ্যমে আহরিত অর্থ ‘দিন গুজরানী আয়’-কেই ইষ্টভৃতির অর্ঘ্য হিসেবে নিবার্চিত করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর । ওই নির্দেশ অনুসারে ইষ্টার্ঘ্য আহরণ করার মধ্যেই প্রীতি, মৈত্রী ও ঐক্যের বীজ বপন করে দিয়েছেন । প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন আর্য্যকৃষ্টির সদাচার এবং বর্ণাশ্রম ধর্মকে । ওই ইষ্টার্ঘ্য ইষ্টকে দিতে হবে । তিনি তা দিয়ে PHILANTHROPICAL WORK বা সব্যষ্টি সমষ্টির মধ্যে ভাগবত ঐক্য স্থাপন দ্বারা গণহিতৈষণা কর্ম করবেন । ইষ্টভৃতির দাতা এবং গ্রহীতার মেলবন্ধনে গড়ে উঠবে পরম রাষ্ট্রিক সমবায় । এই ছিল ঠাকুরের পরিকল্পনা । সেই উদ্দেশে স্থাপন করেছিলেন ফিলানথ্রপি কার্যালয় । মাসান্তে ওই অর্ঘ্য পাঠাতে হবে ইষ্টসকাশে । ইষ্টের নামে প্রেরিত ওই অর্ঘ্য গৃহীত হতো ফিলানথ্রপিতে । পাঠাবার পর দুজনকে ভ্রাতৃভোজ্য দিতে হবে । এর মাধ্যমে প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করলেন । দেশের অর্থনীতিকে করলেন সমৃদ্ধ ।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুশ্রুতি গ্রন্থে ইষ্টভৃতির বিষয়ে বললেন :
“দিন গুজরানী আয় থেকে কর
ইষ্টভৃতি আহরণ,
জলগ্রহণের পূর্ব্বেই তা’
করিস্ ইষ্টে নিবেদন ;
নিত্য এমনি নিয়মিত
যেমন পারিস ক’রেই যা’
মাসটি যবে শেষ হবে তুই
ইষ্টস্থানে পাঠাস্ তা’ ;
ইষ্টস্থানে পাঠিয়ে দিয়ে
আরো দু’টি ভুজ্যি রাখিস্,
গুরুভাই বা গুরুজনের
দু’জনাকে সেইটি দিস্ ;
পাড়া-পড়শীর সেবার কাজে
রাখিস কিন্তু কিছু আরো,
উপযুক্ত আপদগ্রস্তে
দিতেই হ’বে যেটুকু পার ;
এসবগুলির আচরণে
ইষ্টভৃতি নিখুঁত হয়–
এ না-ক’রে ইষ্টভৃতি
জানিস্ কিন্তু পূর্ণ নয় ।”
ইষ্টভৃতিকেন্দ্রিক পূর্বোক্ত বাণীর মাধ্যমেও পরিস্ফূট হয়েছে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধিদ ভাগবত ঐক্যের পরমবার্তা ।
শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত ইষ্টভৃতি নিবেদন মন্ত্রের “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপারর্শ্বিকাঃ ।।” উচ্চারণ করার সাথে সাথে বৃহত্তর পারিপার্শ্বিকের জীবনবৃদ্ধির দায়ভারের শপথ নিতে হয় আমাদের । সব অবস্থাতে বাস্তব কর্মে বৃহত্তর পরিবেশের জৈবাজৈব সবকিছুকে পালন-পোষণে সমৃদ্ধ করে রাখার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সার্থক হয় ইষ্টভৃতি পালন ।
যদিও ইষ্টভৃতি প্রচলনের পূর্বে সত্যানুসরণের “তুমি তোমার, নিজ পরিবারের, দেশের ও দশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দায়ী ।” বাণীতে অনুরূপ দায়ভার দিয়েই রেখেছিলেন ব্যষ্টি ও সমষ্টি উন্নয়নের দিকে লক্ষ্য রেখে ।
এ তো গেল ইষ্টভৃতি আহরণ ও নিবেদনপর্ব । এর পর রয়েছে প্রেরণপর্ব । প্রেরণ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর স্পষ্ট নির্দেশ করে দিয়ে বলেছেন :
ইষ্টভৃতি ইষ্টকেই দিস
করিসনা তায় বঞ্চনা ।
অন্যকে তা দিলেই জানিস
আসবে বিপাক গঞ্জনা ।।
অর্থাত্ ইষ্টভৃতি ইষ্টেরই প্রাপ্য, অন্য কারও নয়। ওই অর্ঘ্য দিয়ে ইষ্টকর্ম করা হবে। ইষ্টকর্ম মানে পূর্ত্তকর্ম। যা প্রকৃত ইষ্টভৃতির মন্ত্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপারর্শ্বিকাঃ ।।” এর সরলার্থ খুব সহজ। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুযায়ী সদাচার, এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন বর্দ্ধনার বিধি মেনে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে চলমান এমন গুরুভাই-ই প্রকৃত ইষ্টভ্রাতা।–যাঁর আপদে-বিপদে সাধ্যানুগ সাহায্য করতে হবে। ভূত মানে,–ক্ষিতি, অপ্, মরুত্, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা পরিবেশের অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। উক্ত উপাদানসমূহকে সমৃদ্ধ রাখার জন্য আর্য্যদের বাস্তব পূর্ত্ত-কর্মের মাধ্যমে নিত্য পঞ্চ-মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করতে হতো সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধিকে অক্ষুণ্ণ রাখতে। শ্রীশ্রীঠাকুর ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের মাধ্যমে ওই প্রক্রিয়াকে নবীকরন করলেন। শ্রীশ্রীঠাকুর হিমায়েতপুর আশ্রম সংগঠনের মাধ্যমে ইষ্টভৃতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আমাদেরও তাই করতে হবে। ইষ্টের অবর্তমানে ইষ্টাদর্শের পরমরাষ্ট্রিক সমবায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ, কৃষি ও শিল্পের বাস্তবায়ন করতে যিনি সক্ষম তিনিই ইষ্টার্ঘ্য গ্রহণের উপযুক্ত ব্যক্তি।–যাঁর মধ্যে ঠাকুরত্ব জাগ্রত থাকতে হবে।–সেই ব্যক্তিটিকে সংহত চরিত্র, বোধিসম্পন্ন, সানুকম্পী চর্য্যানিরত, সমন্বয়ী সামঞ্জস্য-প্রধান, পদনির্লোভ, অদ্রোহী, শিষ্ট-নিয়ন্ত্রক, প্রীতিপ্রাণ হতে হবে। এক-কথায় যাঁর মধ্যে ঠাকুরত্ব জাগ্রত তাঁকেই ইষ্টার্ঘ্য দিতে হবে। অন্যথায় বিপাক-গঞ্জনাকে মেনে নিতে হবে।
আমাদের প্রবৃত্তির সব বিপাক এবং গঞ্জনা থেকে মুক্ত করতেই–
স্বস্ত্যয়নী মুক্তি আনে/রাষ্ট্রসহ প্রতি জনে.—বাণীর ভরসা দিয়ে
পঞ্চনীতি সমন্বিত স্বস্ত্যয়নী ব্রতের প্রবর্তন করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর।
১. শ্রীবিগ্রহের মন্দির ভেবে
যত্ন করিস শরীরটাকে,
সহনপটু সুস্থ রাখিস
বিধিমাফিক পালিস তাকে ;
২. প্রবৃত্তি তোর যখন যেমন
যেভাবেই উঁকি মারুক,
ইষ্টস্বা্র্থ প্রতিষ্ঠাতে ঘুরিয়ে দিবি
তার্ সে ঝোঁক।
৩. যে-কাজে যা ভাল বলে
আসবে মনে তত্ক্ষণা্ত্
হাতে-কলমে করবি রে তা
রোধ করে দার সব ব্যাঘাত।
৪. পাড়াপড়শীর বাঁচা-বাড়ায়
রাখিস রে তুই স্বার্থটান,
তাদের ভালয় চেতিয়ে তুলিস
ইষ্টানুগ করে প্রাণ।
৫. নিজের সেবার আগেই রোজই
শক্তি মত যেমন পারিস,
ইষ্ট অর্ঘ্য ভক্তিভরে
শুচিতে নিবেদন করিস ;
এই নিয়মে নিত্যদিন
প্রতি কাজেই সর্ব্বক্ষণ
স্বস্ত্যয়নীর নিয়মগুলি
পালিস দিয়ে অটুট মন ;
ত্রিশটি দিন পুরে গেলে
মাসিক অর্ঘ্য সদক্ষিণায়
ইষ্টভোজ্য পাঠিয়ে বাকি
মজুত রাখবি বর্দ্ধনায় ;
চিরজীবন এমনি করে
ইষ্টস্থানে হয় নিরত,
তাকেই বলে স্বস্ত্যয়নী
সবার সেরা মহান ব্রত।
এই বাণী থেকে একটা জিনিস স্পষ্ট হলো, যে জড়-পদার্থে নির্মিত মন্দিরের পরিবর্তে নিজ-নিজ দেহটাকেই শ্রীবিগ্রহ মন্দির জ্ঞানে পবিত্রতার সাথে রক্ষা করতে হবে, যেহেতু এই দেহের মধ্যেই পরমাত্মার আবাস। ভোগ, দুর্ভোগ, উপভোগ, মুক্তি, পরামুক্তি, পরাগতি সবকিছুই এই দেহের মধ্যেই। যা নাই ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে এই দেহভাণ্ডে। আমাদের আর্য্য শাস্ত্রাদিতেও একথার উল্লেখ রয়েছে। শ্রীশ্রীঠাকুর জীবাত্মার মধ্যে সুপ্ত পরমাত্মাকে জাগাতে বলেছেন নামের মাধ্যমে। ৫টি কর্মেন্দ্রিয়, ৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয়, মন, বিবেক, জীবাত্মা, পরমাত্মাদির সমন্বয়ে সৃষ্টি এই দেহমন্দিরকে পবিত্র রাখার, সুস্থ-স্বস্থ রাখার ভাগবত-বিধির পালন-পদ্ধতি সহজভাবে বিধায়িত করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর এই ব্রতের মাধ্যমে। তিনি কোনদিন ভুলেও তাঁর মন্দির নির্মাণের কথা বলেন নি। কথা-প্রসঙ্গে গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনাও করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর। তথাপিও কেন জানি আমরা বহুনৈষ্ঠিক-মন্দিরকেন্দ্রিক হয়ে স্বস্ত্যয়নী-বিধি অপলাপী চলনে চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।
যাইহোক, স্বস্ত্যয়নীর পঞ্চম নীতিতে দৈনন্দিন অর্ঘ্য নিবেদনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জমা অর্ঘ্য থেকে সদক্ষিনায় ৩টাকা (১৯৩৭ খ্রীষ্টাব্দের ৩টাকা, বর্তমানে কত হতে পারে আন্দাজ করে নিতে হবে। ) ইষ্ট-সকাশে পাঠিয়ে অবশিষ্ট নিজের কাছে মজুত রেখে তা দিয়ে ইষ্টোত্তর সম্পত্তি করতে হবে। ওইসব সম্পত্তির আয়ের এক-পঞ্চমাংশ সেবায়েত হিসাবে ব্রতধারী ভোগ করতে পারবে, কিন্তু রাষ্ট্র বিপন্ন হলে ওইসব সম্পত্তি রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতি রক্ষার্থে বিনিয়োগ হবে।
শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে প্রেরিত ইষ্টার্ঘ্য থেকে একটি পয়সাও তিনি নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করেন নি। আদর্শ রাষ্ট্রের মডেল হিসেবে হিমাইতপুর আশ্রমকে গড়ে তুলতে এবং রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতি রক্ষার কাজে ব্যয় করেছেন। তৎকালীন নেতৃবর্গ কথা দেওয়া সত্বেও শ্রীশ্রীঠাকুরের নির্দেশিত পথে দেশের ঐক্য ও সংহতি রক্ষায় আত্মনিয়োগ করেন নি, তিনি কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেননি। পাবনা সংলগ্ন সব্বাইকে সেদিন রক্ষা করেছিলেন। ১৩৫০ সালের মহা-দুর্ভিক্ষের সময়েও আশেপাশের গ্রামের কাউকে অনাহারে মরতে দেন নি। স্বস্ত্যয়নীর ইষ্টোত্তর জমি এবং সোনার বিনিময়ে মাটি কিনে রাখা জমির ফসল দিয়ে রক্ষা করেছিলেন বৃহত্তর পাবনার ক্ষুধাপীড়িত মানুষদের।
তথাপিও আশ্রমের ভেতরে-বাইরের উপকৃত মানুষেরাই ঠাকুরের শত্রুতা করেই চলেছিল। খুন হল আশ্রমের কর্মী, তপোবনের ছাত্র, পিতৃ-বিয়োগ, দেশবন্ধু-বিয়োগ, মাতৃ-বিয়োগ, আবাল্যের সাথী মহারাজ-কিশোরীমোহন-দের বিয়োগ-ব্যথায় ব্যথাহারী হলেন ব্যথিত।
* * *
১৩৫৩ সালের প্রথম দিকে মহানবী হজরত রাসুলুল্লাহর আদর্শের পরিপন্থী‌ মুসলিম লীগের জেহাদি-আহ্বান ‘ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে‘ ঘোষিত হবার সাথে সাথে কলকাতায় যে পৈশাচিক হত্যালীলা হয়ে গেল সে সংবাদ শুনে অস্থির হয়ে উঠলেন ঠাকুর। দেশ-নেতাদের আগাম সতর্ক করা সত্ত্বেও, প্রতিরোধী-ব্যবস্থাপত্র দেওয়া সত্ত্বেও তাঁরা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি। বিপন্ন দেশবাসীদের রক্ষা করতে না পারার বেদনায় বিপর্যস্ত তিনি। বেড়ে গেল রক্তচাপ, হয়ে পড়লেন অসুস্থ। খবর শুনে পাবনার বিশিষ্ট মুসলমান নেতৃবৃন্দ ঠাকুরকে দেখতে আসেন, পাবনায় সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াতে দেবেন না বলে আশ্বস্ত করেন। একটু সুস্থ বোধ করেন, আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঠাকুরের প্রিয় কলকাতার বিশিষ্ট চিকিত্সক ডাঃ গুপ্ত প্রয়োজনীয় ঔষধ এবং সম্পূর্ণ বিশ্রামের ব্যবস্থাপত্র দিয়ে যান। বাঁধের ধারে নিভৃত নিবাসের মনোরম পরিবেশে ঠাকুরের বিশ্রামের ব্যবস্থা করেন ঋত্বিগাচার্য্য। চাপমুক্ত রাখতে দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষেধ করে দেন। কিন্তু ঠাকুর রাজী হন না। মনের কথা, প্রাণের ব্যথা নিয়ে যারা যারা আসবে, তাদের তিনি কিছুতেই ফেরাতে নারাজ। আগন্তুকদের দুঃখ-বেদনার কথা শুনতে শুনতে আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন। সংবাদ পেয়ে ডাঃ গুপ্ত আসেন, ঠাকুরকে দূরে কোথাও বায়ু পরিবর্তনের জন্য নিয়ে যাবার পরামর্শ দেন।
অবশেষে আশ্রম কর্তৃপক্ষ ঠাকুরকে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ঠাকুর বিহার প্রদেশের দেওঘরে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
“৩০শে আগষ্ট (১৯৪৬) শ্রীশ্রীঠাকুর পাবনা শহরের হিন্দু-মুসলমান নেতৃবর্গকে ডেকে অনুমতি চান দেওঘর যাওয়ার. তখন সবার কাছ থেকে, বিশেষতঃ মুসলিম নেতা হাকিম সাহেবের কাছে অনুমতি নেন ও কথা কাড়িয়ে নেন যাতে তিনি আশ্রমের সামগ্রিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রসঙ্গতঃ ঠাকুর বলেন—হাকিম সাহেব! এখন আমার বাইরে যাবার সময় নয়। আমার মার নামে– ‘মনমোহিনী ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স য়্যাণ্ড টেকনোলজি‘ কলকাতা ইউনিভার্সিটির অধীনে নূতন কলেজ হয়েছে আমার। কলেজ এবং ইউনিভার্সিটির পরিকল্পনা আমার আজন্মের। সেই সুযোগ হাতে এসে গেছে আমার। কেষ্টদা (ভট্টাচার্য্য) হচ্ছেন কলেজের প্রিন্সিপাল। কেষ্টদা সঙ্গে না থাকলে তো আমি কানা. তাই কেষ্টদাকে সঙ্গে নিয়ে যাব। আমার এই বাচ্চা প্রিন্সিপাল থাকবে প্রফুল্ল দাস। বাচ্চা দেখালে কি হয়, এলেম আছে। আপনি ওকে দেখবেন যাতে আমার মার নামের বিজ্ঞান কলেজ ভাল করে চলে।
হাকিম সাহেব বললেন—আপনি নিশ্চিন্ত মনে যান। কখনও কোনও অসুবিধা হলে বঙ্কিমবাবু (রায়) ও প্রফুল্লবাবু যেন আমাদের জানান। ফোনে একটা খবর পেলেও যা করার করতে পারি। খোদাতালার দয়ায় আপনি সুস্থ হয়ে সদলবলে তাড়াতাড়ি ফিরে আসুন। আপনি ফিরে আসা না পর্য্যন্ত আমরা শান্তি পাব না।
পরিবেশটা তখন আবেগে ও মমতায় থরথর করে কাঁপছে। শ্রীশ্রীঠাকুরের চক্ষু অশ্রুভারাক্রান্ত. বেদনাহত দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন সবার পানে. পূজনীয় খেপুদার বাইরের ঘরে বসে এই ঐতিহাসিক শেষ বৈঠক.“
(তথ্যসূত্রঃ কুমারকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য প্রণীত মহামানবের সাগরতীরে/১ম/৩)
ঠাকুরের নির্দেশমত, “রওনা হলেন সুশীলচন্দ্র, সঙ্গে রাজেন্দ্রনাথ ও বীরেন্দ্রলাল। কলকাতা এসে ভোলানাথ সরকারের সঙ্গে রাজেন্দ্রনাথ আপ্রাণ চেষ্টা করে ৩১শে আগষ্ট বগী রিজার্ভ করলেন। ঠিক হল ১লা সেপ্টেম্বর সকালে ঈশ্বরদী থেকে আসাম মেলের সঙ্গে বগী দেওয়া হবে. ৩১শে আগষ্ট আশ্রমে পৌঁছে রাজেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জানালেন সমস্ত সংবাদ। বীরেন্দ্রলাল মিত্রকে সঙ্গে নিয়ে সুশীলচন্দ্র ৩১শে আগষ্ট রাত্রে রওনা হলেন দেওঘরে বাড়ী ঠিক করার জন্য।
আশ্রমে বিদ্যুত বেগে প্রস্তুতি পর্ব্ব চলতে থাকলো. খবর রাখা হল বিশেষ গোপনে, যাতে জনসমুদ্র এসে কেঁদে কেটে ঠাকুরের মত বদলে না ফেলে। পূজনীয় বড়দা বিভিন্ন বিভাগের কর্ম্মীদের দিলেন যথোপযুক্ত উপদেশ ও নির্দ্দেশাদি—যাতে তাঁদের অনুপস্থিতি কালেও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয় সমস্ত কাজ। নির্দ্ধারিত দিনে যথাসময়ে রওনা হলেন শ্রীশ্রীঠাকুর আশ্রম ছেড়ে—সঙ্গে ঠাকুর পরিবারের সবাই, শ্রীশ্রীঠাকুরের পরিচর্য্যাকারিগণ প্রত্যেকে নিজ নিজ পরিবারবর্গসহ, সপরিবারে স-সহচর ঋত্বিগাচার্যদেব, রাজেন্দ্রনাথ এবং আশ্রমের আরও কতিপয় বিশিষ্ট কর্মী. বিষণ্ণ বদনে যাত্রা করলেন শ্রীশ্রীঠাকুর—অত্যন্ত কষ্ট হচ্ছে তাঁর প্রিয়জনদের ছেড়ে যেতে—ছেড়ে যেতে জনক-জননীর পবিত্র স্মৃতিতীর্থ. ব্যথাতুর চিত্তে সজল নেত্রে নির্ব্বাক নিস্তব্ধ হয়ে পাষাণ মূর্ত্তির মত দাঁড়িয়ে থাকল আশ্রমবাসী নরনারী—আবাল-বৃদ্ধ-শিশু-যুবা ঠাকুরের এই ঐতিহাসিক যাত্রাপথের দিকে তাকিয়ে. সূচনা হল পুরুষোত্তমের নবতর দ্বারকা-লীলার.” (তথ্যসূত্রঃ শ্রীমত্ আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী ও সত্সঙ্গ আন্দোলন, পৃঃ ১৪৩)
“এর আগেও কয়েকবার শ্রীশ্রীঠাকুরের বায়ু-পরিবর্তনের জন্য বাইরে যাওয়ার কথা হয়েছিল । কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানা কারণে যাওয়া হয়ে ওঠেনি । এবারেও শেষ পর্যন্ত তাঁর যাওয়া হবে কিনা তা নিয়েও সংশয় ছিল । কিন্তু ১লা সেপ্টেম্বর সকালে মাতৃমন্দিরের সামনে গিয়ে দেখি শ্রীশ্রীঠাকুর যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন । তাঁকে ঈশ্বরদী ষ্টেশনে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ী প্রস্তুত । বেলা দশটা নাগাদ তিনি রওনা হবেন । শ্রীশ্রীঠাকুর গাড়ীতে ওঠার আগে তাঁর পিতা ও মাতার প্রতিকৃতির সামনে প্রণাম নিবেদন করলেন । তারপর আশ্রম প্রাঙ্গণে মন্দিরে গিয়ে হুজুর মহারাজ এবং সরকার সাহেবের প্রতিকৃতির সামনে প্রণাম নিবেদন করলেন । …..তাঁর চোখে জল । চোখের জল ফেলতে ফেলতে ফেলতে তিনি মোটরে উঠলেন । ….চোখের জল ফেলতে ফেলতে তিনি জন্মভূমি থেকে শেষ যাত্রা করেছিলেন ।” (তথ্যসূত্রঃ কুমারকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য প্রণীত মহামানবের সাগরতীরে/১ম/৩-৪)
“২রা সেপ্টেম্বর বেলা ১০টা নাগাদ শ্রীশ্রীঠাকুর বৈদ্যনাথধাম স্টেশনে পৌঁছলেন । সঙ্গে পরিবার-পরিজন, পার্ষদগণ এবং সেবকগণ । তাঁর বাসের জন্য প্রথমে ‘বড়াল-বাংলো’ বাড়ীটি ভাড়া নেওয়া হয় । পরে ‘ওয়েস্ট এণ্ড হাউস’ (মনোমোহিনী ধাম), গোলাপবাগ, রঙ্গনভিলা , অশোক-আশ্রম, হিলস ওয়ে , শশধর-স্মৃতি (শিবতীর্থ), দাস-ভিলা, প্রসন্ন-প্রসাদ প্রভৃতি বাড়ী ভাড়া করা হয় । রঙ্গনভিলায় শ্রীশ্রীঠাকুরের মধ্যমভ্রাতা পূজনীয় প্রভাসচন্দ্র চক্রবর্তী (ক্ষেপুকাকা) হিলস ওয়েতে শ্রীশ্রীঠাকুরের কনিষ্ঠ ভ্রাতা পূজনীয় শ্রীকুমুদরঞ্জন চক্রবর্তী (বাদলকাকা) এবং গোলাপবাগে পূজ্যপাদ বড়দা সপরিবারে বাস করতে থাকেন ।”
(মহামানবের সাগরতীরে, ১ম পৃঃ ৪)
শ্রীশ্রীঠাকুরের দেওঘর আগমনের সংবাদ জানতে পেরে, নিরাপত্তার কারণে, পূর্ববঙ্গের অনেক সত্‍সঙ্গী পরিবার ভিটেমাটি ছেড়ে ঠাকুরের শরণাপন্ন হন । ওদিকে, ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতির থাবায় ১৯৪৭ এর ১৫ আগষ্ট দ্বিজাতি-তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে দেশবিভাগের ফলে আরো ছিন্নমূল সত্‍সঙ্গী পরিবারের দল দেওঘরে চলে আসেন । দেওঘরে ঠাকুর নবাগত । নিজেই পরিবার পরিজনদের নিয়ে প্রভূত কষ্ট স্বীকার করে ভাড়া বাড়ীতে থাকেন । নিদারুণ অর্থকষ্টের মধ্যেও প্রশাসন বা সমাজসেবী সংস্থাদের কাছ থেকে সাহায্য না নিয়ে, কাউকে বিব্রত না করে, আত্মত্যাগী ইষ্টভ্রাতাদের সাহায্যে দুর্গতদের আশ্রয়দান ও ভরণপোষণ করেছিলেন ।
শ্রীশ্রীঠাকুর সর্বহারাদের যোগ্যতাহারা হতে দিলেন না ।
“বাস্তুহারা হওয়া নিদারুণ
কিন্তু যোগ্যতাহারা হওয়া সর্বনাশা,
এই যোগ্যতাকে সর্ব্বাঙ্গসুন্দর ক’রে
অর্জ্জন করতে হলেই
আদর্শে কেন্দ্রায়িত হতেই হবে সক্রিয়তায়,
…তাই আজ যারা বাস্তুহারা
সর্ব্বনাশের ঘনঘটা যাদের
চারিদিকেই ঘিরে ধরেছে
আগ্রহ আকুল কণ্ঠে তাদের বলি…..
সাবধান থেকো,
যোগ্যতাকে হারিও না,
এই যোগ্যতা যদি থাকে
লাখ হারানকে অতিক্রম ক’রে
বহু পাওয়ার আবির্ভাব হতে পারে
বিধিমাফিক শ্রমকুশল
সৌকর্য্যে……”
(সূত্রঃ মহামানবের সাগরতীরে ১ম\১৫)
সেদিন যারা ঠাকুরের উক্ত নিদেশ অমান্য করে খয়রাতি সাহায্য গ্রহণ করেছিলেন, তারা হয়েছিলেন সংকুচিত, আর, যাঁরা ঠাকুরের নিদেশ মেনে চলেছিলেন তাঁরা জীবনের কল্যাণপ্রবাহকে প্রসারিত করতে পেরেছিলেন ।
যাইহোক, দেওঘরে আগত উদ্বাস্তুদের আশ্রয়, ভরণপোষণ, চিকিত্‍সাদি পরিষেবার ব্যবস্থা করতে অনেক বাড়ী ভাড়া করতে হয়েছিল শ্রীশ্রীঠাকুরকে । যা ক্রমে ক্রমে সত্‍সঙ্গ প্রতিষ্ঠানের রূপ পরিগ্রহ করে । তিলে তিলে গড়ে তোলা হিমাইতপুরের ঐতিহ্যমণ্ডিত সেই আশ্রম শত্রু সম্পত্তি ঘোষণা করে পাকিস্তান সরকার দখল করে নেয়।

