সম্ভবামি যুগে যুগে

।। সম্ভবামি যুগে যুগে ।।

                                          —ডাঃ তপন দাস

                                         সুখচর, কলকাতা-৭০০১১৫

।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আত্ম-স্মৃতি কথা—ঈশ্বরকণা-র রহস্যভেদ ।।

[“ষ্টিকেল-এর The Beloved Ego পুস্তক পাঠান্তে আলোচনা কালে—শ্রীশ্রীঠাকুর নিরব যেন কিছু একটা অনুভব করছেন একসময় বলতে লাগলেন—দেখুন, একটা point (বিন্দু) আর তার infinite expression (অনন্ত বিস্তৃতি) যেন একটা জিনিষ বলে মনে হয় দেখছি একটা atom (পরমাণু), সেটা ঝক্ করে ফেটে চৌচির হয়ে তার থেকে millions of smaller electron (কোটি কোটি ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিন) এর মত বেরুচ্ছে সেগুলি আবার (আকর্ষণ) ও (বিকর্ষণ)-এর দরুণ নানারূপ দানা বাঁধছে আবার সেগুলি যেন করছে (উৎপন্ন হচ্চে) একটা আরো ছোট দানা থেকে,—যেন একটা (ক্ষুদ্রতর বৈদ্যুতিন)আবার সেই ছোট্ট –এর (বিন্দুর) মত দানাটা ঝক্ করে ফেটে গেল। তার থেকে (কোটি কোটি অতি ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিন) সমস্তটা ব্যাপ্ত করে ফেল্লে। এমনি করে ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে শেষে একটা দানাতে গিয়ে পৌঁছে। ঐ সেই (আদি) দানাটা থেকেই সমস্ত জগতের উৎপত্তি। ঐ সেই আদি দানাটা থেকে……যেন একটা –এর (ক্রমিক অগ্রগতির) ভিতর দিয়ে আমার (অহং)-এর দানাটা –এর (জ্যান্ত শরীরের) ভেতর এসে পড়লো ….দেখলাম যেন জলে কুমীর হয়ে আছি। এক জন্মে গাছ হয়ে আছি। দেখলাম ছোট ছেলে হয়ে দৌড়াচ্ছিশেষে বিয়ে হল, স্ত্রী নিয়ে (ভোগ) করছি। তারপর দেখলাম ধীরে ধীরে আমি বেড়িয়ে এসেছি। আমার দেহটা পড়ে আছে। সবাই কান্নাকাটি করছে—হঠাৎ তখন মনে হল সত্যি কি আমি মরে গেছি ? তারপর একটা –এর (ফাঁকার) মত লাগে তারপর আবার একটা নতুন জীবন চলতে থাকেএক জীবনে রাজার ঘরে জন্মেছিলাম, বাড়ীতে একটা গম্বুজের মত ছিল এবং তার চূড়াটা সোনার পাতে মোড়া ছিল বাড়ীর ছোট ছোট ছেলে মেয়ে এবং স্ত্রীলোকেরা সবাই আমায় বড় ভালবাসত এক জীবনে মনে পড়ে কোন পাহাড়ের পাদদেশে ঘর বেঁধে আশ্রম করেছি ।। সে স্থানটা একখানা বড় ঢালু শ্বেতপাথরে বাধান ছিল একটা ফুলের লতাগাছ তার উপরে ছায়া করত“]

*      *      *


“অস্তিত্বের নাই উপাসনা

সে-ও কি সতী সে-ও কি সৎ,

সবাই কি তাই হয়ে আছে

বেঁচে থেকেও মৃতবৎ !’’

       অধুনা পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের উপরোক্ত বাণীটি আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। আপনাকেও হয়তো, যদি আপনি একজন সচেতন ব্যক্তি হন।  আপনি-আমি শুধু নয় সচেতন-অচেতন নির্বিশেষে সবাই-ই বোধ হয় জীবনকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়, বৃদ্ধি পেতে চায়, জীবনকে নন্দিত করতে চায়।

       তবু কেন জানিনা, সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণীদের কিছু অংশ আমরা,বোধ-বিবেক বিসর্জন দিয়ে ক্রমেই যেন মৃত্যুর মিছিলে যোগদান করতে এগিয়ে চলেছি প্রবৃত্তির শয়তানী প্ররোচনায়। অযথা মারামারি, হানাহানি করে  হন্তারক কৃতান্তের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে চলেছি ! পূরণ-পোষণ-প্রীতিচর্যার নীতি প্রতিষ্ঠার নামে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে রাজনীতি করে চলেছি। শিক্ষার মূলসূত্র, ‘‘প্রণিপাতেন, পরিপ্রশ্নেন, সেবয়া’’-র সেবা ভুলে শিক্ষার নামে, মারামারি-হানাহানি করে শিক্ষাঙ্গনকে কলুষিত করছি। সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধিকে ধরে রাখার নীতি, ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করার নামে অধর্মের আশ্রয় নিয়ে অবতার বরিষ্ঠদের অনুগামীদের মধ্যে   বিভেদ আনতে  চাইছি ! শান্তির বার্তাবহ ইসলাম-এর প্রতিষ্ঠার নামে স্কুলে ঢুকে নিরীহ ছাত্র-ছাত্রীদের, সংবাদ মাধ্যমের অফিসে ঢুকে নীরিহ কর্মচারীদের অবলীলায় হত্যা করে জিহাদ করে চলেছি! বধ্যকে বধ না করে, অবধ্যকে বধ করে ধার্মিক সাজতে চাইছি!

       আমাদের গুরু, আমাদের শিক্ষক আর্য-ঋষিগণ  ‘‘অসতো মা সদগময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যুর্মামৃতমগময়’’—অসৎ হতে সৎ-এ, অন্ধকার হতে আলোকে, মৃত্যু হতে অমৃত আহরণের শিক্ষা দিলেন। যিনি নিজের আত্মাকেই সর্বাত্মারূপে উপলব্ধি করেন, তিন কাহাকেও ঘৃণা করেন না। সর্বভূতে নিজেকে, নিজের মধ্যে সর্বভূতকে উপলব্ধি করার উপদেশ দিলেন। কেন‍না, আমরা ঐহিক জগতে দ্বৈত ভাবে অসম্পৃক্ত হয়েও সেই এক পরমাত্মার সাথে সম্পৃক্ত।

       তথাপি অযথা এত হিংসা কেন?

       বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতে অহঙ্কার (ego) থেকে আসক্তি। আসক্তি থেকে স্বার্থবুদ্ধি। স্বার্থবুদ্ধি থেকে কামনা। কামনা থেকে ক্রোধ। ক্রোধ থেকে হিংসার উৎপত্তি হয়। হিংসাকে দূর করতে হলে ভক্তির চাষ দিতে হবে । সৎ-এ নিরবিচ্ছিন্ন সংযুক্তি থাকার চেষ্টার নাম ভক্তি। ভক্তি এনে দেয় জ্ঞান। জ্ঞানে সর্বভূতে আত্মবোধ হয়। সর্বভূতে আত্মবোধ জন্মালেই অহিংসার প্রতিষ্ঠা হয়। অহিংসা থেকে প্রেম আসে। আমি সবার, আমার সবাই বোধ জন্মায়।
       আবার হিংসাকে হিংসা দ্বারা জয় করার নাম অহিংসা। যেমন দুষ্টক্ষত বা গ্যাংগ্রীন  থেকে শরীরকে বাঁচাতে হলে আক্রান্ত অংশটিকে কেটে বাদ দিতে হয়। বাদ না দিলে দেহকে বাঁচান যায় না। তেমনি সমাজ রক্ষা, রাষ্ট্র রক্ষা করতে হলে অনুরূপ নীতির অনুসরণ না করতে পারলে সমাজ-রাষ্ট্রের অঙ্গে পচন ধরে যাবে, রাষ্ট্রের সত্তাটাই মারা পড়বে।

       এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন,—অহিংসা পরম ধর্ম্ম, হিংসা তো পরম ধর্ম্ম নয়। হিংসাকে অটুট অক্ষত রাখলে তো অহিংসার প্রতিষ্ঠা হয় না। অহিংসার প্রতিষ্ঠার জন্য হিংসাকে সরাসরিভাবে হিংসা করতে হবে, সুস্থতা আনতে গেলে অসুস্থতাকে বধ করতে হবে, সক্রিয়তাকে জাগাতে গেলে নিষ্ক্রিয়তাকে মারতে হবে। আমি তো এইরকম বুঝি। তবে এটা করতে হবে মঙ্গলবুদ্ধি-প্রণোদিত হয়ে। তাই পাপীকে ঘৃণা বা হিংসা না করে, পাপকে ঘৃণা বা হিংসা করে, পাপীকে পাপমুক্ত করে তুলতে চেষ্টা করতে হবে। তাই বলছিলাম, হিংসকের হিংসার প্রতি যদি আমরা অহিংস হই, তবে সেইটেই হবে অহিংসা-বিরোধী অর্থাৎ হিংসাপোষণী আচরণ। (আ. প্র. ২/১৭. ১২. ১৯৪১)

        আর্য্য ভারতের মা কালী শুম্ভ-নিশুম্ভকে, মা দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে, শ্রীরামচন্দ্র রাবনকে বধ করে ওই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। অযথা কাউকে হত্যা করেন নি। অযথা কাউকে হত্যা না করে পার্থসারথি শ্রীকৃষ্ণ মামা কংসের পাঠান অসুর-রাক্ষস নামক সত্তাহিংস জিঘাংসা বৃত্তিধারীদের হত্যা করেছিলেন। অপকৌশলী অসৎ সাম্রাজ্যবাদী কংসকে হত্যা করে, উগ্রসেনকে কারাগার থেকে মুক্ত করে তাঁকে পুণরায় রাজ্যে অভিষিক্ত করেছিলেন। ধর্মপথভ্রষ্ট অসৎ আগ্রাসনী জরাসন্ধকে হত্যা করে জরাসন্ধের পুত্র সহদেবকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিয়েছিলেন।  আগ্রাসন করেন নি। সব হিংসার মূল উৎপাটন করে, এক পরম রাষ্ট্রীক সমবায প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধ সংগঠিত করে জীবনবাদের জয়গান গেয়েছিলেন। ভবিষ্যত প্রজন্মকে জীবনবাদী হবার জন্য উপহার দিয়ে গেলেন গীতা।

       শ্রীকৃষ্ণ পরবর্তী   বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীষ্ট, হজরত রসুল প্রমুখ পুরুষোত্তমগণও  আর্য্য ভারতীয় ওই শ্বাশ্বত নীতির অনুসরণ করেছেন মানব সভ্যতাকে বাঁচাতে। তাঁরা আগ্রাসন করতে, ধর্মান্তকরণ করতে, অযথা কাউকে হিংসা করতে কোথাও কি বলেছেন? তবে কিসের জেহাদ? কোন জেহাদের জন্য, কার অনুশাসন মেনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে নিরীহ স্কুল ছাত্রদের পর্য্যন্ত হত্যা করা হচ্ছে?   ইসলাম ধর্ম-প্রতিষ্ঠার নামে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা  যে জিঘাংসার দৃষ্টান্ত উপহার দিয়েছে সভ্যতাকে, ওই জিঘাংসা বৃত্তিধারীদের যদি কঠোর হাতে দমন করতে এগিয়ে না আসে  উপ-মহাদেশের শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তথা রাষ্ট্র নায়কেরা, তাহলে মানবতার অপমৃত্যুর কালো ছায়া মানব সভ্যতার অঙ্গে ক্রমে ক্রমে গ্যাংগ্রীন উৎপাদন করবে। নিকট ভবিষ্যতে। যদি এখনও রাষ্ট্রসংঘ ধর্মের প্রকৃত রূপকে রূপায়িত করার চেষ্টা না করেন যুগ-পুরুষোত্তমের পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠনের রীতি মেনে। আমাদের সনাতন ধর্মীয় মতবাদ এবং পূর্বাপূর্ব যুগ-পুরুষোত্তমগণদের একটাই উদ্দেশ্য ছিল বৈচিত্রের মাঝে ঐক্য স্থাপনের লক্ষ্যে পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠন।

বিবর্তনবাদ ও অবতারতত্ত্ব :         

       ‘‘প্রলয়পয়োধিজলে ধৃতবানসি বেদং

      বিহিত-বিচিত্র-চরিত্রম্ খেদম্।’’

       সৃষ্টিতত্ত্বের বিবর্তনীয় ধারার দৃশ্যগ্রাহ্য জল থেকে ‘কেশবধৃত-মীনশরীর’ মৎস্য অবতার। ক্রমে কঠিন মাটি থেকে উদ্ভব উভচর কূর্ম। কূর্ম থেকে বরাহে উত্তরণ। কূর্ম মৎস্যের, বরাহ কূর্মের পরিণতি। নৃসিংহ মানুষ ও পশুর মিশ্রণ। বামন—পশুত্বের অবসান, বুদ্ধির বিকাশ। রামচন্দ্র—সৌম্যাবতার। ক্ষাত্রশক্তি ও সৌম্যভাবের সমন্বয়কারী।

।।  মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রের  স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।

न सा सभा यत्र न सन्ति वृद्धाः
वृद्धा न ते ये न वदन्ति धर्मम् ।
नासौ धर्मो यत्र न सत्यमन्ति
न तत् सत्यं यच्छलेनानुविद्धम् ।।
(Ye sabhai briddha nei ta sabha e noi. Yara dharmmasamgata kotha bolena tara briddha noi. yate satya nei ta dharmma noi, yate chhol aachhe ta satya noi.
RAMAYAN, 3/33)

       আদর্শপুরুষ শ্রীরামচন্দ্র ছিলেন সত্যের পূজারী অথচ অসৎ নিরোধী। তৎকালীন যুগের অচ্ছুৎ অনার্য্যদের আর্য্যীকৃত করে আর্য্য-অনার্য্যদের মেলবন্ধন করলেন।অনার্য্য গুহক চণ্ডালকে করলেন মিত্র, আবার অকালমৃত্যুর দ্যোতক বর্ণাশ্রম-বিদ্বেষী প্রতিলোমাচারী বন্ধুবর শম্বুবকে দিলেন চরম শাস্তি। মায়াবী রাবণ  যখন কিছুতেই সীতাকে বশে আনতে পারছিলেন না তখন সভাসদেরা বলেছিলেন, রামরূপ ধারণ করে গেলেই তো সীতাকে সহজেই বশীভূত করতে পারেন। উত্তরে রাবণ বলেছিলেন, ওই রূপ স্মরণ করলেই আমার সব পাপ-প্রবৃত্তি মুছে গিয়ে আমি এক অন্য মানুষ হয়ে যাই। তথাপি প্রবৃত্তির ঊর্দ্ধে উঠে ওই বোধটাকে ধরে রাখতে পারল না, ফলে রামচন্দ্রের হাতে হত হতে হল। অথচ বিভীষণ রামচন্দ্রের আদর্শে প্রলুব্ধ হয়ে রাবণকে ত্যাগ করলেন।

       এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলছেন, ……রাবণ তো আদর্শবান ছিল না। রামচন্দ্রকে দেখে সে একেবারে বিগলিত হয়ে গেল। রামচন্দ্রের ঊর্দ্ধে তার আর কেউ নেই। ভ্রাতার প্রতি কর্তব্যের চাইতে তার ইষ্টানুরাগই প্রবল। ভীষ্ম কিন্তু কেষ্টঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি নিয়েও, কর্তব্যবোধে কৌরবের পক্ষ ছাড়তে পারেন নি। তা কিন্তু ঠিক হয়নি। ইষ্টের জন্য, সত্যের জন্য, অন্য যে-কোন কর্তব্য ত্যাগ করতে হবে, যদি সে কর্তব্য ইষ্টের পথে অন্তরায় হয়। ‘‘সর্ব্বধর্ম্মান পরিত্যজ্য  মামেকং শরণং ব্রজ’’ । (আ. প্র. 21/2.6.1952)……শ্রীরামচন্দ্রের খুব strong group (শক্তিমান দল) ছিল। হনুমান, সুগ্রীব, জাম্বুবান, অঙ্গদ, নল, নীল এরা সবাই ছিল একটা strong unit (শক্তিমান গুচ্ছ)। রামচন্দ্রের সাথে ওদের একজন না-একজন থাকতই। এক সময় বিভীষণকে সন্দেহ করেছিল লক্ষণ।  বিভীষণ তাতে বলেছিল, ‘আমি জানি তোমরা আমাকে সন্দেহ করবে। কারণ, আমি রাবণের ভাই। আমি ভাই হয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে  treachery (বিশ্বাসঘাতকতা) করেছি। কিন্তু করেছি অসৎ-এর বিরুদ্ধে। হজরত রসুলের  group-ও (দলও) খুব  strong (শক্তিমান) ছিল। তিনি বেঁচে থাকতে-থাকতেই অনেকখানি ভূখণ্ডের king (রাজা) হয়েছিলেন। (দীপরক্ষী 2/26.7.1956)

       রাজাকে কতখানি প্রজাস্বার্থী হতে হবে সেইটেই রামচন্দ্র দেখিয়েছেন। প্রজা প্রাণের চাইতেও বেশী না হলে রাজা হওয়া যায় না। …….সীতাও ছিলেন রামচন্দ্রের আদর্শে উৎসর্গীকৃত। আর এই ছিল আমাদের আর্য্যবিবাহের তাৎপর্য্য। (আ. প্র. 20/9. 8. 1951)

।।  শ্রীকৃষ্ণ স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।   

“ধর্ম যখনই বিপাকী বাহনে
ব্যর্থ অর্থে ধায়,
পুরুষোত্তম আবির্ভূত হন 
পাপী পরিত্রান পায় ।”
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের উপরোক্ত বাণীর সাথে শ্রীকৃষ্ণ প্রদত্ত

“যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লাণির্ভবতি ভারতঃ।

অভ্যুত্থানম্ ধর্মস্য তদাত্মনম্ সৃজাম্যহম্।।

পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশয়চ দুষ্কৃতাম্ ।
ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ।।” 
প্রায় সমার্থক বাণীটির যুগোপযোগী সংস্করণ করেছেন বর্তমান পুরুষোত্তম ।
শ্রীকৃষ্ণ যুগ সংস্কারের প্রয়োজনে দুষ্কৃতি বা পাপীদের বিনাশের কথা বলেছেন আর ঠাকুর পাপীদের পরিত্রাণের কথা বলেছেন । এইটুকুই পার্থক্য । 
শ্রীকৃষ্ণ, বৃহত্তর রাষ্ট্রকে অধর্মের গ্যাংগ্রীন থেকে বাঁচাতে ধর্ম নামের মলম লাগিয়ে বিফল হবার পর সুকৌশলে কংস, জরাসন্ধ, শিশুপাল, শাল্ব কৌরবাদির ন্যায় আততায়ীরূপী গ্যাংগ্রীনদের অপারেশন করেছিলেন ।–হিংসাকে হিংসা দ্বারা প্রতিরোধ করে অহিংসার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন! কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বর্ণাশ্রমধর্মভিত্তিক পরমরাষ্ট্রিক সমবায় ।

       শ্রীকৃষ্ণের পরবর্তী ঋত্বিক সংঘ সক্রিয় থাকার ফলে জনন বিপর্যয় হয় নি । ফলে তিন হাজার বছর পর্যন্ত বৃহত্তর আর্যাবর্তে আগ্রাসন করতে সাহস পায়নি দুষ্কৃতিরা ! যখন থেকে বর্ণাশ্রম-ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের শিক্ষা ভুলে প্রবৃত্তির অধীনস্থ ক্লীব হয়েছি, তখন থেকে আমরা আগ্রাসনের শিকার হয়েছি । আগ্রাসনের চরম বিপর্যয় ইংরেজ অপশাসন থেকে আর্যাবর্তকে মুক্ত করতেও সম্বল ছিল শ্রীকৃষ্ণের গীতার আদর্শ ! স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম শহীদ ক্ষুদিরাম ‘গীতা’-বর্ণিত ‘‘হতো বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং/জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম্’’-এর অমরত্বের মহান আদর্শে ফাঁসি বরণ করে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মৃত্যুঞ্জয়ী হতে শিখিয়েছিলেন। সেইসব বীরগাঁথা ভুলে  আমরা তাঁর ঋণ শোধ করছি,‘ কৃষ্ণ করলেই লীলা, আমরা করলেই বীলা’ গানের ডালি সাজিয়ে! যদিও ওই গান রচনা করার সাহস আমরাই দিয়েছি,–যারা ধর্মের ধ্বজা ধরে প্রবৃত্তিকে পোষণ দিয়ে চলেছি।–পার্থসারথী শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমদ্ভাগবতগীতার আদর্শ ভুলে, হ্লাদিনি শক্তিরূপিনী রাধা-তত্ত্ব ভুলে, মনগড়া প্রবৃত্তি-প্ররোচিত মানবী রাধা, শ্রীকৃষ্ণের মামীর সাথে পরকীয়া কামুক-রূপে, গোপিনীদের বস্ত্রহরনকারী-রূপে শ্রীকৃষ্ণকে চিত্রিত করে!

‘রাই জাগো রাই জাগো বলে শুক-সারি বলে, কত নিদ্রা যাওগো রাধে শ্যাম-নাগরের কোলে। শ্যাম অঙ্গে অঙ্গ দিয়া আছোরে রাই ঘুমাইয়া তোমার কি লোকলজ্জা নাই….’ ইত্যাদি চটুল কথায় প্রভাতী সুর লাগিয়ে বৈষ্ণবীয় শ্রীকৃষ্ণ আরাধনা আর্য্যকৃষ্টি বিরোধী  প্রবৃত্তি-প্ররোচিত পরদারাসক্ত ব্যতীত কোন্ আধ্যাত্মিক আবেদনে সমৃদ্ধ ? ওইসব জাগরণী গান শুনে, এবং কবি জয়দেব বিরচিত গীতগোবিন্দের ছত্রে ছত্রে বর্ণিত কামবিলাসী পরকীয়া শ্রীকৃষ্ণের কীর্তিকলাপ পড়ে, যদি কোন তথাকথিত নাস্তিক্যবাদী শ্রীকৃষ্ণের চরিত্র কালিমালিপ্ত করে,– সেই ধর্মবিরোধী, ইষ্টবিরোধী প্রচারের জন্য দায়ী কারা ?

       পণ্ডিতদের মতে কংসের দূত হয়ে মহামতি অক্রুর বলরামসহ শ্রীকৃষ্ণকে বৃন্দাবন থেকে মথুরায় নিয়ে যান কংস আয়োজিত ধনুর্যজ্ঞে অংশগ্রহণ করাতে। কংসের উদ্দেশ্য ছিল শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করার। পরিবর্তে শ্রীকৃষ্ণ  অত্যাচারী কংস-মামাকে হত্যা করে পিতামহ উগ্রসেনকে রাজ্য প্রত্যর্পণ করেন। তারপর ঘোর আঙ্গিরসের সান্নিধ্যে পরাবিদ্যা এবং সান্দিপনী কাশ্যের সান্নিধ্যে অপরাবিদ্যা লাভ করেন।

       পণ্ডিতদের এই সাক্ষ্য থেকে প্রমাণিত শ্রীকৃষ্ণ ১১ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে কংসকে বধ করেন। অথচ  বেশীরভাগ কৃষ্ণভক্তগণ বৃন্দাবন লীলার,  রাসলীলার নামে কিশোর শ্রীকৃষ্ণকে মানবী রাধার সাথে যুগলবন্দী করে শ্রীকৃষ্ণকে পরকীয়া কামুক রূপে চিত্রিত করে চলেছেন।

       শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতে, রাসলীলা ভগবানের সাথে ভক্তের কেন্দ্রায়িত ছন্দায়িত নিত্যলীলার প্রদর্শণী। এই কেন্দ্রায়িত চলন একটা এ্যাটমের মধ্যেও আছে—রাসলীলা যেন এ্যাটমের মধ্যেকার নিত্য-গতিশীলতার ও সুকেন্দ্রিক অনুচলনের প্রতীক। রাস মানে ধ্বনি, ধ্বনিতে বিহার করেন যিনি, তিনি রাসবিহারী। শব্দযোগেই তাঁর অবস্থান।

       শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর লীলাসঙ্গী অশ্বিনীদাকে বলেছিলেন, ‘‘ভাগবতের একটা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা লিখতে পারেন ? লোকে প্রকৃত ভাবটা হারিয়ে ফেলে কেবল লীলা বা রূপকের দিকটা নিয়ে আছে । মুখে বলে নিত্য বৃন্দাবন, নিত্য লীলা, নিত্য রাস হচ্ছে,  কিন্তু তার ভেদ জানে কয় জন? আর, যেটাকে সাধারণতঃ নিত্য বলে, সেটাকেও রূপকথার একটা ছাযার মত কল্পনা ক’রে রেখেছে।  কথার ব্যুৎপত্তিগত অর্থের দিকে দৃষ্টি করলেও অনেকটা বোঝা যায়। যেমন রাস মানে ধ্বনি, রাস-বিহারী অর্থাৎ রাসে,ধ্বনিতে বিহার করেন যিনি। Creation (সৃষ্টি)-এর sound-theory (নাদ-সিদ্ধান্ত), শব্দ-ব্রহ্ম এসে পড়েছে নাকি? রাধ্-ধাতু অর্থে নিষ্পন্ন করা বুঝায়।  রাধা অর্থাৎ যিনি সব নিষ্পন্ন করেন, সেই শক্তি। তিনি আবার ব্রজেশ্বরী, ব্রজ-ধাতু অর্থে গমন করা—গতিশীলা।  ব্রজেশ্বরী রাধা অর্থে সর্ব্বশ্রেষ্ঠা গতিশীলা নিষ্পন্নকারিণী শক্তি, অর্থাৎ আদি শব্দ-ধারা sound-current. চৈতন্য ধারা বা spirit-current. শ্রীকৃষ্ণ নিত্যলীলা করছেন, গোপীরা সেই আকর্ষণরাজের রাসে—ধ্বনিতে আকৃষ্ট হ’য়ে তাঁর দিকে ছুটছে,—জীবজগৎ তাঁর দিকেই যাচ্ছে। একটু hint (আভাস) দেওয়া রইল; ভাগবতাদি দেখে চেষ্টা করলে মাথা খুলে যেতে পারে, আর বোধহয় লিখতেও পারেন।’’ (অমিয়বাণী ২৯শে অগ্রহায়ণ, রবিবার, ১৩২৪) 

       এ-যুগের শ্রীকৃষ্ণ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর বিকৃতচারী-পাপীদের পরিত্রাণ উদ্দেশ্যে বললেন–
“ভগবান, ইষ্ট বা ধর্ম্মের মৌখিক স্তুতির ভিতর-দিয়ে যা’রা ধর্ম্মবিরোধী কাজ করে, তা’রা হ’ল সব চাইতে বড় শয়তানের দূত–প্রকৃষ্ট লোক-দূষক । ১২৫ । (শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭)

       ,,,,,,শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে বুঝিয়ে দিলেন যে devil (শয়তান) যদি রাজত্ব করে, তবে অর্জ্জুনের ঈপ্সিত ধর্ম্ম, জাতি, কুল, মান কিছুই রক্ষা পাবে না। তাই devil (শয়তান)-কে demolish (ধ্বংস) করা লোকমঙ্গলের জন্যই অপরিহার্য্য। এর মধ্যে দ্বেষ-হিংসার বালাই নেই। বরং অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধকে এড়িয়ে চলার বুদ্ধির পিছনে আছে দুর্ব্বলতা।’’ (আ. প্র. খণ্ড ৬, ৬. ১২. ১৯৪৫)   

       শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র শ্রীকৃষ্ণ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘শ্রীকৃষ্ণ সব সময়েই চেষ্টা করেছেন যুদ্ধবিগ্রহ avoid (পরিহার) করতে, কিন্তু তাঁর environment (পরিবেশ) তাঁকে সে scope (সুযোগ) দিল না। আর শ্রীকৃষ্ণের যুদ্ধ—মৃত্যুকে মারবার জন্য। Gangrene-affected part of the body (শরীরের দুষ্টক্ষতযুক্ত স্থান) আমরা যেমন কেটে ফেলি জীবন বাঁচাবার জন্য, তিনিও তেমনি মৃত্যু ও মারণের মূর্ত্ত প্রতীকস্বরূপ যারা ছিল তাদের মেরেছিলেন সমগ্র সমাজকে বাঁচাবার জন্য। (আ. প্র. খণ্ড ১, ৪. ১২. ১৯৪১)

।। পরমপুরুষ শ্রীবুদ্ধদেবের  স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।

       রাজার ঘরে জন্ম। রাজৈশ্বর্য্যের কোন আকর্ষণই তাঁকে ক্ষুদ্র সংসার মায়ায় আবদ্ধ করতে পারল না। রোগ-শোক-ব্যাধি-জরায় জর্জরিত হয়ে দেহত্যাগ না করে দেহাতীত আত্মার স্বরূপ সন্ধানে হলেন গৃহহারা। সাধনায় সিদ্ধ হয়ে লাভ করলেন বোধি। সিদ্ধার্থ হলেন বুদ্ধদেব। আমাদের বোধকে প্রবুদ্ধ করতে দিলেন চারটি আর্যসত্য।–১.দুঃখ, ২. দুঃখের উৎপত্তি, ৩. দুঃখ নিরোধ ও ৪. দুঃখ নিরোধগামী মার্গ। এই চার আর্য সত্যের উপর ভগবান বুদ্ধের সামগ্রিক ধর্ম-ভাবনা প্রতিষ্ঠিত। দুঃখ নিরোধগামী মার্গকেই অষ্টাঙ্গিক মার্গ বলা হয়েছে।–১. সম্যক দৃষ্টি (দৃষ্টি শুদ্ধতা)। ২. সম্যক সংকল্প—কাম, হিংসা, প্রতিহিংসা পরায়নতা ত্যাগ করে মৈত্রী ও করুণার সংকল্প। ৩. সম্যক বাক্য—মিথ্যা ও কটুবাক্য পরিহার করে সত্য, প্রিয়, মিষ্ট ও অর্থপূর্ণ বাক-বিনিময় করা। ৪. সম্যক কর্ম—প্রাণী হত্যা, চুরি, ব্যাভিচার ও মাদক দ্রব্য ত্যাগ করে, দয়া, বদান্যতা ও চরিত্র সৎ রাখার কর্ম। ৫. সম্যক জীবিকা—অসৎ জীবিকা ত্যাগ করে সৎ জীবিকার আশ্রয় গ্রহণ। ৬. সম্যক উদ্যম—ইন্দ্রিয় সংযম, কুচিন্তা ত্যাগ, সুচিন্তার আশ্রয়, সৎ চেষ্টার বৃদ্ধি। ৭. সম্যক স্মৃতি–কায়, বেদনা, চিত্ত ও মানসিক ভাবের অমলিন স্মৃতি। সম্যক সমাধি—প্রবৃত্তির দুষ্ট চিন্তা ত্যাগ করে সাত্তিক সাধনায় আত্ম-সমাহিত হওয়া।

