।। রথযাত্রা ও আমরা ।।

** রথযাত্রা ও আমরা **
এবার পশ্চিমবঙ্গের সমুদ্র সৈকত দীঘার জগন্নাথদেবের মন্দিরকে কেন্দ্র করে রথযাত্রার আগে থেকেই প্রসাদ বিতরণ সুরু হয়ে গেছে—রেশন দোকান এবং জন প্রতিনিধিদের মাধ্যমে।

প্রসাদ=প্র + √ সদ্ + অ। অর্থাৎ , ইন্দ্রিয় মাধ্যমে যা গ্রহণ করলে অন্তর শুদ্ধ, বুদ্ধ, পবিত্র ও প্রসারিত হয়। শরীর, মন, প্রাণ হৃষ্ট হয় তাই প্রসাদ। যদিও আমরা দেবী-দেবতার, সাধু-মহাপুরুষ, গুরুদেবের উদ্দেশ্যে নিবেদিত খাদ্যদ্রব্যকে সাধারণত প্রসাদ বলে জানি এবং মানি। তাই বলে যেমন-তেমন খাদ্যবস্তু প্রসাদ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়, সাত্ত্বিক খাদ্যদ্রব্য হতে হবে। একমাত্র আস্ত টাটকা-তাজা সুস্থ ফলই সাত্ত্বিক খাদ্যদ্রব্য হিসেবে বিবেচিত।

ফল ব্যতীত পক্কান্ন প্রসাদ দিতে হলে প্রসাদ প্রস্তুতকারিকে এবং প্রসাদ পরিবেশনকারিকেও সদদীক্ষায় দীক্ষিত এবং সাত্ত্বিক চলনে সিদ্ধ হতে হবে।
স্বয়ং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন…………….
“বিষয়ীর অন্ন খাইলে মলিন হয় মন,
মলিন মন হৈলে, নহে কৃষ্ণের স্মরণ।।

                       * * *

প্রসাদ পরিবেশন করার যোগ্যতা :
সাত্ত্বিক আহার গ্রহণকারী দীক্ষিত ভক্তদের দ্বারা প্রসাদ প্রস্তুত এবং পরিবেশন করা উচিত। উভয়কেই সুস্থ, শুদ্ধচিত্ত, পবিত্র, নম্র এবং পরিচ্ছন্ন হতে হবে।
                          * * *
যাইহোক, সবাইকে শুভ রথযাত্রার আগাম যথাযথ শ্রদ্ধা, ভক্তি ও প্রণাম জানিয়ে সবিনয় নিবেদন—-
জগন্নাথদেবকে কেন্দ্র করে বা জগন্নাথদেবের নামে যে রথযাত্রা উৎসব পালিত হয় সেই রথ-যানে তিনজন উপবিষ্ট থাকেন—জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা।

এই জগন্নাথদেবকে আমরা শ্রীকৃষ্ণ নামে জানি, বলরাম হলেন তাঁর দাদা আর সুভদ্রা হলেন বোন বা ভগ্নী। কোন এক সময়ে পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ দাদা ও বোনকে নিয়ে সেইসময়ের শ্রেষ্ঠ চক্রযান রথ-এ আসীন হয়ে মাসীর বাড়িতে গিয়েছিলেন। এই হচ্ছে রথযাত্রার প্রতিপাদ্য বিষয়।

পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণের ভগ্নী সুভদ্রা পিত্রালয়ে (দ্বারকা) এলে তিনি দুই দাদার কাছে নগর ভ্রমণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তখন কৃষ্ণ ও বলরাম সুভদ্রার সঙ্গে রথে করে ঘুরতে বের হন। তার পর থেকেই না কি রথযাত্রা আয়োজিত হয়ে আসছে।

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের পাশে গুন্ডিচা মন্দিরে কৃষ্ণের মাসিবাড়ি। (দ্বারকা থেকে পুরীতে!) তাঁদের মাসি তিন ভাই-বোনকেই বাড়ি আসার আমন্ত্রণ জানান। তার পরই রথযাত্রা করে কৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রা ১০ দিনের জন্য মাসির বাড়ি ঘুরতে যান।

অন্য এক কাহিনি অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণের তিরোভাবের পর তাঁর শব দ্বারকা নগরী নিয়ে আসা হলে ভাইয়ের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ বলরাম তাঁর মরদেহ নিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এ দেখে সুভদ্রাও সমুদ্রে ঝাঁপ দেন। এই সময়কালে পুরীর রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন স্বপ্ন দেখেন যে, শ্রীকৃষ্ণের শরীর সমুদ্রে ভাসছে। শ্রীকৃষ্ণের বিশাল প্রতিমা ও মন্দির তৈরির স্বপ্নাদেশ পান তিনি। কৃষ্ণের সঙ্গে সঙ্গে বলরাম, সুভদ্রার কাঠের মূর্তি তৈরির স্বপ্ন পান তিনি। কৃষ্ণের অবশিষ্টাংশ বা হাড় সেই প্রতিমার পিছনে ছিদ্র করে রাখা হয়, এমনও স্বপ্নাদেশ দেওয়া হয় রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে। তার পরই পুরীর মন্দির তৈরি করা হয়। বিশ্বকর্মা শুরু করেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার কাঠের মূর্তি তৈরির কাজ। কিন্তু তাঁর শর্ত পূর্ণ না-হওয়ায় তিনি মূর্তি অসম্পূর্ণ রেখেই অন্তর্ধান হয়ে যান। রাজা সেই মূর্তির মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের অস্থি রেখে স্থাপন করে দেন।

প্রবাদ যাইহোক, “যেনাত্মন্ স্তথান্যেষাং জীবনংবর্দ্ধনাঞ্চপী ধ্রীয়তে স ধর্ম্ম।” (অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম বলে জানিস্ তা’কে।)— পু্রুষোত্তম প্রদত্ত ধর্মের এই সংজ্ঞা মেনে ধর্ম লাভ নাই বা হোক রথযাত্রার সাথে এক আবেগ, উন্মাদনা, নস্টালজিয়া, দীর্ঘদিন ধরে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

আর ধর্ম অর্জন যদি করতে হয়, তাহলে কিন্তু প্রভু জগন্নাথ পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের নিদেশ মেনে চলতেই হবে।

পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের শ্রেষ্ঠ অবদান যদি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা হয়, উক্ত গীতা গ্রন্থে উক্ত হয়েছে “কর্মে তোমার অধিকার, ফলে নয়।” অর্থাৎ বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বলা অনুযায়ী “করাই পাওয়ার জননী, না করে যে পেতে চায়/দুঃখ তার পিছে ধায়।” সেই শ্রীকৃষ্ণের স্নানযাত্রার দৃশ্য দর্শনে মুক্তি লাভ হয়, এ ধরণের আজগুবি কাহিনী প্রচারণাও গীতা বিরোধী কাজ। আর এই কাহিনীর প্রেক্ষাপটে শ্রীকৃষ্ণকে রাধা নামের নারীর প্রতি বিশেষ প্রণয় প্রকাশ করা হয়েছে। সেটাও শ্রীকৃষ্ণের গীতা এবং ভাগবত বিরোধী কাজ। তাই কোনকিছু প্রচার করার পূর্বে বিশেষভাবে ভেবে দেখা উচিত। আমি যা করছি, তা কি ধর্মসঙ্গত? যাইহোক এবার একটু শ্রীকৃষ্ণের কথা জানা যাক। পণ্ডিতদের গবেষণা থেকে প্রমাণিত, (সূত্র : ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র রচিত শ্রীকৃষ্ণ চরিত্র।) শ্রীকৃষ্ণ ১১ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে কংসকে বধ করেন। অথচ বেশীরভাগ কৃষ্ণভক্তগণ বৃন্দাবন লীলার, রাসলীলার নামে যে যুবক কৃষ্ণকে মানবী রাধার সাথে যুগলবন্দী করে পরকীয়া কামুক রূপে চিত্রিত করে চলেছেন, সে কৃষ্ণ কোন কৃষ্ণ? সে কি বৃষ্ণিসিংহ দেবকীনন্দন, না অন্য কেউ ? সে কি গীতার প্রবক্তা পার্থসারথী, না অন্য কেউ? কারণ, বৈষ্ণবদের প্রামাণ্য গ্রন্থ ভাগবতে রাধা-কৃষ্ণের ওইসব অবৈধ পরকীয়া-লীলার কোন কাহিনী লিপিবদ্ধ নেই। অথচ কৃষ্ণের প্রচারকেরা গীতার কথা বলেন, ভাগবতের কথা বলেন, অথচ আয়ান ঘোষের ঘরণী রাধাকে শ্রীকৃষ্ণের সাথে এক অবৈধ সম্পর্কের সাথে জুড়ে নিয়ে কৃষ্ণনাম করতে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণের যে বদনাম করে চলেছেন, সেটাও তাদের বোধে ধরা পড়ে না, এমনই ধার্মিক তা’রা ! বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন—‘‘শুনেছি ভাগবতে রাধা ব'লে গোপিনী নেই। আমি বুঝি, রাধা মানে সেরা সৃষ্টি-রচয়িতা শক্তি। শব্দের থেকেই সব। কতরকমের শব্দ শোনা যায়। ওঁ-অনুভূতির পূর্বে দারুণ বম্ বম্ বম্ শব্দ হয়। দুনিয়াটা যেন ফেটে চৌচির হ'য়ে যাবে। কিছু থাকবে না, সব ধ্বংস হ'য়ে যাবে। সত্তাকেও বিলুপ্ত ক'রে দেবে। এমন শব্দ, সব যেন টুকরো টুকরো হ'য়ে, রেণু রেণু হ'য়ে উড়ে যাবে। সে কী ভীষণ অবস্থা! ভয় বলি, সত্তার ভয় যে কী তখন বোঝা যায়! সত্তা বুঝি এই মুহূর্তে গুঁড়িয়ে দিল। তখন বোঝা যায় দয়ালের দয়া, যে দয়ায় টিকে আছি এই দুনিয়ায়। ওঁ-অনুধাবনে রং আসে। রং-এ মনোনিবেশ করলে পিকলু বাঁশীর মত শব্দ হয়। দোল আসে। এক অবস্থায় motion and cessation (গতি এবং বিরতি)-এর মত বোধ হয়। স্বামীর অনুভূতি যেন to and from (একেবার সামনে একবার পেছনে হচ্ছে)-এমনতর বোধ করা যায়। ইলেকট্রিক ব্যাটারি দিলে যেমন শব্দ পাওয়া যায় না, ভিতরে বোধ হয়, রাধাও ঐ রকম সত্তা দিয়ে মানুষ হয়। শেষ দিকে আসে একটা পরম শান্ত অবস্থা। আমাদের এই সৎনাম সব মন্ত্রের বীজস্বরূপ। সব বীজের সত্তা হ'লো কম্পন। আর কম্পনের গঠনতন্ত্র অনুভব করা যায় এই নামের মধ্যে। রেডিওর যেমন শর্ট ওয়েভ, মিডিয়াম ওয়েভ এবং নানা মিটার আছে, অনুভূতির রাজ্যেও সেই রকম সব আছে। এগুলি ফালতু কথা না, এগুলির সত্তা আছে। যে সাধন করে সেই বুঝতে পারে। হ্রীং ক্রীং ইত্যাদির স্তরে-স্তরে কত শব্দ এবং তার সঙ্গে-সঙ্গে জ্যোতি ভেসে ওঠে। আর একটা কথা, পরীক্ষা করতে গেলে সদগুরুকে ধরা যায় না। কামনা নিয়ে গেলেও তাঁকে পাওয়া হয় না। কামনা ত্যাগ ক'রে ধরলে তখন তাঁকে পাওয়া যায়। কামনা নিয়ে তাঁতে যুক্ত হ'তে গেলে কামনার সঙ্গে যুক্ত হই, তাঁতে যুক্ত হ'তে পারি না। নিষ্কামের কথা কয়, তার মানে গুরুই আমার একমাত্র কাম্য হবেন, অন্য কোন কামনা থাকবে না। তখনই তাঁকে পাওয়া যাবে।’’ (আ. প্র. ১৫শ খণ্ড, পৃঃ ২০০-২০১ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী)

।। পুরীর জগন্নাথদেব প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।

শ্রীশ্রীঠাকুর— ………. “পুরীতে জগন্নাথের মন্দিরে যদি যাও, তাহ’লে দেখতে পাবে জগন্নাথের হাত নেই। জগন্নাথ জনে-জনে হাত বিলিয়ে নিজে হাতহীন হ’য়ে ব’সে আছেন। আমাদের উপর তাঁর কোন হাত নেই। কিন্তু যেই আমরা তাঁকে আমাদের
হাত দু’খানি দিয়ে নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধ’রবো অমনি আমরা তাঁর হাতে চ’লে যাব। তখন তাঁর ইচ্ছায় আমরা চালিত ক’রবো নিজেদের। এমনি ক’রেই আমরা সেই মঙ্গলের অধিকারী হবো— যে-মঙ্গল তিনি আমাদের দিতে চান”।
(আলোচনা প্রসঙ্গে, নবম খণ্ড, ৫/৯/১৯৪৭)

শ্রীশ্রীঠাকুর— জগন্নাথদেবের যে মন্দির আছে ওখানে, তা’ ছিল একটা culture–এর (কৃষ্টির) কেন্দ্র। সে যে কত আগের থেকে ছিল তার ঠিক পাওয়া যায় না। চৈতন্যদেবের সময় থেকে না, তারও আগে থেকে। ওখানে একটা বিরাট culture
(কৃষ্টি) ছিল। তার সাক্ষী দিচ্ছে জগন্নাথদেবের মন্দির, ভুবনেশ্বরের মন্দির, কোনারকের মন্দির। ………. জগন্নাথদেবের ভোগের মধ্যে আছে পান্তাভাত। পান্তাভাতে যথেষ্ট পরিমাণে বি-ভিটামিন থাকে। ওতে একটা flavor (মৃদু গন্ধ)
থাকে, ওটা health–এর (স্বাস্থ্যের) পক্ষে খুব উপকারী। পান্তাভাত, কলা, দই—খুব উপকারী অথবা পান্তাভাত, কাঁচালঙ্কা আর নুন।”
(দীপরক্ষী, ১ম খণ্ড, ২৭মে ১৯৫৩)

।। রথযাত্রা উপলক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ-এর ‘ভক্তিভাজন’ ।।
রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম–

ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম ।

পথ ভাবে ‘আমি দেব’, রথ ভাবে ‘আমি’.

মূর্তি ভাবে ‘আমি দেব’–

হাসে অন্তর্যামী ।।
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

।। অন্তর্যামী অধিষ্ঠিত রথকে চালাব কেমন করে ।।

आत्मानं रथिनं विद्धि शरीरंरथमेवतु ।

वुद्धिं तु सारथिं विद्धि मनः प्रग्रहमेव च ।।

(कठ उपनिषद 3/57)

উপনিষদ অনুযায়ী মানবদেহকে রথের সাথে তুলনা করা হয়েছে । এই দেহরথকে চালায় ছটি ঘোড়া বা ষড়রিপু । বাস্তবে যে কোন ঘোড়াকে চালনা করে একজন সহিস বা সারথি । সারথির লাগাম নিয়ন্ত্রণের উপর দক্ষতা যদি না থাকে ঘোড়া তার সওয়ারকে না জানি কোন অকুল গরল পাথারে নিয়ে চলে যাবে । তাই আমাদের দেহরথের ঘোড়াগুলোর প্রগ্রহ বা লাগামকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সদগুরু রুপী একজন উপযুক্ত সারথির দরকার । যেমনটা ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ, মহাবীর অর্জুনের রথের সারথি । তেমনিভাবে আমাদের দেহরথটাকে যদি চালাতে পারি সার্থক হবে আমাদের রথ চালনা উত্‍সব রথযাত্রা । নান্যপন্থা বিদ্যতে হয়নায় ।

প্রচলিত রথযাত্রার যাত্রী হয়েও আমরা যারা ত্রিতাপ জ্বালায় জ্বলছি, আমাদের দেহরথটাকে ঈশ্বরপ্রাপ্তির নির্দিষ্ট গন্তব্য পথে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছি, এ-যুগের শ্রীকৃষ্ণ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সেইসব বিকৃতাচারী ধর্মের ধ্বজাধারীদের উদ্দেশ্যে বললেন—
“ভগবান, ইষ্ট বা ধর্ম্মের মৌখিক স্তুতির ভিতর-দিয়ে যা’রা ধর্ম্মবিরোধী কাজ করে, তা’রা হ’ল সব চাইতে বড় শয়তানের দূত–প্রকৃষ্ট লোক-দূষক। ১২৫ । (শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭)’’
‘‘অনেকে শ্রীকৃষ্ণকে মানে, গীতা মানে, অথচ বর্ণাশ্রম মানে না। গীতার কে কি ব্যাখ্যা করেছেন সেই দোহাই দেয়। কিন্তু গীতার বক্তা শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও বাণী দেখে চতুর্বর্ণ সম্বন্ধে তাঁর মত আমরা কি বুঝি? এ সম্বন্ধে কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না, গীতা শ্রীকৃষ্ণের জীবনেই জীবন্তভাবে পরিস্ফুট। গীতায় প্রত্যেক বর্ণের স্বভাবজ কর্ম সম্বন্ধে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। (আ. প্র. ১৪/১১৮)
গীতোক্ত সেই কর্ম বাদ দিয়ে, আহারশুদ্ধি, সত্তাশুদ্ধি, প্রজনন-শুদ্ধির বিধান উপেক্ষা করে আবেগ-প্রবণ হয়ে রথযাত্রার নামে, রথের রশি ধরে টানার উন্মাদনায় মেতে উঠে জীবনকে কতটুকু নন্দিত করা যাবে? কতখানি ধর্ম লাভ হবে?—সে হিসেব কষার কি প্রয়োজন নেই?
জয়গুরু। বন্দে পুরুষোত্তমম্!

