নিজ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র

।। জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।

নিবেদনে—তপন দাস

************************

প্রোটোপ্লাজম্ (জীবনের মূলীভূত উৎপাদন )-এর Psycho-physio chemical evolution ( মানস শারীর রাসায়নিক বিবর্তন) থেকেই নানাপ্রকার জীবের আবির্ভাব। টিকে থাকার তাগিদ জীব মাত্রেরই আছে। যে-পরিবেশে টিকে থাকবার জন্য যেমন দৈহিক ও মানসিক গঠন প্রয়োজন, তেমনতর দৈহিক ও মানসিক গঠন উদ্ভিন্ন করে তোলার প্রয়াস প্রতিটি জীবের ভিতর দেখা যায়। এইভাবে জীবের প্রকৃতি বদলায়। যারা পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না বা পরিবেশকে বাঁচার উপযোগী ক’রে আয়ত্বে আনতে পারে না, তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

(সূত্র : নিজ জীবন প্রসঙ্গে, পৃঃ ১০১)

  ।। ইষ্টের চেয়ে থাকলে আপন,

ছিন্ন-ভিন্ন তার জীবন।।

নিবেদনে—তপন দাস

***********************

আলোচনা প্রসঙ্গের সংকলক শ্রীযুক্ত প্রফুল্ল কুমার দাস মহাশয়ের মাতৃদেবী উদ্বন্ধনে প্রাণত্যাগ করেছেন। প্রফুল্লদা তাতে শোকে মুহ্যমান হ’য়ে পড়েছেন। শ্রীশ্রীঠাকুর তাকে নিয়ে বৈকালে আশ্রমের ( হিমাইতপুর) নাট্যমণ্ডপে গিয়ে বসেছেন। সঙ্গে আছেন কেষ্টদা (ঋত্বিগাচার্য্য), সরোজিনী মা।

শ্রীশ্রীঠাকুর—প্রফুল্লদার প্রতি ( মমতাসিক্ত চোখে ও কণ্ঠে ) — কলকাতায় প্রথমে যখন খবর পেলি তখন তোর কী মনে হ’ল?

প্রফুল্লদা—বেলেঘাটায় একটা সৎসঙ্গ অধিবেশনে রওনা হবার মুখে খবর পেলাম, আপনি আজ রাতেই আশ্রমে রওনা হতে বলে দিয়েছেন। এটুকু শুনেই মনে হল—মা বোধহয় নেই। …. সমস্ত শরীর থর্-থর্ করে কাঁপতে লাগল — বুক ভেঙে কান্না আসছিল, নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। ……… তারপর সব জানলাম।

শ্রীশ্রীঠাকুর—আমি আশ্রমে আসতে বলেছি তাতে তোর মায়ের খারাপ কিছু হয়েছে .…… হঠাৎ ও কথা ভাবতে গেলি কেন?

প্রফুল্লদা—তা জানি না, ক’দিন থেকেই মনে হচ্ছিল, মা’কে বোধ হয় বেশীদিন রাখতে পারব না।

শ্রীশ্রীঠাকুর—অমনি হয়। অমঙ্গলের কথা মনে ডাকে। বিশেষতঃ ভালবাসার জনের অমঙ্গল আসার আগে মনে যেন কেমন একটা ছায়া পড়ে।

প্রফুল্লদা— ঠাকুর! আমি কেবল ভাবছি মা’র অধোগতি হবে, যা কষ্ট পেলেন। কী কষ্টে গেলেন। কী প্রায়শ্চিত্ত করলে .…. মা’র সৎগতি হয় ?

শ্রীশ্রীঠাকুর—সে তো কষ্টের দরুণ যায়নি। আমার প্রতি টান ছাপিয়ে ছিল ওর জায়ের (সদ্যমৃত) প্রতি টান। আমার প্রতি টান থাকলে আমাকে কী খাওয়াবে…তাই নিয়ে উদ্ব্যস্ত হ’য়ে অন্যকথা ভুলে যেত। ঐযে ছড়ায় আছে— “ইষ্টের চেয়ে থাকলে আপন, ছিন্ন ভিন্ন তার জীবন”—এ একেবারে তাই হয়ে গেল। ক’দিন আগে আমাকে কথা দিয়েও কথা রক্ষা করল না— আমি তার মধ্যে কত weak হয়ে গিয়েছিলাম। …. সন্তান যদি কৃতী ….. ইষ্টস্বাৰ্থ প্ৰতিষ্ঠাপ্রাণ হয়, তাতে ত্রিকোটি কুল উদ্ধার হয়। মা’র উদ্ধার, মার সদগতি, মা’র অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত তো সাধারণ কথা ।….জীবিত বা মৃত তাদের সব চাইতে বেশ উপকার করা যায় এই ভাবে চ’লে — অবস্থা যদি সত্যিকার পারস্পরিক প্রীতি থাকে।

যে গেছে সে তো গেছে, আমি তো তোর আছি।

সর্ব্ব ধর্ম্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ

অহং ত্বাং সৰ্ব্বপাপেভ্য মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।

(সূত্র : নিজ জীবন প্রসঙ্গে, পৃঃ ১৬২-১৬৩/আঃ প্রঃ ৫ম খণ্ড)

“সাধনা বলতেই আমি বুঝি ইষ্টনিষ্ঠ হয়ে সত্তাসম্বর্দ্ধনী আত্মনিয়ন্ত্রণী শক্তিলাভ ও তার ইষ্টার্থী বিনিয়োগ।” (নিজ জীবন প্রসঙ্গে, পৃষ্ঠা ৯৩)

।। এত হিংসা কেন ।।

।। এত হিংসা কেন ।।

নিবেদনে—তপন দাস

***************************

ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে, বাংলাভাষায় রচিত বিখ্যাত গানের কলি, “মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য” নস্টালজিয়ার সিড়ি বেয়ে যাঁদের স্মৃতি অধিকার করে আছে, সেইসব বুদ্ধিজীবিরা, সমাজ-বিজ্ঞানীরা, কি জবাব দেবেন পশ্চিমবঙ্গের নোংরা রাজনীতি কেন্দ্রিক হিংসা, নারী-নির্যাতন, মৃত্যুর খবর শুনে! কতটা বোধ-বিপর্য্যয় হলে “পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যার” পবিত্র নীতিকে পাশ কাটিয়ে নীতিহীন রাজনীতির ক্ষমতা দখলে রাখার জন্য বিরোধী মতবাদীদের হত্যা পর্যন্ত করতে পারে! আবার যার প্রমাণ পাওয়া গেল সমাগত পঞ্চায়েত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে! যা’ সংশ্লিষ্ট “সত্যমেব জয়তে” সম্বলিত সীলমোহরের আধিকারিকদের পরিহাস করে যেন বলতে চাইছে, তোমরা কতখানি সৎ তোমাদের বিবেকের কাছে একবার জিগ্যেস করে দেখো তো!

** হিংসার উৎপত্তি **

বুদ্ধিজীবিগণ, সমাজবিজ্ঞানীরা, মনোবিদেরা এর কি ব্যাখ্যা দেবেন জানিনা, তবে যুগত্রাতা বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র হিংসার কারণ প্রসঙ্গে বলছেন, অহঙ্কার থেকে হিংসার উৎপত্তি। “অহঙ্কার আসক্তি এনে দেয় ; আসক্তি এনে দেয় স্বার্থবুদ্ধি ; স্বার্থবুদ্ধি আনে কাম ; কাম হতেই ক্রোধের উৎপত্তি ; আর, ক্রোধ থেকেই আসে হিংসা।’’ তাহলে বোঝা গেল, হিংসার মূল কারণ অহঙ্কার। অহঙ্কারের উৎপত্তি প্রবৃত্তি-পরায়ণতা থেকে। আর সেই প্রবৃত্তি-পরায়ণতার চালক লোভ, কাম, ক্রোধ, মদ, মোহ ও মাৎসর্য্য নামের ষড়রিপু, দেহরথের ৬টা ঘোড়ার লাগাম, দেহরথের সারথী ইষ্টগুরুর হাতে সঁপে দিতে পারলে একেবারে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। আর সেই ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন দিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। আমি অক্রোধী, আমি অমানী, আমি নিরলস … ইত্যাদি মন্ত্রে “স্বতঃ-অনুজ্ঞা”-র নিত্য অনুশীলনের বিধানের মাধ্যমে। হিংসাকে প্রতিরোধ করার জন্য এর চাইতে উপযুক্ত কোন নিদান আছে কি-না আমার জানা নেই।

যুগ-বিধায়ক বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র “প্রাচ্য-প্রতীচ্য নিয়ন্ত্রণে বর্ণাশ্রমানুশাসকম্ আর্য্য চিরায়নম্।” সূত্র-মন্ত্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্তরে এক হিংসামুক্ত সুবিন্যস্ত পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠন করার সূত্র দিলেন।সেই অমোঘ বিধানকে পাশ কাটিয়ে হিংসার প্রতিবিধানের জন্য থানা, পুলিশ, মিলিটারী, কোর্ট, সংশোধনাগার প্রভৃতির ব্যবস্থা করেও হিংসা দমন করতে পারছেন না রাষ্ট্র পরিচালকেরা। তাই যদি পারত তাহলে, জন-প্রতিনিধি হয়ে দেশ-সেবকের অধিকার অর্জনের মাধ্যম, নির্বাচনের ন্যায় একটা সরল প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আমাদের হিংসা এবং হিংসার পরিণতি মৃত্যুর মিছিল দেখতে হতো না! এ কেমন রাজনীতি? এ কেমন গণতন্ত্র ? ছিঃ!

* * *

যুগ-বিধায়ক বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বিধান অনুযায়ী হিংসাকে দূর করতে হলে ভক্তির চাষ দিতে হবে। ভক্তির সংজ্ঞায় তিনি বলছেন, ‘‘সৎ-এ নিরবচ্ছিন্ন সংলগ্ন থাকার চেষ্টাকেই ভক্তি বলে।’’ তাহলে সৎ-এ নিরবচ্ছিন্ন সংলগ্ন থাকার চেষ্টা করার জন্য ভাবী পিতামাতাকে সদগুরুর আদর্শ গ্রহণ করতে হবে। তারপর পরমপিতা প্রদত্ত দিব্য বিবাহ-সংস্কারে সংস্কৃত হয়ে শুদ্ধাত্মাকে আকর্ষণ করে প্রহ্লাদের ন্যায় দিব্য ভক্ত সন্তানের জন্ম দিতে হবে। ভারতের নিজস্ব সংবিধান কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে এর সমর্থন আছে। বর্তমানের চিকিৎসা বিজ্ঞানও এর সমর্থন করেছে। সুস্থ দম্পতির সুস্থ দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে সুস্থ মানবের জন্ম দেওয়ার বিধান দিয়ে। এ ব্যতীত জন্মগত দুরারোগ্য শারিরীক এবং মানসিক ব্যাধি প্রতিরোধের অন্য কোন চিকিৎসা নেই। (Ref. DAVIDSON’S PRACTICE OF MEDICINE/Genetic Factor of Disease)

রাষ্ট্রের অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার বোর্ডের কর্ণধারেরা বিশ্বস্ত, সুস্থ পে-ডিগ্রীড কুকুরের, ঘোড়ার জন্ম নিয়ে গবেষণা করলেও মানুষের বেলায় উদাসীন। একুশ বছরের ছেলে আর আঠারো বছরের মেয়ে হলেই হলো। বংশ, বর্ণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা—কোন কিছুই না দেখে স্পেশ্যাল ম্যারেজ অ্যাক্টের সাহায্যে বিয়ে করতে পারবে, আবার বনিবনা না হলে ডিভোর্সও করতে পারবে! এখন তো আবার বিয়ে না করেও লিভ-টুগেদার আইনের সাহায্যে সন্তানের মা হতে পারা যায়। যার দৃষ্টান্ত লোকসভার সদস্যা নুসরত জাহান। রাষ্ট্রের জন-প্রতিনিধিরা যদি সুস্থ দাম্পত্যের প্রজনন বিজ্ঞানকে অসম্মান করতে পারেন, সেখানে সাধারণ নাগরিকগণ আরো বেশি সুযোগ পেয়ে যাবে লাগামহীন যৌন-জীবন যাপন করার! পরমপিতার অশেষ করুণায় আমাদের গ্রামীন ভারতবর্ষের তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষগুলো এখনো কোন-না-কোনভাবে ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা, পিতামাতায় ভক্তি রেখে বিবাহ সংস্কারের অনুশাসন মেনে চলছে বলে প্রিয়জনের দ্বারা প্রিয়জনদের হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা সমাজে বিস্তার লাভ করতে পারছে না। তবে, রাষ্ট্র ব্যবস্থা যদি এখনই ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুরুত্ব না দেয়, স্বভাববিধ্বংসী প্রতিলোম জাতকদের জন্ম বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাহলে অচিরেই হিংসা আমন্ত্রিত হবে ঘরে ঘরে!

হিংসা প্রতিরোধের জন্য যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র একেবারে সমস্যার মূলে হাত দিয়ে বললেন, “ভক্তি এনে দেয় জ্ঞান ; জ্ঞানেই সর্বভূতে আত্মবোধ হয় ; সর্বভূতে আত্মবোধ হলেই আসে অহিংসা ; আর, অহিংসা হতেই প্রেম। তুমি যতটুকু যে-কোন একটির অধিকারী হবে, ততটুকু সমস্তগুলির অধিকারী হবে।’’

একেবারে অঙ্কের হিসেব। আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি-ইচ্ছার ‘ছোট-আমি’-টার অহঙ্কারের লাগামটাকে যদি ভক্তির মুঠো দিয়ে কষে না ধরা যায় তাহলে ধাপে-ধাপে হিংসার আশ্রয়ে পৌঁছে যাবে। যার পরিণতি অস্বাভাবিক মৃত্যু। আর যদি জীবন নামক রথের চালক ছ’-টা ঘোড়ার (ষড়রিপু) লাগাম জীবন-রথের সারথি স্বরূপ ইষ্টগুরুর হাতে সমর্পণ করা যায়, তাহলে, সরল প্রাণ, মধুর বচন, আর বুকভরা প্রেমের ডালি দিয়ে সবাইকে আপন করে নেওয়া যায়। একটা পিপীলিকারও ব্যথা নিরাকরণের জন্য প্রাণ কাঁদে।

আবার যে হিংসা মৃত্যুর দ্যোতক তাকে শক্ত হাতে দমন করতে হলে হিংসা দিয়েই করতে হবে। হিংসাকে হিংসা দ্বারা জয় করার নাম অহিংসা। যেমন দুষ্টক্ষত বা গ্যাংগ্রীন থেকে শরীরকে বাঁচাতে হলে আক্রান্ত অংশটিকে কেটে বাদ দিতে হয়। বাদ না দিলে দেহকে বাঁচান যায় না। তেমনি সমাজ রক্ষা, রাষ্ট্র রক্ষা করতে হলে অনুরূপ নীতির অনুসরণ না করতে পারলে সমাজ-রাষ্ট্রের অঙ্গে পচন ধরে যাবে, রাষ্ট্রের সত্তাটাই মারা পড়বে।

আর্য্য ভারতের মা কালী শুম্ভ-নিশুম্ভকে, মা দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে, শ্রীরামচন্দ্র রাবনকে বধ করে ওই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। অযথা কাউকে হত্যা করেন নি। অযথা কাউকে হত্যা না করে পার্থসারথি শ্রীকৃষ্ণ মামা কংসের পাঠান অসুর-রাক্ষস নামক সত্তাহিংস জিঘাংসা বৃত্তিধারীদের হত্যা করেছিলেন। অপকৌশলী অসৎ সাম্রাজ্যবাদী কংসকে হত্যা করে, উগ্রসেনকে কারাগার থেকে মুক্ত করে তাঁকে পুণরায় রাজ্যে অভিষিক্ত করেছিলেন। ধর্মপথভ্রষ্ট অসৎ আগ্রাসনী জরাসন্ধকে হত্যা করে জরাসন্ধের পুত্র সহদেবকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিয়েছিলেন। সব হিংসার মূল উৎপাটন করে, এক পরম রাষ্ট্রীক সমবায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধ সংগঠিত করে জীবনবাদের জয়গান গেয়েছিলেন। ভবিষ্যত প্রজন্মকে জীবনবাদী হবার জন্য উপহার দিয়ে গেলেন শ্রীমদ্ভবদ্গীতা। আমাদের রাষ্ট্রীয় স্তোস্ত্র “বন্দে মাতরম্” ধ্বনির উৎস শ্রীমদ্ভবদ্গীতা। একদা শ্রীমদ্ভবদ্গীতা গ্রন্থকে আদর্শ মেনে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছিল। সেসব মহান ইতিহাস ভুলে গণতান্ত্রিক পথে রাজনীতি করতে গিয়ে হিংসাশ্রয়ী হয়ে আমরা যদি ভারতমাতার সন্তানদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলি, ভারতমাতা সেই অপমান কতদিন মুখ বুঁজে সহ্য করবেন?

আমরা আবার গীতা গ্রন্থের স্রষ্টা পার্থসারথী শ্রীকৃষ্ণের আশ্রয়ে ফিরে যাব। শ্রীকৃষ্ণ পরবর্তী বহির্ভারতের বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীষ্ট, হজরত রসুল প্রমুখ পুরুষোত্তমগণও আর্য্য ভারতীয় ওই শ্বাশ্বত নীতির অনুসরণ করেছেন মানব সভ্যতাকে বাঁচাতে। তাঁরা আগ্রাসন করতে, ধর্মান্তকরণ করতে, অযথা কাউকে হিংসা করতে কোথাও কি বলেছেন? তবে কেন এত হিংসা? কেন এত জিঘাংসা? ওই হিংস্র জিঘাংসাকে যদি কঠোর হাতে দমন করতে এগিয়ে না আসেন জীবনপিয়াসী শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তথা রাষ্ট্র নায়কেরা, তাহলে মানবতার অপমৃত্যুর কালো ছায়া মানব সভ্যতার অঙ্গে ক্রমে ক্রমে গ্যাংগ্রীন উৎপাদন করবে নিকট ভবিষ্যতে। অসৎ নিরোধে তৎপর না হয়ে, অসৎকে প্রশ্রয় দিয়ে রাষ্ট্রের পবিত্র মন্ত্র “সত্যমেব জয়তে” সম্বলিত সীলমোহরের আধিকারিক হওয়াটা যেমন ভণ্ডামি, তেমনই অসৎ নিরোধে উদাসীন থেকে সৎসঙ্গী সেজে ভক্ত হওয়াটাও কিন্তু ভণ্ডামী! সকলের কথা বলতে পারব না, সেই দিক দিয়ে বিচার করতে গেলে আমি নিজে কিন্তু ভণ্ড। ভক্ত হতে গেলে ঠাকুরত্বকে জাগাতে হবে চরিত্রে। সেটা যখন জাগাতে ব্যর্থ হয়েছি, তাহলে আমি ভণ্ড ছাড়া আর কি! তাই ভণ্ডামি ত্যাগ করে আমাকেও গুটি কেটে খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে পড়তে হবে, পরিস্থিতিকে সামাল দিতে। পরিস্থিতিকে এড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারব না।

ইষ্টভরণ, পিতৃপোষণ

পরিস্থিতির উন্নয়ন,

এ না ক’রে যাই করিস্ না

অধঃপাতেই তোর চলন। ২ ।

(অনুশ্রুতি, ১ম খণ্ড)

ইষ্টপ্রোক্ত উদ্ধৃত বাণীর অধঃপতন থেকে ব্যক্তিসত্তাকে, সংঘ-সত্তাকে বাঁচাতে হলে অসৎ-নিরোধে তৎপর হতেই হবে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র “ব্যক্তি-দম্পতি-গৃহ-সমাজ-রাষ্ট্র উদ্ধার”-কল্পে, যজন-যাজন-ইষ্টভৃতি-স্বস্ত্যয়ণী প্রবর্তন করছেন। সেকথা বিস্মরণ হলে ইষ্টাদর্শের অপলাপ করা হবে। জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!

AARYA MAHASABHA

** রাজনীতি বলে তায়/পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যায়/সংহতি আনে যায়। **
।।  প্রসঙ্গ : আর্য্য মহাসভা গঠন  ।।
নিবেদনে—তপন দাস
————————————————-

        সবিনয় নিবেদন,

[ভারতবর্ষের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শাসন ক্ষমতা অধিকার করার জন্য অনেক রাজনৈতিক দল থাকা সত্ত্বেও “আর্য্য মহাসভা” নামের রাজনৈতিক দল গঠন করার প্রয়োজন হলো কেন, তার সমর্থনে আমার বক্তব্য।]

গণপ্রজাতন্ত্রী আধুনিক ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভের ধর্মচক্র  আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ধর্মকে রক্ষা করে চলার কর্তব্যকে। আমাদের রাষ্ট্রীয় মন্ত্র ‘সত্যমেব জয়তে’ স্মরণ করিয়ে দেয় উপনিষদীয় আচার্য্য অনুসরণের শাশ্বত অবলম্বনকে। রাষ্ট্রের কর্ণধার রাষ্ট্রপতিসহ মন্ত্রীবর্গ প্রত্যেকেই ঈশ্বরের নামে শপথ গ্রহণ করে ঈশ্বরের প্রতিভূ জীবগণের কল্যাণ সাধনে ব্রতী হয়। ঈশ্বরের প্রতিনিধি স্বরূপ জাগতিক ন্যায়দণ্ডধারী বিচারকেরা ধর্মাধিকরণ পরিচয়ে বন্দিত। বিচারালয়কে বলা হয় ন্যায়ালয় বা ধর্মস্থান।
ভারতীয় অনুশাসনের সাম, দান, ন্যায়, দণ্ড, নীতি ও ভেদ-এর রাজধর্ম রক্ষার পবিত্র কর্তব্যে যা’তে এতটুকু অন্যায়, অধর্ম প্রবেশ করতে না পারে তার জন্যই ওইসব মহাভারতীয় নীতির অনুসরণ। বিধিবৎ প্রকৃষ্ট-জাতক সৃষ্টি করে প্রজা পালনের স্বার্থেই ওই অনুশাসনকে আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে সেই প্রজাপালনের পবিত্র দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাজনৈতিক দলেরা। সেই সুবাদে রাজনৈতিক দলের জন-প্রতিনিধিরা নিজেদের দেশসেবক বলে পরিচয় দেন।

দেশের সেবা করতে হলে প্রথমেই দেশের জনগণের জৈবিক তাগিদ পূরণের জন্য আর কিছু না হোক, অন্ন , বস্ত্র, বাসস্থানের যোগান দিতে হবে। আর তারজন্য প্রথমেই প্রয়োজন বিশুদ্ধ, সুস্থ একটা পরিবেশ। দেশসেবকেরা বিষয়টি নিয়ে যদি ভাবতেন তাহলে সত্যের পরিপন্থী অসত্য, অন্যায়, অধর্ম প্রশ্রয় পেত না। সবুজায়ন বিনষ্ট করে নগরায়নের বাড়বাড়ন্ত হতে পারতো না!

প্রাথমিকভাবে বায়ু, জল, মাটি, সূর্যালোক প্রভৃতি অজৈব উপাদানের উপর আমাদের বেঁচে থাকা নির্ভর করে। শুধু মানুষ নয়, পরিবেশের উদ্ভিদ থেকে প্রাণী সকলের সুস্থভাবে বেঁচে থাকা ওই অজৈব উপাদান বা পঞ্চ মহাভূতের উপর নির্ভরশীল। তাহলে দেশসেবার প্রথম কাজ হবে অসৎ নিরোধী তৎপরতার সাথে প্রাকৃতিক পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখা। তারপর পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যার অনুশাসন মেনে নানাভাষা, নানামত, নানা পরিধানের মানুষের বৈশিষ্ট্য টিঁকিয়ে রাখার চেষ্টা। মহান ভারতের রাজর্ষি জনক যে নিয়মে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন (সূত্র : মহাভারত, বনপর্ব)। ঠিক সেইভাবে অসৎ নিরোধী তৎপরতার সাথে  রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালিত হবে।   তথাপি “মেরা ভারত  মহান।” শ্লোগানে  বিশ্বাসী  ভারতীয় শাসন সংহিতা বা সংবিধান ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ না করে, ধর্ম এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়কে এক করে ফেলে ‘ধর্ম-নিরপেক্ষতাবাদ’,––অর্থাৎ রাষ্ট্র ধর্মের অনুবর্তী নয়’-এর মতবাদকে প্রতিষ্ঠা দেয়, তখন কি মনে হয় না যে, আমরা জাতীয়তাবাদের আদর্শের প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েও এক পরস্পর বিরোধী আচরণ করে চলেছি !
শাস্ত্র বা বিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুযায়ী, যে নীতি-বিধি পদার্থের অস্তিত্ব রক্ষার সহায়ক তাই তো ধর্ম। অথবা বলা যায়, পদার্থের স্বকীয়তা ধারণ করে রাখে যা’ তাই ধর্ম। ধর্ম পালন করলেই পদার্থ টিঁকে থাকবে, নচেৎ থাকবে না। সংসদ প্রকাশিত ইংরেজী অভিধানে ধর্মের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘It is an action, one is bound to do.’ সেই ধর্মের আবার পক্ষ আর নিরপেক্ষ কি? ঈশ্বর যেমন এক এবং অদ্বিতীয়, ধর্মও তেমনই এক অদ্বিতীয়। এর কোন প্রকার হয় না।
      বেঁচে থাকার জন্য আবশ্যিক অজৈব উপকরণ বায়ু, জল, মাটি ইত্যাদির যদি ধর্ম থাকতে পারে, এবং তা’ যদি বিজ্ঞানের বইতে পাঠ্য হতে পারে, তাহলে মানুষের কি ধর্ম নেই? মনুষ্যত্ব প্রকাশের মাধ্যমেই তো মানুষ ধার্মিকতার পরিচয় দেয়। মানুষের মনুষ্যত্বের অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার নীতিবিধি-সমন্বিত ভারতের নিজস্ব সংহিতাগুলোর বিধানসমূহ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের সংহিতায় স্থান পাবে না কেন, প্রজাদের শিক্ষা দিতে পাঠ্য করা হবে না কেন?
বর্তমান যুগ-পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কথিত ধর্মের যুগান্তকারী সংজ্ঞা ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম বলে জানিস তাকে। ধর্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম না-রে।’ ওই সম্প্রদায় নিরপেক্ষ সমন্বয় বার্তাবহ বাণীকে গুরুত্ব না দিয়ে ধর্মের নামে, ভারতীয় সংহিতার নীতি বহির্ভূত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তি পরায়ণতার আস্ফালনকে, কতগুলো অনিত্য, অসার, পৌত্তলিক কু-সংস্কারকে যদি ‘ধর্ম’ নামে প্রতিষ্ঠা দিতে চাই, তা’ কি বিচক্ষণতার পরিচায়ক হবে, না ভারতবর্ষের কৃষ্টির পরিপূরক হবে? ওই ভুলের বোঝা কি আমাদের চিরদিন বইতে হবে? আমাদের বুদ্ধি, বোধ কি নিরেটই থেকে যাবে?

রাষ্ট্রের সৃষ্টিই তো প্রজাদের অধর্ম বা দুর্নীতি থেকে মুক্ত করে ধার্মিক, অর্থাৎ সু-নীতি পরায়ণ করে তোলার জন্য। সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দলগুলো যদি ওই মহান কর্তব্য ভুলে তার প্রজাবর্গকে, তাদের পিতৃ-পিতামহের আদর্শ অনুসারী ধর্ম-পরায়ণ, কৃষ্টি-পরায়ণ হতে উৎসাহ না দিয়ে, প্রবৃত্তি-পরায়ণতায় উৎসাহ দেয়, সেটা ভারতবর্ষের জাতীয় উত্তরাধিকারত্বের অস্তিত্বকে বিপন্ন করার বার্তা ভিন্ন আর কিছু নয়।
‘‘প্রজা মানেই হচ্ছে—
প্রকৃষ্টরূপে জাত—
সর্ব্বসম্ভাব্য উদ্বর্দ্ধনী সার্থকতায় ;
আর প্রকৃষ্ট জন্ম পেতে হলেই চাই—
প্রজনন পরিশুদ্ধি—
সর্ব্ব-সম্ভাব্যতার বৈধানিক সংস্থিতিতে. …. ’’
(‘সম্বিতী’ গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)
মূণ্ডক উপনিষদের পবিত্র মন্ত্র ‘সত্যমেব জয়তে’-এর আদর্শকে সম্বল করে ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দের ১৫ই আগস্ট গণ প্রজাতন্ত্রী ভারতবর্ষের যাত্রা সুরু হলেও ‘‘Of the people, by the people, for the people—জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন।’’-এর লক্ষ্যে রচিত কতগুলো বিধিবদ্ধ নিয়ম, শাসন সংহিতা বা সংবিধান ১৯৪৯ খ্রীস্টাব্দের ২৬শে জানুয়ারী স্বীকৃতি লাভ করে, যে দিনটাকে ‘প্রজাতন্ত্র দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।

‘প্রজা’ শব্দের অর্থ প্রকৃষ্ট জাতক। আর তন্ত্র মানে কতগুলো বিধিবদ্ধ নিয়ম বা system।
প্রজাতন্ত্রের মর্মার্থ হচ্ছে, যে তন্ত্র বা system মেনে আদর্শ প্রজা নির্মাণ, পালন, পোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে রাষ্ট্রের সংহতি রক্ষায় প্রযত্নশীল থেকে পরম রাষ্ট্রিক সমবায়ের লক্ষ্যে এগিয়ে চলা যায়। ভারতের ব্রহ্মসূত্র, মহাকাব্য, বেদ, উপনিষদ, সংহিতা, আদর্শপুরুষ শ্রীরামচন্দ্র ও শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ বলে যা কিছু বর্তমান,—সবকিছুই ওই ‘সত্যমেব জয়তে’-এর আদর্শের উপরেই প্রতিষ্ঠিত।
সত্য মানে অস্তিত্ব। যার অস্তিত্ব আছে যার বিকাশ আছে তাই সত্য (real)। ঋষি প্রদর্শিত এই সত্যের পথই আর্য্য ভারতবর্ষের মূলধন। আমাদের আদর্শ ছিল– ‘আত্মানং বিদ্ধি’, নিজেকে জানো, know thyself, ‘আত্মবৎ সর্বভূতেষু, মাতৃবৎ পরদারেষু, লোষ্ট্রবৎ পরদ্রব্যেষু।’ সকলকে নিজসত্তার প্রতীক মনে কর, মেয়েদের নিজের মায়ের প্রতিরূপ ভেবে শ্রদ্ধা কর, অন্যের জিনিসকে মাটির ঢেলার মত দ্যাখ। ‘মা গৃধ’, লোভ কর না। তথাপি ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের প্রজাগণ কেন সত্যভ্রষ্ট হচ্ছে, ভেবে দেখার প্রয়োজন নেই?
এর উত্তর রয়েছে ভারতের নিজস্ব অর্থশাস্ত্র কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে।
‘‘সুখস্য মূলম্ ধর্মম্,
ধর্মস্য মূলম্ রাষ্ট্রম্,
রাষ্ট্রস্য মূলম্ অর্থম্,
অর্থস্য মূলম্ ইন্দ্রিয়-বিজয়ম্,
ইন্দ্রিয়-বিজয়স্য মূলম্ জ্ঞানবৃদ্ধসেবয়া,
জ্ঞানবৃদ্ধসেবয়া বিজ্ঞানম্।।“
অর্থাৎ, সুখের মূলে ধর্ম। ধর্মের মূলে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের মূলে অর্থ । (পুরুষার্থের চতুর্বর্গ—বর্ণাশ্রম এবং চতুরাশ্রমধর্ম পালন করে পরমার্থ লাভের বিষযে বলা হয়ছে ।) ইন্দ্রিয়জয়ী না হলে পরমার্থ লাভ হয় না । ইন্দ্রিয়জয়ী হতে হলে সদগুরুর সারূপ্য লাভ করতে হবে। সদগুরুর দীক্ষা নিয়ে সেইভাবে চলতে হবে। তা হলেই বিশেষ জ্ঞান লাভ হবে ।
উক্ত বিধি পালন করে প্রকৃষ্ট জাতক বা ‘প্রজা’ সৃষ্টির প্রবহমানতাকে রক্ষা করে চলাই ছিল আর্য্য ভারতের আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্য।
গণপ্রজাতন্ত্রী স্বাধীন ভারতবর্ষ ১৯৪৯ খ্রীস্টাব্দের ২৬শে জানুয়ারী ‘সত্যমেব জয়তে’র আদর্শকে মাথায় নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, যাকে আমরা আজও রাষ্ট্রের পবিত্র মন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে রেখেছি। তথাপি ওইসব বিধিকে আড়াল করে  প্রবৃত্তি-পরিপোষিত শিক্ষায় প্রজাতন্ত্রী ভারতবর্ষের প্রজাদের শিক্ষিত করতে চাইছি। ফলে সন্ত্রাসবাদ, ভ্রষ্টাচার, যৌন-ব্যভিচার ক্রমবর্দ্ধমান। এর কারণ ‘সত্যমেব জয়তে’ কে বাস্তবে মূর্ত করে তোলার মত কোন ইন্দ্রিয়জয়ী সৎপুরুষের জীবন্ত আদর্শ অনুসরণ করছে না রাষ্ট্র। ফলে দেশে মহানগরের বাড়বাড়ন্ত হলেও মনুষ্যত্বের পরিচয় সম্পন্ন ‘পিতামাতার সুজননের সুসন্তান, সন্তানের সুমাতা-সুপিতা, সমাজের সুবন্ধু, রাষ্ট্রের সুনাগরিক’ এমন মহান নাগরিকের সংখ্যা ক্রমশঃ যেন অবলুপ্তির পথে।
তাই তো বর্তমান সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানবৃদ্ধ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সভ্যতাকে সংকট থেকে মুক্ত করতে নিদান দিলেন :
“শাসন-সংস্থা যেমনই হোক,
যাতেই মাথা ঘামাও না,
যৌন-ব্যাপার শুদ্ধ না হলে
দেশের জীবন টিঁকবে না।” (অনুশ্রুতি)
‘সত্যমেব জয়তে’-এর আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত প্রজাতন্ত্রের প্রবহমানতা টিঁকিয়ে রাখতে হলে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিতে হবে আদর্শ প্রজা সৃষ্টির মাধ্যম, সুবিবাহ ও সুপ্রজননের ওপর।       
তাই প্রকৃত অর্থে প্রজাতন্ত্রকে বাস্তবায়িত করতে আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দল সৃষ্টি করার প্রয়োজন আছে। বর্তমান রাজনৈতিক  দলের সাথে সচেতন  ব্যক্তি যারা যুক্ত আছেন তারা কিন্তু পার্টির  সব দুর্নীতি  মেনে নিতে পারেন না। তাদের পথ দেখাতে  ত্রাতার  ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন আমার  গুরুদেবের একটা বাণী। “রাজনীতি বলে তায়/পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যায়/সংহতি আনে যায়।” যে নীতি সকলের অভাব পূরণ করে, সবাইকে অভীষ্ট মঙ্গল প্রতিষ্ঠায় পোষণ দিয়ে সব্বাইকে প্রীতির বাঁধনে আবদ্ধ করে সংহতির  প্রতিষ্ঠা করতে  সমর্থ, সেই নীতির নাম রাজনীতি।
সকলের অভাব পূরণ যিনি বা যারা করবেন তাদের বৈশিষ্ট্যপালী হতে হবে। বৈশিষ্ট্য মানে বিশিষ্টতা। ওই বিশিষ্টতার পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যা দ্বারা সংহতির প্রতিষ্ঠা যিনি করতে পারবেন তিনি হতে পারেন রাজনীতিবিদ। একজন গোপালক বা রাখাল বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের গোরু—ষাড়, বলদ, গাভী, দামড়া, বকনা নামের বিবিধ বৈশিষ্ট্যের গোরুর পাল নিয়ে মাঠে চড়াতে যায়। একটা ছোট লাঠি বা পাচনের সাহায্যে সে গোরুর পালকে পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যা দ্বারা সংহত রেখে আবার  গোধূলি বেলায় গোয়ালে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। তেমনি একজন চাষী তার বিভিন্ন জমির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য  মেনে ভূমিকে কর্ষণ করেন বা চাষ দেন। জমির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ‘জো’ বুঝে বীজ বপন  করেন, চারা রোপন করেন। তারপর উপযুক্ত জলসেচ, সার, কীটনাশক, পাহারা দিয়ে পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যা দ্বারা ফসল উৎপাদন  করেন।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতে, বৈশিষ্ট্য মানে—তদনুপাতিক organic adjustment (বৈধানিক বিন্যাস)। তার আবার (group) গুচ্ছ আছে। এইগুলিকে বলা হয় বর্ণ, এর কোনটাই আমরা নষ্ট করতে চাই না। নষ্ট করা মানে যুগ যুগ ধরে, তিল তিল করে, যা গড়ে উঠেছে তা হারান। ন্যাংড়া আম আছে, ফজলি আম আছে আরো কত রকমের আম আছে। এর একটা জাত যদি নষ্ট করে ফেলি তাহলে তা’ আর ফিরে পাব না—হারাব চিরতরে। সেকি ভালো? ফজলি আমের মধ্যে তো আর ন্যাংড়া আমের স্বাদ পাব না। তাই যেন আমরা বুঝে চলি।  (আলোচনা প্রসঙ্গে, ১৬শ খণ্ড, পৃঃ ১০৯)

