নারায়ণ
(শ্রীদেবীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় রচিত ‘শ্রীশ্রীঠাকুরের দৃষ্টিতে দেব-দেবী’ গ্রন্থ থেকে সংকলিত)
প্রতিটি মানুষ বাঁচতে চায়, সুস্থ থাকতে চায়। এই পৃথিবীতে যারা বেঁচে আছে তাদের প্রত্যেকেই জানে যে একদিন তাকেও মরতে হবে। তবুও মানুষ মরণকে এড়াতে চায়। এড়াতে যে চায় তার প্রমাণ হ’ল, পায়ে সামান্য একটা কাঁটা ফুটলে বা দাঁতের গোড়ায় একটু যন্ত্রণা হ’লেই মানুষ অস্থির হ’য়ে ওঠে। এবং যতক্ষণ পর্য্যন্ত কাঁটাটি তুলে ফেলতে না পারে বা ঐ যন্ত্রণার উপশম ঘটাতে না পারে, ততক্ষণ সে সোয়াস্তি পায় না। এটা হয় ঐ বাঁচার তথা সুস্থ থাকার কামনা থেকেই।
বাঁচার জন্যই মানুষ স্মরণাতীত কাল থেকেই অমৃতের সন্ধান করছে, ‘অমৃত অমৃত’ ব’লে চীৎকার করছে। আর্য্যঋষিগণ মানুষকে সম্বোধন করেছেন ‘অমৃতের পুত্র’ বলে। এই অমৃতের পথ অর্থাৎ মৃত্যুহীনতার পথ তথা বাঁচার পথ যাঁর কাছে পাওয়া যায়, তিনিই নারায়ণ—মানুষের জীবনপথ।
‘নারায়ণ’-শব্দটিকে ভাঙ্গলে দুটি পদ পাওয়া যায়, ‘নর’ এবং ‘অয়ন’। ‘নর’ শব্দের উত্তর ‘অন্’ প্রত্যয় যোগ ক’রে হয় ‘নার’, মানে—নরসমূহ। আর ‘অয়ন’ মানে—চলন, পথ। তাই নারায়ণ মানে হ’ল— নরসমূহের (জীবন) পথ, সর্ব্বজীবের আশ্রয় বা পথ। (২) আবার, ‘নারায়ণ’ মানে—প্রাপ্তি ও বর্দ্ধনার পথ [ নৃ (প্রাপণ, বর্দ্ধন) + ঘঞ্ = নার ]। অর্থাৎ যে-পথ অনুসরণ ক’রে চললে মানুষ ভাল থাকবে, সুস্থ, স্বস্থ, ও ক্রমশঃ বৃদ্ধির পথে অগ্রসর হয়ে সুদীর্ঘ জীবনের অধিকারী হবে তাই হ’ল নারায়ণ।
মনুসংহিতায় আছে, ‘নারা’ মানে জল (১/১০)। এই জল যাঁর আশ্ৰয় তিনিই নারায়ণ। স্মৃতির এই উক্তির একটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে। ক্ষিতি (মাটি), অপ্ (জল), তেজ (আগুন), মরুৎ (বাতাস) ও ব্যোম (শূন্য)। এই পঞ্চভূত দ্বারা সমগ্র বিশ্বচরাচর সৃষ্টি হয়েছে। তার মধ্যে ব্যোম হ’ল মহাশূন্য। সেখানে আছে শুধু শব্দগুণ। তৎপরবর্ত্তী পদার্থ মরুৎ—রূপ-রস-গন্ধ-বিহীন ; তাকে অনুভব করতে হয় স্পর্শের ভিতর দিয়ে। তারপর আসছে তেজ (অগ্নি), যার মধ্যে আছে শব্দ, স্পর্শ ও রূপ-গুণ। কিন্তু তখনও পর্য্যন্ত সৃষ্টিধারা ঘনীভূত কোন অবস্থায় পর্য্যবসিত হয়নি। তেজ বা অগ্নিতে একটা গ্যাসীয় অবস্থার বিকাশ পর্য্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। ঘনীভূত প্রথম পদার্থই হ’ল জল— যার মধ্যে শব্দগুণ, স্পর্শগুণ, রূপগুণ ও রসগুণের অস্তিত্ব আছে। এই জলকে আশ্রয় ক’রেই হয়েছে প্রথম প্রাণের উদ্ভব। প্রাণের উৎপত্তির জন্য চাই রস। তাই, মনুসংহিতাতে আবার বলা হয়েছে, জলই প্রথম সৃষ্টি (১/৮)। জলেই সূচিত হ’ল প্রাণের প্রথম স্পন্দন। এককোষী প্রাণী প্রথম দেখা দিল জলের মধ্যে। তাই, নারায়ণ শব্দের এমনতর বুৎপত্তি।
শতপথ ব্রাহ্মণে আছে, নারায়ণ প্রথম পুরুষ (১৩/৬/২/১)। তিনি সৃষ্টিকর্তারও স্রষ্টা। নারায়ণের নাভিপদ্ম থেকে ব্রহ্মার জন্ম। ব্রহ্মাই জগৎ সৃষ্টি করেছেন। তাই, মহামতি ব্যাসদেব সেই প্রথম পুরুষ নারায়ণকে প্রণাম ক’রে শ্রীমদ্ভাগবত রচনার কাজে ব্রতী হয়েছেন (১/২/৪)।
ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণে আছে, নারায়ণের চতুর্ভূজ মূর্ত্তি। চতুর্ভূজ মানে চার হাত। চার হাতওয়ালা বিষ্ণুমূর্ত্তি আমরা অনেক জায়গায় পূজিত হ’তে দেখে থাকি। নারায়ণের এই চার হাতের তাৎপর্য্য কী ? চার হাত মানে চার দিক দেখে চলা, চারদিকে অথাৎ সবদিকে নজর রাখা। বিশ্ব দুনিয়ার প্রভু যিনি তাঁর দৃষ্টির বাইরে তো কিছুই নেই। —তিনি সর্ব্বদর্শী।
নারায়ণের চার হাতে আছে শঙ্খ, চক্র, গদা এবং পদ্ম। তাই তিনি ‘শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী’ নামে অভিহিত হ’য়ে থাকেন। শঙ্খধ্বনি দ্বারা তিনি সমগ্র মানবসমাজকে আহ্বান করেন, যুদ্ধার্থে বা কর্ম্মার্থে নিয়োজিত হ’তে প্রবুদ্ধ করে তোলেন। চক্র ও গদা হ’ল যুদ্ধাস্ত্রের প্রতীক, যা’ দিয়ে তিনি অন্যায়কারীকে শাস্তি-প্রদান ও নিধন করেন। আর, পদ্ম হ’ল লক্ষ্মী তথা সৌন্দর্য্যের প্রতীক। নারায়ণের করকমলে পদ্ম মানে সেখানে লক্ষ্মীশ্ৰীর আবাস।
এই শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মের অপূৰ্ব্ব এক যুক্তিপূর্ণ সুসমঞ্জস ব্যাখ্যা দান করেছেন পরমপ্রেমময় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। তাঁর কথা থেকে বোঝা যায়, এগুলি নারায়ণের বিভিন্ন শক্তি। আরো উপলব্ধি করা যায় যে, যারা নারায়ণের উপাসনা করে, নারায়ণকে তৃপ্ত ও প্রীত ক’রে চলাই যাদের পরম-পুরুষার্থ, তারা প্রত্যেকেই কমবেশী এইসব শক্তির অধিকারী হ’য়ে ওঠে। এ সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুরের সেই চিরস্মরণীয় বাণীটি মুদ্রিত হ’য়ে আছে তাঁর ‘সম্বিতী’ নামক গ্রন্থে।
ধাতুগত অর্থের উপর দাঁড়িয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর প্রতিটি শব্দকে ব্যাখ্যা করেছেন। এর আগে সাহিত্যে এমনতর দৃষ্টিভঙ্গী আর দেখা যায়নি। তাই, তাঁর কৃত ব্যাখ্যাগুলি চিন্তার এক নবদিগন্ত উন্মোচিত করেছে, ভাষার জগতেও এনে দিয়েছে নতুন প্রাণস্পন্দন।
‘শঙ্খ’ শব্দটির উৎপত্তি ‘শম্’-ধাতু থেকে, অর্থ—শান্ত করা বা প্রশমিত করা। আবার, ‘শম্’ শব্দের মানে কল্যাণ। এই অর্থের উপর ভিত্তি ক’রে কম্বুনিনাদে উচ্চারণ করলেন শ্রীশ্রীঠাকুর —-
“তাঁ’র শঙ্খ তোমাতে গ’র্জ্জে উঠুক,
দুষ্টবুদ্ধিকে দমন করুক,
মরণকে নিরসন করুক,
সব যাতনার উপশম করুক—-
পাপকে নিবৃত্ত ক’রে সবাইকে শান্ত ক’রে তুলুক ;
… … … … … … … … … … … …।”
(‘সম্বিতী’ দর্শন অধ্যায়, বাণী সংখ্যা ৩৩২)
এই হ’ল নারায়ণের হস্তস্থিত শঙ্খের ক্রিয়া।
‘চক্র’ এসেছে ‘কৃ’-ধাতু থেকে, মানে—কর্ম্ম করা,—যে কর্ম্ম মঙ্গল আনে। আবার, ‘চক্’- ধাতু থেকেও ‘চক্র’ শব্দ নিষ্পন্ন হয়, অর্থ—তৃপ্তি। তাই, ‘চক্র’ মানে—যে কর্ম্ম দ্বারা সবার সাত্বত তৃপ্তি হয়। শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন—-
“… … … … … … … … … … … ..
