।। আচার্য্য পরম্পরা ।।
[ভালোই সব চলছিল। সৎসঙ্গ নিয়ে বেশ আনন্দেই মেতে ছিলাম। হঠাৎ তালটা যেন
কেটে গেল। দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রম থেকে প্রকাশিত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র
লিখিত ‘সত্যানুসরণ’ নামক গ্রন্থের ৪৫তম সংস্করণের ৬৫তম পাতার প্রথম
অনুচ্ছেদের বাণীর উপদেশটা আমাকে বেশ বিপাকে ফেলে দিয়েছে। আমার নাম দিবাকর
বৈদ্য। আমি অকপটে সব ‘খ্যাপন’ করলাম। দয়া করে আমার কথাগুলো একটু
শুনবেন। বলা যায় না, আপনাদেরও কাজে লেগে যেতে পারে।]
* * *
একজন দাদা, নাম অনিমেষ চৌধুরী। দেখা হলেই ‘জয়গুরু’ দিয়ে সম্ভাষণ
করেন। ভালো-মন্দ খোঁজখবর নেন। মাঝে-মাঝে ঠাকুরের কথা বলেন। বাড়িতে যেতে
বলেন। একদিন সন্ধ্যা-প্রার্থনার আগে ওঁর বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম।
ভাবলাম, ওনার বাড়ীতেই না-হয় আজকের প্রার্থনাটা করে নেব। উনি দু’জন মা’কে
নিয়ে বসে তখন ধ্যান করছিলেন। পরে জেনেছিলাম ওই দু-জনা ছিলেন ওঁর স্ত্রী
ও কন্যা। সামনে ঠাকুরের একটা মাত্র প্রতিকৃতি। আমার উপস্থিতি বুঝতে পেরে
বসতে বললেন। অনিচ্ছা সত্বেও বসলাম। অনিচ্ছা সত্বেও বলতে বাধ্য হলাম,
কারণ, ওনার বাড়িতে ঠাকুরের ফটো ছাড়া জগজ্জননী বড়মা, শ্রীশ্রীবড়দা,
বর্তমান আচার্য্যদেব পূজ্যপাদ বাবাইদা, পূজ্যপাদ অবিনবাবু-দের কোন
ছবি নেই।— যা’ কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারছিলাম না। আচার্য্য-পরম্পরাকে
যে বা যারা মানে না, তারা ‘ইষ্টদ্রোহী’, আমি তাদের সঙ্গ সবসময় এড়িয়ে চলার
চেষ্টা করি। তেমন শিক্ষাই পেয়েছি আমাদের ঋত্বিক দাদাদের কাছ থেকে। নতুন
পরিচয়, তাই আগে থেকে বুঝতে পারিনি, যে দাদাটি ইষ্টদ্রোহী।
আচার্য্য-পরম্পরা মানে না। মনে যাইহোক, ভদ্রতার খাতিরে মুখে বললাম,
দাদা, সময় তো পার হয়ে গেল, প্রার্থনা করবেন না।
—‘এই তো করবো।’ বলেই উঠে দাঁড়ালেন।
পাশে বসে থাকা মায়েদের দিকে ইশারা করতেই শঙ্খধ্বনি, হুলুধ্বনি বেজে
উঠল। অমনি দাদাটি ডান হাতটি উপরে তুলে, বাম হাতটিকে ঝুলন্ত রেখে কি-সব
বলতে লাগল। সবটা মনে নেই। তবে প্রথমদিকের শব্দগুলো— তমসার পার
অচ্ছেদ্যবর্ণ মহান পুরুষ … গোছের এইরকম কিছু। (যা আমাদের উপাসনা বইতে
লেখা আছে দেখেছি।) তারপর প্রার্থনা শুরু করলেন। প্রথম দুটো বিনতির পর
‘গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু’ না করে আবার কীসব বলতে শুরু করলেন। বাংলা আর
সংস্কৃতে। তারপর শুরু করলেন ‘গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু’। তারপর আবার
কতগুলো সংস্কৃত মন্ত্র আওড়াতে লাগলেন।—যা আমি কোনদিন কোন সৎসঙ্গ
অধিবেশনে করতে দেখিনি। আমার ধৈর্য্যের, রাগের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছিল। তবুও
কৌতুহল বশে নিজেকে সংযত করে নিলাম। ওনার মনগড়া প্রার্থনা শেষে আমাকে
সত্যানুসরণ-এর একটি নির্দিষ্ট অংশ থেকে পাঠ করতে বললেন, আমি পাঠ
করলাম—‘‘কোন-কিছু ‘আজ বুঝেছি আবার কাল বুঝা যায় না—হেঁয়ালি’ ইত্যাদি
ব’লে শৃগাল সেজো না—কারণ, ইতর জন্তুরাও যা’ বোঝে তা’ ভোলে না। তাই, এই
প্রকার বলাটাই দুষ্ট বা অস্থির-বুদ্ধির পরিচায়ক।’’
আমার পড়া শেষ হতেই উনি ‘চলার সাথী’ গ্রন্থ থেকে ‘সন্ধ্যা ও প্রার্থনা’ অংশটি পাঠ করলেন। পাঠ শেষ করে আমাকে একটা কীর্তন করতে বললে,
আমি কিছুটা অনিচ্ছা সত্বেও ‘জয় রাধে রাধে’ কীর্তনটা করলাম। কীর্তনটা শেষ
হলে উনি আমার খুব প্রশংসা করে বললেন, খুব ভাল লাগল তোমার
কীর্তন,—‘ছাড়োরে মন কপট চাতুরি, বদনে বলো হরি হরি!’—কি অপূর্ব কথা!
