WHAT IS MEMORY
।। স্মৃতির উৎস সন্ধানে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।
সংকলক—তপন দাস
‘‘আমাদের nerve-গুলি conducting wire-এর মত। Battery থেকে electric current যেমন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে, brain থেকে nerve fibres দিয়ে এই life current or vital current সমস্ত দেহে ছড়িয়ে পড়ছে। এই vital current এক রকমের subtle energy–র current ছাড়া আর কিছু নয়। তার conductor হচ্ছে nerve fibres. এই current চোখ দিয়ে, নাক দিয়ে, কান দিয়ে, হাত দিয়ে, পা দিয়ে, সারা গা দিয়ে, জিভ দিয়ে শরীরের থেকে নানা রকমে modified হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসছে। আবার এই current–এর সঙ্গে বাইরের জগতের ঘাত-প্রতিঘাতে nerve দিয়ে ভিতরের দিকে কতগুলি wave যাচ্ছে। তাহাই আমাদের বোধ বা perception. সেগুলি ভিতরে গিয়ে brain cell–এ কতগুলি impression দিচ্ছে—Camera-র photographic plate–এ আলোর wave গিয়ে বাইরের একটা impression বা ছবি যেমনি করে আঁকে ঠিক তেমনতর। এই impression–গুলি যখন active হয়, তাকেই আমরা বলি স্মৃতি (memory).’’ (ঋত্বিগাচার্য্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যের দিনপঞ্জী, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৪১)
“Universe-এ সূক্ষ্ম হইতে সূক্ষ্মতর energy-র প্রবাহ চলছেই। আর আমাদের brain cell-গুলি এই subtle energy-কে suck করে নেয় কিংবা accumulate করে—battery-র মত।”
(ঋত্বিগাচার্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য-এর দিনপঞ্জী, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৪১ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী)
Brain-এর ওঁ layer, হ্রীং layer, ক্লীং layer প্রভৃতি আছে। সহস্রদল কমল মানে brain-এর complex-গুলি ভেঙে গিয়ে যে অবস্থা হয়, তার উপলব্ধি। (শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী)
——
ATMOSPHERIC ELECTRICITY
।। আবহাওয়া বিদ্যুৎ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।।
সংকলক—তপন দাস
বিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য প্রতিদিনই বিজ্ঞান বিষয়ক বিবিধ আলোচনা করেন শ্রীশ্রীঠাকুরের সাথে। বিজ্ঞানকে জগতের কল্যাণে
কিভাবে প্রয়োগ করা
যেতে পারে সে বিষয়ে
ঠাকুরের ব্যাখ্যা শুনে তিনি হতবাক হয়ে যান। প্রসঙ্গক্রমে
একদিন ঠাকুর সৌরবিদ্যুতের চাইতেও সহজলভ্য আবহাওয়া বিদ্যুত (atmospheric electricity) প্রসঙ্গে বললে তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। কয়েকদিন পর কেষ্টদাকে কিছু না জানিয়ে তিনি
সুতোর বদলে তামার
তারের সাহায্যে ঘুড়ি
ওড়াবার ব্যবস্থা করেন। পদ্মার তীরে ঠাকুর ঘুড়ি ওড়াচ্ছেন। সাথে অনেক ভক্তবৃন্দ । ঘুড়ি উড়ছে।
ঠাকুর
কেষ্টদাকে লাটাইটা হাতে দিয়ে ঘুড়ি ওড়াতে বললে কেষ্টদা
লাটাই ধরতেই ছিটকে পড়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুর
তাঁকে
ধরে ফেলে বলেন, বিজ্ঞানী কেষ্টদা একটা লাটাই ধরে রাখতে
পারলেন না। কেষ্টদা লজ্জিত হয়ে
বলেন,
আপনার
লাটাইয়ের বিদ্যুত তরঙ্গ আমাকে শক্ দিয়ে ফেলে দিল। তাই ধরে
রাখতে পারি নি। তখন ঠাকুর বললেন, ঘুড়ির তারের সুতোর
মধ্য
দিয়ে যদি বিদ্যুত প্রবাহিত হতে পারে তাহলেই বুঝুন আবহ মণ্ডলে কি
পরিমাণ
বিদ্যুত রয়েছে।
ওই বিষয়ে যেসব আলোচনা হয়েছিল সেগুলো ক্রমশঃ তুলে ধরছি।
‘‘Earth-কে একটা
Pole করে আর atmosphere-এ
একটা conducting pole ঝুলিয়ে অনন্ত electric current পাওয়া যেতে পারে। এ সম্বন্ধে নূতন experiment নিষ্প্রয়োজন,কারণ বজ্রপাত প্রভৃতি নানা ঘটনা দ্বারা ইহা
স্বতঃই প্রমাণিত যে
atmosphere–এ electricity বর্তমান। আবার যত উচ্চে অর্থাৎ সূর্যমণ্ডলের নিকট conducting
Pole রাখা যাইবে তত বেশী Current পাওয়া যাবে। তিনটি
insulated magnet–এর সাহায্যে একটি
লোহার চাকতিওয়ালা Copper
rod atmosphere –এ ঝুলাইয়ারাখিবার arrangement করিতে পারিলে ইহা সম্ভব হইতে পারে। এইরকম ভাবে electric
energy–র দ্বারা পৃথিবীতে বিনা
পরিশ্রমে কতকাজের সম্ভব হইবে।
কয়লার আর প্রয়োজন হইবে না।
কুলীর পরিশ্রমেরও আর আবশ্যক হইবে না।’’
‘‘Electric
Current-এর উদ্ভব হয় Cell-এ। Cell-এCu
ও H2 র energy
particles-এর interaction-এ Cu-plate
হইতে energy particle-এর এক particular arrangement-এর flow
হয় বাহিরের wire-এ। এই flow
কিন্তু spiral flow. যখনই
দুই vibrating particle পরস্পর পরস্পরকে ধাক্কা দেয়, তখনই ঐ particle
দুটি flow করেspirally
Dum Dum bullet-এর মত। Zn-plate হইতেও এই রকমেরই অথচ একটি বিভিন্ন current
বাহিরের wire-এ opposite
direction-এ flow করে। এই উভয়ের ঘাত
প্রতিঘাতে যে resultant flow হয়,তাহাই electric
current. এই electric current আর কিছুই নয়–a
spiral motion of the energy particles. এইটিই really হয়–magnetic
effects of a current in a wire মানে ইহা হইতে
বুঝা
যায়। Electro-magnetic
motion-এ যেন একটি current-এর মধ্যে আর একটি
current-এর effect-এ whirl
pool-এর
সৃষ্টি ছাড়া আর কিছু নয়।’’ (ঋত্বিগাচার্য্য
দিনপঞ্জী ১ম খন্ড পৃঃ ১৬-১৭)
——–
নাম-চিকিত্সা (SOUND THERAPY)
|
।। নাম
