।। নববর্ষ পুরুষোত্তম স্বস্তিতীর্থ মহাযজ্ঞ উৎসবের শুভ সূচনার প্রেক্ষাপট ।।
নিবেদনে—তপন দাস
—————————————————————————————–
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রবর্তিত নববর্ষ পুরুষোত্তম স্বস্তিতীর্থ মহাযজ্ঞ উৎসবের শুভ সূচনার প্রেক্ষাপট অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেকগুলি সোপান পথ অতিক্রম করতে হলো, নাহলে ঠিক স্বস্তি অনুভব করতে পারছিলাম না। তাই একটু অতীতের স্বর্ণালি স্মৃতির রোমন্থন করতে করতে গন্তব্যের দিকে এগোতে চেষ্টা করব।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সৃষ্ট সৎসঙ্গের ভাগবৎ আন্দোলনের প্রথম সেনাপতি ছিলেন মহারাজ অনন্তনাথ রায়, দ্বিতীয় সেনাপতি ছিলেন ভক্তবীর কিশোরীমোহন দাস। ১৩২১ বঙ্গাব্দের ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, অদ্বৈত বংশধর পূজনীয় সতীশচন্দ্র গোস্বামীকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র নিজে সৎমন্ত্রে দীক্ষা দান করে তাঁর ভাগবৎ আন্দোলনের তৃতীয়তম সেনাপতিকে যূথবদ্ধ করেন। আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামীর মাধ্যমে কুষ্টিয়া থেকে সূত্রপাত হয় বহুধাবিস্তৃত সৎসঙ্গ আন্দোলনের। কুষ্টিয়ার ধনী-মানী-জ্ঞানী-গুণী জনেরা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। বিভেদের মাঝে ঐক্য স্থাপনের লক্ষ্যে কুষ্টিয়ার ভক্তদের শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীবুদ্ধ, প্রভু যীশু, হজরত রসুল, শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ প্রমুখ পূর্ববর্তী অবতার-বরিষ্ঠদের জন্মোৎসব পালন করতে উৎসাহিত করেন বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। ঠাকুরের নিদেশ মেনে কুষ্টিয়ার ভক্তরা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের থেকে শুরু করে সাধারণ অনুরাগীদের শ্রদ্ধার সাথে আমন্ত্রণ জানিয়ে আলাপ-আলোচনা-কথকতা ও অন্নব্যঞ্জনাদির সেবার ব্যবস্থা করতে শুরু করেন। এইভাবে পূর্বাপূর্ব অবতার বরিষ্ঠদের জন্মোৎসব পালন করার ফলে সারা কুষ্টিয়ায় এক অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে যায়। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে শ্রদ্ধা ও প্রীতির বন্ধন গড়ে ওঠে।
অন্তরালে থেকে ঠাকুর যে সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতি সংস্থাপনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তার কার্যকারণ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতে গিয়ে কুষ্টিয়ার ভক্তদের মনে একটা প্রশ্ন জাগে—তাই তো! যার নির্দেশে পূর্ব পূর্ব গুরুদের জন্মোৎসব পালন করছি, যার নির্দেশ মেনে সমাজে প্রীতি, শান্তি ক্রম-বর্ধমান, অথচ তাঁর—‘পূবর্তনী পূরণম্ শাশ্বত বর্তমানম্’ যিনি, সেই বর্তমান পুরুষোত্তম, যিনি সব গুরুদের গুরু—বিশ্বগুরু, তাঁর জন্মোৎসব তো পালন করা হয়নি ? এবার তাই করতে হবে। সবাই একবাক্যে রাজী। অতএব আর দেরী নয়, যেই ভাবা, সেই কাজ। কুষ্টিয়ার ভক্তগণ ‘‘শ্রীশ্রীবিশ্বগুরু-আবির্ভাব মহামহোৎসব’’ শিরোনাম দিয়ে ২৯শে ও ৩০শে ভাদ্র ১৩২৫ বঙ্গাব্দে উৎসবের আয়োজন করেন। অগণিত দীন ও দুঃস্থদের ভোজন এবং ভোজনোত্তর ভোজন-দক্ষিণা স্বরূপ অর্থ-বস্ত্রাদি দান—সে এক অভিনব মহাযজ্ঞ সুচারুরূপে সম্পন্ন করেছিলেন কুষ্টিয়াব ভক্তবৃন্দ। কোনরূপ কোন অপ্রীতিকর ঘটনার সাক্ষী না রেখেই।