তাঁ’র চক্র তোমাকে সুদর্শন-প্রবুদ্ধ ক’রে
কৃতী ক’রে তুলুক,
অন্যায়কে অপসারিত করুক,
শান্তির প্রতিষ্ঠায় তোমাকে নিরবিচ্ছিন্ন ক’রে তুলুক ;
… … … … … … … … … … …।”
(‘সম্বিতী’ দর্শন অধ্যায়, বাণী সংখ্যা– ৩৩২)
নারায়ণের সুদর্শন-চক্রের ক্রিয়া এমনতরই।
এই চক্র ‘সুদর্শন’ নামে প্রসিদ্ধ। চক্রের নাম সুদর্শন হ’ল কেন ? চমৎকার ব্যাখ্যা ক’রে বললেন যুগত্রাতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্ৰ—-
“সুদর্শন মানে সম্যক্ দর্শন—-
ভাল ক’রে দেখা—-
পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে দেখা ;
তোমার সুদর্শন—-
যা’-কিছু প্রত্যেককে এমন ক’রে দেখুক—-
যা’তে অন্তর্নিহিত মঙ্গলকে
উদ্ঘাটন করতে পারে ;
আর, তা’রই এমনতর চক্র সৃষ্টি কর—-
যা’র ফলে, জন ও জাতি উৎকর্ষে
অবাধ হ’য়ে চলতে পারে—নিয়ত,—নির্ব্বিরোধে,
ভগবানের সুদর্শন-চক্র
আশীর্ব্বাদী হ’য়ে
তোমাতে পরিশোভিত হোক।”
(শাশ্বতী, সংজ্ঞা– ৫৮৪)
তারপর আসছে ‘গদা’। ‘গদা’ শব্দটা শুনলেই স্বভাবতঃ আমাদের মনে জেগে ওঠে ভীমের গদার কথা। আর, তা’ হ’ল লড়াই করার জন্য এক শ্রেণীর লোহার মুগুর। কিন্তু শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে যখন গদার তাৎপর্য্য জিজ্ঞাসা করা হ’ল, তিনি শব্দটির ধাতুগত অর্থ দেখতে বললেন। দেখা গেল, ‘গদা’ শব্দটি এসেছে ‘গদ্’ ধাতু থেকে। যার মানে—কথন (কথা বলা) এবং মেঘধ্বনি। একথা শুনে পরম দয়াল শ্রীশ্রীঠাকুর গদার তাৎপর্য্য ব্যাখ্যা-প্রসঙ্গে বললেন—-
“… … … … … … … … … … … ..
আর, গদা তোমাকে
গুরুগম্ভীর মেঘবাণীতে বাগ্মী ক’রে তুলুক,
তোমাতে মুগ্ধ হোক সবাই—
পরিপোষণী বিচ্ছুরণে দীপ্ত হোক
তোমার পরিপূরণী প্ৰকীর্ত্তি,
কৌমোদকী সার্থক ক’রে তুলুক তোমাকে ;
… … … … … … … … … … …।”
(‘সম্বিতী’ দর্শন অধ্যায়, বাণী সংখ্যা– ৩৩২)
তাহ’লে ‘গদা’ মানে দেখা যাচ্ছে বাক্য ও কর্ম্মের অমোঘ সুসঙ্গতিপূর্ণ বিন্যাস।
‘পদ্ম’ শব্দস্থিত ‘পদ্’- ধাতুর মানে আছে—গতি, স্থৈর্য্য, প্রাপ্তি। ধাতুগত অথের্র উপর দাঁড়িয়ে পদ্মের কী কাজ তা’ বুঝিয়ে বললেন শ্রীশ্রীঠাকুর—
“… … … … … … … … … … … ..