YOGA Day

।। আন্তর্জাতিক যোগ-দিবসের শ্রদ্ধাঞ্জলি : যোগের সাথে যোগাযোগ ।।
***
অবশেষে হতাশার মাঝে একটু আশার সঞ্চার হলো জীবনপিয়াসী মানুষের মনে। ভাষা,
সম্প্রদায়, সাদা-কালো, ধনী-দরিদ্র ভেদাভেদ ভুলে দেশের গণ্ডী পেরিয়ে
আন্তর্জাতিক স্তরে স্থান করে নিয়েছে যোগ-সাধনা। আসন, ন্যাস, প্রাণায়াম
অভ্যাসে শরীর-মন-আত্মাকে একযোগে বাধতে ফি-বছর ২১শে জুন, উদযাপিত হয়ে
চলেছে আন্তর্জাতিক যোগ-দিবস। আপন-আপন আঙ্গিকে জৈন, বৌদ্ধ, খ্রীশ্চান,
মুসলমান প্রভৃতি সম্প্রদায়, নিজেদের মত করে যোগ-কে উপস্থাপনা করলেও
যোগ-শাস্ত্রের মৌলিকত্বের দাবিদার ভারতবর্ষ। ইতিপূর্বে ভারত সরকারের পক্ষ
থেকে Ministry of AYUSH, আন্তর্জাতিক যোগ-দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে এক
সর্বজনীন বার্তাও দিয়েছে—
“Yoga is not about exercise but to discover the sense of oneness with
ourselves, the world and nature.
Yoga is an invaluable gift of ancient Indian tradition. It embodies
unity of mind and body, thought and action; restraint and fulfillment,
harmony between man and nature and a holistic approach to health and
well-being.” —Ministry of AYUSH, Govt. of India
বৈদিক যুগে মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য তাঁর বিদূষী স্ত্রী মৈত্রেয়ীকে যোগ
সম্পর্কে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন—সংযোগো যোগ ইত্যুক্তো
জীবাত্মাপরমাত্মনোঃ।। —জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার সংযোগ স্থাপনের
মাধ্যম যোগ।
মহর্ষি পতঞ্জলি যোগ-কে চিত্তবৃত্তি নিরোধের মাধ্যম বলে উল্লেখ করেছেন।
যোগঃ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধঃ।
ভারতের অগ্নিপুরানে মন এবং আত্মার মিলনের মাধ্যম হিসেবে যোগকে উল্লেখ করা
হয়েছে। শৈবরা জীবের সাথে শিবের, বৈষ্ণবেরা জীবের সাথে পুরুষোত্তমের
মিলনের মাধ্যম হিসেবে যোগকে ব্যবহার করেন। সহজিয়া তান্ত্রিকেরা শিব ও
শক্তির মিলন, সহজিয়া বৈষ্ণবেরা রাধা ও কৃষ্ণের মিলন এবং সহজীয়া বৌদ্ধরা
প্রজ্ঞা ও উপায়ের মিলনের মাধ্যম হিসেবে যোগ-কে ব্যবহার করেন।

পরমপুরুষ শ্রীকৃষ্ণ যোগকে “যোগঃ কর্ম্ম সুকৌশলম্’’ বলে বর্ণনা করেছেন। পরমপিতার কাছে প্রার্থনা, আমরা সকলে যেন পরমপিতার সাথে যোগযুক্ত থেকে হিংসা ভুলে সবাইকে আপন করে নিতে পারি।

tapanspr@gmail.com

INTERNATIONAL YOGA DAY

** বিশ্ব যোগ দিবসের শ্রদ্ধার্ঘ্য **
।। যোগীর সাথে যোগাযোগ ‘‘যোগাৎ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধঃ’’ ।।
(পর্ব – ১)


‘যোগী’ বিষয়ে বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন,

“যোগী মানেই বুঝবেন—যে যুক্ত, যার যোগ আছে অর্থাৎ কিছু বা কাহাতেও টান
আছে,—এক-কথায় আসক্ত, কোন-কিছু বা কাহাতেও আসক্ত! আসক্তি থাকলে ভাবা,
করা, কওয়ায় মানুষের যেমন-যেমন যা’-যা’ হয়, তাই করাই হচ্ছে যোগী বা যুক্ত
বা অনুরক্ত মানুষের লক্ষণ। ……তাই, শাস্ত্রে যেখানেই যোগ বলে কথা আছে
সেখানেই বুঝতে হবে, সে-কথা বাস্তব কিছুতে যুক্ত হওয়ারই কথা। আর, এই যোগ
হলেই মানুষের চিত্তবৃত্তিনিরোধ হতে সুরু করে, কারণ, যাতে আমার টান যত
বেশী, আমার সাধারণ প্রবৃত্তিই হয় আমার সমস্ত বৃত্তি দিয়ে তাকে উপভোগ
করি—আর তার বাধা যেগুলি, সেগুলিকে এমনতরভাবে বিনিয়ে আমার এই উপভোগের
পথের কোনরকম বাধা না সৃষ্টি করে বরং তার সাহায্য করে এমনতরভাবে
নিয়ন্ত্রিত করতে একটা স্বতঃ-উৎসারিত ঝোঁক আমাদের থাকেই। তাই শাস্ত্রে আছে
“যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ’’। (কথাপ্রসঙ্গে, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৩)

।। যোগীর সাথে যোগাযোগ ‘‘যোগাৎ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধঃ’’ ।।
*
(পর্ব – ২)
আধ্যাত্মিক চেতনায় একনিষ্ঠ না হলে যোগের সাথে নিত্য-যুক্ত থাকা যায় না।
সে বিষয়েও শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের সচেতন করার জন্য বললেন, ‘‘গীতায় আছে,
‘তেষাং জ্ঞানী নিত্যযুক্ত একভক্তির্বিশিষ্যতে’………একভক্তি না হলে
হবে না । পঁচিশ ঠাকুর করলেই মুস্কিল, বহু-নৈষ্ঠিক যারা তাদের জীবনে কোন
সঙ্গতি থাকে না, তারা আস্তে আস্তে পাগলাটে হয়ে ওঠে । বহু-নৈষ্ঠিক মানে
মূলতঃ তার কিছুতেই নিষ্ঠা নেই, নিষ্ঠা আছে রকমারি প্রবৃত্তি-স্বার্থে,
তাই আত্মনিয়ন্ত্রণ বলে জিনিসটা তাদের জীবনে ঘটে ওঠে না, ফলে অভিজ্ঞতা বা
জ্ঞানের উন্মেষ হয় না । ভক্তি ছাড়া, একানুরক্তি ছাড়া জ্ঞান ফোটে না ।
…..একভক্তি যার আছে… তার জ্ঞানের নাড়ী হয় টনটনে । কথায় বলে
প্রহ্লাদমার্কা ছেলে. ……আগুনে, জলে, পাহাড়ে, পর্ব্বতে, অন্তরীক্ষে
কোথাও ডরায় না ।…. তাই ভক্তির চাইতে বড় কামনার বস্তু আর নেই ……।’’
( আ. প্র. ২য় খন্ড, ২০. ১২.


।। যোগীর সাথে যোগাযোগ ‘‘যোগাৎ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধঃ’’ ।। (পর্ব – ৩)
নিজেকে যোগযুক্ত রাখতে শ্রীশ্রীঠাকুর সর্বদা সচেতন থাকতেন। একদিন একটা
সুপুরীর টুকরো মুখে দিতে গিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে নীচে পড়ে যায়। ঠাকুর খাট
থেকে নেমে সুপুরীর টুকরোটাকে খুঁজে পিকদানিতে ফেলে হাত ধুয়ে খাটে উঠে
বসেন। আর একটা সুপুরীর টুকরো মুখে দেন। সামান্য এক টুকরো সুপুরী, তা-ও
আবার খুঁজে নিয়ে ফেলে দিলেন। এই সামান্য কাজটা তো যে কেউ করতে পারত, তার
জন্য খাট থেকে নেমে কষ্ট করে সুপুরী খুঁজতে গিয়ে অমূল্য সময় নষ্ট করার
পেছনে কোন লাভজনক যুক্তির খোঁজ না পেয়ে উপস্থিত যুক্তিবাদীরা অনুযোগ করলে
ঠাকুর বলেছিলেন, তোমাদের হিসাবে আমি বেকুব, আমার হিসাবে আমি কিন্তু
চালাক। আমার হাতের সাথে মুখের স্নায়বিক যোগসূত্র ছিন্ন হবার ফলে আমি
যোগভ্রষ্ট হই, সুপুরীটা নীচে পড়ে যায়। প্রারব্ধ কর্মফলে ওই অপারগতা যাতে
যোগ না হয় তাই একটু সময নষ্ট করে নিজের ত্রুটি নিজেই সংশোধন করে নিলাম।


।। যোগীর সাথে যোগাযোগ ‘‘যোগাৎ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধঃ’’ ।। (পর্ব – ৪)
যোগ বোঝাতে গিয়ে ঠাকুর একদিন গল্পচ্ছলে বলেছিলেন, এক গোয়ালার অনেকগুলো
গোরু ছিল। ওই গোরুগুলোর দুধ এবং দুগ্ধজাত ছানা, দৈ, ঘোল, মাখন, ঘি নিজেরা
খেত, পাড়াপড়শীদেরও দিত। গোয়ালার বয়স হওয়াতে ছেলেকে একদিন একটা পাঁচন হাতে
দিয়ে গোরু চরাবার ভার দেয়। ছেলে মাঠে নিয়ে গোরুগুলোকে চরতে দিয়ে দেখল,
একটা পাঁচনের লাঠি দিয়ে কিছুতেই গোরুগুলোকে বাগে আনতে পারছে না।
এদিক-ওদিক চলে যাচ্ছে। তাই সে ভাবল, একটা পাঁচন দিয়ে সব গোরু সামলানো
যাবে না। সে তখন একমনে এক-একটা গোরুর জন্য আলাদা আলাদা পাঁচন বানাতে
শুরু করলো। পাঁচন বানানো শেষ করে গোরু সামলাতে গিয়ে দেখে নির্দিষ্ট
স্থানের কাছাকাছি গোরুগুলো নেই, চরতে চরতে অনেক দূরে দূরে জঙ্গলে চলে
গেছে। ওদিকে বেলা গড়িয়ে গোধূলি-প্রায়। ছেলে নিরুপায় হয়ে কাঁদতে কাঁদতে
বাবাকে গিয়ে সব কথা খুলে বললে বাবা কোন তিরস্কার না করে ছেলেকে বুঝিয়ে
বলেন, “বাপু, এক পাঁচনেই লাখ গোরু ঠেকানো যায়। যার যেমন দরকার, তেমনতর
ঠক্কর মারলেই তো হয়! তোমার এই অতিবুদ্ধি সব বেসামাল করে ফেলেছে।’’
(কথাপ্রসঙ্গে, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৪) অবশেষে বাবার কাছ থেকে গোরুর বৈশিষ্ট্য
অনুযায়ী ঠক্কর মারার কায়দা শিখে ওই এক পাঁচনের সাহায্যেই গোরুগুলোকে
বাগে আনতে শিখে যায়।
ওই ঠোক্কর মারার কায়দা যিনি শেখাতে পারেন তিনিই ঠাকুর, তিনিই যোগসিদ্ধ
গুরু। যোগসিদ্ধ গুরুর কাছ থেকে কাকে, কখন, কতটুকু ঠোক্কর কিভাবে মারতে
হবে সেই কায়দা একবার শিখে নিতে পারলে আমাদের বিশৃঙ্খল ইন্দ্রিয়গুলোকে
একমুখী আসক্তির সাথে যুক্ত করে যোগ-কে উপলব্ধি করা যায়। তাহলে পালের
গোরুগুলো পালেই থাকবে, বেশী কায়দা করতে গেলে গোরুগুলো পালছাড়া হয়ে যাবে।


।। যোগীর সাথে যোগাযোগ ‘‘যোগাৎ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধঃ’’ ।। (পর্ব – ৫)
যোগসিদ্ধ গুরু শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর নিত্যলীলায় যোগশাস্ত্রে
বর্ণিত আসন-মুদ্রাদি তিনি কোন কালেই অভ্যাস করেন নি। তিনি ছোটবেলা থেকেই
নামধ্যান করতেন। তিনি তাঁর ভাগবত আন্দোলন কীর্তন দিয়ে শুরু করেছিলেন।
কীর্তন করতে করতে সমাধিস্থ হতেন। সেই সময় যোগশাস্ত্রে বর্ণিত সকল ধরণের
আসন-মুদ্রাদি অবলীলায় করতেন। তিনি কীর্তনের মাধ্যমে অনেকানেক পালছাড়াদের
পালে ভেড়ালেন। তারা আবার যাতে পালছাড়া না হয়ে পড়ে তারজন্য কাজে মাতিয়ে
দিয়ে গড়ে তুললেন ভারতীয় আর্য্য ভাবধারার নিদর্শন স্বরূপ এক আদর্শ
প্রতীকী রাষ্ট্র—হিমাইতপুর সত্সঙ্গ আশ্রমে। ব্যক্তি, দম্পতি, গৃহ, সমাজ
ও রাষ্ট্র জীবনকে শুদ্ধ-বুদ্ধ-পবিত্র করে এক যোগে বাধতে দীক্ষা, শিক্ষা,
বিবাহ, কৃষি ও শিল্পের নবীকরণ করলেন।
শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাগবত আন্দোলনের কীর্তনযুগের সাধকেরা কীর্তনের এবং
নামের শক্তি সঞ্চারণা করে রোগ-শোক-ব্যাধি-জরা-য় জর্জরিত,
প্রবৃত্তি-পীড়িত মানুষদের স্বাভাবিক জীবনে অধিষ্ঠিত করে অমৃতের সন্ধান
দিয়েছিলেন। অনুরূপভাবে তাণ্ডবনৃত্যে কীর্তন, আর নিয়ম করে নামধ্যান করতে
পারলে নিজেকে এবং পরিবেশকে সবদিক দিয়ে যে সুস্থ রাখা সম্ভব, তা বলাই
বাহল্য।
জীবাত্মাকে পরমাত্মার সাথে প্রতিনিয়ত যোগযুক্ত রাখতে শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর
অনুগামীদের একটা ছোট্ট নিদেশ-বাণীতে সব বুঝিয়ে দিলেন।
ঊষা-নিশায় মন্ত্রসাধন
চলাফেরায় জপ
যথাসময়ে ইষ্টনিদেশ
মূর্ত্ত করাই তপ।
মন্ত্র সাধনের জন্য সকাল-সন্ধ্যায় নিয়ম করে ধ্যানাভ্যাস করা। প্রতিবার
ধ্যানান্তে ‘আমি অক্রোধী, আমি অমানী’ ইত্যাদি স্বতঃ-অনুজ্ঞার অর্থগুলোকে
আয়ত্ত করতে পারলে প্রবৃত্তির নিগ্রহ থেকে সহজেই মুক্তি লাভ করা যায়।
ধ্যান করার পর দিগন্তের দিকে, সবুজের দিকে তাকালে চক্ষুর দৃষ্টি ভাল
থাকে। চলাফেরায়, কাজেকর্মে, শয়নে-স্বপনে ইষ্টে অনুরাগ সমন্বিত হ’য়ে নামজপ
করার অভ্যাসে পরমাত্মিক শক্তির স্বারূপ্য লাভ হয়। নিয়মিত শবাসন করলে
হৃদরোগ হবার আশঙ্কা থাকে না। নিয়মিত থানকুনি পাতা খেলে শরীর বিধানের
রেচনক্রিয়া সুস্থ থাকে। সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার, মাসান্তে কমকরে একটি
দিন, হবিষ্যান্ন গ্রহণ, পাতিত্য কর্ম থেকে ত্রাণ পেতে শিশু প্রাজাপত্য,
প্রাজাপত্য এবং মহাসান্তপন ব্রত পালনে শরীর-মনের অসঙ্গতি দূর হয়, শরীর
নিরোগ থাকে।
নাম জপ করা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন—নাম করলে অনেক সময় জ্বর কমেও
যায়। কারণ, ব্যাকটেরিয়াগুলি পুড়ে যায়। রোগীর শরীর ছুঁয়ে নাম করলে
তাতেও রোগ ভাল হয়। ঐ জন্য কুষ্টিয়াতে একটা দালানে ত্রিশটা bed (শয্যা)
ছিল। রাধারমণ প্রভৃতি ছিল। রোগী আসলে শুশ্রূষা করত, ছুঁয়ে নাম করত। ডবল
নিউমোনিয়া ৩/৪ দিনে, এমনকি রাতারাতি সেরে যেত।
(সুত্র—আলোচনা প্রসঙ্গে ১৮ খণ্ড)


।। যোগীর সাথে যোগাযোগ ‘‘যোগাৎ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধঃ’’ ।। (পর্ব – ৬)
আমাদের আর্য্যহিন্দু-শাস্ত্র এবং যোগশাস্ত্র অনুসারে সূর্যোদয়ের পর
শয্যাত্যাগ করলে পাতিত্যদোষে দুষ্ট হতে হয়। এবং প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ
উপবাসী থাকার নিদেশ দেওয়া আছে। শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের ওই পাতিত্যদোষ থেকে
মুক্ত করে নিয়ত যোগযুক্ত রাখতে দিনচর্যার এক সহজ নিদেশ দিলেন অনুশ্রুতি
গ্রন্থের বাণীতে।
ঊষার রাগে উঠবি জেগে শৌচে শীতল হবি,
সন্ধ্যা–আহ্নিক জপ সাধনায় ঈশের আশিস লবি।
কুতুহলে পড়শি ঘুরে দেখবি সযতনে,
আছে কেমন কোথায় কে জন মন দিবি রক্ষণে।
তারপরেতে বাড়ী এসে শৌচে যথাযথ,
গৃহস্হালীর উন্নয়নী অর্জ্জনে হ’ রত।
স্নানটি সেরে আহ্নিক করে ক্ষুধামতন খাবি,
একটু চলে বিশ্রাম নিয়ে আগুয়ানে ধাবি।
এমনি তালে সচল চালে চলে সন্ধা এলে,
শৌচে শুদ্ধ হয়ে করিস আহ্নিক হৃদয় ঢেলে।
উন্নয়নের আমন্ত্রনী গল্প-গুজব শীলে,
হৃষ্টমনে আলোচনায় কাটাস সবাই মিলে।
পড়শী দিগের অভাব-নালিশ থাকেই যদি কিছু,
তার সমাধান যেমন পারিস করিস লেগে পিছু।
করন-চলন ধরন-ধারন যজন যাজন কিবা,
সকল কাজেই ইষ্টস্বার্থে চলিস রাত্রি-দিবা।
আদর-সোহাগ উদ্দীপনী কথায় কাজে ঝুঁকে,
স্বার্থ-কেন্দ্র সবার হবি ধরবি ইষ্টমুখে।
বিশ্রামেরই সময় গা-টি ঘুমল হয়ে এলে,
ইষ্ট-চলন মনন নিয়ে ঘুমে গা দিস ঢেলে।
(অনুশ্রুতি গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)
শ্রীশ্রীঠাকুর আহ্বানীসহ পূর্ণাঙ্গ প্রার্থনা মন্ত্রে আচমন, বাংলা সমবেত
প্রার্থনা ও বাংলা সমবেত প্রার্থনার অবশিষ্টাংশ সন্দর্ভে কতগুলো সহজ আসন
এবং প্রাণায়ামের নিদেশ রেখে গেছেন। সেই নিদেশ মেনে আমরা যদি সঠিক অনুশীলন
করতে পারি তাহলে সহজ-যোগে ব্যাধিমুক্ত হয়ে পরমাত্মার সাথে যোগযুক্ত থাকতে
পারব। (দ্রঃ ঋত্বিগাচার্য্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য প্রণীত অনুসৃতি,
যতি-ঋত্বিক শ্রীশরত্চন্দ্র হালদার প্রণীত যুগবাণী এবং সত্সঙ্গ পাব্লিশিং
কর্তৃক প্রকাশিত প্রার্থনা শিরোনামের গ্রন্থাবলী।)
।। যোগীর সাথে যোগাযোগ ‘‘যোগাৎ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধঃ’’ ।।
(পর্ব – ৭)
শ্রীশ্রীঠাকুরের এক অনন্য দৈবী অবদানের নাম ইষ্টভৃতি। ইষ্টের প্রীতির
জন্য কাউকে পীড়িত না করে, নিজে পীড়িত না হয়ে, বর্ণানুগ কর্মের সেবার
মাধ্যমে, বৃহত্তর পরিবেশে, ঘটে ঘটে ইষ্ট স্ফূরণের বা মঙ্গল প্রতিষ্ঠার
কাজে নিয়োজিত থাকার বিনিময়ে অযাচিত প্রাপ্ত অর্থ বা সম্পদকে বলা হয়েছে
অনুগ্রহ অবদান । ওই অনুগ্রহ অবদানকে ঠাকুর ‘দিন গুজরানী আয়’ অভিধায় ভূষিত
করেছেন। ওই ‘দিন গুজরানী আয়’-এর অগ্রভাগ প্রতিদিন পানাহার করার পূর্বে
ইষ্ট-নীতি ভরণের শপথ করে নিবেদন করার নাম ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ। যা
নিখুঁতভাবে পালন করলে শরীর-মন-আত্মার অসঙ্গতি দূর হয়। আর্য্যকৃষ্টির
সদাচার এবং বর্ণাশ্রম ধর্ম রক্ষিত হয়।
শ্রীশ্রীঠাকুরের আর একটি অনন্য দৈবী অবদানের নাম স্বস্ত্যয়নী ব্রত।
প্রবৃত্তির সব বিপাক এবং গঞ্জনা থেকে মুক্ত করে আমাদের স্মৃতিবাহী চেতনায়
সমৃদ্ধ রাখতে প্রবর্তন করলেন পঞ্চনীতি সমন্বিত স্বস্ত্যয়নী ব্রতের।
জড়-পদার্থে নির্মিত মন্দিরের পরিবর্তে নিজ-নিজ দেহটাকেই শ্রীবিগ্রহ
মন্দির জ্ঞানে পবিত্রতার সাথে রক্ষা করতে নিদেশ দিয়েছেন এই ব্রতের
মাধ্যমে, যেহেতু এই দেহের মধ্যেই রয়েছে পরমাত্মার আবাসস্থল। ভোগ,
দুর্ভোগ, উপভোগ, মুক্তি, পরামুক্তি, পরাগতি সবকিছুই এই দেহের মধ্যেই। যা
নাই ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে এই দেহভাণ্ডে। আমাদের আর্য্য শাস্ত্রাদিতেও
একথার উল্লেখ রয়েছে। শ্রীশ্রীঠাকুর জীবাত্মার মধ্যে সুপ্ত পরমাত্মাকে
জাগাতে বলেছেন নামের মাধ্যমে। ৫টি কর্মেন্দ্রিয়, ৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয়, মন,
বিবেক, জীবাত্মা, পরমাত্মাদির সমন্বয়ে সৃষ্টি এই দেহমন্দিরকে পবিত্র
রাখার, সুস্থ-স্বস্থ রাখার ভাগবত-বিধির পালন-পদ্ধতি সহজভাবে বিধায়িত
করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর এই ব্রতের মাধ্যমে।


।। যোগীর সাথে যোগাযোগ ‘‘যোগাৎ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধঃ’’ ।। (পর্ব – ৮)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রবর্তিত যজন, যাজন, ইষ্টভৃতি,
স্বস্ত্যয়নী, সদাচারাদি নিখুঁতভাবে পালন করার নাম ইষ্টকর্ম। ইষ্টকর্ম
ব্যতীত কর্ম অনিষ্টকর্ম। সেই ইষ্টকর্মে যুক্ত থাকলে সহজেই যোগসিদ্ধ হওয়া
যায়।
কাম-আবেশে স্ত্রী-পুরুষে
যেমন করে উপভোগ,
ইষ্টকাজে বাস্তবতায়
তেমনি হলে তবেই যোগ। সব প্রবৃত্তি রত থাকে ইষ্টকর্ম লয়ে, সেই তো যোগী, সে-ই সন্ন্যাসী কাল নত যার ভয়ে। কালাধীশ ঠাকুরের চাহিদামত ইষ্টকর্ম করে একবার যোগী হতে পারলে চিরতরে

নিশ্চিন্ত, কালের কবলে পড়ে ভীত হতে হবে না, কাল হবে যোগীর অধীন।
পরিশেষে জীবনপিয়াসী মানুষদের কাছে, ইষ্টপ্রাণ দাদা ও মায়েদের কাছে
পরমপিতার এই দীন সন্তানের কাতর আবেদন, আমরা যেন নিত্য ইষ্টকর্মের মাধ্যমে
পরমপিতার সাথে যোগযুক্ত থেকে পরিবেশের সব্বাইকে জীবনের জয়গানে যুক্ত করে

নিতে পারি। সবাই যেন মুক্তকণ্ঠে বলতে পারে, ‘আমি সবার, আমার সবাই।’

dast9674@gmail.com

এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ……..

** দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের তিরোধান দিবস স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য **
।। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ-এর শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সান্নিধ্য লাভ।।
বাংলা ১৩৩১ এর জ্যৈষ্ঠ মাস। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কলকাতার মাণিকতলার বাড়িতে, সাথে রয়েছেন মাতা মনোমোহিনী দেবী। বিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য দেশবন্ধুকে সাথে করে নিয়ে এসেছেন ঠাকুরের কাছে। দেশবন্ধু তখন অসুস্থ ছিলেন । ঠাকুরের সাথে প্রাথমিক আলাপচারিতার পর ঠাকুর দেশবন্ধুকে কিছুদিন বিশ্রাম নিতে পরামর্শ দিলেন দেশবন্ধু বলেন,—‘‘এমন একটা লোক নেই, যার উপরে কাজের দায়িত্ব দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত মনে বিশ্রাম নিতে পারি। উত্তরে ঠাকুর বলেন,—এমন লোক যদি আজও তৈরি হয়ে না থাকে, তাহলে একা দাশদা (ঠাকুর ওই নামে সম্বোধন করতেন।) কি দেশের স্বাধীনতা নিয়ে আসতে পারবেন ? আর যদি পারেনও, সে স্বাধীনতা কি টিঁকবে ?
দেশবন্ধু করনীয় কর্তব্য বিষয়ে জানতে চাইলে ঠাকুর উত্তরে বলেন, ‘‘আগে দেশের মানুষ তৈরি করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে আদর্শ মানুষ, আদর্শ পরিবার, আদর্শ পল্লী, আদর্শ সমাজ। তা’ না হলে স্বাধীনতা এলেও তাতে বিপদই সৃষ্টি হবে। ………… দেশের সমাজটা একেবারে rotten (পচা) হয়ে গেছে। ঘরে ঘরে অশান্তি, দাম্পত্য সুখ নাই, শিশুমৃত্যু—আজকাল বিবাহই ঠিকমত হচ্ছে না তো ভাল ছেলে কি-করে হবে! দাশ-দা, সমাজকে যদি সংস্কার করতে পারেন তবে অসম্ভব নয় যে কুড়ি-পঁচিশ বৎসরের মধ্যে এমন সব যুবক পাবেন যারা দেশের কর্মীর অভাব দূর করে দেবে।’’
শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ, কৃষি ও শিল্পের সংস্কারের কথা, পল্লী সংগঠনের কথা শুনে উদ্বুদ্ধ হন। ঠাকুর আদেশক্রমে মাতা মনোমোহিনী দেবীর কাছে দীক্ষা প্রার্থী হন। প্রথমটায় মাতা মনোমোহিনী দেবী দীক্ষা দিতে রাজী হন নি। অবশেষে দেশবন্ধুর নিষ্ঠা দেখে দীক্ষা দান করেন ১৯২৪ সালের ১৪ই মে।
দেশবন্ধুর অনুরোধক্রমে ঠাকুরের আদেশে কর্মযোগী সুশীলচন্দ্র বসু দেশবন্ধুর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। হিমাইতপুরের আশ্রমের বিভিন্ন কর্মযজ্ঞে সাহায্য করেন। অসুস্থ অবস্থায় ১৯২৫ সালের ১১ই মে তিনি স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ ও কন্যাগণসহ হিমাইতপুর আশ্রমে আসেন। তিন-চারদিন ধরে ঠাকুরের সাথে দেশ গঠনের বিষয়ে বিভিন্ন আলোচনা করে উৎফুল্ল হন, সুস্থ বোধ করেন। বিশ্রামের জন্য ঠাকুর তাঁকে আশ্রমে থেকে যেতে বলেন। নানা অছিলায় দার্জিলিং  যাওয়াটা বন্ধ করার চেষ্টা করেন। তিনি রাজীও ছিলেন।  কিন্তু বিধি বাম হয়। বিধাতার বিধিকে অগ্রাহ্য করে ডাক্তারের পরামর্শে এবং পরিজনদের অনুরোধের তাগিদে অবশেষে দার্জিলিং যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ঠাকুরের কাছে একজন বিশ্বস্ত আপ্ত সহায়ক চান। ঠাকুর আশ্রমকর্মী মনোহরচন্দ্র বসুকে মনোনীত করেন। পুত্র, পুত্রবধূ ও কন্যাদের আশ্রমে রেখে বাসন্তী দেবী ও মনোহরচন্দ্র বসুকে সাথে নিয়ে দার্জিলিং যান বিশ্রাম নিতে।
১৯২৫ সালের ১৬ই জুন দার্জিলিং-এর ‘Step Aside’ বাড়ীতে তাঁর বিশ্রামের পরিসমাপ্তি ঘটে। চিরবিদায়ের আগে তিনি পুত্র চিররঞ্জনের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘‘ভোম্বল! আমি পাবনা যাব।’’ পাবনা যাওয়া আর হলো না। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। বেঁচে রইলেন আমাদের মনের মণিকোঠায়। ‘দেশবন্ধু’ নামে।
(সূত্র : সুশীলচন্দ্র বসু বিরচিত ‘মানসতীর্থ পরিক্রমা’)

।। পিতৃ দিবসের শ্রদ্ধাঞ্জলি ।।*********************    “পিতা স্বর্গ পিতা ধর্ম            পিতাই তপের নন্দনা,     পিতৃপ্রীতি চারিয়ে আনে            সব দেবতার বন্দনা।”     “আরোধ্যদেব পিতাকে          তুমি নিত্য কর নমস্কার,    জ্ঞানদাতা তিনিই জেনো         শিবরূপেতে তিনি তোমার।”                  “পিতা যেন স্বর্গ তোমার            ধৃতিসত্তা পিতাই যে,    সব তপেরই গোড়া পিতা            সার্থকতা তাঁ’র মাঝে।”     “জন্মদাতা পিতা যিনি             প্রণত হ’য়ে তাঁহার পায়,     সব দেবতার আধান তিনি         রাখ ধ’রে তাঁয় নিশ্চয়তায়।”                          পিতামাতার সংবেদন,                             মূর্ত্ত স্বস্তি, মূর্ত্ত জ্ঞান                         ইষ্টের যে মুখরিত                                 বুঝবি হ’লে ইষ্টপ্রাণ। দেখ্ না তোরা পিতৃভক্তি      জীবন কেমন করে উছল ,ভরদুনিয়া পিতার তপে     বোধবিবেকে করে উজল।                            জগৎপাতার প্রতীক পিতা                                 ঐ পিতাতে আত্মরতি,                            থাকে যদি মলয়স্রোতা                                  বাড়েই বুদ্ধি বিবেক-মতি।(অনুশ্রুতি ৩য়‌ খন্ড থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্য বাণী।)                  *              *             *পিতামাতার সু-সন্তান, সন্তানের সু-পিতা, সু-মাতা, স্বামীর সু-স্ত্রী, স্ত্রীর সু-স্বামী, সমাজের সু-বন্ধু এবং রাষ্ট্রের সু-নাগরিক রূপে একটা মানুষ যদি পরিচিতি লাভ করতে পারে তাহলেই তাঁকে একজন আদর্শ মানুষ বলা যেতে পারে। এই আদর্শ মানুষ যত জন্মাবে ততই পৃথিবী নামক সবুজ গ্রহটিকে সুস্থ রাখা যাবে। আমাদের ঈপ্সিত আদর্শ মানুষ পেতে গেলে একজন আদর্শ পিতার যেমন প্রয়োজন, আবার সেই পিতাকে একজন আদর্শ পিতা হতে হলে পিতারপিতা পরমপিতার আদর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত একজন জায়া-র (অর্থাৎ যার মাধ্যমে পিতা, পুত্ররূপে জন্মাবেন।)  প্রয়োজন। আর তারজন্য প্রয়োজন যুগ পুরুষোত্তমের বিধি মেনে বিবাহ ও সুপ্রজনন সংস্কারে গুরুত্ব দেওয়া। যেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় একটা আদর্শ পেডিগ্রীড কুকুর তৈরির জন্য! সেই গুরুত্বটুকু মেনে পিতা হবার প্রক্রিয়া পালন করার শপথ নিতে পারলেই সার্থক হবে পিতৃদিবস পালন।  তাই শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ‘‘…..পরমপিতা বিশ্ববিধাতা, আর, আমরা হলাম আমাদের স্ব-স্ব ভাগ্যবিধাতা। স্রষ্টার বেটা সেও এক স্বতন্ত্র স্রষ্টা। যার প্রাণে যেমন চায়, সে তেমনি সৃষ্টির মালিক হয়।’’ (আ. প্র. ১০ম খণ্ড, পৃঃ ৩৭)******************************      দেহ ধারণ এবং দেহ ত্যাগ এই দুইয়ের মাঝে জীবন নামের প্রবাহ কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল তা’ নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত। সৃষ্টিতত্ত্ব অনুসারে পিতার পিতা পরমপিতা লীলার প্রয়োজনে এক থেকে বহুতে পরিণত হতে গিয়ে যে সূক্ষাতিসূক্ষ্ম স্পন্দনের সৃষ্টি হয়েছিল তার নাম অনাহত নাদ বা আদিধ্বনি বা প্রণব। সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী মানুষ ব্রহ্মবিদ্ আচার্য্য মাধ্যমে ‘আত্মানং বিদ্ধি’-র মার্গ অনুসরণ করে  ‘মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়’ মৃত্যু হতে অমৃত আহরণ করতেন । জীবাত্মাকে বিলীন করে দিতেন পরমাত্মায় ।  সোনার তাল থেকে তৈরী গয়নাটাকে ব্যবহার করে আবার ফিরিয়ে দিতেন সেই সোনার তালে । পরমপিতা হলেন সকলের পিতা, আর আমরা হলাম আমাদের স্ব স্ব ভাগ্যবিধাতা ।  সংকোচন (contraction), স্থিতি (stagnation) ও প্রসারণ (expansion)-এর লীলায়িত ছন্দের বিধায়িত নিয়মে আমরা প্রত্যেকেই এক একজন স্রষ্টা । নারী-পুরুষের সম্মিলিত জনন ক্রিয়াকালিন  কোষ বিভাজন মাধ্যমে সংকুচিত ডিম্বাণু (ovum) ও  শুক্রাণু (sperm) নামের  দুটি ভিন্ন সত্তা একটি কোষে এক হয়ে গর্ভে স্থিত হয় । পুণরায় কোষ বিভাজন মাধ্যমে প্রসারিত  হয় । ক্রমান্বয়ে সৃষ্টি হতে থাকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ । গর্ভবাসের স্থিতিকাল উত্তীর্ণ হলে ভূমিষ্ট হয় । শুরু হয় জীবন যাপনের পালা । শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্দ্ধক্যের পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রার ছান্দিক শকটে চড়ে ‘মহাচেতন সমুত্থানের’ গন্তব্যে পৌঁছান অথবা মাঝপথে নেমে পড়া, নির্ভর করে স্রষ্টা পিতামাতার উপর । স্রষ্টা পিতামাতা যেমন ভাবের (দৈবাসুর ভাব) আত্মাকে আকর্ষণ করে, তদনুরূপ আয়ু লাভ করে সন্তান । আবার উক্ত সন্তানের আত্মা যে ভাব নিয়ে বিগত হবে, সেই ভাব  নিয়েই ওই আত্মাকে পিণ্ডদেহ ধারণ করতে হবে । এই হ’ল জীবন-মৃত্যুর আগম-নিগমের চরম সত্য। পিতা থেকে প্রাপ্ত ইহজন্মের সার্থকতা  প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন, “আপূরমান ইষ্টে কারও যদি টান জন্মে, এবং তাই নিয়ে যদি সে বিগত হয় তবে সে মহান জীবন লাভ করবেই । আবার, এ জীবনে যে যতই হোমরা-চোমরা হোক না কেন, সে যদি সুকেন্দ্রিক না হয়, প্রবৃত্তিই যদি তার জীবনের নিয়ামক হয়, তবে ঐ বিচ্ছিন্ন বিকেন্দ্রিকতা তার মৃত্যুকালীন ভাবভূমি ও পরজন্মকে যে অপগতিতে অপকৃষ্ট ক’রে তুলবে, তা’তে সন্দেহ কমই । (আ. প্র. ১ম খণ্ড ১৯. ১১. ১৯৪১)তাই, আমরা যে যতটুকু পিতার পিতা পরমপিতার আদর্শ মেনে স্বীয় পিতামাতাকে গৃহ-দেবতা জ্ঞানে মেনে চলতে পারব, পিতৃ-দিবসকে জীবনে সার্থক করে তুলতে পারব, সে ততটুকু। জয়গুরু। বন্দে পুরুষোত্তমম্!———

।। পুরুষোত্তম-জননী মনোমোহিনী দেবীর শুভ আবির্ভাব দিবস স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি ।।

।। ** পুরুষোত্তম-জননী মাতা মনোমোহিনী দেবীর শুভ ১৫৬তম আবির্ভাব দিবস স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ** ।।
।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মাতৃভক্তি ।।