আমাদের ভারতের গ্রামীন অর্থনীতি কৃষি  ও গোপালনের উপর নির্ভরশীল। ভালো কৃষকেরা কখনোই  যেমন খুশি তেমনভাবে, নিজের খেয়ালখুশি মত চাষ করেন না। সরকারী  কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে জমি অনুযায়ী উন্নত জাতের বীজ বপন করেন, চারা রোপন করেন। গোপালন ক্ষেত্রেও  তাই। সরকারী পশু পালন বিভাগের বিজ্ঞানীদের পরামর্শ মেনে গাভীর জাতের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সম-বিপরীত উন্নত জাতের ষাঁড়ের বীজ দিয়ে উন্নত জাতের সুস্থ, সবল বাচ্চা উৎপাদন করেন।
আমরাও দৈনন্দিন জীবন-যাপনে সকলেই কিছু-না-কিছু বৈশিষ্ট্যের পালন-পোষণ  করেই থাকি। সচেতন ব্যক্তি মাত্রেই বাজার থেকে ভালো জাতের বা কোয়ালিটির আলু, বেগুন, পটল, মুলো, আম,  চাল, ডাল, চা কিনতে অভ্যস্ত।  এমন কোন  সুস্থ মানুষ নেই যে  উদারতার নামে হিমসাগর আমের দাম দিয়ে আঁশযুক্ত টোকো আঁটিসার আম কিনে  আনবেন। মিনিকীট, বাঁশকাঠি, গোবিন্দভোগ, দেরাদুন রাইসের দাম দিয়ে রেশন দোকানে প্রদত্ত মোটা চাল কিনে আনবেন।
এ থেকে প্রমাণিত হলো গাছপালা, পশুপাখি সবকিছুর জাত, বর্ণ আছে। জীব বিজ্ঞানের পুস্তকেও জাতি, প্রজাতি, বর্ণ, গোত্র-এর উল্লেখ আছে। তাহলে মানুষের কি নেই?  অবশ্যই আছে।  মানুষ তো সব জাতহীন হয়ে যায় নি! তবে হ্যাঁ, জাতের নামে বজ্জাতি চলছে—শিডিউলড, আন-শিডিউলড, ট্রাইব নিয়ে ধান্দাবাজি করতে গিয়ে সহজাত-সংস্কারের বৈশিষ্ট্যটাকে নাকাল হতে  হচ্ছে ! অন্যায়, অধর্ম করে, অন্যের বৃত্তি হরণ করে টাকা উপার্জন করতে গিয়ে এক অসম অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করে চলেছি। অর্থ অনর্থ সৃষ্টি করছে!

মানুষের জাত বা সহজাত সংস্কার এবং তাদের জৈবিক তাগিদগুলো প্রবৃত্তির কবলে পড়ে মনুষ্যত্বের অপলাপী কর্মে লিপ্ত যাতে না হতে পারে, বিধিবৎ নীতি প্রণয়ণ করে বিহিত ব্যবস্থায় মানুষের মনুষ্যত্ব রক্ষা করা, রাজনীতির নির্দিষ্ট কর্ম।—সে বিষয়ে উদাসীন রাজনৈতিক জন প্রতিনিধি গণ !
তত‍ঃ কিম্ । তাহলে করণীয় কি।
নৃতাত্ত্বিক গঠনের বৈশিষ্ট্যানুযায়ী মানুষকে আল্পাইন, ব্রাকিসেফাল, মেডিটেরিয়ান, মঙ্গোলয়েড, নর্ডিক, নিগ্রোয়েড প্রভৃতি নামে শ্রেণী বিভাজন করা হয়েছে।  প্রতিটি জনগোষ্ঠীর সহজাত সংস্কার গুণ ও কর্মভিত্তিক বর্ণাশ্রম বিভাজনকে সমৃদ্ধ করেছিলেন আর্য্য ঋষিরা।  শাস্ত্রে গুণ এবং কর্ম দেখে বর্ণ নিরূপণ করার বিধান রয়েছে। সত্ত্ব গুণে বিপ্র। সত্ত্ব মিশ্রিত রজোগুণে ক্ষত্রিয়। রজোমিশ্রিত তমোগুণে বৈশ্য এবং তমোগুণাধিকারে শূদ্র চিহ্নিত করা হয়েছিল। এবং তদনুযায়ী কর্ম নির্ধারিত হয়েছিল। প্রাকৃতিক নিয়মে সকলেই স্ব স্ব বৈশিষ্ট্যে শ্রেষ্ঠত্বের স্থান অধিকার  করে আছে।
এ বিষয়ে একটা সুন্দর ছড়া আছে।
“শূদ্রই তো জাতির চাকা
বৈশ্য জোগায় দেশের টাকা,
ক্ষত্রিয়েরা  রাজার জাত
সবার পূরণ বিপ্র ধাত।

আরো বিস্তারিত ভাবে বললেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।
” …… আর্য্য জাতির uphill motion-এর (উর্ধগামী গতির) acceleration (ত্বরান্বিত করা)-ই হ’চ্ছে front-(সম্মুখে) ব্রাহ্মণ আর back-এ (পিছনে) শূদ্র। চাতুর্বর্ণ্য বিভাগ কতকটা আমাদের body system-এর (শরীর বিধানের) মতন। শূদ্র হ’চ্ছে এই whole system-এর (সমুদয় বিধানের) carrier (বাহক) এবং supporter (সহায়ক), যা’র উপর ভর দিয়ে এই সমাজদেহ চলছে। বৈশ্যদের function (কর্তব্য) হ’ল সমাজদেহকে সুস্থ রাখা by the supply of proper nutrition and food (যথোপযুক্ত পুষ্টি এবং খাদ্য সরবরাহ দ্বারা)।  বৈশ্যশক্তি এই function discharge (কর্তব্য সম্পাদন) করতে যেদিন পরাঙ্মুখ হ’ল, সেদিন এই সমাজদেহ ভেঙ্গে পড়লো। Stomach (পাকস্থলী) যদি boycott (অসহযোগ) করে, আমাদের body-system-এর (শরীর বিধানের) যে অবস্থা হয় তাই হ’ল। এই বৈশ্যশক্তি যদি আবার জাগে এবং legs, heart ও brain-কে (পা, হৃৎপিন্ড ও মস্তিষ্ককে) proper nutrition supply করে (উপযুক্ত পুষ্টি যোগায়), তবে আবার সমাজদেহ জেগে উঠবে। Body system-এর মধ্যে heart (হৃৎপিন্ড) যেমন, সমাজদেহের মধ্যে ক্ষত্রিয় তেমন। Heart-এর মধ্যে দু’রকম cells (কোষ) আছেঃ (১) white cells (সাদা কোষ) (২) Red cells (লাল কোষ)। Red cells-এর (লাল কোষের) কাজ হ’চ্ছে body-কে fit (কার্যক্ষম) রাখা এবং maintain (পরিপোষণ) করা by the proper distribution of red blood (লাল রক্ত উপযুক্ত ভাবে বিতরণ দ্বারা); এবং white cells-এর (সাদা কোষের) কাজ হ’চ্ছে body-কে protect (রক্ষা) করা। ক্ষত্রিয়ত্বের মধ্যে এই দু’টি function (কার্য) আছে; একটি সমাজদেহকে fit (কার্যক্ষম) রাখা ও maintain (প্রতিপালন) করা, আর একটি disease-এর(রোগের) হাত থেকে protect(রক্ষা) করা। কিন্তু এই দুই blood-এর supply (যোগান) নির্ভর করছে stomach-এর (পাকস্থলীর) উপর। সমাজদেহের brain (মস্তিষ্ক) হ’চ্ছেন ব্রাহ্মণ (বিপ্র), যাঁদের working (কার্যতা) নির্ভর করছে ক্ষত্রিয়শক্তি বৈশ্যশক্তি এবং শূদ্রশক্তির উপর। তাঁরা যেমন-তেমন এই তিন শক্তির নিকট support and help (সাহায্য ও সহানুভূতি) পা’চ্ছেন, তেমন-তেমন এই তিনকে regulate, control (নিয়মিত ও আয়ত্ত) করতে পারছেন। এই চারিশক্তির মধ্যে কেহই ছোট-বড় নয়। একটা harmony (সমন্বয়) ও co-ordination-এর (সমবায়ের) যোগে এদের মধ্যে একযোগে একতানে কাজ হ’চ্ছে। কিন্তু body এর মধ্যে brain-এর স্থান যেমন সর্বোচ্চ এবং সর্ব উচ্চে থাকাটা legs, stomach ও heart-এর existence-এর পক্ষে নিতান্ত দরকার, তেমন ব্রাহ্মণকে উচ্চ place দেওয়াতে, যে উচ্চতা তাঁ’র মধ্যে inherent (স্বাভাবিক) হ’য়ে আছে, অন্যান্য বর্ণ চলতে পারছে ঠিকমত তাঁরই guidance-এ (নির্দেশে)। Head-কে বড় স্বীকার করা যেমন body-র অন্যান্য অঙ্গের পক্ষে লজ্জার নয়, বরং পরম গৌরবের, তেমনি অন্যান্য বর্ণের পক্ষে ব্রাহ্মণকে বড় ব’লে মানা তাঁদের বাঁচা-বাড়ার পক্ষে নিতান্ত প্রয়োজনীয়। Superior (শ্রেয়)-এর উপর শ্রদ্ধা রে’খে যদি তুমি সমাজকে পুনর্গঠন করতে লেগে যাও,তবে সে সমাজ টিঁকবে-তার growth (বৃদ্ধি) হবে healthy.” (ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, তৃতীয় খণ্ড, পৃঃ-৬৮-৬৯)

উপরোক্ত বাণী থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, বর্ণাশ্রমের বিন্যস্ত বিভাজন আমাদের শরীর বিধানেও বিদ্যমান। বর্ণাশ্রমানুগ বিধান অনুযায়ী শূদ্র বর্ণ শ্রমশিল্প , কারিগরি বিদ্যার সেবার মাধ্যমে সব বর্ণকে সাহায্য করবেন। শরীর বিধানে আমাদের পদযুগল দেহটাকে বয়ে নিয়ে বেড়ায়  তাই পদযুগলকে শূদ্র  বর্ণের সাথে তুলনা করা হয়েছে। বৈশ্যরা কৃষি ও বাণিজ্যের সেবা দ্বারা সকলের উদরপূর্তি করছেন। সেই উদরকে  বয়ে  বেড়াচ্ছে জানু বা জঙ্ঘা। তাই জঙ্ঘা  বৈশ্যত্বের প্রতীক। ক্ষত্রিয়রা বাহুবল দ্বারা অসৎ নিরোধ করে সমাজকে রক্ষা করেন। শরীর বিধানে বাহু আমাদের দেহটাকে বিপদ-আপদ  থেকে আগলায়, ক্ষত থেকে ত্রাণ  করে, তাই বাহুকে ক্ষত্রিয় বর্ণের সাথে তুলনা করা হয়েছে। বিপ্র বর্ণ বোধ ও বোধির পরামর্শ দিয়ে সকল বর্ণকে বর্ণধর্ম পালন করার শিক্ষা দেয়, বর্ণানুগ কর্মে উৎসাহিত করে বিন্যস্ত সমাজ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের মস্তিষ্ক বিবেক, বিচার-বুদ্ধি দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সমগ্র দেহটাকে পরিচালনা করে, তাই মাথাকে বিপ্র বর্ণের সাথে তুলনা করা হয়েছে। এইভাবে দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিন্যস্ত মেলবন্ধনে দেহটাকে সুস্থভাবে পরিচালিত  করতে সাহায্য করে। ছোটবড়ো কেউ নয়। যে যার বৈশিষ্ট্যে শ্রেষ্ঠ। ওই শাশ্বত প্রাকৃতিক নিয়মকে অগ্রাহ্য করে কেউ যদি মাথার কাজ পা-কে দিয়ে, পায়ের  কাজ মাথাকে দিয়ে করাতে যায় তাহলে দেহটাই রক্ষা করা যাবে না। তেমনি বিন্যস্ত সমাজ ব্যবস্থা রক্ষার স্বার্থে আর্য্য  ঋষিরা প্রতিটি বর্ণের জন্য নির্দিষ্ট কর্ম ও আইডেনটিটি বা স্মারক চিহ্নের বিধান দিয়েছেন।  শ্বেত বর্ণে বিপ্র, লোহিত বর্ণে ক্ষত্রিয়, পীত বর্ণে বৈশ্য এবং নীল বর্ণে শূদ্র চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই জীবনীয়  বৈশিষ্ট্যসমূহ ধারণ করার করার বিধির নাম ধর্ম। ধর্মকে রক্ষা করার জন্য রাজনীতি। শ্রীমদ্ভগবতগীতা যার প্রকৃষ্ট  উদাহরণ।  বর্ণাশ্রম বিধায়িত বিন্যস্ত সমাজের ওই চারটি বর্ণের চিহ্ন শ্বেত, লোহিত, পীত ও নীল। বর্তমান পুরুষোত্তম  যাকে আর্য্যকৃষ্টির স্মারক পতাকা হিসেবে নির্দিষ্ট করেছেন।—সেই পতাকার অনুসরণে আমরা দলীয় পতাকা  নির্বাচন করেছি।

।। ‘আর্য্য’ শব্দের  বিশেষত্ব ।।
‘আর্য্য’ শব্দটি গুণবাচক। যাঁরা বর্ণাশ্রম, চতুরাশ্রম পরিপূরণী দশবিধ সংস্কারে সংস্কৃত হতেন তাঁদেরই আর্য্য অভিধায় ভূষিত করা হতো । তাঁরাই ক্রমে আর্য্য জাতিভুক্ত হয়েছিলেন। বর্তমান যুগধর্মে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যেমন সম্বোধনে ‘স্যর’, ‘ম্যাডাম’ শব্দ ব্যবহার করা হয়, সেসময় সদাচারী বর্ণাশ্রমানুগজীবন যাপন কারীদের উদ্দেশ্যে ‘আর্য্য’, ‘আর্য্যপুত্র’, ‘আর্য্যা’ ইত্যাদি সম্বোধনসূচক শব্দ ব্যবহৃত হতো। এই ব্যবস্থা সকলের জন্য, এখানে সাম্প্রদায়িকতার কোন স্থান নেই। এ বিষয়ে বর্তমান পুরুষোত্তম এক  যুগান্তকারী বিধান দিলেন।
মঙ্গোলীয় নিগ্রো যারা
দ্রাবিড়ী কোল ম্লেচ্ছাবধি
আর্য্যীকৃত হলেই তারা
আর্য্যদেরই সুসন্ততি।
“পঞ্চবর্হি যা’রা স্বীকার করে, আর সপ্তার্চ্চি অনুসরণ করে, তারা যেই হোক আর যা’ই হোক– আর্য্য বা আর্য্যীকৃত । ৬০১ ।
(শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৭)
     পঞ্চবর্হিঃ
১। একমেবাদ্বিতীয়ং শরণম্।
২। পূর্ব্বেষামাপূরয়িতারঃ প্রবুদ্ধা ঋষয় শরণম্।
৩। তদ্বর্ত্মানুবর্ত্তিনঃ পিতরঃ শরণম্।
৪। সত্তানুগুণা বর্ণাশ্রমাঃ শরণম্।
৫। পূর্ব্বাপূরকো বর্ত্তমানঃ পুরুষোত্তমঃ শরণম্ ।
   এতদেবার্য্যায়ণম্, এষ এব সদ্ধর্ম্মঃ,
   এতদেব শাশ্বতং শরণ্যম্।’’
১। এক অদ্বিতীয়ের শরণ লইতেছি।
২। পূর্ব্বপূরণকারী প্রবুদ্ধ ঋষিগণের শরণ লইতেছি।
৩। তাঁহাদের পথ অনুসরণকারী পিতৃপুরুষগণের শরণ লইতেছি।
৪। অস্তিত্বের গুণপরিপোষক বর্ণাশ্রমের শরণ লইতেছি।
৫। পূর্ব্ব-পূরণকারী বর্ত্তমান পুরুষোত্তমের শরণ লইতেছি।
ইহাই আর্য্যপথ, ইহাই সদ্ধর্ম্ম, আর ইহাই চিরন্তন শরণযোগ্য।
“আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে গেল সেইদিন যেদিন থেকে আমরা পঞ্চবর্হির মূল নির্দ্দেশ অবজ্ঞা করতে শুরু করলাম। তখন থেকে আমরা অপরের  খোরাক হলাম কিন্তু নিজেদের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখে পরকে আপন ক’রে নেবার সামর্থ্য হারিয়ে ফেললাম।”
(আঃ প্রঃ ১১। ১০০)

      সপ্তার্চ্চিঃ
১। নোপাস্যমন্যদ্ ব্রহ্মণো ব্রহ্মৈকমেবাদ্বিতীয়ম্।
২। তথাগতাস্তদ্বার্ত্তিকা অভেদাঃ।
৩। তথাগতাগ্র্যোহি বর্ত্তমানঃ পুরুষোত্তমঃ
পূর্ব্বেষামাপূরয়িতা বিশিষ্ট-বিশেষ বিগ্রহঃ।
৪। তদনুকূলশাসনং হ্যনুসর্ত্তব্যন্নেতরৎ।
৫। শিষ্টাপ্তবেদপিতৃপরলোকদেবাঃ শ্রদ্ধেয়া নাপোহ্যাঃ।
৬। সদাচারা বর্ণাশ্রমানুগজীবনবর্দ্ধনা নিতং পালনীয়াঃ।
৭। বিহিতসবর্ণানুলোমাচারাঃ পরমোৎকর্ষ হেতবঃ
স্বভাবপরিদ্ধংসিনস্তু প্রতিলোমাচারাঃ।’’
১। ব্রহ্ম ভিন্ন আর কেহ উপাস্য নহে, ব্রহ্ম এক–অদ্বিতীয়।
২। তথাগত তাঁর বার্ত্তাবহগণ অভিন্ন।
৩। তথাগতগণের অগ্রণী বর্ত্তমান পুরুষোত্তম, পূর্ব্ব-পূর্ব্বগণের পূরণকারী বিশিষ্ট বিশেষ বিগ্রহ।
৪। তাঁহার অনুকূল শাসনই অনুসরণীয়—তাহা ভিন্ন অন্য কিছু অনুসরণীয় নহে। এই
৫। ঋষি-অনুশাসিত প্রামাণ্য জ্ঞান, পিতৃপুরুষ, পরলোক, দেবতাগণ শ্রদ্ধেয়— অবহেলার যোগ্য নহে।
৬। বর্ণাশ্রমের অনুকূল বাঁচাবাড়ার পরিপোষক সদাচার-সমূহ-নিত্যপালনীয়।
৭। বিহিত সবর্ণ ও অনুলোমক্রমিক (বিবাহাদি) আচারসমূহ পরম উৎকর্ষের কারণ— প্রতিলোম-আচার স্বভাব-ধ্বংসকারী।

শ্রীশ্রীঠাকুর সম্বিতী গ্রন্থে বলছেন—
মতবাদ যাই হোক না,—
আর, যে-কোন সম্প্রদায়ই হোক,
যা’ মুখ্যতঃ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’কে
স্বীকার করেনিকো—
কোন-না-কোন রকমে,—
তা’ কখনও অনুসরণ করতে যেও না,
তা’ কিন্তু জঘন্য—অসম্পূর্ণ,
সত্তা-সম্বর্দ্ধনার পরিপন্থী তা’;
আর, ঐ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’ই হ’চ্ছে
সেই রাজপথ—
যা’কে স্বীকার ও গ্রহণ করে চললে
ক্রমশঃই তুমি সার্থকতায় সমুন্নত হ’তে পার। ২৩৪
এই বাণী বর্ণ, সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকলকে মনুষ্যত্বে উত্তরণের পথ দেখিয়েছে। এখন মানা, না-মানা প্রবৃত্তি-প্রেমীদের নিজস্ব ব্যাপার!

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাস্তব উদাহরণঃ
“ধর্ম্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে
সম্প্রদায়টা ধর্ম্ম না রে।।”
আমি বুঝিনা–কোন হিন্দু শুচিশুদ্ধভাবে মসজিদে যেয়ে প্রার্থনা করতে পারবে না কেন, আবার একজন সদাচারী মুসলমান হিন্দুর প্রার্থনা-মন্দিরে বসে প্রার্থনা করতে পারবে না কেন ! ভগবান মানুষকে তার language (ভাষা) দিয়ে চেনেন না, তিনি চেনেন তাকে তার feeling (বোধ) ও activity (কর্ম্ম) দিয়ে। (আঃ প্রঃ ৯ম খণ্ড)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন—হজরত যীশু, হজরত মহম্মদ আমাদেরও prophet (প্রেরিতপুরুষ)। আর্য্যধারা যদি জীবন্ত থাকত, তা’হলে হজরত যীশু, হজরত মহম্মদ হয়তো একাদশ অবতার, দ্বাদশ অবতার ব’লে পরিগণিত হ’তেন। Anti-Biblism (বাইবেল-বিরোধী), Anti-Quranism (কোরাণ-বিরোধী), Anti-Vedism (বেদ-বিরোধী)-এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তার নিরাকরণ করতে হবে। শাক্ত বিপ্র এবং বৈষ্ণব বিপ্র-পরিবারে যেমন বিয়ে-সাদির কোন নিষেধ নেই—সৌর বিপ্র ও গাণপত্য বিপ্রে যেমন বিয়ে চলতে পারে, ইষ্ট, কৃষ্টি ও পিতৃপুরুষের ঐতিহ্যবাহী রসুল-ভক্ত বিপ্র, বুদ্ধভক্ত বিপ্র, খ্রীষ্টভক্ত বিপ্রের সঙ্গেও তেমনি বিধিমাফিক বিয়ে-থাওয়া হ’তে পারে—এতে কোন বাধা নেই। কারণ, স্বধর্ম্ম ও কৃষ্টি-নিষ্ঠ থেকে যে-কোন পূরয়মাণ মহাপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধানতি নিয়ে চলা ধর্ম্মের পরিপন্থী তো নয়ই বরং পরিপোষক। তবে প্রত্যেকটি বিয়ের ব্যাপারে খুব হিসাব ক’রে চলতে হবে, যাতে কোন রকমের ব্যত্যয়ী কিছু বা প্রতিলোম-সংস্রব না ঘটে। (আলোচনা প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড, ২। ৭। ১৯৪০)
পরিশেষে বলতে চাই, “সত্যমেব জয়তে”-এর সীলমোহর এর অধিকারী হতে চাওয়া “আর্য্য মহাসভা” পার্টিসহ সকল দেশসেবক পার্টির   সদস্যদের আবশ্যিক পালনীয় প্রাথমিক বিষয়সমূহ— অভক্ষ্যভোজী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুনাদি তামসিক আহার করা যাবে না। অগম্যাগামী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ  প্রতিলোম, সগোত্র এবং সপিণ্ড সম্বন্ধীয়দের সাথে অবিধি পূর্বক ধর্মবিরুদ্ধ বিবাহের মাধ্যমে কামাচার করা যাবে না। শারিরীক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক সদাচার পালন করতে হবে। অসৎ পথ বর্জন করতে হবে। কদাচারী প্রদত্ত আহার ও পানীয় গ্রহণ করা যাবে না।
আমাদের জীবধর্মের এক আবশ্যিক জৈবিক তাগিদ হলো আহার বা খাদ্য। যদিও ব্যাপক অর্থে আহার মানে আহরণ। যার মধ্যে সবকিছুই আছে। খাওয়া-দাওয়া, শোয়া-বসা, চলাফেরা, কথাবার্তা, কাজকর্ম, তথাকথিত প্রেম-ভালবাসা, বিয়ে করা, বাবা-মা হওয়া ইত্যাদি। আমাদের উপনিষদের ঋষিরা ওই সবগুলোকে একত্রিত করে ‘আহার’ নামকরণ করে বললেন, ‘‘আহারশুদ্ধৌ সত্তাশুদ্ধিঃ, সত্তাশুদ্ধৌ ধ্রুবাস্মৃতিঃ …… ’’—অর্থাৎ জীবন ধারণের নিমিত্ত আহরণগুলো শুদ্ধ হলে সত্তা শুদ্ধি হয়, সত্তা শুদ্ধি হলে স্মৃতি নিশ্চল হয়। স্মৃতি নিশ্চল হলে জাতিস্মর হওয়া যায়। জীবনভূমির এপার-ওপার নিরীক্ষণ করা যায়। যারা দেশসেবক হবেন, তারা যদি আদর্শ চলন-চরিত্র দিয়ে আত্মশুদ্ধির পথে চলতে অভ্যস্ত না হন, দেশের নাগরিকদের কোন সম্পদের উপহার দেবেন ?  তাই প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সদস্যদের বিশুদ্ধ চলন-চরিত্রের ওপর নির্ভর  করছে  ভারতের উজ্জ্বল ভবিষ্যত। এবং ওই  দৃষ্টান্তই  ভারতকে  মহান ভারতের শিরোপায় অধিষ্ঠিত করবে ভবিষ্যতে। এ বিষয়ে জীবন পিয়াসী সকল মানুষকে ভেবে দেখতে হবে। জয়গুরু। বন্দে পুরুষোত্তমম্!
নমস্কার ও ধন্যবাদসহ—
                   

** জীবনের ধর্ম্ম **

** জীবনের ধর্ম্ম **

।। আত্ম-সংরক্ষণ, আত্ম-সম্পোষণ, আত্ম-বিস্তার ।। নিবেদনে—তপন দাস

********************* আমাদের জীবধর্মের এক আবশ্যিক জৈবিক তাগিদ হলো আহার বা খাদ্য। যদিও

ব্যাপক অর্থে আহার মানে আহরণ। যার মধ্যে সবকিছুই আছে। খাওয়া-দাওয়া,

শোয়া-বসা, চলাফেরা, কথাবার্তা, কাজকর্ম, তথাকথিত প্রেম-ভালবাসা, বিয়ে

করা, বাবা-মা হওয়া ইত্যাদি। আমাদের উপনিষদের ঋষিরা ওই সবগুলোকে একত্রিত

করে আহার নামকরণ করে বললেন, ‘‘আহারশুদ্ধৌ সত্তাশুদ্ধিঃ, সত্তাশুদ্ধৌ ধ্রুবাস্মৃতিঃ …… ’’—অর্থাৎ জীবন ধারণের নিমিত্ত আহরণগুলো শুদ্ধ

হলে সত্তা শুদ্ধি হয়, সত্তা শুদ্ধি হলে স্মৃতি নিশ্চল হয়। স্মৃতি নিশ্চল হলে জাতিস্মর হওয়া যায়। জীবনভূমির এপার-ওপার নিরীক্ষণ করা যায়।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র যা’কে স্মৃতিবাহী চেতনা বলেছেন। এবং ‘নিয়তং স্মৃতিচিদযুতে’ মন্ত্রে অভিষিক্ত করেছেন স্বস্ত্যয়ণী ব্রতধারীদের।

বর্তমান সমাজের চিন্তাশীল ব্যক্তিরা সংক্রমণ থেকে বাঁচতে কারো পরিধেয় বস্ত্রাদি ব্যবহার করেন না। পেটের অসুখ থেকে বাঁচতে অরক্ষিত জলপান করে না, সুরক্ষিত, পরিশ্রুত, বোতল বন্দী শুদ্ধ জল পান করেন। কাটা ফল খান না।

অরক্ষিত কোর্মা, কোপ্তা, পোলাও, বিরিয়ানীর মতো যুগধর্ম স্বীকৃত দামী দামী

খাবার ছেড়ে সুরক্ষিত ডাল-ভাতেই সন্তুষ্ট থাকে। উল্টোপাল্টা খেয়ে শরীর

খারাপ করার ঝুঁকি নিতে চায় না। একটা সার্বজনীন মতবাদ সৃষ্টি হয়েছে যে,

অরক্ষিত নয়, সুরক্ষিত জিনিষ দিয়েই জৈবিক তাগিদ পূরণ করতে হবে নিজের

সত্তাকে দূষণ মুক্ত রাখতে। তাইতো বর্তমানে কারো ছোঁয়া স্পর্শদোষ বিকীরিত,

ব্লেড, সিরিঞ্জ, তোয়ালে, রুমাল, গামছা ইত্যাদি ব্যবহার করে না।

স্বাস্থ্যসম্মত বিধি মেনে চলে। এই তো সেদিন, সাম্প্রতিককালে, অতিমারী করোনা-সংক্রমণের আবহে পড়ে মানুষে-মানুষে ছোঁয়াছুঁয়ির এক দূরত্ববিধি রচিত হয়েছিল। সেক্যুলার-ইজম্-এর ভ্রূকুটিকে নস্যাৎ করে সরকারী নির্দেশে “সামাজিক-দূরত্ব” বিধি মেনে চলতে বাধ্য করা হয়েছিল! (যদিও বিষয়টা হবে “শারিরীক-দূরত্ব” “সামাজিক-দূরত্ব” নয়। ওরকম কমন ভুল হয়েই থাকে!) অতিমাত্রায় সচেতন বুদ্ধিমানেরা টাকাকেও বীজাণুমুক্ত করে নিয়েছিলেন! যা সকলেরই করা উচিত! কারণ, টাকাপয়সাগুলো রোগী, ভোগী, পাচারকারী সকলের স্পর্শদোষে দুষ্ট! ওগুলো স্যানিটাইজড্ করে নেওয়া বিচক্ষণতার পরিচয়। কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয়, সেই সমাজেরা

ছেলেরা যদি রক্ষণশীলতার মর্যাদা না দেয়। খোলামেলা স্পর্শ-দোষে দুষ্ট নারী

সংসর্গ প্রয়াসী হয় তাদের কপালে জোটে অশেষ দুঃখ। এইডস্-সহ নানাবিধ যৌনরোগ,

মনোবিকারের শিকার হয় তারা। আর অনিয়ন্ত্রিত চলনের অভ্যাসের জন্য ধর্ষণে অভিযুক্ত হলে তো কথাই নেই!

অপরপক্ষে, সেই সমাজের মেয়েরা যদি কাম নামক জৈবিক তাগিদের

তাড়নার কাছে নতিস্বীকার করে বসনে-ভুষণে, আচার-আচরণে পণ্যরূপে যৌবনকে

প্রজ্ঞাপিত করে নিজেদের অরক্ষিত করে, কামুক পুরুষদের কাম-বিকীরণে সত্তাকে দুষ্ট করে, এবং একাধিক পুরুষদের প্রোফাইল স্মৃতির ফোল্ডারে জমা করে,—তাদের দুর্গতির আর শেষ থাকবে না। মা হওয়ার সময় স্বামীকেন্দ্রিক হতে পারবে না। কারণ, মা হতে গেলে একটা পুরুষই লাগে, একাধিক নয়। অথচ নিজেকে অরক্ষিত রাখার কারণে পাড়ার, রাস্তার, কলেজের, আপিসের একাধিক পছন্দের পুরুষ স্মৃতিতে ভীড় জমাবে এবং সেই সম্মিলিত মানসিকতার সন্তান জন্ম দেবে!

এ বিষয়ে সতর্ক না হলে দুর্গতির আর ইতি হবে না কোনদিন!