       বুদ্ধদেবের মতবাদ শ্রীকৃষ্ণের আদর্শের পরিপূরক হওয়া সত্বেও বুদ্ধ অনুগামীরা আর্যকৃষ্টির আশ্রমধর্মকে মান্যতা না দিয়ে সন্ন্যাস মাধ্যমে মোক্ষ লাভ করতে গিয়ে বর্ণাশ্রমানুগ বিন্যস্ত সমাজ ব্যবস্থার ক্ষতি হয়। হীনযান, মহাযান, তন্ত্র প্রভৃতি উপ-বিভাগের মতানৈক্যের ফলে সনাতনী আর্যকৃষ্টির প্রবহমানতার গতি রুদ্ধ হয়। বিবাহের উপযুক্ত শ্রেয় ঘরের, তুল্য বংশের পাত্রের অভাবে প্রতিলোম বিবাহ হতে থাকে।


       বৌদ্ধধর্ম্ম প্রসঙ্গে  শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন,—‘‘বৌদ্ধমত ও হিন্দুমতে পার্থক্য খুব কম । একই কথা রকমারি করে বলা । শুনেছি বুদ্ধদেবের কথার মধ্যে প্রকারন্তরে বর্ণাশ্রমের সমর্থন আছে । …… তিনি গৃহীদের বিয়ে-থাওয়া, চাল-চলন-সম্বন্ধে যে-সব নির্দ্দেশ দিয়েছেন, তার সঙ্গে বর্ণাশ্রমের কোন বিরোধ নেই । অশোক বৌদ্ধধর্মের যে রূপ দিলেন, তার মধ্যে বর্ণাশ্রম খুঁজে পাওয়া যায় না । বর্ণাশ্রম হ’লো একটা scientific social structure (বৈজ্ঞানিক সমাজ বিধান) । এই structure (কাঠামো) ভেঙ্গে দিলে মানুষের অন্তরে-বাহিরে একটা chaotic condition-এর (বিশৃঙ্খল অবস্থার) সৃষ্টি হয় ।’’ (আ. প্র. ৬ খণ্ড, ২৩. ১২. ১৯৪৫)

       ‘‘অশোকের হাতে পড়ে বৌদ্ধধর্ম্মের কিছু কিছু বিকৃতি দেখা দিল। বৌদ্ধদের সংখ্যা বাড়ল বটে, কিন্তু বর্ণাশ্রমের বাঁধন রইল না। তারপর এল শঙ্করাচার্য্যের মায়াবাদ—‘ব্রহ্ম সত্য, জগৎ  মিথ্যা’। মানুষ ভুলে গেল যে আধ্যাত্মিকতা সার্থক হয় সাত্বত বস্তুতান্ত্রিকতায়। বুদ্ধদেব ও শঙ্করাচার্য্য এই দুইজনের সময় থেকেই অসৎ নিরোধের উপর গুরুত্ব দেওয়া হল না। ‘সোহহং’ চর্চ্চার ফলে ব্যক্তিগত সাধনার উপরই জোর দেওয়া হল।  একটা সর্ব্বাঙ্গীন ভাবধারা কোথাও রইল না।  একটা মূল সূত্রের উপর দাঁড়িয়ে বৈশিষ্ট্যপালী রকমে সমাজ, রাষ্ট্র সব নিয়ে একটা সর্ব্বসঙ্গতিসম্পন্ন ধারা ফুটে উঠল না। এই সবের ফলে এসেছিল নির্ব্বীর্য্যতা।  তোমরা যদি এই সর্ব্বতোমুখী কার্য্যক্রম নিয়ে তেমনভাবে তৈরী হও, তাহলে সব সম্প্রদায়ের সঙ্গে সঙ্গতি নিয়ে আবার তোমরা অসৎনিরোধী পরাক্রম-প্রবুদ্ধ হয়ে বৈশিষ্ট্যপালী আপূরয়মাণ আদর্শের উপর দাঁড়িয়ে জগতে অজেয় হতে পারবে।’’ (আ. প্র. ২১ খণ্ড, ১১. ০৫. ১৯৫২)  

 ।। প্রভু যীশুখ্রীস্ট স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি ।।

       প্রভু যীশু ব্যভিচারের বিরুদ্ধে, অনাচারের বিরুদ্ধে, পৌত্তিলকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে সবাইকে সনাতনী ঈশ্বরপ্রেমে অভিষিক্ত করতে চাইলেন। তাঁর সত্তাপ্রেমী আবেদন প্রবৃত্তি-প্রেমীদের সহ্য হলো না, ফলস্বরূপ তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ হতে হলো। মানবতার শত্রু হলো জুডাস।

       যীশুর ক্রুশবিদ্ধের কথা উঠলে, শ্রীশ্রীঠাকুর করুণ কণ্ঠে ছলছল নেত্রে বললেন,–‘‘সেদিন যেমন যীশু crucified (ক্রুশবিদ্ধ) হয়েছিলেন, আজকের দিনেও সেই যীশু তেমনি করে crucified (ক্রুশবিদ্ধ) হয়ে চলেছেন মানুষের হাতে। এই পাপের নিবৃত্তি না হলে মানুষের নিস্তার নেই। নিস্তারের একমাত্র পথ হলো মূর্ত্ত ত্রাতা যিনি তাঁকে sincerely follow (অকপটভাবে অনুসরণ) করা। তাহলে আমাদের ভুল-ত্রুটিগুলি ধীরে ধীরে শুধরে যাবে। ঠিকপথে চলতে শুরু না করলে, ভুলপথে চলার অভ্যাস আরো মজ্জাগত হবে তার chain reaction (শ্রেণীবদ্ধ প্রতিক্রিয়া) চলতে থাকবে।’’  (আ. প্র. ২৫.০১.১৯৪৮)

       প্রভু যীশু চরম ত্যাগ ও নির্ভরতার কথা বলেছেন।–পাখীদের বাসা আছে, শেয়ালের গর্ত আছে, কিন্তু তোমাদের মাথা গোঁজবার স্থান থাকবে না, কোন কিছুরই সংস্থান থাকবে না। ঈশ্বরের উপর নির্ভর করে নিঃস্ব ও চাহিদাশূণ্য হয়ে তোমরা শুধু মানুষের মঙ্গল করে চলবে, নিজেদের জন্য কোন ভাবনা রাখবে না। ঈশ্বরের দয়ায় যখন যেমন জোটে, তাতেই সন্তুষ্ট থাকবে।               

       “Charm yourself if you wish charm everyone.

       Do not hate anyone, hate their errors, correct their errors.

       Think yourself always powerful. Think not yourself that you are an idle fellow. Try to keep your mind always powerful. A soul of Peter─I the soul of universe.”  (Punya-Punthi)

       “The love of money is the root of all evil.”

                                  —New Testament, Timothy

                                  St. Mathew

       “Man is not to live on bread alone, but on every word that issues from the mouth of God.”            —Chap. IV, Vs. 4-5

       “What is a man profited, if he shall gain the whole world and lose his own soul ?”        

       “Anyone who divorces his wife for any reason except unchastely, makes her an adulteress, and whoever marries divorced woman commits adultery”. (5:32)

       “Do not be troubled then and cry : ‘What are we to eat ? Or What are we to drink ? Or how are we to be clothed ?’ For well your heavenly father knows, you need all that. Seek God’s Realm and his goodness, and all that will be yours over and above.”

                                         St. Mathew —Chap. VI, Vs. 31-33

       “Never imagine I have come to bring peace on earth ; I have not come to bring peace but a sword. He who receives a prophet because he is a prophet, will receive a prophet’s reward. He who has found his life shall lose it, and he who loses his life for my sake shall find it.”

                                         —Chap. XXIV, Vs. 42

                                  St. Mark

       “Go and sell all you have, give the money to the poor and you will have treasure in heaven ; then come, take up the cross and follow me.”          —Chap. X, Vs. 21-22

                                  James

       “For as the body without the breath of life is dead, so faith is dead without deeds.”             —Chap. II, Vs.26

       “But I tell you, any one who divorces his wife for any reason except unchastity makes her an adulteress, and whatsoever marries a divorced woman commits adultery.”
–Chap. V, Vs. 32

       অধ্যাপক ও ফরীশীগণ ব্যভিচারে লিপ্ত এক নারীকে ধরে এনে শ্রীযীশুর কাছে সমর্পণ করে বিচার প্রার্থনা করে বলে, ‘‘হে গুরু এই স্ত্রী লোকটি ব্যভিচার ক্রিয়ায় ধরা পড়েছে। মোশি এমন লোককে পাথর মারার আজ্ঞা দিয়েছেন, আপনার বিচারে কি বলেন।” যীশু নীরব;  মাথা নীচু করে কেবল পায়ের আঙ্গুল দিয়ে ভূমিতে কী লিখে চলেছেন। ফরীশীগণ বার-বার জিজ্ঞাসা করায় তিনি মাথা উঁচু করে বললেন, “তোমাদের মধ্যে যে নিষ্পাপ সেই প্রথমে একে পাথর মারুক।”

He that is without sin among you, let him first cast a stone at her,

                                   (St John, 8:7.)

       তিনি আবার মাথা নীচু করে লিখতে থাকেন ভূমিতে পায়ের আঙ্গুল দিয়ে। কিছুক্ষণ নীরবে গেলে, যীশু মাথা উঁচু করে দেখলেন, স্ত্রীলোকটি ছাড়া আর কেউ নেই। তিনি স্ত্রীলোকটিকে বললেন, “হে নারী তোমার অভিযোগকারীগণ কোথায়, তারা কেহ কি তোমায় দোষী করে নি‍?’’

  নারী কহিল—“না প্রভু, কেহ করে নি।” যীশু বললেন, “আমিও তোমাকে দোষী করি না, যাও আর কখনো এ মুহূর্ত হতে কোন রকম পাপ কর্ম করবে না।’’

—Neither do I condemn thee, go, and sin no more.

                                                                    (St, John.8:11)

       ওই মা-টি যীশুর প্রেমের পরশে স্নাত হয়ে সাধ্বী হয়েছিলেন । তাঁর প্রেমের পরশে মাছ-ধরা জেলেরা মানুষ-ধরা সাধকে পরিণত হয়েছিলেন। 

তাই আমরা যদি বছরে একটি বড়দিন উদযাপনের-এর  পাশাপাশি বাকি দিনগুলি প্রভুর যীশুর আদর্শের অনুসরণে আমাদের ছোট আমি-টাকে বড় করে তুলতে চেষ্টা করতাম ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতা, হিংসা, বিবাহ-বিচ্ছেদ, ভ্রষ্টাচার এভাবে ব্যাপ্তি লাভ করতে পারত কি ?   

 ।।  মুংপর্ব-মিলাদ-উন-নবী বা ইদ-এ-মিলাদ (পয়গম্বর হজরত মহম্মদের আবির্ভাব মুং ১২ রবিয়ল আউয়ল) স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।

       ইসলাম মতবাদের জনক হজরত রসুল ব্যভিচারের বিরুদ্ধে, পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে, শয়তানীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে মানুষকে আর্য্য-সনাতনী আদর্শের অনুরাগী করেছেন। অথর্ব বেদের অথর্বন সূক্তে অল্লার বর্ণিত স্বরূপ “অল্লো জ্যেষ্ঠং শ্রেষ্ঠং, পরমং, পূর্ণং ব্রাহ্মণমল্লাং………ইল্লাকবর, ইল্লাকবর, ইল্ললেতি, ইল্লাল্লা…..” (সূত্রঃ জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস-এর বাঙ্গলা ভাষার অভিধান)—–আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করেছেন, কোন বিভেদ সৃষ্টি করেন নি। তিনি নিরামিষাশী ছিলেন, আর্ষ্যকৃষ্টি মেনে চলতেন, ধর্মান্তকরণের বিরোধী ছিলেন, পরবর্তী নবী বা অবতারদের অনুসরণ করতে বলেছেন।

       হজরত রসুল সম্পর্কে বিশদ বিবরণী সংকলন, সৎসঙ্গ পাব্লিশিং হাউস কর্তৃক প্রকাশিত ইসলাম প্রসঙ্গে গ্রন্থ থেকে কিছু উদ্ধৃতি তুলে ধরলাম।–পাঠকদের জ্ঞাতার্থে।       

       বাসোপযোগী গৃহ, গুপ্তস্থান রক্ষা করিবার উপযুক্ত বস্ত্র, শুষ্ক-রুটি ও পানীয় ব্যতীত মানব-সন্তানের অন্য কোন জিনিসের উপর অধিকার নাই।  (পৃঃ ৫৯)

       একটু পানি এবং কয়েকটি খর্জ্জুরে তাঁহার ক্ষুধার নিবৃত্তি হইত। হজরত মোহাম্মদ একাধারে ধর্ম্ম-প্রবর্ত্তক, মহাকর্মী এবং সন্ন্যাসী ছিলেন।

       শত্রুর প্রতিও তিনি পরম দয়ালু ছিলেন, তিনি কতবার যে বিনা প্রয়োজনে দুষ্মনকে ক্ষমা করিয়াছেন তাহার সংখ্যা নাই। (পৃঃ ৬০)

       একমাত্র ব্যভিচার সত্তর বৎসরের এবাদত ধ্বংস করে।

       যখন মানুষ ব্যভিচার করে, তখন ঈমান তাহাকে ত্যাগ করে।

       হজরত রসুলুল্লাহ লম্পট পুরুষ ও রমণীকে অভিসম্পাত করিয়াছেন এবং তাহাদিগকে গৃহ হইতে বহিষ্কৃত করিতে বলিয়াছেন। (পৃঃ ১৭৭)

       বিবাহ কর কিন্তু তালাক দিও না, কারণ উহাতে আরশ কম্পিত হয়।(পৃঃ ২০০)

       বিশেষ কোন অপ্রিয় কারণ না থাকিলে স্ত্রীদিগকে তালাক দিও না—কারণ, আল্লাহ স্বাদগ্রহণকারী পুরুষ বা স্বাদগ্রহণকারিণী স্ত্রীলোককে ভালবাসেন না।  (পৃঃ ২০১)

       পয়গম্বর ব্যতীত যাহারা কেবল খোদাতায়ালাকে মান্য করে তাহারা মুসলমান নহে। (পৃঃ ৬৮)

       ইসলাম শব্দের অর্থ ঈশ্বরের নিকট সম্পূর্ণ আত্মনিবেদন। (পৃঃ ১৪২)

       সাময়িক প্রেরিত-পুরুষকে মান্য করিলে ঈশ্বরকে মান্য করা হয়। তদ্ব্যতীত ঈশ্বরের আদেশ মান্য করা মিথ্যা।

       প্রেরিতদের বিরোধী হইয়া শুদ্ধ ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসী হইলে বিশ্বাসের পূর্ণতাই হয় না। (পৃঃ ১৪২)

       শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আলোচনা প্রসঙ্গে জনৈক হকসাহেবকে বলছেন,—‘‘ইসলাম শব্দের মানে আমি শুনেছি, খোদায় আত্মনিবেদন বা শান্তি। সব ধর্ম্মেরই  তো মূলকথা এই।   সব ধর্ম্ম বললে কথাটা ভুল বলা হয়, কারণ ধর্ম্ম বহু নয়, ধর্ম্ম একই। আর কলেমা, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত এই পাঁচটি অনুষ্ঠান শুনেছি, মুসলমানদের অবশ্য করণীয়। প্রত্যেক শাস্ত্রেই তো এই বিধান আছে, তবে হয়ত ভিন্ন ভাষায়, ভিন্ন নামে হতে পারে। কলেমা মানে আমি বুঝি, খোদাতালায় বিশ্বাস রেখে প্রেরিত পুরুষকে স্বীকার করে তাঁর অনুশাসনে চলা। এই বিশ্বাস, স্বীকৃতি ও অনুসরণ ধর্ম্মের প্রথম ভিত্তি। হিন্দুর মধ্যেও আছে যুগপুরুষোত্তম বা সদগুরুর কাছে দীক্ষা গ্রহণ করে তাঁকে অনুসরণ করে চলার কথা। খ্রীষ্টানদের মধ্যেও আছে baptism (অভিষেক)-এর প্রথা। বৌদ্ধরাও আনুষ্ঠানিকভাবে ত্রিশরণ-মন্ত্র গ্রহণ করে থাকে বলে শুনেছি। এই স্বীকৃতি, এই পুরুষশ্রেষ্ঠকে আপন করে নেওয়ার মধ্য দিয়েই তাঁর অনুবর্ত্তনে চলার পক্ষে সুবিধা হয়। আর নামাজ মানে সন্ধ্যা, বন্দনা, প্রার্থনা। মানুষ ইষ্টের স্মরণ, মনন যত করে, তত তার মন পবিত্র হয়ে ওঠে, প্রবৃত্তিগুলিকে সুনিয়ন্ত্রিত করবার কায়দা পায়, আত্মবিশ্লেষণ ও আত্মসমীক্ষণে পটু হয়, তাছাড়া এতে করে ইষ্টিচলনের সম্বেগ বাড়ে, তাই এ নির্দ্দেশও সর্ব্বত্র আছে। আর রোজা মানে ইষ্টচিন্তাপরায়ণ হয়ে সুনিয়ন্ত্রিত উপবাস, এতে শরীর মনের অনেক গলদ বেরিয়ে যায়, ইচ্ছাশক্তি প্রবল হয়ে ওঠে। শুনেছি বিধিমাফিক উপবাস কাম-দমনের পক্ষেও সহায়ক। এও সবারই করণীয়, যে যে-পথেই চলুক। হজ মানে তীর্থযাত্রা, ভাবসিক্ত হয়ে তীর্থ-দর্শন করলে আমরা সাধু-মহাপুরুষদের ভাবে অনুপ্রাণিত ও অভিষিক্ত হয়ে উঠি। এ বিধানও সবার মধ্যে আছে। আর জাকাত মানে ধর্ম্মার্থে দান, ইষ্টার্থে উত্সর্গ। এই বাস্তব করণের ভিতর দিয়ে ইষ্টের প্রতি আমাদের অনুরাগ বাড়ে, তাছাড়া আমাদের উদারান্ন-আহরণী কর্ম্মও ইষ্টসার্থকতায় সার্থক হয়ে উঠতে থাকে। এইভাবে ইষ্ট আমাদের সব-কিছুতে  অনুপ্রবিষ্ট হয়ে ওঠেন। সংসারে চলতে আমাদের হাজারো তাল নিয়ে চলতে হবে, কিন্তু যদি সবটার মধ্যে যদি ইষ্টকে স্থাপনা করতে পারি, তাহলেই আমরা বহু অনিষ্ট, বিপদ, আপদ ও অনর্থের হাত হতে রেহাই পেতে পারি। আপনাদের যেমন জাকাত আছে, তেমনি অন্যত্র আছে ইষ্টভৃতি। এই ইষ্টভৃতি যে কত বড় জিনিস, মানুষের কত বড় রক্ষা-কবচ তা করলেই বোঝা যায়। আবার এর ভেতর দিয়ে দুঃস্থ পরিবেশও প্রভূত উপকৃত হয়। তাহলেই দেখুন, মূল জিনিসগুলি সর্ব্বত্র সমান কিনা।’’ (আ. প্র. ২/২৪. ১২. ১৯৪১)              

।। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যদেবের স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।

       কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা চৈতন্যদেব আর্য্যকৃষ্টি বিরোধী বৌদ্ধ-তান্ত্রিকতার পৌত্তলিকদের, শুষ্ক জ্ঞানচর্চাকারী তর্কবাগীশদের, তামসিক ধর্মাচ্ছন্নদের উদ্দেশ্যে পথ-নির্দেশ করলেন ‘হরেরাম হরেকৃষ্ণ’  ফরমূলার মাধ্যমে।–তোমার পাপ, তাপ হরণ করতে, প্রবৃত্তির পাপ-তাপের জ্বালা জুড়াতে পারে রামচন্দ্রের আদর্শ, শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ।   

       চৈতন্যদেব পুরুষার্থের চতুর্বর্গ, আশ্রমধর্মের ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ পালন করেছেন। অসৎ-নিরোধে তৎপর নিমাই পণ্ডিত কোন প্রতিলোম বিবাহ পর্যন্ত হতে দেন নি।  দোর্দন্ডপ্রতাপ জমিদারের দুষ্কৃত ভাইপো মাধবের কবল থেকে চন্দনের বাগদত্তা চুয়াকে পার্ষদদের সাহায্যে চন্দনকে দিয়েই হরণ করিয়ে স্বয়ং পৌরহিত্য করে উপযুক্ত পাত্রে পাত্রস্থ করেছেন।   ( শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত, চুয়াচন্দন উপন্যাস) অসি নয়, তীর-ধনুক-বল্লম লাঠি দিয়েও নয়—খোল, করতালাদি বাদ্যযন্ত্রের অনুষঙ্গে ‘হরেরাম হরেকৃষ্ণ’ নামগানের প্লাবন সৃষ্টি করে,–পুরুষার্থের পঞ্চম-বর্গ প্রেম-ধর্মের সাহায্যে সাম্প্রদায়িক কায়েমী-স্বার্থীদের বিরুদ্ধে ভাগবত আন্দোলনের মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে ভাগবত ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

       চৈতন্য চরিতামৃতের বর্ণনায় রয়েছে—

       “আত্মেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা তারে বলি কাম।

       কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা, ধরে প্রেম নাম।

       কামের তাৎপর্য্য নিজ সম্ভোগ কেবল।

       কৃষ্ণসুখ তাৎপর্য্য প্রেম মহাবল।।”

       চৈতন্যদেবের পরবর্তীকালে কিছু প্রবৃত্তিমার্গী অনুগামীরা ‘‘কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা’’-র আশ্রম-ধর্মের তাৎপর্য্য  ভুলে “আত্মেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা”-য় সহজিয়া গোষ্ঠী তৈরি করে সগোত্র এবং প্রতিলোম বিবাহাদি সমর্থন করে আশ্রমধর্মকে অশ্রদ্ধা করেছেন। ফলে বিকৃত হয়েছে শ্রীকৃষ্ণ-চৈতন্যদেবের আদর্শ। শ্রীকৃষ্ণের গীতার অসৎ-নিরোধী আদর্শকে পাশ কাটিয়ে মনগড়া কৃষ্ণ-নামের কীর্তন করা সত্বেও বিদেশী আগ্রাসনে পরাধীন হতে হয়েছে ভারতবাসীকে।      

চৈতন্যদেব প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, ‘‘চৈতন্যদেবের দ্বৈতবাদ নয়, দ্বৈতভাব। মূলতঃ সকলের বাদই অদ্বৈত, কারণ, একের উপরই দাঁড়িয়ে আছে যা-কিছু, আদিতে এক ছা়ডা দুই নেই। একেরই স্থূল, সূক্ষ্ম, কারণ নানাস্তর ও অভিব্যক্তি আছে। কিন্তু ভক্তিই তাঁকে লাভ করার সহজ পথ। ভক্তির মধ্যে দ্বৈতভাব এসে পড়ে, ভক্ত নিজের সত্তা না হারিয়ে ভগবানকে ভজনা করে চলে। ভক্তির সঙ্গে আবার কর্ম্ম ও জ্ঞান অচ্ছ্যেদ্যভাবে জড়ান। একেরই বিচিত্র প্রকাশ বলে সব সমন্বয় হয়েই আছে।’’ (আ. প্র. ১৩/৩১.৭.১৯৪৮)

       ‘‘ চৈতন্যদেবও জগাই-মাধাইয়ের উপর কেমন উগ্রভাব ধারণ করে তাদের অন্তরে ত্রাস ও অনুতাপ জাগিয়ে তবে প্রেম দেখিয়ে তাদের অন্তর জয় করেছিলেন। তাদের উগ্রদম্ভ, দর্প ও প্রবৃত্তি-উন্মত্ততাকে স্তব্ধ না করে, আয়ত্তে না এনে গোড়ায় প্রেম দেখাতে গেলে সে-প্রেম তারা ধরতে পারত না। হয়তো ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করত।’’ (আ. প্র. ৯/২৭.১২. ১৯৪৬)

 চৈতন্যদেবের স্বীয় স্বরূপ প্রকাশ প্রসঙ্গে বর্ণনা রয়েছে “শ্রীচৈতন্য ভাগবত গ্রন্থে—

চৈতন্য আজ্ঞায় স্থির হইল কীর্তন

কহে আপনার তত্ত্ব করিয়া গর্জন।
কলিযুগে মুঞি কৃষ্ণ নারায়ন

মুঞি সেই ভগবান দেবকীনন্দন।।
অনন্ত ব্রহ্মান্ড কোটি মাঝে মুই নাথ

যত গাও সেই মুঞি তোরা মোর দাস।।’’

       (শ্রীচৈতন্য ভাগবত পৃষ্ঠা ১৪৬, মধ্যখণ্ড ৮ম অধ্যায়।)
এইমত আর আছে দুই অবতার

সঙ্কীর্তন আনন্দ রুপ হইবে আমার।।
তাহাতেও তুমি সব এই মত রঙ্গে

সঙ্কীর্তন করিবা মহাসুখে আমা সঙ্গে।।
(শ্রীচৈতন্য ভাগবত পৃষ্ঠা ১৪৩,মধ্যখণ্ড ষড়বিংশ অধ্যায়।)
আবার বললেন শচীদেবীর উদ্দেশেঃ–
আর দুই জন্ম এই সঙ্কীর্তনারম্ভে

হইব তোমার পুত্র আমি অবিলম্বে।।
এইমত তুমি আমার মাতা জন্মে জন্মে

তোমার আমার কভু ত্যাগ নহে মর্মে।।
আমরা যে এই সব কহিলাম কথা

আর তুমি মনো দুঃখ না কর সর্বথা।।
কহিলেন প্রভু অতি রহস্য কথন

শুনিয়া শচীর কিছু স্থির হৈল মন।।
(শ্রীচৈতন্য ভাগবত পৃষ্ঠা ২৪৪, মধ্যখণ্ড ষড়বিংশ অধ্যায়।)
“এই নাম নয়রে মাধাই আরও নাম আছে,
এই নাম নিয়ে যাবে সেই নামের কাছে,
সেই নাম বিনেরে ভাই এই নাম মিছে।………”
কাল পূর্ণ হয়নি তাই চরম তত্ত্ব দেয়া হলো না
পরপর আমি দুই বার আসব। (শ্রীশ্রীচৈতন্য ভাগবত মধ্যে খণ্ড পৃঃ ২৬৭)

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র অবতারে তিনি সেই চরমতত্ত্ব দিয়ে গেলেন। প্রাণমন দিয়ে সাধনা করলেই তিনি ধরা দেবেন মেধানাড়ীতে । যে সূত্র তিনি শ্রীকৃষ্ণ অবতারে দিয়ে রেখেছিলেন— ‘‘বহূনি মে ব্যতীতানি……………..ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জ্জন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জ্জুন।। (শ্রীমদ্ভগবদগীতা চতুর্থোহধ্যায়, ৫—৯ শ্লোক)

।। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের  স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।

       অবতার বরিষ্ঠমাত্রেই পূর্বাপূর্ব অবতারদের পরিপূরণকারী হন।   তাই তো তিনি ‘‘যেই রাম সেই কৃষ্ণ, এক দেহে রামকৃষ্ণ’’ রূপে এসে আমাদের ভুল ভাঙিয়ে দিলেন। গীর্জায় গিয়ে যীশুর, মসজিদে গিয়ে রসুলের আরাধনা করলেন। পঞ্চমুণ্ডির আসন সাজিয়ে কোনো তান্ত্রিক-গুরু বসালেন তো বসে পড়লেন। তিনি লোকশিক্ষার জন্য বহু ধর্মীয় মতবাদের  গুরুদের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুন্ন রেখেই। তিনি দক্ষিণেশ্বরে পূজারী হয়ে এসেও প্রচলিত পূজা-পদ্ধতি অনুসরণ করেন নি। মৃন্ময়ী জগন্মাতাকে প্রাণবন্ত করে দেখালেন এবং কালী মায়ের আদেশক্রমে নিজে খেয়ে মাকে খাওয়ালেন। ফলহারিনী কালী পূজার শুভলগ্নে সারদাদেবীকে আরাধনা করে চিন্ময়ী মাতৃশক্তিকে আদ্যাশক্তি রূপে শ্রদ্ধা করতে শেখালেন।

।। শ্রীরামকৃষ্ণদেব প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।

       “ভগবান রামকৃষ্ণদেবেরও শোনা গিয়েছে—তাঁর এমনতর সময় এসেছিল, যখন মূর্ত্তি-টুর্ত্তি তাঁর সাধনার পথে বাধাই সৃষ্টি করতো। তিনি এমন-কি তাঁর ঘরে যে-সমস্ত ছবি-টবি ছিল, সেগুলিকেও সরিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি না-কি এই বলেছিলেন—‘মেয়েরা ততদিন পুতুলখেলা করে, যতদিন তার বে’ না হয়, স্বামী-সহবাস না করে।”

                           (কথা প্রসঙ্গে ২য় খণ্ড, পৃঃ ৭৬, ১৭-১০-১৩৪২)

       “শ্রীরামকৃষ্ণদেব ছিলেন তখনকার সময়ের Living Ideal (জীবন্ত আদর্শ)। এই Ideal (আদর্শ-পুরুষ) যখনই যেখানে এসেছেন, তাঁদের মধ্যে সঙ্গতি আছেই। কারণ, সকলেই এক ঈশ্বরের অবতার। ঈশ্বর তো আর দু’জন নয়। আর, ঈশ্বর এক বলে ধর্ম্মও এক। তাই, শ্রীরামকৃষ্ণ কখনও কারো ধর্মমতের নিন্দা করেন নি।”        (দীপরক্ষী ৪/৩০. ১১. ১৯৫৮)

       শ্রীরামকৃষ্ণঠাকুর বলেছেন,—‘‘চারাগাছ বেড়া দিয়ে রাখতে হয়। চারাগাছ বলতে আমি বুঝি সদ্গুরু, সৎনাম ও সৎসঙ্গ। মানুষ যদি অল্প বয়স থেকে সদগুরু গ্রহণ করে সৎনামের অনুশীলন নিয়ে সৎসঙ্গে অর্থাৎ জীবনবৃদ্ধিদ ভাল পরিবেশের ভিতর বাস করে, তাহলেই তার জীবন অনায়াসে সুগঠিত হতে পারে। মানুষের জীবন যদি কোন সৎ-এ সুনিবদ্ধ না হয়, তাহলে সে যে নানা আবর্তে পড়ে হাবুডুবু খাবে, সে-বিষয়ে কি আর কোন সংশয় আছে ?’’ (আ. প্র. ৫/১০. ৫. ১৯৪৩)  

                              ।। কল্পতরু শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব ।।

১৮৮৬ ইংরাজী নববর্ষের দিনে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের কল্পতরু হবার সংবাদ শুনে ভক্তরা সমবেত হয়েছিলেন যে যার মনোবাসনা নিয়ে। অবশেষে দর্শন দিলেন ভক্তদের। সমবেত ভক্তদের উপদেশ দিয়ে বললেন, তোমাদের চৈতন্য হোক।

       শ্রীরামকৃষ্ণদেব জীবনের শেষপ্রান্তে বলেছিলেন, এবারে সব জ্ঞান পার্ষদদের দিচ্ছিনা। শীঘ্রই আবার আমাকে আসতে হবে। ঈশান কোণে, গরীব ব্রাহ্মণের ঘরে। তখন যারা না আসবে তাদের মুক্তি হতে অনেক দেরি হবে।

       শ্রীরামকৃষ্ণদেব ১৮৮৬তে ইহলীলা সম্বরন করে ১৮৮৮তে আবির্ভূত হন অনুকূলচন্দ্র রূপ নিয়ে। পরিপূর্ণ চৈতন্য দিতে। সেই চৈতন্য লাভের সহজপন্থা দিলেন দৈনন্দিন স্বতঃ-অনুজ্ঞা অনুশীলনের মাধ্যমে। অজর-অমর-চিরচেতন মন্ত্রে।    

