আমেরিকা ও ইউরোপে যতদিন সুপ্রজননের নীতিবিধি ঠিকভাবে প্রতিপালিত হ’তো, ততদিন ওখানে অনেক উঁচুদরের মানুষ জন্মাতো, এখন তা’ ক্রমে-ক্রমে লোপ পেয়ে যাচ্ছে, বিশেষ মানুষের অভ্যুত্থান আজকাল কমই হচ্ছে। বিশেষ ধরণের মানুষ যদি না জন্মায়, তা’হলে বাইরের কোন উন্নতিতেই কিন্তু সবদিকের সুরাহা হবে না। সম্পদও বিপদের কারণ হয়ে ওঠে, যদি মানুষ প্রকৃত মানুষ না হয়। সূত্র: (আলোচনা প্রসঙ্গে, ১৪/২৩.৮.১৯৪৮)
।। অবতার-বরিষ্ঠ পুরুষোত্তম চৈতন্যদেবের সমন্বয়ী ধর্মীয় আন্দোলন ।। পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যদেব অসি নয়, তীর-ধনুক-বল্লম লাঠি দিয়েও নয়—খোল, করতালাদি বাদ্যযন্ত্রের অনুষঙ্গে ‘হরেরাম হরেকৃষ্ণ’ নামকীর্তনের মাধ্যমে এক ধর্মীয় প্লাবন সৃষ্টি করেছিলেন। ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ অতিক্রম করে, পুরুষার্থের পঞ্চম-বর্গ প্রেমের সাহায্যে সাম্প্রদায়িক কায়েমী-স্বার্থীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ভাগবত আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে ভাগবত ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্ণাশ্রমানুগ সামাজিক বিন্যাসকে সমৃদ্ধ করতে সর্ববর্ণে হরিনাম প্রচার করে বাহ্য জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। কিছু স্বার্থান্বেষী স্মার্ত্ত-পণ্ডিতদের অভিসন্ধিমূলক অভিযোগের ভিত্তিতে তৎকালিন শাসক চাঁদকাজী হরিনাম সঙ্কীর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। শ্রীবাস অঙ্গনের কীর্তনের আসরে গিয়ে বৈষ্ণবদের ওপর অত্যাচার করে, শ্রীখোল ভেঙ্গে দেয়। শান্ত মহাপ্রভু ওই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে কোন বিরোধ না করেই দুর্বার নিরোধ করেছিলেন। ১৪টি কীর্তনদল সংগঠিত করে উদ্দাম কীর্তন করতে করতে চাঁদকাজির বাড়িতে যান। চাঁদকাজী ভয় পেয়ে গেলে মহাপ্রভু তাকে আশ্বস্ত করতে কৃষ্ণপ্রেমের কথা বলেন। হরিনাম-সংকীর্তনের উপযোগিতা বিষয়ে বিস্তৃত ব্যাখ্যা করেন। তার পরে আপনকরা ভাব নিয়ে বলেন, তুমি আমার মামার গ্রামের লোক হবার সুবাদে তুমি আমার মামা হও, মামা হয়ে ভাগ্নের প্রতি এমন কঠোর হয়ো না। কীর্তন বন্ধ করার আদেশ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত আমরা তোমার বাড়ী ছেড়ে যাচ্ছি না। ধর্ম প্রতিষ্ঠার কর্তব্যে অটল মহাপ্রভুর কীর্তন আন্দোলনের কাছে আনুগত্য স্বীকার করতে বাধ্য হয় চাঁদকাজি। তিনিও মহাপ্রভুর সাথে গলা মিলিয়ে হরিনাম সঙ্কীর্তন করেন। সবাইকে হরিনাম সঙ্কীর্তন করতে আদেশ জারী করেন। চৈতন্য আজ্ঞায় স্থির হইল কীর্তন কহে আপনার তত্ত্ব করিয়া গর্জন। কলিযুগে মুঞি কৃষ্ণ নারায়ন মুঞি সেই ভগবান দেবকীনন্দন।। অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড কোটি মাঝে মুই নাথ যত গাও সেই মুঞি তোরা মোর দাস।।’’ (শ্রীচৈতন্য ভাগবত পৃষ্ঠা ১৪৬, মধ্যখণ্ড ৮ম অধ্যায়।) * * *
(শ্রীমন্ মহাপ্রভু বললেন, মামা! আমি আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করার জন্য আপনার বাড়িতে এসেছি। তার উত্তরে চাঁদকাজী বললেন–-হ্যাঁ, তোমার মনে কি প্রশ্ন আছে তা তুমি বল।) প্রভু কহে দুগ্ধ খাও গাভী তোমা মাতা। বৃষ অন্ন উপজায় তাতে তেঁহো পিতা।।
(শ্রীমন্ মহাপ্রভু বললেন––আপনি গরুর দুধ খান; সেই সূত্রে গাভী হচ্ছে আপনার মাতা। আর বৃষ অন্ন উৎপাদন করে, যা খেয়ে আপনি জীবন ধারন করেন; সেই সূত্রে সে আপনার পিতা।) পিতা মাতা মারি খাও এবা কোন্ ধর্ম্ম। কোন্ বলে কর তুমি এমত বিকর্ম।।
(যেহেতু বৃষ ও গাভী আপনার পিতা ও মাতা, তা হলে তাদের হত্যা করে তাদের মাংস খান কি করে ? এটি কোন্ ধর্ম ? কার বলে আপনি এই পাপকর্ম করছেন ?) কাজী কহে তোমার যৈছে বেদ পুরাণ। তৈছে আমার শাস্ত্র কেতাব কোরাণ।।
(কাজী উত্তর দিলেন, তোমার যেমন বেদ, পুরাণ আদি শাস্ত্র রয়েছে, তেমনই আমাদের শাস্ত্র হচ্ছে কোরান।) সেই শাস্ত্রে কহে প্রবৃত্তি নিবৃত্তি মার্গ ভেদ। নিবৃত্তি মার্গে জীব মাত্র বধের নিষেধ।।
(কোরান অনুসারে উন্নতি সাধনের দুটি পথ রয়েছে––প্রবৃত্তিমার্গ ও নিবৃত্তিমার্গ। নিবৃত্তিমার্গে জীবহত্যা নিষিদ্ধ।) প্রবৃত্তি মার্গে গোবধ করিতে বিধি হয়। শাস্ত্রাজ্ঞায় বধ কৈলে নাহি পাপ ভয়।।
(প্রবৃত্তিমার্গে গোবধ অনুমোদন করা হয়েছে। শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে যদি বধ করা হয়, তাহলে কোন পাপ হয় না।) তোমার বেদেতে আছে গোবধের বাণী। অতএব গোবধ করে বড় বড় মুনি।।
(চাঁদকাজী শ্রীমন্ মহাপ্রভু বললেন-–তোমার বৈদিক শাস্ত্রে গোবধের নির্দেশ রয়েছে। সেই শাস্ত্র-নির্দেশের বলে বড় বড় মুনিরা গোমেধ-যজ্ঞ করেছিলেন।) প্রভু কহে বেদে কহে গোবধ নিষেধ। অতএব হিন্দু মাত্র না করে গোবধ।।
(চাঁদকাজীর উক্তি খণ্ডন করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন-–বেদে স্পষ্টভাবে গোবধ নিষেধ করা হয়েছে। তাই যে কোন হিন্দু, তা তিনি যেই হোন না কেন, কখনোও গোবধ করেন না।) জীয়াইতে পারে যদি তবে মারে প্রাণী। বেদ পুরাণে আছে হেন আজ্ঞাবাণী।।
(বেদ ও পুরাণে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, কেউ যদি কোন প্রাণীকে নবজীবন দান করতে পারে, তাহলে গবেষণার উদ্দ্যেশ্যে সে প্রাণী মারতে পারে।) অতএব জরদগব মারে মুনিগণ। বেদমন্ত্রে সিদ্ধ করে তাহার জীবন।।
(তাই মুনি-ঋষিরা অতি বৃদ্ধ জরদগব (জরাগ্রস্ত বা বৃদ্ধ) পশুদের কখনও কখনও মেরে, বৈদিক মন্ত্রের সাহায্যে তাদের নবজীবন দান করতেন।) জরদগব হঞা যুবা হয় আরবার। তাতে তার বধ নহে হয় উপকার।।
(এই ধরনের জরদগব (জরাগ্রস্ত বা বৃদ্ধ) পশুদের যখন এভাবেই নবজীবন দান করা হত, তাতে তাদের বধ করা হত না, পক্ষান্তরে তাদের মহা উপকার সাধন করা হত।)কলিকালে তৈছে শক্তি নাহিক ব্রাহ্মণে। অতএব গোবধ কেহো না করে এইক্ষণে।।
(পূর্বে মহা শক্তিশালী ব্রাহ্মণেরা বৈদিক মন্ত্রের সাহায্য এই ধরনের কার্য্য সাধন করতে পারতেন, কিন্তু এখন এই কলিযুগে সেই রকম শক্তিশালি কোন ব্রাহ্মণই নেই। তাই গাভী ও বৃষদের নবজীবন দান করার যে গোমেধ-যজ্ঞ, তা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।)তোমরা জীয়াইতে নার বধ মাত্র সার। নরক হৈতে তোমার নাহিক নিস্তার।।
(তোমরা মুসলমানেরা পশুকে নবজীবন দান করতে পার না, তোমরা কেবল হত্যা করতেই পার। তাই তোমরা নরকগামী হচ্ছ; সেখান থেকে তোমরা কোনভাবেই নিস্তার পাবে না।)গো অঙ্গে লোম যত তত সহস্র বৎসর। গোবধী রৌরব মধ্যে পচে নিরন্তর।।
(গরুর শরীরে যত লোম আছে তত হাজার বছর গোহত্যাকারী রৌরব নামক নরকে অকল্পনীয় দুঃখ-যন্ত্রণা ভোগ করে।) তোমা সবা শাস্ত্রকর্ত্তা সেহো ভ্রান্ত হৈল। না জানি শাস্ত্রের মর্ম্ম ঐছে আজ্ঞা দিল।।
(তোমাদের শাস্ত্রে বহু ভুলভ্রান্তি রয়েছে। শাস্ত্রের মর্ম না জেনে, সে সমস্ত শাস্ত্রর প্রণয়নকারীরা এমন ধরনের নির্দেশ দিয়েছে, যাতে যুক্তি বা বুদ্ধির দ্বারা বিচারের কোন ভিত্তি নেই এবং প্রমাণও নেই।) শুনি স্তব্ধ হৈল কাজী না স্ফুরে বাণী। বিচারিয়া কহে কাজী পরাভব মানি।।
(শ্রীমন্ মহাপ্রভুর এই কথা শুনে কাজীর সমস্ত যুক্তি স্তব্ধ হল, তিনি আর কিছু বলতে পারলেনা। এভাবেই পরাজয় স্বীকার করে কাজী বিচারপূর্বক বললেন।—) তুমি যে কহিলে পণ্ডিত সেই সত্য হয়। অধুনা মোর শাস্ত্র, বিচারসহ নয়।।
(নিমাই পণ্ডিত! তুমি যা বললে তা সবই সত্য। আমাদের শাস্ত্র আধুনিক এবং তাই তার নির্দেশগুলি দার্শনিক বিচার বা যুক্তিসঙ্গত নয়।) কল্পিত আমার শাস্ত্র আমি সব জানি। জাতি অনুরোধে তবু সেই শাস্ত্র মানি।।
(আমি জানি যে, আমাদের শাস্ত্র বহু ভ্রান্ত্র ধারনা ও কল্পনায় পূর্ণ, তবুও যেহেতু আমি মুসলমান, তাই সম্প্রদায়ের খাতিরে আমি সেগুলি স্বীকার করি।)
‘দোলে দোদুল দোলে ঝুলনা’—মনকে দুলিয়ে দেওয়া গানের কথাগুলো দোলের সাথে রাধাকৃষ্ণকে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। কৃষ্ণ রাধাকে রঙ দিয়ে রাঙিয়ে দিয়েছে, আমরা তো তার অনুকরণ করতেই পারি! যেন এক নস্টালজিয়ার আস্বাদন ! তাই অনেকেই ধর্ম পালনের নামে রাধাকৃষ্ণের লীলাকে কেন্দ্র করে দোল উৎসব উদযাপন করেন। না জেনে, না বুঝে, রাধা-কৃষ্ণের পরকীয়া লীলাটাকে একটু বেশি প্রাধান্য দেন। অথচ পণ্ডিতেরা বৃন্দাবনে রাধা নামের কোন গোপিনীকে খুঁজে পাননি, আর শ্রীকৃষ্ণ তো অক্রুরের আহ্বানে কিশোর বয়সে বৃন্দাবন থেকে মথুরাতে গিয়ে কংস বধ করে বিদ্যার্জনে মন দেন, বৃন্দাবনে আর ফিরে যান নি। তাই যুবতী রাধার সাথে যুবক শ্রীকৃষ্ণ সুদর্শন চক্র, বাঁশী ফেলে রেখে পিচকিরি হাতে নিয়ে বৃন্দাবনে, না মথুরায়, না দ্বারকায়, না প্রভাসে—কোথায় বসে দোল খেলেছিল আমি বলতে পারব না !******
আমাদের বাংলাদেশে ১৪০৭ শকাব্দ, (১৮-২-১৪৮৬) ২৩ ফাল্গুন, দোলপূর্ণিমা চন্দ্রগ্রহণের রাতে নিমবৃক্ষের নীচে ভূমিষ্ঠ হন জগন্নাথ মিশ্র ও শচীদেবীর দ্বিতীয় পুত্র নদীয়া জেলার নবদ্বীপে। নিম গাছের তলায় ভূমিষ্ঠ হবার কারণে মা নামকরণ করেছিলেন নিমাই, কোষ্ঠী বিচারের নাম ছিল বিশ্বম্ভর। ভক্তদের হৃদয়ে চৈতন্য মহাপ্রভু। দোল পূর্ণিমা তিথিটি চৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব তিথি স্মরণে মহা সমারোহে পালিত হয়।
আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও যাও গো এবার যাবার আগে’ বাণীর ডালি সাজিয়ে দোল উৎসবকে এক নতুন আঙ্গিকে ‘বসন্তোৎসব’ নামে উদযাপন করলেন শান্তিনিকেতনে। যার প্রবহমানতা ক্রম বর্ধমান। দোল পূর্ণিমার দিনটিতে ‘ওরে গৃহবাসী খোল্ দ্বার খোল্ লাগলো যে দোল’ নৃত্যগীতির আনন্দে মেতে ওঠে বোলপুর-শান্তিনিকেতন।
কিন্তু বড্ড কষ্ট পাই, যখন দেখি দোলের আনন্দ জীবনকে নন্দিত না করে নিন্দিত করে। মদের দোকানগুলোতে ভীড় জমে। আর্য্য-সংস্কৃতির পরিপন্থী নাচাগানা, হৈ-হুল্লোড়, মারামারি-ঝগড়াঝাটি-রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটে যায়। অন্যান্য সম্প্রদায় হিন্দুদের এই উৎসবের দিকে তর্জনী তুলতে সুযোগ পায়। তবুও চলছে, চলবে। ‘আসছে বছর আবার হবে’—শ্লোগানটা যেন মনুষ্যত্বের উৎসকে সমৃদ্ধ করে। নিবেদনে অনুরোধ জানাই সংশ্লিষ্ট সবার কাছে।
যাইহোক, এবার দোলের উৎস বিষয়ে একটু জানা যাক।
আর্য্যকৃষ্টির মূল গ্রন্থ ব্রহ্মসংহিতায় আমাদের জীবন-চলনাকে সমৃদ্ধ করার জন্য সব বিষয়ের উপর আলোকপাত করা হয়েছে। তারমধ্যে চিকিৎসা বিষয়টাও রয়েছে। ব্রহ্ম সংহিতায় অষ্টাঙ্গ আয়ুর্বেদের উল্লেখ আছে। পরবর্তীকালে ব্যবহারিক সুবিধার্থে ব্রহ্মসূত্রে উল্লেখিত পুরুষার্থের চতুর্বর্গ-এর বিভিন্ন পর্যায়গুলোকে ঋষিগণ পৃথকীকরণ করেন। এইভাবে জন্ম নেয় বিভিন্ন সংহিতার। তার মধ্যে চরক-সংহিতা চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি প্রামান্য গ্রন্থ। ওই গ্রন্থে প্রাকৃতিক ঋতু পরিবর্তনের সময় সে-সব রোগ হবার সম্ভাবনা থাকে সে-সব রোগ প্রতিরোধ করার জন্য আহার-বিহার, টোটকা, ঔষধের প্রয়োগ ইত্যাদি বিষয়ে বিশদ উপদেশ দেওয়া আছে। শরীর-মনকে সুস্থ রাখার জন্য বসন্তকালে মুক্তবায়ু সেবনের কথা, দোলনায় দুলে দোল খাওয়ার কথাও বলা আছে। ওই সময় বসন্ত রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষা পেতে, কিছু কিছু ফুলের নির্যাস থেকে তৈরি রসায়ন অঙ্গে লেপন করার কথা বলা আছে। ওই নির্যাসের নাম আবির। পরবর্তীকালে বিখ্যাত সব বৈদ্যদের পরামর্শক্রমে সবাই আবির-মাখা এবং মাখানো বিষয়ে সচেতন হতে শুরু করে। বিষয়টি প্রচার হতে থাকে। উৎসব পালন মাধ্যমে ‘রোগ-প্রতিরোধে আবিরের ব্যবহার’ অভ্যাসে পরিণত করার জন্য, ফাল্গুনী-পুর্ণিমার দিনটিকে নির্দিষ্ট করা হয়। সেই দিক থেকে বিচার করলে, বসন্তকালীন রোগ-প্রতিরোধের টীকাকরণ দিবস—ফাল্গুনী-পুর্ণিমার দিনটি। সেই থেকে নানাভাবে, নানা আঙ্গিকে, নানাস্থানে পালিত হয়ে চলেছে ওই দিনটি। সেই হিসেবে বৃন্দাবনে দোল উৎসব হয়ে থাকতেই পারে। গোপ-গোপীরা বালক কৃষ্ণকে বসন্ত-রোগ থেকে রক্ষা করার জন্য আবির দিতেই পারেন। কিন্তু যুবতী রাধার সাথে কৃষ্ণকে দোলমঞ্চে বসিয়ে রঙের উৎসব করাটা কেমন যেন বিসদৃশ মনে হয়।
।। দোলের সাথে চাঁচর বা বহ্নুৎসবের প্রেক্ষাপট ।। ভক্ত প্রহ্লাদের পিতা ইষ্টদ্রোহী হিরণ্যকশিপু কিছুতেই যখন হরিভক্ত পুত্রকে হত্যা করতে পারছিলেন না, তখন তাঁর বোন অগ্নি প্রতিরোধী ক্ষমতাসম্পন্না ‘হোরিকা’ (হোরিকা<হোরি<হোলি) দাদাকে বলেন, আমি প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে দাঁড়াবো, তুমি চারিদিকে আগুন জ্বালিয়ে দেবে। অগ্নি দেবতার বরে বলীয়ান আমি তো পুড়বো না, প্রহ্লাদ সেই আগুনে পুড়ে মরবে। তোমার মনের বাসনা হবে পূর্ণ ! প্রস্তাব পাশ হয়। প্রশস্ত প্রাঙ্গনে ভাইপো কোলে পিসি হোরিকা দাড়ায় । চারিদিকে আগুন জ্বালিয়ে দেয় প্রহ্লাদের বাবা। নির্বিকার প্রহ্লাদ ইষ্টনাম জপতে থাকেন । ইষ্ট বিদ্বেষী হোরিকা অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান। প্রহ্লাদ বেঁচে যান তাঁর ইষ্টদেবতা হরিকে স্মরণ করে। সেই থেকেই প্রবাদ প্রচলিত হয় 'রাখে হরি মারে কে, মারে হরি রাখে কে।' অর্থাৎ, হরিকে যে কেন্দ্রে রাখে, তাকে কেউ মারতে পারে না । হরিকে যে কেন্দ্রচ্যুত করতে চায় তাকে কেউ বাঁচাতে পারে না। এই হচ্ছে বহ্নি উৎসবের তাৎপর্য্য। সবাইকে জানাই আমার দোল-পূর্ণিমার প্রণাম। জয়গুরু। বন্দে পুরুষোত্তমম্!
