।। পুরুষোত্তম-জননী মনোমোহিনী দেবীর শুভ আবির্ভাব দিবস স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি ।।

।। ** পুরুষোত্তম-জননী মাতা মনোমোহিনী দেবীর শুভ ১৫৬তম আবির্ভাব দিবস স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ** ।।
।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মাতৃভক্তি ।।

অপটু লেখনীতে শ্রীশ্রীঠাকুরের অপার মাতৃভক্তির কাহিনী প্রকাশের প্রারম্ভে, শ্রীশ্রীঠাকুর সৃষ্ট সৎসঙ্গ আন্দোলন বিষয়ে দু-চার কথা না বললে ইষ্ট প্রতিষ্ঠা কর্মে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যেতে পারে।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সৃষ্ট সৎসঙ্গ আন্দোলন ব্যক্তি নির্মাণের আন্দোলন, শুদ্ধাত্মা সৃষ্টির আন্দোলন। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, ধনী, দরিদ্র, মুর্খ, পণ্ডিত, সৎ, অসৎ নির্বিশেষে সব্বাইকে ধারণ-পালন-সম্বেগসিদ্ধ ব্যক্তিত্বের অধিকারী করে ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর—‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চি’-র আদর্শের সোপান-পথের মাধ্যমে। সেই পথের দিশারী স্বয়ং তিনি এবং তাঁর আদর্শ। আমরা আর্য্য-ভারতবাসীরা যখন থেকে পূর্বাপূর্ব পুরুষোত্তমদের আদর্শের পথ ভুলে প্রবৃত্তি-পোষিত আদর্শের জীবন-চলনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, তখন থেকে আমাদের জাতীয় জীবনে কৃষ্টিগত অধঃপতনের সূত্রপাত হয়েছে। তাই তো বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুরকে আক্ষেপ করে বলতে হয়েছিল—
“ভারতের অবনতি (degeneration) তখন থেকেই আরম্ভ হয়েছে, যখন-থেকে ভারতবাসীর কাছে অমূৰ্ত্ত ভগবান্ অসীম হ’য়ে উঠেছে—ঋষি বাদ দিয়ে ঋষিবাদের উপাসনা আরম্ভ
হয়েছে।
ভারত! যদি ভবিষ্যৎ-কল্যাণকে আবাহন ক’রতে চাও, তবে সম্প্রদায়গত বিরোধ ভুলে
জগতের পূর্ব্ব-পূর্ব্ব গুরুদের প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হও—আর তোমার মূর্ত ও জীবন্ত গুরু বা ভগবানে আসক্ত (attached) হও, —আর তাদেরই স্বীকার কর—যারা তাঁকে ভালবাসে। কারণ, পূর্ব্ববর্ত্তীকে অধিকার করিয়াই পরবর্ত্তীর আবির্ভাব।”
শ্রীশ্রীঠাকুরের এই আক্ষেপ-বাণী শতবর্ষ অতিক্রম করলেও আমরা তাঁর আবেদনকে বাস্তবায়িত করতে ব্যর্থ হয়েছি। ব্যর্থ হয়েছি অবিকৃতভাবে পুরুষোত্তমের আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে সাধারণ জনমানসে!
তিনি বার-বার বলেছেন, “পঞ্চবর্হিঃ, সপ্তার্চ্চি, হলো আর্য্যকৃষ্টির মেরুদণ্ড ……. এগুলির রোজ স্মরণ করতে হয়। স্মরণ করা মানে শুধু চিন্তা করা নয়।” (আঃ প্রঃ ১৪/৬২)
“হিন্দুমাত্রেরই পঞ্চবর্হি বা পঞ্চাগ্নি স্বীকার্য্য—তবেই সে সনাতন হিন্দু, হিন্দুর হিন্দুত্বের সর্ব্বজনগ্রহনীয় মূল শরণ-মন্ত্র ইহাই ! পঞ্চবর্হি যেমন প্রত্যেক হিন্দুর স্বীকার্য ও গ্রহনীয়,সপ্তার্চ্চিও তেমন প্রতি মানবের অনুসরণীয় ও পালনীয়”! (পুণ্য-পুঁথি, ১ম সংস্করণ)
পরমপিতার ঐকান্তিক আবেদনকে অগ্রাহ্য করে, তাঁর আদর্শকে নিত্যদিনের উপাসনা থেকে বহিষ্কার করে, ইষ্ট প্রতিষ্ঠা নামের অজুহাতে সংগঠন-সৃষ্ট তথাকথিত আচার্য্য-পরম্পরা প্রতিষ্ঠার জন্য যে বিকৃতধারায় সৎসঙ্গ আন্দোলন জনমানসে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে, তার প্রতিকার না করতে পারলে তাঁর ঈপ্সিত আর্য্যকৃষ্টির তুর্য্যধ্বনি পল্লীর নিকেতনে নিকেতনে পৌঁছানো সম্ভব হবে কি? তাঁর ঈপ্সিত—“পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠন”-এর-ই বা কি হবে? আমাদের গুরুভক্তির গন্তব্য ঈশ্বরপ্রাপ্তির-ই বা কি হবে? তিনি যদি অবচেতনে আবির্ভূত হয়ে জবাবদিহি চান, এই প্রশ্নগুলোর, উত্তর কি দেব তাই ভাবছি! !!!!!!!!!
***
যাইহোক, এবার নির্ধারিত আলোচ্য বিষয় “শ্রীশ্রীঠাকুরের মাতৃভক্তি” নিয়ে আমার সাধ্যমত আলোকপাত করার চেষ্টা করব।
প্রাকৃতিক নিয়মেই সব সুস্থ শিশুরাই দুষ্টুমি করে। জিনিসপত্র ভাঙে, তছনছ করে। সমবয়সীদের সাথে মারামারি করে, ঝগড়া করে, অন্যায় করে মার খাওয়ার ভয়ে সবসময় সত্যিটা স্বীকারও করে না। ফলে মায়ের কাছে, পরিজনদের কাছে মার খায়, বকুনি খায়। কিন্তু আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শিশু অনুকূলের দুষ্টুমির ধরণটাই ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি কার্যকারণ ভিন্ন কখনো কোন অন্যায্য দুষ্টুমি করতেন না। আর কখনো তা অস্বীকারও করতেন না। অকপটে সব স্বীকার করতেন। তথাপি তাঁকে মা-সহ পরিজনেরা অযথা শাসন করতে ছাড়তেন না। তারাই বা কি করবেন, প্রতিবেশীদের নালিশ শুনতে শুনতে নাজেহাল হতে হয় যে। তাই ইচ্ছে না থাকলেও, লোকের মন রাখতে জননীদেবীকে অযথা তিরষ্কার, শাসন করতেই হত।
একদিন মায়ের শাসনের ভয়ে লুকিয়ে ছিলেন। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে তবুও বাড়ী ফেরেনি দেখে কর্তামা (মাতামহী কৃষ্ণসুন্দরী দেবী) বাড়ীর আনাচে-কানাচে কোথাও খুঁজে না পেয়ে কিছুটা দূরে বনের মধ্যে এক গাছতলায় বসে থাকতে দেখতে পান। প্রশান্ত বদনে বসে আছেন, তাঁর দেহ থেকে গোলাপী রঙের উজ্জ্বল জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয়ে চারিদিক আলোকিত করে ফেলেছে এবং কতগুলো ছায়ামূর্তি বালক অনুকূলকে ঘিরে আনন্দে নৃত্য করছে। ওই দৃশ্য দেখে কর্তামা ভয় পেয়ে ‘রাম নাম’ জপতে জপতে দৌড়ে গিয়ে দৌহিত্রকে কোলে করে নিয়ে ছুটে বাড়ীতে ফেরেন।
আর একদিন কোন এক দুষ্টুমির জন্য জননীদেবী ছেলেকে শাসন করার জন্য ধরতে যাবেন বুঝতে পেরে অনুকূল দৌড়ে পালাতে গেলে জননীদেবীও পিছন পিছন ছুটতে শুরু করেন। কিছুতেই ধরতে পারছেন না। দৌড়তে দৌড়তে হাঁপিয়ে পড়েছেন। মায়ের কষ্ট হচ্ছে দেখে নিজেই ধরা দেন মায়ের হাতে। মায়ের সব শাসন তিনি আশীর্বাদ মনে করে মাথা পেতে
নিতেন। মায়ের কোন কষ্টই তিনি সহ্য করতে পারতেন না।
মায়ের সব কথা তিনি মেনে চলতেন। তিনি তখন পাবনা ইনস্টিটিউশনে তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র (বর্তমানের অষ্টম শ্রেণী)। অঙ্ক পরীক্ষার দিন। দেরি করে খেতে বসেছেন। স্কুলে যেতে দেরি হবে মনে করে মা বললেন, দেখিস্, আজ তুই অঙ্কের পরীক্ষা পারবি না।
যথারীতি স্কুলে গেছেন। পরীক্ষা শুরু হয়েছে। সব সহপাঠীরা অঙ্ক কষছেন, কিন্তু অনুকূলকে প্রশ্নপত্র হাতে নিয়ে চুপ করে বসে থাকতে দেখে শিক্ষক মহাশয় জিগ্যেস করেন, কি, চুপচাপ বসে কেন, অঙ্কগুলো কি কঠিন লাগছে?
অনুকূল শিক্ষক মহাশয়কে বলেন, না স্যর, অঙ্কগুলো সব আমি কষতে পারবো, কোন অসুবিধাই হবে না। কিন্তু কষতে পারছি না মায়ের কথার জন্য। আজ দেরি করে খেতে বসেছিলাম দেখে মা বলেছিলেন, দেখবি আজ একটাও অঙ্ক করতে পারবি না। তাই, আমি যদি
অঙ্কগুলো কষে ফেলি, তাহলে মায়ের কথা মিথ্যা হয়ে যাবে। আপনি আমায় ক্ষমা করবেন, অঙ্ক কষে মাকে মিথ্যেবাদী বানাতে পারব না! তাঁর ওই মাতৃভক্তির দৃষ্টান্ত দেখে সহপাঠি এবং শিক্ষকেরা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। পরে পৃথকভাবে অঙ্কের পরীক্ষা নিয়েছিলেন।
(সতীশচন্দ্র জোয়ারদার প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ৩৯ পৃঃ)
মায়ের প্রতি ঠাকুরের এমন একটা প্রাণকাড়া টান ছিল যে, কখনো কোন কারণে মায়ের কাছ থেকে অযথা কঠোর শাসন-তিরস্কার পেলেও তিনি হাসিমুখে মেনে নিতেন, কোন প্রত্যুত্তর করতেন না।—পাছে মা কষ্ট পায়, তাঁর প্রতি রুষ্ট হয়!—এই ভেবে! সর্বদা মায়ের আদর, সোহাগ, সান্নিধ্য, একটু বাহবা পাবার আশায় উন্মুখ হয়ে থাকতেন।
অথচ মা যে তাঁর প্রতি কতটা নির্দয় ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া তাঁর একটি বাল্যকালের রচনা থেকে।
It was written when my mother chid me.
কেন গো মা হেন ভাব সন্তানের প্রতি,
কি দোষ করেছি মাগো চরণ কমলে ?
সদাই কেন গো হেন কোপ মম প্রতি,
সদা গালাগালি কেন কর বরিষণ?
আমি কি গো পুত্র নয় তোমার জননী,
গর্ভে কি গো ধরনি মা অভাগা সন্তানে ?
আর আর যত তব পুত্রদের প্রতি,
সদাই সন্তোষ ভাব দেখাও জননী।
তারা যদি কাছে এসে ডাকে মা মা বলি,
প্রশান্ত হৃদয়ে মাগো উত্তর প্রদান।
আমি যদি কাছে এসে ডাকি মা মা বলি,
মোর ভাগ্যে শুধু ছাই দন্ত কড়মড়ি।
পিতার নিকটে যদি যাই গো জননী,
মিষ্ট কথা শুনিবারে মনের উল্লাসে,
তিনিও কঠোর বাক্য প্রয়োগি আমারে,
দূর ক’রে দেন মোরে সে স্থান হইতে।
মিষ্ট কথা ভালবাসি আমি গো জননী,
তাই সাধ যায় মম মিষ্ট শুনিবারে
যেই গো জননী মোরে বলে মিষ্ট ভাষ,
অমনি তাহার আমি হই পদানত।
ঈশ্বরের কেন গো মা এ কঠিন রীতি
যে-জন যাহা চায় তাহা নাহি পায় কেন?
(ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থ, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১০৭-১০৮)
এখানে একটা লক্ষণীয় বিষয়—শ্রীশ্রীঠাকুর এই রচনার মাধ্যমে মায়ের বিরুদ্ধে কোন নালিশ না জানিয়ে, মা-কে দোষারোপ না করে, ঈশ্বরের ওই-ধরণের বৈষম্যমূলক রীতি কেন, তা মায়ের কাছে জানতে চেয়েছেন!
শ্রীশ্রীঠাকুর পরবর্তীকালে পরিণত বয়সে কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, — “আমার জীবনের একমাত্র নেশা ছিল মাকে খুশী করা। আমার বুদ্ধি-বিবেচনা-শক্তিমত বরাবর সেই চেষ্টা করেছি। আমার লোভ ছিল, মার কাছ থেকে বাহবা পাওয়ার, তাঁর আদর পাবার। কিন্তু মা ছিলেন আমার প্রতি বড় কড়া, তাঁর শাসন ও ভর্ৎসনা পেয়েছি অজস্র, তাঁর সোহাগের জন্য ক্ষুধা থাকলেও তেমন পাইনি তা’। তাহ’লে কি হবে ? মা ছাড়া যে আমার অচল। মা যতই অসন্তুষ্ট হউন, রুষ্ট হউন, কেবল এৎফাক খুঁজতাম, কেমন ক’রে মাকে তুষ্ট করব। ঐ ছিল আমার ধান্ধা। প্রতিকূল অবস্থায় ছেড়ে দেবার আমার কোনকালে হয় না। তখন আমার গোঁ চেতে যায়, কেমন ক’রে সেটাকে আয়ত্তে আনব। ছেলেবেলায় পাড়ার সকলেই ছিল আমার অভিভাবক। খানাকা কতজনে কান চেপে ধ’রে দুটো চড় দিয়ে ছেড়ে দিত। সেখানে দোষ হয়ত আমার কিছুই নেই। অন্য কারও দোষের কথা যে কব, তাও আমার কখনও মন চাইত না। অনেকে আজেবাজে কথা মার কাছে এসে লাগাত। মাও চালাতেন একচোট। এই রকম যতই ঘটুক, আমি কখনও হতাশ হতাম না, নিরাশ হতাম না। ভাবতাম, আমি আমাকে এমনভাবে তৈরী করব, এমনভাবে চলব, যা’তে এর অবকাশ না ঘটে।” (আলোচনা-প্রসঙ্গে, ৩য় খণ্ড)

“আমি বড় হব, আমাকে মানুষ বড় কবে—সে কল্পনা আমার কোন দিনই নাই। ওই ধারণায় আমি ব্যক্তিগতভাবে কোন সুখ পাই না। তবে হ্যাঁ। মার কাছে মানুষে সুখ্যাতি করলে মা সুখী হবেন, মা আমাকে বাহাদুর ছেলে ব’লে বাহবা দেবেন, সে লোভ আমার ছিল। লোভ থাকলে কি হবে, মা যেন. কিছুতেই আমার উপর প্রসন্ন হতেন না। আমি যেন অপরাধ ক’রেই আছি তাঁর কাছে৷ কিন্তু তবু, আমি হাল ছাড়তাম না, নাছোরবান্দা হয়ে লেগে থাকতাম মাকে খুশী করবই। মার হয়ত আমাকে না হ’লে চলতে পারতো, আমার কিন্তু মা ছাড়া চলারই উপায় ছিল না। তাই মার খুশীর ধান্ধায় ঘুরতেই হ’তো আমাকে।”
(সূত্রঃ ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থ, ১ম খণ্ড)


মাতা মনোমোহিনী দেবী ও সন্ত সদগুরু পরম্পরা
পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জন্মদাত্রী বিশ্বজননী মনোমোহিনী দেবী বাংলা ১২৭৭ সালের ১৮ই জ্যৈষ্ঠ পাবনা জেলার হিমাইতপুরের বিখ্যাত চৌধুরী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম রামেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী, মাতার নাম কৃষ্ণসুন্দরী। আট বছর বয়সে ধ্যানের মাধ্যমে সৎনাম পান। নয় বছর বয়সে পাবনা জেলার অধীন চাটমোহর গোয়াখাড়া গ্রামের পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তীর পুত্র শিবচন্দ্র চক্রবর্তীর সাথে বিবাহ হয়। বিবাহের পর আগ্রা সৎসঙ্গের দীক্ষাপ্রাপ্ত শিষ্য ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তী মহোদয়ের সাহায্যে ধ্যানযোগে প্রাপ্ত গুরুদেব হুজুর মহারাজ (রায় সালিগ্রাম সিংহ বাহাদুর) মহোদয়কে কলকাতায় দর্শন করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দীক্ষা গ্রহণ করেন।
পুরুষোত্তম জননী মাতা মনোমোহিনী দেবীর দীক্ষাগুরু ছিলেন হুজুর মহারাজ। তিনি সন্তমতের যে সাধনা করতেন, সেই সাধনার ধারা সে-সময় বাংলাদেশে প্রচলিত ছিল না। সন্তমতের আদি সাধক কবীরদাস জন্মেছিলেন 1440C বারানসীতে। তিনিই প্রথম সত্‍মন্ত্রের রহস্য ভেদ করে বলেছিলেনঃ
“কবীর ধারা অগমকী সদগুরু দয়ী লখায়,
উলট তাহি সুমিরন করে স্বামী সংগ লাগায়।”
—অর্থাৎ ধারা উল্টে স্বামী যোগ করে জপ করতে নিদেশ দিলেন। কবীরের পর গুরু নানক জন্ম গ্রহণ করেন 15. 4. 1469 C পঞ্জাব প্রদেশের তালবণ্ডীতে। তিনিও ওই সত্‍নাম প্রচার করেছেন। কবীর সাহেবের পর আগ্রাতে ২৪ শে আগস্ট ১৮১৮ তে জন্মগ্রহণ করেন শিবদয়াল সিং, তিনি স্বামীজী মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ১৫ জুন ১৮৭৮ আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। পরবর্তী গুরু হন রায় সালিগ রাম। তিনি ১৪ মার্চ, ১৮২৯ আগ্রার পীপল মাণ্ডিতে জন্মগ্রহণ করেন। ৬ ডিসেম্বর ১৮৯৮তে আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। তিনি হুজুর মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ওই সৎনাম সাধন করে চরম ও পরম পথের সন্ধান পান। তিনি তাঁর গুরু স্বামীজী মহারাজের অনুমতি ক্রমে ওই সৎনাম সর্বসাধারণ্যে প্রচার করেন। পরবর্তী গুরু হন পণ্ডিত ব্রহ্মশঙ্কর মিশ্র। যিনি ২৮শে মার্চ, ১৮৬১ তে ব্রাহ্মণ পরিবারে, বারানসীতে জন্মগ্রহণ করেন। ১২ অক্টোবর ১৯০৭ সালে দেহত্যাগ করেন। তিনি মহারাজ সাহেব নামে খ্যাত ছিলেন। মহারাজ সাহেব দেহত্যাগের পূর্বে একটি কাউন্সিল গঠন করে বাবু কামতা প্রসাদ ওরফে সরকার সাহেবকে পরবর্তী গুরু রূপে নির্বাচন করেন। (শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরকার সাহেবকে সন্ত বলে উল্লেখ করেছেন, ভাববাণীতে।)
* * *
মাতা মনোমোহিনী দেবী সময় সুযোগ পেলেই এলাহাবাদ, কাশী, আগ্রায় গিয়ে গুরুদেবের সাথে সাক্ষাত করতেন। তিনি একবার গুরুর কাছে প্রার্থনা জানিয়ে বলেছিলেন, ‘‘আশীর্বাদ করুন, যেন আপনার মত সন্তান লাভ করতে পারি।’’
উত্তরে তাঁর গুরুদেব বলেছিলেন, আমার মত কেন, আমার চেয়ে মহৎ সন্তান তোমার গর্ভে জন্মাবে। তাঁর আলোয় পৃথিবী আলোকিত হবে।
তাঁর গুরুদেবের বলা কথা নিষ্ফল হয়নি। সব গুরুদের গুরু ইষ্টগুরু পুরুষোত্তমের জননী হন মাতা মনোমোহিনী দেবী। স্বামী, সন্তান ও বৃহত্তর পরিবেশের সেবা করে, অসৎ-নিরোধী তৎপর থেকে সব রকমের প্রতিকূল পরিস্থিতিকে সামাল দিয়ে ত্রিসন্ধ্যা নামধ্যান ও উপাসনায় অতিবাহিত করতেন। তাঁর গুরুদেবের মাহাত্ম্য-আলোচনা করতেন, বিপুল সমারোহে গুরুদেবের জন্মতিথি পালন করতেন। গুরুদেবের ইচ্ছা-পূরণ, প্রীতি সম্পাদনের জন্য তিনি সর্বদা উন্মুখ থাকতেন। তৎকালীন ও তৎপূর্বতন রাধাস্বামী-মতের সন্তগুরুগণের পুণ্য লীলাভূমি — কাশী, আগ্রা, এলাহাবাদ প্রভৃতি স্থানে প্রায়শ তীর্থ-পর্যটনে গমন করে তিনি অন্তরে প্রভূত আনন্দ ও শান্তি লাভ করতেন।
গুরুর আরাধনা করার জন্য তিনি পদ্মাতীরের একটা নিমগাছতলায় সুন্দর মন্দির নির্মাণ করে গুরুদেবের একখানি পূর্ণাবয়ব বৃহদায়তন প্রতিকৃতি স্থাপন করেছিলেন।
গুরুদেবকে নিয়ে অনেক বন্দনা-গীতিও তিনি রচনা করেছিলেন। তার একটি উদ্ধৃত করছি।
দয়া কর গুরুদেব আঁধার অবনী’পরে
বিতরি করুণা-কণা জাগাও নিদ্রিত নরে ।
করিবে দয়া যখনি
জাগিবে সকল প্রাণী
পালাবে সংশয় যত
তব আগমন হেরে ।৷
তুমি হে পরমপিতা
তুমি সর্বসুখদাতা
তব প্রেমে কত মধু
বুঝাও যতন করে ৷।
পাইলে তব আস্বাদ
ঘুচবে সব অবসাদ
দূরে যাবে সব পরমাদ
নাচিবে আনন্দ ভরে।।”
(ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ১ম খণ্ড, পৃঃ ৪২-৪৩)