চিকিত্সা ।। —তপন দাস দেহ ধারণ এবং দেহ ত্যাগ এই দুইয়ের মাঝে জীবন নামের প্রবাহ কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল তা নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত। সৃষ্টিতত্ত্ব অনুসারে পিতার পিতা পরমপিতা লীলার প্রয়োজনে নিজেকে এক থেকে বহুতে পরিণত হতে গিয়ে যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম স্পন্দনের সৃষ্টি হয়েছিল তার নাম অনাহত নাদ বা আদিধ্বনি বা প্রণব। সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী মানুষ, ব্রহ্মবিদ্ আচার্য্য মাধ্যমে ‘আত্মানং বিদ্ধি’র মার্গ অনুসরণ করে ‘মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়’—মৃত্যু হতে অমৃত আহরণ করতেন। জীবাত্মাকে বিলীন করে দিতেন পরমাত্মায়। সোনার তাল থেকে তৈরী গয়নাটাকে ব্যবহার করে আবার ফিরিয়ে দিতেন সেই সোনার তালে। পরমপিতা সকলের পিতা আর আমরা হলাম আমাদের ভাগ্যবিধাতা। আকর্ষণ (attraction) সংকোচন, (contraction), স্থিতি (stagnation) ও প্রসারণ (expansion)-এর লীলায়িত ছন্দের বিধায়িত নিয়মে আমরা প্রত্যেকেই এক একজন স্রষ্টা। নারী-পুরুষের সম্মিলিত জনন ক্রিয়াকালিন কোষ বিভাজন মাধ্যমে সংকুচিত ডিম্বাণু (ovum) ও শুক্রাণু (sperm) নামের দুটি ভিন্ন সত্তা একটি কোষে এক হয়ে গর্ভে স্থিত হয়। পুণরায় কোষ বিভাজন মাধ্যমে প্রসারিত হয়। ক্রমান্বয়ে সৃষ্টি হতে থাকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। গর্ভবাসের স্থিতিকাল উত্তীর্ণ হলে ভূমিষ্ট হয়। শুরু হয় জীবন যাপনের পালা। শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্দ্ধক্যের পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রার ছান্দিক শকটে চড়ে ‘মহাচেতন সমুত্থানের’ গন্তব্যে পৌঁছান অথবা মাঝপথে নেমে পড়া, নির্ভর করে স্রষ্টা পিতামাতার উপর। স্রষ্টা পিতামাতা যেমন ভাবের আত্মাকে আকর্ষণ করে তদুনুরূপ আয়ু লাভ করে সন্তান। আবার উক্ত সন্তানের আত্মা যে ভাব নিয়ে বিগত হবে, সেই ভাব নিয়েই ওই আত্মাকে পিণ্ডদেহ ধারণ করতে হবে। এই হ’ল জীবন-মৃত্যুর আগম-নিগমের চরম সত্য । ইহজন্ম ও পরজন্ম প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন, “আপূরমান ইষ্টে কারও যদি টান জন্মে, এবং তাই নিয়ে যদি সে বিগত হয় তবে সে মহান জীবন লাভ করবেই। আবার, এ জীবনে যে যতই হোমরা-চোমরা হোক না কেন, সে যদি সুকেন্দ্রিক না হয়, প্রবৃত্তিই যদি তার জীবনের নিয়ামক হয়, তবে ঐ বিচ্ছিন্ন বিকেন্দ্রিকতা তার মৃত্যুকালীন ভাবভূমি ও পরজন্মকে যে অপগতিতে অপকৃষ্ট ক’রে তুলবে, তা’তে সন্দেহ কমই।’’ (আ. প্র. ১ম খণ্ড ১৯. ১১. ১৯৪১) এক্ষেত্রেও সেই নাম চিকিত্সার ব্যাপার। তবে পার্থক্য এই যে অজপাসিদ্ধ সাধক স্পর্শদ্বারা নামের শক্তি কোন অসুস্থ ব্যক্তির দেহে সঞ্চারিত করে আরোগ্যকারী শক্তিকে সঞ্জীবিত করে দুরারোগ্য ব্যাধির নিরাময় করতে পারেন। কিন্তু এক্ষেত্রে নিজের চিকিত্সা নিজেকেই করতে হবে। অজপা জপের সাথে আজ্ঞাচক্রে ‘কেবলম্ জ্ঞানমূর্ত্তিম্’কে অর্থাৎ ইষ্টমূর্ত্তিকে ধারণ করতে হবে। তাই, যারা বহুনৈষ্ঠিক, একাধিক মূর্ত্তিতে কেন্দ্রায়িত, তাদের বিধায়িত পথে একমাত্র ইষ্টে কেন্দ্রায়িত হবার অভ্যাস পাকা করে ফেলতে হবে। নাম সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর ভাববাণীতে বলেছেন : ‘‘শুধু নাম, নাম প্রণবের উপরে। প্রণবের আগে নাম, পাছেও নাম। বীজমন্ত্র কিরে ? নাম। দ্যাখ, নাম নিয়ে। দ্যাখ, নাম নিয়ে যায় প্রণবে, আর প্রণব নিয়ে যায় আমাতে। আমি পরমাত্মা, শুদ্ধ ব্রহ্ম । …… প্রণবে উঠে পরব্রহ্ম।’’ ৪। ১৩ ‘‘আলস্য জড়তা শয়তানের থানা করিস্ নে। নামে ডুবে থাক। নাম কর আর বিলিয়ে দে ! ….. শান্তি শান্তি ক’রে ঘুরে বেড়াচ্ছিস ? নাম ক’রে জগত্ ভুলে যেতে পারিস্ না ? শরীর ভুলে যেতে পারিস্ না ? তা না হ’লে শান্তি পাবি কোথায় ? কি চাস্ ? আর কি চাস্ ? অমৃত ? দেবগণ যে অমৃত পান ক’রে অমর হয়েছিল, তোদের সম্মুখেই সেই অমৃত। তোদের হাতে ধ’রে দিচ্ছে, মুখে তুলে দিচ্ছে, তাও খেতে পারবি না ? অহঙ্কার করবি তো নামের । নাম কর । হনুমানের মত বক্ষ বিদারণ ক’রে দেখাবি নাম। ….অন্তরে নাম ক’রে যা’ সব দিতে পারি ! অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড লয় করে দিতে পারিস্, তার একমাত্র উপায় নাম । নামই সব।’’ ৩৫। ৩ (পুণ্য-পুঁথি) ‘‘ভগবানই সৎ বস্তু। নাম আর ভগবানে পৃথক নাই। নামকেই জানবি ভগবান ব’লে।’’ ১৭।২ (পুণ্য-পুঁথি) “সংসার যন্ত্রণা নিবারণের জন্য কুইনাইন নাম। মনে অনবরত নাম কথা বলতে বলতে মনের মধ্যে নাম হচ্ছে । এই রকম করতে করতে সারূপ্য লাভ হয়।” (পুণ্য-পুঁথি) “ইষ্টে অনুরাগ সমন্বিত হ’য়ে নাম ক’রলে শরীরে অদ্ভূত energy আসে mental advancement (মানসিক অগ্রগতি)-এর সঙ্গে-সঙ্গে কত রকম জ্ঞানের প্রত্যক্ষ অনুভূতি হয়, তোদের পুঁথি পড়া জ্ঞানের মত নয় । এ জ্ঞান যেন সমস্ত প্রকারের সঙ্গে বাঁধা । নাম জিনিসটা আর কিছুই নয়, highest stage (উচ্চ স্তর)-এর যা’ কম্পন, সেই কম্পন ধারা, কথায় প্রকাশ করতে গেলে যে শব্দ হয়, সেইটেই হচ্ছে নাম । এই শব্দটা করলে মনটাকে নানা অবস্থার ভিতর-দিয়ে সেই অবস্থাতে নিয়ে যায় ।” (ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনী গ্রন্থের ২য় ভাগ পৃঃ ১৮৭) পুণ্য-পুঁথি র ত্রিচত্বারিংশত্তম দিবসের ভাববাণীতে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন : “The vibration–Two currents–one downward, one motion. Tenth door from the pineal, extreme of Soham. The ‘I’, inexpresible ‘I’. দ্যাখ, ব্রহ্মের চরম দশম দ্বারে । দশম দ্বারে সমস্ত বাসনা ছুটে