বসুন্ধরা দিবস

** বসুন্ধরা দিবসের ভাবনা **

।। প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্য অবদান।।

নিবেদনে— তপন দাস

————————————————

মহাভারতের বনপর্বে বকরূপী ধর্ম যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্ন করেছিলেন, সব চাইতে আশ্চর্যের বিষয় কি ?

উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, মৃত্যু অবশ্যাম্ভাবী জেনেও মানুষ ন্যায়, নীতি, ধর্ম বিসর্জন দিয়ে চিরদিন বেঁচে থাকতে চায় এটাই সব চাইতে আশ্চর্যের বিষয় ।

তাই, আমরা, ঠাকুরের মানুষেরা যেন ওইসব পথের পথিক না হই । প্রবৃত্তিধর্মী অসৎ পথ অবলম্বন করে যদি চিরজীবি হওয়া যেত তাহলে না হয় অসৎ পথের আশ্রয় অবলম্বন করার সার্থকতা থাকত। তাই আমাদের বাঁচতে হবে পরমপিতার খুশির জন্য, মরতেও হবে পরমপিতার খুশির জন্য—মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার লক্ষ্যে, ‘তৃষ্ণার একান্ত নির্বান— মহাচেতন সমুত্থান।’ বাণীকে সম্মান জানাতে।

নির্দিষ্ট অপরাধবোধ ছাড়াও দুর্বলতাজনিত উৎকণ্ঠার ভয়, আগন্তুক ভয়, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভয় মনের পিছু ছাড়ে না । সব ভয়ের চরম মৃত্যুভয় । একটু অভ্যাস করলেই অন্তর্যামী স্বরূপ পরমাত্মিক শক্তির সাহায্যে আধিভৌতিক, আধিদৈবিক, আধ্যাত্মিক ত্রিবিধ ভয় থেকে মানুষ মুক্ত হতে পারে । এজন্য প্রবৃত্তি অভিভূতির সব দুর্বলতা কাটিয়ে ইষ্টকর্মে নিয়োজিত থাকতে হবে । তাই তো ঠাকুর আমাদের সব ভয় থেকে মুক্তি দিতে বাণী দিলেন ।–

“সব প্রবৃত্তি রত থাকে

ইষ্টকর্ম লয়ে,

সেই তো যোগী, সেই সন্ন্যাসী,

কাল নত যার ভয়ে ।”

“He will stand like a tower when everything rocks around him and when his softer fellow- mortals are winnowed like chaff in the blust.”

(আঃ প্রঃ ২/৭৫)

(যখন সবকিছুর অস্তিত্ব টলায়মান হয়ে উঠবে, এবং শক্তিহীন নির্জীব লোকগুলি ঝড়ের আগে তুষের মত উড়ে যাবে, তখন সে একটা স্তম্ভের মত নিজের শক্তিতে অটল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে ।)

জীবের জীবনবৃদ্ধির অপলাপকারী মৃত্যুকে প্রণাম জানিয়ে, মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার এই পথকে আঁকড়ে আমরা যেন অনন্ত জীবনের অধিকারী হতে পারি । দৈব দুর্বিপাক ভূমিকম্পে ভীত না হয়ে আমরা সকলে যেন মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার সাধনা ইষ্টনাম এবং ইষ্টকর্মে মত্ত থাকি, পড়শিদের, পারিপার্শ্বিকদের, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আক্রান্তদের সহায় হয়ে,—মৌখিক স্তুতি, আত্মার শান্তি কামনার পাশাপাশি বাস্তব কর্মের মাধ্যমে । পরমপিতার অনুশাসনকে সহায় করে বিশ্ব প্রকৃতিকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সব্বাইকে।

বিশ্ব-প্রকৃতির পরম দান, পঞ্চ-মহাভূত—ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-এর অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই পৃথিবী নামক সবুজ গ্রহটি। নগর-সভ্যতার ধারক-বাহকেরা আসুরিক ক্ষমতার বলে, ভোগবাদের ছাড়পত্রের বলে, আদর্শহীনতার বলে ভারতীয় ধর্মের অঙ্গীভূত পঞ্চ-মহাযজ্ঞ, সদাচার এবং বর্ণাশ্রমকে বিদায় জানিয়ে বসুন্ধরার পরিবেশকে যে ধ্বংসাত্মক পথে এগিয়ে দিয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘নাসা’-র গবেষণা। উদ্বেগ প্রকাশ করে গিয়েছিলেন কবিগুরু, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর’-এর প্রতিবাদী বাণীতে।

ভারতবর্ষের বৃহত্তম নদী গঙ্গাকে আমরা মা বলি, যাঁর পূত স্রোতধারায় স্নাত হয়ে পবিত্র হই, সেই মায়ের শরীরে নগর-সভ্যতার পুর-বিভাগ যখন পরিকল্পিতভাবে পূতিগন্ধ ক্লেদ নিক্ষেপ করে, ধর্মের ধ্বজাধারীরা তথাকথিত পূজা-পার্বনের বর্জ্য নিক্ষেপ করে পুণ্য অর্জন করে, তখন মনে হয় না যে আমরা কোন উন্নত সভ্যতার সভ্য, প্রগতি বাদের বাদী, আর্য্য সংস্কৃতির ধারক বাহক ধার্মিক।

পরিবেশ সম্বর্দ্ধনার সেই পরম অনুশীলন কি ভাবে বিকৃত হয়েছে সে বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই। বরং বসুন্ধরার পরিবেশকে রক্ষা করার ব্রতে কিভাবে ব্রতী হওয়া যায় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের উপদেশ মেনে আমাদের প্লাস্টিক-সভ্যতার কর্ণধারেরা যাতে পরিবেশ বান্ধবের ভূমিকা গ্রহণ করেন। রাষ্ট্র নায়কেরা যাতে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, ভূমিদূষণ, ভূ-স্তরদূষণ, জলদূষণ প্রতিরোধ করে গ্লোবাল-ওয়ার্মিং বা বিশ্ব-উষ্ণায়ন-ভ্রূকুটি থেকে সভ্যতাকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হন, সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে, জনমত গঠন করতে হবে, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের লাগামহীন ভোগের চাহিদা মেটাতে যে হারে ভূ-গর্ভস্থ তেল, গ্যাস, কয়লা, বিবিধ আকরিক উত্তোলন করতে গিয়ে ভূ-স্তরের অবক্ষয়কে আহ্বান করে চলেছি, ধ্বংস করে চলেছি ‘রেন ফরেস্ট’কে। এর বিরুদ্ধে সরব না হলে কোন মূল্যেই বাঁচানো যাবে না মানব সভ্যতাকে!

আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর পূর্বে পরম বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরব হয়েছিলেন এই ভয়াবহ পরিস্থিতি প্রতিরোধ মানসে। বিজ্ঞান-সাধক শ্যামাচরণ মুখোপাধ্যায়, পদার্থবিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য প্রমুখ ভক্তদের উৎসাহ দিয়ে হিমাইতপুরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র। বিজ্ঞান-বিষয়ক অত্যাশ্চর্য্য বহুকিছুর সাথে সন্ধান দিয়েছিলেন সহজলভ্য আবহাওয়া বিদ্যুতের। ভূ-গর্ভস্থ প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন পরবর্তী শূন্যগর্ভ অবস্থাকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে কিভাবে পুণঃ-পূর্ণকরণ বা রিফিলিং করলে ভূ-স্তরের ক্ষতি হবে না সে বিষয়েও তিনি বলে গেছেন। তাঁর প্রদত্ত ওইসব ফরমূলাকে বাস্তবায়িত করতে পারলে ভূ-স্তরকে বিনষ্ট না করে, পরিবেশকে দূষিত না করেই প্রাকৃতিক দৌ-শক্তিকে কাজে লাগিয়ে শক্তি-সম্পদে সমৃদ্ধ হতে পারত আমাদের সভ্যতা।

আমরা জানি, ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। আমাদের অস্তিত্বের ধারক, পালক-পোষক পরমাপ্রকৃতির পঞ্চ-মহাভূত। উক্ত পঞ্চ-মহাভূতের অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই বসুন্ধরা—নীল-সবুজ গ্রহ। ধারণ করতে হবে ওই প্রাকৃতিক উপাদানসমূহকে, ওঁদের বিনাশ করলে আমরাও বিনাশ হবো। নচেৎ বিশুদ্ধ জলের বোতলের মত অক্সিজেন সিলিণ্ডার পিঠে বয়ে ঘুরতে হবে একদিন নিকট ভবিষ্যতে।

পল-বিপল, দণ্ড-প্রহর, অহোরাত্র, আহ্নিকগতি, বার্ষিকগতির দিনরাত, মাস, বছর হয়েই চলেছে আদিকাল থেকে, প্রাকৃতিক নিয়মে।দিন-মাস-বছর আসে যায়, রেখে যায় কিছু স্মৃতি মনের মণিকোঠায়। ওই স্মৃতির মালাগুলোকে স্মৃতিবাহীচেতনার ভল্টে অনন্তকাল জমা করে রাখার জন্য আর্য্য-ঋষিরা প্রতিটি মুহূর্তের জীবন ধারণের আহরণ শুদ্ধির মাধ্যমে ধ্রুবাস্মৃতির সন্ধান দিয়ে গেছেন ‘‘আহারশুদ্ধৌ সত্তাশুদ্ধি, সত্তাশুদ্ধৌ ধ্রুবাস্মৃতি’’ মন্ত্রে । শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র স্বস্ত্যয়ণী ব্রতের ‘নিয়তং স্মৃতিচিদয়ুতে’ মন্ত্রে য়াকে সমৃদ্ধ করেছেন। য়ে মুহূর্ত চলে যাবে তা আর ফিরে আসবে না। চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা সমৃদ্ধ সবুজ গ্রহ পৃথিবীর প্রতিটি মুহূর্তকেই যাতে চিরনবীনতায় আস্বাদন করতে পারি, উপভোগ করতে পারি সেজন্যই আর্য্য সভ্যতার ঊষা লগনে পরমপিতার প্রতিভূ আর্য্য ঋষিগণ ‘‘মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ……..’’ মন্ত্রে বন্দনা করে বসুন্ধরার মধুময় পরিবেশকে রক্ষা অর্থাৎ পূজা করতে শিখিয়েছিলেন। পূজা শব্দের অর্থ পূরণ করা, সম্বর্দ্ধনা, সম্যকভাবে বর্দ্ধনার লক্ষ্যে এগিয়ে চলা। যেমন-যেমন আচরণে, পরিবেশের অজৈব উপাদানসমূহকে রক্ষা করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া যায় তাই ছিল আর্য্য ভারতের পূজা, যজ্ঞ, হোম, উৎসবের তাৎপর্য্য।

আমরা যে ৩৩ কোটি দেবতার কথা শুনেছি সে সংখ্যাটা ৩৩,০০০০০০০ নয়, শুধুই ৩৩। কোটি অর্থে (piece) বোঝান হয়েছে, যথা, জীবকোটি, ঈশ্বরকোটি একক অর্থে ব্যবহৃত হয়।

বাস্তবে আমাদের এই সবুজ গ্রহের জীবকূলের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জৈবাজৈব রসদের যোগানদাতার মূল মালিক সূর্য। সূর্যর আর এক নাম আদিত্য। আদিত্য মানে দেবতা। দেদীপ্যমান যা তাকে দেবতা বলে। দেবতা মানে দ্যুতি বিশিষ্ট সত্তা। সব দেবতাই মূলতঃ পরব্রহ্মের প্রতীক। যেমন পৃথিবীর অধিপতি অগ্নি, অন্তরীক্ষে ইন্দ্র বা বায়ু ও দ্যুলোকে সূর্য। পৃথিবী, অন্তরীক্ষ এবং দ্যুলোক-এর প্রতিটি স্থানে ১১টি করে বেঁচে থাকার আবশ্যিক উপাদান সরবরাহকারী দেদীপ্যমান উৎস রয়েছে। উক্ত ৩৩টি জীবনীয় উৎস-সমূহকে দেবতা বলা হয়েছে উপনিষদে।

বৃহদারণ্যক উপনিষদ (৩য় অধ্যায়, ৯ম ব্রাহ্মণ)-এর ঋষি শাকল্য, ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য সমীপে দেবতার সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি অষ্টবসু, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্যাদি ৩১ সংখ্যক দ্যুতিবিশিষ্ট প্রাকৃতিক সত্তা এবং ইন্দ্র ও প্রজাপতি মিলিয়ে ৩৩ সংখ্যক দেবতার উল্লেখ করেছিলেন। ওই ৩৩ কোটি (33 pieces) দেদীপ্যমান উৎসসমূহকে রক্ষা করার প্রশ্নে আমরা প্রবৃত্তি পরবশ হয়ে যাতে দুর্বৃত্ত না হই তারজন্য উপনিষদের ঋষিগণ ‘আত্মানং বিদ্ধি’-র শপথ বাক্যের পাঠ দিলেন।—পরমপিতার সন্তান তুমি, নিজেকে জানো, নিজের প্রতিরূপ মনে করে পরিবেশকে বাঁচাও, নিজে বাঁচ। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’—জীবনবিধ্বংসী আচরণ ত্যাগ করে জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলো। ‘মা গৃধ’—লোভ করো না। সদাচার এবং বর্ণাশ্রম মেনে চলো। পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে নিজে সমৃদ্ধ হও। এই ছিল ভারতবর্ষের বিধি-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠনের, ধর্মের, পূজার, উৎসবের বাস্তব রূপ। ওই হৃত-গৌরব যুগোপযোগী করে পুণঃ-প্রতিষ্ঠিত করে গেলেন সব দেবতার সমাহারের প্রতীকস্বরূপ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। যার প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয় তাঁর প্রদত্ত ‘আর্য্য সন্ধ্যা’ প্রার্থনা মন্ত্রে।

আমরা, ভারত রাষ্ট্রের অধিবাসীরা ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের পবিত্র মন্ত্র মূণ্ডকোপনিষদের ‘সত্যমেব জয়তে’-র মধ্যে নিহিত সত্যের সন্ধান করার চেষ্টা না করে, ‘মেরা ভারত মহান’ মন্ত্রের ধ্বজাধারীরা ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টি রক্ষার পবিত্র কর্তব্য ভুলে, ধর্মের নামে কতগুলো কু-সংস্কারে, আর বিজ্ঞানের নামে ভোগবাদে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছি। অথচ বিশ্বের পরিবেশ বিজ্ঞানীরা প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে, ভারতীয় পঞ্চ-মহাযজ্ঞের বিধানকে, সমাজ বিজ্ঞানীরা সমাজ-বন্ধনের দৃঢ়তার অবক্ষয় রোধে, শ্রেণী-বিন্যস্ত বর্ণাশ্রমানুগ সমাজ ব্যবস্থার বিধানকে এবং প্রজনন বিজ্ঞানীরা সুস্থ মানবজাতি গঠনের জন্য সুবিবাহ ও সুপ্রজনন বিধিকে মেনে চলতে পরামর্শ দিয়েছেন।

বেদ-উপনিষদ-গীতা. ঋষি এবং মহাপুরুষদের নিদেশে কোথাও প্রচলিত পূজার নামে, অনিত্য বস্তুর উপাসনার নামে, হৈ-হুল্লোর করে পরিবেশ দূষণ করার অনুমোদন নেই। ব্যক্তি চরিত্র গঠনের নিমিত্ত সাধন-ভজন-আরাধনা বাদ দিয়ে যে তন্ত্রমতে আমরা পরিবেশ দূষণ করতে প্রতিমা পূজায় মেতে উঠি, সেই তন্ত্র-ই প্রতিমা পূজাকে ‘‘বাহ্যপূজা অধমাধম’’ বলে বর্ণনা করেছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও, ‘‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’’ ছন্দের ডালিতে প্রতিমা পূজার অসারতার বার্তা রেখে গেছেন।

বসুন্ধরার পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, এক বিপ্লব নিয়ে এলেন। ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে, ধর্ম বলে জানিস তাকে। বাঁচা-বাড়ার মর্ম যা, ঠিকই জানিস ধর্ম তা। Upholding urge of existence is Dharma.’……..ইত্যাদি বাণীর মাধ্যমে। অতএব, চাঁদার জুলুম, ফুল, বেলপাতা, ধূপহীন ধূপকাঠি, নৈবেদ্য, দশ-(অ)কর্মার ফর্দ, ঢাক, ঢোল, বাজি, হৈ-হুল্লোর, তার শব্দে মাইকের ডালি দিয়ে নয়— তোমাকে ধার্মিক হতে হলে আগে পরিবেশকে বাঁচাতে হবে। সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বাস্তব কর্মে ব্রতী হতে হবে। পরিবেশ হিতৈষী হতে হবে, তবেই তুমি ভারতীয় মতের ‘ধার্মিক’ অভিধায় ভূষিত হতে পারবে।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের অনুগামীদের নিত্য ইষ্টভৃতি করতে হয়। ইষ্টভৃতি মানে ইষ্ট কর্মের ভরণ। ইষ্টকর্ম মানে পূর্ত্তকর্ম—পরিবেশের উপাদানকে,পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখার বাস্তব কর্ম। যা প্রকৃত ইষ্টভৃতির মন্ত্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ ।” এর সরলার্থ খুব সহজ। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুযায়ী সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন বর্দ্ধনার বিধি মেনে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে চলেন যিনি, এমন গুরুভাই-ই প্রকৃত ইষ্টভ্রাতা।–যাঁর আপদে-বিপদে সাধ্যানুগ সাহায্য করতে হবে। ভূত মানে,–ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা পরিবেশের অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। সেগুলোকে প্রাণ পণ করে রক্ষা করতে হবে। প্রতিনিয়ত এই শপথ মেনে চলার নাম ইষ্টভৃতি। অতএব প্রতিটি আমি যদি প্রকৃত ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের যাজ্ঞিক হবার শপথ পালন করতে পারি তাহলেই অনেকাংশে রক্ষা করা যাবে সুজলা-সুফলা-মলয়জ-শীতল বসুন্ধরার পরিবেশকে।

এ যুগের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমাদের সচেতন করে দিতে বাণী দিয়ে বললেনঃ

‘‘ইষ্টভরণ, পিতৃপোষণ,

পরিস্থিতির উন্নয়ন,

এ না করে, যাই না করিস

অধঃপাতেই তোর চলন।’’

ওই অধঃপতন থেকে মধুময় বসুন্ধরাকে রক্ষা করতে কৃপা পরবশ হয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর ‘পঞ্চবর্হি’ এবং ‘সপ্তার্চ্চি’ পালনের অনুশাসন দিলেন। দলীয় প্রীতির কবলে পড়ে মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার সেই অনুশাসন বিধিকে অবজ্ঞা করার স্পর্দ্ধা যেসব তথাকথিত সৎসঙ্গীরা দেখাচ্ছেন, তাদের অধঃপতনকে প্রতিরোধ করতে হলে, তাদেরও সামিল করতে হবে উক্ত ইষ্ট-ভরণের অনুশাসন পালনে। তা যদি না করি আমরাও কিন্তু বঞ্চিত হব ‘ইষ্ট ভরণের’ পবিত্র কর্ম থেকে।

জয়গুরু, বন্দে পুরুষোত্তমম্!

 

 

।। বসুন্ধরা (EARTH DAY) দিবসের ভাবনা ।।

নিবেদনে—তপন দাস

***************************************

আজ ২২শে এপ্রিল। আমাদের বসবাসপোযোগী এই পৃথিবী নামক সবুজ গ্রহটিকে তার স্বকীয়তায় সমৃদ্ধ রাখতে খ্রীস্টিয় ১৯৭০ সাল থেকে এই দিনটিকে বসুন্ধরা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

‘ধনধান্যে পুষ্পেভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’-র বাণীর স্রষ্টা কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রণাম নিবেদন করতেই হয় আজকের দিনটির স্মরণে। প্রণাম নিবেদন করতে হবে কবীন্দ্র রবীন্দ্রকে যিনি,

‘প্রথম প্রভাত উদয় তব গগনে,

প্রথম সাম রব তব তপোবনে,

প্রথম প্রচারিত তব বন-ভবনে

জ্ঞান-ধর্ম কত কাব্যকাহিনী…….’ বাণীর গাঁথায় বন্দনা করেছেন ভারত-জননীকে। প্রণাম জানাতে হবে সেই পরমপুরুষ অনুকূলচন্দ্রকে যিনি উপরোক্ত স্রষ্টাদের বাণীগুলোকে অমর করে রেখেছেন তাঁর আলোচনার ছত্রে ছত্রে। ‘পদ্ম আসন ধান ভরা ক্ষেত’, ‘আর্য্য ভারতবর্ষ আমার জ্ঞান-গরিমা-গরবিনী’ ইত্যাদি বাণীর সুর-ঝঙ্কারে বসুন্ধরাকে বন্দনা করেছেন।

পরমাপ্রকৃতির পঞ্চ-মহাভূত ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-এর অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই বসুন্ধরা। পরমপিতার প্রতিভূ আর্য্য ঋষিগণ ‘‘মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ……..’’ মন্ত্রে বন্দনা করে বসুন্ধরার মধুময় পরিবেশকে রক্ষা অর্থাৎ পূজা করতে শিখিয়েছিলেন। ‘পূজা’ শব্দের অর্থ সম্বর্দ্ধনা। যেমন যেমন আচরণে পরিবেশের অজৈব উপাদানসমূহকে রক্ষা করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া যায় তাই ছিল আর্য্য ভারতের পূজা, যজ্ঞ, হোমের তাৎপর্য্য। আমরা প্রবৃত্তি পরবশ হয়ে যাতে দুর্বৃত্ত না হই তারজন্য আমাদের ঋষিরা স্মরণ করিয়ে দিলেন ‘আত্মানং বিদ্ধি’—পরমপিতার সন্তান তুমি, নিজেকে জানো, নিজের প্রতিরূপ মনে করে পরিবেশকে বাঁচাও, নিজে বাঁচ। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’—জীবনবিধ্বংসী আচরণ ত্যাগ করে জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলো। ‘মা গৃধ’—লোভ করো না। সদাচার এবং বর্ণাশ্রম মেনে চলো। পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে নিজে সমৃদ্ধ হও। এই ছিল ভারতবর্ষের বিধি-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠনের, ধর্মের, পূজার বাস্তব রূপ।

নগর-সভ্যতার আসুরিক ক্ষমতার বলে, ভোগবাদের ছাড়পত্রের বলে, আদর্শহীনতার বলে সদাচার এবং বর্ণাশ্রমকে বিদায় জানিয়ে বসুন্ধরার পরিবেশকে যে ধ্বংসাত্মক পথে এগিয়ে দিয়েছে নগর-সভ্যতা তা’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘নাসা’-র গবেষণা। উদ্বেগ প্রকাশ করে গিয়েছিলেন কবিগুরু, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর’-এর প্রতিবাদী বাণীতে।

পরিবেশ সম্বর্দ্ধনার সেই পরম অনুশীলন কি ভাবে বিকৃত হয়েছে সে বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই। বরং বসুন্ধরাকে রক্ষা করার ব্রতে কিভাবে ব্রতী হওয়া যায় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে আমাদের। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের উপদেশ মেনে আমাদের প্লাস্টিক-সভ্যতার কর্ণধারেরা যাতে পরিবেশ বান্ধবের ভূমিকা গ্রহণ করেন। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, ভূমিদূষণ, জলদূষণ প্রতিরোধ করতে সচেষ্ট হন। সে বিষয়ে চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

ভারতবর্ষের বৃহত্তম নদী গঙ্গাকে আমরা মা বলি, যাঁর পূত স্রোতধারায় স্নাত হয়ে পবিত্র হই, সেই মায়ের শরীরে পুর-বিভাগ যখন পরিকল্পিতভাবে পূতিগন্ধ ক্লেদ নিক্ষেপ করে, ধর্মের ধ্বজাধারীরা তথাকথিত পূজা-পার্বনের বর্জ্য নিক্ষেপ করে পুণ্য অর্জন করে, তখন মনে হয় না যে আমরা কোন উন্নত সভ্যতার সভ্য, প্রগতি বাদের বাদী, আর্য্য সংস্কৃতির ধারক বাহক ধার্মিক।

ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। আমাদের অস্তিত্বের পালক-পোষক পরমাপ্রকৃতির পঞ্চ-মহাভূত ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ ধারণ করতে অর্থাৎ ওদের অস্তিত্বকে ধরে রাখতে হবে, বিপন্ন হতে দেওয়া যাবে না। উক্ত পঞ্চ-মহাভূতের অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই বসুন্ধরা। পরমপিতার প্রতিভূ আর্য্য ঋষিগণ ‘‘মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ……..’’ মন্ত্রে বন্দনা করে বসুন্ধরার মধুময় পরিবেশকে রক্ষা অর্থাৎ পূজা করতে শিখিয়েছিলেন। পূজা শব্দের অর্থ সম্বর্দ্ধনা। যেমন যেমন আচরণে পরিবেশের অজৈব উপাদানসমূহকে রক্ষা করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া যায় তাই ছিল আর্য্য ভারতের পূজা, যজ্ঞ, হোমের তাৎপর্য্য। আমরা প্রবৃত্তি পরবশ হয়ে যাতে দুর্বৃত্ত না হই তারজন্য বার বার স্মরণ করিয়ে দিলেন ‘আত্মানং বিদ্ধি’—পরমপিতার সন্তান তুমি, নিজেকে জানো, নিজের প্রতিরূপ মনে করে পরিবেশকে বাঁচাও, নিজে বাঁচ। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’—জীবনবিধ্বংসী আচরণ ত্যাগ করে জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলো। ‘মা গৃধ’—লোভ করো না। সদাচার এবং বর্ণাশ্রম মেনে চলো। (সম্প্রতিকালে “করোনা ভাইরাস” সঙ্কটে সকলেই প্রাণ বাঁচাতে যেভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে অভ্যস্ত হয়েছিল, তা’ প্রকৃত অর্থে ত্রি-স্তরীয় সদাচার-বিধির অন্তর্ভুক্ত না হলেও, শারীরিক সদাচার তো বটে!) পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে নিজে সমৃদ্ধ হও। এই ছিল ভারতবর্ষের বিধি-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠনের, ধর্মের, পূজার বাস্তব রূপ।

বেদ-উপনিষদ-গীতা, ঋষিগণ, মহাপুরুষগণ-এর নিদেশে কোথাও প্রচলিত পূজার নামে, অনিত্য বস্তুর উপাসনার নামে, হৈ-হুল্লোর করে পরিবেশ দূষণ করার অনুমোদন নেই। ব্যক্তি চরিত্র গঠনের নিমিত্ত সাধন-ভজন-আরাধনা বাদ দিয়ে যে তন্ত্রমতে আমরা পরিবেশ দূষণ করতে প্রতিমা পূজায় মেতে উঠি, সেই তন্ত্র-ই প্রতিমা পূজাকে ‘‘বাহ্যপূজা অধমাধম’’ বলে বর্ণনা করেছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও, ‘‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’’ ছন্দের ডালিতে প্রতিমা পূজার অসারতার বার্তা রেখে গেছেন।

বসুন্ধরা রক্ষার স্বার্থে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, এক বিপ্লব নিয়ে এলেন। ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে, ধর্ম বলে জানিস তাকে। বাঁচা-বাড়ার মর্ম যা, ঠিকই জানিস ধর্ম তা। Upholding urge of existence is Dharmma.’……..ইত্যাদি বাণীর মাধ্যমে। অর্থাৎ তোমাকে ধার্মিক হতে হলে আগে পরিবেশকে বাঁচাতে হবে। সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বাস্তব কর্মে ব্রতী হতে হবে।

বসুন্ধরার মৌলিক উপাদানসমূহকে পোষণ দিতে, রক্ষা করতে, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র যে আর্য্যসন্ধ্যার অনুশাসন অনুশীলন করতে বললেন তা’ও আমরা নানা অজুহাতে উপেক্ষা করে চলছি!

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের অনুগামীদের নিত্য ইষ্টভৃতি করতে হয়। ইষ্টভৃতি মানে ইষ্ট কর্মের ভরণ। ইষ্টকর্ম মানে পূর্ত্তকর্ম—পরিবেশের বাস্তব সেবা। যা প্রকৃত ইষ্টভৃতির মন্ত্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ ।” এর সরলার্থ খুব সহজ। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুযায়ী সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন বর্দ্ধনার বিধি মেনে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে চলেন যিনি, এমন গুরুভাই-ই প্রকৃত ইষ্টভ্রাতা।–যাঁর আপদে-বিপদে সাধ্যানুগ সাহায্য করতে হবে। ভূত মানে,–ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা পরিবেশের অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। সেগুলোকে প্রাণ পণ করে রক্ষা করতে হবে। প্রতিনিয়ত এই শপথ মেনে চলার নাম ইষ্টভৃতি। অতএব প্রতিটি আমি যদি প্রকৃত ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের যাজ্ঞিক হবার শপথ পালন করেন তাহলেই অনেকাংশে রক্ষা করা যাবে সুজলা-সুফলা-মলয়জ-শীতল বসুন্ধরাকে।

বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রদত্ত ‘পঞ্চবর্হি’ এবং ‘সপ্তার্চ্চি’-র অনুশাসনের বিধি মেনে চলতে পারলে প্রতিরোধ করা যাবে আধিদৈবিক, আধিভৌতিক এবং আধ্যাত্মিক নামের ত্রিতাপ জ্বালার চোখ রাঙানিকে। এজন্য অনিত্য বস্তুর উপাসনাকে এড়িয়ে বা পাশ কাটিয়ে, নিত্যবস্তুর উপাসনাকে পাথেয় করতে হবে। সবাই ভালো থাকুন অন্তর্দেবতা পরমপিতার পরমাত্মিক শক্তির সাহচর্যে। বন্দে পুরুষোত্তমম্!

———-

 

 

 

 

স্বস্তিতীর্থ মহাযজ্ঞ

।। নববর্ষ পুরুষোত্তম স্বস্তিতীর্থ মহাযজ্ঞ উৎসবের শুভ সূচনার প্রেক্ষাপট ।।

নিবেদনে—তপন দাস

—————————————————————————————–

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রবর্তিত নববর্ষ পুরুষোত্তম স্বস্তিতীর্থ মহাযজ্ঞ উৎসবের শুভ সূচনার  প্রেক্ষাপট অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেকগুলি সোপান পথ অতিক্রম করতে হলো, নাহলে ঠিক স্বস্তি অনুভব করতে পারছিলাম না। তাই একটু অতীতের স্বর্ণালি স্মৃতির রোমন্থন করতে করতে গন্তব্যের দিকে এগোতে চেষ্টা করব।    

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সৃষ্ট সৎসঙ্গের ভাগবৎ আন্দোলনের প্রথম সেনাপতি ছিলেন  মহারাজ অনন্তনাথ রায়, দ্বিতীয় সেনাপতি ছিলেন ভক্তবীর কিশোরীমোহন দাস।  ১৩২১ বঙ্গাব্দের    ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, অদ্বৈত বংশধর পূজনীয় সতীশচন্দ্র গোস্বামীকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র নিজে সৎমন্ত্রে দীক্ষা দান করে  তাঁর ভাগবৎ আন্দোলনের তৃতীয়তম সেনাপতিকে যূথবদ্ধ করেন। আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামীর মাধ্যমে কুষ্টিয়া থেকে সূত্রপাত হয় বহুধাবিস্তৃত সৎসঙ্গ আন্দোলনের। কুষ্টিয়ার ধনী-মানী-জ্ঞানী-গুণী জনেরা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। বিভেদের মাঝে ঐক্য স্থাপনের লক্ষ্যে কুষ্টিয়ার ভক্তদের  শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীবুদ্ধ, প্রভু যীশু, হজরত রসুল, শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ প্রমুখ পূর্ববর্তী অবতার-বরিষ্ঠদের জন্মোৎসব পালন করতে উৎসাহিত করেন বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। ঠাকুরের নিদেশ মেনে  কুষ্টিয়ার ভক্তরা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয়  ব্যক্তিদের থেকে শুরু করে সাধারণ অনুরাগীদের শ্রদ্ধার সাথে আমন্ত্রণ জানিয়ে আলাপ-আলোচনা-কথকতা ও অন্নব্যঞ্জনাদির সেবার ব্যবস্থা করতে শুরু করেন। এইভাবে পূর্বাপূর্ব অবতার বরিষ্ঠদের জন্মোৎসব পালন করার ফলে সারা কুষ্টিয়ায় এক অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে যায়। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে শ্রদ্ধা ও প্রীতির বন্ধন গড়ে ওঠে।

         অন্তরালে থেকে ঠাকুর যে সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতি সংস্থাপনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তার কার্যকারণ বিষয়ে  আলাপ-আলোচনা করতে গিয়ে  কুষ্টিয়ার ভক্তদের  মনে একটা প্রশ্ন জাগে—তাই তো! যার নির্দেশে পূর্ব পূর্ব গুরুদের জন্মোৎসব পালন করছি, যার নির্দেশ মেনে  সমাজে প্রীতি, শান্তি ক্রম-বর্ধমান,  অথচ তাঁর—‘পূবর্তনী পূরণম্ শাশ্বত বর্তমানম্’   যিনি, সেই বর্তমান পুরুষোত্তম, যিনি সব গুরুদের গুরু—বিশ্বগুরু, তাঁর জন্মোৎসব তো পালন করা হয়নি ? এবার তাই করতে হবে। সবাই একবাক্যে রাজী। অতএব আর দেরী নয়, যেই ভাবা, সেই কাজ।   কুষ্টিয়ার ভক্তগণ ‘‘শ্রীশ্রীবিশ্বগুরু-আবির্ভাব মহামহোৎসব’’ শিরোনাম দিয়ে ২৯শে ও ৩০শে ভাদ্র ১৩২৫ বঙ্গাব্দে উৎসবের আয়োজন করেন। অগণিত দীন ও দুঃস্থদের ভোজন এবং ভোজনোত্তর ভোজন-দক্ষিণা স্বরূপ অর্থ-বস্ত্রাদি দান—সে এক অভিনব মহাযজ্ঞ সুচারুরূপে সম্পন্ন করেছিলেন কুষ্টিয়াব ভক্তবৃন্দ। কোনরূপ কোন অপ্রীতিকর ঘটনার সাক্ষী না রেখেই।

 বিশ্বগুরু উৎসবের পরের বছর থেকে অনন্ত মহারাজ  হিমাইতপুরে শুরু করেন শ্রীশ্রীঠাকুরের আবির্ভাব মহোৎসব।  ভাদ্র মাসের শুরুতেই অনন্ত মহারাজ কয়েকজন সঙ্গীসাথি নিয়ে সুমধুর কণ্ঠে কীর্তন করতে করতে গৃহস্থের দ্বারে দ্বারে যেতেন গুরুর আবির্ভাব মহোৎসবের আমন্ত্রণ জানাতে। চারজন ভক্ত কাপড়ের ভিক্ষাপাত্রের চার কোণা ধরে চলতেন। গৃহ থেকে গৃহান্তর, গ্রামান্তর—যেখানেই যেতেন সকলকেই মাতিয়ে তুলতেন প্রাণের সাড়া জাগানো উৎসবে। আনন্দের হিল্লোলে মেতে ওঠা পথচারি থেকে গৃহবাসী সকলে সাধ্যানুযায়ী টাকা-পয়সা তো দিতেনই, এমনকি অনেক মায়েরা গায়ের স্বর্ণালঙ্কার পর্যন্ত ভিক্ষাপাত্রে নিবেদন করতেন অর্ঘ্যস্বরূপ—বিশ্বগুরুর উদ্দেশ্যে।

১৩৩১ বঙ্গাব্দে  হিমাইতপুরে দোল উৎসবের সূচনা করেন অনন্ত মহারাজ। বর্তমানের হিমাইতপুরের আশ্রমে উপরোক্ত দুটো উৎসবের প্রবহমানতা বিদ্যমান।

*  *  *

       কুষ্টিয়াতে অনুষ্ঠিত ‘‘শ্রীশ্রীবিশ্বগুরু-আবির্ভাব মহামহোৎসব’’ এর পর থেকেই মূর্খ-পণ্ডিত-ধনী-নির্ধন-জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষ একে একে সমবেত হতে শুরু করেন হিমাইতপুরে। শুরু হলো লোকসংগ্রহ পর্ব। ধীরে ধীরে গড়ে উঠল সৎসঙ্গ আশ্রম। শুরু হলো কর্মযজ্ঞ।

                অখ্যাত পল্লী হিমাইতপুরে বায়ু থেকে বিদ্যুত উৎপাদন করে পরম বিস্ময় সৃষ্টি করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। গড়ে তুলেছিলেন—তপোবন ও মাতৃ বিদ্যালয়—যা শিক্ষাক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। গড়ে তুলেছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত ‘মনোমোহিনী ইনষ্টিউট অফ সায়েন্স এণ্ড টেকনোলজি’ নামের বিজ্ঞান কলেজ। কেমিক্যাল ওয়ার্কসের জীবনদায়ী ঔষধসমূহ দেশে এবং বিদেশে সমাদৃত হয়েছিল। বৈদ্যুতিক এবং যন্ত্রশিল্পের আধুনিক সব ধরণের কাজ হতো ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল ওয়ার্কসপে। যথা,–ঢালাই, ঝালাই, লেদের কাজ, ডাইস, ইলেক্ট্রোপ্লেটিং, ইলেক্ট্রিক্যাল ফিটিং, আরমেচার, ব্যাটারি প্লেট তৈরি ও মেরামত, ডায়নামো মেরামত ইত্যাদি। ছিল—ময়দার কল, আটার কল, চালের কল, তেলের কল, চিনির কল, মেডিকেটেড ওয়াটার মেশিন, স্পাইস পাউডারিং, সুতার গুটি তৈরি, টেলারিং, বোতাম তৈরি, গ্লাস ব্লোয়িং, পটারী ওয়ার্কস্, বেকারী, লজেন্স তৈরি, গ্রোসারী প্রোডাক্ট ইত্যাদির শিল্প। ছিল—কার্ডবোর্ড কারখানা, স্টীমলণ্ড্রী, কটন ইণ্ডাস্ট্রিজ, হোশিয়ারী শিল্প, ব্যাঙ্ক, ইঞ্জিনীয়ারিং ওয়ার্কস্, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র, স্বাস্থ্য বিভাগ, গৃহনির্মাণ বিভাগ, কলাকেন্দ্র, প্রেস (যেখানে বাংলা, হিন্দী, সংস্কৃত, উর্দু, আরবী, ফারসী হরফের কাজ হতো, দেশ ভাগের পর পাকিস্তান সরকার জবরদখল করে ঢাকাতে নিয়ে যায়।), পাব্লিশিং হাউস, ফিলানথ্রপি, মাতৃসঙ্ঘ ইত্যাদি।

       হিমাইতপুর আশ্রম ছিল সর্বতোমুখী জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান। শুধু আশ্রমবাসীরাই নয়, ঠাকুরের আদর্শে দীক্ষিত ছিলেন না, তারাও জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায়-ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে সকলেই আশ্রমের সব প্রতিষ্ঠানের সুলভ সেবা পেতেন।    আশেপাশের সব গ্রামের মানুষেরা জানতো, অনুকূল ঠাকুর নামে একজন ফেরেস্তা আছে, যে আমাদের আপদে-বিপদে সহায় হয়, মায়ের মতো আগলে রাখে।

।। হিমাইতপুর থেকে দেওঘরে আগমনের প্রেক্ষাপট ।।

পরিবেশের জন্য এতকিছু করা সত্বেও  আশ্রমের ভেতরে-বাইরে উপকৃত মানুষেরাই ঠাকুরের সাথে শত্রুতা করেই চলেছিল, এমনকি ঠাকুরকে অপহরণ করতে চেয়েছিল, বিষ প্রয়োগ করে মারতেও চেয়েছিল।  খুন হয় আশ্রমের কর্মী, তপোবনের ছাত্র। পিতৃ-বিয়োগ, দেশবন্ধু-বিয়োগ, কন্যা-বিয়োগ, মাতৃ-বিয়োগ, আবাল্যের সাথী নফর ঘোষ, অনন্ত মহারাজ, কিশোরীমোহন-দের বিয়োগ-ব্যথায় ব্যথাহারী হলেন ব্যথিত।  ১৩৫৩ সালের প্রথম দিকে মুসলিম লীগের  ‘ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে’ ঘোষিত হবার সাথে সাথে কলকাতায় যে পৈশাচিক হত্যালীলা হয়েছিল সে সংবাদ শুনে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন ঠাকুর।  দেশ-নেতাদের আগাম সতর্ক করা সত্ত্বেও, প্রতিরোধী-ব্যবস্থাপত্র দেওয়া সত্ত্বেও তাঁরা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি।  বিপন্ন দেশবাসীদের রক্ষা করতে না পারার বেদনায় বিপর্যস্ত তিনি।  বেড়ে গেল রক্তচাপ, হয়ে পড়লেন অসুস্থ।  খবর শুনে পাবনার বিশিষ্ট মুসলমান নেতৃবৃন্দ ঠাকুরকে দেখতে আসেন, পাবনায় সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াতে দেবেন না বলে আশ্বস্ত করেন।  একটু সুস্থ বোধ করেন, আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন।  ঠাকুরের প্রিয় কলকাতার বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ গুপ্ত প্রয়োজনীয় ঔষধ এবং সম্পূর্ণ বিশ্রামের ব্যবস্থাপত্র দিয়ে যান।  বাঁধের ধারে নিভৃত নিবাসের মনোরম পরিবেশে ঠাকুরের বিশ্রামের ব্যবস্থা করেন ঋত্বিগাচার্য্য।  চাপমুক্ত রাখতে দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষেধ করে দেন।  কিন্তু ঠাকুর রাজী হন না।  মনের কথা, প্রাণের ব্যথা নিয়ে যারা যারা আসবে, তাদের তিনি কিছুতেই ফেরাতে নারাজ।  আগন্তুকদের দুঃখ-বেদনার কথা শুনতে শুনতে আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন।  সংবাদ পেয়ে ডাঃ গুপ্ত আসেন, ঠাকুরকে দূরে কোথাও বায়ু পরিবর্তনের জন্য নিয়ে যাবার পরামর্শ দেন।    

