।। সম্ভবামি যুগে যুগে ।।
—ডাঃ তপন দাস
সুখচর, কলকাতা-৭০০১১৫
।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আত্ম-স্মৃতি কথা—ঈশ্বরকণা-র রহস্যভেদ ।।
[“ষ্টিকেল-এর The Beloved Ego পুস্তক পাঠান্তে আলোচনা কালে—শ্রীশ্রীঠাকুর নিরব। যেন কিছু একটা অনুভব করছেন। একসময় বলতে লাগলেন—দেখুন, একটা point (বিন্দু) আর তার infinite expression (অনন্ত বিস্তৃতি) যেন একটা জিনিষ বলে মনে হয়। দেখছি একটা atom (পরমাণু), সেটা ঝক্ করে ফেটে চৌচির হয়ে তার থেকে millions of smaller electron (কোটি কোটি ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিন) এর মত বেরুচ্ছে। সেগুলি আবার (আকর্ষণ) ও (বিকর্ষণ)-এর দরুণ নানারূপ দানা বাঁধছে। আবার সেগুলি যেন করছে (উৎপন্ন হচ্চে) একটা আরো ছোট দানা থেকে,—যেন একটা (ক্ষুদ্রতর বৈদ্যুতিন)। আবার সেই ছোট্ট –এর (বিন্দুর) মত দানাটা ঝক্ করে ফেটে গেল। তার থেকে (কোটি কোটি অতি ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিন) সমস্তটা ব্যাপ্ত করে ফেল্লে। এমনি করে ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে শেষে একটা দানাতে গিয়ে পৌঁছে। ঐ সেই (আদি) দানাটা থেকেই সমস্ত জগতের উৎপত্তি। ঐ সেই আদি দানাটা থেকে……যেন একটা –এর (ক্রমিক অগ্রগতির) ভিতর দিয়ে আমার (অহং)-এর দানাটা –এর (জ্যান্ত শরীরের) ভেতর এসে পড়লো ….দেখলাম যেন জলে কুমীর হয়ে আছি। এক জন্মে গাছ হয়ে আছি। দেখলাম ছোট ছেলে হয়ে দৌড়াচ্ছি। শেষে বিয়ে হল, স্ত্রী নিয়ে (ভোগ) করছি। তারপর দেখলাম ধীরে ধীরে আমি বেড়িয়ে এসেছি। আমার দেহটা পড়ে আছে। সবাই কান্নাকাটি করছে—হঠাৎ তখন মনে হল সত্যি কি আমি মরে গেছি ? তারপর একটা –এর (ফাঁকার) মত লাগে। তারপর আবার একটা নতুন জীবন চলতে থাকে।এক জীবনে রাজার ঘরে জন্মেছিলাম, বাড়ীতে একটা গম্বুজের মত ছিল এবং তার চূড়াটা সোনার পাতে মোড়া ছিল। বাড়ীর ছোট ছোট ছেলে মেয়ে এবং স্ত্রীলোকেরা সবাই আমায় বড় ভালবাসত । এক জীবনে মনে পড়ে কোন পাহাড়ের পাদদেশে ঘর বেঁধে আশ্রম করেছি ।। সে স্থানটা একখানা বড় ঢালু শ্বেতপাথরে বাধান ছিল । একটা ফুলের লতাগাছ তার উপরে ছায়া করত।“]
* * *
“অস্তিত্বের নাই উপাসনা
সে-ও কি সতী সে-ও কি সৎ,
সবাই কি তাই হয়ে আছে
বেঁচে থেকেও মৃতবৎ !’’
অধুনা পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের উপরোক্ত বাণীটি আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। আপনাকেও হয়তো, যদি আপনি একজন সচেতন ব্যক্তি হন। আপনি-আমি শুধু নয় সচেতন-অচেতন নির্বিশেষে সবাই-ই বোধ হয় জীবনকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়, বৃদ্ধি পেতে চায়, জীবনকে নন্দিত করতে চায়।
তবু কেন জানিনা, সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণীদের কিছু অংশ আমরা,বোধ-বিবেক বিসর্জন দিয়ে ক্রমেই যেন মৃত্যুর মিছিলে যোগদান করতে এগিয়ে চলেছি প্রবৃত্তির শয়তানী প্ররোচনায়। অযথা মারামারি, হানাহানি করে হন্তারক কৃতান্তের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে চলেছি ! পূরণ-পোষণ-প্রীতিচর্যার নীতি প্রতিষ্ঠার নামে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে রাজনীতি করে চলেছি। শিক্ষার মূলসূত্র, ‘‘প্রণিপাতেন, পরিপ্রশ্নেন, সেবয়া’’-র সেবা ভুলে শিক্ষার নামে, মারামারি-হানাহানি করে শিক্ষাঙ্গনকে কলুষিত করছি। সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধিকে ধরে রাখার নীতি, ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করার নামে অধর্মের আশ্রয় নিয়ে অবতার বরিষ্ঠদের অনুগামীদের মধ্যে বিভেদ আনতে চাইছি ! শান্তির বার্তাবহ ইসলাম-এর প্রতিষ্ঠার নামে স্কুলে ঢুকে নিরীহ ছাত্র-ছাত্রীদের, সংবাদ মাধ্যমের অফিসে ঢুকে নীরিহ কর্মচারীদের অবলীলায় হত্যা করে জিহাদ করে চলেছি! বধ্যকে বধ না করে, অবধ্যকে বধ করে ধার্মিক সাজতে চাইছি!
আমাদের গুরু, আমাদের শিক্ষক আর্য-ঋষিগণ ‘‘অসতো মা সদগময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যুর্মামৃতমগময়’’—অসৎ হতে সৎ-এ, অন্ধকার হতে আলোকে, মৃত্যু হতে অমৃত আহরণের শিক্ষা দিলেন। যিনি নিজের আত্মাকেই সর্বাত্মারূপে উপলব্ধি করেন, তিন কাহাকেও ঘৃণা করেন না। সর্বভূতে নিজেকে, নিজের মধ্যে সর্বভূতকে উপলব্ধি করার উপদেশ দিলেন। কেননা, আমরা ঐহিক জগতে দ্বৈত ভাবে অসম্পৃক্ত হয়েও সেই এক পরমাত্মার সাথে সম্পৃক্ত।
তথাপি অযথা এত হিংসা কেন?
বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্রের মতে অহঙ্কার (ego) থেকে আসক্তি। আসক্তি থেকে স্বার্থবুদ্ধি। স্বার্থবুদ্ধি
থেকে
কামনা। কামনা থেকে
ক্রোধ। ক্রোধ থেকে হিংসার উৎপত্তি হয়। হিংসাকে
দূর করতে হলে ভক্তির চাষ দিতে হবে । সৎ-এ নিরবিচ্ছিন্ন
সংযুক্তি থাকার চেষ্টার নাম ভক্তি। ভক্তি এনে দেয় জ্ঞান। জ্ঞানে সর্বভূতে
আত্মবোধ হয়। সর্বভূতে আত্মবোধ জন্মালেই অহিংসার
প্রতিষ্ঠা হয়। অহিংসা থেকে প্রেম আসে। আমি
সবার,
আমার সবাই বোধ জন্মায়।
আবার
হিংসাকে হিংসা দ্বারা জয় করার নাম অহিংসা। যেমন দুষ্টক্ষত বা গ্যাংগ্রীন থেকে শরীরকে বাঁচাতে
হলে আক্রান্ত অংশটিকে কেটে বাদ দিতে হয়। বাদ না দিলে দেহকে বাঁচান যায় না। তেমনি সমাজ রক্ষা, রাষ্ট্র রক্ষা করতে হলে অনুরূপ নীতির
অনুসরণ না করতে পারলে সমাজ-রাষ্ট্রের অঙ্গে পচন ধরে যাবে, রাষ্ট্রের সত্তাটাই মারা
পড়বে।
এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন,—অহিংসা পরম ধর্ম্ম, হিংসা তো পরম ধর্ম্ম নয়। হিংসাকে অটুট অক্ষত রাখলে তো অহিংসার প্রতিষ্ঠা হয় না। অহিংসার প্রতিষ্ঠার জন্য হিংসাকে সরাসরিভাবে হিংসা করতে হবে, সুস্থতা আনতে গেলে অসুস্থতাকে বধ করতে হবে, সক্রিয়তাকে জাগাতে গেলে নিষ্ক্রিয়তাকে মারতে হবে। আমি তো এইরকম বুঝি। তবে এটা করতে হবে মঙ্গলবুদ্ধি-প্রণোদিত হয়ে। তাই পাপীকে ঘৃণা বা হিংসা না করে, পাপকে ঘৃণা বা হিংসা করে, পাপীকে পাপমুক্ত করে তুলতে চেষ্টা করতে হবে। তাই বলছিলাম, হিংসকের হিংসার প্রতি যদি আমরা অহিংস হই, তবে সেইটেই হবে অহিংসা-বিরোধী অর্থাৎ হিংসাপোষণী আচরণ। (আ. প্র. ২/১৭. ১২. ১৯৪১)
আর্য্য ভারতের মা কালী শুম্ভ-নিশুম্ভকে, মা দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে, শ্রীরামচন্দ্র রাবনকে বধ করে ওই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। অযথা কাউকে হত্যা করেন নি। অযথা কাউকে হত্যা না করে পার্থসারথি শ্রীকৃষ্ণ মামা কংসের পাঠান অসুর-রাক্ষস নামক সত্তাহিংস জিঘাংসা বৃত্তিধারীদের হত্যা করেছিলেন। অপকৌশলী অসৎ সাম্রাজ্যবাদী কংসকে হত্যা করে, উগ্রসেনকে কারাগার থেকে মুক্ত করে তাঁকে পুণরায় রাজ্যে অভিষিক্ত করেছিলেন। ধর্মপথভ্রষ্ট অসৎ আগ্রাসনী জরাসন্ধকে হত্যা করে জরাসন্ধের পুত্র সহদেবকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিয়েছিলেন। আগ্রাসন করেন নি। সব হিংসার মূল উৎপাটন করে, এক পরম রাষ্ট্রীক সমবায প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধ সংগঠিত করে জীবনবাদের জয়গান গেয়েছিলেন। ভবিষ্যত প্রজন্মকে জীবনবাদী হবার জন্য উপহার দিয়ে গেলেন গীতা।
