পুরানো সেই দিনের কথা


।। ঋষি-কবি রবীন্দ্রনাথের শুভ জন্মদিন স্মরণে

শ্রদ্ধাঞ্জলি ।।

সৎসঙ্গের তৎকালিন সভাপতি ঋত্বিগাচার্য্য শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপ্রসন্ন

ভট্টাচার্য্য (এম. এ), শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের রচিত ‘সত্যানুসরণ’
পুস্তিকাটি নিয়ে একবার কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বইটির কিছুটা অংশ পাঠ করেই জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘ইহার
বয়স কত?’ ঋত্বিগাচার্য্য শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য তদুত্তরে
বলেছিলেন, ‘তাঁর বয়স বেশী নয়, মাত্র ২২ বছর’। পুস্তকখানার আরও কিয়দংশ
পাঠ করে কবিগুরু পুণরায় জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘কত বয়স বললে?’
ঋত্বিগাচার্য্য শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য পূর্বপ্রদত্ত
উত্তরেরই পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। পুস্তকের আরো কিয়দংশ পাঠ করে কবিগুরু
রবীন্দ্রনাথ আবার সেই একই প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কত বয়স বললে যেন?’
ঋত্বিগাচার্য্য শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য পুণরায় বলেছিলেন, ২২
বছর। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন,— ‘‘এত অল্প বয়সে এরূপ
স্বচ্ছ সাবলীল ছন্দে, অপরূপ ভঙ্গিতে, গভীর তত্ত্বসমূহের এমন অপূর্ব
প্রকাশ কি করিয়া সম্ভব হয়!’’ এর কিছুদিন পর সৎসঙ্গের তৎকালিন সহ-সভাপতি শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত

সুশীল চন্দ্র বসু (বি. এ.) কবিগুরুর সাক্ষাৎ করেন। কবিগুরু শ্রদ্ধেয়
শ্রীযুক্ত সুশীলচন্দ্রের সাথে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৎসঙ্গ
কর্মপ্রতিষ্ঠান সম্বন্ধে আগ্রহ সহকারে নানা আলাপ-আলোচনাদি করেছিলেন। সেই
সাক্ষাৎকারের কথা বিবৃত করে সুশীলচন্দ্র লিখেছেন— “একবার শান্তিনিকেতনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে

গিয়েছিলাম। নানা কথার পর শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ও তাঁর
কর্মপ্রতিষ্ঠান সম্বন্ধীয় আলোচনা প্রসঙ্গ উঠিতেই, তিনি বললেন, ‘আমি
শুনিয়াছি তোমরা কাজকর্ম খুব ভালই করিতেছ, তোমাদের কোন অভাব অভিযোগ নাই,
কিন্তু দেখ, আমার এই বৃদ্ধ বয়সে অপটু শরীর লইয়া ছেলে মেয়ে নাচাইয়া আমার
এই প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ সংগ্রহ করিতে হইতেছে!’ তাঁর কথা শুনে আমি
অবশ্যই খুব দুঃখবোধ করিয়াছিলাম, তাহাকে বলিলাম, ‘অন্যের নিকট হইতে একথা
শুনিলে বিস্মিত হইবার কোন কারণ ছিল না, কিন্তু আপনার নিকট হইতে শুনিয়া
বিস্ময় বোধ না করিয়া পারিতেছি না। আপনি নিজে এ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে
তুলিয়াছেন। কর্ম প্রতিষ্ঠান গড়িতে দেশের লোকের সক্রিয় সহানুভূতি কিরূপ
পাওয়া যায় তাহা আপনি বিলক্ষণ অবগত আছেন। আপনি ধনী পিতার সন্তান, আপনি
বিশ্বকবি, জগৎজোড়া আপনার খ্যাতি, তথাপি প্রতিষ্ঠানটিকে চালাইতে ছেলে মেয়ে
নাচাইয়া আপনাকে অর্থসংগ্রহ করিতে হইতেছে, বৃদ্ধ বয়সে এজন্য আপনার উদ্বেগ
ও উৎকন্ঠার সীমা নাই। আর আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রাণপুরুষ শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্র দরিদ্র ব্রাহ্মণের সন্তান। আপনার ন্যায় খ্যাতি প্রতিপত্তি
তো দূরের কথা, তিনি তাঁহার নিজের দেশবাসীর কাছেই এখনও একরূপ অপরিচিত।
এমতাবস্থায় আমাদের প্রতিষ্ঠানের কোন অভাব-অভিযোগ নাই, ইহা আপনি কিরূপে
অনুমান করিতে পারিলেন?’ আমার কথা শুনিয়া তিনি নিরুত্তর রহিলেন।
বস্তুত যাঁহারাই কোন কর্ম প্রতিষ্ঠান (বিশেষত অভিনব ধরণের ) গড়িয়া
তুলিয়াছেন তাহারাই জানেন যে, এই দেশে কোন প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিতে কি
পর্বতপ্রমাণ বাধাবিঘ্নের সম্মুখীন হইতে হয়।” (সূত্র : মানসতীর্থ
পরিক্রমা)
আজকের এই পুণ্যলগ্নে পরমপিতার রাতুল চরণে প্রার্থনা, শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্রের ঈপ্সিত ঋষিপ্রোক্ত ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টির সদাচার,
বর্ণাশ্রম এবং বিবাহবিধি মেনে আমাদের ঘরের মায়েরা যেন রবীন্দ্রনাথের
ন্যায় শুদ্ধাত্মাদের আবার ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। এই ধরাধামে। তবেই সার্থক
হবে আমাদের ‘রবীন্দ্র জয়ন্তী’ উৎসব পালন করা। সবাইকে আমার জয়গুরু ও

প্রণাম।

নিবেদনে—তপন দাস@tapandasd

।। কবিগুরুর ১৬৪তম শুভ জন্মদিন স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।

।। কবিগুরুর ১৬৪তম শুভ জন্মদিন স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।


পঁচিশে বৈশাখ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

“পঁচিশে বৈশাখ চলেছে
জন্মদিনের ধারাকে বহন ক’রে
মৃত্যুদিনের দিকে।
সেই চলতি আসনের উপর ব’সে কোন্‌ কারিগর গাঁথছে
ছোটো ছোটো জন্মমৃত্যুর সীমানায়
নানা রবীন্দ্রনাথের একখানা মালা ॥

রথে চড়ে চলেছে কাল;
পদাতিক পথিক চলতে চলতে পাত্র তুলে ধরে,
পায় কিছু পানীয়;
পান সারা হলে পিছিয়ে পড়ে অন্ধকারে;
চাকার তলায় ভাঙা পাত্র ধুলায় যায় গুঁড়িয়ে।
তার পিছনে পিছনে
নতুন পাত্র নিয়ে যে আসে ছুটে,
পায় নতুন রস,
একই তার নাম,
কিন্তু সে বুঝি আর-একজন ॥

একদিন ছিলেম বালক
কয়েকটি জন্মদিনের ছাঁদের মধ্যে
সেই-যে লোকটার মূর্তি হয়েছিল গড়া
তোমরা তাকে কেউ জান না।
সে সত্য ছিল যাদের জানার মধ্যে
কেউ নেই তারা।
সেই বালক না আছে আপন স্বরূপে,
না আছে কারো স্মৃতিতে।
সে গেছে চলে তার ছোটো সংসারটাকে নিয়ে;
তার সেদিনকার কান্নাহাসির
প্রতিধ্বনি আসে না কোনো হাওয়ায়।
তার ভাঙা খেলনার টুকরোগুলোও
দেখিনে ধুলোর ’পরে।
সেদিন জীবনের ছোটো গবাক্ষের কাছে
সে বসে থাকত বাইরের দিকে চেয়ে।
তার বিশ্ব ছিল
সেইটুকু ফাঁকের বেষ্টনীর মধ্যে।
তার অবোধ চোখ-মেলে-চাওয়া
ঠেকে যেত বাগানের পাঁচিলটাতে
সারি সারি নারকেল গাছে।
সন্ধ্যেবেলাটা রূপকথার রসে নিবিড়;
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝখানে
বেড়া ছিল না উঁচৃ,
মনটা এ দিক থেকে ও দিকে
ডিঙিয়ে যেত অনায়াসেই।
প্রদোষের আলো-আঁধারে
বস্তুর সঙ্গে ছায়াগুলো ছিল জড়িয়ে,
দুইই ছিল একগোত্রের।
সে কয় দিনের জন্মদিন একটা দ্বীপ,
কিছুকাল ছিল আলোতে,
কালসমুদ্রের তলায় গেছে ডুবে।
ভাঁটার সময় কখনো কখনো
দেখা যায় তার পাহাড়ের চূড়া,
দেখা যায় প্রবালের রক্তিম তটরেখা ॥

পঁচিশে বৈশাখ তার পরে দেখা দিল
আর-এক কালান্তরে,
ফাল্গুনের প্রত্যুষে
রঙিন আভার অস্পষ্টতায়।
তরুণ যৌবনের বাউল
সুর বেঁধে নিল আপন একতারাতে,
ডেকে বেড়ালো নিরুদ্দেশ মনের মানুষকে
অনির্দেশ্য বেদনার খ্যাপা সুরে।
সেই শুনে কোনো-কোনোদিন বা
বৈকুণ্ঠে লক্ষ্মীর আসন টলেছিল,
তিনি পাঠিয়ে দিয়েছেন
তাঁর কোনো-কোনো দূতীকে
পলাশবনের রঙ-মাতাল ছায়াপথে
কাজ-ভোলানো সকাল-বিকালে।
তখন কানে কানে মৃদু গলায় তাদের কথা শুনেছি,–
কিছু বুঝেছি, কিছু বুঝি নি।
দেখেছি কালো চোখের পক্ষ্ণরেখায় জলের আভাস;
দেখেছি কম্পিত অধরে নিমীলিত বাণীর বেদনা;
শুনেছি ক্বণিত কঙ্কণে চঞ্চল আগ্রহের চকিত ঝংকার।
তারা রেখে গেছে আমার অজানিতে
পঁচিশে বৈশাখের
প্রথম-ঘুম-ভাঙা প্রভাতে
নতুন ফোটা বেলফুলের মালা;
ভোরের স্বপ্ন
তারই গন্ধে ছিল বিহ্বল ॥

সেদিনকার জন্মদিনের কিশোরজগৎ
ছিল রূপকথার পাড়ার গায়ে-গায়েই,
জানা না-জানার সংশয়ে।
সেখানে রাজকন্যা আপন এলো চুলের আবরণে
কখনো বা ছিল ঘুমিয়ে,
কখনো বা জেগেছিল চমকে উঠে’
সোনার কাঠির পরশ লেগে ॥

দিন গেল।
সেই বসন্তী রঙের পঁচিশে বৈশাখের
রঙ-করা প্রাচীরগুলো পড়ল ভেঙে।
যে পথে বকুলবনের পাতার দোলনে
ছায়ায় লাগত কাঁপন,
হাওয়ায় জাগত মর্মর,
বিরহী কোকিলের কুহুরবের মিনতিতে
আতুর হত মধ্যাহ্ন,
মৌমাছির ডানায় লাগত গুঞ্জন
ফুলগন্ধের অদৃশ্য ইশারা বেয়ে,
সেই তৃণ-বিছানো বীথিকা
পৌঁছল এসে পাথরে-বাঁধানো রাজপথে।
সেদিনকার কিশোরক সুর সেধেছিল যে একতারায়
একে একে তাতে চড়িয়ে দিল তারের পর নতুন তার ॥

সেদিন পঁচিশে বৈশাখ
আমাকে আনল ডেকে
বন্ধুর পথ দিয়ে
তরঙ্গমন্দ্রিত জনসমুদ্রতীরে।
বেলা-অবেলায়
ধ্বনিতে ধ্বনিতে গেঁথে
জাল ফেলেছি মাঝ-দরিয়ায়–
কোনো মন দিয়েছে ধরা,
ছিন্ন জালের ভিতর থেকে কেউ বা গেছে পালিয়ে ॥

কখনো দিন এসেছে ম্লান হয়ে,
সাধনায় এসেছে নৈরাশ্য,
গ্লানিভারে নত হয়েছে মন।
এমন সময়ে অবসাদের অপরাহ্নে
অপ্রত্যাশিত পথে এসেছে
অমরাবতীর মর্ত্যপ্রতিমা–
সেবাকে তারা সুন্দর করে,
তপঃক্লান্তের জন্যে তারা
আনে সুধার পাত্র।
ভয়কে তারা অপমানিত করে
উল্লোল হাস্যের কলোচ্ছ্বাসে,
তারা জাগিয়ে তোলে দুঃসাহসের শিখা
ভস্মে-ঢাকা অঙ্গারের থেকে।
তারা আকাশবাণীকে ডেকে আনে প্রকাশের তপস্যায়।
তারা আমার নিবে-আসা দীপে জ্বালিয়ে গেছে শিখা,
শিথিল-হওয়া তারে বেঁধে দিয়েছে সুর–
পঁচিশে বৈশাখকে বরণমাল্য পরিয়েছে
আপন হাতে গেঁথে।
তাদের পরশমণির ছোঁওয়া
আজও আছে
আমার গানে, আমার বাণীতে ॥

সেদিন জীবনের রণক্ষেত্রে
দিকে দিকে জেগে উঠল সংগ্রামের সংঘাত
গুরু গুরু মেঘমন্দ্রে।
একতারা ফেলে দিয়ে
কখনো বা নিতে হল ভেরি।
খর মধ্যাহ্নের তাপে
ছুটতে হল
জয়পরাজয়ের আবর্তনের মধ্যে।
পায়ে বিঁধেছে কাঁটা,
ক্ষত বক্ষে পড়েছে রক্তধারা।
নির্মম কঠোরতা মেরেছে ঢেউ
আমার নৌকার ডাইনে বাঁয়ে,
জীবনের পণ্য চেয়েছে ডুবিয়ে দিতে
নিন্দার তলায়, পঙ্কের মধ্যে।
বিদ্বেষে অনুরাগে
ঈর্ষায় মৈত্রীতে
সংগীতে পরুষকোলাহলে
আলোড়িত
তপ্ত বাষ্পনিঃশ্বাসের মধ্য দিয়ে
আমার জগৎ গিয়েছে তার কক্ষপথে ॥

এই দুর্গমে, এই বিরোধসংক্ষোভের মধ্যে
পঁচিশে বৈশাখের প্রৌঢ় প্রহরে
তোমরা এসেছ আমার কাছে।
জেনেছ কি–
আমার প্রকাশে অনেক আছে অসমাপ্ত,
অনেক ছিন্নবিচ্ছিন্ন, অনেক উপেক্ষিত ?