শ্রীশ্রীঠাকুরের দেওঘর আগমনের সংবাদ জানতে পেরে, নিরাপত্তার কারণে,
পূর্ববঙ্গের অনেক সৎসঙ্গী পরিবার ভিটেমাটি ছেড়ে ঠাকুরের শরণাপন্ন হন।
ওদিকে, ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতির থাবায় ১৯৪৭ এর ১৫ আগষ্ট
দ্বিজাতি-তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে দেশবিভাগের ফলে আরো ছিন্নমূল সৎসঙ্গী
পরিবারের দল দেওঘরে চলে আসেন। দেওঘরে ঠাকুর নবাগত। নিজেই পরিবার পরিজনদের
নিয়ে প্রভূত কষ্ট স্বীকার করে ভাড়া বাড়ীতে থাকেন। নিদারুণ অর্থকষ্টের
মধ্যেও প্রশাসন বা সমাজসেবী সংস্থাদের কাছ থেকে সাহায্য না নিয়ে, কাউকে
বিব্রত না করে, আত্মত্যাগী ইষ্টভ্রাতাদের সাহায্যে দুর্গতদের আশ্রয়দান ও
ভরণপোষণ করেছিলেন।

।। দেশভাগ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকুলচন্দ্রের আক্ষেপ ।।
‘‘চেষ্টা করেছিলাম প্রাণপণ যাতে হিমাইতপুর না ছাড়তে হয়, কিন্তু অত্যাচারিত হলাম ভীষণ, পারলাম না কিছুতেই। বাড়ী আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিল, মানুষ খুন করে ফেল্ল। ওখানকার সব লোকের বিরুদ্ধতার জন্য পারলাম না। সকলের ভাল করতে গিয়ে আমি একেবারে জাহান্নামে গেলাম।’’ ‘‘আমরা হিন্দুরাই পাকিস্তানের স্রষ্টা। আমরা আরো চেষ্টা করেছি, যাতে আমরা সকলে মুসলমান হয়ে যাই। আমরা মুসলমান মেয়ে বিয়ে করতে পারি না। কিন্তু মুসলমানরা হিন্দুর মেয়ে বিয়ে করতে পারে। আমরা materialise করেছি তাই যাতে পাকিস্তান হয়, আর materialise করি নাই তা যাতে পাকিস্তান না হয়।….. কিন্তু আগে যদি হায়দ্রাবাদের দিক থেকে বাংলায় হিন্দুদের নিয়ে আসা যেতো, তবে পাকিস্তান হতো না। কিন্তু তা তো হলো না। পাকিস্তান হওয়ায় হিন্দু মুসলমান উভয়েরই কী ভীষণ ক্ষতিই না হল। …….. ’’ (ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থ, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৯৪) * * *

ফলে শ্রীশ্রীঠাকুর নবোদ্যমে প্রতিষ্ঠা করেন কেমিক্যাল ওয়ার্কস, তপোবন বিদ্যালয়, কুটিরশিল্প, প্রেস, প্রকাশনা বিভাগ, হাসপাতাল, যতি আশ্রম প্রভৃতি।
শ্রীশ্রীঠাকুরের জনকল্যাণমুখী কর্ম প্রচেষ্টার বাস্তব রূপায়নের আলোচনা পত্রিকায় প্রকাশিত নিম্ন প্রদত্ত তথ্য পাঠ করলেই বোঝা যাবে শ্রীশ্রীঠাকুরের সুদূরপ্রসারী কল্যাণ প্রতিষ্ঠার প্রতিচ্ছবি ।
“সত্‍সঙ্গের বর্তমান সর্বপ্রধান লক্ষ্যবস্তু হইল বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার, দেশীয় ঔষধপত্র প্রস্তুতের রসায়ণাগার ও কারখানা, হাসপাতাল, প্রসূতিসদন, বালক-বালিকাদের শিক্ষার জন্য উচ্চ বিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্র, কুটির-শিল্প ভবন, কৃষিপরীক্ষা-ক্ষেত্র প্রভৃতি স্থাপন পূর্বক পাবনার ন্যায় একটি আদর্শ পল্লী-উন্নযন কেন্দ্রের পুণঃ প্রতিষ্ঠা করা । প্রসঙ্গতঃ ইহা উল্লেখযোগ্য যে, অতীতের সেই পাবনা-সত্সঙ্গ পল্লী সংগঠনের উজ্জল আদর্শরূপে অদ্যাপি সারা ভারতে প্রসিদ্ধ হইয়া আছে. আর শুধুমাত্র বিহারেই নয়, পরন্তু ভারতের সকল প্রদেশেই এইরূপ আদর্শ কেন্দ্র স্থাপন করাই সত্সঙ্গের অভিলাষ।
শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি আবাসিক পল্লী-বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন পূর্বক শ্রীশ্রীঠাকুরের পরিকল্পনাগুলির বাস্তব রূপায়নের উচ্চাকাঙ্খাও সত্সঙ্গ পোষণ করিয়া চলিয়াছে।……” (আলোচনা, মাঘ, ১৩৬৫/পৃঃ ১৫০)
উক্ত দলিল থেকে প্রাপ্ত সংবাদে এটুকু বোঝা গেল যে, পাবনা আশ্রমে শ্রীশ্রীঠাকুর যথেষ্ট প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে যে-সব কর্ম-প্রতিষ্ঠানসমূহ গড়ে তুলেছিলেন, তদনুরূপ কেন্দ্র ভারতের প্রতিটি প্রদেশে স্থাপন করা হবে। এবং একটি শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে,—যা শ্রীশ্রীঠাকুরের এক অন্যতম ইচ্ছা।
সৎসঙ্গী-সাধারণের জ্ঞাতার্থে পাবনার প্রেরিততীর্থ হিমাইতপুর তপুর-আশ্রমের কর্ম-প্রতিষ্ঠানসমূহের এক সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করছিঃ—
অখ্যাত পল্লী হিমাইতপুরে বায়ু থেকে বিদ্যুত উৎপাদন করে পরম বিস্ময় সৃষ্টি করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। গড়ে তুলেছিলেন—তপোবন ও মাতৃ বিদ্যালয়—যা শিক্ষাক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত মনোমোহিনী ইনষ্টিউট অফ সায়েন্স এণ্ড টেকনোলজি নামের বিজ্ঞান কলেজ।–যার পরিচয় ইতিপূর্বে পেয়েছি। কেমিক্যাল ওয়ার্কসের জীবনদায়ী ঔষধসমূহ দেশে এবং বিদেশে সমাদৃত হয়েছিল। বৈদ্যুতিক এবং যন্ত্রশিল্পের আধুনিক সব ধরণের কাজ হতো ইলেকট্রিকাল ও মেকানিক্যাল ওয়ার্কসপে। যথা,–ঢালাই, ঝালাই, লেদের কাজ, ডাইস, ইলেক্ট্রোপ্লেটিং, ইলেক্ট্রিক্যাল ফিটিং, আরমেচার, ব্যাটারি প্লেট তৈরি ও মেরামত, ডায়নামো মেরামত ইত্যাদি। ছিল—ময়দার কল, আটার কল, চালের কল, তেলের কল, চিনির কল, মেডিকেটেড ওয়াটার মেশিন, স্পাইস পাউডারিং, সুতার গুটি তৈরি, টেলারিং, বোতাম তৈরি, গ্লাস ব্লোয়িং, পটারী ওয়ার্কস্, বেকারী, লজেন্স তৈরি, গ্রোসারী প্রোডাক্ট ইত্যাদির শিল্প। ছিল—কার্ডবোর্ড কারখানা, স্টীমলণ্ড্রী, কটন ইণ্ডাস্ট্রিজ, হোশিয়ারী শিল্প, ব্যাঙ্ক, ইঞ্জিনীয়ারিং ওয়ার্কস্, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র, স্বাস্থ্য বিভাগ, গৃহনির্মাণ বিভাগ, কলাকেন্দ্র, প্রেস (যেখানে বাংলা, হিন্দী, সংস্কৃত, উর্দু, আরবী, ফারসী হরফের কাজ হতো, দেশ ভাগের পর পাকিস্তান সরকার জবরদখল করে ঢাকাতে নিয়ে যায়।), পাব্লিশিং হাউস, ফিলানথ্রপি, মাতৃসঙ্ঘ ইত্যাদি।
(তথ্যসূত্রঃ ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনী গ্রন্থ)
শুধু আশ্রমবাসীরাই নয়, জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায়-ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে সকলেই ওইসব প্রতিষ্ঠানের সুলভ সেবা পেতেন। তথাপিও পাকিস্তান সরকার ওই সর্বজনীন কল্যাণধর্মী প্রতিষ্ঠানসমূহ দখল করে কেন বিনষ্ট করেছিলেন তার উত্তর আমার জানা নেই।
যেমন জানা নেই, আলোচনা পত্রিকাতে বর্ণিত শ্রীশ্রীঠাকুরের ইচ্ছার বাস্তবায়ন দেওঘর সত্সঙ্গ কর্তৃপক্ষ করেছেন কি-না।—জানালে বাধিত হব। কারণ, ইষ্টভৃতি মানে ইষ্টভরণ, ইষ্টভৃতির অর্ঘ্যাদি ইষ্টকর্মে,—ঠাকুরের ইচ্ছার পূর্ত্তিতে ব্যবহৃত হবে, এবং সেটাই স্বাভাবিক!
তবে এটুকু জানতে পেরেছি, ঠাকুরকে প্রীত করার, সুস্থ রাখার অজুহাতে শনির দশা কাটাবার ব্যবস্থা করা হয়, যাগযজ্ঞ করা হয়, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখান হয়। “কিন্তু যা করলে তিনি সুস্থ থাকেন এবং তাঁর মন প্রফুল্ল থাকে সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়নি। তাঁর আবাল্যের স্বপ্ন শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, যাজন-পরিক্রমার জন্য গাড়ী সংগ্রহ, গঙ্গা-দারোয়া পরিকল্পনা, হাসপাতাল স্থাপন, দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ প্রভৃতি বিষয়ে কর্তৃপক্ষের প্রচেষ্টা আন্তরিক ছিল না।……… ” (তথ্যসূত্রঃ কুমারকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য প্রণীত মহামানবের সাগরতীরে/২য়/৩২৭)
চির-অতন্দ্র পুরুষোত্তম মৃতলোকের অনেক বেদনা নিয়ে অমৃতলোকে প্রত্যাবর্তন করেছেন। তাঁর “দেবভিক্ষা–
ওগো ভিক্ষা দাও!–
ঝাঁঝাল ঝঞ্ঝার পিশাচী জৃম্ভন শুরু হয়েছে,
বাতুল ঘুর্ণি বেভুল স্বার্থে
কলঙ্ক কুটিল ব্যবচ্ছেদ
সৃষ্টি করতে আরম্ভ করে দিয়েছে,
প্রেত-কবন্ধ-কলুষ
কৃষ্টিকে বেতাল আক্রমণে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে,
অবদলিত কৃষ্টি অজচ্ছল অশ্রুপাতে
ভিক্ষুকের মতো তাঁরই সন্তানের দ্বারে
নিরর্থক রোদনে রুদ্যমান,
অলক্ষ্মী-অবশ প্রবৃত্তি-শাসিত বেদস্মৃতি–
ঐ দেখ–মর্মান্তিকভাবে নিষ্পেষিত,
ত্রস্ত দোধুক্ষিত দেবতা আজ নতজানু–তোমাদেরই দ্বারে
তোমাদেরই প্রাণের জন্য তোমাদেরই প্রাণভিক্ষায়
তোমাদেরই সত্তার সম্বর্দ্ধনার জন্য
ব্যাকুল হয়ে ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়াচ্ছেন ;
কে আছ এমন দরদী আর্য্য-আত্মজ সন্তান!–
তাঁকে মানুষ ভিক্ষা দেবে, তাঁকে অর্থ ভিক্ষা দেবে—
সব হৃদয়ের সবটুকু উত্সর্গ করে
তোমাদেরই জন্য
সেই দেবোজ্জল প্রচেষ্টাকে সার্থক করে তুলতে ?
যদি থাক কেউ
ওগো ধী-ধুরন্ধর উত্সর্গপ্রাণ
নিরাশী নির্ম্মম!
এস,–উত্সর্গ কর–আত্মাহুতি দাও–
জীবন নিঙড়ানো যা-কিছু সঙ্গতি
তাঁকে দিয়ে সার্থক হয়ে ওঠ,
নিজেকে বাঁচাও, মানুষকে বাঁচাও, কৃষ্টিকে বাঁচাও ;
আর, বাঁচাও দুর্দ্দশাদলিত মহা-ঐশ্বর্য্যশালিনী
আর্য্যস্তন্যদায়িনী, পরম-পবিত্রা
ভিখারিণী মাতা ভারতবর্ষকে,
ধন্য হও, নন্দিত হও,
ঈশ্বরের অজচ্ছল আশীর্ব্বাদকে
মাথা পেতে লও,
শান্ত হও, শান্তি দাও,
অস্তি ও অভ্যুত্থানকে
অনন্তের পথে অবাধ করে রাখ ;
স্বস্তি! স্বস্তি! স্বস্তি!