অবশেষে আশ্রম কর্তৃপক্ষ শ্রীশ্রীঠাকুরকে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।  ঠাকুর বিহার প্রদেশের দেওঘরে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।  

১৯৪৬ খ্রীষ্টাব্দের ১লা সেপ্টেম্বর হিমাইতপুর আশ্রম থেকে যাত্রা শুরু করে ২রা সেপ্টেম্বর বেলা ১০টা নাগাদ শ্রীশ্রীঠাকুর  বৈদ্যনাথধাম স্টেশনে পৌঁছলেন।

 ১৯৪৬ সালের জুলাই মাসে  হিমাইতপুরে অনুষ্ঠিত বর্ষাকালীন ঋত্বিক-অধিবেশনে  

 ১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসে  খুলনা শহরে শ্রীশ্রীঠাকুরের জন্মোৎসব সাড়ম্বরে উদযাপনের

জন্য কর্ম্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছিল। শ্রীশ্রীঠাকুর দেওঘরে চলে আসার কারণে এবং দেশের তৎকালীন বীভৎস সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির কথা চিন্তা ক’রে ঐ  উৎসব বন্ধ রাখা হয়েছিল।

পরিবর্তে ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে দেওঘরে উৎসবের আয়োজন করা হয়। রেলওয়ে গুমটির কাছে বিশাল তোরন-দ্বার নির্মিত হয়। যাত্রাপালা, কীর্তন, আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। শ্রীশ্রীঠাকুরের প্রতিকৃতি নিয়ে কীর্তন করতে করতে পবিত্র বৈদ্যনাথ ধামের নগর পরিক্রমা করেন সমাগত ভক্তবৃন্দের দল। সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল, উৎসবের তৃতীয় দিনে কিছু দুর্বৃত্তরা তোরন-দ্বারে অগ্নি সংযোগ করে, বড়াল বাংলোর অভ্যন্তরে অনুষ্ঠিত যাত্রাগানের সময় একদল দুর্বৃত্ত সৎসঙ্গীদের মারতে শুরু করে। আশু ভট্টাচার্য্য নামক একজন সৎসঙ্গী, গুণ্ডাদের পায়ে ধরে অনুনয়-বিনয় করলেও তারা নিরস্ত হয় না, লাথি মেরে ওই ভক্তকে  অজ্ঞান করে দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে অসৎনিরোধী তৎপর সৎসঙ্গী যুবকবৃন্দ প্রতিরোধ করতে এগিয়ে এলে দুর্বৃত্তের দল প্রাচীর টপকে পালাতে শুরু করে। পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পুলিস কয়েকজনকে অ্যারেস্ট করেন।  খবর পেয়ে পাণ্ডাপাড়া থেকে সম্মানীয় ডাকুবাবু কয়েকজন হিতৈষীদের সাথে নিয়ে আসেন। অরাজকতা কেটে গিয়ে শান্ত হয় পরিবেশ। পরবর্তী দিনে বৈদ্যনাথধামের পাণ্ডারাও উৎসবে যোগদান করে কীর্তন পরিবেশন করেছিলেন। 

(সূত্রঃ শ্রীমৎ আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী ও সৎসঙ্গ আন্দোলন।)  

১৯৪৭ খৃষ্টাব্দের  ১৫ই আগস্ট ভারত স্বাধীন হ’ল। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত দ্বিখণ্ডিত হ’ল। শুরু হ’ল উদ্বাস্তু সমস্যা। নোয়াখালির দাঙ্গার পরই পূর্ববঙ্গের সংখ্যালঘু

হিন্দুরা নিরাপত্তার অভাব বোধ করে আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। ভারত বিভাগের পর জলস্রোতের মতো জনস্রোত বইতে লাগল পশ্চিমবঙ্গের দিকে। দেওঘরেও এসে তার ধাক্কা লাগে। শ্রীশ্রীঠাকুর সাধ্যমত সকলের বাসস্থান এবং অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা করেন। কোন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বা সরকারের কাছ থেকে সাহায্য না নিয়ে তিনি হাজার-হাজার উদ্বাস্তুর পূনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন।

১৬ই, ১৭ই ও ১৮ই সেপ্টেম্বর ১৯৪৯ তিনদিনব্যাপী মহাসমারোহে শ্রীশ্রীঠাকুরের ৬২তম

জন্মোৎসব অনুষ্ঠিত হয় কলকাতার শ্রদ্ধানন্দ পার্কে। ডঃ রাধাকুমুদ

মুখোপাধ্যায়, ব্যারিস্টার নিৰ্ম্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গের

তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী শ্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন প্রমুখ ভাষণ দেন। এই উপলক্ষে

কোলকাতার রাজপথে বিরাট শোভাযাত্রা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

পরের বছর ১৬ই ও ১৭ই সেপ্টেম্বর (১৯৫০) কোলকাতার ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হ’লে

শ্রীশ্রীঠাকুরের ৬৩তম জন্মোৎসব সাড়ম্বরে উদ্যাপিত হয়। উৎসবের উদ্বোধনী ভাষণে

স্বনামধন্য নেতা ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলেন—‘শ্রীশ্রীঠাকুরের সাধনার

ক্ষেত্র পাবনা আশ্রম আজ পাকিস্তানভুক্ত। আশ্রম নষ্ট হ’লেও তাঁর জীবনী ও বাণী

বর্তমান ও ভবিষ্যৎ মানব-সমাজকে পথ দেখাবে। তিনি যে মানুষ গঠনের কাজে

আত্মনিয়োগ করেছেন তা ফলবতী হবেই। জাতীয় জীবনকে সুস্থ, সুন্দর ও সুষ্ঠু ক’রে

তুলতে হলে সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলি ধর্ম্মের ভিত্তিতে সমাধান

হওয়া উচিত এবং শ্রীশ্রীঠাকুর সেই কাজেই আত্মনিয়োগ করেছেন। তিনি জঙ্গলের

সন্ন্যাসী সৃষ্টি করেননি, বরং সংসারী হ’য়ে কেমন ক’রে যথার্থ জনকল্যাণ করা

যায়। তিনি তার আদর্শ দেখিয়েছেন।’ (মহামানবের সাগরতীরে, ১ম খণ্ড)

১৩৬০ বঙ্গাব্দের ১৪ই পৌষ থেকে ১৭ই পৌষ, (২৯ ডিসেম্বর ১৯৫৩ থেকে ১লা জানুয়ারি ১৯৫৪) বৈদ্যনাথ ধামের সৎসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ৬৩তম ঋত্বিক সম্মেলন। উক্ত সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়, আগামী ৬৪তম ঋত্বিক-অধিবেশনের সঙ্গে “নববর্ষ পুরুষোত্তম স্বস্তিতীর্থ মহাযজ্ঞ”

অনুষ্ঠিত হবে।   ওই মহাযজ্ঞ সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য বিভিন্ন

বিভাগের দায়িত্বভার দিয়ে একটি কেন্দ্রীয় কর্মী পরিষদ গঠন করা হয়েছিল।  কর্মী

পরিষদে ছিলেন সৎসঙ্গ আন্দোলনের প্রাতঃ-স্মরণীয় ভক্ত-পার্ষদবৃন্দ।  পূজনীয় ও বরেণ্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচাৰ্য্য, সুশীলচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র হালদার, সুধীরকুমার বসু, অশোক চক্রবর্তী, নরেন্দ্রনাথ মিত্র,

যতীন্দ্রনাথ দাস, চুনীলাল রায়চৌধুরী, রাজেন্দ্রনাথ মজুমদার, বীরেন্দ্রলাল মিত্র, ননীগোপাল চক্রবর্তী, শৈলেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, হরিনন্দন প্রসাদ, বৈকুণ্ঠপ্রসাদ সিং, কিশোরীলাল চৌধুরী, স্মরজিৎ ঘোষ, অমূল্যকুমার ঘোষ, বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়, অজয়কুমার গঙ্গোপাধ্যায়, মনোরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়, সুধীরকুমার সমাজদার, নিরাপদ পাণ্ডে, বীরেন্দ্রনাথ পাণ্ডে, নলিনীপ্রসাদ গুহ, দোবেজী, ইন্দ্ৰকান্ত শর্ম্মা, কিরণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, জ্ঞানেন্দ্রমোহন চৌধুরী প্রমুখ ভক্তবৃন্দের ওপর বিভিন্ন বিভাগের ভার দেওয়া হয়।

শান্ত-গম্ভীর পবিত্র পরিবেশে, বিপুল বিদগ্ধ জনসমাবেশে পুণ্যতীর্থ বৈদ্যনাথধামের

একান্তে সৎসঙ্গ আশ্রমে আতঙ্কগ্রস্ত বিশ্বজনের সর্ব্বাঙ্গীণ এবং সর্ব্বোত্তম

স্বস্তিপ্রয়াসে ২৮শে চৈত্র, ১৩৬০ শুভ রামনবমী দিবস থেকে শুভারম্ভ হয় উৎসবের। সমাপ্ত হয় ৭ই

বৈশাখ, ১৩৬১তে—(১১ই এপ্রিল থেকে ২০শে এপ্রিল, ১৯৫৪) পর্য্যন্ত।  

       ভারতীয় কৃষ্টিতে প্রত্যয়বান জীবন-প্রয়াসী লক্ষাধিক নরনারী বিভিন্ন রাজ্য এবং ভারতের

বিভিন্ন নগর ও প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে বাস, লরি ও স্পেশাল ট্রেনযোগে এসে সম্মিলিত হন মহা-মহোৎসবে।

       সমাগত ভক্তদের আশ্রয়ের জন্য অনেক অস্থায়ী প্যাণ্ডেল নির্মাণ করা হয়। পাম্পের সাহায্যে দারোয়া নদীর তলদেশ থেকে পাম্প, ইঞ্জিন ও পাইপের সাহায্যে বিশুদ্ধ জলের প্রচুর সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। ট্রলির সাহায্যে দ্রুত স্বাদু ও স্বাস্থ্যসম্মত আহার্য্য পরিবেশিত হয়

আনন্দবাজারে। স্বস্তিসেবকগণের সুশৃঙ্খল নিয়মানুবর্তিতার অনুশাসনে,  অতন্দ্র প্রহরায়, সমাগত ভক্তজন নিরুপদ্রবে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করেন। অস্থায়ীভাবে স্থাপন করা হয় অনুসন্ধান কেন্দ্র, সাহায্য কেন্দ্র, প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র ও হাসপাতাল। সঙ্গীত, কীর্তন, নাটক, আলোচনা সভায় মুখরিত থাকে উৎসব প্রাঙ্গন।

ওই দশদিনব্যাপী মহাযজ্ঞের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভাষণ দান করেছিলেন তৎকালীন বরেণ্য বিদগ্ধজনেরা।  অধ্যাপক অতুলচন্দ্র সেন, অধ্যক্ষ রামদীন পাণ্ডে, ডাঃ রামচন্দ্র অধিকারী, ডঃ মাখনলাল রায়চৌধুরী, রাধারমণ চৌধুরী, অধ্যাপক রেজাউল করিম, মন্ত্রী বিনোদানন্দ ঝা, ভিক্ষু শীলভদ্র, অধ্যাপক ত্রিপুরারি চক্রবর্তী, অধ্যাপক ছেদীলাল শাস্ত্রী, শ্রীযুক্তা প্রভাবতী দেবী সরস্বতী, ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সম্পাদক  শ্রীজ্যোতিষচন্দ্র গুহ প্রমুখ জ্ঞানীগুণীবৃন্দ।

ওই মহোৎসবের সাফল্য কামনা ক’রে শুভেচ্ছাবার্তা জানিয়েছিলেন তৎকালিন

ভারতের উপরাষ্ট্রপতি ডঃ সর্ব্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ, ভারতীয় সংসদের ডেপুটি

স্পীকার শ্রীঅনন্তশয়নম আয়েঙ্গার, বিহারের রাজ্যপাল শ্রীরঙ্গনাথ দিবাকর,

পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল ডঃ হরেন্দ্রনাথ মুখার্জি, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের

ভাইস-চ্যান্সেলর ডঃ জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সভাপতি

শ্রীঅপূর্ব্বকুমার চন্দ, ওড়িশার জননায়ক শ্রীহরেকৃষ্ণ মহতাব, আসামের

অর্থমন্ত্রী শ্রীমতিরাম বোরা, ওড়িশার শিক্ষা ও অর্থমন্ত্রী শ্রীরাধানাথ রথ,

পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি শ্রীঅতুল্য ঘোষ, বোম্বাইয়ের মুখ্যমন্ত্রী

শ্রীমোরারজী দেশাই, পশ্চিমবঙ্গের উপমন্ত্রী শ্রীতরুণকান্তি ঘোষ প্রমুখ সম্মানীয় ব্যক্তিবর্গ।

২৮শে চৈত্র, ১৩৬০, (১১ এপ্রিল ১৯৫৪) উৎসবের প্রথম দিন শুভ রামনবমী তিথির অপরাহ্ণে অনুষ্ঠিত সাধারণ-সভায় সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক শ্রীঅতুলচন্দ্র সেন। প্রধান অতিথির আসন

অলঙ্কৃত করেন অধ্যক্ষ শ্রীরামদীন পাণ্ডে। সভাপতির অভিভাষণে শ্রীযুত সেন বলেন – “

এখানে এসে প্রাতঃকালে শ্রবণ করেছি ‘বন্দে পুরুষোত্তমম্’ ধ্বনি। এই তো ভারতের শাশ্বত

বন্দনা-ধ্বনি। রক্তমাংসের শরীরে যখন পরমব্রহ্ম অবতরণ করেন তখন এক পরমাশ্চর্য্য

লীলা দৃষ্ট হয়। সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের জীবন সুস্থ সবল ও সুন্দর হওয়াই

শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শের মর্ম্মকথা। এমনি একদিন আসতে পারে যেদিন সৎসঙ্গীদের

আচরণশীল চলনে সারা পৃথিবীতে এই ভাবরধারার প্লাবন আসবে।”

দ্বিতীয় দিন তিনটি অনুষ্ঠান সাফল্যের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয়

স্বাস্থ্য-প্রদর্শনী উপলক্ষে তরুণ সৎসঙ্গী বালকগণের খেলাধূলার অনুষ্ঠানে

পৌরোহিত্য করেন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সেক্রেটারী শ্রীজ্যোতিষচন্দ্র গুহ। অপর

একটি অনুষ্ঠানে জাতীয় জীবনে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যচর্চা

সম্পর্কে ডাঃ রামচন্দ্র অধিকারী জাতি ও জাতীয়তার সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করে

পারিবারিক ও ব্যক্তি-জীবনের স্বাস্থ্য কিভাবে রক্ষা করা যায় সেই বিষয়ে আলোকসম্পাত করেন।

তৃতীয় দিনের অপরাহ্ণের সাধারণ সভায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক কালচার বিভাগের

প্রধান ডঃ মাখনলাল রায়চৌধুরী সুফী মতবাদ সম্বন্ধে আলোচনা করেন। এছাড়া

ঋত্বিগাচাৰ্য্য শ্রীকৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যের পৌরোহিত্যে ধর্ম্ম ও

বিজ্ঞানের নিগূঢ় সম্বন্ধ ও সংহতি বিষয়ে এবং শ্রীযতীন্দ্রনাথ দাসের

সভাপতিত্বে দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান এবং তার উন্নয়নে সৎসঙ্গের অবদান বিষয়ে

দুইটি সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

চতুর্থ দিন (১লা বৈশাখ, ১৩৬১) সকাল সাতটায় যতি-আশ্রমের সম্মুখের মাঠে পঞ্চাশ

হাজারেরও বেশি নরনারী সমবেত হয়েছেন। ঠিক সাতটায় প্রার্থনা আরম্ভ হ’ল।

যতি-আশ্রমের বারান্দা থেকে মাইকযোগে আহ্বানী দিলেন ঋত্বিগাচার্য

শ্রীকৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য। তারপরেই সেই বিশাল জনসঙ্ঘের সমাগত কণ্ঠের

উচ্চারিত প্রার্থনামন্ত্র মেঘমন্দ্র ধ্বনিতে ব্যোম স্পর্শ করল। প্রার্থনাস্তে

শ্রীশ্রীঠাকুরের আশীর্ব্বাণী পাঠ করলেন ঋত্বিগাচার্য্যদেব।

আশিস-বাণীতে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন—

আজ নবীন বৎসরের জন্মদিন,

     নবীন দীপনা নিয়ে বর্ষ নবীন রূপে

  দুনিয়ার বুকে উদ্ভাসিত হ’য়ে উঠলো,

জন্ম নিল–-সবিতার ভাস্বর-দীপনায়

আত্মবিকাশ ক’রে;

প্রভাতের মলয়-হিল্লোল

    দীপন দ্যোতনায়

       স্মিত-গৌরব-উজ্জ্বলতা নিয়ে

তমসার বক্ষ বিদীর্ণ ক’রে

নবীন স্পন্দনায়, উচ্ছল উজ্জ্বলায়

আবির্ভূত হ’য়ে উঠলো—

স্বাগতম্-কিরণ-স্পন্দনে

    স্বস্তি-অনুকম্পী যাগ-তীর্থের

         দ্যোতন দোলায় হেলে-দুলে

  নৰ্ত্তন-হিল্লোলে দেব-প্রভায় উদ্দাম হ’য়ে ; …..

যিনি আমার একান্ত,

    যিনি আমার প্রিয়পরম,

        যিনি আমার পরমপিতা পরমেশ্বর

     তাঁর চরণে একান্ত প্ৰাৰ্থনা—

 তোমরা সুখে থাক,

স্বস্তির অধিকারী হও,

নির্ব্বাধি হও, চিরায়ু নিয়ে বেঁচে থাক—

               তোমাদের যা-কিছু সব নিয়ে ;

অনুশাসন-অনুসরণ

 তোমাদিগকে স্বস্তির অধিকারী ক’রে তুলুক,

    সম্বৰ্দ্ধনার অধিকারী ক’রে তুলুক,

সমীচীন অনুচলন

 তোমাদিগকে সাধু ক’রে তুলুক—

     সুনিষ্পাদনী অভিসার-অনুদীপনায় ;

আর, স্বস্তি, শান্তি ও স্বধা

     তোমাদের সত্তায় অন্বিত হয়ে

    প্রিয়-পরমে স্বার্থক হ’য়ে উঠুক—

 পুরুষোত্তম-পরিবেদনায় ;

বল—‘বন্দে পুরুষোত্তমম্’

আবার বল—‘বন্দে পুরুষোত্তমম্

আকণ্ঠ ঘোষণায় বল—‘বন্দে পুরুষোত্তমম্।

আশীর্ব্বাণী পাঠান্তে অর্ঘ্যাঞ্জলিসহ প্রণাম নিবেদন করেন সমবেত ভক্তজনমণ্ডলী। সমাপন হয় প্রাতঃকালীন অনুষ্ঠান।

অপরাহ্ণে প্যান্ডেলে ঋত্বিগাচার্য্যদেবের পরিচালনায় ঋত্বিক-সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

সন্ধ্যায় প্রবর্তক-সম্পাদক শ্রীরাধারমণ চৌধুরী মহোদয়ের সভাপতিত্বে এক বিশাল

জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। নির্ধারিত আলোচ্য বিষয় ছিল—শ্রীশ্রীঠাকুরের দিব্য জীবন ও বাণী। সভাপতির ভাষণে শ্রীযুত চৌধুরী বলেন— “গত চল্লিশ বছর ধরে আমি শ্রীশ্রীঠাকুরকে জানি। সেইজন্যই এই বিশাল জনতা শ্রীশ্রীঠাকুরের জন্য যে গভীর প্রেম হৃদয়ে বহন করেন এবং

সৎসঙ্গের জন্য তাদের যে আগ্রহ ও উৎসাহ তা আমি ভালভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারি।

শ্রীশ্রীঠাকুর যে ভাগবতকার্য্যের জন্য অবতীর্ণ হয়েছেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই।”

পঞ্চম দিবসের (২রা বৈশাখ, ১৩৬১) সন্ধ্যায় শিক্ষা-সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সৎ-

সঙ্গের সহ-সভাপতি শ্রীসুশীলচন্দ্র বসু।

৬ষ্ঠ দিবসের সাধারণসভায় সভাপতিত্ব করেন অবসরপ্রাপ্ত সাব-জজ শ্রীশচীন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। প্রধান অতিথি ছিলেন  অধ্যাপক শ্রীরেজাউল করিম। ভাষণ-প্রসঙ্গে অধ্যাপক করিম বলেন — “বর্তমানে বিশ্ব বিজ্ঞানসৃষ্ট এক আগ্নেয়গিরির উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই নিদারুণ আশঙ্কার মধ্যেও আনন্দের বিষয় যে, বিশ্বসভ্যতায় বিশ্বমানবের রক্ষাকল্পে নূতন নেতৃত্ব,

নূতন চিন্তাধারা দেখা দিয়েছে। ত্রাণকর্তার আবির্ভাবে বিশ্বাসী সৎসঙ্গের এই

বিশাল জনগণ সেই নূতন চিন্তাধারার প্রতীক। এই বিশ্বাসী জনগণের প্রবল শক্তিতে

একদিন অশুভ নাশ হবে এবং শয়তানের উপর জীবনদেবতা জয়লাভ করবেনই।”

৭ম দিবসে (১৭ই এপ্রিল, ১৯৫৪) সন্ধ্যায় জননেতা শ্রীবিনোদানন্দ ঝার সভাপতিত্বে

জনসভা হয়।

 তৎপর দিন (৮ম দিবস) অধ্যাপক শ্রীরেজাউল করিমের সভাপতিত্বে সাধারণ

সভা হয়। প্রধান অতিথির আসন গ্রহণ করেন মহাবোধি সোসাইটির ভিক্ষু শীলভদ্র।

সভাপতির ভাষণে অধ্যাপক করিম বলেন—“আমি গতকাল শ্রীশ্রীঠাকুরকে দেখেছি, তাঁর

সঙ্গে আলাপ করেছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস হ’ল যে, বিশ্বের পীড়িত মানুষের জন্য

তাঁর করুণা এবং কৰ্ম্ম আগামী সহস্র-সহস্র বৎসর তাঁকে প্রাতঃস্মরণীয় করে

রাখবে তাতে কোনও সন্দেহ নাই।”

সর্ব্বধর্ম সমন্বয় সম্বন্ধে অধ্যাপক করিম বলেন— “শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকুলচন্দ্রই

সমন্বয়ের মূর্ত প্রতীক। তাঁর প্রবর্তিত নীতি প্রেম, শান্তি ও সুস্থ পরিবেশ

সর্ব্বকালের এবং সর্ব্বলোকের জীবনবিকাশের অনুকূল। এই নীতিই যুগে-যুগে বিভিন্ন

অবতারগণ প্রবর্তন ক’রে গেছেন।”

উৎসবের নবম দিবসে (৬ই বৈশাখ, ১৩৬১, ১৯শে এপ্রিল, ১৯৫৪) সন্ধ্যায় শ্রীযুক্তা

প্রভাবতী দেবী সরস্বতীর সভানেত্রীত্বে এক জনসভা হয়। আলোচ্য বিষয় ছিল—নারী-বৈশিষ্ট্যের জাগরণে সৎসঙ্গ আন্দোলন। সভানেত্রীর ভাষণে শ্রীযুক্তা সরস্বতী বলেন—“শ্রীশ্রীঠাকুরের সঙ্গে তাঁর এই প্রথম দর্শন তাঁর জীবনের এক বিরাট ও মহৎ অভিজ্ঞতা। এই বিরাট ও গভীর ভাবের সন্নিকটে এসে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। যে মহৎ কাজের ভার এই মহামানব গ্রহণ করেছেন তা আমার ধারণারও অতীত। তিনি আমাদের সমস্ত দৃষ্টিভঙ্গী ও জীবনধারার এক আমূল পরিবর্তন আনতে চান। আর্য্যকৃষ্টির ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে তিনি এই জাতিকে পুনর্গঠিত করতে চান।”

৭ই বৈশাখ, ২০শে এপ্রিল দশদিনব্যাপী নববর্ষ পুরুষোত্তম স্বস্তিতীর্থ মহাযজ্ঞের

সমাপ্তি দিবস। এই দিনের সান্ধ্যসভায় সভাপতিত্ব করেন সৎসঙ্গের সহ-সভাপতি

শ্রীসুশীলচন্দ্র বসু। অধ্যাপক শ্রীত্রিপুরারি চক্রবর্তী, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক রেজাউল করিম প্রমুখ ভাষণ দেন। এরপর মহাযজ্ঞের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

এই বিরাট মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠানের ফলে কৰ্ম্মীগণ বিশেষভাবে উদ্দীপিত হয়ে ওঠেন।

শ্রীশ্রীঠাকুরের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ নিয়ে তাঁরা নবীন প্রেরণায়

আবার কৰ্ম্মসাগরে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এবারে পাঞ্জাধারী কর্ম্মীর এবং দীক্ষিতের

সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পায়। (সূত্রঃ মহামানবের সাগরতীরে, ১ম খণ্ড)

* * *

নিত্যপাঠ্য চলার সাথী গ্রন্থের ‘উৎসব’ নিবন্ধে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন :

“যে-প্রচেষ্টার ডাকে জনসাধারণ উৎফুল্ল আনন্দের সহিত জ্ঞানে সমৃদ্ধ হইয়া,

নিজেকে প্রাণনে, ব্যাপনে ও বর্ধনে নিয়ন্ত্রিত করিতে পারে এমনতর মঙ্গলপ্রসূ

অভিসমাগমকেই উৎসব বলে! ৩০৪”

       এখানে  তিনটি শব্দ প্রণিধানযোগ্য। “প্রাণনে, ব্যাপনে ও বর্দ্ধনে”

নিয়ন্ত্রিত হবার কথা বলা হয়েছে।

        এ নিয়ন্ত্রণ প্রাকৃতিকভাবে স্বতঃ-নিয়ন্ত্রিত। বীজ ও রজো  বা sperm &

ovum-এর দুটি অর্ধ-কোষ (22 autosome + x or x/y sex chromosome=44xx or xy)

মিলে প্রথমে একটা কোষের সৃষ্টি হয়। ক্রমে  “প্রাণনে, ব্যাপনে ও বর্দ্ধনে”

নিয়ন্ত্রিত হবার বিধি মেনে কোষ বিভাজনের মাধ্যমে এক থেকে বহুতে পরিণত হতে

শুরু হয়।  বিধিবৎ নিয়ন্ত্রিত হলে ১০ চান্দ্র মাসে পূর্ণতা পায়। এভাবেই সৃষ্টি

হয় আমাদের মানবদেহ—“প্রাণনে, ব্যাপনে ও বর্দ্ধনে”।  এরমধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে

ধর্মের মূল তত্ত্ব ও তথ্য—“অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম বলে জানিস তাকে।” 

প্রাণ সৃজনের বিধি বিন্যাসের ন্যায়, যে সমাবেশ থেকে মানুষ নিজের প্রবৃত্তি

নিয়ন্ত্রণ করে সত্তার পথে চলতে অভ্যস্ত হয় তার নাম উৎসব। যা’ আমাদের প্রতিনিয়ত

অভ্যাস করে যেতে হবে। 

      শব্দার্থ অনুযায়ী উৎকৃষ্ট প্রসব করে যা’ তার নাম উৎসব, যা’তে আমাদের

আমিগুলোর উৎসকে, সহজাত-সংস্কারকে আরোতর উৎকৃষ্ট ভাবে সংরক্ষণ করতে পারি।

উৎসবের উদ্দেশ্য ব্যাপক যাজন, আর যাজন মানে ইষ্টানুগ বিধিতে সবাইকে জীবনে

অধিষ্ঠিত করা। যজন অনুশীলন মাধ্যমে আমি নিজে যদি ইষ্টানুগ বিধিতে জীবনে

অধিষ্ঠিত না হতে পারি, তাহলে প্রবৃত্তি পরিপোষণে আমি যা হয়েছি উৎসবের নামে তার যাজনই করব।                    

শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন, “উৎসব-সম্বন্ধে আমার idea (ধারণা) ছিল—উৎসবে বক্তৃতা হবে, হোম হবে। হোতা, অধ্বর্য্যু, উদ্‌গাতা ইত্যাদি থাকবে। আপনারা এক-এক দল এক-এক জায়গায় বসবেন। আলাপ-আলোচনা করবেন। লোকসমাগম হবে। Educational exhibition (শিক্ষামূলক

প্রদর্শনী) হবে, শিক্ষামূলক সিনেমা হবে। যে কয়দিন উৎসব করবেন তাতে মানুষ

educated (শিক্ষিত) হবে। মানুষকে উচ্চল চলনে শিক্ষিত করে তোলাই উৎসবের

উদ্দেশ্য। উৎসব মানুষকে উৎসমুখী উৎসৃজনের দিকে নিয়ে যাবে। আপনারা এক একজনে

উৎসবের হোতা হবেন।” (শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, ২৬. ০৪. ১৯৫১, আলোচনা প্রসঙ্গে-২০)

       আমরা সকলে মিলে শ্রীশ্রীঠাকুরের ঈপ্সিত উৎসবের হোতা হবার অনুশীলনে যেন সার্থক হতে পারি। প্রার্থনা জানাই পরমপিতার উদ্দেশ্যে। জয়গুরু। সবাই ভালো থাকবেন। বন্দে পুরুষোত্তমম্!

                                  —————-   

 তথ্যঋণ :

১. বরেণ্য ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থ।

২. শ্রীসচ্চিদানন্দ গোস্বামী প্রণীত, ‘আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী ও সৎসঙ্গ আন্দোলন’।

৩. শ্রীনাথ প্রণীত ‘যেমন তাঁকে দেখি’।

 ৪. শ্রীকুমারকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য প্রণীত ‘মহামানবের সাগরতীরে’, ১ম খণ্ড।