বিশ্বগুরু উৎসবের পরের বছর থেকে অনন্ত মহারাজ হিমাইতপুরে শুরু করেন শ্রীশ্রীঠাকুরের আবির্ভাব মহোৎসব। ভাদ্র মাসের শুরুতেই অনন্ত মহারাজ কয়েকজন সঙ্গীসাথি নিয়ে সুমধুর কণ্ঠে কীর্তন করতে করতে গৃহস্থের দ্বারে দ্বারে যেতেন গুরুর আবির্ভাব মহোৎসবের আমন্ত্রণ জানাতে। চারজন ভক্ত কাপড়ের ভিক্ষাপাত্রের চার কোণা ধরে চলতেন। গৃহ থেকে গৃহান্তর, গ্রামান্তর—যেখানেই যেতেন সকলকেই মাতিয়ে তুলতেন প্রাণের সাড়া জাগানো উৎসবে। আনন্দের হিল্লোলে মেতে ওঠা পথচারি থেকে গৃহবাসী সকলে সাধ্যানুযায়ী টাকা-পয়সা তো দিতেনই, এমনকি অনেক মায়েরা গায়ের স্বর্ণালঙ্কার পর্যন্ত ভিক্ষাপাত্রে নিবেদন করতেন অর্ঘ্যস্বরূপ—বিশ্বগুরুর উদ্দেশ্যে।
১৩৩১ বঙ্গাব্দে হিমাইতপুরে দোল উৎসবের সূচনা করেন অনন্ত মহারাজ। বর্তমানের হিমাইতপুরের আশ্রমে উপরোক্ত দুটো উৎসবের প্রবহমানতা বিদ্যমান।
* * *
কুষ্টিয়াতে অনুষ্ঠিত ‘‘শ্রীশ্রীবিশ্বগুরু-আবির্ভাব মহামহোৎসব’’ এর পর থেকেই মূর্খ-পণ্ডিত-ধনী-নির্ধন-জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষ একে একে সমবেত হতে শুরু করেন হিমাইতপুরে। শুরু হলো লোকসংগ্রহ পর্ব। ধীরে ধীরে গড়ে উঠল সৎসঙ্গ আশ্রম। শুরু হলো কর্মযজ্ঞ।
অখ্যাত পল্লী হিমাইতপুরে বায়ু থেকে বিদ্যুত উৎপাদন করে পরম বিস্ময় সৃষ্টি করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। গড়ে তুলেছিলেন—তপোবন ও মাতৃ বিদ্যালয়—যা শিক্ষাক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। গড়ে তুলেছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত ‘মনোমোহিনী ইনষ্টিউট অফ সায়েন্স এণ্ড টেকনোলজি’ নামের বিজ্ঞান কলেজ। কেমিক্যাল ওয়ার্কসের জীবনদায়ী ঔষধসমূহ দেশে এবং বিদেশে সমাদৃত হয়েছিল। বৈদ্যুতিক এবং যন্ত্রশিল্পের আধুনিক সব ধরণের কাজ হতো ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল ওয়ার্কসপে। যথা,–ঢালাই, ঝালাই, লেদের কাজ, ডাইস, ইলেক্ট্রোপ্লেটিং, ইলেক্ট্রিক্যাল ফিটিং, আরমেচার, ব্যাটারি প্লেট তৈরি ও মেরামত, ডায়নামো মেরামত ইত্যাদি। ছিল—ময়দার কল, আটার কল, চালের কল, তেলের কল, চিনির কল, মেডিকেটেড ওয়াটার মেশিন, স্পাইস পাউডারিং, সুতার গুটি তৈরি, টেলারিং, বোতাম তৈরি, গ্লাস ব্লোয়িং, পটারী ওয়ার্কস্, বেকারী, লজেন্স তৈরি, গ্রোসারী প্রোডাক্ট ইত্যাদির শিল্প। ছিল—কার্ডবোর্ড কারখানা, স্টীমলণ্ড্রী, কটন ইণ্ডাস্ট্রিজ, হোশিয়ারী শিল্প, ব্যাঙ্ক, ইঞ্জিনীয়ারিং ওয়ার্কস্, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র, স্বাস্থ্য বিভাগ, গৃহনির্মাণ বিভাগ, কলাকেন্দ্র, প্রেস (যেখানে বাংলা, হিন্দী, সংস্কৃত, উর্দু, আরবী, ফারসী হরফের কাজ হতো, দেশ ভাগের পর পাকিস্তান সরকার জবরদখল করে ঢাকাতে নিয়ে যায়।), পাব্লিশিং হাউস, ফিলানথ্রপি, মাতৃসঙ্ঘ ইত্যাদি।
হিমাইতপুর আশ্রম ছিল সর্বতোমুখী জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান। শুধু আশ্রমবাসীরাই নয়, ঠাকুরের আদর্শে দীক্ষিত ছিলেন না, তারাও জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায়-ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে সকলেই আশ্রমের সব প্রতিষ্ঠানের সুলভ সেবা পেতেন। আশেপাশের সব গ্রামের মানুষেরা জানতো, অনুকূল ঠাকুর নামে একজন ফেরেস্তা আছে, যে আমাদের আপদে-বিপদে সহায় হয়, মায়ের মতো আগলে রাখে।
।। হিমাইতপুর থেকে দেওঘরে আগমনের প্রেক্ষাপট ।।
পরিবেশের জন্য এতকিছু করা সত্বেও আশ্রমের ভেতরে-বাইরে উপকৃত মানুষেরাই ঠাকুরের সাথে শত্রুতা করেই চলেছিল, এমনকি ঠাকুরকে অপহরণ করতে চেয়েছিল, বিষ প্রয়োগ করে মারতেও চেয়েছিল। খুন হয় আশ্রমের কর্মী, তপোবনের ছাত্র। পিতৃ-বিয়োগ, দেশবন্ধু-বিয়োগ, কন্যা-বিয়োগ, মাতৃ-বিয়োগ, আবাল্যের সাথী নফর ঘোষ, অনন্ত মহারাজ, কিশোরীমোহন-দের বিয়োগ-ব্যথায় ব্যথাহারী হলেন ব্যথিত। ১৩৫৩ সালের প্রথম দিকে মুসলিম লীগের ‘ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে’ ঘোষিত হবার সাথে সাথে কলকাতায় যে পৈশাচিক হত্যালীলা হয়েছিল সে সংবাদ শুনে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন ঠাকুর। দেশ-নেতাদের আগাম সতর্ক করা সত্ত্বেও, প্রতিরোধী-ব্যবস্থাপত্র দেওয়া সত্ত্বেও তাঁরা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি। বিপন্ন দেশবাসীদের রক্ষা করতে না পারার বেদনায় বিপর্যস্ত তিনি। বেড়ে গেল রক্তচাপ, হয়ে পড়লেন অসুস্থ। খবর শুনে পাবনার বিশিষ্ট মুসলমান নেতৃবৃন্দ ঠাকুরকে দেখতে আসেন, পাবনায় সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াতে দেবেন না বলে আশ্বস্ত করেন। একটু সুস্থ বোধ করেন, আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঠাকুরের প্রিয় কলকাতার বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ গুপ্ত প্রয়োজনীয় ঔষধ এবং সম্পূর্ণ বিশ্রামের ব্যবস্থাপত্র দিয়ে যান। বাঁধের ধারে নিভৃত নিবাসের মনোরম পরিবেশে ঠাকুরের বিশ্রামের ব্যবস্থা করেন ঋত্বিগাচার্য্য। চাপমুক্ত রাখতে দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষেধ করে দেন। কিন্তু ঠাকুর রাজী হন না। মনের কথা, প্রাণের ব্যথা নিয়ে যারা যারা আসবে, তাদের তিনি কিছুতেই ফেরাতে নারাজ। আগন্তুকদের দুঃখ-বেদনার কথা শুনতে শুনতে আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন। সংবাদ পেয়ে ডাঃ গুপ্ত আসেন, ঠাকুরকে দূরে কোথাও বায়ু পরিবর্তনের জন্য নিয়ে যাবার পরামর্শ দেন।
অবশেষে আশ্রম কর্তৃপক্ষ শ্রীশ্রীঠাকুরকে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ঠাকুর বিহার প্রদেশের দেওঘরে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
১৯৪৬ খ্রীষ্টাব্দের ১লা সেপ্টেম্বর হিমাইতপুর আশ্রম থেকে যাত্রা শুরু করে ২রা সেপ্টেম্বর বেলা ১০টা নাগাদ শ্রীশ্রীঠাকুর বৈদ্যনাথধাম স্টেশনে পৌঁছলেন।
১৯৪৬ সালের জুলাই মাসে হিমাইতপুরে অনুষ্ঠিত বর্ষাকালীন ঋত্বিক-অধিবেশনে
১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসে খুলনা শহরে শ্রীশ্রীঠাকুরের জন্মোৎসব সাড়ম্বরে উদযাপনের
জন্য কর্ম্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছিল। শ্রীশ্রীঠাকুর দেওঘরে চলে আসার কারণে এবং দেশের তৎকালীন বীভৎস সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির কথা চিন্তা ক’রে ঐ উৎসব বন্ধ রাখা হয়েছিল।
পরিবর্তে ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে দেওঘরে উৎসবের আয়োজন করা হয়। রেলওয়ে গুমটির কাছে বিশাল তোরন-দ্বার নির্মিত হয়। যাত্রাপালা, কীর্তন, আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। শ্রীশ্রীঠাকুরের প্রতিকৃতি নিয়ে কীর্তন করতে করতে পবিত্র বৈদ্যনাথ ধামের নগর পরিক্রমা করেন সমাগত ভক্তবৃন্দের দল। সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল, উৎসবের তৃতীয় দিনে কিছু দুর্বৃত্তরা তোরন-দ্বারে অগ্নি সংযোগ করে, বড়াল বাংলোর অভ্যন্তরে অনুষ্ঠিত যাত্রাগানের সময় একদল দুর্বৃত্ত সৎসঙ্গীদের মারতে শুরু করে। আশু ভট্টাচার্য্য নামক একজন সৎসঙ্গী, গুণ্ডাদের পায়ে ধরে অনুনয়-বিনয় করলেও তারা নিরস্ত হয় না, লাথি মেরে ওই ভক্তকে অজ্ঞান করে দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে অসৎনিরোধী তৎপর সৎসঙ্গী যুবকবৃন্দ প্রতিরোধ করতে এগিয়ে এলে দুর্বৃত্তের দল প্রাচীর টপকে পালাতে শুরু করে। পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পুলিস কয়েকজনকে অ্যারেস্ট করেন। খবর পেয়ে পাণ্ডাপাড়া থেকে সম্মানীয় ডাকুবাবু কয়েকজন হিতৈষীদের সাথে নিয়ে আসেন। অরাজকতা কেটে গিয়ে শান্ত হয় পরিবেশ। পরবর্তী দিনে বৈদ্যনাথধামের পাণ্ডারাও উৎসবে যোগদান করে কীর্তন পরিবেশন করেছিলেন।
(সূত্রঃ শ্রীমৎ আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী ও সৎসঙ্গ আন্দোলন।)
