UNITY IN DIVERSITY

UNITY IN DIVERSITY

BOW—FOLLOW AND BE COLOURED

By Shree Shree Thakur Anukulchandra

Bow,      

follow

and be coloured

with the valorous bloom

of Ramchandra,

with the ripples of His

service, love and compassion ;

follow Lord Krishna

to make yourself equipped

with presence of mind

and political adjustment

of yourself

end your environment

with every boldness

tactful go of life ;

love,

serve with every

sonorous appeasement

like Buddha ;

adhere to your Beloved the Great

like Christ

with the service of love to all

and combat evil

with every loving resistance

and cross over every difficulty

and be flooded with love

with every up heaving wave

in your existential trail ;

keep thy adherence untottering

like Rasul

with every victorious step

of honesty

and encouragement

with performing initiative zeal

devoting it out and out

to Providence ;

be flooded

with amusing thrill

with inherent active

constant love

for the Lord

like Sri Chaitanya ;

and conglomerate

all these faculties

with due behaving characteristics

of broad heroic

enamoured, intelligent steps ;

be smeared with every

loving attitude

and meaningful, coherent

compassionate effulgence

like Sri Ram Krishna and others too ;

all the prophets

are the new Advent

of the same,

and they are similar

in attributes and characteristics

according to the need of

time, place and circumstances,

though

their distinctiveness

in existential upholdment

is ever similar ;

he

who ignores one

due to sectarian egotism

ignores all.

————

 

সাহিত্যিক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র

   ।। ভাষার যাদুকর শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।

    নিবেদনে—ডাঃ তপন দাস

শিরোনামটি পাঠ করে অনেক পাঠকের মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগতে পারে, ধর্মগুরু ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আবার কবে ভাষার যাদুকর  হলেন ?

হ্যাঁ, আপনার প্রশ্ন অমূলক নয়। কারণ,  তিনি তথাকথিত লেখক বা কবি-সাহিত্যিক নন, এবং তথাকথিত শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক গুরুও নন। তিনি জাগতিক, আধ্যাত্মিক, ভূলোক, দ্যুলোক, ব্রহ্মলোক, বিষ্ণুলোক, গোলক সব বিষয় নিয়েই আলোকপাত করে গেছেন ভাষার এক নবীন বিন্যাসের মাধ্যমে। তিনি একাধারে ছিলেন কীর্তনীয়া, যোগ-বিশারদ, চিকিৎসকদের চিকিৎসক, শিক্ষকদের শিক্ষক, কৃষকদের উপদেষ্টা। শিল্প, বিজ্ঞান, স্থাপত্য, কলা, বাণিজ্য প্রভৃতি সর্ববিষয়ে  ছিলেন সমান পারদর্শী। তাঁকে পরিমাপ করার মত কোন মাপক যন্ত্র এখনো  আবিষ্কৃত হয়নি। তাই  তিনি কবি-সাহিত্যিক হিসেবে  কখনো কোন সাহিত্য সম্মেলনে যোগদান করেন নি, কোন পত্রিকা তাঁকে কবি বা সাহিত্যিক  শিরোপা দেয়নি, তিনি কোন পুরস্কার প্রাপকও নন। তবে তিনি সদগুরু পরিচয়ে খ্যাত হবার পর থেকে জগতের কল্যান সাধনের জন্য ২২ বছর বয়স থেকে সুরু করে ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত যে শুধুমাত্র অসংখ্য শ্রুতিবাণী, স্মৃতিবাণী, ভাববাণী প্রদান করেছেন  তাই নয়, ছাত্র জীবনেও তিনি বহু কবিতা, সংগীত ও নাটক রচনা করেছিলেন। সে-সব রচনার সব পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। যতটুকু পাওয়া গেছে তার মধ্যে ২২টি কবিতা, ২৯টি সংগীত, ‘দেবযানী’ শিরোনামের পূর্ণাঙ্গ নাটক এবং ১টি নাটকের অংশবিশেষ পাওয়া গেছে।  তাঁর রচিত অসংখ্য কবিতা এবং সংগীতের মধ্যে ‘বাণীস্তব’, ‘ধর্মসঙ্গীত’ যেমন আধ্যাত্মিকতায় সমৃদ্ধ, তেমনি আবার  ‘বঙ্গভঙ্গে’, ‘বিদেশী বর্জন’, ‘স্বদেশী সঙ্গীত’ শিরোনামের রচনায় অপূর্ব দেশপ্রেমের চিত্র প্রকাশিত হয়েছে।  তাঁর  রচিত  গ্রন্থাদি নিয়ে গবেষণা করে অনেক জ্ঞানীগুণীজন  ‘ডক্টরেট’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।  

তিনি সমাজ দর্পণকে, সমাধান বিহীন সমাজের সমস্যাকে, লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরাকে সাহিত্য বলেন নি। তাঁর মতে মানুষের হিত সাধন যা করে, তাই সাহিত্য।  ওই হিত সাধন কিভাবে করতে হবে, সে বিষয়টাকে তিনি তাঁর স্বকীয় রচনার রীতিতে প্রকাশ করলেনঃ

‘‘সাহিত্যের মূল ভিত্তিই হ’চ্ছে—

       জীবন ও কৃষ্টি,

              অর্থাৎ, কৃষ্টি যা’তে জীবনকে

                     পোষণ প্রবৃদ্ধ ক’রে তুলে

                           বিবর্তনে উৎকীর্ণ ক’রে দেয়—

তেমনতর নিয়মনের ভিতর-দিয়ে

       ঘটনাকে সন্নিবেশ করতঃ

              মানুষের অন্তরে

       বিবর্তনী আকূতিকে

              অনুপ্রেরিত ক’রে তোলাই হচ্ছে—

                     সাহিত্যের মন্ত্র চালনা।’’ ২৪৫  (শিক্ষা-বিধায়না)

 তাঁর মতে, শক্তিশালী লেখক, সাহিত্যিক যদি সুকেন্দ্রিক না হয়, তারাই হয়ে দাঁড়ায় ধর্ম, কৃষ্টি,  সংহতি ও আদর্শের  মাথায়  বাড়ি দেবার  গুরু ঠাকুর। তাদের লেখনী দিয়ে প্রবৃত্তি-পোষণী মন্দটাকেই ভালো বলে চালিয়ে দেয়। ফলে মানুষের বোধ ও বিবেচনা দিশেহারা হয়ে ওঠে।  

তাঁর রচিত ‘সত্যানুসরণ’ গ্রন্থটি পাঠ করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ  বিস্মিত হয়ে ঋত্বিগাচার্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য মহোদয়কে  বলেছিলেন,—এত অল্প  বয়সে এরূপ স্বচ্ছ সাবলীল ছন্দে, অপরূপ ভঙ্গীতে, গভীর তত্ত্বসমূহের এমন অপূর্ব প্রকাশ কি করিয়া সম্ভব হয়!  সত্যানুসরণ পাঠ করে কবিগুরু, ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রকে  একজন শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক রূপে গণ্য করেছিলেন।

কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র, ঠাকুরকে তাঁর উপন্যাস রচনার যে প্রেক্ষাপট ব্যক্ত করেছিলেন তার উত্তরে ঠাকুর বলেছিলেন, ‘‘……. —সমাজ পচে গিয়েছে সত্য,  কিন্তু তাই বলে আামরা যদি  দুঃখের চিত্র, হতাশার চিত্র, বিকৃত মনস্তত্ত্বের  অভিব্যক্তি লোকের সামনে তুলে ধরি, তবে কারও কোন উপকারই আমরা করতে পারিনা। সাহিত্যিকের দায়িত্ব গঠনমূলক চিত্র তুলে ধরা, যার ফলে মানুষ হতাশার মধ্যেও আশা, দুখেঃর মধ্যেও পায় শান্তির ইঙ্গিত।  বাস্তববাদের সঙ্গে যদি আদর্শবাদের সম্বন্ধ না থাকে, তবে কোন সুফলই হবে না। আদর্শ চরিত্র রূপায়ণ করলে, তা থেকে মানুষ পাবে উদ্দীপনা। বাস্তব অসুবিধা বা ভাগ্যবিপর্যয়কে প্রতিহত করে দাঁড়াতে চেষ্টা করবে। সাহিত্যিক যদি পাঠকের মনে ভরসার সৃষ্টি করতে না পারে, কল্যাণের ইঙ্গিত দিতে না পারে, তবে সে সাহিত্যের মূল্য কতটুকু ?’’

উত্তরে শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, ‘‘এমন করে কখনো ত ভাবিনি। এতদিন ভাবনার ধারাটাই ছিল উল্টো রকমের। সমস্যাটা তুলে ধরেছি। সমাজ-সংস্কারক করবে তার সমাধান। এখন কি আর শেষ সময়ে অন্য ভাবের রচনা সৃষ্টি করতে পারবো ?’’

ঠাকুরের অভিধানে সবই ইতিবাচক ছিল, নেতিবাচকতার স্থান নেই। কথাশিল্পীর ভাবনাকে নাড়িয়ে দিতে বলেছিলেন, দাদা, আপনার বাড়ীতে কোন অতিথি গেলে তাকে কি বাড়ীর আস্তাকুঁড়ে দেখান ? তা’ যদি না দেখান, তবে লেখনীর মাধ্যমে সমাজের নোংরা দিকটা তুলে ধরে কি সমাজের সংশোধন করা যায় ? তাই আমার মনে হয় সমস্যার সাথে সাথে সমাধান সূত্র যদি দিতে পারেন, প্রবৃত্তি-পীড়িত মানুষগুলো সংশোধিত হবার পথ খুঁজে পাবে। আপনার রচনা মানব-সমাজে হিতবাদী সাহিত্য রূপে বেঁচে থাকবে চিরকাল।

কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র  ঠাকুরের উপদেশ মেনে সমাধানী সূত্র দিয়ে রচনা করেছিলেন, ‘বিপ্রদাস’, ‘পথ-নির্দেশ’ ইত্যাদি শিরোনামের কালজয়ী উপন্যাস।

‘পথের পাঁচালি’-র স্রষ্টা সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ঠাকুরের অস্তিত্বধর্মী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন অগ্নিযুগের সাহিত্যিক এবং বলিষ্ঠ প্রবন্ধকার শাক্যসিংহ সেন, তিনি ‘সৎসঙ্গী’ মাসিক পত্রিকার সম্পাদকও ছিলেন। দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন নাট্যকার শ্রদ্ধেয় যোগেশ চন্দ্র  চৌধুরী। দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন নাট্যকার ব্রজেন দে, যিনি ঠাকুরের বিবাহ-নীতির আদর্শ নাটকের মাধ্যমে জনসমক্ষে তুলে ধরতে রচনা করেছিলেন ‘নিষিদ্ধ ফল’ নাট্যপালা।  এছাড়াও   সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, বিমল কর, আশাপূর্ণা দেবী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, জরাসন্ধ, বিবেকানন্দ মুখার্জী, সৈয়দ মুজতবা আলি, ড. শ্রীকুমার  বন্দ্যোপাধ্যায়, দীনেশ চন্দ্র সেন   প্রমুখ স্বনামধন্য সাহিত্যিকগণ ঠাকুরের সান্নিধ্য লাভ করে সমৃদ্ধ হয়েছিলেন। আর বর্তমান প্রজন্মের  আইডল শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় মহোদয় তো ঠাকুরকে নিয়েই তাঁর রচনাকে সমৃদ্ধ করে  চলেছেন।

                          * * * *

সাহিত্যিক মাত্রেরই একটা স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায় তাঁদের রচনায়। কিন্তু ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের রচনাকে কোন একটা নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের গণ্ডীতে আটকে রাখা যায় না। মানব-সভ্যতার হিতার্থে রচনার প্রয়োজনে  আর্য্য-ভাষার দেশজ, চলিত, প্রাকৃত, লেখ্য, কাব্যিক ভাষা এমন সুনিপুণভাবে প্রয়োগ করেছেন যা’ অন্যান্য লেখকের রচনায় এত বৈচিত্র পরিলক্ষিত হয় না।

মানুষের সর্বাঙ্গীন হিত সাধন করতে হলে প্রথম প্রয়োজন সদগুরুর দীক্ষা গ্রহণ।  তারপর গুরুর আদর্শের শিক্ষার সঞ্চারণা। সেই শিক্ষা শিশুকাল থেকে সুরু করে সারা জীবন ধরেই শিখতে হয়। কিন্তু আমরা শিশুদের সদগুরুর সিলেবাসের সৎ আচার-আচরণের দিকে খুব বেশি একটা গুরুত্ব না দিয়ে প্রথাগত সিলেবাসের বইপড়া শিক্ষায় বেশি করে গুরুত্ব দিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ফলে শিশুদের চরিত্র গঠনের শিক্ষায় ফাঁক থেকে যায়। যার ফলস্বরূপ মহানগরগুলিতে মহান নাগরিকের অভাব পরিলক্ষিত হয়। সেই ফাঁক পূরণ করতে শ্রীশ্রীঠাকুর ছোট ছোট ছড়া বাণীর মাধ্যমে শিশু শিক্ষার সহজ পাঠ দিলেন।

‘‘আধো-কথার সময় থেকেই

করে-করিয়ে যা’ শেখাবি

সেটাই কিন্তু মোক্ষম ছেলের

হিসাবে চল্ নয় পস্তাবি।

শিশু যখন আধবুলিতে

যে  লক্ষ্যেতে যা’ যা’ কয়—

তা’ না বুঝে চাপান কথায়

আনেই বোধের বিপর্যয় ।

ভাল কিছু করতে গিয়ে

       আসে যদি হটেই ছেলে 

এমনি করেই উস্কে দিবি

বাহবা নিতে করেই ফেলে।

ঝোঁক না বুঝে শিক্ষা দিলে 

পদে পদে কুফল মিলে।’’

শিক্ষা বিষয়ে বলতে গিয়ে এমনতর মনোবিজ্ঞান সম্মত অনেক ছড়াবাণী তিনি দিয়েছেন, অভিভাবকগণ সেগুলোকে বাস্তববায়িত করতে পারলে জীবনীয় শিক্ষা থেকে সন্তানেরা কখনোই বঞ্চিত হবে না।

সন্তানদের শিক্ষিত করার প্রতিবন্ধকতা ঠিক কোথায়, সে বিষয়ে মনোবিদেরা, সমাজবিদেরা বিশেষভাবে চিন্তিত হলেও ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তার নিদান দিলেন সহজ-সরল ভাষার প্রয়োগে।

‘‘স্বামী-স্ত্রীতে ঝগড়া করে

ছেলে-পুলেয় দেখে

গোল্লায়েরই সদর দ্বারে

বাছাগুলোয় রাখে।’’

সন্তান, পিতামাতার জৈবী অবদান। তাদের সহজাত-সংস্কার এবং অভ্যাসগুলো সন্তানের চরিত্রে সঞ্চারিত হয়। সন্তানকে শিক্ষা দিতে হলে পিতামাতাকে যে কতখানি  সংযত হতে হবে সে বিষয়ে আগেভাগে সাবধান করে দিলেন।

শ্রীশ্রীঠাকুর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার তুলনায় বাস্তবজীবনের ব্যবহারিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

‘‘অভ্যাস, ব্যবহার ভাল যত

শিক্ষাও তার জানিস্ তত।

লেখাপড়ায় দড় হলেই

শিক্ষা তারে কয় না

অভ্যাস, ব্যবহার, সহজজ্ঞান

নাহলে শিক্ষা হয় না।

মুখে জানে ব্যবহারে নাই

সেই শিক্ষার মুখে ছাই।’’

আমাদের শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য একজন সফল মানুষে পরিণত হওয়া। একজন পুরুষের সার্বিক উন্নতির চরম পরিণতি সফল পিতৃত্বে, একজন নারীর মাতৃত্বে। পিতৃত্ব এবং মাতৃত্ব অর্জনের নির্দিষ্ট উপাঙ্গও প্রকৃতি আমাদের দিয়েছেন, যার সফল বিনিয়োগে একজন আদর্শ পিতা, একজন আদর্শ মাতার পরিচয় বহন করে সুখ্যাত হতে পারি, আবার অসফল বিনিয়োগে কুখ্যাতও হতে পারি।  তাই শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র জাতি গঠনের মূল একক ‘প্রজা’ (প্রকৃষ্ট জাতক) সৃষ্টি কিভাবে করা যেতে পারে, সেই শিক্ষা সভ্যতাকে উপহার দিলেন, যা’ অন্যান্য সমাজ-সংস্কারকেরা কল্পনাও করেন নি।

‘‘প্রজা মানেই হচ্ছে—

       প্রকৃষ্টরূপে জাত—

       সর্ব্বসম্ভাব্য উদ্বর্দ্ধনী সার্থকতায় ;

আর প্রকৃষ্ট জন্ম পেতে হলেই চাই—

       প্রজনন পরিশুদ্ধি—

সর্ব্ব-সম্ভাব্যতার বৈধানিক সংস্থিতিতে।’’ (সম্বিতী)

প্রজনন পরিশুদ্ধির মাধ্যম মেয়েরা। মেয়েরাই মা হয়, নারী এবং পুরুষ উভয়েরই প্রত্যক্ষ স্রষ্টা। নারীরাই জাতির ধাত্রী এবং পালয়িত্রী। সেই নারীর চাল-চলন যত শুদ্ধ হবে, তত শুদ্ধ প্রজা জন্মাবে। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় যা’ সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত। শ্রীশ্রীঠাকুর সহজ-সরল ভাষায় এক মনোবৈজ্ঞানিক আবেদনের মাধ্যমে সে বিষয়ে আমাদের সচেতন করে দিলেন।

নারী হতে জন্মে জাতি
বৃদ্ধি লভে সমষ্টিতে
নারী আনে বৃদ্ধি ধারা
নারী হতেই বাঁচাবাড়া
পুরুষেতে টানটি যেমন
মূর্তি পায় তা সন্ততিতে।

পুরুষ নষ্টে যায় না রে জাত                            
নারী নষ্টে জাত কুপোকাত।

 নারীর চারিত্রিক শুদ্ধতা নষ্ট হলে জাতির শুদ্ধতা নষ্ট হবে। তাই শ্রীশ্রীঠাকুর ‘নারীর নীতি’ গ্রন্থের রচনার সহজ-সরল ছন্দের মাধ্যমে নারীর চারিত্রিক শুদ্ধতা বজায় রাখার শিক্ষা দিলেন।

‘‘মেয়ে আমার,

       তোমার সেবা, তোমার চলা,

        তোমার চিন্তা, তোমার বলা
              পুরুষ-জনসাধারণের ভিতর
                     যেন এমন একটা ভাবের সৃষ্টি করে—
                                  যা’তে তারা
                     অবনতমস্তকে, নতজানু হ’য়ে

                                  সসম্ভ্রমে,
                     ভক্তিগদগদ কন্ঠে—

‘মা আমার,— জননী আমার’! ব’লে
       মুগ্ধ হয়, বুদ্ধ হয়, তৃপ্ত হয়.কৃতার্থ হয়,—
              তবেই তুমি মেয়ে.
                     —তবেই তুমি সতী!’’
 
