নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু প্রসঙ্গে

।। পুরানো সেই দিনের কথা ।।


১৯২২ সালের পূজাবকাশের পর পাবনা আশ্রমে আসেন নেতাজী সুভাষচন্দ্রের ধর্মপ্রাণ পিতৃদেব কটকের ভূতপূর্ব সরকারী উকিল রায়বাহাদুর জানকীনাথ বসু ও ভক্তিমতী জননী প্রভাবতী দেবী। তাঁরা উভয়েই ছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের একান্ত অনুগত ভক্ত। সেইসময় একদিন কথাপ্রসঙ্গে সুভাষ-জননী শ্রীশ্রীঠাকুরকে পুরী নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা মাতা মনোমোহিনী দেবীর নিকট প্রকাশ করেন। মাতা মনোমোহিনী সে কথা শ্রীশ্রীঠাকুরকে জ্ঞাপন করেন। শ্রীশ্রীঠাকুর শুনে বললেন – “আমার যাওয়া তো মুশকিল! কেননা, আমার পুরী যাওয়ার সংবাদ পেলে সৎসঙ্গীরা যে যেখানে আছে, সব পুরী গিয়ে উপস্থিত হবে। তাদের সকলের তাল সামলাতে বোসমা ও বোসদার অনেক বেগ পেতে হবে।” তা শুনে জানকীবাবু ও বোসমা উভয়ে বললেন, “আমরা সে জন্য প্রস্তুত হয়েই আছি। ভক্তদের সেবা করব – এর চেয়ে অর্থব্যয়ের শ্রেষ্ঠ সার্থকতা কোথায়?”

তাঁদের একথা শুনে শ্রীশ্রীঠাকুর রাজী হয়ে গেলেন। তাঁদের ঐকান্তিক আগ্রহ ও অনুরোধে শ্রীশ্রীঠাকুর পরিবারবর্গ ও ভক্তবৃন্দসহ বঙ্গাব্দ ১৩২৯ সনের ১৬ই পৌষ রবিবার মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের সর্বশেষ লীলাভূমি নীলাচলে রওয়ানা হন।
পুরীধামে সমুদ্রতীরে আর্মস্ট্রং রোডের উপর অবস্থিত বসু মহাশয়ের নিজস্ব ভবন ‘হরনাথ লজ’ -এ শ্রীশ্রীঠাকুর ও তাঁহার পরিবারবর্গের জন্য বাসস্থান নির্দিষ্ট করা হয়। নিকটের আরও কয়েকটি বড় বড় বাড়ীতে অপর সকলের থাকবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। শ্রীশ্রীঠাকুর পুরীতে গেছেন শুনে কলকাতা ও ভারতের নানা স্থান থেকে বহু গুরুভাই পুরীতে গিয়ে উপস্থিত হলেন। তাঁদের অবস্থানের জন্যও আরও বাড়ী নেওয়া হল। এই অসংখ্য জনমণ্ডলীর সেবার জন্য বসু দম্পতি আপ্রাণ ছিলেন। শ্রীশ্রীঠাকুর সহ সমবেত ভক্তমণ্ডলী প্রায় দুই মাস পুরীতে অবস্থান করেন। এই এতদিন ধ’রে শ্রীশ্রীঠাকুরের যথাযোগ্য সেবাপূজা এবং ভক্তবৃন্দের যথোচিত সম্বর্ধনায় সস্ত্রীক জানকীনাথ যে অপূর্ব নিষ্ঠা, উদারতা ও মহত্ত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন তা অবর্ণনীয় !
শ্রীশ্রীঠাকুর পুরী অবস্থানকালে ‘হরনাথ লজ’ সর্বদাই কল-কোলাহলে মুখরিত এবং পুরী শহর শঙ্খনিনাদ সহ উন্মত্ত কীর্তনে উদ্বেলিত হয়ে থাকত। একদিকে শ্রীশ্রীঠাকুরের সাথে সৈকতভূমিতে সেই তুমুল সংকীর্তন সহ পাগলকরা উদ্বাহ নৃত্য ও অন্যদিকে সমুদ্রবক্ষে উদ্দাম তরঙ্গপ্রবাহের মিলিত আনন্দোল্লাস কেউ কোনদিন ভুলতে পারবে না!
নিত্যই শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ ও স্থানীয় জনসাধারণ তাঁদের নিজ নিজ জীবনের নানা জটিল সমস্যাদির সমাধানের জন্য তাঁর শ্রীচরণে প্রার্থনা জানাতে থাকেন। শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সহজ সরল মীমাংসা দান করতে থাকেন। তাতে সকলের মনেই এক দিব্য ভাবোন্মাদনার সঞ্চার হ’তে থাকে। আর্ত, ব্যথিত উৎকলবাসীরা সর্বশঙ্কা মুক্ত হ’য়ে অসীম স্বস্তি ও শান্তি লাভ করেন। শ্রীশ্রীঠাকুরের পুরী প্রবাস কালে বহু উৎকলবাসী এই অভিমত পোষণ তথা ব্যক্ত করেন যে, “পুরীধামে শ্রীচৈতন্যদেবের নবকলেবরে পুনরাবির্ভাব ঘটেছে।”
পুরী যাত্রাকালে আমরা কলকাতা থেকে শ্রীহরেকৃষ্ণ সাহা নামে একজন পেশাদার ফটোগ্রাফারকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম। বার-চোদ্দ দিন তিনি আমাদের সঙ্গেই থাকলেন কিন্তু ঠাকুরের ফটো তোলা আমাদের একান্ত আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও, তাঁর অনুমতি না পাওয়ায়, এত দিনের মধ্যেও কোন ফটো তোলা সম্ভব হল না। এদিকে ফটোগ্রাফার ভদ্রলোকটিও দেশে ফেরার জন্য অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। এতে আমাদের সবারই মন খুবই ভেঙে গেল। এমত অবস্থায় আমরা সমস্ত গুরুভাই একত্রে শ্রীশ্রীঠাকুরের সামনে উপস্থিত হয়ে আমাদের ঐকান্তিক মনোভিলাষ নিবেদন করলাম। মনে পড়ে, সেই দিনই শ্রীশ্রীঠাকুর আমাকে ডেকে বলেন, “যতীনদা, পর্যাপ্ত পরিমাণ ফুল যোগাড় করতে পারেন?” আমি সানন্দে বললাম, – “নিশ্চয়ই পারব।”
শ্রীশ্রীঠাকুর তখন অনন্ত মহারাজকে ডেকে বলেন,-“অনন্ত, কাল ভোরে আমি, ফটোগ্রাফার এবং আর জন কয়েককে সঙ্গে নিয়ে সমুদ্রের ধারে পাল-দার (অবিনাশচন্দ্র পালের) বাড়ীর সামনে যাব। তখন যেন অন্য কেউ সেখানে না যায়, তুই এখানে থেকে তার ব্যবস্থা করবি।”
শ্রীশ্রীঠাকুর ভোরবেলা জননী দেবী, বাগবাজারের দুর্গামাসীমা, ফটোগ্রাফার ও আমাকে সঙ্গে নিয়ে সমুদ্রতীরে উপস্থিত হলেন। সেখানে তিনি একখানা বেঞ্চের উপর মাসীমাকে বসিয়ে তাঁর কোলে মাথা রেখে শয়ন করলেন এবং জননী দেবীকে তাঁর পাশে দাঁড়াতে অনুরোধ করলেন। আমাকে ডেকে বললেন,- “যত ফুল এনেছেন, মা’র পায় দিয়ে পুজো করুন এবং এই অবস্থায় মার ফটো নিতে বলুন।”
শ্রীশ্রীঠাকুরের নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করা হল। কিন্তু আমার মনে এই ভেবে ভীষণ দুঃখ হতে লাগল যে,- যত ফুল এনেছিলাম, সবই তো জননী দেবীর চরণে দেওয়া হল, শ্রীশ্রীঠাকুরের পায়ে তো কিছুই দেওয়া হল না। আর, শ্রীশ্রীঠাকুরের একক কোন ফটোও নেওয়া হল না। আমার মনের তৎকালীন অত্যন্ত বিষণ্ণ অবস্থায় শ্রীশ্রীঠাকুর হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,- “যতীনদা, ঠাকুরের ফটো নেবেন নাকি?” তাঁর কথায় আহ্লাদে আটখানা হয়ে আমি বললাম,- “হাঁ নিশ্চয়ই। ঠাকুরের ফটোর জন্যই তো ফটোগ্রাফার হরেকৃষ্ণদাকে এতদিন ধরে এখানে এনে রাখা হয়েছে।”
আমার কথার সঙ্গে সঙ্গেই শ্রীশ্রীঠাকুর মাসীমার কোল থেকে উঠে পড়লেন। এরপর নিজের পরনের কোচার কাপড় ছেড়ে দিয়ে সমুদ্র-সৈকতে গিয়ে দাঁড়ালেন। ফটোগ্রাফার হরেকৃষ্ণদা এই অবস্থায় শ্রীশ্রীঠাকুরের দু’খানি ছবি তুললেন। তারপর আমরা সবাই বাড়ী ফিরে এলাম।
শ্রীশ্রীঠাকুরের ছবির একখানা ফিল্ম ঐ দিনই ওয়াশ করা হল। দুঃখের কথা আর বলবার নয়, দেখা গেল ছবিখানার দুটো চোখই নষ্ট। এই ঘটনায় একান্ত মনো-দুঃখে কাতর হ’য়ে তাঁর চরণেই বিষয়টি নিবেদন করলাম। আমার কথা শুনে তিনি হাসতে হাসতে বললেন,- “সেকি ! ফটো আবার খারাপ হবে কেন? ভাল ক’রে ওয়াশ করতে বলুন।” হরেকৃষ্ণদা পুনরায় যত্ন সহকারে ছবিখানা ওয়াশ করলেন। এবার দেখা গেল, ছবিখানা সর্বাংশেই অতুত্তম হয়েছে। আমি মনের আনন্দে ছুটে গিয়ে ছবিখানা শ্রীশ্রীঠাকুরের হাতে দিলাম। শ্রীশ্রীঠাকুর ছবিখানা বারংবার আপন বক্ষ ও শিরোদেশে ঠেকাতে ঠেকাতে হঠাৎ একবার ভাবাবেগে বলে উঠলেন,- “এটাই পরমপিতার প্রকৃত প্রতিকৃতি।”

তথ্যসূত্র – [শ্রীব্রজগোপাল দত্তরায়ের “শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র”,শ্রীযতীন্দ্রনাথ বসুর বিবৃতি]।

বর্ষ বিদায় বর্ষ বরণ

।। খ্রীস্টাব্দ ২০২৪কে বিদায় ও ২০২৫কে বরণ, তথা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত সৎসঙ্গের ঋদ্ধি-তপনার ঋত্বিক সম্মেলন বনাম যুগধর্মের উৎসব স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।


বর্তমানে প্রচলিত সময় পরিমাপক একক সেকেণ্ড, মিনিট, ঘণ্টা ইত্যাদির পূর্বে, পুরাকালে, পল, দণ্ড, কলা, মুহূর্ত, প্রহর প্রভৃতি কালনির্ণয় সূচক দিয়ে পৃথিবীর আহ্নিক গতিকে ১ অহোরাত্র ধরা হতো। ৩০ অহোরাত্রে ২ পক্ষ বা ১ মাস। ৬ মাসে ১ অয়ন। ২ অয়নে ১ বর্ষ। অপরপক্ষে উত্তরায়নে দেবতাদের ১ দিন, দক্ষিণায়নে ১ রাত। দেবতাদের ১ বছর সমান মানুষের ৩৬০ বছর ধরা হয়। বায়ুপুরাণে সৌর, সৌম্য, নাক্ষত্র এবং সাবন নামে চার প্রকার সময় নিরূপণ মাসের উল্লেখ আছে। ৩০ সূর্যোদয়ে সাবনমাস। সূর্যের রাশি পরিবর্তনে হয় সৌরমাস। কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ থেকে শুক্লপক্ষের পূর্ণিমা পর্যন্ত চান্দ্রমাস। চন্দ্রের নক্ষত্র ভোগকালকে বলা হয় নাক্ষত্রমাস। ৫ সৌরবর্ষে ১ নৈসর্গিক যুগ। (কোনো একটিমাসের আবর্তন কালকে একক ধরে নৈসর্গিক যুগের গণনা শুরু করা যেতে পারে।) ১ হাজার নৈসর্গিক যুগে ১ কল্প। সপ্তর্ষিরা ১০০ বছর করে এক একটি নক্ষত্রে কেন্দ্রীভূত থাকে। ২৭টি নক্ষত্র ভোগকাল ২৭০০ বছর—একটি সপ্তর্ষিযুগ। এই সপ্তর্ষিযুগের গণনা প্রাচীন ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল। ভারতের অন্যতম জ্যোতির্বিদ আর্য্যভট্ট নক্ষত্রাদির সাথে মেষরাশির অবস্থানকে কেন্দ্র করে কল্যব্দের সূচনা করেন ৩১০১ খৃঃ পূঃকে একক ধরে। সেই হিসেব এবং রাশির অবস্থান ধরে উত্তরায়নে ভীষ্মের দেহত্যাগ এর হিসেব কষে ২১৪২ খৃঃ পূঃ কে শ্রীকৃষ্ণের জন্মবর্ষ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
আমরা যে খৃষ্টাব্দ বলি এটা হচ্ছে গ্রেগরীয়ান ক্যালেণ্ডার। এটা একটি সৌর সন। নানা পরিবর্তন, পরিমার্জন, পরিবর্ধন, বিবর্তন এবং যোগ-বিয়োজনের মধ্য দিয়ে এ বর্তমান কাঠামো লাভ করেছে। উল্লেখ্য সৌর সনের সাথে ঋতুর সঙ্গে সম্পর্ক থাকে। বর্ষপঞ্জিকা প্রচলন অল্প পরিসরে প্রাচীন সুমের সভ্যতায় পরিলক্ষিত হয়। তবে মিশরীয় সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীনতম সৌর ক্যালেণ্ডার উদ্বোধন করে বলে জানা যায়। প্রাচীন মিশরীয় ক্যালেণ্ডার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, খৃস্টপূর্ব ৪২৩৬ অব্দ থেকে ক্যালেণ্ডার ব্যবহার গ্রহণ করে। রোমানরা তাদের প্রথম ক্যালেণ্ডার লাভ করে গ্রীকদের কাছ থেকে। রোমানদের প্রাচীন ক্যালেণ্ডারে মাস ছিল ১০টি এবং তারা বর্ষ গণনা করতো ৩০৪দিনে। মধ্য শীত মৌসুমের ৬০ দিন তারা বর্ষগণনায় আনতো না। রোমানদের বর্ষ গণনার প্রথম মাস ছিল মার্চ। তখন ১লা মার্চ পালিত হতো নববর্ষ উৎসব। শীত মৌসুমে ৬০ দিন বর্ষ গণনায়না আনার কারণে বর্ষ গণনায় যে দুটি মাসের ঘাটতি থাকতো তা পূরণ করবার জন্য তাদের অনির্দিষ্ট দিন-মাসের দ্বারস্থ হতে হতো। এই সব নানা জটিলতার কারণে জনসাধারণের মধ্যে তখন ক্যালেণ্ডার ব্যবহার করার প্রবণতা একেবারেই ছিল না। রোমের উপাখ্যান খ্যাত প্রথম সম্রাট রমুলাসই আনুমানিক ৭৩৮ খৃস্টপূর্বাব্দে রোমান ক্যালেন্ডার চালু করার চেষ্টা করেন। পরবর্তীকালে রোমান সম্রাট নূমা ১০ মাসের সঙ্গে আরো দুটো মাস যুক্ত করেন। সে দুটো মাস হচ্ছে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি। তিনি জানুয়ারিকে প্রথম মাস ও ফেব্রুয়ারিকে শেষ মাস হিসাবে যুক্ত করেন। জানুয়ারি মাস ধার্য করা হয় ২৯ দিনে এবং ফেব্রুয়ারি মাস ধার্য করা হয় ২৮ দিন। এ ছাড়াও তিনি মারসিডানাস নামে অতিরিক্ত একটি মাসেরও প্রবর্তন করেন। এই মারসিডানাস মাস গণনা করা হতো ২২ দিনে। এই অতিরিক্ত মাসটি গণনা করা হতো এক বছর অন্তর ফেব্রুয়ারি মাসের ২৩ ও ২৪ তারিখের মাঝখানে। খৃস্টপূর্ব ৪৩২ অব্দে সম্রাট নূমা কর্তৃক প্রবর্তিত মাসের হিসেব পরিমার্জন ও পরিবর্তন করা হয়। পরবর্তীকালে রোমানরা চার বছর অন্তর লীপ ইয়ারের হিসেব প্রবর্তন করে। এ হিসেবেও এক বছরের সঙ্গে অন্য বছরের দিন সংখ্যার হেরফের হতে থাকে। চার বছর অন্তর অতিরিক্ত একটি দিন যোগ করলে দেখা যেতো দিনের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সীজার মিশরীয় ক্যালেন্ডার রোমে চালু করেন। তিনি জ্যোতির্বিদদের পরামর্শে খৃস্টপূর্ব ৪৬ অব্দে সেই বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের মাঝখানে ৬৭ দিন এবং ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে ২৩ দিন এই মোট ৯০ দিন যুক্ত করে ক্যালেণ্ডার সংস্কার করেন। এই ক্যালেন্ডার জুলিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত হয়। এই ক্যালেন্ডারে মার্চ, মে, কুইন্টিলিস (জুলাই) ও অক্টোবর দিন সংখ্যা ৩১ দিন, অপরদিকে জানুয়ারি ও সেক্সটিনিস (আগস্ট) মাসের সঙ্গে দুইদিন যুক্ত করে ৩১ দিন করা হয়। ফেব্রুয়ারি মাস ২৮ দিনেই গণনা হতে থাকে। তবে প্রতি চার বছর অন্তর একদিন যুক্ত করা হয়। জুলিয়াস সীজারের নামানুসারে প্রাচীন কুইন্টিলিস মাসের নাম বদলিয়ে রাখা হয় জুলাই। ৪৪ খৃস্ট পূর্বাব্দের ১৫ মার্চ জুলিয়াস সীজার রোমনগরে নিহত হন। অন্যদিকে সম্রাট অগাস্টাসের নামানুসারে সেক্সটিনিস মাসের নাম পাল্টিয়ে অগাস্ট করা হয়। মিশরীয়রা সৌর বর্ষ গণনা করতো ৩৬৫ দিনে। কিন্তু জুলিয়াস সীজারের সংস্কারের ফলে তা তিনশ’ সাড়ে পঁয়ষট্টি দিনে এসে দাঁড়ায়। তখন থেকে বর্ষপঞ্জিতে ১ মার্চের পরিবর্তে ১ জানুয়ারীতে নববর্ষ প্রচলন হয়। খৃষ্টাব্দের সংখ্যাকে ৪ দিয়ে ভাগ করলে যদি মিলে যায়, তবে সে বছর ফ্রেব্রুয়ারী মাস ২৮ দিনের পরিবর্তে ২৯ দিন হবে। । যীশুখৃস্টের জন্ম বছর থেকে গণনা করে ডাইওনীসিয়াম এক্সিগুয়াস নামক একখৃস্টান পাদরী ৫৩২ অব্দ থেকে খৃস্টাব্দের সূচনা করেন। ১৫৮২ খৃস্টাব্দে রোমের পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরী জ্যোতির্বিদগণের পরামর্শে জুলিয়ান ক্যালেণ্ডার সংশোধন করেন। তার নির্দেশে ১৫৮২ খৃস্টাব্দের অক্টোবর ১০ দিন বাদ দেয়া হয়, ফলে ঐ বছরের ৫ তারিখকে ১৫ তারিখ করা হয়। পোপ গ্রেগরী ঘোষণা করেন যে, যেসব শত বর্ষীয় অব্দ ৪০০ দ্বারা বিভক্ত হবে সেসব শতবর্ষ লিপ ইয়ার হিসাবে গণ্য হবে। পোপ গ্রেগরীর বর্ষপঞ্জি সংস্কারের পর থেকে রোমান বর্ষপঞ্জি পন্ডিতদের কাছে গ্রেগরীয়ান বর্ষপঞ্জি হিসাবে খ্যাত হয়েছে। কিন্তু এ সংস্কার মানুষ সহজে মেনে নেয়নি। ইউরোপের দেশে দেশে এনিয়ে চলছিল দীর্ঘদিনের বাদ-প্রতিবাদ। তদুপরি খৃষ্টানদের রোমের ‘ক্যাথলিক’ বনাম ‘প্রোটেসটেন্ট’ বিরোধের কারণে গ্রেগরীয়ান সংস্কার গ্রহণে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছিল। অবশেষে ১৭৫২ সালে ইংল্যান্ডে ১৯১২ সালে চীনে ও আলবেনিয়াতে, ১৯১৮ সালে রাশিয়াতে ও ১৯২৭ সালে তুরস্কে সরকারীভাবে গ্রেগরীয়ান বর্ষপঞ্জি গৃহীত হয়। যীশুখৃষ্টের নামের সঙ্গে রোমানদের ধারাবাহিক বর্ষ গণনা বা খৃষ্টাব্দ অপেক্ষাকৃত পরবর্তীকালের সংযোজন। যীশুখৃষ্টের দেহত্যাগের ৭৫০ বছর পরে রোমের খৃষ্টান পাদ্রীগণ ধারাবাহিক বর্ষ হিসাবে যীশুর স্মরণে পশ্চাদ গণনার মাধ্যমে খৃষ্টাব্দ চালু করেন। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী যীশুর জন্ম বর্ষকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ‘খৃষ্টাব্দ’ চালু হয়েছে। সে হিসাবে বলা চলে যীশুখৃষ্টের জন্ম হয়েছিল ২০০৭ বছর আগে। আসলে কিন্তু তা নয়। যীশুর জন্ম বর্ষ পাবার জন্য প্রচলিত খৃষ্টাব্দের সঙ্গে আরও ৪ বছর যোগ করতে হবে। সম্ভবত তাঁর মৃত্যুবরণের ৭৫০ বছর পরে ‘খৃষ্টাব্দ’ চালু করার সময় রোমান পাদ্রীগণ প্রকৃত তথ্য খুঁজে পেতে ভুল করেছিলেন। তাছাড়া এ মহাপুরুষের প্রকৃত জন্মদিন বা তারিখ সম্পর্কেও বিভ্রান্তি রয়েছে। আজকাল সারা বিশ্বব্যাপী ২৫ ডিসেম্বর যীশুর জন্মদিন বা বড়দিন পালিত হয়। এক সময়ে খৃষ্টান পাদ্রীগণ জানুয়ারী মাসে যীশুর জন্মদিন পালন করতেন, তারও আগে ২০ মে তারিখ জন্মদিন উদ্যাপিত হত। ১ জানুয়ারী রোমান বর্ষপঞ্জির নববর্ষ; এদিনে খৃষ্টীয় সনের খৃষ্টাব্দের নববর্ষ শুরু হয়। কমবেশী সারাবিশ্বে দিবসটির একটি আবেদন রয়েছে। আমরা ১ জানুয়ারী থেকে নতুন ক্যালেণ্ডার ব্যবহার করি। এই গ্রেগরীয়ান নূতন বছর বা খৃষ্টীয় সনকে ইংরেজি বর্ষপঞ্জি তথা ইংরেজি সন বলার প্রবণতা দেখা যায়। অনেকেই ১ জানুয়ারিকে ইংরেজি নববর্ষ হিসাবে চিহ্নিত করেন। অথচ ইংরেজি বর্ষপঞ্জি বা ইংরেজি সন বলতে প্রকৃত প্রস্তাবে কিছুই নেই। (সূত্র : সংগৃহীত)


গণনার হিসেবের তারতম্য হলেও, দিনরাত-মাস-বছর হয়েই চলেছে আদিকাল থেকে প্রাকৃতিক নিয়মে। দিন-মাস-বছর আসে যায়, রেখে যায় কিছু স্মৃতি মনের মণিকোঠায়। ওইসব স্মৃতির মালাগুলোকে স্মৃতিবাহীচেতনার ভল্টে অনন্তকাল জমা করে রাখার জন্য আর্য্য-ঋষিরা প্রতিটি মুহূর্তের জীবন ধারণের আহরণকে শুদ্ধি করার মাধ্যমে ধ্রুবাস্মৃতির সন্ধান দিয়ে গেছেন। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র স্বস্ত্যয়ণী ব্রতের “নিয়তং স্মৃতিচিদযুতে” মন্ত্রে যাকে সমৃদ্ধ করেছেন। কেননা, যে মুহূর্ত চলে যাবে তা আর ফিরে আসবে না। চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা সমৃদ্ধ সবুজ গ্রহ পৃথিবীর প্রতিটি মুহূর্তকেই যাতে চিরনবীনতায় আস্বাদন করতে পারি, উপভোগ করতে পারি সেজন্যই আর্য্য সভ্যতার ঊষা লগনে পরমপিতার প্রতিভূ আর্য্য ঋষিগণ ‘‘মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ……..’’ মন্ত্রে বন্দনা করে বসুন্ধরার মধুময় পরিবেশকে রক্ষা অর্থাৎ পূজা করতে শিখিয়েছিলেন। পূজা শব্দের অর্থ সম্বর্দ্ধনা। যেমন যেমন আচরণে পরিবেশের অজৈব উপাদানসমূহকে রক্ষা করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া যায় তাই ছিল আর্য্য ভারতের পূজা, যজ্ঞ, হোম বা উৎসবের তাৎপর্য্য ।
আমরা যে ৩৩ কোটি দেবতার কথা শুনেছি সে সংখ্যাটা বাস্তবে ৩৩,০০০০০০০ নয়, শুধুই ৩৩। কোটি অর্থে piece বোঝান হয়েছে, যথা, জীবকোটি, ঈশ্বরকোটি শব্দ একক অর্থে ব্যবহৃত হয়।
এই সবুজ গ্রহের জীবকূলের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জৈবাজৈব রসদের যোগানদাতার মূল মালিক সূর্য। সূর্যের আর এক নাম আদিত্য। আদিত্য মানে দেবতা, দেদীপ্যমান যা’ তাকে দেবতা বলে। পৃথিবী, অন্তরীক্ষ ও দ্যুলোকের প্রতিটি স্থানে ১১টি করে বেঁচে থাকার আবশ্যিক উপাদান সরবরাহকারী দেদীপ্যমান উৎস রয়েছে। প্রাকৃতিক ওই ৩৩টি বা ৩৩কোটি উৎসকে রক্ষা করার প্রশ্নে আমরা প্রবৃত্তি পরবশ হয়ে যাতে দুর্বৃত্ত না হই তারজন্য উপনিষদের ঋষিরা স্মরণ করিয়ে দিলেন ‘আত্মানং বিদ্ধি’-র কথা। —পরমপিতার সন্তান তুমি, নিজেকে জানো, নিজের প্রতিরূপ মনে করে পরিবেশকে বাঁচাও, নিজে বাঁচ। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’—জীবনবিধ্বংসী আচরণ ত্যাগ করে জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলো। ‘মা গৃধ’—লোভ করো না। সদাচার এবং বর্ণাশ্রম মেনে চলো। পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে নিজে সমৃদ্ধ হও। এই ছিল ভারতবর্ষের বিধি-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠনের, ধর্মের, পূজার বা উৎকৃষ্ট প্রসবকারী আচরণ বা উৎসব উদযাপনের নিত্যবাস্তব রূপ। যার উপর প্রতিষ্ঠিত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৎসঙ্গ আন্দোলন। আমাদের নিত্য সাধনার আর্য্য-সন্ধ্যা বন্দনায় যা’ অনুশীলন করতে শিখিয়েছেন যুগ-বিধায়ক পরমবিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। অথচ আমাদের সৎসঙ্গের লোগো-বাহকেরা সেগুলোকে বাদ দিলন। “সত্যমেব জয়তের” ধারকেরা, ওই মহান মন্ত্রের ধ্বজাধারীরা সেইসব পবিত্র কর্তব্য ভুলে, বিজ্ঞানীদের সচেতন-বার্তাকে অগ্রাহ্য করে উৎসব পালনের নামে লোভাদি প্রবৃত্তি-পরায়ণতার উচ্ছৃঙ্খলতাকে উস্কে দিয়ে প্রাকৃতিক এবং আত্মিক পরিবেশকে যে হারে দূষিত করে চলেছি তা কতখানি উৎকৃষ্ট প্রসব করে উৎসব শব্দটিকে সমৃদ্ধ করবে সে হিসেব কষবে কবে সত্যমেব জয়তের আধিকারিকেরা?
যাইহোক, থেমে থাকলো তো আর চলবে না, চরৈবেতি-র নিদেশ মেনে এগিয়ে যেতেই হবে ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যে।
খ্রীষ্টাব্দের ২০২৪তম বর্ষের জাবেদা খাতায় লিপিবদ্ধ হওয়া মানবসভ্যতা-বিরোধী, অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, রেপ, হত্যা ইত্যাদি অমানবিক স্মৃতির সাথে জুড়ে গেল আর এক অকল্পনীয় বিভীষিকাময় স্মৃতি—আর-জি-কর—অভয়া কাণ্ড! বছরের শেষ প্রান্তে এসে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের ঘৃণ্য রাজনীতি, ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে, কোরান-বিরোধী, নবীর আদর্শ-বিরোধী অধার্মিক-বিধিতে, যেভাবে ওই দেশের ভূমিপুত্র হিন্দুদের প্রতি অত্যাচার চালাচ্ছে,—তা যেন কিছুতেই ক্যালেণ্ডারের পুরানো পাতার মত ছিঁড়ে ফেলা গেল না।—মন থেকে মুছে ফেলা যাবে না পশ্চিম বাংলা জুড়ে মানবতা-বিধ্বংসী জঙ্গী-জাল বিস্তার!
তথাপি, আশা-হতাশা, চাওয়া-পাওয়া, সুখ-দুঃখ, মিলন-বিচ্ছেদ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, প্রেম-হিংসার জাবেদা খাতার সঞ্চয় জমা রেখে সম্মুখের দিকে এগিয়ে চলার মাহেন্দ্রক্ষণ সমাগত। সমাগত পরমপুরুষ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রবর্তিত ঋত্বিক অধিবেশন মাধ্যমে আমরা প্রস্তুত ২০২৫তম বর্ষ-এর নতুন সূর্যকে স্বাগত জানাতে।
প্রাণের প্রাণ-স্পন্দন টিঁকিয়ে রাখার উৎস, আমাদের এই সবুজ গ্রহের
অভিভাবক, সকল শক্তির উৎস জ্যোতির্ময় সূর্যের তেজোময় দীপ্তিতে আমরা যেন
সকল প্রকার কলুষতা ত্যাগ করে দীপ্তিমান চরিত্রের অধিকারী হতে পারি।
আমাদের মনুষ্যত্ব যেন দূষিত না হয়। আকাঙ্খার মোহে পড়ে আমরা যেন আমাদের
পঞ্চ-মহাভূত সম্ভূত পরিবেশকে দূষিত না করি। ভিনগ্রহের প্রাণীরা যেন
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ-প্রাণীদের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলতে না পারে, যে
আমরা অসভ্য, ভোগবাদের জোয়ারে ভাসতে গিয়ে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার, বাঁচিয়ে
রাখার অনুকূল পরিবেশকে বিনষ্ট করছি। তাহলে সেটা বড় লজ্জার ব্যাপার হবে।
হে অন্তর্যামী পরমপিতা! তুমি আমাদের শুভবুদ্ধি দাও, আমরা যেন “পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চি”-র আদর্শে মানব সভ্যতাকে জীবন-বাদের পথ প্রদর্শন করতে পারি।
সমাগত
২০২৫-এর নতুন সূর্যের কিরণে স্নাত হয়ে
নতুন প্রাণ, নতুন সুর, নতুন গান,
নতুন ঊষা,
নতুন আলোর নবীনতায় নতুন বছরকে সম্বর্দ্ধিত করতে পারি।
কেটে যাক
আমাদের সব বিষাদ, সব আতঙ্ক—
পরমপিতার আশীষধারায় এসে যাক হর্ষ, শুভ হোক ২০২৫-এর খ্রীষ্টিয় নববর্ষ।
আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক ও আধিভৌতিকাদি ত্রিতাপ জ্বালায় সদাচারের ইষ্টবারি সিঞ্চন করে ‘একদিন-প্রতিদিনের’ চিরনবীন সূর্যালোকের নবীন ছটায় পরমপিতার অনুশাসনের
আশীষধারায় অজর, অমর, চিরচেতনতার সাধনাকে আপ্ত করে আমরা যেন
ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যের চরৈবেতিতে নিরবচ্ছিন্ন থাকতে
পারি।—
বর্ষবিদায়-বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে সীমায়িত না থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্রের দিব্য-নিদেশের দিনচর্যার—
‘‘ঊষার রাগে উঠবি জেগে শৌচে শীতল হবি,
সন্ধ্যা-আহ্নিক জপ সাধনায় ঈশের আশিস লবি,
কুতুহলে পড়শি ঘুরে দেখবি সযতনে,
আছে কেমন কোথায় কে জন মন দিবি রক্ষণে,
তারপরেতে বাড়ী এসে শৌচে যথাযথ
গৃহস্হালীর উন্নয়নী অর্জ্জনে হ’ রত,
স্নানটি সেরে আহ্নিক করে ক্ষুধামতন খাবি,
একটু চলে বিশ্রাম নিয়ে আগুয়ানে ধাবি,
এমনি তালে সচল চালে চলে সন্ধ্যা এলে,
শৌচে শুদ্ধ হয়ে করিস আহ্নিক হৃদয় ঢেলে,
উন্নয়নের আমন্ত্রনী গল্প-গুজব শীলে,
হৃষ্টমনে আলোচনায় কাটাস সবাই মিলে,
পড়শী দিগের অভাব-নালিশ থাকেই যদি কিছু
তার সমাধান যেমন পারিস করিস লেগে পিছু,
করন-চলন ধরন-ধারন যজন যাজন কিবা
সকল কাজেই ইষ্টস্বার্থে চলিস রাত্রি-দিবা,
আদর-সোহাগ উদ্দীপনী কথায় কাজে ঝুঁকে,
স্বার্থ-কেন্দ্র সবার হবি ধরবি ইষ্টমুখে,
বিশ্রামেরই সময় গা-টি ঘুমল হয়ে এলে,
ইষ্ট-চলন মনন নিয়ে ঘুমে গা দিস ঢেলে।’’
(অনুশ্রুতি গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)-র আলোকে
বছরের প্রতিটি দিন হয়ে উঠুক অমৃত-তপনার উৎসব—খ্রীষ্টিয় নববর্ষ ২০২৫-কে
স্বাগত-স্মরণের প্রাক্কালে এই প্রার্থনা জানাই পরমপিতার রাতুল চরণে।

