প্রসঙ্গ : মন্দির

।। মন্দির, শ্রীমন্দির ও সৎসঙ্গ বিহার-এর গঠনতন্ত্র প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।


শ্রীশ্রীঠাকুর—সব মন্দিরই শ্রীমন্দির। জায়গায় জায়গায় মন্দির বা সৎসঙ্গ বিহার ঠিক করা ভাল, যাতে লোকে meet (সাক্ষাৎ) করতে পারে। সেখান থেকে মানুষকে সবভাবে infuse (উদ্বুদ্ধ) করতে হবে। ধর্ম্ম কী, কৃষ্টি কী, সদাচার কী, বিবাহের নীতি কী, যোগ্যতার অনুশীলন কিভাবে করতে হয়, সেবানুচর্য্যার ভিতর দিয়ে সবাই পারস্পরিকভাবে সম্বন্ধান্বিত হয় কিভাবে ইত্যাদি কথা সেখান থেকে চারাতে হবে। মানুষকে practically educated (বাস্তবভাবে শিক্ষিত) করে তুলতে হবে। তাছাড়া মানুষের জন্য যতখানি যা করা যায় তাও বাস্তবভাবে করতে হবে মন্দিরগুলিকে কেন্দ্র করে। মন্দির থাকলে, ঋত্বিক থাকবে, dispensary (চিকিৎসাকেন্দ্র), হাসপাতাল, গবেষণাগার, তপোবনের শাখা ইত্যাদি থাকবে। হয়তো ঐ মন্দিরগুলিই এক একটা university (বিশ্ববিদ্যালয়) বা সর্ব্বতোমুখী শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
(আলোচনা-প্রসঙ্গে, ২১ খণ্ড, পৃঃ ৩১, ৪ঠা বৈশাখ, ১৩৫৯, বৃহস্পতিবার, ইং ১৭-০৪-১৯৫২)

।। পুরুষোত্তম চির-অতন্দ্র ।।

।। পুরুষোত্তম চির অতন্দ্র ।।


পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের তিরোধান দিবসকে কেন্দ্র করে যাঁরা হবিষ্যান্ন গ্রহণের বিধান দিয়েছেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে বিনীত নিবেদন —
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের আবশ্যিক পালনীয় প্রাথমিক বিষয়সমূহ পালন করার পর তিরোধান প্রসঙ্গে চিন্তা করবেন।
যথা, সৎমন্ত্রে দীক্ষিতদের অভক্ষ্যভোজী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুনাদি তামসিক আহার করা যাবে না। যারা করেন, আর্য্য হিন্দুমতে তাদের অভক্ষ্যভোজী বলা হয়েছে। অগম্যাগামী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ যারা প্রতিলোম, সগোত্র এবং সপিণ্ড সম্বন্ধীয়দের সাথে অবিধি পূর্বক ধর্মবিরুদ্ধ বিবাহের মাধ্যমে কামাচার করে, হিন্দুমতে তাদের অগম্যাগামী বলা হয়েছে। এরা কদাচারী, এদের প্রদত্ত আহার ও পানীয় অশুদ্ধ। (দ্রঃ সম্বিতী)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের শিষ্য হতে হলে কমপক্ষে ৪৫মিনিট করে ঊষানিশায় মন্ত্রসাধন করতে হবে। আহ্বানীসহ সন্ধ্যা ও প্রার্থনা, ইষ্টভৃতি (ইষ্টনীতির ভরণ), কমপক্ষে ৩ বার শবাসন প্রভৃতির নিত্য-সাধন করতে হবে। বর্ণধর্মানুযায়ী সদাচারী হতে হবে। বর্ণাশ্রম মেনে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে, বৃত্তিহরণ করা চলবে না। ‘পঞ্চবর্হিঃ’ এবং ‘সপ্তার্চ্চিঃ’-র বিধান মেনে চলতে হবে, সকলকেই। ওই নিয়মাবলী, ওই বিধিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমের নাম দীক্ষা গ্রহণ করা।
যাঁরা এস. পি. আর., পি. আর. উপাধির বলে দীক্ষা সঞ্চারণা করেন, তাঁরা যজমানদের দিয়ে ‘‘এই দীক্ষা গ্রহণ করিয়া আমি সর্বান্তকরণে শপথ করিতেছি যে—মানুষের জীবন ও বৃদ্ধির পরম উদ্ধাতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রকে প্রতিষ্ঠা করাই এইক্ষণ হইতেই আমার জীবনের যজ্ঞ হউক। ……’’ ইত্যাদি উচ্চারণ করিয়ে সংকল্প-শপথ গ্রহণ করান। এবং দীক্ষাপত্রের ২টি স্তবকে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। এর উদ্দেশ্য যজমান যা’তে ঠাকুরের আদর্শ মেনে চলে তারজন্য একেবারে পাকাপোক্ত ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থাপত্র স্বয়ং শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত। দীক্ষাদাতার কর্তব্য, দীক্ষা গ্রহিতাকে শ্রীশ্রীঠাকুরের উপরোক্ত আদর্শের বিষয়ে সম্যকভাবে অবগত করিয়ে দীক্ষা দান করা। তা’ না করিয়ে দীক্ষাদাতা যদি তড়িঘড়ি করে যেনতেন প্রকারেণ মন্ত্র দিয়ে সই-সাবুদ করিয়ে নেয়, তাহলেই মুশকিল। কপটাচার এবং দ্বন্দ্বীবৃত্তি দোষে দুষ্ট হতে হবে। সেই প্রবহমানতা চলছে। যারফলে বেশিরভাগ দীক্ষিতগণ মনে করেন, সকালবেলা উঠে ঠাকুরের নামে পয়সা রাখা, শুক্রবার নিরামিষ খেলেই শ্রীশ্রীঠাকুরের শিষ্য হওয়া যায়। অথচ, সত্যানুসরণ গ্রন্থের প্রথমেই তিনি এ বিষয়ে সাবধান বাণী দিয়ে রেখেছেন। আমার মধ্যে যদি তাঁর আদর্শের প্রকাশ না হয়, অর্থাৎ ঠাকুরত্ব না জাগাতে পারি, তাহলে তিনি আমার ঠাকুর নন। সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছেন। সেই হিসেবে বিচার করে দেখলে দেখা যাবে, তাঁর আদর্শ মেনে চলেন যাঁরা, যজনসিদ্ধ যাঁরা, একমাত্র তাঁদেরই অধিকার রয়েছে, যাজন করার, প্রচার করার। অথচ, আমরা এসব মূল বিষয়টিকে উপেক্ষা করে, অনেক কিছুতে, যথা, সদাচার, বর্ণাশ্রম, ঠাকুরের বলা পরিচ্ছদ, ইত্যাদিতে ছাড় দি‌য়ে, নিয়মের শিথিল করে অধিবেশন করে চলেছি। আর তিরোধানের নামে পক্ষান্তরে শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শকে লঘু করবার চেষ্টা করছি। আবার বলছি, পুরুষোত্তম চির অতন্দ্র! তাঁর তিরোধান হয় না। তবে হবিষ্যান্ন করা দোষের না। মাসে মাসে হবিষ্যান্ন, মাঝে মাঝে শিশু প্রাজাপত্য করার বিধান তো তিনি দিয়েছেন। এছাড়াও তিনি বিধান দিয়েছেন—
রবিগুরু পৌর্ণমাসী আর চতুর্দশী
অমাবস্যা সংক্রান্তি কিংবা একাদশী
এ-কটা দিন অন্ততঃ থাকিস্
পাতলা-পুতলি খেয়ে,
ব্যতিক্রমে পয়মালে যায়
ঘৃষ্ট আঘাত পেয়ে। ( অনুশ্রুতি, ১ম খণ্ড, স্বাস্থ্য ও সদাচার, ৬২)
উপরোক্ত নিয়মিত অবশ্য পালনীয় বিধানসমূহকে পাশ কাটিয়ে তিরোধানের নামে হবিষ্যান্ন গ্রহণে তৎপর হলে লক্ষ্যের চাইতে উপলক্ষ্যকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে সকলকে সচেতন হবে, নচেৎ দ্বন্দীবৃত্তি দোষে দুষ্ট হতে হবে।
সবাইকে জয়গুরু ও প্রণাম। বন্দে পুরুষোত্তমম্!

।। ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ ।।

।। ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রদত্ত নিত্য অনুসর্তব্য ছড়াবাণী—-
“অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে
ধর্ম্ম বলে জানিস্ তা’কে।”-র মধ্যে ইষ্টভৃতির মূল তত্ত্ব সুপ্ত।
সৎসঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কথিত ‘সৎসঙ্গ চায় মানুষ’ বাণীতে বর্ণিত সৎসঙ্গের আদর্শের সাথে, ‘ইষ্টভৃতি’ শব্দের মর্মার্থের সাথে পরিচিত নাহলেও ‘ইষ্টভৃতি’ নামের সাথে বেশীরভাগ সংঘকেন্দ্রিক জনেরা যেমন পরিচিত, তেমনি সাধারণ লোকেরা শ্রীশ্রীঠাকুরের নামে টাকাপয়সা রাখা এবং নির্দিষ্ট সংস্থায় জমা দেওয়াকেই ‘ইষ্টভৃতি’ মনে করেন। অনেকানেক দীক্ষিত জনেরা শুক্রবার বাদে অন্যান্য দিন মাছ-মাংস-পেঁয়াজ-রসুনাদি অভক্ষ্য ভোজন করেন, বর্ণাশ্রমধর্মের প্রতি মুখ ফিরিয়ে বৃত্তিহরণ কর্মাদি করেন, প্রতিলোম-বিবাহ বিলাসে অগম্যাগামী হয়েও গর্ব করে বলেন, ‘আমি রোজ ১০/২০/৩০ ……… টাকা করে ইষ্টভৃতি কর।’ শ্রীশ্রীঠাকুর অসদুপায়ে উপার্জন (সদাচার এবং বর্ণাশ্রম বিধি না মেনে যে উপার্জন।) দিয়ে ইষ্টভৃতি করার নিদেশ কোথাও দেন নি। তিনি বলেন,—
“সত্য পথে চললে রোজগার বেশি হয়। সাধু রোজগার হয়। ……. ফাঁকির পয়সা আর ভালোবাসার পয়সায় ঢের তফাৎ। ফাঁকির পয়সা খেলে শরীর-মন প্রবৃত্তিঝোঁকা হয়। সাত্বত সম্বেগ স্তিমিত হতে থাকে।” (আঃ প্রঃ ১৫শ খণ্ড, পৃঃ ১৯৭)

শ্রীশ্রীঠাকুরকে প্ৰশ্ন করা হয়েছিল আপনি ইষ্টভৃতির উপর এত জোর দেন, কিন্তু কেউ যদি জেলে আটকা পড়ে এবং সেখানে কোন সুযোগ না পায়, তখন কী করবে?
শ্রীশ্রীঠাকুর—ভাতের গ্রাসটা দেবে, ভাত যদি না পায় তবে জল নিবেদন করবে, জল যদি না পায় তবে সীতা যেমন বালির পিণ্ডি দিছিলেন, অগত্যা সেই রকমভাবে বালি বা মাটি দিয়ে ইষ্টভৃতি করবে, তা’ও যদি না পায়, পরমপিতার দান বাতাস তো কেউ কেড়ে নিতে পারবে না, আর সর্বশেষে মানস-উপচারে নিবেদন তো আছেই। সেখানেও চেষ্টা করতে হবে সক্রিয়ভাবে ইষ্টের ইচ্ছা পরিপূরণের ভিতর দিয়ে যাতে তাঁকে তৃপ্ত ও তুষ্ট করা যায়।
(আলোচনা প্রসঙ্গে ৪র্থ, ২৬। ১২। ১৯৪২, পৃষ্ঠা ২০২)
উপরোক্ত বাণীতে বোঝা গেল যে, টাকা-পয়সা নয়, ইষ্টের ইচ্ছা পরিপূরণ করা ইষ্টভৃতির মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। যা পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চি-র অনুশাসনের মধ্যে নিহিত রয়েছে। যুক্তি অনুযায়ী ওই অনুশাসন যারা মানছেন না, তারা তাহলে ইষ্টভৃতি করছেন না।
আমরা আমাদের প্রিয়জনের জন্য কোন কিছু কিনলে সেরা বা শ্রেষ্ঠ জিনিসটাই কিনি। এ বিষয়ে কারো কোন দ্বিমত থাকতে পারে না। তাহলে আমরা যাঁকে আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ আদর্শ মনে করি, সেই প্রিয়পরম প্রেষ্ঠকেও শ্রেষ্ঠ জিনিস নিবেদন করতে হয়। তাই ইষ্টভৃতিকে যারা সবচাইতে বেশি গুরুত্ব দেন, তাদের অবশ্যই শ্রেষ্ঠ ইষ্টভৃতি বিষয়টা জেনে রাখা উচিত।
শ্রেষ্ঠ ইষ্টভৃতি প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন।—
“ঈশ্বর-অনুধ্যায়িতা নিয়ে
গণহিতী অনুচর্য্যায়
তাদের যে অনুগ্রহ-অবদান অর্জ্জন কর,
সেই অবদান হ’তে
শ্রদ্ধানুস্যূত অন্তঃকরণে
স্বতঃস্বেচ্ছায় তোমার ইষ্টকে যা নিবেদন কর,
তাই-ই কিন্তু তোমার শ্রেষ্ঠ ইষ্টভৃতি।”
(ধৃতি-বিধায়না, ১ম খণ্ড, বাণী সংখ্যা ৩০৬)
* * *

‘ঈশ্বর অনুধ্যায়িতা’……..বাণীর নিদেশ ব্যতীত ইষ্টভৃতি বাস্তবায়িত হয় না। ইষ্টভৃতির নামে শুধুমাত্র ইষ্টের প্রীতির জন্য, কাউকে পীড়িত না করে, নিজে পীড়িত না হয়ে বর্ণানুগ কর্মের সেবা মাধ্যমে আহরিত অর্থ ‘দিন গুজরানী আয়’। এই *‘দিন গুজরানী আয়’-কেই ইষ্টভৃতির অর্ঘ্য হিসেবে নিবার্চিত করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর। ওই নিদেশ অনুসারে ইষ্টার্ঘ্য আহরণ করার মধ্যেই প্রীতি, মৈত্রী ও ঐক্যের বীজ বপন করে দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন আর্য্যকৃষ্টির সদাচার এবং বর্ণাশ্রম ধর্মকে। ওই ইষ্টার্ঘ্য ইষ্টকে দিতে হবে। তিনি তা দিয়ে PHILANTHROPICAL WORK বা সব্যষ্টি সমষ্টির মধ্যে ভাগবত ঐক্য স্থাপন দ্বারা গণহিতৈষণা কর্ম করবেন। ইষ্টভৃতির দাতা এবং গ্রহীতার মেলবন্ধনে গড়ে উঠবে পরম রাষ্ট্রিক সমবায়। এই ছিল শ্রীশ্রীঠাকুরের পরিকল্পনা। পরিবেশের সকলকে নিয়ে বাঁচা এবং বৃদ্ধি পাওয়ার বাস্তুতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক বিন্যাস-ব্যবস্থার সরলীকরণ অবদান ইতিপূর্বে পরিলক্ষিত হয়নি।—মানবসভ্যতার সার্বিক উত্তরণের জন্য। সেই উদ্দেশ্যে স্থাপন করেছিলেন ফিলানথ্রপি কার্যালয়। মাসান্তে ওই অর্ঘ্য প্রেরিত হত ইষ্টসকাশে। ইষ্টের নামে প্রেরিত ওই অর্ঘ্য গৃহীত হতো ফিলানথ্রপিতে। ইষ্টভৃতি পাঠাবার পর দুজনকে ভ্রাতৃভোজ্য দিতে হয়। এর মাধ্যমে পারস্পরিক প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করলেন। দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে চাইলেন। ইষ্টভৃতি গ্রহীতারা এ বিষয়টিকে ইষ্টানুগ-বোধ দিয়ে বিবেচনা করলে কিছুটা কাজের কাজ হবে।

