[বিশ্বজুড়ে মেয়েরা তাদের শিক্ষা, তাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা এবং হিংসাবিহীন জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। প্রতিবন্ধী মেয়েরা সহায়তা এবং পরিষেবাগুলি পাওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বাধার সম্মুখীন হচ্ছে,’ রাষ্ট্রসংঘের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে এই কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারকরা বিনিয়োগ করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন যা মেয়েদের দ্বারা অনুভূত বৈষম্য মোকাবেলা করবে। এই দিনটি পালনের ইতিহাস: ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদ ১১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক কন্যা সন্তান দিবস হিসাবে ঘোষণা করে। যাতে সারা বিশ্বে মেয়েদের অধিকার এবং মেয়েরা যে অনন্য চ্যালেঞ্জগুলির মুখোমুখি হয় সেটিকেই স্বীকৃতি দেয়। আন্তর্জাতিক কন্যা সন্তান দিবসের তাৎপর্য: সারা বিশ্বে মেয়েরা যে সমস্যাগুলির সম্মুখীন হন, যেমন শিক্ষা, পুষ্টি, জোরপূর্বক বাল্যবিবাহ, আইনি অধিকার এবং চিকিৎসার অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা না থাকা— এই জাতীয় সমস্যা সম্পর্কে সকলকে সচেতন করে। প্রতি বছর দিনটির থিম পরিবর্তিত হয়। রাষ্ট্রসংঘের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘এখন সময় এসে গিয়েছে, মেয়েদের কাজ, তাঁদের অধিকার সম্পর্কে আমাদের সকলের দায়বদ্ধ হতে হবে। তাঁদের নেতৃত্বে বিশ্বাস রাখতে হবে।’ এটিই সব মিলিয়ে এই দিনটির গুরুত্ব।] (সূত্রঃ গুগল)
আমরা যে, যা বলিনা কেন, একটা মেয়ের চরম প্রাপ্তি সার্থক মাতৃত্বে।আমার ব্যক্তিগত ভাবনায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সে-বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করলেই কন্যা-দিবস উদযাপন যথার্থতায় সার্থক হবে।
বর্তমান যুগে নারীরা লেখাপড়া, শিক্ষা-সংস্কৃতি, কর্মক্ষেত্রে, অভিযানে, বিজ্ঞান গবেষণায় প্রভৃতি কোন ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নেই। এমন অনেক নারীদের কথা আপনারা জানেন, আমিও জানি। আবার এ-ও দেখেছি, বাহ্য জগতের সবক্ষেত্রে কৃতি নারীদের অন্তর্জগতের হাহাকার। মনের মত সন্তান না পাওয়ার জ্বালায়, সন্তানকে মনের মত করে মানুষ করতে না পারার জ্বালায়, থ্যালাসেমিয়া, স্কিজোফ্রেনিয়া, লিউকোমিয়া প্রভৃতি নামের দুরারোগ্য ব্যাধির জ্বালায় জ্বলতে গিয়ে জীবনের সুখ-শান্তির অনুভূতিটা হারিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছে।—যেন, ‘সব আছে তবু নেই’। মাতৃত্ব-পিয়াসী একজন সন্তানহীনা নারীর যে কি কষ্ট, কি বেদনা, তা ভুক্তভোগী ভিন্ন কেউ উপলব্ধি করতে পারবে না। একটি সন্তান পেতে সব-রকমের চিকিৎসা করার পরও যখন সন্তান-লাভে ব্যর্থ হয়, তখন অনেক টাকা খরচ করে গর্ভ ভাড়া নেয়, দত্তক সন্তান নেয়।—এমন অনেক কিছু করেন। ওই সব সমস্যার স্রষ্টাও কিন্তু নারী। ‘আত্মানং বিদ্ধি।’-র শিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে সব কিছুকে জেনেছে, নিজেকে জানতে পারেনি। নিজের নারীত্বের-পূর্ণতার বিষয়ে জানা হয়ে ওঠেনি। প্রাকৃতিক নিয়মে নারী হতে জন্মে জাতি। নারীই গৃহ, সমাজ ও রাষ্ট্রের ধাত্রী ও পালয়িত্রী। প্রাকৃতিক নিয়মে একজন নারীর চরম পরিণতি মাতৃত্বে। মুখে আমরা যতই নারী-স্বাধীনতার কথা বলি না কেন, এক্ষেত্রে কিন্তু পুরুষের উপর নির্ভরশীল হতেই হয়। (অবশ্য লেসবিয়ান আদর্শে বিশ্বাসীদের কথা আলাদা। তারা অবশ্যই ব্যতিক্রমী।) সেই পুরুষটি মাতৃত্বকামী নারীর তুলনায় শারীরিক-মানসিক-আত্মিকভাবে যত উন্নত হবে,— স্বাস্থ্যবান হবে, ভালো চরিত্রের হবে, নারীটির দাম্পত্য জীবন তত সুখের হবে, সন্তানও ভালো হবে। এটাই তো স্বাভাবিক নিয়ম। তাই নয় কি? আর সেগুলো পেতে গেলে বর্ণে, বংশে, বয়সে, স্বাস্থে, শিক্ষায়-দীক্ষায়—সবদিক থেকে উন্নত সম-বিপরীত সত্তার একটা পুরুষকে, ভাবী সন্তানটির বাবাকে খুঁজে নিতে হবে, বিবাহের মাধ্যমে। বিবাহ মানে পুরুষের সত্তাকে বিশেষরূপে বহন করা। যে পুরুষটির কাছে নারীত্বকে সমর্পণ করে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে। তাই নির্ঝঞ্ঝাট সুখের দাম্পত্য জীবন পেতে গেলে, ভালো সন্তানের মা হতে গেলে, লেখাপড়া শেখার পাশাপাশি, কুমারী অবস্থা থেকেই একটা পরিকল্পনা করে নিতে হবে। কারণ প্রত্যেক নারীই চায় তার সন্তানটি সুস্থ থাকুক, ভালো হোক, কৃতী হোক। সেগুলো তো আর রেডিমেড পাওয়া যাবে না, আর স্টেজ মেক-আপও দেয়া যাবে না। নিয়ম মেনে অনুশীলন করতে হবে। মা-কেই মেপে মেপে সঞ্চয় করতে হবে ভবিষ্যতের সন্তানের ভালামন্দের সব উপকরণ। মা মানে মেপে দেওয়া। সন্তানের ভালো-মন্দ মেপে দেয় বলেই মা। ভাবী মায়ের চলন-চরিত্র দ্বারা প্রভাবিত হয় নারী-জননকোষ, অপত্য-কোষ। সেইজন্যই সন্তান ধারন-পালন-লালন-এর জন্য আবশ্যিক প্রত্যঙ্গগুলোকে সযত্নে মেপে মেপে লালন-পালন করতে হবে, সংরক্ষণ করতে হবে ভবিষ্যতের সন্তানের মঙ্গলের জন্য। তা না করে ‘হেটেরো-সেক্সুয়াল’ কমপ্লেক্সের প্রলোভনে পড়ে ওগুলোকে যদি আম-পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করে ফেলা হয়, তাহলে তো ভাবী সন্তানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। যার জন্য সংরক্ষিত জিনিস, আত্মঘাতী উদারতার বশে অন্যকে ভাগ দেবার অপরাধে। এজন্য রোগ-ভোগেও ভুগতে হয়। Oncologist, Gynaecologist, Sexologist, Psychologist-দের শরণাপন্ন হতে হয়।
নারীত্বের বিশুদ্ধতা সংরক্ষিত করে সুসন্তান লাভ করা বিষয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘জন্মকথা’ কবিতায় লিখছেন— খোকা মাকে শুধায় ডেকে, ‘এলেম আমি কোথা থেকে কোনখেনে তুই কুড়িয়ে পেলি আমারে ?’ মা শুনে কয় হেসে কেঁদে খোকারে তার বুকে বেঁধে— ‘ইচ্ছা হয়ে ছিলি মনের মাঝারে।। ছিলি আমার পুতুল খেলায়, ভোরে শিবপূজার বেলায় তোরে আমি ভেঙেছি আর গড়েছি। তুই আমার ঠাকুরের মনে ছিলি পূজার সিংহাসনে, তাঁরি পূজায় তোমার পূজা করেছি।। আমার চিরকালের আশায়, আমার সকল ভালোবাসায়, আমার মায়ের দিদিমায়ের পরাণে, পুরানো এই মোদের ঘরে গৃহদেবীর কোলের ’পরে কতকাল যে লুকিয়ে ছিলি কে জানে।।’
একটু বোধি-তাৎপর্য দিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, কবিগুরু তাঁর ওই কবিতায় জেনেটিক্সের, ইউজেনিক্সের, সুরত-সম্বেগের চরম এক তত্ত্বের অবতারণা করেছেন। একটা উন্নত প্রজাতির আমগাছ লাগাতে গেলেও কিছু প্লান-প্রোগ্রাম নিতে হয়। আগে থেকে জমি নির্বাচন করতে হয়, উপযুক্ত সার দিয়ে জমি তৈরি করতে হয়, তারপর মাটির উপযুক্ত বীজ বা চারা বসাতে হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় বর্তমান যুগের বেশিরভাগ লেখাপড়া শিখতে যাওয়া নারীরা, পুরুষের সাথে পা-মিলিয়ে, গলা-মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ‘হোক-কলরব’ আন্দোলনে পারদর্শী হলেও, নিজের আত্ম-বিস্তারের জন্য আবশ্যিক আত্ম-সম্পোষণ, আত্ম-সংরক্ষণ করার জন্য নির্দিষ্ট নারীত্বের অস্তিত্ব রক্ষার জমিটুকুকে সংরক্ষণ করা বিষয়ে উদাসীন। যারফলে কালেক্রমে মনুষ্যত্ব সম্পন্ন অসৎ-নিরোধে তৎপর সন্তান থেকে সভ্যতা বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব রামকৃষ্ণদেব, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নেতাজী সুভাষচন্দ্র প্রমুখ মনীষীদের জন্মদাত্রীগণ ক্যাম্পাসে, অফিসে, মিটিংয়ে, মিছিলে কোন ‘কলরব’ না করেই, সনাতনী নারীধর্ম পালন করে রত্নগর্ভা হয়েছিলেন। ভারতীয় কৃষ্টি প্রদত্ত প্রকৃষ্ট-গতির পথ ভুলে, তথাকথিত প্রগতির নামে ছুটে চলা নারীবাদিরা বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে দেখতে পারেন।
পরিবারকে উন্নতি বা অবনতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী প্রধানতঃ নারী। কথায় আছে, ‘সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে। গুণবান পতি যদি থাকে তার সনে।।’ আদর্শ একজন পুরুষের সাহচর্যে নারীর হাতেই গড়ে ওঠে আদর্শ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র। নারীই হচ্ছে জাতির বল ও ভরসা। লক্ষী নারীদের উপরেই রয়েছে মহান জাতি গঠনের বিরাট দায়িত্ব। মহান আদর্শকে চরিত্রায়িত করে নারী যদি পরিবারকে সুন্দর ও সার্থক করে সাজিয়ে তুলতে পারে তবেই জগত-সংসার সুখের হয়। আদর্শ জাতি গঠন করার দায়িত্ব নারীদের উপর থাকার জন্য তাদের শিশুকাল থেকেই ভালো মা হবার সাধনায় অগ্রসর হতে হবে। নারী জীবনের বিভিন্ন পর্যায় আছে। ওই পর্যায়গুলো ভগ্নি, বধূ, স্ত্রী, জায়া, জননী ও গৃহিনী ও জননীত্ব। ওগুলোকে সমৃদ্ধ নারীরাই করতে পারেন, পুরুষেরা নয়। স্নেহ, মায়া, মমতা ও ভালবাসার দ্বারা পূর্ণ নারীর হৃদয়। নারীরা ইচ্ছা করলেই তাঁর অন্তর্নিহিত বিভিন্ন শক্তির দ্বারা জাগিয়ে তুলতে পারেন বিশ্বকে। নারীর মধ্যে সুপ্তভাবে থাকা গুণরাজিকে ইচ্ছে করলেই ব্যক্ত করা যায় ভালোবাসা বা ভালোতে বাস করার বিজ্ঞানসম্মত পাঠ নিয়ে।
বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার আয়োজন অনেকগুণ বৃদ্ধি পেলেও, অনেক মাতামাতি হলেও, দেবীদুর্গার দশপ্রহরণধারী আদর্শ কিন্তু আমাদের চরিত্রে তেমন রেখাপাত করতে পারেনি। যদি করতো, কন্যারূপী দুর্গা মায়েরা অসুররূপী পুরুষদের লালসার স্বীকার হতে পারত না। একটা মেয়ে কিভাবে দুর্গাশক্তিকে আয়ত্ত করে আত্মরক্ষায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে, যুগধর্ম সেই শিক্ষায় মেয়েদের শিক্ষিত করতে ব্যর্থ হয়েছে! পুরুষ-সাধারণ, মেয়ে-সাধারণকে কামনার বস্তু হিসেবে না ভেবে, দেবী দুর্গাজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখবে, সেই শিক্ষার প্রচলন করা হয়নি। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কিন্তু ঘরে ঘরে সেই শিক্ষার বীজ বপন করলেন দীক্ষার মাধ্যমে।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র নারীর মধ্যে দেবী দুর্গার আসন পেতে দিতে অনুশ্রুতির বাণীতে বললেন : “শার্দ্দুলেরে বাহন করে সাপের ফণার মালা পরে কালবোশেখী ঝঞ্ঝাবেগে ছোটরে নারী ছোটরে ছোট্ । দত্যিদানার নীচ বাহানা আর্য্যাবর্তে দিয়ে হানা ঘূর্ণিপাকের বেতাল গাঁথায় হুলিয়ে ভুলিয়ে দিচ্ছে চোট্ । দশ প্রহরণ দশ হাতে ধর বক্ষবিদরি ধ্বংসি ইতর সূর্য্যরাগী বজ্রতেজে আর্য্যনারী শত্রু টোট্ ।” তিনি নারীকে অবলা নয় সবলারূপে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন । নারীর সতীত্বই নারীকে সবলা করে তোলে। তাই তিনি কত আশা নিয়ে বললেন— সতীর তেজে ঝলসে দে মা নিঠুর কঠোর অন্ধকারে মদনভস্ম বহ্নিরাগে বৃত্তি-রিপু দে ছারখারে । প্রণবতালে ইষ্টমন্ত্র ঝঙ্কারি তোল সকলতন্ত্রে বিষাণ হাঁকে রুদ্র দোলায় বজ্রে হানি মৃত্যুদ্বারে ।
শুধুমাত্র কন্যাদের জন্যই নয়, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র পুরুষ-সাধারণের উদ্দেশ্যে সত্যানুসরণ গ্রন্থে বললেন, “প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী । প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয়।” এবং পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, “স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যেজন, তাহার হয় না ভবের বন্ধন মোচন। স্ত্রী চিন্ময়ী মা ।” তিনি নারী-সাধারণকে মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েই ক্ষান্ত হন নি, স্ত্রীকেও চিন্ময়ী মা জ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শেখালেন । কারণ, স্ত্রীর মাধ্যমে স্বামী নিজেকে জন্মান, তাই স্ত্রীকে জায়া বলা হয়েছে । আর্য্য বিধির গর্ভাধান কালে স্ত্রীর নাভিমূল স্পর্শ করে “প্রসীদ মা জগজ্জননী” মন্ত্রে অভিষিক্ত করে স্ত্রীর গর্ভে নিজেকে প্রবেশ করাতে হয় । প্রজা-সৃষ্টি প্রকরণের কি অপূর্ব ব্যঞ্জনা । যৌন জীবনে পুরুষদের শিব, আর নারীদের দুর্গা জ্ঞানে অভিষিক্ত করে কাম (lust) কে আসুরিক প্রবৃত্তির কবল থেকে মুক্ত করে দৈবীপ্রেমে (love) রূপান্তরিত করলেন । শ্রীশ্রীঠাকুর মেয়েদের মা এবং ছেলেদের দাদা সম্বোধনের বিধান প্রবর্তন করে নারীপুরুষের সুপ্ত যৌন সম্বেগের রাশ টেনে ধরলেন। ঘরে ঘরে বাস্তব দুর্গাপূজার এক স্থায়ী আসন প্রতিষ্ঠা করলেন।
কন্যা-দিবসকে সার্থক করতে হলে কন্যার মায়েদের এ বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে । গুরুত্ব দিতে হবে নিজ-নিজ মেয়েদের পবিত্রতার দিকে । যুগধর্মের প্রভাব থেকে মুক্ত করে শ্রীশ্রীঠাকুরের নারীর নীতি, নারীর পথে, দেবী-সূক্ত ইত্যাদি গ্রন্থের বিধান অনুসারে মেয়ে যা’তে বয়সে, বর্ণে, বংশে, স্বাস্থ্যে, শিক্ষায় তুলনামূলক সমবিপরীত বৈশিষ্ট্যের সমুন্নত বরণীয় পুরুষকে বরণ করে একজন আদর্শ বধূ, মনোবৃত্যানুসারিনী স্ত্রী, জায়া, পরিমাপনি মা হয়ে শুদ্ধাত্মার জন্ম দিতে পারে ।
কারণ, “নারী হইতেই জাতি জন্মে ও বৃদ্ধি পায়, তাই নারী যেমন ব্যষ্টির জননী তেমনই সমষ্টিরও ;– আর, এই নারী যেমন ভাবে আবিষ্ট থাকিয়া যেমন করিয়া পুরুষকে উদ্দীপ্ত করে পুরুষ হইতে সেই ভাবই নারীতে জন্মগ্রহণ করে ; তাই, নারী মানুষকে প্রকৃতিতে মূর্ত্ত ও পরিমিত করে বলিয়া জীব ও জগতের মা ;–তাহ’লেই বুঝিও– মানুষের উন্নতি নারীই নিরূপিত করিয়া দেয় ; তাই নারীর শুদ্ধতার উপরই জাতির শুদ্ধতা, জীবন ও বৃদ্ধি নির্ভর করিতেছে– বুঝিও, নারীর শুদ্ধতা জাতির পক্ষে কতখানি প্রয়োজনীয়!” ১৭৬ । (চলার সাথী গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী) হে কন্যারূপী মেয়েরা! ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক ভাবনায় তোমাদের দেবীজ্ঞানে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। তাই তো কুমারী পূজা না করলে দেবীর পূজা ও হোম সফল হয় না। শক্তির আরাধনার নামে আদর্শ নারীশক্তির প্রতীক স্বরূপা দুর্গা, কালী, জগদ্ধাত্রী এবং বাসন্তী পূজার আয়োজন হয়ে চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। যার উদ্দ্যেশ্য চিন্ময়ী নারীদেরও আমরা যেন আদ্যাশক্তির প্রতীক মনে করে পরমার্থ দর্শন ও পরমার্থ অর্জন করতে অভ্যস্ত হই, শ্রদ্ধা জানাই, নারীকে যেন কামনার, ভোগের বস্তু মনে না করি, নারীকে ভোগ্যা নয়, পূজ্যা রূপে স্বীকৃত দেবার জন্যই কুমারী পূজা। আদ্যাশক্তির প্রতীক নারীরা যদি রুষ্ট হয় তাহলে সৃষ্টির ছন্দে পতন অবশ্যম্ভাবী। ওই আদর্শকে সমাজজীবনে প্রতিষ্ঠা দিতে মূর্ত্তিপূজার পাশাপাশি তন্ত্রশাস্ত্রকারেরা দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য দেবীজ্ঞানে কুমারী পূজারও প্রচলন করেছিলেন। ফলহারিনী কালীপূজার রাতে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নিজের স্ত্রীকে ষোড়শীজ্ঞানে পূজা করেছিলেন। সেই আদর্শকে পাথেয় করে তোমাদের কন্যা-জীবন সার্থক হোক—প্রার্থনা জানাই পিতার পিতা পরমপিতা সমীপে। জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!
পরিশেষে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের নারীর নীতি গ্রন্থের বাণীর ডালিতে সকল কন্যাদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে যবনিকা টানলাম। ‘‘মেয়ে আমার, তোমার সেবা, তোমার চলা, তোমার চিন্তা, তোমার বলা পুরুষ-জনসাধারণের ভিতর যেন এমন একটা ভাবের সৃষ্টি করে— যা’তে তারা অবনতমস্তকে, নতজানু হ’য়ে সসম্ভ্রমে, ভক্তিগদগদ কন্ঠে— ‘মা আমার,— জননী আমার’! ব’লে মুগ্ধ হয়, বুদ্ধ হয়, তৃপ্ত হয়, কৃতার্থ হয়,— তবেই তুমি মেয়ে, —তবেই তুমি সতী।’’
সত্যি বলতে কি, অনিয়ন্ত্রিত প্রবৃত্তি-পরায়ণতার মোহে পড়ে, জীবদ্দশায় পিতা-মাতাকে গৃহ-দেবতা জ্ঞানে সেবা করতে না-পারা সন্তানেরাও কিন্তু মহালয়ার দিনটিতে বিদেহী পিতা-মাতা, পিতৃপুরুষ, মাতৃপুরুষদের তর্পণ মাধ্যমে স্মরণ করেন।
আশ্বিন মাসের অমাবস্যা তিথিতে পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের সূচনার দিনটি মহালয়া। কথিত আছে পিতৃযান বা পিতৃলোক থেকে আত্মারা মর্ত্ত্যলোকের মহান আলয়ে সম্মিলিত হন, সেই বিশ্বাসে পিতৃ-মাতৃহারা আর্য্য হিন্দুরা তাঁদের তৃপ্তির জন্য তিল-জলসহ মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক বিগত ঊর্দ্ধতন পিতৃ-মাতৃ পুরুষদের গোত্র উল্লেখ করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন,—যাতে তাঁরা লিঙ্গদেহের নিরাশ্রয়, নিরালম্ব, বায়ুভূতের কষ্টদায়ক ভোগ কাটিয়ে অচিরেই পিণ্ডদেহ ধারণ করতে পারেন।—সাথে ‘আব্রহ্মভুবনল্লোকা’ মন্ত্রে সকল জীবের তৃপ্তির প্রার্থনা জানান হয়। এক্ষেত্রে স্মরণে রাখা উচিত বংশে যদি সগোত্রে এবং প্রতিলোম বিবাহ হয়, তাহলে কোন মন্ত্রে, কোন দানে, পিতৃ পুরুষদের আত্মা তৃপ্ত হবে না। তাই পিতৃমাতৃ তর্পণ সার্থক করতে হলে জীবদ্দশাতেই পিতামাতাকে গৃহদেবতা জ্ঞানে সেবা করতে হবে। প্রতিলোম-বিলাসী, দশবিধ সংস্কার পালনে উদাসীন হলে চলবে না।
।। প্রচলিত পিতৃতর্পণ বিধি ।।
পিতৃতর্পণ—গোত্র সম্বন্ধ ও নাম উল্লেখ পূর্বক মন্ত্রপাঠ করিয়া পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ, মাতামহ, প্রমাতামহ, বৃদ্ধপ্রমাতামহ, মাতা, পিতামহী, প্রপিতামহী এই নয়জনের প্রত্যেককে যথাক্রমে তিন তিন অঞ্জলি জল দিবেন এবং মন্ত্রও তিনবার পাঠ করিবেন। মাতামহী, প্রমাতামহী ও বৃদ্ধপ্রমাতামহী ও তিনজনকে একবার মন্ত্র পাঠ করিয়া এক এক অঞ্জলি জল দিবেন। পিতামহ হইতে বৃদ্ধ প্রমাতামহী পর্যন্ত একাদশ পুরুষের মধ্যে কেহ জীবিত থাকিলে বা প্রেতাবস্থায় থাকিলে তাঁহাদের ত্যাগ করিয়া তাঁহার উপরিতন পুরুষকে ধরিয়া একাদশ সংখ্যা পূরণ করিয়া লইতে হইবে।
এই ভাবে গোত্র উল্লেখ করে ১. পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ, বৃদ্ধ প্রপিতামহ, ২. মাতামহ, প্রমাতামহ, বৃদ্ধ প্রমাতামহ, ৩. পিতামহী, প্রপিতামহী, বৃদ্ধ প্রমাতামহী, ৪. মাতামহী, প্রমাতামহী, বৃদ্ধ প্রমাতামহী প্রমুখদের নামের সাথে দেবশর্মন যোগ করে উপরোক্ত মন্ত্র পাঠ করে তিল দান করতে হবে।
৪. শূদ্রেরা— যজুর্ব্বেদীয় প্রণালীতে তর্পণ করিবেন। ‘ওঁঁ’ স্থলে ‘নমঃ’, দেবশর্মন, স্থানে দাস এবং দেবী স্থানে দাসী বলিবেন; ‘স্বধা’ স্থলে ‘নমঃ’ বলিবেন।
৫. ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যরা ‘দেবশর্মন’ ‘স্থলে যথাক্রমে ‘দেববর্মন’ ও ‘গুপ্ত’ বলিবেন। সমর্থ হইলে পিতৃব্য ভ্রাতা মাতুল বিমাতা ভগিনী পিতৃস্বসা মাতৃস্বসা শ্বশুর শ্বাশুড়ী ও সপিণ্ড প্রভৃতিকে এক এক অঞ্জলি জলদ্বারা তর্পণ করিবে।
(সূত্র : বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)
——————————————–
পণ্ডিতদের মতে মহালয়ার দিনে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করে দেবতা ও ব্রাহ্মণদের উদ্দেশ্যে খাদ্যদ্রব্যাদি উৎসর্গ করা প্রকৃতপক্ষে পিতৃপুরুষের ঋণস্বীকার ছাড়া আর কিছুই নয় ।
ভারতকোষ গ্রন্থে চিন্তাহরণ চক্রবর্তী মহালয়াকে ‘পিতৃপুরুষের উৎসবের আধার’ বলেছেন। লয় প্রাপ্তি অর্থাত চন্দ্রের লয় হয় এই অমাবস্যা তিথিতে আর দর্শণশাস্ত্র মতে আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়ের সূক্ষাতিসূক্ষ্ম অনুভূতিগুলি অর্থাত পরমাত্মার রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ-শব্দ এই মহতাদির লয় হয় । তাঁরা তৃপ্ত হন তর্পণের দ্বারা । জাগতিক অনুভূতিগুলি থেকে মুক্ত হয়ে আত্মারা পরমানন্দে ফিরে যান স্বর্গলোকে। পিতৃপুরুষেরা নাকি এই সময়ে পরলোক থেকে ইহলোকে আসেন জল ও পিণ্ডলাভের আশায়। শাস্ত্রজ্ঞের অভিমতে, প্রয়াত পিতৃপুরুষদের জল-পিণ্ড প্রদান করে তাঁদের ‘তৃপ্ত’ করার উদ্দেশ্যেই এই তর্পণ ।
পণ্ডিত সতীনাথ পঞ্চতীর্থের মতে মহালয়ায় যে তর্পণ করা হয়, তা শুধুই পিতৃপুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেব তর্পণ, ঋষি তর্পণ, দিব্য-পিতৃ তর্পণ ইত্যাদির সঙ্গে থাকে রাম ও লক্ষ্মণ তর্পণ এবং জগতে সকল প্রয়াতকে জলদানের মাধ্যমে তৃপ্ত করার কথা বলা আছে। এমনকি জন্ম-জন্মান্তরে যাঁদের আত্মীয়-বন্ধু কেউ কোথাও নেই এরূপ সকল প্রয়াতকে জলদান করে তাঁদের আত্মার তৃপ্তি সাধন করা যায়।
প্রথমে তাম্রপাত্রে কৃষ্ণ তিল এবং অন্য আরেকটি তাম্রকুন্ডে তর্পণের জল ফেলতে থাকে ব্রতী । মন্ত্রোচ্চারণের দ্বারা প্রথমে সে তার জল নিয়ে পৌঁছে যায় দেবলোকে…ওঁ ব্রহ্মা, ওঁ বিষ্ণু, ওঁ রুদ্র, ওঁ প্রজাপতিস্তৃপত্যাম্। তারপর ঋষিলোকে সপ্ত ঋষিকে প্রণতি পূর্বক তর্পণের দ্বারা তৃপ্ত করে।
দেবলোক, ঋষিলোকের পর “এতত্ সতিলোগঙ্গোদকং ওঁ যমায় নমঃ’ …এই বলে মন্ত্রোচ্চারণ করে যমতর্পণ । এবার মহাভারতের সত্যবাদী জিতেন্দ্রিয় ভীষ্ম পিতামহের তর্পণ, রামতর্পণ এবং সবশেষে স্বর্গত আত্মীয় পরিজনের নামে জলদান করার রীতি এই তর্পণে।
এ থেকে জানা গেল ওইদিন মৃত আত্মাদের উদ্দেশ্যে তর্পণ বা শ্রাদ্ধ করা হয়। এরসাথে কোন দেবী-আরাধনার সম্পর্ক নেই। তাছাড়া কোন দেবীর এমন কোন জীবন্ত আদর্শ পাওয়া যায় না, যেখানে জীবাত্মার গতি-প্রকৃতি বর্ণিত হয়ছে। জীবাত্মা, পরমাত্মার সন্ধান বেদে, উপনিষদে পাওয়া গেলেও পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ গীতা গ্রন্থে বিশদে বর্ণনা করেছেন। সেখানেও আমরা কোন দেবীর যোগ খুঁজে পাই না।
হিন্দুদের প্রামাণ্য স্মৃতিগ্রন্থ মনু সংহিতার বিধান অনুযায়ী আর্য্য হিন্দুদের ব্রহ্মযজ্ঞ, দেবযজ্ঞ, ঋষিযজ্ঞ, পিতৃযজ্ঞ ও নৃযজ্ঞ ইত্যাদি নামের পঞ্চ মহাযজ্ঞ নিত্য পালন করতে হয়। বিশ্বাত্মার অন্তর্ভূক্ত সকলের মঙ্গল স্থাপনের লক্ষ্যে বাস্তব কর্মের নিত্য-উদযাপনের যে বিধান বিদ্যমান তার মধ্যে পিতৃ-মাতৃ যজ্ঞ অন্যতম। অথচ আমরা, তথাকথিত হিন্দুরা, সেসব ভুলে এই একটি দিন বিগত আত্মাদের স্মরণ করে হিন্দুত্ব রক্ষা করতে চেষ্টা করছি। উক্ত ব্রাত্যদোষ থেকে মুক্তি পাবার বিধান দিলেন যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, পঞ্চ মহাযজ্ঞের এক উন্নত সংস্করণ করলেন ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ পালনের বিধানের মাধ্যমে।
শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত ইষ্টভৃতি নিবেদন মন্ত্রের “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপারর্শ্বিকাঃ ।।” উচ্চারণ করার সাথে সাথে বৃহত্তর পারিপার্শ্বিকের জীবনবৃদ্ধির দায়ভারের শপথ নিতে হয় আমাদের। সব অবস্থাতে বাস্তব কর্মে পিতামাতা, পরিজনদের সেবার সাথে বৃহত্তর পরিবেশের জৈবাজৈব সবকিছুকে পালন-পোষণে সমৃদ্ধ করে রাখার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সার্থক হয় পঞ্চ-মহাযজ্ঞ বা ইষ্টভৃতি পালন। ইষ্ট বা পূর্ত কর্মের বাস্তব অনুশীলন বাদ দিয়ে, শুধুমাত্র সকালে উঠে টাকা-পয়সা নিবেদন করে মাসে মাসে পছন্দের সংস্থাকে পাঠানোই কিন্তু “ইষ্টভৃতি” নয়!
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের মধ্যে আর্য্যত্বকে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বললেনঃ
“পঞ্চবর্হি যা’রা স্বীকার করে, আর সপ্তার্চ্চি অনুসরণ করে, তারা যেই হোক আর যা’ই হোক– আর্য্য বা আর্য্যীকৃত । ৬০১ ।
(শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৭)
এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন—
“আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে গেল সেইদিন যেদিন থেকে আমরা পঞ্চবর্হির মূল নির্দ্দেশ অবজ্ঞা করতে শুরু করলাম । তখন থেকে আমরা অপরের খোরাক হলাম কিন্তু নিজেদের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখে পরকে আপন ক’রে নেবার সামর্থ্য হারিয়ে ফেললাম ।” (আঃ প্রঃ ১১।১০০)
“পঞ্চবর্হি ও সপ্তার্চ্চিই হ’চ্ছে সেই রাজপথ–যা’কে স্বীকার ও গ্রহণ ক’রে চললে ক্রমশঃই তুমি সার্থকতায় সমুন্নত হ’তে পার । ২৩৪ ।
(সম্বিতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ১২১)
সামগ্রিকভাবে হিন্দুদের কথা বাদ দিলেও, ইষ্ট প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়ে সদদীক্ষা গ্রহণকারী তথাকথিত সৎসঙ্গী-গণেরাও পঞ্চবর্হি ও সপ্তার্চ্চি-র অনুশাসনের অনুশীলনে উদাসীন! তবুও তারা নাকি সৎসঙ্গী!
সর্বশাস্ত্রসার গীতা গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ইষ্টকে নিবেদন না করে আহার (আহরণ) করলে চোর হতে হয়। এই বিধিও নিত্য তর্পনের অন্তর্গত। অতএব হিন্দু হতে গেলে সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার গ্রহণ এবং বর্ণধর্ম পালন আবশ্যিক। নচেৎ, আহার (আহরণ) নিবেদন না করার অপরাধে চোর হতে হবে।
শ্রীশ্রীঠাকুর তাই আমাদের আহার্য্য গ্রহণের পূর্বে নিবেদন করার বিধান দিলেন। খাবার সময় নিবেদন-ভূমিতে খাদ্য এবং জল দিয়ে বলতে হয়—”পরলোকগত পিতৃ-মাতৃ পুরুষ, আত্মীয়স্বজন, গুরুভাই ও আব্রহ্মস্তম্ব প্রত্যেকে যেন অন্ন পাকে পরিতৃপ্ত হয়ে, সন্দীপ্ত হয়ে জীবন-যশ ও বৃদ্ধিতে পরিপোষিত হয়ে স্মৃতিবাহী চেতনা লাভ করে, পরমপিতা তোমারই চরণে যেন সার্থকতা লাভ করে।”–এইভাবে গণ্ডুষ করতে হয়।
শ্রীশ্রীঠাকুর নিদেশিত উক্ত বিধান মেনে চললে আত্মশুদ্ধি হয়, দেহাতীত হলে নিরালম্ব বায়ুভূতে কষ্ট পেতে হয় না।
তাই তো শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন, “আপুরমান ইষ্টে কারও যদি প্রকৃত টান জন্মে, এবং তাই নিয়ে যদি সে বিগত হয় তবে সে মহান জীবন লাভ করবেই। আবার এ জীবনে যে যতই হোমরা-চোমরা হোক না কেন, সে যদি সুকেন্দ্রিক না হয়, প্রবৃত্তিই যদি তার জীবনের নিয়ামক হয়, তবে ঐ বিচ্ছিন্ন বিকেন্দ্রিকতা তার মৃত্যুকালীন ভাবভূমি ও পরজন্মকে যে অপগতিতে অপকৃষ্ট করে তুলবে, তাতে সন্দেহ কমই।” (আঃ প্রঃ ১১/১৮.০৩.১৯৪৮)
তাই তর্পন, পিতৃপক্ষ, দেবীপক্ষ, দেবী আরাধনা, দেবতা আরাধনা, পূজা তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা একমাত্র ইষ্টকেন্দ্রিক চলনে চলতে অভ্যস্ত হতে পারব। জীবাত্মায় বিশ্বাত্মার উপলব্ধি নিয়ে আত্ম-পূজায় সার্থক হতে পারব।–আজ্ঞাচক্রে ইষ্টের ভাব নিয়ে মহাচেতন সমুত্থানের পথে পাড়ি জমাতে পারব!
——————————————-
বিদেহী আত্মাদের সাথে যোগসূত্র রচনার উদ্দেশ্যে মহাভারতে পুরুষোত্তম কেন্দ্রিক জীবন চলনাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতা যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কোন দেব-দেবীর সাহায্য ছাড়াই ভক্ত যতীশ ঘোষ, ভক্ত নফর ঘোষ প্রমুখ বিদেহী-ভক্তদের লিঙ্গ-শরীরের সাথে বার্তালাপ করেছেন। এগুলো প্রামাণ্য সত্য।
শ্রীশ্রীঠাকুর পিণ্ডদেহ এবং লিঙ্গদেহের গতিপ্রকৃতি সকলের সামনে সহজভাবে উপস্থাপন করেছেন। তার দু-একটা উদাহরণ তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
*****************************************
যোগন—মরার সময় কিভাবে বুঝতে পারবো কোন্ দেশে বা যাচ্ছি আর কিরকমই বা হ’চ্ছে?
শ্রীশ্রীঠাকুর–চিত্রগুপ্তের কথা শুনেছেন তো? সারাজীবনের কার্য্য ও চিন্তার চিত্র মৃত্যুকালে মূর্ত্তিমান হ’য়ে একে- একে দেখা দেয়, তারপর সব চিত্র গুপ্ত হ’য়ে গেলে light (জ্যোতি) দেখা যায়। যাদের সেই জ্যোতির সঙ্গে পরিচয় আছে ( অর্থাৎ মৃত্যুকালের পূর্ব্বেও যারা সাধন দ্বারা সেই জ্যোতি দর্শন করেছে) তাদের সে-সময় ভয় হয় না; তারা তাই ধ’রে ব’সে থাকে, আর সদগুরু সেই জ্যোতির মধ্যে এসে দাঁড়ান, তখন পরিচয় হ’য়ে যায়। আর ভয় থাকে না।
যোগেন -আচ্ছা, মরার সময় ভয় পায় কি? এই যে সব যমদূতের বিকট চেহারা দর্শনে ভয় পাবার কথা শুনা যায়, তা’ সত্য নাকি?
শ্রীশ্রীঠাকুর—মনের ভাব সব মৃত্যুকালে এক- একটা form ( আকার) নিয়ে তো সম্মুখে আসে। ধরুন, কোনও স্ত্রীলোকের প্রতি খারাপ নজর যদি থাকে, তবে মরার সময় ঐ খারাপ ভাবটা form নিয়ে সামনে আসবে, আর, খারাপ ভাব যে form নেবে তা’ মনোহর তো হবে না, বিকটই হবে, কাজেই তা’ দেখে ভয় হ’তেই পারে।
যোগেন—আচ্ছা, সদগুরু ধরায় অবতীর্ণ হ’লে যারা তাঁকে আশ্রয় করে তারা কি সকলেই মুক্ত হয়?
শ্রীশ্রীঠাকুর—হ্যাঁ, যারা তাঁকে প্রকৃতই আশ্রয় করে, তাঁর উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে, তাদের সকলকেই তিনি মুক্তি দেন। (অমিয়বাণী, পৃষ্ঠা, ১৫)
** মরো না, মেরো না, যদি পার মৃত্যুকে অবলুপ্ত কর **
।। প্রসঙ্গ মৃত্যু : –অমিয়বাণী গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী ।।
অশ্বিনীকুমার বিশ্বাস—আচ্ছা, যাদের সদগুরু লাভ হয়েছে তারা তো
মৃত্যুকালে সদগুরুর সাক্ষাৎ পাবে? তারফলে তারা তৎক্ষণাৎ মুক্ত হবে? যদি
তা না হয় তবে সাক্ষাৎ পাওয়ায় লাভ কি?
শ্রীশ্রীঠাকুর—এখানে জীবন্মুক্ত না হয়ে যারা মরবে তারা মৃত্যুকালে
সদগুরুর সাক্ষাৎ পেয়ে এই লাভবান হবে যে, একাকী অনির্দ্দিষ্ট পথে যাবার
জন্য ভয় পাবে না, আধারে ঘুরবে না, তাঁর আশ্রয় পেয়ে তৎকালে ভীত হবে না, আর
এ-জীবনে যতদূর উন্নত হয়েছিল, যেরূপ জীবন পেলে তারপর থেকে কাজ করতে পারে,
সেইরূপ জন্মলাভ করবে। যে-সমস্ত অসৎ কর্মফল ছিল তা ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তদ্
দরুন নিম্নতর যোনিতে জন্মাতে হবে না। ওরূপ মানুষ ম’রে মানব ছাড়া অন্য
জন্ম তো পাবেই না, বরং মানবের মধ্যে উন্নত চরিত্রের মানব হ’য়ে জন্মাবে।
* * *
মৃত্যু সম্বন্ধে বলিতেছেন-“Hundred twenty years-এ যে মৃত্যু সেইটাই natural। তার পূর্বে যে সমস্ত মৃত্যু হয়, সেগুলো unnatural। ব্যক্তিগত সাধনা দ্বারা, উন্নত প্রণালীর চিকিৎসা দ্বারা লোকের এই অকালমৃত্যু control করা যায়। মৃত্যুতে cells-এর পরিবর্তন হয়, অর্থাৎ একরকমের cells আর এক রকমের cells-এ transformed হয়, কিন্তু প্রত্যেক cell-এরই consciousness আছে। এই হিসেবে মৃত্যু আর কিছুই নয় কেবল diffusion of crystallised consciousness—cell এর জড়ীভূত এক individual consciousness হারিয়ে cell-এর consciousness গুলি ছড়িয়ে যাওয়া। একটা idea-য় যেন cell গুলি দানা বেঁধে থাকে। মৃত্যুতে cell-এর disintegration হয়। সেই আত্মার উপলব্ধি যার হয়েছে তার জন্ম নাই, মৃত্যু নাই—এটা real; আর আমাদের কাছে পূর্বজন্ম পরজন্ম অস্তিত্বহীন, মিথ্যা, কারণ, আমরা আত্মার সঙ্গে নিজেদের এখনও identified করিনি বলে, আত্মাই যে নানা ঘূর্ণিপাক সৃষ্টি করে করে জীবন-মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চলছে তা বুঝিনা এবং অনুভব করি না।”
যতীনদা—“তা হলে তো আমাদের পূর্বজন্ম, পরজন্ম নেই। তবে আর শ্রাদ্ধাদির কি প্রয়োজন ?”
শ্রীশ্রীঠাকুর—“Individual consciousness cell consciousness-এ বিকীর্ণ হয়ে পড়ে। বহু cell চতুর্দিকে তাদের consciousness নিয়ে বিচ্ছুরিত হয়, এক জটিল আমিত্ব ভেঙ্গে খান খান হয়ে বহু কোষের বহু, আমিত্বে পরিণত হয়, আর তাই মৃত্যু। আমরা যে শ্রাদ্ধাদি করি তাতে আমাদের idea প্রসারিত হয়। তাতে ভাবজগতে idea-র জগতে ঝঙ্কার তোলে। Idea-র পুষ্টি sympathetic idea-তেই। তাই শ্রাদ্ধে উপনিষদাদির উচ্চভাবের স্মৃতিকে জাগরণ করা হয়।” (চির-স্মরণীয় ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ২য় খণ্ড, পৃঃ ৪৫)
আত্মা, ‘অত’’ ধাতু ‘মন্’ করে হয়েছে। ‘অত’ মানে নিয়তগতিশীল হওয়া। আত্মা কি ? আত্মা চিরচঞ্চল। Nerve-এর মধ্য দিয়ে vital energyর যে flow তাই আত্মা। দেখা যায় vital energy-তে হয় বাইরের জগতের impression বা photograph। তাই বলে, আত্মা হতে হয় মন। আর তাই মন নিয়তচঞ্চল। Vital current-এর break আর make করছে যা, তাই মন । মন তা হলে কিছুতেই স্থির হতে পারে না।
শ্রীশ্রীঠাকুর —চিত্রগুপ্তের কথা শুনেছেন তো? সারাজীবনের কার্য্য ও চিন্তার চিত্র মৃত্যুকালে মূর্ত্তিমান হ’য়ে একে- একে দেখা দেয়, তারপর সব চিত্র গুপ্ত হ’য়ে গেলে light (জ্যোতি) দেখা যায়। যাদের সেই জ্যোতির সঙ্গে পরিচয় আছে ( অর্থাৎ মৃত্যুকালের পূর্ব্বেও যারা সাধন দ্বারা সেই জ্যোতি দর্শন করেছে) তাদের সে-সময় ভয় হয় না; তারা তাই ধ’রে ব’সে থাকে, আর সদগুরু সেই জ্যোতির মধ্যে এসে দাঁড়ান,তখন পরিচয় হ’য়ে যায়। আর ভয় থাকে না।
যোগেন (প্রশ্ন কর্তা) —আচ্ছা, মরার সময় ভয় পায় কি? এই যে সব যমদূতের বিকট চেহারা দর্শনে ভয় পাবার কথা শুনা যায়, তা’ সত্য নাকি?
শ্রীশ্রীঠাকুর — মনের ভাব সব মৃত্যুকালে এক-একটা form ( আকার) নিয়ে তো সম্মুখে আসে। ধরুন, কোনও স্ত্রীলোকের প্রতি খারাপ নজর যদি থাকে, তবে মরার সময় ঐ খারাপ ভাবটা form নিয়ে সামনে আসবে, আর, খারাপ ভাব যে form নেবে তা’ মনোহর তো হবে না, বিকটই হবে, কাজেই তা’ দেখে ভয় হ’তেই পারে।
যোগেন — আচ্ছা, সদগুরু ধরায় অবতীর্ণ হ’লে যারা তাঁকে আশ্রয় কর তারা কি সকলেই মুক্ত হয়?