আর, পদ্ম আনুক গতি, আনুক স্থৈর্য্য,—-
প্রাপ্তিতে প্রস্ফুটিত ক’রে তুলুক জন ও জাতিকে ;
আর, সব হৃদয় খুলে—-
উদাত্ত আত্মনিবেদনে তুমি ব’লে ওঠ,
গেয়ে ওঠ—-“বন্দে পুরুষোত্তমম্”।”
(‘সম্বিতী’ দর্শন অধ্যায়, বাণী সংখ্যা– ৩৩২)
সমস্ত কথাগুলি একটু ধীর মস্তিষ্কে গভীরভাবে অনুধাবন করলেই পরিষ্কার বোঝা যায় যে, শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম যে একমাত্র নারায়ণের হাতে ছাড়া আর কোথাও থাকতে পারে না তা’ নয়। যে-ব্যক্তি নিষ্ঠার সঙ্গে নারায়ণের অর্চ্চনা করে, প্রকৃত বিষ্ণুভক্ত বা বৈষ্ণব যে, তারও চরিত্রে ঐ চতুঃশক্তি সতাৎপর্য্যে উদ্ভাসিত হ’য়ে ওঠে—যার যার বৈশিষ্ট্যমাফিক।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র একদিন কথাপ্রসঙ্গে বলছিলেন, “প্রতিটি মানুষই একটি ক্ষুদে ঈশ্বর।” তাই, নারায়ণকে যারা ভালবাসে, তাঁকে অনুসরণ ক’রে যারা চলে, তঁৎপ্রীত্যর্থেই যাদের জীবন ও কর্ম্ম নিয়ন্ত্রিত হয়, তাদের চলা-বলা-করায় শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মের উপরি-উক্ত ক্রিয়া বিকশিত হ’য়ে ওঠে। তারাও হ’য়ে ওঠে এক-একটি ক্ষুদে শঙ্খ-চক্ৰ-গদা-পদ্মধারী। চার আল্ দেখে চলার জন্য তারা হয় চতুরচলনসম্পন্ন। এইভাবে তাদের জীবনে বিষ্ণুপূজা বা নারায়ণপূজা সার্থক হ’য়ে ওঠে। কারণ, পূজা মানেই হ’ল সংবর্ধনা—যাঁকে পূজা করছি, তাঁর প্রতি অনুরাগ নিয়ে, তাঁর গুণাবলী বিহিত অনুশীলনের ভিতর দিয়ে নিজ চরিত্রে মূর্ত্ত করে তোলা।
তাৎপর্য্য জেনে দেবতার আরাধনা করতে পারলেই তাঁর অন্তঃপুরে গতাগতির একটা সুযোগ হয়, দেবতার সাথে প্রাণের একটা নিবিড় সম্বন্ধ স্থাপিত হয়। নতুবা, দেবমূর্ত্তির সামনে শুধু কতগুলি পুঁথিগত শুষ্ক সংস্কৃত মন্ত্র পাঠ ক’রে ফুল-জল দিলে তা’ হয় দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বাড়ীটি দেখে চ’লে আসার মত। জানা হয় না বাড়ীর ভেতরে কতগুলি ঘর, ঘরগুলি কত বড়, আসবাবপত্র কেমন, ইত্যাদি। একেই বলা হয় বাহ্যপূজা। তাতে দেবতার সাথে অন্তরের যোগ স্থাপিত হয় না। ফলে উদ্বর্দ্ধনাও ব্যাহত হয়। মুনিগণ এমনতর পূজাকে বলেছেন অধমেরও অধম।
পুরাণে উল্লিখিত আছে, নারায়ণ অনন্তশয্যায় শায়িত। তাঁর নাভিপদ্ম থেকে ব্রহ্মা জাত হলেন। এই ব্রহ্মা হলেন ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্ত্তা। এই তথ্যটিকে এবার আমরা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ভাবানুসরণে বুঝতে চেষ্টা করব—
‘নর’ শব্দ এসেছে ‘নৃ’-ধাতু থেকে, মানে—বর্দ্ধন। আর ‘অয়ন’ মানে—পথ। তাই, ‘নারায়ণ’ মানে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন—‘বর্দ্ধনার পথ’। বিশ্বদুনিয়ায় সৃষ্ট প্রতিটি পদার্থের মধ্যেই আছে অস্তি ও বৃদ্ধির আকূতি— থেকে, বেড়ে চলার প্রবণতা। বিরাট নীহারিকা জগৎ থেকে আরম্ভ ক’রে ধূলিকণার অতি ক্ষুদ্র অণু পর্য্যন্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যাবতীয় সব কিছুতে এই অস্তি-বৃদ্ধির সম্বেগ অনুস্যূত হ’য়ে আছে। এমন কিছুই নেই যেখানে এই সম্বেগ নেই। তাই নারায়ণ অনন্ত, তাঁর অন্ত করা যায় না। আর, সর্ব্বত্র আছেন বলে সমগ্র বিশ্বই তাঁর অনন্তশয্যা। তিনি ‘অনীয়সামনীয়াংসং স্থবিষ্টঞ্চ স্থবীয়সাম্’ (গরুড় পুরাণ, পূর্ব্বখণ্ড)—তিনি ক্ষুদ্র হতেও ক্ষুদ্র এবং বৃহৎ হতেও বৃহৎ।
আকাশে যে বিরাট বিস্তৃত ছায়াপথ ও তৎসহ অগণিত গ্রহনক্ষত্রের ছড়াছড়ি দেখা যায়, তা’ দেখে কেউ হয়তো ভাবতে পারেন ‘ইহাই নারায়ণের মহিমা’। হ্যাঁ, মহিমা তো বটেই, তবে সেটা এই ব্রহ্মাণ্ডের। আর, তার সৃষ্টিকর্ত্তা একজন ব্রহ্মা। এইরকম অনন্ত কোটি ব্রহ্মাণ্ড আছে। সেগুলির সৃষ্টিকর্ত্তা আছেন অনন্তকোটি ব্রহ্মা, যাঁরা প্রত্যেকেই জাত হয়েছেন নারায়ণের নাভিপদ্ম থেকে। পৃথিবীর বৈজ্ঞানিকগণ এরকম অসংখ্য ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্ব কল্পনা করেছেন মাত্র। কিন্তু তার অতি সামান্য অংশই আছে তাঁদের অবগতিতে। আমরা এই একটি ব্রহ্মাণ্ডের বিস্তৃতি দেখেই হতচকিত হ’য়ে যাই। পৃথিবী কত বড়। এর থেকে বহুগুণ বড় সূর্য্য। আবার, সূর্য্য থেকে বহুগুণ বৃহৎ অসংখ্য তারকাও রয়েছে। এরকম সংখ্যাতীত তারকা-গ্রহ-নিহারিকা নিয়ে আমাদের এই ব্রহ্মাণ্ড। এই বিপুল ব্যাপারের কতটুকু হদিশ আমরা রাখি।
তাইতো গল্প আছে, চতুর্ম্মুখ ব্রহ্মার একবার অহঙ্কার হয়েছিল ‘আমার চাইতে বড় আর কে আছে ! আমি হলাম ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্ত্তা।’ বিষ্ণুর দরবারে তিনি জাঁকিয়ে বসেছিলেন। তারপর একে একে সেই দরবারে প্রবেশ করতে আরম্ভ করলেন দশ মুখ ব্রহ্মা, শতমুখ ব্রহ্মা, সহস্রমুখ, লক্ষমুখ, কোটিমুখ সব ব্ৰহ্মার দল। দেখে তো চতুর্ম্মুখ ব্রহ্মার চোখ ছানাবড়া। তাঁর বড়ত্বের অহঙ্কার চূর্ণ হ’য়ে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন, ‘আমিই একমাত্র ব্রহ্মা নই, আরো ব্রহ্মা আছে এবং তারা আমার থেকে ঢের বেশী শক্তির অধিকারী।’ তাইতো বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতি ভাবাবেগে রচনা করলেন—-
‘কত চতুরানন মরি মরি যাওত
ন তুয়া আদি অবসানা
তোঁহে জনমি পুন তোঁহে সমাওত
সাগর লহরি সমানা।।’
—- কত কত ব্রহ্মা তোমার মধ্যে লীন হ’য়ে যায়। তোমার আদিও নেই, অন্তও নেই। সমগ্র জীবকুল সাগর-তরঙ্গের মত তোমাতেই জন্ম নেয় আবার তোমাতেই লয়প্রাপ্ত হয়।
উপরি-উক্ত কাহিনী থেকে প্রমাণিত হয়— ব্রহ্মা বহু, কিন্তু বিষ্ণু বা নারায়ণ একজন। এক বিষ্ণু থেকে জাত কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ড। এক এক ব্রহ্মা এক ব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা। এইরকম কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ডও যেখানে লীন হ’য়ে যায়, তা’ই নারায়ণের অনন্তশয্যা। সেই বিশাল ব্যাপ্তি, যা’ মানুষের কোনরকম ধারণাতেই আসে না, সেই ব্যক্ত অব্যক্ত সব কিছু ব্যাপ্ত ক’রে নারায়ণ বা বিষ্ণুর অবস্থিতি। সর্ব্বত্র ব্যাপ্ত হ’য়ে আছেন বলেই তাঁর নাম ‘বিষ্ণু’ [‘বিষ্ণু’ শব্দটি হয়েছে ‘বিষ্’- ধাতু থেকে, অর্থ–ব্যাপ্তি। {বিষ্ণু = বিষ্ + নুক্ (কর্ত্তরি)} মানে—যিনি সব-কিছুতে পরিব্যাপ্ত হ’য়ে আছেন।]। ‘সর্ব্বং বিষ্ণুময়ং জগৎ’—সমগ্র জগৎ বিষ্ণুময়।
আমাদের এই গ্রহ-নক্ষত্র-পরিপূর্ণ জগৎ সেই পরম ঐশী সত্তারই ক্ষুদ্র একটি অংশ-মাত্র। তাই, নারায়ণের ব্যক্ত মানুষী তনু পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন—
“বিষ্টভ্যহমিদং কৃৎস্নমেকাংশেন স্থিতো জগৎ।” (গীতা, ১০/৪২)
—এই সমস্ত জগৎ আমি আমার একটি অংশ-মাত্র দ্বারা ধারণ ক’রে আছি।
নারায়ণের বিভূতি বর্ণনা-প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রায়ই এইসব উদ্ধৃতির উল্লেখ করতেন। মহাভাববাণীতে তাঁর শ্রীমুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছে—“আমি পরমকারণ। অনন্তকোটি দেবতা, ইন্দ্র, চন্দ্র, বায়ু, বরুণ, ব্রহ্মজ্যোতিঃ, শ্রীকৃষ্ণের অঙ্গজ্যোতিঃ, সেই পরমপুরুষ শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীকৃষ্ণের সত্তা, সত্ত্ব, আমিই সব। আমি সেই দয়ালদেশ, ব্রহ্মদেশ, পিণ্ডদেশ। আমি সেই বৃন্দাবন, আমি কৃষ্ণ, রাধা, গোপ, গোপী ; আমার আরতি করে চন্দ্র, সূৰ্য্য, তারকা, কোটি কোটি গগন সব আমারই লীলা, আমারই প্রকট, আমারই জন্য আমারই ফাঁদ আর কিছু নয়।” (ষট্ পঞ্চাশত্তম দিবস)। ভাবসমাধি অবস্থায় শ্রীশ্রীঠাকুরের এই বাণী কি গীতার বিভূতিযোগকেই স্মরণ করিয়ে দেয় না?
এই হ’ল নারায়ণের স্বরূপ—যার আদি নেই, অন্ত নেই, কোন পরিমাপে যাঁকে পরিমাপিত করা যায় না। যা’ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তার মধ্যে তিনি আছেন, আবার এর পারেও আছেন। “স ভূমিং সর্ব্বতো বৃত্বাহত্যতিষ্ঠদ্ দশাঙ্গুলম্”—সমস্ত ভূত পদার্থের মধ্যে অনুস্যূত থেকেও তাকেও অতিক্রম ক’রে তিনি আছেন। সেইজন্য ব্রহ্ম বা ব্রহ্মাণ্ডের বিনাশ আছে, পরিবর্ত্তন আছে। কিন্তু নারায়ণ অবিনাশী, অপরিবর্ত্তনীয়। শ্রীশ্রীঠাকুর এই সত্তাকে তাই বলেছেন ‘পরাবর্ত্তনী সৎ’ অর্থাৎ যা’ ঠিক তেমনি থেকে চলেছে, যা’ প্রতিটি পদার্থ ও বিষয়ের মধ্যে জীবন সম্বেগরূপে অন্তঃস্যূত। আর যা’ পরিবর্ত্তনশীল, অর্থাৎ যার উৎপত্তি আছে, তার নাম তিনি দিয়েছেন ‘অপরাবর্ত্তনী সৎ’।
নারায়ণের নাভিপদ্ম থেকে ব্রহ্মার উৎপত্তি। এই নাভি কী ? শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের কাছে এসব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। ব্যাখ্যা ক’রে তিনি বলেছেন, নাভি যেমন শরীরের মধ্যভাগ, তেমনি নারায়ণের নাভিদেশ বলতে বুঝতে হবে সেই বিশাল বিস্তৃতির মধ্যবিন্দু বা কেন্দ্রবিন্দু—বিজ্ঞানের ভাষায় ‘নিউট্রাল জোন্’, যাকে কেন্দ্র ক’রে ‘পজিটিভ্’ ও ‘নেগেটিভ্’ পরস্পর মিলিত হবার আবেগে বার বার আবর্ত্তিত হ’য়ে চলেছে। আর, দুই সমবিপরীত সত্তার মিলন-আবেগ যেখানে ঘনীভূত হ’য়ে ওঠে, সৃষ্টির সূচনা তো সেখান থেকেই হয়।
তা ছাড়া, মনুষ্যদেহের নাভিকুণ্ডলী খুব শক্ত। শবদাহের সময় দেহের সর্ব্বাঙ্গ দগ্ধ হ’য়ে গেলেও নাভিকুণ্ডলী সহজে পুড়তে চায় না। সেইজন্যই বোধহয়, ঘনীভূত পদার্থনিচয়ের সৃষ্টি বিরাট পুরুষের নাভিদেশ থেকেই কল্পনা করা হয়েছে।
লৌকিক জগতেও আমরা দেখি, পুরুষ ও নারী দুইটি সমবিপরীত সত্তা। এরা ‘পজিটিভ্’ ও ‘নেগেটিভ্’ শক্তি। শ্রীশ্রীঠাকুর নাম দিলেন ‘স্থাস্নু’ ও ‘চরিষ্ণু’। এদের মিলন-সম্বেগের ভিতর দিয়েই নব প্রজন্মের উদ্ভব হয়ে ওঠে, সৃষ্টিধারা অব্যাহত থাকে। গাছ, লতা, পশু, পাখী প্রভৃতি যেখানেই সৃষ্টির প্রসার হয়েছে, সেখানেই এই সমবিপরীত সত্তা বা শক্তিদ্বয়ের পরস্পর মিলন-আকূতি আছেই। সৃষ্টির এই রহস্যটি এই জাগতিক বিষয়ে যেমন, মহাব্রহ্মাণ্ডের বুকেও ঠিক একই রকম। ক্ষুদ্ৰাতিক্ষুদ্ৰ পরমাণুর মধ্যেও এই একই ক্রিয়া বিবর্ত্তিত হয়ে চলেছে। পার্সী ভাষায় ক্ষুদ্ৰ ব্রহ্মাণ্ডকে বলা হয়, ‘আলমসগীর’, ইংরাজীতে ‘মাইক্রোকজম্’ এবং বৃহৎ ব্রহ্মাণ্ডকে বলা হয় ‘আলমকবীর’, ইংরাজীতে ‘ম্যাক্রোকজম্’। মাইক্রোকজম্-এই হোক আর ম্যাক্রোকজম্-এই হোক সৃষ্টির ক্রিয়া যেখানেই আছে, সেখানেই পজিটিভ্ ও নেগেটিভ্-এর আবর্ত্তন ক্রিয়া সতত-সঞ্চারমাণ। সর্ব্বত্রই ‘এক তরী করে পারাপার’।
কিন্তু নাভিদেশ থেকে পদ্ম জেগে উঠল কেন ? ছবিতে দেখা যায়, সেই পদ্মের উপরে সৃষ্টিকর্ত্তা ব্রহ্মা উপবিষ্ট। এই পদ্ম কী ? ‘পদ্ম’-শব্দের মধ্যে আছে ‘পদ্’- ধাতু, অর্থ— গতি ও স্থিতি। স্থিতি মানে অস্তিত্ব। এর আর এক নাম সত্য। এই সত্য বা স্থিতিকে আশ্রয় করেই গতি এগিয়ে চলে। এক পায়ে ভর দিয়ে তবেই আর এক পা বাড়ানো যায়। তাই, গতিসম্বেগ যেখানে আছে, সেখানে অবশ্যই আছে স্থিতিসম্বেগ। বর্দ্ধন-আকূতি যেখানে আছে, তার পশ্চাতে আছে থাকার আকূতি। যা’ থাকে, তাই তো বাড়তে পারে। যার অস্তিত্ব নেই, তার বর্দ্ধনারও প্রশ্ন আসে না। স্থিতি ও গতির উপর দাঁড়িয়ে সৃষ্টিধারার এই যে প্রথম বিকাশের সূচনা তারই প্রতীক হ’ল পদ্ম।
নারায়ণ যিনি, বিশ্বাত্মা যিনি, তিনি একক ছিলেন। যখন তাঁর বহুতে বিস্তৃত হওয়ার আকাঙ্খা জাগ্রত হ’ল, তখন তাঁকে সেই বিশেষ ইচ্ছার মধ্যে আবদ্ধ হ’তে হ’ল। এই ইচ্ছা কিন্তু একজাতীয় বন্ধন। কারণ, নিরাকার ঈশ্বর নির্দ্দিষ্ট রূপের মধ্যে সীমায়িত হ’য়ে বাঁধা পড়তে চাইলেন। অসীমের ইচ্ছা জাগল সসীম হ’তে। এরকম ইচ্ছা কিন্তু এক বিশেষ গণ্ডী বা বৃত্ত, যার মধ্যে ধরা পড়তে চাইলেন স্বয়ং বিশ্বেশ্বর। গণ্ডীবদ্ধ হওয়ার এই ইচ্ছার নাম শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাষায় ‘বৃত্তি-অভিধ্যান’ [পুরুষ নিষ্ক্রিয়, স্বীয় ভাবে স্থিত। কিন্তু সৃষ্টির জন্য চাই বৃত্তি-অভিমুখিনতা, অর্থাৎ কোন-একটা বিশেষ ভাবনার বৃত্তের মধ্যে অভিনিবিষ্ট হওয়া। তা’ না হ’তে পারলে সৃষ্টিক্রিয়া সম্ভব হয় না। ইহাই ‘বৃত্তি-অভিধ্যান’।]। পরমপুরুষের যদি বৃত্তির উপর অভিধ্যান না হ’ত, অথবা অন্য কথায় বৃত্তের মধ্যে ধরা পড়ার ইচ্ছা না হ’ত, তাহ’লে বাক্য ও মনের অগোচর ঈশ্বর কখনই বিভিন্ন রূপে রূপায়িত হ’য়ে সারা বিশ্বে প্রকটিত হ’য়ে উঠতেন না। তিনি যেই বৃত্তি অভিধ্যানে রত হলেন, অমনিই সৃষ্টির সুরু হ’ল, রূপ নিল স্থিতি ও গতি। ভাবগম্ভীর মন্ত্রধ্বনিতে উচ্চারণ করলেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র—-
“স্ব-অয়নস্যূত
গতি ও অস্তি
বৃত্ত্যভিধ্যান-তপস্যায়
অধিজাত হইল।” (প্রার্থনা)
নাভিপদ্মের উপরে জন্মগ্রহণ করলেন ব্রহ্মা। তিনি কে ? ‘ব্রহ্মা’- শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘বৃংহ্’-ধাতু থেকে, অর্থ–বৃদ্ধি, দীপ্তি। তাহলে যেখানে প্রকাশ আছে এবং বর্দ্ধনার আকূতি আছে, তাই ‘ব্রহ্ম’ বা ‘ব্রহ্মা’। শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন—-
“যিনি
সব যাহা কিছুতে
বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়া দেদীপ্যমান,—-
সেই ব্রহ্মাকে নমস্কার করি।” (প্রার্থনা)
দ্বিজগণ সন্ধ্যা-আহ্নিকের সময় “নমো ব্রহ্মণে” বলে ব্রহ্মকে প্রণাম করেন। কিন্তু ঐ পর্য্যন্তই। সেই ব্রহ্ম কে ? কেন তাঁর অমনতর নাম, তাঁকে নতিই বা জানাতে হবে কেন, এসব কথা জানা ও বোঝা হয় না। জানাতে ও বোঝাতে পারেন একমাত্র সদ্-গুরু। তাই সদ্-গুরু লাভ না হ’লে মানুষের বোধের দ্বারই উন্মুক্ত হয় না।
ব্রহ্মা থেকে ব্রহ্মাণ্ডের উদ্ভব। তাই, নারায়ণ সৃষ্টিকর্তারও উৎস। নারায়ণপূজা মানে সমগ্ৰ সৃষ্টির উৎসের উৎসকে ধ্যান করা ও সংবর্দ্ধিত ক’রে তোলা।
মূর্ত্তি ছাড়া শালগ্রাম শিলাতেও নারায়ণপূজা করা হয়। শালগ্রাম-শিলার মধ্যে নারায়ণের কল্পনা কিভাবে হ’তে পারে ? শোনা যায়, ঐ আকারের পাথর নাকি দক্ষিণ ভারতে নর্ম্মদা নদীর তীরে অনেক পাওয়া যায়। তা’ ছাড়াও পাওয়া যায় হিমালয়ের স্পিটি এবং গুজরাটের কচ্ছ অঞ্চলে। কিন্তু নারায়ণ শিলার আকারটি ডিম্বাকৃতিই বা হ’তে হবে কেন ? এসব নিয়েও প্রশ্ন করা হয়েছিল দয়াল ঠাকুর শ্রীঅনুকূলচন্দ্রকে। যে-ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছেন তা’ নিম্নোক্ত রূপ—