শ্রীকৃষ্ণ পরবর্তী বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীষ্ট, হজরত রসুল প্রমুখ পুরুষোত্তমগণও আর্য্য ভারতীয় ওই শ্বাশ্বত নীতির অনুসরণ করেছেন মানব সভ্যতাকে বাঁচাতে। তাঁরা আগ্রাসন করতে, ধর্মান্তকরণ করতে, অযথা কাউকে হিংসা করতে কোথাও কি বলেছেন? তবে কিসের জেহাদ? কোন জেহাদের জন্য, কার অনুশাসন মেনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে নিরীহ স্কুল ছাত্রদের পর্য্যন্ত হত্যা করা হচ্ছে? ইসলাম ধর্ম-প্রতিষ্ঠার নামে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা যে জিঘাংসার দৃষ্টান্ত উপহার দিয়েছে সভ্যতাকে, ওই জিঘাংসা বৃত্তিধারীদের যদি কঠোর হাতে দমন করতে এগিয়ে না আসে উপ-মহাদেশের শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তথা রাষ্ট্র নায়কেরা, তাহলে মানবতার অপমৃত্যুর কালো ছায়া মানব সভ্যতার অঙ্গে ক্রমে ক্রমে গ্যাংগ্রীন উৎপাদন করবে। নিকট ভবিষ্যতে। যদি এখনও রাষ্ট্রসংঘ ধর্মের প্রকৃত রূপকে রূপায়িত করার চেষ্টা না করেন যুগ-পুরুষোত্তমের পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠনের রীতি মেনে। আমাদের সনাতন ধর্মীয় মতবাদ এবং পূর্বাপূর্ব যুগ-পুরুষোত্তমগণদের একটাই উদ্দেশ্য ছিল বৈচিত্রের মাঝে ঐক্য স্থাপনের লক্ষ্যে পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠন।
বিবর্তনবাদ ও অবতারতত্ত্ব :
‘‘প্রলয়পয়োধিজলে ধৃতবানসি বেদং
বিহিত-বিচিত্র-চরিত্রম্ খেদম্।’’
সৃষ্টিতত্ত্বের বিবর্তনীয় ধারার দৃশ্যগ্রাহ্য জল থেকে ‘কেশবধৃত-মীনশরীর’ মৎস্য অবতার। ক্রমে কঠিন মাটি থেকে উদ্ভব উভচর কূর্ম। কূর্ম থেকে বরাহে উত্তরণ। কূর্ম মৎস্যের, বরাহ কূর্মের পরিণতি। নৃসিংহ মানুষ ও পশুর মিশ্রণ। বামন—পশুত্বের অবসান, বুদ্ধির বিকাশ। রামচন্দ্র—সৌম্যাবতার। ক্ষাত্রশক্তি ও সৌম্যভাবের সমন্বয়কারী।
।। মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রের স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।
न सा सभा यत्र न सन्ति वृद्धाः
वृद्धा न ते ये न वदन्ति धर्मम् ।
नासौ धर्मो यत्र न सत्यमन्ति
न तत् सत्यं यच्छलेनानुविद्धम्
।।
(Ye sabhai briddha nei ta sabha e noi. Yara
dharmmasamgata kotha bolena tara briddha noi. yate satya nei ta dharmma noi,
yate chhol aachhe ta satya noi.
RAMAYAN, 3/33)
আদর্শপুরুষ শ্রীরামচন্দ্র ছিলেন সত্যের পূজারী অথচ অসৎ নিরোধী। তৎকালীন যুগের অচ্ছুৎ অনার্য্যদের আর্য্যীকৃত করে আর্য্য-অনার্য্যদের মেলবন্ধন করলেন।অনার্য্য গুহক চণ্ডালকে করলেন মিত্র, আবার অকালমৃত্যুর দ্যোতক বর্ণাশ্রম-বিদ্বেষী প্রতিলোমাচারী বন্ধুবর শম্বুবকে দিলেন চরম শাস্তি। মায়াবী রাবণ যখন কিছুতেই সীতাকে বশে আনতে পারছিলেন না তখন সভাসদেরা বলেছিলেন, রামরূপ ধারণ করে গেলেই তো সীতাকে সহজেই বশীভূত করতে পারেন। উত্তরে রাবণ বলেছিলেন, ওই রূপ স্মরণ করলেই আমার সব পাপ-প্রবৃত্তি মুছে গিয়ে আমি এক অন্য মানুষ হয়ে যাই। তথাপি প্রবৃত্তির ঊর্দ্ধে উঠে ওই বোধটাকে ধরে রাখতে পারল না, ফলে রামচন্দ্রের হাতে হত হতে হল। অথচ বিভীষণ রামচন্দ্রের আদর্শে প্রলুব্ধ হয়ে রাবণকে ত্যাগ করলেন।
এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলছেন, ……রাবণ তো আদর্শবান ছিল না। রামচন্দ্রকে দেখে সে একেবারে বিগলিত হয়ে গেল। রামচন্দ্রের ঊর্দ্ধে তার আর কেউ নেই। ভ্রাতার প্রতি কর্তব্যের চাইতে তার ইষ্টানুরাগই প্রবল। ভীষ্ম কিন্তু কেষ্টঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি নিয়েও, কর্তব্যবোধে কৌরবের পক্ষ ছাড়তে পারেন নি। তা কিন্তু ঠিক হয়নি। ইষ্টের জন্য, সত্যের জন্য, অন্য যে-কোন কর্তব্য ত্যাগ করতে হবে, যদি সে কর্তব্য ইষ্টের পথে অন্তরায় হয়। ‘‘সর্ব্বধর্ম্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ’’ । (আ. প্র. 21/2.6.1952)……শ্রীরামচন্দ্রের খুব strong group (শক্তিমান দল) ছিল। হনুমান, সুগ্রীব, জাম্বুবান, অঙ্গদ, নল, নীল এরা সবাই ছিল একটা strong unit (শক্তিমান গুচ্ছ)। রামচন্দ্রের সাথে ওদের একজন না-একজন থাকতই। এক সময় বিভীষণকে সন্দেহ করেছিল লক্ষণ। বিভীষণ তাতে বলেছিল, ‘আমি জানি তোমরা আমাকে সন্দেহ করবে। কারণ, আমি রাবণের ভাই। আমি ভাই হয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে treachery (বিশ্বাসঘাতকতা) করেছি। কিন্তু করেছি অসৎ-এর বিরুদ্ধে। হজরত রসুলের group-ও (দলও) খুব strong (শক্তিমান) ছিল। তিনি বেঁচে থাকতে-থাকতেই অনেকখানি ভূখণ্ডের king (রাজা) হয়েছিলেন। (দীপরক্ষী 2/26.7.1956)
রাজাকে কতখানি প্রজাস্বার্থী হতে হবে সেইটেই রামচন্দ্র দেখিয়েছেন। প্রজা প্রাণের চাইতেও বেশী না হলে রাজা হওয়া যায় না। …….সীতাও ছিলেন রামচন্দ্রের আদর্শে উৎসর্গীকৃত। আর এই ছিল আমাদের আর্য্যবিবাহের তাৎপর্য্য। (আ. প্র. 20/9. 8. 1951)
।। শ্রীকৃষ্ণ স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।
“ধর্ম যখনই বিপাকী বাহনে
ব্যর্থ অর্থে ধায়,
পুরুষোত্তম আবির্ভূত হন
পাপী পরিত্রান পায় ।”
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের উপরোক্ত বাণীর সাথে শ্রীকৃষ্ণ
প্রদত্ত
“যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লাণির্ভবতি ভারতঃ।
অভ্যুত্থানম্ ধর্মস্য তদাত্মনম্ সৃজাম্যহম্।।
পরিত্রাণায় সাধুনাম্
বিনাশয়চ
দুষ্কৃতাম্ ।
ধর্ম
সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ।।”
প্রায়
সমার্থক বাণীটির যুগোপযোগী সংস্করণ করেছেন বর্তমান পুরুষোত্তম ।
শ্রীকৃষ্ণ
যুগ সংস্কারের প্রয়োজনে দুষ্কৃতি বা পাপীদের বিনাশের কথা বলেছেন আর ঠাকুর পাপীদের
পরিত্রাণের কথা বলেছেন । এইটুকুই পার্থক্য ।
শ্রীকৃষ্ণ, বৃহত্তর রাষ্ট্রকে
অধর্মের গ্যাংগ্রীন থেকে বাঁচাতে
ধর্ম নামের মলম লাগিয়ে
বিফল হবার পর সুকৌশলে কংস, জরাসন্ধ, শিশুপাল, শাল্ব
কৌরবাদির ন্যায় আততায়ীরূপী গ্যাংগ্রীনদের অপারেশন করেছিলেন ।–হিংসাকে হিংসা দ্বারা প্রতিরোধ করে অহিংসার প্রতিষ্ঠা
করেছিলেন!
কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বর্ণাশ্রমধর্মভিত্তিক পরমরাষ্ট্রিক
সমবায় ।
শ্রীকৃষ্ণের পরবর্তী ঋত্বিক সংঘ সক্রিয় থাকার ফলে জনন বিপর্যয় হয় নি । ফলে তিন হাজার বছর পর্যন্ত বৃহত্তর আর্যাবর্তে আগ্রাসন করতে সাহস পায়নি দুষ্কৃতিরা ! যখন থেকে বর্ণাশ্রম-ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের শিক্ষা ভুলে প্রবৃত্তির অধীনস্থ ক্লীব হয়েছি, তখন থেকে আমরা আগ্রাসনের শিকার হয়েছি । আগ্রাসনের চরম বিপর্যয় ইংরেজ অপশাসন থেকে আর্যাবর্তকে মুক্ত করতেও সম্বল ছিল শ্রীকৃষ্ণের গীতার আদর্শ ! স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম শহীদ ক্ষুদিরাম ‘গীতা’-বর্ণিত ‘‘হতো বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং/জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম্’’-এর অমরত্বের মহান আদর্শে ফাঁসি বরণ করে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মৃত্যুঞ্জয়ী হতে শিখিয়েছিলেন। সেইসব বীরগাঁথা ভুলে আমরা তাঁর ঋণ শোধ করছি,‘ কৃষ্ণ করলেই লীলা, আমরা করলেই বীলা’ গানের ডালি সাজিয়ে! যদিও ওই গান রচনা করার সাহস আমরাই দিয়েছি,–যারা ধর্মের ধ্বজা ধরে প্রবৃত্তিকে পোষণ দিয়ে চলেছি।–পার্থসারথী শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমদ্ভাগবতগীতার আদর্শ ভুলে, হ্লাদিনি শক্তিরূপিনী রাধা-তত্ত্ব ভুলে, মনগড়া প্রবৃত্তি-প্ররোচিত মানবী রাধা, শ্রীকৃষ্ণের মামীর সাথে পরকীয়া কামুক-রূপে, গোপিনীদের বস্ত্রহরনকারী-রূপে শ্রীকৃষ্ণকে চিত্রিত করে!