১৯৪৭ খৃষ্টাব্দের ১৫ই আগস্ট ভারত স্বাধীন হ’ল। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত দ্বিখণ্ডিত হ’ল। শুরু হ’ল উদ্বাস্তু সমস্যা। নোয়াখালির দাঙ্গার পরই পূর্ববঙ্গের সংখ্যালঘু
হিন্দুরা নিরাপত্তার অভাব বোধ করে আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। ভারত বিভাগের পর জলস্রোতের মতো জনস্রোত বইতে লাগল পশ্চিমবঙ্গের দিকে। দেওঘরেও এসে তার ধাক্কা লাগে। শ্রীশ্রীঠাকুর সাধ্যমত সকলের বাসস্থান এবং অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা করেন। কোন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বা সরকারের কাছ থেকে সাহায্য না নিয়ে তিনি হাজার-হাজার উদ্বাস্তুর পূনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন।
১৬ই, ১৭ই ও ১৮ই সেপ্টেম্বর ১৯৪৯ তিনদিনব্যাপী মহাসমারোহে শ্রীশ্রীঠাকুরের ৬২তম
জন্মোৎসব অনুষ্ঠিত হয় কলকাতার শ্রদ্ধানন্দ পার্কে। ডঃ রাধাকুমুদ
মুখোপাধ্যায়, ব্যারিস্টার নিৰ্ম্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গের
তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী শ্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন প্রমুখ ভাষণ দেন। এই উপলক্ষে
কোলকাতার রাজপথে বিরাট শোভাযাত্রা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
পরের বছর ১৬ই ও ১৭ই সেপ্টেম্বর (১৯৫০) কোলকাতার ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হ’লে
শ্রীশ্রীঠাকুরের ৬৩তম জন্মোৎসব সাড়ম্বরে উদ্যাপিত হয়। উৎসবের উদ্বোধনী ভাষণে
স্বনামধন্য নেতা ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলেন—‘শ্রীশ্রীঠাকুরের সাধনার
ক্ষেত্র পাবনা আশ্রম আজ পাকিস্তানভুক্ত। আশ্রম নষ্ট হ’লেও তাঁর জীবনী ও বাণী
বর্তমান ও ভবিষ্যৎ মানব-সমাজকে পথ দেখাবে। তিনি যে মানুষ গঠনের কাজে
আত্মনিয়োগ করেছেন তা ফলবতী হবেই। জাতীয় জীবনকে সুস্থ, সুন্দর ও সুষ্ঠু ক’রে
তুলতে হলে সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলি ধর্ম্মের ভিত্তিতে সমাধান
হওয়া উচিত এবং শ্রীশ্রীঠাকুর সেই কাজেই আত্মনিয়োগ করেছেন। তিনি জঙ্গলের
সন্ন্যাসী সৃষ্টি করেননি, বরং সংসারী হ’য়ে কেমন ক’রে যথার্থ জনকল্যাণ করা
যায়। তিনি তার আদর্শ দেখিয়েছেন।’ (মহামানবের সাগরতীরে, ১ম খণ্ড)
১৩৬০ বঙ্গাব্দের ১৪ই পৌষ থেকে ১৭ই পৌষ, (২৯ ডিসেম্বর ১৯৫৩ থেকে ১লা জানুয়ারি ১৯৫৪) বৈদ্যনাথ ধামের সৎসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ৬৩তম ঋত্বিক সম্মেলন। উক্ত সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়, আগামী ৬৪তম ঋত্বিক-অধিবেশনের সঙ্গে “নববর্ষ পুরুষোত্তম স্বস্তিতীর্থ মহাযজ্ঞ”
অনুষ্ঠিত হবে। ওই মহাযজ্ঞ সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য বিভিন্ন
বিভাগের দায়িত্বভার দিয়ে একটি কেন্দ্রীয় কর্মী পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। কর্মী
পরিষদে ছিলেন সৎসঙ্গ আন্দোলনের প্রাতঃ-স্মরণীয় ভক্ত-পার্ষদবৃন্দ। পূজনীয় ও বরেণ্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচাৰ্য্য, সুশীলচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র হালদার, সুধীরকুমার বসু, অশোক চক্রবর্তী, নরেন্দ্রনাথ মিত্র,
যতীন্দ্রনাথ দাস, চুনীলাল রায়চৌধুরী, রাজেন্দ্রনাথ মজুমদার, বীরেন্দ্রলাল মিত্র, ননীগোপাল চক্রবর্তী, শৈলেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, হরিনন্দন প্রসাদ, বৈকুণ্ঠপ্রসাদ সিং, কিশোরীলাল চৌধুরী, স্মরজিৎ ঘোষ, অমূল্যকুমার ঘোষ, বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়, অজয়কুমার গঙ্গোপাধ্যায়, মনোরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়, সুধীরকুমার সমাজদার, নিরাপদ পাণ্ডে, বীরেন্দ্রনাথ পাণ্ডে, নলিনীপ্রসাদ গুহ, দোবেজী, ইন্দ্ৰকান্ত শর্ম্মা, কিরণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, জ্ঞানেন্দ্রমোহন চৌধুরী প্রমুখ ভক্তবৃন্দের ওপর বিভিন্ন বিভাগের ভার দেওয়া হয়।