নারীর শুদ্ধতা বজায় রাখার স্বার্থে  লেখাপড়ার নামে ছেলেমেয়েদের সহশিক্ষা এবং সাহচর্য শ্রীশ্রীঠাকুর অনুমোদন করেন নি। ছোট ছোট ছড়াবাণীর মাধ্যমে এক সহজ শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন।
কুমারী একটু বড় হলেই
পুরুষ ছুঁতে নেই,
যথা সম্ভব এর পালনে 
উন্নয়নের খেই ।
 
ছেলেমেয়ে এক যোগেতে
করলে পড়াশোনা
পড়ার সাথে বাড়ে প্রায়ই
কামের উপাসনা।

পরের বাবা পরের দাদা
পরের মামা বন্ধু যত
এদের বাধ্যবাধকতায় 
সম্বন্ধটি যাহার যত
অনুরোধ আর উপরোধে
ব্যস্ত সারা নিশিদিন
কামুক মেয়ে তাকেই জানিস
গুপ্ত কামে করছে ক্ষীণ ।

বিয়ের আগে পড়লে মেয়ে
অন্য পুরুষে ঝোঁকের মন
স্বামীর সংসার পরিবার 
করতে নারে প্রায়ই আপন ।।

ছেলেমেয়েদের জীবনীয় শিক্ষা দিতে চাইলে ওই বাণীগুলো মুখে মুখে ছড়া কেটে একজন সাধারণ মানুষও সহজেই রপ্ত করতে পারে।

এবার আমরা তাঁর শিক্ষা-বিষয়ক সিদ্ধান্তের গদ্য রচনার কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরার চেষ্টা করব।

‘‘জীবন বিকাশের উদ্দেশ্যে, নিজ আচরণ-সমূহকে সহজাত সংস্কার ও স্বীয় অভ্যাসগুলির সাথে সুব্যবস্থিত ও সুগঠিত করে তোলার নাম শিক্ষা।’’

‘‘বৈশিষ্ট্যকে উল্লঙ্ঘন করিয়া শিক্ষার অবতারনা করা আর জীবনকে নপুংসক করা একই কথা।’’

অল্প কথায়, সহজ-সরল ভাষায় শিক্ষা-বিষয়ক এমন বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তের বার্তা ইতিপূর্বে কোন সাহিত্যিক বা শিক্ষাবিদ দিয়েছেন কিনা আমার জানা নেই।     

আবার সহজ, সরল ভাষা ছেড়ে শিক্ষা দেওয়ার ভাব এবং ভাষাটাকে যখন আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরেন, তখন আর, তাঁর সাহিত্যের পরিমাপ করা আমাদের সাধ্যে কুলায় না।

যেমন ইংরাজী ভাষায় গদ্য রচনা করে শিক্ষার সংজ্ঞায় বললেন :

“Systematic organisation  of habits and instinct for the purpose of fulfilling, the becoming of life by a graduated active manipulation of behaviour—may be called education.”

“Literation makes the
complexes facilated
whereas
education enlightens the being,
hence its index, habits and behaviour
glows on in a
sonorous rhyme.”
(MAGNA DICTA)

Education in its true sense
creates adjustment of
intra-cellular substance

through proper exercise;
intelligence and character evolve
and with due marital combination,
progeny improves.”

                             * * * *

‘শিক্ষা’ শব্দের অর্থ, সামর্থ্য, যোগ্যতা, সহায়তা। আর বেকার শব্দের অর্থ, অযোগ্য বা অকাজের লোক। পুঁথিগত শিক্ষায় শিক্ষিত হবার পর রোজগার করতে না পারা-দের পরস্পর বিরোধী ভাষায় ‘শিক্ষিত বেকার’ নামে কেন যে চিহ্নিত করা হয় আমি ভেবে পাই না ! শিক্ষার ওই অসার বাস্তব দিকটাকেও তিনি সাবলীল বাণীতে  তুলে ধরেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। যেমন—

‘‘শিখলি যে তুই কত শত

বোধ তো কিছুই ফুটলো না,

স্মৃতির বলদ হলি শুধু

এক মুঠো ভাত জুটলো না !’’

আবার আন্তর্জাতিক স্তরে তাঁর শিক্ষার ভাবনাকে চারিয়ে দিতে ইংরেজী ভাষার মাধ্যমে যা’ বিধৃত করলেন, সেইসব রচনাকে মূল্যায়ন করার যোগ্যতা কারো আছে কিনা জানি না, তবে আমার তো নেই। সেইসব ওজস্বী ভাষার রচনার কিঞ্চিৎ মাত্র তুলে ধরছি।

METHOD OF IMPARTING EDUCATION

“Let the method

       and device of your

process of imparting education

       be according to the

                     dealings and characteristics

                            of your students

                     and let the way

                            of laying it down

                                    before them

                            be tactful, sweet

                                   and touching

by which

       the characteristic interest

                             of your pupil

                             becomes glaring

       and they become interested

                            and adjusted

in your mission of training

      with jolly propitious propagation;

thus rouse their interest

       towards your mode of delivery

                     and attributes of teaching

       that inspire their awe and regard

                          for your personality;

and infuse your

       affectionate dealings

                             into their mind.”

EDUCATION WITHOUT CHARACTER

“Where education

      does not collaborate

                     with character and conduct,

                           it is merely

                                  an induction

                                         of knowledge

                     without an all-round association

                                           with facts

                     that make

                            the personality

                                    of our inner being

                                                          grow,

                            effulging

into peaceful fellow-feeling

                      with sympathetic service

                             to one’s existential uphill

                                            momentum.”      

LEARN FROM VARIOUS ASPECTS

“Learn

      through enjoyment

learn

      through exercise

                   with every interest

                          and keen observation;

learn

      through fear

                   observing all the affairs

                           with interest

                   which make your existence

                                         shaking;

learn

      from devout urge

                    on which you can stand

                           all through

                    in an unshaken condition,

laying out

      all intelligent tactics

                    and desisting from all evils;

learn

       from foe

                    how to combat,

                            how to deal with him

                                    intelligently

       and how to make him appeased

                                  without any suffering;

learn

       from beauty

                   which makes your heart

                          flourish to bloom

       with all attitude and action

                 how it makes you so

                          and all thoughts

                 that follow accordingly

                                         occur

thus,

       make yourself

                     all-round in experience

                            which comes out

                                           through

                     your keen observation

                            and active energetic urge;

remember however,

       while doing any work,

you have to perform it

       without forgetting anything

                    with all beauty,

                            in good time

                                    and temper.”     

                              * * * *

এবার  আমি সত্তাপোষণী ভাষায় সাহিত্য নির্মাণে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র যে বিশিষ্ট অবদান রেখে গেছেন, মানব সভ্যতাকে সবদিক দিয়ে সমৃদ্ধ করতে, তার কিছু দৃষ্টান্ত উপহার স্বরূপ তুলে ধরছি।

 ‘‘ভাব, ভাষা, যুক্তি,

       ছন্দ ও অনুরণন

যতই সৌষ্ঠবমণ্ডিত হ’য়ে

       আদর্শ-উল্লোল হ’য়ে ওঠে—

              জীবনীয় সাত্তিক সম্বর্দ্ধনায়,—

রচনা জীবন্ত হ’য়ে ওঠে সেখানে তেমনি,

       এই হলো রচনার পঞ্চপ্রাণ।’’ ২৩৯ (শিক্ষা-বিধায়না)

‘‘সমস্ত রসের সমবায়ে

       সন্দীপনার বোধ-পরিবেষণী

              সাত্বত সম্বেদনাই হ’চ্ছে

                     সাহিত্যের প্রাণনদীপ্তি।’’ ২৪০ (শিক্ষা-বিধায়না)

‘‘পরিস্থিতির ভাল-মন্দ পরিচলনকে

              আলোড়ন-বিলোড়ন ক’রে

       সার্থক সঙ্গতিশীল সাত্বত পন্থায়

              সাত্তিক মর্যাদায়

                     সুদীপ্ত ক’রে তোলাই হ’চ্ছে

                     সাহিত্যের সমীচীন তাৎপর্য,

আর তাই-ই হচ্ছে

       জনগণের জীবনীয় সম্বর্দ্ধনা।’’ ২৪১ (শিক্ষা-বিধায়না)

      ।। অনুশ্রুতি ১ম খণ্ড থেকে সংগৃহীত কিছু বাণী-নির্ঝর ।।

আদর-ভরা ফুল্লবাণী

       আশার পিনাক হাতে,

প্রাপ্তিটাকে আনবি ডেকে

       তপের আলোকপাতে। ৭৮। (সাধনা)

মান-গরবে অহংবশে

       ধরলি রে ধাঁজ বেকুব চতুর,

চলনে তোর দিগগজী ভাঁজ

       দেখতে যেন ক্ষিপ্ত কুকুর। ১২২। (বৃত্তিধর্ম)

পথ ভেবেই তুই শ্রান্তিভরে

       ক্ষান্ত হ’য়ে যাসনে দমে,

মানুষ কি রে চলতে পারে

       না ক’রে ভর স্ব-উদ্যমে ? ২৬ । (বৃত্তি নিয়ন্ত্রণ)

শঙ্খ ফুঁকে অমর হাঁকে

       উচ্চরোলে পুরুষ-বুক,

তাথৈ থিয়ায় নাচাও নারী

       বর্মে ঢেকে মৃত্যুমুখ। ৮৭। (পুরুষ ও নারী)

সব দিতে তুই করলি গুরু

       পেতে পরিত্রাণ,

দিলি কিন্তু নব ঘণ্টা

       নিতেই লেলিহান! ৪৩। (কপট টান)

বাসতে ভাল এসে রে তুই

       বাসলি ভাল কা’রে,

প্রতিদানেও তাই পাবি তুই

       মজলি নিয়ে যা’রে। ৭৫। (কপট টান)

এমন অসংখ্য ঋদ্ধ-বাণীতে সমৃদ্ধ রচনাগুলো মূল্যায়ন করতে পারলে তাঁকে কবি, ছান্দসিক, সাহিত্যিক, সাহিত্যদ্রষ্টা ঋষি বললেও বোধহয় অত্যুক্তি হবে না।

                              * * * *  

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র  সব ঝড়ঝঞ্ঝা থেকে মানব সভ্যতাকে আগলে রাখতে ওজস্বী ভাষায় ‘দেবভিক্ষা’ শিরোনামে যে কাতর আবেদন রেখেছিলেন, সে আবেদনের, সে ভাষার, মর্যাদা যদি আমরা দিতে পারতাম, বিশেষ করে সাহিত্যিকগণ যদি তাদের গুটি কেটে বেরিয়ে এসে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করতেন, তাহলে অবক্ষয়ের রাশ কিছুটা হলেও টেনে ধরা যেত।   

।। দেবভিক্ষা ।।

‘‘ওগো ভিক্ষা দাও!—

       ঝাঁঝাল ঝঞ্ঝার পিশাচী জৃম্ভন শুরু হয়েছে,

বাতুল ঘুর্ণি বেভুল স্বার্থে

       কলঙ্ক কুটিল ব্যবচ্ছেদ

              সৃষ্টি করতে আরম্ভ করে দিয়েছে,

প্রেত-কবন্ধ-কলুষ

       কৃষ্টিকে বেতাল আক্রমণে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে,

অবদলিত কৃষ্টি অজচ্ছল অশ্রুপাতে

       ভিক্ষুকের মতো তাঁরই সন্তানের দ্বারে

              নিরর্থক রোদনে রুদ্যমান,

অলক্ষ্মী-অবশ প্রবৃত্তি-শাসিত বেদস্মৃতি—

       ঐ দেখ—মর্মান্তিকভাবে নিষ্পেষিত,

ত্রস্ত দোধুক্ষিত দেবতা আজ নতজানু—তোমাদেরই দ্বারে

       তোমাদেরই প্রাণের জন্য তোমাদেরই প্রাণভিক্ষায়

       তোমাদেরই সত্তার সম্বর্দ্ধনার জন্য

              ব্যাকুল হয়ে ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়াচ্ছেন ;

কে আছ এমন দরদী আর্য্য-আত্মজ সন্তান !—

       তাঁকে মানুষ ভিক্ষা দেবে, তাঁকে অর্থ ভিক্ষা দেবে—-

সব হৃদয়ের সবটুকু উত্সর্গ করে

       তোমাদেরই জন্য

সেই দেবোজ্জল প্রচেষ্টাকে সার্থক করে তুলতে ?

যদি থাক কেউ

       ওগো ধী-ধুরন্ধর উত্সর্গপ্রাণ

              নিরাশী নির্ম্মম !

এস,—উত্সর্গ কর—আত্মাহুতি দাও—     

       জীবন নিঙড়ানো যা-কিছু সঙ্গতি

              তাঁকে দিয়ে সার্থক হয়ে ওঠ,

       নিজেকে বাঁচাও, মানুষকে বাঁচাও, কৃষ্টিকে বাঁচাও ;

আর, বাঁচাও দুর্দ্দশাদলিত মহা-ঐশ্বর্য্যশালিনী

       আর্য্যস্তন্যদায়িনী, পরম-পবিত্রা

              ভিখারিণী মাতা ভারতবর্ষকে,

ধন্য হও, নন্দিত হও,

       ঈশ্বরের অজচ্ছল আশীর্ব্বাদকে

              মাথা পেতে লও,

শান্ত হও, শান্তি দাও,

       অস্তি ও অভ্যুত্থানকে

              অনন্তের পথে অবাধ করে রাখ ;

                           স্বস্তি! স্বস্তি! স্বস্তি!

                           * * * *

এবার আমি  সাহিত্যের উৎস বিষয়ে বলা শ্রীশ্রীঠাকুরের কিছু রচনার উপর আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী পরমপিতা এক থেকে বহুতে পরিণত হবার প্রাক্কালে যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনাহত-নাদ উৎপন্ন হয়েছিল, সেই আদিধ্বনিস্পন্দিত  শব্দ বা ধ্বনি বা পরাবাক্ ওঁ সব সৃষ্টির আদি উত্স। ‘ব্যাপ্ত প্রাক, প্রথম বাক্।’  পুণ্যপুঁথিতে বর্ণিত শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাষায় ‘‘এক বিরাট ধ্বনি সোঽহং পুরুষ ভেদ করে সৃষ্টি করতে চলে এল—সেই ওম্।’’

আবার অনুশ্রুতি গ্রন্থে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন—

‘‘স্পন্দন়টার সংবেদনা

       যেমনতর যেথায় হয়,

শব্দটাও তো মূর্তি নিয়ে

       বিশেষ হয়ে তাতেই রয়।’’ 

এই নিয়মনা বা বিধির মধ্য দিয়েই সৃষ্টি হয়েছে সব ভাষার। শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাষায়— ‘‘ভাষা তার/পরিস্থিতি ও পরিবেশ অনুগ/ব্যক্তির ভাব-সন্দীপনী ব্যক্ত বিবর্তন/ছাড়া আর কিছুই নয়কো।’’ (শিক্ষা-বিধায়না, ১১৮)

এই বিবর্তন পরিলক্ষিত হয় রামায়ণ রচনার প্রেক্ষাপটে।

যেমন, রাম-নামের নাদ-সাধন করে রত্নাকর দস্যু মেধানাড়ীকে জাগ্রত করে হয়েছিলেন বাল্মীকি।  একদা তমসা নদী থেকে স্নান করে ফিরছিলেন। এক তরুশাখে ক্রৌঞ্চ-জুটি পরস্পর খেলছিল। এক ব্যাধ পুরুষ পাখিটিকে তীর মেরে হত্যা করলে স্ত্রী পাখিটি করুণ বিলাপ করতে থাকে। বাল্মীকি বিচলিত হয়ে ‘কোনদিন প্রতিষ্ঠা পাবে না’ বলে ব্যাধকে অভিসম্পাত করেন। সেই অভিশাপ বাণী স্বতঃস্ফূর্ত শ্লোকবদ্ধ হয়ে নির্গত হয়েছিল :—সৃষ্টি করেছিলেন দেব-ভাষার আদি শ্লোক— ‘‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতী সমাঃ/যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকম্ অবধী কামমোহিতম্।’’   অতএব, বলা চলে, নাদরূপী বা শব্দরূপী ব্রহ্ম থেকেই ভাষার সৃষ্টি।

সেই ভাষার সমন্বয়ের রচনা যখন সত্তাপোষণী রূপে জগতের হিতসাধনে ব্রতী হয়, তখনই সৃষ্টি হয় সাহিত্যের। শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর শ্রীমুখ   নিঃসৃত ভাষায় চলার সাথী গ্রন্থে বলছেন—‘‘যার আলোচনায় মানুষ হিতে অধিষ্ঠিত বা উন্নীত হতে পারে, তাই যে সাহিত্য।’’  শিক্ষা-বিধায়না গ্রন্থের ২৪৫ সংখ্যক বাণীতে বলছেন,  ‘‘ঈশ্বরই সুসঙ্গত, সর্ববিভান্বিত/ সুসমাবিষ্ট, প্রাজ্ঞ জীবন-সাহিত্য,/ তাই তিনি রসো বৈ সঃ।’’