শ্রীশ্রীঠাকুরের আবির্ভাব ও দীক্ষা।
মাতা মনোমোহিনী দেবী আঠারো বছর বয়সে প্রথম অন্তঃসত্ত্বা হন। একদিন দুপুরে একজন সন্ন্যাসী মনোমোহিনী দেবীর কাছে সেবা নিতে চাইলে তিনি ভক্তিভরে অতিথিকে সেবা করেন। সন্ন্যাসী বাড়ী ছেড়ে যাবার সময় বলেন, এই বাড়ির একমাত্র পুত্রের মৃত্যু হবে। এবং এই বাড়িতে একজন মহাপুরুষ জন্মাবেন, যিনি বহুলোকের অধীশ্বর হবেন এবং জগতের প্রভুত কল্যাণ সাধন করবেন।
তার কিছুদিন পরেই মনোমোহিনী দেবীর ভাই যোগেন্দ্রনারায়ণ, (ডাকনাম ছিল লোহা) অসুস্থ হয়ে পড়েন, রোগভোগে দেহত্যাগ করেন। ওদিকে মনোমোহিনী দেবীর গর্ভে ১১টি সৌরমাস অতিক্রম করে, গর্ভবাসের লীলা সেরে, মাটির পৃথিবীতে ভূমিষ্ট হয়েছিলেন মনোমোহিনী দেবীর ১ম সন্তান। শাস্ত্র-নির্দিষ্ট সব লক্ষণ নিয়েই মানবদেহে সীমায়িত হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন পিতার-পিতা পরমপিতা। বারেন্দ্র শ্রেণীর ব্রাহ্মণ পিতা শিবচন্দ্র চক্রবর্তী এবং মাতা মনোমোহিনীর সন্তানরূপে। অবিভক্ত বাংলার পাবনা জেলার হিমাইতপুর গ্রামে। বাংলা ১২৯৫ সনের ৩০শে ভাদ্র, সংক্রান্তির শুভ সকালে, চার দণ্ড বিশ পল্-এ।
‘‘অকূলে পড়িলে দীন হীন জনে
নুয়াইও শির, কহিও কথা।
কূল দিতে তারে সেধো প্রাণপণে
লক্ষ্য করি তার নাশিও ব্যথা।’’
—উপরোক্ত চার পংক্তির আশীর্বাণীর আদ্যাক্ষর মিলিয়ে অ-নু-কূ-ল নামকরণ করেছিলেন বিশ্বজননী মাতা মনোমোহিনী দেবী। অন্নপ্রাশন সংস্কারের শুভলগ্নে।
ছোটবেলা থেকেই পুত্র অনুকূলের বিবিধ আধিদৈবিক কার্যকলাপ, অত্যাশ্চর্য্য ব্যাপার-স্যাপার প্রত্যক্ষ করে মাতা মনোমোহিনী দেবী বিশেষ চিন্তিত ছিলেন। কলকাতার বৌ-বাজারে ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুলে অ্যালোপ্যাথী মতে ডাক্তারি পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরে আসার পরও তার ব্যতিক্রম ছিল না। হিতৈষীদের পরামর্শ মেনে অনেক কিছু করেও নিজের ছেলেকে নিজের মনের মত, অন্যান্য দশজন জীবকোটির ছেলের মত আচার-আচরণে স্বাভাবিক করতে পারলেন না। অবশেষে হুজুর মহারাজ পরবর্তী তৎকালিন আগ্রা সৎসঙ্গের সদগুরু বাবু কামতাপ্রসাদ ওরফে সরকার সাহেবের কাছে সকল বৃত্তান্ত জানিয়ে চিঠি লেখেন, গাজিপুরে। সরকার সাহেব তখন অন্তিম শয্যায়। চিঠি পেয়ে খুব আনন্দিত হন। চিঠির উত্তরে তিনি লিখেছিলেন, ‘মেরা কাম হো গয়া, তুমি ছেলেকে দীক্ষা দিয়ে দাও।’ ওই পত্র মারফৎ অনুমতিই ছিল মাতা মনোমোহিনী দেবীর পাঞ্জা। পুরুষোত্তমরূপী সদগুরু অবতীর্ণ হয়েছেন বুঝতে পেরে সাধ্যায়ী গুরু তাঁর দায়িত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন। সরকার সাহেব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গাজীপুরে। তারপর থেকেই মাতা মনোমোহিনী দেবী সন্তমতের সৎনামে দীক্ষা দিতে শুরু করেছিলেন।
যাইহোক, সরকার সাহেবের অনুমতি ক্রমে মাতা মনোমোহিনী দেবী অনুকূলচন্দ্রকে সত্‍মন্ত্র প্রদান করার পর ঠাকুর বলেছিলেনঃ এ তুই কি দিলি ? এ নাম তো আমি তোর পেটে থাকতেই করি। অর্থাৎ উনি যে ওই সৎ নামের নামী-পুরুষ সেই তত্ত্বই তিনি ব্যক্ত করলেন তাঁর মায়ের কাছে।
অধ্যাত্মশাস্ত্রবিদূষী সাধিকা মনোমোহিনী দেবী, পুত্র অনুকূলচন্দ্রের নামধ্যান সংক্রান্ত সমস্ত অনুভূতির বর্ণনা শুনে বিস্মিত ও আনন্দিত হয়ে পুত্র অনুকূলচন্দ্রকে বলেছিলেন, ‘‘এই নামই তো আদি সৎ-নাম। তুই এই নাম করতে থাক।’’

  • * *
    সৎসঙ্গ আন্দোলনে মাতা মনোমোহিনী দেবীর ভূমিকা

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সৎসঙ্গ আন্দোলনের সূচনা করেন কীর্তন প্রচারের মাধ্যমে। কীর্তন করতে করতে তিনি অচৈতন্য হয়ে পড়ে যেতেন, কাৎলা মাছের মত লাফাতেন, থর্ থর্ করে কাঁপতো তাঁর পায়ের বুড়ো আঙুল ! দেহ থেকে শ্বেতবর্ণের স্বেদ নির্গত হতো! রোমকূপ দিয়ে রক্ত ঝরতো পিচকিরি দিয়ে!
যোগশাস্ত্রের পুঁথিতে যে-সমস্ত আসনের কথা উল্লেখ নেই অক্লেশে নতুন নতুন আয়াসসাধ্য সব আসন করতেন! আসন করতে করতে উঠে পড়তেন ৫-৬ হাত উপরে, শূন্যে! আবার নিথর-নিষ্পন্দ হয়ে ভূমিতে শুয়ে পড়তেন। তাঁর শ্রীমুখ থেকে নির্গত হতো মানব জীবনের জটিল সব সমস্যার সহজ সমাধানী বাণী। নানা ভাষায়। উপস্থিত কোন মানুষের মনের কথার, প্রাণের ব্যথার উত্তর দিতেন।
এমন সব সাধারণের বুদ্ধির গণ্ডীর বাইরের সব ঘটনা প্রত্যক্ষ করে নানা মানুষ নানা মত প্রকাশ করেছেন। কেউ বলছেন মৃগী রোগ, কেউ বলছেন নির্ঘাৎ কোন দানোতে ধরেছে। কেউ আবার পরীক্ষা করার জন্য জ্বলন্ত অঙ্গার চেপে ধরতেন। পরীক্ষা করার জন্য সূঁচালো শলাকা ঢুকিয়ে দিতেন শরীরে! মানুষ কত বীভৎস হলে এসব কাজ করতে পারে!— ব্যথা ভারাক্রান্ত মনে অনুকূলচন্দ্রের অন্তরঙ্গ কীর্তন পার্ষদ কিশোরীমোহন, অনন্তনাথ রায় ও মুকুন্দচন্দ্র ঘোষ প্রমুখগণ পাবনা জেলা-কোর্টের লব্ধপ্রতিষ্ঠ উকিল পরম-বৈষ্ণব বৃন্দাবনচন্দ্র অধিকারীর কাছে সব নিবেদন করেন। সব শুনে, তিনি পরম কৌতূহলী হয়ে পর পর কয়েকদিন কীর্তনে যোগদান করেন। প্রত্যক্ষ করেন অপূর্ব কীর্তনের দৈবীলীলা। তাঁর শ্রীমুখ নিঃসৃত বাণীসমূহের ভাব-গাম্ভীর্য ও সার্বজনীনতা উপলব্ধি করে একান্ত বিস্মিত হন। ঠাকুরের অন্তরঙ্গ সঙ্গীদের ডেকে বলেন, শাস্ত্রাদিতে যে সমস্ত সমাধির কথা জানা যায় সেসবের তুলনায় অনেক উচ্চস্তরের নির্বিকল্প সমাধি। “এ সকল শ্রীমন্মহাপ্রভুর ভাব—বিশ্বহিতের জন্য পরমাত্মার মহাবাণী—মানব জাতির পরম সম্পদ। বহু-যুগ অন্তে পরমপিতার বিশেষ ইচ্ছায় কদাচিৎ এরূপ ঘটিয়া থাকে। সুতরাং আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ, তোমরা এখন হইতে ঠাকুরের শ্রীকণ্ঠোচ্চারিত এই সকল মহাবাণীর একটি অক্ষরও বাদ না দিয়া সমুদয়ই যথাশক্তি নিঃশেষে লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিবার ব্যবস্থা করিবে। আমি আশা করি, তোমরা ইহা অবশ্যকরণীয় পরম-পবিত্র কর্তব্য বলিয়া মনে করিবে।”
বৃন্দাবনবাবুর ওই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের অন্তরঙ্গ ভক্তেরা। হিমাইতপুর, প্রতাপপুর, কাশীপুর, কুষ্টিয়া, বাড়াদি, খলিলপুর, বরইচারা, ধুশণ্ডু (নদীয়া), কণ্ঠ গজরা (নদীয়া), ধলহরাচন্দ্র (যশোহর), খোকসাজানিপুর (নদীয়া), রাতুলপাড়া (নদীয়া), কমলাপুর (নদীয়া), মদাপুর (নদীয়া) হরিণাকুণ্ডু (নদীয়া) চক্রতীর্থ (২৪ পরগণা) প্রভৃতি স্থানে, যেখানেই ঠাকুর কীর্তনদলের সাথে যেতেন, সাথে লিপিকারেরাও যেতেন। প্রস্তুত থাকতেন শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাববাণীসমূহ লিখে রাখার জন্য। তাঁরা সাংসারিক সব কাজকর্ম ফেলে সযত্নে সেগুলো ধরে রেখেছিলেন বলেই ওই দৈবী-লীলার সাথে পরিচিত হতে পেরেছে জগৎবাসী। ওই অবদানের জন্য জগদ্বাসী চিরঋণী হয়ে থাকবে পরমবৈষ্ণব বৃন্দাবনচন্দ্র অধিকারী, ভক্তবীর কিশোরীমোহন, মহারাজ অনন্তনাথ রায়, আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী প্রমুখ পুরুষোত্তম-পার্ষদ ঋদ্ধি-সেনানীদের কাছে।

কুষ্টিয়া অনুষ্ঠিত বিশ্বগুরু উৎসবের পর থেকেই ঠাকুর দর্শনে হিমাইতপুরে নানা স্থানের ভক্ত-সমাগম হতে থাকে। ঠাকুরের কথা জানতে পেরে কলকাতার ব্যারিষ্টার চন্দ্রশেখর সেন হিমাইতপুর আসেন ঠাকুর দর্শনে। ঠাকুরের সাথে আলাপচারিতায় মুগ্ধ হয়ে দীক্ষা গ্রহণ করেন। ঠাকুরের মহান আদর্শ কলকাতার সম্ভ্রান্ত মহলে প্রচারিত হওয়ার ফলে বিদগ্ধ মহলে সাড়া পড়ে যায়। তাঁর যাজনে অনুপ্রাণিত হয়ে সম্ভ্রান্ত মানুষেরা শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ গ্রহণ করেন।
সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ মহামহোপাধ্যায় পন্ডিত কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন মহোদয়ের দ্বিতীয় পুত্র বিজ্ঞান গবেষক কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য ১৩৩০ বঙ্গাব্দের প্রথমদিকে স্থায়ীভাবে হিমাইতপুর চলে আসেন। ১৩৩০ সালের অগ্রহায়ণ মাসে স্থায়ীভাবে চলে আসেন বঙ্কিমচন্দ্র রায়। ১৩৩০ সালের ২৪শে অগ্রহায়ণ শ্রীশ্রীঠাকুরের পিতৃবিয়োগ হয়। একই সময়ে বিজ্ঞান গবেষক কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য মহোদয়েরও পিতৃবিয়োগ হয়। তথাপি তিনি ঠাকুরকে ছেড়ে বাড়ী না গিয়ে আশ্রমেই পিতৃদেবের শ্রাদ্ধাদি ক্রিয়া করেছিলেন। ১৩৩০ সালের ফাল্গুন মাসে ময়মনসিংহের উকিল শ্রীব্রজগোপাল দত্তরায় সপরিবারে আশ্রমে চলে আসেন এবং তপোবন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। আশ্রম সংগঠনকে গড়ে তুলতে প্রকাশচন্দ্র বসু, প্রবোধচন্দ্র বাগচী, চারুচন্দ্র সরকার, অনুকূল ব্রহ্মচারী, তারাপদ বাগচী, অধ্যাপক পঞ্চানন সরকার, ডাঃ গোকুলচন্দ্র মন্ডল প্রমুখ ভক্তবৃন্দসহ অনেকেই ঠাকুরের নিরবচ্ছিন্ন সান্নিধ্য লাভের আশায় স্থায়ীভাবে চলে আসেন হিমাইতপুরে। শ্রীযুক্ত সুশীলচন্দ্র বসু, তাঁর পত্নী রাণীমা, নফরচন্দ্র ঘোষ, যতীন্দ্রনাথ সরকার, হরিদাস ভদ্র প্রমুখ ভক্তগন তখন ঠাকুর বাড়ীতেই থাকতেন। ক্রমশঃ স্থায়ী বাসিন্দা বৃদ্ধি পেতে থাকলে কতগুলো খড়ের ও টিনের ঘর তৈরি করা হয়। পদ্মার ধারে বাঁশঝাড়ের মধ্যে কয়েকটা খাটা পায়খানা তৈরি হয়। এইভাবে প্রয়োজন অনুপাতে কুটিরের পর কুটির নির্মিত হতে থাকে। ক্রমে ক্রমে গড়ে ওঠে আশ্রম। প্রথম পত্তনকালীন তখনকার লোকেরা হিমাইতপুরের আশ্রমকে বলতো অনুকূল ঠাকুরের আশ্রম। পরে শ্রীশ্রীঠাকুরের মা আগ্রা সৎসঙ্গের অনুকরণে ‘সৎসঙ্গ আশ্রম’ এবং দীক্ষিতদের ‘সৎসঙ্গী’ নামে অভিহিত করেছিলেন। মূর্খ-পণ্ডিত-ধনী-নির্ধন-জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষ একে একে সমবেত হতে শুরু করলো হিমাইতপুরে। শুরু হলো লোকসংগ্রহ পর্ব। শুরু হলো কর্মযজ্ঞ।

এক এক করে গড়ে ওঠে আনন্দবাজার, কেমিক্যাল ওয়ার্কস, তপোবন বিদ্যালয়, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র, প্রেস, পাব্লিশিং হাউস, কলাকেন্দ্র, কুটীর শিল্পাগার প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান। সব কর্মকাণ্ডের সাথে মায়ের অগ্রণীর ভূমিকা ছিল। তাঁর চরিত্র ছিল, কুসুমের ন্যায় কোমল, পাথরের ন্যায় কঠিন। আধ্যাত্ম জগতের সাথে সাথে জাগতিক জগতেও তিনি ছিলেন সকলের অভিভাবক স্বরূপা। নিজের, নিজের পরিবারের সব বিপদ-আপদকে তুচ্ছ করে অন্যকে রক্ষা করতেন জগজ্জননী-স্বরূপিণী হয়ে। হিমাইতপুর সৎসঙ্গ আশ্রমের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী। আশ্রমিকদের খাওয়া-দাওয়া, শিক্ষা, স্বাস্থ্য রক্ষা, প্রতিরক্ষা ইত্যাদি সব বিষয়ে তিনি সজাগ থাকতেন। দুর্বৃত্তদের অত্যাচার থেকে আশ্রমিকদের রক্ষা করতে লাঠি হাতে সারারাত জেগে পাহারা দিতেন। তাঁর ভয়ে আশ্রমে কেহ অন্যায় কাজ করতে সাহস পেত না।

মহাত্মাগান্ধী হিমাইতপুর আশ্রম পরিদর্শন করে আশ্রমের ভুয়সী প্রশংসা করার পর বলেছিলেন, “I have never seen a masterly woman of such wonderful personality in my life.”

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৃষ্ট সৎসঙ্গ আন্দোলন বিশ্ব পরিবার সংগঠনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রূপে একসময় প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল হিমাইতপুরে। সুদূর আমেরিকার খ্রিস্টান সম্প্রদায়ভুক্ত শ্রদ্ধাভাজন স্পেনসারদা, হাউজারম্যানদা, ইসলাম সম্প্রদায়ের খলিলুর রহমান, ব্রাহ্মণ পরিবারের বিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য মহোদয়ের ন্যায় পণ্ডিত ব্যক্তি প্রমুখদের পাশাপাশি খুব সাধারণ মাপের, অভাবে পরিশ্রান্ত মানুষদের পরিবার নিয়ে গড়ে তোলা পরিবারের নাম ছিল বৃহত্তর সৎসঙ্গীদের একটা পরিবার। দিনান্তে একবার আনন্দবাজারে আশ্রমমাতা জননী মনোমোহিনী দেবীর মাখা “দলা” প্রসাদ খেয়ে পরমানন্দে আশ্রম সংগঠনের ইষ্টের ঈপ্সিত কর্মে মত্ত থাকতেন—বিনা ওজরে, বিনা আপত্তিতে। ওই একবেলা খেয়েই নামধ্যান, কীর্তন, পঠন-পাঠন, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, সংস্কৃতি, বিজ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন থাকতেন। সকল পরিবার ছিল একে অপরের পরিপূরক পরিবার। সে এক স্বর্ণালি যুগ ছিল সৎসঙ্গের। প্রতিটি পরিবারের অভিভাবক ছিলেন মাতা মনোমোহিনী দেবী। সেই সৎসঙ্গ পরিবারের সদস্য আমরা। ব্যক্তি, দম্পতি, গৃহ, সমাজ, রাষ্ট্র জীবনকে অখণ্ড রেখে, প্রাচ্য-প্রতীচ্যকে বর্ণাশ্রমানুশাসনে নিয়ন্ত্রণ করে পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন আমাদের জীবন দেবতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। আমরা যদি ঠাকুরের আদর্শের পরিপালনে, পরিবার থেকে, সমাজ থেকে ডিভোর্সকে, বৃদ্ধাশ্রমকে বিদায় জানিয়ে, পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি মিলেমিশে এক ছাদের নীচে জীবন যাপন করে এক-একটা আদর্শ পরিবারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি—সার্থক হবে শ্রীশ্রীঠাকুরের সৎসঙ্গ আন্দোলন।


