সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

।। হিন্দু-মুসলিম অনৈক্যের প্রতিকার সম্বন্ধে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতবাদ।।

সংকলক—তপন দাস

‘‘হিন্দু মুসলমানের নামে নাক সিটকায়, মুসলমান হিন্দুদের নামে নাক সিটকায়—তার মানে তারা ভগবানকে, ধর্মকে, প্রেরিতকে ভালবাসে না। আর্য্যরা মানে এক অদ্বিতীয়কে, পূর্বতন ঋষি মহাপুরুষদিগকে, তারা মানে পূর্বপুরুষকে ও জন্মগত বিশিষ্ট গুণসম্পদকে। অর্থাৎ বর্ণধর্মকে, সর্ব্বোপরি তারা মানে বৈশিষ্ট্যপালী আপূরয়মান যুগপুরুষোত্তমকে। এগুলি মালার মত গাঁথা আছে। যাদের দেখার চোখ আছে ও দেখতে চায়, তারাই দেখতে পায়। বেদ, কোরান, বাইবেল ঘেঁটে দেখ, সব জায়গায় ঐ একই জিনিস রকমারি ভাবে পাবে। অন্ততঃ ওগুলির উল্টো কথা পাবে না। কোরাণে স্পষ্ট করে আছে পিতৃপুরুষকে স্বীকার করার কথা। আমি ইসলামের ভক্ত হলে আমার নাম গোলাম সোফান হবে কেন? অনুকূল চক্রবর্তীই তো থাকা উচিত। কারণ, খোদাতায়ালা যেমন সকলের, রসুল যেমন সকলের, ইসলামও তেমনি সকলের। মুসলমানের মধ্যেও বংশগত আভিজাত্য ও বৈশিষ্ট্যকে শ্রদ্ধা দিয়ে চলার কথা আছে। ওর ভিতর দিয়েই তো বর্ণধর্মের মূল তাৎপর্য্য-সম্বন্ধে সমর্থন পাওয়া যায়। আজ আমরা বৈশিষ্ট্যকে নষ্ট করতে চাই কেন ? রসূলের কি তেমন কোন কথা আছে ? আর নিজেদের বৈশিষ্ট্যকে যদি বজায় রাখতে চাই, তবে অপরের বৈশিষ্ট্য যাতে বজায় থাকে সেদিকেও লক্ষ্য রাখা লাগে। অপরের বৈশিষ্ট্য ভাঙ্গার প্রবৃত্তিকে প্রশ্রয় দিলে, কালে-কালে নিজের বৈশিষ্ট্য ভাঙ্গার পথই প্রশস্ত হয়।

আমি বলি, আমি যদি হযরতকে ভালবাসি এবং তাঁর নীতিবিধি মেনে চলি, তবে আমি হিন্দু থাকব না কেন ? পরমপিতার পথে চলতে গিয়ে পিতৃপরিচয় খোয়াতে হবে কেন ? আমি তো বুঝি হিন্দুও আর্য্য, মুসলমানও আর্য্য। উভয়ের পন্থা ও গন্তব্য এক। হযরত পূর্ববর্তীকে মানেন, পরবর্তীকে মানার ইঙ্গিতও তিনি দিয়ে গেছেন, তিনি যা মানেন আমরা যদি তা না মানি, তার মানে আমরা তাঁকে মানি না। মুসলমান পীরের কাছ থেকে দীক্ষা নেয়া লাগে, হিন্দুরও গুরুর কাছ থেকে দীক্ষা নেওয়া লাগে, সে একই কথা। শুধু ভাষা আলাদা। কতকগুলি নীতি আছে, দেশকাল, পাত্র, নির্ব্বিশেষে সর্ব্বত্র সর্বদা সবার পালনীয়, আবার কতকগুলি আছে বিশেষ-বিশেষ ব্যক্তির বিশেষ-বিশেষ অবস্থায় ও দেশকালে পালনীয়। এই দুটোর মধ্যে গুলিয়ে ফেলতে নেই। Fundamental  (মৌলিক) ও universal (সার্ব্বজনীন) জিনিস হল—এক অদ্বিতীয়কে মানা, পূর্বতন ঋষি-মহাপুরুষকে মানা, পিতৃপুরুষকে মানা, বৈশিষ্ট্য মানা, পূরয়মান যুগপুরুষোত্তমকে অনুসরণ করে চলা। তুমি হিন্দুই হও বা মুসলমানই হও, এগুলি যদি না মান, তুমি হিন্দুও নও, মুসলমানও নও, এককথায় তুমি ম্লেচ্ছদলভুক্ত, ম্লেচ্ছ মানে যারা সংস্কৃতির উল্টো চলে। আর যে এগুলিকে মেনে চলে সে যে সম্প্রদায়ের লোক হোক না কেন, তাকে তুমি কখনও কাফের বলতে পার না। কাফের মানে যে ধর্মবিরোধী চলায় চলে। সাম্প্রদায়িক বিরোধের প্রশ্রয় না দিয়ে, ধর্মবিরুদ্ধ চলনের বিরুদ্ধে আমাদের জেহাদ ঘোষণা করা লাগে। তাই করা লাগে যাতে প্রতি প্রত্যেকে ঈশ্বরপ্রেমী হয়ে ওঠে, ধর্মপ্রবুদ্ধ হয়ে ওঠে। এ দায় হিন্দু-মুসলমান সকলেরই মিলিত দায়। তাই, এই কাজে হিন্দুর মুসলমানকে সাহায্য করা উচিত, মুসলমানেরও হিন্দুর সাহায্য করা উচিত। আমি বুঝি, সৎসঙ্গ যেমন হিন্দুর, তেমনি মুসলমানের, তেমনি বৌদ্ধের, তেমনি খ্রিষ্টানের, তেমনি অন্যান্য সকলের। সব মানুষই পরমপিতার, তা তারা জানুক বা না-জানুক, মানুক বা না-মানুক।

(আ: প্র: একাদশ খন্ড, ইং ১৭-০৩-১৯৪৮)

 

 

 

BE VEGETARIAN

।। মাছ-মাংস খাসনে আর/পেঁয়াজ-রসুন মাদক ছাড় ।।

সংকলক—তপন দাস

সর্বশ্রেষ্ঠ হিন্দু ধর্মগ্রন্থ মহাভারতের অনুশাসনপর্ব – ১১৪ অধ্যায়ে  বলা হয়েছে—
“যে ব্যক্তি মোহ প্রভাবে পুত্র-মাংস-তুল্য অন্যজীবের মাংস ভক্ষণ করে, সে অতি জঘন্য প্রকৃতির এবং তার সেই জীবহিংসা বহুবিধ পাপযোনিতে জন্মগ্রহণ করবার একমাত্র কারণ বলে নির্দিষ্ট হয়।’’

শুধু হিন্দু মতেই নয়, কোন ধর্মীয় মতবাদে জীবহত্যা স্বীকৃত নয়।  কোরানে, আর্য্য হিন্দু-শাস্ত্রে এবং পুরুষোত্তমদের বাণীতে কোথাও ‘বলিদান’ বা ‘কোরবাণী’-র নামে প্রাণী হত্যার অনুমোদন নেই।

       ‘কোরবাণী’ কথাটি আসিয়াছে আরবী ‘কুরবান’ হইতে। ‘কুরবান’ মানে উৎসর্গ, বলি। আবার বলি মানে দান। তন, মন, ধন কর কুরবানী অর্থাৎ কায়, মন, ধন পরমেশ্বরের জন্য উৎসর্গ কর। এই আত্মোৎসর্গ বা আত্ম-বলিদানই প্রকৃত বলি বা কোরবাণী।

মুসলমানদের ধর্ম গ্রন্থ আল-কোরানে বলা হয়েছে, “এদের মাংস আর রক্ত আল্লাহর কাছে পৌছায় না, কিন্তু তোমার ভক্তি তার কাছে পৌছায়।” – (সুরা  21/37)

       “আল্লার নিকট তাহার মাংস ও তাহার রক্ত কখন পৌঁছে না বা তিনি তাহা ইচ্ছা করেন না। বরং তোমরা অসৎকর্ম্ম হইতে নিজেকে রক্ষা কর ইহাই তিনি ইচ্ছা করেন। তিনি  আমাদের অধীনে থাকিয়া কার্য্যনির্বাহের জন্য পশু সৃষ্টি করিয়াছেন—সেজন্য তোমরা খোদার নিকট নম্র ও নিরীহ হইতে শিক্ষালাভ করিবে। এই সৎপথ-প্রাপ্তির অর্থাৎ সৎ-শিক্ষার জন্যই খোদা এই ব্যবস্থা করিয়াছেন। যাহারা অন্যের মঙ্গল সাধন করে, তাহাদের মঙ্গল করিয়া থাকেন  ……..”  (কোর-আণ—২২ হজ ৩৭ র, ৫)

“বাসোপযোগী গৃহ, গুপ্তস্থান রক্ষা করিবার উপযুক্ত বস্ত্র, এবং শুষ্ক-রুটি ও পানীয় ব্যতীত মানব-সন্তানের অন্য কোন জিনিসের উপর অধিকার নাই ।” (–হাদিস তিরমিজি)
“একটু পানি এবং কয়েকটি খর্জ্জুরে তাঁহার ক্ষুধার নিবৃত্তি হইত । হজরত মোহাম্মদ একাধারে ধর্ম্ম-প্রবর্ত্তক, মহাকর্মী এবং সন্ন্যাসী ছিলেন ।” (ইসলামের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৯)   

ভগবান বুদ্ধদেব বলেছেন, “আমি কখনই কাউকে মাংস খাওয়ার অনুমোদন করি নি, করি না এবং করব না।” (লঙ্কাবতার সূক্ত)

প্রভু যিশু বলেন, “তুমি হত্যা করিও না” । (এক্সোডাস – 20:13)
“যে একটি ষাড়কে হত্যা করলো, সে যেন একটি মানুষকে হত্যা করলো।”  (ইসা – 66:33)

উক্ত অনুশাসনবাদ আমাদের  স্মরণ করিয়ে দেয়, যে নিজেকে পরমেশ্বরের সন্তান  বা খোদাতাল্লার বান্দা মনে করবেন তিনি কখনই কোন প্রাণী হত্যা করবেন না এবং প্রাণীর রক্ত-মাংসে ক্ষুধার নিবৃত্তি করবেন না।

জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন

জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন

                                 নিবেদনে—তপন দাস

অবশেষে সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে সপ্তদশতম লোকসভা নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগড়িষ্ঠতা নিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টির  প্রতিনিধিগণ   গণ-প্রজাতন্ত্রী  ভারতরাষ্ট্রের শাসন-ব্যবস্থার অধিকার গ্রহণ করল।