তাই না ভাই ?—তারপর যেন অনেকটা আক্ষেপের সুরেই বললেন, ‘কোথায় আর পারলাম
কপটতা ত্যাগ করে ধর্মরাজ্যে প্রবেশ করতে!’ —ঠিক আছে! তাহলে ধ্বনি দিয়ে
দি। কি বলো?
আমার সম্মতি পেয়ে উনি ‘বন্দে পুরুষোত্তমম্! বন্দে আর্য্য পিতৃন!
বন্দে মাতৃবর্গান্! বন্দেহংকৃষ্টি দৈবতান্!— ইত্যাদি ধ্বনি দিয়ে
প্রার্থনা-পর্বের ইতি টানলেন। বড়মা এবং আচার্য্যদেব-দের নামে কোন ধ্বনি
দিলেন না। আমার মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। —এ তো অন্যায়! অন্যায়কে
প্রশ্রয় দেওয়াও তো অন্যায়। তাই আমি সহ্য করতে না পেরে বলেই
বসলাম,—দাদা! আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি ?
—অনায়াসে করতে পার।
—আপনি চলার সাথী থেকে ‘সন্ধ্যা ও প্রার্থনা’-র বাণীটা পড়লেন, অথচ
আপনি প্রার্থনার সময়সূচী মেনে প্রার্থনাটা করলেন না। আর প্রার্থনাটাকেও
বিকৃত করে করলেন। যেগুলো ঠাকুর করতে মানা করে গেছেন। আর একটা কথা, আপনি
আপনার বাড়ীতে শ্রীশ্রীবড়মা, শ্রীশ্রীবড়দা, শ্রীশ্রীআচার্য্যদেব, পূজনীয়
বাবাইবাবা, পূজনীয় অবিনবাবুদের কোন ছবি রাখেন নি, তাঁদের নামে কোন ধ্বনিও
দিলেন না!—কেন, জানতে পারি কি?
আমার কথা শুনে হা-হা করে হেসে উঠে বললেন, তোমার কথাটা ঠিক সোনার
পাথরবাটির মত হয়ে গেল না-কি?
—তার মানে?
—তার মানে হলো এই, শ্রীশ্রীঠাকুর চলার সাথী গ্রন্থে ‘সন্ধ্যা ও প্রার্থনা’ শিরোনামে যে বাণীটি লিপিবদ্ধ করেছেন, তার মধ্যে তিনি তাঁর
রচিত ‘আর্য্যসন্ধ্যা’ ও ‘প্রার্থনা’-র কথা বলেছেন। উক্ত প্রার্থনার
অস্তিত্ব যেখানে বিলুপ্ত করা হয়েছে, সেখানে প্রার্থনা না করে
প্রার্থনার-সময়সূচী দিয়ে কি হবে? আর ইষ্টাসনে সদগুরু ছাড়া অন্যান্য ছবি
রাখতে গেলে তো সত্যানুসরণ থেকে ‘‘গুরুই ভগবানের সাকার মূর্ত্তি, আর তিনিই
Absolute (অখণ্ড)।’’—লেখাটি বাদ দিতে হবে।
—প্রার্থনার অস্তিত্ব বিলুপ্ত করা হয়েছে মানে!— আপনি কি বোঝাতে
চাইছেন? দেওঘরে, অসংখ্য কেন্দ্র-মন্দিরগুলোতে সকাল-সন্ধ্যায় তাহলে কি
করা হয়?