মাতা মনোমোহিনী দেবী তাঁর গুরুদেব সাধক পুরুষ হুজুর মহারাজের কাছ থেকে যে বিনতী করতে শিখেছিলেন, সেই শিক্ষার ধারাটাকে প্রাধান্য দিয়ে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন পাবনার সৎসঙ্গ আন্দোলন। যে ধারায় বীজমন্ত্রের উচ্চারণ স্বীকৃত, বীজমন্ত্রের মাধ্যমেই পারস্পরিক সম্ভাষণ প্রচলিত। আর্য্যকৃষ্টির দশবিধ সংস্কার অবহেলিত—যা শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শের পরিপন্থী! যার ফলে, আজও বিনতীর মাধ্যমে বীজমন্ত্র উচ্চারিত হয়ে চলেছে। নিত্য সাধ্যায়ের জন্য আবশ্যিক, শ্রীশ্রীঠাকুর রচিত ‘জাগরণী’ সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দীক্ষিতরা যতটা না জানেন, তার চেয়ে বেশি মানেন মাতা মনোমোহিনী দেবী রচিত তাঁর গুরুদেবের প্রশস্তির প্রভাতী গীতি ‘প্রভাত যামিনী উদিত দিনমনি’-কে।
শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শের অনুগামীদের ঊষা-নিশায় মন্ত্রসাধন করা এক আবশ্যিক সাধনা। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সেকথা তিনি বার-বার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এ বিষয়ে একটা উদ্ধৃতি তুলে ধরছি।
শ্রীশ্রীঠাকুর কয়েকজনকে লক্ষ্য ক’রে বললেন—খুব সকালে উঠে ভোর চারটের মধ্যে প্রাতঃকৃত্যাদি ও নামধ্যান সেরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাগরণী গান গেয়ে সবাইকে জাগিয়ে দিতে হয়। তাড়াতাড়ি যাতে নামধ্যানে বসে তা’ করতে হয়। ওতে লোকে আনন্দ পায়, স্ফূর্তি পায়, তাদের শরীরও ভাল থাকে। আগে যতদিন ভোরে সবাইকে জাগিয়ে দিয়ে নামধ্যান করিয়েছি, ততদিন মানুষ অকালে মরেনি। তাই প্রত্যেককে এটা করানো লাগে। (আ. প্র. ১৬/ ১৫. ৪. ১৯৪৯)

তপো-বিধায়না গ্রন্থ থেকে—
“প্রার্থনা বা তপঃ-উপাসনার পক্ষে
ঊষা বা ব্রাহ্মমুহূর্ত্ত,
মধ্যাহ্ন ও সায়ংকাল—
এই তিনই শ্রেষ্ঠ,
তা’র ভিতর আবার
ব্রাহ্মমুহূর্ত্তই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ;
মানসিক জপ সর্ব্বকালেই শ্রেয়;
আবার, প্রসন্ন, নির্দ্বন্দ্ব,
হৃদ্য-প্রীতি-প্রবুদ্ধ-যাজন
যা’ চিন্তন ও কথনের ভিতর-দিয়ে
উভয়কেই উদ্যোগী-উৎফুল্ল ক’রে তোলে,—
তা’ কিন্তু সর্ব্বকালেই শ্রেষ্ঠ‌।” ৯৩।

এখনও পর্য্যন্ত তাঁর ওই নিদেশকে উপেক্ষা করে শ্রীশ্রীঠাকুরের উৎসব-অনুষ্ঠানে সূর্য ওঠার আগেই, ঊষা-কীর্তনের নামে পুরুষোত্তম-জননী মাতা মনোমোহিনী দেবী রচিত—তাঁর গুরুদেবের প্রশ্বস্তি-গীতি—
“প্রভাত যামিনী উদিত দিনমনি
ঊষারাণী হাসিমুখে চায় রে—
জাগি বিহগ সব তুলি নানা কলরব
রাধা রাধা রাধাস্বামী গায় রে।
নবীন বৃন্দাবনে তুলসী কাননে
ভ্রমরী রাধাস্বামী গায় রে।
সেই সে মধুর গান বাঁশিতে তুলিতে তান
আপনি যে রাধাস্বামী গায় রে।।
যে নামে নন্দের কানু সেধেছিল মোহন বেণু
সেই রাধা রাধা নাম গাও রে।।
আজি মধু জাগরণ শুনে সবে নরগণ
জয় জয় রাধাস্বামী গাও রে।
মথিয়া সকল তন্ত্র রাধাস্বামী মহামন্ত্র
আদিগুরু জগতে বিলায় রে।।
রাধাস্বামী গুণগানে আনন্দ বাড়িবে প্রাণে
চরমে পরম গতি হয় রে।।
রোগ-শোক ব্যাধি-জরা দূরে পালাবে তারা
আনন্দে রাধাস্বামী গাও রে।
জয় রাধাস্বামী জয় রাধাস্বামী
জয় জয় রাধাস্বামী গাও রে।।” কীর্তন করতে এবং করাতে অভ্যস্ত উৎসবের আয়োজকগণ!—-ব্রাত্য হয়ে আছে শ্রীশ্রীঠাকুর রচিত জাগরণী!


পরবর্তীকালে দৈনন্দিন জীবনচলনায় আর্য্যকৃষ্টির অনুশাসনকে প্রতিষ্ঠা করতে শ্রীশ্রীঠাকুর যে সান্ধ্য-প্রার্থনা মন্ত্র রচনা (দ্রঃ সৎসঙ্গ পাব্লিশিং-এর প্রার্থনা নামের পুস্তিকা।) করেছিলেন, মাতা মনোমোহিনী দেবী সেই প্রার্থনাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন, ‘‘সন্ধ্যা মন্ত্রটা মা মারা যাবার তিনদিন আগে লেখা হয়। মা শুনে বড় খুশি হয়েছিলেন। সেইজন্য ও জিনিসটার উপর আমার খুব প্রীতি আছে। মা শুনেছিলেন তাই ওটা আমার অর্ঘ্য হয়ে আছে।’’ (আঃ প্রঃ ২১ খণ্ড, ৭. ১১. ১৯৫২)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে কারো কাছে দীক্ষা গ্রহণ না করলেও বার বার তিনি বলেছেন, ‘আমার মা-ই যেন সরকার সাহেব, হুজুর মহারাজ ও অন্যান্য অন্যান্য মহাপুরুষদের প্রতীক—মা-ই আমার আদর্শ—মা-ই আমার জীবত্ব।’ তথাপি তিনি সরকার সাহবকে নিজের গুরু হিসেবে এবং হুজুর মহারাজকে মাতৃদেবীর গুরু হিসেবে মান্য করতেন, তাঁদের প্রতিকৃতিতে প্রণাম নিবেদন করতেন।

।। মায়ের মাধ্যমে পুরুষোত্তম রূপে আত্মপ্রকাশ ।।
শ্রীশ্রীজননী একদিন আমাকে (ডাঃ সতীশ জোয়ারদার) বলিলেন—“হ্যাঁ রে, তোরা অ……র মূর্ত্তি ধ্যান করিস কেন?” আমি বলিলাম—“শ্রীকৃষ্ণ-মূর্ত্তি বা অন্য সদ্গুরুমূর্ত্তি ধ্যান করতে আপনার ছেলের মূর্তি যে এসে উপস্থিত হন তা আমরা কি করব।” তিনি বলিলেন—“তা যদি সত্যি হয় তবে কর।” কথাটা যেন অনিচ্ছার সহিত বলিলেন। মধ্যাহ্নে শ্রীশ্রীজননীর পূর্ব্বদ্বারী বড় টিনের ঘরে শ্রীশ্রীঠাকুরসহ আমরা অনেকে ভোজন করিতে বসিলাম। শ্রীশ্রীঠাকুর বলিলেন—“মা, তুই আমার থালায় ব’সে নিবেদন করে দে না, তুই নিবেদন ক’রে দে আমি প্রসাদ খাই।” মা বলিলেন—“আমি এখন পারি না।” তিনি পঞ্চমবর্ষীয় বালকবৎ যেন আবদার করিয়া বলিলেন—“না মা, তুই নিবেদন ক’রে দে, তুই নিবেদন করে না দিলে আমার ভাল লাগবে না। তুই বেশ ক’রে ভাত মাখিয়ে দে, নিবেদন ক’রে দে, আর একটু খেয়ে প্রসাদ ক’রে দে না মা।” তখন শ্রীশ্রীজননী তাঁহার আবদার রক্ষা না করিয়া পারিলেন না। তিনি ভোজ্যসমীপে শ্রীশ্রীঠাকুরের নিকট বসিয়া তাঁহার ইষ্টমূৰ্ত্তিকে সেই ভোজ্যসামগ্রী নিবেদন করিতে লাগিলেন, ধ্যানে বসিলেন। ধ্যান করিতে করিতে দেখিলেন, তাঁহারই পুত্র আজ তাঁহার ইষ্টস্থলে অধিষ্ঠিত হইয়া ভোজ্য ভোজন করিলেন। তখন শ্রীশ্রীজননী (পূর্ব্বেও কিছু জানিতেন বোধহয়) বলিলেন—“এখন কি তোর এঁটো আমার খেতে হবে নাকি?”
শ্রীশ্রীঠাকুর বলিলেন—“ওমা, সেকি কথা!” শ্রীশ্রীজননী বলিলেন— “নিবেদন করলাম, দেখলাম তুই-ই তো খেয়ে গেলি।” শ্রীশ্রীঠাকুর বলিলেন— “ওমা, সেকি কথা!” তখন সকলেই নীরব হইলেন! ব্যাপার বুঝিতে কাহারও আর বাকী থাকিল না। শ্রীশ্রীজননী তদবধি তাঁহার পুত্রকে সদ্গুরুরূপে ধ্যান করিতে আমাদিগকে আর নিষেধ করেন নাই। (সূত্র : ডাঃ সতীশচন্দ্র জোয়ারদার রচিত গ্রন্থ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকচলচন্দ্র, পৃঃ ২৩৬-২৩৭)

কেন জানি, প্রথম জীবনে মাতা মনোমোহিনী দেবী পুত্র অনুকূলকে সব গুরুদের গুরু পরমগুরু রূপে মেনে নিতে পারেন নি। এমনকি ভাবসমাধি যাতে না হয় সেজন্য নফর আর রাধিকাকে দিয়ে কীর্তনের আঙিনায় জল ঢেলে কীর্তন বন্ধ করিয়েছিলেন! (দ্রঃ ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীর জীবনী গ্রন্থের ১ম খণ্ড, দ্বাদশ অধ্যায়।) উপরোক্ত ঘটনা উপলব্ধি করার পর থেকেই হয়তো পুত্রের ভগবৎ সত্তা সম্বন্ধে নিজে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
মাতা মনোমোহিনী দেবী একবার কলকাতায় ১/১ সি হরিতকী বাগান লেনের বাড়িতে তাঁর পুত্র অনুকূলচন্দ্র, প্রভাসচন্দ্র, কুমুদচন্দ্র ও গুরুপ্রসাদীকে নিয়ে সপরিবারে ছিলেন। ঐ বাড়িতে থাকাকালীন গুরুপ্রসাদী দেবী বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল। গুরুপ্রসাদী দেবীর জীবনের আশা রইল না। মনোমোহিনী দেবী পুরুষোত্তমরূপী সন্তান অনুকূলের শরণাপন্ন হলে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন, — ‘ভয় নেই মা তোর গুরুপ্রসাদী সেরে উঠবে।’ পরদিন সকালে দেখা গেল শ্রীশ্রীঠাকুরের শরীরটা গুটি বসন্তে ভরে গেছে। এদিকে গুরুপ্রসাদী দেবী ধীরে ধীরে আরোগ্য লাভ করলেন। শ্রীশ্রীঠাকুর বেশ কয়েকদিন রোগ ভোগ করে সুস্থ হয়ে উঠলেন। এই বাড়িতেই শ্রীশ্রীঠাকুরে মেজ ভাই প্রভাসচন্দ্র কঠিন টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হন। রোগ উপশম হওয়া দূরে কথা ক্রমশঃ ব্যাধির প্রকোপ বেড়েই চলল। চিকিৎসকের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে রোগীর দেহ ঠাণ্ডা হতে লাগলো। জননী মনোমোহিনী তখন প্রথম পুত্র অনুকূলচন্দ্রের হাত দুটি ধরে আর্তকণ্ঠে বললেন — “অনুকূল, তুমি আমার ছেলেই হও আর যাই হও, তুমি সাক্ষাৎ ভগবান। আমার খ্যাপাকে (প্রভাসচন্দ্র) ফিরিয়ে দাও বাবা।” শ্রীশ্রীঠাকুর কিছুক্ষণ মৌন থেকে বললেন— ‘আচ্ছা যাও’। প্রভাসচন্দ্র ধীরে ধীরে আরোগ্যলাভ করলেন। একই ঘটনা ঘটেছিল বিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যের জীবনে। তিনি একবার গুরুতর রোগে আক্রান্ত হলেন। রোগের কোন উপশম হল না। চিকিৎসকের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল। তখন কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যের বয়স মাত্র উনত্রিশ বছর। কোষ্ঠিতে এই সময় তাঁর মৃত্যুযোগ নির্ধারিত ছিল। মাতা মনোমোহিনী দেবী কৃষ্ণপ্রসন্নের শিয়রে শুশ্রূষায় ব্যস্ত ছিলেন। রোগীর অন্তিম দশা দেখে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে তিনি ঠাকুরকে বলেন, – ‘অনুকূল রে, কেষ্ট বুঝি আমাদের ছেড়ে চলে গেল। কেষ্টকে বাবা তুই এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দে নইলে আমি মারা যাব।’ শ্রীশ্রীঠাকুর মায়ের এই আর্জি মঞ্জুর করেছিলেন। কৃষ্ণপ্রসন্নের দেহে প্রাণ ফিরে এসেছিল। তিনি নিরাময় হয়ে উঠলেন।
প্রত্যেকের ব্যথার ব্যথী ছিলেন মাতা মনোমোহিনী দেবী। হিমাইতপুর আশ্রমটা ছিল তাঁর কাছে একটা পরিবার স্বরূপ। আশ্রম ছাড়াও আশেপাশের গ্রামের মানুষের অসুখ-বিসুখ, অভাব-অভিযোগ, বিপদ-আপদ সবকিছুতেই তিনি ছিলেন সকলের ত্রাতা, অসৎ নিরোধে তৎপর। তাঁর ছিল দুর্জয় সাহস ও অসামান্য ব্যক্তিত্ব! নিজের জীবনের মায়া তুচ্ছ করে সব্বাইকে আগলে রাখতেন। না, বেশিদিন আর আগলে রাখতে পারলেন না।


লোক-সংগ্রহের প্রয়োজনে শ্রীশ্রীঠাকুরকে মাঝে-মাঝেই কলকাতায় যেতে হতো। প্রায়শই মা সাথে যেতেন। বাংলা ১৩৪৪ সালের মাঝামাঝি। লিভারের পীড়ায় পীড়িত জননীদেবীকে আশ্রমে থাকতে বলে শ্রীশ্রীঠাকুর কলকাতা চলে যান। ঠাকুর যাবার পর ঠাকুরের নিষেধ অমান্য করে মা কলকাতা চলে এলে ঠাকুর ব্যথিত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তার ব্যাধি বৃদ্ধি পেতে থাকে। কলকাতার ডাক্তারদের চিকিৎসাতে কোন উপশম হচ্ছিল না দেখে ঠাকুর মা-কে নিয়ে হিমাইতপুর ফিরে আসেন।
অসুস্থতার অন্তিম অবস্থায় ডাঃ কেদারনাথ ভট্টাচার্য্যকে উদ্দেশ্য করে জননীদেবী বলেছিলেন—‘দ্যাখ্ কেদার, তোরা আর আমার কি করবি? আমার এই কষ্টভোগ আমারই সৃষ্টি। অনুকূলকে আমি ছেলের বেশি ভাবতে পারিনি—তাই আমার ব্যারাম। সে যা বলে তাই সত্য হয়। ভূত ভবিষ্যত সবই ও জানে। ওর কথা না শুনে আজ আমার এই দুর্ভোগ। অনুকূল আমাকে বারবারই এখানে (কলকাতায়) আসতে নিষেধ করেছিল, আমি তা শুনিনি। যেখানে বাৎসল্য সেখানেই তাচ্ছিল্য, পদে পদে ভুল হয়ে যায়। কর্মফল আর এড়াতে পারলাম না।’
১৩৪৪ বঙ্গাব্দের ৬ই চৈত্রর দিনটিতে বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে সর্বগুণের গুণান্বিতা মাতৃমূর্তি স্বরূপিণী বিশ্বজননী মাতা মনোমোহিনী দেবী সকলকে শোকসাগরে নিক্ষিপ্ত করে ইহলীলা সম্বরণ করেন।
মায়ের নিথর দেহকে আগলে ঠাকুর ‘নিরাশ্রয়, নিরাশ্রয়’ ….. ‘কোথায় আমার মা, কোথায় আমার মা’ বলে কপালে করাঘাত করতে থাকেন। পদ্মার তীরে সৎকার করা হয়। সৎকার করার পরেও ঠাকুর উন্মত্তের ন্যায় কখনো মায়ের ঘরে, কখনো চিতাভূমিতে, কখনো শ্মশানের দিকে তাকিয়ে,—“মা তুই এলিনা—ওমা, মা গো তোর অনুকূলের কি দশা হয়েছে একবার দেখে যা!” …. বলে আকূল আর্তনাদ করতে থাকেন। যথাবিধি শ্রাদ্ধক্রিয়া সমাপন করে কুল পুরোহিতের নির্দেশে একটি বছর ধরে জামা, জুতো, ছাতা ব্যবহার না করে কালাশৌচ পালন করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর।
মায়ের অসুস্থতার সময়ে মাকে সবদিক থেকে স্বস্তিতে রাখার জন্য মায়ের বসবাসের জন্য একটা ঘর তৈরি করিয়েছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। ঘরটিকে খাট, ইজিচেয়ার, টেবিল, আলনা, আয়না, বৈদ্যুতিক আলো, পাখা প্রভৃতি নিত্য ব্যবহার্য্য সরঞ্জামে সাজিয়েছিলেন। স্যানিটারী পায়খানার ব্যবস্থা করেছিলেন, মায়ের যাতে কোন অসুবিধা না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে। পরিতাপের বিষয়, জীবদ্দশায় মায়ের আর ওই ঘরে বাস করা হয়ে ওঠে নি।
মায়ের তিরোভাবের পর সেই গৃহটিকে ‘মাতৃমন্দির’ নামে সংরক্ষিত করে যে স্মৃতিফলক স্থাপন করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর, তাঁর প্রতিলিপি সংযোজিত করলাম।

মা!
বড় আকুল আগ্রহ উদ্‌গ্ৰীৰ উৎকণ্ঠা নিয়েই এই ঘর আর তার আসবাব যা কিছুর কাজ সমাধা ক’চ্ছিলাম—আশা ছিল তুমি থাকবে—ব্যবহার করবে— ধন্য হ’ব আমি—তা হল না— তুমি চ’লে গেলে—পার্থির শরীরের পতন হ’ল—আমার হতভাগ্য অদৃষ্ট কালের নিষ্ঠুর শ্লেষমলিন ধিক্কারে—মৃত্যুর মত জীয়ন্ত হ’য়ে রইল।
মনীষীরা ব’লে থাকেন, মানুষ পার্থিব শরীর ছেড়ে গেলেও আবার যেমন ছিল সূক্ষ্ম শরীরে তেমনই প্রাণ নিয়েই বেঁচে থাকে, আবার জাতিস্মর হ’য়েও নাকি সেই মানুষই জন্মাতে পারে—
মা!
মা আমার !
দয়াল যদি তাই করেন—তুমি যদি কখনও জাতিস্মর হ’য়ে এ দুনিয়ায় আবার ফিরে এস—তোমার অনুকূলকে মনে পড়ে—নিরাশ্রয় ব’লে যদি বেদনা অনুকম্পাজড়িত হৃদয় তোমার আমাকে খোঁজই করে—তুমি এসো— এসে এখানেই থেকো— এসবই ব্যবহার কো’রো—
তোমারই
হতভাগ্য
দীন সন্তান,
অনুকূল
——————————————————————————————– তথ্যঋণ :
১. ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ১ম খণ্ড।
২. শ্রীসচ্চিদানন্দ গোস্বামী প্রণীত, ‘আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী ও সৎসঙ্গ আন্দোলন’।