 তাইতো, যুগের প্রয়োজনে, ঈশ্বর, অবতার-বরিষ্ঠরূপে নরবপু ধারণ করেন। হিতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে সৃষ্ট হয় নব-নব সাহিত্য।  বেদ-বেদান্ত, রামায়ণ, গীতা, ত্রিপিটক, বাইবেল, কোর-আন্, চৈতন্য-ভাগবত, চৈতন্য চরিতামৃত, রামকৃষ্ণ কথামৃত ইত্যাদি নামে সংকলিত এবং লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাহিত্যিকদের যে-সব জীবন-সাহিত্যের সাথে আমরা পরিচিত হয়েছি, সেই সব সাহিত্যের প্রকৃত মূল্যায়ন করে অনেক ভুল শুধরে দিয়েছেন, জীবনীয় উদ্ধৃতিগুলো নানাভাবে জনমানসে তুলে ধরে জীবন-সাহিত্যের রূপ দান করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর। যার মাধ্যমে অবতারবরিষ্ঠ পরম্পরাকে, ঋষিবাদকে, জীবনবাদী সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।  তাঁর শ্রীহস্ত লিখিত রচনা, স্মৃতি-বাণী, শ্রুতি বাণীসমূহ এক অভিনব বর্ণ-বিন্যাসে, শব্দ-বিন্যাসে, ব্যাকরণ-বিন্যাসে, পংক্তি-বিন্যাসে, ভাব-বিন্যাসে সমৃদ্ধ হয়ে সৃষ্টি করেছে এক সুসমাবিষ্ট, প্রাজ্ঞ জীবন-সাহিত্যের সম্ভার। তাঁর বাণী সাহিত্যে আমরা অনেক নবীন মৌলিক ভাষার সন্ধান পেয়েছি এবং আরও পেতে পারতাম যদি বর্তমানের ন্যায় দর্শ-শ্রুতি বৈদ্যুতিন মাধ্যমের সাহায্য পাওয়া যেত। যার অভাবে মহাসমাধির ভাববাণীর সময় প্রোক্ত অনেক বিদেশী ভাষাকে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তথাপি তাঁর সৃষ্ট বাণীসাহিত্যে সংস্কৃত, বাংলা, ইংরেজী ভাষার যে অনবদ্য প্রয়োগের সাথে আমরা পরিচিত হতে পেরেছি, তা’ সমৃদ্ধ করেছে মানবজীবনের একান্ত প্রয়োজনীয় প্রতিটি আঙ্গিককে। উপাসনা, সাধনা, লোক-ব্যবহার, দর্শন, কৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, বিজ্ঞান, পরিবেশ-পরিচর্যা, বাণিজ্য, সমাজ, সমাজ-সংস্কার, দশবিধ-সংস্কার, বিবাহ, প্রজনন, রাষ্ট্র, পরমরাষ্ট্রিক সমবায়, ইত্যাদি সব কিছুই স্থান পেয়েছে তাঁর রচনায়।  ওইসব বিধিবদ্ধ অনুশাসনগুলো  জীবনকে জীবনীয়ভাবে উপভোগ করার রসদে পরিপূর্ণ। যা আমাদের জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক সকল অভাবকে তাড়িয়ে দেবার ব্যবস্থা করে জীবনকে পূর্ণতার আস্বাদে ভরিয়ে দিতে এক নিশ্চিত নির্ভরশীল দিগদর্শন। সেই পূর্ণতার আস্বাদের স্বাদের নেশা ধরাতে,— তাঁর সুললিত ভাষার বাণী-সাহিত্যের সাথে জগদ্বাসীকে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য শত বাধা-বিপত্তি, অভাব-অনটনকে অতিক্রম করে শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর ভক্তদের কাছ থেকে কাগজ ভিক্ষা করেছেন, টাকা ভিক্ষা করেছেন পত্র-পত্রিকা মাধ্যমে এবং পুস্তকাকারে তাঁর বাণীগুলোকে সুলভ মূল্যে পৌঁছে দেবার মানসে। শুধু তাই নয়, তিনি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের জন্যও জনে জনে বলেছিলেন। অনেক আত্মোৎসর্গকৃত ভক্ত ও প্রতিষ্ঠান পত্র-পত্রিকা, সাময়িকী, পুস্তক-পুস্তিকা তাঁর বলা কথাগুলো অবিকৃতভাবে প্রকাশ করে  তাঁর চাহিদা পূরণ করেছেন এবং এখনো করে চলেছেন। তাঁদের উদ্দেশ্যে প্রণাম নিবেদন করেই বলতে হয়, তাঁর সব চাহিদা পূরণের লক্ষ্যমাত্রাকে এখনো ছুঁতে পারিনি আমরা। গড়ে তুলতে পারিনি জীবনবাদী সত্তাপিয়াসী পাঠকসমাজ। একথা ঠিক যে, সাধারণ মানুষেরা অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে, প্রকৃত জীবনবাদী সাহিত্যের আস্বাদ নিতে, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দেবভাষার দেবসাহিত্য চর্চায় একদিন না একদিন এগিয়ে আসবেই। সেই শুভাগমনকে ত্বরান্বিত করতে, তাঁর বাণী-সাহিত্যকে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক, বার্ষিক পত্র-পত্রিকা এবং বৈদ্যুতিন যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে উপঢৌকন রূপে সাজিয়ে তো রাখতে হবে, না কি ?        ক্ষুদ্র আত্মস্বার্থ প্রতিষ্ঠাকে উপেক্ষা করে যদি দীক্ষাকালীন প্রতিজ্ঞা পূরণের শপথ স্মরণ করে ইষ্টস্বার্থ প্রতিষ্ঠায় আমাদের ইচ্ছাটাকে বিনিয়োগ করতে পারি, তবে—হবে, হবে, হবেই জয়। হাসি ফুটবে তাঁর মুখে। অন্তর্যামী পরমপিতার পরম করুণার প্রস্রবনের অমৃত ধারায় স্নাত হয়ে সবাই ভাল থাকবেন, সবাইকে ভাল রাখবেন।

                          * * * *

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র রচিত ‘বিধি-বিন্যাস’  গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত এক অনবদ্য  স্তবগাঁথা দিয়ে  যবনিকা টানলাম।

“হে পূণ্য! পরাক্রান্ত! পরাত্‍পর !
প্রচণ্ড মার্ত্তণ্ডবরেণ্য !
এক! অদ্বিতীয় !
তোমারই বিনিষ্কাষিত কিরণবীচি
তাপন প্রতিক্রিয়ায়
অযুত জ্যোতিষ্কের সৃষ্টি করেছে;
বৈধী মিতিচলনে চলেছে তা’রা
তোমারই প্রাণদ গতিপথে
বোধি-বিজৃম্ভী বিসৃষ্ট পরাক্রমে
সৃজন-সম্বেগে—
দৃপ্ত জীবনের অদম্য আবেগে,—
নভোমণ্ডলে সজ্জিত স্থালীর স্থল-সর্জ্জনে
দ্যৌঃ ও পৃথিবীর জীবন-দীপালি
সজ্জিত করে নাদ নিক্কণে—
অভ্যুদয়ী, আরুদ্র পরিক্রমায়;—
তোমাতেই আমার অযুত নমস্কার!”

                              —বন্দে পুরুষোত্তমম্ ! জয়গুরু ! প্রণাম !

——————————————————————————-

তথ্যঋণঃ

১.  ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনী  গ্রন্থ।

২. সৎসঙ্গ পাব্লিশিং প্রকাশিত বাণীগ্রন্থ। _� @_�

স্বাধীনতা

।। স্বাধীনতা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।।

                                    নিবেদনে—তপন দাস

শ্রীশ্রীঠাকুর–নিজেরা স্বাধীন না হ’লে কি স্বাধীনতা আসে? স্বাধীনতা দিলেও তো আসে না। Common ideal-এ (এক আদর্শে) integrated (সংহত) হ’য়ে প্রত্যেকের জন্য প্রত্যেকে হ’লে স্বাধীনতা আপনি আসে। আমি independence (অনধীনতা) বুঝি না, freedom বা liberty (স্বাধীনতা) বুঝি। জন্ম মানে dependence (অধীনতা), জন্ম নিতেই মা-বাপ লাগে, independence (অনধীনতা) কোথায়? স্বাধীনতার ভিতর আছে  love-service (প্রীতি-প্রসূত সেবা), কান ধ’রে করা নয়, প্রাণ ধ’রে করা। Freedom-এর ধাতুগত অর্থ শুনেছি–প্রিয়ের বাড়ী, আর liberty মানে শুনেছি–বৃদ্ধি, বাঁচাবাড়া। | পরস্পর পরস্পরের বাঁচাবাড়ার সহায় যখন হয়–আদর্শ-স্বার্থে স্বার্থান্বিত হ’য়ে,– তখনই আসে সত্যিকার স্বাধীনতা। যেমন আমরা দেখতে পাই আমাদের শরীরবিধানে। কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই বেঁচে থাকতে পারে না, যদি পরস্পর পরস্পরের বাঁচা-বাড়ার সহায়ক না হয়। বাঙলা যদি বিহারের জন্য না হয়, প্রত্যেক প্রদেশ যদি প্রত্যেক প্রদেশের জন্য না হয়, প্রত্যেক দল যদি প্রত্যেক দলের জন্য না হয়, প্রত্যেক সম্প্রদায় যদি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য না হয়, প্রত্যেক ব্যক্তি যদি প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য না হয়, তবে স্বাধীনতা আসে না।

(সূত্রঃ আলোচনা প্রসঙ্গে, সপ্তম খণ্ড/পৃষ্ঠা-৬৭, ২৯শে মাঘ, মঙ্গলবার, ১৩৫২, ইং ১২।০২।১৯৪৬)

।। আমি স্বাধীন না স্বেচ্ছাচারী ? ।।

                               নিবেদনে—তপন দাস

স্বাধীনতা মানে সু-এর অধীনতা, সত্তার অধীনতা। স্বাধীন যে, সে কখনোই স্বেচ্ছাচারী হয়ে কোন সত্তাবিধ্বংসী অসত্‍ কাজ তো করবেই না বরং সে অসত্‍ নিরোধে তত্‍পর হবে । মানুষ যখন প্রবৃত্তির অধীনতা থেকে মুক্তি পেতে পরমপিতাকে আশ্রয় করে বিবেককে অবলম্বন করে চলতে শেখে তখনই সে প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করে । তখন সে অন্যায়, অধর্ম, দুর্নীতি, ভ্রষ্টাচারকে আশ্রয় করে “সত্যমেব জয়তে”র সীলমোহরের দখল নিতে চাইবে না। বরং অসত্‍ বলে ওগুলোকে ঘৃনা করবে । মেয়েদের মাতৃভাবে দেখবে। কামনার বস্তু রূপে নয়। ঘরে বাইরের কোন অসতের সাথে আপোষ করবে না।

পরিপূর্ণ স্বাধীন পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, freedom মানে প্রিয়ের বাড়ি। প্রিয়ের বাড়ীর বাসিন্দা কখনো কি অপ্রিয় কিছু করতে পারে ?

“এমন আমি কবে হব।

আমায় দেখে বলবে লোকে

আছে জীবনবল্লভ।”

                    ——— exposedshow>প্রিয়ের বাড়ী, আর liberty মানে শুনেছি–

INDEDENDENCE

।। স্বাধীনতা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।
                                         নিবেদনে—তপন দাস

কীর্তন, পল্লী সংগঠন, তপোবন বিদ্যালয়, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র ইত্যাদি কর্মসংগঠনের মাধ্যমে আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের নমুনার কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করে চলেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর হিমায়েতপুরে । সেই সময় কিছু স্বাধীনতাকামী বিপ্লবী ঠাকুরকে ওইসব ছেড়ে তাদের সাথে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেবার আহ্বান জানালে ঠাকুর বলেন, ভারত তো পরাধীন ছিল না। আর্য্যযুগ থেকে শুরু করে দীর্ঘদিনের স্বাধীনতা আমাদের হারাতে হলো কেন ?
বিপ্লবী : সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্তে ।
ঠাকুর : সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্ত যদি থেকেই থাকে সে চক্রান্তের ফাঁদে আমরা পা দিলাম কেন ?
বিপ্লবী : আমাদের জাতীয় চরিত্রের দুর্বলতার জন্য ।
ঠাকুর : তাহলে দেখুন আপনিই স্বীকার করলেন যে পরাধীনতার মূল কারণ চরিত্রগত দুর্বলতা । আমি তো দাদা সেই কাজটাই করছি, মানুষ যাতে লোভ, কাম, ক্রোধ এইসব রিপুর,বা প্রবৃত্তির অধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে সু বা সত্তার অধীন হতে পারে। তাই আপনাদের উচিত আমার সাথে যোগ দেওয়া।   
তাই তো, শ্রীশ্রীঠাকুর সর্বপ্রথমে আমাদের দুর্বলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সু অর্থাৎ সত্তার অধীন হতে উপদেশ দিলেন যাতে আমরা আর কোন চক্রান্তের শিকার না হই। 
শ্রীশ্রীঠাকুরের মতে, FREEDOM মানে প্রিয়ের বাড়ী । inborn we are inter-dependent not independent. জন্ম নিতেও বাবা মা লাগে অধীনতা মানতেই হয়। সু পিতামাতার অধীনেই সুসন্তান অর্থাৎ স্বাধীন সন্তান বা প্রকৃষ্ট জাতক বা প্রজা জন্মায়।
এই হলো প্রকৃত স্বাধীনতার তাৎপর্য।

——–

MONER MAANUSH

।। মনের মানুষ কোথায় পাই।।

                                                নিবেদনে—তপন দাস

‘এমন একটা মানুষ খুঁজে পেলাম না, যার মন আছে………’ গানের এই কলিটা অজান্তে কত মানুষের মন ছুঁয়ে গেছে বলেই না বাংলা গানের জগতের একটি জনপ্রিয় গান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবুও কেন জানি গানটির স্রষ্টা একটা মনওয়ালা মানুষ খুঁজে পায়নি বলে সুরে সুরে আক্ষেপ করেছে।

      মন আছে বলেই তো মানুষ। মন নেই, তা’ কি করে হয় !  পশুদের  তো আর মন হয় না। তবুও তো  কত কুকুর-বিড়াল মানুষের মনের মণিকোঠায় আসন পেতে নেয়। যে মানুষ, আর একটা মানুষের মন বুঝে তাকে প্রিয়জনের আসনে বসাতে পারে না, সেই মানুষটাই হয়তো একটা কুকুরকে কোলে করে ঘুরে বেড়ায়, সাথে নিয়ে ঘুমোয়, তাই না ! আসল  ব্যাপারটা বোধহয় তা’ নয়।  আমি যখন সবার মন জয় করে চলার চেষ্টা করছি, তখন আমার মনের মণিকোঠা যারা ছুঁতে চাইছে না, বা  আমার মনের মণিকোঠাকে ছুঁতে পারছে না, এমনটা যখন হয় তখনই ‘একটা মনের মানুষ পেলাম না’ বলে আক্ষেপ হতেই পারে, যেমনটা হয়েছিল মানুষ-শ্রেষ্ঠ পরম প্রেমময় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের। কত গুণী-জ্ঞানী-বিজ্ঞানী যাঁর আদর্শ মাথায় নিয়ে চলেছে, সেই তিনিও আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘একটা মানুষ পেলাম না।’

স্বভাবতঃই একটা প্রশ্ন জাগে—তিনি তাহলে কেমন মানুষ চেয়েছেন, যে মানুষেরা তাঁর নিদেশ মেনে ‘ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যে’ পৌঁছে তাঁর ঈপ্সিত ‘পরমরাষ্ট্রিক সমবায়’-এর স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি !

নিত্য হতে লীলার আগম-নিগমের চরম ভাবের প্রকাশের মাধ্যমে তিনি  তাঁর চাওয়াটাকে  সংক্ষেপে ব্যক্ত করে বললেন—‘‘আমি চাই শুদ্ধাত্মা।’’

তিনি আমাদের কাছে  শুদ্ধাত্মা-সম্পন্ন মানুষ চেয়েছিলেন। যে মানুষগুলো সদদীক্ষা গ্রহণ করে পরমপিতার দেওয়া শিক্ষায় শিক্ষিত হবে, পরমপিতার দেওয়া বিবাহনীতি পালন করে এবং করিয়ে ঘরে ঘরে শুদ্ধাত্মার আগমনের পথ সুগম করবে, পরমপিতার দেওয়া কৃষির বাস্তবায়ন করে মানুষের খাদ্যের সুরক্ষা দেবে। পরমপিতার দেওয়া শিল্পনীতি বাস্তবায়িত করে বংশানুক্রমিক বৃত্তির পোষণের মাধ্যমে মানুষের দারিদ্র্যব্যাধী দূর করবে।  মানব-সভ্যতার সব সমস্যা সমাধানের রাজপথ স্বরূপ পঞ্চবর্হি, সপ্তার্চ্চির আদর্শ মেনে চলার শপথ পালন করবে।…………..

    নাহ্ ! এরপর নিজেকে ঠাকুরের ঈপ্সিত মানুষ বলে আর ভাবতে পারি না। তথাপি জন্ম-জন্মান্তরের প্রারব্ধ কাটাতে, অর্থ-মান-যশ-এর আশা ত্যাগ করে তাঁর আদর্শ মেনে শুদ্ধ-বুদ্ধ-পবিত্র হওয়ার চেষ্টা করতে তো কোন বাঁধা নেই। তবে পথ খুব বন্ধুর, মসৃণ নয়। …….তাঁর  বলা অনুযায়ী, তুমি বিনিময়ে হলাহল পাবে জেনেই সবাইকে অমৃত বিতরণ করতে হবে, আর এটাই তোমার সাধনা। তোমাকে কেউ যদি আগুনে পুড়িয়েও মারতে চায়  তবুও  তুমি তোমার ইষ্টের প্রতি নিষ্ঠায় অটুট থাকবে।

কি আর করা যাবে বলুন, তিনিই তো পরমপিতা, শত্রু, মিত্র,  তিনিই তো সব হয়েছেন, তিনিই সাপ হয়ে বিষ দেন, তিনিই আবার বিষ তুলে নেন। তাই নিজের প্রতি নিজের ‘অরাতি বুদ্ধি’ দহন করার প্রার্থনা জানিয়ে যেতেই হবে। কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা যাবে না। তাই বলে অসৎ নিরোধী তৎপর হবো না, তা’ তো হতে পারে না। সৎকে টিঁকিয়ে রাখার স্বার্থে অসৎ-এর নিকেষ করতেই হবে। গ্যাংগ্রীনকে বাড়তে দেওয়া যাবে না, এ্যাম্পুট বা অঙ্গচ্ছেদ করতেই হবে দেহটাকে বাঁচাবার স্বার্থে। ‘আমরা-ওরা’র বিভাজনের গণ্ডী টেনে নিজেকে ছোট না করে, কৌশলে সমাজ থেকে  অসৎ-নামের গ্যাংগ্রীন কেটে বাদ দিতে হবে বৃহত্তর স্বার্থে। ধারণ-পালন-সম্বেগসিদ্ধ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হলে এ ছাড়া কোন উপায় নাই।

না, না, যুগ-ধর্মের ‘ছোট আমি’-র স্বার্থপূরণ-সর্বস্ব আদর্শ—কারটা কিভাবে হাতাবো, যেন-তেন-প্রকারেণ অন্যের পকেটের টাকা, আমার পকেটে আনবো, ‘ফ্যালো কড়ি মাখো তেল, তুমি কি আমার পর !’….. নিজের নিজের আখের গোছানোর ‘গিভ এ্যাণ্ড টেক্’ পলিসি নিয়ে চললে কিন্তু হবে না। কালের কবল থেকে বাঁচতে হলে মানতে হবে কালাধিশের ছোট্ট একটি নিদেশ, ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম বলে জানিস্ তাকে।’

জয়গুরু ! সবাই আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম নেবেন।

MARRIAGE GUIDELINE

MARRIAGE GUIDELINE

By Shree Shree Thakur Anukukulchandra

Bottom of Form

 

VARNA -ESSENTIAL TO THE RACE

(The Message/vol-vii/chapter-varnashram

Sri Sri Thakur Anukulchandra)

“Varnas with their Vargas

according to

hypergamous marital cleaving,

give rise to collaborating classes

of cultural varieties

through which

culture with all its traits

manifests itself

in different gradiations

amongest different groups

of people-

enhancing their being

and becoming

with a graduated

educative uphill move-

adjusting their habits,

behaviour and tradition,

social and domestic,

and makes them achieve

development and efficiency

in a systematic progressive manner,-

cementing existence

with all its attributes

through love and service

for the Ideal;

hence, they are essential

for the perpetuation

of the race.”