*”দিন গুজরানী আয় থেকে কর
ইষ্টভৃতি আহরণ,
জলগ্রহণের পূর্ব্বেই তা’
করিস্ ইষ্টে নিবেদন ;
নিত্য এমনি নিয়মিত
যেমন পারিস ক’রেই যা’
মাসটি যবে শেষ হবে তুই
*ইষ্টস্থানে পাঠাস্ তা’ ;
ইষ্টস্থানে পাঠিয়ে দিয়ে
আরো দু’টি ভুজ্যি রাখিস্,
গুরুভাই বা গুরুজনের
দু’জনাকে সেইটি দিস্ ;
পাড়া-পড়শীর সেবার কাজে
রাখিস কিন্তু কিছু আরো,
উপযুক্ত আপদগ্রস্তে
দিতেই হ’বে যেটুকু পার ;
এসবগুলির আচরণে
ইষ্টভৃতি নিখুঁত হয়–
এ না-ক’রে ইষ্টভৃতি

জানিস্ কিন্তু পূর্ণ নয়।”

*ইষ্টস্থান বলতে শুধু ইষ্ট বা প্রিয়পরমের বসতবাটিই নয়। ইষ্টস্থান মানে, যেখানে থেকে আমরা মঙ্গল-অভিগমনে চলি। সে-হিসেবে পরমপিতার এই সারা দুনিয়াটাই ইষ্টস্থানে পরিণত হ’তে পারে।
(আলোচনা প্রসঙ্গে, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ইং ১৮-১০-১৯৪৫)

ইষ্টভৃতি নিবেদন করার পর শ্রীশ্রীঠাকুর নিম্নোক্ত বাণীর মাধ্যমে অগ্নিহোত্র করতে নিদেশ দিলেন।
“তুমি যখন তোমার ইষ্টে বা আচার্য্যে
ইষ্টার্ঘ্য বা ইষ্টভৃতি নিবেদন কর,
সে নিবেদন-সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই
শ্রদ্ধোৎসারিণী অন্তঃকরণে
অন্তর-আবেগ নিয়ে বল —
“হে দেবতা !
হে আমার আচার্য্য !
হে আমার প্রিয়পরম !
আমি আমার শ্রদ্ধাকে
তোমাকে আহূতি দিতেছি।”
—ইহাই অগ্নিহোত্রের তাৎপর্য্য,
কারণ, অগ্নিই হ’চ্ছেন
ইষ্টদেবতা ও ব্রহ্মবিৎ আচার্য্যের
প্রতীক,
তা’দেরই অগ্নিমুখ বলা হয়,
তাই অগ্নিহোত্র
নিত্য করণীয়,
কখনই পরিত্যাজ্য নয়। ১৫ ।
(ধৃতি-বিধায়না ১ম খন্ড)

শ্রীশ্রীঠাকুর পথের কড়ি গ্রন্থে ইষ্টভৃতির বিষয়ে বললেন :
❝ইষ্টভৃতি মানে হ’চ্ছে—সাংসারিক কোন কর্মে হস্তক্ষেপ করিবার পূর্ব্বেই ইষ্টপোষণার্থ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ পূর্ব্বক অন্ততঃ নিজের আহার্য্য পরিমিত ভোজ্য নিবেদন করা।❞
* * *
“ইষ্টভৃতি ভোজ্যই রীতি
অনুকল্পে জোটে যা’
বিনিময়ে তাই পাওয়া যায়
এমনি দিয়ে রাখিস্ তা।”

শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত ইষ্টভৃতি নিবেদন মন্ত্রের ‘‘ইষ্টভৃতির্ম্ময়াদেব কৃতাপ্রীত্যৈ তবো প্রভো, ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ।’’ উচ্চারণ করার সাথে সাথে বৃহত্তর পারিপার্শ্বিকের জীবনবৃদ্ধির দায়ভারের শপথ নিতে হয় আমাদের। সব অবস্থাতে বাস্তব কর্মে বৃহত্তর পরিবেশের জৈবাজৈব সবকিছুকে পালন-পোষণে সমৃদ্ধ করে রাখার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সার্থক হয় ইষ্টভৃতি পালন। ইষ্টাদর্শের পঞ্চবর্হিঃ ও সপ্তার্চ্চি-র বিধি মেনে শারিরীক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক সদাচার পালনে, ইষ্টপ্রোক্ত বিধি অনুসরণ করে বিবাহ ও সুপ্রজনন নীতি পালনে অভ্যস্ত না হতে পারলে—‘আমি ইষ্টভৃতি করি’ এই কথা বলা বোধহয় সমীচীন হবে না। ইষ্টভৃতি করা মানে, বাস্তবে ইষ্টনীতি মেনে চলা, ইষ্টনীতির ভরণ করা।

যদিও ইষ্টভৃতি প্রচলনের পূর্বে সত্যানুসরণের “তুমি তোমার, নিজ পরিবারের, দেশের ও দশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দায়ী।”—বাণী-মাধ্যমে অনুরূপ দায়ভার দিয়েই রেখেছিলেন ব্যষ্টি ও সমষ্টি উন্নয়নের দিকে লক্ষ্য রেখে।
এ তো গেল ইষ্টভৃতি আহরণ ও নিবেদনপর্ব। এর পর রয়েছে প্রেরণপর্ব। প্রেরণ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর স্পষ্ট নিদেশ দিয়ে বলেছেন :
ইষ্টভৃতি ইষ্টকেই দিস্
করিসনা তা’য় বঞ্চনা।
অন্যকে তা’ দিলেই জানিস
আসবে বিপাক গঞ্জনা ।।
অর্থাৎ ইষ্টভৃতি ইষ্টেরই প্রাপ্য, অন্য কারও নয়। ওই অর্ঘ্য দিয়ে ইষ্টকর্ম করা হবে। ইষ্টকর্ম মানে পূর্ত্তকর্ম। যা প্রকৃত ইষ্টভৃতির মন্ত্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ ।।” এর সরলার্থ খুব সহজ। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুযায়ী সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন বর্দ্ধনার বিধি মেনে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে চলেন যিনি এমন গুরুভাই-ই প্রকৃত ইষ্টভ্রাতা।––যাঁর আপদে-বিপদে সাধ্যানুগ সাহায্য করতে হবে। ভূত মানে,—ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা পরিবেশের অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। উক্ত উপাদানসমূহকে সমৃদ্ধ রাখার জন্য আর্য্যদের বাস্তব পূর্ত্ত-কর্মের মাধ্যমে নিত্য পঞ্চ-মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করতে হতো সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধিকে অক্ষুণ্ণ রাখতে। শ্রীশ্রীঠাকুর ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের মাধ্যমে ওই প্রক্রিয়াকে নবীকরণ করলেন। শ্রীশ্রীঠাকুর হিমাইতপুরে সপারিপার্শ্বিক জীবন বৃদ্ধিদ আশ্রম সংগঠনের মাধ্যমে, ইষ্টভৃতি প্রবর্তনের পূর্বেই ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আমাদেরও তাই করতে হবে, বাস্তবে।
ইষ্টের অবর্তমানে, ইষ্টাদর্শের পরমরাষ্ট্রিক সমবায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অবিচল থেকে দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ, কৃষি ও শিল্পের বাস্তবায়ন করতে নিবেদিত-প্রাণ যিনি, তিনিই ইষ্টার্ঘ্য গ্রহণের উপযুক্ত ব্যক্তি।
এ বিষয়ে পরম দয়ালের সুস্পষ্ট নির্দেশ :-
“আগত যিনি, উপস্থিত যিনি—
তাঁর বিগতিতে বা তিরোভাবে
তাঁর বংশে যদি
তাঁ’তে অচ্যুত—সশ্রদ্ধ—আনতি-সম্পন্ন,
প্রবুদ্ধ-সেবাপ্রাণ,
তঁৎবিধি ও নীতির সুষ্ঠু পরিচারক
ও পরিপালক,
সানুকম্পী-চর্য্যানিরত,
সমন্বয়ী সামঞ্জস্য-প্রধান,
পদনির্লোভ, অদ্রোহী,
শিষ্ট-নিয়ন্ত্রক,
প্রীতিপ্রাণ—এমনতর কেউ থাকেন—
তাঁরই অনুগমন ক’রো,
কিম্বা তা’ও যদি না পাও—
তবে, তাঁর কৃষ্টি-সন্ততির ভিতর
অমনতর গুণসম্পন্ন যিনি
তাঁরই অনুগমন ক’র পারম্পর্য্যে—
যতক্ষণ আবার
আগতের অভ্যুত্থান না হয়,
ঠকবে না—
শিষ্ট-সমন্বয়ে সম্বর্দ্ধনাও পাবে।” ৩৯ । (সম্বিতী)

১) তাঁতে অচ্যুত-সশ্রদ্ধ-আনতিসম্পন্ন,
২) প্রবুদ্ধ-সেবাপ্রাণ,
৩) তঁৎবিধি ও নীতির সুষ্ঠু পরিচারক ও পরিপালক,
৪) সানুকম্পী-চর্য্যানিরত,
৫) সমন্বয়ী-সামঞ্জস্য প্রধান,
৬) পদনির্লোভ,
৭) অদ্রোহী,
৮) শিষ্ট নিয়ন্ত্রক,
৯) প্রীতিপ্রাণ।
তাঁর সন্তান-সন্ততিগণের মধ্যে এই নয়টি বিশেষ গুণসম্পন্ন যিনি—অভাবে তাঁর কৃষ্টি সন্ততির অর্থাৎ শিষ্যবর্গের মধ্যে অমন গুণ সম্পন্ন যিনি তাঁরই অনুগমন কর !”

উক্ত বাণীর সরলার্থ,—যিনি অর্থ-মান-যশ ইত্যাদির নাগপাশ থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিজের চরিত্রে ঠাকুরত্বকে জাগ্রত করেছেন, তাঁকে কেন্দ্র করে চলতে হবে, তাঁকেই ইষ্টার্ঘ্য দিতে হবে। অন্যথায় বিপাক-গঞ্জনাকে মেনে নিতে হবে।
ওই বাণীর মর্মার্থ অনুযায়ী ১. ইষ্ট পরিবারের সব সদস্যরা মিলে যাঁকে উপযুক্ত নির্বাচন করবেন তাঁকে কেন্দ্র করে চলতে হবে। ২. ইষ্ট পরিবারের সদস্যরা যদি অমনতর গুণসম্পন্ন উপযুক্ত কাউকে নির্বাচিত না করতে পারেন তাহলে কৃষ্টিসন্তানদের মধ্য থেকে নির্বাচিত করতে হবে এবং তাঁর অনুগমন করে কেন্দ্রায়িত চলনে চলতে হবে।—অন্যথায় শ্রীশ্রীঠাকুরের নিদেশ অনুযায়ী বিপাক-গঞ্জনাকে মেনে নিতে হবে। এই বাণীতে বংশানুক্রমিক জ্যেষ্ঠ-পরম্পরার বিষয় কিন্তু উল্লেখ করেন নি।
———————

।।  সমাগত প্রজাতন্ত্র দিবসের ভাবনা ।।

** সমাগত প্রজাতন্ত্র দিবসের ভাবনা **
।। বর্তমান সভ্যতার সংকট ।।
বর্তমান সভ্যতার সংকট বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে সবকিছুর মূলে রয়েছে জৈবিক তাগিদের অসফল বিনিয়োগ । উক্ত বিনিয়োগজাত সন্তানেরা সভ্যতাকে উপঢৌকনও দিচ্ছে ইন্দ্রিয়পরায়নতা । অথচ আমাদের আদর্শ ছিল—“আত্মানং বিদ্ধি”, নিজেকে জানো, know thyself, “আত্মবত্‍ সর্বভূতেষু, মাতৃবত্‍ পরদারেষু, লোষ্ট্রবত্‍ পরদ্রব্যেষু।” সকলকে নিজসত্তার প্রতীক মনে কর, মেয়েদের নিজের মায়ের প্রতিরূপ ভেবে শ্রদ্ধা কর, অন্যের জিনিসকে মাটির ঢেলার মত দ্যাখ । ‘মা গৃধ’, লোভ কর না ।
যে উপনিষদের বাণীর উপরে উক্ত শাশ্বত সত্যসমূহ প্রতিষ্ঠিত, গণপ্রজাতন্ত্রী স্বাধীন ভারত সেই সত্যের সারমর্ম, “সত্যমেব জয়তে”-র আদর্শকে মাথায় নিয়ে একদিন যাত্রা শুরু করেছিল, যাকে আমরা আজো রাষ্ট্রের পবিত্র মন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে রেখেছি । অথচ ওইসব বিধিকে আড়াল করে পাশ্চাত্যের প্রবৃত্তি-পরিপোষিত শিক্ষায় প্রজাতন্ত্রী ভারতবর্ষের প্রজাদের শিক্ষিত করতে চাইছি । ফলে সন্ত্রাসবাদ, ভ্রষ্টাচার, যৌন-ব্যভিচার ক্রমবর্দ্ধমান। এর কারণ, “সত্যমেব জয়তে’’-কে বাস্তবে মূর্ত করে তোলার মত কোন ইন্দ্রিয়জয়ী সৎ-পুরুষের জীবন্ত আদর্শ অনুসরণ করছে না রাষ্ট্র।
ভারতের নিজস্ব অর্থশাস্ত্র, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে ।
सुखस्य मूलम् धर्म्मः
धर्म्मस्य मूलम् राष्ट्र,
राष्ट्रस्य मूलम् अर्थम् (पुरुषार्थ),
अर्थस्य मूलम् इन्द्रिय विजयम्,
इन्द्रिय विजयस्य मूलम् ज्ञानवृद्धसेवया,
ज्ञानवृद्धसेवया विज्ञानम् ।।
অর্থাত্‍ সুখের মূলে ধর্ম।
ধর্মের মূলে রাষ্ট্র । রাষ্ট্রের মূলে অর্থ (বর্ণাশ্রম এবং চতুরাশ্রমধর্ম পালন করে পরমার্থ লাভ।) অর্থের মূলে ইন্দ্রিয়বিজয়। (ইন্দ্রিয়জয়ী না হলে পরমার্থ লাভ হয় না।) ইন্দ্রিয়বিজয়ের মূলে জ্ঞানবৃদ্ধ সেবা। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়জয়ী হতে হলে সদগুরুর সারূপ্য লাভ করতে হবে । তাহলেই বিশেষ জ্ঞান লাভ হবে ।

উক্ত বিধি পালন করে প্রকৃষ্ট জাতক বা প্রজা সৃষ্টির প্রবহমানতাকে রক্ষা করে চলাই ছিল আর্য্য ভারতের আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্য। তাহলে প্রজাতন্ত্র মানে হচ্ছে, যে তন্ত্র বা system মেনে আদর্শ প্রজা নির্মাণ, পালন, পোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে রাষ্ট্রের সংহতি রক্ষায় প্রযত্নশীল থেকে পরম রাষ্ট্রিক সমবায়ের লক্ষ্যে এগিয়ে চলা যায়। ভারতের মেরুদন্ড আর্য্যকৃষ্টি। আর্য্যকৃষ্টির অনুশাসন, বর্ণাশ্রম, চতুরাশ্রম, দশবিধ সংস্কার প্রভৃতি উপেক্ষা করে প্রজা নির্মাণ সম্ভব নয়। ভারতের মহাকাব্য, বেদ, উপনিষদ, সংহিতা, আদর্শপুরুষ শ্রীরামচন্দ্র ও শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ ওইসব জীবনীয় সংস্কারের বার্তাবহ। যারমধ্যে নিহিত আছে ‘সত্যমেব জয়তে’-র মূলসূত্র।

বর্তমান সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানবৃদ্ধ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সভ্যতাকে সংকট থেকে মুক্ত করতে নিদান দিলেন :

“শাসন-সংস্থা যেমনই হোক,
যাতেই মাথা ঘামাও না,
যৌন-ব্যাপার শুদ্ধ না হলে
দেশের জীবন টিঁকবে না ।”
ওই যৌন ব্যাপারে শুদ্ধতা আনতে সত্যানুসরণে বললেন, “প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী । প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয় ।”
এবং পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, “স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যেজন, তাহার হয় না ভবের বন্ধন মোচন । স্ত্রী চিন্ময়ী মা ।”
তিনি তাঁর নারীর নীতির বিধানে কুমারী মেয়েদের এমন শ্রদ্ধা আকর্ষণী চলনে চলতে বললেন যেন তাকে দেখে পুরুষেরা “অবনতমস্তকে, নতজানু হ’য়ে,
সসম্ভ্রমে,
ভক্তিগদগদ কণ্ঠে–
‘মা আমার,–জননী আমার’ ! ব’লে
মুগ্ধ হয়, বুদ্ধ হয়, তৃপ্ত হয়, কৃতার্থ হয়,–
তবেই তুমি মেয়ে,
তবেই তুমি সতী ।” জ্ঞানে শ্রদ্ধা জানায় ।
যুগ-ধর্মে স্বীকৃত এবং নানাভাবে উৎসাহিত করার আত্ম-বিপণনী, লাস্যময়ী, যৌন-আকর্ষণী চলনার দর্শকাম, স্পর্শকাম, শ্রুতকাম কুপ্রভাব এড়িয়ে মমতাময়ী মায়েরা যদি নিজের নিজের মেয়েদের ওই শ্রদ্ধা-আকর্ষণী চলনার সিলেবাসটা শেখাতে পারেন তাহলে নারীজাতি মাতৃত্বের স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।

আর্য্য ভারতের হৃত-গৌরব ফিরিয়ে আনার স্বার্থে, “মেরা ভারত মহান” শ্লোগানকে বাস্তবায়িত করতে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রদত্ত “পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চি”র অনুশাসন আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের জীবন্ত সংবিধান শুধু নয় পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠনের সংবিধান। মানবসম্পদকে উন্নীত করতে এছাড়া কোন পথ নেই।
বিপন্ন আর্য্যকৃষ্টিকে রক্ষা করার বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সমাধানী সূত্র—
শ্রীশ্রীঠাকুর—পঞ্চবর্হিঃ বা পঞ্চাগ্নির উপর দাঁড়িয়ে কিছু লোক যদি জোরদার ভাবে দানা বেঁধে ওঠে, তবে সেই জীয়ন্ত দানাই ক্রমশঃ আরো বিস্তৃত ও শক্তিমান হয়ে ওঠে বহু সমস্যার সমাধান দিতে পারে। তোমাদের সৎসঙ্গের প্রাণশক্তি অতুলনীয়। যা আছে সেই সংগে আরো কতকগুলি দেবদক্ষ কর্মী যদি সব ছেড়ে-ছুড়ে দিয়ে পাগলের মতো নাছোরবান্দা হ’য়ে লাগত—অন্য কোন পিছুটান না রেখে, ইষ্টচিন্তা, ইষ্টকর্ম ও লোকহিতই যদি হ’তো তাদের একমাত্র ধ্যান, জ্ঞান, ধান্দা ও তপস্যা, তবে ঢের হ’তে পারতো, সবাই পেতে তার সুফল। তারাও পরম প্রাপ্তির অধিকারী হতো।
পঞ্চবর্হিঃ, সপ্তার্চ্চি, হলো আর্য্যকৃষ্টির মেরুদণ্ড ……. এগুলির রোজ স্মরণ করতে হয়। স্মরণ করা মানে শুধু চিন্তা করা নয়। (আঃ প্রঃ ১৪/৬২)
“হিন্দুমাত্রেরই পঞ্চবর্হি বা পঞ্চাগ্নি স্বীকার্য্য—তবেই সে সনাতন হিন্দু, হিন্দুর হিন্দুত্বের সর্ব্বজনগ্রহনীয় মূল শরণ-মন্ত্র ইহাই ! পঞ্চবর্হি যেমন প্রত্যেক হিন্দুর স্বীকার্য ও গ্রহনীয়,সপ্তার্চ্চিও তেমন প্রতি মানবের অনুসরণীয় ও পালনীয়”! (পুণ্য-পুঁথি, ১ম সংস্করণ)
তবে সবচাইতে দুঃখের বিষয়, মূল সৎসঙ্গের কর্তৃপক্ষ মূল আচার্য্যের ওই বিষয়কে বিসর্জন দিয়ে আচার্য্য-অনুশাসন-বিহীন সঙ্ঘ নির্ধারিত আচার্য্য-পরম্পরা লীলায় মেতে উঠেছেন। ওঁদের যা’তে বোধোদয় হয় সে-বিষয়ে সবাইকে প্রযত্ন নিতে হবে।
জয়গুরু। বন্দে পুরুষোত্তমম্!

।। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি ।।

** নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর শুভ জন্মদিন উপলক্ষ্যে শ্রদ্ধার্ঘ্য **
।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ও নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ।।


শুধুমাত্র বাঙালীই নয়, সমগ্ৰ ভারতবর্ষ এবং আন্তর্জাতিক স্তরের সুধীজন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর আপোষহীন সংগ্রাম ও তাঁর বীরত্বের আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে থাকেন। ভারত সরকার এবং প্রাদেশিক সরকারের নানাবিধ সমাজ সংগঠনের পক্ষ থেকে তাঁর জন্মদিন উপলক্ষ্যে অনেক কর্মসূচী গৃহীত হয়ে চলেছে। তাঁর আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়েছে।
নেতাজীর জীবন কাহিনীর অনেক সুপ্ত গৌরবময় ঘটনা রয়েছে, যা হয়তো সকলে জানেন না। সেই অজানা কাহিনীর কিয়দংশ নিবেদন করার চেষ্টা করছি।
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর মামা তৎকালিন খ্যাতনামা ব্যারিষ্টার জে. এন. দত্ত শ্রীশ্রীঠাকুরের আশ্রিত হয়েছেন শুনে নেতাজীর পিতৃদেব জানকীনাথ বসু ও মাতৃদেবী প্রভাবতী দেবী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শে দীক্ষিত হন। তাঁরা ঠাকুরের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। হিমাইতপুর আশ্রম নির্মাণে তাঁদের আর্থিক অবদান এবং নিজ হস্তে শ্রমদান সৎসঙ্গের ইতিহাসের এক স্বর্ণালী অধ্যায় রূপে নন্দিত হয়ে আছে।
শ্রীক্ষেত্র পুরী ধামের আর্মস্ট্রং রোডে নেতাজীর পিতামহ হরনাথ বসুর স্মৃতি রক্ষার্থে নেতাজীর পিতৃদেব জানকীনাথ বসু ‘হরনাথ লজ’ নামে যে গৃহ নির্মাণ করেছিলেন সেই অঙ্গনকে পুরুষোত্তম পদার্পণে ধন্য করতে প্রায় ২০০ জন ভক্তসহ ঠাকুরকে পুরীতে নিয়ে গিয়েছিলেন নেতাজীর পিতৃদেব । সেদিনটি ছিল ১৯২২ সালের ৩১শে ডিসেম্বর। ভক্তপার্ষদসহ প্রায় দুমাস পুরীসহ সন্নিহিত অঞ্চলকে কীর্তনানন্দের ভক্তিরসের অমৃত ধারায় নিমজ্জিত করে আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামীকে উ়ড়িষ্যা প্রদেশে প্রচারের জন্য থাকতে বলে সপার্ষদ হিমাইতপুরে ফিরে এসেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর।
এই আদর্শ সৎসঙ্গী পরিবারের সন্তান নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু মা-বাবার কাছেই ঠাকুরের অমৃত জীবন কথা শুনে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু তিনবার ঠাকুর দর্শনে আসেন। প্রথমবার আসেন I.C.S পাশ করার পর। ঠাকুর তখন কলকাতায় ছিলেন। তারপর আরো দুবার হিমাইতপুরে এসেছিলেন ঠাকুর দর্শনে। নেতাজী ঠাকুর দর্শনে হিমাইতপুর, পাবনা সৎসঙ্গ আশ্রমে এলে ঠাকুরের অন্যতম পার্ষদ পূজনীয় কর্মবীর শ্রীসুশীলচন্দ্র বসু তাঁকে আশ্রমের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখান। ঠাকুরের মতাদর্শ ও তাঁর পরিকল্পনার বিভিন্ন বিষয় নেতাজীর কাছে তুলে ধরেন সুশীলদা। আশ্রম ঘুরে নেতাজী ভাবলেন যে, ঠাকুরের অধিকাংশ প্রচারকেরা বিবাহিত এবং সংসারী। ঠাকুরকে মাথায় নিয়ে, সংসার ঠিক রেখেও বিশ্বসংসারের মাঙ্গলিক-ব্রতে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন এঁরা। তারপর আশ্রম ঘুরে দেখে নেতাজী সুশীলদাকে বলেছিলেন– “সাধারণতঃ আশ্রম বলতে লোকে সন্ন্যাসী বা গৃহত্যাগীদের আশ্রমই বোঝে। গৃহী হয়ে পরিবারসহ আশ্রম জীবন-যাপন করবার দৃষ্টান্ত আপনারাই প্রথম দেখালেন। পরিবার, পরিজন এবং পরিবেশের সবরকম দায়দায়িত্ব বহন করে, দৈন্য অভাব অভিযোগের মধ্য দিয়ে আপনারা এগিয়ে চলেছেন। তাই আমার মনে হয়, আপনারা দেশ গঠনের একটা বড় গুরুদায়িত্ব নিয়েছেন। আপনারা যদি সত্যি সত্যি এভাবে আশ্রম গড়ে তুলতে পারেন তাহলে আপনারা দেশের কাছে একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন। গৃহী হয়েও যে আশ্রমজীবন যাপন করা যায়, একথা লোকের কাছে আর অবিশ্বাস্য বলে বোধ হবে না। তারপর নেতাজী ঠাকুরের কাছে এসে ভক্তি ভরে প্রণাম করলেন। নেতাজীকে বসবার জন্য যে চেয়ার দেওয়া হয়েছিল সেখানে তিনি বসলেন না। মাতৃভক্ত নেতাজী বলেছিলেন– “ঠাকুর আমার মায়ের ইষ্ট, তাঁর সামনে আমি চেয়ারে বসতে পারি না।” বলে ঠাকুরের পদপ্রান্তেই বসে পড়েছিলেন নেতাজী। ঠাকুর সস্নেহে নেতাজীর মা-বাবা এবং পরিবারের অন্যান্য সকলের কুশল সংবাদ নিলেন। তারপর নেতাজী ঠাকুরকে বললেন– “দেশের তো নানা কাজই করবার আছে। তা দেশের প্রকৃত সেবা করতে হলে কোথা থেকে আরম্ভ করতে হবে? এ বিষয়ে আপনার মত কি?” শ্রীশ্রীঠাকুর নেতাজীর দিকে গভীর স্নেহল দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর ভাব বিভোর কন্ঠে বললেন—“আমার কথা হচ্ছে দেশের কাজ করতে হলে প্রথম মানুষ তৈরীর কর্মসূচী নিতে হবে। ভাল মানুষ পেতে হলেই বিবাহ-সংস্কার আশু প্রয়োজন। আর এটা এমনভাবে করতে হবে যাতে সব বিয়েগুলিই Compatible (সুসঙ্গত) হয়, আর Compatible বিয়ে মানেই বিহিত সঙ্গতি। বর্ণ, বংশ, আয়ু, স্বাস্থ্য ইত্যাদি সব হিসাব করে দেখে শুনে কাজ করতে হবে। বিহিত বিবাহ হলেই ভাল সন্তানাদি জন্মাবে আর তখন তাদের দ্বারাই দেশের, দশের সবারই মঙ্গলব্রতের কাজ করা যাবে। সেইজন্য মানুষ তৈরীর ব্যবস্থা আগে করা প্রয়োজন। দাশদা (দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ) যখন আমায় বললেন যে, তিনি মানুষ খুঁজে পাচ্ছেন না, যার উপর ভার দিয়ে তিনি একটু বিশ্রাম নিতে পারেন। —তার উত্তরে আমি একথাই বলেছিলাম।”
ঠাকুরের কথা শুনে নেতাজীর চোখেমুখে গভীর চিন্তার ছাপ পড়ল। তাঁর চিন্তা জগত নতুন আলোড়ন সৃষ্টি হলো যেন।
নেতাজী ঠাকুরকে বললেন, —“বিবেকানন্দও মানুষ তৈরীর কথা বলেছেন, এবং তা যে আশু প্রয়োজন তা ভেবেছি, কিন্তু তা করতে হলে যে বিবাহ সংস্কার প্রয়োজন তা ভেবে দেখিনি।…. এখন ভেবে দেখছি ভাল সংস্কার-সম্পন্ন শিশু যদি না জন্মায় শুধু শিক্ষা তাদের বিশেষ কি করতে পারে ? বীজ থেকেই তো গাছ হয়, বীজ ভাল হলেই গাছ ভাল হবে। এটা আপনার কথা শুনে বুঝতে পারছি। কিন্তু এতে দীর্ঘসময় সাপেক্ষ।”
ঠাকুর দৃপ্তকন্ঠে বললেন—“দীর্ঘ সময় তো নেবেই—আমরা তো এতদিন পর্যন্ত জাতির বা সমাজের স্থায়ী কল্যাণের জন্য কিছুই করিনি। বহু গলদ জমে গেছে। সাফ করতে সময় নেবে বৈকি ? কোন Shortcut Programme (সংক্ষিপ্ত কর্মসূচী) এ জাতির সত্যিকার কল্যাণ হবে বলে আমার মনে হয় না।”
উপরোক্ত ঐতিহাসিক আলাপচারিতার পর অনেকদিন অতিবাহিত হয়েছে, কিন্তু মানুষ তৈরির মূল বিষয়টি নিয়ে তেমন অগ্রগতি হয়নি। তাই আজকের এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার স্বার্থে আমাদের সকলকে বিবাহ সংস্কারের উপর গুরুত্ব দিতেই হবে।

এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত কিছু অনুভব নিবেদন করছি।
১. প্রতিটি পরিবারের কুলপঞ্জীকরণ।
২. বর্ণ চিহ্নিত করণ এবং বর্ণানুগ কর্মে উৎসাহিত করা।
৩. দীক্ষাপত্রে সংরক্ষিত তথ্যগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষিত করে অঞ্চলভিত্তিক পাত্র এবং পাত্রীদের যোটক নির্বাচন করে বিবাহ সম্পাদন করা।
৪. প্রতিটি অধিবেশনে বিবাহ বাস্তবায়ন বিষয়ে আলোচনা করা এবং তথ্য সংগ্রহ করে পারস্পরিক আদান-প্রদান করা, যা’তে সহজেই পাত্র-পাত্রী নির্বাচন করা যায়।
শ্রীশ্রীঠাকুর ম্যারেজ ব্যুরো গঠন করে বিবাহ আন্দোলন বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। পঞ্চবর্হি এবং সপ্তার্চ্চি-র আদর্শের উপর ভিত্তি করে আমরা যদি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করি, তাহলে সম্ভব।
এ বিষয়ে আপনাদের সুচিন্তিত মতামত জানালে ভালো হয়। জয়গুরু।
সবাইকে আমার জয়গুরু ও প্রণাম।
——————-+++—————
নিবেদনে—তপন দাস

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু প্রসঙ্গে

।। পুরানো সেই দিনের কথা ।।


১৯২২ সালের পূজাবকাশের পর পাবনা আশ্রমে আসেন নেতাজী সুভাষচন্দ্রের ধর্মপ্রাণ পিতৃদেব কটকের ভূতপূর্ব সরকারী উকিল রায়বাহাদুর জানকীনাথ বসু ও ভক্তিমতী জননী প্রভাবতী দেবী। তাঁরা উভয়েই ছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের একান্ত অনুগত ভক্ত। সেইসময় একদিন কথাপ্রসঙ্গে সুভাষ-জননী শ্রীশ্রীঠাকুরকে পুরী নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা মাতা মনোমোহিনী দেবীর নিকট প্রকাশ করেন। মাতা মনোমোহিনী সে কথা শ্রীশ্রীঠাকুরকে জ্ঞাপন করেন। শ্রীশ্রীঠাকুর শুনে বললেন – “আমার যাওয়া তো মুশকিল! কেননা, আমার পুরী যাওয়ার সংবাদ পেলে সৎসঙ্গীরা যে যেখানে আছে, সব পুরী গিয়ে উপস্থিত হবে। তাদের সকলের তাল সামলাতে বোসমা ও বোসদার অনেক বেগ পেতে হবে।” তা শুনে জানকীবাবু ও বোসমা উভয়ে বললেন, “আমরা সে জন্য প্রস্তুত হয়েই আছি। ভক্তদের সেবা করব – এর চেয়ে অর্থব্যয়ের শ্রেষ্ঠ সার্থকতা কোথায়?”

তাঁদের একথা শুনে শ্রীশ্রীঠাকুর রাজী হয়ে গেলেন। তাঁদের ঐকান্তিক আগ্রহ ও অনুরোধে শ্রীশ্রীঠাকুর পরিবারবর্গ ও ভক্তবৃন্দসহ বঙ্গাব্দ ১৩২৯ সনের ১৬ই পৌষ রবিবার মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের সর্বশেষ লীলাভূমি নীলাচলে রওয়ানা হন।
পুরীধামে সমুদ্রতীরে আর্মস্ট্রং রোডের উপর অবস্থিত বসু মহাশয়ের নিজস্ব ভবন ‘হরনাথ লজ’ -এ শ্রীশ্রীঠাকুর ও তাঁহার পরিবারবর্গের জন্য বাসস্থান নির্দিষ্ট করা হয়। নিকটের আরও কয়েকটি বড় বড় বাড়ীতে অপর সকলের থাকবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। শ্রীশ্রীঠাকুর পুরীতে গেছেন শুনে কলকাতা ও ভারতের নানা স্থান থেকে বহু গুরুভাই পুরীতে গিয়ে উপস্থিত হলেন। তাঁদের অবস্থানের জন্যও আরও বাড়ী নেওয়া হল। এই অসংখ্য জনমণ্ডলীর সেবার জন্য বসু দম্পতি আপ্রাণ ছিলেন। শ্রীশ্রীঠাকুর সহ সমবেত ভক্তমণ্ডলী প্রায় দুই মাস পুরীতে অবস্থান করেন। এই এতদিন ধ’রে শ্রীশ্রীঠাকুরের যথাযোগ্য সেবাপূজা এবং ভক্তবৃন্দের যথোচিত সম্বর্ধনায় সস্ত্রীক জানকীনাথ যে অপূর্ব নিষ্ঠা, উদারতা ও মহত্ত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন তা অবর্ণনীয় !
শ্রীশ্রীঠাকুর পুরী অবস্থানকালে ‘হরনাথ লজ’ সর্বদাই কল-কোলাহলে মুখরিত এবং পুরী শহর শঙ্খনিনাদ সহ উন্মত্ত কীর্তনে উদ্বেলিত হয়ে থাকত। একদিকে শ্রীশ্রীঠাকুরের সাথে সৈকতভূমিতে সেই তুমুল সংকীর্তন সহ পাগলকরা উদ্বাহ নৃত্য ও অন্যদিকে সমুদ্রবক্ষে উদ্দাম তরঙ্গপ্রবাহের মিলিত আনন্দোল্লাস কেউ কোনদিন ভুলতে পারবে না!
নিত্যই শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ ও স্থানীয় জনসাধারণ তাঁদের নিজ নিজ জীবনের নানা জটিল সমস্যাদির সমাধানের জন্য তাঁর শ্রীচরণে প্রার্থনা জানাতে থাকেন। শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সহজ সরল মীমাংসা দান করতে থাকেন। তাতে সকলের মনেই এক দিব্য ভাবোন্মাদনার সঞ্চার হ’তে থাকে। আর্ত, ব্যথিত উৎকলবাসীরা সর্বশঙ্কা মুক্ত হ’য়ে অসীম স্বস্তি ও শান্তি লাভ করেন। শ্রীশ্রীঠাকুরের পুরী প্রবাস কালে বহু উৎকলবাসী এই অভিমত পোষণ তথা ব্যক্ত করেন যে, “পুরীধামে শ্রীচৈতন্যদেবের নবকলেবরে পুনরাবির্ভাব ঘটেছে।”
পুরী যাত্রাকালে আমরা কলকাতা থেকে শ্রীহরেকৃষ্ণ সাহা নামে একজন পেশাদার ফটোগ্রাফারকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম। বার-চোদ্দ দিন তিনি আমাদের সঙ্গেই থাকলেন কিন্তু ঠাকুরের ফটো তোলা আমাদের একান্ত আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও, তাঁর অনুমতি না পাওয়ায়, এত দিনের মধ্যেও কোন ফটো তোলা সম্ভব হল না। এদিকে ফটোগ্রাফার ভদ্রলোকটিও দেশে ফেরার জন্য অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। এতে আমাদের সবারই মন খুবই ভেঙে গেল। এমত অবস্থায় আমরা সমস্ত গুরুভাই একত্রে শ্রীশ্রীঠাকুরের সামনে উপস্থিত হয়ে আমাদের ঐকান্তিক মনোভিলাষ নিবেদন করলাম। মনে পড়ে, সেই দিনই শ্রীশ্রীঠাকুর আমাকে ডেকে বলেন, “যতীনদা, পর্যাপ্ত পরিমাণ ফুল যোগাড় করতে পারেন?” আমি সানন্দে বললাম, – “নিশ্চয়ই পারব।”
শ্রীশ্রীঠাকুর তখন অনন্ত মহারাজকে ডেকে বলেন,-“অনন্ত, কাল ভোরে আমি, ফটোগ্রাফার এবং আর জন কয়েককে সঙ্গে নিয়ে সমুদ্রের ধারে পাল-দার (অবিনাশচন্দ্র পালের) বাড়ীর সামনে যাব। তখন যেন অন্য কেউ সেখানে না যায়, তুই এখানে থেকে তার ব্যবস্থা করবি।”
শ্রীশ্রীঠাকুর ভোরবেলা জননী দেবী, বাগবাজারের দুর্গামাসীমা, ফটোগ্রাফার ও আমাকে সঙ্গে নিয়ে সমুদ্রতীরে উপস্থিত হলেন। সেখানে তিনি একখানা বেঞ্চের উপর মাসীমাকে বসিয়ে তাঁর কোলে মাথা রেখে শয়ন করলেন এবং জননী দেবীকে তাঁর পাশে দাঁড়াতে অনুরোধ করলেন। আমাকে ডেকে বললেন,- “যত ফুল এনেছেন, মা’র পায় দিয়ে পুজো করুন এবং এই অবস্থায় মার ফটো নিতে বলুন।”
শ্রীশ্রীঠাকুরের নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করা হল। কিন্তু আমার মনে এই ভেবে ভীষণ দুঃখ হতে লাগল যে,- যত ফুল এনেছিলাম, সবই তো জননী দেবীর চরণে দেওয়া হল, শ্রীশ্রীঠাকুরের পায়ে তো কিছুই দেওয়া হল না। আর, শ্রীশ্রীঠাকুরের একক কোন ফটোও নেওয়া হল না। আমার মনের তৎকালীন অত্যন্ত বিষণ্ণ অবস্থায় শ্রীশ্রীঠাকুর হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,- “যতীনদা, ঠাকুরের ফটো নেবেন নাকি?” তাঁর কথায় আহ্লাদে আটখানা হয়ে আমি বললাম,- “হাঁ নিশ্চয়ই। ঠাকুরের ফটোর জন্যই তো ফটোগ্রাফার হরেকৃষ্ণদাকে এতদিন ধরে এখানে এনে রাখা হয়েছে।”
আমার কথার সঙ্গে সঙ্গেই শ্রীশ্রীঠাকুর মাসীমার কোল থেকে উঠে পড়লেন। এরপর নিজের পরনের কোচার কাপড় ছেড়ে দিয়ে সমুদ্র-সৈকতে গিয়ে দাঁড়ালেন। ফটোগ্রাফার হরেকৃষ্ণদা এই অবস্থায় শ্রীশ্রীঠাকুরের দু’খানি ছবি তুললেন। তারপর আমরা সবাই বাড়ী ফিরে এলাম।
শ্রীশ্রীঠাকুরের ছবির একখানা ফিল্ম ঐ দিনই ওয়াশ করা হল। দুঃখের কথা আর বলবার নয়, দেখা গেল ছবিখানার দুটো চোখই নষ্ট। এই ঘটনায় একান্ত মনো-দুঃখে কাতর হ’য়ে তাঁর চরণেই বিষয়টি নিবেদন করলাম। আমার কথা শুনে তিনি হাসতে হাসতে বললেন,- “সেকি ! ফটো আবার খারাপ হবে কেন? ভাল ক’রে ওয়াশ করতে বলুন।” হরেকৃষ্ণদা পুনরায় যত্ন সহকারে ছবিখানা ওয়াশ করলেন। এবার দেখা গেল, ছবিখানা সর্বাংশেই অতুত্তম হয়েছে। আমি মনের আনন্দে ছুটে গিয়ে ছবিখানা শ্রীশ্রীঠাকুরের হাতে দিলাম। শ্রীশ্রীঠাকুর ছবিখানা বারংবার আপন বক্ষ ও শিরোদেশে ঠেকাতে ঠেকাতে হঠাৎ একবার ভাবাবেগে বলে উঠলেন,- “এটাই পরমপিতার প্রকৃত প্রতিকৃতি।”

তথ্যসূত্র – [শ্রীব্রজগোপাল দত্তরায়ের “শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র”,শ্রীযতীন্দ্রনাথ বসুর বিবৃতি]।

বর্ষ বিদায় বর্ষ বরণ

।। খ্রীস্টাব্দ ২০২৪কে বিদায় ও ২০২৫কে বরণ, তথা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত সৎসঙ্গের ঋদ্ধি-তপনার ঋত্বিক সম্মেলন বনাম যুগধর্মের উৎসব স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।


বর্তমানে প্রচলিত সময় পরিমাপক একক সেকেণ্ড, মিনিট, ঘণ্টা ইত্যাদির পূর্বে, পুরাকালে, পল, দণ্ড, কলা, মুহূর্ত, প্রহর প্রভৃতি কালনির্ণয় সূচক দিয়ে পৃথিবীর আহ্নিক গতিকে ১ অহোরাত্র ধরা হতো। ৩০ অহোরাত্রে ২ পক্ষ বা ১ মাস। ৬ মাসে ১ অয়ন। ২ অয়নে ১ বর্ষ। অপরপক্ষে উত্তরায়নে দেবতাদের ১ দিন, দক্ষিণায়নে ১ রাত। দেবতাদের ১ বছর সমান মানুষের ৩৬০ বছর ধরা হয়। বায়ুপুরাণে সৌর, সৌম্য, নাক্ষত্র এবং সাবন নামে চার প্রকার সময় নিরূপণ মাসের উল্লেখ আছে। ৩০ সূর্যোদয়ে সাবনমাস। সূর্যের রাশি পরিবর্তনে হয় সৌরমাস। কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ থেকে শুক্লপক্ষের পূর্ণিমা পর্যন্ত চান্দ্রমাস। চন্দ্রের নক্ষত্র ভোগকালকে বলা হয় নাক্ষত্রমাস। ৫ সৌরবর্ষে ১ নৈসর্গিক যুগ। (কোনো একটিমাসের আবর্তন কালকে একক ধরে নৈসর্গিক যুগের গণনা শুরু করা যেতে পারে।) ১ হাজার নৈসর্গিক যুগে ১ কল্প। সপ্তর্ষিরা ১০০ বছর করে এক একটি নক্ষত্রে কেন্দ্রীভূত থাকে। ২৭টি নক্ষত্র ভোগকাল ২৭০০ বছর—একটি সপ্তর্ষিযুগ। এই সপ্তর্ষিযুগের গণনা প্রাচীন ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল। ভারতের অন্যতম জ্যোতির্বিদ আর্য্যভট্ট নক্ষত্রাদির সাথে মেষরাশির অবস্থানকে কেন্দ্র করে কল্যব্দের সূচনা করেন ৩১০১ খৃঃ পূঃকে একক ধরে। সেই হিসেব এবং রাশির অবস্থান ধরে উত্তরায়নে ভীষ্মের দেহত্যাগ এর হিসেব কষে ২১৪২ খৃঃ পূঃ কে শ্রীকৃষ্ণের জন্মবর্ষ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
আমরা যে খৃষ্টাব্দ বলি এটা হচ্ছে গ্রেগরীয়ান ক্যালেণ্ডার। এটা একটি সৌর সন। নানা পরিবর্তন, পরিমার্জন, পরিবর্ধন, বিবর্তন এবং যোগ-বিয়োজনের মধ্য দিয়ে এ বর্তমান কাঠামো লাভ করেছে। উল্লেখ্য সৌর সনের সাথে ঋতুর সঙ্গে সম্পর্ক থাকে। বর্ষপঞ্জিকা প্রচলন অল্প পরিসরে প্রাচীন সুমের সভ্যতায় পরিলক্ষিত হয়। তবে মিশরীয় সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীনতম সৌর ক্যালেণ্ডার উদ্বোধন করে বলে জানা যায়। প্রাচীন মিশরীয় ক্যালেণ্ডার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, খৃস্টপূর্ব ৪২৩৬ অব্দ থেকে ক্যালেণ্ডার ব্যবহার গ্রহণ করে। রোমানরা তাদের প্রথম ক্যালেণ্ডার লাভ করে গ্রীকদের কাছ থেকে। রোমানদের প্রাচীন ক্যালেণ্ডারে মাস ছিল ১০টি এবং তারা বর্ষ গণনা করতো ৩০৪দিনে। মধ্য শীত মৌসুমের ৬০ দিন তারা বর্ষগণনায় আনতো না। রোমানদের বর্ষ গণনার প্রথম মাস ছিল মার্চ। তখন ১লা মার্চ পালিত হতো নববর্ষ উৎসব। শীত মৌসুমে ৬০ দিন বর্ষ গণনায়না আনার কারণে বর্ষ গণনায় যে দুটি মাসের ঘাটতি থাকতো তা পূরণ করবার জন্য তাদের অনির্দিষ্ট দিন-মাসের দ্বারস্থ হতে হতো। এই সব নানা জটিলতার কারণে জনসাধারণের মধ্যে তখন ক্যালেণ্ডার ব্যবহার করার প্রবণতা একেবারেই ছিল না। রোমের উপাখ্যান খ্যাত প্রথম সম্রাট রমুলাসই আনুমানিক ৭৩৮ খৃস্টপূর্বাব্দে রোমান ক্যালেন্ডার চালু করার চেষ্টা করেন। পরবর্তীকালে রোমান সম্রাট নূমা ১০ মাসের সঙ্গে আরো দুটো মাস যুক্ত করেন। সে দুটো মাস হচ্ছে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি। তিনি জানুয়ারিকে প্রথম মাস ও ফেব্রুয়ারিকে শেষ মাস হিসাবে যুক্ত করেন। জানুয়ারি মাস ধার্য করা হয় ২৯ দিনে এবং ফেব্রুয়ারি মাস ধার্য করা হয় ২৮ দিন। এ ছাড়াও তিনি মারসিডানাস নামে অতিরিক্ত একটি মাসেরও প্রবর্তন করেন। এই মারসিডানাস মাস গণনা করা হতো ২২ দিনে। এই অতিরিক্ত মাসটি গণনা করা হতো এক বছর অন্তর ফেব্রুয়ারি মাসের ২৩ ও ২৪ তারিখের মাঝখানে। খৃস্টপূর্ব ৪৩২ অব্দে সম্রাট নূমা কর্তৃক প্রবর্তিত মাসের হিসেব পরিমার্জন ও পরিবর্তন করা হয়। পরবর্তীকালে রোমানরা চার বছর অন্তর লীপ ইয়ারের হিসেব প্রবর্তন করে। এ হিসেবেও এক বছরের সঙ্গে অন্য বছরের দিন সংখ্যার হেরফের হতে থাকে। চার বছর অন্তর অতিরিক্ত একটি দিন যোগ করলে দেখা যেতো দিনের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সীজার মিশরীয় ক্যালেন্ডার রোমে চালু করেন। তিনি জ্যোতির্বিদদের পরামর্শে খৃস্টপূর্ব ৪৬ অব্দে সেই বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের মাঝখানে ৬৭ দিন এবং ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে ২৩ দিন এই মোট ৯০ দিন যুক্ত করে ক্যালেণ্ডার সংস্কার করেন। এই ক্যালেন্ডার জুলিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত হয়। এই ক্যালেন্ডারে মার্চ, মে, কুইন্টিলিস (জুলাই) ও অক্টোবর দিন সংখ্যা ৩১ দিন, অপরদিকে জানুয়ারি ও সেক্সটিনিস (আগস্ট) মাসের সঙ্গে দুইদিন যুক্ত করে ৩১ দিন করা হয়। ফেব্রুয়ারি মাস ২৮ দিনেই গণনা হতে থাকে। তবে প্রতি চার বছর অন্তর একদিন যুক্ত করা হয়। জুলিয়াস সীজারের নামানুসারে প্রাচীন কুইন্টিলিস মাসের নাম বদলিয়ে রাখা হয় জুলাই। ৪৪ খৃস্ট পূর্বাব্দের ১৫ মার্চ জুলিয়াস সীজার রোমনগরে নিহত হন। অন্যদিকে সম্রাট অগাস্টাসের নামানুসারে সেক্সটিনিস মাসের নাম পাল্টিয়ে অগাস্ট করা হয়। মিশরীয়রা সৌর বর্ষ গণনা করতো ৩৬৫ দিনে। কিন্তু জুলিয়াস সীজারের সংস্কারের ফলে তা তিনশ’ সাড়ে পঁয়ষট্টি দিনে এসে দাঁড়ায়। তখন থেকে বর্ষপঞ্জিতে ১ মার্চের পরিবর্তে ১ জানুয়ারীতে নববর্ষ প্রচলন হয়। খৃষ্টাব্দের সংখ্যাকে ৪ দিয়ে ভাগ করলে যদি মিলে যায়, তবে সে বছর ফ্রেব্রুয়ারী মাস ২৮ দিনের পরিবর্তে ২৯ দিন হবে। । যীশুখৃস্টের জন্ম বছর থেকে গণনা করে ডাইওনীসিয়াম এক্সিগুয়াস নামক একখৃস্টান পাদরী ৫৩২ অব্দ থেকে খৃস্টাব্দের সূচনা করেন। ১৫৮২ খৃস্টাব্দে রোমের পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরী জ্যোতির্বিদগণের পরামর্শে জুলিয়ান ক্যালেণ্ডার সংশোধন করেন। তার নির্দেশে ১৫৮২ খৃস্টাব্দের অক্টোবর ১০ দিন বাদ দেয়া হয়, ফলে ঐ বছরের ৫ তারিখকে ১৫ তারিখ করা হয়। পোপ গ্রেগরী ঘোষণা করেন যে, যেসব শত বর্ষীয় অব্দ ৪০০ দ্বারা বিভক্ত হবে সেসব শতবর্ষ লিপ ইয়ার হিসাবে গণ্য হবে। পোপ গ্রেগরীর বর্ষপঞ্জি সংস্কারের পর থেকে রোমান বর্ষপঞ্জি পন্ডিতদের কাছে গ্রেগরীয়ান বর্ষপঞ্জি হিসাবে খ্যাত হয়েছে। কিন্তু এ সংস্কার মানুষ সহজে মেনে নেয়নি। ইউরোপের দেশে দেশে এনিয়ে চলছিল দীর্ঘদিনের বাদ-প্রতিবাদ। তদুপরি খৃষ্টানদের রোমের ‘ক্যাথলিক’ বনাম ‘প্রোটেসটেন্ট’ বিরোধের কারণে গ্রেগরীয়ান সংস্কার গ্রহণে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছিল। অবশেষে ১৭৫২ সালে ইংল্যান্ডে ১৯১২ সালে চীনে ও আলবেনিয়াতে, ১৯১৮ সালে রাশিয়াতে ও ১৯২৭ সালে তুরস্কে সরকারীভাবে গ্রেগরীয়ান বর্ষপঞ্জি গৃহীত হয়। যীশুখৃষ্টের নামের সঙ্গে রোমানদের ধারাবাহিক বর্ষ গণনা বা খৃষ্টাব্দ অপেক্ষাকৃত পরবর্তীকালের সংযোজন। যীশুখৃষ্টের দেহত্যাগের ৭৫০ বছর পরে রোমের খৃষ্টান পাদ্রীগণ ধারাবাহিক বর্ষ হিসাবে যীশুর স্মরণে পশ্চাদ গণনার মাধ্যমে খৃষ্টাব্দ চালু করেন। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী যীশুর জন্ম বর্ষকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ‘খৃষ্টাব্দ’ চালু হয়েছে। সে হিসাবে বলা চলে যীশুখৃষ্টের জন্ম হয়েছিল ২০০৭ বছর আগে। আসলে কিন্তু তা নয়। যীশুর জন্ম বর্ষ পাবার জন্য প্রচলিত খৃষ্টাব্দের সঙ্গে আরও ৪ বছর যোগ করতে হবে। সম্ভবত তাঁর মৃত্যুবরণের ৭৫০ বছর পরে ‘খৃষ্টাব্দ’ চালু করার সময় রোমান পাদ্রীগণ প্রকৃত তথ্য খুঁজে পেতে ভুল করেছিলেন। তাছাড়া এ মহাপুরুষের প্রকৃত জন্মদিন বা তারিখ সম্পর্কেও বিভ্রান্তি রয়েছে। আজকাল সারা বিশ্বব্যাপী ২৫ ডিসেম্বর যীশুর জন্মদিন বা বড়দিন পালিত হয়। এক সময়ে খৃষ্টান পাদ্রীগণ জানুয়ারী মাসে যীশুর জন্মদিন পালন করতেন, তারও আগে ২০ মে তারিখ জন্মদিন উদ্যাপিত হত। ১ জানুয়ারী রোমান বর্ষপঞ্জির নববর্ষ; এদিনে খৃষ্টীয় সনের খৃষ্টাব্দের নববর্ষ শুরু হয়। কমবেশী সারাবিশ্বে দিবসটির একটি আবেদন রয়েছে। আমরা ১ জানুয়ারী থেকে নতুন ক্যালেণ্ডার ব্যবহার করি। এই গ্রেগরীয়ান নূতন বছর বা খৃষ্টীয় সনকে ইংরেজি বর্ষপঞ্জি তথা ইংরেজি সন বলার প্রবণতা দেখা যায়। অনেকেই ১ জানুয়ারিকে ইংরেজি নববর্ষ হিসাবে চিহ্নিত করেন। অথচ ইংরেজি বর্ষপঞ্জি বা ইংরেজি সন বলতে প্রকৃত প্রস্তাবে কিছুই নেই। (সূত্র : সংগৃহীত)