শান্ত-গম্ভীর পবিত্র পরিবেশে, বিপুল বিদগ্ধ জনসমাবেশে পুণ্যতীর্থ বৈদ্যনাথধামের
একান্তে সৎসঙ্গ আশ্রমে আতঙ্কগ্রস্ত বিশ্বজনের সর্ব্বাঙ্গীণ এবং সর্ব্বোত্তম
স্বস্তিপ্রয়াসে ২৮শে চৈত্র, ১৩৬০ শুভ রামনবমী দিবস থেকে শুভারম্ভ হয় উৎসবের। সমাপ্ত হয় ৭ই
বৈশাখ, ১৩৬১তে—(১১ই এপ্রিল থেকে ২০শে এপ্রিল, ১৯৫৪) পর্য্যন্ত।
ভারতীয় কৃষ্টিতে প্রত্যয়বান জীবন-প্রয়াসী লক্ষাধিক নরনারী বিভিন্ন রাজ্য এবং ভারতের
বিভিন্ন নগর ও প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে বাস, লরি ও স্পেশাল ট্রেনযোগে এসে সম্মিলিত হন মহা-মহোৎসবে।
সমাগত ভক্তদের আশ্রয়ের জন্য অনেক অস্থায়ী প্যাণ্ডেল নির্মাণ করা হয়। পাম্পের সাহায্যে দারোয়া নদীর তলদেশ থেকে পাম্প, ইঞ্জিন ও পাইপের সাহায্যে বিশুদ্ধ জলের প্রচুর সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। ট্রলির সাহায্যে দ্রুত স্বাদু ও স্বাস্থ্যসম্মত আহার্য্য পরিবেশিত হয়
আনন্দবাজারে। স্বস্তিসেবকগণের সুশৃঙ্খল নিয়মানুবর্তিতার অনুশাসনে, অতন্দ্র প্রহরায়, সমাগত ভক্তজন নিরুপদ্রবে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করেন। অস্থায়ীভাবে স্থাপন করা হয় অনুসন্ধান কেন্দ্র, সাহায্য কেন্দ্র, প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র ও হাসপাতাল। সঙ্গীত, কীর্তন, নাটক, আলোচনা সভায় মুখরিত থাকে উৎসব প্রাঙ্গন।
ওই দশদিনব্যাপী মহাযজ্ঞের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভাষণ দান করেছিলেন তৎকালীন বরেণ্য বিদগ্ধজনেরা। অধ্যাপক অতুলচন্দ্র সেন, অধ্যক্ষ রামদীন পাণ্ডে, ডাঃ রামচন্দ্র অধিকারী, ডঃ মাখনলাল রায়চৌধুরী, রাধারমণ চৌধুরী, অধ্যাপক রেজাউল করিম, মন্ত্রী বিনোদানন্দ ঝা, ভিক্ষু শীলভদ্র, অধ্যাপক ত্রিপুরারি চক্রবর্তী, অধ্যাপক ছেদীলাল শাস্ত্রী, শ্রীযুক্তা প্রভাবতী দেবী সরস্বতী, ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সম্পাদক শ্রীজ্যোতিষচন্দ্র গুহ প্রমুখ জ্ঞানীগুণীবৃন্দ।
ওই মহোৎসবের সাফল্য কামনা ক’রে শুভেচ্ছাবার্তা জানিয়েছিলেন তৎকালিন
ভারতের উপরাষ্ট্রপতি ডঃ সর্ব্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ, ভারতীয় সংসদের ডেপুটি
স্পীকার শ্রীঅনন্তশয়নম আয়েঙ্গার, বিহারের রাজ্যপাল শ্রীরঙ্গনাথ দিবাকর,
পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল ডঃ হরেন্দ্রনাথ মুখার্জি, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের
ভাইস-চ্যান্সেলর ডঃ জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সভাপতি
শ্রীঅপূর্ব্বকুমার চন্দ, ওড়িশার জননায়ক শ্রীহরেকৃষ্ণ মহতাব, আসামের
অর্থমন্ত্রী শ্রীমতিরাম বোরা, ওড়িশার শিক্ষা ও অর্থমন্ত্রী শ্রীরাধানাথ রথ,
পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি শ্রীঅতুল্য ঘোষ, বোম্বাইয়ের মুখ্যমন্ত্রী
শ্রীমোরারজী দেশাই, পশ্চিমবঙ্গের উপমন্ত্রী শ্রীতরুণকান্তি ঘোষ প্রমুখ সম্মানীয় ব্যক্তিবর্গ।
২৮শে চৈত্র, ১৩৬০, (১১ এপ্রিল ১৯৫৪) উৎসবের প্রথম দিন শুভ রামনবমী তিথির অপরাহ্ণে অনুষ্ঠিত সাধারণ-সভায় সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক শ্রীঅতুলচন্দ্র সেন। প্রধান অতিথির আসন
অলঙ্কৃত করেন অধ্যক্ষ শ্রীরামদীন পাণ্ডে। সভাপতির অভিভাষণে শ্রীযুত সেন বলেন – “
এখানে এসে প্রাতঃকালে শ্রবণ করেছি ‘বন্দে পুরুষোত্তমম্’ ধ্বনি। এই তো ভারতের শাশ্বত