আমাদের ভারত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় প্রতীক অশোক স্তম্ভ। মূন্ডক উপনিষদের পবিত্র মন্ত্র ‘সত্যমেব জয়তে’ আমাদের রাষ্ট্রীয় মন্ত্র।  ভারতরাষ্ট্রের শাসন-ব্যবস্থা ৫ বছর অন্তর নবীকরণ করতে হয় নির্বাচনের মাধ্যমে। ‘সত্যমেব জয়তে’র সীলমোহর দিয়ে। সত্যে অটল থাকার জন্য প্রতিশ্রুতদের কাছে নির্বাচন একটা শান্তশিষ্ট প্রক্রিয়া। ঢাল তরোয়াল গুলি বন্দুক কোন কিছুরই প্রয়োজন থাকার কথা নয়। লাইন দেবে সুইচ টিপবে । যা’ বর্তমানে তথ্য-প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অতি সহজে অন লাইনে করা যায়। তাহলে নিষ্প্রয়োজনে এত শ্রমদিবসের, এত শক্তির, এত অর্থের অপচয় কেন? কেনই বা নির্বাচনের নামে হিংসার আশ্রয়-প্রশ্রয় পাবে? তাহলে কি আমরা সত্যের প্রতিজ্ঞার পথচলা থেকে ভ্রষ্ট হয়েছি ? এর কারণ কি, ‘সত্যমেব জয়তে’র আধিকারিকদের একটু ভেবে দেখতে অনুরোধ জানাই।       জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যম  নির্বাচন প্রক্রিয়া বা গণতন্ত্রের আঁতুড়ঘর যদি অস্বচ্ছতায় পূর্ণ থাকে সেখান থেকে স্বচ্ছ জনপ্রতিনিধি আশা করা  বাতুলতা মাত্র।

ইতিপূর্বে আমরা অনেক জন-প্রতিনিধির সাথে পরিচিত হয়েছি, যারা তাদের সরকারী আপ্ত-সহায়ক আমলাদের যোগ্যতার তুলনায় অনেক অযোগ্য। একজন অশিক্ষিত, অস্বচ্ছ চরিত্রের অযোগ্য মন্ত্রীকে স্যর/ম্যাডাম বলে সম্বোধন করে একজন আই. এ. এস অফিসারকে যদি উঠতে বসতে হয়, তা কি সভ্যতার নিরিখে সম্মানের?  অতএব এ ধরণের অসম-প্রথার অবসান ঘটিয়ে প্রকৃত যোগ্যতার মর্যাদার প্রতিষ্ঠা করতে হবে সরকারকে।

মাননীয় নরেন্দ্র মোদিজীর নেতৃত্বাধীন বর্তমানের বিজেপি সরকার ‘জয় শ্রীরাম’ শ্লোগানকে আঁকড়ে বিপুল জন সমর্থন পেয়েছে। মর্যাদা পুরুষোত্তম রামচন্দ্রের আদর্শে বিশ্বাসী ভারতের  নির্বাচকগণ ‘রাম-রাজত্বের’ ন্যায় এক স্বচ্ছ, নির্মল শাসনতন্ত্রের আশায় ভোট দান করেছেন। অতএব রামচন্দ্রের নাম-মাহাত্ম্যের জোরে যে শাসনতন্ত্রের অধিকার অর্জন করেছেন যে জন-প্রতিনিধিরা, তাদের ক্যাবিনেট যদি রামচন্দ্রের গুরু ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠের আদর্শের আলোকে আলোকিত না হয়,— সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হয়,— জন-প্রতিনিধিগণ যদি রাম-রাজত্বের পরিপন্থী বিলাস-ব্যসন ত্যাগ করে, আত্ম-প্রতিষ্ঠার মোহ ত্যাগ করে, সাত্ত্বিক-চলনে সাধারণভাবে  চলতে অভ্যস্ত না হয়,—তাঁরা কখনোই ঈপ্সিত রাম-রাজত্ব ফিরিয়ে আনতে পারবে না। কারণ, রাম-রাজত্বে পশুরাও সুবিচার পেত। রামচন্দ্রের সভায় একটা কুকুর বিচার  চাইতে এসে বলেছিল—

न सा सभा यत्र न सन्ति वृद्धाः
वृद्धा न ते ये न वदन्ति धर्मम् ।
नासौ धर्मो यत्र न सत्यमन्ति
न तत् सत्यं यच्छलेनानुविद्धम् ।।

(VALMIKEE RAMAYAN, 3/33)
(যে সভায় বৃদ্ধ নেই, তা সভাই নয়। যারা ধর্মসঙ্গত কথা বলে না, তারা বৃদ্ধ নয়। যা’তে সত্য নেই তা’ ধর্ম নয়। যা’তে ছলনা আছে, তা’ সত্য নয়।)

তাই জন-প্রতিনিধিদের উচিত হবে, রামচন্দ্রের সভার ন্যায়  একজন আদর্শ সভাসদরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। এবং তা বাস্তবায়িত করতে হলে, সরকারী কোষাগার থেকে সাধারণভাবে বেঁচে থাকার প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ না করা। বর্তমান শাসনতন্ত্রের পরিকাঠামো অনুযায়ী জন-প্রতিনিধিদের জন্য বরাদ্দ সুবিধা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে রাম-রাজত্ব প্রতিষ্ঠার চিন্তা অধরাই থেকে যাবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর ক্যাবিনেটকে এ বিষয়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

                ——-

সংগঠন ও সংগঠনী

সংগঠন ও সংগঠনী।।

সৎসঙ্গী মাত্রই ‘অর্ঘ্য-প্রস্বস্তি’ শব্দটির সাথে কমবেশী পরিচিত। সেই ‘অর্ঘ্য-প্রস্বস্তি’র একটি স্তম্ভের নাম সংগঠনী। দীক্ষিতদের ইষ্টার্থে, অর্থাৎ শ্রীশ্রীঠাকুরের মূল আদর্শ দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ, কৃষি ও শিল্পের বিষয়ে  সম্যকভাবে গঠিত করার ভাগবৎ প্রচেষ্টা বাস্তবায়িত করার ফান্ড বিশেষ এই  সংগঠনী।

          সংগঠনের ব্যাপারে মুখ্য করণীয় কি ? বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে 

শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছিলেনঃ—‘‘দীক্ষিতদের মধ্যে আনতে হবে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সেবা-বিনিময় এবং প্রত্যেকটি দীক্ষিতকে তার বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য-অনুযায়ী চিন্তা ও চরিত্রে ইষ্টানুগ পরিপূর্ণতায় উচ্ছল কর্মপটু ক’রে তুলতে হবে। এই দু’টি দিক লক্ষ্য রেখে চললে প্রকৃত সংগঠন হবে। সংগঠনের এই মুল সুত্র প্রয়োগ করতে হবে যেমন আপনাদের নিজের বেলায় তেমনি অন্যদের বেলায়। এর মূল কথা হল উপযুক্ত কর্মী। মানুষকে ধারাবাহিক nurture (পোষণ) দিতে গেলে নিজেরা adjusted (নিয়ন্ত্রিত) হওয়া লাগে। আর প্রত্যেককে তার মতো করে nurture (পোষণ) দিতে হয়। এক-এক জনের এক-একটা বদ্ধমুল বদভ্যাস থাকে। তার দরুন জীবনে উন্নতি করতে পারে না। মানুষকে এমনভাবে উস্কে দিতে হয় যাতে নিজেই নিজের দোষ খুঁজে বের করতে ও সংশোধন করতে বদ্ধপরিকর হয়। তাছাড়া মানুষের সদগুণ যেগুলি আছে, সেগুলি খুব glowing (উজ্জ্বল) করে তার ও অপরের সামনে তুলে ধরতে হয়, যাতে সে ঐ গুলির অনুশীলন ও প্রবর্দ্ধনে আরো তৎপর হয়। বাস্তব গুণের প্রশংসা করে মানুষকে যতটা ভাল করা যায়, তার দোষ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে, তার শতাংশের একাংশও হয় না। বরং উল্টো ফল ফলে। তাই অন্যের চারিত্রিক গলদ যদি আপনার অসুবিধারও সৃষ্টি করে, তাও চ’টে যাওয়া চলবে না। চুলচেরা বিচারের মধ্যে ফেললে কেউই রেহাই পায় না। তাই সহানুভূতির সঙ্গে দেখবেন প্রত্যেককে। তখন আপনার প্রতি ভালবাসার বশে মানুষ আত্মসংশোধনের তাগিত অনুভব করবে। নিজেকে সর্বদা শাসন করে চলুন, তাহ’লে আপনার সংস্পর্শে আপনার পরিবেশ, বিশেষতঃ সশ্রদ্ধ যারা আপনার প্রতি তারা স্বতঃই শাসিত হয়ে উঠবে। আর, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সেবা বিনিময়ের ব্যাপারেও নিজেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করা লাগে…। এই ভাবে চললে, কোথায়ও ঠকছেন বলে আপসোস করতে হবে না। মানুষ যে টাকার চেয়ে মূল্যবান—এইটে হ’লো আসল অর্থনীতি। টাকার consideration ( বিবেচনায়)-এ মানুষ ত্যাগ করবেন না, মানুষের ভালোর জন্য টাকার প্রতি নির্মম হবেন। একটা মানুষ যদি বিলকুল আপনার হয়, টাকার অংকে কি তার মূল্য নিরূপণ করা যায় ? সে যে অমূল্য সম্পদ। এই কথাগুলি মাথায় রেখে এগিয়ে চলেন, আপনারাও দেখবেন, দুনিয়াও দেখতে পাবে সংগঠন কাকে বলে। (আঃ প্রঃ ৯ম খন্ড, পৃঃ ১৮৭-১৮৮)

 

��্শিতা। রোগীর বিছানার গন্ধ শুঁকে ওষুধ নির্বাচন করতেন।

        আর একটি দিনের ঘটনা। দুই বন্ধুতে মিলে বসেছিলেন ডাক্তারখানার বারান্দায়। অদূরে একটি লোককে হেঁটে যেতে দেখে অনুকূলচন্দ্র বলে ওঠেন, ডাক্তার দেখো, ওই যে,— ‘এসেটিক এসিড’ হেঁটে যাচ্ছে। সহকারী ডাক্তারের ওই অতি-ডাক্তারি আচরণে ক্ষুব্ধ হন কিশোরীমোহন। বলেন, একটা মানুষ অদূরে হেঁটে যাচ্ছে, আর তুমি বলছো ‘এসেটিক এসিড’ হেঁটে যাচ্ছে! সবকিছুর একটা মাত্রা থাকা উচিত!