৩. প্রিয়পরমের পরশে, ১ম খণ্ড।

৪. সতীশচন্দ্র জোয়ারদার প্রণীত জীবনীগ্রন্থ।

tapanspr@gmail.com

প্রসঙ্গ : কল্কি অবতার

।। প্রসঙ্গ : কল্কি অবতার ।।
বৈদিক সাহিত্যে কল্কির কোন উল্লেখ নেই।  বৈদিক সাহিত্যে, রুদ্রের জন্য “কলমলকিনাম” উপাধি পাওয়া যায় (শিবের নামে), যার অর্থ “অন্ধকারের উজ্জ্বল অপসারণকারী”; যাকে “কল্কির অগ্রদূত” হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
কল্কি প্রথমবারের মতো মহাযুদ্ধের মহাকাব্য মহাভারতে আবির্ভূত হয়।  মহা-পুরাণ, যেমন বিষ্ণু পুরাণ,  মৎস্য পুরাণ, ও ভাগবত পুরাণে  কল্কি অবতারের উল্লেখ পাওয়া যায়। যাইহোক, কল্কির পৌরাণিক কাহিনী সম্পর্কিত বিবরণ মহাকাব্য ও পুরাণগুলির পাশাপাশি পুরাণগুলির মধ্যেও ভিন্ন।
পুরাণে কল্কিকে অবতার হিসেবে উল্লেখ করার পাশাপাশি তার সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁর সম্পর্কে বিষদ বর্ণনা পাওয়া যায় কল্কিপুরাণে। তিনি অন্ধকার ও ধ্বংসাত্মক সময়ের অবসান ঘটিয়ে সত্যকে পুনরুজ্জীবিত করবেন, অধর্ম দূর করবেন ও সত্যযুগের সূচনা করবেন, এবং তিনি সাদা ঘোড়ার পিঠে খোলা তরবারী হাতে অবতরণ করবেন।
শ্রী কল্কি পুরাণ  সংস্কৃত ভাষায় রচিত একটি ভবিষ্যতবাণী ভিত্তিক ধর্মগ্রন্থ যেখানে বিষ্ণুর দশম ও শেষ অবতার কল্কির জীবনের বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। সৌটি দ্বারা উন্মোচিত এই কাহিনী কলি যুগ এর শেষের দিকে ভিত্তি করে উপস্থাপিত হয়েছে।
বিদ্যমান ধর্মগ্রন্থটি তিনটি অংশে বিভক্ত যেগুলো যথাক্রমে ৭, ৭ ও ২১টি অধ্যায় নিয়ে গঠিত। এটিকে উপপুরাণ বা ‘গৌণ পুরাণ’ হিসেবে ধরা হলেও এর অনুচ্ছেদগুলো ১৮টি মূখ্য পুরাণ থেকে সংগৃহীত হয়েছে, যেমন বেদব্যাস কর্তৃক বর্ণিত বিষ্ণু পুরাণ ও ভাগবত পুরাণ। কল্কি পুরাণের তারিখ নবম শতাব্দী বা এর পরে নির্ধারিত হয়েছে।
  বৌদ্ধ গ্রন্থে কালচক্র তন্ত্রে ধার্মিক রাজাদের বলা হয় কল্কি (কালকিন, আলোচিত সর্দার), সম্ভলে বসবাসকারী। এই গ্রন্থ অনুসারে অনেক কল্কি আছে, প্রত্যেকেই বর্বরতা, নিপীড়ন ও বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে লড়াই করছে। শেষ কল্কিকে “কাকরিন” বলা হয় এবং বিশৃঙ্খলা ও অবক্ষয়ের অবসান ঘটানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়।  ডোনাল্ড লোপেজের মতে, “কল্কি নিখুঁত যুগের নতুন চক্র শুরু করার পূর্বাভাস দিয়েছেন, যেখানে “বৌদ্ধধর্ম সমৃদ্ধ হবে, মানুষ দীর্ঘজীবী হবে, সুখী জীবনযাপন করবে এবং ধার্মিকতা সর্বোচ্চ রাজত্ব করবে”। সপ্তম শতাব্দীর পরের, সম্ভবত নবম বা দশম শতাব্দীর পাঠ্যটি কাল্কি ধারণার কালানুক্রম প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ।  লোপেজ বলেছেন যে বৌদ্ধ পাঠ সম্ভবত হিন্দু পুরাণ থেকে ধার করেছে। অন্যান্য পণ্ডিত, যেমন যিজু জিন, বলেন যে পাঠ্যটি দশম শতাব্দীতে মধ্য এশিয়ায় উদ্ভূত হয়েছিল এবং তিব্বতি সাহিত্য ১০২৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে ভারতে এর একটি সংস্করণ তুলেছিল।
ঐতিহাসিক শিখ ধর্মগ্রন্থে দেখা যায়, বিশেষ করে দশম গ্রন্থে, পাঠ্যটি ঐতিহ্যগতভাবে গুরু গোবিন্দ সিং-এর উপর আরোপিত। চব্বিশ অবতার বিভাগে উল্লেখ হয়েছে যে ঋষি মৎস্যানর মন্দ, লোভ, হিংসা ও অজ্ঞতার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বিষ্ণু অবতারের চেহারা বর্ণনা করে। ধবন বলেন, ধার্মিকতা ও অধর্মের শক্তির মধ্যে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য চব্বিশতম অবতার হিসেবে কল্কিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। (সূত্রঃ উইকিপিডিয়া)
কিছু পণ্ডিতদের মতে ভগবান বিষ্ণুর দশম অবতার হলেন কল্কি। কল্কি থার্মোনিউক্লিয়ার বিজ্ঞানের সাহায্যে মানব সমাজের দুঃখ দুর্দশা দূর করবেন।
পুরাণকথা অনুসারে কলিযুগ পাপে পূর্ণ হলে বিষ্ণু দুষ্টের দমনের জন্য কল্কি অবতারে আবির্ভূত হবেন। কল্কি অবতার কলিযুগ অবসানের জন্য হবে। যখন কলিযুগে মানুষ ধর্মপথ ত্যাগ করবে তখন ইনি প্রকাশ পাবেন।
শম্ভল গ্রামে (মোরাদাবাদ জেলায়) সুমতি নামে ব্রাহ্মণ কন্যার গর্ভে, বিষ্ণুযশা নামে ব্রাহ্মণের বাড়িতে, কল্কি নামে ভগবান বিষ্ণুর দশম অবতারের আর্বিভাব ঘটবে। কল্কি হবে বিষ্ণুযশা-সুমতির চতুর্থ সন্তান।
বিষ্ণুযশা-সুমতির প্রথম তিন সন্তানের নাম হবে যথাক্রমে কবি, প্রাজ্ঞ আর সুমন্তক।
কল্কিদেব অশ্বারোহনে সিংহল দ্বীপে যাইবেন। সিংহল দ্বীপের রাজা বৃহদ্রথ ও তাঁহার মহিষী কৌমুদী কল্কিদেবকে স্বীয় কন্যা পদ্মাবতীকে সমর্পণ করিবেন। কল্কিদেবের জয় ও বিজয় নামে দুই মহাবলশালী পুত্র জন্মিবে।
আবার ভল্লাটের রাজা শশিধ্বজ ও তাঁর স্ত্রী সুশান্তা স্বীয় কন্যা রমাকে কল্কিদেবের করে সমর্পণ করিয়া তাঁহাকে জামাতৃপদে বরণ করিবেন।
এরপর কল্কিদেব দিগ্বিজয় করিয়া তিনি সমস্ত ভারতের রাজচক্রবর্তী হইবেন এবং পিতার সঙ্কল্পিত অশ্বমেধ ও অন্যান্য অনেক যজ্ঞ সম্পাদন করিয়া বৈদিক ধর্মের পুনরুদ্ধার করিবেন।
এইরূপে সত্যযুগের পুনরাবির্ভাব হইলে কল্কিদেব অবতার দেহ ত্যাগ করিয়া গোলকে বিহার করিবেন। (সংগৃহীত)
**  ** **
মহাভারতের বনপর্বে বকরূপী ধর্ম্ম যুধিষ্ঠিরকে যে-সব প্রশ্ন করেছিলেন তার মধ্যে একটা প্রশ্ন ছিল, পথ কি? সেই প্রশ্নের উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন—
“श्रुतिर्विभिन्ना स्मृतयो विभिन्नाः, नैको मुनिर्यस्य वचः प्रमाणम्। धर्मस्य तत्त्वं निहितं गुहायाम्, महाजनो येन गतः स पन्था।।” 
(বেদ বিভিন্ন, স্মৃতি বিভিন্ন, নানা মুনির নানা মত, ধর্মের মর্ম্ম অমীমাংসিত ভাবে রহিয়াছে; অতএব মহাজ্ঞানী-মহাজন ব্যক্তিগণ যে পথ (আদর্শ) প্রদর্শন করে গেছেন, সেই পথই  মানুষের অনুকরণীয় পথ।)

মহাজ্ঞানী-মহাজন পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র মহা সমাধিস্থ অবস্থায় ভাববাণীতে প্রকাশ করেছেন—“যখন তোরা সেই ব্রজ লীলায় নিত্য রাসে মাতিস, তখন আমি প্রতি ঘটে ঘটে শ্রীকৃষ্ণ। আবার যখন তোরা নদীয়ার পথে ঘাটে বাটে হরিবোল বলে প্রেমে উন্মাদ হয়ে নিত্য করিস, তখন সর্বঘটে আমি শ্রীচৈতন্য রূপে প্রেম দান করি । আমি নিত্য সাক্ষী স্বরূপ। আমিই শ্রীকৃষ্ণ, আমিই শ্রীচৈতন্য, আমিই রামকৃষ্ণ, আমিই সব আমিই সব। (পুণ্যপুঁথি ৬৭ দিবস)
** “কলির লয় অতি নিকট। তোরাই রে তোরা, তোরা সব মিলে আমি— মহা আমি । তাই কল্কি অবতার । পূর্ণ আমি।”১৭
( বিশেষ প্রণিধানযোগ্য তৃতীয় দিবসের ভাববাণী।)
* * *
মহাজ্ঞানী-মহাজন চৈতন্য মহাপ্রভু রূপে তিনি বলেছেন,—
“এইমত আর আছে দুই অবতার,
সংকীৰ্ত্তন আনন্দ রূপ হইবে আমার।।
তাহাতেও তুমি সব এইমত রঙ্গে,
সংকীৰ্ত্তন করিযা মহাসুখে আমা সঙ্গে।।”
(চৈতন্যভাগবত মধ্যখন্ড ২৪৩ পৃষ্ঠা)
* * *
মহাজ্ঞানী-মহাজন শ্রীরামকৃষ্ণ রূপে তিনি বলেছেন—
“আর একবার আসতে হবে তাই পার্যদদের সব জ্ঞান দিচ্ছি না।”
(কথামৃত-৪র্থ ভাগ, পৃষ্ঠা-৬০) “বায়ু কোণে আর একবার আমার দেহ হবে।” কলির শেষে কল্কি অবতার হবে ব্রাহ্মণের ঘরে।” (কথামৃত-১৩৪ পৃষ্ঠা)
* * *
সাধনার দ্বারা উপরোক্ত সব তথ্য বিচার-বিশ্লেষণ করে খুঁজে নিতে হবে আমাদের পিতার পিতা পরমপিতার জীবন্ত আদর্শকে।—ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে। সবাইকে জয়গুরু ও প্রণাম। বন্দে পুরুষোত্তমম্!
————————————————————
tapanspr@gmail.com

।। বিশ্ব পরিবার দিবসের ভাবনা ।।

।। বিশ্ব পরিবার দিবসের শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।


[ ১৫ মে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস। ১৯৯৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রসংঘ সাধারণ পরিষদের এক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৫ মে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস হিসেবে ঘোষিত হয়। রাষ্ট্রসংঘ ১৯৯৪ সালকে আন্তর্জাতিক পরিবার বর্ষ ঘোষণা করেছিল।

নৃবিজ্ঞানী ম্যালিনোস্কির মতে – “পরিবার হল একটি গোষ্ঠী বা সংগঠন আর বিবাহ হল সন্তান উৎপাদন ও পালনের একটি চুক্তি মাত্র”। সামনার ও কেলারের মতে- ‘পরিবার হল ক্ষুদ্র সামাজিক সংগঠন, যা কমপক্ষে দু’ পুরুষকাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে”- এ সংজ্ঞার প্রেক্ষিতে বোঝা যায়, বিবাহপ্রথার আগেও সমাজে পরিবারের সৃষ্টি হয়েছিল- কারণ এ সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়ার আগে থেকেই মানুষ দলবদ্ধ জীবনযাত্রা করত যা পারিবারিক জীবনযাপনের স্বাক্ষরবহ।

তবে বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন সংস্কৃতির পরিবারের ভূমিকা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে পরিলক্ষিত হয়। এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বৈচিত্র্যপূর্ণ নানামুখী ধারা যে কারণে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে এর গঠন ও অন্যান্য অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে এবং হচ্ছে।

শিল্প বিপ্লবের পরে পরিবারের ধরন ও ভূমিকা পাল্টাতে থাকে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে পিতৃতান্ত্রিক পারিবারিক ব্যবস্থা থেকে ক্রমশ ব্যক্তিকেন্দ্রিক গণতান্ত্রিক পরিবার বা যৌথ পরিবার ব্যবস্থা থেকে একক বা নিউক্লিয়ার পরিবার। সমাজবিজ্ঞানী ফলসমের মতে ‘একক’ পরিবারের অন্যতম তিনটি কারণ যেমন স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েরই প্রয়োজন ও চাহিদা সম্পর্কে সচেতনতা, অলাভজনক শিশুশ্রম এবং জন্ম নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার। এরই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর্থিক অনটন, ব্যক্তিত্বের সংঘাত এবং ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের উন্মেষ।

তবে পরিবারের মৌলিক কাজ অনেক।এক দিকে জৈবিক, অপর দিকে মনস্তাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষাদান ইত্যাদি। তবে সব চাইতে বড় দায়িত্ব শিশুর সামাজিকীকরণ এবং সংস্কৃতির সংরক্ষণ। যে শিশুটি ভবিষ্যতের নাগরিক, তার মনোজগত প্রস্তুত হয় পরিবারে। পরিবারের ধারা কেমন, কী ধরনের প্রথা-রীতিনীতি, এ সবের উপর ভিত্তি করে তার জীবনভঙ্গি গড়ে ওঠে। তাই শিশুর সুষ্ঠু পারিবারিক শিক্ষা শৈশব তথা শিশুর মন তথা সাদা কাগজের পাতায় যে ছাপ রাখে, তা ওর পরবর্তী জীবনে অসাধারণ ভূমিকা রাখে। তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় যেমন কিছু সংবিধান আছে তেমনি পারিবারিক সংবিধানও থাকা দরকার। যেমন পরিবারের সবার সঙ্গে সদ্ভাব গড়ে তোলা, সাংসারিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা, মিথ্যে না বলা, গুরুজনদের শ্রদ্ধা করা, নির্দিষ্ট সময়ে ঘরে ফেরা, নিজের কাজ নিজে সম্পন্ন করা, মিথ্যেকে ঘৃণা করা এবং মানবিক মূল্যবোধগুলোর চর্চার মাধ্যমে অন্তরকে বিকশিত করা।]
(সূত্র: suprovat.com)


।। আদর্শ পরিবার গঠনে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্য অবদান ।।

পরিবারের একক ব্যক্তি। স্ত্রী আর পুরুষ দোঁহে মিলে এক হলে একটা আদর্শ ব্যক্তি নির্মাণ হয়। পুংবীজ আর ডিম্বকোষের দুটি অর্ধ-কোষের শুদ্ধ আকূতিতে জন্ম নেয় শুদ্ধাত্মার। ওই একটা কোষ, কোষ-বিভাজনের মাধ্যমে নানা বৈচিত্র্য এবং বৈশিষ্ট্যের কোষের উৎপাদন করে ক্রমে মাথা, বুক, পেট, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সমন্বয়ে পরিপূর্ণ একটা ব্যক্তিতে পরিণত হয়—গর্ভে। গর্ভবাস পরিপূর্ণ হলে কেহ জননীর জননদ্বার দিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়, আবার কাউকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বের করতে হয়।
একজন পূর্ণ, সুস্থ ব্যক্তি নানা-বৈচিত্র্যর কোষ, কলার, অস্থি, মজ্জার সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়। ওই ব্যক্তি-নির্মাণ পদ্ধতি যত শুদ্ধ হবে, ততই এক-একটা শুদ্ধ পরিবার গঠিত হবে। ব্যক্তির আর্য্য নাম প্রজা। প্রজা মানে প্রকৃষ্ট জাতক। প্রকৃষ্ট জাতক নির্মাণ পদ্ধতির মাধ্যম প্রকৃষ্ট যৌনজীবন। উপযুক্ত সুস্থ বিবাহের মাধ্যমে, বিহিত গর্ভাধান সংস্কার দ্বারা ভালো ব্যক্তি নির্মাণ হয়। বর্তমান সভ্যতায় যে বিষয়টি রাষ্ট্রীয়ভাবে উপেক্ষিত। যেমন খুশি তেমন বিবাহের ছাড়পত্র দিয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্র। এবং ডিভোর্সের ছাড়পত্র দিয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্র। যারফলে আমাদের ঈপ্সিত ভালো পরিবারের খুব অভাব। মহানগর আছে অসংখ্য, কিন্তু মহান নাগরিকের অমিল!
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র এখান থেকে তাঁর সৎসঙ্গ আন্দোলন সুরু করতে চাইলেন।
শাসন সংস্থা যেমনই হোক
যা’তেই মাথা ঘামাও না
যৌন ব্যাপার শুদ্ধ না হলে
জাতির জীবন টিঁকবে না। ……….


বর্তমানের ইঁদুড়-দৌড় প্রতিযোগিতার ক্যারিয়ারে চাপা প্রবৃত্তি-পীড়িত মানুষদের মাইক্রো-ফ্যামিলির কনসেপ্ট-এর কাছে সনাতনী পরিবার জীবন আজ মৃতপ্রায়।
রাষ্ট্র স্বীকৃত আইনে মনের রঙীন নেশায় বিয়ে করলাম। ভালো লাগলো না ডিভোর্স করলাম। আবার বিয়ে করলাম। এর ফলে ছেলেমেয়ে বাবা-মা থাকা সত্বেও অনাথ-প্রায়! উপযুক্ত ছেলে থাকতেও বাবা-মা’কে বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে হয়! এই করুণ চিত্রকে ক্যানভাসে রেখে কোন ‘আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস’-এর ছবি আমরা আঁকব? আর সেই ছবি আঁকতে না পারার জন্য ব্যক্তি জীবন, দাম্পত্য জীবন, গৃহ জীবন, সমাজ জীবনগুলো অবিন্যস্তভাবে বিচ্ছিন্ন। পিতামাতা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি নিয়ে একটা আচ্ছাদনের তলায় মিলেমিশে বাস করতে না পারা আমিটি যখন “বিচ্ছিন্নতাবাদ নিপাত যাক” শ্লোগানে চিৎকার করে গলা ফাটাই, তখন মনের আয়নায় যদি নিজের চরিত্রটাকে একবার দেখতে পেতাম, তাহলে না হয় সংশোধনী পথ পাওয়া যেত। আসলে আয়না মানে তো আদর্শ। উচ্চ আদর্শে অনুপ্রাণিত হলেই আত্ম নিয়ন্ত্রণ হয়, অর্থাৎ নিজের প্রবৃত্তির লাগামটা টেনে ধরে সত্তাপ্রেমী হওয়া যায়। ব্যক্তিত্ব নির্মাণ হয়। দাম্পত্য জীবন সুখের হয়। ছেলেমেয়ে ভালো জন্মে। এইভাবে আদর্শ গৃহ জীবনগুলো সূত্রাকারে সমাজ নামের মালার আকার ধারণ করে। যে সমাজের ধনী-দরিদ্র-ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল-হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খৃষ্টান প্রমুখ নামের ফুলগুলো নিজ-নিজ বৈশিষ্ট্য মেনে পরস্পর নির্ভরশীল সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র নির্মাণ করে পরমরাষ্ট্রিক সমবায়ের পরিবার গঠন করবে। প্রাচীন ভারতের আশ্রম ধর্মের সমাজ ব্যবস্থা তাই ছিল। (দ্রঃ বিষ্ণু পুরাণ)

সেই স্বপ্ন সার্থক করে দেখালেন যুগত্রাতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।
এক ছাদের আশ্রয়ে পিতৃব্য, মাতৃব্য, মাতা-পিতা, স্বামী-স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, পৌত্র-পৌত্রাদি, পড়শি, বৃহত্তর পারিপার্শ্বিক নিয়ে বৃহত্তর পরিবার জীবন আমাদের সনাতনী ভারতের আদর্শ ছিল।
ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা পরিবেশের অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। উক্ত উপাদানসমূহকে সমৃদ্ধ রাখার জন্য আর্য্যদের বাস্তব পূর্ত্ত-কর্মের মাধ্যমে নিত্য পঞ্চ-মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করতে হতো সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধিকে অক্ষুণ্ণ রাখতে। শ্রীশ্রীঠাকুর উক্ত বিধানের নবীকরণ করলেন। ইষ্টভৃতি, পিতৃ-মাতৃভৃতি, পরিবেশভৃতি ইত্যাদির প্রবর্তন করে এক বৃহৎ পরিবারের সদস্য করে তুলতে চাইলেন তাঁর কৃষ্টি সন্তানদের।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুশ্রুতি গ্রন্থে ইষ্টভৃতির বিষয়ে বললেন :
‘‘দিন গুজরানী আয় থেকে কর
ইষ্টভৃতি আহরণ,
জলগ্রহণের পূর্ব্বেই তা’
করিস্ ইষ্টে নিবেদন ;
নিত্য এমনি নিয়মিত
যেমন পারিস ক’রেই যা’
মাসটি যবে শেষ হবে তুই
ইষ্টস্থানে পাঠাস্ তা’ ;
ইষ্টস্থানে পাঠিয়ে দিয়ে
আরো দু’টি ভুজ্যি রাখিস্,
গুরুভাই বা গুরুজনের
দু’জনাকে সেইটি দিস্ ;
পাড়া-পড়শীর সেবার কাজে
রাখিস কিন্তু কিছু আরো,
উপযুক্ত আপদগ্রস্তে
দিতেই হ’বে যেটুকু পার ;
এসবগুলির আচরণে
ইষ্টভৃতি নিখুঁত হয়–
এ না-ক’রে ইষ্টভৃতি
জানিস্ কিন্তু পূর্ণ নয় ।’’
(ইষ্টভৃতি মানে, যেনতেনভাবে উপায় করা পয়সা রেখে মাসে মাসে কোন সংগঠনে পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় কিন্তু। উপরোক্ত বাণীতে যা স্পষ্ট করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর।)