‘রাই জাগো রাই জাগো বলে শুক-সারি বলে, কত নিদ্রা যাওগো রাধে শ্যাম-নাগরের কোলে। শ্যাম অঙ্গে অঙ্গ দিয়া আছোরে রাই ঘুমাইয়া তোমার কি লোকলজ্জা নাই….’ ইত্যাদি চটুল কথায় প্রভাতী সুর লাগিয়ে বৈষ্ণবীয় শ্রীকৃষ্ণ আরাধনা আর্য্যকৃষ্টি বিরোধী প্রবৃত্তি-প্ররোচিত পরদারাসক্ত ব্যতীত কোন্ আধ্যাত্মিক আবেদনে সমৃদ্ধ ? ওইসব জাগরণী গান শুনে, এবং কবি জয়দেব বিরচিত গীতগোবিন্দের ছত্রে ছত্রে বর্ণিত কামবিলাসী পরকীয়া শ্রীকৃষ্ণের কীর্তিকলাপ পড়ে, যদি কোন তথাকথিত নাস্তিক্যবাদী শ্রীকৃষ্ণের চরিত্র কালিমালিপ্ত করে,– সেই ধর্মবিরোধী, ইষ্টবিরোধী প্রচারের জন্য দায়ী কারা ?
পণ্ডিতদের মতে কংসের দূত হয়ে মহামতি অক্রুর বলরামসহ শ্রীকৃষ্ণকে বৃন্দাবন থেকে মথুরায় নিয়ে যান কংস আয়োজিত ধনুর্যজ্ঞে অংশগ্রহণ করাতে। কংসের উদ্দেশ্য ছিল শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করার। পরিবর্তে শ্রীকৃষ্ণ অত্যাচারী কংস-মামাকে হত্যা করে পিতামহ উগ্রসেনকে রাজ্য প্রত্যর্পণ করেন। তারপর ঘোর আঙ্গিরসের সান্নিধ্যে পরাবিদ্যা এবং সান্দিপনী কাশ্যের সান্নিধ্যে অপরাবিদ্যা লাভ করেন।
পণ্ডিতদের এই সাক্ষ্য থেকে প্রমাণিত শ্রীকৃষ্ণ ১১ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে কংসকে বধ করেন। অথচ বেশীরভাগ কৃষ্ণভক্তগণ বৃন্দাবন লীলার, রাসলীলার নামে কিশোর শ্রীকৃষ্ণকে মানবী রাধার সাথে যুগলবন্দী করে শ্রীকৃষ্ণকে পরকীয়া কামুক রূপে চিত্রিত করে চলেছেন।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতে, রাসলীলা ভগবানের সাথে ভক্তের কেন্দ্রায়িত ছন্দায়িত নিত্যলীলার প্রদর্শণী। এই কেন্দ্রায়িত চলন একটা এ্যাটমের মধ্যেও আছে—রাসলীলা যেন এ্যাটমের মধ্যেকার নিত্য-গতিশীলতার ও সুকেন্দ্রিক অনুচলনের প্রতীক। রাস মানে ধ্বনি, ধ্বনিতে বিহার করেন যিনি, তিনি রাসবিহারী। শব্দযোগেই তাঁর অবস্থান।
শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর লীলাসঙ্গী অশ্বিনীদাকে বলেছিলেন, ‘‘ভাগবতের একটা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা লিখতে পারেন ? লোকে প্রকৃত ভাবটা হারিয়ে ফেলে কেবল লীলা বা রূপকের দিকটা নিয়ে আছে । মুখে বলে নিত্য বৃন্দাবন, নিত্য লীলা, নিত্য রাস হচ্ছে, কিন্তু তার ভেদ জানে কয় জন? আর, যেটাকে সাধারণতঃ নিত্য বলে, সেটাকেও রূপকথার একটা ছাযার মত কল্পনা ক’রে রেখেছে। কথার ব্যুৎপত্তিগত অর্থের দিকে দৃষ্টি করলেও অনেকটা বোঝা যায়। যেমন রাস মানে ধ্বনি, রাস-বিহারী অর্থাৎ রাসে,ধ্বনিতে বিহার করেন যিনি। Creation (সৃষ্টি)-এর sound-theory (নাদ-সিদ্ধান্ত), শব্দ-ব্রহ্ম এসে পড়েছে নাকি? রাধ্-ধাতু অর্থে নিষ্পন্ন করা বুঝায়। রাধা অর্থাৎ যিনি সব নিষ্পন্ন করেন, সেই শক্তি। তিনি আবার ব্রজেশ্বরী, ব্রজ-ধাতু অর্থে গমন করা—গতিশীলা। ব্রজেশ্বরী রাধা অর্থে সর্ব্বশ্রেষ্ঠা গতিশীলা নিষ্পন্নকারিণী শক্তি, অর্থাৎ আদি শব্দ-ধারা sound-current. চৈতন্য ধারা বা spirit-current. শ্রীকৃষ্ণ নিত্যলীলা করছেন, গোপীরা সেই আকর্ষণরাজের রাসে—ধ্বনিতে আকৃষ্ট হ’য়ে তাঁর দিকে ছুটছে,—জীবজগৎ তাঁর দিকেই যাচ্ছে। একটু hint (আভাস) দেওয়া রইল; ভাগবতাদি দেখে চেষ্টা করলে মাথা খুলে যেতে পারে, আর বোধহয় লিখতেও পারেন।’’ (অমিয়বাণী ২৯শে অগ্রহায়ণ, রবিবার, ১৩২৪)
এ-যুগের শ্রীকৃষ্ণ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর বিকৃতচারী-পাপীদের পরিত্রাণ উদ্দেশ্যে বললেন–
“ভগবান, ইষ্ট বা ধর্ম্মের মৌখিক স্তুতির ভিতর-দিয়ে যা’রা ধর্ম্মবিরোধী কাজ করে, তা’রা হ’ল সব চাইতে বড় শয়তানের দূত–প্রকৃষ্ট লোক-দূষক । ১২৫ । (শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭)
,,,,,,শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে বুঝিয়ে দিলেন যে devil (শয়তান) যদি রাজত্ব করে, তবে অর্জ্জুনের ঈপ্সিত ধর্ম্ম, জাতি, কুল, মান কিছুই রক্ষা পাবে না। তাই devil (শয়তান)-কে demolish (ধ্বংস) করা লোকমঙ্গলের জন্যই অপরিহার্য্য। এর মধ্যে দ্বেষ-হিংসার বালাই নেই। বরং অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধকে এড়িয়ে চলার বুদ্ধির পিছনে আছে দুর্ব্বলতা।’’ (আ. প্র. খণ্ড ৬, ৬. ১২. ১৯৪৫)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র শ্রীকৃষ্ণ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘শ্রীকৃষ্ণ সব সময়েই চেষ্টা করেছেন যুদ্ধবিগ্রহ avoid (পরিহার) করতে, কিন্তু তাঁর environment (পরিবেশ) তাঁকে সে scope (সুযোগ) দিল না। আর শ্রীকৃষ্ণের যুদ্ধ—মৃত্যুকে মারবার জন্য। Gangrene-affected part of the body (শরীরের দুষ্টক্ষতযুক্ত স্থান) আমরা যেমন কেটে ফেলি জীবন বাঁচাবার জন্য, তিনিও তেমনি মৃত্যু ও মারণের মূর্ত্ত প্রতীকস্বরূপ যারা ছিল তাদের মেরেছিলেন সমগ্র সমাজকে বাঁচাবার জন্য। (আ. প্র. খণ্ড ১, ৪. ১২. ১৯৪১)
।। পরমপুরুষ শ্রীবুদ্ধদেবের স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।
রাজার ঘরে জন্ম। রাজৈশ্বর্য্যের কোন আকর্ষণই তাঁকে ক্ষুদ্র সংসার মায়ায় আবদ্ধ করতে পারল না। রোগ-শোক-ব্যাধি-জরায় জর্জরিত হয়ে দেহত্যাগ না করে দেহাতীত আত্মার স্বরূপ সন্ধানে হলেন গৃহহারা। সাধনায় সিদ্ধ হয়ে লাভ করলেন বোধি। সিদ্ধার্থ হলেন বুদ্ধদেব। আমাদের বোধকে প্রবুদ্ধ করতে দিলেন চারটি আর্যসত্য।–১.দুঃখ, ২. দুঃখের উৎপত্তি, ৩. দুঃখ নিরোধ ও ৪. দুঃখ নিরোধগামী মার্গ। এই চার আর্য সত্যের উপর ভগবান বুদ্ধের সামগ্রিক ধর্ম-ভাবনা প্রতিষ্ঠিত। দুঃখ নিরোধগামী মার্গকেই অষ্টাঙ্গিক মার্গ বলা হয়েছে।–১. সম্যক দৃষ্টি (দৃষ্টি শুদ্ধতা)। ২. সম্যক সংকল্প—কাম, হিংসা, প্রতিহিংসা পরায়নতা ত্যাগ করে মৈত্রী ও করুণার সংকল্প। ৩. সম্যক বাক্য—মিথ্যা ও কটুবাক্য পরিহার করে সত্য, প্রিয়, মিষ্ট ও অর্থপূর্ণ বাক-বিনিময় করা। ৪. সম্যক কর্ম—প্রাণী হত্যা, চুরি, ব্যাভিচার ও মাদক দ্রব্য ত্যাগ করে, দয়া, বদান্যতা ও চরিত্র সৎ রাখার কর্ম। ৫. সম্যক জীবিকা—অসৎ জীবিকা ত্যাগ করে সৎ জীবিকার আশ্রয় গ্রহণ। ৬. সম্যক উদ্যম—ইন্দ্রিয় সংযম, কুচিন্তা ত্যাগ, সুচিন্তার আশ্রয়, সৎ চেষ্টার বৃদ্ধি। ৭. সম্যক স্মৃতি–কায়, বেদনা, চিত্ত ও মানসিক ভাবের অমলিন স্মৃতি। সম্যক সমাধি—প্রবৃত্তির দুষ্ট চিন্তা ত্যাগ করে সাত্তিক সাধনায় আত্ম-সমাহিত হওয়া।
বুদ্ধদেবের মতবাদ শ্রীকৃষ্ণের আদর্শের পরিপূরক হওয়া সত্বেও বুদ্ধ অনুগামীরা আর্যকৃষ্টির আশ্রমধর্মকে মান্যতা না দিয়ে সন্ন্যাস মাধ্যমে মোক্ষ লাভ করতে গিয়ে বর্ণাশ্রমানুগ বিন্যস্ত সমাজ ব্যবস্থার ক্ষতি হয়। হীনযান, মহাযান, তন্ত্র প্রভৃতি উপ-বিভাগের মতানৈক্যের ফলে সনাতনী আর্যকৃষ্টির প্রবহমানতার গতি রুদ্ধ হয়। বিবাহের উপযুক্ত শ্রেয় ঘরের, তুল্য বংশের পাত্রের অভাবে প্রতিলোম বিবাহ হতে থাকে।