—যা করা হয় সেগুলো শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র রচিত এবং নিদেশিত
প্রার্থনা নয়। তুমি এ বিষয়ে যদি জানতে চাও, প্রার্থনা বিষয়ক প্রামাণ্য
গ্রন্থ ঋত্বিগাচার্য্য প্রণীত ‘অনুসৃতি’ এবং ‘সৎসঙ্গ পাব্লিশিং প্রকাশিত
‘প্রার্থনা’ শিরোনামের গ্রন্থটি ভাল করে পড়ে নিও।
—দেখুন ওসব পড়ার আমার দরকার নেই। ওসব এখন অচল। আমরা
আচার্য্যদেবের নির্দেশে ‘উপাসনা’ বইটাকে মেনে চলি। উপাসনা বইয়ের প্রথমেই
লেখা আছে ১৯৬৫ সালে শ্রীশ্রীঠাকুর ওসব বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন।
আমার কথা শুনে দাদাটি ‘হো-হো’ করে আবার পাগলের মত হেসে উঠে বলল,
তোমার কথার উত্তরটা ঠাকুর সত্যানুসরণের ৬৫ সংখ্যক পাতায় দিয়েছেন, যেটা
আজকে তুমি পাঠ করলে। আমার প্রতি রাগ না করে, বাড়িতে গিয়ে বাণীটা ভাল করে
বোঝার চেষ্টা করবে।
যাইহোক, লোকটার ব্যবহারে আন্তরিকতার সুর ছিল। ফেরার সময় আমাকে ৫টা
ফল এবং কিছু ভ্রাতৃভোজ্যও দেয়। আমি স্থান ত্যাগ করে বাড়ি না ফিরে আমাদের
কেন্দ্র-মন্দিরে চলে যাই। এ বিষয়ে একটা হেস্তনেস্ত করার জন্য। ভাগ্য ভাল, দেখা
পেয়ে যাই বিভাস সরকারদার। প্রবীণ ঋত্বিক-দেবতা। ঠাকুর দেখা মানুষ,
আচার্য্যদেবের কাছের লোক, তাঁর কাছে গিয়ে ঘটনাটা খুলে বলি। তিনি সব শুনে
বললেন, ঠিক আছে তুমি বাড়ি চলে যাও, দেখি কি করা যায়।
- * *
তারপর বেশিদিন কাটেনি। সুভাসদার সাথে সৎসঙ্গ সেরে ফিরছিলাম।
ভাগ্যক্রমে দেখা হয়ে যায় অনিমেষদার সাথে। আমি সুভাসদার সাথে অনিমেষদার
পরিচয় করিয়ে দিলে, সুভাসদা অনিমেষদাকে বলেন আপনি আমাদের গুরুভাই অথচ
মন্দিরে আপনাকে দেখি না, কি ব্যাপার?
—‘আমি কি ওখানে ভণ্ডামি করতে যাব?’ অনিমেষদার অনভিপ্রেত উত্তর
শুনে সুভাসদা বলেন—ভণ্ডামি বলছেন কেন, আমরা কি ওখানে ভণ্ডামি করছি?
—ওটা আমার কথা নয়, ঠাকুরের কথা।
—ঠাকুরের কথা! প্রমাণ দিতে পারবেন?
—অবশ্যই। তবে রাস্তায় নয় বাড়িতে চলুন, ঠাকুরের বই খুলে প্রমাণ দেব।
—দেখুন, এখন তো আপনার বাড়িতে যাওয়া সম্ভব না, বরং কাল সকালে
প্রেয়ারের আগে মন্দিরে আসুন, প্রেয়ারের পর না হয় যুক্তিতর্ক করা যাবে।
—দেখুন, মনে কিছু করবেন না, আবার আমাকে অপ্রিয় কথা বলতে বাধ্য করলেন।
—এমন কি বললাম, যাতে আপনাকে অপ্রিয় কথা বলতে হবে?
—ওই যে প্রেয়ারের কথা বললেন না, আপনারা কি প্রেয়ার করেন, যে
প্রেয়ার করতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন!
—এ আপনি কি বলছেন! দেওঘর থেকে নির্ধারিত প্রেয়ারের সময়সূচী মেনে
রীতিমত মাইকের মাধ্যমে আমাদের মন্দিরে প্রেয়ার করা হয়, আপনি বলছেন, আমরা
প্রেয়ার করি না! আপনি প্রমাণ করতে পারবেন তো?