তাই, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব সবাইকে সাবধান করে দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘‘চারাগাছে বেড়া দিতে হয় ।’’ বেড়া না দিলে ছাগল, গোরু, দুষ্টু ছেলেরা ওর বাঁচা এবং বৃদ্ধি পাওয়াকে ব্যাহত করবে । একটা সুন্দর ফুলের বাগান যদি অরক্ষিত থাকে,

তখন ‘লোষ্ট্রবৎ পরদ্রব্যেষু’-র নীতিবাক্য ভুলে, লোভের বশে, ফুলশিকারীর দল ফুল ছিঁড়তে চাইবেই । অতএব বেড়া এবং মালি যদি ঢিলেঢালা হয় ফুলের অমর্যাদা হবার সম্ভাবনা থেকেই যায় । আমাদের ক্ষেত্রেও তাই। সদগুরুর আদর্শের বেড়া দিয়ে সত্তাকে সুরক্ষিত রাখতে পারলে কোন সংক্রমণ সত্তাকে বিধ্বস্ত করতে পারবে না।

আমাদের জীবনটাকে ফুলের মত সুন্দর করে গড়ে তুলতে, এবং রক্ষা করতে, এ যুগের

শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র দীক্ষা পরবর্তী যজন, যাজন,

ইষ্টভৃতি, স্বস্ত্যয়নী, সদাচার বিধির রক্ষাকবচের বেড়ার ব্যবস্থা করলেন,

যাতে আমরা নিজের, নিজ পরিবারের, ব্যষ্টিসহ পরিবেশের দুষ্ট প্রবৃত্তিগুলোদের

নিয়ন্ত্রণ করে জীবনকে, সত্তাকে, যথাযথ পালন করে পোষণ দিতে পারি ।

অনিয়ন্ত্রিত, অশাসিত বা কুশাসিত, প্রবৃত্তি-পরায়ণতা থেকে জন্ম নেওয়া বর্তমানের সামাজিক ব্যাধিস্বরূপ যৌন নির্যাতন, ব্যাভিচার, হত্যা, সন্ত্রাস ইত্যাদি প্রতিরোধ করে মানুষকে সংস্কৃত করতে, রত্নাকরদের বাল্মিকী করতে এ ছাড়া ভাল কোন উপায় নেই । যুগধর্মে স্বীকৃত প্রবৃত্তির লুব্ধ হাতছানিকে উপেক্ষা করে সভ্যতাগ্রাসী অবক্ষয়ের সঙ্কট নিরসনে অগ্রণী হতে হবে যুগ পুরুষোত্তমের ঋদ্ধি সেনানীদের।

এজন্য পরিবারের মায়েদের এ বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে ।

গুরুত্ব দিতে হবে মেয়ের পবিত্রতার দিকে । যুগধর্মের প্রভাব থেকে মুক্ত

করে শ্রীশ্রীঠাকুরের নারীর নীতি, নারীর পথে, দেবী-সূক্ত ইত্যাদি গ্রন্থের বিধান অনুসারে মেয়ে যা’তে বয়সে, বর্ণে, বংশে, স্বাস্থ্যে, শিক্ষায়

তুলনামূলক সমবিপরীত বৈশিষ্ট্যের সমুন্নত বরণীয় পুরুষকে বরণ করে একজন

আদর্শ বধূ, মনোবৃত্যানুসারিনী স্ত্রী, জায়া,—পরিমাপনি মা হয়ে

শুদ্ধাত্মার জন্ম দিতে পারে ।

বর্তমানে লেখাপড়ার নামে ছেলেমেয়েদের সহশিক্ষা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুমোদন করেন

নি । এ বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট নিদেশঃ

ছেলেমেয়ে একযোগেতে

করলে পড়াশোনা

পড়ার সাথে বাড়ে প্রায়ই

কামের উপাসনা।

কুমারী একটু বড় হলেই

পুরুষ ছুঁতে নেই,

যথা সম্ভব এর পালনে

উন্নয়নের খেই ।

পরের বাবা, পরের দাদা

পরের মামা বন্ধু যত,

এদের বাধ্যবাধকতায়

সম্বন্ধটি যাহার যত,

অনুরোধ আর উপরোধে

ব্যস্ত সারা নিশিদিন,

কামুক মেয়ে তাকেই জানিস

গুপ্ত কামে করছে ক্ষীণ ।

বিয়ের আগে পড়লে মেয়ে

অন্য পুরুষে ঝোঁকের মন

স্বামীর সংসার পরিবার

করতে নারে প্রায়ই আপন ।।

যাইহোক, ব্যাপক অর্থে না হলেও খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ বিষয়ে দীক্ষিত-অদীক্ষিত সব বুদ্ধিমানেরা বিশেষ সচেতন হলেও বিবাহের বিষয়ে

আমাদের আত্মঘাতী উদারতা আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে যে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে, সে বিষয়ে সকলকে একটু বিশেষ সচেতন হতে হবে। যারজন্য যুগগুরু শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সাবধান করে দিয়ে বললেন।

‘‘শাসন-সংস্থা যেমনই হোক

যাতেই মাথা ঘামাও না

যৌন-ব্যাপার শুদ্ধ না হলে

দেশের জীবন টিঁকবে না।’’

ওই যৌন ব্যাপারে শুদ্ধতা আনতে সত্যানুসরণে পুরুষদের উদ্দশ্যে বললেন,

“প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী । প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ,

এমনতর ভাবতে হয় ।”

এবং পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, “স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যে-জন, তাহার

হয় না ভবের বন্ধন মোচন । স্ত্রী চিন্ময়ী মা ।”

তিনি তাঁর নারীর নীতির বিধানে কুমারী মেয়েদের এমন শ্রদ্ধা আকর্ষণী চলনে

চলতে বললেন যেন তাকে দেখে পুরুষেরা “অবনতমস্তকে, নতজানু হ’য়ে,

সসম্ভ্রমে,

ভক্তিগদগদ কণ্ঠে–

‘মা আমার,–জননী আমার’ ! ব’লে

মুগ্ধ হয়, বুদ্ধ হয়, তৃপ্ত হয়, কৃতার্থ হয়,–

তবেই তুমি মেয়ে,

তবেই তুমি সতী ।”

তথাপিও কোন দুর্বলচিত্ত পুরষ যদি কামনার বিকীরণে দৃষ্টিক্ষেপ করে,

তৎক্ষণাৎ নিজেকে আরো রক্ষণশীল হতে বলেছেন । কোন কারণে যদি যৌন নির্যাতনের

শিকারের পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, সেক্ষেত্রে দেবী দুর্গার ন্যায় অসুরনাশিনী

রণং দেহী মূর্তি ধারণ করতে বলেছেন । কোন অবস্থাতেই পাশবপ্রবৃত্তির কাছে

আত্ম সমর্পণ করতে বলেন নি ।

শ্রীশ্রীঠাকুর নারীর মধ্যে দেবী দুর্গার আসন পেতে দিতে অনুশ্রুতির বাণীতে বললেন :

“শার্দ্দুলেরে বাহন করে

সাপের ফণার মালা পরে

কালবোশেখী ঝঞ্ঝাবেগে

ছোটরে নারী ছোটরে ছোট্ ।

দত্যিদানার নীচ বাহানা

আর্য্যাবর্তে দিয়ে হানা

ঘূর্ণিপাকের বেতাল গাঁথায়

হুলিয়ে ভুলিয়ে দিচ্ছে চোট্ ।

দশ প্রহরণ দশ হাতে ধর

বক্ষবিদরি ধ্বংসি ইতর

সূর্য্যরাগী বজ্রতেজে

আর্য্যনারী শত্রু টোট্ ।”

তিনি নারীকে অবলা নয় সবলারূপে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন । নারীর সতীত্বই

নারীকে সবলা করে তোলে। তাই তিনি কত আশা নিয়ে বললেন—

সতীর তেজে ঝলসে দে মা

নিঠুর কঠোর অন্ধকারে

মদনভস্ম বহ্নিরাগে

বৃত্তি-রিপু দে ছারখারে ।

প্রণবতালে ইষ্টমন্ত্র

ঝঙ্কারি তোল সকলতন্ত্রে

বিষাণ হাঁকে রুদ্র দোলায়

বজ্রে হানি মৃত্যুদ্বারে ।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শ অনুযায়ী, ‘‘নারী হতে জন্মে জাতি, নারী সমাজ ও রাষ্ট্রের ধাত্রী ও পালয়িত্রী।’’ তাই নারী-চরিত্রকে যদি

বজ্রকপাটসম সাত্তিক-চলনায় অভ্যস্ত করা না যায়, তবে জাতিকেও রক্ষা করা

যাবে না।

এই শাশ্বত সত্যকে বুঝতে পেরেছিলেন, তৎকালিন বৃহত্তর বাংলার নবাব সিরাজদৌল্লা।

পলাশী যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি মীরজাফর পবিত্র কোরান হাতে শপথ নিয়েছিলেন

বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য জীবন উৎসর্গ করার। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হতেই

বিপক্ষ ইংরেজ শিবিরে যোগদান করেন। ফলে আত্মরক্ষার জন্য নবাবকে পালাতে হয়।

পলাশীর প্রান্তর থেকে লুকিয়ে পালিয়ে যাবার মুহূর্তে আলেয়াকে বলছেন, “

জানো আলেয়া যৌবনের উন্মাদনায় নারীকে চেয়েছি, পেয়েছি, দেখেছি তাকে

ভোগের সামগ্রী হিসেবে, কিন্তু আজ, এই মুহূর্তে আমার নারীর কাছে অনেক

প্রত্যাশা– ঐশ্বর্য্য যা দিতে পারে না, সাম্রাজ্য যা দিতে পারে না, তা

দিতে পারে একমাত্র নারী ; এই নারীই মীরমদন, মোহনলাল, গোলাম হুসেন,

সিনফ্রেঁর মতো বিশ্বাসী দেশপ্রেমির জন্ম দিয়েছে,– যাঁরা অন্য সম্প্রদায়ের হয়েও

আমার এই দুর্দিনের সাথী, আমার জন্য প্রাণ দিতেও প্রস্তুত;—আবার ওই নারীই

বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের জন্ম দিয়েছে ! যে আমার সমধর্মী, অথচ তারই

বিশ্বাসঘাতকতার জন্য আজ বাংলার স্বাধীনতার সূর্য্য অস্তমিত হতে চলেছে,

বাংলার নবাবকে লুকিয়ে পালিয়ে যেতে হচ্ছে বাংলা ছেড়ে!

তখন নবাবের বিশ্বস্ত গোলাম, গোলাম হুসেন সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, দুঃখ

করবেন না নবাব, এ জন্মে না পারি, আগামী জন্মে আমরা আবার সৈন্য সংগ্রহ

করব, আবার ফিরিয়ে আনব বাংলার স্বাধীনতা ।

ওই প্রাণসঙ্কট মুহূর্তেও নবাব মুচকি হেসে বলেছিলেন, সেদিন কি আর

মীরজাফরেরা জন্মাবে না গোলাম হুশেন?

জয়গুরু ! বন্দে পুরুষোত্তমম্ !

।। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ দিবসের ভাবনা ।।

।। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ দিবসের ভাবনা ।।

নিবেদনে—ডাঃ তপন দাস

************************************

[সম্মিলিত জাতিপুঞ্জে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৮৯ খ্রীস্টাব্দ থেকে প্রতি বছরের ১১ জুলাইয়ের দিনটিকে ‘বিশ্ব-জনসংখ্যা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। আলোচিত হয় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য রক্ষা, মানবাধিকার, লিঙ্গ সমতা প্রভৃতি গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে। বর্তমান ভারতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি অসহিষ্ণুতা, খুন-জখম, রাহাজানি, ধর্ষণ, সন্ত্রাসবাদ, পরিবেশ দূষণ প্রভৃতি জাতীয় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অরণ্য ধ্বংস, বৃক্ষ নিধন করে অপরিকল্পিতভাবে নগরায়নের ফলে, প্রাকৃতিক উপাদানসমূহ অপব্যবহারের ফলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। একদিকে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর একদিকে ভূগর্ভের জলস্তর নেমে যাচ্ছে। অপরিকল্পিত সংরক্ষণের ফলে, বণ্টনের ফলে প্রতুল খাদ্যশষ্য থাকা সত্বেও অনাহারে, অর্ধাহারে মানুষ বাস করছে। অপরিকল্পিত অধিকার দানের ফলে কেহ প্রচুর সম্পদের মালিক, কেহ ভিখারি। ওইসব সঙ্কটের মূলে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে দায়ী করলে ভুল হবে, বরং দায়ী কু-জনদের সংখ্যাধিক্য, সু-জনদের সংখ্যা লঘুতা। সে বিষয়ে আলোকপাত করার ক্ষুদ্র প্রয়াস এই প্রবন্ধ। ভুল-ত্রুটি সংশোধনের পরামর্শ দিলে বাধিত থাকব।]

* * *

প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ভুপেন হাজারিকা মহোদয়ের গাওয়া বিখ্যাত গানের একটি কলি,

‘আমি দেখেছি অনেক গগণচুম্বী অট্টালিকার সারি

তার ছায়াতে দেখেছি অনেক গৃহহীন নরনারী।’— ভীষণ মনে পরছে দিনটির স্মরণে।

বিদেশের কথা বলতে পারবো না, তবে আমাদের দেশে অনেক অট্টালিকা রয়েছে, যে অট্টালিকার ছাদগুলো আশ্রয় দেবার মতো মাথা খুঁজে পায় না। বিশাল বাড়িঘর, একটিই মাত্র ছেলে, বিদেশে থাকে। বৌ আর একটা বাচ্চা নিয়ে ওখানেই সেটেল্ড। মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে কালেভদ্রে বেড়াতে এলে ঘরের ছাদগুলো মাথা পায়। নইলে স্বামী-স্ত্রী দু-জনাতেই থাকেন বিশাল বিশাল বাড়িতে। আবার যাদের নির্দিষ্ট কোন মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, দু-বেলা দু-মুঠো খাওয়ার সংস্থান নেই, লোকের কাছে যাচ্ঞা করে, পরিত্যক্ত, উচ্ছিষ্ঠ খাবার সংগ্রহ করে উদরপূর্তি করে। তারাও ঠিক খুঁজে খুঁজে কোন অট্টালিকার কার্ণিশের তলায়, রেলওয়ে প্লাটফর্মে, ফুটপাথের রেলিং-এ দড়ি বেঁধে প্লাস্টিকের ছাদ রচনা করে, জন্ম-নিয়ন্ত্রণের চিন্তা না করে ৩-৪টে বাচ্চাকাচ্চাসহ রোগ-শোক-ব্যাধি-জরাকে সাথি করে দিব্যি শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা কাটিয়ে দিচ্ছে। সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ণ দপ্তর যদি এ বিষয়ে একটু নজর দিত, তাহলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বিষয়টি সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারতো।

জনসংখ্যার অর্থ মানুষের সংখ্যা। মুখে যতই বলিনা কেন, ‘মানুষ সব সমান’, বাস্তবে তো তা’ হতে পারে না। আমাদের কোষে থাকা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ক্রোমোজোমগুলোও সব সমান নয়, আলাদা আলাদা। অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো ‘হোমো স্যাপিয়েন্স’ বা ‘মানবজাতি’-রও পৃথক পৃথক নৃ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আছে। নর্ডিক, মঙ্গোলয়েড, অস্ট্রালয়েড, নিগ্রোয়েড ইত্যাদি ইত্যাদি। পৃথক পৃথক বংশ, বর্ণ, গোত্র বৈশিষ্ট্যও আছে। প্রতিটি মানুষের মধ্যে আবার দোষ-গুণ, ভালোমন্দ আছে। শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতাতে ‘গুণত্রয়বিভাগযোগ’ নামক অধ্যায়ে সাত্ত্বিক, রাজসিক, তামসিক নামের তিন প্রকার গুণসম্পন্ন মানুষের কথা বলা হয়েছে। আবার ‘দৈবাসুরসম্পদ্বিভাগযোগ’ নামক অধ্যায়ে মানুষের দৈবীভাব এবং অসুরভাবের মানুষের উল্লেখ করা হয়েছে। ভালো মানুষদের মধ্যে দৈবীভাব এবং সত্ত্বগুণের প্রাধান্য রয়েছে। যে মানুষেরা সহানুভূতি-প্রবণ নিজের সত্তার প্রতীক মনে করে সবাই দেখে। মেয়েদের কামুক দৃষ্টিতে না দেখে, মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখে। উপযুক্ত সেবা বা সার্ভিস দিয়ে ন্যায্য পথে উপার্জন করে। অন্যের রোজগারে ভাগ বসায় না। কাট্ মানি, কমিশন, ঘুষ খায় না। একটা আদর্শের অনুসারী হয়ে চলে। পিঠ বাঁচাতে, পেট বাঁচাতে আপোষরফা করে না। দল বদল করে না। রাজনীতির নামে দুর্নীতি করে না, বুথ দখল করে না, পার্টিকে জেতাতে হিংস্র হয়ে ওঠে না। প্রবৃত্তির স্বার্থের হানি হলে মানুষ খুন করতেও পিছপা হয় না। ওই মানুষগুলোকে আমরা অসুর-ভাবের মানুষ বলতে পারি। যারা পরিবার, সমাজ, পরিবেশ রাষ্ট্রকে নানাভাবে অশান্ত করছে। ভালো মানুষদের প্রয়োজনীয় অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান থেকে বঞ্চিত করে নিজেরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ সংগ্রহ করছে, বিনষ্ট করছে। আপনি-আমি ওই মানুষগুলোকে সমাজের, দেশের শত্রু মনে করলে কি হবে, দলীয় রাজনীতিতে এদের কিন্তু খুব কদর। ওই ধরণের মানুষগুলোর বংশ বাড়তে না দিয়ে, ওদের জন্ম নিয়ন্ত্রণ করে যদি দৈবীসম্পদের মানুষের জন্ম বাড়ানো যায়, তাহলেই তো সহজেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়। কিন্তু করবেটা কে? যে প্রজাতন্ত্রের কাঠামোর মাধ্যমে নীতি নির্ধারণ করা হবে, আইন প্রণয়ন করা হবে, সেই প্রজাতন্ত্রের আঁতুড়ঘরটাই তো অশুদ্ধ। অসুর-ভাবের সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষেরাই তো ‘জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন’-দণ্ড হাতে নেবে! নইলে ভোটের জন্য পুলিশ, মিলিটারী, বোমা, আগ্নেয়াস্ত্র, হিংসা, খুন, জখম, কোটি কোটি টাকার অপচয় হয়! যারা দেশের সেবায় ব্রতী হবে, সেই জন-প্রতিনিধিদের পুষতে প্রচুর অর্থের অপচয় হয়!

অপরাধ স্বীকার করে নিয়ে বলতে হয়, করার দায়িত্বটা ছিল, প্রত্যেকটি ‘আমি’র। আমার, আপনার, সকল সৎসঙ্গীদের। আমরা হলাম ব্যর্থ। ‘‘তুমি তোমার, নিজ পরিবারের, দেশের ও দশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দায়ী।’’ বাণীটা সত্যানুসরণেই থেকে গেল। ‘পরমরাষ্ট্রিক সমবায়’ এখনো গঠন করা গেল না।

যাকগে, ওসব ব্যাপার আপনারা সবাই জানেন। আমরা এবার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টাকে একবার বাস্তবভাবে বোঝার চেষ্টা করি।

এমন অনেক দম্পতি আছে, যারা বাস্তব জীবনে কোয়ালিটি প্রোডাক্টের পক্ষপাতী হলেও বাবা-মা হবার বেলায় উদারচেতা—কোয়াণ্টিটি বাড়াতে ব্যস্ত!—‘জীব দিয়েছেন যিনি, আহার যোগাবেন তিনি!’—দর্শনে বিশ্বাসী!

তবে, আধুনিক যুগের একজন চিন্তাশীল মানুষ কখনোই নিজের দাম্পত্য জীবনে জনসংখ্যা বাড়াতে চান না, চাইবেনও না। একটা-দুটো সুস্থ সন্তান জন্মাতে পারলেই তাদের পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু সুস্থ সন্তান কামনা করলেই তো আর সুস্থ সন্তান অর্ডার দিয়ে পাওয়া যাবে না। এজন্য সুস্থ পাত্র-পাত্রী প্রয়োজন। সুস্থ বিয়ের প্রয়োজন। সুস্থ দম্পতির প্রয়োজন। সুস্থ পরিকল্পনার প্রয়োজন। সর্বোপরি সুস্থতা কাকে বলে, তা জানার প্রয়োজন। তাই নয় কি?

সুস্থতা বিষয়ে আমরা বেশী কিছু না জানলেও ‘স্বাস্থ্যই সম্পদ’ এই আপ্ত বাক্যটি আমরা প্রায় সকলেই জানি। সেই স্বাস্থ্য সম্পর্কে স্বাস্থ্যের সর্বময় কর্তা ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’ কি বলেন, সেটা সকলের জানা দরকার আছে। বিশেষ করে জীবন পিয়াসী মানুষদের। সুস্থ যদি থাকতে চান এবং আপনার প্রিয়জনকে যদি সুস্থ রাখতে চান তাহলে এবার সংজ্ঞাটি মনোযোগ সহকারে পড়ুন এবং বোঝার চেষ্টা করুন।

As per World Health Organisation–”Health is a state of complete physical, mental and social well-being, and not merely an absence of disease or infirmity.”

The Sign of Physical Health : “…………a good complexion, a clean skin, bright eyes, lustrous hair with a body well clothed with firm flesh, not too fat, a sweet breath, a good appetite, sound sleep, regular activity of bowels and bladder, and smooth, easy, coordinated bodily movements. All the organs of the body are of unexceptional size and function ‘normally’; all the special senses are intact; the resting pulse rate, blood pressure and excercise tolerance are all within the range of ‘normality’ for the individual’s age and sex….”

The Sign of Mental Health : “…….feel satisfied with himself. He feels happy, calm and cheerful. There are no conflicts within himself. He is well adjusted. He accepts criticism and is not easily upset. He understands the emotional needs of others, and tries to be considerate. He has good self-control; he is not overcome by emotion; he is not dominated by fear, anger, love, jealousy, guilt or worries. He faces problems and tries to solve them intelligently.”

The Sign of Social Health : “He is at peace with others and is able to feel himself as a part of a group and is able to maintain socially considerate behaviour.”

Sign of Positive Health : “A person should be able to express as completely as possible the potentialities of his genetic heritage.” (Source : Preventive and Social Medicine by PARK)

Mentioned all types regulated by positive health. Positive health depends on genetical instinct. A good instinct depends on good breeding. Good breeding depends on healthy couple, those who are physically, mentally and spiritually sound and sane.

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞায় আমরা জানতে পারলাম, শুধু নীরোগ থাকলেই হবে না, –শারীরিক, মানসিক, এবং আত্মিকভাবে স্বচ্ছন্দ ব্যক্তিকেই সুস্থ বলা যাবে। অতএব সার্বিকভাবে সুস্থ থাকতে হলে সুস্থ শরীর, মন, আত্মার অধিকারী হতে হবে। উক্ত সংজ্ঞার পরিপূরক যারা নয়, তারা অসুস্থ। সেই অসুস্থরা যদি সন্তান জন্মাবার অধিকার পায় তাহলে অসুস্থ প্রজন্ম সৃষ্টি হবে। সুস্থ একটা প্রজন্ম তৈরি করতে হলে সংজ্ঞার পরিপূরক সুস্থ দম্পতির যৌথ প্রচেষ্টায় একটা সুস্থ শিশু সৃষ্টি হবে। তারজন্য বিবাহার্থে সুস্থ জুটি নির্বাচন করতে হবে। এছাড়া শুধুমাত্র ওষুধপত্রের চিকিৎসায় সকলকে স্বাস্থ্যের অধিকারী করা যাবে না। তাই বিয়ের আগে পাত্রপাত্রীর স্বাস্থ্যের বিষয়েও আমাদের ভাবতে হবে।

সার্বিকভাবে ভাল স্বাস্থ্যের সন্তান পেতে হলে সংজ্ঞা অনুযায়ী স্বাস্থ্য নির্ণয়ের সাথে সাথে blood ABO Rh & genetic counseling করে নিলে ভাল হয় । সগোত্রে (same blood line)- এ বিয়ে হলে albinism, alkaptonuria নামের রোগ হয়। Schizophrenia, thalassaemia সহ অনেক দুরারোগ্য ব্যাধি আছে যা উত্তরাধিকারে সন্তান পেয়ে থাকে। মেয়েদের বেশি বয়সে বিয়ে হলে ‘mongolism’ নামের বিকৃত সন্তান জন্মাবার সম্ভাবনা থাকে।

* * *

আধুনিক যুগে প্রতিটি সচেতন মানুষই আর কিছু না হোক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে হুঁশিয়ার। লোকসান যাতে না হয় সে বিষয়ে সদা সতর্ক থাকেন। বাজার থেকে আলু, বেগুন, পটল, মুলো কিনতে গেলেও, কোয়াণ্টিটি না দেখে ভালো কোয়ালিটির, ভালো জাতের জিনিস কেনে। লাভালাভ বিবেচনা করেন। ঠকতে চান না। বিশেষ জ্ঞানকে কাজে লাগান। অথচ সেই মানুষেরাই অন্তঃস্থিত দৈবাসুর (প্রবৃত্তি এবং সত্তা) প্রকৃতিকে সঠিক বিনিয়োগে ম্যানেজ করতে ব্যর্থ হন। একজন পুরুষের সার্বিক উন্নতির চরম পরিণতি সফল পিতৃত্বে, একজন নারীর মাতৃত্বে। পিতৃত্ব এবং মাতৃত্ব অর্জনের নির্দিষ্ট উপাঙ্গও প্রকৃতি আমাদের দিয়েছেন, যার সফল বিনিয়োগে একজন আদর্শ পিতা, একজন আদর্শ মাতার পরিচয় বহন করে সুখ্যাত হতে পারি, আবার অসফল বিনিয়োগে কুখ্যাতও হতে পারি। সভ্যতার প্রাতঃ স্মরণীয় মনীষীবৃন্দের জনক-জননীরা সকলের কাছেই বন্দিত। আবার ভ্রষ্টাচারীর, সন্ত্রাসবাদীর, ধর্ষকের পিতামাতারা সমাজের চোখে নিন্দিত।

শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই নয়, মনুষ্যেতর প্রাণীদের ক্ষেত্রেও ওই বিধি কঠোরভাবে প্রযোজ্য।

সরকারী প্রয়োজনে একটা কুকুর কিনতে গেলেও পেডিগ্রি অর্থাৎ বাবা-মায়ের বিশুদ্ধ বংশানুক্রমিকতার শংসাপত্রের সমৃদ্ধির গুরুত্ব বিচার করে প্রভূত মুল্য ব্যয় করে কেনে। এক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া জাতির নামে উদারতা দেখিয়ে রাস্তার কুকুর দিয়ে কাজ চালায় না। একটু খোঁজ নিলে জানতে পারবেন দেশরক্ষার স্বার্থে যে কুকুরগুলোকে ব্যবহার করা হয়, ওদের কি পদ্ধতিতে প্রজনন করান হয়। ওইসব কুকুরীদের সতীত্ব রক্ষা হয়। নিম্ন শ্রেণীর কোন কুকুরদের সাথে মিশতে দেওয়া হয় না। কোন অসুস্থ কুকুর-কুকুরীদের দিয়ে বাচ্চা উৎপাদন করা হয় না। একটা ভালো গোরুর বাচ্চা তৈরির জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করে উন্নত জাতের ষাঁড়ের শুক্রাণু কিনে সুপ্রজনন করার ব্যবস্থা করে সরকার, রাস্তায় ঘোরা ষাঁড়গুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে!

কৃষিক্ষেত্রেও তাই। উন্নত ফসলের জন্য ভালো জাতের সংরক্ষিত বীজ শোধন করে, বীজ অনুযায়ী উপযুক্ত উর্বর জমিতে ‘জো’ বুঝে বপন করতে পরামর্শ দেওয়া হয়। একজন আদর্শ কৃষক বাস্তব পরিচর্যার মাধ্যমে বিশুদ্ধ বীজ, বিশুদ্ধ জমিতে বিনিয়োগ করে উন্নত জাতের ফসল পাবার জন্য।

প্রাণী সম্পদ, কৃষি সম্পদ বিকাশের ক্ষেত্রে জৈবিক সম্পদের বিহিত বিনিয়োগ করে বুদ্ধিমান মানুষেরাই। অথচ এই বুদ্ধিমান মানুষেরাই ওই জৈবী সম্পদকে অপচয়ীভাবে বিনিয়োগ করে নিজেদের বিশেষ জ্ঞানকে অপমান করছে। মহান ভারতের মহান চরিত্র দুর্গা, লক্ষী, সরস্বতী, সীতা, সাবিত্রী প্রমুখ নারীদের আদর্শ ভুলে প্রকৃতি প্রদত্ত জৈবী সম্পদকে যৌবন গরবে গরবিনী প্রবৃত্তিতাড়িত একজন নারী,–নিজের নারীত্বকে দর্শকামে, স্পর্শকামে, শ্রুতকামে, পণ্য করে পুরুষের সুপ্ত কামনাকে জাগিয়ে লাম্পট্য, ব্যভিচারকে পুষ্ট করতে পারে, প্রভূত অনিত্য সম্পদের মালকিন হতে পারে, কিন্তু ভালো মা হয়ে নিত্য-জীবনে আদর্শ নারীর খেতাব অর্জন করতে পারবে না। উনো জমিতেই দুনো ফসল ফলে, বুনো জমিতে নয়। পুরুষের ক্ষেত্রেও তাই। পুর্ব পুরুষের জীবনধারা প্রবাহিত বীর্য্যকে ব্যভিচার, ধর্ষণ, স্বমেহন আর কন্ডোমে অপবিনিয়োগ করে ধর্মবিরুদ্ধ কামসেবার ইন্দ্রিয়-লালসায় বিনিয়োগ করে দুষ্ট প্রবৃত্তিকে তুষ্ট করতে গি়য়ে যৌনব্যাধি, মানসিক কষ্ট, বিবেক-দংশন, সামাজিক ছি! ছি! লাভ করতে পারবে, ভালো বাবার গৌরব অর্জন করতে পারবে না। বীজ শুদ্ধ না হলে ফসলও অশুদ্ধ হবে।

তাই সব কিছুর পূর্বে ভালো মানুষের জন্ম যাতে হয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে মেয়েদের। বর্ণ, বংশ, অভ্যাস, ব্যবহার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সবকিছু মিলিয়ে দেখে সম-বিপরীত সত্তার একজন উন্নত পুরুষকে বর হিসেবে নির্বাচন করে বিয়ে করতে হবে। তাহলেই ভালো সন্তানের মা হতে পারবে।

বিয়েটা যাতে নিখুঁত হয়, সে বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, “বিয়ের প্রথম উদ্দেশ্যই হ’লো genetic enrichment ( জননগত সমৃদ্ধি)। এইটে হ’ল first and foremost (প্রথম এবং প্রধান)। তার পরের জিনিস হ’ল cultural enrichment (কৃষ্টিগত সমৃদ্ধি)। তাই বর-কনের বংশগত ও ব্যক্তিগত আচার, ব্যবহার, কর্মের সঙ্গতি আছে কিনা তা’ দেখা লাগে। আবার চাই physical enrichment (শরীরগত সমৃদ্ধি)। ….Genetic asset কার কেমনতর তা’ না বুঝে বিয়ে থাওয়ার সম্বন্ধ করা ভাল নয়।”

Genetic assetকে গুরুত্ব না দেবার ফলেই বর্তমান পৃথিবীতে শতকরা প্রায়

40টি অকাল মৃত্যুর কারণ কিছু দুরারোগ্য বংশগত ব্যাধি। যা সন্তানেরা উত্তরাধিকারে পায়। যা কোন চিকিৎসাতে সারানো যায় না। প্রতিরোধ করার একমাত্র উপায় সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা দুরারোগ্য বংশগত রোগমুক্ত বিশ্বস্ত বংশে বিবাহ করার নিদান দিয়েছেন। অতএব ওইসব দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে পরমপুরুষ নিদেশিত সুবিবাহ ও সুপ্রজনন বিধি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রজন্মের সুখশান্তি উত্থান-পতন সবকিছুর মূলভিত্তি হলো বিবাহ সংস্কার। সেই বিবাহ যদি শুধু যৌন লালসার এবং লিভ টুগেদার-এর কেন্দ্রবিন্দু হয় তাহলে কোনদিনও অসুখবিসুখ অকালমৃত্যু, সন্ত্রাসবাদ, শোষণবাদ থেকে সভ্যতাকে স্বস্তি দিতে পারবে না ডাক্তার, উকিল, পুলিশ, মিলিটারি, সংশোধনাগার, হাসপাতালের প্রচলিত ব্যবস্থাপনা। বিশ্বাসঘাতক মানুষদের সনাক্ত করতে শুদ্ধ জন্মের শংসাপত্র প্রাপ্ত ভাল জাতের বিশ্বাসী কুকুর (pedigreed dog) আমদানি করতে আগ্রহী যে রাষ্ট্র, সেই রাষ্ট্র ব্যবস্থা দৈবগুণসম্পন্ন বিশ্বাসী মানুষ সৃষ্টি করার মহান আর্যবিধিকে উপেক্ষা করে, যেমন খুশি তেমন বিয়ের মাধ্যমে কু-জন জননের অনুমোদন দিয়েছে! এই ব্যবস্থার পরিবর্তন না করতে পারলে দেশের কোন সমস্যার সমাধান হওয়া সম্ভব নয়।