আত্মসমীক্ষা

আত্মসমীক্ষা
নিবেদনে—তপন দাস
[ভালোই সব চলছিল। সৎসঙ্গ নিয়ে বেশ আনন্দেই ছিলাম। হঠাৎ তালটা যেন কেটে গেল। দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রম থেকে প্রকাশিত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র লিখিত ‘সত্যানুসরণ’ নামক গ্রন্থের ৪৫তম সংস্করণের ৬৫তম পাতার প্রথম অনুচ্ছেদের বাণীর উপদেশটা আমাকে বেশ বিপাকে ফেলে দিয়েছে। আমার নাম দিবাকর বৈদ্য। আমি অকপটে সব ‘খ্যাপন’ করলাম। দয়া করে আমার কথাগুলো একটু শুনবেন। বলা যায় না, আপনাদেরও কাজে লেগে যেতে পারে।]
* * *
একজন দাদা, নাম অনিমেষ চৌধুরী। দেখা হলেই ‘জয়গুরু’ দিয়ে সম্ভাষণ করেন। ভালো-মন্দ খোঁজখবর নেন। মাঝে-মাঝে ঠাকুরের কথা বলেন। বাড়িতে যেতে বলেন। একদিন সন্ধ্যা-প্রার্থনার আগে ওঁর বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। ভাবলাম, ওনার বাড়ীতেই না-হয় আজকের প্রার্থনাটা করে নেব। উনি দু’জন মা’কে নিয়ে বসে তখন ধ্যান করছিলেন। পরে জেনেছিলাম ওই দু-জনা ছিলেন ওঁর স্ত্রী ও কন্যা। সামনে ঠাকুরের একটা মাত্র প্রতিকৃতি। আমার উপস্থিতি বুঝতে পেরে বসতে বললেন। অনিচ্ছা সত্বেও বসলাম। অনিচ্ছা সত্বেও বলতে বাধ্য হলাম, কারণ, ওনার বাড়িতে ঠাকুরের ফটো ছাড়া জগজ্জননী বড়মা, শ্রীশ্রীবড়দা, আচার্য্যদেব শ্রীশ্রীদাদা, পূজ্যপাদ বাবাইদা, পূজ্যপাদ অবিনবাবু-দের কোন ছবি নেই। যা’— কিছুতেই যেন মেনে নিতে পারছিলাম না। আচার্য্য-পরম্পরাকে যে বা যারা মানে না, তারা ‘ইষ্টদ্রোহী’, আমি তাদের সঙ্গ সবসময় এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। তেমন শিক্ষাই পেয়েছি আমাদের ঋত্বিক দাদাদের কাছ থেকে। নতুন পরিচয়, তাই আগে থেকে বুঝতে পারিনি, যে দাদাটি ইষ্টদ্রোহী। আচার্য্য-পরম্পরা মানে না। মনে যাইহোক, ভদ্রতার খাতিরে মুখে বললাম, দাদা, সময় তো পার হয়ে গেল, প্রার্থনা করবেন না।
—‘এই তো করবো।’ বলেই উঠে দাঁড়ালেন।
পাশে বসে থাকা মায়েদের দিকে ইশারা করতেই শঙ্খধ্বনি, হুলুধ্বনি বেজে উঠল। অমনি দাদাটি ডান হাতটি উপরে তুলে, বাম হাতটিকে ঝুলন্ত রেখে কিসব বলতে লাগল। সবটা মনে নেই। তবে প্রথমদিকের শব্দগুলো— তমসার পার অচ্ছেদ্যবর্ণ মহান পুরুষ … গোছের এইরকম কিছু। (যা আমাদের উপাসনা বইতে লেখা আছে দেখেছি।) তারপর প্রার্থনা শুরু করলেন। প্রথম দুটো বিনতির পর ‘গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু’ না করে আবার কীসব বলতে শুরু করলেন। বাংলা আর সংস্কৃতে। তারপর শুরু করলেন ‘গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু’। তারপর আবার কতগুলো সংস্কৃত মন্ত্র আওড়াতে লাগলেন।—যা আমি কোনদিন কোন সৎসঙ্গ অধিবেশনে করতে দেখিনি। আমার ধৈর্য্যের, রাগের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছিল। তবুও কৌতুহল বশে নিজেকে সংযত করে নিলাম। ওনার মনগড়া প্রার্থনা শেষে আমাকে সত্যানুসরণ-এর একটি নির্দিষ্ট অংশ থেকে পাঠ করতে বললেন, আমি পাঠ করলাম—‘‘কোন-কিছু ‘আজ বুঝেছি আবার কাল বুঝা যায় না—হেঁয়ালি’ ইত্যাদি ব’লে শৃগাল সেজো না—কারণ, ইতর জন্তুরাও যা’ বোঝে তা’ ভোলে না। তাই, এই প্রকার বলাটাই দুষ্ট বা অস্থির-বুদ্ধির পরিচায়ক।’’
আমার পড়া শেষ হতেই উনি ‘চলার সাথী’ গ্রন্থ থেকে ‘সন্ধ্যা ও প্রার্থনা’ অংশটি পাঠ করলেন। পাঠ শেষ করে আমাকে একটা কীর্তন করতে বললে, আমি কিছুটা অনিচ্ছা সত্বেও ‘জয় রাধে রাধে’ কীর্তনটা করলাম। কীর্তনটা শেষ হলে উনি আমার খুব প্রশংসা করে বললেন, খুব ভাল লাগল তোমার কীর্তন,—‘ছাড়োরে মন কপট চাতুরি, বদনে বলো হরি হরি!’—কি অপূর্ব কথা! তাই না ভাই ?—তারপর যেন অনেকটা আক্ষেপের সুরেই বললেন, ‘কোথায় আর পারলাম কপটতা ত্যাগ করে ধর্মরাজ্যে প্রবেশ করতে!’ —ঠিক আছে! তাহলে ধ্বনি দিয়ে দি। কি বলো?
আমার সম্মতি পেয়ে উনি ‘বন্দে পুরুষোত্তমম্! বন্দে আর্য্য পিতৃন! বন্দে মাতৃবর্গান্! বন্দেহংকৃষ্টি দৈবতান্!— ইত্যাদি ধ্বনি দিয়ে প্রার্থনা-পর্বের ইতি টানলেন। বড়মা এবং আচার্য্যদেব-দের নামে কোন ধ্বনি দিলেন না। আমার মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। —এ তো অন্যায়! অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়াও তো অন্যায়। তাই আমি সহ্য করতে না পেরে বলেই বসলাম,—দাদা! আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি ?
—অনায়াসে করতে পার।
—আপনি চলার সাথী থেকে ‘সন্ধ্যা ও প্রার্থনা’-র বাণীটা পড়লেন, অথচ আপনি প্রার্থনার সময়সূচী মেনে প্রার্থনাটা করলেন না। আর প্রার্থনাটাকেও বিকৃত করে করলেন। যেগুলো ঠাকুর করতে মানা করে গেছেন। আর একটা কথা, আপনি আপনার বাড়ীতে শ্রীশ্রীবড়মা, শ্রীশ্রীবড়দা, শ্রীশ্রীআচার্য্যদেব, পূজনীয় বাবাইবাবা, পূজনীয় অবিনবাবুদের কোন ছবি রাখেন নি, তাঁদের নামে কোন ধ্বনিও দিলেন না!—কেন, জানতে পারি কি?
আমার কথা শুনে হা-হা করে হেসে উঠে বললেন, তোমার কথাটা ঠিক সোনার পাথরবাটির মত হয়ে গেল না-কি?
—তার মানে?
—তার মানে হলো এই, শ্রীশ্রীঠাকুর চলার সাথী গ্রন্থে ‘সন্ধ্যা ও প্রার্থনা’ শিরোনামে যে বাণীটি লিপিবদ্ধ করেছেন, তার মধ্যে তিনি তাঁর রচিত ‘আর্য্যসন্ধ্যা’ ও ‘প্রার্থনা’-র কথা বলেছেন। উক্ত প্রার্থনার অস্তিত্ব যেখানে বিলুপ্ত করা হয়েছে, সেখানে প্রার্থনা না করে প্রার্থনার-সময়সূচী দিয়ে কি হবে? আর ইষ্টাসনে সদগুরু ছাড়া অন্যান্য ছবি রাখতে গেলে তো সত্যানুসরণ থেকে ‘‘গুরুই ভগবানের সাকার মূর্ত্তি, আর তিনিই Absolute (অখণ্ড)।’’—লেখাটি বাদ দিতে হবে।
—প্রার্থনার অস্তিত্ব বিলুপ্ত করা হয়েছে মানে!— আপনি কি বোঝাতে চাইছেন? দেওঘরে, অসংখ্য কেন্দ্র-মন্দিরগুলোতে সকাল-সন্ধ্যায় তাহলে কি করা হয়?
—যা করা হয় সেগুলো শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র রচিত এবং নিদেশিত প্রার্থনা নয়। তুমি এ বিষয়ে যদি জানতে চাও, প্রার্থনা বিষয়ক প্রামাণ্য গ্রন্থ ঋত্বিগাচার্য্য প্রণীত ‘অনুসৃতি’ এবং ‘সৎসঙ্গ পাব্লিশিং প্রকাশিত ‘প্রার্থনা’ শিরোনামের গ্রন্থটি ভাল করে পড়ে নিও।
—দেখুন ওসব পড়ার আমার দরকার নেই। ওসব এখন অচল। আমরা আচার্য্যদেবের নির্দেশে ‘উপাসনা’ বইটাকে মেনে চলি। উপাসনা বইয়ের প্রথমেই লেখা আছে ১৯৬৫ সালে শ্রীশ্রীঠাকুর ওসব বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন।
আমার কথা শুনে দাদাটি ‘হো-হো’ করে আবার পাগলের মত হেসে উঠে বলল, তোমার কথার উত্তরটা ঠাকুর সত্যানুসরণের ৬৫ সংখ্যক পাতায় দিয়েছেন, যেটা আজকে তুমি পাঠ করলে। আমার প্রতি রাগ না করে, বাড়িতে গিয়ে বাণীটা ভাল করে বোঝার চেষ্টা করবে।
যাইহোক, লোকটার ব্যবহারে আন্তরিকতার সুর ছিল। ফেরার সময় আমাকে ৫টা ফল এবং কিছু ভ্রাতৃভোজ্যও দেয়। আমি স্থান ত্যাগ করে বাড়ি না ফিরে আমাদের মন্দিরে চলে যাই। এ বিষয়ে একটা হেস্তনেস্ত করার জন্য। ভাগ্য ভাল, দেখা পেয়ে যাই বিভাস সরকারদার। প্রবীণ ঋত্বিক-দেবতা। ঠাকুর দেখা মানুষ, আচার্য্যদেবের কাছের লোক, তাঁর কাছে গিয়ে ঘটনাটা খুলে বলি। তিনি সব শুনে বললেন, ঠিক আছে তুমি বাড়ি চলে যাও, দেখি কি করা যায়।
* * *
তারপর বেশিদিন কাটেনি। বিভাসদার সাথে সৎসঙ্গ সেরে ফিরছিলাম। ভাগ্যক্রমে দেখা হয়ে যায় অনিমেষদার সাথে। আমি বিভাসদার সাথে অনিমেষদার পরিচয় করিয়ে দিলে, বিভাসদা অনিমেষদাকে বলেন আপনি আমাদের গুরুভাই অথচ মন্দিরে আপনাকে দেখি না, কি ব্যাপার?
—‘আমি কি ওখানে ভণ্ডামি করতে যাব?’ অনিমেষদার অনভিপ্রেত উত্তর শুনে বিভাসদা বলেন—ভণ্ডামি বলছেন কেন, আমরা কি ওখানে ভণ্ডামি করছি?
—ওটা আমার কথা নয়, ঠাকুরের কথা।
—ঠাকুরের কথা! প্রমাণ দিতে পারবেন?
—অবশ্যই। তবে রাস্তায় নয় বাড়িতে চলুন, ঠাকুরের বই খুলে প্রমাণ দেব।
—দেখুন, এখন তো আপনার বাড়িতে যাওয়া সম্ভব না, বরং কাল সকালে প্রেয়ারের আগে মন্দিরে আসুন, প্রেয়ারের পর না হয় যুক্তিতর্ক করা যাবে।
—দেখুন, মনে কিছু করবেন না, আবার আমাকে অপ্রিয় কথা বলতে বাধ্য করলেন।
—এমন কি বললাম, যাতে আপনাকে অপ্রিয় কথা বলতে হবে?
—ওই যে প্রেয়ারের কথা বললেন না, আপনারা কি প্রেয়ার করেন, যে প্রেয়ার করতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন!
—এ আপনি কি বলছেন! দেওঘর থেকে নির্ধারিত প্রেয়ারের সময়সূচী মেনে রীতিমত মাইকের মাধ্যমে আমাদের মন্দিরে প্রেয়ার করা হয়, আপনি বলছেন, আমরা প্রেয়ার করি না! আপনি প্রমাণ করতে পারবেন তো?
—অবশ্যই।
—তাহলে কাল আসুন আপনার প্রমাণপত্র সব নিয়ে।
* * *
মন্দিরের কাছে বাড়ী হবার সুবাদে প্রায় প্রতিদিনই মন্দিরে গিয়ে সকালের প্রার্থনাটা করি। সেদিন প্রার্থনা শেষে দেখি অনিমেষদা এসেছেন। বিভাসদা ওনাকে নিয়ে গিয়ে বসালেন।
এবার বলুন আপনার বক্তব্য। ঠাকুরের বলা অনুযায়ী আমারা যে ভণ্ডামি করছি, প্রেয়ার করছি না, প্রমাণ করে দেখান।
অনিমেষদা সত্যানুসরণ গ্রন্থটি বের করে বলেন, আপনারা এই বইটিকে যদি মানেন, তাহলে দেখুন ৩১ পৃষ্ঠায় রয়েছে, ‘‘গুরুই ভগবানের সাকার মূর্ত্তি, আর তিনিই Absolute (অখণ্ড)।’’ আবার ৫৭ পৃষ্ঠায় ঠাকুর আত্ম-প্রচারকদের ভণ্ড বলেছেন।
—ঠাকুর, আত্ম-প্রচারকদের ভণ্ড বলেছেন, আমরা তো আর আত্ম-প্রচারক নই!
—গুরুর পাশে শিষ্যদের ছবি রেখে প্রচার করা কি সত্য প্রচারের নামে আত্ম-প্রচার করা নয়?— আপনারা প্রার্থনার নামে দয়ালবাগ সৎসঙ্গের যে বিনতি করেন, সেই বিনতিতে বলেন :
“তুম্ বিন কোই সমরথ নহী জাসে মাঁগু দানা”
“রাধাস্বামী গুরু সমরথ তুম বিনা আউর্ ন দুসরা ।”
আবার শঙ্করাচার্য্য রচিত গুরু বন্দনায় বলি—
“গুরোঃ পরতরং নাস্তি…..”
“কেবলং জ্ঞানমূর্ত্তিম্ ।”
ওই মন্ত্রগুলো একমাত্র গুরুকে উদ্দেশ্য করেই যদি বলা হয়ে থাকে তাহলে গুরুর আসনের পাশে কি গুরুর শিষ্যদের ছবি রাখা যায়? একটা প্রাইমারি স্কুলেও হেড্ স্যরের চেয়ারের একটা আলাদা মর্যাদা থাকে, আপনারা দাদা-প্রীতির নামে সে মর্যাদাটুকুও ক্ষুণ্ণ করে চলেছেন, এগুলোকে কি আত্মপ্রচার বলে না?
বিভাসদাকে নিরুত্তর থাকতে দেখে অনিমেষদা বললেন, আপনারা যারা ঠাকুরের সাথে ঠাকুরের শিষ্যদের প্রচার করতে গিয়ে তাদের প্রতিকৃতিরও পূজা করছেন, তা ভণ্ডামি নয় কি? এই গেল ভণ্ডামির উত্তর। এরপর রয়েছে প্রেয়ার। এই দেখুন সৎসঙ্গ পাব্লিশিং প্রকাশিত ২ খানি গ্রন্থ। এটি শ্রীশ্রীঠাকুরের ইংরেজী ভাষায় লিখিত ‘লর্ডস্ প্রেয়ার’। ভাল করে দেখে বলুন তো এই প্রেয়ার আপনারা করেন কি-না?’
বিভাসদা বইটা নেড়েচেড়ে দেখে বললেন, ‘না করি না’।
—‘তাহলে দেখুন ‘প্রেয়ার’ না করেই মিথ্যা প্রেয়ারের গর্ব করে চলেছেন। ঠাকুরের ভাষায় এর নাম দ্বন্দ্বীবৃত্তি। সবচাইতে বড় পাপ। ঠিক আছে, ইংরেজীর কথা বাদই না হয় দিলাম, বাংলা ভাষায় ঠাকুরের লেখা ‘প্রার্থনা’ নামে একটা বই আছে এবং সেই বইটাও সৎসঙ্গ পাব্লিশিং থেকে প্রকাশিত। প্রথম প্রকাশ ১৯৪৯ সালে। ভাল করে দেখুন তো, এই বইয়ের কোন নির্দেশ মেনে আপনারা প্রার্থনা করেন কি-না?’
বিভাসদা বইটা ভাল করে নেড়েচেড়ে দেখে বললেন, ‘না, করি না’।—তবে এই প্রার্থনা করতে তো ঠাকুরই নিষেধ করে গেছেন ১৯৬৫ সালে, উপাসনা বইতে যা স্পষ্ট করে লেখা রয়েছে।
—মনে কিছু করবেন না দাদা, যাকে আমরা ঠাকুর বলে মানি, সেই তিনিই যদি তাঁর রচিত প্রার্থনা করতে নিষেধ করেন, তাহলে তাঁর নাম করে দীক্ষার সঞ্চারণা করাও তো আর একটা ভণ্ডামি! কোন সাবজেক্ট নেই, সিলেবাস নেই অথচ ধরে ধরে এনে ছাত্র ভর্তি! কোন বুদ্ধিমান মানুষ কি মেনে নেবেন? আপনি যদি সত্যি-সত্যিই নিজেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের শিষ্য বলে মনে করেন তাহলে একটা কাজ অবশ্যই করা উচিত, আপনাদের আচার্য্যদেবকে বলে সত্যানুসরণ থেকে ‘‘কোন-কিছু ‘আজ বুঝেছি আবার কাল বুঝা যায় না—হেঁয়ালি’ ইত্যাদি ব’লে শৃগাল সেজো না—কারণ, ইতর জন্তুরাও যা’ বোঝে তা’ ভোলে না। তাই, এই প্রকার বলাটাই দুষ্ট বা অস্থির-বুদ্ধির পরিচায়ক।’’ এই অংশটা বাদ দিতে বলে বলে দিন।
—কেন, প্রার্থনার সাথে সত্যানুসরণের বাণীর সম্পর্ক কি?
—কারণ, পুরুষোত্তম যদি অভ্রান্ত হয়েই থাকেন, তাঁর নিদেশিত কোন বিধির পরিবর্তন তিনি কখনোই করেন না, কেউ করুক, তা-ও তিনি অনুমোদন করেন না, এমনকি কাউকে পরিবর্তন করার অধিকারও দেন না। তাই তিনি সত্যানুসরণের ওই বাণীতে বললেন, ‘ইতর জন্তুরাও যা’ বোঝে তা’ ভোলে না।’ তাই আমার তো মনে হয়, ঠাকুর তাহলে ভুল করে ওই বাণীটা দিয়েছিলেন, না হলে আপনারা তাঁর রচিত এবং নিদেশিত আহ্বানী, সন্ধ্যা ও প্রার্থনা-র সবটা বাদ দিয়ে, তাঁর নিদেশকে অমান্য করার ধৃষ্টতা দেখাতে পারতেন না!
—দেখুন, আপনি আমাদের যতই যুক্তি দেখান, আমাদের ভোলাতে পারবেন না। এতক্ষণে বুঝতে পারলাম, আপনারা ঠাকুরের নির্দেশের আচার্য্য-পরম্পরা মানেন না। সে আপনারা না মানুন, আমরা কিন্তু আচার্য্যদেবের নির্দেশের বাইরে এক পা-ও চলতে রাজী নই।
—খুব ভাল কথা, আপনি আমাকে বললেন, ‘‘আপনারা ঠাকুরের নির্দেশের আচার্য্য-পরম্পরা মানেন না।’’ একটা প্রশ্নের উত্তর দিন তো, আপনারা উপাসনা, অধিবেশন বা সৎসঙ্গ করার সময় আসনে আচার্য্য-পরম্পরার নামে বা অজুহাতে যাঁদের প্রতিকৃতি রাখেন, তাঁদের দেওয়া কোন প্রার্থনা, উপাসনা করেন কি?—অতএব আপনারা যে পদ্ধতিতে আচার্য্য-পরম্পরা মেনে চলছেন, ওইভাবে মেনে চলার কথা ঠাকুর কোথায় বলেছেন, তাঁর বলা প্রামাণ্য শ্রুতিবাণী থেকে প্রমাণ দেখাতে পারবেন?
কেন জানি বিভাসদা কোন উত্তর দিতে পারলেন না দেখে অনিমেষদা বললেন, অভিধান মতে আচরণসিদ্ধ ব্যক্তিকেই ‘আচার্য্য’ বলে। যিনি যে বিষয়ের আচার্য্য হবেন, তাঁকে সে বিষয়ে আচরণসিদ্ধ হতে হবে। যেমন, আমরা নিউটন, আর্কিমিডিস, আইনস্টাইন প্রমুখ বিজ্ঞান-আচার্য্যদের কেউ দেখিনি। তাঁরা বিগত হবার পর তাঁদের আবিষ্কৃত সূত্র বা জ্ঞানের সাথে পরিচিত হই তাঁদের লিখে রাখা বইয়ের মাধ্যমে, তাঁদের বংশধরদের মাধ্যমে নয়। সেই বইগুলো বাজারে সহজলভ্য হলেও আমরা বই পড়ে সেগুলো নিজে নিজে আয়ত্ব করতে পারি না বলেই শিক্ষকদের মাধ্যমে শিখতে হয়। এবার কোন শিক্ষক যদি ওই বিজ্ঞান-আচার্য্যদের মূল সূত্রগুলো বাদ দিয়ে ভুল শেখাতে শুরু করেন এবং প্রতিপত্তির জোরে বংশানুক্রমিকভাবে জ্যেষ্ঠ-সন্তান-পরম্পরা চালাতে থাকে, মূলসূত্র জানা কোন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছাত্র কি তা মেনে নেবেন?
—তা কি করে হয়!
—তাই যদি না হয়, তাহলে আপনারা কোন্ হিসেবে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মূলসূত্র অর্থাৎ আদর্শকে সযত্নে পরিহার করা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জ্যেষ্ঠ সন্তান পূজনীয় অমরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এবং পরবর্তী বংশানুক্রমিকভাবে জ্যেষ্ঠ-সন্তান-পরম্পরাদের ছবি পুজো করতে শুরু করেছেন? এঁরা কিসের আচার্য্য এবং কোন্ আচরণ দ্বারা আপনাদের শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শ বিষয়ে শিক্ষিত করেছেন বা করছেন?
—দেখুন কিসের সাথে কিসের তুলনা করছেন? আমাদের দেশে আচার্য্য প্রথা কুলগুরু প্রথা কি চালু নেই?
—আপনি যখন বলছেন, থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু ঠাকুর এ বিষয়ে কোন বাণীতে কি বলে গেছেন, সে সম্পর্কে যদি কিছু জানা থাকে বলুন।
—না, ওগুলো আমার শোনা কথা, কোন বাণীতে কি বলে গেছেন তা বলতে পারব না। তবে—
“ইষ্টগুরু পুরুষোত্তম
প্রতীক গুরু বংশধর,
রেতঃ শরীরে সুপ্ত থেকে
জ্যান্ত তিনি নিরন্তর।”
এই বাণীটা যদি ঠাকুরের দেওয়া হয় তাহলে বংশধররা কি প্রতীক-গুরু নয়?
—অবশ্যই। তাহলে তো আপনাদের আচার্য্যদেবদের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে যে!
—তার মানে?
—তার মানে অতি সহজ। অবতার-তত্ত্বের কোন অস্তিত্ব থাকবে না। কারণ রামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীস্ট, হজরত মহম্মদ, চৈতন্যদেব, রামকৃষ্ণদেব-দের রেত-শরীরের সাথে ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের কি কোন সম্পর্ক আছে?
—তা’ কি করে থাকবে! তাছাড়া চৈতন্যদেব ও রামকৃষ্ণদেবের তো কোন সন্তানই ছিল না।
—ঠিক তাই। তাহলে চৈতন্যদেবের পূর্ববর্তী পুরুষোত্তম যিনি ছিলেন বলে আপনার মনে হয়, তাঁর সর্বশেষ বংশধরদের মধ্যে প্রতীক গুরু খুঁজে দীক্ষা নিয়ে ধর্ম পালন করা উচিত। তাই নয় কি? তা করতে পারা কি আপনাদের দ্বারা সম্ভব হবে?
বিভাসদাকে নিরুত্তর থাকতে দেখে অনিমেষদা বলেন, তা যদি না হয়, তাহলে ওই বাণীর উপর ভিত্তি করে আচার্য্য-পরম্পরার নামে কুলগুরুগিরির ব্যবসা চালানো থেকে অবিলম্বে বিরত হওয়া উচিত।
শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুসারে পিতা থেকে পুত্র জন্মায়। পুত্র, পিতার অছি (trustee) মাত্র। যে পুত্র পিতার অছি-কে বহন করে সমৃদ্ধ করে তাকেই পিতার আদর্শ পুত্র বলবে সবাই। তাই বলে পুত্র কখনো পিতা হতে পারে না। তাই যদি হতো বিশ্বশ্রবা ঋযির পুত্র বিভীষণকে আদর্শ পুত্র না বলে রাবনকে তো বলতে পারতেন শ্রীশ্রীঠাকুর। আপনারা ওই বাণীকে ভিত্তি করে, ঠাকুরের মূল আদর্শ বাদ দিয়ে বংশানুক্রমিকভাবে জ্যেষ্ঠ-সন্তান-পরম্পরার চতুর্থ পুরুষকে পর্যন্ত ঠাকুর বানিয়ে ছেড়েছেন। অথচ ঠাকুরের প্রথম বংশধরদের মধ্যে একমাত্র জীবিত সন্তান—পূজনীয় কাজলদাকে বংশধর বলে গণ্য করছেন না। আপনারা সত্যিই যদি উপরের ওই বাণীকে মর্যাদা দিতেন তাহলে সর্বাগ্রে তাঁর পুত্রকে কীলকেন্দ্রে বসাতেন। যুক্তিসঙ্গত যা’, তা’ না করে আপনারা মনগড়া আচার্য্য-পরম্পরায় মেতে উঠে সৎসঙ্গের মূল আচার্য্যের অনুশাসনকে নিকেশ করে দিলেন! ইতিহাস কি আপনাদের কোনদিন ক্ষমা করবে?
শাস্ত্রের ব্যাখ্যা অনুযায়ী পরাবিদ্যায় আচরণসিদ্ধ ব্রহ্মজ্ঞ ইষ্টগুরুকে আচার্য্য এবং অপরাবিদ্যায় আচরণসিদ্ধ শিক্ষাগুরুকে উপাচার্য্য বলা হয়। বীরশ্রেষ্ঠ অর্জুনের কৃপাচার্য্য, দ্রোণাচার্য্য, ধৌম্য নামে তিনজন উপ-আচার্য্য থাকা সত্বেও পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণকে আচার্য্য পদে বরণ না করা পর্য্যন্ত তিনি দুর্বলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারেন নি। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রও পূর্ববর্তী পুরুষোত্তমদের আচার্য্য হিসেবে মেনে চলতেন। এবং মেনে চলতে বলেছেন। তাঁর বলা অনুযায়ী—
সত্তার মূলই হ’ল আত্মা,
আর, এই আত্ম-সমীক্ষুই আত্মবিৎ—
আর, তিনিই আচার্য্য ;
তদন্বিতবৃত্তি ও তৎসমাহিতচিত্ত যিনি—
তিনিই বোধ করেন তাঁ’কে অখণ্ড সচ্চিদানন্দ—
আত্মার মূর্ত্ত প্রতীক। ৩৩১ । (সম্বিতী)
পুরুষোত্তম আসেন যখন
ইষ্ট, আচার্য্য তিনিই গুরু,
তিনি সবার জীবন-দাঁড়া
তিনিই সবার জীবন-মেরু।
তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর ওই নিদেশ অমান্য করা শুরু হয়েছিল বলেই তিনি অমান্যকারীদের উদ্দেশ্যে বাণী দিয়ে বললেন—
আচার্য্য ছেড়ে আচার্য্য ধরলি
মূর্খতাতে দিলি পা,
জ্ঞানের বুকে মারলি ছুরি
লাভ হ’ল তোর ধৃষ্টতা।
আর কুলগুরু অর্থাৎ কৌলগুরু-পরম্পরার কথা যদি বলেন, তাহলে শুনুন—আর্য্যকৃষ্টির রক্ষক সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পুরোহিত রঘুবংশের কৌলগুরু ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠদেব শ্রীরামচন্দ্রকে ‘‘ওঁ নারায়ণঃ পরাবেদা নারায়ণঃ পরাক্ষরঃ।/নারায়ণঃ পরামুক্তি নারায়ণঃ পরাগতিঃ॥’’ মন্ত্রে স্বস্তিবাচন করার সময় শ্রীরামচন্দ্রের মধ্যে পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণকে উপলব্ধি করলে তিনি নারায়ণের পরিবর্তে রামচন্দ্র শব্দ বসিয়ে মন্ত্রটিকে পরিমার্জিত করেন। নররূপী নারায়ণ পুরুষোত্তম রামচন্দ্রকে কেন্দ্র করে সবাইকে ধর্ম পালন করতে উদ্বুদ্ধ করলেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন—-গুরু মানেই সদগুরু–আচার্য্য। গুরু-পুরুষোত্তমই সচ্চিদানন্দের মূর্ত্ত বিগ্রহ, তিনিই রূপায়িত ঈশ্বর প্রেরণা, তিনিই আত্মিক শক্তির প্রোজ্জ্বল প্রকাশ, অস্তিবৃদ্ধির পরম অমৃতপথ। দুনিয়ার যত দ্বন্দ্বের মাঝে অন্বয়ী সার্থকতার সারকেন্দ্র তিনিই। তাঁকে ভালবেসে, তাঁর ইচ্ছা পরিপূরণ ক’রে, তদনুগ আত্মনিয়ন্ত্রণে, তাঁরই সঙ্গ, সাহচর্য্য ও সেবার ভিতর-দিয়ে মানুষ ঈশীস্পর্শ লাভে ধন্য হয়। আর গুরু-পুরুষোত্তমকে direct (সরাসরি) যারা না পায়, তারা তঁদনুবর্ত্তী আচার্য্য-পরম্পরার ভিতর দিয়ে তাঁর ভাবটাই কিছু না কিছু পায়।…….. (আঃ প্রঃ ১/৪. ১২. ১৯৪১)
তাঁর অবর্তমানে তাঁর আদর্শের ধারার প্রবহমানতা রক্ষা করার জন্য তঁদনুবর্ত্তী আচার্য্য-পরম্পরা বজায় রাখতে আচার্য্য হবার যোগ্যতাও নির্ধারণ করে বাণী দিলেন।
‘‘চরিত্র ও চর্য্যার
নিষ্ঠা-বিনায়িত ইষ্টার্থবাহী
বাস্তব সঙ্গতিশীল
সার্থক অনুচলন যা’র নাই—
বাক্য ও ব্যবহারে উদ্ভিন্ন হ’য়ে,—
সে কিন্তু আচার্য্য হ’তে পারে না ;
আচার্য্য হওয়ার ন্যূনতম ভূমিই এই। ১৯ ।’’ (আদর্শ-বিনায়ক)
উপরোক্ত বাণীতে কোথাও কি তাঁর বংশধরদের কথা, জ্যেষ্ঠ-পরম্পরার কথা উল্লেখ করেছেন? তথাপি ওই নিদেশ-বাণীকে যদি আপনাদের আচার্য্যদেব মানতেন এবং সব্বাইকে মানাতে উৎসাহিত করতেন, তাহলে সৎসঙ্গের নীতি ও আদর্শ নিয়ে এত দলাদলি, ভেদাভেদ হবার কোন সুযোগই থাকত না। তাঁরা যদি তাঁদের মধ্যে ঠাকুরত্বকে জাগ্রত রাখার সদিচ্ছা পোষণ করতেন, তাহলে ইষ্টগুরু পুরুষোত্তম প্রদত্ত নিত্যকর্মের আবশ্যিক অনুশাসন, যেমন আহ্বানী, আচমণ, পুরুষোত্তম বন্দনা, আর্য্য-সন্ধ্যা, পঞ্চবর্হিঃ ও সপ্তার্চ্চিঃ মন্ত্রগুলো প্রার্থনা থেকে বাদ দিয়ে ‘প্রার্থনা-সময়সূচী’-র প্রচার করে নিত্য প্রার্থনা নামের পরাকাষ্ঠা দেখাতেন না। ঠাকুরের রচিত ইষ্টভৃতির মন্ত্র “ইষ্টভৃতির্ময়াদেব কৃতা প্রীতৈ তব প্রভো। ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ॥” বাদ দিয়ে অন্য মন্ত্র চালু করা হতো না! এ বিষয়েও তিনি আমাদের সচেতন করে দিতে বলে গেছেন—
মতবাদ যাই হোক না,—
আর, যে-কোন সম্প্রদায়ই হোক,
যা’ মুখ্যতঃ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’কে
স্বীকার করেনিকো—
কোন-না-কোন রকমে,—
তা’ কখনও অনুসরণ করতে যেও না,
তা’ কিন্তু জঘন্য—অসম্পূর্ণ,
সত্তা-সম্বর্দ্ধনার পরিপন্থী তা’ ;
আর, ঐ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’ই হ’চ্ছে
সেই রাজপথ—
যা’কে স্বীকার ও গ্রহণ ক’রে চললে
ক্রমশঃই তুমি সার্থকতায় সমুন্নত হ’তে পার। ২৩৪ । (সম্বিতী)
ওই বাণী অনুসারে আপনারা জঘন্য পথে চলছেন চলুন। তাই বলে আমাকেও কি চলতে হবে? দেখুন দাদা, ঠাকুরের বলা বাণীকে অমান্য করে, ঠাকুর-বিরোধী চলনে চলার অধিকার আপনার বা আপনাদের যেমন আছে, তেমনি মান্য করার অধিকার তো আমার থাকা উচিত। তাই আমার একটা অনুরোধ আপনাদের বিচারে কোন গোষ্ঠীদ্বারা ঘোষিত বা নির্বাচিত আচার্য্যদেব(গণ) যদি সবই হয়, তাঁরাই যদি আপনাদের একমাত্র উপাস্য হয়, তাহলে শ্রীশ্রীঠাকুরের নাম না নিয়ে, তাঁর প্রতিকৃতি না রেখে, আপনাদের আচার্য্যদেবের প্রতিকৃতির উপাসনা করুন,—আমার কোন আপত্তি নেই, কিন্তু ঠাকুরের নামে মন্দির করে, ঠাকুরবাড়ি নাম দিয়ে ঠাকুরের আদর্শবিরোধী চলনে চলতে দেখলে প্রতিবাদ হবেই। আমরা শ্রীশ্রীঠাকুরের কৃষ্টিসন্তান, আমাদের উপর তিনি কাতর আবেদনে কিছু দায়িত্ব দিয়ে গেছেন—
‘‘আর্য্যকৃষ্টির যা’ ব্যাঘাত
খড়্গে তোরা কর নিপাত।

ভণ্ড ঠগী দেখবে যেথায়
করো সামাল সবায়,
কেউ যেন না ঠকে পড়ে
ওদের ভাঁওতায়।’’
‘‘বড়খোকাই হো’ক—, মণিই হো’ক—বা কাজলই হো’ক— বা আপনারাই হোন— আপনাদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই আমি আশা করি যে আপনারা নিজেদের জীবনে ও চরিত্রে আমাকে বহন ক’রে নিয়ে বেড়াবেন এবং অন্যের কাছেও আমাকে পৌঁছে দেবেন—অবিকৃতভাবে, অবশ্য প্রত্যেকে তার বৈশিষ্ট অনুযায়ী। আর আমাকে বহন করা ও পৌঁছে দেওয়া মানে, আমার mission (আদর্শ ও উদ্দ্যেশ্য)-কে বহন করা ও পৌঁছে দেওয়া, আর আমার mission (আদর্শ ও উদ্দেশ্য) মানে সকলের mission (আদর্শ ও উদ্দেশ্য)। জীবনীয় প্রতিটি যা’-কিছুর ইষ্টানুগ সত্তাসম্বর্দ্বনাই আমার mission (আদর্শ ও উদ্দেশ্য)।’’ (আ. প্র. ৩/১৭. ১. ১৯৪২)
‘‘মানুষ, গোরু, পোকা-মাকড়, এমনকি একটা পিঁপড়া পর্য্যন্ত বাঁচতে চায়। মরতে চায় না কেউ। আমিও না। কিন্তু মানুষের শরীর চিরকাল থাকে না, এও ঠিক। তাই আমি বেঁচে থাকতে চাই আপনাদের মধ্যে। আপনারাই আমাকে ব’য়ে নিয়ে বেড়াবেন যুগ যুগ ধরে, ………….. আমাকে এইভাবে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আপনারা গ্রহণ করুন। নইলে আমার কথাগুলি প্রাণ পাবে না। সেগুলি শূন্যে হাহাকার করে ফিরবে।’’ (আ. প্র. খণ্ড ১৮, পৃঃ ২৫০)
এবার আমার প্রশ্ন, আপনাদের আচার্য্যদেব শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ পালনের মৌলিক ব্যাপারটা তো বিকৃত করে রেখেছেনই, আদর্শ প্রচারের জন্য কি কি করেছেন?
—কেন, কত মন্দির তৈরি করেছেন, গণদীক্ষা দেওয়া চলছে।
— ঠিক বলেছেন, মন্দির অবশ্যই হয়েছে বা হচ্ছে তা’ কিন্তু ঠাকুরের ঈপ্সিত মন্দির নয়, আপনাদের আচার্যদেবদের ঈপ্সিত।
—এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত কোন প্রামাণ্য তথ্য দেখাতে পারবেন?
—তাহলে মনোযোগ দিয়ে শুনুন—মন্দির, শ্রীমন্দির ও সৎসঙ্গ বিহার-এর গঠনতন্ত্র প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন—‘‘সব মন্দিরই শ্রীমন্দির। জায়গায় জায়গায় মন্দির বা সৎসঙ্গ বিহার ঠিক করা ভাল, যাতে লোকে meet (সাক্ষাৎ) করতে পারে। সেখান থেকে মানুষকে সবভাবে infuse (উদ্বুদ্ধ) করতে হবে। ধর্ম্ম কী, কৃষ্টি কী, সদাচার কী, বিবাহের নীতি কী, যোগ্যতার অনুশীলন কিভাবে করতে হয়, সেবানুচর্য্যার ভিতর দিয়ে সবাই পারস্পরিকভাবে সম্বন্ধান্বিত হয় কিভাবে ইত্যাদি কথা সেখান থেকে চারাতে হবে। মানুষকে practically educated (বাস্তবভাবে শিক্ষিত) করে তুলতে হবে। তাছাড়া মানুষের জন্য যতখানি যা করা যায় তাও বাস্তবভাবে করতে হবে মন্দিরগুলিকে কেন্দ্র করে। মন্দির থাকলে, ঋত্বিক থাকবে, dispensary (চিকিৎসাকেন্দ্র), হাসপাতাল, গবেষণাগার, তপোবনের শাখা ইত্যাদি থাকবে। হয়তো ঐ মন্দিরগুলিই এক একটা university (বিশ্ববিদ্যালয়) বা সর্ব্বতোমুখী শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।’’ (আলোচনা-প্রসঙ্গে, ২১ খণ্ড, পৃঃ ৩১, ৪ঠা বৈশাখ, ১৩৫৯, বৃহস্পতিবার, ইং ১৭-০৪-১৯৫২) এই বইটাও কিন্তু আপনারা প্রকাশ করেছেন। এবার বলুন কি বলবেন, ঠাকুরের ঈপ্সিত মন্দির আপনারা কোথায় কোথায় করেছেন?
অনিমেষদার প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারলেন না বিভাসদা।
তাই কিছুক্ষণ থেমে অনিমেষদাই বললেন, দেখুন দাদা, শ্রীশ্রীঠাকুর মূলতঃ মানবদেহটাকেই শ্রীবিগ্রহ মন্দির করে গড়ে তুলতে বলেছেন। আমাদের মনগড়া মন্দির-নির্মাণ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন—‘‘আমার নামে দেখবে অনেক মন্দির হবে | কিন্তু আমার ইচ্ছা করে তোমাদের হৃদয়টা, চলমান জীবনটা আমার জাগ্রত মন্দির হোক | এবং আমাকে তোমরা সর্বত্র বয়ে নিয়ে বেড়াও | ধর্ম মানুষের জীবনের মধ্যে না থাকলে, আচরণের মধ্যে না থাকলে, ধর্মসঙ্ঘ থাকা সত্ত্বেও ধর্ম লোপ পায় | এবার সে ব্যাপারটা ঘটতে দিও না | আমার কথাগুলি মনে রেখো | এবং আমার কথাগুলি পৃথিবীর লোকে যাতে জানতে পারে, সময়মত তার ব্যবস্থা ক’রে যেও | কে কখন উপযুক্ত লোক আসবে, ঠিক কি? তবে আমার কাজটা হ’লো ঈশ্বরকোটি পুরুষের কাজ | যুগে যুগে তারা আসে | ঈশ্বর ছাড়া আর কিছুই তাদের মজাতে পারে না |’’
‘‘আমি নগণ্য মানুষ, কিন্তু পরমপিতা আমাকে দিয়ে যা বলালেন, যা করালেন, মনুষ্যসমাজ তার উপর না দাঁড়ালে, সব জ্ঞানগুণ সত্ত্বেও পৃথিবী মারামারি, হানাহানি, কাটাকাটির হাত থেকে রেহাই পাবে না। মানুষের সব শক্তি নিয়োজিত হবে সপরিবেশ আত্মহননে এবং জীবনের ভিত্তিভূমির ধ্বংসসাধনে। আমার বিশ্বাস, তোমরা যদি না কর, হয়ত বাইরের লোক এসে এ কাজ করবে। তোমরা যেই হও আর যাই হও না, বিকৃত হ’লে এ কাজ করবার অধিকার ও
যোগ্যতা হারিয়ে ফেলবে। কামিনী-কাঞ্চনাসক্ত কতকগুলি ওঁছা লোক তোমাদের কাছে ভীড় জমাবে এবং আত্মস্বার্থের জন্য পরস্পর শকুনের মত কামড়াকামড়ি করবে। সৎসঙ্গে একদিন বৃষ্টির জলের মত টাকাবৃষ্টি হবে। সেই দিনই সৎসঙ্গের বিপদের দিন। ঐশ্বর্য ও ক্ষমতায় মাথা ঠিক থাকে খুব কম লোকেরই। যারা মনে করে ঐশ্বর্য্য ও শক্তি পরমপিতার, তিনিই মালিক, আমি এর
অছিমাত্র, কাজলের ঘরে থাকা সত্ত্বেও তাদের গায়ে কালি লাগে না। নইলে মুস্কিল আছে।’’
(‘আলোচনা-প্রসঙ্গে’-র সংকলক প্রফুল্ল কুমার দাস, এম.এ, প্রতি-ঋত্বিক প্রণীত
‘স্মৃতি-তীর্থে’ গ্রন্থের পৃষ্ঠা ১০২-১০৫ থেকে নির্বাচিত বাণী।)
শ্রীশ্রীঠাকুরকে যদি মেনেই থাকেন তাহলে ঠাকুরের নিদেশ মেনে চলা উচিত। তাহলে কোন্ নিদেশ মেনে আপনাদের আচার্য্যদেব(গণ) ঠাকুরের নামে একের পর এক মন্দির নির্মাণ করে ইষ্ট প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে আত্ম প্রতিষ্ঠা করে চলেছেন!—এর কি উত্তর দেবেন বলুন?
আর গণদীক্ষার কথা বলেছিলেন তো? তাহলে শুনুন—ঠাকুরের মতে, দীক্ষা হলো, কোন আদর্শকে সঞ্চারণা করার মাধ্যম। ঠাকুরের মূল আদর্শ—ঈশ্বর এক, ধর্ম এক, প্রেরিত-পুরুষ সেই এক-এরই বার্তাবাহী-র বার্তায় সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা। দীক্ষার মাধ্যমে নাম-ধ্যান, শবাসন, থানকুনি পাতা সেবন, সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার গ্রহণ, পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চিঃ-র অনুশাসন মেনে সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন যাপন বিষয়ে উপদেশ দান এবং নিয়মনাগুলো শিখিয়ে দেওয়া। ওই নিয়মনাকে স্বীকৃতি দান করার মাধ্যম হল ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ পালন—যা দীক্ষাপত্রে উল্লেখ থাকে। এর জন্য কম করে ৩০ মিনিট সময় লাগা উচিত। অথচ গণদীক্ষার নামে যে ভাবে, যে হারে দীক্ষা দেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে তা নিয়ে একটা কর্মশালার মাধ্যমে সমীক্ষা চালালেই দেখা যাবে, তথাকথিত বেশিরভাগ দীক্ষিতগণ, ইষ্টাসনে একাধিক ফটো রেখে তার সামনে বসে বিনতি করা (যদিও তা’ সংখ্যায় নগণ্য), ইষ্টভৃতি এবং আচার্য্যভৃতির নামে পয়সা রাখা এবং মাস গেলে ‘উপযোজনা কেন্দ্রে’ পৌঁছে দেওয়া ভিন্ন কিছুই তারা জানে না।
শ্রীশ্রীঠাকুরের জীবদ্দশায় একসাথে শতাধিক লোককে বসিয়ে দীক্ষা দান করার কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনার কথা জানা যায় নি। তৎকালিন ঋত্বিক দেবতারাও ছিলেন শ্রদ্ধা আকর্ষণী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তথাপিও শ্রীশ্রীঠাকুরকে আক্ষেপ করে বলতে হয়েছিল, —‘‘বৃত্তিতে তেল মালিশ করে বা স্বার্থপ্রত্যাশাকে উসকে দিয়ে মানুষকে দীক্ষিত করতে নেই। তা’তে মানুষ asset (সম্পদ) হয় না।’’ (আ. প্র. ৫ম খন্ড, ২৯. ১২. ১৯৪৩)
—‘‘দ্যাখেন, (বীরেন ভট্টাচার্য্যের প্রতি) আজকাল আপনারা কতলোক দীক্ষা দিচ্ছেন, কিন্তু তার বেশীরভাগই বাজারী। ……ধর্ম্ম বলতে আমি যে সর্ব্বতোমুখী সঙ্গতিশীল কেন্দ্রানুগ কর্ম্মময় সার্থক জীবনের কথা বলি, তা অনেকেরই মাথায় ঢোকে না। ভাবে, আমাকে দিয়ে পরকালের পথ করে নেবে। কিন্তু পরিবার, দেশ, সমাজ, জাতি ও জগতকে …..দুনিয়াটাকে স্বর্গ করে তুলবে সে কথা আর ভাবে না।’’ (আলোচনা প্রসঙ্গে ৩য় খণ্ড, ১৩ই চৈত্র, শনিবার, ১৩৪৮, ইং ২৮। ৩। ১৯৪২)
পরিবার, দেশ, সমাজ, জাতি ও জগতকে …..দুনিয়াটাকে স্বর্গ করে তোলার জন্য একদা দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রম থেকে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল, আলোচনা পত্রিকার, মাঘ সংখ্যার, ১৫০ পৃষ্ঠা থেকে তার একটা ক্ষুদ্র চিত্র তুলে ধরছি।
“সৎসঙ্গের বর্তমান সর্বপ্রধান লক্ষ্যবস্তু হইল বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার, দেশীয় ঔষধপত্র প্রস্তুতের রসায়ণাগার ও কারখানা, হাসপাতাল, প্রসূতিসদন, বালক-বালিকাদের শিক্ষার জন্য উচ্চ বিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্র, কুটির-শিল্প ভবন, কৃষিপরীক্ষা-ক্ষেত্র প্রভৃতি স্থাপন পূর্বক পাবনার ন্যায় একটি আদর্শ পল্লী-উন্নযন কেন্দ্রের পুণঃ প্রতিষ্ঠা করা। প্রসঙ্গতঃ ইহা উল্লেখযোগ্য যে, অতীতের সেই পাবনা-সৎসঙ্গ পল্লী সংগঠনের উজ্জল আদর্শরূপে অদ্যাপি সারা ভারতে প্রসিদ্ধ হইয়া আছে. আর শুধুমাত্র বিহারেই নয়, পরন্তু ভারতের সকল প্রদেশেই এইরূপ আদর্শ কেন্দ্র স্থাপন করাই সৎসঙ্গের অভিলাষ।
শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি আবাসিক পল্লী-বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন পূর্বক শ্রীশ্রীঠাকুরের পরিকল্পনাগুলির বাস্তব রূপায়নের উচ্চাকাঙ্খাও সৎসঙ্গ পোষণ করিয়া চলিয়াছে।……” (আলোচনা, মাঘ, ১৩৬৫/পৃঃ ১৫০)
উক্ত দলিল থেকে প্রাপ্ত সংবাদে এটুকু বোঝা গেল যে, পাবনার হিমাইতপুর আশ্রমে শ্রীশ্রীঠাকুর যথেষ্ট প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে যে-সব কর্ম-প্রতিষ্ঠানসমূহ গড়ে তুলেছিলেন, তদনুরূপ কেন্দ্র ভারতের প্রতিটি প্রদেশে স্থাপন করা হবে। এবং একটি শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে,—যা শ্রীশ্রীঠাকুরের এক অন্যতম ইচ্ছা।
এবার দেখে নেওয়া যাক পাবনার হিমাইতপুর-আশ্রমের কর্ম-প্রতিষ্ঠানসমূহের এক সংক্ষিপ্ত বিবরণ।
অখ্যাত পল্লী হিমায়েতপুরে বায়ু থেকে বিদ্যুত উত্পাদন করে পরম বিস্ময় সৃষ্টি করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। গড়ে তুলেছিলেন—তপোবন ও মাতৃ বিদ্যালয়—যা শিক্ষাক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত মনোমোহিনী ইনষ্টিউট অফ সায়েন্স এণ্ড টেকনোলজি নামের বিজ্ঞান কলেজ। কেমিক্যাল ওয়ার্কসের জীবনদায়ী ঔষধসমূহ দেশে এবং বিদেশে সমাদৃত হয়েছিল।
বৈদ্যুতিক এবং যন্ত্রশিল্পের আধুনিক সব ধরণের কাজ হতো ইলেকট্রিকাল ও মেকানিক্যাল ওয়ার্কসপে। যথা,–ঢালাই, ঝালাই, লেদের কাজ, ডাইস, ইলেক্ট্রোপ্লেটিং, ইলেক্ট্রিক্যাল ফিটিং, আরমেচার, ব্যাটারি প্লেট তৈরি ও মেরামত, ডায়নামো মেরামত ইত্যাদি। ছিল—ময়দার কল, আটার কল, চালের কল, তেলের কল, চিনির কল, মেডিকেটেড ওয়াটার মেশিন, স্পাইস পাউডারিং, সুতার গুটি তৈরি, টেলারিং, বোতাম তৈরি, গ্লাস ব্লোয়িং, পটারী ওয়ার্কস্, বেকারী, লজেন্স তৈরি, গ্রোসারী প্রোডাক্ট ইত্যাদির শিল্প। ছিল—কার্ডবোর্ড কারখানা, স্টীমলণ্ড্রী, কটন ইণ্ডাস্ট্রিজ, হোশিয়ারী শিল্প, ব্যাঙ্ক, ইঞ্জিনীয়ারিং ওয়ার্কস্, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র, স্বাস্থ্য বিভাগ, গৃহনির্মাণ বিভাগ, কলাকেন্দ্র, প্রেস (যেখানে বাংলা, হিন্দী, সংস্কৃত, উর্দু, আরবী, ফারসী হরফের কাজ হতো, দেশ ভাগের পর পাকিস্তান সরকার জবরদখল করে ঢাকাতে নিয়ে যায়।), পাব্লিশিং হাউস, ফিলানথ্রপি, মাতৃসঙ্ঘ ইত্যাদি। (তথ্যসূত্রঃ ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনী গ্রন্থ)
শুধু আশ্রমবাসীরাই নয়, জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায়-ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে সকলেই ওইসব প্রতিষ্ঠানের সুলভ সেবা পেতেন। তথাপিও পাকিস্তান সরকার ওই সর্বজনীন কল্যাণধর্মী প্রতিষ্ঠানসমূহ দখল করে কেন বিনষ্ট করেছিলেন তার উত্তর আমার জানা নেই।
যেমন জানা নেই, আলোচনা পত্রিকাতে বর্ণিত শ্রীশ্রীঠাকুরের একান্ত ইচ্ছাগুলোর বাস্তবায়ন দেওঘর সৎসঙ্গ কর্তৃপক্ষ করেছেন কি-না। যদি করে থাকেন কোথায় করেছেন, তার উদাহরণ দিন। ওই ইষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দেখার পর আপনার সাথে গলা মিলিয়ে ‘আচার্য্যদেব কি! —জয়!’ ধ্বনি দিয়ে মানব জীবনটাকে ধন্য করব। না, না, আপনার এক্ষুনি জানাতে হবে না, আপনাকে এক মাস সময় দিচ্ছি। আশাকরি এই সময়ের মধ্যে আপনি সব তথ্য সংগ্রহ করে আমাকে জানাতে পারবেন। আর যদি অনিবার্য্য কোন কারণে জানাতে না পারেন, তাহলে পরমপিতার একটা ভয়াল বাণী শুনে নিন।
সবাই ক্ষমা পাবে—
তা’ তা’রা যেমনতর অপরাধেই
অপরাধী হোক না কেন,
কিন্তু ক্ষমা পাবে না তারাই—
যা’রা পবিত্র সত্তাকে
অবমানিত করে,
অবলাঞ্ছিত করে,
—তা’ কখনও নয়।
(ধৃতি-বিধায়না, ২য় খণ্ড, বাণী সংখ্যা ১১৬)
* * *
যদিও অনিমেষদা, বিভাসদাকে কথাগুলো বলেছিলেন। তবুও কেন জানি আমার ভয় ভয় করছে। দেওঘরের আচার্য্যদেবদের পাল্লায় পড়ে এ কোন্ বিপদে আবার পড়লাম! আমার আবার কিছু হবে না তো! আমি ক্ষমা পাব তো ? হে দয়াল! তুমি রক্ষা কোরো।
——-

এত হিংসা কেন

।। এত হিংসা কেন ।।
নিবেদনে—তপন দাস
***************************

ইদানীং কালের আন্তর্জাতিক আগ্রাসন, নির্বিচারে হত্যালীলা মানবতাবাদের অপমৃত্যু। টিভির পর্দার মাধ্যমে আমাদের প্রাণে এক বোবা ব্যথা দিয়ে চলেছে, আমরা যারা বর্তমান যুগ-বিধায়ক পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সত্যানুসরণের অনুশাসন— “যতদিন তোমার শরীর ও মনে ব্যথা লাগে, ততদিন তুমি একটি পিপীলিকারও ব্যথা নিরাকরণের দিকে চেষ্টা রেখো, আর তা’ যদি না কর, তবে তোমার চাইতে হীন আর কে?”—পাঠ করি!

ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে, বাংলাভাষায রচিত বিখ্যাত গানের কলি, “মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য” নস্টালজিয়ার সিড়ি বেয়ে যাঁদের স্মৃতি অধিকার করে আছে, সেইসব বুদ্ধিজীবিরা, সমাজ-বিজ্ঞানীরা, কি জবাব দেবেন পশ্চিমবঙ্গের ভোট পরবর্তী হিংসা, নারী-নির্যাতন, মৃত্যুর খবর শুনে! কতটা বোধ-বিপর্য্যয় হলে “পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যার” পবিত্র নীতিকে পাশ কাটিয়ে নীতিহীন রাজনীতির ক্ষমতা দখলে রাখার জন্য বিরোধী মতবাদীদের হত্যা পর্যন্ত করতে পারে!

কিছুদিন পূর্বে সংবাদ-শিরোনাম দখল করে নিয়েছিল মালদহের কালিয়াচকের ১৯ বছরের একটি ছেলে, আসিফ। ঘরের মধ্যে বসে ঠাণ্ডা মাথায় একান্ত প্রিয়জনকে হত্যা করল। চার-চারটি মাস দিব্যি কাটিয়ে দিল! বিবেক-দংশন শব্দটাকে পাত্তা না দিয়ে!

কিছুদিন পূর্বে সংবাদ শিরোনাম দখল করেছিল আফগানিস্তানের তালিবানী হিংসা। আফগানরা মেকী ইসলামপন্থী ধার্মিক তালিবানদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে সবকিছু ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে জন্মভূমি ছেড়ে পালিয়েছিল। এখন কিছুটা শান্ত।

কিছুদিন পূর্বে প্রতিবেশী বাংলাদেশের সন্ত্রাসীরা ধর্মের নামে হিন্দুদের বাড়িতে আগুন দিয়ে, লুঠ করে, নারীদের নির্যাতন করে, হত্যা করে যে সন্ত্রাস চালালো, আন্তর্জাতিক স্তরে তার প্রতিবাদ হলেও প্রতিরোধের সূত্র অধরাই রয়ে গেছে। আর ইদানিংকালে স্থানীয় স্তরে সংবাদ শিরোনাম দখল করেছে পশ্চিম বাংলার শক্তিপীঠ তারাপীঠ সংলগ্ন রামপুরহাটের ভয়াবহ হিংসা! যা’ সংশ্লিষ্ট “সত্যমেব জয়তে” সম্বলিত সীলমোহরের আধিকারিকদের পরিহাস করে যেন বলতে চাইছে, তোমরা কতখানি সৎ তোমাদের বিবেকের কাছে একবার জিগ্যেস করে দেখো তো!

*******

এত হিংসা কেন?
বুদ্ধিজীবিগণ, সমাজবিজ্ঞানীরা, মনোবিদেরা এর কি ব্যাখ্যা দেবেন জানিনা, তবে যুগত্রাতা বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র হিংসার কারণ প্রসঙ্গে বলছেন, “অহঙ্কার আসক্তি এনে দেয় ; আসক্তি এনে দেয় স্বার্থবুদ্ধি ; স্বার্থবুদ্ধি আনে কাম ; কাম হতেই ক্রোধের উৎপত্তি ; আর, ক্রোধ থেকেই আসে হিংসা।’’ তাহলে বোঝা গেল, হিংসার মূল কারণ অহঙ্কার। অহঙ্কারের উৎপত্তি প্রবৃত্তি-পরায়ণতা থেকে। আর সেই প্রবৃত্তি-পরায়ণতার চালক লোভ, কাম, ক্রোধ, মদ, মোহ ও মাৎসর্য্য নামের ষড়রিপু, দেহরথের ৬টা ঘোড়ার লাগাম, দেহরথের সারথী ইষ্টগুরুর হাতে সঁপে দিতে পারলে একেবারে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। আর সেই ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন দিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। আমি অক্রোধী, আমি অমানী, আমি নিরলস … ইত্যাদি মন্ত্রে “স্বতঃ-অনুজ্ঞা”-র নিত্য অনুশীলনের বিধানের মাধ্যমে। হিংসাকে প্রতিরোধ করার জন্য এর চাইতে উপযুক্ত কোন নিদান আছে কি-না আমার জানা নেই।
অথচ আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা যুগ-বিধায়কের “প্রাচ্য-প্রতীচ্য নিয়ন্ত্রণে বর্ণাশ্রমানুশাসকম্ আর্য্য চিরায়নম্।” মন্ত্রের অমোঘ বিধানকে পাশ কাটিয়ে হিংসার প্রতিবিধানের জন্য থানা, পুলিশ, মিলিটারী, কোর্ট, সংশোধনাগার প্রভৃতির ব্যবস্থা করেও হিংসা দমন করতে পারছে না। তাই যদি পারত নির্বাচনের ন্যায় একটা সরল প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আমাদের হিংসা এবং হিংসার পরিণতি মৃত্যুর মিছিল দেখতে হতো না। এ কেমন রাজনীতি? ছিঃ!
যুগ-বিধায়ক বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বিধান অনুযায়ী হিংসাকে দূর করতে হলে ভক্তির চাষ দিতে হবে। ভক্তির সংজ্ঞায় তিনি বলছেন, ‘‘সৎ-এ নিরবচ্ছিন্ন সংলগ্ন থাকার চেষ্টাকেই ভক্তি বলে।’’ তাহলে সৎ-এ নিরবচ্ছিন্ন সংলগ্ন থাকার চেষ্টা করার জন্য ভাবী পিতামাতাকে সদগুরুর আদর্শ গ্রহণ করতে হবে। তারপর পরমপিতা প্রদত্ত দিব্য বিবাহ-সংস্কারে সংস্কৃত হয়ে শুদ্ধাত্মাকে আকর্ষণ করে প্রহ্লাদের ন্যায় দিব্য ভক্ত সন্তানের জন্ম দিতে হবে। ভারতের নিজস্ব সংবিধান কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে এর সমর্থন আছে। বর্তমানের চিকিৎসা বিজ্ঞানও এর সমর্থন করেছে। সুস্থ দম্পতির সুস্থ দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে সুস্থ মানবের জন্ম দেওয়ার বিধান দিয়ে। এ ব্যতীত জন্মগত দুরারোগ্য শারিরীক এবং মানসিক ব্যাধি প্রতিরোধের অন্য কোন চিকিৎসা নেই। (Ref. DAVIDSON’S PRACTICE OF MEDICINE/Genetic Factor of Disease)
রাষ্ট্রের অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার বোর্ডের কর্ণধারেরা বিশ্বস্ত, সুস্থ পে-ডিগ্রীড কুকুরের, ঘোড়ার জন্ম নিয়ে গবেষণা করলেও মানুষের বেলায় উদাসীন। একুশ বছরের ছেলে আর আঠারো বছরের মেয়ে হলেই হলো। বংশ, বর্ণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা—কোন কিছুই না দেখে স্পেশ্যাল ম্যারেজ অ্যাক্টের সাহায্যে বিয়ে করতে পারবে, আবার বনিবনা না হলে ডিভোর্সও করতে পারবে! এখন তো আবার বিয়ে না করেও লিভ-টুগেদার আইনের সাহায্যে সন্তানের মা হতে পারা যায়। যার দৃষ্টান্ত লোকসভার সদস্যা নুসরত জাহান। রাষ্ট্রের জন-প্রতিনিধিরা যদি সুস্থ দাম্পত্যের প্রজনন বিজ্ঞানকে অসম্মান করতে পারেন, সেখানে সাধারণ নাগরিকগণ আরো বেশি সুযোগ পেয়ে যাবে লাগামহীন যৌন-জীবন যাপন করার! পরমপিতার অশেষ করুণায় আমাদের গ্রামীন ভারতবর্ষের তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষগুলো এখনো কোন-না-কোনভাবে ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা, পিতামাতায় ভক্তি রেখে বিবাহ সংস্কারের অনুশাসন মেনে চলছে বলে প্রিয়জনের দ্বারা প্রিয়জনদের হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা সমাজে বিস্তার লাভ করতে পারছে না। তবে, রাষ্ট্র ব্যবস্থা যদি এখনই ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুরুত্ব না দেয়, স্বভাববিধ্বংসী প্রতিলোম জাতকদের জন্ম বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাহলে অচিরেই হিংসা আমন্ত্রিত হবে ঘরে ঘরে!

হিংসা প্রতিরোধের জন্য যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র একেবারে সমস্যার মূলে হাত দিয়ে বললেন, “ভক্তি এনে দেয় জ্ঞান ; জ্ঞানেই সর্বভূতে আত্মবোধ হয় ; সর্বভূতে আত্মবোধ হলেই আসে অহিংসা ; আর, অহিংসা হতেই প্রেম। তুমি যতটুকু যে-কোন একটির অধিকারী হবে, ততটুকু সমস্তগুলির অধিকারী হবে।’’
একেবারে অঙ্কের হিসেব। আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি-ইচ্ছার ‘ছোট-আমি’-টার অহঙ্কারের লাগামটাকে যদি ভক্তির মুঠো দিয়ে কষে না ধরা যায় তাহলে ধাপে-ধাপে হিংসার আশ্রয়ে পৌঁছে যাবে। যার পরিণতি অস্বাভাবিক মৃত্যু। আর যদি জীবন নামক রথের চালক ছ’-টা ঘোড়ার (ষড়রিপু) লাগাম জীবন-রথের সারথি স্বরূপ ইষ্টগুরুর হাতে সমর্পণ করা যায়, তাহলে, সরল প্রাণ, মধুর বচন, আর বুকভরা প্রেমের ডালি দিয়ে সবাইকে আপন করে নেওয়া যায়। একটা পিপীলিকারও ব্যথা নিরাকরণের জন্য প্রাণ কাঁদে।
আবার যে হিংসা মৃত্যুর দ্যোতক তাকে শক্ত হাতে দমন করতে হলে হিংসা দিয়েই করতে হবে। হিংসাকে হিংসা দ্বারা জয় করার নাম অহিংসা। যেমন দুষ্টক্ষত বা গ্যাংগ্রীন থেকে শরীরকে বাঁচাতে হলে আক্রান্ত অংশটিকে কেটে বাদ দিতে হয়। বাদ না দিলে দেহকে বাঁচান যায় না। তেমনি সমাজ রক্ষা, রাষ্ট্র রক্ষা করতে হলে অনুরূপ নীতির অনুসরণ না করতে পারলে সমাজ-রাষ্ট্রের অঙ্গে পচন ধরে যাবে, রাষ্ট্রের সত্তাটাই মারা পড়বে।
আর্য্য ভারতের মা কালী শুম্ভ-নিশুম্ভকে, মা দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে, শ্রীরামচন্দ্র রাবনকে বধ করে ওই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। অযথা কাউকে হত্যা করেন নি। অযথা কাউকে হত্যা না করে পার্থসারথি শ্রীকৃষ্ণ মামা কংসের পাঠান অসুর-রাক্ষস নামক সত্তাহিংস জিঘাংসা বৃত্তিধারীদের হত্যা করেছিলেন। অপকৌশলী অসৎ সাম্রাজ্যবাদী কংসকে হত্যা করে, উগ্রসেনকে কারাগার থেকে মুক্ত করে তাঁকে পুণরায় রাজ্যে অভিষিক্ত করেছিলেন। ধর্মপথভ্রষ্ট অসৎ আগ্রাসনী জরাসন্ধকে হত্যা করে জরাসন্ধের পুত্র সহদেবকে রাজ্যে আভিষিক্ত করিয়েছিলেন। সব হিংসার মূল উৎপাটন করে, এক পরম রাষ্ট্রীক সমবায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধ সংগঠিত করে জীবনবাদের জয়গান গেয়েছিলেন। ভবিষ্যত প্রজন্মকে জীবনবাদী হবার জন্য উপহার দিয়ে গেলেন শ্রীমদ্ভবদ্গীতা। আমাদের রাষ্ট্রীয় স্তোস্ত্র “বন্দে মাতরম্” ধ্বনির উৎস শ্রীমদ্ভবদ্গীতা। একদা শ্রীমদ্ভবদ্গীতা গ্রন্থকে আদর্শ মেনে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছিল। সেসব মহান ইতিহাস ভুলে গণতান্ত্রিক পথে রাজনীতি করতে গিয়ে হিংসাশ্রয়ী হয়ে আমরা যদি ভারতমাতার সন্তানদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলি, ভারতমাতা সেই অপমান কতদিন মুখ বুঁজে সহ্য করবেন?
আমরা আবার গীতা গ্রন্থের স্রষ্টা পার্থসারথী শ্রীকৃষ্ণের আশ্রয়ে ফিরে যাব। শ্রীকৃষ্ণ পরবর্তী বহির্ভারতের বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীষ্ট, হজরত রসুল প্রমুখ পুরুষোত্তমগণও আর্য্য ভারতীয় ওই শ্বাশ্বত নীতির অনুসরণ করেছেন মানব সভ্যতাকে বাঁচাতে। তাঁরা আগ্রাসন করতে, ধর্মান্তকরণ করতে, অযথা কাউকে হিংসা করতে কোথাও কি বলেছেন? তবে কেন এত হিংসা? কেন এত জিঘাংসা? ওই হিংস্র জিঘাংসাকে যদি কঠোর হাতে দমন করতে এগিয়ে না আসেন জীবনপিয়াসী শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তথা রাষ্ট্র নায়কেরা, তাহলে মানবতার অপমৃত্যুর কালো ছায়া মানব সভ্যতার অঙ্গে ক্রমে ক্রমে গ্যাংগ্রীন উৎপাদন করবে নিকট ভবিষ্যতে। অসৎ নিরোধে তৎপর না হয়ে, অসৎকে প্রশ্রয় দিয়ে রাষ্ট্রের পবিত্র মন্ত্র “সত্যমেব জয়তে” সম্বলিত সীলমোহরের আধিকারিক হওয়াটা যেমন ভণ্ডামি, তেমনই অসৎ নিরোধে উদাসীন থেকে সৎসঙ্গী সেজে ভক্ত হওয়াটাও কিন্তু ভণ্ডামী! সকলের কথা বলতে পারব না, সেই দিক দিয়ে বিচার করতে গেলে আমি নিজে কিন্তু ভণ্ড। ভক্ত হতে গেলে ঠাকুরত্বকে জাগাতে হবে চরিত্রে। সেটা যখন জাগাতে ব্যর্থ হয়েছি, তাহলে আমি ভণ্ড ছাড়া আর কি! তাই ভণ্ডামি ত্যাগ করে আমাকেও গুটি কেটে খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে পড়তে হবে, পরিস্থিতিকে সামাল দিতে। পরিস্থিতিকে এড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারব না।
ইষ্টভরণ, পিতৃপোষণ
পরিস্থিতির উন্নয়ন,
এ না ক’রে যাই করিস্ না
অধঃপাতেই তোর চলন। ২ ।

(অনুশ্রুতি, ১ম খণ্ড)
ইষ্টপ্রোক্ত উদ্ধৃত বাণীর অধঃপতন থেকে ব্যক্তিসত্তাকে, সংঘ-সত্তাকে বাঁচাতে হলে অসৎ-নিরোধে তৎপর হতেই হবে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র “ব্যক্তি-দম্পতি-গৃহ-সমাজ-রাষ্ট্র
উদ্ধার”-কল্পে, যজন-যাজন-ইষ্টভৃতি-স্বস্ত্যয়ণী প্রবর্তন করছেন। সেকথা বিস্মরণ হলে ইষ্টাদর্শের অপলাপ করা হবে। জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!

রামনবমী

।। রাম নবমীর শ্রদ্ধার্ঘ্য বনাম রামরাজত্বের প্রতিষ্ঠা ।।

নিবেদনে—তপন দাস

*********************

বেশি কিছুদিন ধরে “জয় শ্রীরাম” ধ্বনি শ্লোগানে পরিণত হয়েছে। দিকে দিকে খুব আশার আলোর বিচ্ছুরণ! নির্মিত হতে চলেছে মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রের আদর্শে বিশ্বাসী অনুগামীদের মিলনস্থলের কেন্দ্র স্বরূপ রামমন্দির। ভারতবর্ষে আবার ফিরে আসবে রামরাজত্ব। যে রামরাজত্বের ক্যাবিনেট চালাতেন বশিষ্ঠাদি স্থিতপ্রজ্ঞ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ঋষিগণ। বর্ণাশ্রম, চতুরাশ্রম, দশবিধ সংস্কার আদর্শের অনুসরণে—ভারতবর্ষে যা’ ‘ঋষিবাদ’ (ঋষিদের দ্বারা প্রবর্তিত অনুশাসনবাদ।) নামে প্রতিষ্ঠিত। ঋষিবাদের মূল সংবিধানের নাম ‘ব্রহ্মসূত্র’। ব্রহ্মসূত্র-এর ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে বেদ, উপনিষদ, অষ্টাদশ সংহিতা।

ঋষি বশিষ্ঠ সৌম্যাবতার রামচন্দ্রকে পুরুষোত্তমরূপে চিনতে পেরে রামচন্দ্রকে ঋষিদেরও ঋষি বলে মান্যতা দেন। ঋষিদের সিদ্ধান্তে তখন থেকে পুরুষোত্তমকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয় নব্য-ঋষিবাদ বা পুরুষোত্তমবাদ। যখন যিনি পুরুষোত্তমরূপে অবতীর্ণ হন, তিনিই তখন জীবন্ত বেদ, সংহিতা, পুরাণ। ওই সূত্র অনুসারে রামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীস্ট, হজরত রসুল, চৈতন্যদেব, শ্রীরামকৃষ্ণদেব সকল গুরুদের গুরু সদগুরুরূপে স্বীকৃতি পান। অর্থাৎ স্থান-কাল-পরিবেশ অনুযায়ী যখন যিনি যেখানেই অবতীর্ণ হন না কেন, তাঁর মধ্যে পূর্ব পূর্ব গুরুদের জীবন্ত অনুভব করা যাবে। পূর্ববর্তীদের প্রকৃত আদর্শ খুঁজে পাওয়া যাবে। যাকে আমরা বর্তমানের সফটওয়ারের ভাষায়, অ্যাপ্লিকেশন বা অ্যাপস্-এর ভাষায় আপডেট বলি। অ্যাপ্লিকেশনের সূত্রপাত থেকে শুরু করে সর্বশেষ সংস্করণের নবীকরণের তথ্য মজুত থাকে। আমি যদি আমার মোবাইলের অ্যাপ্লিকেশনগুলো আপডেট না করি তাহলে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারব না। যারা আপডেটেড্, তারাই লক্-ডাউনের সময় অন-লাইন কাজকর্ম করে অনেক কিছু সামাল দিতে পেরেছেন। সবকিছু সামাল দিতে গেলে আপডেটেড হতেই হবে সবক্ষেত্রে। ব্যাকডেটেড থেকে কিছু সামাল দেওয়া যায় না। অথচ আমরা অজ্ঞতাবশে নিজেদের ধারণ করার প্রশ্নে, অর্থাৎ ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে ব্যাকডেটেড হয়ে আছি। তাই তো বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনকূলচন্দ্র আমাদের সচেতন করে দিতে বললেন—“ভারতের অবনতি (degeneration) তখন-থেকেই আরম্ভ হয়েছে, যখন-থেকে ভারতবাসীর কাছে অমূর্ত্ত ভগবান অসীম হ’য়ে উঠেছে—ঋষি বাদ দিয়ে ঋষিবাদের উপাসনা আরম্ভ হয়েছে।

ভারত! যদি ভবিষ্যৎ-কল্যাণকে আবাহন করতে চাও, তবে সম্প্রদায়গত বিরোধ ভুলে জগতের পূর্ব্ব-পূর্ব্ব গুরুদের প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হও—আর তোমার মূর্ত্ত ও জীবন্ত গুরু বা ভগবানে আসক্ত (attached) হও,—আর তাদেরই স্বীকার কর—যারা তাঁকে ভালবাসে। কারণ, পূর্ব্ববর্তীকে অধিকার করিয়াই পরবর্ত্তীর আবির্ভাব।” (সত্যানুসরণ)

কথাপ্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন—“বর্ত্তমান যিনি, তাঁকে ধরলেই তাঁর মধ্যে সব পাওয়া যায়। ………. রামচন্দ্রকে যে ভালবাসে সে যদি শ্রীকৃষ্ণকে না ধরে তবে বুঝতে হবে তার রামচন্দ্রেও ভালবাসা নেই, ভালবাসা আছে তার নিজস্ব সংস্কারে। (আঃ প্রঃ ২১ খণ্ড, ইং তাং ৩১-১২-১৯

* * *

।। রামচরিতের আদর্শের পুণ্য স্মৃতিচারণ ।।

সৌম্যাবতার মর্যাদাপুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্র ছিলেন সত্যের পূজারী অথচ অসৎ নিরোধী। তৎকালীন যুগের অচ্ছুৎ অনার্য্যদের আর্য্যীকৃত করে আর্য্য-অনার্য্যদের মেলবন্ধন করলেন।অনার্য্য গুহক চণ্ডালকে করলেন মিত্র, আবার অকালমৃত্যুর দ্যোতক বর্ণাশ্রম-বিদ্বেষী প্রতিলোমাচারী বন্ধুবর শম্বুবকে দিলেন চরম শাস্তি। মায়াবী রাবণ যখন কিছুতেই সীতাকে বশে আনতে পারছিলেন না তখন সভাসদেরা রাবণকে বলেছিলেন, রামরূপ ধারণ করে গেলেই তো সীতাকে সহজেই বশীভূত করতে পারেন। উত্তরে রাবণ বলেছিলেন, ওই রূপ স্মরণ করলেই আমার সব পাপ-প্রবৃত্তি মুছে গিয়ে আমি এক অন্য মানুষ হয়ে যাই। তথাপি প্রবৃত্তির ঊর্দ্ধে উঠে ওই বোধটাকে ধরে রাখতে পারল না, ফলে রামচন্দ্রের হাতে হত হতে হল। অথচ বিভীষণ রামচন্দ্রের আদর্শে প্রলুব্ধ হয়ে রাবণকে ত্যাগ করলেন।

শুধু তাড়িত-পীড়িত মানুষদেরই নয়, প্রভু রামচন্দ্র পশুপাখিদের ভাষাও বুঝতেন। তাই তারাও প্রভু রামচন্দ্রের কাছে সুবিধা-অসুবিধার কথা জানাতে পারতেন। রাম-রাজত্বে পশু-পাখিরাও সুখে-শান্তিতে বাস করতেন। ওই নিয়মের ব্যত্যয় হবার ফলে, সেই রাম রাজত্বের সময় একটা কুকুর এসেছিল মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রের কাছে বিচারপ্রার্থী হয়ে। সভায় উপস্থিত ছিলেন ভৃগু, আঙ্গিরস, কুৎস, কাশ্যপ, বশিষ্ঠ প্রমুখ সভাসদগণ। কুকুরের অভিযোগ শুনে, বিচার প্রেক্ষিতে সভাসদদের সম্বোধন করে শ্রীরামচন্দ্র বলেছিলেনঃ

न सा सभा यत्र न सन्ति वृद्धाः

वृद्धा न ते ये न वदन्ति धर्मम् ।

नासौ धर्मो यत्र न सत्यमन्ति

न तत् सत्यं यच्छलेनानुविद्धम् ।।

(Ye sabhai briddha nei ta sabha e noi. Yara dharmmasamgata kotha bolena tara briddha noi. yate satya nei ta dharmma noi, yate chhol aachhe ta satya noi.

RAMAYAN, 3/33)

‘‘ন সা সভা যত্র ন সন্তি বৃদ্ধাঃ

বৃদ্ধা ন তে যে ন বদন্তি ধর্মম্।

নাসৌ ধর্মো যত্র ন সত্যমন্তি

ন তৎ সত্যং যচ্ছলেনানুবিদ্ধম্।। (বাল্মীকি রামায়ণ ৩/৩৩)

—যে সভায় বৃদ্ধ নেই তা সভাই নয়। যারা ধর্মসঙ্গত কথা বলে না তারা বৃদ্ধ নয়। যাতে সত্য নেই তা ধর্ম নয়। যাতে ছল আছে তা সত্য নয়। অর্থাৎ, যেখানে ছলনা আছে, কপটতা আছে, সেখানে ধর্ম নেই।

**********

রাম-রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীরামচন্দ্র তো নয়ই, শ্রীরামচন্দ্রের পিতা রাজা দশরথও কোনদিন ছলনার আশ্রয় গ্রহণ করেন নি। তাঁরই রাজত্বে লোকালয় থেকে দূরে, সরযূ নদীর তীরে কুটির বেধেছিলেন বৈশ্য কুলোদ্ভব অন্ধমুনি, শূদ্রা অন্ধ স্ত্রীকে নিয়ে। তাদের একমাত্র চক্ষুষ্মান সন্তান যজ্ঞদত্ত বা সিন্ধুমুনি গোধূলি বেলায় জল আনতে গেছেন সরযূ নদী থেকে। এক মত্তহাতীর উপদ্রব থেকে প্রজাদের রক্ষা করার মানসে মৃগয়ায় গেছেন রাজা দশরথ। তাঁর ঈপ্সিত মত্তহাতীর উদ্দেশ্যে শব্দভেদী বাণ ছোঁড়েন। বাণে বিদ্ধ হয় কলসীতে জল ভরতে থাকা সিন্ধুমুনি।

কলসীতে জল-ভরার অনু-কার শব্দের সাথে হাতীর জলপান করার অনু-কার শব্দের হুবহু মিল রয়েছে। যারফলে অনধাবনতা বশতঃ এক মারাত্মক ভুল করে ফেলেছিলেন রাজা দশরথ। বাণবিদ্ধ যন্ত্রণাকাতর সিন্ধুমুনির আর্তনাদে তাঁর ভুল ভাঙে। সিন্ধুমুনির অনুরোধে বিদ্ধ বানটাকে খুলে নিলে সিন্ধুমুনি মারা যান। রাজা দশরথ জলপূর্ণ কলসী সাথে নিয়ে অন্ধমুনির কুটিরে যান। অকপটে স্বীকার করেন সব অপরাধের কথা। সদ্য সন্তানহারা অন্ধ দম্পতিকে আজীবন পিতৃ-মাতৃ জ্ঞানে রক্ষণাবেক্ষণ করে ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন। সিন্ধু মুনির অন্ত্যেষ্টিও করেন তিনি। তথাপি রাজা দশরথকে অভিশাপ দিয়ে পুত্রশোকে সহধর্মিনীসহ দেহত্যাগ করেন অন্ধমুনি। সেই অভিশাপেই পুত্র শোকেই রাজা দশরথের অকালমৃত্যু হয়েছিল। এই হচ্ছে ভারতবর্ষের ধর্ম পালনের উদাহরণ।

নির্জন স্থান। প্রত্যক্ষদর্শী কেউ ছিল না। সাক্ষী দেবারও কেউ ছিল না। রাজা দশরথ যদি কপটাচারী হতেন, ছলনার আশ্রয় নিতেন, অনায়াসেই সিন্ধুমুনির বিপন্ন-অস্তিত্বের প্রাণহীন দেহটাকে ফেলে রেখে চলে যেতে পারতেন। গায়ে পড়ে অভিশাপও কুড়োতে হতো না। কিন্তু পারেন নি সত্যের জন্য, বিবেকের জন্য, বিবেকের দংশন থেকে মুক্তি পাবার জন্য। তাই, মনের অনুগমন না করে বিবেককে অবলম্বন করে চলার নামই ধর্মপথে চলা। ধর্মের সাথে অস্তিত্বের সম্পর্ক, অস্তিত্বকে ধারণ করে রাখার সম্পর্ক।

*********

মাননীয় নরেন্দ্র মোদিজীর নেতৃত্বাধীন বর্তমানের বিজেপি সরকার ধর্মের নামে, ‘জয় শ্রীরাম’ শ্লোগানকে আঁকড়ে বিপুল জন সমর্থন পেয়েছেন। মর্যাদা পুরুষোত্তম রামচন্দ্রের আদর্শে বিশ্বাসী ভারতের নির্বাচকগণ ‘রাম-রাজত্বের’ ন্যায় এক স্বচ্ছ, নির্মল শাসনতন্ত্রের আশায় ভোট দান করেছেন। অতএব রামচন্দ্রের নাম-মাহাত্ম্যের জোরে যে শাসনতন্ত্রের অধিকার অর্জন করেছেন যে জন-প্রতিনিধিরা, তাদের ক্যাবিনেট যদি রামচন্দ্রের গুরু ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠের আদর্শের আলোকে আলোকিত না হয়,—সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হয়,—জন-প্রতিনিধিগণ যদি রাম-রাজত্বের পরিপন্থী বিলাস-ব্যসন ত্যাগ করে, আত্ম-প্রতিষ্ঠার মোহ ত্যাগ করে, সাত্ত্বিক-চলনে সাধারণভাবে চলতে অভ্যস্ত না হয়,—তাঁরা কখনোই ঈপ্সিত রাম-রাজত্ব ফিরিয়ে আনতে পারা যাবে না।

********

বনবাসে থাকার সময় রামচন্দ্র ভরতকে রাজকার্য পরিচালনা বিষয়ে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন—“….. তুমি গুণী ও যোগ্য ব্যক্তিকে বহু-মান প্রদর্শন করে থাক তো? বীর, বিদ্বান, জিতেন্দ্রিয়, সদ্বংশজ, ইঙ্গিতজ্ঞ লোকদের মন্ত্রীপদে প্রতিষ্ঠিত করেছ তো? তুমি তাদের সঙ্গে মন্ত্রণা কর তো? তোমাদের মন্ত্রণা লোকের মধ্যে প্রকাশ হয়ে পড়ে না তো? তুমি যথাসময়ে শয্যাত্যাগ কর তো? রাত্রিশেষে অর্থলাভের চিন্তা কর তো? তুমি সহস্র মূর্খ পরিত্যাগ করেও একজন বিদ্বানকে সংগ্রহ করতে চেষ্টা কর তো? অযোগ্য লোককে যোগ্যস্থানে ও যোগ্য লোককে অযোগ্য স্থানে নিয়োগ কর না তো? যে-সব অমাত্য উৎকোচ গ্রহণ করেন না, যাদের পিতৃপুরুষ যোগ্যতার সঙ্গে অমাত্যের কাজ করেছেন, যারা ভিতরে-বাইরে পবিত্র—সেই সব শ্রেষ্ঠ অমাত্যকে শ্রেষ্ঠ কাজে নিযুক্ত করেছ তো? রাজ্যমধ্যে কোন প্রজা অযথা উৎপীড়িত হয় না তো? শত্রুকে পরাস্ত করতে পটু সাহসী, বিপৎকালে ধৈর্য্যশালী, বুদ্ধিমান, সৎকুলজাত, শুদ্ধাচারী, অনুরক্ত ব্যক্তিকে সেনাপতি করেছ তো? বিশেষ নৈপুণ্য যাদের আছে, তাদের তুমি পুরস্কৃত ও সম্মানিত করে থাক তো? প্রত্যেকের প্রাপ্য বেতন সময়মত দিয়ে থাক তো? রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তিবর্গ তোমার প্রতি অনুরক্ত আছেন তো? তোমার কার্য্যসিদ্ধির জন্য তাঁরা মিলিত হয়ে প্রাণ পর্য্যন্ত দিতে প্রস্তুত আছেন তো? বিদ্বান, প্রত্যুৎপন্নমতি, বিচক্ষণ এবং তোমার জনপদের অধিবাসীকেই দৌত্যকার্য্যে নিযুক্ত করেছ তো? স্বরাজ্যে ও পররাজ্যে প্রধান-প্রধান পদের অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের সম্বন্ধে জ্ঞাতব্য সংবাদ চরগণদ্বারা অবগত থাক তো? চরগণ পরস্পর-বিরোধী তথ্য পরিবেষণ করলে তার কারণ নির্ণয় করে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা করে থাক তো? প্রজাগণ সুখে আছে তো? তারা দিন-দিন স্ব-স্ব কর্ম করে সমৃদ্ধ হচ্ছে তো? তোমার আয় বেশী, ব্যয় কম হচ্ছে তো? ধনাগার অর্থশূন্য হচ্ছে না তো? অপরাধীদের ধনলোভে ছেড়ে দেওয়া হয় না তো? তুমি সাম, দান, ভেদ ও দণ্ডের প্রয়োগ যথাস্থানে করে থাক তো? তুমি ইন্দ্রিয়গণকে জয় করতে সচেষ্ট থাক তো? অগ্নি, জল, ব্যাধি, দুর্ভিক্ষ ও মড়ক এই পাঁচ রকমের দৈববিপদের প্রতিকারের জন্য তুমি যত্নশীল থাক তো? সন্ধি-বিগ্রহাদি যথাস্থানে প্রয়োগ কর তো? ? ? ইত্যাদি ইত্যাদি। (আঃ প্রঃ ৫ম খণ্ড, ইং তাং ২-৪-১৯৪৪)

*********

উপরোক্ত বিধানগুলো রাম রাজত্বের অনুশাসনবাদ। তাই রাম-রাজত্ব প্রতিষ্ঠা-পিয়াসী জন-প্রতিনিধিদের উচিত হবে, রামচন্দ্রের সভার ন্যায় একজন আদর্শ সভাসদরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। এবং তা’ বাস্তবায়িত করতে হলে, আদর্শ প্রজাপালকের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। সরকারী কোষাগার থেকে সাধারণভাবে বেঁচে থাকার প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা যাবে না। বর্তমান শাসনতন্ত্রের পরিকাঠামো অনুযায়ী জন-প্রতিনিধিদের জন্য বরাদ্দ সুবিধা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে রাম-রাজত্ব প্রতিষ্ঠার চিন্তা অধরাই থেকে যাবে। জনগণকে স্ব স্ব আত্মমর্যাদায় সুখে রাখতে হলে জন-প্রতিনিধিগণদের বিলাস-ব্যসন সুখ-সুবিধার কথা ভুলতে হবে, নীতিপরায়ণ হতে হবে, সর্বোপরি যথার্থ ধার্মিক হতে হবে। সেদিকে দৃষ্টি দিলে তবে কাজের কাজ কিছুটা হবে।

রাম রাজত্বকে বাস্তবায়িত করতে হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর ক্যাবিনেটকে বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সংবিধান “বিধান বিনায়ক” গ্রন্থের অনুশাসন অনুযায়ী এ বিষয়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

সবাই আমার প্রণাম জানবেন। জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!

tapanspr@gmail.com

——-

No photo description available.

All reactions:

নাম চিকিৎসা

**মরো না, মেরো না, পার তো মৃত্যুকে অবলুপ্ত কর।**

।। নাম চিকিত্সা ।।

নিবেদনে—তপন দাস

************************

দেহ ধারণ এবং দেহ ত্যাগ এই দুইয়ের মাঝে জীবন নামের প্রবাহ কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল তা নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত। সৃষ্টিতত্ত্ব অনুসারে পিতার পিতা পরমপিতা লীলার প্রয়োজনে নিজেকে এক থেকে বহুতে পরিণত হতে গিয়ে যে

সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম স্পন্দনের সৃষ্টি হয়েছিল তার নাম অনাহত নাদ বা আদিধ্বনি বা প্রণব। সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী মানুষ, ব্রহ্মবিদ্ আচার্য্য মাধ্যমে ‘আত্মানং বিদ্ধি’র মার্গ অনুসরণ করে ‘মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়’—মৃত্যু হতে অমৃত আহরণ করতেন। জীবাত্মাকে বিলীন করে দিতেন পরমাত্মায়। সোনার তাল থেকে তৈরী গয়নাটাকে ব্যবহার করে আবার ফিরিয়ে দিতেন সেই সোনার তালে।

পরমপিতা সকলের পিতা আর আমরা হলাম আমাদের ভাগ্যবিধাতা। আকর্ষণ (attraction) সংকোচন, (contraction), স্থিতি (stagnation) ও প্রসারণ (expansion)-এর লীলায়িত

ছন্দের বিধায়িত নিয়মে আমরা প্রত্যেকেই এক একজন স্রষ্টা। নারী-পুরুষের সম্মিলিত জনন ক্রিয়াকালিন কোষ বিভাজন মাধ্যমে সংকুচিত ডিম্বাণু (ovum) ও শুক্রাণু (sperm) নামের দুটি ভিন্ন সত্তা একটি কোষে এক হয়ে গর্ভে স্থিত হয়। পুণরায় কোষ বিভাজন মাধ্যমে প্রসারিত হয়। ক্রমান্বয়ে সৃষ্টি হতে থাকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। গর্ভবাসের স্থিতিকাল উত্তীর্ণ হলে ভূমিষ্ট হয়।

শুরু হয় জীবন যাপনের পালা। শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্দ্ধক্যের

পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রার ছান্দিক শকটে চড়ে ‘মহাচেতন সমুত্থানের’ গন্তব্যে পৌঁছান অথবা মাঝপথে নেমে পড়া, নির্ভর করে স্রষ্টা পিতামাতার উপর। স্রষ্টা পিতামাতার সহজাত ও অর্জিত গুণ ও কর্মের সম্পদ দ্বারা যেমন ভাবের আত্মাকে আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়, তদুনুরূপ আয়ু (সুখায়ু, দুঃখায়ু, পরমায়ু) লাভ করে সন্তান। আবার উক্ত সন্তানের আত্মা যে ভাব নিয়ে বিগত হবে, সেই ভাব

নিয়েই ওই আত্মাকে পিণ্ডদেহ ধারণ করতে হবে। এই হ’ল জীবন-মৃত্যুর আগম-নিগমের চরম সত্য ।

ইহজন্ম ও পরজন্ম প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন,

“আপূরমান ইষ্টে কারও যদি টান জন্মে, এবং তাই নিয়ে যদি সে বিগত হয় তবে সে মহান জীবন লাভ করবেই। আবার, এ জীবনে যে যতই হোমরা-চোমরা হোক না কেন, সে যদি সুকেন্দ্রিক না হয়, প্রবৃত্তিই যদি তার জীবনের নিয়ামক হয়, তবে ঐ

বিচ্ছিন্ন বিকেন্দ্রিকতা তার মৃত্যুকালীন ভাবভূমি ও পরজন্মকে যে অপগতিতে অপকৃষ্ট ক’রে তুলবে, তা’তে সন্দেহ কমই।’’ (আ. প্র. ১ম খণ্ড ১৯. ১১. ১৯৪১)

এক্ষেত্রেও সেই নাম চিকিৎসার ব্যাপার। তবে পার্থক্য এই যে

অজপাসিদ্ধ সাধক স্পর্শদ্বারা নামের শক্তি কোন অসুস্থ ব্যক্তির দেহে সঞ্চারিত করে আরোগ্যকারী শক্তিকে সঞ্জীবিত করে দুরারোগ্য ব্যাধির নিরাময় করতে পারেন। কিন্তু এক্ষেত্রে নিজের চিকিৎসা নিজেকেই করতে হবে। অজপা জপের সাথে আজ্ঞাচক্রে ‘কেবলম্ জ্ঞানমূর্ত্তিম্’কে অর্থাৎ ইষ্টমূর্ত্তিকে ধারণ করতে হবে। তাই, যারা বহুনৈষ্ঠিক, একাধিক মূর্ত্তিতে কেন্দ্রায়িত, তাদের বিধায়িত পথে একমাত্র ইষ্টে কেন্দ্রায়িত হবার

অভ্যাস পাকা করে ফেলতে হবে।

নাম সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর ভাববাণীতে বলেছেন :

‘‘শুধু নাম, নাম প্রণবের উপরে। প্রণবের আগে নাম, পাছেও নাম। বীজমন্ত্র কিরে ? নাম। দ্যাখ, নাম নিয়ে। দ্যাখ, নাম নিয়ে যায় প্রণবে, আর প্রণব নিয়ে যায় আমাতে। আমি পরমাত্মা, শুদ্ধ ব্রহ্ম । …… প্রণবে উঠে পরব্রহ্ম।’’ ৪ । ১৩

‘‘আলস্য জড়তা শয়তানের থানা করিস্ নে। নামে ডুবে থাক। নাম কর আর বিলিয়ে দে ! ….. শান্তি শান্তি ক’রে ঘুরে বেড়াচ্ছিস ? নাম ক’রে জগত্‍ ভুলে যেতে পারিস্ না ? শরীর ভুলে যেতে পারিস্ না ? তা না হ’লে শান্তি পাবি কোথায় ? কি চাস্ ? আর কি চাস্ ? অমৃত ? দেবগণ যে অমৃত পান ক’রে অমর হয়েছিল, তোদের সম্মুখেই সেই অমৃত। তোদের হাতে ধ’রে দিচ্ছে, মুখে তুলে

দিচ্ছে, তাও খেতে পারবি না ? অহঙ্কার করবি তো নামের । নাম কর । হনুমানের মত বক্ষ বিদারণ ক’রে দেখাবি নাম। ….অন্তরে নাম ক’রে যা’ সব দিতে পারি! অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড লয় করে দিতে পারিস্, তার একমাত্র উপায় নাম । নামই সব।’’ ৩৫। ৩ (পুণ্য-পুঁথি)

‘‘ভগবানই সৎ বস্তু। নাম আর ভগবানে পৃথক নাই। নামকেই জানবি ভগবান ব’লে।’’ ১৭।২ (পুণ্য-পুঁথি)

“সংসার যন্ত্রণা নিবারণের জন্য কুইনাইন নাম। মনে অনবরত নাম কথা বলতে বলতে মনের মধ্যে নাম হচ্ছে । এই রকম করতে করতে সারূপ্য লাভ হয়।” (পুণ্য-পুঁথি)

“ইষ্টে অনুরাগ সমন্বিত হ’য়ে নাম ক’রলে শরীরে অদ্ভূত energy আসে mental advancement (মানসিক অগ্রগতি)-এর সঙ্গে-সঙ্গে কত রকম জ্ঞানের প্রত্যক্ষ অনুভূতি হয়, তোদের পুঁথি পড়া জ্ঞানের মত নয় । এ জ্ঞান যেন সমস্ত প্রকারের সঙ্গে বাঁধা । নাম জিনিসটা আর কিছুই নয়, highest stage (উচ্চ স্তর)-এর যা’ কম্পন, সেই কম্পন ধারা, কথায় প্রকাশ করতে গেলে যে শব্দ হয়, সেইটেই হচ্ছে নাম । এই শব্দটা করলে মনটাকে নানা অবস্থার ভিতর-দিয়ে

সেই অবস্থাতে নিয়ে যায় ।”

(ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনী গ্রন্থের ২য় ভাগ পৃঃ ১৮৭)

পুণ্য-পুঁথি র ত্রিচত্বারিংশত্তম দিবসের ভাববাণীতে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন :

“The vibration–Two currents–one downward, one motion. Tenth

door from the pineal, extreme of Soham. The ‘I’, inexpresible ‘I’.

দ্যাখ, ব্রহ্মের চরম দশম দ্বারে । দশম দ্বারে সমস্ত বাসনা ছুটে গেছে,

একমাত্র আমির দিকে ছুটে গেছে । দ্যাখ ‘ভ্যানিস’ নয় । ভগবতের রাজ্য তেসরা

তিল হতে সোহহং। গীতা তেসরা তিল হতে মূলাধার । তেসরার পর আর

কর্ম্ম-টর্ম্ম নাই। কেবল প্রেমে পর্য্যবসিত হচ্ছে ।”

শ্রীশ্রীঠাকুরের উপরোক্ত বাণীতে নামসাধন পদ্ধতির যে স্বরূপ পাওয়া গেল ।

তা একটু বুঝে নেবার চেষ্টা করব ।

আধ্যাত্মিক সাধনায় কুলকুণ্ডলিনী জাগরণের বিষয় সব মতবাদের মধ্যে

বিদ্যমান। প্রবৃত্তিকে সত্তামুখী করার লক্ষ্যে। সেই লক্ষ্যে এবার পৌঁছবার

চেষ্টা করব।

মস্তিষ্কের সম্মুখস্থ cerebrum-এর occipital lobe-এর পর cerebellum-এর

অবস্থান। ওই দুই লঘু ও গুরু মস্তিষ্কের সংযোগস্থল ব্রহ্মতালু।

মস্তিষ্কের প্রান্তভাগ medulla oblongata নাম নিয়ে মেরুদণ্ডের উপরিভাগ

থেকে শুরু হয়ে coccyx নামে কোমরের নীচে শেষ হয়েছে। ঠিক ওর নীচে

ব্রহ্মশক্তিরূপী মূলাধার চক্রের অবস্থান। মূলাধার থেকে ব্রহ্মরন্ধ্রে

মনকে নিয়ে যেতে পারলে অমৃতত্ব লাভ হয়। অমৃতের দেশের দ্বারদেশ দুই

ভ্রূর মাঝখানের দ্বিদল বা আজ্ঞাচক্র। (যেখানে শরীর বিজ্ঞানের pineal

gland-এর অবস্থান।) তারপর মনশ্চক্র, সোমচক্র ভেদ করে পৌঁছাতে হয়

ব্রহ্মরন্ধ্রের অমৃতের দেশে বা দয়ালদেশে। যা সদ্ দীক্ষার শবধ্যান

অনুশাসনে বর্ণিত আছে। নিয়মিত শবধ্যান করলে হৃদরোগ এবং মস্তিষ্কের রোগ

হয় না। এবং আজ্ঞাচক্রে পুরুষোত্তমরূপী ত্রিগুণাতীত পুরুষের ধ্যান করলে

ত্রিগুণের উপর আধিপত্য লাভ হয়।

শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের সাধনার কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছেন। যারফলে আমাদের

১। মলদ্বার ও লিংগের মধ্যবর্তী চতুর্দল বিশিষ্ট মূলাধার ; ২। লিংগমূলের

ষটদল বিশিষ্ট স্বাধিষ্ঠান ; ৩। নাভিদেশের দশদল বিশিষ্ট মণিপূরক ; ৪।

হৃদয়ের দ্বাদশদল বিশিষ্ট প্রণবাকৃতির অনাহত ; ৫। কণ্ঠদেশের সরস্বতীর

আবাসস্থলের ষোড়শদল বিশিষ্ট বিশুদ্ধি এবং ৬। জিহ্বামূলে দ্বাদশদল বিশিষ্ট

ললনাদি চক্র ভেদ করে আজ্ঞাচক্রে পৌঁছাতে হবে না। অনাহত নাদে এবং

ইষ্টমূর্তি ধ্যানের মাধ্যমে আজ্ঞাচক্রের সত্ত, রজঃ ও তমো নামাঙ্কিত

ত্রিদল বিশিষ্ট চক্র পার হয়ে নিম্ন কপালে অবস্থিত ছয়দল বিশিষ্ট

মনশ্চক্র ও ঊর্দ্ধ কপালে অবস্থিত চন্দ্রকলাসম ষোড়শদল বিশিষ্ট সোমচক্র

পার হয়ে ব্রহ্মতালুর সহস্রদল বিশিষ্ট অমৃতের আধারে পৌঁছাতে পারলেই

“মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়”-র আস্বাদন। অমৃতত্ব লাভ। যা আস্বাদন করতে হলে

শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত “পঞ্চবর্হি” এবং “সপ্তার্চ্চি”র অনুশাসন মেনে

চলতেই হবে।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র নিজে একজন কৃতী চিকিত্সক ছিলেন। আয়ুর্বেদ,

হোমিওপ্যাথী, টোটকার সাহায্যে অনেক অনেক দুরারোগ্য দেহের ব্যাধি আরোগ্য

করেছেন। পরবর্তীকালে প্রথাগত চিকিত্সাযর ভার বন্ধুবর অনন্তনাথ রায়ের

উপর অর্পণ করে রোগের কারণ নিরাকরণে মনোনিবেশ করেন। গড়ে তোলেন কীর্তনদল।

কীর্তনের ত্রিদোষ-নাশী ব্যাধিহরা সঞ্জীবনী আহতনাদধ্বনী পরিবেশের

প্রবৃত্তিদুষ্ট মানুষগুলোকে করে তোলে সত্তাপ্রেমী। কীর্তনের আঙিনায়

প্রকাশিত হয় তাঁর বিশ্বাত্মার পরিচয়–ভাব সমাধির মাধ্যমে। ক্রমে কীর্তন

দলের কলেবর বৃদ্ধি হতে থাকে। হিমায়েতপুর সংলগ্ন গ্রাম থেকে গ্রামান্তর,

ওদিকে কুষ্ঠিয়া মেতে ওঠে এক অভিনব কীর্তনের আনন্দে।

“এ যে আনন্দবাজার ! নাইরে দুঃখ নাইরে দৈন্য আনন্দ, আনন্দ সবার !'”

রোগ-শোক-ব্যাধি-জরা জর্জরিত মানুষেরা এক নবীন জীবনের স্বাদ আস্বাদন করে ধন্য

হয়। শুধু মানুষেরাই নয় পরিবেশের গাছপালা, পশুপাখিরা পর্যন্ত ওই

কীর্তনান্দের স্বর্গীয় সুখ উপভোগ করে জয় করেছিল সব দুর্ভোগ ।

নাম বা নাদ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুশ্রুতি গ্রন্থে বলছেন :

“অনুরাগে করলে নাম

আপনিই আসে প্রাণায়াম।”

অনুরাগ মানসবৃত্তিয় একটি প্রকাশ। স্ত্রী, সন্তান, অর্থ, মান, যশ,

প্রভাব, প্রতিপত্তি ইত্যাদির উপর আমাদের এক সহজাত অনুরাগ থাকেই। সেই

অনুরাগ ইষ্টানুগ সত্তাধর্মী করে তুলতে সদগুরু আদর্শের প্রতি অনুরক্ত হতে

হবে নামের মাধ্যমে। নাম<নমঃ=আনতি সম্পন্ন হয়ে চলা। তাই নামীর আদর্শের

প্রতি আনতি সম্পন্ন হয়ে নাম অভ্যাস করার কথা শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন।

ওই অভ্যাস কিভাবে করতে হবে সে বিষয়ে তিনি বলেছেন :

‘‘সৃষ্টি ধারা উল্টে নিয়ে

স্বামীর সাথে মিল করে

অর্থে ভেবে ঐ জপে যা’

সদগুরুতে ধ্যান ধরে।’’

এই নিদেশ মেনে যেসব সাধকেরা নিজেদের অজপাসিদ্ধ করে তুলতে পারবেন, তারা

নামের শক্তির বিকীরণে রোগশক্তিকে পরাভূত করে নিজেরা সুস্থ থেকে পরিবেশকেও

সুস্থ করে তুলবেন।

শুধু দীক্ষা নিয়ে কীর্তন করলেই তো আর হবে না! কীর্তনের যে একটা

শক্তি আছে, সৎ নামেরও যে একটা শক্তি আছে, সেটা তো সবার চোখের সামনে তুলে

ধরতে হবে।

ইদানীং স্বাস্থ্যসচেতন মানুষেরা ধ্যান বা প্রাণায়াম অভ্যাসে বিশেষ

গুরুত্ব দিচ্ছেন। রেইকি নামের স্পর্শ চিকিত্সা পদ্ধতিও বিশেষ জনপ্রিয়তা

লাভ করেছে। এ সব কিছুর লক্ষ্য শরীর, মন ও আত্মার সাথে সমন্বয় সাধন

মাধ্যমে শারীরবৃত্তিয় আরোগ্যকারী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে

সুস্থ থাকা, সুস্থ করা।

ধ্যানে কেন্দ্রায়িত লক্ষ্যবস্তুর আদর্শের অনুরূপ ধ্যানী নিজেকে স্থির ও

গ্রহণক্ষম করতে পারে। পূরক, কুম্ভক, রেচক সমন্বিত প্রাণায়াম পদ্ধতি

বিধিপূর্বক বিনিয়োগ করতে না পারলে আরামের পরিবর্তে ব্যারামও এনে দিতে

পারে।

রেইকি চিকিত্সক মহাজাগতিক শক্তি সঞ্চারনা মাধ্যমে রোগ নিরাময় করেন। ওই

সব পদ্ধতির সম্মিলিত রূপ শ্রীশ্রীঠাকুর প্রবর্তিত উচ্চস্তরের নাদ এবং

মহালক্ষী যন্ত্রমধ্যে স্থাপিত সদগুরুর ধ্যান পদ্ধতি। যার সহজ অনুশীলনে

কঠিন সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, পীড়িতকে মুক্ত করাও যায়।

কুষ্টিয়ার অশ্বিনী বিশ্বাসের বাড়ীতে কীর্তন চলছে। খবর পেয়ে দীর্ঘদিন

ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত কুষ্টিয়ার ডাকপিওন লক্ষণ ঘোষকে চারজন বাহক খাটিয়ায়

করে এনে নামালো কীর্তনের আসরে, গোঁসাইদার পায়ের কাছে। লক্ষণকে বুকে জড়িয়ে

ধরে কীর্তন করতে লাগলেন গোঁসাইদা। কিছুক্ষণ পর এক ধাক্কা দিয়ে বাড়ী যেতে

বললেন। দিব্যি হাঁটতে হাঁটতে বাড়ী চলে যান লক্ষণ ঘোষ। ……. বরৈচারার

জানকী হালদারের উত্থানশক্তি নেই। আমলা পাড়ার রামকৃষ্ণ বিশ্বাসকে পাঠালেন

ঠাকুর জানকী হালদারের চিকিৎসার জন্য। এহেন কঠিন দায়িত্ব পেয়ে ঘাবড়ে যায়

রামকৃষ্ণ বিশ্বাস। ঠাকুর তাকে স্পর্শ করে বললেন, “নিশ্চয়ই পারবি তুই। কোন

চিন্তা নাই।” ঠাকুরের আদেশে ওই রামকৃষ্ণ বিশ্বাসই বরৈচারার জানকী

হালদারের বাড়ীতে গিয়ে রোগীকে ছুঁয়ে নাম করতে করতে রোগীকে আরোগ্য করে ফিরে

এসেছিলেন কুষ্টিয়ায়। প্রসঙ্গত বলে রাখি, ওই রামকৃষ্ণ বিশ্বাসই কীর্তন

করার অপরাধে গোঁসাইদাকে লাঠি দিয়ে মারতে গিয়ে বিপদে পড়ে যান। গোঁসাইদাকে

ছোঁয়ার সাথে সাথে বন্-বন্ করে মাথা ঘুরতে থাকলে হাতের লাঠি ফেলে উন্মাদের

মতো চীৎকার করে নাম করতে থাকে। তারপর কাজকর্ম ছেড়ে দীক্ষা নিয়ে গোঁসাইদার

সাথে সাথেই কীর্তন করে বেড়াতো।

তাই, এবার ঠাকুর ঠিক করলেন, আলাদা করে একটা নাম চিকিৎসালয় গড়ে তোলার।

কুষ্টিয়ায় একটি দোতালা পাকা বাড়ীতে ১৫-১৬ শয্যাবিশিষ্ট “সৎসঙ্গ

প্রাণতত্ত্বানুসন্ধান সমিতি’’ (Life Research Society) শিরোনামে

চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠিত করা হলো। ঠাকুরের বিশেষ প্রশিক্ষণে সতীশচন্দ্র

গোস্বামী, রামকৃষ্ণ প্রামাণিক, রাধারমণ জোয়ারদার, সুশীলচন্দ্র বসু,

মহম্মদ গহরআলি বিশ্বাস প্রমুখ ভক্তগণ রোগীর শরীরে সৎনামের সঞ্চারনার

মাধ্যমে রোগ আরোগ্যকারী শক্তিকে জাগিয়ে অসুস্থদের সুস্থ করে তুলছেন।

সর্পদংশনে মৃত, মেনিঞ্জাইটিসে অচৈতন্য, পক্ষাঘাতগ্রস্ত—এমন অনেক,

প্রচলিত চিকিৎসায় ফেরত দুরারোগ্য রোগীদের নাম-সঞ্চারণার মাধ্যমে আরোগ্য

করে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিস্ময় সৃষ্টিকারী এক নবীন ধারাকে সংযোজিত

করে রেখে গেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।

———

বর্ষবরণ—বর্ষবিদায়

।। বঙ্গাব্দ ১৪২৯কে বিদায় ও ১৪৩০কে বরণ স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।

নিবেদনে—তপন দাস

******************************

* কাল নির্ণয়ের ইতিবৃত্ত *

পল, দণ্ড, কলা, মুহূর্ত, প্রহর ইত্যাদি দিয়ে শুরু করে পৃথিবীর আহ্নিক গতিকে ১ অহোরাত্র ধরা হয়। ৩০ অহোরাত্রে ২ পক্ষ বা ১ মাস। ৬ মাসে ১ অয়ন। ২ অয়নে ১ বর্ষ। অপরপক্ষে উত্তরায়নে দেবতাদের ১ দিন, দক্ষিণায়নে ১ রাত।

দেবতাদের ১ বছর সমান মানুষের ৩৬০ বছর ধরা হয়। বায়ুপুরাণে সৌর, সৌম্য, নাক্ষত্র এবং সাবন নামে চার প্রকার সময় নিরূপণ মাসের উল্লেখ আছে। ৩০ সূর্যোদয়ে সাবনমাস। সূর্যের রাশি পরিবর্তনে হয় সৌরমাস। কৃষ্ণপক্ষের

প্রতিপদ থেকে শুক্লপক্ষের পূর্ণিমা পর্যন্ত চান্দ্রমাস। চন্দ্রের নক্ষত্র ভোগকালকে বলা হয় নাক্ষত্রমাস। ৫ সৌরবর্ষে ১ নৈসর্গিক যুগ। (কোনো একটি

মাসের আবর্তন কালকে একক ধরে নৈসর্গিক যুগের গণনা শুরু করা যেতে পারে।) ১

হাজার নৈসর্গিক যুগে ১ কল্প। সপ্তর্ষিরা ১০০ বছর করে এক একটি নক্ষত্রে কেন্দ্রীভূত থাকে। ২৭টি নক্ষত্র ভোগকাল ২৭০০ বছর—একটি সপ্তর্ষিযুগ। এই সপ্তর্ষিযুগের গণনা প্রাচীন ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল। ভারতের অন্যতম জ্যোতির্বিদ আর্যভট্ট নক্ষত্রাদির সাথে মেষরাশির অবস্থানকে কেন্দ্র করে

কল্যব্দের সূচনা করেন ৩১০১ খৃঃপূঃকে একক ধরে। সেই হিসেব এবং রাশির অবস্থান ধরে উত্তরায়নে ভীষ্মের দেহত্যাগ এর হিসেব কষে ৩২২৮ খৃঃপূঃ কে

পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের জন্মবর্ষ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

এইভাবেই দিনরাত-মাস-বছর হয়েই চলেছে আদিকাল থেকে প্রাকৃতিক নিয়মে।

দিন-মাস-বছর আসে যায়, রেখে যায় কিছু স্মৃতি মনের মণিকোঠায়। ওই স্মৃতির

মালাগুলোকে স্মৃতিবাহীচেতনার ভল্টে অনন্তকাল জমা করে রাখার জন্য আর্য্য-ঋষিরা প্রতিটি মুহূর্তের জীবন ধারণের আহরণকে শুদ্ধি করার মাধ্যমে

ধ্রুবাস্মৃতির সন্ধান দিয়ে গেছেন।

বঙ্গাব্দের ১৪২৯তম বর্ষের স্মৃতিমেদুর আশা-হতাশা, চাওয়া-পাওয়া, সুখ-দুঃখ,

মিলন-বিচ্ছেদ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, প্রেম-হিংসার জাবেদা খাতার সঞ্চয় জমা রেখে সম্মুখের দিকে এগিয়ে চলার মাহেন্দ্রক্ষণ সমাগত। সমাগত পরমপুরুষ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রবর্তিত নববর্ষ পুরুষোত্তম স্বস্তিতীর্থ মহাযজ্ঞ। আমরা প্রস্তুত ১৪৩০তম বর্ষ-এর নতুন সূর্যকে স্বাগত জানাতে।

প্রাণের প্রাণ-স্পন্দন টিঁকিয়ে রাখার উৎস, আমাদের এই সবুজ গ্রহের

অভিভাবক, সকল শক্তির উৎস জ্যোতির্ময় সূর্যের তেজোময় দীপ্তিতে আমরা যেন

সকল প্রকার কলুষতা ত্যাগ করে দীপ্তিমান চরিত্রের অধিকারী হতে পারি।

আমাদের মনুষ্যত্ব যেন দূষিত না হয়। আকাঙ্খার মোহে পড়ে আমরা যেন আমাদের

পঞ্চ-মহাভূত সম্ভূত পরিবেশকে দূষিত না করি। ভিনগ্রহের প্রাণীরা যেন

পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ-প্রাণীদের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলতে না পারে, যে

আমরা অসভ্য, ভোগবাদের জোয়ারে ভাসতে গিয়ে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার, বাঁচিয়ে

রাখার অনুকূল পরিবেশকে বিনষ্ট করছি। তাহলে সেটা বড় লজ্জার ব্যাপার হবে।

হে অন্তর্যামী পরমপিতা! তুমি আমাদের শুভবুদ্ধি দাও, আমরা যেন সমাগত

১৪৩০-এর নতুন সূর্যের কিরণে স্নাত হয়ে অসৎনিরোধী তৎপরতায় নতুন প্রাণ, নতুন সুর, নতুন গান, নতুন ঊষা, নতুন আলোর নবীনতায় নতুন বছরকে সম্বর্দ্ধিত করতে পারি। কেটে যাক

আমাদের সব বিষাদ, পরমপিতার আশীষধারায় এসে যাক হর্ষ, শুভ হোক ১৪৩০-এর

নববর্ষ।

আগন্তুক ব্যাধি ভয়ে ভীত না হয়ে, প্রবৃত্তি প্ররায়ণতা জাত ত্রিতাপ জ্বালায় ইষ্টবারি সিঞ্চন করে ‘একদিন-প্রতিদিনের’ চিরনবীন সূর্যালোকের নবীন ছটায় পরমপিতার অনুশাসনের

আশীষধারায় অজর, অমর, চিরচেতনতার সাধনাকে আপ্ত করে আমরা যেন

ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যের চরৈবেতিতে নিরবচ্ছিন্ন থাকতে

পারি।—বর্ষবিদায়-বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে সীমায়িত না থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্য-নিদেশের দিনচর্যার আঙ্গিকে—

‘‘ঊষার রাগে উঠবি জেগে শৌচে শীতল হবি,

সন্ধ্যা-আহ্নিক জপ সাধনায় ঈশের আশিস লবি,

কুতুহলে পড়শি ঘুরে দেখবি সযতনে,

আছে কেমন কোথায় কে জন মন দিবি রক্ষণে,

তারপরেতে বাড়ী এসে শৌচে যথাযথ

গৃহস্হালীর উন্নয়নী অর্জ্জনে হ’ রত,

স্নানটি সেরে আহ্নিক করে ক্ষুধামতন খাবি,

একটু চলে বিশ্রাম নিয়ে আগুয়ানে ধাবি,

এমনি তালে সচল চালে চলে সন্ধ্যা এলে,

শৌচে শুদ্ধ হয়ে করিস আহ্নিক হৃদয় ঢেলে,

উন্নয়নের আমন্ত্রনী গল্প-গুজব শীলে,

হৃষ্টমনে আলোচনায় কাটাস সবাই মিলে,

পড়শী দিগের অভাব-নালিশ থাকেই যদি কিছু

তার সমাধান যেমন পারিস করিস লেগে পিছু,

করন-চলন ধরন-ধারন যজন যাজন কিবা

সকল কাজেই ইষ্টস্বার্থে চলিস রাত্রি-দিবা,

আদর-সোহাগ উদ্দীপনী কথায় কাজে ঝুঁকে,

স্বার্থ-কেন্দ্র সবার হবি ধরবি ইষ্টমুখে,

বিশ্রামেরই সময় গা-টি ঘুমল হয়ে এলে,

ইষ্ট-চলন মনন নিয়ে ঘুমে গা দিস ঢেলে।’’

(অনুশ্রুতি গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)-র আলোকে

বছরের প্রতিটি দিন হয়ে উঠুক অমৃত-তপনার উৎসব—নববর্ষ ১৪৩০-কে

স্বাগত-স্মরণের প্রাক্কালে এই প্রার্থনা জানাই পরমপিতার রাতুল চরণে। সকলে আমার প্রণাম নেবেন, কোন অপরাধ করে থাকলে মার্জনা করবেন। জয়গুরু। বন্দে পুরুষোত্তমম্!

——-

All reactions:

22Tapan Hazra, Nayan Saha and 20 others

পুরুষোত্তম জননী মাতা মনোমোহিনী দেবী

।। পুরুষোত্তম-জননী মাতা মনোমোহিনী দেবীর শুভ আবির্ভাব দিবস স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য।।

নিবেদনে—তপন দাস

প্রভাত যামিনী               উদিত দিনমনি

   ঊষারাণী হাসিমুখে চায় রে

জাগি বিহগ সব             তুলি নানা কলরব

   রাধা রাধা রাধাস্বামী গায় রে।

নবীন বৃন্দাবনে                     তুলসী কাননে

    ভ্রমরী রাধাস্বামী গায় রে।

সেই সে মধুর গান          বাঁশিতে তুলিতে তান

   আপনি যে রাধাস্বামী গায় রে।।

যে নামে নন্দের কানু        সেধেছিল মোহন বেণু

    সেই রাধা রাধা নাম গাও রে।।

আজি মধু জাগরণ           শুনে সবে নরগণ

    জয় জয় রাধাস্বামী গাও রে।

মথিয়া সকল তন্ত্র            রাধাস্বামী মহামন্ত্র

আদিগুরু জগতে বিলায় রে।।

রাধাস্বামী গুণগানে           আনন্দ বাড়িবে প্রাণে

       চরমে পরম গতি হয় রে।।

রোগ-শোক ব্যাধি-জরা              দূরে পালাবে তারা

     আনন্দে রাধাস্বামী গাও রে।

জয় রাধাস্বামী        জয় রাধাস্বামী

           জয় জয় রাধাস্বামী গাও রে।।

পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জন্মদাত্রী বিশ্বজননী মনোমোহিনী দেবী বাংলা ১২৭৭ সালের ১৮ই জ্যৈষ্ঠ পাবনা জেলার হিমাইতপুরের বিখ্যাত চৌধুরী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম রামেন্দ্রনারায়ণ, মাতার নাম কৃষ্ণসুন্দরী। আট বছর বয়সে ধ্যানযোগ মাধ্যমে সদগুরু এবং সৎনাম প্রাপ্ত হন। নয় বছর বয়সে পাবনা জেলার অধীন চাটমোহর গোয়াখাড়া গ্রামের পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তীর পুত্র শিবচন্দ্রচক্রবর্তীর সাথে বিবাহ হয়। বিবাহের পর আগ্রা সৎসঙ্গের দীক্ষাপ্রাপ্ত শিষ্য ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তী মহোদয়ের সাহায্যে ধ্যানযোগে প্রাপ্ত গুরুদেব হুজুর মহারাজ (রায় সালিগ্রাম সিংহ বাহাদুর) মহোদয়কে কলকাতায় দর্শন করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দীক্ষা গ্রহণ করেন।

সরকার সাহেবের অনুমতিপত্র পেয়ে জ্যেষ্ঠপুত্র অনুকূলচন্দ্রকে দীক্ষা দান করেন ১৯১৩ খ্রীষ্টাব্দের ৭ই ডিসেম্বর। ঠিক সেই মুহূর্তে ‘‘মেরা কাম হো গিয়া’’—বলে পরম তৃপ্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সরকার সাহেব।

তাঁর চরিত্র ছিল, কুসুমের ন্যায় কোমল, পাথরের ন্যায় কঠিন। আধ্যাত্ম জগতের সাথে সাথে জাগতিক জগতেও তিনি ছিলেন সকলের অভিভাবক স্বরূপা। নিজের, নিজের পরিবারের সব বিপদ-আপদকে তুচ্ছ করে অন্যকে রক্ষা করতেন জগজ্জননী-স্বরূপিণী হয়ে।

হিমাইতপুর সৎসঙ্গ আশ্রমের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী। আশ্রমিকদের খাওয়া-দাওয়া, শিক্ষা, স্বাস্থ্য রক্ষা, প্রতিরক্ষা ইত্যাদি সব বিষয়ে তিনি সজাগ থাকতেন। দুর্বৃত্তদের অত্যাচার থেকে আশ্রমিকদের রক্ষা করতে লাঠি হাতে সারারাত জেগে পাহারা দিতেন। তাঁর ভয়ে আশ্রমে কেহ অন্যায় কাজ করতে সাহস পেত না।

মহাত্মাগান্ধী হিমাইতপুর আশ্রম পরিদর্শন করে আশ্রমের ভুয়সী প্রশংসা করার পর বলেছিলেন, “I have never seen a masterly woman of such wonderful personality in my life.” আজকের দিনটিতে সেই আশ্চর্যজনক মহিলা বিশ্বজননী মাতা মনোমোহিনী দেবীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে জানাই আমার বিনম্র প্রণাম। ‘‘—মা! তোমার চারিত্রিক দ্যুতির দৈবীগুণের সাধনায় আমাদের সৎসঙ্গী পরিবারেরা মায়েরাও যেন তোমার ন্যায় রত্নগর্ভা হয়ে বিশ্বপিতার আকূতি—‘‘আমি চাই শুদ্ধাত্মা।’’ বাণীকে বাস্তবে উপহার দিতে পারে।’’

—পরমপিতার এই দীন সন্তানের কাতর প্রার্থনা তোমার চরণে।

 পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জন্মদাত্রী বিশ্বজননী মনোমোহিনী দেবী বাংলা ১২৭৭সালের ১৮ই জ্যৈষ্ঠ পাবনা জেলার হিমাইতপুরের বিখ্যাত চৌধুরী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম রামেন্দ্রনারায়ণ, মাতার নাম কৃষ্ণসুন্দরী। আট বছর বয়সে ধ্যানযোগ মাধ্যমে সদগুরু এবং সৎনাম প্রাপ্ত হন। নয় বছর বয়সে পাবনা জেলার অধীন চাটমোহর গোয়াখাড়া গ্রামের পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তীর পুত্র শিবচন্দ্রের সাথে বিবাহ হয়। বিবাহের পর আগ্রা সৎসঙ্গের দীক্ষাপ্রাপ্ত শিষ্য ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তী মহোদয়ের সাহায্যে ধ্যানযোগে প্রাপ্ত গুরুদেব হুজুর মহারাজ (রায় সালিগ্রাম সিংহ বাহাদুর) মহোদয়কে কলকাতায় দর্শন করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দীক্ষা গ্রহণ করেন।

সরকার সাহেবের অনুমতিপত্র পেয়ে জ্যেষ্ঠপুত্র অনুকূলচন্দ্রকে দীক্ষা দান করেন ১৯১৩ খ্রীষ্টাব্দের ৭ই ডিসেম্বর, সোমবার। ঠিক সেই মুহূর্তে ‘‘মেরা কাম হো গিয়া’’—বলে পরম তৃপ্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সরকার সাহেব।

তাঁর চরিত্র ছিল, কুসুমের ন্যায় কোমল, পাথরের ন্যায় কঠিন। আধ্যাত্ম জগতের সাথে সাথে জাগতিক জগতেও তিনি ছিলেন সকলের অভিভাবক স্বরূপা। নিজের, নিজের পরিবারের সব বিপদ-আপদকে তুচ্ছ করে অন্যকে রক্ষা করতেন জগজ্জননী-স্বরূপিণী হয়ে।

হিমাইতপুর সৎসঙ্গ আশ্রমের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী। আশ্রমিকদের খাওয়া-দাওয়া, শিক্ষা, স্বাস্থ্য রক্ষা, প্রতিরক্ষা ইত্যাদি সব বিষয়ে তিনি সজাগ থাকতেন। দুর্বৃত্তদের অত্যাচার থেকে আশ্রমিকদের রক্ষা করতে লাঠি হাতে সারারাত জেগে পাহারা দিতেন। তাঁর ভয়ে আশ্রমে কেহ অন্যায় কাজ করতে সাহস পেত না।

মহাত্মাগান্ধী হিমাইতপুর আশ্রম পরিদর্শন করে আশ্রমের ভুয়সী প্রশংসা করার পর বলেছিলেন, “I have never seen a masterly woman of such wonderful personality in my life.”

অবিভক্ত বাংলার পাবনা শহরের কমবেশী তিন  কি. মি. পশ্চিমে পদ্মার উত্তর তীরের জঙ্গলে পরিপূর্ণ জনবিরল গ্রামটির নাম  হিমাইতপুর। ঊনিশ শতকের প্রথমদিকের ঘটনা। ওই গ্রামে কমলাকান্ত বাগচী নামে একজন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ বাস করতেন। তাঁর সাথে বিবাহ হয় ঈশ্বরভক্তি পরায়ণা রমণী  কৃপাময়ী দেবীর। তিনি নিজেকে শ্রীহরির পাদপদ্মে সমর্পণ করে সবসময় হরিনামে মেতে থাকতেন বলে গ্রামের  সকলে শ্রদ্ধার সাথে ‘হরিবোলা বাগচী মা’ বলে তাঁকে সম্বোধন করতেন। ওই  কৃপাময়ী দেবীর গর্ভে কেশব,  উমাসুন্দরী, হরনাথ এবং কৃষ্ণসুন্দরী নামে চারজন সন্তান জন্মগ্রহণ করে।

ওই হিমাইতপুর গ্রামে কাশ্যপ গোত্রীয় চৌধুরী পরিবারের স্বনামধন্য পণ্ডিত রামেন্দ্রনারায়ণ ভাদুড়ী চৌধুরীর প্রথমা স্ত্রী নিঃসন্তান ছিলেন। কৃপাময়ী দেবী তাঁর কন্যা কৃষ্ণসুন্দরী দেবীর বিবাহ দেন রামেন্দ্রনারায়ণ ভাদুড়ী চৌধুরীর সাথে।  কৃষ্ণসুন্দরী দেবীর গর্ভে রামেন্দ্রনারায়ণের তিন পুত্র সন্তান ও তিন কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। তারমধ্যে রামেন্দ্রনারায়ণের জীবদ্দশায় প্রথম ও তৃতীয় পুত্র শৈশবেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। অপর চার সন্তান কন্যা নিস্তারিণী দেবী, মনোমোহিনী দেবী, গোবিন্দমণি দেবী এবং পুত্র যোগেন্দ্রনারায়ণ (ডাক নাম লোহা)। তারমধ্যে কৃষ্ণসুন্দরী দেবীর জীবিতাবস্থায় নিস্তারিণী দেবী চল্লিশ বছর বয়েসে এবং যোগেন্দ্রনারায়ণ (লোহা) ষোড়শ বছর বয়েসে পরলোকগমন করেন। রামেন্দ্রনারায়ণ বাংলা ১২৯০ সালে এবং কৃষ্ণসুন্দরীদেবী ১৩৩২ সালে পরলোক গমন করেন।

মনোমোহিনী দেবীর আবির্ভাব—১২৭৭ বঙ্গাব্দের ১৮ই জ্যৈষ্ঠ। বাল্যকালে একজন জ্যোতিষী মনোমোহিনী দেবীর হস্তরেখা  বিচার করে বলেছিলেন,  এই বালিকার অল্প বয়সে বিয়ে হবে এবং ইনি লোক-পালয়িত্রী হবেন। শৈশবকাল থেকেই  দিদিমা কৃপাময়ী দেবীর প্রত্যক্ষ ইষ্টনিষ্ঠার প্রভাবে ভক্তি  এবং পিতৃদেব রামেন্দ্রনারায়ণের কাছে লেখাপড়া শিখে তিনি সমস্ত বিষয়েই জ্ঞান অর্জন করেন।

তিনি পিতার কাছে আদর্শ মানুষ হবার গুণ জানতে চাইলে রামেন্দ্রনারায়ণ বলেছিলেন—

১। যারা  সর্বদা সত্য কথা বলে।

২। পরের দ্রব্য যে কখনো চুরি করে না।

৩। যে গুরুজনের কথামত চলে।

৪। অন্য মানুষের প্রতি যে দরদী হয়।

৫। যে নরনারায়ণ সেবা করে।

৬। যে ঈশ্বরকে ভক্তি করে এবং ভালবাসে।

ওই গুণগুলো অর্জন করতে পারলে ঈশ্বর সুপ্রসন্ন হয়ে দীক্ষা দানও করেন।

মনোমোহিনী দেবী ওইসব গুণে গুণান্বিত ছিলেনই। তাই বাবার কথা শুনে দীক্ষা পাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলে রামেন্দ্রনারায়ণ মেয়েকে বললেন—‘‘মা তুমি এক কাজ কর, রোজ ঠাকুর ঘরে গিয়ে দেবতার সামনে বসে মন্ত্র পাওয়ার জন্য প্রার্থনা কর, ঠাকুর অবশ্যই তোমার প্রার্থনা মঞ্জুর করে তোমাকে মন্ত্র বলে দেবেন।’’

        সরলপ্রাণা মনোমোহিনী দেবীর তখন  আট বছর  বয়স।  পিতার কথা মেনে ছোটভাই লোহাকে সাথে নিয়ে ঠাকুর ঘরে  বসে প্রার্থনা করতে শুরু করেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রার্থনায় গুরুর আসন  টলে যায়।  হঠাৎ আলোকিত হয় ঠাকুর ঘরটি। মনোমোহিনী দেবী স্পষ্ট দেখতে পান, সিংহাসনের  পিতলের   মূর্তির স্থানে  বসে আছেন মাথায় টুপি, মুখে কাঁচা-পাকা দাড়ি, সুঠাম দেহের এক পুরুষ মূর্তি।  মনোমোহিনী দেবীকে একটি মন্ত্র বলে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। মন্ত্র লাভের আনন্দে আত্মহারা হয়ে যান মনোমোহিনী দেবী। পিতার কাছে ঘটনাটি খুলে বললে, পিতা  বলেন, ‘‘মা তুমি এখন থেকে ওই মন্ত্র জপ কর, আর ওই মূর্তি ধ্যান করতে থাক।’’

        পিতার উপদেশ মেনে তিনি নিয়মিত জপ-ধ্যান করতে থাকেন।

 *   *   *

নবকৃষ্ণ চৌধুরী  নামে রামেন্দ্রনারায়ণের এক  জ্ঞাতি প্রতিবেশী ছিল। তাঁর জামাতার নাম ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তী। পিতার নাম গোবিন্দ চন্দ্র চক্রবর্তী। ওরা  বাস করতেন পাবনা জেলার মথুরা ডাকঘরের অধীন ধোপাদহ গ্রামে।  তিনি কার্যোপলক্ষ্যে হিমাইতপুরে ডাঃ বসন্ত চৌধুরীর বাড়ীতে এসেছেন। মনোমোহিনী দেবীও কার্যকারণে সেখানে গিয়েছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র একজন সাধক পুরুষ ছিলেন। তিনি প্রতিদিন স্নান করে বাক্স থেকে কাপড়ে মোড়া একটি পট ও গ্রন্থ বের করে পুজোপাঠ করে আবার কাপড়ে মুড়ে বাক্সে রেখে দিতেন। মনোমোহিনী দেবীর মনে  বিষয়টি সম্পর্কে জানার কৌতুহল জাগে। একদিন ঈশ্বরচন্দ্র পদ্মায় স্নান করতে গেলে মনোমোহিনী দেবী তার বাল্যসখী বিপদনাশিনীর সাহায্যে বাক্স খুলে পটমূর্তি দেখে বিস্ময় ও আনন্দে মূর্ছিত হয়ে পড়েন। ঈশ্বরচন্দ্র স্নান সেরে ফিরে এলে মনোমোহিনী দেবীর কাছে তাঁর দীক্ষা প্রাপ্তির ঘটনার বিবরণ শুনে বলেন, তুমি মা ভাগ্যবতী। স্বপ্নে যিনি তোমাকে মন্ত্র দিয়েছিলেন তিনি আগ্রা দয়ালবাগ সৎসঙ্গের বর্তমান গুরু, আমার গুরুদেব হুজুর মহারাজ।