        না মাত্রা তিনি ছাড়ান নি। বন্ধু ডাক্তার কিশোরীমোহনকে মাত্রাবদ্ধ করতে অনুনয় করেন তাঁর মুখ থেকে সদ্য নিঃসৃত বাক্যটিকে একবার পরখ করে দেখতে।

        ক্ষুব্ধ হলেও নাছোড়বান্দা সহকারী ডাক্তার বন্ধুর অনুরোধ মেনে অদূরে হেঁটে যাওয়া ভিন্ গাঁয়ের লোকটির সাথে আলাপ জমান ডাক্তার কিশোরীমোহন। নানাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে ওই লোকটির মধ্যে খুঁজে পান হোমিওপ্যাথিক ওয়ুধ ‘এসেটিক এসিড’-এর এক পূর্ণচিত্র । অনুকূলচন্দ্রের কথামত হাজার শক্তির একমাত্রা এসেটিক এসিড দিয়ে উক্ত ভদ্রলোকের দীর্ঘদিনের দুরারোগ্য ব্যাধি আরোগ্য করেছিলেন।

        আর একদিনের ঘটনা। কাশীপুরের রাস্তা দিয়ে রোগী দেখতে যাচ্ছিলেন অনুকূলচন্দ্র। বোয়ালW

ডাক্তার অনুকূলচন্দ্র

           চিকিৎসক অনুকূলচন্দ্র
                              নিবেদনে—তপন দাস

হোমিওপ্যাথী আবিষ্কার করে চিকিৎসা জগতের ইতিহাসে নবযুগ এনেছিলেন যে মানুষটি, সেই হোমিওপ্যাথীর জনক মহাত্মা হ্যানিমান জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৭৫৫ খ্রীস্টাব্দের ১০ এপ্রিল জার্মানিতে (Meissen, Saxony, near Dresden) । তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে জানাই প্রণাম। তাঁর আবিষ্কৃত সদৃশ বিধানকে সমৃদ্ধ করেছিলেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে ডাঃ কেন্ট, ডাঃ এ্যালেন, ডাঃ হেরিং, ডাঃ ফ্যারিংটন, ডাঃ টেস্টি, বাংলার ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকার প্রমুখ চিকিৎসকগণ প্রাতঃ-স্মরণীয়। তাঁদের কীর্তি বিশ্বের সব হোমিওপ্যাথ ডাক্তাররা জানেন। এমনই একজন হোমিওপ্যাথ ডাক্তার ছিলেন এই বাংলায়, যাঁর কীর্তি হোমিওপ্যাথী ডাক্তারসমাজে প্রায় অজ্ঞাত। যিনি বাল্য বয়সেই মহাত্মা হ্যানিমানের সদৃশ বিধান মতে ভাটপাতা (Clerodendron Infortunatum) খেয়ে অসুখ তৈরি করে সদৃশ বিধানকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তাঁর নাম ছিল অনুকূলচন্দ্র। নিবাস ছিল পাবনা জেলার হিমাইতপুর গ্রামে।
        অনুকূলচন্দ্র ডাক্তারী অধ্যয়ন করার সময় কিছুদিন কলকাতার গ্রে স্ট্রীটের এক কয়লার গোলায় থাকতেন। বাঘা যতীন-এর মাতুল হেমন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ‘লাহিড়ী কোম্পানী’ নামে একটি হোমিওপ্যাথিক ঔষধালয় ছিল গ্রে স্ট্রীট ও চিৎপুর রোডের মোড়ে। তিনি অনুকূলচন্দ্রকে উৎসাহ দিতে স্বনামধন্য চিকিৎসক ডাঃ মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য প্রণীত ‘পারিবারিক চিকিৎসা’ গ্রন্থের সাথে ২৪ শিশি ঔষধের একটি বাক্স উপহার দিয়ছিলেন। তা দিয়ে অনুকূলচন্দ্র স্থানীয় কুলী-মজুরদের মধ্যে হোমিওপ্যাথী মতে চিকিৎসা শুরু করেন। খুব নামডাক হয়। ক্রমে সন্নিহিত ভদ্রজনেরাও অনুকূলচন্দ্রকে দিয়ে চিকিৎসা করাতে শুরু করেন। খুব অল্পদিনের মধ্যই রোগীদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাক্ষাৎ ভগবান স্বরূপ।
        ১৯১২ সালে কলকাতার ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুল থেকে এ্যালোপ্যাথী ডাক্তারি শিক্ষা সমাপ্ত করে নিজগ্রামে ফিরে বন্ধুবর ডাক্তার কিশোরীমোহনের সহকারী চিকিৎসক হিসেবে হোমিওপ্যাথী মতে ডাক্তারী শুরু করেন। তাঁরা উভয় উভয়কে ডাক্তার বলে সম্বোধন করতেন। একসঙ্গে রোগী দেখতে গিয়ে হতো মজা। একদিন কিশোরীমোহনের সহকারী হয়ে রোগীর বাড়ীতে গেছেন। কিশোরীমোহন তখনো রোগীকে দেখেন নি। রোগী বাহ্যি করতে গেছে। তার আগেই রোগীর ঘরে ঢুকে অনুকূলচন্দ্র ‘মার্ক-সল’ ওষুধটি নির্বাচন করে বসেন। কিশোরীমোহন অসন্তুষ্ট হয়ে বলেন, আমি রোগী দেখলাম না, তার আগেই তুমি ওষুধের নাম বলে দিলে! লক্ষণ-সমষ্টি না দেখে হোমিওপ্যাথিতে ওষুধ নির্বাচন করতে নেই। অবশেষে কিশোরীমোহন রোগীর লক্ষণ সমষ্টি দেখে ওই ‘মার্ক-সল’কেই নির্বাচন করেন। এমনই ছিল অনুকূলচন্দ্রের রোগী পর্যবেক্ষণ দূরদর্শিতা। রোগীর বিছানার গন্ধ শুঁকে ওষুধ নির্বাচন করতেন।
        আর একটি দিনের ঘটনা। দুই বন্ধুতে মিলে বসেছিলেন ডাক্তারখানার বারান্দায়। অদূরে একটি লোককে হেঁটে যেতে দেখে অনুকূলচন্দ্র বলে ওঠেন, ডাক্তার দেখো, ওই যে,— ‘এসেটিক এসিড’ হেঁটে যাচ্ছে। সহকারী ডাক্তারের ওই অতি-ডাক্তারি আচরণে ক্ষুব্ধ হন কিশোরীমোহন। বলেন, একটা মানুষ অদূরে হেঁটে যাচ্ছে, আর তুমি বলছো ‘এসেটিক এসিড’ হেঁটে যাচ্ছে! সবকিছুর একটা মাত্রা থাকা উচিত!
        না মাত্রা তিনি ছাড়ান নি। বন্ধু ডাক্তার কিশোরীমোহনকে মাত্রাবদ্ধ করতে অনুনয় করেন তাঁর মুখ থেকে সদ্য নিঃসৃত বাক্যটিকে একবার পরখ করে দেখতে।
        ক্ষুব্ধ হলেও নাছোড়বান্দা সহকারী ডাক্তার বন্ধুর অনুরোধ মেনে অদূরে হেঁটে যাওয়া ভিন্ গাঁয়ের লোকটির সাথে আলাপ জমান ডাক্তার কিশোরীমোহন। নানাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে ওই লোকটির মধ্যে খুঁজে পান হোমিওপ্যাথিক ওয়ুধ ‘এসেটিক এসিড’-এর এক পূর্ণচিত্র । অনুকূলচন্দ্রের কথামত হাজার শক্তির একমাত্রা এসেটিক এসিড দিয়ে উক্ত ভদ্রলোকের দীর্ঘদিনের দুরারোগ্য ব্যাধি আরোগ্য করেছিলেন।
        আর একদিনের ঘটনা। কাশীপুরের রাস্তা দিয়ে রোগী দেখতে যাচ্ছিলেন অনুকূলচন্দ্র। বোয়ালমাছ হাতে করে একজন গ্রামবাসীকে যেতে দেখে অনুকূলচন্দ্রের মানসপটে ‘Veratrum Album’ ওষুধটির চিত্র ফুটে ওঠে। তিনি লোকটিকে ওই বোয়ালমাছ খেতে নিষেধ করেছিলেন। ভদ্রলোক বলেন, ‘খোদা পয়দা করেছে, একদিন তো মরতে হবেই।’ বলে বিরক্তি প্রকাশ করে চলে যান। সেই মাছ খেয়ে ভদ্রলোকের পায়খানা-বমি শুরু হলে বাড়ির লোক এসে ড়াক্তার অনুকূলচন্দ্রকে নিয়ে যান। অনুকূলচন্দ্র গিয়ে ওই ‘Veratrum Album’ ওষুধের সাহায্যে রোগীকে সুস্থ করে বাড়ী ফেরেন। সেই থেকে সাধারণ গ্রামবাসীরা অনুকূলচন্দ্রকে শুধু ডাক্তার হিসেবে নয়, একজন অতিমানব জ্ঞানে মান্য করতে থাকেন।
        অনুকূলচন্দ্র ওই সখের ডাক্তারী বেশীদিন করেন নি। মানুষের প্রবৃত্তির রিংরসায় লুকিয়ে থাকা বন্ধুরূপী শত্রুদের ষড়রিপু—ত্রিদোষ—বায়ু-পিত্ত-কফ—সোরা, সিফিলিস, সাইকোসিক-দের মূলোৎপাটন করে শারীর-মানস সঙ্গতি সাধন করতে গড়ে তুলেছিলেন কীর্তনদল। আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে কৃষি, শিক্ষা, বিবিধ-শিল্প, ফলিত-বিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণা শুরু করান। সাথে রসৈষণা মন্দির প্রতিষ্ঠা করে গ্রামবাংলার ভেষজের সাহায্যে নানাবিধ জীবনদায়ী ওযুধ আবিষ্কার করেছিলেন। সেই ওষুধগুলো বহির্ভারতেও সমাদৃত হয়েছিল। সব মতের চিকিৎসায় তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। যেখানে যেমন প্রয়োজন, সেখানে তেমন ঔষধ ও পথ্যের ব্যবস্থাপত্রের সাহায্যে সারা জীবন ধরে তিনি প্রবৃত্তি-পীড়িত মানুষের ক্যানসারসহ সব ধরণের দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা করে গেছেন। তিনি আজ ভক্তজনের আজ্ঞাচক্রে চির-অতন্দ্র পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র রূপে প্রতিষ্ঠিত।

——-

 

 

Top of Form

Bottom of Form

Top of Form

UNITY IN DIVERSITY

UNITY IN DIVERSITY

BOW—FOLLOW AND BE COLOURED

By Shree Shree Thakur Anukulchandra

Bow,      

follow

and be coloured

with the valorous bloom

of Ramchandra,

with the ripples of His

service, love and compassion ;

follow Lord Krishna

to make yourself equipped

with presence of mind

and political adjustment

of yourself

end your environment

with every boldness

tactful go of life ;

love,

serve with every

sonorous appeasement

like Buddha ;

adhere to your Beloved the Great

like Christ

with the service of love to all

and combat evil

with every loving resistance

and cross over every difficulty

and be flooded with love

with every up heaving wave

in your existential trail ;

keep thy adherence untottering

like Rasul

with every victorious step

of honesty

and encouragement

with performing initiative zeal

devoting it out and out

to Providence ;

be flooded

with amusing thrill

with inherent active

constant love

for the Lord

like Sri Chaitanya ;

and conglomerate

all these faculties

with due behaving characteristics

of broad heroic

enamoured, intelligent steps ;

be smeared with every

loving attitude

and meaningful, coherent

compassionate effulgence

like Sri Ram Krishna and others too ;

all the prophets

are the new Advent

of the same,

and they are similar

in attributes and characteristics

according to the need of

time, place and circumstances,

though

their distinctiveness

in existential upholdment

is ever similar ;

he

who ignores one

due to sectarian egotism

ignores all.