বৌদ্ধধর্ম্ম
প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন,—‘‘বৌদ্ধমত ও হিন্দুমতে পার্থক্য খুব কম ।
একই কথা রকমারি করে বলা । শুনেছি বুদ্ধদেবের
কথার মধ্যে প্রকারন্তরে বর্ণাশ্রমের সমর্থন আছে । …… তিনি গৃহীদের
বিয়ে-থাওয়া, চাল-চলন-সম্বন্ধে
যে-সব নির্দ্দেশ
দিয়েছেন, তার সঙ্গে
বর্ণাশ্রমের কোন বিরোধ নেই । অশোক বৌদ্ধধর্মের যে রূপ দিলেন, তার মধ্যে বর্ণাশ্রম খুঁজে পাওয়া যায় না । বর্ণাশ্রম হ’লো একটা scientific social structure (বৈজ্ঞানিক
সমাজ বিধান) । এই structure (কাঠামো) ভেঙ্গে দিলে মানুষের
অন্তরে-বাহিরে একটা chaotic condition-এর (বিশৃঙ্খল অবস্থার)
সৃষ্টি হয় ।’’ (আ. প্র. ৬ খণ্ড, ২৩. ১২. ১৯৪৫)
‘‘অশোকের হাতে পড়ে বৌদ্ধধর্ম্মের কিছু কিছু বিকৃতি দেখা দিল। বৌদ্ধদের সংখ্যা বাড়ল বটে, কিন্তু বর্ণাশ্রমের বাঁধন রইল না। তারপর এল শঙ্করাচার্য্যের মায়াবাদ—‘ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা’। মানুষ ভুলে গেল যে আধ্যাত্মিকতা সার্থক হয় সাত্বত বস্তুতান্ত্রিকতায়। বুদ্ধদেব ও শঙ্করাচার্য্য এই দুইজনের সময় থেকেই অসৎ নিরোধের উপর গুরুত্ব দেওয়া হল না। ‘সোহহং’ চর্চ্চার ফলে ব্যক্তিগত সাধনার উপরই জোর দেওয়া হল। একটা সর্ব্বাঙ্গীন ভাবধারা কোথাও রইল না। একটা মূল সূত্রের উপর দাঁড়িয়ে বৈশিষ্ট্যপালী রকমে সমাজ, রাষ্ট্র সব নিয়ে একটা সর্ব্বসঙ্গতিসম্পন্ন ধারা ফুটে উঠল না। এই সবের ফলে এসেছিল নির্ব্বীর্য্যতা। তোমরা যদি এই সর্ব্বতোমুখী কার্য্যক্রম নিয়ে তেমনভাবে তৈরী হও, তাহলে সব সম্প্রদায়ের সঙ্গে সঙ্গতি নিয়ে আবার তোমরা অসৎনিরোধী পরাক্রম-প্রবুদ্ধ হয়ে বৈশিষ্ট্যপালী আপূরয়মাণ আদর্শের উপর দাঁড়িয়ে জগতে অজেয় হতে পারবে।’’ (আ. প্র. ২১ খণ্ড, ১১. ০৫. ১৯৫২)
।। প্রভু যীশুখ্রীস্ট স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি ।।
প্রভু যীশু ব্যভিচারের বিরুদ্ধে, অনাচারের বিরুদ্ধে, পৌত্তিলকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে সবাইকে সনাতনী ঈশ্বরপ্রেমে অভিষিক্ত করতে চাইলেন। তাঁর সত্তাপ্রেমী আবেদন প্রবৃত্তি-প্রেমীদের সহ্য হলো না, ফলস্বরূপ তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ হতে হলো। মানবতার শত্রু হলো জুডাস।
যীশুর ক্রুশবিদ্ধের কথা উঠলে, শ্রীশ্রীঠাকুর করুণ কণ্ঠে ছলছল নেত্রে বললেন,–‘‘সেদিন যেমন যীশু crucified (ক্রুশবিদ্ধ) হয়েছিলেন, আজকের দিনেও সেই যীশু তেমনি করে crucified (ক্রুশবিদ্ধ) হয়ে চলেছেন মানুষের হাতে। এই পাপের নিবৃত্তি না হলে মানুষের নিস্তার নেই। নিস্তারের একমাত্র পথ হলো মূর্ত্ত ত্রাতা যিনি তাঁকে sincerely follow (অকপটভাবে অনুসরণ) করা। তাহলে আমাদের ভুল-ত্রুটিগুলি ধীরে ধীরে শুধরে যাবে। ঠিকপথে চলতে শুরু না করলে, ভুলপথে চলার অভ্যাস আরো মজ্জাগত হবে তার chain reaction (শ্রেণীবদ্ধ প্রতিক্রিয়া) চলতে থাকবে।’’ (আ. প্র. ২৫.০১.১৯৪৮)
প্রভু যীশু চরম ত্যাগ ও নির্ভরতার কথা বলেছেন।–পাখীদের বাসা আছে, শেয়ালের গর্ত আছে, কিন্তু তোমাদের মাথা গোঁজবার স্থান থাকবে না, কোন কিছুরই সংস্থান থাকবে না। ঈশ্বরের উপর নির্ভর করে নিঃস্ব ও চাহিদাশূণ্য হয়ে তোমরা শুধু মানুষের মঙ্গল করে চলবে, নিজেদের জন্য কোন ভাবনা রাখবে না। ঈশ্বরের দয়ায় যখন যেমন জোটে, তাতেই সন্তুষ্ট থাকবে।
“Charm yourself if you wish charm everyone.
Do not hate anyone, hate their errors, correct their errors.
Think yourself always powerful. Think not yourself that you are an idle fellow. Try to keep your mind always powerful. A soul of Peter─I the soul of universe.” (Punya-Punthi)
“The love of money is the root of all evil.”
—New Testament, Timothy
St. Mathew
“Man is not to live on bread alone, but on every word that issues from the mouth of God.” —Chap. IV, Vs. 4-5
“What is a man profited, if he shall gain the whole world and lose his own soul ?”
“Anyone who divorces his wife for any reason except unchastely, makes her an adulteress, and whoever marries divorced woman commits adultery”. (5:32)
“Do not be troubled then and cry : ‘What are we to eat ? Or What are we to drink ? Or how are we to be clothed ?’ For well your heavenly father knows, you need all that. Seek God’s Realm and his goodness, and all that will be yours over and above.”
St. Mathew —Chap. VI, Vs. 31-33
“Never imagine I have come to bring peace on earth ; I have not come to bring peace but a sword. He who receives a prophet because he is a prophet, will receive a prophet’s reward. He who has found his life shall lose it, and he who loses his life for my sake shall find it.”
—Chap. XXIV, Vs. 42
St. Mark
“Go and sell all you have, give the money to the poor and you will have treasure in heaven ; then come, take up the cross and follow me.” —Chap. X, Vs. 21-22
James
“For as the body without the breath of life is dead, so faith is dead without deeds.” —Chap. II, Vs.26
“But
I tell you, any one who divorces his wife for any reason except unchastity
makes her an adulteress, and whatsoever marries a divorced woman commits
adultery.”
–Chap. V, Vs. 32
অধ্যাপক ও ফরীশীগণ ব্যভিচারে লিপ্ত এক নারীকে ধরে এনে শ্রীযীশুর কাছে সমর্পণ করে বিচার প্রার্থনা করে বলে, ‘‘হে গুরু এই স্ত্রী লোকটি ব্যভিচার ক্রিয়ায় ধরা পড়েছে। মোশি এমন লোককে পাথর মারার আজ্ঞা দিয়েছেন, আপনার বিচারে কি বলেন।” যীশু নীরব; মাথা নীচু করে কেবল পায়ের আঙ্গুল দিয়ে ভূমিতে কী লিখে চলেছেন। ফরীশীগণ বার-বার জিজ্ঞাসা করায় তিনি মাথা উঁচু করে বললেন, “তোমাদের মধ্যে যে নিষ্পাপ সেই প্রথমে একে পাথর মারুক।”
He that is without sin among you, let him first cast a stone at her,
(St John, 8:7.)
তিনি আবার মাথা নীচু করে লিখতে থাকেন ভূমিতে পায়ের আঙ্গুল দিয়ে। কিছুক্ষণ নীরবে গেলে, যীশু মাথা উঁচু করে দেখলেন, স্ত্রীলোকটি ছাড়া আর কেউ নেই। তিনি স্ত্রীলোকটিকে বললেন, “হে নারী তোমার অভিযোগকারীগণ কোথায়, তারা কেহ কি তোমায় দোষী করে নি?’’
নারী কহিল—“না প্রভু, কেহ করে নি।” যীশু বললেন, “আমিও তোমাকে দোষী করি না, যাও আর কখনো এ মুহূর্ত হতে কোন রকম পাপ কর্ম করবে না।’’
—Neither do I condemn thee, go, and sin no more.
(St, John.8:11)
ওই মা-টি যীশুর প্রেমের পরশে স্নাত হয়ে সাধ্বী হয়েছিলেন । তাঁর প্রেমের পরশে মাছ-ধরা জেলেরা মানুষ-ধরা সাধকে পরিণত হয়েছিলেন।
তাই আমরা যদি বছরে একটি বড়দিন উদযাপনের-এর পাশাপাশি বাকি দিনগুলি প্রভুর যীশুর আদর্শের অনুসরণে আমাদের ছোট আমি-টাকে বড় করে তুলতে চেষ্টা করতাম ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতা, হিংসা, বিবাহ-বিচ্ছেদ, ভ্রষ্টাচার এভাবে ব্যাপ্তি লাভ করতে পারত কি ?
।। মুংপর্ব-মিলাদ-উন-নবী বা ইদ-এ-মিলাদ (পয়গম্বর হজরত মহম্মদের আবির্ভাব মুং ১২ রবিয়ল আউয়ল) স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।
ইসলাম মতবাদের জনক হজরত রসুল ব্যভিচারের বিরুদ্ধে, পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে, শয়তানীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে মানুষকে আর্য্য-সনাতনী আদর্শের অনুরাগী করেছেন। অথর্ব বেদের অথর্বন সূক্তে অল্লার বর্ণিত স্বরূপ “অল্লো জ্যেষ্ঠং শ্রেষ্ঠং, পরমং, পূর্ণং ব্রাহ্মণমল্লাং………ইল্লাকবর, ইল্লাকবর, ইল্ললেতি, ইল্লাল্লা…..” (সূত্রঃ জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস-এর বাঙ্গলা ভাষার অভিধান)—–আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করেছেন, কোন বিভেদ সৃষ্টি করেন নি। তিনি নিরামিষাশী ছিলেন, আর্ষ্যকৃষ্টি মেনে চলতেন, ধর্মান্তকরণের বিরোধী ছিলেন, পরবর্তী নবী বা অবতারদের অনুসরণ করতে বলেছেন।
হজরত রসুল সম্পর্কে বিশদ বিবরণী সংকলন, সৎসঙ্গ পাব্লিশিং হাউস কর্তৃক প্রকাশিত ইসলাম প্রসঙ্গে গ্রন্থ থেকে কিছু উদ্ধৃতি তুলে ধরলাম।–পাঠকদের জ্ঞাতার্থে।
বাসোপযোগী গৃহ, গুপ্তস্থান রক্ষা করিবার উপযুক্ত বস্ত্র, শুষ্ক-রুটি ও পানীয় ব্যতীত মানব-সন্তানের অন্য কোন জিনিসের উপর অধিকার নাই। (পৃঃ ৫৯)
একটু পানি এবং কয়েকটি খর্জ্জুরে তাঁহার ক্ষুধার নিবৃত্তি হইত। হজরত মোহাম্মদ একাধারে ধর্ম্ম-প্রবর্ত্তক, মহাকর্মী এবং সন্ন্যাসী ছিলেন।
শত্রুর প্রতিও তিনি পরম দয়ালু ছিলেন, তিনি কতবার যে বিনা প্রয়োজনে দুষ্মনকে ক্ষমা করিয়াছেন তাহার সংখ্যা নাই। (পৃঃ ৬০)
একমাত্র ব্যভিচার সত্তর বৎসরের এবাদত ধ্বংস করে।
যখন মানুষ ব্যভিচার করে, তখন ঈমান তাহাকে ত্যাগ করে।
হজরত রসুলুল্লাহ লম্পট পুরুষ ও রমণীকে অভিসম্পাত করিয়াছেন এবং তাহাদিগকে গৃহ হইতে বহিষ্কৃত করিতে বলিয়াছেন। (পৃঃ ১৭৭)
বিবাহ কর কিন্তু তালাক দিও না, কারণ উহাতে আরশ কম্পিত হয়।(পৃঃ ২০০)
বিশেষ কোন অপ্রিয় কারণ না থাকিলে স্ত্রীদিগকে তালাক দিও না—কারণ, আল্লাহ স্বাদগ্রহণকারী পুরুষ বা স্বাদগ্রহণকারিণী স্ত্রীলোককে ভালবাসেন না। (পৃঃ ২০১)
পয়গম্বর ব্যতীত যাহারা কেবল খোদাতায়ালাকে মান্য করে তাহারা মুসলমান নহে। (পৃঃ ৬৮)
ইসলাম শব্দের অর্থ ঈশ্বরের নিকট সম্পূর্ণ আত্মনিবেদন। (পৃঃ ১৪২)
সাময়িক প্রেরিত-পুরুষকে মান্য করিলে ঈশ্বরকে মান্য করা হয়। তদ্ব্যতীত ঈশ্বরের আদেশ মান্য করা মিথ্যা।
প্রেরিতদের বিরোধী হইয়া শুদ্ধ ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসী হইলে বিশ্বাসের পূর্ণতাই হয় না। (পৃঃ ১৪২)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আলোচনা প্রসঙ্গে জনৈক হকসাহেবকে বলছেন,—‘‘ইসলাম শব্দের মানে আমি শুনেছি, খোদায় আত্মনিবেদন বা শান্তি। সব ধর্ম্মেরই তো মূলকথা এই। সব ধর্ম্ম বললে কথাটা ভুল বলা হয়, কারণ ধর্ম্ম বহু নয়, ধর্ম্ম একই। আর কলেমা, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত এই পাঁচটি অনুষ্ঠান শুনেছি, মুসলমানদের অবশ্য করণীয়। প্রত্যেক শাস্ত্রেই তো এই বিধান আছে, তবে হয়ত ভিন্ন ভাষায়, ভিন্ন নামে হতে পারে। কলেমা মানে আমি বুঝি, খোদাতালায় বিশ্বাস রেখে প্রেরিত পুরুষকে স্বীকার করে তাঁর অনুশাসনে চলা। এই বিশ্বাস, স্বীকৃতি ও অনুসরণ ধর্ম্মের প্রথম ভিত্তি। হিন্দুর মধ্যেও আছে যুগপুরুষোত্তম বা সদগুরুর কাছে দীক্ষা গ্রহণ করে তাঁকে অনুসরণ করে চলার কথা। খ্রীষ্টানদের মধ্যেও আছে baptism (অভিষেক)-এর প্রথা। বৌদ্ধরাও আনুষ্ঠানিকভাবে ত্রিশরণ-মন্ত্র গ্রহণ করে থাকে বলে শুনেছি। এই স্বীকৃতি, এই পুরুষশ্রেষ্ঠকে আপন করে নেওয়ার মধ্য দিয়েই তাঁর অনুবর্ত্তনে চলার পক্ষে সুবিধা হয়। আর নামাজ মানে সন্ধ্যা, বন্দনা, প্রার্থনা। মানুষ ইষ্টের স্মরণ, মনন যত করে, তত তার মন পবিত্র হয়ে ওঠে, প্রবৃত্তিগুলিকে সুনিয়ন্ত্রিত করবার কায়দা পায়, আত্মবিশ্লেষণ ও আত্মসমীক্ষণে পটু হয়, তাছাড়া এতে করে ইষ্টিচলনের সম্বেগ বাড়ে, তাই এ নির্দ্দেশও সর্ব্বত্র আছে। আর রোজা মানে ইষ্টচিন্তাপরায়ণ হয়ে সুনিয়ন্ত্রিত উপবাস, এতে শরীর মনের অনেক গলদ বেরিয়ে যায়, ইচ্ছাশক্তি প্রবল হয়ে ওঠে। শুনেছি বিধিমাফিক উপবাস কাম-দমনের পক্ষেও সহায়ক। এও সবারই করণীয়, যে যে-পথেই চলুক। হজ মানে তীর্থযাত্রা, ভাবসিক্ত হয়ে তীর্থ-দর্শন করলে আমরা সাধু-মহাপুরুষদের ভাবে অনুপ্রাণিত ও অভিষিক্ত হয়ে উঠি। এ বিধানও সবার মধ্যে আছে। আর জাকাত মানে ধর্ম্মার্থে দান, ইষ্টার্থে উত্সর্গ। এই বাস্তব করণের ভিতর দিয়ে ইষ্টের প্রতি আমাদের অনুরাগ বাড়ে, তাছাড়া আমাদের উদারান্ন-আহরণী কর্ম্মও ইষ্টসার্থকতায় সার্থক হয়ে উঠতে থাকে। এইভাবে ইষ্ট আমাদের সব-কিছুতে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে ওঠেন। সংসারে চলতে আমাদের হাজারো তাল নিয়ে চলতে হবে, কিন্তু যদি সবটার মধ্যে যদি ইষ্টকে স্থাপনা করতে পারি, তাহলেই আমরা বহু অনিষ্ট, বিপদ, আপদ ও অনর্থের হাত হতে রেহাই পেতে পারি। আপনাদের যেমন জাকাত আছে, তেমনি অন্যত্র আছে ইষ্টভৃতি। এই ইষ্টভৃতি যে কত বড় জিনিস, মানুষের কত বড় রক্ষা-কবচ তা করলেই বোঝা যায়। আবার এর ভেতর দিয়ে দুঃস্থ পরিবেশও প্রভূত উপকৃত হয়। তাহলেই দেখুন, মূল জিনিসগুলি সর্ব্বত্র সমান কিনা।’’ (আ. প্র. ২/২৪. ১২. ১৯৪১)
।। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যদেবের স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।
কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা চৈতন্যদেব আর্য্যকৃষ্টি বিরোধী বৌদ্ধ-তান্ত্রিকতার পৌত্তলিকদের, শুষ্ক জ্ঞানচর্চাকারী তর্কবাগীশদের, তামসিক ধর্মাচ্ছন্নদের উদ্দেশ্যে পথ-নির্দেশ করলেন ‘হরেরাম হরেকৃষ্ণ’ ফরমূলার মাধ্যমে।–তোমার পাপ, তাপ হরণ করতে, প্রবৃত্তির পাপ-তাপের জ্বালা জুড়াতে পারে রামচন্দ্রের আদর্শ, শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ।
চৈতন্যদেব পুরুষার্থের চতুর্বর্গ, আশ্রমধর্মের ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ পালন করেছেন। অসৎ-নিরোধে তৎপর নিমাই পণ্ডিত কোন প্রতিলোম বিবাহ পর্যন্ত হতে দেন নি। দোর্দন্ডপ্রতাপ জমিদারের দুষ্কৃত ভাইপো মাধবের কবল থেকে চন্দনের বাগদত্তা চুয়াকে পার্ষদদের সাহায্যে চন্দনকে দিয়েই হরণ করিয়ে স্বয়ং পৌরহিত্য করে উপযুক্ত পাত্রে পাত্রস্থ করেছেন। ( শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত, চুয়াচন্দন উপন্যাস) অসি নয়, তীর-ধনুক-বল্লম লাঠি দিয়েও নয়—খোল, করতালাদি বাদ্যযন্ত্রের অনুষঙ্গে ‘হরেরাম হরেকৃষ্ণ’ নামগানের প্লাবন সৃষ্টি করে,–পুরুষার্থের পঞ্চম-বর্গ প্রেম-ধর্মের সাহায্যে সাম্প্রদায়িক কায়েমী-স্বার্থীদের বিরুদ্ধে ভাগবত আন্দোলনের মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে ভাগবত ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
চৈতন্য চরিতামৃতের বর্ণনায় রয়েছে—
“আত্মেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা তারে বলি কাম।
কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা, ধরে প্রেম নাম।
কামের তাৎপর্য্য নিজ সম্ভোগ কেবল।
কৃষ্ণসুখ তাৎপর্য্য প্রেম মহাবল।।”
চৈতন্যদেবের পরবর্তীকালে কিছু প্রবৃত্তিমার্গী অনুগামীরা ‘‘কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা’’-র আশ্রম-ধর্মের তাৎপর্য্য ভুলে “আত্মেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা”-য় সহজিয়া গোষ্ঠী তৈরি করে সগোত্র এবং প্রতিলোম বিবাহাদি সমর্থন করে আশ্রমধর্মকে অশ্রদ্ধা করেছেন। ফলে বিকৃত হয়েছে শ্রীকৃষ্ণ-চৈতন্যদেবের আদর্শ। শ্রীকৃষ্ণের গীতার অসৎ-নিরোধী আদর্শকে পাশ কাটিয়ে মনগড়া কৃষ্ণ-নামের কীর্তন করা সত্বেও বিদেশী আগ্রাসনে পরাধীন হতে হয়েছে ভারতবাসীকে।
চৈতন্যদেব প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, ‘‘চৈতন্যদেবের দ্বৈতবাদ নয়, দ্বৈতভাব। মূলতঃ সকলের বাদই অদ্বৈত, কারণ, একের উপরই দাঁড়িয়ে আছে যা-কিছু, আদিতে এক ছা়ডা দুই নেই। একেরই স্থূল, সূক্ষ্ম, কারণ নানাস্তর ও অভিব্যক্তি আছে। কিন্তু ভক্তিই তাঁকে লাভ করার সহজ পথ। ভক্তির মধ্যে দ্বৈতভাব এসে পড়ে, ভক্ত নিজের সত্তা না হারিয়ে ভগবানকে ভজনা করে চলে। ভক্তির সঙ্গে আবার কর্ম্ম ও জ্ঞান অচ্ছ্যেদ্যভাবে জড়ান। একেরই বিচিত্র প্রকাশ বলে সব সমন্বয় হয়েই আছে।’’ (আ. প্র. ১৩/৩১.৭.১৯৪৮)
‘‘ চৈতন্যদেবও জগাই-মাধাইয়ের উপর কেমন উগ্রভাব ধারণ করে তাদের অন্তরে ত্রাস ও অনুতাপ জাগিয়ে তবে প্রেম দেখিয়ে তাদের অন্তর জয় করেছিলেন। তাদের উগ্রদম্ভ, দর্প ও প্রবৃত্তি-উন্মত্ততাকে স্তব্ধ না করে, আয়ত্তে না এনে গোড়ায় প্রেম দেখাতে গেলে সে-প্রেম তারা ধরতে পারত না। হয়তো ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করত।’’ (আ. প্র. ৯/২৭.১২. ১৯৪৬)
চৈতন্যদেবের স্বীয় স্বরূপ প্রকাশ প্রসঙ্গে বর্ণনা রয়েছে “শ্রীচৈতন্য ভাগবত গ্রন্থে—
চৈতন্য আজ্ঞায় স্থির হইল কীর্তন
কহে আপনার তত্ত্ব করিয়া গর্জন।
কলিযুগে মুঞি কৃষ্ণ নারায়ন
মুঞি সেই ভগবান দেবকীনন্দন।।
অনন্ত ব্রহ্মান্ড কোটি মাঝে মুই নাথ
যত গাও সেই মুঞি তোরা মোর দাস।।’’
(শ্রীচৈতন্য ভাগবত পৃষ্ঠা ১৪৬, মধ্যখণ্ড ৮ম অধ্যায়।)
এইমত আর আছে দুই অবতার
সঙ্কীর্তন আনন্দ রুপ হইবে আমার।।
তাহাতেও তুমি সব এই মত রঙ্গে
সঙ্কীর্তন করিবা মহাসুখে আমা সঙ্গে।।
(শ্রীচৈতন্য ভাগবত পৃষ্ঠা ১৪৩,মধ্যখণ্ড ষড়বিংশ অধ্যায়।)
আবার বললেন শচীদেবীর উদ্দেশেঃ–
আর দুই জন্ম এই সঙ্কীর্তনারম্ভে
হইব তোমার পুত্র আমি অবিলম্বে।।
এইমত তুমি আমার মাতা জন্মে জন্মে
তোমার আমার কভু ত্যাগ নহে মর্মে।।
আমরা যে এই সব কহিলাম কথা
আর তুমি মনো দুঃখ না কর সর্বথা।।
কহিলেন প্রভু অতি রহস্য কথন
শুনিয়া শচীর কিছু স্থির হৈল মন।।
(শ্রীচৈতন্য ভাগবত পৃষ্ঠা ২৪৪, মধ্যখণ্ড ষড়বিংশ অধ্যায়।)
“এই নাম নয়রে মাধাই আরও নাম আছে,
এই নাম নিয়ে যাবে সেই নামের কাছে,
সেই নাম বিনেরে ভাই এই নাম মিছে।………”
কাল পূর্ণ হয়নি তাই চরম তত্ত্ব দেয়া
হলো না
পরপর আমি দুই বার আসব। (শ্রীশ্রীচৈতন্য
ভাগবত মধ্যে খণ্ড পৃঃ ২৬৭)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র অবতারে তিনি সেই চরমতত্ত্ব দিয়ে গেলেন। প্রাণমন দিয়ে সাধনা করলেই তিনি ধরা দেবেন মেধানাড়ীতে । যে সূত্র তিনি শ্রীকৃষ্ণ অবতারে দিয়ে রেখেছিলেন— ‘‘বহূনি মে ব্যতীতানি……………..ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জ্জন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জ্জুন।। (শ্রীমদ্ভগবদগীতা চতুর্থোহধ্যায়, ৫—৯ শ্লোক)
।। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।
অবতার বরিষ্ঠমাত্রেই পূর্বাপূর্ব অবতারদের পরিপূরণকারী হন। তাই তো তিনি ‘‘যেই রাম সেই কৃষ্ণ, এক দেহে রামকৃষ্ণ’’ রূপে এসে আমাদের ভুল ভাঙিয়ে দিলেন। গীর্জায় গিয়ে যীশুর, মসজিদে গিয়ে রসুলের আরাধনা করলেন। পঞ্চমুণ্ডির আসন সাজিয়ে কোনো তান্ত্রিক-গুরু বসালেন তো বসে পড়লেন। তিনি লোকশিক্ষার জন্য বহু ধর্মীয় মতবাদের গুরুদের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুন্ন রেখেই। তিনি দক্ষিণেশ্বরে পূজারী হয়ে এসেও প্রচলিত পূজা-পদ্ধতি অনুসরণ করেন নি। মৃন্ময়ী জগন্মাতাকে প্রাণবন্ত করে দেখালেন এবং কালী মায়ের আদেশক্রমে নিজে খেয়ে মাকে খাওয়ালেন। ফলহারিনী কালী পূজার শুভলগ্নে সারদাদেবীকে আরাধনা করে চিন্ময়ী মাতৃশক্তিকে আদ্যাশক্তি রূপে শ্রদ্ধা করতে শেখালেন।
।। শ্রীরামকৃষ্ণদেব প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।
“ভগবান রামকৃষ্ণদেবেরও শোনা গিয়েছে—তাঁর এমনতর সময় এসেছিল, যখন মূর্ত্তি-টুর্ত্তি তাঁর সাধনার পথে বাধাই সৃষ্টি করতো। তিনি এমন-কি তাঁর ঘরে যে-সমস্ত ছবি-টবি ছিল, সেগুলিকেও সরিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি না-কি এই বলেছিলেন—‘মেয়েরা ততদিন পুতুলখেলা করে, যতদিন তার বে’ না হয়, স্বামী-সহবাস না করে।”
(কথা প্রসঙ্গে ২য় খণ্ড, পৃঃ ৭৬, ১৭-১০-১৩৪২)
“শ্রীরামকৃষ্ণদেব ছিলেন তখনকার সময়ের Living Ideal (জীবন্ত আদর্শ)। এই Ideal (আদর্শ-পুরুষ) যখনই যেখানে এসেছেন, তাঁদের মধ্যে সঙ্গতি আছেই। কারণ, সকলেই এক ঈশ্বরের অবতার। ঈশ্বর তো আর দু’জন নয়। আর, ঈশ্বর এক বলে ধর্ম্মও এক। তাই, শ্রীরামকৃষ্ণ কখনও কারো ধর্মমতের নিন্দা করেন নি।” (দীপরক্ষী ৪/৩০. ১১. ১৯৫৮)
শ্রীরামকৃষ্ণঠাকুর বলেছেন,—‘‘চারাগাছ বেড়া দিয়ে রাখতে হয়। চারাগাছ বলতে আমি বুঝি সদ্গুরু, সৎনাম ও সৎসঙ্গ। মানুষ যদি অল্প বয়স থেকে সদগুরু গ্রহণ করে সৎনামের অনুশীলন নিয়ে সৎসঙ্গে অর্থাৎ জীবনবৃদ্ধিদ ভাল পরিবেশের ভিতর বাস করে, তাহলেই তার জীবন অনায়াসে সুগঠিত হতে পারে। মানুষের জীবন যদি কোন সৎ-এ সুনিবদ্ধ না হয়, তাহলে সে যে নানা আবর্তে পড়ে হাবুডুবু খাবে, সে-বিষয়ে কি আর কোন সংশয় আছে ?’’ (আ. প্র. ৫/১০. ৫. ১৯৪৩)