অপটু লেখনীতে শ্রীশ্রীঠাকুরের অপার মাতৃভক্তির কাহিনী প্রকাশের প্রারম্ভে, শ্রীশ্রীঠাকুর সৃষ্ট সৎসঙ্গ আন্দোলন বিষয়ে দু-চার কথা না বললে ইষ্ট প্রতিষ্ঠা কর্মে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যেতে পারে।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সৃষ্ট সৎসঙ্গ আন্দোলন ব্যক্তি নির্মাণের আন্দোলন, শুদ্ধাত্মা সৃষ্টির আন্দোলন। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, ধনী, দরিদ্র, মুর্খ, পণ্ডিত, সৎ, অসৎ নির্বিশেষে সব্বাইকে ধারণ-পালন-সম্বেগসিদ্ধ ব্যক্তিত্বের অধিকারী করে ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর—‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চি’-র আদর্শের সোপান-পথের মাধ্যমে। সেই পথের দিশারী স্বয়ং তিনি এবং তাঁর আদর্শ। আমরা আর্য্য-ভারতবাসীরা যখন থেকে পূর্বাপূর্ব পুরুষোত্তমদের আদর্শের পথ ভুলে প্রবৃত্তি-পোষিত আদর্শের জীবন-চলনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, তখন থেকে আমাদের জাতীয় জীবনে কৃষ্টিগত অধঃপতনের সূত্রপাত হয়েছে। তাই তো বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুরকে আক্ষেপ করে বলতে হয়েছিল—
“ভারতের অবনতি (degeneration) তখন থেকেই আরম্ভ হয়েছে, যখন-থেকে ভারতবাসীর কাছে অমূৰ্ত্ত ভগবান্ অসীম হ’য়ে উঠেছে—ঋষি বাদ দিয়ে ঋষিবাদের উপাসনা আরম্ভ
হয়েছে।
ভারত! যদি ভবিষ্যৎ-কল্যাণকে আবাহন ক’রতে চাও, তবে সম্প্রদায়গত বিরোধ ভুলে
জগতের পূর্ব্ব-পূর্ব্ব গুরুদের প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হও—আর তোমার মূর্ত ও জীবন্ত গুরু বা ভগবানে আসক্ত (attached) হও, —আর তাদেরই স্বীকার কর—যারা তাঁকে ভালবাসে। কারণ, পূর্ব্ববর্ত্তীকে অধিকার করিয়াই পরবর্ত্তীর আবির্ভাব।”
শ্রীশ্রীঠাকুরের এই আক্ষেপ-বাণী শতবর্ষ অতিক্রম করলেও আমরা তাঁর আবেদনকে বাস্তবায়িত করতে ব্যর্থ হয়েছি। ব্যর্থ হয়েছি অবিকৃতভাবে পুরুষোত্তমের আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে সাধারণ জনমানসে!
তিনি বার-বার বলেছেন, “পঞ্চবর্হিঃ, সপ্তার্চ্চি, হলো আর্য্যকৃষ্টির মেরুদণ্ড ……. এগুলির রোজ স্মরণ করতে হয়। স্মরণ করা মানে শুধু চিন্তা করা নয়।” (আঃ প্রঃ ১৪/৬২)
“হিন্দুমাত্রেরই পঞ্চবর্হি বা পঞ্চাগ্নি স্বীকার্য্য—তবেই সে সনাতন হিন্দু, হিন্দুর হিন্দুত্বের সর্ব্বজনগ্রহনীয় মূল শরণ-মন্ত্র ইহাই ! পঞ্চবর্হি যেমন প্রত্যেক হিন্দুর স্বীকার্য ও গ্রহনীয়,সপ্তার্চ্চিও তেমন প্রতি মানবের অনুসরণীয় ও পালনীয়”! (পুণ্য-পুঁথি, ১ম সংস্করণ)
পরমপিতার ঐকান্তিক আবেদনকে অগ্রাহ্য করে, তাঁর আদর্শকে নিত্যদিনের উপাসনা থেকে বহিষ্কার করে, ইষ্ট প্রতিষ্ঠা নামের অজুহাতে সংগঠন-সৃষ্ট তথাকথিত আচার্য্য-পরম্পরা প্রতিষ্ঠার জন্য যে বিকৃতধারায় সৎসঙ্গ আন্দোলন জনমানসে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে, তার প্রতিকার না করতে পারলে তাঁর ঈপ্সিত আর্য্যকৃষ্টির তুর্য্যধ্বনি পল্লীর নিকেতনে নিকেতনে পৌঁছানো সম্ভব হবে কি? তাঁর ঈপ্সিত—“পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠন”-এর-ই বা কি হবে? আমাদের গুরুভক্তির গন্তব্য ঈশ্বরপ্রাপ্তির-ই বা কি হবে? তিনি যদি অবচেতনে আবির্ভূত হয়ে জবাবদিহি চান, এই প্রশ্নগুলোর, উত্তর কি দেব তাই ভাবছি! !!!!!!!!!
***
যাইহোক, এবার নির্ধারিত আলোচ্য বিষয় “শ্রীশ্রীঠাকুরের মাতৃভক্তি” নিয়ে আমার সাধ্যমত আলোকপাত করার চেষ্টা করব।
প্রাকৃতিক নিয়মেই সব সুস্থ শিশুরাই দুষ্টুমি করে। জিনিসপত্র ভাঙে, তছনছ করে। সমবয়সীদের সাথে মারামারি করে, ঝগড়া করে, অন্যায় করে মার খাওয়ার ভয়ে সবসময় সত্যিটা স্বীকারও করে না। ফলে মায়ের কাছে, পরিজনদের কাছে মার খায়, বকুনি খায়। কিন্তু আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শিশু অনুকূলের দুষ্টুমির ধরণটাই ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি কার্যকারণ ভিন্ন কখনো কোন অন্যায্য দুষ্টুমি করতেন না। আর কখনো তা অস্বীকারও করতেন না। অকপটে সব স্বীকার করতেন। তথাপি তাঁকে মা-সহ পরিজনেরা অযথা শাসন করতে ছাড়তেন না। তারাই বা কি করবেন, প্রতিবেশীদের নালিশ শুনতে শুনতে নাজেহাল হতে হয় যে। তাই ইচ্ছে না থাকলেও, লোকের মন রাখতে জননীদেবীকে অযথা তিরষ্কার, শাসন করতেই হত।
একদিন মায়ের শাসনের ভয়ে লুকিয়ে ছিলেন। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে তবুও বাড়ী ফেরেনি দেখে কর্তামা (মাতামহী কৃষ্ণসুন্দরী দেবী) বাড়ীর আনাচে-কানাচে কোথাও খুঁজে না পেয়ে কিছুটা দূরে বনের মধ্যে এক গাছতলায় বসে থাকতে দেখতে পান। প্রশান্ত বদনে বসে আছেন, তাঁর দেহ থেকে গোলাপী রঙের উজ্জ্বল জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয়ে চারিদিক আলোকিত করে ফেলেছে এবং কতগুলো ছায়ামূর্তি বালক অনুকূলকে ঘিরে আনন্দে নৃত্য করছে। ওই দৃশ্য দেখে কর্তামা ভয় পেয়ে ‘রাম নাম’ জপতে জপতে দৌড়ে গিয়ে দৌহিত্রকে কোলে করে নিয়ে ছুটে বাড়ীতে ফেরেন।
আর একদিন কোন এক দুষ্টুমির জন্য জননীদেবী ছেলেকে শাসন করার জন্য ধরতে যাবেন বুঝতে পেরে অনুকূল দৌড়ে পালাতে গেলে জননীদেবীও পিছন পিছন ছুটতে শুরু করেন। কিছুতেই ধরতে পারছেন না। দৌড়তে দৌড়তে হাঁপিয়ে পড়েছেন। মায়ের কষ্ট হচ্ছে দেখে নিজেই ধরা দেন মায়ের হাতে। মায়ের সব শাসন তিনি আশীর্বাদ মনে করে মাথা পেতে
নিতেন। মায়ের কোন কষ্টই তিনি সহ্য করতে পারতেন না।
মায়ের সব কথা তিনি মেনে চলতেন। তিনি তখন পাবনা ইনস্টিটিউশনে তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র (বর্তমানের অষ্টম শ্রেণী)। অঙ্ক পরীক্ষার দিন। দেরি করে খেতে বসেছেন। স্কুলে যেতে দেরি হবে মনে করে মা বললেন, দেখিস্, আজ তুই অঙ্কের পরীক্ষা পারবি না।
যথারীতি স্কুলে গেছেন। পরীক্ষা শুরু হয়েছে। সব সহপাঠীরা অঙ্ক কষছেন, কিন্তু অনুকূলকে প্রশ্নপত্র হাতে নিয়ে চুপ করে বসে থাকতে দেখে শিক্ষক মহাশয় জিগ্যেস করেন, কি, চুপচাপ বসে কেন, অঙ্কগুলো কি কঠিন লাগছে?
অনুকূল শিক্ষক মহাশয়কে বলেন, না স্যর, অঙ্কগুলো সব আমি কষতে পারবো, কোন অসুবিধাই হবে না। কিন্তু কষতে পারছি না মায়ের কথার জন্য। আজ দেরি করে খেতে বসেছিলাম দেখে মা বলেছিলেন, দেখবি আজ একটাও অঙ্ক করতে পারবি না। তাই, আমি যদি
অঙ্কগুলো কষে ফেলি, তাহলে মায়ের কথা মিথ্যা হয়ে যাবে। আপনি আমায় ক্ষমা করবেন, অঙ্ক কষে মাকে মিথ্যেবাদী বানাতে পারব না! তাঁর ওই মাতৃভক্তির দৃষ্টান্ত দেখে সহপাঠি এবং শিক্ষকেরা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। পরে পৃথকভাবে অঙ্কের পরীক্ষা নিয়েছিলেন।
(সতীশচন্দ্র জোয়ারদার প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ৩৯ পৃঃ)
মায়ের প্রতি ঠাকুরের এমন একটা প্রাণকাড়া টান ছিল যে, কখনো কোন কারণে মায়ের কাছ থেকে অযথা কঠোর শাসন-তিরস্কার পেলেও তিনি হাসিমুখে মেনে নিতেন, কোন প্রত্যুত্তর করতেন না।—পাছে মা কষ্ট পায়, তাঁর প্রতি রুষ্ট হয়!—এই ভেবে! সর্বদা মায়ের আদর, সোহাগ, সান্নিধ্য, একটু বাহবা পাবার আশায় উন্মুখ হয়ে থাকতেন।
অথচ মা যে তাঁর প্রতি কতটা নির্দয় ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া তাঁর একটি বাল্যকালের রচনা থেকে।
It was written when my mother chid me.
কেন গো মা হেন ভাব সন্তানের প্রতি,
কি দোষ করেছি মাগো চরণ কমলে ?
সদাই কেন গো হেন কোপ মম প্রতি,
সদা গালাগালি কেন কর বরিষণ?
আমি কি গো পুত্র নয় তোমার জননী,
গর্ভে কি গো ধরনি মা অভাগা সন্তানে ?
আর আর যত তব পুত্রদের প্রতি,
সদাই সন্তোষ ভাব দেখাও জননী।
তারা যদি কাছে এসে ডাকে মা মা বলি,
প্রশান্ত হৃদয়ে মাগো উত্তর প্রদান।
আমি যদি কাছে এসে ডাকি মা মা বলি,
মোর ভাগ্যে শুধু ছাই দন্ত কড়মড়ি।
পিতার নিকটে যদি যাই গো জননী,
মিষ্ট কথা শুনিবারে মনের উল্লাসে,
তিনিও কঠোর বাক্য প্রয়োগি আমারে,
দূর ক’রে দেন মোরে সে স্থান হইতে।
মিষ্ট কথা ভালবাসি আমি গো জননী,
তাই সাধ যায় মম মিষ্ট শুনিবারে
যেই গো জননী মোরে বলে মিষ্ট ভাষ,
অমনি তাহার আমি হই পদানত।
ঈশ্বরের কেন গো মা এ কঠিন রীতি
যে-জন যাহা চায় তাহা নাহি পায় কেন?
(ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থ, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১০৭-১০৮)
এখানে একটা লক্ষণীয় বিষয়—শ্রীশ্রীঠাকুর এই রচনার মাধ্যমে মায়ের বিরুদ্ধে কোন নালিশ না জানিয়ে, মা-কে দোষারোপ না করে, ঈশ্বরের ওই-ধরণের বৈষম্যমূলক রীতি কেন, তা মায়ের কাছে জানতে চেয়েছেন!
শ্রীশ্রীঠাকুর পরবর্তীকালে পরিণত বয়সে কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, — “আমার জীবনের একমাত্র নেশা ছিল মাকে খুশী করা। আমার বুদ্ধি-বিবেচনা-শক্তিমত বরাবর সেই চেষ্টা করেছি। আমার লোভ ছিল, মার কাছ থেকে বাহবা পাওয়ার, তাঁর আদর পাবার। কিন্তু মা ছিলেন আমার প্রতি বড় কড়া, তাঁর শাসন ও ভর্ৎসনা পেয়েছি অজস্র, তাঁর সোহাগের জন্য ক্ষুধা থাকলেও তেমন পাইনি তা’। তাহ’লে কি হবে ? মা ছাড়া যে আমার অচল। মা যতই অসন্তুষ্ট হউন, রুষ্ট হউন, কেবল এৎফাক খুঁজতাম, কেমন ক’রে মাকে তুষ্ট করব। ঐ ছিল আমার ধান্ধা। প্রতিকূল অবস্থায় ছেড়ে দেবার আমার কোনকালে হয় না। তখন আমার গোঁ চেতে যায়, কেমন ক’রে সেটাকে আয়ত্তে আনব। ছেলেবেলায় পাড়ার সকলেই ছিল আমার অভিভাবক। খানাকা কতজনে কান চেপে ধ’রে দুটো চড় দিয়ে ছেড়ে দিত। সেখানে দোষ হয়ত আমার কিছুই নেই। অন্য কারও দোষের কথা যে কব, তাও আমার কখনও মন চাইত না। অনেকে আজেবাজে কথা মার কাছে এসে লাগাত। মাও চালাতেন একচোট। এই রকম যতই ঘটুক, আমি কখনও হতাশ হতাম না, নিরাশ হতাম না। ভাবতাম, আমি আমাকে এমনভাবে তৈরী করব, এমনভাবে চলব, যা’তে এর অবকাশ না ঘটে।” (আলোচনা-প্রসঙ্গে, ৩য় খণ্ড)

“আমি বড় হব, আমাকে মানুষ বড় কবে—সে কল্পনা আমার কোন দিনই নাই। ওই ধারণায় আমি ব্যক্তিগতভাবে কোন সুখ পাই না। তবে হ্যাঁ। মার কাছে মানুষে সুখ্যাতি করলে মা সুখী হবেন, মা আমাকে বাহাদুর ছেলে ব’লে বাহবা দেবেন, সে লোভ আমার ছিল। লোভ থাকলে কি হবে, মা যেন. কিছুতেই আমার উপর প্রসন্ন হতেন না। আমি যেন অপরাধ ক’রেই আছি তাঁর কাছে৷ কিন্তু তবু, আমি হাল ছাড়তাম না, নাছোরবান্দা হয়ে লেগে থাকতাম মাকে খুশী করবই। মার হয়ত আমাকে না হ’লে চলতে পারতো, আমার কিন্তু মা ছাড়া চলারই উপায় ছিল না। তাই মার খুশীর ধান্ধায় ঘুরতেই হ’তো আমাকে।”
(সূত্রঃ ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থ, ১ম খণ্ড)


মাতা মনোমোহিনী দেবী ও সন্ত সদগুরু পরম্পরা
পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জন্মদাত্রী বিশ্বজননী মনোমোহিনী দেবী বাংলা ১২৭৭ সালের ১৮ই জ্যৈষ্ঠ পাবনা জেলার হিমাইতপুরের বিখ্যাত চৌধুরী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম রামেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী, মাতার নাম কৃষ্ণসুন্দরী। আট বছর বয়সে ধ্যানের মাধ্যমে সৎনাম পান। নয় বছর বয়সে পাবনা জেলার অধীন চাটমোহর গোয়াখাড়া গ্রামের পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তীর পুত্র শিবচন্দ্র চক্রবর্তীর সাথে বিবাহ হয়। বিবাহের পর আগ্রা সৎসঙ্গের দীক্ষাপ্রাপ্ত শিষ্য ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তী মহোদয়ের সাহায্যে ধ্যানযোগে প্রাপ্ত গুরুদেব হুজুর মহারাজ (রায় সালিগ্রাম সিংহ বাহাদুর) মহোদয়কে কলকাতায় দর্শন করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দীক্ষা গ্রহণ করেন।
পুরুষোত্তম জননী মাতা মনোমোহিনী দেবীর দীক্ষাগুরু ছিলেন হুজুর মহারাজ। তিনি সন্তমতের যে সাধনা করতেন, সেই সাধনার ধারা সে-সময় বাংলাদেশে প্রচলিত ছিল না। সন্তমতের আদি সাধক কবীরদাস জন্মেছিলেন 1440C বারানসীতে। তিনিই প্রথম সত্‍মন্ত্রের রহস্য ভেদ করে বলেছিলেনঃ
“কবীর ধারা অগমকী সদগুরু দয়ী লখায়,
উলট তাহি সুমিরন করে স্বামী সংগ লাগায়।”
—অর্থাৎ ধারা উল্টে স্বামী যোগ করে জপ করতে নিদেশ দিলেন। কবীরের পর গুরু নানক জন্ম গ্রহণ করেন 15. 4. 1469 C পঞ্জাব প্রদেশের তালবণ্ডীতে। তিনিও ওই সত্‍নাম প্রচার করেছেন। কবীর সাহেবের পর আগ্রাতে ২৪ শে আগস্ট ১৮১৮ তে জন্মগ্রহণ করেন শিবদয়াল সিং, তিনি স্বামীজী মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ১৫ জুন ১৮৭৮ আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। পরবর্তী গুরু হন রায় সালিগ রাম। তিনি ১৪ মার্চ, ১৮২৯ আগ্রার পীপল মাণ্ডিতে জন্মগ্রহণ করেন। ৬ ডিসেম্বর ১৮৯৮তে আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। তিনি হুজুর মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ওই সৎনাম সাধন করে চরম ও পরম পথের সন্ধান পান। তিনি তাঁর গুরু স্বামীজী মহারাজের অনুমতি ক্রমে ওই সৎনাম সর্বসাধারণ্যে প্রচার করেন। পরবর্তী গুরু হন পণ্ডিত ব্রহ্মশঙ্কর মিশ্র। যিনি ২৮শে মার্চ, ১৮৬১ তে ব্রাহ্মণ পরিবারে, বারানসীতে জন্মগ্রহণ করেন। ১২ অক্টোবর ১৯০৭ সালে দেহত্যাগ করেন। তিনি মহারাজ সাহেব নামে খ্যাত ছিলেন। মহারাজ সাহেব দেহত্যাগের পূর্বে একটি কাউন্সিল গঠন করে বাবু কামতা প্রসাদ ওরফে সরকার সাহেবকে পরবর্তী গুরু রূপে নির্বাচন করেন। (শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরকার সাহেবকে সন্ত বলে উল্লেখ করেছেন, ভাববাণীতে।)
* * *
মাতা মনোমোহিনী দেবী সময় সুযোগ পেলেই এলাহাবাদ, কাশী, আগ্রায় গিয়ে গুরুদেবের সাথে সাক্ষাত করতেন। তিনি একবার গুরুর কাছে প্রার্থনা জানিয়ে বলেছিলেন, ‘‘আশীর্বাদ করুন, যেন আপনার মত সন্তান লাভ করতে পারি।’’
উত্তরে তাঁর গুরুদেব বলেছিলেন, আমার মত কেন, আমার চেয়ে মহৎ সন্তান তোমার গর্ভে জন্মাবে। তাঁর আলোয় পৃথিবী আলোকিত হবে।
তাঁর গুরুদেবের বলা কথা নিষ্ফল হয়নি। সব গুরুদের গুরু ইষ্টগুরু পুরুষোত্তমের জননী হন মাতা মনোমোহিনী দেবী। স্বামী, সন্তান ও বৃহত্তর পরিবেশের সেবা করে, অসৎ-নিরোধী তৎপর থেকে সব রকমের প্রতিকূল পরিস্থিতিকে সামাল দিয়ে ত্রিসন্ধ্যা নামধ্যান ও উপাসনায় অতিবাহিত করতেন। তাঁর গুরুদেবের মাহাত্ম্য-আলোচনা করতেন, বিপুল সমারোহে গুরুদেবের জন্মতিথি পালন করতেন। গুরুদেবের ইচ্ছা-পূরণ, প্রীতি সম্পাদনের জন্য তিনি সর্বদা উন্মুখ থাকতেন। তৎকালীন ও তৎপূর্বতন রাধাস্বামী-মতের সন্তগুরুগণের পুণ্য লীলাভূমি — কাশী, আগ্রা, এলাহাবাদ প্রভৃতি স্থানে প্রায়শ তীর্থ-পর্যটনে গমন করে তিনি অন্তরে প্রভূত আনন্দ ও শান্তি লাভ করতেন।
গুরুর আরাধনা করার জন্য তিনি পদ্মাতীরের একটা নিমগাছতলায় সুন্দর মন্দির নির্মাণ করে গুরুদেবের একখানি পূর্ণাবয়ব বৃহদায়তন প্রতিকৃতি স্থাপন করেছিলেন।
গুরুদেবকে নিয়ে অনেক বন্দনা-গীতিও তিনি রচনা করেছিলেন। তার একটি উদ্ধৃত করছি।
দয়া কর গুরুদেব আঁধার অবনী’পরে
বিতরি করুণা-কণা জাগাও নিদ্রিত নরে ।
করিবে দয়া যখনি
জাগিবে সকল প্রাণী
পালাবে সংশয় যত
তব আগমন হেরে ।৷
তুমি হে পরমপিতা
তুমি সর্বসুখদাতা
তব প্রেমে কত মধু
বুঝাও যতন করে ৷।
পাইলে তব আস্বাদ
ঘুচবে সব অবসাদ
দূরে যাবে সব পরমাদ
নাচিবে আনন্দ ভরে।।”
(ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ১ম খণ্ড, পৃঃ ৪২-৪৩)


শ্রীশ্রীঠাকুরের আবির্ভাব ও দীক্ষা।
মাতা মনোমোহিনী দেবী আঠারো বছর বয়সে প্রথম অন্তঃসত্ত্বা হন। একদিন দুপুরে একজন সন্ন্যাসী মনোমোহিনী দেবীর কাছে সেবা নিতে চাইলে তিনি ভক্তিভরে অতিথিকে সেবা করেন। সন্ন্যাসী বাড়ী ছেড়ে যাবার সময় বলেন, এই বাড়ির একমাত্র পুত্রের মৃত্যু হবে। এবং এই বাড়িতে একজন মহাপুরুষ জন্মাবেন, যিনি বহুলোকের অধীশ্বর হবেন এবং জগতের প্রভুত কল্যাণ সাধন করবেন।
তার কিছুদিন পরেই মনোমোহিনী দেবীর ভাই যোগেন্দ্রনারায়ণ, (ডাকনাম ছিল লোহা) অসুস্থ হয়ে পড়েন, রোগভোগে দেহত্যাগ করেন। ওদিকে মনোমোহিনী দেবীর গর্ভে ১১টি সৌরমাস অতিক্রম করে, গর্ভবাসের লীলা সেরে, মাটির পৃথিবীতে ভূমিষ্ট হয়েছিলেন মনোমোহিনী দেবীর ১ম সন্তান। শাস্ত্র-নির্দিষ্ট সব লক্ষণ নিয়েই মানবদেহে সীমায়িত হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন পিতার-পিতা পরমপিতা। বারেন্দ্র শ্রেণীর ব্রাহ্মণ পিতা শিবচন্দ্র চক্রবর্তী এবং মাতা মনোমোহিনীর সন্তানরূপে। অবিভক্ত বাংলার পাবনা জেলার হিমাইতপুর গ্রামে। বাংলা ১২৯৫ সনের ৩০শে ভাদ্র, সংক্রান্তির শুভ সকালে, চার দণ্ড বিশ পল্-এ।
‘‘অকূলে পড়িলে দীন হীন জনে
নুয়াইও শির, কহিও কথা।
কূল দিতে তারে সেধো প্রাণপণে
লক্ষ্য করি তার নাশিও ব্যথা।’’
—উপরোক্ত চার পংক্তির আশীর্বাণীর আদ্যাক্ষর মিলিয়ে অ-নু-কূ-ল নামকরণ করেছিলেন বিশ্বজননী মাতা মনোমোহিনী দেবী। অন্নপ্রাশন সংস্কারের শুভলগ্নে।
ছোটবেলা থেকেই পুত্র অনুকূলের বিবিধ আধিদৈবিক কার্যকলাপ, অত্যাশ্চর্য্য ব্যাপার-স্যাপার প্রত্যক্ষ করে মাতা মনোমোহিনী দেবী বিশেষ চিন্তিত ছিলেন। কলকাতার বৌ-বাজারে ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুলে অ্যালোপ্যাথী মতে ডাক্তারি পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরে আসার পরও তার ব্যতিক্রম ছিল না। হিতৈষীদের পরামর্শ মেনে অনেক কিছু করেও নিজের ছেলেকে নিজের মনের মত, অন্যান্য দশজন জীবকোটির ছেলের মত আচার-আচরণে স্বাভাবিক করতে পারলেন না। অবশেষে হুজুর মহারাজ পরবর্তী তৎকালিন আগ্রা সৎসঙ্গের সদগুরু বাবু কামতাপ্রসাদ ওরফে সরকার সাহেবের কাছে সকল বৃত্তান্ত জানিয়ে চিঠি লেখেন, গাজিপুরে। সরকার সাহেব তখন অন্তিম শয্যায়। চিঠি পেয়ে খুব আনন্দিত হন। চিঠির উত্তরে তিনি লিখেছিলেন, ‘মেরা কাম হো গয়া, তুমি ছেলেকে দীক্ষা দিয়ে দাও।’ ওই পত্র মারফৎ অনুমতিই ছিল মাতা মনোমোহিনী দেবীর পাঞ্জা। পুরুষোত্তমরূপী সদগুরু অবতীর্ণ হয়েছেন বুঝতে পেরে সাধ্যায়ী গুরু তাঁর দায়িত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন। সরকার সাহেব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গাজীপুরে। তারপর থেকেই মাতা মনোমোহিনী দেবী সন্তমতের সৎনামে দীক্ষা দিতে শুরু করেছিলেন।
যাইহোক, সরকার সাহেবের অনুমতি ক্রমে মাতা মনোমোহিনী দেবী অনুকূলচন্দ্রকে সত্‍মন্ত্র প্রদান করার পর ঠাকুর বলেছিলেনঃ এ তুই কি দিলি ? এ নাম তো আমি তোর পেটে থাকতেই করি। অর্থাৎ উনি যে ওই সৎ নামের নামী-পুরুষ সেই তত্ত্বই তিনি ব্যক্ত করলেন তাঁর মায়ের কাছে।
অধ্যাত্মশাস্ত্রবিদূষী সাধিকা মনোমোহিনী দেবী, পুত্র অনুকূলচন্দ্রের নামধ্যান সংক্রান্ত সমস্ত অনুভূতির বর্ণনা শুনে বিস্মিত ও আনন্দিত হয়ে পুত্র অনুকূলচন্দ্রকে বলেছিলেন, ‘‘এই নামই তো আদি সৎ-নাম। তুই এই নাম করতে থাক।’’