(১৯৪৬ খৃস্টাব্দের প্রথম দিকে হিমায়েতপুরে নিজহস্তে লিপিবদ্ধ করেন, এই ‘দেবভিক্ষা’ বাণী, পরবর্তীতে চর্য্যা-সূক্ত গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়!)-র” ঝুলি ভরাতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি! তবে আশা রাখি “অনুকূল সদাবিভুঃ পদ্মনাভঃ মনপ্রভু”-র অনুগামী ইষ্টস্বার্থপ্রতিষ্ঠাপরায়ণ ঋদ্ধসেনানীদের দিয়ে তিনি তাঁর কাজ ঠিক করিয়ে নেবেন—পুণঃ প্রতিষ্ঠিত হবে তাঁর পুণ্য জন্মভূমি পরমতীর্থ হিমায়েতপুরের হৃত গৌরব!—দেশে ও বিদেশে।

tapanspr@gmail.com

।। সংক্ষেপে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শ ।।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সংক্ষিপ্ত দিব্য জীবনীর কিয়দংশ।


                  ।। ভগবানের আবির্ভাব ।।

নারী ও পুরুষ উভয়ের সংঘাতে যখন উভয়ে নিজ-নিজ বৈশিষ্ট্যে উদ্দাম ও অবাধ হয়, উভয়ের উভয়ের প্রতি আকর্ষণ যেখানে উভয়কে মূঢ় করিয়া না তুলিয়া উদ্বুদ্ধ হইয়া আদর্শে আপ্রাণ হইয়া ওঠে—তেমনতর প্রকৃতি ও পুরুষেই ভগবান মূর্ত্ত হইয়া আবির্ভূত হন, আর, জীব ও জগৎকে সংবৃদ্ধির পথে আকর্ষণ করিয়া অমৃতকে পরিবেশন করেন ! ১৮৪। (চলার সাথী)

                          

     * * * দাস, চলভাষ ৭০০৩৪১০০৭৬ * * *

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত সৎসঙ্গ আন্দোলন সন্তমত, বৈদিক মত এবং পূর্বাপূর্ব অবতারবরিষ্ঠ পুরুষোত্তমগণকে মেনে চলার শিক্ষা দিয়েছে।
আগ্রা সৎসঙ্গের বিনতীর মাধ্যমে সন্ত-মতবাদকে, শ্রীশ্রীঠাকুর রচিত এবং প্রবর্তিত আহ্বানী, আচমন, আর্য্যসন্ধ্যা, পঞ্চবর্হিঃ, সপ্তার্চ্চি বৈদিক-মতবাদকে এবং পুরুষোত্তম বন্দনার মাধ্যমে পূর্বাপূর্ব অবতার-বরিষ্ঠদের আদর্শকে মান্যতা দিয়ে এক সর্বজনীন উপাসনা, প্রার্থনা প্রবর্তন করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। কেন জানিনা, দেওঘর সৎসঙ্গের কর্ণধারগণ ওই সর্বজনীন প্রার্থনাকে অস্বীকার করে ইষ্টগুরুর আদর্শকে অবমাননা করছেন।
* * *
“মৎস্য-কূৰ্ম্ম-কোল-নৃসিংহ-বামন শরীরম্ রাম-কৃষ্ণ-বুদ্ধ-যীশু-মোহম্মদ রূপায়িতম্ চৈতন্য-রামকৃষ্ণানুকূলং পূর্ব্বর্তনীপূরণম্
শাশ্বতং বৰ্ত্তমানম্।”-এর প্রবক্তা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সন্ত-সদগুরু পরম্পরা প্রসঙ্গে বলছেন, “……….. বুদ্ধদেব যে স্থানে উঠিয়া নির্বাক ছিলেন, শঙ্কর সেখানে পরমাত্মা খাড়া করিলেন। শঙ্করের পর রামানুজ, রামানুজের পরেই কবীর, নানক প্রভৃতি বহু সাধুর ভারতে প্রায় সর্বত্রই অভ্যুত্থান হয়। তারপর চৈতন্য, তারপর খৃষ্টধর্মের ঢেউ—তাহার ফলে রামমোহন প্রভৃতি। তারপর রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ। এই যে বিরাট, বহু কালব্যাপী বহু ধর্ম মতের আবির্ভাব ও সমাজ সংস্কারের প্রচেষ্টা— সমস্তই শ্রীকৃষ্ণ তত্ত্বেরই practical application বলা যাইতে পারে। তত্ত্ব হিসাবে বিশেষ নূতন কিছুই হয় নাই। একই বহুৎ তত্ত্বেরই নানা অংশ নানা মহাত্মার মধ্য দিয়া সমাজ শরীরের উপর দেশ কাল ভেদে ও মানুষের যোগ্যতা ও প্রয়োজনানুসারে পরীক্ষিত হইয়াছে। কিন্তু তাহার সঙ্গে সঙ্গে নূতন এক চরম তত্ত্বের সূচনাও দেখা দিয়াছিল কবীর প্রভৃতি কয়েক জনের মধ্যে। বলিতে গেলে রামচন্দ্রের তত্ত্বের পরে শ্রীকৃষ্ণই নূতন বৃহত্তর তত্ত্ব আনয়ন করেন। আবার শ্রীকৃষ্ণের পরে এই যুগেই ব্যাপকতর তত্ত্বের আবির্ভাব। আর সে তত্ত্ব শ্রীকৃষ্ণ, কবীর প্রভৃতির মধ্য দিয়া ক্রমশঃ আবির্ভূত হইয়াছে। এই নূতন তত্ত্বের speciality হচ্ছে এই যে, অন্যান্য মহাত্মার তত্ত্বের ন্যায় ইহার গ্লানি হওয়া অসম্ভব, কারণ এই মত কাহাকেও বাদ দিয়া নয়। যে কেহ যে অবস্থায়ই থাকুক না কেন, কিছুই বাদ না দিয়া এই মত গ্রহণ করিতে পারে। কেউ হয়ত ভুল করতে পারে (এই মতের Catholicity দেখে ), কিন্তু এ মত তাহাতে কোন রকমেই affected হবে না। (সূত্রঃ ঋত্বিগাচার্য্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য প্রণীত দিনপঞ্জী প্রথম খন্ড।)


যাইহোক, সাধক রামানুজ পরবর্তী সন্তমতের সাধক কবীরদাস জন্মেছিলেন 1440C বারানসীতে। তিনিই প্রথম আমাদের সৎ মন্ত্রের রহস্য ভেদ করে বলেছিলেনঃ
“কবীর ধারা অগমকী সদগুরু দয়ী লখায়,
উলট তাহি সুমিরন করে স্বামী সংগ লাগায়।”
অর্থাৎ ধারা উল্টে স্বামী যোগ করে জপ করতে নিদেশ দিলেন। সন্ত কবীরের পর গুরু নানক জন্মগ্রহণ করেন 15. 4. 1469 C পঞ্জাব প্রদেশের তালবণ্ডীতে। তিনিও ওই সত্যনাম প্রচার করেছেন। গুরু নানকের পর আগ্রাতে ২৪শে আগস্ট ১৮১৮ তে জন্মগ্রহণ করেন শিবদয়াল সিং, তিনি স্বামীজী মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ১৫ জুন ১৮৭৮ আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। পরবর্তী গুরু হন রায় সালিগ রাম। তিনি ১৪ মার্চ, ১৮২৯ আগ্রার পীপল মাণ্ডিতে জন্মগ্রহণ করেন। ৬ ডিসেম্বর ১৮৯৮তে আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। তিনি হুজুর মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ওই সৎনাম সাধন করে চরম ও পরম পথের সন্ধান পান। তিনি তাঁর গুরু স্বামীজী মহারাজের অনুমতি ক্রমে ওই সৎনাম সর্বসাধারণে প্রচার করেন। পরবর্তী গুরু হন পণ্ডিত ব্রহ্মশঙ্কর মিশ্র। ২৮শে মার্চ, ১৮৬১ তে ব্রাহ্মণ পরিবারে, বারানসীতে জন্মগ্রহণ করেন। ১২ অক্টোবর ১৯০৭ সালে দেহত্যাগ করেন। তিনি মহারাজ সাহেব নামে খ্যাত ছিলেন। মহারাজ সাহেব দেহত্যাগের পূর্বে একটি কাউন্সিল গঠন করে বাবু কামতা প্রসাদ ওরফে সরকার সাহেবকে পরবর্তী গুরু রূপে নির্বাচন করেন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরকার সাহেবকে সন্ত বলে উল্লেখ করেছেন, ভাববাণীতে। অন্তর্ধানের পর আগ্রা সৎসঙ্গের প্রধান গুরু হন সরকার সাহেব।
পুরুষোত্তম জননী মাতা মনোমোহিনী দেবী হুজুর মহারাজের দীক্ষিত ছিলেন। হুজুর মহারাজ বিগত হবার পর সরকার সাহেবের কাছে মা তাঁর ছেলের সম্পর্কে জানালে সরকার সাহেব “মেরা কাম ফতে।” বলে দেহ ত্যাগ করেন। পুরুষোত্তমরূপী সদগুরু অবতীর্ণ হয়েছেন জানতে পারে সাধ্যায়ী গুরু তাঁর দায়িত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন। সরকার সাহেব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গাজীপুরে। তারপর থেকেই মাতা মনোমোহিনী দেবী সন্তমতের সৎনামে দীক্ষা দিতে শুরু করেছিলেন।
মাতা মনোমোহিনী দেবী তাঁর গুরুদেব সাধক পুরুষ হুজুর মহারাজের কাছ থেকে যে বিনতী প্রার্থনা করতে শিখেছিলেন, সেই শিক্ষার ধারাটাকে প্রাধান্য দিয়ে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন পাবনার সৎসঙ্গ আন্দোলন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র পুরুষোত্তম রূপে স্বীকৃত হবার পরও আগ্রা সৎসঙ্গের ধারায় (যে ধারায় বীজমন্ত্রের উচ্চারণ স্বীকৃত, বীজমন্ত্রের মাধ্যমেই পারস্পরিক সম্ভাষণ প্রচলিত। আর্য্যকৃষ্টির দশবিধ সংস্কার অবহেলিত।) পাবনা সৎসঙ্গকে পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন বলেই আগ্রা সৎসঙ্গের বিনতী-র শিক্ষা দেওয়া হয় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের অনুসারীদের। যার ফলে, আজও বিনতীর মাধ্যমে বীজমন্ত্র উচ্চারিত হয়ে চলেছে। নিত্য সাধ্যায়ের জন্য আবশ্যিক, শ্রীশ্রীঠাকুর রচিত ‘জাগরণী’ সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দীক্ষিতরা যতটা না জানে, তার চেয়ে বেশি মানে মাতা মনোমোহিনী দেবী রচিত তাঁর গুরুদেবের প্রশ্বস্তির প্রভাতী গীতি ‘প্রভাত যামিনী উদিত দিনমনি’-কে।
পরবর্তীকালে দৈনন্দিন জীবনে আর্য্যকৃষ্টিকে উপস্থাপিত করতে শ্রীশ্রীঠাকুর যে আর্য্যসন্ধ্যা ও প্রার্থনা মন্ত্র রচনা করেছিলেন, মাতা মনোমোহিনী দেবী সেই প্রার্থনাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন, ‘‘সন্ধ্যা মন্ত্রটা মা মারা যাবার তিনদিন আগে লেখা হয়। মা শুনে বড় খুশি হয়েছিলেন। সেইজন্য ও জিনিসটার উপর আমার খুব প্রীতি আছে। মা শুনেছিলেন তাই ওটা আমার অর্ঘ্য হয়ে আছে।’’
(আঃ প্রঃ ২১ খণ্ড, ৭. ১১. ১৯৫২)

।। আর্য্য সন্ধ্যা ও প্রার্থনার গুরুত্ব প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর। আর্য্যদের জীবনের তপস্যা একটা প্রধান অঙ্গ ছিল, এবং করলে এখনও আছে। তাই, প্রত্যেক individual সাংসারিক গোলমালকে এড়িয়ে যতক্ষণ তপস্যায় নিরত থাকতে পারতেন, ততক্ষণ থাকতেন। তাই, congregation-হিসাবে বিজ্ঞান, দর্শন এবং ধৰ্ম্ম পুস্তিকাদির আলোচনা-ছাড়া তেমনতর কোন প্রার্থনার ব্যবস্থা ছিল ব’লে শোনা যায় না। তবে অনেক আগে সামগানের কথা শোনা যায়, আরও এখনও কীর্ত্তনের ‘চল’ আছে!
তবে আমার মনে হয়, আমাদের সন্ধ্যামন্ত্র (দ্রঃ ‘প্রার্থনা’ নামাঙ্কিত পুস্তক, সৎসঙ্গ পাবলিশিং হাউস, দেওঘর।) যা’ আছে গায়ত্রী, প্রাণায়াম বাদ দিয়ে—সেগুলি congregational (সমবেত) প্রার্থনা-হিসাবে চলতে পারে। ভাবের প্রতি নজর রেখে অর্থবোধ নিয়ে ঐগুলি পাঠ বা আবৃত্তিতে এবং একটা পাঠের পর চোখ বুজে একটু চিন্তায়, মন—এমন-কি শরীর পর্য্যন্ত কেমনতর হ’য়ে ওঠে, কিছুদিন একটু করলেই হাতে-হাতে বোধ করতে পারা যায়। ভাবের সহিত ঐ শব্দগুলি উচ্চারণে এতই তীব্রতা ও enlightenment এনে দেয় যা’তে নাকি পারিপার্শ্বিক-সহ সমস্ত জীবনটাই কেমনতর জীবনে মুহূর্তে যেন উদ্বুদ্ধ হ’য়ে ওঠে। গায়ত্রী ও প্রাণায়াম বাদ এই জন্য বললাম—ইহা জপ চিন্তার সহিত meditation-এর জন্য, তাই উহা নিরিবিলি হ’য়ে করতে পারলেই ভাল।

প্রশ্ন। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র—সকলেরই পালনীয় এমন কোন সার্ব্বজনীন প্রার্থনা বা সন্ধ্যা সবারই জন্যে চলতে পারে নাকি? সন্ধ্যা যা’ যা’ আছে তা’ তো শূদ্র পালন করতে পারে না, আর, ওর ভিতর জড়ের পূজো আছে—যেমন জল, সূর্য্য ইত্যাদি।

শ্রীশ্রীঠাকুর। Enlightened আর্য্যরা জড়ের পূজা নিয়ে কখনই বেকুবের মতন ব্যাপৃত ছিলেন না। সূর্য্য, বাতাস, জল ইত্যাদি সেই পরমপুরুষের দান—যা’ প্রতিনিয়তই আমাদের জীবন ও বৃদ্ধিকে invigorate ও accelerate করছে। তাদের উপলক্ষ্য ক’রে সেই almighty-তে কৃতজ্ঞতার সহিত আকৃষ্ট বা মুগ্ধ হতেন। আর, যে-প্রার্থনার কথা পূর্ব্বে বলেছি তা’ congregation-এর মধ্যে সবাই—ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, এমন-কি শূদ্রও—অবলীলাক্রমে করতে পারেন।
(নানা প্রসঙ্গে, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১৫২-১৫৩)
* * *
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে কারো কাছে দীক্ষা গ্রহণ না করলেও বার বার তিনি বলেছেন, ‘আমার মা-ই যেন সরকার সাহেব, হুজুর মহারাজ ও অন্যান্য অন্যান্য মহাপুরুষদের প্রতীক—মা-ই আমার আদর্শ—মা-ই আমার জীবত্ব।’ তথাপি তিনি সরকার সাহেবকে নিজের গুরু হিসেবে এবং হুজুর মহারাজকে মাতৃদেবীর গুরু হিসেবে মান্য করতেন, তাঁদের প্রতিকৃতিতে প্রণাম নিবেদন করতেন।

                                ———-

tapanspr@gmail.com

সার্বজনীন সমবেত প্রার্থনা

।। সার্বজনীন সমবেত প্রার্থনা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর। আর্য্যদের জীবনের তপস্যা একটা প্রধান অঙ্গ ছিল, এবং করলে এখনও আছে। তাই, প্রত্যেক individual সাংসারিক গোলমালকে এড়িয়ে যতক্ষণ তপস্যায় নিরত থাকতে পারতেন, ততক্ষণ থাকতেন। তাই, congregation-হিসাবে বিজ্ঞান, দর্শন এবং ধৰ্ম্ম পুস্তিকাদির আলোচনা-ছাড়া তেমনতর কোন প্রার্থনার ব্যবস্থা ছিল ব’লে শোনা যায় না। তবে অনেক আগে সামগানের কথা শোনা যায়, আরও এখনও কীর্ত্তনের ‘চল’ আছে!
তবে আমার মনে হয়, আমাদের সন্ধ্যামন্ত্র (দ্রঃ ‘প্রার্থনা’ নামাঙ্কিত পুস্তক, সৎসঙ্গ পাবলিশিং হাউস, দেওঘর।) যা’ আছে গায়ত্রী, প্রাণায়াম বাদ দিয়ে—সেগুলি congregational (সমবেত) প্রার্থনা-হিসাবে চলতে পারে। ভাবের প্রতি নজর রেখে অর্থবোধ নিয়ে ঐগুলি পাঠ বা আবৃত্তিতে এবং একটা পাঠের পর চোখ বুজে একটু চিন্তায়, মন—এমন-কি শরীর পর্য্যন্ত কেমনতর হ’য়ে ওঠে, কিছুদিন একটু করলেই হাতে-হাতে বোধ করতে পারা যায়। ভাবের সহিত ঐ শব্দগুলি উচ্চারণে এতই তীব্রতা ও enlightenment এনে দেয় যা’তে নাকি পারিপার্শ্বিক-সহ সমস্ত জীবনটাই কেমনতর জীবনে মুহূর্তে যেন উদ্বুদ্ধ হ’য়ে ওঠে। গায়ত্রী ও প্রাণায়াম বাদ এই জন্য বললাম—ইহা জপ চিন্তার সহিত meditation-এর জন্য, তাই উহা নিরিবিলি হ’য়ে করতে পারলেই ভাল।

প্রশ্ন। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র—সকলেরই পালনীয় এমন কোন সার্ব্বজনীন প্রার্থনা বা সন্ধ্যা সবারই জন্যে চলতে পারে নাকি? সন্ধ্যা যা’ যা’ আছে তা’ তো শূদ্র পালন করতে পারে না, আর, ওর ভিতর জড়ের পূজো আছে—যেমন জল, সূর্য্য ইত্যাদি।

শ্রীশ্রীঠাকুর। Enlightened আর্য্যরা জড়ের পূজা নিয়ে কখনই বেকুবের মতন ব্যাপৃত ছিলেন না। সূর্য্য, বাতাস, জল ইত্যাদি সেই পরমপুরুষের দান—যা’ প্রতিনিয়তই আমাদের জীবন ও বৃদ্ধিকে invigorate ও accelerate করছে। তাদের উপলক্ষ্য ক’রে সেই almighty-তে কৃতজ্ঞতার সহিত আকৃষ্ট বা মুগ্ধ হতেন। আর, যে-প্রার্থনার কথা পূর্ব্বে বলেছি তা’ congregation-এর মধ্যে সবাই—ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, এমন-কি শূদ্রও—অবলীলাক্রমে করতে পারেন।
(নানা প্রসঙ্গে, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১৫২-১৫৩)

শ্রীরামকৃষ্ণদেবের তিরোধান দিবস স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য

।। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের তিরোধান দিবস স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য।।


অবতার বরিষ্ঠমাত্রেই পূর্বাপূর্ব অবতারদের পরিপূরণকারী হন। তাই তো তিনি ‘‘যেই রাম সেই কৃষ্ণ, এক দেহে রামকৃষ্ণ’’ রূপে এসে আমাদের ভুল ভাঙিয়ে দিলেন। গীর্জায় গিয়ে যীশুর, মসজিদে গিয়ে রসুলের আরাধনা করলেন। পঞ্চমুণ্ডির আসন সাজিয়ে কোনো তান্ত্রিক-গুরু বসালেন তো বসে পড়লেন। তিনি লোকশিক্ষার জন্য বহু ধর্মীয় মতবাদের গুরুদের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুন্ন রেখেই। তিনি দক্ষিণেশ্বরে পূজারী হয়ে এসেও প্রচলিত পূজা-পদ্ধতি অনুসরণ করেন নি। মৃন্ময়ী জগন্মাতাকে প্রাণবন্ত করে দেখালেন এবং কালী মায়ের আদেশক্রমে নিজে খেয়ে মাকে খাওয়ালেন। ফলহারিনী কালী পূজার শুভলগ্নে সারদাদেবীকে আরাধনা করে চিন্ময়ী মাতৃশক্তিকে আদ্যাশক্তি রূপে শ্রদ্ধা করতে শেখালেন।

।। শ্রীরামকৃষ্ণদেব প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।

“ভগবান রামকৃষ্ণদেবেরও শোনা গিয়েছে—তাঁর এমনতর সময় এসেছিল, যখন মূর্ত্তি-টুর্ত্তি তাঁর সাধনার পথে বাধাই সৃষ্টি করতো। তিনি এমন-কি তাঁর ঘরে যে-সমস্ত ছবি-টবি ছিল, সেগুলিকেও সরিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি না-কি এই বলেছিলেন—‘মেয়েরা ততদিন পুতুলখেলা করে, যতদিন তার বে’ না হয়, স্বামী-সহবাস না করে।”

(কথা প্রসঙ্গে ২য় খণ্ড, পৃঃ ৭৬, ১৭-১০-১৩৪২)

।। শ্রীরামকৃষ্ণদেব প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।

“শ্রীরামকৃষ্ণদেব ছিলেন তখনকার সময়ের Living Ideal (জীবন্ত আদর্শ)। এই Ideal (আদর্শ-পুরুষ) যখনই যেখানে এসেছেন, তাঁদের মধ্যে সঙ্গতি আছেই। কারণ, সকলেই এক ঈশ্বরের অবতার। ঈশ্বর তো আর দু’জন নয়। আর, ঈশ্বর এক বলে ধর্ম্মও এক। তাই, শ্রীরামকৃষ্ণ কখনও কারো ধর্মমতের নিন্দা করেন নি।” (দীপরক্ষী ৪/৩০. ১১. ১৯৫৮)

শ্রীরামকৃষ্ণঠাকুর বলেছেন,—‘‘চারাগাছ বেড়া দিয়ে রাখতে হয়। চারাগাছ বলতে আমি বুঝি সদ্গুরু, সৎনাম ও সৎসঙ্গ। মানুষ যদি অল্প বয়স থেকে সদগুরু গ্রহণ করে সৎনামের অনুশীলন নিয়ে সৎসঙ্গে অর্থাৎ জীবনবৃদ্ধিদ ভাল পরিবেশের ভিতর বাস করে, তাহলেই তার জীবন অনায়াসে সুগঠিত হতে পারে। মানুষের জীবন যদি কোন সৎ-এ সুনিবদ্ধ না হয়, তাহলে সে যে নানা আবর্তে পড়ে হাবুডুবু খাবে, সে-বিষয়ে কি আর কোন সংশয় আছে ?’’ (আ. প্র. ৫/১০. ৫. ১৯৪৩)

জন্মাষ্টমীর শ্রদ্ধার্ঘ্য

।। পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের শুভ আবির্ভাব তিথি জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।