* * *

নারী হতে জন্মে জাতি। নারীই গৃহ, সমাজ ও রাষ্ট্রের ধাত্রী ও পালয়িত্রী। প্রাকৃতিক নিয়মে একজন নারীর চরম পরিণতি মাতৃত্বে। মুখে আমরা যতই নারী-স্বাধীনতার কথা বলি না কেন, এক্ষেত্রে কিন্তু পুরুষের উপর নির্ভরশীল হতেই হয়। (অবশ্য মা হতে না চাওয়া লেসবিয়ান আদর্শে বিশ্বাসীদের কথা আলাদা। তারা অবশ্যই ব্যতিক্রমী।) সেই পুরুষটি মাতৃত্বকামী নারীর তুলনায় শারীরিক-মানসিক-আত্মিকভাবে যত উন্নত হবে,— স্বাস্থ্যবান হবে, ভালো চরিত্রের হবে, নারীটির দাম্পত্য জীবন তত সুখের হবে, সন্তানও ভালো হবে। এটাই তো স্বাভাবিক নিয়ম। তাই নয় কি? আর সেগুলো পেতে গেলে বর্ণে, বংশে, বয়সে, স্বাস্থ্যে, শিক্ষায়-দীক্ষায়—সবদিক থেকে উন্নত সম-বিপরীত সত্তার একটা পুরুষকে,— ভাবী সন্তানটির বাবাটিকে খুঁজে নিতে হবে, বিবাহের মাধ্যমে। বিবাহ করে নারী। পুরুষ করে উদ্বাহ। বিবাহ মানে পুরুষের সত্তাকে বিশেষরূপে বহন করা। যে পুরুষটির কাছে নারীত্বকে সমর্পণ করে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে। তাই নির্ঝঞ্ঝাট সুখের দাম্পত্য জীবন পেতে গেলে, ভালো সন্তানের মা হতে গেলে, লেখাপড়া শেখার পাশাপাশি, কুমারী অবস্থা থেকেই একটা পরিকল্পনা করে নিতে হবে, প্রস্তুতি নিতে হবে। কারণ প্রত্যেক নারীই চায় তার সন্তানটি সুস্থ থাকুক, ভালো হোক, কৃতী হোক। সেগুলো তো আর রেডিমেড পাওয়া যাবে না, আর স্টেজ মেক-আপও দেয়া যাবে না। নিয়ম মেনে অনুশীলন করতে হবে। মা-কেই মেপে মেপে সঞ্চয় করতে হবে ভবিষ্যতের সন্তানের ভালোমন্দের সব উপকরণ। মা মানে মেপে দেওয়া। সন্তানের ভালো-মন্দ মেপে দেয় বলেই মা। ভাবী মায়ের চলন-চরিত্র দ্বারা প্রভাবিত হয় নারীর-জননকোষ, অপত্য-কোষ। সেইজন্যই সন্তান ধারন-পালন-লালন-এর জন্য আবশ্যিক প্রত্যঙ্গগুলোকে (স্তন ও অপত্যপথ) সযত্নে মেপে মেপে লালন-পালন করতে হবে, সংরক্ষণ করতে হবে ভবিষ্যতের সন্তানের মঙ্গলের জন্য। তা না করে, যুগধর্মের বশবর্তী হয়ে ‘হেটেরো-সেক্সুয়াল’ কমপ্লেক্সের প্রলোভনে পড়ে ওগুলোকে যদি আম-পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করে ফেলা হয়, তাহলে তো ভাবী সন্তানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। যার জন্য সংরক্ষিত জিনিস, আত্মঘাতী উদারতার বশে অন্যকে ভাগ দেবার অপরাধে। এজন্য রোগ-ভোগেও ভুগতে হয়। Oncologist, Gynaecologist, Sexologist, Psychologist-দের শরণাপন্ন হতে হয়।

বর্তমান যুগে নারীরা লেখাপড়া, শিক্ষা-সংস্কৃতি, কর্মক্ষেত্রে, অভিযানে, বিজ্ঞান গবেষণায় প্রভৃতি কোন ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নেই। এমন অনেক নারীদের কথা আপনারা জানেন, আমিও জানি। আবার এ-ও দেখেছি, বাহ্য জগতের সবক্ষেত্রে কৃতি নারীদের অন্তর্জগতের হাহাকার। মনের মত সন্তান না পাওয়ার জ্বালায়, সন্তানকে মনের মত করে মানুষ করতে না পারার জ্বালায়, থ্যালাসেমিয়া, স্কিজোফ্রেনিয়া, লিউকোমিয়া প্রভৃতি নামের দুরারোগ্য ব্যাধির জ্বালায় জ্বলতে গিয়ে জীবনের সুখ-শান্তির অনুভূতিটা হারিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছে।—যেন, ‘সব আছে তবু নেই’। মাতৃত্ব-পিয়াসী একজন সন্তানহীনা নারীর যে কি কষ্ট, কি বেদনা, তা ভুক্তভোগী ভিন্ন কেউ উপলব্ধি করতে পারবে না। একটি সন্তান পেতে সব-রকমের চিকিৎসা করার পরও যখন সন্তান-লাভে ব্যর্থ হয়, তখন অনেক টাকা খরচ করে গর্ভ ভাড়া নেয়, দত্তক সন্তান নেয়।—এমন অনেক কিছু করেন। ওই সব সমস্যার স্রষ্টাও কিন্তু নারী। ‘আত্মানং বিদ্ধি।’ (know thyself বা নিজেকে জানা)-র শিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে সব কিছুকে জেনেছে, জানতে পারেনি নিজেকে। নিজের নারীত্বের-পূর্ণতার বিষয়ে জানা হয়ে ওঠেনি।

একটা উন্নত প্রজাতির কোন গাছ লাগাতে গেলেও কিছু প্লান-প্রোগ্রাম নিতে হয়। আগে থেকে জমি নির্বাচন করতে হয়, উপযুক্ত সার দিয়ে জমি তৈরি করতে হয়, তারপর মাটির উপযুক্ত বীজ বা চারা বসাতে হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় বর্তমান যুগের বেশিরভাগ লেখাপড়া শিখতে যাওয়া নারীরা, পুরুষের সাথে পা-মিলিয়ে, গলা-মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ‘হোক-কলরব’ আন্দোলনে পারদর্শী হলেও, নিজের আত্ম-বিস্তারের জন্য আবশ্যিক আত্ম-সম্পোষণ, আত্ম-সংরক্ষণ করার জন্য নির্দিষ্ট নারীত্বের অস্তিত্ব রক্ষার জমিটুকুকে সংরক্ষণ করা বিষয়ে উদাসীন। যারফলে কালেক্রমে মনুষ্যত্ব সম্পন্ন অসৎ-নিরোধে তৎপর সন্তান থেকে সভ্যতা বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব রামকৃষ্ণদেব, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নেতাজী সুভাষচন্দ্র প্রমুখ মনীষীদের জন্মদাত্রীগণ ক্যাম্পাসে, অফিসে, মিটিংয়ে, মিছিলে কোন ‘কলরব’ না করেই, সনাতনী নারীধর্ম পালন করে রত্নগর্ভা হয়েছিলেন। ভারতীয় কৃষ্টি প্রদত্ত প্রকৃষ্ট-গতির পথ ভুলে, তথাকথিত প্রগতির নামে ছুটে চলা নারীবাদিরা বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে দেখতে পারেন।

জগতের সকল অশান্তির সুতিকাগৃহ হচ্ছে যৌন বিকৃতি। ভালকরে খোঁজ নিলে দেখা যাবে সব গণ্ডগোলের জন্ম হয় অনিয়ন্ত্রিত যৌনতা থেকে। অবৈধ যৌন-সংশ্রব মস্তিস্কে এমন সংস্থিতি এনে দেয় যার অভিভূতিকে অতিক্রম করা দুরূহ হয়ে ওঠে। তাই তো শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের সাবধান করে বাণী দিলেন।

যোনি যোগে ঢুকলে পাপ,

রোখাই কঠিন তাহার দাপ।

শাসন সংস্থা যেমনই হোক

যাতেই মাথা ঘামাও না,

যৌন-জীবন শুদ্ধ না হলে

দেশের জীবন টিঁকবে না।

ব্যষ্টি-চরিত্র যৌনজীবন

ব্যভিচার যেথা উচ্ছলা

জনজীবন সে দেশে প্রায়ই

চরিত্র দোষের পিচ্ছলা;

অন্তরালে অদৃষ্ট তখন

ভাসতে থাকে চোখের জলে

আপদ তখন বিপদ নিয়ে

সবার পিছু পিছু চলে।

জনন-বিভ্রাট যেই এলো রে

ক্রমে ক্রমে রাষ্ট্র ছেঁয়ে

লাখ ঐশ্বর্য্য থাক না কেন

আপদ সেথায় যাবেই বেয়ে।

পরিবারকে উন্নতি বা অবনতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী প্রধানতঃ নারী। কথায় আছে, ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে। গুণবান পতি যদি থাকে তার সনে।।’ আদর্শ একজন পুরুষের সাহচর্যে নারীর হাতেই গড়ে ওঠে আদর্শ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র। নারীই হচ্ছে জাতির বল ও ভরসা। লক্ষী নারীদের উপরেই রয়েছে মহান জাতি গঠনের বিরাট দায়িত্ব। মহান আদর্শকে চরিত্রায়িত করে নারী যদি পরিবারকে সুন্দর ও সার্থক করে সাজিয়ে তুলতে পারে তবেই জগত-সংসার সুখের হয়। আদর্শ জাতি গঠন করার দায়িত্ব নারীদের উপর থাকার জন্য তাদের শিশুকাল থেকেই ভালো মা হবার সাধনায় অগ্রসর হতে হবে। নারী জীবনের বিভিন্ন পর্যায় আছে। ওই পর্যায়গুলো ভগ্নি, বধূ, স্ত্রী, জায়া, জননী ও গৃহিনী ও জননীত্ব। ওগুলোকে সমৃদ্ধ নারীরাই করতে পারেন, পুরুষেরা নয়। স্নেহ, মায়া, মমতা ও ভালবাসার দ্বারা পূর্ণ নারীর হৃদয়। নারীরা ইচ্ছা করলেই তাঁর অন্তর্নিহিত বিভিন্ন শক্তির দ্বারা জাগিয়ে তুলতে পারেন বিশ্বকে। সুসন্তান উপহার দিয়ে। যেমনটি দিয়েছিলেন হিরণ্যকশিপুর পত্নী কয়াধু, প্রহ্লাদকে জন্ম দিয়ে।

কু-জনদের জন্ম নিরোধ করে, কিভাবে সু-জনদের মা হওয়া যায়, সেই শিক্ষায় নারীদের শিক্ষিত করার জন্য শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ‘নারীর নীতি’, ‘নারীর পথে’, ‘দেবীসূক্ত’, ‘বিবাহ-বিধায়না’ শিরোনামের গ্রন্থরাজির উপহার রেখে গেছেন। সেই উপহারের ডালিগুলোকে কাজে লাগাতে পারলে শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণজনিত সমস্যা নয়, জগতের সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।

পরিশেষে বিশ্বশান্তির আহ্বায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের একটি বাণী পাঠকদের উপহার দিয়ে যবনিকা টানলাম। জয়গুরু! প্রণাম! বন্দে পুরুষোত্তমম্! tapanspr@gmail.com

——

** জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ভাবনা **

“নারী হইতেই জাতি জন্মে ও বৃদ্ধি পায়, তাই নারী যেমন ব্যষ্টির জননী তেমনই সমষ্টিরও ;– আর, এই নারী যেমন ভাবে আবিষ্ট থাকিয়া যেমন করিয়া পুরুষকে উদ্দীপ্ত করে পুরুষ হইতে সেই ভাবই নারীতে জন্মগ্রহণ করে ; তাই, নারী মানুষকে প্রকৃতিতে মূর্ত্ত ও পরিমিত করে বলিয়া জীব ও জগতের মা ;–তাহ’লেই বুঝিও– মানুষের উন্নতি নারীই নিরূপিত করিয়া দেয় ; তাই নারীর শুদ্ধতার উপরই জাতির শুদ্ধতা, জীবন ও বৃদ্ধি নির্ভর করিতেছে– বুঝিও, নারীর শুদ্ধতা জাতির পক্ষে কতখানি প্রয়োজনীয় ! ১৭৬ ।’’

(চলার সাথী গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী)


“পুরুষের আপূরণী প্রবৃত্তির প্রতিক্রিয়াই
নারীকে সৃষ্টি করেছে,
তাই, পুরুষকে আপূরিত করাই
নারীর প্রকৃতি, …….”
(দেবীসূক্ত, ৯)

প্রকৃত প্রস্তাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে উপরোক্ত বাণীদ্বয়ের যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে।

——————————————————

ওঁ শান্তি! শান্তি! শান্তি!

No photo description available.

বসুন্ধরা দিবস

** বসুন্ধরা দিবসের ভাবনা **

।। প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্য অবদান।।

নিবেদনে— তপন দাস

————————————————

মহাভারতের বনপর্বে বকরূপী ধর্ম যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্ন করেছিলেন, সব চাইতে আশ্চর্যের বিষয় কি ?

উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, মৃত্যু অবশ্যাম্ভাবী জেনেও মানুষ ন্যায়, নীতি, ধর্ম বিসর্জন দিয়ে চিরদিন বেঁচে থাকতে চায় এটাই সব চাইতে আশ্চর্যের বিষয় ।

তাই, আমরা, ঠাকুরের মানুষেরা যেন ওইসব পথের পথিক না হই । প্রবৃত্তিধর্মী অসৎ পথ অবলম্বন করে যদি চিরজীবি হওয়া যেত তাহলে না হয় অসৎ পথের আশ্রয় অবলম্বন করার সার্থকতা থাকত। তাই আমাদের বাঁচতে হবে পরমপিতার খুশির জন্য, মরতেও হবে পরমপিতার খুশির জন্য—মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার লক্ষ্যে, ‘তৃষ্ণার একান্ত নির্বান— মহাচেতন সমুত্থান।’ বাণীকে সম্মান জানাতে।

নির্দিষ্ট অপরাধবোধ ছাড়াও দুর্বলতাজনিত উৎকণ্ঠার ভয়, আগন্তুক ভয়, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভয় মনের পিছু ছাড়ে না । সব ভয়ের চরম মৃত্যুভয় । একটু অভ্যাস করলেই অন্তর্যামী স্বরূপ পরমাত্মিক শক্তির সাহায্যে আধিভৌতিক, আধিদৈবিক, আধ্যাত্মিক ত্রিবিধ ভয় থেকে মানুষ মুক্ত হতে পারে । এজন্য প্রবৃত্তি অভিভূতির সব দুর্বলতা কাটিয়ে ইষ্টকর্মে নিয়োজিত থাকতে হবে । তাই তো ঠাকুর আমাদের সব ভয় থেকে মুক্তি দিতে বাণী দিলেন ।–

“সব প্রবৃত্তি রত থাকে

ইষ্টকর্ম লয়ে,

সেই তো যোগী, সেই সন্ন্যাসী,

কাল নত যার ভয়ে ।”

“He will stand like a tower when everything rocks around him and when his softer fellow- mortals are winnowed like chaff in the blust.”

(আঃ প্রঃ ২/৭৫)

(যখন সবকিছুর অস্তিত্ব টলায়মান হয়ে উঠবে, এবং শক্তিহীন নির্জীব লোকগুলি ঝড়ের আগে তুষের মত উড়ে যাবে, তখন সে একটা স্তম্ভের মত নিজের শক্তিতে অটল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে ।)

জীবের জীবনবৃদ্ধির অপলাপকারী মৃত্যুকে প্রণাম জানিয়ে, মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার এই পথকে আঁকড়ে আমরা যেন অনন্ত জীবনের অধিকারী হতে পারি । দৈব দুর্বিপাক ভূমিকম্পে ভীত না হয়ে আমরা সকলে যেন মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার সাধনা ইষ্টনাম এবং ইষ্টকর্মে মত্ত থাকি, পড়শিদের, পারিপার্শ্বিকদের, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আক্রান্তদের সহায় হয়ে,—মৌখিক স্তুতি, আত্মার শান্তি কামনার পাশাপাশি বাস্তব কর্মের মাধ্যমে । পরমপিতার অনুশাসনকে সহায় করে বিশ্ব প্রকৃতিকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সব্বাইকে।

বিশ্ব-প্রকৃতির পরম দান, পঞ্চ-মহাভূত—ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-এর অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই পৃথিবী নামক সবুজ গ্রহটি। নগর-সভ্যতার ধারক-বাহকেরা আসুরিক ক্ষমতার বলে, ভোগবাদের ছাড়পত্রের বলে, আদর্শহীনতার বলে ভারতীয় ধর্মের অঙ্গীভূত পঞ্চ-মহাযজ্ঞ, সদাচার এবং বর্ণাশ্রমকে বিদায় জানিয়ে বসুন্ধরার পরিবেশকে যে ধ্বংসাত্মক পথে এগিয়ে দিয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘নাসা’-র গবেষণা। উদ্বেগ প্রকাশ করে গিয়েছিলেন কবিগুরু, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর’-এর প্রতিবাদী বাণীতে।

ভারতবর্ষের বৃহত্তম নদী গঙ্গাকে আমরা মা বলি, যাঁর পূত স্রোতধারায় স্নাত হয়ে পবিত্র হই, সেই মায়ের শরীরে নগর-সভ্যতার পুর-বিভাগ যখন পরিকল্পিতভাবে পূতিগন্ধ ক্লেদ নিক্ষেপ করে, ধর্মের ধ্বজাধারীরা তথাকথিত পূজা-পার্বনের বর্জ্য নিক্ষেপ করে পুণ্য অর্জন করে, তখন মনে হয় না যে আমরা কোন উন্নত সভ্যতার সভ্য, প্রগতি বাদের বাদী, আর্য্য সংস্কৃতির ধারক বাহক ধার্মিক।

পরিবেশ সম্বর্দ্ধনার সেই পরম অনুশীলন কি ভাবে বিকৃত হয়েছে সে বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই। বরং বসুন্ধরার পরিবেশকে রক্ষা করার ব্রতে কিভাবে ব্রতী হওয়া যায় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের উপদেশ মেনে আমাদের প্লাস্টিক-সভ্যতার কর্ণধারেরা যাতে পরিবেশ বান্ধবের ভূমিকা গ্রহণ করেন। রাষ্ট্র নায়কেরা যাতে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, ভূমিদূষণ, ভূ-স্তরদূষণ, জলদূষণ প্রতিরোধ করে গ্লোবাল-ওয়ার্মিং বা বিশ্ব-উষ্ণায়ন-ভ্রূকুটি থেকে সভ্যতাকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হন, সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে, জনমত গঠন করতে হবে, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের লাগামহীন ভোগের চাহিদা মেটাতে যে হারে ভূ-গর্ভস্থ তেল, গ্যাস, কয়লা, বিবিধ আকরিক উত্তোলন করতে গিয়ে ভূ-স্তরের অবক্ষয়কে আহ্বান করে চলেছি, ধ্বংস করে চলেছি ‘রেন ফরেস্ট’কে। এর বিরুদ্ধে সরব না হলে কোন মূল্যেই বাঁচানো যাবে না মানব সভ্যতাকে!

আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর পূর্বে পরম বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরব হয়েছিলেন এই ভয়াবহ পরিস্থিতি প্রতিরোধ মানসে। বিজ্ঞান-সাধক শ্যামাচরণ মুখোপাধ্যায়, পদার্থবিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য প্রমুখ ভক্তদের উৎসাহ দিয়ে হিমাইতপুরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র। বিজ্ঞান-বিষয়ক অত্যাশ্চর্য্য বহুকিছুর সাথে সন্ধান দিয়েছিলেন সহজলভ্য আবহাওয়া বিদ্যুতের। ভূ-গর্ভস্থ প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন পরবর্তী শূন্যগর্ভ অবস্থাকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে কিভাবে পুণঃ-পূর্ণকরণ বা রিফিলিং করলে ভূ-স্তরের ক্ষতি হবে না সে বিষয়েও তিনি বলে গেছেন। তাঁর প্রদত্ত ওইসব ফরমূলাকে বাস্তবায়িত করতে পারলে ভূ-স্তরকে বিনষ্ট না করে, পরিবেশকে দূষিত না করেই প্রাকৃতিক দৌ-শক্তিকে কাজে লাগিয়ে শক্তি-সম্পদে সমৃদ্ধ হতে পারত আমাদের সভ্যতা।

আমরা জানি, ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। আমাদের অস্তিত্বের ধারক, পালক-পোষক পরমাপ্রকৃতির পঞ্চ-মহাভূত। উক্ত পঞ্চ-মহাভূতের অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই বসুন্ধরা—নীল-সবুজ গ্রহ। ধারণ করতে হবে ওই প্রাকৃতিক উপাদানসমূহকে, ওঁদের বিনাশ করলে আমরাও বিনাশ হবো। নচেৎ বিশুদ্ধ জলের বোতলের মত অক্সিজেন সিলিণ্ডার পিঠে বয়ে ঘুরতে হবে একদিন নিকট ভবিষ্যতে।

পল-বিপল, দণ্ড-প্রহর, অহোরাত্র, আহ্নিকগতি, বার্ষিকগতির দিনরাত, মাস, বছর হয়েই চলেছে আদিকাল থেকে, প্রাকৃতিক নিয়মে।দিন-মাস-বছর আসে যায়, রেখে যায় কিছু স্মৃতি মনের মণিকোঠায়। ওই স্মৃতির মালাগুলোকে স্মৃতিবাহীচেতনার ভল্টে অনন্তকাল জমা করে রাখার জন্য আর্য্য-ঋষিরা প্রতিটি মুহূর্তের জীবন ধারণের আহরণ শুদ্ধির মাধ্যমে ধ্রুবাস্মৃতির সন্ধান দিয়ে গেছেন ‘‘আহারশুদ্ধৌ সত্তাশুদ্ধি, সত্তাশুদ্ধৌ ধ্রুবাস্মৃতি’’ মন্ত্রে । শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র স্বস্ত্যয়ণী ব্রতের ‘নিয়তং স্মৃতিচিদয়ুতে’ মন্ত্রে য়াকে সমৃদ্ধ করেছেন। য়ে মুহূর্ত চলে যাবে তা আর ফিরে আসবে না। চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা সমৃদ্ধ সবুজ গ্রহ পৃথিবীর প্রতিটি মুহূর্তকেই যাতে চিরনবীনতায় আস্বাদন করতে পারি, উপভোগ করতে পারি সেজন্যই আর্য্য সভ্যতার ঊষা লগনে পরমপিতার প্রতিভূ আর্য্য ঋষিগণ ‘‘মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ……..’’ মন্ত্রে বন্দনা করে বসুন্ধরার মধুময় পরিবেশকে রক্ষা অর্থাৎ পূজা করতে শিখিয়েছিলেন। পূজা শব্দের অর্থ পূরণ করা, সম্বর্দ্ধনা, সম্যকভাবে বর্দ্ধনার লক্ষ্যে এগিয়ে চলা। যেমন-যেমন আচরণে, পরিবেশের অজৈব উপাদানসমূহকে রক্ষা করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া যায় তাই ছিল আর্য্য ভারতের পূজা, যজ্ঞ, হোম, উৎসবের তাৎপর্য্য।

আমরা যে ৩৩ কোটি দেবতার কথা শুনেছি সে সংখ্যাটা ৩৩,০০০০০০০ নয়, শুধুই ৩৩। কোটি অর্থে (piece) বোঝান হয়েছে, যথা, জীবকোটি, ঈশ্বরকোটি একক অর্থে ব্যবহৃত হয়।

বাস্তবে আমাদের এই সবুজ গ্রহের জীবকূলের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জৈবাজৈব রসদের যোগানদাতার মূল মালিক সূর্য। সূর্যর আর এক নাম আদিত্য। আদিত্য মানে দেবতা। দেদীপ্যমান যা তাকে দেবতা বলে। দেবতা মানে দ্যুতি বিশিষ্ট সত্তা। সব দেবতাই মূলতঃ পরব্রহ্মের প্রতীক। যেমন পৃথিবীর অধিপতি অগ্নি, অন্তরীক্ষে ইন্দ্র বা বায়ু ও দ্যুলোকে সূর্য। পৃথিবী, অন্তরীক্ষ এবং দ্যুলোক-এর প্রতিটি স্থানে ১১টি করে বেঁচে থাকার আবশ্যিক উপাদান সরবরাহকারী দেদীপ্যমান উৎস রয়েছে। উক্ত ৩৩টি জীবনীয় উৎস-সমূহকে দেবতা বলা হয়েছে উপনিষদে।

বৃহদারণ্যক উপনিষদ (৩য় অধ্যায়, ৯ম ব্রাহ্মণ)-এর ঋষি শাকল্য, ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য সমীপে দেবতার সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি অষ্টবসু, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্যাদি ৩১ সংখ্যক দ্যুতিবিশিষ্ট প্রাকৃতিক সত্তা এবং ইন্দ্র ও প্রজাপতি মিলিয়ে ৩৩ সংখ্যক দেবতার উল্লেখ করেছিলেন। ওই ৩৩ কোটি (33 pieces) দেদীপ্যমান উৎসসমূহকে রক্ষা করার প্রশ্নে আমরা প্রবৃত্তি পরবশ হয়ে যাতে দুর্বৃত্ত না হই তারজন্য উপনিষদের ঋষিগণ ‘আত্মানং বিদ্ধি’-র শপথ বাক্যের পাঠ দিলেন।—পরমপিতার সন্তান তুমি, নিজেকে জানো, নিজের প্রতিরূপ মনে করে পরিবেশকে বাঁচাও, নিজে বাঁচ। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’—জীবনবিধ্বংসী আচরণ ত্যাগ করে জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলো। ‘মা গৃধ’—লোভ করো না। সদাচার এবং বর্ণাশ্রম মেনে চলো। পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে নিজে সমৃদ্ধ হও। এই ছিল ভারতবর্ষের বিধি-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠনের, ধর্মের, পূজার, উৎসবের বাস্তব রূপ। ওই হৃত-গৌরব যুগোপযোগী করে পুণঃ-প্রতিষ্ঠিত করে গেলেন সব দেবতার সমাহারের প্রতীকস্বরূপ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। যার প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয় তাঁর প্রদত্ত ‘আর্য্য সন্ধ্যা’ প্রার্থনা মন্ত্রে।

আমরা, ভারত রাষ্ট্রের অধিবাসীরা ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের পবিত্র মন্ত্র মূণ্ডকোপনিষদের ‘সত্যমেব জয়তে’-র মধ্যে নিহিত সত্যের সন্ধান করার চেষ্টা না করে, ‘মেরা ভারত মহান’ মন্ত্রের ধ্বজাধারীরা ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টি রক্ষার পবিত্র কর্তব্য ভুলে, ধর্মের নামে কতগুলো কু-সংস্কারে, আর বিজ্ঞানের নামে ভোগবাদে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছি। অথচ বিশ্বের পরিবেশ বিজ্ঞানীরা প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে, ভারতীয় পঞ্চ-মহাযজ্ঞের বিধানকে, সমাজ বিজ্ঞানীরা সমাজ-বন্ধনের দৃঢ়তার অবক্ষয় রোধে, শ্রেণী-বিন্যস্ত বর্ণাশ্রমানুগ সমাজ ব্যবস্থার বিধানকে এবং প্রজনন বিজ্ঞানীরা সুস্থ মানবজাতি গঠনের জন্য সুবিবাহ ও সুপ্রজনন বিধিকে মেনে চলতে পরামর্শ দিয়েছেন।

বেদ-উপনিষদ-গীতা. ঋষি এবং মহাপুরুষদের নিদেশে কোথাও প্রচলিত পূজার নামে, অনিত্য বস্তুর উপাসনার নামে, হৈ-হুল্লোর করে পরিবেশ দূষণ করার অনুমোদন নেই। ব্যক্তি চরিত্র গঠনের নিমিত্ত সাধন-ভজন-আরাধনা বাদ দিয়ে যে তন্ত্রমতে আমরা পরিবেশ দূষণ করতে প্রতিমা পূজায় মেতে উঠি, সেই তন্ত্র-ই প্রতিমা পূজাকে ‘‘বাহ্যপূজা অধমাধম’’ বলে বর্ণনা করেছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও, ‘‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’’ ছন্দের ডালিতে প্রতিমা পূজার অসারতার বার্তা রেখে গেছেন।

বসুন্ধরার পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, এক বিপ্লব নিয়ে এলেন। ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে, ধর্ম বলে জানিস তাকে। বাঁচা-বাড়ার মর্ম যা, ঠিকই জানিস ধর্ম তা। Upholding urge of existence is Dharma.’……..ইত্যাদি বাণীর মাধ্যমে। অতএব, চাঁদার জুলুম, ফুল, বেলপাতা, ধূপহীন ধূপকাঠি, নৈবেদ্য, দশ-(অ)কর্মার ফর্দ, ঢাক, ঢোল, বাজি, হৈ-হুল্লোর, তার শব্দে মাইকের ডালি দিয়ে নয়— তোমাকে ধার্মিক হতে হলে আগে পরিবেশকে বাঁচাতে হবে। সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বাস্তব কর্মে ব্রতী হতে হবে। পরিবেশ হিতৈষী হতে হবে, তবেই তুমি ভারতীয় মতের ‘ধার্মিক’ অভিধায় ভূষিত হতে পারবে।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের অনুগামীদের নিত্য ইষ্টভৃতি করতে হয়। ইষ্টভৃতি মানে ইষ্ট কর্মের ভরণ। ইষ্টকর্ম মানে পূর্ত্তকর্ম—পরিবেশের উপাদানকে,পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখার বাস্তব কর্ম। যা প্রকৃত ইষ্টভৃতির মন্ত্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ ।” এর সরলার্থ খুব সহজ। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুযায়ী সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন বর্দ্ধনার বিধি মেনে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে চলেন যিনি, এমন গুরুভাই-ই প্রকৃত ইষ্টভ্রাতা।–যাঁর আপদে-বিপদে সাধ্যানুগ সাহায্য করতে হবে। ভূত মানে,–ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা পরিবেশের অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। সেগুলোকে প্রাণ পণ করে রক্ষা করতে হবে। প্রতিনিয়ত এই শপথ মেনে চলার নাম ইষ্টভৃতি। অতএব প্রতিটি আমি যদি প্রকৃত ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের যাজ্ঞিক হবার শপথ পালন করতে পারি তাহলেই অনেকাংশে রক্ষা করা যাবে সুজলা-সুফলা-মলয়জ-শীতল বসুন্ধরার পরিবেশকে।

এ যুগের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমাদের সচেতন করে দিতে বাণী দিয়ে বললেনঃ

‘‘ইষ্টভরণ, পিতৃপোষণ,

পরিস্থিতির উন্নয়ন,

এ না করে, যাই না করিস

অধঃপাতেই তোর চলন।’’

ওই অধঃপতন থেকে মধুময় বসুন্ধরাকে রক্ষা করতে কৃপা পরবশ হয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর ‘পঞ্চবর্হি’ এবং ‘সপ্তার্চ্চি’ পালনের অনুশাসন দিলেন। দলীয় প্রীতির কবলে পড়ে মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার সেই অনুশাসন বিধিকে অবজ্ঞা করার স্পর্দ্ধা যেসব তথাকথিত সৎসঙ্গীরা দেখাচ্ছেন, তাদের অধঃপতনকে প্রতিরোধ করতে হলে, তাদেরও সামিল করতে হবে উক্ত ইষ্ট-ভরণের অনুশাসন পালনে। তা যদি না করি আমরাও কিন্তু বঞ্চিত হব ‘ইষ্ট ভরণের’ পবিত্র কর্ম থেকে।

জয়গুরু, বন্দে পুরুষোত্তমম্!

 

 

।। বসুন্ধরা (EARTH DAY) দিবসের ভাবনা ।।

নিবেদনে—তপন দাস

***************************************

আজ ২২শে এপ্রিল। আমাদের বসবাসপোযোগী এই পৃথিবী নামক সবুজ গ্রহটিকে তার স্বকীয়তায় সমৃদ্ধ রাখতে খ্রীস্টিয় ১৯৭০ সাল থেকে এই দিনটিকে বসুন্ধরা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

‘ধনধান্যে পুষ্পেভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’-র বাণীর স্রষ্টা কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রণাম নিবেদন করতেই হয় আজকের দিনটির স্মরণে। প্রণাম নিবেদন করতে হবে কবীন্দ্র রবীন্দ্রকে যিনি,

‘প্রথম প্রভাত উদয় তব গগনে,

প্রথম সাম রব তব তপোবনে,

প্রথম প্রচারিত তব বন-ভবনে

জ্ঞান-ধর্ম কত কাব্যকাহিনী…….’ বাণীর গাঁথায় বন্দনা করেছেন ভারত-জননীকে। প্রণাম জানাতে হবে সেই পরমপুরুষ অনুকূলচন্দ্রকে যিনি উপরোক্ত স্রষ্টাদের বাণীগুলোকে অমর করে রেখেছেন তাঁর আলোচনার ছত্রে ছত্রে। ‘পদ্ম আসন ধান ভরা ক্ষেত’, ‘আর্য্য ভারতবর্ষ আমার জ্ঞান-গরিমা-গরবিনী’ ইত্যাদি বাণীর সুর-ঝঙ্কারে বসুন্ধরাকে বন্দনা করেছেন।

পরমাপ্রকৃতির পঞ্চ-মহাভূত ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-এর অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই বসুন্ধরা। পরমপিতার প্রতিভূ আর্য্য ঋষিগণ ‘‘মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ……..’’ মন্ত্রে বন্দনা করে বসুন্ধরার মধুময় পরিবেশকে রক্ষা অর্থাৎ পূজা করতে শিখিয়েছিলেন। ‘পূজা’ শব্দের অর্থ সম্বর্দ্ধনা। যেমন যেমন আচরণে পরিবেশের অজৈব উপাদানসমূহকে রক্ষা করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া যায় তাই ছিল আর্য্য ভারতের পূজা, যজ্ঞ, হোমের তাৎপর্য্য। আমরা প্রবৃত্তি পরবশ হয়ে যাতে দুর্বৃত্ত না হই তারজন্য আমাদের ঋষিরা স্মরণ করিয়ে দিলেন ‘আত্মানং বিদ্ধি’—পরমপিতার সন্তান তুমি, নিজেকে জানো, নিজের প্রতিরূপ মনে করে পরিবেশকে বাঁচাও, নিজে বাঁচ। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’—জীবনবিধ্বংসী আচরণ ত্যাগ করে জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলো। ‘মা গৃধ’—লোভ করো না। সদাচার এবং বর্ণাশ্রম মেনে চলো। পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে নিজে সমৃদ্ধ হও। এই ছিল ভারতবর্ষের বিধি-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠনের, ধর্মের, পূজার বাস্তব রূপ।

নগর-সভ্যতার আসুরিক ক্ষমতার বলে, ভোগবাদের ছাড়পত্রের বলে, আদর্শহীনতার বলে সদাচার এবং বর্ণাশ্রমকে বিদায় জানিয়ে বসুন্ধরার পরিবেশকে যে ধ্বংসাত্মক পথে এগিয়ে দিয়েছে নগর-সভ্যতা তা’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘নাসা’-র গবেষণা। উদ্বেগ প্রকাশ করে গিয়েছিলেন কবিগুরু, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর’-এর প্রতিবাদী বাণীতে।

পরিবেশ সম্বর্দ্ধনার সেই পরম অনুশীলন কি ভাবে বিকৃত হয়েছে সে বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই। বরং বসুন্ধরাকে রক্ষা করার ব্রতে কিভাবে ব্রতী হওয়া যায় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে আমাদের। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের উপদেশ মেনে আমাদের প্লাস্টিক-সভ্যতার কর্ণধারেরা যাতে পরিবেশ বান্ধবের ভূমিকা গ্রহণ করেন। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, ভূমিদূষণ, জলদূষণ প্রতিরোধ করতে সচেষ্ট হন। সে বিষয়ে চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

ভারতবর্ষের বৃহত্তম নদী গঙ্গাকে আমরা মা বলি, যাঁর পূত স্রোতধারায় স্নাত হয়ে পবিত্র হই, সেই মায়ের শরীরে পুর-বিভাগ যখন পরিকল্পিতভাবে পূতিগন্ধ ক্লেদ নিক্ষেপ করে, ধর্মের ধ্বজাধারীরা তথাকথিত পূজা-পার্বনের বর্জ্য নিক্ষেপ করে পুণ্য অর্জন করে, তখন মনে হয় না যে আমরা কোন উন্নত সভ্যতার সভ্য, প্রগতি বাদের বাদী, আর্য্য সংস্কৃতির ধারক বাহক ধার্মিক।

ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। আমাদের অস্তিত্বের পালক-পোষক পরমাপ্রকৃতির পঞ্চ-মহাভূত ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ ধারণ করতে অর্থাৎ ওদের অস্তিত্বকে ধরে রাখতে হবে, বিপন্ন হতে দেওয়া যাবে না। উক্ত পঞ্চ-মহাভূতের অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই বসুন্ধরা। পরমপিতার প্রতিভূ আর্য্য ঋষিগণ ‘‘মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ……..’’ মন্ত্রে বন্দনা করে বসুন্ধরার মধুময় পরিবেশকে রক্ষা অর্থাৎ পূজা করতে শিখিয়েছিলেন। পূজা শব্দের অর্থ সম্বর্দ্ধনা। যেমন যেমন আচরণে পরিবেশের অজৈব উপাদানসমূহকে রক্ষা করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া যায় তাই ছিল আর্য্য ভারতের পূজা, যজ্ঞ, হোমের তাৎপর্য্য। আমরা প্রবৃত্তি পরবশ হয়ে যাতে দুর্বৃত্ত না হই তারজন্য বার বার স্মরণ করিয়ে দিলেন ‘আত্মানং বিদ্ধি’—পরমপিতার সন্তান তুমি, নিজেকে জানো, নিজের প্রতিরূপ মনে করে পরিবেশকে বাঁচাও, নিজে বাঁচ। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’—জীবনবিধ্বংসী আচরণ ত্যাগ করে জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলো। ‘মা গৃধ’—লোভ করো না। সদাচার এবং বর্ণাশ্রম মেনে চলো। (সম্প্রতিকালে “করোনা ভাইরাস” সঙ্কটে সকলেই প্রাণ বাঁচাতে যেভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে অভ্যস্ত হয়েছিল, তা’ প্রকৃত অর্থে ত্রি-স্তরীয় সদাচার-বিধির অন্তর্ভুক্ত না হলেও, শারীরিক সদাচার তো বটে!) পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে নিজে সমৃদ্ধ হও। এই ছিল ভারতবর্ষের বিধি-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠনের, ধর্মের, পূজার বাস্তব রূপ।

বেদ-উপনিষদ-গীতা, ঋষিগণ, মহাপুরুষগণ-এর নিদেশে কোথাও প্রচলিত পূজার নামে, অনিত্য বস্তুর উপাসনার নামে, হৈ-হুল্লোর করে পরিবেশ দূষণ করার অনুমোদন নেই। ব্যক্তি চরিত্র গঠনের নিমিত্ত সাধন-ভজন-আরাধনা বাদ দিয়ে যে তন্ত্রমতে আমরা পরিবেশ দূষণ করতে প্রতিমা পূজায় মেতে উঠি, সেই তন্ত্র-ই প্রতিমা পূজাকে ‘‘বাহ্যপূজা অধমাধম’’ বলে বর্ণনা করেছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও, ‘‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’’ ছন্দের ডালিতে প্রতিমা পূজার অসারতার বার্তা রেখে গেছেন।

বসুন্ধরা রক্ষার স্বার্থে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, এক বিপ্লব নিয়ে এলেন। ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে, ধর্ম বলে জানিস তাকে। বাঁচা-বাড়ার মর্ম যা, ঠিকই জানিস ধর্ম তা। Upholding urge of existence is Dharmma.’……..ইত্যাদি বাণীর মাধ্যমে। অর্থাৎ তোমাকে ধার্মিক হতে হলে আগে পরিবেশকে বাঁচাতে হবে। সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বাস্তব কর্মে ব্রতী হতে হবে।

বসুন্ধরার মৌলিক উপাদানসমূহকে পোষণ দিতে, রক্ষা করতে, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র যে আর্য্যসন্ধ্যার অনুশাসন অনুশীলন করতে বললেন তা’ও আমরা নানা অজুহাতে উপেক্ষা করে চলছি!