————

 

সাহিত্যিক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র

   ।। ভাষার যাদুকর শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।

    নিবেদনে—ডাঃ তপন দাস

শিরোনামটি পাঠ করে অনেক পাঠকের মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগতে পারে, ধর্মগুরু ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আবার কবে ভাষার যাদুকর  হলেন ?

হ্যাঁ, আপনার প্রশ্ন অমূলক নয়। কারণ,  তিনি তথাকথিত লেখক বা কবি-সাহিত্যিক নন, এবং তথাকথিত শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক গুরুও নন। তিনি জাগতিক, আধ্যাত্মিক, ভূলোক, দ্যুলোক, ব্রহ্মলোক, বিষ্ণুলোক, গোলক সব বিষয় নিয়েই আলোকপাত করে গেছেন ভাষার এক নবীন বিন্যাসের মাধ্যমে। তিনি একাধারে ছিলেন কীর্তনীয়া, যোগ-বিশারদ, চিকিৎসকদের চিকিৎসক, শিক্ষকদের শিক্ষক, কৃষকদের উপদেষ্টা। শিল্প, বিজ্ঞান, স্থাপত্য, কলা, বাণিজ্য প্রভৃতি সর্ববিষয়ে  ছিলেন সমান পারদর্শী। তাঁকে পরিমাপ করার মত কোন মাপক যন্ত্র এখনো  আবিষ্কৃত হয়নি। তাই  তিনি কবি-সাহিত্যিক হিসেবে  কখনো কোন সাহিত্য সম্মেলনে যোগদান করেন নি, কোন পত্রিকা তাঁকে কবি বা সাহিত্যিক  শিরোপা দেয়নি, তিনি কোন পুরস্কার প্রাপকও নন। তবে তিনি সদগুরু পরিচয়ে খ্যাত হবার পর থেকে জগতের কল্যান সাধনের জন্য ২২ বছর বয়স থেকে সুরু করে ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত যে শুধুমাত্র অসংখ্য শ্রুতিবাণী, স্মৃতিবাণী, ভাববাণী প্রদান করেছেন  তাই নয়, ছাত্র জীবনেও তিনি বহু কবিতা, সংগীত ও নাটক রচনা করেছিলেন। সে-সব রচনার সব পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। যতটুকু পাওয়া গেছে তার মধ্যে ২২টি কবিতা, ২৯টি সংগীত, ‘দেবযানী’ শিরোনামের পূর্ণাঙ্গ নাটক এবং ১টি নাটকের অংশবিশেষ পাওয়া গেছে।  তাঁর রচিত অসংখ্য কবিতা এবং সংগীতের মধ্যে ‘বাণীস্তব’, ‘ধর্মসঙ্গীত’ যেমন আধ্যাত্মিকতায় সমৃদ্ধ, তেমনি আবার  ‘বঙ্গভঙ্গে’, ‘বিদেশী বর্জন’, ‘স্বদেশী সঙ্গীত’ শিরোনামের রচনায় অপূর্ব দেশপ্রেমের চিত্র প্রকাশিত হয়েছে।  তাঁর  রচিত  গ্রন্থাদি নিয়ে গবেষণা করে অনেক জ্ঞানীগুণীজন  ‘ডক্টরেট’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।  

তিনি সমাজ দর্পণকে, সমাধান বিহীন সমাজের সমস্যাকে, লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরাকে সাহিত্য বলেন নি। তাঁর মতে মানুষের হিত সাধন যা করে, তাই সাহিত্য।  ওই হিত সাধন কিভাবে করতে হবে, সে বিষয়টাকে তিনি তাঁর স্বকীয় রচনার রীতিতে প্রকাশ করলেনঃ

‘‘সাহিত্যের মূল ভিত্তিই হ’চ্ছে—

       জীবন ও কৃষ্টি,

              অর্থাৎ, কৃষ্টি যা’তে জীবনকে

                     পোষণ প্রবৃদ্ধ ক’রে তুলে

                           বিবর্তনে উৎকীর্ণ ক’রে দেয়—

তেমনতর নিয়মনের ভিতর-দিয়ে

       ঘটনাকে সন্নিবেশ করতঃ

              মানুষের অন্তরে

       বিবর্তনী আকূতিকে

              অনুপ্রেরিত ক’রে তোলাই হচ্ছে—

                     সাহিত্যের মন্ত্র চালনা।’’ ২৪৫  (শিক্ষা-বিধায়না)

 তাঁর মতে, শক্তিশালী লেখক, সাহিত্যিক যদি সুকেন্দ্রিক না হয়, তারাই হয়ে দাঁড়ায় ধর্ম, কৃষ্টি,  সংহতি ও আদর্শের  মাথায়  বাড়ি দেবার  গুরু ঠাকুর। তাদের লেখনী দিয়ে প্রবৃত্তি-পোষণী মন্দটাকেই ভালো বলে চালিয়ে দেয়। ফলে মানুষের বোধ ও বিবেচনা দিশেহারা হয়ে ওঠে।  

তাঁর রচিত ‘সত্যানুসরণ’ গ্রন্থটি পাঠ করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ  বিস্মিত হয়ে ঋত্বিগাচার্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য মহোদয়কে  বলেছিলেন,—এত অল্প  বয়সে এরূপ স্বচ্ছ সাবলীল ছন্দে, অপরূপ ভঙ্গীতে, গভীর তত্ত্বসমূহের এমন অপূর্ব প্রকাশ কি করিয়া সম্ভব হয়!  সত্যানুসরণ পাঠ করে কবিগুরু, ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রকে  একজন শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক রূপে গণ্য করেছিলেন।

কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র, ঠাকুরকে তাঁর উপন্যাস রচনার যে প্রেক্ষাপট ব্যক্ত করেছিলেন তার উত্তরে ঠাকুর বলেছিলেন, ‘‘……. —সমাজ পচে গিয়েছে সত্য,  কিন্তু তাই বলে আামরা যদি  দুঃখের চিত্র, হতাশার চিত্র, বিকৃত মনস্তত্ত্বের  অভিব্যক্তি লোকের সামনে তুলে ধরি, তবে কারও কোন উপকারই আমরা করতে পারিনা। সাহিত্যিকের দায়িত্ব গঠনমূলক চিত্র তুলে ধরা, যার ফলে মানুষ হতাশার মধ্যেও আশা, দুখেঃর মধ্যেও পায় শান্তির ইঙ্গিত।  বাস্তববাদের সঙ্গে যদি আদর্শবাদের সম্বন্ধ না থাকে, তবে কোন সুফলই হবে না। আদর্শ চরিত্র রূপায়ণ করলে, তা থেকে মানুষ পাবে উদ্দীপনা। বাস্তব অসুবিধা বা ভাগ্যবিপর্যয়কে প্রতিহত করে দাঁড়াতে চেষ্টা করবে। সাহিত্যিক যদি পাঠকের মনে ভরসার সৃষ্টি করতে না পারে, কল্যাণের ইঙ্গিত দিতে না পারে, তবে সে সাহিত্যের মূল্য কতটুকু ?’’

উত্তরে শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, ‘‘এমন করে কখনো ত ভাবিনি। এতদিন ভাবনার ধারাটাই ছিল উল্টো রকমের। সমস্যাটা তুলে ধরেছি। সমাজ-সংস্কারক করবে তার সমাধান। এখন কি আর শেষ সময়ে অন্য ভাবের রচনা সৃষ্টি করতে পারবো ?’’

ঠাকুরের অভিধানে সবই ইতিবাচক ছিল, নেতিবাচকতার স্থান নেই। কথাশিল্পীর ভাবনাকে নাড়িয়ে দিতে বলেছিলেন, দাদা, আপনার বাড়ীতে কোন অতিথি গেলে তাকে কি বাড়ীর আস্তাকুঁড়ে দেখান ? তা’ যদি না দেখান, তবে লেখনীর মাধ্যমে সমাজের নোংরা দিকটা তুলে ধরে কি সমাজের সংশোধন করা যায় ? তাই আমার মনে হয় সমস্যার সাথে সাথে সমাধান সূত্র যদি দিতে পারেন, প্রবৃত্তি-পীড়িত মানুষগুলো সংশোধিত হবার পথ খুঁজে পাবে। আপনার রচনা মানব-সমাজে হিতবাদী সাহিত্য রূপে বেঁচে থাকবে চিরকাল।

কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র  ঠাকুরের উপদেশ মেনে সমাধানী সূত্র দিয়ে রচনা করেছিলেন, ‘বিপ্রদাস’, ‘পথ-নির্দেশ’ ইত্যাদি শিরোনামের কালজয়ী উপন্যাস।

‘পথের পাঁচালি’-র স্রষ্টা সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ঠাকুরের অস্তিত্বধর্মী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন অগ্নিযুগের সাহিত্যিক এবং বলিষ্ঠ প্রবন্ধকার শাক্যসিংহ সেন, তিনি ‘সৎসঙ্গী’ মাসিক পত্রিকার সম্পাদকও ছিলেন। দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন নাট্যকার শ্রদ্ধেয় যোগেশ চন্দ্র  চৌধুরী। দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন নাট্যকার ব্রজেন দে, যিনি ঠাকুরের বিবাহ-নীতির আদর্শ নাটকের মাধ্যমে জনসমক্ষে তুলে ধরতে রচনা করেছিলেন ‘নিষিদ্ধ ফল’ নাট্যপালা।  এছাড়াও   সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, বিমল কর, আশাপূর্ণা দেবী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, জরাসন্ধ, বিবেকানন্দ মুখার্জী, সৈয়দ মুজতবা আলি, ড. শ্রীকুমার  বন্দ্যোপাধ্যায়, দীনেশ চন্দ্র সেন   প্রমুখ স্বনামধন্য সাহিত্যিকগণ ঠাকুরের সান্নিধ্য লাভ করে সমৃদ্ধ হয়েছিলেন। আর বর্তমান প্রজন্মের  আইডল শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় মহোদয় তো ঠাকুরকে নিয়েই তাঁর রচনাকে সমৃদ্ধ করে  চলেছেন।

                          * * * *

সাহিত্যিক মাত্রেরই একটা স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায় তাঁদের রচনায়। কিন্তু ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের রচনাকে কোন একটা নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের গণ্ডীতে আটকে রাখা যায় না। মানব-সভ্যতার হিতার্থে রচনার প্রয়োজনে  আর্য্য-ভাষার দেশজ, চলিত, প্রাকৃত, লেখ্য, কাব্যিক ভাষা এমন সুনিপুণভাবে প্রয়োগ করেছেন যা’ অন্যান্য লেখকের রচনায় এত বৈচিত্র পরিলক্ষিত হয় না।