।। বড়দিনের বড় বার্তা ।।

** বড়দিনের বড়কথা **
।। প্রভু যীশুর ভক্ত মেরি ম্যাগডিলিনি প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন—যীশুখ্রীষ্টেরর ভক্তদের মধ্যে মেরি ম্যাগডিলিনির সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। She love Lord for his own sake ( সে প্রভুকে তাঁর জন্যই ভালবাসত)। তার মত unexpectant, selfless love (প্রত্যাশাশূন্য, নিঃস্বার্থ ভালবাসা)আর কারো ছিল কিনা জানি না। আজ ভগবান যীশুর কত ভক্তের কথা শোনা যায়। কত saint (সন্ত)-এর কথা শোনা যায়। কিন্তু আমার মনে হয়, যীশুর অনুরাগীদের মধ্যে সর্ব্বাগ্রে নাম করা উচিত তার।
প্রশ্ন-আজ মেরির খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা ও প্রভাব খ্রীষ্টান জগতে যতটুকু আছে ও হয়েছে, তার থেকে ঢের বেশী হওয়া উচিত ছিল।
শ্রীশ্রীঠাকুর ~ কিন্তু একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে সে ছিল pivot (মূল খুঁটো)। চরম দু:সময়ে যখন কেউ ছিল না যীশুর পাশে, প্রত্যেকে ভয়ে আত্মগোপন ক’রে চলছিল, তখন একমাত্র সে-ই প্রাণের মায়া ত্যাগ ক’রে
বেপরোয়া হ’য়ে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়েছিল যীশুর জন্য পাগল হ’য়ে। কেউ-কেউ বলে নাকি—যীশুর প্রতি তার যে ভালবাসা ছিল, তা ছিল lustful (কামনালিপ্সু)। হয়তো তা’ lustful (কামনালিপ্সু)-ই ছিল। কিন্তু সমগ্র সত্তার প্রতিটি অণুপরমাণু দিয়ে অমন ক’রে আর কেউ বোধ হয় যীশুর অস্তিত্ব ও স্বস্তি কামনা করেনি। Her whole soul and entire being was bequeathed to Chirst and that was the holiest of love ( তার সমগ্র আত্মা, সমগ্র সত্তা যীশুকে সমর্পিত হয়েছিল এবং তার প্রেম ছিল পবিত্রতম)। ভালবাসা এমন পবিত্র জিনিস যে তাতে প্রিয়তমের কথা ছাড়া অন্য কোন কথা মনে পড়ে না। “রূপ লাগি
আঁখি ঝুরে, গুনে মন ভোর, প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর”—এমনতর হয়।
” অনুরাগের বাতি যার
নয়নকোণে জ্বলেছে,
সে না সর্ব্বস্ব তেয়াগিয়া
গুরুকে সার করেছে।
ম্যাগডিলিনি-এর মধ্যে ছিল এই প্রাণ-উপচান অনুরাগ। আবার ছিল প্রচন্ড নির্ভীকতা ও পরাক্রম। আমি যত ভাবি ততই আমার শ্রদ্ধা হয়।
(আ. প্র. ৯/১১.১১.১৯৪৭)

বড়দিনের বড়কথা

।। বড়দিনের বড়কথা : প্রভু যীশুখ্রীস্ট স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি ।।


অবতার বরিষ্ঠমাত্রেই পূর্বাপূর্ব অবতারদের পরিপূরণকারী হন। ‘‘যেই রাম সেই কৃষ্ণ, এক দেহে রামকৃষ্ণ’’ রূপে এসে বিভিন্ন ধর্মমতের মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য স্থাপনের জন্য গীর্জায় গিয়ে যীশুর, মসজিদে গিয়ে রসুলের আরাধনা করেছিলেন। তিনি লোকশিক্ষার জন্য বহু ধর্মীয় মতবাদের গুরুদের কাছে দীক্ষাও নিয়েছিলেন গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুন্ন রেখেই। তথাপিও সাধারণ মানুষেরা মনের মণিকোঠায় জমে থাকা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ একেবারে মুছে ফেলতে পারে নি। এবার অনুকূলচন্দ্র রূপে এসে ‘‘ঈশ্বর এক, ধর্ম এক, প্রেরিতগণ সেই এক-এরই বার্তাবাহী’’ বাণীর মর্মার্থ বোঝাতে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে ভেদাভেদ ঘোচাতে, এক অভিনব ব্যবস্থা করেছিলেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপনের জন্য কুষ্টিয়ার ভক্তদের শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীবুদ্ধ, প্রভু যীশু, হজরত রসুল, শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ প্রমুখ পূর্ববর্তী অবতার-বরিষ্ঠদের জন্মোৎসব পালন করতে উৎসাহিত করেছিলেন। ঠাকুরের নির্দেশ মেনে কুষ্টিয়ার ভক্তরা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের থেকে শুরু করে সাধারণ অনুরাগীদের শ্রদ্ধার সাথে আমন্ত্রণ জানিয়ে আলাপ-আলোচনা-কথকতা ও অন্নব্যঞ্জনাদির সেবার ব্যবস্থা করতেন। ওইভাবে পূর্বাপূর্ব অবতার বরিষ্ঠদের জন্মোৎসব পালন করার ফলে সারা কুষ্টিয়ায় এক অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে গিয়েছিল। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে শ্রদ্ধা-প্রীতির বন্ধন গড়ে উঠেছিল।

পুরুষোত্তমগণের প্রধান লক্ষণ তাঁরা সম্বেগসিদ্ধ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হন। আত্মপ্রচার না করে সমাগতদিগের বৈশিষ্ট্যের পালন ও পোষণ করেন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের কাছে শ্রীরামচন্দ্রের ভক্ত গেলে তিনি আলাপ-আলোচনায় শ্রীরামচন্দ্রের, শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত গেলে শ্রীকৃষ্ণের, বুদ্ধদেবের ভক্ত গেলে বুদ্ধদেবের, প্রভু যীশুর ভক্ত গেলে প্রভু যীশুর, রসুল ভক্ত গেলে হজরত মহম্মদের, চৈতন্যদেবের ভক্ত গেলে চৈতন্যদেবের, শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্ত গেলে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের গুণগান করে তাঁদের ইষ্টানুরাগ বাড়িয়ে দিতেন। তাঁরা তাঁদের ঈপ্সিত ইষ্টকে খুঁজে পেতেন পূর্বতন পূরয়মান বর্তমান পুরুষোত্তমের মধ্যে। অনুরূপভাবে প্রভু যীশুখ্রীষ্টের ভক্ত রে. আর্চার হাউজারম্যান, ই. জে. স্পেনসার প্রমুখ যীশুখ্রীস্টের ভক্তগণ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মধ্যে তাঁদের আরাধ্য দেবতাকে খুঁজে পেয়ে সারাটা জীবন তাঁর সান্নিধ্যে কাটিয়ে তাঁর সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত সমন্বয়ী ধর্মাদর্শ প্রচার করে গেছেন।
দেওঘরে, এক বড়দিনের সন্ধ্যা-প্রার্থনান্তে প্রণম্য স্পেনসারদা ঠাকুরকে প্রণাম করার পর ঠাকুর বললেন, আজ গীর্জায় যাবে না প্রেয়ার করতে ? উত্তরে স্পেনসারদা বলেছিলেন, দীর্ঘকাল গীর্জায় গিয়েও প্রভুর সাক্ষাৎ পাইনি, আপনার মধ্যে আমার আরাধ্য-দেবতা যীশুকে খুঁজে পেয়েছি, তারপরেও গীর্জায় যেতে হবে ?
উত্তরে ঠাকুর বলেছিলেন, পূর্বতনীদের প্রতি শ্রদ্ধানতি জানাতেই হয়।
স্পেনসারদা আর দ্বিরুক্তি না করে গীর্জায় চলে যান, সারারাত গীর্জায় থেকে প্রত্যুষে ফিরে আসেন ঠাকুর-বাংলোয়। ঠাকুর যেন তাঁর প্রত্যাগমনের অপেক্ষায়ই ছিলেন। স্পেনসারদা প্রণাম করে বললেন, আপনি আমার সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবসান করে দিলেন আজ। প্রভু-যীশুর ধ্যান করতে করতে আজ আবার প্রমাণ পেয়ে গেলাম আপনিই বর্তমান যীশু। আবার প্রমাণ পেয়ে গেলাম আপনার বলা সেই বাণীগুলোর—“All the Prophets of the past converge and are awakened in living Guru of the age. It is through our love for the lover of Christ that we can love Christ.” (পূর্বতন প্রেরিতগণ জীবন্ত যুগুরুর মধ্যে কেন্দ্রীভূত ও জাগ্রত থাকেন। খ্রীষ্ট-প্রেমীর প্রতি ভালবাসার ভিতর-দিয়েই আমরা যীশুখ্রীষ্টকে ভালবাসতে পারি।) (আঃ প্রঃ দশম খণ্ড, ০৮. ০১. ১৯৪৮)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, ‘‘একজন সত্যকার হিন্দু, একজন সত্যকার মুসলমান, একজন সত্যিকার খ্রীষ্টান—পরমপিতার চোখে এরা সবাই সমান। …… প্রকৃত ধার্ম্মিক যারা তারাই সমাজের গৌরব।
একজন খ্রীষ্টানের প্রথম যীশুখ্রীষ্টকে ভালবাসা উচিত এবং তাঁর মাধ্যমে সব প্রেরিতপুরুষকে ভালবাসা উচিত। একজন হিন্দুর শ্রীকৃষ্ণকে বা যে-প্রেরিতপুরুষকে সে অনুসরণ করে তাঁকে ভালবাসা উচিত এবং তাঁর মাধ্যমে অন্য সব প্রেরিত পুরুষকে ভালবাসা উচিত। কোন প্রেরিত পুরুষকে ভালবাসা মানে তিনি যেমন ছিলেন, সেইভাবে তাঁকে বোঝা। আামাদের সুবিধা অনুযায়ী তাঁর মতের বিকৃত ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। যদি কেউ বলে—যীশুকে নয়, আামি মা মেরীকে ভালবাসি, তাহলে সে মা মেরীকে ভালবাসে কি না, তা সন্দেহযোগ্য। (সূত্রঃ আ. প্র. ১১ খণ্ড, ইং তাং ৭. ২. ১৯৪৮)
প্রভু যীশু তাঁর অনুগামীদের উদ্দেশ্যে চরম ত্যাগ ও নির্ভরতার কথা বলেছেন।–-
পাখীদের বাসা আছে, শেয়ালের গর্ত আছে, কিন্তু তোমাদের মাথা গোঁজবার স্থান থাকবে না, কোন কিছুরই সংস্থান থাকবে না। ঈশ্বরের উপর নির্ভর করে নিঃস্ব ও চাহিদাশূণ্য হয়ে তোমরা শুধু মানুষের মঙ্গল করে চলবে, নিজেদের জন্য কোন ভাবনা রাখবে না। ঈশ্বরের দয়ায় যখন যেমন জোটে, তাতেই সন্তুষ্ট থাকবে।
অধ্যাপক ও ফরীশীগণ ব্যভিচারে লিপ্ত এক নারীকে ধরে এনে শ্রীযীশুর কাছে সমর্পণ করে বিচার প্রার্থনা করে বলে, ‘‘হে গুরু এই স্ত্রী লোকটি ব্যভিচার ক্রিয়ায় ধরা পড়েছে। মোশি এমন লোককে পাথর মারার আজ্ঞা দিয়েছেন, আপনার বিচারে কি বলেন।” যীশু নীরব; মাথা নীচু করে কেবল পায়ের আঙ্গুল দিয়ে ভূমিতে কী লিখে চলেছেন। ফরীশীগণ বার-বার জিজ্ঞাসা করায় তিনি মাথা উঁচু করে বললেন, “তোমাদের মধ্যে যে নিষ্পাপ সেই প্রথমে একে পাথর মারুক।”
“He that is without sin among you, let him first cast a stone at her.”
(St John, 8:7.)
তিনি আবার মাথা নীচু করে লিখতে থাকেন ভূমিতে পায়ের আঙ্গুল দিয়ে। কিছুক্ষণ নীরবে গেলে, যীশু মাথা উঁচু করে দেখলেন, স্ত্রীলোকটি ছাড়া আর কেউ নেই। তিনি স্ত্রীলোকটিকে বললেন, “হে নারী তোমার অভিযোগকারীগণ কোথায়, তারা কেহ কি তোমায় দোষী করে নি‍?’’
নারী কহিল—“না প্রভু, কেহ করে নি।” যীশু বললেন, “আমিও তোমাকে দোষী করি না, যাও আর কখনো এ মুহূর্ত হতে কোন রকম পাপ কর্ম করবে না।’’
“Neither do I condemn thee, go, and sin no more.” (St, John.8:11)

ওই মা-টি যীশুর প্রেমের পরশে স্নাত হয়ে সাধ্বী হয়েছিলেন, যাঁর নাম ছিল মেরী ম্যাগডিলিনী । তাঁর প্রেমের পরশে মাছ-ধরা জেলেরা মানুষ-ধরা সাধকে পরিণত হয়েছিলেন।
প্রভু যীশু ব্যভিচারের বিরুদ্ধে, অনাচারের বিরুদ্ধে, পৌত্তিলকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে সবাইকে সনাতনী ঈশ্বরপ্রেমে অভিষিক্ত করতে চাইলেন। তাঁর সত্তাপ্রেমী আবেদন প্রবৃত্তি-প্রেমীদের সহ্য হলো না, ফলস্বরূপ তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ হতে হলো। মানবতার শত্রু হলো জুডাস।
প্রভু যীশুর ক্রুশারোহণের পর সব ভক্তগণ যখন ভয়ে গা ঢাকা দিয়েছিলেন তখন মেরী ম্যাগডিলিনী জীবনের মায়া তুচ্ছ করে প্রভু যীশুর সন্ধানে ঘর ছেড়ে পথে বেড়িয়েছিলেন। পথে-প্রান্তরে, ঝোপে-জঙ্গলে, গুহায়-কন্দরে, পাহাড়ে-পর্বতে, পাথরের কোণে সর্বত্র তাঁকে খুঁজে বেড়িয়েছেন। সেই সন্ত্রাসের রাজ্যে ভক্তদের ভেঙ্গে পড়া মনোবল পুণরায় জাগিয়ে তুলেছিলেন তিনি।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন—যীশুখ্রীষ্টের ভক্তদের মধ্যে মেরী ম্যাগডিলিনির সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। She love Lord for his own sake ( সে প্রভুকে তাঁর জন্যই ভালবাসত)। তার মত unexpectant, selfless love (প্রত্যাশাশূন্য, নিঃস্বার্থ ভালবাসা) আর কারো ছিল কিনা জানি না। আজ ভগবান যীশুর কত ভক্তের কথা শোনা যায়। কত saint (সন্ত)-এর কথা শোনা যায়। কিন্তু আমার মনে হয়, যীশুর অনুরাগীদের মধ্যে সর্ব্বাগ্রে নাম করা উচিত তার। ……. চরম দু:সময়ে যখন কেউ ছিল না যীশুর পাশে, প্রত্যেকে ভয়ে আত্মগোপন ক’রে চলছিল, তখন একমাত্র সে-ই প্রাণের মায়া ত্যাগ ক’রে বেপরোয়া হ’য়ে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়েছিল যীশুর জন্য পাগল হ’য়ে। কেউ-কেউ বলে নাকি—যীশুর প্রতি তার যে ভালবাসা ছিল, তা ছিল lustful (কামনালিপ্সু)। হয়তো তা’ lustful (কামনালিপ্সু)-ই ছিল। কিন্তু সমগ্র সত্তার প্রতিটি অণুপরমাণু দিয়ে অমন ক’রে আর কেউ বোধ হয় যীশুর অস্তিত্ব ও স্বস্তি কামনা করেনি। Her whole soul and entire being was bequeathed to Chirst and that was the holiest of love ( তার সমগ্র আত্মা, সমগ্র সত্তা যীশুকে সমর্পিত হয়েছিল এবং তার প্রেম ছিল পবিত্রতম)। ভালবাসা এমন পবিত্র জিনিস যে তাতে প্রিয়তমের কথা ছাড়া অন্য কোন কথা মনে পড়ে না। “রূপ লাগি
আঁখি ঝুরে, গুনে মন ভোর, প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর”—এমনতর হয়।
অনুরাগের বাতি যার
নয়নকোণে জ্বলেছে,
সে না সর্ব্বস্ব তেয়াগিয়া
গুরুকে সার করেছে।
ম্যাগডিলিনি-এর মধ্যে ছিল এই প্রাণ-উপচান অনুরাগ। আবার ছিল প্রচন্ড নির্ভীকতা ও পরাক্রম। আমি যত ভাবি ততই আমার শ্রদ্ধা হয়। (আ. প্র. ৯/১১. ১১. ১৯৪৭)
যীশুর ক্রুশবিদ্ধের কথা উঠলে, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র করুণ কণ্ঠে ছলছল নেত্রে বললেন, –‘‘সেদিন যেমন যীশু crucified (ক্রুশবিদ্ধ) হয়েছিলেন, আজকের দিনেও সেই যীশু তেমনি করে crucified (ক্রুশবিদ্ধ) হয়ে চলেছেন মানুষের হাতে। এই পাপের নিবৃত্তি না হলে মানুষের নিস্তার নেই। নিস্তারের একমাত্র পথ হলো মূর্ত্ত ত্রাতা যিনি তাঁকে sincerely follow (অকপটভাবে অনুসরণ) করা। তাহলে আমাদের ভুল-ত্রুটিগুলি ধীরে ধীরে শুধরে যাবে। ঠিকপথে চলতে শুরু না করলে, ভুলপথে চলার অভ্যাস আরো মজ্জাগত হবে তার chain reaction (শ্রেণীবদ্ধ প্রতিক্রিয়া) চলতে থাকবে।’’ (আ. প্র. ২৫. ০১. ১৯৪৮)
১৯৪৮ সালের বড়দিনের সকালে হাউজারম্যানদা প্রণাম করে উঠতে-না-উঠতেই শ্রীশ্রীঠাকুর আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললেন—আজকে আমাদের তাঁরই দিন, যিনি দুনিয়ায় এসেছিলেন দুনিয়ার দুঃখ ঘোচাতে—সেই Divine the Great–এর (দিব্য মহাপুরুষের) জন্মদিন—যাঁকে আামরা বিদায় দিয়েছি দুঃখে, কষ্টে, যন্ত্রণায়, অনাদরে, অপঘাতে।
একটু পরে শ্রীশ্রীঠাকুর ইংরাজীতে ঐ ভাব অবলম্বনে বাণী দিলেন—
This day is verily the day of Him Who is ours,
Who came on earth
To remove the misery of the world,
The birthday of that Divine the Great
Whom we have seen off
In sorrows, sufferings, woe and anguish
In uncared negligence
And bleeding tyranny.
বাণীটি বলে শ্রীশ্রীঠাকুর বিষাদগম্ভীর হয়ে গেলেন, তাঁর চোখ দুটি ছলছল।
(আঃ প্রঃ ১৫ খণ্ড, ২৫. ১২. ১৯৪৮)
বিষাদগম্ভীর আমরাও। বড়দিন উদযাপন প্রবৃত্তি পরায়ণতার আনন্দের জোয়ারে ভেসে যাওয়ার দিন নয়। বড়দিনের স্মৃতি স্মরণে রেখে প্রতি দিনগুলি প্রভু যীশুর আদর্শের পরিপূরণকারী বর্তমান পুরুষোত্তমের আদর্শের অনুসরণে আমরা যদি আমাদের ছোট আমি-টাকে বড় করে ব্যাপ্তির লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করি, তাহলে ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্তকরণ, হিংসা, বিবাহ-বিচ্ছেদ, ভ্রষ্টাচার এভাবে ব্যাপ্তি লাভ করতে পারবে না বোধহয়। সবাইকে বাঁচিয়ে নিজেকে বাঁচাবার এই একমাত্র পথ।


।। এত হিংসা কেন ।।

।। এত হিংসা কেন! ।।
নিবেদনে—তপন দাস


অনেকদিন ধরেই চলছে—আন্তর্জাতিক স্তরের ক্ষমতার দম্ভের আগ্রাসন, দুর্বলের প্রতি অত্যাচার, নির্বিচারে হত্যালীলা মানবতাবাদের অপমৃত্যু। নতুন করে ইরান-ইস্রায়েলের দ্বন্দ্বযুদ্ধ—সভ্যতার সঙ্কট!

প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের নব্য স্বাধীনতাকামী সন্ত্রাসীরা ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে হিন্দুদের উপাসনা-স্থলে, বাড়িতে আগুন দিয়ে, লুঠ করে, নারীদের নির্যাতন করে, হত্যা করে যে সন্ত্রাস চালাচ্ছে, আন্তর্জাতিক স্তরে কিছু প্রতিবাদ হলেও প্রতিরোধের সূত্র অধরাই রয়ে গেছে।
আমাদের রাজ্যের ভোট পরবর্তী রাজনৈতিক হিংসা,
নারী-নির্যাতন, মৃত্যু—- কতটা বোধ-বিপর্য্যয় হলে “পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যার” পবিত্র নীতিকে পাশ কাটিয়ে নীতিহীন রাজনীতির ক্ষমতা দখলে রাখার জন্য বিরোধী মতবাদীদের হত্যা পর্যন্ত করতে পারে!
যা’ সংশ্লিষ্ট “সত্যমেব জয়তে” সম্বলিত সীলমোহরের আধিকারিকদের পরিহাস করে যেন বলতে চাইছে, তোমরা কতখানি সৎ তোমাদের বিবেকের কাছে একবার জিগ্যেস করে দেখো তো! !!!!!!!!!!!! ?????????

——আর-জি-কর, পটাশপুর, কুলতলি, কৃষ্ণনগর ইত্যাদি ইত্যাদি…….
টিভির পর্দার মাধ্যমে ওইসব মর্মস্পর্শী বিকৃতকাম, হিংসা, মৃত্যুর ছায়াচিত্র/সংবাদ আমাদের প্রাণে এক বোবা ব্যথা দিয়ে চলেছে, আমরা যারা বর্তমান যুগ-বিধায়ক পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সত্যানুসরণের অনুশাসন— “যতদিন তোমার শরীর ও মনে ব্যথা লাগে, ততদিন তুমি একটি পিপীলিকারও ব্যথা নিরাকরণের দিকে চেষ্টা রেখো, আর তা’ যদি না কর, তবে তোমার চাইতে হীন আর কে?”—পাঠ করি! ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে, বাংলাভাষায় রচিত বিখ্যাত গানের কলি, “মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য” নস্টালজিয়ার সিড়ি বেয়ে যাঁদের স্মৃতি অধিকার করে আছে, সেইসব বুদ্ধিজীবিরা, সমাজ-বিজ্ঞানীরা, কি জবাব দেবেন?