শ্রীশ্রীঠাকুর — হ্যাঁ, যারা তাঁকে প্রকৃতই আশ্রয় করে, তাঁর উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে, তাদের সকলকেই তিনি মুক্তি দেন।
(সূত্র : অমিয়বাণী, পৃষ্ঠা-১৫)
জন্ম ও মৃত্যুর আগম-নিগম-এর স্বরূপ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেনঃ “সম্বেগ জীবের বা মানুষের মধ্যে gene-এর (জনির) ভিতর দিয়ে যে pitch-এ (স্তরে) ওঠে, মরে যাওয়ার সময় psycho-plasm-এ (মানস দেহে) engraved ( মুদ্রিত) হয়ে থাকে সেই pitch-এ wave-এর (তরঙ্গের) আকারে। মিলনেচ্ছু sperm-এর (শুক্রকীটের) ভিতর সেই জাতীয় সম্বেগ সৃষ্টি হলে tuning (সঙ্গতি) হয় এবং মৃত ব্যক্তি পুনরায় শরীর গ্রহণ করার সুযোগ পায়। জন্ম ও মৃত্যুর এটাই revolving process (ঘুর্ণায়মান পদ্ধতি)।” (আ. প্র. ২১/১০৭)
*মৃত্যুর স্বরূপ প্রসঙ্গে* শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন : “আমাদের consciousness (চেতনা) ধৃতি যেটা, যা’ নিয়ে আমরা থাকি, সেটা হ’ল সম্বেগ। যে-সম্বেগ দ্বারা আমরা বাঁচি, বাড়ি, সেটা যদি কোন কারণে blocked হয়ে যায় তাহলে আমরা
মরে যাই।”
“আপূরয়মান ইষ্টে কারও যদি প্রকৃত টান জন্মে, এবং তাই নিয়ে যদি সে বিগত হয় তবে সে মহান জীবন লাভ করবেই। আবার, এ জীবনে যে যতই হোমরা-চোমরা হোক না কেন, সে যদি সুকেন্দ্রিক না হয়, প্রবৃত্তিই যদি তার জীবনের নিয়ামক হয়, তবে ঐ বিচ্ছিন্ন বিকেন্দ্রিকতা তার মৃত্যুকালীন ভাবভূমি ও পরজন্মকে যে অপগতিতে অপকৃষ্ট ক’রে তুলবে, তা’তে সন্দেহ কমই।” (আঃ প্রঃ ১/ ১৯.১১.১৯১৪)
শ্রীশ্রীঠাকুর কথাপ্রসঙ্গে বললেন—”মানুষের আত্মা যেমন অমর, নিষ্ঠাও তেমনি অমর। আমরা যে অমৃত-অমৃত করি, তার চাবিকাঠি হ’ল ইষ্টনিষ্ঠা। ইষ্টনিষ্ঠা যেই একজনকে পেয়ে বসে, তখন এক-একটা প্রবৃত্তির সিন্দুকের ডালা খুলে যেতে থাকে এবং বিভিন্ন প্রবৃত্তি ইষ্টমুখী অর্থাৎ একমুখী হ’তে থাকে। তখন বোঝা যায় কামের স্বরূপ কী, ক্রোধের স্বরূপ কী, লোভ-মোহ- মাৎসর্য্যের স্বরূপ কী! এবং এগুলির প্রত্যেকটির সপরিবেশ নিজের সত্তাপোষণী বিনিয়োগ করা যায় কিভাবে। তখন মানুষ প্রবৃত্তির হাতে গিয়ে পড়ে না, বরং প্রবৃত্তিগুলি তার হাতে খেলার পুতুলের মত হয়ে দাঁড়ায়। বেফাঁস চলন বন্ধ হয়ে যায়। এইভাবে মানুষের ভিতরে অখণ্ড ব্যক্তিত্বের প্রতিষ্ঠা হয়। সে প্রাজ্ঞ হয়ে ওঠে। বোধিসত্ত্ব হয়ে ওঠে।”
(আলোচনা-প্রসঙ্গে, উনবিংশ খণ্ড, ইং ১৭. ৪. ১৯৫০)
—————————————————————–
· নিরালম্ব, নিরাশ্রয়, বায়ুভূতে অবস্থানরত লিঙ্গদেহীদের উদ্দেশ্যে প্রণতি জানাই। শুভ-সংস্কারী পিণ্ডদেহী মায়েদের সাধনায় আপনারা যেন পিণ্ডদেহ ধারণ করে এই মহান আলয়ে আবার ফিরে আসতে পারেন। পরমপিতার রাতুল চরণে সেই প্রার্থনা জানাই। সবাইকে জয়গুরু ও প্রণাম জানাই। আমরা যেন অমৃত জীবনের অধিকারী হতে পারি।বিনয়াবনত—তপন দাস
।। গুরু পূর্ণিমা, সন্ত সদগুরু পরম্পরা ও বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।। নিবেদনে-তপন দাস
‘‘গুরুই ভগবানের সাকার মূর্তি, আর তিনিই absolute (অখন্ড)।’’ ‘‘গুরু হ’তে চেও না। (অর্থাৎ, তোমার গুরু যিনি তাঁর পাশে তোমার নিজের পট বসিয়ে প্রণাম ও প্রণামী নিতে যেওনা।) গুরুমুখ হ’তে চেষ্টা কর ; আর, গুরুমুখই জীবের প্রকৃত উদ্ধারকর্ত্তা।’’ (সত্যানুসরণ গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী) বর্তমান ইষ্টগুরু শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলছেনঃ শিক্ষাগুরু থাক না অনেক শিখো যেমন পার ইষ্টগুরু একই কিন্তু নিষ্টাসহ ধর । জীবনচলনার জাগতিক বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনে যে বা যারা সাহায্য করেন তারা হলেন শিক্ষাগুরু। পিতামাতা থেকে স্বভাব পাই বলে তাঁরা হলেন স্বভাবগুরু। আর জীবননদীর ঘুর্ণিপাক থেকে বাঁচাবার কৌশল যিনি শেখাতে পারেন অর্থাৎ অন্তর্যামীকে উপলব্ধি করাতে যিনি পারেন তিনি ইষ্টগুরু বা সদগুরু। এই গুরুই হলেন ভগবানের সাকার মূর্তি। তিনিই absolute (অখণ্ড) । ইষ্টগুরু গ্রহণ করলে মানুষ স্থিতধী হয়ে ব্যক্তিসত্তার অখণ্ড বিন্যাসকে বজায় রেখে নিজসত্তাকে উপলব্ধি করতে পারে। তখন শান্তি এবং সুখ দাস হয়ে সেবা করে। বর্তমান ইষ্টগুরু শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন— ‘‘স্ত্রীলোকের যেমন দুটি স্বামী হয় না, দুটি স্বামী মানে ব্যভিচার ও ব্যতিক্রম-দুষ্ট হওয়া, পূত আত্মনিয়ন্ত্রণকে বিক্ষুব্ধ ও দুষ্ট ক’রে তোলা, তেমনি নারী হো’ক-পুরুষই হো’ক— কা’রো সদগুরু বা আচার্য্য দু’জন হয় না, দু’জন হওয়া মানেই — বিকেন্দ্রিক বিকৃতি ও ব্যতিক্রমে নিজেকেই দুষ্ট ক’রে তোলা।’’ (আদর্শ বিনায়ক গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী) শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত সৎসঙ্গ আন্দোলন সন্তমত, বৈদিক মত এবং পূর্বাপূর্ব অবতারবরিষ্ঠ পুরুষোত্তমগণকে মেনে চলার শিক্ষা দিয়েছে। আগ্রা সৎসঙ্গের বিনতীর মাধ্যমে সন্ত-মতবাদকে, শ্রীশ্রীঠাকুর রচিত এবং প্রবর্তিত আহ্বানী, আচমন, আর্য্যসন্ধ্যা, পঞ্চবর্হিঃ, সপ্তার্চ্চি বৈদিক-মতবাদকে এবং পুরুষোত্তম বন্দনার মাধ্যমে পূর্বাপূর্ব অবতার-বরিষ্ঠদের আদর্শকে মান্যতা দিয়ে এক সর্বজনীন উপাসনা, প্রার্থনা প্রবর্তন করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। কেন জানিনা, দেওঘর সৎসঙ্গের কর্ণধারগণ ওই সর্বজনীন প্রার্থনাকে অস্বীকার করে ইষ্টগুরুর আদর্শকে অবমাননা করছেন। * * * “মৎস্য-কূৰ্ম্ম-কোল-নৃসিংহ-বামন শরীরম্ রাম-কৃষ্ণ-বুদ্ধ-যীশু-মোহম্মদ রূপায়িতম্ চৈতন্য-রামকৃষ্ণানুকূলং পূর্ব্বর্তনীপূরণম্ শাশ্বতং বৰ্ত্তমানম্।”-এর প্রবক্তা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সন্ত-সদগুরু পরম্পরা প্রসঙ্গে বলছেন, “……….. বুদ্ধদেব যে স্থানে উঠিয়া নির্বাক ছিলেন, শঙ্কর সেখানে পরমাত্মা খাড়া করিলেন। শঙ্করের পর রামানুজ, রামানুজের পরেই কবীর, নানক প্রভৃতি বহু সাধুর ভারতে প্রায় সর্বত্রই অভ্যুত্থান হয়। তারপর চৈতন্য, তারপর খৃষ্টধর্মের ঢেউ—তাহার ফলে রামমোহন প্রভৃতি। তারপর রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ। এই যে বিরাট, বহু কালব্যাপী বহু ধর্ম মতের আবির্ভাব ও সমাজ সংস্কারের প্রচেষ্টা— সমস্তই শ্রীকৃষ্ণ তত্ত্বেরই practical application বলা যাইতে পারে। তত্ত্ব হিসাবে বিশেষ নূতন কিছুই হয় নাই। একই বহুৎ তত্ত্বেরই নানা অংশ নানা মহাত্মার মধ্য দিয়া সমাজ শরীরের উপর দেশ কাল ভেদে ও মানুষের যোগ্যতা ও প্রয়োজনানুসারে পরীক্ষিত হইয়াছে। কিন্তু তাহার সঙ্গে সঙ্গে নূতন এক চরম তত্ত্বের সূচনাও দেখা দিয়াছিল কবীর প্রভৃতি কয়েক জনের মধ্যে। বলিতে গেলে রামচন্দ্রের তত্ত্বের পরে শ্রীকৃষ্ণই নূতন বৃহত্তর তত্ত্ব আনয়ন করেন। আবার শ্রীকৃষ্ণের পরে এই যুগেই ব্যাপকতর তত্ত্বের আবির্ভাব। আর সে তত্ত্ব শ্রীকৃষ্ণ, কবীর প্রভৃতির মধ্য দিয়া ক্রমশঃ আবির্ভূত হইয়াছে। এই নূতন তত্ত্বের speciality হচ্ছে এই যে, অন্যান্য মহাত্মার তত্ত্বের ন্যায় ইহার গ্লানি হওয়া অসম্ভব, কারণ এই মত কাহাকেও বাদ দিয়া নয়। যে কেহ যে অবস্থায়ই থাকুক না কেন, কিছুই বাদ না দিয়া এই মত গ্রহণ করিতে পারে। কেউ হয়ত ভুল করতে পারে (এই মতের Catholicity দেখে ), কিন্তু এ মত তাহাতে কোন রকমেই affected হবে না। (সূত্রঃ ঋত্বিগাচার্য্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য প্রণীত দিনপঞ্জী প্রথম খন্ড।)
যাইহোক, সাধক রামানুজ পরবর্তী সন্তমতের সাধক কবীরদাস জন্মেছিলেন 1440C বারানসীতে। তিনিই প্রথম আমাদের সৎ মন্ত্রের রহস্য ভেদ করে বলেছিলেনঃ “কবীর ধারা অগমকী সদগুরু দয়ী লখায়, উলট তাহি সুমিরন করে স্বামী সংগ লাগায়।” অর্থাৎ ধারা উল্টে স্বামী যোগ করে জপ করতে নিদেশ দিলেন। সন্ত কবীরের পর গুরু নানক জন্মগ্রহণ করেন 15. 4. 1469 C পঞ্জাব প্রদেশের তালবণ্ডীতে। তিনিও ওই সত্যনাম প্রচার করেছেন। গুরু নানকের পর আগ্রাতে ২৪শে আগস্ট ১৮১৮ তে জন্মগ্রহণ করেন শিবদয়াল সিং, তিনি স্বামীজী মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ১৫ জুন ১৮৭৮ আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। পরবর্তী গুরু হন রায় সালিগ রাম। তিনি ১৪ মার্চ, ১৮২৯ আগ্রার পীপল মাণ্ডিতে জন্মগ্রহণ করেন। ৬ ডিসেম্বর ১৮৯৮তে আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। তিনি হুজুর মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ওই সৎনাম সাধন করে চরম ও পরম পথের সন্ধান পান। তিনি তাঁর গুরু স্বামীজী মহারাজের অনুমতি ক্রমে ওই সৎনাম সর্বসাধারণে প্রচার করেন। পরবর্তী গুরু হন পণ্ডিত ব্রহ্মশঙ্কর মিশ্র। ২৮শে মার্চ, ১৮৬১ তে ব্রাহ্মণ পরিবারে, বারানসীতে জন্মগ্রহণ করেন। ১২ অক্টোবর ১৯০৭ সালে দেহত্যাগ করেন। তিনি মহারাজ সাহেব নামে খ্যাত ছিলেন। মহারাজ সাহেব দেহত্যাগের পূর্বে একটি কাউন্সিল গঠন করে বাবু কামতা প্রসাদ ওরফে সরকার সাহেবকে পরবর্তী গুরু রূপে নির্বাচন করেন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরকার সাহেবকে সন্ত বলে উল্লেখ করেছেন, ভাববাণীতে। অন্তর্ধানের পর আগ্রা সৎসঙ্গের প্রধান গুরু হন সরকার সাহেব। পুরুষোত্তম জননী মাতা মনোমোহিনী দেবী হুজুর মহারাজের দীক্ষিত ছিলেন। হুজুর মহারাজ বিগত হবার পর সরকার সাহেবের কাছে মা তাঁর ছেলের সম্পর্কে জানালে সরকার সাহেব “মেরা কাম ফতে।” বলে দেহ ত্যাগ করেন। পুরুষোত্তমরূপী সদগুরু অবতীর্ণ হয়েছেন জানতে পারে সাধ্যায়ী গুরু তাঁর দায়িত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন। সরকার সাহেব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গাজীপুরে। তারপর থেকেই মাতা মনোমোহিনী দেবী সন্তমতের সৎনামে দীক্ষা দিতে শুরু করেছিলেন। মাতা মনোমোহিনী দেবী তাঁর গুরুদেব সাধক পুরুষ হুজুর মহারাজের কাছ থেকে যে বিনতী প্রার্থনা করতে শিখেছিলেন, সেই শিক্ষার ধারাটাকে প্রাধান্য দিয়ে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন পাবনার সৎসঙ্গ আন্দোলন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র পুরুষোত্তম রূপে স্বীকৃত হবার পরও আগ্রা সৎসঙ্গের ধারায় (যে ধারায় বীজমন্ত্রের উচ্চারণ স্বীকৃত, বীজমন্ত্রের মাধ্যমেই পারস্পরিক সম্ভাষণ প্রচলিত। আর্য্যকৃষ্টির দশবিধ সংস্কার অবহেলিত।) পাবনা সৎসঙ্গকে পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন বলেই আগ্রা সৎসঙ্গের বিনতী-র শিক্ষা দেওয়া হয় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের অনুসারীদের। যার ফলে, আজও বিনতীর মাধ্যমে বীজমন্ত্র উচ্চারিত হয়ে চলেছে। নিত্য সাধ্যায়ের জন্য আবশ্যিক, শ্রীশ্রীঠাকুর রচিত ‘জাগরণী’ সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দীক্ষিতরা যতটা না জানে, তার চেয়ে বেশি মানে মাতা মনোমোহিনী দেবী রচিত তাঁর গুরুদেবের প্রশ্বস্তির প্রভাতী গীতি ‘প্রভাত যামিনী উদিত দিনমনি’-কে। পরবর্তীকালে দৈনন্দিন জীবনে আর্য্যকৃষ্টিকে উপস্থাপিত করতে শ্রীশ্রীঠাকুর যে সান্ধ্য-প্রার্থনা মন্ত্র রচনা করেছিলেন, মাতা মনোমোহিনী দেবী সেই প্রার্থনাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন, ‘‘সন্ধ্যা মন্ত্রটা মা মারা যাবার তিনদিন আগে লেখা হয়। মা শুনে বড় খুশি হয়েছিলেন। সেইজন্য ও জিনিসটার উপর আমার খুব প্রীতি আছে। মা শুনেছিলেন তাই ওটা আমার অর্ঘ্য হয়ে আছে।’’ (আঃ প্রঃ ২১ খণ্ড, ৭. ১১. ১৯৫২) শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে কারো কাছে দীক্ষা গ্রহণ না করলেও বার বার তিনি বলেছেন, ‘আমার মা-ই যেন সরকার সাহেব, হুজুর মহারাজ ও অন্যান্য অন্যান্য মহাপুরুষদের প্রতীক—মা-ই আমার আদর্শ—মা-ই আমার জীবত্ব। তথাপি তিনি সরকার সাহবকে নিজের গুরু হিসেবে এবং হুজুর মহারাজকে মাতৃদেবীর গুরু হিসেবে মান্য করতেন, তাঁদের প্রতিকৃতিতে প্রণাম নিবেদন করতেন।
তাই আজকের পুণ্য দিনটিতে সকলকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে যে আমরা যেন ‘দ্বন্দ্বের অতীত গগনসদৃশ কেবলম্ জ্ঞানমূর্তিকে’ আজ্ঞাচক্রে স্থাপিত করে জগতের সব শিক্ষাগুরুকে, সব জীবকে যেন ভগবান জ্ঞানে সেবা করতে পারি । আমরা সবাই যেন গুরুমুখ চলনে চলতে চেষ্টা করি । গুরু পূর্ণিমার শুভক্ষণে পরমপিতার কাছে দীন সেবকের এই প্রার্থনা। জয়গুরু ও প্রণাম। বন্দে পুরুষোত্তমম্!
এই রচনায় তত্ত্ব ও তথ্যের কোন ভুল থাকলে অনুগ্রহ করে জানালে কৃতজ্ঞ থাকব।
আমাদের গুরুদেব/ইষ্ট শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সত্যানুসরণ গ্রন্থে বলেছেন, গুরুই ভগবানের সাকার মূর্ত্তি…..। আজ গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষ্যে সব গুরুর শিষ্যগণ গুরুদেবের প্রতিকৃতির সামনে নানা উপাচার সাজিয়ে গুরুকে সেবা করার জন্য, গুরুর তুষ্টির জন্য গুরু পূজা করবেন। সেই পূজা কিভাবে করতে হবে সেটাও বলে দিয়ে গেছেন আমাদের গুরুদেব পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। ভগবানের তুষ্টি প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন— “যা’রা তৃষ্ণার্তকে পানীয় দেয়, ক্ষুধার্তকে অন্ন দেয়, রুগ্নকে নিরাময় করে, দুর্বলকে সাহায্যে সবল করে তোলে, শোকার্তকে সন্দীপ্ত করে তোলে সান্ত্বনায়— সুশীল-সৌজন্যে ইষ্টানুগ সম্বোধি পরিচর্য্যায়, গৃহহারা, আশ্রয়হারা অভ্যাগত যা’রা তা’দিগকে যা’রা আশ্রয়ে সুস্থ ও শ্রীমণ্ডিত ক’রে ধর্মে অভিদীপ্ত করে তোলে, যোগ্যতার যোগ্য অনুচর্য্যায় আত্মনির্ভরশীল করে তোলে, ঈশ্বরের সেবা করে তা’রা প্রত্যক্ষভাবে।” (সেবা-বিধায়না, ১৪২)
।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দৃষ্টিতে বাস্তব ইষ্টপূজা ।। ইষ্ট স্বার্থ ও প্রতিষ্ঠার অনুকূলে প্রবৃত্তি ও চাহিদাগুলিকে নিয়ন্ত্রিত ক’রে সত্ অর্থাত্ ইষ্টানুকূল জীবনবৃদ্ধিদ যা’-কিছু চিন্তাকে বাস্তবতায় পরিণত করবার প্রচেষ্টার সঙ্গে যথাযথ সেবা ও যাজনে পারিপার্শ্বিককে আকৃষ্ট ও উদ্বুদ্ধ ক’রে প্রতি প্রত্যেককে ইষ্টে অনুরক্ত ক’রে তোলাই হচ্ছে প্রকৃত ইষ্টপূজা।২৪ (পথের কড়ি) তাঁর বলা অনুযায়ী চলনে চলে আমরা যেন নিত্যকর্মের মাধ্যমে গুরু পূজায় সার্থক হতে পারি। সবাইকে জয়গুরু ও প্রণাম।
বাঙালী মননশীলতা দিয়ে দুর্গাপূজার বিষয়টাকে বাস্তববোধে চিন্তা করলে দেখা যাবে, আমাদের আলোচ্য মা-দুর্গা পূজ্য তাঁর চরিত্রগুণে। মা দুর্গার সমার্থক, মা উমাকে আমরা কন্যা জ্ঞান করি। তাইতো ফি বছর কৈলাস থেকে নিয়ে আসি। যদিও তাঁকে আনতে এবং দিতে কে বা কারা যান। কোন রুটে দোলায়, নৌকায়, ঘোটকে এবং গজে যাতায়াত করেন, সে খবর দেবার দায়িত্ব তথ্যাধিকারীদের, আমার নয়! তবে আমি এবং আমরা দশভুজার চাইতেও দ্বিভুজা উমাকে বেশী পছন্দ করি বলেই না উমাকে নিয়ে কতই না আগমনী গানের ডালি সাজিয়ে তাঁকে বরণ করে নিতে চাই। কামনা করি, ঘরে ঘরে উমার মত আদর্শ মেয়ে যেন জন্মায়। উমাই তো আমাদের মা দুর্গা! ভারতেই শুধু নয়, সারা বিশ্বের সংস্কৃত মনীষায় নারীজাতির আদর্শরূপে স্বীকৃত, পূজিত। স্বীকৃতি পাবেনই না বা কেন, পূজিত হবেনই না বা কেন,–কারো কান-ভাঙানিতে কান না দিয়ে পরমভক্ত, পরমজ্ঞানী শিবকে পতিরূপে বরণ করে, স্বামীর মনোবৃত্ত্যানুসারিণী স্ত্রী হয়ে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীদের ন্যায় কৃতি সন্তানদের জননী হয়েছেন। তিনি একজন আদর্শ সংসারী নারী হয়েও অসৎ নিরোধী তৎপর,–অশুভ শক্তিকে সমুচিত দণ্ড দেবার জন্য রণসাজে সজ্জিত হয়েছেন। পশুরাজকে করেছেন বাহন। পারস্পরিক শত্রু খাদ্য-খাদক সম্পর্কের পেঁচা-ইঁদুর, ময়ুর-সাপকে মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ করেছেন। দুটি হাত দিয়েই বৃহত্তর সংসারের দশদিক সামলাতেন। তাই তো তিনি দ্বিভূজা হয়েও দশ ইন্দ্রিয়কে বশ করে হতে পেরেছেন দশভূজা। তাই তো তিনি দশপ্রহরণধারিণী। তাই তো তিনি পূজ্য। –এহেন চরিত্র ‘দেবী’ জ্ঞানে, ‘জগজ্জননী’ জ্ঞানে স্বীকৃতি তো পাবেনই। তাই তো আমাদের ঋষিরা দেবতাদের সম্মিলিত শক্তিতে সৃষ্ট দেবী দুর্গা কাত্যায়ন অঙ্গনে মহিষাসুরকে বধ করার পর তাঁর প্রদর্শিত শক্তিকে দৃষ্টান্ত স্বরূপ চিরস্থায়ী একটা আদর্শে রূপ দিয়েছিলেন। দেবী দুর্গাকে স্ত্রীজাতির এক আদর্শ প্রতীক রূপে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁরা দেবী দুর্গার ওই অসৎ-নিরোধী তৎপরতাকে দৃষ্টান্ত রূপে তুলে ধরে নারীসাধারণকে দেবী রূপে, জগন্মাতা রূপে মর্যাদা দিয়েছেন, কামিনীরূপে নয়। তাইতো বর্তমানেও সম্ভ্রান্ত হিন্দু নারীদের মধ্যে দেবী পদবি প্রচলিত। ঋষিরা ছিলেন বিজ্ঞানী। তাই তো তাঁরা দুর্গাপূজার বিধান দিলেন বাস্তব অনুশাসনের মাধ্যমে। আত্মবিস্তার কল্পে গর্ভাধান-সংস্কারের সময় স্বামী, নিজের স্ত্রীকে জগন্মাতা জ্ঞানে স্ত্রীর নাভিমূল স্পর্শ করে বলবেন, প্রসীদ মা জগজ্জননী,–হে জগন্মাতার প্রতীকস্বরূপা চিন্ময়ী মা, তুমি প্রসন্ন হয়ে আমাকৃত গর্ভাধান মাধ্যমে দেদীপ্যমান আত্মাকে আকর্ষণ কর।–ওই স্বীকৃতির মাধ্যমে স্ত্রীকেও মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েছেন, কামিনীজ্ঞানে নয়। এর কারণ, স্বামী, স্ত্রীর মাধ্যমে নিজেকে জন্মান, তাই তিনি জায়া। জীববিজ্ঞান অনুসারে প্রজনন-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আত্ম-প্রতিলিপি গঠন করা হয়। পুরুষ-বীজ ধারণ করে, বীজের প্রতিলিপি গঠন করে ভূমি-স্বরূপা নারী। জনন করেন বলে জননী। তাই কৃষকেরা ফসল ফলাতে জমি কর্ষণ করে, কর্ষণ মানে আকর্ষণ, যাতে জমি বীজ থেকে ভালো সন্তান (ফসল) আকর্ষণ করতে পারে। জমি অনুযায়ী উপযুক্ত শুদ্ধ-বীজ বপনের আগে ভূমিকে আগাছা মুক্ত করে, সার দেয়, জল দেয়, জমি জননক্ষম হলে জো বুঝে বীজ বোনে।–জমিকে মাতৃজ্ঞানে পোষণ দিয়ে ভূমিকে পূজা করে—যাতে জমি বীজের অন্তর্নিহিত সত্তাকে ভালোভাবে পুষ্ট করতে পারে, বীজের সত্তাকে ধারণ করে আদর্শ মা হয়ে ভালো ফসল ফলাতে পারে। ফসল ফলাতে যদি গর্ভাধান প্রক্রিয়া থাকতে পারে, মানুষ ফলাতে তো আরও বেশী বিধি-নিয়ম থাকা উচিত! আমাদের ঋষিরা ছিলেন প্রকৃত বিজ্ঞানী। বিজ্ঞান শব্দটিও উপনিষদ থেকে উৎপত্তি হয়েছে। তাই ঋষিরা নারীদের জগন্মাতাজ্ঞানে ব্যবহার (treat) করতে, শ্রদ্ধা (honour) করতে শিখিয়েছেন।–যার নাম প্রকৃত পূজা। যার মাধ্যমে স্বভাবের স্ফূরণ হয়ে সব অভাবের পূরণ হয়।
ভারতের আর্য্য-ঋষিগণ, অবতার-বরিষ্ঠগণ প্রত্যেকেই সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির উপাসনার কথা বলেছেন ধর্মের নামে, পূজার নামে। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আরও একটু সহজ করে দিয়ে বললেন, ‘‘ধর্ম্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম্ম না-রে। অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম্ম বলে জানিস্ তাকে। পূর্বতনে মানে না যারা/জানিস্ নিছক ম্লেচ্ছ তা’রা।’’ ‘‘পূজা-আর্চ্চা মানেই কিন্তু /দৈবগুণ যা সেধে নেওয়া। হাতে-কলমে মক্স করে/বাস্তবে তার রূপটি দেওয়া।।’’ ইত্যাদি ছড়াবাণীগুলো সহজ, সরল, ওজস্বী আবেদনে সমৃদ্ধ হলেও একটা নির্দিষ্ট গণ্ডীর ভাষা-ভাষীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ওই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দিতে বললেন, ‘Upholding urge of existence is Dharmma.’ বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্তা বা অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করে উৎকর্ষতায় রক্ষা করার নাম ধর্ম। তথাপিও আমরা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতার, কু-সংস্কারের, অজ্ঞানতার আবরণ ভেদ করে শুদ্ধ আমিটাকে বের করতে ব্যর্থ হলাম। তথাকথিত ইনটেলেকচ্যুয়াল হওয়া সত্বেও ধর্মের নামে ফুল, বেলপাতা, ধূপবিহীন ধূপকাঠি, ফল-মিষ্টান্নাদির অঢেল আয়োজনে, মাইক বাজিয়ে, শব্দবাজির আওয়াজ দিয়ে পরিবেশবিদদের চিন্তার বলিরেখায় ভাঁজ ফেলে দিতে ইন্ধন যোগাচ্ছি। আর আমাদের গর্বের রবীন্দ্রনাথ আমাদের দ্বিচারিতা দেখে কষ্ট পাচ্ছেন আর ভাবছেন, যে মানুষগুলো ‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তলে’ ইত্যাদি ছন্দের ডালি সাজিয়ে ভক্তির আবেদন জানায়, তারাই আবার পূজার নামে কু-সংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে বিশ্বাত্মাকে দূষিত করে চলেছে। আমাদের বর্তমান যুগ যে যুক্তিবাদী সে কথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি অস্বীকার করবেন না আশাকরি। যেমন, সন্তানের হয়ে মা খেলে সন্তানের পেট ভরবে না। ছাত্রের হয়ে শিক্ষক লেখাপড়া করলে ছাত্র পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে না।–তেমনি প্রচলিত পূজার আয়োজকদের হয়ে কোন পুরোহিত পূজা করলে আয়োজকদের কিছু ফললাভ হবে কি ?
অবশ্য পুরোহিতও জানেন না ফললাতের বিষয় সম্পর্কে। যদি জানতেন বিসর্জন মন্ত্রে বলতেন না—ওঁ আবাহনং ন জানামি, নৈব জানামি পূজনম্। বিসর্জনং ন জানামি ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি।–অর্থাৎ আমি আবাহনও জানিনা, বিসর্জনও জানিনা, আমাকে ক্ষমা করুন। (দ্রঃ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা) বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী পূজ্য-প্রতিমা চঞ্চল চিত্তের ধারণের জন্য একটি অবলম্বন। প্রতিমাকে ব্রহ্মের রূপ কল্পনা করে উপাসনা, সংযম, সাত্তিক আহার, সাত্তিক বিহার ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে পূজা করা হয়।–যাতে পূজক বা উপাসক মনসংযোগ দ্বারা প্রতিমাকে হৃদয়ে ধারণ করে প্রতিমার গুণে গুণান্বিত হতে পারে। এই হলো প্রতিমা পূজার মূল কথা। তাহলে তো যার পুজো তাকেই করতে হবে। পূজ্যর সাথে পূজকের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। যাই হোক, এ থেকে এটুকু বোঝা গেল যে সততা, সংযম, ন্যায়নীতি ইত্যাদি মানবিক গুণগুলোর প্রবহমানতাকে নবীকরণ করার মাধ্যম, পূজা উদযাপনের উদ্দেশ্য। অথচ বাঙালীর সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার আয়োজন বিশ্লেষণ করলে এর বিপরীত চিত্রটাই আমাদের বোধে ধরা পড়ে। বিজ্ঞানের বিধি অনুযায়ী একটা নির্ভুল অংক কষতে গেলেও একটা শান্ত পরিবেশ প্রয়োজন, একাগ্রতার প্রয়োজন। কিন্তু পূজার নামে, বেশীরভাগ বারোয়ারী পূজা-প্রাঙ্গনগুলোতে ঢাকের আওয়াজ, মাইকের আওয়াজ, আয়োজকদের অহংকারের আওয়াজে কোন সুস্থ মানুষের একটি ঘণ্টার জন্যও একাগ্রভাবে, স্থিরচিত্তে বসে থাকতে পারার কথা নয়! অবশ্য দেবদেবীর ব্যাপারটা আলাদা। মাটির পুতুল বলেই আমাদের সব অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করতে পারে! তাই কবিগুরুর ভাষার—
“তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি
বুঝতে নারি কখন্ তুমি
দাও’ যে ফাঁকি॥
তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি–
ফুলের মালা দীপের আলো ধূপের ধোঁওয়ার
পিছন হতে পাই নে ‘সুযোগ চরণ-ছোঁওয়ার,
স্তবের বাণীর আড়াল টানি
তোমায় ঢাকি॥
তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি—
দেখব ব’লে এই আয়োজন মিথ্যা রাখি
আছে তো মোর তৃষা’ কাতর আপন আঁখি
কাজ কী আমার মন্দিরেতে
আনাগোনায়—
পাতব আসন আপন মনের একটি কোণায়
সরল প্রাণে’ নীরব হয়ে
তোমায় ডাকি॥
তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি”—-
বাণীগুলো এক নির্মম সত্যের বার্তা দেয় না কি?
* * *
বাঙালিদের মানস-দেবী মা দুর্গা। ‘যা দেবি সর্বভূতেষু’ মন্ত্রে যাঁর অস্তিত্বের স্বরূপ প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ দেবী সর্বভূতের প্রাণশক্তি স্বরূপা, সর্বভূতে দেবী অধিষ্ঠিতা। এবার প্রশ্ন, যে দেবী সর্বভূতে অধিষ্ঠিতা সেই পঞ্চ-মহাভূত পরিপোষিত স্বেদজ, ক্লেদজ, অণ্ডজ, জরায়ুজ-জাত ভূত(জীব/প্রাণী)গুলোকে, বেঁচে থাকার জৈবাজৈব আবশ্যক উপাদানগুলোকে দেবীর প্রতিভূ মনে করে সম্বর্দ্ধিত না করে, সুস্থভাবে টিঁকিয়ে রাখার চেষ্টা না করে, কোন যুক্তিতে মাটির প্রতিমা পূজার নামে প্রাণী হত্যা (মাংসের দোকানে লাইন, তার প্রমাণ।) করে, নানাভাবে পরিবেশকে দূষিত করার জন্য বিশেষ করে কলকাতায়, (দ্রঃ পুজোর আগের এবং পরের দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের রিপোর্ট।) কোটি কোটি টাকা অপচয় করা হয়! ভাষা-বিজ্ঞান অনুযায়ী পূজা মানে পূরণ করা, সম্বর্দ্ধিত করা। যে আচার-আচরণ পরিবেশের সাত্তিক জীবন-বর্দ্ধনার অভাবকে পূরণ করে, জৈবাজৈব সবকিছুকে সম্যকরূপে বর্দ্ধিত করে, তার নাম পূজা। উৎকৃষ্ট প্রসব করে যা, তার নাম উৎসব। আর যে আচার-আচরণ জীবনবৃদ্ধিকে নন্দিত করে তার নাম আনন্দ। এখন প্রশ্ন, আমাদের প্রচলিত পূজা, উৎসবের উদযাপনকে কেন্দ্র করে আনন্দের প্রকাশ বৃহত্তর পরিবেশকে কতখানি নন্দিত করে ‘পূজা’ শব্দের যথার্থতাকে উপহার দিতে পেরেছে? —এইসব বিষয়ে সত্তাপিয়াসী চিন্তাশীলদের চিন্তা করে দেখা উচিত। বিশেষ করে যাঁরা কুসংস্কার বিরোধী রূপে নিজেদের বোধ ও বোধিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। বাহ্য পূজাবাদীদের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী পূজা শুরুর আগে মৃন্ময়ী মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। আয়োজকদের বিশ্বাস, পুরোহিতের মন্ত্রবলে নিষ্প্রাণ মূর্তিগুলো প্রাণবন্ত হয়। তর্কের খাতিরে বিষয়টাকে সত্য বলে যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে একটা প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, জীববিজ্ঞান অনুযায়ী জীবন্ত প্রাণীদের চলন, গমন, ইত্যাদি অভিব্যক্তি থাকা আবশ্যিক। অতএব বিজ্ঞানসম্মত কারণেই পুরোহিতের মন্ত্রবলে দুর্গাঠাকুরের চালচিত্রের দেবদেবী, অসুর, সিংহ, ময়ূর, সাপ, পেঁচা, ইঁদুরেরা জীবন্ত হয়ে নিজ নিজ অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে। কেউ চুপচাপ স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে পারবে না। ফলে শুরু হয়ে যাবে মহিষাসুর মর্দিনীর বাস্তব উপস্থাপনা—যুদ্ধ। অসুর, দুর্গাকে আক্রমণ করবে, সিংহ গর্জন করতে করতে দেবীকে নিয়ে অসুরের দিকে ধাবিত হবে, বাহনসহ অন্যান্য দেবদেবীরাও যোগদান করবে যুদ্ধে।–-এবার প্রশ্ন–ওই অবস্থায় পুরোহিত, আয়োজকেরা, ভক্তেরা, উদ্বোধন করতে আসা সেলিব্রিটিরা, নেতা-মন্ত্রীরা কোন পক্ষে যোগদান করবেন? দেবীর পক্ষে না অসুরের পক্ষে ? আর একটা প্রশ্ন, যে পুরোহিত আদ্যিকালের দেবদেবীদের কল্পিত মাটির মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম, তিনি মানুষের প্রাণহীন দেহে আরো সহজে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন বা পারা উচিত। কারণ, বিজ্ঞান মতে, মাটির মধ্যে থাকা অণু-পরমাণুর তুলনায় সদ্য মৃতদেহের অণু-পরমাণু বেশী সক্রিয় থাকে, বেশী জীবন্ত থাকে। মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ এ বিযয়টা নিয়ে ভেবে দেখতে পারেন। তাহলে অনেক অকালমৃত্যু সহজে রোধ করা যাবে। সনাতন ধর্মীয় মতবাদ অনুযায়ী মানুষ অমৃতের পুত্র, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ বলা হয়েছে। সেই মানুষ যাতে দশবিধ-সংস্কারে সংস্কৃত হয়ে প্রকৃষ্ট জাতক বা প্রজা হয়, অকালে নিষ্প্রাণ না হয়, সন্ত্রাসবাদী না হয়, রেপ-কেসের আসামী না হয়, নারীদের মা-দুর্গার প্রতীক জ্ঞানে সম্মান জানায়, ‘অসতো মা সদ্গময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়’-এর আদর্শ অনুসরণে সমৃদ্ধ হয়,–সমাজের পুরোভাগে থেকে, ওইসব বিষয়ে মানুষকে সচেতন করে পরিবেশের হিতসাধন যাঁরা করতেন তাঁদের বলা হতো পুরোহিত। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পুরোহিত ঋষি বশিষ্ঠ রামচন্দ্রের রাজসভায় অকালমৃত্যু-দেহে প্রাণ সঞ্চার করার স্পর্দ্ধা দেখান নি। বিজ্ঞান-যুগের পুরোহিতেরা যদি পুতুলে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন, মৃতদেহেও পারা উচিত! যদি না পারেন, ততঃ কিম্! ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি, ‘পূজা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সম্বর্দ্ধনা। পূজ্য ব্যক্তিত্বের গুণে গুণান্বিত হয়ে নিজেকে এবং পরিবেশকে সম্বর্দ্ধিত করা। এতদিন ধরে হাজার-হাজার দুর্গাপূজা করে আমাদের চিন্ময়ী নারীরা কতখানি সমৃদ্ধ হয়েছে মা দুর্গার ন্যায় অসৎ-নিরোধী-তৎপর আদর্শ চরিত্রের চরিত্রায়নে ? আমাদের চিন্ময় পুরুষেরা নারী সাধারণকে কতটা মা-দুর্গার প্রতীক মনে করে শ্রদ্ধা করতে বা পূজা করতে শিখেছে ? আমরা সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির পথে কতটা এগিয়েছি? আমাদের কতখানি দুর্গতি নাশ হয়েছে? আমাদের সার্বিক জীবন-চলনা দুর্গ-সম পরিরক্ষিত হয়েছে কতটা?—তথ্য জানার অধিকার বলে এ বিষয়ে জানতে চাওয়াটা নিশ্চয়ই অপরাধ হবে না! যদিও প্রচলিত তথ্য এর বিপরীত মত প্রকাশ করে চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। পূজাকে কেন্দ্র করে সাত্তিকতা বৃদ্ধি না পেলেও, তামসিকতা বেড়ে যায় বহুগুণ। পুজোকে কেন্দ্র করে ভক্তদের অনিত্য দেহটাকে পূজা-বিপরীত সাধের নানা বেশভূষায় সাজিয়ে দিতে বিকিকিনির পসরা সাজিয়ে যারা বসেন, তারা কি পূজা-সদৃশ সততার দৃষ্টান্ত উপহার দেন সমাজকে ? পূজাই যদি উদ্দেশ্য তবে ইভটিজিং, আদমটিজিং কেন হবে ? অপরাধ কেন বৃদ্ধি পাবে ? দূষণ কেন বৃদ্ধি পাবে পূজাকে কেন্দ্র করে ?— এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে ? এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, “Accident-এ (আকস্মিকভাবে) যা’ জন্মে, তা বুনো, বিহিত সুফলপ্রদ চাষে যা’ জন্মে তা’ পুণো (পুণ্য)। প্রবৃত্তি লালসায় অবিধিপূর্বক উপগতি হয়ে যে সন্তান জন্মে, তার চরিত্রের কোন ঠিক ঠিক থাকে না। গর্ভাধান সংস্কারের ভিতর দিয়ে উন্নত চিন্তাপ্রসূত বিধিমাফিক পবিত্র যে জন্ম, তার রকমই আলাদা। ঘরে ঘরে ভগবান জন্মে। তেমনি ছিল আমাদের বিধান।’’ (আঃ প্রঃ ১৮/১৩)
অতএব আমাদের ঘরের মা দুর্গারা যেদিন আবার ঘরে ঘরে লক্ষ্মী-সরস্বতী, কার্তিক-গণেশ সদৃশ ভগবান জন্মাতে পারবেন সেদিন সার্থক হবে আমাদের দুর্গাপূজা।
দুর্গাপূজার বাস্তবতা তুলে ধরতে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেনঃ
“….যে মৃন্ময় মূর্ত্তি আমরা পূজা করি— কল্পনায় প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করে,– তিনি দশভূজা, দশপ্রহরণ-ধারিণী— ঐ আমাদের মায়েরই প্রতীক— আমাদের ঘরে ঘরে যে মা অধিষ্ঠিতা তাঁরই বিনায়িত সুসঙ্গত প্রতীক; তাই ঐ মায়ের পূজা মানেই হচ্ছে— যে মা আমার, যে মা তোমার, যে মা ঘরে ঘরে দুর্গা হয়ে অধিষ্ঠিতা, দুর্গতিনাশিনী হয়ে দশপ্রহরণ ধারণ করে সন্তান-সংরক্ষণায় নিয়োজিতা, সেই মায়েরই পূজা;………..” (আশীষ বাণী, ৬২/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)
“মা আমাদের দশভুজা, প্রতি ঘরে ঘরে যদিও তাঁকে দ্বিভুজাই দেখতে পাই, তিনি দশদিক্ আবরিত করে রেখেছেন— তাঁর স্নেহ-উৎসারিত স্বস্তি-উৎসারিণী উদাত্ত অনুচর্য্যায়, কায়মনোবাক্যে প্রতিটি কর্ম্মের ভিতর-দিয়ে ব্যষ্টির পথে সমষ্টিকে আন্দোলিত করে, সাত্বত উৎসর্জ্জনায় আপূরিত করে সবাইকে, কৃতি-উদ্দীপনার অনুপ্রেরণায়— তাই মা আমার দশভূজা;……” (আশীষ বাণী, ৫৯/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)
উক্ত বাণীর মাধ্যমে পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র রক্ত-মাংসের মানবীদের মা দুর্গা রূপে সম্বোধন করলেন!
।। পূজা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের অনুভবী দিব্যবাণী ।। “পূজা মানে সম্বর্দ্ধনা। শুধু নিরিবিলি মূর্ত্তি বা পটের সামনে ফুল-বিল্বপত্র দিয়ে মন্ত্রপাঠ করলে পূজা হয় না। গুরু ও গণের অর্থাৎ পারিপার্শ্বিকের বাস্তব সম্বর্দ্ধনা যাতে হয়, তাই করা চাই। তাতে শান্তি সুনিশ্চিত। (আঃ প্রঃ ৭ম খণ্ড, পৃঃ ১৯৬)
আমি আপনার পূজা করছি মানে, আপনার গুণ চিন্তা করছি এবং নিত্য অনুশীলনের মাধ্যমে ঐ গুণগুলি আমার চরিত্রগত করে তুলছি, আমার ভিতরে বাড়িয়ে তুলছি। স্তব করি মানে গুণ বর্ণনা করি। তা কিন্তু শুধু মুখে বা মনে-মনে করলেই হবে না, প্রতিদিনকার অভ্যাস ও অনুশীলনের ভিতর দিয়ে ঐ গুণগুলি আমার চরিত্রে মূর্ত্ত করে তোলা চাই।’’ (দীপরক্ষী ৪/১৮২)
আদর্শ যদি থাকে, আর তাতে ভাবমুগ্ধ সক্রিয় অনুরাগ যদি হয়, তবে তার ভিতর দিয়েই মানুষগুলির প্রবৃত্তির একটা সার্থক বিন্যাস হতে পারে। নচেৎ শুধু একটা হাওয়ার উপর দাঁড়িয়ে এ জিনিসটা হয় না। …গুরুগত প্রাণ না হলে মূর্তিতে বা নিজের ভিতর প্রকৃত প্রাণ–প্রতিষ্ঠা হয় না। তাই পূজার ফলও তাতে মেলে না। ব্রহ্মবিদকে উপেক্ষা করে যখন ব্রহ্মকে উপাসনা করতে চাই, তখন আমরা তমসাচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। কারণ, বোধ থাকে না, বাদ থাকে। তার থেকে বোধবন্ধ্যা বাদব্যাহৃতির উদয় হয়।… বাদব্যাহৃতি মানে তথাকথিত অনুভূতিহীন বাগাড়ম্বর। (আলোচনা প্রসঙ্গে ১৮তম খণ্ড)
।। পূজা কেমন করে করতে হবে ।।
“দেবতার পূজা-অর্চনা করতে গেলে আগে ইষ্টের ভাব অন্তরে জাগ্রত করে সেই ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে, দেবতার স্মরণ মনন করতে হয়। তাঁকে স্মরণ করা মানে—তাঁর চলন-চরিত্র ও গুণ গরিমা স্মৃতিতে এনে অনুশীলনের ভিতর দিয়ে আয়ত্ব করা। চরণ-পূজা মানে চলন পূজা। ইষ্টের চলনাকে নিজের জীবনে আয়ত্ত ক’রে ঐ চলনের প্রসারতা ও সম্বর্দ্ধনা যদি না ঘটাই বাস্তবে, তাহলে তাঁর চরণ-পূজা সার্থক হয় না। আমরা ফাঁকতালে কাম সারতে চাই, কিন্তু বিধি বড় কঠিন বান্দা, কোন চালাকি চলে না তাঁর কাছে।” (আ. প্র. ২৯. ১২. ১৯৪২)
“প্রশ্ন। হিন্দুরা দেবদেবীর পূজা করেন কিন্তু মুসলমানেরা একমাত্র খোদাতায়ালার পূজা ক’রে থাকেন। হজরত ত’ ছবি ও পুতুল-পূজা একেবারেই নিষেধ ক’রে গেছেন, কিন্তু আপনি এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য করছেন কেমন-ক’রে ?
শ্রীশ্রীঠাকুর। ধর্ম্ম-আচরণের দিক দিয়ে হজরত রসুলও যা’ ব’লে গেছেন, আর্য্যদের ধর্ম্মশাস্ত্র চিরকালই ঋষির নিদেশরূপে তাই বহন ক’রে আসছে। আর্য্য-ধর্ম্মশাস্ত্র ছবি বা পুতুল-পূজা এমনতর বিকট তাচ্ছিল্যের সহিত নিরস্ত করতে ঘোষণা ক’রেছেন—এমন-কি অধমাধম বলতেও ক্ষান্ত হন নি। তবে আর্য্য-ঋষিদের প্রত্যেক মানুষকে উন্নতির পথে নিয়ন্ত্রণ করবার এমনতর একটা ঝোঁক ছিল—যা-নাকি হজরত রসুলের ভিতর দেখতে পাওয়া যায়–………..” যারা পুতুল-পূজা নিয়ে পুতুলকে ভগবান করে একটা বেপরোয়া জড়ত্বের আরাধনায় মশগুল হয়ে আছে—কায়দা-কলম করে তাদিগকে ঐ পুতুল বা ছবি-পূজার অনিষ্টকারিত্ব বুঝিয়ে ঐগুলি যে নিরেটই অধম, তাদের তা বিবেচনার ভিতর দিয়ে এনে, অন্তর থেকে তা যাতে মুছে যায় তারই মতলব কত কথার ভিতর-দিয়ে কত রকমে দিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। ………. (ইসলাম-প্রসঙ্গে/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র/পৃঃ ২৮-৩০)
।। পুরুষোত্তমের দৃষ্টিতে প্রতিমা পূজা ।।
কোন্ বেকুব শিখিয়ে দেছে
আর্য্য যা’রা পৌত্তলিক,
পুতুল-পুজো করে না তা’রা
পূজক আপ্তবীর-প্রতীক; ……… ১১।
(অনুশ্রুতি, ১ম খণ্ড/ আর্য্যকৃষ্টি)
সাধক রামপ্রসাদ তাঁর স্বরচিত গানের ভেতরেই তো বলেছেন— ‘‘ধাতু-পাষাণ মাটির মূর্ত্তি কাজ কি রে তোর আরাধনে তুই মনোময় প্রতিমা গড়ি’ বসা হৃদি-পদ্মাসনে।।’’ এমন কত কি যে আছে, তার ইয়ত্তা নেই।’’ (কথা প্রসঙ্গে, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৭৬, ১৭-১০-১৩৪২)
* * * এবার আমরা এক়টু দেখে দেখে নেব, পূজা প্রসঙ্গে ‘মেরা ভারত মহান’-এর অন্যান্য মহানেরা এবং মহান গ্রন্থগুলো কি নিদেশ রেখে গেছেন।
পূজা বিষয়ে মহানির্ব্বাণতন্ত্র নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ ‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ। অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’ মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ভারতে বিবেকানন্দ গ্রন্থের ৩৩৬ পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট। ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’ ‘‘যে-ব্যক্তি সর্ব্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে।’’ –শ্রীমদ্ভাগবত। ৩-২৯-২২ “ঈশ্বরঃ সর্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জ্জুন তিষ্ঠতি। ভ্রাময়ন্ সর্ব্বভূতানি যন্ত্ররূঢ়ানি মায়য়া।।’’ (গীতা, ১৮। ৬৫) “যিনি এই সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার নিজের স্বধর্মানুরূপ নিষ্কাম কর্মাচরণ দ্বারা (বাক্য বা ফুলজল দ্বারা নহে) পূজা করিয়া মানুষ সিদ্ধি লাভ করে। স্বধর্মানুরূপ (বর্ণানুগ সত্তাধর্ম পালন) নিষ্কাম কর্মই পরমেশ্বরের পূজার ডালি। (গীতা ১৮। ৪৬)
“বৈদিকযুগে বেদের কোন দেবতাই শরীর গ্রহণ করেন নাই। বেদে বিগ্রহ বা দেবমন্দিরের উল্লেখ নাই। পৌত্তলিকতার চিহ্ন পর্য্যন্তও নাই। পুরাকালে বিগ্রহ বা মন্দির ছিল না।“
“কোন বেদে বা মূল পুরাণেও প্রতিমা–পূজার প্রসঙ্গ নাই।“
(ঋগ্বেদ–সংহিতা, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১১১)
সূত্রঃ সৎসঙ্গ পাব্লিশিং-এর গ্রন্থ, ইসলাম প্রসঙ্গে, পৃঃ ১১
তাই, শাস্ত্র বর্ণিত অধমের চাইতেও অধম পূজায় মেতে উঠে আমাদের যাতে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে না হয়, তাই, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের নিত্য বাস্তব দুর্গাপূজার পূজারী করে তুলতে সৎসঙ্গীদের নিত্যপাঠ্য ‘সত্যানুসরণ’ নামক মহাগ্রন্থে নারীকে জগজ্জননী জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত করতে নিদেশ দিয়ে বললেন, ‘‘প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী । প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয় ।’’ এবং পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, ‘‘স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যে-জন, তাহার হয় না ভবের বন্ধন মোচন । …..স্ত্রী চিন্ময়ী মা।’’—এই শিক্ষার ধারাকে বাস্তবায়িত করার নাম প্রকৃত দুর্গাপূজা ।
শ্রীশ্রীঠাকুর শুধু পুরুষদেরই প্রতিনিয়ত দুর্গাপূজা করার বিধান দিয়েই ক্ষান্ত হননি, নারী-সাধারণের মধ্যেও দেবী দুর্গার এক স্থায়ী আসন পেতে দিতে অনুশ্রুতি গ্রন্থের ১ম খণ্ডের বাণীতে বললেন—
‘‘শার্দ্দুলেরে বাহন করে সাপের ফণার মালা পরে কালবোশেখী ঝঞ্ঝাবেগে ছোটরে নারী ছোটরে ছোট্ । দত্যিদানার নীচ বাহানা আর্য্যাবর্তে দিয়ে হানা ঘূর্ণিপাকের বেতাল গাঁথায় হুলিয়ে ভুলিয়ে দিচ্ছে চোট্ । দশ প্রহরণ দশ হাতে ধর বক্ষবিদরি ধ্বংসি ইতর সূর্য্যরাগী বজ্রতেজে আর্য্যনারী শত্রু টোট্ ।” (পুরুষ ও নারী/৮৩)
তিনি নারীকে অবলা নয়, সবলারূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন । নারীর সতীত্বই নারীকে সবলা করে তোলে। তাই তিনি কত আশা নিয়ে বললেন— ‘‘সতীর তেজে ঝলসে দে মা নিঠুর কঠোর অন্ধকারে মদনভস্ম বহ্নিরাগে বৃত্তি-রিপু দে ছারখারে । প্রণবতালে ইষ্টমন্ত্র ঝঙ্কারি তোল সকলতন্ত্রে বিষাণ হাঁকে রুদ্র দোলায় বজ্রে হানি মৃত্যুদ্বারে।’’ (পুরুষ ও নারী/৮৯)
তাই আসুন, পূজার নামে অনিত্য-বস্তুর প্রতিযোগিতায় না মেতে, সব দেবতার সমাহার-স্বরূপ যুগ-পুরুষোত্তমের বিধি মেনে, মা দুর্গার নিত্য-সিদ্ধ দেদীপ্যমান আদর্শের আলোকে, আমাদের ঘরের মেয়েরা যাতে রাষ্ট্রপূজার অর্ঘ্যস্বরূপ সুজননে সুসন্তানের উপহার সাজিয়ে, শক্তিরূপিণী-দশপ্রহরণধারিণী সাজে সজ্জিত হয়ে নরাসুরদের কিভাবে দমন করে অস্তিত্ব রক্ষার পূজার পূজারী হতে পারে,—সেই চেষ্টায় যত্নবান হই।
অসুরনাশিনী মা দুর্গার ন্যায় অসৎ-নিরোধী তৎপর হয়ে ওঠা যদি আমাদের কাম্য হয়, তাহলে সবার আগে ইষ্টপ্রাণতায় সমৃদ্ধ হতে হবে। তাহলে সব পূজার আগে আমাদের ইষ্টপূজায় সমৃদ্ধ হতে হবে। ইষ্টপূজায় সমৃদ্ধ হতে গেলে যা’ যা’ করতে হবে, বরং তা’ তা’ শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণী থেকে জেনে নেওয়া যাক।
।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের দৃষ্টিতে প্রকৃত ইষ্টপূজা ।। ইষ্টস্বার্থ ও প্রতিষ্ঠার অনুকূলে প্রবৃত্তি ও চাহিদাগুলিকে নিয়ন্ত্রিত ক’রে সৎ অর্থাৎ ইষ্টানুকূল জীবনবৃদ্ধিদ যা’-কিছু চিন্তাকে বাস্তবতায় পরিণত করবার প্রচেষ্টার সঙ্গে যথাযথ সেবা ও যাজনে পারিপার্শ্বিককে আকৃষ্ট ও উদ্বুদ্ধ ক’রে প্রতি প্রত্যেককে ইষ্টে অনুরক্ত ক’রে তোলাই হচ্ছে প্রকৃত ইষ্টপূজা। ২৪ (পথের কড়ি)
—————–
।। ইষ্টপূজার উপাচার ।।
সব দেবতার সমাহারে পুরুষোত্তমের সৃষ্টি।
সহজ মানুষ নর রূপে করেন ধৃতি বৃষ্টি।।
( অনুশ্রুতি প্রথম খন্ড )
আমাদের এই আধুনিক সভ্যতার সদস্য জ্ঞানী-গুণী-বুদ্ধিজীবিগণ জগৎ সম্পর্কে অনেককিছু জানলেও, মানব জীবনের উদ্দেশ্য ও গন্তব্য বিষয়ে সুস্পষ্ট কোন ধারণা দিতে পারেন নি। এ-বিষয়ে যুগ-পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, “জীবনের উদ্দেশ্য অভাবকে একদম তাড়িয়ে দেওয়া ……” —অভাবকে তাড়াতে হলে ভাবীর সাথে ভাব করতে হবে। আর সেই ভাবী হলেন সর্বজ্ঞত্ত্ববীজের আধার, পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। আর, “আমাদের গন্তব্য হলো ঈশ্বরপ্রাপ্তি—ঈশ্বরকে আপ্ত করতে হলে, ধারণ-পালন-সম্বেগসিদ্ধ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হওয়া প্রয়োজন….. তার উপায় হচ্ছে আচার্য্যে সক্রিয় অনুরতি।” সেই আচার্য্যের নাম যুগ-পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।
তাই, জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে হলে, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানব-জীবনকে পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে হলে বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের দীক্ষা বা আদর্শ জীবন–চলনার নিয়ম গ্রহণ করতেই হবে।
পুরুষোত্তমের দীক্ষা সবারই নিতে হয় কেন ?