অন্তরে বাহিরে সেই
ভালো-মন্দ স্পষ্ট-অস্পষ্ট খ্যাত-অখ্যাত
ব্যর্থ-চরিতার্থের জটিল সম্মিশ্রণের মধ্য থেকে
যে আমার মূর্তি
তোমাদের শ্রদ্ধায়, তোমাদের ভালোবাসায়,
তোমাদের ক্ষমায় আজ প্রতিফলিত–
আজ যার সামনে এনেছ তোমাদের মালা,
তাকেই আমার পঁচিশে বৈশাখের
শেষবেলাকার পরিচয় ব’লে
নিলেম স্বীকার ক’রে–
আর রেখে গেলেম তোমাদের জন্যে
আমার আশীর্বাদ।
যাবার সময় এই মানসী মূর্তি
রইল তোমাদের চিত্তে,
কালের হাতে রইল ব’লে করব না অহংকার ॥

তার পরে দাও আমাকে ছুটি
জীবনের কালো-সাদা সূত্রে-গাঁথা
সকল পরিচয়ের অন্তরালে,
নির্জন নামহীন নিভৃতে–
নানা সুরের নানা তারের যন্ত্রে
সুর মিলিয়ে নিতে দাও

এক চরম সংগীতের গভীরতায় ॥”

কৃতজ্ঞতা : রবীন্দ্রসঙ্গীত

।। দীঘায় জগন্নাথদেবের মন্দির ।।

আমরা যারপরনাই আনন্দিত! ১৪৩২ বঙ্গাব্দের শুভ অক্ষয় তৃতীয়ার দিনটি অক্ষয় হয়ে থাকবে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে।— কথিত আছে, যে দিনটিতে ব্যাসদেব ও গণেশদেব মিলে ভারতবর্ষের মহাকাব্য মহাভারত রচনা সুরু করেছিলেন।—আর সেই স্মরণীয় দিনটিতে রাজ্য সরকারের উদ্যোগে দীঘাতে, মহাভারতের কেন্দ্রীয় চরিত্র জগন্নাথ(শ্রীকৃষ্ণ)দেবের নামাঙ্কিত জগন্নাথ মন্দিরের বিগ্রহে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হবে।—যে রাজ্যে চিন্ময়ী সত্তাদের প্রাণগুলো নিরাপত্তা হীনতায় ভোগে, অকালে প্রাণহানি হয়, ভোট পরবর্তী হিংসায়, ধর্ষণে, হিন্দু হবার অপরাধে!—ইত্যাদি ইত্যাদিতে …….. । সেই রাজ্যে পুরুষোত্তম শ্রীজগন্নাথ (শ্রীকৃষ্ণ) দেবের নামাঙ্কিত মন্দির! সত্যিই এক আশার আলোর ঝল্কানি দেখতে পাচ্ছি। পার্থসারথী পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের “পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশয়চ দুষ্কৃতাম্।” আদর্শে বিশ্বাসী অনুগামীদের মিলনস্থলের কেন্দ্র স্বরূপ হবে এই জগন্নাথ মন্দির। অচেতন, পদার্থে নির্মিত মন্দির প্রাঙ্গনে সমবেত হবেন চেতনাসম্পন্ন মানুষেরা, সচ্চিদানন্দ-বিগ্রহের অধিকারী মানুষেরা তাদের দেহমনকে পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের পূত-পবিত্র শ্রীমদ্ভাবদ্গীতা গ্রন্থের আদর্শের অনুসরণে প্রবৃত্তিজাত লোভ-কাম-ক্রোধাদি ষড়রিপুকে বশ করে নিজ-নিজ দেহমন্দিরকে বিনির্মাণ করে সত্তাশ্রয়ী চলনে অভ্যস্ত হবেন। পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের ন্যায় অসৎনিরোধে তৎপর হবেন। আমরা, পশ্চিমবঙ্গবাসীরা, ন্যায়নীতির আদর্শবাহী শ্রীকৃষ্ণের আদর্শের রাজত্ব ফিরে না পেলেও, চিন্ময়ী সত্তার দেহ-মন্দিরগুলো এখন থেকে সুরক্ষা পাবে, সেই আশা তো করতে পারি। গভীর রাতেও সালঙ্কারা সুন্দরী রমণী নিরাপদে নি়জ-নিজ আশ্রয়ে ফিরতে পারবে। নারী-নির্যাতন হবে না, ধর্ষণ হবে না, ভোটে বুথ দখল হবে না, যার ভোট সে দিতে পারবেন, ভোট পরবর্তী হিংসা হবে না, কোন নির্দিষ্ট দলকে ভোট দেবার জন্য ঘরছাড়া হতে হবে না, ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হবে না, ধর্ষণ হবে না, খুন হবে না, বধ্যকে বধ না করে, অবধ্যকে বধ করা হবে না।—সত্যমেব জয়তে-এর সীলমোহরের অধিকারীরা আচার-আচরণ দিয়ে সত্যের প্রতিষ্ঠা করবে। কাট-মানি, চুরি, ঘুষ প্রভৃতি ঘৃণ্য সংস্কৃতির অবসান হবে। স্বচ্ছ প্রশাসন, স্বচ্ছ কর্ম-সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা পাবে। যোগ্য লোক, যোগ্য মর্যাদায়, যোগ্য পদে নিয়োগ হবে। নায্য অধিকার পেতে ধর্ণা-তলায় বছরের পর বছর প্রতীক্ষা করতে হবে না। কাউকে অধিকার ফিরে পেতে আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে না।—সত্যিই, কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে! এই শুভক্ষণে আমাদের শপথ নিতে হবে, আমরা যেন আচার-আচরণে আমাদের দেহ মন্দিরের শ্রীবিগ্রহ অন্তর্যামী অন্তর্দেবতা পুরুষোত্তমকে কলুষিত না করি।

।। বসুন্ধরা দিবসের ভাবনা ।।

** বসুন্ধরা দিবসের ভাবনা **

।। প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্য অবদান ।।

[ ধরিত্রী দিবস (বা বিশ্ব বসুন্ধরা দিবস) হলো পরিবেশ রক্ষার জন্য সমর্থন প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে প্রতি বছর ২২শে এপ্রিল পালিত একটি অনুষ্ঠান। ধরিত্রী শব্দটি এসেছে ধরণী বা ধরা থেকে, যার অর্থ হলো পৃথিবী। পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য সর্বসম্মতিক্রমে ধার্য করা একটি দিবসই হলো ধরিত্রী দিবস। সর্বপ্রথম ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে দিবসটি পালিত হয়, এবং বর্তমানে আর্থ ডে নেটওয়ার্ক কর্তৃক বিশ্বব্যাপী সমন্বিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়, এবং ১৯৩ সংখ্যারও অধিক দেশে প্রতি বছর পালন করা হয়ে থাকে।

ধরিত্রী দিবস
জন ম্যাককনেলের তৈরি অনানুষ্ঠানিক ধরিত্রী পতাকায় অ্যাপোলো ১৭-এর ক্রুদের তোলা ব্লু মার্বেল ছবিটি ব্যবহার করা হয়েছে
তাৎপর্য
পরিবেশ সুরক্ষায় সমর্থন
শুরু
১৯৭০
তারিখ
২২ এপ্রিল
সংঘটন
বার্ষিক
১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে মার্কিন সেনেটর গেলর্ড নেলসন ধরিত্রী দিবসের প্রচলন করেন। পৃথিবীর অনেক দেশেই সরকারিভাবে এই দিবস পালন করা হয়। উত্তর গোলার্ধের দেশগুলিতে বসন্তকালে আর দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলিতে শরতে ধরিত্রী দিবস পালিত হয়। এই দিবস ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয় এবং ১৪১ সংখ্যক জাতি দ্বারা আয়োজন করা হয়েছিল।একই ধরনের আরেকটি উৎসব হল বিশ্ব পরিবেশ দিবস। জাতিসংঘের উদ্যোগে ৫ জুন এটি বিশ্বের প্রায় সব দেশেই পালিত হয়।

২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের ধরিত্রী দিবসে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং অন্যান্য ১২০টি দেশ একটি দিকনির্দেশ প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। এই চুক্তি স্বাক্ষরের ফলস্বরূপ ঐতিহাসিক খসড়া আবহাওয়া রক্ষা চুক্তির একটা আসল প্রয়োজনীয় সক্রিয়তার মধ্যে প্রবেশ করতে স্বস্তি এসেছিল, যে সিদ্ধান্ত প্যারিসে ২০১৫ জাতি সংঘ আবহাওয়া পরিবর্তন সম্মেলন-এ উপস্থিত ১৯৫টা দেশের সম্মতিতে নেওয়া হয়েছিল।

১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে সানফ্রান্সিস্কোতে ইউনেস্কো সম্মেলনে শান্তি কর্মী জন ম্যাককনেল পৃথিবী মায়ের সম্মানে একটা দিন উৎসর্গ করতে প্রস্তাব করেন এবং শান্তির ধারণা থেকে, উত্তর গোলার্ধে বসন্তের প্রথম দিন হিসেবে ২১ মার্চ, ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম এই দিনটা উদযাপিত হয়। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এই দিনই পরে একটা পরিঘোষণায় অনুমোদিত হয়, যেটা লিখেছিলেন ম্যাককনেল এবং মহাসচিব উ থান্ট জাতি সংঘ সনদে স্বাক্ষর করেছিলেন। এক মাস পর একটা পরিবেশগত শিক্ষামূলক দিন হিসেবে একটা আলাদা ধরিত্রী দিবসের অবতারণা করেন যুক্তরাষ্ট্র সেনেটর গেলর্ড নেলসন, যেটা প্রথম সংঘটিত হয় ২২ এপ্রিল, ১৯৭০। এই নেলসন পরবর্তীকালে তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে প্রেসিডেন্সিয়াল মেডাল অফ ফ্রিডম পুরস্কারে পুরস্কৃত হন। যখন এই ২২ এপ্রিল ধরিত্রী দিবস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত, তখন ডেনিস হায়েস একটা সংগঠন চালু করেন, যিনি ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে আসল জাতীয় সমন্বয়সাধক ছিলেন; যেটা ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে আন্তর্জাতিক রূপ পেয়েছিল এবং ১৪১টা দেশে সংগঠিত ঘটনা হিসেবে দেখা দিয়েছিল।

এক বিরাট সংখ্যক সামাজিক গোষ্ঠী ধরিত্রী সপ্তাহ উদ্‌যাপন করে, বিশ্ব আজ যেসব পরিবেশগত বিষয়াদির সম্মুখীন হয় সেগুলো নিয়ে সারা সপ্তাহ জুড়ে নানা কার্যাবলি চলে। ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে ধরিত্রী দিবস সংঘটিত হয়েছিল বিজ্ঞানের জন্যে পদযাত্রা (২২ এপ্রিল, ২০১৭) এবং এর অনুসরণে মানুষের আবহাওয়া সরলীকরণ হয়েছিল (২৯ এপ্রিল, ২০১৭)।
(সূত্র : উইকিপিডিয়া)


* * *

উফ্ কি গরম! বলে হা-হুতাশ করে লাভ নেই, অহঙ্কারের দেমাকে বেঁচে থাকার আশ্রয় পঞ্চ-মহাভুতকে যে-হারে অত্যাচার করে চলেছি, তার ফল তো ভুগতে হবেই।