        ঈশ্বরচন্দ্রের সহযোগিতায় মনোমোহিনী দেবী তাঁর স্বপ্নের গুরুদেবকে পত্র লিখলে তিনি ‘সুশীলে’ সম্বোধনে পত্রের উত্তর দেন সাথে সাথে সাধন-ভজনের  নিমিত্ত কিছু পুস্তকাদিও পাঠিয়ে দেন।

 *    *     *

নয় বছর বয়সে পাবনা জেলার অধীন চাটমোহর গোয়াখাড়া গ্রামের পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তীর পুত্র শিবচন্দ্র চক্রবর্তীর সাথে বিবাহ হয় মনোমোহিনী দেবীর। বিবাহের পর  ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তী মহোদয়ের সাহায্যে ধ্যানযোগে প্রাপ্ত গুরুদেব হুজুর মহারাজ (রায় সালিগ্রাম সিংহ বাহাদুর) মহোদয়কে কলকাতায় দর্শন করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দীক্ষা গ্রহণ করেন।

        তারপর থেকে সময় সুযোগ পেলেই এলাহাবাদ, কাশী, আগ্রায় গিয়ে গুরুদেবের সাক্ষাত করতেন। মনোমোহিনী দেবী একবার গুরুর কাছে প্রার্থনা জানিয়ে বলেছিলেন, ‘‘আশীর্বাদ করুন, যেন আপনার মত সন্তান লাভ করতে পারি।’’

        উত্তরে তাঁর গুরুদেব বলেছিলেন, আমার মত কেন, আমার চেয়ে মহৎ সন্তান তোমার গর্ভে জন্মাবে। তার আলোয় পৃথিবী আলোকিত হবে।

*      *     *

        বিবাহের চার বছর পরে, ১২৯০ বঙ্গাব্দে মনোমোহিনী দেবীর পিতা রামেন্দ্রনারায়ণ ঋণগ্রস্ত অবস্থায় ইহলোক ত্যাগ করেন। সুযোগ বুঝে শরিকরা কৃষ্ণসুন্দরী দেবীকে মিথ্যা মামলায় উচ্ছেদ  করার চক্রান্ত করেন। বিষয়-সম্পত্তি, জমিদারী রক্ষা করতে একের পর এক মামলা  করতে গিয়ে সংসারের কত্রী প্রজাদের প্রিয় কর্তামা,—কৃষ্ণসুন্দরী দেবী ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কোন উপায় না দেখে  জামাতা শিবচন্দ্রের শরণাপন্ন হলে শিবচন্দ্র শাশুড়ি মায়ের সম্পত্তি রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গুয়াখারার বাড়ী ছেড়ে সহধর্মিনী মনোমোহিনী দেবীকে নিয়ে হিমাইতপুর চলে আসতে বাধ্য হন। শিবচন্দ্রকে বেশিরভাগ সময় কোর্ট-কাছারির কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হতো। ফলে সংসারের অন্যান্য সব দায়িত্বভার, যেমন, রান্নাবান্না থেকে শুরু করে, গোরু-বাছুর, ক্ষেত-খামার, প্রজাদের ভালোমন্দ সবটাই দেখতে হতো মনোমোহিনী দেবীকে। এতকিছু করেও মা এবং স্বামীর সেবাযত্নতেও কোন ত্রুটি রাখতেন না।

*      *     *

        মনোমোহিনী দেবী আঠারো বছর বয়সে প্রথম অন্তঃসত্ত্বা হন। একদিন দুপুরে  একজন সন্ন্যাসী মনোমোহিনী দেবীর কাছে সেবা নিতে চাইলে তিনি ভক্তিভরে অতিথিকে সেবা করেন। সন্ন্যাসী বাড়ী ছেড়ে যাবার সময় বলেন, এই বাড়ির  একমাত্র পুত্রের মৃত্যু হবে। এবং এই বাড়িতে একজন মহাপুরুষ জন্মাবেন, যিনি বহুলোকের অধীশ্বর হবেন এবং জগতের প্রভুত কল্যাণ সাধন করবেন।

        তার কিছুদিন পরেই কৃষ্ণসুন্দরীর পুত্র যোগেন্দ্রনারায়ণ অসুস্থ হয়ে পড়েন, রোগভোগে মারা যান। ওদিকে মনোমোহিনী  দেবীর গর্ভ-ধারণের স্বাভাবিক কাল ১০ চান্দ্রমাস পেরিয়ে আরো ১ মাস হয়ে গেল ! এখনো প্রসব-বেদনার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না ! সকলে চিন্তিত। অবশেষে সব-চিন্তার চিন্তামনি ১১টি সৌরমাস গর্ভবাসের লীলা সেরে মাটির পৃথিবীতে ভূমিষ্ট হলেন কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে—সকলের অজান্তে।              

         সাধারণ জীবকোটির মানুষেরা জ্যোতির্ময়ের জ্যোতির আলোকরশ্মির ছটার মহিমা বা স্বরূপের সাথে তো পরিচিত নয়! তাই ভুল করে পদ্মানদীর মাঝিরা, পাড়া-প্রতিবেশীরা, অনেকেই হাতে জলের বালতি নিয়ে, জ্যোতির ছটা-কে আগুন ভেবে,  আগুন নেভাতে চলে এসেছে কর্তামার বাড়ীতে! লোকজনের ভীড়, শঙ্খ বাজছে, হুলু দিচ্ছে,— কোথায় আগুন!  কর্তামার মেয়ে ‘মনো’-র ছেলে হয়েচে, জন্মাবার সময়  সেই ছেলের গা থেকেই নাকি আলো   বেরোচ্ছিল! কি অলুক্ষণে ব্যাপার বলো দিকিনি! জন্মের সাথে সাথে  সব বাচ্চারা কাঁদে, এ ছেলে নাকি খিল খিল করে হাঁসচে! তার ওপর আবার মাথায় নেই চুল! মুণ্ডিত মস্তক !

       হ্যাঁ, ঠিক তাই।  শাস্ত্র-নির্দিষ্ট সব লক্ষণ নিয়েই অসীম মানবদেহে সীমায়িত হয়ে জন্ম নিয়েছিলেন বারেন্দ্র শ্রেণীর ব্রাহ্মণ পিতা শিবচন্দ্র চক্রবর্তী এবং  মাতা মনোমোহিনীর সন্তানরূপে। অবিভক্ত বাংলার পাবনা জেলার হিমায়েতপুর গ্রামে। বাংলা ১২৯৫ সনের  ৩০শে ভাদ্র, সংক্রান্তির শুভ সকালে, চার দণ্ড বিশ পল্-এ।

       ভুবনমোহিনী হাসির ডালির মুখে আধো আধো কথাও ফুটেছে সাত মাসে। হাঁটি-হাঁটি, পা-পা করে হাঁটতেও শিখে গেছে। নবম মাসের এক শুভদিন দেখে দৌহিত্রের অন্নপ্রাশন দিলেন মাতামহী কৃষ্ণসুন্দরী দেবী।

                     ‘‘অকূলে পড়িলে দীন হীন জনে

                     নুয়াইও শির, কহিও কথা।

                     কূল দিতে তারে সেধো প্রাণপণে

                     লক্ষ্য করি তার নাশিও ব্যথা।’’

—উপরোক্ত চার পংক্তির আশীর্বাণীর আদ্যাক্ষর মিলিয়ে অ-নু-কূ-ল নামকরণ করলেন বিশ্বজননী মাতা মনোমোহিনী দেবী।

প্রথম সন্তান অনুকূল ব্যতীত মাতা মনোমোহিনী দেবী আরও ৮টি সন্তানের জননী ছিলেন। পরিতাপের বিষয়, তন্মধ্যে ৫টি সন্তান অকালে বিদেহী হন। জীবিত দ্বিতীয় সন্তানের নাম রেখেছিলেন প্রভাসচন্দ্র, ডাকনাম ছিল ক্ষেপু। তৃতীয় সন্তানের নাম রেখেছিলেন কুমুদচন্দ্র, ডাকনাম রেখেছিলেন বাদল। একমাত্র কন্যা সন্তানের নাম রেখেছিলেন গুরুপ্রসাদী।

মাতা মনোমোহিনী দেবীর প্রথম সন্তান অনুকূলচন্দ্র বিশ্বপিতার প্রতিভূ সদগুরু রূপে আবির্ভূত হওয়ার সুবাদে  এই রচনায় মাতা মনোমোহিনী দেবীর সাথে তাঁর প্রথম সন্তান অনুকূলচন্দ্রকে প্রধান চরিত্ররূপে উপস্থাপন করতে বাধ্য হচ্ছি।        

যাইহোক, অসংখ্য বিচিত্র বাল্যলীলার লীলাময় (যা এখানে বর্ণনা করার অবকাশ নেই।)   অনুকূলচন্দ্র পাঁচ বছরে পদার্পণ করেছেন। যথাবিধি হাতেখড়ি দেন পণ্ডিত সূর্যকুমার শাস্ত্রী ও ভগবানচন্দ্র শিরোমণি। কাশীপুর হাটের কৃষ্ণচন্দ্র বৈরাগী গুরুমহাশয়ের পাঠশালায় বিদ্যারম্ভ করেন। সেখানে দু’-বছর অধ্যয়ন করার পর কাশীপুর গ্রামের ব্রজনাথ কর্মকার ও ভবানীচরণ পাল নামের দুই প্রবীণ শিক্ষকের কাছে তিন-বছর অধ্যয়ন করার পর ১৩০৫ বঙ্গাব্দে অধ্যক্ষ গোপাল লাহিড়ী মহোদয় প্রতিষ্ঠিত উচ্চ ইংরাজী বিদ্যালয় ‘পাবনা ইনষ্টিটিউশন্’-এ ভর্তি হন।                                                                                                                                          

       হাতেখড়ির পর পাঠশালা যেতে শুরু করেছেন। ঠাকুরের তখন বছর পাঁচেক বয়স। সংসারে নেমে আসে এক বিপত্তি।  পিতা শিবচন্দ্র অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিন তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন। ওই দুঃসময়ে সান্ত্বনা দেবার মতও কেউ ছিল না। দুরন্ত বালক অনুকূল বালসুলভ সব চপলতা ভুলে একজন অভিজ্ঞ অভিভাবকের মতো মাকে সান্ত্বনা দিতেন, সব কাজে সাহায্য করতেন, ভাইবোনদের কান্নাকাটি সামলাতেন। শুধু তাই নয়, পিতার চিকিৎসার জন্য  নির্জন পথে তিন মাইল রাস্তা পায়ে হেঁটে পাবনা শহরে যেতেন ওযুধ আনতে। আবার পাঠশালাতেও যেতেন। সংসারের আর্থিক সংকট দূর করতে মাকে ভরসা দিয়ে বলতেন, ‘‘মা, ভয় করিসনে, তুই খুব মুড়ি ভাজবি আর আমি বেচবো, দেখিস্ তখন তোর কত টাকা হবে।’’

       পরমপিতার দয়ায়, পরমপিতার প্রতিভূকে যদিও কোনদিন অপরের বৃত্তিহরণ কর্মস্বরূপ মুড়ি বিক্রী করতে হয়নি। তবে অ-মূল্যে বিক্রী করেছেন তাঁর অহৈতুকী অমূল্য প্রেম—সারা জীবন ধরে।

       বালক বয়সের তাঁর ওই মনোবল, চারিত্রিক দৃঢ়তা, কষ্ট সহিষ্ণুতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে পরবর্তীকালে তিনি বলেছিলেন—‘‘আমি ছিলাম rejected son (পরিত্যক্ত ছেলে)। আচার্যি ঠাকুরও আমার সম্বন্ধে কখনও কোন আশার কথা বলে নি। কি আর করব? আপন মনে এৎফাকি করতাম। হয়তো চাঁদের দিকে চেয়ে তন্ময় হয়ে নাম করছি। আর একটা রোখ্ ছিল—কিছুই না বুঝে ছাড়তাম না। Pursue (অনুসরণ) করতাম। ভাঁটির পাতা খেয়ে পেট ব্যথা হয়, তাই দেখে মনে হ’ল ভাঁটির পাতা না খেয়ে যদি ঐ রকম পেটের ব্যথা হয়, তবে ভাঁটির পাতায় তা সারতে পারে। বাস্তবে করে দেখলাম—সত্যি তাই হয়। ঐ রকম কত রকম যে করেছি।……. ’’ 

       ‘‘ছেলেবেলায় ঘাসের বুকে শিশির বিন্দুকে দেখতাম, যেন গোটা সূর্য্যকে প্রতিফলিত করছে সে। দেখতাম আর মনে হ’তো, শিশির বিন্দু যদি জগৎ প্রসবিতা সূর্য্যকে বুকে বহন করে বেড়াতে পারে, তবে আমি যতই ক্ষুদ্র হই, আমি বা পারবো না কেন পরম কারুণিক পরমপিতাকে বুকে বহন করে বেড়াতে শিশির বিন্দুর মত তাঁকেই ঠিকরে দিতে আমার সারাটা জীবন দিয়ে?’’ (আঃ প্রঃ ৪ম খন্ড)

       তাঁর উপরোক্ত আত্মকথা থেকে এটুকু বোঝা গেল, তিনি কোনদিন কোন আনুষ্ঠানিক বা লোক-দেখানো সাধন-ভজন করেন নি।  কোন উপাচার ছাড়াই নামধ্যান করেছেন।  তাঁর মতে ‘‘শব্দ সাধন পূর্ণাঙ্গ সাধন। জ্যোতির চেয়েও নাদ সূক্ষ্মতর। নাদ সাধনের প্রকৃষ্ট পন্থাযুক্ত সাধনই প্রকৃত পূর্ণাঙ্গ সাধন। বাহ্যাড়ম্বর কম বলে পূর্ণ সৎটিকে যত  সোজাসুজিভাবে নেওয়া সম্ভব, তা এই শব্দযোগে নেওয়া হয়েছে—এ-ই বর্তমান যুগধর্ম বা পূর্ণাঙ্গ সাধন।’’

              ‘‘১ আর ১এ ১ই হয়, ২ কভু নয়……’’

       পাঠশালাতে একদিন অঙ্কের শিক্ষক বোঝাচ্ছিলেন, ‘১ আর ১=২ হয়।’’ শুনে ছাত্র অনুকূল মনে মনে ভাবলেন, ‘‘তা’ কি করে সম্ভব? জগতের সব বস্তুই পরস্পর পৃথক, কোন একটির সঙ্গে আর একটির তো পুরোপুরি মিল কোথাও নেই। ঠিক একই রকমের দুটো জিনিষ যখন এ দুনিয়ায় কোথায়ও দেখতে পাওয়া যায় না—সবই যখন পরস্পর অসমান, তখন একের সঙ্গে কেমন করে একের যোগ হয়ে দুই হবে!’’ (বর্তমানের বিজ্ঞান গবেষণাতেও ওই সিদ্ধান্ত প্রমাণিত। জীবদেহের কোষাণুপুঞ্জের অতি ক্ষুদ্র ক্রোমোজোমগুলোও একটার মতো আর একটা নয়, পৃথক বৈশিষ্ট্য রয়েছে।)

       শিক্ষক মহাশয়কে বললেন, —‘‘স্যার! কোন দুটো জিনিষ তো একরকম দেখিনা, তবে এক আর এক দুই হলো কি করে?’’

       সব শিক্ষকের শিক্ষক যিনি, তাঁর কথার  গূঢ় রহস্য বুঝতে না পেরে মারের পর মার দিয়েছিলেন ঠাকুরকে, অঙ্কের ওই শিক্ষক মহাশয়।

       এ বিষয়ে ঠাকুর পরবর্তীকালে বলেছিলেন, ‘‘ওই যে মার খেলাম, সেই থেকে অঙ্কের প্রতি আমার যেন কেমন একটা ভয় হয়ে গেল। (আ. প্র. ৩য় খন্ড)’’

*      *       *

      তিনি তখন পাবনা ইনষ্টিটিউশন্’-এ তৃতীয় শ্রেণীতে (বর্তমানের অষ্টম মান) ছাত্র। দিদিমা কৃষ্ণসুন্দরী দেবী, অন্যান্য গুরুজনদের সাথে কথা বলে  আদরের  দৌহিত্রের জন্য পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমার ধোপাদহ গ্রামের রামগোপাল ভট্টাচার্যের প্রথমা কন্যা সরসীবালা দেবীকে নাতবৌ করে ঘরে আনার পাকাপাকি করে ফেলেছেন।   কর্তামা-র নাতবৌ দেখার আতিশয্যের কারণে  পাঠরত অবস্থায় উদ্বাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হন ১৩১৩ বঙ্গাব্দের ২৮শে শ্রাবণ।  

       বিয়ের কিছুদিন পর বাবা, তাঁর কর্মস্থল ঢাকা জেলার আমিরাবাদে নিয়ে যান, সেখানে  রাইপুরা হাইস্কুলে ভর্তি করে দেন। কিন্তু বেশীদিন সেখানে পড়াশোনা করতে পারেন নি।

       আমিরাবাদে থাকার জন্য নির্দিষ্ট বাড়ীতে ঢোকামাত্রই ঠাকুর এক বীভৎস অশরীরী আত্মার অস্তিত্ব টের পান ঘরের ভিতর। আসন্ন বিপদ বুঝতে পেরে তিনি বাড়িতে ঢুকেই  অশরীরী আত্মার কথা না বলে বাড়িটিকে পরিত্যাগ করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু তাঁর রাশভারী নায়েব-বাবা এবং মা-দিদিমা কেউ তাঁর কথায় গুরুত্ব দেন নি। সেইদিন রাতেই পিতা শিবচন্দ্রের জ্বর  শুরু হয়। ডাক্তার-বদ্যি করেও জ্বর কমছে না। সবাই মিলে সেবা-শুশ্রূষা করছে, জ্বর কমার নাম নেই। অবশেষে ঠাকুর কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে বলেন, ‘বাবা, এ বাড়ী না ছাড়লে তোমার মারাত্মক অসুখ হবে।’ ছেলের কান্নার কাছে হার মেনে ওই বাড়ি ছেড়ে অন্য বাড়িতে যেতেই পিতা শিবচন্দ্র সুস্থ হন।

       বিদ্যার প্রতি তীব্র অনুরাগী হওয়া সত্বেও অনুকূলচন্দ্রের ছাত্রজীবন নানাপ্রকার বিশৃঙ্খলা ও বাধাবিপত্তির মধ্য দিয়ে কেটেছে। নিয়মিত পড়াশোনা তিনি করতে পারেন নি। তার ওপর কোন কোন শিক্ষকের চরিত্রদোষ, দরদশূন্য কঠোর শাসন এবং অবসাদকর তীব্র কটুক্তি তাঁর কোমল মনের ওপর যে আঘাত হেনেছিল, তারফলে প্রথাগত শিক্ষার প্রতি তিনি বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। স্কুলে যেতেও তাঁর ইচ্ছা করত না।

       তথাপি তিনি স্কুলে যেতেন। হয়তো পিতামাতার ইচ্ছাকে সম্মান জানাতে। নইলে সর্বজ্ঞ যিনি, তাঁর তো পদ্ধতিগত ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণের কোন প্রয়োজন ছিল না। এবং পরবর্তীকালে সে শিক্ষাকে তিনি গুরুত্বও দেন নি। দিলে, একেবারে নতুন ধারায় তপোবন বিদ্যালয় গড়ে তুলতেন না এবং শান্ডিল্য বিশ্ব বিদ্যালয়ের স্থাপনের পরিকল্পনা করতেন না।            

        ছাত্র জীবনে অনুকূলচন্দ্র স্কুল-ছুটির দিনগুলিতে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে কৃষ্টিমূলক আমোদ-প্রমোদ করতেন। গান রচনা করে, সুর দিয়ে, হারমোনিয়াম বাজিয়ে নিজে গাইতেন এবং বন্ধুবান্ধবদেরও শেখাতেন। যাত্রা-থিয়েটারের পালা রচনা করে নিজে প্রধান প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করতেন এবং সাথীদেরও অভিনয় শিখিয়ে অভিনয় করাতেন।

       তিনি সদগুরু পরিচয়ে খ্যাত হবার পর থেকে জগতের কল্যাণ সাধনের জন্য ২২ বছর বয়স থেকে শুরু করে ৮০ বছর পর্য্যন্ত অসংখ্য শ্রুতিবাণী, স্মৃতিবাণী, ভাববাণী প্রদান করেছেন। এছাড়া ছাত্রজীবনেও তিনি বহু কবিতা, সঙ্গীত ও নাটক রচনা করেছিলেন। তাঁর বাল্য রচনার সব পান্ডুলিপি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।  বহু চেষ্টার ফলে তাঁর স্বহস্ত লিখিত যে পান্ডুলিপির সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল, তা’তে ২২টি কবিতা, ঊনত্রিশটি সঙ্গীত, ‘দেবযানী’ শিরোনামে একটি পূর্ণাঙ্গ নাটক ও অপর একটি নাটকের অংশবিশেষ লিপিবদ্ধ রয়েছে। পাবনা ইনষ্টিটিউশনে ৪র্থ শ্রেণীতে পড়ার সময় অমিত্রছন্দে রচিত উক্ত ‘দেবযানী’ নাটক তিনি বয়স্যদের নিয়ে অভিনয় করেছিলেন।

       ছাত্রজীবনে তিনি খাগের কলমে কালি ভরে, নিব লাগিয়ে দিব্যি একটা ফাউন্টেন পেন তৈরি করে ফেলেছিলেন। বাবলা কাঁটা দিয়ে কলের গানের রেকর্ড বাজাবার পিন তৈরি করেছিলেন। বাবার সাথে স্টীমারে চেপে আমিরাবাদ যাওয়ার সময় স্টীমারের গঠন কৌশল দেখে একটা খেলনা স্টীমার বানিয়ে সবাইকে তাক্ লাগিয়ে দিয়েছিলেন।

       অভিভাবকদের অভিপ্রায় অনুযায়ী আমিরাবাদের স্কুল ছেড়ে দিয়ে প্রথাগত শিক্ষাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে ১৩১৫ বঙ্গাব্দে তাঁকে চলে আসতে হয় ২৪ পরগণার নৈহাটি শহরে, মাসতুতো ভগ্নীপতি শশীভূষণ চক্রবর্তী মহোদয়ের বাড়ীতে।   ভর্তি হন মহেন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ে। ওই স্কুল থেকেই প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু পরীক্ষায় বসতে পারেন নি। বাবার পাঠানো পরীক্ষার ফি-এর টাকা নিজের নামে জমা না দিয়ে দরিদ্র এক সহপাঠিকে দিয়ে দেন। উক্ত সহপাঠী কৃতিত্বের সাথে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল।

       অভিভাবকদের পরামর্শক্রমে আত্মীয় শশীভূষণ চক্রবর্তী মহোদয়ের  সাহচর্যে অর্থকরী বিদ্যা উপার্জনের উদ্দেশ্যে কলকাতায় যান । বাবু শরৎচন্দ্র মল্লিক স্থাপিত বৌবাজারের ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুলে ভর্তি হবার জন্য। প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হবার ফলে কর্তৃপক্ষ প্রথমতঃ কিছুতেই ভর্তি করতে রাজী হন না। অবশেষে শিক্ষার্থীর অধ্যবসায়, যুক্তির কাছে হার মেনে অধ্যক্ষ মহোদয় কঠোর-কঠিন পরীক্ষা নিয়ে ভর্তি করে নেন ১৩১৭-১৩১৮ বঙ্গাব্দ শিক্ষাবর্ষের প্রথম ব্যাচে।

 ছোটবেলা থেকেই অনুকূলের বিবিধ আধিদৈবিক কার্যকলাপ, অত্যাশ্চর্য ব্যাপার প্রত্যক্ষ করে মাতা মনোমোহিনী দেবী বিশেষ চিন্তিত ছিলেন। ডাক্তারি পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরে আসার পরও তার ব্যতিক্রম নেই। হিতৈষীদের পরামর্শ মেনে অনেক কিছু করেও ছেলেকে অন্যান্য দশজন ছেলের মত স্বাভাবিক করতে পারলেন না। অবশেষে সব বৃত্তান্ত জানিয়ে হুজুর মহারাজ পরবর্তী  তৎকালিন সদগুরু বাবু কামতাপ্রসাদ ওরফে সরকার সাহেবের কাছে ছেলের দীক্ষা প্রার্থনা করে চিঠি লেখেন গাজিপুরে। সরকার সাহেব তখন অন্তিম শয্যায়। চিঠি পেয়ে খুব আনন্দিত হন। চিঠির উত্তরে তিনি লিখেছিলেন, ‘মেরা কাম হো গয়া, তুমি ছেলেকে দীক্ষা দিয়ে দাও।’ ওই পত্র মারফৎ অনুমতিই ছিল মাতা মনোমোহিনী দেবীর পাঞ্জা। ওই অধিকারবলে মা, ছেলেকে  সাধক-পরম্পরার সন্তমতে দীক্ষা দিলেন ১৯১৩ সালের ৭ই ডিসেম্বর। ওই দিনই সরকার সাহেব গাজীপুরে দেহ ত্যাগ করেন। 

যাইহোক, সরকার সাহেবের অনুমতি ক্রমে মাতা মনোমোহিনী দেবী অনুকূলচন্দ্রকে সত্‍মন্ত্র দিলে ঠাকুর বলেছিলেনঃ এ তুই কি দিলি ? এ নাম তো আমি তোর পেটে থাকতেই করি। অর্থাৎ উনি যে ওই নামের নামী-পুরুষ সেই তত্ত্বই তিনি ব্যক্ত করলেন তাঁর মায়ের কাছে।

       অধ্যাত্মশাস্ত্রবিদূষী সাধিকা মনোমোহিনী দেবী পুত্র অনুকূলচন্দ্রের নামধ্যান সংক্রান্ত সমস্ত অনুভূতির বর্ণনা শুনে বিস্মিত ও আনন্দিত হয়ে পুত্র অনুকূলচন্দ্রকে বলেছিলেন, ‘‘এই নামই তো আদি সৎ-নাম। তুই এই নাম করতে থাক।’’

 *       *       *

এবার আমরা সন্তমতের গুরুদের বিষয়ে কিছু জানবার চেষ্টা করব।

সন্তমতের আদি সাধক কবীরদাস জন্মেছিলেন 1440C বারানসীতে। তিনিই প্রথম সত্‍মন্ত্রের রহস্য ভেদ করে বলেছিলেনঃ
       “কবীর ধারা অগমকী সদগুরু দয়ী লখায়,
       উলট তাহি সুমিরন করে স্বামী সংগ লাগায়।” —অর্থাৎ ধারা উল্টে স্বামী যোগ করে জপ করতে নিদেশ দিলেন।  কবীরের পর গুরু নানক জন্ম গ্রহণ করেন 15. 4. 1469 C পঞ্জাব প্রদেশের তালবণ্ডীতে। তিনিও ওই সত্‍নাম প্রচার করেছেন। কবীরের জন্মের প্রায় সাতশো বছর পর আগ্রাতে ২৪ শে আগস্ট ১৮১৮ তে জন্মগ্রহণ করেন শিবদয়াল সিং,  তিনি স্বামীজী মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ১৫ জুন ১৮৭৮ আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। পরবর্তী গুরু হন রায়  সালিগ রাম। তিনি ১৪ মার্চ, ১৮২৯ আগ্রার পীপল মাণ্ডিতে জন্মগ্রহণ করেন। ৬ ডিসেম্বর ১৮৯৮তে আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। তিনি হুজুর মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ওই সৎনাম সাধন করে চরম ও পরম পথের সন্ধান পান। তিনি তাঁর গুরু স্বামীজী  মহারাজের অনুমতি ক্রমে ওই সৎনাম সর্বসাধারণে প্রচার করেন। পরবর্তী গুরু হন পণ্ডিত ব্রহ্মশঙ্কর মিশ্র। ২৮শে মার্চ, ১৮৬১ তে ব্রাহ্মণ পরিবারে, বারানসীতে জন্মগ্রহণ করেন। ১২ অক্টোবর ১৯০৭ সালে দেহত্যাগ করেন। তিনি মহারাজ সাহেব নামে খ্যাত ছিলেন। মহারাজ সাহেব দেহত্যাগের পূর্বে একটি কাউন্সিল গঠন করে বাবু কামতা প্রসাদ ওরফে সরকার সাহেবকে পরবর্তী গুরু রূপে নির্বাচন করেন।  শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরকার সাহেবকে সন্ত বলে উল্লেখ করেছেন, ভাববাণীতে।  অন্তর্ধানের পর আগ্রা সত্‍সঙ্গের প্রধান গুরু হন সরকার সাহেব।
        পুরুষোত্তম জননী মাতা মনোমোহিনী দেবী হুজুর মহারাজের দীক্ষিত ছিলেন । হুজুর মহারাজ বিগত হবার পর সরকার সাহেবের কাছে মা তাঁর ছেলের সম্পর্কে জানালে সরকার সাহেব “মেরা কাম ফতে।” বলে দেহ ত্যাগ করেন। পুরুষোত্তমরূপী সদগুরু অবতীর্ণ হয়েছেন জানতে পারে সাধ্যায়ী গুরু তাঁর দায়িত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন। সরকার সাহেব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গাজীপুরে। তারপর থেকেই মাতা মনোমোহিনী দেবী সন্তমতের সৎনামে দীক্ষা দিতে শুরু করেছিলেন।

        মাতা মনোমোহিনী দেবী তাঁর গুরুদেব সাধক পুরুষ হুজুর মহারাজের কাছ থেকে যে বিনতী প্রার্থনা করতে শিখেছিলেন, সেই শিক্ষার  ধারাটাকে প্রাধান্য দিয়ে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন পাবনার সৎসঙ্গ  আন্দোলন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র  পুরুষোত্তম রূপে স্বীকৃত হবার পরও আগ্রা সৎসঙ্গের ধারায় (যে ধারায় বীজমন্ত্রের উচ্চারণ স্বীকৃত, বীজমন্ত্রের মাধ্যমেই পারস্পরিক সম্ভাষণ প্রচলিত। আর্যকৃষ্টির দশবিধ সংস্কার অবহেলিত।) পাবনা সৎসঙ্গকে পরিচালনা করতে  চেয়েছিলেন বলেই আগ্রা সৎসঙ্গের বিনতী-র শিক্ষা দেওয়া হয় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের  আদর্শের অনুসারীদের। যার ফলে, আজও বিনতীর মাধ্যমে বীজমন্ত্র উচ্চারিত হয়ে চলেছে। নিত্য সাধ্যায়ের জন্য আবশ্যিক, শ্রীশ্রীঠাকুর রচিত ‘জাগরণী’ সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দীক্ষিতরা যতটা না জানে, তার চেয়ে বেশি মানে মাতা মনোমোহিনী দেবী রচিত তাঁর গুরুদেবের প্রশস্তির প্রভাতী গীতি ‘প্রভাত যামিনী উদিত দিনমনি’-কে।

       পরবর্তীকালে দৈনন্দিন জীবনে আর্য্যকৃষ্টিকে উপস্থাপিত করতে শ্রীশ্রীঠাকুর যে সান্ধ্য-প্রার্থনা মন্ত্র রচনা করেছিলেন, মাতা মনোমোহিনী  দেবী সেই প্রার্থনাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন, ‘‘সন্ধ্যা মন্ত্রটা মা মারা যাবার তিনদিন আগে লেখা হয়। মা শুনে বড় খুশি হয়েছিলেন। সেইজন্য ও জিনিসটার উপর আমার খুব প্রীতি আছে। মা শুনেছিলেন তাই ওটা আমার অর্ঘ্য হয়ে আছে।’’ (আঃ প্রঃ ২১ খণ্ড, ৭. ১১. ১৯৫২)

 শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে কারো কাছে দীক্ষা গ্রহণ না করলেও বার বার তিনি বলেছেন, ‘আমার মা-ই যেন সরকার সাহেব, হুজুর মহারাজ ও অন্যান্য অন্যান্য মহাপুরুষদের  প্রতীক—মা-ই আমার আদর্শ—মা-ই আমার জীবত্ব।’ তথাপি তিনি সরকার সাহবকে নিজের গুরু হিসেবে এবং হুজুর মহারাজকে মাতৃদেবীর গুরু হিসেবে মান্য করতেন, তাঁদের প্রতিকৃতিতে প্রণাম নিবেদন করতেন।   

*        *        *

  ——————————————————————————————–   তথ্যঋণ :

১.  ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ১ম খণ্ড।

২. শ্রীসচ্চিদানন্দ গোস্বামী প্রণীত, ‘আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী ও সৎসঙ্গ আন্দোলন’।

৩. প্রিয়পরমের পরশে, ১ম খণ্ড।

৪. সতীশচন্দ্র জোয়ারদার প্রণীত জীবনীগ্রন্থ।

কমন সেন্স

কমন সেন্স

নিবেদনে — তপন দাস

**********************

পরম কারুণিক ঈশ্বর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষকে সবকিছু দিয়ে পূর্ণরূপে তৈরি করেছেন বা স্বয়ং সৃষ্ট হয়েছেন, স্বাধিকার দিয়েছেন। যা’ দিয়ে মানুষ ইচ্ছে করলে মরতে পারে, মারতে পারে, আবার বাঁচতে পারে, বাঁচাতেও পারে। আমরা কোন কারণে যদি একটু ভুল করে বসি, সাথে সাথে আমাদের অভিভাবকেরা, প্রিয়জনেরা, বন্ধুবান্ধবেরা উপদেশ দিয়ে বলতে সুরু করে দেবেন, তুমি একটু কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করতে পারলে না! অবশ্য যারা এই কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করতে বলেন, তারাও অ্যাপ্লাই করতে গিয়ে কেন জানি বেসামাল হয়ে পড়েন। নইলে সুস্থভাবে বাঁচার জন্য, আহার, নিদ্রা, অপত্যোৎপাদনের জৈবধর্ম পালন করতে এত কেরামতি করতে হয়! আমরা যদি জৈবিক তাগিদগুলোকে ওই কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম তাহলে তো স্বর্গে অর্থাৎ সুখে বাস করতে পারতাম। এত দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করতে হতো না। যেমন, বাঁচতে হলে খেতে হয়, সেই খাওয়াটা যদি সত্তাপোষণী না হয়ে প্রবৃত্তিপোষণী হয় তাহলে অসুখ হবেই। সাধারণভাবে সিদ্ধ ভাত খেয়েও তৃপ্তির ঢেকুর তোলা যায়, আবার পাঁচতারা হোটেলের দামী খাবার খেয়ে অতৃপ্তির ঢেকুর তুলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। এ বিষয়ে ঠাকুর বেশ সাবধানী ছিলেন। হিমাইতপুর আশ্রম পত্তনের প্রথম যুগে, বিদ্বজ্জন ভদ্রলোকদের মানদণ্ডে যা খুবই সাধারণ মানের খাবার—নাম লাবসি, সেই লাবসি একবেলা করে খেয়ে দিনে-রাতে প্রায় আঠার ঘণ্টা পরিশ্রমের কাজ করতেন আশ্রমিকগণ । ওই নিয়ম মেনে প্রায় আঠার বছর পর্যন্ত আশ্রমিকদের রোগ-ভোগ-অকালমৃত্যু হয়নি। সেই সময় জনশ্রুতি ছিল, “অনুকূল ঠাকুরের আশ্রমে রোগব্যাধি ঢুকতে ভয় পায়।’’ পরবর্তীকালে ভিটামিন, প্রোটিন ইত্যাদি খাদ্যগুণের দোঁহাই দিয়ে কিছু কর্তা-ব্যক্তিরা ঠাকুরের বিধিকে অমান্য করে আনন্দবাজারে জিভের স্বাদের খাবার পরিবেশন করার ব্যবস্থা করলে আশ্রমিকদের অসুখ-বিসুখ হতে সুরু করে।

তাই খাওয়ার ব্যাপারে আমরা যদি ঠাকুরের দেওয়া ‘‘পেটের জন্য জীবন নয়কো,/জীবনের জন্য পেট/তাই জীবন—/পেটকে জীবন্ত করে রাখ।’’ বাণীর কমন সেন্সটাকে অ্যাপ্লাই করে সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার গ্রহণে অভ্যস্ত হতে পারি তাহলে আমাদের অভাবও ঘুচে যাবে, অসুখ-বিসুখ থেকেও বেঁচে যাব।

।। অধিক ভোজন প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতবাদ ।।

শ্রীশ্রীঠাকুর—যা’ প্রয়োজন তার চাইতে বেশী খেলেই তো তার চাপ আমাদের Stomach, Nerves, Heart (পেট, স্নায়ু, হৃদয়) ইত্যাদিকে বইতে হবে। কিন্তু আপনি-আমি তো Sperm ও ova–র product (শুক্র ও ডিম্বের ফল)—একটা limited energy (সীমিত শক্তি) নিয়ে জন্মেছি, আর তাই নিয়ে চলেছি। এই life-potency (জীবনীশক্তি)-কেই বলে আয়ু, এই আয়ু যদি অযথা অপব্যয় করি—এ তো ফুরোবেই, শরীর দুর্বল হবেই—তা’ হয়তো বহু পরে টের পাওয়া যায়। পঞ্চাশ বছর বয়সে শরীরের উপর অত্যাচার করা সত্ত্বেও হয়তো আপনার ক্ষতি করে না, ষাট বছর বয়সে আপনি হয়তো দেখবেন আশি বছরে আপলার শরীর যতখানি অপটু ও জীর্ণ হতো, তাই হয়ে গেছে। অনিয়মের effect (ফল) তো আছে। (আলোচনা প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড, ৫ই ভাদ্র, বুধবার, ১৩৪৭, ইং ২১।৮।১৯৪০)

।। আমিষ-আহারের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক রুচি প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বিধান ।।

শ্রীশ্রীঠাকুর—ওটাকে বিকৃত রুচিও বলা যায়। একটা মানুষকে হত্যা করলে সে যেমন ব্যথা বোধ করে, একটা জীবকে হত্যা করলে সেও তেমনি করে। জিহ্বার একটু সুখের জন্য আমার মত রক্ত-মাংস-বিশিষ্ট একটা প্রাণীকে মেরে ফেলতে দ্বিধা বোধ করব না, এ কেমন কথা? আমার মনে হয়, প্রত্যেকটি জীবই যেন এক-একটি স্বল্প মানুষ। নরহত্যার কথায় আঁতকে উঠি আর জীব হত্যার বেলায় গায়ে বাধে না, আমাদের বোধবৃত্তি যদি এমনতর প্রবৃত্তি-আবিল, স্থূল, হৃদয়হীন ও সহানুভূতিহীন হয়, তবে প্রবৃত্তি-স্বার্থের খাতিরে প্রয়োজন হ’লে মানুষের উপর আক্রমণ চালাতেও আমাদের আটকাবে না। তাই বলি—না খেলেই হ’লো। ‘Let them enjoy their little day’ (তাদের স্বল্প জীবন তারা ভোগ করুক)। তাদের সুখ-দুঃখ আছে, তারাও ভাল চায়, তাদেরও মন আছে, তাদের কেন কষ্ট দেবে? শুনেছি দুম্বার পাছার দিকে মেদবৃদ্ধি হয়। সেই মাংস কেটে নিলে সে বেশ আরাম পায়। ওতে তার কোন ক্ষতি হয় না। ঐ মাংস খেলে প্রাণী হত্যা হয় না বটে, কিন্তু আমিষ-আহারের কুফল যা’ তা’ ফলতে কসুর করে না। আমি যা’ জানি নিরামিষ আহার শরীর, মন সব দিক-দিয়েই শ্রেয়। (আঃ প্রঃ ৮ম খণ্ড, ৫.৬.১৯৪৬)

“সদাচারী নয়কো যে জন

ইষ্ট বিহীন রয়,

তাহার হাতে পান ও ভোজন

বিষ বহনই হয় ।”

জীবনকে অমৃতের স্নাতক রূপে গড়ে তুলতে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কথিত অমৃতনিষ্যন্দি স্বরূপ উপরোক্ত বাণীটি মেনে চলা আমাদের একান্ত কর্তব্য । বাণীটির মর্মার্থ হলো এই যে, অসদাচারী লোকের দেওয়া অন্ন এবং পানীয় বিষতুল্য । অতএব গ্রহণ করা যাবে না । শাস্ত্র নির্দেশ মেনে শ্রীশ্রীঠাকুর অভক্ষ্য ভোজী, অগম্যা গামী এবং বহনৈষ্ঠিক যারা (পঞ্চবর্হি এবং সপ্তার্চ্চি অনুসরণ করে চলে না ।) তাদের অসদাচারী বলেছেন । মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুন, মাদকসেবী এবং বর্ণধর্ম অপলাপী, অসত্‍ উপায়ী প্রদত্ত ভোজ্য অভক্ষ্য, অর্থাত্‍ খাওয়া যাবে না ।