শ্রীশ্রীঠাকুর—দীক্ষা সবারই নেওয়া প্রয়োজন এবং নানাজনের নানা জায়গায় দীক্ষা নেওয়া হয়তো আছে। হিন্দুদের কথা, মহাপুরুষ বা পুরুষোত্তম যখন আসেন, তখন তাঁকেই গ্রহণ করাই লাগে। তাঁকে গ্রহণ করলে সবগুলির পুরশ্চরণ হয়। আর, তাঁকে কেন্দ্র ক’রেই সব দীক্ষার integration (সংহতি) আসে। কেউ হয়তো তান্ত্রিক দীক্ষা নিয়েছে, কেউ হয়তো শৈব মতে দীক্ষা নিয়েছে। সেগুলির অনুষ্ঠান ক’রে বা না ক’রে যদি মহাপুরুষ বা পুরুষোত্তম-নির্দেশিত পন্থায় সাধন করে, ওতেই তাদের দীক্ষা সার্থক হবে। সাধু নাগ মহাশয় তো আগে দীক্ষা নিয়েছিলেন। কিন্ত রামকৃষ্ণদেবকে পেয়ে তাঁর কাছ থেকে দীক্ষা নিতে দ্বিধা করেননি। তাতে ওই (আগের) দীক্ষারই পুরশ্চরণ হয়েছিল। এইভাবে পুরুষোত্তমকে গ্রহণের রীতি যদি না থাকে, বিভিন্ন দীক্ষাপদ্ধতি ও তাতে দীক্ষিত লোকগুলো বিচ্ছিন্ন হ’য়ে থাকে। লোকসংহতি বলে জিনিষটা আসে না। ভাবগুলি integrated (সংহত) হয় না। নানা মত ও পদ্ধতির solution (সমাধান) হয় না। বিভিন্ন রকমগুলির solution (সমাধান) না হ’য়ে যে-দীক্ষাতেই মানুষ দীক্ষিত হোক না কেন, তাতে পরম solution (সমাধান) অর্থাৎ meaningful adjustment (সার্থক বিন্যাস) হয় না, নানা সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়। তাদের কেউ কাউকে দেখতে পারে না, বিরোধ থেকেই যায়, consolidation (দৃঢ়ীকরণ) হয় না।
আমাদের হিন্দুদের মধ্যে ধারণা আছে “সর্ব্বদেবময়ো গুরু”। গুরুর মধ্যে সমস্ত দেবতাকে দেখতে চাই আমরা। অর্থাৎ, তিনি তেমনি সর্ব্বপরিপূরক হওয়া চাই বাস্তবে। তা’ না হ’লে ব্যষ্টি ও সমষ্টির সর্বাঙ্গীণ বিকাশ সম্ভব নয়। তাঁর কাছে দীক্ষা first and foremost (প্রথম ও প্রধান)। আর, যা কিছুকে সঙ্গতিশীল অন্বয়ী তাৎপর্য্যের ভিতর দিয়ে সত্তাপোষণী ক’রে তোলাই হ’ল তপস্যা। তাকেই বলে শিক্ষা। (আলোচনা প্রসঙ্গে, খণ্ড ২২/৪. ৯. ১৯৫৩)
শ্রীশ্রীঠাকুরঃ সদ্গুরু বা পুরুষোত্তমকে পেয়েও যারা দীক্ষা না নেয় তারা কিন্তু ঠকে যায়। তিনি তো আর নিত্য আসেন না। পেয়েও ছেড়ে দেওয়া মানে মন, মায়া, কাল ও প্রবৃত্তির ঘানিতে আরো শত সহস্রবার ঘোরা। (আ. প্র. ৩/১৩৫)
যাঁরা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৎমন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছেন, তাঁরা অবশ্যই জানেন,— শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শ-নির্দিষ্ট দীক্ষাপদ্ধতিতে প্রথমে আচমন করে সংবেদনী পাঠ করতে হয়। তারপর আসন করে বসা শিখতে হয়। তারপর প্রণাম মন্ত্র পাঠান্তর আজ্ঞাচক্রে ধ্যান করা শিখতে হয়। যে ধ্যানকে ঊষানিশায় কমপক্ষে আধঘণ্টা থেকে ৪৫ মিনিট সাধন করতে হয়। ধ্যানান্তে পুনরায় প্রণাম মন্ত্র পাঠপূর্বক *স্বতঃ-অনুজ্ঞা পাঠ করিয়ে চরিত্রায়িত করার শিক্ষা দেওয়া হয়। যথা—
আমি অক্রোধী
আমি অমানী
আমি নিরলস
কাম-লোভজিৎ-বশী
আমি ইষ্টপ্ৰাণ
সেবাপটু
অস্তি-বৃদ্ধি-যাজন-জৈত্র
পরমানন্দ
উদ্দীপ্ত শক্তি-সংবৃদ্ধ
তোমারই সন্তান
প্রেমপুষ্ট, চির-চেতন,
অজর, অমর
আমায় গ্রহণ কর,
প্ৰণাম লও।
* স্বতঃ–অনুজ্ঞা (auto-suggestion) —নিজেই নিজেকে আদেশ ক‘রে অন্তস্থঃ চৈতন্যের জাগরণ ঘটানোর বা আত্ম–সমবর্দ্ধনার অনুশীলন। যা প্রতিবার ধ্যানান্তে করতে হয়।
তারপর শবাসন ধ্যান শিখিয়ে দিনে ৩-৪ বার অভ্যাস করতে বলা হয়। তারপর থানকুনি পাতা খাওয়ার উপদেশ দেওয়া হয়। তারপর সংকল্প পাঠ করতে হয়। তারপর দক্ষিণা বাক্য পাঠ করতে হয়। তারপর জপ ও সিদ্ধি বিষয়ে উপদেশ নিয়ে ধ্যানের পদ্ধতির উপদেশ নিতে হয়। সবশেষে ইষ্টভৃতির উপদেশ প্রদান করা হয়।
* * *
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের আবশ্যিক পালনীয় প্রাথমিক বিষয়সমূহ—অভক্ষ্যভোজী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুনাদি তামসিক আহার করা যাবে না। যারা করেন, আর্য্য হিন্দুমতে তাদের অভক্ষ্যভোজী বলা হয়েছে। অগম্যাগামী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ যারা প্রতিলোম, সগোত্র এবং সপিণ্ড সম্বন্ধীয়দের সাথে অবিধি পূর্বক ধর্মবিরুদ্ধ বিবাহের মাধ্যমে কামাচার করে, হিন্দুমতে তাদের অগম্যাগামী বলা হয়েছে। এরা কদাচারী, এদের প্রদত্ত আহার ও পানীয় অশুদ্ধ। (দ্রঃ সম্বিতী)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের শিষ্যদের প্রাথমিকভাবে আবশ্যিক পালনীয় বিধিসমূহ— ঊষানিশায় মন্ত্রসাধন করা। সকালে ও সন্ধ্যায় আহ্বানীসহ সন্ধ্যা ও প্রার্থনা করা। ইষ্টভৃতি (ইষ্টনীতির ভরণ) করা। পরিশ্রান্ত হলে শ্রান্তি কাটাতে কমপক্ষে ৩ বার ৫-৭ মিনিট শবাসন নিত্য-সাধন করা। বর্ণধর্মানুযায়ী সদাচারী হতে হবে। বর্ণাশ্রম মেনে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে। আপদ্ধর্ম ব্যতীত অন্য বর্ণের বৃত্তিহরণ করা চলবে না। ‘পঞ্চবর্হিঃ’ এবং ‘সপ্তার্চ্চিঃ’-র বিধান মেনে চলতেই হবে, যদি আদর্শ মানুষ হতে হয়। ওইসব বিধানসমূহকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার নাম দীক্ষা গ্রহণ করা।
যাঁরা এস. পি. আর., পি. আর. উপাধির বলে দীক্ষা সঞ্চারণা করেন, তাঁরা যজমানদের দিয়ে ‘‘এই দীক্ষা গ্রহণ করিয়া আমি সর্বান্তকরণে শপথ করিতেছি যে—মানুষের জীবন ও বৃদ্ধির পরম উদ্ধাতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রকে প্রতিষ্ঠা করাই এইক্ষণ হইতেই আমার জীবনের যজ্ঞ হউক। ……’’ ইত্যাদি উচ্চারণ করিয়ে সংকল্প-শপথ গ্রহণ করান। এবং দীক্ষাপত্রের ২টি স্তবকে স্বাক্ষর করিয়ে নেন। এর উদ্দেশ্য যজমান যা’তে শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ মেনে চলেন তারজন্য একেবারে পাকাপোক্ত ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থাপত্র স্বয়ং শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত। দীক্ষাদাতার কর্তব্য, দীক্ষা গ্রহিতাকে শ্রীশ্রীঠাকুরের উপরোক্ত আদর্শের বিষয়ে সম্যকভাবে অবগত করিয়ে দীক্ষা দান করা। তা’ না করিয়ে দীক্ষাদাতা যদি তড়িঘড়ি করে যেনতেন প্রকারেণ মন্ত্র দিয়ে, সই-সাবুদ করিয়ে নেয়, তাহলেই মুশকিল। কপটাচার এবং দ্বন্দ্বীবৃত্তি দোষে দুষ্ট হতে হবে। অনেকক্ষেত্রে সেই প্রবহমানতা চলছে। যারফলে বেশিরভাগ দীক্ষিতগণ মনে করেন, সকালবেলা উঠে ঠাকুরের নামে কিছু টাকা-পয়সা নিবেদন করে, শুক্রবার নিরামিষ খেলেই শ্রীশ্রীঠাকুরের শিষ্য হওয়া যায়। অথচ, সত্যানুসরণ গ্রন্থের প্রথমেই তিনি এ বিষয়ে সাবধান বাণী দিয়ে রেখেছেন। “অর্থ, মান, যশ ইত্যাদি পাওয়ার আশায় আমাকে ঠাকুর সাজিয়ে ভক্ত হ’য়ো না, সাবধান হও—ঠকবে ; তোমার ঠাকুরত্ব না জাগলে কেহ তোমার কেন্দ্রও নয়, ঠাকুরও নয়–ফাঁকি দিলেই পেতে হবে তা’।” অর্থাৎ, আমার মধ্যে যদি তাঁর আদর্শের প্রকাশ না পায়, আচার-আচরণের মধ্যে ঠাকুরত্বকে না জাগাতে পারি, তাহলে তিনি আমার ঠাকুর নন, তিনি আমার কেন্দ্রও নন। সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছেন। সেই হিসেবে বিচার করে দেখলে দেখা যাবে, তাঁর আদর্শ মেনে চলেন যাঁরা, যজনসিদ্ধ যাঁরা, একমাত্র তাঁদেরই অধিকার রয়েছে, যাজন করার, প্রচার করার। অথচ, আমরা এসব মূল বিষয়টিকে অনেক সময় উপেক্ষা করে, নিত্য সাধন-পদ্ধতির নামধ্যান, শবাসন, সদাচার, বর্ণাশ্রম, ঠাকুরের বলা অনুযায়ী পরিচ্ছদ, ইত্যাদিতে ছাড় দিয়ে, নিয়মের শিথিল করে অধিবেশন করে চলেছি, পূজা করে চলেছি। এ বিষয়ে সকলকে সচেতন হতে হবে, নচেৎ দ্বন্দ্বীবৃত্তি দোষে দুষ্ট হতে হবে।
পবিত্র সদদীক্ষা সঞ্চারণা-কালে ইষ্ট প্রতিষ্ঠার সপক্ষে যে শপথবাক্য পাঠ করানো হয়, সেই শপথের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শ প্রতিষ্ঠা বা ইষ্ট-প্রতিষ্ঠাই দীক্ষিত-জীবনের একমাত্র *যজ্ঞ। যজ্ঞ শব্দের অর্থ লোকসম্বর্দ্ধনী অনুচর্য্যা—ব্যক্তি, দম্পতি, গৃহ, সমাজ ও রাষ্ট্রের লোকসম্বর্দ্ধনী অনুচর্য্যা। ওই ইষ্টপ্রতিষ্ঠা নামক যজ্ঞের বা লোকসম্বর্দ্ধনী অনুচর্য্যার প্রাথমিক ধাপ, ব্যক্তিগত জীবনে ইষ্টনীতির পরিপালন করে নিজের চলন-বলন, খাওয়া-দাওয়া, জৈবিক তাগিদের কাজকর্মগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা। যাকে আমরা যজন বলতে পারি।
——————————————————————————————
*শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র যজ্ঞ প্রসঙ্গে বলেছেন—
যজ্ঞ মানে বুঝলি কি তুই?
আদরে-সেবায়-যত্নে পালা
আর্য্য ছেলের নিত্য নীতি—
পঞ্চযজ্ঞে জীবন ঢালা,
ব্রহ্মযজ্ঞ, দেবযজ্ঞ
নৃযজ্ঞ আর পিতৃযজ্ঞ,
ভূতযজ্ঞে পরিস্থিতির
সেবাবর্দ্ধন করে প্রজ্ঞ। ৭০ ।
(অনুশ্রুতি, ১ম খণ্ড/সাধনা)
এবং আলোচনা প্রসঙ্গে বিস্তারিতভাবে বললেন—
শ্রীশ্রীঠাকুর— প্রথম হ’লো ঋষিযজ্ঞ বা ব্রহ্মযজ্ঞ। ঋষিরাই হলেন জ্ঞানবিজ্ঞানের উৎস। তাঁরা যে জ্ঞান দিয়ে গেছেন, তা’ আয়ত্ত করতে হবে এবং অন্যকেও তা’ আয়ত্ত করাতে হবে। একে বলে অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা। আর, জীয়ন্ত ঋষি যিনি, সঙ্গ ও সেবায় তাঁকে তুষ্ট-পুষ্ট ক’রে জ্ঞান আহরণ করতে হবে। এ সবই ঋষিযজ্ঞের মধ্যে পড়ে। তোমরা যে যজন-যাজন কর তা’ও প্রকারান্তরে ব্রহ্মযজ্ঞ। ব্রহ্মযজ্ঞ মানে, যার ভিতর-দিয়ে মানুষ বৃদ্ধি পায়। জ্ঞানের অনুশীলনের ভিতর-দিয়েই মানুষ বৃদ্ধি পায়। যে লোক সংসারে ঢুকে কেবল উদর-চিন্তা নিয়ে থাকে, জ্ঞান-আহরণের চেষ্টা করে না, তার উন্নতি খতম হ’য়ে যায়।
তারপর দেবযজ্ঞ। দেবতা মানে, যাঁরা নিজেদের চরিত্র, গুণপনা, ঐশীবিকাশ ও ভাবৈশ্বর্য্যের ভিতর-দিয়ে লোকসমক্ষে দেদীপ্যমান হ’য়ে আছেন। দেবযজ্ঞ মানে, ঐ দেবতাদের অনুধ্যান ক’রে তাঁদের ভাব নিজের ভিতর সম্বর্দ্ধিত ক’রে তোলা এবং বাস্তব উৎসর্গে তাঁদেরও পরিতুষ্ট করা। শাস্ত্রে আছে, “সর্ব্বদেবময়ো গুরুঃ”—অর্থাৎ সদগুরুর মধ্যে সমস্ত দেবতারই অধিষ্ঠান আছে। তাই ইষ্টচিন্তা, ইষ্টের ইচ্ছানুযায়ী নিজেকে নিয়ন্ত্রিত করা, ইষ্টকে বাস্তব নিবেদন ইত্যাদি দেবযজ্ঞের মধ্যে পড়ে।
আবার আছে পিতৃযজ্ঞ। পিতৃপুরুষের দৌলতেই আমরা দুনিয়ার মুখ দেখি ও দুনিয়ায় ক’রে খাই। তাঁদের দয়া ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। তাঁদের দেওয়া রক্ত ও গুণপনার জোরেই আমরা চলি। তাই তাঁদের তৃপ্তি যা’তে হয়, তা’ আমাদের অবশ্যকরণীয়। পিতামাতা বেঁচে থাকলে জীবন্ত গৃহদেবতা বোধে নিত্য তাঁদের সর্ব্বপ্রকারে সেবা করা উচিত। নয়তো নিত্য তর্পণ করার বিধি আছে। এতে পিতৃপুরুষের স্মরণ-মননের ভিতর-দিয়ে তাঁদের গুণগুলি আমাদের ভিতর সঞ্জীবিত থাকে। একটা আত্মপ্রসাদও লাভ করা যায়।………….
………….আর আছে নৃযজ্ঞ ও ভূতযজ্ঞ। অতিথি-সৎকার ও দুঃস্থ পরিবেশের বাস্তব সেবা-সাহায্যকে বলা যায় নৃযজ্ঞ। পরিবেশকে বাদ দিয়ে আমরা বাঁচতে পারি না, তাই তাদের সর্ব্বপ্রকার সেবা আমাদের করতে হবে। গৃহীর কর্তব্য হ’লো আগে অতিথিকে খাইয়ে তারপর সে খাবে। অতিথিকে নারায়নজ্ঞানে সেবা করার রীতি আছে আমাদের দেশে। কথা হ’চ্ছে, আমার দ্বারস্থ হ’য়ে কেউ যেন অভুক্ত না থাকে, বিমুখ না হয়, আমি ঘর বেঁধেছি সবার সেবার জন্য। ভূতযজ্ঞ বলতে ইতর জীবজন্তু থেকে আরম্ভ ক’রে গাছপালার পর্য্যন্ত সেবা করা বুঝায়। একটা গরুকে দেখছ জল না খেয়ে কষ্ট পাচ্ছে, তুমি কলের থেকে এক বালতি জল তুলে তাকে খেতে দিলে, সেটাও ভূতযজ্ঞের মধ্যে পড়বে। সাধারণতঃ নিজ আহার্য্যের অগ্রভাগ সশ্রদ্ধভাবে তাদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করার রীতি আছে। আদত কথা হ’লো, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবার সঙ্গে নিজের যোগসূত্রটা বোধ করতে অভ্যস্ত হওয়া। এগুলি যদি ভাবায় থাকে, করায় না থাকে, তাহ’লে হবে না। (আলোচনা-প্রসঙ্গে, ৩য় খণ্ড, ইং ৮-৬-১৯৪২)
উপরোক্ত আর্য্যকৃষ্টির মহান বিধানসমূহকে ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের আদর্শের মাধ্যমে নবীকরণ করে পঞ্চ-মহাযজ্ঞের যুগপোযোগী বাস্তবায়ন করলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত ইষ্টভৃতি নিবেদন-মন্ত্র ‘‘ইষ্টভৃতির্ম্ময়াদেব কৃতাপ্রীত্যৈ তব প্রভো, ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ।।’’—উচ্চারণ করার সাথে সাথে বৃহত্তর পারিপার্শ্বিকের জীবনবৃদ্ধির দায়ভারের শপথ নিতে হয় আমাদের। সব অবস্থাতে বাস্তব কর্মে বৃহত্তর পরিবেশের জৈব এবং অজৈব সবকিছুকে পালন-পোষণে সমৃদ্ধ করে রাখার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সার্থক হয় ইষ্টভৃতি পালন। ইষ্টাদর্শের পঞ্চবর্হিঃ ও সপ্তার্চ্চি-র বিধি মেনে শারিরীক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক সদাচার পালনে, ইষ্টপ্রোক্ত বিধি অনুসরণ করে বিবাহ ও সুপ্রজনন নীতি পালনে অভ্যস্ত না হতে পারলে—‘আমি ইষ্টভৃতি করি’ এই কথা বলা বোধহয় সমীচীন হবে না। ইষ্টভৃতি করা মানে, বাস্তবে ইষ্টনীতি মেনে চলা, ইষ্টনীতির ভরণ করা।
* * *
শ্রীশ্রীঠাকুরের নিদেশ অনুযায়ী, সৎমন্ত্রে দীক্ষিতদের ব্যক্তিগত জীবনে যজনশীল থাকার জন্য ঊষা-নিশায় নিয়মিত কমপক্ষে ৪৫ মিনিট করে মন্ত্রসাধন করতে হয়। ৫ থেকে ৭ মিনিট করে কমপক্ষে তিনবার শবধ্যান করতে হয়। প্রাতঃকালিন ধ্যান, ইষ্টভৃতি, আর্য্যসন্ধ্যা ও প্রার্থনাদির অনুশাসন অনুশীলন করার পর পরিবারের বড়দের প্রণাম এবং ছোটদের প্রীতি-সম্ভাষন করতে হয়। তারপর ইক্ষুগুড়সহ থানকুনি পাতা সেবন করতে হয়।
শ্রীশ্রীঠাকুরের বলা অনুযায়ী তিথি, ঋতু, সুস্থতা, অসুস্থতা, ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের জন্য নিদেশিত আহারবিধি মেনে সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার গ্রহণ করতে হয়। এতদ্ব্যতীত প্রার্থনা মন্ত্রে প্রদত্ত পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চির অনুশাসন মেনে সদাচার এবং বর্ণাশ্রম ধর্ম পালন করা আমাদের জীবনবৃদ্ধির জন্য নিত্য করণীয় কর্ম। এইসব ইষ্টবিধির নিত্য নিয়মিত অনুশীলন করার মাধ্যমে যজনশীল হতে হয়। যজনশীলতার মুখ্য বিষয়, বর্ণধর্ম পালন, দ্বন্দ্বীবৃত্তি ও প্রতিলোম আচরণ ত্যাগ করা। সবর্ণ অনুলোম বিবাহের নীতি পালন করা। কারো বৃত্তিহরণ না করে, সেবা-কর্ম মাধ্যমে অর্জিত দিন গুজরানি আয়ের অগ্রভাগ ইষ্টের উদ্দেশ্যে নিবেদন করার শপথ পালনের নাম ইষ্টভৃতি বা ইষ্টনীতির ভরণ করা। জীবনকে সম্বর্দ্ধিত করার জন্য এর অতিরিক্ত আর কোন প্রচলিত পূজার প্রয়োজন থাকতে পারে কি?
* * *
শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের জন্য দৈনন্দিন জীবনে সহজ সাধনার একটা অনুশীলন করতে নিদেশ দিলেন অনুশ্রুতি গ্রন্থের নিম্নোক্ত বাণী মাধ্যমে।
‘‘ঊষার রাগে উঠবি জেগে
শৌচে শীতল হ’বি,
সন্ধ্যা–আহ্নিক জপ-সাধনায়
ঈশের আশিস্ ল’বি;
কুতূহলে পড়শি ঘুরে
দেখবি সযতনে,
আছে কেমন কোথায় কে জন
মন দিবি রক্ষণে;
তারপরেতে বাড়ী এসে
শৌচে যথাযথ,
গৃহস্হালীর উন্নয়নী
অর্জ্জনে হ’ রত;
স্নানটি সেরে আহ্নিক ক’রে
ক্ষুধামতন খাবি,
একটু চ’লে বিশ্রাম নিয়ে
আগুয়ানে ধাবি;
এমনি তালে সচল চালে
চলে সন্ধ্যা এলে,
শৌচে শুদ্ধ হ’য়ে করিস
আহ্নিক হৃদয় ঢেলে;
উন্নয়নের আমন্ত্রণী
গল্প-গুজব শীলে,
হৃষ্টমনে আলোচনায়
কাটাস্ সবাই মিলে;
পড়শীদিগের অভাব-নালিশ
থাকেই যদি কিছু,
তা’র সমাধান যেমন পারিস্
করিস্ লেগে পিছু;
করন-চলন ধরন-ধারণ
যজন-যাজন কিবা
সকল কাজেই ইষ্টস্বার্থে
চলিস্ রাত্রি-দিবা;
আদর-সোহাগ উদ্দীপনী
কথায় কাজে ঝুঁকে,
স্বার্থ-কেন্দ্র সবার হ’বি
ধরবি ইষ্টমুখে;
বিশ্রামেরই সময় গা’টি
ঘুমল হ’য়ে এলে,
ইষ্ট-চলন মনন নিয়ে
ঘুমে গা’ দিস্ ঢেলে।’’
(অনুশ্রুতি/১ম/স্বাস্থ্য ও সদাচার/৬৯)
জীবনকে সম্বর্দ্ধিত করার জন্য এর অতিরিক্ত আর কোন প্রচলিত পূজার প্রয়োজন থাকতে পারে কি?
* * *
“Be concentric.”
আমাদের আদর্শ–পুরুষ পুরুষোত্তমশ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র একজন বিদেশী ভক্তকে জীবন–চলনার সহজসাধন পদ্ধতি বোঝাতে ‘Be concentric’ বলে উপদেশ দিয়েছিলেন। আমার তো মনে হয় ওই উপদেশ আমাদের সকলের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। আর সুকেন্দ্রিক তৎপর থাকতে হলে সাধন–ভজনের মাধ্যমে ইষ্টাদর্শের সাথে অবিচ্ছিন্নভাবে যোগযুক্ত থাকতে হবে। বিশাল কঠিন ব্যাপার! যাইহোক, এ প্রসঙ্গে বিস্তারিতভাবে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন।—
শ্রীশ্রীঠাকুর—‘‘মানুষ যদি কোন-কিছু অবলম্বন না ক’রে একাগ্র হ’তে চেষ্টা করে, complex (প্রবৃত্তি)-গুলি dormant, dull ও indolent (সুপ্ত, ভোঁতা ও অলস) হ’য়ে যায়। কিন্তু মানুষ যদি সুকেন্দ্রিক হয়, তাতে সেগুলি roused, active ও meaningful (জাগ্রত, সক্রিয় ও সার্থক) হয়, individuality grow করে (ব্যক্তিত্ব গজায়)। আমাদের শরীরে যতগুলি cell (কোষ) আছে, সেগুলি concentric (সুকেন্দ্রিক) না হ’লে ছিটিয়ে যেত, impuls (সাড়া) carry (বহন) ক’রতে পারত না, বিচ্ছিন্ন হ’য়ে থাকত। concentric (সুকেন্দ্রিক) হওয়াই হ’লো উন্নতিলাভের পরম পথ। …… Earth (পৃথিবী)-টা যদি sun- এ (সূর্য্যে) concentric (সুকেন্দ্রিক) না হ’তো তাহ’লে তা ভেঙে গুঁড়ো-গুঁড়ো হ’য়ে যেত। গ্রহগুলি যদি কোথাও নিবদ্ধ না থাকতো, তবে অস্তিত্ব বজায় রেখে চলতে পারত না। আমাদের প্রত্যেকের ভিতরেই একটা যোগাবেগ আছে। ভালবাসা ও টান জিনিসটা দেওয়াই আছে। বীজ ও ডিম্বকোষের মধ্যে টান না থাকলে conception (গর্ভসঞ্চার) হয় না, ব্যক্তিই বেরোয় না। ঐ টানকে রক্ষা করার জন্য সুকেন্দ্রিক হওয়া লাগে। সেজন্য বামুন, ক্ষত্রিয়, বৈশ্যের ছোট বয়সেই দীক্ষা নিতে হ’তো। দীক্ষা এসেছে দক্ষ কথা হ’তে। দীক্ষা মানে তাই যা’ আমাদের দক্ষ ক’রে তোলে। ….. ধর্ম ও বিজ্ঞান পরস্পর জড়িত। ধর্মে যদি বিজ্ঞান না থাকে, তবে তা’ অন্ধ। আবার বিজ্ঞানে যদি ধর্ম না থাকে, তবে তা খোঁড়া।’’ (আলোচনা প্রসঙ্গে ১৪ই অগ্রহায়ণ, ১৩৬০, সোমবার।)
ওই সুকেন্দ্রিক থাকার জন্য তিনি আমাদের নাম, ধ্যান, ভজন, সদাচার, লীলাস্মরণ ইত্যাদি বিধির মাধ্যমে এক সহজ সাধন পদ্ধতি দিয়েছেন।
অমিয়বাণী গ্রন্থের প্রণেতা বরেণ্য শ্রীযুক্ত অশ্বিনী কুমার বিশ্বাস মহোদয় পরমদয়ালের কাছে প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছিলেন—নানারকম সাধনপদ্ধতি জগতে আছে, কি-রকম সাধনকে পূর্ণাঙ্গ সাধন বলা যেতে পারে।
শ্রীশ্রীঠাকুর—শব্দ-সাধন যাঁরা জানেন না, তাঁদের সাধন পূর্ণাঙ্গ সাধন নয়।
আমি (অশ্বিনী বিশ্বাস)—ঠিক বুঝলাম না। এমন সাধক আছেন যাঁরা জ্যোতির সাধন করেন, কিন্তু শব্দ-সাধন বা নাদ-সাধনের বিষয়ও জ্ঞাত আছেন। শ্রীরামকৃষ্ণপন্থীরা কি সাধন করেন জানি না, তবে নাদ-সাধন-সম্বন্ধে শ্রীরামকৃষ্ণ স্বয়ং বলেছেন, “নাদ-ভেদ না হলে সমাধি হয় না।” বিবেকানন্দও অনাহত নাদের অনুভূতির কথা বলেছেন।
শ্রীশ্রীঠাকুর—জ্যোতিঃ নাদের বা শব্দের শরীর। জ্যোতির চেয়েও নাদ সূক্ষ্মতর। যারা নাদ-সাধনের যে পরিমাণ জানে, তাদের সাধন-পদ্ধতি সেই পরিমাণে উন্নত বলা যায়। নাদ-সাধনের প্রকৃষ্ট পন্থাযুক্ত সাধনই প্রকৃত পূর্ণাঙ্গ সাধন। এই সাধনে সব সাধনের সারভাগ গৃহীত, কিন্তু বহিরঙ্গ-ভাব বর্ত্তমান যুগে অনাবশ্যক ব’লে বাহ্যভাবগুলো অনেকাংশে পরিত্যক্ত। বর্ত্তমানে ঐ সব বহিরঙ্গ ভাবসাধনে অযথা কালক্ষেপের আবশ্যকও নেই, অবসরও নেই। বাহ্যাড়ম্বর কম ব’লে পূর্ণ সত্যটিকে যত সোজাসুজিভাবে নেওয়া সম্ভব, তা’ এই শব্দযোগে নেওয়া হয়েছে। ইহাই বর্ত্তমানের যুগধর্ম্ম বা পূর্ণাঙ্গ সাধন। (সূত্র : অমিয়-বাণী, শ্রীঅশ্বিনী কুমার বিশ্বাস।)
।। পূর্ণাঙ্গ সাধন করা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুরের নিদেশ ।।
“ভোরে সন্ধ্যার mood আসে, তখন সন্ধ্যা করতে হয়—সে একটা জাগরণের ভাব। আবার সূর্য যখন ডোবে, তখনও সন্ধ্যার mood আসে, তখনও সন্ধ্যা করতে হয়। দুপুরের সময়ও, বিশেষতঃ গরমের সময় সন্ধ্যার mood আসে। তখনও সন্ধ্যার সময়। দিনের সব কাজ এমনভাবে করা লাগে—যাতে সন্ধ্যায় যেই সূর্য ডুবছে, তখন আপনিই তার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত কাজ যেন নিভে আসে, আর তখন সন্ধ্যায় বসতে হয়। সন্ধ্যা করে তারপর সৎসঙ্গে যেতে হয়। এ করলে আর কিছু হোক আর না হোক, অন্ততঃ শরীরের স্বাস্থ্য আর কিছুতেই খারাপ হতে পারে না— আজীবন।” (ঋত্বিগাচার্য্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যের দিনপঞ্জী, ১ম খণ্ড থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী।)
।। পুণ্যপুঁথি গ্রন্থ থেকে নামধ্যান সাধনার সহজ পদ্ধতি প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুরঅনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী ।।
ধ্যান করবি সকল সময়। চলতে বসতে খেতে শুতে সকল সময়। একটু অভ্যাস করলেই হয়, বেশী কঠিন কিছু নয়। আর মনে অনবরত নাম, এমনকি কথা বলতে পর্য্যন্ত মনের মধ্যে নাম হচ্ছে, এই রকম করতে করতে স্বারূপ্য লাভ হয়। ৯। ২৪
দ্যাখ, নিঝুম হ’য়ে নাম কর, ডুবে নাম কর, বেশ তালে তালে নাম কর আর মনের চোখটি ঠিক জায়গায় রাখ। নীলদাঁড়া সোজা ক’রে হাত দুটি ঘুরিয়ে মাজার উপর রাখ। কাজের সময় কাকেও কাছে রাখবি নে, একা। এমন ক’রে বসবি, যাতে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ না ঝুলে পড়ে, না গ’লে পড়ে। একটা ঘুমের অবস্থা আসবে, সেটা করিস নে। অন্য রকম স্মৃতি কিছু আসতে দিস না, আসলেও তাড়িয়ে দিবি। তিন বেলা প্রত্যেকবার এক ঘন্টা থেকে দেড়ঘন্টা। ৩৫। ৭
কর্ম না করলে ধ্যান হয় না। আসলে ধ্যানে অধিকারী হয় না। যে যত কর্মী সে তত ধ্যানী। ঘুম বেশী করতে নেই। ঘুম বেশীতে লয় এনে দেয়। মাঝামাঝি থাকবি। ৪৫। ৫
দ্যাখ, যেমন তেমন করে নাম কর্তে পাল্লেই আয়ু বৃদ্ধি হয়। নামের সঙ্গে সঙ্গে আয়ু বল সব বেড়ে পড়ে। নামে মুক্তি।
অনবরত নাম করবি আর চলতে ফিরতে সব সময় নাসামুলে দৃষ্টি রাখবি। দ্যাখ, যে আপন গুরুকে ঐ জায়গায় জাগিয়ে নিতে পারে, তার সব হবে। ২০। ২৪
তাঁকে ধ্যান করবি চব্বিশ ঘণ্টা। সব দেখবি—সব সেই। তা’কেই কয় সন্ধ্যারে বন্ধ্যা করা। ৩। ১৯
ঐ নামটি ও ধ্যানটি যদি চব্বিশ ঘণ্টা করতে পারিস,—এমন-কি অন্যের সাথে কথা কইতেও ধ্যানটি হওয়া দরকার। সন্ধ্যায় শব্দ শোনা যায়। সন্ধ্যাটা দিন যায় রাত আসে—ভোরেও। তাই দুই সময়ই প্রকৃত কাজের সময়। দুই সময়ই ভাল। ২৬। ৬১ (সূত্র : ভাববাণী পুণ্য-পুঁথি মহাগ্রন্থ।)
।। নিত্য–সাধনার জন্য তপো–বিধায়না গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী ।।
*”প্রার্থনা বা তপঃ-উপাসনার পক্ষে
ঊষা বা ব্রাহ্মমুহূর্ত্ত,
মধ্যাহ্ন ও সায়ংকাল—
এই তিনই শ্রেষ্ঠ,
তা’র ভিতর আবার
ব্রাহ্মমুহূর্ত্তই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ;
মানসিক জপ সর্ব্বকালেই শ্রেয়;
আবার, প্রসন্ন, নির্দ্বন্দ্ব,
হৃদ্য-প্রীতি-প্রবুদ্ধ-যাজন
যা’ চিন্তন ও কথনের ভিতর-দিয়ে
উভয়কেই উদ্যোগী-উৎফুল্ল ক’রে তোলে,—
তা’ কিন্তু সর্ব্বকালেই শ্রেষ্ঠ।” ৯৩।
——————————————————————
*উপরোক্ত অনুশাসনসমূহ অনুশীলন করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে পূজা। পূজা শব্দের অর্থ—সম্মাননা, সংবর্দ্ধনা, গুরুত্ব আরোপ করা। যাঁকে পূজা করছি, তাঁকে আমার ভিতরে সম্বর্দ্ধিত করে তোলাই প্রকৃত পূজা, অর্থাৎ তাঁর গুণাবলী আমার মধ্যে বাড়িয়ে তোলা।
“পূজার উপকরণ ও অর্ঘ্য হলো যোগ্যতা। যোগ্যতার পূজা-অর্ঘ্যে পরিবার, পরিবেশ-সহ বেঁচে থাক।” (সূত্রঃ শব্দরত্নকোষ/সৎসঙ্গ পাব্লিশিং)
১৯২৩ সালের মে মাস। কথাপ্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলিতেছেন—
“নামের উপর খুব stress দিতে হয়। তাহলে intellect at will কোথাও apply করা যায় আবার ছাড়াও যায় সহজে। আমি কখনও কিছু ছাড়িনি, ছাড়ার কথা কখনও আমার মনেই হয় নি। যখন যেটাতে মন লাগত তখন সেটাই করতাম। অন্য কাজে মন লাগলে করতাম। আর আমি কখনো বসে আসন করে নাম করিনি, দৌড়িয়ে বেড়াতুম, কখন হয়ত বসে পড়তাম, কিন্তু বুদ্ধি করে নয়। তাই বলে আপনারা যেন মনে না করেন বসার দরকার নেই। Regularly বসা (at least সকাল ও সন্ধ্যায়) খুবই দরকার। সকালে ও সন্ধ্যায় চাদরে শরীর ঢেকে (বাহিরের influence না আসার জন্য) দুবার অন্ততঃ বসা উচিত। তা ছাড়া ২ মিনিট ১০ মিনিট যখনই পারা যায় বসা দরকার। কিন্তু সকাল সন্ধ্যায় যেন আজীবন বসা থাকে। পথে ঘাটেও একখানা বড় রুমাল বা চাদর সঙ্গে রাখা ভাল। যখন সময় হবে তখনই বসা দরকার, মুসলমানদের নমাজ পড়ার মত। নতুন বিয়ের পর বৌয়ের কথা যেমন সর্বদা মনে থাকে, কত রাত্রি জাগরণে কেটে যায় কিন্তু কয়েক বৎসরের মধ্যেই এ-পাশ ফিরে ও-পাশ ফিরে শুয়ে থাকে, তেমন পুরাতন হতে দিতে নেই। আমার কাছে ত নাম কখন পুরাতন হয়নি—সব সময়েই নতুন মনে হয় ।
Succession of events যেখানে বেশী সেখানে সময় যেন তাড়াতাড়ি চলে, যেমন সুখের সময় তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়। আবার succession যেখানে কম, সেখানে সময় যেন ফুরোতে চায় না। ধ্যানের সময় প্রথম প্রথম মনে হয় এক ঘণ্টা হয়ে গেছে। উঠে ঘড়ি খুলে দেখা গেল মোট ১০ মিনিট হয়েছে। আবার attachment হলে ধ্যানে এক ঘণ্টা হয়ে গেলে, মনে হয় যেন মাত্র ১০ মিনিট হ’ল। তাহলে time এর perception শুধু succession of events এর ওপর নির্ভর করে না, আমাদের মনের attachment বা concentration এর উপর নির্ভর করে, অর্থাৎ মন যদি একটা idea তে attached হয় এবং তাতে যদি তার full concentration থাকে সেখানে মুহূর্তকালই অনন্তকালে পর্যবসিত হতে পারে। আর concentration না থাকলে মুহূর্তকাল অনেক সময় বলে বোধ হয়। unattached এর পক্ষে ধ্যানের সময় যেন কাটেই না। Attachment একে থাকলে beyond time যাওয়া যায়, attachment বহুতে হলেই time এর মধ্যে এসে পড়ে। ছেলেদের time খুব তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়, activity খুব বেশি, কারণ succession of ideas খুব বেশি। যত বড় হয় তত যেন মনের ভিতর ফাঁক বেড়ে যেতে থাকে।” (ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনী গ্রন্থের ২য় খণ্ড, পৃঃ ৩৫-৩৬)
।।আমাদের আচার্য্যশ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আচরণ–দ্বারা যে সাধন–ভজন করতেন ।।
সব কাজের মধ্য দিয়ে সর্ব্বদা নাম চালাবার বুদ্ধি ছিল আমার। তাছাড়া যখনই ফাঁক পেতাম, নামধ্যান ও ভজন করতাম। কোন সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই হয়তো ধ্যানে ডুবে যেতাম। আর ঊষা-নিশায় তো করতামই। ধূঁ-ধূঁ হয়ে যেতাম। নাম করতে করতে চলেছি, হয়ত বেতবনের মধ্যে ঢুকে গেলাম। নাক বরাবর যেতে যেতে হয়তো পটলক্ষেতেই উপস্থিত হলাম। বাইরের দিকে খেয়ালই থাকত না। নামের নেশা পেয়ে বসে থাকত। (আ. প্র. ১৬/ ৫. ৪. ১৯৪৯)
।। নামধ্যানের তত্ত্ব প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর– নামই হ’ল বিশ্বচরাচরের প্রতিটি সত্তার মূল ভিত্তি। তাই, নামকে জানলে আত্মতত্ত্ব জানা যায়। নামকে জানতে গেলে নামীর শরণাপন্ন হ’তে হয়। নামী মানে যিনি নামস্বরূপ অর্থাৎ নামের মূর্ত্ত বিগ্ৰহ। তিনি হ’লেন দয়ীপুরুষ। জীবের প্রতি করুণাবশে তিনি মানুষ হ’য়ে আসেন, যাতে মানুষ তাঁকে ধ’রে দয়ালদেশে পৌঁছাতে পারে। নামে প্রেরণা জোগায় আর ধ্যান মানুষকে ধ্যেয়ের ভাবে ভাবিত ক’রে তঁদভিমুখী ও তঁৎচলনপরায়ণ ক’রে তোলে। যার–তার ধ্যান করতে নেই, কারণ তাতে ধ্যেয়ের মধ্যে যদি কোন imperfection (অপূর্ণতা) বা unsolved knot (অসমাহিত গ্ৰন্থি) থাকে, তবে তা’ ধ্যানীর মধ্যে transmitted (সঞ্চারিত) হ’য়ে যেতে পারে। উপর থেকে যিনি perfection (পূর্ণতার) তকমা নিয়ে আসেন, তিনিই ধ্যেয়। কারণ, He is the highest and best guide and goad to human evolution (তিনি হলেন মানব–বিবর্ত্তনের সর্ব্বোচ্চ ও সর্ব্বশ্রেষ্ঠ পরিচালক ও অনুপ্রেরক)। পুরুষোত্তমকে যারা জীবদ্দশায় পায়, তাঁরা যদি তাঁর প্রতি অনুরক্ত হ’য়ে তাঁর সঙ্গ, অনুসরণ, অনুচর্য্যা ও তীব্র কর্ম্মসহ নিষ্ঠাসহকারে নামধ্যান করে, তবে অল্প সময়ের মধ্যে ঢের এগিয়ে যেতে পারে। পুরুষোত্তমই ইষ্ট, পুরুষোত্তমই ধ্যেয়। তাঁর অন্তর্ধানের পরও তিনিই মানুষের ইষ্ট ও ধ্যেয় হ‘য়ে থাকেন, যতদিন পর্য্যন্ত তাঁর পুনরাবির্ভাব না ঘটে। তাঁর অনুগামীদের কাজ হ‘ল তাঁকেই লোকসমক্ষে তুলে ধরা। মানুষের প্রাপ্তব্য হলেনঈশ্বর এবং পুরুষোত্তমই হ‘লেন রক্তমাংস–সঙ্কুল আমান ঈশ্বর। আবার, পুরুষোত্তমকে নিজ জীবন দিয়ে যিনি যতখানি অবিকৃতভাবে ধারণ, বহন, প্রতিষ্ঠা ও প্রকাশ করেন, যাঁর চরিত্র ও ব্যাক্তিত্ব যতখানি ইষ্টানুরাগসন্দীপী, তিনি ততখানি পূজনীয় মানুষের কাছে।
(আঃ প্রঃ ১১ খণ্ড, ৬৭ পৃঃ থেকে সংগৃহীত)
।। প্রত্যেককে নামধ্যানে অভ্যাস করাবার পদ্ধতি ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর কয়েকজনকে লক্ষ্য ক’রে বললেন—খুব সকালে উঠে ভোর চারটের মধ্যে প্রাতঃকৃত্যাদি ও নামধ্যান সেরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাগরণী গান গেয়ে সবাইকে জাগিয়ে দিতে হয়। তাড়াতাড়ি যাতে নামধ্যানে বসে তা’ করতে হয়। ওতে লোকে আনন্দ পায়, স্ফূর্তি পায়, তাদের শরীরও ভাল থাকে। আগে যতদিন ভোরে সবাইকে জাগিয়ে দিয়ে নামধ্যান করিয়েছি, ততদিন মানুষ অকালে মরেনি। তাই প্রত্যেককে এটা করানো লাগে। (আ. প্র. ১৬/ ১৫. ৪. ১৯৪৯)
———————————————————————————————–
(বিঃ দ্রঃ পরিতাপের বিষয়, লোকশিক্ষার জন্য উৎসবাদিতে শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত উক্ত নিদেশকে মেনে চলা হয় না।)
“মরো না, মেরো না, যদি পার মৃত্যুকে অবলুপ্ত কর।”
।। মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার সহজ উপায় ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর অমনি বললেন—অশ্বিনীদা, regular সাধন যে করে তার আর মৃত্যুভয় থাকে না। সে জীবন্তে ম’রে দেখে, death point এত বেশী দূর নয় যে কিছুকাল regular সাধন করলে তাহা না feel করা যায়। কিন্তু যে তাহা একবার feel করেই আবার সাধন ছেড়ে দেয় তারও কিন্তু অসুখে ভুগে মরতে হয়। আর, যে তা’ feel করেও regular সাধন করতে থাকে, তার শরীর ধ্বংসকারী অসুখ হলে ইচ্ছায় মনকে শরীর থেকে তুলে নিয়ে death point সহজে pass করে; বড় একটা কষ্ট পায় না—অভ্যাস রাখতে হয়। তবে একবারও যে জীবন্তে তা’ feel করেছে সেও রোগে ভুগতে-ভুগতে সেই point-এর কাছে গেলে তার সেই সংস্কার জেগে ওঠে এবং সেও তখন তাতে concentrate করে ভাল idea-তে absorbed হয়ে (যথা, সদ্গুরু ধ্যান ইত্যাদি) দেহত্যাগ করে; ফলে সদগতি হয়। আর, যার অভ্যাস আছে, সে তো কতবার death point অনুভব করে ফিরে আসছে, সে অসুখে বেশী ভোগে না; সে-রকম দেখলে তো ঐ point-এ concentrate করে সদগুরুর ধ্যানে absorbed হয়ে শরীর ছাড়ে। Death-টা হচ্ছে কর্মসংস্কারগত একটা idea-তে বেশী absorbed হ’য়ে এই ব্যক্তিত্ববোধ হারান। এই আমি অশ্বিনী রূপে যে আমিত্ব-বোধ-এর সঙ্গে সম্বন্ধরাহিত্য, এই আমিত্বের সঙ্গে যে connecting links আছে তাহা cut off হয়ে যায়। যে idea-টা তকালে predominant থাকে তাতে absorbed হয়ে যেন তাহাই আমি—এইভাবে তন্ময় হয়ে এই আমিত্বকে বিস্মৃত হওয়া। একপ্রকার লয় আর কি। সাধকেরও লয় বহুবার ঘটবার মত হয়, উচ্চ-উচ্চ ধামে (plane-এ) যখন গতি হয়, তখন তাতে absorbed হয়ে লয় হয়। যে যত তীব্র সাধক, সে লয় তত রক্ষা করে-করে উচ্চ হতে উচ্চতর লোকে যায়। আর, যেখানে গিয়ে লয় এসে যায়, সেই তার খতম। (সূত্রঃ অমিয়বাণী)
।।মৃত্যুকালে নাম করার কি ফল হয়।।
একজন জিজ্ঞাসা করলেন– মরার সময় নাম করে, তার ফল কী হয়?
শ্রীশ্রীঠাকুর—সেটা যদি তার সত্তাকে স্পর্শ করে তবে ভাল হয়। সত্তাকে স্পর্শ না করলে পরজন্ম নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ফলপ্রসূ হয় না। অর্জ্জিত সংস্কার যেমন সত্তাসঙ্গত না হ’লে সন্তানে বর্ত্তায় না। (আঃ প্রঃ ২০/১৭. ৭. ১৯৫১)
নামধ্যান ব্যতীত আমাদের, সৎসঙ্গীদের কমপক্ষে প্রতিদিন ৩ বার করে শবাসন করতে হয়। সে বিষয়ে একজন ভক্ত জিজ্ঞাসা করলেন—শবাসন কি মৃত্যুর ধরণ অভ্যাস করা?
শ্রীশ্রীঠাকুর — এটা শরীর-বিধানকে নিয়ন্ত্রিত করবার ক্ষমতা দেয়। এটা দ্বারা হার্ট ফেল ইত্যাদি আকস্মিক ব্যাপার এড়ান যায়। (আঃ প্রঃ ২০/৩০. ১২. ১৯৫১)
।। চক্রফটোধ্যান ও শবাসন করা বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী ।।
শৈলেনদা—আমাদের দীক্ষাদানের সময় যে চক্রফটো ধ্যান করার কথা বলতে হয় ……… ।
শ্রীশ্রীঠাকুর—ওটা আমি আগে করিনি। পরে হয়েছে। পি. সি. সরকার যখন আশ্রম ( পাবনায়) গেল, তখন তার সাথে কথায়-কথায় light reflection-এর (আলোর প্রতিফলনের) কথা উঠল। সে বলল, শাস্ত্রে এরকম যন্ত্রের কথা আছে। ঐরকম গোলাকার একটা যন্ত্রের মধ্যে যদি মনঃসংযোগ করা যায় তাতে একটা mechanical push (যান্ত্রিক প্রযোজনা) মতন হয়, আর তাতে brain power (মস্তিষ্কের শক্তি) বাড়ে। তখন আমি সাদা-কালো ক’রে এই ষোড়শদল চক্রের idea (পরিকল্পনা) দিই। পরে কেষ্টদা তন্ত্র থেকে খুঁজে বের করল, এরকম একটা যন্ত্রের কথা সেখানে আছে, তার নাম মহালক্ষ্মীযন্ত্র। ঐ সময় থেকে এ’টা চলে আসছে। এরপর শৈলেনদা শবাসন করা নিয়ে কথা তুললেন। সেই প্রসঙ্গে বললেন পরম দয়াল—শবাসন আমিও করতেম । ওতে শরীরটা soothed (ঠান্ডা) করে। *শবাসন নিয়মিত করলে সহজে হার্টফেল হতে দেয় না। (দীপরক্ষী, ষষ্ঠ খণ্ড, ইং ২৯-৪-১৯৬০)
* * *
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শ গ্রহণ করে আমরা জানতে পেরেছি, ধর্ম মানে ধারণ করা। অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম্ম বলে জানিস তাকে। নিজের এবং অপরের অস্তিত্বের ধারক, পালক ও পোষক হবার জন্য যা যা করা হয়, তাই ধর্ম। জীবনবর্দ্ধনার অপচয়ী অনিত্যকে ত্যাগ করে, জীবনবর্দ্ধনার উপচয়ী নিত্য-এর উপাসনা করা, আরাধনা করা। জীবনবৃদ্ধির তাগিদে একটা ফুলকেও বাঁচতে সাহায্য করতে হবে। অযথা একটা ফুলকে মেরে ফুলের স্রষ্টার পূজা হতে পারে না। অতএব ধর্ম বা ধারণ করার বিধি যার-যার, তার-তার পালনীয়। একে যদি আমরা পূজা মনে করি, তাহলেও যার পূজা তাকেই করতে হবে। কোনো ভায়া-মিডিয়া প্রতিনিধি দিয়ে হবে না। যার ক্ষিদে তাকেই খেতে হবে, ক্ষুধার্তের হয়ে অন্য কেউ খেলে ক্ষুধার্তের কি পেট ভরবে? অথচ আমরা শ্রীশ্রীঠাকুরের পূজার নামেও ওই কাজটাই করে চলেছি। ইষ্টপ্রোক্ত নামধ্যানের অনুশীলন বাদ দিয়ে, ভক্তদের প্রতিনিধি স্বরূপ একজন পুরোহিত ফুল, ফল, মিষ্টি, কাসর, ঘণ্টা, চামর, ধূপ, দীপ প্রভৃতি উপাচার সহযোগে, মন্ত্র উচ্চারণ করে শ্রীশ্রীঠাকুরের প্রতিকৃতির উদ্দেশ্যে ভোগ নিবেদন করেন। ভক্তরা দর্শক-শ্রোতা হয়ে প্রতিকৃতির কাছে মনে মনে দুঃখ, কষ্ট, বেদনা, কামনা-বাসনার কথা জানান। পূজা অন্তে প্রতিকৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত খাদ্যদ্রব্য সকলের মাঝে প্রসাদ নামে বণ্টন করা হয়।
স্বভাবতই একটা প্রশ্ন জাগে, ওই পূজার নামে যে খাদ্যদ্রব্য নিবেদন করা হয়, সেগুলি কি প্রতিকৃতি খান, ঈশ্বর কি শুধুমাত্র প্রতিকৃতিতে আবদ্ধ থাকেন ?
শ্রীশ্রীঠাকুর—মানুষকে যখন ভালবেসে খাওয়াই, তখন ভগবান একটু পান। যেমন প্রাণে দিই, তিনি তেমনি পান। বিশেষ ক’রে অশক্ত, ক্ষুধার্ত্ত, আপদগ্রস্ত, বিপাক-বিধ্বস্ত—এদের খাওয়ালে ভগবান খান। খাওয়ানো কেন, তাদের প্রতি যত্ন-আদর, সেবা-শুশ্রুষা-যা’ই করা হয়, সবই ভগবান পান। তাদের যোগ্যতায় যোগ্য ক’রে তুললে ভগবান আরও তৃপ্তি পান। যাকেই যোগ্য ক’রে তুলবে, ভগবান তাতেই তৃপ্ত হন। (আঃ প্রঃ খণ্ড ১৯/ পৃঃ ২৩৬/ তারিখঃ ২৫/০৮/১৯৫০)
এছাড়াও, আমরা ভগবানের সেবক বা সেবাইত হয়ে, ভগবানকে সেবা করতে আমরা নানা উপাচারের নৈবেদ্য সাজিয়ে নিবেদন করে থাকি। তাতে কি ভগবান তুষ্ট হন ?