শালগ্রাম-শিলা হ’ল ব্রহ্মাণ্ডের প্রতীক। ব্রহ্মাণ্ডের আকৃতিটা ডিম্বসদৃশ (ডিমের মত আকার), মানে, ঠিক নিখুঁত জ্যামিতিক বৃত্ত নয়, বরং বলা যায় খানিকটা বৃত্তের মত। শ্রীশ্রীঠাকুর এর নাম দিলেন ‘বৃত্তাভাস’। এই বৃত্তাভাস-গতি ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি ধাপে বর্ত্তমান। সূর্য্যকে কেন্দ্র ক’রে গ্রহগণ যে কক্ষপথে আবৰ্ত্তিত হ’য়ে চলেছে সেই কক্ষপথও ডিম্বাকৃত। ব্রহ্মাণ্ডের সর্ব্বস্তরে এই যে ডিম্বাকৃতি গতি বিদ্যমান, সেই আকৃতিরই প্রতীক ঐ শালগ্রামশিলা। সেইজন্য শালগ্রামশিলা ডিম্বাকৃতি হওয়াই বিধেয়।
নারায়ণ পূজা মানে নারায়ণের প্রীতিকর কর্ম্মের অনুষ্ঠান করা এবং তাঁর অনভিপ্রেত কিছু না করা। অন্য কথায় বলতে গেলে, মানুষের জীবনবৃদ্ধি যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে তাই ক’রে চলা এবং যে চিন্তা বা কর্ম্ম সুস্থ দেহ-মন নিয়ে বেঁচে থাকার ব্যাঘাত ঘটায় তা’ বর্জ্জন করা। ক্রিয়াযোগসারে (১৮শ অধ্যায়) নারায়ণের প্রীতিকর কর্ম্ম বলা আছে—সর্ব্বভূতে দয়া, নিরহঙ্কার, তাঁর উদ্দেশ্যে ভক্তিপূৰ্ব্বক ধৰ্ম্মকাৰ্য্যানুষ্ঠান, যথাৰ্থ বাক্য-কথন, মিষ্ট বস্তু তাঁর উদ্দেশ্যে নিবেদন, পরহিংসাবিহীনতা, মান-অপমান তুল্যজ্ঞান, গো ও ব্রাহ্মণ-হিতৈষিতা, শাস্ত্রনিয়ম-পরিপালন, উপকার প্রত্যাশা না করে দান, ইত্যাদি। আর, নারায়ণের অপ্রীতিকর কর্ম্ম—হিংসা, ক্রোধ, অসত্য, অহংঙ্কার, ক্রূরতা, পরনিন্দা, পিতা-মাতা-ভ্রাতা-পত্নী-ভগিনী ত্যাগ, গুরুজনের প্রতি কটুবাক্য প্রয়োগ, শ্রেয়জনকে অবজ্ঞা, পরদ্রব্য হরণ, জলাশয় নষ্টকরণ, পরস্ত্রীদর্শনে আকুলতা, পাপচর্য্যাশ্রবণ, অনাথ ব্যক্তিকে দ্বেষকরণ, বিশ্বাসঘাতকতা, বেদনিন্দা, পরদারাসক্তি, মিত্রদ্রোহ, বৈষ্ণবনিন্দা, ইত্যাদি। দেখা যাচ্ছে, এই অপ্রীতিকর কর্ম্মগুলি অপরের ক্ষতি করে, সমাজের অমঙ্গল করে, নিজের মনকে সঙ্কুচিত করে, শরীরে অবসাদ আনে, মনে সবসময় একটা ভয়-ভয় ভাব থাকাতে মনের প্রসারতা নষ্ট ক’রে দেয়। ফলে, বিস্তারের পথও বন্ধ হয়। আর, বিস্তার বা বৃদ্ধির পথ যেথানে নেই, সেখানে নারায়ণও নেই।
নারায়ণ জীবনের পথ ও বৃদ্ধি পাওয়ার পথ। এ পথের পরিপোষণ যাতে হয় তা-ই প্রকৃত নারায়ণপূজা। আর, ঐ পথ বাদ দিয়ে হাজার ‘নারায়ণায় নমঃ’ ব’লে ফুল দিলে বা ‘নমো ব্রহ্মণ্যদেবায়’ ব’লে আভূমি প্ৰণাম করলে কোন লাভ হয় না। নারায়ণ সেবা শুধু বিশেষ সময়ে বিশেষ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই সংঘটিত হ’য়ে থাকে তাই নয়। জীবনের প্রতি পদক্ষেপেই আছে নারায়ণের সেবা। এ ব্যাপারে দয়াল ঠাকুর শ্রীঅনুকূলচন্দ্র আমাদের বিশেষভাবে সজাগ ক’রে দিয়েছেন তাঁর অজস্র বাণীর মধ্য দিয়ে। একটি উদাহরণ নেওয়া যাক।
সৎসঙ্গীগণ নিয়মিত আহার্য্যগ্রহণের পূৰ্ব্বেই ইষ্টাৰ্থে ইষ্টভৃতি নিবেদন করেন। ইষ্টভৃতি প্রতি ত্রিশ দিনে ইষ্টসন্নিধানে পাঠিয়ে দিতে হয়। ইষ্টভৃতি যেদিন পাঠানো হয়, সেদিন দু’জন গুরুভ্রাতাকে দুটি ভ্রাতৃভোজ্য দেবার নিয়ম আছে। কেউ যদি কোন কারণে অবজ্ঞা ক’রে ঐ ভ্রাতৃভোজ্য গ্রহণ না করে, তাহলে সে নারায়ণকেই অস্বীকার করে। সে যতই চোখ বুঁজে ‘ধ্যেয়ঃ সদা সবিতৃমণ্ডল-মধ্যবর্ত্তী…..’ বলুক অথবা মুখে ঠাকুর-ঠাকুর করুক, নারায়ণ তাতে প্রীত হ’ন না। এবিষয়ে একটি ছড়া দিয়েছেন যুগপুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্ৰ—-
“ইষ্টভৃতির ভ্রাতৃভোজ্য
অবজ্ঞা ক’রে নেয় না,
পায়ে লক্ষ্মী সেই তো ঠেলে
নারায়ণে চায় না।”
(অনুশ্রুতি ১ম খণ্ড, ইষ্টভৃতি স্বস্ত্যয়নী অধ্যায়, বাণী সংখ্য ২৭)
এরকম আরো বহু বাণী ও ছড়ার মাধ্যমে শ্রীশ্রীঠাকুর দেখিয়ে দিয়েছেন দৈনন্দিন প্রতিটি ব্যাপারে ও বিষয়ের মধ্যে কিভাবে নারায়ণসেবা ওতপ্রোত হ’য়ে আছে।
কথিত আছে, নারায়ণের স্ত্রী লক্ষ্মীদেবী। লক্ষ্মী হচ্ছেন ধনসম্পদের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা। তাঁর কৃপা হ’লে অর্থসম্পদ লাভ হয়। এই উদ্দেশ্যে গৃহস্থের বাড়ীতে কত ঘটা ক’রে লক্ষ্মীপূজা হয়, লক্ষ্মীর আড়ি পাতা হয়, আলপনা দেওয়া হয়, ইত্যাদি। কিন্তু বহু আড়ম্বরে লক্ষ্মীপূজা করার পরেও হয়তো দেখা যায়, গৃহস্থের দারিদ্রদশা ঘুচছে না, ঘরে তার লক্ষ্মীশ্ৰী কিছুতেই থাকছে না। কিন্তু তা’ তো হওয়া উচিত নয়। যে-কাজের যে-ফল তাই-ই হওয়া উচিত। লক্ষ্মীপূজায় লক্ষ্মীলাভ হওয়াই উচিত। তা’ যখন হচ্ছে না, তখন বুঝতে হবে সেই ক্রিয়ায় কোন গোলমাল আছে। আরো পরিষ্কার ক’রে বলা যায়, লক্ষ্মীপূজাই বিধিমত হচ্ছে না।
তা’হলে কেমন প্রক্রিয়ায় লক্ষ্মীর আরাধনা ঠিকমত করা হয় ? এ সম্বন্ধে অপূৰ্ব্ব সমাধানবাণী এনে দিয়েছেন যুগত্রাতা পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্ৰ। আলোচনা-প্রসঙ্গে তিনি বলছিলেন একদিন—-