মানুষের সর্বাঙ্গীন হিত সাধন করতে হলে প্রথম প্রয়োজন সদগুরুর দীক্ষা গ্রহণ।  তারপর গুরুর আদর্শের শিক্ষার সঞ্চারণা। সেই শিক্ষা শিশুকাল থেকে সুরু করে সারা জীবন ধরেই শিখতে হয়। কিন্তু আমরা শিশুদের সদগুরুর সিলেবাসের সৎ আচার-আচরণের দিকে খুব বেশি একটা গুরুত্ব না দিয়ে প্রথাগত সিলেবাসের বইপড়া শিক্ষায় বেশি করে গুরুত্ব দিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ফলে শিশুদের চরিত্র গঠনের শিক্ষায় ফাঁক থেকে যায়। যার ফলস্বরূপ মহানগরগুলিতে মহান নাগরিকের অভাব পরিলক্ষিত হয়। সেই ফাঁক পূরণ করতে শ্রীশ্রীঠাকুর ছোট ছোট ছড়া বাণীর মাধ্যমে শিশু শিক্ষার সহজ পাঠ দিলেন।

‘‘আধো-কথার সময় থেকেই

করে-করিয়ে যা’ শেখাবি

সেটাই কিন্তু মোক্ষম ছেলের

হিসাবে চল্ নয় পস্তাবি।

শিশু যখন আধবুলিতে

যে  লক্ষ্যেতে যা’ যা’ কয়—

তা’ না বুঝে চাপান কথায়

আনেই বোধের বিপর্যয় ।

ভাল কিছু করতে গিয়ে

       আসে যদি হটেই ছেলে 

এমনি করেই উস্কে দিবি

বাহবা নিতে করেই ফেলে।

ঝোঁক না বুঝে শিক্ষা দিলে 

পদে পদে কুফল মিলে।’’

শিক্ষা বিষয়ে বলতে গিয়ে এমনতর মনোবিজ্ঞান সম্মত অনেক ছড়াবাণী তিনি দিয়েছেন, অভিভাবকগণ সেগুলোকে বাস্তববায়িত করতে পারলে জীবনীয় শিক্ষা থেকে সন্তানেরা কখনোই বঞ্চিত হবে না।

সন্তানদের শিক্ষিত করার প্রতিবন্ধকতা ঠিক কোথায়, সে বিষয়ে মনোবিদেরা, সমাজবিদেরা বিশেষভাবে চিন্তিত হলেও ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তার নিদান দিলেন সহজ-সরল ভাষার প্রয়োগে।

‘‘স্বামী-স্ত্রীতে ঝগড়া করে

ছেলে-পুলেয় দেখে

গোল্লায়েরই সদর দ্বারে

বাছাগুলোয় রাখে।’’

সন্তান, পিতামাতার জৈবী অবদান। তাদের সহজাত-সংস্কার এবং অভ্যাসগুলো সন্তানের চরিত্রে সঞ্চারিত হয়। সন্তানকে শিক্ষা দিতে হলে পিতামাতাকে যে কতখানি  সংযত হতে হবে সে বিষয়ে আগেভাগে সাবধান করে দিলেন।

শ্রীশ্রীঠাকুর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার তুলনায় বাস্তবজীবনের ব্যবহারিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

‘‘অভ্যাস, ব্যবহার ভাল যত

শিক্ষাও তার জানিস্ তত।

লেখাপড়ায় দড় হলেই

শিক্ষা তারে কয় না

অভ্যাস, ব্যবহার, সহজজ্ঞান

নাহলে শিক্ষা হয় না।

মুখে জানে ব্যবহারে নাই

সেই শিক্ষার মুখে ছাই।’’

আমাদের শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য একজন সফল মানুষে পরিণত হওয়া। একজন পুরুষের সার্বিক উন্নতির চরম পরিণতি সফল পিতৃত্বে, একজন নারীর মাতৃত্বে। পিতৃত্ব এবং মাতৃত্ব অর্জনের নির্দিষ্ট উপাঙ্গও প্রকৃতি আমাদের দিয়েছেন, যার সফল বিনিয়োগে একজন আদর্শ পিতা, একজন আদর্শ মাতার পরিচয় বহন করে সুখ্যাত হতে পারি, আবার অসফল বিনিয়োগে কুখ্যাতও হতে পারি।  তাই শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র জাতি গঠনের মূল একক ‘প্রজা’ (প্রকৃষ্ট জাতক) সৃষ্টি কিভাবে করা যেতে পারে, সেই শিক্ষা সভ্যতাকে উপহার দিলেন, যা’ অন্যান্য সমাজ-সংস্কারকেরা কল্পনাও করেন নি।

‘‘প্রজা মানেই হচ্ছে—

       প্রকৃষ্টরূপে জাত—

       সর্ব্বসম্ভাব্য উদ্বর্দ্ধনী সার্থকতায় ;

আর প্রকৃষ্ট জন্ম পেতে হলেই চাই—

       প্রজনন পরিশুদ্ধি—

সর্ব্ব-সম্ভাব্যতার বৈধানিক সংস্থিতিতে।’’ (সম্বিতী)

প্রজনন পরিশুদ্ধির মাধ্যম মেয়েরা। মেয়েরাই মা হয়, নারী এবং পুরুষ উভয়েরই প্রত্যক্ষ স্রষ্টা। নারীরাই জাতির ধাত্রী এবং পালয়িত্রী। সেই নারীর চাল-চলন যত শুদ্ধ হবে, তত শুদ্ধ প্রজা জন্মাবে। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় যা’ সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত। শ্রীশ্রীঠাকুর সহজ-সরল ভাষায় এক মনোবৈজ্ঞানিক আবেদনের মাধ্যমে সে বিষয়ে আমাদের সচেতন করে দিলেন।

নারী হতে জন্মে জাতি
বৃদ্ধি লভে সমষ্টিতে
নারী আনে বৃদ্ধি ধারা
নারী হতেই বাঁচাবাড়া
পুরুষেতে টানটি যেমন
মূর্তি পায় তা সন্ততিতে।

পুরুষ নষ্টে যায় না রে জাত                            
নারী নষ্টে জাত কুপোকাত।

 নারীর চারিত্রিক শুদ্ধতা নষ্ট হলে জাতির শুদ্ধতা নষ্ট হবে। তাই শ্রীশ্রীঠাকুর ‘নারীর নীতি’ গ্রন্থের রচনার সহজ-সরল ছন্দের মাধ্যমে নারীর চারিত্রিক শুদ্ধতা বজায় রাখার শিক্ষা দিলেন।

‘‘মেয়ে আমার,

       তোমার সেবা, তোমার চলা,

        তোমার চিন্তা, তোমার বলা
              পুরুষ-জনসাধারণের ভিতর
                     যেন এমন একটা ভাবের সৃষ্টি করে—
                                  যা’তে তারা
                     অবনতমস্তকে, নতজানু হ’য়ে

                                  সসম্ভ্রমে,
                     ভক্তিগদগদ কন্ঠে—

‘মা আমার,— জননী আমার’! ব’লে
       মুগ্ধ হয়, বুদ্ধ হয়, তৃপ্ত হয়.কৃতার্থ হয়,—
              তবেই তুমি মেয়ে.
                     —তবেই তুমি সতী!’’
 
নারীর শুদ্ধতা বজায় রাখার স্বার্থে  লেখাপড়ার নামে ছেলেমেয়েদের সহশিক্ষা এবং সাহচর্য শ্রীশ্রীঠাকুর অনুমোদন করেন নি। ছোট ছোট ছড়াবাণীর মাধ্যমে এক সহজ শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন।
কুমারী একটু বড় হলেই
পুরুষ ছুঁতে নেই,
যথা সম্ভব এর পালনে 
উন্নয়নের খেই ।
 
ছেলেমেয়ে এক যোগেতে
করলে পড়াশোনা
পড়ার সাথে বাড়ে প্রায়ই
কামের উপাসনা।

পরের বাবা পরের দাদা
পরের মামা বন্ধু যত
এদের বাধ্যবাধকতায় 
সম্বন্ধটি যাহার যত
অনুরোধ আর উপরোধে
ব্যস্ত সারা নিশিদিন
কামুক মেয়ে তাকেই জানিস
গুপ্ত কামে করছে ক্ষীণ ।

বিয়ের আগে পড়লে মেয়ে
অন্য পুরুষে ঝোঁকের মন
স্বামীর সংসার পরিবার 
করতে নারে প্রায়ই আপন ।।

ছেলেমেয়েদের জীবনীয় শিক্ষা দিতে চাইলে ওই বাণীগুলো মুখে মুখে ছড়া কেটে একজন সাধারণ মানুষও সহজেই রপ্ত করতে পারে।

এবার আমরা তাঁর শিক্ষা-বিষয়ক সিদ্ধান্তের গদ্য রচনার কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরার চেষ্টা করব।

‘‘জীবন বিকাশের উদ্দেশ্যে, নিজ আচরণ-সমূহকে সহজাত সংস্কার ও স্বীয় অভ্যাসগুলির সাথে সুব্যবস্থিত ও সুগঠিত করে তোলার নাম শিক্ষা।’’

‘‘বৈশিষ্ট্যকে উল্লঙ্ঘন করিয়া শিক্ষার অবতারনা করা আর জীবনকে নপুংসক করা একই কথা।’’

অল্প কথায়, সহজ-সরল ভাষায় শিক্ষা-বিষয়ক এমন বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তের বার্তা ইতিপূর্বে কোন সাহিত্যিক বা শিক্ষাবিদ দিয়েছেন কিনা আমার জানা নেই।     

আবার সহজ, সরল ভাষা ছেড়ে শিক্ষা দেওয়ার ভাব এবং ভাষাটাকে যখন আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরেন, তখন আর, তাঁর সাহিত্যের পরিমাপ করা আমাদের সাধ্যে কুলায় না।

যেমন ইংরাজী ভাষায় গদ্য রচনা করে শিক্ষার সংজ্ঞায় বললেন :

“Systematic organisation  of habits and instinct for the purpose of fulfilling, the becoming of life by a graduated active manipulation of behaviour—may be called education.”

“Literation makes the
complexes facilated
whereas
education enlightens the being,
hence its index, habits and behaviour
glows on in a
sonorous rhyme.”
(MAGNA DICTA)

Education in its true sense
creates adjustment of
intra-cellular substance

through proper exercise;
intelligence and character evolve
and with due marital combination,
progeny improves.”

                             * * * *

‘শিক্ষা’ শব্দের অর্থ, সামর্থ্য, যোগ্যতা, সহায়তা। আর বেকার শব্দের অর্থ, অযোগ্য বা অকাজের লোক। পুঁথিগত শিক্ষায় শিক্ষিত হবার পর রোজগার করতে না পারা-দের পরস্পর বিরোধী ভাষায় ‘শিক্ষিত বেকার’ নামে কেন যে চিহ্নিত করা হয় আমি ভেবে পাই না ! শিক্ষার ওই অসার বাস্তব দিকটাকেও তিনি সাবলীল বাণীতে  তুলে ধরেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। যেমন—

‘‘শিখলি যে তুই কত শত

বোধ তো কিছুই ফুটলো না,

স্মৃতির বলদ হলি শুধু

এক মুঠো ভাত জুটলো না !’’

আবার আন্তর্জাতিক স্তরে তাঁর শিক্ষার ভাবনাকে চারিয়ে দিতে ইংরেজী ভাষার মাধ্যমে যা’ বিধৃত করলেন, সেইসব রচনাকে মূল্যায়ন করার যোগ্যতা কারো আছে কিনা জানি না, তবে আমার তো নেই। সেইসব ওজস্বী ভাষার রচনার কিঞ্চিৎ মাত্র তুলে ধরছি।

METHOD OF IMPARTING EDUCATION

“Let the method

       and device of your

process of imparting education

       be according to the

                     dealings and characteristics

                            of your students

                     and let the way

                            of laying it down

                                    before them

                            be tactful, sweet

                                   and touching

by which

       the characteristic interest

                             of your pupil

                             becomes glaring

       and they become interested

                            and adjusted

in your mission of training

      with jolly propitious propagation;

thus rouse their interest

       towards your mode of delivery

                     and attributes of teaching

       that inspire their awe and regard

                          for your personality;

and infuse your

       affectionate dealings

                             into their mind.”

EDUCATION WITHOUT CHARACTER

“Where education

      does not collaborate

                     with character and conduct,

                           it is merely

                                  an induction

                                         of knowledge

                     without an all-round association

                                           with facts

                     that make

                            the personality

                                    of our inner being

                                                          grow,

                            effulging

into peaceful fellow-feeling

                      with sympathetic service

                             to one’s existential uphill

                                            momentum.”      

LEARN FROM VARIOUS ASPECTS

“Learn

      through enjoyment

learn

      through exercise

                   with every interest

                          and keen observation;

learn

      through fear

                   observing all the affairs

                           with interest

                   which make your existence

                                         shaking;

learn

      from devout urge

                    on which you can stand

                           all through

                    in an unshaken condition,

laying out

      all intelligent tactics

                    and desisting from all evils;

learn

       from foe

                    how to combat,

                            how to deal with him

                                    intelligently

       and how to make him appeased

                                  without any suffering;

learn

       from beauty

                   which makes your heart

                          flourish to bloom

       with all attitude and action

                 how it makes you so

                          and all thoughts

                 that follow accordingly

                                         occur

thus,

       make yourself

                     all-round in experience

                            which comes out

                                           through

                     your keen observation

                            and active energetic urge;

remember however,

       while doing any work,

you have to perform it

       without forgetting anything

                    with all beauty,

                            in good time

                                    and temper.”     

                              * * * *

এবার  আমি সত্তাপোষণী ভাষায় সাহিত্য নির্মাণে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র যে বিশিষ্ট অবদান রেখে গেছেন, মানব সভ্যতাকে সবদিক দিয়ে সমৃদ্ধ করতে, তার কিছু দৃষ্টান্ত উপহার স্বরূপ তুলে ধরছি।

 ‘‘ভাব, ভাষা, যুক্তি,

       ছন্দ ও অনুরণন

যতই সৌষ্ঠবমণ্ডিত হ’য়ে

       আদর্শ-উল্লোল হ’য়ে ওঠে—

              জীবনীয় সাত্তিক সম্বর্দ্ধনায়,—

রচনা জীবন্ত হ’য়ে ওঠে সেখানে তেমনি,

       এই হলো রচনার পঞ্চপ্রাণ।’’ ২৩৯ (শিক্ষা-বিধায়না)

‘‘সমস্ত রসের সমবায়ে

       সন্দীপনার বোধ-পরিবেষণী

              সাত্বত সম্বেদনাই হ’চ্ছে

                     সাহিত্যের প্রাণনদীপ্তি।’’ ২৪০ (শিক্ষা-বিধায়না)

‘‘পরিস্থিতির ভাল-মন্দ পরিচলনকে

              আলোড়ন-বিলোড়ন ক’রে

       সার্থক সঙ্গতিশীল সাত্বত পন্থায়

              সাত্তিক মর্যাদায়

                     সুদীপ্ত ক’রে তোলাই হ’চ্ছে

                     সাহিত্যের সমীচীন তাৎপর্য,

আর তাই-ই হচ্ছে

       জনগণের জীবনীয় সম্বর্দ্ধনা।’’ ২৪১ (শিক্ষা-বিধায়না)

      ।। অনুশ্রুতি ১ম খণ্ড থেকে সংগৃহীত কিছু বাণী-নির্ঝর ।।

আদর-ভরা ফুল্লবাণী

       আশার পিনাক হাতে,

প্রাপ্তিটাকে আনবি ডেকে

       তপের আলোকপাতে। ৭৮। (সাধনা)

মান-গরবে অহংবশে

       ধরলি রে ধাঁজ বেকুব চতুর,

চলনে তোর দিগগজী ভাঁজ

       দেখতে যেন ক্ষিপ্ত কুকুর। ১২২। (বৃত্তিধর্ম)

পথ ভেবেই তুই শ্রান্তিভরে

       ক্ষান্ত হ’য়ে যাসনে দমে,

মানুষ কি রে চলতে পারে

       না ক’রে ভর স্ব-উদ্যমে ? ২৬ । (বৃত্তি নিয়ন্ত্রণ)

শঙ্খ ফুঁকে অমর হাঁকে

       উচ্চরোলে পুরুষ-বুক,

তাথৈ থিয়ায় নাচাও নারী

       বর্মে ঢেকে মৃত্যুমুখ। ৮৭। (পুরুষ ও নারী)

সব দিতে তুই করলি গুরু

       পেতে পরিত্রাণ,

দিলি কিন্তু নব ঘণ্টা

       নিতেই লেলিহান! ৪৩। (কপট টান)

বাসতে ভাল এসে রে তুই

       বাসলি ভাল কা’রে,

প্রতিদানেও তাই পাবি তুই

       মজলি নিয়ে যা’রে। ৭৫। (কপট টান)

এমন অসংখ্য ঋদ্ধ-বাণীতে সমৃদ্ধ রচনাগুলো মূল্যায়ন করতে পারলে তাঁকে কবি, ছান্দসিক, সাহিত্যিক, সাহিত্যদ্রষ্টা ঋষি বললেও বোধহয় অত্যুক্তি হবে না।

                              * * * *  

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র  সব ঝড়ঝঞ্ঝা থেকে মানব সভ্যতাকে আগলে রাখতে ওজস্বী ভাষায় ‘দেবভিক্ষা’ শিরোনামে যে কাতর আবেদন রেখেছিলেন, সে আবেদনের, সে ভাষার, মর্যাদা যদি আমরা দিতে পারতাম, বিশেষ করে সাহিত্যিকগণ যদি তাদের গুটি কেটে বেরিয়ে এসে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করতেন, তাহলে অবক্ষয়ের রাশ কিছুটা হলেও টেনে ধরা যেত।   

।। দেবভিক্ষা ।।

‘‘ওগো ভিক্ষা দাও!—

       ঝাঁঝাল ঝঞ্ঝার পিশাচী জৃম্ভন শুরু হয়েছে,

বাতুল ঘুর্ণি বেভুল স্বার্থে

       কলঙ্ক কুটিল ব্যবচ্ছেদ

              সৃষ্টি করতে আরম্ভ করে দিয়েছে,

প্রেত-কবন্ধ-কলুষ

       কৃষ্টিকে বেতাল আক্রমণে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে,

অবদলিত কৃষ্টি অজচ্ছল অশ্রুপাতে

       ভিক্ষুকের মতো তাঁরই সন্তানের দ্বারে

              নিরর্থক রোদনে রুদ্যমান,

অলক্ষ্মী-অবশ প্রবৃত্তি-শাসিত বেদস্মৃতি—

       ঐ দেখ—মর্মান্তিকভাবে নিষ্পেষিত,

ত্রস্ত দোধুক্ষিত দেবতা আজ নতজানু—তোমাদেরই দ্বারে

       তোমাদেরই প্রাণের জন্য তোমাদেরই প্রাণভিক্ষায়

       তোমাদেরই সত্তার সম্বর্দ্ধনার জন্য

              ব্যাকুল হয়ে ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়াচ্ছেন ;

কে আছ এমন দরদী আর্য্য-আত্মজ সন্তান !—

       তাঁকে মানুষ ভিক্ষা দেবে, তাঁকে অর্থ ভিক্ষা দেবে—-

সব হৃদয়ের সবটুকু উত্সর্গ করে

       তোমাদেরই জন্য

সেই দেবোজ্জল প্রচেষ্টাকে সার্থক করে তুলতে ?

যদি থাক কেউ

       ওগো ধী-ধুরন্ধর উত্সর্গপ্রাণ

              নিরাশী নির্ম্মম !

এস,—উত্সর্গ কর—আত্মাহুতি দাও—     

       জীবন নিঙড়ানো যা-কিছু সঙ্গতি

              তাঁকে দিয়ে সার্থক হয়ে ওঠ,

       নিজেকে বাঁচাও, মানুষকে বাঁচাও, কৃষ্টিকে বাঁচাও ;

আর, বাঁচাও দুর্দ্দশাদলিত মহা-ঐশ্বর্য্যশালিনী

       আর্য্যস্তন্যদায়িনী, পরম-পবিত্রা

              ভিখারিণী মাতা ভারতবর্ষকে,

ধন্য হও, নন্দিত হও,

       ঈশ্বরের অজচ্ছল আশীর্ব্বাদকে

              মাথা পেতে লও,

শান্ত হও, শান্তি দাও,

       অস্তি ও অভ্যুত্থানকে

              অনন্তের পথে অবাধ করে রাখ ;

                           স্বস্তি! স্বস্তি! স্বস্তি!