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের অনুগামীদের নিত্য ইষ্টভৃতি করতে হয়। ইষ্টভৃতি মানে ইষ্ট কর্মের ভরণ। ইষ্টকর্ম মানে পূর্ত্তকর্ম—পরিবেশের বাস্তব সেবা। যা প্রকৃত ইষ্টভৃতির মন্ত্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ ।” এর সরলার্থ খুব সহজ। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুযায়ী সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন বর্দ্ধনার বিধি মেনে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে চলেন যিনি, এমন গুরুভাই-ই প্রকৃত ইষ্টভ্রাতা।–যাঁর আপদে-বিপদে সাধ্যানুগ সাহায্য করতে হবে। ভূত মানে,–ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা পরিবেশের অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। সেগুলোকে প্রাণ পণ করে রক্ষা করতে হবে। প্রতিনিয়ত এই শপথ মেনে চলার নাম ইষ্টভৃতি। অতএব প্রতিটি আমি যদি প্রকৃত ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের যাজ্ঞিক হবার শপথ পালন করেন তাহলেই অনেকাংশে রক্ষা করা যাবে সুজলা-সুফলা-মলয়জ-শীতল বসুন্ধরাকে।

বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রদত্ত ‘পঞ্চবর্হি’ এবং ‘সপ্তার্চ্চি’-র অনুশাসনের বিধি মেনে চলতে পারলে প্রতিরোধ করা যাবে আধিদৈবিক, আধিভৌতিক এবং আধ্যাত্মিক নামের ত্রিতাপ জ্বালার চোখ রাঙানিকে। এজন্য অনিত্য বস্তুর উপাসনাকে এড়িয়ে বা পাশ কাটিয়ে, নিত্যবস্তুর উপাসনাকে পাথেয় করতে হবে। সবাই ভালো থাকুন অন্তর্দেবতা পরমপিতার পরমাত্মিক শক্তির সাহচর্যে। বন্দে পুরুষোত্তমম্!

———-

 

 

 

 

স্বস্তিতীর্থ মহাযজ্ঞ

।। নববর্ষ পুরুষোত্তম স্বস্তিতীর্থ মহাযজ্ঞ উৎসবের শুভ সূচনার প্রেক্ষাপট ।।

নিবেদনে—তপন দাস

—————————————————————————————–

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রবর্তিত নববর্ষ পুরুষোত্তম স্বস্তিতীর্থ মহাযজ্ঞ উৎসবের শুভ সূচনার  প্রেক্ষাপট অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেকগুলি সোপান পথ অতিক্রম করতে হলো, নাহলে ঠিক স্বস্তি অনুভব করতে পারছিলাম না। তাই একটু অতীতের স্বর্ণালি স্মৃতির রোমন্থন করতে করতে গন্তব্যের দিকে এগোতে চেষ্টা করব।    

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সৃষ্ট সৎসঙ্গের ভাগবৎ আন্দোলনের প্রথম সেনাপতি ছিলেন  মহারাজ অনন্তনাথ রায়, দ্বিতীয় সেনাপতি ছিলেন ভক্তবীর কিশোরীমোহন দাস।  ১৩২১ বঙ্গাব্দের    ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, অদ্বৈত বংশধর পূজনীয় সতীশচন্দ্র গোস্বামীকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র নিজে সৎমন্ত্রে দীক্ষা দান করে  তাঁর ভাগবৎ আন্দোলনের তৃতীয়তম সেনাপতিকে যূথবদ্ধ করেন। আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামীর মাধ্যমে কুষ্টিয়া থেকে সূত্রপাত হয় বহুধাবিস্তৃত সৎসঙ্গ আন্দোলনের। কুষ্টিয়ার ধনী-মানী-জ্ঞানী-গুণী জনেরা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। বিভেদের মাঝে ঐক্য স্থাপনের লক্ষ্যে কুষ্টিয়ার ভক্তদের  শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীবুদ্ধ, প্রভু যীশু, হজরত রসুল, শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ প্রমুখ পূর্ববর্তী অবতার-বরিষ্ঠদের জন্মোৎসব পালন করতে উৎসাহিত করেন বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। ঠাকুরের নিদেশ মেনে  কুষ্টিয়ার ভক্তরা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয়  ব্যক্তিদের থেকে শুরু করে সাধারণ অনুরাগীদের শ্রদ্ধার সাথে আমন্ত্রণ জানিয়ে আলাপ-আলোচনা-কথকতা ও অন্নব্যঞ্জনাদির সেবার ব্যবস্থা করতে শুরু করেন। এইভাবে পূর্বাপূর্ব অবতার বরিষ্ঠদের জন্মোৎসব পালন করার ফলে সারা কুষ্টিয়ায় এক অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে যায়। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে শ্রদ্ধা ও প্রীতির বন্ধন গড়ে ওঠে।

         অন্তরালে থেকে ঠাকুর যে সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতি সংস্থাপনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তার কার্যকারণ বিষয়ে  আলাপ-আলোচনা করতে গিয়ে  কুষ্টিয়ার ভক্তদের  মনে একটা প্রশ্ন জাগে—তাই তো! যার নির্দেশে পূর্ব পূর্ব গুরুদের জন্মোৎসব পালন করছি, যার নির্দেশ মেনে  সমাজে প্রীতি, শান্তি ক্রম-বর্ধমান,  অথচ তাঁর—‘পূবর্তনী পূরণম্ শাশ্বত বর্তমানম্’   যিনি, সেই বর্তমান পুরুষোত্তম, যিনি সব গুরুদের গুরু—বিশ্বগুরু, তাঁর জন্মোৎসব তো পালন করা হয়নি ? এবার তাই করতে হবে। সবাই একবাক্যে রাজী। অতএব আর দেরী নয়, যেই ভাবা, সেই কাজ।   কুষ্টিয়ার ভক্তগণ ‘‘শ্রীশ্রীবিশ্বগুরু-আবির্ভাব মহামহোৎসব’’ শিরোনাম দিয়ে ২৯শে ও ৩০শে ভাদ্র ১৩২৫ বঙ্গাব্দে উৎসবের আয়োজন করেন। অগণিত দীন ও দুঃস্থদের ভোজন এবং ভোজনোত্তর ভোজন-দক্ষিণা স্বরূপ অর্থ-বস্ত্রাদি দান—সে এক অভিনব মহাযজ্ঞ সুচারুরূপে সম্পন্ন করেছিলেন কুষ্টিয়াব ভক্তবৃন্দ। কোনরূপ কোন অপ্রীতিকর ঘটনার সাক্ষী না রেখেই।

 বিশ্বগুরু উৎসবের পরের বছর থেকে অনন্ত মহারাজ  হিমাইতপুরে শুরু করেন শ্রীশ্রীঠাকুরের আবির্ভাব মহোৎসব।  ভাদ্র মাসের শুরুতেই অনন্ত মহারাজ কয়েকজন সঙ্গীসাথি নিয়ে সুমধুর কণ্ঠে কীর্তন করতে করতে গৃহস্থের দ্বারে দ্বারে যেতেন গুরুর আবির্ভাব মহোৎসবের আমন্ত্রণ জানাতে। চারজন ভক্ত কাপড়ের ভিক্ষাপাত্রের চার কোণা ধরে চলতেন। গৃহ থেকে গৃহান্তর, গ্রামান্তর—যেখানেই যেতেন সকলকেই মাতিয়ে তুলতেন প্রাণের সাড়া জাগানো উৎসবে। আনন্দের হিল্লোলে মেতে ওঠা পথচারি থেকে গৃহবাসী সকলে সাধ্যানুযায়ী টাকা-পয়সা তো দিতেনই, এমনকি অনেক মায়েরা গায়ের স্বর্ণালঙ্কার পর্যন্ত ভিক্ষাপাত্রে নিবেদন করতেন অর্ঘ্যস্বরূপ—বিশ্বগুরুর উদ্দেশ্যে।

১৩৩১ বঙ্গাব্দে  হিমাইতপুরে দোল উৎসবের সূচনা করেন অনন্ত মহারাজ। বর্তমানের হিমাইতপুরের আশ্রমে উপরোক্ত দুটো উৎসবের প্রবহমানতা বিদ্যমান।

*  *  *

       কুষ্টিয়াতে অনুষ্ঠিত ‘‘শ্রীশ্রীবিশ্বগুরু-আবির্ভাব মহামহোৎসব’’ এর পর থেকেই মূর্খ-পণ্ডিত-ধনী-নির্ধন-জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষ একে একে সমবেত হতে শুরু করেন হিমাইতপুরে। শুরু হলো লোকসংগ্রহ পর্ব। ধীরে ধীরে গড়ে উঠল সৎসঙ্গ আশ্রম। শুরু হলো কর্মযজ্ঞ।

                অখ্যাত পল্লী হিমাইতপুরে বায়ু থেকে বিদ্যুত উৎপাদন করে পরম বিস্ময় সৃষ্টি করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। গড়ে তুলেছিলেন—তপোবন ও মাতৃ বিদ্যালয়—যা শিক্ষাক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। গড়ে তুলেছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত ‘মনোমোহিনী ইনষ্টিউট অফ সায়েন্স এণ্ড টেকনোলজি’ নামের বিজ্ঞান কলেজ। কেমিক্যাল ওয়ার্কসের জীবনদায়ী ঔষধসমূহ দেশে এবং বিদেশে সমাদৃত হয়েছিল। বৈদ্যুতিক এবং যন্ত্রশিল্পের আধুনিক সব ধরণের কাজ হতো ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল ওয়ার্কসপে। যথা,–ঢালাই, ঝালাই, লেদের কাজ, ডাইস, ইলেক্ট্রোপ্লেটিং, ইলেক্ট্রিক্যাল ফিটিং, আরমেচার, ব্যাটারি প্লেট তৈরি ও মেরামত, ডায়নামো মেরামত ইত্যাদি। ছিল—ময়দার কল, আটার কল, চালের কল, তেলের কল, চিনির কল, মেডিকেটেড ওয়াটার মেশিন, স্পাইস পাউডারিং, সুতার গুটি তৈরি, টেলারিং, বোতাম তৈরি, গ্লাস ব্লোয়িং, পটারী ওয়ার্কস্, বেকারী, লজেন্স তৈরি, গ্রোসারী প্রোডাক্ট ইত্যাদির শিল্প। ছিল—কার্ডবোর্ড কারখানা, স্টীমলণ্ড্রী, কটন ইণ্ডাস্ট্রিজ, হোশিয়ারী শিল্প, ব্যাঙ্ক, ইঞ্জিনীয়ারিং ওয়ার্কস্, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র, স্বাস্থ্য বিভাগ, গৃহনির্মাণ বিভাগ, কলাকেন্দ্র, প্রেস (যেখানে বাংলা, হিন্দী, সংস্কৃত, উর্দু, আরবী, ফারসী হরফের কাজ হতো, দেশ ভাগের পর পাকিস্তান সরকার জবরদখল করে ঢাকাতে নিয়ে যায়।), পাব্লিশিং হাউস, ফিলানথ্রপি, মাতৃসঙ্ঘ ইত্যাদি।

       হিমাইতপুর আশ্রম ছিল সর্বতোমুখী জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান। শুধু আশ্রমবাসীরাই নয়, ঠাকুরের আদর্শে দীক্ষিত ছিলেন না, তারাও জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায়-ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে সকলেই আশ্রমের সব প্রতিষ্ঠানের সুলভ সেবা পেতেন।    আশেপাশের সব গ্রামের মানুষেরা জানতো, অনুকূল ঠাকুর নামে একজন ফেরেস্তা আছে, যে আমাদের আপদে-বিপদে সহায় হয়, মায়ের মতো আগলে রাখে।

।। হিমাইতপুর থেকে দেওঘরে আগমনের প্রেক্ষাপট ।।

পরিবেশের জন্য এতকিছু করা সত্বেও  আশ্রমের ভেতরে-বাইরে উপকৃত মানুষেরাই ঠাকুরের সাথে শত্রুতা করেই চলেছিল, এমনকি ঠাকুরকে অপহরণ করতে চেয়েছিল, বিষ প্রয়োগ করে মারতেও চেয়েছিল।  খুন হয় আশ্রমের কর্মী, তপোবনের ছাত্র। পিতৃ-বিয়োগ, দেশবন্ধু-বিয়োগ, কন্যা-বিয়োগ, মাতৃ-বিয়োগ, আবাল্যের সাথী নফর ঘোষ, অনন্ত মহারাজ, কিশোরীমোহন-দের বিয়োগ-ব্যথায় ব্যথাহারী হলেন ব্যথিত।  ১৩৫৩ সালের প্রথম দিকে মুসলিম লীগের  ‘ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে’ ঘোষিত হবার সাথে সাথে কলকাতায় যে পৈশাচিক হত্যালীলা হয়েছিল সে সংবাদ শুনে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন ঠাকুর।  দেশ-নেতাদের আগাম সতর্ক করা সত্ত্বেও, প্রতিরোধী-ব্যবস্থাপত্র দেওয়া সত্ত্বেও তাঁরা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি।  বিপন্ন দেশবাসীদের রক্ষা করতে না পারার বেদনায় বিপর্যস্ত তিনি।  বেড়ে গেল রক্তচাপ, হয়ে পড়লেন অসুস্থ।  খবর শুনে পাবনার বিশিষ্ট মুসলমান নেতৃবৃন্দ ঠাকুরকে দেখতে আসেন, পাবনায় সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াতে দেবেন না বলে আশ্বস্ত করেন।  একটু সুস্থ বোধ করেন, আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন।  ঠাকুরের প্রিয় কলকাতার বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ গুপ্ত প্রয়োজনীয় ঔষধ এবং সম্পূর্ণ বিশ্রামের ব্যবস্থাপত্র দিয়ে যান।  বাঁধের ধারে নিভৃত নিবাসের মনোরম পরিবেশে ঠাকুরের বিশ্রামের ব্যবস্থা করেন ঋত্বিগাচার্য্য।  চাপমুক্ত রাখতে দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষেধ করে দেন।  কিন্তু ঠাকুর রাজী হন না।  মনের কথা, প্রাণের ব্যথা নিয়ে যারা যারা আসবে, তাদের তিনি কিছুতেই ফেরাতে নারাজ।  আগন্তুকদের দুঃখ-বেদনার কথা শুনতে শুনতে আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন।  সংবাদ পেয়ে ডাঃ গুপ্ত আসেন, ঠাকুরকে দূরে কোথাও বায়ু পরিবর্তনের জন্য নিয়ে যাবার পরামর্শ দেন।    

অবশেষে আশ্রম কর্তৃপক্ষ শ্রীশ্রীঠাকুরকে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।  ঠাকুর বিহার প্রদেশের দেওঘরে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।  

১৯৪৬ খ্রীষ্টাব্দের ১লা সেপ্টেম্বর হিমাইতপুর আশ্রম থেকে যাত্রা শুরু করে ২রা সেপ্টেম্বর বেলা ১০টা নাগাদ শ্রীশ্রীঠাকুর  বৈদ্যনাথধাম স্টেশনে পৌঁছলেন।

 ১৯৪৬ সালের জুলাই মাসে  হিমাইতপুরে অনুষ্ঠিত বর্ষাকালীন ঋত্বিক-অধিবেশনে  

 ১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসে  খুলনা শহরে শ্রীশ্রীঠাকুরের জন্মোৎসব সাড়ম্বরে উদযাপনের

জন্য কর্ম্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছিল। শ্রীশ্রীঠাকুর দেওঘরে চলে আসার কারণে এবং দেশের তৎকালীন বীভৎস সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির কথা চিন্তা ক’রে ঐ  উৎসব বন্ধ রাখা হয়েছিল।

পরিবর্তে ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে দেওঘরে উৎসবের আয়োজন করা হয়। রেলওয়ে গুমটির কাছে বিশাল তোরন-দ্বার নির্মিত হয়। যাত্রাপালা, কীর্তন, আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। শ্রীশ্রীঠাকুরের প্রতিকৃতি নিয়ে কীর্তন করতে করতে পবিত্র বৈদ্যনাথ ধামের নগর পরিক্রমা করেন সমাগত ভক্তবৃন্দের দল। সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল, উৎসবের তৃতীয় দিনে কিছু দুর্বৃত্তরা তোরন-দ্বারে অগ্নি সংযোগ করে, বড়াল বাংলোর অভ্যন্তরে অনুষ্ঠিত যাত্রাগানের সময় একদল দুর্বৃত্ত সৎসঙ্গীদের মারতে শুরু করে। আশু ভট্টাচার্য্য নামক একজন সৎসঙ্গী, গুণ্ডাদের পায়ে ধরে অনুনয়-বিনয় করলেও তারা নিরস্ত হয় না, লাথি মেরে ওই ভক্তকে  অজ্ঞান করে দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে অসৎনিরোধী তৎপর সৎসঙ্গী যুবকবৃন্দ প্রতিরোধ করতে এগিয়ে এলে দুর্বৃত্তের দল প্রাচীর টপকে পালাতে শুরু করে। পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পুলিস কয়েকজনকে অ্যারেস্ট করেন।  খবর পেয়ে পাণ্ডাপাড়া থেকে সম্মানীয় ডাকুবাবু কয়েকজন হিতৈষীদের সাথে নিয়ে আসেন। অরাজকতা কেটে গিয়ে শান্ত হয় পরিবেশ। পরবর্তী দিনে বৈদ্যনাথধামের পাণ্ডারাও উৎসবে যোগদান করে কীর্তন পরিবেশন করেছিলেন। 

(সূত্রঃ শ্রীমৎ আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী ও সৎসঙ্গ আন্দোলন।)  

১৯৪৭ খৃষ্টাব্দের  ১৫ই আগস্ট ভারত স্বাধীন হ’ল। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত দ্বিখণ্ডিত হ’ল। শুরু হ’ল উদ্বাস্তু সমস্যা। নোয়াখালির দাঙ্গার পরই পূর্ববঙ্গের সংখ্যালঘু

হিন্দুরা নিরাপত্তার অভাব বোধ করে আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। ভারত বিভাগের পর জলস্রোতের মতো জনস্রোত বইতে লাগল পশ্চিমবঙ্গের দিকে। দেওঘরেও এসে তার ধাক্কা লাগে। শ্রীশ্রীঠাকুর সাধ্যমত সকলের বাসস্থান এবং অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা করেন। কোন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বা সরকারের কাছ থেকে সাহায্য না নিয়ে তিনি হাজার-হাজার উদ্বাস্তুর পূনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন।

১৬ই, ১৭ই ও ১৮ই সেপ্টেম্বর ১৯৪৯ তিনদিনব্যাপী মহাসমারোহে শ্রীশ্রীঠাকুরের ৬২তম

জন্মোৎসব অনুষ্ঠিত হয় কলকাতার শ্রদ্ধানন্দ পার্কে। ডঃ রাধাকুমুদ

মুখোপাধ্যায়, ব্যারিস্টার নিৰ্ম্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গের

তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী শ্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন প্রমুখ ভাষণ দেন। এই উপলক্ষে

কোলকাতার রাজপথে বিরাট শোভাযাত্রা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

পরের বছর ১৬ই ও ১৭ই সেপ্টেম্বর (১৯৫০) কোলকাতার ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হ’লে

শ্রীশ্রীঠাকুরের ৬৩তম জন্মোৎসব সাড়ম্বরে উদ্যাপিত হয়। উৎসবের উদ্বোধনী ভাষণে

স্বনামধন্য নেতা ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলেন—‘শ্রীশ্রীঠাকুরের সাধনার

ক্ষেত্র পাবনা আশ্রম আজ পাকিস্তানভুক্ত। আশ্রম নষ্ট হ’লেও তাঁর জীবনী ও বাণী

বর্তমান ও ভবিষ্যৎ মানব-সমাজকে পথ দেখাবে। তিনি যে মানুষ গঠনের কাজে

আত্মনিয়োগ করেছেন তা ফলবতী হবেই। জাতীয় জীবনকে সুস্থ, সুন্দর ও সুষ্ঠু ক’রে

তুলতে হলে সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলি ধর্ম্মের ভিত্তিতে সমাধান

হওয়া উচিত এবং শ্রীশ্রীঠাকুর সেই কাজেই আত্মনিয়োগ করেছেন। তিনি জঙ্গলের

সন্ন্যাসী সৃষ্টি করেননি, বরং সংসারী হ’য়ে কেমন ক’রে যথার্থ জনকল্যাণ করা

যায়। তিনি তার আদর্শ দেখিয়েছেন।’ (মহামানবের সাগরতীরে, ১ম খণ্ড)

১৩৬০ বঙ্গাব্দের ১৪ই পৌষ থেকে ১৭ই পৌষ, (২৯ ডিসেম্বর ১৯৫৩ থেকে ১লা জানুয়ারি ১৯৫৪) বৈদ্যনাথ ধামের সৎসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ৬৩তম ঋত্বিক সম্মেলন। উক্ত সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়, আগামী ৬৪তম ঋত্বিক-অধিবেশনের সঙ্গে “নববর্ষ পুরুষোত্তম স্বস্তিতীর্থ মহাযজ্ঞ”

অনুষ্ঠিত হবে।   ওই মহাযজ্ঞ সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য বিভিন্ন

বিভাগের দায়িত্বভার দিয়ে একটি কেন্দ্রীয় কর্মী পরিষদ গঠন করা হয়েছিল।  কর্মী

পরিষদে ছিলেন সৎসঙ্গ আন্দোলনের প্রাতঃ-স্মরণীয় ভক্ত-পার্ষদবৃন্দ।  পূজনীয় ও বরেণ্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচাৰ্য্য, সুশীলচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র হালদার, সুধীরকুমার বসু, অশোক চক্রবর্তী, নরেন্দ্রনাথ মিত্র,

যতীন্দ্রনাথ দাস, চুনীলাল রায়চৌধুরী, রাজেন্দ্রনাথ মজুমদার, বীরেন্দ্রলাল মিত্র, ননীগোপাল চক্রবর্তী, শৈলেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, হরিনন্দন প্রসাদ, বৈকুণ্ঠপ্রসাদ সিং, কিশোরীলাল চৌধুরী, স্মরজিৎ ঘোষ, অমূল্যকুমার ঘোষ, বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়, অজয়কুমার গঙ্গোপাধ্যায়, মনোরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়, সুধীরকুমার সমাজদার, নিরাপদ পাণ্ডে, বীরেন্দ্রনাথ পাণ্ডে, নলিনীপ্রসাদ গুহ, দোবেজী, ইন্দ্ৰকান্ত শর্ম্মা, কিরণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, জ্ঞানেন্দ্রমোহন চৌধুরী প্রমুখ ভক্তবৃন্দের ওপর বিভিন্ন বিভাগের ভার দেওয়া হয়।

শান্ত-গম্ভীর পবিত্র পরিবেশে, বিপুল বিদগ্ধ জনসমাবেশে পুণ্যতীর্থ বৈদ্যনাথধামের

একান্তে সৎসঙ্গ আশ্রমে আতঙ্কগ্রস্ত বিশ্বজনের সর্ব্বাঙ্গীণ এবং সর্ব্বোত্তম

স্বস্তিপ্রয়াসে ২৮শে চৈত্র, ১৩৬০ শুভ রামনবমী দিবস থেকে শুভারম্ভ হয় উৎসবের। সমাপ্ত হয় ৭ই

বৈশাখ, ১৩৬১তে—(১১ই এপ্রিল থেকে ২০শে এপ্রিল, ১৯৫৪) পর্য্যন্ত।  

       ভারতীয় কৃষ্টিতে প্রত্যয়বান জীবন-প্রয়াসী লক্ষাধিক নরনারী বিভিন্ন রাজ্য এবং ভারতের

বিভিন্ন নগর ও প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে বাস, লরি ও স্পেশাল ট্রেনযোগে এসে সম্মিলিত হন মহা-মহোৎসবে।

       সমাগত ভক্তদের আশ্রয়ের জন্য অনেক অস্থায়ী প্যাণ্ডেল নির্মাণ করা হয়। পাম্পের সাহায্যে দারোয়া নদীর তলদেশ থেকে পাম্প, ইঞ্জিন ও পাইপের সাহায্যে বিশুদ্ধ জলের প্রচুর সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। ট্রলির সাহায্যে দ্রুত স্বাদু ও স্বাস্থ্যসম্মত আহার্য্য পরিবেশিত হয়

আনন্দবাজারে। স্বস্তিসেবকগণের সুশৃঙ্খল নিয়মানুবর্তিতার অনুশাসনে,  অতন্দ্র প্রহরায়, সমাগত ভক্তজন নিরুপদ্রবে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করেন। অস্থায়ীভাবে স্থাপন করা হয় অনুসন্ধান কেন্দ্র, সাহায্য কেন্দ্র, প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র ও হাসপাতাল। সঙ্গীত, কীর্তন, নাটক, আলোচনা সভায় মুখরিত থাকে উৎসব প্রাঙ্গন।

ওই দশদিনব্যাপী মহাযজ্ঞের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভাষণ দান করেছিলেন তৎকালীন বরেণ্য বিদগ্ধজনেরা।  অধ্যাপক অতুলচন্দ্র সেন, অধ্যক্ষ রামদীন পাণ্ডে, ডাঃ রামচন্দ্র অধিকারী, ডঃ মাখনলাল রায়চৌধুরী, রাধারমণ চৌধুরী, অধ্যাপক রেজাউল করিম, মন্ত্রী বিনোদানন্দ ঝা, ভিক্ষু শীলভদ্র, অধ্যাপক ত্রিপুরারি চক্রবর্তী, অধ্যাপক ছেদীলাল শাস্ত্রী, শ্রীযুক্তা প্রভাবতী দেবী সরস্বতী, ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সম্পাদক  শ্রীজ্যোতিষচন্দ্র গুহ প্রমুখ জ্ঞানীগুণীবৃন্দ।

ওই মহোৎসবের সাফল্য কামনা ক’রে শুভেচ্ছাবার্তা জানিয়েছিলেন তৎকালিন

ভারতের উপরাষ্ট্রপতি ডঃ সর্ব্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ, ভারতীয় সংসদের ডেপুটি

স্পীকার শ্রীঅনন্তশয়নম আয়েঙ্গার, বিহারের রাজ্যপাল শ্রীরঙ্গনাথ দিবাকর,

পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল ডঃ হরেন্দ্রনাথ মুখার্জি, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের

ভাইস-চ্যান্সেলর ডঃ জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সভাপতি

শ্রীঅপূর্ব্বকুমার চন্দ, ওড়িশার জননায়ক শ্রীহরেকৃষ্ণ মহতাব, আসামের

অর্থমন্ত্রী শ্রীমতিরাম বোরা, ওড়িশার শিক্ষা ও অর্থমন্ত্রী শ্রীরাধানাথ রথ,

পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি শ্রীঅতুল্য ঘোষ, বোম্বাইয়ের মুখ্যমন্ত্রী

শ্রীমোরারজী দেশাই, পশ্চিমবঙ্গের উপমন্ত্রী শ্রীতরুণকান্তি ঘোষ প্রমুখ সম্মানীয় ব্যক্তিবর্গ।

২৮শে চৈত্র, ১৩৬০, (১১ এপ্রিল ১৯৫৪) উৎসবের প্রথম দিন শুভ রামনবমী তিথির অপরাহ্ণে অনুষ্ঠিত সাধারণ-সভায় সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক শ্রীঅতুলচন্দ্র সেন। প্রধান অতিথির আসন

অলঙ্কৃত করেন অধ্যক্ষ শ্রীরামদীন পাণ্ডে। সভাপতির অভিভাষণে শ্রীযুত সেন বলেন – “

এখানে এসে প্রাতঃকালে শ্রবণ করেছি ‘বন্দে পুরুষোত্তমম্’ ধ্বনি। এই তো ভারতের শাশ্বত

বন্দনা-ধ্বনি। রক্তমাংসের শরীরে যখন পরমব্রহ্ম অবতরণ করেন তখন এক পরমাশ্চর্য্য

লীলা দৃষ্ট হয়। সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের জীবন সুস্থ সবল ও সুন্দর হওয়াই

শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শের মর্ম্মকথা। এমনি একদিন আসতে পারে যেদিন সৎসঙ্গীদের

আচরণশীল চলনে সারা পৃথিবীতে এই ভাবরধারার প্লাবন আসবে।”

দ্বিতীয় দিন তিনটি অনুষ্ঠান সাফল্যের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয়

স্বাস্থ্য-প্রদর্শনী উপলক্ষে তরুণ সৎসঙ্গী বালকগণের খেলাধূলার অনুষ্ঠানে

পৌরোহিত্য করেন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সেক্রেটারী শ্রীজ্যোতিষচন্দ্র গুহ। অপর

একটি অনুষ্ঠানে জাতীয় জীবনে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যচর্চা

সম্পর্কে ডাঃ রামচন্দ্র অধিকারী জাতি ও জাতীয়তার সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করে

পারিবারিক ও ব্যক্তি-জীবনের স্বাস্থ্য কিভাবে রক্ষা করা যায় সেই বিষয়ে আলোকসম্পাত করেন।

তৃতীয় দিনের অপরাহ্ণের সাধারণ সভায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক কালচার বিভাগের

প্রধান ডঃ মাখনলাল রায়চৌধুরী সুফী মতবাদ সম্বন্ধে আলোচনা করেন। এছাড়া

ঋত্বিগাচাৰ্য্য শ্রীকৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যের পৌরোহিত্যে ধর্ম্ম ও

বিজ্ঞানের নিগূঢ় সম্বন্ধ ও সংহতি বিষয়ে এবং শ্রীযতীন্দ্রনাথ দাসের

সভাপতিত্বে দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান এবং তার উন্নয়নে সৎসঙ্গের অবদান বিষয়ে

দুইটি সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

চতুর্থ দিন (১লা বৈশাখ, ১৩৬১) সকাল সাতটায় যতি-আশ্রমের সম্মুখের মাঠে পঞ্চাশ

হাজারেরও বেশি নরনারী সমবেত হয়েছেন। ঠিক সাতটায় প্রার্থনা আরম্ভ হ’ল।

যতি-আশ্রমের বারান্দা থেকে মাইকযোগে আহ্বানী দিলেন ঋত্বিগাচার্য

শ্রীকৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য। তারপরেই সেই বিশাল জনসঙ্ঘের সমাগত কণ্ঠের

উচ্চারিত প্রার্থনামন্ত্র মেঘমন্দ্র ধ্বনিতে ব্যোম স্পর্শ করল। প্রার্থনাস্তে

শ্রীশ্রীঠাকুরের আশীর্ব্বাণী পাঠ করলেন ঋত্বিগাচার্য্যদেব।

আশিস-বাণীতে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন—

আজ নবীন বৎসরের জন্মদিন,

     নবীন দীপনা নিয়ে বর্ষ নবীন রূপে

  দুনিয়ার বুকে উদ্ভাসিত হ’য়ে উঠলো,

জন্ম নিল–-সবিতার ভাস্বর-দীপনায়

আত্মবিকাশ ক’রে;

প্রভাতের মলয়-হিল্লোল

    দীপন দ্যোতনায়

       স্মিত-গৌরব-উজ্জ্বলতা নিয়ে

তমসার বক্ষ বিদীর্ণ ক’রে

নবীন স্পন্দনায়, উচ্ছল উজ্জ্বলায়

আবির্ভূত হ’য়ে উঠলো—

স্বাগতম্-কিরণ-স্পন্দনে

    স্বস্তি-অনুকম্পী যাগ-তীর্থের

         দ্যোতন দোলায় হেলে-দুলে

  নৰ্ত্তন-হিল্লোলে দেব-প্রভায় উদ্দাম হ’য়ে ; …..