“ধর্ম যখনই বিপাকী বাহনে ব্যর্থ অর্থে ধায়, প্রেরিত তখন আবির্ভূত হন পাপী পরিত্রাণ পায় ।” শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের উপরোক্ত বাণীর সাথে শ্রীকৃষ্ণ প্রদত্ত “যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লাণির্ভবতি ভারতঃ। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মনম্ সৃজাম্যহম্ পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম্। ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে॥” প্রায় সমার্থক বাণীটির যুগোপযোগী সংস্করণ করেছেন বর্তমান পুরুষোত্তম। শ্রীকৃষ্ণ যুগ সংস্কারের প্রয়োজনে দুষ্কৃতি বা পাপীদের বিনাশের কথা বলেছেন আর ঠাকুর পাপীদের পরিত্রাণের কথা বলেছেন। এইটুকুই পার্থক্য। ব্যষ্টি জীবন এবং সমষ্টি জীবনের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে কর্ম করে যাওয়ার নামই ধর্ম পালন করা। অন্যের বাঁচা এবং বৃদ্ধি পাওয়াকে অব্যাহত রেখে মানুষ বাঁচার জন্য, আনন্দের জন্য যা’ যা’ করে, তাই ধর্ম। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কোন ভারী তাত্ত্বিক কথা না বলে প্রাঞ্জল ভাষায় বাণী দিয়ে বললেনঃ ‘‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে ধর্ম বলে জানিস তা’কে।’’
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র চৈতন্যদেবের আবির্ভাব প্রসঙ্গে ভাবাবস্থায় বললেন, ‘‘বুদ্ধ ‘লয়’ শিক্ষা দিয়ে গিয়েছিল। শঙ্করাচার্য্য পরিষ্কার ক’রে দিয়েছিল। বুদ্ধের উত্তর শঙ্করাচার্য্যের কাছে, জ্ঞানী ছাড়া বুঝত না কিনা? তাই চৈতন্যের আবির্ভাব। ধর্ম্ম নিয়ে হিংসা হয়েছিল কিনা, তাই একত্ব দেখাতে এসেছিলেন রামকৃষ্ণ। থাক্ ধর্ম্ম-কর্ম্ম, আমার আমিত্ব পেলেই বাঁচি এখন।’’ (ভাববাণী, ষষ্ঠ দিবস)
কিছু গবেষকদের মতে শ্রীচৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষ উৎকল প্রদেশের জাজপুরের আদি বাসিন্দা ছিলেন। (বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতে আসাম প্রদেশ।) তাঁর পিতামহ মধুকর মিশ্র বাংলাদেশের শ্রীহট্টে এসে বসতি স্থাপন করেন। শ্রীহট্টে জন্মগ্রহণ করেন জগন্নাথ মিশ্র। পণ্ডিত নীলাম্বর চক্রবর্তীর কন্যা শচীদেবীর সাথে বিবাহ হয়। শচীদেবীর গর্ভে পর পর সাতটি কন্যা হয়। কেহই জীবিত ছিলেন না। তারপর জন্মগ্রহণ করেন প্রথম পুত্র বিশ্বরূপ। বিশ্বরূপের যখন আট বছর বয়স তারপর শচীমাতা অন্তর্বতী হন। দ্বাদশ মাস গর্ভকাল অতিবাহিত করে ১৪০৭ শকাব্দ, (১৮-২-১৪৮৬) ২৩ ফাল্গুন, দোলপূর্ণিমা চন্দ্রগ্রহণের রাতে নিমবৃক্ষের নীচে ভূমিষ্ঠ হন শচীদেবীর দ্বিতীয় পুত্র নদীয়া জেলার নবদ্বীপে। নিম গাছের তলায় ভূমিষ্ঠ হবার কারণে মা নামকরণ করেছিলেন নিমাই, কোষ্ঠী বিচারের নাম বিশ্বম্ভর। চৌদ্দশত সাত শকে মাস যে ফাল্গুন পৌর্ণ মাসী সন্ধ্যাকালে হৈল শুভক্ষণ। সিংহ রাশি, সিংহ লগ্ন উচ্চ প্রহসন ষড়বর্গ অষ্টবর্গ সর্ব্ব শুভক্ষণ।।
তৎকালিন ভারতবর্ষের শিক্ষা-সংস্কৃতির এক অন্যতম পীঠস্থান ছিল বাংলার নদীয়া জেলার নবদ্বীপ। মহাপ্রভুর পিতৃদেব শ্রীহট্ট থেকে নবদ্বীপে এসেছিলেন অধ্যয়ন ও শাস্ত্রচর্চার জন্য। সে কারণেই মায়াপুরে আর একটি নতুন বসতি স্থাপন করতে হয়েছিল। শচীদেবীর স্বাভাবিক গর্ভকালের সময় উত্তীর্ণ হলে শ্বশুর মশাই জ্যোতিষাচার্য পণ্ডিত নীলাম্বর চক্রবর্তীর আদেশক্রমে স্ত্রী-পুত্রকে শ্রীহট্ট থেকে নবদ্বীপের বাড়িতে নিয়ে আসেন জগন্নাথ মিশ্র। সেখানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন বিশ্বম্ভর। তবে গার্হস্থ্যাশ্রমে নিমাই নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন। তাই রচনার প্রয়োজনে অবতারবরিষ্ঠ চৈতন্য মহাপ্রভুকে কখনো নিমাই, কখনোবা নিমাই পণ্ডিত নামে উল্লেখ করতে হয়েছে। সেজন্য প্রথমেই পাঠকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে রাখলাম। শচীমাতার দুলাল নিমাই বাল্যকাল থেকেই দুরন্ত ছিলেন। তাঁর দুরন্তপনার নালিশ শুনতে শুনতে অস্থির হয়ে পড়েছিলেন তাঁর পিতামাতা। দাদা বিশ্বরূপকেই যা একটু সমীহ করে চলতেন। দুরন্তপনায় রাশ টানতে পিতৃদেব ১৪৯১ খ্রীষ্টাব্দে আচার্য্য গঙ্গাদাস পণ্ডিতের মাধ্যমে উপনয়ন সংস্কারে সংস্কৃত করান। সাবিত্রীমন্ত্রে দীক্ষিত করাবার পর আচার্য্য নিমাইকে গৌরহরি নামকরণ করেন। সংস্কৃত শিক্ষার জন্য গঙ্গাদাস পণ্ডিতের টোলে ভর্তি করে দেন পিতা। সেখানে ব্যাকরণ, কাব্য, অলঙ্কারশাস্ত্র, তর্কশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। তাঁর মধ্যে অসাধারণ পাণ্ডিত্যের প্রকাশ পায়। ১৪৯২ খ্রীষ্টাব্দে দাদা বিশ্বরূপ সন্ন্যাস নিয়ে গৃহত্যাগী হন। দাদার বিরহ-ব্যথায় শান্ত হন নিমাই। দাদা বিশ্বরূপ নিত্য গৃহদেবতা বিষ্ণুর পূজা করতেন। দাদার অবর্তমানে নিজে থেকে সেই পূজার ভার গ্রহণ করেন নিমাই। ১৪৯৭ খ্রীষ্টাব্দে পিতা জগন্নাথদেব সবাইকে শোকসাগরে ভাসিয়ে বিষ্ণুর পরমপদে আশ্রয় নেন। পিতার দেহান্তর হবার পর জাগতিক সংসারের সব দায়িত্ব তাঁর ওপর এসে পড়ে। নিমাই লোকপালী উপার্জনে মন দেন। মুকুন্দ-সঞ্জয়ের চণ্ডীমণ্ডপে টোল খুলে ছাত্র পড়াতে শুরু করেন। শিষ্যদের এবং বিদ্যানুরাগীদের কাছে নিমাই পণ্ডিত নামে খ্যাত হন। ভারতখ্যাত কেশবাচার্য নিমাই পণ্ডিতের কাছে পরাজয় স্বীকার করলে ভারতের পণ্ডিত সমাজে শ্রেষ্ঠ স্থান লাভ করেন নিমাই পণ্ডিত। মাতা শচীদেবীর আদেশে ১৫০২ খ্রীষ্টাব্দে বল্লভ আচার্যের কন্যা লক্ষীপ্রিয়া সাথে উদ্বাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হন। (চৈঃ চঃ অনুসারে কৈশার লীলায় প্রথমে উদ্বাহ বর্ণিত হয়েছে।) উদ্বাহের পর ১৫০৬ খ্রীষ্টাব্দে স্ত্রীকে নিয়ে পূর্ববঙ্গের শ্রীহট্টের বাড়িতে যান। সেখানে সর্প দংশনে (মতান্তরে বিরহ-সর্প দংশন) মৃত্যু হয় লক্ষীপ্রিয়ার। এই ঘটনায় নিমাই মর্মাহত হন। শচীদেবী পুণরায় নিমাইয়ের বিবাহ দিতে চাইলে, নিমাই কিছুতেই পুণর্বার দার পরিগ্রহ করতে চান নি। মায়ের পীড়াপিড়িতে সনাতন পণ্ডিতের কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়ার সাথে বিবাহ হয় ১৫০৭ খ্রীষ্টাব্দে। ১৫০৮ খ্রীষ্টাব্দে পিতৃদেবের পিণ্ডদান করতে গয়াতে যান। পরিচিত হন ঈশ্বরপুরীর সাথে। ১০ অক্ষর গোপাল মন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ করেন নিমাই। নবদ্বীপে ফিরে বৈষ্ণব আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র নাম প্রচার মাধ্যমে। ১৫১০ খ্রীষ্টাব্দের ১০ই জানুয়ারী কাটোয়ার কেশব ভারতীর কাছে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। গুরু তাঁকে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নামে অভিহিত করেন। সন্ন্যাস গ্রহণের পর থেকে তিনি লোক-সংগ্রহ উদ্দেশ্যে প্রায় পাঁচ বছর দক্ষিণ-ভারত, পশ্চিম-ভারত ও মথুরা-বৃন্দাবন পরিভ্রমন করেন। ১৫১৫-১৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দ, এই আঠারটি বছর পুরীর রাজা প্রতাপ রুদ্রের রাজগুরু কাশী মিশ্রের বাড়ী গম্ভীরায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে কৃষ্ণনাম প্রচার করেন। ১৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দে পুরীতে ইহলীলা সম্বরণ করেন। চৈতন্যদেব তাঁর অনুগামীদের জন্য নিজের হাতে সংস্কৃতে লেখা ‘শিক্ষাষ্টক’ নামে আটটি শ্লোকে উপদেশামৃত রেখে গেছেন, সব শ্লোকেই কৃষ্ণের প্রতি শুদ্ধাভক্তির কথা রয়েছে। রাধা-নামের কোন উল্লেখ পর্যন্ত নেই। ‘শিক্ষাষ্টক’ শ্লোকের মধ্যে তৃতীয়তম শ্লোকটি ভক্তজন কণ্ঠে বহুল উচ্চারিত। যথাঃ তৃণাদপি সুনীচেন তরোরিব সহিষ্ণুনা। অমানিনা মানদেন কীর্তনীয়ঃ সদা হরিঃ॥ যার ভাবার্থ—তৃণকে মাড়িয়ে গেলে তৃণ যেমন প্রতিবাদ করে না, গাছ কাটলে গাছ যেমন প্রতিবাদ করে না, তুমি তাদের চাইতেও সহিষ্ণু হবে। সমাজে যারা অবহেলিত তাদেরও তুমি মান দিয়ে সদা হরির গুণকীর্তন করবে। তাহলে সারমর্ম হলো, তুমি তোমার নিজের জীবনের ক্ষুদ্র মান-অপমান, চাওয়া-পাওয়া সবকিছু উপেক্ষা করে সবাইকে হরি অর্থাৎ কৃষ্ণের প্রদত্ত আদর্শের গুণকীর্তন করবে। * * * চৈতন্যদেবের স্নেহধন্য মুরারী গুপ্ত সংস্কৃত ভাষায় যে লীলা কাহিনী রচনা করেছিলেন সেই গ্রন্থ ‘মুরারী গুপ্তের করচা’ নামে সুপ্রসিদ্ধ। মহাপ্রভুর বিশেষ স্নেহভাজন, যাঁকে তিনি ‘কবিকর্ণপুর’ আখ্যা দিয়েছিলেন তাঁর নাম ছিল পরমানন্দ। তিনি সংস্কৃত ভাষায় ‘চৈতন্যচরিতামৃতম্’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। চৈতন্যদেবের লীলাবসান পরবর্তীকালে তথ্য সংগ্রহভিত্তিক বাংলা ভাষায় ‘চৈতন্যভাগবত’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন বৃন্দাবন দাস। সমসাময়িক কালে কবি লোচন দাস ‘চৈতন্যমঙ্গল’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন। পরবর্তীকালে কবি জয়ানন্দও ‘চৈতন্যমঙ্গল’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন। ওইসব জীবনীগ্রন্থ থেকে বৃন্দাবনের গোস্বামীগণ নাকি পরিপূর্ণরূপে চৈতন্যদেবকে আস্বাদন করতে পারেন নি, তাই রূপ গোস্বামীর শিষ্য বর্ধমান জেলার ঝামটপুরের বিখ্যাত বৈদ্য, অকৃতদার কৃষ্ণদাস কবিরাজকে নতুন করে এক জীবনীগ্রন্থ রচনা করতে উদ্বুদ্ধ করলে তিনি পূর্ববর্তী জীবনীকারদের গ্রন্থ এবং অন্যান্য সংস্কৃত গ্রন্থের সাহায্য নিয়ে নয় বছর ধরে ‘শ্রীশ্রীচৈতন্য চরিতামৃত’ শিরোনামে গ্রন্থটি রচনা করেন। যে গ্রন্থটি বৈষ্ণব মহলে প্রামাণ্য রূপে স্বীকৃত হলেও সবক্ষেত্রে ঘটনাপঞ্জীর সন-তারিখ উল্লেখিত হয়নি। গবেষকগণও সকল ঘটনাপঞ্জীর সন-তারিখ নিয়ে একমত হতে পারেন নি। তাই আমিও বিভিন্ন গ্রন্থ পঠন-পাঠন ও গুগল সার্চ করা তথ্যভিত্তিক আনুমানিক সন-তারিখ উল্লেখ করেছি মাত্র।
নিমাই পণ্ডিত, বৈষ্ণব-পণ্ডিত বংশে জন্ম নিয়ে শিক্ষা-সংস্কৃতির পীঠস্থানের পণ্ডিত পরিবেশে বড় হয়ে উঠলেও তৎকালিন নবদ্বীপে আচার্য্য শঙ্করের মায়াবাদের সিদ্ধান্তবাগীশদের শুষ্ক জ্ঞানচর্চা, শাক্ত মতবাদের পৌত্তলিকতার পঞ্চ-ম-কারের এবং বৈষ্ণব, শৈব, কিশোরীভজা, কর্তাভজা, পরকীয়া সাধনা ইত্যাদি সহজীয়া মতবাদের উপাসনার প্রাবল্যের মধ্যে সনাতন ধর্মের প্রচারক প্রকৃত বৈষ্ণবেরা প্রায় উপেক্ষিতই ছিলেন। শাক্তরা সুযোগ পেলেই বৈষ্ণবদের নানাভাবে যাতনা দিতেন, এমনকি ধর্মের নামে পশুবলি দিয়ে পশুর মাংস বাড়িতে ফেলে আসতেন। বিষ্ণুর উপাসক বৈষ্ণবেরা নবদ্বীপের শ্রীবাস পণ্ডিতের আঙিনায় মিলিত হয়ে কীর্তন করতেন। আর শান্তিপুরের কমলাক্ষ মিশ্রের আঙিনায় বৈষ্ণবদের মিলনমেলা বসতো। বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণের উপাসক তৎকালিন বৈষ্ণব প্রধানগণ যথা, শ্রীনিবাস, শুক্লাম্বর, শ্রীমান, মুকুন্দ, বিশ্বরূপ প্রমুখ ভক্তগণ, সেকালের সাধকশ্রেষ্ঠ বৈষ্ণবাচার্য কমলাক্ষ মিশ্র (অদ্বৈত মহাপ্রভু)-এর কাছে তাদের অন্তরের বেদনার কথা বলতেন। অদ্বৈত মহাপ্রভু মথুরার গর্গাচার্যের ন্যায় সনাতন ধর্মের দীনতা থেকে ভক্তদের রক্ষা করতে গঙ্গাজল আর তুলসীমঞ্জুরির নিত্য সেবায় শ্রীকৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা জানাতেন। পণ্ডিতদের মতে মূলতঃ অদ্বৈত মহাপ্রভুর আরাধনায় শ্রীবিষ্ণু শুদ্ধাত্মা শচীদেবীর মাধ্যমে নিমাই রূপে ধরাধামে অবতীর্ণ হন।
বালক নিমাইয়ের চপলতা এবং তীক্ষ্ণ পাণ্ডিত্যের কাছে ম্লাণ হতে সুরু করে তার্কিক পণ্ডিতদের, শাক্ত পণ্ডিতদের, (অ)বৈষ্ণব পণ্ডিতদের ভ্রান্ত ধারণার পাণ্ডিত্য। তাঁদের দেখলেই শাস্ত্রের ধাঁধাঁ আর ব্যাকরণের ফাঁকি জিগ্যেস করতেন। একদিন ‘‘ওঁ সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম’’—মতবাদের তার্কিক পণ্ডিতকে শিক্ষা দিতে তার ভাতে প্রস্রাব করে দেন নিমাই, পণ্ডিত রেগে গিয়ে মারতে এলে নিমাই বলেন, আমার চপলতার জন্য দু’-ঘা মারবেন না হয়, তবুও আমি করজোড়ে বলছি, ব্রহ্মময় জগতে সবই যদি ব্রহ্ম, তবে আপনার ভাতে, আর আমার মুতে ব্রহ্ম কি নেই ! আপনার বিচারে ভাতের ব্রহ্ম আর মুতের ব্রহ্ম কি আলাদা? আলাদাই যদি হয়ে থাকে তাহলে আর আজ থেকে আপনার ওই সিদ্ধান্ত বদলে ফেলতে হবে। তবে আমার বুঝ মতে, ব্রহ্ম কারণ, জীব কার্য। ব্রহ্ম পূর্ণ, জীব অংশ। ব্রহ্ম উপাস্য, জীব উপাসক। ব্রহ্ম আর জীব সত্তায় অভেদ, স্বাদে পৃথক। ব্রহ্মবিজ্ঞতা নিমাইয়ের মুখ থেকে ব্রহ্মকথা শুনে পণ্ডিত তখন বুঝতে পারেন ব্রহ্মের বিশিষ্টতা, বিশিষ্ট অদ্বৈতবাদের তত্ত্ব। * * * কিশোর নিমাই যখন টোলে ছাত্র পড়াতেন, সেই সময় কাশ্ম পণ্ডিত কেশবাচার্য দিগ্বিজয় করতে বেড়িয়ে ভারতের সব বিখ্যাত পণ্ডিতদের তর্কযুদ্ধে পরাজিত করে অনেক শিষ্য ও বাহনসহ নবদ্বীপে আসেন। নবদ্বীপের স্মার্ত্ত-পণ্ডিতগণ সুযোগ বুঝে নিমাই পণ্ডিতকে জব্দ করতে পণ্ডিত কেশবাচার্যকে নিমাইয়ের কাছে পাঠান। নিমাইয়ের কাছে গিয়ে কেশবাচার্য বলেন, তুমিই বুঝি নিমাই পণ্ডিত? নিমাই যথোচিত মর্যাদার সাথে প্রণাম জানিয়ে বলেন, আজ্ঞে, লোকেরা বলেন, কিন্তু আমি নিজেকে পণ্ডিত মনে করি না, শিষ্যদের কিছু পাঠদান করার চেষ্টা করি মাত্র। —তা’ কি পড়াও? —কলাপ। —‘কলাপ’! ও তো শিশুপাঠ্য! —ওই শিশুপাঠ্যই সঠিক পড়াতে পারছি কি-না, জানি না। —তাহলে তো আর তোমার সাথে তর্ক করা চলে না! —শুনেছি আপনি ভারত বিখ্যাত পণ্ডিত, আপনার সাথে তর্ক করার স্পর্দ্ধা যেন না হয়। শুনেছি আপনি সরস্বতী-মাতার বরপুত্র। মুখে মুখে শ্লোক রচনা করেন। অনুগ্রহ করে যদি কিছু নিবেদন করেন, শুনে ধন্য হতাম। —বলো, কি শুনতে চাও? —সুরধনী গঙ্গার পবিত্র ধারা বয়ে চলেছে, সে বিষয়ে যদি কিছু নিবেদন করেন। নিমাই বিনীতভাবে বলেন। পণ্ডিত কেশবাচার্য তৎক্ষণাৎ শত-শ্লোক রচনা দ্বারা গঙ্গার বন্দনা করে গর্বভরে নিমাইকে জিগ্যেস করেন, কি হে নিমাই পণ্ডিত! এতক্ষণ ধরে গঙ্গার মহিমা যা’ বর্ণনা করলাম, কিছু বুঝলে? নিমাই বিনীতভাবে বললেন, আপনার রচনার অর্থ আপনি না বোঝালে বোঝে কার সাধ্য? নিমাইয়ের বিনীত ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে কেশবাচার্য বলেন, বলো, কোন্ শ্লোকটা বুঝতে চাও? নিমাই কেশবাচার্য পণ্ডিতের তাৎক্ষণিক রচনা থেকে— ‘‘মহত্ত্বং গঙ্গায়াঃ সততমিদমাভাতি নিতরাং, যদেষা শ্রীবিষ্ণোশ্চরণকমলোৎপত্তিসুভগা। দ্বিতীয় শ্রীলক্ষ্মীরিব সুরনরৈরর্চ্চ্যচরণা, ভবানীভর্ত্তুর্ষা শিরসি বিভবত্যদ্ভুতগুণা॥’’ (চৈঃ চঃ আদিলীলা, পৃঃ ১২৬) শ্লোকটি আবৃত্তি করে তার ভাবার্থ জানতে চাইলে পণ্ডিত কেশবাচার্য আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন, প্রায় ঝড়ের গতিতে বলা শ্লোক থেকে তুমি এই একটি শ্লোক কণ্ঠস্থ করলে কিভাবে? নিমাই বিনীতভাবে বলেন, আপনি দৈববলে যেমন মাতা সরস্বতীর বরপুত্র, কবি, আমিও তেমনি একজন শ্রুতিধর। নিমাইয়ের উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে কেশবাচার্য বলেন, তাহলে শোন, এই শ্লোকের ভাবার্থ হচ্ছে—‘‘গঙ্গা, শ্রীবিষ্ণুর চরণকমল থেকে উৎপন্ন হওয়ার কারণে সৌভাগ্যবতী। দ্বিতীয়া শ্রীলক্ষ্মীর ন্যায় দেব ও মানবেরা যাঁর চরণ-পূজায় রত এবং যিনি ভবানীপতি মহাদেবের মস্তকে বিরাজমানা হওয়ার জন্য অদ্ভুত গুণশালিনী হয়েছেন, সেই গঙ্গার এই মহত্ত্ব সর্বদাই নিশ্চিতরূপে প্রত্যক্ষীভূত হয়ে আছে।—বলো, আর কি জানতে চাও?’’ —এবার শ্লোকের দোষ-গুণ বলুন। —বেদসদৃশ গুণসম্পন্ন অনুপ্রাসযুক্ত উপমারূপ শ্লোকে কোন দোষ নেই, সম্পূর্ণ নির্দোষ। তোমার ব্যাকরণের অলঙ্কার জ্ঞান থাকলে তো তুমি দোষ-গুণ বুঝবে? —যথার্থই বলেছেন। আমি অলঙ্কার না পড়লেও শুনেছি তো, তা’ থেকেই মনে হচ্ছে আপনার শ্লোক দোষযুক্ত। —তোমার স্পর্দ্ধা তো কম নয়! ‘কলাপ’ আর ‘ফাঁকি’ পড়া বিদ্যা দিয়ে তুমি আমার শ্লোকের দোষ ধরতে চাও? —প্রভু, আপনি আমার প্রতি রুষ্ট হবেন না, আমার ন্যায় অর্বাচীন কি আপনার রোষের উপযুক্ত? মার্জনা করবেন, আমি কিন্ত্তু আপনার রচনায় ৫টি দোষ খুঁজে পেয়েছি, যদি অনুমতি করেন, তাহলে এক-এক করে বর্ণনা করি। শিষ্যসামন্ত, স্থানীয় বিদ্বজ্জনের সামনে এমন কথা কেউ যে কোনদিন বলবে ভাবতেই পারেন নি কেশবাচার্য, তথাপি তর্কশাস্ত্রের নিয়ম মেনে নিমাইকে বলার জন্য অনুমতি দিলে নিমাই বলেন—- পঞ্চ দোষ এই শ্লোকে পঞ্চ অলঙ্কার। ক্রমে আমি কহ শুন করহ বিচার॥ অবিমৃষ্ট বিধেয়াংশ দুই ঠাঞি চিন। বিরুদ্ধমতি ভগ্নক্রম পুনরাত্ত দোষ তিন॥ গঙ্গার মহত্ত্ব শ্লোকের মূল বিধেয়। ইদং শব্দে অনুবাদ পশ্চাৎ অবিধেয়॥ বিধেয় আগে কহি পাছে কহিলে অনুবাদ। এই লাগি শ্লোকের অর্থ করিয়াছে বাদ॥ …………………………………………………… গঙ্গাতে কমল জন্মে সবার সুবোধ। কমলে গঙ্গার জন্ম অত্যন্ত বিরোধ॥ ইহা বিষ্ণু পাদপদ্মে গঙ্গার উৎপত্তি। বিরোধালঙ্কার ইহা মহা চমৎকৃতি॥ ঈশ্বর অচিন্ত্য শক্ত্যে গঙ্গার প্রকাশ। ইহাতে বিরোধ নাহি বিরোধ আভাষ॥ গঙ্গার মহত্ত্ব সাধ্য সাধন তাহার। বিষ্ণুপাদোৎপত্তি অনুমান অলঙ্কার॥ স্থূল এই পঞ্চ দোষ পঞ্চ অলঙ্কার। সূক্ষ্ম বিচারিলে যদি আছয়ে অপার॥ (চৈঃ চঃ আদিলীলা, পৃঃ ১২৭-১২৯) —-হে পণ্ডিতপ্রবর! ‘‘আপনি বিধেয় অর্থাৎ জ্ঞাত আগে বলে পরে অনুবাদ অর্থাৎ অজ্ঞাত বলেছেন। এরফলে শ্লোকের অনুবাদ ঘটেছে, মূল অর্থ বাদ পড়েছে। ‘দ্বিতীয় শ্রীলক্ষ্মী’ রচনায় ‘দ্বিতীয়’ শব্দ বিধেয়, সমাসে গৌণ হওয়াতে শব্দার্থ ক্ষয় হয়ে শব্দটি অপ্রাধান্য রূপে নির্দিষ্ট হয়েছে। ‘ভব’ অর্থে মহাদেব বোঝালে ‘ভবানী’ অর্থে মহাদেবের স্ত্রীকে বোঝায়। এবং ভবানীর ভর্তা বললেও মহাদেবকে বোঝায়। ‘ভবানীভর্ত্তুর্ষা’ শব্দের প্রয়োগে ‘ভবানীর ভর্তা’-র অর্থ হয়, ভবের পত্নী যে ভবানী তার ভর্তা, যেন ভব ব্যতিরেকে আর একজন ভর্তা বোঝায়, তাই ওই শব্দের প্রয়োগ বিরুদ্ধমতিকারক। শ্রী অর্থে লক্ষ্মী বা শোভাময়ী বোঝায়। এক্ষেত্রে ‘শ্রীলক্ষ্মী’ প্রয়োগে পুনরুক্তবদাভাস অলঙ্কার হয়েছে। আপনি ‘শ্রীবিষ্ণুর চরণ-কমলে গঙ্গার জন্ম’ বোঝাতে চেয়ে ‘কমলে গঙ্গার জন্ম’ বলে ফেলে প্রচলিত সত্যের সাথে বিরোধ করে ফেলেছেন, যদিও তা বিরোধাভাস মাত্র, তাই বিরোধাভাস-অলঙ্কারের প্রয়োগ হয়েছে। ‘গঙ্গার এই মহিমা সর্বদা নিশ্চিতরূপে দেদীপ্যমান, যেহেতু এই গঙ্গা শ্রীবিষ্ণুর চরণকমল হইতে উৎপন্ন হওয়ার কারণে অত্যন্ত সৌভাগ্যবতী।’—এখানে গঙ্গার মহত্ত্বের সাধন ও সাধ্য দুই-ই পরিলক্ষিত হয়। ওই অনুমান অলঙ্কারের প্রয়োগের ফলে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব জড়ীভূত হয়ে গেল।’’ নিমাই পণ্ডিতের বলা ব্যাখ্যান শুনে কেশবাচার্য আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলেন, শাস্ত্র না পড়ে, অলঙ্কার না পড়ে আমার শ্লোকের এইরূপ ব্যাখ্যা তুমি কিভাবে করলে? উত্তরে নিমাই পণ্ডিত বলেন, শাস্ত্রের বিচার আমি জানি না, মাতা সরস্বতী যা’ বলান, তাই বলি। আপনি মহাপণ্ডিত, কবি শিরোমণি, আপনি দুঃখ করবেন না। আপনার শিষ্য মনে করে আমার কিশোর-সুলভ চপলতা ক্ষমা করে দেবেন। আজ চলুন বাসায় ফিরে যাই, কাল আবার মিলিত হয়ে আপনার কাছে শাস্ত্রের বিচার শুনব।
এই মতে নিজ গৃহে গেলা দুই জন। কবি রাত্রে কৈল সরস্বতী আরাধন॥ সরস্বতী রাত্রে তারে উপদেশ কৈল। সাক্ষাৎ ঈশ্বর করি প্রভুরে জানিল॥ প্রাতে আসি প্রভুপদে লইল শরণ। প্রভু কৃপা কৈল তার খণ্ডিল বন্ধন॥ ভাগ্যবন্ত দিগ্বিজয়ী সফল জীবন। বিদ্যাবলে পায় মহাপ্রভুর চরণ॥
কাশ্মীরি পণ্ডিত নিমাই পণ্ডিতের মধ্যে ষড়ৈশ্বর্য্যের প্রকাশ উপলব্ধি করতে পেরে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তারপর থেকে নবদ্বীপের পণ্ডিতসমাজে শুধু নয়, ভারতবর্ষের পণ্ডিতসমাজে নিমাই পণ্ডিত একজন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।