।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সমন্বয় বার্তা।।

       শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ধর্ম, ও ধর্মীয় সম্প্রদায় বিষয়ে আমাদের চেতনাকে সমৃদ্ধ করতে বিস্তৃতভাবে বললেনঃ

       “ধর্ম্ম মানে বাঁচাবাড়ার বিজ্ঞান। যে-কোন মহাপুরুষই তার প্রবক্তা হউন না কেন, তাতে ধর্ম্মের কোন পরিবর্তন হয় না; ধর্ম্ম চিরকালই এক। হিন্দুর ধর্ম্ম যা, মুসলমানের ধর্ম্মও তাই; প্রত্যেক ধর্মমতের লোকই ঈশ্বরপন্থী। আর, সেই ঈশ্বর একজন ছাড়া দুইজন নন। তাঁর প্রেরিত বাণীবাহক যাঁরা, তাঁরাও একই সত্যের উদ্গাতা—একই পথের পথিক—নানা কলেবরে একই সত্তা। তাই ধর্ম্ম মানুষকে মিলিত ছাড়া বিচ্ছিন্ন করে না। ধর্ম্মের থেকে চ্যুত হলেই সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে বিভেদ-বিরোধের সৃষ্টি হয়। হিন্দু যদি প্রকৃত হিন্দু হয়, মুসলমান যদি প্রকৃত মুসলমান হয়, তারা বান্ধববন্ধনে আবদ্ধ হতে বাধ্য; বাপকে যে ভালবাসে, সে কখনও ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ হতে পারে না। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের উপাস্যই এক ও অদ্বিতীয়; তাই সম্প্রদায়গুলি ভাই-ভাই ছাড়া আর কি? মানুষের সহজ বুদ্ধিতে সবই ধরা পড়ে; গোলমাল করে দূরভিসন্ধিপ্রসূত অপব্যাখ্যা ও অপযাজন। ধর্ম্ম যদি বিপন্ন হয়ে থাকে, তবে সবচাইতে বেশী বিপন্ন হয়েছে, এমনতর  অপযাজকদের হাতে। প্রত্যেক ধর্ম্মমতের আসল রূপটি তুলে ধরতে হবে সাধারণ লোকের কাছে; তাহলে দুষ্টলোকের জারীজুরি খাটবে না। হিন্দুর যেমন হিন্দুত্বের বিকৃতি বরদাস্ত করা উচিত নয়, তেমনি উচিত নয় ইসলামের বিকৃতি বরদাস্ত করা। মুসলমানেরও তেমনি উচিত নয় ইসলাম ও হিন্দুত্বের আদর্শকে ক্ষুণ্ণ হতে দেওয়া। কোন ধর্ম্মাদর্শকে ক্ষুণ্ণ হতে দেওয়া মানে শয়তানের সাগরেদি করা। আমাদের নিজেদের যেমন ধর্ম্মপরায়ণ হয়ে উঠতে হবে—পরিবেশকেও তেমনি ধর্ম্মপরায়ণ করে তুলতে হবে—প্রত্যেককে তার বৈশিষ্ট্য ও ধর্ম্মাদর্শ অনুযায়ী। হিন্দু যেমন গীতা পড়বে, তেমনি কোরাণ-বাইবেলও পড়বে; মুসলমান যেমন কোরাণ পড়বে, তেমনি গীতা বাইবেলও পড়বে। প্রত্যকে চেষ্টা করবে বাস্তব আচরণে স্বধর্মনিষ্ঠ হতে এবং অন্যকেও সাহায্য করবে ও প্রেরণা জোগাবে অমনতর হয়ে উঠতে।

       এমনতর হতে থাকলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সৌহার্দ্দ্য গড়ে তুলতে কদিন লাগে? আমি তো বুঝি, হিন্দুত্বের প্রতিষ্ঠা যেমন আমার দায়, ইসলাম ও খ্রীষ্টধর্ম প্রভৃতির প্রতিষ্ঠাও তেমনি আমারই দায়। আমার পরিবেশের প্রত্যেকে তার মত করে যদি ঈশ্বরপরায়ণ না হয়ে ওঠে, আদর্শপ্রেমী না হয়ে ওঠে, ধর্ম্মনিষ্ঠ না হয়ে ওঠে, তাহলে তো আমারই সমূহ বিপদ। পরিবেশকে বাদ দিয়ে আমার ধর্ম্ম করা অর্থাৎ বাঁচাবাড়ার পথে চলা তো সম্ভব নয়।”         

(আ. প্র. ৯/২. ১০. ১৯৪৭)

       ।। পূর্বতনে মানে না যারা/জানিস নিছক ম্লেচ্ছ তারা ।।

       “……শুনেছি রসুল পূর্বতনকে মানার কথা যেমন বলেছেন তেমনি আবার বলেছেন—যদি কোন হাবসী ক্রীতদাসও তোমাদের কোরাণ অনুসারে পরিচালিত করেন, তবে তোমরা তাঁর আদেশ পালন করে চলো। আর এটা ঠিক জেনো—কোরাণ, বেদ, বাইবেল, গীতা ইত্যাদির মধ্যে যেমন কোন বিরোধ নেই, বৈশিষ্ট্যপালী, আপূরয়মান মহাপুরুষ, তা তিনি পরবর্তী যে যুগেই আবির্ভূত হউন, তাঁর বাণীর মধ্যে কোরাণ, বেদ, বাইবেল, গীতার পরিপন্থী কোন কথা থাকে না, বরং থাকে যুগোপযোগী পরিপূরণ। তাই পরবর্তীর মধ্যে আমরা পূর্ববর্তীকে আরো করে পাই। একই ঈশ্বরপ্রেরণার প্রবাহই তো যুগ-যুগ ধরে বয়ে চলে আরো আরোতর অভিব্যক্তি নিয়ে প্রয়োজন ও পরিস্থিতির পরিপূরণে। সৃষ্টি যতদিন থাকবে, ততদিন এ ধারা চলতেই থাকবে।”                   –শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, আ. প্র. (১১/৭.৫.১৯৪৮)

৪ঠা পৌষ, শুক্রবার, ১৩৪৮ (ইং ১৯. ১২. ১৯৪১)। শ্রীশ্রীঠাকুর অতি  প্রত্যুষে বিছানা থেকে উঠে দক্ষিণাস্য হয়ে বাঁধের উপর বেশ কিছুক্ষণ মৌন-গম্ভীর হয়ে দিগন্তবিসারী দৃষ্টিতে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে একাকী দাঁড়িয়ে  থেকে ফিরে এসে তাসুর ভিতরে ঢুকে বিছানায় উপবেশন করলেন। আর সবাই চৌকির চারিপাশ ঘিরে মাটিতে বসলেন। ।। ধর্মের নামে অধর্মের প্রশ্রয় ।।

      শ্রীশ্রীঠাকুর হঠাৎ বললেন—(কথার মধ্যে কেমন যেন একটা অন্তরঙ্গ রহস্য গভীর সুর) ‘‘দ্যাখ, দুনিয়ায় সবই কিন্তু চেতন, অচেতন কোথাও  নেই কিছু। সবার সঙ্গেই তাই আদান-প্রদান চলে, ভাববিনিময় চলে। আবার, মাঝে-মাঝে আমার মনে হয় সবই যেন মানুষ—গরু-মানুষ, গাছ-মানুষ, ঘাস-মানুষ, চাঁদ-মানুষ, সূর্য্য-মানুষ এমন কত কী ! কখনও আবার দেখি—সবই যেন  আমি—গাছ-আমি, পোকা-আমি, রাম-আমি, শ্যাম-আমি, এক আমি এত হয়ে আছি, আমিই আমার সঙ্গে এত কাণ্ড করছি—এ বড় বিচিত্র ব্যাপার। তাই কেউ যখন কারও ক্ষতি করতে চায়, আমার বড় হাসি পায়। ভাবি—পরমপিতা ! এ তোমার কী খেলা ? মানুষ নিজেরই ক্ষতি করতে চায় নিজে। কারও ক্ষতি করা মানে যে নিজেরই ক্ষতি করা—এইটুকুই বোঝে না। তত্ত্বদৃষ্টি বাদ দিলেও একথা খাটে। তোমার পরিবেশকে তুমি যদি ক্ষুণ্ণ কর, প্রতিক্রিয়ায় তারাও তোমাকে ক্ষুণ্ণ করতে চেষ্টা করবে, আর তা’ যদি না-ও করে, তারা ক্ষুণ্ণ হলে আগের মত জীবনীয় পোষণ যোগাতে পারবে না তোমাকে ও অন্যান্যকে। ফলে, তোমারই তো ক্ষতি সব থেকে বেশী। তাই বলে দুষ্টবুদ্ধি নিয়ে চলছে যারা—তাদের যে নিরস্ত করবে না, তা’ কিন্তু নয়। সেখানে প্রতিরোধ না করাই দুর্বলতা, ঐ দুর্বলতা অধর্মেরই নামান্তর। ধর্মের নামে কত যে অধর্ম প্রশ্রয় পাচ্ছে দুনিয়ায়, তার কি ঠিক আছে !’’

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, ওই দুর্বলতা দ্বারা আচ্ছন্ন আমিও।  নইলে তাঁর প্রদত্ত

“তমসার পার—-
      অচ্ছেদ্যবর্ণ
           মহান্ পুরুষ
ইষ্টপ্রতীকে আবির্ভূত !
যদ্বিদাচারণে
     তদুপাসনাতেই
          ব্রতী হই !
—জাগ্রত হও
     আগমন কর—
আমরা যেন একেই অভিগমন করি,
     একোদ্দেশ্যেই বাক্, কর্ম্ম বিনিয়োগ করি,
একনিরন্তরতায়
     সেই তাঁকেই যেন জানিতে পারি,
শ্রদ্ধানুসৃত—
     আপূর্য্যমাণ
         ইষ্টৈকপ্রাণনায়
               একই মন্ত্রে একই মননে
     সমষ্টি-উৎসারণায়
           বৈশিষ্ট্য-পূরণী একচেতনাভিমন্ত্রণে
     শিষ্ট হবিঃ ও শ্রেষ্ঠ হবনায়
          সমান আকূতি ও সম্যক হৃদয়ে
জীবন-বর্দ্ধনে
          ঋদ্ধিমান্ হই !
             স্বস্তি ! স্বস্তি ! স্বস্তি !”

আহ্বানী মন্ত্র উপেক্ষিত হতে পারত তাঁরই উত্তরসূরীদের দ্বারা—পারত না, আমি যদি একান্তই তাঁর জন্য নিবেদিত প্রাণ হতে পারতাম।

আমি যদি আমার প্রিয়ের জন্য দুর্বলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারতাম তাহলে কি তাঁর প্রদত্ত ‘পঞ্চবর্হি’-র অনুশাসনসমূহ—       

‘‘১। একমেবাদ্বিতীয়ং শরণম্।
২। পূর্ব্বেষামাপূরয়িতারঃ প্রবুদ্ধা ঋষয় শরণম্।
৩। তদ্বর্ত্মানুবর্ত্তিনঃ পিতরঃ শরণম্।
৪। সত্তানুগুণা বর্ণাশ্রমাঃ শরণম্।
৫। পূর্ব্বাপূরকো বর্ত্তমানঃ পুরুষোত্তমঃ শরণম্ ।
    এতদেবার্য্যায়ণম্, এষ এব সদ্ধর্ম্মঃ,
    এতদেব শাশ্বতাং শরণ্যম্।’’

১। এক অদ্বিতীয়ের শরণ লইতেছি।
২। পূর্ব্বপূরণকারী প্রবুদ্ধ ঋষিগণের শরণ লইতেছি।
৩। তাঁহাদের পথ অনুসরণকারী পিতৃপুরুষগণের শরণ লইতেছি।
৪। অস্তিত্বের গুণপরিপোষক বর্ণাশ্রমের শরণ লইতেছি।
৫। পূর্ব্ব-পূরণকারী বর্ত্তমান পুরুষোত্তমের শরণ লইতেছি।

    ইহাই আর্য্যপথ, ইহাই সদ্ধর্ম্ম, আর ইহাই চিরন্তন শরণযোগ্য।

(হিন্দুমাত্রেরই এই পঞ্চবর্হি বা পঞ্চাগ্নি  স্বীকার্য্য—তবেই সে হিন্দু, হিন্দুর হিন্দুত্বের মূল শরণমন্ত্র ইহাই—সর্বজন-গ্রহণীয়।)

মন্ত্র উপেক্ষিত হতে তাঁরই উত্তরসূরীদের দ্বারা—পারত না, আমি যদি একান্তই তাঁর জন্য নিবেদিত প্রাণ হতে পারতাম।

আমি যদি আমার প্রিয়ের জন্য দুর্বলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারতাম তাহলে কি তাঁর প্রদত্ত ‘সপ্তার্চ্চি’-র অনুশাসনসমূহ—        

‘‘১। নোপাস্যমন্যদ্ ব্রহ্মণো ব্রহ্মৈকমেবাদ্বিতীয়ম্।
২। তথাগতাস্তদ্বার্ত্তিকা অভেদাঃ।
৩। তথাগতাগ্র্যোহি বর্ত্তমানঃ পুরুষোত্তমঃ
    পূর্ব্বেষামাপূরয়িতা বিশিষ্ট-বিশেষ বিগ্রহঃ।
৪। তদনুকূলশাসনং হ্যনুসর্ত্তব্যন্নেতরৎ।
৫। শিষ্টাপ্তবেদপিতৃপরলোকদেবাঃ শ্রদ্ধেয়া নাপোহ্যাঃ।
৬। সদাচারা বর্ণাশ্রমানুগজীবনবর্দ্ধনা নিতং পালনীয়াঃ।
৭। বিহিতসবর্ণানুলোমাচারাঃ পরমোৎকর্ষ হেতবঃ
    স্বভাবপরিদ্ধংসিনস্তু প্রতিলোমাচারাঃ।’’

১। ব্রহ্ম ভিন্ন আর কেহ উপাস্য নহে, ব্রহ্ম এক–অদ্বিতীয়।
২। তথাগত তাঁর বার্ত্তাবহগণ অভিন্ন।
৩। তথাগতগণের অগ্রণী বর্ত্তমান পুরুষোত্তম, পূর্ব্ব-পূর্ব্বগণের পূরণকারী  বিশিষ্ট                      বিশেষ বিগ্রহ।
৪। তাঁহার অনুকূল শাসনই অনুসরণীয়—তাহা ভিন্ন অন্য কিছু অনুসরণীয় নহে।
৫। ঋষি-অনুশাসিত প্রামাণ্য জ্ঞান,  পিতৃপুরুষ, পরলোক, দেবতাগণ শ্রদ্ধেয়—   অবহেলার যোগ্য নহে।
৬। বর্ণাশ্রমের অনুকূল বাঁচাবাড়ার পরিপোষক সদাচার-সমূহ-নিত্যপালনীয়।
৭। বিহিত সবর্ণ ও অনুলোমক্রমিক (বিবাহাদি) আচারসমূহ পরম উৎকর্ষের কারণ—        প্রতিলোম-আচার স্বভাব-ধ্বংসকারী।

(পঞ্চবর্হি যেমন প্রত্যেক হিন্দুর স্বীকার্য্য ও গ্রহণীয়, এই সপ্তার্চ্চিও তেমনি অনুসরণীয় এবং পালনীয়।)

মন্ত্র উপেক্ষিত হতে তাঁরই উত্তরসূরীদের দ্বারা—পারত না, আমি যদি একান্তই তাঁর জন্য নিবেদিত প্রাণ হতে পারতাম।

শ্রীশ্রীঠাকুর সম্বিতী গ্রন্থে বলছেন—

মতবাদ যাই হোক না,—

আর, যে-কোন সম্প্রদায়ই হোক,

     যা’ মুখ্যতঃ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’কে

          স্বীকার করেনিকো—

     কোন-না-কোন রকমে,—

তা’ কখনও অনুসরণ করতে যেও না,

     তা’ কিন্তু জঘন্য—অসম্পূর্ণ,

          সত্তা-সম্বর্দ্ধনার পরিপন্থী তা’;

আর, ঐ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’ই হ’চ্ছে

          সেই রাজপথ—

যা’কে স্বীকার ও গ্রহণ করে চললে

ক্রমশঃই তুমি সার্থকতায় সমুন্নত হ’তে পার। ২৩৪ ।

আমি ভাবছি, শ্রীশ্রীঠাকুরের ওই নিদেশকে অমান্য করে যারা ধর্মের নামে অধর্ম করে সৎসঙ্গী পরিচয়ের গর্ব করেন, তাদের পরিণতি কি হবে ? তা’রা যা’তে শ্রীশ্রীঠাকুরের প্রদত্ত বিধিকে উপেক্ষা করে দুর্গতিতে পতিত না হয়, পরমপিতাকে অবমাননা করে নিজেদের ক্ষতিকে আবাহন না করতে পারে, সে বিষয়ে যাজন করা একান্ত দরকার—সবার আগে। কারণ, সব অন্যায়ের ক্ষমা থাকলেও পুরুষোত্তম-বিধিকে অমান্য করলে বিধি কখনো ক্ষমা করবে না।   

সবাইকে ইষ্টরঙে রঞ্জিত হবার আবেদন জানিয়ে, জানাই শ্রদ্ধা, ভক্তি, প্রণাম ও জয়গুরু! অভিবাদন।  বন্দে পুরুষোত্তমম্ ! ধ্বনি দিয়ে নিত্য হতে লীলায়, লীলা হতে নিত্যে আগম-নিগমকারী পূর্বাপূর্ব সব পুরুষোত্তমদের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে ইতি টানলাম। 

                                  ––––––

UTTARADHIKAR

বিপন্ন উত্তরাধিকার

                              ––ডাঃ তপন দাস

‘‘অভাবে পরিশ্রান্ত  মনই ধর্ম্ম বা  ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা করে, নতুবা করে না।’’

      পরম প্রেমময় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র লিখিত সত্যানুসরণের চিরন্তন ওই বাণীর অমোঘ টানে নরেন দত্ত গেলেন পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের দরবারে––জাগতিক অর্থাভাব ঘোচাতে। অন্তর্যামী ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব দেবোপম চরিত্রের উত্তরাধিকারীকে সচেতন করিয়ে দিলেন, আত্মসুখ নয়, ভারতবর্ষের শাশ্বত দর্শন, ‘‘বহুজন হিতায় চ, বহুজন সুখায় চ’’-এর আদর্শের উত্তরাধিকারী হয়ে পরমার্থ লাভ করার জন্য তোমাকে আত্ম নিবেদন করতে হবে।

      শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ঐশী শক্তিতে শক্তিমান হয়ে নরেন্দ্রনাথ হলেন বিবেকানন্দ। এঁকে দিলেন মহান ভারতবর্ষের পূর্ণাঙ্গ এক চিত্র। শিকাগো ধর্ম্ম মহাসভার ক্যানভাসে।

      ‘আব্রহ্মস্তম্বভৃদ্ধাতা’–তৃণলতা থেকে ব্রহ্ম, সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বার্তাবহ বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, সংহিতা, পুরুষোত্তমবাদ নিয়ে বিশ্বজনমানস নতুন করে ভাবতে শুরু করলো।  হৃত উত্তরাধিকার ফিরে পেতে ভারতবর্ষ ‘‘উত্তিষ্ঠত জাগ্রত, প্রাপ্য বরান্ নিবোধত।।’’ মন্ত্রে আবার নতুন করে জেগে উঠলো।………

      ‘‘কর্ম্মণ্যেবাধিকারেস্তু মা ফলেষু কদাচন।…….’’ ––কর্মেই তোমার অধিকার ফলে নয়। ––শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতার ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার আদর্শ আঁকড়ে নবযুগের অভিমন্যু ক্ষুদিরাম, দেশরক্ষার ধর্ম পালন করতে গিয়ে ফাঁসির আসামী হলেন। ‘‘ন জায়তে ম্রিয়তে কদাচিৎ…….বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়………নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ।…….’’। বাণীর অমৃত আদর্শে স্থিতপ্রজ্ঞ, মৃত্যুঞ্জয়ী ক্ষুদিরাম হাসিমুখে ফাঁসির দড়ির মালা পড়লেন গলায়। একটা ক্ষুদিরামের আত্মাহুতি জন্ম দিল হাজারো ক্ষুদিরামের। ফাঁসিরজ্জু আর ইংরেজ রাজশক্তির বুলেটের আলিঙ্গনে জীবনের জয়গান গাইতে গাইতে অকালে হাসিমুখে বিদায় নিল উত্তরাধিকারের স্বপ্নদেখা কতশত বীর ভারত-সন্তানেরা। অবশেষে একদিন গ্যালন গ্যালন রক্তের বিনিময়ে আমরা ফিরে পেলাম উত্তরাধিকার। অপূর্ণ, খণ্ডিত। অখণ্ড ভারতবর্ষ হিন্দুস্তান, পাকিস্তান আখ্যা পেল। কিন্তু পূর্ব পশ্চিমে প্রসারিত ভারতমাতার কর্তিত দুটো বাহুর ক্ষত আজও শুকলো না। সৃষ্ট হলো জাতীয় ম্যালিগন্যাণ্ট সমস্যার। বর্তমান যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের প্রদত্ত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার নিমিত্ত রক্ষাকবচ ‘পপুলেশন এক্সচেঞ্জ’ বিধি না মানার জন্য।

তা’ সমস্যা যতই থাকুক, তথাপি জাতীয়তাবাদের পরিচয়ের নিরিখে আমরা ভারতবাসী। আর্য্যজাতির বংশধর। বাল্মীকি, বেদব্যাস আমাদের জাতীয় কবি। রাম, কৃষ্ণ, চৈতন্য, রামকৃষ্ণ প্রমুখ আর্য্য ভারতবর্ষের জাতীয় মানবতাবাদের পূজারী পুরুষোত্তমগণের সাথে ‘‘দিবে আর নিবে মেলাবে মিলিবে’’-র আদর্শ মেনে বুদ্ধ, যীশু, হজরত রসুলকেও দ্রষ্টাপুরুষরূপে চিহ্নিত করিয়ে দিলেন বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। জাতীয় জীবনে সাম্প্রদায়িক সমন্বয়ের বাস্তব সেতুবন্ধন রচিত না হলেও, ভারতীয় হিন্দু, ভারতীয় মুসলমান, ভারতীয় খৃষ্টান, ভারতীয় বৌদ্ধ, ভারতীয় শিখ প্রত্যেকেই যে আর্য্যজাতির বংশধর আমরা বুঝতে শিখলাম, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের কাছে আনত হয়ে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আসমুদ্র হিমাচল পর্যন্ত বিস্তৃত ভারতবর্ষের মহিমা বন্দনা করলেন ‘আর্য্য ভারতবর্ষ আমার জ্ঞান-গরিমা-গরবিনী …….’ সঙ্গীতের ছন্দে।

এই সবকিছু নিয়েই তো আমরা জোর গলায় বলতে পারছি,  ‘মেরা ভারত মহান, India is  great.’ আচ্ছা ওই শ্লোগানগুলো বলার সাথে সাথে করার যদি মিল না থাকে, ইতিহাসে আমাদের পরিচয় কি হবে? ভারতীয় ঐতিহ্য, ভারতীয় কৃষ্টি, ভারতীয় অনুশাসনের উত্তরাধিকার আমরা প্রকৃত অর্থে বহন করে চলছি কি?

গণপ্রজাতন্ত্রী আধুনিক ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ধর্মকে রক্ষা করে চলার কর্তব্যকে। রাষ্ট্রীয় মন্ত্র ‘সত্যমেব জয়তে’ স্মরণ করিয়ে দেয় উপনিষদীয় আচার্য অনুসরণের  শাশ্বত অবলম্বনকে। রাষ্ট্রের কর্ণধার রাষ্ট্রপতিসহ মন্ত্রীবর্গ প্রত্যেকেই ঈশ্বরের নামে শপথ গ্রহণ করে ঈশ্বরসৃষ্ট জীবগণের কল্যাণ সাধনে ব্রতী হয়। ঈশ্বরের প্রতিভূস্বরূপ জাগতিক ন্যায়দণ্ডধারী বিচারকেরা ধর্মাধিকরণ নামে চিহ্নিত। বিচারালয়কে বলা হয় ধর্মস্থান। কেন?

ভারতীয় অনুশাসনের সাম, দান, ন্যায়, দণ্ড, নীতি ও ভেদ-এর রাজধর্ম রক্ষার পবিত্র কর্তব্যে যাতে এতটুকু অন্যায়, অধর্ম প্রবেশ করতে না পারে তার জন্যই ওইসব মহাভারতীয় নীতির অনুসরণ। বিধিবৎ প্রকৃষ্ট-জাতক সৃষ্টি করে প্রজা পালনের স্বার্থেই  ওই অনুশাসনকে আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি। তথাপি যখন ভারতীয় শাসন সংহিতা বা সংবিধান ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ না করে, ধর্ম এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়কে এক করে ফেলে ‘ধর্ম-নিরপেক্ষতাবাদ’,––অর্থাৎ রাষ্ট্র ধর্মের অনুবর্তী নয়’-এর মতবাদকে প্রতিষ্ঠা দেয়, তখন কি মনে হয় না, আমরা জাতীয়তাবাদের আদর্শের প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েও এক পরস্পর বিরোধী আচরণ করে চলেছি !

বর্তমান যুগ-পুরুষোত্তম কথিত ধর্মের যুগান্তকারী সংজ্ঞা ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম বলে জানিস তাকে। ধর্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম না-রে।’ সমন্বয় বার্তাবহ বাণীকে গুরুত্ব না দিয়ে ধর্মের নামে, ভারতীয় সংহিতার নীতি বহির্ভূত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তি পরায়ণতার  আস্ফালনকে, কতগুলো অনিত্য, অসার, পৌত্তলিক কু-সংস্কারকে যদি ‘ধর্ম’ নামে প্রতিষ্ঠা দিতে চাই, তা’ কি বিচক্ষণতার পরিচায়ক হবে, না ভারতবর্ষের কৃষ্টির পরিপূরক হবে? ওই ভুলের বোঝা কি আমাদের চিরদিন বইতে হবে? আমাদের বুদ্ধি, বোধ কি নিরেটই থেকে যাবে?

যে নীতি-বিধি পদার্থের অস্তিত্ব রক্ষার সহায়ক তাই তো ধর্ম। পদার্থের স্বকীয়তা ধারণ করে রাখার সহায়ক যা’ তাই ধর্ম। ধর্ম পালন করলেই পদার্থ টিঁকে থাকবে, নচেৎ থাকবে না। সংসদ প্রকাশিত ইংরেজী অভিধানে ধর্মের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘It is an action, one is bound to  do.’ সেই ধর্মের আবার পক্ষ আর নিরপেক্ষ কি? বেঁচে থাকার অজৈব উপকরণ বায়ু, জল, মাটি ইত্যাদির যদি ধর্ম থাকতে পারে, এবং তা’ যদি বিজ্ঞানের বইতে পাঠ্য হতে পারে, তাহলে মানুষের অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার নীতিবিধি-সমন্বিত ভারতের নিজস্ব সংহিতাগুলোর বিধানসমূহ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের সংহিতায় স্থান পাবে না কেন, প্রজাদের শিক্ষা দিতে পাঠ্য করা  হবে না কেন?     