শুধু ইষ্টভৃতির মাধ্যমেই নয়, সত্যানুসরণে ‘‘তুমি তোমার, নিজ পরিবারের, দেশের ও দশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দায়ী ।’’ বাণীতেও অনুরূপ দায়ভার দিয়েই রেখেছেন ব্যষ্টি ও সমষ্টি উন্নয়নের দিকে লক্ষ্য রেখে ।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর জন্মভিটা হিমাইতপুরে সকলকে নিয়ে আশ্রম নির্মাণ করে যে বিশ্ব পরিবার রচনা করার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা নিয়ে একদিন অনেক ইতিহাস রচিত হবে।
অপরদিকে, ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতির থাবায় ১৯৪৭ এর ১৫ আগষ্ট দ্বিজাতি-তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে দেশবিভাগের ফলে বহু ছিন্নমূল সৎসঙ্গী পরিবারের দল দেওঘরে চলে আসেন । দেওঘরে ঠাকুর তখন নবাগত । নিজেই পরিবার পরিজনদের নিয়ে প্রভূত কষ্ট স্বীকার করে ভাড়া বাড়ীতে থাকেন । নিদারুণ অর্থকষ্টের মধ্যেও প্রশাসন বা সমাজসেবী সংস্থাদের কাছ থেকে সাহায্য না নিয়ে, কাউকে বিব্রত না করে, আত্মত্যাগী ইষ্টভ্রাতাদের সাহায্যে দুর্গতদের আশ্রয়দান ও ভরণপোষণ করে এক বৃহৎ সৎসঙ্গী পরিবার রচনা করে এক আন্তর্জাতিক পরিবার গঠনের মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৃষ্ট সৎসঙ্গ আন্দোলন বিশ্ব পরিবার সংগঠনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রূপে একসময় প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল হিমাইতপুরে। সুদূর আমেরিকার খ্রিস্টান সম্প্রদায়ভুক্ত শ্রদ্ধাভাজন স্পেনসারদা, হাউজারম্যানদা, ইসলাম সম্প্রদায়ের খলিলুর রহমান, ব্রাহ্মণ পরিবারের বিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য মহোদয়ের ন্যায় পণ্ডিত ব্যক্তি প্রমুখদের পাশাপাশি খুব সাধারণ মাপের অভাবে পরিশ্রান্ত মানুষদের পরিবার নিয়ে গড়ে তোলা পরিবারের নাম ছিল বৃহত্তর সৎসঙ্গীদের একটা পরিবার। দিনান্তে একবার আনন্দবাজারে আশ্রমমাতা জননী মনোমোহিনী দেবীর মাখা “দলা” প্রসাদ খেয়ে পরমানন্দে আশ্রম সংগঠনের ইষ্টের ঈপ্সিত কর্মে মত্ত থাকতেন—বিনা ওজরে, বিনা আপত্তিতে। ওই একবেলা খেয়েই নামধ্যান, কীর্তন, পঠন-পাঠন, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, সংস্কৃতি, বিজ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন থাকতেন। সকল পরিবার ছিল একে অপরের পরিপূরক পরিবার। সে এক স্বর্ণালি যুগ ছিল সৎসঙ্গের। প্রতিটি পরিবারের অভিভাবক ছিলেন মাতা মনোমোহিনী দেবী। সেই সৎসঙ্গ পরিবারের সদস্য আমরা। ব্যক্তি, দম্পতি, গৃহ, সমাজ, রাষ্ট্র জীবনকে অখণ্ড রেখে, প্রাচ্য-প্রতীচ্যকে বর্ণাশ্রমানুশাসনে নিয়ন্ত্রণ করে পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন আমাদের জীবন দেবতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। আমরা যদি ঠাকুরের আদর্শের পরিপালনে, ডিভোর্সকে, বৃদ্ধাশ্রমকে বিদায় জানিয়ে, পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি মিলেমিশে এক ছাদের নীচে জীবন যাপন করে এক-একটা আদর্শ পরিবারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি—সার্থক হবে “পরিবার দিবস” পালন।
বিচ্ছিন্নতাবাদ নিপাত যাক! শ্লোগান সার্থক হবে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ঈপ্সিত সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র গঠন করে পরমরাষ্ট্রিক সমবায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ‘প্রাচ্য-প্রতীচ্য নিয়ন্ত্রণে বর্ণাশ্রমানুশাসকম্ আর্য্য চিরায়ণম্’ ফর্মূলার সাহায্যে।
জয়গুরু!

বন্দে পুরুষোত্তমম্!

tapanspr@gmail.com

।। শ্রীবুদ্ধদেবের আবির্ভাব তিথি স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি ।।

।। পরমপুরুষ শ্রীবুদ্ধদেবের শুভ আবির্ভাব তিথি স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।


[আজ বুদ্ধ পূর্ণিমা। বুদ্ধ পূর্ণিমা বুদ্ধ জয়ন্তী নামেও পরিচিত। বিশ্বজুড়ে এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করা হয়। এই তিথিতে বুদ্ধদেবের আবির্ভাব হয়েছিল বলে ইতিহাসে জানা যায়। বৈদিক সাহিত্য মতে ভগবান বুদ্ধ বিষ্ণুর আরেকটি অবতারও। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর রচিত পুরুষোত্তম বন্দনা মন্ত্রে পূর্বাপর অবতার-বরিষ্ঠদের স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করতে শিখিয়েছেন। বৈদিক সাহিত্য মতে পৃথিবী থেকে হিংসা ও সহিষ্ণুতা চিরতরে মুছে দেওয়ার জন্যই বুদ্ধদেবের আবির্ভাব হয়েছিল। বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিটকে সেই কথা পরিষ্কার ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।]


রাজার ঘরে জন্ম। রাজৈশ্বর্য্যের কোন আকর্ষণই তাঁকে ক্ষুদ্র সংসার মায়ায় আবদ্ধ করতে পারল না। রোগ-শোক-ব্যাধি-জরায় জর্জরিত হয়ে দেহত্যাগ না করে দেহাতীত আত্মার স্বরূপ সন্ধানে হলেন গৃহহারা। সাধনায় সিদ্ধ হয়ে লাভ করলেন বোধি। সিদ্ধার্থ হলেন বুদ্ধদেব। আমাদের বোধকে প্রবুদ্ধ করতে দিলেন চারটি আর্য্যসত্য।–১.দুঃখ, ২. দুঃখের উৎপত্তি, ৩. দুঃখ নিরোধ ও ৪. দুঃখ নিরোধগামী মার্গ। এই চার আর্য্য সত্যের উপর ভগবান বুদ্ধের সামগ্রিক ধর্ম-ভাবনা প্রতিষ্ঠিত। দুঃখ নিরোধগামী মার্গকেই অষ্টাঙ্গিক মার্গ বলা হয়েছে।–১. সম্যক দৃষ্টি (দৃষ্টি শুদ্ধতা)। ২. সম্যক সংকল্প—কাম, হিংসা, প্রতিহিংসা পরায়নতা ত্যাগ করে মৈত্রী ও করুণার সংকল্প। ৩. সম্যক বাক্য—মিথ্যা ও কটুবাক্য পরিহার করে সত্য, প্রিয়, মিষ্ট ও অর্থপূর্ণ বাক-বিনিময় করা। ৪. সম্যক কর্ম—প্রাণী হত্যা, চুরি, ব্যাভিচার ও মাদক দ্রব্য ত্যাগ করে, দয়া, বদান্যতা ও চরিত্র সৎ রাখার কর্ম। ৫. সম্যক জীবিকা—অসৎ জীবিকা ত্যাগ করে সৎ জীবিকার আশ্রয় গ্রহণ। ৬. সম্যক উদ্যম—ইন্দ্রিয় সংযম, কুচিন্তা ত্যাগ, সুচিন্তার আশ্রয়, সৎ চেষ্টার বৃদ্ধি। ৭. সম্যক স্মৃতি--কায়, বেদনা, চিত্ত ও মানসিক ভাবের অমলিন স্মৃতি। সম্যক সমাধি—প্রবৃত্তির দুষ্ট চিন্তা ত্যাগ করে সাত্তিক সাধনায় আত্ম-সমাহিত হওয়া। বুদ্ধদেবের মতবাদ শ্রীকৃষ্ণের আদর্শের পরিপূরক হওয়া সত্বেও বুদ্ধ অনুগামীরা আর্যকৃষ্টির আশ্রমধর্মকে মান্যতা না দিয়ে সন্ন্যাস মাধ্যমে মোক্ষ লাভ করতে গিয়ে বর্ণাশ্রমানুগ বিন্যস্ত সমাজ ব্যবস্থার ক্ষতি হয়। হীনযান, মহাযান, তন্ত্র প্রভৃতি উপ-বিভাগের মতানৈক্যের ফলে সনাতনী আর্যকৃষ্টির প্রবহমানতার গতি রুদ্ধ হয়। বিবাহের উপযুক্ত শ্রেয় ঘরের, তুল্য বংশের পাত্রের অভাবে প্রতিলোম বিবাহ হতে থাকে। বৌদ্ধধর্ম্ম প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন,---‘‘বৌদ্ধমত ও হিন্দুমতে পার্থক্য খুব কম । একই কথা রকমারি করে বলা । শুনেছি বুদ্ধদেবের কথার মধ্যে প্রকারন্তরে বর্ণাশ্রমের সমর্থন আছে । ...... তিনি গৃহীদের বিয়ে-থাওয়া, চাল-চলন-সম্বন্ধে যে-সব নির্দ্দেশ দিয়েছেন, তার সঙ্গে বর্ণাশ্রমের কোন বিরোধ নেই । অশোক বৌদ্ধধর্মের যে রূপ দিলেন, তার মধ্যে বর্ণাশ্রম খুঁজে পাওয়া যায় না । বর্ণাশ্রম হ'লো একটা scientific social structure (বৈজ্ঞানিক সমাজ বিধান) । এই structure (কাঠামো) ভেঙ্গে দিলে মানুষের অন্তরে-বাহিরে একটা chaotic condition-এর (বিশৃঙ্খল অবস্থার) সৃষ্টি হয় ।’’ (আ. প্র. ৬ খণ্ড, ২৩. ১২. ১৯৪৫) ‘‘অশোকের হাতে পড়ে বৌদ্ধধর্ম্মের কিছু কিছু বিকৃতি দেখা দিল। বৌদ্ধদের সংখ্যা বাড়ল বটে, কিন্তু বর্ণাশ্রমের বাঁধন রইল না। তারপর এল শঙ্করাচার্য্যের মায়াবাদ---‘ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা’। মানুষ ভুলে গেল যে আধ্যাত্মিকতা সার্থক হয় সাত্বত বস্তুতান্ত্রিকতায়। বুদ্ধদেব ও শঙ্করাচার্য্য এই দুইজনের সময় থেকেই অসৎ নিরোধের উপর গুরুত্ব দেওয়া হল না। ‘সোহহং’ চর্চ্চার ফলে ব্যক্তিগত সাধনার উপরই জোর দেওয়া হল। একটা সর্ব্বাঙ্গীন ভাবধারা কোথাও রইল না। একটা মূল সূত্রের উপর দাঁড়িয়ে বৈশিষ্ট্যপালী রকমে সমাজ, রাষ্ট্র সব নিয়ে একটা সর্ব্বসঙ্গতিসম্পন্ন ধারা ফুটে উঠল না। এই সবের ফলে এসেছিল নির্ব্বীর্য্যতা। তোমরা যদি এই সর্ব্বতোমুখী কার্য্যক্রম নিয়ে তেমনভাবে তৈরী হও, তাহলে সব সম্প্রদায়ের সঙ্গে সঙ্গতি নিয়ে আবার তোমরা অসৎনিরোধী পরাক্রম-প্রবুদ্ধ হয়ে বৈশিষ্ট্যপালী আপূরয়মাণ আদর্শের উপর দাঁড়িয়ে জগতে অজেয় হতে পারবে।’’ (আ. প্র. ২১ খণ্ড, ১১. ০৫. ১৯৫২)

আজকের এই পুণ্য তিথিতে পরমপিতার উদ্দেশ্যে নিবেদন, শুদ্ধ বোধি দিয়ে আমরা যেন সব ধরনের বোধ-বিপর্যয় থেকে নিজেদের রক্ষা করে স্মৃতিবাহী চেতনায় সমৃদ্ধ হতে পারি। জয়গুরু।

নিবেদনে—tapanspr@gmail.com

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য

পুরানো সেই দিনের কথা

।। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।

‘প্রথম প্রভাত উদয় তব গগনে,
প্রথম সাম রব তব তপোবনে,
প্রথম প্রচারিত তব বন-ভবনে
জ্ঞান-ধর্ম কত কাব্যকাহিনী…….’ বাণীর গাঁথায় বন্দনা করেছেন ভারত-জননীকে। ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বৈশিষ্ট্যপালী আপূরয়মাণ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সকলকে যথাযোগ্য মূল্যায়ণ করতেন, যথাযোগ্য সম্মান দিতেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে তিনি ‘ঋষি বলতেন’। আলোচনা-প্রসঙ্গের সংকলনে কবিগুরুর রচনাকে নানা আঙ্গিকে তুলে ধরেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। বিষয়বস্তুকে সমৃদ্ধ করতে মাঝে মধ্যেই উদাত্ত কণ্ঠে ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা তিনি আবৃত্তি করতেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের পুণ্য জন্মদিন স্মরণে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আবৃত্তি করা ‘কথা ও কাহিনী’-র ‘গুরু গোবিন্দ’ কবিতার ক’টি লাইন উদ্ধৃত করলাম।—
‘‘কবে প্রাণ খুলে বলিতে পারিব—-
‘পেয়েছি আমার শেষ!
তোমরা সকলে এসো মোর পিছে,
গুরু তোমাদের সবারে ডাকিছে,
আমার জীবনে লভিয়া জীবন
জাগো রে সকল দেশ।
‘নাহি আর ভয়, নাহি সংশয়,
নাহি আর আগু-পিছু।
পেয়েছি সত্য, লভিয়াছি পথ,
সরিয়া দাঁড়াক সকল জগৎ—
নাই তার কাছে জীবন মরণ
নাই নাই আর কিছু।’
‘হৃদয়ের মাঝে পেতেছি শুনিতে
দৈববাণীর মতো—-
‘উঠিয়া দাঁড়াও আপন আলোতে,
ওই চেয়ে দেখো কত দূর হতে
তোমার কাছেতে ধরা দিবে ব’লে
আসে লোক কত শত।
‘ওই শোনো শোনো কল্লোলধ্বনি,
ছুটে হৃদয়ের ধারা।
স্থির থাকো তুমি, থাকো তুমি জাগি
প্রদীপের মতো আলস তেয়াগি,
এ নিশীথমাঝে তুমি ঘুমাইলে
ফিরিয়া যাইবে তারা।’
‘ওই চেয়ে দেখো দিগন্ত-পানে
ঘনঘোর ঘটা অতি।
আসিতেছে ঝড় মরণেরে লয়ে—
তাই বসে বসে হৃদয়-আলয়ে
জ্বালিতেছে আলো, নিবিবে না ঝড়ে,
দিবে অনন্ত জ্যোতি।’’
——
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আবৃত্তি করা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিরচিত ‘কৃপণ’ কবিতা।
কৃপণআমি ভিক্ষা করে ফিরতেছিলেম গ্রামের পথে পথে, তুমি তখন চলেছিলে তোমার স্বর্ণরথে। অপূর্ব্ব এক স্বপ্নসম লাগতেছিল চক্ষে মম--- কি বিচিত্র শোভা তোমার, কি বিচিত্র সাজ। আমি মনে ভাবতেছিলেম এ কোন্ মহারাজ।। আজি শুভক্ষণে রাত পোহালো. ভেবেছিলেম তবে, আজ আমারে দ্বারে দ্বারে ফিরতে নাহি হবে। বাহির হতে নাহি হতে কাহার দেখা পেলেম পথে, চলিতে রথ ধনধান্য ছড়াবে দুই ধারে--- মুঠা মুঠা কুড়িয়ে নেব, নেব ভারে ভারে।। দেখি সহসা রথ থেমে গেল আমার কাছে এসে, আমার মুখ-পানে চেয়ে নামলে তুমি হেসে। দেখে মুখের প্রসন্নতা জুড়িয়ে গেল সকল ব্যথা, হেন কালে, কিসের লাগি তুমি অকস্মাৎ ‘আমায় কিছু দাও গো’ বলে বাড়িয়ে দিলে হাত।। মরি, এ কী কথা রাজাধিরাজ! ‘আমায় দাও গো কিছু’--- শুনে ক্ষণকালের তরে রইনু মাথা-নীচু। তোমার কিবা অভাব আছে ভিক্ষা চাও ভিখারির কাছে! এ কেবল কৌতুকের বশে আমায় প্রবঞ্চনা। ঝুলি হতে দিলেম তুলে একটি ছোটো কণা।। যবে পাত্রখানি ঘরে এনে উজাড় করি,--- একি, ভিক্ষা-মাঝে একটি ছোটো সোনার কণা দেখি! দিলেম যা রাজ-ভিখারিরে স্বর্ণ হয়ে এল ফিরে,--- তখন কাঁদি চোখের জলে দুটি নয়ন ভ’রে,--- তোমায় কেন দিইনি আমার সকল শূণ্য করে?


সৎসঙ্গের তৎকালিন সভাপতি ঋত্বিগাচার্য্য শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য (এম. এ), শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের রচিত ‘সত্যানুসরণ’ পুস্তিকাটি নিয়ে একবার কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বইটির কিছুটা অংশ পাঠ করেই জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘ইহার বয়স কত?’ ঋত্বিগাচার্য্য শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য তদুত্তরে বলেছিলেন, ‘তাঁর বয়স বেশী নয়, মাত্র ২২ বছর’। পুস্তকখানার আরও কিয়দংশ পাঠ করে কবিগুরু পুণরায় জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘কত বয়স বললে?’ ঋত্বিগাচার্য্য শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য পূর্বপ্রদত্ত উত্তরেরই পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। পুস্তকের আরো কিয়দংশ পাঠ করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ আবার সেই একই প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কত বয়স বললে যেন?’ ঋত্বিগাচার্য্য শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য পুণরায় বলেছিলেন, ২২ বছর। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন,--- ‘‘এত অল্প বয়সে এরূপ স্বচ্ছ সাবলীল ছন্দে, অপরূপ ভঙ্গিতে, গভীর তত্ত্বসমূহের এমন অপূর্ব প্রকাশ কি করিয়া সম্ভব হয়!’’ এর কিছুদিন পর সৎসঙ্গের তৎকালিন সহ-সভাপতি শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত সুশীল চন্দ্র বসু (বি. এ.) কবিগুরুর সাক্ষাৎ করেন। কবিগুরু শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত সুশীলচন্দ্রের সাথে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৎসঙ্গ কর্মপ্রতিষ্ঠান সম্বন্ধে আগ্রহ সহকারে নানা আলাপ-আলোচনাদি করেছিলেন। সেই সাক্ষাৎকারের কথা বিবৃত করে সুশীলচন্দ্র লিখেছেন--- “একবার শান্তিনিকেতনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম। নানা কথার পর শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ও তাঁর কর্মপ্রতিষ্ঠান সম্বন্ধীয় আলোচনা প্রসঙ্গ উঠিতেই, তিনি বললেন, ‘আমি শুনিয়াছি তোমরা কাজকর্ম খুব ভালই করিতেছ, তোমাদের কোন অভাব অভিযোগ নাই, কিন্তু দেখ, আমার এই বৃদ্ধ বয়সে অপটু শরীর লইয়া ছেলে মেয়ে নাচাইয়া আমার এই প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ সংগ্রহ করিতে হইতেছে!’ তাঁর কথা শুনে আমি অবশ্যই খুব দুঃখবোধ করিয়াছিলাম, তাহাকে বলিলাম, ‘অন্যের নিকট হইতে একথা শুনিলে বিস্মিত হইবার কোন কারণ ছিল না, কিন্তু আপনার নিকট হইতে শুনিয়া বিস্ময় বোধ না করিয়া পারিতেছি না। আপনি নিজে এ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলিয়াছেন। কর্ম প্রতিষ্ঠান গড়িতে দেশের লোকের সক্রিয় সহানুভূতি কিরূপ পাওয়া যায় তাহা আপনি বিলক্ষণ অবগত আছেন। আপনি ধনী পিতার সন্তান, আপনি বিশ্বকবি, জগৎজোড়া আপনার খ্যাতি, তথাপি প্রতিষ্ঠানটিকে চালাইতে ছেলে মেয়ে নাচাইয়া আপনাকে অর্থসংগ্রহ করিতে হইতেছে, বৃদ্ধ বয়সে এজন্য আপনার উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার সীমা নাই। আর আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রাণপুরুষ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র দরিদ্র ব্রাহ্মণের সন্তান। আপনার ন্যায় খ্যাতি প্রতিপত্তি তো দূরের কথা, তিনি তাঁহার নিজের দেশবাসীর কাছেই এখনও একরূপ অপরিচিত। এমতাবস্থায় আমাদের প্রতিষ্ঠানের কোন অভাব-অভিযোগ নাই, ইহা আপনি কিরূপে অনুমান করিতে পারিলেন?’ আমার কথা শুনিয়া তিনি নিরুত্তর রহিলেন। বস্তুত যাঁহারাই কোন কর্ম প্রতিষ্ঠান (বিশেষত অভিনব ধরণের ) গড়িয়া তুলিয়াছেন তাহারাই জানেন যে, এই দেশে কোন প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিতে কি পর্বতপ্রমাণ বাধাবিঘ্নের সম্মুখীন হইতে হয়।” (সূত্র : মানসতীর্থ পরিক্রমা) আজকের এই স্মৃতিচারণ-লগ্নে পরমপিতার রাতুল চরণে প্রার্থনা, ঋষিপ্রোক্ত ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টির সদাচার, বর্ণাশ্রম এবং বিবাহবিধি মেনে আমাদের ঘরের মায়েরা যেন রবীন্দ্রনাথের ন্যায় শুদ্ধাত্মাদের আবার ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয় এই ধরাধামে। তবেই সার্থক হবে আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিকে চিরভাস্বর করে রাখা। সবাইকে আমার জয়গুরু ও প্রণাম।