—অবশ্যই।
—তাহলে কাল আসুন আপনার প্রমাণপত্র সব নিয়ে। - * *
মন্দিরের কাছে বাড়ী হবার সুবাদে প্রায় প্রতিদিনই মন্দিরে গিয়ে
সকালের প্রার্থনাটা করি। সেদিন প্রার্থনা শেষে দেখি অনিমেষদা এসেছেন।
বিভাসদা ওনাকে নিয়ে গিয়ে বসালেন।
এবার বলুন আপনার বক্তব্য। ঠাকুরের বলা অনুযায়ী আমরা যে ভণ্ডামি করছি,
প্রেয়ার করছি না, প্রমাণ করে দেখান।
অনিমেষদা সত্যানুসরণ গ্রন্থটি বের করে বলেন, আপনারা এই বইটিকে যদি
মানেন, তাহলে দেখুন ৩১ পৃষ্ঠায় রয়েছে, ‘‘গুরুই ভগবানের সাকার মূর্ত্তি,
আর তিনিই Absolute (অখণ্ড)।’’ আবার ৫৭ পৃষ্ঠায় ঠাকুর আত্ম-প্রচারকদের
ভণ্ড বলেছেন।
—ঠাকুর, আত্ম-প্রচারকদের ভণ্ড বলেছেন, আমরা তো আর আত্ম-প্রচারক নই!
—গুরুর পাশে শিষ্যদের ছবি রেখে প্রচার করা কি সত্য প্রচারের নামে
আত্ম-প্রচার করা নয়?— আপনারা প্রার্থনার নামে দয়ালবাগ সৎসঙ্গের যে
বিনতি করেন, সেই বিনতিতে বলেন :
“তুম্ বিন কোই সমরথ নহী জাসে মাঁগু দানা”
“রাধাস্বামী গুরু সমরথ তুম বিনা আউর্ ন দুসরা ।”
আবার শঙ্করাচার্য্য রচিত গুরু বন্দনায় বলি—
“গুরোঃ পরতরং নাস্তি…..”
“কেবলং জ্ঞানমূর্ত্তিম্ ।”
ওই মন্ত্রগুলো একমাত্র গুরুকে উদ্দেশ্য করেই যদি বলা হয়ে থাকে তাহলে
গুরুর আসনের পাশে কি গুরুর শিষ্যদের ছবি রাখা যায়? একটা প্রাইমারি
স্কুলেও হেড্ স্যরের চেয়ারের একটা আলাদা মর্যাদা থাকে, আপনারা
দাদা-প্রীতির নামে সে মর্যাদাটুকুও ক্ষুণ্ণ করে চলেছেন, এগুলোকে কি
আত্মপ্রচার বলে না?
সুভাসদাকে নিরুত্তর থাকতে দেখে অনিমেষদা বললেন, আপনারা যারা
ঠাকুরের সাথে ঠাকুরের শিষ্যদের প্রচার করতে গিয়ে তাদের প্রতিকৃতিরও পূজা
করছেন, তা ভণ্ডামি নয় কি? এই গেল ভণ্ডামির উত্তর। এরপর রয়েছে প্রেয়ার।
এই দেখুন সৎসঙ্গ পাব্লিশিং প্রকাশিত ২ খানি গ্রন্থ। এটি শ্রীশ্রীঠাকুরের
ইংরেজী ভাষায় লিখিত ‘লর্ডস্ প্রেয়ার’। ভাল করে দেখে বলুন তো এই প্রেয়ার
আপনারা করেন কি-না?’
সুভাসদা বইটা নেড়েচেড়ে দেখে বললেন, ‘না করি না’।
—‘তাহলে দেখুন ‘প্রেয়ার’ না করেই মিথ্যা প্রেয়ারের গর্ব করে
চলেছেন। ঠাকুরের ভাষায় এর নাম দ্বন্দ্বীবৃত্তি। সবচাইতে বড় পাপ। ঠিক আছে,
ইংরেজীর কথা বাদই না হয় দিলাম, প্রেয়ার-এর বাংলা প্রার্থনা। বাংলা ভাষায় ঠাকুরের লেখা ‘প্রার্থনা’
নামে একটা বই আছে এবং সেই বইটাও সৎসঙ্গ পাব্লিশিং থেকে প্রকাশিত। হিমাইতপুরে প্রথমে প্রথমে প্রকাশিত হয়। দেওঘরে প্রথম
প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে। ভাল করে দেখুন তো, এই বইয়ের নিদেশ মেনে আপনারা
প্রার্থনা করেন কি-না?’