                           * * * *

এবার আমি  সাহিত্যের উৎস বিষয়ে বলা শ্রীশ্রীঠাকুরের কিছু রচনার উপর আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী পরমপিতা এক থেকে বহুতে পরিণত হবার প্রাক্কালে যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনাহত-নাদ উৎপন্ন হয়েছিল, সেই আদিধ্বনিস্পন্দিত  শব্দ বা ধ্বনি বা পরাবাক্ ওঁ সব সৃষ্টির আদি উত্স। ‘ব্যাপ্ত প্রাক, প্রথম বাক্।’  পুণ্যপুঁথিতে বর্ণিত শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাষায় ‘‘এক বিরাট ধ্বনি সোঽহং পুরুষ ভেদ করে সৃষ্টি করতে চলে এল—সেই ওম্।’’

আবার অনুশ্রুতি গ্রন্থে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন—

‘‘স্পন্দন়টার সংবেদনা

       যেমনতর যেথায় হয়,

শব্দটাও তো মূর্তি নিয়ে

       বিশেষ হয়ে তাতেই রয়।’’ 

এই নিয়মনা বা বিধির মধ্য দিয়েই সৃষ্টি হয়েছে সব ভাষার। শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাষায়— ‘‘ভাষা তার/পরিস্থিতি ও পরিবেশ অনুগ/ব্যক্তির ভাব-সন্দীপনী ব্যক্ত বিবর্তন/ছাড়া আর কিছুই নয়কো।’’ (শিক্ষা-বিধায়না, ১১৮)

এই বিবর্তন পরিলক্ষিত হয় রামায়ণ রচনার প্রেক্ষাপটে।

যেমন, রাম-নামের নাদ-সাধন করে রত্নাকর দস্যু মেধানাড়ীকে জাগ্রত করে হয়েছিলেন বাল্মীকি।  একদা তমসা নদী থেকে স্নান করে ফিরছিলেন। এক তরুশাখে ক্রৌঞ্চ-জুটি পরস্পর খেলছিল। এক ব্যাধ পুরুষ পাখিটিকে তীর মেরে হত্যা করলে স্ত্রী পাখিটি করুণ বিলাপ করতে থাকে। বাল্মীকি বিচলিত হয়ে ‘কোনদিন প্রতিষ্ঠা পাবে না’ বলে ব্যাধকে অভিসম্পাত করেন। সেই অভিশাপ বাণী স্বতঃস্ফূর্ত শ্লোকবদ্ধ হয়ে নির্গত হয়েছিল :—সৃষ্টি করেছিলেন দেব-ভাষার আদি শ্লোক— ‘‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতী সমাঃ/যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকম্ অবধী কামমোহিতম্।’’   অতএব, বলা চলে, নাদরূপী বা শব্দরূপী ব্রহ্ম থেকেই ভাষার সৃষ্টি।

সেই ভাষার সমন্বয়ের রচনা যখন সত্তাপোষণী রূপে জগতের হিতসাধনে ব্রতী হয়, তখনই সৃষ্টি হয় সাহিত্যের। শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর শ্রীমুখ   নিঃসৃত ভাষায় চলার সাথী গ্রন্থে বলছেন—‘‘যার আলোচনায় মানুষ হিতে অধিষ্ঠিত বা উন্নীত হতে পারে, তাই যে সাহিত্য।’’  শিক্ষা-বিধায়না গ্রন্থের ২৪৫ সংখ্যক বাণীতে বলছেন,  ‘‘ঈশ্বরই সুসঙ্গত, সর্ববিভান্বিত/ সুসমাবিষ্ট, প্রাজ্ঞ জীবন-সাহিত্য,/ তাই তিনি রসো বৈ সঃ।’’

 তাইতো, যুগের প্রয়োজনে, ঈশ্বর, অবতার-বরিষ্ঠরূপে নরবপু ধারণ করেন। হিতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে সৃষ্ট হয় নব-নব সাহিত্য।  বেদ-বেদান্ত, রামায়ণ, গীতা, ত্রিপিটক, বাইবেল, কোর-আন্, চৈতন্য-ভাগবত, চৈতন্য চরিতামৃত, রামকৃষ্ণ কথামৃত ইত্যাদি নামে সংকলিত এবং লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাহিত্যিকদের যে-সব জীবন-সাহিত্যের সাথে আমরা পরিচিত হয়েছি, সেই সব সাহিত্যের প্রকৃত মূল্যায়ন করে অনেক ভুল শুধরে দিয়েছেন, জীবনীয় উদ্ধৃতিগুলো নানাভাবে জনমানসে তুলে ধরে জীবন-সাহিত্যের রূপ দান করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর। যার মাধ্যমে অবতারবরিষ্ঠ পরম্পরাকে, ঋষিবাদকে, জীবনবাদী সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।  তাঁর শ্রীহস্ত লিখিত রচনা, স্মৃতি-বাণী, শ্রুতি বাণীসমূহ এক অভিনব বর্ণ-বিন্যাসে, শব্দ-বিন্যাসে, ব্যাকরণ-বিন্যাসে, পংক্তি-বিন্যাসে, ভাব-বিন্যাসে সমৃদ্ধ হয়ে সৃষ্টি করেছে এক সুসমাবিষ্ট, প্রাজ্ঞ জীবন-সাহিত্যের সম্ভার। তাঁর বাণী সাহিত্যে আমরা অনেক নবীন মৌলিক ভাষার সন্ধান পেয়েছি এবং আরও পেতে পারতাম যদি বর্তমানের ন্যায় দর্শ-শ্রুতি বৈদ্যুতিন মাধ্যমের সাহায্য পাওয়া যেত। যার অভাবে মহাসমাধির ভাববাণীর সময় প্রোক্ত অনেক বিদেশী ভাষাকে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তথাপি তাঁর সৃষ্ট বাণীসাহিত্যে সংস্কৃত, বাংলা, ইংরেজী ভাষার যে অনবদ্য প্রয়োগের সাথে আমরা পরিচিত হতে পেরেছি, তা’ সমৃদ্ধ করেছে মানবজীবনের একান্ত প্রয়োজনীয় প্রতিটি আঙ্গিককে। উপাসনা, সাধনা, লোক-ব্যবহার, দর্শন, কৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, বিজ্ঞান, পরিবেশ-পরিচর্যা, বাণিজ্য, সমাজ, সমাজ-সংস্কার, দশবিধ-সংস্কার, বিবাহ, প্রজনন, রাষ্ট্র, পরমরাষ্ট্রিক সমবায়, ইত্যাদি সব কিছুই স্থান পেয়েছে তাঁর রচনায়।  ওইসব বিধিবদ্ধ অনুশাসনগুলো  জীবনকে জীবনীয়ভাবে উপভোগ করার রসদে পরিপূর্ণ। যা আমাদের জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক সকল অভাবকে তাড়িয়ে দেবার ব্যবস্থা করে জীবনকে পূর্ণতার আস্বাদে ভরিয়ে দিতে এক নিশ্চিত নির্ভরশীল দিগদর্শন। সেই পূর্ণতার আস্বাদের স্বাদের নেশা ধরাতে,— তাঁর সুললিত ভাষার বাণী-সাহিত্যের সাথে জগদ্বাসীকে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য শত বাধা-বিপত্তি, অভাব-অনটনকে অতিক্রম করে শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর ভক্তদের কাছ থেকে কাগজ ভিক্ষা করেছেন, টাকা ভিক্ষা করেছেন পত্র-পত্রিকা মাধ্যমে এবং পুস্তকাকারে তাঁর বাণীগুলোকে সুলভ মূল্যে পৌঁছে দেবার মানসে। শুধু তাই নয়, তিনি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের জন্যও জনে জনে বলেছিলেন। অনেক আত্মোৎসর্গকৃত ভক্ত ও প্রতিষ্ঠান পত্র-পত্রিকা, সাময়িকী, পুস্তক-পুস্তিকা তাঁর বলা কথাগুলো অবিকৃতভাবে প্রকাশ করে  তাঁর চাহিদা পূরণ করেছেন এবং এখনো করে চলেছেন। তাঁদের উদ্দেশ্যে প্রণাম নিবেদন করেই বলতে হয়, তাঁর সব চাহিদা পূরণের লক্ষ্যমাত্রাকে এখনো ছুঁতে পারিনি আমরা। গড়ে তুলতে পারিনি জীবনবাদী সত্তাপিয়াসী পাঠকসমাজ। একথা ঠিক যে, সাধারণ মানুষেরা অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে, প্রকৃত জীবনবাদী সাহিত্যের আস্বাদ নিতে, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দেবভাষার দেবসাহিত্য চর্চায় একদিন না একদিন এগিয়ে আসবেই। সেই শুভাগমনকে ত্বরান্বিত করতে, তাঁর বাণী-সাহিত্যকে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক, বার্ষিক পত্র-পত্রিকা এবং বৈদ্যুতিন যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে উপঢৌকন রূপে সাজিয়ে তো রাখতে হবে, না কি ?        ক্ষুদ্র আত্মস্বার্থ প্রতিষ্ঠাকে উপেক্ষা করে যদি দীক্ষাকালীন প্রতিজ্ঞা পূরণের শপথ স্মরণ করে ইষ্টস্বার্থ প্রতিষ্ঠায় আমাদের ইচ্ছাটাকে বিনিয়োগ করতে পারি, তবে—হবে, হবে, হবেই জয়। হাসি ফুটবে তাঁর মুখে। অন্তর্যামী পরমপিতার পরম করুণার প্রস্রবনের অমৃত ধারায় স্নাত হয়ে সবাই ভাল থাকবেন, সবাইকে ভাল রাখবেন।

                          * * * *

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র রচিত ‘বিধি-বিন্যাস’  গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত এক অনবদ্য  স্তবগাঁথা দিয়ে  যবনিকা টানলাম।

“হে পূণ্য! পরাক্রান্ত! পরাত্‍পর !
প্রচণ্ড মার্ত্তণ্ডবরেণ্য !
এক! অদ্বিতীয় !
তোমারই বিনিষ্কাষিত কিরণবীচি
তাপন প্রতিক্রিয়ায়
অযুত জ্যোতিষ্কের সৃষ্টি করেছে;
বৈধী মিতিচলনে চলেছে তা’রা
তোমারই প্রাণদ গতিপথে
বোধি-বিজৃম্ভী বিসৃষ্ট পরাক্রমে
সৃজন-সম্বেগে—
দৃপ্ত জীবনের অদম্য আবেগে,—
নভোমণ্ডলে সজ্জিত স্থালীর স্থল-সর্জ্জনে
দ্যৌঃ ও পৃথিবীর জীবন-দীপালি
সজ্জিত করে নাদ নিক্কণে—
অভ্যুদয়ী, আরুদ্র পরিক্রমায়;—
তোমাতেই আমার অযুত নমস্কার!”

                              —বন্দে পুরুষোত্তমম্ ! জয়গুরু ! প্রণাম !

——————————————————————————-

তথ্যঋণঃ

১.  ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনী  গ্রন্থ।

২. সৎসঙ্গ পাব্লিশিং প্রকাশিত বাণীগ্রন্থ। _� @_�

স্বাধীনতা

।। স্বাধীনতা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।।

                                    নিবেদনে—তপন দাস

শ্রীশ্রীঠাকুর–নিজেরা স্বাধীন না হ’লে কি স্বাধীনতা আসে? স্বাধীনতা দিলেও তো আসে না। Common ideal-এ (এক আদর্শে) integrated (সংহত) হ’য়ে প্রত্যেকের জন্য প্রত্যেকে হ’লে স্বাধীনতা আপনি আসে। আমি independence (অনধীনতা) বুঝি না, freedom বা liberty (স্বাধীনতা) বুঝি। জন্ম মানে dependence (অধীনতা), জন্ম নিতেই মা-বাপ লাগে, independence (অনধীনতা) কোথায়? স্বাধীনতার ভিতর আছে  love-service (প্রীতি-প্রসূত সেবা), কান ধ’রে করা নয়, প্রাণ ধ’রে করা। Freedom-এর ধাতুগত অর্থ শুনেছি–প্রিয়ের বাড়ী, আর liberty মানে শুনেছি–বৃদ্ধি, বাঁচাবাড়া। | পরস্পর পরস্পরের বাঁচাবাড়ার সহায় যখন হয়–আদর্শ-স্বার্থে স্বার্থান্বিত হ’য়ে,– তখনই আসে সত্যিকার স্বাধীনতা। যেমন আমরা দেখতে পাই আমাদের শরীরবিধানে। কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই বেঁচে থাকতে পারে না, যদি পরস্পর পরস্পরের বাঁচা-বাড়ার সহায়ক না হয়। বাঙলা যদি বিহারের জন্য না হয়, প্রত্যেক প্রদেশ যদি প্রত্যেক প্রদেশের জন্য না হয়, প্রত্যেক দল যদি প্রত্যেক দলের জন্য না হয়, প্রত্যেক সম্প্রদায় যদি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য না হয়, প্রত্যেক ব্যক্তি যদি প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য না হয়, তবে স্বাধীনতা আসে না।