পুরানো সেই দিনের কথা


।। ঋষি-কবি রবীন্দ্রনাথের শুভ জন্মদিন স্মরণে

শ্রদ্ধাঞ্জলি ।।

সৎসঙ্গের তৎকালিন সভাপতি ঋত্বিগাচার্য্য শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপ্রসন্ন

ভট্টাচার্য্য (এম. এ), শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের রচিত ‘সত্যানুসরণ’
পুস্তিকাটি নিয়ে একবার কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বইটির কিছুটা অংশ পাঠ করেই জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘ইহার
বয়স কত?’ ঋত্বিগাচার্য্য শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য তদুত্তরে
বলেছিলেন, ‘তাঁর বয়স বেশী নয়, মাত্র ২২ বছর’। পুস্তকখানার আরও কিয়দংশ
পাঠ করে কবিগুরু পুণরায় জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘কত বয়স বললে?’
ঋত্বিগাচার্য্য শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য পূর্বপ্রদত্ত
উত্তরেরই পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। পুস্তকের আরো কিয়দংশ পাঠ করে কবিগুরু
রবীন্দ্রনাথ আবার সেই একই প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কত বয়স বললে যেন?’
ঋত্বিগাচার্য্য শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য পুণরায় বলেছিলেন, ২২
বছর। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন,— ‘‘এত অল্প বয়সে এরূপ
স্বচ্ছ সাবলীল ছন্দে, অপরূপ ভঙ্গিতে, গভীর তত্ত্বসমূহের এমন অপূর্ব
প্রকাশ কি করিয়া সম্ভব হয়!’’ এর কিছুদিন পর সৎসঙ্গের তৎকালিন সহ-সভাপতি শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত

সুশীল চন্দ্র বসু (বি. এ.) কবিগুরুর সাক্ষাৎ করেন। কবিগুরু শ্রদ্ধেয়
শ্রীযুক্ত সুশীলচন্দ্রের সাথে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৎসঙ্গ
কর্মপ্রতিষ্ঠান সম্বন্ধে আগ্রহ সহকারে নানা আলাপ-আলোচনাদি করেছিলেন। সেই
সাক্ষাৎকারের কথা বিবৃত করে সুশীলচন্দ্র লিখেছেন— “একবার শান্তিনিকেতনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে

গিয়েছিলাম। নানা কথার পর শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ও তাঁর
কর্মপ্রতিষ্ঠান সম্বন্ধীয় আলোচনা প্রসঙ্গ উঠিতেই, তিনি বললেন, ‘আমি
শুনিয়াছি তোমরা কাজকর্ম খুব ভালই করিতেছ, তোমাদের কোন অভাব অভিযোগ নাই,
কিন্তু দেখ, আমার এই বৃদ্ধ বয়সে অপটু শরীর লইয়া ছেলে মেয়ে নাচাইয়া আমার
এই প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ সংগ্রহ করিতে হইতেছে!’ তাঁর কথা শুনে আমি
অবশ্যই খুব দুঃখবোধ করিয়াছিলাম, তাহাকে বলিলাম, ‘অন্যের নিকট হইতে একথা
শুনিলে বিস্মিত হইবার কোন কারণ ছিল না, কিন্তু আপনার নিকট হইতে শুনিয়া
বিস্ময় বোধ না করিয়া পারিতেছি না। আপনি নিজে এ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে
তুলিয়াছেন। কর্ম প্রতিষ্ঠান গড়িতে দেশের লোকের সক্রিয় সহানুভূতি কিরূপ
পাওয়া যায় তাহা আপনি বিলক্ষণ অবগত আছেন। আপনি ধনী পিতার সন্তান, আপনি
বিশ্বকবি, জগৎজোড়া আপনার খ্যাতি, তথাপি প্রতিষ্ঠানটিকে চালাইতে ছেলে মেয়ে
নাচাইয়া আপনাকে অর্থসংগ্রহ করিতে হইতেছে, বৃদ্ধ বয়সে এজন্য আপনার উদ্বেগ
ও উৎকন্ঠার সীমা নাই। আর আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রাণপুরুষ শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্র দরিদ্র ব্রাহ্মণের সন্তান। আপনার ন্যায় খ্যাতি প্রতিপত্তি
তো দূরের কথা, তিনি তাঁহার নিজের দেশবাসীর কাছেই এখনও একরূপ অপরিচিত।
এমতাবস্থায় আমাদের প্রতিষ্ঠানের কোন অভাব-অভিযোগ নাই, ইহা আপনি কিরূপে
অনুমান করিতে পারিলেন?’ আমার কথা শুনিয়া তিনি নিরুত্তর রহিলেন।
বস্তুত যাঁহারাই কোন কর্ম প্রতিষ্ঠান (বিশেষত অভিনব ধরণের ) গড়িয়া
তুলিয়াছেন তাহারাই জানেন যে, এই দেশে কোন প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিতে কি
পর্বতপ্রমাণ বাধাবিঘ্নের সম্মুখীন হইতে হয়।” (সূত্র : মানসতীর্থ
পরিক্রমা)
আজকের এই পুণ্যলগ্নে পরমপিতার রাতুল চরণে প্রার্থনা, শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্রের ঈপ্সিত ঋষিপ্রোক্ত ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টির সদাচার,
বর্ণাশ্রম এবং বিবাহবিধি মেনে আমাদের ঘরের মায়েরা যেন রবীন্দ্রনাথের
ন্যায় শুদ্ধাত্মাদের আবার ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। এই ধরাধামে। তবেই সার্থক
হবে আমাদের ‘রবীন্দ্র জয়ন্তী’ উৎসব পালন করা। সবাইকে আমার জয়গুরু ও

প্রণাম।

নিবেদনে—তপন দাস@tapandasd

।। কবিগুরুর ১৬৪তম শুভ জন্মদিন স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।

।। কবিগুরুর ১৬৪তম শুভ জন্মদিন স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।


পঁচিশে বৈশাখ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

“পঁচিশে বৈশাখ চলেছে
জন্মদিনের ধারাকে বহন ক’রে
মৃত্যুদিনের দিকে।
সেই চলতি আসনের উপর ব’সে কোন্‌ কারিগর গাঁথছে
ছোটো ছোটো জন্মমৃত্যুর সীমানায়
নানা রবীন্দ্রনাথের একখানা মালা ॥

রথে চড়ে চলেছে কাল;
পদাতিক পথিক চলতে চলতে পাত্র তুলে ধরে,
পায় কিছু পানীয়;
পান সারা হলে পিছিয়ে পড়ে অন্ধকারে;
চাকার তলায় ভাঙা পাত্র ধুলায় যায় গুঁড়িয়ে।
তার পিছনে পিছনে
নতুন পাত্র নিয়ে যে আসে ছুটে,
পায় নতুন রস,
একই তার নাম,
কিন্তু সে বুঝি আর-একজন ॥

একদিন ছিলেম বালক
কয়েকটি জন্মদিনের ছাঁদের মধ্যে
সেই-যে লোকটার মূর্তি হয়েছিল গড়া
তোমরা তাকে কেউ জান না।
সে সত্য ছিল যাদের জানার মধ্যে
কেউ নেই তারা।
সেই বালক না আছে আপন স্বরূপে,
না আছে কারো স্মৃতিতে।
সে গেছে চলে তার ছোটো সংসারটাকে নিয়ে;
তার সেদিনকার কান্নাহাসির
প্রতিধ্বনি আসে না কোনো হাওয়ায়।
তার ভাঙা খেলনার টুকরোগুলোও
দেখিনে ধুলোর ’পরে।
সেদিন জীবনের ছোটো গবাক্ষের কাছে
সে বসে থাকত বাইরের দিকে চেয়ে।
তার বিশ্ব ছিল
সেইটুকু ফাঁকের বেষ্টনীর মধ্যে।
তার অবোধ চোখ-মেলে-চাওয়া
ঠেকে যেত বাগানের পাঁচিলটাতে
সারি সারি নারকেল গাছে।
সন্ধ্যেবেলাটা রূপকথার রসে নিবিড়;
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝখানে
বেড়া ছিল না উঁচৃ,
মনটা এ দিক থেকে ও দিকে
ডিঙিয়ে যেত অনায়াসেই।
প্রদোষের আলো-আঁধারে
বস্তুর সঙ্গে ছায়াগুলো ছিল জড়িয়ে,
দুইই ছিল একগোত্রের।
সে কয় দিনের জন্মদিন একটা দ্বীপ,
কিছুকাল ছিল আলোতে,
কালসমুদ্রের তলায় গেছে ডুবে।
ভাঁটার সময় কখনো কখনো
দেখা যায় তার পাহাড়ের চূড়া,
দেখা যায় প্রবালের রক্তিম তটরেখা ॥

পঁচিশে বৈশাখ তার পরে দেখা দিল
আর-এক কালান্তরে,
ফাল্গুনের প্রত্যুষে
রঙিন আভার অস্পষ্টতায়।
তরুণ যৌবনের বাউল
সুর বেঁধে নিল আপন একতারাতে,
ডেকে বেড়ালো নিরুদ্দেশ মনের মানুষকে
অনির্দেশ্য বেদনার খ্যাপা সুরে।
সেই শুনে কোনো-কোনোদিন বা
বৈকুণ্ঠে লক্ষ্মীর আসন টলেছিল,
তিনি পাঠিয়ে দিয়েছেন
তাঁর কোনো-কোনো দূতীকে
পলাশবনের রঙ-মাতাল ছায়াপথে
কাজ-ভোলানো সকাল-বিকালে।
তখন কানে কানে মৃদু গলায় তাদের কথা শুনেছি,–
কিছু বুঝেছি, কিছু বুঝি নি।
দেখেছি কালো চোখের পক্ষ্ণরেখায় জলের আভাস;
দেখেছি কম্পিত অধরে নিমীলিত বাণীর বেদনা;
শুনেছি ক্বণিত কঙ্কণে চঞ্চল আগ্রহের চকিত ঝংকার।
তারা রেখে গেছে আমার অজানিতে
পঁচিশে বৈশাখের
প্রথম-ঘুম-ভাঙা প্রভাতে
নতুন ফোটা বেলফুলের মালা;
ভোরের স্বপ্ন
তারই গন্ধে ছিল বিহ্বল ॥

সেদিনকার জন্মদিনের কিশোরজগৎ
ছিল রূপকথার পাড়ার গায়ে-গায়েই,
জানা না-জানার সংশয়ে।
সেখানে রাজকন্যা আপন এলো চুলের আবরণে
কখনো বা ছিল ঘুমিয়ে,
কখনো বা জেগেছিল চমকে উঠে’
সোনার কাঠির পরশ লেগে ॥

দিন গেল।
সেই বসন্তী রঙের পঁচিশে বৈশাখের
রঙ-করা প্রাচীরগুলো পড়ল ভেঙে।
যে পথে বকুলবনের পাতার দোলনে
ছায়ায় লাগত কাঁপন,
হাওয়ায় জাগত মর্মর,
বিরহী কোকিলের কুহুরবের মিনতিতে
আতুর হত মধ্যাহ্ন,
মৌমাছির ডানায় লাগত গুঞ্জন
ফুলগন্ধের অদৃশ্য ইশারা বেয়ে,
সেই তৃণ-বিছানো বীথিকা
পৌঁছল এসে পাথরে-বাঁধানো রাজপথে।
সেদিনকার কিশোরক সুর সেধেছিল যে একতারায়
একে একে তাতে চড়িয়ে দিল তারের পর নতুন তার ॥

সেদিন পঁচিশে বৈশাখ
আমাকে আনল ডেকে
বন্ধুর পথ দিয়ে
তরঙ্গমন্দ্রিত জনসমুদ্রতীরে।
বেলা-অবেলায়
ধ্বনিতে ধ্বনিতে গেঁথে
জাল ফেলেছি মাঝ-দরিয়ায়–
কোনো মন দিয়েছে ধরা,
ছিন্ন জালের ভিতর থেকে কেউ বা গেছে পালিয়ে ॥

কখনো দিন এসেছে ম্লান হয়ে,
সাধনায় এসেছে নৈরাশ্য,
গ্লানিভারে নত হয়েছে মন।
এমন সময়ে অবসাদের অপরাহ্নে
অপ্রত্যাশিত পথে এসেছে
অমরাবতীর মর্ত্যপ্রতিমা–
সেবাকে তারা সুন্দর করে,
তপঃক্লান্তের জন্যে তারা
আনে সুধার পাত্র।
ভয়কে তারা অপমানিত করে
উল্লোল হাস্যের কলোচ্ছ্বাসে,
তারা জাগিয়ে তোলে দুঃসাহসের শিখা
ভস্মে-ঢাকা অঙ্গারের থেকে।
তারা আকাশবাণীকে ডেকে আনে প্রকাশের তপস্যায়।
তারা আমার নিবে-আসা দীপে জ্বালিয়ে গেছে শিখা,
শিথিল-হওয়া তারে বেঁধে দিয়েছে সুর–
পঁচিশে বৈশাখকে বরণমাল্য পরিয়েছে
আপন হাতে গেঁথে।
তাদের পরশমণির ছোঁওয়া
আজও আছে
আমার গানে, আমার বাণীতে ॥

সেদিন জীবনের রণক্ষেত্রে
দিকে দিকে জেগে উঠল সংগ্রামের সংঘাত
গুরু গুরু মেঘমন্দ্রে।
একতারা ফেলে দিয়ে
কখনো বা নিতে হল ভেরি।
খর মধ্যাহ্নের তাপে
ছুটতে হল
জয়পরাজয়ের আবর্তনের মধ্যে।
পায়ে বিঁধেছে কাঁটা,
ক্ষত বক্ষে পড়েছে রক্তধারা।
নির্মম কঠোরতা মেরেছে ঢেউ
আমার নৌকার ডাইনে বাঁয়ে,
জীবনের পণ্য চেয়েছে ডুবিয়ে দিতে
নিন্দার তলায়, পঙ্কের মধ্যে।
বিদ্বেষে অনুরাগে
ঈর্ষায় মৈত্রীতে
সংগীতে পরুষকোলাহলে
আলোড়িত
তপ্ত বাষ্পনিঃশ্বাসের মধ্য দিয়ে
আমার জগৎ গিয়েছে তার কক্ষপথে ॥

এই দুর্গমে, এই বিরোধসংক্ষোভের মধ্যে
পঁচিশে বৈশাখের প্রৌঢ় প্রহরে
তোমরা এসেছ আমার কাছে।
জেনেছ কি–
আমার প্রকাশে অনেক আছে অসমাপ্ত,
অনেক ছিন্নবিচ্ছিন্ন, অনেক উপেক্ষিত ?

অন্তরে বাহিরে সেই
ভালো-মন্দ স্পষ্ট-অস্পষ্ট খ্যাত-অখ্যাত
ব্যর্থ-চরিতার্থের জটিল সম্মিশ্রণের মধ্য থেকে
যে আমার মূর্তি
তোমাদের শ্রদ্ধায়, তোমাদের ভালোবাসায়,
তোমাদের ক্ষমায় আজ প্রতিফলিত–
আজ যার সামনে এনেছ তোমাদের মালা,
তাকেই আমার পঁচিশে বৈশাখের
শেষবেলাকার পরিচয় ব’লে
নিলেম স্বীকার ক’রে–
আর রেখে গেলেম তোমাদের জন্যে
আমার আশীর্বাদ।
যাবার সময় এই মানসী মূর্তি
রইল তোমাদের চিত্তে,
কালের হাতে রইল ব’লে করব না অহংকার ॥

তার পরে দাও আমাকে ছুটি
জীবনের কালো-সাদা সূত্রে-গাঁথা
সকল পরিচয়ের অন্তরালে,
নির্জন নামহীন নিভৃতে–
নানা সুরের নানা তারের যন্ত্রে
সুর মিলিয়ে নিতে দাও

এক চরম সংগীতের গভীরতায় ॥”

কৃতজ্ঞতা : রবীন্দ্রসঙ্গীত

।। দীঘায় জগন্নাথদেবের মন্দির ।।

আমরা যারপরনাই আনন্দিত! ১৪৩২ বঙ্গাব্দের শুভ অক্ষয় তৃতীয়ার দিনটি অক্ষয় হয়ে থাকবে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে।— কথিত আছে, যে দিনটিতে ব্যাসদেব ও গণেশদেব মিলে ভারতবর্ষের মহাকাব্য মহাভারত রচনা সুরু করেছিলেন।—আর সেই স্মরণীয় দিনটিতে রাজ্য সরকারের উদ্যোগে দীঘাতে, মহাভারতের কেন্দ্রীয় চরিত্র জগন্নাথ(শ্রীকৃষ্ণ)দেবের নামাঙ্কিত জগন্নাথ মন্দিরের বিগ্রহে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হবে।—যে রাজ্যে চিন্ময়ী সত্তাদের প্রাণগুলো নিরাপত্তা হীনতায় ভোগে, অকালে প্রাণহানি হয়, ভোট পরবর্তী হিংসায়, ধর্ষণে, হিন্দু হবার অপরাধে!—ইত্যাদি ইত্যাদিতে …….. । সেই রাজ্যে পুরুষোত্তম শ্রীজগন্নাথ (শ্রীকৃষ্ণ) দেবের নামাঙ্কিত মন্দির! সত্যিই এক আশার আলোর ঝল্কানি দেখতে পাচ্ছি। পার্থসারথী পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের “পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশয়চ দুষ্কৃতাম্।” আদর্শে বিশ্বাসী অনুগামীদের মিলনস্থলের কেন্দ্র স্বরূপ হবে এই জগন্নাথ মন্দির। অচেতন, পদার্থে নির্মিত মন্দির প্রাঙ্গনে সমবেত হবেন চেতনাসম্পন্ন মানুষেরা, সচ্চিদানন্দ-বিগ্রহের অধিকারী মানুষেরা তাদের দেহমনকে পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের পূত-পবিত্র শ্রীমদ্ভাবদ্গীতা গ্রন্থের আদর্শের অনুসরণে প্রবৃত্তিজাত লোভ-কাম-ক্রোধাদি ষড়রিপুকে বশ করে নিজ-নিজ দেহমন্দিরকে বিনির্মাণ করে সত্তাশ্রয়ী চলনে অভ্যস্ত হবেন। পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের ন্যায় অসৎনিরোধে তৎপর হবেন। আমরা, পশ্চিমবঙ্গবাসীরা, ন্যায়নীতির আদর্শবাহী শ্রীকৃষ্ণের আদর্শের রাজত্ব ফিরে না পেলেও, চিন্ময়ী সত্তার দেহ-মন্দিরগুলো এখন থেকে সুরক্ষা পাবে, সেই আশা তো করতে পারি। গভীর রাতেও সালঙ্কারা সুন্দরী রমণী নিরাপদে নি়জ-নিজ আশ্রয়ে ফিরতে পারবে। নারী-নির্যাতন হবে না, ধর্ষণ হবে না, ভোটে বুথ দখল হবে না, যার ভোট সে দিতে পারবেন, ভোট পরবর্তী হিংসা হবে না, কোন নির্দিষ্ট দলকে ভোট দেবার জন্য ঘরছাড়া হতে হবে না, ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হবে না, ধর্ষণ হবে না, খুন হবে না, বধ্যকে বধ না করে, অবধ্যকে বধ করা হবে না।—সত্যমেব জয়তে-এর সীলমোহরের অধিকারীরা আচার-আচরণ দিয়ে সত্যের প্রতিষ্ঠা করবে। কাট-মানি, চুরি, ঘুষ প্রভৃতি ঘৃণ্য সংস্কৃতির অবসান হবে। স্বচ্ছ প্রশাসন, স্বচ্ছ কর্ম-সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা পাবে। যোগ্য লোক, যোগ্য মর্যাদায়, যোগ্য পদে নিয়োগ হবে। নায্য অধিকার পেতে ধর্ণা-তলায় বছরের পর বছর প্রতীক্ষা করতে হবে না। কাউকে অধিকার ফিরে পেতে আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে না।—সত্যিই, কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে! এই শুভক্ষণে আমাদের শপথ নিতে হবে, আমরা যেন আচার-আচরণে আমাদের দেহ মন্দিরের শ্রীবিগ্রহ অন্তর্যামী অন্তর্দেবতা পুরুষোত্তমকে কলুষিত না করি।

।। বসুন্ধরা দিবসের ভাবনা ।।

** বসুন্ধরা দিবসের ভাবনা **

।। প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্য অবদান ।।

[ ধরিত্রী দিবস (বা বিশ্ব বসুন্ধরা দিবস) হলো পরিবেশ রক্ষার জন্য সমর্থন প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে প্রতি বছর ২২শে এপ্রিল পালিত একটি অনুষ্ঠান। ধরিত্রী শব্দটি এসেছে ধরণী বা ধরা থেকে, যার অর্থ হলো পৃথিবী। পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য সর্বসম্মতিক্রমে ধার্য করা একটি দিবসই হলো ধরিত্রী দিবস। সর্বপ্রথম ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে দিবসটি পালিত হয়, এবং বর্তমানে আর্থ ডে নেটওয়ার্ক কর্তৃক বিশ্বব্যাপী সমন্বিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়, এবং ১৯৩ সংখ্যারও অধিক দেশে প্রতি বছর পালন করা হয়ে থাকে।