।। কল্পতরু শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব ।।
১৮৮৬ ইংরাজী নববর্ষের দিনে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের কল্পতরু হবার সংবাদ শুনে ভক্তরা সমবেত হয়েছিলেন যে যার মনোবাসনা নিয়ে। অবশেষে দর্শন দিলেন ভক্তদের। সমবেত ভক্তদের উপদেশ দিয়ে বললেন, তোমাদের চৈতন্য হোক।
শ্রীরামকৃষ্ণদেব জীবনের শেষপ্রান্তে বলেছিলেন, এবারে সব জ্ঞান পার্ষদদের দিচ্ছিনা। শীঘ্রই আবার আমাকে আসতে হবে। ঈশান কোণে, গরীব ব্রাহ্মণের ঘরে। তখন যারা না আসবে তাদের মুক্তি হতে অনেক দেরি হবে।
শ্রীরামকৃষ্ণদেব ১৮৮৬তে ইহলীলা সম্বরন করে ১৮৮৮তে আবির্ভূত হন অনুকূলচন্দ্র রূপ নিয়ে। পরিপূর্ণ চৈতন্য দিতে। সেই চৈতন্য লাভের সহজপন্থা দিলেন দৈনন্দিন স্বতঃ-অনুজ্ঞা অনুশীলনের মাধ্যমে। অজর-অমর-চিরচেতন মন্ত্রে।
।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সমন্বয় বার্তা।।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ধর্ম, ও ধর্মীয় সম্প্রদায় বিষয়ে আমাদের চেতনাকে সমৃদ্ধ করতে বিস্তৃতভাবে বললেনঃ
“ধর্ম্ম মানে বাঁচাবাড়ার বিজ্ঞান। যে-কোন মহাপুরুষই তার প্রবক্তা হউন না কেন, তাতে ধর্ম্মের কোন পরিবর্তন হয় না; ধর্ম্ম চিরকালই এক। হিন্দুর ধর্ম্ম যা, মুসলমানের ধর্ম্মও তাই; প্রত্যেক ধর্মমতের লোকই ঈশ্বরপন্থী। আর, সেই ঈশ্বর একজন ছাড়া দুইজন নন। তাঁর প্রেরিত বাণীবাহক যাঁরা, তাঁরাও একই সত্যের উদ্গাতা—একই পথের পথিক—নানা কলেবরে একই সত্তা। তাই ধর্ম্ম মানুষকে মিলিত ছাড়া বিচ্ছিন্ন করে না। ধর্ম্মের থেকে চ্যুত হলেই সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে বিভেদ-বিরোধের সৃষ্টি হয়। হিন্দু যদি প্রকৃত হিন্দু হয়, মুসলমান যদি প্রকৃত মুসলমান হয়, তারা বান্ধববন্ধনে আবদ্ধ হতে বাধ্য; বাপকে যে ভালবাসে, সে কখনও ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ হতে পারে না। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের উপাস্যই এক ও অদ্বিতীয়; তাই সম্প্রদায়গুলি ভাই-ভাই ছাড়া আর কি? মানুষের সহজ বুদ্ধিতে সবই ধরা পড়ে; গোলমাল করে দূরভিসন্ধিপ্রসূত অপব্যাখ্যা ও অপযাজন। ধর্ম্ম যদি বিপন্ন হয়ে থাকে, তবে সবচাইতে বেশী বিপন্ন হয়েছে, এমনতর অপযাজকদের হাতে। প্রত্যেক ধর্ম্মমতের আসল রূপটি তুলে ধরতে হবে সাধারণ লোকের কাছে; তাহলে দুষ্টলোকের জারীজুরি খাটবে না। হিন্দুর যেমন হিন্দুত্বের বিকৃতি বরদাস্ত করা উচিত নয়, তেমনি উচিত নয় ইসলামের বিকৃতি বরদাস্ত করা। মুসলমানেরও তেমনি উচিত নয় ইসলাম ও হিন্দুত্বের আদর্শকে ক্ষুণ্ণ হতে দেওয়া। কোন ধর্ম্মাদর্শকে ক্ষুণ্ণ হতে দেওয়া মানে শয়তানের সাগরেদি করা। আমাদের নিজেদের যেমন ধর্ম্মপরায়ণ হয়ে উঠতে হবে—পরিবেশকেও তেমনি ধর্ম্মপরায়ণ করে তুলতে হবে—প্রত্যেককে তার বৈশিষ্ট্য ও ধর্ম্মাদর্শ অনুযায়ী। হিন্দু যেমন গীতা পড়বে, তেমনি কোরাণ-বাইবেলও পড়বে; মুসলমান যেমন কোরাণ পড়বে, তেমনি গীতা বাইবেলও পড়বে। প্রত্যকে চেষ্টা করবে বাস্তব আচরণে স্বধর্মনিষ্ঠ হতে এবং অন্যকেও সাহায্য করবে ও প্রেরণা জোগাবে অমনতর হয়ে উঠতে।
এমনতর হতে থাকলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সৌহার্দ্দ্য গড়ে তুলতে কদিন লাগে? আমি তো বুঝি, হিন্দুত্বের প্রতিষ্ঠা যেমন আমার দায়, ইসলাম ও খ্রীষ্টধর্ম প্রভৃতির প্রতিষ্ঠাও তেমনি আমারই দায়। আমার পরিবেশের প্রত্যেকে তার মত করে যদি ঈশ্বরপরায়ণ না হয়ে ওঠে, আদর্শপ্রেমী না হয়ে ওঠে, ধর্ম্মনিষ্ঠ না হয়ে ওঠে, তাহলে তো আমারই সমূহ বিপদ। পরিবেশকে বাদ দিয়ে আমার ধর্ম্ম করা অর্থাৎ বাঁচাবাড়ার পথে চলা তো সম্ভব নয়।”
(আ. প্র. ৯/২. ১০. ১৯৪৭)
।। পূর্বতনে মানে না যারা/জানিস নিছক ম্লেচ্ছ তারা ।।
“……শুনেছি রসুল পূর্বতনকে মানার কথা যেমন বলেছেন তেমনি আবার বলেছেন—যদি কোন হাবসী ক্রীতদাসও তোমাদের কোরাণ অনুসারে পরিচালিত করেন, তবে তোমরা তাঁর আদেশ পালন করে চলো। আর এটা ঠিক জেনো—কোরাণ, বেদ, বাইবেল, গীতা ইত্যাদির মধ্যে যেমন কোন বিরোধ নেই, বৈশিষ্ট্যপালী, আপূরয়মান মহাপুরুষ, তা তিনি পরবর্তী যে যুগেই আবির্ভূত হউন, তাঁর বাণীর মধ্যে কোরাণ, বেদ, বাইবেল, গীতার পরিপন্থী কোন কথা থাকে না, বরং থাকে যুগোপযোগী পরিপূরণ। তাই পরবর্তীর মধ্যে আমরা পূর্ববর্তীকে আরো করে পাই। একই ঈশ্বরপ্রেরণার প্রবাহই তো যুগ-যুগ ধরে বয়ে চলে আরো আরোতর অভিব্যক্তি নিয়ে প্রয়োজন ও পরিস্থিতির পরিপূরণে। সৃষ্টি যতদিন থাকবে, ততদিন এ ধারা চলতেই থাকবে।” –শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, আ. প্র. (১১/৭.৫.১৯৪৮)
৪ঠা পৌষ, শুক্রবার, ১৩৪৮ (ইং ১৯. ১২. ১৯৪১)। শ্রীশ্রীঠাকুর অতি প্রত্যুষে বিছানা থেকে উঠে দক্ষিণাস্য হয়ে বাঁধের উপর বেশ কিছুক্ষণ মৌন-গম্ভীর হয়ে দিগন্তবিসারী দৃষ্টিতে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে একাকী দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে এসে তাসুর ভিতরে ঢুকে বিছানায় উপবেশন করলেন। আর সবাই চৌকির চারিপাশ ঘিরে মাটিতে বসলেন। ।। ধর্মের নামে অধর্মের প্রশ্রয় ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর হঠাৎ বললেন—(কথার মধ্যে কেমন যেন একটা অন্তরঙ্গ রহস্য গভীর সুর) ‘‘দ্যাখ, দুনিয়ায় সবই কিন্তু চেতন, অচেতন কোথাও নেই কিছু। সবার সঙ্গেই তাই আদান-প্রদান চলে, ভাববিনিময় চলে। আবার, মাঝে-মাঝে আমার মনে হয় সবই যেন মানুষ—গরু-মানুষ, গাছ-মানুষ, ঘাস-মানুষ, চাঁদ-মানুষ, সূর্য্য-মানুষ এমন কত কী ! কখনও আবার দেখি—সবই যেন আমি—গাছ-আমি, পোকা-আমি, রাম-আমি, শ্যাম-আমি, এক আমি এত হয়ে আছি, আমিই আমার সঙ্গে এত কাণ্ড করছি—এ বড় বিচিত্র ব্যাপার। তাই কেউ যখন কারও ক্ষতি করতে চায়, আমার বড় হাসি পায়। ভাবি—পরমপিতা ! এ তোমার কী খেলা ? মানুষ নিজেরই ক্ষতি করতে চায় নিজে। কারও ক্ষতি করা মানে যে নিজেরই ক্ষতি করা—এইটুকুই বোঝে না। তত্ত্বদৃষ্টি বাদ দিলেও একথা খাটে। তোমার পরিবেশকে তুমি যদি ক্ষুণ্ণ কর, প্রতিক্রিয়ায় তারাও তোমাকে ক্ষুণ্ণ করতে চেষ্টা করবে, আর তা’ যদি না-ও করে, তারা ক্ষুণ্ণ হলে আগের মত জীবনীয় পোষণ যোগাতে পারবে না তোমাকে ও অন্যান্যকে। ফলে, তোমারই তো ক্ষতি সব থেকে বেশী। তাই বলে দুষ্টবুদ্ধি নিয়ে চলছে যারা—তাদের যে নিরস্ত করবে না, তা’ কিন্তু নয়। সেখানে প্রতিরোধ না করাই দুর্বলতা, ঐ দুর্বলতা অধর্মেরই নামান্তর। ধর্মের নামে কত যে অধর্ম প্রশ্রয় পাচ্ছে দুনিয়ায়, তার কি ঠিক আছে !’’