রাষ্ট্রের সৃষ্টিই তো প্রজাদের অধর্ম বা দুর্নীতি থেকে মুক্ত করে ধার্মিক, অর্থাৎ সু-নীতি পরায়ণ করে তোলার জন্য। সেই রাষ্ট্র যদি তার প্রজাবর্গকে, তাদের পিতৃ-পিতামহের আদর্শ অনুসারী ধর্ম-পরায়ণ, কৃষ্টি-পরায়ণ হতে উৎসাহ না দিয়ে, প্রবৃত্তি-পরায়ণতায় উৎসাহ দেয়, সেটা ভারতবর্ষের জাতীয়  উত্তরাধিকারত্বের অস্তিত্বকে বিপন্ন করার বার্তা ভিন্ন আর কিছু নয়।

আর্য্য ভারতবর্ষের আদি সংবিধান ‘ব্রহ্মসূত্র’-এর নবীন সংস্করণ ‘কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র’ অনুযায়ী–

‘‘সুখস্য মূলম্ ধর্ম্মম্

ধর্ম্মস্য মূলম্ অর্থম্

অর্থস্য মূলম্ রাষ্ট্রম্

রাষ্ট্রস্য মূলম্ ইন্দ্রিয় বিজয়ম্

ইন্দ্রিয় বিজয়স্য মূলম্ জ্ঞানবৃদ্ধ সেবয়া

জ্ঞানবৃদ্ধ সেবয়া বিজ্ঞানম্।’’

অর্থাৎ সুখী হতে হলে ধর্ম পালন করতে হবে। প্রকৃত ধার্মিক হতে হলে পুরুষার্থের চতুর্বর্গ সমন্বিত আশ্রমধর্ম পালন করতে হবে। নির্বিঘ্নে আশ্রমধর্ম পালন করার জন্য রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী প্রজাদের দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী হবার জন্য গুরু গ্রহণ করতে হবে। গুরুর আদেশ-নিদেশ পালন করলে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করা যাবে। তবেই জীবনে সুখী হওয়া যাবে।

                                    *    *    *

আমরা আমাদের ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদে আর্য্যজাতির মহান গ্রন্থ ‘মহাভারত’-কে স্বীকৃতি দিয়েছি। সেই স্বীকৃতির অধিকারে স্বীকৃতি পেয়েছে ‘শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতা’। সেই সূত্রে স্বীকার করে নিতে হয় মহান রাজনীতিবিদ্ পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণকে। স্বীকার করে নিতে হয় ‘শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতা’ প্রদত্ত––‘গতির্ভর্ত্তা প্রভুঃ প্রেষ্ঠ ঈশ্বরঃ পুরুষোত্তমঃ।/আব্রহ্মস্তম্বভৃদ্ধাতা সদগুরুস্ত্বং নমহোস্তুতে।।’ বাণীর শাশ্বত বার্তাকে। অতএব, আমাদের প্রকৃত উত্তরাধিকার প্রাপ্তির সূত্রই হলো সদগুরুর দীক্ষা গ্রহণ করে তাঁর নীতি-নিদেশ মেনে চলা। তাঁর আদর্শের প্রতি আনতি সম্পন্ন হয়ে চলা।

আমরা ‘মেরা ভারত মহান’ বলে চিৎকার করবো অথচ ভারতীয় কৃষ্টির ধারা অনুসরণ করবো না, পরিপালন করবো না, প্রচার করবো না, তা’-তো হতে পারে না ! যদি আমরা সত্যিসত্যিই ওই মহান অনুশাসন মেনে নিতাম তাহলে কি ভারতীয় টিভিতে, সিনেমাতে, পুস্তকে, রাস্তাঘাটে ভারতীয় কৃষ্টির অনুশাসন পরিপন্থী, প্রবৃত্তি-প্ররোচিত স্পর্শকাম, দর্শকাম, শ্রুতিকাম, হিংসা-দ্বেষ প্রদর্শিত এবং প্রচারিত হয়ে মনুষ্যত্বকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারতো? ওইসব প্রবৃত্তি-প্ররোচিত আদর্শের কবলে পড়ে আমরা ভুলতে বসেছি আমাদের জাতীয় আদর্শ, আমাদের প্রকৃত উত্তরাধিকারের তত্ত্বকে।

চিদানন্দ সম্পদের অধিকারী আমার, আপনার, আমাদের প্রাথমিক পরিচয় কি, একটু ভেবে বলুন তো? না, না, নার্ভাস হবার কিছু নেই। এককথায় এর উত্তর যে ‘মানুষ’, তা’ প্রগতিশীল, প্রতিক্রিয়াশীল প্রত্যেকেই স্বীকার করবেন। আর  এ-ও স্বীকার করবেন যে, আমরা আকাশ থেকে শিলাবৃষ্টির সাথে একদিন হঠাৎ এই মহীতলে পতিত হইনি কোন গ্রহান্তরের প্রাণী হিসেবে। অযোনী-সম্ভূতও নয়। আমরা প্রত্যেকেই মাতৃদেবীর গর্ভবাসকাল শেষ করে অপত্যপথে, না হয় নিম্ন-উদরচেরা হয়ে পৃথিবীর আলো-হাওয়ার সাথে পরিচিত হয়েছি। পুরুষ-পরম্পরাগত জৈবী-সত্তার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দেহ-মন-প্রাণ নিয়ে। প্রত্যেকের বৈশিষ্ট্য আলাদা আলাদা। যেহেতু পৃথক পৃথক  বংশের ধারা নিয়ে আমরা জন্মেছি। এই তথ্যকে অস্বীকার করলে জীব-বিজ্ঞানকেও অস্বীকার করতে হয়।

বিজ্ঞানের মানদণ্ডে, পিতৃ-মাতৃ বংশের ধারার সাথে নিজেদের অর্জিত দোষ-গুণ মিলেমিশে তৈরি genetic code Meiotic cell division-এ বিভাজিত হয়ে প্রস্তুতি নেয় উত্তর পুরুষ সৃষ্টির। মায়ের আকুতি, ভাবাবেগ  সম্বর্দ্ধিত Ectoplasmic body বা লিঙ্গ-শরীর বা আত্মা আশ্রয় গ্রহণ করে পিতার পুং-জননকোষের কোষাণুপুঞ্জে। দৈবরূপী বীজকে পুরুষাকাররূপী প্রকৃতি বা ডিম্বাণু করে বরণ। পিতার এবং মাতার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সংস্করণ, দুটি অর্দ্ধ কোষাণু (y+x, or, x+x chromosome) এক হয়ে সৃষ্ট হয় একটি পূর্ণাঙ্গ কোষ। একটা প্রজন্মের ভ্রূণ। পিতামাতার আত্ম-প্রতিলিপির প্রতিনিধি স্বরূপ।

কোন ভ্রূণ বিস্তৃতি লাভ করে জীবনবাদের গান গেয়ে যায়। কেউ ধ্বংসকে ডেকে আনে। কেউ ঝরে যায় অকালে। আমরা কেউ চাই না আমাদের উত্তরাধিকার অকালে ঝরে যাক, বিকৃত হয়ে জন্মাক। তবুও জন্মে যায় আমাদের অজ্ঞতার জন্য। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জাগতিক সম্পদ, ভোগের  উপকরণ ম্লাণ হয়ে যায় যদি থ্যালাসেমিয়া, স্কিজোফ্রেনিয়া, হিমোফিলিয়ার ন্যায় দুরারোগ্য বংশগত রোগে আক্রান্ত হয় চিদানন্দ শক্তির অংশ কোনো উত্তরপুরুষ।

বিকৃত উত্তরাধিকার সমস্যা সৃষ্টির মূলে কিন্তু আমরাই। ভারতীয় বর্ণাশ্রমধর্ম্ম, ভারতীয় দশবিধ সংস্কারের অনুশাসন না মেনে তথাকথিত প্রগতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে সংগতি রাখতে পারিনা জীবনধর্মের সাথে। ফলে বিপর্যয় এসে যায় ব্যষ্টি, সমষ্টি এবং রাষ্ট্র জীবনে।

 আমাদের জাতীয় জীবনের উত্তরাধিকারকে সুরক্ষিত রাখতে আমাদের ভারতীয় ঋষিগণ ‘বর্ণাশ্রম ধর্ম্ম’, ‘দশবিধ সংস্কার’ নামে কতগুলো জীবনীয় সংস্কার প্রবর্তন করেছিলেন। বর্তমানের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী প্রগতিবাদীরা ওইসব বিধান শুনে যারা মনে মনে ‘বিজ্ঞানের যুগে কুসংস্কার’ শীর্ষক সমালোচনার জন্য তৈরি হচ্ছেন, তাদের জন্য গুটি কয়েক বিজ্ঞানের তথ্য নিবেদন করছি Davidson’s Practice of Medicine, 16th edition, Genetic Factor of Disease Chapter থেকে।

“In survey carried out in Edinburgh a few years ago, no less than 50% of childhood deaths could be attributed to  genetic disease. The contribution of genetic factors to mortality and morbidity in adults is mere difficult to assess but is also increasing.”…..

“…..Several extensive studies have shown that  among the offspring of consanguineous matings there is an increase of perinatal mortality rate together with an increased frequency of both congenital abnormalities and mental retardation………”

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ওই তথ্য অনুযায়ী বর্তমান বিশ্বে শতকরা ৫০টি শিশু মৃত্যুর কারণ পোলিও নয়, উত্তরাধিকারে প্রাপ্ত জেনেটিক ডিজিজ। বিসদৃশ যৌনমিলনজাত ওই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবার একমাত্র উপায় হিসেবে বলা হয়েছে, বিশ্বস্ত বংশে সদৃশ বিবাহ এবং সুপ্রজনন নীতির পরিপালন।––যা’  ভারতীয় বর্ণাশ্রমধর্ম ও দশবিধ সংস্কার পালনের মধ্যে নিহিত রয়েছে। বর্ণাশ্রমধর্ম ও দশবিধ সংস্কার পালনের মাধ্যমে প্রতিটি বংশের কুলপঞ্জীর মর্যাদা রক্ষা করে যারা নির্মল, নিষ্কলুষ উত্তরাধিকারীদের সৃষ্টি করতে পারবেন, তাদের বংশধরগণ দুরারোগ্য ব্যাধি এবং অকাল মৃত্যুর কবল থেকে সুরক্ষিত থাকবেই। নচেৎ উত্তরাধিকারীদের নিয়ে নানা সমস্যায় জর্জরিত হতে হবে।

তাই বলছিলাম কি, সদগুরুর দীক্ষা নিয়ে, বিধিবৎ বৃত্তি নিয়ন্ত্রণ মাধ্যমে তাঁর প্রদত্ত সংস্কারে সংস্কৃত হতে পারলে উত্তরাধিকারে পাওয়া বিকৃত রূপটাকে সযত্নে পরিহার করে, বৃদ্ধি পেতে না দিয়ে, উত্তরাধিকারে পাওয়া ভালোটুকুকে সুস্থ পরিষেবা দিয়ে যদি একটা সুস্থ প্রজন্ম উপহার দিয়ে যেতে পারি ভারতমাতাকে, তবেই বোধহয় মানুষ হিসেবে সঠিক পরিচয় রেখে যেতে পারবো। তাই নয় কি?

‘ভারাক্রান্ত হৃদয়ের যা’ কিছু মলিনতা’ ইষ্টীপূত প্রবাহে ধুয়েমুছে রত্নগর্ভার আধার স্বরূপিণী কল্যাণীয়া মায়েরা, গুরুর নিদেশ মেনে, স্বামীর মনোবৃত্ত্যানুসারিণী হয়ে চলতে পারলেই হয়তো অচিরেই আগমন হতে পারে শুদ্ধাত্মাদের।

      ‘শুদ্ধাত্মাদের’ জন্ম দিয়ে জাতীয় উত্তরাধিকার রক্ষার দায়িত্ব কি শুধু মেয়েদের, ছেলেদের কি কোন দায়িত্বই নেই? ––বর্তমান প্রজন্মের কল্যাণীয়া মায়েদের মনে এই প্রশ্নটা জাগা স্বাভাবিক। হ্যাঁ, ছেলেদের অবশ্যই দায়িত্ব আছে,––

‘ইষ্ট ঝোঁকে ছুটলে পুরুষ প্রজ্ঞা অনুপমা

স্বামীর ঝোঁকে ছুটলে নারী শ্রেষ্ঠ ছেলের মা।’

পুরুষদের ইষ্টনিষ্ঠ হতে হবে, পূরণকারী হতে হবে, ‘‘প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী। প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ এমনতর ভাবতে হয়।’’-–বাণীকে মেনে চলতে হবে। এবং সে দায়িত্ব স্বয়ং বিধাতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রই দিয়েছেন। কিন্তু মায়েদের উপর দায়িত্ব একটু বেশি করে দিয়েছেন।

‘‘নারী হতে জন্মে জাতি
বৃদ্ধি লভে সমষ্টিতে
নারী আনে বৃদ্ধি ধারা
নারী হতেই বাঁচাবাড়া
পুরুষেতে টানটী যেমন
মূর্ত্তি পায় তা সন্ততিতে ।

অভ্যাস ব্যবহার যেমনতর
সন্তানও পাবি তেমনতর।
স্বামীতে যার যেমনি রতি
সন্তানও পায় তেমনি মতি ।

স্বামীর প্রতি যেমনি টান
ছেলেও জীবন তেমনি পান ।

যে ভাবেতে স্বামীকে স্ত্রী
করবে উদ্দীপিত
সেই রকমই ছেলে পাবে
তেমনি সঞ্জীবিত ।”

      ‘‘মা হ’লো মাটির মত। মা যদি স্বামীগতপ্রাণা হয়, নিজের প্রবৃত্তির উপর তার যে নেশা, তা’ থেকে যদি তার স্বামীনেশা প্রবলতর হয়, স্বামীকে খুশি করার জন্য নিজের যে কোন খেয়াল যদি সে উপেক্ষা করতে পারে, তাহ’লে তা’র ব্যক্তিত্বের একটা এককেন্দ্রিক রূপান্তর হয়। একে বলে সতীত্ব। তা’ থেকে তা’র শরীরের ভিতরকার অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিগুলির ক্ষরণ ঠিকমত হয় এবং সেগুলি আবার সত্তাপোষণী হয়। এইগুলি গর্ভস্থ সন্তানের শরীর-মনের ভাবী সুসঙ্গত বিকাশের পক্ষে যে-সব সারী উপাদান প্রয়োজন, সেগুলি সরবরাহ করে। এইসব ছেলেমেয়ে মাতৃভক্ত হয়, পিতৃভক্ত হয়, গুরুভক্ত হয়, সংযত হয়, দক্ষ হয়, লোকস্বার্থী হয়, চৌকস হয়, এরা সাধারনতঃ মোটামুটি সুস্থ, সবল ও দীর্ঘায়ুও হয়।’’ (আলোচনা প্রসঙ্গে পঞ্চদশ খণ্ড/৭৩)

      বর্তমান যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর  অনুকূলচন্দ্রের ওই সঞ্জীবনী মন্ত্রের বাস্তব প্রয়োগে আমাদের ঘরের মেয়েরা যদি উপযুক্ত বরণীয় বর-কে বরণ করে আদর্শ বধূ, মনোবৃত্ত্যানুসারিনী স্ত্রী, আদর্শ জায়া হয়ে তাদের ভাবী সন্তানদের ভালোমন্দ পরিমাপিত করে গর্ভে ধারণ করতে পারেন, তা হলেই জন্ম নেবে সুস্থ দাম্পত্যের সুস্থ শিশু। এবং সেই সন্তানদের সদাচারের প্রলেপনে আধো কথার সময় থেকেই করে করিয়ে সদগুণের শিক্ষা ধরিয়ে দিতে পারেন,— তা হলেই সংরক্ষণ করা যাবে আমাদের আর্য্য ভারতবর্ষের জাতীয় উত্তরাধিকার।

 প্রহ্লাদ, ব্যাসদেব, কৌটিল্য, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্রের ন্যায় কত-শত বিখ্যাত মনীষীদের শুদ্ধাত্মারা সেই আশায় পথ চেয়ে বসে আছেন। উপযুক্ত মা পেতে। এক বুক আশা নিয়ে, পথ চেয়ে বসে রয়েছেন মানুষ-পাগল পরমপিতাও। তাঁকে শুদ্ধাত্মার ডালির উপহার কে দেবে, সে-তো এক-একজন কয়াধু, সত্যবতী, চন্নেশ্বরী, সারদাদেবী, ভুবনেশ্বরী দেবী, প্রভাবতী দেবীর ন্যায় মায়েদের দ্বারাই সম্ভব। আমাদের আর্য্য ভারতবর্ষের উত্তরাধিকারের দায়িত্ব  মায়েদেরই তো নিতে হবে। না, না কল্যাণীয়া মায়েরা অরাজী হবেন না। পরমপিতা যে পথ চেয়ে বসে আছেন আপনাদের দেওয়া উপহার পেতে।

জয়গুরু! ভালো থাকবেন, ভালো রাখবেন।   

                              ––––   zZ1YXaiUHSqRjsc3fJjjIFaged2gmDRpn873F7xbX2fw2DGAHHXoRnk5mr2VfeC+C2WxZUG/ckN28+VxJZfOyRd3gikDvg9pNCvmC/l+R+Wg+7EQEfnbDXbtgzPI8ULo/8cRyE+4K/W2hAqgduG5cX/FHsg7v8vzlcuA4T/2mdPkk9kaOzBPV6ApKOjRFEJOVQ5K5Hv/lpjzj64WFPICuDzpUEBakZOhob6IvF+ujETHTohmj0hmiUJWk9s62GnapAdWT9XW/+m0+Hqdrw+BsuC0/bIFXDE13NVI+HKW8I+FsAUmkFzQtoQR0VBSRp4/IJQb+C8UrCPtbP0LdkGFQSuRzKGA//ZFwPmagkTT8Pv

POLLUTIONS CONTROL

POLLUTION CONTROL

                    পরিবেশ সুরক্ষা

নিবেদনে—তপন দাস

পরমাপ্রকৃতির পঞ্চ-মহাভূত ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-এর অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই বসুন্ধরা। পরমপিতার প্রতিভূ আর্য্য ঋষিগণ ‘‘মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ……..’’ মন্ত্রে বন্দনা করে বসুন্ধরার মধুময় পরিবেশকে রক্ষা অর্থাৎ পূজা করতে শিখিয়েছিলেন। পূজা শব্দের অর্থ সম্বর্দ্ধনা। যেমন যেমন আচরণে পরিবেশের অজৈব উপাদানসমূহকে রক্ষা করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া যায় তাই ছিল আর্য্য ভারতের পূজা, যজ্ঞ, হোমের তাৎপর্য্য।  আমরা প্রবৃত্তি পরবশ হয়ে যাতে দুর্বৃত্ত না হই তারজন্য আমাদের ঋষিরা বার বার স্মরণ করিয়ে দিলেন ‘আত্মানং বিদ্ধি’—পরমপিতার সন্তান তুমি,  নিজেকে জানো, নিজের প্রতিরূপ মনে করে পরিবেশকে বাঁচাও, নিজে বাঁচ। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’—জীবনবিধ্বংসী আচরণ ত্যাগ করে জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলো। ‘মা গৃধ’—লোভ করো না। সদাচার এবং বর্ণাশ্রম মেনে চলো। পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে নিজে সমৃদ্ধ হও। এই ছিল ভারতবর্ষের বিধি-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠনের,  ধর্মের, পূজার বাস্তব রূপ।

নগর-সভ্যতার আসুরিক ক্ষমতার বলে, ভোগবাদের ছাড়পত্রের বলে, আদর্শহীনতার বলে সদাচার এবং বর্ণাশ্রমকে বিদায় জানিয়ে বসুন্ধরার পরিবেশকে যে ধ্বংসাত্মক পথে এগিয়ে নিয়ে চলেছে আমাদের সভ্যতা, তা’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ‘নাসা’-র গবেষক বিজ্ঞানীরা। উদ্বেগ প্রকাশ করে গিয়েছিলেন কবিগুরু, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর’-এর প্রতিবাদী বাণীতে।  

অরণ্য ফিরিয়ে দেবার উদ্যোগ হয়তো নেওয়া যাবে না, তবে সদিচ্ছাকে কাজে লাগিয়ে নগরায়নের ছাড়পত্র দেবার পূর্বে বৃক্ষরোপন না করে যেন বৃক্ষ-নিধন না করতে পারে সে উদ্যোগটা তো নিতে পারে পুর নিগম !

       ভারতবর্ষের বৃহত্তম নদী গঙ্গাকে আমরা মা বলি, যাঁর পূত স্রোতধারায় স্নাত হয়ে পবিত্র হই, সেই মায়ের শরীরে পুর-বিভাগ যখন পরিকল্পিতভাবে পূতিগন্ধ ক্লেদ নিক্ষেপ করে, ধর্মের ধ্বজাধারীরা তথাকথিত পূজা-পার্বনের বর্জ্য নিক্ষেপ করে পুণ্য অর্জন করে, তখন মনে হয় না যে আমরা কোন উন্নত সভ্যতার সভ্য, প্রগতি বাদের বাদী, আর্য্য সংস্কৃতির ধারক বাহক ধার্মিক।

ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। আমাদের অস্তিত্বের ধারক-পালক-পোষক  পরমাপ্রকৃতির পঞ্চ-মহাভূত ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজাদির অস্তিত্বকে এবং সেই অস্তিত্বের উপর নির্ভরশীল সব উদ্ভিদ ও প্রাণীর অস্তিত্বকে ধারণ করে রাখার অ্যাকটিভিটি বা কার্যকলাপের নাম ধর্ম।   উক্ত পঞ্চ-মহাভূতের অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই বসুন্ধরা। পরমপিতার প্রতিভূ আর্য্য ঋষিগণ ‘‘মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ……..’’ মন্ত্রে বন্দনা করে বসুন্ধরার মধুময় পরিবেশকে রক্ষা অর্থাৎ পূজা করতে শিখিয়েছিলেন। পূজা শব্দের অর্থ সম্বর্দ্ধনা। যেমন যেমন আচরণে পরিবেশের অজৈব উপাদানসমূহকে রক্ষা করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া যায় তাই ছিল আর্য্য ভারতের পূজা, যজ্ঞ, হোমের তাৎপর্য্য।  আমরা প্রবৃত্তি পরবশ হয়ে যাতে দুর্বৃত্ত না হই তারজন্য আমাদের ঋষিরা স্মরণ করিয়ে দিলেন ‘আত্মানং বিদ্ধি’-র মর্মবাণীকে। —পরমপিতার সন্তান তুমি,  নিজেকে জানো, নিজের প্রতিরূপ মনে করে পরিবেশকে বাঁচাও, নিজে বাঁচ। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’—জীবনবিধ্বংসী আচরণ ত্যাগ করে জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলো। ‘মা গৃধ’—লোভ করো না। সদাচার এবং বর্ণাশ্রম মেনে চলো। পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে নিজে সমৃদ্ধ হও। এই ছিল ভারতবর্ষের বিধি-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠনের,  ধর্মের, পূজার বাস্তব রূপ।

      বেদ-উপনিষদ-গীতা-কোরাণ-বাইবেল-এর বক্তা, মহাপুরুষ, পুরুষোত্তম-গণের নিদেশে কোথাও প্রচলিত পূজার নামে, অনিত্য বস্তুর উপাসনার নামে, মাইক বাজিয়ে, বাজি ফাটিয়ে, হৈ-হুল্লোর করে, হিংসা করে, হত্যা করে সামগ্রিকভাবে জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশ দূষণ করার অনুমোদন নেই। ব্যক্তি চরিত্র গঠনের নিমিত্ত  সাধন-ভজন-আরাধনা বাদ দিয়ে যে তন্ত্রমতে আমরা পরিবেশ দূষণ করতে প্রতিমা পূজায় মেতে উঠি, সেই তন্ত্র-ই প্রতিমা পূজাকে ‘‘বাহ্যপূজা অধমাধম’’ বলে বর্ণনা করেছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও, ‘‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’’ ছন্দের ডালিতে প্রতিমা পূজার অসারতার বার্তা রেখে গেছেন। তথাপি আমরা করেই চলেছি !

পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে  যুগ-পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, এক বিপ্লব নিয়ে এলেন। ‘অন্যে বাঁচায নিজে থাকে, ধর্ম বলে জানিস তাকে। বাঁচা-বাড়ার মর্ম যা, ঠিকই জানিস ধর্ম তা।  Upholding urge of existence is Dharmma.’……..ইত্যাদি বাণীর মাধ্যমে।  অর্থাৎ তোমাকে ধার্মিক হতে হলে আগে পরিবেশকে বাঁচাতে হবে। সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বাস্তব কর্মে ব্রতী হতে হবে।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের অনুগামীদের নিত্য ইষ্টভৃতি করতে হয়।  ইষ্টভৃতি মানে ইষ্ট কর্মের ভরণ। ইষ্টকর্ম মানে পূর্ত্তকর্ম—পরিবেশের বাস্তব সেবা। যা প্রকৃত ইষ্টভৃতির মন্ত্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে।   “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ ।” এর সরলার্থ খুব সহজ। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুযায়ী সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন বর্দ্ধনার বিধি মেনে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে চলেন যিনি, এমন গুরুভাই-ই প্রকৃত ইষ্টভ্রাতা।-–যাঁর আপদে-বিপদে সাধ্যানুগ সাহায্য করতে হবে। ভূত মানে,–ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা পরিবেশের অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না।  সেগুলোকে প্রাণ পণ করে রক্ষা করতে হবে। প্রতিনিয়ত এই শপথ মেনে চলার নাম ইষ্টভৃতি।  অতএব প্রতিটি আমি যদি  প্রকৃত ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের যাজ্ঞিক হবার শপথ পালন করেন, তাহলেই অনেকাংশে রক্ষা করা যাবে সুজলা-সুফলা-মলয়জ-শীতল বসুন্ধরাকে।

পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ মানসে, আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর পূর্বে পরম বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র  প্রাতঃ-স্মরণীয় পদার্থবিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যকে উৎসাহ দিয়ে হিমাইতপুরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র। বিজ্ঞান-বিষয়ক অত্যাশ্চর্য্য বহুকিছুর সাথে সন্ধান দিয়েছিলেন সহজলভ্য আবহাওয়া বিদ্যুতের। ভূ-গর্ভস্থ প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন পরবর্তী শূন্যগর্ভ অবস্থাকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে কিভাবে পুণঃ-পূর্ণকরণ বা রিফিলিং করলে ভূ-স্তরের ক্ষতি হবে না সে বিষয়েও তিনি বলে গেছেন। তাঁর প্রদত্ত ওইসব ফরমূলাকে বাস্তবায়িত করতে পারলে ভূ-স্তরকে বিনষ্ট না করে, পরিবেশকে দূষিত না করেই প্রাকৃতিক দৌ-শক্তিকে কাজে লাগিয়ে শক্তি-সম্পদে সমৃদ্ধ হতে পারবে আমাদের সভ্যতা।

পরিবেশ রক্ষার, সম্বর্দ্ধনার  অনুশীলন কি ভাবে বিকৃত হয়েছে সে বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই। বরং পরিবেশ রক্ষা করার ব্রতে কিভাবে ব্রতী হওয়া যায় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে আমাদের। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, ভূমিদূষণ, ভূ-স্তরদূষণ, জলদূষণ প্রতিরোধ করে গ্লোবাল-ওয়ার্মিং বা বিশ্ব-উষ্ণায়ন-ভ্রূকুটি থেকে সভ্যতাকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হন, সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে, জনমত গঠন করতে হবে, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের লাগামহীন ভোগের চাহিদা মেটাতে যে হারে ভূ-গর্ভস্থ তেল, গ্যাস, কয়লা, বিবিধ আকরিক উত্তোলন করতে গিয়ে ভূ-স্তরের অবক্ষয়কে আহ্বান করে চলেছি, ধ্বংস করে চলেছি ‘রেন ফরেস্ট’কে। এর বিরুদ্ধে সরব না হলে কোন মূল্যেই বাঁচানো যাবে না মানব সভ্যতাকে !
        পরিবেশ বিজ্ঞানীদের উপদেশ মেনে, বিপণনকারীরা, বাণিজ্যজীবিরা, ব্যবসায়ীরা যা’তে পরিবেশ-দূষণকারী ‘মোড়ক-জঞ্জালমুক্ত’ (যথা, একটা পাড়ার দোকানেও প্রথমেই নজর কাড়ে কতগুলো ঝুলন্ত প্যাকেট। চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় খাদ্য দ্রব্যের পাশাপাশি নেশার দ্রব্য, প্রসাধনী দ্রব্যে ভরাট প্লাস্টিক-পলিথিনের সব প্যাকেট। নামী-দামী ব্রাণ্ডের একটা অন্তর্বাসের আয়তনের তুলনায় তার মোড়কের আয়তন বেশি। সচেতনতার অভাবে মোড়ক খুলে পণ্যটা নিয়ে মোড়কগুলো যেখানে-সেখানে ফেলে দেওয়া অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সেগুলো তো সবই জঞ্জাল।) পণ্য-পরিসেবা দিতে এবং  নিতে অভ্যস্ত হয় সে বিষয়ে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত পরিবেশ মন্ত্রকের। গৃহস্থালী, বাণিজ্যিক সব বর্জ্য পদার্থগুলোকে সংরক্ষণ করে রিসাইক্লিং (পুনর্ব্যবহারযোগ্য) করার উদ্যোগ নিতে হবে সরকারীভাবে, পরিবেশ মন্ত্রককে। প্রত্যেকটি নাগরিক  যা’তে পরিবেশ বান্ধবের ভূমিকা গ্রহণ  করতে অভ্যস্ত হয় সে বিষয়ে জন-সচেতনতা বৃদ্ধির কর্মসূচী গ্রহণ করতে  হবে পরিবেশ-প্রেমী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনদের, ‘ভোট-বান্ধব’ জন-প্রতিনিধিদের। তবেই সার্থক হবে প্রতি বছর জুন মাসে ঘটা করে পরিবেশ-দিবস উদযাপন।

Fবিবেককে অবলম্বন করে সবাই ভালো থাকুন। জয়গুরু। বন্দে পুরুষোত্তমম্ ! ����������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��W9����������������������������������������������������������������������i��P0��Z<��Y;��Y;��Y;��Y;���������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������333�������������333�������������333�����333�������������333�����������������333�������������333�����333�������������333���������333�����333���������333���������������������������������333�������������333�����������������333�������������333�����333���������������������333�����333�����333�����333�����������������333�������������333�����333�������������333�����333�������������333�����333�������������333�����333�����������������333�������������333�����333�������������333�����333�������������333�����333�������������333�������������333�333��������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��Y;��W9����������������������������������������������������������������������nT��S5��Y;��Y;��Y;��Y;��Y;���������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������������333�������������333�������������333�����333�������������333�����������������333�������������333�����333�������������333�������������333�������������333�������������333�����������������333�������������333�����������������333�������������333�����333�������������333���������333�������������333���������������������333�������������333�����333�������������333�����333�������������333�����333�������������333�����333�����������������333�������������333�����333�������������333�����333�������������333�����333�������������333�����������������333���������333������

CHAITANYA MAHAPRABHU

        ।। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যদেবের  আবির্ভাব তিথি স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।

      নিবেদনেডাঃ তপন দাস

————————————————————————————————–

“ধর্ম যখনই বিপাকী বাহনে
ব্যর্থ অর্থে ধায়,
প্রেরিত তখন আবির্ভূত হন 
পাপী পরিত্রা
পায় ।”

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের উপরোক্ত বাণীর সাথে শ্রীকৃষ্ণ প্রদত্ত

“যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লাণির্ভবতি ভারতঃ।

অভ্যুত্থানম্ ধর্মস্য তদাত্মনম্ সৃজাম্যহম্॥

পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশয়চ দুষ্কৃতাম্।
      ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে॥” 
        প্রায় সমার্থক বাণীটির যুগোপযোগী সংস্করণ করেছেন বর্তমান পুরুষোত্তম।
শ্রীকৃষ্ণ যুগ সংস্কারের প্রয়োজনে দুষ্কৃতি বা পাপীদের বিনাশের কথা বলেছেন আর ঠাকুর পাপীদের পরিত্রাণের কথা বলেছেন। এইটুকুই পার্থক্য।

ব্যষ্টি জীবন এবং সমষ্টি জীবনের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে কর্ম করে যাওয়ার নামই ধর্ম পালন করা। অন্যের বাঁচা এবং বৃদ্ধি পাওয়াকে অব্যাহত রেখে মানুষ বাঁচার জন্য, আনন্দের জন্য যা’ যা’ করে, তাই ধর্ম। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কোন ভারী তাত্ত্বিক কথা না বলে প্রাঞ্জল ভাষায় বাণী দিয়ে বললেনঃ

‘‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে

ধর্ম বলে জানিস তাকে।’’

শ্রীশ্রীঠাকুর  অনুকূলচন্দ্র চৈতন্যদেবের আবির্ভাব প্রসঙ্গে ভাবাবস্থায় বললেন, ‘‘বুদ্ধ ‘লয়’ শিক্ষা দিয়ে গিয়েছিল। শঙ্করাচার্য্য পরিষ্কার ক’রে দিয়েছিল। বুদ্ধের উত্তর  শঙ্করাচার্য্যের কাছে,  জ্ঞানী ছাড়া  বুঝত না কিনা? তাই চৈতন্যের আবির্ভাব। ধর্ম্ম নিয়ে হিংসা হয়েছিল কিনা,  তাই একত্ব দেখাতে এসেছিলেন রামকৃষ্ণ।  থাক্ ধর্ম্ম-কর্ম্ম, আমার আমিত্ব পেলেই বাঁচি এখন।’’ (ভাববাণী, ষষ্ঠ দিবস)

————————————————————————————————–

চৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষ উৎকল প্রদেশের জাজপুরের আদি বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর পিতামহ মধুকর মিশ্র বাংলাদেশের শ্রীহট্টে এসে বসতি স্থাপন করেন। শ্রীহট্টে  জন্মগ্রহণ করেন জগন্নাথ মিশ্র। পণ্ডিত নীলাম্বর চক্রবর্তীর কন্যা শচীদেবীর সাথে বিবাহ হয়। শচীদেবীর গর্ভে পর পর সাতটি কন্যা হয়। কেহই জীবিত ছিলেন না। তারপর জন্মগ্রহণ করেন প্রথম পুত্র বিশ্বরূপ। বিশ্বরূপের যখন আট বছর বয়স তারপর শচীমাতা অন্তর্বতী হন। দ্বাদশ মাস গর্ভকাল অতিবাহিত করে  ১৪০৭ শকাব্দ, (১৮-২-১৪৮৬) ২৩ ফাল্গুন, দোলপূর্ণিমা চন্দ্রগ্রহণের রাতে নিমবৃক্ষের নীচে ভূমিষ্ঠ হন শচীদেবীর দ্বিতীয় পুত্র নদীয়া জেলার নবদ্বীপে। নিম গাছের তলায় ভূমিষ্ঠ হবার কারণে মা নামকরণ করেছিলেন নিমাই, কোষ্ঠী বিচারের নাম বিশ্বম্ভর।