দেশে তো আইনের শাসন রয়েছে, না নেই? যদি থেকেই থাকে, তাহলে প্রতিবাদের নামে স্থানে স্থানে অবরোধ করে, ধর্মীয় অঙ্গন তোড়ফোড়-ভাঙচুর করে, আগুন জ্বালিয়ে, পাথর ছুঁড়ে, মেরেধরে, জনজীবন বিপর্যস্ত করে, জাতীয় সম্পত্তি বিনষ্ট করে, যে তাণ্ডব প্রদর্শন করা হয়ে থাকে তার অনুমোদন কারা দেয়? কোন সংবিধান, কোন নবী, কোন অবতার, কোন পুরুষোত্তম কি এই ধরণের হাঙ্গামা করতে নিদেশ দিয়েছেন? তাহলে
এত হিংসা কেন? প্রতিটি চিন্তাশীল মানুষের মননশীলতায় এই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। ওইসব হিংস্র আততায়ীরা যদি উপযুক্ত শাস্তি না পায় তাহলে অদূর ভবিষ্যতে শান্তি ও স্বস্তির জীবনযাত্রা এভাবে ব্যাহত হতেই থাকবে, মনুষ্যত্বের মূল বুনিয়াদ বিলুপ্ত হতে থাকবে! বুদ্ধিজীবিগণ, সমাজবিজ্ঞানীরা, মনোবিদেরা এর কি ব্যাখ্যা দেবেন জানিনা, তবে যুগত্রাতা বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র হিংসার কারণ প্রসঙ্গে বলছেন, “অহঙ্কার আসক্তি এনে দেয় ; আসক্তি এনে দেয় স্বার্থবুদ্ধি ; স্বার্থবুদ্ধি আনে কাম ; কাম হতেই ক্রোধের উৎপত্তি ; আর, ক্রোধ থেকেই আসে হিংসা।’’ তাহলে বোঝা গেল, হিংসার মূল কারণ অহঙ্কার। অহঙ্কারের উৎপত্তি প্রবৃত্তি-পরায়ণতা থেকে। আর সেই প্রবৃত্তি-পরায়ণতার চালক লোভ, কাম, ক্রোধ, মদ, মোহ ও মাৎসর্য্য নামের ষড়রিপু, দেহরথের ৬টা ঘোড়ার লাগাম, দেহরথের সারথী ইষ্টগুরুর হাতে সঁপে দিতে পারলে একেবারে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। আর সেই ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন দিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। আমি অক্রোধী, আমি অমানী, আমি নিরলস ... ইত্যাদি মন্ত্রে আত্ম নিয়ন্ত্রণ করে, “স্বতঃ-অনুজ্ঞা”-র নিত্য অনুশীলনের বিধানের মাধ্যমে। হিংসাকে প্রতিরোধ করার জন্য এর চাইতে উপযুক্ত কোন নিদান আছে কি-না আমার জানা নেই।

অথচ আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা যুগ-বিধায়কের “প্রাচ্য-প্রতীচ্য নিয়ন্ত্রণে বর্ণাশ্রমানুশাসকম্ আর্য্য চিরায়নম্।” মন্ত্রের অমোঘ বিধানকে পাশ কাটিয়ে হিংসার প্রতিবিধানের জন্য থানা, পুলিশ, মিলিটারী, কোর্ট, সংশোধনাগার প্রভৃতির ব্যবস্থা করেও হিংসা দমন করতে পারছে না। তাই যদি পারত নির্বাচনের ন্যায় একটা সরল প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আমাদের হিংসা এবং হিংসার পরিণতি মৃত্যুর মিছিল দেখতে হতো না। এ কেমন রাজনীতি? ছিঃ!
যুগ-বিধায়ক বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বিধান অনুযায়ী হিংসাকে দূর করতে হলে ভক্তির চাষ দিতে হবে। ভক্তির সংজ্ঞায় তিনি বলছেন, ‘‘সৎ-এ নিরবচ্ছিন্ন সংলগ্ন থাকার চেষ্টাকেই ভক্তি বলে।’’ তাহলে সৎ-এ নিরবচ্ছিন্ন সংলগ্ন থাকার চেষ্টা করার জন্য ভাবী পিতামাতাকে সদগুরুর আদর্শ গ্রহণ করতে হবে। তারপর পরমপিতা প্রদত্ত দিব্য বিবাহ-সংস্কারে সংস্কৃত হয়ে শুদ্ধাত্মাকে আকর্ষণ করে প্রহ্লাদের ন্যায় দিব্য ভক্ত সন্তানের জন্ম দিতে হবে। ভারতের নিজস্ব সংবিধান কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে এর সমর্থন আছে। বর্তমানের চিকিৎসা বিজ্ঞানও এর সমর্থন করেছে। সুস্থ দম্পতির সুস্থ দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে সুস্থ মানবের জন্ম দেওয়ার বিধান দিয়ে। এ ব্যতীত জন্মগত দুরারোগ্য শারিরীক এবং মানসিক ব্যাধি প্রতিরোধের অন্য কোন চিকিৎসা নেই। (Ref. DAVIDSON’S PRACTICE OF MEDICINE/Genetic Factor of Disease)
রাষ্ট্রের অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার বোর্ডের কর্ণধারেরা বিশ্বস্ত, সুস্থ পে-ডিগ্রীড কুকুরের, ঘোড়ার জন্ম নিয়ে গবেষণা করলেও মানুষের বেলায় উদাসীন। একুশ বছরের ছেলে আর আঠারো বছরের মেয়ে হলেই হলো। বংশ, বর্ণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা—কোন কিছুই না দেখে স্পেশ্যাল ম্যারেজ অ্যাক্টের সাহায্যে বিয়ে করতে পারবে, আবার বনিবনা না হলে ডিভোর্সও করতে পারবে! এখন তো আবার বিয়ে না করেও লিভ-টুগেদার আইনের সাহায্যে সন্তানের মা হতে পারা যায়। যার দৃষ্টান্ত লোকসভার সদস্যা নুসরত জাহান। রাষ্ট্রের জন-প্রতিনিধিরা যদি সুস্থ দাম্পত্যের প্রজনন বিজ্ঞানকে অসম্মান করতে পারেন, সেখানে সাধারণ নাগরিকগণ আরো বেশি সুযোগ পেয়ে যাবে লাগামহীন যৌন-জীবন যাপন করার! পরমপিতার অশেষ করুণায় আমাদের গ্রামীন ভারতবর্ষের তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষগুলো এখনো কোন-না-কোনভাবে ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা, পিতামাতায় ভক্তি রেখে বিবাহ সংস্কারের অনুশাসন মেনে চলছে বলে প্রিয়জনের দ্বারা প্রিয়জনদের হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা সমাজে বিস্তার লাভ করতে পারছে না। তবে, রাষ্ট্র ব্যবস্থা যদি এখনই ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুরুত্ব না দেয়, স্বভাববিধ্বংসী প্রতিলোম জাতকদের জন্ম বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাহলে অচিরেই হিংসা আমন্ত্রিত হবে ঘরে ঘরে! হিংসা প্রতিরোধের জন্য যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র একেবারে সমস্যার মূলে হাত দিয়ে বললেন, “ভক্তি এনে দেয় জ্ঞান ; জ্ঞানেই সর্বভূতে আত্মবোধ হয় ; সর্বভূতে আত্মবোধ হলেই আসে অহিংসা ; আর, অহিংসা হতেই প্রেম। তুমি যতটুকু যে-কোন একটির অধিকারী হবে, ততটুকু সমস্তগুলির অধিকারী হবে।’’ একেবারে অঙ্কের হিসেব। আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি-ইচ্ছার ‘ছোট-আমি’-টার অহঙ্কারের লাগামটাকে যদি ভক্তির মুঠো দিয়ে কষে না ধরা যায় তাহলে ধাপে-ধাপে হিংসার আশ্রয়ে পৌঁছে যাবে। যার পরিণতি অস্বাভাবিক মৃত্যু। আর যদি জীবন নামক রথের চালক ছ’-টা ঘোড়ার (ষড়রিপু) লাগাম জীবন-রথের সারথি স্বরূপ ইষ্টগুরুর হাতে সমর্পণ করা যায়, তাহলে, সরল প্রাণ, মধুর বচন, আর বুকভরা প্রেমের ডালি দিয়ে সবাইকে আপন করে নেওয়া যায়। একটা পিপীলিকারও ব্যথা নিরাকরণের জন্য প্রাণ কাঁদে। আবার যে হিংসা মৃত্যুর দ্যোতক তাকে শক্ত হাতে দমন করতে হলে হিংসা দিয়েই করতে হবে। হিংসাকে হিংসা দ্বারা জয় করার নাম অহিংসা। যেমন দুষ্টক্ষত বা গ্যাংগ্রীন থেকে শরীরকে বাঁচাতে হলে আক্রান্ত অংশটিকে কেটে বাদ দিতে হয়। বাদ না দিলে দেহকে বাঁচান যায় না। তেমনি সমাজ রক্ষা, রাষ্ট্র রক্ষা করতে হলে অনুরূপ নীতির অনুসরণ না করতে পারলে সমাজ-রাষ্ট্রের অঙ্গে পচন ধরে যাবে, রাষ্ট্রের সত্তাটাই মারা পড়বে। আর্য্য ভারতের মা কালী শুম্ভ-নিশুম্ভকে, মা দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে, শ্রীরামচন্দ্র রাবনকে বধ করে ওই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। অযথা কাউকে হত্যা করেন নি। অযথা কাউকে হত্যা না করে পার্থসারথি শ্রীকৃষ্ণ মামা কংসের পাঠান অসুর-রাক্ষস নামক সত্তাহিংস জিঘাংসা বৃত্তিধারীদের হত্যা করেছিলেন। অপকৌশলী অসৎ সাম্রাজ্যবাদী কংসকে হত্যা করে, উগ্রসেনকে কারাগার থেকে মুক্ত করে তাঁকে পুণরায় রাজ্যে অভিষিক্ত করেছিলেন। ধর্মপথভ্রষ্ট অসৎ আগ্রাসনী জরাসন্ধকে হত্যা করে জরাসন্ধের পুত্র সহদেবকে রাজ্যে আভিষিক্ত করিয়েছিলেন। সব হিংসার মূল উৎপাটন করে, এক পরম রাষ্ট্রীক সমবায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধ সংগঠিত করে জীবনবাদের জয়গান গেয়েছিলেন। ভবিষ্যত প্রজন্মকে জীবনবাদী হবার জন্য উপহার দিয়ে গেলেন শ্রীমদ্ভবদ্গীতা। আমাদের রাষ্ট্রীয় স্তোস্ত্র “বন্দে মাতরম্” ধ্বনির উৎস শ্রীমদ্ভবদ্গীতা। একদা শ্রীমদ্ভবদ্গীতা গ্রন্থকে আদর্শ মেনে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছিল। সেসব মহান ইতিহাস ভুলে গণতান্ত্রিক পথে রাজনীতি করতে গিয়ে হিংসাশ্রয়ী হয়ে আমরা যদি ভারতমাতার সন্তানদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলি, ভারতমাতা সেই অপমান কতদিন মুখ বুঁজে সহ্য করবেন? আমরা আবার গীতা গ্রন্থের স্রষ্টা পার্থসারথী শ্রীকৃষ্ণের আশ্রয়ে ফিরে যাব। শ্রীকৃষ্ণ পরবর্তী বহির্ভারতের বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীষ্ট, হজরত রসুল প্রমুখ পুরুষোত্তমগণও আর্য্য ভারতীয় ওই শ্বাশ্বত নীতির অনুসরণ করেছেন মানব সভ্যতাকে বাঁচাতে। তাঁরা আগ্রাসন করতে, ধর্মান্তকরণ করতে, অযথা কাউকে হিংসা করতে কোথাও কি বলেছেন? তবে কেন এত হিংসা? কেন এত জিঘাংসা? ওই হিংস্র জিঘাংসাকে যদি কঠোর হাতে দমন করতে এগিয়ে না আসেন জীবনপিয়াসী শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তথা রাষ্ট্র নায়কেরা, তাহলে মানবতার অপমৃত্যুর কালো ছায়া মানব সভ্যতার অঙ্গে ক্রমে ক্রমে গ্যাংগ্রীন উৎপাদন করবে নিকট ভবিষ্যতে। অসৎ নিরোধে তৎপর না হয়ে, অসৎকে প্রশ্রয় দিয়ে রাষ্ট্রের পবিত্র মন্ত্র “সত্যমেব জয়তে” সম্বলিত সীলমোহরের আধিকারিক হওয়াটা যেমন ভণ্ডামি, তেমনই অসৎ নিরোধে উদাসীন থেকে সৎসঙ্গী সেজে ভক্ত হওয়াটাও কিন্তু ভণ্ডামী! সকলের কথা বলতে পারব না, সেই দিক দিয়ে বিচার করতে গেলে আমি নিজে কিন্তু ভণ্ড। ভক্ত হতে গেলে ঠাকুরত্বকে জাগাতে হবে চরিত্রে। সেটা যখন জাগাতে ব্যর্থ হয়েছি, তাহলে আমি ভণ্ড ছাড়া আর কি! তাই ভণ্ডামি ত্যাগ করে আমাকেও গুটি কেটে খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে পড়তে হবে, পরিস্থিতিকে সামাল দিতে। পরিস্থিতিকে এড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারব না।

ইষ্টভরণ, পিতৃপোষণ
পরিস্থিতির উন্নয়ন,
এ না ক’রে যাই করিস্ না
অধঃপাতেই তোর চলন। ২ ।
(অনুশ্রুতি, ১ম খণ্ড)
ইষ্টপ্রোক্ত উদ্ধৃত বাণীর অধঃপতন থেকে ব্যক্তিসত্তাকে, সংঘ-সত্তাকে বাঁচাতে হলে অসৎ-নিরোধে তৎপর হতেই হবে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র “ব্যক্তি-দম্পতি-গৃহ-সমাজ-রাষ্ট্র উদ্ধার”-কল্পে, যজন-যাজন-ইষ্টভৃতি-স্বস্ত্যয়ণী প্রবর্তন করছেন। সেকথা বিস্মরণ হলে ইষ্টাদর্শের অপলাপ করা হবে। জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!

কন্যা দিবসের শ্রদ্ধার্ঘ্য

।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের দৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবসের শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।

নিবেদনে—তপন দাস


[বিশ্বজুড়ে মেয়েরা তাদের শিক্ষা, তাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা এবং হিংসাবিহীন জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। প্রতিবন্ধী মেয়েরা সহায়তা এবং পরিষেবাগুলি পাওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বাধার সম্মুখীন হচ্ছে,’ রাষ্ট্রসংঘের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে এই কথা বলা হয়েছে।
রাষ্ট্রসংঘের কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারকরা বিনিয়োগ করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন যা মেয়েদের দ্বারা অনুভূত বৈষম্য মোকাবেলা করবে।
এই দিনটি পালনের ইতিহাস:
২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদ ১১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক কন্যা সন্তান দিবস হিসাবে ঘোষণা করে। যাতে সারা বিশ্বে মেয়েদের অধিকার এবং মেয়েরা যে অনন্য চ্যালেঞ্জগুলির মুখোমুখি হয় সেটিকেই স্বীকৃতি দেয়।
আন্তর্জাতিক কন্যা সন্তান দিবসের তাৎপর্য:
সারা বিশ্বে মেয়েরা যে সমস্যাগুলির সম্মুখীন হন, যেমন শিক্ষা, পুষ্টি, জোরপূর্বক বাল্যবিবাহ, আইনি অধিকার এবং চিকিৎসার অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা না থাকা— এই জাতীয় সমস্যা সম্পর্কে সকলকে সচেতন করে। প্রতি বছর দিনটির থিম পরিবর্তিত হয়।
রাষ্ট্রসংঘের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘এখন সময় এসে গিয়েছে, মেয়েদের কাজ, তাঁদের অধিকার সম্পর্কে আমাদের সকলের দায়বদ্ধ হতে হবে। তাঁদের নেতৃত্বে বিশ্বাস রাখতে হবে।’ এটিই সব মিলিয়ে এই দিনটির গুরুত্ব।] (সূত্রঃ গুগল)


আমরা যে, যা বলিনা কেন, একটা মেয়ের চরম প্রাপ্তি সার্থক মাতৃত্বে।আমার ব্যক্তিগত ভাবনায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সে-বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করলেই কন্যা-দিবস উদযাপন যথার্থতায় সার্থক হবে।

বর্তমান যুগে নারীরা লেখাপড়া, শিক্ষা-সংস্কৃতি, কর্মক্ষেত্রে, অভিযানে, বিজ্ঞান গবেষণায় প্রভৃতি কোন ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নেই। এমন অনেক নারীদের কথা আপনারা জানেন, আমিও জানি। আবার এ-ও দেখেছি, বাহ্য জগতের সবক্ষেত্রে কৃতি নারীদের অন্তর্জগতের হাহাকার। মনের মত সন্তান না পাওয়ার জ্বালায়, সন্তানকে মনের মত করে মানুষ করতে না পারার জ্বালায়, থ্যালাসেমিয়া, স্কিজোফ্রেনিয়া, লিউকোমিয়া প্রভৃতি নামের দুরারোগ্য ব্যাধির জ্বালায় জ্বলতে গিয়ে জীবনের সুখ-শান্তির অনুভূতিটা হারিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছে।—যেন, ‘সব আছে তবু নেই’। মাতৃত্ব-পিয়াসী একজন সন্তানহীনা নারীর যে কি কষ্ট, কি বেদনা, তা ভুক্তভোগী ভিন্ন কেউ উপলব্ধি করতে পারবে না। একটি সন্তান পেতে সব-রকমের চিকিৎসা করার পরও যখন সন্তান-লাভে ব্যর্থ হয়, তখন অনেক টাকা খরচ করে গর্ভ ভাড়া নেয়, দত্তক সন্তান নেয়।—এমন অনেক কিছু করেন। ওই সব সমস্যার স্রষ্টাও কিন্তু নারী। ‘আত্মানং বিদ্ধি।’-র শিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে সব কিছুকে জেনেছে, নিজেকে জানতে পারেনি। নিজের নারীত্বের-পূর্ণতার বিষয়ে জানা হয়ে ওঠেনি।
প্রাকৃতিক নিয়মে নারী হতে জন্মে জাতি। নারীই গৃহ, সমাজ ও রাষ্ট্রের ধাত্রী ও পালয়িত্রী। প্রাকৃতিক নিয়মে একজন নারীর চরম পরিণতি মাতৃত্বে। মুখে আমরা যতই নারী-স্বাধীনতার কথা বলি না কেন, এক্ষেত্রে কিন্তু পুরুষের উপর নির্ভরশীল হতেই হয়। (অবশ্য লেসবিয়ান আদর্শে বিশ্বাসীদের কথা আলাদা। তারা অবশ্যই ব্যতিক্রমী।) সেই পুরুষটি মাতৃত্বকামী নারীর তুলনায় শারীরিক-মানসিক-আত্মিকভাবে যত উন্নত হবে,— স্বাস্থ্যবান হবে, ভালো চরিত্রের হবে, নারীটির দাম্পত্য জীবন তত সুখের হবে, সন্তানও ভালো হবে। এটাই তো স্বাভাবিক নিয়ম। তাই নয় কি? আর সেগুলো পেতে গেলে বর্ণে, বংশে, বয়সে, স্বাস্থে, শিক্ষায়-দীক্ষায়—সবদিক থেকে উন্নত সম-বিপরীত সত্তার একটা পুরুষকে, ভাবী সন্তানটির বাবাকে খুঁজে নিতে হবে, বিবাহের মাধ্যমে। বিবাহ মানে পুরুষের সত্তাকে বিশেষরূপে বহন করা। যে পুরুষটির কাছে নারীত্বকে সমর্পণ করে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে। তাই নির্ঝঞ্ঝাট সুখের দাম্পত্য জীবন পেতে গেলে, ভালো সন্তানের মা হতে গেলে, লেখাপড়া শেখার পাশাপাশি, কুমারী অবস্থা থেকেই একটা পরিকল্পনা করে নিতে হবে। কারণ প্রত্যেক নারীই চায় তার সন্তানটি সুস্থ থাকুক, ভালো হোক, কৃতী হোক। সেগুলো তো আর রেডিমেড পাওয়া যাবে না, আর স্টেজ মেক-আপও দেয়া যাবে না। নিয়ম মেনে অনুশীলন করতে হবে। মা-কেই মেপে মেপে সঞ্চয় করতে হবে ভবিষ্যতের সন্তানের ভালামন্দের সব উপকরণ। মা মানে মেপে দেওয়া। সন্তানের ভালো-মন্দ মেপে দেয় বলেই মা। ভাবী মায়ের চলন-চরিত্র দ্বারা প্রভাবিত হয় নারী-জননকোষ, অপত্য-কোষ। সেইজন্যই সন্তান ধারন-পালন-লালন-এর জন্য আবশ্যিক প্রত্যঙ্গগুলোকে সযত্নে মেপে মেপে লালন-পালন করতে হবে, সংরক্ষণ করতে হবে ভবিষ্যতের সন্তানের মঙ্গলের জন্য। তা না করে ‘হেটেরো-সেক্সুয়াল’ কমপ্লেক্সের প্রলোভনে পড়ে ওগুলোকে যদি আম-পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করে ফেলা হয়, তাহলে তো ভাবী সন্তানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। যার জন্য সংরক্ষিত জিনিস, আত্মঘাতী উদারতার বশে অন্যকে ভাগ দেবার অপরাধে। এজন্য রোগ-ভোগেও ভুগতে হয়। Oncologist, Gynaecologist, Sexologist, Psychologist-দের শরণাপন্ন হতে হয়।

নারীত্বের বিশুদ্ধতা সংরক্ষিত করে সুসন্তান লাভ করা বিষয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘জন্মকথা’ কবিতায় লিখছেন—
খোকা মাকে শুধায় ডেকে, ‘এলেম আমি কোথা থেকে
কোনখেনে তুই কুড়িয়ে পেলি আমারে ?’
মা শুনে কয় হেসে কেঁদে খোকারে তার বুকে বেঁধে—
‘ইচ্ছা হয়ে ছিলি মনের মাঝারে।।
ছিলি আমার পুতুল খেলায়, ভোরে শিবপূজার বেলায়
তোরে আমি ভেঙেছি আর গড়েছি।
তুই আমার ঠাকুরের মনে ছিলি পূজার সিংহাসনে,
তাঁরি পূজায় তোমার পূজা করেছি।।
আমার চিরকালের আশায়, আমার সকল ভালোবাসায়,
আমার মায়ের দিদিমায়ের পরাণে,
পুরানো এই মোদের ঘরে গৃহদেবীর কোলের ’পরে
কতকাল যে লুকিয়ে ছিলি কে জানে।।’

একটু বোধি-তাৎপর্য দিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, কবিগুরু তাঁর ওই কবিতায় জেনেটিক্সের, ইউজেনিক্সের, সুরত-সম্বেগের চরম এক তত্ত্বের অবতারণা করেছেন।
একটা উন্নত প্রজাতির আমগাছ লাগাতে গেলেও কিছু প্লান-প্রোগ্রাম নিতে হয়। আগে থেকে জমি নির্বাচন করতে হয়, উপযুক্ত সার দিয়ে জমি তৈরি করতে হয়, তারপর মাটির উপযুক্ত বীজ বা চারা বসাতে হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় বর্তমান যুগের বেশিরভাগ লেখাপড়া শিখতে যাওয়া নারীরা, পুরুষের সাথে পা-মিলিয়ে, গলা-মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ‘হোক-কলরব’ আন্দোলনে পারদর্শী হলেও, নিজের আত্ম-বিস্তারের জন্য আবশ্যিক আত্ম-সম্পোষণ, আত্ম-সংরক্ষণ করার জন্য নির্দিষ্ট নারীত্বের অস্তিত্ব রক্ষার জমিটুকুকে সংরক্ষণ করা বিষয়ে উদাসীন। যারফলে কালেক্রমে মনুষ্যত্ব সম্পন্ন অসৎ-নিরোধে তৎপর সন্তান থেকে সভ্যতা বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব রামকৃষ্ণদেব, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নেতাজী সুভাষচন্দ্র প্রমুখ মনীষীদের জন্মদাত্রীগণ ক্যাম্পাসে, অফিসে, মিটিংয়ে, মিছিলে কোন ‘কলরব’ না করেই, সনাতনী নারীধর্ম পালন করে রত্নগর্ভা হয়েছিলেন। ভারতীয় কৃষ্টি প্রদত্ত প্রকৃষ্ট-গতির পথ ভুলে, তথাকথিত প্রগতির নামে ছুটে চলা নারীবাদিরা বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে দেখতে পারেন।

পরিবারকে উন্নতি বা অবনতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী প্রধানতঃ নারী। কথায় আছে, ‘সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে। গুণবান পতি যদি থাকে তার সনে।।’ আদর্শ একজন পুরুষের সাহচর্যে নারীর হাতেই গড়ে ওঠে আদর্শ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র। নারীই হচ্ছে জাতির বল ও ভরসা। লক্ষী নারীদের উপরেই রয়েছে মহান জাতি গঠনের বিরাট দায়িত্ব। মহান আদর্শকে চরিত্রায়িত করে নারী যদি পরিবারকে সুন্দর ও সার্থক করে সাজিয়ে তুলতে পারে তবেই জগত-সংসার সুখের হয়। আদর্শ জাতি গঠন করার দায়িত্ব নারীদের উপর থাকার জন্য তাদের শিশুকাল থেকেই ভালো মা হবার সাধনায় অগ্রসর হতে হবে। নারী জীবনের বিভিন্ন পর্যায় আছে। ওই পর্যায়গুলো ভগ্নি, বধূ, স্ত্রী, জায়া, জননী ও গৃহিনী ও জননীত্ব। ওগুলোকে সমৃদ্ধ নারীরাই করতে পারেন, পুরুষেরা নয়। স্নেহ, মায়া, মমতা ও ভালবাসার দ্বারা পূর্ণ নারীর হৃদয়। নারীরা ইচ্ছা করলেই তাঁর অন্তর্নিহিত বিভিন্ন শক্তির দ্বারা জাগিয়ে তুলতে পারেন বিশ্বকে। নারীর মধ্যে সুপ্তভাবে থাকা গুণরাজিকে ইচ্ছে করলেই ব্যক্ত করা যায় ভালোবাসা বা ভালোতে বাস করার বিজ্ঞানসম্মত পাঠ নিয়ে।

বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার আয়োজন অনেকগুণ বৃদ্ধি পেলেও, অনেক মাতামাতি হলেও, দেবীদুর্গার দশপ্রহরণধারী আদর্শ কিন্তু আমাদের চরিত্রে তেমন রেখাপাত করতে পারেনি। যদি করতো, কন্যারূপী দুর্গা মায়েরা অসুররূপী পুরুষদের লালসার স্বীকার হতে পারত না। একটা মেয়ে কিভাবে দুর্গাশক্তিকে আয়ত্ত করে আত্মরক্ষায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে, যুগধর্ম সেই শিক্ষায় মেয়েদের শিক্ষিত করতে ব্যর্থ হয়েছে! পুরুষ-সাধারণ, মেয়ে-সাধারণকে কামনার বস্তু হিসেবে না ভেবে, দেবী দুর্গাজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখবে, সেই শিক্ষার প্রচলন করা হয়নি। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কিন্তু ঘরে ঘরে সেই শিক্ষার বীজ বপন করলেন দীক্ষার মাধ্যমে।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র নারীর মধ্যে দেবী দুর্গার আসন পেতে দিতে অনুশ্রুতির বাণীতে বললেন :
“শার্দ্দুলেরে বাহন করে
সাপের ফণার মালা পরে
কালবোশেখী ঝঞ্ঝাবেগে
ছোটরে নারী ছোটরে ছোট্ ।
দত্যিদানার নীচ বাহানা
আর্য্যাবর্তে দিয়ে হানা
ঘূর্ণিপাকের বেতাল গাঁথায়
হুলিয়ে ভুলিয়ে দিচ্ছে চোট্ ।
দশ প্রহরণ দশ হাতে ধর
বক্ষবিদরি ধ্বংসি ইতর
সূর্য্যরাগী বজ্রতেজে
আর্য্যনারী শত্রু টোট্ ।”
তিনি নারীকে অবলা নয় সবলারূপে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন । নারীর সতীত্বই নারীকে সবলা করে তোলে। তাই তিনি কত আশা নিয়ে বললেন—
সতীর তেজে ঝলসে দে মা
নিঠুর কঠোর অন্ধকারে
মদনভস্ম বহ্নিরাগে
বৃত্তি-রিপু দে ছারখারে ।
প্রণবতালে ইষ্টমন্ত্র
ঝঙ্কারি তোল সকলতন্ত্রে
বিষাণ হাঁকে রুদ্র দোলায়
বজ্রে হানি মৃত্যুদ্বারে ।

শুধুমাত্র কন্যাদের জন্যই নয়, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র পুরুষ-সাধারণের উদ্দেশ্যে সত্যানুসরণ গ্রন্থে বললেন, “প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী । প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয়।”
এবং পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, “স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যেজন, তাহার হয় না ভবের বন্ধন মোচন। স্ত্রী চিন্ময়ী মা ।”
তিনি নারী-সাধারণকে মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েই ক্ষান্ত হন নি, স্ত্রীকেও চিন্ময়ী মা জ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শেখালেন । কারণ, স্ত্রীর মাধ্যমে স্বামী নিজেকে জন্মান, তাই স্ত্রীকে জায়া বলা হয়েছে । আর্য্য বিধির গর্ভাধান কালে স্ত্রীর নাভিমূল স্পর্শ করে “প্রসীদ মা জগজ্জননী” মন্ত্রে অভিষিক্ত করে স্ত্রীর গর্ভে নিজেকে প্রবেশ করাতে হয় । প্রজা-সৃষ্টি প্রকরণের কি অপূর্ব ব্যঞ্জনা । যৌন জীবনে পুরুষদের শিব, আর নারীদের দুর্গা জ্ঞানে অভিষিক্ত করে কাম (lust) কে আসুরিক প্রবৃত্তির কবল থেকে মুক্ত করে দৈবীপ্রেমে (love) রূপান্তরিত করলেন ।
শ্রীশ্রীঠাকুর মেয়েদের মা এবং ছেলেদের দাদা সম্বোধনের বিধান প্রবর্তন করে নারীপুরুষের সুপ্ত যৌন সম্বেগের রাশ টেনে ধরলেন। ঘরে ঘরে বাস্তব দুর্গাপূজার এক স্থায়ী আসন প্রতিষ্ঠা করলেন।

কন্যা-দিবসকে সার্থক করতে হলে কন্যার মায়েদের এ বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে ।
গুরুত্ব দিতে হবে নিজ-নিজ মেয়েদের পবিত্রতার দিকে । যুগধর্মের প্রভাব থেকে মুক্ত করে শ্রীশ্রীঠাকুরের নারীর নীতি, নারীর পথে, দেবী-সূক্ত ইত্যাদি গ্রন্থের বিধান অনুসারে মেয়ে যা’তে বয়সে, বর্ণে, বংশে, স্বাস্থ্যে, শিক্ষায় তুলনামূলক সমবিপরীত বৈশিষ্ট্যের সমুন্নত বরণীয় পুরুষকে বরণ করে একজন আদর্শ বধূ, মনোবৃত্যানুসারিনী স্ত্রী, জায়া, পরিমাপনি মা হয়ে শুদ্ধাত্মার জন্ম দিতে পারে ।

কারণ, “নারী হইতেই জাতি জন্মে ও বৃদ্ধি পায়, তাই নারী যেমন ব্যষ্টির জননী তেমনই সমষ্টিরও ;– আর, এই নারী যেমন ভাবে আবিষ্ট থাকিয়া যেমন করিয়া পুরুষকে উদ্দীপ্ত করে পুরুষ হইতে সেই ভাবই নারীতে জন্মগ্রহণ করে ; তাই, নারী মানুষকে প্রকৃতিতে মূর্ত্ত ও পরিমিত করে বলিয়া জীব ও জগতের মা ;–তাহ’লেই বুঝিও– মানুষের উন্নতি নারীই নিরূপিত করিয়া দেয় ; তাই নারীর শুদ্ধতার উপরই জাতির শুদ্ধতা, জীবন ও বৃদ্ধি নির্ভর করিতেছে– বুঝিও, নারীর শুদ্ধতা জাতির পক্ষে কতখানি প্রয়োজনীয়!” ১৭৬ ।
(চলার সাথী গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)
হে কন্যারূপী মেয়েরা! ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক ভাবনায় তোমাদের দেবীজ্ঞানে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। তাই তো কুমারী পূজা না করলে দেবীর পূজা ও হোম সফল হয় না। শক্তির আরাধনার নামে আদর্শ নারীশক্তির প্রতীক স্বরূপা দুর্গা, কালী, জগদ্ধাত্রী এবং বাসন্তী পূজার আয়োজন হয়ে চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। যার উদ্দ্যেশ্য চিন্ময়ী নারীদেরও আমরা যেন আদ্যাশক্তির প্রতীক মনে করে পরমার্থ দর্শন ও পরমার্থ অর্জন করতে অভ্যস্ত হই, শ্রদ্ধা জানাই, নারীকে যেন কামনার, ভোগের বস্তু মনে না করি, নারীকে ভোগ্যা নয়, পূজ্যা রূপে স্বীকৃত দেবার জন্যই কুমারী পূজা। আদ্যাশক্তির প্রতীক নারীরা যদি রুষ্ট হয় তাহলে সৃষ্টির ছন্দে পতন অবশ্যম্ভাবী। ওই আদর্শকে সমাজজীবনে প্রতিষ্ঠা দিতে মূর্ত্তিপূজার পাশাপাশি তন্ত্রশাস্ত্রকারেরা দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য দেবীজ্ঞানে কুমারী পূজারও প্রচলন করেছিলেন। ফলহারিনী কালীপূজার রাতে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নিজের স্ত্রীকে ষোড়শীজ্ঞানে পূজা করেছিলেন। সেই আদর্শকে পাথেয় করে তোমাদের কন্যা-জীবন সার্থক হোক—প্রার্থনা জানাই পিতার পিতা পরমপিতা সমীপে। জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!


পরিশেষে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের নারীর নীতি গ্রন্থের বাণীর ডালিতে সকল কন্যাদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে যবনিকা টানলাম।
‘‘মেয়ে আমার,
তোমার সেবা, তোমার চলা,
তোমার চিন্তা, তোমার বলা
পুরুষ-জনসাধারণের ভিতর
যেন এমন একটা ভাবের সৃষ্টি করে—
যা’তে তারা
অবনতমস্তকে, নতজানু হ’য়ে
সসম্ভ্রমে,
ভক্তিগদগদ কন্ঠে—
‘মা আমার,— জননী আমার’! ব’লে
মুগ্ধ হয়, বুদ্ধ হয়, তৃপ্ত হয়, কৃতার্থ হয়,—
তবেই তুমি মেয়ে,
—তবেই তুমি সতী।’’


মহালয়া বা মহান আলয়

।। মহালয় বা মহান আলয়ের শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।

নিবেদনে—তপন দাস

*************************

সত্যি বলতে কি, অনিয়ন্ত্রিত প্রবৃত্তি-পরায়ণতার মোহে পড়ে,   জীবদ্দশায় পিতা-মাতাকে গৃহ-দেবতা জ্ঞানে সেবা করতে না-পারা সন্তানেরাও কিন্তু মহালয়ার দিনটিতে  বিদেহী পিতা-মাতা, পিতৃপুরুষ, মাতৃপুরুষদের তর্পণ মাধ্যমে স্মরণ করেন।  

আশ্বিন মাসের অমাবস্যা তিথিতে পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের সূচনার দিনটি মহালয়া। কথিত আছে পিতৃযান বা পিতৃলোক থেকে আত্মারা মর্ত্ত্যলোকের মহান আলয়ে সম্মিলিত হন, সেই বিশ্বাসে পিতৃ-মাতৃহারা আর্য্য হিন্দুরা তাঁদের তৃপ্তির জন্য তিল-জলসহ মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক বিগত ঊর্দ্ধতন পিতৃ-মাতৃ পুরুষদের গোত্র উল্লেখ করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন,—যাতে তাঁরা লিঙ্গদেহের নিরাশ্রয়, নিরালম্ব, বায়ুভূতের কষ্টদায়ক ভোগ কাটিয়ে অচিরেই পিণ্ডদেহ ধারণ করতে পারেন।—সাথে ‘আব্রহ্মভুবনল্লোকা’ মন্ত্রে সকল জীবের তৃপ্তির প্রার্থনা জানান হয়। এক্ষেত্রে স্মরণে রাখা উচিত বংশে যদি সগোত্রে এবং প্রতিলোম বিবাহ হয়, তাহলে কোন মন্ত্রে, কোন দানে, পিতৃ পুরুষদের আত্মা তৃপ্ত হবে না। তাই পিতৃমাতৃ তর্পণ সার্থক করতে হলে জীবদ্দশাতেই পিতামাতাকে গৃহদেবতা জ্ঞানে সেবা করতে হবে। প্রতিলোম-বিলাসী, দশবিধ সংস্কার পালনে উদাসীন হলে চলবে না।

।। প্রচলিত পিতৃতর্পণ বিধি ।।

পিতৃতর্পণ—গোত্র সম্বন্ধ ও নাম উল্লেখ পূর্বক মন্ত্রপাঠ করিয়া পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ, মাতামহ, প্রমাতামহ, বৃদ্ধপ্রমাতামহ, মাতা, পিতামহী, প্রপিতামহী এই নয়জনের প্রত্যেককে যথাক্রমে তিন তিন অঞ্জলি জল দিবেন এবং মন্ত্রও তিনবার পাঠ করিবেন। মাতামহী, প্রমাতামহী ও বৃদ্ধপ্রমাতামহী ও তিনজনকে একবার মন্ত্র পাঠ করিয়া এক এক অঞ্জলি জল দিবেন। পিতামহ হইতে বৃদ্ধ প্রমাতামহী পর্যন্ত একাদশ পুরুষের মধ্যে কেহ জীবিত থাকিলে বা প্রেতাবস্থায় থাকিলে তাঁহাদের ত্যাগ করিয়া তাঁহার উপরিতন পুরুষকে ধরিয়া একাদশ সংখ্যা পূরণ করিয়া লইতে হইবে।

১. যজুর্বেদীয় বিপ্রদের প্রণালী যথা—

‘ওঁ’ উর্জং বহন্তীরমৃতং ঘৃতং পয়ঃ কীলালং পরিশ্রুতং স্বধাস্থ তর্পয়ত মে পিতৃন।

বিষ্ণুরোম —– গোত্র পিতরমুক দেবশর্মন তৃপ্যস্বৈতৎ সতিলোদকংত্যুভং স্বধা (৩বার)।

এই ভাবে গোত্র উল্লেখ করে ১. পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ, বৃদ্ধ প্রপিতামহ, ২. মাতামহ, প্রমাতামহ, বৃদ্ধ প্রমাতামহ, ৩. পিতামহী, প্রপিতামহী, বৃদ্ধ প্রমাতামহী, ৪. মাতামহী, প্রমাতামহী, বৃদ্ধ প্রমাতামহী প্রমুখদের নামের সাথে দেবশর্মন যোগ করে উপরোক্ত মন্ত্র পাঠ করে তিল দান করতে হবে।

*****************************

২. ঋগ্বেদীয় বিপ্রগণ—“বিষ্ণুরোম্ অমুকগোত্রঃ পিতরম্ অমুক দেবশর্মানম্ তর্পয়ামি এতৎ সতিলোদকং তস্মৈ স্বধা নমঃ।” (কেহ বা স্বধানমন্তর্পয়ামি বলেন) এইরূপ বাক্যে পিতামহাদি পুরুষগণকে তর্পণ করিয়া অমুক গোত্রাং মাতরং অমুকীদেবীং তর্পয়ামি এতৎ সতিলোদকং তস্যৈ স্বধা নমঃ (কেহ বা স্বধানমস্তপয়ামি) এই বাক্যে মাত্রাদি স্ত্রীগণকে তর্পণ করিবে।

৩. সামবেদীয় বিপ্রগণ—বিষ্ণুরোম অমুকগোত্রঃ পিতা অমুক দেবশর্মা তৃপ্যতামেতৎ সতিলোদকং তস্মৈ স্বধা নমঃ এইরূপ বাক্যে পিতামহাদি পুরুষগণকে তর্পণ করিয়া অমুকগোত্রা মাতা অমুকীদেবী তৃপ্যতামেতৎ সতিলোদকঃ তস্যৈ স্বধা এইরূপ বাক্যে মাতা প্রভৃতি স্ত্রীলোকগণকে তর্পণ করিবে।

৪. শূদ্রেরা— যজুর্ব্বেদীয় প্রণালীতে তর্পণ করিবেন। ‘ওঁঁ’ স্থলে ‘নমঃ’, দেবশর্মন, স্থানে দাস এবং দেবী স্থানে দাসী বলিবেন; ‘স্বধা’ স্থলে ‘নমঃ’ বলিবেন।

৫. ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যরা ‘দেবশর্মন’ ‘স্থলে যথাক্রমে ‘দেববর্মন’ ও ‘গুপ্ত’ বলিবেন। সমর্থ হইলে পিতৃব্য ভ্রাতা মাতুল বিমাতা ভগিনী পিতৃস্বসা মাতৃস্বসা শ্বশুর শ্বাশুড়ী ও সপিণ্ড প্রভৃতিকে এক এক অঞ্জলি জলদ্বারা তর্পণ করিবে।

(সূত্র : বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)

——————————————–

 পণ্ডিতদের মতে মহালয়ার দিনে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করে দেবতা ও ব্রাহ্মণদের উদ্দেশ্যে খাদ্যদ্রব্যাদি উৎসর্গ করা প্রকৃতপক্ষে পিতৃপুরুষের ঋণস্বীকার ছাড়া আর কিছুই নয় ।

ভারতকোষ গ্রন্থে চিন্তাহরণ চক্রবর্তী মহালয়াকে ‘পিতৃপুরুষের উৎসবের আধার’ বলেছেন। লয় প্রাপ্তি অর্থাত চন্দ্রের লয় হয় এই অমাবস্যা তিথিতে আর দর্শণশাস্ত্র মতে আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়ের সূক্ষাতিসূক্ষ্ম অনুভূতিগুলি অর্থাত পরমাত্মার রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ-শব্দ এই মহতাদির লয় হয় । তাঁরা তৃপ্ত হন তর্পণের দ্বারা । জাগতিক অনুভূতিগুলি থেকে মুক্ত হয়ে আত্মারা পরমানন্দে ফিরে যান স্বর্গলোকে। পিতৃপুরুষেরা নাকি এই সময়ে পরলোক থেকে ইহলোকে আসেন জল ও পিণ্ডলাভের আশায়। শাস্ত্রজ্ঞের অভিমতে, প্রয়াত পিতৃপুরুষদের জল-পিণ্ড প্রদান করে তাঁদের ‘তৃপ্ত’ করার উদ্দেশ্যেই এই তর্পণ ।

পণ্ডিত সতীনাথ পঞ্চতীর্থের মতে মহালয়ায় যে তর্পণ করা হয়, তা শুধুই পিতৃপুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেব তর্পণ, ঋষি তর্পণ, দিব্য-পিতৃ তর্পণ ইত্যাদির সঙ্গে থাকে রাম ও লক্ষ্মণ তর্পণ এবং জগতে সকল প্রয়াতকে জলদানের মাধ্যমে তৃপ্ত করার কথা বলা আছে। এমনকি জন্ম-জন্মান্তরে যাঁদের আত্মীয়-বন্ধু কেউ কোথাও নেই এরূপ সকল প্রয়াতকে জলদান করে তাঁদের আত্মার তৃপ্তি সাধন করা যায়।

প্রথমে তাম্রপাত্রে কৃষ্ণ তিল এবং অন্য আরেকটি তাম্রকুন্ডে তর্পণের জল ফেলতে থাকে ব্রতী । মন্ত্রোচ্চারণের দ্বারা প্রথমে সে তার জল নিয়ে পৌঁছে যায় দেবলোকে…ওঁ ব্রহ্মা, ওঁ বিষ্ণু, ওঁ রুদ্র, ওঁ প্রজাপতিস্তৃপত্যাম্‌। তারপর ঋষিলোকে সপ্ত ঋষিকে প্রণতি পূর্বক তর্পণের দ্বারা তৃপ্ত করে।

দেবলোক, ঋষিলোকের পর “এতত্‌ সতিলোগঙ্গোদকং ওঁ যমায় নমঃ’ …এই বলে মন্ত্রোচ্চারণ করে যমতর্পণ । এবার মহাভারতের সত্যবাদী জিতেন্দ্রিয় ভীষ্ম পিতামহের তর্পণ, রামতর্পণ এবং সবশেষে স্বর্গত আত্মীয় পরিজনের নামে জলদান করার রীতি এই তর্পণে।

এ থেকে জানা গেল ওইদিন মৃত আত্মাদের উদ্দেশ্যে তর্পণ বা শ্রাদ্ধ করা হয়। এরসাথে কোন দেবী-আরাধনার সম্পর্ক নেই। তাছাড়া কোন দেবীর এমন কোন জীবন্ত আদর্শ পাওয়া যায় না, যেখানে জীবাত্মার গতি-প্রকৃতি বর্ণিত হয়ছে। জীবাত্মা, পরমাত্মার সন্ধান বেদে, উপনিষদে পাওয়া গেলেও পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ গীতা গ্রন্থে বিশদে বর্ণনা করেছেন। সেখানেও আমরা কোন দেবীর যোগ খুঁজে পাই না।

হিন্দুদের প্রামাণ্য স্মৃতিগ্রন্থ মনু সংহিতার বিধান অনুযায়ী আর্য্য হিন্দুদের ব্রহ্মযজ্ঞ, দেবযজ্ঞ, ঋষিযজ্ঞ, পিতৃযজ্ঞ ও নৃযজ্ঞ ইত্যাদি নামের পঞ্চ মহাযজ্ঞ নিত্য পালন করতে হয়। বিশ্বাত্মার অন্তর্ভূক্ত সকলের মঙ্গল স্থাপনের লক্ষ্যে বাস্তব কর্মের নিত্য-উদযাপনের যে বিধান বিদ্যমান তার মধ্যে পিতৃ-মাতৃ যজ্ঞ অন্যতম। অথচ আমরা, তথাকথিত হিন্দুরা, সেসব ভুলে এই একটি দিন বিগত আত্মাদের স্মরণ করে হিন্দুত্ব রক্ষা করতে চেষ্টা করছি। উক্ত ব্রাত্যদোষ থেকে মুক্তি পাবার বিধান দিলেন যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, পঞ্চ মহাযজ্ঞের এক উন্নত সংস্করণ করলেন ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ পালনের বিধানের মাধ্যমে।

শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত ইষ্টভৃতি নিবেদন মন্ত্রের “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপারর্শ্বিকাঃ ।।” উচ্চারণ করার সাথে সাথে বৃহত্তর পারিপার্শ্বিকের জীবনবৃদ্ধির দায়ভারের শপথ নিতে হয় আমাদের। সব অবস্থাতে বাস্তব কর্মে পিতামাতা, পরিজনদের সেবার সাথে বৃহত্তর পরিবেশের জৈবাজৈব সবকিছুকে পালন-পোষণে সমৃদ্ধ করে রাখার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সার্থক হয় পঞ্চ-মহাযজ্ঞ বা ইষ্টভৃতি পালন। ইষ্ট বা পূর্ত কর্মের বাস্তব অনুশীলন বাদ দিয়ে, শুধুমাত্র সকালে উঠে টাকা-পয়সা নিবেদন করে মাসে মাসে পছন্দের সংস্থাকে পাঠানোই কিন্তু “ইষ্টভৃতি” নয়!

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের মধ্যে আর্য্যত্বকে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বললেনঃ

“পঞ্চবর্হি যা’রা স্বীকার করে, আর সপ্তার্চ্চি অনুসরণ করে, তারা যেই হোক আর যা’ই হোক– আর্য্য বা আর্য্যীকৃত । ৬০১ ।

(শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৭)

এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন—

“আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে গেল সেইদিন যেদিন থেকে আমরা পঞ্চবর্হির মূল নির্দ্দেশ অবজ্ঞা করতে শুরু করলাম । তখন থেকে আমরা অপরের খোরাক হলাম কিন্তু নিজেদের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখে পরকে আপন ক’রে নেবার সামর্থ্য হারিয়ে ফেললাম ।” (আঃ প্রঃ ১১।১০০)

“পঞ্চবর্হি ও সপ্তার্চ্চিই হ’চ্ছে সেই রাজপথ–যা’কে স্বীকার ও গ্রহণ ক’রে চললে ক্রমশঃই তুমি সার্থকতায় সমুন্নত হ’তে পার । ২৩৪ ।

(সম্বিতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ১২১)

সামগ্রিকভাবে হিন্দুদের কথা বাদ দিলেও, ইষ্ট প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়ে সদদীক্ষা গ্রহণকারী তথাকথিত সৎসঙ্গী-গণেরাও পঞ্চবর্হি ও সপ্তার্চ্চি-র অনুশাসনের অনুশীলনে উদাসীন! তবুও তারা নাকি সৎসঙ্গী!

সর্বশাস্ত্রসার গীতা গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ইষ্টকে নিবেদন না করে আহার (আহরণ) করলে চোর হতে হয়। এই বিধিও নিত্য তর্পনের অন্তর্গত। অতএব হিন্দু হতে গেলে সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার গ্রহণ এবং বর্ণধর্ম পালন আবশ্যিক। নচেৎ, আহার (আহরণ) নিবেদন না করার অপরাধে চোর হতে হবে।

শ্রীশ্রীঠাকুর তাই আমাদের আহার্য্য গ্রহণের পূর্বে নিবেদন করার বিধান দিলেন। খাবার সময় নিবেদন-ভূমিতে খাদ্য এবং জল দিয়ে বলতে হয়—”পরলোকগত পিতৃ-মাতৃ পুরুষ, আত্মীয়স্বজন, গুরুভাই ও আব্রহ্মস্তম্ব প্রত্যেকে যেন অন্ন পাকে পরিতৃপ্ত হয়ে, সন্দীপ্ত হয়ে জীবন-যশ ও বৃদ্ধিতে পরিপোষিত হয়ে স্মৃতিবাহী চেতনা লাভ করে, পরমপিতা তোমারই চরণে যেন সার্থকতা লাভ করে।”–এইভাবে গণ্ডুষ করতে হয়।

শ্রীশ্রীঠাকুর নিদেশিত উক্ত বিধান মেনে চললে আত্মশুদ্ধি হয়, দেহাতীত হলে নিরালম্ব বায়ুভূতে কষ্ট পেতে হয় না।

তাই তো শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন, “আপুরমান ইষ্টে কারও যদি প্রকৃত টান জন্মে, এবং তাই নিয়ে যদি সে বিগত হয় তবে সে মহান জীবন লাভ করবেই। আবার এ জীবনে যে যতই হোমরা-চোমরা হোক না কেন, সে যদি সুকেন্দ্রিক না হয়, প্রবৃত্তিই যদি তার জীবনের নিয়ামক হয়, তবে ঐ বিচ্ছিন্ন বিকেন্দ্রিকতা তার মৃত্যুকালীন ভাবভূমি ও পরজন্মকে যে অপগতিতে অপকৃষ্ট করে তুলবে, তাতে সন্দেহ কমই।” (আঃ প্রঃ ১১/১৮.০৩.১৯৪৮)

তাই তর্পন, পিতৃপক্ষ, দেবীপক্ষ, দেবী আরাধনা, দেবতা আরাধনা, পূজা তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা একমাত্র ইষ্টকেন্দ্রিক চলনে চলতে অভ্যস্ত হতে পারব। জীবাত্মায় বিশ্বাত্মার উপলব্ধি নিয়ে আত্ম-পূজায় সার্থক হতে পারব।–আজ্ঞাচক্রে ইষ্টের ভাব নিয়ে মহাচেতন সমুত্থানের পথে পাড়ি জমাতে পারব!

——————————————-

বিদেহী আত্মাদের সাথে যোগসূত্র রচনার উদ্দেশ্যে মহাভারতে পুরুষোত্তম কেন্দ্রিক জীবন চলনাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতা যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কোন দেব-দেবীর সাহায্য ছাড়াই ভক্ত যতীশ ঘোষ, ভক্ত নফর ঘোষ প্রমুখ বিদেহী-ভক্তদের লিঙ্গ-শরীরের সাথে বার্তালাপ করেছেন। এগুলো প্রামাণ্য সত্য।

শ্রীশ্রীঠাকুর পিণ্ডদেহ এবং লিঙ্গদেহের গতিপ্রকৃতি সকলের সামনে সহজভাবে উপস্থাপন ক‍রেছেন। তার দু-একটা উদাহরণ তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

*****************************************

যোগন—মরার সময় কিভাবে বুঝতে পারবো কোন্ দেশে বা যাচ্ছি আর কিরকমই বা হ’চ্ছে?

শ্রীশ্রীঠাকুর–চিত্রগুপ্তের কথা শুনেছেন তো? সারাজীবনের কার্য্য ও চিন্তার চিত্র মৃত্যুকালে মূর্ত্তিমান হ’য়ে একে- একে দেখা দেয়, তারপর সব চিত্র গুপ্ত হ’য়ে গেলে light (জ্যোতি) দেখা যায়। যাদের সেই জ্যোতির সঙ্গে পরিচয় আছে ( অর্থাৎ মৃত্যুকালের পূর্ব্বেও যারা সাধন দ্বারা সেই জ্যোতি দর্শন করেছে) তাদের সে-সময় ভয় হয় না; তারা তাই ধ’রে ব’সে থাকে, আর সদগুরু সেই জ্যোতির মধ্যে এসে দাঁড়ান, তখন পরিচয় হ’য়ে যায়। আর ভয় থাকে না।

যোগেন -আচ্ছা, মরার সময় ভয় পায় কি? এই যে সব যমদূতের বিকট চেহারা দর্শনে ভয় পাবার কথা শুনা যায়, তা’ সত্য নাকি?

শ্রীশ্রীঠাকুর—মনের ভাব সব মৃত্যুকালে এক- একটা form ( আকার) নিয়ে তো সম্মুখে আসে। ধরুন, কোনও স্ত্রীলোকের প্রতি খারাপ নজর যদি থাকে, তবে মরার সময় ঐ খারাপ ভাবটা form নিয়ে সামনে আসবে, আর, খারাপ ভাব যে form নেবে তা’ মনোহর তো হবে না, বিকটই হবে, কাজেই তা’ দেখে ভয় হ’তেই পারে।

যোগেন—আচ্ছা, সদগুরু ধরায় অবতীর্ণ হ’লে যারা তাঁকে আশ্রয় করে তারা কি সকলেই মুক্ত হয়?

শ্রীশ্রীঠাকুর—হ্যাঁ, যারা তাঁকে প্রকৃতই আশ্রয় করে, তাঁর উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে, তাদের সকলকেই তিনি মুক্তি দেন। (অমিয়বাণী, পৃষ্ঠা,  ১৫)

** মরো না, মেরো না, যদি পার মৃত্যুকে অবলুপ্ত কর **

।। প্রসঙ্গ মৃত্যু : –অমিয়বাণী গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী ।।

অশ্বিনীকুমার বিশ্বাস—আচ্ছা, যাদের সদগুরু লাভ হয়েছে তারা তো

মৃত্যুকালে সদগুরুর সাক্ষাৎ পাবে? তারফলে তারা তৎক্ষণাৎ মুক্ত হবে? যদি

তা না হয় তবে সাক্ষাৎ পাওয়ায় লাভ কি?

শ্রীশ্রীঠাকুর—এখানে জীবন্মুক্ত না হয়ে যারা মরবে তারা মৃত্যুকালে

সদগুরুর সাক্ষাৎ পেয়ে এই লাভবান হবে যে, একাকী অনির্দ্দিষ্ট পথে যাবার

জন্য ভয় পাবে না, আধারে ঘুরবে না, তাঁর আশ্রয় পেয়ে তৎকালে ভীত হবে না, আর

এ-জীবনে যতদূর উন্নত হয়েছিল, যেরূপ জীবন পেলে তারপর থেকে কাজ করতে পারে,

সেইরূপ জন্মলাভ করবে। যে-সমস্ত অসৎ কর্মফল ছিল তা ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তদ্

দরুন নিম্নতর যোনিতে জন্মাতে হবে না। ওরূপ মানুষ ম’রে মানব ছাড়া অন্য

জন্ম তো পাবেই না, বরং মানবের মধ্যে উন্নত চরিত্রের মানব হ’য়ে জন্মাবে।

                             * * *

মৃত্যু সম্বন্ধে বলিতেছেন-“Hundred twenty years-এ যে মৃত্যু সেইটাই natural। তার পূর্বে যে সমস্ত মৃত্যু হয়, সেগুলো unnatural। ব্যক্তিগত সাধনা দ্বারা, উন্নত প্রণালীর চিকিৎসা দ্বারা লোকের এই অকালমৃত্যু control করা যায়। মৃত্যুতে cells-এর পরিবর্তন হয়, অর্থাৎ একরকমের cells আর এক রকমের cells-এ transformed হয়, কিন্তু প্রত্যেক cell-এরই consciousness আছে। এই হিসেবে মৃত্যু আর কিছুই নয় কেবল diffusion of crystallised consciousness—cell এর জড়ীভূত এক individual consciousness হারিয়ে cell-এর consciousness গুলি ছড়িয়ে যাওয়া। একটা idea-য় যেন cell গুলি দানা বেঁধে থাকে। মৃত্যুতে cell-এর disintegration হয়। সেই আত্মার উপলব্ধি যার হয়েছে তার জন্ম নাই, মৃত্যু নাই—এটা real; আর আমাদের কাছে পূর্বজন্ম পরজন্ম অস্তিত্বহীন, মিথ্যা, কারণ, আমরা আত্মার সঙ্গে নিজেদের এখনও identified করিনি বলে, আত্মাই যে নানা ঘূর্ণিপাক সৃষ্টি করে করে জীবন-মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চলছে তা বুঝিনা এবং অনুভব করি না।”

যতীনদা—“তা হলে তো আমাদের পূর্বজন্ম, পরজন্ম নেই। তবে আর শ্রাদ্ধাদির কি প্রয়োজন ?”

শ্রীশ্রীঠাকুর—“Individual consciousness cell consciousness-এ বিকীর্ণ হয়ে পড়ে। বহু cell চতুর্দিকে তাদের consciousness নিয়ে বিচ্ছুরিত হয়, এক জটিল আমিত্ব ভেঙ্গে খান খান হয়ে বহু কোষের বহু, আমিত্বে পরিণত হয়, আর তাই মৃত্যু। আমরা যে শ্রাদ্ধাদি করি তাতে আমাদের idea প্রসারিত হয়। তাতে ভাবজগতে idea-র জগতে ঝঙ্কার তোলে। Idea-র পুষ্টি sympathetic idea-তেই। তাই শ্রাদ্ধে উপনিষদাদির উচ্চভাবের স্মৃতিকে জাগরণ করা হয়।” (চির-স্মরণীয় ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ২য় খণ্ড, পৃঃ ৪৫)

আত্মা, ‘অত’’ ধাতু ‘মন্’ করে হয়েছে। ‘অত’ মানে নিয়তগতিশীল হওয়া। আত্মা কি ? আত্মা চিরচঞ্চল। Nerve-এর মধ্য দিয়ে vital energyর যে flow তাই আত্মা। দেখা যায় vital energy-তে হয় বাইরের জগতের impression বা photograph। তাই বলে, আত্মা হতে হয় মন। আর তাই মন নিয়তচঞ্চল। Vital current-এর break আর make করছে যা, তাই মন । মন তা হলে কিছুতেই স্থির হতে পারে না।

(চির-স্মরণীয় ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ২য় খণ্ড, পৃঃ ১১৩)

************************

শ্রীশ্রীঠাকুর —চিত্রগুপ্তের কথা শুনেছেন তো? সারাজীবনের কার্য্য ও চিন্তার চিত্র মৃত্যুকালে মূর্ত্তিমান হ’য়ে একে- একে দেখা দেয়, তারপর সব চিত্র গুপ্ত হ’য়ে গেলে light (জ্যোতি) দেখা যায়। যাদের সেই জ্যোতির সঙ্গে পরিচয় আছে ( অর্থাৎ মৃত্যুকালের পূর্ব্বেও যারা সাধন দ্বারা সেই জ্যোতি দর্শন করেছে) তাদের সে-সময় ভয় হয় না; তারা তাই ধ’রে ব’সে থাকে, আর সদগুরু সেই জ্যোতির মধ্যে এসে দাঁড়ান,তখন পরিচয় হ’য়ে যায়। আর ভয় থাকে না।

যোগেন (প্রশ্ন কর্তা) —আচ্ছা, মরার সময় ভয় পায় কি? এই যে সব যমদূতের বিকট চেহারা দর্শনে ভয় পাবার কথা শুনা যায়, তা’ সত্য নাকি?

শ্রীশ্রীঠাকুর — মনের ভাব সব মৃত্যুকালে এক-একটা form ( আকার) নিয়ে তো সম্মুখে আসে। ধরুন, কোনও স্ত্রীলোকের প্রতি খারাপ নজর যদি থাকে, তবে মরার সময় ঐ খারাপ ভাবটা form নিয়ে সামনে আসবে, আর, খারাপ ভাব যে form নেবে তা’ মনোহর তো হবে না, বিকটই হবে, কাজেই তা’ দেখে ভয় হ’তেই পারে।

যোগেন — আচ্ছা, সদগুরু ধরায় অবতীর্ণ হ’লে যারা তাঁকে আশ্রয় কর তারা কি সকলেই মুক্ত হয়?

শ্রীশ্রীঠাকুর — হ্যাঁ, যারা তাঁকে প্রকৃতই আশ্রয় করে, তাঁর উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে, তাদের সকলকেই তিনি মুক্তি দেন।

(সূত্র : অমিয়বাণী, পৃষ্ঠা-১৫)

জন্ম ও মৃত্যুর আগম-নিগম-এর স্বরূপ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেনঃ “সম্বেগ জীবের বা মানুষের মধ্যে gene-এর (জনির) ভিতর দিয়ে যে pitch-এ (স্তরে) ওঠে, মরে যাওয়ার সময় psycho-plasm-এ (মানস দেহে) engraved ( মুদ্রিত) হয়ে থাকে সেই pitch-এ wave-এর (তরঙ্গের) আকারে। মিলনেচ্ছু sperm-এর (শুক্রকীটের) ভিতর সেই জাতীয় সম্বেগ সৃষ্টি হলে tuning (সঙ্গতি) হয় এবং মৃত ব্যক্তি পুনরায় শরীর গ্রহণ করার সুযোগ পায়। জন্ম ও মৃত্যুর এটাই revolving process (ঘুর্ণায়মান পদ্ধতি)।” (আ. প্র. ২১/১০৭)

*মৃত্যুর স্বরূপ প্রসঙ্গে* শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন : “আমাদের consciousness (চেতনা) ধৃতি যেটা, যা’ নিয়ে আমরা থাকি, সেটা হ’ল সম্বেগ। যে-সম্বেগ দ্বারা আমরা বাঁচি, বাড়ি, সেটা যদি কোন কারণে blocked হয়ে যায় তাহলে আমরা

মরে যাই।”

“আপূরয়মান ইষ্টে কারও যদি প্রকৃত টান জন্মে, এবং তাই নিয়ে যদি সে বিগত হয় তবে সে মহান জীবন লাভ করবেই। আবার, এ জীবনে যে যতই হোমরা-চোমরা হোক না কেন, সে যদি সুকেন্দ্রিক না হয়, প্রবৃত্তিই যদি তার জীবনের নিয়ামক হয়, তবে ঐ বিচ্ছিন্ন বিকেন্দ্রিকতা তার মৃত্যুকালীন ভাবভূমি ও পরজন্মকে যে অপগতিতে অপকৃষ্ট ক’রে তুলবে, তা’তে সন্দেহ কমই।” (আঃ প্রঃ ১/ ১৯.১১.১৯১৪)

শ্রীশ্রীঠাকুর কথাপ্রসঙ্গে বললেন—”মানুষের আত্মা যেমন অমর, নিষ্ঠাও তেমনি অমর। আমরা যে অমৃত-অমৃত করি, তার চাবিকাঠি হ’ল ইষ্টনিষ্ঠা। ইষ্টনিষ্ঠা যেই একজনকে পেয়ে বসে, তখন এক-একটা প্রবৃত্তির সিন্দুকের ডালা খুলে যেতে থাকে এবং বিভিন্ন প্রবৃত্তি ইষ্টমুখী অর্থাৎ একমুখী হ’তে থাকে। তখন বোঝা যায় কামের স্বরূপ কী, ক্রোধের স্বরূপ কী, লোভ-মোহ- মাৎসর্য্যের স্বরূপ কী! এবং এগুলির প্রত্যেকটির সপরিবেশ নিজের সত্তাপোষণী বিনিয়োগ করা যায় কিভাবে। তখন মানুষ প্রবৃত্তির হাতে গিয়ে পড়ে না, বরং প্রবৃত্তিগুলি তার হাতে খেলার পুতুলের মত হয়ে দাঁড়ায়। বেফাঁস চলন বন্ধ হয়ে যায়। এইভাবে মানুষের ভিতরে অখণ্ড ব্যক্তিত্বের প্রতিষ্ঠা হয়। সে প্রাজ্ঞ হয়ে ওঠে। বোধিসত্ত্ব হয়ে ওঠে।”

(আলোচনা-প্রসঙ্গে, উনবিংশ খণ্ড, ইং ১৭. ৪. ১৯৫০)

—————————————————————–

·         নিরালম্ব, নিরাশ্রয়, বায়ুভূতে অবস্থানরত লিঙ্গদেহীদের উদ্দেশ্যে প্রণতি জানাই। শুভ-সংস্কারী পিণ্ডদেহী মায়েদের সাধনায় আপনারা যেন পিণ্ডদেহ ধারণ করে এই মহান আলয়ে আবার ফিরে আসতে পারেন। পরমপিতার রাতুল চরণে সেই প্রার্থনা জানাই। সবাইকে জয়গুরু ও প্রণাম জানাই। আমরা যেন অমৃত জীবনের অধিকারী হতে পারি।বিনয়াবনত—তপন দাস

 

 

 

SANT SADGURU PARAMPARA

।। গুরু পূর্ণিমা, সন্ত সদগুরু পরম্পরা ও বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।
নিবেদনে-তপন দাস


‘‘গুরুই ভগবানের সাকার মূর্তি, আর তিনিই absolute (অখন্ড)।’’
‘‘গুরু হ’তে চেও না। (অর্থাৎ, তোমার গুরু যিনি তাঁর পাশে তোমার নিজের পট বসিয়ে প্রণাম ও প্রণামী নিতে যেওনা।) গুরুমুখ হ’তে চেষ্টা কর ; আর, গুরুমুখই জীবের প্রকৃত উদ্ধারকর্ত্তা।’’ (সত্যানুসরণ গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)
বর্তমান ইষ্টগুরু শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলছেনঃ
শিক্ষাগুরু থাক না অনেক
শিখো যেমন পার
ইষ্টগুরু একই কিন্তু
নিষ্টাসহ ধর ।
জীবনচলনার জাগতিক বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনে যে বা যারা সাহায্য করেন তারা হলেন শিক্ষাগুরু। পিতামাতা থেকে স্বভাব পাই বলে তাঁরা হলেন স্বভাবগুরু। আর জীবননদীর ঘুর্ণিপাক থেকে বাঁচাবার কৌশল যিনি শেখাতে পারেন অর্থাৎ অন্তর্যামীকে উপলব্ধি করাতে যিনি পারেন তিনি ইষ্টগুরু বা সদগুরু। এই গুরুই হলেন ভগবানের সাকার মূর্তি। তিনিই absolute (অখণ্ড) । ইষ্টগুরু গ্রহণ করলে মানুষ স্থিতধী হয়ে ব্যক্তিসত্তার অখণ্ড বিন্যাসকে বজায় রেখে নিজসত্তাকে উপলব্ধি করতে পারে। তখন শান্তি এবং সুখ দাস হয়ে সেবা করে।
বর্তমান ইষ্টগুরু শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন—
‘‘স্ত্রীলোকের যেমন দুটি স্বামী হয় না,
দুটি স্বামী মানে ব্যভিচার ও ব্যতিক্রম-দুষ্ট হওয়া,
পূত আত্মনিয়ন্ত্রণকে বিক্ষুব্ধ ও দুষ্ট ক’রে তোলা,
তেমনি নারী হো’ক-পুরুষই হো’ক—
কা’রো সদগুরু বা আচার্য্য দু’জন হয় না,
দু’জন হওয়া মানেই —
বিকেন্দ্রিক বিকৃতি ও ব্যতিক্রমে নিজেকেই দুষ্ট ক’রে তোলা।’’
(আদর্শ বিনায়ক গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত সৎসঙ্গ আন্দোলন সন্তমত, বৈদিক মত এবং পূর্বাপূর্ব অবতারবরিষ্ঠ পুরুষোত্তমগণকে মেনে চলার শিক্ষা দিয়েছে।
আগ্রা সৎসঙ্গের বিনতীর মাধ্যমে সন্ত-মতবাদকে, শ্রীশ্রীঠাকুর রচিত এবং প্রবর্তিত আহ্বানী, আচমন, আর্য্যসন্ধ্যা, পঞ্চবর্হিঃ, সপ্তার্চ্চি বৈদিক-মতবাদকে এবং পুরুষোত্তম বন্দনার মাধ্যমে পূর্বাপূর্ব অবতার-বরিষ্ঠদের আদর্শকে মান্যতা দিয়ে এক সর্বজনীন উপাসনা, প্রার্থনা প্রবর্তন করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। কেন জানিনা, দেওঘর সৎসঙ্গের কর্ণধারগণ ওই সর্বজনীন প্রার্থনাকে অস্বীকার করে ইষ্টগুরুর আদর্শকে অবমাননা করছেন।
* * *
“মৎস্য-কূৰ্ম্ম-কোল-নৃসিংহ-বামন শরীরম্ রাম-কৃষ্ণ-বুদ্ধ-যীশু-মোহম্মদ রূপায়িতম্ চৈতন্য-রামকৃষ্ণানুকূলং পূর্ব্বর্তনীপূরণম্
শাশ্বতং বৰ্ত্তমানম্।”-এর প্রবক্তা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সন্ত-সদগুরু পরম্পরা প্রসঙ্গে বলছেন, “……….. বুদ্ধদেব যে স্থানে উঠিয়া নির্বাক ছিলেন, শঙ্কর সেখানে পরমাত্মা খাড়া করিলেন। শঙ্করের পর রামানুজ, রামানুজের পরেই কবীর, নানক প্রভৃতি বহু সাধুর ভারতে প্রায় সর্বত্রই অভ্যুত্থান হয়। তারপর চৈতন্য, তারপর খৃষ্টধর্মের ঢেউ—তাহার ফলে রামমোহন প্রভৃতি। তারপর রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ। এই যে বিরাট, বহু কালব্যাপী বহু ধর্ম মতের আবির্ভাব ও সমাজ সংস্কারের প্রচেষ্টা— সমস্তই শ্রীকৃষ্ণ তত্ত্বেরই practical application বলা যাইতে পারে। তত্ত্ব হিসাবে বিশেষ নূতন কিছুই হয় নাই। একই বহুৎ তত্ত্বেরই নানা অংশ নানা মহাত্মার মধ্য দিয়া সমাজ শরীরের উপর দেশ কাল ভেদে ও মানুষের যোগ্যতা ও প্রয়োজনানুসারে পরীক্ষিত হইয়াছে। কিন্তু তাহার সঙ্গে সঙ্গে নূতন এক চরম তত্ত্বের সূচনাও দেখা দিয়াছিল কবীর প্রভৃতি কয়েক জনের মধ্যে। বলিতে গেলে রামচন্দ্রের তত্ত্বের পরে শ্রীকৃষ্ণই নূতন বৃহত্তর তত্ত্ব আনয়ন করেন। আবার শ্রীকৃষ্ণের পরে এই যুগেই ব্যাপকতর তত্ত্বের আবির্ভাব। আর সে তত্ত্ব শ্রীকৃষ্ণ, কবীর প্রভৃতির মধ্য দিয়া ক্রমশঃ আবির্ভূত হইয়াছে। এই নূতন তত্ত্বের speciality হচ্ছে এই যে, অন্যান্য মহাত্মার তত্ত্বের ন্যায় ইহার গ্লানি হওয়া অসম্ভব, কারণ এই মত কাহাকেও বাদ দিয়া নয়। যে কেহ যে অবস্থায়ই থাকুক না কেন, কিছুই বাদ না দিয়া এই মত গ্রহণ করিতে পারে। কেউ হয়ত ভুল করতে পারে (এই মতের Catholicity দেখে ), কিন্তু এ মত তাহাতে কোন রকমেই affected হবে না। (সূত্রঃ ঋত্বিগাচার্য্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য প্রণীত দিনপঞ্জী প্রথম খন্ড।)


যাইহোক, সাধক রামানুজ পরবর্তী সন্তমতের সাধক কবীরদাস জন্মেছিলেন 1440C বারানসীতে। তিনিই প্রথম আমাদের সৎ মন্ত্রের রহস্য ভেদ করে বলেছিলেনঃ
“কবীর ধারা অগমকী সদগুরু দয়ী লখায়,
উলট তাহি সুমিরন করে স্বামী সংগ লাগায়।”
অর্থাৎ ধারা উল্টে স্বামী যোগ করে জপ করতে নিদেশ দিলেন। সন্ত কবীরের পর গুরু নানক জন্মগ্রহণ করেন 15. 4. 1469 C পঞ্জাব প্রদেশের তালবণ্ডীতে। তিনিও ওই সত্যনাম প্রচার করেছেন। গুরু নানকের পর আগ্রাতে ২৪শে আগস্ট ১৮১৮ তে জন্মগ্রহণ করেন শিবদয়াল সিং, তিনি স্বামীজী মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ১৫ জুন ১৮৭৮ আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। পরবর্তী গুরু হন রায় সালিগ রাম। তিনি ১৪ মার্চ, ১৮২৯ আগ্রার পীপল মাণ্ডিতে জন্মগ্রহণ করেন। ৬ ডিসেম্বর ১৮৯৮তে আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। তিনি হুজুর মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ওই সৎনাম সাধন করে চরম ও পরম পথের সন্ধান পান। তিনি তাঁর গুরু স্বামীজী মহারাজের অনুমতি ক্রমে ওই সৎনাম সর্বসাধারণে প্রচার করেন। পরবর্তী গুরু হন পণ্ডিত ব্রহ্মশঙ্কর মিশ্র। ২৮শে মার্চ, ১৮৬১ তে ব্রাহ্মণ পরিবারে, বারানসীতে জন্মগ্রহণ করেন। ১২ অক্টোবর ১৯০৭ সালে দেহত্যাগ করেন। তিনি মহারাজ সাহেব নামে খ্যাত ছিলেন। মহারাজ সাহেব দেহত্যাগের পূর্বে একটি কাউন্সিল গঠন করে বাবু কামতা প্রসাদ ওরফে সরকার সাহেবকে পরবর্তী গুরু রূপে নির্বাচন করেন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরকার সাহেবকে সন্ত বলে উল্লেখ করেছেন, ভাববাণীতে। অন্তর্ধানের পর আগ্রা সৎসঙ্গের প্রধান গুরু হন সরকার সাহেব।
পুরুষোত্তম জননী মাতা মনোমোহিনী দেবী হুজুর মহারাজের দীক্ষিত ছিলেন। হুজুর মহারাজ বিগত হবার পর সরকার সাহেবের কাছে মা তাঁর ছেলের সম্পর্কে জানালে সরকার সাহেব “মেরা কাম ফতে।” বলে দেহ ত্যাগ করেন। পুরুষোত্তমরূপী সদগুরু অবতীর্ণ হয়েছেন জানতে পারে সাধ্যায়ী গুরু তাঁর দায়িত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন। সরকার সাহেব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গাজীপুরে। তারপর থেকেই মাতা মনোমোহিনী দেবী সন্তমতের সৎনামে দীক্ষা দিতে শুরু করেছিলেন।
মাতা মনোমোহিনী দেবী তাঁর গুরুদেব সাধক পুরুষ হুজুর মহারাজের কাছ থেকে যে বিনতী প্রার্থনা করতে শিখেছিলেন, সেই শিক্ষার ধারাটাকে প্রাধান্য দিয়ে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন পাবনার সৎসঙ্গ আন্দোলন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র পুরুষোত্তম রূপে স্বীকৃত হবার পরও আগ্রা সৎসঙ্গের ধারায় (যে ধারায় বীজমন্ত্রের উচ্চারণ স্বীকৃত, বীজমন্ত্রের মাধ্যমেই পারস্পরিক সম্ভাষণ প্রচলিত। আর্য্যকৃষ্টির দশবিধ সংস্কার অবহেলিত।) পাবনা সৎসঙ্গকে পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন বলেই আগ্রা সৎসঙ্গের বিনতী-র শিক্ষা দেওয়া হয় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের অনুসারীদের। যার ফলে, আজও বিনতীর মাধ্যমে বীজমন্ত্র উচ্চারিত হয়ে চলেছে। নিত্য সাধ্যায়ের জন্য আবশ্যিক, শ্রীশ্রীঠাকুর রচিত ‘জাগরণী’ সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দীক্ষিতরা যতটা না জানে, তার চেয়ে বেশি মানে মাতা মনোমোহিনী দেবী রচিত তাঁর গুরুদেবের প্রশ্বস্তির প্রভাতী গীতি ‘প্রভাত যামিনী উদিত দিনমনি’-কে।
পরবর্তীকালে দৈনন্দিন জীবনে আর্য্যকৃষ্টিকে উপস্থাপিত করতে শ্রীশ্রীঠাকুর যে সান্ধ্য-প্রার্থনা মন্ত্র রচনা করেছিলেন, মাতা মনোমোহিনী দেবী সেই প্রার্থনাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন, ‘‘সন্ধ্যা মন্ত্রটা মা মারা যাবার তিনদিন আগে লেখা হয়। মা শুনে বড় খুশি হয়েছিলেন। সেইজন্য ও জিনিসটার উপর আমার খুব প্রীতি আছে। মা শুনেছিলেন তাই ওটা আমার অর্ঘ্য হয়ে আছে।’’ (আঃ প্রঃ ২১ খণ্ড, ৭. ১১. ১৯৫২)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে কারো কাছে দীক্ষা গ্রহণ না করলেও বার বার তিনি বলেছেন, ‘আমার মা-ই যেন সরকার সাহেব, হুজুর মহারাজ ও অন্যান্য অন্যান্য মহাপুরুষদের প্রতীক—মা-ই আমার আদর্শ—মা-ই আমার জীবত্ব। তথাপি তিনি সরকার সাহবকে নিজের গুরু হিসেবে এবং হুজুর মহারাজকে মাতৃদেবীর গুরু হিসেবে মান্য করতেন, তাঁদের প্রতিকৃতিতে প্রণাম নিবেদন করতেন।

তাই আজকের পুণ্য দিনটিতে সকলকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে যে আমরা যেন ‘দ্বন্দ্বের অতীত গগনসদৃশ কেবলম্ জ্ঞানমূর্তিকে’ আজ্ঞাচক্রে স্থাপিত করে জগতের সব শিক্ষাগুরুকে, সব জীবকে যেন ভগবান জ্ঞানে সেবা করতে পারি । আমরা সবাই যেন গুরুমুখ চলনে চলতে চেষ্টা করি । গুরু পূর্ণিমার শুভক্ষণে পরমপিতার কাছে দীন সেবকের এই প্রার্থনা। জয়গুরু ও প্রণাম। বন্দে পুরুষোত্তমম্!

এই রচনায় তত্ত্ব ও তথ্যের কোন ভুল থাকলে অনুগ্রহ করে জানালে কৃতজ্ঞ থাকব।

GURU PURNIMA

।। গুরু পূর্ণিমার শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।

নিবেদনে—তপন দাস

আমাদের গুরুদেব/ইষ্ট শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সত্যানুসরণ গ্রন্থে বলেছেন, গুরুই ভগবানের সাকার মূর্ত্তি…..।
আজ গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষ্যে সব গুরুর শিষ্যগণ গুরুদেবের প্রতিকৃতির সামনে নানা উপাচার সাজিয়ে গুরুকে সেবা করার জন্য, গুরুর তুষ্টির জন্য গুরু পূজা করবেন। সেই পূজা কিভাবে করতে হবে সেটাও বলে দিয়ে গেছেন আমাদের গুরুদেব পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।
ভগবানের তুষ্টি প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন—
“যা’রা তৃষ্ণার্তকে পানীয় দেয়,
ক্ষুধার্তকে অন্ন দেয়,
রুগ্নকে নিরাময় করে,
দুর্বলকে সাহায্যে সবল করে তোলে,
শোকার্তকে সন্দীপ্ত করে তোলে সান্ত্বনায়—
সুশীল-সৌজন্যে
ইষ্টানুগ সম্বোধি পরিচর্য্যায়,
গৃহহারা, আশ্রয়হারা অভ্যাগত যা’রা
তা’দিগকে যা’রা আশ্রয়ে সুস্থ
ও শ্রীমণ্ডিত ক’রে
ধর্মে অভিদীপ্ত করে তোলে,
যোগ্যতার যোগ্য অনুচর্য্যায়
আত্মনির্ভরশীল করে তোলে,
ঈশ্বরের সেবা করে তা’রা
প্রত্যক্ষভাবে।”
(সেবা-বিধায়না, ১৪২)

।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দৃষ্টিতে বাস্তব ইষ্টপূজা ।।
ইষ্ট স্বার্থ ও প্রতিষ্ঠার অনুকূলে
প্রবৃত্তি ও চাহিদাগুলিকে নিয়ন্ত্রিত ক’রে
সত্ অর্থাত্ ইষ্টানুকূল জীবনবৃদ্ধিদ
যা’-কিছু চিন্তাকে
বাস্তবতায় পরিণত করবার প্রচেষ্টার সঙ্গে
যথাযথ সেবা ও যাজনে
পারিপার্শ্বিককে আকৃষ্ট ও উদ্বুদ্ধ ক’রে
প্রতি প্রত্যেককে ইষ্টে অনুরক্ত ক’রে তোলাই হচ্ছে
প্রকৃত ইষ্টপূজা।২৪
(পথের কড়ি)
তাঁর বলা অনুযায়ী চলনে চলে আমরা যেন নিত্যকর্মের মাধ্যমে গুরু পূজায় সার্থক হতে পারি।
সবাইকে জয়গুরু ও প্রণাম।

d

।। দুর্গাপূজা ও ধর্ম ।।

                         

।। দুর্গাপূজা ও ধর্ম ।।

                                                            নিবেদনে—তপন দাস

—————————————————————————————-

বাঙালী মননশীলতা দিয়ে দুর্গাপূজার বিষয়টাকে বাস্তববোধে চিন্তা করলে দেখা যাবে, আমাদের আলোচ্য মা-দুর্গা পূজ্য তাঁর চরিত্রগুণে। মা দুর্গার সমার্থক, মা উমাকে আমরা
কন্যা জ্ঞান করি। তাইতো ফি বছর কৈলাস থেকে নিয়ে আসি। যদিও তাঁকে আনতে এবং
দিতে কে বা কারা যান। কোন রুটে দোলায়, নৌকায়, ঘোটকে এবং গজে যাতায়াত
করেন, সে খবর দেবার দায়িত্ব তথ্যাধিকারীদের, আমার নয়! তবে আমি এবং আমরা
দশভুজার চাইতেও দ্বিভুজা উমাকে বেশী পছন্দ করি বলেই না উমাকে নিয়ে কতই না
আগমনী গানের ডালি সাজিয়ে তাঁকে বরণ করে নিতে চাই। কামনা করি, ঘরে ঘরে
উমার মত আদর্শ  মেয়ে  যেন জন্মায়। উমাই তো আমাদের মা দুর্গা! ভারতেই শুধু
নয়, সারা বিশ্বের সংস্কৃত মনীষায় নারীজাতির আদর্শরূপে স্বীকৃত, পূজিত।
স্বীকৃতি পাবেনই না বা কেন, পূজিত হবেনই না বা কেন,–কারো কান-ভাঙানিতে
কান না দিয়ে পরমভক্ত, পরমজ্ঞানী শিবকে পতিরূপে বরণ করে, স্বামীর
মনোবৃত্ত্যানুসারিণী স্ত্রী হয়ে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীদের ন্যায়
কৃতি সন্তানদের জননী হয়েছেন। তিনি একজন আদর্শ সংসারী নারী হয়েও অসৎ
নিরোধী তৎপর,–অশুভ শক্তিকে সমুচিত দণ্ড দেবার জন্য রণসাজে সজ্জিত
হয়েছেন।  পশুরাজকে করেছেন বাহন। পারস্পরিক শত্রু খাদ্য-খাদক সম্পর্কের
পেঁচা-ইঁদুর, ময়ুর-সাপকে মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ করেছেন। দুটি হাত দিয়েই
বৃহত্তর সংসারের দশদিক সামলাতেন। তাই তো তিনি দ্বিভূজা হয়েও দশ
ইন্দ্রিয়কে বশ করে হতে পেরেছেন দশভূজা। তাই তো তিনি দশপ্রহরণধারিণী।  তাই
তো তিনি পূজ্য। –এহেন চরিত্র ‘দেবী’ জ্ঞানে, ‘জগজ্জননী’ জ্ঞানে স্বীকৃতি
তো পাবেনই।  তাই তো আমাদের ঋষিরা দেবতাদের সম্মিলিত শক্তিতে সৃষ্ট দেবী
দুর্গা কাত্যায়ন অঙ্গনে মহিষাসুরকে বধ করার পর তাঁর প্রদর্শিত শক্তিকে
দৃষ্টান্ত স্বরূপ চিরস্থায়ী একটা আদর্শে রূপ দিয়েছিলেন। দেবী দুর্গাকে
স্ত্রীজাতির এক আদর্শ প্রতীক রূপে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁরা দেবী দুর্গার ওই
অসৎ-নিরোধী তৎপরতাকে দৃষ্টান্ত রূপে তুলে ধরে  নারীসাধারণকে  দেবী রূপে,
জগন্মাতা রূপে   মর্যাদা দিয়েছেন,  কামিনীরূপে নয়। তাইতো বর্তমানেও
সম্ভ্রান্ত হিন্দু নারীদের মধ্যে দেবী পদবি প্রচলিত।  ঋষিরা ছিলেন
বিজ্ঞানী। তাই তো তাঁরা দুর্গাপূজার  বিধান দিলেন বাস্তব অনুশাসনের
মাধ্যমে। আত্মবিস্তার কল্পে গর্ভাধান-সংস্কারের সময় স্বামী, নিজের
স্ত্রীকে জগন্মাতা জ্ঞানে স্ত্রীর নাভিমূল স্পর্শ করে বলবেন, প্রসীদ মা
জগজ্জননী,–হে  জগন্মাতার প্রতীকস্বরূপা চিন্ময়ী মা, তুমি প্রসন্ন হয়ে
আমাকৃত গর্ভাধান মাধ্যমে দেদীপ্যমান আত্মাকে আকর্ষণ কর।–ওই স্বীকৃতির
মাধ্যমে স্ত্রীকেও মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েছেন, কামিনীজ্ঞানে নয়।
এর কারণ, স্বামী, স্ত্রীর মাধ্যমে নিজেকে জন্মান, তাই তিনি জায়া।
    জীববিজ্ঞান অনুসারে প্রজনন-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আত্ম-প্রতিলিপি গঠন করা
হয়। পুরুষ-বীজ ধারণ করে, বীজের প্রতিলিপি গঠন করে ভূমি-স্বরূপা নারী। জনন
করেন বলে জননী। তাই কৃষকেরা ফসল ফলাতে জমি কর্ষণ করে, কর্ষণ মানে আকর্ষণ,
যাতে জমি বীজ থেকে ভালো সন্তান (ফসল) আকর্ষণ করতে পারে। জমি অনুযায়ী
উপযুক্ত শুদ্ধ-বীজ বপনের আগে ভূমিকে আগাছা মুক্ত করে, সার দেয়, জল দেয়,
জমি জননক্ষম হলে জো বুঝে বীজ বোনে।–জমিকে মাতৃজ্ঞানে পোষণ দিয়ে ভূমিকে
পূজা করে—যাতে জমি বীজের অন্তর্নিহিত সত্তাকে ভালোভাবে পুষ্ট করতে পারে,
বীজের সত্তাকে ধারণ করে আদর্শ মা হয়ে ভালো ফসল ফলাতে পারে। ফসল ফলাতে যদি
গর্ভাধান প্রক্রিয়া থাকতে পারে, মানুষ ফলাতে তো আরও বেশী বিধি-নিয়ম থাকা
উচিত!  আমাদের ঋষিরা ছিলেন প্রকৃত বিজ্ঞানী। বিজ্ঞান শব্দটিও উপনিষদ থেকে
উৎপত্তি হয়েছে। তাই ঋষিরা নারীদের জগন্মাতাজ্ঞানে ব্যবহার (treat) করতে,
শ্রদ্ধা  (honour) করতে  শিখিয়েছেন।–যার নাম প্রকৃত পূজা। যার মাধ্যমে
স্বভাবের স্ফূরণ হয়ে সব অভাবের পূরণ হয়।

                              
        ভারতের আর্য্য-ঋষিগণ, অবতার-বরিষ্ঠগণ প্রত্যেকেই সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির
উপাসনার কথা বলেছেন ধর্মের নামে, পূজার নামে। বর্তমান পুরুষোত্তম
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আরও একটু সহজ করে দিয়ে বললেন, ‘‘ধর্ম্মে সবাই
বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম্ম না-রে। অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম্ম
বলে জানিস্ তাকে। পূর্বতনে মানে না যারা/জানিস্ নিছক ম্লেচ্ছ তা’রা।’’
‘‘পূজা-আর্চ্চা মানেই কিন্তু /দৈবগুণ যা সেধে নেওয়া। হাতে-কলমে মক্স
করে/বাস্তবে তার রূপটি দেওয়া।।’’ ইত্যাদি ছড়াবাণীগুলো সহজ, সরল, ওজস্বী
আবেদনে সমৃদ্ধ হলেও একটা নির্দিষ্ট গণ্ডীর ভাষা-ভাষীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
ওই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দিতে বললেন,
‘Upholding urge of existence is Dharmma.’ বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্তা বা
অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করে উৎকর্ষতায় রক্ষা করার নাম ধর্ম। তথাপিও
আমরা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতার, কু-সংস্কারের, অজ্ঞানতার আবরণ ভেদ করে
শুদ্ধ আমিটাকে বের করতে ব্যর্থ হলাম। তথাকথিত ইনটেলেকচ্যুয়াল হওয়া সত্বেও
ধর্মের নামে ফুল, বেলপাতা, ধূপবিহীন ধূপকাঠি, ফল-মিষ্টান্নাদির অঢেল
আয়োজনে, মাইক বাজিয়ে, শব্দবাজির আওয়াজ দিয়ে পরিবেশবিদদের চিন্তার
বলিরেখায় ভাঁজ ফেলে দিতে ইন্ধন যোগাচ্ছি। আর আমাদের গর্বের রবীন্দ্রনাথ
আমাদের দ্বিচারিতা দেখে কষ্ট পাচ্ছেন আর ভাবছেন, যে মানুষগুলো ‘তোমার
পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার
তলে’ ইত্যাদি ছন্দের ডালি সাজিয়ে ভক্তির আবেদন জানায়, তারাই আবার পূজার
নামে কু-সংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে বিশ্বাত্মাকে দূষিত করে চলেছে।
        আমাদের বর্তমান যুগ যে যুক্তিবাদী সে কথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি
অস্বীকার করবেন না আশাকরি। যেমন, সন্তানের হয়ে মা খেলে সন্তানের পেট ভরবে
না। ছাত্রের হয়ে শিক্ষক লেখাপড়া করলে ছাত্র পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে
না।–তেমনি প্রচলিত পূজার আয়োজকদের হয়ে কোন পুরোহিত পূজা করলে আয়োজকদের
কিছু ফললাভ হবে কি ?


        অবশ্য পুরোহিতও  জানেন না ফললাতের বিষয় সম্পর্কে। যদি জানতেন বিসর্জন
মন্ত্রে বলতেন না—ওঁ আবাহনং ন জানামি, নৈব জানামি পূজনম্। বিসর্জনং ন
জানামি ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি।–অর্থাৎ আমি আবাহনও জানিনা,
বিসর্জনও জানিনা, আমাকে ক্ষমা করুন। (দ্রঃ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)
        বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী পূজ্য-প্রতিমা চঞ্চল চিত্তের
ধারণের জন্য একটি অবলম্বন। প্রতিমাকে ব্রহ্মের রূপ কল্পনা করে উপাসনা,
সংযম, সাত্তিক আহার, সাত্তিক বিহার ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে পূজা
করা হয়।–যাতে পূজক বা উপাসক মনসংযোগ দ্বারা প্রতিমাকে হৃদয়ে ধারণ করে
প্রতিমার গুণে গুণান্বিত হতে পারে। এই হলো প্রতিমা পূজার মূল কথা। তাহলে তো যার পুজো তাকেই করতে হবে। পূজ্যর সাথে পূজকের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে।
       যাই হোক,  এ থেকে এটুকু  বোঝা গেল যে  সততা, সংযম, ন্যায়নীতি ইত্যাদি মানবিক
গুণগুলোর প্রবহমানতাকে নবীকরণ করার মাধ্যম, পূজা
উদযাপনের উদ্দেশ্য। অথচ বাঙালীর সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার আয়োজন
বিশ্লেষণ করলে এর বিপরীত চিত্রটাই আমাদের বোধে ধরা পড়ে।
        বিজ্ঞানের বিধি অনুযায়ী একটা নির্ভুল অংক কষতে গেলেও একটা শান্ত পরিবেশ
প্রয়োজন, একাগ্রতার প্রয়োজন।  কিন্তু পূজার নামে, বেশীরভাগ
বারোয়ারী পূজা-প্রাঙ্গনগুলোতে ঢাকের আওয়াজ, মাইকের আওয়াজ, আয়োজকদের অহংকারের আওয়াজে কোন সুস্থ মানুষের একটি ঘণ্টার জন্যও একাগ্রভাবে, স্থিরচিত্তে বসে
থাকতে পারার কথা নয়! অবশ্য দেবদেবীর ব্যাপারটা আলাদা। মাটির পুতুল বলেই
আমাদের সব অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করতে পারে! তাই কবিগুরুর ভাষার—  

“তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি

বুঝতে নারি কখন্‌ তুমি

দাও’ যে ফাঁকি॥

তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি–

ফুলের মালা দীপের আলো ধূপের ধোঁওয়ার

পিছন হতে পাই নে ‘সুযোগ চরণ-ছোঁওয়ার,

স্তবের বাণীর আড়াল টানি

তোমায় ঢাকি॥

তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি—

দেখব ব’লে এই আয়োজন মিথ্যা রাখি

আছে তো মোর তৃষা’ কাতর আপন আঁখি

কাজ কী আমার মন্দিরেতে

আনাগোনায়—

পাতব আসন আপন মনের একটি কোণায়

সরল প্রাণে’ নীরব হয়ে

তোমায় ডাকি॥

তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি”—-

বাণীগুলো এক নির্মম সত্যের বার্তা  দেয় না কি?

                                         * * *

     বাঙালিদের মানস-দেবী মা দুর্গা। ‘যা দেবি সর্বভূতেষু’ মন্ত্রে যাঁর
অস্তিত্বের স্বরূপ প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ দেবী সর্বভূতের প্রাণশক্তি
স্বরূপা, সর্বভূতে দেবী অধিষ্ঠিতা। এবার প্রশ্ন, যে দেবী সর্বভূতে
অধিষ্ঠিতা সেই পঞ্চ-মহাভূত পরিপোষিত স্বেদজ, ক্লেদজ, অণ্ডজ, জরায়ুজ-জাত
ভূত(জীব/প্রাণী)গুলোকে, বেঁচে থাকার জৈবাজৈব  আবশ্যক উপাদানগুলোকে দেবীর প্রতিভূ  মনে করে সম্বর্দ্ধিত না করে, সুস্থভাবে টিঁকিয়ে রাখার  চেষ্টা না করে, কোন
যুক্তিতে মাটির প্রতিমা পূজার নামে প্রাণী হত্যা (মাংসের দোকানে লাইন, তার প্রমাণ।) করে, নানাভাবে পরিবেশকে দূষিত  করার জন্য বিশেষ করে কলকাতায়, (দ্রঃ পুজোর আগের এবং পরের দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের রিপোর্ট।) কোটি কোটি টাকা অপচয় করা হয়!
     ভাষা-বিজ্ঞান অনুযায়ী পূজা মানে পূরণ করা, সম্বর্দ্ধিত করা। যে
আচার-আচরণ পরিবেশের সাত্তিক জীবন-বর্দ্ধনার অভাবকে পূরণ করে, জৈবাজৈব
সবকিছুকে সম্যকরূপে বর্দ্ধিত করে, তার নাম পূজা।  উৎকৃষ্ট প্রসব করে যা,
তার নাম উৎসব। আর যে আচার-আচরণ জীবনবৃদ্ধিকে নন্দিত করে তার নাম আনন্দ।
এখন প্রশ্ন,  আমাদের প্রচলিত পূজা, উৎসবের উদযাপনকে কেন্দ্র করে আনন্দের
প্রকাশ বৃহত্তর পরিবেশকে কতখানি নন্দিত করে  ‘পূজা’ শব্দের যথার্থতাকে
উপহার দিতে পেরেছে? —এইসব বিষয়ে সত্তাপিয়াসী চিন্তাশীলদের চিন্তা করে
দেখা উচিত। বিশেষ করে যাঁরা কুসংস্কার বিরোধী রূপে নিজেদের বোধ ও বোধিকে
প্রতিষ্ঠিত করতে চান।
     বাহ্য পূজাবাদীদের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী পূজা শুরুর আগে মৃন্ময়ী
মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়।  আয়োজকদের বিশ্বাস, পুরোহিতের
মন্ত্রবলে নিষ্প্রাণ মূর্তিগুলো প্রাণবন্ত হয়। তর্কের খাতিরে বিষয়টাকে
সত্য বলে যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে একটা  প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে,
জীববিজ্ঞান অনুযায়ী জীবন্ত প্রাণীদের চলন, গমন, ইত্যাদি অভিব্যক্তি থাকা
আবশ্যিক।  অতএব বিজ্ঞানসম্মত  কারণেই পুরোহিতের মন্ত্রবলে দুর্গাঠাকুরের
চালচিত্রের দেবদেবী, অসুর, সিংহ, ময়ূর, সাপ, পেঁচা, ইঁদুরেরা জীবন্ত হয়ে নিজ
নিজ অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে। কেউ চুপচাপ স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে পারবে
না। ফলে শুরু হয়ে যাবে মহিষাসুর মর্দিনীর বাস্তব উপস্থাপনা—যুদ্ধ। অসুর,
দুর্গাকে আক্রমণ করবে, সিংহ গর্জন করতে করতে দেবীকে নিয়ে অসুরের দিকে
ধাবিত হবে, বাহনসহ অন্যান্য দেবদেবীরাও যোগদান করবে যুদ্ধে।–-এবার
প্রশ্ন–ওই অবস্থায় পুরোহিত, আয়োজকেরা, ভক্তেরা,  উদ্বোধন করতে আসা
সেলিব্রিটিরা, নেতা-মন্ত্রীরা কোন পক্ষে যোগদান করবেন? দেবীর পক্ষে না
অসুরের পক্ষে ?
         আর একটা প্রশ্ন, যে পুরোহিত আদ্যিকালের দেবদেবীদের কল্পিত মাটির
মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম, তিনি মানুষের প্রাণহীন দেহে আরো
সহজে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন বা পারা উচিত। কারণ,  বিজ্ঞান মতে,
মাটির মধ্যে থাকা অণু-পরমাণুর তুলনায় সদ্য মৃতদেহের অণু-পরমাণু বেশী
সক্রিয় থাকে, বেশী জীবন্ত থাকে।  মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী সরকারের স্বাস্থ্য
বিভাগ এ বিযয়টা নিয়ে ভেবে দেখতে পারেন। তাহলে অনেক অকালমৃত্যু সহজে রোধ
করা যাবে।
        সনাতন ধর্মীয় মতবাদ অনুযায়ী মানুষ অমৃতের পুত্র, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’
বলা হয়েছে।  সেই মানুষ যাতে দশবিধ-সংস্কারে সংস্কৃত হয়ে প্রকৃষ্ট জাতক বা
প্রজা হয়, অকালে নিষ্প্রাণ না হয়, সন্ত্রাসবাদী না হয়, রেপ-কেসের আসামী
না হয়, নারীদের মা-দুর্গার প্রতীক জ্ঞানে সম্মান জানায়, ‘অসতো মা সদ্গময়,
তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়’-এর আদর্শ অনুসরণে সমৃদ্ধ
হয়,–সমাজের পুরোভাগে থেকে, ওইসব বিষয়ে মানুষকে সচেতন করে পরিবেশের
হিতসাধন যাঁরা করতেন তাঁদের বলা হতো পুরোহিত।
   সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পুরোহিত ঋষি বশিষ্ঠ রামচন্দ্রের রাজসভায়
অকালমৃত্যু-দেহে প্রাণ সঞ্চার করার স্পর্দ্ধা দেখান নি।  বিজ্ঞান-যুগের
পুরোহিতেরা যদি পুতুলে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন, মৃতদেহেও পারা
উচিত! যদি না পারেন, ততঃ কিম্!
   ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি, ‘পূজা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সম্বর্দ্ধনা।
পূজ্য ব্যক্তিত্বের গুণে গুণান্বিত হয়ে নিজেকে এবং পরিবেশকে সম্বর্দ্ধিত
করা।  এতদিন ধরে হাজার-হাজার দুর্গাপূজা করে আমাদের চিন্ময়ী নারীরা
কতখানি সমৃদ্ধ হয়েছে মা দুর্গার ন্যায় অসৎ-নিরোধী-তৎপর আদর্শ চরিত্রের চরিত্রায়নে ? আমাদের চিন্ময় পুরুষেরা নারী সাধারণকে কতটা মা-দুর্গার প্রতীক মনে করে শ্রদ্ধা
করতে বা পূজা করতে শিখেছে ? আমরা সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির পথে কতটা এগিয়েছি?
আমাদের কতখানি দুর্গতি নাশ হয়েছে? আমাদের সার্বিক জীবন-চলনা দুর্গ-সম
পরিরক্ষিত হয়েছে কতটা?—তথ্য জানার অধিকার বলে এ বিষয়ে জানতে চাওয়াটা
নিশ্চয়ই অপরাধ হবে না! যদিও প্রচলিত তথ্য এর বিপরীত মত প্রকাশ করে চলেছে
দীর্ঘদিন ধরে। পূজাকে কেন্দ্র করে সাত্তিকতা বৃদ্ধি না পেলেও, তামসিকতা
বেড়ে যায় বহুগুণ।  পুজোকে কেন্দ্র করে ভক্তদের অনিত্য দেহটাকে
পূজা-বিপরীত সাধের  নানা বেশভূষায় সাজিয়ে দিতে বিকিকিনির পসরা সাজিয়ে
যারা বসেন, তারা কি পূজা-সদৃশ সততার দৃষ্টান্ত  উপহার দেন সমাজকে ? পূজাই
যদি উদ্দেশ্য তবে ইভটিজিং, আদমটিজিং কেন হবে ? অপরাধ কেন  বৃদ্ধি পাবে ?
দূষণ কেন বৃদ্ধি পাবে পূজাকে কেন্দ্র করে ?— এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে
?
        এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, “Accident-এ (আকস্মিকভাবে) যা’ জন্মে, তা বুনো, বিহিত সুফলপ্রদ চাষে যা’ জন্মে তা’ পুণো (পুণ্য)। প্রবৃত্তি লালসায়
অবিধিপূর্বক উপগতি হয়ে যে সন্তান জন্মে, তার চরিত্রের কোন ঠিক ঠিক থাকে
না। গর্ভাধান সংস্কারের ভিতর দিয়ে উন্নত চিন্তাপ্রসূত বিধিমাফিক পবিত্র
যে জন্ম, তার রকমই আলাদা। ঘরে ঘরে ভগবান জন্মে। তেমনি ছিল আমাদের
বিধান।’’ (আঃ প্রঃ ১৮/১৩)

অতএব আমাদের ঘরের মা দুর্গারা যেদিন আবার ঘরে
ঘরে লক্ষ্মী-সরস্বতী, কার্তিক-গণেশ সদৃশ ভগবান জন্মাতে পারবেন সেদিন সার্থক হবে আমাদের দুর্গাপূজা।

   দুর্গাপূজার বাস্তবতা তুলে ধরতে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেনঃ

       

 “….যে মৃন্ময় মূর্ত্তি
                আমরা পূজা করি—
                কল্পনায় প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করে,–
                        তিনি দশভূজা,
                                দশপ্রহরণ-ধারিণী—
                                ঐ আমাদের মায়েরই প্রতীক—
                        আমাদের ঘরে ঘরে
                                যে মা অধিষ্ঠিতা
                                তাঁরই বিনায়িত সুসঙ্গত প্রতীক;
        তাই ঐ মায়ের পূজা মানেই হচ্ছে—
                যে মা আমার,
                যে মা তোমার,
                যে মা ঘরে ঘরে
                        দুর্গা হয়ে অধিষ্ঠিতা,
        দুর্গতিনাশিনী হয়ে
        দশপ্রহরণ ধারণ করে
                সন্তান-সংরক্ষণায় নিয়োজিতা,
সেই মায়েরই পূজা;………..”
(আশীষ বাণী, ৬২/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)

“মা আমাদের দশভুজা,
        প্রতি ঘরে ঘরে
                যদিও তাঁকে
                        দ্বিভুজাই দেখতে পাই,
                        তিনি
দশদিক্ আবরিত করে রেখেছেন—
        তাঁর স্নেহ-উৎসারিত
স্বস্তি-উৎসারিণী উদাত্ত অনুচর্য্যায়,
        কায়মনোবাক্যে
                প্রতিটি কর্ম্মের ভিতর-দিয়ে
                        ব্যষ্টির পথে
                                সমষ্টিকে আন্দোলিত করে,
        সাত্বত উৎসর্জ্জনায়
                আপূরিত করে সবাইকে,
        কৃতি-উদ্দীপনার অনুপ্রেরণায়—
                তাই মা আমার দশভূজা;……”
(আশীষ বাণী, ৫৯/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)

উক্ত বাণীর মাধ্যমে পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র রক্ত-মাংসের মানবীদের মা দুর্গা রূপে সম্বোধন করলেন!

।। পূজা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের অনুভবী দিব্যবাণী ।।
“পূজা মানে সম্বর্দ্ধনা। শুধু নিরিবিলি মূর্ত্তি বা পটের সামনে ফুল-বিল্বপত্র দিয়ে মন্ত্রপাঠ করলে পূজা হয় না। গুরু ও গণের অর্থাৎ পারিপার্শ্বিকের বাস্তব সম্বর্দ্ধনা যাতে হয়, তাই করা চাই। তাতে শান্তি সুনিশ্চিত।  (আঃ প্রঃ ৭ম খণ্ড, পৃঃ ১৯৬)

       আমি আপনার পূজা করছি মানে, আপনার গুণ চিন্তা করছি এবং নিত্য অনুশীলনের
মাধ্যমে ঐ গুণগুলি আমার চরিত্রগত করে তুলছি, আমার ভিতরে বাড়িয়ে তুলছি।
স্তব করি মানে গুণ বর্ণনা করি। তা কিন্তু শুধু মুখে বা মনে-মনে করলেই
হবে না, প্রতিদিনকার অভ্যাস ও অনুশীলনের ভিতর দিয়ে ঐ গুণগুলি আমার
চরিত্রে মূর্ত্ত করে তোলা চাই।’’ (দীপরক্ষী ৪/১৮২)

      আদর্শ যদি থাকে, আর তাতে ভাবমুগ্ধ সক্রিয় অনুরাগ যদি হয়, তবে তার ভিতর দিয়েই মানুষগুলির প্রবৃত্তির একটা সার্থক বিন্যাস হতে পারে। নচেৎ শুধু একটা হাওয়ার উপর দাঁড়িয়ে এ জিনিসটা হয় না।   …গুরুগত প্রাণ না হলে মূর্তিতে বা নিজের ভিতর প্রকৃত প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয় না। তাই পূজার ফলও তাতে মেলে না। ব্রহ্মবিদকে উপেক্ষা করে যখন ব্রহ্মকে উপাসনা করতে চাই, তখন আমরা তমসাচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। কারণ, বোধ থাকে না, বাদ থাকে। তার থেকে বোধবন্ধ্যা বাদব্যাহৃতির উদয় হয়।… বাদব্যাহৃতি মানে তথাকথিত অনুভূতিহীন বাগাড়ম্বর।    (আলোচনা প্রসঙ্গে ১৮তম খণ্ড)


।। পূজা কেমন করে করতে হবে ।।

      “দেবতার পূজা-অর্চনা করতে গেলে আগে ইষ্টের ভাব অন্তরে জাগ্রত করে সেই
ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে, দেবতার স্মরণ মনন করতে হয়। তাঁকে স্মরণ করা
মানে—তাঁর চলন-চরিত্র ও গুণ গরিমা স্মৃতিতে এনে অনুশীলনের ভিতর দিয়ে
আয়ত্ব করা। চরণ-পূজা মানে চলন পূজা। ইষ্টের চলনাকে নিজের জীবনে আয়ত্ত
ক’রে ঐ চলনের প্রসারতা ও সম্বর্দ্ধনা যদি না ঘটাই বাস্তবে, তাহলে তাঁর
চরণ-পূজা সার্থক হয় না। আমরা ফাঁকতালে কাম সারতে চাই, কিন্তু বিধি বড়
কঠিন বান্দা, কোন চালাকি চলে না তাঁর কাছে।”  (আ. প্র. ২৯. ১২. ১৯৪২)


      “প্রশ্ন। হিন্দুরা দেবদেবীর পূজা করেন কিন্তু মুসলমানেরা একমাত্র
খোদাতায়ালার পূজা ক’রে থাকেন। হজরত ত’ ছবি ও পুতুল-পূজা একেবারেই নিষেধ
ক’রে গেছেন, কিন্তু আপনি এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য করছেন কেমন-ক’রে ?


      শ্রীশ্রীঠাকুর। ধর্ম্ম-আচরণের দিক দিয়ে হজরত রসুলও যা’ ব’লে গেছেন,
আর্য্যদের ধর্ম্মশাস্ত্র চিরকালই ঋষির নিদেশরূপে তাই বহন ক’রে আসছে।
আর্য্য-ধর্ম্মশাস্ত্র ছবি বা পুতুল-পূজা এমনতর বিকট তাচ্ছিল্যের সহিত
নিরস্ত করতে ঘোষণা ক’রেছেন—এমন-কি অধমাধম বলতেও ক্ষান্ত হন নি। তবে
আর্য্য-ঋষিদের প্রত্যেক মানুষকে উন্নতির পথে নিয়ন্ত্রণ করবার এমনতর একটা
ঝোঁক ছিল—যা-নাকি হজরত রসুলের ভিতর দেখতে পাওয়া যায়–………..” যারা পুতুল-পূজা নিয়ে পুতুলকে ভগবান করে একটা বেপরোয়া জড়ত্বের আরাধনায় মশগুল হয়ে আছে—কায়দা-কলম করে তাদিগকে ঐ পুতুল বা ছবি-পূজার অনিষ্টকারিত্ব বুঝিয়ে ঐগুলি যে নিরেটই অধম, তাদের তা বিবেচনার ভিতর দিয়ে এনে,  অন্তর থেকে তা যাতে মুছে যায় তারই মতলব কত কথার ভিতর-দিয়ে কত রকমে দিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। ………. (ইসলাম-প্রসঙ্গে/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র/পৃঃ ২৮-৩০)

       ।। পুরুষোত্তমের দৃষ্টিতে প্রতিমা পূজা ।।

              কোন্ বেকুব শিখিয়ে দেছে

                     আর্য্য যা’রা পৌত্তলিক,

              পুতুল-পুজো করে না তা’রা

                     পূজক আপ্তবীর-প্রতীক; ……… ১১।

                   (অনুশ্রুতি, ১ম খণ্ড/ আর্য্যকৃষ্টি)


সাধক রামপ্রসাদ তাঁর স্বরচিত গানের ভেতরেই তো
বলেছেন—
‘‘ধাতু-পাষাণ মাটির মূর্ত্তি
কাজ কি রে তোর আরাধনে
তুই মনোময় প্রতিমা গড়ি’
বসা হৃদি-পদ্মাসনে।।’’
এমন কত কি যে আছে, তার ইয়ত্তা নেই।’’
(কথা প্রসঙ্গে, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৭৬, ১৭-১০-১৩৪২)

* * *
        এবার আমরা এক়টু দেখে দেখে নেব, পূজা প্রসঙ্গে মেরা ভারত মহান’-এর
অন্যান্য মহানেরা এবং মহান গ্রন্থগুলো কি নিদেশ রেখে গেছেন।


পূজা বিষয়ে মহানির্ব্বাণতন্ত্র নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ
‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ।
অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’
মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ভারতে বিবেকানন্দ গ্রন্থের ৩৩৬
পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট।
ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’
‘‘যে-ব্যক্তি সর্ব্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ
প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে।’’ –শ্রীমদ্ভাগবত। ৩-২৯-২২
“ঈশ্বরঃ সর্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জ্জুন তিষ্ঠতি।
ভ্রাময়ন্ সর্ব্বভূতানি যন্ত্ররূঢ়ানি মায়য়া।।’’
(গীতা, ১৮। ৬৫)
“যিনি এই সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার নিজের স্বধর্মানুরূপ
নিষ্কাম কর্মাচরণ দ্বারা (বাক্য বা ফুলজল দ্বারা নহে) পূজা করিয়া মানুষ
সিদ্ধি লাভ করে। স্বধর্মানুরূপ (বর্ণানুগ সত্তাধর্ম পালন) নিষ্কাম কর্মই
পরমেশ্বরের পূজার ডালি। (গীতা ১৮। ৪৬)

      বৈদিকযুগে বেদের কোন দেবতাই শরীর গ্রহণ করেন নাই। বেদে বিগ্রহ বা দেবমন্দিরের উল্লেখ নাই। পৌত্তলিকতার চিহ্ন পর্য্যন্তও নাই। পুরাকালে বিগ্রহ বা মন্দির ছিল না।

কোন বেদে বা মূল পুরাণেও প্রতিমাপূজার প্রসঙ্গ নাই।

(ঋগ্বেদসংহিতা, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১১১)

সূত্রঃ সৎসঙ্গ পাব্লিশিং-এর গ্রন্থ, ইসলাম প্রসঙ্গে, পৃঃ ১১

        তাই, শাস্ত্র বর্ণিত অধমের চাইতেও অধম পূজায় মেতে উঠে আমাদের যাতে
ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে না হয়, তাই, শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্র আমাদের নিত্য বাস্তব দুর্গাপূজার পূজারী করে তুলতে
সৎসঙ্গীদের নিত্যপাঠ্য ‘সত্যানুসরণ’ নামক মহাগ্রন্থে নারীকে জগজ্জননী
জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত করতে নিদেশ দিয়ে বললেন, ‘‘প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী ।
প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয় ।’’
  এবং
পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, ‘‘স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যে-জন, তাহার হয়
না ভবের বন্ধন মোচন । …..স্ত্রী চিন্ময়ী মা।’’—এই শিক্ষার ধারাকে
বাস্তবায়িত করার নাম প্রকৃত দুর্গাপূজা ।


        শ্রীশ্রীঠাকুর শুধু পুরুষদেরই প্রতিনিয়ত দুর্গাপূজা করার বিধান দিয়েই
ক্ষান্ত হননি,   নারী-সাধারণের মধ্যেও দেবী দুর্গার এক স্থায়ী আসন পেতে
দিতে অনুশ্রুতি গ্রন্থের ১ম খণ্ডের বাণীতে বললেন—


‘‘শার্দ্দুলেরে বাহন করে
সাপের ফণার মালা পরে
কালবোশেখী ঝঞ্ঝাবেগে
ছোটরে নারী ছোটরে ছোট্ ।
দত্যিদানার নীচ বাহানা
আর্য্যাবর্তে দিয়ে হানা
ঘূর্ণিপাকের বেতাল গাঁথায়
হুলিয়ে ভুলিয়ে দিচ্ছে চোট্ ।
দশ প্রহরণ দশ হাতে ধর
বক্ষবিদরি ধ্বংসি ইতর
সূর্য্যরাগী বজ্রতেজে
আর্য্যনারী শত্রু টোট্ ।” (পুরুষ ও নারী/৮৩)


        তিনি নারীকে অবলা নয়, সবলারূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন । নারীর সতীত্বই
নারীকে সবলা করে তোলে। তাই তিনি কত আশা নিয়ে বললেন—
‘‘সতীর তেজে ঝলসে দে মা
        নিঠুর কঠোর অন্ধকারে
মদনভস্ম বহ্নিরাগে
        বৃত্তি-রিপু দে ছারখারে ।
প্রণবতালে ইষ্টমন্ত্র
        ঝঙ্কারি তোল সকলতন্ত্রে
বিষাণ হাঁকে রুদ্র দোলায়
        বজ্রে হানি মৃত্যুদ্বারে।’’ (পুরুষ ও নারী/৮৯)

        তাই আসুন, পূজার নামে অনিত্য-বস্তুর প্রতিযোগিতায় না মেতে, সব দেবতার
সমাহার-স্বরূপ যুগ-পুরুষোত্তমের বিধি মেনে, মা দুর্গার নিত্য-সিদ্ধ
দেদীপ্যমান আদর্শের আলোকে, আমাদের ঘরের মেয়েরা যাতে রাষ্ট্রপূজার
অর্ঘ্যস্বরূপ সুজননে সুসন্তানের উপহার সাজিয়ে,
শক্তিরূপিণী-দশপ্রহরণধারিণী সাজে সজ্জিত হয়ে নরাসুরদের কিভাবে দমন করে
অস্তিত্ব রক্ষার পূজার পূজারী হতে পারে,—সেই চেষ্টায় যত্নবান হই।


অসুরনাশিনী মা দুর্গার ন্যায় অসৎ-নিরোধী তৎপর হয়ে ওঠা যদি আমাদের কাম্য হয়,  তাহলে সবার আগে ইষ্টপ্রাণতায় সমৃদ্ধ হতে হবে।   তাহলে সব পূজার আগে আমাদের ইষ্টপূজায় সমৃদ্ধ হতে হবে। ইষ্টপূজায় সমৃদ্ধ হতে গেলে যা’ যা’ করতে হবে, বরং তা’ তা’ শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণী থেকে  জেনে নেওয়া যাক।

।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের দৃষ্টিতে প্রকৃত ইষ্টপূজা ।।
        ইষ্টস্বার্থ ও প্রতিষ্ঠার অনুকূলে
                প্রবৃত্তি ও চাহিদাগুলিকে নিয়ন্ত্রিত ক’রে
        সৎ অর্থাৎ ইষ্টানুকূল জীবনবৃদ্ধিদ
                যা’-কিছু চিন্তাকে
        বাস্তবতায় পরিণত করবার প্রচেষ্টার সঙ্গে
                যথাযথ সেবা ও যাজনে
        পারিপার্শ্বিককে আকৃষ্ট ও উদ্বুদ্ধ ক’রে
                প্রতি প্রত্যেককে ইষ্টে অনুরক্ত ক’রে তোলাই হচ্ছে
                        প্রকৃত ইষ্টপূজা। ২৪ (পথের কড়ি)

                                             —————–

।। ইষ্টপূজার উপাচার ।।

সব দেবতার সমাহারে পুরুষোত্তমের সৃষ্টি।

সহজ মানুষ নর রূপে করেন ধৃতি বৃষ্টি।।

( অনুশ্রুতি প্রথম খন্ড )

আমাদের  এই আধুনিক সভ্যতার সদস্য জ্ঞানী-গুণী-বুদ্ধিজীবিগণ জগৎ সম্পর্কে অনেককিছু জানলেও, মানব জীবনের উদ্দেশ্য ও গন্তব্য বিষয়ে সুস্পষ্ট কোন ধারণা দিতে পারেন নি। এ-বিষয়ে যুগ-পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, “জীবনের উদ্দেশ্য অভাবকে একদম তাড়িয়ে দেওয়া ……” —অভাবকে তাড়াতে হলে ভাবীর সাথে ভাব করতে হবে। আর সেই ভাবী হলেন সর্বজ্ঞত্ত্ববীজের আধার, পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।  আর,  “আমাদের গন্তব্য হলো ঈশ্বরপ্রাপ্তি—ঈশ্বরকে আপ্ত করতে হলে, ধারণ-পালন-সম্বেগসিদ্ধ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হওয়া প্রয়োজন….. তার উপায় হচ্ছে আচার্য্যে সক্রিয় অনুরতি।” সেই আচার্য্যের নাম যুগ-পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।

তাই, জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে হলে, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানব-জীবনকে পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে হলে বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের দীক্ষা বা আদর্শ জীবনচলনার নিয়ম গ্রহণ করতেই হবে।

পুরুষোত্তমের দীক্ষা সবারই নিতে হয় কেন ?