বন্দনা-ধ্বনি। রক্তমাংসের শরীরে যখন পরমব্রহ্ম অবতরণ করেন তখন এক পরমাশ্চর্য্য
লীলা দৃষ্ট হয়। সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের জীবন সুস্থ সবল ও সুন্দর হওয়াই
শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শের মর্ম্মকথা। এমনি একদিন আসতে পারে যেদিন সৎসঙ্গীদের
আচরণশীল চলনে সারা পৃথিবীতে এই ভাবরধারার প্লাবন আসবে।”
দ্বিতীয় দিন তিনটি অনুষ্ঠান সাফল্যের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয়
স্বাস্থ্য-প্রদর্শনী উপলক্ষে তরুণ সৎসঙ্গী বালকগণের খেলাধূলার অনুষ্ঠানে
পৌরোহিত্য করেন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সেক্রেটারী শ্রীজ্যোতিষচন্দ্র গুহ। অপর
একটি অনুষ্ঠানে জাতীয় জীবনে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যচর্চা
সম্পর্কে ডাঃ রামচন্দ্র অধিকারী জাতি ও জাতীয়তার সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করে
পারিবারিক ও ব্যক্তি-জীবনের স্বাস্থ্য কিভাবে রক্ষা করা যায় সেই বিষয়ে আলোকসম্পাত করেন।
তৃতীয় দিনের অপরাহ্ণের সাধারণ সভায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক কালচার বিভাগের
প্রধান ডঃ মাখনলাল রায়চৌধুরী সুফী মতবাদ সম্বন্ধে আলোচনা করেন। এছাড়া
ঋত্বিগাচাৰ্য্য শ্রীকৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যের পৌরোহিত্যে ধর্ম্ম ও
বিজ্ঞানের নিগূঢ় সম্বন্ধ ও সংহতি বিষয়ে এবং শ্রীযতীন্দ্রনাথ দাসের
সভাপতিত্বে দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান এবং তার উন্নয়নে সৎসঙ্গের অবদান বিষয়ে
দুইটি সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
চতুর্থ দিন (১লা বৈশাখ, ১৩৬১) সকাল সাতটায় যতি-আশ্রমের সম্মুখের মাঠে পঞ্চাশ
হাজারেরও বেশি নরনারী সমবেত হয়েছেন। ঠিক সাতটায় প্রার্থনা আরম্ভ হ’ল।
যতি-আশ্রমের বারান্দা থেকে মাইকযোগে আহ্বানী দিলেন ঋত্বিগাচার্য
শ্রীকৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য। তারপরেই সেই বিশাল জনসঙ্ঘের সমাগত কণ্ঠের
উচ্চারিত প্রার্থনামন্ত্র মেঘমন্দ্র ধ্বনিতে ব্যোম স্পর্শ করল। প্রার্থনাস্তে
শ্রীশ্রীঠাকুরের আশীর্ব্বাণী পাঠ করলেন ঋত্বিগাচার্য্যদেব।
আশিস-বাণীতে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন—
আজ নবীন বৎসরের জন্মদিন,
নবীন দীপনা নিয়ে বর্ষ নবীন রূপে
দুনিয়ার বুকে উদ্ভাসিত হ’য়ে উঠলো,
জন্ম নিল–-সবিতার ভাস্বর-দীপনায়
আত্মবিকাশ ক’রে;
প্রভাতের মলয়-হিল্লোল
দীপন দ্যোতনায়
স্মিত-গৌরব-উজ্জ্বলতা নিয়ে
তমসার বক্ষ বিদীর্ণ ক’রে
নবীন স্পন্দনায়, উচ্ছল উজ্জ্বলায়
আবির্ভূত হ’য়ে উঠলো—
স্বাগতম্-কিরণ-স্পন্দনে
স্বস্তি-অনুকম্পী যাগ-তীর্থের
দ্যোতন দোলায় হেলে-দুলে
নৰ্ত্তন-হিল্লোলে দেব-প্রভায় উদ্দাম হ’য়ে ; …..
যিনি আমার একান্ত,
যিনি আমার প্রিয়পরম,
যিনি আমার পরমপিতা পরমেশ্বর
তাঁর চরণে একান্ত প্ৰাৰ্থনা—
তোমরা সুখে থাক,
স্বস্তির অধিকারী হও,
নির্ব্বাধি হও, চিরায়ু নিয়ে বেঁচে থাক—
তোমাদের যা-কিছু সব নিয়ে ;
অনুশাসন-অনুসরণ
তোমাদিগকে স্বস্তির অধিকারী ক’রে তুলুক,
সম্বৰ্দ্ধনার অধিকারী ক’রে তুলুক,
সমীচীন অনুচলন
তোমাদিগকে সাধু ক’রে তুলুক—
সুনিষ্পাদনী অভিসার-অনুদীপনায় ;
আর, স্বস্তি, শান্তি ও স্বধা
তোমাদের সত্তায় অন্বিত হয়ে
প্রিয়-পরমে স্বার্থক হ’য়ে উঠুক—
পুরুষোত্তম-পরিবেদনায় ;
বল—‘বন্দে পুরুষোত্তমম্’
আবার বল—‘বন্দে পুরুষোত্তমম্
আকণ্ঠ ঘোষণায় বল—‘বন্দে পুরুষোত্তমম্।
আশীর্ব্বাণী পাঠান্তে অর্ঘ্যাঞ্জলিসহ প্রণাম নিবেদন করেন সমবেত ভক্তজনমণ্ডলী। সমাপন হয় প্রাতঃকালীন অনুষ্ঠান।