ভগবানের সেবা করা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন—
“যা’রা তৃষ্ণার্তকে পানীয় দেয়,
ক্ষুধার্তকে অন্ন দেয়,
রুগ্নকে নিরাময় করে,
দুর্বলকে সাহায্যে সবল করে তোলে,
শোকার্তকে সন্দীপ্ত করে তোলে সান্ত্বনায়—
সুশীল-সৌজন্যে
ইষ্টানুগ সম্বোধি পরিচর্য্যায়,
গৃহহারা, আশ্রয়হারা অভ্যাগত যা’রা
তা’দিগকে যা’রা আশ্রয়ে সুস্থ
ও শ্রীমণ্ডিত ক’রে
ধর্মে অভিদীপ্ত করে তোলে,
যোগ্যতার যোগ্য অনুচর্য্যায়
আত্মনির্ভরশীল করে তোলে,
ঈশ্বরের সেবা করে তা’রা
প্রত্যক্ষভাবে।”
(সেবা-বিধায়না, ১৪২)
এতক্ষণে আমরা বুঝতে পারলাম যে, ভগবান বা দেবতাকে পুজো করা সহজসাধ্য ব্যাপার নয়।
আমরা তথাকথিত পূজা এবং অধিবেশন অন্তে কিছু খাদ্যবস্তুকে *প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করে প্রসাদভুক হয়ে থাকি। ওই প্রসাদ-এর অর্থ এবং ভাবার্থ এবার জেনে নেওয়া যাক।
[প্র-সদ্ (হৃষ্ট হওয়া)]=যা গ্রহণ করলে দেহ-মন-প্রাণ হৃষ্ট (প্রফুল্ল হৃদয়) হয়, তার নাম প্রসাদ। শুধু সাত্তিক খাদ্যবস্তু নয়, ব্যবহারিক শ্রবণ, কথন, আলাপন, পঠন-পাঠন ইত্যাদি যা আমাদের দেহ-মন-আত্মাকে হৃষ্ট করে, তার নাম প্রসাদ। (অভিধান/জ্ঞানেন্দ্র মোহন দাস)
প্রসাদভুক [দীপরক্ষী ১ম, ০৩/০৬/১৯৫৩]— ঈশ্বরের আশীর্বাদ বা অনুগ্রহ লাভ, ঈশ্বরের প্রসন্নতা লাভ। [প্রসাদ—প্র-√সদ + ঘঞ্ (ভাবে)] অনুগ্রহ। “মানুষকে যে যত service সেবা দেয়, সে তত বড় প্রসাদভুক হয়।” (শব্দরত্নকোষ)
*সৎসঙ্গের আনন্দবাজার নামক সর্বজনীন ভোজনালয়ে প্রদত্ত আহার্য্য দ্রব্যকে প্রসাদ বলা হয়। শ্রীশ্রীঠাকুরের লীলাকালিন সৎসঙ্গ অধিবেশন অন্তে প্রসাদ হিসেবে গুড়ের বাতাসা প্রদান করা হতো।
যাইহোক, প্রসাদরূপী খাদ্যদ্রব্য আমাদের জৈবিক ক্ষুধা নিবারণ করতে প্রয়োজন হলেও, আত্ম-বিস্তারের জন্য প্রসাদভুক হতে হলে মানুষকে শুধু নয়, ব্রহ্মের প্রতীক-স্বরূপ, পরিবেশের সবাইকে সেবা দিয়ে অমঙ্গল দূর করে মঙ্গল প্রতিষ্ঠা করতে হবে—মরণকে স্তব্ধ করতে জীবনের জয়গান গাইতে হবে—নিম্নোক্ত বাণীতে প্রদত্ত ইষ্ট নিদেশ মেনে।
সবাইকে শুভ রথযাত্রার যথাযথ শ্রদ্ধা, ভক্তি ও প্রণাম জানিয়ে সবিনয় নিবেদন—- জগন্নাথদেবকে কেন্দ্র করে বা জগন্নাথদেবের নামে যে রথযাত্রা উৎসব পালিত হয় সেই রথ-যানে তিনজন উপবিষ্ট থাকেন—জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। এই জগন্নাথদেবকে আমরা শ্রীকৃষ্ণ নামে জানি, বলরাম হলেন তাঁর দাদা আর সুভদ্রা হলেন বোন বা ভগ্নী। কোন এক সময়ে পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ দাদা ও বোনকে নিয়ে সেইসময়ের শ্রেষ্ঠ চক্রযান রথ-এ আসীন হয়ে মাসীর বাড়িতে গিয়েছিলেন। এই হচ্ছে রথযাত্রার প্রতিপাদ্য বিষয়। পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণের ভগ্নী সুভদ্রা পিত্রালয়ে (দ্বারকা) এলে তিনি দুই দাদার কাছে নগর ভ্রমণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তখন কৃষ্ণ ও বলরাম সুভদ্রার সঙ্গে রথে করে ঘুরতে বের হন। তার পর থেকেই না কি রথযাত্রা আয়োজিত হয়ে আসছে। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের পাশে গুন্ডিচা মন্দিরে কৃষ্ণের মাসিবাড়ি। (দ্বারকা থেকে পুরীতে!) তাঁদের মাসি তিন ভাই-বোনকেই বাড়ি আসার আমন্ত্রণ জানান। তার পরই রথযাত্রা করে কৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রা ১০ দিনের জন্য মাসির বাড়ি ঘুরতে যান। অন্য এক কাহিনি অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণের তিরোভাবের পর তাঁর শব দ্বারকা নগরী নিয়ে আসা হলে ভাইয়ের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ বলরাম তাঁর মরদেহ নিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এ দেখে সুভদ্রাও সমুদ্রে ঝাঁপ দেন। এই সময়কালে পুরীর রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন স্বপ্ন দেখেন যে, শ্রীকৃষ্ণের শরীর সমুদ্রে ভাসছে। শ্রীকৃষ্ণের বিশাল প্রতিমা ও মন্দির তৈরির স্বপ্নাদেশ পান তিনি। কৃষ্ণের সঙ্গে সঙ্গে বলরাম, সুভদ্রার কাঠের মূর্তি তৈরির স্বপ্ন পান তিনি। কৃষ্ণের অবশিষ্টাংশ বা হাড় সেই প্রতিমার পিছনে ছিদ্র করে রাখা হয়, এমনও স্বপ্নাদেশ দেওয়া হয় রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে। তার পরই পুরীর মন্দির তৈরি করা হয়। বিশ্বকর্মা শুরু করেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার কাঠের মূর্তি তৈরির কাজ। কিন্তু তাঁর শর্ত পূর্ণ না-হওয়ায় তিনি মূর্তি অসম্পূর্ণ রেখেই অন্তর্ধান হয়ে যান। রাজা সেই মূর্তির মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের অস্থি রেখে স্থাপন করে দেন। প্রবাদ যাইহোক, “যেনাত্মন্ স্তথান্যেষাং জীবনংবর্দ্ধনাঞ্চপী ধ্রীয়তে স ধর্ম্ম।” (অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম বলে জানিস্ তা’কে।)— পু্রুষোত্তম প্রদত্ত ধর্মের এই সংজ্ঞা মেনে ধর্ম লাভ নাই বা হোক রথযাত্রার সাথে এক আবেগ, উন্মাদনা, নস্টালজিয়া, দীর্ঘদিন ধরে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। আর ধর্ম অর্জন যদি করতে হয়, তাহলে কিন্তু প্রভু জগন্নাথ পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের নিদেশ মেনে চলতেই হবে। পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের শ্রেষ্ঠ অবদান যদি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা হয়, উক্ত গীতা গ্রন্থে উক্ত হয়েছে “কর্মে তোমার অধিকার, ফলে নয়।” অর্থাৎ বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বলা অনুযায়ী “করাই পাওয়ার জননী, না করে যে পেতে চায়/দুঃখ তার পিছে ধায়।” সেই শ্রীকৃষ্ণের স্নানযাত্রার দৃশ্য দর্শনে মুক্তি লাভ হয়, এ ধরণের আজগুবি কাহিনী প্রচারণাও গীতা বিরোধী কাজ। আর এই কাহিনীর প্রেক্ষাপটে শ্রীকৃষ্ণকে রাধা নামের নারীর প্রতি বিশেষ প্রণয় প্রকাশ করা হয়েছে। সেটাও শ্রীকৃষ্ণের গীতা এবং ভাগবত বিরোধী কাজ। তাই কোনকিছু প্রচার করার পূর্বে বিশেষভাবে ভেবে দেখা উচিত। আমি যা করছি, তা কি ধর্মসঙ্গত? যাইহোক এবার একটু শ্রীকৃষ্ণের কথা জানা যাক। পণ্ডিতদের গবেষণা থেকে প্রমাণিত, (সূত্র : ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র রচিত শ্রীকৃষ্ণ চরিত্র।) শ্রীকৃষ্ণ ১১ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে কংসকে বধ করেন। অথচ বেশীরভাগ কৃষ্ণভক্তগণ বৃন্দাবন লীলার, রাসলীলার নামে যে যুবক কৃষ্ণকে মানবী রাধার সাথে যুগলবন্দী করে পরকীয়া কামুক রূপে চিত্রিত করে চলেছেন, সে কৃষ্ণ কোন কৃষ্ণ? সে কি বৃষ্ণিসিংহ দেবকীনন্দন, না অন্য কেউ ? সে কি গীতার প্রবক্তা পার্থসারথী, না অন্য কেউ? কারণ, বৈষ্ণবদের প্রামাণ্য গ্রন্থ ভাগবতে রাধা-কৃষ্ণের ওইসব অবৈধ পরকীয়া-লীলার কোন কাহিনী লিপিবদ্ধ নেই। অথচ কৃষ্ণের প্রচারকেরা গীতার কথা বলেন, ভাগবতের কথা বলেন, অথচ আয়ান ঘোষের ঘরণী রাধাকে শ্রীকৃষ্ণের সাথে এক অবৈধ সম্পর্কের সাথে জুড়ে নিয়ে কৃষ্ণনাম করতে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণের যে বদনাম করে চলেছেন, সেটাও তাদের বোধে ধরা পড়ে না, এমনই ধার্মিক তা’রা ! বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন—‘‘শুনেছি ভাগবতে রাধা ব’লে গোপিনী নেই। আমি বুঝি, রাধা মানে সেরা সৃষ্টি-রচয়িতা শক্তি। শব্দের থেকেই সব। কতরকমের শব্দ শোনা যায়। ওঁ-অনুভূতির পূর্বে দারুণ বম্ বম্ বম্ শব্দ হয়। দুনিয়াটা যেন ফেটে চৌচির হ’য়ে যাবে। কিছু থাকবে না, সব ধ্বংস হ’য়ে যাবে। সত্তাকেও বিলুপ্ত ক’রে দেবে। এমন শব্দ, সব যেন টুকরো টুকরো হ’য়ে, রেণু রেণু হ’য়ে উড়ে যাবে। সে কী ভীষণ অবস্থা! ভয় বলি, সত্তার ভয় যে কী তখন বোঝা যায়! সত্তা বুঝি এই মুহূর্তে গুঁড়িয়ে দিল। তখন বোঝা যায় দয়ালের দয়া, যে দয়ায় টিকে আছি এই দুনিয়ায়। ওঁ-অনুধাবনে রং আসে। রং-এ মনোনিবেশ করলে পিকলু বাঁশীর মত শব্দ হয়। দোল আসে। এক অবস্থায় motion and cessation (গতি এবং বিরতি)-এর মত বোধ হয়। স্বামীর অনুভূতি যেন to and from (একেবার সামনে একবার পেছনে হচ্ছে)-এমনতর বোধ করা যায়। ইলেকট্রিক ব্যাটারি দিলে যেমন শব্দ পাওয়া যায় না, ভিতরে বোধ হয়, রাধাও ঐ রকম সত্তা দিয়ে মানুষ হয়। শেষ দিকে আসে একটা পরম শান্ত অবস্থা। আমাদের এই সৎনাম সব মন্ত্রের বীজস্বরূপ। সব বীজের সত্তা হ’লো কম্পন। আর কম্পনের গঠনতন্ত্র অনুভব করা যায় এই নামের মধ্যে। রেডিওর যেমন শর্ট ওয়েভ, মিডিয়াম ওয়েভ এবং নানা মিটার আছে, অনুভূতির রাজ্যেও সেই রকম সব আছে। এগুলি ফালতু কথা না, এগুলির সত্তা আছে। যে সাধন করে সেই বুঝতে পারে। হ্রীং ক্রীং ইত্যাদির স্তরে-স্তরে কত শব্দ এবং তার সঙ্গে-সঙ্গে জ্যোতি ভেসে ওঠে। আর একটা কথা, পরীক্ষা করতে গেলে সদগুরুকে ধরা যায় না। কামনা নিয়ে গেলেও তাঁকে পাওয়া হয় না। কামনা ত্যাগ ক’রে ধরলে তখন তাঁকে পাওয়া যায়। কামনা নিয়ে তাঁতে যুক্ত হ’তে গেলে কামনার সঙ্গে যুক্ত হই, তাঁতে যুক্ত হ’তে পারি না। নিষ্কামের কথা কয়, তার মানে গুরুই আমার একমাত্র কাম্য হবেন, অন্য কোন কামনা থাকবে না। তখনই তাঁকে পাওয়া যাবে।’’ (আ. প্র. ১৫শ খণ্ড, পৃঃ ২০০-২০১ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী) ।। পুরীর জগন্নাথদেব প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।। শ্রীশ্রীঠাকুর— ………. “পুরীতে জগন্নাথের মন্দিরে যদি যাও, তাহ’লে দেখতে পাবে জগন্নাথের হাত নেই। জগন্নাথ জনে-জনে হাত বিলিয়ে নিজে হাতহীন হ’য়ে ব’সে আছেন। আমাদের উপর তাঁর কোন হাত নেই। কিন্তু যেই আমরা তাঁকে আমাদের হাত দু’খানি দিয়ে নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধ’রবো অমনি আমরা তাঁর হাতে চ’লে যাব। তখন তাঁর ইচ্ছায় আমরা চালিত ক’রবো নিজেদের। এমনি ক’রেই আমরা সেই মঙ্গলের অধিকারী হবো— যে-মঙ্গল তিনি আমাদের দিতে চান”। (আলোচনা প্রসঙ্গে, নবম খণ্ড, ৫/৯/১৯৪৭) শ্রীশ্রীঠাকুর— জগন্নাথদেবের যে মন্দির আছে ওখানে, তা’ ছিল একটা culture–এর (কৃষ্টির) কেন্দ্র। সে যে কত আগের থেকে ছিল তার ঠিক পাওয়া যায় না। চৈতন্যদেবের সময় থেকে না, তারও আগে থেকে। ওখানে একটা বিরাট culture (কৃষ্টি) ছিল। তার সাক্ষী দিচ্ছে জগন্নাথদেবের মন্দির, ভুবনেশ্বরের মন্দির, কোনারকের মন্দির। ………. জগন্নাথদেবের ভোগের মধ্যে আছে পান্তাভাত। পান্তাভাতে যথেষ্ট পরিমাণে বি-ভিটামিন থাকে। ওতে একটা flavor (মৃদু গন্ধ) থাকে, ওটা health–এর (স্বাস্থ্যের) পক্ষে খুব উপকারী। পান্তাভাত, কলা, দই—খুব উপকারী অথবা পান্তাভাত, কাঁচালঙ্কা আর নুন।” (দীপরক্ষী, ১ম খণ্ড, ২৭মে ১৯৫৩) ।। রথযাত্রা উপলক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ-এর ‘ভক্তিভাজন’ ।। রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম– ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম । পথ ভাবে ‘আমি দেব’, রথ ভাবে ‘আমি’. মূর্তি ভাবে ‘আমি দেব’– হাসে অন্তর্যামী ।। (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) ।। অন্তর্যামী অধিষ্ঠিত রথকে চালাব কেমন করে ।। आत्मानं रथिनं विद्धि शरीरंरथमेवतु । वुद्धिं तु सारथिं विद्धि मनः प्रग्रहमेव च ।। (कठ उपनिषद 3/57) উপনিষদ অনুযায়ী মানবদেহকে রথের সাথে তুলনা করা হয়েছে । এই দেহরথকে চালায় ছটি ঘোড়া বা ষড়রিপু । বাস্তবে যে কোন ঘোড়াকে চালনা করে একজন সহিস বা সারথি । সারথির লাগাম নিয়ন্ত্রণের উপর দক্ষতা যদি না থাকে ঘোড়া তার সওয়ারকে না জানি কোন অকুল গরল পাথারে নিয়ে চলে যাবে । তাই আমাদের দেহরথের ঘোড়াগুলোর প্রগ্রহ বা লাগামকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সদগুরু রুপী একজন উপযুক্ত সারথির দরকার । যেমনটা ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ, মহাবীর অর্জুনের রথের সারথি । তেমনিভাবে আমাদের দেহরথটাকে যদি চালাতে পারি সার্থক হবে আমাদের রথ চালনা উত্সব রথযাত্রা । নান্যপন্থা বিদ্যতে হয়নায় । প্রচলিত রথযাত্রার যাত্রী হয়েও আমরা যারা ত্রিতাপ জ্বালায় জ্বলছি, আমাদের দেহরথটাকে ঈশ্বরপ্রাপ্তির নির্দিষ্ট গন্তব্য পথে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছি, এ-যুগের শ্রীকৃষ্ণ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সেইসব বিকৃতাচারী ধর্মের ধ্বজাধারীদের উদ্দেশ্যে বললেন— “ভগবান, ইষ্ট বা ধর্ম্মের মৌখিক স্তুতির ভিতর-দিয়ে যা’রা ধর্ম্মবিরোধী কাজ করে, তা’রা হ’ল সব চাইতে বড় শয়তানের দূত–প্রকৃষ্ট লোক-দূষক। ১২৫ । (শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭)’’ ‘‘অনেকে শ্রীকৃষ্ণকে মানে, গীতা মানে, অথচ বর্ণাশ্রম মানে না। গীতার কে কি ব্যাখ্যা করেছেন সেই দোহাই দেয়। কিন্তু গীতার বক্তা শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও বাণী দেখে চতুর্বর্ণ সম্বন্ধে তাঁর মত আমরা কি বুঝি? এ সম্বন্ধে কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না, গীতা শ্রীকৃষ্ণের জীবনেই জীবন্তভাবে পরিস্ফুট। গীতায় প্রত্যেক বর্ণের স্বভাবজ কর্ম সম্বন্ধে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। (আ. প্র. ১৪/১১৮) গীতোক্ত সেই কর্ম বাদ দিয়ে, আহারশুদ্ধি, সত্তাশুদ্ধি, প্রজনন-শুদ্ধির বিধান উপেক্ষা করে আবেগ-প্রবণ হয়ে রথযাত্রার নামে, রথের রশি ধরে টানার উন্মাদনায় মেতে উঠে জীবনকে কতটুকু নন্দিত করা যাবে? কতখানি ধর্ম লাভ হবে?—সে হিসেব কষার কি প্রয়োজন নেই? জয়গুরু। বন্দে পুরুষোত্তমম্!
বর্তমানে রোগ-শোক-ব্যাধি-জরায় জর্জরিত মানুষদের দুঃখের শেষ নেই। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে সব দুঃখের মূল কারণ প্রবৃত্তিগত ভোগের চাহিদা। চাহিদা যতই থাকুক না কেন, ভোগ করার ক্ষমতা কিন্তু আমাদের সীমিত। ভোগকে ঠিক ঠিক হজম করতে পারি না, বদহজম হয়ে যায়। তথাপি, সেই চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে স্ব-বিরোধী, বিবেক-বিরোধী, ধর্ম-বিরোধী কাজকর্ম করে ফেলি। ফলে দুঃখ পেতে হয়। আর দুঃখ পেলেই কপালের দোষ দিই, ভগবানের দোষ দিই। ‘ক’ মানে কেন্দ্র, ‘পাল’ মানে পালন। আমি আমার কেন্দ্রস্বরূপ মস্তিষ্কস্থিত পরমাত্মিক শক্তি, ব্রহ্ম শক্তিকে যেমন পালন করব, আমার কপালও তেমনভাবে আমাকে পালন করবে। আর ভগবান মানে ভজমান। পরমাত্মিক শক্তিকে আমরা যেমন ভজনা করব, তেমন ফল পাব। তাই গুরু ধরা লাগে। গুরুই ভগবানের সাকার মূর্তি। একমাত্র গুরুর প্রদর্শিত পথে আমরা আমাদের কপালের হাল ফেরাতে পারি। তাই সব দুঃখের স্রষ্টা আমরাই। যুগ-পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের দুঃখ-মুক্ত জীবনের চাবিকাঠি দিয়ে বললেন, চাওয়াটা না পাওয়াই দুঃখ। কিছু চেওনা, সব অবস্থায় রাজী থাক, দুঃখ তোমার কি করবে। আবার বললেন, করাই পাওয়ার জননী। না করে যে পেতে চায়/দুঃখ তার পিছে ধায়। আমরা কিভাবে দুঃখের সাধনা করি, তারই একটা গল্পঃ এক গৃহিনী, এক সাধুবাবার কাছে দুঃখ-মোচনের তাবিজ চাইলে সাধুবাবা বলেন, বাস্তববুদ্ধিতে দুঃখের মোকাবিলা করতে হয়। তাবিজ-কবচ দিয়ে হয় না। তাবিজ আমি একটা দিচ্ছি, এই তাবিজ তোমাকে তিনটি বর দেবে। যদি বুদ্ধি করে কাজে লাগাতে না পার তাহলে তোমার দুঃখ কিন্তু বেড়ে যাবে। গৃহিনী মনে মনে ভাবছে, মার দিয়া কেল্লা, আমাকে আর পায় কে! হাতের মুঠোয় পেয়ে গেছি সুখের চাবিকাঠি। এবার তাবিজটার ক্ষমতা পরীক্ষা করে দেখতে হয়। ৫০০ টাকার দরকার। তাবিজটাকে মন্ত্রপূত করে ৫০০ টাকা চায়। প্রায় সন্ধ্যা। পিওন এসেছে একটা খাম নিয়ে। খামের ভিতর রয়েছে ৫০০ টাকা, আর একটা চিঠি। গৃহিনীর স্বামী আকস্মিক দুর্ঘটনায় মারা গেছে, অন্ত্যেষ্টির জন্য স্বামীর অফিস থেকে পাঠিয়েছে। গৃহিনী, স্বামীর শেষকৃত্য করে এসে ভাবছে, তাই তো, ভুল হয়ে গেল, আমার তো আরো দুটো বর পাওনা আছে, তার একটা দিয়ে তো স্বামীকে বাঁচাতে পারতাম। তিনি স্বামীর জীবন ফিরে পেতে তাবিজ মন্ত্রপূত করে অপেক্ষা করতে থাকে। গভীর রাতে দরজায় খট্খট্। দরজা খুলে জীবন্ত স্বামীকে দেখে ভুত ভেবে ভয় পেয়ে অন্তিম বরটি প্রয়োগ করে। স্বামী অন্তর্হিত হয়। লাভের মধ্যে লাভ হলো, অকালে স্বামী হারাল! তাইতো ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রকে বাণী দিয়ে বলতে হলো— ‘‘হাজার পাওয়া আসুক তোমার থাকবে না তা কিছুতেই, পেলে, রাখবে কেমন করে না জানলে তা কিছুতেই। পেতে গেলেই করতে হবে—যাই না পেতে চাও তুমি, নিষ্ঠা নিপুন কৃতি জেনো করে পাওয়ার শিষ্ট ভূমি।’’ সবাইকে জয়গুরু! নাম চলছে তো।
।। ‘আর্য্য মহাসভা’ নামে সর্বজনীন রাজনৈতিক দল কেন প্রয়োজন ।।
নিবেদনে—তপন দাস
—————————————————————————————
।। আর্য্য মহাসভা নামের প্রেক্ষাপট ।।
সব্বাইকে যথাবিধি শ্রদ্ধা ও প্রণাম জানিয়ে সবিনয় নিবেদন,
মানবসভ্যতার এক পরম বিস্ময় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র জ্ঞান গরিমায়
গরবিনী আর্য্য ভারতবর্ষের অখণ্ডতা রক্ষার কথা জনে জনে বলেছিলেন। মুসলিম
লীগ ও হিন্দু মহাসভার নেতাদের সাথে কথা বলেছিলেন সাম্প্রদায়িকতার ব্যাধি
নিরসনের জন্য।
“১৯৩৯ সালে হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় গিয়েছিলেন পাবনা আশ্রমে। তিনি ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করেন কীভাবে মুসলিম লীগের ভারতবিভাগের পরিকল্পনাকে বানচাল করা যায় বলুন।ঠাকুর তাঁকে বলেন—হিন্দু মহাসভার বদলে নাম রাখুন আর্য্য মহাসভা। মুসলমানরাও আর্য্য। তাদেরও আপনাদের সভ্য করুন। কোরাণ ভাল ক‘রে পড়ুন। আরবী শিখুন। রসুল যে আপনাদেরও জন্য প্রেরিত তা‘ হিন্দুদের শেখান। লীগ যদি কোরাণবিরোধী কোন পদক্ষেপ নেয়, আর্য্য মহাসভারসভ্য হিসেবে আপনারা কোর্টে শত শত কেস করুন যে আপনাদের প্রফেট ও কোরাণকে বিকৃত করা হ‘চ্ছে। আমি নির্ঘাৎ জানি-—রসুল এসেছিলেন সর্বমানবের মঙ্গলের জন্য, সংহতির জন্য, শান্তির জন্য। রসুল ও কোরাণের দোহাই দিয়ে দেশকে খণ্ডিত করার পরিকল্পনা বানচাল ক‘রে দেন। আমি তো বুঝি খাঁটি হিন্দু, খাঁটি মুসলমান, খাঁটি খ্রীষ্টান, খাঁটি বৌদ্ধ এদের মধ্যে কোন তফাৎ নেই। আর একটা বুদ্ধি বাতলে দিচ্ছি। সারা ভারতে হিন্দুর সংখ্যা মুসলমানের তুলনায় অনেক বেশী। আপনারা হিন্দুগরিষ্ঠ অঞ্চল থেকে পঁচিশ লাখ পরিবার এনে বাংলায় বসান, প্রত্যেক পরিবারে পাঁচ জন ক‘রে লোক থাকলে নতুন সওয়া কোটি লোক হবে। তখন নতুন ক‘রে census করুন। এতে বাংলা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ হ‘য়ে দাঁড়াবে। বাংলা ভাগ হবে না। পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান, উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশেও এই কাজ করুন। ওদিকটাকেও হিন্দুগরিষ্ঠ ক‘রে তুলুন। ওদিকটাও ঠিক থাকবে। দেশভাগ হ‘লে পাকিস্তান ও ভারত পরস্পর পরস্পরের ক্যানসার স্বরূপ হ‘য়ে দাঁড়াবে। কারও ভাল হবে না। ধর্মের সঙ্গে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের কোন সম্পর্ক নেই। প্রেরিতদের মধ্যে বিভেদ করাই একটা ধর্মবিরুদ্ধ ব্যাপার। Conversion (ধর্মান্তর) জিনিষটাই একটা treachery (বিশ্বাসঘাতকতা)।“
(স্মৃতি-তীর্থে, পৃঃ ৮৮, প্রফুল্ল কুমার দাস)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ওই দৈবী-আবেদনে আমরা সাড়া দিতে পারিনি, ব্যর্থ হয়েছিলাম। ফলে সাম্প্রদায়িকতা সঙ্ঘর্ষের আকার ধারণ করেছিল।
১৩৫৩ সালের প্রথম দিকে (১৬ আগস্ট, ১৯৪৬) মুসলিম লীগের ‘ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে‘ ঘোষিত হবার সাথে সাথে কলকাতায় যে পৈশাচিক হত্যালীলা হয়েছিল সে সংবাদ শুনে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন ঠাকুর। দেশ-নেতাদের আগাম সতর্ক করা সত্ত্বেও, প্রতিরোধী-ব্যবস্থাপত্র দেওয়া সত্ত্বেও তাঁরা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি। বিপন্ন দেশবাসীদের রক্ষা করতে না পারার বেদনায় বিপর্যস্ত তিনি। বেড়ে গেল রক্তচাপ, হয়ে পড়লেন অসুস্থ। খবর শুনে পাবনার বিশিষ্ট মুসলমান নেতৃবৃন্দ ঠাকুরকে দেখতে আসেন, পাবনায় সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াতে দেবেন না বলে আশ্বস্ত করেন। একটু সুস্থ বোধ করেন, আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঠাকুরের প্রিয় কলকাতার বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ গুপ্ত প্রয়োজনীয় ঔষধ এবং সম্পূর্ণ বিশ্রামের ব্যবস্থাপত্র দিয়ে যান। বাঁধের ধারে নিভৃত নিবাসের মনোরম পরিবেশে ঠাকুরের বিশ্রামের ব্যবস্থা করেন ঋত্বিগাচার্য্য। চাপমুক্ত রাখতে দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষেধ করে দেন। কিন্তু ঠাকুর রাজী হন না। মনের কথা, প্রাণের ব্যথা নিয়ে যারা যারা আসবে, তাদের তিনি কিছুতেই ফেরাতে নারাজ। আগন্তুকদের দুঃখ-বেদনার কথা শুনতে শুনতে আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন। সংবাদ পেয়ে ডাঃ গুপ্ত আসেন, ঠাকুরকে দূরে কোথাও বায়ু পরিবর্তনের জন্য নিয়ে যাবার পরামর্শ দেন। শ্রীশ্রীঠাকুর ১৯৪৬ খৃঃ ২রা সেপ্টেম্বর চলে আসেন দেওঘরে।
শ্রীশ্রীঠাকুরের দেওঘর আগমনের সংবাদ জানতে পেরে, নিরাপত্তার কারণে, পূর্ববঙ্গের অনেক সৎসঙ্গী পরিবার ভিটেমাটি ছেড়ে ঠাকুরের শরণাপন্ন হন। ওদিকে, ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতির থাবায় ১৯৪৭ এর ১৫ আগষ্ট দ্বিজাতি-তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে দেশবিভাগের ফলে আরো ছিন্নমূল সৎসঙ্গী পরিবারের দল দেওঘরে চলে আসেন। দেওঘরে ঠাকুর নবাগত। নিজেই পরিবার পরিজনদের নিয়ে প্রভূত কষ্ট স্বীকার করে ভাড়া বাড়ীতে থাকেন। নিদারুণ অর্থকষ্টের মধ্যেও প্রশাসন বা সমাজসেবী সংস্থাদের কাছ থেকে কোন সাহায্য না নিয়ে, কাউকে বিব্রত না করে, শরণার্থীদের আশ্রয়দান ও ভরণপোষণ করেছিলেন।
‘‘চেষ্টা করেছিলাম প্রাণপণ যাতে হিমাইতপুর না ছাড়তে হয়, কিন্তু অত্যাচারিত হলাম ভীষণ, পারলাম না কিছুতেই। বাড়ী আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিল, মানুষ খুন করে ফেল্ল। ওখানকার সব লোকের বিরুদ্ধতার জন্য পারলাম না। সকলের ভাল করতে গিয়ে আমি একেবারে জাহান্নামে গেলাম।’’ ‘‘আমরা হিন্দুরাই পাকিস্তানের স্রষ্টা। আমরা আরো চেষ্টা করেছি, যাতে আমরা সকলে মুসলমান হয়ে যাই। আমরা মুসলমান মেয়ে বিয়ে করতে পারি না। কিন্তু মুসলমানরা হিন্দুর মেয়ে বিয়ে করতে পারে। আমরা materialise করেছি তাই যাতে পাকিস্তান হয়, আর materialise করি নাই তা যাতে পাকিস্তান না হয়।….. কিন্তু আগে যদি হায়দ্রাবাদের দিক থেকে বাংলায় হিন্দুদের নিয়ে আসা যেতো, তবে পাকিস্তান হতো না। কিন্তু তা তো হলো না। পাকিস্তান হওয়ায় হিন্দু মুসলমান উভয়েরই কী ভীষণ ক্ষতিই না হল। …….. ’’
ওই নিদারুন সঙ্কটকালে শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর কাছে আত্ম সমর্পিত সর্বহারাদের যোগ্যতাহারা হতে দিলেন না। সবাইকে আদর্শকে আঁকড়ে ধরে জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে প্রেরণা দিয়েছিলেন।
“বাস্তুহারা হওয়া নিদারুণ
কিন্তু যোগ্যতাহারা হওয়া সর্বনাশা,
এই যোগ্যতাকে সর্ব্বাঙ্গসুন্দর ক‘রে
অর্জ্জন করতে হলেই
আদর্শে কেন্দ্রায়িত হতেই হবে সক্রিয়তায়,
…তাই আজ যারা বাস্তুহারা
সর্ব্বনাশের ঘনঘটা যাদের
চারিদিকেই ঘিরে ধরেছে
আগ্রহ আকুল কণ্ঠে তাদের বলি…..
সাবধান থেকো,
যোগ্যতাকে হারিও না,
এই যোগ্যতা যদি থাকে
লাখ হারানকে অতিক্রম ক‘রে
বহু পাওয়ার আবির্ভাব হতে পারে
বিধিমাফিক শ্রমকুশল
সৌকর্য্যে……”
(সূত্রঃ মহামানবের সাগরতীরে ১ম/১৫)
সেদিন যারা ঠাকুরের উক্ত নিদেশ অমান্য করে খয়রাতি সাহায্য গ্রহণ করেছিলেন, তারা হয়েছিলেন সংকুচিত, আর, যাঁরা ঠাকুরের নিদেশ মেনে চলেছিলেন, তাঁরা জীবনের কল্যাণপ্রবাহকে প্রসারিত করতে পেরেছিলেন।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শ অনুসরণ করে ব্যক্তিগতভাবে অনেকে সমৃদ্ধ হলেও, সেই থেকে আজ পর্যন্ত, এতদিন ধরে, আমরা, সমষ্টিগতভাবে তাঁর ঈপ্সিত পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠনের প্রথম ধাপ ‘আর্য্য মহাসভা’ গঠন করে সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র নির্মাণের পথে অগ্রসর হতে পারিনি। এ আমাদের অপারগতার ব্যর্থতা! তথাপি, আর্য্যকৃষ্টি অনুশাসিত মনুষ্যত্বের গুণ-সমৃদ্ধ মানব-সভ্যতাকে টিঁকিয়ে রাখার স্বার্থে যুগ-পুরুষোত্তমের ঈপ্সিত ইষ্ট প্রতিষ্ঠার মাঙ্গলিক যজ্ঞ বাস্তবায়িত করার জন্য জীবনপিয়াসী সব্বাইকে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে অনুরোধ করছি।
* * *
।।চুম্বকেআর্য্যকৃষ্টি, ধর্ম ও রাজনীতি বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দর্শন ।।
আর্য্যস্থান – পিতৃস্থান
উচ্চ সবার – পূর্য্যমান।
অমর রহুক – আর্য্যবাদ
জাগুক উঠুক – আর্য্যজাত।
ফুলিয়ে তোল – দুলিয়ে তোল
তাথৈ তালে – আর্য্যরোল।
আর্য্যকৃষ্টির – যা ব্যাঘাত
খড়্গে তোরা – কর্ নিপাত।
* * *
ARYA–ITS MEANING
“The meaning of the word
‘Arya’ is–
to go, to cultivate, to achieve.”
ARYANS
“People
who are prone to cultivate
and achieve
the clue to the philosophy
of life and becoming–
are Aryans
as I think.”
ARYAN CULTURE
“He who adopts a culture
of life and growth–
is Aryan.”
(The Message, Vol. IX by Shree Shree Thakur Anukulchandra)
* * *
রাজনীতি বলে তা’য়
পূরণ-পোষণ প্রীতিচর্য্যায়
সংহতি আনে যা’য়।
রাজশক্তি হাতে পেয়েও
সতের পীড়ক যা’রাই হয়,
দেশকে মারে নিজেও মরে
রাষ্ট্রে আনে তারাই ক্ষয়।
* * *
“Politics is that which protects, nurtures and fulfills the uphold of existence..”
“When the elite are selfish, inert and non-coperating villain rises and rules.”
* * *
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, ……….. ভালো বংশের মানুষ চাই যারা শয়তানের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। আমি ধৰ্ম্ম ছাড়া politics (পূৰ্ত্তনীতি) বুঝি না। ধৰ্ম্ম মানে ধৃতি, বাঁচাবাড়ায় চলা। বাঁচতে গেলে পরিবেশের দরকার। পরিবেশ বাঁচবে না, আমি বাঁচব, তা’ হয় না। তোমরা প্রত্যেকে মরছ মানে আমি মরছি। একটা মানুষ গেল তার মানে আমার বাঁচার উপকরণ গেল। মানুষ টাকার দাম বোঝে। মানুষের দাম বোঝে না। কিন্তু মানুষই তো যা’ কিছু সৃষ্টি করে। তাই মানুষ বাদ দিয়ে, মানুষের যোগ্যতা বাদ দিয়ে রাজনীতির দাম কী? ………………. (শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, আঃ প্রঃ ত্রয়োবিংশ খণ্ড, পৃঃ ৬৩)
———————————————————————————————–
।। অবতরণিকা ।।
ভারতবর্ষের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শাসন ক্ষমতা অধিকার করার জন্য অনেক রাজনৈতিক দল থাকা সত্বেও “আর্য্য মহাসভা” নামের রাজনৈতিক দল গঠন করার প্রয়োজন রয়েছে কেন, তার সমর্থনে আমাদের বক্তব্য।
আমরা সাধারণ জনগণেরা পলিটিক্যাল সায়েন্স বা রাষ্ট্র বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্ব ও তথ্য বিষয়ে পারদর্শী না হলেও এটুকু অন্ততঃ বুঝি, যে নীতিবিধি বা অনুশাসনের সাহায্যে রাষ্ট্রের জনগণ দুটো খেয়ে-পরে সুখে-শান্তিতে নিরাপদে বসবাস করতে পারে তার জন্যই রাজনীতি। সেই রাজনীতির নিয়ামক মানুষ। ভারত রাষ্ট্র সেই মানুষদের প্রজা নামে পরিচিত করিয়েছেন বলেই আমরা গণ প্রজাতন্ত্রী ভারতবর্ষের নাগরিক বা প্রজা হিসেবে পরিচিত। আমাদের ভারতবর্ষে এই প্রজারাই রাষ্ট্র নির্মাণের একক। ভারতের নিজস্ব সংবিধান, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে।
‘‘সুখস্য মূলম্ ধর্মঃ।
ধর্মস্য মূলম্ অর্থঃ।
অর্থস্য মূলম্ রাষ্ট্রম্।
রাষ্ট্রস্য মূলম্ ইন্দ্রিয়-বিজয়ম্।
ইন্দ্রিয়-বিজয়স্য মূলম্ জ্ঞানবৃদ্ধসেবয়া।
জ্ঞানবৃদ্ধসেবয়া বিজ্ঞানম্।।”
অর্থাৎ, সুখের মূলে ধর্ম (যে নীতিবিধি অস্তিত্বের, ধারক, পালক, পোষক।)। ধর্মের মূলে অর্থ। অর্থ বলতে এখানে শুধু টাকাপয়সার কথা বলা হয়নি, পুরুষার্থের চতুর্বর্গ—বর্ণাশ্রম এবং চতুরাশ্রমধর্ম পালন করার বিষয়ে বলা হয়েছে। প্রজাদের পরমার্থ লাভের বিষয়ে অবহিত করার জন্য রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। রাষ্ট্রের কাজ হলো প্রজাদের ধর্মপথে, অর্থাৎ ন্যায়ের পথে পরিচালিত করা। তাই, রাষ্ট্র গঠন করতে হবে ইন্দ্রিয়বিজয়ী প্রজাদের দ্বারা। যেহেতু, ইন্দ্রিয়জাত অনিয়ন্ত্রিত লোভ, কাম, ক্রোধ, হিংসা ইত্যাদি ন্যায়ের পরিপন্থী। আধ্যাত্মিক অনুশাসন ব্যতীত ইন্দ্রিয়বিজয়ী হওয়া সম্ভব নয়। আর ইন্দ্রিয়বিজয়ী হতে হলে জ্ঞানবৃদ্ধের সেবা করতে হবে, অনুশাসন মেনে চলতে হবে। ইন্দ্রিয়ের ওপর আধিপত্য বা নিয়ন্ত্রণ যাঁর আছে, তিনিই জ্ঞানবৃদ্ধ। সদগুরু হলেন সেই জ্ঞানবৃদ্ধ। সদগুরুর দীক্ষা নিয়ে আদর্শানুগ জীবন যাপন করতে পারলেই বিশেষ জ্ঞান লাভ হবে। জড় ও চৈতন্য (matter and spirit) বিষয়ক বিজ্ঞান জানা যাবে।
জ্ঞানবৃদ্ধ প্রদত্ত অনুশাসন পালন করে প্রকৃষ্ট জাতক বা ‘প্রজা’ সৃষ্টির প্রবহমানতাকে রক্ষা করে চলাই ছিল আর্য্য ভারতের আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্য। প্রায়োগিক বিন্যাসের ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে আমরা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছি। কোন উপলক্ষ্যই যেন সেই লক্ষ্যকে ম্লাণ করতে না পারে সে বিষয়ে রাষ্ট্র-নির্মাতাদের সচেতন করার জন্যই আমাদের এই অভিযান। নাগরিক অধিকার নিয়ে দেশের আপামর জনগণ সচেতন হলেও নাগরিক কর্তব্য পালন বিষয়ে আমরা অনেকটাই উদাসীন। ‘উত্তিষ্ঠতঃ জাগ্রত’ মন্ত্রে আবার আমাদের জেগে উঠতে হবে। ‘ভারত আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে’—সেই গন্তব্যে পাড়ি জমাতে।
গন্তব্যে পাড়ি জমাবার সোপান-পথকে আরও সুগম করে দিলেন বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। উপরোক্ত প্রাচীন সংবিধানের বিধানকে নবীকরণ করে দিলেন বিধান-বিনায়ক গ্রন্থের বাণীতে।
তোমার রাষ্ট্রই বল,
সমাজই বল,
আর, গণ-ব্যষ্টিই বল,
ধর্ম্মের ভিত্তিতে যদি তা’ গড়ে না তোল,—
আবার, সে-ধর্ম্ম যদি
বৈশিষ্ট্যপালী আপূরয়মাণ আদর্শ বা ইষ্টের
বাস্তব জীবনে জীয়ন্ত হ’য়ে না ওঠে—
প্রাজ্ঞ, পরিদর্শী, অন্বিত সার্থক সুকেন্দ্রিকতায়,
যা’ই কর আর তা’ই কর.
ঐক্য. সংহতি ও সম্বর্দ্ধনা
সুদূরপরাহত সেখানে,
আর, ধর্ম্ম মানেই হল—
সেই নীতি-বিধি জীবনে প্রতিপালন করা,—
যাতে মানুষ বাঁচে, বাড়ে
ব্যষ্টি ও সমষ্টি-সহ। ২৯
——-
সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ প্রাণী মানুষ চায় সুখে শান্তিতে বেঁচে থাকতে। শুধু মানুষ কেন, গাছপালা, পোকামাকড়, জন্তু-জানোয়ার—সবাই বেঁচে থাকতে চায়, বৃদ্ধি পেতে চায়। যে যে নিয়ম পালন করলে সুস্থভাবে বাঁচা যায়, বৃদ্ধি পাওয়া যায় সেই প্রক্রিয়ার নাম জীবনের ধর্ম পালন করা। কিন্তু বাস্তবে তো সবাই চিরকাল বেঁচে থাকতে পারে না, একদিন-না-একদিন সবকিছুর মায়া কাটিয়ে এই ধরাধাম থেকে বিদায় নিতেই হবে। এই পিণ্ডদেহ পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যাবে জেনেও, বুদ্ধিমান মানুষ অন্যায়, অধর্ম করে, বিবেক-বিরোধী কর্ম করে ধন-সম্পত্তি অর্জন করতে গিয়ে অসুখ, অশান্তিকে আবাহন করে, এটাই সবচাইতে আশ্চর্যের।
মানুষ ব্যতীত অন্যান্য প্রাণীরা সহজাত প্রবৃত্তি মাধ্যমে জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, মানুষ বুদ্ধি দ্বারা জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। অরণ্যবাসী, গুহাবাসী মানুষ একসময় কাঁচা ফলমূল, মাংস ইত্যাদি খেয়ে প্রাণ ধারণ করত। ক্রমে আগুনের ব্যবহার, পশুপালন, কৃষিকাজ শিখে আস্তানা তৈরি করে, গৃহ নির্মাণ করে ক্রমোত্তরণের সিঁড়ি বেয়ে আজকের আধুনিক যুগের সভ্যতার সভ্য হতে পেরেছে।
বেঁচে থাকার প্রশ্নে মনুষ্যেতর প্রাণীরা এই আধুনিক বৈজ্ঞানিক যুগেও প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। যেমন, পরিযায়ী পাখিরা অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে টিঁকে থাকতে নদনদী, পাহাড়, পর্বত, সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আমাদের দেশে আসে জৈবিক তাগিদ পূরণের প্রয়োজনে।—আবার ফিরে যায় ‘চরৈবেতি’-র পথ ধরে। ওদের জন্য কোন রাজনৈতিক দল, কোন সরকার, কোন সংগঠন নির্দিষ্ট রুট ম্যাপ, আশ্রয়-শিবির, খাদ্যের ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিছুই করে কি-না আমার জানা নেই। তবে আমার জানা মতে, প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে ওরা জীবন যাপন করে বলেই তেমন একটা অসুখী নয়, অকালমৃত্যুও হয় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের মত কিছু সভ্য মানুষদের অসভ্যতার জন্য ওদের সুখ-শান্তি ব্যহত হয়।
অপরপক্ষে, তথাকথিত ধর্ম পালনের নামে, ‘ভোলেবাবা পার করেগা’ ধ্বনি সহযোগে যে-সব মানুষেরা বাঁকে করে জলঘট নিয়ে বিশেষ-বিশেষ লগনে শিবালয়ের শিবলিঙ্গে জল নিবেদন করতে যান, তাঁদের সেবা দেবার জন্য প্যাণ্ডেল করে, মাইক বাজিয়ে, রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় সংগঠনগুলো কতইনা তৎপর থাকেন! শ্রাবন মাসে রাস্তার ধারে ধারে প্যাণ্ডেলে প্যাণ্ডেলে ছয়লাপ হয়ে যায়! সেবার ডালি দিয়ে কে কাকে টেক্কা দেবে সেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়! যারা চাক্ষুস করতে চান, একটু কষ্ট করে শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবার বি. টি. রোড ধরে ডানলপ থেকে ব্যারাকপুর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করলেই উপলব্ধি করতে পারবেন। শ্রীরামপুরের মাহেশের রথের মেলাতে গেলেও সেবার প্রতিযোগিতা অবলোকন করতে পারবেন। সত্যিই, না দেখলে বোঝা যেত না যে, মানুষ মানুষের জন্য কত সেবা-ই না করতে পারেন!
মানুষকে সুখে-শান্তিতে রাখার জন্য (নিন্দুকেরা বলেন, ভোট পাবার জন্য।) রাজ্য সরকার ‘দুয়ারে সরকার’-এর মাধ্যমে খয়রাতি সাহায্যের বিভিন্ন নামের প্রকল্প চালু করেছেন। তথাপিও কেন জানি সরকার সব মানুষদের সুখে, শান্তিতে রাখতে পারছেন না! অসুখ, অশান্তি, দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, হিংসা প্রভৃতি সমস্যায় জেরবার হয়ে জনগণ থানা, পুলিশ, কোর্ট, হাসপাতাল, রাজনৈতিক নেতাদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে বাধ্য হচ্ছে! এসব সমস্যার কারণ কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত প্রবৃত্তি। মানুষের দেহে বিরাজমান বন্ধুরূপী শত্রু লোভ, কাম, ক্রোধ, মদ, মোহ, মাৎসর্য ইত্যাদির লাগামহীন পরিচর্যা। সব অশান্তির মূল কারণ ষড়রিপু। সেই ষড়রিপুর মুখে লাগাম পড়াবার মতো কোন প্রকল্প রাজনৈতিক দলগুলো গ্রহণ করছে না। করতে পারলে মানুষকে সৎ-এর বা সত্তার পথে পরিচালিত করে আত্মনির্ভর হতে শেখানো যেত। মানুষকে সুখী করা যেত। লাগামহীন ভোগের চাহিদায় সুড়সুড়ি দিয়ে মানুষকে কখনোই সুখী করা যায় না। অথচ দেখুন, সুকুমার রায়ের কালজয়ী রচনা ‘রাজার অসুখ’-এর চালচুলোহীন ভিখারীটা কেমন চাহিদাশূন্য হয়ে নিজেকে রাজার চাইতেও সুখী প্রমাণ করে ছেড়েছেন।
সুখের বিপরীতে বাস করে দুঃখ। চাওয়াটা না পাওয়াই দুঃখ। সব দুঃখের কারণ কিন্তু প্রবৃত্তি-পোষণী চাহিদার বাড়বাড়ন্ত। যাকে আমরা অভাব বলতে অভ্যস্ত। হাজার চাহিদা পূরণ করেও মানুষের অভাবজনীত দুঃখ দূর করা যায় না,—যতক্ষণ না মানুষ ওই অভাবের ভাবটাকে মন থেকে তাড়িয়ে দিতে পারবে। কোন রাজার বা রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়া ছাড়াই রাজার অসুখের ভিখারিটা মন থেকে অভাবের ভাবটাকে তাড়াতে পেরেছিলেন বলেই তিনি প্রকৃত সুখী হতে পেরেছিলেন।
যাইহোক, মানুষ মানুষকে সুখী করার জন্য, সুখী দেখার জন্য এখনো ভাবে। নইলে ‘ভাল থাকবেন’ বলে যবনিকা টানতেন না আলাপচারিতার অন্তে, বিদায় লগ্নের প্রাক্কালে। ভাল থাকার ইচ্ছে আছে বলেইনা ‘হ্যাভ এ গুড ডে’, ‘সী ইউ অ্যাগেইন’ ইত্যাদি শুভেচ্ছা সম্বোধনগুলো আমরা আয়ত্ত করেছি।
সরলার্থ—সকলে সুখী হোন, নিরোগ হোন এবং শান্তি লাভ করুন, কেউ যেন দুঃখ ভোগ লাভ না করে।।
মন্ত্র সমৃদ্ধ মঙ্গলাচারণের শুভেচ্ছাবার্তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
* * *
কে চায় না? সবাই তো সুখি হতে চায়, সবাই তো শান্তি চায়, সবাই তো নীরোগ থাকতে চায়। কিন্তু অ-সুখকে পাশ কাটিয়ে সুখি কিভাবে হতে হয়, অশান্তিকে পাশ কাটিয়ে কিভাবে শান্তি পেতে হয়, দুষ্ট মনকে শিষ্ট করে কিভাবে নীরোগ থাকতে হয়, তা হয়তো সকলে জানেন না।
উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, অঋণী, অপ্রবাসী, দিনান্তে একবার যে শাকান্ন খেয়ে জীবন ধারণ করেন, সে-ই প্রকৃত সুখী। শুধু কথার কথা নয়, নবদ্বীপের পণ্ডিত রামনাথ তর্কসিদ্ধান্ত, যাঁকে সবাই বুনো রামনাথ বলে জানতেন। তিনি তো প্রয়োজনে তেঁতুলপাতার ঝোল, আর মোটা চালের ভাত খেয়েই বিনে মাইনেতে শিক্ষকতা করতেন, সংস্কৃতে গ্রন্থ রচনা করতেন, কোন দান বা খয়রাতি সাহায্য না নিয়েই বেশ নীরোগ দেহ নিয়ে সুখে, শান্তিতে জীবন কাটিয়ে বোদ্ধা সমাজে অমর হয়ে আছেন।
মহাভারতে ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা নামক পর্বাধ্যায়ে বর্ণিত সুখের বিষয়টা আরও আরও বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হয়েছে। মহাবীর অর্জুনকে যে সুখের সন্ধান দিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ, নিম্নোক্ত শ্লোক বর্ণিত জ্ঞানের মাধ্যমে।
नास्ति बुद्धिरयुक्तस्य न चायुक्तस्य भावना। न चाभावयतः शान्तिरशान्तस्य कुतः सुखम्।। 2.66।। “নাস্তি বুদ্ধিরযুক্তস্য ন চাযুক্তস্য ভাবনা।” ন চাভাবয়তঃ শান্তিরশান্তস্য কুতঃ সুখম্।। —অর্থাৎ, পরমপিতার সাথে যোগযুক্ত নয় এমন অযুক্তের বুদ্ধি হয় না, ফলে বাঁচার ভাবনা ভাবতে পারে না, শান্ত হতে পারে না, শান্তি পায় না, (কোন অবস্থায় সাম্যহারা না হওয়াই শান্তি।) আর অশান্ত যে, সে সুখের সন্ধান পাবে কোত্থেকে?
এই শ্লোকের মাধ্যমে আমরা সুখের রাজ্যে পৌঁছবার একটা সিঁড়ির সন্ধান পেলাম। বুদ্ধি থাকলেই হবে না। বুদ্ধি কোন উচ্চ আদর্শে যোগযুক্ত হলেই বাঁচার ভাবনা ভাবতে পারে, ফলে শান্ত হয়, শান্তি পায়, যার ফলে প্রকৃত সুখ আস্বাদন করতে পারেন। এথেকে বোঝা গেল যে, স্থিতধীসম্পন্ন না হলে সুখী হওয়া যায় না। স্থিতধীসম্পন্ন হতে গেলে ভালো বুদ্ধিদাতার শরণাপন্ন হতে হয়। সেই বুদ্ধিদাতা ছিলেন পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ।
আমরা, বুদ্ধিমান মানুষেরা প্রচলিত অনেক মতবাদ না মানলেও ধর্মগ্রন্থ হিসেবে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাকে কিন্তু স্বীকৃতি দিয়েছি। কোন মন্দিরে, কোন আশ্রমে নয়, কুরুক্ষেত্র নামের বিস্তৃত ধর্মক্ষেত্র প্রাঙ্গনে যার উদ্ভব। কুরু-পাণ্ডবদের রাজ্য-বিবাদ বা রাজনীতির টানাপোড়েনের চরম মীমাংসার পথ খুঁজে নেয় দুর্যোধন, যুদ্ধের মাধ্যমে। যুদ্ধ যাতে না হয় বৃষ্ণিবংশীয় শ্রীকৃষ্ণ নিজে থেকে উদ্যোগ নিয়ে মীমাংসা করার চেষ্টা করেছিলেন। পঞ্চ পাণ্ডবদের বসবাসের জন্য মাত্র ৫ খানা গ্রাম চেয়েছিলেন। রাজী হননি কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র পুত্র দুর্যোধন। পণ করেছিলেন, ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’। যার ফলস্বরূপ ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রের প্রাঙ্গনে যুদ্ধের আয়োজন হয়েছিল।
কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে যুযুধান কৌরব ও পাণ্ডব দুইপক্ষের সৈন্য সমাবেশ হয়েছে। পাণ্ডব পক্ষের প্রধান যোদ্ধা তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন, তাঁর রথের সারথী শ্রীকৃষ্ণকে উভয় পক্ষের সৈন্যদের মাঝখানে রথ স্থাপন করতে বললেন। শ্রীকৃষ্ণ রথটি চালিয়ে নিয়ে উভয় পক্ষের সৈন্যদের মাঝখানে রাখলেন। অর্জুন, কৌরব পক্ষের সেনাদলের মধ্যে পিতৃব্য, পিতামহ, আচার্য্য, মাতুল, ভ্রাতা, পুত্র, পৌত্র, শ্বশুর, মিত্র ও শুভাকাংক্ষীদের দেখতে পেয়ে, শুধু রাজত্ব ফিরে পাবার জন্য তো নয়ই, ত্রিভুবনের বিনিময়েও আপনজনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে রাজী নয়, স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন শ্রীকৃষ্ণকে। প্রমাদ গুনলেন শ্রীকৃষ্ণ। যার ওপর ভরসা করে ধর্ম সংস্থাপন করার পরিকল্পনা করেছেন, সেই মহাবীর অর্জুন কিনা শেষমেষ যুদ্ধবিমুখ! তীরে এসে তরী ডোবাতে চাইছে! পরিস্থিতি সামাল দিতে পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বর্ণাশ্রমানুগ ক্ষাত্রধর্ম পালন করতে উৎসাহিত করার জন্য বলেন, এই ঘোর সংঙ্কটময় যুদ্ধস্থলে যারা জীবনের প্রকৃত মূল্য বোঝে না, সেই সব অনার্যের মতো শোকানল তোমার হৃদয়ে কিভাবে প্রজ্জ্বলিত হল? এই ধরনের মনোভাব তোমাকে স্বর্গলোকে উন্নীত করবে না, পক্ষান্তরে তোমার সমস্ত যশরাশি বিনষ্ট করবে। এই সম্মান হানিকর ক্লীবত্বের বশবর্তী হয়ো না৷ এই ধরনের আচরণ তোমার পক্ষে অনুচিত। এই যুদ্ধে নিহত হলে তুমি স্বর্গ লাভ করবে, আর জয়ী হলে পৃথিবী ভোগ করবে৷ অতএব যুদ্ধের জন্য দৃঢ়সংকল্প হয়ে উত্থিত হও।—এইসব তত্ত্বকথা বিফল হবার পরে শ্রীকৃষ্ণ বলতে বাধ্য হলেন, আসলে তোমার বুদ্ধি বিপর্য্যয় হয়েছে বলে তুমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছ, তোমার অশান্ত হৃদয় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
যুদ্ধক্ষেত্রে রথে উপবিষ্ট হয়ে উপরোক্ত (২/৬৬) শ্লোকের মাধ্যমে দ্রোণাচার্য্য, কৃপাচার্য্য নামের বিখ্যাত শিক্ষাগুরুদের শিষ্য, মহাবীর, মহারথী, মহা-সংযমী, ব্রহ্মচারী অর্জুনকে অস্থিরবুদ্ধিসম্পন্ন বললেন, ভগবানের সাথে যোগযুক্ত নয় বলে!—ভাবা যায়! আর যোগযুক্ত হতে হলে গুরুকরণ করতে হবে। মহাবীর অর্জুনের অনেক শিক্ষাগুরু থাকলেও ইষ্টগুরু কিন্তু ছিল না।
“(ইষ্ট)গুরুই ভগবানের সাকার মূর্তি, আর তিনিই absolute (অখন্ড)।”
বর্তমান ইষ্টগুরু শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলছেনঃ
শিক্ষাগুরু থাক না অনেক
শিখো যেমন পার
ইষ্টগুরু একই কিন্তু
নিষ্টাসহ ধর।
জীবনচলনার জাগতিক বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনে যিনি বা যাঁরা সাহায্য করেন তারা হলেন শিক্ষাগুরু। পিতামাতা থেকে স্বভাব পাই বলে তাঁরা হলেন স্বভাবগুরু। আর স্থূল হতে সূক্ষ্ম, সূক্ষ্ম হতে স্থূল (matter to spirit, spirit to matter), জীবননদীর ঘুর্ণিপাক থেকে বাঁচাবার কৌশল যিনি শেখাতে পারেন অর্থাৎ অন্তর্যামীকে উপলব্ধি করাতে যিনি পারেন তিনি ইষ্টগুরু বা সদগুরু। এই গুরুই হলেন ভগবানের সাকার মূর্তি। তিনিই absolute (অখণ্ড)। ইষ্টগুরু গ্রহণ করলে মানুষ স্থিতধী হয়ে ব্যক্তিসত্তার অখণ্ড বিন্যাসকে বজায় রেখে নিজসত্তাকে উপলব্ধি করতে পারে। তখন শান্তি এবং সুখ দাস হয়ে সেবা করে। মহাবীর অর্জুন সদ্-দীক্ষার মাধ্যমে ইষ্টগুরুর সাথে যোগযুক্ত ছিলেন না বলেই শ্রীকৃষ্ণ, অর্জুনকে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা বর্ণিত অনুশাসন বা সম্যক-বিধানের মাধ্যমে প্রকৃত সুখের পথের সন্ধান দিয়েছিলেন। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যদি ধর্মগ্রন্থ হয়, তাহলে বলতে হয়, ধর্মনীতিই অর্জুনকে প্রকৃত রাজনীতি শিখিয়েছিল। তাই নয় কি?