চৌদ্দশত সাত শকে মাস যে ফাল্গুন

পৌর্ণ মাসী সন্ধ্যাকালে হৈল শুভক্ষণ।

সিংহ রাশি, সিংহ লগ্ন উচ্চ প্রহসন                         

ষড়বর্গ অষ্টবর্গ সর্ব্ব শুভক্ষণ।।    

*******

তৎকালিন ভারতবর্ষের শিক্ষা-সংস্কৃতির এক অন্যতম পীঠস্থান ছিল বাংলার নদীয়া জেলার নবদ্বীপ। মহাপ্রভুর পিতৃদেব শ্রীহট্ট থেকে নবদ্বীপে এসেছিলেন  অধ্যয়ন ও শাস্ত্রচর্চার জন্য। সে কারণেই মায়াপুরে আর একটি নতুন বসতি স্থাপন করতে হয়েছিল। শচীদেবীর স্বাভাবিক গর্ভকালের সময় উত্তীর্ণ হলে শ্বশুর মশাই জ্যোতিষাচার্য পণ্ডিত নীলাম্বর চক্রবর্তীর আদেশক্রমে স্ত্রী-পুত্রকে শ্রীহট্ট থেকে নবদ্বীপের বাড়িতে নিয়ে আসেন জগন্নাথ মিশ্র। সেখানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন বিশ্বম্ভর। তবে গার্হস্থ্যাশ্রমে নিমাই নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন। তাই রচনার প্রয়োজনে অবতারবরিষ্ঠ চৈতন্য মহাপ্রভুকে কখনো নিমাই, কখনোবা নিমাই পণ্ডিত নামে উল্লেখ করতে হয়েছে। সেজন্য প্রথমেই পাঠকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে রাখলাম।

শচীমাতার দুলাল নিমাই বাল্যকাল থেকেই দুরন্ত ছিলেন।  তাঁর দুরন্তপনার নালিশ শুনতে শুনতে অস্থির হয়ে পড়েছিলেন তাঁর পিতামাতা। দাদা বিশ্বরূপকেই যা একটু সমীহ করে চলতেন। দুরন্তপনায় রাশ টানতে পিতৃদেব ১৪৯১ খ্রীষ্টাব্দে আচার্য্য গঙ্গাদাস পণ্ডিতের মাধ্যমে উপনয়ন সংস্কারে সংস্কৃত করান। সাবিত্রীমন্ত্রে দীক্ষিত করাবার পর আচার্য্য নিমাইকে গৌরহরি নামকরণ করেন।  সংস্কৃত শিক্ষার জন্য গঙ্গাদাস পণ্ডিতের টোলে ভর্তি করে দেন পিতা।  সেখানে ব্যাকরণ, কাব্য, অলঙ্কারশাস্ত্র, তর্কশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। তাঁর মধ্যে অসাধারণ পাণ্ডিত্যের প্রকাশ পায়।    ১৪৯২ খ্রীষ্টাব্দে দাদা বিশ্বরূপ সন্ন্যাস নিয়ে  গৃহত্যাগী হন। দাদার বিরহ-ব্যথায়  শান্ত হন নিমাই।  দাদা বিশ্বরূপ নিত্য গৃহদেবতা বিষ্ণুর পূজা করতেন। দাদার অবর্তমানে নিজে থেকে সেই পূজার ভার গ্রহণ করেন নিমাই।  ১৪৯৭ খ্রীষ্টাব্দে পিতা জগন্নাথদেব সবাইকে শোকসাগরে ভাসিয়ে বিষ্ণুর পরমপদে আশ্রয় নেন। পিতার দেহান্তর হবার পর জাগতিক সংসারের সব দায়িত্ব তাঁর ওপর এসে পড়ে।  নিমাই লোকপালী উপার্জনে মন দেন। মুকুন্দ-সঞ্জয়ের চণ্ডীমণ্ডপে টোল খুলে ছাত্র পড়াতে শুরু করেন। শিষ্যদের  এবং বিদ্যানুরাগীদের কাছে নিমাই পণ্ডিত নামে খ্যাত হন। ভারতখ্যাত কেশবাচার্য নিমাই পণ্ডিতের কাছে পরাজয় স্বীকার করলে ভারতের পণ্ডিত সমাজে শ্রেষ্ঠ স্থান লাভ করেন নিমাই পণ্ডিত। মাতা শচীদেবীর আদেশে ১৫০২ খ্রীষ্টাব্দে বল্লভ আচার্যের কন্যা লক্ষীপ্রিয়া সাথে উদ্বাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হন। (চৈঃ চঃ অনুসারে কৈশার লীলায় প্রথমে উদ্বাহ বর্ণিত হয়েছে।) উদ্বাহের পর ১৫০৬ খ্রীষ্টাব্দে স্ত্রীকে নিয়ে পূর্ববঙ্গের শ্রীহট্টের বাড়িতে যান। সেখানে সর্প দংশনে (মতান্তরে বিরহ-সর্প দংশন) মৃত্যু হয় লক্ষীপ্রিয়ার। এই ঘটনায় নিমাই মর্মাহত হন। শচীদেবী পুণরায় নিমাইয়ের বিবাহ দিতে চাইলে, নিমাই কিছুতেই পুণর্বার দার পরিগ্রহ করতে চান নি। মায়ের পীড়াপিড়িতে সনাতন পণ্ডিতের কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়ার সাথে বিবাহ হয় ১৫০৭ খ্রীষ্টাব্দে।

১৫০৮ খ্রীষ্টাব্দে পিতৃদেবের পিণ্ডদান করতে গয়াতে যান। পরিচিত হন ঈশ্বরপুরীর সাথে। ১০ অক্ষর গোপাল মন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ করেন নিমাই। নবদ্বীপে ফিরে বৈষ্ণব  আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র নাম প্রচার মাধ্যমে।

১৫১০ খ্রীষ্টাব্দের ১০ই জানুয়ারী কাটোয়ার কেশব ভারতীর কাছে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। গুরু তাঁকে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নামে অভিহিত করেন। সন্ন্যাস গ্রহণের পর থেকে তিনি লোক-সংগ্রহ উদ্দেশ্যে প্রায় পাঁচ বছর দক্ষিণ-ভারত, পশ্চিম-ভারত ও মথুরা-বৃন্দাবন পরিভ্রমন করেন। ১৫১৫-১৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দ, এই আঠারটি বছর পুরীর রাজা প্রতাপ রুদ্রের রাজগুরু কাশী মিশ্রের বাড়ী গম্ভীরায়  স্থায়ীভাবে বসবাস করে কৃষ্ণনাম প্রচার করেন। ১৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দে পুরীতে ইহলীলা সম্বরণ করেন।

চৈতন্যদেব তাঁর অনুগামীদের জন্য নিজের হাতে সংস্কৃতে লেখা ‘শিক্ষাষ্টক’ নামে আটটি শ্লোকে উপদেশামৃত রেখে গেছেন,  সব শ্লোকেই কৃষ্ণের প্রতি শুদ্ধাভক্তির কথা রয়েছে। রাধা-নামের কোন উল্লেখ পর্যন্ত নেই। ‘শিক্ষাষ্টক’ শ্লোকের মধ্যে তৃতীয়তম শ্লোকটি ভক্তজন কণ্ঠে বহুল উচ্চারিত। যথাঃ

তৃণাদপি সুনীচেন তরোরিব সহিষ্ণুনা।

অমানিনা মানদেন কীর্তনীয়ঃ সদা হরিঃ॥                  

যার ভাবার্থ—তৃণকে মাড়িয়ে গেলে তৃণ যেমন প্রতিবাদ করে না, গাছ কাটলে গাছ যেমন প্রতিবাদ করে না, তুমি তাদের চাইতেও সহিষ্ণু হবে। সমাজে যারা অবহেলিত তাদেরও তুমি মান দিয়ে সদা হরির গুণকীর্তন করবে। তাহলে সারমর্ম হলো, তুমি তোমার নিজের জীবনের ক্ষুদ্র মান-অপমান, চাওয়া-পাওয়া সবকিছু উপেক্ষা করে সবাইকে হরি অর্থাৎ কৃষ্ণের প্রদত্ত অষ্টাদশ অধ্যায়ে বিধৃত গীতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে তুলবে, যাজন করবে।                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                           

চৈতন্যদেবের  স্নেহধন্য  মুরারী গুপ্ত সংস্কৃত  ভাষায় যে লীলা কাহিনী রচনা করেছিলেন সেই গ্রন্থ ‘মুরারী গুপ্তের করচা’ নামে সুপ্রসিদ্ধ। মহাপ্রভুর  বিশেষ স্নেহভাজন, যাঁকে তিনি ‘কবিকর্ণপুর’ আখ্যা দিয়েছিলেন তাঁর নাম ছিল পরমানন্দ। তিনি সংস্কৃত ভাষায় ‘চৈতন্যচরিতামৃতম্’  নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। চৈতন্যদেবের লীলাবসান পরবর্তীকালে তথ্য সংগ্রহভিত্তিক বাংলা ভাষায় ‘চৈতন্যভাগবত’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন বৃন্দাবন দাস। সমসাময়িক কালে কবি লোচন দাস ‘চৈতন্যমঙ্গল’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন। পরবর্তীকালে কবি জয়ানন্দও ‘চৈতন্যমঙ্গল’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন। ওইসব জীবনীগ্রন্থ থেকে বৃন্দাবনের গোস্বামীগণ নাকি পরিপূর্ণরূপে চৈতন্যদেবকে আস্বাদন করতে পারেন নি, তাই রূপ গোস্বামীর শিষ্য বর্ধমান জেলার ঝামটপুরের বিখ্যাত বৈদ্য অকৃতদার কৃষ্ণদাস কবিরাজকে নতুন করে এক জীবনীগ্রন্থ রচনা করতে উদ্বুদ্ধ করলে তিনি পূর্ববর্তী জীবনীকারদের গ্রন্থ এবং অন্যান্য সংস্কৃত গ্রন্থের সাহায্য নিয়ে নয় বছর ধরে ‘শ্রীশ্রীচৈতন্য চরিতামৃত’ শিরোনামে গ্রন্থটি রচনা করেন। যে গ্রন্থটি বৈষ্ণব মহলে প্রামাণ্য রূপে স্বীকৃত হলেও সবক্ষেত্রে ঘটনাপঞ্জীর সন-তারিখ উল্লেখিত হয়নি। গবেষকগণও সকল ঘটনাপঞ্জীর সন-তারিখ নিয়ে একমত হতে পারেন নি। তাই আমিও বিভিন্ন গ্রন্থ পঠন-পাঠন ও গুগল সার্চ করা তথ্যভিত্তিক  আনুমানিক সন-তারিখ উল্লেখ করেছি মাত্র।     

                                  ********   

  নিমাই পণ্ডিত, বৈষ্ণব-পণ্ডিত বংশে জন্ম নিয়ে শিক্ষা-সংস্কৃতির পীঠস্থানের পণ্ডিত পরিবেশে বড় হয়ে উঠলেও তৎকালিন নবদ্বীপে আচার্য্য শঙ্করের মায়াবাদের সিদ্ধান্তবাগীশদের শুষ্ক জ্ঞানচর্চা, শাক্ত মতবাদের পৌত্তলিকতার পঞ্চ-ম-কারের এবং বৈষ্ণব, শৈব, কিশোরীভজা, কর্তাভজা, পরকীয়া সাধনা ইত্যাদি সহজীয়া মতবাদের উপাসনার প্রাবল্যের মধ্যে সনাতন ধর্মের প্রচারক প্রকৃত বৈষ্ণবেরা প্রায় উপেক্ষিতই ছিলেন। শাক্তরা সুযোগ পেলেই বৈষ্ণবদের নানাভাবে যাতনা দিতেন, এমনকি ধর্মের নামে পশুবলি দিয়ে পশুর মাংস বাড়িতে ফেলে আসতেন।

বিষ্ণুর উপাসক বৈষ্ণবেরা  নবদ্বীপের শ্রীবাস পণ্ডিতের আঙিনায়  মিলিত হয়ে   কীর্তন করতেন। আর শান্তিপুরের কমলাক্ষ মিশ্রের আঙিনায় বৈষ্ণবদের মিলনমেলা বসতো। বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণের উপাসক তৎকালিন বৈষ্ণব প্রধানগণ যথা, শ্রীনিবাস, শুক্লাম্বর, শ্রীমান, মুকুন্দ, বিশ্বরূপ প্রমুখ ভক্তগণ, সেকালের সাধকশ্রষ্ঠ বৈষ্ণবাচার্য কমলাক্ষ মিশ্র (অদ্বৈত মহাপ্রভু)-এর কাছে তাদের অন্তরের বেদনার কথা বলতেন। অদ্বৈত মহাপ্রভু মথুরার গর্গাচার্যের ন্যায় সনাতন ধর্মের দীনতা থেকে ভক্তদের রক্ষা করতে গঙ্গাজল আর তুলসীমঞ্জুরির নিত্য সেবায় শ্রীকৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা জানাতেন। পণ্ডিতদের মতে মূলতঃ অদ্বৈত মহাপ্রভুর আরাধনায় শ্রীবিষ্ণু শুদ্ধাত্মা শচীদেবীর মাধ্যমে নিমাই রূপে ধরাধামে অবতীর্ণ হন।

 ******

বালক নিমাইয়ের চপলতা এবং তীক্ষ্ণ পাণ্ডিত্যের  কাছে ম্লাণ হতে সুরু করে তার্কিক পণ্ডিতদের, শাক্ত পণ্ডিতদের, (অ)বৈষ্ণব পণ্ডিতদের ভ্রান্ত ধারণার পাণ্ডিত্য। তাঁদের দেখলেই শাস্ত্রের ধাঁধাঁ আর ব্যাকরণের ফাঁকি জিগ্যেস করতেন। একদিন ‘‘ওঁ সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম’’—মতবাদের তার্কিক পণ্ডিতকে শিক্ষা দিতে তার ভাতে প্রস্রাব করে দেন নিমাই,  পণ্ডিত রেগে গিয়ে মারতে এলে নিমাই বলেন, আমার চপলতার জন্য দু-ঘা মারবেন না হয়, তবুও আমি করজোড়ে  বলছি, ব্রহ্মময় জগতে সবই যদি ব্রহ্ম, তবে আপনার ভাতে, আর আমার মুতে ব্রহ্ম কি নেই ! আপনার বিচারে ভাতের ব্রহ্ম আর মুতের ব্রহ্ম কি আলাদা? আলাদাই যদি হয়ে থাকে তাহলে আর আজ থেকে আপনার ওই সিদ্ধান্ত বদলে ফেলতে হবে। তবের আমার বুঝ মতে, ব্রহ্ম কারণ, জীব কাব্য। ব্রহ্ম পূর্ণ, জীব অংশ। ব্রহ্ম উপাস্য, জীব উপাসক। ব্রহ্ম আর জীব সত্তায় অভেদ, স্বাদে পৃথক।

ব্রহ্মবিজ্ঞতা নিমাইয়ের মুখ থেকে ব্রহ্মকথা শুনে পণ্ডিত তখন বুঝতে পারেন ব্রহ্মের বিশিষ্টতা, বিশিষ্ট অদ্বৈতবাদের তত্ত্ব।

কিশোর নিমাই  যখন টোলে ছাত্র পড়াতেন, সেই সময় কাশ্মীরের বিখ্যাত পণ্ডিত কেশবাচার্য দিগ্বিজয় করতে বেরিয়েছিলেন। ভারতের  সব বিখ্যাত পণ্ডিতদের  তর্কযুদ্ধে পরাজিত করে অনেক শিষ্য ও বাহনসহ  নবদ্বীপে আসেন। নবদ্বীপের স্মার্ত্ত-পণ্ডিতগণ সুযোগ বুঝে নিমাই পণ্ডিতকে জব্দ করতে পণ্ডিত কেশবাচার্যকে নিমাইয়ের কাছে পাঠান। নিমাইয়ের কাছে গিয়ে কেশবাচার্য বলেন, তুমিই বুঝি নিমাই  পণ্ডিত?            

—নিমাই যথোচিত মর্যাদার সাথে প্রণাম জানিয়ে বলেন, লোকেরা বলেন, কিন্তু আমি নিজেকে পণ্ডিত মনে করি না, শিষ্যদের কিছু পাঠদান করার চেষ্টা করি মাত্র।

—তা’ কি পড়াও?

—কলাপ।

—‘কলাপ’! ও তো শিশুপাঠ্য!

—ওই শিশুপাঠ্যই সঠিক পড়াতে পারছি কি-না, জানি না।

—তাহলে তো তোমার সাথে তর্ক করা চলে না।

—শুনেছি আপনি ভারত বিখ্যাত পণ্ডিত, আপনার সাথে তর্ক করার স্পর্দ্ধা যেন না হয়। শুনেছি আপনি সরস্বতী মাতার  বরপুত্র। মুখে মুখে শ্লোক রচনা করেন। যদি কিছু নিবেদন করেন শুনে ধন্য হতাম।

—বলো, কি শুনতে চাও?

—সুরধনী গঙ্গার পবিত্র ধারা বয়ে চলেছে, সে বিষয়ে যদি  কিছু নিবেদন করেন। নিমাই বিনীতভাবে বলেন।

পণ্ডিত কেশবাচার্য তৎক্ষণাৎ শত-শ্লোক রচনা দ্বারা গঙ্গার বন্দনা করে গর্বভরে নিমাইকে জিগ্যেস করেন, কি হে নিমাই পণ্ডিত, এতক্ষণ ধরে গঙ্গার মহিমা যা বর্ণনা করলাম, কিছু বুঝলে?

নিমাই বিনীতভাবে বললেন, আপনার রচনার অর্থ আপনি না বোঝালে বোঝে কার সাধ্য?

নিমাইয়ের বিনীত ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে কেশবাচার্য বলেন, বলো, কোন্ শ্লোকটা বুঝতে চাও?

নিমাই কেশবাচার্য পণ্ডিতের তাৎক্ষণিক রচনা থেকে—  

‘‘মহত্ত্বং গঙ্গায়াঃ সততমিদমাভাতি নিতরাং,

যদেষা শ্রীবিষ্ণোশ্চরণকমলোৎপত্তিসুভগা।

দ্বিতীয় শ্রীলক্ষ্মীরিব সুরনরৈরর্চ্চ্যচরণা,

ভবানীভর্ত্তুর্ষা শিরসি বিভবত্যদ্ভুতগুণা॥’’ (চৈঃ চঃ আদিলীলা, পৃঃ ১২৬)

শ্লোকটি আবৃত্তি করে তার ভাবার্থ জানতে চাইলে পণ্ডিত কেশবাচার্য আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন, প্রায় ঝড়ের গতিতে বলা শ্লোক থেকে তুমি এই একটি শ্লোক কণ্ঠস্থ করলে কিভাবে?

নিমাই বিনীতভাবে বলেন, আপনি দৈববলে যেমন কবি, আমি তেমনি একজন শ্রুতিধর।

নিমাইয়ের উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে কেশবাচার্য বলেন, তাহলে শোন, এই শ্লোকের ভাবার্থ হচ্ছে—‘‘গঙ্গা, শ্রীবিষ্ণুর চরণকমল থেকে উৎপন্ন হওয়ার কারণে সৌভাগ্যবতী। দ্বিতীয়া শ্রীলক্ষ্মীর ন্যায় দেব ও মানবেরা যাঁর  চরণ-পূজায় রত এবং যিনি  ভবানীপতি  মহাদেবের মস্তকে বিরাজমানা হওয়ার জন্য অদ্ভুত গুণশালিনী হয়েছেন, সেই গঙ্গার এই মহত্ত্ব সর্বদাই নিশ্চিতরূপে প্রত্যক্ষীভূত হয়ে আছে।— বলো, আর কি জানতে চাও?’’

—এবার শ্লোকের  দোষ-গুণ বলুন।

—বেদসদৃশ গুণসম্পন্ন অনুপ্রাসযুক্ত উপমারূপ শ্লোকে কোন দোষ নেই, সম্পূর্ণ নির্দোষ। তোমার ব্যাকরণের অলঙ্কার জ্ঞান থাকলে তো তুমি দোষ-গুণ বুঝবে?

—যথার্থই বলেছেন। আমি  অলঙ্কার না পড়লেও শুনেছি তো, তা’তেই মনে হচ্ছে আপনার শ্লোক দোষযুক্ত।

—তোমার স্পর্দ্ধা তো কম নয়! কলাপ আর ফাঁকি পড়া বিদ্যা দিয়ে আমার শ্লোকের দোষ ধরতে চাও?

—প্রভু, আপনি আমার প্রতি  রুষ্ট  হবেন না, আমি কিন্তু আপনার এই শ্লোকের রচনায় পাঁচটি দোষ খুঁজে পেয়েছি, যদি অনুমতি  করেন, তাহলে এক-এক করে বর্ণনা করি।

শিষ্যসামন্ত, স্থানীয়  বিদ্বজ্জনের সামনে এমন কথা কেউ যে কোনদিন বলবে ভাবতেই  পারেন নি কেশবাচার্য,  তথাপি তর্কশাস্ত্রের নিয়ম মেনে নিমাইকে বলার জন্য অনুমতি দিলে নিমাই বলেন—-

পঞ্চ দোষ এই শ্লোকে পঞ্চ অলঙ্কার।

ক্রমে আমি কহ শুন করহ বিচার॥

অবিমৃষ্ট বিধেয়াংশ  দুই ঠাঞি চিন।

বিরুদ্ধমতি ভগ্নক্রম পুনরাত্ত দোষ তিন॥

গঙ্গার মহত্ত্ব  শ্লোকের মূল বিধেয়।

ইদং শব্দে  অনুবাদ পশ্চাৎ  অবিধেয়॥

বিধেয়  আগে কহি পাছে কহিলে অনুবাদ।

এই লাগি শ্লোকের অর্থ করিয়াছে  বাদ॥

……………………………………………………

গঙ্গাতে কমল জন্মে সবার সুবোধ।

কমলে গঙ্গার জন্ম অত্যন্ত বিরোধ॥

ইহা বিষ্ণু পাদপদ্মে গঙ্গার  উৎপত্তি।

বিরোধালঙ্কার  ইহা মহা চমৎকৃতি॥

ঈশ্বর অচিন্ত্য শক্ত্যে গঙ্গার প্রকাশ।

ইহাতে বিরোধ নাহি বিরোধ আভাষ॥

গঙ্গার মহত্ত্ব সাধ্য সাধন তাহার।

বিষ্ণুপাদোৎপত্তি অনুমান অলঙ্কার॥

স্থূল এই পঞ্চ দোষ পঞ্চ অলঙ্কার।

সূক্ষ্ম বিচারিলে যদি আছয়ে অপার॥ (চৈঃ চঃ আদিলীলা, পৃঃ ১২৭-১২৯)

—-হে পণ্ডিতপ্রবর! ‘‘আপনি বিধেয়  অর্থাৎ জ্ঞাত  আগে  বলে পরে অনুবাদ অর্থাৎ অজ্ঞাত বলেছেন। এরফলে শ্লোকের অনুবাদ ঘটেছে, মূল অর্থ বাদ পড়েছে। ‘দ্বিতীয় শ্রীলক্ষ্মী’ রচনায় ‘দ্বিতীয়’ শব্দ বিধেয়, সমাসে গৌণ হওয়াতে শব্দার্থ ক্ষয় হয়ে শব্দটি অপ্রাধান্য রূপে নির্দিষ্ট হয়েছে। ‘ভব’ অর্থে মহাদেব বোঝালে ‘ভবানী’  অর্থে মহাদেবের স্ত্রীকে বোঝায়। এবং ভবানীর  ভর্তা বললেও মহাদেবকে বোঝায়।  ‘ভবানীভর্ত্তুর্ষা’ শব্দের প্রয়োগে ‘ভবানীর ভর্তা’-র অর্থ হয়, ভবের পত্নী যে ভবানী তার ভর্তা, যেন ভব ব্যতিরেকে আর একজন ভর্তা বোঝায়, তাই  ওই শব্দের প্রয়োগ  বিরুদ্ধমতিকারক। শ্রী অর্থে লক্ষ্মী বা শোভাময়ী বোঝায়। এক্ষেত্রে ‘শ্রীলক্ষ্মী’ প্রয়োগে পুনরুক্তবদাভাস অলঙ্কার হয়েছে। আপনি  ‘শ্রীবিষ্ণুর চরণ-কমলে গঙ্গার  জন্ম’ বোঝাতে চেয়ে ‘কমলে গঙ্গার জন্ম’ বলে ফেলে প্রচলিত সত্যের সাথে বিরোধ করে ফেলেছেন, যদিও তা বিরোধাভাস মাত্র, তাই বিরোধাভাস-অলঙ্কারের প্রয়োগ হয়েছে। ‘গঙ্গার এই মহিমা সর্বদা নিশ্চিতরূপে দেদীপ্যমান, যেহেতু এই গঙ্গা শ্রীবিষ্ণুর চরণকমল হইতে উৎপন্ন হওয়ার কারণে অত্যন্ত সৌভাগ্যবতী।’—এখানে গঙ্গার মহত্ত্বের সাধন ও সাধ্য দুই-ই পরিলক্ষিত হয়। ওই অনুমান অলঙ্কারের প্রয়োগের ফলে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব জড়ীভূত হয়ে গেল।’’

নিমাই পণ্ডিতের বলা ব্যাখ্যান শুনে কেশবাচার্য আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলেন, শাস্ত্র না পড়ে, অলঙ্কার না পড়ে আমার শ্লোকের এইরূপ ব্যাখ্যা তুমি কিভাবে করলে?

উত্তরে নিমাই পণ্ডিত বলেন, শাস্ত্রের বিচার আমি জানি না, মাতা সরস্বতী যা বলান, তাই বলি। আপনি মহাপণ্ডিত, কবি শিরোমণি, আপনি দুঃখ করবেন না। আপনার শিষ্য মনে করে আমার কিশোর-সুলভ চপলতা ক্ষমা করে দেবেন। আজ চলুন বাসায় ফিরে যাই, কাল আবার মিলিত হয়ে আপনার কাছে শাস্ত্রের বিচার শুনব।

এই মতে নিজ গৃহে গেলা  দুই জন।

কবি রাত্রে কৈল সরস্বতী আরাধন॥

সরস্বতী রাত্রে তারে উপদেশ কৈল।

সাক্ষাৎ ঈশ্বর করি প্রভুরে জানিল॥

প্রাতে আসি প্রভুপদে লইল শরণ।

প্রভু কৃপা কৈল তার খণ্ডিল বন্ধন॥

ভাগ্যবন্ত দিগ্বিজয়ী সফল জীবন।

বিদ্যাবলে পায় মহাপ্রভুর  চরণ॥

কাশ্মীরি পণ্ডিত নিমাই পণ্ডিতের মধ্যে ষড়ৈশ্বর্য্যের প্রকাশ উপলব্ধি করতে পেরে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তারপর থেকে নবদ্বীপের পণ্ডিতসমাজে শুধু নয়, ভারতবর্ষের পণ্ডিতসমাজে নিমাই পণ্ডিত একজন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।      

                                  ********  

নিমাই পণ্ডিত পিতৃদেবের পিণ্ডদান করতে গয়ায় গিয়ে ঈশ্বরপুরীর কাছে দীক্ষা নেবার পর পাণ্ডিত্য ছেড়ে ভক্তিরসে নিজেকে জারিত করলেন। শ্রীবাস অঙ্গনের বৈষ্ণব সভায় যোগদান করে কীর্তনানন্দে মেতে ওঠেন। কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা চৈতন্যদেব আর্য্যকৃষ্টি বিরোধী বৌদ্ধ-তান্ত্রিকতার পৌত্তলিকদের, শুষ্ক জ্ঞানচর্চাকারী তর্কবাগীশদের, তামসিক ধর্মাচ্ছন্নদের উদ্দেশ্যে পথ-নির্দেশ করলেন ‘হরেরাম হরেকৃষ্ণ’  কীর্তনের ফরমূলার মাধ্যমে।––তোমার পাপ, তাপ হরণ করতে, প্রবৃত্তির পাপ-তাপের জ্বালা জুড়াতে, সবকিছু ছেড়ে শ্রীরামচন্দ্রের আদর্শ, শ্রীকৃষ্ণের আদর্শের অনুসরণ কর।   

এবার প্রশ্ন জাগতে পারে,  যিনি সর্বশাস্ত্রে পারদর্শী একজন ব্রাহ্মণ ছিলেন, এবং তৎকালিন হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রাধান্য থাকা সত্বেও তিনি কেন হরেকৃষ্ণ কীর্তনের মাধ্যমে ক্ষত্রিয় বংশজাত রামচন্দ্র এবং কৃষ্ণের জীবন্ত আদর্শে সবাইকে অনুপ্রাণিত করতে চাইলেন।

*        *        *

কীর্তনগান বাঙালি কবিদের এক অভিনব সৃষ্টি। কৃত্ ধাতু থেকে এসেছে কীর্তন। কৃত্ শব্দের অর্থ প্রশংসা। কীর্তন মানে কীর্তি আলাপন। কীর্তিকর কোন আদর্শের স্মরণ, মনন, গুণ বর্ণন কীর্তনের মূল উদ্দেশ্য। যা’ শ্রবণেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রবেশ করে মানুষের সাত্তিক গুণকে প্রকাশ করতে সাহায্য করে। তাই, মানুষকে সহজে প্রভাবিত করতে, কীর্তন এক সহজ প্রচার মাধ্যম।

কীর্তি-আলাপন দু’-ভাবেই হতে পারে। কথার আদান-প্রদান মাধ্যমে এবং সুরে, ছন্দে, নৃত্যে, যন্ত্রানুষঙ্গের ঐকতানের প্রকাশের মাধ্যমে।

প্রাক চৈতন্যযুগে, খ্রীঃ ১২ শতকে রচিত, শ্রীকৃষ্ণকে নায়ক করে, হ্লাদিনী শক্তিস্বরূপা রাধাকে একজন পরকীয়া নারী রূপে চিত্রণ করে কিছু অশাস্ত্রীয় আদিরসাত্মক পরকীয়া কাহিনী দিয়ে সাজানো,  কবি জয়দেব গোস্বামী  বিরচিত ‘গীতগোবিন্দম্ কাব্য’ বাংলার কীর্তনের প্রকৃত উৎস।

এ বিষয়ে  হিন্দুধর্মের এনসাইক্লোপিডিয়া, ‘পৌরাণিকা’র রচয়িতা অমল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন— (দ্রঃ গীতগোবিন্দ) ‘‘রামায়ণ ও মহাভারতের কট্টর পটভূমিতে ব্লু-বুক হিসাবে বর্ষবরদের চরম ও পরম পরিতৃপ্তি দিয়েছিল; তন্ত্রাভিলাষী সমাজে তন্ত্রগুলি চেতন ও অবচেতন মনকে যেমন তৃপ্তি দেয়।’’ কবি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্যের মূল্যায়ন বিষয়ে বলছেন—‘‘গীতগোবিন্দে সুড়সুড়ি আছে আর আছে দুষ্পাচ্য যৌনতা।  ….. সহজিয়া জয়দেব আবিল, অপাঠ্য।’’ রাধা সন্দর্ভে বলছেন— ‘‘…. রাধাবাদ শক্তিবাদেরই একটি ধারা; রাসলীলা নিরোধ ব্যবহারের বিশুদ্ধ বিজ্ঞাপন। তন্ত্রের মানসকন্যা রাধা। রস ও রতির মিলন বৈষ্ণব তত্ত্ব; সাধক ও ভৈরবীর সম্ভোগ শাক্ত তত্ত্ব এবং বজ্রযানে বজ্র ও পদ্মের মিলন এ  সবগুলিই তান্ত্রিক তত্ত্ব; বজ্রযানে তাই বলা হয়েছে বুদ্ধত্বং যোষিৎ-যোনিপ্রতিষ্ঠিতম্। ….. ভাগবতে  রাধা নাই। …. ভাগবত ও বিষ্ণু  পুরাণে রাসলীলা আছে কিন্তু রাধা নাই। ….. ’’