গেছে, একমাত্র আমির দিকে ছুটে গেছে । দ্যাখ ‘ভ্যানিস’ নয় । ভগবতের রাজ্য তেসরা তিল হতে সোহহং। গীতা তেসরা তিল হতে মূলাধার । তেসরার পর আর কর্ম্ম-টর্ম্ম নাই। কেবল প্রেমে পর্য্যবসিত হচ্ছে ।” শ্রীশ্রীঠাকুরের উপরোক্ত বাণীতে নামসাধন পদ্ধতির যে স্বরূপ পাওয়া গেল । তা একটু বুঝে নেবার চেষ্টা করব । আধ্যাত্মিক সাধনায় কুলকুণ্ডলিনী জাগরণের বিষয় সব মতবাদের মধ্যে বিদ্যমান। প্রবৃত্তিকে সত্তামুখী করার লক্ষ্যে। সেই লক্ষ্যে এবার পৌঁছবার চেষ্টা করব। মস্তিষ্কের সম্মুখস্থ cerebrum-এর occipital lobe-এর পর cerebellum-এর অবস্থান। ওই দুই লঘু ও গুরু মস্তিষ্কের সংযোগস্থল ব্রহ্মতালু। মস্তিষ্কের প্রান্তভাগ medulla oblongata নাম নিয়ে মেরুদণ্ডের উপরিভাগ থেকে শুরু হয়ে coccyx নামে কোমরের নীচে শেষ হয়েছে। ঠিক ওর নীচে ব্রহ্মশক্তিরূপী মূলাধার চক্রের অবস্থান। মূলাধার থেকে ব্রহ্মরন্ধ্রে মনকে নিয়ে যেতে পারলে অমৃতত্ব লাভ হয়। অমৃতের দেশের দ্বারদেশ দুই ভ্রূর মাঝখানের দ্বিদল বা আজ্ঞাচক্র। (যেখানে শরীর বিজ্ঞানের pineal gland-এর অবস্থান।) তারপর মনশ্চক্র, সোমচক্র ভেদ করে পৌঁছাতে হয় ব্রহ্মরন্ধ্রের অমৃতের দেশে বা দয়ালদেশে। যা সদ্ দীক্ষার শবধ্যান অনুশাসনে বর্ণিত আছে। নিয়মিত শবধ্যান করলে হৃদরোগ এবং মস্তিষ্কের রোগ হয় না। এবং আজ্ঞাচক্রে পুরুষোত্তমরূপী ত্রিগুণাতীত পুরুষের ধ্যান করলে ত্রিগুণের উপর আধিপত্য লাভ হয়। শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের সাধনার কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছেন। যারফলে আমাদের ১। মলদ্বার ও লিংগের মধ্যবর্তী চতুর্দল বিশিষ্ট মূলাধার ; ২। লিংগমূলের ষটদল বিশিষ্ট স্বাধিষ্ঠান ; ৩। নাভিদেশের দশদল বিশিষ্ট মণিপূরক ; ৪। হৃদয়ের দ্বাদশদল বিশিষ্ট প্রণবাকৃতির অনাহত ; ৫। কণ্ঠদেশের সরস্বতীর আবাসস্থলের ষোড়শদল বিশিষ্ট বিশুদ্ধি এবং ৬। জিহ্বামূলে দ্বাদশদল বিশিষ্ট ললনাদি চক্র ভেদ করে আজ্ঞাচক্রে পৌঁছাতে হবে না। অনাহত নাদে এবং ইষ্টমূর্তি ধ্যানের মাধ্যমে আজ্ঞাচক্রের সত্ত, রজঃ ও তমো নামাঙ্কিত ত্রিদল বিশিষ্ট চক্র পার হয়ে নিম্ন কপালে অবস্থিত ছয়দল বিশিষ্ট মনশ্চক্র ও ঊর্দ্ধ কপালে অবস্থিত চন্দ্রকলাসম ষোড়শদল বিশিষ্ট সোমচক্র পার হয়ে ব্রহ্মতালুর সহস্রদল বিশিষ্ট অমৃতের আধারে পৌঁছাতে পারলেই “মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়”-র আস্বাদন। অমৃতত্ব লাভ। যা আস্বাদন করতে হলে শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত “পঞ্চবর্হি” এবং “সপ্তার্চ্চি”র অনুশাসন মেনে চলতেই হবে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র নিজে একজন কৃতী চিকিত্সক ছিলেন। আয়ুর্বেদ, হোমিওপ্যাথী, টোটকার সাহায্যে অনেক অনেক দুরারোগ্য দেহের ব্যাধি আরোগ্য করেছেন। পরবর্তীকালে প্রথাগত চিকিত্সাযর ভার বন্ধুবর অনন্তনাথ রায়ের উপর অর্পণ করে রোগের কারণ নিরাকরণে মনোনিবেশ করেন। গড়ে তোলেন কীর্তনদল। কীর্তনের ত্রিদোষ-নাশী ব্যাধিহরা সঞ্জীবনী আহতনাদধ্বনী পরিবেশের প্রবৃত্তিদুষ্ট মানুষগুলোকে করে তোলে সত্তাপ্রেমী। কীর্তনের আঙিনায় প্রকাশিত হয় তাঁর বিশ্বাত্মার পরিচয়–ভাব সমাধির মাধ্যমে। ক্রমে কীর্তন দলের কলেবর বৃদ্ধি হতে থাকে। হিমায়েতপুর সংলগ্ন গ্রাম থেকে গ্রামান্তর, ওদিকে কুষ্ঠিয়া মেতে ওঠে এক অভিনব কীর্তনের আনন্দে। “এ যে আনন্দবাজার ! নাইরে দুঃখ নাইরে দৈন্য আনন্দ, আনন্দ সবার !'” রোগ-শোক-ব্যাধি-জরা জর্জরিত মানুষেরা এক নবীন জীবনের স্বাদ আস্বাদন করে ধন্য হয়। শুধু মানুষেরাই নয় পরিবেশের গাছপালা, পশুপাখিরা পর্যন্ত ওই কীর্তনান্দের স্বর্গীয় সুখ উপভোগ করে জয় করেছিল সব দুর্ভোগ । নাম বা নাদ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুশ্রুতি গ্রন্থে বলছেন : “অনুরাগে করলে নাম আপনিই আসে প্রাণায়াম।” অনুরাগ মানসবৃত্তিয় একটি প্রকাশ। স্ত্রী, সন্তান, অর্থ, মান, যশ, প্রভাব, প্রতিপত্তি ইত্যাদির উপর আমাদের এক সহজাত অনুরাগ থাকেই। সেই অনুরাগ ইষ্টানুগ সত্তাধর্মী করে তুলতে সদগুরু আদর্শের প্রতি অনুরক্ত হতে হবে নামের মাধ্যমে। নাম<নমঃ=আনতি সম্পন্ন হয়ে চলা। তাই নামীর আদর্শের প্রতি আনতি সম্পন্ন হয়ে নাম অভ্যাস করার কথা শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন। ওই অভ্যাস কিভাবে করতে হবে সে বিষয়ে তিনি বলেছেন : ‘‘সৃষ্টি ধারা উল্টে নিয়ে স্বামীর সাথে মিল করে অর্থে ভেবে ঐ জপে যা’ সদগুরুতে ধ্যান ধরে।’’ এই নিদেশ মেনে যেসব সাধকেরা নিজেদের অজপাসিদ্ধ করে তুলতে পারবেন, তারা নামের শক্তির বিকীরণে রোগশক্তিকে পরাভূত করে নিজেরা সুস্থ থেকে পরিবেশকেও সুস্থ করে তুলবেন। শুধু দীক্ষা নিয়ে কীর্তন করলেই তো আর হবে না! কীর্তনের যে একটা শক্তি আছে, সৎ নামেরও যে একটা শক্তি আছে, সেটা তো সবার চোখের সামনে তুলে ধরতে হবে। ইদানীং স্বাস্থ্যসচেতন মানুষেরা ধ্যান বা প্রাণায়াম অভ্যাসে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। রেইকি নামের স্পর্শ চিকিত্সা পদ্ধতিও বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এ সব কিছুর লক্ষ্য শরীর, মন ও আত্মার সাথে সমন্বয় সাধন মাধ্যমে শারীরবৃত্তিয় আরোগ্যকারী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সুস্থ থাকা, সুস্থ করা। ধ্যানে কেন্দ্রায়িত লক্ষ্যবস্তুর আদর্শের অনুরূপ ধ্যানী নিজেকে স্থির ও গ্রহণক্ষম করতে পারে। পূরক, কুম্ভক, রেচক সমন্বিত প্রাণায়াম পদ্ধতি