যাকগে, আজ ২২শে এপ্রিল। আমাদের বসবাসপোযোগী এই পৃথিবী নামক সবুজ গ্রহটিকে তার স্বকীয়তায় সমৃদ্ধ রাখতে খ্রীস্টিয় ১৯৭০ সাল থেকে এই দিনটিকে বসুন্ধরা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
‘ধনধান্যে পুষ্পেভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’-র বাণীর স্রষ্টা কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রণাম নিবেদন করতেই হয় আজকের দিনটির স্মরণে। প্রণাম নিবেদন করতে হবে কবীন্দ্র রবীন্দ্রকে যিনি,
‘প্রথম প্রভাত উদয় তব গগনে,
প্রথম সাম রব তব তপোবনে,
প্রথম প্রচারিত তব বন-ভবনে
জ্ঞান-ধর্ম কত কাব্যকাহিনী…….’ বাণীর গাঁথায় বন্দনা করেছেন ভারত-জননীকে। প্রণাম জানাতে হবে সেই পরমপুরুষ অনুকূলচন্দ্রকে যিনি উপরোক্ত স্রষ্টাদের বাণীগুলোকে অমর করে রেখেছেন তাঁর আলোচনার ছত্রে ছত্রে। ‘পদ্ম আসন ধান ভরা ক্ষেত’, ‘আর্য্য ভারতবর্ষ আমার জ্ঞান-গরিমা-গরবিনী’ ইত্যাদি বাণীর সুর-ঝঙ্কারে বসুন্ধরাকে বন্দনা করেছেন।
* * *
মহাভারতের বনপর্বে বকরূপী ধর্ম যুধিষ্ঠিরকে অনেক প্রশ্নের মধ্যে একটা প্রশ্ন করেছিলেন, সব চাইতে আশ্চর্যের বিষয় কি ?
উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, মৃত্যু অবশ্যাম্ভাবী জেনেও মানুষ ন্যায়, নীতি, ধর্ম বিসর্জন দিয়ে চিরদিন বেঁচে থাকতে চায় এটাই সব চাইতে আশ্চর্যের বিষয় ।
তাই, আমরা, ঠাকুরের মানুষেরা যেন ওইসব পথের পথিক না হই । প্রবৃত্তিধর্মী অসৎ পথ অবলম্বন করে যদি চিরজীবি হওয়া যেত তাহলে না হয় অসৎ পথের আশ্রয় অবলম্বন করার সার্থকতা থাকত। তাই আমাদের বাঁচতে হবে পরমপিতার খুশির জন্য, মরতেও হবে পরমপিতার খুশির জন্য—মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার লক্ষ্যে, ‘তৃষ্ণার একান্ত নির্বান— মহাচেতন সমুত্থান।’ বাণীকে সম্মান জানাতে।
* * ‌*
‘ভয়’ আমাদের জৈবিক তাড়নার একটা অঙ্গ। নির্দিষ্ট অপরাধবোধ ছাড়াও দুর্বলতাজনিত উৎকণ্ঠার ভয়, আগন্তুক ভয়, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভয় মনের পিছু ছাড়ে না । সব ভয়ের চরম মৃত্যুভয় । একটু অভ্যাস করলেই অন্তর্যামী স্বরূপ পরমাত্মিক শক্তির সাহায্যে আধিভৌতিক, আধিদৈবিক, আধ্যাত্মিক ত্রিবিধ ভয় থেকে মানুষ মুক্ত হতে পারে । এজন্য প্রবৃত্তি অভিভূতির সব দুর্বলতা কাটিয়ে ইষ্টকর্মে নিয়োজিত থাকতে হবে । তাই তো ঠাকুর আমাদের সব ভয় থেকে মুক্তি দিতে বাণী দিলেন ।–
“সব প্রবৃত্তি রত থাকে
ইষ্টকর্ম লয়ে,
সেই তো যোগী, সেই সন্ন্যাসী,
কাল নত যার ভয়ে ।”
“He will stand like a tower when everything rocks around him and when his softer fellow- mortals are winnowed like chaff in the blust.”
(আঃ প্রঃ ২/৭৫)
(যখন সবকিছুর অস্তিত্ব টলায়মান হয়ে উঠবে, এবং শক্তিহীন নির্জীব লোকগুলি ঝড়ের আগে তুষের মত উড়ে যাবে, তখন সে একটা স্তম্ভের মত নিজের শক্তিতে অটল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে ।)
জীবের জীবনবৃদ্ধির অপলাপকারী মৃত্যুকে প্রণাম জানিয়ে, মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার এই পথকে আঁকড়ে আমরা যেন অনন্ত জীবনের অধিকারী হতে পারি । দৈব দুর্বিপাক ভূমিকম্পে ভীত না হয়ে আমরা সকলে যেন মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার সাধনা ইষ্টনাম এবং ইষ্টকর্মে মত্ত থাকি, পড়শিদের, পারিপার্শ্বিকদের, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আক্রান্তদের সহায় হয়ে,—মৌখিক স্তুতি, আত্মার শান্তি কামনার পাশাপাশি বাস্তব কর্মের মাধ্যমে । পরমপিতার অনুশাসনকে সহায় করে বিশ্ব প্রকৃতিকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সব্বাইকে।
বিশ্ব-প্রকৃতির পরম দান, পঞ্চ-মহাভূত—ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-এর অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই পৃথিবী নামক সবুজ গ্রহটি। নগর-সভ্যতার ধারক-বাহকেরা আসুরিক ক্ষমতার বলে, ভোগবাদের ছাড়পত্রের বলে, আদর্শহীনতার বলে ভারতীয় ধর্মের অঙ্গীভূত পঞ্চ-মহাযজ্ঞ, সদাচার এবং বর্ণাশ্রমকে বিদায় জানিয়ে বসুন্ধরার পরিবেশকে যে ধ্বংসাত্মক পথে এগিয়ে দিয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘নাসা’-র গবেষণা। উদ্বেগ প্রকাশ করে গিয়েছিলেন কবিগুরু, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর’-এর প্রতিবাদী বাণীতে।
ভারতবর্ষের বৃহত্তম নদী গঙ্গাকে আমরা মা বলি, যাঁর পূত স্রোতধারায় স্নাত হয়ে পবিত্র হই, সেই মায়ের শরীরে নগর-সভ্যতার পুর-বিভাগ যখন পরিকল্পিতভাবে পূতিগন্ধ ক্লেদ নিক্ষেপ করে, ধর্মের ধ্বজাধারীরা তথাকথিত পূজা-পার্বনের বর্জ্য নিক্ষেপ করে পুণ্য অর্জন করে, তখন মনে হয় না যে আমরা কোন উন্নত সভ্যতার সভ্য, প্রগতি বাদের বাদী, আর্য্য সংস্কৃতির ধারক বাহক ধার্মিক।
পরিবেশ সম্বর্দ্ধনার সেই পরম অনুশীলন কি ভাবে বিকৃত হয়েছে সে বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই। বরং বসুন্ধরার পরিবেশকে রক্ষা করার ব্রতে কিভাবে ব্রতী হওয়া যায় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের উপদেশ মেনে আমাদের প্লাস্টিক-সভ্যতার কর্ণধারেরা যাতে পরিবেশ বান্ধবের ভূমিকা গ্রহণ করেন। রাষ্ট্র নায়কেরা যাতে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, ভূমিদূষণ, ভূ-স্তরদূষণ, জলদূষণ প্রতিরোধ করে গ্লোবাল-ওয়ার্মিং বা বিশ্ব-উষ্ণায়ন-ভ্রূকুটি থেকে সভ্যতাকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হন, সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে, জনমত গঠন করতে হবে, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের লাগামহীন ভোগের চাহিদা মেটাতে যে হারে ভূ-গর্ভস্থ তেল, গ্যাস, কয়লা, বিবিধ আকরিক উত্তোলন করতে গিয়ে ভূ-স্তরের অবক্ষয়কে আহ্বান করে চলেছি, ধ্বংস করে চলেছি ‘রেন ফরেস্ট’কে। এর বিরুদ্ধে সরব না হলে কোন মূল্যেই বাঁচানো যাবে না মানব সভ্যতাকে!
আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর পূর্বে পরম বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরব হয়েছিলেন এই ভয়াবহ পরিস্থিতি প্রতিরোধ মানসে। বিজ্ঞান-সাধক শ্যামাচরণ মুখোপাধ্যায়, পদার্থবিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য প্রমুখ ভক্তদের উৎসাহ দিয়ে হিমাইতপুরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র। বিজ্ঞান-বিষয়ক অত্যাশ্চর্য্য বহুকিছুর সাথে সন্ধান দিয়েছিলেন সহজলভ্য আবহাওয়া বিদ্যুতের। কৃত্রিম মেঘের সাহায্যে বৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করার সহজ পদ্ধতির কথা বলেছিলেন। ভূ-গর্ভস্থ প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন পরবর্তী শূন্যগর্ভ অবস্থাকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে কিভাবে পুণঃ-পূর্ণকরণ বা রিফিলিং করলে ভূ-স্তরের ক্ষতি হবে না সে বিষয়েও তিনি বলে গেছেন। তাঁর প্রদত্ত ওইসব ফরমূলাকে বাস্তবায়িত করতে পারলে ভূ-স্তরকে বিনষ্ট না করে, পরিবেশকে দূষিত না করেই প্রাকৃতিক দৌ-শক্তিকে কাজে লাগিয়ে শক্তি-সম্পদে সমৃদ্ধ হতে পারত আমাদের সভ্যতা।
আমরা জানি, ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। আমাদের অস্তিত্বের ধারক, পালক-পোষক পরমাপ্রকৃতির পঞ্চ-মহাভূত। উক্ত পঞ্চ-মহাভূতের অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই বসুন্ধরা—নীল-সবুজ গ্রহ। ধারণ করতে হবে ওই প্রাকৃতিক উপাদানসমূহকে, ওঁদের বিনাশ করলে আমরাও বিনাশ হবো। নচেৎ বিশুদ্ধ জলের বোতলের মত অক্সিজেন সিলিণ্ডার পিঠে বয়ে ঘুরতে হবে একদিন নিকট ভবিষ্যতে।
পল-বিপল, দণ্ড-প্রহর, অহোরাত্র, আহ্নিকগতি, বার্ষিকগতির দিনরাত, মাস, বছর হয়েই চলেছে আদিকাল থেকে, প্রাকৃতিক নিয়মে।দিন-মাস-বছর আসে যায়, রেখে যায় কিছু স্মৃতি মনের মণিকোঠায়। ওই স্মৃতির মালাগুলোকে স্মৃতিবাহীচেতনার ভল্টে অনন্তকাল জমা করে রাখার জন্য আর্য্য-ঋষিরা প্রতিটি মুহূর্তের জীবন ধারণের আহরণ শুদ্ধির মাধ্যমে ধ্রুবাস্মৃতির সন্ধান দিয়ে গেছেন ‘‘আহারশুদ্ধৌ সত্তাশুদ্ধি, সত্তাশুদ্ধৌ ধ্রুবাস্মৃতি’’ মন্ত্রে । শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র স্বস্ত্যয়ণী ব্রতের ‘নিয়তং স্মৃতিচিদয়ুতে’ মন্ত্রে য়াকে সমৃদ্ধ করেছেন। য়ে মুহূর্ত চলে যাবে তা আর ফিরে আসবে না। চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা সমৃদ্ধ সবুজ গ্রহ পৃথিবীর প্রতিটি মুহূর্তকেই যাতে চিরনবীনতায় আস্বাদন করতে পারি, উপভোগ করতে পারি সেজন্যই আর্য্য সভ্যতার ঊষা লগনে পরমপিতার প্রতিভূ আর্য্য ঋষিগণ ‘‘মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ……..’’ মন্ত্রে বন্দনা করে বসুন্ধরার মধুময় পরিবেশকে রক্ষা অর্থাৎ পূজা করতে শিখিয়েছিলেন। পূজা শব্দের অর্থ পূরণ করা, সম্বর্দ্ধনা, সম্যকভাবে বর্দ্ধনার লক্ষ্যে এগিয়ে চলা। যেমন-যেমন আচরণে, পরিবেশের অজৈব উপাদানসমূহকে রক্ষা করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া যায় তাই ছিল আর্য্য ভারতের পূজা, যজ্ঞ, হোম, উৎসবের তাৎপর্য্য।
আমরা যে ৩৩ কোটি দেবতার কথা শুনেছি সে সংখ্যাটা ৩৩,০০০০০০০ নয়, শুধুই ৩৩। কোটি অর্থে (piece) বোঝান হয়েছে, যথা, জীবকোটি, ঈশ্বরকোটি একক অর্থে ব্যবহৃত হয়।
বাস্তবে আমাদের এই সবুজ গ্রহের জীবকূলের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জৈবাজৈব রসদের যোগানদাতার মূল মালিক সূর্য। সূর্যর আর এক নাম আদিত্য। আদিত্য মানে দেবতা। দেদীপ্যমান যা তাকে দেবতা বলে। দেবতা মানে দ্যুতি বিশিষ্ট সত্তা। সব দেবতাই মূলতঃ পরব্রহ্মের প্রতীক। যেমন পৃথিবীর অধিপতি অগ্নি, অন্তরীক্ষে ইন্দ্র বা বায়ু ও দ্যুলোকে সূর্য। পৃথিবী, অন্তরীক্ষ এবং দ্যুলোক-এর প্রতিটি স্থানে ১১টি করে বেঁচে থাকার আবশ্যিক উপাদান সরবরাহকারী দেদীপ্যমান উৎস রয়েছে। উক্ত ৩৩টি জীবনীয় উৎস-সমূহকে দেবতা বলা হয়েছে উপনিষদে।
বৃহদারণ্যক উপনিষদ (৩য় অধ্যায়, ৯ম ব্রাহ্মণ)-এর ঋষি শাকল্য, ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য সমীপে দেবতার সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি অষ্টবসু, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্যাদি ৩১ সংখ্যক দ্যুতিবিশিষ্ট প্রাকৃতিক সত্তা এবং ইন্দ্র ও প্রজাপতি মিলিয়ে ৩৩ সংখ্যক দেবতার উল্লেখ করেছিলেন। ওই ৩৩ কোটি (33 pieces) দেদীপ্যমান উৎসসমূহকে রক্ষা করার প্রশ্নে আমরা প্রবৃত্তি পরবশ হয়ে যাতে দুর্বৃত্ত না হই তারজন্য উপনিষদের ঋষিগণ ‘আত্মানং বিদ্ধি’-র শপথ বাক্যের পাঠ দিলেন।—পরমপিতার সন্তান তুমি, নিজেকে জানো, নিজের প্রতিরূপ মনে করে পরিবেশকে বাঁচাও, নিজে বাঁচ। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’—জীবনবিধ্বংসী আচরণ ত্যাগ করে জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলো। ‘মা গৃধ’—লোভ করো না। সদাচার এবং বর্ণাশ্রম মেনে চলো। পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে নিজে সমৃদ্ধ হও। এই ছিল ভারতবর্ষের বিধি-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠনের, ধর্মের, পূজার, উৎসবের বাস্তব রূপ। ওই হৃত-গৌরব যুগোপযোগী করে পুণঃ-প্রতিষ্ঠিত করে গেলেন সব দেবতার সমাহারের প্রতীকস্বরূপ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। যার প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয় তাঁর প্রদত্ত ‘আর্য্য সন্ধ্যা’ প্রার্থনা মন্ত্রে।
আমরা, ভারত রাষ্ট্রের অধিবাসীরা ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের পবিত্র মন্ত্র মূণ্ডকোপনিষদের ‘সত্যমেব জয়তে’-র মধ্যে নিহিত সত্যের সন্ধান করার চেষ্টা না করে, ‘মেরা ভারত মহান’ মন্ত্রের ধ্বজাধারীরা ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টি রক্ষার পবিত্র কর্তব্য ভুলে, ধর্মের নামে কতগুলো কু-সংস্কারে, আর বিজ্ঞানের নামে ভোগবাদে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছি। অথচ বিশ্বের পরিবেশ বিজ্ঞানীরা প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে, ভারতীয় পঞ্চ-মহাযজ্ঞের বিধানকে, সমাজ বিজ্ঞানীরা সমাজ-বন্ধনের দৃঢ়তার অবক্ষয় রোধে, শ্রেণী-বিন্যস্ত বর্ণাশ্রমানুগ সমাজ ব্যবস্থার বিধানকে এবং প্রজনন বিজ্ঞানীরা সুস্থ মানবজাতি গঠনের জন্য সুবিবাহ ও সুপ্রজনন বিধিকে মেনে চলতে পরামর্শ দিয়েছেন।
বেদ-উপনিষদ-গীতা. ঋষি এবং মহাপুরুষদের নিদেশে কোথাও প্রচলিত পূজার নামে, অনিত্য বস্তুর উপাসনার নামে, হৈ-হুল্লোর করে পরিবেশ দূষণ করার অনুমোদন নেই। ব্যক্তি চরিত্র গঠনের নিমিত্ত সাধন-ভজন-আরাধনা বাদ দিয়ে যে তন্ত্রমতে আমরা পরিবেশ দূষণ করতে প্রতিমা পূজায় মেতে উঠি, সেই তন্ত্র-ই প্রতিমা পূজাকে ‘‘বাহ্যপূজা অধমাধম’’ বলে বর্ণনা করেছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও, ‘‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’’ ছন্দের ডালিতে প্রতিমা পূজার অসারতার বার্তা রেখে গেছেন।
বসুন্ধরার পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, এক বিপ্লব নিয়ে এলেন। ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে, ধর্ম বলে জানিস তাকে। বাঁচা-বাড়ার মর্ম যা, ঠিকই জানিস ধর্ম তা। Upholding urge of existence is Dharma.’……..ইত্যাদি বাণীর মাধ্যমে। অতএব, চাঁদার জুলুম, ফুল, বেলপাতা, ধূপহীন ধূপকাঠি, নৈবেদ্য, দশ-(অ)কর্মার ফর্দ, ঢাক, ঢোল, বাজি, হৈ-হুল্লোর, তার শব্দে মাইকের ডালি দিয়ে নয়— তোমাকে ধার্মিক হতে হলে আগে পরিবেশকে বাঁচাতে হবে। সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বাস্তব কর্মে ব্রতী হতে হবে। পরিবেশ হিতৈষী হতে হবে, তবেই তুমি ভারতীয় মতের ‘ধার্মিক’ অভিধায় ভূষিত হতে পারবে।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের অনুগামীদের নিত্য ইষ্টভৃতি করতে হয়। ইষ্টভৃতি মানে ইষ্ট কর্মের ভরণ। ইষ্টকর্ম মানে পূর্ত্তকর্ম—পরিবেশের উপাদানকে,পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখার বাস্তব কর্ম। যা প্রকৃত ইষ্টভৃতির মন্ত্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ ।” এর সরলার্থ খুব সহজ। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুযায়ী সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন বর্দ্ধনার বিধি মেনে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে চলেন যিনি, এমন গুরুভাই-ই প্রকৃত ইষ্টভ্রাতা।–যাঁর আপদে-বিপদে সাধ্যানুগ সাহায্য করতে হবে। ভূত মানে,–ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা পরিবেশের অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। সেগুলোকে প্রাণ পণ করে রক্ষা করতে হবে। প্রতিনিয়ত এই শপথ মেনে চলার নাম ইষ্টভৃতি। অতএব প্রতিটি আমি যদি প্রকৃত ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের যাজ্ঞিক হবার শপথ পালন করতে পারি তাহলেই অনেকাংশে রক্ষা করা যাবে সুজলা-সুফলা-মলয়জ-শীতল বসুন্ধরার পরিবেশকে।
এ যুগের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমাদের সচেতন করে দিতে বাণী দিয়ে বললেনঃ
‘‘ইষ্টভরণ, পিতৃপোষণ,
পরিস্থিতির উন্নয়ন,
এ না করে, যাই না করিস
অধঃপাতেই তোর চলন।’’
ওই অধঃপতন থেকে মধুময় বসুন্ধরাকে রক্ষা করতে কৃপা পরবশ হয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর ‘পঞ্চবর্হি’ এবং ‘সপ্তার্চ্চি’ পালনের অনুশাসন দিলেন। দলীয় প্রীতির কবলে পড়ে মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার সেই অনুশাসন বিধিকে অবজ্ঞা করার স্পর্দ্ধা যেসব তথাকথিত সৎসঙ্গীরা দেখাচ্ছেন, তাদের অধঃপতনকে প্রতিরোধ করতে হলে, তাদেরও সামিল করতে হবে উক্ত ইষ্ট-ভরণের অনুশাসন পালনে। তা যদি না করি আমরাও কিন্তু বঞ্চিত হব ‘ইষ্ট ভরণের’ পবিত্র কর্ম থেকে।
জয়গুরু, বন্দে পুরুষোত্তমম্!
—————————————-© tapandasd. Contact : tapanspr@gmail.com

এত হিংসা কেন!

।। এত হিংসা কেন! ।।


অনেকদিন ধরেই চলছে—আন্তর্জাতিক স্তরের ক্ষমতার দম্ভের আগ্রাসন, দুর্বলের প্রতি অত্যাচার, নির্বিচারে হত্যালীলা মানবতাবাদের অপমৃত্যু। নতুন করে ইরান-ইস্রায়েলের-প্যালেস্টাইনী ইত্যাদিদের দ্বন্দ্বযুদ্ধ— যা মানব সভ্যতার সঙ্কট!

প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের নব্য স্বাধীনতাকামী সন্ত্রাসীরা ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে হিন্দুদের উপাসনা-স্থলে, বাড়িতে আগুন দিয়ে, লুঠ করে, নারীদের নির্যাতন করে, হত্যা করে যে সন্ত্রাস চালাচ্ছে, আন্তর্জাতিক স্তরে কিছু প্রতিবাদ হলেও প্রতিরোধের সূত্র অধরাই রয়ে গেছে।
আমাদের রাজ্যের ভোট পরবর্তী রাজনৈতিক হিংসা,
নারী-নির্যাতন, মৃত্যু—- কতটা বোধ-বিপর্য্যয় হলে “পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যার” পবিত্র নীতিকে পাশ কাটিয়ে নীতিহীন রাজনীতির ক্ষমতা দখলে রাখার জন্য বিরোধী মতবাদীদের হত্যা পর্যন্ত করতে পারে!
যা’ সংশ্লিষ্ট “সত্যমেব জয়তে” সম্বলিত সীলমোহরের আধিকারিকদের পরিহাস করে যেন বলতে চাইছে, তোমরা কতখানি সৎ তোমাদের বিবেকের কাছে একবার জিগ্যেস করে দেখো তো! !!!!!!!!!!!! ?????????

——আর-জি-কর, পটাশপুর, কুলতলি, কৃষ্ণনগর ইত্যাদি ইত্যাদি…….সব কিছু ছাপিয়ে শীর্ষে স্থান করে নিয়েছে ওয়াক্ফ আন্দোলনের নামে মুর্শিদাবাদে ঘটে যাওয়া বর্বর-হিংসার প্রদর্শন!
টিভির পর্দার মাধ্যমে ওইসব মর্মস্পর্শী বিকৃতকাম, হিংসা, মৃত্যুর ছায়াচিত্র/সংবাদ আমাদের প্রাণে এক বোবা ব্যথা দিয়ে চলেছে, আমরা যারা বর্তমান যুগ-বিধায়ক পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সত্যানুসরণের অনুশাসন— “যতদিন তোমার শরীর ও মনে ব্যথা লাগে, ততদিন তুমি একটি পিপীলিকারও ব্যথা নিরাকরণের দিকে চেষ্টা রেখো, আর তা’ যদি না কর, তবে তোমার চাইতে হীন আর কে?”—পাঠ করি! ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে, বাংলাভাষায় রচিত বিখ্যাত গানের কলি, “মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য” নস্টালজিয়ার সিড়ি বেয়ে যাঁদের স্মৃতি অধিকার করে আছে, সেইসব বুদ্ধিজীবিরা, সমাজ-বিজ্ঞানীরা, কি জবাব দেবেন?