অপরাহ্ণে প্যান্ডেলে ঋত্বিগাচার্য্যদেবের পরিচালনায় ঋত্বিক-সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সন্ধ্যায় প্রবর্তক-সম্পাদক শ্রীরাধারমণ চৌধুরী মহোদয়ের সভাপতিত্বে এক বিশাল
জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। নির্ধারিত আলোচ্য বিষয় ছিল—শ্রীশ্রীঠাকুরের দিব্য জীবন ও বাণী। সভাপতির ভাষণে শ্রীযুত চৌধুরী বলেন— “গত চল্লিশ বছর ধরে আমি শ্রীশ্রীঠাকুরকে জানি। সেইজন্যই এই বিশাল জনতা শ্রীশ্রীঠাকুরের জন্য যে গভীর প্রেম হৃদয়ে বহন করেন এবং
সৎসঙ্গের জন্য তাদের যে আগ্রহ ও উৎসাহ তা আমি ভালভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারি।
শ্রীশ্রীঠাকুর যে ভাগবতকার্য্যের জন্য অবতীর্ণ হয়েছেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই।”
পঞ্চম দিবসের (২রা বৈশাখ, ১৩৬১) সন্ধ্যায় শিক্ষা-সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সৎ-
সঙ্গের সহ-সভাপতি শ্রীসুশীলচন্দ্র বসু।
৬ষ্ঠ দিবসের সাধারণসভায় সভাপতিত্ব করেন অবসরপ্রাপ্ত সাব-জজ শ্রীশচীন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। প্রধান অতিথি ছিলেন অধ্যাপক শ্রীরেজাউল করিম। ভাষণ-প্রসঙ্গে অধ্যাপক করিম বলেন — “বর্তমানে বিশ্ব বিজ্ঞানসৃষ্ট এক আগ্নেয়গিরির উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই নিদারুণ আশঙ্কার মধ্যেও আনন্দের বিষয় যে, বিশ্বসভ্যতায় বিশ্বমানবের রক্ষাকল্পে নূতন নেতৃত্ব,
নূতন চিন্তাধারা দেখা দিয়েছে। ত্রাণকর্তার আবির্ভাবে বিশ্বাসী সৎসঙ্গের এই
বিশাল জনগণ সেই নূতন চিন্তাধারার প্রতীক। এই বিশ্বাসী জনগণের প্রবল শক্তিতে
একদিন অশুভ নাশ হবে এবং শয়তানের উপর জীবনদেবতা জয়লাভ করবেনই।”
৭ম দিবসে (১৭ই এপ্রিল, ১৯৫৪) সন্ধ্যায় জননেতা শ্রীবিনোদানন্দ ঝার সভাপতিত্বে
জনসভা হয়।
তৎপর দিন (৮ম দিবস) অধ্যাপক শ্রীরেজাউল করিমের সভাপতিত্বে সাধারণ
সভা হয়। প্রধান অতিথির আসন গ্রহণ করেন মহাবোধি সোসাইটির ভিক্ষু শীলভদ্র।
সভাপতির ভাষণে অধ্যাপক করিম বলেন—“আমি গতকাল শ্রীশ্রীঠাকুরকে দেখেছি, তাঁর
সঙ্গে আলাপ করেছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস হ’ল যে, বিশ্বের পীড়িত মানুষের জন্য
তাঁর করুণা এবং কৰ্ম্ম আগামী সহস্র-সহস্র বৎসর তাঁকে প্রাতঃস্মরণীয় করে
রাখবে তাতে কোনও সন্দেহ নাই।”
সর্ব্বধর্ম সমন্বয় সম্বন্ধে অধ্যাপক করিম বলেন— “শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকুলচন্দ্রই
সমন্বয়ের মূর্ত প্রতীক। তাঁর প্রবর্তিত নীতি প্রেম, শান্তি ও সুস্থ পরিবেশ
সর্ব্বকালের এবং সর্ব্বলোকের জীবনবিকাশের অনুকূল। এই নীতিই যুগে-যুগে বিভিন্ন
অবতারগণ প্রবর্তন ক’রে গেছেন।”
উৎসবের নবম দিবসে (৬ই বৈশাখ, ১৩৬১, ১৯শে এপ্রিল, ১৯৫৪) সন্ধ্যায় শ্রীযুক্তা
প্রভাবতী দেবী সরস্বতীর সভানেত্রীত্বে এক জনসভা হয়। আলোচ্য বিষয় ছিল—নারী-বৈশিষ্ট্যের জাগরণে সৎসঙ্গ আন্দোলন। সভানেত্রীর ভাষণে শ্রীযুক্তা সরস্বতী বলেন—“শ্রীশ্রীঠাকুরের সঙ্গে তাঁর এই প্রথম দর্শন তাঁর জীবনের এক বিরাট ও মহৎ অভিজ্ঞতা। এই বিরাট ও গভীর ভাবের সন্নিকটে এসে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। যে মহৎ কাজের ভার এই মহামানব গ্রহণ করেছেন তা আমার ধারণারও অতীত। তিনি আমাদের সমস্ত দৃষ্টিভঙ্গী ও জীবনধারার এক আমূল পরিবর্তন আনতে চান। আর্য্যকৃষ্টির ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে তিনি এই জাতিকে পুনর্গঠিত করতে চান।”
৭ই বৈশাখ, ২০শে এপ্রিল দশদিনব্যাপী নববর্ষ পুরুষোত্তম স্বস্তিতীর্থ মহাযজ্ঞের
সমাপ্তি দিবস। এই দিনের সান্ধ্যসভায় সভাপতিত্ব করেন সৎসঙ্গের সহ-সভাপতি
শ্রীসুশীলচন্দ্র বসু। অধ্যাপক শ্রীত্রিপুরারি চক্রবর্তী, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক রেজাউল করিম প্রমুখ ভাষণ দেন। এরপর মহাযজ্ঞের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