বিধিপূর্বক বিনিয়োগ করতে না পারলে আরামের পরিবর্তে ব্যারামও এনে দিতে পারে। রেইকি চিকিত্সক মহাজাগতিক শক্তি সঞ্চারনা মাধ্যমে রোগ নিরাময় করেন। ওই সব পদ্ধতির সম্মিলিত রূপ শ্রীশ্রীঠাকুর প্রবর্তিত উচ্চস্তরের নাদ এবং মহালক্ষী যন্ত্রমধ্যে স্থাপিত সদগুরুর ধ্যান পদ্ধতি। যার সহজ অনুশীলনে কঠিন সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, পীড়িতকে মুক্ত করাও যায়। কুষ্টিয়ার অশ্বিনী বিশ্বাসের বাড়ীতে কীর্তন চলছে। খবর পেয়ে দীর্ঘদিন ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত কুষ্টিয়ার ডাকপিওন লক্ষণ ঘোষকে চারজন বাহক খাটিয়ায় করে এনে নামালো কীর্তনের আসরে, গোঁসাইদার পায়ের কাছে। লক্ষণকে বুকে জড়িয়ে ধরে কীর্তন করতে লাগলেন গোঁসাইদা। কিছুক্ষণ পর এক ধাক্কা দিয়ে বাড়ী যেতে বললেন। দিব্যি হাঁটতে হাঁটতে বাড়ী চলে যান লক্ষণ ঘোষ। ……. বরৈচারার জানকী হালদারের উত্থানশক্তি নেই। আমলা পাড়ার রামকৃষ্ণ বিশ্বাসকে পাঠালেন ঠাকুর জানকী হালদারের চিকিৎসার জন্য। এহেন কঠিন দায়িত্ব পেয়ে ঘাবড়ে যায় রামকৃষ্ণ বিশ্বাস। ঠাকুর তাকে স্পর্শ করে বললেন, “নিশ্চয়ই পারবি তুই। কোন চিন্তা নাই।” ঠাকুরের আদেশে ওই রামকৃষ্ণ বিশ্বাসই বরৈচারার জানকী হালদারের বাড়ীতে গিয়ে রোগীকে ছুঁয়ে নাম করতে করতে রোগীকে আরোগ্য করে ফিরে এসেছিলেন কুষ্টিয়ায়। প্রসঙ্গত বলে রাখি, ওই রামকৃষ্ণ বিশ্বাসই কীর্তন করার অপরাধে গোঁসাইদাকে লাঠি দিয়ে মারতে গিয়ে বিপদে পড়ে যান। গোঁসাইদাকে ছোঁয়ার সাথে সাথে বন্-বন্ করে মাথা ঘুরতে থাকলে হাতের লাঠি ফেলে উন্মাদের মতো চীৎকার করে নাম করতে থাকে। তারপর কাজকর্ম ছেড়ে দীক্ষা নিয়ে গোঁসাইদার সাথে সাথেই কীর্তন করে বেড়াতো। তাই, এবার ঠাকুর ঠিক করলেন, আলাদা করে একটা নাম চিকিৎসালয় গড়ে তোলার। কুষ্টিয়ায় একটি দোতালা পাকা বাড়ীতে ১৫-১৬ শয্যাবিশিষ্ট “সৎসঙ্গ প্রাণতত্ত্বানুসন্ধান সমিতি’’ (Life Research Society) শিরোনামে চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠিত করা হলো। ঠাকুরের বিশেষ প্রশিক্ষণে সতীশচন্দ্র গোস্বামী, রামকৃষ্ণ প্রামাণিক, রাধারমণ জোয়ারদার, সুশীলচন্দ্র বসু, মহম্মদ গহরআলি বিশ্বাস প্রমুখ ভক্তগণ রোগীর শরীরে সৎনামের সঞ্চারনার মাধ্যমে রোগ আরোগ্যকারী শক্তিকে জাগিয়ে অসুস্থদের সুস্থ করে তুলছেন। সর্পদংশনে মৃত, মেনিঞ্জাইটিসে অচৈতন্য, পক্ষাঘাতগ্রস্ত—এমন অনেক, প্রচলিত চিকিৎসায় ফেরত দুরারোগ্য রোগীদের নাম-সঞ্চারণার মাধ্যমে আরোগ্য করে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিস্ময় সৃষ্টিকারী এক নবীন ধারাকে সংযোজিত করে রেখে গেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। ——— |
”মানুষ মানুষের জন্য”
।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ধর্ম-ভাবনা।।
সংকলক—ডাঃ তপন দাস
অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে
ধর্ম বলে জানিস তা’কে।।
টাকা উপায় করবি কি রে
মানুষ উপায় কর,
শিষ্ঠ-সুধী তৎপরতায়
উচ্ছলাতে ধর।।
।। প্রকৃত বড়লোক হতে গেলে কি করতে হবে ।।
প্রশ্ন:— বড় হওয়া বলতে কেউ-কেউ বোঝেন, অনেক টাকার মালিক হওয়া এবং টাকা না থাকলে তারা নিজেদের ছোট মনে করেন।
শ্রীশ্রীঠাকুরঃ–আমার ধারণা উল্টো, আমি বুঝি মানুষ-সম্পদ। টাকা থাকলেই প্রাণের উদ্বোধন ক’রে দেওয়া যায় না। কিন্তু ভালবাসায় তোমায় যদি প্রাণের উদ্বোধন হ’য়ে থাকে এবং তুমি যদি অন্যের প্রাণের উদ্বোধন ক’রে দিতে পার, মানুষ তোমার আপনজন হয়ে দাঁড়াবে। যীশু বলেছিলেন, “Come ye after me, and l shall make you fishers of men.” (তোমরা আমার সঙ্গে আস, তোমাদের মানুষ ধরতে শেখাব)। যার মানুষ আছে, মানুষকে যে জীবনের পথ দেখিয়েছে, বাড়িয়ে তুলেছে, তার টাকার অভাব হয় না। আমি টাকা পাই কোত্থেকে? আমায় মানুষ টাকা দেয় কেন? তাই বলি, নারায়ণ বাদ দিয়ে লক্ষ্মীর উপাসনা করলে লক্ষ্মীকে পাওয়া যায় না। নারায়ণ মানে জীবনের পথ, বৃদ্ধির পথ। যিনি যত মানুষকে জীবন-বৃদ্ধির পথে চালিয়ে নিতে পারবেন, তিনি তত বড় নারায়ণ। আর, যিনি যত বড় নারায়ণ, তত বড় লক্ষ্মী তাঁর গৃহে অচলা। হিটলার, মুসোলিনী একদিন তোমার আমার মতই ছিল, খেতে পেত না, কিন্তু তারা ছিল মানুষ-স্বার্থী। আজ দেখো, তাদের অর্থের কুলকিনারা করতে পার না। আর, যতদিন তারা প্রকৃত মানুষ-স্বার্থী থাকবে, ততদিন তাদের এমনতরই চলবে—আশা করা যায়। টাকাকে মুখ্য ক’রে ভাবা একটা sign of idiocy (মূর্খতার লক্ষণ)। (আঃ প্রঃ ৪র্থ খণ্ড/১১)
।। মানুষ চেনার সহজ উপায় প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বিধান।।
বীরেনদা (ভট্টাচাৰ্য্য)— মানুষ চেনার সহজ উপায় কী ?
শ্রীশ্রীঠাকুর— দেখতে হয়, কথার সঙ্গে কাজ ও ব্যবহারের মিল আছে কিনা। আর দেখতে হয়, কথাবার্তার মধ্যে-দিয়ে সে নিষ্ঠাকে অটুট রেখে মানুষকে প্রীত করে প্রীত হতে চায়, না, হামবড়ায়ী চালে নিজের প্রাধান্যকে জাহির করতে চায়। ভালো মানুষের একটি প্রধান লক্ষণ হলো, সে আদর্শে অটুট থেকে, পরিবেশকে আনন্দ দিয়ে আনন্দ পেতে চায়। নিজের অহমিকার বালাই নিয়ে সকলকে আঘাত করেনা। একরকম আছে ব্যক্তিত্বহীন বিনয়, সব কথাতেই সায় দিয়ে যায়, সে কিন্তু ভালো নয়। সৎ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন যারা, তারা হৃদ্য ব্যবহার ও সেবানুসন্ধিৎসা নিয়ে চললেও আদর্শকে কখনো বিসর্জন দেয় না বা অন্যায়ের সাথে আপোসরফা করে না।
বীরেনদা— যারা আদর্শ গ্রহণ করেনি ?