দেশে তো আইনের শাসন রয়েছে, না নেই? যদি থেকেই থাকে, তাহলে প্রতিবাদের নামে স্থানে স্থানে অবরোধ করে, ধর্মীয় অঙ্গন তোড়ফোড়-ভাঙচুর করে, আগুন জ্বালিয়ে, পাথর ছুঁড়ে, মেরেধরে, জনজীবন বিপর্যস্ত করে, নিরীহ মানুষ হত্যা করে, জাতীয় সম্পত্তি বিনষ্ট করে, যে তাণ্ডব প্রদর্শন করা হয়ে থাকে তার অনুমোদন কারা দেয়? কোন সংবিধান, কোন নবী, কোন অবতার, কোন পুরুষোত্তম কি এই ধরণের হাঙ্গামা করতে নিদেশ দিয়েছেন? তাহলে
এত হিংসা কেন? প্রতিটি চিন্তাশীল মানুষের মননশীলতায় এই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। ওইসব হিংস্র আততায়ীরা যদি উপযুক্ত শাস্তি না পায় তাহলে অদূর ভবিষ্যতে শান্তি ও স্বস্তির জীবনযাত্রা এভাবে ব্যাহত হতেই থাকবে, মনুষ্যত্বের মূল বুনিয়াদ বিলুপ্ত হতে থাকবে! বুদ্ধিজীবিগণ, সমাজবিজ্ঞানীরা, মনোবিদেরা এর কি ব্যাখ্যা দেবেন জানিনা, তবে যুগত্রাতা বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র হিংসার কারণ প্রসঙ্গে বলছেন, “অহঙ্কার আসক্তি এনে দেয় ; আসক্তি এনে দেয় স্বার্থবুদ্ধি ; স্বার্থবুদ্ধি আনে কাম ; কাম হতেই ক্রোধের উৎপত্তি ; আর, ক্রোধ থেকেই আসে হিংসা।’’ তাহলে বোঝা গেল, হিংসার মূল কারণ অহঙ্কার। অহঙ্কারের উৎপত্তি প্রবৃত্তি-পরায়ণতা থেকে। আর সেই প্রবৃত্তি-পরায়ণতার চালক লোভ, কাম, ক্রোধ, মদ, মোহ ও মাৎসর্য্য নামের ষড়রিপু, দেহরথের ৬টা ঘোড়ার লাগাম, দেহরথের সারথী ইষ্টগুরুর হাতে সঁপে দিতে পারলে একেবারে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। আর সেই ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন দিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। আমি অক্রোধী, আমি অমানী, আমি নিরলস ... ইত্যাদি মন্ত্রে আত্ম নিয়ন্ত্রণ করে, “স্বতঃ-অনুজ্ঞা”-র নিত্য অনুশীলনের বিধানের মাধ্যমে। হিংসাকে প্রতিরোধ করার জন্য এর চাইতে উপযুক্ত কোন নিদান আছে কি-না আমার জানা নেই।

অথচ আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা যুগ-বিধায়কের “প্রাচ্য-প্রতীচ্য নিয়ন্ত্রণে বর্ণাশ্রমানুশাসকম্ আর্য্য চিরায়নম্।” মন্ত্রের অমোঘ বিধানকে পাশ কাটিয়ে হিংসার প্রতিবিধানের জন্য থানা, পুলিশ, মিলিটারী, কোর্ট, সংশোধনাগার প্রভৃতির ব্যবস্থা করেও হিংসা দমন করতে পারছে না। তাই যদি পারত নির্বাচনের ন্যায় একটা সরল প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আমাদের হিংসা এবং হিংসার পরিণতি মৃত্যুর মিছিল দেখতে হতো না। এ কেমন রাজনীতি? ছিঃ!
যুগ-বিধায়ক বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বিধান অনুযায়ী হিংসাকে দূর করতে হলে ভক্তির চাষ দিতে হবে। ভক্তির সংজ্ঞায় তিনি বলছেন, ‘‘সৎ-এ নিরবচ্ছিন্ন সংলগ্ন থাকার চেষ্টাকেই ভক্তি বলে।’’ তাহলে সৎ-এ নিরবচ্ছিন্ন সংলগ্ন থাকার চেষ্টা করার জন্য ভাবী পিতামাতাকে সদগুরুর আদর্শ গ্রহণ করতে হবে। তারপর পরমপিতা প্রদত্ত দিব্য বিবাহ-সংস্কারে সংস্কৃত হয়ে শুদ্ধাত্মাকে আকর্ষণ করে প্রহ্লাদের ন্যায় দিব্য ভক্ত সন্তানের জন্ম দিতে হবে। ভারতের নিজস্ব সংবিধান কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে এর সমর্থন আছে। বর্তমানের চিকিৎসা বিজ্ঞানও এর সমর্থন করেছে। সুস্থ দম্পতির সুস্থ দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে সুস্থ মানবের জন্ম দেওয়ার বিধান দিয়ে। এ ব্যতীত জন্মগত দুরারোগ্য শারিরীক এবং মানসিক ব্যাধি প্রতিরোধের অন্য কোন চিকিৎসা নেই। (Ref. DAVIDSON’S PRACTICE OF MEDICINE/Genetic Factor of Disease)
রাষ্ট্রের অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার বোর্ডের কর্ণধারেরা বিশ্বস্ত, সুস্থ পে-ডিগ্রীড কুকুরের, ঘোড়ার জন্ম নিয়ে গবেষণা করলেও মানুষের বেলায় উদাসীন। একুশ বছরের ছেলে আর আঠারো বছরের মেয়ে হলেই হলো। বংশ, বর্ণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা—কোন কিছুই না দেখে স্পেশ্যাল ম্যারেজ অ্যাক্টের সাহায্যে বিয়ে করতে পারবে, আবার বনিবনা না হলে ডিভোর্সও করতে পারবে! এখন তো আবার বিয়ে না করেও লিভ-টুগেদার আইনের সাহায্যে সন্তানের মা হতে পারা যায়। যার দৃষ্টান্ত লোকসভার সদস্যা নুসরত জাহান। রাষ্ট্রের জন-প্রতিনিধিরা যদি সুস্থ দাম্পত্যের প্রজনন বিজ্ঞানকে অসম্মান করতে পারেন, সেখানে সাধারণ নাগরিকগণ আরো বেশি সুযোগ পেয়ে যাবে লাগামহীন যৌন-জীবন যাপন করার! পরমপিতার অশেষ করুণায় আমাদের গ্রামীন ভারতবর্ষের তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষগুলো এখনো কোন-না-কোনভাবে ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা, পিতামাতায় ভক্তি রেখে বিবাহ সংস্কারের অনুশাসন মেনে চলছে বলে প্রিয়জনের দ্বারা প্রিয়জনদের হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা সমাজে বিস্তার লাভ করতে পারছে না। তবে, রাষ্ট্র ব্যবস্থা যদি এখনই ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুরুত্ব না দেয়, স্বভাববিধ্বংসী প্রতিলোম জাতকদের জন্ম বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাহলে অচিরেই হিংসা আমন্ত্রিত হবে ঘরে ঘরে! হিংসা প্রতিরোধের জন্য যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র একেবারে সমস্যার মূলে হাত দিয়ে বললেন, “ভক্তি এনে দেয় জ্ঞান ; জ্ঞানেই সর্বভূতে আত্মবোধ হয় ; সর্বভূতে আত্মবোধ হলেই আসে অহিংসা ; আর, অহিংসা হতেই প্রেম। তুমি যতটুকু যে-কোন একটির অধিকারী হবে, ততটুকু সমস্তগুলির অধিকারী হবে।’’ একেবারে অঙ্কের হিসেব। আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি-ইচ্ছার ‘ছোট-আমি’-টার অহঙ্কারের লাগামটাকে যদি ভক্তির মুঠো দিয়ে কষে না ধরা যায় তাহলে ধাপে-ধাপে হিংসার আশ্রয়ে পৌঁছে যাবে। যার পরিণতি অস্বাভাবিক মৃত্যু। আর যদি জীবন নামক রথের চালক ছ’-টা ঘোড়ার (ষড়রিপু) লাগাম জীবন-রথের সারথি স্বরূপ ইষ্টগুরুর হাতে সমর্পণ করা যায়, তাহলে, সরল প্রাণ, মধুর বচন, আর বুকভরা প্রেমের ডালি দিয়ে সবাইকে আপন করে নেওয়া যায়। একটা পিপীলিকারও ব্যথা নিরাকরণের জন্য প্রাণ কাঁদে। আবার যে হিংসা মৃত্যুর দ্যোতক তাকে শক্ত হাতে দমন করতে হলে হিংসা দিয়েই করতে হবে। হিংসাকে হিংসা দ্বারা জয় করার নাম অহিংসা। যেমন দুষ্টক্ষত বা গ্যাংগ্রীন থেকে শরীরকে বাঁচাতে হলে আক্রান্ত অংশটিকে কেটে বাদ দিতে হয়। বাদ না দিলে দেহকে বাঁচান যায় না। তেমনি সমাজ রক্ষা, রাষ্ট্র রক্ষা করতে হলে অনুরূপ নীতির অনুসরণ না করতে পারলে সমাজ-রাষ্ট্রের অঙ্গে পচন ধরে যাবে, রাষ্ট্রের সত্তাটাই মারা পড়বে। আর্য্য ভারতের মা কালী শুম্ভ-নিশুম্ভকে, মা দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে, শ্রীরামচন্দ্র রাবনকে বধ করে ওই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। অযথা কাউকে হত্যা করেন নি। অযথা কাউকে হত্যা না করে পার্থসারথি শ্রীকৃষ্ণ মামা কংসের পাঠান অসুর-রাক্ষস নামক সত্তাহিংস জিঘাংসা বৃত্তিধারীদের হত্যা করেছিলেন। অপকৌশলী অসৎ সাম্রাজ্যবাদী কংসকে হত্যা করে, উগ্রসেনকে কারাগার থেকে মুক্ত করে তাঁকে পুণরায় রাজ্যে অভিষিক্ত করেছিলেন। ধর্মপথভ্রষ্ট অসৎ আগ্রাসনী জরাসন্ধকে হত্যা করে জরাসন্ধের পুত্র সহদেবকে রাজ্যে আভিষিক্ত করিয়েছিলেন। সব হিংসার মূল উৎপাটন করে, এক পরম রাষ্ট্রীক সমবায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধ সংগঠিত করে জীবনবাদের জয়গান গেয়েছিলেন। ভবিষ্যত প্রজন্মকে জীবনবাদী হবার জন্য উপহার দিয়ে গেলেন শ্রীমদ্ভবদ্গীতা। আমাদের রাষ্ট্রীয় স্তোস্ত্র “বন্দে মাতরম্” ধ্বনির উৎস শ্রীমদ্ভবদ্গীতা। একদা শ্রীমদ্ভবদ্গীতা গ্রন্থকে আদর্শ মেনে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছিল। সেসব মহান ইতিহাস ভুলে গণতান্ত্রিক পথে রাজনীতি করতে গিয়ে হিংসাশ্রয়ী হয়ে আমরা যদি ভারতমাতার সন্তানদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলি, ভারতমাতা সেই অপমান কতদিন মুখ বুঁজে সহ্য করবেন? আমরা আবার গীতা গ্রন্থের স্রষ্টা পার্থসারথী শ্রীকৃষ্ণের আশ্রয়ে ফিরে যাব। শ্রীকৃষ্ণ পরবর্তী বহির্ভারতের বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীষ্ট, হজরত রসুল প্রমুখ পুরুষোত্তমগণও আর্য্য ভারতীয় ওই শ্বাশ্বত নীতির অনুসরণ করেছেন মানব সভ্যতাকে বাঁচাতে। তাঁরা আগ্রাসন করতে, ধর্মান্তকরণ করতে, অযথা কাউকে হিংসা করতে কোথাও কি বলেছেন? তবে কেন এত হিংসা? কেন এত জিঘাংসা? ওই হিংস্র জিঘাংসাকে যদি কঠোর হাতে দমন করতে এগিয়ে না আসেন জীবনপিয়াসী শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তথা রাষ্ট্র নায়কেরা, তাহলে মানবতার অপমৃত্যুর কালো ছায়া মানব সভ্যতার অঙ্গে ক্রমে ক্রমে গ্যাংগ্রীন উৎপাদন করবে নিকট ভবিষ্যতে। অসৎ নিরোধে তৎপর না হয়ে, অসৎকে প্রশ্রয় দিয়ে রাষ্ট্রের পবিত্র মন্ত্র “সত্যমেব জয়তে” সম্বলিত সীলমোহরের আধিকারিক হওয়াটা যেমন ভণ্ডামি, তেমনই অসৎ নিরোধে উদাসীন থেকে সৎসঙ্গী সেজে ভক্ত হওয়াটাও কিন্তু ভণ্ডামী! সকলের কথা বলতে পারব না, সেই দিক দিয়ে বিচার করতে গেলে আমি নিজে কিন্তু ভণ্ড। ভক্ত হতে গেলে ঠাকুরত্বকে জাগাতে হবে চরিত্রে। সেটা যখন জাগাতে ব্যর্থ হয়েছি, তাহলে আমি ভণ্ড ছাড়া আর কি! তাই ভণ্ডামি ত্যাগ করে আমাকেও গুটি কেটে খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে পড়তে হবে, পরিস্থিতিকে সামাল দিতে। পরিস্থিতিকে এড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারব না।

ইষ্টভরণ, পিতৃপোষণ
পরিস্থিতির উন্নয়ন,
এ না ক’রে যাই করিস্ না
অধঃপাতেই তোর চলন। ২ ।
(অনুশ্রুতি, ১ম খণ্ড)

ইষ্টপ্রোক্ত উদ্ধৃত বাণীর অধঃপতন থেকে ব্যক্তিসত্তাকে, সংঘ-সত্তাকে বাঁচাতে হলে অসৎ-নিরোধে তৎপর হতেই হবে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র “ব্যক্তি-দম্পতি-গৃহ-সমাজ-রাষ্ট্র উদ্ধার”-কল্পে, যজন-যাজন-ইষ্টভৃতি-স্বস্ত্যয়ণী প্রবর্তন করছেন। সেকথা বিস্মরণ হলে ইষ্টাদর্শের অপলাপ করা হবে। জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!