নিমাই পণ্ডিত পিতৃদেবের পিণ্ডদান করতে গয়ায় গিয়ে ঈশ্বরপুরীর কাছে দীক্ষা নেবার পর পাণ্ডিত্য ছেড়ে ভক্তিরসে নিজেকে জারিত করলেন। শ্রীবাস অঙ্গনের বৈষ্ণব সভায় যোগদান করে কীর্তনানন্দে মেতে ওঠেন। কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা চৈতন্যদেব আর্য্যকৃষ্টি বিরোধী বৌদ্ধ-তান্ত্রিকতার পৌত্তলিকদের, শুষ্ক জ্ঞানচর্চাকারী তর্কবাগীশদের, তামসিক ধর্মাচ্ছন্নদের উদ্দেশ্যে পথ-নির্দেশ করলেন ‘হরেরাম হরেকৃষ্ণ’ কীর্তনের ফরমূলার মাধ্যমে।––তোমার পাপ, তাপ হরণ করতে, প্রবৃত্তির পাপ-তাপের জ্বালা জুড়াতে, সবকিছু ছেড়ে শ্রীরামচন্দ্রের আদর্শ, শ্রীকৃষ্ণের আদর্শের অনুসরণ কর। তৎকালিন হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রাধান্য থাকা সত্বেও তিনি হরেকৃষ্ণ কীর্তনের মাধ্যমে ক্ষত্রিয় বংশজাত রামচন্দ্র এবং কৃষ্ণের জীবন্ত আদর্শে সবাইকে অনুপ্রাণিত করতে চাইলেন। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অবতারবাদের আদর্শ মেনে। * * * কীর্তনগান বাঙালি কবিদের এক অভিনব সৃষ্টি। কৃত্ ধাতু থেকে এসেছে কীর্তন। কৃত্ শব্দের অর্থ প্রশংসা। কীর্তন মানে কীর্তি আলাপন। কীর্তিকর কোন আদর্শের স্মরণ, মনন, গুণ বর্ণন কীর্তনের মূল উদ্দেশ্য। যা’ শ্রবণেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রবেশ করে মানুষের সাত্তিক গুণকে প্রকাশ করতে সাহায্য করে। তাই, মানুষকে সহজে প্রভাবিত করতে, কীর্তন এক সহজ প্রচার মাধ্যম। কীর্তি-আলাপন দু’-ভাবেই হতে পারে। কথার আদান-প্রদান মাধ্যমে এবং সুরে, ছন্দে, নৃত্যে, যন্ত্রানুষঙ্গের ঐকতানের প্রকাশের মাধ্যমে। প্রাক চৈতন্যযুগে, খ্রীঃ ১২ শতকে রচিত, শ্রীকৃষ্ণকে নায়ক করে, হ্লাদিনী শক্তিস্বরূপা রাধাকে একজন পরকীয়া নারী রূপে চিত্রণ করে কিছু অশাস্ত্রীয় আদিরসাত্মক পরকীয়া কাহিনী দিয়ে সাজানো, কবি জয়দেব গোস্বামী বিরচিত ‘গীতগোবিন্দম্ কাব্য’ বাংলার কীর্তনের প্রকৃত উৎস। এ বিষয়ে হিন্দুধর্মের এনসাইক্লোপিডিয়া, ‘পৌরাণিকা’র রচয়িতা অমল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন— (দ্রঃ গীতগোবিন্দ) ‘‘রামায়ণ ও মহাভারতের কট্টর পটভূমিতে ব্লু-বুক হিসাবে বর্ষবরদের চরম ও পরম পরিতৃপ্তি দিয়েছিল; তন্ত্রাভিলাষী সমাজে তন্ত্রগুলি চেতন ও অবচেতন মনকে যেমন তৃপ্তি দেয়।’’ কবি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্যের মূল্যায়ন বিষয়ে বলছেন—‘‘গীতগোবিন্দে সুড়সুড়ি আছে আর আছে দুষ্পাচ্য যৌনতা। ….. সহজিয়া জয়দেব আবিল, অপাঠ্য।’’ রাধা সন্দর্ভে বলছেন— ‘‘…. রাধাবাদ শক্তিবাদেরই একটি ধারা; রাসলীলা নিরোধ ব্যবহারের বিশুদ্ধ বিজ্ঞাপন। তন্ত্রের মানসকন্যা রাধা। রস ও রতির মিলন বৈষ্ণব তত্ত্ব; সাধক ও ভৈরবীর সম্ভোগ শাক্ত তত্ত্ব এবং বজ্রযানে বজ্র ও পদ্মের মিলন এ সবগুলিই তান্ত্রিক তত্ত্ব; বজ্রযানে তাই বলা হয়েছে বুদ্ধত্বং যোষিৎ-যোনিপ্রতিষ্ঠিতম্। ….. ভাগবতে রাধা নাই। …. ভাগবত ও বিষ্ণু পুরাণে রাসলীলা আছে কিন্তু রাধা নাই। ….. ’’ তথাপি রাধার মানবী অস্তিত্ব কিছু-কিছু অ-বৈষ্ণবদের রিরংসায় বাসা বেঁধেছিল। সেই বিকৃত ধারার বাসাটাকে ভাঙতে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যদেব নিজেকে রাধা-কৃষ্ণের যুগলরূপ বলে প্রচার করলেন। যাতে ধর্মের অজুহাতে ধর্মবিরুদ্ধ পরকীয়া-প্রীতি প্রশ্রয় না পায়। তাই তিনি রাধাকে নারীদেহে নয়, সুরত-সম্বেগের ধারায় অন্বেষণ করতে পথ দেখালেন। রাধাকৃষ্ণের যুগলধারার আদর্শে, পরকীয়া-প্রীতির আদর্শে গড়ে ওঠা তৎকালিন প্রচলিত কীর্তনের ধারাটাকে গীতা গ্রন্থে বর্ণিত— “যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লাণির্ভবতি ভারতঃ। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মনম্ সৃজাম্যহম্॥ পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম্ । ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ॥”–এর সূত্র মেনে,—অর্থাৎ ‘‘ঈশ্বর এক, ধর্ম এক, প্রেরিতগণ বিভিন্ন নামে সেই এক-এরই বার্তাবাহী’’র সনাতনী ধারা বা সনাতন ধর্মকে সংস্থাপিত করলেন। শ্রীরামচন্দ্র এবং শ্রীকৃষ্ণের আদর্শকে সামনে রেখে। হরেকৃষ্ণ, হরেরাম প্রচার মাধ্যমে। এর ফলে পরকীয়া-তত্ত্বের সহজীয়া মতবাদীরা বৈষ্ণবীয় মূলস্রোতে ফিরে আসার সুযোগ পেল এবং পৌত্তলিকতার নাগপাশ থেকে সনাতন ধর্মকে উদ্ধার করে এক সর্বজনীন রূপ দিলেন। মূলতঃ শ্রীকৃষ্ণকে কেন্দ্র করে। নিজেকে অন্তরালে রেখে। ‘অবতার নাহি কহে, আমি অবতার।’ তথাপি ধরা পড়ে গেলেন বৈষ্ণবাচার্য সাধক অদ্বৈত মহাপ্রভুর কাছে। অদ্বৈত মহাপ্রভুকে ফাঁকি দিতে পারলেন না। তাঁর সাধনার কাছে ধরা পড়ে গেলেন। নিত্যানন্দ মহাপ্রভুও বুঝতে পেরে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুকে কৃষ্ণের নব-কলেবর রূপে প্রচার করতে শুরু করলেন। * * * আসলে সমগ্র জগতের প্রাণনশক্তি বা প্রাণপঙ্ক বা প্রটোপ্লাজমকে পরমাত্মিক শক্তি বলা হয়, যা বিশ্ব ব্যাপিয়া বিদ্যমান, ‘‘যিনি সর্ব্ব ও প্রত্যেকের ভিতর বিশেষভাবে পরিব্যাপ্ত’’ তিনিই বিষ্ণু। যে পুরোহিতগণ প্রতিমা পূজা করেন, তাঁরাও সর্বাগ্রে ‘ওঁ শ্রীবিষ্ণু’ মন্ত্রে আচমন করেন। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পুরোহিত রঘুবংশের কৌলগুরু বশিষ্ঠদেব শ্রীরামচন্দ্রকে ‘‘ওঁ নারায়ণঃ পরাবেদা নারায়ণঃ পরাক্ষরঃ।/নারায়ণঃ পরামুক্তি নারায়ণঃ পরাগতিঃ॥’’ মন্ত্রে স্বস্তিবাচন করার সময় শ্রীরামচন্দ্রের মধ্যে পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণকে উপলব্ধি করলে তিনি নারায়ণের পরিবর্তে রামচন্দ্র শব্দ বসিয়ে মন্ত্রটিকে পরিমার্জিত করেন। নররূপী নারায়ণ পুরুষোত্তম রামচন্দ্রকে কেন্দ্র করে সবাইকে ধর্ম পালন করতে উদ্বুদ্ধ করলেন। অনুরূপভাবে কৃষ্ণনামের প্রচারক শ্রীগৌরাঙ্গদেবের মধ্যে বিষ্ণুত্ব বা কৃষ্ণত্ব-এর পরিপূর্ণতা সাধনদ্বারা উপলব্ধি করা মাত্রই নিত্যানন্দ প্রভু ‘‘ভজ গৌরাঙ্গ কহ গৌরাঙ্গ লহ গৌরাঙ্গের নাম রে …. ।’’ ‘‘প্রভু নিত্যানন্দ কহে দন্তে তৃণ ধরি। আমারে কিনিয়া লহ ভজ গৌরহরি॥ ইত্যাদি স্বস্তিবাচনে গীতার অবতারবাদকে সম্মান জানালেন। তৎকালিন পুরুষোত্তম চৈতন্যদেবকে কেন্দ্র করে সবাইকে চলতে বললেন। এই হচ্ছে সাজা-গুরুদের কবল থেকে সনাতন বৈষ্ণবধর্মের ধারাকে নবীকরণ মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখার ফরমূলা। গীতা গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণ বিষয়টিকে স্পষ্ট করে বিধৃত করেছেন।
* * অবতার-তত্ত্বের ধারা অনুসারে অবতার বরিষ্ঠ শ্রীরামচন্দ্র ছিলেন সত্যের পূজারী অথচ অসৎ নিরোধী। তৎকালীন যুগের অচ্ছুৎ অনার্য্যদের আর্য্যীকৃত করে আর্য্য-অনার্য্যদের মেলবন্ধন করলেন। অনার্য্য গুহক চণ্ডালকে করলেন মিত্র, আবার অকালমৃত্যুর দ্যোতক বর্ণাশ্রম-বিদ্বেষী প্রতিলোমাচারী বন্ধুবর শম্বুককে দিলেন চরম শাস্তি। ব্রাহ্মণ ঔরসজাত রাবণ যখন কিছুতেই সীতাকে বশে আনতে পারছিলেন না তখন সভাসদেরা মায়াবী-রাবণকে বলেছিলেন, আপনি রামরূপ ধারণ করে গেলেই তো সীতাকে সহজেই বশীভূত করতে পারেন। উত্তরে রাবণ বলেছিলেন, ওই রূপ স্মরণ করলেই আমার সব পাপ-প্রবৃত্তি মুছে গিয়ে আমি এক অন্য মানুষ হয়ে যাই। তথাপি প্রবৃত্তির ঊর্দ্ধে উঠে ওই বোধটাকে ধরে রাখতে পারল না, ফলে রামচন্দ্রের হাতে হত হতে হল। অথচ বিভীষণ রামচন্দ্রের আদর্শে প্রলুব্ধ হয়ে রাবণকে ত্যাগ করলেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ……রাবণ তো আদর্শবান ছিল না। রামচন্দ্রকে দেখে সে একেবারে বিগলিত হয়ে গেল। রামচন্দ্রের ঊর্দ্ধে তার আর কেউ নেই। ভ্রাতার প্রতি কর্তব্যের চাইতে তার ইষ্টানুরাগই প্রবল। ভীষ্ম কিন্তু কেষ্টঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি নিয়েও, কর্তব্যবোধে কৌরবের পক্ষ ছাড়তে পারেন নি। তা কিন্তু ঠিক হয়নি। ইষ্টের জন্য, সত্যের জন্য, অন্য যে-কোন কর্তব্য ত্যাগ করতে হবে, যদি সে কর্তব্য ইষ্টের পথে অন্তরায় হয়। ‘‘সর্ব্বধর্ম্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ’’ । (আ. প্র. 21/2.6.1952) ……শ্রীরামচন্দ্রের খুব strong group (শক্তিমান দল) ছিল। হনুমান, সুগ্রীব, জাম্বুবান, অঙ্গদ, নল, নীল এরা সবাই ছিল একটা strong unit (শক্তিমান গুচ্ছ)। রামচন্দ্রের সাথে ওদের একজন না-একজন থাকতই। এক সময় বিভীষণকে সন্দেহ করেছিল লক্ষণ। বিভীষণ তাতে বলেছিল, ‘আমি জানি তোমরা আমাকে সন্দেহ করবে। কারণ, আমি রাবণের ভাই। আমি ভাই হয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে treachery (বিশ্বাসঘাতকতা) করেছি। কিন্তু করেছি অসৎ-এর বিরুদ্ধে। হজরত রসুলের group-ও (দলও) খুব strong (শক্তিমান) ছিল। তিনি বেঁচে থাকতে-থাকতেই অনেকখানি ভূখণ্ডের king (রাজা) হয়েছিলেন। (দীপরক্ষী 2/26.7.1956) রাজাকে কতখানি প্রজাস্বার্থী হতে হবে সেইটেই রামচন্দ্র দেখিয়েছেন। প্রজা প্রাণের চাইতেও বেশী না হলে রাজা হওয়া যায় না। …….সীতাও ছিলেন রামচন্দ্রের আদর্শে উৎসর্গীকৃত। আর এই ছিল আমাদের আর্য্যবিবাহের তাৎপর্য্য। (আ. প্র. 20/9. 8. 1951) অবতার বরিষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ‘‘শ্রীকৃষ্ণ সব সময়েই চেষ্টা করেছেন যুদ্ধবিগ্রহ avoid (পরিহার) করতে, কিন্তু তাঁর environment (পরিবেশ) তাঁকে সে scope (সুযোগ) দিল না। আর শ্রীকৃষ্ণের যুদ্ধ—মৃত্যুকে মারবার জন্য। Gangrene-affected part of the body (শরীরের দুষ্টক্ষতযুক্ত স্থান) আমরা যেমন কেটে ফেলি জীবন বাঁচাবার জন্য, তিনিও তেমনি মৃত্যু ও মারণের মূর্ত্ত প্রতীকস্বরূপ যারা ছিল তাদের মেরেছিলেন সমগ্র সমাজকে বাঁচাবার জন্য। (আ. প্র. খণ্ড ১, ৪. ১২. ১৯৪১) …… শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে বুঝিয়ে দিলেন যে devil (শয়তান) যদি রাজত্ব করে, তবে অর্জ্জুনের ঈপ্সিত ধর্ম্ম, জাতি, কুল, মান কিছুই রক্ষা পাবে না। তাই devil (শয়তান)-কে demolish (ধ্বংস) করা লোকমঙ্গলের জন্যই অপরিহার্য্য। এর মধ্যে দ্বেষ-হিংসার বালাই নেই। বরং অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধকে এড়িয়ে চলার বুদ্ধির পিছনে আছে দুর্ব্বলতা।’’ (আ. প্র. খণ্ড ৬, ৬. ১২. ১৯৪৫) কেষ্টদা (ভট্টাচার্য্য) প্রশ্ন করেন– গীতায় শ্রীকৃষ্ণ প্রথমে আত্মতত্ত্ব সম্বন্ধে এক বিরাট দার্শনিক আলোচনার অবতারণা করে তারপর ক্ষত্রিয়ের করণীয় নির্দ্দেশ করলেন অর্জুনকে। ওভাবে বললেন কেন ? শ্রীশ্রীঠাকুর– Divine Philosophy ( ভাগবত দর্শন ) দিয়ে শুরু করে তা থেকে Concrete – এ ( বাস্তবে ) আসলেন। আত্মিক ধর্ম প্রত্যেকে পালন করতে হয় তার Instinctive activity ( সহজাত সংস্কার-সম্মত কর্ম ) এর ভিতর দিয়ে। অর্জ্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ যা বলেছিলেন তার মর্ম্ম হল — You are a Kshatriya, born with Kshatriya instincts. And you must do your instinctive duty with all elevating urge ( তুমি ক্ষাত্র সংস্কার নিয়ে জাত ক্ষত্রিয়। এবং উন্নয়নী আকুতি নিয়ে তোমাকে অবশ্যই তোমার সহজাত সংস্কার-সম্মত কর্তব্য পালন করতে হবে )। অর্জ্জুন পন্ডিত কিনা তাই কেষ্টঠাকুর ঐভাবে অর্জ্জুনকে তাঁর বক্তব্য বলেছিলেন। Philosophy ( দর্শন ) না বললে অর্জ্জুন ধরত না। (আলোচনা প্রসঙ্গে, ১১দশ খন্ড, (ইং ২০-০৫-১৯৪৮) রামচন্দ্র এবং শ্রীকৃষ্ণ উভয়েই বৈষ্ণবধর্মের বা সনাতন ধর্মের মূল কাঠামো সদাচার এবং বর্ণাশ্রমকে রক্ষা এবং প্রতিষ্ঠা করার জন্যই জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। চৈতন্যদেবও ভারতীয় কৃষ্টির মূল, বর্ণধর্ম, আশ্রমধর্ম পালন করার পর লোকশিক্ষার জন্য সন্ন্যাস নিয়েছিলেন। তিনি বাস্তব জীবনে অসৎ-নিরোধে তৎপর ছিলেন। বর্ণাশ্রম বিরোধী কোন প্রতিলোম বিবাহ পর্যন্ত হতে দেন নি। দোর্দন্ডপ্রতাপ জমিদারের দুষ্কৃত ভাইপো মাধবের কবল থেকে চন্দনের বাগদত্তা চুয়াকে পার্ষদদের সাহায্যে চন্দনকে দিয়েই হরণ করিয়ে স্বয়ং পৌরহিত্য করে উপযুক্ত পাত্রে পাত্রস্থ করেছেন। (সূত্রঃ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত, চুয়াচন্দন উপন্যাস)
* * বাংলার বিশুদ্ধ কীর্তন-আন্দোলনের পথিকৃৎ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তিনি স্বভাবজ পাণ্ডিত্যের মাধ্যমে নবদ্বীপের স্মার্ত্ত পণ্ডিতদের, ভারতখ্যাত কাশ্মীরি-পণ্ডিতের দর্প চূর্ণ করেছেন। তিনি তামসিক গুণসম্পন্ন সমাজের প্রতিনিধি জগাই-মাধাইদের প্রেম দিয়ে সাত্তিক গুণের উদ্বোধন করেছেন। সনাতন ধর্ম বিদ্বেষী চাঁদ কাজীদের হরিনাম সংকীর্তনের মাধ্যমে চরমবার্তা দিয়ে তমোগুণ নাশ করে ইসলামের বিকৃতি প্রচারকে নস্যাৎ করে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বাহ্য জাতিভেদের বেড়াজাল অগ্রাহ্য করে, যবন হরিদাসের ভক্তিকে মর্যাদা দিয়ে ভক্ত হরিদাসে রূপান্তর করেছেন। তৎকালিন ভারতের বিখ্যাত তাত্ত্বিক পণ্ডিতদের, যেমন রায় রামানন্দ, প্রকাশানন্দ সরস্বতী, সার্ব্বভৌম প্রভৃতিদের ভুল ভাঙাতে তথ্যসমৃদ্ধ বাচনিক কীর্তি— ‘‘চণ্ডালোহপি দ্বিজশ্রেষ্ঠ হরিভক্তি পরায়ণঃ।’’ ‘‘মুচি যদি ভক্তিসহ ডাকে কৃষ্ণধনে। কোটি নমস্কার করি তাহার চরণে॥’’—-প্রকাশ মাধ্যমে আপামর সবাইকে সনাতন ধর্মে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ‘‘চৈতন্যদেবও জগাই-মাধাইয়ের উপর কেমন উগ্রভাব ধারণ করে তাদের অন্তরে ত্রাস ও অনুতাপ জাগিয়ে তবে প্রেম দেখিয়ে তাদের অন্তর জয় করেছিলেন। তাদের উগ্রদম্ভ, দর্প ও প্রবৃত্তি-উন্মত্ততাকে স্তব্ধ না করে, আয়ত্তে না এনে গোড়ায় প্রেম দেখাতে গেলে সে-প্রেম তারা ধরতে পারত না। হয়তো ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করত।’’ (আ. প্র. ৯/২৭. ১২. ১৯৪৬) প্রকাশানন্দ সরস্বতী, সার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্য প্রমুখগণ বৈদান্তিক পণ্ডিত ছিলেন। তাঁদের পাণ্ডিত্য বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন,—- বৈদান্তিক ভাব মানে record of experience (জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার দলিল)। ওরা হয়তো achieve (আয়ত্ত) করার পথ ঠিক অবলম্বন করেননি, সেইটে চৈতন্য মহাপ্রভু ধরিয়ে দিয়েছেন। ভক্তি লাগেই, ভক্তিপথ সহজ, সুষ্ঠু, accurate (যথাযথ), ভক্তির রাস্তা দিয়েই যেতে হয়, তার সঙ্গে বৈশিষ্ট্যানুযায়ী ঝোঁক থাকেই। অদ্বৈতবাদেও গুরুভক্তির উপর জোর দেওয়া আছে। নইলে এগোন যায় না। তাই আছে— ‘অদ্বৈতং ত্রিষু লোকেষু নাদ্বৈতং গুরুনা সহ’। নির্ব্বিকল্প সমাধিতে অদ্বৈতভূমিতে সমাসীন হ’লে জ্ঞান, জ্ঞেয়, জ্ঞাতা লয় পেয়ে যায়। তখন মানুষ বোধস্বরূপ হ’য়ে থাকে, সে অবস্থা মুখে বলা যায় না। অন্য সময় সে মানুষেরও সেব্য-সেবকভাব নিয়ে থাকা স্বাভাবিক! আমি না থাকলে তুমি থাকে না, তুমি না থাকলে আমি থাকে না। জীবজগতের সঙ্গে ব্যবহারে যে আমি-তুমি রূপ দ্বৈতভাব থাকে, তখনও তার মধ্যে একটা একাত্মবোধের চেতনা খেলা ক’রে বেড়ায়। ইষ্টই যে সব-কিছু হ’য়ে আছেন, এই স্মৃতি লেগে থাকে। আত্মাই কই আর ব্রহ্মই কই, তার মূর্ত্ত বিগ্রহ হলেন ইষ্ট। মানুষ যখন ইষ্টসর্ব্বস্ব হয়, ইষ্টপ্রীত্যর্থে ছাড়া যখন সে একটা নিঃশ্বাসও ফেলে না, তখনই সে একই সঙ্গে ভক্তিযোগ, কর্ম্মযোগ ও জ্ঞানযোগে সিদ্ধ হ’য়ে ওঠে। কর্ম্মযোগ, জ্ঞানযোগ যাই বল, ভক্তির সঙ্গে যোগ না থাকলে কাজ হয় না, সব যোগই আসে ভক্তিযোগ থেকে— “বহুনাং জন্মনামন্তে জ্ঞানবান্ মাং প্রপদ্যতে, বাসুদেবঃ সর্ব্বমিতি স মহাত্মা সুদুর্লভঃ”। এই জ্ঞানী একাধারে জ্ঞানী, ভক্ত ও কর্ম্মী। গোড়া থেকেই অদ্বৈতবাদ mathematically (গাণিতিকভাবে) সম্ভব হ’তে পারে, practically (বাস্তবে) সম্ভব হয় কমই। (আলোচনা প্রসঙ্গে, ত্রয়োদশ খণ্ড, তাং ১-৮-১৯৪৮)
* *
চৈতন্যদেব অসি নয়, তীর-ধনুক-বল্লম লাঠি দিয়েও নয়—খোল, করতালাদি বাদ্যযন্ত্রের অনুষঙ্গে ‘হরেরাম হরেকৃষ্ণ’ নামকীর্তনের মাধ্যমে এক ধর্মীয় প্লাবন সৃষ্টি করেছিলেন। ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ অতিক্রম করে, পুরুষার্থের পঞ্চম-বর্গ প্রেমের সাহায্যে সাম্প্রদায়িক কায়েমী-স্বার্থীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ভাগবত আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে ভাগবত ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্ণাশ্রমানুগ সামাজিক বিন্যাসকে সমৃদ্ধ করতে সর্ববর্ণে হরিনাম প্রচার করে বাহ্য জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। কিছু স্বার্থান্বেষী স্মার্ত্ত-পণ্ডিতদের অভিসন্ধিমূলক অভিযোগের ভিত্তিতে তৎকালিন শাসক চাঁদকাজী হরিনাম সঙ্কীর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। শ্রীবাস অঙ্গনের কীর্তনের আসরে গিয়ে বৈষ্ণবদের ওপর অত্যাচার করে, শ্রীখোল ভেঙ্গে দেয়। শান্ত মহাপ্রভু ওই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে কোন বিরোধ না করেই দুর্বার নিরোধ করেছিলেন। ১৪টি কীর্তনদল সংগঠিত করে উদ্দাম কীর্তন করতে করতে চাঁদকাজির বাড়িতে যান। চাঁদকাজী ভয় পেয়ে গেলে মহাপ্রভু তাকে আশ্বস্ত করতে কৃষ্ণপ্রেমের কথা বলেন। হরিনাম-সংকীর্তনের উপযোগিতা বিষয়ে বিস্তৃত ব্যাখ্যা করেন। তার পরে আপনকরা ভাব নিয়ে বলেন, তুমি আমার মামার গ্রামের লোক হবার সুবাদে তুমি আমার মামা হও, মামা হয়ে ভাগ্নের প্রতি এমন কঠোর হয়ো না। কীর্তন বন্ধ করার আদেশ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত আমরা তোমার বাড়ী ছেড়ে যাচ্ছি না। ধর্ম প্রতিষ্ঠার কর্তব্যে অটল মহাপ্রভুর কীর্তন আন্দোলনের কাছে আনুগত্য স্বীকার করতে বাধ্য হয় চাঁদকাজি। তিনিও মহাপ্রভুর সাথে গলা মিলিয়ে হরিনাম সঙ্কীর্তন করেন। সবাইকে হরিনাম সঙ্কীর্তন করতে আদেশ জারী করেন। চৈতন্য আজ্ঞায় স্থির হইল কীর্তন কহে আপনার তত্ত্ব করিয়া গর্জন। কলিযুগে মুঞি কৃষ্ণ নারায়ন মুঞি সেই ভগবান দেবকীনন্দন।। অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড কোটি মাঝে মুই নাথ যত গাও সেই মুঞি তোরা মোর দাস।।’’ (শ্রীচৈতন্য ভাগবত পৃষ্ঠা ১৪৬, মধ্যখণ্ড ৮ম অধ্যায়।) “গৌড়েশ্বর নবাবের দৌহিত্র চাঁদকাজী কে ভগবান শ্রীমন্ মহাপ্রভুর কৃপা”– (৩)
প্রভু কহে – প্রশ্ন লাগি আইলাম তোমার স্থানে। কাজী কহে-আজ্ঞা কর যে তোমার মনে।। ১৪৬ অনুবাদ :- শ্রীমন্ মহাপ্রভু বললেন, মামা! আমি আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করার জন্য আপনার বাড়িতে এসেছি। তার উত্তরে চাঁদকাজী বললেন – হ্যা, তোমার মনে কি প্রশ্ন আছে তা তুমি বল।
প্রভু কহে – গোদুগ্ধ খাও গাভী তোমার মাতা। বৃষ অন্ন উপজায় তাতে তেঁহো পিতা।। ১৪৭ অনুবাদ :- শ্রীমন্ মহাপ্রভু বললেন – আপনি গরুর দুধ খান; সেই সূত্রে গাভী হচ্ছে আপনার মাতা। আর বৃষ অন্ন উৎপাদন করে, যা খেয়ে আপনি জীবন ধারন করেন; সেই সূত্রে সে আপনার পিতা।
পিতা মাতা মারি খাও এবা কোন্ ধর্ম। কোন্ বলে কর তুমি এমত বিকর্ম।। ১৪৮ অনুবাদ :- যেহেতু বৃষ ও গাভী আপনার পিতা ও মাতা, তা হলে তাদের হত্যা করে তাদের মাংস খান কি করে ? এটি কোন্ ধর্ম ? কার বলে আপনি এই পাপকর্ম করছেন ?
কাজী কহে – তোমার যৈছে বেদ পুরাণ। তৈছে আমার শাস্ত্র কেতাব কোরাণ।। ১৪৯ অনুবাদ :- কাজী উত্তর দিলেন, তোমার যেমন বেদ, পুরাণ আদি শাস্ত্র রয়েছে, তেমনই আমাদের শাস্ত্র হচ্ছে কোরান।
সেই শাস্ত্রে কহে প্রবৃত্তি নিবৃত্তি মার্গ-ভেদ। নিবৃত্তি-মার্গে জীব মাত্র বধের নিষধ।। ১৫০ অনুবাদ :- কোরন অনুসারে উন্নতি সাধনের দুটি পথ রয়েছে – প্রবৃত্তিমার্গ ও নিবৃত্তিমার্গ। নিবৃত্তিমার্গে জীবহত্যা নিষিদ্ধ।
প্রবৃত্তি-মার্গে গোবধ করিতে বিধি হয়। শাস্ত্র আজ্ঞায় বধ কৈলে নাহি পাপ ভয়।। ১৫১ অনুবাদ :- প্রবৃত্তিমার্গে গোবধ অনুমোন করা হয়েছে। শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে যদি বধ করা হয়, তাহলে কোনম পাপ হয় না।
তোমার বেদেতে আছে গোবধের বাণী। অতএব গোবধ করে বড় বড় মনি।। ১৫২ অনুবাদ :- চাঁদকাজী শ্রীমন্ মহাপ্রভু বললেন – তোমার বৈদিক শাস্ত্রে গোবধের নির্দেশ রয়েছে। সেই শাস্ত্র-নির্দেশের বলে বড় বড় মুনিরা গোমেধ-যজ্ঞ করেছিলেন।
প্রভু কহে – বেদে কহে গোবধ নিষেধে। অতএব হিন্দুমাত্র না করে গোবধে।। ১৫৩ অনুবাদ :- চাঁদকাজীর উক্তি খণ্ডন করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন – বেদে স্পষ্টভাবে গোবধ নিষধ করা হয়েছে। তাই যে কোন হিন্দু, তা তিনি যেই হোন না কেন, কখনোও গোবধ করেন না।
জীয়াইতে পারে যদি তবে মারে প্রাণী। বেদ-পুরাণে আছে হেন আজ্ঞাবাণী।। ১৫৪ অনুবাদ :- বেদ ও পুরাণে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, কেউ যদি কোন প্রাণীকে নবজীবন দান করতে পারে, তাহলে গবেষণার উদ্দ্যেশে সে প্রাণী মারতে পারে।
অতএব জরদগব মারে মুনিগণ। বেদমন্ত্রে শীঘ্র করে তাহার জীবন।। ১৫৫ অনুবাদ :- তাই মুনি-ঋষিরা অতি বৃদ্ধ জরদগব (জরাগ্রস্ত বা বৃদ্ধ) পশুদের কখনও কখনও মেরে, বৈদিক মন্ত্রের সাহায্যে তাদের নবজীবন দান করতেন।
জরদগব হঞা যুবা হয় আর বার। তাতে তার বধ নহে হয় উপকার।। ১৫৬ অনুবাদ :- এই ধরনের জরদগব (জরাগ্রস্ত বা বৃদ্ধ) পশুদের যখন এভাবেই নবজীবন দান করা হত, তাতে তাদের তাতে তাদের বধ করা হত না, পক্ষান্তরে তাদের মহা উপকার সাধন করা হত।
কলিকালে তৈছে শক্তি নাহিক ব্রাহ্মণে। অতএব গোবধ কেহো না করে এখনে।। ১৫৭ অনুবাদ :- পূর্বে মহা শক্তিশালী ব্রাহ্মণেরা বৈদিক মন্ত্রের সাহায্য এই ধরনের কার্য্য সাধন করতে পারতেন, কিন্তু এখন এই কলিযুগে সেই রকম শক্তিশালি কোন ব্রাহ্মণই নেই। তাই গাভী ও বৃষদের নবজীবন দান করার যে গোমেধ-যোজ্ঞ, তা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।
তোমরা জীয়াইতে নার বধ মাত্র সার। নরক হৈতে তোমার নাহিক নিস্তার।। ১৫৮ অনুবাদ :- তোমরা মুসলমানেরা পশুকে নবজীবন দান করতে পার না, তোমারা কেবল হত্যা করতেই পার। তাই তোমরা নরকগামী হচ্ছ; সেখান থেকে তোমরা কোনভাবেই নিস্তার পাবে না।
গরুর যতেক রোম, তত সহস্র বৎসর। গোবধী রৌরব মধ্যে পচে নিরন্তর।। ১৫৯ অনুবাদ :- গরুর শরীরে যত লোম আছে তত হাজার বছর গোহত্যাকারী রৌরব নামক নরকে অকল্পনীয় দুঃখ-যন্ত্রণা ভোগ করে।
তোমাসভার শাস্ত্রকর্তা-সেহো ভ্রান্ত হৈল। না জানি শাস্ত্রের মর্ম ঐছে আজ্ঞা দিল।। ১৬০ অনুবাদ :- তোমাদের শাস্ত্রে বহু ভুলভ্রান্তি রয়েছে। শাস্ত্রের মর্ম না জেনে, সে সমস্ত শাস্ত্রর প্রণয়নকারীরা এমন ধরনের নির্দেশ দিয়েছে, যাতে যুক্তি বা বুদ্ধির দ্বারা বিচারের কোন ভিত্তি নেই এবং প্রমাণও নেই।
শুনি স্তব্ধ হৈল কাজী না স্ফুরে বাণী। বিচারিয়া কহে কাজী পরাভব মানি।। ১৬১ অনুবাদ :- শ্রীমন্ মহাপ্রভুর এই কথা শুনে কাজীর সমস্ত যুক্তি স্তব্ধ হল, তিনি আর কিছু বলতে পারলেনা। এভাবেই পরাজয় স্বীকার করে কাজী বিচারপূর্বক বললেন—
তুমি যে কহিলে পণ্ডিত সেই সত্য হয়। আধুনিক আমার শাস্ত্র, বিচার-সহ নয়।। ১৬২ অনুবাদ :- নিমাই পণ্ডিত! তুমি যা বললে তা সবই সত্য। আমাদের শাস্ত্র আধুনিক এবং তাই তার নির্দশগুলি দার্শনিক বিচার বা যুক্তিসঙ্গত নয়।
কল্পিত আমার শাস্ত্র আমি সব জানি। জাতি-অনুরোধে তবু সেই শাস্ত্র মানি।। ১৬৩ অনুবাদ :- আমি জানি যে, আমাদের শাস্ত্র বহু ভ্রান্ত্র ধারনা ও কল্পনায় পূর্ণ, তবুও যেহেতু আমি মুসলমান, তাই সম্প্রদায়ের খাতিরে আমি সেগুলি স্বীকার করি। (শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত সপ্তদশ পরিচ্ছেদ।)
সনাতন ধর্মকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করতে এত কিছু করা সত্বেও নবদ্বীপের কিছু স্মার্ত্ত পণ্ডিতেরা মহাপ্রভুর বিরোধিতা করেছেন। তাই তিনি অনিচ্ছা সত্বেও বাধ্য হয়ে বৈষ্ণব আন্দোলনকে নবদ্বীপে বা নদীয়াতে সীমাবদ্ধ না রেখে ভারতব্যাপী বিস্তার করার মানসে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নামে ভুষিত হয়ে লোক-সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পরিব্রাজক হয়ে বেরিয়ে পড়েন। “সন্ন্যাস লইনু যবে ছন্ন হইল মন। কী কাজ সন্ন্যাসে মোর প্রেম প্রয়োজন॥” —এই বাণীর মধ্যে যা’ স্পষ্টরূপে প্রকাশিত। * * * চৈতন্যদেবের লীলাবসান পরবর্তীকালে কিছু প্রবৃত্তিমার্গী অনুগামীরা চৈতন্যদেব কথিত অবতারবাদের মূলমন্ত্র— “আত্মেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা তারে বলি কাম। কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা, ধরে প্রেম নাম। কামের তাৎপর্য্য নিজ সম্ভোগ কেবল। কৃষ্ণসুখ তাৎপর্য্য প্রেম মহাবল।।” একটু বোধী তাৎপর্যে বিচার করলে দেখা যাবে, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-র আদর্শের অনুশাসন অনুশীলন ভিন্ন “কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা” উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। ‘‘কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা’’-র সদাচার, বর্ণাশ্রম ও চতুরাশ্রম-ধর্মের তাৎপর্য্য বোঝার চেষ্টা না করে, কৃষ্ণের আদর্শ চরিত্রগত করার অনুশীলন না করে, সাধনদ্বারা চৈতন্যদেবের পরবর্তী অবতারকে অন্বেষণ না করে, প্রবৃত্তি পরবশতার “আত্মেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা”-কে গুরুত্ব দিলেন তথাকথিত শ্রীকৃষ্ণ-চৈতন্য-প্রেমীরা। শ্রীকৃষ্ণের সাথে রাধাকে জুড়ে নিয়ে মুখে ‘কৃষ্ণ-কৃষ্ণ’ বলে খোল-করতাল সহযোগে কীর্তন করতে অভ্যস্ত হলেন। রাধা-কৃষ্ণের পরকীয়া প্রীতির সহজিয়া গোষ্ঠী তৈরি করে সগোত্র এবং প্রতিলোম বিবাহাদি সমর্থন করে আশ্রমধর্মকে অশ্রদ্ধা করেছেন। ফলে বিকৃত হয়েছে শ্রীকৃষ্ণ-চৈতন্যদেবের আদর্শ। যার প্রবহমানতা বর্তমানেও বিদ্যমান। চৈতন্যদেব প্রদত্ত ‘শিক্ষাষ্টক’ উপদেশামৃত, যার মধ্যে ‘রাধা’ নামের উল্লেখ পর্যন্ত নেই, ওই উপেদেশামৃতকে গুরুত্বের সাথে বিচার-বিশ্লেষণ না করেই ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থেও রাধাকে মানবী রূপে চিত্রিত করা হয়েছে। রাধাকে কৃষ্ণের বল্লভা বলা হয়েছে। বল্লভা শব্দের অর্থ প্রণয়িণী। যে কৃষ্ণকে সবকিছুর স্রষ্টা মনে করেন যারা, যে কৃষ্ণ অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখান বলে প্রচার করা হয়, সেই কৃষ্ণের প্রাণধন, প্রাণশক্তি বা জীবনীশক্তির উৎস একজন নারী ! ভাবা যায় ! না মেনে নেওয়া যায় ? যদি রাধাকে কৃষ্ণের একজন ভক্ত হিসাবে দেখাতেন, তাহলে মেনে নেওয়া যেত। রাধা সহ ক্রীড়ারস বৃদ্ধির কারণ। আর সব গোপীগণ রাসোপকরণ॥ কৃষ্ণের বল্লভা রাধা কৃষ্ণ প্রাণধন। তাঁহা বিনু সুখ হেতু নহে গোপীগণ॥ (চৈঃ চঃ পৃঃ ৬৪) শুধু তাই নয়, শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে গবেষণা করেন যারা, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাকে নিয়ে গবেষণা করেন যারা, তারাও পার্থসারথী কৃষ্ণের আদর্শকে পাশ কাটিয়ে, বর্ণাশ্রমধর্মকে উপেক্ষা করে, বাঁশী হাতে নিয়ে রাধাকে জড়িয়ে ধরা রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তির উপাসনা করেন। ‘আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সঙ্ঘ’, সংক্ষেপে ইসকনের ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথি স্মরণে জন্মাষ্টমীর দিনটিতেও রাধাকে সাথে রাখেন, যেন রাধাকে সাথে নিয়েই কৃষ্ণ জন্মেছিলেন! বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন—‘‘শুনেছি ভাগবতে রাধা ব'লে গোপিনী নেই। আমি বুঝি, রাধা মানে সেরা সৃষ্টি-রচয়িতা শক্তি। শব্দের থেকেই সব। কতরকমের শব্দ শোনা যায়। ওঁ-অনুভূতির পূর্বে দারুণ বম্ বম্ বম্ শব্দ হয়। দুনিয়াটা যেন ফেটে চৌচির হ'য়ে যাবে। কিছু থাকবে না, সব ধ্বংস হ'য়ে যাবে। সত্তাকেও বিলুপ্ত ক'রে দেবে। এমন শব্দ, সব যেন টুকরো টুকরো হ'য়ে, রেণু রেণু হ'য়ে উড়ে যাবে। সে কী ভীষণ অবস্থা! ভয় বলি, সত্তার ভয় যে কী তখন বোঝা যায়! সত্তা বুঝি এই মুহূর্তে গুঁড়িয়ে দিল। তখন বোঝা যায় দয়ালের দয়া, যে দয়ায় টিকে আছি এই দুনিয়ায়। ওঁ-অনুধাবনে রং আসে। রং-এ মনোনিবেশ করলে পিকলু বাঁশীর মত শব্দ হয়। দোল আসে। এক অবস্থায় motion and cessation (গতি এবং বিরতি)-এর মত বোধ হয়। স্বামীর অনুভূতি যেন to and from (একেবার সামনে একবার পেছনে হচ্ছে)-এমনতর বোধ করা যায়। ইলেকট্রিক ব্যাটারি দিলে যেমন শব্দ পাওয়া যায় না, ভিতরে বোধ হয়, রাধাও ঐ রকম সত্তা দিয়ে মানুষ হয়। শেষ দিকে আসে একটা পরম শান্ত অবস্থা। আমাদের এই সৎনাম সব মন্ত্রের বীজস্বরূপ। সব বীজের সত্তা হ'লো কম্পন। আর কম্পনের গঠনতন্ত্র অনুভব করা যায় এই নামের মধ্যে। রেডিওর যেমন শর্ট ওয়েভ, মিডিয়াম ওয়েভ এবং নানা মিটার আছে, অনুভূতির রাজ্যেও সেই রকম সব আছে। এগুলি ফালতু কথা না, এগুলির সত্তা আছে। যে সাধন করে সেই বুঝতে পারে। হ্রীং ক্রীং ইত্যাদির স্তরে-স্তরে কত শব্দ এবং তার সঙ্গে-সঙ্গে জ্যোতি ভেসে ওঠে। আর একটা কথা, পরীক্ষা করতে গেলে সদগুরুকে ধরা যায় না। কামনা নিয়ে গেলেও তাঁকে পাওয়া হয় না। কামনা ত্যাগ ক'রে ধরলে তখন তাঁকে পাওয়া যায়। কামনা নিয়ে তাঁতে যুক্ত হ'তে গেলে কামনার সঙ্গে যুক্ত হই, তাঁতে যুক্ত হ'তে পারি না। নিষ্কামের কথা কয়, তার মানে গুরুই আমার একমাত্র কাম্য হবেন, অন্য কোন কামনা থাকবে না। তখনই তাঁকে পাওয়া যাবে।’’ (আ. প্র. ১৫শ খণ্ড, পৃঃ ২০০-২০১ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী)
তাই বাধ্য হয়ে এ-যুগের শ্রীকৃষ্ণ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বিকৃতাচারী ধর্মের ধ্বজাধারীদের উদ্দেশ্যে বললেন— “ভগবান, ইষ্ট বা ধর্ম্মের মৌখিক স্তুতির ভিতর-দিয়ে যা’রা ধর্ম্মবিরোধী কাজ করে, তা’রা হ’ল সব চাইতে বড় শয়তানের দূত–প্রকৃষ্ট লোক-দূষক। ১২৫ । (শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭)’’ ‘‘অনেকে শ্রীকৃষ্ণকে মানে, গীতা মানে, অথচ বর্ণাশ্রম মানে না। গীতার কে কি ব্যাখ্যা করেছেন সেই দোহাই দেয়। কিন্তু গীতার বক্তা শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও বাণী দেখে চতুর্বর্ণ সম্বন্ধে তাঁর মত আমরা কি বুঝি? এ সম্বন্ধে কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না, গীতা শ্রীকৃষ্ণের জীবনেই জীবন্তভাবে পরিস্ফুট। গীতায় প্রত্যেক বর্ণের স্বভাবজ কর্ম সম্বন্ধে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। (আ. প্র. ১৪/১১৮) কেষ্টঠাকুরের জীবনটা দেখেন, ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত সবাই তাঁকে পুরুষোত্তমজ্ঞানে পূজা করতেন, কিন্তু তাঁর এত বিয়ের মধ্যে একটাও বামুনের মেয়ে নেই। সমাজ-সংস্থিতির জন্য তিনি বর্ণাশ্রমের বিধান কাঁটায়-কাটায় মেনে গেছেন। (আ. প্র. ৭/৫০)’’ * * * যারা শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে গবেষণা করেন, তাদের তো জানা উচিত যে, শ্রীকৃষ্ণ, বৃহত্তর রাষ্ট্রকে অধর্মের গ্যাংগ্রীন থেকে বাঁচাতেই সুকৌশলে কংস, জরাসন্ধ, শিশুপাল, শাল্ব কৌরবাদির ন্যায় আততায়ীরূপী গ্যাংগ্রীনদের অপারেশন করেছিলেন।---হিংসাকে হিংসা দ্বারা প্রতিরোধ করে অহিংসার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন! কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সনাতনী আর্য্যকৃষ্টির মূলতত্ত্ব, সদাচার ও বর্ণাশ্রমধর্মভিত্তিক পরমরাষ্ট্রিক সমবায়। শ্রীকৃষ্ণের লীলাবসান পরবর্তী শ্রীকৃষ্ণের গীতা-আদর্শের প্রচারক ঋত্বিক সংঘ সক্রিয় থাকার ফলে প্রজাগণ সহজাত-সংস্কার অনুযায়ী সবাই জীবিকা অর্জন করতেন। কেহ কাহারো বৃত্তি-হরণ করতেন না। সকলে আর্য্যকৃষ্টির বিবাহাদি দশবিধ সংস্কার মেনে চলতেন। জনন বিপর্যয় হয় নি, আশ্রমধর্ম ঠিক ছিল। ফলে তিন হাজার বছর পর্যন্ত বৃহত্তর আর্যাবর্তে আগ্রাসন করতে সাহস পায়নি অধার্মিক দুষ্কৃতিরা ! যখন থেকে বর্ণাশ্রম-ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের শিক্ষা ভুলে, প্রবৃত্তিরূপী শয়তানের প্ররোচনার ফাঁদে পড়ে আমরা ক্লীব হয়েছি, তখন থেকে আমরা আগ্রাসনের শিকার হয়েছি। বোধ বিপর্য্যয়ের কারণে, সনাতন ধর্মের অনুশাসন ভুলে, এক আত্মঘাতী উদারতা দেখাতে গিয়ে শক-হুণ-পাঠান-মোগলদের স্বাগত জানিয়েছি। তারা সুযোগ পেয়ে আমাদের জাতীয়তাবোধ, জাতীয়কৃষ্টি অবদলিত করেছে! অনেকদিন পরে, যখন আগ্রাসনের চরম বিপর্যয়, তখন ইংরেজদের অপশাসন থেকে আর্যাবর্তকে মুক্ত করতে আমরা মেরুদণ্ড সোজা করে ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করলাম। সেই শ্রীকৃষ্ণের গীতার আদর্শকে অবলম্বন করে। "যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লাণির্ভবতি ভারতঃ। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মনম্ সৃজাম্যহম্।। পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম্ । ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ।।"---বাণীর অনুসরণে। গীতার ওই সূত্র অবলম্বনে, চৈতন্যদেব ‘‘যেই রাম সেই কৃষ্ণ, এক দেহে রামকৃষ্ণ’’ রূপে এসে আমাদের ভুল ভাঙিয়ে দিলেন। গীর্জায় গিয়ে যীশুর, মসজিদে গিয়ে রসুলের আরাধনা করলেন। পঞ্চমুণ্ডির আসন সাজিয়ে কোনো তান্ত্রিক-গুরু বসালেন তো বসে পড়লেন। তিনি লোকশিক্ষার জন্য বহু ধর্মীয় মতবাদের গুরুদের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুন্ন রেখেই। তিনি দক্ষিণেশ্বরে পূজারী হয়ে এসেও প্রচলিত পূজা-পদ্ধতি অনুসরণ করেন নি। মৃন্ময়ী জগন্মাতাকে প্রাণবন্ত করে দেখালেন এবং কালী মায়ের আদেশক্রমে নিজে খেয়ে মাকে খাওয়ালেন। ফলহারিনী কালী পূজার শুভলগ্নে সারদাদেবীকে আরাধনা করে চিন্ময়ী মাতৃশক্তিকে আদ্যাশক্তি রূপে শ্রদ্ধা করতে শেখালেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব শিষ্য নরেন্দ্রনাথকে শেখালেন, ভারতবর্ষের শাশ্বত দর্শন, ‘‘বহুজন হিতায় চ, বহুজন সুখায় চ’’-এর আদর্শের উত্তরাধিকারী হয়ে পরমার্থ লাভ করার জন্য তোমাকে আত্ম নিবেদন করতে হবে। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ঐশী শক্তিতে শক্তিমান হয়ে নরেন্দ্রনাথ হলেন বিবেকানন্দ। এঁকে দিলেন মহান ভারতবর্ষের পূর্ণাঙ্গ এক চিত্র। শিকাগো ধর্ম্ম মহাসভার ক্যানভাসে। ‘আব্রহ্মস্তম্বভৃদ্ধাতা’–তৃণলতা থেকে ব্রহ্ম, সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বার্তাবহ বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, সংহিতা, পুরুষোত্তমবাদ নিয়ে বিশ্বজনমানস নতুন করে ভাবতে শুরু করলো। সনাতন ধর্মের হৃত উত্তরাধিকার ফিরে পেতে ভারতবর্ষ উপনিষদের ‘‘উত্তিষ্ঠত জাগ্রত, প্রাপ্য বরান্ নিবোধত।।’’ মন্ত্রে আবার নতুন করে জেগে উঠলো।......... ‘‘কর্ম্মণ্যেবাধিকারেস্তু মা ফলেষু কদাচন।.......’’ ––কর্মেই তোমার অধিকার ফলে নয়। ––শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতার ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার আদর্শ আঁকড়ে নবযুগের অভিমন্যু ক্ষুদিরাম, দেশরক্ষার ধর্ম পালন করতে গিয়ে ফাঁসির আসামী হলেন। ‘‘ন জায়তে ম্রিয়তে কদাচিৎ.......বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়.........নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ।.......’’। বাণীর অমৃত আদর্শে স্থিতপ্রজ্ঞ, মৃত্যুঞ্জয়ী ক্ষুদিরাম হাসিমুখে ফাঁসির দড়ির মালা পড়লেন গলায়। একটা ক্ষুদিরামের আত্মাহুতি জন্ম দিল হাজারো ক্ষুদিরামের। ফাঁসিরজ্জু আর ইংরেজ রাজশক্তির বুলেটের আলিঙ্গনে জীবনের জয়গান গাইতে গাইতে অকালে হাসিমুখে বিদায় নিল উত্তরাধিকারের স্বপ্নদেখা কতশত বীর ভারত-সন্তানেরা।
স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম শহীদ ক্ষুদিরাম ‘গীতা’-বর্ণিত ‘‘হতো বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং/জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম্’’-এর বাণীর অনুসরণে অমরত্ব লাভের অনুশাসন মেনে মৃত্যু বরণ করে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মৃত্যুঞ্জয়ী হতে শিখিয়েছিলেন। গীতা গ্রন্থের সেইসব বীরগাঁথা ভুলে আমরা তাঁর ঋণ শোধ করছি, ‘কৃষ্ণ করলেই লীলা, আমরা করলেই বীলা’ গানের ডালি সাজিয়ে! যদিও ওই গান রচনা করার সাহস আমরাই দিয়েছি,—যারা ধর্মের ধ্বজা ধরে প্রবৃত্তিকে পোষণ দিয়ে চলেছি।–-পার্থসারথী শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমদ্ভাগবতগীতার আদর্শ ভুলে, হ্লাদিনি শক্তিরূপিনী রাধা-তত্ত্ব ভুলে, মনগড়া প্রবৃত্তি-প্ররোচিত মানবী রাধা, শ্রীকৃষ্ণের মামীর সাথে পরকীয়া কামুক-রূপে, গোপিনীদের বস্ত্রহরণকারী-রূপে শ্রীকৃষ্ণকে চিত্রিত করে! ‘রাই জাগো রাই জাগো বলে শুক-সারি বলে, কত নিদ্রা যাওগো রাধে শ্যাম-নাগরের কোলে।…..’ এবং ‘রাই জাগোরে, জাগো শ্যামের মনমোহিনী বিনোদিনী রাই/শ্যাম অঙ্গে অঙ্গ দিয়া আছোরে রাই ঘুমাইয়া তোমার কি লোকলজ্জা নাই….’ ওই প্রভাতী গান দুটো বৈষ্ণব মহলে শুধু নয়, কীর্তন হিসেবেও সমাদৃত, জনপ্রিয়। গান দুটোর ভাষা বিশ্লেষণ করে একবার দেখুন। শাস্ত্র অনুযায়ী আর্য্য হিন্দুদের ব্রাহ্মমুহূর্তে শয্যাত্যাগ করে ঈশ্বরোপাসনা করতে হয়। আর প্রাকৃতিক নিয়মে ব্রাহ্মমুহূর্ত কালে সব পাখিরা জেগে যায়। স্বভাবতই শুক-সারি পাখি জেগে গিয়েছে। রাধা তখনো নাগর কৃষ্ণের অঙ্কশায়িনী হয়ে শুয়ে আছে। নগরবাসীরা যদি জানতে পারে তাহলে লজ্জায় পড়তে হবে। তাই শুক-সারী পাখি ওদের ভাষার জাগরণী গান গেয়ে রাধাকে সাবধান করে দিচ্ছেন। আর কৃষ্ণ ভক্তেরা ভালোমন্দ বিচার না করে, ওই গানকেই জাগরণীর জন্য আদর্শ গান হিসেবে নির্বাচন করে গেয়ে চলেছেন। এবার বিচার করে দেখুন, কাম-রসাত্মক চটুল কথায় প্রভাতী সুর লাগিয়ে শ্রীকৃষ্ণের নামে ওই আরাধনা আর্য্যকৃষ্টি বিরোধী প্রবৃত্তি-প্ররোচিত পরদারাসক্ত ব্যতীত কোন্ আধ্যাত্মিক আবেদনে সমৃদ্ধ ? ওইসব জাগরণী গান শুনে, এবং কবি জয়দেব বিরচিত গীতগোবিন্দের ছত্রে ছত্রে বর্ণিত কামবিলাসী, ‘দেহি পদপল্লব মুদারম্’ বলে রাধার মানভঞ্জন করা, পরকীয়া নিয়ে ব্যস্ত শ্রীকৃষ্ণের কীর্তিকলাপ পড়ে, যদি কোন তথাকথিত নাস্তিক্যবাদী শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রে কালিমালিপ্ত করে, —সেই ধর্মবিরোধী, ইষ্টবিরোধী প্রচারের জন্য দায়ী কারা? শ্রীকৃষ্ণ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ‘‘ …….. ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এলেন। ব্রাহ্মণ্যধর্ম্ম অর্থাৎ বৃদ্ধির ধর্ম্ম প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি প্রাণপাত করলেন। অথচ ব্রাহ্মণকুলতিলক দ্রোণাচার্য্যই তাঁর বিরুদ্ধে গেলেন। ভীষ্ম অন্নের কৃতজ্ঞতার দোহাই দিয়ে কৌরবপক্ষে গেলেন। কিন্তু যে-অন্ন তিনি খেয়েছিলেন সে-অন্নের অর্দ্ধেক মালিক পাণ্ডবরা। যা হোক, ধর্ম্ম কোথায়, ন্যায় কোথায়, লোকহিত কোথায়, কৌরবপক্ষ তা না বোঝার ফলে যুদ্ধ অনিবার্য্য হয়ে উঠলো। এতসব বিপর্য্যয় সত্ত্বেও কেষ্টঠাকুর ঘরে-ঘরে ঋত্বিক, অধ্বর্য্যু, যাজক পাঠিয়ে লোকের মনন ও চলনের ধারা দিলেন বদলে। করলেন ধর্ম্মের সংস্থাপনা। বুদ্ধদেব আসবার পর বৌদ্ধভিক্ষুরা দেশ ছেয়ে ফেললো, যার পরিণাম অশোক। অশোকের ভুলত্রুটি যাই থাক, শোনা যায়, অমনতর সম্রাট ও অমনতর সাম্রাজ্য নাকি কমই হয়েছে। রসুল আসার পর ইসলামের যাজনের ঢেউ কী রকম উঠেছিল তা কারও অজানা নয়। বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, মুসলমান সবাই তাদের যাজনের রেশটা কম-বেশী ধরে রেখেছে। প্রচারক আছে, প্রচেষ্টা আছে। অবশ্য, আচরণহীন প্রচারণায় যতটুকু হতে পারে ততটুকুই হচ্ছে। তবু মানুষের কানের ভিতর কথাগুলি ঢুকছে। কিন্তু আমাদের ঘরে ঘরে হানা দেবার কেউ নেই। তারা কেউ জুটলো না। অথচ হুজুগ করার এত লোক জুটছে। হুজুগ করে দল বেঁধে জেলে গেলে তাতে মানুষ কতখানি গড়ে উঠবে তা বুঝতে পারি না। (আ. প্র. ৮ম খণ্ড, ২৬. ০৬. ১৯৪৬) “আলেকজাণ্ডারের আগে পর্য্যন্ত কোন আক্রমণকারী আমাদের দেশে ঢুঁ মেরে কিছু করতে পারেনি । অশোকের Buddhism (বৌদ্ধবাদ)-এর পর থেকে বর্ণাশ্রম ভেঙ্গে পড়ে এবং সেই থেকেই সমাজ ও জাতি দুর্ব্বল হয়ে পড়ে । বুদ্ধদেব গৃহীর জন্য বর্ণাশ্রম রক্ষা করতে বলেছেন । আর ভিক্ষু, শ্রমণ ইত্যাদির বেলায় ওটার ওপর জোর দেননি । আর, সে ক্ষেত্রে ওর প্রয়োজনও ছিল না । কারণ, ভিক্ষু বা শ্রমণদের কোন যৌন সংশ্রব ছিল না । কিন্তু ভিক্ষুণীপ্রথা প্রবর্তনে সে বাঁধনও ভেঙে গেল । বুদ্ধদেব যে স্বর্ণযুগ আনতে চেয়েছিলেন তা আর সম্ভব হ’ল না ।” (আ. প্র. ২১/৬. ৮. ১৯৫২)
* * আর একবার কৃষ্ণকথায় ফিরে আসছি। বিচার করে দেখব, কৃষ্ণ-রাধার আজগুবী তত্ত্বের অস্তিত্ব আদৌ আছে কি-না। পণ্ডিতদের মতে কংসের দূত হয়ে মহামতি অক্রুর, বলরামসহ শ্রীকৃষ্ণকে বৃন্দাবন থেকে মথুরায় নিয়ে যান কংস আয়োজিত ধনুর্যজ্ঞে অংশগ্রহণ করাতে। কংসের উদ্দেশ্য ছিল শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করার। পরিবর্তে শ্রীকৃষ্ণ অত্যাচারী কংস-মামাকে হত্যা করে পিতামহ উগ্রসেনকে রাজ্য প্রত্যর্পণ করেন। তারপর ঘোর আঙ্গিরসের সান্নিধ্যে পরাবিদ্যা এবং সান্দিপনী কাশ্যের সান্নিধ্যে অপরাবিদ্যা লাভ করেন আর বৃন্দাবনে ফিরে যান নি। পণ্ডিতদের এই সাক্ষ্য থেকে প্রমাণিত, শ্রীকৃষ্ণ ১১ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে কংসকে বধ করেন। অথচ বেশীরভাগ কৃষ্ণভক্তগণ বৃন্দাবন লীলার, রাসলীলার নামে যে যুবক কৃষ্ণকে মানবী রাধার সাথে যুগলবন্দী করে পরকীয়া কামুক রূপে চিত্রিত করে চলেছেন, সে কৃষ্ণ কোন কৃষ্ণ? সে কি বৃষ্ণিসিংহ দেবকীনন্দন, না অন্য কেউ ? সে কি গীতার প্রবক্তা পার্থসারথী, না অন্য কেউ? কারণ, বৈষ্ণবদের প্রামাণ্য গ্রন্থ ভাগবতে রাধা-কৃষ্ণের ওইসব অবৈধ পরকীয়া-লীলার কোন কাহিনী লিপিবদ্ধ নেই। অথচ কৃষ্ণের প্রচারকেরা গীতার কথা বলেন, ভাগবতের কথা বলেন, অথচ আয়ান ঘোষের ঘরণী রাধাকে শ্রীকৃষ্ণের সাথে এক অবৈধ সম্পর্কের সাথে জুড়ে নিয়ে কৃষ্ণনাম করতে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণের যে বদনাম করে চলেছেন, সেটাও তাদের বোধে ধরা পড়ে না, এমনই ধার্মিক তা’রা ! কৃষ্ণকে একমাত্র ভগবান বলে মানেন যারা, তারা আবার শ্রীকৃষ্ণের সাথে রাধারও উপাসনা করেন, কোন্ যুক্তিতে? তাদের অনেকেই আবার শ্রীকৃষ্ণের নব-কলেবর জ্ঞানে চৈতন্যদেবের প্রতিকৃতির উপাসনাও করেন। তা’রা বলেন, চৈতন্যদেব রাধা-কৃষ্ণের যুগল অবতার। খুব ভাল কথা। তাই যদি হয়, তাহলে তো একঅঙ্গে দুই-রূপ যুগল অবতার-স্বরূপ চৈতন্যদেবেরই আরাধনা করতে হয়। আলাদা করে রাধা-কৃষ্ণের যুগলমূর্তির আরাধনার প্রয়োজন নেই। কারণ গীতার বাণী ‘‘তেষাং জ্ঞানী নিত্যযুক্ত একভক্তি র্বিশিষ্যতে।’’ (৭ম অধ্যায়) অনুসারে পুরুষোত্তম ব্যতীত একাধিক আদর্শকে মনে স্থান দিলেও ব্যভিচার করা হয়, যা ইষ্টলাভের বা ঈশ্বরলাভের পথে অন্তরায়। ইসকন ভক্তদের এ বিষয়টা একবার ভেবে দেখা উচিত। কারণ, আমরা জীবনপিয়াসী যারা, তারা যদি এভাবে জীবনদেবতার অপমান করে চলি, আমাদের জীবন কিভাবে সমৃদ্ধ হবে? —————————————- নিবেদনে— তপন দাস@tapandasd
দেহ ধারণ এবং দেহ ত্যাগ এই দুইয়ের মাঝে জীবন নামের প্রবাহ কিভাবে সৃষ্টি
হয়েছিল তা নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত। সৃষ্টিতত্ত্ব অনুসারে পিতার পিতা পরমপিতা লীলার প্রয়োজনে নিজেকে এক থেকে বহুতে পরিণত হতে গিয়ে যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম স্পন্দনের সৃষ্টি হয়েছিল তার নাম অনাহত নাদ বা আদিধ্বনি বা প্রণব। সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী মানুষ, ব্রহ্মবিদ্ আচার্য্য মাধ্যমে ‘আত্মানং বিদ্ধি’র মার্গ অনুসরণ করে ‘মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়’—মৃত্যু হতে
অমৃত আহরণ করতেন। জীবাত্মাকে বিলীন করে দিতেন পরমাত্মায়। সোনার তাল
থেকে তৈরী গয়নাটাকে ব্যবহার করে আবার ফিরিয়ে দিতেন সেই সোনার তালে।
পরমপিতা সকলের পিতা আর আমরা হলাম আমাদের ভাগ্যবিধাতা। আকর্ষণ (attraction) সংকোচন, (contraction), স্থিতি (stagnation) ও প্রসারণ (expansion)-এর লীলায়িত
ছন্দের বিধায়িত নিয়মে আমরা প্রত্যেকেই এক একজন স্রষ্টা। নারী-পুরুষের
সম্মিলিত জনন ক্রিয়াকালিন কোষ বিভাজন মাধ্যমে সংকুচিত ডিম্বাণু (ovum) ও
শুক্রাণু (sperm) নামের দুটি ভিন্ন সত্তা একটি কোষে এক হয়ে গর্ভে স্থিত
হয়। পুণরায় কোষ বিভাজন মাধ্যমে প্রসারিত হয়। ক্রমান্বয়ে সৃষ্টি হতে
থাকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। গর্ভবাসের স্থিতিকাল উত্তীর্ণ হলে ভূমিষ্ট হয়।
শুরু হয় জীবন যাপনের পালা। শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্দ্ধক্যের
গন্তব্যে পৌঁছান অথবা মাঝপথে নেমে পড়া, নির্ভর করে স্রষ্টা পিতামাতার
উপর। স্রষ্টা পিতামাতা যেমন ভাবের আত্মাকে আকর্ষণ করে তদুনুরূপ আয়ু লাভ
করে সন্তান। আবার উক্ত সন্তানের আত্মা যে ভাব নিয়ে বিগত হবে, সেই ভাব
নিয়েই ওই আত্মাকে পিণ্ডদেহ ধারণ করতে হবে। এই হ’ল জীবন-মৃত্যুর
আগম-নিগমের চরম সত্য।
উপনিষদের ঋষি বলছেন—
শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা
আ যে ধামানি দিব্যানি তস্থূ।।
বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তম্
আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ।
তমেব বিদিত্বাতিমৃত্যুমেতি
নান্যঃ পনথা বিদ্যতে অয়নায়।।
(শ্বেতাশ্বতর উপনিষৎ–-৩।৮)
শোনো বিশ্বজন,
শোনো অমৃতের পুত্র যত দেবগণ
দিব্যধামবাসী, আমি জেনেছি তাঁহারে
মহান্ত পুরুষ যিনি আঁধারের পারে
জ্যোতির্ময়। তাঁরে জেনে তাঁর পানে চাহি
মৃত্যুরে লঙ্ঘিতে পারো, অন্য পথ নাহি।
(উৎস–”রূপান্তর”, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
এ থেকে বোঝা গেল যে, তমসার পার থেকে আবির্ভূত মহান পুরুষ পুরুষোত্তম ব্যতীত অমৃতের সন্ধান কেউ দিতে পারবেন না। শ্রীমদ্ভবদ্গীতা গ্রন্থেও শ্রীকৃষ্ণ মৃত্যু থেকে অমৃত আহরণের কথা বললেন—
ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ
নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ॥২০॥
(শ্রীমদ্ভগবদগীতা ২য় অধ্যায়: সাংখ্যযোগ)
অনুবাদ : আত্মার কখনও জন্ম হয় না বা মৃত্যু হয় না, অথবা পুনঃ পুনঃ তাঁর উৎপত্তি বা বৃদ্ধি হয় না৷ তিনি জন্মরহিত শাশ্বত, নিত্য এবং পুরাতন হলেও চিরনবীন। শরীর নষ্ট হলেও আত্মা কখনও বিনষ্ট হয় না।)
* * *
।। অমৃত স্নান ।।
এ-বছর পৌষ সংক্রান্তি থেকে সুরু করে শিব চতুর্দশী পর্যন্ত বেনারস থেকে সুরু করে প্রয়াগরাজ পর্যন্ত সাজ-সাজ রবে উৎসবের পরিবেশ। কুম্ভ, মহাকুম্ভ নামের সাথে অজ্ঞাতসারেই একটা ধর্ম-ধর্ম ভাব আমাদের মনের মণিকোঠায়। আধুনিক কালের দৈনন্দিন জীবনে কুম্ভ শব্দের সাথে বিশেষ পরিচিতি না থাকলেও, আমরা কুম্ভকার নামের সাথে বিশেষভাবে পরিচিত। আমাদের জানা মতে মৃৎশিল্পীদের কুমোর বা কুম্ভকার বলে। কুম্ভ হচ্ছে কুম্ভ রাশির প্রতীক এবং জল রাখার পাত্র বিশেষ। একদা সেই পাত্রে রাখা হয়েছিল অমৃত। দেবতারা অমৃতকুম্ভ নিয়ে দৈত্যদের মাঝখান থেকে পালাবার সময় চার জায়গায় কুম্ভ রক্ষিত হয়েছিল বা ওই চার জায়গায় অমৃত বিন্দু উছলে পড়েছিল, সেই প্রেক্ষাপটের স্মৃতি-স্মরণে বারো বৎসর অন্তর সাধু-সন্ত পুণ্যার্থীদের সমাগম হয়। সংগঠিত হয় কুম্ভমেলা বা কুম্ভযোগ বা পুষ্করযোগ।
সূর্য্য ও বৃহস্পতি যথাক্রমে মেষ ও কুম্ভরাশিতে গেলে হরিদ্বারে এই মেলা হয়। সূর্য ও বৃহস্পতি মকর ও বৃষ রাশিতে গেলে প্রয়াগে এই মেলা হয়। সূর্য কর্কট ও সিংহ রাশিতে গেলে নাসিকে এই মেলা হয়। সূর্য তুলা ও বৃশ্চিক রাশিতে গেলে উজ্জয়িনীতে এই মেলা হয়। উল্লিখিত এই চার জায়গাতেই কেবল এই মেলা হয়। বারো বছর অন্তর বারোটি মেলার সম্মিলিত যোগে ১২×১২=১৪৪ বছর পর যে মেলা অনুষ্ঠিত হয় তার নাম মহাকুম্ভ যোগ। ওই মহাকুম্ভ মেলা এবার প্রয়াগরাজে মহা-সমারোহে অনুষ্ঠিত হলো। লক্ষ-কোটি পুণ্যার্থী অমৃতকুম্ভে স্নাত হয়েছেন। প্রয়াগ রাজের ত্রিবেণী সঙ্গমে অনুষ্ঠিত মহাকুম্ভ মেলায় সকলেই যে পুণ্য অর্জনের জন্য, অমৃত লাভের আশায় গিয়েছেন, তা কিন্তু নয়! মহামিলনের মিলনমেলায় মিলিত নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান—বিবিধের মাঝে মিলন মহানের দর্শন করার মধ্যে অন্তর্জগতে যে বিরাটত্বের উপলব্ধি হয়েছে, তার মূল্যায়ন যার-যার, তার-তার। তবে হ্যাঁ, যে-সব অমৃতস্য পুত্রাদের আত্মোপলব্ধি হয়নি, যারা নিজেদের বৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখেনি, আবেগতাড়িত হয়ে, যানবাহনে, লাইনে, ধাক্কাধাক্কি করে, কারে আগে কে যাবে, ত্রিবেণী সঙ্গমে!—ডুব দিয়ে পুণ্য অর্জন করতে! তাদের কথা আলাদা। তাদের জন্য, ব্যবস্থাপনার ত্রুটির জন্য, অনেক অবাঞ্ছিত ঘটনা, দুর্ঘটনা ঘটেছে।
* * *
ঘটনাটা সত্যযুগের। সুরাসুরের দ্বন্দ্বের কারণে যুদ্ধ লেগেই ছিল। অসুরদের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে দেবতারা ক্লান্ত পড়েন। সমাধানের জন্য প্রথমে ব্রহ্মা, পরে বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। বিষ্ণু পরামর্শ দেন, অসুরদের সাথে সন্ধি করে সমুদ্র মন্থন করতে হবে। মন্থন করতে করতে অমৃত উঠবে। সেই অমৃত পান করলে দেবতারা অমর হবেন। শক্তিশালী অসুরদের সাহায্য বিনা এই মন্থন সম্ভব নয়। দেবরাজ ইন্দ্র, অসুররাজ বলির সাথে আলোচনা করেন। বলি অমৃতের ভাগ দাবি করলে ইন্দ্র রাজী হন। মেরু পর্বতকে মন্থন-দন্ড, নাগরাজ বাসুকিকে মন্থন-রজ্জু করে সুরু হয় মন্থন। বাসুকির মুখের দিকটা দৈত্যরা আর লেজের দিকটা দেবতারা ধরে মন্থন সুরু করেন। অনেক টানাপোড়েনের সাথে কয়েকটি ধাপে মন্থন সংগঠিত হয়। মন্থনের চরমে উত্থিত হয় সোম, শ্রী, সুরাদেবী, তুরগ, কৌস্তুভ, ঐরাবত, কালকূট বিষ….. অবশেষে ধন্বন্তরি শ্বেত-কমন্ডুলুতে করে অমৃত নিয়ে ওঠেন। (যদিও নানা গ্রন্থে নানা মত রয়েছে।)
কাহিনী অনুসারে সমুদ্র মন্থনে উত্থিত হয় অমৃত নামের তরল পদার্থ। কমন্ডুলু নামের পাত্রে আনিত হয়, কুম্ভ নামক পাত্রে রক্ষিত হয়। শব্দার্থ ও মর্মার্থ অনুসারে, যা হতে মৃত্যু নাই তাই অমৃত। আবার যা পান করলে মৃত্যু হয় না, তাই অমৃত। আমাদের আলোচ্য কুম্ভস্থিত অমৃত পান করলে অমরত্ব লাভ হবে। সেই বিশ্বাসের কারণেই অমৃতের অধিকার নিয়ে দেবাসুরের মধ্যে দন্দ্ব, যুদ্ধ হয়। অমৃতের কুম্ভ থেকে এই পৃথিবীর জম্বুদ্বীপ (আর্যাবর্ত/ভারতবর্ষ) নামক স্থানের চারটি উপ-স্থানে চলকে-চলকে কয়েক বিন্দু অমৃত পতিত হয়। অমৃত লাভের আশায়, যোগে-যোগে, যুগে-যুগে সেইসব স্থানে সমবেত হয়ে অমৃত-স্নান করেন অমৃত-পিয়াসীরা!
পিণ্ডদেহের কুম্ভস্থিত প্রবৃত্তিকে পোষ মানিয়ে সত্তাধর্মী করে তোলার সাধনার নাম অমৃতস্নানের স্নাতক হওয়া।
।। গার্হস্থ্য আশ্রমে অমৃত লাভ কথা ।।
ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য বার্ধ্যক্যে উপনীত হলে বানপ্রস্থ আশ্রমে যাবার সময়ে কাত্যায়নী ও মৈত্রেয়ী দেবী নাম্নী দুই স্ত্রীকে সম্পত্তি ভাগ করে দিতে চান। কাত্যায়নী দেবী মেনে নিলেও মৈত্রেয়ী দেবী জানতে চান—
‘ভগবান, আপনি যে ধন সম্পত্তির কথা বলছেন সে বিষয়ে আমার কিছু জিজ্ঞাসা আছে । শুধু আপনার আশ্রমের ধন সম্পদ কেন, এই সমুদ্র-মেঘলা সমগ্র পৃথিবী যদি ধন ধান্যে পরিপূর্ণ হয় এবং আমার হয় তবে কি আমি সে সমুদয় দিয়ে অমৃতত্ব লাভ করতে পারব ? এই ধন সম্পদ দিয়ে বহুবিধ যজ্ঞক্রিয়াদি করলেই কি আমি অমর হতে পারব?
মৈত্রেয়ী দেবীর প্রশ্ন শুনে যাজ্ঞবল্ক্য অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে উত্তর দিলেন, ‘মৈত্রেয়ী, তাও কি কখন হয় ? বিত্তের দ্বারা কখনও অমৃতত্ব লাভ করা যায় না, বরং ধন-সম্পদ অনেক সময় অমৃতত্ব সাধনায় বিঘ্ন উৎপাদন করে। তবে হ্যা, জগতে বিত্তশালী ব্যক্তিরা যেমন অভাব অনটন থেকে মুক্ত হয়ে সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করে, তুমিও তা পারবে ।
মৈত্রেয়ী দেবী স্বামীর উত্তর শ্রবণ করে নিতান্ত বিমর্ষ বদনে বললেন, “যেনাহং নামৃতা স্যাং কিমহং তেন কুর্যাম্”—অর্থাৎ যা দিয়ে আমি অমৃতত্ব লাভ করতে পারব না, তা দিয়ে আমি কী করব? এই অসার ধন সম্পদ দিয়ে আমার কী হবে? হে ভগবান! আপনি যে ধন লাভ করে এই বিষয়-সম্পত্তি পরিত্যাগ করেছেন, আপনি যে জ্ঞানে জ্ঞানী হয়েছেন, দয়া করে আমাকে সে সম্বন্ধে উপদেশ দিন, আমাকে অমৃতত্ব লাভের সন্ধান দিন।”
ধন সম্পদে মৈত্রেয়ীর নির্লোভ এবং অমৃতত্ব সাধনে উৎসাহ দেখে ব্রহ্মজ্ঞ ঋষি অত্যন্ত প্রীতিপূর্ণভাবে বলতে লাগলেন, ‘পতি যে পত্নীর প্রিয় হয়, তার কারণ হল—পতিকে ভালোবেসে পত্নীর আত্মা সুখী হয়। পুত্র কন্যাকে স্নেহ করে বাৎসল্য রসে পিতা-মাতা আত্মিক সুখ অনুভব করেন, এ জন্যই সন্তান সন্ততিও পিতা-মাতার স্নেহে নিজ নিজ আত্মিক সুখ অনুভব করে। তাই সন্তান সন্ততি পিতা-মাতার প্রতি অনুরক্ত থাকে। ধনের নিমিত্তই ধন লোকের প্রিয় হয় না, নিজ প্রয়োজন সিদ্ধির জন্যই ধন লোকের প্রিয় হয়ে থাকে। পতি বল, পুত্র বল, পত্নী বল আর বিত্ত বল, এমন কি স্বর্গ বা দেবতাদের কথাই বল সব কিছুই নিজ নিজ আত্মার প্রীতির জন্যই লোকের প্রিয় হয়ে থাকে। তাহলে মূল কথা হল আত্মাই মানুষের মুখ্য প্রীতির বস্তু। এছাড়া ধন, জন, বিত্ত, স্বর্গ-সব কিছুই গৌণ ।
ব্ৰহ্মর্ষি যাজ্ঞবল্ক্যের উপদেশসুধা আকণ্ঠ পান করে মৈত্রেয়ী দেবী তৃপ্ত হলেন। তিনি উপলব্ধি করলেন অমৃতের সাগর দূরে নয়; তা অতি নিকটে, একেবারে তার অন্তরের অন্তরে। তার আত্মাই পরম অমৃত। অমৃতের সন্ধান পেলেন মৈত্রেয়ী দেবী।
মৈত্রেয়ী দেবী আধ্যাত্মিক শিক্ষা সাধন করে অমৃতের সন্ধান পান। স্বামী, ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যকে গার্হস্থ্য আশ্রম ত্যাগ করে বানপ্রস্থ আশ্রমে যাবার অনুমতি দেন।
ওই বিদূষী নারী
‘‘অসতো মা সদ্গময়।
তমসো মা জ্যোতির্গময়।
মৃত্যোর্মাহমৃতং গময়।
আবীরাবীর্ম এধি।”
—হে পরমেশ্বর, তুমি আমাকে অসৎ থেকে সৎ পথে নিয়ে চল, অজ্ঞান-অন্ধকার থেকে আমাকে জ্ঞানের আলোকে নিয়ে চল; মৃত্যুর গ্রাস থেকে রক্ষা করে আমাকে অমৃতলোকে নিয়ে চল। হে স্বপ্রকাশ পরমেশ্বর, তুমি আমার নিকট কৃপা করে প্রকাশিত হও।
(বৃহদারণ্যক উপনিষদ ১।৩।২৮)
মৈত্রেয়ী দেবী উপরোক্ত অমৃতত্ত্ব উপলব্ধি মন্ত্র রচনা করে জগদ্বিখ্যাত হন। ব্রহ্মবাদিনী মৈত্রেয়ী দেবীর উক্ত বিখ্যাত প্রার্থনা মন্ত্র বর্তমানের নামী বিদ্যালয়গুলোরও শোভা বর্দ্ধন করে ।
বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র উক্ত বাণীকে পরিশ্রুত করে “মা ম্রিয়স্ব মা জহি শক্যতে চেৎ মৃত্যুমবপলোপয়।”— মরো না, মেরো না, যদি পার মৃত্যুকে অবলুপ্ত কর।— মন্ত্রে আমাদের সচ্চিদানন্দ সত্তাকে উপলব্ধি করালেন, মহাচেতনসমুত্থানের আবেদনে ঈশ্বর প্রাপ্তির অর্থাৎ আপ্তির=ঈশ্বরত্ব=ঠাকুরত্ব অর্জনের গন্তব্যে পৌঁছে দিলেন—*স্বতঃ-অনুজ্ঞা-প্রোক্ত—
আমি অক্রোধী
আমি অমানী
আমি নিরলস
কাম-লোভজিৎ-বশী
আমি ইষ্টপ্ৰাণ
সেবাপটু
অস্তি-বৃদ্ধি-যাজন-জৈত্র
পরমানন্দ
উদ্দীপ্ত শক্তি-সংবৃদ্ধ
তোমারই সন্তান
প্রেমপুষ্ট, চির-চেতন,
অজর, অমর
আমায় গ্রহণ কর,
প্ৰণাম লও।—অমৃত আহরণী মন্ত্রে।
* স্বতঃ-অনুজ্ঞা (auto-suggestion) —নিজেই নিজেকে আদেশ ক’রে অন্তঃস্থ চৈতন্যের জাগরণ ঘটানোর অনুশীলন। যা’ প্রতিবার ধ্যানান্তে করতে হয়। যা’ শারীরিক-মানসিক-আত্মিক যোগসূত্র রচনা করার এক সহজ মাধ্যম। এর মাধ্যমে মানুষ প্রবৃত্তি-পরায়ণতার কুপ্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করে সত্তার সান্নিধ্য লাভ করতে পারে। বর্তমান সভ্যতার এক জ্বলন্ত সমস্যা হিংসা। হিংসা প্রতিরোধ করতে স্বতঃ-অনুজ্ঞার অনুশাসন অনুশীলনে মানুষকে অভ্যস্ত করে তোলা একান্ত প্রয়োজন।
অতএব ডালপালায় না জড়িয়ে ‘কেবলম্ জ্ঞানমূর্ত্তিম্’-এর মূলে অবিচ্ছিন্ন অনুরক্তি অটুট রাখতে হবে। নচেৎ অন্তিমকালে পরমপিতার জ্যোতির্বলয়ের সন্ধান পাওয়া যাবে না। যাওয়া হবে না দয়ালধামে। নিত্য প্রার্থনা মন্ত্রে উচ্চারিত—
মৃত্যু— যিনি জীবের
জীবন ও বৃদ্ধির অপলাপ করিয়া
স্থায়িত্বকে নিঃশেষ করিয়া দেন—
আমি তাঁহাকেও নমস্কার করিতেছি,—
যেন তাঁহা হইতেও অমৃত বহন করিতে পারি!—আজ্ঞাচক্রে স্থায়ী আসন লাভ করতে হলে এখন থেকেই অনুশীলন তৎপর হতে হবে সব্বাইকে।
** ভাষা দিবসের শ্রদ্ধার্ঘ্য ** ।। সত্তাপোষণী ভাষায় সাহিত্য নির্মাণে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্য অবদান ।।
সত্তাপোষণী ভাষায় সাহিত্য নির্মাণে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র যে বিশিষ্ট অবদান রেখে গেছেন মানব সভ্যতাকে সবদিক দিয়ে সমৃদ্ধ করতে, তার কিছু দৃষ্টান্ত উপহার স্বরূপ তুলে ধরছি। ‘‘ভাব, ভাষা, যুক্তি, ছন্দ ও অনুরণন যতই সৌষ্ঠবমণ্ডিত হ’য়ে আদর্শ-উল্লোল হ’য়ে ওঠে— জীবনীয় সাত্তিক সম্বর্দ্ধনায়,— রচনা জীবন্ত হ’য়ে ওঠে সেখানে তেমনি, এই হলো রচনার পঞ্চপ্রাণ।’’ ২৩৯ (শিক্ষা-বিধায়না) ‘‘সমস্ত রসের সমবায়ে সন্দীপনার বোধ-পরিবেষণী সাত্বত সম্বেদনাই হ’চ্ছে সাহিত্যের প্রাণনদীপ্তি।’’ ২৪০ (শিক্ষা-বিধায়না) ‘‘পরিস্থিতির ভাল-মন্দ পরিচলনকে আলোড়ন-বিলোড়ন ক’রে সার্থক সঙ্গতিশীল সাত্বত পন্থায় সাত্তিক মর্যাদায় সুদীপ্ত ক’রে তোলাই হ’চ্ছে সাহিত্যের সমীচীন তাৎপর্য, আর তাই-ই হচ্ছে জনগণের জীবনীয় সম্বর্দ্ধনা।’’ ২৪১ (শিক্ষা-বিধায়না)
পথ ভেবেই তুই শ্রান্তিভরে ক্ষান্ত হ’য়ে যাসনে দমে, মানুষ কি রে চলতে পারে না ক’রে ভর স্ব-উদ্যমে ? ২৬ । (বৃত্তি নিয়ন্ত্রণ)
শঙ্খ ফুঁকে অমর হাঁকে উচ্চরোলে পুরুষ-বুক, তাথৈ থিয়ায় নাচাও নারী বর্মে ঢেকে মৃত্যুমুখ। ৮৭। (পুরুষ ও নারী)
সব দিতে তুই করলি গুরু পেতে পরিত্রাণ, দিলি কিন্তু নব ঘণ্টা নিতেই লেলিহান! ৪৩। (কপট টান)
বাসতে ভাল এসে রে তুই বাসলি ভাল কা’রে, প্রতিদানেও তাই পাবি তুই মজলি নিয়ে যা’রে। ৭৫। (কপট টান)
এমন অসংখ্য ঋদ্ধ-বাণীতে সমৃদ্ধ রচনা পাঠ করে তাঁকে কবি, ছান্দসিক, সাহিত্যিক, সাহিত্যদ্রষ্টা ঋষি বললেও বোধহয় অত্যুক্তি হবে না।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সব ঝড়ঝঞ্ঝা থেকে মানব সভ্যতাকে আগলে রাখতে ওজস্বী ভাষায় ‘দেবভিক্ষা’ শিরোনামে যে কাতর আবেদন রেখেছিলেন, সে আবেদনের, সে ভাষার, মর্যাদা যদি পেত, বিশেষ করে সাহিত্যিকগণ যদি তাদের গুটি কেটে বেরিয়ে এসে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করতেন, তাহলে অবক্ষয়ের রাশ কিছুটা হলেও টেনে ধরা যেত।
।। দেবভিক্ষা ।। ‘‘ওগো ভিক্ষা দাও!– ঝাঁঝাল ঝঞ্ঝার পিশাচী জৃম্ভন শুরু হয়েছে, বাতুল ঘুর্ণি বেভুল স্বার্থে কলঙ্ক কুটিল ব্যবচ্ছেদ সৃষ্টি করতে আরম্ভ করে দিয়েছে, প্রেত-কবন্ধ-কলুষ কৃষ্টিকে বেতাল আক্রমণে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে, অবদলিত কৃষ্টি অজচ্ছল অশ্রুপাতে ভিক্ষুকের মতো তাঁরই সন্তানের দ্বারে নিরর্থক রোদনে রুদ্যমান, অলক্ষ্মী-অবশ প্রবৃত্তি-শাসিত বেদস্মৃতি– ঐ দেখ–মর্মান্তিকভাবে নিষ্পেষিত, ত্রস্ত দোধুক্ষিত দেবতা আজ নতজানু–তোমাদেরই দ্বারে তোমাদেরই প্রাণের জন্য তোমাদেরই প্রাণভিক্ষায় তোমাদেরই সত্তার সম্বর্দ্ধনার জন্য ব্যাকুল হয়ে ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়াচ্ছেন ; কে আছ এমন দরদী আর্য্য-আত্মজ সন্তান!– তাঁকে মানুষ ভিক্ষা দেবে, তাঁকে অর্থ ভিক্ষা দেবে— সব হৃদয়ের সবটুকু উৎসর্গ করে তোমাদেরই জন্য সেই দেবোজ্জল প্রচেষ্টাকে সার্থক করে তুলতে ? যদি থাক কেউ ওগো ধী-ধুরন্ধর উৎসর্গপ্রাণ নিরাশী নির্ম্মম! এস,—উৎসর্গ কর—আত্মাহুতি দাও— জীবন নিঙড়ানো যা-কিছু সঙ্গতি তাঁকে দিয়ে সার্থক হয়ে ওঠ, নিজেকে বাঁচাও, মানুষকে বাঁচাও, কৃষ্টিকে বাঁচাও ; আর, বাঁচাও দুর্দ্দশাদলিত মহা-ঐশ্বর্য্যশালিনী আর্য্যস্তন্যদায়িনী, পরম-পবিত্রা ভিখারিণী মাতা ভারতবর্ষকে, ধন্য হও, নন্দিত হও, ঈশ্বরের অজচ্ছল আশীর্ব্বাদকে মাথা পেতে লও, শান্ত হও, শান্তি দাও, অস্তি ও অভ্যুত্থানকে অনন্তের পথে অবাধ করে রাখ ;
স্বস্তি! স্বস্তি! স্বস্তি!
এবার আমি সাহিত্যের উৎস বিষয়ে বলা শ্রীশ্রীঠাকুরের কিছু রচনার উপর আলোকপাত করার চেষ্টা করব।--- সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী পরমপিতা এক থেকে বহুতে পরিণত হবার প্রাক্কালে যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনাহত-নাদ উৎপন্ন হয়েছিল, সেই আদিধ্বনিস্পন্দিত শব্দ বা ধ্বনি বা পরাবাক্ ওঁ সব সৃষ্টির আদি উৎস। "ব্যাপ্ত প্রাক, প্রথম বাক্।" পুণ্যপুঁথিতে বর্ণিত শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাষায় ‘‘এক বিরাট ধ্বনি সোঽহং পুরুষ ভেদ করে সৃষ্টি করতে চলে এল---সেই ওম্।’’
আবার অনুশ্রুতি গ্রন্থে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন— ‘‘স্পন্দন়টার সংবেদনা যেমনতর যেথায় হয়, শব্দটাও তো মূর্ত্তি নিয়ে বিশেষ হয়ে তাতেই রয়।’’ এই নিয়মনা বা বিধির মধ্য দিয়েই সৃষ্টি হয়েছে সব ভাষার।
শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাষায়— ‘‘ভাষা তার /পরিস্থিতি ও পরিবেশ অনুগ/ব্যক্তির ভাব-সন্দীপনী ব্যক্ত বিবর্তন/ছাড়া আর কিছুই নয়কো।’’ (শিক্ষা-বিধায়না, ১১৮)
এই বিবর্তন পরিলক্ষিত হয় রামায়ণ রচনার প্রেক্ষাপটে। যেমন, রাম-নামের নাদ-সাধন করে রত্নাকর দস্যু মেধানাড়ীকে জাগ্রত করে হয়েছিলেন বাল্মীকি। একদা তমসা নদী থেকে স্নান করে ফিরছিলেন। এক তরুশাখে ক্রৌঞ্চ-জুটি পরস্পর খেলছিল। এক ব্যাধ পুরুষ পাখিটিকে তীর মেরে হত্যা করলে স্ত্রী পাখিটি করুণ বিলাপ করতে থাকে। বাল্মীকি বিচলিত হয়ে ‘কোনদিন প্রতিষ্ঠা পাবে না’ বলে ব্যাধকে অভিসম্পাত করেন। সেই অভিশাপ বাণী স্বতঃস্ফূর্ত শ্লোকবদ্ধ হয়ে নির্গত হয়েছিল :— সৃষ্টি করেছিলেন দেব-ভাষার আদি শ্লোক— ‘‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতী সমাঃ/যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকম্ অবধী কামমোহিতম্।’’ অতএব, বলা চলে, নাদরূপী বা শব্দরূপী ব্রহ্ম থেকেই ভাষার সৃষ্টি। সেই ভাষার সমন্বয়ের রচনা যখন সত্তাপোষণী রূপে জগতের হিতসাধনে ব্রতী হয়, তখনই সৃষ্টি হয় সাহিত্যের। শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর শ্রীমুখ নিঃসৃত ভাষায় চলার সাথী গ্রন্থে বলছেন—‘‘যার আলোচনায় মানুষ হিতে অধিষ্ঠিত বা উন্নীত হতে পারে, তাই যে সাহিত্য।’’ শিক্ষা-বিধায়না গ্রন্থের ২৪৫ সংখ্যক বাণীতে বলছেন, ‘‘ঈশ্বরই সুসঙ্গত, সর্ববিভান্বিত/ সুসমাবিষ্ট, প্রাজ্ঞ জীবন-সাহিত্য,/ তাই তিনি রসো বৈ সঃ।’’ তাইতো, যুগের প্রয়োজনে, ঈশ্বর, অবতার-বরিষ্ঠরূপে নরবপু ধারণ করেন। হিতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে সৃষ্ট হয় নব-নব সাহিত্য। বেদ-বেদান্ত, রামায়ণ, গীতা, ত্রিপিটক, বাইবেল, কোর-আন্, চৈতন্য-ভাগবত, চৈতন্য চরিতামৃত, রামকৃষ্ণ কথামৃত ইত্যাদি নামে সংকলিত এবং লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাহিত্যিকদের যে-সব জীবন-সাহিত্যের সাথে আমরা পরিচিত হয়েছি, সেই সব সাহিত্যের প্রকৃত মূল্যায়ন করে অনেক ভুল শুধরে দিয়েছেন, জীবনীয় উদ্ধৃতিগুলো নানাভাবে জনমানসে তুলে ধরে জীবন-সাহিত্যের রূপ দান করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর। যার মাধ্যমে অবতারবরিষ্ঠ পরম্পরাকে, ঋষিবাদকে, জীবনবাদী সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। তাঁর শ্রীহস্ত লিখিত রচনা, স্মৃতি-বাণী, শ্রুতি বাণীসমূহ এক অভিনব বর্ণ-বিন্যাসে, শব্দ-বিন্যাসে, ব্যাকরণ-বিন্যাসে, পংক্তি-বিন্যাসে, ভাব-বিন্যাসে সমৃদ্ধ হয়ে সৃষ্টি করেছে এক সুসমাবিষ্ট, প্রাজ্ঞ জীবন-সাহিত্যের সম্ভার। তাঁর বাণী সাহিত্যে আমরা অনেক নবীন মৌলিক ভাষার সন্ধান পেয়েছি এবং আরও পেতে পারতাম যদি বর্তমানের ন্যায় দর্শ-শ্রুতি বৈদ্যুতিন মাধ্যমের সাহায্য পাওয়া যেত। যার অভাবে মহাসমাধির ভাববাণীর সময় প্রোক্ত অনেক বিদেশী ভাষাকে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তথাপি তাঁর সৃষ্ট বাণীসাহিত্যে সংস্কৃত, বাংলা, ইংরেজী ভাষার যে অনবদ্য প্রয়োগের সাথে আমরা পরিচিত হতে পেরেছি, তা’ সমৃদ্ধ করেছে মানবজীবনের একান্ত প্রয়োজনীয় প্রতিটি আঙ্গিককে। উপাসনা, সাধনা, লোক-ব্যবহার, দর্শন, কৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, বিজ্ঞান, পরিবেশ-পরিচর্যা, বাণিজ্য, সমাজ, সমাজ-সংস্কার, দশবিধ-সংস্কার, বিবাহ, প্রজনন, রাষ্ট্র, পরমরাষ্ট্রিক সমবায়, ইত্যাদি সব কিছুই স্থান পেয়েছে তাঁর রচনায়। ওইসব বিধিবদ্ধ অনুশাসনগুলো জীবনকে জীবনীয়ভাবে উপভোগ করার রসদে পরিপূর্ণ। যা' আমাদের জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক সকল অভাবকে তাড়িয়ে দেবার ব্যবস্থা করে জীবনকে পূর্ণতার আস্বাদে ভরিয়ে দিতে এক নিশ্চিত নির্ভরশীল দিগদর্শন। সেই পূর্ণতার আস্বাদের স্বাদের নেশা ধরাতে,--- তাঁর সুললিত ভাষার বাণী-সাহিত্যের সাথে জগদ্বাসীকে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য শত বাধা-বিপত্তি, অভাব-অনটনকে অতিক্রম করে শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর ভক্তদের কাছ থেকে কাগজ ভিক্ষা করেছেন, টাকা ভিক্ষা করেছেন পত্র-পত্রিকা মাধ্যমে এবং পুস্তকাকারে তাঁর বাণীগুলোকে সুলভ মূল্যে পৌঁছে দেবার মানসে। শুধু তাই নয়, তিনি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের জন্যও জনে জনে বলেছেন। অনেক আত্মোৎসর্গকৃত ভক্ত ও প্রতিষ্ঠান পত্র-পত্রিকা, সাময়িকী, পুস্তক-পুস্তিকা তাঁর বলা কথাগুলো অবিকৃতভাবে প্রকাশ করে তাঁর চাহিদা পূরণ করেছেন এবং এখনো করে চলেছেন। তাঁদের উদ্দেশ্যে প্রণাম নিবেদন করেই বলতে হয়, তাঁর সব চাহিদা পূরণের লক্ষ্যমাত্রাকে এখনো ছুঁতে পারিনি আমরা। গড়ে তুলতে পারিনি জীবনবাদী সত্তাপিয়াসী পাঠকসমাজ। একথা ঠিক যে, সাধারণ মানুষেরা অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে, প্রকৃত জীবনবাদী সাহিত্যের আস্বাদ নিতে, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দেবভাষার দেবসাহিত্য চর্চায় একদিন না একদিন এগিয়ে আসবেই। সেই শুভাগমনকে ত্বরান্বিত করতে, তাঁর বাণী-সাহিত্যকে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক, বার্ষিক পত্র-পত্রিকা মাধ্যমে উপঢৌকন রূপে সাজিয়ে তো রাখতে হবে, না কি ? ক্ষুদ্র আত্মস্বার্থ প্রতিষ্ঠাকে উপেক্ষা করে যদি দীক্ষাকালীন প্রতিজ্ঞা পূরণের শপথ স্মরণ করে ইষ্টস্বার্থ প্রতিষ্ঠায় আমাদের ইচ্ছাটাকে বিনিয়োগ করতে পারি, তবে---হবে, হবে, হবেই জয়। হাসি ফুটবে তাঁর মুখে। অন্তর্যামী পরমপিতার পরম করুণার প্রস্রবনের অমৃত ধারায় স্নাত হয়ে ভাল থাকবেন।
‘বিধি-বিন্যাস’ গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত পরমপিতার স্তবগাঁথা দিয়ে ইতি টানলাম। “হে পূণ্য! পরাক্রান্ত! পরাৎপর! প্রচণ্ড মার্ত্তণ্ডবরেণ্য! এক! অদ্বিতীয়! তোমারই বিনিষ্কাষিত কিরণবীচি তাপন প্রতিক্রিয়ায় অযুত জ্যোতিষ্কের সৃষ্টি করেছে; বৈধী মিতিচলনে চলেছে তা’রা তোমারই প্রাণদ গতিপথে বোধি-বিজৃম্ভী বিসৃষ্ট পরাক্রমে সৃজন-সম্বেগে– দৃপ্ত জীবনের অদম্য আবেগে,– নভোমণ্ডলে সজ্জিত স্থালীর স্থল-সর্জ্জনে দ্যৌঃ ও পৃথিবীর জীবন-দীপালি সজ্জিত করে নাদ নিক্কণে — অভ্যুদয়ী, আরুদ্র পরিক্রমায়;– তোমাতেই আমার অযুত নমস্কার!” —বন্দে পুরুষোত্তমম্ ! জয়গুরু ! প্রণাম !
EDUCATION : By the WORLD teacher of mankind Shree Shree Thakur Anukulchandra EDUCATION IN TRUE SENSE “Education in its true sense creates adjustment of intra-cellular substance through proper exercise; intelligence and character evolve and with due marital combination, progeny improves.” EDUCATION IS TO KNOW EXISTENCE
“Education is to know existence in consonant contrast to environment by doing and discerning.” READ man AND KNOW
“Read man and know and drive your knowledge to his welfare.”
METHOD OF IMPARTING EDUCATION “Let the method and device of your process of imparting education be according to the dealings and characteristics of your students and let the way of laying it down before them be tactful, sweet and touching by which the characteristic interest of your pupil becomes glaring and they become interested and adjusted in your mission of training with jolly propitious propagation; thus rouse their interest towards your mode of delivery and attributes of teaching that inspire their awe and regard for your personality; and infuse your affectionate dealings into their mind.” NURTURE THY PUPIL
“Do nurture thy pupil with delighting educative talks, and want something form him from time to time without any selfish loll by which he can feel exalted, and often express to him thy bidding wishes to perform something at thy or others necessity with enlightening encouragement and with every pious aptitude which helps his educative active urge; this elating active attitude will make him inquisitive with active ardour, and he will try to be active with elevating valorous admiration; thus he will gradually gain experience with intelligent go of life.”
“Systematic organisation of habits and instinct, for the purpose of fulfilling, the becoming of life, by a graduated active manipulation of behaviour, may be called education.” (জীবন বিকাশের উদ্দেশ্যে নিজ আচরণসমূহকে সহজাত সংস্কার ও স্বীয় অভ্যাসগুলোর সাথে সুব্যবস্থিত ও সুগঠিত করে তোলার নাম শিক্ষা ।)
“Adherence to and admiration for the teacher is the key in education process. Education means conduct, behaviour and character. It neither lies in books nor is created in school campus. It sprouts through affectionate service to Acharya possessing integrity.” (Alo. Pra. Vol. 8/18.5.46) “Mere literated learning is not education ; trained habits which induce intelligence with every consistency and make the system habituated accordingly is education.” (The Message, Vol. VIII/62) “If there is an inventive and research attitude in learning process, then the learning does not become taxing. Similarly, if you try to teach others, then your own understanding become clearer. Wherever there is a possibility to forget, then its needs to be repeated, and recapitulated.” (The Message, Vol. VIII/57) ‘VEDA’ AND ‘BODHA’ To know is to know a thing in contrast with others with its constituents, construction and action and reaction— not only part but as a whole— and to apply it accordingly to many things by which it is conditioned, acted on and reacts according to its elementary constitution; thus, knowledge grows both analytically and synthetically with its attribute and action wholly and partly; this kind of knowledge is known as ‘Veda’ thus, ‘Veda’ means knowledge —to feel and to know With all thoroughness; ‘Veda’ and ‘Bodha’ mean To know and to feel.” EDUCATION WITHOUT CHARACTER
“Where education does not collaborate with character and conduct, it is merely an induction of knowledge without an all-round association with facts that make the personality of our inner being grow, effulging into peaceful fellow-feeling with sympathetic service to one’s existential uphill momentum.” BE POSITIVE
“See an affair positively think it with all positive essence, discern and adjust it with its connoting meaning and keep the negative adjusted with its negative spirit; serve analytically and synthetically and raise from it the positive essence of existential go by which it is maintained and becomes proptitious to you and others too; so, see with every positiveness, think with every positiveness, speak with every positiveness, do with every positive uphill go and keep the negative as a negation of positiveness, thus be wise positively.” HABIT IS TO 'HAVE IT'
“Go on with your habits until you ‘have it’— the existential go.” EGO OF KNOWLEDGE
“Ego of knowledge without practical experience is a debilitated downfall of learning.” LEARN FROM VARIOUS ASPECTS “Learn through enjoyment learn through exercise with every interest and keen observation; learn through fear observing all the affairs with interest which make your existence shaking; learn from devout urge on which you can stand all through in an unshaken condition, laying out all intelligent tactics and desisting from all evils; learn from foe how to combat, how to deal with him intelligently and how to make him appeased without any suffering; learn from beauty which makes your heart flourish to bloom with all attitude and action how it makes you so and all thoughts that follow accordingly occur thus, make yourself all-round in experience which comes out through your keen observation and active energetic urge; remember however, while doing any work, you have to perform it without forgetting anything with all beauty, in good time and temper.”
*** VALENTINE SPECIAL **** ।। ‘প্রেম’ ব্যাপারটা কি ।।
চারিদিকে এত হিংসার ছড়াছড়ি, তারমধ্যে প্রেমের বার্তা! উঃহ্! ভাবলেই শিহরণ জাগে! সেই কবে স্বামী বিবেকানন্দ জীবে প্রেম করার কথা বলেছিলেন, তার-ই কি প্রতিফলন এই প্রেম দিবস! বাস্তব কিন্তু অন্য সুরে বাজছে। টিভিতে সংবাদ দেখতে গেলেই বেশিরভাগই হিংসার সংবাদ দেখতে পাওয়া যায়। রাজনৈতিক নেতারা, যারা নিজেদের দেশসেবক ভাবেন, তারাও সেবার নামে হিংসার চাষ করে চলেছেন। তাহলে এত হিংসা কেন? হিংসার কারণ সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন, “অহঙ্কার আসক্তি এনে দেয় ; আসক্তি এনে দেয় স্বার্থবুদ্ধি ; স্বার্থবুদ্ধি আনে কাম; কাম হতেই ক্রোধের উৎপত্তি; আর, ক্রোধ থেকেই আসে হিংসা।” হিংসার বিপরীতে প্রেমের অধিষ্ঠান। অতএব হিংসা ভুলে যা’রা প্রেম নিয়ে চর্চা করছেন, প্রেম দিবস পালন করছেন, তাদের শ্রদ্ধা জানাতেই হয়। সেই প্রেমের উৎস সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলছেন, “ভক্তি এনে দেয় জ্ঞান; জ্ঞানেই সৰ্ব্বভূতে আত্মবােধ হয় ; সর্বভূতে আত্মবােধ হলেই আসে অহিংসা; আর, অহিংসা হতেই প্রেম। তুমি যতটুকু যে-কোন একটির অধিকারী হবে, ততটুকু সমস্তগুলির অধিকারী হবে।” কিন্তু বাস্তবে, ভারতীয় সংস্কৃতির শব্দ-ভাণ্ডারের ‘প্রেম’ শব্দটিকে বোধহয় সবচাইতে বেশি অপমানিত হতে হচ্ছে অপব্যবহারের জন্য। বহুল ব্যবহৃত ওই শব্দটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারী-পুরুষের যৌন আকর্ষণের পরিচয়-জ্ঞাপক। শিক্ষাঙ্গনে, টিভি-সিনেমা কালচারে, সাহিত্যে ‘প্রেম’ শব্দটি ‘love’-এর পরিবর্তে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ‘lust’ পরিচয় বহন করে চলেছে। এটা সভ্যতার পক্ষে গৌরবের নয়। প্রীতি বিতরণ, প্রীতি উৎপাদন করে যা’ তাই প্রেম। জীবনকে প্রীত করে যে সম্পর্ক, তাকে বলা চলে প্রেমের সম্পর্ক। চৈতন্য মহাপ্রভু প্রেমকে পুরুষার্থের পঞ্চমবর্গ রূপে অভিহিত করেছেন। আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা তারে বলি কাম। কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা ধরে প্রেম নাম।। বিবেকানন্দও জীবের প্রতি প্রীতিজনক আচরণকে প্রেম আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’ আজ সর্বজনবিদিত। লেখাপড়া জানা মানুষ যখন বলে, ‘প্রেম করে বিয়ে করে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল।’—তখন কি প্রেম বিচ্ছেদের প্রতীক স্বরূপ চিহ্নিত হয়ে গেল না! প্রেম করে বিয়ে করার পর স্বামী-স্ত্রী ডিভোর্স নিয়ে আলাদা হবে। সন্তান বঞ্চিত হবে মা-বাবার প্রেম থেকে। সন্তানের প্রেমে বঞ্চিত হয়ে বৃদ্ধাশ্রমে মা-বাবা অশ্রুপাত করবে। আর আমরা প্রচার মাধ্যমে সেক্সি সেলিব্রিটিদের দিয়ে ‘বিশ্ব প্রেমদিবস’ উদযাপন করব সাড়ম্বরে, ওদিকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ নিপাত যাক’ শ্লোগানে পার্টি-রাজনীতি হবে সমৃদ্ধ! বাঃ! বাঃ! ‘সত্য সেলুকস, কি বিচিত্র এই দেশ!’ যাকগে, আমাদের আদর্শ পুরুষ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, শুধুমাত্র মানুষের নয়, একটা পিঁপড়ারও ব্যথা নিরাকরণ করে প্রেমের প্রদর্শন করতে বলেছেন। আর তা’ যদি না করি, তাহলে আমার চাইতে হীন আর কেউ নেই! এমন প্রেমের জয়গান গাইতে হবে আমাদের। সবাইকে জয়গুরু ও প্রণাম। বন্দে পুরুষোত্তমম্!
।। প্রেম কারে কয়? ।। তথাকথিত শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের মুখে শোনা, প্রপোজ, ব্রেকআপ, ডেটিং, প্রাক্তন-প্রাক্তনী প্রভৃতি উপনামের শাখা-প্রশাখার সাথে সম্পৃক্ত “প্রেম”কে খুঁজতে গিয়ে বেশ ধন্ধে পড়ে গেছি! আসল প্রেম কারে কয়? পাড়ায়, কলেজে, অফিসে, টিভিতে, সিনেমায়, ‘প্রেম’ শব্দটি বহুল উচ্চারিত এবং বহুচর্চিত । কিন্তু বাস্তবে আমরা প্রেমের বিপরীতে অবস্থান ‘হিংসা’ শব্দটি নিয়ে জেরবার । হিংসা দূর করে মানুষের মধ্যে প্রেম প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে সব সুস্থ চিন্তাশীল প্রতিষ্ঠান । তবুও হিংসা ! গৃহে, সমাজে, রাষ্ট্রে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রে হিংসার বাড়বাড়ন্ত ! ব্যাপারটা কি ? প্রেমের সাপোর্টার বেশি থাকা সত্বেও কেন এত হিংসা ? এর উত্তর যা পেয়েছি তাই আপনাদের উদ্দেশ্য নিবেদন করলাম । স্বামী বিবেকানন্দের বিখ্যাত বাণী “জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।” এর মানে বুঝতে কোন অভিধানের সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তথাপি বাংলাদেশের বর্তমান ইসলামপ্রেমী শাসকগোষ্ঠীকে এই প্রেমের সিলেবাস কিছুতেই বোঝান যাচ্ছে না।—এতখানি বোধ-বিপর্যয়ে আক্রান্ত ওরা!তবে বোধদীপ্ত মানবের সোজাসাপ্টা বোধে ঈশ্বর সান্নিধ্য লাভ করতে হলে সকল জীবনের স্পন্দনকে আপন করে নিয়ে প্রেমের বাঁধনে বাঁধতে হবে। অবতার বরিষ্ঠ চৈতন্যদেব বললেনঃ আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা তারে বলে কাম । কৃষ্ণেন্দ্রিয়ে প্রীতি ইচ্ছা ধরে প্রেম নাম। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, “কামের মূলে অহংকার, আর প্রেমের মূলে ভক্তি ।” অহংকার<আসক্তি<স্বার্থবুদ্ধি<কাম<ক্রোধ<হিংসা । ভক্তি<জ্ঞান । জ্ঞানে সর্বভূতে আত্মবোধ হয় । <অহিংসা<প্রেম । ঠাকুরের দেওয়া ওই অভ্রান্ত ফরমূলা অনুযায়ী আমরা যদি আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছার মূল ‘অহংকারের’ সাধনা করতে শুরু করি, লাভ হবে হিংসা । আর যদি কোনওভাবে ভক্তির সাধনার সিঁড়িতে পা রাখতে পারি, লাভ হবে প্রেম । অবশ্য ভক্তিকে সাধনা করতে হলে সদগুরুতে নিরবচ্ছিন্ন সংযুক্ত থাকতে হবে, তাহলেই প্রেম করতে পারব । নচেৎ, “প্রেম (কামাসক্ত) করে বিয়ে করে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।” —ইত্যাদি ধরণের নির্বোধী বাক্যের অপপ্রয়োগ চলতেই থাকবে।
।। প্রসঙ্গ : দেবী সরস্বতী, বিদ্যা, পূজা ও আমরা ।। নিবেদনে—তপন দাস
অবক্ষয় আমাদের দরজায় যতই কড়া নাড়াক না কেন লর্ড মেকলে সাহেবের দাক্ষিণ্যের দৌলতে আমাদের সমাজে শিক্ষিত হবার প্রবণতার হার কিন্তু ক্রমশঃ বর্দ্ধমান। মুখে বুলি ফুটতে না ফুটতেই সন্তান-সন্ততিদের লেখাপড়া শেখাতে এতটুকু কার্পণ্য করি না আমরা। এ বিষয়ে বাবাদের চাইতে মায়েদের আগ্রহ একটু বেশীই। লেখাপড়া শেখাতে স্কুলে ভর্তি করে, একাধিক প্রাইভেট টিউটর রাখে, পাশাপাশি হোম-ওয়ার্ক না করতে পারলে ‘মাথা ফাটিয়ে ঘিলু বার করে দেব, মেরে ফেলব, কেটে ফেলব’ ইত্যাদি বিশেষণের শাসনবাক্যে যুগধর্মের শিক্ষায় সন্তানদের শিক্ষিত করতে মায়েরা যেভাবে পরিশ্রম করে চলেছেন তার তুলনা হয় না! লেখাপড়া মানেই বিদ্যার্জন করা। বিদ্যার্জন করতে স্কুল, টিচার, বই-খাতা-কলম ইত্যাদি আনুসঙ্গিকের পাশাপাশি বিদ্যাদেবীর আরাধনাটাও আবশ্যিক! তাই উত্তরায়ন-সংক্রান্তি পরবর্তী শুক্লা-পঞ্চমী বা শ্রীপঞ্চমী তিথিকে কেন্দ্র করে ঘরে-ঘরে, বিদ্যালয়ে-বিদ্যালয়ে, পাড়ার ক্লাবে, রাস্তাঘাটে সরস্বতী পুজোর সাড়া পড়ে যায়। এমনিতে একটু বেলা পর্যন্ত শুয়ে থাকা পড়ুয়ারাও সেদিন সকাল-সকাল উঠে নিম-হলুদ মেখে স্নান সেরে নেয়। (নিম-হলুদ মাখলে শরীরের রোগ-প্রতিরোধী শক্তি বৃদ্ধি পায়।) তারপর সেজেগুজে যে-যেখানে সুবিধা পায় আগেভাগে অঞ্জলি দেবার কাজটা সেরে নিতে বিদ্যাদাত্রী সরস্বতীর প্রতিকৃতির সামনে কঠিন বিষয়ের বইপত্রগুলো জমা দিয়ে অপেক্ষায় থাকে কতক্ষণে পুরুতঠাকুর অঞ্জলি দেবার জন্য ডাকবেন। অঞ্জলি দেওয়া শেষ করে সরস্বতী-ঠাকুরের কাছে পাশ করার আর্জিটা জানিয়ে, প্রসাদ খেয়ে পুজোর মুখ্যপর্বটা শেষ করে গৌণপর্বে প্রবেশ করে। কচিকাচারা পরিজনদের হাতধরা হয়ে, কিশোর-কিশোরীরা বন্ধু-বান্ধবদের সাথে বিদ্যালয়ে যায়, খাওয়া-দাওয়া হয়। খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুড়ি ওড়ানো, দল বেঁধে ঘুরে ঘুরে প্রতিমা দেখে বেড়ানো। বড় হয়ে ওঠার সোপানে পা-রাখা হেটেরো-সেক্সুয়াল কমপ্লেক্সের অবদানের টেস্টোটেরন হরমোন-প্রপীড়িত ওভারস্মার্ট ছাত্ররা, ফলিকল-স্টিমুল্যাটিং হরমোন-প্রপীড়িত ওভারস্মার্ট ছাত্রীরা পছন্দের জনকে প্রপোজ করার সুযোগ খোঁজে, কেউ আবার একটু ঘনিষ্ট সান্নিধ্য পেতে চায় ভ্যালেনটাইন-উইক কালচারে সমৃদ্ধ হতে। পাড়ায় রাতে হবে মাংস-ভাতের পিকনিক। শুধু পাড়াতেই নয় সরকার পরিপোষিত অনেক প্রাথমিক বিদ্যোলয়েও (যেখানে হিন্দু শাস্ত্রমতে বিদ্যালাভের পরিপন্থী, অভক্ষ্য ডিম সহযোগে ছাত্রদের মিড-ডে মিল খাওয়ান হয়।) পুজোর দিনটির পবিত্রতা বজায় রেখে পরেরদিন মাংস-ভাতের পিকনিক করা হয়েছে। আসছে বছর আবার হবে!—কি হবে ? ‘‘ওঁ ভদ্রকাল্যৈ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈ নমো নমঃ। বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ-বিদ্যাস্থান্যেভ্যঃ এব চ।। ……’’ পুরোহিতের বলা ইত্যাদি মন্ত্র অনুসরণ করে পুষ্পাঞ্জলি দিতে হবে। ‘‘জয় জয় দেবী চরাচর সারে কুচযুগ শোভিত মুক্তাহারে। বীণা রঞ্জিত পুস্তক হস্তে ভগবতী ভারতি দেবী নমোহস্তুতে।। (কোন পণ্ডিত উক্ত মন্ত্র রচনা করেছিলেন আমি জানি না । তবে এটুকু বুঝি, যে স্তনযুগল মাতৃত্বকে সমৃদ্ধ করার জন্য সৃষ্ট, বৃত্তিতন্ত্রীদের সুড়সুড়ি দিতে তাকে মুক্তার হারের আভরণে সজ্জিত না করলেই ভাল করতেন। কারণ বিদ্যালাভ মস্তিকের মেধানাড়ীতে সুপ্ত মানবিক-সাত্ত্বিক গুণের অনুশীলনে সম্পাদিত হয়, বক্ষ-সৌন্দর্যের সজ্জিত বিজ্ঞাপনে নয়।) ওঁ সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে। বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্বি বিদ্যাং দেহী নমোহস্তুতে।।’’— পুরোহিতের বলা ইত্যাদি মন্ত্র অনুসরণ করে প্রণাম জানাতে হবে। …….তারপর সেই,—খাওয়া-দাওয়া, হৈ-হুল্লোর— ছোটদের বড় হবার রিহার্সাল, বড়দের নস্টালজিয়ার স্মৃতিচারণ ……. আসছে বছর আবার হবে! ওইসব উচ্চারিত মন্ত্র অনুযায়ী দেবী সরস্বতীই বিদ্যাদাত্রী, তাকে সাধনা করতে পারলেই বিদ্যার সিলেবাস বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ জ্ঞাত হওয়া যাবে। খুব ভালো কথা। সাধনা দিয়েই তো সিদ্ধি পেতে হবে।
মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী আমরা যা বলি বা সংকল্প করি বাস্তবে তা যদি না করি স্নায়ুমন্ডলীতে জটিলতার সৃষ্টি হয়, আধ্যাত্মিক জগতে যাকে অনাগত প্রারব্ধ কর্মফল বলে। অথচ আমাদের শিক্ষকেরা এই পূজার দিনটিতে অঞ্জলিমন্ত্র, প্রণামমন্ত্র আওড়ানো ব্যতীত বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ শিক্ষা বিষয়ে ছাত্রদের উৎসাহ না দিয়ে প্রচলিত সিলেবাসের বিষয়ভিত্তিক খাতাবই কেনা, নোট কেনা, কোচিং-করানোর দিকে উৎসাহ দেয়। বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ জিনিসটা যে কি বেশিরভাগ পড়ুয়ারা জানেই না, অথচ শিক্ষার আবশ্যিক বিষয় জ্ঞানে বাধ্যতামূলকভাবে বছর-বছর আবৃত্তি করে চলে, সরস্বতী পূজার দিনটিতে। এর নাম দ্বন্দ্বীবৃত্তি, অর্থাৎ মুখে যা বলছি, কাজে তা করছি না। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতে যা মহাপাপের কারণ।
সংস্কৃত বিদ্ִ ধাতু থেকে বেদ এবং বিদ্যা শব্দের উৎপত্তি। যার অর্থ জ্ঞান, বিচরণা, অস্তিত্ব, প্রাপ্তি। বিদ্যা লাভ যার হয়, অস্তিত্ব বজায় রাখার জ্ঞান তার হয়। তার বিচারশক্তি হয়, জীবনচলনায় ভালটাকে বেছে নিয়ে সে এগিয়ে চলে মূল প্রাপ্তি বা গন্তব্যের দিকে। যার চরম ঈশ্বরপ্রাপ্তি। ভাষাবিদ জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস মহোদয় কৃত অভিধানানুসারে, ‘‘যদ্দারা ব্রহ্ম হতে ব্রহ্মান্ড পর্য্যন্ত যাবতীয় পদার্থের সত্যবিজ্ঞান লাভ হইয়া যথাযোগ্য উপকার প্রাপ্ত হওয়া যায় তাহাই বিদ্যা ; যদ্দারা অক্ষর পুরুষকে জানা যায়।’’ ওই বিদ্যায় বিদ্বান হয়ে ছাত্রদের জানাবার কাজটি যিনি করেন তিনি শিক্ষক বা আচার্য্য। বেদ বা জ্ঞান-এর দুটো দিক, আধ্যাত্মিক ও জাগতিক। যা জানলে মানুষের জীবনের পূর্ণতা লাভ হয়, বিদ্যা লাভ হয়। বেদের বিদ্যা দু প্রকার পরা ও অপরা। শিক্ষা (phonetics), কল্প, ব্যাকরণ, ছন্দ, জ্যোতির্বিদ্যা (astronomy) ও নিরুক্ত (শব্দতত্ত্ব) ইত্যাদি নামের বেদের ৬টি শাখার নাম বেদাঙ্গ। সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ্ নামে বেদকে চারভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। যার অন্ত ভাগের নাম বেদান্ত বা উপনিষদ। ‘আত্মানং বিদ্ধি’ (Know Thyself,— who am ‘I’ ?) অর্থাৎ নিজেকে জানার চেষ্টার পাঠক্রমকে বলা হয়েছে পরাবিদ্যা। পরাবিদ্যার পাঠক্রমে আমাদের শিক্ষক আর্য-ঋষিগণ বলেছেন, ‘‘যস্তু সর্বাণি ভূতান্যাত্মন্যেবানুপশ্যতি।/সর্বভূতেষু চাত্মানং ততো ন বিজুগুপ্সতে।।’’ (ঈশোপনিষদ) অর্থাৎ, যিনি নিজের আত্মাকেই সর্বাত্মারূপে উপলব্ধি করেন, তিনি কাহাকেও ঘৃণা করেন না। সর্বভূতে নিজেকে, নিজের মধ্যে সর্বভূতকে উপলব্ধি করেন। কেননাক, আর্য্য হিন্দু শাস্ত্রমতে আমরা মানুষেরা ঐহিক জগতে দ্বৈত ভাবে অসম্পৃক্ত হয়েও সেই এক পরমাত্মার সাথে সম্পৃক্ত। আবার তৈত্তরীয় উপনিষদের বিদ্যা দানের শান্তি পাঠে রয়েছে, ‘‘ওঁ সহ নাববতু। সহ নৌ ভুনক্তু। সহ বীর্য করবাবহৈ। তেজস্বি নাবধীতমস্তু মা বিদ্বিষাবহৈ। ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।।’’ যার মর্মার্থ হলো, আমরা (আচার্য্য ও বিদ্যার্থী উভয়ে) সহমত হয়ে চলব, প্রকৃতির উপাদান সকলে স-মান (Equitable) ভাবে ভাগ করে জীবন ধারণ করব। কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করব না। আর অপরাবিদ্যার বিষয় ছিল জাগতিক শিক্ষা, যা ৬৪ কলা বিদ্যার মধ্যে নিহিত ছিল। (অন্তরাসীজন ৬৪ কলাবিদ্যার সিলেবাস জানতে আগ্রহী হলে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস মহোদয়ের অভিধানে ‘কলা’ সবিশেষ পাঠ করে দেখতে পারেন। তা হলেই বুঝতে পারবেন বিদ্যা কাকে বলে।) পরাবিদ্যার শিক্ষকদের বলা হতো আচার্য্য আর অপরাবিদ্যার শিক্ষকদের উপাচার্য্য (তৈত্তিরীয় উপনিষদ)। বর্তমানের শিক্ষা ব্যবস্থায় সরস্বতী আরাধনা মন্ত্রক্তো বেদ-বেদান্ত-বেদান্তের সাথে বাস্তব সখ্যতা না থাকলেও বিদ্যার সাথে সম্পৃক্ত আচার্য্য এবং উপাচার্য্য শব্দদ্বয়কে এখনো বিদায় দেওয়া যায় নি।
আমাদের বর্তমান যুগ যে যুক্তিবাদী সে কথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি অস্বীকার করবেন না আশাকরি। যেমন, সন্তানের হয়ে মা খেলে সন্তানের পেট ভরবে না। ছাত্রের হয়ে শিক্ষক লেখাপড়া করলে ছাত্র পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে না। তেমনি বিদ্যালাভের জন্য বিহিত সাধনা না করে পুরোহিতের বলে দেওয়া দেবী সরস্বতীর অঞ্জলিমন্ত্র আওড়ালে বিদ্যার্থীদের বিদ্যা বা ঈপ্সিত ফললাভ হবে কি ? অবশ্য পুরোহিতও জানেন না ফললাভের বিষয় সম্পর্কে। যদি জানতেন প্রতিমা-বিসর্জন মন্ত্রে বলতেন না—ওঁ আবাহনং ন জানামি, নৈব জানামি পূজনম্। বিসর্জনং ন জানামি ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি ।–অর্থাৎ আমি আবাহনও জানিনা, বিসর্জনও জানিনা, আমাকে ক্ষমা করুন। (দ্রঃ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)
বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী পূজ্য-প্রতিমা চঞ্চল চিত্তের ধারণের জন্য একটি অবলম্বন। প্রতিমাকে ব্রহ্মের রূপ কল্পনা করে উপাসনা, সংযম, সাত্তিক আহার, সাত্তিক বিহার ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে পূজা করা হয়।–যাতে পূজক বা উপাসক মনসংযোগ দ্বারা প্রতিমাকে হৃদয়ে ধারণ করে প্রতিমার গুণে গুণান্বিত হতে পারে। এই হলো প্রতিমা পূজার মূল কথা।
আমাদের আলোচ্য দেবী সরস্বতী প্রতিমার চরণ পদ্মের উপর ন্যস্ত, এর দ্বারা সৃষ্টির বিবর্ত্তনের কথা রূপকে বর্ণিত হয়েছে। মা সরস্বতী হংসের উপর উপবিষ্ট। হংস পরমাত্মার প্রতীক। বীণা থেকে নাদ বা ধ্বনি উৎপন্ন হয়, তাই বীণা সুরত-শব্দযোগের প্রতীক । পুস্তক বা গ্রন্থ বিদ্যা অর্জনের মাধ্যমের প্রতীক। দেবীর শুক্লবর্ণ সাত্তিকতার প্রতীক। পদ্ম, হংস, বীনা, পুস্তকাদি সজ্জিত শ্বেতবসনা দেবী সরস্বতীর উপাসনার বিষয় তাহলে বিদ্যা, ব্রহ্ম, পরব্রহ্ম, সৃষ্টিতত্ত্ব ইত্যাদি হওয়া উচিত। প্রতিমার অলঙ্কারের ওই গুণগুলোর সিলেবাস জানার পরে তো উপাসনার দ্বারা গুণান্বিত হবার প্রশ্ন! সেই সিলেবাসগুলো দেবী সরস্বতী কোন্ পুস্তকে, কোন্ সংহিতায় লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন, সে বিষয়ে বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকা কোথাও কিছু বলে গেছে কিনা আমি জানি না। যদি কেউ জানেন দয়া করে জানালে বাধিত হব। তবে এটুকু জেনেছি, পরব্রহ্মের ব্যক্ত-প্রতীক ‘‘শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা’’ —‘‘তমসার পার অচ্ছেদ্যবর্ণ মহান পুরুষ ইষ্টপ্রতীকে আবির্ভূত’’ হয়েছেন যিনি, তিনি ওই সব বিষয়ের খুঁটিনাটি জানেন এবং সবাইকে জানিয়েও দিয়েছেন বিবিধ স্মৃতি এবং শ্রুতি বাণীর মাধ্যমে। যিনি মানুষের জীবনের বেঁচে থাকা ও বৃদ্ধি পাওয়ার জীবন্ত আদর্শ স্বরূপ। যিনি পঞ্চবর্হি ও সপ্তার্চ্চি মাধ্যমে সব দেবতার, সব আরাধনার, সব পূজার, সব বিদ্যার সূত্র সন্নিবেশিত করেছেন। যাঁর উপাসনা বাদ দিয়ে কোন পুতুল পূজা করে কোন কিছুই জ্ঞাত হওয়া সম্ভব নয়। তাঁর নাম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। যারজন্য সদদীক্ষার শুভ মুহূর্তে ‘‘ওঁ ব্রহ্ম পরব্রহ্ম ও কুলমালিক ……’’ মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে বাহ্যপূজার বিষয়ে উল্লেখ্য পরব্রহ্ম-এর প্রকৃত তত্ত্বকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।
বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী সততা, সংযম, ন্যায়নীতি ইত্যাদি মানবিক গুণগুলোর প্রবহমানতাকে বৎসারান্তিক নবীকরণ করার জন্যই বাহ্যপূজা বা মূর্তিপূজা উদযাপনের উদ্দেশ্য। বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সরস্বতী পূজাই শুধু নয়, সব পূজার নামে হুজুগে মেতে আহার-বিহারে একটু বেশী করে অসংযমী হয়ে পড়ি আমরা। নাহলে সরস্বতী পূজা উপলক্ষ্যেও মাংসের দোকানে লাইন পড়ে যায়, যা হিন্দু শাস্ত্রে অভক্ষ্য, নিষিদ্ধ খাবার। যা খেলে আয়ুক্ষয় হয়। হিন্দুদের প্রামাণ্য গ্রন্থ মনু সংহিতা অনুযায়ী ‘মাং’ মানে আমাকে ‘স’ মানে সে, অর্থাৎ আমাকে সে খেলে আমিও তাকে খাব। আর আমরা ধর্ম পালনের অজুহাতে, পূজার অজুহাতে শাস্ত্রবিরোধী আচরণ করে হিন্দুত্বের বড়াই করতে চাইছি। এরফলে অহিন্দুরা আমাদের ওপর আঙুল তুলতে সাহস পাচ্ছে।
ভাষা-বিজ্ঞান অনুযায়ী পূজা মানে পূরণ করা, সম্বর্দ্ধিত করা। যে আচার-আচরণ সাত্তিক জীবন-বর্দ্ধনার অভাবকে পূরণ করে, পরিবেশের জৈবাজৈব সবকিছুকে সম্যকরূপে বর্দ্ধিত করে, তার নাম পূজা। ‘শ্রেয়-সৃজনী সংহতি ও সমাবেশ’ যা, তার নাম উৎসব। আর যে আচার-আচরণ জীবনবৃদ্ধিকে নন্দিত করে তার নাম আনন্দ। এখন প্রশ্ন, আমাদের প্রচলিত পূজা, উৎসবের উদযাপন বৃহত্তর পরিবেশকে কতখানি নন্দিত করে ‘পূজা’ শব্দের যথার্থতাকে উপহার দিতে পেরেছে ? –এইসব বিষয়ে সত্তাপিয়াসী চিন্তাশীলদের চিন্তা করে দেখা উচিত। বিশেষ করে যাঁরা কুসংস্কার বিরোধী রূপে নিজেদের বোধ ও বোধিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান।
পূজা বিষয়ে হিন্দুদের প্রামাণ্য গ্রন্থগুলো কি বিধান রেখে গেছে, বাহ্য-পূজাবাদীদের তা একবার জেনে নেওয়া দরকার। ‘মহানির্ব্বাণতন্ত্র’ নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ ‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ। অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’ ওই মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ‘ভারতে বিবেকানন্দ’ গ্রন্থের ৩৩৬ পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট। ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’
‘‘যে-ব্যক্তি সর্ব্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে।’’ –শ্রীমদ্ভাগবত। ৩-২৯-২২
“ঈশ্বরঃ সর্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জ্জুন তিষ্ঠতি। ভ্রাময়ন্ সর্ব্বভূতানি যন্ত্ররূঢ়ানি মায়য়া।।“ –গীতা, ১৮। ৬৫ “যিনি এই সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার নিজের স্বধর্মানুরূপ নিষ্কাম কর্মাচরণ দ্বারা (বাক্য বা ফুলজল দ্বারা নহে) পূজা করিয়া মানুষ সিদ্ধি লাভ করে । স্বধর্মানুরূপ (বর্ণানুগ সত্তাধর্ম পালন) নিষ্কাম কর্মই পরমেশ্বরের পূজার ডালি ।” (গীতা ১৮।৪৬) “যে ব্যক্তি সর্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে ।“ (শ্রীমদ্ভাগবত ৩।২৯।২২)
তাই একটা প্রশ্ন স্বভাবতঃই জাগে, বিদ্যার্জনের জন্য আমরা যদি বাহ্যপূজার ডালি সাজিয়ে দেবী সরস্বতীর উপর সত্যিসত্যিই নির্ভরশীল হতে পারতাম, তাঁকে বিশ্বাস করতাম, তাঁর প্রতি নিষ্ঠা থাকত, তাহলে বিদ্যা লাভের জন্য তাঁকে নিয়েই পড়ে থাকতাম। প্রভূত অর্থ ব্যয় করে, একে-ওকে ধরাধরি করে স্কুল-কলেজে ভর্তি হয়ে, বিষয় ভিত্তিক প্রাইভেট টিউটরের কাছে টুইশন নিতে যেতাম না, পরীক্ষার হলে অসদুপায়ের আশ্রয় নিতাম না। কারণ, এ-তো দ্বন্দ্বীবৃত্তি, বিশ্বাসকে অপমান করা। অবশ্য না করে উপায়ও তো নাই! বর্তমানের মোবাইল প্রীতির যুগে, প্রতিমা-পূজায় বিশ্বাসী এমন কি কাউকে পাওয়া যাবে,— যিনি পুরোহিতকে কিছু দক্ষিণা দিয়ে তার সাধের মোবাইলের প্রতিকৃতি বা প্রতিমার পুজো করিয়ে মোবাইলের সব ফিচার উপভোগ করতে পারবে, ডাউনলোড-আপলোড করতে পারবে, হোয়াটস্ অ্যাপে ছবি পাঠাতে পারবে? প্রতিমা-পূজায় বিশ্বাসী এমন কোন মেয়ে পাওয়া যাবে, যে তার পছন্দের বর-এর ছবি বা কাট্-আউট পুজো করিয়ে মা হতে পারবে, সুখের দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করতে পারবে? যদি পারে তাহলে পুরোহিতকে দক্ষিণা দিয়ে সরস্বতী প্রতিমার পূজা করিয়ে বিদ্যা লাভ সম্ভব! নচেৎ কোন পুতুল পুজো করার আগে একটু বোধ-বিবেককে কাজে লাগাতে হবে।
বাস্তব বোধের দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে বিচার-বিবেচনা করলে দেখা যাবে, সরস্বতী পূজার ওই মন্ত্রগুলোই শুধু নয়, আমাদের সব কথাই বাক্ হয়ে স্ফূরিত হয় বলে সরস্বতী বাগ্দেবী রূপে কল্পিত হয়েছেন। অতএব যুক্তি বা বিজ্ঞান অনুযায়ী দেবী সরস্বতী মেধানাড়ীতে সুপ্ত, কণ্ঠে এবং কলমে ব্যক্ত। একাগ্রতার অনুশীলনে মেধানাড়ী জাগ্রত না করতে পারলে, অর্থাৎ স্মৃতি যদি কাজ না করে মুখস্থ বলা যাবে না, লেখাও যাবে না। মেধানাড়ী ধ্রুবাস্মৃতির কাজ করে। উপনিষদে বর্ণিত আছে, আহার শুদ্ধৌ সত্ত্বাশুদ্ধিঃ, সত্ত্বাশুদ্ধৌ ধ্রুবাস্মৃতি …… । তাই, বিদ্যা লাভ করতে হলে মেধানাড়ীকে জাগ্রত রাখতে হবে। আর, মেধানাড়ীকে জাগ্রত রাখতে হলে সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন-যাপন—আহার-বিহার, জৈবিক তাগিদ পূরণ, জীবিকার্জন ইত্যাদি ইত্যাদি আহরণসমূহকে শুদ্ধ রাখতে হবে খেয়ালখুশীর প্রবৃত্তি-পরায়ণতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে। বেদবিৎ আচার্য্যের বিধানকে উপেক্ষা করে শিক্ষার নামে, বিদ্যার নামে প্রবৃত্তি-পরায়ণতার বিধি-ব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থায় বা সরস্বতীর মূর্তি পূজা করে যদি প্রকৃত বিদ্যা লাভ হতে পারতো, তাহলে তথাকথিত বিদ্যালয়গুলো থেকে অনেক অসৎ-নিরোধী আদর্শবান, বিদ্বান, শ্রদ্ধাবান, চরিত্রবান মানুষের সৃষ্টি হতে পারতো। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উপাচার্যকে ঘেরাও করে ‘হোক কলরব’ সংগঠিত হতো না। ‘মা বিদ্বিষাবহৈ’-এর দেশের বিদ্যালয়ে ছাত্র-রাজনীতির নামে মানুষের প্রতি মানুষের বিদ্বেষ দেখতে হতো না। এসব উল্লেখ করার কারণ, বর্তমানে দুর্নিতীপরায়ণ মানুষদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যাঁরা একসময় বিদ্যাদেবীর আরাধনা করে সমাবর্তন মাধ্যমে আচার্য্য বা উপাচার্য্য স্বাক্ষরিত বিদ্বান আখ্যা বা শংসাপত্র বা ডিগ্রী নিয়েছেন! তাঁদের কি বিদ্বান বলা যাবে ? অথচ এই ভারতবর্ষের রত্নাকর দস্যু সরস্বতীর কোন মূর্তি-পূজা না করেই, আহত-নাদ মর্যাদা-পুরুষোত্তম ‘রাম’-নামের (ম-রা, ম-রা, ম-রা ……..=রাম) সাধন করে দেবী সরস্বতীকে মেধানাড়ীতে জাগ্রত করে হয়েছিলেন বাল্মীকি।
একদা তমসা নদী থেকে স্নান সেরে ফিরছিলেন। এক তরুশাখে ক্রৌঞ্চ-জুটি পরস্পর খেলছিল। এক ব্যাধ পুরুষ পাখিটিকে তীর মেরে হত্যা করলে স্ত্রী পাখিটি করুণ বিলাপ করতে থাকে। বাল্মীকি বিচলিত হয়ে ‘কোনদিন প্রতিষ্ঠা পাবে না’ বলে ব্যাধকে অভিসম্পাত করেন। সেই অভিশাপ বাণী স্বতঃস্ফূর্ত শ্লোকবদ্ধ হয়ে নির্গত হয়েছিল :–‘‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতী সমাঃ/যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকম্ অবধী কামমোহিতম্।’’ এই শ্লোকটিকে পৃথিবীর সারস্বত সাধকেরা আদি শ্লোক বলে মান্য করেন। অতএব, সারস্বত সাধনার মূল বিষয় মস্তিষ্কে সুপ্ত থাকা মেধানাড়ী বা স্মৃতিবাহী চেতনার জাগরণ।
———-
মেধানাড়ীকে জাগ্রত করতে হলে লাগে অনাহত-নাদ বা সৎমন্ত্র সাধন। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের বিদ্বান করার জন্য দীক্ষার মাধ্যমে আজ্ঞাচক্রে অনাহত-নাদের সৎমন্ত্র সাধন, স্বতঃ-অনুজ্ঞার অনুশাসন এবং সদাচার মাধ্যমে আমাদের মেধানাড়ীকে জাগ্রত করার সহজ উপায় দান করেই ক্ষান্ত হন নি, ‘নিয়তং স্মৃতিচিদযুতে’-বাণীতে স্বস্ত্যয়নী ব্রতের মন্ত্রের মাধ্যমে স্মৃতিবাহী চেতনাকে জাগ্রত করার বিধান দিয়ে দেবী সরস্বতীর আরাধনার নিমিত্ত স্থায়ী একটা আসন পেতে দিলেন। যা’তে আমরা প্রতিনিয়ত সরস্বতী পূজায় ব্যাপৃত থাকতে পারি। আমরা একটু চেষ্টা করলেই সেই বিধিগুলোকে অনুশীলন মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে দেবী সরস্বতীকে সম্বর্দ্ধিত করে, প্রকৃত অর্থে পূজা করে নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ,পবিত্র হতে পারব, বিদ্বান হতে পারব। এবার আমরা একটু দেখে নেব বর্তমান বেদবিৎ আচার্য্য শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরস্বতী বিষয়ে কি নিদান রেখে গেছেন। ‘‘বিকাশ-ব্যাকুল গতিই যাঁর সংস্থিতি— তিনিই সরস্বতী, আর, বাক্ বা শব্দই যাঁর সত্তা— তিনিই বাগ্দেবী; তাই, যিনিই বাগ্দেবী তিনিই সরস্বতী। ২ । বাস্তব উপলব্ধিসম্ভূত সার্থক অন্বিত-সঙ্গতিশীল জ্ঞানকেই বিদ্যা বলে। ৩ । সার্থক সর্ব্বসঙ্গতিশীল জ্ঞানই বিজ্ঞান, আর, তা’ই বেদ, প্রজ্ঞাও তা’ই। ১০ ।’’ (সংজ্ঞা সমীক্ষা)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রদত্ত উপরোক্ত বাণীতে এটুকু বোঝা গেল যে সরস্বতী আরাধনার মাধ্যম বাক্ বা শব্দ সাধন। শ্রীশ্রীঠাকুর ভাব-সমাধিতে বাক্ বা শব্দের সন্ধান দিতে গিয়ে ব্যক্ত করলেন,—‘‘নাম-নামী অভেদ, ….. স্থূলে আমার প্রকাশ, সূক্ষ্মে আমার বাস।’’ মহাগ্রন্থ পুণ্যপুঁথির উক্ত বাণীকে স্বীকার করলে বাক্ বা শব্দের অস্তিত্বের আধারও শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। এবং সব দেবতার সমাহারে সৃষ্ট একমাত্র তিনিই ভগবানের অখন্ড সাকার মূর্তি। তিনি ইষ্ট, তিনি ধ্যেয়, তিনি জ্ঞেয় এবং তিনিই পূজ্য। তাঁর আদর্শ মেনে চলে ইষ্টপূজা করতে পারলে সব দেবতার পূজা করা হয়।