শ্রীশ্রীঠাকুর—দীক্ষা সবারই নেওয়া প্রয়োজন এবং নানাজনের নানা জায়গায় দীক্ষা নেওয়া হয়তো আছে। হিন্দুদের কথা, মহাপুরুষ বা পুরুষোত্তম যখন আসেন, তখন তাঁকেই গ্রহণ করাই লাগে। তাঁকে গ্রহণ করলে সবগুলির পুরশ্চরণ হয়। আর,  তাঁকে কেন্দ্র ক’রেই সব দীক্ষার integration (সংহতি) আসে। কেউ হয়তো তান্ত্রিক দীক্ষা নিয়েছে, কেউ হয়তো শৈব মতে দীক্ষা নিয়েছে। সেগুলির অনুষ্ঠান ক’রে বা না ক’রে যদি মহাপুরুষ বা পুরুষোত্তম-নির্দেশিত পন্থায় সাধন করে, ওতেই তাদের দীক্ষা সার্থক হবে। সাধু নাগ মহাশয় তো আগে দীক্ষা নিয়েছিলেন। কিন্ত রামকৃষ্ণদেবকে পেয়ে তাঁর কাছ থেকে দীক্ষা নিতে দ্বিধা করেননি। তাতে ওই (আগের) দীক্ষারই পুরশ্চরণ হয়েছিল। এইভাবে পুরুষোত্তমকে গ্রহণের রীতি যদি না থাকে, বিভিন্ন দীক্ষাপদ্ধতি ও তাতে দীক্ষিত লোকগুলো বিচ্ছিন্ন হ’য়ে থাকে। লোকসংহতি বলে জিনিষটা আসে না। ভাবগুলি integrated (সংহত) হয় না। নানা মত ও পদ্ধতির solution (সমাধান) হয় না। বিভিন্ন রকমগুলির solution (সমাধান) না হ’য়ে যে-দীক্ষাতেই মানুষ দীক্ষিত হোক না কেন, তাতে পরম solution (সমাধান) অর্থাৎ meaningful adjustment (সার্থক বিন্যাস) হয় না, নানা সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়। তাদের কেউ কাউকে দেখতে পারে না, বিরোধ থেকেই যায়, consolidation (দৃঢ়ীকরণ) হয় না।

আমাদের হিন্দুদের মধ্যে ধারণা আছে “সর্ব্বদেবময়ো গুরু”। গুরুর মধ্যে সমস্ত দেবতাকে দেখতে চাই আমরা। অর্থাৎ, তিনি তেমনি সর্ব্বপরিপূরক হওয়া চাই বাস্তবে। তা’ না হ’লে ব্যষ্টি ও সমষ্টির সর্বাঙ্গীণ বিকাশ সম্ভব নয়। তাঁর কাছে দীক্ষা first and foremost (প্রথম ও প্রধান)। আর, যা কিছুকে সঙ্গতিশীল অন্বয়ী তাৎপর্য্যের ভিতর দিয়ে সত্তাপোষণী ক’রে তোলাই হ’ল তপস্যা। তাকেই বলে শিক্ষা। (আলোচনা প্রসঙ্গে, খণ্ড ২২/৪. ৯. ১৯৫৩)

       শ্রীশ্রীঠাকুরঃ সদ্‌গুরু বা পুরুষোত্তমকে পেয়েও যারা দীক্ষা না নেয় তারা কিন্তু ঠকে যায়। তিনি তো আর নিত্য আসেন না। পেয়েও ছেড়ে দেওয়া মানে মন, মায়া, কাল ও প্রবৃত্তির ঘানিতে আরো শত সহস্রবার ঘোরা। (আ. প্র. ৩/১৩৫)

যাঁরা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৎমন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছেন, তাঁরা অবশ্যই জানেন,— শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শ-নির্দিষ্ট দীক্ষাপদ্ধতিতে প্রথমে আচমন করে সংবেদনী পাঠ করতে হয়। তারপর আসন করে বসা শিখতে হয়। তারপর প্রণাম মন্ত্র পাঠান্তর  আজ্ঞাচক্রে ধ্যান করা  শিখতে হয়। যে ধ্যানকে ঊষানিশায় কমপক্ষে আধঘণ্টা থেকে ৪৫ মিনিট সাধন করতে হয়। ধ্যানান্তে পুনরায় প্রণাম মন্ত্র পাঠপূর্বক *স্বতঃ-অনুজ্ঞা পাঠ করিয়ে চরিত্রায়িত করার শিক্ষা দেওয়া হয়। যথা—

আমি অক্রোধী

আমি অমানী

আমি নিরলস

কাম-লোভজিৎ-বশী

আমি ইষ্টপ্ৰাণ

সেবাপটু

অস্তি-বৃদ্ধি-যাজন-জৈত্র

পরমানন্দ

উদ্দীপ্ত শক্তি-সংবৃদ্ধ

তোমারই সন্তান

প্রেমপুষ্ট, চির-চেতন,

অজর, অমর

আমায় গ্রহণ কর,

প্ৰণাম লও।

      * স্বতঃঅনুজ্ঞা (auto-suggestion) —নিজেই নিজেকে আদেশ করে অন্তস্থঃ চৈতন্যের জাগরণ ঘটানোর বা আত্মসমবর্দ্ধনার অনুশীলন যা প্রতিবার ধ্যানান্তে করতে হয়।

      তারপর শবাসন ধ্যান শিখিয়ে দিনে ৩-৪ বার অভ্যাস করতে বলা হয়। তারপর থানকুনি পাতা খাওয়ার উপদেশ দেওয়া হয়। তারপর সংকল্প পাঠ করতে হয়। তারপর দক্ষিণা বাক্য পাঠ করতে হয়। তারপর জপ ও সিদ্ধি বিষয়ে উপদেশ নিয়ে ধ্যানের পদ্ধতির উপদেশ নিতে হয়। সবশেষে ইষ্টভৃতির উপদেশ প্রদান করা হয়।

                                   * * *

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের আবশ্যিক পালনীয় প্রাথমিক বিষয়সমূহ—অভক্ষ্যভোজী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুনাদি তামসিক আহার করা যাবে না। যারা করেন, আর্য্য হিন্দুমতে তাদের অভক্ষ্যভোজী বলা হয়েছে। অগম্যাগামী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ যারা প্রতিলোম, সগোত্র এবং সপিণ্ড সম্বন্ধীয়দের সাথে অবিধি পূর্বক ধর্মবিরুদ্ধ বিবাহের মাধ্যমে কামাচার করে, হিন্দুমতে তাদের অগম্যাগামী বলা হয়েছে। এরা কদাচারী, এদের প্রদত্ত আহার ও পানীয় অশুদ্ধ। (দ্রঃ সম্বিতী)

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের শিষ্যদের প্রাথমিকভাবে আবশ্যিক পালনীয় বিধিসমূহ— ঊষানিশায় মন্ত্রসাধন করা। সকালে ও সন্ধ্যায় আহ্বানীসহ সন্ধ্যা ও প্রার্থনা করা। ইষ্টভৃতি (ইষ্টনীতির ভরণ) করা।  পরিশ্রান্ত হলে শ্রান্তি কাটাতে কমপক্ষে ৩ বার ৫-৭ মিনিট শবাসন নিত্য-সাধন করা। বর্ণধর্মানুযায়ী সদাচারী হতে হবে। বর্ণাশ্রম মেনে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে। আপদ্ধর্ম ব্যতীত অন্য বর্ণের বৃত্তিহরণ করা চলবে না। ‘পঞ্চবর্হিঃ’ এবং ‘সপ্তার্চ্চিঃ’-র বিধান মেনে চলতেই হবে, যদি আদর্শ মানুষ হতে হয়। ওইসব  বিধানসমূহকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার নাম দীক্ষা গ্রহণ করা।

যাঁরা এস. পি. আর., পি. আর. উপাধির বলে দীক্ষা সঞ্চারণা করেন, তাঁরা যজমানদের দিয়ে ‘‘এই দীক্ষা গ্রহণ করিয়া আমি সর্বান্তকরণে শপথ করিতেছি যে—মানুষের জীবন ও বৃদ্ধির পরম উদ্ধাতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রকে প্রতিষ্ঠা করাই এইক্ষণ হইতেই আমার জীবনের যজ্ঞ হউক। ……’’ ইত্যাদি উচ্চারণ করিয়ে সংকল্প-শপথ গ্রহণ করান। এবং দীক্ষাপত্রের ২টি স্তবকে স্বাক্ষর করিয়ে নেন। এর উদ্দেশ্য যজমান যা’তে শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ মেনে চলেন তারজন্য একেবারে পাকাপোক্ত ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থাপত্র স্বয়ং শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত। দীক্ষাদাতার কর্তব্য, দীক্ষা গ্রহিতাকে শ্রীশ্রীঠাকুরের উপরোক্ত আদর্শের বিষয়ে সম্যকভাবে অবগত করিয়ে দীক্ষা দান করা। তা’ না করিয়ে দীক্ষাদাতা যদি তড়িঘড়ি করে যেনতেন প্রকারেণ মন্ত্র দিয়ে, সই-সাবুদ করিয়ে নেয়, তাহলেই মুশকিল। কপটাচার এবং দ্বন্দ্বীবৃত্তি দোষে দুষ্ট হতে হবে। অনেকক্ষেত্রে সেই প্রবহমানতা চলছে। যারফলে বেশিরভাগ দীক্ষিতগণ মনে করেন, সকালবেলা উঠে ঠাকুরের নামে কিছু টাকা-পয়সা নিবেদন করে, শুক্রবার নিরামিষ খেলেই শ্রীশ্রীঠাকুরের শিষ্য হওয়া যায়। অথচ, সত্যানুসরণ গ্রন্থের প্রথমেই তিনি এ বিষয়ে সাবধান বাণী দিয়ে রেখেছেন। “অর্থ, মান, যশ ইত্যাদি পাওয়ার আশায় আমাকে ঠাকুর সাজিয়ে ভক্ত হ’য়ো না, সাবধান হও—ঠকবে ; তোমার ঠাকুরত্ব না জাগলে কেহ তোমার কেন্দ্রও নয়, ঠাকুরও নয়–ফাঁকি দিলেই পেতে হবে তা’।” অর্থাৎ, আমার মধ্যে যদি তাঁর আদর্শের প্রকাশ না পায়, আচার-আচরণের মধ্যে ঠাকুরত্বকে না জাগাতে পারি, তাহলে তিনি আমার ঠাকুর নন, তিনি আমার কেন্দ্রও নন। সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছেন। সেই হিসেবে বিচার করে দেখলে দেখা যাবে, তাঁর আদর্শ মেনে চলেন যাঁরা, যজনসিদ্ধ যাঁরা, একমাত্র তাঁদেরই অধিকার রয়েছে, যাজন করার, প্রচার করার। অথচ, আমরা এসব মূল বিষয়টিকে অনেক সময় উপেক্ষা করে, নিত্য সাধন-পদ্ধতির  নামধ্যান, শবাসন, সদাচার, বর্ণাশ্রম, ঠাকুরের বলা অনুযায়ী পরিচ্ছদ, ইত্যাদিতে ছাড় দি‌য়ে, নিয়মের শিথিল করে অধিবেশন করে চলেছি, পূজা করে চলেছি। এ বিষয়ে সকলকে সচেতন হতে হবে, নচেৎ দ্বন্দ্বীবৃত্তি দোষে দুষ্ট হতে হবে।

পবিত্র সদদীক্ষা সঞ্চারণা-কালে  ইষ্ট প্রতিষ্ঠার সপক্ষে যে শপথবাক্য পাঠ করানো হয়, সেই  শপথের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের   আদর্শ  প্রতিষ্ঠা বা  ইষ্ট-প্রতিষ্ঠাই দীক্ষিত-জীবনের একমাত্র *যজ্ঞ। যজ্ঞ শব্দের অর্থ লোকসম্বর্দ্ধনী অনুচর্য্যা—ব্যক্তি, দম্পতি, গৃহ, সমাজ ও রাষ্ট্রের লোকসম্বর্দ্ধনী অনুচর্য্যা।  ওই ইষ্টপ্রতিষ্ঠা নামক যজ্ঞের বা লোকসম্বর্দ্ধনী অনুচর্য্যার  প্রাথমিক ধাপ,  ব্যক্তিগত জীবনে ইষ্টনীতির পরিপালন  করে  নিজের চলন-বলন, খাওয়া-দাওয়া, জৈবিক তাগিদের কাজকর্মগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা। যাকে আমরা  যজন বলতে পারি।

——————————————————————————————

*শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র যজ্ঞ প্রসঙ্গে বলেছেন—  

যজ্ঞ মানে বুঝলি কি তুই?

      আদরে-সেবায়-যত্নে পালা

আর্য্য ছেলের নিত্য নীতি—

      পঞ্চযজ্ঞে জীবন ঢালা,

ব্রহ্মযজ্ঞ, দেবযজ্ঞ

      নৃযজ্ঞ আর পিতৃযজ্ঞ,

ভূতযজ্ঞে পরিস্থিতির

      সেবাবর্দ্ধন করে প্রজ্ঞ। ৭০ ।

(অনুশ্রুতি, ১ম খণ্ড/সাধনা)

      এবং আলোচনা প্রসঙ্গে বিস্তারিতভাবে বললেন—

      শ্রীশ্রীঠাকুর— প্রথম হ’লো ঋষিযজ্ঞ বা ব্রহ্মযজ্ঞ। ঋষিরাই হলেন জ্ঞানবিজ্ঞানের উৎস। তাঁরা যে জ্ঞান দিয়ে গেছেন, তা’ আয়ত্ত করতে হবে এবং অন্যকেও তা’ আয়ত্ত করাতে হবে। একে বলে অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা। আর, জীয়ন্ত ঋষি যিনি, সঙ্গ ও সেবায় তাঁকে তুষ্ট-পুষ্ট ক’রে জ্ঞান আহরণ করতে হবে। এ সবই ঋষিযজ্ঞের মধ্যে পড়ে। তোমরা যে যজন-যাজন কর তা’ও প্রকারান্তরে ব্রহ্মযজ্ঞ। ব্রহ্মযজ্ঞ মানে, যার ভিতর-দিয়ে মানুষ বৃদ্ধি পায়। জ্ঞানের অনুশীলনের ভিতর-দিয়েই মানুষ বৃদ্ধি পায়। যে লোক সংসারে ঢুকে কেবল উদর-চিন্তা নিয়ে থাকে, জ্ঞান-আহরণের চেষ্টা করে না, তার উন্নতি খতম হ’য়ে যায়।

      তারপর দেবযজ্ঞ। দেবতা মানে, যাঁরা নিজেদের চরিত্র, গুণপনা, ঐশীবিকাশ ও ভাবৈশ্বর্য্যের ভিতর-দিয়ে লোকসমক্ষে দেদীপ্যমান হ’য়ে আছেন। দেবযজ্ঞ মানে, ঐ দেবতাদের অনুধ্যান ক’রে তাঁদের ভাব নিজের ভিতর সম্বর্দ্ধিত ক’রে তোলা এবং বাস্তব উৎসর্গে তাঁদেরও পরিতুষ্ট করা। শাস্ত্রে আছে, “সর্ব্বদেবময়ো গুরুঃ”—অর্থাৎ সদগুরুর মধ্যে সমস্ত দেবতারই অধিষ্ঠান আছে। তাই ইষ্টচিন্তা, ইষ্টের ইচ্ছানুযায়ী নিজেকে নিয়ন্ত্রিত করা, ইষ্টকে বাস্তব নিবেদন ইত্যাদি দেবযজ্ঞের মধ্যে পড়ে।

       আবার আছে পিতৃযজ্ঞ। পিতৃপুরুষের দৌলতেই আমরা দুনিয়ার মুখ দেখি ও দুনিয়ায় ক’রে খাই। তাঁদের দয়া ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। তাঁদের দেওয়া রক্ত ও গুণপনার জোরেই আমরা চলি। তাই তাঁদের তৃপ্তি যা’তে হয়, তা’ আমাদের অবশ্যকরণীয়। পিতামাতা বেঁচে থাকলে জীবন্ত গৃহদেবতা বোধে নিত্য তাঁদের সর্ব্বপ্রকারে সেবা করা উচিত। নয়তো নিত্য তর্পণ করার বিধি আছে। এতে পিতৃপুরুষের স্মরণ-মননের ভিতর-দিয়ে তাঁদের গুণগুলি আমাদের ভিতর সঞ্জীবিত থাকে। একটা আত্মপ্রসাদও লাভ করা যায়।………….

………….আর আছে নৃযজ্ঞ ও ভূতযজ্ঞ। অতিথি-সৎকার ও দুঃস্থ পরিবেশের বাস্তব সেবা-সাহায্যকে বলা যায় নৃযজ্ঞ। পরিবেশকে বাদ দিয়ে আমরা বাঁচতে পারি না, তাই তাদের সর্ব্বপ্রকার সেবা আমাদের করতে হবে। গৃহীর কর্তব্য হ’লো আগে অতিথিকে খাইয়ে তারপর সে খাবে। অতিথিকে নারায়নজ্ঞানে সেবা করার রীতি আছে আমাদের দেশে। কথা হ’চ্ছে, আমার দ্বারস্থ হ’য়ে কেউ যেন অভুক্ত না থাকে, বিমুখ না হয়, আমি ঘর বেঁধেছি সবার সেবার জন্য। ভূতযজ্ঞ বলতে ইতর জীবজন্তু থেকে আরম্ভ ক’রে গাছপালার পর্য্যন্ত সেবা করা বুঝায়। একটা গরুকে দেখছ জল না খেয়ে কষ্ট পাচ্ছে, তুমি কলের থেকে এক বালতি জল তুলে তাকে খেতে দিলে, সেটাও ভূতযজ্ঞের মধ্যে পড়বে। সাধারণতঃ নিজ আহার্য্যের অগ্রভাগ সশ্রদ্ধভাবে তাদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করার রীতি আছে। আদত কথা হ’লো, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবার সঙ্গে নিজের যোগসূত্রটা বোধ করতে অভ্যস্ত হওয়া। এগুলি যদি ভাবায় থাকে, করায় না থাকে, তাহ’লে হবে না। (আলোচনা-প্রসঙ্গে, ৩য় খণ্ড, ইং ৮-৬-১৯৪২)

       উপরোক্ত আর্য্যকৃষ্টির মহান বিধানসমূহকে ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের আদর্শের মাধ্যমে নবীকরণ করে পঞ্চ-মহাযজ্ঞের যুগপোযোগী বাস্তবায়ন করলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত ইষ্টভৃতি নিবেদন-মন্ত্র ‘‘ইষ্টভৃতির্ম্ময়াদেব কৃতাপ্রীত্যৈ তব প্রভো, ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ।।’’—উচ্চারণ করার সাথে সাথে বৃহত্তর পারিপার্শ্বিকের জীবনবৃদ্ধির দায়ভারের শপথ নিতে হয় আমাদের। সব অবস্থাতে বাস্তব কর্মে বৃহত্তর পরিবেশের জৈব এবং অজৈব সবকিছুকে পালন-পোষণে সমৃদ্ধ করে রাখার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সার্থক হয় ইষ্টভৃতি পালন। ইষ্টাদর্শের পঞ্চবর্হিঃ ও সপ্তার্চ্চি-র বিধি মেনে শারিরীক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক সদাচার পালনে, ইষ্টপ্রোক্ত বিধি অনুসরণ করে বিবাহ ও সুপ্রজনন নীতি পালনে অভ্যস্ত না হতে পারলে—‘আমি ইষ্টভৃতি করি’ এই কথা বলা বোধহয় সমীচীন হবে না। ইষ্টভৃতি করা মানে, বাস্তবে ইষ্টনীতি মেনে চলা, ইষ্টনীতির ভরণ করা।

                                      * * *

শ্রীশ্রীঠাকুরের নিদেশ অনুযায়ী, সৎমন্ত্রে দীক্ষিতদের ব্যক্তিগত জীবনে যজনশীল থাকার  জন্য ঊষা-নিশায় নিয়মিত কমপক্ষে ৪৫ মিনিট করে মন্ত্রসাধন করতে হয়। ৫ থেকে ৭  মিনিট করে কমপক্ষে তিনবার শবধ্যান করতে হয়। প্রাতঃকালিন ধ্যান, ইষ্টভৃতি, আর্য্যসন্ধ্যা ও প্রার্থনাদির অনুশাসন অনুশীলন করার পর পরিবারের বড়দের প্রণাম এবং ছোটদের প্রীতি-সম্ভাষন করতে হয়। তারপর  ইক্ষুগুড়সহ থানকুনি পাতা সেবন করতে হয়।

শ্রীশ্রীঠাকুরের বলা অনুযায়ী তিথি, ঋতু, সুস্থতা, অসুস্থতা, ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের জন্য নিদেশিত আহারবিধি মেনে সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার গ্রহণ করতে হয়। এতদ্ব্যতীত প্রার্থনা মন্ত্রে প্রদত্ত পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চির অনুশাসন মেনে সদাচার এবং বর্ণাশ্রম ধর্ম পালন করা আমাদের জীবনবৃদ্ধির জন্য  নিত্য করণীয় কর্ম।  এইসব ইষ্টবিধির নিত্য নিয়মিত অনুশীলন করার মাধ্যমে যজনশীল হতে হয়। যজনশীলতার মুখ্য বিষয়, বর্ণধর্ম পালন, দ্বন্দ্বীবৃত্তি ও প্রতিলোম আচরণ ত্যাগ করা। সবর্ণ অনুলোম বিবাহের নীতি পালন করা। কারো  বৃত্তিহরণ না করে, সেবা-কর্ম মাধ্যমে অর্জিত দিন গুজরানি আয়ের অগ্রভাগ ইষ্টের উদ্দেশ্যে নিবেদন করার শপথ পালনের নাম ইষ্টভৃতি বা ইষ্টনীতির ভরণ করা। জীবনকে সম্বর্দ্ধিত করার জন্য এর অতিরিক্ত আর কোন প্রচলিত পূজার প্রয়োজন থাকতে পারে কি?   

                                             * * *

শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের জন্য দৈনন্দিন জীবনে সহজ সাধনার একটা অনুশীলন করতে নিদেশ দিলেন অনুশ্রুতি গ্রন্থের নিম্নোক্ত বাণী মাধ্যমে।  

‘‘ঊষার রাগে উঠবি জেগে

      শৌচে শীতল হ’বি,

সন্ধ্যা–আহ্নিক জপ-সাধনায়

      ঈশের আশিস্ ল’বি;

কুতূহলে পড়শি ঘুরে

      দেখবি সযতনে,

আছে কেমন কোথায় কে জন

      মন দিবি রক্ষণে;

তারপরেতে বাড়ী এসে

      শৌচে যথাযথ,

গৃহস্হালীর উন্নয়নী

      অর্জ্জনে হ’ রত;

স্নানটি সেরে আহ্নিক ক’রে

      ক্ষুধামতন খাবি,

একটু চ’লে বিশ্রাম নিয়ে

     আগুয়ানে ধাবি;

এমনি তালে সচল চালে

      চলে সন্ধ্যা এলে,

শৌচে শুদ্ধ হ’য়ে করিস

      আহ্নিক হৃদয় ঢেলে;

উন্নয়নের আমন্ত্রণী

      গল্প-গুজব শীলে,

হৃষ্টমনে আলোচনায়

      কাটাস্ সবাই মিলে;

পড়শীদিগের অভাব-নালিশ

      থাকেই যদি কিছু,

তা’র সমাধান যেমন পারিস্

      করিস্ লেগে পিছু;

করন-চলন ধরন-ধারণ

      যজন-যাজন কিবা

সকল কাজেই ইষ্টস্বার্থে

      চলিস্ রাত্রি-দিবা;

আদর-সোহাগ উদ্দীপনী

      কথায় কাজে ঝুঁকে,

স্বার্থ-কেন্দ্র সবার হ’বি

      ধরবি ইষ্টমুখে;

বিশ্রামেরই সময় গা’টি

      ঘুমল হ’য়ে এলে,

ইষ্ট-চলন মনন নিয়ে

      ঘুমে গা’ দিস্ ঢেলে।’’

(অনুশ্রুতি/১ম/স্বাস্থ্য ও সদাচার/৬৯)

জীবনকে সম্বর্দ্ধিত করার জন্য এর অতিরিক্ত আর কোন প্রচলিত পূজার প্রয়োজন থাকতে পারে কি?   

* * *

“Be concentric.”

আমাদের আদর্শপুরুষ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র  একজন বিদেশী ভক্তকে জীবনচলনার সহজসাধন পদ্ধতি বোঝাতে Be concentric’ বলে উপদেশ দিয়েছিলেন।  আমার তো মনে হয় ওই উপদেশ আমাদের সকলের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। আর সুকেন্দ্রিক তৎপর থাকতে হলে সাধনভজনের মাধ্যমে ইষ্টাদর্শের সাথে অবিচ্ছিন্নভাবে যোগযুক্ত থাকতে হবে। বিশাল কঠিন ব্যাপার! যাইহোক, এ প্রসঙ্গে বিস্তারিতভাবে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন। 

শ্রীশ্রীঠাকুর—‘‘মানুষ যদি কোন-কিছু অবলম্বন না ক’রে একাগ্র হ’তে চেষ্টা করে, complex (প্রবৃত্তি)-গুলি dormant, dull ও indolent (সুপ্ত, ভোঁতা ও অলস) হ’য়ে যায়। কিন্তু মানুষ যদি সুকেন্দ্রিক হয়, তাতে সেগুলি roused, active ও meaningful (জাগ্রত, সক্রিয় ও সার্থক) হয়, individuality grow করে (ব্যক্তিত্ব গজায়)। আমাদের শরীরে যতগুলি cell (কোষ) আছে, সেগুলি concentric (সুকেন্দ্রিক) না হ’লে ছিটিয়ে যেত, impuls (সাড়া) carry (বহন) ক’রতে পারত না, বিচ্ছিন্ন হ’য়ে থাকত। concentric (সুকেন্দ্রিক) হওয়াই হ’লো উন্নতিলাভের পরম পথ। …… Earth (পৃথিবী)-টা যদি sun- এ (সূর্য্যে) concentric (সুকেন্দ্রিক) না হ’তো তাহ’লে তা ভেঙে গুঁড়ো-গুঁড়ো হ’য়ে যেত। গ্রহগুলি যদি কোথাও নিবদ্ধ না থাকতো, তবে অস্তিত্ব বজায় রেখে চলতে পারত না। আমাদের প্রত্যেকের ভিতরেই একটা যোগাবেগ আছে। ভালবাসা ও টান জিনিসটা দেওয়াই আছে। বীজ ও ডিম্বকোষের মধ্যে টান না থাকলে conception  (গর্ভসঞ্চার) হয় না, ব্যক্তিই বেরোয় না। ঐ টানকে রক্ষা করার জন্য সুকেন্দ্রিক হওয়া লাগে। সেজন্য বামুন, ক্ষত্রিয়, বৈশ্যের ছোট বয়সেই দীক্ষা নিতে হ’তো। দীক্ষা এসেছে দক্ষ কথা হ’তে। দীক্ষা মানে তাই যা’ আমাদের দক্ষ ক’রে তোলে। ….. ধর্ম ও বিজ্ঞান পরস্পর জড়িত। ধর্মে যদি বিজ্ঞান না থাকে, তবে তা’ অন্ধ। আবার বিজ্ঞানে যদি ধর্ম না থাকে, তবে তা খোঁড়া।’’ (আলোচনা প্রসঙ্গে ১৪ই অগ্রহায়ণ, ১৩৬০, সোমবার।)

ওই সুকেন্দ্রিক থাকার জন্য তিনি আমাদের নাম, ধ্যান, ভজন, সদাচার, লীলাস্মরণ ইত্যাদি বিধির মাধ্যমে এক সহজ সাধন পদ্ধতি দিয়েছেন।

অমিয়বাণী গ্রন্থের প্রণেতা বরেণ্য শ্রীযুক্ত অশ্বিনী কুমার বিশ্বাস মহোদয়  পরমদয়ালের কাছে প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছিলেন—নানারকম সাধনপদ্ধতি জগতে আছে, কি-রকম সাধনকে পূর্ণাঙ্গ সাধন বলা যেতে পারে।

শ্রীশ্রীঠাকুর—শব্দ-সাধন যাঁরা জানেন না, তাঁদের সাধন পূর্ণাঙ্গ সাধন নয়।

আমি (অশ্বিনী বিশ্বাস)—ঠিক বুঝলাম না। এমন সাধক আছেন যাঁরা জ্যোতির সাধন করেন, কিন্তু শব্দ-সাধন বা নাদ-সাধনের বিষয়ও জ্ঞাত আছেন। শ্রীরামকৃষ্ণপন্থীরা কি সাধন করেন জানি না, তবে নাদ-সাধন-সম্বন্ধে শ্রীরামকৃষ্ণ স্বয়ং বলেছেন, “নাদ-ভেদ না হলে সমাধি হয় না।” বিবেকানন্দও অনাহত নাদের অনুভূতির কথা বলেছেন।

শ্রীশ্রীঠাকুর—জ্যোতিঃ নাদের বা শব্দের শরীর। জ্যোতির চেয়েও নাদ সূক্ষ্মতর। যারা নাদ-সাধনের যে পরিমাণ জানে, তাদের সাধন-পদ্ধতি সেই পরিমাণে উন্নত বলা যায়। নাদ-সাধনের প্রকৃষ্ট পন্থাযুক্ত সাধনই প্রকৃত পূর্ণাঙ্গ সাধন। এই সাধনে সব সাধনের সারভাগ গৃহীত, কিন্তু বহিরঙ্গ-ভাব বর্ত্তমান যুগে অনাবশ্যক ব’লে বাহ্যভাবগুলো অনেকাংশে পরিত্যক্ত। বর্ত্তমানে ঐ সব বহিরঙ্গ ভাবসাধনে অযথা কালক্ষেপের আবশ্যকও নেই, অবসরও নেই। বাহ্যাড়ম্বর কম ব’লে পূর্ণ সত্যটিকে যত সোজাসুজিভাবে নেওয়া সম্ভব, তা’ এই শব্দযোগে নেওয়া হয়েছে। ইহাই বর্ত্তমানের যুগধর্ম্ম বা পূর্ণাঙ্গ সাধন।  (সূত্র : অমিয়-বাণী, শ্রীঅশ্বিনী কুমার বিশ্বাস।)

।। পূর্ণাঙ্গ সাধন করা প্রসঙ্গে  শ্রীশ্রীঠাকুরের নিদেশ ।।

“ভোরে সন্ধ্যার mood আসে, তখন সন্ধ্যা করতে হয়—সে একটা জাগরণের ভাব। আবার সূর্য যখন ডোবে, তখনও সন্ধ্যার mood আসে, তখনও সন্ধ্যা করতে হয়। দুপুরের সময়ও, বিশেষতঃ গরমের সময় সন্ধ্যার mood আসে। তখনও সন্ধ্যার সময়। দিনের সব কাজ এমনভাবে করা লাগে—যাতে সন্ধ্যায় যেই সূর্য ডুবছে, তখন আপনিই তার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত কাজ যেন নিভে আসে, আর তখন সন্ধ্যায় বসতে হয়। সন্ধ্যা করে তারপর সৎসঙ্গে যেতে হয়। এ করলে আর কিছু হোক আর না হোক, অন্ততঃ শরীরের স্বাস্থ্য আর কিছুতেই খারাপ হতে পারে না— আজীবন।” (ঋত্বিগাচার্য্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যের দিনপঞ্জী, ১ম খণ্ড থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী।)

।। পুণ্যপুঁথি গ্রন্থ থেকে নামধ্যান সাধনার সহজ  পদ্ধতি প্রসঙ্গে  শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী ।।

ধ্যান করবি সকল সময়। চলতে বসতে খেতে শুতে সকল সময়। একটু অভ্যাস করলেই হয়, বেশী কঠিন কিছু নয়। আর মনে অনবরত নাম, এমনকি কথা বলতে পর্য্যন্ত মনের মধ্যে নাম হচ্ছে, এই রকম করতে করতে স্বারূপ্য লাভ হয়। ৯। ২৪

      দ্যাখ, নিঝুম হ’য়ে নাম কর, ডুবে নাম কর, বেশ তালে তালে নাম কর আর মনের চোখটি ঠিক জায়গায় রাখ।  নীলদাঁড়া সোজা ক’রে হাত দুটি ঘুরিয়ে মাজার উপর রাখ। কাজের সময় কাকেও কাছে রাখবি নে, একা। এমন ক’রে বসবি, যাতে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ না ঝুলে পড়ে, না গ’লে পড়ে। একটা ঘুমের অবস্থা আসবে, সেটা করিস নে। অন্য রকম স্মৃতি কিছু আসতে দিস না, আসলেও তাড়িয়ে দিবি। তিন বেলা প্রত্যেকবার এক ঘন্টা থেকে দেড়ঘন্টা। ৩৫। ৭

কর্ম না করলে ধ্যান হয় না। আসলে ধ্যানে অধিকারী হয় না। যে যত কর্মী সে তত ধ্যানী।  ঘুম বেশী করতে নেই। ঘুম বেশীতে লয় এনে দেয়। মাঝামাঝি থাকবি। ৪৫। ৫

       দ্যাখ, যেমন তেমন করে নাম কর্তে পাল্লেই আয়ু বৃদ্ধি হয়। নামের সঙ্গে সঙ্গে আয়ু বল  সব বেড়ে পড়ে। নামে মুক্তি।

অনবরত নাম করবি আর চলতে ফিরতে সব সময় নাসামুলে দৃষ্টি রাখবি। দ্যাখ, যে আপন গুরুকে ঐ জায়গায় জাগিয়ে নিতে পারে, তার সব হবে ২০। ২৪

তাঁকে ধ্যান করবি চব্বিশ ঘণ্টা। সব দেখবি—সব সেই। তা’কেই কয় সন্ধ্যারে বন্ধ্যা করা। ৩। ১৯

ঐ নামটি ও ধ্যানটি যদি চব্বিশ ঘণ্টা করতে পারিস,—এমন-কি অন্যের সাথে কথা কইতেও ধ্যানটি হওয়া দরকার। সন্ধ্যায় শব্দ শোনা যায়। সন্ধ্যাটা দিন যায় রাত আসে—ভোরেও। তাই দুই সময়ই প্রকৃত কাজের সময়। দুই সময়ই ভাল। ২৬। ৬১ (সূত্র : ভাববাণী পুণ্য-পুঁথি মহাগ্রন্থ।)

।। নিত্যসাধনার জন্য তপোবিধায়না গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী ।।

*”প্রার্থনা বা তপঃ-উপাসনার পক্ষে

ঊষা বা ব্রাহ্মমুহূর্ত্ত,

মধ্যাহ্ন ও সায়ংকাল—

এই তিনই শ্রেষ্ঠ,

তা’র ভিতর আবার

ব্রাহ্মমুহূর্ত্তই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ;

মানসিক জপ সর্ব্বকালেই শ্রেয়;

আবার, প্রসন্ন, নির্দ্বন্দ্ব,

হৃদ্য-প্রীতি-প্রবুদ্ধ-যাজন

যা’ চিন্তন ও কথনের ভিতর-দিয়ে

উভয়কেই উদ্যোগী-উৎফুল্ল ক’রে তোলে,—

তা’ কিন্তু সর্ব্বকালেই শ্রেষ্ঠ‌।” ৯৩।

——————————————————————

     *উপরোক্ত অনুশাসনসমূহ অনুশীলন করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে পূজা। পূজা শব্দের অর্থ—সম্মাননা, সংবর্দ্ধনা, গুরুত্ব আরোপ করা। যাঁকে পূজা করছি, তাঁকে আমার ভিতরে সম্বর্দ্ধিত করে তোলাই প্রকৃত পূজা, অর্থাৎ তাঁর গুণাবলী আমার মধ্যে বাড়িয়ে তোলা।

      “পূজার উপকরণ ও অর্ঘ্য হলো যোগ্যতা। যোগ্যতার পূজা-অর্ঘ্যে পরিবার, পরিবেশ-সহ বেঁচে থাক।” (সূত্রঃ শব্দরত্নকোষ/সৎসঙ্গ পাব্লিশিং)

।। মন্ত্রসাধন প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী ।।

১৯২৩ সালের মে মাস। কথাপ্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলিতেছেন—

“নামের উপর খুব stress দিতে হয়। তাহলে intellect at will কোথাও apply করা যায় আবার ছাড়াও যায় সহজে। আমি কখনও কিছু ছাড়িনি, ছাড়ার কথা কখনও আমার মনেই হয় নি। যখন যেটাতে মন লাগত তখন সেটাই করতাম। অন্য কাজে মন লাগলে করতাম। আর আমি কখনো বসে আসন করে নাম করিনি, দৌড়িয়ে বেড়াতুম, কখন হয়ত বসে পড়তাম, কিন্তু বুদ্ধি করে নয়। তাই বলে আপনারা যেন মনে না করেন বসার দরকার নেই। Regularly বসা (at least সকাল ও সন্ধ্যায়) খুবই দরকার। সকালে ও সন্ধ্যায় চাদরে শরীর ঢেকে (বাহিরের influence না আসার জন্য) দুবার অন্ততঃ বসা উচিত। তা ছাড়া ২ মিনিট ১০ মিনিট যখনই পারা যায় বসা দরকার। কিন্তু সকাল সন্ধ্যায় যেন আজীবন বসা থাকে। পথে ঘাটেও একখানা বড় রুমাল বা চাদর সঙ্গে রাখা ভাল। যখন সময় হবে তখনই বসা দরকার, মুসলমানদের নমাজ পড়ার মত। নতুন বিয়ের পর বৌয়ের কথা যেমন সর্বদা মনে থাকে, কত রাত্রি জাগরণে কেটে যায় কিন্তু কয়েক বৎসরের মধ্যেই এ-পাশ ফিরে ও-পাশ ফিরে শুয়ে থাকে, তেমন পুরাতন হতে দিতে নেই। আমার কাছে ত নাম কখন পুরাতন হয়নি—সব সময়েই নতুন মনে হয় ।

Succession of events যেখানে বেশী সেখানে সময় যেন তাড়াতাড়ি চলে, যেমন সুখের সময় তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়। আবার succession যেখানে কম, সেখানে সময় যেন ফুরোতে চায় না। ধ্যানের সময় প্রথম প্রথম মনে হয় এক ঘণ্টা হয়ে গেছে। উঠে ঘড়ি খুলে দেখা গেল মোট ১০ মিনিট হয়েছে। আবার attachment হলে ধ্যানে এক ঘণ্টা হয়ে গেলে, মনে হয় যেন মাত্র ১০ মিনিট হ’ল। তাহলে time এর perception শুধু succession of events এর ওপর নির্ভর করে না, আমাদের মনের attachment বা concentration এর উপর নির্ভর করে, অর্থাৎ মন যদি একটা idea তে attached হয় এবং তাতে যদি তার full concentration থাকে সেখানে মুহূর্তকালই অনন্তকালে পর্যবসিত হতে পারে। আর concentration না থাকলে মুহূর্তকাল অনেক সময় বলে বোধ হয়। unattached এর পক্ষে ধ্যানের সময় যেন কাটেই না। Attachment একে থাকলে beyond time যাওয়া যায়, attachment বহুতে হলেই time এর মধ্যে এসে পড়ে। ছেলেদের time খুব তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়, activity খুব বেশি, কারণ succession of ideas খুব বেশি। যত বড় হয় তত যেন মনের ভিতর ফাঁক বেড়ে যেতে থাকে।”  (ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনী গ্রন্থের ২য় খণ্ড, পৃঃ ৩৫-৩৬)

     ।।  আমাদের আচার্য্য  শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আচরণদ্বারা যে সাধনভজন করতেন ।।

সব কাজের মধ্য দিয়ে সর্ব্বদা নাম চালাবার বুদ্ধি ছিল আমার। তাছাড়া যখনই ফাঁক পেতাম, নামধ্যান ও ভজন করতাম। কোন সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই হয়তো ধ্যানে ডুবে যেতাম। আর ঊষা-নিশায় তো করতামই। ধূঁ-ধূঁ হয়ে যেতাম। নাম করতে করতে চলেছি, হয়ত বেতবনের মধ্যে ঢুকে গেলাম। নাক বরাবর যেতে যেতে হয়তো পটলক্ষেতেই উপস্থিত হলাম। বাইরের দিকে খেয়ালই থাকত না। নামের নেশা পেয়ে বসে থাকত। (আ. প্র. ১৬/ ৫. ৪. ১৯৪৯)

।। নামধ্যানের তত্ত্ব প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী ।।

শ্রীশ্রীঠাকুর– নামই হ’ল বিশ্বচরাচরের প্রতিটি সত্তার মূল ভিত্তি। তাই, নামকে জানলে আত্মতত্ত্ব জানা যায়। নামকে জানতে গেলে নামীর শরণাপন্ন হ’তে হয়। নামী মানে যিনি নামস্বরূপ অর্থাৎ নামের মূর্ত্ত বিগ্ৰহ। তিনি হ’লেন দয়ীপুরুষ। জীবের প্রতি করুণাবশে তিনি মানুষ হ’য়ে আসেন, যাতে মানুষ তাঁকে ধ’রে দয়ালদেশে পৌঁছাতে পারে। নামে প্রেরণা জোগায় আর ধ্যান মানুষকে ধ্যেয়ের ভাবে ভাবিত ক’রে তঁদভিমুখী ও তঁৎচলনপরায়ণ ক’রে তোলে। যারতার ধ্যান করতে নেই, কারণ তাতে ধ্যেয়ের মধ্যে যদি কোন imperfection (অপূর্ণতা) বা unsolved knot (অসমাহিত গ্ৰন্থি) থাকে, তবে তা’ ধ্যানীর মধ্যে transmitted (সঞ্চারিত) হ’য়ে যেতে পারে। উপর থেকে যিনি perfection (পূর্ণতার) তকমা নিয়ে আসেন, তিনিই ধ্যেয়। কারণ, He is the highest and best guide and goad to human evolution (তিনি হলেন মানববিবর্ত্তনের সর্ব্বোচ্চ ও সর্ব্বশ্রেষ্ঠ পরিচালক ও অনুপ্রেরক) পুরুষোত্তমকে যারা জীবদ্দশায় পায়, তাঁরা যদি তাঁর প্রতি অনুরক্ত হ’য়ে তাঁর সঙ্গ, অনুসরণ, অনুচর্য্যা ও তীব্র কর্ম্মসহ নিষ্ঠাসহকারে নামধ্যান করে, তবে অল্প সময়ের মধ্যে ঢের এগিয়ে যেতে পারে। পুরুষোত্তমই ইষ্ট, পুরুষোত্তমই ধ্যেয়। তাঁর অন্তর্ধানের পরও তিনিই মানুষের ইষ্ট ও ধ্যেয় হয়ে থাকেন, যতদিন পর্য্যন্ত তাঁর পুনরাবির্ভাব না ঘটে। তাঁর অনুগামীদের কাজ হল তাঁকেই লোকসমক্ষে তুলে ধরা। মানুষের প্রাপ্তব্য হলেন ঈশ্বর এবং পুরুষোত্তমই হলেন রক্তমাংসসঙ্কুল আমান ঈশ্বর। আবার, পুরুষোত্তমকে নিজ জীবন দিয়ে যিনি যতখানি অবিকৃতভাবে ধারণ, বহন, প্রতিষ্ঠা ও প্রকাশ করেন, যাঁর চরিত্র ও ব্যাক্তিত্ব যতখানি ইষ্টানুরাগসন্দীপী, তিনি ততখানি পূজনীয় মানুষের কাছে।

(আঃ প্রঃ ১১ খণ্ড, ৬৭ পৃঃ থেকে সংগৃহীত)

।। প্রত্যেককে নামধ্যানে অভ্যাস করাবার  পদ্ধতি ।।

       শ্রীশ্রীঠাকুর কয়েকজনকে লক্ষ্য ক’রে বললেন—খুব সকালে উঠে ভোর চারটের মধ্যে প্রাতঃকৃত্যাদি ও নামধ্যান সেরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাগরণী গান গেয়ে সবাইকে জাগিয়ে দিতে হয়। তাড়াতাড়ি যাতে নামধ্যানে বসে তা’ করতে হয়। ওতে লোকে আনন্দ পায়, স্ফূর্তি পায়, তাদের শরীরও ভাল থাকে। আগে যতদিন ভোরে সবাইকে জাগিয়ে দিয়ে নামধ্যান করিয়েছি, ততদিন মানুষ অকালে মরেনি। তাই প্রত্যেককে এটা করানো লাগে। (আ. প্র. ১৬/ ১৫.  ৪. ১৯৪৯)

———————————————————————————————–

 (বিঃ দ্রঃ পরিতাপের বিষয়, লোকশিক্ষার জন্য উৎসবাদিতে শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত উক্ত নিদেশকে মেনে চলা হয় না।)   

মরো না, মেরো না, যদি পার মৃত্যুকে অবলুপ্ত কর।

।। মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার সহজ উপায় ।।

শ্রীশ্রীঠাকুর অমনি বললেন—অশ্বিনীদা, regular সাধন যে করে তার আর মৃত্যুভয় থাকে না। সে জীবন্তে ম’রে দেখে, death point এত বেশী দূর নয় যে কিছুকাল regular সাধন করলে তাহা না feel করা যায়। কিন্তু যে তাহা একবার feel করেই আবার সাধন ছেড়ে দেয় তারও কিন্তু অসুখে ভুগে মরতে হয়। আর, যে তা’ feel করেও regular সাধন করতে থাকে, তার শরীর ধ্বংসকারী অসুখ হলে ইচ্ছায় মনকে শরীর থেকে তুলে নিয়ে death point সহজে pass করে; বড় একটা কষ্ট পায় না—অভ্যাস রাখতে হয়। তবে একবারও যে জীবন্তে তা’ feel করেছে সেও রোগে ভুগতে-ভুগতে সেই point-এর কাছে গেলে তার সেই সংস্কার জেগে ওঠে এবং সেও তখন তাতে concentrate করে ভাল idea-তে absorbed হয়ে (যথা, সদ্গুরু ধ্যান ইত্যাদি) দেহত্যাগ করে; ফলে সদগতি হয়। আর, যার অভ্যাস আছে, সে তো কতবার death point অনুভব করে ফিরে আসছে, সে অসুখে বেশী ভোগে না; সে-রকম দেখলে তো ঐ point-এ concentrate করে সদগুরুর ধ্যানে absorbed হয়ে শরীর ছাড়ে। Death-টা হচ্ছে কর্মসংস্কারগত একটা idea-তে বেশী absorbed হ’য়ে এই ব্যক্তিত্ববোধ হারান। এই আমি অশ্বিনী রূপে যে আমিত্ব-বোধ-এর সঙ্গে সম্বন্ধরাহিত্য, এই আমিত্বের সঙ্গে যে connecting links আছে তাহা cut off হয়ে যায়। যে idea-টা তকালে predominant থাকে তাতে absorbed হয়ে যেন তাহাই আমি—এইভাবে তন্ময় হয়ে এই আমিত্বকে বিস্মৃত হওয়া। একপ্রকার লয় আর কি। সাধকেরও লয় বহুবার ঘটবার মত হয়, উচ্চ-উচ্চ ধামে (plane-এ) যখন গতি হয়, তখন তাতে absorbed হয়ে লয় হয়। যে যত তীব্র সাধক, সে লয় তত রক্ষা করে-করে উচ্চ হতে উচ্চতর লোকে যায়। আর, যেখানে গিয়ে লয় এসে যায়, সেই তার খতম। (সূত্রঃ  অমিয়বাণী)

।। মৃত্যুকালে নাম করার কি ফল হয়।।

 একজন জিজ্ঞাসা করলেন– মরার সময় নাম করে, তার ফল কী হয়?

 শ্রীশ্রীঠাকুর—সেটা যদি তার সত্তাকে স্পর্শ করে তবে ভাল হয়। সত্তাকে স্পর্শ না করলে পরজন্ম নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ফলপ্রসূ হয় না। অর্জ্জিত সংস্কার যেমন সত্তাসঙ্গত না হ’লে সন্তানে বর্ত্তায় না। (আঃ প্রঃ ২০/১৭. ৭. ১৯৫১)

নামধ্যান ব্যতীত আমাদের, সৎসঙ্গীদের কমপক্ষে প্রতিদিন ৩ বার করে শবাসন করতে হয়। সে বিষয়ে একজন ভক্ত জিজ্ঞাসা করলেন—শবাসন কি মৃত্যুর ধরণ অভ্যাস করা?

শ্রীশ্রীঠাকুর — এটা শরীর-বিধানকে নিয়ন্ত্রিত করবার ক্ষমতা দেয়। এটা দ্বারা হার্ট ফেল ইত্যাদি আকস্মিক ব্যাপার এড়ান যায়। (আঃ প্রঃ ২০/৩০. ১২. ১৯৫১)

।। চক্রফটো ধ্যান ও শবাসন করা  বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী ।।

শৈলেনদা—আমাদের দীক্ষাদানের সময় যে চক্রফটো ধ্যান করার কথা বলতে হয় ……… ।

শ্রীশ্রীঠাকুর—ওটা আমি আগে করিনি। পরে হয়েছে। পি. সি. সরকার যখন আশ্রম ( পাবনায়) গেল, তখন তার সাথে কথায়-কথায় light reflection-এর (আলোর প্রতিফলনের) কথা উঠল। সে বলল, শাস্ত্রে এরকম যন্ত্রের কথা আছে। ঐরকম গোলাকার একটা যন্ত্রের মধ্যে যদি মনঃসংযোগ করা যায় তাতে একটা mechanical push (যান্ত্রিক প্রযোজনা) মতন হয়, আর তাতে brain power (মস্তিষ্কের শক্তি) বাড়ে। তখন আমি সাদা-কালো ক’রে এই ষোড়শদল চক্রের idea (পরিকল্পনা) দিই। পরে কেষ্টদা তন্ত্র থেকে খুঁজে বের করল, এরকম একটা যন্ত্রের কথা সেখানে আছে, তার নাম মহালক্ষ্মীযন্ত্র। ঐ সময় থেকে এ’টা চলে আসছে। এরপর শৈলেনদা শবাসন করা নিয়ে কথা তুললেন। সেই প্রসঙ্গে বললেন পরম দয়াল—শবাসন আমিও করতেম । ওতে শরীরটা soothed (ঠান্ডা) করে। *শবাসন নিয়মিত করলে সহজে হার্টফেল হতে দেয় না। (দীপরক্ষী, ষষ্ঠ খণ্ড, ইং ২৯-৪-১৯৬০)

                                       * * *

       শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শ গ্রহণ করে  আমরা জানতে পেরেছি, ধর্ম মানে ধারণ করা। অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম্ম বলে জানিস তাকে।  নিজের এবং অপরের অস্তিত্বের ধারক, পালক ও পোষক হবার জন্য যা যা করা হয়, তাই ধর্ম। জীবনবর্দ্ধনার অপচয়ী অনিত্যকে ত্যাগ করে, জীবনবর্দ্ধনার উপচয়ী নিত্য-এর উপাসনা করা, আরাধনা করা। জীবনবৃদ্ধির তাগিদে একটা ফুলকেও বাঁচতে সাহায্য করতে হবে। অযথা একটা ফুলকে মেরে ফুলের স্রষ্টার পূজা হতে পারে না। অতএব ধর্ম বা ধারণ করার বিধি  যার-যার, তার-তার পালনীয়। একে যদি আমরা পূজা মনে করি, তাহলেও যার পূজা তাকেই করতে হবে। কোনো ভায়া-মিডিয়া  প্রতিনিধি দিয়ে হবে না। যার ক্ষিদে তাকেই খেতে হবে, ক্ষুধার্তের হয়ে অন্য কেউ খেলে ক্ষুধার্তের কি পেট ভরবে? অথচ আমরা শ্রীশ্রীঠাকুরের পূজার নামেও  ওই কাজটাই করে চলেছি।  ইষ্টপ্রোক্ত নামধ্যানের অনুশীলন বাদ দিয়ে, ভক্তদের প্রতিনিধি স্বরূপ একজন পুরোহিত ফুল, ফল, মিষ্টি, কাসর, ঘণ্টা, চামর, ধূপ, দীপ প্রভৃতি উপাচার সহযোগে, মন্ত্র উচ্চারণ করে শ্রীশ্রীঠাকুরের প্রতিকৃতির  উদ্দেশ্যে ভোগ নিবেদন করেন।  ভক্তরা দর্শক-শ্রোতা হয়ে প্রতিকৃতির কাছে মনে মনে দুঃখ, কষ্ট, বেদনা, কামনা-বাসনার কথা জানান। পূজা অন্তে প্রতিকৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত খাদ্যদ্রব্য সকলের মাঝে প্রসাদ নামে বণ্টন করা হয়।

স্বভাবতই একটা প্রশ্ন জাগে, ওই পূজার নামে যে খাদ্যদ্রব্য নিবেদন করা হয়, সেগুলি কি প্রতিকৃতি খান, ঈশ্বর কি শুধুমাত্র প্রতিকৃতিতে আবদ্ধ থাকেন ?

এ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলছেন—

ঈশ্বর প্রতিটি অস্তিত্বে–

ব্যষ্টি ও সমষ্টিতে

বিকিরিত হ’য়েও

আরো হ’য়ে আছেন ;

অস্তিত্বের জীবনে ধারণ-পালনী সম্বেগ

সত্তা-পোষণায়

যেমন সমৃদ্ধ হ’য়ে চলে,

অমনি ক’রেই ঈশ্বর সবার ভিতর

সমৃদ্ধ হ’য়ে চলেন–

যেমনতর সামগ্রিকভাবে,

তেমনি ব্যষ্টিগতভাবে ;

তাই, গীতার কথা–

ঈশ্বরঃ সর্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জ্জুন তিষ্ঠতি।

ভ্রাময়ন্ সর্ব্বভূতানি যন্ত্রারূঢ়ানি মায়য়া।।

আর, ‘মায়য়া’ মানে

পরিমিত ও পরিণত হ’য়ে ;

আর, ঈশ্বর মানে

যা’তে ধারণ-পালনী সম্বেগ আছে

ও সমৃদ্ধি লাভ করেছে । ১১১ ।

(দর্শন বিধায়না)

ভগবানের খাওয়াদাওয়া প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন

      শ্রীশ্রীঠাকুর—মানুষকে যখন ভালবেসে খাওয়াই, তখন ভগবান একটু পান। যেমন প্রাণে দিই, তিনি তেমনি পান। বিশেষ ক’রে অশক্ত, ক্ষুধার্ত্ত, আপদগ্রস্ত, বিপাক-বিধ্বস্ত—এদের খাওয়ালে ভগবান খান। খাওয়ানো কেন, তাদের প্রতি যত্ন-আদর, সেবা-শুশ্রুষা-যা’ই করা হয়, সবই ভগবান পান। তাদের যোগ্যতায় যোগ্য ক’রে তুললে ভগবান আরও তৃপ্তি পান। যাকেই যোগ্য ক’রে তুলবে, ভগবান তাতেই তৃপ্ত হন। (আঃ প্রঃ খণ্ড ১৯/ পৃঃ ২৩৬/ তারিখঃ ২৫/০৮/১৯৫০)

       এছাড়াও, আমরা ভগবানের সেবক বা সেবাইত হয়ে, ভগবানকে সেবা করতে আমরা নানা উপাচারের নৈবেদ্য সাজিয়ে নিবেদন করে থাকি। তাতে কি ভগবান তুষ্ট হন ?

ভগবানের সেবা করা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন

“যা’রা তৃষ্ণার্তকে পানীয় দেয়,

ক্ষুধার্তকে অন্ন দেয়,

রুগ্নকে নিরাময় করে,

দুর্বলকে সাহায্যে সবল করে তোলে,

শোকার্তকে সন্দীপ্ত ক‍রে তোলে সান্ত্বনায়—

সুশীল-সৌজন্যে

ইষ্টানুগ সম্বোধি পরিচর্য্যায়,

গৃহহারা, আশ্রয়হারা অভ্যাগত যা’রা

তা’দিগকে যা’রা আশ্রয়ে সুস্থ

ও শ্রীমণ্ডিত ক’রে

ধর্মে অভিদীপ্ত করে তোলে,

যোগ্যতার যোগ্য অনুচর্য্যায়

আত্মনির্ভরশীল করে তোলে,

ঈশ্বরের সেবা করে তা’রা

প্রত্যক্ষভাবে।”

(সেবা-বিধায়না, ১৪২)

       এতক্ষণে আমরা বুঝতে পারলাম যে, ভগবান বা দেবতাকে পুজো করা সহজসাধ্য ব্যাপার  নয়।

আমরা তথাকথিত পূজা এবং অধিবেশন অন্তে কিছু খাদ্যবস্তুকে *প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করে প্রসাদভুক হয়ে থাকি। ওই প্রসাদ-এর অর্থ এবং ভাবার্থ এবার জেনে নেওয়া যাক।

 [প্র-সদ্ (হৃষ্ট হওয়া)]=যা গ্রহণ করলে দেহ-মন-প্রাণ হৃষ্ট (প্রফুল্ল হৃদয়) হয়, তার নাম প্রসাদ। শুধু সাত্তিক খাদ্যবস্তু নয়, ব্যবহারিক শ্রবণ, কথন, আলাপন, পঠন-পাঠন ইত্যাদি যা আমাদের দেহ-মন-আত্মাকে হৃষ্ট করে, তার নাম প্রসাদ। (অভিধান/জ্ঞানেন্দ্র মোহন দাস)

প্রসাদভুক [দীপরক্ষী ১ম, ০৩/০৬/১৯৫৩]— ঈশ্বরের আশীর্বাদ বা অনুগ্রহ লাভ, ঈশ্বরের প্রসন্নতা লাভ। [প্রসাদ—প্র-√সদ + ঘঞ্ (ভাবে)] অনুগ্রহ। “মানুষকে যে যত service সেবা দেয়, সে তত বড় প্রসাদভুক হয়।”  (শব্দরত্নকোষ)

*সৎসঙ্গের আনন্দবাজার নামক সর্বজনীন ভোজনালয়ে প্রদত্ত আহার্য্য দ্রব্যকে প্রসাদ বলা হয়। শ্রীশ্রীঠাকুরের লীলাকালিন সৎসঙ্গ অধিবেশন অন্তে প্রসাদ হিসেবে গুড়ের বাতাসা প্রদান করা হতো। 

        যাইহোক, প্রসাদরূপী খাদ্যদ্রব্য আমাদের জৈবিক ক্ষুধা নিবারণ করতে প্রয়োজন হলেও, আত্ম-বিস্তারের জন্য প্রসাদভুক হতে হলে  মানুষকে শুধু নয়, ব্রহ্মের প্রতীক-স্বরূপ, পরিবেশের সবাইকে সেবা দিয়ে অমঙ্গল দূর করে মঙ্গল প্রতিষ্ঠা করতে হবে—মরণকে স্তব্ধ করতে জীবনের জয়গান গাইতে হবে—নিম্নোক্ত বাণীতে প্রদত্ত ইষ্ট নিদেশ মেনে।

ঘটে-ঘটে ইষ্টস্ফূরণ

যখনই তোর হবে,

ব্রহ্মবোধের প্রথম ধাপটি

ঠিক পাবি তুই তবে। ৪৯।

ঘটে-ঘটে ইষ্টনিশান

বোধে দিলে হানা,

ব্রহ্মবোধের ধাপটিরে তোর

হবেই তখন জানা। ৫০।

‘তত্ত্ব’ (অনুশ্রুতি ১ম খণ্ড)।।

সবাইকে যথাবিহিত শ্রদ্ধা ও প্রণাম জানিয়ে বিদায় নিলাম। জয়গুরু। বন্দে পুরুষোত্তমম্!

tapanspr@gmail.com