শ্রীশ্রীঠাকুর — কেউ আদর্শ গ্রহণ করুক বা না-করুক, ভালো মানুষ যে, তার মহতের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবেই কি থাকবে। একটা মানুষ যদি শ্রদ্ধাহীন হয়, সে যতই হোমরা-চোমরা হোক, ধরে নিতে পারো, তার ভিতরে গোলমাল আছেই। (আলোচনা-প্রসঙ্গে, ২য় খণ্ড, ৮ই পৌষ, মঙ্গলবার, ১৩৪৮ (ইং ২৩/১২/১৯৪১)
।। Go-between (দ্বন্দ্বীবৃত্তি) ধর্ম্মরাজ্যের জিনিস নয় ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর— ‘‘Go-between (দ্বন্দ্বীবৃত্তি) ক’রে যদি দান-ধ্যান বা সৎকাজ করা যায়, তাতেও কিন্তু অপরাধ হয়। Go-between-এর নাম দেওয়া যায় মিথ্যাচার, কারণ, এটা সত্তা-সম্বর্দ্ধনাকে হনন করে। Go-between (দ্বন্দ্বীবৃত্তি) অসম্ভব ব্যাপার, এতে treachery (বিশ্বাসঘাতকতা)-র vibgyor (সাতটি রং) আছে। আর, যা’ হো’ক বা না হোক, go-between (দ্বন্দ্বীবৃত্তি) ধর্ম্মরাজ্যের জিনিস নয়। Go-between (দ্বন্দ্বীবৃত্তি) যার আছে—সত্তাপোষণী উপচয়ী চলনার ব্যাপারে, বিশেষ ক’রে personal profit (ব্যক্তিগত লাভ) হ’তে পারে এমন কোন কাজের বেলায়—সে blundering move (ভুল চাল) নেবেই, হয়তো সেই মুহূর্ত্তে হাগা চেপে যাবে।
………. জমায়েৎ go-between-এর ফল যখন মানুষকে চেপে ধরে, তখন পদে-পদে সে ব্যর্থ ও ব্যাহত হ’তে থাকে। সে-চিত্র ভাবতে আমার গা শিউরে উঠছে (শ্রীশ্রীঠাকুরের চোখে-মুখে একটা আর্ত্ত আতঙ্কের চিহ্ন ফুটে উঠলো)। খুব সাবধান।
………….কেষ্টদা প্রশ্ন করলেন— Go-between (দ্বন্দ্বীবৃত্তি)-এর কোন প্রায়শ্চিত্ত নেই? Go-between (দ্বন্দ্বীবৃত্তি) আর না করা ছাড়া তো প্রায়শ্চিত্ত দেখি না।
শ্রীশ্রীঠাকুর—দেখি না তো ! খুঁজে দেখবেন তো পান নাকি। শোনেননি এমন ভূত আছে যা’ ওঝা মানে না, এও সেইরকম। Shortcut (সহজ) প্রায়শ্চিত্ত আছে বলে মনে হয় না। (চিন্তিতভাবে বললেন) এ যে কি সর্ব্বনেশে জিনিস, ইহকাল-পরকাল ঝর-ঝরে ক’রে দিয়ে যায়, চরিত্রে একরত্তি বল থাকে না। Conviction (প্রত্যয়) ব’লে জিনিস থাকে না, সে যত ভাল কথাই কো’ক, মনে হয় ফাঁপা, ফাঁকা আওয়াজ, কোন বস্তু নেই তা’তে, তাই মানুষের অন্তরে গভীরভাবে, স্থায়ীভাবে দাগ কাটতে পারে না।’’ (আঃ প্রঃ ২য় খণ্ড, ৬ই পৌষ, রবিবার, ১৩৪৮/ইং ২১-১২-৪১)
—————
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি
।। হিন্দু-মুসলিম অনৈক্যের প্রতিকার সম্বন্ধে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতবাদ।।
সংকলক—তপন দাস
‘‘হিন্দু মুসলমানের নামে নাক সিটকায়, মুসলমান হিন্দুদের নামে নাক সিটকায়—তার মানে তারা ভগবানকে, ধর্মকে, প্রেরিতকে ভালবাসে না। আর্য্যরা মানে এক অদ্বিতীয়কে, পূর্বতন ঋষি মহাপুরুষদিগকে, তারা মানে পূর্বপুরুষকে ও জন্মগত বিশিষ্ট গুণসম্পদকে। অর্থাৎ বর্ণধর্মকে, সর্ব্বোপরি তারা মানে বৈশিষ্ট্যপালী আপূরয়মান যুগপুরুষোত্তমকে। এগুলি মালার মত গাঁথা আছে। যাদের দেখার চোখ আছে ও দেখতে চায়, তারাই দেখতে পায়। বেদ, কোরান, বাইবেল ঘেঁটে দেখ, সব জায়গায় ঐ একই জিনিস রকমারি ভাবে পাবে। অন্ততঃ ওগুলির উল্টো কথা পাবে না। কোরাণে স্পষ্ট করে আছে পিতৃপুরুষকে স্বীকার করার কথা। আমি ইসলামের ভক্ত হলে আমার নাম গোলাম সোফান হবে কেন? অনুকূল চক্রবর্তীই তো থাকা উচিত। কারণ, খোদাতায়ালা যেমন সকলের, রসুল যেমন সকলের, ইসলামও তেমনি সকলের। মুসলমানের মধ্যেও বংশগত আভিজাত্য ও বৈশিষ্ট্যকে শ্রদ্ধা দিয়ে চলার কথা আছে। ওর ভিতর দিয়েই তো বর্ণধর্মের মূল তাৎপর্য্য-সম্বন্ধে সমর্থন পাওয়া যায়। আজ আমরা বৈশিষ্ট্যকে নষ্ট করতে চাই কেন ? রসূলের কি তেমন কোন কথা আছে ? আর নিজেদের বৈশিষ্ট্যকে যদি বজায় রাখতে চাই, তবে অপরের বৈশিষ্ট্য যাতে বজায় থাকে সেদিকেও লক্ষ্য রাখা লাগে। অপরের বৈশিষ্ট্য ভাঙ্গার প্রবৃত্তিকে প্রশ্রয় দিলে, কালে-কালে নিজের বৈশিষ্ট্য ভাঙ্গার পথই প্রশস্ত হয়।
আমি বলি, আমি যদি হযরতকে ভালবাসি এবং তাঁর নীতিবিধি মেনে চলি, তবে আমি হিন্দু থাকব না কেন ? পরমপিতার পথে চলতে গিয়ে পিতৃপরিচয় খোয়াতে হবে কেন ? আমি তো বুঝি হিন্দুও আর্য্য, মুসলমানও আর্য্য। উভয়ের পন্থা ও গন্তব্য এক। হযরত পূর্ববর্তীকে মানেন, পরবর্তীকে মানার ইঙ্গিতও তিনি দিয়ে গেছেন, তিনি যা মানেন আমরা যদি তা না মানি, তার মানে আমরা তাঁকে মানি না। মুসলমান পীরের কাছ থেকে দীক্ষা নেয়া লাগে, হিন্দুরও গুরুর কাছ থেকে দীক্ষা নেওয়া লাগে, সে একই কথা। শুধু ভাষা আলাদা। কতকগুলি নীতি আছে, দেশকাল, পাত্র, নির্ব্বিশেষে সর্ব্বত্র সর্বদা সবার পালনীয়, আবার কতকগুলি আছে বিশেষ-বিশেষ ব্যক্তির বিশেষ-বিশেষ অবস্থায় ও দেশকালে পালনীয়। এই দুটোর মধ্যে গুলিয়ে ফেলতে নেই। Fundamental (মৌলিক) ও universal (সার্ব্বজনীন) জিনিস হল—এক অদ্বিতীয়কে মানা, পূর্বতন ঋষি-মহাপুরুষকে মানা, পিতৃপুরুষকে মানা, বৈশিষ্ট্য মানা, পূরয়মান যুগপুরুষোত্তমকে অনুসরণ করে চলা। তুমি হিন্দুই হও বা মুসলমানই হও, এগুলি যদি না মান, তুমি হিন্দুও নও, মুসলমানও নও, এককথায় তুমি ম্লেচ্ছদলভুক্ত, ম্লেচ্ছ মানে যারা সংস্কৃতির উল্টো চলে। আর যে এগুলিকে মেনে চলে সে যে সম্প্রদায়ের লোক হোক না কেন, তাকে তুমি কখনও কাফের বলতে পার না। কাফের মানে যে ধর্মবিরোধী চলায় চলে। সাম্প্রদায়িক বিরোধের প্রশ্রয় না দিয়ে, ধর্মবিরুদ্ধ চলনের বিরুদ্ধে আমাদের জেহাদ ঘোষণা করা লাগে। তাই করা লাগে যাতে প্রতি প্রত্যেকে ঈশ্বরপ্রেমী হয়ে ওঠে, ধর্মপ্রবুদ্ধ হয়ে ওঠে। এ দায় হিন্দু-মুসলমান সকলেরই মিলিত দায়। তাই, এই কাজে হিন্দুর মুসলমানকে সাহায্য করা উচিত, মুসলমানেরও হিন্দুর সাহায্য করা উচিত। আমি বুঝি, সৎসঙ্গ যেমন হিন্দুর, তেমনি মুসলমানের, তেমনি বৌদ্ধের, তেমনি খ্রিষ্টানের, তেমনি অন্যান্য সকলের। সব মানুষই পরমপিতার, তা তারা জানুক বা না-জানুক, মানুক বা না-মানুক।