সুভাসদা বইটা ভাল করে নেড়েচেড়ে দেখে বললেন, ‘না, করি না’।—তবে এই
প্রার্থনা করতে তো ঠাকুরই নিষেধ করে গেছেন ১৯৬৫ সালে, উপাসনা বইতে যা
স্পষ্ট করে লেখা রয়েছে।
—মনে কিছু করবেন না দাদা, যাকে আমরা ঠাকুর বলে মানি, সেই তিনিই
যদি তাঁর রচিত প্রার্থনা করতে নিষেধ করেন, তাহলে তাঁর নাম করে দীক্ষার
সঞ্চারণা করাও তো আর একটা ভণ্ডামি! কোন সাবজেক্ট নেই, সিলেবাস নেই অথচ
ধরে ধরে এনে ছাত্র ভর্তি! কোন বুদ্ধিমান মানুষ কি মেনে নেবেন? আপনি যদি
সত্যি-সত্যিই নিজেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের শিষ্য বলে মনে করেন
তাহলে একটা কাজ অবশ্যই করা উচিত, আপনাদের আচার্য্যদেবকে বলে সত্যানুসরণ
থেকে ‘‘কোন-কিছু ‘আজ বুঝেছি আবার কাল বুঝা যায় না—হেঁয়ালি’ ইত্যাদি
ব’লে শৃগাল সেজো না—কারণ, ইতর জন্তুরাও যা’ বোঝে তা’ ভোলে না। তাই, এই
প্রকার বলাটাই দুষ্ট বা অস্থির-বুদ্ধির পরিচায়ক।’’ এই অংশটা বাদ দিতে বলে
বলে দিন।
—কেন, প্রার্থনার সাথে সত্যানুসরণের বাণীর সম্পর্ক কি?
—কারণ, পুরুষোত্তম যদি অভ্রান্ত হয়েই থাকেন, তাঁর নিদেশিত কোন
বিধির পরিবর্তন তিনি কখনোই করেন না, কেউ করুক, তা-ও তিনি অনুমোদন করেন
না, এমনকি কাউকে পরিবর্তন করার অধিকারও দেন না। তাই তিনি সত্যানুসরণের ওই
বাণীতে বললেন, ‘ইতর জন্তুরাও যা’ বোঝে তা’ ভোলে না।’ তাই আমার তো মনে হয়,
ঠাকুর তাহলে ভুল করে ওই বাণীটা দিয়েছিলেন, না হলে আপনারা তাঁর রচিত এবং
নিদেশিত আহ্বানী, সন্ধ্যা ও প্রার্থনা-র সবটা বাদ দিয়ে, তাঁর নিদেশকে
অমান্য করার ধৃষ্টতা দেখাতে পারতেন না!
—দেখুন, আপনি আমাদের যতই যুক্তি দেখান, আমাদের ভোলাতে পারবেন না।
এতক্ষণে বুঝতে পারলাম, আপনারা ঠাকুরের নির্দেশের আচার্য্য-পরম্পরা মানেন
না। সে আপনারা না মানুন, আমরা কিন্তু আচার্য্যদেবের নির্দেশের বাইরে এক
পা-ও চলতে রাজী নই।
—খুব ভাল কথা, আপনি আমাকে বললেন, ‘‘আপনারা ঠাকুরের নির্দেশের
আচার্য্য-পরম্পরা মানেন না।’’ একটা প্রশ্নের উত্তর দিন তো, আপনারা
উপাসনা, অধিবেশন বা সৎসঙ্গ করার সময় আসনে আচার্য্য-পরম্পরার নামে বা
অজুহাতে যাঁদের প্রতিকৃতি রাখেন, তাঁদের দেওয়া কোন প্রার্থনা, উপাসনা
করেন কি?—অতএব আপনারা যে পদ্ধতিতে আচার্য্য-পরম্পরা মেনে চলছেন, ওইভাবে
মেনে চলার কথা ঠাকুর কোথায় বলেছেন, তাঁর বলা প্রামাণ্য শ্রুতিবাণী থেকে
প্রমাণ দেখাতে পারবেন?
কেন জানি সুভাসদা কোন উত্তর দিতে পারলেন না দেখে অনিমেষদা বললেন,
অভিধান মতে আচরণসিদ্ধ ব্যক্তিকেই ‘আচার্য্য’ বলে। যিনি যে বিষয়ের
আচার্য্য হবেন, তাঁকে সে বিষয়ে আচরণসিদ্ধ হতে হবে। যেমন, আমরা নিউটন,
আর্কিমিডিস, আইনস্টাইন প্রমুখ বিজ্ঞান-আচার্য্যদের কেউ দেখিনি। তাঁরা
বিগত হবার পর তাঁদের আবিষ্কৃত সূত্র বা জ্ঞানের সাথে পরিচিত হই তাঁদের
লিখে রাখা বইয়ের মাধ্যমে, তাঁদের বংশধরদের মাধ্যমে নয়। সেই বইগুলো বাজারে
সহজলভ্য হলেও আমরা বই পড়ে সেগুলো নিজে নিজে আয়ত্ত করতে পারি না বলেই
শিক্ষকদের মাধ্যমে শিখতে হয়। এবার কোন শিক্ষক যদি ওই বিজ্ঞান-আচার্য্যদের
মূল সূত্রগুলো বাদ দিয়ে ভুল শেখাতে শুরু করেন এবং প্রতিপত্তির জোরে
বংশানুক্রমিকভাবে জ্যেষ্ঠ-সন্তান-পরম্পরা চালাতে থাকে, মূলসূত্র জানা কোন
ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছাত্র কি তা মেনে নেবেন?
—তা কি করে হয়!
—তাই যদি না হয়, তাহলে আপনারা কোন্ হিসেবে শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্রের মূলসূত্র অর্থাৎ আদর্শকে সযত্নে পরিহার করা শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্রের জ্যেষ্ঠ সন্তান পূজনীয় অমরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এবং
পরবর্তী বংশানুক্রমিকভাবে জ্যেষ্ঠ-সন্তান-পরম্পরাদের ছবি পুজো করতে শুরু
করেছেন? এঁরা কিসের আচার্য্য এবং কোন্ আচরণ দ্বারা আপনাদের শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্রের অবিকৃত আদর্শ অনুসরণ বিষয়ে শিক্ষিত করেছেন বা করছেন?
—দেখুন কিসের সাথে কিসের তুলনা করছেন? আমাদের দেশে আচার্য্য প্রথা কুলগুরু প্রথা কি চালু নেই?
—আপনি যখন বলছেন, থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু ঠাকুর এ বিষয়ে কোন
বাণীতে কি বলে গেছেন, সে সম্পর্কে যদি কিছু জানা থাকে বলুন।
—না, ওগুলো আমার শোনা কথা, কোন বাণীতে কি বলে গেছেন তা বলতে পারব
না। তবে—
“ইষ্টগুরু পুরুষোত্তম
প্রতীক গুরু বংশধর,
রেতঃ শরীরে সুপ্ত থেকে
জ্যান্ত তিনি নিরন্তর।”
এই বাণীটা যদি ঠাকুরের দেওয়া হয় তাহলে বংশধররা কি প্রতীক-গুরু নয়?
—অবশ্যই। তাহলে তো আপনাদের আচার্য্যদেবদের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে যে!
—তার মানে?
—তার মানে অতি সহজ। সত্যানুসরণ গ্রন্থের শুরুতেই তা লিপিবদ্ধ করা আছে।—
“ভারত! যদি ভবিষ্যৎ-কল্যাণকে আবাহন ক’রতে চাও, তবে সম্প্রদায়গত বিরোধ ভুলে
জগতের পূর্ব্ব-পূর্ব্ব গুরুদের প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হও—আর তোমার মূর্ত ও জীবন্ত গুরু বা ভগবানে আসক্ত (attached) হও, —আর তাদেরই স্বীকার কর—যারা তাঁকে ভালবাসে। কারণ, পূর্ব্ববর্ত্তীকে অধিকার করিয়াই পরবর্ত্তীর আবির্ভাব।” এই হচ্ছে প্রকৃত আচার্য্য পরম্পরার মূল সূত্র।
শ্রীশ্রীঠাকুরের ওই আক্ষেপ-বাণী শতবর্ষ অতিক্রম করলেও আমরা তাঁর আবেদনকে বাস্তবায়িত করতে ব্যর্থ হয়েছি। ব্যর্থ হয়েছি অবিকৃতভাবে পুরুষোত্তমের আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে সাধারণ জনমানসে!
তার পরও যদি “ইষ্টগুরু পুরুষোত্তম প্রতীক……” বাণীকে আঁকড়ে ধরে চলতে চান তাহলে তো মুশকিল!
কারণ— শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র
পূর্বাপূর্ব অবতার বরিষ্ঠদের তাঁর পূর্বাচার্য্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের পূর্বাচার্য্য শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীস্ট, হজরত মহম্মদ, চৈতন্যদেব,
রামকৃষ্ণদেব-দের রেত-শরীরের সাথে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের পরিবারের কি কোন সম্পর্ক
আছে?
—তা’ কি করে থাকবে! তাছাড়া চৈতন্যদেব ও রামকৃষ্ণদেবের তো কোন সন্তানই ছিল না।
—ঠিক তাই। তাহলে চৈতন্যদেবের পূর্ববর্তী পুরুষোত্তম যিনি ছিলেন
বলে আপনার মনে হয়, তাঁর সর্বশেষ বংশধরদের মধ্যে প্রতীক গুরু খুঁজে দীক্ষা নিয়ে ধর্ম পালন করা উচিত। তাই নয় কি? তা করতে পারা কি আপনাদের দ্বারা সম্ভব হবে? - * *
পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের পবিত্র সৎসঙ্গ আন্দোলন অব্যাহত রাখতে
তাঁর স্পষ্ট নিদেশ দেওয়া আছে—‘‘আগত যিনি, উপস্থিত যিনি, তাঁর বিগতিতে বা তিরোভাবে তাঁর বংশে যদি তাঁতে অচ্যুত সশ্রদ্ধ আনতিসম্পন্ন, প্রবুদ্ধ সেবাপ্রাণ, তৎবিধি ও নীতির সুষ্ঠু পরিচারক ও পরিপালক, সানুকম্পী চর্য্যানিরত, সমন্বয়ী সামঞ্জস্য প্রধান, পদনির্লোভ, অদ্রোহী, শিষ্ট-নিয়ন্ত্রক, প্রীতিপ্রাণ—এমনতর কেউ থাকেন, তাঁরই অনুগমন করো—কিংবা তাও যদি না পাও—তবে তাঁর কৃষ্টি সন্ততির ভিতর অমনতর গুণসম্পন্ন যিনি তাঁরই অনুগমন করো পারম্পর্য্যে—যতক্ষণ আবার আগতের অভ্যুত্থান না হয়, ঠকবে না—শিষ্ট সমন্বয়ে সম্বর্দ্ধনাও এই পাবে।’’ (সম্বিতী, আদর্শ, ৩৯)
তাঁর বিগতি পরবর্তী উপরোক্ত ওই বাণীকে অবলম্বন না করে তড়িঘড়ি আচার্য্য সেজে সৎসঙ্গের অধিকার গ্রহণ করলেন কোন্ যুক্তিতে?—
* * *
সুভাসদাকে নিরুত্তর থাকতে দেখে অনিমেষদা বলেন, তা যদি না হয়, তাহলে
ওই বাণীর উপর ভিত্তি করে আচার্য্য-পরম্পরার নামে কুলগুরুগিরির ব্যবসা
চালানো থেকে অবিলম্বে বিরত হওয়া উচিত।
শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুসারে পিতা থেকে পুত্র জন্মায়। পুত্র,
পিতার অছি (trustee) মাত্র। যে পুত্র পিতার অছি-কে বহন করে সমৃদ্ধ করে
তাকেই পিতার আদর্শ পুত্র বলবে সবাই। তাই বলে পুত্র কখনো পিতা হতে পারে
না। তাই যদি হতো বিশ্বশ্রবা ঋযির পুত্র বিভীষণকে আদর্শ পুত্র না বলে
রাবনকে তো বলতে পারতেন শ্রীশ্রীঠাকুর। আপনারা ওই বাণীকে ভিত্তি করে,
ঠাকুরের মূল আদর্শ বাদ দিয়ে বংশানুক্রমিকভাবে জ্যেষ্ঠ-সন্তান-পরম্পরার
চতুর্থ পুরুষকে পর্যন্ত ঠাকুর বানিয়ে ছেড়েছেন। অথচ ঠাকুরের প্রথম
বংশধরদের মধ্যে একমাত্র জীবিত সন্তান—পূজনীয় কাজলদা যখন জীবিত ছিলেন তাঁকে আপনারা বংশধর বলে গণ্য
করতেন না। আপনারা সত্যিই যদি উপরের ওই বাণীকে মর্যাদা দিতেন তাহলে
সর্বাগ্রে তাঁর পুত্রকে সম্মান দিয়ে, তাঁর মতামত নিয়ে নিদেশিত বাণীর উপযুক্তকে কীলকেন্দ্রে বসাতেন। অন্যথায় উপযুক্ত কৃষ্টি সন্তানকে। যুক্তিসঙ্গত যা’, তা’ না করে
আপনারা মনগড়া আচার্য্য-পরম্পরায় মেতে উঠে সৎসঙ্গের মূল আচার্য্যের
অনুশাসনকে নিকেশ করে দিলেন! ইতিহাস কি আপনাদের কোনদিন ক্ষমা করবে?