ধরিত্রী দিবস
জন ম্যাককনেলের তৈরি অনানুষ্ঠানিক ধরিত্রী পতাকায় অ্যাপোলো ১৭-এর ক্রুদের তোলা ব্লু মার্বেল ছবিটি ব্যবহার করা হয়েছে
তাৎপর্য
পরিবেশ সুরক্ষায় সমর্থন
শুরু
১৯৭০
তারিখ
২২ এপ্রিল
সংঘটন
বার্ষিক
১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে মার্কিন সেনেটর গেলর্ড নেলসন ধরিত্রী দিবসের প্রচলন করেন। পৃথিবীর অনেক দেশেই সরকারিভাবে এই দিবস পালন করা হয়। উত্তর গোলার্ধের দেশগুলিতে বসন্তকালে আর দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলিতে শরতে ধরিত্রী দিবস পালিত হয়। এই দিবস ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয় এবং ১৪১ সংখ্যক জাতি দ্বারা আয়োজন করা হয়েছিল।একই ধরনের আরেকটি উৎসব হল বিশ্ব পরিবেশ দিবস। জাতিসংঘের উদ্যোগে ৫ জুন এটি বিশ্বের প্রায় সব দেশেই পালিত হয়।

২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের ধরিত্রী দিবসে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং অন্যান্য ১২০টি দেশ একটি দিকনির্দেশ প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। এই চুক্তি স্বাক্ষরের ফলস্বরূপ ঐতিহাসিক খসড়া আবহাওয়া রক্ষা চুক্তির একটা আসল প্রয়োজনীয় সক্রিয়তার মধ্যে প্রবেশ করতে স্বস্তি এসেছিল, যে সিদ্ধান্ত প্যারিসে ২০১৫ জাতি সংঘ আবহাওয়া পরিবর্তন সম্মেলন-এ উপস্থিত ১৯৫টা দেশের সম্মতিতে নেওয়া হয়েছিল।

১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে সানফ্রান্সিস্কোতে ইউনেস্কো সম্মেলনে শান্তি কর্মী জন ম্যাককনেল পৃথিবী মায়ের সম্মানে একটা দিন উৎসর্গ করতে প্রস্তাব করেন এবং শান্তির ধারণা থেকে, উত্তর গোলার্ধে বসন্তের প্রথম দিন হিসেবে ২১ মার্চ, ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম এই দিনটা উদযাপিত হয়। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এই দিনই পরে একটা পরিঘোষণায় অনুমোদিত হয়, যেটা লিখেছিলেন ম্যাককনেল এবং মহাসচিব উ থান্ট জাতি সংঘ সনদে স্বাক্ষর করেছিলেন। এক মাস পর একটা পরিবেশগত শিক্ষামূলক দিন হিসেবে একটা আলাদা ধরিত্রী দিবসের অবতারণা করেন যুক্তরাষ্ট্র সেনেটর গেলর্ড নেলসন, যেটা প্রথম সংঘটিত হয় ২২ এপ্রিল, ১৯৭০। এই নেলসন পরবর্তীকালে তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে প্রেসিডেন্সিয়াল মেডাল অফ ফ্রিডম পুরস্কারে পুরস্কৃত হন। যখন এই ২২ এপ্রিল ধরিত্রী দিবস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত, তখন ডেনিস হায়েস একটা সংগঠন চালু করেন, যিনি ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে আসল জাতীয় সমন্বয়সাধক ছিলেন; যেটা ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে আন্তর্জাতিক রূপ পেয়েছিল এবং ১৪১টা দেশে সংগঠিত ঘটনা হিসেবে দেখা দিয়েছিল।

এক বিরাট সংখ্যক সামাজিক গোষ্ঠী ধরিত্রী সপ্তাহ উদ্‌যাপন করে, বিশ্ব আজ যেসব পরিবেশগত বিষয়াদির সম্মুখীন হয় সেগুলো নিয়ে সারা সপ্তাহ জুড়ে নানা কার্যাবলি চলে। ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে ধরিত্রী দিবস সংঘটিত হয়েছিল বিজ্ঞানের জন্যে পদযাত্রা (২২ এপ্রিল, ২০১৭) এবং এর অনুসরণে মানুষের আবহাওয়া সরলীকরণ হয়েছিল (২৯ এপ্রিল, ২০১৭)।
(সূত্র : উইকিপিডিয়া)


* * *

উফ্ কি গরম! বলে হা-হুতাশ করে লাভ নেই, অহঙ্কারের দেমাকে বেঁচে থাকার আশ্রয় পঞ্চ-মহাভুতকে যে-হারে অত্যাচার করে চলেছি, তার ফল তো ভুগতে হবেই।

যাকগে, আজ ২২শে এপ্রিল। আমাদের বসবাসপোযোগী এই পৃথিবী নামক সবুজ গ্রহটিকে তার স্বকীয়তায় সমৃদ্ধ রাখতে খ্রীস্টিয় ১৯৭০ সাল থেকে এই দিনটিকে বসুন্ধরা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
‘ধনধান্যে পুষ্পেভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’-র বাণীর স্রষ্টা কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রণাম নিবেদন করতেই হয় আজকের দিনটির স্মরণে। প্রণাম নিবেদন করতে হবে কবীন্দ্র রবীন্দ্রকে যিনি,
‘প্রথম প্রভাত উদয় তব গগনে,
প্রথম সাম রব তব তপোবনে,
প্রথম প্রচারিত তব বন-ভবনে
জ্ঞান-ধর্ম কত কাব্যকাহিনী…….’ বাণীর গাঁথায় বন্দনা করেছেন ভারত-জননীকে। প্রণাম জানাতে হবে সেই পরমপুরুষ অনুকূলচন্দ্রকে যিনি উপরোক্ত স্রষ্টাদের বাণীগুলোকে অমর করে রেখেছেন তাঁর আলোচনার ছত্রে ছত্রে। ‘পদ্ম আসন ধান ভরা ক্ষেত’, ‘আর্য্য ভারতবর্ষ আমার জ্ঞান-গরিমা-গরবিনী’ ইত্যাদি বাণীর সুর-ঝঙ্কারে বসুন্ধরাকে বন্দনা করেছেন।
* * *
মহাভারতের বনপর্বে বকরূপী ধর্ম যুধিষ্ঠিরকে অনেক প্রশ্নের মধ্যে একটা প্রশ্ন করেছিলেন, সব চাইতে আশ্চর্যের বিষয় কি ?
উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, মৃত্যু অবশ্যাম্ভাবী জেনেও মানুষ ন্যায়, নীতি, ধর্ম বিসর্জন দিয়ে চিরদিন বেঁচে থাকতে চায় এটাই সব চাইতে আশ্চর্যের বিষয় ।
তাই, আমরা, ঠাকুরের মানুষেরা যেন ওইসব পথের পথিক না হই । প্রবৃত্তিধর্মী অসৎ পথ অবলম্বন করে যদি চিরজীবি হওয়া যেত তাহলে না হয় অসৎ পথের আশ্রয় অবলম্বন করার সার্থকতা থাকত। তাই আমাদের বাঁচতে হবে পরমপিতার খুশির জন্য, মরতেও হবে পরমপিতার খুশির জন্য—মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার লক্ষ্যে, ‘তৃষ্ণার একান্ত নির্বান— মহাচেতন সমুত্থান।’ বাণীকে সম্মান জানাতে।
* * ‌*
‘ভয়’ আমাদের জৈবিক তাড়নার একটা অঙ্গ। নির্দিষ্ট অপরাধবোধ ছাড়াও দুর্বলতাজনিত উৎকণ্ঠার ভয়, আগন্তুক ভয়, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভয় মনের পিছু ছাড়ে না । সব ভয়ের চরম মৃত্যুভয় । একটু অভ্যাস করলেই অন্তর্যামী স্বরূপ পরমাত্মিক শক্তির সাহায্যে আধিভৌতিক, আধিদৈবিক, আধ্যাত্মিক ত্রিবিধ ভয় থেকে মানুষ মুক্ত হতে পারে । এজন্য প্রবৃত্তি অভিভূতির সব দুর্বলতা কাটিয়ে ইষ্টকর্মে নিয়োজিত থাকতে হবে । তাই তো ঠাকুর আমাদের সব ভয় থেকে মুক্তি দিতে বাণী দিলেন ।–
“সব প্রবৃত্তি রত থাকে
ইষ্টকর্ম লয়ে,
সেই তো যোগী, সেই সন্ন্যাসী,
কাল নত যার ভয়ে ।”
“He will stand like a tower when everything rocks around him and when his softer fellow- mortals are winnowed like chaff in the blust.”
(আঃ প্রঃ ২/৭৫)
(যখন সবকিছুর অস্তিত্ব টলায়মান হয়ে উঠবে, এবং শক্তিহীন নির্জীব লোকগুলি ঝড়ের আগে তুষের মত উড়ে যাবে, তখন সে একটা স্তম্ভের মত নিজের শক্তিতে অটল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে ।)
জীবের জীবনবৃদ্ধির অপলাপকারী মৃত্যুকে প্রণাম জানিয়ে, মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার এই পথকে আঁকড়ে আমরা যেন অনন্ত জীবনের অধিকারী হতে পারি । দৈব দুর্বিপাক ভূমিকম্পে ভীত না হয়ে আমরা সকলে যেন মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার সাধনা ইষ্টনাম এবং ইষ্টকর্মে মত্ত থাকি, পড়শিদের, পারিপার্শ্বিকদের, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আক্রান্তদের সহায় হয়ে,—মৌখিক স্তুতি, আত্মার শান্তি কামনার পাশাপাশি বাস্তব কর্মের মাধ্যমে । পরমপিতার অনুশাসনকে সহায় করে বিশ্ব প্রকৃতিকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সব্বাইকে।
বিশ্ব-প্রকৃতির পরম দান, পঞ্চ-মহাভূত—ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-এর অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই পৃথিবী নামক সবুজ গ্রহটি। নগর-সভ্যতার ধারক-বাহকেরা আসুরিক ক্ষমতার বলে, ভোগবাদের ছাড়পত্রের বলে, আদর্শহীনতার বলে ভারতীয় ধর্মের অঙ্গীভূত পঞ্চ-মহাযজ্ঞ, সদাচার এবং বর্ণাশ্রমকে বিদায় জানিয়ে বসুন্ধরার পরিবেশকে যে ধ্বংসাত্মক পথে এগিয়ে দিয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘নাসা’-র গবেষণা। উদ্বেগ প্রকাশ করে গিয়েছিলেন কবিগুরু, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর’-এর প্রতিবাদী বাণীতে।
ভারতবর্ষের বৃহত্তম নদী গঙ্গাকে আমরা মা বলি, যাঁর পূত স্রোতধারায় স্নাত হয়ে পবিত্র হই, সেই মায়ের শরীরে নগর-সভ্যতার পুর-বিভাগ যখন পরিকল্পিতভাবে পূতিগন্ধ ক্লেদ নিক্ষেপ করে, ধর্মের ধ্বজাধারীরা তথাকথিত পূজা-পার্বনের বর্জ্য নিক্ষেপ করে পুণ্য অর্জন করে, তখন মনে হয় না যে আমরা কোন উন্নত সভ্যতার সভ্য, প্রগতি বাদের বাদী, আর্য্য সংস্কৃতির ধারক বাহক ধার্মিক।
পরিবেশ সম্বর্দ্ধনার সেই পরম অনুশীলন কি ভাবে বিকৃত হয়েছে সে বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই। বরং বসুন্ধরার পরিবেশকে রক্ষা করার ব্রতে কিভাবে ব্রতী হওয়া যায় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের উপদেশ মেনে আমাদের প্লাস্টিক-সভ্যতার কর্ণধারেরা যাতে পরিবেশ বান্ধবের ভূমিকা গ্রহণ করেন। রাষ্ট্র নায়কেরা যাতে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, ভূমিদূষণ, ভূ-স্তরদূষণ, জলদূষণ প্রতিরোধ করে গ্লোবাল-ওয়ার্মিং বা বিশ্ব-উষ্ণায়ন-ভ্রূকুটি থেকে সভ্যতাকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হন, সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে, জনমত গঠন করতে হবে, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের লাগামহীন ভোগের চাহিদা মেটাতে যে হারে ভূ-গর্ভস্থ তেল, গ্যাস, কয়লা, বিবিধ আকরিক উত্তোলন করতে গিয়ে ভূ-স্তরের অবক্ষয়কে আহ্বান করে চলেছি, ধ্বংস করে চলেছি ‘রেন ফরেস্ট’কে। এর বিরুদ্ধে সরব না হলে কোন মূল্যেই বাঁচানো যাবে না মানব সভ্যতাকে!
আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর পূর্বে পরম বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরব হয়েছিলেন এই ভয়াবহ পরিস্থিতি প্রতিরোধ মানসে। বিজ্ঞান-সাধক শ্যামাচরণ মুখোপাধ্যায়, পদার্থবিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য প্রমুখ ভক্তদের উৎসাহ দিয়ে হিমাইতপুরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র। বিজ্ঞান-বিষয়ক অত্যাশ্চর্য্য বহুকিছুর সাথে সন্ধান দিয়েছিলেন সহজলভ্য আবহাওয়া বিদ্যুতের। কৃত্রিম মেঘের সাহায্যে বৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করার সহজ পদ্ধতির কথা বলেছিলেন। ভূ-গর্ভস্থ প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন পরবর্তী শূন্যগর্ভ অবস্থাকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে কিভাবে পুণঃ-পূর্ণকরণ বা রিফিলিং করলে ভূ-স্তরের ক্ষতি হবে না সে বিষয়েও তিনি বলে গেছেন। তাঁর প্রদত্ত ওইসব ফরমূলাকে বাস্তবায়িত করতে পারলে ভূ-স্তরকে বিনষ্ট না করে, পরিবেশকে দূষিত না করেই প্রাকৃতিক দৌ-শক্তিকে কাজে লাগিয়ে শক্তি-সম্পদে সমৃদ্ধ হতে পারত আমাদের সভ্যতা।
আমরা জানি, ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। আমাদের অস্তিত্বের ধারক, পালক-পোষক পরমাপ্রকৃতির পঞ্চ-মহাভূত। উক্ত পঞ্চ-মহাভূতের অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই বসুন্ধরা—নীল-সবুজ গ্রহ। ধারণ করতে হবে ওই প্রাকৃতিক উপাদানসমূহকে, ওঁদের বিনাশ করলে আমরাও বিনাশ হবো। নচেৎ বিশুদ্ধ জলের বোতলের মত অক্সিজেন সিলিণ্ডার পিঠে বয়ে ঘুরতে হবে একদিন নিকট ভবিষ্যতে।
পল-বিপল, দণ্ড-প্রহর, অহোরাত্র, আহ্নিকগতি, বার্ষিকগতির দিনরাত, মাস, বছর হয়েই চলেছে আদিকাল থেকে, প্রাকৃতিক নিয়মে।দিন-মাস-বছর আসে যায়, রেখে যায় কিছু স্মৃতি মনের মণিকোঠায়। ওই স্মৃতির মালাগুলোকে স্মৃতিবাহীচেতনার ভল্টে অনন্তকাল জমা করে রাখার জন্য আর্য্য-ঋষিরা প্রতিটি মুহূর্তের জীবন ধারণের আহরণ শুদ্ধির মাধ্যমে ধ্রুবাস্মৃতির সন্ধান দিয়ে গেছেন ‘‘আহারশুদ্ধৌ সত্তাশুদ্ধি, সত্তাশুদ্ধৌ ধ্রুবাস্মৃতি’’ মন্ত্রে । শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র স্বস্ত্যয়ণী ব্রতের ‘নিয়তং স্মৃতিচিদয়ুতে’ মন্ত্রে য়াকে সমৃদ্ধ করেছেন। য়ে মুহূর্ত চলে যাবে তা আর ফিরে আসবে না। চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা সমৃদ্ধ সবুজ গ্রহ পৃথিবীর প্রতিটি মুহূর্তকেই যাতে চিরনবীনতায় আস্বাদন করতে পারি, উপভোগ করতে পারি সেজন্যই আর্য্য সভ্যতার ঊষা লগনে পরমপিতার প্রতিভূ আর্য্য ঋষিগণ ‘‘মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ……..’’ মন্ত্রে বন্দনা করে বসুন্ধরার মধুময় পরিবেশকে রক্ষা অর্থাৎ পূজা করতে শিখিয়েছিলেন। পূজা শব্দের অর্থ পূরণ করা, সম্বর্দ্ধনা, সম্যকভাবে বর্দ্ধনার লক্ষ্যে এগিয়ে চলা। যেমন-যেমন আচরণে, পরিবেশের অজৈব উপাদানসমূহকে রক্ষা করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া যায় তাই ছিল আর্য্য ভারতের পূজা, যজ্ঞ, হোম, উৎসবের তাৎপর্য্য।
আমরা যে ৩৩ কোটি দেবতার কথা শুনেছি সে সংখ্যাটা ৩৩,০০০০০০০ নয়, শুধুই ৩৩। কোটি অর্থে (piece) বোঝান হয়েছে, যথা, জীবকোটি, ঈশ্বরকোটি একক অর্থে ব্যবহৃত হয়।
বাস্তবে আমাদের এই সবুজ গ্রহের জীবকূলের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জৈবাজৈব রসদের যোগানদাতার মূল মালিক সূর্য। সূর্যর আর এক নাম আদিত্য। আদিত্য মানে দেবতা। দেদীপ্যমান যা তাকে দেবতা বলে। দেবতা মানে দ্যুতি বিশিষ্ট সত্তা। সব দেবতাই মূলতঃ পরব্রহ্মের প্রতীক। যেমন পৃথিবীর অধিপতি অগ্নি, অন্তরীক্ষে ইন্দ্র বা বায়ু ও দ্যুলোকে সূর্য। পৃথিবী, অন্তরীক্ষ এবং দ্যুলোক-এর প্রতিটি স্থানে ১১টি করে বেঁচে থাকার আবশ্যিক উপাদান সরবরাহকারী দেদীপ্যমান উৎস রয়েছে। উক্ত ৩৩টি জীবনীয় উৎস-সমূহকে দেবতা বলা হয়েছে উপনিষদে।
বৃহদারণ্যক উপনিষদ (৩য় অধ্যায়, ৯ম ব্রাহ্মণ)-এর ঋষি শাকল্য, ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য সমীপে দেবতার সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি অষ্টবসু, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্যাদি ৩১ সংখ্যক দ্যুতিবিশিষ্ট প্রাকৃতিক সত্তা এবং ইন্দ্র ও প্রজাপতি মিলিয়ে ৩৩ সংখ্যক দেবতার উল্লেখ করেছিলেন। ওই ৩৩ কোটি (33 pieces) দেদীপ্যমান উৎসসমূহকে রক্ষা করার প্রশ্নে আমরা প্রবৃত্তি পরবশ হয়ে যাতে দুর্বৃত্ত না হই তারজন্য উপনিষদের ঋষিগণ ‘আত্মানং বিদ্ধি’-র শপথ বাক্যের পাঠ দিলেন।—পরমপিতার সন্তান তুমি, নিজেকে জানো, নিজের প্রতিরূপ মনে করে পরিবেশকে বাঁচাও, নিজে বাঁচ। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’—জীবনবিধ্বংসী আচরণ ত্যাগ করে জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলো। ‘মা গৃধ’—লোভ করো না। সদাচার এবং বর্ণাশ্রম মেনে চলো। পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে নিজে সমৃদ্ধ হও। এই ছিল ভারতবর্ষের বিধি-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠনের, ধর্মের, পূজার, উৎসবের বাস্তব রূপ। ওই হৃত-গৌরব যুগোপযোগী করে পুণঃ-প্রতিষ্ঠিত করে গেলেন সব দেবতার সমাহারের প্রতীকস্বরূপ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। যার প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয় তাঁর প্রদত্ত ‘আর্য্য সন্ধ্যা’ প্রার্থনা মন্ত্রে।
আমরা, ভারত রাষ্ট্রের অধিবাসীরা ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের পবিত্র মন্ত্র মূণ্ডকোপনিষদের ‘সত্যমেব জয়তে’-র মধ্যে নিহিত সত্যের সন্ধান করার চেষ্টা না করে, ‘মেরা ভারত মহান’ মন্ত্রের ধ্বজাধারীরা ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টি রক্ষার পবিত্র কর্তব্য ভুলে, ধর্মের নামে কতগুলো কু-সংস্কারে, আর বিজ্ঞানের নামে ভোগবাদে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছি। অথচ বিশ্বের পরিবেশ বিজ্ঞানীরা প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে, ভারতীয় পঞ্চ-মহাযজ্ঞের বিধানকে, সমাজ বিজ্ঞানীরা সমাজ-বন্ধনের দৃঢ়তার অবক্ষয় রোধে, শ্রেণী-বিন্যস্ত বর্ণাশ্রমানুগ সমাজ ব্যবস্থার বিধানকে এবং প্রজনন বিজ্ঞানীরা সুস্থ মানবজাতি গঠনের জন্য সুবিবাহ ও সুপ্রজনন বিধিকে মেনে চলতে পরামর্শ দিয়েছেন।
বেদ-উপনিষদ-গীতা. ঋষি এবং মহাপুরুষদের নিদেশে কোথাও প্রচলিত পূজার নামে, অনিত্য বস্তুর উপাসনার নামে, হৈ-হুল্লোর করে পরিবেশ দূষণ করার অনুমোদন নেই। ব্যক্তি চরিত্র গঠনের নিমিত্ত সাধন-ভজন-আরাধনা বাদ দিয়ে যে তন্ত্রমতে আমরা পরিবেশ দূষণ করতে প্রতিমা পূজায় মেতে উঠি, সেই তন্ত্র-ই প্রতিমা পূজাকে ‘‘বাহ্যপূজা অধমাধম’’ বলে বর্ণনা করেছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও, ‘‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’’ ছন্দের ডালিতে প্রতিমা পূজার অসারতার বার্তা রেখে গেছেন।
বসুন্ধরার পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, এক বিপ্লব নিয়ে এলেন। ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে, ধর্ম বলে জানিস তাকে। বাঁচা-বাড়ার মর্ম যা, ঠিকই জানিস ধর্ম তা। Upholding urge of existence is Dharma.’……..ইত্যাদি বাণীর মাধ্যমে। অতএব, চাঁদার জুলুম, ফুল, বেলপাতা, ধূপহীন ধূপকাঠি, নৈবেদ্য, দশ-(অ)কর্মার ফর্দ, ঢাক, ঢোল, বাজি, হৈ-হুল্লোর, তার শব্দে মাইকের ডালি দিয়ে নয়— তোমাকে ধার্মিক হতে হলে আগে পরিবেশকে বাঁচাতে হবে। সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বাস্তব কর্মে ব্রতী হতে হবে। পরিবেশ হিতৈষী হতে হবে, তবেই তুমি ভারতীয় মতের ‘ধার্মিক’ অভিধায় ভূষিত হতে পারবে।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের অনুগামীদের নিত্য ইষ্টভৃতি করতে হয়। ইষ্টভৃতি মানে ইষ্ট কর্মের ভরণ। ইষ্টকর্ম মানে পূর্ত্তকর্ম—পরিবেশের উপাদানকে,পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখার বাস্তব কর্ম। যা প্রকৃত ইষ্টভৃতির মন্ত্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ ।” এর সরলার্থ খুব সহজ। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুযায়ী সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন বর্দ্ধনার বিধি মেনে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে চলেন যিনি, এমন গুরুভাই-ই প্রকৃত ইষ্টভ্রাতা।–যাঁর আপদে-বিপদে সাধ্যানুগ সাহায্য করতে হবে। ভূত মানে,–ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা পরিবেশের অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। সেগুলোকে প্রাণ পণ করে রক্ষা করতে হবে। প্রতিনিয়ত এই শপথ মেনে চলার নাম ইষ্টভৃতি। অতএব প্রতিটি আমি যদি প্রকৃত ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের যাজ্ঞিক হবার শপথ পালন করতে পারি তাহলেই অনেকাংশে রক্ষা করা যাবে সুজলা-সুফলা-মলয়জ-শীতল বসুন্ধরার পরিবেশকে।
এ যুগের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমাদের সচেতন করে দিতে বাণী দিয়ে বললেনঃ
‘‘ইষ্টভরণ, পিতৃপোষণ,
পরিস্থিতির উন্নয়ন,
এ না করে, যাই না করিস
অধঃপাতেই তোর চলন।’’
ওই অধঃপতন থেকে মধুময় বসুন্ধরাকে রক্ষা করতে কৃপা পরবশ হয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর ‘পঞ্চবর্হি’ এবং ‘সপ্তার্চ্চি’ পালনের অনুশাসন দিলেন। দলীয় প্রীতির কবলে পড়ে মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার সেই অনুশাসন বিধিকে অবজ্ঞা করার স্পর্দ্ধা যেসব তথাকথিত সৎসঙ্গীরা দেখাচ্ছেন, তাদের অধঃপতনকে প্রতিরোধ করতে হলে, তাদেরও সামিল করতে হবে উক্ত ইষ্ট-ভরণের অনুশাসন পালনে। তা যদি না করি আমরাও কিন্তু বঞ্চিত হব ‘ইষ্ট ভরণের’ পবিত্র কর্ম থেকে।
জয়গুরু, বন্দে পুরুষোত্তমম্!
—————————————-© tapandasd. Contact : tapanspr@gmail.com