(সূত্রঃ আলোচনা প্রসঙ্গে, সপ্তম খণ্ড/পৃষ্ঠা-৬৭, ২৯শে মাঘ, মঙ্গলবার, ১৩৫২, ইং ১২।০২।১৯৪৬)

।। আমি স্বাধীন না স্বেচ্ছাচারী ? ।।

                               নিবেদনে—তপন দাস

স্বাধীনতা মানে সু-এর অধীনতা, সত্তার অধীনতা। স্বাধীন যে, সে কখনোই স্বেচ্ছাচারী হয়ে কোন সত্তাবিধ্বংসী অসত্‍ কাজ তো করবেই না বরং সে অসত্‍ নিরোধে তত্‍পর হবে । মানুষ যখন প্রবৃত্তির অধীনতা থেকে মুক্তি পেতে পরমপিতাকে আশ্রয় করে বিবেককে অবলম্বন করে চলতে শেখে তখনই সে প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করে । তখন সে অন্যায়, অধর্ম, দুর্নীতি, ভ্রষ্টাচারকে আশ্রয় করে “সত্যমেব জয়তে”র সীলমোহরের দখল নিতে চাইবে না। বরং অসত্‍ বলে ওগুলোকে ঘৃনা করবে । মেয়েদের মাতৃভাবে দেখবে। কামনার বস্তু রূপে নয়। ঘরে বাইরের কোন অসতের সাথে আপোষ করবে না।

পরিপূর্ণ স্বাধীন পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, freedom মানে প্রিয়ের বাড়ি। প্রিয়ের বাড়ীর বাসিন্দা কখনো কি অপ্রিয় কিছু করতে পারে ?

“এমন আমি কবে হব।

আমায় দেখে বলবে লোকে

আছে জীবনবল্লভ।”

                    ——— exposedshow>প্রিয়ের বাড়ী, আর liberty মানে শুনেছি–

INDEDENDENCE

।। স্বাধীনতা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।
                                         নিবেদনে—তপন দাস

কীর্তন, পল্লী সংগঠন, তপোবন বিদ্যালয়, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র ইত্যাদি কর্মসংগঠনের মাধ্যমে আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের নমুনার কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করে চলেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর হিমায়েতপুরে । সেই সময় কিছু স্বাধীনতাকামী বিপ্লবী ঠাকুরকে ওইসব ছেড়ে তাদের সাথে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেবার আহ্বান জানালে ঠাকুর বলেন, ভারত তো পরাধীন ছিল না। আর্য্যযুগ থেকে শুরু করে দীর্ঘদিনের স্বাধীনতা আমাদের হারাতে হলো কেন ?
বিপ্লবী : সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্তে ।
ঠাকুর : সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্ত যদি থেকেই থাকে সে চক্রান্তের ফাঁদে আমরা পা দিলাম কেন ?
বিপ্লবী : আমাদের জাতীয় চরিত্রের দুর্বলতার জন্য ।
ঠাকুর : তাহলে দেখুন আপনিই স্বীকার করলেন যে পরাধীনতার মূল কারণ চরিত্রগত দুর্বলতা । আমি তো দাদা সেই কাজটাই করছি, মানুষ যাতে লোভ, কাম, ক্রোধ এইসব রিপুর,বা প্রবৃত্তির অধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে সু বা সত্তার অধীন হতে পারে। তাই আপনাদের উচিত আমার সাথে যোগ দেওয়া।   
তাই তো, শ্রীশ্রীঠাকুর সর্বপ্রথমে আমাদের দুর্বলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সু অর্থাৎ সত্তার অধীন হতে উপদেশ দিলেন যাতে আমরা আর কোন চক্রান্তের শিকার না হই। 
শ্রীশ্রীঠাকুরের মতে, FREEDOM মানে প্রিয়ের বাড়ী । inborn we are inter-dependent not independent. জন্ম নিতেও বাবা মা লাগে অধীনতা মানতেই হয়। সু পিতামাতার অধীনেই সুসন্তান অর্থাৎ স্বাধীন সন্তান বা প্রকৃষ্ট জাতক বা প্রজা জন্মায়।
এই হলো প্রকৃত স্বাধীনতার তাৎপর্য।

——–

MONER MAANUSH

।। মনের মানুষ কোথায় পাই।।

                                                নিবেদনে—তপন দাস

‘এমন একটা মানুষ খুঁজে পেলাম না, যার মন আছে………’ গানের এই কলিটা অজান্তে কত মানুষের মন ছুঁয়ে গেছে বলেই না বাংলা গানের জগতের একটি জনপ্রিয় গান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবুও কেন জানি গানটির স্রষ্টা একটা মনওয়ালা মানুষ খুঁজে পায়নি বলে সুরে সুরে আক্ষেপ করেছে।

      মন আছে বলেই তো মানুষ। মন নেই, তা’ কি করে হয় !  পশুদের  তো আর মন হয় না। তবুও তো  কত কুকুর-বিড়াল মানুষের মনের মণিকোঠায় আসন পেতে নেয়। যে মানুষ, আর একটা মানুষের মন বুঝে তাকে প্রিয়জনের আসনে বসাতে পারে না, সেই মানুষটাই হয়তো একটা কুকুরকে কোলে করে ঘুরে বেড়ায়, সাথে নিয়ে ঘুমোয়, তাই না ! আসল  ব্যাপারটা বোধহয় তা’ নয়।  আমি যখন সবার মন জয় করে চলার চেষ্টা করছি, তখন আমার মনের মণিকোঠা যারা ছুঁতে চাইছে না, বা  আমার মনের মণিকোঠাকে ছুঁতে পারছে না, এমনটা যখন হয় তখনই ‘একটা মনের মানুষ পেলাম না’ বলে আক্ষেপ হতেই পারে, যেমনটা হয়েছিল মানুষ-শ্রেষ্ঠ পরম প্রেমময় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের। কত গুণী-জ্ঞানী-বিজ্ঞানী যাঁর আদর্শ মাথায় নিয়ে চলেছে, সেই তিনিও আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘একটা মানুষ পেলাম না।’

স্বভাবতঃই একটা প্রশ্ন জাগে—তিনি তাহলে কেমন মানুষ চেয়েছেন, যে মানুষেরা তাঁর নিদেশ মেনে ‘ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যে’ পৌঁছে তাঁর ঈপ্সিত ‘পরমরাষ্ট্রিক সমবায়’-এর স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি !

নিত্য হতে লীলার আগম-নিগমের চরম ভাবের প্রকাশের মাধ্যমে তিনি  তাঁর চাওয়াটাকে  সংক্ষেপে ব্যক্ত করে বললেন—‘‘আমি চাই শুদ্ধাত্মা।’’

তিনি আমাদের কাছে  শুদ্ধাত্মা-সম্পন্ন মানুষ চেয়েছিলেন। যে মানুষগুলো সদদীক্ষা গ্রহণ করে পরমপিতার দেওয়া শিক্ষায় শিক্ষিত হবে, পরমপিতার দেওয়া বিবাহনীতি পালন করে এবং করিয়ে ঘরে ঘরে শুদ্ধাত্মার আগমনের পথ সুগম করবে, পরমপিতার দেওয়া কৃষির বাস্তবায়ন করে মানুষের খাদ্যের সুরক্ষা দেবে। পরমপিতার দেওয়া শিল্পনীতি বাস্তবায়িত করে বংশানুক্রমিক বৃত্তির পোষণের মাধ্যমে মানুষের দারিদ্র্যব্যাধী দূর করবে।  মানব-সভ্যতার সব সমস্যা সমাধানের রাজপথ স্বরূপ পঞ্চবর্হি, সপ্তার্চ্চির আদর্শ মেনে চলার শপথ পালন করবে।…………..

    নাহ্ ! এরপর নিজেকে ঠাকুরের ঈপ্সিত মানুষ বলে আর ভাবতে পারি না। তথাপি জন্ম-জন্মান্তরের প্রারব্ধ কাটাতে, অর্থ-মান-যশ-এর আশা ত্যাগ করে তাঁর আদর্শ মেনে শুদ্ধ-বুদ্ধ-পবিত্র হওয়ার চেষ্টা করতে তো কোন বাঁধা নেই। তবে পথ খুব বন্ধুর, মসৃণ নয়। …….তাঁর  বলা অনুযায়ী, তুমি বিনিময়ে হলাহল পাবে জেনেই সবাইকে অমৃত বিতরণ করতে হবে, আর এটাই তোমার সাধনা। তোমাকে কেউ যদি আগুনে পুড়িয়েও মারতে চায়  তবুও  তুমি তোমার ইষ্টের প্রতি নিষ্ঠায় অটুট থাকবে।

কি আর করা যাবে বলুন, তিনিই তো পরমপিতা, শত্রু, মিত্র,  তিনিই তো সব হয়েছেন, তিনিই সাপ হয়ে বিষ দেন, তিনিই আবার বিষ তুলে নেন। তাই নিজের প্রতি নিজের ‘অরাতি বুদ্ধি’ দহন করার প্রার্থনা জানিয়ে যেতেই হবে। কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা যাবে না। তাই বলে অসৎ নিরোধী তৎপর হবো না, তা’ তো হতে পারে না। সৎকে টিঁকিয়ে রাখার স্বার্থে অসৎ-এর নিকেষ করতেই হবে। গ্যাংগ্রীনকে বাড়তে দেওয়া যাবে না, এ্যাম্পুট বা অঙ্গচ্ছেদ করতেই হবে দেহটাকে বাঁচাবার স্বার্থে। ‘আমরা-ওরা’র বিভাজনের গণ্ডী টেনে নিজেকে ছোট না করে, কৌশলে সমাজ থেকে  অসৎ-নামের গ্যাংগ্রীন কেটে বাদ দিতে হবে বৃহত্তর স্বার্থে। ধারণ-পালন-সম্বেগসিদ্ধ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হলে এ ছাড়া কোন উপায় নাই।

না, না, যুগ-ধর্মের ‘ছোট আমি’-র স্বার্থপূরণ-সর্বস্ব আদর্শ—কারটা কিভাবে হাতাবো, যেন-তেন-প্রকারেণ অন্যের পকেটের টাকা, আমার পকেটে আনবো, ‘ফ্যালো কড়ি মাখো তেল, তুমি কি আমার পর !’….. নিজের নিজের আখের গোছানোর ‘গিভ এ্যাণ্ড টেক্’ পলিসি নিয়ে চললে কিন্তু হবে না। কালের কবল থেকে বাঁচতে হলে মানতে হবে কালাধিশের ছোট্ট একটি নিদেশ, ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম বলে জানিস্ তাকে।’

জয়গুরু ! সবাই আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম নেবেন।