“নারায়ণকে খুশি করতে পারলে লক্ষ্মী আপনি এসে ধরা দেন, আর নারায়ণকে তোয়াক্কা করে না, সতী-স্ত্রী-লক্ষ্মী কি তার কাছে এগোন ?” তিনি তাকে এড়িয়েই চলেন, সে তাঁকে যতই তোয়াজ করুক না কেন। নারায়ণ মানে বৃদ্ধির পথ, মূৰ্ত্ত নারায়ণে যুক্ত হ’য়ে তাঁকেই মুখ্য ক’রে বাস্তবভাবে বৃদ্ধির পথে, বিস্তারের পথে চলতে হবে। তবেই নারায়ণ পূজা সাৰ্থক হবে, লক্ষ্মীও বরণডালা সাজিয়ে নিয়ে এসে ধরা দেবেন। এ বাদ দিয়ে উন্নতি যে হয় না, তার কারণ, মানুষ প্রবৃত্তিপন্থী হ’য়ে পড়লে তার কাছে টাকা বড় হয়, মানুষ হ’য়ে যায় ছোট, সে মানুষের সংস্রব হারায়। একটি ছোট্ট ছড়াতে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন—
“মানুষ আপন টাকা পর
যত পারিস্ মানুষ ধর।”
অন্যত্রও বলেছেন, “মানুষ হ’ল লক্ষ্মীর বরযাত্রী।”
এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, নারায়ণকে প্রীত করতে না পারলে লক্ষ্মীর অনুগ্রহ লাভ করা যায় না। আর, নারায়ণের সেবা মানে মানুষের সেবা—মানুষ যাতে সুস্থ নীরোগ সুদীর্ঘজীবী হ’য়ে থাকে তাই ক’রে চলা। কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই কমবেশী প্রবৃত্তির অধীন। প্রবৃত্তিপথ হ’ল ঈশ্বরের বিপরীত পথ বা শয়তানের পথ। প্রবৃত্তির অধীন থেকে যদি আমরা লোকসেবা করতে যাই, তাহলে মানুষের সর্ব্বাঙ্গীণ সাত্বত কল্যাণ করা কিছুতেই সম্ভব নয়। কারণ, প্রবৃত্তিপাশের মধ্যে আছে দম্ভ, অভিমান, লোভ, স্বার্থপরতা, ঈর্ষ্যা, আত্মম্ভরিতা প্রভৃতি। যে-মানুষের মধ্যে এসব বর্ত্তমান, সে তার কথা ও কাজের মধ্য দিয়ে তারই অভিব্যক্তি দিতে পারে মাত্র। সে মানুষের জন্য কিছু করতে গেলেই তার মধ্যে প্রাধান্য পাবে ঐ অবগুণগুলি। ঈশ্বর চান মিলন, আনন্দ, স্বস্তি, মনের প্রসারতা, সহ্য, ধৈর্য্য, অধ্যবসায়। প্রবৃত্তি-অধীন মানুষের এসব গুণ থাকে না। তার নিজের ব্যাপারটাই তার কাছে সব চাইতে বড় হ’য়ে দাঁড়ায়। প্রবৃত্তির বৃত্তেই সে ঘুরপাক খেতে থাকে। তার বাইরে কিছু দেখার শক্তি তার থাকে না। সে হয় আত্মকেন্দ্রিক। তাই, অপরকে সে বুঝতে পারে না, বুঝতে চায়ও না। মানুষের সত্তাগত স্থায়ী কল্যাণসাধন করা তার পক্ষে অসম্ভবই হ’য়ে থাকে। কেউ যদি হয় স্বার্থপর-মনোবৃত্তিসম্পন্ন, সে সব কাজের মধ্যেই কিভাবে নিজের দু’পয়সা হবে, কতটুকু লাভ হবে, সেই ধান্ধা নিয়ে চলবে। কেউ যদি অহংকারে মদমত্ত বা আত্মপ্রতিষ্ঠা-পরায়ণ হয়, সে সব ব্যাপারের মধ্যেই তার প্রধানত্ব যাতে অটুট থাকে তাই ক’রে চলবে। তার সমকক্ষ বা তার চাইতে বড় এমন কাউকে সে সহ্য করতে পারবে না। তার নিজের নাম-যশ ও প্রতিষ্ঠা নিয়ে যেখানে মাতামাতি হয় না, তা’ যত মঙ্গলকর বিষয়ই হোক, সে বিষয়ে তার কোন আগ্রহ থাকে না। মানুষকে বড় ক’রে তোলা বা অপরের ন্যায্য প্রশংসা করা তার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। তার ঠুনকো মনের বড়াইয়ে সে উচ্চকেও শ্রদ্ধা করতে পারে না। এইভাবে প্রতিপদে তার মানুষের সাথে অসহযোগ হ’তে থাকবে ; মানুষের সত্তাগত প্রয়োজন বুঝে চলা তার পক্ষে অসম্ভব হবে। সেইজন্য, প্রবৃত্তির আকর্ষণের উপরে উঠতে না পারলে মানুষের প্রকৃত সেবা করা সম্ভব নয়।
কিন্তু নিজ চেষ্টায় প্রবৃত্তির উপরে ওঠা যায় না। এজন্য চাই একটা অবলম্বন, যাকে ধ’রে উঠতে হবে। সেই অবলম্বন-দণ্ডই হচ্ছেন মানুষের ইষ্ট, সদ্-গুরু— মূর্ত্ত নারায়ণ। তাঁর উপরে টান হ’লেই অন্য সব টানের শক্তি কমে যায়। এইভাবে কাটানো যায় প্রবৃত্তির বাঁধন। তাই তনিই একমাত্র উপাস্য, আরাধ্য, শরণীয়।
ঈশ্বর অব্যক্ত, অচিন্তনীয়। তাঁকে চিনিয়ে দেন, জানিয়ে দেন ঐ ইষ্টগুরু। তাই, ‘তৎপদং দর্শিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ’। সেই নারায়ণের পরম পদ (‘তদ্-বিষ্ণোঃ পরমং পদম্’) যিনি দেখিয়ে দেন তিনিই মানুষের ইষ্ট, আচার্য্য। তিনি স্বয়ং ঘোষণা করেন, ‘আমাকে আচার্য্য ব’লে জানবে’ (শ্রীমদ্ভাগবত)। আর, সেই পরম পদ কী ? পরম মানে শ্রেষ্ঠ, আর ‘পদ্’- ধাতুর অর্থ– গতি, চলা। তাই, পরম পদ মানে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ চলার রীতি। সে-রীতি হ’ল বাঁচাবাড়ার পথ, স্বস্তির পথ, শান্তির পথ–যা’ মানুষের পরম কাম্য।
বিষ্ণু সেই পরম পদে নিত্য অবস্থান করেন, মানে বিশ্বজগতে সাত্বত বিধি হিসাবে তিনি নিত্য বর্ত্তমান। জীবন ও বর্দ্ধনকে কেন্দ্র ক’রেই আবর্ত্তিত বৈষ্ণবীয় নীতি। বিষ্ণু কখনও তাঁর এই পথ থেকে চ্যুত হন না। তাই, তাঁর আর এক নাম ‘অচ্যুত’। আর, মর্ত্ত্যধামে তাঁরই জীয়ন্ত সচল রূপ হলেন গুরু-পুরুষোত্তম।