শ্রীকৃষ্ণের জন্ম দ্বাপর ২৮শ কৃষ্ণাষ্টমী সিংহমাসে মধ্যরাতে জয়ন্তী শবরীতে বিজয় মুহূর্তে । পিতা বসুদেব মাতা দেবকী । নামকরণ এবং উপনয়ন গর্গাচার্য্যের তত্বাবধানে ।পরাবিদ্যার আচার্য্য ঘোর আঙ্গিরস । অপরাবিদ্যার আচার্য্য সান্দপণী কাশ্য । রুক্মিণী, জাম্ববতী, কালিন্দী, মিত্রবিন্দা, সত্যা, ভদ্রা ,লক্ষণা, এবং সত্যভামা নাম্নী অষ্টমহিষী ।
অসত্‍ নিরোধে তত্‍পর ধর্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা অবতার বরিষ্ঠ পুরুষোত্তমের গীতার আদর্শে আলোকিত হোক বিশ্ব ।
প্রার্থনা জানাই পরমপিতার রাতুল চরণে ।
* * *
“ধর্ম্ম যেখানে বিপাকী বাহনে
ব্যর্থ অর্থে ধায়,
তখনি প্রেরিত আবির্ভূত হন
পাপী পরিত্রাণ পায়।”
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের উপরোক্ত বাণীর সাথে শ্রীকৃষ্ণ প্রদত্ত
“যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লাণির্ভবতি ভারতঃ।
অভ্যুত্থানম্ অধর্মস্য তদাত্মনম্ সৃজাম্যহম্।।
পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশয়চ দুষ্কৃতাম্ ।
ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ।।”
প্রায় সমার্থক বাণীটির যুগোপযোগী সংস্করণ করেছেন বর্তমান পুরুষোত্তম ।
শ্রীকৃষ্ণ যুগ সংস্কারের প্রয়োজনে দুষ্কৃতি বা পাপীদের বিনাশের কথা বলেছেন আর ঠাকুর পাপীদের পরিত্রাণের কথা বলেছেন । এইটুকুই পার্থক্য ।
শ্রীকৃষ্ণ, বৃহত্তর রাষ্ট্রকে অধর্মের গ্যাংগ্রীন থেকে বাঁচাতে ধর্ম নামের মলম লাগিয়ে বিফল হবার পর সুকৌশলে কংস, জরাসন্ধ, শিশুপাল, শাল্ব কৌরবাদির ন্যায় আততায়ীরূপী গ্যাংগ্রীনদের অপারেশন করেছিলেন ।–হিংসাকে হিংসা দ্বারা প্রতিরোধ করে অহিংসার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন! কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বর্ণাশ্রমধর্মভিত্তিক পরমরাষ্ট্রিক সমবায় ।
শ্রীকৃষ্ণের পরবর্তী ঋত্বিক সংঘ সক্রিয় থাকার ফলে জনন বিপর্যয় হয় নি । ফলে তিন হাজার বছর পর্যন্ত বৃহত্তর আর্যাবর্তে আগ্রাসন করতে সাহস পায়নি দুষ্কৃতিরা ! যখন থেকে বর্ণাশ্রম-ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের শিক্ষা ভুলে প্রবৃত্তির অধীনস্থ ক্লীব হয়েছি, তখন থেকে আমরা আগ্রাসনের শিকার হয়েছি । আগ্রাসনের চরম বিপর্যয় ইংরেজ অপশাসন থেকে আর্যাবর্তকে মুক্ত করতেও সম্বল ছিল শ্রীকৃষ্ণের গীতার আদর্শ ! স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম শহীদ ক্ষুদিরাম ‘গীতা’-বর্ণিত ‘‘হতো বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং/জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম্’’-এর অমরত্বের মহান আদর্শে ফাঁসি বরণ করে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মৃত্যুঞ্জয়ী হতে শিখিয়েছিলেন। সেইসব বীরগাঁথা ভুলে আমরা তাঁর ঋণ শোধ করছি,‘ কৃষ্ণ করলেই লীলা, আমরা করলেই বীলা’ গানের ডালি সাজিয়ে! যদিও ওই গান রচনা করার সাহস আমরাই দিয়েছি,–যারা ধর্মের ধ্বজা ধরে প্রবৃত্তিকে পোষণ দিয়ে চলেছি।–পার্থসারথী শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমদ্ভাগবতগীতার আদর্শ ভুলে, হ্লাদিনি শক্তিরূপিনী রাধা-তত্ত্ব ভুলে, মনগড়া প্রবৃত্তি-প্ররোচিত মানবী রাধা, শ্রীকৃষ্ণের মামীর সাথে পরকীয়া কামুক-রূপে, গোপিনীদের বস্ত্রহরনকারী-রূপে শ্রীকৃষ্ণকে চিত্রিত করে!
‘রাই জাগো রাই জাগো বলে শুক-সারি বলে, কত নিদ্রা যাওগো রাধে শ্যাম-নাগরের কোলে। শ্যাম অঙ্গে অঙ্গ দিয়া আছোরে রাই ঘুমাইয়া তোমার কি লোকলজ্জা নাই….’ ইত্যাদি চটুল কথায় প্রভাতী সুর লাগিয়ে বৈষ্ণবীয় শ্রীকৃষ্ণ আরাধনা আর্য্যকৃষ্টি বিরোধী প্রবৃত্তি-প্ররোচিত পরদারাসক্ত ব্যতীত কোন্ আধ্যাত্মিক আবেদনে সমৃদ্ধ ? ওইসব জাগরণী গান শুনে, এবং কবি জয়দেব বিরচিত গীতগোবিন্দের ছত্রে ছত্রে বর্ণিত কামবিলাসী পরকীয়া শ্রীকৃষ্ণের কীর্তিকলাপ পড়ে, যদি কোন তথাকথিত নাস্তিক্যবাদী শ্রীকৃষ্ণের চরিত্র কালিমালিপ্ত করে,– সেই ধর্মবিরোধী, ইষ্টবিরোধী প্রচারের জন্য দায়ী কারা ?
পণ্ডিতদের মতে কংসের দূত হয়ে মহামতি অক্রুর বলরামসহ শ্রীকৃষ্ণকে বৃন্দাবন থেকে মথুরায় নিয়ে যান কংস আয়োজিত ধনুর্যজ্ঞে অংশগ্রহণ করাতে। কংসের উদ্দেশ্য ছিল শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করার। পরিবর্তে শ্রীকৃষ্ণ অত্যাচারী কংস-মামাকে হত্যা করে পিতামহ উগ্রসেনকে রাজ্য প্রত্যর্পণ করেন। তারপর ঘোর আঙ্গিরসের সান্নিধ্যে পরাবিদ্যা এবং সান্দিপনী কাশ্যের সান্নিধ্যে অপরাবিদ্যা লাভ করেন।
পণ্ডিতদের এই সাক্ষ্য থেকে প্রমাণিত শ্রীকৃষ্ণ ১১ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে কংসকে বধ করেন। অথচ বেশীরভাগ কৃষ্ণভক্তগণ বৃন্দাবন লীলার, রাসলীলার নামে কিশোর শ্রীকৃষ্ণকে মানবী রাধার সাথে যুগলবন্দী করে শ্রীকৃষ্ণকে পরকীয়া কামুক রূপে চিত্রিত করে চলেছেন।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতে, রাসলীলা ভগবানের সাথে ভক্তের কেন্দ্রায়িত ছন্দায়িত নিত্যলীলার প্রদর্শণী। এই কেন্দ্রায়িত চলন একটা এ্যাটমের মধ্যেও আছে—রাসলীলা যেন এ্যাটমের মধ্যেকার নিত্য-গতিশীলতার ও সুকেন্দ্রিক অনুচলনের প্রতীক। রাস মানে ধ্বনি, ধ্বনিতে বিহার করেন যিনি, তিনি রাসবিহারী। শব্দযোগেই তাঁর অবস্থান।
শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর লীলাসঙ্গী অশ্বিনীদাকে বলেছিলেন, ‘‘ভাগবতের একটা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা লিখতে পারেন ? লোকে প্রকৃত ভাবটা হারিয়ে ফেলে কেবল লীলা বা রূপকের দিকটা নিয়ে আছে । মুখে বলে নিত্য বৃন্দাবন, নিত্য লীলা, নিত্য রাস হচ্ছে, কিন্তু তার ভেদ জানে কয় জন? আর, যেটাকে সাধারণতঃ নিত্য বলে, সেটাকেও রূপকথার একটা ছাযার মত কল্পনা ক’রে রেখেছে। কথার ব্যুৎপত্তিগত অর্থের দিকে দৃষ্টি করলেও অনেকটা বোঝা যায়। যেমন রাস মানে ধ্বনি, রাস-বিহারী অর্থাৎ রাসে,ধ্বনিতে বিহার করেন যিনি। Creation (সৃষ্টি)-এর sound-theory (নাদ-সিদ্ধান্ত), শব্দ-ব্রহ্ম এসে পড়েছে নাকি? রাধ্-ধাতু অর্থে নিষ্পন্ন করা বুঝায়। রাধা অর্থাৎ যিনি সব নিষ্পন্ন করেন, সেই শক্তি। তিনি আবার ব্রজেশ্বরী, ব্রজ-ধাতু অর্থে গমন করা—গতিশীলা। ব্রজেশ্বরী রাধা অর্থে সর্ব্বশ্রেষ্ঠা গতিশীলা নিষ্পন্নকারিণী শক্তি, অর্থাৎ আদি শব্দ-ধারা sound-current. চৈতন্য ধারা বা spirit-current. শ্রীকৃষ্ণ নিত্যলীলা করছেন, গোপীরা সেই আকর্ষণরাজের রাসে—ধ্বনিতে আকৃষ্ট হ’য়ে তাঁর দিকে ছুটছে,—জীবজগৎ তাঁর দিকেই যাচ্ছে। একটু hint (আভাস) দেওয়া রইল; ভাগবতাদি দেখে চেষ্টা করলে মাথা খুলে যেতে পারে, আর বোধহয় লিখতেও পারেন।’’ (অমিয়বাণী ২৯শে অগ্রহায়ণ, রবিবার, ১৩২৪) শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র শ্রীকৃষ্ণ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘শ্রীকৃষ্ণ সব সময়েই চেষ্টা করেছেন যুদ্ধবিগ্রহ avoid (পরিহার) করতে, কিন্তু তাঁর environment (পরিবেশ) তাঁকে সে scope (সুযোগ) দিল না। আর শ্রীকৃষ্ণের যুদ্ধ---মৃত্যুকে মারবার জন্য। Gangrene-affected part of the body (শরীরের দুষ্টক্ষতযুক্ত স্থান) আমরা যেমন কেটে ফেলি জীবন বাঁচাবার জন্য, তিনিও তেমনি মৃত্যু ও মারণের মূর্ত্ত প্রতীকস্বরূপ যারা ছিল তাদের মেরেছিলেন সমগ্র সমাজকে বাঁচাবার জন্য। (আ. প্র. খণ্ড ১, ৪. ১২. ১৯৪১) ,,,,,,শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে বুঝিয়ে দিলেন যে devil (শয়তান) যদি রাজত্ব করে, তবে অর্জ্জুনের ঈপ্সিত ধর্ম্ম, জাতি, কুল, মান কিছুই রক্ষা পাবে না। তাই devil (শয়তান)-কে demolish (ধ্বংস) করা লোকমঙ্গলের জন্যই অপরিহার্য্য। এর মধ্যে দ্বেষ-হিংসার বালাই নেই। বরং অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধকে এড়িয়ে চলার বুদ্ধির পিছনে আছে দুর্ব্বলতা।’’ (আ. প্র. খণ্ড ৬, ৬. ১২. ১৯৪৫)

এ-যুগের শ্রীকৃষ্ণ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বিকৃতচারী-পাপীদের পরিত্রাণ উদ্দেশ্যে বললেন–
“ভগবান, ইষ্ট বা ধর্ম্মের মৌখিক স্তুতির ভিতর-দিয়ে যা’রা ধর্ম্মবিরোধী কাজ করে, তা’রা হ’ল সব চাইতে বড় শয়তানের দূত–প্রকৃষ্ট লোক-দূষক । ১২৫ ।
(শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭)
পরিশেষে, সকলের কাছে নিবেদন, বর্তমানের এই দুঃসময়ে যে গুরুদেবের সাধনা করুন, সেই সাধনার মাধ্যমে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা গ্রন্থের অবতার তত্ত্বের বাণী অনুধাবন করে সন্ধান করতে হবে শ্রীকৃষ্ণের নব-কলেবরকে, এবং তাঁর নিদেশবাণী মেনে চলতে পারলে প্রকৃত ধর্ম পথে চলা যাবে, পৌঁছনো যাবে ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যে। জয়গুরু! প্রণাম। সবাইকে।

৭৯তম স্বাধীনতা দিবসের শ্রদ্ধাঞ্জলি

।। ভারতবর্ষের ৭৯তম স্বাধীনতা দিবসের ভাবনা ।।
^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^
একদিকে সমুদ্র, আর একদিকে হিমালয় পর্বতমালা দ্বারা বেষ্টিত, গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, দৃষদ্বতীর পূত-পবিত্র বারিধারায় বিধৌত ভূখণ্ড বৃহত্তর আর্যাবর্তের পবিত্র আশ্রম-ধর্মানুগ অনুশাসিত ভারতবর্ষ নামক জনপদ তাঁর স্বকীয় সত্তার স্বাধীনতা কেন শক-হুন-পাঠান-মোগল-ইংরেজ প্রমুখ নামের আগ্রাসীদের দ্বারা বিপন্ন হয়েছিল, তা’ নিয়ে অনেকানেক মতবাদ থাকলেও শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতে ঋষির অনুশাসন অনুশীলন বাদ দিয়ে অমূর্ত আদর্শকে অসীম জ্ঞানে উপাসনা করার কারণে আমরা আমাদের সত্তাকে বিসর্জন দিয়েছি।
অবশেষে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের রক্তক্ষয়ী আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আমরা ফিরে পাই খণ্ডিত স্বাধীনতা ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই আগস্ট, আনুষ্ঠানিকভাবে। অনেক ওঠাপড়া টানাপোড়েন সাথে নিয়ে ৭৮টি বছর পাড়ি দিয়ে ৭৯তম বছরে পদার্পণ করল আমাদের গণ প্রজাতন্ত্রী ভারত রাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস। সেই সূত্রে গণপ্রজাতন্ত্রী আধুনিক ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ধর্মকে রক্ষা করে চলার কর্তব্যকে। রাষ্ট্রীয় মন্ত্র 'সত্যমেব জয়তে' স্মরণ করিয়ে দেয় উপনিষদীয় আচার্য অনুসরণের শাশ্বত অবলম্বনকে স্মরণ করিয়ে দেয় "আত্মবৎ সর্বভূতেষু মাতৃবৎ পরদারেষু, লোষ্ট্রবৎ পরদ্রব্যেষু....."-এর আদর্শের কথা। রাষ্ট্রের কর্ণধার রাষ্ট্রপতিসহ মন্ত্রীবর্গ প্রত্যেকেই ঈশ্বরের নামে শপথ গ্রহণ করে ঈশ্বরসৃষ্ট জীবগণের কল্যাণ সাধনে ব্রতী হয়। ঈশ্বরের প্রতিভূস্বরূপ জাগতিক ন্যায়দণ্ডধারী বিচারকেরা ধর্মাধিকরণ নামে চিহ্নিত। বিচারালয়কে বলা হয় ধর্মস্থান। তথাপি স্বাধীনতা দিবসের দিনেও প্রাণী-হত্যার ছাড়পত্র কেন নিরীহ প্রাণীগুলোর সুস্থভাবে বেঁচে থাকার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষ !---এ প্রশ্নের জবাব দেবে কে?

স্বাধীনতা মানে সু-এর অধীনতা, সত্তার অধীনতা। স্বাধীন যে, সে কখনোই স্বেচ্ছাচারী হয়ে কোন সত্তাবিধ্বংসী অসৎ কাজ তো করবেই না বরং সে অসৎ নিরোধে তৎপর হবে। মানুষ যখন প্রবৃত্তির অধীনতা থেকে মুক্তি পেতে পরমপিতাকে আশ্রয় করে বিবেককে অবলম্বন করে চলতে শেখে তখনই সে প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করে। তখন সে অন্যায়, অধর্ম, দুর্নীতি, ভ্রষ্টাচারকে আশ্রয় করে “সত্যমেব জয়তে”র সীলমোহরের দখল নিতে চাইবে না, উৎকোচ নিয়ে ন্যায়কে অন্যায়, অন্যায়কে ন্যায় বানাবার জন্য “সত্যমেব জয়তে”র সীলমোহরের ব্যবহার করবে না। অসৎ বলে ওগুলোকে ঘৃণা করবে। মেয়েদের মাতৃভাবে দেখবে। কামনার বস্তু রূপে নয়। নারীরা নির্যাতনের শিকার হবে না। কি ঘরে কি বাইরে, কোন অসতের সাথে অন্যায়ের সাথে আপোষ করবে না।

ভারতীয় অনুশাসনের সাম, দান, ন্যায়, দণ্ড, নীতি ও ভেদ-এর রাজধর্ম রক্ষার পবিত্র কর্তব্যে যাতে এতটুকু অন্যায়, অধর্ম প্রবেশ করতে না পারে তার জন্যই ওইসব মহাভারতীয় নীতির অনুসরণ। বিধিবৎ প্রকৃষ্ট-জাতক সৃষ্টি করে প্রজা পালনের স্বার্থেই ওই অনুশাসনকে আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি। তথাপি যখন ভারতীয় শাসন সংহিতা বা সংবিধান ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ না করে, ধর্ম এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়কে এক করে ফেলে ‘ধর্ম-নিরপেক্ষতাবাদ’ –অর্থাৎ রাষ্ট্র ধর্মের অনুবর্তী নয়’-এর মতবাদকে প্রতিষ্ঠা দেয়, তখন কি মনে হয় না, আমরা জাতীয়তাবাদের আদর্শের প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েও এক পরস্পর বিরোধী আচরণ করে চলেছি।

বর্তমান যুগ-পুরুষোত্তম কথিত ধর্মের যুগান্তকারী সংজ্ঞা ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম বলে জানিস তাকে। ধর্মে সবাই বাঁচে বাড়ে/ সম্প্রদায়টা ধর্ম না-রে। সমন্বয় বার্তাবহ বাণীকে গুরুত্ব না দিয়ে ধর্মের নামে ভারতীয় সংহিতার নীতি বহির্ভূত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তি পরায়ণতার আস্ফালনকে, কতগুলো অনিত্য, অসার, পৌত্তলিক কু-সংস্কারকে যদি ‘ধর্ম’ নামে প্রতিষ্ঠা দিতে চাই, তা’ কি বিচক্ষণতার পরিচায়ক হবে, না ভারতবর্ষের কৃষ্টির পরিপুরক হবে? ওই ভুলের বোঝা কি আমাদের চিরদিন বইতে হবে? আমাদের বুদ্ধি বোধ কি নিরেটই থেকে যাবে?

যে নীতি-বিধি পদার্থের অস্তিত্ব রক্ষার সহায়ক তাই তো ধর্ম। পদার্থের স্বকীয়তা ধারণ করে রাখার সহায়ক যা’ তাই ধর্ম। ধর্ম পালন করলেই পদার্থ টিঁকে থাকবে, নচেৎ থাকবে না। সংসদ প্রকাশিত ইংরেজী অভিধানে ধর্মের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘It is an action, one is bound to do.’ সেই ধর্মের আবার পক্ষ আর নিরপেক্ষ কি? বেঁচে থাকার অজৈব উপকরণ বায়ু জল মাটি ইত্যাদির যদি
ধর্ম থাকতে পারে এবং তা যদি বিজ্ঞানের বইতে পাঠ্য হতে পারে, তাহলে মানুষের অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার নীতিবিধি-সমন্বিত ভারতের নিজস্ব সংহিতাগুলোর বিধানসমূহ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের সংহিতায় স্থান পাবে না কেন, প্রজাদের শিক্ষা দিতে পাঠ্য করা হবে না কেন? রাষ্ট্রের সৃষ্টিই তো প্রজাদের অধর্ম বা দুর্নীতি থেকে মুক্ত করে ধার্মিক, অর্থাৎ সু-নীতি পরায়ণ করে তোলার জন্য। সেই রাষ্ট্র যদি তার প্রজাবর্গকে, তাদের পিতৃ-পিতামহের আদর্শ অনুসারী ধর্ম-পরায়ণ, কৃষ্টি-পরায়ণ হতে উৎসাহ না দিয়ে, প্রবৃত্তি পরায়ণতায় উৎসাহ দেয়, সেটা ভারতবর্ষের জাতীয় উত্তরাধিকারত্বের অস্তিত্বকে বিপন্ন করার বার্তা ভিন্ন আর কিছু নয়। আর্য্য ভারতবর্ষের আদি সংবিধান ব্রহ্মসূত্র'-এর নবীন সংস্করণ 'কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র'

অনুযায়ী— “সুখস্য মূলম্ ধৰ্ম্মম্ / ধৰ্ম্মস্য মূলম্ অর্থম্ / অর্থস্য মূলম্ রাষ্ট্রম্ / রাষ্ট্রস্য মূলম্ ইন্দ্রিয় বিজয়ম্ / ইন্দ্রিয় বিজয়স্য মূলম্ জ্ঞানবৃদ্ধ সেবয়া / জ্ঞানবৃদ্ধ সেবয়া বিজ্ঞানম্।”
—অর্থাৎ সুখী হতে হলে ধর্ম পালন করতে হবে। প্রকৃত ধার্মিক হতে হলে পুরুষার্থের চতুর্বর্গ সমন্বিত আশ্রমধর্ম পালন করতে হবে। নির্বিঘ্নে আশ্রমধর্ম পালন করার জন্য রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী প্রজাদের দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী হবার জন্য গুরু গ্রহণ করতে হবে। গুরুর আদেশ-নির্দেশ পালন করলে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করা যাবে। জীবনের অনুসঙ্গ ত্রিতাপ-জ্বালা প্রতিহত করে জীবনে সুখী হওয়া যাবে। সত্তার অধীন হয়ে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হওয়া যাবে।
———