 

MARRIAGE AND EUGENICS GUIDELINE

     by Shree Shree Thakur Anukulchandra

                BE WEDDED FIRST TO THE LORD

First be wedded

       to Love, the Lord

                 then marry if needed

and serve Him unrepellingly

       being weded to each other—

               thus be happy in sufferance.

 

            MARRY IN EQUITABLE CLAN            

Marry in equitable clan

               with lovely embrace

      binding with the thread of love

                            with unbreakable mind ;

breathe

       with every solemn love

                and worldly service

                      to each other,

        thus let the glorifying being

                come out of your family,

                      and let thy family

                             be famed with character,

                observance of constituents

                      of life and growth,

and every healthy

              prolonged existence

                    with effulging piety ;

thus try to make

      thy family happy,

              imparting this

                    to others too.                 

 

           WIFE AND HUSBAND

Wife is she

       who never wipes out

             her adherence 

                      to the husband ;

     husband is he

             who through his love

                   to Lord, the Lead,

does not separate himself

      from her existential interest

              in every suffering

                    and happiness.

 

            SELECT BRIDE JUDICIOUSLY

Male child

      and female child

               are conditioned by

                      father’s sperm

                               and mother’s  ovum ;

hence, marriage

      between similar clans

              from which

      trails of intelligence,

             body-building and energy

                        come out

                              is always preferable ;

test thy

      prospective bride

              as to whether

                    there is any

                            deficiency in

              characteristics

              that makes her

                   incompatible with you ;

      select judiciously

           and have propitious progress

                 for your existential range. 

 

MOTHERS AND NURTURES OF HUMANITY

 

“Do never toss the females,

            rather be regardful, modest

                 and serviceable to them,–

because they are the

       mothers and nurturers

            of humanity,–

       caress and solace in sufferings,

            the keen conscientious good

                                   of the people.’’

           (The Message, Vol. VII by Shree Shree Thakur Anukulchandra)

MARITAL RELATION–SOURCE OF

DISTINGUISHED PROGENY

Marital relation

with proper distinctiveness

which fulfils each other

with every happy coupling–

is a source of

distinguished progeny.

                                             (The Message, Vol. VII by Shree Shree Thakur Anukulchandra)

 

CHASTITY DWELLS THERE !

When in a female 

all the passions converge

in welling up

the life and lift of her beloved,

ceases all her hankering

for self-enjoyment

but for Love :

hope relieves despair,

labour relieves rest,

joy relieves suffering,

and life relieves death

in the innermost recesses,

peeping wistfully towards the lover,

making him unconsciously exuberant

in life, love and service,

with a beautiful serviceable move–

Chastity dwells there !

(The Message, Vol. I by Shree Shree Thakur Anukulchandra)

BIOLOGICAL INVESTMENT

                    জৈবিক তাগিদের সফল বিনিয়োগ

                                                          —তপন দাস                                                                          বর্তমান সভ্যতায় প্রতিটি সচেতন মানুষই, আর কিছু না হোক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে হুঁশিয়ার। লোকসান যাতে না হয় সে বিষয়ে সদা সতর্ক থাকেন। বাজার থেকে আলু, বেগুন, পটল, মুলো কিনতে গেলেও লাভালাভ বিবেচনা করেন। ঠকতে চান না। বিশেষ জ্ঞানকে কাজে লাগান। অথচ সেই মানুষেরাই অন্তঃস্থিত দৈবাসুর (প্রবৃত্তি এবং সত্তা) প্রকৃতিকে সঠিক বিনিয়োগে ম্যানেজ করতে ব্যর্থ হয়।

       আমাদের জীবধর্মের এক আবশ্যিক জৈবিক তাগিদ হলো আহার বা খাদ্য। যদিও ব্যাপক অর্থে আহার মানে আহরণ। যারমধ্যে সবকিছুই আছে। খাওয়া-দাওয়া, শোয়া-বসা, চলাফেরা, কথাবার্তা, কাজকর্ম, তথাকথিত প্রেম-ভালবাসা, বিয়ে করা, বাবা-মা হওয়া ইত্যাদি। আমাদের উপনিষদের ঋষিরা ওইসবগুলোকে একত্রিত করে ‘আহার’ নামকরণ করে বললেন, ‘‘আহারশুদ্ধৌ সত্তাশুদ্ধিঃ,সত্তাশুদ্ধৌ ধ্রুবাস্মৃতিঃ …… ’’—অর্থাৎ জীবন ধারণের নিমিত্ত আহরণগুলো শুদ্ধ হলে সত্তা শুদ্ধি হয়, সত্তা শুদ্ধি হলে স্মৃতি নিশ্চল হয়। স্মৃতি নিশ্চল হলে জাতিস্মর হওয়া যায়। জীবনভূমির এপার-ওপার নিরীক্ষণ করা যায়।  শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র যা’কে স্মৃতিবাহীচেতনা বলেছেন। এবং ‘নিয়তং স্মৃতিচিদযুতে’ মন্ত্রে অভিষিক্ত করেছেন স্বস্ত্যয়ণী ব্রতধারীদের।

       যাইহোক, সর্বাঙ্গীন না হলেও খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ বিষয়ে দীক্ষিত-অদীক্ষিত সব বুদ্ধিমানেরা বিশেষ সচেতন। অরক্ষিত জলপান করে না, সুরক্ষিত, পরিশ্রুত, বোতল বন্দী শুদ্ধ জল পান করে। অরক্ষিত কোর্মা, কোপ্তা, পোলাও, বিরিয়ানীর মতো যুগধর্ম স্বীকৃত দামী দামী খাবার ফেলে   সুরক্ষিত ডাল-ভাতেই সন্তুষ্ট থাকে।  উল্টোপাল্টা খেয়ে শরীর খারাপ করার রিস্ক নিতে চায় না। একটা সার্বজনীন মতবাদ সৃষ্টি হয়েছে যে, অরক্ষিত নয়, সুরক্ষিত জিনিষ দিয়েই জৈবিক তাগিদ পূরণ করতে হবে নিজের সত্তাকে দূষণ মুক্ত রাখতে। তাইতো বর্তমানে কারো ছোঁয়া স্পর্শদোষ বিকীরিত, ব্লেড, সিরিঞ্জ, তোয়ালে, রুমাল, গামছা ইত্যাদি শেয়ার করে ব্যবহার করে না। স্বাস্থ্যসম্মত বিধি মেনে চলে। সেই সমাজের মেয়েরা যদি বিজ্ঞানমনস্কতার নামে, উদারতার নামে, যুগধর্মের অজুহাতে, মহান ভারতের মহান চরিত্র দুর্গা, লক্ষী, সরস্বতী, সীতা, সাবিত্রী প্রমুখ নারীদের আদর্শ ভুলে প্রকৃতি প্রদত্ত জৈবী সম্পদ স্তন্যকে সন্তানের জীবন-পিযূষ ভাণ্ডার, জনন-দ্বারকে আদর্শ জননী হবার যজ্ঞকুণ্ড হিসেবে মর্যাদা না দিয়ে,—যৌবন গরবে গরবিনী প্রবৃত্তিতাড়িত হয়ে কাম নামক জৈবিক তাড়নার কাছে নতি স্বীকার করে বসনে-ভুষণে, আচার-আচরণে নিজের নারীত্বকে দর্শকাম, স্পর্শকাম, শ্রুতকাম-এর ইন্ধন দিয়ে পুরুষের সুপ্ত কামনাকে জাগিয়ে লাম্পট্য, ব্যভিচারকে পুষ্ট করে,—পণ্যরূপে যৌবনকে প্রজ্ঞাপিত করে নিজেদের   অরক্ষিত করে কামুক পুরুষদের কাম-বিকীরণে সত্তাকে দুষ্ট করে, —তার দুর্গতির আর অন্ত থাকবে না। ওই বিনিয়োগের ফলস্বরূপ প্রভূত অনিত্য সম্পদের মালকিন হতে পারবে, ভোগের জোয়ারে ভাসতে ভাসতে দুর্ভোগকে বন্ধু করতে পারবে, কিন্তু নিত্য-জীবনে ‘রত্নগর্ভা’ ভালো মা হয়ে আদর্শ নারীর খেতাব অর্জন করতে পারবে না। উনো জমিতেই দুনো ফসল ফলে, বুনো জমিতে নয় ।

       মা হওয়ার সময় নিজসত্তার প্রতীক স্বরূপ স্বামীকেন্দ্রিক-একাগ্র হতে পারবে না। কারণ, মা হতে  একটা পুরুষই লাগে, একাধিক নয়। অথচ নিজেকে অরক্ষিত রাখার কারণে গর্ভাধান কালে  স্মৃতির ফোল্ডারে জমা থাকা  পাড়ার, রাস্তার, কলেজের, আপিসের একাধিক পছন্দের-অপছন্দের  পুরুষদের প্রোফাইল স্মৃতিতে ভীড় জমাবে এবং সেই সম্মিলিত মানসিকতার সন্তান জন্ম দেবে!

       পুরুষের ক্ষেত্রেও তাই । পুর্ব-পুরুষদের জীবনধারা ও অর্জিত দোষ-গুণে সমৃদ্ধ প্রাণপ্রবাহের ধারা বীর্য্যেকে ব্যভিচার, ধর্ষণ, স্বমেহন আর কন্ডোমের মাধ্যমে ধর্মবিরুদ্ধ কামসেবার ইন্দ্রিয়-লালসায় অপ-বিনিয়োগ করে দুষ্ট প্রবৃত্তিকে তুষ্ট করতে গি়য়ে যৌনব্যাধি, মানসিক কষ্ট, বিবেক-দংশন, কারাবাস, সামাজিক ছি! ছি! লাভ করতে পারবে, কিন্তু ভালো বাবার গৌরব অর্জন করতে পারবে না। বীজ শুদ্ধ না হলে ফসলও অশুদ্ধ হবে!

 তাই তো   শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব আমাদের সাবধান করে দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘‘চারাগাছে বেড়া দিতে হয় ।’’ বেড়া না দিলে ছাগল, গোরু, দুষ্টু ছেলেরা ওর বাঁচা এবং বৃদ্ধি পাওয়াকে ব্যাহত করবে । একটা সুন্দর ফুলের বাগান যদি অরক্ষিত থাকে, তখন ‘লোষ্ট্রবৎ  পরদ্রব্যেষু’-র নীতিবাক্য ভুলে, লোভের বশে, ফুলশিকারীর দল ফুল ছিঁড়তে চাইবেই । অতএব বেড়া এবং মালি যদি ঢিলেঢালা হয় ফুলের অমর্যাদা হবার সম্ভাবনা থেকেই যায় । আমাদের ক্ষেত্রেও তাই। অতএব, সদগুরুর আদর্শের বেড়া দিয়ে সত্তাকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।  

       আমাদের জীবনটাকে ফুলের মত সুন্দর করে গড়ে তুলতে, এবং রক্ষা করতে, এ যুগের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র দীক্ষা পরবর্তী যজন, যাজন, ইষ্টভৃতি, স্বস্ত্যয়নী, সদাচার বিধির রক্ষাকবচের বেড়ার ব্যবস্থা করলেন,— যাতে আমরা নিজের, নিজ পরিবারের, ব্যষ্টিসহ পরিবেশের দুষ্ট প্রবৃত্তিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে জীবনকে, সত্তাকে, যথাযথ পালন করে পোষণ দিতে পারি । অনিয়ন্ত্রিত, অশাসিত বা কুশাসিত, প্রবৃত্তি-পরায়ণতা থেকে জন্ম নেওয়া বর্তমানের সামাজিক ব্যাধিস্বরূপ যৌন নির্যাতন, ব্যাভিচার, হত্যা, সন্ত্রাস ইত্যাদি প্রতিরোধ করে মানুষকে সংস্কৃত করতে, রত্নাকরদের বাল্মীকি করতে এ ছাড়া ভাল কোন উপায় নেই। তাই, প্রবৃত্তির লুব্ধ হাতছানিকে উপেক্ষা করে এই সঙ্কট নিরসনে অগ্রণী হতে হবে যুগ পুরুষোত্তমের ঋদ্ধি সেনানীদের।

                                  *      *      *

       একজন পুরুষের সার্বিক উন্নতির চরম পরিণতি সফল পিতৃত্বে, একজন নারীর মাতৃত্বে । পিতৃত্ব এবং মাতৃত্ব অর্জনের নির্দিষ্ট উপাঙ্গও প্রকৃতি আমাদের দিয়েছেন, যার সফল বিনিয়োগে একজন আদর্শ পিতা, একজন আদর্শ মাতার পরিচয় বহন করে সুখ্যাত হতে পারি, আবার অসফল বিনিয়োগে কুখ্যাতও হতে পারি । 
       সভ্যতার প্রাতঃ স্মরণীয় মনীষীবৃন্দের জনক-জননীরা সকলের কাছেই বন্দিত । আবার ভ্রষ্টাচারীর, সন্ত্রাসবাদীর, ধর্ষকের পিতামাতারা সমাজের চোখে নিন্দিত । 
       শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই নয়, মনুষ্যেতর প্রাণীদের ক্ষেত্রেও ওই বিধি কঠোরভাবে প্রযোজ্য । 
       রাষ্ট্রের প্রয়োজনে একটা কুকুর, একটা ঘোড়া কিনতে গেলেও পেডিগ্রি অর্থাৎ বাবা-মায়ের বিশুদ্ধ বংশানুক্রমিকতার শংসাপত্রের সমৃদ্ধির গুরুত্ব বিচার করে কেনে এবং উপযুক্ত পরিবেশে লালন-পালন করে । এক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া জাতির নামে উদারতা দেখিয়ে রাস্তার কুকুর, টমটম চালানো ঘোড়া কেনে না, লালন-পালনও করে না। শুধু তাই নয়, একটা ভালো গোরুর বাচ্চা তৈরির জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করে উন্নত জাতের ষাঁড়ের শুক্রাণু কিনে সুপ্রজনন করার ব্যবস্থা করে সরকার, রাস্তায় ঘোরা ষাঁড়গুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে !
       কৃষিক্ষেত্রেও তাই । উন্নত ফসলের জন্য ভালো জাতের সংরক্ষিত বীজ শোধন করে, বীজ অনুযায়ী উপযুক্ত উর্বর জমিতে ‘জো’ (internal potentiality of soil) বুঝে বীজ বপন করতে পরামর্শ দেওয়া হয় । একজন আদর্শ কৃষক বাস্তব পরিচর্যার মাধ্যমে বিশুদ্ধ বীজ, বীজের উপযুক্ত জমিতে বিনিয়োগ করে উন্নত জাতের ফসল পাবার জন্য । 
       প্রাণী সম্পদ, কৃষি সম্পদ বিকাশের ক্ষেত্রে জৈবিক সম্পদের বিহিত বিনিয়োগ করে বুদ্ধিমান মানুষেরাই । অথচ সেই বুদ্ধিমান মানুষেরাই নিজেদের জৈবী সম্পদকে অপচয়ীভাবে বিনিয়োগ করে  বিশেষ জ্ঞানকে অপমান করছে ।

       অতএব, বর্তমান সভ্যতার সংকট বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে সবকিছুর মূলে রয়েছে জৈবিক তাগিদের অসফল বিনিয়োগ । উক্ত বিনিয়োগজাত সন্তানেরা সভ্যতাকে উপঢৌকনও দিচ্ছে ইন্দ্রিয়পরায়নতার ভ্রষ্টাচার । অথচ আমাদের আদর্শ ছিল– ‘আত্মানং বিদ্ধি’, নিজেকে জানো, know thyself, ‘আত্মবৎ সর্বভূতেষু, মাতৃবৎ পরদারেষু, লোষ্ট্রবৎ পরদ্রব্যেষু ।’ সকলকে নিজসত্তার প্রতীক মনে কর, মেয়েদের নিজের মায়ের প্রতিরূপ ভেবে শ্রদ্ধা কর, অন্যের জিনিসকে মাটির ঢেলার মত দ্যাখ । ‘মা গৃধ’, লোভ কর না । যে উপনিষদের বাণীর উপরে উক্ত শাশ্বত সত্যসমূহ প্রতিষ্ঠিত, গণপ্রজাতন্ত্রী স্বাধীন ভারত সেই সত্যের সারমর্ম, ‘সত্যমেব জয়তে’র আদর্শকে মাথায় নিয়ে একদিন যাত্রা শুরু করেছিল, যাকে আমরা আজও রাষ্ট্রের পবিত্র মন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে রেখেছি । অথচ ওইসব বিধিকে আড়াল করে পাশ্চাত্যের প্রবৃত্তি-পরিপোষিত শিক্ষায় প্রজাতন্ত্রী ভারতবর্ষের প্রজাদের শিক্ষিত করতে চাইছি । ফলে সন্ত্রাসবাদ, ভ্রষ্টাচার, যৌন-ব্যভিচার ক্রমবর্দ্ধমান। এর কারণ ‘সত্যমেব জয়তে’ কে বাস্তবে মূর্ত করে তোলার মত কোন ইন্দ্রিয়জয়ী সৎপুরুষের জীবন্ত আদর্শ অনুসরণ করছে না রাষ্ট্র ।

       ভারতের নিজস্ব অর্থশাস্ত্র কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে ।

‘‘সুখস্য মূলম্ ধর্মম্,

ধর্মস্য মূলম্ রাষ্ট্রম্,

রাষ্ট্রস্য মূলম্ অর্থম্,

অর্থস্য মূলম্ ইন্দ্রিয়-বিজয়ম্,

ইন্দ্রিয়-বিজয়স্য মূলম্ জ্ঞানবৃদ্ধসেবয়া,

জ্ঞানবৃদ্ধসেবয়া বিজ্ঞানম্।।“


       অর্থাৎ, সুখের মূলে ধর্ম। ধর্মের মূলে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের মূলে অর্থ । (পুরুষার্থের চতুর্বর্গ—বর্ণাশ্রম এবং চতুরাশ্রমধর্ম পালন করে পরমার্থ লাভের বিষযে বলা হয়ছে ।) ইন্দ্রিয়জয়ী না হলে পরমার্থ লাভ হয় না । ইন্দ্রিয়জয়ী হতে হলে সদগুরুর সারূপ্য লাভ করতে হবে । তাহলেই বিশেষ জ্ঞান লাভ হবে ।

       উক্ত বিধি পালন করে প্রকৃষ্ট জাতক বা প্রজা সৃষ্টির প্রবহমানতাকে রক্ষা করে চলাই ছিল আর্য ভারতের আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্য । তাই প্রজাতন্ত্র মানে, যে তন্ত্র বা system মেনে আদর্শ প্রজা নির্মাণ, পালন, পোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে রাষ্ট্রের সংহতি রক্ষায় প্রযত্নশীল থেকে পরম রাষ্ট্রিক সমবায়ের লক্ষ্যে এগিয়ে চলা যায়। ভারতের মহাকাব্য, বেদ, উপনিষদ, সংহিতা, আদর্শপুরুষ শ্রীরামচন্দ্র ও শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ ওই সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত । 

                                  *      *      *

 
       বর্তমান সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানবৃদ্ধ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সভ্যতাকে সংকট থেকে মুক্ত করতে নিদান দিলেন :

প্রজা মানেই হচ্ছে—

       প্রকৃষ্টরূপে জাত—

       সর্ব্বসম্ভাব্য উদ্বর্দ্ধনী সার্থকতায় ;

আর প্রকৃষ্ট জন্ম পেতে হলেই চাই—

       প্রজনন পরিশুদ্ধি—

সর্ব্ব-সম্ভাব্যতার বৈধানিক সংস্থিতিতে .(সম্বিতী)

“শাসন-সংস্থা যেমনই হোক,
যাতেই মাথা ঘামাও না, 
যৌন-ব্যাপার শুদ্ধ না হলে
দেশের জীবন টিঁকবে না ।” (অনুশ্রুতি)

                                  *      *      *

      শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শ অনুযায়ী, ‘‘নারী হতে জন্মে জাতি নারী সমাজ ও রাষ্ট্রের ধাত্রী ও পালয়িত্রী।’’ —

“নারী হতে জন্মে জাতি
বৃদ্ধি লভে সমষ্টিতে
নারী আনে বৃদ্ধি ধারা
নারী হতেই বাঁচাবাড়া
পুরুষেতে টানটি যেমন
মূর্তি পায় তা সন্ততিতে।” (অনুশ্রুতি)

তিনি তাঁর নারীর নীতির বিধানে কুমারী মেয়েদের উদ্দেশ্য বললেনঃ
‘‘মেয়ে আমার,

       তোমার সেবা, তোমার চলা,

        তোমার চিন্তা, তোমার বলা
              পুরুষ-জনসাধারণের ভিতর
                     যেন এমন একটা ভাবের সৃষ্টি করে—
                                  যা’তে তারা
                     অবনতমস্তকে, নতজানু হ’য়ে

                                  সসম্ভ্রমে,
                     ভক্তিগদগদ কন্ঠে—

‘মা আমার,— জননী আমার’! ব’লে
       মুগ্ধ হয়, বুদ্ধ হয়, তৃপ্ত হয়.কৃতার্থ হয়,—
              তবেই তুমি মেয়ে.
                     —তবেই তুমি সতী!’’

       তাই পরিবারের, বিশেষ করে মায়েদের এ বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে । গুরুত্ব দিতে হবে মেয়ের পবিত্রতার দিকে । যুগধর্মের প্রভাব থেকে মুক্ত করে শ্রীশ্রীঠাকুরের নারীর নীতি, নারীর পথে, দেবী-সূক্ত ইত্যাদি গ্রন্থের বিধান অনুসারে মেয়ে যা’তে বয়সে, বর্ণে, বংশে, স্বাস্থ্যে, শিক্ষায় তুলনামূলক সমবিপরীত বৈশিষ্ট্যের সমুন্নত বরণীয় পুরুষকে বরণ করে একজন আদর্শ বধূ, মনোবৃত্যানুসারিনী স্ত্রী, জায়া, পরিমাপনি মা হয়ে শুদ্ধাত্মার জন্ম দিতে পারে ।

                              *      *      *

 
       বর্তমানে লেখাপড়ার নামে ছেলেমেয়েদের সহশিক্ষা এবং সাহচর্য শ্রীশ্রীঠাকুর অনুমোদন করেন নি । এ বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট নিদেশ :
কুমারী একটু বড় হলেই
পুরুষ ছুঁতে নেই,
যথা সম্ভব এর পালনে 
উন্নয়নের খেই ।
 
ছেলেমেয়ে এক যোগেতে
করলে পড়াশোনা
পড়ার সাথে বাড়ে প্রায়ই
কামের উপাসনা।

পরের বাবা পরের দাদা
পরের মামা বন্ধু যত
এদের বাধ্যবাধকতায় 
সম্বন্ধটি যাহার যত
অনুরোধ আর উপরোধে
ব্যস্ত সারা নিশিদিন
কামুক মেয়ে তাকেই জানিস
গুপ্ত কামে করছে ক্ষীণ ।

বিয়ের আগে পড়লে মেয়ে
অন্য পুরুষে ঝোঁকের মন
স্বামীর সংসার পরিবার 
করতে নারে প্রায়ই আপন ।।
      
পুরুষ নষ্টে যায় না রে জাত                            
নারী নষ্টে জাত কুপোকাত ।
নারী হতে জন্মে জাতি
থাকলে জাত তবেই জাতি ।
             
ওইগুলো না মানালে হবেই ক্ষতি ।
 
       ওই ক্ষতি থেকে জাতিকে রক্ষা করতে আর্য্য বিবাহ-বিধি মেনে সন্তানাদির বিবাহ দিতে হবে। এই বিধিকে উপেক্ষা করে কখনোই উপযুক্ত প্রজা সৃষ্টি করা সম্ভব নয় । 
                                  *     *     *
      ।। বিবাহের ক্ষেত্রে আবশ্যিক পালনীয় ।।                

“ন মাতৃতস্তু আ পঞ্চমাৎ পুরুষাৎ পিতৃতশ্চা সপ্তমাৎ ।।”

(বিষ্ণুসংহিতা ২৪/১০)

“অসপিণ্ডা চ যা মাতুঃ অসগোত্রা চ যা পিতুঃ ।

সা প্রশস্তা দ্বিজাতীনাং দারকর্ম্মণি মৈথুনে ।।”

(মনুসংহিতা ৩/৫)

(অর্থাৎ মায়ের দিক দিয়া পঞ্চম ও পিতার দিক দিয়া সপ্তম পুরুষ পর্য্যন্ত আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ । মাতার দিক থেকে ঊর্দ্ধতন পাঁচ পুরুষ অসপিণ্ডা এবং পিতার দিক থেকে ঊর্দ্ধতন সাত পুরুষ অসগোত্রা বিচার করে কন্যাকে সবর্ণে পাত্রস্থ করতে হয়।)

       সৎ পাত্রস্থ হবার পর ভাল মা হবার আর একটা দায়িত্ব থেকে যায়।  

এ বিষয়ে মনু সংহিতায় (9/28) বলা আছে– সন্তান, ধর্মকার্য্য, শুশ্রূষা, উত্তম রতি এবং পিতৃগণের ও নিজের স্বর্গ দারাধীন, অর্থাৎ স্ত্রীর উপর নির্ভরশীল।    

       একজন আদর্শ মায়ের দায়িত্ব সম্পর্কে সৎসঙ্গের প্রাতঃ স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক পঞ্চানন সরকার মহোদয় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রকে প্রশ্ন করে যে বিজ্ঞানসম্মত সমাধান পেয়েছিলেন, সেগুলোকে আরো তথ্য সমৃদ্ধ করে ‘নারীর পথে’ নামক গ্রন্থে সন্নিবেশ করে রেখে গেছেন। সেই অমরগাঁথা থেকে কিছু উদ্ধৃতির উদাহরণ, উপহার স্বরূপ তুলে ধরছি পাঠকদের বোঝার সুবিধার জন্য।  

প্রশ্নঃ স্বামী কথার অর্থ কি?
শ্রীশ্রীঠাকুর। স্ত্রীর স্ব (self-আত্মা,existence) আছে যাহাতে, অর্থাৎ স্ত্রীর অস্তিত্ব যাহার উপর ন্যস্ত, স্ত্রী যাহাতে বাঁচিয়া আছে— সে তাহার স্বামী ।
প্রশ্নঃ স্ত্রী কথার মানে কী ?
শ্রীশ্রীঠাকুর। যে বেষ্টন করিয়া দীপ্তি পায়, সে স্ত্রী। স্ত্রী আসিয়াছে স্ত্রৈ-ধাতু (বেষ্টন, দীপ্তি) হইতে।
প্রশ্নঃ পত্নী কী?
শ্রীশ্রীঠাকুর। পালন এবং রক্ষণ-ধর্মী স্ত্রী- অর্থাৎ পালন এবং রক্ষণেই যার সার্থকতা, সে পত্নী। পা-ধাতুর মানে পালন ও রক্ষা করা ।
প্রশ্নঃ সুপ্রজননের দায়িত্ব কার- পুরুষ না নারীর?
শ্রীশ্রীঠাকুর। নারীর। নারী তার সাহচয্যে পুরুষকে যেমনতরভাবে enlightened বা উদ্বর্দ্ধন করে পুরুষের সেই মনই স্ত্রীতে গমন করে এবং সন্তানরূপে মূর্ত হয়, তাই, স্ত্রীকে জায়া বলে।
প্রশ্নঃ সু বা কু-সন্তান প্রজননের শর্ত কী?
শ্রীশ্রীঠাকুর। সুসন্তান লাভ করিতে হইলেই নারীর তাহার স্বামীর মনোবৃত্তির উৎকর্ষিণী হওয়া চাই। বৃত্তির অভিঘাতিনী যদি হয়, তবে সে যে-যে বৃত্তির অভিঘাতিনী হয়, সেই-সেই বৃত্তির অপরিপুষ্ট বৃত্তিযুক্ত সন্তানই হইতে দেখা যায়!

প্রশ্ন । সুপ্রজননের দায়িত্ব কার ?– পুরুষের না নারীর ?

শ্রীশ্রীঠাকুর । নারীর । নারী তার সাহচর্য্যে পুরুষকে যেমনতরভাবে enlightened বা উদ্বর্দ্ধন করে পুরুষের সেই মনই স্ত্রীতে গমন করে এবং সন্তানরূপে মূর্ত্ত হয়,– তাই স্ত্রীকে জায়া বলে । 
প্রশ্ন। কখনো হাত-কাটা, পা-ভাঙ্গা, দুই-মাথা প্রভৃতি monsters (বিকটাকার বিকৃত সন্তান) জন্মায়,–এর জন্য দায়ী কে?
শ্রীশ্রীঠাকুর। তাহাতেও নারী প্রধানতঃ দায়ী। কারণ, দেখা গিয়াছে—ঐরূপ পিতার ঔরসেও স্বাস্থ্যবান দীর্ঘায়ু এবং পণ্ডিতের জন্ম হইয়াছে। অবশ্য পুরুষেরও incurable (দুঃসাধ্য, দুশ্চিকিৎস্য) unenlightenable psycho-physical defect থাকতে পারে—যার জন্য স্ত্রী তাকে অমনতরভাবে যথাযোগ্য শুশ্রূষাদি দ্বারাও সুসন্তান লাভে সমর্থ হয় না। এ-রকম পুরুষকে ঋষিরা বিবাহ ব্যাপার হইতে নিষ্কৃতি দিয়াছেন—ইহাকেই প্রকৃতপক্ষে ‘নষ্ট পুরুষ’ বলে।
       শ্রীশ্রীঠাকুর । যে স্ত্রী স্বামীর দোষদর্শিনী, যার কাছে স্বামী বিদ্বেষভাজন, স্বামীকে ঘৃণা করে, তাচ্ছিল্য করে, হীন ভাবে, নানা অনুযোগ করে, নিজের দুরদৃষ্ট ভাবিয়া অনুতাপ ও আপশোষ করে,–এমনতর স্ত্রী লইয়া যে পুরুষ বাস করিতে বাধ্য হয়, তার Nervous Debility (স্নায়বিক দৌর্বল্য), Dyspepsia (অজীর্ণ), dull memory (স্মৃতিহীনতা), dull eye-sight (দৃষ্টিশক্তির খর্বতা), dull hearing (শ্রবণশক্তি রাহিত্য), complete কিম্বা partial (সম্পূর্ণ বা আংশিক) impotency বা রতিশক্তি-হীনতা প্রায়শঃই অল্পবিস্তর হইতে দেখাই যায়।  তাই, শাস্ত্রে অমনতর স্ত্রীর সহিত মিলিত হইতে বিশেষভাবে নিষেধ করা আছে এবং এই মিলনে অল্পায়ু, দুর্ভাগ্য, জড়মস্তিষ্ক, peevish (খিটখিটে), egoistic (অহং বিকারগ্রস্ত) ইত্যাদি-রকমের সন্তানের সৃষ্টি হয়। তাই, এই মিলনকে সামাজিক পাপও বলা যাইতে পারে । 

শ্রীশ্রীঠাকুর । প্রত্যেক complex–এর (গ্রন্থির) সঙ্গে full (পূর্ণ আমি) থাকে। কোন গ্রন্থি বা বৃত্তি অভিহত হইলেই তাহা paralysed (অবসন্ন) হয়, তাহাতে full (পূর্ণ আমি) সেই অভিহত বৃত্তির বা গ্রন্থির reflection–এ (পরাবর্ত্তনে) dull (মূঢ়) হইয়া যায়। অর্থাৎ, নারী যেমনতর ভাবদ্বারা পুরুষকে উদ্দীপিত করে সেই ভাবই অনুপ্রাণিত হইয়া নারীতে জন্মগ্রহণ করেন , তা হলেই সেই উদ্দীপনা যেমনতর হইবে—সন্তানের জীবন ও চরিত্র temperamentally অর্থাৎ ধাতুগতভাবে বা প্রকৃতিগতভাবে তাহাই হইবে। তবেই দেখুন, নারী পুরুষের বৃত্তিগুলি যেমনভাবে পুষ্ট করিবে বা খিন্ন করিবে, সন্তান তাহার তেমনি পুষ্ট বা অপরিপুষ্ট প্রকৃতিযুক্ত হইবে। তাই, কেহ হয়ত অঙ্ক কিছুতেই বোঝে না—কেহবা অঙ্কই শুধু বোঝে আর-কিছু বোঝে না, কেহ হয়ত হিংসাপ্রবণ, দোষদৃষ্টিপরায়ণ, নিন্দুক—কেহ হয়ত উদার, দয়াপরায়ণ, দোষদৃষ্টিহীন—স্বভাবতঃই শ্রদ্ধা বা প্রশংসা-প্রকৃতিযুক্ত। 
শ্রীশ্রীঠাকুর । পুরুষ যত বড়ই হোক, স্ত্রী যদি তাহাকে কুৎসিত ব্যবহার, ভাব, ভাষা দিয়া রঞ্জিত করে–তার সন্তান তেমনতরই হইবে । তাই, হয়তো মহাবীরের সন্তান এক মহাভীরু জন্মগ্রহণ করে–মহাজ্ঞানীর সন্তান একটা মূঢ় অপোগণ্ড জন্মায় । তেমনি, নিকৃষ্ট পুরুষের স্ত্রী যদি এমনতর হয় যাহার সাহচর্য্যে সে soothed, nourished and enlightened হয়, অর্থাৎ, বিনোদিত, পুষ্ট ও উদ্ভাসিত হয়, –তবে সে স্ত্রীর ভাগ্যে কুৎসিত পুরুষ হইতেও সুসন্তান লাভ ঘটিয়া থাকে ।                                                                (সূত্রঃ নারীর পথে)
       সাধ্বী কয়াধু, হিরণ্যকশিপুর ন্যায় কুৎসিত পুরুষকে ইষ্টকথায় উদ্দীপিত করে প্রহ্লাদের ন্যায় ভক্তকে গর্ভে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন । অপরপক্ষে, বিশ্বশ্রবা ঋষির পত্নী নিকষা তামসিক ভাবের বিকীরণ প্রভাবে রাবনের ন্যায় পুত্রের জননী হলেন ।

       শুধুমাত্র মায়েদের নয়, ভাবী বাবাদেরও সাবধান করে দিয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলে গেছেন,–“…….প্রত্যেকটা sperm (শুক্রাণু)-ই micro-cosmic form-এ (ক্ষুদ্রাকারে) এক-একটা being (জীব), ও নষ্ট করা মানে micro-cosmic form-এর (ক্ষুদ্রাকারের) একটা মানুষ মেরে ফেলা। আমাদের বোধশক্তি ও মমত্ববোধ জাগলে…… নিজের সুখের জন্য, ইন্দ্রিয়-পরিতৃপ্তির জন্য লক্ষ-লক্ষ শুক্রাণু নষ্ট ক’রে অতোগুলো soul (আত্মা)-কে মারতে পারবো না ।….. তাই প্রজননকল্পে ছাড়া অন্য কারণে শুক্রাণু যথাসম্ভব নষ্ট না করাই উচিত । তুমি-আমি সবই তো ঐ living sperm (জীবন্ত শুক্রাণু), প্রত্যেকে ওরই ওপর দাঁড়িয়ে গজিয়েছে, ওই আজ কত কথা কইছে, ঘুরছে, ফিরছে, হাতি-ঘোড়া মারছে । তুমি যে-দশা পছন্দ কর না, অনর্থক সে-দশায় ওদের ফেলবে ? ওরা যে তুমিই !”  (আ. প্র. ১/১. ১২. ১৯৪১)