এত হিংসা কেন!

।। এত হিংসা কেন! ।।


অনেকদিন ধরেই চলছে—আন্তর্জাতিক স্তরের ক্ষমতার দম্ভের আগ্রাসন, দুর্বলের প্রতি অত্যাচার, নির্বিচারে হত্যালীলা মানবতাবাদের অপমৃত্যু। নতুন করে ইরান-ইস্রায়েলের-প্যালেস্টাইনী ইত্যাদিদের দ্বন্দ্বযুদ্ধ— যা মানব সভ্যতার সঙ্কট!

প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের নব্য স্বাধীনতাকামী সন্ত্রাসীরা ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে হিন্দুদের উপাসনা-স্থলে, বাড়িতে আগুন দিয়ে, লুঠ করে, নারীদের নির্যাতন করে, হত্যা করে যে সন্ত্রাস চালাচ্ছে, আন্তর্জাতিক স্তরে কিছু প্রতিবাদ হলেও প্রতিরোধের সূত্র অধরাই রয়ে গেছে।
আমাদের রাজ্যের ভোট পরবর্তী রাজনৈতিক হিংসা,
নারী-নির্যাতন, মৃত্যু—- কতটা বোধ-বিপর্য্যয় হলে “পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যার” পবিত্র নীতিকে পাশ কাটিয়ে নীতিহীন রাজনীতির ক্ষমতা দখলে রাখার জন্য বিরোধী মতবাদীদের হত্যা পর্যন্ত করতে পারে!
যা’ সংশ্লিষ্ট “সত্যমেব জয়তে” সম্বলিত সীলমোহরের আধিকারিকদের পরিহাস করে যেন বলতে চাইছে, তোমরা কতখানি সৎ তোমাদের বিবেকের কাছে একবার জিগ্যেস করে দেখো তো! !!!!!!!!!!!! ?????????

——আর-জি-কর, পটাশপুর, কুলতলি, কৃষ্ণনগর ইত্যাদি ইত্যাদি…….সব কিছু ছাপিয়ে শীর্ষে স্থান করে নিয়েছে ওয়াক্ফ আন্দোলনের নামে মুর্শিদাবাদে ঘটে যাওয়া বর্বর-হিংসার প্রদর্শন!
টিভির পর্দার মাধ্যমে ওইসব মর্মস্পর্শী বিকৃতকাম, হিংসা, মৃত্যুর ছায়াচিত্র/সংবাদ আমাদের প্রাণে এক বোবা ব্যথা দিয়ে চলেছে, আমরা যারা বর্তমান যুগ-বিধায়ক পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সত্যানুসরণের অনুশাসন— “যতদিন তোমার শরীর ও মনে ব্যথা লাগে, ততদিন তুমি একটি পিপীলিকারও ব্যথা নিরাকরণের দিকে চেষ্টা রেখো, আর তা’ যদি না কর, তবে তোমার চাইতে হীন আর কে?”—পাঠ করি! ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে, বাংলাভাষায় রচিত বিখ্যাত গানের কলি, “মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য” নস্টালজিয়ার সিড়ি বেয়ে যাঁদের স্মৃতি অধিকার করে আছে, সেইসব বুদ্ধিজীবিরা, সমাজ-বিজ্ঞানীরা, কি জবাব দেবেন?

দেশে তো আইনের শাসন রয়েছে, না নেই? যদি থেকেই থাকে, তাহলে প্রতিবাদের নামে স্থানে স্থানে অবরোধ করে, ধর্মীয় অঙ্গন তোড়ফোড়-ভাঙচুর করে, আগুন জ্বালিয়ে, পাথর ছুঁড়ে, মেরেধরে, জনজীবন বিপর্যস্ত করে, নিরীহ মানুষ হত্যা করে, জাতীয় সম্পত্তি বিনষ্ট করে, যে তাণ্ডব প্রদর্শন করা হয়ে থাকে তার অনুমোদন কারা দেয়? কোন সংবিধান, কোন নবী, কোন অবতার, কোন পুরুষোত্তম কি এই ধরণের হাঙ্গামা করতে নিদেশ দিয়েছেন? তাহলে
এত হিংসা কেন? প্রতিটি চিন্তাশীল মানুষের মননশীলতায় এই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। ওইসব হিংস্র আততায়ীরা যদি উপযুক্ত শাস্তি না পায় তাহলে অদূর ভবিষ্যতে শান্তি ও স্বস্তির জীবনযাত্রা এভাবে ব্যাহত হতেই থাকবে, মনুষ্যত্বের মূল বুনিয়াদ বিলুপ্ত হতে থাকবে! বুদ্ধিজীবিগণ, সমাজবিজ্ঞানীরা, মনোবিদেরা এর কি ব্যাখ্যা দেবেন জানিনা, তবে যুগত্রাতা বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র হিংসার কারণ প্রসঙ্গে বলছেন, “অহঙ্কার আসক্তি এনে দেয় ; আসক্তি এনে দেয় স্বার্থবুদ্ধি ; স্বার্থবুদ্ধি আনে কাম ; কাম হতেই ক্রোধের উৎপত্তি ; আর, ক্রোধ থেকেই আসে হিংসা।’’ তাহলে বোঝা গেল, হিংসার মূল কারণ অহঙ্কার। অহঙ্কারের উৎপত্তি প্রবৃত্তি-পরায়ণতা থেকে। আর সেই প্রবৃত্তি-পরায়ণতার চালক লোভ, কাম, ক্রোধ, মদ, মোহ ও মাৎসর্য্য নামের ষড়রিপু, দেহরথের ৬টা ঘোড়ার লাগাম, দেহরথের সারথী ইষ্টগুরুর হাতে সঁপে দিতে পারলে একেবারে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। আর সেই ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন দিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। আমি অক্রোধী, আমি অমানী, আমি নিরলস ... ইত্যাদি মন্ত্রে আত্ম নিয়ন্ত্রণ করে, “স্বতঃ-অনুজ্ঞা”-র নিত্য অনুশীলনের বিধানের মাধ্যমে। হিংসাকে প্রতিরোধ করার জন্য এর চাইতে উপযুক্ত কোন নিদান আছে কি-না আমার জানা নেই।

অথচ আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা যুগ-বিধায়কের “প্রাচ্য-প্রতীচ্য নিয়ন্ত্রণে বর্ণাশ্রমানুশাসকম্ আর্য্য চিরায়নম্।” মন্ত্রের অমোঘ বিধানকে পাশ কাটিয়ে হিংসার প্রতিবিধানের জন্য থানা, পুলিশ, মিলিটারী, কোর্ট, সংশোধনাগার প্রভৃতির ব্যবস্থা করেও হিংসা দমন করতে পারছে না। তাই যদি পারত নির্বাচনের ন্যায় একটা সরল প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আমাদের হিংসা এবং হিংসার পরিণতি মৃত্যুর মিছিল দেখতে হতো না। এ কেমন রাজনীতি? ছিঃ!
যুগ-বিধায়ক বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বিধান অনুযায়ী হিংসাকে দূর করতে হলে ভক্তির চাষ দিতে হবে। ভক্তির সংজ্ঞায় তিনি বলছেন, ‘‘সৎ-এ নিরবচ্ছিন্ন সংলগ্ন থাকার চেষ্টাকেই ভক্তি বলে।’’ তাহলে সৎ-এ নিরবচ্ছিন্ন সংলগ্ন থাকার চেষ্টা করার জন্য ভাবী পিতামাতাকে সদগুরুর আদর্শ গ্রহণ করতে হবে। তারপর পরমপিতা প্রদত্ত দিব্য বিবাহ-সংস্কারে সংস্কৃত হয়ে শুদ্ধাত্মাকে আকর্ষণ করে প্রহ্লাদের ন্যায় দিব্য ভক্ত সন্তানের জন্ম দিতে হবে। ভারতের নিজস্ব সংবিধান কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে এর সমর্থন আছে। বর্তমানের চিকিৎসা বিজ্ঞানও এর সমর্থন করেছে। সুস্থ দম্পতির সুস্থ দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে সুস্থ মানবের জন্ম দেওয়ার বিধান দিয়ে। এ ব্যতীত জন্মগত দুরারোগ্য শারিরীক এবং মানসিক ব্যাধি প্রতিরোধের অন্য কোন চিকিৎসা নেই। (Ref. DAVIDSON’S PRACTICE OF MEDICINE/Genetic Factor of Disease)
রাষ্ট্রের অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার বোর্ডের কর্ণধারেরা বিশ্বস্ত, সুস্থ পে-ডিগ্রীড কুকুরের, ঘোড়ার জন্ম নিয়ে গবেষণা করলেও মানুষের বেলায় উদাসীন। একুশ বছরের ছেলে আর আঠারো বছরের মেয়ে হলেই হলো। বংশ, বর্ণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা—কোন কিছুই না দেখে স্পেশ্যাল ম্যারেজ অ্যাক্টের সাহায্যে বিয়ে করতে পারবে, আবার বনিবনা না হলে ডিভোর্সও করতে পারবে! এখন তো আবার বিয়ে না করেও লিভ-টুগেদার আইনের সাহায্যে সন্তানের মা হতে পারা যায়। যার দৃষ্টান্ত লোকসভার সদস্যা নুসরত জাহান। রাষ্ট্রের জন-প্রতিনিধিরা যদি সুস্থ দাম্পত্যের প্রজনন বিজ্ঞানকে অসম্মান করতে পারেন, সেখানে সাধারণ নাগরিকগণ আরো বেশি সুযোগ পেয়ে যাবে লাগামহীন যৌন-জীবন যাপন করার! পরমপিতার অশেষ করুণায় আমাদের গ্রামীন ভারতবর্ষের তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষগুলো এখনো কোন-না-কোনভাবে ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা, পিতামাতায় ভক্তি রেখে বিবাহ সংস্কারের অনুশাসন মেনে চলছে বলে প্রিয়জনের দ্বারা প্রিয়জনদের হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা সমাজে বিস্তার লাভ করতে পারছে না। তবে, রাষ্ট্র ব্যবস্থা যদি এখনই ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুরুত্ব না দেয়, স্বভাববিধ্বংসী প্রতিলোম জাতকদের জন্ম বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাহলে অচিরেই হিংসা আমন্ত্রিত হবে ঘরে ঘরে! হিংসা প্রতিরোধের জন্য যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র একেবারে সমস্যার মূলে হাত দিয়ে বললেন, “ভক্তি এনে দেয় জ্ঞান ; জ্ঞানেই সর্বভূতে আত্মবোধ হয় ; সর্বভূতে আত্মবোধ হলেই আসে অহিংসা ; আর, অহিংসা হতেই প্রেম। তুমি যতটুকু যে-কোন একটির অধিকারী হবে, ততটুকু সমস্তগুলির অধিকারী হবে।’’ একেবারে অঙ্কের হিসেব। আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি-ইচ্ছার ‘ছোট-আমি’-টার অহঙ্কারের লাগামটাকে যদি ভক্তির মুঠো দিয়ে কষে না ধরা যায় তাহলে ধাপে-ধাপে হিংসার আশ্রয়ে পৌঁছে যাবে। যার পরিণতি অস্বাভাবিক মৃত্যু। আর যদি জীবন নামক রথের চালক ছ’-টা ঘোড়ার (ষড়রিপু) লাগাম জীবন-রথের সারথি স্বরূপ ইষ্টগুরুর হাতে সমর্পণ করা যায়, তাহলে, সরল প্রাণ, মধুর বচন, আর বুকভরা প্রেমের ডালি দিয়ে সবাইকে আপন করে নেওয়া যায়। একটা পিপীলিকারও ব্যথা নিরাকরণের জন্য প্রাণ কাঁদে। আবার যে হিংসা মৃত্যুর দ্যোতক তাকে শক্ত হাতে দমন করতে হলে হিংসা দিয়েই করতে হবে। হিংসাকে হিংসা দ্বারা জয় করার নাম অহিংসা। যেমন দুষ্টক্ষত বা গ্যাংগ্রীন থেকে শরীরকে বাঁচাতে হলে আক্রান্ত অংশটিকে কেটে বাদ দিতে হয়। বাদ না দিলে দেহকে বাঁচান যায় না। তেমনি সমাজ রক্ষা, রাষ্ট্র রক্ষা করতে হলে অনুরূপ নীতির অনুসরণ না করতে পারলে সমাজ-রাষ্ট্রের অঙ্গে পচন ধরে যাবে, রাষ্ট্রের সত্তাটাই মারা পড়বে। আর্য্য ভারতের মা কালী শুম্ভ-নিশুম্ভকে, মা দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে, শ্রীরামচন্দ্র রাবনকে বধ করে ওই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। অযথা কাউকে হত্যা করেন নি। অযথা কাউকে হত্যা না করে পার্থসারথি শ্রীকৃষ্ণ মামা কংসের পাঠান অসুর-রাক্ষস নামক সত্তাহিংস জিঘাংসা বৃত্তিধারীদের হত্যা করেছিলেন। অপকৌশলী অসৎ সাম্রাজ্যবাদী কংসকে হত্যা করে, উগ্রসেনকে কারাগার থেকে মুক্ত করে তাঁকে পুণরায় রাজ্যে অভিষিক্ত করেছিলেন। ধর্মপথভ্রষ্ট অসৎ আগ্রাসনী জরাসন্ধকে হত্যা করে জরাসন্ধের পুত্র সহদেবকে রাজ্যে আভিষিক্ত করিয়েছিলেন। সব হিংসার মূল উৎপাটন করে, এক পরম রাষ্ট্রীক সমবায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধ সংগঠিত করে জীবনবাদের জয়গান গেয়েছিলেন। ভবিষ্যত প্রজন্মকে জীবনবাদী হবার জন্য উপহার দিয়ে গেলেন শ্রীমদ্ভবদ্গীতা। আমাদের রাষ্ট্রীয় স্তোস্ত্র “বন্দে মাতরম্” ধ্বনির উৎস শ্রীমদ্ভবদ্গীতা। একদা শ্রীমদ্ভবদ্গীতা গ্রন্থকে আদর্শ মেনে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছিল। সেসব মহান ইতিহাস ভুলে গণতান্ত্রিক পথে রাজনীতি করতে গিয়ে হিংসাশ্রয়ী হয়ে আমরা যদি ভারতমাতার সন্তানদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলি, ভারতমাতা সেই অপমান কতদিন মুখ বুঁজে সহ্য করবেন? আমরা আবার গীতা গ্রন্থের স্রষ্টা পার্থসারথী শ্রীকৃষ্ণের আশ্রয়ে ফিরে যাব। শ্রীকৃষ্ণ পরবর্তী বহির্ভারতের বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীষ্ট, হজরত রসুল প্রমুখ পুরুষোত্তমগণও আর্য্য ভারতীয় ওই শ্বাশ্বত নীতির অনুসরণ করেছেন মানব সভ্যতাকে বাঁচাতে। তাঁরা আগ্রাসন করতে, ধর্মান্তকরণ করতে, অযথা কাউকে হিংসা করতে কোথাও কি বলেছেন? তবে কেন এত হিংসা? কেন এত জিঘাংসা? ওই হিংস্র জিঘাংসাকে যদি কঠোর হাতে দমন করতে এগিয়ে না আসেন জীবনপিয়াসী শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তথা রাষ্ট্র নায়কেরা, তাহলে মানবতার অপমৃত্যুর কালো ছায়া মানব সভ্যতার অঙ্গে ক্রমে ক্রমে গ্যাংগ্রীন উৎপাদন করবে নিকট ভবিষ্যতে। অসৎ নিরোধে তৎপর না হয়ে, অসৎকে প্রশ্রয় দিয়ে রাষ্ট্রের পবিত্র মন্ত্র “সত্যমেব জয়তে” সম্বলিত সীলমোহরের আধিকারিক হওয়াটা যেমন ভণ্ডামি, তেমনই অসৎ নিরোধে উদাসীন থেকে সৎসঙ্গী সেজে ভক্ত হওয়াটাও কিন্তু ভণ্ডামী! সকলের কথা বলতে পারব না, সেই দিক দিয়ে বিচার করতে গেলে আমি নিজে কিন্তু ভণ্ড। ভক্ত হতে গেলে ঠাকুরত্বকে জাগাতে হবে চরিত্রে। সেটা যখন জাগাতে ব্যর্থ হয়েছি, তাহলে আমি ভণ্ড ছাড়া আর কি! তাই ভণ্ডামি ত্যাগ করে আমাকেও গুটি কেটে খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে পড়তে হবে, পরিস্থিতিকে সামাল দিতে। পরিস্থিতিকে এড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারব না।

ইষ্টভরণ, পিতৃপোষণ
পরিস্থিতির উন্নয়ন,
এ না ক’রে যাই করিস্ না
অধঃপাতেই তোর চলন। ২ ।
(অনুশ্রুতি, ১ম খণ্ড)

ইষ্টপ্রোক্ত উদ্ধৃত বাণীর অধঃপতন থেকে ব্যক্তিসত্তাকে, সংঘ-সত্তাকে বাঁচাতে হলে অসৎ-নিরোধে তৎপর হতেই হবে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র “ব্যক্তি-দম্পতি-গৃহ-সমাজ-রাষ্ট্র উদ্ধার”-কল্পে, যজন-যাজন-ইষ্টভৃতি-স্বস্ত্যয়ণী প্রবর্তন করছেন। সেকথা বিস্মরণ হলে ইষ্টাদর্শের অপলাপ করা হবে। জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!

নিবেদনে—তপন দাস@tapanspr