নিবেদনে—তপন দাস@tapanspr

।। প্রভু যীশুখ্রীষ্ট স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।

।। প্রভু যীশুখ্রীস্ট স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি ।।


অবতার বরিষ্ঠমাত্রেই পূর্বাপূর্ব অবতারদের পরিপূরণকারী হন। ‘‘যেই রাম সেই কৃষ্ণ, এক দেহে রামকৃষ্ণ’’ রূপে এসে বিভিন্ন ধর্মমতের মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য স্থাপনের জন্য গীর্জায় গিয়ে যীশুর, মসজিদে গিয়ে রসুলের আরাধনা করেছিলেন। তিনি লোকশিক্ষার জন্য বহু ধর্মীয় মতবাদের গুরুদের কাছে দীক্ষাও নিয়েছিলেন গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুন্ন রেখেই। তথাপিও সাধারণ মানুষেরা মনের মণিকোঠায় জমে থাকা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ একেবারে মুছে ফেলতে পারে নি। এবার অনুকূলচন্দ্র রূপে এসে ‘‘ঈশ্বর এক, ধর্ম এক, প্রেরিতগণ সেই এক-এরই বার্তাবাহী’’ বাণীর মর্মার্থ বোঝাতে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে ভেদাভেদ ঘোচাতে, এক অভিনব ব্যবস্থা করেছিলেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপনের জন্য কুষ্টিয়ার ভক্তদের শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীবুদ্ধ, প্রভু যীশু, হজরত রসুল, শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ প্রমুখ পূর্ববর্তী অবতার-বরিষ্ঠদের জন্মোৎসব পালন করতে উৎসাহিত করেছিলেন। ঠাকুরের নির্দেশ মেনে কুষ্টিয়ার ভক্তরা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের থেকে শুরু করে সাধারণ অনুরাগীদের শ্রদ্ধার সাথে আমন্ত্রণ জানিয়ে আলাপ-আলোচনা-কথকতা ও অন্নব্যঞ্জনাদির সেবার ব্যবস্থা করতেন। ওইভাবে পূর্বাপূর্ব অবতার বরিষ্ঠদের জন্মোৎসব পালন করার ফলে সারা কুষ্টিয়ায় এক অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে গিয়েছিল। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে শ্রদ্ধা-প্রীতির বন্ধন গড়ে উঠেছিল।

পুরুষোত্তমগণের প্রধান লক্ষণ তাঁরা সম্বেগসিদ্ধ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হন। আত্মপ্রচার না করে সমাগতদিগের বৈশিষ্ট্যের পালন ও পোষণ করেন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের কাছে শ্রীরামচন্দ্রের ভক্ত গেলে তিনি আলাপ-আলোচনায় শ্রীরামচন্দ্রের, শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত গেলে শ্রীকৃষ্ণের, বুদ্ধদেবের ভক্ত গেলে বুদ্ধদেবের, প্রভু যীশুর ভক্ত গেলে প্রভু যীশুর, রসুল ভক্ত গেলে হজরত মহম্মদের, চৈতন্যদেবের ভক্ত গেলে চৈতন্যদেবের, শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্ত গেলে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের গুণগান করে তাঁদের ইষ্টানুরাগ বাড়িয়ে দিতেন। তাঁরা তাঁদের ঈপ্সিত ইষ্টকে খুঁজে পেতেন পূর্বতন পূরয়মান বর্তমান পুরুষোত্তমের মধ্যে। অনুরূপভাবে প্রভু যীশুখ্রীষ্টের ভক্ত রে. আর্চার হাউজারম্যান, ই. জে. স্পেনসার প্রমুখ যীশুখ্রীস্টের ভক্তগণ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মধ্যে তাঁদের আরাধ্য দেবতাকে খুঁজে পেয়ে সারাটা জীবন তাঁর সান্নিধ্যে কাটিয়ে তাঁর সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত সমন্বয়ী ধর্মাদর্শ প্রচার করে গেছেন।
দেওঘরে, এক বড়দিনের সন্ধ্যা-প্রার্থনান্তে শ্রদ্ধেয় স্পেনসারদা ঠাকুরকে প্রণাম করার পর ঠাকুর বললেন, আজ গীর্জায় যাবে না প্রেয়ার করতে ? উত্তরে স্পেনসারদা বলেছিলেন, দীর্ঘকাল গীর্জায় গিয়েও প্রভুর সাক্ষাৎ পাইনি, আপনার মধ্যে আমার আরাধ্য-দেবতা যীশুকে খুঁজে পেয়েছি, তারপরেও গীর্জায় যেতে হবে ?
উত্তরে ঠাকুর বলেছিলেন, পূর্বতনীদের প্রতি শ্রদ্ধানতি জানাতেই হয়।
স্পেনসারদা আর দ্বিরুক্তি না করে গীর্জায় চলে যান, সারারাত গীর্জায় থেকে প্রত্যুষে ফিরে আসেন ঠাকুর-বাংলোয়। ঠাকুর যেন তাঁর প্রত্যাগমনের অপেক্ষায়ই ছিলেন। স্পেনসারদা প্রণাম করে বললেন, আপনি আমার সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবসান করে দিলেন আজ। প্রভু-যীশুর ধ্যান করতে করতে আজ আবার প্রমাণ পেয়ে গেলাম আপনিই বর্তমান যীশু। আবার প্রমাণ পেয়ে গেলাম আপনার বলা সেই বাণীগুলোর—“All the Prophets of the past converge and are awakened in living Guru of the age. It is through our love for the lover of Christ that we can love Christ.” (পূর্বতন প্রেরিতগণ জীবন্ত যুগুরুর মধ্যে কেন্দ্রীভূত ও জাগ্রত থাকেন। খ্রীষ্ট-প্রেমীর প্রতি ভালবাসার ভিতর-দিয়েই আমরা যীশুখ্রীষ্টকে ভালবাসতে পারি।) (আঃ প্রঃ দশম খণ্ড, ০৮. ০১. ১৯৪৮)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, ‘‘একজন সত্যকার হিন্দু, একজন সত্যকার মুসলমান, একজন সত্যিকার খ্রীষ্টান—পরমপিতার চোখে এরা সবাই সমান। …… প্রকৃত ধার্ম্মিক যারা তারাই সমাজের গৌরব।
একজন খ্রীষ্টানের প্রথম যীশুখ্রীষ্টকে ভালবাসা উচিত এবং তাঁর মাধ্যমে সব প্রেরিতপুরুষকে ভালবাসা উচিত। একজন হিন্দুর শ্রীকৃষ্ণকে বা যে-প্রেরিতপুরুষকে সে অনুসরণ করে তাঁকে ভালবাসা উচিত এবং তাঁর মাধ্যমে অন্য সব প্রেরিত পুরুষকে ভালবাসা উচিত। কোন প্রেরিত পুরুষকে ভালবাসা মানে তিনি যেমন ছিলেন, সেইভাবে তাঁকে বোঝা। আামাদের সুবিধা অনুযায়ী তাঁর মতের বিকৃত ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। যদি কেউ বলে—যীশুকে নয়, আামি মা মেরীকে ভালবাসি, তাহলে সে মা মেরীকে ভালবাসে কি না, তা সন্দেহযোগ্য। (সূত্রঃ আ. প্র. ১১ খণ্ড, ইং তাং ৭. ২. ১৯৪৮)
প্রভু যীশু তাঁর অনুগামীদের উদ্দেশ্যে চরম ত্যাগ ও নির্ভরতার কথা বলেছেন।–-
পাখীদের বাসা আছে, শেয়ালের গর্ত আছে, কিন্তু তোমাদের মাথা গোঁজবার স্থান থাকবে না, কোন কিছুরই সংস্থান থাকবে না। ঈশ্বরের উপর নির্ভর করে নিঃস্ব ও চাহিদাশূণ্য হয়ে তোমরা শুধু মানুষের মঙ্গল করে চলবে, নিজেদের জন্য কোন ভাবনা রাখবে না। ঈশ্বরের দয়ায় যখন যেমন জোটে, তাতেই সন্তুষ্ট থাকবে।
অধ্যাপক ও ফরীশীগণ ব্যভিচারে লিপ্ত এক নারীকে ধরে এনে শ্রীযীশুর কাছে সমর্পণ করে বিচার প্রার্থনা করে বলে, ‘‘হে গুরু এই স্ত্রী লোকটি ব্যভিচার ক্রিয়ায় ধরা পড়েছে। মোশি এমন লোককে পাথর মারার আজ্ঞা দিয়েছেন, আপনার বিচারে কি বলেন।” যীশু নীরব; মাথা নীচু করে কেবল পায়ের আঙ্গুল দিয়ে ভূমিতে কী লিখে চলেছেন। ফরীশীগণ বার-বার জিজ্ঞাসা করায় তিনি মাথা উঁচু করে বললেন, “তোমাদের মধ্যে যে নিষ্পাপ সেই প্রথমে একে পাথর মারুক।”
“He that is without sin among you, let him first cast a stone at her.”
(St John, 8:7.)
তিনি আবার মাথা নীচু করে লিখতে থাকেন ভূমিতে পায়ের আঙ্গুল দিয়ে। কিছুক্ষণ নীরবে গেলে, যীশু মাথা উঁচু করে দেখলেন, স্ত্রীলোকটি ছাড়া আর কেউ নেই। তিনি স্ত্রীলোকটিকে বললেন, “হে নারী তোমার অভিযোগকারীগণ কোথায়, তারা কেহ কি তোমায় দোষী করে নি‍?’’
নারী কহিল—“না প্রভু, কেহ করে নি।” যীশু বললেন, “আমিও তোমাকে দোষী করি না, যাও আর কখনো এ মুহূর্ত হতে কোন রকম পাপ কর্ম করবে না।’’
“Neither do I condemn thee, go, and sin no more.” (St, John.8:11)

ওই মা-টি যীশুর প্রেমের পরশে স্নাত হয়ে সাধ্বী হয়েছিলেন, যাঁর নাম ছিল মেরী ম্যাগডিলিনী । তাঁর প্রেমের পরশে মাছ-ধরা জেলেরা মানুষ-ধরা সাধকে পরিণত হয়েছিলেন।
প্রভু যীশু ব্যভিচারের বিরুদ্ধে, অনাচারের বিরুদ্ধে, পৌত্তিলকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে সবাইকে সনাতনী ঈশ্বরপ্রেমে অভিষিক্ত করতে চাইলেন। তাঁর সত্তাপ্রেমী আবেদন প্রবৃত্তি-প্রেমীদের সহ্য হলো না, ফলস্বরূপ তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ হতে হলো। মানবতার শত্রু হলো জুডাস।
প্রভু যীশুর ক্রুশারোহণের পর সব ভক্তগণ যখন ভয়ে গা ঢাকা দিয়েছিলেন তখন মেরী ম্যাগডিলিনী জীবনের মায়া তুচ্ছ করে প্রভু যীশুর সন্ধানে ঘর ছেড়ে পথে বেড়িয়েছিলেন। পথে-প্রান্তরে, ঝোপে-জঙ্গলে, গুহায়-কন্দরে, পাহাড়ে-পর্বতে, পাথরের কোণে সর্বত্র তাঁকে খুঁজে বেড়িয়েছেন। সেই সন্ত্রাসের রাজ্যে ভক্তদের ভেঙ্গে পড়া মনোবল পুণরায় জাগিয়ে তুলেছিলেন তিনি।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন—যীশুখ্রীষ্টের ভক্তদের মধ্যে মেরী ম্যাগডিলিনির সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। She love Lord for his own sake ( সে প্রভুকে তাঁর জন্যই ভালবাসত)। তার মত unexpectant, selfless love (প্রত্যাশাশূন্য, নিঃস্বার্থ ভালবাসা) আর কারো ছিল কিনা জানি না। আজ ভগবান যীশুর কত ভক্তের কথা শোনা যায়। কত saint (সন্ত)-এর কথা শোনা যায়। কিন্তু আমার মনে হয়, যীশুর অনুরাগীদের মধ্যে সর্ব্বাগ্রে নাম করা উচিত তার। ……. চরম দু:সময়ে যখন কেউ ছিল না যীশুর পাশে, প্রত্যেকে ভয়ে আত্মগোপন ক’রে চলছিল, তখন একমাত্র সে-ই প্রাণের মায়া ত্যাগ ক’রে বেপরোয়া হ’য়ে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়েছিল যীশুর জন্য পাগল হ’য়ে। কেউ-কেউ বলে নাকি—যীশুর প্রতি তার যে ভালবাসা ছিল, তা ছিল lustful (কামনালিপ্সু)। হয়তো তা’ lustful (কামনালিপ্সু)-ই ছিল। কিন্তু সমগ্র সত্তার প্রতিটি অণুপরমাণু দিয়ে অমন ক’রে আর কেউ বোধ হয় যীশুর অস্তিত্ব ও স্বস্তি কামনা করেনি। Her whole soul and entire being was bequeathed to Chirst and that was the holiest of love ( তার সমগ্র আত্মা, সমগ্র সত্তা যীশুকে সমর্পিত হয়েছিল এবং তার প্রেম ছিল পবিত্রতম)। ভালবাসা এমন পবিত্র জিনিস যে তাতে প্রিয়তমের কথা ছাড়া অন্য কোন কথা মনে পড়ে না। “রূপ লাগি
আঁখি ঝুরে, গুনে মন ভোর, প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর”—এমনতর হয়।
অনুরাগের বাতি যার
নয়নকোণে জ্বলেছে,
সে না সর্ব্বস্ব তেয়াগিয়া
গুরুকে সার করেছে।
ম্যাগডিলিনি-এর মধ্যে ছিল এই প্রাণ-উপচান অনুরাগ। আবার ছিল প্রচন্ড নির্ভীকতা ও পরাক্রম। আমি যত ভাবি ততই আমার শ্রদ্ধা হয়। (আ. প্র. ৯/১১. ১১. ১৯৪৭)
যীশুর ক্রুশবিদ্ধের কথা উঠলে, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র করুণ কণ্ঠে ছলছল নেত্রে বললেন, –‘‘সেদিন যেমন যীশু crucified (ক্রুশবিদ্ধ) হয়েছিলেন, আজকের দিনেও সেই যীশু তেমনি করে crucified (ক্রুশবিদ্ধ) হয়ে চলেছেন মানুষের হাতে। এই পাপের নিবৃত্তি না হলে মানুষের নিস্তার নেই। নিস্তারের একমাত্র পথ হলো মূর্ত্ত ত্রাতা যিনি তাঁকে sincerely follow (অকপটভাবে অনুসরণ) করা। তাহলে আমাদের ভুল-ত্রুটিগুলি ধীরে ধীরে শুধরে যাবে। ঠিকপথে চলতে শুরু না করলে, ভুলপথে চলার অভ্যাস আরো মজ্জাগত হবে তার chain reaction (শ্রেণীবদ্ধ প্রতিক্রিয়া) চলতে থাকবে।’’ (আ. প্র. ২৫. ০১. ১৯৪৮)
১৯৪৮ সালের বড়দিনের সকালে হাউজারম্যানদা প্রণাম করে উঠতে-না-উঠতেই শ্রীশ্রীঠাকুর আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললেন—আজকে আমাদের তাঁরই দিন, যিনি দুনিয়ায় এসেছিলেন দুনিয়ার দুঃখ ঘোচাতে—সেই Divine the Great–এর (দিব্য মহাপুরুষের) জন্মদিন—যাঁকে আামরা বিদায় দিয়েছি দুঃখে, কষ্টে, যন্ত্রণায়, অনাদরে, অপঘাতে।
একটু পরে শ্রীশ্রীঠাকুর ইংরাজীতে ঐ ভাব অবলম্বনে বাণী দিলেন—
This day is verily the day of Him Who is ours,
Who came on earth
To remove the misery of the world,
The birthday of that Divine the Great
Whom we have seen off
In sorrows, sufferings, woe and anguish
In uncared negligence
And bleeding tyranny.
বাণীটি বলে শ্রীশ্রীঠাকুর বিষাদগম্ভীর হয়ে গেলেন, তাঁর চোখ দুটি ছলছল।
(আঃ প্রঃ ১৫ খণ্ড, ২৫. ১২. ১৯৪৮)
বিষাদগম্ভীর আমরাও। বড়দিন উদযাপন প্রবৃত্তি পরায়ণতার আনন্দের জোয়ারে ভেসে যাওয়ার দিন নয়। বড়দিনের স্মৃতি স্মরণে রেখে প্রতি দিনগুলি প্রভু যীশুর আদর্শের পরিপূরণকারী বর্তমান পুরুষোত্তমের আদর্শের অনুসরণে আমরা যদি আমাদের ছোট আমি-টাকে বড় করে ব্যাপ্তির লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করি, তাহলে ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্তকরণ, হিংসা, বিবাহ-বিচ্ছেদ, ভ্রষ্টাচার এভাবে ব্যাপ্তি লাভ করতে পারবে না বোধহয়। সবাইকে বাঁচিয়ে নিজেকে বাঁচাবার এই একমাত্র পথ।


  • GOOD FRIDAY
    The day is come again
    with all its
    sad memories
    when the life of Love
    was lost in tyranny,
    uncaressed and ignored;
    the Cross is still alive
    with Him
    in its breast;
    Love came
    with throbbing thrill–
    man pierced Him
    in cruel taunt;
    remember,
    atone,
    bear the Cross of installing Him
    with love;
    let thy love
    meander to Him,
    the Love,
    embracing all
    that He hath;
    live in that Love
    and make man fit
    to save himself
    with the tidings of Him
    the Man,
    God,
    the Son of Man;
    let blessed peace
    breeze
    with heavenly scent.
    (THE MESSAGE, Vol. IX by Shree Shree Thakur Anukulchandra)

।। বাংলা শুভ নববর্ষ ১৪৩২ ।।

।। বাংলা শুভ নববর্ষ ১৪৩২কে বরণ করার শ্রদ্ধার্ঘ্য— সব্বাইকে জানাই আমার প্রণাম ।।


শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রবর্তিত নববর্ষ পুরুষোত্তম স্বস্তিতীর্থ মহাযজ্ঞের স্মরণে আমরা প্রস্তুত ১৪৩২তম বর্ষ-এর নতুন সূর্যকে স্বাগত জানাতে।
প্রাণের প্রাণ-স্পন্দন টিঁকিয়ে রাখার উৎস, আমাদের এই সবুজ গ্রহের
অভিভাবক, সকল শক্তির উৎস জ্যোতির্ময় সূর্যের তেজোময় দীপ্তিতে আমরা যেন
সকল প্রকার কলুষতা ত্যাগ করে দীপ্তিমান চরিত্রের অধিকারী হতে পারি। অনিয়ন্ত্রিত
প্রবৃত্তির কবলে পড়ে আমরা যেন আমাদের মনুষ্যত্বকে দূষিত করে না ফেলি। আকাঙ্খার মোহে পড়ে আমরা যেন আমাদের
পঞ্চ-মহাভূত সম্ভূত পরিবেশকে দূষিত না করি। ভিনগ্রহের প্রাণীরা যেন
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ-প্রাণীদের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলতে না পারে, যে
আমরা অসভ্য, ভোগবাদের জোয়ারে ভাসতে গিয়ে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার, বাঁচিয়ে
রাখার অনুকূল পরিবেশকে বিনষ্ট করছি। তাহলে সেটা বড় লজ্জার ব্যাপার হবে।
হে অন্তর্যামী পরমপিতা! তুমি আমাদের শুভবুদ্ধি দাও, আমরা যেন সমাগত
১৪৩২-এর নতুন সূর্যের কিরণে স্নাত হয়ে নতুন প্রাণ, নতুন সুর, নতুন গান,
নতুন ঊষা, নতুন আলোর নবীনতায় নতুন বছরকে সম্বর্দ্ধিত করতে পারি। কেটে যাক
আমাদের সব বিষাদ, পরমপিতার আশীষধারায় এসে যাক হর্ষ, শুভ হোক ১৪৩২-এর
নববর্ষ।
কাল-কবলের রোগ-শোক-ব্যাধি-জরা-র ভয়ে ভীত না হয়ে, ত্রিতাপ জ্বালায় ইষ্টবারি সিঞ্চন করে ‘একদিন-প্রতিদিনের’ চিরনবীন সূর্যালোকের নবীন ছটায় পরমপিতার অনুশাসনের
আশীষধারায় অজর, অমর, চিরচেতনতার সাধনাকে আপ্ত করে আমরা যেন
ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যের চরৈবেতিতে নিরবচ্ছিন্ন থাকতে
পারি।— বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে সীমায়িত না থেকে কালাধীশ শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্রের দিব্য-নিদেশের দিনচর্যার আঙ্গিকে—
‘‘ঊষার রাগে উঠবি জেগে শৌচে শীতল হবি,
সন্ধ্যা-আহ্নিক জপ সাধনায় ঈশের আশিস লবি,
কুতুহলে পড়শি ঘুরে দেখবি সযতনে,
আছে কেমন কোথায় কে জন মন দিবি রক্ষণে,
তারপরেতে বাড়ী এসে শৌচে যথাযথ
গৃহস্হালীর উন্নয়নী অর্জ্জনে হ’ রত,
স্নানটি সেরে আহ্নিক করে ক্ষুধামতন খাবি,
একটু চলে বিশ্রাম নিয়ে আগুয়ানে ধাবি,
এমনি তালে সচল চালে চলে সন্ধ্যা এলে,
শৌচে শুদ্ধ হয়ে করিস আহ্নিক হৃদয় ঢেলে,
উন্নয়নের আমন্ত্রনী গল্প-গুজব শীলে,
হৃষ্টমনে আলোচনায় কাটাস সবাই মিলে,
পড়শী দিগের অভাব-নালিশ থাকেই যদি কিছু
তার সমাধান যেমন পারিস করিস লেগে পিছু,
করন-চলন ধরন-ধারন যজন যাজন কিবা
সকল কাজেই ইষ্টস্বার্থে চলিস রাত্রি-দিবা,
আদর-সোহাগ উদ্দীপনী কথায় কাজে ঝুঁকে,
স্বার্থ-কেন্দ্র সবার হবি ধরবি ইষ্টমুখে,
বিশ্রামেরই সময় গা-টি ঘুমল হয়ে এলে,
ইষ্ট-চলন মনন নিয়ে ঘুমে গা দিস ঢেলে।’’
(অনুশ্রুতি গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)-র আলোকে
বছরের প্রতিটি দিন হয়ে উঠুক অমৃত-তপনার উত্সব—নববর্ষ ১৪৩২-কে
স্বাগত-স্মরণের প্রাক্কালে এই প্রার্থনা জানাই পরমপিতার রাতুল চরণে। সবাই আমার প্রণাম নেবেন, মার্জনা করে দেবেন সব দোষ-ত্রুটি। জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!
——-

।। বাংলা শুভ নববর্ষ ১৪৩২ ।।

।। বাংলা শুভ নববর্ষ ১৪৩২কে বরণ করার শ্রদ্ধার্ঘ্য— সব্বাইকে জানাই আমার প্রণাম ।।


শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রবর্তিত নববর্ষ পুরুষোত্তম স্বস্তিতীর্থ মহাযজ্ঞের স্মরণে আমরা প্রস্তুত ১৪৩২তম বর্ষ-এর নতুন সূর্যকে স্বাগত জানাতে।
প্রাণের প্রাণ-স্পন্দন টিঁকিয়ে রাখার উৎস, আমাদের এই সবুজ গ্রহের
অভিভাবক, সকল শক্তির উৎস জ্যোতির্ময় সূর্যের তেজোময় দীপ্তিতে আমরা যেন
সকল প্রকার কলুষতা ত্যাগ করে দীপ্তিমান চরিত্রের অধিকারী হতে পারি। অনিয়ন্ত্রিত
প্রবৃত্তির কবলে পড়ে আমরা যেন আমাদের মনুষ্যত্বকে দূষিত করে না ফেলি। আকাঙ্খার মোহে পড়ে আমরা যেন আমাদের
পঞ্চ-মহাভূত সম্ভূত পরিবেশকে দূষিত না করি। ভিনগ্রহের প্রাণীরা যেন
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ-প্রাণীদের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলতে না পারে, যে
আমরা অসভ্য, ভোগবাদের জোয়ারে ভাসতে গিয়ে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার, বাঁচিয়ে
রাখার অনুকূল পরিবেশকে বিনষ্ট করছি। তাহলে সেটা বড় লজ্জার ব্যাপার হবে।
হে অন্তর্যামী পরমপিতা! তুমি আমাদের শুভবুদ্ধি দাও, আমরা যেন সমাগত
১৪৩২-এর নতুন সূর্যের কিরণে স্নাত হয়ে নতুন প্রাণ, নতুন সুর, নতুন গান,
নতুন ঊষা, নতুন আলোর নবীনতায় নতুন বছরকে সম্বর্দ্ধিত করতে পারি। কেটে যাক
আমাদের সব বিষাদ, পরমপিতার আশীষধারায় এসে যাক হর্ষ, শুভ হোক ১৪৩২-এর
নববর্ষ।
কাল-কবলের রোগ-শোক-ব্যাধি-জরা-র ভয়ে ভীত না হয়ে, ত্রিতাপ জ্বালায় ইষ্টবারি সিঞ্চন করে ‘একদিন-প্রতিদিনের’ চিরনবীন সূর্যালোকের নবীন ছটায় পরমপিতার অনুশাসনের
আশীষধারায় অজর, অমর, চিরচেতনতার সাধনাকে আপ্ত করে আমরা যেন
ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যের চরৈবেতিতে নিরবচ্ছিন্ন থাকতে
পারি।— বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে সীমায়িত না থেকে কালাধীশ শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্রের দিব্য-নিদেশের দিনচর্যার আঙ্গিকে—
‘‘ঊষার রাগে উঠবি জেগে শৌচে শীতল হবি,
সন্ধ্যা-আহ্নিক জপ সাধনায় ঈশের আশিস লবি,
কুতুহলে পড়শি ঘুরে দেখবি সযতনে,
আছে কেমন কোথায় কে জন মন দিবি রক্ষণে,
তারপরেতে বাড়ী এসে শৌচে যথাযথ
গৃহস্হালীর উন্নয়নী অর্জ্জনে হ’ রত,
স্নানটি সেরে আহ্নিক করে ক্ষুধামতন খাবি,
একটু চলে বিশ্রাম নিয়ে আগুয়ানে ধাবি,
এমনি তালে সচল চালে চলে সন্ধ্যা এলে,
শৌচে শুদ্ধ হয়ে করিস আহ্নিক হৃদয় ঢেলে,
উন্নয়নের আমন্ত্রনী গল্প-গুজব শীলে,
হৃষ্টমনে আলোচনায় কাটাস সবাই মিলে,
পড়শী দিগের অভাব-নালিশ থাকেই যদি কিছু
তার সমাধান যেমন পারিস করিস লেগে পিছু,
করন-চলন ধরন-ধারন যজন যাজন কিবা
সকল কাজেই ইষ্টস্বার্থে চলিস রাত্রি-দিবা,
আদর-সোহাগ উদ্দীপনী কথায় কাজে ঝুঁকে,
স্বার্থ-কেন্দ্র সবার হবি ধরবি ইষ্টমুখে,
বিশ্রামেরই সময় গা-টি ঘুমল হয়ে এলে,
ইষ্ট-চলন মনন নিয়ে ঘুমে গা দিস ঢেলে।’’
(অনুশ্রুতি গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)-র আলোকে
বছরের প্রতিটি দিন হয়ে উঠুক অমৃত-তপনার উত্সব—নববর্ষ ১৪৩২-কে
স্বাগত-স্মরণের প্রাক্কালে এই প্রার্থনা জানাই পরমপিতার রাতুল চরণে। সবাই আমার প্রণাম নেবেন, মার্জনা করে দেবেন সব দোষ-ত্রুটি। জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!
——-

।। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের ভাবনা ।।

।। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের ভাবনা ।।
*************************
[৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। এ দিনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৫০ সালের ৭ এপ্রিল থেকে বিশ্বজুড়ে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে   স্থানীয়ভাবে ও আন্তর্জাতিক স্তরে দিবসটি পালন করা হয়।]
*******************************
স্বাস্থ্য বিষয়ে আমরা বেশী কিছু না জানলেও ‘স্বাস্থ্যই সম্পদ’ এই আপ্ত বাক্যটি আমরা প্রায় সকলেই জানি। সেই স্বাস্থ্য সম্পর্কে স্বাস্থ্যের সর্বময় কর্তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কি বলেন সেটা সকলের জানা দরকার আছে। বিশেষ করে জীবন পিয়াসী মানুষের। সুস্থ যদি থাকতে চান এবং আপনার প্রিয়জনকে যদি সুস্থ রাখতে চান তাহলে এবার সংজ্ঞাটি মনোযোগ সহকারে পড়ুন এবং বোঝার চেষ্টা করুন।
As per World Health Organisation–”Health is a state of complete physical, mental and social well-being, and not merely an absence of disease or infirmity.”
The Sign of  Physical  Health : “…………a good complexion, a clean skin, bright eyes, lustrous hair with a body well clothed with firm flesh, not too fat, a sweet breath, a good appetite, sound sleep, regular activity of bowels and bladder, and smooth, easy, coordinated bodily movements. All the organs of the body are of unexceptional size and function ‘normally’; all the special senses are intact; the resting pulse rate, blood pressure and excercise tolerance are all within the range of ‘normality’ for the individual’s age and sex….”
The Sign of Mental Health : “…….feel satisfied with himself. He feels happy, calm and cheerful. There are no conflicts within himself. He is well adjusted. He accepts criticism and is not easily upset. He understands the emotional needs of others, and tries to be considerate. He has good self-control; he is not overcome by emotion; he is not dominated by fear, anger, love, jealousy, guilt or worries. He faces problems and tries to solve them intelligently.”
The Sign of Social Health : “He is at peace with others and is able to feel himself as a part of a group and is able to maintain socially considerate behaviour.”
Sign of Positive Health : “A person should be able to express as completely as possible the potentialities of his genetic heritage.” (Source : Preventive and Social Medicine by PARK)
Mentioned all types regulated by positive health. Positive health depends on genetical instinct. A good instinct depends on good breeding. Good breeding depends on healthy couple, those who are physically, mentally and spiritually sound and sane.

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞায় আমরা জানতে পারলাম, শুধু নীরোগ থাকলেই হবে না, –শারীরিক, মানসিক, এবং আত্মিকভাবে স্বচ্ছন্দ ব্যক্তিকেই সুস্থ বলা যাবে। অতএব সার্বিকভাবে সুস্থ থাকতে হলে সুস্থ শরীর, মন, আত্মার অধিকারী হতে হবে। উক্ত সংজ্ঞার পরিপূরক যারা নয়, তারা অসুস্থ । সেই অসুস্থরা যদি সন্তান জন্মাবার অধিকার পায় তাহলে অসুস্থ প্রজন্ম সৃষ্টি হবে ।   সুস্থ একটা প্রজন্ম তৈরি করতে হলে সংজ্ঞার পরিপূরক সুস্থ দম্পতির যৌথ প্রচেষ্টায় একটা সুস্থ শিশু সৃষ্টি হবে। তারজন্য বিবাহার্থে সুস্থ জুটি নির্বাচন করতে হবে । এছাড়া শুধুমাত্র ওষুধপত্রের চিকিৎসায় সকলকে স্বাস্থ্যের অধিকারী করা যাবে না।  তাই বিয়ের আগে পাত্রপাত্রীর স্বাস্থ্যের বিষয়েও  আমাদের ভাবতে
হবে ।
সার্বিকভাবে ভাল স্বাস্থ্যের সন্তান পেতে হলে সংজ্ঞা অনুযায়ী স্বাস্থ্য নির্ণয়ের সাথে সাথে  blood ABO Rh & genetic counseling করে নিলে ভাল হয় । সগোত্রে (same blood line)- এ বিয়ে হলে albinism, alkaptonuria নামের রোগ হয় । Schizophrenia, thalassaemia সহ অনেক দুরারোগ্য ব্যাধি আছে যা উত্তরাধিকারে সন্তান পেয়ে থাকে । মেয়েদের বেশি বয়সে বিয়ে হলে ‘mongolism’ নামের বিকৃত সন্তান জন্মাবার সম্ভাবনা থাকে ।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, “বিয়ের প্রথম উদ্দেশ্যই হ’লো genetic enrichment ( জননগত সমৃদ্ধি) । এইটে হ’ল first and foremost (প্রথম এবং প্রধান) । তার পরের জিনিস হ’ল cultural enrichment (কৃষ্টিগত সমৃদ্ধি) । তাই বর-কনের বংশগত ও ব্যক্তিগত আচার, ব্যবহার, কর্মের সঙ্গতি আছে কিনা তা’ দেখা লাগে । আবার চাই physical enrichment (শরীরগত সমৃদ্ধি) । ….Genetic asset কার কেমনতর তা’ না বুঝে বিয়ে থাওয়ার সম্বন্ধ করা ভাল নয় ।”
Genetic assetকে গুরুত্ব না দেবার ফলেই বর্তমান পৃথিবীতে শতকরা প্রায়
40টি অকাল মৃত্যুর কারণ কিছু  দুরারোগ্য বংশগত ব্যাধি। যা সন্তানেরা উত্তরাধিকারে পায়। যা কোন চিকিৎসাতে সারানো যায় না। প্রতিরোধ করার একমাত্র উপায় সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা দুরারোগ্য বংশগত রোগমুক্ত বিশ্বস্ত বংশে বিবাহ করার নিদান দিয়েছেন।  অতএব ওইসব দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে পরমপুরুষ নিদেশিত সুবিবাহ ও সুপ্রজনন বিধি প্রতিষ্ঠা করতে হবে । প্রজন্মের সুখশান্তি উত্থানপতন সবকিছুর মূলভিত্তি হলো বিবাহ সংস্কার। সেই বিবাহ যদি শুধু যৌনলালসার এবং লিভ টুগেদার-এর কেন্দ্রবিন্দু হয় তাহলে কোনদিনও অসুখবিসুখ অকালমৃত্যু, সন্ত্রাসবাদ, শোষণবাদ থেকে সভ্যতাকে স্বস্তি দিতে পারবে না ডাক্তার, উকিল, পুলিশ, মিলিটারি, জেলখানা, হাসপাতালের প্রচলিত ব্যবস্থাপনা । বিশ্বাসঘাতক মানুষদের সনাক্ত করতে শুদ্ধ জন্মের শংসাপত্র প্রাপ্ত ভাল জাতের কুকুর (pedigreed dog) আমদানি করতে আমরা আগ্রহী, অথচ শুদ্ধ মানুষ সৃষ্টি করার মহান আর্যবিধিকে উপেক্ষা করে যেমন খুশি তেমন বিয়ের অনুমোদন দিয়েছি ! এই বোধ বিপর্যয়ের হাত থেকে আমাদের মুক্ত করলেন যুগ সংস্কারক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।
“শাসনসংস্থা যেমনই হোক
যাতেই মাথা ঘামাওনা
যৌন ব্যাপার শুদ্ধ না হলে
দেশের জীবন টিঁকবে না ।” বাণীতে।
অতএব স্বাস্থ্য রক্ষা বিষয়ে ভাবার সাথে সাথে দেশ রক্ষার স্বার্থে পরমপুরুষের বিবাহ বিধান মেনে চলতে হবে সবার আগে ।

      বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞায় আমরা জানতে পারলাম, শুধু নীরোগ থাকলেই হবে না, –শারীরিক, মানসিক, এবং আত্মিকভাবে স্বচ্ছন্দ ব্যক্তিকেই সুস্থ বলা যাবে। অতএব সার্বিকভাবে সুস্থ থাকতে হলে সুস্থ শরীর, মন, আত্মার অধিকারী হতে হবে। উক্ত সংজ্ঞার পরিপূরক যারা নয়, তারা অসুস্থ । সেই অসুস্থরা যদি সন্তান জন্মাবার অধিকার পায় তাহলে অসুস্থ প্রজন্ম সৃষ্টি হবে ।   সুস্থ একটা প্রজন্ম তৈরি করতে হলে সংজ্ঞার পরিপূরক সুস্থ দম্পতির যৌথ প্রচেষ্টায় একটা সুস্থ শিশু সৃষ্টি হবে। তারজন্য বিবাহার্থে সুস্থ জুটি নির্বাচন করতে হবে । এছাড়া শুধুমাত্র ওষুধপত্রের চিকিৎসায় সকলকে স্বাস্থ্যের অধিকারী করা যাবে না। তাই যদি সম্ভব হতো, সহজেই কোভিড-১৯ সংক্রমণকে সামাল দেওয়া যেত। নব-নব রূপে আইডেন্টিটি পরিবর্তন করে নাজেহাল করে দিতে সমর্থ হতে পারত না। যেসব শিশু জন্মগত ভাবে রোগ-প্রতিরোধী শক্তিতে সমৃদ্ধ, তাদের স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো সমস্যা নেই।  তাই বিয়ের আগে পাত্রপাত্রীর স্বাস্থ্যের বিষয়েও ঠাকুর আমাদের ভাবতে বলেছেন ।
সার্বিকভাবে ভাল স্বাস্থ্যের সন্তান পেতে হলে সংজ্ঞা অনুযায়ী স্বাস্থ্য নির্ণয়ের সাথে সাথে  blood ABO Rh & genetic counseling করে নিলে ভাল হয় । সগোত্রে (same blood line)- এ বিয়ে হলে albinism, alkaptonuria নামের রোগ হয় । Schizophrenia, thalassaemia সহ অনেক দুরারোগ্য ব্যাধি আছে যা উত্তরাধিকারে সন্তান পেয়ে থাকে । মেয়েদের বেশি বয়সে বিয়ে হলে ‘mongolism’ নামের বিকৃত সন্তান জন্মাবার সম্ভাবনা থাকে ।
এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন, “বিয়ের প্রথম উদ্দেশ্যই হ’লো genetic enrichment ( জননগত সমৃদ্ধি) । এইটে হ’ল first and foremost (প্রথম এবং প্রধান) । তার পরের জিনিস হ’ল cultural enrichment (কৃষ্টিগত সমৃদ্ধি) । তাই বর-কনের বংশগত ও ব্যক্তিগত আচার, ব্যবহার, কর্মের সঙ্গতি আছে কিনা তা’ দেখা লাগে । আবার চাই physical enrichment (শরীরগত সমৃদ্ধি) । ….Genetic asset কার কেমনতর তা’ না বুঝে বিয়ে থাওয়ার সম্বন্ধ করা ভাল নয় ।”
Genetic assetকে গুরুত্ব না দেবার ফলেই বর্তমান পৃথিবীতে শতকরা প্রায়
40টি অকাল মৃত্যুর কারণ কিছু  দুরারোগ্য বংশগত ব্যাধি। যা সন্তানেরা উত্তরাধিকারে পায়। যা কোন চিকিৎসাতে সারানো যায় না। প্রতিরোধ করার একমাত্র উপায় সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা দুরারোগ্য বংশগত রোগমুক্ত বিশ্বস্ত বংশে বিবাহ করার নিদান দিয়েছেন।  অতএব ওইসব দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে পরমপুরুষ নিদেশিত সুবিবাহ ও সুপ্রজনন বিধি প্রতিষ্ঠা করতে হবে । প্রজন্মের সুখশান্তি উত্থানপতন সবকিছুর মূলভিত্তি হলো বিবাহ সংস্কার। সেই বিবাহ যদি শুধু যৌনলালসার এবং লিভটুগেদার-এর কেন্দ্রবিন্দু হয় তাহলে কোনদিনও অসুখবিসুখ অকালমৃত্যু, সন্ত্রাসবাদ, শোষণবাদ থেকে সভ্যতাকে স্বস্তি দিতে পারবে না ডাক্তার, উকিল, পুলিশ, মিলিটারি, জেলখানা, হাসপাতালের প্রচলিত ব্যবস্থাপনা । বিশ্বাসঘাতক মানুষদের সনাক্ত করতে শুদ্ধ জন্মের শংসাপত্র প্রাপ্ত ভাল জাতের কুকুর (pedigreed dog) আমদানি করতে আমরা আগ্রহী, অথচ শুদ্ধ মানুষ সৃষ্টি করার মহান আর্যবিধিকে উপেক্ষা করে যেমন খুশি তেমন বিয়ের অনুমোদন দিয়েছি ! এই বোধ বিপর্যয়ের হাত থেকে আমাদের মুক্ত করলেন যুগ সংস্কারক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।
“শাসনসংস্থা যেমনই হোক
যাতেই মাথা ঘামাওনা
যৌন ব্যাপার শুদ্ধ না হলে
দেশের জীবন টিঁকবে না ।” বাণীতে।
অতএব স্বাস্থ্য রক্ষা বিষয়ে ভাবার সাথে সাথে দেশ রক্ষার স্বার্থে পরমপুরুষের বিবাহ বিধান মেনে চলতে হবে সবার আগে ।
জয়গুরু, পরমপিতার বিধান মেনে সবাই সুস্থ থাকুন।
বন্দে পুরুষোত্তমম্!

।। রাম নবমীর শ্রদ্ধাঞ্জলি ।।

।। রাম নবমীর শ্রদ্ধার্ঘ্য বনাম রামরাজত্বের প্রতিষ্ঠা ।।


বেশি কিছুদিন ধরে “জয় শ্রীরাম” ধ্বনি শ্লোগানে পরিণত হয়েছে। দিকে দিকে খুব আশার আলোর বিচ্ছুরণ! নির্মিত হয়েছে মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রের আদর্শে বিশ্বাসী অনুগামীদের মিলনস্থলের কেন্দ্র স্বরূপ রামমন্দির। ভারতবর্ষে আবার ফিরে আসবে রামরাজত্ব। যে রামরাজত্বের ক্যাবিনেট চালাতেন বশিষ্ঠাদি স্থিতপ্রজ্ঞ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ঋষিগণ। বর্ণাশ্রম, চতুরাশ্রম, দশবিধ সংস্কার আদর্শের অনুসরণে—ভারতবর্ষে যা’ ‘ঋষিবাদ’ (ঋষিদের দ্বারা প্রবর্তিত অনুশাসনবাদ।) নামে প্রতিষ্ঠিত। ঋষিবাদের মূল সংবিধানের নাম ‘ব্রহ্মসূত্র’। ব্রহ্মসূত্র-এর ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে বেদ, উপনিষদ, অষ্টাদশ সংহিতা।

ঋষি বশিষ্ঠ সৌম্যাবতার রামচন্দ্রকে পুরুষোত্তমরূপে চিনতে পেরে রামচন্দ্রকে ঋষিদেরও ঋষি বলে মান্যতা দেন। ঋষিদের সিদ্ধান্তে তখন থেকে পুরুষোত্তমকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয় নব্য-ঋষিবাদ বা পুরুষোত্তমবাদ। যখন যিনি পুরুষোত্তমরূপে অবতীর্ণ হন, তিনিই তখন জীবন্ত বেদ, সংহিতা, পুরাণ। ওই সূত্র অনুসারে রামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীস্ট, হজরত রসুল, চৈতন্যদেব, শ্রীরামকৃষ্ণদেব সকল গুরুদের গুরু সদগুরুরূপে স্বীকৃতি পান। অর্থাৎ স্থান-কাল-পরিবেশ অনুযায়ী যখন যিনি যেখানেই অবতীর্ণ হন না কেন, তাঁর মধ্যে পূর্ব পূর্ব গুরুদের জীবন্ত অনুভব করা যাবে। পূর্ববর্তীদের প্রকৃত আদর্শ খুঁজে পাওয়া যাবে। যাকে আমরা বর্তমানের সফটওয়ারের ভাষায়, অ্যাপ্লিকেশন বা অ্যাপস্-এর ভাষায় আপডেট বলি। অ্যাপ্লিকেশনের সূত্রপাত থেকে শুরু করে সর্বশেষ সংস্করণের নবীকরণের তথ্য মজুত থাকে। আমি যদি আমার মোবাইলের অ্যাপ্লিকেশনগুলো আপডেট না করি তাহলে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারব না। যারা আপডেটেড্, তারাই লক্-ডাউনের সময় অন-লাইন কাজকর্ম করে অনেক কিছু সামাল দিতে পেরেছেন। সবকিছু সামাল দিতে গেলে আপডেটেড হতেই হবে সবক্ষেত্রে। ব্যাকডেটেড থেকে কিছু সামাল দেওয়া যায় না। অথচ আমরা অজ্ঞতাবশে নিজেদের ধারণ করার প্রশ্নে, অর্থাৎ ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে ব্যাকডেটেড হয়ে আছি। তাই তো বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনকূলচন্দ্র আমাদের সচেতন করে দিতে বললেন—“ভারতের অবনতি (degeneration) তখন-থেকেই আরম্ভ হয়েছে, যখন-থেকে ভারতবাসীর কাছে অমূর্ত্ত ভগবান অসীম হ’য়ে উঠেছে—ঋষি বাদ দিয়ে ঋষিবাদের উপাসনা আরম্ভ হয়েছে।

ভারত! যদি ভবিষ্যৎ-কল্যাণকে আবাহন করতে চাও, তবে সম্প্রদায়গত বিরোধ ভুলে জগতের পূর্ব্ব-পূর্ব্ব গুরুদের প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হও—আর তোমার মূর্ত্ত ও জীবন্ত গুরু বা ভগবানে আসক্ত (attached) হও,—আর তাদেরই স্বীকার কর—যারা তাঁকে ভালবাসে। কারণ, পূর্ব্ববর্তীকে অধিকার করিয়াই পরবর্ত্তীর আবির্ভাব।” (সত্যানুসরণ)

কথাপ্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন—“বর্ত্তমান যিনি, তাঁকে ধরলেই তাঁর মধ্যে সব পাওয়া যায়। ………. রামচন্দ্রকে যে ভালবাসে সে যদি শ্রীকৃষ্ণকে না ধরে তবে বুঝতে হবে তার রামচন্দ্রেও ভালবাসা নেই, ভালবাসা আছে তার নিজস্ব সংস্কারে। (আঃ প্রঃ ২১ খণ্ড, ইং তাং ৩১-১২-১৯

  • * *

।। রামচরিতের আদর্শের পুণ্য স্মৃতিচারণ ।।

সৌম্যাবতার মর্যাদাপুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্র ছিলেন সত্যের পূজারী অথচ অসৎ নিরোধী। তৎকালীন যুগের অচ্ছুৎ অনার্য্যদের আর্য্যীকৃত করে আর্য্য-অনার্য্যদের মেলবন্ধন করলেন।অনার্য্য গুহক চণ্ডালকে করলেন মিত্র, আবার অকালমৃত্যুর দ্যোতক বর্ণাশ্রম-বিদ্বেষী প্রতিলোমাচারী বন্ধুবর শম্বুবকে দিলেন চরম শাস্তি। মায়াবী রাবণ যখন কিছুতেই সীতাকে বশে আনতে পারছিলেন না তখন সভাসদেরা রাবণকে বলেছিলেন, রামরূপ ধারণ করে গেলেই তো সীতাকে সহজেই বশীভূত করতে পারেন। উত্তরে রাবণ বলেছিলেন, ওই রূপ স্মরণ করলেই আমার সব পাপ-প্রবৃত্তি মুছে গিয়ে আমি এক অন্য মানুষ হয়ে যাই। তথাপি প্রবৃত্তির ঊর্দ্ধে উঠে ওই বোধটাকে ধরে রাখতে পারল না, ফলে রামচন্দ্রের হাতে হত হতে হল। অথচ বিভীষণ রামচন্দ্রের আদর্শে প্রলুব্ধ হয়ে রাবণকে ত্যাগ করলেন। * * *

শুধু তাড়িত-পীড়িত মানুষেরাই নয়, প্রভু রামচন্দ্রের কাছে পশুপাখিরাও ন্যায্য বিচার পেতেন রামচন্দ্রের কাছে। তিনি ওদের ভাষাও বুঝতেন। তাই তারাও প্রভু রামচন্দ্রের কাছে সুবিধা-অসুবিধার কথা জানাতে পারতেন। রাম-রাজত্বে পশু-পাখিরাও সুখে-শান্তিতে বাস করতেন। ওই নিয়মের ব্যত্যয় হবার ফলে, সেই রাম রাজত্বের সময় একটা কুকুর এসেছিল মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রের কাছে বিচারপ্রার্থী হয়ে। সভায় উপস্থিত ছিলেন ভৃগু, আঙ্গিরস, কুৎস, কাশ্যপ, বশিষ্ঠ প্রমুখ সভাসদগণ। কুকুরের অভিযোগ শুনে, বিচার প্রেক্ষিতে সভাসদদের সম্বোধন করে শ্রীরামচন্দ্র বলেছিলেনঃ

न सा सभा यत्र न सन्ति वृद्धाः
वृद्धा न ते ये न वदन्ति धर्मम् ।
नासौ धर्मो यत्र न सत्यमन्ति
न तत् सत्यं यच्छलेनानुविद्धम् ।।
(Ye sabhai briddha nei ta sabha e noi. Yara dharmmasamgata kotha bolena tara briddha noi. yate satya nei ta dharmma noi, yate chhol aachhe ta satya noi.
RAMAYAN, 3/33)

‘‘ন সা সভা যত্র ন সন্তি বৃদ্ধাঃ

বৃদ্ধা ন তে যে ন বদন্তি ধর্মম্।

নাসৌ ধর্মো যত্র ন সত্যমন্তি

ন তৎ সত্যং যচ্ছলেনানুবিদ্ধম্।। (বাল্মীকি রামায়ণ ৩/৩৩)

—যে সভায় বৃদ্ধ নেই তা সভাই নয়। যারা ধর্মসঙ্গত কথা বলে না তারা বৃদ্ধ নয়। যাতে সত্য নেই তা ধর্ম নয়। যাতে ছল আছে তা সত্য নয়। অর্থাৎ, যেখানে ছলনা আছে, কপটতা আছে, সেখানে ধর্ম নেই।


রাম-রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীরামচন্দ্র তো নয়ই, শ্রীরামচন্দ্রের পিতা রাজা দশরথও কোনদিন ছলনার আশ্রয় গ্রহণ করেন নি। তাঁরই রাজত্বে লোকালয় থেকে দূরে, সরযূ নদীর তীরে কুটির বেধেছিলেন বৈশ্য কুলোদ্ভব অন্ধমুনি, শূদ্রা অন্ধ স্ত্রীকে নিয়ে। তাদের একমাত্র চক্ষুষ্মান সন্তান যজ্ঞদত্ত বা সিন্ধুমুনি গোধূলি বেলায় জল আনতে গেছেন সরযূ নদী থেকে। এক মত্তহাতীর উপদ্রব থেকে প্রজাদের রক্ষা করার মানসে মৃগয়ায় গেছেন রাজা দশরথ। তাঁর ঈপ্সিত মত্তহাতীর উদ্দেশ্যে শব্দভেদী বাণ ছোঁড়েন। বাণে বিদ্ধ হয় কলসীতে জল ভরতে থাকা সিন্ধুমুনি। কলসীতে জল-ভরার অনু-কার শব্দের সাথে হাতীর জলপান করার অনু-কার শব্দের হুবহু মিল রয়েছে। যারফলে অনধাবনতা বশতঃ এক মারাত্মক ভুল করে ফেলেছিলেন রাজা দশরথ। বাণবিদ্ধ যন্ত্রণাকাতর সিন্ধুমুনির আর্তনাদে তাঁর ভুল ভাঙে। সিন্ধুমুনির অনুরোধে বিদ্ধ বানটাকে খুলে নিলে সিন্ধুমুনি মারা যান। রাজা দশরথ জলপূর্ণ কলসী সাথে নিয়ে অন্ধমুনির কুটিরে যান। অকপটে স্বীকার করেন সব অপরাধের কথা। সদ্য সন্তানহারা অন্ধ দম্পতিকে আজীবন পিতৃ-মাতৃ জ্ঞানে রক্ষণাবেক্ষণ করে ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন। সিন্ধু মুনির অন্ত্যেষ্টিও করেন তিনি। তথাপি রাজা দশরথকে অভিশাপ দিয়ে পুত্রশোকে সহধর্মিনীসহ দেহত্যাগ করেন অন্ধমুনি। সেই অভিশাপেই পুত্র শোকেই রাজা দশরথের অকালমৃত্যু হয়েছিল। এই হচ্ছে ভারতবর্ষের ধর্ম পালনের উদাহরণ। নির্জন স্থান। প্রত্যক্ষদর্শী কেউ ছিল না। সাক্ষী দেবারও কেউ ছিল না। রাজা দশরথ যদি কপটাচারী হতেন, ছলনার আশ্রয় নিতেন, অনায়াসেই সিন্ধুমুনির বিপন্ন-অস্তিত্বের প্রাণহীন দেহটাকে ফেলে রেখে চলে যেতে পারতেন। গায়ে পড়ে অভিশাপও কুড়োতে হতো না। কিন্তু পারেন নি সত্যের জন্য, বিবেকের জন্য, বিবেকের দংশন থেকে মুক্তি পাবার জন্য। তাই, মনের অনুগমন না করে বিবেককে অবলম্বন করে চলার নামই ধর্মপথে চলা। ধর্মের সাথে অস্তিত্বের সম্পর্ক, অস্তিত্বকে ধারণ করে রাখার সম্পর্ক।


মাননীয় নরেন্দ্র মোদিজীর নেতৃত্বাধীন বর্তমানের বিজেপি সরকার ধর্মের নামে, ‘জয় শ্রীরাম’ শ্লোগানকে আঁকড়ে বিপুল জন সমর্থন পেয়েছেন। মর্যাদা পুরুষোত্তম রামচন্দ্রের আদর্শে বিশ্বাসী ভারতের নির্বাচকগণ ‘রাম-রাজত্বের’ ন্যায় এক স্বচ্ছ, নির্মল শাসনতন্ত্রের আশায় ভোট দান করেছেন। অতএব রামচন্দ্রের নাম-মাহাত্ম্যের জোরে যে শাসনতন্ত্রের অধিকার অর্জন করেছেন যে জন-প্রতিনিধিরা, তাদের ক্যাবিনেট যদি রামচন্দ্রের গুরু ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠের আদর্শের আলোকে আলোকিত না হয়,---সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হয়,---জন-প্রতিনিধিগণ যদি রাম-রাজত্বের পরিপন্থী বিলাস-ব্যসন ত্যাগ করে, আত্ম-প্রতিষ্ঠার মোহ ত্যাগ করে, সাত্ত্বিক-চলনে সাধারণভাবে চলতে অভ্যস্ত না হয়,---তাঁরা কখনোই ঈপ্সিত রাম-রাজত্ব ফিরিয়ে আনতে পারা যাবে না।


।। শ্রীরামচন্দ্রের আদর্শের সংবিধান ।।
বনবাসে থাকার সময় রামচন্দ্র ভরতকে রাজকার্য পরিচালনা বিষয়ে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন—“….. তুমি গুণী ও যোগ্য ব্যক্তিকে বহু-মান প্রদর্শন করে থাক তো? বীর, বিদ্বান, জিতেন্দ্রিয়, সদ্বংশজ, ইঙ্গিতজ্ঞ লোকদের মন্ত্রীপদে প্রতিষ্ঠিত করেছ তো? তুমি তাদের সঙ্গে মন্ত্রণা কর তো? তোমাদের মন্ত্রণা লোকের মধ্যে প্রকাশ হয়ে পড়ে না তো? তুমি যথাসময়ে শয্যাত্যাগ কর তো? রাত্রিশেষে অর্থলাভের চিন্তা কর তো? তুমি সহস্র মূর্খ পরিত্যাগ করেও একজন বিদ্বানকে সংগ্রহ করতে চেষ্টা কর তো? অযোগ্য লোককে যোগ্যস্থানে ও যোগ্য লোককে অযোগ্য স্থানে নিয়োগ কর না তো? যে-সব অমাত্য উৎকোচ গ্রহণ করেন না, যাদের পিতৃপুরুষ যোগ্যতার সঙ্গে অমাত্যের কাজ করেছেন, যারা ভিতরে-বাইরে পবিত্র—সেই সব শ্রেষ্ঠ অমাত্যকে শ্রেষ্ঠ কাজে নিযুক্ত করেছ তো? রাজ্যমধ্যে কোন প্রজা অযথা উৎপীড়িত হয় না তো? শত্রুকে পরাস্ত করতে পটু সাহসী, বিপৎকালে ধৈর্য্যশালী, বুদ্ধিমান, সৎকুলজাত, শুদ্ধাচারী, অনুরক্ত ব্যক্তিকে সেনাপতি করেছ তো? বিশেষ নৈপুণ্য যাদের আছে, তাদের তুমি পুরস্কৃত ও সম্মানিত করে থাক তো? প্রত্যেকের প্রাপ্য বেতন সময়মত দিয়ে থাক তো? রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তিবর্গ তোমার প্রতি অনুরক্ত আছেন তো? তোমার কার্য্যসিদ্ধির জন্য তাঁরা মিলিত হয়ে প্রাণ পর্য্যন্ত দিতে প্রস্তুত আছেন তো? বিদ্বান, প্রত্যুৎপন্নমতি, বিচক্ষণ এবং তোমার জনপদের অধিবাসীকেই দৌত্যকার্য্যে নিযুক্ত করেছ তো? স্বরাজ্যে ও পররাজ্যে প্রধান-প্রধান পদের অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের সম্বন্ধে জ্ঞাতব্য সংবাদ চরগণদ্বারা অবগত থাক তো? চরগণ পরস্পর-বিরোধী তথ্য পরিবেষণ করলে তার কারণ নির্ণয় করে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা করে থাক তো? প্রজাগণ সুখে আছে তো? তারা দিন-দিন স্ব-স্ব কর্ম করে সমৃদ্ধ হচ্ছে তো? তোমার আয় বেশী, ব্যয় কম হচ্ছে তো? ধনাগার অর্থশূন্য হচ্ছে না তো? অপরাধীদের ধনলোভে ছেড়ে দেওয়া হয় না তো? তুমি সাম, দান, ভেদ ও দণ্ডের প্রয়োগ যথাস্থানে করে থাক তো? তুমি ইন্দ্রিয়গণকে জয় করতে সচেষ্ট থাক তো? অগ্নি, জল, ব্যাধি, দুর্ভিক্ষ ও মড়ক এই পাঁচ রকমের দৈববিপদের প্রতিকারের জন্য তুমি যত্নশীল থাক তো? সন্ধি-বিগ্রহাদি যথাস্থানে প্রয়োগ কর তো? ? ? ইত্যাদি ইত্যাদি। (আঃ প্রঃ ৫ম খণ্ড, ইং তাং ২-৪-১৯৪৪)


উপরোক্ত বিধানগুলো রাম রাজত্বের অনুশাসনবাদ। তাই রাম-রাজত্ব প্রতিষ্ঠা-পিয়াসী জন-প্রতিনিধিদের উচিত হবে, রামচন্দ্রের সভার ন্যায় একজন আদর্শ সভাসদরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। এবং তা’ বাস্তবায়িত করতে হলে, আদর্শ প্রজাপালকের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। সরকারী কোষাগার থেকে সাধারণভাবে বেঁচে থাকার প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা যাবে না। বর্তমান শাসনতন্ত্রের পরিকাঠামো অনুযায়ী জন-প্রতিনিধিদের জন্য বরাদ্দ সুবিধা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে রাম-রাজত্ব প্রতিষ্ঠার চিন্তা অধরাই থেকে যাবে। জনগণকে স্ব স্ব আত্মমর্যাদায় সুখে রাখতে হলে জন-প্রতিনিধিগণদের বিলাস-ব্যসন সুখ-সুবিধার কথা ভুলতে হবে, নীতিপরায়ণ হতে হবে, সর্বোপরি যথার্থ ধার্মিক হতে হবে। সেদিকে দৃষ্টি দিলে তবে কাজের কাজ কিছুটা হবে। * * *

।। স্বাধীন ভারতের প্রজাতন্ত্র ।।
মূণ্ডক উপনিষদের পবিত্র মন্ত্র ‘সত্যমেব জয়তে’-এর আদর্শকে সম্বল করে ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দের ১৫ই আগস্ট গণ প্রজাতন্ত্রী ভারতবর্ষের যাত্রা সুরু হলেও ‘‘Of the people, by the people, for the people—জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন।’’-এর লক্ষ্যে রচিত কতগুলো বিধিবদ্ধ নিয়ম, শাসন সংহিতা বা সংবিধান ১৯৪৯ খ্রীস্টাব্দের ২৬শে জানুয়ারী স্বীকৃতি লাভ করে, যে দিনটাকে ‘প্রজাতন্ত্র দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। প্রজা শব্দের অর্থ প্রকৃষ্ট জাতক। আর তন্ত্র মানে কতগুলো বিধিবদ্ধ নিয়ম বা system। প্রজাতন্ত্রের মর্মার্থ হচ্ছে, যে তন্ত্র বা system মেনে আদর্শ প্রজা নির্মাণ, পালন, পোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে রাষ্ট্রের সংহতি রক্ষায় প্রযত্নশীল থেকে পরম রাষ্ট্রিক সমবায়ের লক্ষ্যে এগিয়ে চলা যায়। ভারতের ব্রহ্মসূত্র, মহাকাব্য, বেদ, উপনিষদ, সংহিতা, আদর্শপুরুষ শ্রীরামচন্দ্র ও শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ বলে যা কিছু বর্তমান,—সবকিছুই ওই ‘সত্যমেব জয়তে’-এর আদর্শের উপরেই প্রতিষ্ঠিত। সত্য মানে অস্তিত্ব। যার অস্তিত্ব আছে যার বিকাশ আছে তাই সত্য (real)। ঋষি প্রদর্শিত এই সত্যের পথই আর্য্য ভারতবর্ষের মূলধন। আমাদের আদর্শ ছিল– ‘আত্মানং বিদ্ধি’, নিজেকে জানো, know thyself, ‘আত্মবৎ সর্বভূতেষু, মাতৃবৎ পরদারেষু, লোষ্ট্রবৎ পরদ্রব্যেষু।’ সকলকে নিজসত্তার প্রতীক মনে কর, মেয়েদের নিজের মায়ের প্রতিরূপ ভেবে শ্রদ্ধা কর, অন্যের জিনিসকে মাটির ঢেলার মত দ্যাখ। ‘মা গৃধ’, লোভ কর না। তথাপি ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের প্রজাগণ, নেতা-মন্ত্রী-জনপ্রতিনিধিগণ কেন সত্যভ্রষ্ট হচ্ছে, ভেবে দেখার প্রয়োজন নেই? নির্বাচনের নামে প্রহসন, উপ-নির্বাচনের নামে অযথা অর্থের অপব্যয় কি চলতেই থাকবে? প্রজাতন্ত্রের আঁতুড়ঘরটাই যদি অসত্যের সংক্রমণে সংক্রামিত হয়ে পড়ে তাহলে প্রজারা সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাবে কোন্ প্রতিষেধকে?—সত্যের পূজারীদের ভেবে দেখার কি কোন প্রয়োজন নেই? এই বিষয়টাকেও উপেক্ষা করেন নি শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। তিনি বিধান-বিনায়ক গ্রন্থের বাণীতে বলছেন—

“যখনই দেখবে—
শাসকমণ্ডলী ও প্রতিষ্ঠাবান ব্যক্তিরা
সৎ-এর পীড়নে
দুষ্কৃতকারীদের সাহায্য করতে ব্যগ্র,
এবং তাদের উদ্ধত ক’রে তুলবার
সরঞ্জাম সরবরাহে ব্যাপৃত—
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে,—
বুঝে নিও—
সেই দেশ
সেই জনপদ
সেই সাম্রাজ্য
অধঃপাতের দিকে ক্ষিপ্র চলৎশীল; … (সংক্ষিপ্ত)”
* * *
আর্য্য ভারতের সনাতন ধর্মের মূল গ্রন্থ ‘ব্রহ্মসূত্র’ থেকে জাত ভারতের নিজস্ব সংবিধান কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে।

‘‘সুখস্য মূলম্ ধর্ম্ম
ধর্ম্মস্য মূলম্ অর্থম্ (পুরুষার্থ)
অর্থস্য মূলম্ রাষ্ট্রম্
রাষ্ট্রস্য মূলম্ ইন্দ্রিয়-বিজয়ম্
ইন্দ্রিয়-বিজয়স্য মূলম্ জ্ঞানবৃদ্ধসেবয়া,
জ্ঞানবৃদ্ধসেবয়া বিজ্ঞানম্।।” অর্থাৎ সুখী হতে হলে ধর্ম পালন করতে হবে। প্রকৃত ধার্মিক হতে হলে পুরুষার্থের চতুর্বর্গ সমন্বিত আশ্রমধর্ম (বর্ণাশ্রম এবং চতুরাশ্রম) পালন করতে হবে। সঠিকভাবে আশ্রমধর্ম পালন করার স্বার্থে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী প্রজাদের দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী হবার জন্য জ্ঞানবৃদ্ধ সদগুরু গ্রহণ করতে হবে। গুরুর আদেশ-নিদেশ পালন করলে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করা যাবে। তবেই জীবনে সুখী হওয়া যাবে। এই হলো ভারতবর্ষের সনাতনী ধর্মের মূল কথা।

ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টি অনুসারে, ‘‘যেনাত্মন্ স্তথান্যেষাং জীবনংবর্দ্ধাঞ্চপি ধ্রীয়তে য স ধর্ম্মঃ।’’ অর্থাৎ, অন্যের বাঁচা এবং বৃদ্ধি পাওয়াকে অক্ষুন্ন রেখে, মানুষ বাঁচার জন্য, বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য যা’ যা’ করে, তাই ধর্ম। ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। ধর্ম আচরণের মাধ্যমে পালন করার জিনিস, অনুভব করার জিনিস, যা’তে প্রতিটি সত্তা তার অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করতে পারে, তার অনুশীলন করা। অথচ বাস্তব চিত্রটার সাথে মেলানো যাচ্ছে না ধর্মকে। বর্তমানে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্মের নামে চলছে বাহ্যপূজা, পৌত্তলিকতার প্রকাশ, হৈ-চৈ, প্রকাশ্যে প্রাণীহত্যা, পরিবেশ-দূষণ, রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায়। রাস্তা আটক করে, চাঁদার জুলুম করে, জনজীবন বিপর্যস্ত করে, তারস্বরে মাইক বাজিয়ে, বাজি ফাটিয়ে, অবধ্য, নিরীহ প্রাণীদের হত্যা করে ধর্ম উদযাপন করার বিধি কোন মহাপুরুষ, কোন সাধক, কোন নবী, কোন ঋষি, প্রবর্তন করেছেন কি? যদি না করে থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রের কর্তব্য সব সম্প্রদায়কে প্রকৃত ধর্ম পালনে উৎসাহিত করা। ধর্মের নামে বিধি-বহির্ভূত অসদাচারের অনুষ্ঠানের উদযাপনকে কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা।
ওইসব বিধি, নিয়ম বা সংবিধান পালন করে প্রকৃষ্ট জাতক বা প্রজা সৃষ্টির প্রবহমানতাকে রক্ষা করে চলাই ছিল আর্য্য ভারতের আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্য। ওই আদর্শ থেকে লক্ষ্যচ্যুত হলে আমাদের ঈপ্সিত শ্রীরামচন্দ্রের আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়!

শ্রীরামচন্দ্রের আদর্শের রাম রাজত্বকে বাস্তবায়িত করতে হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর ক্যাবিনেটকে বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সংবিধান “বিধান বিনায়ক” গ্রন্থের অনুশাসন অনুযায়ী এ বিষয়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

সবাই আমার প্রণাম জানবেন। জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্! tapanspr@gmail.com -------