       অতএব, আমাদের,–পরমপিতার সন্তানদের, অতি সন্তর্পণে, যুগধর্মের প্রলোভনের হাতছানি এড়িয়ে একমাত্র পরমপিতার আদর্শে বিনিয়োগ করতে হবে এবং করাতে হবে আমাদের জৈবিক তাগিদগুলোকে। সকল প্রকার দুর্বলতা কাটিয়ে পরিচিত হতে হবে—পিতামাতার সুসন্তান, সন্তানের আদর্শ পিতা-মাতা,  আদর্শ দম্পতি, আদর্শ গৃহস্থ, সমাজের আদর্শ বন্ধু, রাষ্ট্রের আদর্শ নাগরিক রূপে।

                                         ——          89-80699,80702-80710,80712-80718,80720,80722-80728,80731,80733-80742,80746-80774,80777-80782,80784,80787-80788,80790-80794,80797-80805,80807-80816,80818-80827,80829-80831,80834-80835,80837-80838,80840-80846,80848-80850,80852-80863,80865-80869,80871-80875,80877-80891,80893-80896,80899-80903,80906-80909,80911-80919,80922-80926,80928-80941,80943-80944,80946-80948,80950-80959,80963-80966,80969-80972,80974-80975,80977-80980,80982,80984-80988,80992,80994-80996,80998,81000-81002,81005,81007-81009,81011,81013-81016,81020-81021,81023,81025-81027,81029,81031-81037,81040-81065,81067-81070,81072,81074-81098,81100,81102-81121,81124-81129,81131-81134,81136-81143,81145,81148-81164,81166-81169,81171-81187,81189-81190,81192-81195,81197-81213,81215-81218,81220-81223,81225-81230,81232-81237,81239-81256,81258-81274,81276-81283,81285-81286,81288-81290,81292-81294,81296-81299,81302-81305,81307-81316,81318-81330,81332-81341,81344-81345,81347-81349,81351,81353-81356,81361,81364�

বশীকরণ

       —ডাঃ তপন দাস

       পান্ডবদের এটা দ্বিতীয় বারের বনবাস। এর আগে, পিতৃব্য বিদুরের পরামর্শে বারাণাবতের জতুগৃহ দাহ থেকে রক্ষা পেয়ে   আত্মরক্ষার্থে তপস্বীর ছদ্মবেশে বারোটি বছর বনবাসে কাটিয়েছেন।  তখন সাথে ছিল মাতা কুন্তী।  এবারের সাথী দ্রৌপদী। প্রতিবিন্ধ্য, সুতসোম, শ্রুতকর্ম্মা, শতানীক ও শ্রুতসেনাদি পঞ্চ-পুত্রকে সুভদ্রার দায়িত্বে রেখে দ্রৌপদীও পঞ্চ-পান্ডবদের সাথে বনগমন করেছেন। কাম্যকবন ঘুরে দ্বৈতবনে এসে তাঁরা কুটীর বেঁধেছেন।

       শ্রীকৃষ্ণ সৌভরাজ  শাল্ব দমনে ব্যস্ত ছিলেন বলে তিনি কপট পাশাখেলার সময় হস্তিনাপুরে উপস্থিত হতে পারেন নি। সৌভরাজ  শাল্বকে সমুচিত শিক্ষা দিয়ে দ্বারকা নগরীতে ফিরে পান্ডবদের বনবাসের ওই দুঃসংবাদ শুনতে পান। তাই আর বিলম্ব না করে ধৃষ্টকেতু, কৈকয়, ভোজ, অন্ধক ও পাঞ্চাল দেশের প্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে পান্ডবদের সাথে সাক্ষাত করতে ছুটে এসেছেন দ্বৈতবনে। শ্রীকৃষ্ণ পাঞ্চালীকে নানাভাবে সান্ত্বনা দিয়ে শান্ত করে পান্ডবদের  সাথে ভবিষ্যতের করণীয় কর্তব্য বিষয়ে পরামর্শ দান করে পুণরাগমনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফিরে যান দ্বারকায়।

       তারপর বেশিদিন হয়নি। শ্রীকৃষ্ণের দেওয়া উপদেশ মত ভবিষ্যত কর্মসূচী ঠিক করতে পাঁচভাই একত্রে  মার্কন্ডেয় ঋষি ও ব্রাহ্মণদের সাথে বসে শলা-পরামর্শ করছিলেন। দ্রৌপদী রয়েছেন নিজের কুটিরে। এমন সময়  কুটিরের সামনে একটি রথ এসে দাঁড়ালে পান্ডবেরা স্বাগত জানাতে কুটির থেকে বেরিয়ে দেখেন আগন্তুক আর কেউ নয়, তাদের একান্ত আপনজন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। রাণী সত্যভামাকে সাথে নিয়ে এসেছেন।   যুধিষ্ঠির শ্রীকৃষ্ণকে যথোচিত মর্যাদায় কুটিরের অভ্যন্তরে  নিয়ে বসান। দ্রৌপদী সত্যভামাকে নিয়ে যান তাঁর নিজস্ব কুটীরে।

       অনেকদিন বাদে দুই সখীর দেখা।  কুটীরে ঢুকে সত্যভামা দ্রৌপদীকে আলিঙন করে নানাবিধ সান্ত্বনা বাক্যে আশ্বস্ত করার পর একসময় হাস্য পরিহাস ছলে দ্রৌপদীকে বলে ফেলেন, বনে থাক আর যেখানেই থাক, স্ত্রী হিসেবে তুমি কিন্তু খুব সুখী, তোমার সুখ দেখে না, আমার ঈর্ষা হয়।

       —আমার সুখ দেখে তোমার ঈর্ষা হয়! ভরা রাজসভায় কুরুবৃদ্ধদের সামনে, কুরু-আচার্য্যদের সামনে দুর্যোধন, দুঃশাসন, সুতপুত্র কর্ণ আমার নারীত্বের যে অপমান  করেছে, সেই অপমানের জ্বালা নিয়ে শ্বাপদসঙ্কুল বনে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছি, এটা যদি তোমার বিচারে সুখ হয়, তাহলে একটা কাজ করলে হয়না, সখা কৃষ্ণের সাথে দ্বারকায় না  ফিরে আমার সাথে বনবাসে থেকে আমার সুখের ভাগীদার  হলেই তো হয়! দুই সখীতে মিলে সুখের জোয়ারে ভাসা যাবে!—দ্রৌপদী বলেন।

       দ্রৌপদীর কথার উত্তরে সত্যভামা বলেন, অত সুখ কি আমার ভাগ্যে আছে সখী ?

       —ভাগ্যে না থাকার কি হয়েছে ? সখা কৃষ্ণ দ্বারকায় চলে যাবেন, সখাকে বলে তোমাকে রেখে দেব, তুমি আমার সাথে থাকবে ?

       —সুখের আকরই যদি কাছে না থাকে, সুখের স্বাদ কি পাওয়া যাবে ? সত্যভামা বলেন।

—কেন আমরা কি এতই অযোগ্য যে তোমার সুখের আকর হতে পারব না?

—ওঃ, তুমি এতক্ষণে এই বুঝলে! আমার অস্তিত্ব যিনি তাঁকে বিনা সুখ ভোগ, তা কি কখনো হতে পারে ? সে তো বিনি-সুতোর মালার মতো হবে,— ক্ষণস্থায়ী।

—তোমার অস্তিত্ব তো তোমার অন্তর্যামী জীবনদেবতা, তিনি তো তোমার সাথে সাথেই থাকবেন! দ্রৌপদী বলেন।

       —দ্যাখ সখী, আমি অতশত বুঝি না বাপু, আমি জানি আমার আমিত্ব যাঁর কাছে বাঁধা পড়েছে, সে-ই আমার অন্তর্যামী, আমার জীবন-দেবতা।  তিনি হলেন তোমার সখা বৃষ্ণিসিংহ, আমার স্বামী। তিনি থাকবেন দ্বারকায়, আর আমি থাকব এখানে? তাঁকে ছেড়ে সুখ! তাঁর শ্রীমুখ দর্শন বিনে সুখ! সে তো কল্পনাও করা যায় না! বরং তোমাদের অনুরোধে তিনি যদি এখানে থাকেন, তাহলে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে রাজী আছি এই বনবাসে।  তারপর একটু থেমে বলেন, —আচ্ছা সখী পাঞ্চালি, একটা কথা বলবো, রাগ করবে না তো ?

       —স্বচ্ছন্দে বলতে পার সখী, এতটুকুও রাগ করব না। দ্রৌপদী বলেন।

       —তুমি কোন ব্রত, কোন উপবাস, কোন তপ-জপ-হোম, কোন তীর্থে স্নান, কোন মন্ত্র, কোন ওষুধ, কোন বশীকরণ বিদ্যা দিয়ে লোকপালসদৃশ, মহাবীর পাঁচ-পাঁচটা স্বামীকে বশ করে রেখেছ, যে, তাঁরা কখনো তোমার উপর রাগ করেন না, তোমাকে ছাড়া কাউকে মনে করেন না, তোমাকে ভিন্ন তাঁদের চলে না, তুমি তাঁদের কাছে এমনই অপরিহার্য্য যে এই বনবাসেও তোমাকে সাথে নিয়ে এসেছে!

       আর, আমাদের অবস্থা দ্যাখ, আমরা আটজন সপত্নী মিলে হাজারো চেষ্টা করে কেউই  একটা স্বামীকে বশে রাখতে পারি না। তাই তোমার হাত ধরে অনুরোধ করছি ভাই, একটিবার শিখিয়ে দাও না, তোমার ওই স্বামী বশীকরণ বিদ্যাগুলো। যাতে আমি আমার স্বামী কৃষ্ণকে নিরন্তর আমার বশে রাখতে পারি।

       সত্যভামার কথা শেষ হলে  যাজ্ঞসেনী কিছুক্ষণ মৌন থেকে গম্ভীরভাবে বলেন, হে সখী সত্যভামা! তুমি যে সব বিষয়ের অবতারনা করলে অসৎ স্ত্রীলোকেরাই ওইসব আচার করে থাকে। আর স্বামী যদি একবার জানতে পারে যে তার স্ত্রী তাকে ওযুধপত্র, মন্ত্রতন্ত্র দিয়ে তুকতাক করে বশ করার চেষ্টা করছে, সেই স্বামী কখনোই তার স্ত্রীকে সুনজরে দেখবে না। একটা বিষধর সর্পের সাথে বাস করছে মনে করবে। কখনোই তাকে বিশ্বাস করবে না। তার সঙ্গ পরিহার করে চলার চেষ্টা করবে। শুনতে পাই, অনেক স্ত্রীলোক ওইসব তুকতাক করে স্বামীদের বশ করতে গিয়ে স্বামীদের সারা জীবনের মতো অথর্ব, পঙ্গু করে ফেলেছে। স্বামীর বিপ্রিয়াচরণ করতে গিয়ে স্বামীর সত্তাটাকেই বশ-এর বদলে অ-বশ করে মেরে ফেলেছে। তোমার ন্যায় বুদ্ধিমতী, বিশেষতঃ কৃষ্ণের মহিষীর কাছ থেকে এমন প্রশ্ন আমি আশা করি নি। অতএব, তুমি যে বিষয়ে আমার কাছে জানতে চাইলে তার উত্তর দিতে আমি অক্ষম সখী।

       দ্রৌপদীর কথায় সত্যভামা নিজের ভুল বুঝতে পেরে বলেন, দ্যাখ, আমি না বুঝে কি বলতে কি বলে ফেলেছি মনে কিছু করোনা ভাই। আসলে স্বামীকে নিজের মত করে কাছে না পাওয়ার জ্বালায় জ্বলছি তো ভাই, তাই প্রগলভতার প্রকাশ করে ফেলেছি। ঠিক আছে আমার ঘাট হয়েছে, এবার বল তো তুমি, কোন উপায়ে পাঁচ-পাঁচটা স্বামীর কাছে তুমি অপরিহার্য হয়ে উঠেছ, যে তোমাকে না হলেই তাঁদের চলে না ?  

       সত্যভামার প্রশ্নের উত্তরে এবার পাঞ্চালী বলেন, হে সত্যভামে! শুনবে আমার বশীকরণ করার তুক্?

সত্যভামা সম্মতিসূচক ঈঙ্গিত করলে, দ্রৌপদী বলেন, আমি সকলের আগে শয্যাত্যাগ করি এবং সকলের শেষে শুতে যাই। নিজে হাতে ঘরদোর পরিষ্কার করি। ঘরদোর সাজিয়ে রাখি। পাকশালার রান্নাবান্না নিজে হাতে সামলাই।  আলস্য ত্যাগ করে সকলের সাথে সৎ ভাব বজায় রাখার চেষ্টা করি। তিরস্কার বাক্য মুখেও আনি না।   আমি কাম, ক্রোধ, অহঙ্কার পরিহার করে সবসময় মহাত্মা পান্ডবদের এবং তাঁদের অন্যান্য স্ত্রীদের পরিচর্যা করে থাকি। অভিমানশূন্য হয়ে পতিদের মনোবৃত্ত্যানুসারিণী হয়ে চলি। তাঁরা যে সমস্ত খাওয়া-দাওয়া বসন-ভূষণ আচার-আচরণ অপছন্দ করেন, আমিও সেসব সযত্নে পরিহার করে থাকি। কখনো কটুবাক প্রয়োগ করি না, দ্রুতপদসঞ্চারে মন্দছন্দে গমন বা কুৎসিতরূপে উপবেশন করি না। সতত ভর্ত্তাদের ইঙ্গিত বুঝে তাঁদের সেবা করি। কি দেব, কি গন্ধর্ব, কি কন্দর্পকান্তি অলঙ্কৃত কোন যুবা পুরুষকে মনে স্থান দিই না। অসৎ স্ত্রীলোকদের সঙ্গ পরিহার করে চলি, সত্তাধর্মী হাস্যপরিহাস ছাড়া কোন প্রবৃত্তিধর্মী হাস্যপরিহাসে কখনোই প্রবৃত্ত হই না।

        স্বামীরা নিজের নিজের কাজে বেরোবার সময় নিজে হাতে সব গুছিয়ে দিয়ে বিদায় সম্বর্দ্ধনা জানাই। এবং গৃহে প্রত্যাগমনের সময়টা জেনে নিয়ে সাদরে বরণ করে সেবা দ্বারা শ্রান্তি দূর করার জন্য প্রস্তুত থাকি। কোন দাসীকে দিয়ে করাই না। তাঁরা উপবেশন না করা পর্যন্ত আমি উপবেশন করি না। তাঁরা আহার না করা পর্যন্ত আমি আহার করি না। স্বামীরা কোন কর্তব্যকর্মে বহির্দেশে গেলে ফিরে না আসা পর্যন্ত ব্রত পালন করি। আমার মতে পতিই নারীর দেবতা ও একমাত্র গতি।

       হে সত্যভামে! আমি প্রতিদিন আমার শ্বাশুড়ী বীরপ্রসবিনী আর্য্যা কুন্তীকে নিজে হাতে স্নান-পান-ভোজন করাই, তাঁর সেবা করি। কখনো ওঁর নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক সামগ্রীর তুলনায় উৎকৃষ্ট ভোজন বা বসন-ভূষণ পরিধান করি না এবং প্রাণান্তেও শ্বাশুড়ীর নিন্দা করি না। তাঁর নিদেশ মেনে সতত চলতে চেষ্টা করি। তিনিও আমাকে পুত্রীবৎ স্নেহ করেন।

       ইন্দ্রপ্রস্থে মহারাজ যুধিষ্ঠরের নিকেতনে সহস্রাধিক ব্রাহ্মণ, গৃহমেধী স্নাতক প্রতিপালিত হতেন, আমি স্বয়ং তাঁদের সৎকার করতাম।

       মহারাজ যুধিষ্ঠিরের রাজত্বকালে যে-সমস্ত  অমাত্য, দাসদাসী, হাতী, ঘোড়া, গোরু, মেষ, মাহুত, সহিস,  সারথী, গোপালক, মেষপালক, যোদ্ধা, অসংখ্য রাজ-কর্মচারী ছিল, আমি তাদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান করতাম। নির্দিষ্ট রাজ-কর্মচারী থাকা সত্ত্বেও আমি নিজে নিত্য কোষাগারের আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখতাম। আয় বহির্ভূত ব্যয় সংকট দেখা দিলে যথাসময়ে  মহারাজকে অবগত করতাম। মহারাজ যথাযথ ব্যবস্থা নিতেন। পান্ডবগণ আমার উপর সমুদয় ভার অর্পণ করে নিশ্চিন্ত চিত্তে ধর্মানুষ্ঠানে নিরত থাকতেন, প্রজাহিতে ব্রতী থাকতেন, আর আমি আমার আহার, নিদ্রা, বিশ্রামাদি সমস্ত সুখ বিসর্জন দিয়ে, দিন ও রাতকে সমান জ্ঞান করে ইন্দ্রপ্রস্থের মর্যাদা রক্ষা করার সব দায়দায়িত্ব পালন করতাম।

       এই বনবাসকালেও কোন কষ্টকে কষ্ট মনে না করে সতত স্বামী সেবায় নিরত থাকি। স্বামীদের সাক্ষাৎ প্রার্থীদের সেবা করি। স্বামীদের সৎ সংসর্গে উৎসাহ দিই এবং অসৎ জন দেখতে পেলে সাথে সাথে স্বামীদের সাবধান করে দিই। এইসবই হলো  আমার বশীকরণের সামগ্রী।–তুমিও যদি কৃষ্ণের প্রতি অনুরূপ হৃদয়রঞ্জনী সেবার ডালি সাজাতে পার, দেখবে সখা কৃষ্ণও তোমার অনুবর্তিনী হবেন।

       দ্রৌপদীর বাক্যের প্রত্যুত্তরে সত্যভামা বলেন, তুমি একটু বলে দাও না সখী, আমি কেমন চলনে চললে কৃষ্ণ একান্ত আমার অনুবর্তিনী হবেন।

       দ্রৌপদী বলেন, সখা কৃষ্ণ বাইরে থেকে ঘরে ঢোকার পূর্বেই তুমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা করবে, নিজ হাতে সেবা করে শ্রান্তি দূর করার ব্যবস্থা করবে। কোন কাজে দাসীকে নিয়োগ করতে গেলে নিজ হাতে সেই কাজ সম্পাদন করবে। কৃষ্ণ তোমার কাছে যেসব কথা প্রকাশ করবেন তা গোপনীয় না হলেও কারো কাছে প্রকাশ করবে না। স্বামীর হিতকারী প্রণয়পাত্রদের অন্তরালে থেকে সমাদর করবে এবং অহিতাচারী দ্বেষ্যদের সঙ্গ ত্যাগ করাতে প্রযত্নবান হবে। প্রদ্যুম্ন ও শাম্ব তোমার ছেলে হলেও স্বামীর অসমক্ষে কখনো একত্রে বাস করবে না।