তথাপি রাধার মানবী অস্তিত্ব কিছু-কিছু অ-বৈষ্ণবদের রিরংসায় বাসা বেঁধেছিল। সেই বিকৃত ধারার বাসাটাকে ভাঙতে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যদেব নিজেকে রাধা-কৃষ্ণের যুগলরূপ বলে প্রচার করলেন। যাতে ধর্মের অজুহাতে ধর্মবিরুদ্ধ পরকীয়া-প্রীতি প্রশ্রয় না পায়। তাই তিনি রাধাকে নারীদেহে নয়, সুরত-সম্বেগের ধারায় অন্বেষণ করতে পথ দেখালেন।  রাধাকৃষ্ণের যুগলধারার আদর্শে, পরকীয়া-প্রীতির আদর্শে গড়ে ওঠা তৎকালিন প্রচলিত কীর্তনের ধারাটাকে গীতা গ্রন্থে বর্ণিত—

       “যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লাণির্ভবতি ভারতঃ।

অভ্যুত্থানম্ ধর্মস্য তদাত্মনম্ সৃজাম্যহম্॥  

পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশয়চ দুষ্কৃতাম্ ।
ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ॥”–এর সূত্র মেনে,—

অর্থাৎ ‘‘ঈশ্বর এক, ধর্ম এক, প্রেরিতগণ বিভিন্ন নামে সেই এক-এরই বার্তাবাহী’’র সনাতনী ধারা বা সনাতন ধর্মকে সংস্থাপিত করলেন।  শ্রীরামচন্দ্র এবং শ্রীকৃষ্ণের আদর্শকে সামনে রেখে।  হরেকৃষ্ণ, হরেরাম প্রচার মাধ্যমে। এর ফলে পরকীয়া-তত্ত্বের সহজীয়া মতবাদীরা বৈষ্ণবীয় মূলস্রোতে ফিরে আসার সুযোগ পেল এবং পৌত্তলিকতার নাগপাশ থেকে সনাতন ধর্মকে উদ্ধার করে এক সর্বজনীন রূপ দিলেন। মূলতঃ শ্রীকৃষ্ণকে কেন্দ্র করে। নিজেকে অন্তরালে রেখে। ‘অবতার নাহি কহে, আমি অবতার।’ তথাপি ধরা পড়ে গেলেন বৈষ্ণবাচার্য সাধক অদ্বৈত মহাপ্রভুর কাছে। অদ্বৈত মহাপ্রভুকে ফাঁকি দিতে পারলেন না। তাঁর সাধনার কাছে ধরা পড়ে গেলেন। নিত্যানন্দ মহাপ্রভুও বুঝতে পেরে  গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুকে কৃষ্ণের নব-কলেবর রূপে প্রচার করতে শুরু করলেন।

*        *        *

আসলে সমগ্র জগতের প্রাণনশক্তি বা প্রাণপঙ্ক বা প্রটোপ্লাজমকে পরমাত্মিক শক্তি বলা হয়, যা বিশ্ব ব্যাপিয়া বিদ্যমান, ‘‘যিনি সর্ব্ব ও প্রত্যেকের ভিতর বিশেষভাবে পরিব্যাপ্ত’’ তিনিই বিষ্ণু।  যে পুরোহিতগণ প্রতিমা পূজা করেন, তাঁরাও সর্বাগ্রে ‘ওঁ শ্রীবিষ্ণু’ মন্ত্রে আচমন করেন। সর্বকালের  শ্রেষ্ঠ পুরোহিত রঘুবংশের কৌলগুরু বশিষ্ঠদেব শ্রীরামচন্দ্রকে ‘‘ওঁ নারায়ণঃ পরাবেদা নারায়ণঃ পরাক্ষরঃ।/নারায়ণঃ পরামুক্তি নারায়ণঃ পরাগতিঃ॥’’ মন্ত্রে স্বস্তিবাচন করার সময় শ্রীরামচন্দ্রের মধ্যে পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণকে উপলব্ধি করলে তিনি নারায়ণের পরিবর্তে রামচন্দ্র শব্দ বসিয়ে মন্ত্রটিকে পরিমার্জিত করেন। নররূপী নারায়ণ পুরুষোত্তম রামচন্দ্রকে কেন্দ্র করে সবাইকে ধর্ম পালন করতে উদ্বুদ্ধ করলেন।   অনুরূপভাবে কৃষ্ণনামের প্রচারক শ্রীগৌরাঙ্গদেবের মধ্যে বিষ্ণুত্ব বা কৃষ্ণত্ব-এর পরিপূর্ণতা সাধনদ্বারা উপলব্ধি করা মাত্রই নিত্যানন্দ প্রভু ‘‘ভজ গৌরাঙ্গ কহ গৌরাঙ্গ লহ গৌরাঙ্গের নাম রে …. ।’’ ‘‘প্রভু নিত্যানন্দ কহে দন্তে তৃণ ধরি। আমারে কিনিয়া লহ ভজ গৌরহরি॥ ইত্যাদি স্বস্তিবাচনে গীতার অবতারবাদকে সম্মান জানালেন। তৎকালিন পুরুষোত্তম চৈতন্যদেবকে কেন্দ্র করে সবাইকে চলতে বললেন। এই হচ্ছে সাজা-গুরুদের কবল থেকে সনাতন বৈষ্ণবধর্মের ধারাকে নবীকরণ মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখার ফরমূলা।  গীতা গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণ বিষয়টিকে স্পষ্ট করে বিধৃত করেছেন।      

*        *        *

অবতার-তত্ত্বের ধারা অনুসারে অবতার বরিষ্ঠ শ্রীরামচন্দ্র ছিলেন সত্যের পূজারী অথচ অসৎ নিরোধী। তৎকালীন যুগের অচ্ছুৎ অনার্য্যদের আর্য্যীকৃত করে আর্য্য-অনার্য্যদের মেলবন্ধন করলেন। অনার্য্য গুহক চণ্ডালকে করলেন মিত্র, আবার অকালমৃত্যুর দ্যোতক বর্ণাশ্রম-বিদ্বেষী প্রতিলোমাচারী বন্ধুবর শম্বুককে দিলেন চরম শাস্তি। ব্রাহ্মণ ঔরসজাত  রাবণ  যখন কিছুতেই সীতাকে বশে আনতে পারছিলেন না তখন সভাসদেরা মায়াবী-রাবণকে বলেছিলেন, আপনি রামরূপ ধারণ করে গেলেই তো সীতাকে সহজেই বশীভূত করতে পারেন। উত্তরে রাবণ বলেছিলেন, ওই রূপ স্মরণ করলেই আমার সব পাপ-প্রবৃত্তি মুছে গিয়ে আমি এক অন্য মানুষ হয়ে যাই। তথাপি প্রবৃত্তির ঊর্দ্ধে উঠে ওই বোধটাকে ধরে রাখতে পারল না, ফলে রামচন্দ্রের হাতে হত হতে হল। অথচ বিভীষণ রামচন্দ্রের আদর্শে প্রলুব্ধ হয়ে রাবণকে ত্যাগ করলেন।

       এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ……রাবণ তো আদর্শবান ছিল না। রামচন্দ্রকে দেখে সে একেবারে বিগলিত হয়ে গেল। রামচন্দ্রের ঊর্দ্ধে তার আর কেউ নেই। ভ্রাতার প্রতি কর্তব্যের চাইতে তার ইষ্টানুরাগই প্রবল। ভীষ্ম কিন্তু কেষ্টঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি নিয়েও, কর্তব্যবোধে কৌরবের পক্ষ ছাড়তে পারেন নি। তা কিন্তু ঠিক হয়নি। ইষ্টের জন্য, সত্যের জন্য, অন্য যে-কোন কর্তব্য ত্যাগ করতে হবে, যদি সে কর্তব্য ইষ্টের পথে অন্তরায় হয়। ‘‘সর্ব্বধর্ম্মান পরিত্যজ্য  মামেকং শরণং ব্রজ’’ । (আ. প্র. 21/2.6.1952)

……শ্রীরামচন্দ্রের খুব strong group (শক্তিমান দল) ছিল। হনুমান, সুগ্রীব, জাম্বুবান, অঙ্গদ, নল, নীল এরা সবাই ছিল একটা strong unit (শক্তিমান গুচ্ছ)। রামচন্দ্রের সাথে ওদের একজন না-একজন থাকতই। এক সময় বিভীষণকে সন্দেহ করেছিল লক্ষণ।  বিভীষণ তাতে বলেছিল, ‘আমি জানি তোমরা আমাকে সন্দেহ করবে। কারণ, আমি রাবণের ভাই। আমি ভাই হয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে  treachery (বিশ্বাসঘাতকতা) করেছি। কিন্তু করেছি অসৎ-এর বিরুদ্ধে। হজরত রসুলের  group-ও (দলও) খুব  strong (শক্তিমান) ছিল। তিনি বেঁচে থাকতে-থাকতেই অনেকখানি ভূখণ্ডের king (রাজা) হয়েছিলেন। (দীপরক্ষী 2/26.7.1956)

রাজাকে কতখানি প্রজাস্বার্থী হতে হবে সেইটেই রামচন্দ্র দেখিয়েছেন। প্রজা প্রাণের চাইতেও বেশী না হলে রাজা হওয়া যায় না। …….সীতাও ছিলেন রামচন্দ্রের আদর্শে উৎসর্গীকৃত। আর এই ছিল আমাদের আর্য্যবিবাহের তাৎপর্য্য। (আ. প্র. 20/9. 8. 1951)

       অবতার বরিষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ‘‘শ্রীকৃষ্ণ সব সময়েই চেষ্টা করেছেন যুদ্ধবিগ্রহ avoid (পরিহার) করতে, কিন্তু তাঁর environment (পরিবেশ) তাঁকে সে scope (সুযোগ) দিল না। আর শ্রীকৃষ্ণের যুদ্ধ—মৃত্যুকে মারবার জন্য। Gangrene-affected part of the body (শরীরের দুষ্টক্ষতযুক্ত স্থান) আমরা যেমন কেটে ফেলি জীবন বাঁচাবার জন্য, তিনিও তেমনি মৃত্যু ও মারণের মূর্ত্ত প্রতীকস্বরূপ যারা ছিল তাদের মেরেছিলেন সমগ্র সমাজকে বাঁচাবার জন্য। (আ. প্র. খণ্ড ১, ৪. ১২. ১৯৪১)

        …… শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে বুঝিয়ে দিলেন যে devil (শয়তান) যদি রাজত্ব করে, তবে অর্জ্জুনের ঈপ্সিত ধর্ম্ম, জাতি, কুল, মান কিছুই রক্ষা পাবে না। তাই devil (শয়তান)-কে demolish (ধ্বংস) করা লোকমঙ্গলের জন্যই অপরিহার্য্য। এর মধ্যে দ্বেষ-হিংসার বালাই নেই। বরং অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধকে এড়িয়ে চলার বুদ্ধির পিছনে আছে দুর্ব্বলতা।’’ (আ. প্র. খণ্ড ৬, ৬. ১২. ১৯৪৫)   

কেষ্টদা (ভট্টাচার্য্য) প্রশ্ন করেন– গীতায় শ্রীকৃষ্ণ প্রথমে আত্মতত্ত্ব সম্বন্ধে এক বিরাট দার্শনিক আলোচনার অবতারণা করে তারপর ক্ষত্রিয়ের করণীয় নির্দ্দেশ করলেন অর্জুনকে। ওভাবে বললেন কেন ?

শ্রীশ্রীঠাকুর– Divine Philosophy ( ভাগবত দর্শন ) দিয়ে শুরু করে তা থেকে Concrete – এ ( বাস্তবে ) আসলেন। আত্মিক ধর্ম প্রত্যেকে পালন করতে হয় তার Instinctive activity ( সহজাত সংস্কার-সম্মত কর্ম ) এর ভিতর দিয়ে। অর্জ্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ যা বলেছিলেন তার মর্ম্ম হল — You are a Kshatriya, born with Kshatriya instincts. And you must do your instinctive duty with all elevating urge ( তুমি ক্ষাত্র সংস্কার নিয়ে জাত ক্ষত্রিয়। এবং উন্নয়নী আকুতি নিয়ে তোমাকে অবশ্যই তোমার সহজাত সংস্কার-সম্মত কর্তব্য পালন করতে হবে )। অর্জ্জুন পন্ডিত কিনা তাই কেষ্টঠাকুর ঐভাবে অর্জ্জুনকে তাঁর বক্তব্য বলেছিলেন। Philosophy ( দর্শন ) না বললে অর্জ্জুন ধরত না।

(আলোচনা প্রসঙ্গে, ১১দশ খন্ড, (ইং ২০-০৫-১৯৪৮)

       রামচন্দ্র এবং শ্রীকৃষ্ণ উভয়েই বৈষ্ণবধর্মের বা সনাতন ধর্মের মূল কাঠামো সদাচার এবং বর্ণাশ্রমকে রক্ষা এবং প্রতিষ্ঠা করার জন্যই জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। চৈতন্যদেবও ভারতীয় কৃষ্টির মূল, বর্ণধর্ম, আশ্রমধর্ম  পালন করার পর লোকশিক্ষার জন্য সন্ন্যাস নিয়েছিলেন। তিনি বাস্তব জীবনে অসৎ-নিরোধে তৎপর ছিলেন। বর্ণাশ্রম বিরোধী  কোন প্রতিলোম বিবাহ পর্যন্ত হতে দেন নি।  দোর্দন্ডপ্রতাপ জমিদারের দুষ্কৃত ভাইপো মাধবের কবল থেকে চন্দনের বাগদত্তা চুয়াকে পার্ষদদের সাহায্যে চন্দনকে দিয়েই হরণ করিয়ে স্বয়ং পৌরহিত্য করে উপযুক্ত পাত্রে পাত্রস্থ করেছেন।     (সূত্রঃ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত, চুয়াচন্দন উপন্যাস)

 *       *        *

বাংলার বিশুদ্ধ কীর্তন-আন্দোলনের পথিকৃৎ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তিনি স্বভাবজ পাণ্ডিত্যের মাধ্যমে নবদ্বীপের স্মার্ত্ত পণ্ডিতদের, ভারতখ্যাত কাশ্মীরি-পণ্ডিতের দর্প চূর্ণ করেছেন। তিনি তামসিক গুণসম্পন্ন সমাজের প্রতিনিধি জগাই-মাধাইদের প্রেম দিয়ে সাত্তিক গুণের উদ্বোধন করেছেন। সনাতন ধর্ম বিদ্বেষী চাঁদ কাজীদের হরিনাম সংকীর্তনের মাধ্যমে চরমবার্তা দিয়ে তমোগুণ নাশ করে ইসলামের বিকৃতি প্রচারকে নস্যাৎ করে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বাহ্য জাতিভেদের বেড়াজাল অগ্রাহ্য করে, যবন হরিদাসের ভক্তিকে মর্যাদা দিয়ে ভক্ত হরিদাসে রূপান্তর করেছেন। তৎকালিন ভারতের বিখ্যাত তাত্ত্বিক পণ্ডিতদের, যেমন রায় রামানন্দ, প্রকাশানন্দ সরস্বতী, সার্ব্বভৌম প্রভৃতিদের ভুল ভাঙাতে তথ্যসমৃদ্ধ বাচনিক কীর্তি—

‘‘চণ্ডালোহপি দ্বিজশ্রেষ্ঠ হরিভক্তি পরায়ণঃ।’’

‘‘মুচি যদি ভক্তিসহ ডাকে কৃষ্ণধনে।

কোটি নমস্কার করি তাহার চরণে॥’’—-প্রকাশ মাধ্যমে আপামর সবাইকে সনাতন ধর্মে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ‘‘চৈতন্যদেবও জগাই-মাধাইয়ের উপর কেমন উগ্রভাব ধারণ করে তাদের অন্তরে ত্রাস ও অনুতাপ জাগিয়ে তবে প্রেম দেখিয়ে তাদের অন্তর জয় করেছিলেন। তাদের উগ্রদম্ভ, দর্প ও প্রবৃত্তি-উন্মত্ততাকে স্তব্ধ না করে, আয়ত্তে না এনে গোড়ায় প্রেম দেখাতে গেলে সে-প্রেম তারা ধরতে পারত না। হয়তো ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করত।’’

(আ. প্র. ৯/২৭. ১২. ১৯৪৬)      
      প্রকাশানন্দ সরস্বতী, সার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্য প্রমুখগণ বৈদান্তিক পণ্ডিত ছিলেন। তাঁদের পাণ্ডিত্য বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন,—- বৈদান্তিক ভাব মানে record of experience (জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার দলিল)। ওরা হয়তো achieve (আয়ত্ত) করার পথ ঠিক অবলম্বন করেননি, সেইটে চৈতন্য মহাপ্রভু ধরিয়ে দিয়েছেন। ভক্তি লাগেই, ভক্তিপথ সহজ, সুষ্ঠু, accurate (যথাযথ), ভক্তির রাস্তা দিয়েই যেতে হয়, তার সঙ্গে বৈশিষ্ট্যানুযায়ী ঝোঁক থাকেই। অদ্বৈতবাদেও গুরুভক্তির উপর জোর দেওয়া আছে। নইলে এগোন যায় না। তাই আছে— ‘অদ্বৈতং ত্রিষু লোকেষু নাদ্বৈতং গুরুনা সহ’। নির্ব্বিকল্প সমাধিতে অদ্বৈতভূমিতে সমাসীন হ’লে জ্ঞান, জ্ঞেয়, জ্ঞাতা লয় পেয়ে যায়। তখন মানুষ বোধস্বরূপ হ’য়ে থাকে, সে অবস্থা মুখে বলা যায় না। অন্য সময় সে মানুষেরও সেব্য-সেবকভাব নিয়ে থাকা স্বাভাবিক! আমি না থাকলে তুমি থাকে না, তুমি না থাকলে আমি থাকে না। জীবজগতের সঙ্গে ব্যবহারে যে আমি-তুমি রূপ দ্বৈতভাব থাকে, তখনও তার মধ্যে একটা একাত্মবোধের চেতনা খেলা ক’রে বেড়ায়। ইষ্টই যে সব-কিছু হ’য়ে আছেন, এই স্মৃতি লেগে থাকে। আত্মাই কই আর ব্রহ্মই কই, তার মূর্ত্ত বিগ্রহ হলেন ইষ্ট। মানুষ যখন ইষ্টসর্ব্বস্ব হয়, ইষ্টপ্রীত্যর্থে ছাড়া যখন সে একটা নিঃশ্বাসও ফেলে না, তখনই সে একই সঙ্গে ভক্তিযোগ, কর্ম্মযোগ ও জ্ঞানযোগে সিদ্ধ হ’য়ে ওঠে। কর্ম্মযোগ, জ্ঞানযোগ যাই বল, ভক্তির সঙ্গে যোগ না থাকলে কাজ হয় না, সব যোগই আসে ভক্তিযোগ থেকে—
      “বহূননাং জন্মনামন্তে জ্ঞানবান্ মাং প্রপদ্যতে, বাসুদেবঃ সর্ব্বমিতি স মহাত্মা সুদুর্লভঃ”। এই জ্ঞানী একাধারে জ্ঞানী, ভক্ত ও কর্ম্মী। গোড়া থেকেই অদ্বৈতবাদ mathematically (গাণিতিকভাবে) সম্ভব হ’তে পারে, practically (বাস্তবে) সম্ভব হয় কমই। (আলোচনা প্রসঙ্গে, ত্রয়োদশ খণ্ড, তাং ১-৮-১৯৪৮)

 *       *        *

চৈতন্যদেব অসি নয়, তীর-ধনুক-বল্লম লাঠি দিয়েও নয়—খোল, করতালাদি বাদ্যযন্ত্রের অনুষঙ্গে ‘হরেরাম হরেকৃষ্ণ’ নামকীর্তনের মাধ্যমে এক ধর্মীয় প্লাবন সৃষ্টি করেছিলেন। ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ অতিক্রম করে,  পুরুষার্থের পঞ্চম-বর্গ প্রেমের সাহায্যে সাম্প্রদায়িক কায়েমী-স্বার্থীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ভাগবত আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে ভাগবত ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্ণাশ্রমানুগ সামাজিক বিন্যাসকে সমৃদ্ধ করতে সর্ববর্ণে হরিনাম প্রচার করে বাহ্য জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন।  কিছু স্বার্থান্বেষী স্মার্ত্ত-পণ্ডিতদের অভিসন্ধিমূলক অভিযোগের ভিত্তিতে তৎকালিন শাসক চাঁদকাজী হরিনাম সঙ্কীর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। শ্রীবাস অঙ্গনের কীর্তনের আসরে গিয়ে বৈষ্ণবদের ওপর অত্যাচার করে, শ্রীখোল ভেঙ্গে দেয়। শান্ত মহাপ্রভু ওই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে কোন বিরোধ না করেই দুর্বার নিরোধ করেছিলেন।  ১৪টি কীর্তনদল সংগঠিত করে  উদ্দাম কীর্তন করতে করতে চাঁদকাজির বাড়িতে যান। চাঁদকাজী ভয় পেয়ে গেলে মহাপ্রভু তাকে আশ্বস্ত করতে কৃষ্ণপ্রেমের কথা বলেন। হরিনাম-সংকীর্তনের উপযোগিতা বিষয়ে বিস্তৃত ব্যাখ্যা করেন। তার পরে আপনকরা ভাব নিয়ে বলেন, তুমি আমার মামার গ্রামের লোক হবার সুবাদে তুমি আমার মামা হও, মামা হয়ে ভাগ্নের প্রতি এমন কঠোর হয়ো না। কীর্তন বন্ধ করার আদেশ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত আমরা তোমার বাড়ী ছেড়ে যাচ্ছি না।  ধর্ম প্রতিষ্ঠার কর্তব্যে অটল মহাপ্রভুর কীর্তন আন্দোলনের কাছে আনুগত্য স্বীকার করতে বাধ্য হয় চাঁদকাজি। তিনিও মহাপ্রভুর সাথে গলা মিলিয়ে হরিনাম সঙ্কীর্তন করেন। সবাইকে হরিনাম সঙ্কীর্তন করতে আদেশ জারী করেন।

      চৈতন্য আজ্ঞায় স্থির হইল কীর্তন  

      কহে আপনার তত্ত্ব করিয়া গর্জন।
      কলিযুগে মুঞি কৃষ্ণ নারায়ন

      মুঞি সেই ভগবান দেবকীনন্দন।।
      অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড কোটি মাঝে মুই নাথ

      যত গাও সেই মুঞি তোরা মোর দাস।।’’

     (শ্রীচৈতন্য ভাগবত পৃষ্ঠা ১৪৬, মধ্যখণ্ড ৮ম অধ্যায়।)

       তথাপি নবদ্বীপের কিছু স্মার্ত্ত পণ্ডিতেরা মহাপ্রভুর বিরোধিতা করেছেন।  তাই তিনি অনিচ্ছা সত্বেও বাধ্য হয়ে বৈষ্ণব আন্দোলনকে নবদ্বীপে বা নদীয়াতে সীমাবদ্ধ না রেখে ভারতব্যাপী বিস্তার করার মানসে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নামে ভুষিত হয়ে লোক-সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পরিব্রাজক হয়ে বেরিয়ে পড়েন।

       সন্ন্যাস লইনু যবে ছন্ন হইল মন।

       কী কাজ সন্ন্যাসে মোর প্রেম প্রয়োজন॥

*        *        *   

       চৈতন্যদেবের লীলাবসান পরবর্তীকালে কিছু প্রবৃত্তিমার্গী অনুগামীরা চৈতন্যদেব কথিত অবতারবাদের মূলমন্ত্র—

       “আত্মেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা তারে বলি কাম।

       কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা, ধরে প্রেম নাম।

       কামের তাৎপর্য্য নিজ সম্ভোগ কেবল।

       কৃষ্ণসুখ তাৎপর্য্য প্রেম মহাবল।।”

           ‘‘কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা’’-র সদাচার, বর্ণাশ্রম ও চতুরাশ্রম-ধর্মের তাৎপর্য্য বোঝার চেষ্টা না করে,  কৃষ্ণের আদর্শ চরিত্রগত করার অনুশীলন না করে, সাধনদ্বারা চৈতন্যদেবের পরবর্তী অবতারকে অন্বেষণ না করে, প্রবৃত্তি পরবশতার “আত্মেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা”-কে গুরুত্ব দিলেন। কৃষ্ণের সাথে রাধাকে জুড়ে নিয়ে মুখে ‘কৃষ্ণ-কৃষ্ণ’ বলে খোল-করতাল সহযোগে কীর্তন করতে অভ্যস্ত হলেন।  রাধা-কৃষ্ণের পরকীয়া প্রীতির সহজিয়া গোষ্ঠী তৈরি করে সগোত্র এবং প্রতিলোম বিবাহাদি সমর্থন করে আশ্রমধর্মকে অশ্রদ্ধা করেছেন। ফলে বিকৃত হয়েছে শ্রীকৃষ্ণ-চৈতন্যদেবের আদর্শ।  যার প্রবহমানতা বর্তমানেও বিদ্যমান। চৈতন্যদেব প্রদত্ত ‘শিক্ষাষ্টক’ উপদেশামৃত, যার মধ্যে ‘রাধা’ নামের উল্লেখ পর্যন্ত নেই, ওই উপেদেশামৃতকে গুরুত্বের সাথে বিচার-বিশ্লেষণ না করেই ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থেও রাধাকে মানবী রূপে চিত্রিত করা হয়েছে।  রাধাকে কৃষ্ণের বল্লভা বলা হয়েছে। বল্লভা শব্দের অর্থ প্রণয়িণী। যে কৃষ্ণকে সবকিছুর স্রষ্টা মনে করেন যারা, যে কৃষ্ণ অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখান বলে প্রচার করা হয়, সেই কৃষ্ণের প্রাণধন, প্রাণশক্তি বা জীবনীশক্তির উৎস একজন নারী ! ভাবা যায় !  না মেনে নেওয়া যায় ? যদি রাধাকে কৃষ্ণের একজন ভক্ত হিসাবে দেখাতেন, তাহলে মেনে নেওয়া যায়।

রাধা সহ ক্রীড়ারস বৃদ্ধির কারণ। 

আর সব  গোপীগণ রাসোপকরণ॥

কৃষ্ণের বল্লভা রাধা কৃষ্ণ প্রাণধন।

তাঁহা বিনু সুখ হেতু নহে গোপীগণ॥ (চৈঃ চঃ পৃঃ ৬৪)  

শুধু তাই নয়, শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে গবেষণা করেন যারা, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাকে নিয়ে গবেষণা করেন যারা, তারাও পার্থসারথী কৃষ্ণের আদর্শকে পাশ কাটিয়ে, বর্ণাশ্রমধর্মকে উপেক্ষা করে, বাঁশী হাতে নিয়ে রাধাকে জড়িয়ে ধরা রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তির উপাসনা করেন। ‘আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সঙ্ঘ’, সংক্ষেপে ইসকনের ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথি স্মরণে জন্মাষ্টমীর দিনটিতেও রাধাকে সাথে রাখেন, যেন রাধাকে সাথে নিয়েই কৃষ্ণ জন্মেছিলেন! গীতা-বিরুদ্ধ, শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ-বিরুদ্ধ ধর্ম পালন করতে গিয়ে ধাতব রাধাকৃষ্ণের মূর্তিতে মাখনাদি অনেক কিছু মাখিয়ে  প্রতিমার অঙ্গরাগ করে স্নান করান! (প্রমাণ পেতে ইউ-টিউবে ইসকনের ভিডিও দেখতে পারেন।)

তাই বাধ্য হয়ে এ-যুগের শ্রীকৃষ্ণ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ধর্ম-প্রতিষ্ঠার নামে বিকৃতাচারীদের উদ্দেশ্যে বললেন—
      “ভগবান, ইষ্ট বা ধর্ম্মের মৌখিক স্তুতির ভিতর-দিয়ে যা’রা ধর্ম্মবিরোধী কাজ করে, তা’রা হ’ল সব চাইতে বড় শয়তানের দূত–প্রকৃষ্ট লোক-দূষক। ১২৫ ।
(শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭)’’

‘‘অনেকে শ্রীকৃষ্ণকে মানে, গীতা মানে, অথচ বর্ণাশ্রম মানে না। গীতার কে কি ব্যাখ্যা করেছেন সেই দোহাই দেয়। কিন্তু গীতার বক্তা শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও বাণী দেখে চতুর্বর্ণ সম্বন্ধে তাঁর মত আমরা কি বুঝি? এ সম্বন্ধে কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না, গীতা শ্রীকৃষ্ণের জীবনেই জীবন্তভাবে পরিস্ফুট। গীতায় প্রত্যেক বর্ণের স্বভাবজ কর্ম সম্বন্ধে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে।  (আ. প্র. ১৪/১১৮)

কেষ্টঠাকুরের জীবনটা দেখেন, ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত সবাই তাঁকে পুরুষোত্তমজ্ঞানে পূজা করতেন, কিন্তু তাঁর এত বিয়ের মধ্যে একটাও বামুনের মেয়ে নেই। সমাজ-সংস্থিতির  জন্য তিনি বর্ণাশ্রমের বিধান কাঁটায়-কাটায় মেনে গেছেন। (আ. প্র. ৭/৫০)’’

*        *        *

      যারা শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে গবেষণা করেন, তাদের তো জানা উচিত যে, শ্রীকৃষ্ণ, বৃহত্তর রাষ্ট্রকে অধর্মের গ্যাংগ্রীন থেকে বাঁচাতেই সুকৌশলে কংস, জরাসন্ধ, শিশুপাল, শাল্ব কৌরবাদির ন্যায় আততায়ীরূপী গ্যাংগ্রীনদের অপারেশন করেছিলেন।—হিংসাকে হিংসা দ্বারা প্রতিরোধ করে অহিংসার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন! কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সনাতনী আর্য্যকৃষ্টির মূলতত্ত্ব, সদাচার ও বর্ণাশ্রমধর্মভিত্তিক পরমরাষ্ট্রিক সমবায়।