যিনি আমার একান্ত,

    যিনি আমার প্রিয়পরম,

        যিনি আমার পরমপিতা পরমেশ্বর

     তাঁর চরণে একান্ত প্ৰাৰ্থনা—

 তোমরা সুখে থাক,

স্বস্তির অধিকারী হও,

নির্ব্বাধি হও, চিরায়ু নিয়ে বেঁচে থাক—

               তোমাদের যা-কিছু সব নিয়ে ;

অনুশাসন-অনুসরণ

 তোমাদিগকে স্বস্তির অধিকারী ক’রে তুলুক,

    সম্বৰ্দ্ধনার অধিকারী ক’রে তুলুক,

সমীচীন অনুচলন

 তোমাদিগকে সাধু ক’রে তুলুক—

     সুনিষ্পাদনী অভিসার-অনুদীপনায় ;

আর, স্বস্তি, শান্তি ও স্বধা

     তোমাদের সত্তায় অন্বিত হয়ে

    প্রিয়-পরমে স্বার্থক হ’য়ে উঠুক—

 পুরুষোত্তম-পরিবেদনায় ;

বল—‘বন্দে পুরুষোত্তমম্’

আবার বল—‘বন্দে পুরুষোত্তমম্

আকণ্ঠ ঘোষণায় বল—‘বন্দে পুরুষোত্তমম্।

আশীর্ব্বাণী পাঠান্তে অর্ঘ্যাঞ্জলিসহ প্রণাম নিবেদন করেন সমবেত ভক্তজনমণ্ডলী। সমাপন হয় প্রাতঃকালীন অনুষ্ঠান।

অপরাহ্ণে প্যান্ডেলে ঋত্বিগাচার্য্যদেবের পরিচালনায় ঋত্বিক-সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

সন্ধ্যায় প্রবর্তক-সম্পাদক শ্রীরাধারমণ চৌধুরী মহোদয়ের সভাপতিত্বে এক বিশাল

জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। নির্ধারিত আলোচ্য বিষয় ছিল—শ্রীশ্রীঠাকুরের দিব্য জীবন ও বাণী। সভাপতির ভাষণে শ্রীযুত চৌধুরী বলেন— “গত চল্লিশ বছর ধরে আমি শ্রীশ্রীঠাকুরকে জানি। সেইজন্যই এই বিশাল জনতা শ্রীশ্রীঠাকুরের জন্য যে গভীর প্রেম হৃদয়ে বহন করেন এবং

সৎসঙ্গের জন্য তাদের যে আগ্রহ ও উৎসাহ তা আমি ভালভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারি।

শ্রীশ্রীঠাকুর যে ভাগবতকার্য্যের জন্য অবতীর্ণ হয়েছেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই।”

পঞ্চম দিবসের (২রা বৈশাখ, ১৩৬১) সন্ধ্যায় শিক্ষা-সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সৎ-

সঙ্গের সহ-সভাপতি শ্রীসুশীলচন্দ্র বসু।

৬ষ্ঠ দিবসের সাধারণসভায় সভাপতিত্ব করেন অবসরপ্রাপ্ত সাব-জজ শ্রীশচীন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। প্রধান অতিথি ছিলেন  অধ্যাপক শ্রীরেজাউল করিম। ভাষণ-প্রসঙ্গে অধ্যাপক করিম বলেন — “বর্তমানে বিশ্ব বিজ্ঞানসৃষ্ট এক আগ্নেয়গিরির উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই নিদারুণ আশঙ্কার মধ্যেও আনন্দের বিষয় যে, বিশ্বসভ্যতায় বিশ্বমানবের রক্ষাকল্পে নূতন নেতৃত্ব,

নূতন চিন্তাধারা দেখা দিয়েছে। ত্রাণকর্তার আবির্ভাবে বিশ্বাসী সৎসঙ্গের এই

বিশাল জনগণ সেই নূতন চিন্তাধারার প্রতীক। এই বিশ্বাসী জনগণের প্রবল শক্তিতে

একদিন অশুভ নাশ হবে এবং শয়তানের উপর জীবনদেবতা জয়লাভ করবেনই।”

৭ম দিবসে (১৭ই এপ্রিল, ১৯৫৪) সন্ধ্যায় জননেতা শ্রীবিনোদানন্দ ঝার সভাপতিত্বে

জনসভা হয়।

 তৎপর দিন (৮ম দিবস) অধ্যাপক শ্রীরেজাউল করিমের সভাপতিত্বে সাধারণ

সভা হয়। প্রধান অতিথির আসন গ্রহণ করেন মহাবোধি সোসাইটির ভিক্ষু শীলভদ্র।

সভাপতির ভাষণে অধ্যাপক করিম বলেন—“আমি গতকাল শ্রীশ্রীঠাকুরকে দেখেছি, তাঁর

সঙ্গে আলাপ করেছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস হ’ল যে, বিশ্বের পীড়িত মানুষের জন্য

তাঁর করুণা এবং কৰ্ম্ম আগামী সহস্র-সহস্র বৎসর তাঁকে প্রাতঃস্মরণীয় করে

রাখবে তাতে কোনও সন্দেহ নাই।”

সর্ব্বধর্ম সমন্বয় সম্বন্ধে অধ্যাপক করিম বলেন— “শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকুলচন্দ্রই

সমন্বয়ের মূর্ত প্রতীক। তাঁর প্রবর্তিত নীতি প্রেম, শান্তি ও সুস্থ পরিবেশ

সর্ব্বকালের এবং সর্ব্বলোকের জীবনবিকাশের অনুকূল। এই নীতিই যুগে-যুগে বিভিন্ন

অবতারগণ প্রবর্তন ক’রে গেছেন।”

উৎসবের নবম দিবসে (৬ই বৈশাখ, ১৩৬১, ১৯শে এপ্রিল, ১৯৫৪) সন্ধ্যায় শ্রীযুক্তা

প্রভাবতী দেবী সরস্বতীর সভানেত্রীত্বে এক জনসভা হয়। আলোচ্য বিষয় ছিল—নারী-বৈশিষ্ট্যের জাগরণে সৎসঙ্গ আন্দোলন। সভানেত্রীর ভাষণে শ্রীযুক্তা সরস্বতী বলেন—“শ্রীশ্রীঠাকুরের সঙ্গে তাঁর এই প্রথম দর্শন তাঁর জীবনের এক বিরাট ও মহৎ অভিজ্ঞতা। এই বিরাট ও গভীর ভাবের সন্নিকটে এসে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। যে মহৎ কাজের ভার এই মহামানব গ্রহণ করেছেন তা আমার ধারণারও অতীত। তিনি আমাদের সমস্ত দৃষ্টিভঙ্গী ও জীবনধারার এক আমূল পরিবর্তন আনতে চান। আর্য্যকৃষ্টির ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে তিনি এই জাতিকে পুনর্গঠিত করতে চান।”

৭ই বৈশাখ, ২০শে এপ্রিল দশদিনব্যাপী নববর্ষ পুরুষোত্তম স্বস্তিতীর্থ মহাযজ্ঞের

সমাপ্তি দিবস। এই দিনের সান্ধ্যসভায় সভাপতিত্ব করেন সৎসঙ্গের সহ-সভাপতি

শ্রীসুশীলচন্দ্র বসু। অধ্যাপক শ্রীত্রিপুরারি চক্রবর্তী, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক রেজাউল করিম প্রমুখ ভাষণ দেন। এরপর মহাযজ্ঞের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

এই বিরাট মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠানের ফলে কৰ্ম্মীগণ বিশেষভাবে উদ্দীপিত হয়ে ওঠেন।

শ্রীশ্রীঠাকুরের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ নিয়ে তাঁরা নবীন প্রেরণায়

আবার কৰ্ম্মসাগরে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এবারে পাঞ্জাধারী কর্ম্মীর এবং দীক্ষিতের

সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পায়। (সূত্রঃ মহামানবের সাগরতীরে, ১ম খণ্ড)

* * *

নিত্যপাঠ্য চলার সাথী গ্রন্থের ‘উৎসব’ নিবন্ধে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন :

“যে-প্রচেষ্টার ডাকে জনসাধারণ উৎফুল্ল আনন্দের সহিত জ্ঞানে সমৃদ্ধ হইয়া,

নিজেকে প্রাণনে, ব্যাপনে ও বর্ধনে নিয়ন্ত্রিত করিতে পারে এমনতর মঙ্গলপ্রসূ

অভিসমাগমকেই উৎসব বলে! ৩০৪”

       এখানে  তিনটি শব্দ প্রণিধানযোগ্য। “প্রাণনে, ব্যাপনে ও বর্দ্ধনে”

নিয়ন্ত্রিত হবার কথা বলা হয়েছে।

        এ নিয়ন্ত্রণ প্রাকৃতিকভাবে স্বতঃ-নিয়ন্ত্রিত। বীজ ও রজো  বা sperm &

ovum-এর দুটি অর্ধ-কোষ (22 autosome + x or x/y sex chromosome=44xx or xy)

মিলে প্রথমে একটা কোষের সৃষ্টি হয়। ক্রমে  “প্রাণনে, ব্যাপনে ও বর্দ্ধনে”

নিয়ন্ত্রিত হবার বিধি মেনে কোষ বিভাজনের মাধ্যমে এক থেকে বহুতে পরিণত হতে

শুরু হয়।  বিধিবৎ নিয়ন্ত্রিত হলে ১০ চান্দ্র মাসে পূর্ণতা পায়। এভাবেই সৃষ্টি

হয় আমাদের মানবদেহ—“প্রাণনে, ব্যাপনে ও বর্দ্ধনে”।  এরমধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে

ধর্মের মূল তত্ত্ব ও তথ্য—“অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম বলে জানিস তাকে।” 

প্রাণ সৃজনের বিধি বিন্যাসের ন্যায়, যে সমাবেশ থেকে মানুষ নিজের প্রবৃত্তি

নিয়ন্ত্রণ করে সত্তার পথে চলতে অভ্যস্ত হয় তার নাম উৎসব। যা’ আমাদের প্রতিনিয়ত

অভ্যাস করে যেতে হবে। 

      শব্দার্থ অনুযায়ী উৎকৃষ্ট প্রসব করে যা’ তার নাম উৎসব, যা’তে আমাদের

আমিগুলোর উৎসকে, সহজাত-সংস্কারকে আরোতর উৎকৃষ্ট ভাবে সংরক্ষণ করতে পারি।

উৎসবের উদ্দেশ্য ব্যাপক যাজন, আর যাজন মানে ইষ্টানুগ বিধিতে সবাইকে জীবনে

অধিষ্ঠিত করা। যজন অনুশীলন মাধ্যমে আমি নিজে যদি ইষ্টানুগ বিধিতে জীবনে

অধিষ্ঠিত না হতে পারি, তাহলে প্রবৃত্তি পরিপোষণে আমি যা হয়েছি উৎসবের নামে তার যাজনই করব।                    

শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন, “উৎসব-সম্বন্ধে আমার idea (ধারণা) ছিল—উৎসবে বক্তৃতা হবে, হোম হবে। হোতা, অধ্বর্য্যু, উদ্‌গাতা ইত্যাদি থাকবে। আপনারা এক-এক দল এক-এক জায়গায় বসবেন। আলাপ-আলোচনা করবেন। লোকসমাগম হবে। Educational exhibition (শিক্ষামূলক

প্রদর্শনী) হবে, শিক্ষামূলক সিনেমা হবে। যে কয়দিন উৎসব করবেন তাতে মানুষ

educated (শিক্ষিত) হবে। মানুষকে উচ্চল চলনে শিক্ষিত করে তোলাই উৎসবের

উদ্দেশ্য। উৎসব মানুষকে উৎসমুখী উৎসৃজনের দিকে নিয়ে যাবে। আপনারা এক একজনে

উৎসবের হোতা হবেন।” (শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, ২৬. ০৪. ১৯৫১, আলোচনা প্রসঙ্গে-২০)

       আমরা সকলে মিলে শ্রীশ্রীঠাকুরের ঈপ্সিত উৎসবের হোতা হবার অনুশীলনে যেন সার্থক হতে পারি। প্রার্থনা জানাই পরমপিতার উদ্দেশ্যে। জয়গুরু। সবাই ভালো থাকবেন। বন্দে পুরুষোত্তমম্!

                                  —————-   

 তথ্যঋণ :

১. বরেণ্য ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থ।

২. শ্রীসচ্চিদানন্দ গোস্বামী প্রণীত, ‘আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী ও সৎসঙ্গ আন্দোলন’।

৩. শ্রীনাথ প্রণীত ‘যেমন তাঁকে দেখি’।

 ৪. শ্রীকুমারকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য প্রণীত ‘মহামানবের সাগরতীরে’, ১ম খণ্ড।

আত্মসমীক্ষা

আত্মসমীক্ষা
নিবেদনে—তপন দাস
[ভালোই সব চলছিল। সৎসঙ্গ নিয়ে বেশ আনন্দেই ছিলাম। হঠাৎ তালটা যেন কেটে গেল। দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রম থেকে প্রকাশিত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র লিখিত ‘সত্যানুসরণ’ নামক গ্রন্থের ৪৫তম সংস্করণের ৬৫তম পাতার প্রথম অনুচ্ছেদের বাণীর উপদেশটা আমাকে বেশ বিপাকে ফেলে দিয়েছে। আমার নাম দিবাকর বৈদ্য। আমি অকপটে সব ‘খ্যাপন’ করলাম। দয়া করে আমার কথাগুলো একটু শুনবেন। বলা যায় না, আপনাদেরও কাজে লেগে যেতে পারে।]
* * *
একজন দাদা, নাম অনিমেষ চৌধুরী। দেখা হলেই ‘জয়গুরু’ দিয়ে সম্ভাষণ করেন। ভালো-মন্দ খোঁজখবর নেন। মাঝে-মাঝে ঠাকুরের কথা বলেন। বাড়িতে যেতে বলেন। একদিন সন্ধ্যা-প্রার্থনার আগে ওঁর বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। ভাবলাম, ওনার বাড়ীতেই না-হয় আজকের প্রার্থনাটা করে নেব। উনি দু’জন মা’কে নিয়ে বসে তখন ধ্যান করছিলেন। পরে জেনেছিলাম ওই দু-জনা ছিলেন ওঁর স্ত্রী ও কন্যা। সামনে ঠাকুরের একটা মাত্র প্রতিকৃতি। আমার উপস্থিতি বুঝতে পেরে বসতে বললেন। অনিচ্ছা সত্বেও বসলাম। অনিচ্ছা সত্বেও বলতে বাধ্য হলাম, কারণ, ওনার বাড়িতে ঠাকুরের ফটো ছাড়া জগজ্জননী বড়মা, শ্রীশ্রীবড়দা, আচার্য্যদেব শ্রীশ্রীদাদা, পূজ্যপাদ বাবাইদা, পূজ্যপাদ অবিনবাবু-দের কোন ছবি নেই। যা’— কিছুতেই যেন মেনে নিতে পারছিলাম না। আচার্য্য-পরম্পরাকে যে বা যারা মানে না, তারা ‘ইষ্টদ্রোহী’, আমি তাদের সঙ্গ সবসময় এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। তেমন শিক্ষাই পেয়েছি আমাদের ঋত্বিক দাদাদের কাছ থেকে। নতুন পরিচয়, তাই আগে থেকে বুঝতে পারিনি, যে দাদাটি ইষ্টদ্রোহী। আচার্য্য-পরম্পরা মানে না। মনে যাইহোক, ভদ্রতার খাতিরে মুখে বললাম, দাদা, সময় তো পার হয়ে গেল, প্রার্থনা করবেন না।
—‘এই তো করবো।’ বলেই উঠে দাঁড়ালেন।
পাশে বসে থাকা মায়েদের দিকে ইশারা করতেই শঙ্খধ্বনি, হুলুধ্বনি বেজে উঠল। অমনি দাদাটি ডান হাতটি উপরে তুলে, বাম হাতটিকে ঝুলন্ত রেখে কিসব বলতে লাগল। সবটা মনে নেই। তবে প্রথমদিকের শব্দগুলো— তমসার পার অচ্ছেদ্যবর্ণ মহান পুরুষ … গোছের এইরকম কিছু। (যা আমাদের উপাসনা বইতে লেখা আছে দেখেছি।) তারপর প্রার্থনা শুরু করলেন। প্রথম দুটো বিনতির পর ‘গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু’ না করে আবার কীসব বলতে শুরু করলেন। বাংলা আর সংস্কৃতে। তারপর শুরু করলেন ‘গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু’। তারপর আবার কতগুলো সংস্কৃত মন্ত্র আওড়াতে লাগলেন।—যা আমি কোনদিন কোন সৎসঙ্গ অধিবেশনে করতে দেখিনি। আমার ধৈর্য্যের, রাগের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছিল। তবুও কৌতুহল বশে নিজেকে সংযত করে নিলাম। ওনার মনগড়া প্রার্থনা শেষে আমাকে সত্যানুসরণ-এর একটি নির্দিষ্ট অংশ থেকে পাঠ করতে বললেন, আমি পাঠ করলাম—‘‘কোন-কিছু ‘আজ বুঝেছি আবার কাল বুঝা যায় না—হেঁয়ালি’ ইত্যাদি ব’লে শৃগাল সেজো না—কারণ, ইতর জন্তুরাও যা’ বোঝে তা’ ভোলে না। তাই, এই প্রকার বলাটাই দুষ্ট বা অস্থির-বুদ্ধির পরিচায়ক।’’
আমার পড়া শেষ হতেই উনি ‘চলার সাথী’ গ্রন্থ থেকে ‘সন্ধ্যা ও প্রার্থনা’ অংশটি পাঠ করলেন। পাঠ শেষ করে আমাকে একটা কীর্তন করতে বললে, আমি কিছুটা অনিচ্ছা সত্বেও ‘জয় রাধে রাধে’ কীর্তনটা করলাম। কীর্তনটা শেষ হলে উনি আমার খুব প্রশংসা করে বললেন, খুব ভাল লাগল তোমার কীর্তন,—‘ছাড়োরে মন কপট চাতুরি, বদনে বলো হরি হরি!’—কি অপূর্ব কথা! তাই না ভাই ?—তারপর যেন অনেকটা আক্ষেপের সুরেই বললেন, ‘কোথায় আর পারলাম কপটতা ত্যাগ করে ধর্মরাজ্যে প্রবেশ করতে!’ —ঠিক আছে! তাহলে ধ্বনি দিয়ে দি। কি বলো?
আমার সম্মতি পেয়ে উনি ‘বন্দে পুরুষোত্তমম্! বন্দে আর্য্য পিতৃন! বন্দে মাতৃবর্গান্! বন্দেহংকৃষ্টি দৈবতান্!— ইত্যাদি ধ্বনি দিয়ে প্রার্থনা-পর্বের ইতি টানলেন। বড়মা এবং আচার্য্যদেব-দের নামে কোন ধ্বনি দিলেন না। আমার মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। —এ তো অন্যায়! অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়াও তো অন্যায়। তাই আমি সহ্য করতে না পেরে বলেই বসলাম,—দাদা! আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি ?
—অনায়াসে করতে পার।
—আপনি চলার সাথী থেকে ‘সন্ধ্যা ও প্রার্থনা’-র বাণীটা পড়লেন, অথচ আপনি প্রার্থনার সময়সূচী মেনে প্রার্থনাটা করলেন না। আর প্রার্থনাটাকেও বিকৃত করে করলেন। যেগুলো ঠাকুর করতে মানা করে গেছেন। আর একটা কথা, আপনি আপনার বাড়ীতে শ্রীশ্রীবড়মা, শ্রীশ্রীবড়দা, শ্রীশ্রীআচার্য্যদেব, পূজনীয় বাবাইবাবা, পূজনীয় অবিনবাবুদের কোন ছবি রাখেন নি, তাঁদের নামে কোন ধ্বনিও দিলেন না!—কেন, জানতে পারি কি?
আমার কথা শুনে হা-হা করে হেসে উঠে বললেন, তোমার কথাটা ঠিক সোনার পাথরবাটির মত হয়ে গেল না-কি?
—তার মানে?
—তার মানে হলো এই, শ্রীশ্রীঠাকুর চলার সাথী গ্রন্থে ‘সন্ধ্যা ও প্রার্থনা’ শিরোনামে যে বাণীটি লিপিবদ্ধ করেছেন, তার মধ্যে তিনি তাঁর রচিত ‘আর্য্যসন্ধ্যা’ ও ‘প্রার্থনা’-র কথা বলেছেন। উক্ত প্রার্থনার অস্তিত্ব যেখানে বিলুপ্ত করা হয়েছে, সেখানে প্রার্থনা না করে প্রার্থনার-সময়সূচী দিয়ে কি হবে? আর ইষ্টাসনে সদগুরু ছাড়া অন্যান্য ছবি রাখতে গেলে তো সত্যানুসরণ থেকে ‘‘গুরুই ভগবানের সাকার মূর্ত্তি, আর তিনিই Absolute (অখণ্ড)।’’—লেখাটি বাদ দিতে হবে।
—প্রার্থনার অস্তিত্ব বিলুপ্ত করা হয়েছে মানে!— আপনি কি বোঝাতে চাইছেন? দেওঘরে, অসংখ্য কেন্দ্র-মন্দিরগুলোতে সকাল-সন্ধ্যায় তাহলে কি করা হয়?
—যা করা হয় সেগুলো শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র রচিত এবং নিদেশিত প্রার্থনা নয়। তুমি এ বিষয়ে যদি জানতে চাও, প্রার্থনা বিষয়ক প্রামাণ্য গ্রন্থ ঋত্বিগাচার্য্য প্রণীত ‘অনুসৃতি’ এবং ‘সৎসঙ্গ পাব্লিশিং প্রকাশিত ‘প্রার্থনা’ শিরোনামের গ্রন্থটি ভাল করে পড়ে নিও।
—দেখুন ওসব পড়ার আমার দরকার নেই। ওসব এখন অচল। আমরা আচার্য্যদেবের নির্দেশে ‘উপাসনা’ বইটাকে মেনে চলি। উপাসনা বইয়ের প্রথমেই লেখা আছে ১৯৬৫ সালে শ্রীশ্রীঠাকুর ওসব বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন।
আমার কথা শুনে দাদাটি ‘হো-হো’ করে আবার পাগলের মত হেসে উঠে বলল, তোমার কথার উত্তরটা ঠাকুর সত্যানুসরণের ৬৫ সংখ্যক পাতায় দিয়েছেন, যেটা আজকে তুমি পাঠ করলে। আমার প্রতি রাগ না করে, বাড়িতে গিয়ে বাণীটা ভাল করে বোঝার চেষ্টা করবে।
যাইহোক, লোকটার ব্যবহারে আন্তরিকতার সুর ছিল। ফেরার সময় আমাকে ৫টা ফল এবং কিছু ভ্রাতৃভোজ্যও দেয়। আমি স্থান ত্যাগ করে বাড়ি না ফিরে আমাদের মন্দিরে চলে যাই। এ বিষয়ে একটা হেস্তনেস্ত করার জন্য। ভাগ্য ভাল, দেখা পেয়ে যাই বিভাস সরকারদার। প্রবীণ ঋত্বিক-দেবতা। ঠাকুর দেখা মানুষ, আচার্য্যদেবের কাছের লোক, তাঁর কাছে গিয়ে ঘটনাটা খুলে বলি। তিনি সব শুনে বললেন, ঠিক আছে তুমি বাড়ি চলে যাও, দেখি কি করা যায়।
* * *
তারপর বেশিদিন কাটেনি। বিভাসদার সাথে সৎসঙ্গ সেরে ফিরছিলাম। ভাগ্যক্রমে দেখা হয়ে যায় অনিমেষদার সাথে। আমি বিভাসদার সাথে অনিমেষদার পরিচয় করিয়ে দিলে, বিভাসদা অনিমেষদাকে বলেন আপনি আমাদের গুরুভাই অথচ মন্দিরে আপনাকে দেখি না, কি ব্যাপার?
—‘আমি কি ওখানে ভণ্ডামি করতে যাব?’ অনিমেষদার অনভিপ্রেত উত্তর শুনে বিভাসদা বলেন—ভণ্ডামি বলছেন কেন, আমরা কি ওখানে ভণ্ডামি করছি?
—ওটা আমার কথা নয়, ঠাকুরের কথা।
—ঠাকুরের কথা! প্রমাণ দিতে পারবেন?
—অবশ্যই। তবে রাস্তায় নয় বাড়িতে চলুন, ঠাকুরের বই খুলে প্রমাণ দেব।
—দেখুন, এখন তো আপনার বাড়িতে যাওয়া সম্ভব না, বরং কাল সকালে প্রেয়ারের আগে মন্দিরে আসুন, প্রেয়ারের পর না হয় যুক্তিতর্ক করা যাবে।
—দেখুন, মনে কিছু করবেন না, আবার আমাকে অপ্রিয় কথা বলতে বাধ্য করলেন।
—এমন কি বললাম, যাতে আপনাকে অপ্রিয় কথা বলতে হবে?
—ওই যে প্রেয়ারের কথা বললেন না, আপনারা কি প্রেয়ার করেন, যে প্রেয়ার করতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন!
—এ আপনি কি বলছেন! দেওঘর থেকে নির্ধারিত প্রেয়ারের সময়সূচী মেনে রীতিমত মাইকের মাধ্যমে আমাদের মন্দিরে প্রেয়ার করা হয়, আপনি বলছেন, আমরা প্রেয়ার করি না! আপনি প্রমাণ করতে পারবেন তো?
—অবশ্যই।
—তাহলে কাল আসুন আপনার প্রমাণপত্র সব নিয়ে।
* * *
মন্দিরের কাছে বাড়ী হবার সুবাদে প্রায় প্রতিদিনই মন্দিরে গিয়ে সকালের প্রার্থনাটা করি। সেদিন প্রার্থনা শেষে দেখি অনিমেষদা এসেছেন। বিভাসদা ওনাকে নিয়ে গিয়ে বসালেন।
এবার বলুন আপনার বক্তব্য। ঠাকুরের বলা অনুযায়ী আমারা যে ভণ্ডামি করছি, প্রেয়ার করছি না, প্রমাণ করে দেখান।
অনিমেষদা সত্যানুসরণ গ্রন্থটি বের করে বলেন, আপনারা এই বইটিকে যদি মানেন, তাহলে দেখুন ৩১ পৃষ্ঠায় রয়েছে, ‘‘গুরুই ভগবানের সাকার মূর্ত্তি, আর তিনিই Absolute (অখণ্ড)।’’ আবার ৫৭ পৃষ্ঠায় ঠাকুর আত্ম-প্রচারকদের ভণ্ড বলেছেন।
—ঠাকুর, আত্ম-প্রচারকদের ভণ্ড বলেছেন, আমরা তো আর আত্ম-প্রচারক নই!
—গুরুর পাশে শিষ্যদের ছবি রেখে প্রচার করা কি সত্য প্রচারের নামে আত্ম-প্রচার করা নয়?— আপনারা প্রার্থনার নামে দয়ালবাগ সৎসঙ্গের যে বিনতি করেন, সেই বিনতিতে বলেন :
“তুম্ বিন কোই সমরথ নহী জাসে মাঁগু দানা”
“রাধাস্বামী গুরু সমরথ তুম বিনা আউর্ ন দুসরা ।”
আবার শঙ্করাচার্য্য রচিত গুরু বন্দনায় বলি—
“গুরোঃ পরতরং নাস্তি…..”
“কেবলং জ্ঞানমূর্ত্তিম্ ।”
ওই মন্ত্রগুলো একমাত্র গুরুকে উদ্দেশ্য করেই যদি বলা হয়ে থাকে তাহলে গুরুর আসনের পাশে কি গুরুর শিষ্যদের ছবি রাখা যায়? একটা প্রাইমারি স্কুলেও হেড্ স্যরের চেয়ারের একটা আলাদা মর্যাদা থাকে, আপনারা দাদা-প্রীতির নামে সে মর্যাদাটুকুও ক্ষুণ্ণ করে চলেছেন, এগুলোকে কি আত্মপ্রচার বলে না?
বিভাসদাকে নিরুত্তর থাকতে দেখে অনিমেষদা বললেন, আপনারা যারা ঠাকুরের সাথে ঠাকুরের শিষ্যদের প্রচার করতে গিয়ে তাদের প্রতিকৃতিরও পূজা করছেন, তা ভণ্ডামি নয় কি? এই গেল ভণ্ডামির উত্তর। এরপর রয়েছে প্রেয়ার। এই দেখুন সৎসঙ্গ পাব্লিশিং প্রকাশিত ২ খানি গ্রন্থ। এটি শ্রীশ্রীঠাকুরের ইংরেজী ভাষায় লিখিত ‘লর্ডস্ প্রেয়ার’। ভাল করে দেখে বলুন তো এই প্রেয়ার আপনারা করেন কি-না?’
বিভাসদা বইটা নেড়েচেড়ে দেখে বললেন, ‘না করি না’।
—‘তাহলে দেখুন ‘প্রেয়ার’ না করেই মিথ্যা প্রেয়ারের গর্ব করে চলেছেন। ঠাকুরের ভাষায় এর নাম দ্বন্দ্বীবৃত্তি। সবচাইতে বড় পাপ। ঠিক আছে, ইংরেজীর কথা বাদই না হয় দিলাম, বাংলা ভাষায় ঠাকুরের লেখা ‘প্রার্থনা’ নামে একটা বই আছে এবং সেই বইটাও সৎসঙ্গ পাব্লিশিং থেকে প্রকাশিত। প্রথম প্রকাশ ১৯৪৯ সালে। ভাল করে দেখুন তো, এই বইয়ের কোন নির্দেশ মেনে আপনারা প্রার্থনা করেন কি-না?’
বিভাসদা বইটা ভাল করে নেড়েচেড়ে দেখে বললেন, ‘না, করি না’।—তবে এই প্রার্থনা করতে তো ঠাকুরই নিষেধ করে গেছেন ১৯৬৫ সালে, উপাসনা বইতে যা স্পষ্ট করে লেখা রয়েছে।
—মনে কিছু করবেন না দাদা, যাকে আমরা ঠাকুর বলে মানি, সেই তিনিই যদি তাঁর রচিত প্রার্থনা করতে নিষেধ করেন, তাহলে তাঁর নাম করে দীক্ষার সঞ্চারণা করাও তো আর একটা ভণ্ডামি! কোন সাবজেক্ট নেই, সিলেবাস নেই অথচ ধরে ধরে এনে ছাত্র ভর্তি! কোন বুদ্ধিমান মানুষ কি মেনে নেবেন? আপনি যদি সত্যি-সত্যিই নিজেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের শিষ্য বলে মনে করেন তাহলে একটা কাজ অবশ্যই করা উচিত, আপনাদের আচার্য্যদেবকে বলে সত্যানুসরণ থেকে ‘‘কোন-কিছু ‘আজ বুঝেছি আবার কাল বুঝা যায় না—হেঁয়ালি’ ইত্যাদি ব’লে শৃগাল সেজো না—কারণ, ইতর জন্তুরাও যা’ বোঝে তা’ ভোলে না। তাই, এই প্রকার বলাটাই দুষ্ট বা অস্থির-বুদ্ধির পরিচায়ক।’’ এই অংশটা বাদ দিতে বলে বলে দিন।
—কেন, প্রার্থনার সাথে সত্যানুসরণের বাণীর সম্পর্ক কি?
—কারণ, পুরুষোত্তম যদি অভ্রান্ত হয়েই থাকেন, তাঁর নিদেশিত কোন বিধির পরিবর্তন তিনি কখনোই করেন না, কেউ করুক, তা-ও তিনি অনুমোদন করেন না, এমনকি কাউকে পরিবর্তন করার অধিকারও দেন না। তাই তিনি সত্যানুসরণের ওই বাণীতে বললেন, ‘ইতর জন্তুরাও যা’ বোঝে তা’ ভোলে না।’ তাই আমার তো মনে হয়, ঠাকুর তাহলে ভুল করে ওই বাণীটা দিয়েছিলেন, না হলে আপনারা তাঁর রচিত এবং নিদেশিত আহ্বানী, সন্ধ্যা ও প্রার্থনা-র সবটা বাদ দিয়ে, তাঁর নিদেশকে অমান্য করার ধৃষ্টতা দেখাতে পারতেন না!
—দেখুন, আপনি আমাদের যতই যুক্তি দেখান, আমাদের ভোলাতে পারবেন না। এতক্ষণে বুঝতে পারলাম, আপনারা ঠাকুরের নির্দেশের আচার্য্য-পরম্পরা মানেন না। সে আপনারা না মানুন, আমরা কিন্তু আচার্য্যদেবের নির্দেশের বাইরে এক পা-ও চলতে রাজী নই।
—খুব ভাল কথা, আপনি আমাকে বললেন, ‘‘আপনারা ঠাকুরের নির্দেশের আচার্য্য-পরম্পরা মানেন না।’’ একটা প্রশ্নের উত্তর দিন তো, আপনারা উপাসনা, অধিবেশন বা সৎসঙ্গ করার সময় আসনে আচার্য্য-পরম্পরার নামে বা অজুহাতে যাঁদের প্রতিকৃতি রাখেন, তাঁদের দেওয়া কোন প্রার্থনা, উপাসনা করেন কি?—অতএব আপনারা যে পদ্ধতিতে আচার্য্য-পরম্পরা মেনে চলছেন, ওইভাবে মেনে চলার কথা ঠাকুর কোথায় বলেছেন, তাঁর বলা প্রামাণ্য শ্রুতিবাণী থেকে প্রমাণ দেখাতে পারবেন?
কেন জানি বিভাসদা কোন উত্তর দিতে পারলেন না দেখে অনিমেষদা বললেন, অভিধান মতে আচরণসিদ্ধ ব্যক্তিকেই ‘আচার্য্য’ বলে। যিনি যে বিষয়ের আচার্য্য হবেন, তাঁকে সে বিষয়ে আচরণসিদ্ধ হতে হবে। যেমন, আমরা নিউটন, আর্কিমিডিস, আইনস্টাইন প্রমুখ বিজ্ঞান-আচার্য্যদের কেউ দেখিনি। তাঁরা বিগত হবার পর তাঁদের আবিষ্কৃত সূত্র বা জ্ঞানের সাথে পরিচিত হই তাঁদের লিখে রাখা বইয়ের মাধ্যমে, তাঁদের বংশধরদের মাধ্যমে নয়। সেই বইগুলো বাজারে সহজলভ্য হলেও আমরা বই পড়ে সেগুলো নিজে নিজে আয়ত্ব করতে পারি না বলেই শিক্ষকদের মাধ্যমে শিখতে হয়। এবার কোন শিক্ষক যদি ওই বিজ্ঞান-আচার্য্যদের মূল সূত্রগুলো বাদ দিয়ে ভুল শেখাতে শুরু করেন এবং প্রতিপত্তির জোরে বংশানুক্রমিকভাবে জ্যেষ্ঠ-সন্তান-পরম্পরা চালাতে থাকে, মূলসূত্র জানা কোন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছাত্র কি তা মেনে নেবেন?
—তা কি করে হয়!
—তাই যদি না হয়, তাহলে আপনারা কোন্ হিসেবে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মূলসূত্র অর্থাৎ আদর্শকে সযত্নে পরিহার করা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জ্যেষ্ঠ সন্তান পূজনীয় অমরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এবং পরবর্তী বংশানুক্রমিকভাবে জ্যেষ্ঠ-সন্তান-পরম্পরাদের ছবি পুজো করতে শুরু করেছেন? এঁরা কিসের আচার্য্য এবং কোন্ আচরণ দ্বারা আপনাদের শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শ বিষয়ে শিক্ষিত করেছেন বা করছেন?
—দেখুন কিসের সাথে কিসের তুলনা করছেন? আমাদের দেশে আচার্য্য প্রথা কুলগুরু প্রথা কি চালু নেই?
—আপনি যখন বলছেন, থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু ঠাকুর এ বিষয়ে কোন বাণীতে কি বলে গেছেন, সে সম্পর্কে যদি কিছু জানা থাকে বলুন।
—না, ওগুলো আমার শোনা কথা, কোন বাণীতে কি বলে গেছেন তা বলতে পারব না। তবে—
“ইষ্টগুরু পুরুষোত্তম
প্রতীক গুরু বংশধর,
রেতঃ শরীরে সুপ্ত থেকে
জ্যান্ত তিনি নিরন্তর।”
এই বাণীটা যদি ঠাকুরের দেওয়া হয় তাহলে বংশধররা কি প্রতীক-গুরু নয়?
—অবশ্যই। তাহলে তো আপনাদের আচার্য্যদেবদের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে যে!
—তার মানে?
—তার মানে অতি সহজ। অবতার-তত্ত্বের কোন অস্তিত্ব থাকবে না। কারণ রামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীস্ট, হজরত মহম্মদ, চৈতন্যদেব, রামকৃষ্ণদেব-দের রেত-শরীরের সাথে ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের কি কোন সম্পর্ক আছে?
—তা’ কি করে থাকবে! তাছাড়া চৈতন্যদেব ও রামকৃষ্ণদেবের তো কোন সন্তানই ছিল না।
—ঠিক তাই। তাহলে চৈতন্যদেবের পূর্ববর্তী পুরুষোত্তম যিনি ছিলেন বলে আপনার মনে হয়, তাঁর সর্বশেষ বংশধরদের মধ্যে প্রতীক গুরু খুঁজে দীক্ষা নিয়ে ধর্ম পালন করা উচিত। তাই নয় কি? তা করতে পারা কি আপনাদের দ্বারা সম্ভব হবে?
বিভাসদাকে নিরুত্তর থাকতে দেখে অনিমেষদা বলেন, তা যদি না হয়, তাহলে ওই বাণীর উপর ভিত্তি করে আচার্য্য-পরম্পরার নামে কুলগুরুগিরির ব্যবসা চালানো থেকে অবিলম্বে বিরত হওয়া উচিত।
শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুসারে পিতা থেকে পুত্র জন্মায়। পুত্র, পিতার অছি (trustee) মাত্র। যে পুত্র পিতার অছি-কে বহন করে সমৃদ্ধ করে তাকেই পিতার আদর্শ পুত্র বলবে সবাই। তাই বলে পুত্র কখনো পিতা হতে পারে না। তাই যদি হতো বিশ্বশ্রবা ঋযির পুত্র বিভীষণকে আদর্শ পুত্র না বলে রাবনকে তো বলতে পারতেন শ্রীশ্রীঠাকুর। আপনারা ওই বাণীকে ভিত্তি করে, ঠাকুরের মূল আদর্শ বাদ দিয়ে বংশানুক্রমিকভাবে জ্যেষ্ঠ-সন্তান-পরম্পরার চতুর্থ পুরুষকে পর্যন্ত ঠাকুর বানিয়ে ছেড়েছেন। অথচ ঠাকুরের প্রথম বংশধরদের মধ্যে একমাত্র জীবিত সন্তান—পূজনীয় কাজলদাকে বংশধর বলে গণ্য করছেন না। আপনারা সত্যিই যদি উপরের ওই বাণীকে মর্যাদা দিতেন তাহলে সর্বাগ্রে তাঁর পুত্রকে কীলকেন্দ্রে বসাতেন। যুক্তিসঙ্গত যা’, তা’ না করে আপনারা মনগড়া আচার্য্য-পরম্পরায় মেতে উঠে সৎসঙ্গের মূল আচার্য্যের অনুশাসনকে নিকেশ করে দিলেন! ইতিহাস কি আপনাদের কোনদিন ক্ষমা করবে?
শাস্ত্রের ব্যাখ্যা অনুযায়ী পরাবিদ্যায় আচরণসিদ্ধ ব্রহ্মজ্ঞ ইষ্টগুরুকে আচার্য্য এবং অপরাবিদ্যায় আচরণসিদ্ধ শিক্ষাগুরুকে উপাচার্য্য বলা হয়। বীরশ্রেষ্ঠ অর্জুনের কৃপাচার্য্য, দ্রোণাচার্য্য, ধৌম্য নামে তিনজন উপ-আচার্য্য থাকা সত্বেও পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণকে আচার্য্য পদে বরণ না করা পর্য্যন্ত তিনি দুর্বলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারেন নি। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রও পূর্ববর্তী পুরুষোত্তমদের আচার্য্য হিসেবে মেনে চলতেন। এবং মেনে চলতে বলেছেন। তাঁর বলা অনুযায়ী—
সত্তার মূলই হ’ল আত্মা,
আর, এই আত্ম-সমীক্ষুই আত্মবিৎ—
আর, তিনিই আচার্য্য ;
তদন্বিতবৃত্তি ও তৎসমাহিতচিত্ত যিনি—
তিনিই বোধ করেন তাঁ’কে অখণ্ড সচ্চিদানন্দ—
আত্মার মূর্ত্ত প্রতীক। ৩৩১ । (সম্বিতী)
পুরুষোত্তম আসেন যখন
ইষ্ট, আচার্য্য তিনিই গুরু,
তিনি সবার জীবন-দাঁড়া
তিনিই সবার জীবন-মেরু।
তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর ওই নিদেশ অমান্য করা শুরু হয়েছিল বলেই তিনি অমান্যকারীদের উদ্দেশ্যে বাণী দিয়ে বললেন—
আচার্য্য ছেড়ে আচার্য্য ধরলি
মূর্খতাতে দিলি পা,
জ্ঞানের বুকে মারলি ছুরি
লাভ হ’ল তোর ধৃষ্টতা।
আর কুলগুরু অর্থাৎ কৌলগুরু-পরম্পরার কথা যদি বলেন, তাহলে শুনুন—আর্য্যকৃষ্টির রক্ষক সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পুরোহিত রঘুবংশের কৌলগুরু ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠদেব শ্রীরামচন্দ্রকে ‘‘ওঁ নারায়ণঃ পরাবেদা নারায়ণঃ পরাক্ষরঃ।/নারায়ণঃ পরামুক্তি নারায়ণঃ পরাগতিঃ॥’’ মন্ত্রে স্বস্তিবাচন করার সময় শ্রীরামচন্দ্রের মধ্যে পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণকে উপলব্ধি করলে তিনি নারায়ণের পরিবর্তে রামচন্দ্র শব্দ বসিয়ে মন্ত্রটিকে পরিমার্জিত করেন। নররূপী নারায়ণ পুরুষোত্তম রামচন্দ্রকে কেন্দ্র করে সবাইকে ধর্ম পালন করতে উদ্বুদ্ধ করলেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন—-গুরু মানেই সদগুরু–আচার্য্য। গুরু-পুরুষোত্তমই সচ্চিদানন্দের মূর্ত্ত বিগ্রহ, তিনিই রূপায়িত ঈশ্বর প্রেরণা, তিনিই আত্মিক শক্তির প্রোজ্জ্বল প্রকাশ, অস্তিবৃদ্ধির পরম অমৃতপথ। দুনিয়ার যত দ্বন্দ্বের মাঝে অন্বয়ী সার্থকতার সারকেন্দ্র তিনিই। তাঁকে ভালবেসে, তাঁর ইচ্ছা পরিপূরণ ক’রে, তদনুগ আত্মনিয়ন্ত্রণে, তাঁরই সঙ্গ, সাহচর্য্য ও সেবার ভিতর-দিয়ে মানুষ ঈশীস্পর্শ লাভে ধন্য হয়। আর গুরু-পুরুষোত্তমকে direct (সরাসরি) যারা না পায়, তারা তঁদনুবর্ত্তী আচার্য্য-পরম্পরার ভিতর দিয়ে তাঁর ভাবটাই কিছু না কিছু পায়।…….. (আঃ প্রঃ ১/৪. ১২. ১৯৪১)
তাঁর অবর্তমানে তাঁর আদর্শের ধারার প্রবহমানতা রক্ষা করার জন্য তঁদনুবর্ত্তী আচার্য্য-পরম্পরা বজায় রাখতে আচার্য্য হবার যোগ্যতাও নির্ধারণ করে বাণী দিলেন।
‘‘চরিত্র ও চর্য্যার
নিষ্ঠা-বিনায়িত ইষ্টার্থবাহী
বাস্তব সঙ্গতিশীল
সার্থক অনুচলন যা’র নাই—
বাক্য ও ব্যবহারে উদ্ভিন্ন হ’য়ে,—
সে কিন্তু আচার্য্য হ’তে পারে না ;
আচার্য্য হওয়ার ন্যূনতম ভূমিই এই। ১৯ ।’’ (আদর্শ-বিনায়ক)
উপরোক্ত বাণীতে কোথাও কি তাঁর বংশধরদের কথা, জ্যেষ্ঠ-পরম্পরার কথা উল্লেখ করেছেন? তথাপি ওই নিদেশ-বাণীকে যদি আপনাদের আচার্য্যদেব মানতেন এবং সব্বাইকে মানাতে উৎসাহিত করতেন, তাহলে সৎসঙ্গের নীতি ও আদর্শ নিয়ে এত দলাদলি, ভেদাভেদ হবার কোন সুযোগই থাকত না। তাঁরা যদি তাঁদের মধ্যে ঠাকুরত্বকে জাগ্রত রাখার সদিচ্ছা পোষণ করতেন, তাহলে ইষ্টগুরু পুরুষোত্তম প্রদত্ত নিত্যকর্মের আবশ্যিক অনুশাসন, যেমন আহ্বানী, আচমণ, পুরুষোত্তম বন্দনা, আর্য্য-সন্ধ্যা, পঞ্চবর্হিঃ ও সপ্তার্চ্চিঃ মন্ত্রগুলো প্রার্থনা থেকে বাদ দিয়ে ‘প্রার্থনা-সময়সূচী’-র প্রচার করে নিত্য প্রার্থনা নামের পরাকাষ্ঠা দেখাতেন না। ঠাকুরের রচিত ইষ্টভৃতির মন্ত্র “ইষ্টভৃতির্ময়াদেব কৃতা প্রীতৈ তব প্রভো। ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ॥” বাদ দিয়ে অন্য মন্ত্র চালু করা হতো না! এ বিষয়েও তিনি আমাদের সচেতন করে দিতে বলে গেছেন—
মতবাদ যাই হোক না,—
আর, যে-কোন সম্প্রদায়ই হোক,
যা’ মুখ্যতঃ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’কে
স্বীকার করেনিকো—
কোন-না-কোন রকমে,—
তা’ কখনও অনুসরণ করতে যেও না,
তা’ কিন্তু জঘন্য—অসম্পূর্ণ,
সত্তা-সম্বর্দ্ধনার পরিপন্থী তা’ ;
আর, ঐ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’ই হ’চ্ছে
সেই রাজপথ—
যা’কে স্বীকার ও গ্রহণ ক’রে চললে
ক্রমশঃই তুমি সার্থকতায় সমুন্নত হ’তে পার। ২৩৪ । (সম্বিতী)
ওই বাণী অনুসারে আপনারা জঘন্য পথে চলছেন চলুন। তাই বলে আমাকেও কি চলতে হবে? দেখুন দাদা, ঠাকুরের বলা বাণীকে অমান্য করে, ঠাকুর-বিরোধী চলনে চলার অধিকার আপনার বা আপনাদের যেমন আছে, তেমনি মান্য করার অধিকার তো আমার থাকা উচিত। তাই আমার একটা অনুরোধ আপনাদের বিচারে কোন গোষ্ঠীদ্বারা ঘোষিত বা নির্বাচিত আচার্য্যদেব(গণ) যদি সবই হয়, তাঁরাই যদি আপনাদের একমাত্র উপাস্য হয়, তাহলে শ্রীশ্রীঠাকুরের নাম না নিয়ে, তাঁর প্রতিকৃতি না রেখে, আপনাদের আচার্য্যদেবের প্রতিকৃতির উপাসনা করুন,—আমার কোন আপত্তি নেই, কিন্তু ঠাকুরের নামে মন্দির করে, ঠাকুরবাড়ি নাম দিয়ে ঠাকুরের আদর্শবিরোধী চলনে চলতে দেখলে প্রতিবাদ হবেই। আমরা শ্রীশ্রীঠাকুরের কৃষ্টিসন্তান, আমাদের উপর তিনি কাতর আবেদনে কিছু দায়িত্ব দিয়ে গেছেন—
‘‘আর্য্যকৃষ্টির যা’ ব্যাঘাত
খড়্গে তোরা কর নিপাত।