       সৎকুলজাত পুণ্যশীলা পতিব্রতা স্ত্রীদের সাথে সখ্যতা করবে, কুটিল, ঝগড়াটে, পেটুক, চোর, দুষ্ট ও চপল স্ত্রীদের সঙ্গ সতত পরিহার করবে। সতীন-বিদ্বেষী না হয়ে সদাসর্বদা সদাচার পরায়ণ থেকে স্বামীকে সেবা-শুশ্রূষা করার চেষ্টা করবে। এইভাবে স্বামীর মনোবৃত্ত্যানুসারিণী হয়ে উঠতে পারলে দেখবে ক্রমে ক্রমে তোমার স্বামীর কাছে তুমি অপরিহার্য্য হয়ে উঠবে। সার্থক হবে তোমার স্ত্রী-জীবন।

       ওদিকে শ্রীকৃষ্ণ মার্কন্ডেয়াদি ঋষি, ব্রাহ্মণ ও পান্ডবদের সাথে প্রয়োজনীয় আলাপ-আলোচনা সেরে প্রত্যাগমনের অনুমতি চেয়ে সকলের কাছ থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। ফিরে যাবার জন্য সত্যভামাকে আহ্বান করলে, সত্যভামা বিবিধ সান্ত্বনাবাক্যে দ্রৌপদীকে  আশ্বস্ত করে বিদায় সম্ভাষণ সেরে রথের দিকে এগিয়ে যান। শ্রীকৃষ্ণ সত্যভামাকে সাথে নিয়ে রথারুঢ় হন। শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ পেয়ে সারথী দারুক প্রগ্রহ হাতে নিয়ে তাঁর একান্ত অনুগত অশ্বদের  চলার অনুমতি দিলে রথ ছুটে চলে দ্বারকাভিমুখে—পুরুষোত্তমের লীলা-আঙিনায়।

                                         —— �F )G �G !H �H I �I Y �����s

যোগীর সাথে যোগাযোগ

যোগীর সাথে যোগাযোগ : ‘‘যোগাৎ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধ’’                                                           –তপন দাস

বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, “যোগী মানেই বুঝবেন—যে যুক্ত, যার যোগ আছে অর্থাৎ কিছু বা কাহাতেও টান আছে,—এক-কথায় আসক্ত, কোন-কিছু বা কাহাতেও আসক্ত।  আসক্তি থাকলে ভাবা, করা, কওয়ায় মানুষের যেমন-যেমন যা’-যা’ হয়, তাই করাই হচ্ছে যোগী বা যুক্ত বা অনুরক্ত মানুষের লক্ষণ। ……তাই, শাস্ত্রে যেখানেই যোগ বলে কথা আছে সেখানেই বুঝতে হবে, সে-কথা বাস্তব কিছুতে যুক্ত হওয়ারই কথা। আর, এই যোগ হলেই মানুষের চিত্তবৃত্তিনিরোধ হতে সুরু করে, কারণ, যাতে আমার টান যত বেশী, আমার সাধারণ প্রবৃত্তিই হয় আমার সমস্ত বৃত্তি দিয়ে তাকে উপভোগ করি—আর তার বাধা যেগুলি, সেগুলিকে এমনতরভাবে বিনিয়ে আমার এই উপভোগের পথের কোনরকম বাধা না সৃষ্টি করে বরং তার সাহায্য করে এমনতরভাবে নিয়ন্ত্রিত করতে একটা স্বতঃ-উৎসারিত ঝোঁক আমাদের থাকেই। তাই শাস্ত্রে আছে “যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ’’। (কথাপ্রসঙ্গে, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৩)

      আধ্যাত্মিক চেতনায় একনিষ্ঠ না হলে যোগের সাথে নিত্য-যুক্ত থাকা যায় না। সে বিষয়েও শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের সচেতন করার জন্য বললেন, ‘‘গীতায় আছে, ‘তেষাং জ্ঞানী নিত্যযুক্ত একভক্তির্বিশিষ্যতে’………একভক্তি না হলে হবে না । পঁচিশ ঠাকুর করলেই মুস্কিল, বহু-নৈষ্ঠিক যারা তাদের জীবনে কোন সঙ্গতি থাকে না, তারা আস্তে আস্তে পাগলাটে হয়ে ওঠে । বহু-নৈষ্ঠিক মানে মূলতঃ তার কিছুতেই নিষ্ঠা নেই, নিষ্ঠা আছে রকমারি প্রবৃত্তি-স্বার্থে, তাই আত্মনিয়ন্ত্রণ বলে জিনিসটা তাদের জীবনে ঘটে ওঠে না, ফলে অভিজ্ঞতা বা জ্ঞানের উন্মেষ হয় না । ভক্তি ছাড়া, একানুরক্তি ছাড়া জ্ঞান ফোটে না । …..একভক্তি যার আছে… তার জ্ঞানের নাড়ী হয় টনটনে । কথায় বলে প্রহ্লাদমার্কা ছেলে. ……আগুনে, জলে, পাহাড়ে, পর্ব্বতে, অন্তরীক্ষে কোথাও ডরায় না ।…. তাই ভক্তির চাইতে বড় কামনার বস্তু আর নেই  ……।’’ ( আ. প্র. ২য় খন্ড, ২০. ১২. ১৯৪১)

      নিজেকে যোগযুক্ত রাখতে  শ্রীশ্রীঠাকুর সর্বদা সচেতন থাকতেন।  একদিন একটা সুপুরীর টুকরো মুখে দিতে গিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে নীচে পড়ে যায়। ঠাকুর খাট থেকে নেমে সুপুরীর টুকরোটাকে খুঁজে পিকদানিতে ফেলে হাত ধুয়ে খাটে উঠে বসেন।   আর একটা সুপুরীর টুকরো মুখে দেন। সামান্য এক টুকরো সুপুরী, তা-ও আবার খুঁজে নিয়ে ফেলে দিলেন। এই সামান্য কাজটা তো যে কেউ করতে পারত, তার জন্য  খাট থেকে নেমে কষ্ট করে সুপুরী খুঁজতে গিয়ে  অমূল্য সময় নষ্ট করার পেছনে কোন লাভজনক যুক্তির খোঁজ না পেয়ে উপস্থিত যুক্তিবাদীরা অনুযোগ করলে ঠাকুর বলেছিলেন, তোমাদের হিসাবে  আমি বেকুব, আমার হিসাবে আমি কিন্তু চালাক।   আমার হাতের সাথে মুখের স্নায়বিক যোগসূত্র ছিন্ন হবার ফলে আমি যোগভ্রষ্ট হই, সুপুরীটা নীচে পড়ে যায়। প্রারব্ধ কর্মফলে ওই অপারগতা যাতে যোগ না হয় তাই একটু সময় নষ্ট করে নিজের ত্রুটি নিজেই সংশোধন করে নিলাম।    

      যোগ বোঝাতে গিয়ে ঠাকুর একদিন   গল্পচ্ছলে বলেছিলেন, এক গোয়ালার অনেকগুলো গোরু ছিল। ওই গোরুগুলোর দুধ এবং দুগ্ধজাত ছানা, দৈ, ঘোল, মাখন, ঘি নিজেরা খেত, পাড়াপড়শীদেরও দিত। গোয়ালার বয়স হওয়াতে ছেলেকে একদিন একটা পাঁচন হাতে দিয়ে গোরু চরাবার ভার দেয়। ছেলে মাঠে নিয়ে গোরুগুলোকে চরতে দিয়ে দেখল, একটা পাঁচনের লাঠি দিয়ে কিছুতেই গোরুগুলোকে বাগে আনতে পারছে না। এদিক-ওদিক চলে যাচ্ছে। তাই সে ভাবল, একটা পাঁচন দিয়ে সব গোরু সামলানো যাবে না। সে তখন  একমনে এক-একটা গোরুর জন্য আলাদা আলাদা পাঁচন বানাতে শুরু করলো। পাঁচন বানানো শেষ করে গোরু সামলাতে গিয়ে দেখে নির্দিষ্ট স্থানের কাছাকাছি গোরুগুলো নেই, চরতে চরতে অনেক দূরে দূরে জঙ্গলে চলে গেছে। ওদিকে বেলা গড়িয়ে গোধূলি-প্রায়। ছেলে নিরুপায় হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে গিয়ে সব কথা খুলে বললে বাবা কোন তিরস্কার না করে ছেলেকে বুঝিয়ে বলেন, “বাপু, এক পাঁচনেই লাখ গোরু ঠেকানো যায়। যার যেমন দরকার, তেমনতর ঠক্কর মারলেই তো হয় ! তোমার এই অতিবুদ্ধি সব বেসামাল করে ফেলেছে।’’ (কথাপ্রসঙ্গে, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৪) অবশেষে বাবার কাছ থেকে গোরুর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী  ঠক্কর মারার কায়দা শিখে ওই এক পাঁচনের সাহায্যেই গোরুগুলোকে বাগে আনতে শিখে যায়।

      ওই ঠোক্কর মারার কায়দা যিনি শেখাতে পারেন তিনিই ঠাকুর, তিনিই যোগসিদ্ধ গুরু। যোগসিদ্ধ গুরুর কাছ থেকে কাকে, কখন, কতটুকু ঠোক্কর কিভাবে মারতে হবে সেই কায়দা একবার শিখে নিতে পারলে আমাদের বিশৃঙ্খল ইন্দ্রিয়গুলোকে একমুখী আসক্তির সাথে যুক্ত করে যোগ-কে উপলব্ধি করা যায়। তাহলে পালের গোরুগুলো পালেই থাকবে, বেশী কায়দা করতে গেলে গোরুগুলো পালছাড়া হয়ে যাবে।

      যোগসিদ্ধ গুরু শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর নিত্যলীলায় যোগশাস্ত্রে বর্ণিত আসন-মুদ্রাদি তিনি কোন কালেই অভ্যাস করেন নি। তিনি ছোটবেলা থেকেই নামধ্যান করতেন। তিনি তাঁর ভাগবত আন্দোলন কীর্তন দিয়ে শুরু করেছিলেন। কীর্তন করতে করতে সমাধিস্থ হতেন। সেই সময় যোগশাস্ত্রে বর্ণিত সকল ধরণের আসন-মুদ্রাদি অবলীলায় করতেন। তিনি কীর্তনের মাধ্যমে অনেকানেক পালছাড়াদের পালে ভেড়ালেন। তারা আবার যাতে পালছাড়া না হয়ে পড়ে তারজন্য কাজে মাতিয়ে দিয়ে গড়ে তুললেন ভারতীয় আর্য্য ভাবধারার নিদর্শন স্বরূপ এক আদর্শ প্রতীকী রাষ্ট্র—হিমাইতপুর সত্সঙ্গ আশ্রমে। ব্যক্তি, দম্পতি, গৃহ, সমাজ ও রাষ্ট্র জীবনকে শুদ্ধ-বুদ্ধ-পবিত্র করে এক যোগে বাধতে দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ, কৃষি ও শিল্পের নবীকরণ করলেন। 

      শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাগবত আন্দোলনের কীর্তনযুগের সাধকেরা কীর্তনের এবং নামের শক্তি সঞ্চারণা করে রোগ-শোক-ব্যাধি-জরা-য় জর্জরিত, প্রবৃত্তি-পীড়িত মানুষদের স্বাভাবিক জীবনে অধিষ্ঠিত করে অমৃতের সন্ধান দিয়েছিলেন। অনুরূপভাবে তাণ্ডবনৃত্যে কীর্তন, আর নিয়ম করে নামধ্যান করতে পারলে নিজেকে এবং পরিবেশকে সবদিক দিয়ে যে সুস্থ রাখা সম্ভব, তা বলাই বাহল্য। 

      জীবাত্মাকে পরমাত্মার সাথে প্রতিনিয়ত যোগযুক্ত রাখতে শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর অনুগামীদের একটা ছোট্ট নিদেশ-বাণীতে সব বুঝিয়ে দিলেন।

      ঊষা-নিশায় মন্ত্রসাধন

            চলাফেরায় জপ

      যথাসময়ে ইষ্টনিদেশ

            মূর্ত্ত করাই তপ।

      মন্ত্র সাধনের জন্য সকাল-সন্ধ্যায় নিয়ম করে ধ্যানাভ্যাস করা। প্রতিবার ধ্যানান্তে ‘আমি অক্রোধী, আমি অমানী’ ইত্যাদি স্বতঃ-অনুজ্ঞার অর্থগুলোকে আয়ত্ত করতে পারলে প্রবৃত্তির নিগ্রহ থেকে সহজেই মুক্তি লাভ করা যায়। ধ্যান করার পর দিগন্তের দিকে, সবুজের দিকে তাকালে চক্ষুর দৃষ্টি ভাল থাকে। চলাফেরায়, কাজেকর্মে, শয়নে-স্বপনে ইষ্টে অনুরাগ সমন্বিত হ’য়ে নামজপ করার অভ্যাসে পরমাত্মিক শক্তির স্বারূপ্য লাভ হয়। নিয়মিত শবাসন করলে হৃদরোগ হবার আশঙ্কা থাকে না। নিয়মিত থানকুনি পাতা খেলে শরীর বিধানের রেচনক্রিয়া সুস্থ থাকে। সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার, মাসান্তে কমকরে একটি দিন, হবিষ্যান্ন গ্রহণ, পাতিত্য কর্ম থেকে ত্রাণ পেতে শিশু প্রাজাপত্য, প্রাজাপত্য এবং মহাসান্তপন ব্রত পালনে শরীর-মনের অসঙ্গতি দূর হয়, শরীর নিরোগ থাকে।

      নাম জপ করা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন—নাম করলে অনেক সময় জ্বর কমেও যায়। কারণ, ব্যাকটেরিয়াগুলি পুড়ে যায়। রোগীর শরীর ছুঁয়ে নাম করলে তাতেও রোগ ভাল হয়। ঐ জন্য কুষ্টিয়াতে একটা দালানে ত্রিশটা bed (শয্যা) ছিল। রাধারমণ প্রভৃতি ছিল। রোগী আসলে শুশ্রূষা করত, ছুঁয়ে নাম করত। ডবল নিউমোনিয়া ৩/৪ দিনে, এমনকি রাতারাতি সেরে যেত।
                                              (সুত্র—আলোচনা প্রসঙ্গে ১৮ খণ্ড)

আমাদের আর্য্যহিন্দু-শাস্ত্র এবং যোগশাস্ত্র অনুসারে সূর্যোদয়ের পর শয্যাত্যাগ করলে পাতিত্যদোষে দুষ্ট হতে হয়। এবং প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ উপবাসী থাকার নিদেশ দেওয়া আছে। শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের ওই পাতিত্যদোষ থেকে মুক্ত করে নিয়ত যোগযুক্ত রাখতে দিনচর্যার এক সহজ নিদেশ দিলেন অনুশ্রুতি গ্রন্থের বাণীতে। 

      ঊষার রাগে উঠবি জেগে শৌচে শীতল হবি,

      সন্ধ্যা–আহ্নিক জপ সাধনায় ঈশের আশিস লবি।

      কুতুহলে পড়শি ঘুরে দেখবি সযতনে,

      আছে কেমন কোথায় কে জন মন দিবি রক্ষণে।

      তারপরেতে বাড়ী এসে শৌচে যথাযথ,

      গৃহস্হালীর উন্নয়নী অর্জ্জনে হ’ রত।

      স্নানটি সেরে আহ্নিক করে ক্ষুধামতন খাবি,

      একটু চলে বিশ্রাম নিয়ে আগুয়ানে ধাবি।

      এমনি তালে সচল চালে চলে সন্ধা এলে,

      শৌচে শুদ্ধ হয়ে করিস আহ্নিক হৃদয় ঢেলে।

      উন্নয়নের আমন্ত্রনী গল্প-গুজব শীলে,

      হৃষ্টমনে আলোচনায় কাটাস সবাই মিলে।

      পড়শী দিগের অভাব-নালিশ থাকেই যদি কিছু,

      তার সমাধান যেমন পারিস করিস লেগে পিছু।

      করন-চলন ধরন-ধারন যজন যাজন কিবা,

      সকল কাজেই ইষ্টস্বার্থে চলিস রাত্রি-দিবা।

      আদর-সোহাগ উদ্দীপনী কথায় কাজে ঝুঁকে,

      স্বার্থ-কেন্দ্র সবার হবি ধরবি ইষ্টমুখে।

      বিশ্রামেরই সময় গা-টি ঘুমল হয়ে এলে,

      ইষ্ট-চলন মনন নিয়ে ঘুমে গা দিস ঢেলে।

      (অনুশ্রুতি গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)

      শ্রীশ্রীঠাকুর আহ্বানীসহ পূর্ণাঙ্গ প্রার্থনা মন্ত্রে আচমন, বাংলা সমবেত প্রার্থনা ও বাংলা সমবেত প্রার্থনার অবশিষ্টাংশ সন্দর্ভে কতগুলো সহজ আসন এবং প্রাণায়ামের নিদেশ রেখে গেছেন। সেই নিদেশ মেনে আমরা যদি সঠিক অনুশীলন করতে পারি তাহলে সহজ-যোগে ব্যাধিমুক্ত হয়ে পরমাত্মার সাথে যোগযুক্ত থাকতে পারব।  (দ্রঃ ঋত্বিগাচার্য্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য প্রণীত অনুসৃতি, যতি-ঋত্বিক শ্রীশরত্চন্দ্র হালদার প্রণীত যুগবাণী এবং সত্সঙ্গ পাব্লিশিং কর্তৃক প্রকাশিত প্রার্থনা শিরোনামের গ্রন্থাবলী।)

      শ্রীশ্রীঠাকুরের এক অনন্য দৈবী অবদানের নাম ইষ্টভৃতি। ইষ্টের প্রীতির জন্য কাউকে পীড়িত না করে, নিজে পীড়িত না হয়ে, বর্ণানুগ কর্মের সেবার মাধ্যমে, বৃহত্তর পরিবেশে, ঘটে ঘটে ইষ্ট স্ফূরণের বা মঙ্গল প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত থাকার বিনিময়ে অযাচিত প্রাপ্ত অর্থ বা সম্পদকে বলা হয়েছে অনুগ্রহ অবদান । ওই অনুগ্রহ অবদানকে ঠাকুর ‘দিন গুজরানী আয়’ অভিধায় ভূষিত করেছেন। ওই ‘দিন গুজরানী আয়’-এর অগ্রভাগ প্রতিদিন পানাহার করার পূর্বে ইষ্ট-নীতি ভরণের শপথ করে নিবেদন করার নাম ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ। যা নিখুঁতভাবে পালন করলে শরীর-মন-আত্মার অসঙ্গতি দূর হয়। আর্য্যকৃষ্টির সদাচার এবং বর্ণাশ্রম ধর্ম রক্ষিত হয়।

      শ্রীশ্রীঠাকুরের  আর একটি অনন্য দৈবী অবদানের নাম স্বস্ত্যয়নী ব্রত। প্রবৃত্তির সব বিপাক এবং গঞ্জনা থেকে মুক্ত করে আমাদের স্মৃতিবাহী চেতনায় সমৃদ্ধ রাখতে প্রবর্তন করলেন পঞ্চনীতি সমন্বিত স্বস্ত্যয়নী ব্রতের। জড়-পদার্থে নির্মিত মন্দিরের পরিবর্তে নিজ-নিজ দেহটাকেই শ্রীবিগ্রহ মন্দির জ্ঞানে পবিত্রতার সাথে রক্ষা করতে নিদেশ দিয়েছেন এই ব্রতের মাধ্যমে, যেহেতু এই দেহের মধ্যেই রয়েছে পরমাত্মার আবাসস্থল। ভোগ, দুর্ভোগ, উপভোগ, মুক্তি, পরামুক্তি, পরাগতি সবকিছুই এই দেহের মধ্যেই। যা নাই ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে এই দেহভাণ্ডে।  আমাদের আর্য্য শাস্ত্রাদিতেও একথার উল্লেখ রয়েছে। শ্রীশ্রীঠাকুর জীবাত্মার মধ্যে সুপ্ত পরমাত্মাকে জাগাতে বলেছেন নামের মাধ্যমে। ৫টি কর্মেন্দ্রিয়, ৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয়, মন, বিবেক, জীবাত্মা, পরমাত্মাদির সমন্বয়ে সৃষ্টি এই দেহমন্দিরকে পবিত্র রাখার, সুস্থ-স্বস্থ রাখার ভাগবত-বিধির পালন-পদ্ধতি সহজভাবে বিধায়িত করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর এই ব্রতের মাধ্যমে।  

      শ্র্রীশ্র্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রবর্তিত যজন, যাজন, ইষ্টভৃতি, স্বস্ত্যয়নী, সদাচারাদি নিখুঁতভাবে পালন করার নাম ইষ্টকর্ম। ইষ্টকর্ম ব্যতীত কর্ম অনিষ্টকর্ম। সেই ইষ্টকর্মে যুক্ত থাকলে সহজেই যোগসিদ্ধ হওয়া যায়।  

      কাম-আবেশে স্ত্রী-পুরুষে

            যেমন করে উপভোগ,

      ইষ্টকাজে বাস্তবতায়

            তেমনি হলে তবেই য়োগ। 

      সব প্রবৃত্তি রত থাকে

      ইষ্টকর্ম লয়ে,

      সেই তো যোগী, সে-ই সন্ন্যাসী

      কাল নত যার ভয়ে।

      কালাধীশ ঠাকুরের চাহিদামত ইষ্টকর্ম করে একবার যোগী হতে পারলে চিরতরে নিশ্চিন্ত, কালের কবলে পড়ে ভীত হতে হবে না, কাল হবে যোগীর অধীন।

      পরিশেষে জীবনপিয়াসী মানুষদের কাছে, ইষ্টপ্রাণ দাদা ও মায়েদের কাছে পরমপিতার এই দীন সন্তানের কাতর আবেদন, আমরা যেন নিত্য ইষ্টকর্মের মাধ্যমে পরমপিতার সাথে যোগযুক্ত থেকে পরিবেশের সব্বাইকে জীবনের জয়গানে যুক্ত করে নিতে পারি। সবাই যেন মুক্তকণ্ঠে বলতে পারে, ‘আমি সবার, আমার সবাই।’

                              ——

যোগের সাথে যোগাযোগ

              যোগের সাথে যোগাযোগ

––তপন দাস

বৈদিক যুগে মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য তাঁর বিদূষী স্ত্রী গার্গীকে যোগ সম্পর্কে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন—সংযোগো যোগ ইত্যুক্তো জীবাত্মাপরমাত্মনোঃ।।  জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার সংযোগ স্থাপনের মাধ্যম যোগ

মহর্ষি পতঞ্জলি যোগ-কে চিত্তবৃত্তি নিরোধের মাধ্যম বলে উল্লেখ করেছেন। ‘‘যোগঃ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধঃ’’    

ভারতের অগ্নিপুরানে মন এবং আত্মার মিলনের মাধ্যম হিসেবে যোগকে উল্লেখ করা হয়েছে শৈবরা জীবের সাথে শিবের, বৈষ্ণবেরা জীবের সাথে পুরুষোত্তমের মিলনের মাধ্যম হিসেবে যোগকে ব্যবহার  করেন সহজিয়া তান্ত্রিকেরা শিব ও শক্তির মিলন, সহজিয়া বৈষ্ণবেরা রাধা ও কৃষ্ণের মিলন এবং সহজিয়া বৌদ্ধরা প্রজ্ঞা ও উপায়ের মিলনের মাধ্যম হিসেবে যোগ-কে ব্যবহার করেন

পরমপুরুষ শ্রীকৃষ্ণ যোগকে “যোগঃ কর্ম্ম সুকৌশলম্’’ বলে বর্ণনা করেছেন।   

     বিদগ্ধজন স্বীকৃত পতঞ্জলি মতে যোগের আটটি অঙ্গ যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধ্যান, ধারণা ও সমাধি

     যম—অহিংসা (হিংসাকে হিংসা দ্বারা জয় করার নাম অহিংসা), সত্য (অনিত্য বাদ দিয়ে নিত্যে বিচরণ করার মধ্য দিয়েই সত্য বা অস্তিত্বের উপলব্ধি হয় ‘সত্যমেব জয়তে’ আমাদের জাতিয়তাবাদের মূলমন্ত্র আমাদের ব্যবহারিক প্রয়োগে সেই সত্যের অস্তিত্ব আজ প্রায় বিপন্ন অস্তিত্ব সংকট থেকে সত্যকে উদ্ধার করতে না পারলে বৃথাই হবে আমাদের যোগ সাধনা), অস্তেয় (অন্যায় না করা), ব্রহ্মচর্য (বৃহতে বিচরণ, বৃদ্ধিতে বিচরণ, সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বাস্তবায়নে যা প্রকাশিত হয়), কৃপা (করে পাওয়া), আর্জব (সরলতা), ক্ষমা, ধৃতি (ধারণ করা), মিতাহার ও শৌচ মাধ্যমে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখার অনুশাসন  

     নিয়ম—নিয়মের মধ্যে আছে তপঃ, সন্তোষ, আস্তিক্য, দান, দেবপূজা, সিদ্ধান্ত শ্রবণ, হ্রী (লজ্জা), মতি, জপ ও হোম

     আসন—নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় জীবাত্মাস্থিত শরীর-মনকে সুস্থ রাখার কৌশল অধো, অর্ধ, এক, বন্ধ, ধনুক, অনন্তাসন, অঞ্জনেয়রাসন, অর্ধচন্দ্রাসন, অর্ধ মৎস্যেন্দ্রাসন, অর্ধ-নবাসন, অষ্টবক্রাসন, বদ্ধকোনাসন, বকাসন, বালাসন, ভরদ্বাজাসন, ভেকাসন, ভুজঙ্গাসন, বিড়ালাসন, চতুরঙ্গ দণ্ডাসন, চক্রাসন, দণ্ডাসন, ধনুরাসন, দ্বিপদ শীর্ষাসন, দ্বিপদ বিপরীত দণ্ডাসন, একপাদ কৌদিন্যাসন, একপাদ রাজকপোতাসন, একপাদ শীর্ষাসন, গর্ভাসন, গড়ুড়াসন, গোমুখাসন, গুপ্তাসন, হলাসন, হনুমানাসন, জানুশীর্ষাসন, জঠরপরিবর্তনাসন, কপোতাসন, ক্রৌঞ্চাসন, কুক্কুটাসন, কুর্মাসন, লোলাসন, মহামুদ্রা, মকরাসন, মালাসন, মণ্ডলাসন, মার্জারাসন, মত্স্যাসন, ময়ূরাসন, মুক্তহস্তশীর্ষাসন, মুক্তাসন, নটরাজাসন, নাওয়াসন (নৌকা), নিরালম্বসর্বঙ্গাসন, পদহস্তাসন, পদ্মাসন, পাশাসন, রাজকপোতাসন, শলভাসন, শশকাসন, শবাসন, সর্বাসন, সিদ্ধাসন, সিংহাসন, সুখাসন, সুপ্তকোনাসন, সুপ্তবীরাসন, স্বস্তিকাসন, তুলাসন, উপবেশনাসন, ঊর্দ্ধধনুরাসন, বজ্রাসন, বাতায়নাসন, বীরাসন ইত্যাদি ইত্যাদি প্রভূত নামের আসনের মধ্যে সুখাসন, পদ্মাসন, শবাসন, স্বস্তিকাসন, ভদ্রাসন, বজ্রাসন, ও বীরাসন মুখ্যরূপে গৃহীত হয়েছে, পরমাত্মিক শক্তিকে উপলব্ধি করার জন্য

     প্রাণায়াম—পূরক, কুম্ভক ও রেচকাদি শ্বাস-প্রশ্বাসের আগম-নিগম কৌশল আয়ত্ব মাধ্যমে প্রাণবায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করা

     প্রত্যাহার—পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে বিষয় আসক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে আত্মার উপর নিযুক্ত করা      ধারণা—আঙুল, গুলফ (গোড়ালি), জানু (হাঁটু), সীবনী (উপস্থ থেকে পায়ু পর্যন্ত স্থান), লম্বিকা (আল্-জিভ), ও ব্রহ্মরন্ধ্রে প্রাণবায়ুকে ধারণ করা

     ধ্যান—নির্দিষ্ট বিষয়ে একাগ্র থাকা

      সমাধি—মন ও আত্মা এক হয়ে যাওয়া (তৃষ্ণার একান্ত নির্বান—মহাচেতন সমুত্থান)

      যোগ শব্দটি যুজ্-ধাতু থেকে উৎপন্ন, অর্থ যুক্ত হওয়া (attachment) যোগ শব্দের সাধারণ অর্থ মিলন, ঐক্য, যুক্ত হওয়া, যুক্ত থাকা যোগাভ্যাস মাধ্যমে ব্যষ্টি জীবনের ইন্দ্রিয় ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টায় আমরা সফল হলেও, সমষ্টি জীবনে এর প্রভাব খুব একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে নি  তাহলে সহজেই আমরা আমাদের জীবাত্মার  দ্যোতক ইন্দ্রিয়াদি, মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার, আমাদের বন্ধুরূপী শত্রু প্রবৃত্তি বা রিপুগুলোকে একমুখী করে পরমাত্মিক শক্তির সাথে সহজেই যুক্ত করতে পারতাম “আত্মবৎ সর্ব্বভূতেষু’’-র শিক্ষায় সকলকে আপন করে নিতে পারতাম ‘আমরা’, ‘ওরা’ বলে ক্ষুদ্র বিভাজনের রেখার গণ্ডীতে নিজেদের আবদ্ধ করতে পারতাম না। মাতৃ-বিচ্ছেদ, পিতৃ-বিচ্ছেদ, ভ্রাতৃ-বিচ্ছেদ, স্বামী-স্ত্রী বিচ্ছেদ, সন্তান-বিচ্ছেদ ইত্যাদি শব্দগুলোকে প্রশ্রয় দিয়ে “বিচ্ছিন্নতাবাদ ধ্বংস হোক’’ বলে হাস্যস্কর শ্লোগান দিতেও পারতাম না !

     আসলে বিচ্ছিন্নতাবাদ রয়েছে আমাদের মনে। পরমাত্মিক শক্তির প্রাধান্য বোঝাতে উপনিষদের ঋষি গল্পচ্ছলে বলেছেন, আমাদের শরীরের চোখ একদিন অসূয়া বশে নিজেকে প্রধান ভেবে শরীর থেকে বেড়িয়ে যায়। তাতেও দেহরথ চলছে দেখে আত্মিক জীবনীশক্তিকে প্রশ্ন করে জানতে চাইলে জীবনীশক্তি বলেন, কেন দৃষ্টিহীনরা বেঁচে থাকে না ! এইভাবে প্রতিটি ইন্দ্রিয় এক এক করে নিজেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে দেহ ছেড়ে চলে গেলেও দেহটা বেঁচে ছিল। অবশেষে ইন্দ্রিয়াধিপতি মন নিজের প্রাধান্যকে প্রতিষ্ঠা করতে দেহ ছেড়ে চলে যায়। তা সত্বেও দেহকে বেঁচে থাকতে দেখে আত্মিক জীবনীশক্তিকে প্রশ্ন করে জানতে চাইলে জীবনীশক্তি বলেন, কেন মানসিক বৈকল্যরা বেঁচে থাকে না ! তারপর ইন্দ্রিয়দের দর্প চূর্ণ করতে পরমাত্মার অদৃশ্য আত্মিক জীবনীশক্তি দেহ ছেড়ে বেড়িয়ে যাবার উপক্রম করলে জীবাত্মা অধিকৃত সকল ইন্দ্রিয় শক্তিহীন হতে শুরু করেতখন সকলে মিলে একজোট হয়ে সমস্বরে প্রার্থনা জানায়, হে পরমাত্মা, আপনি দয়া করে দেহ ছেড়ে বেরোবেন না, তাহলে আমাদের সকলের অস্তিত্ব বিলোপ হবে।

     অতএব যে কৌশল অবলম্বনে পরমাত্মিক শক্তির সাথে যোগযুক্ত থাকা যায় তাকে বলে যোগ। এই যোগসূত্র রচনা করতে হবে অনন্তকালের জন্য, ভৌতিক দেহ চলে গেলেও যেন লিঙ্গ শরীর পরমাত্মিক শক্তির সাথে যুক্ত থাকে ধ্রুবাস্মৃতি বা স্মৃতিবাহী চেতনার মধ্য দিয়ে।  

     কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের প্রাঙ্গনে মহাবীর মহাযোগী অর্জুন কিছুতেই চিত্তবৃত্তিকে নিরোধ করতে না পেরে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন। ঠিক তখনই শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বর্ণধর্ম পালনে সুকৌশলী করে তোলার জন্য মৃদু ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন, “নাস্তি বুদ্ধিরযুক্তস্য ন চাযুক্তস্য ভাবনা। ন চাভাবায়তঃ শান্তিরশান্তস্য কুতঃ সুখম্।। (গীতা ২/৬৬) অর্থাৎ পরমপিতার সাথে যোগযুক্ত না হতে পারলে বুদ্ধি স্থির হয় না, বাঁচার ভাবনা ভাবতে পারে না, ফলে শান্ত হতে পারে না, শান্তি পায় না,—সুখ তো অনেক দূরের কথা ‍!

     শ্রীকৃষ্ণ ওই উপদেশ যাঁকে উদ্দেশ্য করে দিয়েছিলেন তিনি আর কেউ নন, সে যুগের শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন। যিনি অজ্ঞাতবাসকালে বিরাট রাজার গোধন হরণ করতে আসা কৌরব বাহিনীকে সংমোহন বাণে সংজ্ঞাহীন করেছিলেন। যিনি শ্রেষ্ঠ সংযমী, সকামা নারী উর্বশীর যৌন আবেদন প্রত্যাখ্যান করে বৃহন্নলা হয়েছিলেন। শ্রেষ্ঠ তাপস, যিনি তপস্যাবলে অনেক দিব্যাস্ত্র লাভ করেছিলেনযাঁর শিক্ষাগুরু ছিলেন কৃপাচার্য, দ্রোনাচার্য। পুরোহিত ছিলেন আচার্য ধৌম্য। তিনি তথাকথিত অষ্টাঙ্গ যোগ জানতেন না এমন তো নয় ! তথাপিও নিজের সাথে নিজেকে যোগযুক্ত করে রাখতে না পারার জন্য বকুনি খেয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণের কাছে ! কেন ?

     মহাবীর অর্জুন সহজ-সরল বুদ্ধি নিয়ে চলতেন বলেই শ্রীকৃষ্ণের ভূত-মহেশ্বর রূপটাকে বোঝার চেষ্টা করেন নি। শ্রীকৃষ্ণকে সখার অতিরিক্ত ভাবতে পারেন নি বলেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে রথের সারথী হবার মত অনুচিত কর্মে নিযুক্ত করার ঔদ্ধত্য দেখিয়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ নির্বিকার থেকে সব আবদার মেনে নিলেও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুনের ওই ধর্মবিরুদ্ধ হৃদয়-দৌর্বল্য ভাবটাকে আর সহ্য করতে পারছিলেন না। অসৎ নিরোধের স্বার্থে গীতার অবতারণা করতে গিয়ে ‘অনার্য্যজুষ্টম’ (২/২) বলে গাল দিতেও হয়েছিল। তাতেও কাজ হয়নি। তাই এই শ্লোকে নির্বোধ বলতেও দ্বিধা করলেন না। তাতেও কাজ হল না দেখে তাঁর ভূত-মহেশ্বর ভাবের সাথে যোগযুক্ত করতে সাংখ্য যোগ, কর্ম যোগ, জ্ঞান যোগ, কর্মসন্ন্যাস যোগ, অভ্যাস যোগ ইত্যাদি একের পর এক যোগের বর্ণনা দিয়েও কাজ না হওয়াতে বিশ্বরূপদর্শন যোগ-এ নিজের পরমাত্মিক শক্তির প্রকাশ দেখিয়ে অর্জুনের দুর্বলতা দূর করেন। অর্জুন এতদিনের সখাকে ইষ্টগুরু রূপে মেনে নিয়ে ইষ্টগুরুর সাথে যোগযুক্ত হয়ে সব দুর্বলতা কাটিয়ে বুদ্ধিকে স্থির করতে পারেন। জীবনযুদ্ধে জয়ী হন। জয়ী হন ধর্মযুদ্ধেঅতএব, সব যোগের মূল যোগ হল, ইষ্টগুরুর সাহচর্যে জীবাত্মাস্থিত সুপ্ত পরমাত্মার সাথে যোগসূত্র স্থাপন করে মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার অভ্যাসদ্বারা অমৃতত্ত্ব লাভ করে অনন্ত জীবনের অধিকারী হওয়া।

                     —————-