কমন সেন্স

** ইষ্টভৃতি মানে ইষ্ট নীতির ভরণ।
ইষ্ট ভরণ পিতৃপোষণ
পরিস্থিতির উন্নয়ন
এই না করে
যাই না করিস
অধঃপাতেই তোর চলন। **
**********************
কমন সেন্স
নিবেদনে — তপন দাস
**********************
পরম কারুণিক ঈশ্বর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষকে সবকিছু দিয়ে পূর্ণরূপে তৈরি করেছেন, স্বাধিকার দিয়েছেন। যা দিয়ে মানুষ ইচ্ছে করলে মরতে পারে, মারতে পারে, আবার বাঁচতে পারে, বাঁচাতেও পারে। আমরা কোন কারণে যদি একটু ভুল করে বসি, সাথে সাথে আমাদের অভিভাবকেরা, প্রিয়জনেরা, বন্ধুবান্ধবেরা উপদেশ দিয়ে বলতে সুরু করে দেবেন, তুমি একটু কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করতে পারলে না! অবশ্য যারা এই কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করতে বলেন, তারাও অ্যাপ্লাই করতে গিয়ে কেন জানি বেসামাল হয়ে পড়েন। নইলে সুস্থভাবে বাঁচার জন্য, আহার, নিদ্রা,  অপত্যোৎপাদনের জৈবধর্ম পালন করতে এত কেরামতি করতে হয়। আমরা যদি জৈবিক তাগিদগুলোকে ওই কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম তাহলে তো স্বর্গে অর্থাৎ সুখে বাস করতে পারতাম। এত দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করতে হতো না।  যেমন, বাঁচতে হলে খেতে হয়, সেই খাওয়াটা যদি সত্তাপোষণী না হয়ে প্রবৃত্তিপোষণী হয় তাহলে অসুখ হবেই। সাধারণভাবে সিদ্ধ ভাত খেয়েও তৃপ্তির ঢেকুর তোলা যায়, আবার পাঁচতারা হোটেলের দামী খাবার খেয়ে অতৃপ্তির ঢেকুর তুলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। এ বিষয়ে ঠাকুর বেশ সাবধানী ছিলেন। আশ্রম পত্তনের প্রথম যুগে, বিদ্বজ্জন ভদ্রলোকদের মানদণ্ডে যা খুবই সাধারণ মানের খাবার—নাম লাবসি, সেই লাবসি একবেলা করে খেয়ে দিনে-রাতে প্রায় আঠার ঘণ্টা পরিশ্রমের কাজ করতেন। ওই নিয়ম মেনে প্রায় আঠার বছর পর্যন্ত  আশ্রমিকদের রোগ-ভোগ-অকালমৃত্যু হয়নি। সেই সময় জনশ্রুতি ছিল, “অনুকূল ঠাকুরের আশ্রমে রোগব্যাধি ঢুকতে ভয় পায়।’’ পরবর্তীকালে ভিটামিন, প্রোটিন ইত্যাদি খাদ্যগুণের দোঁহাই দিয়ে কিছু কর্তা-ব্যক্তিরা ঠাকুরের বিধিকে অমান্য করে আনন্দবাজারে জিভের স্বাদের খাবার পরিবেশন করার ব্যবস্থা করলে আশ্রমিকদের অসুখ-বিসুখ হতে সুরু করে।  
  তাই খাওয়ার ব্যাপারে আমরা যদি ঠাকুরের দেওয়া ‘‘পেটের জন্য জীবন নয়কো,/জীবনের জন্য পেট/তাই জীবন—/পেটকে জীবন্ত করে রাখ।’’ বাণীর  কমন সেন্সটাকে অ্যাপ্লাই করে সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার গ্রহণে অভ্যস্ত হতে  পারি তাহলে আমাদের অভাবও ঘুচে যাবে, অসুখ-বিসুখ থেকেও বেঁচে যাব।

।। অধিক ভোজন প্রসঙ্গে  শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতবাদ ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর—যা’ প্রয়োজন তার চাইতে বেশী খেলেই তো তার চাপ আমাদের Stomach, Nerves, Heart (পেট, স্নায়ু, হৃদয়) ইত্যাদিকে বইতে হবে। কিন্তু আপনি-আমি তো Sperm ও ova–র product (শুক্র ও ডিম্বের ফল)—একটা limited energy (সীমিত শক্তি) নিয়ে জন্মেছি, আর তাই নিয়ে চলেছি। এই life-potency (জীবনীশক্তি)-কেই বলে আয়ু, এই আয়ু যদি অযথা অপব্যয় করি—এ তো ফুরোবেই, শরীর দুর্বল হবেই—তা’ হয়তো বহু পরে টের পাওয়া যায়। পঞ্চাশ বছর বয়সে শরীরের উপর অত্যাচার করা সত্ত্বেও হয়তো আপনার ক্ষতি করে না, ষাট বছর বয়সে আপনি হয়তো দেখবেন আশি বছরে আপনার শরীর যতখানি অপটু ও জীর্ণ হতো, তাই হয়ে গেছে। অনিয়মের effect (ফল) তো আছে। (আলোচনা প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড, ৫ই ভাদ্র, বুধবার, ১৩৪৭, ইং ২১।৮।১৯৪০)

।।  আমিষ-আহারের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক রুচি প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বিধান ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর—ওটাকে বিকৃত রুচিও বলা যায়। একটা মানুষকে হত্যা করলে সে যেমন ব্যথা বোধ করে, একটা জীবকে হত্যা করলে সেও তেমনি করে। জিহ্বার একটু সুখের জন্য আমার মত রক্ত-মাংস-বিশিষ্ট একটা প্রাণীকে মেরে ফেলতে দ্বিধা বোধ করব না, এ কেমন কথা? আমার মনে হয়, প্রত্যেকটি জীবই যেন এক-একটি স্বল্প মানুষ। নরহত্যার কথায় আঁতকে উঠি আর জীব হত্যার বেলায় গায়ে বাধে না, আমাদের বোধবৃত্তি যদি এমনতর প্রবৃত্তি-আবিল, স্থূল, হৃদয়হীন ও সহানুভূতিহীন হয়, তবে প্রবৃত্তি-স্বার্থের খাতিরে প্রয়োজন হ’লে মানুষের উপর আক্রমণ চালাতেও আমাদের আটকাবে না। তাই বলি—না খেলেই হ’লো। ‘Let them enjoy their little day’ (তাদের স্বল্প জীবন তারা ভোগ করুক)। তাদের সুখ-দুঃখ আছে, তারাও ভাল চায়, তাদেরও মন আছে, তাদের কেন কষ্ট দেবে? শুনেছি দুম্বার পাছার দিকে মেদবৃদ্ধি হয়। সেই মাংস কেটে নিলে সে বেশ আরাম পায়। ওতে তার কোন ক্ষতি হয় না। ঐ মাংস খেলে প্রাণী হত্যা হয় না বটে, কিন্তু আমিষ-আহারের কুফল যা’ তা’ ফলতে কসুর করে না। আমি যা’ জানি নিরামিষ আহার শরীর, মন সব দিক-দিয়েই শ্রেয়।  (আঃ প্রঃ ৮ম খণ্ড, ৫.৬.১৯৪৬)

“সদাচারী নয়কো যে জন
ইষ্ট বিহীন রয়,
তাহার হাতে পান ও ভোজন
বিষ বহনই হয় ।”

জীবনকে অমৃতের স্নাতক রূপে গড়ে তুলতে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কথিত অমৃতনিষ্যন্দি স্বরূপ উপরোক্ত বাণীটি মেনে চলা আমাদের একান্ত কর্তব্য । বাণীটির মর্মার্থ হলো এই যে, অসদাচারী লোকের দেওয়া অন্ন এবং পানীয় বিষতুল্য । অতএব গ্রহণ করা যাবে না । শাস্ত্র নির্দেশ মেনে শ্রীশ্রীঠাকুর অভক্ষ্য ভোজী, অগম্যা গামী এবং বহনৈষ্ঠিক যারা (পঞ্চবর্হি এবং সপ্তার্চ্চি অনুসরণ করে চলে না ।) তাদের অসদাচারী বলেছেন । মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুন, মাদকসেবী এবং বর্ণধর্ম অপলাপী, অসত্‍ উপায়ী প্রদত্ত ভোজ্য অভক্ষ্য, অর্থাত্‍ খাওয়া যাবে না ।
ঋতুমতী, মৈথুনে অনিচ্ছুক, শারিরীক এবং মানসিকভাবে অপরিচ্ছন্ন, অপ্রিয় বাদিনী, উচ্চ বয়সের, উচ্চ বর্ণের, উচ্চ বংশের, রোগগ্রস্তা, হীনাঙ্গী, গর্ভিনী, বিদ্বেষী, ঈর্ষা পরায়ণ, হিংসা পরায়ণা স্ত্রীদের অগম্যা বলা হয়েছে ।
খাওয়ার পর ঘুম আর একটা জৈবিক তাগিদ। সেই ঘুম যদি প্রবৃত্তির কবলে পড়ে আমাদের চেতনা কেড়ে নেয় তাহলেও বিপদের সম্ভাবনা।  পুণ্য-পুঁথি গ্রন্থে ঠাকুর যা’কে মরণের সমতুল বলেছেন। আর তাছাড়া স্বতঃ-অনুজ্ঞার প্রতিজ্ঞা ‘চিরচেতন’ পালন না করার জন্য দ্বন্দ্বীবৃত্তিও হয়। ঘুমের বিষয়ে ঠাকুরের স্পষ্ট নিদেশ, ‘‘ঘুমিও তুমি ততটুকুই/অবসাদ না আসে/চেতন থাকাই বর বিধাতার/জড়ত্ব যায় নাশে।’’
শুচিবস্ত্রে পবিত্র বিছানায় শোবার আয়োজন করতে হয়। বিছানায় গা এলিয়ে দেবার পূর্বে নামধ্যানের মাধ্যমে সারাদিনের কাজকর্মের আত্মবিশ্লেষণ করতে হয়। ‘আমি একজন সৎসঙ্গী। দীক্ষা গ্রহণের সাথে সাথে ঘটে-ঘটে ইষ্টস্ফূরণের দায়িত্ব নিয়েছি। আমি কারো সাথে কথার খেলাপ করিনি তো? কোন কপটতার আশ্রয় নিইনি তো?  ঠাকুরের বলা অনুযায়ী অর্থ, মান, যশের আশা ছেড়ে সব্বাইকে ‘ভগবান জ্ঞানে ভালবেসে’  ঠাকুরত্ব প্রাপ্তির গন্তব্যের লক্ষ্যে ঠিক ঠিক চলতে পারছি তো?  আমার দ্বারা সৎ-এ, ইষ্টনীতির সান্নিধ্যে নিরবচ্ছিন্ন সংযুক্ত থাকাটা কতখানি ব্যাহত হলো ? কেন ব্যাহত হলো? ইষ্টভরণ এবং পিতৃপোষণের জন্য সদাচার এবং বর্ণাশ্রম অনুযায়ী চলে, কাউকে পীড়িত না করে, নিজে পীড়িত না হয়ে বর্ণানুগ কর্মের সেবার বিনিময়ে দিন গুজরানী আয় ঠিক ঠিক করতে পারছি তো?  ‘সপ্তার্চ্চি’ এবং ‘পঞ্চবর্হির’ ১২টি নীতি ঠিক ঠিক পালন করতে চেষ্টা করছি তো? আমার আকাঙ্খানদীর স্রোতের ধারার কামিনী-কাঞ্চনের আসক্তি ইষ্ট প্রতিষ্ঠার অনুকূলে সত্তাপোষণী করতে পারছি তো? সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে অন্তরায় যা কিছু  নিয়ন্ত্রণ, সামঞ্জস্য, সমাধান তৎপর থেকে বিরোধহীন দুর্বার নিরোধ করার চেষ্টায় যত্নবান ছিলাম তো? আমার বাক্, ব্যবহার, কর্ম কারো অপ্রীতির কারণ হয়নি তো?’—ইত্যাদি ইত্যাদি ইষ্টপ্রতিষ্ঠামূলক ভাবনাগুলোকে স্মরণ-মনন করতে করতে আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে সারাদিনের কর্মটাকে অন্তর্দেবতা পরমপিতার কাছে জবাবদিহি করে আপডেট করে শুতে পারলে কর্মের বন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হয়।  অজপা নামের নেশাটাকে বাঁচিয়ে রাখতে ঘুমের মধ্যেও নাম জপ করার অভ্যাস করে ফেলতে পারলে স্বতঃ-অনুজ্ঞার  ‘চিরচেতন’ অনুজ্ঞা পালন করা সহজ হয়ে যাবে। আমরা নিদ্রাজয়ী হতে পারব। প্রত্যুষে ‘ঊষার রাগে’ শয্যা ত্যাগ করে শুরু করতে হবে মন্ত্র সাধন, জাগতিক-আধ্যাত্মিক মেলবন্ধনটাকে ঠিক রাখতে। দিনচর্যার কাজকর্মগুলোকে নিখুঁত করার জন্য শ্রীশ্রীঠাকুরেরর এ এক অমোঘ অবদান।  
    
আর এক জৈবিক তাগিদের নাম যৌনজীবন। ওই যৌন জীবনের সিড়ি বেয়ে  একজন পুরুষ  আদর্শ পিতা এবং  একজন নারী আদর্শ মাতার পরিচয় বহন করে সুখ্যাত হতে পারে, আবার কুখ্যাতও হতে পারে । অথচ ওই সিড়ি-চড়ার বিষয়ে আমরা সবচাইতে বেশী উদাসীন। ভাল বাবা হবার জন্য আদর্শ চরিত্র গঠনের দিকে গুরুত্ব না দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করার জন্য যেনতেনপ্রকারেণ টাকা রোজগার করার দিকেই আমাদের ঝোঁক বেশি। টাকার খনির সন্ধান পেয়েও নানারকম অশান্তি, দুঃখ, মনস্তাপ, অবসাদে ভুগতে হয়। থানা, পুলিশ, উকিল, ডাক্তার, রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারস্থ হতে হয়।  আমরা যদি একটু বিচার করে দেখি তাহলে দেখা যাবে, সন্তানের শিক্ষার জন্য টাকা দিয়ে বই কেনা যায়, নামী স্কুলে ভর্তি করানো যায়, অনেক টিউটর রাখা যায় কিন্তু মেধা কেনা যায় না, বিদ্যা কেনা যায় না। মেধা এবং বিদ্যা পিতৃ-মাতৃদত্ত উপহার, যা জন্মগত সংস্কারে নিহিত থাকে। মেধা এবং বিদ্যা, মা, বাবার কাছ থেকে নিয়ে যেমন যেমন মেপে দেন তাই সন্তানে মূর্ত হয়। টাকা দিয়ে গৃহ নির্মাণ করা যায় কিন্তু উপযুক্ত গৃহিনী না হলে গৃহসুখ পাওয়া যায় না। টাকা দিয়ে ওষুধ কেনা যায়, স্বাস্থ্য কেনা যায় না, স্বাস্থ্য যদি কেনাই যেত তাহলে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া থ্যালাসেমিয়াদি  রোগগুলো থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া যেত। স্বাস্থ্য পিতামাতার অবদান, জন্মগত সমৃদ্ধির বিষয়। এবার একটু হিসেব করে দেখুনতো, টাকা উপার্জনের দিকে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ বিষয়ক গুরু প্রদত্ত বিদ্যাকে উপার্জন করে মনুষ্যত্ব নির্মাণের দিকে গুরুত্ব দিলে অতি সহজেই সুখের জীবন লাভ করা যায় না কি?     

এ বিষয়ে শরৎদা (হালদার) শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে জানতে চেয়ে প্রশ্ন করেছিলেন—Heredity (বংশগতি) ও environment (পারিপার্শ্বিক)-এর মধ্যে কোনটি prominent (প্রধান)?
শ্রীশ্রীঠাকুর—মানুষ heredity (বংশগতি) থেকে পায় instinct (সহজাত-সংস্কার), environment (পারিপার্শ্বিক) দেয় তাকে nurture (পোষণ)। ছেলে জন্মাতে যেমন বাপ-মা দুই-ই লাগে, মানুষের জীবনে তেমনি heredity (বংশগতি),  environment (পারিপার্শ্বিক) দুটো factor (জিনিস)-ই লাগে। পরিবেশের মধ্যে অনেক কিছুই থাকে, কিন্তু মানুষ সাধারণতঃ তার instinct (সহজাত-সংস্কার) অনুযায়ীই Pick up (গ্রহণ) করে। প্রত্যেকের specific instinct (বিশিষ্ট সংস্কার) পোষণ পায় যা’তে তেমনতর পারিবেশিক বিন্যাস যত হয় ততই ভাল।
(আলোচনা প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড, ৩।১২।১৯৪১)

ওই instinct (সহজাত-সংস্কার) ও environment (পারিপার্শ্বিক)-এর উপর ভিত্তি করেই সভ্যতার প্রাতঃ স্মরণীয় মনীষীবৃন্দের জনক-জননীরা সকলের কাছেই নন্দিত । আবার ভ্রষ্টাচারীর, সন্ত্রাসবাদীর, ধর্ষকের পিতামাতারা সমাজের চোখে নিন্দিত ।
শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই নয়, মনুষ্যেতর প্রাণীদের ক্ষেত্রেও ওই বিধি প্রযোজ্য। সরকারী পুলিশ বা মিলিটারীদের প্রয়োজনে একটা কুকুর, একটা ঘোড়া কিনতে গেলেও ওই instinct (সহজাত-সংস্কার) ও environment (পারিপার্শ্বিক)-এর  কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে পেডিগ্রি অর্থাৎ বাবা-মায়ের বিশুদ্ধ বংশানুক্রমিকতার শংসাপত্রের সমৃদ্ধির গুরুত্ব বিচার করে কেনে । সেক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া জাতির নামে সংরক্ষণের উদারতা দেখিয়ে বংশমর্যাদাহীন  কুকুর, ঘোড়া কেনে না । শুধু তাই নয়, একটা ভালো গোরুর বাচ্চা তৈরির জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করে বিদেশ থেকে উন্নত জাতের ষাঁড়ের শুক্রাণু কিনে সুপ্রজনন করার ব্যবস্থা করে সরকার,  রাস্তায় ঘোরা ষাঁড়গুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে !
কৃষিক্ষেত্রেও তাই । উন্নত ফসলের জন্য ভালো জাতের সংরক্ষিত বীজ শোধন করে, বীজ অনুযায়ী উপযুক্ত উর্বর জমিতে ‘জো’ (fertile enrichment of soil quality.) বুঝে বপন করতে পরামর্শ দেওয়া হয় । একজন আদর্শ কৃষক কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে বাস্তব পরিচর্যার মাধ্যমে বিশুদ্ধ বীজ, বিশুদ্ধ জমিতে বিনিয়োগ করে উন্নত জাতের ফসল পাবার জন্য ।  টবে একটা ফুল গাছ লাগাতে গেলেও আমরা বীজ অনুযায়ী মাটির সাথে মেলবন্ধন করে বপন করি।

প্রাণী সম্পদ, কৃষি সম্পদ বিকাশের ক্ষেত্রে জৈবিক সম্পদের বিহিত বিনিয়োগ করে বুদ্ধিমান মানুষেরাই । অথচ এই বুদ্ধিমান মানুষেরাই ওই জৈবী সম্পদকে অপচয়ীভাবে বিনিয়োগ করে নিজেদের কমন সেন্সকে অপমান করছে ।
আমরা অনেক সময় কামুক পুরুষদের ‘কুকুরের চাইতেও অধম’ বলে গাল দিয়ে অযথা কুকুরদের অপমান করে বসি। কারণ, কুকুরেরা প্রজনন ঋতু ভিন্ন অন্ন সময় নারী-পুরুষেরা একত্রে সহবাস করা সত্বেও যৌন-মিলনে প্রবৃত্ত হয় না। এ বিষয়ে কুকুরেরা মানুষদের তুলনায় অনেক সংযমী। শুধু কুকুর নয়, মনুষ্যেতর  কোন মেরুদণ্ড প্রাণীই বংশ বিস্তার ব্যতীত যৌন মিলনে প্রবৃত্ত হয় না। আর আমরা বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষেরা কি করছি, কতটুকু কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে জৈবিক তাগিদকে সফল বিনিয়োগ করছি, মনের ভল্ট থেকে সেই হিসেবের খাতা বের করে যার যার নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করলেই উত্তরটা পেয়ে যাব।   
  মহান ভারতের মহান চরিত্র দুর্গা, লক্ষী, সরস্বতী, সীতা, সাবিত্রী প্রমুখ নারীদের আদর্শ ভুলে প্রকৃতি প্রদত্ত জৈবী সম্পদকে যৌবন গরবে গরবিনী প্রবৃত্তিতাড়িত একজন নারী,–নিজের নারীত্বকে দর্শকামে, স্পর্শকামে, শ্রুতকামে, পণ্য করে পুরুষের সুপ্ত কামনাকে জাগিয়ে লাম্পট্য, ব্যভিচারকে পুষ্ট করতে পারে, প্রভূত অনিত্য সম্পদের মালকিন হতে পারে, কিন্তু ভালো মা হয়ে নিত্য-জীবনে আদর্শ নারীর খেতাব অর্জন করতে পারবে না। উনো জমিতেই দুনো ফসল ফলে, বুনো জমিতে নয় । পুরুষের ক্ষেত্রেও তাই । পুর্ব পুরুষের জীবনধারা প্রবাহিত বীর্য্যকে ব্যভিচার, ধর্ষণ, স্বমেহন আর কন্ডোমে অপবিনিয়োগ করে ধর্মবিরুদ্ধ কামসেবার ইন্দ্রিয়-লালসায় বিনিয়োগ করে দুষ্ট প্রবৃত্তিকে তুষ্ট করতে গি়য়ে   যৌনব্যাধি, মানসিক কষ্ট, বিবেক-দংশন, সামাজিক ছি! ছি! লাভ করতে পারবে, ভালো বাবার গৌরব অর্জন করতে পারবে না। বীজ শুদ্ধ না হলে ফসলও অশুদ্ধ হবে ।
আমাদের কাম-প্রবৃত্তি নামক জৈবিক তাগিদকে নিয়ন্ত্রণ করতে বৃত্ত্যাধীশ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র নারী-সাধারণকে মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েই ক্ষান্ত হন নি,  নিজের স্ত্রীকেও  চিন্ময়ী মা জ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শেখালেন । কারণ, স্ত্রীর মাধ্যমে স্বামী নিজেকে জন্মান, তাই স্ত্রীকে জায়া বলা হয়েছে । আমাদের আর্য্য বিধির গর্ভাধান কালে স্ত্রীর নাভিমূল স্পর্শ করে “প্রসীদ মা জগজ্জননী” মন্ত্রে অভিষিক্ত করে স্ত্রীর গর্ভে নিজেকে প্রবেশ করাতে হয় । প্রজা-সৃষ্টি প্রকরণের কি অপূর্ব ব্যঞ্জনা । যৌন জীবনে পুরুষদের শিব, আর নারীদের দুর্গা জ্ঞানে অভিষিক্ত করে কাম (lust) কে আসুরিক প্রবৃত্তির কবল থেকে মুক্ত করে দৈবীপ্রেমে (love) রূপান্তরিত করলেন আর্য্য-ঋষিরা। ওই জীবনীয় বিধিকে মেনে চলার মধ্য দিয়েই সার্থক হয় শিবপূজা, দুর্গাপূজা।  