(আ: প্র: একাদশ খন্ড, ইং ১৭-০৩-১৯৪৮)
BE VEGETARIAN
।। মাছ-মাংস খাসনে আর/পেঁয়াজ-রসুন মাদক ছাড় ।।
সংকলক—তপন দাস
সর্বশ্রেষ্ঠ হিন্দু ধর্মগ্রন্থ মহাভারতের অনুশাসনপর্ব – ১১৪
অধ্যায়ে বলা হয়েছে—
“যে ব্যক্তি মোহ প্রভাবে
পুত্র-মাংস-তুল্য অন্যজীবের মাংস ভক্ষণ করে, সে অতি জঘন্য
প্রকৃতির এবং তার সেই জীবহিংসা বহুবিধ পাপযোনিতে জন্মগ্রহণ করবার একমাত্র কারণ বলে
নির্দিষ্ট হয়।’’
শুধু হিন্দু মতেই নয়, কোন ধর্মীয় মতবাদে জীবহত্যা স্বীকৃত নয়। কোরানে, আর্য্য হিন্দু-শাস্ত্রে এবং পুরুষোত্তমদের বাণীতে কোথাও ‘বলিদান’ বা ‘কোরবাণী’-র নামে প্রাণী হত্যার অনুমোদন নেই।
‘কোরবাণী’ কথাটি আসিয়াছে আরবী ‘কুরবান’ হইতে। ‘কুরবান’ মানে উৎসর্গ, বলি। আবার বলি মানে দান। তন, মন, ধন কর কুরবানী অর্থাৎ কায়, মন, ধন পরমেশ্বরের জন্য উৎসর্গ কর। এই আত্মোৎসর্গ বা আত্ম-বলিদানই প্রকৃত বলি বা কোরবাণী।
মুসলমানদের ধর্ম গ্রন্থ আল-কোরানে বলা হয়েছে, “এদের মাংস আর রক্ত আল্লাহর কাছে পৌছায় না, কিন্তু তোমার ভক্তি তার কাছে পৌছায়।” – (সুরা 21/37)
“আল্লার নিকট তাহার মাংস ও তাহার রক্ত কখন পৌঁছে না বা তিনি তাহা ইচ্ছা করেন না। বরং তোমরা অসৎকর্ম্ম হইতে নিজেকে রক্ষা কর ইহাই তিনি ইচ্ছা করেন। তিনি আমাদের অধীনে থাকিয়া কার্য্যনির্বাহের জন্য পশু সৃষ্টি করিয়াছেন—সেজন্য তোমরা খোদার নিকট নম্র ও নিরীহ হইতে শিক্ষালাভ করিবে। এই সৎপথ-প্রাপ্তির অর্থাৎ সৎ-শিক্ষার জন্যই খোদা এই ব্যবস্থা করিয়াছেন। যাহারা অন্যের মঙ্গল সাধন করে, তাহাদের মঙ্গল করিয়া থাকেন ……..” (কোর-আণ—২২ হজ ৩৭ র, ৫)
“বাসোপযোগী গৃহ,
গুপ্তস্থান রক্ষা করিবার উপযুক্ত বস্ত্র, এবং শুষ্ক-রুটি ও পানীয় ব্যতীত মানব-সন্তানের অন্য কোন জিনিসের উপর
অধিকার নাই ।” (–হাদিস তিরমিজি)
“একটু পানি এবং কয়েকটি খর্জ্জুরে তাঁহার ক্ষুধার নিবৃত্তি হইত । হজরত
মোহাম্মদ একাধারে ধর্ম্ম-প্রবর্ত্তক, মহাকর্মী এবং
সন্ন্যাসী ছিলেন ।” (ইসলামের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৯)
ভগবান বুদ্ধদেব বলেছেন, “আমি কখনই কাউকে মাংস খাওয়ার অনুমোদন করি নি, করি না এবং করব না।” (লঙ্কাবতার সূক্ত)
প্রভু যিশু বলেন, “তুমি হত্যা করিও না” । (এক্সোডাস – 20:13)
“যে একটি ষাড়কে হত্যা করলো,
সে যেন একটি মানুষকে হত্যা করলো।” (ইসা – 66:33)
উক্ত অনুশাসনবাদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যে নিজেকে পরমেশ্বরের সন্তান বা খোদাতাল্লার বান্দা মনে করবেন তিনি কখনই কোন প্রাণী হত্যা করবেন না এবং প্রাণীর রক্ত-মাংসে ক্ষুধার নিবৃত্তি করবেন না।
জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন
জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন
নিবেদনে—তপন দাস
অবশেষে সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে সপ্তদশতম লোকসভা নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগড়িষ্ঠতা নিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টির প্রতিনিধিগণ গণ-প্রজাতন্ত্রী ভারতরাষ্ট্রের শাসন-ব্যবস্থার অধিকার গ্রহণ করল।
আমাদের ভারত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় প্রতীক অশোক স্তম্ভ। মূন্ডক উপনিষদের পবিত্র মন্ত্র ‘সত্যমেব জয়তে’ আমাদের রাষ্ট্রীয় মন্ত্র। ভারতরাষ্ট্রের শাসন-ব্যবস্থা ৫ বছর অন্তর নবীকরণ করতে হয় নির্বাচনের মাধ্যমে। ‘সত্যমেব জয়তে’র সীলমোহর দিয়ে। সত্যে অটল থাকার জন্য প্রতিশ্রুতদের কাছে নির্বাচন একটা শান্তশিষ্ট প্রক্রিয়া। ঢাল তরোয়াল গুলি বন্দুক কোন কিছুরই প্রয়োজন থাকার কথা নয়। লাইন দেবে সুইচ টিপবে । যা’ বর্তমানে তথ্য-প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অতি সহজে অন লাইনে করা যায়। তাহলে নিষ্প্রয়োজনে এত শ্রমদিবসের, এত শক্তির, এত অর্থের অপচয় কেন? কেনই বা নির্বাচনের নামে হিংসার আশ্রয়-প্রশ্রয় পাবে? তাহলে কি আমরা সত্যের প্রতিজ্ঞার পথচলা থেকে ভ্রষ্ট হয়েছি ? এর কারণ কি, ‘সত্যমেব জয়তে’র আধিকারিকদের একটু ভেবে দেখতে অনুরোধ জানাই। জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যম নির্বাচন প্রক্রিয়া বা গণতন্ত্রের আঁতুড়ঘর যদি অস্বচ্ছতায় পূর্ণ থাকে সেখান থেকে স্বচ্ছ জনপ্রতিনিধি আশা করা বাতুলতা মাত্র।
ইতিপূর্বে আমরা অনেক জন-প্রতিনিধির সাথে পরিচিত হয়েছি, যারা তাদের সরকারী আপ্ত-সহায়ক আমলাদের যোগ্যতার তুলনায় অনেক অযোগ্য। একজন অশিক্ষিত, অস্বচ্ছ চরিত্রের অযোগ্য মন্ত্রীকে স্যর/ম্যাডাম বলে সম্বোধন করে একজন আই. এ. এস অফিসারকে যদি উঠতে বসতে হয়, তা কি সভ্যতার নিরিখে সম্মানের? অতএব এ ধরণের অসম-প্রথার অবসান ঘটিয়ে প্রকৃত যোগ্যতার মর্যাদার প্রতিষ্ঠা করতে হবে সরকারকে।