মনুষ্য দেহধারী পরমপিতা, পুরুষোত্তম, সদগুরু, বা ভগবানের সাথে যোগযুক্ত না হয়ে যেমন ধর্ম পালন করা সম্ভব নয়, তেমনি রাজনীতি শেখাও সম্ভব নয়। সনাতন ধর্মের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ঈশ্বর এক, ধর্ম এক, প্রেরিতপুরুষগণ সেই এক-এরই বার্তাবাহী। এই তত্ত্বজ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করতে হলে শ্রীকৃষ্ণরূপী জীবন্ত সদগুরুর চিরন্তনী নিদেশ—
সর্বধর্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ॥ (গীতা ১৮ অধ্যায় ৬৬তম শ্লোক)
অর্থাৎ, জীবনকে ধারণ করার জন্য ধর্মের নামে প্রচলিত সব নীতিবিধি পরিত্যাগ করে কেবল আমার শরণাগত হও। আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করবো। এই বাণী মেনে চলতে হবে।
মানবজাতির মনুষ্যত্বের প্রবহমানতাকে সমৃদ্ধ করতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতা গ্রন্থের ৪র্থ অধ্যায়ের ৭ম থেকে ৯ম শ্লোকে সকল-যুগের সকল মনুষ্যদের জন্য এক স্পষ্ট নির্দেশিকা, গাইডলাইন দিয়ে বলেছেন—
যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভ্যূত্থান হয়, তখন আমি দুষ্কৃতকারীদের হাত থেকে সাধুদের পরিত্রাণ করতে ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে অবতীর্ণ হই। যিনি সাধনা দ্বারা আমার এই প্রকার দিব্য জন্ম ও কর্ম যথাযথভাবে জানতে পারেন, তাঁকে আর দেহত্যাগ করার পর পুণরায় জন্মগ্রহণ করতে হয় না, তিনি আমার নিত্য ধাম লাভ করেন।
উপরোক্ত বাণী সকল যুগের মানুষদের জন্য চূড়ান্ত পথ নির্দেশ। যখন যে রূপে পুরুষোত্তমের আবির্ভাব হবে, তখন সেই নররূপ পরিগ্রহকারী সর্বোত্তম পরিপূরণকারী পুরুষোত্তমের শরণাপন্ন হতে হবে, তাঁর ভজনা করতে হবে।—এই হলো প্রকৃত ধর্মের পথে চলে ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যে পৌঁছাবার সিঁড়ি, সোপান, লিফট্……. সকলের জন্য—‘নান্যপন্থাঃ বিদ্যতে হয়নায়’।
যখন যিনি পুরুষোত্তমরূপে অবতীর্ণ হন, তিনিই তখনকার সময়ের জন্য জীবন্ত বেদ, সংহিতা, পুরাণ। ওই সূত্র অনুসারে শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীস্ট, হজরত রসুল, চৈতন্যদেব, শ্রীরামকৃষ্ণদেব সকল গুরুদের গুরু সদগুরুরূপে স্বীকৃতি পান। অর্থাৎ স্থান-কাল-পরিবেশ অনুযায়ী যখন যিনি যেখানেই অবতীর্ণ হন না কেন, তাঁর মধ্যে পূর্ব পূর্ব গুরুদের জীবন্ত অনুভব করা যাবে। পূর্ববর্তীদের প্রকৃত আদর্শ খুঁজে পাওয়া যাবে। যাকে আমরা বর্তমানের সফটওয়ারের ভাষায়, অ্যাপ্লিকেশন বা অ্যাপস্-এর ভাষায় আপডেট বলি। যারমধ্যে অ্যাপ্লিকেশনের সূত্রপাত থেকে শুরু করে সর্বশেষ সংস্করণের নবীকরণের তথ্য মজুত থাকে। আমি যদি আমার মোবাইলের অ্যাপ্লিকেশনগুলো আপডেট না করি তাহলে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারব না। যারা আপডেটেড্, তারাই লক্-ডাউনের সময় অন-লাইন কাজকর্ম করে অনেক কিছু সামাল দিতে পেরেছেন। সবকিছু সামাল দিতে গেলে আপডেটেড হতে হবে সবক্ষেত্রে। ব্যাকডেটেড থেকে কিছু সামাল দেওয়া যায় না। অথচ আমরা অজ্ঞতাবশে নিজেদের ধারণ করার প্রশ্নে, অর্থাৎ ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে ব্যাকডেটেড হয়ে আছি। তাই তো বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনকূলচন্দ্র আমাদের সচেতন করে দিতে বললেন—“ভারতের অবনতি (degeneration) তখন-থেকেই আরম্ভ হয়েছে, যখন-থেকে ভারতবাসীর কাছে অমূর্ত্ত ভগবান অসীম হ’য়ে উঠেছে—ঋষি বাদ দিয়ে ঋষিবাদের উপাসনা আরম্ভ হয়েছে।
ভারত! যদি ভবিষ্যৎ-কল্যাণকে আবাহন করতে চাও, তবে সম্প্রদায়গত বিরোধ ভুলে জগতের পূর্ব্ব-পূর্ব্ব গুরুদের প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হও—আর তোমার মূর্ত্ত ও জীবন্ত গুরু বা ভগবানে আসক্ত (attached) হও,—আর তাদেরই স্বীকার কর—যারা তাঁকে ভালবাসে। কারণ, পূর্ব্ববর্তীকে অধিকার করিয়াই পরবর্ত্তীর আবির্ভাব।” (সত্যানুসরণ)
কথাপ্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনকূলচন্দ্র বললেন—“বর্ত্তমান যিনি, তাঁকে ধরলেই তাঁর মধ্যে সব পাওয়া যায়। ………. রামচন্দ্রকে যে ভালবাসে সে যদি শ্রীকৃষ্ণকে না ধরে তবে বুঝতে হবে তার রামচন্দ্রেও ভালবাসা নেই, ভালবাসা আছে তার নিজস্ব সংস্কারে।”
(আঃ প্রঃ ২১ খণ্ড, ইং তাং ৩১-১২-১৯৫২)
* * *
ইষ্টগুরু নিদেশিত সদাচার এবং বর্ণাশ্রমধর্মকে অগ্রাহ্য করে তথাকথিত ধার্মিক হতে চাওয়া সখা অর্জুনকে প্রকৃত ধার্মিকে রূপান্তরিত করার জন্য পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ অর্জুন বিষাদ যোগ, সাংখ্য যোগ, কর্ম যোগ, জ্ঞান-কর্ম-সন্ন্যাস যোগ, কর্ম-সন্ন্যাস যোগ, আত্ম-সংযম যোগ, জ্ঞান-বিজ্ঞান যোগ, অক্ষর-পরব্রহ্ম যোগ, রাজ-বিদ্যা-রাজ-গুহ্য যোগ, বিভূতি যোগ, বিশ্বরূপ-দর্শন যোগ, ভক্তি যোগ, ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ-বিভাগ যোগ, গুণত্রয়-বিভাগ যোগ, পুরুষোত্তম যোগ, দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগ যোগ, শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ যোগ ও মোক্ষ-সন্ন্যাস যোগ ইত্যাদি নামাঙ্কিত অষ্টাদশ প্রকৃতির যোগ-এর সাহায্যে পরমাত্মিক শক্তির সাথে যোগযুক্ত করেন।
মহাবীর অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে সখাজ্ঞানে ভালবাসতেন, ভরসা করতেন, কিন্তু তাঁর ‘মানুষীতনুআশ্রিতম্ ভূত-মহেশ্বর’ রূপের পরিচয়, পুরুষোত্তমীয় শক্তির পরিচয় তিনি অনুভব করতে পারেন নি। অনুভব যদি করতে পারতেন, পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণকে তাঁর রথের সারথী হতে বলতে পারতেন না। আর তিনি যদি অর্জুনের সারথী না হতেন, আমরা, জগৎ-সারথী প্রোক্ত সুখে-শান্তিতে বেঁচে থাকার চাবিকাঠি-স্বরূপ মানব জীবনের প্রকৃত সংবিধান শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পেতাম না। তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার জ্ঞান পেয়ে শ্রীকৃষ্ণকে ইষ্টগুরু রূপে বরণ করে তাঁর আদর্শ মেনে কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। ক্ষাত্র জনোচিত স্বধর্ম বা বৃত্তিধর্ম পালন করে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন। জয়লাভ করতে পেরেছিলেন জীবনযুদ্ধে—বর্ণাশ্রমধর্ম মেনে। তাইতো শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রার্থনা মন্ত্রে “সদাচারা বর্ণাশ্রমানুগজীবনবর্দ্ধনা নিত্যং পালনীয়াঃ।” মেনে চলতে নিদেশ দিলেন। অতএব, প্রবৃত্তিপরায়ণতার বুদ্ধি যতক্ষণ না ইষ্টগুরুর আদর্শের সাথে যোগযুক্ত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত সুখি হওয়া যে সম্ভব নয় তা প্রমাণিত সত্য, যদি শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা গ্রন্থকে আমরা মান্য করি।
* * *
সম্মানীয় পাঠক, এতক্ষণে বেশ বিরক্ত হয়েছেন বুঝতে পারছি। হয়তো ভাবছেন, রাজনীতির কথা বলতে গিয়ে আমি ধর্মচর্চা শুরু করে দিয়েছি! ধর্ম আর রাজনীতিকে এক করে ফেলতে চাইছি!
আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যদি ধর্মগ্রন্থ হয়, তাহলে তার উৎপত্তি কি রাজনীতিকে কেন্দ্র করে নয়? কৌরব-পাণ্ডবদের রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্যই তো কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হয়েছিল। ওই যুদ্ধক্ষেত্রকে কেন্দ্র করেই তো শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার উৎপত্তি। আবার ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনকে যদি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বলে মানেন, সেই রাজনীতির প্রেরণা ছিল শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার আদর্শ। ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ-এর বন্দে মাতরম্ স্তোত্র-ও কিন্তু শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার আদর্শের অনুসরণে সৃষ্টি হয়েছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবীদের কাছে একটা করে গীতা গ্রন্থ থাকত। তাই, ধর্ম ও রাজনীতি নিয়ে নতুন করে রাজনীতি করার পূর্বে একটু ভেবেচিন্তে করাটাই ভাল।
ভুললে চলবে না যে, ‘‘কর্ম্মণ্যেবাধিকারেস্তু মা ফলেষু কদাচন।…….’’ ––কর্মেই তোমার অধিকার ফলে নয়। ––শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই বাণীর অনুপ্রেরণায় নবযুগের অভিমন্যু ক্ষুদিরাম, দেশরক্ষার ধর্ম পালন করতে গিয়ে ফাঁসির আসামী হয়েছিলেন। ‘‘ন জায়তে ম্রিয়তে কদাচিৎ…….বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়………নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ।…….’’। …… ইত্যাদি ইত্যাদি বাণীর অমৃত আদর্শে স্থিতপ্রজ্ঞ, মৃত্যুঞ্জয়ী ক্ষুদিরাম হাসিমুখে ফাঁসির দড়ির মালা পড়েছিলেন গলায়। একটা ক্ষুদিরামের আত্মাহুতি জন্ম দিয়েছিল হাজারো ক্ষুদিরামের। ফাঁসির রজ্জু আর ইংরেজ রাজশক্তির বুলেটের আলিঙ্গনে জীবনের জয়গান গাইতে গাইতে অকালে হাসিমুখে বিদায় নিয়েছিল আর্য্য ভারতের উত্তরাধিকারের স্বপ্নদেখা কতশত বীর ভারত-সন্তানেরা। অবশেষে একদিন গ্যালন গ্যালন রক্তের বিনিময়ে আমরা ফিরে পেয়েছিলাম আমাদের জাতীয় উত্তরাধিকার। অপূর্ণ, খণ্ডিত। তথাকথিত ধর্মের সুড়সুড়িতে দ্বিজাতি-তত্ত্বের ভিত্তিতে অখণ্ড ভারতবর্ষ হিন্দুস্তান, পাকিস্তান আখ্যা পেয়েছিল। কিন্তু পূর্ব পশ্চিমে প্রসারিত ভারতমাতার কর্তিত দুটো বাহুর ক্ষত আজও শুকলো না। সৃষ্ট হলো জাতীয় ম্যালিগন্যাণ্ট সমস্যার। সব কিছুর কারণ কিন্তু ধর্মকে আড়াল করে ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতাকে প্রাধান্য দেওয়া।
* * *
যারা পলিটিক্স নিয়ে মাথা ঘামান, তাদের জেনে রাখা উচিত, পলিটিক্স-এর প্রকৃত মর্ম।-
‘পলিটিক্স মানেই—
পূর্ত্তনীতি বা পূর্য্যনীতি
অর্থাৎ, যে-সৎনীতির অনুশাসন ও অনুসরণে
পূরণ ও পালন করা যায়—
এবং বিরুদ্ধকে আবৃত করে
নিরোধ করা যায়—
এ ব্যষ্টিতেও যেমন, সমষ্টিতেও তেমনি;
আর, যাতে তা হয় নাকো—
তা পূর্ত্তনীতি বা পূর্য্যনীতি নয়।’ (শাশ্বতী, বাণীসংখ্যা ১৭৫)
উপরোক্ত বাণী থেকে জানা গেল, পলিটিক্স বা রাজনীতি মানে পূর্তনীতি—সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির পথে চলার নীতি। যে নীতি সকলের অভাব পূরণ করে, সবাইকে অভীষ্ট মঙ্গল প্রতিষ্ঠায় পোষণ দিয়ে সব্বাইকে প্রীতির বাঁধনে আবদ্ধ করে সংহতির প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ, সেই নীতির নাম রাজনীতি। সবাইকে প্রীতির বাঁধনে বাঁধতে গেলে একটা উচ্চ জীবন্ত-আদর্শ থাকতে হবে। সেই আদর্শের অভাব বলেই আজ রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির বাসা! যারা জনগণের সেবা করবেন সেই জন প্রতিনিধিদের সেবা করার জন্য, মন্ত্রীদের সেবা করার জন্য, নিরাপত্তার দেবার জন্য যদি রাজকোষ থেকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হয়! তাহলে কি জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগনের শাসন প্রক্রিয়ায় একটা প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিচ্ছে না! যিনি জনগণের সেবা করবেন তিনি যদি সবসময় নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থাকতে অভ্যস্ত হন, তাহলে অন্যদের নিরাপত্তা দেবেন কিভাবে? সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা উপলব্ধি করবেন কিভাবে? যেমন ধরুন, রেলমন্ত্রী যদি নিরাপত্তার ঘেরাটোপ ছেড়ে, ছদ্মবেশে সাধারণ যাত্রী সেজে মাঝে মাঝে সাধারণ ট্রেনগুলোতে যাতায়াত করতে পারেন, তাহলে প্রকৃত সমস্যা উপলব্ধি করে সমস্যার বাস্তব সমাধান করতে পারবেন। তবে সমস্যা কিন্তু বিরাজ করছে আমাদের শাসন-সংহিতায়। যোগ্য মানুষকে যোগ্য স্থানে কাজে লাগাবার ব্যবস্থা আমাদের সংবিধানে যদি থাকত, তাহলে যোগ্যতার মাপকাঠিতে মন্ত্রী করা হতো। যেমন, রেলের চৌহদ্দি সম্পর্কে যার কোন ধারণা নেই, রেলের টেকনোলজির সাথে যার কোন পরিচয় নেই, তিনি হয়ে যান রেলমন্ত্রী! শরীর বিদ্যা, চিকিৎসা বিদ্যার সাথে যার পরিচয় নেই, তিনি হয়ে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী! অথচ একজন সাধারণ নাগরিককে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রেল বিভাগে, স্বাস্থ্য বিভাগে নিয়োগ করা হয়! (নিয়োগ দুর্নীতি ব্যতীত।) আবার নির্বাচন কমিশন পুণর্নিবাচন, উপ-নির্বাচনের নামে দেশের অনেক অর্থ অপচয় করেন। ফলে সত্যমেব জয়তে-এর নীতিবাক্য বাস্তবে বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে!
নির্বাচন কমিশনের হাতে সব ধরণের ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার থাকা সত্বেও সঠিক নির্বাচন করাতে না পারাটাও তো অক্ষমতার পরিচয়! আর উপ-নির্বাচনের ক্ষেত্রে অক্টোবর ২০২১-এ অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গের একটা উপ-নির্বাচনের উদাহরণ দিলে জিনিসটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। যেমন, খড়দহ বিধানসভার প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে উপ-নির্বাচন হবে, তারজন্য কালীঘাটের বিধায়ককে পদত্যাগ করিয়ে তাকে খড়দহে প্রার্থী করা হলো, কালীঘাটে আর একটা উপ-নির্বাচন করানো হলো! আবার হবে, যে-সব বিধায়কদের পদত্যাগ করিয়ে ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী করা হবে, সেইসব শূন্যস্থান পূর্ণ করতে আবার উপ-নির্বাচন করা হবে! এই যে, নিষ্প্রয়োজনে, উপ-নির্বাচনের নিমিত্ত ব্যয়ভার বহন করা হয়, অর্থ অপচয় করা হয়, সেটা কি ‘‘Of the people, by the people, for the people—জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন।’’ ব্যবস্থার সদর্থক উদাহরণ হতে পারে?—এর জবাব কে দেবে?
* * *
‘মেরা ভারত মহান’ শ্লোগান দিতে যে-সব দেশপ্রেমী জন-প্রতিনিধিরা গর্ব বোধ করেন, প্রাচীন ভারতের শাসনতন্ত্র প্রসঙ্গে তাঁদের একটু জেনে রাখা ভাল।
প্রাচীন ভারতের শাসনতন্ত্র প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলছেন—আর্য্যদের যে কী জিনিস ছিলো তা’ কল্পনায়ই আনা যায় না। Cabinet formed (মন্ত্রীপরিষদ গঠন) হ’ত বিপ্র, ক্ষত্রিয়, বৈশ্যদের প্রধানদের নিয়ে। প্রধানের প্রধান, তাদের প্রধান, এইরকমভাবে একটা সুন্দর gradation (পর্য্যায়) ছিলো। যারা যত বেশীকে পূরণ করতো তারা তত বড় প্রধান। প্রধান মন্ত্রী সর্ব্বদা ঠিক হ’য়েই থাকতো, উপযুক্ত লোক নির্ব্বাচন নিয়ে কোন গণ্ডগোল উপস্থিত হ’তো না। অন্যদেশ ভারতবর্ষকে আক্রমণ করার সাহসই পেতো না। সব জাতটা দারুণ compact (সংহত) থাকতো। অনুলোম বিয়ে থাকার দরুন সারা জাতটা যেন দানা বেঁধে থাকতো, আর এতে evolution–এর (ক্রমোন্নতির) সুবিধা হ’তো—যথাক্রমে পাঁচ, সাত ও চৌদ্দপুরুষ ধরে ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের ভিতর যদি Brahmanic instinct (ব্রহ্মণ্য-সংস্কার) দেখা যেতো—তাদের বিপ্র ক’রে দেওয়া হ’তো। উন্নতির পথ সব দিক থেকে খোলা ছিল। আগের কালে টাকা দিয়ে একজনের সামাজিক position (অবস্থান) ঠিক করা হ’তো না। কারও হয়তো ৫০ লাখ টাকা আছে, কিন্তু কেউ হয়তো পাঁচ টাকায় সংসার চালাচ্ছে—অথচ instinct (সহজাত-সংস্কার) বড়—সে-ই বড় ব’লে গণ্য হ’তো। Instinct, habit, behaviour, activity (সংস্কার, অভ্যাস, ব্যবহার ও কর্ম)—এইগুলিই ছিল মাপকাঠি। Learning (লেখাপড়া)-কে কখনও শিক্ষা বলা হ’তো না। চরিত্রগত না হ’লে তথাকথিত পাণ্ডিত্যের কোন মূল্য দেওয়া হ’তো না। সব সময় লক্ষ্য ছিল—জ্ঞান, গুণ যাতে জন্মগত সংস্কার ও সম্পদে পরিণত হয়। বর্ণাশ্রমধর্ম্ম এত সূক্ষ্ম, উন্নত ও বৈজ্ঞানিক ব্যাপার যে অনেকে এর অন্তর্নিহিত তথ্য বুঝতে না পেরে একে বৈষম্যমূলক বলে মনে করে—এর চেয়ে বড় ভুল আর নেই। যারা বিজ্ঞানসম্মত বর্ণাশ্রমধর্ম্মকে বিপর্য্যস্ত করবার উদ্দেশ্যে generous pose (উদারতার ভঙ্গী) নিয়ে inferior (অসমর্থ)-দের ক্ষেপিয়ে তোলে, তারা সমাজের মহাশত্রু। শ্রীরামচন্দ্র শম্বুকের প্রতি কঠোর হয়েছিলেন—কারণ, শম্বুকের movement (আন্দোলন)-টা বর্ণাশ্রম-ধর্ম্মের বিরুদ্ধে একটা passionate raid (প্রবৃত্তি-প্ররোচিত অভিযান) বই আর-কিছু নয়। (আলোচনা প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড, ৩২শে জৈষ্ঠ্য, বৃহস্পতিবার, ১৩৪৬, ইং ১৫। ৬। ১৯৩৯)
* * *
ইদানীংকালে ভারতের রাজনীতির অঙ্গন ‘রাম’ নামের জয়ধ্বনিতে মুখরিত। রামমন্দিরে রামলালার প্রাণ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে আমরা ভারতীয় প্রজাগণ আর্য্যকৃষ্টির রামরাজত্বকে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। এবার তাহলে অসৎ-নিরোধী তৎপরতার সাথে দুর্নীতিপরায়ণ রাবনদের বিনাশ করা সম্ভব হবে। সেই রামচন্দ্রের রাজ্য শাসন প্রণালী সম্পর্কে সামান্য কিছু কথা জেনে নিলে পাঠক অনেকটাই সমৃদ্ধ হবেন আশাকরি।
বনবাসে থাকার সময় রামচন্দ্র ভরতকে রাজকার্য পরিচালনা বিষয়ে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন—“….. তুমি গুণী ও যোগ্য ব্যক্তিকে বহু-মান প্রদর্শন করে থাক তো? বীর, বিদ্বান, জিতেন্দ্রিয়, সদ্বংশজ, ইঙ্গিতজ্ঞ লোকদের মন্ত্রীপদে প্রতিষ্ঠিত করেছ তো? তুমি তাদের সঙ্গে মন্ত্রণা কর তো? তোমাদের মন্ত্রণা লোকের মধ্যে প্রকাশ হয়ে পড়ে না তো? তুমি যথাসময়ে শয্যাত্যাগ কর তো? রাত্রিশেষে অর্থলাভের চিন্তা কর তো? তুমি সহস্র মূর্খ পরিত্যাগ করেও একজন বিদ্বানকে সংগ্রহ করতে চেষ্টা কর তো? অযোগ্য লোককে যোগ্যস্থানে ও যোগ্য লোককে অযোগ্য স্থানে নিয়োগ কর না তো? যে-সব অমাত্য উৎকোচ গ্রহণ করেন না, যাদের পিতৃপুরুষ যোগ্যতার সঙ্গে অমাত্যের কাজ করেছেন, যারা ভিতরে-বাইরে পবিত্র—সেই সব শ্রেষ্ঠ অমাত্যকে শ্রেষ্ঠ কাজে নিযুক্ত করেছ তো? রাজ্যমধ্যে কোন প্রজা অযথা উৎপীড়িত হয় না তো? শত্রুকে পরাস্ত করতে পটু সাহসী, বিপৎকালে ধৈর্য্যশালী, বুদ্ধিমান, সৎকুলজাত, শুদ্ধাচারী, অনুরক্ত ব্যক্তিকে সেনাপতি করেছ তো? বিশেষ নৈপুণ্য যাদের আছে, তাদের তুমি পুরস্কৃত ও সম্মানিত করে থাক তো? প্রত্যেকের প্রাপ্য বেতন সময়মত দিয়ে থাক তো? রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তিবর্গ তোমার প্রতি অনুরক্ত আছেন তো? তোমার কার্য্যসিদ্ধির জন্য তাঁরা মিলিত হয়ে প্রাণ পর্য্যন্ত দিতে প্রস্তুত আছেন তো? বিদ্বান, প্রত্যুৎপন্নমতি, বিচক্ষণ এবং তোমার জনপদের অধিবাসীকেই দৌত্যকার্য্যে নিযুক্ত করেছ তো? স্বরাজ্যে ও পররাজ্যে প্রধান-প্রধান পদের অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের সম্বন্ধে জ্ঞাতব্য সংবাদ চরগণদ্বারা অবগত থাক তো? চরগণ পরস্পর-বিরোধী তথ্য পরিবেষণ করলে তার কারণ নির্ণয় করে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা করে থাক তো? প্রজাগণ সুখে আছে তো? তারা দিন-দিন স্ব-স্ব কর্ম করে সমৃদ্ধ হচ্ছে তো? তোমার আয় বেশী, ব্যয় কম হচ্ছে তো? ধনাগার অর্থশূন্য হচ্ছে না তো? অপরাধীদের ধনলোভে ছেড়ে দেওয়া হয় না তো? তুমি সাম, দান, ভেদ ও দণ্ডের প্রয়োগ যথাস্থানে করে থাক তো? তুমি ইন্দ্রিয়গণকে জয় করতে সচেষ্ট থাক তো? অগ্নি, জল, ব্যাধি, দুর্ভিক্ষ ও মড়ক এই পাঁচ রকমের দৈববিপদের প্রতিকারের জন্য তুমি যত্নশীল থাক তো? সন্ধি-বিগ্রহাদি যথাস্থানে প্রয়োগ কর তো?… ইত্যাদি ইত্যাদি। (আঃ প্রঃ ৫ম খণ্ড, ইং তাং ২-৪-১৯৪৪)
উপরোক্ত বাণী-সংহিতাগুলো রাম রাজত্বের অনুশাসনবাদের কিয়দংশ মাত্র। তাই রাম-রাজত্ব প্রতিষ্ঠা-পিয়াসী জন-প্রতিনিধিদের উচিত হবে, রামচন্দ্রের সভার ন্যায় একজন আদর্শ সভাসদরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। এবং তা’ বাস্তবায়িত করতে হলে, আদর্শ প্রজাপালকের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। সরকারী কোষাগার থেকে সাধারণভাবে বেঁচে থাকার প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা যাবে না। শুনেছি, শ্রীরামচন্দ্রের শ্বশ্রুপিতা রাজর্ষি জনক নিজের জীবন ধারণের জন্য রাজকোষ থেকে এক কপর্দকও গ্রহণ করতেন না। বর্তমান শাসনতন্ত্রের পরিকাঠামো অনুযায়ী জন-প্রতিনিধিদের জন্য বরাদ্দ সুবিধা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে রাম-রাজত্ব প্রতিষ্ঠার চিন্তা অধরাই থেকে যাবে। জনগণকে স্ব স্ব আত্মমর্যাদায় সুখে রাখতে হলে জন-প্রতিনিধিগণদের বিলাস-ব্যসন সুখ-সুবিধার কথা ভুলতে হবে, নীতিপরায়ণ হতে হবে, সর্বোপরি যথার্থ ধার্মিক হতে হবে। সেদিকে দৃষ্টি দিলে তবে কাজের কাজ কিছুটা হবে। স্বমহিমায় বিরাজমান থাকবে ‘সত্যমেব জয়তে’-এর জাতীয় নীতি।
ভারতবর্ষের রাষ্ট্র ব্যবস্থার গৌরবের প্রবহমানতাকে রক্ষা করতে হলে উপরোক্ত ওই বিধানসমূহকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।
* * *
রাষ্ট্রীয়ভাবে সাম্য, মৈত্রী ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য যুগ-পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর অনুগামীদের বললেন, “কখনও নিন্দা কর না, কিন্তু অসত্যের প্রশ্রয় দিও না। নিন্দা করতে হয় তো করবে সাক্ষাতে।”
অর্থাৎ, অস্তিত্ব ধ্বংসকারী লোককে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না, অথচ তার সম্পর্কে অন্যের কাছে নিন্দাও করা যাবে না। এই দুই এর মধ্যে এক মিলনসেতু রচনা করে বিরোধহীন দুর্বার নিরোধ গড়ে তুলতে বললেন। আর যদি এড়িয়ে, গা বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করি তা হলেও বিপদ। “তুমি তোমার, নিজ পরিবারের, দেশের ও দশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দায়ী।”—বাণীর মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতি রক্ষার দায়িত্ব দিয়ে দিলেন। অথচ, বাস্তবে, সমাজ ও রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতি রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত জনপ্রতিনিধিগণদের প্রচারের মাধ্যমে, মিটিং-মিছিলে, আলোচনায় নিন্দামন্দের প্রতিযোগিতা দেখতে এবং শুনতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। নিন্দা-মন্দ ছাড়া, তারা যেন কথা বলতেও শেখেনি। “নিন্দা-কুৎসা ক’রে কা’রও/হয় না শুভ অনুষ্ঠান,/মিষ্টি কথায় শিষ্ট চালই/উদ্বোধনার উপাদান।”—এই শিক্ষা যার আছে, তিনি কখনও নিন্দার আশ্রয় গ্রহণ করবেন না। নীতিহীন রাজনীতির টানাপোড়েনে, পারস্পরিক নিন্দা-মন্দ দিয়ে আক্রমণের ফলে উত্তরোত্তর সামাজিক অবক্ষয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর অবসান কি প্রয়োজন নেই ?
রাজনীতির ভিত্তি হ’ল ধৰ্ম্ম। ধর্ম্মের ভিত্তি হ’ল আদর্শ। আদর্শ থেকে
আসে কৃষ্টি। রাজনীতির ভিত্তি যদি ধৰ্ম্ম না হয়, তবে ধৰ্ম্মও থাকে না, কৃষ্টিও থাকে
না। প্রবৃত্তি শাসন করে। ব্রাহ্মণ ছিল রাষ্ট্রশাসনের বাইরে। প্রীতি-অবদান ছিল তাদের জীবিকা। চাকরী করলে এদের পাতিত্য হ’তো, কারণ এরা জনতার স্বাভাবিক প্রতিনিধি। আপনারা যদি এখনও না লাগেন তবে আপনি তো কষ্ট পাচ্ছেনই, আপনার থেকে inferior (হীন) যারা তারা শেষ হ’য়ে যাবে। আপনাকেও রেহাই দেবে না। আমরা প্রবৃত্তিতে অভিভূত হ’য়ে থাকি, কিন্তু সত্য যা, সত্তাপোষণী যা, তা’ করি না। আপনার যেমন টাইফয়েড হয়েছিল। তা কি আপনি চান? সামগ্রিক জীবনের ক্ষেত্রে আমাদের তেমনি টাইফয়েড ধ’রে আছে। অথচ তা’ থেকে রেহাই পাবার জন্য কোন চেষ্টা করছেন না। মৃত্যুকে যদি ভালবাসি, তবে জীবন পাব কি করে? অন্যায়ের প্রতি যদি হিংস্র না হই, তবে জীবনের প্রতি অহিংস হওয়া হবে না। আর, এই মরণ-নেশা ও সৎ-বিমুখতা শুধু আমাদিগেতেই নিবদ্ধ থাকে না, আমাদের পরবর্তী বংশধরেরাও affected (ক্ষতিগ্রস্ত) হয়। (আঃ প্রঃ খণ্ড ২১, পৃঃ ২২৩)
* * *
রাজনীতি বলে তা’য়
পূরণ-পোষণ প্রীতিচর্য্যায়
সংহতি আনে যা’য়।
রাজশক্তি হাতে পেয়েও
সতের পীড়ক যা’রাই হয়,
দেশকে মারে নিজেও মরে
রাষ্ট্রে আনে তারাই ক্ষয়।
লোকরঞ্জনী চর্য্যানীতি
স্বতঃস্রবা ব্যক্তিত্বে যা’র,
রাজনীতিজ্ঞ তা’কেই জানিস,
সাত্বত চৰ্য্যায় লক্ষ্য তা’র । ১।
রাজনীতির যা’রা বড়াই করে
অথচ জানে না ধর্মনীতি,
অপকর্ষী সে-সব নেতার
অপদম্ভ ঘটায় ভীতি । ২ ।
মত যদি তুই বাস্তবতায়
সত্তাসিদ্ধ করলি না,
মত কিন্তু মতই র’ল
অর্থে তা’কে আনলি না ৩।
থাকলে আদর্শে ব্যতিক্রম
জাতির ঘটায় মতিবিভ্রম। ৪ ।
নেতা যেথায় সাত্বত নয়,
সাত্বত স্বার্থ করেই ক্ষয়। ৫ ।
নেতার রইলে কু-ঊর্জ্জন,
ক্ষয়েই চলে দেশ ও জন । ৬।
আদর্শ না হ’লে মহৎ-শিষ্ট,
করেই জাতিকে কুট-নিকৃষ্ট । ৭।
শিষ্ট সঙ্গতি সমৃদ্ধ না হলে—
সেই আদর্শে কুফল ফলে । ৮।
আক্রোশদুষ্ট আদর্শ যে ধরে,
জাতি ও জন সে বসে করে। ৯ ।
পালন-পোষণ-চৰ্য্যাবিহীন
আদর্শ দেশকে করেই যে দীন । ১০।
অসৎ ধাওয়া, অসৎ পাওয়া,
অসৎ করায় বাহাদুরি,
ছারেখারে দেশটা পোড়ে
সত্তা-বিভব হরণ করি’। ১১।
(অনুশ্রুতি, ৪র্থ খণ্ড, রাজনীতি)
উপরোক্ত নিদেশ-বাণীর বাস্তবায়ন ব্যতীত রাজনীতিকে সার্থক করা প্রায় অসম্ভব!
এবার, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্ররাজনীতির ব্যর্থতা প্রসঙ্গে ইংরেজী ভাষায় কি বললেন একটু জেনে নেওয়া যাক।—
POLITICS WEEPS ALONG
When the sufferers, the distressed
and the misfortunated
are not managed
to get rid of
the heinous, foul breathing of evil
by the service and solace of the noble,
and are not obliged by them—
Politics weeps along !
(THE MESSAGE, VOL. I, by Shree Shree Thakur Anukulchandra)
* * *
যাঁরা ধর্ম ও রাজনীতি নিয়ে প্রচার মাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করেন তাঁদের জেনে রাখা উচিত, গণপ্রজাতন্ত্রী আধুনিক ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভের ধর্মচক্র আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ধর্মকে রক্ষা করে চলার কর্তব্যকে। আমাদের রাষ্ট্রীয় মন্ত্র মূণ্ডক উপনিষদ থেকে প্রাপ্ত ‘সত্যমেব জয়তে’ স্মরণ করিয়ে দেয় উপনিষদীয় আচার্য্য অনুসরণের শাশ্বত অবলম্বনকে। রাষ্ট্রের কর্ণধার রাষ্ট্রপতিসহ মন্ত্রীবর্গ প্রত্যেকেই ঈশ্বরের নামে শপথ গ্রহণ করে, ঈশ্বরের প্রতিভূ জীবগণের কল্যাণ সাধনে ব্রতী হয়। ঈশ্বরের প্রতিনিধি স্বরূপ জাগতিক ন্যায়দণ্ডধারী বিচারকেরা ধর্মাধিকরণ পরিচয়ে বন্দিত। বিচারালয়কে বলা হয় ন্যায়ালয় বা ধর্মস্থান। এ থেকে বোঝা গেল, ন্যায় এবং ধর্ম দুটি শব্দ সমার্থক।
ভারতীয় রাজনীতির অনুশাসনের সাম, দান, ন্যায়, দণ্ড, নীতি ও ভেদ-এর রাজধর্ম রক্ষার পবিত্র কর্তব্যে যা’তে এতটুকু অন্যায়, অধর্ম প্রবেশ করতে না পারে তার জন্যই ওইসব মহাভারতীয় নীতির অনুসরণ। বিধিবৎ প্রকৃষ্ট-জাতক সৃষ্টি করে প্রজা পালনের স্বার্থেই ওই অনুশাসনকে আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে প্রজাপালনের পবিত্র দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাজনৈতিক দলেরা। সেই সুবাদে রাজনৈতিক দলের জন-প্রতিনিধিরা নিজেদের দেশসেবক বলে পরিচয় দেন। ভোটে জিতে দেশ সেবার অধিকার অর্জনের প্রতিযোগিতায় জিততে অনেক রাজনৈতিক দল আবার হিংসার আশ্রয় নেয়, রক্ত ঝরে, জনগণ ঘরছাড়া হয়! এ ধরণের নোংরা রাজনীতির অপসারণের জন্যই আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
দেশের সেবা করতে হলে প্রথমেই যুগ পুরুষোত্তমের আদর্শ অনুযায়ী ব্যক্তি-চরিত্র নির্মাণের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। ভালো মানুষ জন্মাতে হবে। ভালো মানুষ যদি না জন্মায়, দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশের ভালো করবে কারা? রাষ্ট্রীয় পর্যবেক্ষণে এবং পৃষ্ঠপোষকতায় যে বিধি মেনে, ভালো ফসল, ভালো ফল, ভালো গোরু, ভালো কুকুর জন্মানো হয়, মানুষের ক্ষেত্রে সেই বিধিকে অগ্রাহ্য করছে ভারতের সংবিধান! ২১ বছরের ছেলে হলেই ১৮ বছরের ঊর্দ্ধের মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে! জাতি, বর্ণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্বভাব-অভ্যাস-ব্যবহার ইত্যাদি কোন কিছুর উপর গুরুত্ব দেওয়া হয় না! আমাদের রাষ্ট্রিয় কর্ণধারেরা অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার বোর্ড-এর মাধ্যমে উন্নত প্রজাতির পশু প্রজননের ওপর গুরুত্ব দিলেও সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ন পর্ষদ মানুষের উন্নত প্রজাতি সৃষ্টি বিষয়ে উদাসীন! উদাসীন যদি না হতেন, তাহলে মানুষ জন্মানোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানীদের পরামর্শ উপেক্ষা করতে পারতেন না!
ভারতের আর্য্যকৃষ্টিতে বর্ণিত বিবাহ ও সুপ্রজনন বিধির সঠিক প্রয়োগ ব্যতীত উন্নত মানের মানুষ জন্মানো কিছুতেই যে সম্ভব নয়, তার সমর্থনে যুগ-পুরুষোত্তম ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মনীষীদের কিছু মতবাদ উদ্ধৃত করলাম,—মানবসম্পদ উন্নয়ন পর্ষদ সহ জীবনপিয়াসী মানুষদের উদ্দেশ্যে।
।। বিবাহ ও সুপ্রজনন বিষয়ে প্রাথমিক পাঠ ।।
আর্য্যকৃষ্টি অনুসারে বিবাহ যৌবনের সংস্কার। ভারতীয় আশ্রমধর্ম অনুযায়ী কৃতি ব্রহ্মচারী স্নাতকেরাই এই সংস্কারের অধিকারী হতেন। উদ্বাহ করে গার্হস্থ্য আশ্রমে প্রবেশ করতেন। বিবাহ করে নারী, পুরুষ করে উদ্বাহ। একজন আদর্শ নারী বধূরূপে স্বামীর সত্তাকে বহন করে যৌন জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। রত্নগর্ভা হয়ে স্বামীর বংশধারাকে করে উন্নত। একজন আদর্শ স্বামী আচার্য্য অনুসরণে গৃহ, সমাজ ও রাষ্ট্রের সত্তাসম্বর্দ্ধনার চাহিদা করে পূর্ণ। শিব-পার্বতির দাম্পত্য জীবন যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
“ইষ্ট টানে ছুটলে পুরুষ
প্রজ্ঞা অনুপমা
… স্বামীর ঝোঁকে ছুটলে নারী
শ্রেষ্ঠ ছেলের মা।”
(শ্রীশ্রীঠাকুর)
বিবাহের বন্ধনকে সার্থক করতে হলে বর্ণ, বংশ, চরিত্র, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাত্স্যায়ন শ্রেণী বৈশিষ্ট্য এবং বয়সের সামঞ্জস্য অনুযায়ী পাত্রপাত্রী নির্বাচন করতে হয়। এবং খেয়াল রাখতে হবে পাত্রী যেন উল্লেখিত যোগ্যতায় পাত্রকে অতিক্রম না করে। প্রচলিত ধারণার বশবর্তী হয়ে লেনদেন, চাকুরি এবং জাগতিক প্রতিষ্ঠার বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিলে শোভন ও মনোবিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পাত্রপাত্রী নির্বাচন সম্ভব হয় না।
ভারতীয় বিবাহ ব্যবস্থায় পণের কোন স্থান নেই। যেহেতু ‘বর’ মানে বরিষ্ঠ, ‘কনে’ মানে কনিষ্ঠ। স্বাভাবিক নিয়মে বড় হয় দাতা, ছোট গ্রহীতা। অতএব পণ দেবার ক্ষমতাসম্পন্ন পাত্রী কখনই কনিষ্ঠ হতে পারে না। আর পণভূক স্বামীকে কোন স্ত্রী শ্রদ্ধা করতে পারবে না। শ্রদ্ধাহারা স্ত্রী সুসন্তানের জননী হতে পারবে না। ফলে দাম্পত্য অসুখে ভুগতে হবে সারা জীবন । সন্তান হবে সমতান হারা। ফলে ডাক্তার, উকিল, পুলিশ এবং দাদাদের ক্রীড়নক হয়ে চলতে হবে।
শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন, “বিয়ের প্রথম উদ্দেশ্যই হ’লো genetic enrichment ( জননগত সমৃদ্ধি)। এইটে হ’ল first and foremost (প্রথম এবং প্রধান)। তার পরের জিনিস হ’ল cultural enrichment (কৃষ্টিগত সমৃদ্ধি)। তাই বর-কনের বংশগত ও ব্যক্তিগত আচার, ব্যবহার, কর্মের সঙ্গতি আছে কিনা তা’ দেখা লাগে। আবার চাই physical enrichment (শরীরগত সমৃদ্ধি)। ….Genetic asset কার কেমনতর তা’না বুঝে বিয়ে থাওয়ার সম্বন্ধ করা ভাল নয়।”
Genetic assetকে গুরুত্ব না দেবার ফলেই বর্তমান পৃথিবীতে শতকরা প্রায়
40টি অকাল মৃত্যুর কারণ কিছু দুরারোগ্য বংশগত ব্যাধি। ওইসব দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে পরমপুরুষ নিদেশিত সুবিবাহ ও সুপ্রজনন বিধি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রজন্মের সুখশান্তি উত্থানপতন সবকিছুর মূলভিত্তি এই সংস্কার। সেই বিবাহ যদি শুধু যৌনলালসার এবং লিভটুগেদার-এর কেন্দ্রবিন্দু হয় তাহলে কোনদিনও অসুখবিসুখ অকালমৃত্যু, সন্ত্রাসবাদ, শোষণবাদ থেকে সভ্যতাকে স্বস্তি দিতে পারবে না ডাক্তার, উকিল, পুলিশ, মিলিটারি, জেলখানা, হাসপাতালের প্রচলিত ব্যবস্থাপনা। বিশ্বাসঘাতক মানুষদের সনাক্ত করতে শুদ্ধ জন্মের শংসাপত্র প্রাপ্ত ভাল জাতের কুকুর (pedigreed dog) আমদানি করতে আমরা আগ্রহী, অথচ শুদ্ধ মানুষ সৃষ্টি করার মহান আর্য্যবিধিকে উপেক্ষা করে যেমন খুশি তেমন বিয়ের অনুমোদন দিয়েছি! এই বোধ বিপর্যয়ের হাত থেকে আমাদের মুক্ত করলেন যুগ সংস্কারক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। আর্য্য বিবাহবিধির সংস্কারকে নবীকরণ করে।
* * *
পাশ্চাত্ত্য মনীষিগণও আর্য্য বিবাহবিধির সপক্ষে মতামত ব্যক্ত করেছেন :
“Women should marry when they are about eighteen years of age, and men at seven and thirty; then they are in the prime of life and the decline in the powers of both will coincide. “In men the bodily frame is stunted if they marry while they are growing. Since the time of generation is commonly limited within the age of seventy years in the case of man, and of fifty in the case of a woman, the commencement of union should conform to these periods.” “Further, the children, if their birth takes place at the time that may reasonably be expected, will succeed in their prime when the fathers are already in the decline of life, and have nearly reached their term of three score years and ten.” (MARRIAGE GUIDELINE-by ARISTOTLE Translated by Jowth, source Nana-Prasange, part II, page, 76) * * *
“The various problems of marriage should be considered before actual marriage, viz. (1) the question of age (2) the question of health and heredity (3) the question of physical examination (4) the question of preparedness or preparation for marriage (5) the question of delayed procreation (6) the highly important question of compatibility physical or psychic, on which so often the happiness of marriage rests.” “Sometimes a young woman will, for a time, contemplate work out and the woman who has had such an idea seldom repents abandoning it. Lady Chatterlay can never be the happy wife of her peasant lover.” (EUGENICS AND MARRIAGE, By W. Grant Hague, M.D.) * * *
“The eugenic idea, practically applied to the institution of marriage, means that no unfit person will be allowed to marry. It will be necessary for each applicant to pass a medical examination as to his, or her, physical and mental fitness. This is eminently a just decree. It will not only be a competent safeguard against marriage with those obviously diseased and incompetent, but it will render impossible marriage with those afflicted with undetected or secret disease. Inasmuch as the latter type of disease is the foundation for most of the failures in marriage, and for most the ills and tragedies in the lives of women, it is essential to devote special consideration to it in the interest of the mothers of the race…
“When a girl marries she does not know what fate has in store for her, nor is there any possible way of knowing under the present marriage system. If she begets a sickly, puny child, assuming she herself has providentially escaped immediate disease, she devotes all her mother love and devotion to it, but she is fighting a hopeless fight, as I previously explained when I stated that one-half of the total effort of one-third of the race is expended in combating conditions against which no successful effort is possible. Even her prayers are futile, because the wrong is implanted in the constitution of the child, and the remedy is elsewhere. These are the tragedies of life, which no words can adequately describe, and compared to which the incidental troubles of the world are as nothing.” (EUGENICS AND MARRIAGE, by Dr. Hirschfeld) * * * “Most people pick their partners of life with less care than their partners in business-they utilise less caution in the selection of a husband or a wife than in the choice of a cook or in the purchase of a car or cow.”
“Both the man and woman should be carefully examined not only with regard to their health-not only with regard to their fitness to marry but whether they are fit to marry each other. One man’s meat is another man’s poison. The Jill that will make Jack the happiest mortal may make life a living hell for Tom….”
“I do not see how any sane young couple can risk the hazard of marriage, involving heavy responsibilities towards each other, their progeny, society without subjecting themselves to the tests provided by Chemistry, Biology and Psycho-Analysis.” (EUGENICS AND MARRIAGE,By Dr. Alexis Carrel, Nobel Laureate)
পাশ্চাত্ত্য মনীষি বার্লিনের যৌন বিজ্ঞানাগারের অধ্যক্ষ Dr. Hirschfeld বলেছেন,– ভবিষ্যত প্রজন্মের সুরক্ষার কথা চিন্তা করে প্রত্যেক নারীপুরুষের জৈব-রসায়ন এবং মনোজগতকে বিশ্লেষণ করে বিবাহ হওয়া উচিত। একজন মানুষের রক্ত অন্য একজনের বিষক্রিয়ারও কারণ হতে পারে।”
এই উক্তির সত্যতা আমরা উপলব্ধি করতে পারি blood transfusion-এর ক্ষেত্রে। যেমন খুশি তেমন বিয়ের পক্ষপাতি তথাকথিত উদারপন্থীরা কি group, Rh factor, aglutinin, aglutinogen etc. না মিলিয়ে যেমন খুশি তেমন রক্ত আদানপ্রদান করতে পারবেন ? যদি পারেন তাহলে কোন কথা নেই, নচেৎ সুস্থ উত্তর প্রজন্ম জন্মানোর জন্য আর্য্য বিবাহ বিধি মেনে চলতে হবেই। নতুবা আপনার ওই অজ্ঞান-উদারতার জনন-বিপর্যয়ের ফলে আপনার পরিবারসহ সমাজ এবং রাষ্ট্র বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।
নব-প্রজন্ম সৃষ্টি করার আগে আপনাকে একটু পরিকল্পনা করে নিতে হবে। একটা টবে ভাল ফুলগাছ লাগাতে গেলেওতো পরিকল্পনা করতে হয়। আর আমরা পরিকল্পনাবিহীনভাবে বাবা-মা হয়ে যাব সেটা কি বুদ্ধিমত্তার পরিচয় হবে ?
অতএব বুদ্ধি বিবেচনাকে কাজে লাগিয়ে পূর্বপুরুষদের গুণ ও কর্মের সামঞ্জস্য বিচার করে শ্রেয়ঘরে তুল্যবংশে মেয়েদের বিবাহ সম্বন্ধ হলে সবর্ণ অনুলোম বিবাহ সংগঠিত হয়। মেয়ের বর্গের তুলনায় উচ্চবর্গে হলে অনুলোম অসবর্ণ। বিপরীত হলে প্রতিলোম হয়, যা’ ধ্বংসের কারক।
এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন, “অনুলোম বিয়ে ছাড়া বর্ণগুলির মধ্যে মিল আনা দুরূহ । আর প্রতিলোম যেন-তেন-প্রকারেণ বন্ধ করা চাই। এক বর্ণের মধ্যেও বড় বংশের মেয়ে ছোট বংশের ছেলেকে দিলে তাতেও প্রতিলোম হয়। …..নীচু বংশের হয়েও একজন সদ্বংশজ হতে পারে আবার উঁচু বংশের হয়েও একজন অসদ্বংশজ হতে পারে । অসদ্বংশের প্রধান দোষ হলো– তারা কাউকে শ্রদ্ধা করতে পারে না। …..তাই মেয়ের বিয়ে দিতে গেলেই দেখতে হবে, ছেলে উঁচু সদ্বংশজ কিনা– এ না হলেই প্রতিলোম হলেই সর্বনাশ।”
(আলোচনা প্রসঙ্গে, ১ম খণ্ড/ ৭২)
এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন, “সদ্বংশের ধারাবাহিকতা যেখানে অক্ষুণ্ণ আছে তার আরও একটা বৈশিষ্ট্য দেখতে পাবেন, in moment of upset বা anger, depression, disappointment, zealous enterprise বা crisis সে কিছুতেই ungrateful বা treacherous move নেবেই না–দাঁড়িয়ে মরবে, হয়তো অস্বাভাবিকভাবে সর্বনাশকেও আগলে ধরতে পারে কিংবা শয়তানী করে নানারকম ফন্দিবাজির ভিতর দিয়ে তা’কে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করতে পারে; কিন্তু betrayal-এ tamed হওয়া তার ধাতের আনাচে-কানাচেও নেই, আর ওসব proposal বরদাস্ত করতেও কমই পারে।” (নানা প্রসঙ্গে, ২য় খণ্ড/১২৯-১৩০)
* * *
ইদানীংকালে রাজনৈতিক দলগুলো মানুষের প্রবৃত্তি-পোষিত, সব সর্বনাশের মূল জাগতিক আকাঙ্খা পূরণ করতে ব্যস্ত। মানুষের জিনগত সম্পদকে সংরক্ষণ করে শুদ্ধ প্রজন্ম সৃষ্টি বিষয়ে কোন পরিকল্পনা তাদের নেই। একমাত্র শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র এই মূল বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তাঁর মূল চাহিদা ছিল মানবতায় সমৃদ্ধ এক-একটা শুদ্ধ মানুষ। যার প্রকাশ তিনি করেছিলেন, মহাগ্রন্থ পুণ্য-পুঁথির প্রথম বাণীতে, ‘‘আমি চাই শুদ্ধ আত্মা’’।
শ্রীশ্রীঠাকুরের ওই চাহিদার পূর্তি করতে হলে চাই অপাপবিদ্ধ শুদ্ধ মনের এক-একটা সুস্থ মানুষ। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের কথা সকলে না-ই মানতে পারেন কিন্তু বিজ্ঞানকে তো আর অস্বীকার করতে পারবেন না। বিজ্ঞানীরাও প্রকারান্তরে সীলমোহর দিয়েছেন শ্রীশ্রীঠাকুরের ওই চাওয়াটাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের নিয়ে গঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সুস্থ মানুষের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন—
”Health is a state of complete physical, mental and social well-being, and not merely an absence of disease or infirmity.”
The Sign of Physical Health : “…………a good complexion, a clean skin, bright eyes, lustrous hair with a body well clothed with firm flesh, not too fat, a sweet breath, a good appetite, sound sleep, regular activity of bowels and bladder, and smooth, easy, coordinated bodily movements. All the organs of the body are of unexceptional size and function ‘normally’; all the special senses are intact; the resting pulse rate, blood pressure and excercise tolerance are all within the range of ‘normality’ for the individual’s age and sex….”
The Sign of Mental Health : “…….feel satisfied with himself. He feels happy, calm and cheerful. There are no conflicts within himself. He is well adjusted. He accepts criticism and is not easily upset. He understands the emotional needs of others, and tries to be considerate. He has good self-control; he is not overcome by emotion; he is not dominated by fear, anger, love, jealousy, guilt or worries. He faces problems and tries to solve them intelligently.”
The Sign of Social Health : “He is at peace with others and is able to feel himself as a part of a group and is able to maintain socialy considerate behaviour.”
Positive Health : “A person should be able to express as completely as possible the potentialities of his genetic heritage.”
(Source : Preventive and Social Medicine by PARK)
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওই সংজ্ঞা অনুযায়ী শুধু বাহ্যিকভাবে নীরোগ বা ব্যাধিমুক্ত থাকাই নয়,—শরীরে, মনে, প্রাণে, সামাজিকভাবে এবং জিনগতভাবে স্বচ্ছ, স্বস্থ ব্যক্তিটিকেই সুস্থ বলা যাবে। যে ব্যক্তিটির প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং প্রত্যেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জৈবিক ক্রিয়াশীলতা হতে হবে ত্রুটিমুক্ত। মানুষটিকে হতে হবে সদানন্দে পরিপূর্ণ বৃত্তি নিয়ন্ত্রিত এক ব্যক্তি। সে নিজেকে ছোটও মনে করবে না, বড় কেউকেটাও মনে করবে না। সে নিজেকে সমাজের এক অত্যাবশ্যক অংশ মনে করে সকলের সাথে মানিয়ে চলবে। সেই ব্যক্তি তার বংশগতিকে ক্লিষ্ট না করে সমৃদ্ধ করবে উত্তর প্রজন্ম সৃষ্টির মাধ্যমে।—এমন মানুষ কি আমরা চাই না! অবশ্যই চাই।
ওই ধরণের সুস্থ মানুষদের দ্বারা সুস্থ মানুষ সৃষ্টির প্রবহমানতা ঠিক রাখতে পারলেই সার্থক হবে প্রজাতন্ত্র।
প্রত্যক্ষভাবে দেখতে গেলে আমাদের ভালোমন্দ সব সৃষ্টির মূলে রয়েছে মননশীলতার প্রয়োগ।
সদা চঞ্চল এই মন প্রভাবিত হয় চিন্তার চিৎকণা দ্বারা। নিয়ন্ত্রিত হয় ইচ্ছাশক্তির দ্বারা। চিন্তাশক্তি এবং ইচ্ছাশক্তির পারস্পরিক সংযোগে সৎ এবং অসৎ দুই-ই জন্মলাভ করে। যেমন, কাশ্যপ ঋষির পত্নী দিতি-মায়ের অনিষ্ট চিন্তার ফসল ছিল হিরণ্যকশিপু। যিনি হরিভক্তি-পরায়ণ সন্তানকে পর্যন্ত মারতে নানা ফন্দী এঁটেছিলেন। আবার হরিভক্তি পরায়ণা স্ত্রী কয়াধুর সেবায়, সাহচর্য্যে, প্রেরণায়, উদ্দীপনায় হরি-বিদ্বেষী হিরণ্যকশিপুর হৃদয়ে ভক্তি ভাবের সঞ্চারণা করে প্রহ্লাদের মতো শুদ্ধাত্মাকে গর্ভে ধারণ করে রত্নগর্ভা হয়েছিলেন কয়াধু। এ থেকে বোঝা গেল যে, সৎ এবং অসৎ মননশীলতার জন্মদাত্রী একজন মা। মা মানে মেপে দেওয়া, পরিমাপিত করা। অনুশ্রুতির ছড়াবাণীতে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন—
যে ভাবেতে স্বামীকে স্ত্রী
করবে উদ্দীপিত
সেই রকমই ছেলে পাবে
তেমনি সঞ্জীবিত।
‘চলার সাথী’ গ্রন্থে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন—
‘‘নারী হইতেই জাতি জন্মে ও বৃদ্ধি পায়, তাই নারী যেমন ব্যষ্টির জননী তেমনই সমষ্টিরও ; —আর, এই নারী যেমন ভাবে আবিষ্ট থাকিয়া যেমন করিয়া পুরুষকে উদ্দীপ্ত করে পুরুষ হইতে সেই ভাবই নারীতে জন্মগ্রহণ করে ; তাই, নারী মানুষকে প্রকৃতিতে মূর্ত্ত ও পরিমিত করে বলিয়া জীব ও জগতের মা ; —তাহ’লেই বুঝিও—মানুষের উন্নতি নারীই নিরূপিত করিয়া দেয় ; তাই নারীর শুদ্ধতার উপরই জাতির শুদ্ধতা, জীবন ও বৃদ্ধি নির্ভর করিতেছে—বুঝিও, নারীর শুদ্ধতা জাতির পক্ষে কতখানি প্রয়োজনীয় ! ১৭৬ ।’’
‘নারীর পথে’ গ্রন্থে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র এক সুস্থ প্রজন্ম-সৃষ্টি-প্রকরণের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে দিয়ে বললেন।—‘‘প্রত্যেক complex–এর (গ্রন্থির) সঙ্গে full (পূর্ণ আমি) থাকে। কোন গ্রন্থি বা বৃত্তি অভিহত হইলেই তাহা paralysed (অবসন্ন) হয়, তাহাতে full (পূর্ণ আমি) সেই অভিহত বৃত্তির বা গ্রন্থির reflection–এ (পরাবর্ত্তনে) dull (মূঢ়) হইয়া যায়। অর্থাৎ, নারী যেমনতর ভাবদ্বারা পুরুষকে উদ্দীপিত করে সেই ভাবই অনুপ্রাণিত হইয়া নারীতে জন্মগ্রহণ করেন, তা হলেই সেই উদ্দীপনা যেমনতর হইবে—সন্তানের জীবন ও চরিত্র temperamentally অর্থাৎ ধাতুগতভাবে বা প্রকৃতিগতভাবে তাহাই হইবে। তবেই দেখুন, নারী পুরুষের বৃত্তিগুলি যেমনভাবে পুষ্ট করিবে বা খিন্ন করিবে, সন্তান তাহার তেমনি পুষ্ট বা অপরিপুষ্ট প্রকৃতিযুক্ত হইবে। তাই, কেহ হয়ত অঙ্ক কিছুতেই বোঝে না—কেহবা অঙ্কই শুধু বোঝে আর-কিছু বোঝে না, কেহ হয়ত হিংসাপ্রবণ, দোষদৃষ্টিপরায়ণ, নিন্দুক—কেহ হয়ত উদার, দয়াপরায়ণ, দোষদৃষ্টিহীন—স্বভাবতঃই শ্রদ্ধা বা প্রশংসা-প্রকৃতিযুক্ত।’’
বর্তমান সমস্ত বিশ্বব্যাপী যেসব সমস্যা সভ্যতার সঙ্কটরূপে দেখা দিয়েছে, তার সব কিছুর মূলে রয়েছে অসুস্থতা এবং বিকৃত মানসিকতা। সেই অসুস্থতা এবং বিকৃত মানসিকতার বৃদ্ধি এবং বংশানুক্রমিক বিকাশে প্রতিরোধী লাগাম টেনে না ধরতে পারলে নিকট ভবিষ্যতে মনুষ্যত্বের মূল বুনিয়াদ বলে আর কিছু থাকবে না।
এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বহু পূর্বেই আমাদের সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন—
শাসন-সংস্থা যেমনই হোক
যাতেই মাথা ঘামাও না
যৌন-ব্যাপার শুদ্ধ নাহলে
দেশের জীবন টিঁকবে না।
ওই যৌন-ব্যাপার শুদ্ধ করা বিষয়ে বিস্তারিতভাবে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন, ‘‘সমাজের মূলে বিবাহ। বিবাহকে সংস্কার করতে না পারলে কোন সংস্কারই কোন কাজের নয়। Intercourse-এর সময়ে male ও female দুই জনেরই concentration যত বেশী হয় sperm ও ovum–এর উপর life impression তত বেশী হয়। সেই জন্য marriage based on real life হলে এই concentration possible হয় এবং life impression বেশী হয়। ………………আমাদের শরীর তৈয়ার করে মা। বাবা তৈরী করে মন। অবশ্য দুই-ই পরস্পর গূঢ়সম্বন্ধযুক্ত। শরীর ও মন দুর্বল হলে বোঝা যায় পিতামাতা পরস্পরের প্রতি অনুরাগবিহীন। আর শরীর ও মন উভয়ই সবল হলে বোঝা যায় পিতামাতা পরস্পরে খুব অনুরক্ত।
যেদেশে বিবাহপদ্ধতি দূষিত হয়ে পড়ে, সে দেশে শরীর ও মন দুর্বল নিয়েই সন্তান জন্মগ্রহণ করে। আবার সেই দেশে খুব বড় genius জন্মায় কেন ভেবে দেখতে হবে। Criminals, idiots প্রভৃতি যতকিছু জন্মায় তা সব বিবাহ পদ্ধতি দূষিত বলেই যে হয় তা বলাই বাহুল্য।
………. আবার দেখা যায় during the period of pregnancy যে ভাবে বা যার ভাবে সব সময় মাতাপিতা ভাবিত থাকে তদনুরূপ আকৃতি নিয়েই শিশু জন্মে। From the point of intercourse to birth মায়ের মানসিক ভাব সন্তানের শরীরের ও আকৃতির উপর ক্রিয়া করে। আবার আকৃতিকে mould করার জন্য মনকেও কিয়দংশে mould করে।
Intercourse-এর সময় খুব concentration হয়, তাই মনের মধ্য সবচেয়ে deeply impressed ideaটাই তখন spermatozoa–র ভিতর দিয়ে সন্তানে মূর্ত হয়ে উঠে।
Intercourse-এ দেখা যায়, concentration-এর একটা cessation আসে, ঠিক ধ্যানের মত। আর ধ্যানে যেমন subconscious strongest impression মূর্ত হয়ে উঠে, সন্তান জন্মাবার সময়ও ঠিক তেমনি হয়।’’
একটা সুস্থ মানবসভ্যতা গঠন করার জন্য শ্রীশ্রীঠাকুর আদর্শ দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ, কৃষি ও শিল্পের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন অবিভক্ত বাংলার পাবনা জেলার হিমাইতপুরে। সর্বোপরি আর্য্যকৃষ্টির বিবাহ নীতিকে প্রতিষ্ঠা করার উপর জোর দিয়েছেন। আর্য্য বিবাহ নীতিকে যুগোপযোগীভাবে সংস্কার করার জন্য জনে জনে বলেছেন। ম্যারেজ-ব্যুরো গঠন করে সুবিবাহ ও সুপ্রজনন বিধিকে মানুষের মননশীলতায় প্রবেশ করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তার ইচ্ছার পূর্ত্তি কতটা হয়েছে বা হয়নি সেই বিতর্কে না গিয়ে নিজের নিজের দায়ভারটাকে তো কাজে লাগাতে পারি! সামগ্রিকভাবে সেই দায়ভার বহন করার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করে আইন প্রণয়ন করা। আর সেই উদ্দেশ্য সাধনে প্রয়োজন আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক সংগঠনের।
* * *
যে রাষ্ট্র কৃষি পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে, পশু উৎপাদনের ক্ষেত্রে উন্নত জাত, বংশ, গোত্র, বিচার করে; বিশ্বাসঘাতক সন্ত্রাসবাদী দমনে প্রভূত অর্থ ব্যয় করে শুদ্ধ জন্মের শংসাপত্র প্রাপ্ত পে-ডিগ্রীড অ্যালশেসিয়ান, জোবারম্যান, জার্মান শেফার্ড ইত্যাদি সমৃদ্ধ জাতের কুকুর আমদানী করে;—অসংখ্য স্ট্রীট ডগ্দের অবহেলিত, দলিত হিসেবে মর্যাদা না দিয়ে! সেই রাষ্ট্র ব্যবস্থাই মানুষের জন্মটাকে অশুদ্ধ করার জন্য বর্ণাশ্রমানুগ শ্রেণীবিন্যস্ত ভারতীয় সমাজ বিধানকে অমর্যাদা করে যেমন খুশি তেমন বিয়ের এবং বিবাহ-বিচ্ছেদের ছাড়পত্র দিয়ে জাতিকে ভয়ানক সর্বনাশের পথে এগিয়ে দিচ্ছে–-অথচ জাত-পাতের নামে সংরক্ষণ, ভাতা চালু রেখেছে! এই বিষয়গুলো যথার্থভাবে অবগত করাবার জন্য আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
* * *
জনগণের জৈবিক তাগিদ পূরণের জন্য আর কিছু না হোক, অন্ন, বস্ত্র, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থানের তো যোগান দিতে হবে। আর তারজন্য প্রথমেই প্রয়োজন বিশুদ্ধ, সুস্থ একটা পারিবারিক পরিবেশ। মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী-সন্তান একটা ছাদের তলায় সুখে-দুঃখে মিলেমিশে একটা বিন্যস্ত পরিবার গড়ে তুলবে। বিন্যস্ত পরিবারগুলো একটা সুস্থ বিন্যস্ত সমাজ রচনা করবে। নানাভাষা, নানামত, নানা পরিধানের বিন্যস্ত সমাজ থেকেই গঠিত হবে অসৎ নিরোধে তৎপর এক শক্তিশালী রাষ্ট্র। দেশসেবকেরা বিষয়টি নিয়ে যদি ভাবতেন তাহলে সত্যের পরিপন্থী অসত্য, অন্যায়, অধর্ম, পিতা-মাতা-স্বামী-স্ত্রী-সন্তানদের মধ্যে বিচ্ছন্নতাবাদ প্রশ্রয় পেত না, প্রতিষ্ঠা পেত না। মহান নাগরিক সৃষ্টির গুরুত্বকে উপেক্ষা করে মহানগরের বিস্তারে প্রাধান্য পেত না। সবুজায়ন বিনষ্ট করে নগরায়নের বাড়বাড়ন্ত হতে পারতো না! সর্বত্র দূষণ বিস্তার লাভ করতে পারত না। এ বিষয়ে সকলকে অবগত করার জন্য আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
বেঁচে থাকা নিয়ে আমরা যে যতই আস্ফালন করি না কেন, মূলতঃ, প্রকৃতির অকৃপণ দান বায়ু, জল, মাটি, সূর্যালোক প্রভৃতি মৌলিক অজৈব উপাদানের উপর আমাদের বেঁচে থাকা নির্ভর করে। শুধু মানুষ নয়, প্রোটোভাইরাস, ভাইরাস, ব্যাক্টেরিয়া, প্যারাসাইট, শ্যাওলা, উদ্ভিদ থেকে শুরু করে মনুষ্যেতর প্রাণী সকলের সুস্থভাবে বেঁচে থাকা ওই অজৈব উপাদান বা পঞ্চ মহাভূতের উপর নির্ভরশীল। তাহলে দেশসেবার প্রথম কাজ হবে অসৎ নিরোধী তৎপরতার সাথে জৈবাজৈব প্রাকৃতিক পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখা। (সেই কর্তব্য ভুলে, সভ্যতা বিস্তারের নামে প্রাকৃতিক উপাদানকে যথেচ্ছ ব্যবহার করতে গিয়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে আহ্বান করছে অপরিণামদর্শী প্রবৃত্তিপরায়ণ জন-প্রতিনিধিগণ!) তারপর পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যার অনুশাসন মেনে নানাভাষা, নানামত, নানা পরিধানের মানুষের বৈশিষ্ট্য টিঁকিয়ে রাখার চেষ্টা করা। মহান ভারতের রাজর্ষি জনক ওই বিধি মেনে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন (সূত্র : মহাভারত, বনপর্ব)। সে বিষয়ে সবাইকে অবগত করার জন্য আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
* * *
।। বৈচিত্রের মাঝে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় বর্ণাশ্রমের ভূমিকা ।।
আর্য্য হিন্দু সমাজে বর্ণ সংখ্যা চার, জাতি প্রায় তিন হাজারেরও বেশী। প্রাচীন ভারতে নতুন কোন জাতির সন্ধান পাওয়া গেলে ঐ জাতির গুণ ও কর্ম অনুসারে উপযুক্ত বর্ণে স্থান করে দেওয়া হত। তৎকালিন সমাজ ব্যবস্থায় কুলোচিত জীবিকার মাধ্যমে জাত্যুৎকর্ষে উন্নীত বা জাত্যাপকর্ষে অপনীত হওয়ার এক সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছিল। নাগরিকদের বৈশিষ্ট্যের পালন এবং পোষণ করত রাষ্ট্র। সত্ত্বগুণে ব্রাহ্মণ, সত্ত্বমিশ্রিত রজোগুণে ক্ষত্রিয়, রজঃমিশ্রিত তমোগুণে বৈশ্য এবং তমঃ গুণাধিকারে শূদ্রাদি বর্গ নির্ণয়দ্বারা শ্রেণী-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠন নির্দ্ধারিত হতো। সমাজ ব্যবস্থায় শূদ্রের কর্ম বা বৃত্তিধর্ম ছিল শিল্পকর্ম ও সেবা; বৈশ্যের কৃষি, বাণিজ্য, গোরক্ষা; ক্ষত্রিয়েরা সমাজকে, পরিবেশকে পোষণ, প্রীতিচর্য্যা, বাহুবল দিয়ে ক্ষত থেকে ত্রাণ করার রক্ষাধর্ম পালন করতেন এবং ব্রাহ্মণদের ব্রহ্মচর্য্য, তপস্যা, মন্ত্র ও সত্য নির্দ্ধারিত করা ছিল। রাজশক্তি বংশপরাস্পরায় সকল প্রজাদের বৃত্তিধর্মে নিয়োজিত করতেন। বৃত্তিহরণ স্বীকৃত ছিল না। ফলে অশিক্ষা, কুশিক্ষার বেকার সমস্যা ছিল না।
রাজর্ষি জনকের রাজ্যে কোন প্রজার কোনরূপ অভিযোগ ছিলনা রাজার বিরুদ্ধে। সকলেই গুণোচিত কর্মের এবং যোগ্যতার মর্যাদা পেতেন। দুষ্কর্মের জন্য দুষ্কৃতিরা উপযুক্ত শাস্তি পেত। সুকর্মের জন্য পুরস্কৃত হত।
ঠিক সেইভাবে, রাজর্ষি জনকের ন্যায় অসৎ নিরোধী তৎপরতার সাথে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করতে হবে। রাম-রাজত্ব না হোক, অন্ততঃ গৌরবময় গুপ্ত সাম্রাজ্যকে ফিরিয়ে আনতে হলে ভারতীয় শাসন সংহিতায় বা সংবিধানে ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ করতে হবে। সংবিধানের প্রচলিত ধারা ধর্ম এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়কে একাকার করে ফেলে ‘ধর্ম-নিরপেক্ষতাবাদ’,––অর্থাৎ রাষ্ট্র ধর্মের অনুবর্তী নয়’-এর মতবাদকে প্রতিষ্ঠা দেয়, তখন কি মনে হয় না যে, আমরা জাতীয়তাবাদের আদর্শের প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েও এক বিপর্য্যয়ী বোধ-দ্বারা পরিচালিত হয়ে পরস্পর বিরোধী আচরণ করে চলেছি ! যার ফলে ধর্মের নামে জীবন-বিরোধী অধর্মের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে রাষ্ট্রের অনুমোদন ক্রমে। এ জন্যই আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
* * *
শাস্ত্র বা বিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুযায়ী, যে নীতি-বিধি পদার্থের অস্তিত্ব রক্ষার সহায়ক তাই তো ধর্ম। অথবা বলা যায়, পদার্থের স্বকীয়তা ধারণ করে রাখে যা’ তাই ধর্ম। ধর্ম পালন করলেই পদার্থ টিঁকে থাকবে, নচেৎ থাকবে না। সেই ধর্মের অনুবর্তী না থাকার মানে, জীবন ধারণের শাশ্বত বিধিকে অস্বীকার করা। সংসদ প্রকাশিত ইংরেজী অভিধানে religion অর্থে বলা হয়েছে, ‘It is an action, one is bound to do.’ সেই ধর্মের আবার পক্ষ আর নিরপেক্ষ কি? ঈশ্বর যেমন এক এবং অদ্বিতীয়, ধর্মও তেমনই এক অদ্বিতীয়। এর কোন প্রকার হয় না। হিন্দুধর্ম, মুসলমান ধর্ম এগুলো সম্প্রদায়গত ধর্মীয় মতবাদ। প্রকৃত ধার্মিক তাঁরা, যাঁরা, মনুষ্যত্বের প্রকাশে এবং বিকাশে বিশ্বাসী, মানুষে-মানুষে পারস্পরিক হানাহানিতে নয়। বেদ, গীতা, কোরান, বাইবেল প্রভৃতি ধর্মীয় পুস্তকগুলিতে মনুষ্যত্বের উত্তরণের বিধান পরিবেশিত হয়েছে। রামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীষ্ট, হজরত রসুল প্রমুখ পুরুষোত্তমগণ কোথাও বিভেদ সৃষ্টি করে যান নি, সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও সংহতির সুস্থ সমাবেশ গঠনের কথা বলেছেন।
বেঁচে থাকার জন্য আবশ্যিক অজৈব উপকরণ বায়ু, জল, মাটি ইত্যাদির যদি ধর্ম থাকতে পারে, এবং তা’ যদি বিজ্ঞানের বইতে পাঠ্য হতে পারে, তাহলে মানুষের কি ধর্ম নেই? মনুষ্যত্ব প্রকাশের মাধ্যমেই তো মানুষ ধার্মিকতার পরিচয় দেয়। মানুষের মনুষ্যত্বের অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার নীতিবিধি-সমন্বিত ভারতের নিজস্ব সংহিতাগুলোর বিধানসমূহ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের সংহিতায় স্থান পাবে না কেন, প্রজাদের শিক্ষা দিতে পাঠ্য করা হবে না কেন? এ জন্যই আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
।। হিন্দুধর্ম্ম বা সনাতন ধর্মের স্বরূপ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর—হিন্দুধর্ম্ম নয়, আর্য্যকৃষ্টি। আর্য্যকৃষ্টি মানে that which Can be achieve through Culture (যা’ অনুশীলনের ভিতর-দিয়ে আয়ত্ত করা যায়)। মনকে চাষ দিতে-দিতে জানা যায়। পঞ্চবর্হি ও সপ্তার্চ্চি আর্য্যকৃষ্টির কতকগুলি স্তম্ভবিশেষ। স্বীকার করতে হবে যে ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। তিনি সচ্চিদানন্দ স্বরূপ। সবার অস্তিত্ব, চেতনা ও বৃদ্ধির মূলে তিনি। পূর্ব্বপুরয়মান সমস্ত ঋষিকেই আপন ব’লে স্বীকার করতে হবে। তাঁরা কিন্তু অভিন্ন তা’ যিনি যেখানেই থাকুনয়। আটলান্টিকেই থাকুন, হিমালয়েই থাকুন, এখানেই থাকুন আর আল্পস্ পর্ব্বতের গুহাতেই এসে থাকুন। তাঁরা কিন্তু এক, যারা তাঁদের মধ্যে বিভেদ করে, তারা কিন্তু ম্লেচ্ছ অর্থাৎ অসংস্কৃতমনা। Instinct অর্থাৎ সহজাত-গুণবৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বিভিন্ন গুচ্ছ বা শ্রেণী আছে, যার উপর দাঁড়িয়ে গ’ড়ে উঠেছে বর্ণাশ্রম, সেটা মানতে হয়, যেমন একই আমের মধ্যে কত রকমারি আছে। প্রত্যেকটার স্বাদ আলাদা, গুণ-গঠন আলাদা। ঐ বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে জগৎ। বিয়ে- থাওয়াও এমনভাবে হওয়া দরকার যাতে বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে ও উৎকর্ষলাভ করে। বিয়ে-থাওয়ার বেলায় বর্ণাশ্রম বিধি মেনে চলা একান্ত দরকার। বিহিত সবর্ণ ও অনুলোম ভাল, কিন্তু প্রতিলোম বর্জ্জনীয়। বর্ত্তমানের আইন যাই বলুক, পরমপিতা ও প্রকৃতির বিধি ব’লে যা’ জানি, তাই বলছি আমি। আমাদের স্বীকার করতে হবে পিতৃপুরুষকে। তাঁদের প্রণাম ক’রে, আশীর্ব্বাদ প্রার্থনা ক’রে তর্পণ ক’রে তাঁদের গুণ অনুসরণ ক’রে আমরা ভগবানে পৌঁছাব। আর , সবার পরিপূরণী যুগপুরুষোত্তম যিনি, তাঁকে না মানলে আমরা dis-integrated (বিশ্লিষ্ট) হ’য়ে পড়ব। তাঁর মধ্যে পূর্ব্বতন সবারই জীবন্ত স্পর্শ পাওয়া যায়। আমরা খাঁটি হিন্দু, খাঁটি মুসলমান, খাঁটি বৌদ্ধ, খাঁটি খ্রীষ্টান হ’লে যুগপুরুষোত্তমের প্রতি আনতি নিয়ে স্ব-স্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে এক হ’তে পারতাম। ( আঃ প্রঃ ১৪, পৃঃ ১৫৭)
ধর্ম প্রসঙ্গে বর্ণিত উপরোক্ত বাণীসমূহ কি কোন মানুষের জীবনবিরোধী কোন তাৎপর্য্য বহন করছে, না কোন ধর্ম প্রবক্তাদের, রাজনৈতিক-প্রবক্তাদের মতবাদের এতটুকু বিরোধিতা প্রকাশ করেছে ?
বর্তমান যুগ-পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সাধারণ জনদের বোঝাবার জন্য আরও সহজ ভাষায় বললেন, ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম বলে জানিস তাকে। ধর্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম না-রে।’ ওই সম্প্রদায় নিরপেক্ষ সমন্বয় বার্তাবহ বাণীকে গুরুত্ব না দিয়ে, রাষ্ট্র, ধর্মের নামে, শাস্ত্র বহির্ভূত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তি পরায়ণতার আস্ফালনকে, কতগুলো অনিত্য, অসার, অবৈজ্ঞানিক, পরিবেশ দূষক, পৌত্তলিকতার কু-সংস্কারকে যদি ‘ধর্ম’ নামে প্রতিষ্ঠা দিতে চায়, তা’ কি বিচক্ষণতার পরিচায়ক হবে, না ভারতবর্ষের কৃষ্টির পরিপূরক হবে? ওই ভুলের বোঝা কি আমাদের চিরদিন বইতে হবে? আমাদের বুদ্ধি, বোধ কি নিরেটই থেকে যাবে?
রাষ্ট্রের সৃষ্টিই তো প্রজাদের অধর্ম বা দুর্নীতি থেকে মুক্ত করে ধার্মিক, অর্থাৎ সু-নীতি পরায়ণ করে তোলার জন্য। সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দলগুলো যদি ওই মহান কর্তব্য ভুলে তার প্রজাবর্গকে, তাদের পিতৃ-পিতামহের আদর্শ অনুসারী ধর্ম-পরায়ণ, কৃষ্টি-পরায়ণ হতে উৎসাহ না দিয়ে, প্রবৃত্তি-পরায়ণতায় উৎসাহ দেয়, সেটা ভারতবর্ষের জাতীয় উত্তরাধিকারত্বের অস্তিত্বকে বিপন্ন করার বার্তা ভিন্ন আর কিছু নয়। কারণ,—
‘‘প্রজা মানেই হচ্ছে—
প্রকৃষ্টরূপে জাত—
সর্ব্বসম্ভাব্য উদ্বর্দ্ধনী সার্থকতায় ;
আর প্রকৃষ্ট জন্ম পেতে হলেই চাই—
প্রজনন পরিশুদ্ধি—
সর্ব্ব-সম্ভাব্যতার বৈধানিক সংস্থিতিতে. …. ’’
(‘সম্বিতী’ গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)
* * *
।। গণ প্রজাতন্ত্রী ভারতবর্ষের সেকাল-একাল ।।
মূণ্ডক উপনিষদের পবিত্র মন্ত্র ‘সত্যমেব জয়তে’-এর আদর্শকে সম্বল করে ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দের ১৫ই আগস্ট গণ প্রজাতন্ত্রী আধুনিক ভারতবর্ষের যাত্রা শুরু হলেও ‘‘Of the people, by the people, for the people—জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন।’’-এর লক্ষ্যে রচিত কতগুলো বিধিবদ্ধ নিয়ম, শাসন সংহিতা বা সংবিধান ১৯৫০ খ্রীস্টাব্দের ২৬শে জানুয়ারী স্বীকৃতি লাভ করে, যে দিনটাকে ‘প্রজাতন্ত্র দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।
আর্য্যশাস্ত্র মুন্ডক উপনিষদ-এর প্রথম খণ্ড (3.1.6) থেকে গৃহীত মন্ত্র‘সত্যমেব জয়তে’ ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের জাতীয় আদর্শ। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে পণ্ডিত মদন মোহন মালব্য ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি থাকার সময় এই মন্ত্রটিকে জাতীয় রাজনীতিতে নিয়ে এসে জনপ্রিয় করেন। এটি ভারতের জাতীয় নীতিবাক্য হিসাবে গৃহীত হয়েছিল 26 জানুয়ারী 1950, যেদিন ভারত একটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। ‘সত্যমেব জয়তে’-এর অর্থ হলো সত্যেরই জয় হয়। এটি ভারতীয় জাতীয় প্রতীক অশোক স্তম্ভ-এর গোড়ায় দেবনাগরী লিপিতে খোদাই করা হয়েছে। সমস্ত ভারতীয় মুদ্রা এবং জাতীয় নথির একপাশে খোদাই করা আছে।
সত্যের আশ্রয়ে ‘আমরা করবো জয়’ এই ছিল আমাদের প্রতিজ্ঞা, তারজন্য খোদাই করা হয়েছিল। (সূত্রঃ উইকিপিডিয়া) ‘সত্যমেব জয়তে’-এর সীলমোহর হাতে পেয়ে অসত্যের পথে চলার জন্য নয়।
সত্য বিষয়ে মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য বলছেন, “সত্যং ভূতহিতং প্রোক্তং ন যথার্থাভিভাষণম্।” অর্থাৎ যা প্রাণীদের পক্ষে মঙ্গলকর তাই সত্য। অহিতকর যথার্থ সত্য নয়।
‘সত্যমেব জয়তে’-র আধিকারিকেরা এই সত্য পথ অবলম্বন করে প্রকৃত সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেই জয় হবে সত্যের। অর্থের লোভ, আত্মপ্রতিষ্ঠার মোহের কাছে ‘সত্যমেব জয়তে’-র সীলমোহর ধারকেরা যদি বিবেককে বন্ধক রেখে আত্মবিক্রয় করতে থাকে তাহলে মনুষ্যত্বের অবক্ষয় প্রতিরোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। ভারতীয় কৃষ্টির ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে সব সত্তা প্রেমীদের।
সত্য মানে অস্তিত্ব। যার অস্তিত্ব আছে যার বিকাশ আছে তাই সত্য (real)। ঋষি প্রদর্শিত এই সত্যের পথই আর্য্য ভারতবর্ষের মূলধন। আমাদের আদর্শ ছিল– ‘আত্মানং বিদ্ধি’, নিজেকে জানো, know thyself, ‘আত্মবৎ সর্বভূতেষু, মাতৃবৎ পরদারেষু, লোষ্ট্রবৎ পরদ্রব্যেষু।’ সকলকে নিজসত্তার প্রতীক মনে কর, মেয়েদের নিজের মায়ের প্রতিরূপ ভেবে শ্রদ্ধা কর, অন্যের জিনিসকে মাটির ঢেলার মত দ্যাখ। ‘মা গৃধ’, লোভ কর না। তথাপি ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের প্রজাগণ কেন সত্যভ্রষ্ট হচ্ছে, ভেবে দেখার প্রয়োজন নেই?
আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি, ‘প্রজা’ শব্দের অর্থ প্রকৃষ্ট জাতক। আর তন্ত্র মানে কতগুলো বিধিবদ্ধ নিয়ম বা system। প্রত্যক্ষভাবে প্রজার স্রষ্টা স্বামী এবং স্ত্রী। বিধিবদ্ধ নিয়ম মেনে জৈবিক তাগিদের জন্য আবশ্যিক আহার, নিদ্রা, অপত্যোৎপাদন ধর্ম বিন্যস্তভাবে পালন করার মাধ্যমেই প্রকৃষ্ট জাতক সৃষ্টি করা সম্ভব। এজন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন স্বামী এবং স্ত্রী পরস্পরের পরিপূরক সম-বিপরীত সত্তারূপে সহাবস্থানে থেকে বিধিবদ্ধ নিয়ম বা সংস্কারের অনুবর্তী হয়ে চলা।
প্রজাতন্ত্রের মর্মার্থ হচ্ছে, যে তন্ত্র বা system মেনে আদর্শ প্রজা নির্মাণ, পালন, পোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে রাষ্ট্রের সংহতি রক্ষায় প্রযত্নশীল থেকে পরম রাষ্ট্রিক সমবায়ের লক্ষ্যে এগিয়ে চলা যায়। ভারতের ব্রহ্মসূত্র, মহাকাব্য, বেদ, উপনিষদ, সংহিতা, আদর্শপুরুষ শ্রীরামচন্দ্র ও শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ বলে যা কিছু বর্তমান,—সবকিছুই ওই ‘সত্যমেব জয়তে’-এর আদর্শের উপরেই প্রতিষ্ঠিত।
কতিপয় রাজনৈতিক নেতারা মহান ভারতের ওইসব বিধিকে আড়াল করে প্রবৃত্তি-পরিপোষিত শিক্ষায় প্রজাতন্ত্রী ভারতবর্ষের প্রজাদের শিক্ষিত করতে চাইছে। ফলে সন্ত্রাসবাদ, ভ্রষ্টাচার, যৌন-ব্যভিচার ক্রমবর্দ্ধমান। এর কারণ ‘সত্যমেব জয়তে’ কে বাস্তবে মূর্ত করে তোলার মত কোন ইন্দ্রিয়জয়ী সৎপুরুষের জীবন্ত আদর্শ অনুসরণ করছে না রাষ্ট্র। ফলে দেশে মহানগরের বাড়বাড়ন্ত হলেও মনুষ্যত্বের পরিচয় সম্পন্ন ‘পিতামাতার সুজননের সুসন্তান, সন্তানের সুমাতা-সুপিতা, সমাজের সুবন্ধু, রাষ্ট্রের সুনাগরিক’ এমন মহান নাগরিকের সংখ্যা ক্রমশঃ যেন অবলুপ্তির পথে।
ওই অবলুপ্তি থেকে সভ্যতাকে বাঁচাতে, যা-যা করণীয় তা যদি না করা হয়, ভবিষ্যত প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।
তাই, ‘সত্যমেব জয়তে’-এর আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত প্রজাতন্ত্রের প্রবহমানতা টিঁকিয়ে রাখতে হলে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিতে হবে আদর্শ প্রজা সৃষ্টির মাধ্যম, সুবিবাহ ও সুপ্রজননের ওপর। সুপ্রজননের দায়িত্ব মূলতঃ মেয়েদের। মেয়েই তো মা হয়। মায়ের শুদ্ধতার ওপর নির্ভর করে সন্তানের শুদ্ধতা। বিধিমাফিক সেই মায়েদের শুদ্ধতা রক্ষা করার ব্যবস্থা না করতে পারলে শুদ্ধ প্রজা সৃষ্টি হবে না। বিপন্ন হবে প্রজাতন্ত্র! এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন করতে আর্য্য মহাসভা রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
যদিও বর্তমান পুরুষোত্তম এ বিষয়ে আমাদের সচেতন করতে বাণীর মাধ্যমে বললেন–
“দেশের অবনতির
প্রথম পদক্ষেপই হ’চ্ছে—
মেয়েদের উচ্ছৃঙ্খলতা,
পারিবারিক সঙ্গতির প্রতি
বিদ্রূপাত্মক অবহেলা,—
যা’ দেশের শুভদৃষ্টিটাও
ভেঙ্গেচুরে চুরমার করে
সর্ব্বনাশকে আমন্ত্রণ ক’রে থাকে;
তাই বলি,
মেয়েরা যেন
তাদের পবিত্রতা হ’তে
এতটুকুও স্খলিত না হয়,
ব্যবস্থা ও বিধানগুলি
এমনতরই বিনায়িত করে
তাদের ভিতর সঞ্চারিত করে তোল;
তুমি যদি দেশের স্বস্তিকামীই হও—
এদিক থেকে
তোমার দৃষ্টি ও কৃতিচর্য্যার
একটুও অবহেলা যেন না থাকে,
স্বস্তিই হ’চ্ছে
শান্তির শুভ আশীর্ব্বাদ,
আর, স্বস্তি মানেই হ’চ্ছে
সু-অস্তি—”
(বাণী সংখ্যা ৩৭৩)
* * *
প্রজা সৃষ্টি বা ব্যক্তি নির্মাণের সহজ উপায় প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন, “আর্য্যকৃষ্টির মধ্যে তো আছে তারই কলা-কৌশল। তার জন্য প্রথমে চাই good breeding (ভাল জন্ম)। ভাল জন্ম হ’তে গেলে পিতা-মাতার instinct (জন্মগত সংস্কার) ভাল হওয়া চাই এবং তাদের বিয়েও সব দিক দিয়ে মিল ক’রে হওয়া চাই। তারপর পারিবারিক চালচলন এমন হওয়া চাই, যাতে ছেলে-মেয়েরা গোড়া থেকেই সৎ দৃষ্টান্ত দেখে ভাল হওয়ার অনুপ্রেরণা পায়। পারিবারিক শিক্ষা যদি ভাল না হয়, তাহ’লে পুঁথিগত শিক্ষা যতই হোক না কেন, তাতে মানুষের habits, behaviour (অভ্যাস, ব্যবহার) adjusted (সুনিয়ন্ত্রিত) হয় না।
তারপর চাই সদ্গুরুর কাছে দীক্ষিত হ’য়ে শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠাসহকারে তাঁর নির্দ্দেশ মেনে চলা।
শিক্ষা-ব্যবস্থাও এমন হওয়া দরকার, যাতে প্রত্যেকে তার বৈশিষ্ট্যের উপর দাঁড়িয়ে চৌকষ হ’য়ে উঠতে পারে। স্বতঃদায়িত্বে environment (পরিবেশ)-এর প্রয়োজন কে কতখানি পূরণ ক’রে চলতে পারে, অপরের জীবনীয় স্বার্থকে কে কতখানি বাস্তবে নিজের স্বার্থ ক’রে তুলতে পারে, মোট কথায় সেইটেই শিক্ষার বড় তকমা। আর জীবিকার ব্যবস্থা যথাসম্ভব বর্ণবৈশিষ্ট্যানুগ ও স্বাধীন হওয়া দরকার। উপার্জ্জনের অন্য যে-কোন পথই থাক, cottage-industry (কুটিরশিল্প) ও agriculture (কৃষি) সব পরিবারেই কিছু না কিছু থাকা চাই। আর চাই গো-পালন। জীবিকার জন্য যদি পরের দাসত্ব করতে না হয় বা dishonesty (অসাধুতা) করতে না হয়, তাহ’লে কিন্তু মানুষ অনেকখানি ঠিক থাকে।
আর চাই ভাল-ভাল ঋত্বিক্, অধ্বর্য্যু, যাজক। তারা তাদের উন্নত চরিত্র, সেবা ও যাজনের ভিতর-দিয়ে সারা দেশের মানুষকে সত্তাপোষণী চলনে অভ্যস্ত ক’রে তুলবে, ধর্ম্ম, ইষ্ট, কৃষ্টির ভিত্তিতে integrated (সংহত) ক’রে তুলবে। সঙ্গে-সঙ্গে দেখবে, অসৎ অর্থাৎ সত্তাপরিপন্থী রকমগুলি যাতে দানা বেঁধে উঠতে না-পারে। Simultaneously (যুগপৎ) এই সবগুলির দিকে নজর দিয়ে যদি চলা যায়, তাহ’লে দেশের আবহাওয়াই বদলে যাবে। তখন মানুষের ভাল হবার সম্ভাবনাই বেশী থাকবে। খারাপ যারা থাকবে, তারাও উপযুক্ত শাসন-তোষণ ও প্রেরণার ভিতর-দিয়ে অনেকখানি ঠিক হ’য়ে উঠবে।
Bad instinct (খারাপ সংস্কার)-ওয়ালা progeny (সন্ততি) যাতে সমাজে বাড়তে না পারে, তার ব্যবস্থা না করলেই নয়।
সেইজন্য আমি proper marriage (উপযুক্ত বিবাহ)-এর উপর অতো জোর দিই। ঐ জায়গায় হাত না দিলে সব programme (কর্ম্মসূচী)-ই fail করবে (অকৃতকার্য্য হবে)।
আমি মুখ্যু মানুষ, আমার কথার তো দাম নেই। কিন্তু দাসীর কথা বাসি হলি কামে লাগবি। (আলোচনা-প্রসঙ্গে, ষষ্ঠ খণ্ড, ২৩শে অগ্রহায়ণ, শনিবার, ১৩৫১, ইং ৯-১২-১৯৪৪)
যথার্থ মর্যাদায় প্রজাতন্ত্রকে বাস্তবায়িত করতে হলে যুগ-পুরুষোত্তমের আদর্শকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল সৃষ্টি করার প্রয়োজন আছে। বর্তমান রাজনৈতিক দলের সাথে দেশপ্রেমী সচেতন ব্যক্তিবর্গ যাঁরা যুক্ত আছেন, তাঁরা কিন্তু পার্টির সব দুর্নীতি মেনে নিতে পারেন না। তাদের পথ দেখাতে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন আমার গুরুদেবের একটা বাণী। “রাজনীতি বলে তায়/পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যায়/সংহতি আনে যায়।” যে নীতি সকলের অভাব পূরণ করে, সবাইকে অভীষ্ট মঙ্গল প্রতিষ্ঠায় পোষণ দিয়ে সব্বাইকে প্রীতির বাঁধনে আবদ্ধ করে সংহতির প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ, সেই নীতির নাম রাজনীতি। এ বিষয়ে প্রজাগণকে সচেতন করতে আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
* * *
জনগণের অভাব পূরণ যিনি বা যারা করবেন তাদের বৈশিষ্ট্যপালী হতে হবে। বৈশিষ্ট্য মানে বিশিষ্টতা। বৈচিত্র্যময় ভারতবর্ষের নানাভাষা, নানামত, নানা পরিধানসমৃদ্ধ বিশিষ্টতার পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যা দ্বারা সংহতির প্রতিষ্ঠা যিনি করতে পারবেন তিনি হতে পারবেন একজন আদর্শ রাজনীতিবিদ।
যেমন, একজন গোপালক বা রাখাল বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের গোরু—ষাড়, বলদ, গাভী, দামড়া, বকনা নামের বিবিধ বৈশিষ্ট্যের গোরুর পাল নিয়ে মাঠে চড়াতে যায়। একটা ছোট লাঠি বা পাচনের সাহায্যে সে গোরুর পাল্-কে পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যা দ্বারা সংহত রেখে আবার গোধূলি বেলায় গোয়ালে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। যেমন, একজন চাষী তার বিভিন্ন জমির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য মেনে ভূমিকে কর্ষণ করেন বা চাষ দেন। জমির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ‘জো’ বুঝে বীজ বপন করেন, চারা রোপন করেন। তারপর উপযুক্ত জলসেচ, সার, কীটনাশক, পাহারা দিয়ে পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যা দ্বারা ফসল উৎপাদন করেন। দুঃখের বিষয় বর্তমানের রাজনীতির নেতারা সে বিষয়ে কোন গুরুত্ব আরোপ করছেন না। এ জন্যই আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
* * *
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতে, বৈশিষ্ট্য মানে—তদনুপাতিক organic adjustment (বৈধানিক বিন্যাস)। তার আবার (group) গুচ্ছ আছে। এইগুলিকে বলা হয় বর্ণ, এর কোনটাই আমরা নষ্ট করতে চাই না। নষ্ট করা মানে যুগ যুগ ধরে, তিল তিল করে, যা গড়ে উঠেছে তা হারান। ন্যাংড়া আম আছে, ফজলি আম আছে আরো কত রকমের আম আছে। এর একটা জাত যদি নষ্ট করে ফেলি তাহলে তা’ আর ফিরে পাব না—হারাব চিরতরে। সেকি ভালো? ফজলি আমের মধ্যে তো আর ন্যাংড়া আমের স্বাদ পাব না। তাই যেন আমরা বুঝে চলি। (আলোচনা প্রসঙ্গে, ১৬শ খণ্ড, পৃঃ ১০৯)
আমাদের ভারতের গ্রামীন অর্থনীতি কৃষি ও গোপালনের উপর নির্ভরশীল। ভালো কৃষকেরা কখনোই যেমন খুশি তেমনভাবে, নিজের খেয়ালখুশি মত চাষ করেন না। সরকারী কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে জমি অনুযায়ী উন্নত জাতের বীজ বপন করেন, চারা রোপন করেন। গোপালন ক্ষেত্রেও তাই। সরকারী পশু পালন বিভাগের বিজ্ঞানীদের পরামর্শ মেনে গাভীর জাতের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সম-বিপরীত উন্নত জাতের ষাঁড়ের বীজ দিয়ে উন্নত জাতের সুস্থ, সবল বাচ্চা উৎপাদন করেন। অথচ, ওই পদ্ধতি মেনে সুস্থ মানব-শিশু সৃষ্টির বিষয়ে রাষ্ট্র উদাসীন। এ বিষয়ে সবাইকে অবগত করাবার জন্য আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
আমরাও দৈনন্দিন জীবন-যাপনে সকলেই কিছু-না-কিছু বৈশিষ্ট্যের পালন-পোষণ করেই থাকি। সচেতন ব্যক্তি মাত্রেই বাজার থেকে ভালো জাতের বা কোয়ালিটির আলু, বেগুন, পটল, মুলো, আম, চাল, ডাল, চা কিনতে অভ্যস্ত। এমন কোন সুস্থ মানুষ নেই যে উদারতার নামে হিমসাগর আমের দাম দিয়ে আঁশযুক্ত টোকো আঁটিসার আম কিনে আনবেন? মিনিকীট, বাঁশকাঠি, গোবিন্দভোগ, দেরাদুন রাইসের দাম দিয়ে রেশন দোকানে প্রদত্ত মোটা চাল কিনে আনবেন?
এ থেকে প্রমাণিত হলো গাছপালা, পশুপাখি সবকিছুর জাত, বর্ণ আছে। জীব বিজ্ঞানের পুস্তকেও জাতি, প্রজাতি, বর্ণ, গোত্র-এর উল্লেখ আছে। তাহলে মানুষের কি নেই? অবশ্যই আছে। মানুষ তো সব জাতহীন হয়ে যায় নি? তবে হ্যাঁ, জাতের নামে বজ্জাতি কিন্তু চলছে—শিডিউলড্, আন-শিডিউলড্, ওবিসি, ট্রাইব প্রভৃতি নিয়ে পার্টিবাজি করতে গিয়ে সহজাত-সংস্কারের বৈশিষ্ট্যটাকে নাকাল হতে হচ্ছে! অন্যায়, অধর্ম করে, অন্যের বৃত্তি হরণ করে টাকা উপার্জন করতে গিয়ে এক অসম অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করে চলেছি আমরা। ফলে অর্থ, অনর্থ সৃষ্টি করে চলেছে ! এর অবসানের জন্যই আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
* * *
বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, দরিদ্র এবং দারিদ্র সীমার নীচে ইত্যাদি অর্থনৈতিক মানদণ্ডে বিভাজিত। যার সাথে বর্ণানুগ কর্মের কোন সম্পর্ক নেই। ফলে, তথাকথিত একজন নিম্ন বর্ণের মানুষও কালোয়ারী, দালালি, সিণ্ডিকেট, প্রমোটারী ইত্যাদি বৃত্তি মাধ্যমে প্রভূত টাকা রোজগার করার সুযোগ পাচ্ছে। উচ্চ-বিত্তধারী হয়ে অপরাপর উচ্চবর্ণকে চাকর রেখে, দরিদ্র অথচ গুণীজনদের দাবিয়ে রেখে সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারছে! এক মেকী উদার অর্থনীতির প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বংশানুক্রমিক গুণ ও কর্মের যোগ্যতার মানদণ্ডকে শিথিল করে সংরক্ষণ প্রথা মাধ্যমে এক পরস্পর বিরোধী শ্রেণী-বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তথাকথিত শিক্ষিত লোকেরা বর্ণাশ্রম না বুঝলেও সুবিধা আদায় করার লক্ষ্যে SC/ST/OBC বুঝতে শিখেছে। ফলে সামগ্রিকভাবে ‘ওয়ার্ক কালচার’ নষ্ট হয়ে এক অসম অর্থনৈতিক বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারী, বেসরকারী, সংগঠিত, অসংগঠিত কর্ম সংস্থানে আকাশ-পাতাল বৈষম্য। এর কারণ গোড়ায় গলদ! ব্যক্তিসত্তার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ভুলে বড় হতে গিয়ে প্রকারান্তরে নিজেদের অস্তিত্বকে ম্যালিগন্যাণ্ট স্তরে বিপন্ন করে চলেছি। এর অবসান প্রয়োজন। এ জন্যই আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন। * * *
আর্য্যকৃষ্টির বর্ণাশ্রমধর্ম্মের বিধি-বিন্যাস অনুযায়ী যোগ্যতাসম্পন্ন ব্রাহ্মণেরা আচার্য্যপদে, উপাচার্য্যপদে অধিষ্ঠিত হয়ে অধ্যাপনা করতেন, শিক্ষাদানের মাধ্যমে ছাত্রদের সন্তোষ বিধান করতে পারলেই গ্রহণ করতেন শ্রদ্ধার্ঘ্যের দক্ষিণা। হাতীবাগান, হাওড়া, ভাটপাড়া, বারানসী, রাজস্থান এবং কাশ্মীরের কিছু কিছু পণ্ডিতেরা বর্তমানেও টোল বা গুরুকুল মাধ্যমে ওই প্রথা জীইয়ে রেখেছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ‘আশ্রমের রূপ ও বিকাশ’ প্রবন্ধ এবং কালজয়ী ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শতাব্দীর মৃত্যু’ উপন্যাসে ভারতীয় শিক্ষার একাল-সেকাল বিষয়ক এক জীবন্ত চরিত্র অঙ্কিত হয়েছে।
আর্য্যকৃষ্টির ভারতবর্ষে, শিক্ষাদান এবং শিক্ষাগ্রহণ দুইই ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধার উপরে প্রতিষ্ঠিত। “প্রণিপাতেন, পরিপ্রশ্নেন, সেবয়া”, –-আচার্য্য বা শিক্ষকের প্রতি প্রকৃষ্টরূপে আনতি প্রকাশ দ্বারা প্রশ্নের মাধ্যমে, সেবার মাধ্যমে অজানাকে জেনে নিজেকে সমৃদ্ধ করতেন। জানার তত্ত্ব এবং তথ্য ছিল, “অসতো মা সদগময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়” – অসৎ হতে সৎ-এ অবস্থান করে, অন্ধকার থেকে আলোর লক্ষ্যে এগিয়ে, মৃত্যুময় জগতের মধ্যে থেকেও যেন অমৃত আহরণ করতে পারি। এই গন্তব্যের লক্ষ্যে পরিচালিত। ওই গন্তব্যে পৌঁছতে “আত্মবৎ সর্বভূতেষু, মাতৃবৎ পরদারেষু, লোষ্ট্রবৎ পরদ্রব্যেষু”––সকল প্রাণীকে নিজের মত করে ভালবাসব, সকল মেয়েদের নিজের মায়ের মত সম্মান করব, অন্যের জিনিসকে রাস্তায় পরিত্যক্ত ঢিলের মত মনে করব। “মা গৃধ”—লোভ সম্বরন করব।—ইত্যাদি ছিল ভারতীয় শিক্ষার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। ‘মেরা ভারত মহান’ শ্লোগানে সমৃদ্ধ আধিকারিকেরা ‘সত্যমেব জয়তে’-র সীলমোহর দিয়ে ওই বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাকে নষ্ট করে শিক্ষকদের মাস মাইনের চাকর করার ফলে শিক্ষা আজ ব্যবসায়ে পরিণত। শিক্ষাঙ্গনে ‘আমরা ওরা’ বিভেদের শিক্ষার সাথে পরিপোষিত হচ্ছে অসদাচার, ভ্রষ্টাচার, দুর্নীতি, হিংসার শিক্ষা! এ জন্যই আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
*** প্রাচীন ভারতের আদর্শ রাজন্যবর্গ প্রজাগণকে বংশানুক্রমিক কৌলিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে, কর্মানুগত শাসনে রেখে কর্মচ্যুত বা বেকারদের স্ব স্ব বৈশিষ্ট্যানুপাতিক কর্মে নিযুক্ত করতেন। যাতে বর্ণাশ্রম ধর্ম বিনষ্ট হয়ে প্রজাগণ সঙ্করদোষে দুষ্ট না হয়। প্রজা সঙ্করদোষে দুষ্ট হলে সমাজে ভীষণাকৃতি, বামন, কুব্জ, স্থূল মস্তিষ্ক সম্পন্ন, ক্লীব, অন্ধ, বধির, অপরাধপ্রবণ মানুষের সৃষ্টি হয়। (দ্রঃ বিষ্ণুপুরাণ) ওই শিক্ষার ধারা লুপ্ত করার ফলে সমাজের পারস্পরিক সংহতি, শান্তি, সমৃদ্ধি লোপ পেতে শুরু করেছে।
বর্তমানে জীবিকা এবং পেশাগত শ্রেণী বিন্যাসের অন্তর্ভূক্ত বৃহদায়তন, মাঝারি, ক্ষুদ্র শিল্পপতি, বাণিজ্যজীবী, পাইকারী, খুচরা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ফেরিওয়ালা, আমলা, ডাক্তার, নার্স, আয়া, বিউটিশিয়ান, উকিল, ইঞ্জিনীয়ার, শিক্ষক, করনিক, এজেণ্ট, পাইলট, ড্রাইভার, মেকানিক, অপারেটরর্স, বাইণ্ডার, প্রিন্টার, কম্পোজিটর, ওয়েল্ডার, টার্নার, ফিটার, উইভার, ইলেকট্রিশিয়ান, ইলেক্ট্রনিকস্ ওয়ার্কার, কম্প্যুটার ওয়ার্কার, কার্পেন্টার, কন্ট্রাকটর, প্রমোটার, নির্মাণকর্মী, শ্রমজীবী ইত্যাদি আরো আরো অনেক বৃত্তিতে, কর্মে নিযুক্তরা বেশীরভাগই বর্ণাশ্রম অনুসারী বৃত্তিতে রত নয়। ফলে এক অসম অর্থনৈতিক বণ্টন ব্যবস্থা রাষ্টে বিদ্যমান। কর্মক্ষেত্রে উপযুক্ত জন্মগত সংস্কার (instinct)কে উপযুক্ত মর্যাদা না দেবার জন্য সার্বিকভাবে কর্মসংস্কৃতিতে বিপর্য্যয় নেমে এসেছে। সমান কর্মে সমান মজুরী, সমান সম্মান না পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট জনেদের মানসিক স্বাস্থ্য বিপন্ন হচ্ছে।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, (আমাদের) বর্ণাশ্রমের মধ্যে un-employment (বেকার সমস্যা) বলে জিনিস ছিল না, তা’তে বৃত্তিহরণ ছিল মহাপাপ, প্রত্যেকে স্ব-স্ব বর্ণোচিত কর্ম করতো, প্রত্যেকে প্রত্যেকের সহযোগী ও পরিপূরণী হ’তো। (আঃ প্রঃ ১ম খণ্ড, পৃঃ ৭৯)
আমার মনে হয়, বর্ণাশ্রমটা যদি ঠিকভাবে জাগিয়ে তোলা যায়, তবে অনেক কিছু গোল চুকে যায়। (আঃ প্রঃ ১ম খণ্ড, পৃঃ ৭৯)
এ বিষয়ে স্বামী বিবেকানন্দও বলেছেন, “ভারতবর্ষের বর্ণাশ্রম ধর্ম মানবজাতিকে ঈশ্বরের দেওয়া শ্রেষ্ঠ সম্পদগুলোর অন্যতম। …..এই বর্ণাশ্রম ধর্ম ভারতে আশ্চর্যকীর্তি স্থাপন করেছে এবং ভবিষ্যতেও ভারতবাসীকে পরম লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করবে।”
(নবপত্র প্রকাশনীর বিবেকানন্দ রচনা সমগ্র পৃঃ ৬৭৯ থেকে সংগৃহীত।)
বর্ণাশ্রমকে মেনে চলার জন্য একটা সময়ে ভারতবর্ষের প্রতিটি গ্রাম স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। উপার্জনের জন্য পরিযায়ী হতে হতো না।
।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রদত্ত বর্ণাশ্রমের বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা ।।
শরৎদা জিজ্ঞাসা করলেন—‘চাতুর্ব্বণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকৰ্ম্মাবিভাগশঃ’–এর মানে কী। এটা কি গোড়া থেকে আছে ? শ্রীশ্রীঠাকুর—হ্যাঁ, ভিতরে যেমন instinct (সহজাত সংস্কার বা গুণ) থাকে, কৰ্ম্মও তদনুযায়ী হয়। দুনিয়ার দুটো জিনিস ঠিক অবিকল বা একরকম দেখতে পাবেন না। প্রত্যেকটি যা-কিছুর একটা বিশিষ্টতা আছে— তা যেমন রূপে তেমন গুণে। একই বাপ-মায়ের পাঁচটি সন্তান পাঁচরকম হয়। কারণ, উপগতির সময় নারী, পুরুষকে যখন যেমন প্রেরণা দেয়, পুরুষের ভিতরকার তেমনতর জিনিসই তখন বেরোয়। স্ব-অয়ন-স্যূত বৃত্ত্যাভিধ্যান তপস্যায় গতি ও অস্তি অধিজাত হয়েছে। সেখানে স্ব হচ্ছে যেন পুরুষ, sperm. (বীজ), বৃত্তি যেন প্রকৃতি ovum (ডিম্বকোষ), আর অভিধ্যান হলো cohesive affinity. (যোগাবেগ)। প্রকৃতির বিভিন্ন প্রেরণায় একই পুরুষের ভিতর থেকে বিভিন্ন গুণের সৃষ্টি হ’লো। যত রকমের গুণই থাক না কেন, তার Grand division (প্রধান বিভাগ) ঐ চার বর্ণের মধ্যেই রয়েছে। শুধু মানুষের জন্যই নয়, জীব-জগতের সব স্তরেই চাতুর্ব্বর্ণ রয়েছে, সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গেই বর্ণ ঢুকে গেছে। প্রথম থেকেই তা instinct হিসাবে থাকে। Environment (পারিপার্শ্বিক) এর মধ্যে তা প্রকাশিত হয়। Generation after generation (বংশ পরম্পরায়) সেই ধারা চলে।
শরতদা— বর্ণ যদি প্রধানতঃ গুণগত ব্যাপার, তাহলে hereditary varna (বংশানুক্রমিক বর্ণ) মানবার প্রয়োজন কী?
শ্রীশ্রীঠাকুর—তাহলে তো বেশ বুঝেছেন দেখছি! গুণটা আসছে কোত্থেকে? সেও তো ঐ জন্মসূত্র থেকে। আপনার জৈবী বিধানকে বাদ দিয়ে আপনার কোন গুণ বা কৰ্ম্মক্ষমতা নেই। হাওয়ার উপর কিছু দাঁড়ায় না। গুণ ও কৰ্ম্মক্ষমতা শরীর, স্নায়ু, কোষ chromosome, gene ইত্যাদিকে আশ্রয় করেই অবস্থান করে। সেগুলি বংশানুক্রমিকতার সূত্র বেয়েই তো নেমে আসে, যাকে বলে immortal neckless of germ-cell (বীজ কোষের অবিনশ্বর মালা।)
শরৎদা—বর্ণধৰ্ম্ম ঠিক ভাবে পালন করতে গেলে তো মানুষ বর্ণোচিত কৰ্ম্ম ছাড়া অন্য কাজ করতে পারবে না। কিন্তু কোন মানুষের অন্য বর্ণের কৰ্ম্মে যদি বিশেষ প্রতিভা থাকে এবং তা যদি সে না করতে পারে, তাহলে তো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শ্রীশ্রীঠাকুর—মানুষ জীবিকার বর্ণোচিত কৰ্ম্ম ছাড়া করতে পারবে না—এক আপদ্ধর্ম ছাড়া। তাছাড়া কোন কৰ্ম্মানুশীলনে মানুষের কোন বাধা নেই। বর্ণাতীত কৰ্ম্মে যার বিশেষ প্রতিভা থাকে, বর্ণোচিত কর্মেও সে অপটু হয় না। সেই কৰ্ম্ম দিয়ে জীবিকা আহরণ করে বাদবাকী সময় সে তার প্রতিভার স্ফূরণ এবং তদনুযায়ী লোক সেবায় ব্যয় করতে পারে। তার বিনিময় সে কিছু চাইবে না, কিন্তু তার সেবায় প্রীত হয়ে স্বতঃস্বেচ্ছ আগ্রহে প্রীতি অবদান স্বরূপ কেউ যদি তাকে কিছু দেয়, তা গ্রহণ করতে তার কোন বাধা নেই। কিংবা রাষ্ট্রের তরফ থেকেও যদি তাকে কোন পুরস্কার দেয় তাও সে গ্রহণ করতে পারে। প্রত্যেকে যদি বর্ণোচিত কর্মনিরত থাকে, কেউ কারও বৃত্তিহরণ না করে তাহলে বেকার সমস্যা জিনিসটাই আসতে পারে না। অযথা প্রতিযোগিতা জিনিসটাও বন্ধ হয়ে যায়। পারস্পরিক সহযোগিতা ও নির্ভরশীলতা বেড়ে যায়। বংশপরম্পরায় একই কৰ্ম্ম করার ফলে প্রত্যেকের দক্ষতা ও যোগ্যতাও বেড়ে যায়। প্রত্যেকে স্ব স্ব কৰ্ম্ম করায় সর্ব্বতোমুখী সুষম উৎপাদন ও সেবা পরিবেষণের একটা স্বাভাবিক ব্যবস্থা স্বতঃই গজিয়ে ওঠে। কোন বর্ণের বিশিষ্ট সেবার অভাবে, তারা এবং অন্যান্য বর্ণ অপুষ্ট থাকে না। সামাজিক শৃঙ্খলা অব্যাহতভাবেই এগিয়ে চলে। তাই আমাদের বাপ, বড়বাপ, ঋষি, মহাপুরুষরা যে বিধান করে গেছেন, তা একটু তলিয়ে বুঝতে চেষ্টা করবেন। অদূরদর্শিতা ও হীনত্ববুদ্ধি থেকে দুনিয়ার অনেক আন্দোলনই হয়েছে, কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান কিছু হয় নি, সব ব্যাপার মানুষের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং বার বার বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য্য হয়ে উঠছে। এর আছে সুসঙ্গত ব্যক্তিবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানকে আশ্রয় করার মধ্যে। এই বিজ্ঞানের নামই বর্ণাশ্রম,এবং আমাদের ঋষি-মহাপুরুষরাই এই প্রাকৃতিক বেদবিজ্ঞানের দ্রষ্টা, আবিষ্কর্তা ও প্রতিষ্ঠাতা। (আলোচনা প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড / ১৭৩-১৭৪ পৃঃ)
শ্রীশ্রীঠাকুর কথাপ্রসঙ্গে বললেন—যে যে-কোন ধৰ্ম্মাবলম্বীই হোক না কেন, তার বংশে যদি প্রতিলোম সংমিশ্রণ না হয়ে থাকে, তবে তার বংশানুক্রমিক জীবিকা, অভ্যাস, আচার, ব্যবহার অনুপাতিক তার বর্ণ নিরূপণ করে বর্ণাশ্রমের বিধি অনুযায়ী তাকে পরিচালিত করা যেতে পারে। বর্ণাশ্রম একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাপার; এটা সার্ব্বজনীন। সহজাত সংস্কার বিন্যাস এবং বৈধী বিবাহের ভিতর দিয়ে বংশানুক্রমিক বৈশিষ্ট্যগুলিকে ধারাবাহিকতায় অক্ষুণ্ণ রেখে বংশপরম্পরায় প্রগতিপন্ন করে তোলাই হচ্ছে এর মূল কথা। পৃথিবীর প্রত্যেকটি সমাজকে যদি এমন বিধিবদ্ধভাবে সাজিয়ে তোলা যায়—তাদের বৈশিষ্ট্যের আপূরণী করে, তবে বিহিত অনুলোমক্রমে পারস্পরিক পরিণয় নিবদ্ধও সৃষ্টি করা যেতে পারে। পূরয়মান এক আদর্শ ও অনুলোম বিবাহ যেমন একটা জাতকে একগাট্টা করে তোলে, তেমনি করে তা সমগ্র বিশ্বকেও সংহত ও ঐক্যবদ্ধ করে তুলতে পারে—পারস্পরিক বৈশিষ্ট্যানুগ সংহতি নিয়ে। পরমপিতার দয়ায় বিশ্বশান্তির এই যা এৎফাক বের হয়েছে, এ একেবারে চরম এৎফাক, এখন তোরা মাথায় নিয়ে করলেই হয়। (আলোচনা প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড, পৃঃ ৮৯-৯০) আমাদের বুঝটাকে পাকা করে দিতে একই বিষয় তিনি নানাভাবে উপস্থাপনা করে গেছেন যাতে আমরা ‘না বোঝার’ অজুহাত না দিতে পারি। তাই তিনি অনুশ্রুতি-র ছড়াবাণীতে
বিষয়টাকে আরো একটু প্রাঞ্জল করে তুলে ধরলেনঃ বর্ণাশ্রমী নয়কো যা’রা আৰ্য্যকৃষ্টি মেনে চলে কিম্বা আৰ্য্যকৃত হ’য়ে বর্ণাশ্রম প্রার্থী হ’লে গুণ বঞ্চনা-সক্রিয়তায় বংশক্রমে ব্যক্তিগত অনুক্রমে যথাবর্ণে করবি তা’রে সুসংহত।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র উপরোক্ত বাণীর মাধ্যমে বাহ্য জাতিভেদ প্রথার মূলোৎপাটন করে মানুষকে ভারতীয় বর্ণাশ্রমানুগ বিধানে স্ব-স্ব বৈশিষ্ট্যে প্রতিষ্ঠিত করলেন। মানুষের জাত বা সহজাত সংস্কার এবং তাদের জৈবিক তাগিদগুলো প্রবৃত্তির কবলে পড়ে মনুষ্যত্বের অপলাপী কর্মে লিপ্ত যাতে না হতে পারে, বিধিবৎ নীতি প্রণয়ণ করে বিহিত ব্যবস্থায় মানুষের মনুষ্যত্ব রক্ষা করা, রাজনীতির নির্দিষ্ট কর্ম।—সে বিষয়ে উদাসীন রাজনৈতিক জন প্রতিনিধিগণ! এ জন্যই আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
* * *
শান্তি-মৈত্রী-ঐক্য প্রতিষ্ঠার পথ-নির্দেশ
নৃতাত্ত্বিক গঠনের বৈশিষ্ট্যানুযায়ী মানুষকে আল্পাইন, ব্রাকিসেফাল, মেডিটেরিয়ান, মঙ্গোলয়েড, নর্ডিক, নিগ্রোয়েড প্রভৃতি নামে শ্রেণী বিভাজন করা হয়েছে। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর সহজাত সংস্কার গুণ ও কর্মভিত্তিক বর্ণাশ্রম বিভাজনকে সমৃদ্ধ করেছিলেন আর্য্য ঋষিরা। শাস্ত্রে গুণ এবং কর্ম দেখে বর্ণ নিরূপণ করার বিধান রয়েছে। সত্ত্ব গুণে বিপ্র, সত্ত্ব মিশ্রিত রজোগুণে ক্ষত্রিয়, রজোমিশ্রিত তমোগুণে বৈশ্য এবং তমোগুণাধিকারে শূদ্র চিহ্নিত করা হয়েছিল। এবং তদনুযায়ী কর্ম নির্ধারিত হয়েছিল। প্রাকৃতিক নিয়মে সকলেই স্ব স্ব বৈশিষ্ট্যে শ্রেষ্ঠত্বের স্থান অধিকার করে আছে।
এ বিষয়ে একটা সুন্দর ছড়া আছে।
“শূদ্রই তো জাতির চাকা
বৈশ্য জোগায় দেশের টাকা,
ক্ষত্রিয়েরা রাজার জাত
সবার পূরণ বিপ্র ধাত।
বিপ্র যদি জাগত আবার
বিজয়গুরু মত্ততায়,
দেশটা কি আর চ’লত উধাও
সর্ব্বনাশা ব্যর্থতায় ?
ক্ষত্র যারা কায়েত হয়ে
চলছে বেভুল ঝিমিয়ে মাথা,
তা’রা যদি উঠত জেগে
চ’লত করা অসৎ যা তা’?
বৈশ্য বণিক বিশাল আয়ে
বিভব দেশে দিত যদি,
অভাব কি আর ঢুকত দেশে
হা-হুতাশে নিরবধি?
শুদ্র যদি শুচির গানে
সেবামুখর ধৃতিচর্য্যায়—
চ’লত, তবে রুখত কে তা’র
কৃতিমুখর কৃষ্টিসেবায়?
জাতিগত বৰ্ণই হ’ল
সংস্কারের গুণধারা
দুর্বল সবল যাই হোক্ না
সেই চলনে চলে তারা।
বিপ্র-ক্ষত্রিয়-বৈশ্য-শূদ্রের
বর্ণগত বিশেষ আচার
রুদ্ধ ক’রে ভাঙ্গেই যে-জন
ব্যতিক্রমী সত্তা তার।”
মানুষের বোধে উপরোক্ত সহজ-সাধারণ, অথচ প্রয়োগ ক্ষেত্রে অসাধারণ বিষয়গুলো প্রবেশ করাবার জন্য আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
* * *
জ্ঞানী, বিজ্ঞানী, সমাজতত্ত্ববিদ্, মনস্তত্ত্ববিদ প্রমুখ পণ্ডিত ব্যক্তিদের বোঝাবার জন্য আরও বিস্তারিত ভাবে বললেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।
” …… আর্য্য জাতির uphill motion-এর (উর্ধগামী গতির) acceleration (ত্বরান্বিত করা)-ই হ’চ্ছে front-(সম্মুখে) ব্রাহ্মণ আর back-এ (পিছনে) শূদ্র। চাতুর্বর্ণ্য বিভাগ কতকটা আমাদের body system-এর (শরীর বিধানের) মতন। শূদ্র হ’চ্ছে এই whole system-এর (সমুদয় বিধানের) carrier (বাহক) এবং supporter (সহায়ক), যা’র উপর ভর দিয়ে এই সমাজদেহ চলছে। বৈশ্যদের function (কর্তব্য) হ’ল সমাজদেহকে সুস্থ রাখা by the supply of proper nutrition and food (যথোপযুক্ত পুষ্টি এবং খাদ্য সরবরাহ দ্বারা)। বৈশ্যশক্তি এই function discharge (কর্তব্য সম্পাদন) করতে যেদিন পরাঙ্মুখ হ’ল, সেদিন এই সমাজদেহ ভেঙ্গে পড়লো। Stomach (পাকস্থলী) যদি boycott (অসহযোগ) করে, আমাদের body-system-এর (শরীর বিধানের) যে অবস্থা হয় তাই হ’ল। এই বৈশ্যশক্তি যদি আবার জাগে এবং legs, heart ও brain-কে (পা, হৃৎপিন্ড ও মস্তিষ্ককে) proper nutrition supply করে (উপযুক্ত পুষ্টি যোগায়), তবে আবার সমাজদেহ জেগে উঠবে। Body system-এর মধ্যে heart (হৃৎপিন্ড) যেমন, সমাজদেহের মধ্যে ক্ষত্রিয় তেমন। Heart-এর মধ্যে দু’রকম cells (কোষ) আছেঃ (১) white cells (সাদা কোষ) (২) Red cells (লাল কোষ)। Red cells-এর (লাল কোষের) কাজ হ’চ্ছে body-কে fit (কার্যক্ষম) রাখা এবং maintain (পরিপোষণ) করা by the proper distribution of red blood (লাল রক্ত উপযুক্ত ভাবে বিতরণ দ্বারা); এবং white cells-এর (সাদা কোষের) কাজ হ’চ্ছে body-কে protect (রক্ষা) করা। ক্ষত্রিয়ত্বের মধ্যে এই দু’টি function (কার্য) আছে; একটি সমাজদেহকে fit (কার্যক্ষম) রাখা ও maintain (প্রতিপালন) করা, আর একটি disease-এর (রোগের) হাত থেকে protect (রক্ষা) করা। কিন্তু এই দুই blood-এর supply (যোগান) নির্ভর করছে stomach-এর (পাকস্থলীর) উপর। সমাজদেহের brain (মস্তিষ্ক) হ’চ্ছেন ব্রাহ্মণ (বিপ্র), যাঁদের working (কার্যতা) নির্ভর করছে ক্ষত্রিয়শক্তি বৈশ্যশক্তি এবং শূদ্রশক্তির উপর। তাঁরা যেমন-তেমন এই তিন শক্তির নিকট support and help (সাহায্য ও সহানুভূতি) পা’চ্ছেন, তেমন-তেমন এই তিনকে regulate, control (নিয়মিত ও আয়ত্ত) করতে পারছেন। এই চারিশক্তির মধ্যে কেহই ছোট-বড় নয়। একটা harmony (সমন্বয়) ও co-ordination-এর (সমবায়ের) যোগে এদের মধ্যে একযোগে একতানে কাজ হ’চ্ছে। কিন্তু body এর মধ্যে brain-এর স্থান যেমন সর্বোচ্চ এবং সর্ব উচ্চে থাকাটা legs, stomach ও heart-এর existence-এর পক্ষে নিতান্ত দরকার, তেমন ব্রাহ্মণকে উচ্চ place দেওয়াতে, যে উচ্চতা তাঁ’র মধ্যে inherent (স্বাভাবিক) হ’য়ে আছে, অন্যান্য বর্ণ চলতে পারছে ঠিকমত তাঁরই guidance-এ (নির্দেশে)। Head-কে বড় স্বীকার করা যেমন body-র অন্যান্য অঙ্গের পক্ষে লজ্জার নয়, বরং পরম গৌরবের, তেমনি অন্যান্য বর্ণের পক্ষে ব্রাহ্মণকে বড় ব’লে মানা তাঁদের বাঁচা-বাড়ার পক্ষে নিতান্ত প্রয়োজনীয়। Superior (শ্রেয়)-এর উপর শ্রদ্ধা রে’খে যদি তুমি সমাজকে পুনর্গঠন করতে লেগে যাও,তবে সে সমাজ টিঁকবে-তার growth (বৃদ্ধি) হবে healthy.” (ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, তৃতীয় খণ্ড, পৃঃ-৬৮-৬৯)
উপরোক্ত বাণী থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, বর্ণাশ্রমের বিন্যস্ত বিভাজন আমাদের শরীর বিধানেও বিদ্যমান। বর্ণাশ্রমানুগ বিধান অনুযায়ী শূদ্র বর্ণ শ্রমশিল্প, কারিগরি বিদ্যার সেবার মাধ্যমে সব বর্ণকে সাহায্য করবেন। শরীর বিধানে আমাদের পদযুগল দেহটাকে বয়ে নিয়ে বেড়ায় তাই পদযুগলকে শূদ্র বর্ণের সাথে তুলনা করা হয়েছে। বৈশ্যরা কৃষি ও বাণিজ্যের সেবা দ্বারা সকলের উদরপূর্তি করছেন। সেই উদরকে বয়ে বেড়াচ্ছে জানু বা জঙ্ঘা। তাই জঙ্ঘা বৈশ্যত্বের প্রতীক। ক্ষত্রিয়রা বাহুবল দ্বারা অসৎ নিরোধ করে সমাজকে রক্ষা করেন। শরীর বিধানে বাহু আমাদের দেহটাকে বিপদ-আপদ থেকে আগলায়, ক্ষত থেকে ত্রাণ করে, তাই বাহুকে ক্ষত্রিয় বর্ণের সাথে তুলনা করা হয়েছে। বিপ্র বর্ণ বোধ ও বোধির পরামর্শ দিয়ে সকল বর্ণকে বর্ণধর্ম পালন করার শিক্ষা দেয়, বর্ণানুগ কর্মে উৎসাহিত করে বিন্যস্ত সমাজ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের মস্তিষ্ক বিবেক, বিচার-বুদ্ধি দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সমগ্র দেহটাকে পরিচালনা করে, তাই মাথাকে বিপ্র বর্ণের সাথে তুলনা করা হয়েছে। এইভাবে দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিন্যস্ত মেলবন্ধনে দেহটাকে সুস্থভাবে পরিচালিত করতে সাহায্য করে। ছোটবড়ো কেউ নয়। যে যার বৈশিষ্ট্যে শ্রেষ্ঠ। ওই শাশ্বত প্রাকৃতিক নিয়মকে অগ্রাহ্য করে কেউ যদি মাথার কাজ পা-কে দিয়ে, পায়ের কাজ মাথাকে দিয়ে করাতে যায় তাহলে দেহটাই রক্ষা করা যাবে না। তেমনি বিন্যস্ত সমাজ ব্যবস্থা রক্ষার স্বার্থে আর্য্য ঋষিরা প্রতিটি বর্ণের জন্য নির্দিষ্ট কর্ম ও আইডেনটিটি বা স্মারক চিহ্নের বিধান দিয়েছেন। শ্বেত বর্ণে বিপ্র, লোহিত বর্ণে ক্ষত্রিয়, হরিদ্রা বর্ণে বৈশ্য এবং সবুজ বর্ণে শূদ্র চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই জীবনীয় বৈশিষ্ট্যসমূহ ধারণ করার করার বিধির নাম ধর্ম। ধর্মকে রক্ষা করার জন্য রাজনীতি। শ্রীমদ্ভগবদগীতা যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বর্ণাশ্রম বিধায়িত বিন্যস্ত সমাজের ওই চারটি বর্ণের চিহ্ন সাদা, লাল, হলুদ ও সবুজ। বর্তমান পুরুষোত্তম যাকে আর্য্যকৃষ্টির স্মারক পতাকা তথা জাতীয় পতাকা হিসেবে নির্দিষ্ট করেছেন।—সেই পতাকার অনুসরণে আর্য্য মহাসভার দলীয় পতাকা নির্বাচন করা বাঞ্ছনীয়।
।। আর্য্যকৃষ্টির স্মারক পতাকা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী ।।
বৈশিষ্ট্যপালী আপূরয়মাণ মূর্ত্ত ইষ্ট
বা আদর্শ’ পুরুষোত্তমই
তোমাদের জাতীয় পতাকার
প্রাণস্বরূপ হয়ে উঠুন;
চতুর্ব্বর্ণ-বিরেখ
সুদর্শনচক্র-বিভূষিত
পবিত্র পরমার্থ-অভিধ্যায়ী
প্রাণনপ্রদীপী উড্ডীয়মান
নর্ত্তনলাস্যমণ্ডিত হ’য়ে উঠুক তা’;
ঐ ইষ্টপ্রাণ প্রাণনলাস্যই হ’য়ে উঠুক
তোমাদের সংহতির জীবন্ত মন্ত্র—
তন্ত্র-নিয়মনী উৎসর্জ্জন-অনুক্রমণায়;
তোমরা পতাকাকে যখনই প্রণাম ক’রবে,
মনে রেখো—
সেই পতাকা প্রাণবন্ত
তোমাদের ঐ বৈশিষ্ট্যপালী আপুরয়মাণ
মূর্ত্ত আদর্শ-পুরুষোত্তমে,
সেই পতাকার প্রণাম-মন্ত্র হ’য়ে উঠুক-
‘বন্দে পুরুষোত্তমম্’—
সেই পুরুষোত্তমেরই
ধ্যানবিভোর জাগ্রত স্মৃতি নিয়ে;
তোমাদের স্বরাষ্ট্রনীতিই হো’ক,
আর, পররাষ্ট্রনীতিই হো’ক,
তা’ যেন সর্ব্বথাই
স্বস্তি-প্রণোদনায় পরিচালিত হয়—
সন্ধিৎসু সত্তাপোষণী স্বাচ্ছন্দ্যের
ছান্দোগ্য-অনুশীলনী তৎপরতা নিয়ে,
সাম্য, সাগ্নিক সম্বর্দ্ধনা
অর্থাৎ সম্বর্দ্ধনী অগ্রগতি ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের
সুকেন্দ্রিক, সুবিনায়িত অন্বিত চলনে,
অসৎ-নিরোধী, তৎপর প্রস্তুতির
পবিত্র উপকরণে;
তোমাদের সব্যষ্টি গণদেবতা যেন
আদর্শ-পুরুষোত্তমের
অর্ঘ্য-অন্বিত সঙ্গতিশালিন্যে
ব্রাহ্মণ্য-অনুবেদনী অভিধায়
সুনিয়ন্ত্রিত হয়; (সংক্ষিপ্ত, বাণী সংখ্যা ৩৬৫)
জাতীয় পতাকা সম্বন্ধে পরম দয়াল বললেন–- “আমার মনে হয়, আমাদের জাতীয় পতাকা তিনরঙা না হ’য়ে, চাররঙা হওয়া উচিত। চতুর্ব্বর্ণের চারটি রঙ। তার মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের একখানা হাত দেওয়া থাকবে। হাতে থাকবে সুদর্শন।
দেবীদা প্রশ্ন করলেন—প্রত্যেক বর্ণের রঙ তো আলাদা হবে?
ঠাকুর—নিশ্চয়ই। উপরে সাদা, তার নীচে লাল, তার নীচে হলুদ এবং সবুজ। এই রকম থাকবে। (দীপরক্ষী ৫ম খণ্ড, পৃঃ ১৯)
।। ‘আর্য্য’ শব্দের বিশেষত্ব ।।
‘আর্য্য’ শব্দটি মূলতঃ গুণবাচক। যাঁরা বর্ণাশ্রম, চতুরাশ্রম পরিপূরণী দশবিধ সংস্কারে সংস্কৃত হতেন তাঁদেরই আর্য্য অভিধায় ভূষিত করা হতো। তাঁরাই ক্রমে আর্য্য জাতিভুক্ত হয়েছিলেন। বর্তমান যুগধর্মে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যেমন সম্বোধনে ‘স্যর’, ‘ম্যাডাম’ শব্দ ব্যবহার করা হয়, সেসময় সদাচারী বর্ণাশ্রমানুগজীবন যাপন কারীদের উদ্দেশ্যে ‘আর্য্য’, ‘আর্য্যপুত্র’, ‘আর্য্যা’ ইত্যাদি সম্বোধনসূচক শব্দ ব্যবহৃত হতো। এই ব্যবস্থা সকলের জন্য, এখানে সাম্প্রদায়িকতার কোন স্থান নেই। এ বিষয়ে বর্তমান পুরুষোত্তম এক যুগান্তকারী বিধান দিলেন।
মঙ্গোলীয় নিগ্রো যারা
দ্রাবিড়ী কোল ম্লেচ্ছাবধি
আর্য্যীকৃত হলেই তারা
আর্য্যদেরই সুসন্ততি।
যুগ পুরুষোত্তমের আদর্শকে স্বীকার করলেই আর্য্যীকৃত হওয়া যায়। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন, “পঞ্চবর্হিঃ যা’রা স্বীকার করে, আর সপ্তার্চ্চি অনুসরণ করে, তারা যেই হোক আর যা’ই হোক– আর্য্য বা আর্য্যীকৃত । ৬০১ । (শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৭)
এবার পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চিঃ-র অনুশাসন বিষয়ে জেনে নেওয়া যাক।
।। পঞ্চবর্হিঃ ।।
১। একমেবাদ্বিতীয়ং শরণম্।
২। পূর্ব্বেষামাপূরয়িতারঃ প্রবুদ্ধা ঋষয় শরণম্।
৩। তদ্বর্ত্মানুবর্ত্তিনঃ পিতরঃ শরণম্।
৪। সত্তানুগুণা বর্ণাশ্রমাঃ শরণম্।
৫। পূর্ব্বাপূরকো বর্ত্তমানঃ পুরুষোত্তমঃ শরণম্ ।
এতদেবার্য্যায়ণম্, এষ এব সদ্ধর্ম্মঃ,
এতদেব শাশ্বতং শরণ্যম্।’’
১। এক অদ্বিতীয়ের শরণ লইতেছি।
২। পূর্ব্বপূরণকারী প্রবুদ্ধ ঋষিগণের শরণ লইতেছি।
৩। তাঁহাদের পথ অনুসরণকারী পিতৃপুরুষগণের শরণ লইতেছি।
ইহাই আর্য্যপথ, ইহাই সদ্ধর্ম্ম, আর ইহাই চিরন্তন শরণযোগ্য।
“আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে গেল সেইদিন যেদিন থেকে আমরা পঞ্চবর্হির মূল নির্দ্দেশ অবজ্ঞা করতে শুরু করলাম। তখন থেকে আমরা অপরের খোরাক হলাম কিন্তু নিজেদের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখে পরকে আপন ক’রে নেবার সামর্থ্য হারিয়ে ফেললাম।”
পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চিঃ-র অনুশাসনকে অগ্রাহ্য করে দেশ ও জাতির মধ্যে সাম্য, মৈত্রী ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর সম্বিতী গ্রন্থে বলছেন—
মতবাদ যাই হোক না,—
আর, যে-কোন সম্প্রদায়ই হোক,
যা’ মুখ্যতঃ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’কে
স্বীকার করেনিকো—
কোন-না-কোন রকমে,—
তা’ কখনও অনুসরণ করতে যেও না,
তা’ কিন্তু জঘন্য—অসম্পূর্ণ,
সত্তা-সম্বর্দ্ধনার পরিপন্থী তা’;
আর, ঐ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’ই হ’চ্ছে
সেই রাজপথ—
যা’কে স্বীকার ও গ্রহণ করে চললে
ক্রমশঃই তুমি সার্থকতায় সমুন্নত হ’তে পার। ২৩৪
এই বাণী বর্ণ, সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকলকে মনুষ্যত্বে উত্তরণের পথ দেখিয়েছে। এখন মানা, না-মানা যার যার নিজস্ব ব্যাপার! আর্য্য মহাসভা রাজনৈতিক দল সকলের কাছে এই সত্য পৌঁছে দেবার জন্য দায়বদ্ধ।
‘‘হিন্দু মুসলমানের নামে নাক সিটকায়, মুসলমান হিন্দুদের নামে নাক সিটকায়—তার মানে তারা ভগবানকে, ধর্মকে, প্রেরিতকে ভালবাসে না। আর্য্যরা মানে এক অদ্বিতীয়কে, পূর্বতন ঋষি মহাপুরুষদিগকে, তারা মানে পূর্বপুরুষকে ও জন্মগত বিশিষ্ট গুণসম্পদকে। অর্থাৎ বর্ণধর্মকে, সর্ব্বোপরি তারা মানে বৈশিষ্ট্যপালী আপূরয়মান যুগপুরুষোত্তমকে। এগুলি মালার মত গাঁথা আছে। যাদের দেখার চোখ আছে ও দেখতে চায়, তারাই দেখতে পায়। বেদ, কোরান, বাইবেল ঘেঁটে দেখ, সব জায়গায় ঐ একই জিনিস রকমারি ভাবে পাবে। অন্ততঃ ওগুলির উল্টো কথা পাবে না। কোরাণে স্পষ্ট করে আছে পিতৃপুরুষকে স্বীকার করার কথা। আমি ইসলামের ভক্ত হলে আমার নাম গোলাম সোফান হবে কেন? অনুকূল চক্রবর্তীই তো থাকা উচিত। কারণ, খোদাতায়ালা যেমন সকলের, রসুল যেমন সকলের, ইসলামও তেমনি সকলের। মুসলমানের মধ্যেও বংশগত আভিজাত্য ও বৈশিষ্ট্যকে শ্রদ্ধা দিয়ে চলার কথা আছে। ওর ভিতর দিয়েই তো বর্ণধর্মের মূল তাৎপর্য্য-সম্বন্ধে সমর্থন পাওয়া যায়। আজ আমরা বৈশিষ্ট্যকে নষ্ট করতে চাই কেন ? রসুলের কি তেমন কোন কথা আছে ? আর নিজেদের বৈশিষ্ট্যকে যদি বজায় রাখতে চাই, তবে অপরের বৈশিষ্ট্য যাতে বজায় থাকে সেদিকেও লক্ষ্য রাখা লাগে। অপরের বৈশিষ্ট্য ভাঙ্গার প্রবৃত্তিকে প্রশ্রয় দিলে, কালে-কালে নিজের বৈশিষ্ট্য ভাঙ্গার পথই প্রশস্ত হয়।
আমি বলি, আমি যদি হযরতকে ভালবাসি এবং তাঁর নীতিবিধি মেনে চলি, তবে আমি হিন্দু থাকব না কেন? পরমপিতার পথে চলতে গিয়ে পিতৃপরিচয় খোয়াতে হবে কেন? আমি তো বুঝি হিন্দুও আর্য্য, মুসলমানও আর্য্য। উভয়ের পন্থা ও গন্তব্য এক। হযরত পূর্ববর্তীকে মানেন, পরবর্তীকে মানার ইঙ্গিতও তিনি দিয়ে গেছেন, তিনি যা মানেন আমরা যদি তা না মানি, তার মানে আমরা তাঁকে মানি না। মুসলমান পীরের কাছ থেকে দীক্ষা নেয়া লাগে, হিন্দুরও গুরুর কাছ থেকে দীক্ষা নেওয়া লাগে, সে একই কথা। শুধু ভাষা আলাদা। কতকগুলি নীতি আছে, দেশকাল, পাত্র, নির্ব্বিশেষে সর্ব্বত্র সর্বদা সবার পালনীয়, আবার কতকগুলি আছে বিশেষ-বিশেষ ব্যক্তির বিশেষ-বিশেষ অবস্থায় ও দেশকালে পালনীয়। এই দুটোর মধ্যে গুলিয়ে ফেলতে নেই। Fundamental (মৌলিক) ও universal (সার্ব্বজনীন) জিনিস হল—এক অদ্বিতীয়কে মানা, পূর্বতন ঋষি-মহাপুরুষকে মানা, পিতৃপুরুষকে মানা, বৈশিষ্ট্য মানা, পূরয়মান যুগপুরুষোত্তমকে অনুসরণ করে চলা। তুমি হিন্দুই হও বা মুসলমানই হও, এগুলি যদি না মান, তুমি হিন্দুও নও, মুসলমানও নও, এককথায় তুমি ম্লেচ্ছদলভুক্ত, ম্লেচ্ছ মানে যারা সংস্কৃতির উল্টো চলে। আর যে এগুলিকে মেনে চলে সে যে সম্প্রদায়ের লোক হোক না কেন, তাকে তুমি কখনও কাফের বলতে পার না। কাফের মানে যে ধর্মবিরোধী চলায় চলে। সাম্প্রদায়িক বিরোধের প্রশ্রয় না দিয়ে, ধর্মবিরুদ্ধ চলনের বিরুদ্ধে আমাদের জেহাদ ঘোষণা করা লাগে। তাই করা লাগে যাতে প্রতি প্রত্যেকে ঈশ্বরপ্রেমী হয়ে ওঠে, ধর্মপ্রবুদ্ধ হয়ে ওঠে। এ দায় হিন্দু-মুসলমান সকলেরই মিলিত দায়। তাই, এই কাজে হিন্দুর মুসলমানকে সাহায্য করা উচিত, মুসলমানেরও হিন্দুর সাহায্য করা উচিত। আমি বুঝি, সৎসঙ্গ যেমন হিন্দুর, তেমনি মুসলমানের, তেমনি বৌদ্ধের, তেমনি খ্রিষ্টানের, তেমনি অন্যান্য সকলের। সব মানুষই পরমপিতার, তা তারা জানুক বা না-জানুক, মানুক বা না-মানুক।
(আঃ প্রঃ একাদশ খন্ড, ইং ১৭-০৩-১৯৪৮)
আমি বুঝিনা–কোন হিন্দু শুচিশুদ্ধভাবে মসজিদে যেয়ে প্রার্থনা করতে পারবে না কেন, আবার একজন সদাচারী মুসলমান হিন্দুর প্রার্থনা-মন্দিরে বসে প্রার্থনা করতে পারবে না কেন ! ভগবান মানুষকে তার language (ভাষা) দিয়ে চেনেন না, তিনি চেনেন তাকে তার feeling (বোধ) ও activity (কর্ম্ম) দিয়ে। (আঃ প্রঃ ৯ম খণ্ড)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন—হজরত যীশু, হজরত মহম্মদ আমাদেরও prophet (প্রেরিতপুরুষ)। আর্য্যধারা যদি জীবন্ত থাকত, তা’হলে হজরত যীশু, হজরত মহম্মদ হয়তো একাদশ অবতার, দ্বাদশ অবতার ব’লে পরিগণিত হ’তেন। Anti-Biblism (বাইবেল-বিরোধী), Anti-Quranism (কোরাণ-বিরোধী), Anti-Vedism (বেদ-বিরোধী)-এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তার নিরাকরণ করতে হবে। শাক্ত বিপ্র এবং বৈষ্ণব বিপ্র-পরিবারে যেমন বিয়ে-সাদির কোন নিষেধ নেই—সৌর বিপ্র ও গাণপত্য বিপ্রে যেমন বিয়ে চলতে পারে, ইষ্ট, কৃষ্টি ও পিতৃপুরুষের ঐতিহ্যবাহী রসুল-ভক্ত বিপ্র, বুদ্ধভক্ত বিপ্র, খ্রীষ্টভক্ত বিপ্রের সঙ্গেও তেমনি বিধিমাফিক বিয়ে-থাওয়া হ’তে পারে—এতে কোন বাধা নেই। কারণ, স্বধর্ম্ম ও কৃষ্টি-নিষ্ঠ থেকে যে-কোন পূরয়মাণ মহাপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধানতি নিয়ে চলা ধর্ম্মের পরিপন্থী তো নয়ই বরং পরিপোষক। তবে প্রত্যেকটি বিয়ের ব্যাপারে খুব হিসাব ক’রে চলতে হবে, যাতে কোন রকমের ব্যত্যয়ী কিছু বা প্রতিলোম-সংস্রব না ঘটে। (আলোচনা প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড, ২। ৭। ১৯৪০)
* * *
সত্যের পথে চলতে পিয়াসী “সত্যমেব জয়তে”-এর সীলমোহর এর অধিকারী হতে চাওয়া সকল দেশসেবক পার্টির সদস্যদের কিছু নির্দিষ্ট আদর্শের অনুসরণ করে চলা উচিত। সাত্তিক ব্যক্তি চরিত্র নির্মাণ না করে, সদাচারী না হয়ে কখনোই মানুষের সেবা করে মনুষ্যত্বের জাগরণ ঘটানো সম্ভবপর নয়। তাই ব্যক্তি চরিত্র নির্মাণকল্পে কতগুলো বিধান মেনে চলতে হবে সবাইকে। যদি মানুষের মত মানুষ হয়ে মানুষের সেবা করতে চাই।
একজন মানুষের শারীরিক-মানসিক বিধানকে সুস্থ রাখতে হলে অভক্ষ্যভোজী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুনাদি তামসিক আহার করা যাবে না। করলে স্বাস্থ্য ক্ষুণ্ণ হবে। অগম্যাগামী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ প্রতিলোম, সগোত্র এবং সপিণ্ড সম্বন্ধীয়দের সাথে অবিধি পূর্বক ধর্মবিরুদ্ধ বিবাহের মাধ্যমে কামাচার করা যাবে না, করলে নীরোগ সুসন্তানের জনক-জননী হওয়া যাবে না। স্মৃতিকে নিশ্চল রাখতে শারিরীক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক সদাচার পালন করতে হবে। অসৎ পথ বর্জন করতে হবে। কদাচারী প্রদত্ত আহার ও পানীয় গ্রহণ করা যাবে না। করলে সংক্রামিত হবার আশঙ্কা থাকবে। এই আবশ্যিক জ্ঞানগুলো জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেবার জন্যই আর্য্য মহাসভা রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
আমাদের জীবধর্মের এক আবশ্যিক জৈবিক তাগিদ হলো আহার বা খাদ্য। যদিও ব্যাপক অর্থে আহার মানে আহরণ। যার মধ্যে সবকিছুই আছে। খাওয়া-দাওয়া, শোয়া-বসা, চলাফেরা, কথাবার্তা, কাজকর্ম, তথাকথিত প্রেম-ভালবাসা, বিয়ে করা, বাবা-মা হওয়া ইত্যাদি। আমাদের উপনিষদের ঋষিরা ওই সবগুলোকে একত্রিত করে ‘আহার’ নামকরণ করে বললেন, ‘‘আহারশুদ্ধৌ সত্তাশুদ্ধিঃ, সত্তাশুদ্ধৌ ধ্রুবাস্মৃতিঃ …… ’’—অর্থাৎ জীবন ধারণের নিমিত্ত আহরণগুলো শুদ্ধ হলে সত্তা শুদ্ধি হয়, সত্তা শুদ্ধি হলে স্মৃতি নিশ্চল হয়। স্মৃতি নিশ্চল হলে জাতিস্মর হওয়া যায়। জীবনভূমির এপার-ওপার নিরীক্ষণ করা যায়। যারা দেশসেবক হবেন, তারা যদি আদর্শ চলন-চরিত্র দিয়ে আত্মশুদ্ধির পথে চলতে অভ্যস্ত না হন, দেশের নাগরিকদের কোন সম্পদের উপহার দেবেন ? তাই প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সদস্যদের বিশুদ্ধ চলন-চরিত্রের ওপর নির্ভর করছে ভারতের উজ্জ্বল ভবিষ্যত। এবং ওই দৃষ্টান্তই ভারতকে মহান ভারতের শিরোপায় অধিষ্ঠিত করবে ভবিষ্যতে। এ বিষয়ে জীবন পিয়াসী সকল মানুষকে ভেবে দেখতে হবে। কোন ধর্মীয় মতবাদ প্রবৃত্তি-প্ররোচিত অশুদ্ধ আহার-বিহার-অনাচারকে সমর্থন করেনি।
আহার বিষয়ে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের বাণী
সর্বশ্রেষ্ঠ আর্য্য হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ মহাভারতের অনুশাসনপর্ব—১১৪ অধ্যায়ে বলা হয়েছে–
“যে ব্যক্তি মোহ প্রভাবে পুত্র-মাংস-তুল্য অন্যজীবের মাংস ভক্ষণ করে, সে অতি জঘন্য প্রকৃতির এবং তার সেই জীবহিংসা বহুবিধ পাপযোনিতে জন্মগ্রহণ করবার একমাত্র কারণ বলে নির্দিষ্ট হয়।’’
শুধু হিন্দু মতেই নয়, কোন ধর্মীয় মতবাদে জীবহত্যা স্বীকৃত নয়। কোরানে, আর্য্য হিন্দু-শাস্ত্রে এবং পুরুষোত্তমদের বাণীতে কোথাও ‘বলিদান’ বা ‘কোরবাণী’-র নামে প্রাণী হত্যার অনুমোদন নেই।
“আল্লার নিকট তাহার মাংস ও তাহার রক্ত কখন পৌঁছে না বা তিনি তাহা ইচ্ছা করেন না। বরং তোমরা অসৎকর্ম্ম হইতে নিজেকে রক্ষা কর ইহাই তিনি ইচ্ছা করেন। তিনি আমাদের অধীনে থাকিয়া কার্য্যনির্বাহের জন্য পশু সৃষ্টি করিয়াছেন—সেজন্য তোমরা খোদার নিকট নম্র ও নিরীহ হইতে শিক্ষালাভ করিবে। এই সৎপথ-প্রাপ্তির অর্থাৎ সৎ-শিক্ষার জন্যই খোদা এই ব্যবস্থা করিয়াছেন। যাহারা অন্যের মঙ্গল সাধন করে, তাহাদের মঙ্গল করিয়া থাকেন ……..” (কোর-আণ—২২ হজ ৩৭ র, ৫)
“বাসোপযোগী গৃহ, গুপ্তস্থান রক্ষা করিবার উপযুক্ত বস্ত্র, এবং শুষ্ক-রুটি ও পানীয় ব্যতীত মানব-সন্তানের অন্য কোন জিনিসের উপর অধিকার নাই ।” (–হাদিস তিরমিজি)
“একটু পানি এবং কয়েকটি খর্জ্জুরে তাঁহার ক্ষুধার নিবৃত্তি হইত । হজরত মোহাম্মদ একাধারে ধর্ম্ম-প্রবর্ত্তক, মহাকর্মী এবং সন্ন্যাসী ছিলেন ।” (ইসলামের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৯)
ভগবান বুদ্ধদেব বলেছেন, “আমি কখনই কাউকে মাংস খাওয়ার অনুমোদন করি নি, করি না এবং করব না।” (লঙ্কাবতার সূক্ত)
প্রভু যিশু বলেন, “তুমি হত্যা করিও না” । (এক্সোডাস – 20:13)
“যে একটি ষাড়কে হত্যা করলো, সে যেন একটি মানুষকে হত্যা করলো।” (ইসা – 66:33)
উক্ত অনুশাসনবাদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যে নিজেকে পরমেশ্বরের সন্তান বা খোদাতাল্লার বান্দা মনে করবেন তিনি কখনই কোন প্রাণী হত্যা করবেন না এবং প্রাণীর রক্ত-মাংসে ক্ষুধার নিবৃত্তি করবেন না।
প্রত্যেকের মানসিক অবস্থা-অনুযায়ী তার থেকে একটা Radiation (বিকিরণ) নির্গত হয়, সেই Radiation (বিকিরণ) আবার অন্যকে Influence (প্রভাবিত) করে । সেই জন্য শুধু খাওয়া কেন, সবাইকে সব সময় ছোঁয়াও ভাল নয়। বিশেষতঃ মানুষ যখন সাধন-ভজন ব্রত প্রায়শ্চিত্ত ইত্যাদি নিয়ে ব্যাপৃত থাকে। এগুলি কোন কুসংস্কারের কথা নয়। সাদা চোখে দেখা যায়। আবার সূক্ষ্ম যন্ত্র আবিষ্কার করলে তাতেই ধরা পড়তে পারে।
(শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, আঃ প্রঃ-৩/২৮০)
* * *
“…… আমরা আমাদের নিজেদের কৃষ্টির ধার না ধেরে পরের পরাক্রমে অভিভূত হয়ে চলছি। তাই, আমরা যত আন্দোলনই করি, একটা bastard thinking (জারজ) চিন্তা নিয়ে চলি।” (আলোচনা-প্রসঙ্গে ২১ খণ্ড, পৃঃ ৮১)
তাই—
আর্য্যকৃষ্টি অনুযায়ী রাষ্ট্রকে অবহিত করার জন্য
।। ‘বিধান বিনায়ক’ গ্রন্থ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিদেশ।।
“তোমরা
শাসন-সংস্থায় পদক্ষেপ করবার সাথে-সাথেই
কী দায়িত্বের কর্ণধার হ’য়ে পদক্ষেপ ক’রছ—বোধিদীপনা নিয়ে
কুশলকৌশলী সমীক্ষ অনুচর্য্যার সম্বেগ-সহ
তা’ স্মৃতিপটে জাগরূক রাখতে যত্নবান হয়ো,
আর, শ্রেয়নিষ্ঠায় অচ্যুত থেকে
হৃদ্য বৈধী ব্যক্তিত্বে
অটুট হ’য়ে যাতে থাকতে পার,—
তাই ক’রে চ’লো
সমস্ত প্রবৃত্তিকে শ্রেয়ার্থ-সংহত ক’রে;
১। প্রথমেই নজর রেখো
বিবাহ ও সুজনন-সংস্কারের উপর,
শ্রেয়কুল-সংস্কৃতি-সম্ভূত কন্যা
যাতে অশ্রেয়
বা অপকৃষ্ট-সংস্কৃতি-সম্পন্ন কুলে
অর্পিত না হয়—
তা’র সুব্যবস্থা ক’রো ;
কন্যার কুল-সংস্কৃতি ও চারিত্রিক সঙ্গতি
যেন বর বা পুরুষের
কুল-সংস্কৃতি ও চরিত্রের অনুপোষণী হয় ;
পণ বা যৌতুক-লালসার অপসারণে
লক্ষ্য রেখো,
পুরুষের সুকেন্দ্রিকতা
ও নারীর সতীত্বের উপর ভিত্তি করে
তোমাদের গৃহ, সমাজ ও গণ যেন
উদ্বর্দ্ধনমুখর হ’য়ে চলে ;
প্রথমেই এ-কথা বলার উদ্দেশ্য এই—
সুজনন যদি না হয়,
যে-নিয়ন্ত্রণের দ্বারা জাতক
শ্রেয় জৈবী-সংস্থিতি পেয়ে
আয়ু, মেধা, বল,
সুসঙ্গত চরিত্র এবং গুণবৈশিষ্ট্য নিয়ে কৰ্ম্মানুপ্রেরণায় যোগ্য হ’য়ে ওঠে,—
তা’ যদি না ক’রতে পার,
রাষ্ট্র-সংহতি ও রাষ্ট্রসত্তার সম্বর্দ্ধনা
দিন-দিনই ঘোর তমসাবৃত
ও নিথর হ’য়ে উঠতে থাকবেই কি থাকবে; প্রাকৃতিক বিজ্ঞানকে অবহেলা করে
যে-বিজ্ঞানেরই অবতারণা কর না কেন,
তা’ কখনও সহজ, সলীল, শুভসন্দীপী
হ’য়ে উঠতে পারবেই না,
অমনতর অবান্তর কল্পনাও
একটা মূঢ়তা মাত্র ;
তাই, শুধুমাত্র বর্ণাশ্রমের নীতিবিধিকে
দক্ষচক্ষুতে সুনিয়ন্ত্রিত ক’রে চ’লতে পারলেই
রাষ্ট্র-সংস্থা সৎ-সম্বদ্ধ হ’য়ে চ’লতে পারে,—
প্রাচীন শাস্ত্রে এ-কথা বহুল কীৰ্ত্তিত হ’য়ে আছে,
তাই, রাষ্ট্র-সংস্থার প্রধান করণীয়ই হচ্ছে
বর্ণাশ্রমের ধারণ ও সংরক্ষণ।
২। কৃষি-ব্যাপারে
বীজ ও ভূমির সুসঙ্গতির প্রতি লক্ষ্য রেখো,
যে-ভূমিতে যে-বীজের ফলন
পুষ্ট ও অধিক হ’য়ে ওঠে,
তা’র সুব্যবস্থা ক’রো,
কৃষি সম্বন্ধীয় চলনসই তত্ত্বগুলিতে
মানুষ যা’তে শিক্ষা লাভ করে—
তা’র ব্যবস্থা
ও যথাসম্ভব তা’তে প্রেরণাসম্বুদ্ধ করে
কৃষি-ব্যাপারে
লোককে এমনতর ব্যাপৃত রাখ,—
যাতে ক্রমশঃই
নানা জাতীয় ফসলের প্রাচুর্য্য ঘটে ওঠে,
আর, শাসন-সংস্থার সুব্যবস্থ পরিচালনে
পূর্ত্তবিভাগ, নদী-সংস্কার, সেচ
ও বনব্যবস্থার সুনিয়ন্ত্রণে
তা’দিগকে কৃষিকৰ্ম্মে
যথাসম্ভব সব দিক-দিয়ে সাহায্য ক’রো,
যাতে খাদ্য-বিষয়ে পরমুখাপেক্ষী না-থেকে
দেশ স্বাবলম্বী তো হ’য়ে ওঠেই,
বরং উদ্বৃত্ত খাদ্যবণ্টনে
অন্যের অভাবকেও দূরীভূত ক’রতে পারে।
৩। মানুষের সম্বেগকে
এমন উদ্দীপ্ত ক’রে তোল,
যা’তে তা’রা যোগ্যতায় অভিদীপ্ত হ’য়ে ওঠে,
এবং পারদর্শিতা, বোধ ও শ্রমনিয়োজনে
দেশ ও বিদেশের প্রয়োজনে
শিল্পের উন্নতি করতে পারে—
কুটীরশিল্পের সম্প্রসারণে
সবিশেষ লক্ষ্য রেখে—–
যাতে অধিকাংশ পরিবারই
শিল্প পরিচর্য্যায় ব্যাপৃত হ’য়ে ওঠে,
আর, ঐ জাতীয় সমস্ত ব্যাপারের জন্য
যে-যে উপকরণের প্রয়োজন
তা’ বিহিত ত্বরিতভাবে সরবরাহ কর– শিল্পোপযোগী যন্ত্রপাতি ও শক্তি সরবরাহকে
সহজ, সুগম ও ব্যাপক ক’রে তু’লে;
সঙ্গে সঙ্গে যানবাহন ও যোগাযোগের
বিহিত ব্যবস্থা কর,
যাতে কেউ
জীবনচর্য্যার যোগ্যতর পরিচর্য্যায়
কোন দিক-দিয়ে কোনরকমে
ব্যাহত না হয় ;
বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে,–
শ্রমিকরা যা’তে ধনিকের উপচয়ী হয়,
এবং ধনিকরা যা’তে
শ্রমিকদের সত্তাপোষণী হয়,
আর, যোগ্যতায় অভিদীপ্ত হ’য়ে
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে
শ্রমিকরা যাতে স্বাবলম্বী হ’য়ে ওঠে—
নিজের পরিবারকে শ্রমনিকেতন ক’রে
সম্পদে উদ্ভিন্ন হ’য়ে।
৪। ব্যবসা-বাণিজ্য-নিয়ন্ত্রণ
এমনই শুভ, সহজ,
অনুচৰ্য্যাদীপক হওয়া উচিত,
যা’র ফলে বা যে-নিয়ন্ত্রণে
মানুষ এতটুকুও অভাব বোধ না করে,
বরং যোগ্যতা ও প্রাচুর্য্যে উচ্ছল হ’য়ে ওঠে;
দেশে যা’ জন্মে, তা’র সহজ পরিবেষণ
ও জীবন-চলনার পক্ষে যা’ নিতান্তই প্রয়োজনীয়,
অথচ দেশে পাওয়া যায় না—
বিদেশ হ’তে এমনতর দ্রব্যাদির
শীঘ্র ও সহজ আমদানি
এমনতরভাবে
যা’তে মূল্য-বাহুল্যে
মানুষ পীড়িত না হ’য়ে ওঠে,
বা কেউ তা’র অভাবে সঙ্কটাপন্ন হ’য়ে
জীবন না হারায়,——
অতীব তৎপরতা নিয়ে
তীক্ষ্ণ চক্ষুর দিব্য বিবেচনায়
তা’র সমাধান হওয়া একান্তই সমীচীন—
অবান্তর গণবিক্ষোভের অবসরই যাতে না থাকে
এমনতরভাবে;
কৃষি ও শিল্পের উপচয়ী উৎপাদন ও বণ্টন
এবং বাণিজ্য ও বৈদেশিক অর্থ-বিনিময়ের
লাভজনক সুপ্রসারই হ’চ্ছে
অর্থনীতির মূল ভিত্তি,
আবার, কৃষিই এ-সবের মেরুদণ্ড,
যা’দের কৃষি অব্যবস্থ——
অনটনও তা’দের অপরিহার্য্য,
তা’দের পরশোষী না হ’য়ে উপায়ই থাকে না ।
৫। শিক্ষাকে একানুধ্যায়ী আদর্শে
অনুচর্য্যী ধৰ্ম্মের ভিত্তিতে
সুসঙ্গত সত্তাপোষণী ক’রে তোল,
যা’তে কোন শিক্ষাই
অন্য যা’-কিছুর সাথে
সঙ্গতির তাল রেখে
সম্বুদ্ধ সম্বর্দ্ধনায়
বাস্তব যোগ্যতার উৎক্রমণে
উদ্গতি লাভ ক’রতে না-পেরে—
বৃথা ও বিচ্ছিন্ন হ’য়ে না ওঠে ;
শ্রদ্ধোষিত অন্তরাসী হ’য়ে
প্রতিপ্রত্যেকে যা’তে শিক্ষানুবৰ্ত্তনায়
উচ্ছল চলনে চ’লতে পারে, –
তা’র জন্য যথাবিহিত পরিবেশ সৃষ্টি কর ;
শিক্ষকদিগকে ঐ অমনতর শিক্ষার
মূর্ত্তপ্রতীক হ’য়ে উঠতে হবে,
তাঁরা যদি সুকেন্দ্রিক, একানুধ্যায়ী
সশ্রদ্ধ না হ’য়ে ওঠেন—
অন্তরাসী সম্বেগ-সম্বুদ্ধ হ’য়ে—
ছাত্রেরাও সুসঙ্গত হয়ে উঠবে না তাঁতে,
অন্তরাসী হবে না,
যা’র ফলে, শিক্ষা
একটা শাতনী পটভূমিতে
আবর্ত্তিত হয়ে উঠবে ;
শিক্ষার সাথে
বৈধানিক দক্ষতা ও শক্তি
এমনতর সূক্ষ্ম, সবেগ
ও কৰ্ম্মঠ হয়ে ওঠা চাই,
যা’র ফলে, মানুষ
কোন ব্যাপারের সম্মুখীন হ’লেই
মুহূর্ত্তে সেগুলি উপলব্ধি ক’রতে পারে,
ন্যায়-অন্যায়, ভাল-মন্দ, সৎ-অসৎকে
দেশকালপাত্র ও অবস্থার ভিতরেও
ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্ত্তমানের সঙ্গতি নিয়ে
লহমায় বেছে নিতে পারে ।
৬। গবেষণা কেন্দ্রগুলিকে দেশের
দীপালী-বীক্ষণাগার ক’রে তুলতে হবে,
সুসঙ্গত সত্তাপোষণী সমাচার
যা’তে সুদূরপ্রসারী পরীক্ষায়
সুনিশ্চয়ী তাৎপর্য্যে
সবার কাছে উপস্থিত হয়,
যা’র পরিপালনে তারা জীবন ও সম্বৃদ্ধিতে
আরো হ’তে আরোতর উদ্বর্দ্ধনায়
নিয়ত চলৎনশীল থাকতে পারে—
আদর্শ ও ধর্ম্মের ভিত্তিতে
নিটোলভাবে দাঁড়িয়ে—
তা’র ব্যবস্থা ক’রতে হবে।
৭। তোমাদের স্বাস্থ্য অভিযান যেন
গ্রামের কানায় কানায় উপস্থিত হয়,
সদাচার ও স্বাস্থ্য-নীতিগুলিতে
প্রতিটি ব্যষ্টি যেন পারদর্শী হয়ে ওঠে,
ঔষধ, পথ্য, চিকিৎসা ও বৈদ্যের
যেন এতটুকু অভাব না ঘটে,
তোমাদের গণজীবন
স্বাস্থ্যে, বীর্য্যে
অযুত-আয়ু হ’য়ে
বীৰ্য্যবান যোগ্যতা নিয়ে
তাদের অস্তিকে স্বস্তি-বিকিরণে
যেন বিকীর্ণ ক’রে তোলে,—
হৃদ্য হ’য়ে, তৃপ্তিপ্রদ হ’য়ে
মধুদীপনার রশ্মিজাল বিচ্ছুরণে
অস্তিত্বের সামগানে
সম্বৃদ্ধ ক’রতে পারে সবাইকে ।
৮। শান্তিরক্ষক-বিভাগ ও সৈন্য-বিভাগ
সুষ্ঠু সন্দীপনায়
আদর্শপ্রাণ ধৰ্ম্মানুগ ভিত্তিতে
অসৎ-নিরোধী হ’য়ে
যা’তে প্রতিপ্রত্যেকের আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে,
সে-বিষয়ে বিশেষ লক্ষ্য রেখো,
ব্যতিক্রমে
বিশেষ ব্যবস্থা অবলম্বন করো;
নিরাপত্তা যেখানে সন্দেহের
নিরোধও সেখানে অব্যর্থভাবে প্রয়োজন—
ক্ষিপ্র তৎপরতায় ;
আর, শান্তিরক্ষক ও সৈন্য-বিভাগের
প্রতিপ্রত্যেকে যেন
একানুধ্যায়ী, ধৰ্ম্মপ্রদীপ্ত
সৌকৰ্য্য-সমন্বিত ঐ শাসন সংস্থার
স্বভাব-যাজী হ’য়ে ওঠে–
বাক্য, ব্যবহার ও কর্ম্মের সুসঙ্গতির তালে,
যার ফলে, প্রত্যেকটি মানুষ
উপলব্ধি ও উপভোগ করতে পারে
ঐ শাসন-সংস্থা
তাদের কাছে কতখানি শ্রেয় বা প্রিয়,
সবাই যেন একটা আসান ও আশা পায়,
শাস্তিকেও তারা যেন
স্বস্তি ব’লে আলিঙ্গন ক’রতে পারে।
৯। গুপ্তচর-বিভাগকে
এমনতর ক্ষিপ্র, দক্ষ, নিপুণ, বিশ্বস্ত ও তৎপর
ক’রে তুলতে হবে—
আপ্রাণ শ্রেয়ার্থ-অভিদীপনা-নিবদ্ধ করে,
যেন তারা যাই করুক না কেন
শ্রেয়ার্থকে
কিছুতেই বিসৰ্জ্জন দিতে না পারে,
তাদের জীবনমূল
যেন এতই ধর্মভিত্তিতে প্রোথিত থাকে যে,
তাকে উল্লঙ্ঘন করা তাদের পক্ষে
দুর্ভাবনীয় ব্যাপার হ’য়ে দাঁড়ায়;
তা’দের চক্ষু, কর্ণ, জিহবা,
নাসিকা, ত্বক্ ইত্যাদিকে
এতই তীক্ষ্ণ ও নির্ভুল বোধপ্রবণ ক’রে তুলতে হবে,—
যা’তে তা’রা স্বতঃই
বিচক্ষণ বোধ-তাৎপৰ্য্যশীল হয়ে ওঠে,
তাদের উপস্থিতবুদ্ধি, বাক্য-বিন্যাস
এমনতর ক’রে তুলতে হবে–
যাতে কোন বিষয়ে তাদের বিবরণ
বাস্তবতারই বাক্-ছবি হ’য়ে ওঠে,
তাদের ধারণাগুলিকে
এমনতর সুস্থ ধৃতি-প্রবণ ক’রে তুলতে হবে—
যাতে বিবরণে
কোনমাত্র ব্যতিক্রম না হয়,
অযথা অপকৃষ্ট-ধারণাদুষ্ট হয়ে
বা বাস্তব বিষয়ের অসাক্ষাৎকারে
তাদের প্রদত্ত কোন বিবরণের দ্বারা
কেউ যেন
অযথাভাবে আক্রান্ত বা বিমর্দ্দিত না হয়,
আবার, আলস্য বা প্রবৃত্তি-প্রলুব্ধ হয়ে
তাদের ক্ষিপ্র নৈপুণ্য
এতটুকুও যেন বিকম্পিত না হয়ে ওঠে,
দুষ্ট পরিবেশ বেষ্টিত হয়েও
তাদের এমনতর
উপস্থিতবুদ্ধির তালিমসম্পন্ন হওয়া উচিত—
যাতে তারা
যে-কোন অবস্থায় পড়ুক না কেন,
সে-ব্যুহ ভেদ ক’রে ফিরে আসা
তাদের পক্ষে হস্তামলকবৎ হ’য়ে ওঠে,
তারা যেন
সাহস ও প্রত্যয়ে অভিদীপ্ত হয়ে চলে,
দেবপ্রভ চরিত্র,
শাতন-ভেদী ইন্দ্রিয় ও বোধি-সমন্বিত যে যত,—
সেই তত শ্রেয়,
দক্ষ, পারদর্শী, কর্ম্মপটু হ’য়ে থাকে,
নিষ্ঠা, সহ্য, ধৈর্য্য, অধ্যবসায়
ও কৰ্ম্মপটু তীব্রবীর্য্যী বোধায়নী সন্ধিৎসাই হচ্ছে
তাদের প্রিয় সম্পদ ;
গুপ্তচর-বিভাগ ছাড়া
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও উৎকর্ষ-অভিধ্যায়িতার জন্য
উপযুক্ত সন্ধানী বিভাগেরও প্রয়োজন,
যা’রা দক্ষ, কর্ম্মপটু, সুসন্ধিৎসু
নিপুণ অভিধ্যায়িতা নিয়ে
ক্ষিপ্র তৎপরতার সহিত
রাষ্ট্রের সম্পদ ও আপদকে
সম্যকভাবে নির্দ্ধারণ ক’রে
চতুর বৈধী-তৎপরতায়
উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণে
আপদকে নিরাকরণ ক’রে
সম্পদকে সুবর্দ্ধিত ক’রে তুলতে পারে,
উক্ত বিভাগে সত্তাপোষণী ধৰ্ম্মানুগ সুনিষ্ঠ একানুধ্যায়ী তাৎপর্য্যবান
পটু, শ্রমপ্রিয়, ধীমান কর্মীর নিয়োগও
একান্ত প্রয়োজন ।
১০। বিচারালয়ে বিচারক
ঐ সশ্রদ্ধ ধৰ্ম্মানুগ
একানুধ্যায়িতা নিয়ে
যেন এমনতর
বিচার ও সুশাসন-তৎপর হ’য়ে ওঠেন,–
যা’তে সব্যষ্টি প্রত্যেকটি গণগুচ্ছই
তাঁ’তে আস্থাসম্পন্ন, তৃপ্ত ও সন্দীপ্ত হ’য়ে
শাসন-সংস্থায় আত্মনিয়োগ করে,
তা’র সৌকর্য্যে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠে—
স্বাভাবিক স্বতঃ-সন্দীপনায় ।
১১। কর্মচারী নিয়োগ-ব্যাপারে
প্রথমেই দেখা উচিত
সসংস্কৃতি তা’র কুল ও বংশ,
দেখতে হবে
মাতৃকুলই হোক বা পিতৃকুলই হোক—
তাতে কোনরকম অশ্রেয় বা অবৈধ
বিক্ষেপ আছে কিনা,
কারণ, তা’ থাকলে,
সে যত বড়ই দক্ষ
ও বোধিবীৰ্য্যবান হোক না কেন,
অবিশ্বস্ত হওয়ার ঝোঁক তা’তে
কিছু-না-কিছু থাকবেই ;
আবার, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধি
যেন একমাত্র বিচার্য্য না হ’য়ে ওঠে,
বিশ্বস্ত, দক্ষ, বীৰ্য্যবান,
কর্ম্মঠ পারদর্শিতাকে ভিত্তি ক’রেই
নির্বাচন-বিচার চালানো যুক্তিসঙ্গত,
তা’র সাথে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের তকমা থাকে—
সে তো ভালই,
তা’ ছাড়া
স্বাস্থ্য, মনোবল, সাহস, বোধিদক্ষতা
অনুবৰ্ত্তিতা, উপস্থিতবুদ্ধি,
সুসঙ্গত ক্ষিপ্র চিন্তাসঙ্গতি,
সুসিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা,
নির্ভুল ও ক্ষিপ্র সম্পাদনী
তৎপরতা ইত্যাদি দেখা
অতীব সমীচীন ;
এগুলি দেখতে হবে,
যে যে-পদের প্রার্থী
তা’র উপযোগিতা-অনুপাতিক—
জৈবী-সঙ্গতিকে ভিত্তি করে।
১২। স্বরাষ্ট্র ও বৈদেশিক দপ্তরকে
এমনতরই সাবুদ ক’রে তুলতে হবে,
যাতে স্বরাষ্ট্র ও বিদেশের
সুসঙ্গত পারস্পরিক অনুচৰ্য্যায়
কোথাও এতটুকু অবিবেকী অসামঞ্জস্য না থাকে,
তা’রা বান্ধবতায় সুনিবন্ধ হয়ে ওঠে—
পারস্পরিকতায়,
রাষ্ট্রসত্তা ও স্বার্থকে অব্যাহত রেখে,
সত্তাপোষণী ধৰ্ম্ম, কৃষ্টি
ও আদর্শানুগ রাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্যকে
অটুট রেখে,
সম্ভ্রমাত্মক অনুবেদনী আনতির সহিত ;
বৈদেশিক বান্ধবতা যেন অচ্ছেদ্য থাকে,
কোনপ্রকার কূটকৌশলই যেন
ঐ বান্ধবতাকে ছিন্ন করতে না পারে,
তাদিগকে এমনতর ক’রে তোল
যাতে তারা তোমার রাষ্ট্রীয় সত্তার সংরক্ষণ
ও তৎপরিপন্থী যা’-কিছুর নিরাকরণে
অপরিহার্য্যভাবে
সক্রিয় স্বতঃ-অনুধ্যায়ী হয়ে ওঠে।
১৩। আবার, ঐ আদর্শকে রূপায়িত ক’রতে
রাষ্ট্রদূতও তেমনতরভাবে
নিয়োগ করো,
রাষ্ট্রসত্তায় স্বার্থবান, সদ্বংশজ, বিদ্বান,
সুসঙ্গত বোধিপরায়ণ,
উপস্থিতবুদ্ধিসম্পন্ন, নীতিজ্ঞ, মিষ্টভাষী,
ধৰ্ম্ম, কৃষ্টি ও আদর্শে অচ্যুত সুনিষ্ঠ,
কৌটিল্য-অভিজ্ঞ, ইঙ্গিতজ্ঞ, মর্ম্মজ্ঞ,—
মোক্তা কথায়
এই জাতীয় জন্ম ও গুণবিশিষ্ট
শ্রেয়ার্থপরায়ণ লোকই কিন্তু
দৌত্যের উপযুক্ত পাত্র,
বিসদৃশ, বিশৃঙ্খল যা’,
আদর্শ, ধৰ্ম্ম ও কৃষ্টি-সমন্বিত
রাষ্ট্রসত্তা ও স্বার্থকে
ব্যাহত করে, খাটো করে,
বা নিন্দা করে যা’,—
সুযুক্তিপূর্ণ তথ্য-সমন্বিত
বাক্য, ব্যবহারের ভিতর-দিয়ে
তাকে নিয়শ্রিত করে
রাষ্ট্রসত্তা ও স্বার্থকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে,—
এমনতর উপস্থিতবুদ্ধি নিয়ন্ত্রিত-ধী-সমন্বিত
কূট-কৃতি পরিচর্য্যাসম্পন্ন ব্যক্তিই
দৌত্য-ব্যাপারে বাঞ্ছনীয় ।
১৪। প্রচার-প্রাচুর্য্য এতই হওয়া উচিত—
যাতে দেশের আদর্শ, দেশের কৃষ্টি,
দেশের বিবর্ত্তনী পদক্ষেপ,
বিদেশের প্রত্যেককেই
মুগ্ধ ও আন্দোলিত ক’রে তোলে—
উন্নয়ন-অনুশীলনী সম্বেগে,—
সবাই শ্রদ্ধাবন্ত হয়ে ওঠে
তোমার দেশের গণ ও ব্যষ্টিতে;
ধৰ্ম্মের মূলসূত্র যা’,
আদর্শ, কৃষ্টি এবং সত্তাপোষণী নীতি যেগুলি—
সে-সবগুলি বিহিতভাবে উদ্ভিন্ন করে
সঞ্চারিত ক’রে, নিয়মন ক’রে
যাতে প্রত্যেকটি ব্যষ্টি
তদ্ভাবান্বিত হয়ে ওঠে
একত্বানুধাবনী তাৎপর্য্যে,
পারস্পরিক বৈশিষ্টপোষণী সশ্রদ্ধ পরিচর্য্যায়,
বাক্যে, ব্যবহারে, চলনে,—
তার বিহিত ব্যবস্থা করা নিতান্তই সমীচীন,
আর, ঐ সমীচীনতার অবহেলা
যতই বেশী হ’য়ে ওঠে,
একানুধ্যায়ী সংহতি-স্বাতন্ত্র্য
পারস্পরিক সহযোগিতা
যোগ্যতা-অভিদীপ্ত বিবৰ্ত্তনী অনুপ্রাণনা
ক্রমশঃই অপলাপের দিকে
চ’লতে থাকে ততই,
তখন সত্তাতান্ত্রিকতার বদলে আসে—
প্রবৃত্তির ব্যভিচারী পরিক্রমা,
দুর্ব্বুদ্ধির উদগ্র লেলিহান সম্বেগ,
যা’ নিজের সত্তাকেই আয়বাদ দিয়ে
পরিশোষণ করে
তারই উপভোগ্য উপকরণ-সংগ্রহে
আগ্রহবিধুর হ’য়ে ওঠে,
এই হচ্ছে শাতনী সঞ্চলন,—
ব্যষ্টি, গণ ও রাষ্ট্রকে
সৰ্ব্বনাশে সমাধিগ্রস্ত করার
আত্মঘাতী আবেগ—
যা’ গণবিদ্রোহের সৃষ্টি ক’রে তোলে ।
১৫। শাসন-সংস্থা নিজে
তা’র প্রতিটি কর্মচারী-সহ
যথাসম্ভব একানুধ্যায়িতার সহিত
পরার্থপরতার সম্বেগ নিয়ে
কৃতি-অধ্যুষিত সন্দীপনায়
যেন রাষ্ট্রের প্রতিটি ব্যষ্টিকে দেখা-শোনা করেন,
তা’ ছাড়া, নিয়মিতভাবে নগর—
বিশেষতঃ পল্লী-পরিদর্শন,
লোকের সুখদুঃখ, অভাব-অভিযোগের তথ্য গ্রহণ,
তন্নিরাকরণী যোগ্যতা-সন্দীপী আলোচনা,
অযথা অবান্তর ব্যয়বাহুল্যের
সঙ্কোচ ও সুনিয়মন,
এবং বিশেষ বিষয়ে বিহিত স্থানে
আপূরণী সাহায্য-দানের
এমনতর ব্যবস্থা যেন করেন
যার ফলে
প্রতিপ্রত্যেকের বোধে
উপস্থাপিত হয় যে,—
শাসন-সংস্থা তা’র প্রতিটি ব্যষ্টি-সহ
তাদের কাছে কতখানি আত্মীয়ভাবাপন্ন;
এটা একটা অপরিহার্য্য করণীয়।
১৬। করধার্য্য এমনি ক’রে করো,—
যাতে মানুষের কর
তোমার শাসন-সংস্থার
সহায় হ’য়ে ওঠে,
সম্বর্দ্ধনার শক্তি হয়ে ওঠে,
তোমার কর যেন
মানুষের করকেই আলিঙ্গন করে,
আবার মানুষের যোগ্যতা
ও আন্তরিক আগ্রহ
কর্ম্মদীপ্ত হয়ে
যেন এমনতর উপচয়ী হ’য়ে ওঠে,—
এবং তোমাদের পালন পরিচর্য্যায়
এমনতরই সম্বুদ্ধ ও সম্বৃদ্ধ হ’য়ে ওঠে—
যা’র ফলে, প্রতিটি গণের
আগ্রহ-উদ্দীপ্ত অবদানে
তোমাদের রাজকোষ
উচ্ছল চলনায় চলতে থাকে,
আর, তা’র ব্যবহারও যেন এমনতর হয়—
যাতে ঐ কোষ অবাধভাবে
উপচয়ী চলনে চলতে পারে
এবং ব্যয়টাই যেন উপচয়ের কারণ হয়ে ওঠে;
রাজকোষ যেখানে অপটু,
গণযোগ্যতাকে সম্বেগে প্রবুদ্ধ করে
উৎপাদন-হারকেই প্রবুদ্ধ করে তোল—
ক্রমচলনের ভিতর-দিয়ে,
আর, রাজকোষকে উচ্ছল করে
তুলতে চেষ্টা কর—
সমবেত সানুকম্পী পরিচর্য্যায় ;
গণসত্তার নিরাপত্তার জন্য
আয়ের একদশমাংশ সংরক্ষিত ক’রে
অন্যায্য-ব্যয়-সঙ্কোচে
ন্যায্য নিয়ন্ত্রণে
গণ-নিরাপত্তাকে অটুট ক’রে তোল,
আর, গণসত্তা-পোষণ ও প্রবর্দ্ধনের জন্য
‘যা’ প্রয়োজন
‘তা’ ঐ নয়-দশমাংশের ভিতর
নিষ্পন্ন করতে চেষ্টা কর;
যতক্ষণ পর্য্যন্ত কোন উৎপাদন
তেমনতর প্রাচুর্য্যে উপস্থিত না হয়—
যা’র ফলে, নিরাপত্তার ব্যয়
ঐ উপচিত ভাণ্ডার থেকেই
সচ্ছল হ’য়ে ওঠে,
ততদিন শ্রমপটুতাকে উপেক্ষা না ক’রে
উৎপাদনকে আরো-আরো
সম্বুদ্ধ করে তুলো;
তাতে তোমার রাষ্ট্রসত্তাও
পরাক্রমশীল হয়ে উঠবে।
১৭। নিজের দেশের দুর্ব্বলতা যেগুলি আছে,
সেগুলির সংস্কারে
জাতিকে সবল করে তুলতে হবে,
অনটনের অপনোদনে
দেশকে প্রাচুর্য্যে উদ্ভিন্ন করে তুলতে হবে,
অপটু যারা তা’দিগকে পটুত্বে
প্রকৃষ্ট করে তুলতে হ’বে,
যারা অপলাপের কোলে অবশায়িত
তাদিগকে উদ্গতিশীল করে তুলতে হবে,
সৎ-কে আরো আরোতে
উদ্দীপ্ত করে তুলতে হবে—
বৈধী বৈশিষ্ট্যপালী বিবৰ্ত্তন-পদক্ষেপী ক’রে সুকেন্দ্রিকতায় সুনিবদ্ধ করে।
১৮। অবিশ্বস্ততা ও কৃতঘ্নতাকে
উপযুক্ত উপায়ে
নিরোধ করবেই কি ক’রবে—
ক্ষিপ্র তৎপরতায়,
যা’র ফলে, মানুষের ঐ প্রবৃত্তি
বৃদ্ধিপর না হ’য়ে
ক্রমশঃই সঙ্কুচিত হয়ে
অপলাপে নিঃশেষ হয়ে ওঠে,
যেখানে দেখবে
অসৎ যা’, বিরোধী যা’
আদর্শ, ধৰ্ম্ম, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি-বিধ্বংসী যা’
নিয়তই ক্রুর ও সাংঘাতিকভাবে
তোমার সংস্থা ও সত্তার
অপঘাতী হয়ে চলেছে,—
সুদৃঢ় প্রস্তুতি নিয়ে
তাকে অনতিবিলম্বেই নিরোধ ক’রতে
একটুকুও ত্রুটি ক’রো না,
বিলম্বে তাকে হয়তো আয়ত্তে আনা
সুকঠিনই হয়ে উঠতে পারে;
সম, দান, ভেদ ও দণ্ডের প্রতি
বিশেষ বিবেচনা
ও অনুধ্যায়ী বিচারণার সহিত
যেখানে যখন যেমনটি প্রয়োজন
সত্তাসম্বর্দ্ধনা ও অসৎ-নিরোধে
সেখানে তেমনতরই
যথাসম্ভব প্রস্বস্তির আবহাওয়া নিয়ে
তা নিষ্পাদন করতে
একটুও অবহেলা করো না;
সাম-দানে যদি সমস্যা সমাধান লাভ করে
তবে ভেদ সৃষ্টি করতে যেও না,
ভেদেই যেখানে তা নিরাকৃত হয়
সেখানে দণ্ড দিতে যেও না;
কিন্তু দণ্ড যেখানে অপরিহার্য্য হয়ে উঠেছে
সেখানে দণ্ডকে ত্যাগ করো না,
আবার, কোথাও প্রয়োজন হ’লে
যুগপৎ চতুঃ-পন্থাই অবলম্বন করতে পার;
ফলকথা, অবৈধ যা’, অসৎ যা’,
অন্যায় যা’,
তা’ যেন ভীত, ত্রস্ত শ্রদ্ধাবনত হ’য়ে থাকে
তোমাদের শাসন-নিয়ন্ত্রণের ফলে।
১৯। সর্ব্বোপরি, তোমাদের শাসন-সংস্থা যেন
বৈশিষ্ট্যপোষণী লোকপালী সংস্থা
ও সুসঙ্গত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের পরিপোষণে
যত্নবান্ হয়,
বৈশিষ্ট্যপালী আপূরয়মাণ বিজ্ঞ-মহানদের প্রতি
বিশেষ সম্ভ্রম ও অনুচর্য্যা নিয়ে চলে,
আর, শাসন-সংস্থার পরিচালকবর্গ যেন
দেশের পূরয়মাণ ধৰ্ম্ম-প্রবক্তা যাঁরা
তঁৎসংশ্রয়ে উপস্থিত হয়ে
সশ্রদ্ধ আগ্রহে
উন্মুখ আপ্রাণতা নিয়ে
আলাপ-আলোচনার ভিতর-দিয়ে
তাঁদের দূরদর্শী উপদেশ ও অনুশাসন-গ্রহণ
ও তৎপ্রবর্ত্তনায় মনোযোগী হন,
এতে শাসন সংস্থা স্বতঃই
অভ্যুদয়ী কল্যাণের পথে চলতে পারবে ।
২০। এইতো গেল সেগুলি—
মোটা কথায় যা আমার ইয়াদে আসে ;
তবে আরো মনে হয়,
শাসন-পরিষদ বা শাসন-সংস্থার বাহিরে
সব সময়ই এমনতর একজন প্রাজ্ঞ বহুদর্শী
ইষ্ট, কৃষ্টি ও ধর্মের অনুচর্য্যাপরায়ণ
বৈশিষ্ট্যপালী আপূরয়মাণ
কেউ যদি থাকেন,
যিনি ঐ শাসন-সংস্থার
সমস্ত নিয়মন ও পরিচালনে
নিয়ত লক্ষ্য রেখে
বাষ্টিগত ও সমষ্টিগতভাবে
লোকের অভিধ্যায়ী প্রয়োজনগুলিকে
অবলোকন করে থাকেন—
সম্যক্ তাৎপর্যে অভিগমনশীল হ’য়ে
সুসঙ্গত সূত্রকে অনুভব করে—
শ্রদ্ধাবনত অন্তঃকরণে
আগ্রহদীপনার সহিত
বোধায়নী পরিচর্য্যায়
পরিপ্রশ্ন ও সেবার দ্বারা
আলোচনায়
সমস্ত ব্যাপারগলিকে অনুধাবন করে
যখন যে-ব্যাপারে যেমন প্রয়োজন
তাঁর মত
ও কুশলকৌশলী নিয়মনের মন্ত্রণা নিয়ে—
তা’ পূৰ্ত্তনীতি সম্বন্ধেই হো’ক
আর, কৌটিল্য-সম্বন্ধীয়ই হো’ক,
নিজদিগকে তদনুপাতিক
সংস্থ ক’রে চ’লতে পারলে
শাসন-সংস্থা
আরও সুষ্ঠু, সুকেন্দ্রিক
ও সুন্দর হয়ে উঠতে পারে
অচ্যুত আদর্শাভিগমনে ;
কারণ, যা’রা দাবা খেলে,—
নিজেদের দুরাগ্রহ ঔৎসুক্য-বশতঃ
তাদের বোধদর্শিতা
অনেকখানি অবসন্ন হ’য়ে ওঠে,
ঐ কুশলকৌশলী তাৎপর্য্য-পরায়ণ
বোধিসম্পন্ন পৃষ্ঠপোষকের ইঙ্গিত
তখন সাফল্যের দিকেই নিয়ে যায়,
আমার বৃদ্ধি ও বিবেচনা-মাফিক
শাসন-সংস্থার বাহিরে
এমনতর একজন
মানুষের প্রয়োজন অপরিহার্য্য—
যদিও সব ক্ষেত্রে, সব সময়ে
এমনতর লোক পাওয়া দুষ্কর;
আর, এমনতর লোক থাকুন আর নাই থাকুন—
শাসন-সংস্থার বাইরে
সব সময়
এমন শক্তিশালী নাগরিক সংস্থার প্রয়োজন,
যে-সংস্থা
নাগরিকদের ভিতর থেকে
ইষ্ট, কৃষ্টি ও ধৰ্ম্ম-অনুশাসন-সম্বুদ্ধ
শ্রেয়-কুল-সম্ভূত
আদর্শপ্রাণ সৰ্ব্বসঙ্গত বোধসম্ভারসম্পন্ন
বেদ-বিজ্ঞানবিৎ,
কৰ্ম্মপ্রাজ্ঞ,
বৈশিষ্ট্যপালী-আপূরয়মাণ-শ্রেয়নিষ্ঠ
সভ্য দ্বারা সুসংহিত হবে,
সুনিবদ্ধ হ’য়ে রইবে,—
যা’রা ধর্ম্মানুগ অস্তিবৃদ্ধির নিয়মনে
গণজীবনকে
যেমনতরভাবে নিয়ন্ত্রিত করা উচিত
তা’ তো করবেনই,
আরো, শাসন-সংস্থার
যে-কোন বিধি প্রণয়ন করতে হলে
তাঁদের অনুমতি ছাড়া
তা ঐ বিধান-সভায়
উত্থাপিত হতে পারবে না;
পরিস্থিতি, দেশকালপাত্র ও প্রয়োজন-অনুপাতিক এমনতর ব্যবস্থা যদি না হয়,
পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রবর্তিত এই পবিত্র ধ্বনির মাধ্যমে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীস্টানাদি সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অবতার পুরুষদের বন্দনা করা হয়।
।। প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্য অবদান।।
নিবেদনে— তপন দাস
————————————————
মহাভারতের বনপর্বে বকরূপী ধর্ম যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্ন করেছিলেন, সব চাইতে আশ্চর্যের বিষয় কি ?
উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, মৃত্যু অবশ্যাম্ভাবী জেনেও মানুষ ন্যায়, নীতি, ধর্ম বিসর্জন দিয়ে চিরদিন বেঁচে থাকতে চায় এটাই সব চাইতে আশ্চর্যের বিষয় ।
তাই, আমরা, ঠাকুরের মানুষেরা যেন ওইসব পথের পথিক না হই । প্রবৃত্তিধর্মী অসৎ পথ অবলম্বন করে যদি চিরজীবি হওয়া যেত তাহলে না হয় অসৎ পথের আশ্রয় অবলম্বন করার সার্থকতা থাকত। তাই আমাদের বাঁচতে হবে পরমপিতার খুশির জন্য, মরতেও হবে পরমপিতার খুশির জন্য—মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার লক্ষ্যে, ‘তৃষ্ণার একান্ত নির্বান— মহাচেতন সমুত্থান।’ বাণীকে সম্মান জানাতে।
নির্দিষ্ট অপরাধবোধ ছাড়াও দুর্বলতাজনিত উৎকণ্ঠার ভয়, আগন্তুক ভয়, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভয় মনের পিছু ছাড়ে না । সব ভয়ের চরম মৃত্যুভয় । একটু অভ্যাস করলেই অন্তর্যামী স্বরূপ পরমাত্মিক শক্তির সাহায্যে আধিভৌতিক, আধিদৈবিক, আধ্যাত্মিক ত্রিবিধ ভয় থেকে মানুষ মুক্ত হতে পারে । এজন্য প্রবৃত্তি অভিভূতির সব দুর্বলতা কাটিয়ে ইষ্টকর্মে নিয়োজিত থাকতে হবে । তাই তো ঠাকুর আমাদের সব ভয় থেকে মুক্তি দিতে বাণী দিলেন ।–
“সব প্রবৃত্তি রত থাকে
ইষ্টকর্ম লয়ে,
সেই তো যোগী, সেই সন্ন্যাসী,
কাল নত যার ভয়ে ।”
“He will stand like a tower when everything rocks around him and when his softer fellow- mortals are winnowed like chaff in the blust.”
(আঃ প্রঃ ২/৭৫)
(যখন সবকিছুর অস্তিত্ব টলায়মান হয়ে উঠবে, এবং শক্তিহীন নির্জীব লোকগুলি ঝড়ের আগে তুষের মত উড়ে যাবে, তখন সে একটা স্তম্ভের মত নিজের শক্তিতে অটল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে ।)
জীবের জীবনবৃদ্ধির অপলাপকারী মৃত্যুকে প্রণাম জানিয়ে, মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার এই পথকে আঁকড়ে আমরা যেন অনন্ত জীবনের অধিকারী হতে পারি । দৈব দুর্বিপাক ভূমিকম্পে ভীত না হয়ে আমরা সকলে যেন মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার সাধনা ইষ্টনাম এবং ইষ্টকর্মে মত্ত থাকি, পড়শিদের, পারিপার্শ্বিকদের, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আক্রান্তদের সহায় হয়ে,—মৌখিক স্তুতি, আত্মার শান্তি কামনার পাশাপাশি বাস্তব কর্মের মাধ্যমে । পরমপিতার অনুশাসনকে সহায় করে বিশ্ব প্রকৃতিকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সব্বাইকে।
বিশ্ব-প্রকৃতির পরম দান, পঞ্চ-মহাভূত—ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-এর অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই পৃথিবী নামক সবুজ গ্রহটি। নগর-সভ্যতার ধারক-বাহকেরা আসুরিক ক্ষমতার বলে, ভোগবাদের ছাড়পত্রের বলে, আদর্শহীনতার বলে ভারতীয় ধর্মের অঙ্গীভূত পঞ্চ-মহাযজ্ঞ, সদাচার এবং বর্ণাশ্রমকে বিদায় জানিয়ে বসুন্ধরার পরিবেশকে যে ধ্বংসাত্মক পথে এগিয়ে দিয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘নাসা’-র গবেষণা। উদ্বেগ প্রকাশ করে গিয়েছিলেন কবিগুরু, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর’-এর প্রতিবাদী বাণীতে।
ভারতবর্ষের বৃহত্তম নদী গঙ্গাকে আমরা মা বলি, যাঁর পূত স্রোতধারায় স্নাত হয়ে পবিত্র হই, সেই মায়ের শরীরে নগর-সভ্যতার পুর-বিভাগ যখন পরিকল্পিতভাবে পূতিগন্ধ ক্লেদ নিক্ষেপ করে, ধর্মের ধ্বজাধারীরা তথাকথিত পূজা-পার্বনের বর্জ্য নিক্ষেপ করে পুণ্য অর্জন করে, তখন মনে হয় না যে আমরা কোন উন্নত সভ্যতার সভ্য, প্রগতি বাদের বাদী, আর্য্য সংস্কৃতির ধারক বাহক ধার্মিক।
পরিবেশ সম্বর্দ্ধনার সেই পরম অনুশীলন কি ভাবে বিকৃত হয়েছে সে বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই। বরং বসুন্ধরার পরিবেশকে রক্ষা করার ব্রতে কিভাবে ব্রতী হওয়া যায় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের উপদেশ মেনে আমাদের প্লাস্টিক-সভ্যতার কর্ণধারেরা যাতে পরিবেশ বান্ধবের ভূমিকা গ্রহণ করেন। রাষ্ট্র নায়কেরা যাতে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, ভূমিদূষণ, ভূ-স্তরদূষণ, জলদূষণ প্রতিরোধ করে গ্লোবাল-ওয়ার্মিং বা বিশ্ব-উষ্ণায়ন-ভ্রূকুটি থেকে সভ্যতাকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হন, সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে, জনমত গঠন করতে হবে, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের লাগামহীন ভোগের চাহিদা মেটাতে যে হারে ভূ-গর্ভস্থ তেল, গ্যাস, কয়লা, বিবিধ আকরিক উত্তোলন করতে গিয়ে ভূ-স্তরের অবক্ষয়কে আহ্বান করে চলেছি, ধ্বংস করে চলেছি ‘রেন ফরেস্ট’কে। এর বিরুদ্ধে সরব না হলে কোন মূল্যেই বাঁচানো যাবে না মানব সভ্যতাকে!
আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর পূর্বে পরম বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরব হয়েছিলেন এই ভয়াবহ পরিস্থিতি প্রতিরোধ মানসে। বিজ্ঞান-সাধক শ্যামাচরণ মুখোপাধ্যায়, পদার্থবিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য প্রমুখ ভক্তদের উৎসাহ দিয়ে হিমাইতপুরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র। বিজ্ঞান-বিষয়ক অত্যাশ্চর্য্য বহুকিছুর সাথে সন্ধান দিয়েছিলেন সহজলভ্য আবহাওয়া বিদ্যুতের। ভূ-গর্ভস্থ প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন পরবর্তী শূন্যগর্ভ অবস্থাকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে কিভাবে পুণঃ-পূর্ণকরণ বা রিফিলিং করলে ভূ-স্তরের ক্ষতি হবে না সে বিষয়েও তিনি বলে গেছেন। তাঁর প্রদত্ত ওইসব ফরমূলাকে বাস্তবায়িত করতে পারলে ভূ-স্তরকে বিনষ্ট না করে, পরিবেশকে দূষিত না করেই প্রাকৃতিক দৌ-শক্তিকে কাজে লাগিয়ে শক্তি-সম্পদে সমৃদ্ধ হতে পারত আমাদের সভ্যতা।
আমরা জানি, ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। আমাদের অস্তিত্বের ধারক, পালক-পোষক পরমাপ্রকৃতির পঞ্চ-মহাভূত। উক্ত পঞ্চ-মহাভূতের অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই বসুন্ধরা—নীল-সবুজ গ্রহ। ধারণ করতে হবে ওই প্রাকৃতিক উপাদানসমূহকে, ওঁদের বিনাশ করলে আমরাও বিনাশ হবো। নচেৎ বিশুদ্ধ জলের বোতলের মত অক্সিজেন সিলিণ্ডার পিঠে বয়ে ঘুরতে হবে একদিন নিকট ভবিষ্যতে।
পল-বিপল, দণ্ড-প্রহর, অহোরাত্র, আহ্নিকগতি, বার্ষিকগতির দিনরাত, মাস, বছর হয়েই চলেছে আদিকাল থেকে, প্রাকৃতিক নিয়মে।দিন-মাস-বছর আসে যায়, রেখে যায় কিছু স্মৃতি মনের মণিকোঠায়। ওই স্মৃতির মালাগুলোকে স্মৃতিবাহীচেতনার ভল্টে অনন্তকাল জমা করে রাখার জন্য আর্য্য-ঋষিরা প্রতিটি মুহূর্তের জীবন ধারণের আহরণ শুদ্ধির মাধ্যমে ধ্রুবাস্মৃতির সন্ধান দিয়ে গেছেন ‘‘আহারশুদ্ধৌ সত্তাশুদ্ধি, সত্তাশুদ্ধৌ ধ্রুবাস্মৃতি’’ মন্ত্রে । শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র স্বস্ত্যয়ণী ব্রতের ‘নিয়তং স্মৃতিচিদয়ুতে’ মন্ত্রে য়াকে সমৃদ্ধ করেছেন। য়ে মুহূর্ত চলে যাবে তা আর ফিরে আসবে না। চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা সমৃদ্ধ সবুজ গ্রহ পৃথিবীর প্রতিটি মুহূর্তকেই যাতে চিরনবীনতায় আস্বাদন করতে পারি, উপভোগ করতে পারি সেজন্যই আর্য্য সভ্যতার ঊষা লগনে পরমপিতার প্রতিভূ আর্য্য ঋষিগণ ‘‘মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ……..’’ মন্ত্রে বন্দনা করে বসুন্ধরার মধুময় পরিবেশকে রক্ষা অর্থাৎ পূজা করতে শিখিয়েছিলেন। পূজা শব্দের অর্থ পূরণ করা, সম্বর্দ্ধনা, সম্যকভাবে বর্দ্ধনার লক্ষ্যে এগিয়ে চলা। যেমন-যেমন আচরণে, পরিবেশের অজৈব উপাদানসমূহকে রক্ষা করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া যায় তাই ছিল আর্য্য ভারতের পূজা, যজ্ঞ, হোম, উৎসবের তাৎপর্য্য।
আমরা যে ৩৩ কোটি দেবতার কথা শুনেছি সে সংখ্যাটা ৩৩,০০০০০০০ নয়, শুধুই ৩৩। কোটি অর্থে (piece) বোঝান হয়েছে, যথা, জীবকোটি, ঈশ্বরকোটি একক অর্থে ব্যবহৃত হয়।
বাস্তবে আমাদের এই সবুজ গ্রহের জীবকূলের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জৈবাজৈব রসদের যোগানদাতার মূল মালিক সূর্য। সূর্যর আর এক নাম আদিত্য। আদিত্য মানে দেবতা। দেদীপ্যমান যা তাকে দেবতা বলে। দেবতা মানে দ্যুতি বিশিষ্ট সত্তা। সব দেবতাই মূলতঃ পরব্রহ্মের প্রতীক। যেমন পৃথিবীর অধিপতি অগ্নি, অন্তরীক্ষে ইন্দ্র বা বায়ু ও দ্যুলোকে সূর্য। পৃথিবী, অন্তরীক্ষ এবং দ্যুলোক-এর প্রতিটি স্থানে ১১টি করে বেঁচে থাকার আবশ্যিক উপাদান সরবরাহকারী দেদীপ্যমান উৎস রয়েছে। উক্ত ৩৩টি জীবনীয় উৎস-সমূহকে দেবতা বলা হয়েছে উপনিষদে।
বৃহদারণ্যক উপনিষদ (৩য় অধ্যায়, ৯ম ব্রাহ্মণ)-এর ঋষি শাকল্য, ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য সমীপে দেবতার সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি অষ্টবসু, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্যাদি ৩১ সংখ্যক দ্যুতিবিশিষ্ট প্রাকৃতিক সত্তা এবং ইন্দ্র ও প্রজাপতি মিলিয়ে ৩৩ সংখ্যক দেবতার উল্লেখ করেছিলেন। ওই ৩৩ কোটি (33 pieces) দেদীপ্যমান উৎসসমূহকে রক্ষা করার প্রশ্নে আমরা প্রবৃত্তি পরবশ হয়ে যাতে দুর্বৃত্ত না হই তারজন্য উপনিষদের ঋষিগণ ‘আত্মানং বিদ্ধি’-র শপথ বাক্যের পাঠ দিলেন।—পরমপিতার সন্তান তুমি, নিজেকে জানো, নিজের প্রতিরূপ মনে করে পরিবেশকে বাঁচাও, নিজে বাঁচ। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’—জীবনবিধ্বংসী আচরণ ত্যাগ করে জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলো। ‘মা গৃধ’—লোভ করো না। সদাচার এবং বর্ণাশ্রম মেনে চলো। পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে নিজে সমৃদ্ধ হও। এই ছিল ভারতবর্ষের বিধি-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠনের, ধর্মের, পূজার, উৎসবের বাস্তব রূপ। ওই হৃত-গৌরব যুগোপযোগী করে পুণঃ-প্রতিষ্ঠিত করে গেলেন সব দেবতার সমাহারের প্রতীকস্বরূপ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। যার প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয় তাঁর প্রদত্ত ‘আর্য্য সন্ধ্যা’ প্রার্থনা মন্ত্রে।
আমরা, ভারত রাষ্ট্রের অধিবাসীরা ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের পবিত্র মন্ত্র মূণ্ডকোপনিষদের ‘সত্যমেব জয়তে’-র মধ্যে নিহিত সত্যের সন্ধান করার চেষ্টা না করে, ‘মেরা ভারত মহান’ মন্ত্রের ধ্বজাধারীরা ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টি রক্ষার পবিত্র কর্তব্য ভুলে, ধর্মের নামে কতগুলো কু-সংস্কারে, আর বিজ্ঞানের নামে ভোগবাদে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছি। অথচ বিশ্বের পরিবেশ বিজ্ঞানীরা প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে, ভারতীয় পঞ্চ-মহাযজ্ঞের বিধানকে, সমাজ বিজ্ঞানীরা সমাজ-বন্ধনের দৃঢ়তার অবক্ষয় রোধে, শ্রেণী-বিন্যস্ত বর্ণাশ্রমানুগ সমাজ ব্যবস্থার বিধানকে এবং প্রজনন বিজ্ঞানীরা সুস্থ মানবজাতি গঠনের জন্য সুবিবাহ ও সুপ্রজনন বিধিকে মেনে চলতে পরামর্শ দিয়েছেন।
বেদ-উপনিষদ-গীতা. ঋষি এবং মহাপুরুষদের নিদেশে কোথাও প্রচলিত পূজার নামে, অনিত্য বস্তুর উপাসনার নামে, হৈ-হুল্লোর করে পরিবেশ দূষণ করার অনুমোদন নেই। ব্যক্তি চরিত্র গঠনের নিমিত্ত সাধন-ভজন-আরাধনা বাদ দিয়ে যে তন্ত্রমতে আমরা পরিবেশ দূষণ করতে প্রতিমা পূজায় মেতে উঠি, সেই তন্ত্র-ই প্রতিমা পূজাকে ‘‘বাহ্যপূজা অধমাধম’’ বলে বর্ণনা করেছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও, ‘‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’’ ছন্দের ডালিতে প্রতিমা পূজার অসারতার বার্তা রেখে গেছেন।
বসুন্ধরার পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, এক বিপ্লব নিয়ে এলেন। ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে, ধর্ম বলে জানিস তাকে। বাঁচা-বাড়ার মর্ম যা, ঠিকই জানিস ধর্ম তা। Upholding urge of existence is Dharma.’……..ইত্যাদি বাণীর মাধ্যমে। অতএব, চাঁদার জুলুম, ফুল, বেলপাতা, ধূপহীন ধূপকাঠি, নৈবেদ্য, দশ-(অ)কর্মার ফর্দ, ঢাক, ঢোল, বাজি, হৈ-হুল্লোর, তার শব্দে মাইকের ডালি দিয়ে নয়— তোমাকে ধার্মিক হতে হলে আগে পরিবেশকে বাঁচাতে হবে। সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বাস্তব কর্মে ব্রতী হতে হবে। পরিবেশ হিতৈষী হতে হবে, তবেই তুমি ভারতীয় মতের ‘ধার্মিক’ অভিধায় ভূষিত হতে পারবে।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের অনুগামীদের নিত্য ইষ্টভৃতি করতে হয়। ইষ্টভৃতি মানে ইষ্ট কর্মের ভরণ। ইষ্টকর্ম মানে পূর্ত্তকর্ম—পরিবেশের উপাদানকে,পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখার বাস্তব কর্ম। যা প্রকৃত ইষ্টভৃতির মন্ত্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ ।” এর সরলার্থ খুব সহজ। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুযায়ী সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন বর্দ্ধনার বিধি মেনে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে চলেন যিনি, এমন গুরুভাই-ই প্রকৃত ইষ্টভ্রাতা।–যাঁর আপদে-বিপদে সাধ্যানুগ সাহায্য করতে হবে। ভূত মানে,–ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা পরিবেশের অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। সেগুলোকে প্রাণ পণ করে রক্ষা করতে হবে। প্রতিনিয়ত এই শপথ মেনে চলার নাম ইষ্টভৃতি। অতএব প্রতিটি আমি যদি প্রকৃত ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের যাজ্ঞিক হবার শপথ পালন করতে পারি তাহলেই অনেকাংশে রক্ষা করা যাবে সুজলা-সুফলা-মলয়জ-শীতল বসুন্ধরার পরিবেশকে।
এ যুগের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমাদের সচেতন করে দিতে বাণী দিয়ে বললেনঃ
‘‘ইষ্টভরণ, পিতৃপোষণ,
পরিস্থিতির উন্নয়ন,
এ না করে, যাই না করিস
অধঃপাতেই তোর চলন।’’
ওই অধঃপতন থেকে মধুময় বসুন্ধরাকে রক্ষা করতে কৃপা পরবশ হয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর ‘পঞ্চবর্হি’ এবং ‘সপ্তার্চ্চি’ পালনের অনুশাসন দিলেন। দলীয় প্রীতির কবলে পড়ে মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার সেই অনুশাসন বিধিকে অবজ্ঞা করার স্পর্দ্ধা যেসব তথাকথিত সৎসঙ্গীরা দেখাচ্ছেন, তাদের অধঃপতনকে প্রতিরোধ করতে হলে, তাদেরও সামিল করতে হবে উক্ত ইষ্ট-ভরণের অনুশাসন পালনে। তা যদি না করি আমরাও কিন্তু বঞ্চিত হব ‘ইষ্ট ভরণের’ পবিত্র কর্ম থেকে।