  • * *
    সৎসঙ্গ আন্দোলনে মাতা মনোমোহিনী দেবীর ভূমিকা

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সৎসঙ্গ আন্দোলনের সূচনা করেন কীর্তন প্রচারের মাধ্যমে। কীর্তন করতে করতে তিনি অচৈতন্য হয়ে পড়ে যেতেন, কাৎলা মাছের মত লাফাতেন, থর্ থর্ করে কাঁপতো তাঁর পায়ের বুড়ো আঙুল ! দেহ থেকে শ্বেতবর্ণের স্বেদ নির্গত হতো! রোমকূপ দিয়ে রক্ত ঝরতো পিচকিরি দিয়ে!
যোগশাস্ত্রের পুঁথিতে যে-সমস্ত আসনের কথা উল্লেখ নেই অক্লেশে নতুন নতুন আয়াসসাধ্য সব আসন করতেন! আসন করতে করতে উঠে পড়তেন ৫-৬ হাত উপরে, শূন্যে! আবার নিথর-নিষ্পন্দ হয়ে ভূমিতে শুয়ে পড়তেন। তাঁর শ্রীমুখ থেকে নির্গত হতো মানব জীবনের জটিল সব সমস্যার সহজ সমাধানী বাণী। নানা ভাষায়। উপস্থিত কোন মানুষের মনের কথার, প্রাণের ব্যথার উত্তর দিতেন।
এমন সব সাধারণের বুদ্ধির গণ্ডীর বাইরের সব ঘটনা প্রত্যক্ষ করে নানা মানুষ নানা মত প্রকাশ করেছেন। কেউ বলছেন মৃগী রোগ, কেউ বলছেন নির্ঘাৎ কোন দানোতে ধরেছে। কেউ আবার পরীক্ষা করার জন্য জ্বলন্ত অঙ্গার চেপে ধরতেন। পরীক্ষা করার জন্য সূঁচালো শলাকা ঢুকিয়ে দিতেন শরীরে! মানুষ কত বীভৎস হলে এসব কাজ করতে পারে!— ব্যথা ভারাক্রান্ত মনে অনুকূলচন্দ্রের অন্তরঙ্গ কীর্তন পার্ষদ কিশোরীমোহন, অনন্তনাথ রায় ও মুকুন্দচন্দ্র ঘোষ প্রমুখগণ পাবনা জেলা-কোর্টের লব্ধপ্রতিষ্ঠ উকিল পরম-বৈষ্ণব বৃন্দাবনচন্দ্র অধিকারীর কাছে সব নিবেদন করেন। সব শুনে, তিনি পরম কৌতূহলী হয়ে পর পর কয়েকদিন কীর্তনে যোগদান করেন। প্রত্যক্ষ করেন অপূর্ব কীর্তনের দৈবীলীলা। তাঁর শ্রীমুখ নিঃসৃত বাণীসমূহের ভাব-গাম্ভীর্য ও সার্বজনীনতা উপলব্ধি করে একান্ত বিস্মিত হন। ঠাকুরের অন্তরঙ্গ সঙ্গীদের ডেকে বলেন, শাস্ত্রাদিতে যে সমস্ত সমাধির কথা জানা যায় সেসবের তুলনায় অনেক উচ্চস্তরের নির্বিকল্প সমাধি। “এ সকল শ্রীমন্মহাপ্রভুর ভাব—বিশ্বহিতের জন্য পরমাত্মার মহাবাণী—মানব জাতির পরম সম্পদ। বহু-যুগ অন্তে পরমপিতার বিশেষ ইচ্ছায় কদাচিৎ এরূপ ঘটিয়া থাকে। সুতরাং আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ, তোমরা এখন হইতে ঠাকুরের শ্রীকণ্ঠোচ্চারিত এই সকল মহাবাণীর একটি অক্ষরও বাদ না দিয়া সমুদয়ই যথাশক্তি নিঃশেষে লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিবার ব্যবস্থা করিবে। আমি আশা করি, তোমরা ইহা অবশ্যকরণীয় পরম-পবিত্র কর্তব্য বলিয়া মনে করিবে।”
বৃন্দাবনবাবুর ওই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের অন্তরঙ্গ ভক্তেরা। হিমাইতপুর, প্রতাপপুর, কাশীপুর, কুষ্টিয়া, বাড়াদি, খলিলপুর, বরইচারা, ধুশণ্ডু (নদীয়া), কণ্ঠ গজরা (নদীয়া), ধলহরাচন্দ্র (যশোহর), খোকসাজানিপুর (নদীয়া), রাতুলপাড়া (নদীয়া), কমলাপুর (নদীয়া), মদাপুর (নদীয়া) হরিণাকুণ্ডু (নদীয়া) চক্রতীর্থ (২৪ পরগণা) প্রভৃতি স্থানে, যেখানেই ঠাকুর কীর্তনদলের সাথে যেতেন, সাথে লিপিকারেরাও যেতেন। প্রস্তুত থাকতেন শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাববাণীসমূহ লিখে রাখার জন্য। তাঁরা সাংসারিক সব কাজকর্ম ফেলে সযত্নে সেগুলো ধরে রেখেছিলেন বলেই ওই দৈবী-লীলার সাথে পরিচিত হতে পেরেছে জগৎবাসী। ওই অবদানের জন্য জগদ্বাসী চিরঋণী হয়ে থাকবে পরমবৈষ্ণব বৃন্দাবনচন্দ্র অধিকারী, ভক্তবীর কিশোরীমোহন, মহারাজ অনন্তনাথ রায়, আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী প্রমুখ পুরুষোত্তম-পার্ষদ ঋদ্ধি-সেনানীদের কাছে।

কুষ্টিয়া অনুষ্ঠিত বিশ্বগুরু উৎসবের পর থেকেই ঠাকুর দর্শনে হিমাইতপুরে নানা স্থানের ভক্ত-সমাগম হতে থাকে। ঠাকুরের কথা জানতে পেরে কলকাতার ব্যারিষ্টার চন্দ্রশেখর সেন হিমাইতপুর আসেন ঠাকুর দর্শনে। ঠাকুরের সাথে আলাপচারিতায় মুগ্ধ হয়ে দীক্ষা গ্রহণ করেন। ঠাকুরের মহান আদর্শ কলকাতার সম্ভ্রান্ত মহলে প্রচারিত হওয়ার ফলে বিদগ্ধ মহলে সাড়া পড়ে যায়। তাঁর যাজনে অনুপ্রাণিত হয়ে সম্ভ্রান্ত মানুষেরা শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ গ্রহণ করেন।
সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ মহামহোপাধ্যায় পন্ডিত কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন মহোদয়ের দ্বিতীয় পুত্র বিজ্ঞান গবেষক কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য ১৩৩০ বঙ্গাব্দের প্রথমদিকে স্থায়ীভাবে হিমাইতপুর চলে আসেন। ১৩৩০ সালের অগ্রহায়ণ মাসে স্থায়ীভাবে চলে আসেন বঙ্কিমচন্দ্র রায়। ১৩৩০ সালের ২৪শে অগ্রহায়ণ শ্রীশ্রীঠাকুরের পিতৃবিয়োগ হয়। একই সময়ে বিজ্ঞান গবেষক কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য মহোদয়েরও পিতৃবিয়োগ হয়। তথাপি তিনি ঠাকুরকে ছেড়ে বাড়ী না গিয়ে আশ্রমেই পিতৃদেবের শ্রাদ্ধাদি ক্রিয়া করেছিলেন। ১৩৩০ সালের ফাল্গুন মাসে ময়মনসিংহের উকিল শ্রীব্রজগোপাল দত্তরায় সপরিবারে আশ্রমে চলে আসেন এবং তপোবন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। আশ্রম সংগঠনকে গড়ে তুলতে প্রকাশচন্দ্র বসু, প্রবোধচন্দ্র বাগচী, চারুচন্দ্র সরকার, অনুকূল ব্রহ্মচারী, তারাপদ বাগচী, অধ্যাপক পঞ্চানন সরকার, ডাঃ গোকুলচন্দ্র মন্ডল প্রমুখ ভক্তবৃন্দসহ অনেকেই ঠাকুরের নিরবচ্ছিন্ন সান্নিধ্য লাভের আশায় স্থায়ীভাবে চলে আসেন হিমাইতপুরে। শ্রীযুক্ত সুশীলচন্দ্র বসু, তাঁর পত্নী রাণীমা, নফরচন্দ্র ঘোষ, যতীন্দ্রনাথ সরকার, হরিদাস ভদ্র প্রমুখ ভক্তগন তখন ঠাকুর বাড়ীতেই থাকতেন। ক্রমশঃ স্থায়ী বাসিন্দা বৃদ্ধি পেতে থাকলে কতগুলো খড়ের ও টিনের ঘর তৈরি করা হয়। পদ্মার ধারে বাঁশঝাড়ের মধ্যে কয়েকটা খাটা পায়খানা তৈরি হয়। এইভাবে প্রয়োজন অনুপাতে কুটিরের পর কুটির নির্মিত হতে থাকে। ক্রমে ক্রমে গড়ে ওঠে আশ্রম। প্রথম পত্তনকালীন তখনকার লোকেরা হিমাইতপুরের আশ্রমকে বলতো অনুকূল ঠাকুরের আশ্রম। পরে শ্রীশ্রীঠাকুরের মা আগ্রা সৎসঙ্গের অনুকরণে ‘সৎসঙ্গ আশ্রম’ এবং দীক্ষিতদের ‘সৎসঙ্গী’ নামে অভিহিত করেছিলেন। মূর্খ-পণ্ডিত-ধনী-নির্ধন-জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষ একে একে সমবেত হতে শুরু করলো হিমাইতপুরে। শুরু হলো লোকসংগ্রহ পর্ব। শুরু হলো কর্মযজ্ঞ।

এক এক করে গড়ে ওঠে আনন্দবাজার, কেমিক্যাল ওয়ার্কস, তপোবন বিদ্যালয়, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র, প্রেস, পাব্লিশিং হাউস, কলাকেন্দ্র, কুটীর শিল্পাগার প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান। সব কর্মকাণ্ডের সাথে মায়ের অগ্রণীর ভূমিকা ছিল। তাঁর চরিত্র ছিল, কুসুমের ন্যায় কোমল, পাথরের ন্যায় কঠিন। আধ্যাত্ম জগতের সাথে সাথে জাগতিক জগতেও তিনি ছিলেন সকলের অভিভাবক স্বরূপা। নিজের, নিজের পরিবারের সব বিপদ-আপদকে তুচ্ছ করে অন্যকে রক্ষা করতেন জগজ্জননী-স্বরূপিণী হয়ে। হিমাইতপুর সৎসঙ্গ আশ্রমের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী। আশ্রমিকদের খাওয়া-দাওয়া, শিক্ষা, স্বাস্থ্য রক্ষা, প্রতিরক্ষা ইত্যাদি সব বিষয়ে তিনি সজাগ থাকতেন। দুর্বৃত্তদের অত্যাচার থেকে আশ্রমিকদের রক্ষা করতে লাঠি হাতে সারারাত জেগে পাহারা দিতেন। তাঁর ভয়ে আশ্রমে কেহ অন্যায় কাজ করতে সাহস পেত না।

মহাত্মাগান্ধী হিমাইতপুর আশ্রম পরিদর্শন করে আশ্রমের ভুয়সী প্রশংসা করার পর বলেছিলেন, “I have never seen a masterly woman of such wonderful personality in my life.”

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৃষ্ট সৎসঙ্গ আন্দোলন বিশ্ব পরিবার সংগঠনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রূপে একসময় প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল হিমাইতপুরে। সুদূর আমেরিকার খ্রিস্টান সম্প্রদায়ভুক্ত শ্রদ্ধাভাজন স্পেনসারদা, হাউজারম্যানদা, ইসলাম সম্প্রদায়ের খলিলুর রহমান, ব্রাহ্মণ পরিবারের বিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য মহোদয়ের ন্যায় পণ্ডিত ব্যক্তি প্রমুখদের পাশাপাশি খুব সাধারণ মাপের, অভাবে পরিশ্রান্ত মানুষদের পরিবার নিয়ে গড়ে তোলা পরিবারের নাম ছিল বৃহত্তর সৎসঙ্গীদের একটা পরিবার। দিনান্তে একবার আনন্দবাজারে আশ্রমমাতা জননী মনোমোহিনী দেবীর মাখা “দলা” প্রসাদ খেয়ে পরমানন্দে আশ্রম সংগঠনের ইষ্টের ঈপ্সিত কর্মে মত্ত থাকতেন—বিনা ওজরে, বিনা আপত্তিতে। ওই একবেলা খেয়েই নামধ্যান, কীর্তন, পঠন-পাঠন, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, সংস্কৃতি, বিজ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন থাকতেন। সকল পরিবার ছিল একে অপরের পরিপূরক পরিবার। সে এক স্বর্ণালি যুগ ছিল সৎসঙ্গের। প্রতিটি পরিবারের অভিভাবক ছিলেন মাতা মনোমোহিনী দেবী। সেই সৎসঙ্গ পরিবারের সদস্য আমরা। ব্যক্তি, দম্পতি, গৃহ, সমাজ, রাষ্ট্র জীবনকে অখণ্ড রেখে, প্রাচ্য-প্রতীচ্যকে বর্ণাশ্রমানুশাসনে নিয়ন্ত্রণ করে পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন আমাদের জীবন দেবতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। আমরা যদি ঠাকুরের আদর্শের পরিপালনে, পরিবার থেকে, সমাজ থেকে ডিভোর্সকে, বৃদ্ধাশ্রমকে বিদায় জানিয়ে, পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি মিলেমিশে এক ছাদের নীচে জীবন যাপন করে এক-একটা আদর্শ পরিবারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি—সার্থক হবে শ্রীশ্রীঠাকুরের সৎসঙ্গ আন্দোলন।


মাতা মনোমোহিনী দেবী তাঁর গুরুদেব সাধক পুরুষ হুজুর মহারাজের কাছ থেকে যে বিনতী করতে শিখেছিলেন, সেই শিক্ষার ধারাটাকে প্রাধান্য দিয়ে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন পাবনার সৎসঙ্গ আন্দোলন। যে ধারায় বীজমন্ত্রের উচ্চারণ স্বীকৃত, বীজমন্ত্রের মাধ্যমেই পারস্পরিক সম্ভাষণ প্রচলিত। আর্য্যকৃষ্টির দশবিধ সংস্কার অবহেলিত—যা শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শের পরিপন্থী! যার ফলে, আজও বিনতীর মাধ্যমে বীজমন্ত্র উচ্চারিত হয়ে চলেছে। নিত্য সাধ্যায়ের জন্য আবশ্যিক, শ্রীশ্রীঠাকুর রচিত ‘জাগরণী’ সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দীক্ষিতরা যতটা না জানেন, তার চেয়ে বেশি মানেন মাতা মনোমোহিনী দেবী রচিত তাঁর গুরুদেবের প্রশস্তির প্রভাতী গীতি ‘প্রভাত যামিনী উদিত দিনমনি’-কে।
শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শের অনুগামীদের ঊষা-নিশায় মন্ত্রসাধন করা এক আবশ্যিক সাধনা। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সেকথা তিনি বার-বার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এ বিষয়ে একটা উদ্ধৃতি তুলে ধরছি।
শ্রীশ্রীঠাকুর কয়েকজনকে লক্ষ্য ক’রে বললেন—খুব সকালে উঠে ভোর চারটের মধ্যে প্রাতঃকৃত্যাদি ও নামধ্যান সেরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাগরণী গান গেয়ে সবাইকে জাগিয়ে দিতে হয়। তাড়াতাড়ি যাতে নামধ্যানে বসে তা’ করতে হয়। ওতে লোকে আনন্দ পায়, স্ফূর্তি পায়, তাদের শরীরও ভাল থাকে। আগে যতদিন ভোরে সবাইকে জাগিয়ে দিয়ে নামধ্যান করিয়েছি, ততদিন মানুষ অকালে মরেনি। তাই প্রত্যেককে এটা করানো লাগে। (আ. প্র. ১৬/ ১৫. ৪. ১৯৪৯)

তপো-বিধায়না গ্রন্থ থেকে—
“প্রার্থনা বা তপঃ-উপাসনার পক্ষে
ঊষা বা ব্রাহ্মমুহূর্ত্ত,
মধ্যাহ্ন ও সায়ংকাল—
এই তিনই শ্রেষ্ঠ,
তা’র ভিতর আবার
ব্রাহ্মমুহূর্ত্তই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ;
মানসিক জপ সর্ব্বকালেই শ্রেয়;
আবার, প্রসন্ন, নির্দ্বন্দ্ব,
হৃদ্য-প্রীতি-প্রবুদ্ধ-যাজন
যা’ চিন্তন ও কথনের ভিতর-দিয়ে
উভয়কেই উদ্যোগী-উৎফুল্ল ক’রে তোলে,—
তা’ কিন্তু সর্ব্বকালেই শ্রেষ্ঠ‌।” ৯৩।

এখনও পর্য্যন্ত তাঁর ওই নিদেশকে উপেক্ষা করে শ্রীশ্রীঠাকুরের উৎসব-অনুষ্ঠানে সূর্য ওঠার আগেই, ঊষা-কীর্তনের নামে পুরুষোত্তম-জননী মাতা মনোমোহিনী দেবী রচিত—তাঁর গুরুদেবের প্রশ্বস্তি-গীতি—
“প্রভাত যামিনী উদিত দিনমনি
ঊষারাণী হাসিমুখে চায় রে—
জাগি বিহগ সব তুলি নানা কলরব
রাধা রাধা রাধাস্বামী গায় রে।
নবীন বৃন্দাবনে তুলসী কাননে
ভ্রমরী রাধাস্বামী গায় রে।
সেই সে মধুর গান বাঁশিতে তুলিতে তান
আপনি যে রাধাস্বামী গায় রে।।
যে নামে নন্দের কানু সেধেছিল মোহন বেণু
সেই রাধা রাধা নাম গাও রে।।
আজি মধু জাগরণ শুনে সবে নরগণ
জয় জয় রাধাস্বামী গাও রে।
মথিয়া সকল তন্ত্র রাধাস্বামী মহামন্ত্র
আদিগুরু জগতে বিলায় রে।।
রাধাস্বামী গুণগানে আনন্দ বাড়িবে প্রাণে
চরমে পরম গতি হয় রে।।
রোগ-শোক ব্যাধি-জরা দূরে পালাবে তারা
আনন্দে রাধাস্বামী গাও রে।
জয় রাধাস্বামী জয় রাধাস্বামী
জয় জয় রাধাস্বামী গাও রে।।” কীর্তন করতে এবং করাতে অভ্যস্ত উৎসবের আয়োজকগণ!—-ব্রাত্য হয়ে আছে শ্রীশ্রীঠাকুর রচিত জাগরণী!


পরবর্তীকালে দৈনন্দিন জীবনচলনায় আর্য্যকৃষ্টির অনুশাসনকে প্রতিষ্ঠা করতে শ্রীশ্রীঠাকুর যে সান্ধ্য-প্রার্থনা মন্ত্র রচনা (দ্রঃ সৎসঙ্গ পাব্লিশিং-এর প্রার্থনা নামের পুস্তিকা।) করেছিলেন, মাতা মনোমোহিনী দেবী সেই প্রার্থনাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন, ‘‘সন্ধ্যা মন্ত্রটা মা মারা যাবার তিনদিন আগে লেখা হয়। মা শুনে বড় খুশি হয়েছিলেন। সেইজন্য ও জিনিসটার উপর আমার খুব প্রীতি আছে। মা শুনেছিলেন তাই ওটা আমার অর্ঘ্য হয়ে আছে।’’ (আঃ প্রঃ ২১ খণ্ড, ৭. ১১. ১৯৫২)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে কারো কাছে দীক্ষা গ্রহণ না করলেও বার বার তিনি বলেছেন, ‘আমার মা-ই যেন সরকার সাহেব, হুজুর মহারাজ ও অন্যান্য অন্যান্য মহাপুরুষদের প্রতীক—মা-ই আমার আদর্শ—মা-ই আমার জীবত্ব।’ তথাপি তিনি সরকার সাহবকে নিজের গুরু হিসেবে এবং হুজুর মহারাজকে মাতৃদেবীর গুরু হিসেবে মান্য করতেন, তাঁদের প্রতিকৃতিতে প্রণাম নিবেদন করতেন।

।। মায়ের মাধ্যমে পুরুষোত্তম রূপে আত্মপ্রকাশ ।।
শ্রীশ্রীজননী একদিন আমাকে (ডাঃ সতীশ জোয়ারদার) বলিলেন—“হ্যাঁ রে, তোরা অ……র মূর্ত্তি ধ্যান করিস কেন?” আমি বলিলাম—“শ্রীকৃষ্ণ-মূর্ত্তি বা অন্য সদ্গুরুমূর্ত্তি ধ্যান করতে আপনার ছেলের মূর্তি যে এসে উপস্থিত হন তা আমরা কি করব।” তিনি বলিলেন—“তা যদি সত্যি হয় তবে কর।” কথাটা যেন অনিচ্ছার সহিত বলিলেন। মধ্যাহ্নে শ্রীশ্রীজননীর পূর্ব্বদ্বারী বড় টিনের ঘরে শ্রীশ্রীঠাকুরসহ আমরা অনেকে ভোজন করিতে বসিলাম। শ্রীশ্রীঠাকুর বলিলেন—“মা, তুই আমার থালায় ব’সে নিবেদন করে দে না, তুই নিবেদন ক’রে দে আমি প্রসাদ খাই।” মা বলিলেন—“আমি এখন পারি না।” তিনি পঞ্চমবর্ষীয় বালকবৎ যেন আবদার করিয়া বলিলেন—“না মা, তুই নিবেদন ক’রে দে, তুই নিবেদন করে না দিলে আমার ভাল লাগবে না। তুই বেশ ক’রে ভাত মাখিয়ে দে, নিবেদন ক’রে দে, আর একটু খেয়ে প্রসাদ ক’রে দে না মা।” তখন শ্রীশ্রীজননী তাঁহার আবদার রক্ষা না করিয়া পারিলেন না। তিনি ভোজ্যসমীপে শ্রীশ্রীঠাকুরের নিকট বসিয়া তাঁহার ইষ্টমূৰ্ত্তিকে সেই ভোজ্যসামগ্রী নিবেদন করিতে লাগিলেন, ধ্যানে বসিলেন। ধ্যান করিতে করিতে দেখিলেন, তাঁহারই পুত্র আজ তাঁহার ইষ্টস্থলে অধিষ্ঠিত হইয়া ভোজ্য ভোজন করিলেন। তখন শ্রীশ্রীজননী (পূর্ব্বেও কিছু জানিতেন বোধহয়) বলিলেন—“এখন কি তোর এঁটো আমার খেতে হবে নাকি?”
শ্রীশ্রীঠাকুর বলিলেন—“ওমা, সেকি কথা!” শ্রীশ্রীজননী বলিলেন— “নিবেদন করলাম, দেখলাম তুই-ই তো খেয়ে গেলি।” শ্রীশ্রীঠাকুর বলিলেন— “ওমা, সেকি কথা!” তখন সকলেই নীরব হইলেন! ব্যাপার বুঝিতে কাহারও আর বাকী থাকিল না। শ্রীশ্রীজননী তদবধি তাঁহার পুত্রকে সদ্গুরুরূপে ধ্যান করিতে আমাদিগকে আর নিষেধ করেন নাই। (সূত্র : ডাঃ সতীশচন্দ্র জোয়ারদার রচিত গ্রন্থ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকচলচন্দ্র, পৃঃ ২৩৬-২৩৭)

কেন জানি, প্রথম জীবনে মাতা মনোমোহিনী দেবী পুত্র অনুকূলকে সব গুরুদের গুরু পরমগুরু রূপে মেনে নিতে পারেন নি। এমনকি ভাবসমাধি যাতে না হয় সেজন্য নফর আর রাধিকাকে দিয়ে কীর্তনের আঙিনায় জল ঢেলে কীর্তন বন্ধ করিয়েছিলেন! (দ্রঃ ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীর জীবনী গ্রন্থের ১ম খণ্ড, দ্বাদশ অধ্যায়।) উপরোক্ত ঘটনা উপলব্ধি করার পর থেকেই হয়তো পুত্রের ভগবৎ সত্তা সম্বন্ধে নিজে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
মাতা মনোমোহিনী দেবী একবার কলকাতায় ১/১ সি হরিতকী বাগান লেনের বাড়িতে তাঁর পুত্র অনুকূলচন্দ্র, প্রভাসচন্দ্র, কুমুদচন্দ্র ও গুরুপ্রসাদীকে নিয়ে সপরিবারে ছিলেন। ঐ বাড়িতে থাকাকালীন গুরুপ্রসাদী দেবী বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল। গুরুপ্রসাদী দেবীর জীবনের আশা রইল না। মনোমোহিনী দেবী পুরুষোত্তমরূপী সন্তান অনুকূলের শরণাপন্ন হলে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন, — ‘ভয় নেই মা তোর গুরুপ্রসাদী সেরে উঠবে।’ পরদিন সকালে দেখা গেল শ্রীশ্রীঠাকুরের শরীরটা গুটি বসন্তে ভরে গেছে। এদিকে গুরুপ্রসাদী দেবী ধীরে ধীরে আরোগ্য লাভ করলেন। শ্রীশ্রীঠাকুর বেশ কয়েকদিন রোগ ভোগ করে সুস্থ হয়ে উঠলেন। এই বাড়িতেই শ্রীশ্রীঠাকুরে মেজ ভাই প্রভাসচন্দ্র কঠিন টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হন। রোগ উপশম হওয়া দূরে কথা ক্রমশঃ ব্যাধির প্রকোপ বেড়েই চলল। চিকিৎসকের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে রোগীর দেহ ঠাণ্ডা হতে লাগলো। জননী মনোমোহিনী তখন প্রথম পুত্র অনুকূলচন্দ্রের হাত দুটি ধরে আর্তকণ্ঠে বললেন — “অনুকূল, তুমি আমার ছেলেই হও আর যাই হও, তুমি সাক্ষাৎ ভগবান। আমার খ্যাপাকে (প্রভাসচন্দ্র) ফিরিয়ে দাও বাবা।” শ্রীশ্রীঠাকুর কিছুক্ষণ মৌন থেকে বললেন— ‘আচ্ছা যাও’। প্রভাসচন্দ্র ধীরে ধীরে আরোগ্যলাভ করলেন। একই ঘটনা ঘটেছিল বিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যের জীবনে। তিনি একবার গুরুতর রোগে আক্রান্ত হলেন। রোগের কোন উপশম হল না। চিকিৎসকের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল। তখন কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যের বয়স মাত্র উনত্রিশ বছর। কোষ্ঠিতে এই সময় তাঁর মৃত্যুযোগ নির্ধারিত ছিল। মাতা মনোমোহিনী দেবী কৃষ্ণপ্রসন্নের শিয়রে শুশ্রূষায় ব্যস্ত ছিলেন। রোগীর অন্তিম দশা দেখে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে তিনি ঠাকুরকে বলেন, – ‘অনুকূল রে, কেষ্ট বুঝি আমাদের ছেড়ে চলে গেল। কেষ্টকে বাবা তুই এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দে নইলে আমি মারা যাব।’ শ্রীশ্রীঠাকুর মায়ের এই আর্জি মঞ্জুর করেছিলেন। কৃষ্ণপ্রসন্নের দেহে প্রাণ ফিরে এসেছিল। তিনি নিরাময় হয়ে উঠলেন।
প্রত্যেকের ব্যথার ব্যথী ছিলেন মাতা মনোমোহিনী দেবী। হিমাইতপুর আশ্রমটা ছিল তাঁর কাছে একটা পরিবার স্বরূপ। আশ্রম ছাড়াও আশেপাশের গ্রামের মানুষের অসুখ-বিসুখ, অভাব-অভিযোগ, বিপদ-আপদ সবকিছুতেই তিনি ছিলেন সকলের ত্রাতা, অসৎ নিরোধে তৎপর। তাঁর ছিল দুর্জয় সাহস ও অসামান্য ব্যক্তিত্ব! নিজের জীবনের মায়া তুচ্ছ করে সব্বাইকে আগলে রাখতেন। না, বেশিদিন আর আগলে রাখতে পারলেন না।


লোক-সংগ্রহের প্রয়োজনে শ্রীশ্রীঠাকুরকে মাঝে-মাঝেই কলকাতায় যেতে হতো। প্রায়শই মা সাথে যেতেন। বাংলা ১৩৪৪ সালের মাঝামাঝি। লিভারের পীড়ায় পীড়িত জননীদেবীকে আশ্রমে থাকতে বলে শ্রীশ্রীঠাকুর কলকাতা চলে যান। ঠাকুর যাবার পর ঠাকুরের নিষেধ অমান্য করে মা কলকাতা চলে এলে ঠাকুর ব্যথিত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তার ব্যাধি বৃদ্ধি পেতে থাকে। কলকাতার ডাক্তারদের চিকিৎসাতে কোন উপশম হচ্ছিল না দেখে ঠাকুর মা-কে নিয়ে হিমাইতপুর ফিরে আসেন।
অসুস্থতার অন্তিম অবস্থায় ডাঃ কেদারনাথ ভট্টাচার্য্যকে উদ্দেশ্য করে জননীদেবী বলেছিলেন—‘দ্যাখ্ কেদার, তোরা আর আমার কি করবি? আমার এই কষ্টভোগ আমারই সৃষ্টি। অনুকূলকে আমি ছেলের বেশি ভাবতে পারিনি—তাই আমার ব্যারাম। সে যা বলে তাই সত্য হয়। ভূত ভবিষ্যত সবই ও জানে। ওর কথা না শুনে আজ আমার এই দুর্ভোগ। অনুকূল আমাকে বারবারই এখানে (কলকাতায়) আসতে নিষেধ করেছিল, আমি তা শুনিনি। যেখানে বাৎসল্য সেখানেই তাচ্ছিল্য, পদে পদে ভুল হয়ে যায়। কর্মফল আর এড়াতে পারলাম না।’
১৩৪৪ বঙ্গাব্দের ৬ই চৈত্রর দিনটিতে বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে সর্বগুণের গুণান্বিতা মাতৃমূর্তি স্বরূপিণী বিশ্বজননী মাতা মনোমোহিনী দেবী সকলকে শোকসাগরে নিক্ষিপ্ত করে ইহলীলা সম্বরণ করেন।
মায়ের নিথর দেহকে আগলে ঠাকুর ‘নিরাশ্রয়, নিরাশ্রয়’ ….. ‘কোথায় আমার মা, কোথায় আমার মা’ বলে কপালে করাঘাত করতে থাকেন। পদ্মার তীরে সৎকার করা হয়। সৎকার করার পরেও ঠাকুর উন্মত্তের ন্যায় কখনো মায়ের ঘরে, কখনো চিতাভূমিতে, কখনো শ্মশানের দিকে তাকিয়ে,—“মা তুই এলিনা—ওমা, মা গো তোর অনুকূলের কি দশা হয়েছে একবার দেখে যা!” …. বলে আকূল আর্তনাদ করতে থাকেন। যথাবিধি শ্রাদ্ধক্রিয়া সমাপন করে কুল পুরোহিতের নির্দেশে একটি বছর ধরে জামা, জুতো, ছাতা ব্যবহার না করে কালাশৌচ পালন করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর।
মায়ের অসুস্থতার সময়ে মাকে সবদিক থেকে স্বস্তিতে রাখার জন্য মায়ের বসবাসের জন্য একটা ঘর তৈরি করিয়েছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। ঘরটিকে খাট, ইজিচেয়ার, টেবিল, আলনা, আয়না, বৈদ্যুতিক আলো, পাখা প্রভৃতি নিত্য ব্যবহার্য্য সরঞ্জামে সাজিয়েছিলেন। স্যানিটারী পায়খানার ব্যবস্থা করেছিলেন, মায়ের যাতে কোন অসুবিধা না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে। পরিতাপের বিষয়, জীবদ্দশায় মায়ের আর ওই ঘরে বাস করা হয়ে ওঠে নি।
মায়ের তিরোভাবের পর সেই গৃহটিকে ‘মাতৃমন্দির’ নামে সংরক্ষিত করে যে স্মৃতিফলক স্থাপন করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর, তাঁর প্রতিলিপি সংযোজিত করলাম।

মা!
বড় আকুল আগ্রহ উদ্‌গ্ৰীৰ উৎকণ্ঠা নিয়েই এই ঘর আর তার আসবাব যা কিছুর কাজ সমাধা ক’চ্ছিলাম—আশা ছিল তুমি থাকবে—ব্যবহার করবে— ধন্য হ’ব আমি—তা হল না— তুমি চ’লে গেলে—পার্থির শরীরের পতন হ’ল—আমার হতভাগ্য অদৃষ্ট কালের নিষ্ঠুর শ্লেষমলিন ধিক্কারে—মৃত্যুর মত জীয়ন্ত হ’য়ে রইল।
মনীষীরা ব’লে থাকেন, মানুষ পার্থিব শরীর ছেড়ে গেলেও আবার যেমন ছিল সূক্ষ্ম শরীরে তেমনই প্রাণ নিয়েই বেঁচে থাকে, আবার জাতিস্মর হ’য়েও নাকি সেই মানুষই জন্মাতে পারে—
মা!
মা আমার !
দয়াল যদি তাই করেন—তুমি যদি কখনও জাতিস্মর হ’য়ে এ দুনিয়ায় আবার ফিরে এস—তোমার অনুকূলকে মনে পড়ে—নিরাশ্রয় ব’লে যদি বেদনা অনুকম্পাজড়িত হৃদয় তোমার আমাকে খোঁজই করে—তুমি এসো— এসে এখানেই থেকো— এসবই ব্যবহার কো’রো—
তোমারই
হতভাগ্য
দীন সন্তান,
অনুকূল
——————————————————————————————– তথ্যঋণ :
১. ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ১ম খণ্ড।
২. শ্রীসচ্চিদানন্দ গোস্বামী প্রণীত, ‘আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী ও সৎসঙ্গ আন্দোলন’।

৩. প্রিয়পরমের পরশে, ১ম খণ্ড।

৪. সতীশচন্দ্র জোয়ারদার প্রণীত জীবনীগ্রন্থ।

tapanspr@gmail.com

প্রসঙ্গ : কল্কি অবতার

।। প্রসঙ্গ : কল্কি অবতার ।।
বৈদিক সাহিত্যে কল্কির কোন উল্লেখ নেই।  বৈদিক সাহিত্যে, রুদ্রের জন্য “কলমলকিনাম” উপাধি পাওয়া যায় (শিবের নামে), যার অর্থ “অন্ধকারের উজ্জ্বল অপসারণকারী”; যাকে “কল্কির অগ্রদূত” হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
কল্কি প্রথমবারের মতো মহাযুদ্ধের মহাকাব্য মহাভারতে আবির্ভূত হয়।  মহা-পুরাণ, যেমন বিষ্ণু পুরাণ,  মৎস্য পুরাণ, ও ভাগবত পুরাণে  কল্কি অবতারের উল্লেখ পাওয়া যায়। যাইহোক, কল্কির পৌরাণিক কাহিনী সম্পর্কিত বিবরণ মহাকাব্য ও পুরাণগুলির পাশাপাশি পুরাণগুলির মধ্যেও ভিন্ন।
পুরাণে কল্কিকে অবতার হিসেবে উল্লেখ করার পাশাপাশি তার সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁর সম্পর্কে বিষদ বর্ণনা পাওয়া যায় কল্কিপুরাণে। তিনি অন্ধকার ও ধ্বংসাত্মক সময়ের অবসান ঘটিয়ে সত্যকে পুনরুজ্জীবিত করবেন, অধর্ম দূর করবেন ও সত্যযুগের সূচনা করবেন, এবং তিনি সাদা ঘোড়ার পিঠে খোলা তরবারী হাতে অবতরণ করবেন।
শ্রী কল্কি পুরাণ  সংস্কৃত ভাষায় রচিত একটি ভবিষ্যতবাণী ভিত্তিক ধর্মগ্রন্থ যেখানে বিষ্ণুর দশম ও শেষ অবতার কল্কির জীবনের বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। সৌটি দ্বারা উন্মোচিত এই কাহিনী কলি যুগ এর শেষের দিকে ভিত্তি করে উপস্থাপিত হয়েছে।
বিদ্যমান ধর্মগ্রন্থটি তিনটি অংশে বিভক্ত যেগুলো যথাক্রমে ৭, ৭ ও ২১টি অধ্যায় নিয়ে গঠিত। এটিকে উপপুরাণ বা ‘গৌণ পুরাণ’ হিসেবে ধরা হলেও এর অনুচ্ছেদগুলো ১৮টি মূখ্য পুরাণ থেকে সংগৃহীত হয়েছে, যেমন বেদব্যাস কর্তৃক বর্ণিত বিষ্ণু পুরাণ ও ভাগবত পুরাণ। কল্কি পুরাণের তারিখ নবম শতাব্দী বা এর পরে নির্ধারিত হয়েছে।
  বৌদ্ধ গ্রন্থে কালচক্র তন্ত্রে ধার্মিক রাজাদের বলা হয় কল্কি (কালকিন, আলোচিত সর্দার), সম্ভলে বসবাসকারী। এই গ্রন্থ অনুসারে অনেক কল্কি আছে, প্রত্যেকেই বর্বরতা, নিপীড়ন ও বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে লড়াই করছে। শেষ কল্কিকে “কাকরিন” বলা হয় এবং বিশৃঙ্খলা ও অবক্ষয়ের অবসান ঘটানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়।  ডোনাল্ড লোপেজের মতে, “কল্কি নিখুঁত যুগের নতুন চক্র শুরু করার পূর্বাভাস দিয়েছেন, যেখানে “বৌদ্ধধর্ম সমৃদ্ধ হবে, মানুষ দীর্ঘজীবী হবে, সুখী জীবনযাপন করবে এবং ধার্মিকতা সর্বোচ্চ রাজত্ব করবে”। সপ্তম শতাব্দীর পরের, সম্ভবত নবম বা দশম শতাব্দীর পাঠ্যটি কাল্কি ধারণার কালানুক্রম প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ।  লোপেজ বলেছেন যে বৌদ্ধ পাঠ সম্ভবত হিন্দু পুরাণ থেকে ধার করেছে। অন্যান্য পণ্ডিত, যেমন যিজু জিন, বলেন যে পাঠ্যটি দশম শতাব্দীতে মধ্য এশিয়ায় উদ্ভূত হয়েছিল এবং তিব্বতি সাহিত্য ১০২৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে ভারতে এর একটি সংস্করণ তুলেছিল।
ঐতিহাসিক শিখ ধর্মগ্রন্থে দেখা যায়, বিশেষ করে দশম গ্রন্থে, পাঠ্যটি ঐতিহ্যগতভাবে গুরু গোবিন্দ সিং-এর উপর আরোপিত। চব্বিশ অবতার বিভাগে উল্লেখ হয়েছে যে ঋষি মৎস্যানর মন্দ, লোভ, হিংসা ও অজ্ঞতার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বিষ্ণু অবতারের চেহারা বর্ণনা করে। ধবন বলেন, ধার্মিকতা ও অধর্মের শক্তির মধ্যে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য চব্বিশতম অবতার হিসেবে কল্কিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। (সূত্রঃ উইকিপিডিয়া)
কিছু পণ্ডিতদের মতে ভগবান বিষ্ণুর দশম অবতার হলেন কল্কি। কল্কি থার্মোনিউক্লিয়ার বিজ্ঞানের সাহায্যে মানব সমাজের দুঃখ দুর্দশা দূর করবেন।
পুরাণকথা অনুসারে কলিযুগ পাপে পূর্ণ হলে বিষ্ণু দুষ্টের দমনের জন্য কল্কি অবতারে আবির্ভূত হবেন। কল্কি অবতার কলিযুগ অবসানের জন্য হবে। যখন কলিযুগে মানুষ ধর্মপথ ত্যাগ করবে তখন ইনি প্রকাশ পাবেন।
শম্ভল গ্রামে (মোরাদাবাদ জেলায়) সুমতি নামে ব্রাহ্মণ কন্যার গর্ভে, বিষ্ণুযশা নামে ব্রাহ্মণের বাড়িতে, কল্কি নামে ভগবান বিষ্ণুর দশম অবতারের আর্বিভাব ঘটবে। কল্কি হবে বিষ্ণুযশা-সুমতির চতুর্থ সন্তান।
বিষ্ণুযশা-সুমতির প্রথম তিন সন্তানের নাম হবে যথাক্রমে কবি, প্রাজ্ঞ আর সুমন্তক।
কল্কিদেব অশ্বারোহনে সিংহল দ্বীপে যাইবেন। সিংহল দ্বীপের রাজা বৃহদ্রথ ও তাঁহার মহিষী কৌমুদী কল্কিদেবকে স্বীয় কন্যা পদ্মাবতীকে সমর্পণ করিবেন। কল্কিদেবের জয় ও বিজয় নামে দুই মহাবলশালী পুত্র জন্মিবে।
আবার ভল্লাটের রাজা শশিধ্বজ ও তাঁর স্ত্রী সুশান্তা স্বীয় কন্যা রমাকে কল্কিদেবের করে সমর্পণ করিয়া তাঁহাকে জামাতৃপদে বরণ করিবেন।
এরপর কল্কিদেব দিগ্বিজয় করিয়া তিনি সমস্ত ভারতের রাজচক্রবর্তী হইবেন এবং পিতার সঙ্কল্পিত অশ্বমেধ ও অন্যান্য অনেক যজ্ঞ সম্পাদন করিয়া বৈদিক ধর্মের পুনরুদ্ধার করিবেন।
এইরূপে সত্যযুগের পুনরাবির্ভাব হইলে কল্কিদেব অবতার দেহ ত্যাগ করিয়া গোলকে বিহার করিবেন। (সংগৃহীত)
**  ** **
মহাভারতের বনপর্বে বকরূপী ধর্ম্ম যুধিষ্ঠিরকে যে-সব প্রশ্ন করেছিলেন তার মধ্যে একটা প্রশ্ন ছিল, পথ কি? সেই প্রশ্নের উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন—
“श्रुतिर्विभिन्ना स्मृतयो विभिन्नाः, नैको मुनिर्यस्य वचः प्रमाणम्। धर्मस्य तत्त्वं निहितं गुहायाम्, महाजनो येन गतः स पन्था।।” 
(বেদ বিভিন্ন, স্মৃতি বিভিন্ন, নানা মুনির নানা মত, ধর্মের মর্ম্ম অমীমাংসিত ভাবে রহিয়াছে; অতএব মহাজ্ঞানী-মহাজন ব্যক্তিগণ যে পথ (আদর্শ) প্রদর্শন করে গেছেন, সেই পথই  মানুষের অনুকরণীয় পথ।)

মহাজ্ঞানী-মহাজন পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র মহা সমাধিস্থ অবস্থায় ভাববাণীতে প্রকাশ করেছেন—“যখন তোরা সেই ব্রজ লীলায় নিত্য রাসে মাতিস, তখন আমি প্রতি ঘটে ঘটে শ্রীকৃষ্ণ। আবার যখন তোরা নদীয়ার পথে ঘাটে বাটে হরিবোল বলে প্রেমে উন্মাদ হয়ে নিত্য করিস, তখন সর্বঘটে আমি শ্রীচৈতন্য রূপে প্রেম দান করি । আমি নিত্য সাক্ষী স্বরূপ। আমিই শ্রীকৃষ্ণ, আমিই শ্রীচৈতন্য, আমিই রামকৃষ্ণ, আমিই সব আমিই সব। (পুণ্যপুঁথি ৬৭ দিবস)
** “কলির লয় অতি নিকট। তোরাই রে তোরা, তোরা সব মিলে আমি— মহা আমি । তাই কল্কি অবতার । পূর্ণ আমি।”১৭
( বিশেষ প্রণিধানযোগ্য তৃতীয় দিবসের ভাববাণী।)
* * *
মহাজ্ঞানী-মহাজন চৈতন্য মহাপ্রভু রূপে তিনি বলেছেন,—
“এইমত আর আছে দুই অবতার,
সংকীৰ্ত্তন আনন্দ রূপ হইবে আমার।।
তাহাতেও তুমি সব এইমত রঙ্গে,
সংকীৰ্ত্তন করিযা মহাসুখে আমা সঙ্গে।।”
(চৈতন্যভাগবত মধ্যখন্ড ২৪৩ পৃষ্ঠা)
* * *
মহাজ্ঞানী-মহাজন শ্রীরামকৃষ্ণ রূপে তিনি বলেছেন—
“আর একবার আসতে হবে তাই পার্যদদের সব জ্ঞান দিচ্ছি না।”
(কথামৃত-৪র্থ ভাগ, পৃষ্ঠা-৬০) “বায়ু কোণে আর একবার আমার দেহ হবে।” কলির শেষে কল্কি অবতার হবে ব্রাহ্মণের ঘরে।” (কথামৃত-১৩৪ পৃষ্ঠা)
* * *
সাধনার দ্বারা উপরোক্ত সব তথ্য বিচার-বিশ্লেষণ করে খুঁজে নিতে হবে আমাদের পিতার পিতা পরমপিতার জীবন্ত আদর্শকে।—ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে। সবাইকে জয়গুরু ও প্রণাম। বন্দে পুরুষোত্তমম্!
————————————————————
tapanspr@gmail.com

।। বিশ্ব পরিবার দিবসের ভাবনা ।।

।। বিশ্ব পরিবার দিবসের শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।


[ ১৫ মে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস। ১৯৯৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রসংঘ সাধারণ পরিষদের এক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৫ মে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস হিসেবে ঘোষিত হয়। রাষ্ট্রসংঘ ১৯৯৪ সালকে আন্তর্জাতিক পরিবার বর্ষ ঘোষণা করেছিল।

নৃবিজ্ঞানী ম্যালিনোস্কির মতে – “পরিবার হল একটি গোষ্ঠী বা সংগঠন আর বিবাহ হল সন্তান উৎপাদন ও পালনের একটি চুক্তি মাত্র”। সামনার ও কেলারের মতে- ‘পরিবার হল ক্ষুদ্র সামাজিক সংগঠন, যা কমপক্ষে দু’ পুরুষকাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে”- এ সংজ্ঞার প্রেক্ষিতে বোঝা যায়, বিবাহপ্রথার আগেও সমাজে পরিবারের সৃষ্টি হয়েছিল- কারণ এ সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়ার আগে থেকেই মানুষ দলবদ্ধ জীবনযাত্রা করত যা পারিবারিক জীবনযাপনের স্বাক্ষরবহ।

তবে বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন সংস্কৃতির পরিবারের ভূমিকা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে পরিলক্ষিত হয়। এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বৈচিত্র্যপূর্ণ নানামুখী ধারা যে কারণে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে এর গঠন ও অন্যান্য অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে এবং হচ্ছে।

শিল্প বিপ্লবের পরে পরিবারের ধরন ও ভূমিকা পাল্টাতে থাকে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে পিতৃতান্ত্রিক পারিবারিক ব্যবস্থা থেকে ক্রমশ ব্যক্তিকেন্দ্রিক গণতান্ত্রিক পরিবার বা যৌথ পরিবার ব্যবস্থা থেকে একক বা নিউক্লিয়ার পরিবার। সমাজবিজ্ঞানী ফলসমের মতে ‘একক’ পরিবারের অন্যতম তিনটি কারণ যেমন স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েরই প্রয়োজন ও চাহিদা সম্পর্কে সচেতনতা, অলাভজনক শিশুশ্রম এবং জন্ম নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার। এরই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর্থিক অনটন, ব্যক্তিত্বের সংঘাত এবং ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের উন্মেষ।

তবে পরিবারের মৌলিক কাজ অনেক।এক দিকে জৈবিক, অপর দিকে মনস্তাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষাদান ইত্যাদি। তবে সব চাইতে বড় দায়িত্ব শিশুর সামাজিকীকরণ এবং সংস্কৃতির সংরক্ষণ। যে শিশুটি ভবিষ্যতের নাগরিক, তার মনোজগত প্রস্তুত হয় পরিবারে। পরিবারের ধারা কেমন, কী ধরনের প্রথা-রীতিনীতি, এ সবের উপর ভিত্তি করে তার জীবনভঙ্গি গড়ে ওঠে। তাই শিশুর সুষ্ঠু পারিবারিক শিক্ষা শৈশব তথা শিশুর মন তথা সাদা কাগজের পাতায় যে ছাপ রাখে, তা ওর পরবর্তী জীবনে অসাধারণ ভূমিকা রাখে। তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় যেমন কিছু সংবিধান আছে তেমনি পারিবারিক সংবিধানও থাকা দরকার। যেমন পরিবারের সবার সঙ্গে সদ্ভাব গড়ে তোলা, সাংসারিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা, মিথ্যে না বলা, গুরুজনদের শ্রদ্ধা করা, নির্দিষ্ট সময়ে ঘরে ফেরা, নিজের কাজ নিজে সম্পন্ন করা, মিথ্যেকে ঘৃণা করা এবং মানবিক মূল্যবোধগুলোর চর্চার মাধ্যমে অন্তরকে বিকশিত করা।]
(সূত্র: suprovat.com)


।। আদর্শ পরিবার গঠনে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্য অবদান ।।

পরিবারের একক ব্যক্তি। স্ত্রী আর পুরুষ দোঁহে মিলে এক হলে একটা আদর্শ ব্যক্তি নির্মাণ হয়। পুংবীজ আর ডিম্বকোষের দুটি অর্ধ-কোষের শুদ্ধ আকূতিতে জন্ম নেয় শুদ্ধাত্মার। ওই একটা কোষ, কোষ-বিভাজনের মাধ্যমে নানা বৈচিত্র্য এবং বৈশিষ্ট্যের কোষের উৎপাদন করে ক্রমে মাথা, বুক, পেট, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সমন্বয়ে পরিপূর্ণ একটা ব্যক্তিতে পরিণত হয়—গর্ভে। গর্ভবাস পরিপূর্ণ হলে কেহ জননীর জননদ্বার দিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়, আবার কাউকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বের করতে হয়।
একজন পূর্ণ, সুস্থ ব্যক্তি নানা-বৈচিত্র্যর কোষ, কলার, অস্থি, মজ্জার সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়। ওই ব্যক্তি-নির্মাণ পদ্ধতি যত শুদ্ধ হবে, ততই এক-একটা শুদ্ধ পরিবার গঠিত হবে। ব্যক্তির আর্য্য নাম প্রজা। প্রজা মানে প্রকৃষ্ট জাতক। প্রকৃষ্ট জাতক নির্মাণ পদ্ধতির মাধ্যম প্রকৃষ্ট যৌনজীবন। উপযুক্ত সুস্থ বিবাহের মাধ্যমে, বিহিত গর্ভাধান সংস্কার দ্বারা ভালো ব্যক্তি নির্মাণ হয়। বর্তমান সভ্যতায় যে বিষয়টি রাষ্ট্রীয়ভাবে উপেক্ষিত। যেমন খুশি তেমন বিবাহের ছাড়পত্র দিয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্র। এবং ডিভোর্সের ছাড়পত্র দিয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্র। যারফলে আমাদের ঈপ্সিত ভালো পরিবারের খুব অভাব। মহানগর আছে অসংখ্য, কিন্তু মহান নাগরিকের অমিল!
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র এখান থেকে তাঁর সৎসঙ্গ আন্দোলন সুরু করতে চাইলেন।
শাসন সংস্থা যেমনই হোক
যা’তেই মাথা ঘামাও না
যৌন ব্যাপার শুদ্ধ না হলে
জাতির জীবন টিঁকবে না। ……….


বর্তমানের ইঁদুড়-দৌড় প্রতিযোগিতার ক্যারিয়ারে চাপা প্রবৃত্তি-পীড়িত মানুষদের মাইক্রো-ফ্যামিলির কনসেপ্ট-এর কাছে সনাতনী পরিবার জীবন আজ মৃতপ্রায়।
রাষ্ট্র স্বীকৃত আইনে মনের রঙীন নেশায় বিয়ে করলাম। ভালো লাগলো না ডিভোর্স করলাম। আবার বিয়ে করলাম। এর ফলে ছেলেমেয়ে বাবা-মা থাকা সত্বেও অনাথ-প্রায়! উপযুক্ত ছেলে থাকতেও বাবা-মা’কে বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে হয়! এই করুণ চিত্রকে ক্যানভাসে রেখে কোন ‘আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস’-এর ছবি আমরা আঁকব? আর সেই ছবি আঁকতে না পারার জন্য ব্যক্তি জীবন, দাম্পত্য জীবন, গৃহ জীবন, সমাজ জীবনগুলো অবিন্যস্তভাবে বিচ্ছিন্ন। পিতামাতা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি নিয়ে একটা আচ্ছাদনের তলায় মিলেমিশে বাস করতে না পারা আমিটি যখন “বিচ্ছিন্নতাবাদ নিপাত যাক” শ্লোগানে চিৎকার করে গলা ফাটাই, তখন মনের আয়নায় যদি নিজের চরিত্রটাকে একবার দেখতে পেতাম, তাহলে না হয় সংশোধনী পথ পাওয়া যেত। আসলে আয়না মানে তো আদর্শ। উচ্চ আদর্শে অনুপ্রাণিত হলেই আত্ম নিয়ন্ত্রণ হয়, অর্থাৎ নিজের প্রবৃত্তির লাগামটা টেনে ধরে সত্তাপ্রেমী হওয়া যায়। ব্যক্তিত্ব নির্মাণ হয়। দাম্পত্য জীবন সুখের হয়। ছেলেমেয়ে ভালো জন্মে। এইভাবে আদর্শ গৃহ জীবনগুলো সূত্রাকারে সমাজ নামের মালার আকার ধারণ করে। যে সমাজের ধনী-দরিদ্র-ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল-হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খৃষ্টান প্রমুখ নামের ফুলগুলো নিজ-নিজ বৈশিষ্ট্য মেনে পরস্পর নির্ভরশীল সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র নির্মাণ করে পরমরাষ্ট্রিক সমবায়ের পরিবার গঠন করবে। প্রাচীন ভারতের আশ্রম ধর্মের সমাজ ব্যবস্থা তাই ছিল। (দ্রঃ বিষ্ণু পুরাণ)

সেই স্বপ্ন সার্থক করে দেখালেন যুগত্রাতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।
এক ছাদের আশ্রয়ে পিতৃব্য, মাতৃব্য, মাতা-পিতা, স্বামী-স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, পৌত্র-পৌত্রাদি, পড়শি, বৃহত্তর পারিপার্শ্বিক নিয়ে বৃহত্তর পরিবার জীবন আমাদের সনাতনী ভারতের আদর্শ ছিল।
ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা পরিবেশের অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। উক্ত উপাদানসমূহকে সমৃদ্ধ রাখার জন্য আর্য্যদের বাস্তব পূর্ত্ত-কর্মের মাধ্যমে নিত্য পঞ্চ-মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করতে হতো সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধিকে অক্ষুণ্ণ রাখতে। শ্রীশ্রীঠাকুর উক্ত বিধানের নবীকরণ করলেন। ইষ্টভৃতি, পিতৃ-মাতৃভৃতি, পরিবেশভৃতি ইত্যাদির প্রবর্তন করে এক বৃহৎ পরিবারের সদস্য করে তুলতে চাইলেন তাঁর কৃষ্টি সন্তানদের।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুশ্রুতি গ্রন্থে ইষ্টভৃতির বিষয়ে বললেন :
‘‘দিন গুজরানী আয় থেকে কর
ইষ্টভৃতি আহরণ,
জলগ্রহণের পূর্ব্বেই তা’
করিস্ ইষ্টে নিবেদন ;
নিত্য এমনি নিয়মিত
যেমন পারিস ক’রেই যা’
মাসটি যবে শেষ হবে তুই
ইষ্টস্থানে পাঠাস্ তা’ ;
ইষ্টস্থানে পাঠিয়ে দিয়ে
আরো দু’টি ভুজ্যি রাখিস্,
গুরুভাই বা গুরুজনের
দু’জনাকে সেইটি দিস্ ;
পাড়া-পড়শীর সেবার কাজে
রাখিস কিন্তু কিছু আরো,
উপযুক্ত আপদগ্রস্তে
দিতেই হ’বে যেটুকু পার ;
এসবগুলির আচরণে
ইষ্টভৃতি নিখুঁত হয়–
এ না-ক’রে ইষ্টভৃতি
জানিস্ কিন্তু পূর্ণ নয় ।’’
(ইষ্টভৃতি মানে, যেনতেনভাবে উপায় করা পয়সা রেখে মাসে মাসে কোন সংগঠনে পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় কিন্তু। উপরোক্ত বাণীতে যা স্পষ্ট করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর।)

শুধু ইষ্টভৃতির মাধ্যমেই নয়, সত্যানুসরণে ‘‘তুমি তোমার, নিজ পরিবারের, দেশের ও দশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দায়ী ।’’ বাণীতেও অনুরূপ দায়ভার দিয়েই রেখেছেন ব্যষ্টি ও সমষ্টি উন্নয়নের দিকে লক্ষ্য রেখে ।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর জন্মভিটা হিমাইতপুরে সকলকে নিয়ে আশ্রম নির্মাণ করে যে বিশ্ব পরিবার রচনা করার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা নিয়ে একদিন অনেক ইতিহাস রচিত হবে।
অপরদিকে, ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতির থাবায় ১৯৪৭ এর ১৫ আগষ্ট দ্বিজাতি-তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে দেশবিভাগের ফলে বহু ছিন্নমূল সৎসঙ্গী পরিবারের দল দেওঘরে চলে আসেন । দেওঘরে ঠাকুর তখন নবাগত । নিজেই পরিবার পরিজনদের নিয়ে প্রভূত কষ্ট স্বীকার করে ভাড়া বাড়ীতে থাকেন । নিদারুণ অর্থকষ্টের মধ্যেও প্রশাসন বা সমাজসেবী সংস্থাদের কাছ থেকে সাহায্য না নিয়ে, কাউকে বিব্রত না করে, আত্মত্যাগী ইষ্টভ্রাতাদের সাহায্যে দুর্গতদের আশ্রয়দান ও ভরণপোষণ করে এক বৃহৎ সৎসঙ্গী পরিবার রচনা করে এক আন্তর্জাতিক পরিবার গঠনের মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৃষ্ট সৎসঙ্গ আন্দোলন বিশ্ব পরিবার সংগঠনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রূপে একসময় প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল হিমাইতপুরে। সুদূর আমেরিকার খ্রিস্টান সম্প্রদায়ভুক্ত শ্রদ্ধাভাজন স্পেনসারদা, হাউজারম্যানদা, ইসলাম সম্প্রদায়ের খলিলুর রহমান, ব্রাহ্মণ পরিবারের বিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য মহোদয়ের ন্যায় পণ্ডিত ব্যক্তি প্রমুখদের পাশাপাশি খুব সাধারণ মাপের অভাবে পরিশ্রান্ত মানুষদের পরিবার নিয়ে গড়ে তোলা পরিবারের নাম ছিল বৃহত্তর সৎসঙ্গীদের একটা পরিবার। দিনান্তে একবার আনন্দবাজারে আশ্রমমাতা জননী মনোমোহিনী দেবীর মাখা “দলা” প্রসাদ খেয়ে পরমানন্দে আশ্রম সংগঠনের ইষ্টের ঈপ্সিত কর্মে মত্ত থাকতেন—বিনা ওজরে, বিনা আপত্তিতে। ওই একবেলা খেয়েই নামধ্যান, কীর্তন, পঠন-পাঠন, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, সংস্কৃতি, বিজ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন থাকতেন। সকল পরিবার ছিল একে অপরের পরিপূরক পরিবার। সে এক স্বর্ণালি যুগ ছিল সৎসঙ্গের। প্রতিটি পরিবারের অভিভাবক ছিলেন মাতা মনোমোহিনী দেবী। সেই সৎসঙ্গ পরিবারের সদস্য আমরা। ব্যক্তি, দম্পতি, গৃহ, সমাজ, রাষ্ট্র জীবনকে অখণ্ড রেখে, প্রাচ্য-প্রতীচ্যকে বর্ণাশ্রমানুশাসনে নিয়ন্ত্রণ করে পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন আমাদের জীবন দেবতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। আমরা যদি ঠাকুরের আদর্শের পরিপালনে, ডিভোর্সকে, বৃদ্ধাশ্রমকে বিদায় জানিয়ে, পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি মিলেমিশে এক ছাদের নীচে জীবন যাপন করে এক-একটা আদর্শ পরিবারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি—সার্থক হবে “পরিবার দিবস” পালন।
বিচ্ছিন্নতাবাদ নিপাত যাক! শ্লোগান সার্থক হবে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ঈপ্সিত সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র গঠন করে পরমরাষ্ট্রিক সমবায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ‘প্রাচ্য-প্রতীচ্য নিয়ন্ত্রণে বর্ণাশ্রমানুশাসকম্ আর্য্য চিরায়ণম্’ ফর্মূলার সাহায্যে।
জয়গুরু!

বন্দে পুরুষোত্তমম্!

tapanspr@gmail.com

।। শ্রীবুদ্ধদেবের আবির্ভাব তিথি স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি ।।

।। পরমপুরুষ শ্রীবুদ্ধদেবের শুভ আবির্ভাব তিথি স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।


[আজ বুদ্ধ পূর্ণিমা। বুদ্ধ পূর্ণিমা বুদ্ধ জয়ন্তী নামেও পরিচিত। বিশ্বজুড়ে এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করা হয়। এই তিথিতে বুদ্ধদেবের আবির্ভাব হয়েছিল বলে ইতিহাসে জানা যায়। বৈদিক সাহিত্য মতে ভগবান বুদ্ধ বিষ্ণুর আরেকটি অবতারও। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর রচিত পুরুষোত্তম বন্দনা মন্ত্রে পূর্বাপর অবতার-বরিষ্ঠদের স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করতে শিখিয়েছেন। বৈদিক সাহিত্য মতে পৃথিবী থেকে হিংসা ও সহিষ্ণুতা চিরতরে মুছে দেওয়ার জন্যই বুদ্ধদেবের আবির্ভাব হয়েছিল। বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিটকে সেই কথা পরিষ্কার ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।]


রাজার ঘরে জন্ম। রাজৈশ্বর্য্যের কোন আকর্ষণই তাঁকে ক্ষুদ্র সংসার মায়ায় আবদ্ধ করতে পারল না। রোগ-শোক-ব্যাধি-জরায় জর্জরিত হয়ে দেহত্যাগ না করে দেহাতীত আত্মার স্বরূপ সন্ধানে হলেন গৃহহারা। সাধনায় সিদ্ধ হয়ে লাভ করলেন বোধি। সিদ্ধার্থ হলেন বুদ্ধদেব। আমাদের বোধকে প্রবুদ্ধ করতে দিলেন চারটি আর্য্যসত্য।–১.দুঃখ, ২. দুঃখের উৎপত্তি, ৩. দুঃখ নিরোধ ও ৪. দুঃখ নিরোধগামী মার্গ। এই চার আর্য্য সত্যের উপর ভগবান বুদ্ধের সামগ্রিক ধর্ম-ভাবনা প্রতিষ্ঠিত। দুঃখ নিরোধগামী মার্গকেই অষ্টাঙ্গিক মার্গ বলা হয়েছে।–১. সম্যক দৃষ্টি (দৃষ্টি শুদ্ধতা)। ২. সম্যক সংকল্প—কাম, হিংসা, প্রতিহিংসা পরায়নতা ত্যাগ করে মৈত্রী ও করুণার সংকল্প। ৩. সম্যক বাক্য—মিথ্যা ও কটুবাক্য পরিহার করে সত্য, প্রিয়, মিষ্ট ও অর্থপূর্ণ বাক-বিনিময় করা। ৪. সম্যক কর্ম—প্রাণী হত্যা, চুরি, ব্যাভিচার ও মাদক দ্রব্য ত্যাগ করে, দয়া, বদান্যতা ও চরিত্র সৎ রাখার কর্ম। ৫. সম্যক জীবিকা—অসৎ জীবিকা ত্যাগ করে সৎ জীবিকার আশ্রয় গ্রহণ। ৬. সম্যক উদ্যম—ইন্দ্রিয় সংযম, কুচিন্তা ত্যাগ, সুচিন্তার আশ্রয়, সৎ চেষ্টার বৃদ্ধি। ৭. সম্যক স্মৃতি--কায়, বেদনা, চিত্ত ও মানসিক ভাবের অমলিন স্মৃতি। সম্যক সমাধি—প্রবৃত্তির দুষ্ট চিন্তা ত্যাগ করে সাত্তিক সাধনায় আত্ম-সমাহিত হওয়া। বুদ্ধদেবের মতবাদ শ্রীকৃষ্ণের আদর্শের পরিপূরক হওয়া সত্বেও বুদ্ধ অনুগামীরা আর্যকৃষ্টির আশ্রমধর্মকে মান্যতা না দিয়ে সন্ন্যাস মাধ্যমে মোক্ষ লাভ করতে গিয়ে বর্ণাশ্রমানুগ বিন্যস্ত সমাজ ব্যবস্থার ক্ষতি হয়। হীনযান, মহাযান, তন্ত্র প্রভৃতি উপ-বিভাগের মতানৈক্যের ফলে সনাতনী আর্যকৃষ্টির প্রবহমানতার গতি রুদ্ধ হয়। বিবাহের উপযুক্ত শ্রেয় ঘরের, তুল্য বংশের পাত্রের অভাবে প্রতিলোম বিবাহ হতে থাকে। বৌদ্ধধর্ম্ম প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন,---‘‘বৌদ্ধমত ও হিন্দুমতে পার্থক্য খুব কম । একই কথা রকমারি করে বলা । শুনেছি বুদ্ধদেবের কথার মধ্যে প্রকারন্তরে বর্ণাশ্রমের সমর্থন আছে । ...... তিনি গৃহীদের বিয়ে-থাওয়া, চাল-চলন-সম্বন্ধে যে-সব নির্দ্দেশ দিয়েছেন, তার সঙ্গে বর্ণাশ্রমের কোন বিরোধ নেই । অশোক বৌদ্ধধর্মের যে রূপ দিলেন, তার মধ্যে বর্ণাশ্রম খুঁজে পাওয়া যায় না । বর্ণাশ্রম হ'লো একটা scientific social structure (বৈজ্ঞানিক সমাজ বিধান) । এই structure (কাঠামো) ভেঙ্গে দিলে মানুষের অন্তরে-বাহিরে একটা chaotic condition-এর (বিশৃঙ্খল অবস্থার) সৃষ্টি হয় ।’’ (আ. প্র. ৬ খণ্ড, ২৩. ১২. ১৯৪৫) ‘‘অশোকের হাতে পড়ে বৌদ্ধধর্ম্মের কিছু কিছু বিকৃতি দেখা দিল। বৌদ্ধদের সংখ্যা বাড়ল বটে, কিন্তু বর্ণাশ্রমের বাঁধন রইল না। তারপর এল শঙ্করাচার্য্যের মায়াবাদ---‘ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা’। মানুষ ভুলে গেল যে আধ্যাত্মিকতা সার্থক হয় সাত্বত বস্তুতান্ত্রিকতায়। বুদ্ধদেব ও শঙ্করাচার্য্য এই দুইজনের সময় থেকেই অসৎ নিরোধের উপর গুরুত্ব দেওয়া হল না। ‘সোহহং’ চর্চ্চার ফলে ব্যক্তিগত সাধনার উপরই জোর দেওয়া হল। একটা সর্ব্বাঙ্গীন ভাবধারা কোথাও রইল না। একটা মূল সূত্রের উপর দাঁড়িয়ে বৈশিষ্ট্যপালী রকমে সমাজ, রাষ্ট্র সব নিয়ে একটা সর্ব্বসঙ্গতিসম্পন্ন ধারা ফুটে উঠল না। এই সবের ফলে এসেছিল নির্ব্বীর্য্যতা। তোমরা যদি এই সর্ব্বতোমুখী কার্য্যক্রম নিয়ে তেমনভাবে তৈরী হও, তাহলে সব সম্প্রদায়ের সঙ্গে সঙ্গতি নিয়ে আবার তোমরা অসৎনিরোধী পরাক্রম-প্রবুদ্ধ হয়ে বৈশিষ্ট্যপালী আপূরয়মাণ আদর্শের উপর দাঁড়িয়ে জগতে অজেয় হতে পারবে।’’ (আ. প্র. ২১ খণ্ড, ১১. ০৫. ১৯৫২)

আজকের এই পুণ্য তিথিতে পরমপিতার উদ্দেশ্যে নিবেদন, শুদ্ধ বোধি দিয়ে আমরা যেন সব ধরনের বোধ-বিপর্যয় থেকে নিজেদের রক্ষা করে স্মৃতিবাহী চেতনায় সমৃদ্ধ হতে পারি। জয়গুরু।

নিবেদনে—tapanspr@gmail.com

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য

পুরানো সেই দিনের কথা

।। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।

‘প্রথম প্রভাত উদয় তব গগনে,
প্রথম সাম রব তব তপোবনে,
প্রথম প্রচারিত তব বন-ভবনে
জ্ঞান-ধর্ম কত কাব্যকাহিনী…….’ বাণীর গাঁথায় বন্দনা করেছেন ভারত-জননীকে। ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বৈশিষ্ট্যপালী আপূরয়মাণ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সকলকে যথাযোগ্য মূল্যায়ণ করতেন, যথাযোগ্য সম্মান দিতেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে তিনি ‘ঋষি বলতেন’। আলোচনা-প্রসঙ্গের সংকলনে কবিগুরুর রচনাকে নানা আঙ্গিকে তুলে ধরেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। বিষয়বস্তুকে সমৃদ্ধ করতে মাঝে মধ্যেই উদাত্ত কণ্ঠে ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা তিনি আবৃত্তি করতেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের পুণ্য জন্মদিন স্মরণে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আবৃত্তি করা ‘কথা ও কাহিনী’-র ‘গুরু গোবিন্দ’ কবিতার ক’টি লাইন উদ্ধৃত করলাম।—
‘‘কবে প্রাণ খুলে বলিতে পারিব—-
‘পেয়েছি আমার শেষ!
তোমরা সকলে এসো মোর পিছে,
গুরু তোমাদের সবারে ডাকিছে,
আমার জীবনে লভিয়া জীবন
জাগো রে সকল দেশ।
‘নাহি আর ভয়, নাহি সংশয়,
নাহি আর আগু-পিছু।
পেয়েছি সত্য, লভিয়াছি পথ,
সরিয়া দাঁড়াক সকল জগৎ—
নাই তার কাছে জীবন মরণ
নাই নাই আর কিছু।’
‘হৃদয়ের মাঝে পেতেছি শুনিতে
দৈববাণীর মতো—-
‘উঠিয়া দাঁড়াও আপন আলোতে,
ওই চেয়ে দেখো কত দূর হতে
তোমার কাছেতে ধরা দিবে ব’লে
আসে লোক কত শত।
‘ওই শোনো শোনো কল্লোলধ্বনি,
ছুটে হৃদয়ের ধারা।
স্থির থাকো তুমি, থাকো তুমি জাগি
প্রদীপের মতো আলস তেয়াগি,
এ নিশীথমাঝে তুমি ঘুমাইলে
ফিরিয়া যাইবে তারা।’
‘ওই চেয়ে দেখো দিগন্ত-পানে
ঘনঘোর ঘটা অতি।
আসিতেছে ঝড় মরণেরে লয়ে—
তাই বসে বসে হৃদয়-আলয়ে
জ্বালিতেছে আলো, নিবিবে না ঝড়ে,
দিবে অনন্ত জ্যোতি।’’
——
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আবৃত্তি করা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিরচিত ‘কৃপণ’ কবিতা।
কৃপণআমি ভিক্ষা করে ফিরতেছিলেম গ্রামের পথে পথে, তুমি তখন চলেছিলে তোমার স্বর্ণরথে। অপূর্ব্ব এক স্বপ্নসম লাগতেছিল চক্ষে মম--- কি বিচিত্র শোভা তোমার, কি বিচিত্র সাজ। আমি মনে ভাবতেছিলেম এ কোন্ মহারাজ।। আজি শুভক্ষণে রাত পোহালো. ভেবেছিলেম তবে, আজ আমারে দ্বারে দ্বারে ফিরতে নাহি হবে। বাহির হতে নাহি হতে কাহার দেখা পেলেম পথে, চলিতে রথ ধনধান্য ছড়াবে দুই ধারে--- মুঠা মুঠা কুড়িয়ে নেব, নেব ভারে ভারে।। দেখি সহসা রথ থেমে গেল আমার কাছে এসে, আমার মুখ-পানে চেয়ে নামলে তুমি হেসে। দেখে মুখের প্রসন্নতা জুড়িয়ে গেল সকল ব্যথা, হেন কালে, কিসের লাগি তুমি অকস্মাৎ ‘আমায় কিছু দাও গো’ বলে বাড়িয়ে দিলে হাত।। মরি, এ কী কথা রাজাধিরাজ! ‘আমায় দাও গো কিছু’--- শুনে ক্ষণকালের তরে রইনু মাথা-নীচু। তোমার কিবা অভাব আছে ভিক্ষা চাও ভিখারির কাছে! এ কেবল কৌতুকের বশে আমায় প্রবঞ্চনা। ঝুলি হতে দিলেম তুলে একটি ছোটো কণা।। যবে পাত্রখানি ঘরে এনে উজাড় করি,--- একি, ভিক্ষা-মাঝে একটি ছোটো সোনার কণা দেখি! দিলেম যা রাজ-ভিখারিরে স্বর্ণ হয়ে এল ফিরে,--- তখন কাঁদি চোখের জলে দুটি নয়ন ভ’রে,--- তোমায় কেন দিইনি আমার সকল শূণ্য করে?


সৎসঙ্গের তৎকালিন সভাপতি ঋত্বিগাচার্য্য শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য (এম. এ), শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের রচিত ‘সত্যানুসরণ’ পুস্তিকাটি নিয়ে একবার কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বইটির কিছুটা অংশ পাঠ করেই জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘ইহার বয়স কত?’ ঋত্বিগাচার্য্য শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য তদুত্তরে বলেছিলেন, ‘তাঁর বয়স বেশী নয়, মাত্র ২২ বছর’। পুস্তকখানার আরও কিয়দংশ পাঠ করে কবিগুরু পুণরায় জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘কত বয়স বললে?’ ঋত্বিগাচার্য্য শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য পূর্বপ্রদত্ত উত্তরেরই পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। পুস্তকের আরো কিয়দংশ পাঠ করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ আবার সেই একই প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কত বয়স বললে যেন?’ ঋত্বিগাচার্য্য শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য পুণরায় বলেছিলেন, ২২ বছর। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন,--- ‘‘এত অল্প বয়সে এরূপ স্বচ্ছ সাবলীল ছন্দে, অপরূপ ভঙ্গিতে, গভীর তত্ত্বসমূহের এমন অপূর্ব প্রকাশ কি করিয়া সম্ভব হয়!’’ এর কিছুদিন পর সৎসঙ্গের তৎকালিন সহ-সভাপতি শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত সুশীল চন্দ্র বসু (বি. এ.) কবিগুরুর সাক্ষাৎ করেন। কবিগুরু শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত সুশীলচন্দ্রের সাথে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৎসঙ্গ কর্মপ্রতিষ্ঠান সম্বন্ধে আগ্রহ সহকারে নানা আলাপ-আলোচনাদি করেছিলেন। সেই সাক্ষাৎকারের কথা বিবৃত করে সুশীলচন্দ্র লিখেছেন--- “একবার শান্তিনিকেতনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম। নানা কথার পর শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ও তাঁর কর্মপ্রতিষ্ঠান সম্বন্ধীয় আলোচনা প্রসঙ্গ উঠিতেই, তিনি বললেন, ‘আমি শুনিয়াছি তোমরা কাজকর্ম খুব ভালই করিতেছ, তোমাদের কোন অভাব অভিযোগ নাই, কিন্তু দেখ, আমার এই বৃদ্ধ বয়সে অপটু শরীর লইয়া ছেলে মেয়ে নাচাইয়া আমার এই প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ সংগ্রহ করিতে হইতেছে!’ তাঁর কথা শুনে আমি অবশ্যই খুব দুঃখবোধ করিয়াছিলাম, তাহাকে বলিলাম, ‘অন্যের নিকট হইতে একথা শুনিলে বিস্মিত হইবার কোন কারণ ছিল না, কিন্তু আপনার নিকট হইতে শুনিয়া বিস্ময় বোধ না করিয়া পারিতেছি না। আপনি নিজে এ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলিয়াছেন। কর্ম প্রতিষ্ঠান গড়িতে দেশের লোকের সক্রিয় সহানুভূতি কিরূপ পাওয়া যায় তাহা আপনি বিলক্ষণ অবগত আছেন। আপনি ধনী পিতার সন্তান, আপনি বিশ্বকবি, জগৎজোড়া আপনার খ্যাতি, তথাপি প্রতিষ্ঠানটিকে চালাইতে ছেলে মেয়ে নাচাইয়া আপনাকে অর্থসংগ্রহ করিতে হইতেছে, বৃদ্ধ বয়সে এজন্য আপনার উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার সীমা নাই। আর আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রাণপুরুষ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র দরিদ্র ব্রাহ্মণের সন্তান। আপনার ন্যায় খ্যাতি প্রতিপত্তি তো দূরের কথা, তিনি তাঁহার নিজের দেশবাসীর কাছেই এখনও একরূপ অপরিচিত। এমতাবস্থায় আমাদের প্রতিষ্ঠানের কোন অভাব-অভিযোগ নাই, ইহা আপনি কিরূপে অনুমান করিতে পারিলেন?’ আমার কথা শুনিয়া তিনি নিরুত্তর রহিলেন। বস্তুত যাঁহারাই কোন কর্ম প্রতিষ্ঠান (বিশেষত অভিনব ধরণের ) গড়িয়া তুলিয়াছেন তাহারাই জানেন যে, এই দেশে কোন প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিতে কি পর্বতপ্রমাণ বাধাবিঘ্নের সম্মুখীন হইতে হয়।” (সূত্র : মানসতীর্থ পরিক্রমা) আজকের এই স্মৃতিচারণ-লগ্নে পরমপিতার রাতুল চরণে প্রার্থনা, ঋষিপ্রোক্ত ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টির সদাচার, বর্ণাশ্রম এবং বিবাহবিধি মেনে আমাদের ঘরের মায়েরা যেন রবীন্দ্রনাথের ন্যায় শুদ্ধাত্মাদের আবার ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয় এই ধরাধামে। তবেই সার্থক হবে আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিকে চিরভাস্বর করে রাখা। সবাইকে আমার জয়গুরু ও প্রণাম।