ভণ্ড ঠগী দেখবে যেথায়
করো সামাল সবায়,
কেউ যেন না ঠকে পড়ে
ওদের ভাঁওতায়।’’
‘‘বড়খোকাই হো’ক—, মণিই হো’ক—বা কাজলই হো’ক— বা আপনারাই হোন— আপনাদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই আমি আশা করি যে আপনারা নিজেদের জীবনে ও চরিত্রে আমাকে বহন ক’রে নিয়ে বেড়াবেন এবং অন্যের কাছেও আমাকে পৌঁছে দেবেন—অবিকৃতভাবে, অবশ্য প্রত্যেকে তার বৈশিষ্ট অনুযায়ী। আর আমাকে বহন করা ও পৌঁছে দেওয়া মানে, আমার mission (আদর্শ ও উদ্দ্যেশ্য)-কে বহন করা ও পৌঁছে দেওয়া, আর আমার mission (আদর্শ ও উদ্দেশ্য) মানে সকলের mission (আদর্শ ও উদ্দেশ্য)। জীবনীয় প্রতিটি যা’-কিছুর ইষ্টানুগ সত্তাসম্বর্দ্বনাই আমার mission (আদর্শ ও উদ্দেশ্য)।’’ (আ. প্র. ৩/১৭. ১. ১৯৪২)
‘‘মানুষ, গোরু, পোকা-মাকড়, এমনকি একটা পিঁপড়া পর্য্যন্ত বাঁচতে চায়। মরতে চায় না কেউ। আমিও না। কিন্তু মানুষের শরীর চিরকাল থাকে না, এও ঠিক। তাই আমি বেঁচে থাকতে চাই আপনাদের মধ্যে। আপনারাই আমাকে ব’য়ে নিয়ে বেড়াবেন যুগ যুগ ধরে, ………….. আমাকে এইভাবে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আপনারা গ্রহণ করুন। নইলে আমার কথাগুলি প্রাণ পাবে না। সেগুলি শূন্যে হাহাকার করে ফিরবে।’’ (আ. প্র. খণ্ড ১৮, পৃঃ ২৫০)
এবার আমার প্রশ্ন, আপনাদের আচার্য্যদেব শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ পালনের মৌলিক ব্যাপারটা তো বিকৃত করে রেখেছেনই, আদর্শ প্রচারের জন্য কি কি করেছেন?
—কেন, কত মন্দির তৈরি করেছেন, গণদীক্ষা দেওয়া চলছে।
— ঠিক বলেছেন, মন্দির অবশ্যই হয়েছে বা হচ্ছে তা’ কিন্তু ঠাকুরের ঈপ্সিত মন্দির নয়, আপনাদের আচার্যদেবদের ঈপ্সিত।
—এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত কোন প্রামাণ্য তথ্য দেখাতে পারবেন?
—তাহলে মনোযোগ দিয়ে শুনুন—মন্দির, শ্রীমন্দির ও সৎসঙ্গ বিহার-এর গঠনতন্ত্র প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন—‘‘সব মন্দিরই শ্রীমন্দির। জায়গায় জায়গায় মন্দির বা সৎসঙ্গ বিহার ঠিক করা ভাল, যাতে লোকে meet (সাক্ষাৎ) করতে পারে। সেখান থেকে মানুষকে সবভাবে infuse (উদ্বুদ্ধ) করতে হবে। ধর্ম্ম কী, কৃষ্টি কী, সদাচার কী, বিবাহের নীতি কী, যোগ্যতার অনুশীলন কিভাবে করতে হয়, সেবানুচর্য্যার ভিতর দিয়ে সবাই পারস্পরিকভাবে সম্বন্ধান্বিত হয় কিভাবে ইত্যাদি কথা সেখান থেকে চারাতে হবে। মানুষকে practically educated (বাস্তবভাবে শিক্ষিত) করে তুলতে হবে। তাছাড়া মানুষের জন্য যতখানি যা করা যায় তাও বাস্তবভাবে করতে হবে মন্দিরগুলিকে কেন্দ্র করে। মন্দির থাকলে, ঋত্বিক থাকবে, dispensary (চিকিৎসাকেন্দ্র), হাসপাতাল, গবেষণাগার, তপোবনের শাখা ইত্যাদি থাকবে। হয়তো ঐ মন্দিরগুলিই এক একটা university (বিশ্ববিদ্যালয়) বা সর্ব্বতোমুখী শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।’’ (আলোচনা-প্রসঙ্গে, ২১ খণ্ড, পৃঃ ৩১, ৪ঠা বৈশাখ, ১৩৫৯, বৃহস্পতিবার, ইং ১৭-০৪-১৯৫২) এই বইটাও কিন্তু আপনারা প্রকাশ করেছেন। এবার বলুন কি বলবেন, ঠাকুরের ঈপ্সিত মন্দির আপনারা কোথায় কোথায় করেছেন?
অনিমেষদার প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারলেন না বিভাসদা।
তাই কিছুক্ষণ থেমে অনিমেষদাই বললেন, দেখুন দাদা, শ্রীশ্রীঠাকুর মূলতঃ মানবদেহটাকেই শ্রীবিগ্রহ মন্দির করে গড়ে তুলতে বলেছেন। আমাদের মনগড়া মন্দির-নির্মাণ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন—‘‘আমার নামে দেখবে অনেক মন্দির হবে | কিন্তু আমার ইচ্ছা করে তোমাদের হৃদয়টা, চলমান জীবনটা আমার জাগ্রত মন্দির হোক | এবং আমাকে তোমরা সর্বত্র বয়ে নিয়ে বেড়াও | ধর্ম মানুষের জীবনের মধ্যে না থাকলে, আচরণের মধ্যে না থাকলে, ধর্মসঙ্ঘ থাকা সত্ত্বেও ধর্ম লোপ পায় | এবার সে ব্যাপারটা ঘটতে দিও না | আমার কথাগুলি মনে রেখো | এবং আমার কথাগুলি পৃথিবীর লোকে যাতে জানতে পারে, সময়মত তার ব্যবস্থা ক’রে যেও | কে কখন উপযুক্ত লোক আসবে, ঠিক কি? তবে আমার কাজটা হ’লো ঈশ্বরকোটি পুরুষের কাজ | যুগে যুগে তারা আসে | ঈশ্বর ছাড়া আর কিছুই তাদের মজাতে পারে না |’’
‘‘আমি নগণ্য মানুষ, কিন্তু পরমপিতা আমাকে দিয়ে যা বলালেন, যা করালেন, মনুষ্যসমাজ তার উপর না দাঁড়ালে, সব জ্ঞানগুণ সত্ত্বেও পৃথিবী মারামারি, হানাহানি, কাটাকাটির হাত থেকে রেহাই পাবে না। মানুষের সব শক্তি নিয়োজিত হবে সপরিবেশ আত্মহননে এবং জীবনের ভিত্তিভূমির ধ্বংসসাধনে। আমার বিশ্বাস, তোমরা যদি না কর, হয়ত বাইরের লোক এসে এ কাজ করবে। তোমরা যেই হও আর যাই হও না, বিকৃত হ’লে এ কাজ করবার অধিকার ও
যোগ্যতা হারিয়ে ফেলবে। কামিনী-কাঞ্চনাসক্ত কতকগুলি ওঁছা লোক তোমাদের কাছে ভীড় জমাবে এবং আত্মস্বার্থের জন্য পরস্পর শকুনের মত কামড়াকামড়ি করবে। সৎসঙ্গে একদিন বৃষ্টির জলের মত টাকাবৃষ্টি হবে। সেই দিনই সৎসঙ্গের বিপদের দিন। ঐশ্বর্য ও ক্ষমতায় মাথা ঠিক থাকে খুব কম লোকেরই। যারা মনে করে ঐশ্বর্য্য ও শক্তি পরমপিতার, তিনিই মালিক, আমি এর
অছিমাত্র, কাজলের ঘরে থাকা সত্ত্বেও তাদের গায়ে কালি লাগে না। নইলে মুস্কিল আছে।’’
(‘আলোচনা-প্রসঙ্গে’-র সংকলক প্রফুল্ল কুমার দাস, এম.এ, প্রতি-ঋত্বিক প্রণীত
‘স্মৃতি-তীর্থে’ গ্রন্থের পৃষ্ঠা ১০২-১০৫ থেকে নির্বাচিত বাণী।)
শ্রীশ্রীঠাকুরকে যদি মেনেই থাকেন তাহলে ঠাকুরের নিদেশ মেনে চলা উচিত। তাহলে কোন্ নিদেশ মেনে আপনাদের আচার্য্যদেব(গণ) ঠাকুরের নামে একের পর এক মন্দির নির্মাণ করে ইষ্ট প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে আত্ম প্রতিষ্ঠা করে চলেছেন!—এর কি উত্তর দেবেন বলুন?
আর গণদীক্ষার কথা বলেছিলেন তো? তাহলে শুনুন—ঠাকুরের মতে, দীক্ষা হলো, কোন আদর্শকে সঞ্চারণা করার মাধ্যম। ঠাকুরের মূল আদর্শ—ঈশ্বর এক, ধর্ম এক, প্রেরিত-পুরুষ সেই এক-এরই বার্তাবাহী-র বার্তায় সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা। দীক্ষার মাধ্যমে নাম-ধ্যান, শবাসন, থানকুনি পাতা সেবন, সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার গ্রহণ, পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চিঃ-র অনুশাসন মেনে সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন যাপন বিষয়ে উপদেশ দান এবং নিয়মনাগুলো শিখিয়ে দেওয়া। ওই নিয়মনাকে স্বীকৃতি দান করার মাধ্যম হল ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ পালন—যা দীক্ষাপত্রে উল্লেখ থাকে। এর জন্য কম করে ৩০ মিনিট সময় লাগা উচিত। অথচ গণদীক্ষার নামে যে ভাবে, যে হারে দীক্ষা দেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে তা নিয়ে একটা কর্মশালার মাধ্যমে সমীক্ষা চালালেই দেখা যাবে, তথাকথিত বেশিরভাগ দীক্ষিতগণ, ইষ্টাসনে একাধিক ফটো রেখে তার সামনে বসে বিনতি করা (যদিও তা’ সংখ্যায় নগণ্য), ইষ্টভৃতি এবং আচার্য্যভৃতির নামে পয়সা রাখা এবং মাস গেলে ‘উপযোজনা কেন্দ্রে’ পৌঁছে দেওয়া ভিন্ন কিছুই তারা জানে না।
শ্রীশ্রীঠাকুরের জীবদ্দশায় একসাথে শতাধিক লোককে বসিয়ে দীক্ষা দান করার কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনার কথা জানা যায় নি। তৎকালিন ঋত্বিক দেবতারাও ছিলেন শ্রদ্ধা আকর্ষণী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তথাপিও শ্রীশ্রীঠাকুরকে আক্ষেপ করে বলতে হয়েছিল, —‘‘বৃত্তিতে তেল মালিশ করে বা স্বার্থপ্রত্যাশাকে উসকে দিয়ে মানুষকে দীক্ষিত করতে নেই। তা’তে মানুষ asset (সম্পদ) হয় না।’’ (আ. প্র. ৫ম খন্ড, ২৯. ১২. ১৯৪৩)
—‘‘দ্যাখেন, (বীরেন ভট্টাচার্য্যের প্রতি) আজকাল আপনারা কতলোক দীক্ষা দিচ্ছেন, কিন্তু তার বেশীরভাগই বাজারী। ……ধর্ম্ম বলতে আমি যে সর্ব্বতোমুখী সঙ্গতিশীল কেন্দ্রানুগ কর্ম্মময় সার্থক জীবনের কথা বলি, তা অনেকেরই মাথায় ঢোকে না। ভাবে, আমাকে দিয়ে পরকালের পথ করে নেবে। কিন্তু পরিবার, দেশ, সমাজ, জাতি ও জগতকে …..দুনিয়াটাকে স্বর্গ করে তুলবে সে কথা আর ভাবে না।’’ (আলোচনা প্রসঙ্গে ৩য় খণ্ড, ১৩ই চৈত্র, শনিবার, ১৩৪৮, ইং ২৮। ৩। ১৯৪২)
পরিবার, দেশ, সমাজ, জাতি ও জগতকে …..দুনিয়াটাকে স্বর্গ করে তোলার জন্য একদা দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রম থেকে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল, আলোচনা পত্রিকার, মাঘ সংখ্যার, ১৫০ পৃষ্ঠা থেকে তার একটা ক্ষুদ্র চিত্র তুলে ধরছি।
“সৎসঙ্গের বর্তমান সর্বপ্রধান লক্ষ্যবস্তু হইল বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার, দেশীয় ঔষধপত্র প্রস্তুতের রসায়ণাগার ও কারখানা, হাসপাতাল, প্রসূতিসদন, বালক-বালিকাদের শিক্ষার জন্য উচ্চ বিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্র, কুটির-শিল্প ভবন, কৃষিপরীক্ষা-ক্ষেত্র প্রভৃতি স্থাপন পূর্বক পাবনার ন্যায় একটি আদর্শ পল্লী-উন্নযন কেন্দ্রের পুণঃ প্রতিষ্ঠা করা। প্রসঙ্গতঃ ইহা উল্লেখযোগ্য যে, অতীতের সেই পাবনা-সৎসঙ্গ পল্লী সংগঠনের উজ্জল আদর্শরূপে অদ্যাপি সারা ভারতে প্রসিদ্ধ হইয়া আছে. আর শুধুমাত্র বিহারেই নয়, পরন্তু ভারতের সকল প্রদেশেই এইরূপ আদর্শ কেন্দ্র স্থাপন করাই সৎসঙ্গের অভিলাষ।
শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি আবাসিক পল্লী-বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন পূর্বক শ্রীশ্রীঠাকুরের পরিকল্পনাগুলির বাস্তব রূপায়নের উচ্চাকাঙ্খাও সৎসঙ্গ পোষণ করিয়া চলিয়াছে।……” (আলোচনা, মাঘ, ১৩৬৫/পৃঃ ১৫০)
উক্ত দলিল থেকে প্রাপ্ত সংবাদে এটুকু বোঝা গেল যে, পাবনার হিমাইতপুর আশ্রমে শ্রীশ্রীঠাকুর যথেষ্ট প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে যে-সব কর্ম-প্রতিষ্ঠানসমূহ গড়ে তুলেছিলেন, তদনুরূপ কেন্দ্র ভারতের প্রতিটি প্রদেশে স্থাপন করা হবে। এবং একটি শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে,—যা শ্রীশ্রীঠাকুরের এক অন্যতম ইচ্ছা।
এবার দেখে নেওয়া যাক পাবনার হিমাইতপুর-আশ্রমের কর্ম-প্রতিষ্ঠানসমূহের এক সংক্ষিপ্ত বিবরণ।
অখ্যাত পল্লী হিমায়েতপুরে বায়ু থেকে বিদ্যুত উত্পাদন করে পরম বিস্ময় সৃষ্টি করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। গড়ে তুলেছিলেন—তপোবন ও মাতৃ বিদ্যালয়—যা শিক্ষাক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত মনোমোহিনী ইনষ্টিউট অফ সায়েন্স এণ্ড টেকনোলজি নামের বিজ্ঞান কলেজ। কেমিক্যাল ওয়ার্কসের জীবনদায়ী ঔষধসমূহ দেশে এবং বিদেশে সমাদৃত হয়েছিল।
বৈদ্যুতিক এবং যন্ত্রশিল্পের আধুনিক সব ধরণের কাজ হতো ইলেকট্রিকাল ও মেকানিক্যাল ওয়ার্কসপে। যথা,–ঢালাই, ঝালাই, লেদের কাজ, ডাইস, ইলেক্ট্রোপ্লেটিং, ইলেক্ট্রিক্যাল ফিটিং, আরমেচার, ব্যাটারি প্লেট তৈরি ও মেরামত, ডায়নামো মেরামত ইত্যাদি। ছিল—ময়দার কল, আটার কল, চালের কল, তেলের কল, চিনির কল, মেডিকেটেড ওয়াটার মেশিন, স্পাইস পাউডারিং, সুতার গুটি তৈরি, টেলারিং, বোতাম তৈরি, গ্লাস ব্লোয়িং, পটারী ওয়ার্কস্, বেকারী, লজেন্স তৈরি, গ্রোসারী প্রোডাক্ট ইত্যাদির শিল্প। ছিল—কার্ডবোর্ড কারখানা, স্টীমলণ্ড্রী, কটন ইণ্ডাস্ট্রিজ, হোশিয়ারী শিল্প, ব্যাঙ্ক, ইঞ্জিনীয়ারিং ওয়ার্কস্, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র, স্বাস্থ্য বিভাগ, গৃহনির্মাণ বিভাগ, কলাকেন্দ্র, প্রেস (যেখানে বাংলা, হিন্দী, সংস্কৃত, উর্দু, আরবী, ফারসী হরফের কাজ হতো, দেশ ভাগের পর পাকিস্তান সরকার জবরদখল করে ঢাকাতে নিয়ে যায়।), পাব্লিশিং হাউস, ফিলানথ্রপি, মাতৃসঙ্ঘ ইত্যাদি। (তথ্যসূত্রঃ ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনী গ্রন্থ)
শুধু আশ্রমবাসীরাই নয়, জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায়-ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে সকলেই ওইসব প্রতিষ্ঠানের সুলভ সেবা পেতেন। তথাপিও পাকিস্তান সরকার ওই সর্বজনীন কল্যাণধর্মী প্রতিষ্ঠানসমূহ দখল করে কেন বিনষ্ট করেছিলেন তার উত্তর আমার জানা নেই।
যেমন জানা নেই, আলোচনা পত্রিকাতে বর্ণিত শ্রীশ্রীঠাকুরের একান্ত ইচ্ছাগুলোর বাস্তবায়ন দেওঘর সৎসঙ্গ কর্তৃপক্ষ করেছেন কি-না। যদি করে থাকেন কোথায় করেছেন, তার উদাহরণ দিন। ওই ইষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দেখার পর আপনার সাথে গলা মিলিয়ে ‘আচার্য্যদেব কি! —জয়!’ ধ্বনি দিয়ে মানব জীবনটাকে ধন্য করব। না, না, আপনার এক্ষুনি জানাতে হবে না, আপনাকে এক মাস সময় দিচ্ছি। আশাকরি এই সময়ের মধ্যে আপনি সব তথ্য সংগ্রহ করে আমাকে জানাতে পারবেন। আর যদি অনিবার্য্য কোন কারণে জানাতে না পারেন, তাহলে পরমপিতার একটা ভয়াল বাণী শুনে নিন।
সবাই ক্ষমা পাবে—
তা’ তা’রা যেমনতর অপরাধেই
অপরাধী হোক না কেন,
কিন্তু ক্ষমা পাবে না তারাই—
যা’রা পবিত্র সত্তাকে
অবমানিত করে,
অবলাঞ্ছিত করে,
—তা’ কখনও নয়।
(ধৃতি-বিধায়না, ২য় খণ্ড, বাণী সংখ্যা ১১৬)
* * *
যদিও অনিমেষদা, বিভাসদাকে কথাগুলো বলেছিলেন। তবুও কেন জানি আমার ভয় ভয় করছে। দেওঘরের আচার্য্যদেবদের পাল্লায় পড়ে এ কোন্ বিপদে আবার পড়লাম! আমার আবার কিছু হবে না তো! আমি ক্ষমা পাব তো ? হে দয়াল! তুমি রক্ষা কোরো।
——-

এত হিংসা কেন

।। এত হিংসা কেন ।।
নিবেদনে—তপন দাস
***************************

ইদানীং কালের আন্তর্জাতিক আগ্রাসন, নির্বিচারে হত্যালীলা মানবতাবাদের অপমৃত্যু। টিভির পর্দার মাধ্যমে আমাদের প্রাণে এক বোবা ব্যথা দিয়ে চলেছে, আমরা যারা বর্তমান যুগ-বিধায়ক পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সত্যানুসরণের অনুশাসন— “যতদিন তোমার শরীর ও মনে ব্যথা লাগে, ততদিন তুমি একটি পিপীলিকারও ব্যথা নিরাকরণের দিকে চেষ্টা রেখো, আর তা’ যদি না কর, তবে তোমার চাইতে হীন আর কে?”—পাঠ করি!

ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে, বাংলাভাষায রচিত বিখ্যাত গানের কলি, “মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য” নস্টালজিয়ার সিড়ি বেয়ে যাঁদের স্মৃতি অধিকার করে আছে, সেইসব বুদ্ধিজীবিরা, সমাজ-বিজ্ঞানীরা, কি জবাব দেবেন পশ্চিমবঙ্গের ভোট পরবর্তী হিংসা, নারী-নির্যাতন, মৃত্যুর খবর শুনে! কতটা বোধ-বিপর্য্যয় হলে “পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যার” পবিত্র নীতিকে পাশ কাটিয়ে নীতিহীন রাজনীতির ক্ষমতা দখলে রাখার জন্য বিরোধী মতবাদীদের হত্যা পর্যন্ত করতে পারে!

কিছুদিন পূর্বে সংবাদ-শিরোনাম দখল করে নিয়েছিল মালদহের কালিয়াচকের ১৯ বছরের একটি ছেলে, আসিফ। ঘরের মধ্যে বসে ঠাণ্ডা মাথায় একান্ত প্রিয়জনকে হত্যা করল। চার-চারটি মাস দিব্যি কাটিয়ে দিল! বিবেক-দংশন শব্দটাকে পাত্তা না দিয়ে!

কিছুদিন পূর্বে সংবাদ শিরোনাম দখল করেছিল আফগানিস্তানের তালিবানী হিংসা। আফগানরা মেকী ইসলামপন্থী ধার্মিক তালিবানদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে সবকিছু ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে জন্মভূমি ছেড়ে পালিয়েছিল। এখন কিছুটা শান্ত।

কিছুদিন পূর্বে প্রতিবেশী বাংলাদেশের সন্ত্রাসীরা ধর্মের নামে হিন্দুদের বাড়িতে আগুন দিয়ে, লুঠ করে, নারীদের নির্যাতন করে, হত্যা করে যে সন্ত্রাস চালালো, আন্তর্জাতিক স্তরে তার প্রতিবাদ হলেও প্রতিরোধের সূত্র অধরাই রয়ে গেছে। আর ইদানিংকালে স্থানীয় স্তরে সংবাদ শিরোনাম দখল করেছে পশ্চিম বাংলার শক্তিপীঠ তারাপীঠ সংলগ্ন রামপুরহাটের ভয়াবহ হিংসা! যা’ সংশ্লিষ্ট “সত্যমেব জয়তে” সম্বলিত সীলমোহরের আধিকারিকদের পরিহাস করে যেন বলতে চাইছে, তোমরা কতখানি সৎ তোমাদের বিবেকের কাছে একবার জিগ্যেস করে দেখো তো!

*******

এত হিংসা কেন?
বুদ্ধিজীবিগণ, সমাজবিজ্ঞানীরা, মনোবিদেরা এর কি ব্যাখ্যা দেবেন জানিনা, তবে যুগত্রাতা বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র হিংসার কারণ প্রসঙ্গে বলছেন, “অহঙ্কার আসক্তি এনে দেয় ; আসক্তি এনে দেয় স্বার্থবুদ্ধি ; স্বার্থবুদ্ধি আনে কাম ; কাম হতেই ক্রোধের উৎপত্তি ; আর, ক্রোধ থেকেই আসে হিংসা।’’ তাহলে বোঝা গেল, হিংসার মূল কারণ অহঙ্কার। অহঙ্কারের উৎপত্তি প্রবৃত্তি-পরায়ণতা থেকে। আর সেই প্রবৃত্তি-পরায়ণতার চালক লোভ, কাম, ক্রোধ, মদ, মোহ ও মাৎসর্য্য নামের ষড়রিপু, দেহরথের ৬টা ঘোড়ার লাগাম, দেহরথের সারথী ইষ্টগুরুর হাতে সঁপে দিতে পারলে একেবারে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। আর সেই ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন দিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। আমি অক্রোধী, আমি অমানী, আমি নিরলস … ইত্যাদি মন্ত্রে “স্বতঃ-অনুজ্ঞা”-র নিত্য অনুশীলনের বিধানের মাধ্যমে। হিংসাকে প্রতিরোধ করার জন্য এর চাইতে উপযুক্ত কোন নিদান আছে কি-না আমার জানা নেই।
অথচ আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা যুগ-বিধায়কের “প্রাচ্য-প্রতীচ্য নিয়ন্ত্রণে বর্ণাশ্রমানুশাসকম্ আর্য্য চিরায়নম্।” মন্ত্রের অমোঘ বিধানকে পাশ কাটিয়ে হিংসার প্রতিবিধানের জন্য থানা, পুলিশ, মিলিটারী, কোর্ট, সংশোধনাগার প্রভৃতির ব্যবস্থা করেও হিংসা দমন করতে পারছে না। তাই যদি পারত নির্বাচনের ন্যায় একটা সরল প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আমাদের হিংসা এবং হিংসার পরিণতি মৃত্যুর মিছিল দেখতে হতো না। এ কেমন রাজনীতি? ছিঃ!
যুগ-বিধায়ক বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বিধান অনুযায়ী হিংসাকে দূর করতে হলে ভক্তির চাষ দিতে হবে। ভক্তির সংজ্ঞায় তিনি বলছেন, ‘‘সৎ-এ নিরবচ্ছিন্ন সংলগ্ন থাকার চেষ্টাকেই ভক্তি বলে।’’ তাহলে সৎ-এ নিরবচ্ছিন্ন সংলগ্ন থাকার চেষ্টা করার জন্য ভাবী পিতামাতাকে সদগুরুর আদর্শ গ্রহণ করতে হবে। তারপর পরমপিতা প্রদত্ত দিব্য বিবাহ-সংস্কারে সংস্কৃত হয়ে শুদ্ধাত্মাকে আকর্ষণ করে প্রহ্লাদের ন্যায় দিব্য ভক্ত সন্তানের জন্ম দিতে হবে। ভারতের নিজস্ব সংবিধান কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে এর সমর্থন আছে। বর্তমানের চিকিৎসা বিজ্ঞানও এর সমর্থন করেছে। সুস্থ দম্পতির সুস্থ দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে সুস্থ মানবের জন্ম দেওয়ার বিধান দিয়ে। এ ব্যতীত জন্মগত দুরারোগ্য শারিরীক এবং মানসিক ব্যাধি প্রতিরোধের অন্য কোন চিকিৎসা নেই। (Ref. DAVIDSON’S PRACTICE OF MEDICINE/Genetic Factor of Disease)
রাষ্ট্রের অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার বোর্ডের কর্ণধারেরা বিশ্বস্ত, সুস্থ পে-ডিগ্রীড কুকুরের, ঘোড়ার জন্ম নিয়ে গবেষণা করলেও মানুষের বেলায় উদাসীন। একুশ বছরের ছেলে আর আঠারো বছরের মেয়ে হলেই হলো। বংশ, বর্ণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা—কোন কিছুই না দেখে স্পেশ্যাল ম্যারেজ অ্যাক্টের সাহায্যে বিয়ে করতে পারবে, আবার বনিবনা না হলে ডিভোর্সও করতে পারবে! এখন তো আবার বিয়ে না করেও লিভ-টুগেদার আইনের সাহায্যে সন্তানের মা হতে পারা যায়। যার দৃষ্টান্ত লোকসভার সদস্যা নুসরত জাহান। রাষ্ট্রের জন-প্রতিনিধিরা যদি সুস্থ দাম্পত্যের প্রজনন বিজ্ঞানকে অসম্মান করতে পারেন, সেখানে সাধারণ নাগরিকগণ আরো বেশি সুযোগ পেয়ে যাবে লাগামহীন যৌন-জীবন যাপন করার! পরমপিতার অশেষ করুণায় আমাদের গ্রামীন ভারতবর্ষের তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষগুলো এখনো কোন-না-কোনভাবে ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা, পিতামাতায় ভক্তি রেখে বিবাহ সংস্কারের অনুশাসন মেনে চলছে বলে প্রিয়জনের দ্বারা প্রিয়জনদের হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা সমাজে বিস্তার লাভ করতে পারছে না। তবে, রাষ্ট্র ব্যবস্থা যদি এখনই ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুরুত্ব না দেয়, স্বভাববিধ্বংসী প্রতিলোম জাতকদের জন্ম বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাহলে অচিরেই হিংসা আমন্ত্রিত হবে ঘরে ঘরে!

হিংসা প্রতিরোধের জন্য যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র একেবারে সমস্যার মূলে হাত দিয়ে বললেন, “ভক্তি এনে দেয় জ্ঞান ; জ্ঞানেই সর্বভূতে আত্মবোধ হয় ; সর্বভূতে আত্মবোধ হলেই আসে অহিংসা ; আর, অহিংসা হতেই প্রেম। তুমি যতটুকু যে-কোন একটির অধিকারী হবে, ততটুকু সমস্তগুলির অধিকারী হবে।’’
একেবারে অঙ্কের হিসেব। আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি-ইচ্ছার ‘ছোট-আমি’-টার অহঙ্কারের লাগামটাকে যদি ভক্তির মুঠো দিয়ে কষে না ধরা যায় তাহলে ধাপে-ধাপে হিংসার আশ্রয়ে পৌঁছে যাবে। যার পরিণতি অস্বাভাবিক মৃত্যু। আর যদি জীবন নামক রথের চালক ছ’-টা ঘোড়ার (ষড়রিপু) লাগাম জীবন-রথের সারথি স্বরূপ ইষ্টগুরুর হাতে সমর্পণ করা যায়, তাহলে, সরল প্রাণ, মধুর বচন, আর বুকভরা প্রেমের ডালি দিয়ে সবাইকে আপন করে নেওয়া যায়। একটা পিপীলিকারও ব্যথা নিরাকরণের জন্য প্রাণ কাঁদে।
আবার যে হিংসা মৃত্যুর দ্যোতক তাকে শক্ত হাতে দমন করতে হলে হিংসা দিয়েই করতে হবে। হিংসাকে হিংসা দ্বারা জয় করার নাম অহিংসা। যেমন দুষ্টক্ষত বা গ্যাংগ্রীন থেকে শরীরকে বাঁচাতে হলে আক্রান্ত অংশটিকে কেটে বাদ দিতে হয়। বাদ না দিলে দেহকে বাঁচান যায় না। তেমনি সমাজ রক্ষা, রাষ্ট্র রক্ষা করতে হলে অনুরূপ নীতির অনুসরণ না করতে পারলে সমাজ-রাষ্ট্রের অঙ্গে পচন ধরে যাবে, রাষ্ট্রের সত্তাটাই মারা পড়বে।
আর্য্য ভারতের মা কালী শুম্ভ-নিশুম্ভকে, মা দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে, শ্রীরামচন্দ্র রাবনকে বধ করে ওই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। অযথা কাউকে হত্যা করেন নি। অযথা কাউকে হত্যা না করে পার্থসারথি শ্রীকৃষ্ণ মামা কংসের পাঠান অসুর-রাক্ষস নামক সত্তাহিংস জিঘাংসা বৃত্তিধারীদের হত্যা করেছিলেন। অপকৌশলী অসৎ সাম্রাজ্যবাদী কংসকে হত্যা করে, উগ্রসেনকে কারাগার থেকে মুক্ত করে তাঁকে পুণরায় রাজ্যে অভিষিক্ত করেছিলেন। ধর্মপথভ্রষ্ট অসৎ আগ্রাসনী জরাসন্ধকে হত্যা করে জরাসন্ধের পুত্র সহদেবকে রাজ্যে আভিষিক্ত করিয়েছিলেন। সব হিংসার মূল উৎপাটন করে, এক পরম রাষ্ট্রীক সমবায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধ সংগঠিত করে জীবনবাদের জয়গান গেয়েছিলেন। ভবিষ্যত প্রজন্মকে জীবনবাদী হবার জন্য উপহার দিয়ে গেলেন শ্রীমদ্ভবদ্গীতা। আমাদের রাষ্ট্রীয় স্তোস্ত্র “বন্দে মাতরম্” ধ্বনির উৎস শ্রীমদ্ভবদ্গীতা। একদা শ্রীমদ্ভবদ্গীতা গ্রন্থকে আদর্শ মেনে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছিল। সেসব মহান ইতিহাস ভুলে গণতান্ত্রিক পথে রাজনীতি করতে গিয়ে হিংসাশ্রয়ী হয়ে আমরা যদি ভারতমাতার সন্তানদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলি, ভারতমাতা সেই অপমান কতদিন মুখ বুঁজে সহ্য করবেন?
আমরা আবার গীতা গ্রন্থের স্রষ্টা পার্থসারথী শ্রীকৃষ্ণের আশ্রয়ে ফিরে যাব। শ্রীকৃষ্ণ পরবর্তী বহির্ভারতের বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীষ্ট, হজরত রসুল প্রমুখ পুরুষোত্তমগণও আর্য্য ভারতীয় ওই শ্বাশ্বত নীতির অনুসরণ করেছেন মানব সভ্যতাকে বাঁচাতে। তাঁরা আগ্রাসন করতে, ধর্মান্তকরণ করতে, অযথা কাউকে হিংসা করতে কোথাও কি বলেছেন? তবে কেন এত হিংসা? কেন এত জিঘাংসা? ওই হিংস্র জিঘাংসাকে যদি কঠোর হাতে দমন করতে এগিয়ে না আসেন জীবনপিয়াসী শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তথা রাষ্ট্র নায়কেরা, তাহলে মানবতার অপমৃত্যুর কালো ছায়া মানব সভ্যতার অঙ্গে ক্রমে ক্রমে গ্যাংগ্রীন উৎপাদন করবে নিকট ভবিষ্যতে। অসৎ নিরোধে তৎপর না হয়ে, অসৎকে প্রশ্রয় দিয়ে রাষ্ট্রের পবিত্র মন্ত্র “সত্যমেব জয়তে” সম্বলিত সীলমোহরের আধিকারিক হওয়াটা যেমন ভণ্ডামি, তেমনই অসৎ নিরোধে উদাসীন থেকে সৎসঙ্গী সেজে ভক্ত হওয়াটাও কিন্তু ভণ্ডামী! সকলের কথা বলতে পারব না, সেই দিক দিয়ে বিচার করতে গেলে আমি নিজে কিন্তু ভণ্ড। ভক্ত হতে গেলে ঠাকুরত্বকে জাগাতে হবে চরিত্রে। সেটা যখন জাগাতে ব্যর্থ হয়েছি, তাহলে আমি ভণ্ড ছাড়া আর কি! তাই ভণ্ডামি ত্যাগ করে আমাকেও গুটি কেটে খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে পড়তে হবে, পরিস্থিতিকে সামাল দিতে। পরিস্থিতিকে এড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারব না।
ইষ্টভরণ, পিতৃপোষণ
পরিস্থিতির উন্নয়ন,
এ না ক’রে যাই করিস্ না
অধঃপাতেই তোর চলন। ২ ।

(অনুশ্রুতি, ১ম খণ্ড)
ইষ্টপ্রোক্ত উদ্ধৃত বাণীর অধঃপতন থেকে ব্যক্তিসত্তাকে, সংঘ-সত্তাকে বাঁচাতে হলে অসৎ-নিরোধে তৎপর হতেই হবে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র “ব্যক্তি-দম্পতি-গৃহ-সমাজ-রাষ্ট্র
উদ্ধার”-কল্পে, যজন-যাজন-ইষ্টভৃতি-স্বস্ত্যয়ণী প্রবর্তন করছেন। সেকথা বিস্মরণ হলে ইষ্টাদর্শের অপলাপ করা হবে। জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!

রামনবমী

।। রাম নবমীর শ্রদ্ধার্ঘ্য বনাম রামরাজত্বের প্রতিষ্ঠা ।।

নিবেদনে—তপন দাস

*********************

বেশি কিছুদিন ধরে “জয় শ্রীরাম” ধ্বনি শ্লোগানে পরিণত হয়েছে। দিকে দিকে খুব আশার আলোর বিচ্ছুরণ! নির্মিত হতে চলেছে মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রের আদর্শে বিশ্বাসী অনুগামীদের মিলনস্থলের কেন্দ্র স্বরূপ রামমন্দির। ভারতবর্ষে আবার ফিরে আসবে রামরাজত্ব। যে রামরাজত্বের ক্যাবিনেট চালাতেন বশিষ্ঠাদি স্থিতপ্রজ্ঞ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ঋষিগণ। বর্ণাশ্রম, চতুরাশ্রম, দশবিধ সংস্কার আদর্শের অনুসরণে—ভারতবর্ষে যা’ ‘ঋষিবাদ’ (ঋষিদের দ্বারা প্রবর্তিত অনুশাসনবাদ।) নামে প্রতিষ্ঠিত। ঋষিবাদের মূল সংবিধানের নাম ‘ব্রহ্মসূত্র’। ব্রহ্মসূত্র-এর ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে বেদ, উপনিষদ, অষ্টাদশ সংহিতা।

ঋষি বশিষ্ঠ সৌম্যাবতার রামচন্দ্রকে পুরুষোত্তমরূপে চিনতে পেরে রামচন্দ্রকে ঋষিদেরও ঋষি বলে মান্যতা দেন। ঋষিদের সিদ্ধান্তে তখন থেকে পুরুষোত্তমকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয় নব্য-ঋষিবাদ বা পুরুষোত্তমবাদ। যখন যিনি পুরুষোত্তমরূপে অবতীর্ণ হন, তিনিই তখন জীবন্ত বেদ, সংহিতা, পুরাণ। ওই সূত্র অনুসারে রামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীস্ট, হজরত রসুল, চৈতন্যদেব, শ্রীরামকৃষ্ণদেব সকল গুরুদের গুরু সদগুরুরূপে স্বীকৃতি পান। অর্থাৎ স্থান-কাল-পরিবেশ অনুযায়ী যখন যিনি যেখানেই অবতীর্ণ হন না কেন, তাঁর মধ্যে পূর্ব পূর্ব গুরুদের জীবন্ত অনুভব করা যাবে। পূর্ববর্তীদের প্রকৃত আদর্শ খুঁজে পাওয়া যাবে। যাকে আমরা বর্তমানের সফটওয়ারের ভাষায়, অ্যাপ্লিকেশন বা অ্যাপস্-এর ভাষায় আপডেট বলি। অ্যাপ্লিকেশনের সূত্রপাত থেকে শুরু করে সর্বশেষ সংস্করণের নবীকরণের তথ্য মজুত থাকে। আমি যদি আমার মোবাইলের অ্যাপ্লিকেশনগুলো আপডেট না করি তাহলে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারব না। যারা আপডেটেড্, তারাই লক্-ডাউনের সময় অন-লাইন কাজকর্ম করে অনেক কিছু সামাল দিতে পেরেছেন। সবকিছু সামাল দিতে গেলে আপডেটেড হতেই হবে সবক্ষেত্রে। ব্যাকডেটেড থেকে কিছু সামাল দেওয়া যায় না। অথচ আমরা অজ্ঞতাবশে নিজেদের ধারণ করার প্রশ্নে, অর্থাৎ ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে ব্যাকডেটেড হয়ে আছি। তাই তো বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনকূলচন্দ্র আমাদের সচেতন করে দিতে বললেন—“ভারতের অবনতি (degeneration) তখন-থেকেই আরম্ভ হয়েছে, যখন-থেকে ভারতবাসীর কাছে অমূর্ত্ত ভগবান অসীম হ’য়ে উঠেছে—ঋষি বাদ দিয়ে ঋষিবাদের উপাসনা আরম্ভ হয়েছে।

ভারত! যদি ভবিষ্যৎ-কল্যাণকে আবাহন করতে চাও, তবে সম্প্রদায়গত বিরোধ ভুলে জগতের পূর্ব্ব-পূর্ব্ব গুরুদের প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হও—আর তোমার মূর্ত্ত ও জীবন্ত গুরু বা ভগবানে আসক্ত (attached) হও,—আর তাদেরই স্বীকার কর—যারা তাঁকে ভালবাসে। কারণ, পূর্ব্ববর্তীকে অধিকার করিয়াই পরবর্ত্তীর আবির্ভাব।” (সত্যানুসরণ)

কথাপ্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন—“বর্ত্তমান যিনি, তাঁকে ধরলেই তাঁর মধ্যে সব পাওয়া যায়। ………. রামচন্দ্রকে যে ভালবাসে সে যদি শ্রীকৃষ্ণকে না ধরে তবে বুঝতে হবে তার রামচন্দ্রেও ভালবাসা নেই, ভালবাসা আছে তার নিজস্ব সংস্কারে। (আঃ প্রঃ ২১ খণ্ড, ইং তাং ৩১-১২-১৯

* * *

।। রামচরিতের আদর্শের পুণ্য স্মৃতিচারণ ।।

সৌম্যাবতার মর্যাদাপুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্র ছিলেন সত্যের পূজারী অথচ অসৎ নিরোধী। তৎকালীন যুগের অচ্ছুৎ অনার্য্যদের আর্য্যীকৃত করে আর্য্য-অনার্য্যদের মেলবন্ধন করলেন।অনার্য্য গুহক চণ্ডালকে করলেন মিত্র, আবার অকালমৃত্যুর দ্যোতক বর্ণাশ্রম-বিদ্বেষী প্রতিলোমাচারী বন্ধুবর শম্বুবকে দিলেন চরম শাস্তি। মায়াবী রাবণ যখন কিছুতেই সীতাকে বশে আনতে পারছিলেন না তখন সভাসদেরা রাবণকে বলেছিলেন, রামরূপ ধারণ করে গেলেই তো সীতাকে সহজেই বশীভূত করতে পারেন। উত্তরে রাবণ বলেছিলেন, ওই রূপ স্মরণ করলেই আমার সব পাপ-প্রবৃত্তি মুছে গিয়ে আমি এক অন্য মানুষ হয়ে যাই। তথাপি প্রবৃত্তির ঊর্দ্ধে উঠে ওই বোধটাকে ধরে রাখতে পারল না, ফলে রামচন্দ্রের হাতে হত হতে হল। অথচ বিভীষণ রামচন্দ্রের আদর্শে প্রলুব্ধ হয়ে রাবণকে ত্যাগ করলেন।

শুধু তাড়িত-পীড়িত মানুষদেরই নয়, প্রভু রামচন্দ্র পশুপাখিদের ভাষাও বুঝতেন। তাই তারাও প্রভু রামচন্দ্রের কাছে সুবিধা-অসুবিধার কথা জানাতে পারতেন। রাম-রাজত্বে পশু-পাখিরাও সুখে-শান্তিতে বাস করতেন। ওই নিয়মের ব্যত্যয় হবার ফলে, সেই রাম রাজত্বের সময় একটা কুকুর এসেছিল মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রের কাছে বিচারপ্রার্থী হয়ে। সভায় উপস্থিত ছিলেন ভৃগু, আঙ্গিরস, কুৎস, কাশ্যপ, বশিষ্ঠ প্রমুখ সভাসদগণ। কুকুরের অভিযোগ শুনে, বিচার প্রেক্ষিতে সভাসদদের সম্বোধন করে শ্রীরামচন্দ্র বলেছিলেনঃ

न सा सभा यत्र न सन्ति वृद्धाः

वृद्धा न ते ये न वदन्ति धर्मम् ।

नासौ धर्मो यत्र न सत्यमन्ति

न तत् सत्यं यच्छलेनानुविद्धम् ।।

(Ye sabhai briddha nei ta sabha e noi. Yara dharmmasamgata kotha bolena tara briddha noi. yate satya nei ta dharmma noi, yate chhol aachhe ta satya noi.

RAMAYAN, 3/33)

‘‘ন সা সভা যত্র ন সন্তি বৃদ্ধাঃ

বৃদ্ধা ন তে যে ন বদন্তি ধর্মম্।

নাসৌ ধর্মো যত্র ন সত্যমন্তি

ন তৎ সত্যং যচ্ছলেনানুবিদ্ধম্।। (বাল্মীকি রামায়ণ ৩/৩৩)

—যে সভায় বৃদ্ধ নেই তা সভাই নয়। যারা ধর্মসঙ্গত কথা বলে না তারা বৃদ্ধ নয়। যাতে সত্য নেই তা ধর্ম নয়। যাতে ছল আছে তা সত্য নয়। অর্থাৎ, যেখানে ছলনা আছে, কপটতা আছে, সেখানে ধর্ম নেই।

**********

রাম-রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীরামচন্দ্র তো নয়ই, শ্রীরামচন্দ্রের পিতা রাজা দশরথও কোনদিন ছলনার আশ্রয় গ্রহণ করেন নি। তাঁরই রাজত্বে লোকালয় থেকে দূরে, সরযূ নদীর তীরে কুটির বেধেছিলেন বৈশ্য কুলোদ্ভব অন্ধমুনি, শূদ্রা অন্ধ স্ত্রীকে নিয়ে। তাদের একমাত্র চক্ষুষ্মান সন্তান যজ্ঞদত্ত বা সিন্ধুমুনি গোধূলি বেলায় জল আনতে গেছেন সরযূ নদী থেকে। এক মত্তহাতীর উপদ্রব থেকে প্রজাদের রক্ষা করার মানসে মৃগয়ায় গেছেন রাজা দশরথ। তাঁর ঈপ্সিত মত্তহাতীর উদ্দেশ্যে শব্দভেদী বাণ ছোঁড়েন। বাণে বিদ্ধ হয় কলসীতে জল ভরতে থাকা সিন্ধুমুনি।

কলসীতে জল-ভরার অনু-কার শব্দের সাথে হাতীর জলপান করার অনু-কার শব্দের হুবহু মিল রয়েছে। যারফলে অনধাবনতা বশতঃ এক মারাত্মক ভুল করে ফেলেছিলেন রাজা দশরথ। বাণবিদ্ধ যন্ত্রণাকাতর সিন্ধুমুনির আর্তনাদে তাঁর ভুল ভাঙে। সিন্ধুমুনির অনুরোধে বিদ্ধ বানটাকে খুলে নিলে সিন্ধুমুনি মারা যান। রাজা দশরথ জলপূর্ণ কলসী সাথে নিয়ে অন্ধমুনির কুটিরে যান। অকপটে স্বীকার করেন সব অপরাধের কথা। সদ্য সন্তানহারা অন্ধ দম্পতিকে আজীবন পিতৃ-মাতৃ জ্ঞানে রক্ষণাবেক্ষণ করে ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন। সিন্ধু মুনির অন্ত্যেষ্টিও করেন তিনি। তথাপি রাজা দশরথকে অভিশাপ দিয়ে পুত্রশোকে সহধর্মিনীসহ দেহত্যাগ করেন অন্ধমুনি। সেই অভিশাপেই পুত্র শোকেই রাজা দশরথের অকালমৃত্যু হয়েছিল। এই হচ্ছে ভারতবর্ষের ধর্ম পালনের উদাহরণ।

নির্জন স্থান। প্রত্যক্ষদর্শী কেউ ছিল না। সাক্ষী দেবারও কেউ ছিল না। রাজা দশরথ যদি কপটাচারী হতেন, ছলনার আশ্রয় নিতেন, অনায়াসেই সিন্ধুমুনির বিপন্ন-অস্তিত্বের প্রাণহীন দেহটাকে ফেলে রেখে চলে যেতে পারতেন। গায়ে পড়ে অভিশাপও কুড়োতে হতো না। কিন্তু পারেন নি সত্যের জন্য, বিবেকের জন্য, বিবেকের দংশন থেকে মুক্তি পাবার জন্য। তাই, মনের অনুগমন না করে বিবেককে অবলম্বন করে চলার নামই ধর্মপথে চলা। ধর্মের সাথে অস্তিত্বের সম্পর্ক, অস্তিত্বকে ধারণ করে রাখার সম্পর্ক।

*********

মাননীয় নরেন্দ্র মোদিজীর নেতৃত্বাধীন বর্তমানের বিজেপি সরকার ধর্মের নামে, ‘জয় শ্রীরাম’ শ্লোগানকে আঁকড়ে বিপুল জন সমর্থন পেয়েছেন। মর্যাদা পুরুষোত্তম রামচন্দ্রের আদর্শে বিশ্বাসী ভারতের নির্বাচকগণ ‘রাম-রাজত্বের’ ন্যায় এক স্বচ্ছ, নির্মল শাসনতন্ত্রের আশায় ভোট দান করেছেন। অতএব রামচন্দ্রের নাম-মাহাত্ম্যের জোরে যে শাসনতন্ত্রের অধিকার অর্জন করেছেন যে জন-প্রতিনিধিরা, তাদের ক্যাবিনেট যদি রামচন্দ্রের গুরু ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠের আদর্শের আলোকে আলোকিত না হয়,—সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হয়,—জন-প্রতিনিধিগণ যদি রাম-রাজত্বের পরিপন্থী বিলাস-ব্যসন ত্যাগ করে, আত্ম-প্রতিষ্ঠার মোহ ত্যাগ করে, সাত্ত্বিক-চলনে সাধারণভাবে চলতে অভ্যস্ত না হয়,—তাঁরা কখনোই ঈপ্সিত রাম-রাজত্ব ফিরিয়ে আনতে পারা যাবে না।

********

বনবাসে থাকার সময় রামচন্দ্র ভরতকে রাজকার্য পরিচালনা বিষয়ে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন—“….. তুমি গুণী ও যোগ্য ব্যক্তিকে বহু-মান প্রদর্শন করে থাক তো? বীর, বিদ্বান, জিতেন্দ্রিয়, সদ্বংশজ, ইঙ্গিতজ্ঞ লোকদের মন্ত্রীপদে প্রতিষ্ঠিত করেছ তো? তুমি তাদের সঙ্গে মন্ত্রণা কর তো? তোমাদের মন্ত্রণা লোকের মধ্যে প্রকাশ হয়ে পড়ে না তো? তুমি যথাসময়ে শয্যাত্যাগ কর তো? রাত্রিশেষে অর্থলাভের চিন্তা কর তো? তুমি সহস্র মূর্খ পরিত্যাগ করেও একজন বিদ্বানকে সংগ্রহ করতে চেষ্টা কর তো? অযোগ্য লোককে যোগ্যস্থানে ও যোগ্য লোককে অযোগ্য স্থানে নিয়োগ কর না তো? যে-সব অমাত্য উৎকোচ গ্রহণ করেন না, যাদের পিতৃপুরুষ যোগ্যতার সঙ্গে অমাত্যের কাজ করেছেন, যারা ভিতরে-বাইরে পবিত্র—সেই সব শ্রেষ্ঠ অমাত্যকে শ্রেষ্ঠ কাজে নিযুক্ত করেছ তো? রাজ্যমধ্যে কোন প্রজা অযথা উৎপীড়িত হয় না তো? শত্রুকে পরাস্ত করতে পটু সাহসী, বিপৎকালে ধৈর্য্যশালী, বুদ্ধিমান, সৎকুলজাত, শুদ্ধাচারী, অনুরক্ত ব্যক্তিকে সেনাপতি করেছ তো? বিশেষ নৈপুণ্য যাদের আছে, তাদের তুমি পুরস্কৃত ও সম্মানিত করে থাক তো? প্রত্যেকের প্রাপ্য বেতন সময়মত দিয়ে থাক তো? রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তিবর্গ তোমার প্রতি অনুরক্ত আছেন তো? তোমার কার্য্যসিদ্ধির জন্য তাঁরা মিলিত হয়ে প্রাণ পর্য্যন্ত দিতে প্রস্তুত আছেন তো? বিদ্বান, প্রত্যুৎপন্নমতি, বিচক্ষণ এবং তোমার জনপদের অধিবাসীকেই দৌত্যকার্য্যে নিযুক্ত করেছ তো? স্বরাজ্যে ও পররাজ্যে প্রধান-প্রধান পদের অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের সম্বন্ধে জ্ঞাতব্য সংবাদ চরগণদ্বারা অবগত থাক তো? চরগণ পরস্পর-বিরোধী তথ্য পরিবেষণ করলে তার কারণ নির্ণয় করে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা করে থাক তো? প্রজাগণ সুখে আছে তো? তারা দিন-দিন স্ব-স্ব কর্ম করে সমৃদ্ধ হচ্ছে তো? তোমার আয় বেশী, ব্যয় কম হচ্ছে তো? ধনাগার অর্থশূন্য হচ্ছে না তো? অপরাধীদের ধনলোভে ছেড়ে দেওয়া হয় না তো? তুমি সাম, দান, ভেদ ও দণ্ডের প্রয়োগ যথাস্থানে করে থাক তো? তুমি ইন্দ্রিয়গণকে জয় করতে সচেষ্ট থাক তো? অগ্নি, জল, ব্যাধি, দুর্ভিক্ষ ও মড়ক এই পাঁচ রকমের দৈববিপদের প্রতিকারের জন্য তুমি যত্নশীল থাক তো? সন্ধি-বিগ্রহাদি যথাস্থানে প্রয়োগ কর তো? ? ? ইত্যাদি ইত্যাদি। (আঃ প্রঃ ৫ম খণ্ড, ইং তাং ২-৪-১৯৪৪)

*********

উপরোক্ত বিধানগুলো রাম রাজত্বের অনুশাসনবাদ। তাই রাম-রাজত্ব প্রতিষ্ঠা-পিয়াসী জন-প্রতিনিধিদের উচিত হবে, রামচন্দ্রের সভার ন্যায় একজন আদর্শ সভাসদরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। এবং তা’ বাস্তবায়িত করতে হলে, আদর্শ প্রজাপালকের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। সরকারী কোষাগার থেকে সাধারণভাবে বেঁচে থাকার প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা যাবে না। বর্তমান শাসনতন্ত্রের পরিকাঠামো অনুযায়ী জন-প্রতিনিধিদের জন্য বরাদ্দ সুবিধা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে রাম-রাজত্ব প্রতিষ্ঠার চিন্তা অধরাই থেকে যাবে। জনগণকে স্ব স্ব আত্মমর্যাদায় সুখে রাখতে হলে জন-প্রতিনিধিগণদের বিলাস-ব্যসন সুখ-সুবিধার কথা ভুলতে হবে, নীতিপরায়ণ হতে হবে, সর্বোপরি যথার্থ ধার্মিক হতে হবে। সেদিকে দৃষ্টি দিলে তবে কাজের কাজ কিছুটা হবে।

রাম রাজত্বকে বাস্তবায়িত করতে হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর ক্যাবিনেটকে বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সংবিধান “বিধান বিনায়ক” গ্রন্থের অনুশাসন অনুযায়ী এ বিষয়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

সবাই আমার প্রণাম জানবেন। জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!

tapanspr@gmail.com

——-

No photo description available.

All reactions: