আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের শ্রদ্ধার্ঘ্য

** ভাষা দিবসের শ্রদ্ধার্ঘ্য **
।। সত্তাপোষণী ভাষায় সাহিত্য নির্মাণে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্য অবদান ।।


সত্তাপোষণী ভাষায় সাহিত্য নির্মাণে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র যে বিশিষ্ট অবদান রেখে গেছেন মানব সভ্যতাকে সবদিক দিয়ে সমৃদ্ধ করতে, তার কিছু দৃষ্টান্ত উপহার স্বরূপ তুলে ধরছি।
‘‘ভাব, ভাষা, যুক্তি,
ছন্দ ও অনুরণন
যতই সৌষ্ঠবমণ্ডিত হ’য়ে
আদর্শ-উল্লোল হ’য়ে ওঠে—
জীবনীয় সাত্তিক সম্বর্দ্ধনায়,—
রচনা জীবন্ত হ’য়ে ওঠে সেখানে তেমনি,
এই হলো রচনার পঞ্চপ্রাণ।’’ ২৩৯ (শিক্ষা-বিধায়না)
‘‘সমস্ত রসের সমবায়ে
সন্দীপনার বোধ-পরিবেষণী
সাত্বত সম্বেদনাই হ’চ্ছে
সাহিত্যের প্রাণনদীপ্তি।’’ ২৪০ (শিক্ষা-বিধায়না)
‘‘পরিস্থিতির ভাল-মন্দ পরিচলনকে
আলোড়ন-বিলোড়ন ক’রে
সার্থক সঙ্গতিশীল সাত্বত পন্থায়
সাত্তিক মর্যাদায়
সুদীপ্ত ক’রে তোলাই হ’চ্ছে
সাহিত্যের সমীচীন তাৎপর্য,
আর তাই-ই হচ্ছে
জনগণের জীবনীয় সম্বর্দ্ধনা।’’ ২৪১ (শিক্ষা-বিধায়না)

অনুশ্রুতি ১ম খণ্ড থেকে —
আদব-ভরা ফুল্লবাণী
আশার পিনাক হাতে,
প্রাপ্তিটাকে আনবি ডেকে
তপের আলোকপাতে। ৭৮। (সাধনা)

মান-গরবে অহংবশে
ধরলি রে ধাঁজ বেকুব চতুর,
চলনে তোর দিগ্গ্জী ভাঁজ
দেখতে যেন ক্ষিপ্ত কুকুর। ১২২। (বৃত্তিধর্ম)

পথ ভেবেই তুই শ্রান্তিভরে
ক্ষান্ত হ’য়ে যাসনে দমে,
মানুষ কি রে চলতে পারে
না ক’রে ভর স্ব-উদ্যমে ? ২৬ । (বৃত্তি নিয়ন্ত্রণ)

শঙ্খ ফুঁকে অমর হাঁকে
উচ্চরোলে পুরুষ-বুক,
তাথৈ থিয়ায় নাচাও নারী
বর্মে ঢেকে মৃত্যুমুখ। ৮৭। (পুরুষ ও নারী)

সব দিতে তুই করলি গুরু
পেতে পরিত্রাণ,
দিলি কিন্তু নব ঘণ্টা
নিতেই লেলিহান! ৪৩। (কপট টান)

বাসতে ভাল এসে রে তুই
বাসলি ভাল কা’রে,
প্রতিদানেও তাই পাবি তুই
মজলি নিয়ে যা’রে। ৭৫। (কপট টান)

এমন অসংখ্য ঋদ্ধ-বাণীতে সমৃদ্ধ রচনা পাঠ করে তাঁকে কবি, ছান্দসিক, সাহিত্যিক, সাহিত্যদ্রষ্টা ঋষি বললেও বোধহয় অত্যুক্তি হবে না।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সব ঝড়ঝঞ্ঝা থেকে মানব সভ্যতাকে আগলে রাখতে ওজস্বী ভাষায় ‘দেবভিক্ষা’ শিরোনামে যে কাতর আবেদন রেখেছিলেন, সে আবেদনের, সে ভাষার, মর্যাদা যদি পেত, বিশেষ করে সাহিত্যিকগণ যদি তাদের গুটি কেটে বেরিয়ে এসে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করতেন, তাহলে অবক্ষয়ের রাশ কিছুটা হলেও টেনে ধরা যেত।

।। দেবভিক্ষা ।।
‘‘ওগো ভিক্ষা দাও!–
ঝাঁঝাল ঝঞ্ঝার পিশাচী জৃম্ভন শুরু হয়েছে,
বাতুল ঘুর্ণি বেভুল স্বার্থে
কলঙ্ক কুটিল ব্যবচ্ছেদ
সৃষ্টি করতে আরম্ভ করে দিয়েছে,
প্রেত-কবন্ধ-কলুষ
কৃষ্টিকে বেতাল আক্রমণে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে,
অবদলিত কৃষ্টি অজচ্ছল অশ্রুপাতে
ভিক্ষুকের মতো তাঁরই সন্তানের দ্বারে
নিরর্থক রোদনে রুদ্যমান,
অলক্ষ্মী-অবশ প্রবৃত্তি-শাসিত বেদস্মৃতি–
ঐ দেখ–মর্মান্তিকভাবে নিষ্পেষিত,
ত্রস্ত দোধুক্ষিত দেবতা আজ নতজানু–তোমাদেরই দ্বারে
তোমাদেরই প্রাণের জন্য তোমাদেরই প্রাণভিক্ষায়
তোমাদেরই সত্তার সম্বর্দ্ধনার জন্য
ব্যাকুল হয়ে ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়াচ্ছেন ;
কে আছ এমন দরদী আর্য্য-আত্মজ সন্তান!–
তাঁকে মানুষ ভিক্ষা দেবে, তাঁকে অর্থ ভিক্ষা দেবে—
সব হৃদয়ের সবটুকু উৎসর্গ করে
তোমাদেরই জন্য
সেই দেবোজ্জল প্রচেষ্টাকে সার্থক করে তুলতে ?
যদি থাক কেউ
ওগো ধী-ধুরন্ধর উৎসর্গপ্রাণ
নিরাশী নির্ম্মম!
এস,—উৎসর্গ কর—আত্মাহুতি দাও—
জীবন নিঙড়ানো যা-কিছু সঙ্গতি
তাঁকে দিয়ে সার্থক হয়ে ওঠ,
নিজেকে বাঁচাও, মানুষকে বাঁচাও, কৃষ্টিকে বাঁচাও ;
আর, বাঁচাও দুর্দ্দশাদলিত মহা-ঐশ্বর্য্যশালিনী
আর্য্যস্তন্যদায়িনী, পরম-পবিত্রা
ভিখারিণী মাতা ভারতবর্ষকে,
ধন্য হও, নন্দিত হও,
ঈশ্বরের অজচ্ছল আশীর্ব্বাদকে
মাথা পেতে লও,
শান্ত হও, শান্তি দাও,
অস্তি ও অভ্যুত্থানকে
অনন্তের পথে অবাধ করে রাখ ;

স্বস্তি! স্বস্তি! স্বস্তি!

এবার আমি সাহিত্যের উৎস বিষয়ে বলা শ্রীশ্রীঠাকুরের কিছু রচনার উপর আলোকপাত করার চেষ্টা করব।--- সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী পরমপিতা এক থেকে বহুতে পরিণত হবার প্রাক্কালে যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনাহত-নাদ উৎপন্ন হয়েছিল, সেই আদিধ্বনিস্পন্দিত শব্দ বা ধ্বনি বা পরাবাক্ ওঁ সব সৃষ্টির আদি উৎস। "ব্যাপ্ত প্রাক, প্রথম বাক্।" পুণ্যপুঁথিতে বর্ণিত শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাষায় ‘‘এক বিরাট ধ্বনি সোঽহং পুরুষ ভেদ করে সৃষ্টি করতে চলে এল---সেই ওম্।’’

আবার অনুশ্রুতি গ্রন্থে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন—
‘‘স্পন্দন়টার সংবেদনা
যেমনতর যেথায় হয়,
শব্দটাও তো মূর্ত্তি নিয়ে
বিশেষ হয়ে তাতেই রয়।’’ এই নিয়মনা বা বিধির মধ্য দিয়েই সৃষ্টি হয়েছে সব ভাষার।

শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাষায়— ‘‘ভাষা তার /পরিস্থিতি ও পরিবেশ অনুগ/ব্যক্তির ভাব-সন্দীপনী ব্যক্ত বিবর্তন/ছাড়া আর কিছুই নয়কো।’’ (শিক্ষা-বিধায়না, ১১৮)

এই বিবর্তন পরিলক্ষিত হয় রামায়ণ রচনার প্রেক্ষাপটে।
যেমন, রাম-নামের নাদ-সাধন করে রত্নাকর দস্যু মেধানাড়ীকে জাগ্রত করে হয়েছিলেন বাল্মীকি। একদা তমসা নদী থেকে স্নান করে ফিরছিলেন। এক তরুশাখে ক্রৌঞ্চ-জুটি পরস্পর খেলছিল। এক ব্যাধ পুরুষ পাখিটিকে তীর মেরে হত্যা করলে স্ত্রী পাখিটি করুণ বিলাপ করতে থাকে। বাল্মীকি বিচলিত হয়ে ‘কোনদিন প্রতিষ্ঠা পাবে না’ বলে ব্যাধকে অভিসম্পাত করেন। সেই অভিশাপ বাণী স্বতঃস্ফূর্ত শ্লোকবদ্ধ হয়ে নির্গত হয়েছিল :— সৃষ্টি করেছিলেন দেব-ভাষার আদি শ্লোক— ‘‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতী সমাঃ/যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকম্ অবধী কামমোহিতম্।’’ অতএব, বলা চলে, নাদরূপী বা শব্দরূপী ব্রহ্ম থেকেই ভাষার সৃষ্টি।
সেই ভাষার সমন্বয়ের রচনা যখন সত্তাপোষণী রূপে জগতের হিতসাধনে ব্রতী হয়, তখনই সৃষ্টি হয় সাহিত্যের। শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর শ্রীমুখ নিঃসৃত ভাষায় চলার সাথী গ্রন্থে বলছেন—‘‘যার আলোচনায় মানুষ হিতে অধিষ্ঠিত বা উন্নীত হতে পারে, তাই যে সাহিত্য।’’
শিক্ষা-বিধায়না গ্রন্থের ২৪৫ সংখ্যক বাণীতে বলছেন, ‘‘ঈশ্বরই সুসঙ্গত, সর্ববিভান্বিত/ সুসমাবিষ্ট, প্রাজ্ঞ জীবন-সাহিত্য,/ তাই তিনি রসো বৈ সঃ।’’
তাইতো, যুগের প্রয়োজনে, ঈশ্বর, অবতার-বরিষ্ঠরূপে নরবপু ধারণ করেন। হিতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে সৃষ্ট হয় নব-নব সাহিত্য। বেদ-বেদান্ত, রামায়ণ, গীতা, ত্রিপিটক, বাইবেল, কোর-আন্, চৈতন্য-ভাগবত, চৈতন্য চরিতামৃত, রামকৃষ্ণ কথামৃত ইত্যাদি নামে সংকলিত এবং লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাহিত্যিকদের যে-সব জীবন-সাহিত্যের সাথে আমরা পরিচিত হয়েছি, সেই সব সাহিত্যের প্রকৃত মূল্যায়ন করে অনেক ভুল শুধরে দিয়েছেন, জীবনীয় উদ্ধৃতিগুলো নানাভাবে জনমানসে তুলে ধরে জীবন-সাহিত্যের রূপ দান করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর। যার মাধ্যমে অবতারবরিষ্ঠ পরম্পরাকে, ঋষিবাদকে, জীবনবাদী সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। তাঁর শ্রীহস্ত লিখিত রচনা, স্মৃতি-বাণী, শ্রুতি বাণীসমূহ এক অভিনব বর্ণ-বিন্যাসে, শব্দ-বিন্যাসে, ব্যাকরণ-বিন্যাসে, পংক্তি-বিন্যাসে, ভাব-বিন্যাসে সমৃদ্ধ হয়ে সৃষ্টি করেছে এক সুসমাবিষ্ট, প্রাজ্ঞ জীবন-সাহিত্যের সম্ভার। তাঁর বাণী সাহিত্যে আমরা অনেক নবীন মৌলিক ভাষার সন্ধান পেয়েছি এবং আরও পেতে পারতাম যদি বর্তমানের ন্যায় দর্শ-শ্রুতি বৈদ্যুতিন মাধ্যমের সাহায্য পাওয়া যেত। যার অভাবে মহাসমাধির ভাববাণীর সময় প্রোক্ত অনেক বিদেশী ভাষাকে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তথাপি তাঁর সৃষ্ট বাণীসাহিত্যে সংস্কৃত, বাংলা, ইংরেজী ভাষার যে অনবদ্য প্রয়োগের সাথে আমরা পরিচিত হতে পেরেছি, তা’ সমৃদ্ধ করেছে মানবজীবনের একান্ত প্রয়োজনীয় প্রতিটি আঙ্গিককে। উপাসনা, সাধনা, লোক-ব্যবহার, দর্শন, কৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, বিজ্ঞান, পরিবেশ-পরিচর্যা, বাণিজ্য, সমাজ, সমাজ-সংস্কার, দশবিধ-সংস্কার, বিবাহ, প্রজনন, রাষ্ট্র, পরমরাষ্ট্রিক সমবায়, ইত্যাদি সব কিছুই স্থান পেয়েছে তাঁর রচনায়। ওইসব বিধিবদ্ধ অনুশাসনগুলো জীবনকে জীবনীয়ভাবে উপভোগ করার রসদে পরিপূর্ণ। যা' আমাদের জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক সকল অভাবকে তাড়িয়ে দেবার ব্যবস্থা করে জীবনকে পূর্ণতার আস্বাদে ভরিয়ে দিতে এক নিশ্চিত নির্ভরশীল দিগদর্শন। সেই পূর্ণতার আস্বাদের স্বাদের নেশা ধরাতে,--- তাঁর সুললিত ভাষার বাণী-সাহিত্যের সাথে জগদ্বাসীকে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য শত বাধা-বিপত্তি, অভাব-অনটনকে অতিক্রম করে শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর ভক্তদের কাছ থেকে কাগজ ভিক্ষা করেছেন, টাকা ভিক্ষা করেছেন পত্র-পত্রিকা মাধ্যমে এবং পুস্তকাকারে তাঁর বাণীগুলোকে সুলভ মূল্যে পৌঁছে দেবার মানসে। শুধু তাই নয়, তিনি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের জন্যও জনে জনে বলেছেন। অনেক আত্মোৎসর্গকৃত ভক্ত ও প্রতিষ্ঠান পত্র-পত্রিকা, সাময়িকী, পুস্তক-পুস্তিকা তাঁর বলা কথাগুলো অবিকৃতভাবে প্রকাশ করে তাঁর চাহিদা পূরণ করেছেন এবং এখনো করে চলেছেন। তাঁদের উদ্দেশ্যে প্রণাম নিবেদন করেই বলতে হয়, তাঁর সব চাহিদা পূরণের লক্ষ্যমাত্রাকে এখনো ছুঁতে পারিনি আমরা। গড়ে তুলতে পারিনি জীবনবাদী সত্তাপিয়াসী পাঠকসমাজ। একথা ঠিক যে, সাধারণ মানুষেরা অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে, প্রকৃত জীবনবাদী সাহিত্যের আস্বাদ নিতে, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দেবভাষার দেবসাহিত্য চর্চায় একদিন না একদিন এগিয়ে আসবেই। সেই শুভাগমনকে ত্বরান্বিত করতে, তাঁর বাণী-সাহিত্যকে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক, বার্ষিক পত্র-পত্রিকা মাধ্যমে উপঢৌকন রূপে সাজিয়ে তো রাখতে হবে, না কি ? ক্ষুদ্র আত্মস্বার্থ প্রতিষ্ঠাকে উপেক্ষা করে যদি দীক্ষাকালীন প্রতিজ্ঞা পূরণের শপথ স্মরণ করে ইষ্টস্বার্থ প্রতিষ্ঠায় আমাদের ইচ্ছাটাকে বিনিয়োগ করতে পারি, তবে---হবে, হবে, হবেই জয়। হাসি ফুটবে তাঁর মুখে। অন্তর্যামী পরমপিতার পরম করুণার প্রস্রবনের অমৃত ধারায় স্নাত হয়ে ভাল থাকবেন।

‘বিধি-বিন্যাস’ গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত পরমপিতার স্তবগাঁথা দিয়ে ইতি টানলাম।
“হে পূণ্য! পরাক্রান্ত! পরাৎপর!
প্রচণ্ড মার্ত্তণ্ডবরেণ্য!
এক! অদ্বিতীয়!
তোমারই বিনিষ্কাষিত কিরণবীচি
তাপন প্রতিক্রিয়ায়
অযুত জ্যোতিষ্কের সৃষ্টি করেছে;
বৈধী মিতিচলনে চলেছে তা’রা
তোমারই প্রাণদ গতিপথে
বোধি-বিজৃম্ভী বিসৃষ্ট পরাক্রমে
সৃজন-সম্বেগে–
দৃপ্ত জীবনের অদম্য আবেগে,–
নভোমণ্ডলে সজ্জিত স্থালীর স্থল-সর্জ্জনে
দ্যৌঃ ও পৃথিবীর জীবন-দীপালি
সজ্জিত করে নাদ নিক্কণে —
অভ্যুদয়ী, আরুদ্র পরিক্রমায়;–
তোমাতেই আমার অযুত নমস্কার!”
—বন্দে পুরুষোত্তমম্ ! জয়গুরু ! প্রণাম !

EDUCATION

EDUCATION :
By the WORLD teacher of mankind Shree Shree Thakur Anukulchandra
EDUCATION IN TRUE SENSE
“Education in its true sense
creates adjustment of
intra-cellular substance
through proper exercise;
intelligence and character evolve
and with due marital combination,
progeny improves.” EDUCATION IS TO KNOW EXISTENCE

“Education
is to know existence
in consonant contrast
to environment
by doing and discerning.” READ man AND KNOW

“Read man and know
and drive your knowledge
to his welfare.”

METHOD OF IMPARTING EDUCATION
“Let the method
and device of your
process of imparting education
be according to the
dealings and characteristics
of your students
and let the way
of laying it down
before them
be tactful, sweet
and touching
by which
the characteristic interest
of your pupil
becomes glaring
and they become interested
and adjusted
in your mission of training
with jolly propitious propagation;
thus rouse their interest
towards your mode of delivery
and attributes of teaching
that inspire their awe and regard
for your personality;
and infuse your
affectionate dealings
into their mind.” NURTURE THY PUPIL

“Do nurture thy pupil
with delighting educative talks,
and want something form him
from time to time
without any selfish loll
by which he can feel exalted,
and often
express to him thy bidding wishes
to perform something
at thy or others necessity
with enlightening encouragement
and with every pious aptitude
which helps his educative
active urge;
this elating active attitude
will make him
inquisitive with active ardour,
and he will try to be active
with elevating valorous admiration;
thus he will gradually
gain experience
with intelligent go of life.”

“Systematic organisation of habits and instinct, for the purpose of fulfilling, the becoming of life, by a graduated active manipulation of behaviour, may be called education.”
(জীবন বিকাশের উদ্দেশ্যে নিজ আচরণসমূহকে সহজাত সংস্কার ও স্বীয় অভ্যাসগুলোর সাথে সুব্যবস্থিত ও সুগঠিত করে তোলার নাম শিক্ষা ।)

“Adherence to and admiration for the teacher is the key in education process.
Education means conduct, behaviour and character. It neither lies in books nor is created in school campus. It sprouts through affectionate service to Acharya possessing integrity.”
(Alo. Pra. Vol. 8/18.5.46)
“Mere literated learning is not education ;
trained habits which induce intelligence with every consistency and make the system habituated accordingly is education.”
(The Message, Vol. VIII/62)
“If there is an inventive and research attitude in learning process, then the learning does not become taxing.
Similarly, if you try to teach others, then your own understanding become clearer.
Wherever there is a possibility to forget, then its needs to be repeated, and recapitulated.”
(The Message, Vol. VIII/57)
‘VEDA’ AND ‘BODHA’
To know
is to know a thing
in contrast with others
with its constituents, construction
and action and reaction—
not only part
but as a whole—
and to apply it
accordingly
to many things
by which
it is conditioned,
acted on
and reacts
according to its
elementary constitution;
thus,
knowledge grows
both analytically and synthetically
with its attribute and action
wholly and partly;
this kind of knowledge
is known as ‘Veda’
thus,
‘Veda’ means knowledge
—to feel and to know
With all thoroughness;
‘Veda’ and ‘Bodha’ mean
To know and to feel.”
EDUCATION WITHOUT CHARACTER

“Where education
does not collaborate
with character and conduct,
it is merely
an induction
of knowledge
without an all-round association
with facts
that make
the personality
of our inner being
grow,
effulging
into peaceful fellow-feeling
with sympathetic service
to one’s existential uphill
momentum.” BE POSITIVE

“See an affair positively
think it with all positive essence,
discern and adjust it
with its connoting meaning
and keep the negative
adjusted with its negative spirit;
serve analytically
and synthetically
and raise from it
the positive essence
of existential go
by which it is maintained
and becomes proptitious to you
and others too;
so, see with every positiveness,
think with every positiveness,
speak with every positiveness,
do with every positive uphill go
and keep the negative
as a negation of positiveness,
thus be wise positively.” HABIT IS TO 'HAVE IT'

“Go on
with your habits
until you ‘have it’—
the existential go.” EGO OF KNOWLEDGE

“Ego of knowledge
without practical experience
is a debilitated downfall
of learning.”
LEARN FROM VARIOUS ASPECTS
“Learn
through enjoyment
learn
through exercise
with every interest
and keen observation;
learn
through fear
observing all the affairs
with interest
which make your existence
shaking;
learn
from devout urge
on which you can stand
all through
in an unshaken condition,
laying out
all intelligent tactics
and desisting from all evils;
learn
from foe
how to combat,
how to deal with him
intelligently
and how to make him appeased
without any suffering;
learn
from beauty
which makes your heart
flourish to bloom
with all attitude and action
how it makes you so
and all thoughts
that follow accordingly
occur
thus,
make yourself
all-round in experience
which comes out
through
your keen observation
and active energetic urge;
remember however,
while doing any work,
you have to perform it
without forgetting anything
with all beauty,
in good time
and temper.”

Valentine’s Special

*** VALENTINE SPECIAL ****
।। ‘প্রেম’ ব্যাপারটা কি ।।


চারিদিকে এত হিংসার ছড়াছড়ি, তারমধ্যে প্রেমের বার্তা! উঃহ্! ভাবলেই শিহরণ জাগে! সেই কবে স্বামী বিবেকানন্দ জীবে প্রেম করার কথা বলেছিলেন, তার-ই কি প্রতিফলন এই প্রেম দিবস! বাস্তব কিন্তু অন্য সুরে বাজছে। টিভিতে সংবাদ দেখতে গেলেই বেশিরভাগই হিংসার সংবাদ দেখতে পাওয়া যায়। রাজনৈতিক নেতারা, যারা নিজেদের দেশসেবক ভাবেন, তারাও সেবার নামে হিংসার চাষ করে চলেছেন। তাহলে এত হিংসা কেন? হিংসার কারণ সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন,
“অহঙ্কার আসক্তি এনে দেয় ; আসক্তি এনে দেয় স্বার্থবুদ্ধি ; স্বার্থবুদ্ধি আনে কাম; কাম হতেই ক্রোধের উৎপত্তি; আর, ক্রোধ থেকেই আসে হিংসা।” হিংসার বিপরীতে প্রেমের অধিষ্ঠান। অতএব হিংসা ভুলে যা’রা প্রেম নিয়ে চর্চা করছেন, প্রেম দিবস পালন করছেন, তাদের শ্রদ্ধা জানাতেই হয়। সেই প্রেমের উৎস সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলছেন, “ভক্তি এনে দেয় জ্ঞান; জ্ঞানেই সৰ্ব্বভূতে আত্মবােধ হয় ; সর্বভূতে আত্মবােধ হলেই আসে অহিংসা; আর, অহিংসা হতেই প্রেম। তুমি যতটুকু যে-কোন একটির অধিকারী হবে, ততটুকু সমস্তগুলির অধিকারী হবে।”
কিন্তু বাস্তবে, ভারতীয় সংস্কৃতির শব্দ-ভাণ্ডারের ‘প্রেম’ শব্দটিকে বোধহয় সবচাইতে বেশি অপমানিত হতে হচ্ছে অপব্যবহারের জন্য। বহুল ব্যবহৃত ওই শব্দটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারী-পুরুষের যৌন আকর্ষণের পরিচয়-জ্ঞাপক। শিক্ষাঙ্গনে, টিভি-সিনেমা কালচারে, সাহিত্যে ‘প্রেম’ শব্দটি ‘love’-এর পরিবর্তে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ‘lust’ পরিচয় বহন করে চলেছে। এটা সভ্যতার পক্ষে গৌরবের নয়। প্রীতি বিতরণ, প্রীতি উৎপাদন করে যা’ তাই প্রেম। জীবনকে প্রীত করে যে সম্পর্ক, তাকে বলা চলে প্রেমের সম্পর্ক। চৈতন্য মহাপ্রভু প্রেমকে পুরুষার্থের পঞ্চমবর্গ রূপে অভিহিত করেছেন।
আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা তারে বলি কাম।
কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা ধরে প্রেম নাম।।
বিবেকানন্দও জীবের প্রতি প্রীতিজনক আচরণকে প্রেম আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’ আজ সর্বজনবিদিত। লেখাপড়া জানা মানুষ যখন বলে, ‘প্রেম করে বিয়ে করে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল।’—তখন কি প্রেম বিচ্ছেদের প্রতীক স্বরূপ চিহ্নিত হয়ে গেল না! প্রেম করে বিয়ে করার পর স্বামী-স্ত্রী ডিভোর্স নিয়ে আলাদা হবে। সন্তান বঞ্চিত হবে মা-বাবার প্রেম থেকে। সন্তানের প্রেমে বঞ্চিত হয়ে বৃদ্ধাশ্রমে মা-বাবা অশ্রুপাত করবে। আর আমরা প্রচার মাধ্যমে সেক্সি সেলিব্রিটিদের দিয়ে ‘বিশ্ব প্রেমদিবস’ উদযাপন করব সাড়ম্বরে, ওদিকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ নিপাত যাক’ শ্লোগানে পার্টি-রাজনীতি হবে সমৃদ্ধ! বাঃ! বাঃ! ‘সত্য সেলুকস, কি বিচিত্র এই দেশ!’
যাকগে, আমাদের আদর্শ পুরুষ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, শুধুমাত্র মানুষের নয়, একটা পিঁপড়ারও ব্যথা নিরাকরণ করে প্রেমের প্রদর্শন করতে বলেছেন। আর তা’ যদি না করি, তাহলে আমার চাইতে হীন আর কেউ নেই! এমন প্রেমের জয়গান গাইতে হবে আমাদের। সবাইকে জয়গুরু ও প্রণাম।
বন্দে পুরুষোত্তমম্!

প্রেমের কথা

।। প্রেম কারে কয়? ।।
তথাকথিত শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের মুখে শোনা, প্রপোজ, ব্রেকআপ, ডেটিং, প্রাক্তন-প্রাক্তনী প্রভৃতি উপনামের শাখা-প্রশাখার সাথে সম্পৃক্ত “প্রেম”কে খুঁজতে গিয়ে বেশ ধন্ধে পড়ে গেছি! আসল প্রেম কারে কয়?
পাড়ায়, কলেজে, অফিসে, টিভিতে, সিনেমায়, ‘প্রেম’ শব্দটি বহুল উচ্চারিত এবং বহুচর্চিত । কিন্তু বাস্তবে আমরা প্রেমের বিপরীতে অবস্থান ‘হিংসা’ শব্দটি নিয়ে জেরবার । হিংসা দূর করে মানুষের মধ্যে প্রেম প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে সব সুস্থ চিন্তাশীল প্রতিষ্ঠান । তবুও হিংসা ! গৃহে, সমাজে, রাষ্ট্রে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রে হিংসার বাড়বাড়ন্ত ! ব্যাপারটা কি ? প্রেমের সাপোর্টার বেশি থাকা সত্বেও কেন এত হিংসা ?
এর উত্তর যা পেয়েছি তাই আপনাদের উদ্দেশ্য নিবেদন করলাম । স্বামী বিবেকানন্দের বিখ্যাত বাণী “জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।” এর মানে বুঝতে কোন অভিধানের সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তথাপি বাংলাদেশের বর্তমান ইসলামপ্রেমী শাসকগোষ্ঠীকে এই প্রেমের সিলেবাস কিছুতেই বোঝান যাচ্ছে না।—এতখানি বোধ-বিপর্যয়ে আক্রান্ত ওরা!তবে বোধদীপ্ত মানবের সোজাসাপ্টা বোধে ঈশ্বর সান্নিধ্য লাভ করতে হলে সকল জীবনের স্পন্দনকে আপন করে নিয়ে প্রেমের বাঁধনে বাঁধতে হবে। অবতার বরিষ্ঠ চৈতন্যদেব বললেনঃ আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা তারে বলে কাম । কৃষ্ণেন্দ্রিয়ে প্রীতি ইচ্ছা ধরে প্রেম নাম। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন,
“কামের মূলে অহংকার, আর প্রেমের মূলে ভক্তি ।”
অহংকার<আসক্তি<স্বার্থবুদ্ধি<কাম<ক্রোধ<হিংসা ।
ভক্তি<জ্ঞান । জ্ঞানে সর্বভূতে আত্মবোধ হয় । <অহিংসা<প্রেম । ঠাকুরের দেওয়া ওই অভ্রান্ত ফরমূলা অনুযায়ী আমরা যদি আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছার মূল ‘অহংকারের’ সাধনা করতে শুরু করি, লাভ হবে হিংসা । আর যদি কোনওভাবে ভক্তির সাধনার সিঁড়িতে পা রাখতে পারি, লাভ হবে প্রেম ।
অবশ্য ভক্তিকে সাধনা করতে হলে সদগুরুতে নিরবচ্ছিন্ন সংযুক্ত থাকতে হবে, তাহলেই প্রেম করতে পারব । নচেৎ, “প্রেম (কামাসক্ত) করে বিয়ে করে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।” —ইত্যাদি ধ‍রণের নির্বোধী বাক্যের অপপ্রয়োগ চলতেই থাকবে।

।। সরস্বতী পূজার শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।

।। প্রসঙ্গ : দেবী সরস্বতী, বিদ্যা, পূজা ও আমরা ।।
নিবেদনে—তপন দাস


অবক্ষয় আমাদের দরজায় যতই কড়া নাড়াক না কেন লর্ড মেকলে সাহেবের দাক্ষিণ্যের দৌলতে আমাদের সমাজে শিক্ষিত হবার প্রবণতার হার কিন্তু ক্রমশঃ বর্দ্ধমান। মুখে বুলি ফুটতে না ফুটতেই সন্তান-সন্ততিদের লেখাপড়া শেখাতে এতটুকু কার্পণ্য করি না আমরা। এ বিষয়ে বাবাদের চাইতে মায়েদের আগ্রহ একটু বেশীই। লেখাপড়া শেখাতে স্কুলে ভর্তি করে, একাধিক প্রাইভেট টিউটর রাখে, পাশাপাশি হোম-ওয়ার্ক না করতে পারলে ‘মাথা ফাটিয়ে ঘিলু বার করে দেব, মেরে ফেলব, কেটে ফেলব’ ইত্যাদি বিশেষণের শাসনবাক্যে যুগধর্মের শিক্ষায় সন্তানদের শিক্ষিত করতে মায়েরা যেভাবে পরিশ্রম করে চলেছেন তার তুলনা হয় না! লেখাপড়া মানেই বিদ্যার্জন করা। বিদ্যার্জন করতে স্কুল, টিচার, বই-খাতা-কলম ইত্যাদি আনুসঙ্গিকের পাশাপাশি বিদ্যাদেবীর আরাধনাটাও আবশ্যিক! তাই উত্তরায়ন-সংক্রান্তি পরবর্তী শুক্লা-পঞ্চমী বা শ্রীপঞ্চমী তিথিকে কেন্দ্র করে ঘরে-ঘরে, বিদ্যালয়ে-বিদ্যালয়ে, পাড়ার ক্লাবে, রাস্তাঘাটে সরস্বতী পুজোর সাড়া পড়ে যায়। এমনিতে একটু বেলা পর্যন্ত শুয়ে থাকা পড়ুয়ারাও সেদিন সকাল-সকাল উঠে নিম-হলুদ মেখে স্নান সেরে নেয়। (নিম-হলুদ মাখলে শরীরের রোগ-প্রতিরোধী শক্তি বৃদ্ধি পায়।) তারপর সেজেগুজে যে-যেখানে সুবিধা পায় আগেভাগে অঞ্জলি দেবার কাজটা সেরে নিতে বিদ্যাদাত্রী সরস্বতীর প্রতিকৃতির সামনে কঠিন বিষয়ের বইপত্রগুলো জমা দিয়ে অপেক্ষায় থাকে কতক্ষণে পুরুতঠাকুর অঞ্জলি দেবার জন্য ডাকবেন। অঞ্জলি দেওয়া শেষ করে সরস্বতী-ঠাকুরের কাছে পাশ করার আর্জিটা জানিয়ে, প্রসাদ খেয়ে পুজোর মুখ্যপর্বটা শেষ করে গৌণপর্বে প্রবেশ করে। কচিকাচারা পরিজনদের হাতধরা হয়ে, কিশোর-কিশোরীরা বন্ধু-বান্ধবদের সাথে বিদ্যালয়ে যায়, খাওয়া-দাওয়া হয়। খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুড়ি ওড়ানো, দল বেঁধে ঘুরে ঘুরে প্রতিমা দেখে বেড়ানো। বড় হয়ে ওঠার সোপানে পা-রাখা হেটেরো-সেক্সুয়াল কমপ্লেক্সের অবদানের টেস্টোটেরন হরমোন-প্রপীড়িত ওভারস্মার্ট ছাত্ররা, ফলিকল-স্টিমুল্যাটিং হরমোন-প্রপীড়িত ওভারস্মার্ট ছাত্রীরা পছন্দের জনকে প্রপোজ করার সুযোগ খোঁজে, কেউ আবার একটু ঘনিষ্ট সান্নিধ্য পেতে চায় ভ্যালেনটাইন-উইক কালচারে সমৃদ্ধ হতে। পাড়ায় রাতে হবে মাংস-ভাতের পিকনিক। শুধু পাড়াতেই নয় সরকার পরিপোষিত অনেক প্রাথমিক বিদ্যোলয়েও (যেখানে হিন্দু শাস্ত্রমতে বিদ্যালাভের পরিপন্থী, অভক্ষ্য ডিম সহযোগে ছাত্রদের মিড-ডে মিল খাওয়ান হয়।) পুজোর দিনটির পবিত্রতা বজায় রেখে পরেরদিন মাংস-ভাতের পিকনিক করা হয়েছে। আসছে বছর আবার হবে!—কি হবে ?
‘‘ওঁ ভদ্রকাল্যৈ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈ নমো নমঃ।
বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ-বিদ্যাস্থান্যেভ্যঃ এব চ।। ……’’ পুরোহিতের বলা ইত্যাদি মন্ত্র অনুসরণ করে পুষ্পাঞ্জলি দিতে হবে।
‘‘জয় জয় দেবী চরাচর সারে কুচযুগ শোভিত মুক্তাহারে।
বীণা রঞ্জিত পুস্তক হস্তে ভগবতী ভারতি দেবী নমোহস্তুতে।।
(কোন পণ্ডিত উক্ত মন্ত্র রচনা করেছিলেন আমি জানি না । তবে এটুকু বুঝি, যে স্তনযুগল মাতৃত্বকে সমৃদ্ধ করার জন্য সৃষ্ট, বৃত্তিতন্ত্রীদের সুড়সুড়ি দিতে তাকে মুক্তার হারের আভরণে সজ্জিত না করলেই ভাল করতেন। কারণ বিদ্যালাভ মস্তিকের মেধানাড়ীতে সুপ্ত মানবিক-সাত্ত্বিক গুণের অনুশীলনে সম্পাদিত হয়, বক্ষ-সৌন্দর্যের সজ্জিত বিজ্ঞাপনে নয়।)
ওঁ সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে।
বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্বি বিদ্যাং দেহী নমোহস্তুতে।।’’— পুরোহিতের বলা ইত্যাদি মন্ত্র অনুসরণ করে প্রণাম জানাতে হবে। …….তারপর সেই,—খাওয়া-দাওয়া, হৈ-হুল্লোর— ছোটদের বড় হবার রিহার্সাল, বড়দের নস্টালজিয়ার স্মৃতিচারণ ……. আসছে বছর আবার হবে!
ওইসব উচ্চারিত মন্ত্র অনুযায়ী দেবী সরস্বতীই বিদ্যাদাত্রী, তাকে সাধনা করতে পারলেই বিদ্যার সিলেবাস বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ জ্ঞাত হওয়া যাবে। খুব ভালো কথা। সাধনা দিয়েই তো সিদ্ধি পেতে হবে।


মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী আমরা যা বলি বা সংকল্প করি বাস্তবে তা যদি না করি স্নায়ুমন্ডলীতে জটিলতার সৃষ্টি হয়, আধ্যাত্মিক জগতে যাকে অনাগত প্রারব্ধ কর্মফল বলে। অথচ আমাদের শিক্ষকেরা এই পূজার দিনটিতে অঞ্জলিমন্ত্র, প্রণামমন্ত্র আওড়ানো ব্যতীত বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ শিক্ষা বিষয়ে ছাত্রদের উৎসাহ না দিয়ে প্রচলিত সিলেবাসের বিষয়ভিত্তিক খাতাবই কেনা, নোট কেনা, কোচিং-করানোর দিকে উৎসাহ দেয়। বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ জিনিসটা যে কি বেশিরভাগ পড়ুয়ারা জানেই না, অথচ শিক্ষার আবশ্যিক বিষয় জ্ঞানে বাধ্যতামূলকভাবে বছর-বছর আবৃত্তি করে চলে, সরস্বতী পূজার দিনটিতে। এর নাম দ্বন্দ্বীবৃত্তি, অর্থাৎ মুখে যা বলছি, কাজে তা করছি না। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতে যা মহাপাপের কারণ।


সংস্কৃত বিদ্ִ ধাতু থেকে বেদ এবং বিদ্যা শব্দের উৎপত্তি। যার অর্থ জ্ঞান, বিচরণা, অস্তিত্ব, প্রাপ্তি। বিদ্যা লাভ যার হয়, অস্তিত্ব বজায় রাখার জ্ঞান তার হয়। তার বিচারশক্তি হয়, জীবনচলনায় ভালটাকে বেছে নিয়ে সে এগিয়ে চলে মূল প্রাপ্তি বা গন্তব্যের দিকে। যার চরম ঈশ্বরপ্রাপ্তি। ভাষাবিদ জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস মহোদয় কৃত অভিধানানুসারে, ‘‘যদ্দারা ব্রহ্ম হতে ব্রহ্মান্ড পর্য্যন্ত যাবতীয় পদার্থের সত্যবিজ্ঞান লাভ হইয়া যথাযোগ্য উপকার প্রাপ্ত হওয়া যায় তাহাই বিদ্যা ; যদ্দারা অক্ষর পুরুষকে জানা যায়।’’ ওই বিদ্যায় বিদ্বান হয়ে ছাত্রদের জানাবার কাজটি যিনি করেন তিনি শিক্ষক বা আচার্য্য।
বেদ বা জ্ঞান-এর দুটো দিক, আধ্যাত্মিক ও জাগতিক। যা জানলে মানুষের জীবনের পূর্ণতা লাভ হয়, বিদ্যা লাভ হয়। বেদের বিদ্যা দু প্রকার পরা ও অপরা। শিক্ষা (phonetics), কল্প, ব্যাকরণ, ছন্দ, জ্যোতির্বিদ্যা (astronomy) ও নিরুক্ত (শব্দতত্ত্ব) ইত্যাদি নামের বেদের ৬টি শাখার নাম বেদাঙ্গ। সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ্ নামে বেদকে চারভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। যার অন্ত ভাগের নাম বেদান্ত বা উপনিষদ। ‘আত্মানং বিদ্ধি’ (Know Thyself,— who am ‘I’ ?) অর্থাৎ নিজেকে জানার চেষ্টার পাঠক্রমকে বলা হয়েছে পরাবিদ্যা। পরাবিদ্যার পাঠক্রমে আমাদের শিক্ষক আর্য-ঋষিগণ বলেছেন, ‘‘যস্তু সর্বাণি ভূতান্যাত্মন্যেবানুপশ্যতি।/সর্বভূতেষু চাত্মানং ততো ন বিজুগুপ্সতে।।’’ (ঈশোপনিষদ) অর্থাৎ, যিনি নিজের আত্মাকেই সর্বাত্মারূপে উপলব্ধি করেন, তিনি কাহাকেও ঘৃণা করেন না। সর্বভূতে নিজেকে, নিজের মধ্যে সর্বভূতকে উপলব্ধি করেন। কেননাক, আর্য্য হিন্দু শাস্ত্রমতে আমরা মানুষেরা ঐহিক জগতে দ্বৈত ভাবে অসম্পৃক্ত হয়েও সেই এক পরমাত্মার সাথে সম্পৃক্ত।
আবার তৈত্তরীয় উপনিষদের বিদ্যা দানের শান্তি পাঠে রয়েছে, ‘‘ওঁ সহ নাববতু। সহ নৌ ভুনক্তু। সহ বীর্য করবাবহৈ। তেজস্বি নাবধীতমস্তু মা বিদ্বিষাবহৈ। ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।।’’ যার মর্মার্থ হলো, আমরা (আচার্য্য ও বিদ্যার্থী উভয়ে) সহমত হয়ে চলব, প্রকৃতির উপাদান সকলে স-মান (Equitable) ভাবে ভাগ করে জীবন ধারণ করব। কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করব না। আর অপরাবিদ্যার বিষয় ছিল জাগতিক শিক্ষা, যা ৬৪ কলা বিদ্যার মধ্যে নিহিত ছিল। (অন্তরাসীজন ৬৪ কলাবিদ্যার সিলেবাস জানতে আগ্রহী হলে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস মহোদয়ের অভিধানে ‘কলা’ সবিশেষ পাঠ করে দেখতে পারেন। তা হলেই বুঝতে পারবেন বিদ্যা কাকে বলে।) পরাবিদ্যার শিক্ষকদের বলা হতো আচার্য্য আর অপরাবিদ্যার শিক্ষকদের উপাচার্য্য (তৈত্তিরীয় উপনিষদ)। বর্তমানের শিক্ষা ব্যবস্থায় সরস্বতী আরাধনা মন্ত্রক্তো বেদ-বেদান্ত-বেদান্তের সাথে বাস্তব সখ্যতা না থাকলেও বিদ্যার সাথে সম্পৃক্ত আচার্য্য এবং উপাচার্য্য শব্দদ্বয়কে এখনো বিদায় দেওয়া যায় নি।


আমাদের বর্তমান যুগ যে যুক্তিবাদী সে কথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি অস্বীকার করবেন না আশাকরি। যেমন, সন্তানের হয়ে মা খেলে সন্তানের পেট ভরবে না। ছাত্রের হয়ে শিক্ষক লেখাপড়া করলে ছাত্র পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে না। তেমনি বিদ্যালাভের জন্য বিহিত সাধনা না করে পুরোহিতের বলে দেওয়া দেবী সরস্বতীর অঞ্জলিমন্ত্র আওড়ালে বিদ্যার্থীদের বিদ্যা বা ঈপ্সিত ফললাভ হবে কি ?
অবশ্য পুরোহিতও জানেন না ফললাভের বিষয় সম্পর্কে। যদি জানতেন প্রতিমা-বিসর্জন মন্ত্রে বলতেন না—ওঁ আবাহনং ন জানামি, নৈব জানামি পূজনম্। বিসর্জনং ন জানামি ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি ।–অর্থাৎ আমি আবাহনও জানিনা, বিসর্জনও জানিনা, আমাকে ক্ষমা করুন। (দ্রঃ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)

বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী পূজ্য-প্রতিমা চঞ্চল চিত্তের ধারণের জন্য একটি অবলম্বন। প্রতিমাকে ব্রহ্মের রূপ কল্পনা করে উপাসনা, সংযম, সাত্তিক আহার, সাত্তিক বিহার ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে পূজা করা হয়।–যাতে পূজক বা উপাসক মনসংযোগ দ্বারা প্রতিমাকে হৃদয়ে ধারণ করে প্রতিমার গুণে গুণান্বিত হতে পারে। এই হলো প্রতিমা পূজার মূল কথা।


আমাদের আলোচ্য দেবী সরস্বতী প্রতিমার চরণ পদ্মের উপর ন্যস্ত, এর দ্বারা সৃষ্টির বিবর্ত্তনের কথা রূপকে বর্ণিত হয়েছে। মা সরস্বতী হংসের উপর উপবিষ্ট। হংস পরমাত্মার প্রতীক। বীণা থেকে নাদ বা ধ্বনি উৎপন্ন হয়, তাই বীণা সুরত-শব্দযোগের প্রতীক । পুস্তক বা গ্রন্থ বিদ্যা অর্জনের মাধ্যমের প্রতীক। দেবীর শুক্লবর্ণ সাত্তিকতার প্রতীক। পদ্ম, হংস, বীনা, পুস্তকাদি সজ্জিত শ্বেতবসনা দেবী সরস্বতীর উপাসনার বিষয় তাহলে বিদ্যা, ব্রহ্ম, পরব্রহ্ম, সৃষ্টিতত্ত্ব ইত্যাদি হওয়া উচিত। প্রতিমার অলঙ্কারের ওই গুণগুলোর সিলেবাস জানার পরে তো উপাসনার দ্বারা গুণান্বিত হবার প্রশ্ন! সেই সিলেবাসগুলো দেবী সরস্বতী কোন্ পুস্তকে, কোন্ সংহিতায় লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন, সে বিষয়ে বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকা কোথাও কিছু বলে গেছে কিনা আমি জানি না। যদি কেউ জানেন দয়া করে জানালে বাধিত হব। তবে এটুকু জেনেছি, পরব্রহ্মের ব্যক্ত-প্রতীক ‘‘শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা’’ —‘‘তমসার পার অচ্ছেদ্যবর্ণ মহান পুরুষ ইষ্টপ্রতীকে আবির্ভূত’’ হয়েছেন যিনি, তিনি ওই সব বিষয়ের খুঁটিনাটি জানেন এবং সবাইকে জানিয়েও দিয়েছেন বিবিধ স্মৃতি এবং শ্রুতি বাণীর মাধ্যমে। যিনি মানুষের জীবনের বেঁচে থাকা ও বৃদ্ধি পাওয়ার জীবন্ত আদর্শ স্বরূপ। যিনি পঞ্চবর্হি ও সপ্তার্চ্চি মাধ্যমে সব দেবতার, সব আরাধনার, সব পূজার, সব বিদ্যার সূত্র সন্নিবেশিত করেছেন। যাঁর উপাসনা বাদ দিয়ে কোন পুতুল পূজা করে কোন কিছুই জ্ঞাত হওয়া সম্ভব নয়। তাঁর নাম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। যারজন্য সদদীক্ষার শুভ মুহূর্তে ‘‘ওঁ ব্রহ্ম পরব্রহ্ম ও কুলমালিক ……’’ মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে বাহ্যপূজার বিষয়ে উল্লেখ্য পরব্রহ্ম-এর প্রকৃত তত্ত্বকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।


বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী সততা, সংযম, ন্যায়নীতি ইত্যাদি মানবিক গুণগুলোর প্রবহমানতাকে বৎসারান্তিক নবীকরণ করার জন্যই বাহ্যপূজা বা মূর্তিপূজা উদযাপনের উদ্দেশ্য। বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সরস্বতী পূজাই শুধু নয়, সব পূজার নামে হুজুগে মেতে আহার-বিহারে একটু বেশী করে অসংযমী হয়ে পড়ি আমরা। নাহলে সরস্বতী পূজা উপলক্ষ্যেও মাংসের দোকানে লাইন পড়ে যায়, যা হিন্দু শাস্ত্রে অভক্ষ্য, নিষিদ্ধ খাবার। যা খেলে আয়ুক্ষয় হয়। হিন্দুদের প্রামাণ্য গ্রন্থ মনু সংহিতা অনুযায়ী ‘মাং’ মানে আমাকে ‘স’ মানে সে, অর্থাৎ আমাকে সে খেলে আমিও তাকে খাব। আর আমরা ধর্ম পালনের অজুহাতে, পূজার অজুহাতে শাস্ত্রবিরোধী আচরণ করে হিন্দুত্বের বড়াই করতে চাইছি। এরফলে অহিন্দুরা আমাদের ওপর আঙুল তুলতে সাহস পাচ্ছে।


ভাষা-বিজ্ঞান অনুযায়ী পূজা মানে পূরণ করা, সম্বর্দ্ধিত করা। যে আচার-আচরণ সাত্তিক জীবন-বর্দ্ধনার অভাবকে পূরণ করে, পরিবেশের জৈবাজৈব সবকিছুকে সম্যকরূপে বর্দ্ধিত করে, তার নাম পূজা। ‘শ্রেয়-সৃজনী সংহতি ও সমাবেশ’ যা, তার নাম উৎসব। আর যে আচার-আচরণ জীবনবৃদ্ধিকে নন্দিত করে তার নাম আনন্দ। এখন প্রশ্ন, আমাদের প্রচলিত পূজা, উৎসবের উদযাপন বৃহত্তর পরিবেশকে কতখানি নন্দিত করে ‘পূজা’ শব্দের যথার্থতাকে উপহার দিতে পেরেছে ? –এইসব বিষয়ে সত্তাপিয়াসী চিন্তাশীলদের চিন্তা করে দেখা উচিত। বিশেষ করে যাঁরা কুসংস্কার বিরোধী রূপে নিজেদের বোধ ও বোধিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান।


পূজা বিষয়ে হিন্দুদের প্রামাণ্য গ্রন্থগুলো কি বিধান রেখে গেছে, বাহ্য-পূজাবাদীদের তা একবার জেনে নেওয়া দরকার।
‘মহানির্ব্বাণতন্ত্র’ নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ
‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ।
অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’
ওই মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ‘ভারতে বিবেকানন্দ’ গ্রন্থের ৩৩৬ পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট। ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’

‘‘যে-ব্যক্তি সর্ব্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে।’’ –শ্রীমদ্ভাগবত। ৩-২৯-২২

“ঈশ্বরঃ সর্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জ্জুন তিষ্ঠতি।
ভ্রাময়ন্ সর্ব্বভূতানি যন্ত্ররূঢ়ানি মায়য়া।।“
–গীতা, ১৮। ৬৫
“যিনি এই সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার নিজের স্বধর্মানুরূপ নিষ্কাম কর্মাচরণ দ্বারা (বাক্য বা ফুলজল দ্বারা নহে) পূজা করিয়া মানুষ সিদ্ধি লাভ করে । স্বধর্মানুরূপ (বর্ণানুগ সত্তাধর্ম পালন) নিষ্কাম কর্মই পরমেশ্বরের পূজার ডালি ।” (গীতা ১৮।৪৬)
“যে ব্যক্তি সর্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে ।“ (শ্রীমদ্ভাগবত ৩।২৯।২২)


তাই একটা প্রশ্ন স্বভাবতঃই জাগে, বিদ্যার্জনের জন্য আমরা যদি বাহ্যপূজার ডালি সাজিয়ে দেবী সরস্বতীর উপর সত্যিসত্যিই নির্ভরশীল হতে পারতাম, তাঁকে বিশ্বাস করতাম, তাঁর প্রতি নিষ্ঠা থাকত, তাহলে বিদ্যা লাভের জন্য তাঁকে নিয়েই পড়ে থাকতাম। প্রভূত অর্থ ব্যয় করে, একে-ওকে ধরাধরি করে স্কুল-কলেজে ভর্তি হয়ে, বিষয় ভিত্তিক প্রাইভেট টিউটরের কাছে টুইশন নিতে যেতাম না, পরীক্ষার হলে অসদুপায়ের আশ্রয় নিতাম না। কারণ, এ-তো দ্বন্দ্বীবৃত্তি, বিশ্বাসকে অপমান করা। অবশ্য না করে উপায়ও তো নাই! বর্তমানের মোবাইল প্রীতির যুগে, প্রতিমা-পূজায় বিশ্বাসী এমন কি কাউকে পাওয়া যাবে,— যিনি পুরোহিতকে কিছু দক্ষিণা দিয়ে তার সাধের মোবাইলের প্রতিকৃতি বা প্রতিমার পুজো করিয়ে মোবাইলের সব ফিচার উপভোগ করতে পারবে, ডাউনলোড-আপলোড করতে পারবে, হোয়াটস্ অ্যাপে ছবি পাঠাতে পারবে? প্রতিমা-পূজায় বিশ্বাসী এমন কোন মেয়ে পাওয়া যাবে, যে তার পছন্দের বর-এর ছবি বা কাট্-আউট পুজো করিয়ে মা হতে পারবে, সুখের দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করতে পারবে? যদি পারে তাহলে পুরোহিতকে দক্ষিণা দিয়ে সরস্বতী প্রতিমার পূজা করিয়ে বিদ্যা লাভ সম্ভব! নচেৎ কোন পুতুল পুজো করার আগে একটু বোধ-বিবেককে কাজে লাগাতে হবে।


বাস্তব বোধের দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে বিচার-বিবেচনা করলে দেখা যাবে, সরস্বতী পূজার ওই মন্ত্রগুলোই শুধু নয়, আমাদের সব কথাই বাক্ হয়ে স্ফূরিত হয় বলে সরস্বতী বাগ্দেবী রূপে কল্পিত হয়েছেন। অতএব যুক্তি বা বিজ্ঞান অনুযায়ী দেবী সরস্বতী মেধানাড়ীতে সুপ্ত, কণ্ঠে এবং কলমে ব্যক্ত। একাগ্রতার অনুশীলনে মেধানাড়ী জাগ্রত না করতে পারলে, অর্থাৎ স্মৃতি যদি কাজ না করে মুখস্থ বলা যাবে না, লেখাও যাবে না। মেধানাড়ী ধ্রুবাস্মৃতির কাজ করে। উপনিষদে বর্ণিত আছে, আহার শুদ্ধৌ সত্ত্বাশুদ্ধিঃ, সত্ত্বাশুদ্ধৌ ধ্রুবাস্মৃতি …… । তাই, বিদ্যা লাভ করতে হলে মেধানাড়ীকে জাগ্রত রাখতে হবে। আর, মেধানাড়ীকে জাগ্রত রাখতে হলে সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন-যাপন—আহার-বিহার, জৈবিক তাগিদ পূরণ, জীবিকার্জন ইত্যাদি ইত্যাদি আহরণসমূহকে শুদ্ধ রাখতে হবে খেয়ালখুশীর প্রবৃত্তি-পরায়ণতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে।
বেদবিৎ আচার্য্যের বিধানকে উপেক্ষা করে শিক্ষার নামে, বিদ্যার নামে প্রবৃত্তি-পরায়ণতার বিধি-ব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থায় বা সরস্বতীর মূর্তি পূজা করে যদি প্রকৃত বিদ্যা লাভ হতে পারতো, তাহলে তথাকথিত বিদ্যালয়গুলো থেকে অনেক অসৎ-নিরোধী আদর্শবান, বিদ্বান, শ্রদ্ধাবান, চরিত্রবান মানুষের সৃষ্টি হতে পারতো। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উপাচার্যকে ঘেরাও করে ‘হোক কলরব’ সংগঠিত হতো না। ‘মা বিদ্বিষাবহৈ’-এর দেশের বিদ্যালয়ে ছাত্র-রাজনীতির নামে মানুষের প্রতি মানুষের বিদ্বেষ দেখতে হতো না। এসব উল্লেখ করার কারণ, বর্তমানে দুর্নিতীপরায়ণ মানুষদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যাঁরা একসময় বিদ্যাদেবীর আরাধনা করে সমাবর্তন মাধ্যমে আচার্য্য বা উপাচার্য্য স্বাক্ষরিত বিদ্বান আখ্যা বা শংসাপত্র বা ডিগ্রী নিয়েছেন! তাঁদের কি বিদ্বান বলা যাবে ?
অথচ এই ভারতবর্ষের রত্নাকর দস্যু সরস্বতীর কোন মূর্তি-পূজা না করেই, আহত-নাদ মর্যাদা-পুরুষোত্তম ‘রাম’-নামের (ম-রা, ম-রা, ম-রা ……..=রাম) সাধন করে দেবী সরস্বতীকে মেধানাড়ীতে জাগ্রত করে হয়েছিলেন বাল্মীকি।


একদা তমসা নদী থেকে স্নান সেরে ফিরছিলেন। এক তরুশাখে ক্রৌঞ্চ-জুটি পরস্পর খেলছিল। এক ব্যাধ পুরুষ পাখিটিকে তীর মেরে হত্যা করলে স্ত্রী পাখিটি করুণ বিলাপ করতে থাকে। বাল্মীকি বিচলিত হয়ে ‘কোনদিন প্রতিষ্ঠা পাবে না’ বলে ব্যাধকে অভিসম্পাত করেন। সেই অভিশাপ বাণী স্বতঃস্ফূর্ত শ্লোকবদ্ধ হয়ে নির্গত হয়েছিল :–‘‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতী সমাঃ/যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকম্ অবধী কামমোহিতম্।’’ এই শ্লোকটিকে পৃথিবীর সারস্বত সাধকেরা আদি শ্লোক বলে মান্য করেন। অতএব, সারস্বত সাধনার মূল বিষয় মস্তিষ্কে সুপ্ত থাকা মেধানাড়ী বা স্মৃতিবাহী চেতনার জাগরণ।

———-


মেধানাড়ীকে জাগ্রত করতে হলে লাগে অনাহত-নাদ বা সৎমন্ত্র সাধন। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের বিদ্বান করার জন্য দীক্ষার মাধ্যমে আজ্ঞাচক্রে অনাহত-নাদের সৎমন্ত্র সাধন, স্বতঃ-অনুজ্ঞার অনুশাসন এবং সদাচার মাধ্যমে আমাদের মেধানাড়ীকে জাগ্রত করার সহজ উপায় দান করেই ক্ষান্ত হন নি, ‘নিয়তং স্মৃতিচিদযুতে’-বাণীতে স্বস্ত্যয়নী ব্রতের মন্ত্রের মাধ্যমে স্মৃতিবাহী চেতনাকে জাগ্রত করার বিধান দিয়ে দেবী সরস্বতীর আরাধনার নিমিত্ত স্থায়ী একটা আসন পেতে দিলেন। যা’তে আমরা প্রতিনিয়ত সরস্বতী পূজায় ব্যাপৃত থাকতে পারি। আমরা একটু চেষ্টা করলেই সেই বিধিগুলোকে অনুশীলন মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে দেবী সরস্বতীকে সম্বর্দ্ধিত করে, প্রকৃত অর্থে পূজা করে নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ,পবিত্র হতে পারব, বিদ্বান হতে পারব।
এবার আমরা একটু দেখে নেব বর্তমান বেদবিৎ আচার্য্য শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরস্বতী বিষয়ে কি নিদান রেখে গেছেন।
‘‘বিকাশ-ব্যাকুল গতিই যাঁর সংস্থিতি—
তিনিই সরস্বতী,
আর, বাক্ বা শব্দই
যাঁর সত্তা—
তিনিই বাগ্দেবী‍;
তাই, যিনিই বাগ্দেবী
তিনিই সরস্বতী। ২ ।
বাস্তব উপলব্ধিসম্ভূত
সার্থক অন্বিত-সঙ্গতিশীল জ্ঞানকেই
বিদ্যা বলে। ৩ ।
সার্থক সর্ব্বসঙ্গতিশীল জ্ঞানই
বিজ্ঞান,
আর, তা’ই বেদ,
প্রজ্ঞাও তা’ই। ১০ ।’’
(সংজ্ঞা সমীক্ষা)

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রদত্ত উপরোক্ত বাণীতে এটুকু বোঝা গেল যে সরস্বতী আরাধনার মাধ্যম বাক্ বা শব্দ সাধন। শ্রীশ্রীঠাকুর ভাব-সমাধিতে বাক্ বা শব্দের সন্ধান দিতে গিয়ে ব্যক্ত করলেন,—‘‘নাম-নামী অভেদ, ….. স্থূলে আমার প্রকাশ, সূক্ষ্মে আমার বাস।’’ মহাগ্রন্থ পুণ্যপুঁথির উক্ত বাণীকে স্বীকার করলে বাক্ বা শব্দের অস্তিত্বের আধারও শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। এবং সব দেবতার সমাহারে সৃষ্ট একমাত্র তিনিই ভগবানের অখন্ড সাকার মূর্তি। তিনি ইষ্ট, তিনি ধ্যেয়, তিনি জ্ঞেয় এবং তিনিই পূজ্য। তাঁর আদর্শ মেনে চলে ইষ্টপূজা করতে পারলে সব দেবতার পূজা করা হয়।

প্রসঙ্গ : মন্দির

।। মন্দির, শ্রীমন্দির ও সৎসঙ্গ বিহার-এর গঠনতন্ত্র প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।


শ্রীশ্রীঠাকুর—সব মন্দিরই শ্রীমন্দির। জায়গায় জায়গায় মন্দির বা সৎসঙ্গ বিহার ঠিক করা ভাল, যাতে লোকে meet (সাক্ষাৎ) করতে পারে। সেখান থেকে মানুষকে সবভাবে infuse (উদ্বুদ্ধ) করতে হবে। ধর্ম্ম কী, কৃষ্টি কী, সদাচার কী, বিবাহের নীতি কী, যোগ্যতার অনুশীলন কিভাবে করতে হয়, সেবানুচর্য্যার ভিতর দিয়ে সবাই পারস্পরিকভাবে সম্বন্ধান্বিত হয় কিভাবে ইত্যাদি কথা সেখান থেকে চারাতে হবে। মানুষকে practically educated (বাস্তবভাবে শিক্ষিত) করে তুলতে হবে। তাছাড়া মানুষের জন্য যতখানি যা করা যায় তাও বাস্তবভাবে করতে হবে মন্দিরগুলিকে কেন্দ্র করে। মন্দির থাকলে, ঋত্বিক থাকবে, dispensary (চিকিৎসাকেন্দ্র), হাসপাতাল, গবেষণাগার, তপোবনের শাখা ইত্যাদি থাকবে। হয়তো ঐ মন্দিরগুলিই এক একটা university (বিশ্ববিদ্যালয়) বা সর্ব্বতোমুখী শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
(আলোচনা-প্রসঙ্গে, ২১ খণ্ড, পৃঃ ৩১, ৪ঠা বৈশাখ, ১৩৫৯, বৃহস্পতিবার, ইং ১৭-০৪-১৯৫২)

।। পুরুষোত্তম চির-অতন্দ্র ।।

।। পুরুষোত্তম চির অতন্দ্র ।।


পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের তিরোধান দিবসকে কেন্দ্র করে যাঁরা হবিষ্যান্ন গ্রহণের বিধান দিয়েছেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে বিনীত নিবেদন —
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের আবশ্যিক পালনীয় প্রাথমিক বিষয়সমূহ পালন করার পর তিরোধান প্রসঙ্গে চিন্তা করবেন।
যথা, সৎমন্ত্রে দীক্ষিতদের অভক্ষ্যভোজী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুনাদি তামসিক আহার করা যাবে না। যারা করেন, আর্য্য হিন্দুমতে তাদের অভক্ষ্যভোজী বলা হয়েছে। অগম্যাগামী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ যারা প্রতিলোম, সগোত্র এবং সপিণ্ড সম্বন্ধীয়দের সাথে অবিধি পূর্বক ধর্মবিরুদ্ধ বিবাহের মাধ্যমে কামাচার করে, হিন্দুমতে তাদের অগম্যাগামী বলা হয়েছে। এরা কদাচারী, এদের প্রদত্ত আহার ও পানীয় অশুদ্ধ। (দ্রঃ সম্বিতী)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের শিষ্য হতে হলে কমপক্ষে ৪৫মিনিট করে ঊষানিশায় মন্ত্রসাধন করতে হবে। আহ্বানীসহ সন্ধ্যা ও প্রার্থনা, ইষ্টভৃতি (ইষ্টনীতির ভরণ), কমপক্ষে ৩ বার শবাসন প্রভৃতির নিত্য-সাধন করতে হবে। বর্ণধর্মানুযায়ী সদাচারী হতে হবে। বর্ণাশ্রম মেনে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে, বৃত্তিহরণ করা চলবে না। ‘পঞ্চবর্হিঃ’ এবং ‘সপ্তার্চ্চিঃ’-র বিধান মেনে চলতে হবে, সকলকেই। ওই নিয়মাবলী, ওই বিধিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমের নাম দীক্ষা গ্রহণ করা।
যাঁরা এস. পি. আর., পি. আর. উপাধির বলে দীক্ষা সঞ্চারণা করেন, তাঁরা যজমানদের দিয়ে ‘‘এই দীক্ষা গ্রহণ করিয়া আমি সর্বান্তকরণে শপথ করিতেছি যে—মানুষের জীবন ও বৃদ্ধির পরম উদ্ধাতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রকে প্রতিষ্ঠা করাই এইক্ষণ হইতেই আমার জীবনের যজ্ঞ হউক। ……’’ ইত্যাদি উচ্চারণ করিয়ে সংকল্প-শপথ গ্রহণ করান। এবং দীক্ষাপত্রের ২টি স্তবকে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। এর উদ্দেশ্য যজমান যা’তে ঠাকুরের আদর্শ মেনে চলে তারজন্য একেবারে পাকাপোক্ত ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থাপত্র স্বয়ং শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত। দীক্ষাদাতার কর্তব্য, দীক্ষা গ্রহিতাকে শ্রীশ্রীঠাকুরের উপরোক্ত আদর্শের বিষয়ে সম্যকভাবে অবগত করিয়ে দীক্ষা দান করা। তা’ না করিয়ে দীক্ষাদাতা যদি তড়িঘড়ি করে যেনতেন প্রকারেণ মন্ত্র দিয়ে সই-সাবুদ করিয়ে নেয়, তাহলেই মুশকিল। কপটাচার এবং দ্বন্দ্বীবৃত্তি দোষে দুষ্ট হতে হবে। সেই প্রবহমানতা চলছে। যারফলে বেশিরভাগ দীক্ষিতগণ মনে করেন, সকালবেলা উঠে ঠাকুরের নামে পয়সা রাখা, শুক্রবার নিরামিষ খেলেই শ্রীশ্রীঠাকুরের শিষ্য হওয়া যায়। অথচ, সত্যানুসরণ গ্রন্থের প্রথমেই তিনি এ বিষয়ে সাবধান বাণী দিয়ে রেখেছেন। আমার মধ্যে যদি তাঁর আদর্শের প্রকাশ না হয়, অর্থাৎ ঠাকুরত্ব না জাগাতে পারি, তাহলে তিনি আমার ঠাকুর নন। সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছেন। সেই হিসেবে বিচার করে দেখলে দেখা যাবে, তাঁর আদর্শ মেনে চলেন যাঁরা, যজনসিদ্ধ যাঁরা, একমাত্র তাঁদেরই অধিকার রয়েছে, যাজন করার, প্রচার করার। অথচ, আমরা এসব মূল বিষয়টিকে উপেক্ষা করে, অনেক কিছুতে, যথা, সদাচার, বর্ণাশ্রম, ঠাকুরের বলা পরিচ্ছদ, ইত্যাদিতে ছাড় দি‌য়ে, নিয়মের শিথিল করে অধিবেশন করে চলেছি। আর তিরোধানের নামে পক্ষান্তরে শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শকে লঘু করবার চেষ্টা করছি। আবার বলছি, পুরুষোত্তম চির অতন্দ্র! তাঁর তিরোধান হয় না। তবে হবিষ্যান্ন করা দোষের না। মাসে মাসে হবিষ্যান্ন, মাঝে মাঝে শিশু প্রাজাপত্য করার বিধান তো তিনি দিয়েছেন। এছাড়াও তিনি বিধান দিয়েছেন—
রবিগুরু পৌর্ণমাসী আর চতুর্দশী
অমাবস্যা সংক্রান্তি কিংবা একাদশী
এ-কটা দিন অন্ততঃ থাকিস্
পাতলা-পুতলি খেয়ে,
ব্যতিক্রমে পয়মালে যায়
ঘৃষ্ট আঘাত পেয়ে। ( অনুশ্রুতি, ১ম খণ্ড, স্বাস্থ্য ও সদাচার, ৬২)
উপরোক্ত নিয়মিত অবশ্য পালনীয় বিধানসমূহকে পাশ কাটিয়ে তিরোধানের নামে হবিষ্যান্ন গ্রহণে তৎপর হলে লক্ষ্যের চাইতে উপলক্ষ্যকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে সকলকে সচেতন হবে, নচেৎ দ্বন্দীবৃত্তি দোষে দুষ্ট হতে হবে।
সবাইকে জয়গুরু ও প্রণাম। বন্দে পুরুষোত্তমম্!

।। ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ ।।

।। ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রদত্ত নিত্য অনুসর্তব্য ছড়াবাণী—-
“অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে
ধর্ম্ম বলে জানিস্ তা’কে।”-র মধ্যে ইষ্টভৃতির মূল তত্ত্ব সুপ্ত।
সৎসঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কথিত ‘সৎসঙ্গ চায় মানুষ’ বাণীতে বর্ণিত সৎসঙ্গের আদর্শের সাথে, ‘ইষ্টভৃতি’ শব্দের মর্মার্থের সাথে পরিচিত নাহলেও ‘ইষ্টভৃতি’ নামের সাথে বেশীরভাগ সংঘকেন্দ্রিক জনেরা যেমন পরিচিত, তেমনি সাধারণ লোকেরা শ্রীশ্রীঠাকুরের নামে টাকাপয়সা রাখা এবং নির্দিষ্ট সংস্থায় জমা দেওয়াকেই ‘ইষ্টভৃতি’ মনে করেন। অনেকানেক দীক্ষিত জনেরা শুক্রবার বাদে অন্যান্য দিন মাছ-মাংস-পেঁয়াজ-রসুনাদি অভক্ষ্য ভোজন করেন, বর্ণাশ্রমধর্মের প্রতি মুখ ফিরিয়ে বৃত্তিহরণ কর্মাদি করেন, প্রতিলোম-বিবাহ বিলাসে অগম্যাগামী হয়েও গর্ব করে বলেন, ‘আমি রোজ ১০/২০/৩০ ……… টাকা করে ইষ্টভৃতি কর।’ শ্রীশ্রীঠাকুর অসদুপায়ে উপার্জন (সদাচার এবং বর্ণাশ্রম বিধি না মেনে যে উপার্জন।) দিয়ে ইষ্টভৃতি করার নিদেশ কোথাও দেন নি। তিনি বলেন,—
“সত্য পথে চললে রোজগার বেশি হয়। সাধু রোজগার হয়। ……. ফাঁকির পয়সা আর ভালোবাসার পয়সায় ঢের তফাৎ। ফাঁকির পয়সা খেলে শরীর-মন প্রবৃত্তিঝোঁকা হয়। সাত্বত সম্বেগ স্তিমিত হতে থাকে।” (আঃ প্রঃ ১৫শ খণ্ড, পৃঃ ১৯৭)

শ্রীশ্রীঠাকুরকে প্ৰশ্ন করা হয়েছিল আপনি ইষ্টভৃতির উপর এত জোর দেন, কিন্তু কেউ যদি জেলে আটকা পড়ে এবং সেখানে কোন সুযোগ না পায়, তখন কী করবে?
শ্রীশ্রীঠাকুর—ভাতের গ্রাসটা দেবে, ভাত যদি না পায় তবে জল নিবেদন করবে, জল যদি না পায় তবে সীতা যেমন বালির পিণ্ডি দিছিলেন, অগত্যা সেই রকমভাবে বালি বা মাটি দিয়ে ইষ্টভৃতি করবে, তা’ও যদি না পায়, পরমপিতার দান বাতাস তো কেউ কেড়ে নিতে পারবে না, আর সর্বশেষে মানস-উপচারে নিবেদন তো আছেই। সেখানেও চেষ্টা করতে হবে সক্রিয়ভাবে ইষ্টের ইচ্ছা পরিপূরণের ভিতর দিয়ে যাতে তাঁকে তৃপ্ত ও তুষ্ট করা যায়।
(আলোচনা প্রসঙ্গে ৪র্থ, ২৬। ১২। ১৯৪২, পৃষ্ঠা ২০২)
উপরোক্ত বাণীতে বোঝা গেল যে, টাকা-পয়সা নয়, ইষ্টের ইচ্ছা পরিপূরণ করা ইষ্টভৃতির মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। যা পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চি-র অনুশাসনের মধ্যে নিহিত রয়েছে। যুক্তি অনুযায়ী ওই অনুশাসন যারা মানছেন না, তারা তাহলে ইষ্টভৃতি করছেন না।
আমরা আমাদের প্রিয়জনের জন্য কোন কিছু কিনলে সেরা বা শ্রেষ্ঠ জিনিসটাই কিনি। এ বিষয়ে কারো কোন দ্বিমত থাকতে পারে না। তাহলে আমরা যাঁকে আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ আদর্শ মনে করি, সেই প্রিয়পরম প্রেষ্ঠকেও শ্রেষ্ঠ জিনিস নিবেদন করতে হয়। তাই ইষ্টভৃতিকে যারা সবচাইতে বেশি গুরুত্ব দেন, তাদের অবশ্যই শ্রেষ্ঠ ইষ্টভৃতি বিষয়টা জেনে রাখা উচিত।
শ্রেষ্ঠ ইষ্টভৃতি প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন।—
“ঈশ্বর-অনুধ্যায়িতা নিয়ে
গণহিতী অনুচর্য্যায়
তাদের যে অনুগ্রহ-অবদান অর্জ্জন কর,
সেই অবদান হ’তে
শ্রদ্ধানুস্যূত অন্তঃকরণে
স্বতঃস্বেচ্ছায় তোমার ইষ্টকে যা নিবেদন কর,
তাই-ই কিন্তু তোমার শ্রেষ্ঠ ইষ্টভৃতি।”
(ধৃতি-বিধায়না, ১ম খণ্ড, বাণী সংখ্যা ৩০৬)
* * *

‘ঈশ্বর অনুধ্যায়িতা’……..বাণীর নিদেশ ব্যতীত ইষ্টভৃতি বাস্তবায়িত হয় না। ইষ্টভৃতির নামে শুধুমাত্র ইষ্টের প্রীতির জন্য, কাউকে পীড়িত না করে, নিজে পীড়িত না হয়ে বর্ণানুগ কর্মের সেবা মাধ্যমে আহরিত অর্থ ‘দিন গুজরানী আয়’। এই *‘দিন গুজরানী আয়’-কেই ইষ্টভৃতির অর্ঘ্য হিসেবে নিবার্চিত করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর। ওই নিদেশ অনুসারে ইষ্টার্ঘ্য আহরণ করার মধ্যেই প্রীতি, মৈত্রী ও ঐক্যের বীজ বপন করে দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন আর্য্যকৃষ্টির সদাচার এবং বর্ণাশ্রম ধর্মকে। ওই ইষ্টার্ঘ্য ইষ্টকে দিতে হবে। তিনি তা দিয়ে PHILANTHROPICAL WORK বা সব্যষ্টি সমষ্টির মধ্যে ভাগবত ঐক্য স্থাপন দ্বারা গণহিতৈষণা কর্ম করবেন। ইষ্টভৃতির দাতা এবং গ্রহীতার মেলবন্ধনে গড়ে উঠবে পরম রাষ্ট্রিক সমবায়। এই ছিল শ্রীশ্রীঠাকুরের পরিকল্পনা। পরিবেশের সকলকে নিয়ে বাঁচা এবং বৃদ্ধি পাওয়ার বাস্তুতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক বিন্যাস-ব্যবস্থার সরলীকরণ অবদান ইতিপূর্বে পরিলক্ষিত হয়নি।—মানবসভ্যতার সার্বিক উত্তরণের জন্য। সেই উদ্দেশ্যে স্থাপন করেছিলেন ফিলানথ্রপি কার্যালয়। মাসান্তে ওই অর্ঘ্য প্রেরিত হত ইষ্টসকাশে। ইষ্টের নামে প্রেরিত ওই অর্ঘ্য গৃহীত হতো ফিলানথ্রপিতে। ইষ্টভৃতি পাঠাবার পর দুজনকে ভ্রাতৃভোজ্য দিতে হয়। এর মাধ্যমে পারস্পরিক প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করলেন। দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে চাইলেন। ইষ্টভৃতি গ্রহীতারা এ বিষয়টিকে ইষ্টানুগ-বোধ দিয়ে বিবেচনা করলে কিছুটা কাজের কাজ হবে।

*”দিন গুজরানী আয় থেকে কর
ইষ্টভৃতি আহরণ,
জলগ্রহণের পূর্ব্বেই তা’
করিস্ ইষ্টে নিবেদন ;
নিত্য এমনি নিয়মিত
যেমন পারিস ক’রেই যা’
মাসটি যবে শেষ হবে তুই
*ইষ্টস্থানে পাঠাস্ তা’ ;
ইষ্টস্থানে পাঠিয়ে দিয়ে
আরো দু’টি ভুজ্যি রাখিস্,
গুরুভাই বা গুরুজনের
দু’জনাকে সেইটি দিস্ ;
পাড়া-পড়শীর সেবার কাজে
রাখিস কিন্তু কিছু আরো,
উপযুক্ত আপদগ্রস্তে
দিতেই হ’বে যেটুকু পার ;
এসবগুলির আচরণে
ইষ্টভৃতি নিখুঁত হয়–
এ না-ক’রে ইষ্টভৃতি

জানিস্ কিন্তু পূর্ণ নয়।”

*ইষ্টস্থান বলতে শুধু ইষ্ট বা প্রিয়পরমের বসতবাটিই নয়। ইষ্টস্থান মানে, যেখানে থেকে আমরা মঙ্গল-অভিগমনে চলি। সে-হিসেবে পরমপিতার এই সারা দুনিয়াটাই ইষ্টস্থানে পরিণত হ’তে পারে।
(আলোচনা প্রসঙ্গে, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ইং ১৮-১০-১৯৪৫)

ইষ্টভৃতি নিবেদন করার পর শ্রীশ্রীঠাকুর নিম্নোক্ত বাণীর মাধ্যমে অগ্নিহোত্র করতে নিদেশ দিলেন।
“তুমি যখন তোমার ইষ্টে বা আচার্য্যে
ইষ্টার্ঘ্য বা ইষ্টভৃতি নিবেদন কর,
সে নিবেদন-সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই
শ্রদ্ধোৎসারিণী অন্তঃকরণে
অন্তর-আবেগ নিয়ে বল —
“হে দেবতা !
হে আমার আচার্য্য !
হে আমার প্রিয়পরম !
আমি আমার শ্রদ্ধাকে
তোমাকে আহূতি দিতেছি।”
—ইহাই অগ্নিহোত্রের তাৎপর্য্য,
কারণ, অগ্নিই হ’চ্ছেন
ইষ্টদেবতা ও ব্রহ্মবিৎ আচার্য্যের
প্রতীক,
তা’দেরই অগ্নিমুখ বলা হয়,
তাই অগ্নিহোত্র
নিত্য করণীয়,
কখনই পরিত্যাজ্য নয়। ১৫ ।
(ধৃতি-বিধায়না ১ম খন্ড)

শ্রীশ্রীঠাকুর পথের কড়ি গ্রন্থে ইষ্টভৃতির বিষয়ে বললেন :
❝ইষ্টভৃতি মানে হ’চ্ছে—সাংসারিক কোন কর্মে হস্তক্ষেপ করিবার পূর্ব্বেই ইষ্টপোষণার্থ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ পূর্ব্বক অন্ততঃ নিজের আহার্য্য পরিমিত ভোজ্য নিবেদন করা।❞
* * *
“ইষ্টভৃতি ভোজ্যই রীতি
অনুকল্পে জোটে যা’
বিনিময়ে তাই পাওয়া যায়
এমনি দিয়ে রাখিস্ তা।”

শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত ইষ্টভৃতি নিবেদন মন্ত্রের ‘‘ইষ্টভৃতির্ম্ময়াদেব কৃতাপ্রীত্যৈ তবো প্রভো, ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ।’’ উচ্চারণ করার সাথে সাথে বৃহত্তর পারিপার্শ্বিকের জীবনবৃদ্ধির দায়ভারের শপথ নিতে হয় আমাদের। সব অবস্থাতে বাস্তব কর্মে বৃহত্তর পরিবেশের জৈবাজৈব সবকিছুকে পালন-পোষণে সমৃদ্ধ করে রাখার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সার্থক হয় ইষ্টভৃতি পালন। ইষ্টাদর্শের পঞ্চবর্হিঃ ও সপ্তার্চ্চি-র বিধি মেনে শারিরীক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক সদাচার পালনে, ইষ্টপ্রোক্ত বিধি অনুসরণ করে বিবাহ ও সুপ্রজনন নীতি পালনে অভ্যস্ত না হতে পারলে—‘আমি ইষ্টভৃতি করি’ এই কথা বলা বোধহয় সমীচীন হবে না। ইষ্টভৃতি করা মানে, বাস্তবে ইষ্টনীতি মেনে চলা, ইষ্টনীতির ভরণ করা।

যদিও ইষ্টভৃতি প্রচলনের পূর্বে সত্যানুসরণের “তুমি তোমার, নিজ পরিবারের, দেশের ও দশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দায়ী।”—বাণী-মাধ্যমে অনুরূপ দায়ভার দিয়েই রেখেছিলেন ব্যষ্টি ও সমষ্টি উন্নয়নের দিকে লক্ষ্য রেখে।
এ তো গেল ইষ্টভৃতি আহরণ ও নিবেদনপর্ব। এর পর রয়েছে প্রেরণপর্ব। প্রেরণ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর স্পষ্ট নিদেশ দিয়ে বলেছেন :
ইষ্টভৃতি ইষ্টকেই দিস্
করিসনা তা’য় বঞ্চনা।
অন্যকে তা’ দিলেই জানিস
আসবে বিপাক গঞ্জনা ।।
অর্থাৎ ইষ্টভৃতি ইষ্টেরই প্রাপ্য, অন্য কারও নয়। ওই অর্ঘ্য দিয়ে ইষ্টকর্ম করা হবে। ইষ্টকর্ম মানে পূর্ত্তকর্ম। যা প্রকৃত ইষ্টভৃতির মন্ত্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ ।।” এর সরলার্থ খুব সহজ। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুযায়ী সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন বর্দ্ধনার বিধি মেনে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে চলেন যিনি এমন গুরুভাই-ই প্রকৃত ইষ্টভ্রাতা।––যাঁর আপদে-বিপদে সাধ্যানুগ সাহায্য করতে হবে। ভূত মানে,—ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা পরিবেশের অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। উক্ত উপাদানসমূহকে সমৃদ্ধ রাখার জন্য আর্য্যদের বাস্তব পূর্ত্ত-কর্মের মাধ্যমে নিত্য পঞ্চ-মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করতে হতো সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধিকে অক্ষুণ্ণ রাখতে। শ্রীশ্রীঠাকুর ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের মাধ্যমে ওই প্রক্রিয়াকে নবীকরণ করলেন। শ্রীশ্রীঠাকুর হিমাইতপুরে সপারিপার্শ্বিক জীবন বৃদ্ধিদ আশ্রম সংগঠনের মাধ্যমে, ইষ্টভৃতি প্রবর্তনের পূর্বেই ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আমাদেরও তাই করতে হবে, বাস্তবে।
ইষ্টের অবর্তমানে, ইষ্টাদর্শের পরমরাষ্ট্রিক সমবায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অবিচল থেকে দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ, কৃষি ও শিল্পের বাস্তবায়ন করতে নিবেদিত-প্রাণ যিনি, তিনিই ইষ্টার্ঘ্য গ্রহণের উপযুক্ত ব্যক্তি।
এ বিষয়ে পরম দয়ালের সুস্পষ্ট নির্দেশ :-
“আগত যিনি, উপস্থিত যিনি—
তাঁর বিগতিতে বা তিরোভাবে
তাঁর বংশে যদি
তাঁ’তে অচ্যুত—সশ্রদ্ধ—আনতি-সম্পন্ন,
প্রবুদ্ধ-সেবাপ্রাণ,
তঁৎবিধি ও নীতির সুষ্ঠু পরিচারক
ও পরিপালক,
সানুকম্পী-চর্য্যানিরত,
সমন্বয়ী সামঞ্জস্য-প্রধান,
পদনির্লোভ, অদ্রোহী,
শিষ্ট-নিয়ন্ত্রক,
প্রীতিপ্রাণ—এমনতর কেউ থাকেন—
তাঁরই অনুগমন ক’রো,
কিম্বা তা’ও যদি না পাও—
তবে, তাঁর কৃষ্টি-সন্ততির ভিতর
অমনতর গুণসম্পন্ন যিনি
তাঁরই অনুগমন ক’র পারম্পর্য্যে—
যতক্ষণ আবার
আগতের অভ্যুত্থান না হয়,
ঠকবে না—
শিষ্ট-সমন্বয়ে সম্বর্দ্ধনাও পাবে।” ৩৯ । (সম্বিতী)

১) তাঁতে অচ্যুত-সশ্রদ্ধ-আনতিসম্পন্ন,
২) প্রবুদ্ধ-সেবাপ্রাণ,
৩) তঁৎবিধি ও নীতির সুষ্ঠু পরিচারক ও পরিপালক,
৪) সানুকম্পী-চর্য্যানিরত,
৫) সমন্বয়ী-সামঞ্জস্য প্রধান,
৬) পদনির্লোভ,
৭) অদ্রোহী,
৮) শিষ্ট নিয়ন্ত্রক,
৯) প্রীতিপ্রাণ।
তাঁর সন্তান-সন্ততিগণের মধ্যে এই নয়টি বিশেষ গুণসম্পন্ন যিনি—অভাবে তাঁর কৃষ্টি সন্ততির অর্থাৎ শিষ্যবর্গের মধ্যে অমন গুণ সম্পন্ন যিনি তাঁরই অনুগমন কর !”

উক্ত বাণীর সরলার্থ,—যিনি অর্থ-মান-যশ ইত্যাদির নাগপাশ থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিজের চরিত্রে ঠাকুরত্বকে জাগ্রত করেছেন, তাঁকে কেন্দ্র করে চলতে হবে, তাঁকেই ইষ্টার্ঘ্য দিতে হবে। অন্যথায় বিপাক-গঞ্জনাকে মেনে নিতে হবে।
ওই বাণীর মর্মার্থ অনুযায়ী ১. ইষ্ট পরিবারের সব সদস্যরা মিলে যাঁকে উপযুক্ত নির্বাচন করবেন তাঁকে কেন্দ্র করে চলতে হবে। ২. ইষ্ট পরিবারের সদস্যরা যদি অমনতর গুণসম্পন্ন উপযুক্ত কাউকে নির্বাচিত না করতে পারেন তাহলে কৃষ্টিসন্তানদের মধ্য থেকে নির্বাচিত করতে হবে এবং তাঁর অনুগমন করে কেন্দ্রায়িত চলনে চলতে হবে।—অন্যথায় শ্রীশ্রীঠাকুরের নিদেশ অনুযায়ী বিপাক-গঞ্জনাকে মেনে নিতে হবে। এই বাণীতে বংশানুক্রমিক জ্যেষ্ঠ-পরম্পরার বিষয় কিন্তু উল্লেখ করেন নি।
———————

।।  সমাগত প্রজাতন্ত্র দিবসের ভাবনা ।।

** সমাগত প্রজাতন্ত্র দিবসের ভাবনা **
।। বর্তমান সভ্যতার সংকট ।।
বর্তমান সভ্যতার সংকট বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে সবকিছুর মূলে রয়েছে জৈবিক তাগিদের অসফল বিনিয়োগ । উক্ত বিনিয়োগজাত সন্তানেরা সভ্যতাকে উপঢৌকনও দিচ্ছে ইন্দ্রিয়পরায়নতা । অথচ আমাদের আদর্শ ছিল—“আত্মানং বিদ্ধি”, নিজেকে জানো, know thyself, “আত্মবত্‍ সর্বভূতেষু, মাতৃবত্‍ পরদারেষু, লোষ্ট্রবত্‍ পরদ্রব্যেষু।” সকলকে নিজসত্তার প্রতীক মনে কর, মেয়েদের নিজের মায়ের প্রতিরূপ ভেবে শ্রদ্ধা কর, অন্যের জিনিসকে মাটির ঢেলার মত দ্যাখ । ‘মা গৃধ’, লোভ কর না ।
যে উপনিষদের বাণীর উপরে উক্ত শাশ্বত সত্যসমূহ প্রতিষ্ঠিত, গণপ্রজাতন্ত্রী স্বাধীন ভারত সেই সত্যের সারমর্ম, “সত্যমেব জয়তে”-র আদর্শকে মাথায় নিয়ে একদিন যাত্রা শুরু করেছিল, যাকে আমরা আজো রাষ্ট্রের পবিত্র মন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে রেখেছি । অথচ ওইসব বিধিকে আড়াল করে পাশ্চাত্যের প্রবৃত্তি-পরিপোষিত শিক্ষায় প্রজাতন্ত্রী ভারতবর্ষের প্রজাদের শিক্ষিত করতে চাইছি । ফলে সন্ত্রাসবাদ, ভ্রষ্টাচার, যৌন-ব্যভিচার ক্রমবর্দ্ধমান। এর কারণ, “সত্যমেব জয়তে’’-কে বাস্তবে মূর্ত করে তোলার মত কোন ইন্দ্রিয়জয়ী সৎ-পুরুষের জীবন্ত আদর্শ অনুসরণ করছে না রাষ্ট্র।
ভারতের নিজস্ব অর্থশাস্ত্র, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে ।
सुखस्य मूलम् धर्म्मः
धर्म्मस्य मूलम् राष्ट्र,
राष्ट्रस्य मूलम् अर्थम् (पुरुषार्थ),
अर्थस्य मूलम् इन्द्रिय विजयम्,
इन्द्रिय विजयस्य मूलम् ज्ञानवृद्धसेवया,
ज्ञानवृद्धसेवया विज्ञानम् ।।
অর্থাত্‍ সুখের মূলে ধর্ম।
ধর্মের মূলে রাষ্ট্র । রাষ্ট্রের মূলে অর্থ (বর্ণাশ্রম এবং চতুরাশ্রমধর্ম পালন করে পরমার্থ লাভ।) অর্থের মূলে ইন্দ্রিয়বিজয়। (ইন্দ্রিয়জয়ী না হলে পরমার্থ লাভ হয় না।) ইন্দ্রিয়বিজয়ের মূলে জ্ঞানবৃদ্ধ সেবা। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়জয়ী হতে হলে সদগুরুর সারূপ্য লাভ করতে হবে । তাহলেই বিশেষ জ্ঞান লাভ হবে ।

উক্ত বিধি পালন করে প্রকৃষ্ট জাতক বা প্রজা সৃষ্টির প্রবহমানতাকে রক্ষা করে চলাই ছিল আর্য্য ভারতের আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্য। তাহলে প্রজাতন্ত্র মানে হচ্ছে, যে তন্ত্র বা system মেনে আদর্শ প্রজা নির্মাণ, পালন, পোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে রাষ্ট্রের সংহতি রক্ষায় প্রযত্নশীল থেকে পরম রাষ্ট্রিক সমবায়ের লক্ষ্যে এগিয়ে চলা যায়। ভারতের মেরুদন্ড আর্য্যকৃষ্টি। আর্য্যকৃষ্টির অনুশাসন, বর্ণাশ্রম, চতুরাশ্রম, দশবিধ সংস্কার প্রভৃতি উপেক্ষা করে প্রজা নির্মাণ সম্ভব নয়। ভারতের মহাকাব্য, বেদ, উপনিষদ, সংহিতা, আদর্শপুরুষ শ্রীরামচন্দ্র ও শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ ওইসব জীবনীয় সংস্কারের বার্তাবহ। যারমধ্যে নিহিত আছে ‘সত্যমেব জয়তে’-র মূলসূত্র।

বর্তমান সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানবৃদ্ধ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সভ্যতাকে সংকট থেকে মুক্ত করতে নিদান দিলেন :

“শাসন-সংস্থা যেমনই হোক,
যাতেই মাথা ঘামাও না,
যৌন-ব্যাপার শুদ্ধ না হলে
দেশের জীবন টিঁকবে না ।”
ওই যৌন ব্যাপারে শুদ্ধতা আনতে সত্যানুসরণে বললেন, “প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী । প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয় ।”
এবং পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, “স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যেজন, তাহার হয় না ভবের বন্ধন মোচন । স্ত্রী চিন্ময়ী মা ।”
তিনি তাঁর নারীর নীতির বিধানে কুমারী মেয়েদের এমন শ্রদ্ধা আকর্ষণী চলনে চলতে বললেন যেন তাকে দেখে পুরুষেরা “অবনতমস্তকে, নতজানু হ’য়ে,
সসম্ভ্রমে,
ভক্তিগদগদ কণ্ঠে–
‘মা আমার,–জননী আমার’ ! ব’লে
মুগ্ধ হয়, বুদ্ধ হয়, তৃপ্ত হয়, কৃতার্থ হয়,–
তবেই তুমি মেয়ে,
তবেই তুমি সতী ।” জ্ঞানে শ্রদ্ধা জানায় ।
যুগ-ধর্মে স্বীকৃত এবং নানাভাবে উৎসাহিত করার আত্ম-বিপণনী, লাস্যময়ী, যৌন-আকর্ষণী চলনার দর্শকাম, স্পর্শকাম, শ্রুতকাম কুপ্রভাব এড়িয়ে মমতাময়ী মায়েরা যদি নিজের নিজের মেয়েদের ওই শ্রদ্ধা-আকর্ষণী চলনার সিলেবাসটা শেখাতে পারেন তাহলে নারীজাতি মাতৃত্বের স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।

আর্য্য ভারতের হৃত-গৌরব ফিরিয়ে আনার স্বার্থে, “মেরা ভারত মহান” শ্লোগানকে বাস্তবায়িত করতে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রদত্ত “পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চি”র অনুশাসন আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের জীবন্ত সংবিধান শুধু নয় পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠনের সংবিধান। মানবসম্পদকে উন্নীত করতে এছাড়া কোন পথ নেই।
বিপন্ন আর্য্যকৃষ্টিকে রক্ষা করার বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সমাধানী সূত্র—
শ্রীশ্রীঠাকুর—পঞ্চবর্হিঃ বা পঞ্চাগ্নির উপর দাঁড়িয়ে কিছু লোক যদি জোরদার ভাবে দানা বেঁধে ওঠে, তবে সেই জীয়ন্ত দানাই ক্রমশঃ আরো বিস্তৃত ও শক্তিমান হয়ে ওঠে বহু সমস্যার সমাধান দিতে পারে। তোমাদের সৎসঙ্গের প্রাণশক্তি অতুলনীয়। যা আছে সেই সংগে আরো কতকগুলি দেবদক্ষ কর্মী যদি সব ছেড়ে-ছুড়ে দিয়ে পাগলের মতো নাছোরবান্দা হ’য়ে লাগত—অন্য কোন পিছুটান না রেখে, ইষ্টচিন্তা, ইষ্টকর্ম ও লোকহিতই যদি হ’তো তাদের একমাত্র ধ্যান, জ্ঞান, ধান্দা ও তপস্যা, তবে ঢের হ’তে পারতো, সবাই পেতে তার সুফল। তারাও পরম প্রাপ্তির অধিকারী হতো।
পঞ্চবর্হিঃ, সপ্তার্চ্চি, হলো আর্য্যকৃষ্টির মেরুদণ্ড ……. এগুলির রোজ স্মরণ করতে হয়। স্মরণ করা মানে শুধু চিন্তা করা নয়। (আঃ প্রঃ ১৪/৬২)
“হিন্দুমাত্রেরই পঞ্চবর্হি বা পঞ্চাগ্নি স্বীকার্য্য—তবেই সে সনাতন হিন্দু, হিন্দুর হিন্দুত্বের সর্ব্বজনগ্রহনীয় মূল শরণ-মন্ত্র ইহাই ! পঞ্চবর্হি যেমন প্রত্যেক হিন্দুর স্বীকার্য ও গ্রহনীয়,সপ্তার্চ্চিও তেমন প্রতি মানবের অনুসরণীয় ও পালনীয়”! (পুণ্য-পুঁথি, ১ম সংস্করণ)
তবে সবচাইতে দুঃখের বিষয়, মূল সৎসঙ্গের কর্তৃপক্ষ মূল আচার্য্যের ওই বিষয়কে বিসর্জন দিয়ে আচার্য্য-অনুশাসন-বিহীন সঙ্ঘ নির্ধারিত আচার্য্য-পরম্পরা লীলায় মেতে উঠেছেন। ওঁদের যা’তে বোধোদয় হয় সে-বিষয়ে সবাইকে প্রযত্ন নিতে হবে।
জয়গুরু। বন্দে পুরুষোত্তমম্!

।। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি ।।

** নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর শুভ জন্মদিন উপলক্ষ্যে শ্রদ্ধার্ঘ্য **
।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ও নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ।।


শুধুমাত্র বাঙালীই নয়, সমগ্ৰ ভারতবর্ষ এবং আন্তর্জাতিক স্তরের সুধীজন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর আপোষহীন সংগ্রাম ও তাঁর বীরত্বের আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে থাকেন। ভারত সরকার এবং প্রাদেশিক সরকারের নানাবিধ সমাজ সংগঠনের পক্ষ থেকে তাঁর জন্মদিন উপলক্ষ্যে অনেক কর্মসূচী গৃহীত হয়ে চলেছে। তাঁর আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়েছে।
নেতাজীর জীবন কাহিনীর অনেক সুপ্ত গৌরবময় ঘটনা রয়েছে, যা হয়তো সকলে জানেন না। সেই অজানা কাহিনীর কিয়দংশ নিবেদন করার চেষ্টা করছি।
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর মামা তৎকালিন খ্যাতনামা ব্যারিষ্টার জে. এন. দত্ত শ্রীশ্রীঠাকুরের আশ্রিত হয়েছেন শুনে নেতাজীর পিতৃদেব জানকীনাথ বসু ও মাতৃদেবী প্রভাবতী দেবী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শে দীক্ষিত হন। তাঁরা ঠাকুরের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। হিমাইতপুর আশ্রম নির্মাণে তাঁদের আর্থিক অবদান এবং নিজ হস্তে শ্রমদান সৎসঙ্গের ইতিহাসের এক স্বর্ণালী অধ্যায় রূপে নন্দিত হয়ে আছে।
শ্রীক্ষেত্র পুরী ধামের আর্মস্ট্রং রোডে নেতাজীর পিতামহ হরনাথ বসুর স্মৃতি রক্ষার্থে নেতাজীর পিতৃদেব জানকীনাথ বসু ‘হরনাথ লজ’ নামে যে গৃহ নির্মাণ করেছিলেন সেই অঙ্গনকে পুরুষোত্তম পদার্পণে ধন্য করতে প্রায় ২০০ জন ভক্তসহ ঠাকুরকে পুরীতে নিয়ে গিয়েছিলেন নেতাজীর পিতৃদেব । সেদিনটি ছিল ১৯২২ সালের ৩১শে ডিসেম্বর। ভক্তপার্ষদসহ প্রায় দুমাস পুরীসহ সন্নিহিত অঞ্চলকে কীর্তনানন্দের ভক্তিরসের অমৃত ধারায় নিমজ্জিত করে আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামীকে উ়ড়িষ্যা প্রদেশে প্রচারের জন্য থাকতে বলে সপার্ষদ হিমাইতপুরে ফিরে এসেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর।
এই আদর্শ সৎসঙ্গী পরিবারের সন্তান নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু মা-বাবার কাছেই ঠাকুরের অমৃত জীবন কথা শুনে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু তিনবার ঠাকুর দর্শনে আসেন। প্রথমবার আসেন I.C.S পাশ করার পর। ঠাকুর তখন কলকাতায় ছিলেন। তারপর আরো দুবার হিমাইতপুরে এসেছিলেন ঠাকুর দর্শনে। নেতাজী ঠাকুর দর্শনে হিমাইতপুর, পাবনা সৎসঙ্গ আশ্রমে এলে ঠাকুরের অন্যতম পার্ষদ পূজনীয় কর্মবীর শ্রীসুশীলচন্দ্র বসু তাঁকে আশ্রমের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখান। ঠাকুরের মতাদর্শ ও তাঁর পরিকল্পনার বিভিন্ন বিষয় নেতাজীর কাছে তুলে ধরেন সুশীলদা। আশ্রম ঘুরে নেতাজী ভাবলেন যে, ঠাকুরের অধিকাংশ প্রচারকেরা বিবাহিত এবং সংসারী। ঠাকুরকে মাথায় নিয়ে, সংসার ঠিক রেখেও বিশ্বসংসারের মাঙ্গলিক-ব্রতে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন এঁরা। তারপর আশ্রম ঘুরে দেখে নেতাজী সুশীলদাকে বলেছিলেন– “সাধারণতঃ আশ্রম বলতে লোকে সন্ন্যাসী বা গৃহত্যাগীদের আশ্রমই বোঝে। গৃহী হয়ে পরিবারসহ আশ্রম জীবন-যাপন করবার দৃষ্টান্ত আপনারাই প্রথম দেখালেন। পরিবার, পরিজন এবং পরিবেশের সবরকম দায়দায়িত্ব বহন করে, দৈন্য অভাব অভিযোগের মধ্য দিয়ে আপনারা এগিয়ে চলেছেন। তাই আমার মনে হয়, আপনারা দেশ গঠনের একটা বড় গুরুদায়িত্ব নিয়েছেন। আপনারা যদি সত্যি সত্যি এভাবে আশ্রম গড়ে তুলতে পারেন তাহলে আপনারা দেশের কাছে একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন। গৃহী হয়েও যে আশ্রমজীবন যাপন করা যায়, একথা লোকের কাছে আর অবিশ্বাস্য বলে বোধ হবে না। তারপর নেতাজী ঠাকুরের কাছে এসে ভক্তি ভরে প্রণাম করলেন। নেতাজীকে বসবার জন্য যে চেয়ার দেওয়া হয়েছিল সেখানে তিনি বসলেন না। মাতৃভক্ত নেতাজী বলেছিলেন– “ঠাকুর আমার মায়ের ইষ্ট, তাঁর সামনে আমি চেয়ারে বসতে পারি না।” বলে ঠাকুরের পদপ্রান্তেই বসে পড়েছিলেন নেতাজী। ঠাকুর সস্নেহে নেতাজীর মা-বাবা এবং পরিবারের অন্যান্য সকলের কুশল সংবাদ নিলেন। তারপর নেতাজী ঠাকুরকে বললেন– “দেশের তো নানা কাজই করবার আছে। তা দেশের প্রকৃত সেবা করতে হলে কোথা থেকে আরম্ভ করতে হবে? এ বিষয়ে আপনার মত কি?” শ্রীশ্রীঠাকুর নেতাজীর দিকে গভীর স্নেহল দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর ভাব বিভোর কন্ঠে বললেন—“আমার কথা হচ্ছে দেশের কাজ করতে হলে প্রথম মানুষ তৈরীর কর্মসূচী নিতে হবে। ভাল মানুষ পেতে হলেই বিবাহ-সংস্কার আশু প্রয়োজন। আর এটা এমনভাবে করতে হবে যাতে সব বিয়েগুলিই Compatible (সুসঙ্গত) হয়, আর Compatible বিয়ে মানেই বিহিত সঙ্গতি। বর্ণ, বংশ, আয়ু, স্বাস্থ্য ইত্যাদি সব হিসাব করে দেখে শুনে কাজ করতে হবে। বিহিত বিবাহ হলেই ভাল সন্তানাদি জন্মাবে আর তখন তাদের দ্বারাই দেশের, দশের সবারই মঙ্গলব্রতের কাজ করা যাবে। সেইজন্য মানুষ তৈরীর ব্যবস্থা আগে করা প্রয়োজন। দাশদা (দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ) যখন আমায় বললেন যে, তিনি মানুষ খুঁজে পাচ্ছেন না, যার উপর ভার দিয়ে তিনি একটু বিশ্রাম নিতে পারেন। —তার উত্তরে আমি একথাই বলেছিলাম।”
ঠাকুরের কথা শুনে নেতাজীর চোখেমুখে গভীর চিন্তার ছাপ পড়ল। তাঁর চিন্তা জগত নতুন আলোড়ন সৃষ্টি হলো যেন।
নেতাজী ঠাকুরকে বললেন, —“বিবেকানন্দও মানুষ তৈরীর কথা বলেছেন, এবং তা যে আশু প্রয়োজন তা ভেবেছি, কিন্তু তা করতে হলে যে বিবাহ সংস্কার প্রয়োজন তা ভেবে দেখিনি।…. এখন ভেবে দেখছি ভাল সংস্কার-সম্পন্ন শিশু যদি না জন্মায় শুধু শিক্ষা তাদের বিশেষ কি করতে পারে ? বীজ থেকেই তো গাছ হয়, বীজ ভাল হলেই গাছ ভাল হবে। এটা আপনার কথা শুনে বুঝতে পারছি। কিন্তু এতে দীর্ঘসময় সাপেক্ষ।”
ঠাকুর দৃপ্তকন্ঠে বললেন—“দীর্ঘ সময় তো নেবেই—আমরা তো এতদিন পর্যন্ত জাতির বা সমাজের স্থায়ী কল্যাণের জন্য কিছুই করিনি। বহু গলদ জমে গেছে। সাফ করতে সময় নেবে বৈকি ? কোন Shortcut Programme (সংক্ষিপ্ত কর্মসূচী) এ জাতির সত্যিকার কল্যাণ হবে বলে আমার মনে হয় না।”
উপরোক্ত ঐতিহাসিক আলাপচারিতার পর অনেকদিন অতিবাহিত হয়েছে, কিন্তু মানুষ তৈরির মূল বিষয়টি নিয়ে তেমন অগ্রগতি হয়নি। তাই আজকের এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার স্বার্থে আমাদের সকলকে বিবাহ সংস্কারের উপর গুরুত্ব দিতেই হবে।

এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত কিছু অনুভব নিবেদন করছি।
১. প্রতিটি পরিবারের কুলপঞ্জীকরণ।
২. বর্ণ চিহ্নিত করণ এবং বর্ণানুগ কর্মে উৎসাহিত করা।
৩. দীক্ষাপত্রে সংরক্ষিত তথ্যগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষিত করে অঞ্চলভিত্তিক পাত্র এবং পাত্রীদের যোটক নির্বাচন করে বিবাহ সম্পাদন করা।
৪. প্রতিটি অধিবেশনে বিবাহ বাস্তবায়ন বিষয়ে আলোচনা করা এবং তথ্য সংগ্রহ করে পারস্পরিক আদান-প্রদান করা, যা’তে সহজেই পাত্র-পাত্রী নির্বাচন করা যায়।
শ্রীশ্রীঠাকুর ম্যারেজ ব্যুরো গঠন করে বিবাহ আন্দোলন বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। পঞ্চবর্হি এবং সপ্তার্চ্চি-র আদর্শের উপর ভিত্তি করে আমরা যদি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করি, তাহলে সম্ভব।
এ বিষয়ে আপনাদের সুচিন্তিত মতামত জানালে ভালো হয়। জয়গুরু।
সবাইকে আমার জয়গুরু ও প্রণাম।
——————-+++—————
নিবেদনে—তপন দাস