  শ্রীশ্রীঠাকুর পুরুষ সাধারণকে কাম উপভোগ বিষয়ে মিতব্যয়ী হবার উদ্দেশ্যে বলছেন,–“…….প্রত্যেকটা sperm ( শুক্রাণু)-ই micro-cosmic form-এ (ক্ষুদ্রাকারে) এক-একটা being (জীব), ও নষ্ট করা মানে micro-cosmic form-এর (ক্ষুদ্রাকারের) একটা মানুষ মেরে ফেলা । আমাদের বোধশক্তি ও মমত্ববোধ জাগলে…… নিজের সুখের জন্য, ইন্দ্রিয়-পরিতৃপ্তির জন্য লক্ষ-লক্ষ শুক্রাণু নষ্ট ক’রে অতোগুলো soul (আত্মা)-কে মারতে পারবো না ।….. তাই প্রজননকল্পে ছাড়া অন্য কারণে শুক্রাণু যথাসম্ভব নষ্ট না করাই উচিত । তুমি-আমি সবই তো ঐ living sperm (জীবন্ত শুক্রাণু), প্রত্যেকে ওরই ওপর দাঁড়িয়ে গজিয়েছে, ওই আজ কত কথা কইছে, ঘুরছে, ফিরছে, হাতি-ঘোড়া মারছে । তুমি যে-দশা পছন্দ কর না, অনর্থক সে-দশায় ওদের ফেলবে ? ওরা যে তুমিই !” (আ. প্র. ১/১. ১২. ১৯৪১)
তিনি তাঁর নারীর নীতির বিধানে কুমারী মেয়েদের উদ্দেশ্যে বললেন—  
‘‘মেয়ে আমার,
তোমার সেবা, তোমার চলা,
  তোমার চিন্তা, তোমার বলা
পুরুষ-জনসাধারণের ভিতর
যেন এমন একটা ভাবের সৃষ্টি করে—
যা’তে তারা
অবনতমস্তকে, নতজানু হ’য়ে
সসম্ভ্রমে,
ভক্তিগদগদ কন্ঠে—
‘মা আমার,— জননী আমার’! ব’লে
মুগ্ধ হয়, বুদ্ধ হয়, তৃপ্ত হয়.কৃতার্থ হয়,—
তবেই তুমি মেয়ে.
—তবেই তুমি সতী!’’   

নারীর নীতির ওই বিধান না মানার ফলে, কিছুদিন পূর্বে, একজন আর্য্যহিন্দু নারী ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে পিটার মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব খান্না এবং ইন্দ্রাণীর মেয়ে শিনার বাবা সিদ্ধার্থ দাস সাম্প্রতিককালে সংবাদ শিরোনাম দখল করে নিয়েছে। সংবাদের বিষয়বস্তু সকলেই জানেন। ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায় মা হয়ে মেয়েকে বোন বলে পরিচয় দেয়, অপত্য স্নেহ ভুলে মা হয়ে মেয়েকে হত্যা করে! ওদিকে এক ব্যাঙ্ক অফিসার কামের মোহে পরকীয়া করতে গিয়ে বেসামাল হয়ে কামিনীকে, কামিনীর মেয়েকে কেটে টুকরো টুকরো করে হুগলী নদীতে ফেলতে গিয়ে ধরা পড়ে! প্রবৃত্তির রিংরসার আঠায় আটকে গিয়ে যাদের এখন দুর্দশার জীবন কাটাতে হচ্ছে! ওই দুর্বিসহ জীবন থেকে নিস্তার পেতে বাস্তব সব পদক্ষেপ নেবার পাশাপাশি ওরা অবশ্যই ভগবানেরও শরণাপন্ন হচ্ছে। আমরা সৎসঙ্গীরা নিয়ম করে  অধিবেশনে অধিবেশনে সৎ-অসৎ নির্বিশেষে সকলের মঙ্গল কামনার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা জানাই। সেই রীতির অনুসরণে  আমিও বলতে চাই, ভগবান ওদের ওই দুর্বিসহ জীবন থেকে মুক্ত করুন।
না, পরমপিতা আমার আর্জি নাকচ করে দিয়ে বললেন,  ‘‘ভগবান আমাদের বাঁচাতে পারেন না, ভগবানের উপর আমাদের যে টান ঐ টানটাই বাঁচায়।’’
‘‘কেউ কারও যম নয়রে, তোর যম তুই।’’ 
God (ঈশ্বর)-এর opposite pole (বিপরীত মেরু) হ’ল Satan (শয়তান) যা’ disintegrate (বিশ্লিষ্ট) করে। ভগবানের প্রতি বিমুখ হ’য়ে, তাঁকে অস্বীকার করে, তাঁর বিরুদ্ধ যা’ তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে, তাকে প্রাধান্য দিয়ে চলার স্বাধীনতাটুকু মানুষের আছে। এই স্বাধীনতার উপর তিনি হস্তক্ষেপ করেন না। তিনি যেমন ইচ্ছাময়, প্রত্যেকটা মানুষকে তেমনি ইচ্ছাময় করে ছেড়ে দিয়েছেন। যে ইচ্ছাময় যেমন ইচ্ছা করে, সে ইচ্ছাময় তেমন হয়, তেমন পায়—বিধির অনুবর্তনে। পরমপিতা বিশ্ববিধাতা, আর, আামরা হলাম স্ব-স্ব ভাগ্য-বিধাতা। স্রষ্টার বেটা সেও এক স্বতন্ত্র স্রষ্টা। যার প্রাণে যেমন চায়, সে তেমনি সৃষ্টির মালিক হয়।’’ (আ. প্র. ১০ম খণ্ড/ ৮. ১. ৪৮) 
আমরা যখন স্ব-স্ব ভাগ্য-বিধাতা, তখন ওইসব দুরাবস্থা থেকে রেহাই পেতে হলে একমাত্র উপায় হচ্ছে বিশ্ববিধাতা পরমপিতার বলা আদেশ-নিদেশ মেনে কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে আমাদের স্ব-স্ব ভাগ্য-বিধাতার কর্তব্যটুকু পালন করে যাওয়া, সকলকে পালন করতে উৎসাহিত করা—  মনুষ্যত্বের মূল বুনিয়াদকে রক্ষা করতে হলে।
জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!
আমরা যেন প্রকৃত  ইষ্টভৃতি পরায়ণ হয়ে পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠন করতে পারি।
“Common sense is the most uncommon things in this world.”             
—Shree Shree Thakur Anukulchandra
————————————————
tapanspr@gmail.com

আমাদের শিব আরাধনা

** “ভোলে বাবা পার করেগা” **

।। আমাদের শিব-আরাধনা।।


সারা শ্রাবণ মাস জুড়ে “ভোলে বাবা পার করেগা” শ্লোগানে মুখরিত হয় চারিদিক। শিব ভক্তগণ জলপূর্ণ ঘট নিয়ে ছোটে শিবমন্দির প্রাঙ্গণে। ভোলে বাবা কিভাবে আমাদের পার করবে, জেনে নেবার চেষ্টা করি। আমরা স্থূল দেহ ধারণ করে এই মর্ত্ত্যভূমিতে লীলা করছি, এপারে আছি। এই দেহত্যাগ করেন লিঙ্গশরীর নিয়ে যেখানে যাব, সেটাই ওপার। দেহ-ধারণের রোগ-শোক-ব্যাধি-জরা থেকে মুক্তি পেলেই ‘ভোলেবাবা পার করেগা’ শ্লোগান সার্থক রূপ নেবে।—স্মৃতিবাহী চেতনা নিয়ে পরপারে যেতে পারব। এজন্য লাগে সাধনা। দেহধর্মের জৈবিক তাগিদ যথাযথ পালন না করে পারাপার হওয়া সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন হয় দীক্ষা-শিক্ষা। দীক্ষা-শিক্ষা ব্যতীত জৈবিক ধর্ম পালন করা যায় না। জৈবিক ধর্ম পালন করার কায়দা না জানলে শরীর-মন-আত্মাকে জানা যায় না। ‘আত্মানং বিদ্ধি’র সোপানে চলতে না শিখতে পারলে পারাপার হওয়া তো যাবে না! যেমন, কোন কারণে হাত অসার হলে অন্যের সাহায্যে খাবার খেতে হয়। তাই এপারের পিণ্ডদেহের সব কর্মফল সাথে নিয়ে লিঙ্গদেহ ওপারে যাবে। তাই “সাধন করনা চাহিরে মনুয়া, ভজন করনা চাহি।…..”


।। অতঃ সাধন-ভজন কথন ।।
ওঁ নমঃ শিবায় শান্তায় কারণত্রয় হেতবে।
নিবেদয়ামি চাত্মানং ত্বং গতি পরমেশ্বর।।
সত্যম্-শিবম্-সুন্দরম্। সত্যই শিব, শিবই সুন্দর। সত্য মানে অস্তিত্ব। পরিবেশের সব অস্তিত্বের পালন-পোষণ করে এই সুন্দর পৃথিবীর সুন্দরত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার বাস্তব প্রক্রিয়ার নাম শিবপূজা। পূজা মানে সম্বর্দ্ধনা—সম্যকরূপে বর্দ্ধনার পথে চলা।
শিব একাধারে সার্থক যোগী, সন্ন্যাসী, নটরাজ। আবার গৃহস্থরূপে দেবী পার্বতীর স্বামী। গণেশ এবং কার্তিক দুই পুত্রের পিতা। সে-সব দিকগুলো বিচার করে শিবকে যোগ, ধ্যান ও শিল্পকলার দেবতা মনে করা হয়। কিছু গবেষণায় জানা যায় শিব নাকি চিকিৎসা বিদ্যার জনক ছিলেন। কৃষিবিদ্যার আবিষ্কারকও ছিলেন। নট-নটীরা শিবকে নটরাজ বলে পূজা করেন। রামায়ণে বর্ণিত, সংস্কৃতে রচিত শিব-বন্দনার ‘তাণ্ডব-স্তোত্র’ আর্য্যকৃষ্টিতে বন্দিত। পরমপুরুষ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর ভাববাণীতে বলেছেন।—‘‘তাণ্ডব-স্তোত্র মুখস্থ করিস্, এ্যাজমা সারবে।’’
শিবের পূজা বা আরাধনার নিমিত্ত যতগুলো প্রতিষ্ঠিত মন্দির রয়েছে, সে-সব মন্দিরগুলোতে শিবলিঙ্গকেই পূজা করা হয়। শিবলিঙ্গের সৃষ্টির বিষয়ে শাস্ত্রগুলোতে নানা মতভেদ রয়েছে। সবগুলোতেই রিরংসার নীলজল মেশানো আছে। সেগুলো থেকে নারদ পঞ্চরাত্রে বর্ণিত কাহিনী যেন একটু ফিকে, গ্রহণযোগ্য। নারদ পঞ্চরাত্র মতে শিব-পার্বতির প্রথম মিলনের সম্মিলিত তেজ থেকে উৎপন্ন হয় শিবলিঙ্গ। শিবলিঙ্গ-এর বেষ্টনীকে বলে গৌরীপট্ট। গৌরীপট্ট শিবলিঙ্গের আধার, জগতের যোনি। যোনি-সম্ভূত সৃষ্টি প্রকরণের প্রতীক হিসেবে মানা হয় শিবলিঙ্গকে। এর অন্তর্নিহিত অর্থ, পুরুষেরা শিবলিঙ্গকে প্রতীক রূপে মেনে, শিবের ন্যায় আদর্শ পিতা হবার নিমিত্ত তাদের প্রজন্ম সৃষ্টির উপাঙ্গ জননেন্দ্রিয়কে ব্যবহার করবেন, আর নারীরা গৌরীপট্টকে প্রতীক রূপে মেনে, গৌরীর ন্যায় আদর্শ মাতা হবার নিমিত্ত প্রজন্ম সৃষ্টির উপাঙ্গ জননেন্দ্রিয়কে ব্যবহার করবেন।
আমাদের ভারতীয় আধ্যাত্মবাদের সাথে শিব অনেকটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামেও একটা না একটা শিবমন্দির দেখা যায়। যারা দৈনন্দিন জীবনে আর্যকৃষ্টির নিত্যকর্ম পদ্ধতির সদাচার, বর্ণাশ্রমধর্ম পালনে অভ্যস্ত নয়, তারাও সোমবার, শ্রাবণ মাস, চৈত্র মাস-এর পার্বনের দিনগুলোতে শিবলিঙ্গে ফুল-জল-বেলপাতা দিয়ে তথাকথিত পুজো করেন। শ্রাবণ মাস শিবের জন্মমাস হিসেবে পালন করেন অনেক ভক্ত। বাঁকে করে জল নিয়ে প্রতিষ্ঠিত শিবমন্দিরগুলোতে গিয়ে অনেক কসরৎ করে শিবলিঙ্গে জল ঢালতে যান। (যদিও বিখ্যাত শিব মন্দিরগুলোতে প্রত্যক্ষভাবে জল ঢালা যায় না, দূর থেকে ছুঁড়ে দিতে হয়!)
তাদের সেবা করার জন্য রাস্তার ধারে ধারে প্যাণ্ডেল করে, তারস্বরে মাইক বাজানো হয়। অনেক সাধকেরা আবার ‘ভোলে-ব্যোম’ ধ্বনি দিয়ে গঞ্জিকা, ভাঙ্-এর মৌতাতে শিবত্ব লাভ করতে চান। টিভি সিরিয়ালগুলোতেও শিবকে সিদ্ধিখোর, গাঁজাখোর হিসেবে তুলে ধরা হয়। শিব ছিলেন একজন পরমবৈষ্ণব, সিদ্ধ-পুরুষ, তাঁকে সিদ্ধিখোর, গাঁজাখোর না বানালেই কি চলছিল না!
তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া চলে আমাদের হিন্দু নারীদের শিবরাত্রির উপবাসকে। শুনেছি অনূঢ়া বা কুমারী মেয়েরা শিবের মতো স্বামী পাবার আশায় (অবশ্য বাস্তবে আমাদের কল্পনার শিবের মত,—বাঘছাল পরে, গলায় সাপ জড়িয়ে, ষণ্ডের পিঠে চেপে, কোন পুরুষ যদি স্বামীরূপে উপস্থিত হয়, তখন কি হবে?), কুমার পুরুষেরা (যদিও সংখ্যায় অনেক কম) গৌরীর মতো স্ত্রী লাভের আশায় শিবরাত্রির উপবাস করেন। আর বিবাহিতা মহিলারা কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীর ন্যায় সন্তান লাভ করে সুখে-শান্তিতে ঘর-সংসার করার আশায় শিবরাত্রির উপবাস করেন।
ওই আশাগুলোকে পূরণ করতে হলে শুধুমাত্র শিবরাত্রির উপবাস করলেই তো আর হবে না। উপ মানে নিকটে, বাস মানে অবস্থান। শিব-পার্বতীর আদর্শে নিত্য অবস্থান করতে হবে। আর সেজন্য সদগুরু গ্রহণ করতে হবে। শাস্ত্রানুসারে গুরু গ্রহণ না করা পর্যন্ত কোন দেবদেবীর পূজা করার অধিকার জন্মায় না।
পুরাণ অনুসারে গিরিরাজ দুহিতা উমা ছোটবেলা থেকেই ভক্তিমতী। শিবের ভক্ত। পণ করেছেন, শিবকে ছাড়া অন্য কাউকেই বিয়ে করবেন না। বাবা-মা-পরিজনেরা কত করে বোঝাল, শিবকে বিয়ে করলে আর কষ্টের শেষ শেষ থাকবে না। বাপের বয়সী, কাজকর্ম করে না। নারায়ণের ভুতের বেগার খেটে মরে। (অর্থাৎ, নারায়ণী-বার্তা যাজন করে প্রাণী নামক ভুতদের উন্নয়ন করে বেড়ান।) তথাপি উমা কিন্তু কারোর কথায় কান না দিয়ে, সৎ-স্বভাবে পরান পাগল, জ্ঞানবৃদ্ধ, বয়োবৃদ্ধ শিবকেই পতিত্বে বরণ করেন।

উমা বা পার্বতী, স্বামীকে মাথায়, অর্থাৎ জীবনের কেন্দ্রে রেখে, স্বামীর মনোবৃত্ত্যানুসারিনী স্ত্রী হয়ে সুসন্তানের মা হয়েছেন, মা হয়েছেন আমাদের, জগতের। উমা-মাকে আমরা দেবীর চাইতে অনেকটা বেশি করে ঘরের মেয়ে হিসেবে বরণ করে নিয়েছি। এই মর্ত্ত্যধামের প্রতিটি ঘর তাঁর বাপের বাড়ি। তাই বাস্তব জীবন-চলনায় যদি শিব-গৌরীর ন্যায় আমাদের ভালোবাসার পবিত্র দাম্পত্যের পূজা-জাত কন্যারূপী সন্তানটিকে উমার মত করে, পুত্ররূপী সন্তানটিকে শিবের মত করে সৃষ্টি করতে পারি, তা হলেই তো ষোল-কলায় পূর্ণ হবে আমাদের শিব আরাধনা।

tapanspr@gmail.com

বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস

** বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস **
।। আজকের ভাবনাকে বাস্তবায়িত করতে নিত্য দিনের জন্য পালন করার শপথ নিতে হবে ।।
আজ “বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস ২৮শে জুলাই পালিত হয় এবং এটি স্বীকার করে যে একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি হল একটি সুস্থ পরিবেশ। এই সচেতনতা দিবসের উদ্দেশ্য হল আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা ।”
কিন্তু দুঃখের বিষয়, ভোটের রাজনীতিতে জয়লাভ করা অপ্রকৃতস্থ জন-প্রতিনিধিরা, যারা প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব বোঝে না, কেবল বোঝে, প্রকৃতি ধ্বংস করে অবৈধ নির্মাণ কার্যে সীলমোহর দিয়ে টাকা রোজগার করা। তাদের সচেতনতা বাড়াবে কে বা কারা?
* * *
মহাভারতের বনপর্বে বকরূপী ধর্ম যুধিষ্ঠিরকে অনেক প্রশ্নের মধ্যে একটা প্রশ্ন করেছিলেন, সব চাইতে আশ্চর্যের বিষয় কি ?
উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, মৃত্যু অবশ্যাম্ভাবী জেনেও মানুষ ন্যায়, নীতি, ধর্ম বিসর্জন দিয়ে চিরদিন বেঁচে থাকতে চায় এটাই সব চাইতে আশ্চর্যের বিষয় ।
তাই, আমরা, ঠাকুরের মানুষেরা যেন ওইসব পথের পথিক না হই । প্রবৃত্তিধর্মী অসৎ পথ অবলম্বন করে যদি চিরজীবি হওয়া যেত তাহলে না হয় অসৎ পথের আশ্রয় অবলম্বন করার সার্থকতা থাকত।
আর একটা প্রশ্ন ছিল—পথ কি?
তার উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, বেদ বিভিন্ন, স্মৃতি বিভিন্ন, এমন মুনি নেই যাঁর মত ভিন্ন নয়। ধর্মের তত্ত্ব গুহায় নিহিত, অতএব মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথ (আদর্শ) বলে গেছেন তাই হচ্ছে একমাত্র পন্থা। বর্তমান পুরুষোত্তম পরমপিতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র হলেন, সেই মহাজ্ঞানী,মহাজন।
তাই আমাদের বাঁচতে হবে পরমপিতার খুশির জন্য, মরতেও হবে পরমপিতার খুশির জন্য—মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার লক্ষ্যে, ‘তৃষ্ণার একান্ত নির্বান— মহাচেতন সমুত্থান।’ বাণীকে সম্মান জানাতে।
* * ‌*
বিশ্ব প্রকৃতির স্বরূপ নির্দেশক
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন (ভাববাণী,
ষট্ পঞ্চাশত্তম দিবস, ২রা শ্রাবণ, ১৩২৪)