ঋতুমতী, মৈথুনে অনিচ্ছুক, শারিরীক এবং মানসিকভাবে অপরিচ্ছন্ন, অপ্রিয় বাদিনী, উচ্চ বয়সের, উচ্চ বর্ণের, উচ্চ বংশের, রোগগ্রস্তা, হীনাঙ্গী, গর্ভিনী, বিদ্বেষী, ঈর্ষা পরায়ণ, হিংসা পরায়ণা স্ত্রীদের অগম্যা বলা হয়েছে ।

খাওয়ার পর ঘুম আর একটা জৈবিক তাগিদ। সেই ঘুম যদি প্রবৃত্তির কবলে পড়ে আমাদের চেতনা কেড়ে নেয় তাহলেও বিপদের সম্ভাবনা। পুণ্য-পুঁথি গ্রন্থে ঠাকুর যা’কে মরণের সমতুল বলেছেন। আর তাছাড়া স্বতঃ-অনুজ্ঞার প্রতিজ্ঞা ‘চিরচেতন’ পালন না করার জন্য দ্বন্দ্বীবৃত্তিও হয়। ঘুমের বিষয়ে ঠাকুরের স্পষ্ট নিদেশ, ‘‘ঘুমিও তুমি ততটুকুই/অবসাদ না আসে/চেতন থাকাই বর বিধাতার/জড়ত্ব যায় নাশে।’’

শুচিবস্ত্রে পবিত্র বিছানায় শোবার আয়োজন করতে হয়। বিছানায় গা এলিয়ে দেবার পূর্বে নামধ্যানের মাধ্যমে সারাদিনের কাজকর্মের আত্মবিশ্লেষণ করতে হয়। ‘আমি একজন সৎসঙ্গী। দীক্ষা গ্রহণের সাথে সাথে ঘটে-ঘটে ইষ্টস্ফূরণের দায়িত্ব নিয়েছি। আমি কারো সাথে কথার খেলাপ করিনি তো? কোন কপটতার আশ্রয় নিইনি তো? ঠাকুরের বলা অনুযায়ী অর্থ, মান, যশের আশা ছেড়ে সব্বাইকে ‘ভগবান জ্ঞানে ভালবেসে’ ঠাকুরত্ব প্রাপ্তির গন্তব্যের লক্ষ্যে ঠিক ঠিক চলতে পারছি তো? আমার দ্বারা সৎ-এ, ইষ্টনীতির সান্নিধ্যে নিরবচ্ছিন্ন সংযুক্ত থাকাটা কতখানি ব্যাহত হলো ? কেন ব্যাহত হলো? ইষ্টভরণ এবং পিতৃপোষণের জন্য সদাচার এবং বর্ণাশ্রম অনুযায়ী চলে, কাউকে পীড়িত না করে, নিজে পীড়িত না হয়ে বর্ণানুগ কর্মের সেবার বিনিময়ে দিন গুজরানী আয় ঠিক ঠিক করতে পারছি তো? ‘সপ্তার্চ্চি’ এবং ‘পঞ্চবর্হির’ ১২টি নীতি ঠিক ঠিক পালন করতে চেষ্টা করছি তো? আমার আকাঙ্খানদীর স্রোতের ধারার কামিনী-কাঞ্চনের আসক্তি ইষ্ট প্রতিষ্ঠার অনুকূলে সত্তাপোষণী করতে পারছি তো? সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে অন্তরায় যা কিছু নিয়ন্ত্রণ, সামঞ্জস্য, সমাধান তৎপর থেকে বিরোধহীন দুর্বার নিরোধ করার চেষ্টায় যত্নবান ছিলাম তো? আমার বাক্, ব্যবহার, কর্ম কারো অপ্রীতির কারণ হয়নি তো?’—ইত্যাদি ইত্যাদি ইষ্টপ্রতিষ্ঠামূলক ভাবনাগুলোকে স্মরণ-মনন করতে করতে আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে সারাদিনের কর্মটাকে অন্তর্দেবতা পরমপিতার কাছে জবাবদিহি করে আপডেট করে শুতে পারলে কর্মের বন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হয়। অজপা নামের নেশাটাকে বাঁচিয়ে রাখতে ঘুমের মধ্যেও নাম জপ করার অভ্যাস করে ফেলতে পারলে স্বতঃ-অনুজ্ঞার ‘চিরচেতন’ অনুজ্ঞা পালন করা সহজ হয়ে যাবে। আমরা নিদ্রাজয়ী হতে পারব। প্রত্যুষে ‘ঊষার রাগে’ শয্যা ত্যাগ করে শুরু করতে হবে মন্ত্র সাধন, জাগতিক-আধ্যাত্মিক মেলবন্ধনটাকে ঠিক রাখতে। দিনচর্যার কাজকর্মগুলোকে নিখুঁত করার জন্য শ্রীশ্রীঠাকুরেরর এ এক অমোঘ অবদান।

আর এক জৈবিক তাগিদের নাম যৌনজীবন। ওই যৌন জীবনের সিড়ি বেয়ে একজন পুরুষ আদর্শ পিতা এবং একজন নারী আদর্শ মাতার পরিচয় বহন করে সুখ্যাত হতে পারে, আবার কুখ্যাতও হতে পারে । অথচ ওই সিড়ি-চড়া-র বিষয়ে আমরা সবচাইতে বেশী উদাসীন। ভাল বাবা হবার জন্য আদর্শ চরিত্র গঠনের দিকে গুরুত্ব না দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করার জন্য যেনতেনপ্রকারেণ টাকা রোজগার করার দিকেই আমাদের ঝোঁক বেশি। টাকার খনির সন্ধান পেয়েও নানারকম অশান্তি, দুঃখ, মনস্তাপ, অবসাদে ভুগতে হয়। থানা, পুলিশ, উকিল, ডাক্তার, রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারস্থ হতে হয়। আমরা যদি একটু বিচার করে দেখি তাহলে দেখা যাবে, সন্তানের শিক্ষার জন্য টাকা দিয়ে বই কেনা যায়, নামী স্কুলে ভর্তি করানো যায়, অনেক টিউটর রাখা যায় কিন্তু মেধা কেনা যায় না, বিদ্যা কেনা যায় না। মেধা এবং বিদ্যা পিতৃ-মাতৃদত্ত উপহার, যা জন্মগত সংস্কারে নিহিত থাকে। মেধা এবং বিদ্যা, মা, বাবার কাছ থেকে নিয়ে যেমন যেমন মেপে দেন তাই সন্তানে মূর্ত হয়। টাকা দিয়ে গৃহ নির্মাণ করা যায় কিন্তু উপযুক্ত গৃহিনী না হলে গৃহসুখ পাওয়া যায় না। টাকা দিয়ে ওষুধ কেনা যায়, স্বাস্থ্য কেনা যায় না, স্বাস্থ্য যদি কেনাই যেত তাহলে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া থ্যালাসেমিয়াদি রোগগুলো থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া যেত। স্বাস্থ্য পিতামাতার অবদান, জন্মগত সমৃদ্ধির বিষয়। এবার একটু হিসেব করে দেখুনতো, টাকা উপার্জনের দিকে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ বিষয়ক গুরু প্রদত্ত বিদ্যাকে উপার্জন করে মনুষ্যত্ব নির্মাণের দিকে গুরুত্ব দিলে অতি সহজেই সুখের জীবন লাভ করা যায় না কি?

এ বিষয়ে শরৎদা (হালদার) শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে জানতে চেয়ে প্রশ্ন করেছিলেন—Heredity (বংশগতি) ও environment (পারিপার্শ্বিক)-এর মধ্যে কোনটি prominent (প্রধান)?

শ্রীশ্রীঠাকুর—মানুষ heredity (বংশগতি) থেকে পায় instinct (সহজাত-সংস্কার), environment (পারিপার্শ্বিক) দেয় তাকে nurture (পোষণ)। ছেলে জন্মাতে যেমন বাপ-মা দুই-ই লাগে, মানুষের জীবনে তেমনি heredity (বংশগতি), environment (পারিপার্শ্বিক) দুটো factor (জিনিস)-ই লাগে। পরিবেশের মধ্যে অনেক কিছুই থাকে, কিন্তু মানুষ সাধারণতঃ তার instinct (সহজাত-সংস্কার) অনুযায়ীই Pick up (গ্রহণ) করে। প্রত্যেকের specific instinct (বিশিষ্ট সংস্কার) পোষণ পায় যা’তে তেমনতর পারিবেশিক বিন্যাস যত হয় ততই ভাল।

(আলোচনা প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড, ৩।১২।১৯৪১)

ওই instinct (সহজাত-সংস্কার) ও environment (পারিপার্শ্বিক)-এর উপর ভিত্তি করেই সভ্যতার প্রাতঃ স্মরণীয় মনীষীবৃন্দের জনক-জননীরা সকলের কাছেই নন্দিত । আবার ভ্রষ্টাচারীর, সন্ত্রাসবাদীর, ধর্ষকের পিতামাতারা সমাজের চোখে নিন্দিত ।

শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই নয়, মনুষ্যেতর প্রাণীদের ক্ষেত্রেও ওই বিধি প্রযোজ্য। সরকারী পুলিশ বা মিলিটারীদের প্রয়োজনে একটা কুকুর, একটা ঘোড়া কিনতে গেলেও ওই instinct (সহজাত-সংস্কার) ও environment (পারিপার্শ্বিক)-এর কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে পেডিগ্রি অর্থাৎ বাবা-মায়ের বিশুদ্ধ বংশানুক্রমিকতার শংসাপত্রের সমৃদ্ধির গুরুত্ব বিচার করে কেনে । সেক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া জাতির নামে সংরক্ষণের উদারতা দেখিয়ে বংশমর্যাদাহীন কুকুর, ঘোড়া কেনে না । শুধু তাই নয়, একটা ভালো গোরুর বাচ্চা তৈরির জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করে বিদেশ থেকে উন্নত জাতের ষাঁড়ের শুক্রাণু কিনে সুপ্রজনন করার ব্যবস্থা করে সরকার, রাস্তায় ঘোরা ষাঁড়গুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে !

কৃষিক্ষেত্রেও তাই । উন্নত ফসলের জন্য ভালো জাতের সংরক্ষিত বীজ শোধন করে, বীজ অনুযায়ী উপযুক্ত উর্বর জমিতে ‘জো’ বুঝে বপন করতে পরামর্শ দেওয়া হয় । একজন আদর্শ কৃষক কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে বাস্তব পরিচর্যার মাধ্যমে বিশুদ্ধ বীজ, বিশুদ্ধ জমিতে বিনিয়োগ করে উন্নত জাতের ফসল পাবার জন্য । প্রাণী সম্পদ, কৃষি সম্পদ বিকাশের ক্ষেত্রে জৈবিক সম্পদের বিহিত বিনিয়োগ করে বুদ্ধিমান মানুষেরাই । অথচ এই বুদ্ধিমান মানুষেরাই ওই জৈবী সম্পদকে অপচয়ীভাবে বিনিয়োগ করে নিজেদের কমন সেন্সকে অপমান করছে ।

আমরা অনেক সময় কামুক পুরুষদের ‘কুকুরের চাইতেও অধম’ বলে গাল দিয়ে অযথা কুকুরদের অপমান করে বসি। কারণ, কুকুরেরা প্রজনন ঋতু ভিন্ন অন্য সময় নারী-পুরুষেরা একত্রে সহবাস করা সত্বেও যৌন-মিলনে প্রবৃত্ত হয় না। এ বিষয়ে কুকুরেরা মানুষদের তুলনায় অনেক সংযমী। শুধু কুকুর নয়, মনুষ্যেতর কোন মেরুদণ্ড প্রাণীই বংশ বিস্তার ব্যতীত যৌন মিলনে প্রবৃত্ত হয় না। আর আমরা বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষেরা কি করছি, কতটুকু কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে জৈবিক তাগিদকে সফল বিনিয়োগ করছি, মনের ভল্ট থেকে সেই হিসেবের খাতা বের করে যার যার নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করলেই উত্তরটা পেয়ে যাব।

মহান ভারতের মহান চরিত্র দুর্গা, লক্ষী, সরস্বতী, সীতা, সাবিত্রী প্রমুখ নারীদের আদর্শ ভুলে প্রকৃতি প্রদত্ত জৈবী সম্পদকে যৌবন গরবে গরবিনী প্রবৃত্তিতাড়িত একজন নারী,–নিজের নারীত্বকে দর্শকামে, স্পর্শকামে, শ্রুতকামে, পণ্য করে পুরুষের সুপ্ত কামনাকে জাগিয়ে লাম্পট্য, ব্যভিচারকে পুষ্ট করতে পারে, প্রভূত অনিত্য সম্পদের মালকিন হতে পারে, কিন্তু ভালো মা হয়ে নিত্য-জীবনে আদর্শ নারীর খেতাব অর্জন করতে পারবে না। উনো জমিতেই দুনো ফসল ফলে, বুনো জমিতে নয় । পুরুষের ক্ষেত্রেও তাই । পুর্ব পুরুষের জীবনধারা প্রবাহিত বীর্য্যকে ব্যভিচার, ধর্ষণ, স্বমেহন আর কন্ডোমে অপবিনিয়োগ করে ধর্মবিরুদ্ধ কামসেবার ইন্দ্রিয়-লালসায় বিনিয়োগ করে দুষ্ট প্রবৃত্তিকে তুষ্ট করতে গি়য়ে যৌনব্যাধি, মানসিক কষ্ট, বিবেক-দংশন, সামাজিক ছি! ছি! লাভ করতে পারবে, ভালো বাবার গৌরব অর্জন করতে পারবে না। বীজ শুদ্ধ না হলে ফসলও অশুদ্ধ হবে ।

আমাদের কাম-প্রবৃত্তি নামক জৈবিক তাগিদকে নিয়ন্ত্রণ করতে বৃত্ত্যাধীশ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র নারী-সাধারণকে মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েই ক্ষান্ত হন নি, নিজের স্ত্রীকেও চিন্ময়ী মা জ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শেখালেন । কারণ, স্ত্রীর মাধ্যমে স্বামী নিজেকে জন্মান, তাই স্ত্রীকে জায়া বলা হয়েছে । আমাদের আর্য্য বিধির গর্ভাধান কালে স্ত্রীর নাভিমূল স্পর্শ করে “প্রসীদ মা জগজ্জননী” মন্ত্রে অভিষিক্ত করে স্ত্রীর গর্ভে নিজেকে প্রবেশ করাতে হয় । প্রজা-সৃষ্টি প্রকরণের কি অপূর্ব ব্যঞ্জনা । যৌন জীবনে পুরুষদের শিব, আর নারীদের দুর্গা জ্ঞানে অভিষিক্ত করে কাম (lust) কে আসুরিক প্রবৃত্তির কবল থেকে মুক্ত করে দৈবীপ্রেমে (love) রূপান্তরিত করলেন আর্য্য-ঋষিরা। ওই জীবনীয় বিধিকে মেনে চলার মধ্য দিয়েই সার্থক হয় শিবপূজা, দুর্গাপূজা।

শ্রীশ্রীঠাকুর পুরুষ সাধারণকে কাম উপভোগ বিষয়ে মিতব্যয়ী হবার উদ্দেশ্যে বলছেন,–“…….প্রত্যেকটা sperm ( শুক্রাণু)-ই micro-cosmic form-এ (ক্ষুদ্রাকারে) এক-একটা being (জীব), ও নষ্ট করা মানে micro-cosmic form-এর (ক্ষুদ্রাকারের) একটা মানুষ মেরে ফেলা । আমাদের বোধশক্তি ও মমত্ববোধ জাগলে…… নিজের সুখের জন্য, ইন্দ্রিয়-পরিতৃপ্তির জন্য লক্ষ-লক্ষ শুক্রাণু নষ্ট ক’রে অতোগুলো soul (আত্মা)-কে মারতে পারবো না ।….. তাই প্রজননকল্পে ছাড়া অন্য কারণে শুক্রাণু যথাসম্ভব নষ্ট না করাই উচিত । তুমি-আমি সবই তো ঐ living sperm (জীবন্ত শুক্রাণু), প্রত্যেকে ওরই ওপর দাঁড়িয়ে গজিয়েছে, ওই আজ কত কথা কইছে, ঘুরছে, ফিরছে, হাতি-ঘোড়া মারছে । তুমি যে-দশা পছন্দ কর না, অনর্থক সে-দশায় ওদের ফেলবে ? ওরা যে তুমিই !” (আ. প্র. ১/১. ১২. ১৯৪১)

তিনি তাঁর নারীর নীতির বিধানে কুমারী মেয়েদের উদ্দেশ্যে বললেন—

‘‘মেয়ে আমার,

তোমার সেবা, তোমার চলা,

তোমার চিন্তা, তোমার বলা

পুরুষ-জনসাধারণের ভিতর

যেন এমন একটা ভাবের সৃষ্টি করে—

যা’তে তারা

অবনতমস্তকে, নতজানু হ’য়ে

সসম্ভ্রমে,

ভক্তিগদগদ কন্ঠে—

‘মা আমার,— জননী আমার’! ব’লে

মুগ্ধ হয়, বুদ্ধ হয়, তৃপ্ত হয়.কৃতার্থ হয়,—

তবেই তুমি মেয়ে.

—তবেই তুমি সতী!’’

নারীর নীতির ওই বিধান না মানার ফলে একজন আর্য্যহিন্দু নারী ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে পিটার মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব খান্না এবং ইন্দ্রাণীর মেয়ে শিনার বাবা সিদ্ধার্থ দাস সাম্প্রতিককালে সংবাদ শিরোনাম দখল করে নিয়েছে। সংবাদের বিষয়বস্তু সকলেই জানেন। ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায় মা হয়ে মেয়েকে বোন বলে পরিচয় দেয়, অপত্য স্নেহ ভুলে মা হয়ে মেয়েকে হত্যা করে! ওদিকে এক ব্যাঙ্ক অফিসার কামের মোহে পরকীয়া করতে গিয়ে বেসামাল হয়ে কামিনীকে, কামিনীর মেয়েকে কেটে টুকরো টুকরো করে হুগলী নদীতে ফেলতে গিয়ে ধরা পড়ে! প্রবৃত্তির রিংরসার আঠায় আটকে গিয়ে যাদের এখন দুর্দশার জীবন কাটাতে হচ্ছে! ওই দুর্বিসহ জীবন থেকে নিস্তার পেতে বাস্তব সব পদক্ষেপ নেবার পাশাপাশি ওরা অবশ্যই ভগবানেরও শরণাপন্ন হচ্ছে। আমরা সৎসঙ্গীরা নিয়ম করে অধিবেশনে অধিবেশনে সৎ-অসৎ নির্বিশেষে সকলের মঙ্গল কামনার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা জানাই। সেই রীতির অনুসরণে আমিও বলতে চাই, ভগবান ওদের ওই দুর্বিসহ জীবন থেকে মুক্ত করুন।

না, পরমপিতা আমার আর্জি নাকচ করে দিয়ে বললেন, ‘‘ভগবান আমাদের বাঁচাতে পারেন না, ভগবানের উপর আমাদের যে টান ঐ টানটাই বাঁচায়।’’

‘‘কেউ কারও যম নয়রে, তোর যম তুই।’’

God (ঈশ্বর)-এর opposite pole (বিপরীত মেরু) হ’ল Satan (শয়তান) যা’ disintegrate (বিশ্লিষ্ট) করে। ভগবানের প্রতি বিমুখ হ’য়ে, তাঁকে অস্বীকার করে, তাঁর বিরুদ্ধ যা’ তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে, তাকে প্রাধান্য দিয়ে চলার স্বাধীনতাটুকু মানুষের আছে। এই স্বাধীনতার উপর তিনি হস্তক্ষেপ করেন না। তিনি যেমন ইচ্ছাময়, প্রত্যেকটা মানুষকে তেমনি ইচ্ছাময় করে ছেড়ে দিয়েছেন। যে ইচ্ছাময় যেমন ইচ্ছা করে, সে ইচ্ছাময় তেমন হয়, তেমন পায়—বিধির অনুবর্তনে। পরমপিতা বিশ্ববিধাতা, আর, আামরা হলাম স্ব-স্ব ভাগ্য-বিধাতা। স্রষ্টার বেটা সেও এক স্বতন্ত্র স্রষ্টা। যার প্রাণে যেমন চায়, সে তেমনি সৃষ্টির মালিক হয়।’’ (আ. প্র. ১০ম খণ্ড/ ৮. ১. ৪৮)

আমরা যখন স্ব-স্ব ভাগ্য-বিধাতা, তখন ওইসব দুরাবস্থা থেকে রেহাই পেতে হলে একমাত্র উপায় হচ্ছে বিশ্ববিধাতা পরমপিতার বলা আদেশ-নিদেশ মেনে কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে আমাদের স্ব-স্ব ভাগ্য-বিধাতার কর্তব্যটুকু পালন করে যাওয়া, সকলকে পালন করতে উৎসাহিত করা— মনুষ্যত্বের মূল বুনিয়াদকে রক্ষা করতে হলে।

জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!

“Common sense is the most uncommon things in this world.” —Shree Shree Thakur Anukulchandra

dast9674@gmail.com

 

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মাতৃভক্তি

 

।। পুরুষোত্তম-জননী মাতা মনোমোহিনী দেবীর শুভ আবির্ভাব দিবস স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য।।

শ্রীশ্রীঠাকুরের মাতৃভক্তি

নিবেদনে—তপন দাস

অপটু লেখনীতে শ্রীশ্রীঠাকুরের অপার মাতৃভক্তির কাহিনী প্রকাশের প্রারম্ভে, শ্রীশ্রীঠাকুর সৃষ্ট সৎসঙ্গ আন্দোলন বিষয়ে দু-চার কথা না বললে ইষ্ট প্রতিষ্ঠা কর্মে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যেতে পারে।  

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সৃষ্ট সৎসঙ্গ আন্দোলন  ব্যক্তি নির্মাণের আন্দোলন, শুদ্ধাত্মা সৃষ্টির আন্দোলন। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, ধনী, দরিদ্র, মুর্খ, পণ্ডিত, সৎ, অসৎ নির্বিশেষে সব্বাইকে ধারণ-পালন-সম্বেগসিদ্ধ ব্যক্তিত্বের অধিকারী করে ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর—‘পঞ্চবর্হিঃ’  ও ‘সপ্তার্চ্চি’-র   আদর্শের সোপান-পথের মাধ্যমে। সেই পথের দিশারী স্বয়ং তিনি এবং  তাঁর আদর্শ। আমরা আর্য্য-ভারতবাসীরা যখন থেকে পূর্বাপূর্ব পুরুষোত্তমদের আদর্শের পথ ভুলে প্রবৃত্তি-পোষিত আদর্শের জীবন-চলনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, তখন থেকে আমাদের জাতীয় জীবনে কৃষ্টিগত অধঃপতনের সূত্রপাত হয়েছে। তাই তো বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুরকে আক্ষেপ করে বলতে হয়েছিল—

“ভারতের অবনতি (degeneration) তখন থেকেই আরম্ভ হয়েছে, যখন-থেকে ভারতবাসীর কাছে অমূৰ্ত্ত ভগবান্ অসীম হ’য়ে উঠেছে—ঋষি বাদ দিয়ে ঋষিবাদের উপাসনা আরম্ভ

হয়েছে।

ভারত! যদি ভবিষ্যৎ-কল্যাণকে আবাহন ক’রতে চাও, তবে সম্প্রদায়গত বিরোধ ভুলে

জগতের পূর্ব্ব-পূর্ব্ব গুরুদের প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হও—আর তোমার মূর্ত ও জীবন্ত গুরু বা ভগবানে আসক্ত (attached) হও, —আর তাদেরই স্বীকার কর—যারা তাঁকে ভালবাসে। কারণ, পূর্ব্ববর্ত্তীকে অধিকার করিয়াই পরবর্ত্তীর আবির্ভাব।”

        শ্রীশ্রীঠাকুরের এই আক্ষেপ-বাণী শতবর্ষ অতিক্রম করলেও আমরা তাঁর আবেদনকে বাস্তবায়িত করতে ব্যর্থ হয়েছি।  ব্যর্থ হয়েছি অবিকৃতভাবে পুরুষোত্তমের আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে সাধারণ জনমানসে!

তিনি বার-বার বলেছেন, “পঞ্চবর্হিঃ, সপ্তার্চ্চি, হলো আর্য্যকৃষ্টির মেরুদণ্ড ……. এগুলির রোজ স্মরণ করতে হয়। স্মরণ করা মানে শুধু চিন্তা করা নয়।” (আঃ প্রঃ ১৪/৬২)

“হিন্দুমাত্রেরই পঞ্চবর্হি বা পঞ্চাগ্নি স্বীকার্য্য—তবেই সে সনাতন হিন্দু, হিন্দুর হিন্দুত্বের সর্ব্বজনগ্রহনীয় মূল শরণ-মন্ত্র ইহাই ! পঞ্চবর্হি যেমন প্রত্যেক হিন্দুর স্বীকার্য ও গ্রহনীয়,সপ্তার্চ্চিও তেমন প্রতি মানবের অনুসরণীয় ও পালনীয়”! (পুণ্য-পুঁথি, ১ম সংস্করণ)

পরমপিতার ঐকান্তিক আবেদনকে  অগ্রাহ্য করে, তাঁর আদর্শকে নিত্যদিনের উপাসনা থেকে বহিষ্কার করে, ইষ্ট প্রতিষ্ঠা নামের অজুহাতে  সংগঠন-সৃষ্ট তথাকথিত আচার্য্য-পরম্পরা প্রতিষ্ঠার জন্য যে বিকৃতধারায় সৎসঙ্গ আন্দোলন জনমানসে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে, তার  প্রতিকার না করতে পারলে তাঁর ঈপ্সিত আর্য্যকৃষ্টির তুর্য্যধ্বনি পল্লীর নিকেতনে নিকেতনে পৌঁছানো সম্ভব হবে কি? তাঁর ঈপ্সিত—“পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠন”-এর-ই বা কি হবে? আমাদের  গুরুভক্তির গন্তব্য ঈশ্বরপ্রাপ্তির-ই বা কি হবে? তিনি যদি অবচেতনে আবির্ভূত হয়ে জবাবদিহি চান, এই প্রশ্নগুলোর,  উত্তর কি দেব তাই ভাবছি! !!!!!!!!!

                           ***********

 যাইহোক, এবার নির্ধারিত আলোচ্য বিষয় “শ্রীশ্রীঠাকুরের মাতৃভক্তি” নিয়ে আমার সাধ্যমত আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

প্রাকৃতিক নিয়মেই সব সুস্থ শিশুরাই দুষ্টুমি করে। জিনিসপত্র ভাঙে, তছনছ করে। সমবয়সীদের সাথে মারামারি করে, ঝগড়া করে, অন্যায় করে মার খাওয়ার ভয়ে সবসময় সত্যিটা স্বীকারও করে না। ফলে মায়ের কাছে, পরিজনদের কাছে মার খায়, বকুনি খায়। কিন্তু আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শিশু অনুকূলের দুষ্টুমির ধরণটাই ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি কার্যকারণ ভিন্ন কখনো কোন অন্যায্য দুষ্টুমি করতেন না। আর কখনো তা অস্বীকারও করতেন না। অকপটে সব স্বীকার করতেন। তথাপি তাঁকে মা-সহ পরিজনেরা অযথা শাসন করতে ছাড়তেন না। তারাই বা কি করবেন, প্রতিবেশীদের নালিশ শুনতে শুনতে নাজেহাল হতে হয় যে। তাই ইচ্ছে না থাকলেও, লোকের মন রাখতে জননীদেবীকে অযথা তিরষ্কার, শাসন করতেই হত।

একদিন মায়ের শাসনের ভয়ে লুকিয়ে ছিলেন। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে তবুও  বাড়ী ফেরেনি দেখে কর্তামা (মাতামহী কৃষ্ণসুন্দরী দেবী) বাড়ীর আনাচে-কানাচে কোথাও খুঁজে না পেয়ে কিছুটা দূরে বনের মধ্যে এক গাছতলায় বসে থাকতে দেখতে পান। প্রশান্ত বদনে বসে আছেন, তাঁর দেহ থেকে গোলাপী রঙের উজ্জ্বল জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয়ে চারিদিক আলোকিত করে ফেলেছে এবং কতগুলো ছায়ামূর্তি বালক অনুকূলকে ঘিরে আনন্দে নৃত্য করছে। ওই দৃশ্য দেখে কর্তামা ভয় পেয়ে ‘রাম নাম’ জপতে জপতে দৌড়ে গিয়ে দৌহিত্রকে কোলে করে নিয়ে ছুটে বাড়ীতে ফেরেন।

আর একদিন কোন এক দুষ্টুমির জন্য জননীদেবী ছেলেকে শাসন করার জন্য ধরতে যাবেন বুঝতে পেরে অনুকূল দৌড়ে পালাতে গেলে জননীদেবীও পিছন পিছন ছুটতে শুরু করেন। কিছুতেই ধরতে পারছেন না। দৌড়তে দৌড়তে হাঁপিয়ে পড়েছেন। মায়ের কষ্ট হচ্ছে দেখে নিজেই ধরা দেন মায়ের হাতে। মায়ের সব শাসন তিনি আশীর্বাদ মনে করে মাথা পেতে

নিতেন। মায়ের কোন কষ্টই তিনি সহ্য করতে পারতেন না।

মায়ের সব কথা তিনি মেনে চলতেন। তিনি  তখন পাবনা ইনস্টিটিউশনে তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র (বর্তমানের অষ্টম শ্রেণী)। অঙ্ক পরীক্ষার দিন। দেরি করে খেতে বসেছেন। স্কুলে যেতে দেরি হবে মনে করে মা বললেন, দেখিস্, আজ তুই অঙ্কের পরীক্ষা পারবি না।

 যথারীতি স্কুলে গেছেন। পরীক্ষা শুরু হয়েছে। সব সহপাঠীরা অঙ্ক কষছেন, কিন্তু অনুকূলকে প্রশ্নপত্র হাতে নিয়ে চুপ করে বসে থাকতে দেখে শিক্ষক মহাশয় জিগ্যেস করেন, কি, চুপচাপ বসে কেন, অঙ্কগুলো কি কঠিন লাগছে?

অনুকূল শিক্ষক মহাশয়কে বলেন, না স্যর,  অঙ্কগুলো সব আমি কষতে পারবো, কোন অসুবিধাই হবে না। কিন্তু কষতে পারছি না মায়ের কথার জন্য। আজ দেরি করে খেতে বসেছিলাম দেখে মা বলেছিলেন, দেখবি আজ একটাও অঙ্ক করতে পারবি না। তাই, আমি যদি

অঙ্কগুলো কষে ফেলি, তাহলে মায়ের কথা মিথ্যা হয়ে যাবে। আপনি আমায় ক্ষমা করবেন, অঙ্ক কষে মাকে মিথ্যেবাদী বানাতে পারব না! তাঁর  ওই মাতৃভক্তির দৃষ্টান্ত দেখে সহপাঠি  এবং শিক্ষকেরা স্তম্ভিত  হয়ে গিয়েছিলেন।  পরে  পৃথকভাবে অঙ্কের  পরীক্ষা  নিয়েছিলেন।

(সতীশচন্দ্র জোয়ারদার প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ৩৯ পৃঃ)

মায়ের প্রতি ঠাকুরের এমন একটা প্রাণকাড়া টান ছিল যে, কখনো কোন কারণে মায়ের কাছ থেকে অযথা কঠোর শাসন-তিরস্কার পেলেও তিনি হাসিমুখে মেনে নিতেন, কোন প্রত্যুত্তর করতেন না।—পাছে মা কষ্ট পায়, তাঁর প্রতি রুষ্ট হয়!—এই ভেবে! সর্বদা মায়ের আদর, সোহাগ, সান্নিধ্য, একটু বাহবা পাবার আশায় উন্মুখ হয়ে থাকতেন।

অথচ মা যে  তাঁর  প্রতি কতটা নির্দয় ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া তাঁর একটি বাল্যকালের  রচনা থেকে।

It was written when my mother chid me.

কেন গো মা হেন ভাব সন্তানের প্রতি,

কি দোষ করেছি মাগো চরণ কমলে ?

সদাই কেন গো হেন কোপ মম প্রতি,

সদা গালাগালি কেন কর বরিষণ?

আমি কি গো পুত্র নয় তোমার জননী,

গর্ভে কি গো ধরনি মা অভাগা সন্তানে ?

আর আর যত তব পুত্রদের প্রতি,

সদাই সন্তোষ ভাব দেখাও জননী।

তারা যদি কাছে এসে ডাকে মা মা বলি,

প্রশান্ত হৃদয়ে মাগো উত্তর প্রদান।

আমি যদি কাছে এসে ডাকি মা মা বলি,

মোর ভাগ্যে শুধু ছাই দন্ত কড়মড়ি।

পিতার নিকটে যদি যাই গো জননী,

মিষ্ট কথা শুনিবারে মনের উল্লাসে,

তিনিও কঠোর বাক্য প্রয়োগি আমারে,

দূর ক’রে দেন মোরে সে স্থান হইতে।

মিষ্ট কথা ভালবাসি আমি গো জননী,

তাই সাধ যায় মম মিষ্ট শুনিবারে

যেই গো জননী মোরে বলে মিষ্ট ভাষ,

অমনি তাহার আমি হই পদানত।

ঈশ্বরের কেন  গো মা এ কঠিন রীতি

যে-জন যাহা চায় তাহা নাহি পায় কেন?

(ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থ, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১০৭-১০৮)

       এখানে একটা লক্ষণীয় বিষয়—শ্রীশ্রীঠাকুর এই রচনার মাধ্যমে  মায়ের বিরুদ্ধে কোন নালিশ না জানিয়ে, মা-কে দোষারোপ না করে, ঈশ্বরের ওই-ধরণের বৈষম্যমূলক রীতি কেন, তা মায়ের কাছে জানতে চেয়েছেন!

শ্রীশ্রীঠাকুর  পরবর্তীকালে পরিণত বয়সে কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, — “আমার জীবনের একমাত্র নেশা ছিল মাকে খুশী করা। আমার বুদ্ধি-বিবেচনা-শক্তিমত বরাবর সেই চেষ্টা করেছি। আমার লোভ ছিল, মার কাছ থেকে বাহবা পাওয়ার, তাঁর আদর পাবার। কিন্তু মা ছিলেন আমার প্রতি বড় কড়া, তাঁর শাসন ও ভর্ৎসনা পেয়েছি অজস্র, তাঁর সোহাগের জন্য ক্ষুধা থাকলেও তেমন পাইনি তা’। তাহ’লে কি হবে ? মা ছাড়া যে আমার অচল। মা যতই অসন্তুষ্ট হউন, রুষ্ট হউন, কেবল এৎফাক খুঁজতাম, কেমন ক’রে মাকে তুষ্ট করব। ঐ ছিল আমার ধান্ধা। প্রতিকূল অবস্থায় ছেড়ে দেবার আমার কোনকালে হয় না। তখন আমার গোঁ চেতে যায়, কেমন ক’রে সেটাকে আয়ত্তে আনব। ছেলেবেলায় পাড়ার সকলেই ছিল আমার অভিভাবক। খানাকা কতজনে কান চেপে ধ’রে দুটো চড় দিয়ে ছেড়ে দিত। সেখানে দোষ হয়ত আমার কিছুই নেই। অন্য কারও দোষের কথা যে কব, তাও আমার কখনও মন চাইত না। অনেকে আজেবাজে কথা মার কাছে এসে লাগাত। মাও চালাতেন একচোট। এই রকম যতই ঘটুক, আমি কখনও হতাশ হতাম না, নিরাশ হতাম না। ভাবতাম, আমি আমাকে এমনভাবে তৈরী করব, এমনভাবে চলব, যা’তে এর অবকাশ না ঘটে।” (আলোচনা-প্রসঙ্গে, ৩য় খণ্ড)

“আমি বড় হব, আমাকে মানুষ বড় কবে—সে কল্পনা আমার কোন দিনই নাই। ওই ধারণায় আমি ব্যক্তিগতভাবে কোন সুখ পাই না। তবে হ্যাঁ। মার কাছে মানুষে সুখ্যাতি করলে মা সুখী হবেন, মা আমাকে বাহাদুর ছেলে ব’লে বাহবা দেবেন, সে লোভ আমার ছিল। লোভ থাকলে কি হবে, মা যেন. কিছুতেই আমার উপর প্রসন্ন হতেন না। আমি যেন অপরাধ ক’রেই আছি তাঁর কাছে৷ কিন্তু তবু, আমি হাল ছাড়তাম না, নাছোরবান্দা হয়ে লেগে থাকতাম মাকে খুশী করবই। মার হয়ত আমাকে না হলে চলতে পারতো, আমার কিন্তু মা ছাড়া চলারই উপায় ছিল না। তাই মার খুশীর ধান্ধায় ঘুরতেই হ’তো আমাকে।”

(সূত্রঃ ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থ, ১ম খণ্ড)

                           *************

মাতা মনোমোহিনী দেবী ও সন্ত সদগুরু পরম্পরা
        পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জন্মদাত্রী বিশ্বজননী মনোমোহিনী দেবী বাংলা ১২৭৭ সালের ১৮ই জ্যৈষ্ঠ পাবনা জেলার হিমাইতপুরের বিখ্যাত চৌধুরী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম রামেন্দ্রনারায়ণ  চৌধুরী, মাতার নাম কৃষ্ণসুন্দরী। আট বছর বয়সে ধ্যানের মাধ্যমে সৎনাম পান।  নয় বছর বয়সে পাবনা জেলার অধীন চাটমোহর গোয়াখাড়া গ্রামের পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তীর পুত্র শিবচন্দ্র চক্রবর্তীর সাথে বিবাহ হয়। বিবাহের পর আগ্রা সৎসঙ্গের দীক্ষাপ্রাপ্ত শিষ্য ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তী মহোদয়ের সাহায্যে ধ্যানযোগে প্রাপ্ত গুরুদেব হুজুর মহারাজ (রায় সালিগ্রাম সিংহ বাহাদুর) মহোদয়কে কলকাতায় দর্শন করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দীক্ষা গ্রহণ করেন।

 পুরুষোত্তম জননী মাতা মনোমোহিনী দেবীর দীক্ষাগুরু ছিলেন হুজুর মহারাজ।  তিনি সন্তমতের যে সাধনা করতেন, সেই সাধনার ধারা সে-সময় বাংলাদেশে প্রচলিত ছিল না। সন্তমতের আদি সাধক কবীরদাস জন্মেছিলেন 1440C বারানসীতে। তিনিই প্রথম সত্‍মন্ত্রের রহস্য ভেদ করে বলেছিলেনঃ
       “কবীর ধারা অগমকী সদগুরু দয়ী লখায়,
       উলট তাহি সুমিরন করে স্বামী সংগ লাগায়।”

—অর্থাৎ ধারা উল্টে স্বামী যোগ করে জপ করতে নিদেশ দিলেন।  কবীরের পর গুরু নানক জন্ম গ্রহণ করেন 15. 4. 1469 C পঞ্জাব প্রদেশের তালবণ্ডীতে। তিনিও ওই সত্‍নাম প্রচার করেছেন। কবীরের জন্মের প্রায় সাতশো বছর পর আগ্রাতে ২৪ শে আগস্ট ১৮১৮ তে জন্মগ্রহণ করেন শিবদয়াল সিং,  তিনি স্বামীজী মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ১৫ জুন ১৮৭৮ আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। পরবর্তী গুরু হন রায়  সালিগ রাম। তিনি ১৪ মার্চ, ১৮২৯ আগ্রার পীপল মাণ্ডিতে জন্মগ্রহণ করেন। ৬ ডিসেম্বর ১৮৯৮তে আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। তিনি হুজুর মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ওই সৎনাম সাধন করে চরম ও পরম পথের সন্ধান পান। তিনি তাঁর গুরু স্বামীজী  মহারাজের অনুমতি ক্রমে ওই সৎনাম সর্বসাধারণ্যে প্রচার করেন। পরবর্তী গুরু হন পণ্ডিত ব্রহ্মশঙ্কর মিশ্র। যিনি ২৮শে মার্চ, ১৮৬১ তে ব্রাহ্মণ পরিবারে, বারানসীতে জন্মগ্রহণ করেন। ১২ অক্টোবর ১৯০৭ সালে দেহত্যাগ করেন। তিনি মহারাজ সাহেব নামে খ্যাত ছিলেন। মহারাজ সাহেব দেহত্যাগের পূর্বে একটি কাউন্সিল গঠন করে বাবু কামতা প্রসাদ ওরফে সরকার সাহেবকে পরবর্তী গুরু রূপে নির্বাচন করেন।   (শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরকার সাহেবকে সন্ত বলে উল্লেখ করেছেন, ভাববাণীতে।)  

***

 মাতা মনোমোহিনী দেবী সময় সুযোগ পেলেই এলাহাবাদ, কাশী, আগ্রায় গিয়ে গুরুদেবের সাথে সাক্ষাত করতেন। তিনি একবার গুরুর কাছে প্রার্থনা জানিয়ে বলেছিলেন, ‘‘আশীর্বাদ করুন, যেন আপনার মত সন্তান লাভ করতে পারি।’’

        উত্তরে তাঁর গুরুদেব বলেছিলেন, আমার মত কেন, আমার চেয়ে মহৎ সন্তান তোমার গর্ভে জন্মাবে। তাঁর আলোয় পৃথিবী আলোকিত হবে।

তাঁর গুরুদেবের বলা কথা নিষ্ফল হয়নি। সব গুরুদের গুরু ইষ্টগুরু পুরুষোত্তমের জননী হন মাতা  মনোমোহিনী দেবী। স্বামী, সন্তান ও বৃহত্তর পরিবেশের সেবা করে, অসৎ-নিরোধী  তৎপর থেকে সব রকমের প্রতিকূল পরিস্থিতিকে সামাল দিয়ে ত্রিসন্ধ্যা নামধ্যান ও উপাসনায় অতিবাহিত করতেন।  তাঁর গুরুদেবের মাহাত্ম্য-আলোচনা করতেন, বিপুল সমারোহে গুরুদেবের জন্মতিথি পালন করতেন। গুরুদেবের ইচ্ছা-পূরণ, প্রীতি সম্পাদনের জন্য তিনি সর্বদা উন্মুখ থাকতেন। তৎকালীন ও তৎপূর্বতন রাধাস্বামী-মতের সন্তগুরুগণের পুণ্য লীলাভূমি — কাশী, আগ্রা, এলাহাবাদ প্রভৃতি স্থানে প্রায়শ তীর্থ-পর্যটনে গমন করে তিনি অন্তরে প্রভূত আনন্দ ও শান্তি লাভ করতেন।

  গুরুর আরাধনা করার জন্য তিনি পদ্মাতীরের একটা নিমগাছতলায়  সুন্দর মন্দির নির্মাণ করে গুরুদেবের একখানি পূর্ণাবয়ব বৃহদায়তন প্রতিকৃতি স্থাপন করেছিলেন।

 গুরুদেবকে নিয়ে অনেক বন্দনা-গীতিও তিনি রচনা করেছিলেন। তার একটি উদ্ধৃত করছি।

দয়া কর গুরুদেব আঁধার অবনী’পরে 

বিতরি করুণা-কণা জাগাও নিদ্রিত নরে ।

করিবে দয়া যখনি

জাগিবে সকল প্রাণী 

পালাবে সংশয় যত

তব আগমন হেরে ।৷  

তুমি হে পরমপিতা

তুমি সর্বসুখদাতা

তব প্রেমে কত মধু

বুঝাও যতন করে ৷। 

পাইলে তব আস্বাদ

ঘুচবে সব অবসাদ

দূরে যাবে সব পরমাদ

নাচিবে আনন্দ ভরে।।”

(ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ১ম খণ্ড, পৃঃ ৪২-৪৩)

                                  *********               

শ্রীশ্রীঠাকুরের আবির্ভাব ও দীক্ষা

          মাতা মনোমোহিনী দেবী আঠারো বছর বয়সে প্রথম অন্তঃসত্ত্বা হন। একদিন দুপুরে  একজন সন্ন্যাসী মনোমোহিনী দেবীর কাছে সেবা নিতে চাইলে তিনি ভক্তিভরে অতিথিকে সেবা করেন। সন্ন্যাসী বাড়ী ছেড়ে যাবার সময় বলেন, এই বাড়ির  একমাত্র পুত্রের মৃত্যু হবে। এবং এই বাড়িতে একজন মহাপুরুষ জন্মাবেন, যিনি বহুলোকের অধীশ্বর হবেন এবং জগতের প্রভুত কল্যাণ সাধন করবেন।

          তার কিছুদিন পরেই মনোমোহিনী দেবীর ভাই যোগেন্দ্রনারায়ণ, (ডাকনাম ছিল লোহা) অসুস্থ হয়ে পড়েন, রোগভোগে দেহত্যাগ করেন। ওদিকে  মনোমোহিনী  দেবীর গর্ভে ১১টি সৌরমাস   অতিক্রম করে, গর্ভবাসের লীলা সেরে, মাটির পৃথিবীতে ভূমিষ্ট হয়েছিলেন মনোমোহিনী দেবীর ১ম সন্তান।  শাস্ত্র-নির্দিষ্ট সব লক্ষণ নিয়েই মানবদেহে সীমায়িত হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন পিতার-পিতা পরমপিতা। বারেন্দ্র শ্রেণীর ব্রাহ্মণ পিতা শিবচন্দ্র চক্রবর্তী এবং  মাতা মনোমোহিনীর সন্তানরূপে। অবিভক্ত বাংলার পাবনা জেলার হিমাইতপুর গ্রামে। বাংলা ১২৯৫ সনের  ৩০শে ভাদ্র, সংক্রান্তির শুভ সকালে, চার দণ্ড বিশ পল্-এ।

                     ‘‘অকূলে পড়িলে দীন হীন জনে

                     নুয়াইও শির, কহিও কথা।

                     কূল দিতে তারে সেধো প্রাণপণে

                     লক্ষ্য করি তার নাশিও ব্যথা।’’

—উপরোক্ত চার পংক্তির আশীর্বাণীর আদ্যাক্ষর মিলিয়ে অ-নু-কূ-ল নামকরণ করেছিলেন বিশ্বজননী মাতা মনোমোহিনী দেবী। অন্নপ্রাশন সংস্কারের শুভলগ্নে।

ছোটবেলা থেকেই পুত্র অনুকূলের বিবিধ আধিদৈবিক কার্যকলাপ, অত্যাশ্চর্য্য ব্যাপার-স্যাপার প্রত্যক্ষ করে মাতা মনোমোহিনী দেবী বিশেষ চিন্তিত ছিলেন। কলকাতার বৌ-বাজারে ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুলে অ্যালোপ্যাথী মতে ডাক্তারি পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরে আসার পরও তার ব্যতিক্রম ছিল না। হিতৈষীদের পরামর্শ মেনে অনেক কিছু করেও নিজের  ছেলেকে নিজের মনের মত, অন্যান্য দশজন  জীবকোটির ছেলের মত আচার-আচরণে স্বাভাবিক করতে পারলেন না। অবশেষে হুজুর মহারাজ পরবর্তী  তৎকালিন আগ্রা সৎসঙ্গের সদগুরু বাবু কামতাপ্রসাদ ওরফে সরকার সাহেবের কাছে সকল বৃত্তান্ত  জানিয়ে চিঠি লেখেন, গাজিপুরে। সরকার সাহেব তখন অন্তিম শয্যায়। চিঠি পেয়ে খুব আনন্দিত হন। চিঠির উত্তরে তিনি লিখেছিলেন, ‘মেরা কাম হো গয়া, তুমি ছেলেকে দীক্ষা দিয়ে দাও।’ ওই পত্র মারফৎ অনুমতিই ছিল মাতা মনোমোহিনী দেবীর পাঞ্জা। পুরুষোত্তমরূপী সদগুরু অবতীর্ণ হয়েছেন বুঝতে পেরে সাধ্যায়ী গুরু তাঁর দায়িত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন। সরকার সাহেব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গাজীপুরে। তারপর থেকেই মাতা মনোমোহিনী দেবী সন্তমতের সৎনামে দীক্ষা দিতে শুরু করেছিলেন।

যাইহোক, সরকার সাহেবের অনুমতি ক্রমে মাতা মনোমোহিনী দেবী অনুকূলচন্দ্রকে সত্‍মন্ত্র প্রদান করার পর ঠাকুর বলেছিলেনঃ এ তুই কি দিলি ? এ নাম তো আমি তোর পেটে থাকতেই করি। অর্থাৎ উনি যে ওই সৎ নামের নামী-পুরুষ সেই তত্ত্বই তিনি ব্যক্ত করলেন তাঁর মায়ের কাছে

        অধ্যাত্মশাস্ত্রবিদূষী সাধিকা মনোমোহিনী দেবী, পুত্র অনুকূলচন্দ্রের নামধ্যান সংক্রান্ত সমস্ত অনুভূতির বর্ণনা শুনে বিস্মিত ও আনন্দিত হয়ে পুত্র অনুকূলচন্দ্রকে বলেছিলেন, ‘‘এই নামই তো আদি সৎ-নাম। তুই এই নাম করতে থাক।’’

 *       *       *

সৎসঙ্গ আন্দোলনে মাতা  মনোমোহিনী দেবীর ভূমিকা

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সৎসঙ্গ আন্দোলনের সূচনা করেন  কীর্তন প্রচারের মাধ্যমে।  কীর্তন করতে করতে তিনি অচৈতন্য হয়ে পড়ে যেতেন,  কাৎলা মাছের মত লাফাতেন, থর্ থর্ করে কাঁপতো তাঁর পায়ের বুড়ো আঙুল ! দেহ থেকে শ্বেতবর্ণের স্বেদ নির্গত হতো! রোমকূপ দিয়ে রক্ত ঝরতো পিচকিরি দিয়ে!

       যোগশাস্ত্রের পুঁথিতে যে-সমস্ত আসনের কথা উল্লেখ নেই অক্লেশে নতুন নতুন আয়াসসাধ্য সব আসন করতেন! আসন করতে করতে উঠে পড়তেন ৫-৬ হাত উপরে, শূন্যে! আবার নিথর-নিষ্পন্দ হয়ে ভূমিতে শুয়ে পড়তেন। তাঁর শ্রীমুখ থেকে নির্গত হতো মানব জীবনের জটিল সব সমস্যার সহজ সমাধানী বাণী। নানা ভাষায়। উপস্থিত কোন মানুষের মনের কথার, প্রাণের ব্যথার উত্তর দিতেন।

এমন সব সাধারণের বুদ্ধির গণ্ডীর বাইরের সব ঘটনা প্রত্যক্ষ করে নানা মানুষ নানা মত প্রকাশ করেছেন। কেউ বলছেন মৃগী রোগ, কেউ বলছেন নির্ঘাৎ কোন দানোতে ধরেছে। কেউ আবার পরীক্ষা করার জন্য জ্বলন্ত অঙ্গার চেপে ধরতেন। পরীক্ষা করার  জন্য সূঁচালো শলাকা ঢুকিয়ে দিতেন শরীরে! মানুষ কত বীভৎস হলে এসব কাজ করতে পারে!— ব্যথা ভারাক্রান্ত মনে অনুকূলচন্দ্রের অন্তরঙ্গ কীর্তন পার্ষদ কিশোরীমোহন, অনন্তনাথ রায় ও মুকুন্দচন্দ্র ঘোষ প্রমুখগণ পাবনা জেলা-কোর্টের লব্ধপ্রতিষ্ঠ উকিল পরম-বৈষ্ণব বৃন্দাবনচন্দ্র অধিকারীর কাছে সব নিবেদন করেন। সব শুনে, তিনি পরম কৌতূহলী হয়ে পর পর কয়েকদিন কীর্তনে যোগদান করেন। প্রত্যক্ষ করেন অপূর্ব কীর্তনের দৈবীলীলা। তাঁর শ্রীমুখ নিঃসৃত বাণীসমূহের ভাব-গাম্ভীর্য ও সার্বজনীনতা উপলব্ধি করে একান্ত বিস্মিত হন। ঠাকুরের অন্তরঙ্গ সঙ্গীদের ডেকে বলেন, শাস্ত্রাদিতে যে সমস্ত সমাধির কথা জানা যায় সেসবের তুলনায় অনেক উচ্চস্তরের নির্বিকল্প সমাধি। “এ সকল শ্রীমন্মহাপ্রভুর ভাব—বিশ্বহিতের জন্য পরমাত্মার মহাবাণী—মানব জাতির পরম সম্পদ। বহু-যুগ অন্তে পরমপিতার বিশেষ ইচ্ছায় কদাচিৎ এরূপ ঘটিয়া থাকে। সুতরাং আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ, তোমরা এখন হইতে ঠাকুরের শ্রীকণ্ঠোচ্চারিত এই সকল মহাবাণীর একটি অক্ষরও বাদ না দিয়া সমুদয়ই যথাশক্তি নিঃশেষে লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিবার ব্যবস্থা করিবে। আমি আশা করি, তোমরা ইহা অবশ্যকরণীয় পরম-পবিত্র কর্তব্য বলিয়া মনে করিবে।”

বৃন্দাবনবাবুর ওই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের অন্তরঙ্গ ভক্তেরা। হিমাইতপুর, প্রতাপপুর, কাশীপুর, কুষ্টিয়া, বাড়াদি, খলিলপুর, বরইচারা, ধুশণ্ডু (নদীয়া), কণ্ঠ গজরা (নদীয়া), ধলহরাচন্দ্র (যশোহর), খোকসাজানিপুর (নদীয়া), রাতুলপাড়া (নদীয়া), কমলাপুর (নদীয়া), মদাপুর (নদীয়া) হরিণাকুণ্ডু (নদীয়া) চক্রতীর্থ (২৪ পরগণা) প্রভৃতি স্থানে, যেখানেই ঠাকুর কীর্তনদলের সাথে যেতেন, সাথে লিপিকারেরাও যেতেন। প্রস্তুত থাকতেন শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাববাণীসমূহ লিখে রাখার জন্য। তাঁরা সাংসারিক সব কাজকর্ম ফেলে সযত্নে সেগুলো ধরে রেখেছিলেন বলেই ওই দৈবী-লীলার সাথে পরিচিত হতে পেরেছে জগৎবাসী। ওই অবদানের জন্য জগদ্বাসী চিরঋণী হয়ে থাকবে পরমবৈষ্ণব বৃন্দাবনচন্দ্র অধিকারী, ভক্তবীর কিশোরীমোহন, মহারাজ অনন্তনাথ রায়, আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী প্রমুখ পুরুষোত্তম-পার্ষদ ঋদ্ধি-সেনানীদের কাছে।

       কুষ্টিয়া অনুষ্ঠিত বিশ্বগুরু উৎসবের পর থেকেই ঠাকুর দর্শনে হিমাইতপুরে নানা স্থানের ভক্ত-সমাগম হতে থাকে।  ঠাকুরের কথা জানতে পেরে কলকাতার ব্যারিষ্টার চন্দ্রশেখর সেন হিমাইতপুর আসেন ঠাকুর দর্শনে। ঠাকুরের সাথে আলাপচারিতায় মুগ্ধ হয়ে  দীক্ষা গ্রহণ করেন। ঠাকুরের মহান আদর্শ কলকাতার সম্ভ্রান্ত  মহলে প্রচারিত হওয়ার ফলে বিদগ্ধ মহলে সাড়া পড়ে যায়। তাঁর যাজনে অনুপ্রাণিত  হয়ে সম্ভ্রান্ত মানুষেরা শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ গ্রহণ করেন।  

সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ মহামহোপাধ্যায় পন্ডিত কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন মহোদয়ের দ্বিতীয় পুত্র বিজ্ঞান গবেষক কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য ১৩৩০ বঙ্গাব্দের প্রথমদিকে স্থায়ীভাবে হিমাইতপুর চলে আসেন। ১৩৩০ সালের অগ্রহায়ণ মাসে স্থায়ীভাবে চলে আসেন বঙ্কিমচন্দ্র রায়। ১৩৩০ সালের ২৪শে অগ্রহায়ণ শ্রীশ্রীঠাকুরের পিতৃবিয়োগ হয়। একই সময়ে বিজ্ঞান গবেষক কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য মহোদয়েরও পিতৃবিয়োগ হয়। তথাপি তিনি ঠাকুরকে ছেড়ে বাড়ী না গিয়ে আশ্রমেই পিতৃদেবের শ্রাদ্ধাদি ক্রিয়া করেছিলেন। ১৩৩০ সালের ফাল্গুন মাসে ময়মনসিংহের উকিল শ্রীব্রজগোপাল দত্তরায় সপরিবারে আশ্রমে চলে আসেন এবং তপোবন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। আশ্রম সংগঠনকে গড়ে তুলতে প্রকাশচন্দ্র বসু, প্রবোধচন্দ্র বাগচী, চারুচন্দ্র সরকার, অনুকূল ব্রহ্মচারী, তারাপদ বাগচী, অধ্যাপক পঞ্চানন সরকার, ডাঃ গোকুলচন্দ্র মন্ডল প্রমুখ ভক্তবৃন্দসহ অনেকেই ঠাকুরের নিরবচ্ছিন্ন সান্নিধ্য লাভের আশায় স্থায়ীভাবে চলে আসেন হিমাইতপুরে। শ্রীযুক্ত সুশীলচন্দ্র বসু, তাঁর পত্নী রাণীমা, নফরচন্দ্র ঘোষ, যতীন্দ্রনাথ সরকার, হরিদাস ভদ্র প্রমুখ ভক্তগন তখন ঠাকুর বাড়ীতেই থাকতেন। ক্রমশঃ স্থায়ী বাসিন্দা বৃদ্ধি পেতে থাকলে কতগুলো খড়ের ও টিনের ঘর তৈরি করা হয়। পদ্মার ধারে বাঁশঝাড়ের মধ্যে কয়েকটা খাটা পায়খানা তৈরি হয়। এইভাবে প্রয়োজন অনুপাতে কুটিরের পর কুটির নির্মিত হতে থাকে। ক্রমে ক্রমে গড়ে ওঠে আশ্রম। প্রথম পত্তনকালীন তখনকার লোকেরা হিমাইতপুরের আশ্রমকে বলতো অনুকূল ঠাকুরের আশ্রম। পরে শ্রীশ্রীঠাকুরের মা আগ্রা সৎসঙ্গের অনুকরণে ‘সৎসঙ্গ আশ্রম’ এবং দীক্ষিতদের ‘সৎসঙ্গী’ নামে অভিহিত করেছিলেন। মূর্খ-পণ্ডিত-ধনী-নির্ধন-জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষ একে একে সমবেত হতে শুরু করলো হিমাইতপুরে। শুরু হলো লোকসংগ্রহ পর্ব। শুরু হলো কর্মযজ্ঞ।

এক এক করে গড়ে ওঠে আনন্দবাজার, কেমিক্যাল ওয়ার্কস, তপোবন বিদ্যালয়, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র, প্রেস, পাব্লিশিং হাউস, কলাকেন্দ্র, কুটীর শিল্পাগার প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান। সব কর্মকাণ্ডের সাথে মায়ের অগ্রণীর ভূমিকা  ছিল। তাঁর চরিত্র ছিল, কুসুমের ন্যায় কোমল, পাথরের ন্যায় কঠিন। আধ্যাত্ম জগতের সাথে সাথে জাগতিক জগতেও তিনি ছিলেন সকলের অভিভাবক স্বরূপা। নিজের, নিজের পরিবারের সব বিপদ-আপদকে তুচ্ছ করে অন্যকে রক্ষা করতেন জগজ্জননী-স্বরূপিণী হয়ে। হিমাইতপুর সৎসঙ্গ আশ্রমের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী। আশ্রমিকদের খাওয়া-দাওয়া, শিক্ষা, স্বাস্থ্য রক্ষা, প্রতিরক্ষা ইত্যাদি সব বিষয়ে তিনি সজাগ থাকতেন। দুর্বৃত্তদের অত্যাচার থেকে আশ্রমিকদের রক্ষা করতে লাঠি হাতে সারারাত জেগে পাহারা দিতেন। তাঁর ভয়ে আশ্রমে কেহ অন্যায় কাজ করতে সাহস পেত না।

মহাত্মাগান্ধী হিমাইতপুর আশ্রম পরিদর্শন করে আশ্রমের ভুয়সী প্রশংসা করার পর বলেছিলেন, “I have never seen a masterly woman of such wonderful personality in my life.”

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৃষ্ট সৎসঙ্গ আন্দোলন বিশ্ব পরিবার সংগঠনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রূপে একসময় প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল হিমাইতপুরে। সুদূর আমেরিকার খ্রিস্টান সম্প্রদায়ভুক্ত শ্রদ্ধাভাজন স্পেনসারদা, হাউজারম্যানদা, ইসলাম সম্প্রদায়ের খলিলুর রহমান, ব্রাহ্মণ পরিবারের বিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য মহোদয়ের ন্যায় পণ্ডিত ব্যক্তি প্রমুখদের পাশাপাশি খুব সাধারণ মাপের, অভাবে পরিশ্রান্ত মানুষদের পরিবার নিয়ে গড়ে তোলা পরিবারের নাম ছিল বৃহত্তর সৎসঙ্গীদের একটা পরিবার। দিনান্তে একবার আনন্দবাজারে আশ্রমমাতা জননী মনোমোহিনী দেবীর মাখা “দলা” প্রসাদ খেয়ে পরমানন্দে আশ্রম সংগঠনের ইষ্টের ঈপ্সিত কর্মে মত্ত থাকতেন—বিনা ওজরে, বিনা আপত্তিতে। ওই একবেলা খেয়েই নামধ্যান, কীর্তন, পঠন-পাঠন, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, সংস্কৃতি, বিজ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন থাকতেন। সকল পরিবার ছিল একে অপরের পরিপূরক পরিবার। সে এক স্বর্ণালি যুগ ছিল সৎসঙ্গের। প্রতিটি পরিবারের অভিভাবক ছিলেন মাতা মনোমোহিনী দেবী। সেই সৎসঙ্গ পরিবারের সদস্য আমরা। ব্যক্তি, দম্পতি, গৃহ, সমাজ, রাষ্ট্র জীবনকে অখণ্ড রেখে, প্রাচ্য-প্রতীচ্যকে বর্ণাশ্রমানুশাসনে নিয়ন্ত্রণ করে পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন আমাদের জীবন দেবতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। আমরা যদি ঠাকুরের আদর্শের পরিপালনে, পরিবার থেকে, সমাজ থেকে ডিভোর্সকে, বৃদ্ধাশ্রমকে বিদায় জানিয়ে, পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি মিলেমিশে এক ছাদের নীচে জীবন যাপন করে এক-একটা আদর্শ পরিবারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি—সার্থক হবে শ্রীশ্রীঠাকুরের সৎসঙ্গ আন্দোলন।

                           *************

       মাতা মনোমোহিনী দেবী তাঁর গুরুদেব সাধক পুরুষ হুজুর মহারাজের কাছ থেকে যে বিনতী  করতে শিখেছিলেন, সেই শিক্ষার  ধারাটাকে প্রাধান্য দিয়ে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন পাবনার সৎসঙ্গ  আন্দোলন। যে ধারায় বীজমন্ত্রের উচ্চারণ স্বীকৃত, বীজমন্ত্রের মাধ্যমেই পারস্পরিক সম্ভাষণ প্রচলিত। আর্য্যকৃষ্টির দশবিধ সংস্কার অবহেলিত—যা শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শের পরিপন্থী! যার ফলে, আজও বিনতীর মাধ্যমে বীজমন্ত্র উচ্চারিত হয়ে চলেছে। নিত্য সাধ্যায়ের জন্য আবশ্যিক, শ্রীশ্রীঠাকুর রচিত ‘জাগরণী’ সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দীক্ষিতরা যতটা না জানেন, তার চেয়ে বেশি মানেন মাতা মনোমোহিনী দেবী রচিত তাঁর গুরুদেবের প্রশস্তির প্রভাতী গীতি ‘প্রভাত যামিনী উদিত দিনমনি’-কে।

শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শের অনুগামীদের ঊষা-নিশায় মন্ত্রসাধন করা এক আবশ্যিক সাধনা। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সেকথা তিনি বার-বার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এ বিষয়ে একটা উদ্ধৃতি তুলে ধরছি।

শ্রীশ্রীঠাকুর কয়েকজনকে লক্ষ্য ক’রে বললেন—খুব সকালে উঠে ভোর চারটের মধ্যে প্রাতঃকৃত্যাদি ও নামধ্যান সেরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাগরণী গান গেয়ে সবাইকে জাগিয়ে দিতে হয়। তাড়াতাড়ি যাতে নামধ্যানে বসে তা’ করতে হয়। ওতে লোকে আনন্দ পায়, স্ফূর্তি পায়, তাদের শরীরও ভাল থাকে। আগে যতদিন ভোরে সবাইকে জাগিয়ে দিয়ে নামধ্যান করিয়েছি, ততদিন মানুষ অকালে মরেনি। তাই প্রত্যেককে এটা করানো লাগে। (আ. প্র. ১৬/ ১৫.  ৪. ১৯৪৯)

এখনও পর্য্যন্ত তাঁর ওই নিদেশকে উপেক্ষা করে শ্রীশ্রীঠাকুরের উৎসব-অনুষ্ঠানে  সূর্য ওঠার আগেই, ঊষা-কীর্তনের নামে পুরুষোত্তম-জননী মাতা মনোমোহিনী দেবী রচিত—তাঁর  গুরুদেবের প্রশ্বস্তি-গীতি—

 “প্রভাত যামিনী            উদিত দিনমনি

   ঊষারাণী হাসিমুখে চায় রে—

জাগি বিহগ সব             তুলি নানা কলরব

   রাধা রাধা রাধাস্বামী গায় রে।

নবীন বৃন্দাবনে                     তুলসী কাননে

    ভ্রমরী রাধাস্বামী গায় রে।

সেই সে মধুর গান          বাঁশিতে তুলিতে তান

   আপনি যে রাধাস্বামী গায় রে।।

যে নামে নন্দের কানু        সেধেছিল মোহন বেণু

    সেই রাধা রাধা নাম গাও রে।।

আজি মধু জাগরণ           শুনে সবে নরগণ

    জয় জয় রাধাস্বামী গাও রে।

মথিয়া সকল তন্ত্র            রাধাস্বামী মহামন্ত্র

    আদিগুরু জগতে বিলায় রে।।

রাধাস্বামী গুণগানে           আনন্দ বাড়িবে প্রাণে

       চরমে পরম গতি হয় রে।।

রোগ-শোক ব্যাধি-জরা              দূরে পালাবে তারা

     আনন্দে রাধাস্বামী গাও রে।

জয় রাধাস্বামী               জয় রাধাস্বামী

    জয় জয় রাধাস্বামী গাও রে।।”  কীর্তন করতে এবং করাতে অভ্যস্ত উৎসবের আয়োজকগণ!—-ব্রাত্য হয়ে আছে শ্রীশ্রীঠাকুর  রচিত জাগরণী!

                                                *****

        পরবর্তীকালে দৈনন্দিন জীবনচলনায় আর্য্যকৃষ্টির অনুশাসনকে প্রতিষ্ঠা করতে শ্রীশ্রীঠাকুর যে সান্ধ্য-প্রার্থনা মন্ত্র রচনা (দ্রঃ সৎসঙ্গ পাব্লিশিং-এর প্রার্থনা নামের পুস্তিকা।) করেছিলেন, মাতা মনোমোহিনী  দেবী সেই প্রার্থনাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন, ‘‘সন্ধ্যা মন্ত্রটা মা মারা যাবার তিনদিন আগে লেখা হয়। মা শুনে বড় খুশি হয়েছিলেন। সেইজন্য ও জিনিসটার উপর আমার খুব প্রীতি আছে। মা শুনেছিলেন তাই ওটা আমার অর্ঘ্য হয়ে আছে।’’ (আঃ প্রঃ ২১ খণ্ড, ৭. ১১. ১৯৫২)

      শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে কারো কাছে দীক্ষা গ্রহণ না করলেও বার বার তিনি বলেছেন, ‘আমার মা-ই যেন সরকার সাহেব, হুজুর মহারাজ ও অন্যান্য অন্যান্য মহাপুরুষদের  প্রতীক—মা-ই আমার আদর্শ—মা-ই আমার জীবত্ব।’ তথাপি তিনি সরকার সাহবকে নিজের গুরু হিসেবে এবং হুজুর মহারাজকে মাতৃদেবীর গুরু হিসেবে মান্য করতেন, তাঁদের প্রতিকৃতিতে প্রণাম নিবেদন করতেন।   

।। মায়ের মাধ্যমে পুরুষোত্তম রূপে আত্মপ্রকাশ ।।

শ্রীশ্রীজননী একদিন আমাকে (ডাঃ সতীশ জোয়ারদার) বলিলেন—“হ্যাঁ রে, তোরা অ……র মূর্ত্তি ধ্যান করিস কেন?” আমি বলিলাম—“শ্রীকৃষ্ণ-মূর্ত্তি বা অন্য সদ্গুরুমূর্ত্তি ধ্যান করতে আপনার ছেলের মূর্তি যে এসে উপস্থিত হন তা আমরা কি করব।” তিনি বলিলেন—“তা যদি সত্যি হয় তবে কর।” কথাটা যেন অনিচ্ছার সহিত বলিলেন। মধ্যাহ্নে শ্রীশ্রীজননীর পূর্ব্বদ্বারী বড় টিনের ঘরে শ্রীশ্রীঠাকুরসহ আমরা অনেকে ভোজন করিতে বসিলাম। শ্রীশ্রীঠাকুর বলিলেন—“মা, তুই আমার থালায় ব’সে নিবেদন করে দে না, তুই নিবেদন ক’রে দে আমি প্রসাদ খাই।” মা বলিলেন—“আমি এখন পারি না।” তিনি পঞ্চমবর্ষীয় বালকবৎ যেন আবদার করিয়া বলিলেন—“না মা, তুই নিবেদন ক’রে দে, তুই নিবেদন করে না দিলে আমার ভাল লাগবে না। তুই বেশ ক’রে ভাত মাখিয়ে দে, নিবেদন ক’রে দে, আর একটু খেয়ে প্রসাদ ক’রে দে না মা।” তখন শ্রীশ্রীজননী তাঁহার আবদার রক্ষা না করিয়া পারিলেন না। তিনি ভোজ্যসমীপে শ্রীশ্রীঠাকুরের নিকট বসিয়া তাঁহার ইষ্টমূৰ্ত্তিকে সেই ভোজ্যসামগ্রী নিবেদন করিতে লাগিলেন, ধ্যানে বসিলেন। ধ্যান করিতে করিতে দেখিলেন, তাঁহারই পুত্র আজ তাঁহার ইষ্টস্থলে অধিষ্ঠিত হইয়া ভোজ্য ভোজন করিলেন। তখন শ্রীশ্রীজননী (পূর্ব্বেও কিছু জানিতেন বোধহয়) বলিলেন—“এখন কি তোর এঁটো আমার খেতে হবে নাকি?”

শ্রীশ্রীঠাকুর বলিলেন—“ওমা, সেকি কথা!” শ্রীশ্রীজননী বলিলেন— “নিবেদন করলাম, দেখলাম তুই-ই তো খেয়ে গেলি।” শ্রীশ্রীঠাকুর বলিলেন— “ওমা, সেকি কথা!” তখন সকলেই নীরব হইলেন! ব্যাপার বুঝিতে কাহারও আর বাকী থাকিল না। শ্রীশ্রীজননী তদবধি তাঁহার পুত্রকে সদ্গুরুরূপে ধ্যান করিতে আমাদিগকে আর নিষেধ করেন নাই। (সূত্র : ডাঃ সতীশচন্দ্র জোয়ারদার রচিত গ্রন্থ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকচলচন্দ্র, পৃঃ ২৩৬-২৩৭)

কেন জানি, প্রথম জীবনে মাতা মনোমোহিনী দেবী পুত্র অনুকূলকে সব গুরুদের গুরু পরমগুরু রূপে মেনে নিতে পারেন নি। এমনকি ভাবসমাধি যাতে না হয় সেজন্য নফর আর রাধিকাকে দিয়ে কীর্তনের আঙিনায় জল ঢেলে কীর্তন বন্ধ করিয়েছিলেন! (দ্রঃ ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীর জীবনী গ্রন্থের ১ম খণ্ড, দ্বাদশ অধ্যায়।)  উপরোক্ত ঘটনা উপলব্ধি করার পর থেকেই হয়তো  পুত্রের ভগবৎ সত্তা সম্বন্ধে নিজে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।

মাতা মনোমোহিনী দেবী একবার কলকাতায় ১/১ সি হরিতকী বাগান লেনের বাড়িতে তাঁর পুত্র অনুকূলচন্দ্র, প্রভাসচন্দ্র, কুমুদচন্দ্র ও গুরুপ্রসাদীকে নিয়ে সপরিবারে ছিলেন। ঐ বাড়িতে থাকাকালীন গুরুপ্রসাদী দেবী বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল। গুরুপ্রসাদী দেবীর জীবনের আশা রইল না। মনোমোহিনী দেবী পুরুষোত্তমরূপী সন্তান অনুকূলের শরণাপন্ন হলে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন, — ‘ভয় নেই মা তোর গুরুপ্রসাদী সেরে উঠবে।’ পরদিন সকালে দেখা গেল শ্রীশ্রীঠাকুরের শরীরটা গুটি বসন্তে ভরে গেছে। এদিকে গুরুপ্রসাদী দেবী ধীরে ধীরে আরোগ্য লাভ করলেন। শ্রীশ্রীঠাকুর বেশ কয়েকদিন রোগ ভোগ করে সুস্থ হয়ে উঠলেন। এই বাড়িতেই শ্রীশ্রীঠাকুরে মেজ ভাই প্রভাসচন্দ্র কঠিন টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হন। রোগ উপশম হওয়া দূরে কথা ক্রমশঃ ব্যাধির প্রকোপ বেড়েই চলল। চিকিৎসকের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে রোগীর দেহ ঠাণ্ডা হতে লাগলো। জননী মনোমোহিনী তখন প্রথম পুত্র অনুকূলচন্দ্রের হাত দুটি ধরে আর্তকণ্ঠে বললেন — “অনুকূল, তুমি আমার ছেলেই হও আর যাই হও, তুমি সাক্ষাৎ ভগবান। আমার খ্যাপাকে (প্রভাসচন্দ্র) ফিরিয়ে দাও বাবা।” শ্রীশ্রীঠাকুর কিছুক্ষণ মৌন থেকে বললেন— ‘আচ্ছা যাও’। প্রভাসচন্দ্র ধীরে ধীরে আরোগ্যলাভ করলেন। একই ঘটনা ঘটেছিল বিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যের জীবনে। তিনি একবার গুরুতর রোগে আক্রান্ত হলেন। রোগের কোন উপশম হল না। চিকিৎসকের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল। তখন কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যের বয়স মাত্র উনত্রিশ বছর। কোষ্ঠিতে এই সময় তাঁর মৃত্যুযোগ নির্ধারিত ছিল। মাতা  মনোমোহিনী দেবী কৃষ্ণপ্রসন্নের শিয়রে শুশ্রূষায় ব্যস্ত ছিলেন। রোগীর অন্তিম দশা দেখে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে তিনি ঠাকুরকে বলেন, – ‘অনুকূল রে, কেষ্ট বুঝি আমাদের ছেড়ে চলে গেল। কেষ্টকে বাবা তুই এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দে নইলে আমি মারা যাব।’ শ্রীশ্রীঠাকুর মায়ের এই আর্জি মঞ্জুর করেছিলেন। কৃষ্ণপ্রসন্নের দেহে প্রাণ  ফিরে এসেছিল। তিনি নিরাময় হয়ে উঠলেন।

       প্রত্যেকের  ব্যথার ব্যথী ছিলেন মাতা মনোমোহিনী দেবী। হিমাইতপুর আশ্রমটা ছিল তাঁর কাছে একটা পরিবার স্বরূপ। আশ্রম ছাড়াও আশেপাশের গ্রামের মানুষের অসুখ-বিসুখ, অভাব-অভিযোগ, বিপদ-আপদ সবকিছুতেই তিনি ছিলেন সকলের ত্রাতা, অসৎ নিরোধে তৎপর। তাঁর ছিল দুর্জয় সাহস ও অসামান্য ব্যক্তিত্ব!  নিজের জীবনের মায়া তুচ্ছ করে সব্বাইকে আগলে রাখতেন। না, বেশিদিন আর আগলে রাখতে পারলেন না।

***

লোক-সংগ্রহের প্রয়োজনে শ্রীশ্রীঠাকুরকে মাঝে-মাঝেই কলকাতায় যেতে হতো। প্রায়শই মা সাথে যেতেন। বাংলা ১৩৪৪ সালের  মাঝামাঝি। লিভারের  পীড়ায় পীড়িত জননীদেবীকে আশ্রমে থাকতে বলে শ্রীশ্রীঠাকুর কলকাতা  চলে যান। ঠাকুর  যাবার পর ঠাকুরের নিষেধ অমান্য করে মা কলকাতা চলে  এলে  ঠাকুর ব্যথিত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তার ব্যাধি   বৃদ্ধি পেতে থাকে। কলকাতার ডাক্তারদের চিকিৎসাতে কোন  উপশম হচ্ছিল না  দেখে ঠাকুর  মা-কে নিয়ে হিমাইতপুর ফিরে আসেন।      

অসুস্থতার  অন্তিম অবস্থায় ডাঃ কেদারনাথ ভট্টাচার্য্যকে উদ্দেশ্য করে জননীদেবী বলেছিলেন—‘দ্যাখ্ কেদার, তোরা আর আমার কি করবি? আমার এই কষ্টভোগ আমারই সৃষ্টি। অনুকূলকে আমি ছেলের বেশি ভাবতে পারিনি—তাই আমার ব্যারাম। সে যা বলে তাই সত্য হয়। ভূত ভবিষ্যত সবই ও জানে। ওর কথা না শুনে আজ আমার এই দুর্ভোগ। অনুকূল আমাকে বারবারই এখানে (কলকাতায়) আসতে নিষেধ করেছিল, আমি তা শুনিনি। যেখানে বাৎসল্য সেখানেই তাচ্ছিল্য, পদে পদে ভুল হয়ে যায়। কর্মফল আর এড়াতে পারলাম না।’

 ১৩৪৪ বঙ্গাব্দের ৬ই চৈত্রর দিনটিতে বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে সর্বগুণের গুণান্বিতা  মাতৃমূর্তি স্বরূপিণী বিশ্বজননী মাতা মনোমোহিনী দেবী সকলকে শোকসাগরে নিক্ষিপ্ত করে ইহলীলা সম্বরণ করেন।

মায়ের নিথর দেহকে আগলে ঠাকুর ‘নিরাশ্রয়, নিরাশ্রয়’ ….. ‘কোথায় আমার মা,  কোথায় আমার মা’ বলে কপালে করাঘাত  করতে থাকেন। পদ্মার  তীরে  সৎকার  করা হয়। সৎকার করার পরেও ঠাকুর উন্মত্তের ন্যায় কখনো মায়ের ঘরে, কখনো চিতাভূমিতে, কখনো শ্মশানের দিকে তাকিয়ে,—“মা তুই এলিনা—ওমা, মা গো তোর অনুকূলের কি দশা হয়েছে একবার  দেখে যা!” ….  বলে আকূল আর্তনাদ করতে থাকেন। যথাবিধি শ্রাদ্ধক্রিয়া সমাপন করে কুল পুরোহিতের  নির্দেশে একটি বছর  ধরে জামা, জুতো, ছাতা ব্যবহার না করে কালাশৌচ  পালন করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর।

মায়ের অসুস্থতার সময়ে মাকে সবদিক থেকে স্বস্তিতে রাখার  জন্য মায়ের বসবাসের  জন্য একটা ঘর তৈরি করিয়েছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর।  ঘরটিকে খাট, ইজিচেয়ার, টেবিল,  আলনা,  আয়না, বৈদ্যুতিক আলো, পাখা প্রভৃতি নিত্য  ব্যবহার্য্য সরঞ্জামে সাজিয়েছিলেন। স্যানিটারী পায়খানার ব্যবস্থা করেছিলেন, মায়ের যাতে কোন  অসুবিধা না হয়  সেদিকে খেয়াল রেখে।  পরিতাপের  বিষয়,  জীবদ্দশায় মায়ের আর ওই ঘরে বাস করা হয়ে ওঠে নি।       

মায়ের তিরোভাবের পর সেই গৃহটিকে ‘মাতৃমন্দির’ নামে সংরক্ষিত করে যে স্মৃতিফলক স্থাপন করেছিলেন  শ্রীশ্রীঠাকুর, তাঁর প্রতিলিপি সংযোজিত করলাম।

মা!

বড় আকুল আগ্রহ উদ্‌গ্ৰীৰ উৎকণ্ঠা নিয়েই এই ঘর আর তার আসবাব যা কিছুর কাজ সমাধা ক’চ্ছিলাম—আশা ছিল তুমি থাকবে—ব্যবহার করবে— ধন্য হ’ব আমি—তা হল না— তুমি চ’লে গেলে—পার্থির শরীরের পতন হ’ল—আমার হতভাগ্য অদৃষ্ট কালের নিষ্ঠুর শ্লেষমলিন ধিক্কারে—মৃত্যুর মত জীয়ন্ত হ’য়ে রইল।

মনীষীরা ব’লে থাকেন, মানুষ পার্থিব শরীর ছেড়ে গেলেও আবার যেমন ছিল সূক্ষ্ম শরীরে তেমনই প্রাণ নিয়েই বেঁচে থাকে, আবার জাতিস্মর হ’য়েও নাকি সেই মানুষই জন্মাতে পারে—

মা!

মা আমার !

দয়াল যদি তাই করেন—তুমি যদি কখনও জাতিস্মর হ’য়ে এ দুনিয়ায় আবার ফিরে এস—তোমার অনুকূলকে মনে পড়ে—নিরাশ্রয় ব’লে যদি বেদনা অনুকম্পাজড়িত হৃদয় তোমার আমাকে খোঁজই করে—তুমি এসো— এসে এখানেই থেকো— এসবই ব্যবহার কো’রো—

তোমারই

হতভাগ্য

দীন সন্তান,

অনুকূল

  ——————————————————————————————–   তথ্যঋণ :

১.  ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ১ম খণ্ড।

২. শ্রীসচ্চিদানন্দ গোস্বামী প্রণীত, ‘আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী ও সৎসঙ্গ আন্দোলন’।

৩. প্রিয়পরমের পরশে, ১ম খণ্ড।

৪. সতীশচন্দ্র জোয়ারদার প্রণীত জীবনীগ্রন্থ।