মাননীয় নরেন্দ্র মোদিজীর নেতৃত্বাধীন বর্তমানের বিজেপি সরকার ‘জয় শ্রীরাম’ শ্লোগানকে আঁকড়ে বিপুল জন সমর্থন পেয়েছে। মর্যাদা পুরুষোত্তম রামচন্দ্রের আদর্শে বিশ্বাসী ভারতের নির্বাচকগণ ‘রাম-রাজত্বের’ ন্যায় এক স্বচ্ছ, নির্মল শাসনতন্ত্রের আশায় ভোট দান করেছেন। অতএব রামচন্দ্রের নাম-মাহাত্ম্যের জোরে যে শাসনতন্ত্রের অধিকার অর্জন করেছেন যে জন-প্রতিনিধিরা, তাদের ক্যাবিনেট যদি রামচন্দ্রের গুরু ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠের আদর্শের আলোকে আলোকিত না হয়,— সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হয়,— জন-প্রতিনিধিগণ যদি রাম-রাজত্বের পরিপন্থী বিলাস-ব্যসন ত্যাগ করে, আত্ম-প্রতিষ্ঠার মোহ ত্যাগ করে, সাত্ত্বিক-চলনে সাধারণভাবে চলতে অভ্যস্ত না হয়,—তাঁরা কখনোই ঈপ্সিত রাম-রাজত্ব ফিরিয়ে আনতে পারবে না। কারণ, রাম-রাজত্বে পশুরাও সুবিচার পেত। রামচন্দ্রের সভায় একটা কুকুর বিচার চাইতে এসে বলেছিল—
न सा सभा यत्र न सन्ति वृद्धाः
वृद्धा न ते ये न वदन्ति धर्मम् ।
नासौ धर्मो यत्र न सत्यमन्ति
न तत् सत्यं यच्छलेनानुविद्धम् ।।
(VALMIKEE RAMAYAN, 3/33)
(যে সভায় বৃদ্ধ নেই, তা সভাই নয়। যারা
ধর্মসঙ্গত কথা বলে না, তারা বৃদ্ধ নয়। যা’তে সত্য
নেই তা’ ধর্ম নয়। যা’তে ছলনা আছে, তা’ সত্য নয়।)
তাই জন-প্রতিনিধিদের উচিত হবে, রামচন্দ্রের সভার ন্যায় একজন আদর্শ সভাসদরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। এবং তা বাস্তবায়িত করতে হলে, সরকারী কোষাগার থেকে সাধারণভাবে বেঁচে থাকার প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ না করা। বর্তমান শাসনতন্ত্রের পরিকাঠামো অনুযায়ী জন-প্রতিনিধিদের জন্য বরাদ্দ সুবিধা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে রাম-রাজত্ব প্রতিষ্ঠার চিন্তা অধরাই থেকে যাবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর ক্যাবিনেটকে এ বিষয়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
——-
সংগঠন ও সংগঠনী
সংগঠন ও সংগঠনী।।
সৎসঙ্গী মাত্রই ‘অর্ঘ্য-প্রস্বস্তি’ শব্দটির সাথে কমবেশী পরিচিত। সেই ‘অর্ঘ্য-প্রস্বস্তি’র একটি স্তম্ভের নাম সংগঠনী। দীক্ষিতদের ইষ্টার্থে, অর্থাৎ শ্রীশ্রীঠাকুরের মূল আদর্শ দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ, কৃষি ও শিল্পের বিষয়ে সম্যকভাবে গঠিত করার ভাগবৎ প্রচেষ্টা বাস্তবায়িত করার ফান্ড বিশেষ এই সংগঠনী।
সংগঠনের ব্যাপারে মুখ্য করণীয় কি ? বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে
শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছিলেনঃ—‘‘দীক্ষিতদের মধ্যে আনতে হবে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সেবা-বিনিময় এবং প্রত্যেকটি দীক্ষিতকে তার বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য-অনুযায়ী চিন্তা ও চরিত্রে ইষ্টানুগ পরিপূর্ণতায় উচ্ছল কর্মপটু ক’রে তুলতে হবে। এই দু’টি দিক লক্ষ্য রেখে চললে প্রকৃত সংগঠন হবে। সংগঠনের এই মুল সুত্র প্রয়োগ করতে হবে যেমন আপনাদের নিজের বেলায় তেমনি অন্যদের বেলায়। এর মূল কথা হল উপযুক্ত কর্মী। মানুষকে ধারাবাহিক nurture (পোষণ) দিতে গেলে নিজেরা adjusted (নিয়ন্ত্রিত) হওয়া লাগে। আর প্রত্যেককে তার মতো করে nurture (পোষণ) দিতে হয়। এক-এক জনের এক-একটা বদ্ধমুল বদভ্যাস থাকে। তার দরুন জীবনে উন্নতি করতে পারে না। মানুষকে এমনভাবে উস্কে দিতে হয় যাতে নিজেই নিজের দোষ খুঁজে বের করতে ও সংশোধন করতে বদ্ধপরিকর হয়। তাছাড়া মানুষের সদগুণ যেগুলি আছে, সেগুলি খুব glowing (উজ্জ্বল) করে তার ও অপরের সামনে তুলে ধরতে হয়, যাতে সে ঐ গুলির অনুশীলন ও প্রবর্দ্ধনে আরো তৎপর হয়। বাস্তব গুণের প্রশংসা করে মানুষকে যতটা ভাল করা যায়, তার দোষ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে, তার শতাংশের একাংশও হয় না। বরং উল্টো ফল ফলে। তাই অন্যের চারিত্রিক গলদ যদি আপনার অসুবিধারও সৃষ্টি করে, তাও চ’টে যাওয়া চলবে না। চুলচেরা বিচারের মধ্যে ফেললে কেউই রেহাই পায় না। তাই সহানুভূতির সঙ্গে দেখবেন প্রত্যেককে। তখন আপনার প্রতি ভালবাসার বশে মানুষ আত্মসংশোধনের তাগিত অনুভব করবে। নিজেকে সর্বদা শাসন করে চলুন, তাহ’লে আপনার সংস্পর্শে আপনার পরিবেশ, বিশেষতঃ সশ্রদ্ধ যারা আপনার প্রতি তারা স্বতঃই শাসিত হয়ে উঠবে। আর, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সেবা বিনিময়ের ব্যাপারেও নিজেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করা লাগে…। এই ভাবে চললে, কোথায়ও ঠকছেন বলে আপসোস করতে হবে না। মানুষ যে টাকার চেয়ে মূল্যবান—এইটে হ’লো আসল অর্থনীতি। টাকার consideration ( বিবেচনায়)-এ মানুষ ত্যাগ করবেন না, মানুষের ভালোর জন্য টাকার প্রতি নির্মম হবেন। একটা মানুষ যদি বিলকুল আপনার হয়, টাকার অংকে কি তার মূল্য নিরূপণ করা যায় ? সে যে অমূল্য সম্পদ। এই কথাগুলি মাথায় রেখে এগিয়ে চলেন, আপনারাও দেখবেন, দুনিয়াও দেখতে পাবে সংগঠন কাকে বলে। (আঃ প্রঃ ৯ম খন্ড, পৃঃ ১৮৭-১৮৮)
��্শিতা। রোগীর বিছানার গন্ধ শুঁকে ওষুধ নির্বাচন করতেন।
আর একটি দিনের ঘটনা। দুই বন্ধুতে মিলে বসেছিলেন ডাক্তারখানার বারান্দায়। অদূরে একটি লোককে হেঁটে যেতে দেখে অনুকূলচন্দ্র বলে ওঠেন, ডাক্তার দেখো, ওই যে,— ‘এসেটিক এসিড’ হেঁটে যাচ্ছে। সহকারী ডাক্তারের ওই অতি-ডাক্তারি আচরণে ক্ষুব্ধ হন কিশোরীমোহন। বলেন, একটা মানুষ অদূরে হেঁটে যাচ্ছে, আর তুমি বলছো ‘এসেটিক এসিড’ হেঁটে যাচ্ছে! সবকিছুর একটা মাত্রা থাকা উচিত!