‘‘সে একটা অব্যক্ত পরমানন্দ,—নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ,—প্রাণের
প্রাণ,—জগতের জগৎ—অণুর অণু,—সে একটা বলা যায় না রে। যখন ‘ছিল না’র
সত্তা ছিল, কাল আসে নাই, যখন শব্দ ছিল, যখন সূর্য্যের-চাদের সৃষ্টি হয়
নাই, তখন এক বিরাট ধ্বনি সোহহং পুরুষ ভেদ ক’রে সৃষ্টি করতে চ’লে এল—সেই
ওম্। শব্দে, সূক্ষ্ম মায়াতে, ব্রাহ্মী মায়াতে, হ্লাদিনী শক্তিতে
ঘাত-প্রতিঘাতে সে ধারা বাধা পেল, তখনই সৃষ্টি,—ব্রহ্মা, বিষ্ণু,
মহেশ্বর—সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ—ত্রিধারা। বিরাট গতিতে শব্দ চলতে লাগল, তখন
প্রাণ স্থির হয় নাই—তখন সৃষ্টি হ’ল আকাশ ….. বায়ু ….. কাল নির্দেশ
ক’রে চলল—তখন সৃষ্টি তেজ—সেই শক্তি। গতি চলছিল আবার চলবে, তাই দিয়ে
বিরাট্ জলখণ্ড! তেজ ও জলখণ্ড যখন উপর-গতি ধরতে না পেরে আপন গতিতে চলতে
লাগল, তখন সৃষ্টি হ’ল জড়। আবার, এই ঘাত-প্রতিঘাতে সৃষ্টি হ’ল দেবতা,
কিন্নর, জীব-জগৎ। এখন আমি কী? সত্তা কোথায় আমার ? আমি কি ক্ষিতি, অপ্,
তেজ, মরুৎ, ব্যোম ? আমি কি সেই বিরাট্— ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর? আমি
কি সেই সোহহং ধারার সুরত শব্দ? সেই সোহহং পুরুষ, সোহহং পরমাত্মা, কি সেই
সেই অনামি পুরুষ? কে বলবে আমার সত্তা কোথায়? দ্যাখ্ আমি কি? আমার
অস্তিত্ব কোথায়? আমি স্ত্রী, পুরুষ, ক্লীব, আমি যা-কিছু সব,—আবার আমি
কিছু নয়। কিছু নয় সেই আমি কত সৃষ্টি করেছে! কত ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর,
কৃষ্ণ, বুদ্ধ, কত আল্লা-খোদা, যিশু,—কোটি-কোটি অবতার। আমি সব
হ’য়েছিলাম,—সব হ’চ্ছে আমার অবিরাম গতি। আমার কারণসত্তা না জেনে যদি
আমার কর্মসত্তা জান ..…।’’ ১
আপনি মিশে যাচ্ছে, আপনি চলছে—তাহাকেই বলে প্রকৃতি। আমি
পরমকারণ। অনন্ত কোটি দেবতা, ইন্দ্র, চন্দ্র, বায়ু, বরুণ, ব্রহ্মজ্যোতিঃ,
শ্রীকৃষ্ণের অঙ্গজ্যোতিঃ, সেই পরমপুরুষ শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীকৃষ্ণের সত্তা,
সত্ত্ব, আমিই সব। আমি সেই দয়ালদেশ, ব্রহ্মদেশ, পিণ্ডদেশ। আমি সেই
বৃন্দাবন, আমি কৃষ্ণ, রাধা, গোপ, গোপী; আমার আরতি করে চন্দ্র, সূর্য্য,
তারকা, কোটি-কোটি গগন সব আমারই লীলা, আমারই প্রকট, আমারই জন্য আমারই
ফাঁদ, আর কিছু নয়। …………
* * *

বিশ্ব-প্রকৃতি রক্ষার স্বার্থে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, এক বিপ্লব নিয়ে এলেন। ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে, ধর্ম বলে জানিস তাকে। বাঁচা-বাড়ার মর্ম যা, ঠিকই জানিস ধর্ম তা। Upholding urge of existence is Dharma.’……..ইত্যাদি বাণীর মাধ্যমে। অতএব, চাঁদার জুলুম, ফুল, বেলপাতা, ধূপহীন ধূপকাঠি, নৈবেদ্য, দশ-(অ)কর্মার ফর্দ, ঢাক, ঢোল, বাজি, হৈ-হুল্লোর, তার শব্দে মাইকের ডালি দিয়ে নয়— তোমাকে ধার্মিক হতে হলে আগে প্রকৃতিকে বাঁচাতে হবে। সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বাস্তব কর্মে ব্রতী হতে হবে। পরিবেশ হিতৈষী হতে হবে, তবেই তুমি ভারতীয় মতের ‘ধার্মিক’ অভিধায় ভূষিত হতে পারবে।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের অনুগামীদের নিত্য ইষ্টভৃতি করতে হয়। ইষ্টভৃতি মানে ইষ্ট কর্মের ভরণ। ইষ্টকর্ম মানে পূর্ত্তকর্ম—প্রকৃতির উপাদানকে,পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখার বাস্তব কর্ম। যা প্রকৃত ইষ্টভৃতির মন্ত্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ ।” এর সরলার্থ খুব সহজ। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুযায়ী সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন বর্দ্ধনার বিধি মেনে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে চলেন যিনি, এমন গুরুভাই-ই প্রকৃত ইষ্টভ্রাতা।–যাঁর আপদে-বিপদে সাধ্যানুগ সাহায্য করতে হবে। ভূত মানে,–ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা প্রকৃতির অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। সেগুলোকে প্রাণ পণ করে রক্ষা করতে হবে। অর্থাৎ আমার দ্বারা যেন প্রকৃতির বায়ু, জল, মাটি, দূষিত না হয়, ধর্ষিত না হয়। আমার দ্বারা যেন নিষ্প্রয়োজনে কোন গাছ, কোন প্রজাতি, কোন পারিপার্শ্বিক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। প্রতিনিয়ত এই শপথ মেনে চলার নাম ইষ্টভৃতি। অতএব প্রতিটি আমি যদি প্রকৃত ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের যাজ্ঞিক হবার শপথ পালন করতে পারি তাহলেই অনেকাংশে রক্ষা করা যাবে সুজলা-সুফলা-মলয়জ-শীতল বসুন্ধরার প্রকৃতিকে।
এ যুগের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমাদের সচেতন করে দিতে বাণী দিয়ে বললেনঃ
‘‘ইষ্টভরণ, পিতৃপোষণ,
পরিস্থিতির উন্নয়ন,
এ না করে, যাই না করিস
অধঃপাতেই তোর চলন।’’
ওই অধঃপতন থেকে মধুময় বসুন্ধরার প্রকৃতিকে রক্ষা করতে কৃপা-পরবশ হয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের ‘পঞ্চবর্হি’ এবং ‘সপ্তার্চ্চি’ পালনের অনুশাসন দিলেন। দলীয় প্রীতির কবলে পড়ে বিশ্ব-প্রকৃতিকে রক্ষার সেই অনুশাসন বিধিকে অজ্ঞতার বিকৃত ধারনা নিয়ে, অবজ্ঞা করার স্পর্দ্ধা যেসব তথাকথিত সৎসঙ্গীরা দেখাচ্ছেন, তাদের অধঃপতনকে প্রতিরোধ করতে হলে, তাদেরও সামিল করতে হবে উক্ত ইষ্ট-ভরণের অনুশাসন পালনে। তা যদি না করি আমরাও কিন্তু বঞ্চিত হব ‘ইষ্ট ভরণের’ পবিত্র কর্ম থেকে। ইষ্টভৃতি বাস্তবায়নের শপথকে পালন করা যাবে না।—কারণ, “তুমি ঠিক ঠিক জেনো যে, তুমি তোমার, নিজ পরিবারের, দশের এবং দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দায়ী।”—এই বাণীতে আমাদের সব্বাইকে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন। সেই দায়িত্ব তো আর অস্বীকার করা যাবে না!
জয়গুরু, বন্দে পুরুষোত্তমম্!

WORLD POPULATION DAY 2025

।। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ দিবসের ভাবনা ।।


[সম্মিলিত জাতিপুঞ্জে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৮৯ খ্রীস্টাব্দ থেকে প্রতি বছরের ১১ জুলাইয়ের দিনটিকে ‘বিশ্ব-জনসংখ্যা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। আলোচিত হয় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য রক্ষা, মানবাধিকার, লিঙ্গ সমতা প্রভৃতি গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে। বর্তমান ভারতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি অসহিষ্ণুতা, খুন-জখম, রাহাজানি, ধর্ষণ, সন্ত্রাসবাদ, পরিবেশ দূষণ প্রভৃতি জাতীয় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অরণ্য ধ্বংস, বৃক্ষ নিধন করে অপরিকল্পিতভাবে নগরায়নের ফলে, প্রাকৃতিক উপাদানসমূহ অপব্যবহারের ফলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। একদিকে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর একদিকে ভূগর্ভের জলস্তর নেমে যাচ্ছে। অপরিকল্পিত সংরক্ষণের ফলে, বণ্টনের ফলে প্রতুল খাদ্যশষ্য থাকা সত্বেও অনাহারে, অর্ধাহারে মানুষ বাস করছে। অপরিকল্পিত অধিকার দানের ফলে কেহ প্রচুর সম্পদের মালিক, কেহ ভিখারি। ওইসব সঙ্কটের মূলে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে দায়ী করলে ভুল হবে, বরং দায়ী কু-জনদের সংখ্যাধিক্য, সু-জনদের সংখ্যা লঘুতা। সে বিষয়ে আলোকপাত করার ক্ষুদ্র প্রয়াস এই প্রবন্ধ। ভুল-ত্রুটি সংশোধনের পরামর্শ দিলে বাধিত থাকব।]

  • * *
    প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ভুপেন হাজারিকা মহোদয়ের গাওয়া বিখ্যাত গানের একটি কলি,
    ‘আমি দেখেছি অনেক গগণচুম্বী অট্টালিকার সারি
    তার ছায়াতে দেখেছি অনেক গৃহহীন নরনারী।’— ভীষণ মনে পরছে দিনটির স্মরণে।
    বিদেশের কথা বলতে পারবো না, তবে আমাদের দেশে অনেক অট্টালিকা রয়েছে, যে অট্টালিকার ছাদগুলো আশ্রয় দেবার মতো মাথা খুঁজে পায় না। বিশাল বাড়িঘর, একটিই মাত্র ছেলে, বিদেশে থাকে। বৌ আর একটা বাচ্চা নিয়ে ওখানেই সেটেল্ড। মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে কালেভদ্রে বেড়াতে এলে ঘরের ছাদগুলো মাথা পায়। নইলে স্বামী-স্ত্রী দু-জনাতেই থাকেন বিশাল বিশাল বাড়িতে। আবার যাদের নির্দিষ্ট কোন মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, দু-বেলা দু-মুঠো খাওয়ার সংস্থান নেই, লোকের কাছে যাচ্ঞা করে, পরিত্যক্ত, উচ্ছিষ্ঠ খাবার সংগ্রহ করে উদরপূর্তি করে। তারাও ঠিক খুঁজে খুঁজে কোন অট্টালিকার কার্ণিশের তলায়, রেলওয়ে প্লাটফর্মে, ফুটপাথের রেলিং-এ দড়ি বেঁধে প্লাস্টিকের ছাদ রচনা করে, জন্ম-নিয়ন্ত্রণের চিন্তা না করে ৩-৪টে বাচ্চাকাচ্চাসহ রোগ-শোক-ব্যাধি-জরাকে সাথি করে দিব্যি শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা কাটিয়ে দিচ্ছে। সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ণ দপ্তর যদি এ বিষয়ে একটু নজর দিত, তাহলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বিষয়টি সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারতো।
    জনসংখ্যার অর্থ মানুষের সংখ্যা। মুখে যতই বলিনা কেন, ‘মানুষ সব সমান’, বাস্তবে তো তা’ হতে পারে না। আমাদের কোষে থাকা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ক্রোমোজোমগুলোও সব সমান নয়, আলাদা আলাদা। অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো ‘হোমো স্যাপিয়েন্স’ বা ‘মানবজাতি’-রও পৃথক পৃথক নৃ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আছে। নর্ডিক, মঙ্গোলয়েড, অস্ট্রালয়েড, নিগ্রোয়েড ইত্যাদি ইত্যাদি। পৃথক পৃথক বংশ, বর্ণ, গোত্র বৈশিষ্ট্যও আছে। প্রতিটি মানুষের মধ্যে আবার দোষ-গুণ, ভালোমন্দ আছে। শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতাতে ‘গুণত্রয়বিভাগযোগ’ নামক অধ্যায়ে সাত্ত্বিক, রাজসিক, তামসিক নামের তিন প্রকার গুণসম্পন্ন মানুষের কথা বলা হয়েছে। আবার ‘দৈবাসুরসম্পদ্বিভাগযোগ’ নামক অধ্যায়ে মানুষের দৈবীভাব এবং অসুরভাবের মানুষের উল্লেখ করা হয়েছে। ভালো মানুষদের মধ্যে দৈবীভাব এবং সত্ত্বগুণের প্রাধান্য রয়েছে। যে মানুষেরা সহানুভূতি-প্রবণ নিজের সত্তার প্রতীক মনে করে সবাই দেখে। মেয়েদের কামুক দৃষ্টিতে না দেখে, মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখে। উপযুক্ত সেবা বা সার্ভিস দিয়ে ন্যায্য পথে উপার্জন করে। অন্যের রোজগারে ভাগ বসায় না। কাট্ মানি, কমিশন, ঘুষ খায় না। একটা আদর্শের অনুসারী হয়ে চলে। পিঠ বাঁচাতে, পেট বাঁচাতে আপোষরফা করে না। দল বদল করে না। রাজনীতির নামে দুর্নীতি করে না, বুথ দখল করে না, পার্টিকে জেতাতে হিংস্র হয়ে ওঠে না। প্রবৃত্তির স্বার্থের হানি হলে মানুষ খুন করতেও পিছপা হয় না। ওই মানুষগুলোকে আমরা অসুর-ভাবের মানুষ বলতে পারি। যারা পরিবার, সমাজ, পরিবেশ রাষ্ট্রকে নানাভাবে অশান্ত করছে। ভালো মানুষদের প্রয়োজনীয় অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান থেকে বঞ্চিত করে নিজেরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ সংগ্রহ করছে, বিনষ্ট করছে। আপনি-আমি ওই মানুষগুলোকে সমাজের, দেশের শত্রু মনে করলে কি হবে, দলীয় রাজনীতিতে এদের কিন্তু খুব কদর। ওই ধরণের মানুষগুলোর বংশ বাড়তে না দিয়ে, ওদের জন্ম নিয়ন্ত্রণ করে যদি দৈবীসম্পদের মানুষের জন্ম বাড়ানো যায়, তাহলেই তো সহজেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়। কিন্তু করবেটা কে? যে প্রজাতন্ত্রের কাঠামোর মাধ্যমে নীতি নির্ধারণ করা হবে, আইন প্রণয়ন করা হবে, সেই প্রজাতন্ত্রের আঁতুড়ঘরটাই তো অশুদ্ধ। অসুর-ভাবের সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষেরাই তো ‘জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন’-দণ্ড হাতে নেবে! নইলে ভোটের জন্য পুলিশ, মিলিটারী, বোমা, আগ্নেয়াস্ত্র, হিংসা, খুন, জখম, কোটি কোটি টাকার অপচয় হয়! যারা দেশের সেবায় ব্রতী হবে, সেই জন-প্রতিনিধিদের পুষতে প্রচুর অর্থের অপচয় হয়!
    অপরাধ স্বীকার করে নিয়ে বলতে হয়, করার দায়িত্বটা ছিল, প্রত্যেকটি ‘আমি’র। আমার, আপনার, সকল সৎসঙ্গীদের। আমরা হলাম ব্যর্থ। ‘‘তুমি তোমার, নিজ পরিবারের, দেশের ও দশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দায়ী।’’ বাণীটা সত্যানুসরণেই থেকে গেল। ‘পরমরাষ্ট্রিক সমবায়’ এখনো গঠন করা গেল না।
    যাকগে, ওসব ব্যাপার আপনারা সবাই জানেন। আমরা এবার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টাকে একবার বাস্তবভাবে বোঝার চেষ্টা করি।
    এমন অনেক দম্পতি আছে, যারা বাস্তব জীবনে কোয়ালিটি প্রোডাক্টের পক্ষপাতী হলেও বাবা-মা হবার বেলায় উদারচেতা—কোয়াণ্টিটি বাড়াতে ব্যস্ত!—‘জীব দিয়েছেন যিনি, আহার যোগাবেন তিনি!’—দর্শনে বিশ্বাসী!
    তবে, আধুনিক যুগের একজন চিন্তাশীল মানুষ কখনোই নিজের দাম্পত্য জীবনে জনসংখ্যা বাড়াতে চান না, চাইবেনও না। একটা-দুটো সুস্থ সন্তান জন্মাতে পারলেই তাদের পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু সুস্থ সন্তান কামনা করলেই তো আর সুস্থ সন্তান অর্ডার দিয়ে পাওয়া যাবে না। এজন্য সুস্থ পাত্র-পাত্রী প্রয়োজন। সুস্থ বিয়ের প্রয়োজন। সুস্থ দম্পতির প্রয়োজন। সুস্থ পরিকল্পনার প্রয়োজন। সর্বোপরি সুস্থতা কাকে বলে, তা জানার প্রয়োজন। তাই নয় কি?
    সুস্থতা বিষয়ে আমরা বেশী কিছু না জানলেও ‘স্বাস্থ্যই সম্পদ’ এই আপ্ত বাক্যটি আমরা প্রায় সকলেই জানি। সেই স্বাস্থ্য সম্পর্কে স্বাস্থ্যের সর্বময় কর্তা ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’ কি বলেন, সেটা সকলের জানা দরকার আছে। বিশেষ করে জীবন পিয়াসী মানুষদের। সুস্থ যদি থাকতে চান এবং আপনার প্রিয়জনকে যদি সুস্থ রাখতে চান তাহলে এবার সংজ্ঞাটি মনোযোগ সহকারে পড়ুন এবং বোঝার চেষ্টা করুন।
    As per World Health Organisation–”Health is a state of complete physical, mental and social well-being, and not merely an absence of disease or infirmity.”
    The Sign of Physical Health : “…………a good complexion, a clean skin, bright eyes, lustrous hair with a body well clothed with firm flesh, not too fat, a sweet breath, a good appetite, sound sleep, regular activity of bowels and bladder, and smooth, easy, coordinated bodily movements. All the organs of the body are of unexceptional size and function ‘normally’; all the special senses are intact; the resting pulse rate, blood pressure and excercise tolerance are all within the range of ‘normality’ for the individual’s age and sex….”
    The Sign of Mental Health : “…….feel satisfied with himself. He feels happy, calm and cheerful. There are no conflicts within himself. He is well adjusted. He accepts criticism and is not easily upset. He understands the emotional needs of others, and tries to be considerate. He has good self-control; he is not overcome by emotion; he is not dominated by fear, anger, love, jealousy, guilt or worries. He faces problems and tries to solve them intelligently.”
    The Sign of Social Health : “He is at peace with others and is able to feel himself as a part of a group and is able to maintain socially considerate behaviour.”
    Sign of Positive Health : “A person should be able to express as completely as possible the potentialities of his genetic heritage.” (Source : Preventive and Social Medicine by PARK)
    Mentioned all types regulated by positive health. Positive health depends on genetical instinct. A good instinct depends on good breeding. Good breeding depends on healthy couple, those who are physically, mentally and spiritually sound and sane.
    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞায় আমরা জানতে পারলাম, শুধু নীরোগ থাকলেই হবে না, —শারীরিক, মানসিক, এবং আত্মিকভাবে স্বচ্ছন্দ ব্যক্তিকেই সুস্থ বলা যাবে। অতএব সার্বিকভাবে সুস্থ থাকতে হলে সুস্থ শরীর, মন, আত্মার অধিকারী হতে হবে। উক্ত সংজ্ঞার পরিপূরক যারা নয়, তারা অসুস্থ। সেই অসুস্থরা যদি সন্তান জন্মাবার অধিকার পায় তাহলে অসুস্থ প্রজন্ম সৃষ্টি হবে। সুস্থ একটা প্রজন্ম তৈরি করতে হলে সংজ্ঞার পরিপূরক সুস্থ দম্পতির যৌথ প্রচেষ্টায় একটা সুস্থ শিশু সৃষ্টি হবে। তারজন্য বিবাহার্থে সুস্থ জুটি নির্বাচন করতে হবে। এছাড়া শুধুমাত্র ওষুধপত্রের চিকিৎসায় সকলকে স্বাস্থ্যের অধিকারী করা যাবে না। তাই বিয়ের আগে পাত্রপাত্রীর স্বাস্থ্যের বিষয়েও আমাদের ভাবতে হবে।
    সার্বিকভাবে ভাল স্বাস্থ্যের সন্তান পেতে হলে সংজ্ঞা অনুযায়ী স্বাস্থ্য নির্ণয়ের সাথে সাথে blood ABO Rh & genetic counseling করে নিলে ভাল হয় । সগোত্রে (same blood line)- এ বিয়ে হলে albinism, alkaptonuria নামের রোগ হয়। Schizophrenia, thalassaemia সহ অনেক দুরারোগ্য ব্যাধি আছে যা উত্তরাধিকারে সন্তান পেয়ে থাকে। মেয়েদের বেশি বয়সে বিয়ে হলে ‘mongolism’ নামের বিকৃত সন্তান জন্মাবার সম্ভাবনা থাকে।
  • * *
    আধুনিক যুগে প্রতিটি সচেতন মানুষই আর কিছু না হোক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে হুঁশিয়ার। লোকসান যাতে না হয় সে বিষয়ে সদা সতর্ক থাকেন। বাজার থেকে আলু, বেগুন, পটল, মুলো কিনতে গেলেও, কোয়াণ্টিটি না দেখে ভালো কোয়ালিটির, ভালো জাতের জিনিস কেনে। লাভালাভ বিবেচনা করেন। ঠকতে চান না। বিশেষ জ্ঞানকে কাজে লাগান। অথচ সেই মানুষেরাই অন্তঃস্থিত দৈবাসুর (প্রবৃত্তি এবং সত্তা) প্রকৃতিকে সঠিক বিনিয়োগে ম্যানেজ করতে ব্যর্থ হন। একজন পুরুষের সার্বিক উন্নতির চরম পরিণতি সফল পিতৃত্বে, একজন নারীর মাতৃত্বে। পিতৃত্ব এবং মাতৃত্ব অর্জনের নির্দিষ্ট উপাঙ্গও প্রকৃতি আমাদের দিয়েছেন, যার সফল বিনিয়োগে একজন আদর্শ পিতা, একজন আদর্শ মাতার পরিচয় বহন করে সুখ্যাত হতে পারি, আবার অসফল বিনিয়োগে কুখ্যাতও হতে পারি। সভ্যতার প্রাতঃ স্মরণীয় মনীষীবৃন্দের জনক-জননীরা সকলের কাছেই বন্দিত। আবার ভ্রষ্টাচারীর, সন্ত্রাসবাদীর, ধর্ষকের পিতামাতারা সমাজের চোখে নিন্দিত।
    শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই নয়, মনুষ্যেতর প্রাণীদের ক্ষেত্রেও ওই বিধি কঠোরভাবে প্রযোজ্য।
    সরকারী প্রয়োজনে একটা কুকুর কিনতে গেলেও পেডিগ্রি অর্থাৎ বাবা-মায়ের বিশুদ্ধ বংশানুক্রমিকতার শংসাপত্রের সমৃদ্ধির গুরুত্ব বিচার করে প্রভূত মুল্য ব্যয় করে কেনে। এক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া জাতির নামে উদারতা দেখিয়ে রাস্তার কুকুর দিয়ে কাজ চালায় না। একটু খোঁজ নিলে জানতে পারবেন দেশরক্ষার স্বার্থে যে কুকুরগুলোকে ব্যবহার করা হয়, ওদের কি পদ্ধতিতে প্রজনন করান হয়। ওইসব কুকুরীদের সতীত্ব রক্ষা হয়। নিম্ন শ্রেণীর কোন কুকুরদের সাথে মিশতে দেওয়া হয় না। কোন অসুস্থ কুকুর-কুকুরীদের দিয়ে বাচ্চা উৎপাদন করা হয় না। একটা ভালো গোরুর বাচ্চা তৈরির জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করে উন্নত জাতের ষাঁড়ের শুক্রাণু কিনে সুপ্রজনন করার ব্যবস্থা করে সরকার, রাস্তায় ঘোরা ষাঁড়গুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে!
    কৃষিক্ষেত্রেও তাই। উন্নত ফসলের জন্য ভালো জাতের সংরক্ষিত বীজ শোধন করে, বীজ অনুযায়ী উপযুক্ত উর্বর জমিতে ‘জো’ বুঝে বপন করতে পরামর্শ দেওয়া হয়। একজন আদর্শ কৃষক বাস্তব পরিচর্যার মাধ্যমে বিশুদ্ধ বীজ, বিশুদ্ধ জমিতে বিনিয়োগ করে উন্নত জাতের ফসল পাবার জন্য।
    প্রাণী সম্পদ, কৃষি সম্পদ বিকাশের ক্ষেত্রে জৈবিক সম্পদের বিহিত বিনিয়োগ করে বুদ্ধিমান মানুষেরাই। অথচ এই বুদ্ধিমান মানুষেরাই ওই জৈবী সম্পদকে অপচয়ীভাবে বিনিয়োগ করে নিজেদের বিশেষ জ্ঞানকে অপমান করছে। মহান ভারতের মহান চরিত্র দুর্গা, লক্ষী, সরস্বতী, সীতা, সাবিত্রী প্রমুখ নারীদের আদর্শ ভুলে প্রকৃতি প্রদত্ত জৈবী সম্পদকে যৌবন গরবে গরবিনী প্রবৃত্তিতাড়িত একজন নারী,–নিজের নারীত্বকে দর্শকামে, স্পর্শকামে, শ্রুতকামে, পণ্য করে পুরুষের সুপ্ত কামনাকে জাগিয়ে লাম্পট্য, ব্যভিচারকে পুষ্ট করতে পারে, প্রভূত অনিত্য সম্পদের মালকিন হতে পারে, কিন্তু ভালো মা হয়ে নিত্য-জীবনে আদর্শ নারীর খেতাব অর্জন করতে পারবে না। উনো জমিতেই দুনো ফসল ফলে, বুনো জমিতে নয়। পুরুষের ক্ষেত্রেও তাই। পুর্ব পুরুষের জীবনধারা প্রবাহিত বীর্য্যকে ব্যভিচার, ধর্ষণ, স্বমেহন আর কন্ডোমে অপবিনিয়োগ করে ধর্মবিরুদ্ধ কামসেবার ইন্দ্রিয়-লালসায় বিনিয়োগ করে দুষ্ট প্রবৃত্তিকে তুষ্ট করতে গি়য়ে যৌনব্যাধি, মানসিক কষ্ট, বিবেক-দংশন, সামাজিক ছি! ছি! লাভ করতে পারবে, ভালো বাবার গৌরব অর্জন করতে পারবে না। বীজ শুদ্ধ না হলে ফসলও অশুদ্ধ হবে।
    তাই সব কিছুর পূর্বে ভালো মানুষের জন্ম যাতে হয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে মেয়েদের। বর্ণ, বংশ, অভ্যাস, ব্যবহার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সবকিছু মিলিয়ে দেখে সম-বিপরীত সত্তার একজন উন্নত পুরুষকে বর হিসেবে নির্বাচন করে বিয়ে করতে হবে। তাহলেই ভালো সন্তানের মা হতে পারবে।
    বিয়েটা যাতে নিখুঁত হয়, সে বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, “বিয়ের প্রথম উদ্দেশ্যই হ’লো genetic enrichment ( জননগত সমৃদ্ধি)। এইটে হ’ল first and foremost (প্রথম এবং প্রধান)। তার পরের জিনিস হ’ল cultural enrichment (কৃষ্টিগত সমৃদ্ধি)। তাই বর-কনের বংশগত ও ব্যক্তিগত আচার, ব্যবহার, কর্মের সঙ্গতি আছে কিনা তা’ দেখা লাগে। আবার চাই physical enrichment (শরীরগত সমৃদ্ধি)। ….Genetic asset কার কেমনতর তা’ না বুঝে বিয়ে থাওয়ার সম্বন্ধ করা ভাল নয়।”
    Genetic assetকে গুরুত্ব না দেবার ফলেই বর্তমান পৃথিবীতে শতকরা প্রায়
    40টি অকাল মৃত্যুর কারণ কিছু দুরারোগ্য বংশগত ব্যাধি। যা সন্তানেরা উত্তরাধিকারে পায়। যা কোন চিকিৎসাতে সারানো যায় না। প্রতিরোধ করার একমাত্র উপায় সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা দুরারোগ্য বংশগত রোগমুক্ত বিশ্বস্ত বংশে বিবাহ করার নিদান দিয়েছেন। অতএব ওইসব দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে পরমপুরুষ নিদেশিত সুবিবাহ ও সুপ্রজনন বিধি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রজন্মের সুখশান্তি উত্থান-পতন সবকিছুর মূলভিত্তি হলো বিবাহ সংস্কার। সেই বিবাহ যদি শুধু যৌন লালসার এবং লিভ টুগেদার-এর কেন্দ্রবিন্দু হয় তাহলে কোনদিনও অসুখবিসুখ অকালমৃত্যু, সন্ত্রাসবাদ, শোষণবাদ থেকে সভ্যতাকে স্বস্তি দিতে পারবে না ডাক্তার, উকিল, পুলিশ, মিলিটারি, সংশোধনাগার, হাসপাতালের প্রচলিত ব্যবস্থাপনা। বিশ্বাসঘাতক মানুষদের সনাক্ত করতে শুদ্ধ জন্মের শংসাপত্র প্রাপ্ত ভাল জাতের বিশ্বাসী কুকুর (pedigreed dog) আমদানি করতে আগ্রহী যে রাষ্ট্র, সেই রাষ্ট্র ব্যবস্থা দৈবগুণসম্পন্ন বিশ্বাসী মানুষ সৃষ্টি করার মহান আর্যবিধিকে উপেক্ষা করে, যেমন খুশি তেমন বিয়ের মাধ্যমে কু-জন জননের অনুমোদন দিয়েছে! এই ব্যবস্থার পরিবর্তন না করতে পারলে দেশের কোন সমস্যার সমাধান হওয়া সম্ভব নয়।
  • * *
    নারী হতে জন্মে জাতি। নারীই গৃহ, সমাজ ও রাষ্ট্রের ধাত্রী ও পালয়িত্রী। প্রাকৃতিক নিয়মে একজন নারীর চরম পরিণতি মাতৃত্বে। মুখে আমরা যতই নারী-স্বাধীনতার কথা বলি না কেন, এক্ষেত্রে কিন্তু পুরুষের উপর নির্ভরশীল হতেই হয়। (অবশ্য মা হতে না চাওয়া লেসবিয়ান আদর্শে বিশ্বাসীদের কথা আলাদা। তারা অবশ্যই ব্যতিক্রমী।) সেই পুরুষটি মাতৃত্বকামী নারীর তুলনায় শারীরিক-মানসিক-আত্মিকভাবে যত উন্নত হবে,— স্বাস্থ্যবান হবে, ভালো চরিত্রের হবে, নারীটির দাম্পত্য জীবন তত সুখের হবে, সন্তানও ভালো হবে। এটাই তো স্বাভাবিক নিয়ম। তাই নয় কি? আর সেগুলো পেতে গেলে বর্ণে, বংশে, বয়সে, স্বাস্থ্যে, শিক্ষায়-দীক্ষায়—সবদিক থেকে উন্নত সম-বিপরীত সত্তার একটা পুরুষকে,— ভাবী সন্তানটির বাবাটিকে খুঁজে নিতে হবে, বিবাহের মাধ্যমে। বিবাহ করে নারী। পুরুষ করে উদ্বাহ। বিবাহ মানে পুরুষের সত্তাকে বিশেষরূপে বহন করা। যে পুরুষটির কাছে নারীত্বকে সমর্পণ করে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে। তাই নির্ঝঞ্ঝাট সুখের দাম্পত্য জীবন পেতে গেলে, ভালো সন্তানের মা হতে গেলে, লেখাপড়া শেখার পাশাপাশি, কুমারী অবস্থা থেকেই একটা পরিকল্পনা করে নিতে হবে, প্রস্তুতি নিতে হবে। কারণ প্রত্যেক নারীই চায় তার সন্তানটি সুস্থ থাকুক, ভালো হোক, কৃতী হোক। সেগুলো তো আর রেডিমেড পাওয়া যাবে না, আর স্টেজ মেক-আপও দেয়া যাবে না। নিয়ম মেনে অনুশীলন করতে হবে। মা-কেই মেপে মেপে সঞ্চয় করতে হবে ভবিষ্যতের সন্তানের ভালোমন্দের সব উপকরণ। মা মানে মেপে দেওয়া। সন্তানের ভালো-মন্দ মেপে দেয় বলেই মা। ভাবী মায়ের চলন-চরিত্র দ্বারা প্রভাবিত হয় নারীর-জননকোষ, অপত্য-কোষ। সেইজন্যই সন্তান ধারন-পালন-লালন-এর জন্য আবশ্যিক প্রত্যঙ্গগুলোকে (স্তন ও অপত্যপথ) সযত্নে মেপে মেপে লালন-পালন করতে হবে, সংরক্ষণ করতে হবে ভবিষ্যতের সন্তানের মঙ্গলের জন্য। তা না করে, যুগধর্মের বশবর্তী হয়ে ‘হেটেরো-সেক্সুয়াল’ কমপ্লেক্সের প্রলোভনে পড়ে ওগুলোকে যদি আম-পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করে ফেলা হয়, তাহলে তো ভাবী সন্তানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। যার জন্য সংরক্ষিত জিনিস, আত্মঘাতী উদারতার বশে অন্যকে ভাগ দেবার অপরাধে। এজন্য রোগ-ভোগেও ভুগতে হয়। Oncologist, Gynaecologist, Sexologist, Psychologist-দের শরণাপন্ন হতে হয়।
    বর্তমান যুগে নারীরা লেখাপড়া, শিক্ষা-সংস্কৃতি, কর্মক্ষেত্রে, অভিযানে, বিজ্ঞান গবেষণায় প্রভৃতি কোন ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নেই। এমন অনেক নারীদের কথা আপনারা জানেন, আমিও জানি। আবার এ-ও দেখেছি, বাহ্য জগতের সবক্ষেত্রে কৃতি নারীদের অন্তর্জগতের হাহাকার। মনের মত সন্তান না পাওয়ার জ্বালায়, সন্তানকে মনের মত করে মানুষ করতে না পারার জ্বালায়, থ্যালাসেমিয়া, স্কিজোফ্রেনিয়া, লিউকোমিয়া প্রভৃতি নামের দুরারোগ্য ব্যাধির জ্বালায় জ্বলতে গিয়ে জীবনের সুখ-শান্তির অনুভূতিটা হারিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছে।—যেন, ‘সব আছে তবু নেই’। মাতৃত্ব-পিয়াসী একজন সন্তানহীনা নারীর যে কি কষ্ট, কি বেদনা, তা ভুক্তভোগী ভিন্ন কেউ উপলব্ধি করতে পারবে না। একটি সন্তান পেতে সব-রকমের চিকিৎসা করার পরও যখন সন্তান-লাভে ব্যর্থ হয়, তখন অনেক টাকা খরচ করে গর্ভ ভাড়া নেয়, দত্তক সন্তান নেয়।—এমন অনেক কিছু করেন। ওই সব সমস্যার স্রষ্টাও কিন্তু নারী। ‘আত্মানং বিদ্ধি।’ (know thyself বা নিজেকে জানা)-র শিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে সব কিছুকে জেনেছে, জানতে পারেনি নিজেকে। নিজের নারীত্বের-পূর্ণতার বিষয়ে জানা হয়ে ওঠেনি।
    একটা উন্নত প্রজাতির কোন গাছ লাগাতে গেলেও কিছু প্লান-প্রোগ্রাম নিতে হয়। আগে থেকে জমি নির্বাচন করতে হয়, উপযুক্ত সার দিয়ে জমি তৈরি করতে হয়, তারপর মাটির উপযুক্ত বীজ বা চারা বসাতে হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় বর্তমান যুগের বেশিরভাগ লেখাপড়া শিখতে যাওয়া নারীরা, পুরুষের সাথে পা-মিলিয়ে, গলা-মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ‘হোক-কলরব’ আন্দোলনে পারদর্শী হলেও, নিজের আত্ম-বিস্তারের জন্য আবশ্যিক আত্ম-সম্পোষণ, আত্ম-সংরক্ষণ করার জন্য নির্দিষ্ট নারীত্বের অস্তিত্ব রক্ষার জমিটুকুকে সংরক্ষণ করা বিষয়ে উদাসীন। যারফলে কালেক্রমে মনুষ্যত্ব সম্পন্ন অসৎ-নিরোধে তৎপর সন্তান থেকে সভ্যতা বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব রামকৃষ্ণদেব, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নেতাজী সুভাষচন্দ্র প্রমুখ মনীষীদের জন্মদাত্রীগণ ক্যাম্পাসে, অফিসে, মিটিংয়ে, মিছিলে কোন ‘কলরব’ না করেই, সনাতনী নারীধর্ম পালন করে রত্নগর্ভা হয়েছিলেন। ভারতীয় কৃষ্টি প্রদত্ত প্রকৃষ্ট-গতির পথ ভুলে, তথাকথিত প্রগতির নামে ছুটে চলা নারীবাদিরা বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে দেখতে পারেন।
    জগতের সকল অশান্তির সুতিকাগৃহ হচ্ছে যৌন বিকৃতি। ভালকরে খোঁজ নিলে দেখা যাবে সব গণ্ডগোলের জন্ম হয় অনিয়ন্ত্রিত যৌনতা থেকে। অবৈধ যৌন-সংশ্রব মস্তিস্কে এমন সংস্থিতি এনে দেয় যার অভিভূতিকে অতিক্রম করা দুরূহ হয়ে ওঠে। তাই তো শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের সাবধান করে বাণী দিলেন।
    যোনি যোগে ঢুকলে পাপ,
    রোখাই কঠিন তাহার দাপ।
    শাসন সংস্থা যেমনই হোক
    যাতেই মাথা ঘামাও না,
    যৌন-জীবন শুদ্ধ না হলে
    দেশের জীবন টিঁকবে না।
    ব্যষ্টি-চরিত্র যৌনজীবন
    ব্যভিচার যেথা উচ্ছলা
    জনজীবন সে দেশে প্রায়ই
    চরিত্র দোষের পিচ্ছলা;
    অন্তরালে অদৃষ্ট তখন
    ভাসতে থাকে চোখের জলে
    আপদ তখন বিপদ নিয়ে
    সবার পিছু পিছু চলে।
    জনন-বিভ্রাট যেই এলো রে
    ক্রমে ক্রমে রাষ্ট্র ছেঁয়ে
    লাখ ঐশ্বর্য্য থাক না কেন
    আপদ সেথায় যাবেই বেয়ে।
    পরিবারকে উন্নতি বা অবনতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী প্রধানতঃ নারী। কথায় আছে, ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে। গুণবান পতি যদি থাকে তার সনে।।’ আদর্শ একজন পুরুষের সাহচর্যে নারীর হাতেই গড়ে ওঠে আদর্শ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র। নারীই হচ্ছে জাতির বল ও ভরসা। লক্ষী নারীদের উপরেই রয়েছে মহান জাতি গঠনের বিরাট দায়িত্ব। মহান আদর্শকে চরিত্রায়িত করে নারী যদি পরিবারকে সুন্দর ও সার্থক করে সাজিয়ে তুলতে পারে তবেই জগত-সংসার সুখের হয়। আদর্শ জাতি গঠন করার দায়িত্ব নারীদের উপর থাকার জন্য তাদের শিশুকাল থেকেই ভালো মা হবার সাধনায় অগ্রসর হতে হবে। নারী জীবনের বিভিন্ন পর্যায় আছে। ওই পর্যায়গুলো ভগ্নি, বধূ, স্ত্রী, জায়া, জননী ও গৃহিনী ও জননীত্ব। ওগুলোকে সমৃদ্ধ নারীরাই করতে পারেন, পুরুষেরা নয়। স্নেহ, মায়া, মমতা ও ভালবাসার দ্বারা পূর্ণ নারীর হৃদয়। নারীরা ইচ্ছা করলেই তাঁর অন্তর্নিহিত বিভিন্ন শক্তির দ্বারা জাগিয়ে তুলতে পারেন বিশ্বকে। সুসন্তান উপহার দিয়ে। যেমনটি দিয়েছিলেন হিরণ্যকশিপুর পত্নী কয়াধু, প্রহ্লাদকে জন্ম দিয়ে।
    কু-জনদের জন্ম নিরোধ করে, কিভাবে সু-জনদের মা হওয়া যায়, সেই শিক্ষায় নারীদের শিক্ষিত করার জন্য শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ‘নারীর নীতি’, ‘নারীর পথে’, ‘দেবীসূক্ত’, ‘বিবাহ-বিধায়না’ শিরোনামের গ্রন্থরাজির উপহার রেখে গেছেন। সেই উপহারের ডালিগুলোকে কাজে লাগাতে পারলে শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণজনিত সমস্যা নয়, জগতের সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।
    পরিশেষে বিশ্বশান্তির আহ্বায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের একটি বাণী পাঠকদের উপহার দিয়ে যবনিকা টানলাম। জয়গুরু! প্রণাম! বন্দে পুরুষোত্তমম্! tapanspr@gmail.com
    ——
    ** জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ভাবনা **
    ।। লক্ষ্মী নারী ।।
    সংকলক—তপন দাস

নারী হইতেই জাতি জন্মে ও বৃদ্ধি পায়, তাই নারী যেমন ব্যষ্টির জননী তেমনই সমষ্টিরও ;– আর, এই নারী যেমন ভাবে আবিষ্ট থাকিয়া যেমন করিয়া পুরুষকে উদ্দীপ্ত করে পুরুষ হইতে সেই ভাবই নারীতে জন্মগ্রহণ করে ; তাই, নারী মানুষকে প্রকৃতিতে মূর্ত্ত ও পরিমিত করে বলিয়া জীব ও জগতের মা ;–তাহ’লেই বুঝিও– মানুষের উন্নতি নারীই নিরূপিত করিয়া দেয় ; তাই নারীর শুদ্ধতার উপরই জাতির শুদ্ধতা, জীবন ও বৃদ্ধি নির্ভর করিতেছে– বুঝিও, নারীর শুদ্ধতা জাতির পক্ষে কতখানি প্রয়োজনীয় ! ১৭৬ ।’’
(চলার সাথী গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী)