।। ** পুরুষোত্তম-জননী মাতা মনোমোহিনী দেবীর শুভ ১৫৬তম আবির্ভাব দিবস স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ** ।।
।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মাতৃভক্তি ।।
অপটু লেখনীতে শ্রীশ্রীঠাকুরের অপার মাতৃভক্তির কাহিনী প্রকাশের প্রারম্ভে, শ্রীশ্রীঠাকুর সৃষ্ট সৎসঙ্গ আন্দোলন বিষয়ে দু-চার কথা না বললে ইষ্ট প্রতিষ্ঠা কর্মে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যেতে পারে।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সৃষ্ট সৎসঙ্গ আন্দোলন ব্যক্তি নির্মাণের আন্দোলন, শুদ্ধাত্মা সৃষ্টির আন্দোলন। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, ধনী, দরিদ্র, মুর্খ, পণ্ডিত, সৎ, অসৎ নির্বিশেষে সব্বাইকে ধারণ-পালন-সম্বেগসিদ্ধ ব্যক্তিত্বের অধিকারী করে ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর—‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চি’-র আদর্শের সোপান-পথের মাধ্যমে। সেই পথের দিশারী স্বয়ং তিনি এবং তাঁর আদর্শ। আমরা আর্য্য-ভারতবাসীরা যখন থেকে পূর্বাপূর্ব পুরুষোত্তমদের আদর্শের পথ ভুলে প্রবৃত্তি-পোষিত আদর্শের জীবন-চলনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, তখন থেকে আমাদের জাতীয় জীবনে কৃষ্টিগত অধঃপতনের সূত্রপাত হয়েছে। তাই তো বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুরকে আক্ষেপ করে বলতে হয়েছিল—
“ভারতের অবনতি (degeneration) তখন থেকেই আরম্ভ হয়েছে, যখন-থেকে ভারতবাসীর কাছে অমূৰ্ত্ত ভগবান্ অসীম হ’য়ে উঠেছে—ঋষি বাদ দিয়ে ঋষিবাদের উপাসনা আরম্ভ
হয়েছে।
ভারত! যদি ভবিষ্যৎ-কল্যাণকে আবাহন ক’রতে চাও, তবে সম্প্রদায়গত বিরোধ ভুলে
জগতের পূর্ব্ব-পূর্ব্ব গুরুদের প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হও—আর তোমার মূর্ত ও জীবন্ত গুরু বা ভগবানে আসক্ত (attached) হও, —আর তাদেরই স্বীকার কর—যারা তাঁকে ভালবাসে। কারণ, পূর্ব্ববর্ত্তীকে অধিকার করিয়াই পরবর্ত্তীর আবির্ভাব।”
শ্রীশ্রীঠাকুরের এই আক্ষেপ-বাণী শতবর্ষ অতিক্রম করলেও আমরা তাঁর আবেদনকে বাস্তবায়িত করতে ব্যর্থ হয়েছি। ব্যর্থ হয়েছি অবিকৃতভাবে পুরুষোত্তমের আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে সাধারণ জনমানসে!
তিনি বার-বার বলেছেন, “পঞ্চবর্হিঃ, সপ্তার্চ্চি, হলো আর্য্যকৃষ্টির মেরুদণ্ড ……. এগুলির রোজ স্মরণ করতে হয়। স্মরণ করা মানে শুধু চিন্তা করা নয়।” (আঃ প্রঃ ১৪/৬২)
“হিন্দুমাত্রেরই পঞ্চবর্হি বা পঞ্চাগ্নি স্বীকার্য্য—তবেই সে সনাতন হিন্দু, হিন্দুর হিন্দুত্বের সর্ব্বজনগ্রহনীয় মূল শরণ-মন্ত্র ইহাই ! পঞ্চবর্হি যেমন প্রত্যেক হিন্দুর স্বীকার্য ও গ্রহনীয়,সপ্তার্চ্চিও তেমন প্রতি মানবের অনুসরণীয় ও পালনীয়”! (পুণ্য-পুঁথি, ১ম সংস্করণ)
পরমপিতার ঐকান্তিক আবেদনকে অগ্রাহ্য করে, তাঁর আদর্শকে নিত্যদিনের উপাসনা থেকে বহিষ্কার করে, ইষ্ট প্রতিষ্ঠা নামের অজুহাতে সংগঠন-সৃষ্ট তথাকথিত আচার্য্য-পরম্পরা প্রতিষ্ঠার জন্য যে বিকৃতধারায় সৎসঙ্গ আন্দোলন জনমানসে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে, তার প্রতিকার না করতে পারলে তাঁর ঈপ্সিত আর্য্যকৃষ্টির তুর্য্যধ্বনি পল্লীর নিকেতনে নিকেতনে পৌঁছানো সম্ভব হবে কি? তাঁর ঈপ্সিত—“পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠন”-এর-ই বা কি হবে? আমাদের গুরুভক্তির গন্তব্য ঈশ্বরপ্রাপ্তির-ই বা কি হবে? তিনি যদি অবচেতনে আবির্ভূত হয়ে জবাবদিহি চান, এই প্রশ্নগুলোর, উত্তর কি দেব তাই ভাবছি! !!!!!!!!!
***
যাইহোক, এবার নির্ধারিত আলোচ্য বিষয় “শ্রীশ্রীঠাকুরের মাতৃভক্তি” নিয়ে আমার সাধ্যমত আলোকপাত করার চেষ্টা করব।
প্রাকৃতিক নিয়মেই সব সুস্থ শিশুরাই দুষ্টুমি করে। জিনিসপত্র ভাঙে, তছনছ করে। সমবয়সীদের সাথে মারামারি করে, ঝগড়া করে, অন্যায় করে মার খাওয়ার ভয়ে সবসময় সত্যিটা স্বীকারও করে না। ফলে মায়ের কাছে, পরিজনদের কাছে মার খায়, বকুনি খায়। কিন্তু আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শিশু অনুকূলের দুষ্টুমির ধরণটাই ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি কার্যকারণ ভিন্ন কখনো কোন অন্যায্য দুষ্টুমি করতেন না। আর কখনো তা অস্বীকারও করতেন না। অকপটে সব স্বীকার করতেন। তথাপি তাঁকে মা-সহ পরিজনেরা অযথা শাসন করতে ছাড়তেন না। তারাই বা কি করবেন, প্রতিবেশীদের নালিশ শুনতে শুনতে নাজেহাল হতে হয় যে। তাই ইচ্ছে না থাকলেও, লোকের মন রাখতে জননীদেবীকে অযথা তিরষ্কার, শাসন করতেই হত।
একদিন মায়ের শাসনের ভয়ে লুকিয়ে ছিলেন। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে তবুও বাড়ী ফেরেনি দেখে কর্তামা (মাতামহী কৃষ্ণসুন্দরী দেবী) বাড়ীর আনাচে-কানাচে কোথাও খুঁজে না পেয়ে কিছুটা দূরে বনের মধ্যে এক গাছতলায় বসে থাকতে দেখতে পান। প্রশান্ত বদনে বসে আছেন, তাঁর দেহ থেকে গোলাপী রঙের উজ্জ্বল জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয়ে চারিদিক আলোকিত করে ফেলেছে এবং কতগুলো ছায়ামূর্তি বালক অনুকূলকে ঘিরে আনন্দে নৃত্য করছে। ওই দৃশ্য দেখে কর্তামা ভয় পেয়ে ‘রাম নাম’ জপতে জপতে দৌড়ে গিয়ে দৌহিত্রকে কোলে করে নিয়ে ছুটে বাড়ীতে ফেরেন।
আর একদিন কোন এক দুষ্টুমির জন্য জননীদেবী ছেলেকে শাসন করার জন্য ধরতে যাবেন বুঝতে পেরে অনুকূল দৌড়ে পালাতে গেলে জননীদেবীও পিছন পিছন ছুটতে শুরু করেন। কিছুতেই ধরতে পারছেন না। দৌড়তে দৌড়তে হাঁপিয়ে পড়েছেন। মায়ের কষ্ট হচ্ছে দেখে নিজেই ধরা দেন মায়ের হাতে। মায়ের সব শাসন তিনি আশীর্বাদ মনে করে মাথা পেতে
নিতেন। মায়ের কোন কষ্টই তিনি সহ্য করতে পারতেন না।
মায়ের সব কথা তিনি মেনে চলতেন। তিনি তখন পাবনা ইনস্টিটিউশনে তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র (বর্তমানের অষ্টম শ্রেণী)। অঙ্ক পরীক্ষার দিন। দেরি করে খেতে বসেছেন। স্কুলে যেতে দেরি হবে মনে করে মা বললেন, দেখিস্, আজ তুই অঙ্কের পরীক্ষা পারবি না।
যথারীতি স্কুলে গেছেন। পরীক্ষা শুরু হয়েছে। সব সহপাঠীরা অঙ্ক কষছেন, কিন্তু অনুকূলকে প্রশ্নপত্র হাতে নিয়ে চুপ করে বসে থাকতে দেখে শিক্ষক মহাশয় জিগ্যেস করেন, কি, চুপচাপ বসে কেন, অঙ্কগুলো কি কঠিন লাগছে?
অনুকূল শিক্ষক মহাশয়কে বলেন, না স্যর, অঙ্কগুলো সব আমি কষতে পারবো, কোন অসুবিধাই হবে না। কিন্তু কষতে পারছি না মায়ের কথার জন্য। আজ দেরি করে খেতে বসেছিলাম দেখে মা বলেছিলেন, দেখবি আজ একটাও অঙ্ক করতে পারবি না। তাই, আমি যদি
অঙ্কগুলো কষে ফেলি, তাহলে মায়ের কথা মিথ্যা হয়ে যাবে। আপনি আমায় ক্ষমা করবেন, অঙ্ক কষে মাকে মিথ্যেবাদী বানাতে পারব না! তাঁর ওই মাতৃভক্তির দৃষ্টান্ত দেখে সহপাঠি এবং শিক্ষকেরা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। পরে পৃথকভাবে অঙ্কের পরীক্ষা নিয়েছিলেন।
(সতীশচন্দ্র জোয়ারদার প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ৩৯ পৃঃ)
মায়ের প্রতি ঠাকুরের এমন একটা প্রাণকাড়া টান ছিল যে, কখনো কোন কারণে মায়ের কাছ থেকে অযথা কঠোর শাসন-তিরস্কার পেলেও তিনি হাসিমুখে মেনে নিতেন, কোন প্রত্যুত্তর করতেন না।—পাছে মা কষ্ট পায়, তাঁর প্রতি রুষ্ট হয়!—এই ভেবে! সর্বদা মায়ের আদর, সোহাগ, সান্নিধ্য, একটু বাহবা পাবার আশায় উন্মুখ হয়ে থাকতেন।
অথচ মা যে তাঁর প্রতি কতটা নির্দয় ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া তাঁর একটি বাল্যকালের রচনা থেকে।
It was written when my mother chid me.
কেন গো মা হেন ভাব সন্তানের প্রতি,
কি দোষ করেছি মাগো চরণ কমলে ?
সদাই কেন গো হেন কোপ মম প্রতি,
সদা গালাগালি কেন কর বরিষণ?
আমি কি গো পুত্র নয় তোমার জননী,
গর্ভে কি গো ধরনি মা অভাগা সন্তানে ?
আর আর যত তব পুত্রদের প্রতি,
সদাই সন্তোষ ভাব দেখাও জননী।
তারা যদি কাছে এসে ডাকে মা মা বলি,
প্রশান্ত হৃদয়ে মাগো উত্তর প্রদান।
আমি যদি কাছে এসে ডাকি মা মা বলি,
মোর ভাগ্যে শুধু ছাই দন্ত কড়মড়ি।
পিতার নিকটে যদি যাই গো জননী,
মিষ্ট কথা শুনিবারে মনের উল্লাসে,
তিনিও কঠোর বাক্য প্রয়োগি আমারে,
দূর ক’রে দেন মোরে সে স্থান হইতে।
মিষ্ট কথা ভালবাসি আমি গো জননী,
তাই সাধ যায় মম মিষ্ট শুনিবারে
যেই গো জননী মোরে বলে মিষ্ট ভাষ,
অমনি তাহার আমি হই পদানত।
ঈশ্বরের কেন গো মা এ কঠিন রীতি
যে-জন যাহা চায় তাহা নাহি পায় কেন?
(ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থ, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১০৭-১০৮)
এখানে একটা লক্ষণীয় বিষয়—শ্রীশ্রীঠাকুর এই রচনার মাধ্যমে মায়ের বিরুদ্ধে কোন নালিশ না জানিয়ে, মা-কে দোষারোপ না করে, ঈশ্বরের ওই-ধরণের বৈষম্যমূলক রীতি কেন, তা মায়ের কাছে জানতে চেয়েছেন!
শ্রীশ্রীঠাকুর পরবর্তীকালে পরিণত বয়সে কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, — “আমার জীবনের একমাত্র নেশা ছিল মাকে খুশী করা। আমার বুদ্ধি-বিবেচনা-শক্তিমত বরাবর সেই চেষ্টা করেছি। আমার লোভ ছিল, মার কাছ থেকে বাহবা পাওয়ার, তাঁর আদর পাবার। কিন্তু মা ছিলেন আমার প্রতি বড় কড়া, তাঁর শাসন ও ভর্ৎসনা পেয়েছি অজস্র, তাঁর সোহাগের জন্য ক্ষুধা থাকলেও তেমন পাইনি তা’। তাহ’লে কি হবে ? মা ছাড়া যে আমার অচল। মা যতই অসন্তুষ্ট হউন, রুষ্ট হউন, কেবল এৎফাক খুঁজতাম, কেমন ক’রে মাকে তুষ্ট করব। ঐ ছিল আমার ধান্ধা। প্রতিকূল অবস্থায় ছেড়ে দেবার আমার কোনকালে হয় না। তখন আমার গোঁ চেতে যায়, কেমন ক’রে সেটাকে আয়ত্তে আনব। ছেলেবেলায় পাড়ার সকলেই ছিল আমার অভিভাবক। খানাকা কতজনে কান চেপে ধ’রে দুটো চড় দিয়ে ছেড়ে দিত। সেখানে দোষ হয়ত আমার কিছুই নেই। অন্য কারও দোষের কথা যে কব, তাও আমার কখনও মন চাইত না। অনেকে আজেবাজে কথা মার কাছে এসে লাগাত। মাও চালাতেন একচোট। এই রকম যতই ঘটুক, আমি কখনও হতাশ হতাম না, নিরাশ হতাম না। ভাবতাম, আমি আমাকে এমনভাবে তৈরী করব, এমনভাবে চলব, যা’তে এর অবকাশ না ঘটে।” (আলোচনা-প্রসঙ্গে, ৩য় খণ্ড)
“আমি বড় হব, আমাকে মানুষ বড় কবে—সে কল্পনা আমার কোন দিনই নাই। ওই ধারণায় আমি ব্যক্তিগতভাবে কোন সুখ পাই না। তবে হ্যাঁ। মার কাছে মানুষে সুখ্যাতি করলে মা সুখী হবেন, মা আমাকে বাহাদুর ছেলে ব’লে বাহবা দেবেন, সে লোভ আমার ছিল। লোভ থাকলে কি হবে, মা যেন. কিছুতেই আমার উপর প্রসন্ন হতেন না। আমি যেন অপরাধ ক’রেই আছি তাঁর কাছে৷ কিন্তু তবু, আমি হাল ছাড়তাম না, নাছোরবান্দা হয়ে লেগে থাকতাম মাকে খুশী করবই। মার হয়ত আমাকে না হ’লে চলতে পারতো, আমার কিন্তু মা ছাড়া চলারই উপায় ছিল না। তাই মার খুশীর ধান্ধায় ঘুরতেই হ’তো আমাকে।”
(সূত্রঃ ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থ, ১ম খণ্ড)
মাতা মনোমোহিনী দেবী ও সন্ত সদগুরু পরম্পরা
পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জন্মদাত্রী বিশ্বজননী মনোমোহিনী দেবী বাংলা ১২৭৭ সালের ১৮ই জ্যৈষ্ঠ পাবনা জেলার হিমাইতপুরের বিখ্যাত চৌধুরী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম রামেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী, মাতার নাম কৃষ্ণসুন্দরী। আট বছর বয়সে ধ্যানের মাধ্যমে সৎনাম পান। নয় বছর বয়সে পাবনা জেলার অধীন চাটমোহর গোয়াখাড়া গ্রামের পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তীর পুত্র শিবচন্দ্র চক্রবর্তীর সাথে বিবাহ হয়। বিবাহের পর আগ্রা সৎসঙ্গের দীক্ষাপ্রাপ্ত শিষ্য ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তী মহোদয়ের সাহায্যে ধ্যানযোগে প্রাপ্ত গুরুদেব হুজুর মহারাজ (রায় সালিগ্রাম সিংহ বাহাদুর) মহোদয়কে কলকাতায় দর্শন করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দীক্ষা গ্রহণ করেন।
পুরুষোত্তম জননী মাতা মনোমোহিনী দেবীর দীক্ষাগুরু ছিলেন হুজুর মহারাজ। তিনি সন্তমতের যে সাধনা করতেন, সেই সাধনার ধারা সে-সময় বাংলাদেশে প্রচলিত ছিল না। সন্তমতের আদি সাধক কবীরদাস জন্মেছিলেন 1440C বারানসীতে। তিনিই প্রথম সত্মন্ত্রের রহস্য ভেদ করে বলেছিলেনঃ
“কবীর ধারা অগমকী সদগুরু দয়ী লখায়,
উলট তাহি সুমিরন করে স্বামী সংগ লাগায়।”
—অর্থাৎ ধারা উল্টে স্বামী যোগ করে জপ করতে নিদেশ দিলেন। কবীরের পর গুরু নানক জন্ম গ্রহণ করেন 15. 4. 1469 C পঞ্জাব প্রদেশের তালবণ্ডীতে। তিনিও ওই সত্নাম প্রচার করেছেন। কবীর সাহেবের পর আগ্রাতে ২৪ শে আগস্ট ১৮১৮ তে জন্মগ্রহণ করেন শিবদয়াল সিং, তিনি স্বামীজী মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ১৫ জুন ১৮৭৮ আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। পরবর্তী গুরু হন রায় সালিগ রাম। তিনি ১৪ মার্চ, ১৮২৯ আগ্রার পীপল মাণ্ডিতে জন্মগ্রহণ করেন। ৬ ডিসেম্বর ১৮৯৮তে আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। তিনি হুজুর মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ওই সৎনাম সাধন করে চরম ও পরম পথের সন্ধান পান। তিনি তাঁর গুরু স্বামীজী মহারাজের অনুমতি ক্রমে ওই সৎনাম সর্বসাধারণ্যে প্রচার করেন। পরবর্তী গুরু হন পণ্ডিত ব্রহ্মশঙ্কর মিশ্র। যিনি ২৮শে মার্চ, ১৮৬১ তে ব্রাহ্মণ পরিবারে, বারানসীতে জন্মগ্রহণ করেন। ১২ অক্টোবর ১৯০৭ সালে দেহত্যাগ করেন। তিনি মহারাজ সাহেব নামে খ্যাত ছিলেন। মহারাজ সাহেব দেহত্যাগের পূর্বে একটি কাউন্সিল গঠন করে বাবু কামতা প্রসাদ ওরফে সরকার সাহেবকে পরবর্তী গুরু রূপে নির্বাচন করেন। (শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরকার সাহেবকে সন্ত বলে উল্লেখ করেছেন, ভাববাণীতে।)
* * *
মাতা মনোমোহিনী দেবী সময় সুযোগ পেলেই এলাহাবাদ, কাশী, আগ্রায় গিয়ে গুরুদেবের সাথে সাক্ষাত করতেন। তিনি একবার গুরুর কাছে প্রার্থনা জানিয়ে বলেছিলেন, ‘‘আশীর্বাদ করুন, যেন আপনার মত সন্তান লাভ করতে পারি।’’
উত্তরে তাঁর গুরুদেব বলেছিলেন, আমার মত কেন, আমার চেয়ে মহৎ সন্তান তোমার গর্ভে জন্মাবে। তাঁর আলোয় পৃথিবী আলোকিত হবে।
তাঁর গুরুদেবের বলা কথা নিষ্ফল হয়নি। সব গুরুদের গুরু ইষ্টগুরু পুরুষোত্তমের জননী হন মাতা মনোমোহিনী দেবী। স্বামী, সন্তান ও বৃহত্তর পরিবেশের সেবা করে, অসৎ-নিরোধী তৎপর থেকে সব রকমের প্রতিকূল পরিস্থিতিকে সামাল দিয়ে ত্রিসন্ধ্যা নামধ্যান ও উপাসনায় অতিবাহিত করতেন। তাঁর গুরুদেবের মাহাত্ম্য-আলোচনা করতেন, বিপুল সমারোহে গুরুদেবের জন্মতিথি পালন করতেন। গুরুদেবের ইচ্ছা-পূরণ, প্রীতি সম্পাদনের জন্য তিনি সর্বদা উন্মুখ থাকতেন। তৎকালীন ও তৎপূর্বতন রাধাস্বামী-মতের সন্তগুরুগণের পুণ্য লীলাভূমি — কাশী, আগ্রা, এলাহাবাদ প্রভৃতি স্থানে প্রায়শ তীর্থ-পর্যটনে গমন করে তিনি অন্তরে প্রভূত আনন্দ ও শান্তি লাভ করতেন।
গুরুর আরাধনা করার জন্য তিনি পদ্মাতীরের একটা নিমগাছতলায় সুন্দর মন্দির নির্মাণ করে গুরুদেবের একখানি পূর্ণাবয়ব বৃহদায়তন প্রতিকৃতি স্থাপন করেছিলেন।
গুরুদেবকে নিয়ে অনেক বন্দনা-গীতিও তিনি রচনা করেছিলেন। তার একটি উদ্ধৃত করছি।
দয়া কর গুরুদেব আঁধার অবনী’পরে
বিতরি করুণা-কণা জাগাও নিদ্রিত নরে ।
করিবে দয়া যখনি
জাগিবে সকল প্রাণী
পালাবে সংশয় যত
তব আগমন হেরে ।৷
তুমি হে পরমপিতা
তুমি সর্বসুখদাতা
তব প্রেমে কত মধু
বুঝাও যতন করে ৷।
পাইলে তব আস্বাদ
ঘুচবে সব অবসাদ
দূরে যাবে সব পরমাদ
নাচিবে আনন্দ ভরে।।”
(ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ১ম খণ্ড, পৃঃ ৪২-৪৩)
শ্রীশ্রীঠাকুরের আবির্ভাব ও দীক্ষা।
মাতা মনোমোহিনী দেবী আঠারো বছর বয়সে প্রথম অন্তঃসত্ত্বা হন। একদিন দুপুরে একজন সন্ন্যাসী মনোমোহিনী দেবীর কাছে সেবা নিতে চাইলে তিনি ভক্তিভরে অতিথিকে সেবা করেন। সন্ন্যাসী বাড়ী ছেড়ে যাবার সময় বলেন, এই বাড়ির একমাত্র পুত্রের মৃত্যু হবে। এবং এই বাড়িতে একজন মহাপুরুষ জন্মাবেন, যিনি বহুলোকের অধীশ্বর হবেন এবং জগতের প্রভুত কল্যাণ সাধন করবেন।
তার কিছুদিন পরেই মনোমোহিনী দেবীর ভাই যোগেন্দ্রনারায়ণ, (ডাকনাম ছিল লোহা) অসুস্থ হয়ে পড়েন, রোগভোগে দেহত্যাগ করেন। ওদিকে মনোমোহিনী দেবীর গর্ভে ১১টি সৌরমাস অতিক্রম করে, গর্ভবাসের লীলা সেরে, মাটির পৃথিবীতে ভূমিষ্ট হয়েছিলেন মনোমোহিনী দেবীর ১ম সন্তান। শাস্ত্র-নির্দিষ্ট সব লক্ষণ নিয়েই মানবদেহে সীমায়িত হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন পিতার-পিতা পরমপিতা। বারেন্দ্র শ্রেণীর ব্রাহ্মণ পিতা শিবচন্দ্র চক্রবর্তী এবং মাতা মনোমোহিনীর সন্তানরূপে। অবিভক্ত বাংলার পাবনা জেলার হিমাইতপুর গ্রামে। বাংলা ১২৯৫ সনের ৩০শে ভাদ্র, সংক্রান্তির শুভ সকালে, চার দণ্ড বিশ পল্-এ।
‘‘অকূলে পড়িলে দীন হীন জনে
নুয়াইও শির, কহিও কথা।
কূল দিতে তারে সেধো প্রাণপণে
লক্ষ্য করি তার নাশিও ব্যথা।’’
—উপরোক্ত চার পংক্তির আশীর্বাণীর আদ্যাক্ষর মিলিয়ে অ-নু-কূ-ল নামকরণ করেছিলেন বিশ্বজননী মাতা মনোমোহিনী দেবী। অন্নপ্রাশন সংস্কারের শুভলগ্নে।
ছোটবেলা থেকেই পুত্র অনুকূলের বিবিধ আধিদৈবিক কার্যকলাপ, অত্যাশ্চর্য্য ব্যাপার-স্যাপার প্রত্যক্ষ করে মাতা মনোমোহিনী দেবী বিশেষ চিন্তিত ছিলেন। কলকাতার বৌ-বাজারে ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুলে অ্যালোপ্যাথী মতে ডাক্তারি পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরে আসার পরও তার ব্যতিক্রম ছিল না। হিতৈষীদের পরামর্শ মেনে অনেক কিছু করেও নিজের ছেলেকে নিজের মনের মত, অন্যান্য দশজন জীবকোটির ছেলের মত আচার-আচরণে স্বাভাবিক করতে পারলেন না। অবশেষে হুজুর মহারাজ পরবর্তী তৎকালিন আগ্রা সৎসঙ্গের সদগুরু বাবু কামতাপ্রসাদ ওরফে সরকার সাহেবের কাছে সকল বৃত্তান্ত জানিয়ে চিঠি লেখেন, গাজিপুরে। সরকার সাহেব তখন অন্তিম শয্যায়। চিঠি পেয়ে খুব আনন্দিত হন। চিঠির উত্তরে তিনি লিখেছিলেন, ‘মেরা কাম হো গয়া, তুমি ছেলেকে দীক্ষা দিয়ে দাও।’ ওই পত্র মারফৎ অনুমতিই ছিল মাতা মনোমোহিনী দেবীর পাঞ্জা। পুরুষোত্তমরূপী সদগুরু অবতীর্ণ হয়েছেন বুঝতে পেরে সাধ্যায়ী গুরু তাঁর দায়িত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন। সরকার সাহেব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গাজীপুরে। তারপর থেকেই মাতা মনোমোহিনী দেবী সন্তমতের সৎনামে দীক্ষা দিতে শুরু করেছিলেন।
যাইহোক, সরকার সাহেবের অনুমতি ক্রমে মাতা মনোমোহিনী দেবী অনুকূলচন্দ্রকে সত্মন্ত্র প্রদান করার পর ঠাকুর বলেছিলেনঃ এ তুই কি দিলি ? এ নাম তো আমি তোর পেটে থাকতেই করি। অর্থাৎ উনি যে ওই সৎ নামের নামী-পুরুষ সেই তত্ত্বই তিনি ব্যক্ত করলেন তাঁর মায়ের কাছে।
অধ্যাত্মশাস্ত্রবিদূষী সাধিকা মনোমোহিনী দেবী, পুত্র অনুকূলচন্দ্রের নামধ্যান সংক্রান্ত সমস্ত অনুভূতির বর্ণনা শুনে বিস্মিত ও আনন্দিত হয়ে পুত্র অনুকূলচন্দ্রকে বলেছিলেন, ‘‘এই নামই তো আদি সৎ-নাম। তুই এই নাম করতে থাক।’’
- * *
সৎসঙ্গ আন্দোলনে মাতা মনোমোহিনী দেবীর ভূমিকা
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সৎসঙ্গ আন্দোলনের সূচনা করেন কীর্তন প্রচারের মাধ্যমে। কীর্তন করতে করতে তিনি অচৈতন্য হয়ে পড়ে যেতেন, কাৎলা মাছের মত লাফাতেন, থর্ থর্ করে কাঁপতো তাঁর পায়ের বুড়ো আঙুল ! দেহ থেকে শ্বেতবর্ণের স্বেদ নির্গত হতো! রোমকূপ দিয়ে রক্ত ঝরতো পিচকিরি দিয়ে!
যোগশাস্ত্রের পুঁথিতে যে-সমস্ত আসনের কথা উল্লেখ নেই অক্লেশে নতুন নতুন আয়াসসাধ্য সব আসন করতেন! আসন করতে করতে উঠে পড়তেন ৫-৬ হাত উপরে, শূন্যে! আবার নিথর-নিষ্পন্দ হয়ে ভূমিতে শুয়ে পড়তেন। তাঁর শ্রীমুখ থেকে নির্গত হতো মানব জীবনের জটিল সব সমস্যার সহজ সমাধানী বাণী। নানা ভাষায়। উপস্থিত কোন মানুষের মনের কথার, প্রাণের ব্যথার উত্তর দিতেন।
এমন সব সাধারণের বুদ্ধির গণ্ডীর বাইরের সব ঘটনা প্রত্যক্ষ করে নানা মানুষ নানা মত প্রকাশ করেছেন। কেউ বলছেন মৃগী রোগ, কেউ বলছেন নির্ঘাৎ কোন দানোতে ধরেছে। কেউ আবার পরীক্ষা করার জন্য জ্বলন্ত অঙ্গার চেপে ধরতেন। পরীক্ষা করার জন্য সূঁচালো শলাকা ঢুকিয়ে দিতেন শরীরে! মানুষ কত বীভৎস হলে এসব কাজ করতে পারে!— ব্যথা ভারাক্রান্ত মনে অনুকূলচন্দ্রের অন্তরঙ্গ কীর্তন পার্ষদ কিশোরীমোহন, অনন্তনাথ রায় ও মুকুন্দচন্দ্র ঘোষ প্রমুখগণ পাবনা জেলা-কোর্টের লব্ধপ্রতিষ্ঠ উকিল পরম-বৈষ্ণব বৃন্দাবনচন্দ্র অধিকারীর কাছে সব নিবেদন করেন। সব শুনে, তিনি পরম কৌতূহলী হয়ে পর পর কয়েকদিন কীর্তনে যোগদান করেন। প্রত্যক্ষ করেন অপূর্ব কীর্তনের দৈবীলীলা। তাঁর শ্রীমুখ নিঃসৃত বাণীসমূহের ভাব-গাম্ভীর্য ও সার্বজনীনতা উপলব্ধি করে একান্ত বিস্মিত হন। ঠাকুরের অন্তরঙ্গ সঙ্গীদের ডেকে বলেন, শাস্ত্রাদিতে যে সমস্ত সমাধির কথা জানা যায় সেসবের তুলনায় অনেক উচ্চস্তরের নির্বিকল্প সমাধি। “এ সকল শ্রীমন্মহাপ্রভুর ভাব—বিশ্বহিতের জন্য পরমাত্মার মহাবাণী—মানব জাতির পরম সম্পদ। বহু-যুগ অন্তে পরমপিতার বিশেষ ইচ্ছায় কদাচিৎ এরূপ ঘটিয়া থাকে। সুতরাং আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ, তোমরা এখন হইতে ঠাকুরের শ্রীকণ্ঠোচ্চারিত এই সকল মহাবাণীর একটি অক্ষরও বাদ না দিয়া সমুদয়ই যথাশক্তি নিঃশেষে লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিবার ব্যবস্থা করিবে। আমি আশা করি, তোমরা ইহা অবশ্যকরণীয় পরম-পবিত্র কর্তব্য বলিয়া মনে করিবে।”
বৃন্দাবনবাবুর ওই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের অন্তরঙ্গ ভক্তেরা। হিমাইতপুর, প্রতাপপুর, কাশীপুর, কুষ্টিয়া, বাড়াদি, খলিলপুর, বরইচারা, ধুশণ্ডু (নদীয়া), কণ্ঠ গজরা (নদীয়া), ধলহরাচন্দ্র (যশোহর), খোকসাজানিপুর (নদীয়া), রাতুলপাড়া (নদীয়া), কমলাপুর (নদীয়া), মদাপুর (নদীয়া) হরিণাকুণ্ডু (নদীয়া) চক্রতীর্থ (২৪ পরগণা) প্রভৃতি স্থানে, যেখানেই ঠাকুর কীর্তনদলের সাথে যেতেন, সাথে লিপিকারেরাও যেতেন। প্রস্তুত থাকতেন শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাববাণীসমূহ লিখে রাখার জন্য। তাঁরা সাংসারিক সব কাজকর্ম ফেলে সযত্নে সেগুলো ধরে রেখেছিলেন বলেই ওই দৈবী-লীলার সাথে পরিচিত হতে পেরেছে জগৎবাসী। ওই অবদানের জন্য জগদ্বাসী চিরঋণী হয়ে থাকবে পরমবৈষ্ণব বৃন্দাবনচন্দ্র অধিকারী, ভক্তবীর কিশোরীমোহন, মহারাজ অনন্তনাথ রায়, আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী প্রমুখ পুরুষোত্তম-পার্ষদ ঋদ্ধি-সেনানীদের কাছে।
কুষ্টিয়া অনুষ্ঠিত বিশ্বগুরু উৎসবের পর থেকেই ঠাকুর দর্শনে হিমাইতপুরে নানা স্থানের ভক্ত-সমাগম হতে থাকে। ঠাকুরের কথা জানতে পেরে কলকাতার ব্যারিষ্টার চন্দ্রশেখর সেন হিমাইতপুর আসেন ঠাকুর দর্শনে। ঠাকুরের সাথে আলাপচারিতায় মুগ্ধ হয়ে দীক্ষা গ্রহণ করেন। ঠাকুরের মহান আদর্শ কলকাতার সম্ভ্রান্ত মহলে প্রচারিত হওয়ার ফলে বিদগ্ধ মহলে সাড়া পড়ে যায়। তাঁর যাজনে অনুপ্রাণিত হয়ে সম্ভ্রান্ত মানুষেরা শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ গ্রহণ করেন।
সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ মহামহোপাধ্যায় পন্ডিত কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন মহোদয়ের দ্বিতীয় পুত্র বিজ্ঞান গবেষক কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য ১৩৩০ বঙ্গাব্দের প্রথমদিকে স্থায়ীভাবে হিমাইতপুর চলে আসেন। ১৩৩০ সালের অগ্রহায়ণ মাসে স্থায়ীভাবে চলে আসেন বঙ্কিমচন্দ্র রায়। ১৩৩০ সালের ২৪শে অগ্রহায়ণ শ্রীশ্রীঠাকুরের পিতৃবিয়োগ হয়। একই সময়ে বিজ্ঞান গবেষক কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য মহোদয়েরও পিতৃবিয়োগ হয়। তথাপি তিনি ঠাকুরকে ছেড়ে বাড়ী না গিয়ে আশ্রমেই পিতৃদেবের শ্রাদ্ধাদি ক্রিয়া করেছিলেন। ১৩৩০ সালের ফাল্গুন মাসে ময়মনসিংহের উকিল শ্রীব্রজগোপাল দত্তরায় সপরিবারে আশ্রমে চলে আসেন এবং তপোবন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। আশ্রম সংগঠনকে গড়ে তুলতে প্রকাশচন্দ্র বসু, প্রবোধচন্দ্র বাগচী, চারুচন্দ্র সরকার, অনুকূল ব্রহ্মচারী, তারাপদ বাগচী, অধ্যাপক পঞ্চানন সরকার, ডাঃ গোকুলচন্দ্র মন্ডল প্রমুখ ভক্তবৃন্দসহ অনেকেই ঠাকুরের নিরবচ্ছিন্ন সান্নিধ্য লাভের আশায় স্থায়ীভাবে চলে আসেন হিমাইতপুরে। শ্রীযুক্ত সুশীলচন্দ্র বসু, তাঁর পত্নী রাণীমা, নফরচন্দ্র ঘোষ, যতীন্দ্রনাথ সরকার, হরিদাস ভদ্র প্রমুখ ভক্তগন তখন ঠাকুর বাড়ীতেই থাকতেন। ক্রমশঃ স্থায়ী বাসিন্দা বৃদ্ধি পেতে থাকলে কতগুলো খড়ের ও টিনের ঘর তৈরি করা হয়। পদ্মার ধারে বাঁশঝাড়ের মধ্যে কয়েকটা খাটা পায়খানা তৈরি হয়। এইভাবে প্রয়োজন অনুপাতে কুটিরের পর কুটির নির্মিত হতে থাকে। ক্রমে ক্রমে গড়ে ওঠে আশ্রম। প্রথম পত্তনকালীন তখনকার লোকেরা হিমাইতপুরের আশ্রমকে বলতো অনুকূল ঠাকুরের আশ্রম। পরে শ্রীশ্রীঠাকুরের মা আগ্রা সৎসঙ্গের অনুকরণে ‘সৎসঙ্গ আশ্রম’ এবং দীক্ষিতদের ‘সৎসঙ্গী’ নামে অভিহিত করেছিলেন। মূর্খ-পণ্ডিত-ধনী-নির্ধন-জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষ একে একে সমবেত হতে শুরু করলো হিমাইতপুরে। শুরু হলো লোকসংগ্রহ পর্ব। শুরু হলো কর্মযজ্ঞ।
এক এক করে গড়ে ওঠে আনন্দবাজার, কেমিক্যাল ওয়ার্কস, তপোবন বিদ্যালয়, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র, প্রেস, পাব্লিশিং হাউস, কলাকেন্দ্র, কুটীর শিল্পাগার প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান। সব কর্মকাণ্ডের সাথে মায়ের অগ্রণীর ভূমিকা ছিল। তাঁর চরিত্র ছিল, কুসুমের ন্যায় কোমল, পাথরের ন্যায় কঠিন। আধ্যাত্ম জগতের সাথে সাথে জাগতিক জগতেও তিনি ছিলেন সকলের অভিভাবক স্বরূপা। নিজের, নিজের পরিবারের সব বিপদ-আপদকে তুচ্ছ করে অন্যকে রক্ষা করতেন জগজ্জননী-স্বরূপিণী হয়ে। হিমাইতপুর সৎসঙ্গ আশ্রমের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী। আশ্রমিকদের খাওয়া-দাওয়া, শিক্ষা, স্বাস্থ্য রক্ষা, প্রতিরক্ষা ইত্যাদি সব বিষয়ে তিনি সজাগ থাকতেন। দুর্বৃত্তদের অত্যাচার থেকে আশ্রমিকদের রক্ষা করতে লাঠি হাতে সারারাত জেগে পাহারা দিতেন। তাঁর ভয়ে আশ্রমে কেহ অন্যায় কাজ করতে সাহস পেত না।
মহাত্মাগান্ধী হিমাইতপুর আশ্রম পরিদর্শন করে আশ্রমের ভুয়সী প্রশংসা করার পর বলেছিলেন, “I have never seen a masterly woman of such wonderful personality in my life.”
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৃষ্ট সৎসঙ্গ আন্দোলন বিশ্ব পরিবার সংগঠনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রূপে একসময় প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল হিমাইতপুরে। সুদূর আমেরিকার খ্রিস্টান সম্প্রদায়ভুক্ত শ্রদ্ধাভাজন স্পেনসারদা, হাউজারম্যানদা, ইসলাম সম্প্রদায়ের খলিলুর রহমান, ব্রাহ্মণ পরিবারের বিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য মহোদয়ের ন্যায় পণ্ডিত ব্যক্তি প্রমুখদের পাশাপাশি খুব সাধারণ মাপের, অভাবে পরিশ্রান্ত মানুষদের পরিবার নিয়ে গড়ে তোলা পরিবারের নাম ছিল বৃহত্তর সৎসঙ্গীদের একটা পরিবার। দিনান্তে একবার আনন্দবাজারে আশ্রমমাতা জননী মনোমোহিনী দেবীর মাখা “দলা” প্রসাদ খেয়ে পরমানন্দে আশ্রম সংগঠনের ইষ্টের ঈপ্সিত কর্মে মত্ত থাকতেন—বিনা ওজরে, বিনা আপত্তিতে। ওই একবেলা খেয়েই নামধ্যান, কীর্তন, পঠন-পাঠন, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, সংস্কৃতি, বিজ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন থাকতেন। সকল পরিবার ছিল একে অপরের পরিপূরক পরিবার। সে এক স্বর্ণালি যুগ ছিল সৎসঙ্গের। প্রতিটি পরিবারের অভিভাবক ছিলেন মাতা মনোমোহিনী দেবী। সেই সৎসঙ্গ পরিবারের সদস্য আমরা। ব্যক্তি, দম্পতি, গৃহ, সমাজ, রাষ্ট্র জীবনকে অখণ্ড রেখে, প্রাচ্য-প্রতীচ্যকে বর্ণাশ্রমানুশাসনে নিয়ন্ত্রণ করে পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন আমাদের জীবন দেবতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। আমরা যদি ঠাকুরের আদর্শের পরিপালনে, পরিবার থেকে, সমাজ থেকে ডিভোর্সকে, বৃদ্ধাশ্রমকে বিদায় জানিয়ে, পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি মিলেমিশে এক ছাদের নীচে জীবন যাপন করে এক-একটা আদর্শ পরিবারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি—সার্থক হবে শ্রীশ্রীঠাকুরের সৎসঙ্গ আন্দোলন।
মাতা মনোমোহিনী দেবী তাঁর গুরুদেব সাধক পুরুষ হুজুর মহারাজের কাছ থেকে যে বিনতী করতে শিখেছিলেন, সেই শিক্ষার ধারাটাকে প্রাধান্য দিয়ে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন পাবনার সৎসঙ্গ আন্দোলন। যে ধারায় বীজমন্ত্রের উচ্চারণ স্বীকৃত, বীজমন্ত্রের মাধ্যমেই পারস্পরিক সম্ভাষণ প্রচলিত। আর্য্যকৃষ্টির দশবিধ সংস্কার অবহেলিত—যা শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শের পরিপন্থী! যার ফলে, আজও বিনতীর মাধ্যমে বীজমন্ত্র উচ্চারিত হয়ে চলেছে। নিত্য সাধ্যায়ের জন্য আবশ্যিক, শ্রীশ্রীঠাকুর রচিত ‘জাগরণী’ সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দীক্ষিতরা যতটা না জানেন, তার চেয়ে বেশি মানেন মাতা মনোমোহিনী দেবী রচিত তাঁর গুরুদেবের প্রশস্তির প্রভাতী গীতি ‘প্রভাত যামিনী উদিত দিনমনি’-কে।
শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শের অনুগামীদের ঊষা-নিশায় মন্ত্রসাধন করা এক আবশ্যিক সাধনা। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সেকথা তিনি বার-বার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এ বিষয়ে একটা উদ্ধৃতি তুলে ধরছি।
শ্রীশ্রীঠাকুর কয়েকজনকে লক্ষ্য ক’রে বললেন—খুব সকালে উঠে ভোর চারটের মধ্যে প্রাতঃকৃত্যাদি ও নামধ্যান সেরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাগরণী গান গেয়ে সবাইকে জাগিয়ে দিতে হয়। তাড়াতাড়ি যাতে নামধ্যানে বসে তা’ করতে হয়। ওতে লোকে আনন্দ পায়, স্ফূর্তি পায়, তাদের শরীরও ভাল থাকে। আগে যতদিন ভোরে সবাইকে জাগিয়ে দিয়ে নামধ্যান করিয়েছি, ততদিন মানুষ অকালে মরেনি। তাই প্রত্যেককে এটা করানো লাগে। (আ. প্র. ১৬/ ১৫. ৪. ১৯৪৯)
তপো-বিধায়না গ্রন্থ থেকে—
“প্রার্থনা বা তপঃ-উপাসনার পক্ষে
ঊষা বা ব্রাহ্মমুহূর্ত্ত,
মধ্যাহ্ন ও সায়ংকাল—
এই তিনই শ্রেষ্ঠ,
তা’র ভিতর আবার
ব্রাহ্মমুহূর্ত্তই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ;
মানসিক জপ সর্ব্বকালেই শ্রেয়;
আবার, প্রসন্ন, নির্দ্বন্দ্ব,
হৃদ্য-প্রীতি-প্রবুদ্ধ-যাজন
যা’ চিন্তন ও কথনের ভিতর-দিয়ে
উভয়কেই উদ্যোগী-উৎফুল্ল ক’রে তোলে,—
তা’ কিন্তু সর্ব্বকালেই শ্রেষ্ঠ।” ৯৩।
এখনও পর্য্যন্ত তাঁর ওই নিদেশকে উপেক্ষা করে শ্রীশ্রীঠাকুরের উৎসব-অনুষ্ঠানে সূর্য ওঠার আগেই, ঊষা-কীর্তনের নামে পুরুষোত্তম-জননী মাতা মনোমোহিনী দেবী রচিত—তাঁর গুরুদেবের প্রশ্বস্তি-গীতি—
“প্রভাত যামিনী উদিত দিনমনি
ঊষারাণী হাসিমুখে চায় রে—
জাগি বিহগ সব তুলি নানা কলরব
রাধা রাধা রাধাস্বামী গায় রে।
নবীন বৃন্দাবনে তুলসী কাননে
ভ্রমরী রাধাস্বামী গায় রে।
সেই সে মধুর গান বাঁশিতে তুলিতে তান
আপনি যে রাধাস্বামী গায় রে।।
যে নামে নন্দের কানু সেধেছিল মোহন বেণু
সেই রাধা রাধা নাম গাও রে।।
আজি মধু জাগরণ শুনে সবে নরগণ
জয় জয় রাধাস্বামী গাও রে।
মথিয়া সকল তন্ত্র রাধাস্বামী মহামন্ত্র
আদিগুরু জগতে বিলায় রে।।
রাধাস্বামী গুণগানে আনন্দ বাড়িবে প্রাণে
চরমে পরম গতি হয় রে।।
রোগ-শোক ব্যাধি-জরা দূরে পালাবে তারা
আনন্দে রাধাস্বামী গাও রে।
জয় রাধাস্বামী জয় রাধাস্বামী
জয় জয় রাধাস্বামী গাও রে।।” কীর্তন করতে এবং করাতে অভ্যস্ত উৎসবের আয়োজকগণ!—-ব্রাত্য হয়ে আছে শ্রীশ্রীঠাকুর রচিত জাগরণী!
পরবর্তীকালে দৈনন্দিন জীবনচলনায় আর্য্যকৃষ্টির অনুশাসনকে প্রতিষ্ঠা করতে শ্রীশ্রীঠাকুর যে সান্ধ্য-প্রার্থনা মন্ত্র রচনা (দ্রঃ সৎসঙ্গ পাব্লিশিং-এর প্রার্থনা নামের পুস্তিকা।) করেছিলেন, মাতা মনোমোহিনী দেবী সেই প্রার্থনাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন, ‘‘সন্ধ্যা মন্ত্রটা মা মারা যাবার তিনদিন আগে লেখা হয়। মা শুনে বড় খুশি হয়েছিলেন। সেইজন্য ও জিনিসটার উপর আমার খুব প্রীতি আছে। মা শুনেছিলেন তাই ওটা আমার অর্ঘ্য হয়ে আছে।’’ (আঃ প্রঃ ২১ খণ্ড, ৭. ১১. ১৯৫২)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে কারো কাছে দীক্ষা গ্রহণ না করলেও বার বার তিনি বলেছেন, ‘আমার মা-ই যেন সরকার সাহেব, হুজুর মহারাজ ও অন্যান্য অন্যান্য মহাপুরুষদের প্রতীক—মা-ই আমার আদর্শ—মা-ই আমার জীবত্ব।’ তথাপি তিনি সরকার সাহবকে নিজের গুরু হিসেবে এবং হুজুর মহারাজকে মাতৃদেবীর গুরু হিসেবে মান্য করতেন, তাঁদের প্রতিকৃতিতে প্রণাম নিবেদন করতেন।
।। মায়ের মাধ্যমে পুরুষোত্তম রূপে আত্মপ্রকাশ ।।
শ্রীশ্রীজননী একদিন আমাকে (ডাঃ সতীশ জোয়ারদার) বলিলেন—“হ্যাঁ রে, তোরা অ……র মূর্ত্তি ধ্যান করিস কেন?” আমি বলিলাম—“শ্রীকৃষ্ণ-মূর্ত্তি বা অন্য সদ্গুরুমূর্ত্তি ধ্যান করতে আপনার ছেলের মূর্তি যে এসে উপস্থিত হন তা আমরা কি করব।” তিনি বলিলেন—“তা যদি সত্যি হয় তবে কর।” কথাটা যেন অনিচ্ছার সহিত বলিলেন। মধ্যাহ্নে শ্রীশ্রীজননীর পূর্ব্বদ্বারী বড় টিনের ঘরে শ্রীশ্রীঠাকুরসহ আমরা অনেকে ভোজন করিতে বসিলাম। শ্রীশ্রীঠাকুর বলিলেন—“মা, তুই আমার থালায় ব’সে নিবেদন করে দে না, তুই নিবেদন ক’রে দে আমি প্রসাদ খাই।” মা বলিলেন—“আমি এখন পারি না।” তিনি পঞ্চমবর্ষীয় বালকবৎ যেন আবদার করিয়া বলিলেন—“না মা, তুই নিবেদন ক’রে দে, তুই নিবেদন করে না দিলে আমার ভাল লাগবে না। তুই বেশ ক’রে ভাত মাখিয়ে দে, নিবেদন ক’রে দে, আর একটু খেয়ে প্রসাদ ক’রে দে না মা।” তখন শ্রীশ্রীজননী তাঁহার আবদার রক্ষা না করিয়া পারিলেন না। তিনি ভোজ্যসমীপে শ্রীশ্রীঠাকুরের নিকট বসিয়া তাঁহার ইষ্টমূৰ্ত্তিকে সেই ভোজ্যসামগ্রী নিবেদন করিতে লাগিলেন, ধ্যানে বসিলেন। ধ্যান করিতে করিতে দেখিলেন, তাঁহারই পুত্র আজ তাঁহার ইষ্টস্থলে অধিষ্ঠিত হইয়া ভোজ্য ভোজন করিলেন। তখন শ্রীশ্রীজননী (পূর্ব্বেও কিছু জানিতেন বোধহয়) বলিলেন—“এখন কি তোর এঁটো আমার খেতে হবে নাকি?”
শ্রীশ্রীঠাকুর বলিলেন—“ওমা, সেকি কথা!” শ্রীশ্রীজননী বলিলেন— “নিবেদন করলাম, দেখলাম তুই-ই তো খেয়ে গেলি।” শ্রীশ্রীঠাকুর বলিলেন— “ওমা, সেকি কথা!” তখন সকলেই নীরব হইলেন! ব্যাপার বুঝিতে কাহারও আর বাকী থাকিল না। শ্রীশ্রীজননী তদবধি তাঁহার পুত্রকে সদ্গুরুরূপে ধ্যান করিতে আমাদিগকে আর নিষেধ করেন নাই। (সূত্র : ডাঃ সতীশচন্দ্র জোয়ারদার রচিত গ্রন্থ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকচলচন্দ্র, পৃঃ ২৩৬-২৩৭)
কেন জানি, প্রথম জীবনে মাতা মনোমোহিনী দেবী পুত্র অনুকূলকে সব গুরুদের গুরু পরমগুরু রূপে মেনে নিতে পারেন নি। এমনকি ভাবসমাধি যাতে না হয় সেজন্য নফর আর রাধিকাকে দিয়ে কীর্তনের আঙিনায় জল ঢেলে কীর্তন বন্ধ করিয়েছিলেন! (দ্রঃ ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীর জীবনী গ্রন্থের ১ম খণ্ড, দ্বাদশ অধ্যায়।) উপরোক্ত ঘটনা উপলব্ধি করার পর থেকেই হয়তো পুত্রের ভগবৎ সত্তা সম্বন্ধে নিজে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
মাতা মনোমোহিনী দেবী একবার কলকাতায় ১/১ সি হরিতকী বাগান লেনের বাড়িতে তাঁর পুত্র অনুকূলচন্দ্র, প্রভাসচন্দ্র, কুমুদচন্দ্র ও গুরুপ্রসাদীকে নিয়ে সপরিবারে ছিলেন। ঐ বাড়িতে থাকাকালীন গুরুপ্রসাদী দেবী বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল। গুরুপ্রসাদী দেবীর জীবনের আশা রইল না। মনোমোহিনী দেবী পুরুষোত্তমরূপী সন্তান অনুকূলের শরণাপন্ন হলে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন, — ‘ভয় নেই মা তোর গুরুপ্রসাদী সেরে উঠবে।’ পরদিন সকালে দেখা গেল শ্রীশ্রীঠাকুরের শরীরটা গুটি বসন্তে ভরে গেছে। এদিকে গুরুপ্রসাদী দেবী ধীরে ধীরে আরোগ্য লাভ করলেন। শ্রীশ্রীঠাকুর বেশ কয়েকদিন রোগ ভোগ করে সুস্থ হয়ে উঠলেন। এই বাড়িতেই শ্রীশ্রীঠাকুরে মেজ ভাই প্রভাসচন্দ্র কঠিন টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হন। রোগ উপশম হওয়া দূরে কথা ক্রমশঃ ব্যাধির প্রকোপ বেড়েই চলল। চিকিৎসকের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে রোগীর দেহ ঠাণ্ডা হতে লাগলো। জননী মনোমোহিনী তখন প্রথম পুত্র অনুকূলচন্দ্রের হাত দুটি ধরে আর্তকণ্ঠে বললেন — “অনুকূল, তুমি আমার ছেলেই হও আর যাই হও, তুমি সাক্ষাৎ ভগবান। আমার খ্যাপাকে (প্রভাসচন্দ্র) ফিরিয়ে দাও বাবা।” শ্রীশ্রীঠাকুর কিছুক্ষণ মৌন থেকে বললেন— ‘আচ্ছা যাও’। প্রভাসচন্দ্র ধীরে ধীরে আরোগ্যলাভ করলেন। একই ঘটনা ঘটেছিল বিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যের জীবনে। তিনি একবার গুরুতর রোগে আক্রান্ত হলেন। রোগের কোন উপশম হল না। চিকিৎসকের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল। তখন কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যের বয়স মাত্র উনত্রিশ বছর। কোষ্ঠিতে এই সময় তাঁর মৃত্যুযোগ নির্ধারিত ছিল। মাতা মনোমোহিনী দেবী কৃষ্ণপ্রসন্নের শিয়রে শুশ্রূষায় ব্যস্ত ছিলেন। রোগীর অন্তিম দশা দেখে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে তিনি ঠাকুরকে বলেন, – ‘অনুকূল রে, কেষ্ট বুঝি আমাদের ছেড়ে চলে গেল। কেষ্টকে বাবা তুই এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দে নইলে আমি মারা যাব।’ শ্রীশ্রীঠাকুর মায়ের এই আর্জি মঞ্জুর করেছিলেন। কৃষ্ণপ্রসন্নের দেহে প্রাণ ফিরে এসেছিল। তিনি নিরাময় হয়ে উঠলেন।
প্রত্যেকের ব্যথার ব্যথী ছিলেন মাতা মনোমোহিনী দেবী। হিমাইতপুর আশ্রমটা ছিল তাঁর কাছে একটা পরিবার স্বরূপ। আশ্রম ছাড়াও আশেপাশের গ্রামের মানুষের অসুখ-বিসুখ, অভাব-অভিযোগ, বিপদ-আপদ সবকিছুতেই তিনি ছিলেন সকলের ত্রাতা, অসৎ নিরোধে তৎপর। তাঁর ছিল দুর্জয় সাহস ও অসামান্য ব্যক্তিত্ব! নিজের জীবনের মায়া তুচ্ছ করে সব্বাইকে আগলে রাখতেন। না, বেশিদিন আর আগলে রাখতে পারলেন না।
লোক-সংগ্রহের প্রয়োজনে শ্রীশ্রীঠাকুরকে মাঝে-মাঝেই কলকাতায় যেতে হতো। প্রায়শই মা সাথে যেতেন। বাংলা ১৩৪৪ সালের মাঝামাঝি। লিভারের পীড়ায় পীড়িত জননীদেবীকে আশ্রমে থাকতে বলে শ্রীশ্রীঠাকুর কলকাতা চলে যান। ঠাকুর যাবার পর ঠাকুরের নিষেধ অমান্য করে মা কলকাতা চলে এলে ঠাকুর ব্যথিত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তার ব্যাধি বৃদ্ধি পেতে থাকে। কলকাতার ডাক্তারদের চিকিৎসাতে কোন উপশম হচ্ছিল না দেখে ঠাকুর মা-কে নিয়ে হিমাইতপুর ফিরে আসেন।
অসুস্থতার অন্তিম অবস্থায় ডাঃ কেদারনাথ ভট্টাচার্য্যকে উদ্দেশ্য করে জননীদেবী বলেছিলেন—‘দ্যাখ্ কেদার, তোরা আর আমার কি করবি? আমার এই কষ্টভোগ আমারই সৃষ্টি। অনুকূলকে আমি ছেলের বেশি ভাবতে পারিনি—তাই আমার ব্যারাম। সে যা বলে তাই সত্য হয়। ভূত ভবিষ্যত সবই ও জানে। ওর কথা না শুনে আজ আমার এই দুর্ভোগ। অনুকূল আমাকে বারবারই এখানে (কলকাতায়) আসতে নিষেধ করেছিল, আমি তা শুনিনি। যেখানে বাৎসল্য সেখানেই তাচ্ছিল্য, পদে পদে ভুল হয়ে যায়। কর্মফল আর এড়াতে পারলাম না।’
১৩৪৪ বঙ্গাব্দের ৬ই চৈত্রর দিনটিতে বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে সর্বগুণের গুণান্বিতা মাতৃমূর্তি স্বরূপিণী বিশ্বজননী মাতা মনোমোহিনী দেবী সকলকে শোকসাগরে নিক্ষিপ্ত করে ইহলীলা সম্বরণ করেন।
মায়ের নিথর দেহকে আগলে ঠাকুর ‘নিরাশ্রয়, নিরাশ্রয়’ ….. ‘কোথায় আমার মা, কোথায় আমার মা’ বলে কপালে করাঘাত করতে থাকেন। পদ্মার তীরে সৎকার করা হয়। সৎকার করার পরেও ঠাকুর উন্মত্তের ন্যায় কখনো মায়ের ঘরে, কখনো চিতাভূমিতে, কখনো শ্মশানের দিকে তাকিয়ে,—“মা তুই এলিনা—ওমা, মা গো তোর অনুকূলের কি দশা হয়েছে একবার দেখে যা!” …. বলে আকূল আর্তনাদ করতে থাকেন। যথাবিধি শ্রাদ্ধক্রিয়া সমাপন করে কুল পুরোহিতের নির্দেশে একটি বছর ধরে জামা, জুতো, ছাতা ব্যবহার না করে কালাশৌচ পালন করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর।
মায়ের অসুস্থতার সময়ে মাকে সবদিক থেকে স্বস্তিতে রাখার জন্য মায়ের বসবাসের জন্য একটা ঘর তৈরি করিয়েছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। ঘরটিকে খাট, ইজিচেয়ার, টেবিল, আলনা, আয়না, বৈদ্যুতিক আলো, পাখা প্রভৃতি নিত্য ব্যবহার্য্য সরঞ্জামে সাজিয়েছিলেন। স্যানিটারী পায়খানার ব্যবস্থা করেছিলেন, মায়ের যাতে কোন অসুবিধা না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে। পরিতাপের বিষয়, জীবদ্দশায় মায়ের আর ওই ঘরে বাস করা হয়ে ওঠে নি।
মায়ের তিরোভাবের পর সেই গৃহটিকে ‘মাতৃমন্দির’ নামে সংরক্ষিত করে যে স্মৃতিফলক স্থাপন করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর, তাঁর প্রতিলিপি সংযোজিত করলাম।
মা!
বড় আকুল আগ্রহ উদ্গ্ৰীৰ উৎকণ্ঠা নিয়েই এই ঘর আর তার আসবাব যা কিছুর কাজ সমাধা ক’চ্ছিলাম—আশা ছিল তুমি থাকবে—ব্যবহার করবে— ধন্য হ’ব আমি—তা হল না— তুমি চ’লে গেলে—পার্থির শরীরের পতন হ’ল—আমার হতভাগ্য অদৃষ্ট কালের নিষ্ঠুর শ্লেষমলিন ধিক্কারে—মৃত্যুর মত জীয়ন্ত হ’য়ে রইল।
মনীষীরা ব’লে থাকেন, মানুষ পার্থিব শরীর ছেড়ে গেলেও আবার যেমন ছিল সূক্ষ্ম শরীরে তেমনই প্রাণ নিয়েই বেঁচে থাকে, আবার জাতিস্মর হ’য়েও নাকি সেই মানুষই জন্মাতে পারে—
মা!
মা আমার !
দয়াল যদি তাই করেন—তুমি যদি কখনও জাতিস্মর হ’য়ে এ দুনিয়ায় আবার ফিরে এস—তোমার অনুকূলকে মনে পড়ে—নিরাশ্রয় ব’লে যদি বেদনা অনুকম্পাজড়িত হৃদয় তোমার আমাকে খোঁজই করে—তুমি এসো— এসে এখানেই থেকো— এসবই ব্যবহার কো’রো—
তোমারই
হতভাগ্য
দীন সন্তান,
অনুকূল
——————————————————————————————– তথ্যঋণ :
১. ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ১ম খণ্ড।
২. শ্রীসচ্চিদানন্দ গোস্বামী প্রণীত, ‘আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী ও সৎসঙ্গ আন্দোলন’।
৩. প্রিয়পরমের পরশে, ১ম খণ্ড।
৪. সতীশচন্দ্র জোয়ারদার প্রণীত জীবনীগ্রন্থ।
tapanspr@gmail.com