       শ্রীকৃষ্ণের লীলাবসান পরবর্তী শ্রীকৃষ্ণের গীতা-আদর্শের প্রচারক ঋত্বিক সংঘ সক্রিয় থাকার ফলে প্রজাগণ সহজাত-সংস্কার অনুযায়ী সবাই জীবিকা অর্জন করতেন। কেহ কাহারো বৃত্তি-হরণ করতেন না। সকলে আর্য্যকৃষ্টির বিবাহাদি দশবিধ সংস্কার মেনে চলতেন। জনন বিপর্যয় হয় নি, আশ্রমধর্ম ঠিক ছিল। ফলে তিন হাজার বছর পর্যন্ত বৃহত্তর আর্যাবর্তে আগ্রাসন করতে সাহস পায়নি অধার্মিক দুষ্কৃতিরা ! যখন থেকে বর্ণাশ্রম-ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের শিক্ষা ভুলে, প্রবৃত্তিরূপী শয়তানের প্ররোচনার ফাঁদে পড়ে আমরা  ক্লীব হয়েছি, তখন থেকে আমরা আগ্রাসনের শিকার হয়েছি। বোধ বিপর্য্যয়ের কারণে, সনাতন ধর্মের অনুশাসন ভুলে, এক আত্মঘাতী উদারতা দেখাতে গিয়ে শক-হুণ-পাঠান-মোগলদের স্বাগত জানিয়েছি। তারা সুযোগ পেয়ে আমাদের জাতীয়তাবোধ, জাতীয়কৃষ্টি অবদলিত করেছে! অনেকদিন পরে, যখন আগ্রাসনের চরম বিপর্যয়, তখন ইংরেজদের অপশাসন থেকে আর্যাবর্তকে মুক্ত করতে আমরা মেরুদণ্ড সোজা করে ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করলাম। সেই শ্রীকৃষ্ণের গীতার আদর্শকে অবলম্বন করে।

        “যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লাণির্ভবতি ভারতঃ।

        অভ্যুত্থানম্ ধর্মস্য তদাত্মনম্ সৃজাম্যহম্।।

        পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশয়চ দুষ্কৃতাম্ ।
        ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ।।”—বাণীর অনুসরণে।
     গীতার ওই সূত্র অবলম্বনে, চৈতন্যদেব ‘‘যেই রাম সেই কৃষ্ণ, এক দেহে রামকৃষ্ণ’’ রূপে এসে আমাদের ভুল ভাঙিয়ে দিলেন। গীর্জায় গিয়ে যীশুর, মসজিদে গিয়ে রসুলের আরাধনা করলেন। পঞ্চমুণ্ডির আসন সাজিয়ে কোনো তান্ত্রিক-গুরু বসালেন তো বসে পড়লেন। তিনি লোকশিক্ষার জন্য বহু ধর্মীয় মতবাদের  গুরুদের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুন্ন রেখেই। তিনি দক্ষিণেশ্বরে পূজারী হয়ে এসেও প্রচলিত পূজা-পদ্ধতি অনুসরণ করেন নি। মৃন্ময়ী জগন্মাতাকে প্রাণবন্ত করে দেখালেন এবং কালী মায়ের আদেশক্রমে নিজে খেয়ে মাকে খাওয়ালেন। ফলহারিনী কালী পূজার শুভলগ্নে সারদাদেবীকে আরাধনা করে চিন্ময়ী মাতৃশক্তিকে আদ্যাশক্তি রূপে শ্রদ্ধা করতে শেখালেন।  ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব শিষ্য নরেন্দ্রনাথকে শেখালেন,  ভারতবর্ষের শাশ্বত দর্শন, ‘‘বহুজন হিতায় চ, বহুজন সুখায় চ’’-এর আদর্শের উত্তরাধিকারী হয়ে পরমার্থ লাভ করার জন্য তোমাকে আত্ম নিবেদন করতে হবে।

       শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ঐশী শক্তিতে শক্তিমান হয়ে নরেন্দ্রনাথ হলেন বিবেকানন্দ। এঁকে দিলেন মহান ভারতবর্ষের পূর্ণাঙ্গ এক চিত্র। শিকাগো ধর্ম্ম মহাসভার ক্যানভাসে।

       ‘আব্রহ্মস্তম্বভৃদ্ধাতা’–তৃণলতা থেকে ব্রহ্ম, সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বার্তাবহ বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, সংহিতা, পুরুষোত্তমবাদ নিয়ে বিশ্বজনমানস নতুন করে ভাবতে শুরু করলো।  সনাতন ধর্মের হৃত উত্তরাধিকার ফিরে পেতে ভারতবর্ষ উপনিষদের ‘‘উত্তিষ্ঠত জাগ্রত, প্রাপ্য বরান্ নিবোধত।।’’ মন্ত্রে আবার নতুন করে জেগে উঠলো।………

       ‘‘কর্ম্মণ্যেবাধিকারেস্তু মা ফলেষু কদাচন।…….’’ ––কর্মেই তোমার অধিকার ফলে নয়। ––শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতার ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার আদর্শ আঁকড়ে নবযুগের অভিমন্যু ক্ষুদিরাম, দেশরক্ষার ধর্ম পালন করতে গিয়ে ফাঁসির আসামী হলেন। ‘‘ন জায়তে ম্রিয়তে কদাচিৎ…….বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়………নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ।…….’’। বাণীর অমৃত আদর্শে স্থিতপ্রজ্ঞ, মৃত্যুঞ্জয়ী ক্ষুদিরাম হাসিমুখে ফাঁসির দড়ির মালা পড়লেন গলায়। একটা ক্ষুদিরামের আত্মাহুতি জন্ম দিল হাজারো ক্ষুদিরামের। ফাঁসিরজ্জু আর ইংরেজ রাজশক্তির বুলেটের আলিঙ্গনে জীবনের জয়গান গাইতে গাইতে অকালে হাসিমুখে বিদায় নিল উত্তরাধিকারের স্বপ্নদেখা কতশত বীর ভারত-সন্তানেরা।

স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম শহীদ ক্ষুদিরাম ‘গীতা’-বর্ণিত ‘‘হতো বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং/জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম্’’-এর বাণীর অনুসরণে অমরত্ব লাভের অনুশাসন মেনে মৃত্যু বরণ করে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মৃত্যুঞ্জয়ী হতে শিখিয়েছিলেন। গীতা গ্রন্থের সেইসব বীরগাঁথা ভুলে  আমরা তাঁর ঋণ শোধ করছি, ‘কৃষ্ণ করলেই লীলা, আমরা করলেই বীলা’ গানের ডালি সাজিয়ে! যদিও ওই গান রচনা করার সাহস আমরাই দিয়েছি,—যারা ধর্মের ধ্বজা ধরে প্রবৃত্তিকে পোষণ দিয়ে চলেছি।–-পার্থসারথী শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমদ্ভাগবতগীতার আদর্শ ভুলে, হ্লাদিনি শক্তিরূপিনী রাধা-তত্ত্ব ভুলে, মনগড়া প্রবৃত্তি-প্ররোচিত মানবী রাধা, শ্রীকৃষ্ণের মামীর সাথে পরকীয়া কামুক-রূপে, গোপিনীদের বস্ত্রহরণকারী-রূপে শ্রীকৃষ্ণকে চিত্রিত করে!

      ‘রাই জাগো রাই জাগো বলে শুক-সারি বলে, কত নিদ্রা যাওগো রাধে শ্যাম-নাগরের কোলে।…..’ এবং ‘রাই জাগোরে, জাগো শ্যামের মনমোহিনী বিনোদিনী রাই/শ্যাম অঙ্গে অঙ্গ দিয়া আছোরে রাই ঘুমাইয়া তোমার কি লোকলজ্জা নাই….’ ওই প্রভাতী গান দুটো বৈষ্ণব মহলে শুধু নয়, কীর্তন হিসেবেও সমাদৃত, জনপ্রিয়। গান দুটোর ভাষা বিশ্লেষণ করে একবার দেখুন।

শাস্ত্র অনুযায়ী আর্য্য হিন্দুদের ব্রাহ্মমুহূর্তে শয্যাত্যাগ করে ঈশ্বরোপাসনা করতে হয়। আর প্রাকৃতিক নিয়মে ব্রাহ্মমুহূর্ত কালে সব পাখিরা জেগে যায়। স্বভাবতই শুক-সারি পাখি জেগে গিয়েছে। রাধা তখনো নাগর কৃষ্ণের অঙ্কশায়িনী হয়ে শুয়ে আছে। নগরবাসীরা যদি জানতে পারে তাহলে লজ্জায় পড়তে হবে। তাই শুক-সারী পাখি ওদের ভাষার  জাগরণী গান গেয়ে রাধাকে সাবধান করে দিচ্ছেন। আর কৃষ্ণ ভক্তেরা ভালোমন্দ বিচার না করে, ওই গানকেই জাগরণীর জন্য আদর্শ গান হিসেবে নির্বাচন করে গেয়ে চলেছেন। এবার বিচার করে দেখুন, কাম-রসাত্মক চটুল কথায় প্রভাতী সুর লাগিয়ে শ্রীকৃষ্ণের নামে ওই আরাধনা আর্য্যকৃষ্টি বিরোধী  প্রবৃত্তি-প্ররোচিত পরদারাসক্ত ব্যতীত কোন্ আধ্যাত্মিক আবেদনে সমৃদ্ধ ? ওইসব জাগরণী গান শুনে, এবং কবি জয়দেব বিরচিত গীতগোবিন্দের ছত্রে ছত্রে বর্ণিত কামবিলাসী, ‘দেহি পদপল্লব মুদারম্’ বলে রাধার মানভঞ্জন করা,  পরকীয়া নিয়ে ব্যস্ত শ্রীকৃষ্ণের কীর্তিকলাপ পড়ে, যদি কোন তথাকথিত নাস্তিক্যবাদী শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রে কালিমালিপ্ত করে, —সেই ধর্মবিরোধী, ইষ্টবিরোধী প্রচারের জন্য দায়ী কারা?

শ্রীকৃষ্ণ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ‘‘ ……..  ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এলেন। ব্রাহ্মণ্যধর্ম্ম অর্থাৎ বৃদ্ধির ধর্ম্ম প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি প্রাণপাত করলেন। অথচ ব্রাহ্মণকুলতিলক দ্রোণাচার্য্যই তাঁর বিরুদ্ধে গেলেন। ভীষ্ম অন্নের কৃতজ্ঞতার দোহাই দিয়ে কৌরবপক্ষে গেলেন। কিন্তু যে-অন্ন তিনি খেয়েছিলেন সে-অন্নের অর্দ্ধেক মালিক পাণ্ডবরা। যা হোক, ধর্ম্ম কোথায়, ন্যায় কোথায়, লোকহিত কোথায়, কৌরবপক্ষ তা না বোঝার ফলে যুদ্ধ অনিবার্য্য হয়ে উঠলো। এতসব বিপর্য্যয় সত্ত্বেও কেষ্টঠাকুর ঘরে-ঘরে ঋত্বিক, অধ্বর্য্যু, যাজক পাঠিয়ে লোকের মনন ও চলনের ধারা দিলেন বদলে। করলেন ধর্ম্মের সংস্থাপনা। বুদ্ধদেব আসবার পর বৌদ্ধভিক্ষুরা দেশ ছেয়ে ফেললো, যার পরিণাম অশোক। অশোকের ভুলত্রুটি যাই থাক, শোনা যায়, অমনতর সম্রাট ও অমনতর সাম্রাজ্য নাকি কমই হয়েছে। রসুল আসার পর ইসলামের যাজনের ঢেউ কী রকম উঠেছিল তা কারও অজানা নয়। বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, মুসলমান সবাই তাদের যাজনের রেশটা কম-বেশী ধরে রেখেছে। প্রচারক আছে, প্রচেষ্টা আছে। অবশ্য, আচরণহীন প্রচারণায় যতটুকু হতে পারে ততটুকুই হচ্ছে। তবু মানুষের কানের ভিতর কথাগুলি ঢুকছে। কিন্তু আমাদের ঘরে ঘরে হানা দেবার কেউ নেই। তারা কেউ জুটলো না। অথচ হুজুগ করার এত লোক জুটছে। হুজুগ করে দল বেঁধে জেলে গেলে তাতে মানুষ কতখানি গড়ে  উঠবে তা বুঝতে পারি না। (আ. প্র. ৮ম খণ্ড, ২৬. ০৬. ১৯৪৬)

“আলেকজাণ্ডারের আগে পর্য্যন্ত কোন আক্রমণকারী আমাদের দেশে ঢুঁ মেরে কিছু করতে পারেনি । অশোকের Buddhism (বৌদ্ধবাদ)-এর পর থেকে বর্ণাশ্রম ভেঙ্গে পড়ে এবং সেই থেকেই সমাজ ও জাতি দুর্ব্বল হয়ে পড়ে । বুদ্ধদেব গৃহীর জন্য বর্ণাশ্রম রক্ষা করতে বলেছেন । আর ভিক্ষু, শ্রমণ ইত্যাদির বেলায় ওটার ওপর জোর দেননি । আর, সে ক্ষেত্রে ওর প্রয়োজনও ছিল না । কারণ, ভিক্ষু বা শ্রমণদের কোন যৌন সংশ্রব ছিল না । কিন্তু ভিক্ষুণীপ্রথা প্রবর্তনে সে বাঁধনও ভেঙে গেল । বুদ্ধদেব যে স্বর্ণযুগ আনতে চেয়েছিলেন তা আর সম্ভব হ’ল না ।”
আ. প্র. ২১/৬. ৮. ১৯৫২   

  *      *        *

       আর একবার কৃষ্ণকথায় ফিরে আসছি। বিচার করে দেখব, কৃষ্ণ-রাধার  আজগুবী তত্ত্বের অস্তিত্ব আদৌ আছে কি-না।

পণ্ডিতদের মতে কংসের দূত হয়ে মহামতি অক্রুর, বলরামসহ শ্রীকৃষ্ণকে বৃন্দাবন থেকে মথুরায় নিয়ে যান কংস আয়োজিত ধনুর্যজ্ঞে অংশগ্রহণ করাতে। কংসের উদ্দেশ্য ছিল শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করার। পরিবর্তে শ্রীকৃষ্ণ  অত্যাচারী কংস-মামাকে হত্যা করে পিতামহ উগ্রসেনকে রাজ্য প্রত্যর্পণ করেন। তারপর ঘোর আঙ্গিরসের সান্নিধ্যে পরাবিদ্যা এবং সান্দিপনী কাশ্যের সান্নিধ্যে অপরাবিদ্যা লাভ করেন আর বৃন্দাবনে ফিরে যান নি।  

       পণ্ডিতদের এই সাক্ষ্য থেকে প্রমাণিত, শ্রীকৃষ্ণ ১১ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে কংসকে বধ করেন। অথচ  বেশীরভাগ কৃষ্ণভক্তগণ বৃন্দাবন লীলার,  রাসলীলার নামে যে যুবক কৃষ্ণকে মানবী রাধার সাথে যুগলবন্দী করে পরকীয়া কামুক রূপে চিত্রিত করে চলেছেন, সে কৃষ্ণ  কোন কৃষ্ণ? সে কি বৃষ্ণিসিংহ দেবকীনন্দন, না অন্য  কেউ ? সে কি গীতার প্রবক্তা পার্থসারথী, না অন্য কেউ? কারণ, বৈষ্ণবদের প্রামাণ্য গ্রন্থ ভাগবতে রাধা-কৃষ্ণের ওইসব অবৈধ পরকীয়া-লীলার কোন কাহিনী লিপিবদ্ধ নেই। অথচ কৃষ্ণের প্রচারকেরা গীতার কথা বলেন, ভাগবতের কথা বলেন, অথচ আয়ান ঘোষের ঘরণী রাধাকে শ্রীকৃষ্ণের সাথে এক অবৈধ সম্পর্কের সাথে জুড়ে নিয়ে কৃষ্ণনাম করতে গিয়ে  শ্রীকৃষ্ণের যে বদনাম করে চলেছেন, সেটাও তাদের বোধে ধরা পড়ে না, এমনই ধার্মিক তা’রা !

কৃষ্ণকে একমাত্র ভগবান বলে মানেন যারা, তারা আবার শ্রীকৃষ্ণের সাথে রাধারও উপাসনা  করেন, কোন্ যুক্তিতে? তাদের অনেকেই আবার শ্রীকৃষ্ণের নব-কলেবর জ্ঞানে চৈতন্যদেবের প্রতিকৃতির উপাসনাও করেন। তা’রা বলেন, চৈতন্যদেব রাধা-কৃষ্ণের যুগল অবতার। খুব ভাল কথা। তাই যদি হয়, তাহলে তো একঅঙ্গে দুই-রূপ  যুগল অবতার-স্বরূপ চৈতন্যদেবেরই আরাধনা করতে হয়। আলাদা করে রাধা-কৃষ্ণের যুগলমূর্তির আরাধনার প্রয়োজন নেই। কারণ গীতার বাণী ‘‘তেষাং জ্ঞানী নিত্যযুক্ত একভক্তি র্বিশিষ্যতে।’’ (৭ম অধ্যায়) অনুসারে পুরুষোত্তম ব্যতীত একাধিক আদর্শকে মনে স্থান দিলেও ব্যভিচার করা হয়, যা ইষ্টলাভের বা ঈশ্বরলাভের পথে অন্তরায়। ইসকন ভক্তদের এ বিষয়টা একবার ভেবে দেখা উচিত। কারণ, আমরা জীবনপিয়াসী যারা, তারা যদি এভাবে জীবনদেবতার অপমান করে চলি, আমাদের জীবন কিভাবে  সমৃদ্ধ হবে ?      

এ বিষয়ে বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, ‘‘চৈতন্যদেবের দ্বৈতবাদ নয়, দ্বৈতভাব। মূলতঃ সকলের বাদই অদ্বৈত, কারণ, একের উপরই দাঁড়িয়ে আছে যা-কিছু, আদিতে এক ছা়ড়া দুই নেই। একেরই স্থূল, সূক্ষ্ম, কারণ নানাস্তর ও অভিব্যক্তি আছে। কিন্তু ভক্তিই তাঁকে লাভ করার সহজ পথ। ভক্তির মধ্যে দ্বৈতভাব এসে পড়ে, ভক্ত নিজের সত্তা না হারিয়ে ভগবানকে ভজনা করে চলে। ভক্তির সঙ্গে আবার কর্ম্ম ও জ্ঞান অচ্ছ্যেদ্যভাবে জড়ান। একেরই বিচিত্র প্রকাশ বলে সব সমন্বয় হয়েই আছে।’’ (আ. প্র. ১৩/৩১.৭.১৯৪৮)

       “ধর্ম্ম মানে বাঁচাবাড়ার বিজ্ঞান। যে-কোন মহাপুরুষই তার প্রবক্তা হউন না কেন, তাতে ধর্ম্মের কোন পরিবর্তন হয় না; ধর্ম্ম চিরকালই এক। হিন্দুর ধর্ম্ম যা, মুসলমানের ধর্ম্মও তাই; প্রত্যেক ধর্মমতের লোকই ঈশ্বরপন্থী। আর, সেই ঈশ্বর একজন ছাড়া দুইজন নন। তাঁর প্রেরিত বাণীবাহক যাঁরা, তাঁরাও একই সত্যের উদ্গাতা—একই পথের পথিক—নানা কলেবরে একই সত্তা। তাই ধর্ম্ম মানুষকে মিলিত ছাড়া বিচ্ছিন্ন করে না। ধর্ম্মের থেকে চ্যুত হলেই সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে বিভেদ-বিরোধের সৃষ্টি হয়। হিন্দু যদি প্রকৃত হিন্দু হয়, মুসলমান যদি প্রকৃত মুসলমান হয়, তারা বান্ধববন্ধনে আবদ্ধ হতে বাধ্য; বাপকে যে ভালবাসে, সে কখনও ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ হতে পারে না। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের উপাস্যই এক ও অদ্বিতীয়; তাই সম্প্রদায়গুলি ভাই-ভাই ছাড়া আর কি? মানুষের সহজ বুদ্ধিতে সবই ধরা পড়ে; গোলমাল করে দূরভিসন্ধিপ্রসূত অপব্যাখ্যা ও অপযাজন। ধর্ম্ম যদি বিপন্ন হয়ে থাকে, তবে সবচাইতে বেশী বিপন্ন হয়েছে, এমনতর  অপযাজকদের হাতে। প্রত্যেক ধর্ম্মমতের আসল রূপটি তুলে ধরতে হবে সাধারণ লোকের কাছে; তাহলে দুষ্টলোকের জারীজুরি খাটবে না। হিন্দুর যেমন হিন্দুত্বের বিকৃতি বরদাস্ত করা উচিত নয়, তেমনি উচিত নয় ইসলামের বিকৃতি বরদাস্ত করা। মুসলমানেরও তেমনি উচিত নয় ইসলাম ও হিন্দুত্বের আদর্শকে ক্ষুণ্ণ হতে দেওয়া। কোন ধর্ম্মাদর্শকে ক্ষুণ্ণ হতে দেওয়া মানে শয়তানের সাগরেদি করা। আমাদের নিজেদের যেমন ধর্ম্মপরায়ণ হয়ে উঠতে হবে—পরিবেশকেও তেমনি ধর্ম্মপরায়ণ করে তুলতে হবে—প্রত্যেককে তার বৈশিষ্ট্য ও ধর্ম্মাদর্শ অনুযায়ী। হিন্দু যেমন গীতা পড়বে, তেমনি কোরাণ-বাইবেলও পড়বে; মুসলমান যেমন কোরাণ পড়বে, তেমনি গীতা বাইবেলও পড়বে। প্রত্যকে চেষ্টা করবে বাস্তব আচরণে স্বধর্মনিষ্ঠ হতে এবং অন্যকেও সাহায্য করবে ও প্রেরণা জোগাবে অমনতর হয়ে উঠতে।

       এমনতর হতে থাকলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সৌহার্দ্দ্য গড়ে তুলতে কদিন লাগে? আমি তো বুঝি, হিন্দুত্বের প্রতিষ্ঠা যেমন আমার দায়, ইসলাম ও খ্রীষ্টধর্ম প্রভৃতির প্রতিষ্ঠাও তেমনি আমারই দায়। আমার পরিবেশের প্রত্যেকে তার মত করে যদি ঈশ্বরপরায়ণ না হয়ে ওঠে, আদর্শপ্রেমী না হয়ে ওঠে, ধর্ম্মনিষ্ঠ না হয়ে ওঠে, তাহলে তো আমারই সমূহ বিপদ। পরিবেশকে বাদ দিয়ে আমার ধর্ম্ম করা অর্থাৎ বাঁচাবাড়ার পথে চলা তো সম্ভব নয়।”                                     (আ. প্র. ৯/২. ১০. ১৯৪৭)

       “……শুনেছি রসুল পূর্বতনকে মানার কথা যেমন বলেছেন তেমনি আবার বলেছেন—যদি কোন হাবসী ক্রীতদাসও তোমাদের কোরাণ অনুসারে পরিচালিত করেন, তবে তোমরা তাঁর আদেশ পালন করে চলো। আর এটা ঠিক জেনো—কোরাণ, বেদ, বাইবেল, গীতা ইত্যাদির মধ্যে যেমন কোন বিরোধ নেই, বৈশিষ্ট্যপালী, আপূরয়মান মহাপুরুষ, তা তিনি পরবর্তী যে যুগেই আবির্ভূত হউন, তাঁর বাণীর মধ্যে কোরাণ, বেদ, বাইবেল, গীতার পরিপন্থী কোন কথা থাকে না, বরং থাকে যুগোপযোগী পরিপূরণ। তাই পরবর্তীর মধ্যে আমরা পূর্ববর্তীকে আরো করে পাই। একই ঈশ্বরপ্রেরণার প্রবাহই তো যুগ-যুগ ধরে বয়ে চলে আরো আরোতর অভিব্যক্তি নিয়ে প্রয়োজন ও পরিস্থিতির পরিপূরণে। সৃষ্টি যতদিন থাকবে, ততদিন এ ধারা চলতেই থাকবে।”                                              –শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, আ. প্র. (১১/৭.৫.১৯৪৮)

চৈতন্যদেবের পরবর্তী আবির্ভাব প্রসঙ্গে  শ্রীচৈতন্য ভাগবত গ্রন্থে বর্ণনা রয়েছে—

        এইমত আর আছে দুই অবতার

        সঙ্কীর্তন আনন্দ রূপ হইবে আমার।।
        তাহাতেও তুমি সব এই মত রঙ্গে

        সঙ্কীর্তন করিবা মহাসুখে আমা সঙ্গে।।
        (শ্রীচৈতন্য ভাগবত পৃষ্ঠা ১৪৩, মধ্যখণ্ড ষড়বিংশ অধ্যায়।)

       অথচ বেশিরভাগ চৈতন্য অনুগামীরা গোঁসাই সাজলেন, কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষা দিয়ে বেড়ালেন, অথচ সাধনা দিয়ে চৈতন্যদেবের নব-কলেবর শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে  মেনে নিলেন না। তেমনি বেশিরভাগ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ভক্তরা শ্রীরামকৃষ্ণের পরবর্তী অবতার শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রকে অন্বেষণ করতে সাধন করলেন না। ফলে ধর্মের গ্লাণি থেকেই গেল।

       ১৮৮৬ ইংরাজী নববর্ষের দিনে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের কল্পতরু হবার সংবাদ শুনে ভক্তরা সমবেত হয়েছিলেন কাশীপুরের উদ্যানবাটীতে।  নিজেদের মনোবাসনা পূর্ণ করতে। অবশেষে অসুস্থ শ্রীরামকৃষ্ণদেব দর্শন দিলেন ভক্তদের। সমবেত ভক্তদের উপদেশ দিয়ে বললেন, তোমাদের চৈতন্য হোক।

       শ্রীরামকৃষ্ণদেব জীবনের শেষপ্রান্তে বলেছিলেন, এবারে সব জ্ঞান পার্ষদদের দিচ্ছিনা। শীঘ্রই আবার আমাকে আসতে হবে। ঈশান কোণে, গরীব ব্রাহ্মণের ঘরে। তখন যারা না আসবে তাদের মুক্তি হতে অনেক দেরি হবে।

       শ্রীরামকৃষ্ণদেব ১৮৮৬তে ইহলীলা সম্বরন করে ১৮৮৮তে আবির্ভূত হন অনুকূলচন্দ্র রূপ নিয়ে।  শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র অবতারে পরিপূর্ণ চৈতন্য দিতে চরমতত্ত্ব দিয়ে গেলেন।  চৈতন্য লাভের সহজপন্থা দিলেন দৈনন্দিন স্বতঃ-অনুজ্ঞা অনুশীলনের মাধ্যমে। অজর-অমর-চিরচেতন মন্ত্রে।    

যারা চৈতন্যদেবকে বা শ্রীরামকৃষ্ণ দেবকে পেতে ইচ্ছুক, তাদের কাছে বিনীত অনুরোধ, শ্রীকৃষ্ণের সর্বশেষ অবতার বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সাধন-পদ্ধতি প্রাণমন দিয়ে সাধনা করলেই আপনাদের অভীষ্ট ইষ্টদেব ধরা দেবেন মেধানাড়ীতে। যে সূত্র তিনি শ্রীকৃষ্ণ অবতারে দিয়ে রেখেছিলেন— ‘‘বহূনি মে ব্যতীতানি……………..ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জ্জন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জ্জুন।। (শ্রীমদ্ভগবদগীতা চতুর্থোহধ্যায়, ৫—৯ শ্লোক)

সবাইকে ইষ্টরঙে রঞ্জিত হবার আবেদন জানিয়ে, জানাই শ্রদ্ধা, ভক্তি, প্রণাম ও জয়গুরু! অভিবাদন।  বন্দে পুরুষোত্তমম্! ধ্বনী দিয়ে নিত্য হতে লীলায়, লীলা হতে নিত্যে আগম-নিগমকারী পূর্বাপূর্ব সব পুরুষোত্তমদের লীলা স্মরণ করে ইতি টানলাম।  আমাদের সকলের ‘চৈতন্য হোক’। ধর্মের বিকৃত ধারা যেন আমাদের স্পর্শ করতে না পারে।

 ———

POPULATION CONTROL METHOD

POPULATION CONTROL

Top of Form

Bottom of Form

।। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ দিবসের ভাবনা ।।

—তপন দাস

[সম্মিলিত জাতিপুঞ্জে গৃহীত সিন্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৮৯ খ্রীস্টাব্দ থেকে প্রতি বছরের ১১ জুলাইয়ের দিনটিকে ‘বিশ্ব-জনসংখ্যা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। আলোচিত হয় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য রক্ষা, মানবাধিকার, লিঙ্গ সমতা প্রভৃতি গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে। বর্তমান ভারতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি অসহিষ্ণুতা, খুন-জখম, রাহাজানি, ধর্ষণ, সন্ত্রাসবাদ, পরিবেশ দূষণ প্রভৃতি জাতীয় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অরণ্য ধ্বংস, বৃক্ষ নিধন করে অপরিকল্পিতভাবে  নগরায়নের ফলে, প্রাকৃতিক উপাদানসমূহ অপব্যবহারের ফলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হচ্ছে একদিকে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর একদিকে  ভূগর্ভের জলস্তর নেমে যাচ্ছে। অপরিকল্পিত সংরক্ষণের ফলে, বণ্টনের ফলে  প্রতুল খাদ্যশষ্য থাকা সত্বেও অনাহারে, অর্ধাহারে মানুষ বাস করছে। অপরিকল্পিত অধিকার দানের ফলে কেহ প্রচুর সম্পদের মালিক, কেহ ভিখারি। ওইসব সঙ্কটের  মূলে  জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে দায়ী করলে ভুল হবে, বরং দায়ী কু-জনদের সংখ্যাধিক্য, সু-জনদের সংখ্যা লঘুতা  সে বিষয়ে আলোকপাত করার ক্ষুদ্র প্রয়াস এই প্রবন্ধ। ভুল-ত্রুটি সংশোধনের পরামর্শ দিলে বাধিত থাকব।]

*        *       *

প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ভুপেন হাজারিকা মহোদয়ের গাওয়া বিখ্যাত গানের একটি কলি,

‘আমি দেখেছি অনেক গগণচুম্বী অট্টালিকার সারি

তার ছায়াতে দেখেছি অনেক গৃহহীন নরনারী।’— ভীষণ  মনে পরছে দিনটির স্মরণে।

বিদেশের কথা বলতে পারবো না, তবে আমাদের দেশে অনেক অট্টালিকা রয়েছে, যে অট্টালিকার ছাদগুলো আশ্রয় দেবার মতো মাথা খুঁজে পায় না। বিশাল বাড়িঘর, একটিই মাত্র ছেলে, বিদেশে থাকে।  বৌ আর একটা বাচ্চা নিয়ে ওখানেই সেটেল্ড। মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে কালেভদ্রে বেড়াতে এলে ঘরের ছাদগুলো মাথা পায়।  নইলে স্বামী-স্ত্রী দু-জনাতেই থাকেন বিশাল বিশাল বাড়িতে।  আবার যাদের নির্দিষ্ট কোন মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, দু-বেলা দু-মুঠো খাওয়ার সংস্থান নেই, লোকের কাছে যাচ্ঞা করে, পরিত্যক্ত, উচ্ছিষ্ঠ খাবার সংগ্রহ করে উদরপূর্তি করে। তারাও ঠিক খুঁজে খুঁজে কোন অট্টালিকার কার্ণিশের তলায়, রেলওয়ে প্লাটফর্মে,  ফুটপাথের রেলিং-এ দড়ি বেঁধে  প্লাস্টিকের ছাদ রচনা করে, জন্ম-নিয়ন্ত্রণের চিন্তা না করে ৩-৪টে বাচ্চাকাচ্চাসহ  রোগ-শোক-ব্যাধি-জরাকে সাথি করে দিব্যি শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা কাটিয়ে দিচ্ছে।  সরকারের  মানবসম্পদ উন্নয়ণ দপ্তর যদি এ বিষয়ে একটু নজর দিত, তাহলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বিষয়টি সহজেই নিয়ন্ত্রণ  করা যেতে পারতো।

জনসংখ্যার অর্থ মানুষের সংখ্যা। মুখে যতই বলিনা কেন, ‘মানুষ সব সমান’, বাস্তবে তো তা’ হতে পারে না। আমাদের কোষে থাকা সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ ক্রোমোজোমগুলোও সব সমান নয়, আলাদা আলাদা। অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো ‘হোমো স্যাপিয়েন্স’ বা ‘মানবজাতি’-রও পৃথক পৃথক নৃ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আছে। নর্ডিক, মঙ্গোলয়েড, অস্ট্রালয়েড, নিগ্রোয়েড ইত্যাদি ইত্যাদি।  পৃথক পৃথক বংশ, বর্ণ, গোত্র বৈশিষ্ট্যও আছে।  প্রতিটি মানুষের মধ্যে আবার দোষ-গুণ, ভালোমন্দ আছে।               শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতাতে ‘গুণত্রয়বিভাগযোগ’ নামক অধ্যায়ে সাত্ত্বিক, রাজসিক, তামসিক নামের তিন প্রকার গুণসম্পন্ন মানুষের কথা বলা হয়েছে। আবার ‘দৈবাসুরসম্পদ্বিভাগযোগ’ নামক অধ্যায়ে  মানুষের  দৈবীভাব  এবং অসুরভাবের মানুষের উল্লেখ করা হয়েছে। ভালো মানুষদের মধ্যে দৈবীভাব এবং সত্ত্বগুণের প্রাধান্য রয়েছে। যে মানুষেরা সহানুভূতি-প্রবণ নিজের সত্তার প্রতীক মনে করে সবাই দেখে। মেয়েদের কামুক দৃষ্টিতে না দেখে, মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখে।  উপযুক্ত সেবা বা সার্ভিস দিয়ে ন্যায্য পথে উপার্জন  করে। অন্যের রোজগারে ভাগ বসায় না। কাট্ মানি, কমিশন, ঘুষ খায় না। একটা  আদর্শের অনুসারী হয়ে চলে। পিঠ বাঁচাতে, পেট বাঁচাতে আপোষরফা করে না। দল বদল করে না। রাজনীতির নামে দুর্নীতি করে না, বুথ দখল করে না, পার্টিকে জেতাতে হিংস্র হয়ে ওঠে না। প্রবৃত্তির স্বার্থের হানি হলে মানুষ খুন করতেও পিছপা হয় না।  ওই মানুষগুলোকে আমরা অসুর-ভাবের মানুষ বলতে পারি। যারা পরিবার, সমাজ, পরিবেশ রাষ্ট্রকে নানাভাবে অশান্ত করছে।  ভালো মানুষদের প্রয়োজনীয় অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান থেকে বঞ্চিত করে নিজেরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ সংগ্রহ করছে, বিনষ্ট করছে। আপনি-আমি ওই মানুষগুলোকে সমাজের, দেশের শত্রু মনে করলে কি হবে, দলীয় রাজনীতিতে এদের কিন্তু খুব কদর। ওই ধরণের মানুষগুলোর বংশ বাড়তে না দিয়ে, ওদের  জন্ম নিয়ন্ত্রণ করে যদি দৈবীসম্পদের মানুষের জন্ম বাড়ানো যায়, তাহলেই তো সহজেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়। কিন্তু করবেটা কে? যে প্রজাতন্ত্রের কাঠামোর মাধ্যমে নীতি নির্ধারণ করা হবে, আইন প্রণয়ন করা হবে, সেই প্রজাতন্ত্রের আঁতুড়ঘরটাই তো অশুদ্ধ। অসুর-ভাবের সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষেরাই তো ‘জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন’-দণ্ড হাতে নেবে! নইলে ভোটের জন্য পুলিশ, মিলিটারী, বোমা, আগ্নেয়াস্ত্র, হিংসা, খুন, জখম, কোটি কোটি টাকার অপচয় হয়! যারা দেশের সেবায় ব্রতী হবে, সেই জন-প্রতিনিধিদের পুষতে প্রচুর অর্থের অপচয় হয়!

অপরাধ স্বীকার করে নিয়ে বলতে হয়, করার দায়িত্বটা ছিল, প্রত্যেকটি ‘আমি’র। আমার, আপনার, সকল সৎসঙ্গীদের। আমরা হলাম ব্যর্থ। ‘‘তুমি তোমার, নিজ পরিবারের, দেশের ও দশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দায়ী।’’ বাণীটা সত্যানুসরণেই থেকে গেল। ‘পরমরাষ্ট্রিক সমবায়’ এখনো গঠন করা গেল না।  

যাকগে, ওসব ব্যাপার আপনারা সবাই জানেন। আমরা এবার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টাকে একবার  বাস্তবভাবে বোঝার চেষ্টা করি।

এমন অনেক দম্পতি আছে, যারা বাস্তব জীবনে কোয়ালিটি প্রোডাক্টের পক্ষপাতী হলেও বাবা-মা হবার বেলায় উদারচেতা—কোয়াণ্টিটি বাড়াতে ব্যস্ত!—‘জীব দিয়েছেন যিনি, আহার যোগাবেন তিনি!’—দর্শনে বিশ্বাসী!   

তবে, আধুনিক যুগের একজন চিন্তাশীল মানুষ কখনোই নিজের দাম্পত্য জীবনে জনসংখ্যা বাড়াতে চান না, চাইবেনও না। একটা-দুটো সুস্থ সন্তান জন্মাতে পারলেই তাদের পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু সুস্থ সন্তান কামনা করলেই তো আর সুস্থ সন্তান অর্ডার দিয়ে পাওয়া যাবে না। এজন্য সুস্থ পাত্র-পাত্রী প্রয়োজন। সুস্থ বিয়ের প্রয়োজন। সুস্থ দম্পতির প্রয়োজন। সুস্থ পরিকল্পনার প্রয়োজন। সর্বোপরি সুস্থতা কাকে বলে, তা জানার প্রয়োজন। তাই  নয় কি?

সুস্থতা বিষয়ে আমরা বেশী কিছু না জানলেও ‘স্বাস্থ্যই সম্পদ’ এই আপ্ত বাক্যটি আমরা প্রায় সকলেই জানি। সেই স্বাস্থ্য সম্পর্কে স্বাস্থ্যের সর্বময় কর্তা ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’ কি বলেন, সেটা সকলের জানা দরকার আছে। বিশেষ করে জীবন পিয়াসী মানুষদের। সুস্থ যদি থাকতে চান এবং আপনার প্রিয়জনকে যদি সুস্থ রাখতে চান তাহলে এবার সংজ্ঞাটি মনোযোগ সহকারে পড়ুন এবং বোঝার চেষ্টা করুন।
       As per World Health Organisation–”Health is a state of complete physical, mental and social well-being, and not merely an absence of disease or infirmity.” 
       The Sign of  Physical  Health : “…………a good complexion, a clean skin, bright eyes, lustrous hair with a body well clothed with firm flesh, not too fat, a sweet breath, a good appetite, sound sleep, regular activity of bowels and bladder, and smooth, easy, coordinated bodily movements. All the organs of the body are of unexceptional size and function ‘normally’; all the special senses are intact; the resting pulse rate, blood pressure and excercise tolerance are all within the range of ‘normality’ for the individual’s age and sex….”
       The Sign of Mental Health : “…….feel satisfied with himself. He feels happy, calm and cheerful. There are no conflicts within himself. He is well adjusted. He accepts criticism and is not easily upset. He understands the emotional needs of others, and tries to be considerate. He has good self-control; he is not overcome by emotion; he is not dominated by fear, anger, love, jealousy, guilt or worries. He faces problems and tries to solve them intelligently.” 
       The Sign of Social Health : “He is at peace with others and is able to feel himself as a part of a group and is able to maintain socially considerate behaviour.”
       Sign of Positive Health : “A person should be able to express as completely as possible the potentialities of his genetic heritage.” (Source : Preventive and Social Medicine by PARK) 
Mentioned all types regulated by positive health. Positive health depends on genetical instinct. A good instinct depends on good breeding. Good breeding depends on healthy couple, those who are physically, mentally and spiritually sound and sane.

       বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞায় আমরা জানতে পারলাম, শুধু নীরোগ থাকলেই হবে না, –শারীরিক, মানসিক, এবং আত্মিকভাবে স্বচ্ছন্দ ব্যক্তিকেই সুস্থ বলা যাবে। অতএব সার্বিকভাবে সুস্থ থাকতে হলে সুস্থ শরীর, মন, আত্মার অধিকারী হতে হবে। উক্ত সংজ্ঞার পরিপূরক যারা নয়, তারা অসুস্থ। সেই অসুস্থরা যদি সন্তান জন্মাবার অধিকার পায় তাহলে অসুস্থ প্রজন্ম সৃষ্টি হবে।   সুস্থ একটা প্রজন্ম তৈরি করতে হলে সংজ্ঞার পরিপূরক সুস্থ দম্পতির যৌথ প্রচেষ্টায় একটা সুস্থ শিশু সৃষ্টি হবে। তারজন্য বিবাহার্থে সুস্থ জুটি নির্বাচন করতে হবে। এছাড়া শুধুমাত্র ওষুধপত্রের চিকিৎসায় সকলকে স্বাস্থ্যের অধিকারী করা যাবে না।  তাই বিয়ের আগে পাত্রপাত্রীর স্বাস্থ্যের বিষয়েও আমাদের ভাবতে হবে। 

সার্বিকভাবে ভাল স্বাস্থ্যের সন্তান পেতে হলে সংজ্ঞা অনুযায়ী স্বাস্থ্য নির্ণয়ের সাথে সাথে  blood ABO Rh & genetic counseling করে নিলে ভাল হয় । সগোত্রে (same blood line)- এ বিয়ে হলে albinism, alkaptonuria নামের রোগ হয়। Schizophrenia, thalassaemia সহ অনেক দুরারোগ্য ব্যাধি আছে যা উত্তরাধিকারে সন্তান পেয়ে থাকে। মেয়েদের বেশি বয়সে বিয়ে হলে ‘mongolism’ নামের বিকৃত সন্তান জন্মাবার সম্ভাবনা থাকে।

*        *       *

আধুনিক যুগে প্রতিটি সচেতন মানুষই আর কিছু না হোক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে হুঁশিয়ার। লোকসান যাতে না হয় সে বিষয়ে সদা সতর্ক থাকেন। বাজার থেকে আলু, বেগুন, পটল, মুলো কিনতে গেলেও, কোয়াণ্টিটি না দেখে ভালো কোয়ালিটির, ভালো জাতের জিনিস কেনে। লাভালাভ বিবেচনা করেন। ঠকতে চান না। বিশেষ জ্ঞানকে কাজে লাগান। অথচ সেই মানুষেরাই অন্তঃস্থিত দৈবাসুর (প্রবৃত্তি এবং সত্তা) প্রকৃতিকে সঠিক বিনিয়োগে ম্যানেজ করতে ব্যর্থ হন। একজন পুরুষের সার্বিক উন্নতির চরম পরিণতি সফল পিতৃত্বে, একজন নারীর মাতৃত্বে। পিতৃত্ব এবং মাতৃত্ব অর্জনের নির্দিষ্ট উপাঙ্গও প্রকৃতি আমাদের দিয়েছেন, যার সফল বিনিয়োগে একজন আদর্শ পিতা, একজন আদর্শ মাতার পরিচয় বহন করে সুখ্যাত হতে পারি, আবার অসফল বিনিয়োগে কুখ্যাতও হতে পারি। সভ্যতার প্রাতঃ স্মরণীয় মনীষীবৃন্দের জনক-জননীরা সকলের কাছেই বন্দিত। আবার ভ্রষ্টাচারীর, সন্ত্রাসবাদীর, ধর্ষকের পিতামাতারা সমাজের চোখে নিন্দিত। 
      শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই নয়, মনুষ্যেতর প্রাণীদের ক্ষেত্রেও ওই বিধি কঠোরভাবে প্রযোজ্য। 
      সরকারী প্রয়োজনে একটা কুকুর কিনতে গেলেও পেডিগ্রি অর্থাৎ বাবা-মায়ের বিশুদ্ধ বংশানুক্রমিকতার শংসাপত্রের সমৃদ্ধির গুরুত্ব বিচার করে প্রভূত মুল্য ব্যয় করে কেনে। এক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া জাতির নামে উদারতা দেখিয়ে রাস্তার কুকুর দিয়ে কাজ চালায় না। একটু খোঁজ নিলে জানতে পারবেন দেশরক্ষার স্বার্থে যে কুকুরগুলোকে ব্যবহার করা হয়, ওদের কি পদ্ধতিতে প্রজনন করান হয়। ওইসব কুকুরীদের সতীত্ব রক্ষা হয়। নিম্ন শ্রেণীর কোন কুকুরদের সাথে মিশতে দেওয়া হয় না। কোন অসুস্থ কুকুর-কুকুরীদের দিয়ে বাচ্চা উৎপাদন করা হয় না। একটা ভালো গোরুর বাচ্চা তৈরির জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করে উন্নত জাতের ষাঁড়ের শুক্রাণু কিনে সুপ্রজনন করার ব্যবস্থা করে সরকার, রাস্তায় ঘোরা ষাঁড়গুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে!
      কৃষিক্ষেত্রেও তাই। উন্নত ফসলের জন্য ভালো জাতের সংরক্ষিত বীজ শোধন করে, বীজ অনুযায়ী উপযুক্ত উর্বর জমিতে ‘জো’ বুঝে বপন করতে পরামর্শ দেওয়া হয়। একজন আদর্শ কৃষক বাস্তব পরিচর্যার মাধ্যমে বিশুদ্ধ বীজ, বিশুদ্ধ জমিতে বিনিয়োগ করে উন্নত জাতের ফসল পাবার জন্য। 
      প্রাণী সম্পদ, কৃষি সম্পদ বিকাশের ক্ষেত্রে জৈবিক সম্পদের বিহিত বিনিয়োগ করে বুদ্ধিমান মানুষেরাই। অথচ এই বুদ্ধিমান মানুষেরাই ওই জৈবী সম্পদকে অপচয়ীভাবে বিনিয়োগ করে নিজেদের বিশেষ জ্ঞানকে অপমান করছে। মহান ভারতের মহান চরিত্র দুর্গা, লক্ষী, সরস্বতী, সীতা, সাবিত্রী প্রমুখ নারীদের আদর্শ ভুলে প্রকৃতি প্রদত্ত জৈবী সম্পদকে যৌবন গরবে গরবিনী প্রবৃত্তিতাড়িত একজন নারী,–নিজের নারীত্বকে দর্শকামে, স্পর্শকামে, শ্রুতকামে, পণ্য করে পুরুষের সুপ্ত কামনাকে জাগিয়ে লাম্পট্য, ব্যভিচারকে পুষ্ট করতে পারে, প্রভূত অনিত্য সম্পদের মালকিন হতে পারে, কিন্তু ভালো মা হয়ে নিত্য-জীবনে আদর্শ নারীর খেতাব অর্জন করতে পারবে না। উনো জমিতেই দুনো ফসল ফলে, বুনো জমিতে নয়। পুরুষের ক্ষেত্রেও তাই। পুর্ব পুরুষের জীবনধারা প্রবাহিত বীর্য্যকে ব্যভিচার, ধর্ষণ, স্বমেহন আর কন্ডোমে অপবিনিয়োগ করে ধর্মবিরুদ্ধ কামসেবার ইন্দ্রিয়-লালসায় বিনিয়োগ করে দুষ্ট প্রবৃত্তিকে তুষ্ট করতে গি়য়ে   যৌনব্যাধি, মানসিক কষ্ট, বিবেক-দংশন, সামাজিক ছি! ছি! লাভ করতে পারবে, ভালো বাবার গৌরব অর্জন করতে পারবে না। বীজ শুদ্ধ না হলে ফসলও অশুদ্ধ হবে।

তাই সব কিছুর পূর্বে ভালো মানুষের জন্ম যাতে হয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে মেয়েদের। বর্ণ, বংশ, অভ্যাস, ব্যবহার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সবকিছু মিলিয়ে দেখে সম-বিপরীত সত্তার একজন উন্নত পুরুষকে বর হিসেবে নির্বাচন করে বিয়ে করতে হবে। তাহলেই ভালো সন্তানের মা হতে পারবে।

বিয়েটা যাতে নিখুঁত হয়, সে বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, “বিয়ের প্রথম উদ্দেশ্যই হ’লো genetic enrichment ( জননগত সমৃদ্ধি)। এইটে হ’ল first and foremost (প্রথম এবং প্রধান)। তার পরের জিনিস হ’ল cultural enrichment (কৃষ্টিগত সমৃদ্ধি)। তাই বর-কনের বংশগত ও ব্যক্তিগত আচার, ব্যবহার, কর্মের সঙ্গতি আছে কিনা তা’ দেখা লাগে। আবার চাই physical enrichment (শরীরগত সমৃদ্ধি)। ….Genetic asset কার কেমনতর তা’ না বুঝে বিয়ে থাওয়ার সম্বন্ধ করা ভাল নয়।”
      Genetic assetকে গুরুত্ব না দেবার ফলেই বর্তমান পৃথিবীতে শতকরা প্রায় 
40টি অকাল মৃত্যুর কারণ কিছু  দুরারোগ্য বংশগত ব্যাধি। যা সন্তানেরা উত্তরাধিকারে পায়। যা কোন চিকিৎসাতে সারানো যায় না। প্রতিরোধ করার একমাত্র উপায় সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা দুরারোগ্য বংশগত রোগমুক্ত বিশ্বস্ত বংশে বিবাহ করার নিদান দিয়েছেন।  অতএব ওইসব দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে পরমপুরুষ নিদেশিত সুবিবাহ ও সুপ্রজনন বিধি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রজন্মের সুখশান্তি উত্থান-পতন সবকিছুর মূলভিত্তি হলো বিবাহ সংস্কার। সেই বিবাহ যদি শুধু যৌন লালসার এবং লিভ টুগেদার-এর কেন্দ্রবিন্দু হয় তাহলে কোনদিনও অসুখবিসুখ অকালমৃত্যু, সন্ত্রাসবাদ, শোষণবাদ থেকে সভ্যতাকে স্বস্তি দিতে পারবে না ডাক্তার, উকিল, পুলিশ, মিলিটারি, সংশোধনাগার, হাসপাতালের প্রচলিত ব্যবস্থাপনা। বিশ্বাসঘাতক মানুষদের সনাক্ত করতে শুদ্ধ জন্মের শংসাপত্র প্রাপ্ত ভাল জাতের বিশ্বাসী কুকুর (pedigreed dog) আমদানি করতে আগ্রহী যে রাষ্ট্র,  সেই রাষ্ট্র ব্যবস্থা দৈবগুণসম্পন্ন বিশ্বাসী মানুষ সৃষ্টি করার মহান আর্যবিধিকে উপেক্ষা করে, যেমন খুশি তেমন বিয়ের মাধ্যমে কু-জন জননের অনুমোদন দিয়েছে! এই ব্যবস্থার পরিবর্তন না করতে পারলে দেশের কোন সমস্যার সমাধান হওয়া সম্ভব নয়।

*        *       * 

নারী হতে জন্মে জাতি। নারীই গৃহ,  সমাজ ও রাষ্ট্রের ধাত্রী ও পালয়িত্রী। প্রাকৃতিক নিয়মে একজন নারীর চরম পরিণতি মাতৃত্বে। মুখে আমরা যতই নারী-স্বাধীনতার কথা বলি না কেন, এক্ষেত্রে কিন্তু পুরুষের উপর নির্ভরশীল হতেই হয়। (অবশ্য মা হতে না চাওয়া লেসবিয়ান আদর্শে বিশ্বাসীদের কথা আলাদা। তারা অবশ্যই ব্যতিক্রমী।) সেই পুরুষটি মাতৃত্বকামী নারীর তুলনায় শারীরিক-মানসিক-আত্মিকভাবে যত উন্নত হবে,— স্বাস্থ্যবান হবে, ভালো চরিত্রের হবে, নারীটির দাম্পত্য জীবন তত সুখের হবে, সন্তানও ভালো হবে। এটাই তো স্বাভাবিক নিয়ম। তাই নয় কি? আর সেগুলো পেতে গেলে বর্ণে, বংশে, বয়সে, স্বাস্থ্যে, শিক্ষায়-দীক্ষায়—সবদিক থেকে উন্নত সম-বিপরীত সত্তার একটা পুরুষকে,— ভাবী সন্তানটির  বাবাটিকে খুঁজে নিতে হবে, বিবাহের মাধ্যমে। বিবাহ করে নারী। পুরুষ করে উদ্বাহ। বিবাহ মানে পুরুষের সত্তাকে বিশেষরূপে বহন করা। যে পুরুষটির কাছে নারীত্বকে সমর্পণ করে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে। তাই নির্ঝঞ্ঝাট সুখের দাম্পত্য জীবন পেতে গেলে, ভালো সন্তানের মা হতে গেলে, লেখাপড়া শেখার পাশাপাশি, কুমারী অবস্থা থেকেই একটা পরিকল্পনা করে নিতে হবে,  প্রস্তুতি নিতে হবে। কারণ প্রত্যেক নারীই চায় তার সন্তানটি সুস্থ থাকুক, ভালো হোক, কৃতী হোক। সেগুলো তো আর রেডিমেড পাওয়া যাবে না, আর স্টেজ মেক-আপও দেয়া যাবে না। নিয়ম মেনে অনুশীলন করতে হবে। মা-কেই মেপে মেপে সঞ্চয় করতে হবে ভবিষ্যতের সন্তানের ভালোমন্দের সব উপকরণ। মা মানে মেপে দেওয়া। সন্তানের ভালো-মন্দ মেপে দেয় বলেই মা। ভাবী মায়ের চলন-চরিত্র দ্বারা প্রভাবিত হয় নারীর-জননকোষ, অপত্য-কোষ। সেইজন্যই সন্তান ধারন-পালন-লালন-এর জন্য আবশ্যিক প্রত্যঙ্গগুলোকে (স্তন ও অপত্যপথ) সযত্নে মেপে মেপে লালন-পালন করতে হবে, সংরক্ষণ করতে হবে ভবিষ্যতের সন্তানের মঙ্গলের জন্য। তা না করে, যুগধর্মের বশবর্তী হয়ে  ‘হেটেরো-সেক্সুয়াল’ কমপ্লেক্সের প্রলোভনে পড়ে ওগুলোকে যদি আম-পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করে ফেলা হয়, তাহলে তো ভাবী সন্তানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। যার জন্য সংরক্ষিত জিনিস, আত্মঘাতী উদারতার বশে অন্যকে ভাগ দেবার অপরাধে। এজন্য রোগ-ভোগেও ভুগতে হয়। Oncologist, Gynaecologist, Sexologist, Psychologist-দের শরণাপন্ন হতে হয়।

র্তমান যুগে নারীরা লেখাপড়া, শিক্ষা-সংস্কৃতি, কর্মক্ষেত্রে, অভিযানে, বিজ্ঞান গবেষণায় প্রভৃতি কোন ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নেই। এমন অনেক নারীদের কথা আপনারা জানেন, আমিও জানি। আবার এ-ও দেখেছি, বাহ্য জগতের সবক্ষেত্রে কৃতি নারীদের অন্তর্জগতের হাহাকার। মনের  মত সন্তান না পাওয়ার জ্বালায়, সন্তানকে মনের মত করে মানুষ করতে না পারার জ্বালায়, থ্যালাসেমিয়া, স্কিজোফ্রেনিয়া, লিউকোমিয়া প্রভৃতি নামের দুরারোগ্য ব্যাধির জ্বালায় জ্বলতে গিয়ে জীবনের সুখ-শান্তির অনুভূতিটা হারিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছে।—যেন, ‘সব আছে তবু নেই’। মাতৃত্ব-পিয়াসী একজন সন্তানহীনা নারীর যে কি কষ্ট, কি বেদনা, তা ভুক্তভোগী ভিন্ন কেউ উপলব্ধি করতে পারবে না। একটি সন্তান পেতে সব-রকমের চিকিৎসা করার পরও যখন সন্তান-লাভে ব্যর্থ হয়, তখন অনেক টাকা খরচ করে গর্ভ ভাড়া নেয়, দত্তক সন্তান নেয়।—এমন অনেক কিছু করেন। ওই সব সমস্যার স্রষ্টাও কিন্তু নারী। ‘আত্মানং বিদ্ধি।’ (know thyself বা নিজেকে জানা)-র শিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে সব কিছুকে জেনেছে, জানতে পারেনি নিজেকে। নিজের নারীত্বের-পূর্ণতার বিষয়ে জানা হয়ে ওঠেনি।

একটা উন্নত প্রজাতির কোন গাছ লাগাতে গেলেও কিছু প্লান-প্রোগ্রাম নিতে হয়। আগে থেকে জমি নির্বাচন করতে হয়, উপযুক্ত সার দিয়ে জমি তৈরি করতে হয়, তারপর মাটির উপযুক্ত বীজ বা চারা বসাতে হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় বর্তমান যুগের বেশিরভাগ লেখাপড়া শিখতে যাওয়া নারীরা, পুরুষের সাথে পা-মিলিয়ে, গলা-মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ‘হোক-কলরব’ আন্দোলনে পারদর্শী হলেও, নিজের আত্ম-বিস্তারের জন্য আবশ্যিক  আত্ম-সম্পোষণ, আত্ম-সংরক্ষণ করার জন্য নির্দিষ্ট নারীত্বের অস্তিত্ব রক্ষার জমিটুকুকে সংরক্ষণ করা বিষয়ে উদাসীন। যারফলে কালেক্রমে মনুষ্যত্ব সম্পন্ন অসৎ-নিরোধে তৎপর সন্তান থেকে সভ্যতা বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব রামকৃষ্ণদেব, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নেতাজী সুভাষচন্দ্র প্রমুখ মনীষীদের জন্মদাত্রীগণ ক্যাম্পাসে, অফিসে, মিটিংয়ে, মিছিলে কোন ‘কলরব’ না করেই, সনাতনী নারীধর্ম পালন করে রত্নগর্ভা হয়েছিলেন। ভারতীয় কৃষ্টি প্রদত্ত প্রকৃষ্ট-গতির পথ ভুলে, তথাকথিত প্রগতির নামে ছুটে চলা নারীবাদিরা বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে দেখতে পারেন।

জগতের সকল অশান্তির সুতিকাগৃহ হচ্ছে যৌন বিকৃতি। ভালকরে খোঁজ নিলে দেখা যাবে সব গণ্ডগোলের জন্ম হয় অনিয়ন্ত্রিত যৌনতা  থেকে। অবৈধ যৌন-সংশ্রব মস্তিস্কে এমন সংস্থিতি এনে দেয় যার অভিভূতিকে অতিক্রম করা দুরূহ হয়ে ওঠে। তাই তো শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের সাবধান করে বাণী দিলেন।

যোনি যোগে ঢুকলে পাপ,
রোখাই কঠিন তাহার দাপ।


শাসন সংস্থা যেমনই হোক
যাতেই মাথা ঘামাও না,
যৌন-জীবন শুদ্ধ না হলে
দেশের জীবন টিঁকবে না।

 
ব্যষ্টি-চরিত্র যৌনজীবন
ব্যভিচার যেথা উচ্ছলা
জনজীবন সে দেশে প্রায়ই
চরিত্র দোষের পিচ্ছলা;
অন্তরালে অদৃষ্ট তখন
ভাসতে থাকে চোখের জলে
আপদ তখন বিপদ নিয়ে
সবার পিছু পিছু চলে।


জনন-বিভ্রাট যেই এলো রে
ক্রমে ক্রমে রাষ্ট্র ছেঁয়ে
লাখ ঐশ্বর্য্য থাক না কেন
আপদ সেথায় যাবেই বেয়ে।

পরিবারকে উন্নতি বা অবনতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী প্রধানতঃ নারী। কথায় আছে, ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে। গুণবান পতি যদি থাকে তার সনে।।’ আদর্শ একজন পুরুষের সাহচর্যে নারীর হাতেই গড়ে ওঠে আদর্শ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র। নারীই হচ্ছে জাতির বল ও ভরসা। লক্ষী নারীদের উপরেই রয়েছে মহান জাতি গঠনের বিরাট দায়িত্ব। মহান আদর্শকে চরিত্রায়িত করে  নারী যদি পরিবারকে সুন্দর ও সার্থক করে সাজিয়ে তুলতে পারে তবেই জগত-সংসার সুখের হয়। আদর্শ জাতি গঠন করার দায়িত্ব নারীদের উপর থাকার জন্য তাদের শিশুকাল থেকেই ভালো মা হবার সাধনায় অগ্রসর হতে হবে। নারী জীবনের বিভিন্ন পর্যায় আছে। ওই পর্যায়গুলো ভগ্নি, বধূ, স্ত্রী, জায়া, জননী ও গৃহিনী ও জননীত্ব।  ওগুলোকে সমৃদ্ধ নারীরাই করতে পারেন, পুরুষেরা নয়। স্নেহ, মায়া, মমতা ও ভালবাসার দ্বারা পূর্ণ নারীর হৃদয়। নারীরা ইচ্ছা করলেই তাঁর অন্তর্নিহিত বিভিন্ন শক্তির দ্বারা জাগিয়ে তুলতে পারেন বিশ্বকে। সুসন্তান উপহার দিয়ে। যেমনটি দিয়েছিলেন হিরণ্যকশিপুর পত্নী কয়াধু, প্রহ্লাদকে জন্ম দিয়ে।  

কু-জনদের জন্ম নিরোধ করে, কিভাবে সু-জনদের মা হওয়া যায়, সেই শিক্ষায় নারীদের শিক্ষিত করার জন্য শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ‘নারীর নীতি’, ‘নারীর পথে’, ‘দেবীসূক্ত’, ‘বিবাহ-বিধায়না’ শিরোনামের গ্রন্থরাজির উপহার রেখে গেছেন।  সেই উপহারের ডালিগুলোকে কাজে লাগাতে পারলে শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণজনিত সমস্যা নয়, জগতের সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।

পরিশেষে বিশ্বশান্তির আহ্বায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের একটি বাণী পাঠকদের উপহার দিয়ে যবনিকা টানলাম।  জয়গুরু! প্রণাম! বন্দে পুরুষোত্তমম্! tapanspr@gmail.com

                                   ——

    ।। লক্ষী নারী ।।

‘‘নারী হইতেই জাতি জন্মে ও বৃদ্ধি পায়, তাই নারী যেমন ব্যষ্টির জননী তেমনই সমষ্টিরও ;– আর, এই নারী যেমন ভাবে আবিষ্ট থাকিয়া যেমন করিয়া পুরুষকে উদ্দীপ্ত করে পুরুষ হইতে সেই ভাবই নারীতে জন্মগ্রহণ করে ; তাই, নারী মানুষকে প্রকৃতিতে মূর্ত্ত ও পরিমিত করে বলিয়া জীব ও জগতের মা ;–তাহ’লেই বুঝিও– মানুষের উন্নতি নারীই নিরূপিত করিয়া দেয় ; তাই নারীর শুদ্ধতার উপরই জাতির শুদ্ধতা, জীবন ও বৃদ্ধি নির্ভর করিতেছে– বুঝিও, নারীর শুদ্ধতা জাতির পক্ষে কতখানি প্রয়োজনীয় ! ১৭৬ ।’’

(চলার সাথী গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)