না মাত্রা তিনি ছাড়ান নি। বন্ধু ডাক্তার কিশোরীমোহনকে মাত্রাবদ্ধ করতে অনুনয় করেন তাঁর মুখ থেকে সদ্য নিঃসৃত বাক্যটিকে একবার পরখ করে দেখতে।
ক্ষুব্ধ হলেও নাছোড়বান্দা সহকারী ডাক্তার বন্ধুর অনুরোধ মেনে অদূরে হেঁটে যাওয়া ভিন্ গাঁয়ের লোকটির সাথে আলাপ জমান ডাক্তার কিশোরীমোহন। নানাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে ওই লোকটির মধ্যে খুঁজে পান হোমিওপ্যাথিক ওয়ুধ ‘এসেটিক এসিড’-এর এক পূর্ণচিত্র । অনুকূলচন্দ্রের কথামত হাজার শক্তির একমাত্রা এসেটিক এসিড দিয়ে উক্ত ভদ্রলোকের দীর্ঘদিনের দুরারোগ্য ব্যাধি আরোগ্য করেছিলেন।
আর একদিনের ঘটনা। কাশীপুরের রাস্তা দিয়ে রোগী দেখতে যাচ্ছিলেন অনুকূলচন্দ্র। বোয়ালW
ডাক্তার অনুকূলচন্দ্র
চিকিৎসক অনুকূলচন্দ্র
নিবেদনে—তপন দাস
হোমিওপ্যাথী
আবিষ্কার করে চিকিৎসা জগতের ইতিহাসে নবযুগ এনেছিলেন যে মানুষটি, সেই হোমিওপ্যাথীর জনক মহাত্মা হ্যানিমান জন্মগ্রহণ
করেছিলেন ১৭৫৫ খ্রীস্টাব্দের ১০ এপ্রিল জার্মানিতে (Meissen, Saxony, near
Dresden) । তাঁর স্মৃতির
উদ্দেশ্যে জানাই প্রণাম। তাঁর আবিষ্কৃত সদৃশ বিধানকে সমৃদ্ধ করেছিলেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে ডাঃ কেন্ট, ডাঃ এ্যালেন, ডাঃ হেরিং, ডাঃ
ফ্যারিংটন, ডাঃ টেস্টি, বাংলার ডাঃ
মহেন্দ্রলাল সরকার প্রমুখ চিকিৎসকগণ প্রাতঃ-স্মরণীয়। তাঁদের কীর্তি বিশ্বের সব
হোমিওপ্যাথ ডাক্তাররা জানেন। এমনই একজন হোমিওপ্যাথ ডাক্তার ছিলেন এই বাংলায়,
যাঁর কীর্তি হোমিওপ্যাথী ডাক্তারসমাজে প্রায় অজ্ঞাত। যিনি বাল্য
বয়সেই মহাত্মা হ্যানিমানের সদৃশ বিধান মতে ভাটপাতা (Clerodendron
Infortunatum) খেয়ে অসুখ তৈরি করে সদৃশ বিধানকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
তাঁর নাম ছিল অনুকূলচন্দ্র। নিবাস ছিল পাবনা জেলার হিমাইতপুর গ্রামে।
অনুকূলচন্দ্র
ডাক্তারী অধ্যয়ন করার সময় কিছুদিন কলকাতার গ্রে স্ট্রীটের এক কয়লার গোলায় থাকতেন।
বাঘা যতীন-এর মাতুল হেমন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ‘লাহিড়ী
কোম্পানী’ নামে একটি হোমিওপ্যাথিক ঔষধালয় ছিল গ্রে স্ট্রীট ও
চিৎপুর রোডের মোড়ে। তিনি অনুকূলচন্দ্রকে উৎসাহ দিতে স্বনামধন্য চিকিৎসক ডাঃ
মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য প্রণীত ‘পারিবারিক চিকিৎসা’ গ্রন্থের সাথে ২৪ শিশি ঔষধের একটি বাক্স উপহার দিয়ছিলেন। তা দিয়ে অনুকূলচন্দ্র
স্থানীয় কুলী-মজুরদের মধ্যে হোমিওপ্যাথী মতে চিকিৎসা শুরু করেন। খুব নামডাক হয়।
ক্রমে সন্নিহিত ভদ্রজনেরাও অনুকূলচন্দ্রকে দিয়ে চিকিৎসা করাতে শুরু করেন। খুব
অল্পদিনের মধ্যই রোগীদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাক্ষাৎ ভগবান স্বরূপ।
১৯১২ সালে কলকাতার
ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুল থেকে এ্যালোপ্যাথী ডাক্তারি শিক্ষা সমাপ্ত করে নিজগ্রামে
ফিরে বন্ধুবর ডাক্তার কিশোরীমোহনের সহকারী চিকিৎসক হিসেবে হোমিওপ্যাথী মতে ডাক্তারী
শুরু করেন। তাঁরা উভয় উভয়কে ডাক্তার বলে সম্বোধন করতেন। একসঙ্গে রোগী দেখতে গিয়ে
হতো মজা। একদিন কিশোরীমোহনের সহকারী হয়ে রোগীর বাড়ীতে গেছেন। কিশোরীমোহন তখনো
রোগীকে দেখেন নি। রোগী বাহ্যি করতে গেছে। তার আগেই রোগীর ঘরে ঢুকে অনুকূলচন্দ্র ‘মার্ক-সল’ ওষুধটি নির্বাচন করে বসেন। কিশোরীমোহন
অসন্তুষ্ট হয়ে বলেন, আমি রোগী দেখলাম না, তার আগেই তুমি ওষুধের নাম বলে দিলে! লক্ষণ-সমষ্টি না দেখে হোমিওপ্যাথিতে
ওষুধ নির্বাচন করতে নেই। অবশেষে কিশোরীমোহন রোগীর লক্ষণ সমষ্টি দেখে ওই ‘মার্ক-সল’কেই নির্বাচন করেন। এমনই ছিল অনুকূলচন্দ্রের
রোগী পর্যবেক্ষণ দূরদর্শিতা। রোগীর বিছানার গন্ধ শুঁকে ওষুধ নির্বাচন করতেন।
আর একটি দিনের ঘটনা।
দুই বন্ধুতে মিলে বসেছিলেন ডাক্তারখানার বারান্দায়। অদূরে একটি লোককে হেঁটে যেতে
দেখে অনুকূলচন্দ্র বলে ওঠেন, ডাক্তার দেখো, ওই যে,— ‘এসেটিক এসিড’ হেঁটে
যাচ্ছে। সহকারী ডাক্তারের ওই অতি-ডাক্তারি আচরণে ক্ষুব্ধ হন কিশোরীমোহন। বলেন,
একটা মানুষ অদূরে হেঁটে যাচ্ছে, আর তুমি বলছো ‘এসেটিক এসিড’ হেঁটে যাচ্ছে! সবকিছুর একটা মাত্রা
থাকা উচিত!
না মাত্রা তিনি ছাড়ান
নি। বন্ধু ডাক্তার কিশোরীমোহনকে মাত্রাবদ্ধ করতে অনুনয় করেন তাঁর মুখ থেকে সদ্য
নিঃসৃত বাক্যটিকে একবার পরখ করে দেখতে।
ক্ষুব্ধ হলেও নাছোড়বান্দা
সহকারী ডাক্তার বন্ধুর অনুরোধ মেনে অদূরে হেঁটে যাওয়া ভিন্ গাঁয়ের লোকটির সাথে
আলাপ জমান ডাক্তার কিশোরীমোহন। নানাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে ওই লোকটির মধ্যে খুঁজে
পান হোমিওপ্যাথিক ওয়ুধ ‘এসেটিক এসিড’-এর
এক পূর্ণচিত্র । অনুকূলচন্দ্রের কথামত হাজার শক্তির একমাত্রা এসেটিক এসিড দিয়ে
উক্ত ভদ্রলোকের দীর্ঘদিনের দুরারোগ্য ব্যাধি আরোগ্য করেছিলেন।
আর একদিনের ঘটনা।
কাশীপুরের রাস্তা দিয়ে রোগী দেখতে যাচ্ছিলেন অনুকূলচন্দ্র। বোয়ালমাছ হাতে করে একজন
গ্রামবাসীকে যেতে দেখে অনুকূলচন্দ্রের মানসপটে ‘Veratrum Album’ ওষুধটির চিত্র ফুটে ওঠে। তিনি লোকটিকে ওই বোয়ালমাছ খেতে নিষেধ করেছিলেন।
ভদ্রলোক বলেন, ‘খোদা পয়দা করেছে, একদিন
তো মরতে হবেই।’ বলে বিরক্তি প্রকাশ করে চলে যান। সেই মাছ
খেয়ে ভদ্রলোকের পায়খানা-বমি শুরু হলে বাড়ির লোক এসে ড়াক্তার অনুকূলচন্দ্রকে নিয়ে
যান। অনুকূলচন্দ্র গিয়ে ওই ‘Veratrum Album’ ওষুধের সাহায্যে
রোগীকে সুস্থ করে বাড়ী ফেরেন। সেই থেকে সাধারণ গ্রামবাসীরা অনুকূলচন্দ্রকে শুধু
ডাক্তার হিসেবে নয়, একজন অতিমানব জ্ঞানে মান্য করতে থাকেন।
অনুকূলচন্দ্র ওই
সখের ডাক্তারী বেশীদিন করেন নি। মানুষের প্রবৃত্তির রিংরসায় লুকিয়ে থাকা বন্ধুরূপী
শত্রুদের ষড়রিপু—ত্রিদোষ—বায়ু-পিত্ত-কফ—সোরা, সিফিলিস,
সাইকোসিক-দের মূলোৎপাটন করে শারীর-মানস সঙ্গতি সাধন করতে গড়ে
তুলেছিলেন কীর্তনদল। আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে কৃষি, শিক্ষা,
বিবিধ-শিল্প, ফলিত-বিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণা শুরু
করান। সাথে রসৈষণা মন্দির প্রতিষ্ঠা করে গ্রামবাংলার ভেষজের সাহায্যে নানাবিধ
জীবনদায়ী ওযুধ আবিষ্কার করেছিলেন। সেই ওষুধগুলো বহির্ভারতেও সমাদৃত হয়েছিল। সব
মতের চিকিৎসায় তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। যেখানে যেমন প্রয়োজন, সেখানে তেমন ঔষধ ও পথ্যের ব্যবস্থাপত্রের সাহায্যে সারা জীবন ধরে তিনি প্রবৃত্তি-পীড়িত
মানুষের ক্যানসারসহ সব ধরণের দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা করে গেছেন। তিনি আজ
ভক্তজনের আজ্ঞাচক্রে চির-অতন্দ্র পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র রূপে
প্রতিষ্ঠিত।
——-
Top of Form
Bottom of Form
Top of Form