বিশ্বেশ্বর নারায়ণ যখনই গুরুরূপে মানুষী তনু আশ্রয় ক’রে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছেন, তিনি শিখিয়েছেন নারায়ণ-উপাসনা। নানা ইঙ্গিতে কখনও স্পষ্ট ভাষায় তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনিই সেই। তাঁর আদেশ পালন ক’রে চললে, তাঁকে তৃপ্ত ও প্রীত করতে পারলেই প্রকৃত নারায়ণ পূজা করা হয়।
যুগে যুগে এই বার্ত্তা নিয়ে এসেছেন প্রেরিত পুরুষগণ। কলির এই শেষ যামে জগতের জন্য সেই শিক্ষা নিয়ে আবার আবির্ভূত হলেন পরম দয়াল শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্ৰ। মানুষকে তিনি নারায়ণমুখী ক’রে তুললেন। দৈনন্দিন জীবনের আচরণের ভিতর দিয়ে তিনি দেখালেন নারায়ণপূজা কী ! আবার, কথাপ্রসঙ্গে মাঝে-মাঝে প্রাণদোলনী সুরে ও ছন্দে তিনি গেয়ে উঠেছেন—-
“নারায়ণঃ পরা বেদাঃ নারায়ণঃ পরাক্ষরাঃ।
নারায়ণঃ পরা মূর্ত্তির্নারায়ণঃ পরা গতিঃ।।”
———- eirsIEuh/KUA2kNfpayELJbP6JyerijlSrUUXP/UY8TTpZs1zb5bgHLyGZwlDImJtkGLyWuRX1s0BtsG9eGpIE7SOA3Lsdp8M9LPMH+7aKpTakFZG1/WDSwa5saPTtqpvKw4n9ZcCVL3/979SMBFx52ondXgPnYjVzMdeVr3GR4uT05ymjwgFVYYVmFFzSXDtW5Vh3vYIqkFxwJua1wmyXbgZLcvEire3YmHDjo3yIFThExU4ZySW1H5R4FBnvPr9ASHKDWOBy8w+V5APsbKtRvmBtS5uJrmpXQIBVs1g+vf/uQ7YELwDQaPXHP6BEScJ4/9ROtt3WnWJZfq8vHYfCiAdlwPsjxztGMOhMmr+bEOoZ4UWNaZlUU9W11agksVj7IEpv8e1aGyw2cNSf6VpdrKXMxOMTYbR5bbm1D7SVU5PaMWjfLapHueDtSUdvSAn6nrIx9KtAdCibrLn4cOuz6B+fCUMWvgoZCwIisKHswEGRRu4jDenN6FtX0PoW7XpwyHSy18AvW7Ii24h0jSp7irDaM9ri3lVW+wpp7bnYFFR3EnYmuhIV07T6pZO3PvhKVt5Znza1GH/Z2eUZj9lw+inbZuNqPk88Qy2JR2RCKRYfx/5JnqkaWlpfwzXfj02/h4B5l9GWZiMUbHMD1NatcJRrDklnHHPD7sEfO4y7u2Z5jjfvv29nLwacZsaJdXW9fLo2BJsMN6DIkt292T0Y35BSXETd4SIG0ePzGlZqvL1lEP0lpw/dbHXieowjmLhobgn91JLRps1VRD8M/vpKYJqn0QfwZ/ARRiRF6IsZdJ1/6bQq0Q5ENZI5E98FB6Bf/R7RJfzEV/EiLvSWuoF4OlFiati3qyVB3PK6UKCwU80S58wCfdLtQhfiJHHL5kXIDMgDLGxxkU1uwvAijI+qZTAD8quaO5vKnwJ8mV/HNryL9O8iBHAAwp+UOGrfcLO/9aNhTyB/fI15YNDfrDcxtlngtqLWpm8CJqPGsCyJsmgHyJEKDB5aosLuLHsQYCmyZB4BIhQda1BviDJId2sybmVZKcUqe88NTCiXR0SA6uv+ruD9e1XXZYZPt5pcZ94cUBp5eykSWOIGC5bMLtOLEK9/YufNsfkUdHEkdGI0fikSPh4ciRmIuRDCJPKNz1PhbDtXU4TlyXR0kEP9HlDrN3Lw+gKxkeFIGcYlYWlPKyWpnQKhAoEt6JzRV8gwXXP/LjPxKsQbjMinuDL7qHnpnW6PcGb71HfG4aJEKQo3Bxpy795BY0xHBZqGK+Z7KglUqYMifUM2phRtPDlukXlmSMIuQyw8gg1np0JJJ8C166njUjsQg+1V/yB48Esvia6PaEiUUk78rRqG9JwrdkJCJ5d1MXzZEIvmpeWhfNkQuDZqwOmrgnTM2XMTQvDDaPg5q4I4zmy+uj6Y+M/wDOMZojgObt9dF8nLN+9mi2IW5DkXwVtklzhHcEGx2Shefil/z4kZdskT7+9A5+egc/vYMvqR18RZ0d3Ojav59vfgL7N7LRxmh4EmyMS2oq7wggjrhYgrz4pKu7nJpcywkcy+lqWpyap1aHs4ZuOQFOzwXXX/bF97g5SluoCN52T02u7he7WMosmK2JZgnSS6giYDE9wWxaFozlZTCNPcNrXnajNlbseGNsRZfRisk+1M5KOQuhrZJV7DLJo5KEleNlJD4UI9ZBmMfv8UCEBjrEuLi7OHuc8g5ORKBJ2EYRLr2PF0FOavo5R8LKc8RZrw1zYoe0RihCXCysWCVTWlmFOIxrwfX/+eP7BXvlPvCOoeHqbahF0OssTk25YpSKAr7Ea3XZw0T13HUd4Lt2rcc2l8PIexvRFSdXVLWAxSujUDgB6l2wKSShrkgBCRkL2qLjqN0qtkjfk5VRPwnyVoIwCHmPlqQOd1PJOdRNvuEKXg3WVNioi+Sv8RphubZHaaMGOBL1EE02jaclx72FQbxO+pj8jg8dGXyTTsOkzWhFlcSsEUNbd87Pj89PAxC4LduPHnl5Gwoclng53VGBdDs5mcijR4J5rUq/fd677vHqmhoUXqRxw7G5iNqcTqG94PpP7/uTzQZq6LbfkMZI9ME4s0OTfgt142Zxe2ayWiyBRpsF1zSD6x/457eR1zPw0zbMyvWaqVVwN+2oFRJWMLAOGTTMIkiHTB6tiOGbHB3jX+xwlyrawbo8YSwbS0spBZyz3/HQm4Qd3ukBhfvic4uIlNvGd3JDQPodFLeMP3V1dSBXVklQCaUwsDhNzD6t1DoDZXx94s+aPjAzDBruCG8Juk/aO4mrLk7TlAHHjDJDa9Ju0IRbjstJA3Q9gXamUwusjo8NBxcnq4+FGLPu64QYLuvfAyjkJCxiwwLND0l1h1G+ylbN2e8BQdTlVJk1bGgzeY31ujKnZ7xB8J0SDPlVvxYNsOpLS3XqD/rUT+2XWkfAPjw2Rm3kR91vEMRwSnpPIwphEh7lom7TaCWMksnvBtCOWXV1sqAquB/7JULuQ21WeIQMMdqSWk1ypz8DDGrkMOp3InlTgAxeDlyiglanT1negZoqyrKEoG4GV8xkswW027qiSOfVEoRgm1ib0Co6ZsDRbh5nzqyXYI+G6pXO6eOFwng5B6G7cjSm+BXOw2KErJAREt1wZJSn2qn7X/LAz9vBFLfessuhLodgi9NcTOG8vAe1kLg1kg+I3IGa06qal7bKETkSScgj2V1ImtaJgbJatmvgq5m+4WZ3SR7F8JTPDccZwcr6Tz77s5YbAoNdpP1hWQ5HRuLgZDoSTcQS8f8PMqBS/IaOBgA=”,”variations_country”:”in”,”variations_last_fetch_time”:”13237286075987500″,”variations_permanent_consistency_country”:[“49.0.2623.112″,”in”],”variations_seed_date”:”13237286017000000″,”variations_seed_signature”:”MEYCIQC6MAkyVYwkP1Zl