এই বিরাট মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠানের ফলে কৰ্ম্মীগণ বিশেষভাবে উদ্দীপিত হয়ে ওঠেন।
শ্রীশ্রীঠাকুরের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ নিয়ে তাঁরা নবীন প্রেরণায়
আবার কৰ্ম্মসাগরে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এবারে পাঞ্জাধারী কর্ম্মীর এবং দীক্ষিতের
সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পায়। (সূত্রঃ মহামানবের সাগরতীরে, ১ম খণ্ড)
* * *
নিত্যপাঠ্য চলার সাথী গ্রন্থের ‘উৎসব’ নিবন্ধে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন :
“যে-প্রচেষ্টার ডাকে জনসাধারণ উৎফুল্ল আনন্দের সহিত জ্ঞানে সমৃদ্ধ হইয়া,
নিজেকে প্রাণনে, ব্যাপনে ও বর্ধনে নিয়ন্ত্রিত করিতে পারে এমনতর মঙ্গলপ্রসূ
অভিসমাগমকেই উৎসব বলে! ৩০৪”
এখানে তিনটি শব্দ প্রণিধানযোগ্য। “প্রাণনে, ব্যাপনে ও বর্দ্ধনে”
নিয়ন্ত্রিত হবার কথা বলা হয়েছে।
এ নিয়ন্ত্রণ প্রাকৃতিকভাবে স্বতঃ-নিয়ন্ত্রিত। বীজ ও রজো বা sperm &
ovum-এর দুটি অর্ধ-কোষ (22 autosome + x or x/y sex chromosome=44xx or xy)
মিলে প্রথমে একটা কোষের সৃষ্টি হয়। ক্রমে “প্রাণনে, ব্যাপনে ও বর্দ্ধনে”
নিয়ন্ত্রিত হবার বিধি মেনে কোষ বিভাজনের মাধ্যমে এক থেকে বহুতে পরিণত হতে
শুরু হয়। বিধিবৎ নিয়ন্ত্রিত হলে ১০ চান্দ্র মাসে পূর্ণতা পায়। এভাবেই সৃষ্টি
হয় আমাদের মানবদেহ—“প্রাণনে, ব্যাপনে ও বর্দ্ধনে”। এরমধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে
ধর্মের মূল তত্ত্ব ও তথ্য—“অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম বলে জানিস তাকে।”
প্রাণ সৃজনের বিধি বিন্যাসের ন্যায়, যে সমাবেশ থেকে মানুষ নিজের প্রবৃত্তি
নিয়ন্ত্রণ করে সত্তার পথে চলতে অভ্যস্ত হয় তার নাম উৎসব। যা’ আমাদের প্রতিনিয়ত
অভ্যাস করে যেতে হবে।
শব্দার্থ অনুযায়ী উৎকৃষ্ট প্রসব করে যা’ তার নাম উৎসব, যা’তে আমাদের
আমিগুলোর উৎসকে, সহজাত-সংস্কারকে আরোতর উৎকৃষ্ট ভাবে সংরক্ষণ করতে পারি।
উৎসবের উদ্দেশ্য ব্যাপক যাজন, আর যাজন মানে ইষ্টানুগ বিধিতে সবাইকে জীবনে
অধিষ্ঠিত করা। যজন অনুশীলন মাধ্যমে আমি নিজে যদি ইষ্টানুগ বিধিতে জীবনে
অধিষ্ঠিত না হতে পারি, তাহলে প্রবৃত্তি পরিপোষণে আমি যা হয়েছি উৎসবের নামে তার যাজনই করব।
শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন, “উৎসব-সম্বন্ধে আমার idea (ধারণা) ছিল—উৎসবে বক্তৃতা হবে, হোম হবে। হোতা, অধ্বর্য্যু, উদ্গাতা ইত্যাদি থাকবে। আপনারা এক-এক দল এক-এক জায়গায় বসবেন। আলাপ-আলোচনা করবেন। লোকসমাগম হবে। Educational exhibition (শিক্ষামূলক
প্রদর্শনী) হবে, শিক্ষামূলক সিনেমা হবে। যে কয়দিন উৎসব করবেন তাতে মানুষ
educated (শিক্ষিত) হবে। মানুষকে উচ্চল চলনে শিক্ষিত করে তোলাই উৎসবের
উদ্দেশ্য। উৎসব মানুষকে উৎসমুখী উৎসৃজনের দিকে নিয়ে যাবে। আপনারা এক একজনে
উৎসবের হোতা হবেন।” (শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, ২৬. ০৪. ১৯৫১, আলোচনা প্রসঙ্গে-২০)
আমরা সকলে মিলে শ্রীশ্রীঠাকুরের ঈপ্সিত উৎসবের হোতা হবার অনুশীলনে যেন সার্থক হতে পারি। প্রার্থনা জানাই পরমপিতার উদ্দেশ্যে। জয়গুরু। সবাই ভালো থাকবেন। বন্দে পুরুষোত্তমম্!
—————-
তথ্যঋণ :
১. বরেণ্য ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থ।
২. শ্রীসচ্চিদানন্দ গোস্বামী প্রণীত, ‘আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী ও সৎসঙ্গ আন্দোলন’।
৩. শ্রীনাথ প্রণীত ‘যেমন তাঁকে দেখি’।
৪. শ্রীকুমারকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য প্রণীত ‘মহামানবের সাগরতীরে’, ১ম খণ্ড।