স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, ওই দুর্বলতা দ্বারা আচ্ছন্ন আমিও। নইলে তাঁর প্রদত্ত
“তমসার পার—-
অচ্ছেদ্যবর্ণ
মহান্
পুরুষ
ইষ্টপ্রতীকে আবির্ভূত !
যদ্বিদাচারণে
তদুপাসনাতেই
ব্রতী
হই !
—জাগ্রত হও
আগমন কর—
আমরা যেন একেই অভিগমন করি,
একোদ্দেশ্যেই
বাক্,
কর্ম্ম
বিনিয়োগ করি,
একনিরন্তরতায়
সেই
তাঁকেই যেন জানিতে পারি,
শ্রদ্ধানুসৃত—
আপূর্য্যমাণ
ইষ্টৈকপ্রাণনায়
একই
মন্ত্রে একই মননে
সমষ্টি-উৎসারণায়
বৈশিষ্ট্য-পূরণী
একচেতনাভিমন্ত্রণে
শিষ্ট
হবিঃ ও শ্রেষ্ঠ হবনায়
সমান আকূতি
ও সম্যক হৃদয়ে
জীবন-বর্দ্ধনে
ঋদ্ধিমান্
হই !
স্বস্তি ! স্বস্তি ! স্বস্তি !”
আহ্বানী মন্ত্র উপেক্ষিত হতে পারত তাঁরই উত্তরসূরীদের দ্বারা—পারত না, আমি যদি একান্তই তাঁর জন্য নিবেদিত প্রাণ হতে পারতাম।
আমি যদি আমার প্রিয়ের জন্য দুর্বলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারতাম তাহলে কি তাঁর প্রদত্ত ‘পঞ্চবর্হি’-র অনুশাসনসমূহ—
‘‘১। একমেবাদ্বিতীয়ং শরণম্।
২। পূর্ব্বেষামাপূরয়িতারঃ প্রবুদ্ধা ঋষয় শরণম্।
৩। তদ্বর্ত্মানুবর্ত্তিনঃ পিতরঃ শরণম্।
৪। সত্তানুগুণা বর্ণাশ্রমাঃ শরণম্।
৫। পূর্ব্বাপূরকো বর্ত্তমানঃ পুরুষোত্তমঃ শরণম্ ।
এতদেবার্য্যায়ণম্,
এষ এব সদ্ধর্ম্মঃ,
এতদেব শাশ্বতাং শরণ্যম্।’’
১। এক অদ্বিতীয়ের শরণ লইতেছি।
২। পূর্ব্বপূরণকারী
প্রবুদ্ধ ঋষিগণের শরণ লইতেছি।
৩। তাঁহাদের
পথ অনুসরণকারী পিতৃপুরুষগণের শরণ
লইতেছি।
৪। অস্তিত্বের
গুণপরিপোষক বর্ণাশ্রমের শরণ লইতেছি।
৫। পূর্ব্ব-পূরণকারী
বর্ত্তমান পুরুষোত্তমের শরণ লইতেছি।
ইহাই আর্য্যপথ, ইহাই সদ্ধর্ম্ম, আর ইহাই চিরন্তন শরণযোগ্য।
(হিন্দুমাত্রেরই এই পঞ্চবর্হি বা পঞ্চাগ্নি স্বীকার্য্য—তবেই সে হিন্দু, হিন্দুর হিন্দুত্বের মূল শরণমন্ত্র ইহাই—সর্বজন-গ্রহণীয়।)
মন্ত্র উপেক্ষিত হতে তাঁরই উত্তরসূরীদের দ্বারা—পারত না, আমি যদি একান্তই তাঁর জন্য নিবেদিত প্রাণ হতে পারতাম।
আমি যদি আমার প্রিয়ের জন্য দুর্বলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারতাম তাহলে কি তাঁর প্রদত্ত ‘সপ্তার্চ্চি’-র অনুশাসনসমূহ—
‘‘১। নোপাস্যমন্যদ্ ব্রহ্মণো ব্রহ্মৈকমেবাদ্বিতীয়ম্।
২। তথাগতাস্তদ্বার্ত্তিকা অভেদাঃ।
৩। তথাগতাগ্র্যোহি বর্ত্তমানঃ পুরুষোত্তমঃ
পূর্ব্বেষামাপূরয়িতা
বিশিষ্ট-বিশেষ বিগ্রহঃ।
৪। তদনুকূলশাসনং হ্যনুসর্ত্তব্যন্নেতরৎ।
৫। শিষ্টাপ্তবেদপিতৃপরলোকদেবাঃ শ্রদ্ধেয়া নাপোহ্যাঃ।
৬। সদাচারা বর্ণাশ্রমানুগজীবনবর্দ্ধনা নিতং পালনীয়াঃ।
৭। বিহিতসবর্ণানুলোমাচারাঃ পরমোৎকর্ষ হেতবঃ
স্বভাবপরিদ্ধংসিনস্তু
প্রতিলোমাচারাঃ।’’
১। ব্রহ্ম
ভিন্ন আর কেহ উপাস্য নহে,
ব্রহ্ম এক–অদ্বিতীয়।
২। তথাগত তাঁর বার্ত্তাবহগণ অভিন্ন।
৩। তথাগতগণের
অগ্রণী বর্ত্তমান পুরুষোত্তম, পূর্ব্ব-পূর্ব্বগণের
পূরণকারী বিশিষ্ট বিশেষ বিগ্রহ।
৪। তাঁহার
অনুকূল শাসনই অনুসরণীয়—তাহা
ভিন্ন অন্য কিছু অনুসরণীয় নহে।
৫। ঋষি-অনুশাসিত প্রামাণ্য জ্ঞান, পিতৃপুরুষ,
পরলোক, দেবতাগণ
শ্রদ্ধেয়— অবহেলার যোগ্য নহে।
৬। বর্ণাশ্রমের
অনুকূল বাঁচাবাড়ার পরিপোষক সদাচার-সমূহ-নিত্যপালনীয়।
৭। বিহিত
সবর্ণ ও অনুলোমক্রমিক (বিবাহাদি) আচারসমূহ
পরম উৎকর্ষের কারণ— প্রতিলোম-আচার
স্বভাব-ধ্বংসকারী।
(পঞ্চবর্হি যেমন প্রত্যেক হিন্দুর স্বীকার্য্য ও গ্রহণীয়, এই সপ্তার্চ্চিও তেমনি অনুসরণীয় এবং পালনীয়।)
মন্ত্র উপেক্ষিত হতে তাঁরই উত্তরসূরীদের দ্বারা—পারত না, আমি যদি একান্তই তাঁর জন্য নিবেদিত প্রাণ হতে পারতাম।
শ্রীশ্রীঠাকুর সম্বিতী গ্রন্থে বলছেন—
মতবাদ যাই হোক না,—
আর, যে-কোন সম্প্রদায়ই হোক,
যা’ মুখ্যতঃ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’কে
স্বীকার করেনিকো—
কোন-না-কোন রকমে,—
তা’ কখনও অনুসরণ করতে যেও না,
তা’ কিন্তু জঘন্য—অসম্পূর্ণ,
সত্তা-সম্বর্দ্ধনার পরিপন্থী তা’;
আর, ঐ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’ই হ’চ্ছে
সেই রাজপথ—
যা’কে স্বীকার ও গ্রহণ করে চললে
ক্রমশঃই তুমি সার্থকতায় সমুন্নত হ’তে পার। ২৩৪ ।
আমি ভাবছি, শ্রীশ্রীঠাকুরের ওই নিদেশকে অমান্য করে যারা ধর্মের নামে অধর্ম করে সৎসঙ্গী পরিচয়ের গর্ব করেন, তাদের পরিণতি কি হবে ? তা’রা যা’তে শ্রীশ্রীঠাকুরের প্রদত্ত বিধিকে উপেক্ষা করে দুর্গতিতে পতিত না হয়, পরমপিতাকে অবমাননা করে নিজেদের ক্ষতিকে আবাহন না করতে পারে, সে বিষয়ে যাজন করা একান্ত দরকার—সবার আগে। কারণ, সব অন্যায়ের ক্ষমা থাকলেও পুরুষোত্তম-বিধিকে অমান্য করলে বিধি কখনো ক্ষমা করবে না।
সবাইকে ইষ্টরঙে রঞ্জিত
হবার আবেদন জানিয়ে, জানাই শ্রদ্ধা, ভক্তি, প্রণাম ও জয়গুরু! অভিবাদন। বন্দে পুরুষোত্তমম্ ! ধ্বনি দিয়ে নিত্য হতে
লীলায়, লীলা হতে নিত্যে আগম-নিগমকারী পূর্বাপূর্ব সব পুরুষোত্তমদের উদ্দেশ্যে
প্রণাম জানিয়ে ইতি টানলাম।
––––––