গণনার হিসেবের তারতম্য হলেও, দিনরাত-মাস-বছর হয়েই চলেছে আদিকাল থেকে প্রাকৃতিক নিয়মে। দিন-মাস-বছর আসে যায়, রেখে যায় কিছু স্মৃতি মনের মণিকোঠায়। ওইসব স্মৃতির মালাগুলোকে স্মৃতিবাহীচেতনার ভল্টে অনন্তকাল জমা করে রাখার জন্য আর্য্য-ঋষিরা প্রতিটি মুহূর্তের জীবন ধারণের আহরণকে শুদ্ধি করার মাধ্যমে ধ্রুবাস্মৃতির সন্ধান দিয়ে গেছেন। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র স্বস্ত্যয়ণী ব্রতের “নিয়তং স্মৃতিচিদযুতে” মন্ত্রে যাকে সমৃদ্ধ করেছেন। কেননা, যে মুহূর্ত চলে যাবে তা আর ফিরে আসবে না। চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা সমৃদ্ধ সবুজ গ্রহ পৃথিবীর প্রতিটি মুহূর্তকেই যাতে চিরনবীনতায় আস্বাদন করতে পারি, উপভোগ করতে পারি সেজন্যই আর্য্য সভ্যতার ঊষা লগনে পরমপিতার প্রতিভূ আর্য্য ঋষিগণ ‘‘মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ……..’’ মন্ত্রে বন্দনা করে বসুন্ধরার মধুময় পরিবেশকে রক্ষা অর্থাৎ পূজা করতে শিখিয়েছিলেন। পূজা শব্দের অর্থ সম্বর্দ্ধনা। যেমন যেমন আচরণে পরিবেশের অজৈব উপাদানসমূহকে রক্ষা করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া যায় তাই ছিল আর্য্য ভারতের পূজা, যজ্ঞ, হোম বা উৎসবের তাৎপর্য্য ।
আমরা যে ৩৩ কোটি দেবতার কথা শুনেছি সে সংখ্যাটা বাস্তবে ৩৩,০০০০০০০ নয়, শুধুই ৩৩। কোটি অর্থে piece বোঝান হয়েছে, যথা, জীবকোটি, ঈশ্বরকোটি শব্দ একক অর্থে ব্যবহৃত হয়।
এই সবুজ গ্রহের জীবকূলের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জৈবাজৈব রসদের যোগানদাতার মূল মালিক সূর্য। সূর্যের আর এক নাম আদিত্য। আদিত্য মানে দেবতা, দেদীপ্যমান যা’ তাকে দেবতা বলে। পৃথিবী, অন্তরীক্ষ ও দ্যুলোকের প্রতিটি স্থানে ১১টি করে বেঁচে থাকার আবশ্যিক উপাদান সরবরাহকারী দেদীপ্যমান উৎস রয়েছে। প্রাকৃতিক ওই ৩৩টি বা ৩৩কোটি উৎসকে রক্ষা করার প্রশ্নে আমরা প্রবৃত্তি পরবশ হয়ে যাতে দুর্বৃত্ত না হই তারজন্য উপনিষদের ঋষিরা স্মরণ করিয়ে দিলেন ‘আত্মানং বিদ্ধি’-র কথা। —পরমপিতার সন্তান তুমি, নিজেকে জানো, নিজের প্রতিরূপ মনে করে পরিবেশকে বাঁচাও, নিজে বাঁচ। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’—জীবনবিধ্বংসী আচরণ ত্যাগ করে জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলো। ‘মা গৃধ’—লোভ করো না। সদাচার এবং বর্ণাশ্রম মেনে চলো। পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে নিজে সমৃদ্ধ হও। এই ছিল ভারতবর্ষের বিধি-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠনের, ধর্মের, পূজার বা উৎকৃষ্ট প্রসবকারী আচরণ বা উৎসব উদযাপনের নিত্যবাস্তব রূপ। যার উপর প্রতিষ্ঠিত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৎসঙ্গ আন্দোলন। আমাদের নিত্য সাধনার আর্য্য-সন্ধ্যা বন্দনায় যা’ অনুশীলন করতে শিখিয়েছেন যুগ-বিধায়ক পরমবিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। অথচ আমাদের সৎসঙ্গের লোগো-বাহকেরা সেগুলোকে বাদ দিলন। “সত্যমেব জয়তের” ধারকেরা, ওই মহান মন্ত্রের ধ্বজাধারীরা সেইসব পবিত্র কর্তব্য ভুলে, বিজ্ঞানীদের সচেতন-বার্তাকে অগ্রাহ্য করে উৎসব পালনের নামে লোভাদি প্রবৃত্তি-পরায়ণতার উচ্ছৃঙ্খলতাকে উস্কে দিয়ে প্রাকৃতিক এবং আত্মিক পরিবেশকে যে হারে দূষিত করে চলেছি তা কতখানি উৎকৃষ্ট প্রসব করে উৎসব শব্দটিকে সমৃদ্ধ করবে সে হিসেব কষবে কবে সত্যমেব জয়তের আধিকারিকেরা?
যাইহোক, থেমে থাকলো তো আর চলবে না, চরৈবেতি-র নিদেশ মেনে এগিয়ে যেতেই হবে ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যে।
খ্রীষ্টাব্দের ২০২৪তম বর্ষের জাবেদা খাতায় লিপিবদ্ধ হওয়া মানবসভ্যতা-বিরোধী, অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, রেপ, হত্যা ইত্যাদি অমানবিক স্মৃতির সাথে জুড়ে গেল আর এক অকল্পনীয় বিভীষিকাময় স্মৃতি—আর-জি-কর—অভয়া কাণ্ড! বছরের শেষ প্রান্তে এসে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের ঘৃণ্য রাজনীতি, ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে, কোরান-বিরোধী, নবীর আদর্শ-বিরোধী অধার্মিক-বিধিতে, যেভাবে ওই দেশের ভূমিপুত্র হিন্দুদের প্রতি অত্যাচার চালাচ্ছে,—তা যেন কিছুতেই ক্যালেণ্ডারের পুরানো পাতার মত ছিঁড়ে ফেলা গেল না।—মন থেকে মুছে ফেলা যাবে না পশ্চিম বাংলা জুড়ে মানবতা-বিধ্বংসী জঙ্গী-জাল বিস্তার!
তথাপি, আশা-হতাশা, চাওয়া-পাওয়া, সুখ-দুঃখ, মিলন-বিচ্ছেদ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, প্রেম-হিংসার জাবেদা খাতার সঞ্চয় জমা রেখে সম্মুখের দিকে এগিয়ে চলার মাহেন্দ্রক্ষণ সমাগত। সমাগত পরমপুরুষ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রবর্তিত ঋত্বিক অধিবেশন মাধ্যমে আমরা প্রস্তুত ২০২৫তম বর্ষ-এর নতুন সূর্যকে স্বাগত জানাতে।
প্রাণের প্রাণ-স্পন্দন টিঁকিয়ে রাখার উৎস, আমাদের এই সবুজ গ্রহের
অভিভাবক, সকল শক্তির উৎস জ্যোতির্ময় সূর্যের তেজোময় দীপ্তিতে আমরা যেন
সকল প্রকার কলুষতা ত্যাগ করে দীপ্তিমান চরিত্রের অধিকারী হতে পারি।
আমাদের মনুষ্যত্ব যেন দূষিত না হয়। আকাঙ্খার মোহে পড়ে আমরা যেন আমাদের
পঞ্চ-মহাভূত সম্ভূত পরিবেশকে দূষিত না করি। ভিনগ্রহের প্রাণীরা যেন
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ-প্রাণীদের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলতে না পারে, যে
আমরা অসভ্য, ভোগবাদের জোয়ারে ভাসতে গিয়ে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার, বাঁচিয়ে
রাখার অনুকূল পরিবেশকে বিনষ্ট করছি। তাহলে সেটা বড় লজ্জার ব্যাপার হবে।
হে অন্তর্যামী পরমপিতা! তুমি আমাদের শুভবুদ্ধি দাও, আমরা যেন “পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চি”-র আদর্শে মানব সভ্যতাকে জীবন-বাদের পথ প্রদর্শন করতে পারি।
সমাগত
২০২৫-এর নতুন সূর্যের কিরণে স্নাত হয়ে
নতুন প্রাণ, নতুন সুর, নতুন গান,
নতুন ঊষা,
নতুন আলোর নবীনতায় নতুন বছরকে সম্বর্দ্ধিত করতে পারি।
কেটে যাক
আমাদের সব বিষাদ, সব আতঙ্ক—
পরমপিতার আশীষধারায় এসে যাক হর্ষ, শুভ হোক ২০২৫-এর খ্রীষ্টিয় নববর্ষ।
আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক ও আধিভৌতিকাদি ত্রিতাপ জ্বালায় সদাচারের ইষ্টবারি সিঞ্চন করে ‘একদিন-প্রতিদিনের’ চিরনবীন সূর্যালোকের নবীন ছটায় পরমপিতার অনুশাসনের
আশীষধারায় অজর, অমর, চিরচেতনতার সাধনাকে আপ্ত করে আমরা যেন
ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যের চরৈবেতিতে নিরবচ্ছিন্ন থাকতে
পারি।—
বর্ষবিদায়-বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে সীমায়িত না থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্রের দিব্য-নিদেশের দিনচর্যার—
‘‘ঊষার রাগে উঠবি জেগে শৌচে শীতল হবি,
সন্ধ্যা-আহ্নিক জপ সাধনায় ঈশের আশিস লবি,
কুতুহলে পড়শি ঘুরে দেখবি সযতনে,
আছে কেমন কোথায় কে জন মন দিবি রক্ষণে,
তারপরেতে বাড়ী এসে শৌচে যথাযথ
গৃহস্হালীর উন্নয়নী অর্জ্জনে হ’ রত,
স্নানটি সেরে আহ্নিক করে ক্ষুধামতন খাবি,
একটু চলে বিশ্রাম নিয়ে আগুয়ানে ধাবি,
এমনি তালে সচল চালে চলে সন্ধ্যা এলে,
শৌচে শুদ্ধ হয়ে করিস আহ্নিক হৃদয় ঢেলে,
উন্নয়নের আমন্ত্রনী গল্প-গুজব শীলে,
হৃষ্টমনে আলোচনায় কাটাস সবাই মিলে,
পড়শী দিগের অভাব-নালিশ থাকেই যদি কিছু
তার সমাধান যেমন পারিস করিস লেগে পিছু,
করন-চলন ধরন-ধারন যজন যাজন কিবা
সকল কাজেই ইষ্টস্বার্থে চলিস রাত্রি-দিবা,
আদর-সোহাগ উদ্দীপনী কথায় কাজে ঝুঁকে,
স্বার্থ-কেন্দ্র সবার হবি ধরবি ইষ্টমুখে,
বিশ্রামেরই সময় গা-টি ঘুমল হয়ে এলে,
ইষ্ট-চলন মনন নিয়ে ঘুমে গা দিস ঢেলে।’’
(অনুশ্রুতি গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)-র আলোকে
বছরের প্রতিটি দিন হয়ে উঠুক অমৃত-তপনার উৎসব—খ্রীষ্টিয় নববর্ষ ২০২৫-কে
স্বাগত-স্মরণের প্রাক্কালে এই প্রার্থনা জানাই পরমপিতার রাতুল চরণে।

।। বড়দিনের বড় বার্তা ।।

** বড়দিনের বড়কথা **
।। প্রভু যীশুর ভক্ত মেরি ম্যাগডিলিনি প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন—যীশুখ্রীষ্টেরর ভক্তদের মধ্যে মেরি ম্যাগডিলিনির সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। She love Lord for his own sake ( সে প্রভুকে তাঁর জন্যই ভালবাসত)। তার মত unexpectant, selfless love (প্রত্যাশাশূন্য, নিঃস্বার্থ ভালবাসা)আর কারো ছিল কিনা জানি না। আজ ভগবান যীশুর কত ভক্তের কথা শোনা যায়। কত saint (সন্ত)-এর কথা শোনা যায়। কিন্তু আমার মনে হয়, যীশুর অনুরাগীদের মধ্যে সর্ব্বাগ্রে নাম করা উচিত তার।
প্রশ্ন-আজ মেরির খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা ও প্রভাব খ্রীষ্টান জগতে যতটুকু আছে ও হয়েছে, তার থেকে ঢের বেশী হওয়া উচিত ছিল।
শ্রীশ্রীঠাকুর ~ কিন্তু একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে সে ছিল pivot (মূল খুঁটো)। চরম দু:সময়ে যখন কেউ ছিল না যীশুর পাশে, প্রত্যেকে ভয়ে আত্মগোপন ক’রে চলছিল, তখন একমাত্র সে-ই প্রাণের মায়া ত্যাগ ক’রে
বেপরোয়া হ’য়ে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়েছিল যীশুর জন্য পাগল হ’য়ে। কেউ-কেউ বলে নাকি—যীশুর প্রতি তার যে ভালবাসা ছিল, তা ছিল lustful (কামনালিপ্সু)। হয়তো তা’ lustful (কামনালিপ্সু)-ই ছিল। কিন্তু সমগ্র সত্তার প্রতিটি অণুপরমাণু দিয়ে অমন ক’রে আর কেউ বোধ হয় যীশুর অস্তিত্ব ও স্বস্তি কামনা করেনি। Her whole soul and entire being was bequeathed to Chirst and that was the holiest of love ( তার সমগ্র আত্মা, সমগ্র সত্তা যীশুকে সমর্পিত হয়েছিল এবং তার প্রেম ছিল পবিত্রতম)। ভালবাসা এমন পবিত্র জিনিস যে তাতে প্রিয়তমের কথা ছাড়া অন্য কোন কথা মনে পড়ে না। “রূপ লাগি
আঁখি ঝুরে, গুনে মন ভোর, প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর”—এমনতর হয়।
” অনুরাগের বাতি যার
নয়নকোণে জ্বলেছে,
সে না সর্ব্বস্ব তেয়াগিয়া
গুরুকে সার করেছে।
ম্যাগডিলিনি-এর মধ্যে ছিল এই প্রাণ-উপচান অনুরাগ। আবার ছিল প্রচন্ড নির্ভীকতা ও পরাক্রম। আমি যত ভাবি ততই আমার শ্রদ্ধা হয়।
(আ. প্র. ৯/১১.১১.১৯৪৭)

বড়দিনের বড়কথা

।। বড়দিনের বড়কথা : প্রভু যীশুখ্রীস্ট স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি ।।


অবতার বরিষ্ঠমাত্রেই পূর্বাপূর্ব অবতারদের পরিপূরণকারী হন। ‘‘যেই রাম সেই কৃষ্ণ, এক দেহে রামকৃষ্ণ’’ রূপে এসে বিভিন্ন ধর্মমতের মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য স্থাপনের জন্য গীর্জায় গিয়ে যীশুর, মসজিদে গিয়ে রসুলের আরাধনা করেছিলেন। তিনি লোকশিক্ষার জন্য বহু ধর্মীয় মতবাদের গুরুদের কাছে দীক্ষাও নিয়েছিলেন গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুন্ন রেখেই। তথাপিও সাধারণ মানুষেরা মনের মণিকোঠায় জমে থাকা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ একেবারে মুছে ফেলতে পারে নি। এবার অনুকূলচন্দ্র রূপে এসে ‘‘ঈশ্বর এক, ধর্ম এক, প্রেরিতগণ সেই এক-এরই বার্তাবাহী’’ বাণীর মর্মার্থ বোঝাতে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে ভেদাভেদ ঘোচাতে, এক অভিনব ব্যবস্থা করেছিলেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপনের জন্য কুষ্টিয়ার ভক্তদের শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীবুদ্ধ, প্রভু যীশু, হজরত রসুল, শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ প্রমুখ পূর্ববর্তী অবতার-বরিষ্ঠদের জন্মোৎসব পালন করতে উৎসাহিত করেছিলেন। ঠাকুরের নির্দেশ মেনে কুষ্টিয়ার ভক্তরা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের থেকে শুরু করে সাধারণ অনুরাগীদের শ্রদ্ধার সাথে আমন্ত্রণ জানিয়ে আলাপ-আলোচনা-কথকতা ও অন্নব্যঞ্জনাদির সেবার ব্যবস্থা করতেন। ওইভাবে পূর্বাপূর্ব অবতার বরিষ্ঠদের জন্মোৎসব পালন করার ফলে সারা কুষ্টিয়ায় এক অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে গিয়েছিল। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে শ্রদ্ধা-প্রীতির বন্ধন গড়ে উঠেছিল।

পুরুষোত্তমগণের প্রধান লক্ষণ তাঁরা সম্বেগসিদ্ধ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হন। আত্মপ্রচার না করে সমাগতদিগের বৈশিষ্ট্যের পালন ও পোষণ করেন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের কাছে শ্রীরামচন্দ্রের ভক্ত গেলে তিনি আলাপ-আলোচনায় শ্রীরামচন্দ্রের, শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত গেলে শ্রীকৃষ্ণের, বুদ্ধদেবের ভক্ত গেলে বুদ্ধদেবের, প্রভু যীশুর ভক্ত গেলে প্রভু যীশুর, রসুল ভক্ত গেলে হজরত মহম্মদের, চৈতন্যদেবের ভক্ত গেলে চৈতন্যদেবের, শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্ত গেলে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের গুণগান করে তাঁদের ইষ্টানুরাগ বাড়িয়ে দিতেন। তাঁরা তাঁদের ঈপ্সিত ইষ্টকে খুঁজে পেতেন পূর্বতন পূরয়মান বর্তমান পুরুষোত্তমের মধ্যে। অনুরূপভাবে প্রভু যীশুখ্রীষ্টের ভক্ত রে. আর্চার হাউজারম্যান, ই. জে. স্পেনসার প্রমুখ যীশুখ্রীস্টের ভক্তগণ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মধ্যে তাঁদের আরাধ্য দেবতাকে খুঁজে পেয়ে সারাটা জীবন তাঁর সান্নিধ্যে কাটিয়ে তাঁর সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত সমন্বয়ী ধর্মাদর্শ প্রচার করে গেছেন।
দেওঘরে, এক বড়দিনের সন্ধ্যা-প্রার্থনান্তে প্রণম্য স্পেনসারদা ঠাকুরকে প্রণাম করার পর ঠাকুর বললেন, আজ গীর্জায় যাবে না প্রেয়ার করতে ? উত্তরে স্পেনসারদা বলেছিলেন, দীর্ঘকাল গীর্জায় গিয়েও প্রভুর সাক্ষাৎ পাইনি, আপনার মধ্যে আমার আরাধ্য-দেবতা যীশুকে খুঁজে পেয়েছি, তারপরেও গীর্জায় যেতে হবে ?
উত্তরে ঠাকুর বলেছিলেন, পূর্বতনীদের প্রতি শ্রদ্ধানতি জানাতেই হয়।
স্পেনসারদা আর দ্বিরুক্তি না করে গীর্জায় চলে যান, সারারাত গীর্জায় থেকে প্রত্যুষে ফিরে আসেন ঠাকুর-বাংলোয়। ঠাকুর যেন তাঁর প্রত্যাগমনের অপেক্ষায়ই ছিলেন। স্পেনসারদা প্রণাম করে বললেন, আপনি আমার সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবসান করে দিলেন আজ। প্রভু-যীশুর ধ্যান করতে করতে আজ আবার প্রমাণ পেয়ে গেলাম আপনিই বর্তমান যীশু। আবার প্রমাণ পেয়ে গেলাম আপনার বলা সেই বাণীগুলোর—“All the Prophets of the past converge and are awakened in living Guru of the age. It is through our love for the lover of Christ that we can love Christ.” (পূর্বতন প্রেরিতগণ জীবন্ত যুগুরুর মধ্যে কেন্দ্রীভূত ও জাগ্রত থাকেন। খ্রীষ্ট-প্রেমীর প্রতি ভালবাসার ভিতর-দিয়েই আমরা যীশুখ্রীষ্টকে ভালবাসতে পারি।) (আঃ প্রঃ দশম খণ্ড, ০৮. ০১. ১৯৪৮)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, ‘‘একজন সত্যকার হিন্দু, একজন সত্যকার মুসলমান, একজন সত্যিকার খ্রীষ্টান—পরমপিতার চোখে এরা সবাই সমান। …… প্রকৃত ধার্ম্মিক যারা তারাই সমাজের গৌরব।
একজন খ্রীষ্টানের প্রথম যীশুখ্রীষ্টকে ভালবাসা উচিত এবং তাঁর মাধ্যমে সব প্রেরিতপুরুষকে ভালবাসা উচিত। একজন হিন্দুর শ্রীকৃষ্ণকে বা যে-প্রেরিতপুরুষকে সে অনুসরণ করে তাঁকে ভালবাসা উচিত এবং তাঁর মাধ্যমে অন্য সব প্রেরিত পুরুষকে ভালবাসা উচিত। কোন প্রেরিত পুরুষকে ভালবাসা মানে তিনি যেমন ছিলেন, সেইভাবে তাঁকে বোঝা। আামাদের সুবিধা অনুযায়ী তাঁর মতের বিকৃত ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। যদি কেউ বলে—যীশুকে নয়, আামি মা মেরীকে ভালবাসি, তাহলে সে মা মেরীকে ভালবাসে কি না, তা সন্দেহযোগ্য। (সূত্রঃ আ. প্র. ১১ খণ্ড, ইং তাং ৭. ২. ১৯৪৮)
প্রভু যীশু তাঁর অনুগামীদের উদ্দেশ্যে চরম ত্যাগ ও নির্ভরতার কথা বলেছেন।–-
পাখীদের বাসা আছে, শেয়ালের গর্ত আছে, কিন্তু তোমাদের মাথা গোঁজবার স্থান থাকবে না, কোন কিছুরই সংস্থান থাকবে না। ঈশ্বরের উপর নির্ভর করে নিঃস্ব ও চাহিদাশূণ্য হয়ে তোমরা শুধু মানুষের মঙ্গল করে চলবে, নিজেদের জন্য কোন ভাবনা রাখবে না। ঈশ্বরের দয়ায় যখন যেমন জোটে, তাতেই সন্তুষ্ট থাকবে।
অধ্যাপক ও ফরীশীগণ ব্যভিচারে লিপ্ত এক নারীকে ধরে এনে শ্রীযীশুর কাছে সমর্পণ করে বিচার প্রার্থনা করে বলে, ‘‘হে গুরু এই স্ত্রী লোকটি ব্যভিচার ক্রিয়ায় ধরা পড়েছে। মোশি এমন লোককে পাথর মারার আজ্ঞা দিয়েছেন, আপনার বিচারে কি বলেন।” যীশু নীরব; মাথা নীচু করে কেবল পায়ের আঙ্গুল দিয়ে ভূমিতে কী লিখে চলেছেন। ফরীশীগণ বার-বার জিজ্ঞাসা করায় তিনি মাথা উঁচু করে বললেন, “তোমাদের মধ্যে যে নিষ্পাপ সেই প্রথমে একে পাথর মারুক।”
“He that is without sin among you, let him first cast a stone at her.”
(St John, 8:7.)
তিনি আবার মাথা নীচু করে লিখতে থাকেন ভূমিতে পায়ের আঙ্গুল দিয়ে। কিছুক্ষণ নীরবে গেলে, যীশু মাথা উঁচু করে দেখলেন, স্ত্রীলোকটি ছাড়া আর কেউ নেই। তিনি স্ত্রীলোকটিকে বললেন, “হে নারী তোমার অভিযোগকারীগণ কোথায়, তারা কেহ কি তোমায় দোষী করে নি‍?’’
নারী কহিল—“না প্রভু, কেহ করে নি।” যীশু বললেন, “আমিও তোমাকে দোষী করি না, যাও আর কখনো এ মুহূর্ত হতে কোন রকম পাপ কর্ম করবে না।’’
“Neither do I condemn thee, go, and sin no more.” (St, John.8:11)

ওই মা-টি যীশুর প্রেমের পরশে স্নাত হয়ে সাধ্বী হয়েছিলেন, যাঁর নাম ছিল মেরী ম্যাগডিলিনী । তাঁর প্রেমের পরশে মাছ-ধরা জেলেরা মানুষ-ধরা সাধকে পরিণত হয়েছিলেন।
প্রভু যীশু ব্যভিচারের বিরুদ্ধে, অনাচারের বিরুদ্ধে, পৌত্তিলকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে সবাইকে সনাতনী ঈশ্বরপ্রেমে অভিষিক্ত করতে চাইলেন। তাঁর সত্তাপ্রেমী আবেদন প্রবৃত্তি-প্রেমীদের সহ্য হলো না, ফলস্বরূপ তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ হতে হলো। মানবতার শত্রু হলো জুডাস।
প্রভু যীশুর ক্রুশারোহণের পর সব ভক্তগণ যখন ভয়ে গা ঢাকা দিয়েছিলেন তখন মেরী ম্যাগডিলিনী জীবনের মায়া তুচ্ছ করে প্রভু যীশুর সন্ধানে ঘর ছেড়ে পথে বেড়িয়েছিলেন। পথে-প্রান্তরে, ঝোপে-জঙ্গলে, গুহায়-কন্দরে, পাহাড়ে-পর্বতে, পাথরের কোণে সর্বত্র তাঁকে খুঁজে বেড়িয়েছেন। সেই সন্ত্রাসের রাজ্যে ভক্তদের ভেঙ্গে পড়া মনোবল পুণরায় জাগিয়ে তুলেছিলেন তিনি।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন—যীশুখ্রীষ্টের ভক্তদের মধ্যে মেরী ম্যাগডিলিনির সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। She love Lord for his own sake ( সে প্রভুকে তাঁর জন্যই ভালবাসত)। তার মত unexpectant, selfless love (প্রত্যাশাশূন্য, নিঃস্বার্থ ভালবাসা) আর কারো ছিল কিনা জানি না। আজ ভগবান যীশুর কত ভক্তের কথা শোনা যায়। কত saint (সন্ত)-এর কথা শোনা যায়। কিন্তু আমার মনে হয়, যীশুর অনুরাগীদের মধ্যে সর্ব্বাগ্রে নাম করা উচিত তার। ……. চরম দু:সময়ে যখন কেউ ছিল না যীশুর পাশে, প্রত্যেকে ভয়ে আত্মগোপন ক’রে চলছিল, তখন একমাত্র সে-ই প্রাণের মায়া ত্যাগ ক’রে বেপরোয়া হ’য়ে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়েছিল যীশুর জন্য পাগল হ’য়ে। কেউ-কেউ বলে নাকি—যীশুর প্রতি তার যে ভালবাসা ছিল, তা ছিল lustful (কামনালিপ্সু)। হয়তো তা’ lustful (কামনালিপ্সু)-ই ছিল। কিন্তু সমগ্র সত্তার প্রতিটি অণুপরমাণু দিয়ে অমন ক’রে আর কেউ বোধ হয় যীশুর অস্তিত্ব ও স্বস্তি কামনা করেনি। Her whole soul and entire being was bequeathed to Chirst and that was the holiest of love ( তার সমগ্র আত্মা, সমগ্র সত্তা যীশুকে সমর্পিত হয়েছিল এবং তার প্রেম ছিল পবিত্রতম)। ভালবাসা এমন পবিত্র জিনিস যে তাতে প্রিয়তমের কথা ছাড়া অন্য কোন কথা মনে পড়ে না। “রূপ লাগি
আঁখি ঝুরে, গুনে মন ভোর, প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর”—এমনতর হয়।
অনুরাগের বাতি যার
নয়নকোণে জ্বলেছে,
সে না সর্ব্বস্ব তেয়াগিয়া
গুরুকে সার করেছে।
ম্যাগডিলিনি-এর মধ্যে ছিল এই প্রাণ-উপচান অনুরাগ। আবার ছিল প্রচন্ড নির্ভীকতা ও পরাক্রম। আমি যত ভাবি ততই আমার শ্রদ্ধা হয়। (আ. প্র. ৯/১১. ১১. ১৯৪৭)
যীশুর ক্রুশবিদ্ধের কথা উঠলে, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র করুণ কণ্ঠে ছলছল নেত্রে বললেন, –‘‘সেদিন যেমন যীশু crucified (ক্রুশবিদ্ধ) হয়েছিলেন, আজকের দিনেও সেই যীশু তেমনি করে crucified (ক্রুশবিদ্ধ) হয়ে চলেছেন মানুষের হাতে। এই পাপের নিবৃত্তি না হলে মানুষের নিস্তার নেই। নিস্তারের একমাত্র পথ হলো মূর্ত্ত ত্রাতা যিনি তাঁকে sincerely follow (অকপটভাবে অনুসরণ) করা। তাহলে আমাদের ভুল-ত্রুটিগুলি ধীরে ধীরে শুধরে যাবে। ঠিকপথে চলতে শুরু না করলে, ভুলপথে চলার অভ্যাস আরো মজ্জাগত হবে তার chain reaction (শ্রেণীবদ্ধ প্রতিক্রিয়া) চলতে থাকবে।’’ (আ. প্র. ২৫. ০১. ১৯৪৮)
১৯৪৮ সালের বড়দিনের সকালে হাউজারম্যানদা প্রণাম করে উঠতে-না-উঠতেই শ্রীশ্রীঠাকুর আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললেন—আজকে আমাদের তাঁরই দিন, যিনি দুনিয়ায় এসেছিলেন দুনিয়ার দুঃখ ঘোচাতে—সেই Divine the Great–এর (দিব্য মহাপুরুষের) জন্মদিন—যাঁকে আামরা বিদায় দিয়েছি দুঃখে, কষ্টে, যন্ত্রণায়, অনাদরে, অপঘাতে।
একটু পরে শ্রীশ্রীঠাকুর ইংরাজীতে ঐ ভাব অবলম্বনে বাণী দিলেন—
This day is verily the day of Him Who is ours,
Who came on earth
To remove the misery of the world,
The birthday of that Divine the Great
Whom we have seen off
In sorrows, sufferings, woe and anguish
In uncared negligence
And bleeding tyranny.
বাণীটি বলে শ্রীশ্রীঠাকুর বিষাদগম্ভীর হয়ে গেলেন, তাঁর চোখ দুটি ছলছল।
(আঃ প্রঃ ১৫ খণ্ড, ২৫. ১২. ১৯৪৮)
বিষাদগম্ভীর আমরাও। বড়দিন উদযাপন প্রবৃত্তি পরায়ণতার আনন্দের জোয়ারে ভেসে যাওয়ার দিন নয়। বড়দিনের স্মৃতি স্মরণে রেখে প্রতি দিনগুলি প্রভু যীশুর আদর্শের পরিপূরণকারী বর্তমান পুরুষোত্তমের আদর্শের অনুসরণে আমরা যদি আমাদের ছোট আমি-টাকে বড় করে ব্যাপ্তির লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করি, তাহলে ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্তকরণ, হিংসা, বিবাহ-বিচ্ছেদ, ভ্রষ্টাচার এভাবে ব্যাপ্তি লাভ করতে পারবে না বোধহয়। সবাইকে বাঁচিয়ে নিজেকে বাঁচাবার এই একমাত্র পথ।


।। এত হিংসা কেন ।।

।। এত হিংসা কেন! ।।
নিবেদনে—তপন দাস


অনেকদিন ধরেই চলছে—আন্তর্জাতিক স্তরের ক্ষমতার দম্ভের আগ্রাসন, দুর্বলের প্রতি অত্যাচার, নির্বিচারে হত্যালীলা মানবতাবাদের অপমৃত্যু। নতুন করে ইরান-ইস্রায়েলের দ্বন্দ্বযুদ্ধ—সভ্যতার সঙ্কট!

প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের নব্য স্বাধীনতাকামী সন্ত্রাসীরা ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে হিন্দুদের উপাসনা-স্থলে, বাড়িতে আগুন দিয়ে, লুঠ করে, নারীদের নির্যাতন করে, হত্যা করে যে সন্ত্রাস চালাচ্ছে, আন্তর্জাতিক স্তরে কিছু প্রতিবাদ হলেও প্রতিরোধের সূত্র অধরাই রয়ে গেছে।
আমাদের রাজ্যের ভোট পরবর্তী রাজনৈতিক হিংসা,
নারী-নির্যাতন, মৃত্যু—- কতটা বোধ-বিপর্য্যয় হলে “পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যার” পবিত্র নীতিকে পাশ কাটিয়ে নীতিহীন রাজনীতির ক্ষমতা দখলে রাখার জন্য বিরোধী মতবাদীদের হত্যা পর্যন্ত করতে পারে!
যা’ সংশ্লিষ্ট “সত্যমেব জয়তে” সম্বলিত সীলমোহরের আধিকারিকদের পরিহাস করে যেন বলতে চাইছে, তোমরা কতখানি সৎ তোমাদের বিবেকের কাছে একবার জিগ্যেস করে দেখো তো! !!!!!!!!!!!! ?????????

——আর-জি-কর, পটাশপুর, কুলতলি, কৃষ্ণনগর ইত্যাদি ইত্যাদি…….
টিভির পর্দার মাধ্যমে ওইসব মর্মস্পর্শী বিকৃতকাম, হিংসা, মৃত্যুর ছায়াচিত্র/সংবাদ আমাদের প্রাণে এক বোবা ব্যথা দিয়ে চলেছে, আমরা যারা বর্তমান যুগ-বিধায়ক পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সত্যানুসরণের অনুশাসন— “যতদিন তোমার শরীর ও মনে ব্যথা লাগে, ততদিন তুমি একটি পিপীলিকারও ব্যথা নিরাকরণের দিকে চেষ্টা রেখো, আর তা’ যদি না কর, তবে তোমার চাইতে হীন আর কে?”—পাঠ করি! ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে, বাংলাভাষায় রচিত বিখ্যাত গানের কলি, “মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য” নস্টালজিয়ার সিড়ি বেয়ে যাঁদের স্মৃতি অধিকার করে আছে, সেইসব বুদ্ধিজীবিরা, সমাজ-বিজ্ঞানীরা, কি জবাব দেবেন?

দেশে তো আইনের শাসন রয়েছে, না নেই? যদি থেকেই থাকে, তাহলে প্রতিবাদের নামে স্থানে স্থানে অবরোধ করে, ধর্মীয় অঙ্গন তোড়ফোড়-ভাঙচুর করে, আগুন জ্বালিয়ে, পাথর ছুঁড়ে, মেরেধরে, জনজীবন বিপর্যস্ত করে, জাতীয় সম্পত্তি বিনষ্ট করে, যে তাণ্ডব প্রদর্শন করা হয়ে থাকে তার অনুমোদন কারা দেয়? কোন সংবিধান, কোন নবী, কোন অবতার, কোন পুরুষোত্তম কি এই ধরণের হাঙ্গামা করতে নিদেশ দিয়েছেন? তাহলে
এত হিংসা কেন? প্রতিটি চিন্তাশীল মানুষের মননশীলতায় এই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। ওইসব হিংস্র আততায়ীরা যদি উপযুক্ত শাস্তি না পায় তাহলে অদূর ভবিষ্যতে শান্তি ও স্বস্তির জীবনযাত্রা এভাবে ব্যাহত হতেই থাকবে, মনুষ্যত্বের মূল বুনিয়াদ বিলুপ্ত হতে থাকবে! বুদ্ধিজীবিগণ, সমাজবিজ্ঞানীরা, মনোবিদেরা এর কি ব্যাখ্যা দেবেন জানিনা, তবে যুগত্রাতা বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র হিংসার কারণ প্রসঙ্গে বলছেন, “অহঙ্কার আসক্তি এনে দেয় ; আসক্তি এনে দেয় স্বার্থবুদ্ধি ; স্বার্থবুদ্ধি আনে কাম ; কাম হতেই ক্রোধের উৎপত্তি ; আর, ক্রোধ থেকেই আসে হিংসা।’’ তাহলে বোঝা গেল, হিংসার মূল কারণ অহঙ্কার। অহঙ্কারের উৎপত্তি প্রবৃত্তি-পরায়ণতা থেকে। আর সেই প্রবৃত্তি-পরায়ণতার চালক লোভ, কাম, ক্রোধ, মদ, মোহ ও মাৎসর্য্য নামের ষড়রিপু, দেহরথের ৬টা ঘোড়ার লাগাম, দেহরথের সারথী ইষ্টগুরুর হাতে সঁপে দিতে পারলে একেবারে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। আর সেই ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন দিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। আমি অক্রোধী, আমি অমানী, আমি নিরলস ... ইত্যাদি মন্ত্রে আত্ম নিয়ন্ত্রণ করে, “স্বতঃ-অনুজ্ঞা”-র নিত্য অনুশীলনের বিধানের মাধ্যমে। হিংসাকে প্রতিরোধ করার জন্য এর চাইতে উপযুক্ত কোন নিদান আছে কি-না আমার জানা নেই।

অথচ আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা যুগ-বিধায়কের “প্রাচ্য-প্রতীচ্য নিয়ন্ত্রণে বর্ণাশ্রমানুশাসকম্ আর্য্য চিরায়নম্।” মন্ত্রের অমোঘ বিধানকে পাশ কাটিয়ে হিংসার প্রতিবিধানের জন্য থানা, পুলিশ, মিলিটারী, কোর্ট, সংশোধনাগার প্রভৃতির ব্যবস্থা করেও হিংসা দমন করতে পারছে না। তাই যদি পারত নির্বাচনের ন্যায় একটা সরল প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আমাদের হিংসা এবং হিংসার পরিণতি মৃত্যুর মিছিল দেখতে হতো না। এ কেমন রাজনীতি? ছিঃ!
যুগ-বিধায়ক বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বিধান অনুযায়ী হিংসাকে দূর করতে হলে ভক্তির চাষ দিতে হবে। ভক্তির সংজ্ঞায় তিনি বলছেন, ‘‘সৎ-এ নিরবচ্ছিন্ন সংলগ্ন থাকার চেষ্টাকেই ভক্তি বলে।’’ তাহলে সৎ-এ নিরবচ্ছিন্ন সংলগ্ন থাকার চেষ্টা করার জন্য ভাবী পিতামাতাকে সদগুরুর আদর্শ গ্রহণ করতে হবে। তারপর পরমপিতা প্রদত্ত দিব্য বিবাহ-সংস্কারে সংস্কৃত হয়ে শুদ্ধাত্মাকে আকর্ষণ করে প্রহ্লাদের ন্যায় দিব্য ভক্ত সন্তানের জন্ম দিতে হবে। ভারতের নিজস্ব সংবিধান কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে এর সমর্থন আছে। বর্তমানের চিকিৎসা বিজ্ঞানও এর সমর্থন করেছে। সুস্থ দম্পতির সুস্থ দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে সুস্থ মানবের জন্ম দেওয়ার বিধান দিয়ে। এ ব্যতীত জন্মগত দুরারোগ্য শারিরীক এবং মানসিক ব্যাধি প্রতিরোধের অন্য কোন চিকিৎসা নেই। (Ref. DAVIDSON’S PRACTICE OF MEDICINE/Genetic Factor of Disease)
রাষ্ট্রের অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার বোর্ডের কর্ণধারেরা বিশ্বস্ত, সুস্থ পে-ডিগ্রীড কুকুরের, ঘোড়ার জন্ম নিয়ে গবেষণা করলেও মানুষের বেলায় উদাসীন। একুশ বছরের ছেলে আর আঠারো বছরের মেয়ে হলেই হলো। বংশ, বর্ণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা—কোন কিছুই না দেখে স্পেশ্যাল ম্যারেজ অ্যাক্টের সাহায্যে বিয়ে করতে পারবে, আবার বনিবনা না হলে ডিভোর্সও করতে পারবে! এখন তো আবার বিয়ে না করেও লিভ-টুগেদার আইনের সাহায্যে সন্তানের মা হতে পারা যায়। যার দৃষ্টান্ত লোকসভার সদস্যা নুসরত জাহান। রাষ্ট্রের জন-প্রতিনিধিরা যদি সুস্থ দাম্পত্যের প্রজনন বিজ্ঞানকে অসম্মান করতে পারেন, সেখানে সাধারণ নাগরিকগণ আরো বেশি সুযোগ পেয়ে যাবে লাগামহীন যৌন-জীবন যাপন করার! পরমপিতার অশেষ করুণায় আমাদের গ্রামীন ভারতবর্ষের তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষগুলো এখনো কোন-না-কোনভাবে ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা, পিতামাতায় ভক্তি রেখে বিবাহ সংস্কারের অনুশাসন মেনে চলছে বলে প্রিয়জনের দ্বারা প্রিয়জনদের হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা সমাজে বিস্তার লাভ করতে পারছে না। তবে, রাষ্ট্র ব্যবস্থা যদি এখনই ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুরুত্ব না দেয়, স্বভাববিধ্বংসী প্রতিলোম জাতকদের জন্ম বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাহলে অচিরেই হিংসা আমন্ত্রিত হবে ঘরে ঘরে! হিংসা প্রতিরোধের জন্য যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র একেবারে সমস্যার মূলে হাত দিয়ে বললেন, “ভক্তি এনে দেয় জ্ঞান ; জ্ঞানেই সর্বভূতে আত্মবোধ হয় ; সর্বভূতে আত্মবোধ হলেই আসে অহিংসা ; আর, অহিংসা হতেই প্রেম। তুমি যতটুকু যে-কোন একটির অধিকারী হবে, ততটুকু সমস্তগুলির অধিকারী হবে।’’ একেবারে অঙ্কের হিসেব। আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি-ইচ্ছার ‘ছোট-আমি’-টার অহঙ্কারের লাগামটাকে যদি ভক্তির মুঠো দিয়ে কষে না ধরা যায় তাহলে ধাপে-ধাপে হিংসার আশ্রয়ে পৌঁছে যাবে। যার পরিণতি অস্বাভাবিক মৃত্যু। আর যদি জীবন নামক রথের চালক ছ’-টা ঘোড়ার (ষড়রিপু) লাগাম জীবন-রথের সারথি স্বরূপ ইষ্টগুরুর হাতে সমর্পণ করা যায়, তাহলে, সরল প্রাণ, মধুর বচন, আর বুকভরা প্রেমের ডালি দিয়ে সবাইকে আপন করে নেওয়া যায়। একটা পিপীলিকারও ব্যথা নিরাকরণের জন্য প্রাণ কাঁদে। আবার যে হিংসা মৃত্যুর দ্যোতক তাকে শক্ত হাতে দমন করতে হলে হিংসা দিয়েই করতে হবে। হিংসাকে হিংসা দ্বারা জয় করার নাম অহিংসা। যেমন দুষ্টক্ষত বা গ্যাংগ্রীন থেকে শরীরকে বাঁচাতে হলে আক্রান্ত অংশটিকে কেটে বাদ দিতে হয়। বাদ না দিলে দেহকে বাঁচান যায় না। তেমনি সমাজ রক্ষা, রাষ্ট্র রক্ষা করতে হলে অনুরূপ নীতির অনুসরণ না করতে পারলে সমাজ-রাষ্ট্রের অঙ্গে পচন ধরে যাবে, রাষ্ট্রের সত্তাটাই মারা পড়বে। আর্য্য ভারতের মা কালী শুম্ভ-নিশুম্ভকে, মা দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে, শ্রীরামচন্দ্র রাবনকে বধ করে ওই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। অযথা কাউকে হত্যা করেন নি। অযথা কাউকে হত্যা না করে পার্থসারথি শ্রীকৃষ্ণ মামা কংসের পাঠান অসুর-রাক্ষস নামক সত্তাহিংস জিঘাংসা বৃত্তিধারীদের হত্যা করেছিলেন। অপকৌশলী অসৎ সাম্রাজ্যবাদী কংসকে হত্যা করে, উগ্রসেনকে কারাগার থেকে মুক্ত করে তাঁকে পুণরায় রাজ্যে অভিষিক্ত করেছিলেন। ধর্মপথভ্রষ্ট অসৎ আগ্রাসনী জরাসন্ধকে হত্যা করে জরাসন্ধের পুত্র সহদেবকে রাজ্যে আভিষিক্ত করিয়েছিলেন। সব হিংসার মূল উৎপাটন করে, এক পরম রাষ্ট্রীক সমবায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধ সংগঠিত করে জীবনবাদের জয়গান গেয়েছিলেন। ভবিষ্যত প্রজন্মকে জীবনবাদী হবার জন্য উপহার দিয়ে গেলেন শ্রীমদ্ভবদ্গীতা। আমাদের রাষ্ট্রীয় স্তোস্ত্র “বন্দে মাতরম্” ধ্বনির উৎস শ্রীমদ্ভবদ্গীতা। একদা শ্রীমদ্ভবদ্গীতা গ্রন্থকে আদর্শ মেনে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছিল। সেসব মহান ইতিহাস ভুলে গণতান্ত্রিক পথে রাজনীতি করতে গিয়ে হিংসাশ্রয়ী হয়ে আমরা যদি ভারতমাতার সন্তানদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলি, ভারতমাতা সেই অপমান কতদিন মুখ বুঁজে সহ্য করবেন? আমরা আবার গীতা গ্রন্থের স্রষ্টা পার্থসারথী শ্রীকৃষ্ণের আশ্রয়ে ফিরে যাব। শ্রীকৃষ্ণ পরবর্তী বহির্ভারতের বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীষ্ট, হজরত রসুল প্রমুখ পুরুষোত্তমগণও আর্য্য ভারতীয় ওই শ্বাশ্বত নীতির অনুসরণ করেছেন মানব সভ্যতাকে বাঁচাতে। তাঁরা আগ্রাসন করতে, ধর্মান্তকরণ করতে, অযথা কাউকে হিংসা করতে কোথাও কি বলেছেন? তবে কেন এত হিংসা? কেন এত জিঘাংসা? ওই হিংস্র জিঘাংসাকে যদি কঠোর হাতে দমন করতে এগিয়ে না আসেন জীবনপিয়াসী শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তথা রাষ্ট্র নায়কেরা, তাহলে মানবতার অপমৃত্যুর কালো ছায়া মানব সভ্যতার অঙ্গে ক্রমে ক্রমে গ্যাংগ্রীন উৎপাদন করবে নিকট ভবিষ্যতে। অসৎ নিরোধে তৎপর না হয়ে, অসৎকে প্রশ্রয় দিয়ে রাষ্ট্রের পবিত্র মন্ত্র “সত্যমেব জয়তে” সম্বলিত সীলমোহরের আধিকারিক হওয়াটা যেমন ভণ্ডামি, তেমনই অসৎ নিরোধে উদাসীন থেকে সৎসঙ্গী সেজে ভক্ত হওয়াটাও কিন্তু ভণ্ডামী! সকলের কথা বলতে পারব না, সেই দিক দিয়ে বিচার করতে গেলে আমি নিজে কিন্তু ভণ্ড। ভক্ত হতে গেলে ঠাকুরত্বকে জাগাতে হবে চরিত্রে। সেটা যখন জাগাতে ব্যর্থ হয়েছি, তাহলে আমি ভণ্ড ছাড়া আর কি! তাই ভণ্ডামি ত্যাগ করে আমাকেও গুটি কেটে খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে পড়তে হবে, পরিস্থিতিকে সামাল দিতে। পরিস্থিতিকে এড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারব না।

ইষ্টভরণ, পিতৃপোষণ
পরিস্থিতির উন্নয়ন,
এ না ক’রে যাই করিস্ না
অধঃপাতেই তোর চলন। ২ ।
(অনুশ্রুতি, ১ম খণ্ড)
ইষ্টপ্রোক্ত উদ্ধৃত বাণীর অধঃপতন থেকে ব্যক্তিসত্তাকে, সংঘ-সত্তাকে বাঁচাতে হলে অসৎ-নিরোধে তৎপর হতেই হবে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র “ব্যক্তি-দম্পতি-গৃহ-সমাজ-রাষ্ট্র উদ্ধার”-কল্পে, যজন-যাজন-ইষ্টভৃতি-স্বস্ত্যয়ণী প্রবর্তন করছেন। সেকথা বিস্মরণ হলে ইষ্টাদর্শের অপলাপ করা হবে। জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!