শাস্ত্রের ব্যাখ্যা অনুযায়ী পরাবিদ্যায় আচরণসিদ্ধ ব্রহ্মজ্ঞ
ইষ্টগুরুকে আচার্য্য এবং অপরাবিদ্যায় আচরণসিদ্ধ শিক্ষাগুরুকে উপাচার্য্য
বলা হয়। বীরশ্রেষ্ঠ অর্জুনের কৃপাচার্য্য, দ্রোণাচার্য্য, ধৌম্য নামে
তিনজন উপ-আচার্য্য থাকা সত্বেও পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণকে আচার্য্য পদে বরণ
না করা পর্য্যন্ত তিনি দুর্বলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারেন নি।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রও পূর্ববর্তী পুরুষোত্তমদের আচার্য্য হিসেবে
মেনে চলতেন। এবং মেনে চলতে বলেছেন। তাঁর বলা অনুযায়ী—
সত্তার মূলই হ’ল আত্মা,
আর, এই আত্ম-সমীক্ষুই আত্মবিৎ—
আর, তিনিই আচার্য্য ;
তদন্বিতবৃত্তি ও তৎসমাহিতচিত্ত যিনি—
তিনিই বোধ করেন তাঁ’কে অখণ্ড সচ্চিদানন্দ—
আত্মার মূর্ত্ত প্রতীক। ৩৩১ । (সম্বিতী)
পুরুষোত্তম আসেন যখন
ইষ্ট, আচার্য্য তিনিই গুরু,
তিনি সবার জীবন-দাঁড়া
তিনিই সবার জীবন-মেরু।
তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর ওই নিদেশ অমান্য করা শুরু হয়েছিল বলেই তিনি
অমান্যকারীদের উদ্দেশ্যে বাণী দিয়ে বললেন—
আচার্য্য ছেড়ে আচার্য্য ধরলি
মূর্খতাতে দিলি পা,
জ্ঞানের বুকে মারলি ছুরি
লাভ হ’ল তোর ধৃষ্টতা।
আর কুলগুরু অর্থাৎ কৌলগুরু-পরম্পরার কথা যদি বলেন, তাহলে
শুনুন—আর্য্যকৃষ্টির রক্ষক সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পুরোহিত রঘুবংশের
কৌলগুরু ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠদেব শ্রীরামচন্দ্রকে ‘‘ওঁ নারায়ণঃ পরাবেদা
নারায়ণঃ পরাক্ষরঃ।/নারায়ণঃ পরামুক্তি নারায়ণঃ পরাগতিঃ॥’’ মন্ত্রে
স্বস্তিবাচন করার সময় শ্রীরামচন্দ্রের মধ্যে পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণকে
উপলব্ধি করলে তিনি নারায়ণের পরিবর্তে রামচন্দ্র শব্দ বসিয়ে মন্ত্রটিকে
পরিমার্জিত করেন। নররূপী নারায়ণ পুরুষোত্তম রামচন্দ্রকে কেন্দ্র করে
সবাইকে ধর্ম পালন করতে উদ্বুদ্ধ করলেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর
বললেন—-গুরু মানেই সদগুরু–আচার্য্য। গুরু-পুরুষোত্তমই সচ্চিদানন্দের
মূর্ত্ত বিগ্রহ, তিনিই রূপায়িত ঈশ্বর প্রেরণা, তিনিই আত্মিক শক্তির
প্রোজ্জ্বল প্রকাশ, অস্তিবৃদ্ধির পরম অমৃতপথ। দুনিয়ার যত দ্বন্দ্বের মাঝে
অন্বয়ী সার্থকতার সারকেন্দ্র তিনিই। তাঁকে ভালবেসে, তাঁর ইচ্ছা পরিপূরণ
ক’রে, তদনুগ আত্মনিয়ন্ত্রণে, তাঁরই সঙ্গ, সাহচর্য্য ও সেবার ভিতর-দিয়ে
মানুষ ঈশীস্পর্শ লাভে ধন্য হয়। আর গুরু-পুরুষোত্তমকে direct (সরাসরি)
যারা না পায়, তারা তঁদনুবর্ত্তী আচার্য্য-পরম্পরার ভিতর দিয়ে তাঁর ভাবটাই
কিছু না কিছু পায়।…….. (আঃ প্রঃ ১/৪. ১২. ১৯৪১)তাঁর অবর্তমানে তাঁর আদর্শের ধারার প্রবহমানতা রক্ষা করার জন্যতঁদনুবর্ত্তী আচার্য্য-পরম্পরা বজায় রাখতে আচার্য্য হবার যোগ্যতাও
নির্ধারণ করে বাণী দিলেন।
‘‘চরিত্র ও চর্য্যার
নিষ্ঠা-বিনায়িত ইষ্টার্থবাহী
বাস্তব সঙ্গতিশীল
সার্থক অনুচলন যা’র নাই—
বাক্য ও ব্যবহারে উদ্ভিন্ন হ’য়ে,—
সে কিন্তু আচার্য্য হ’তে পারে না ;
আচার্য্য হওয়ার ন্যূনতম ভূমিই এই। ১৯ ।’’ (আদর্শ-বিনায়ক)
উপরোক্ত বাণীতে কোথাও কি তাঁর বংশধরদের কথা, জ্যেষ্ঠ-পরম্পরার কথা
উল্লেখ করেছেন? তথাপি ওই নিদেশ-বাণীকে যদি আপনাদের আচার্য্যদেব মানতেন
এবং সব্বাইকে মানাতে উৎসাহিত করতেন, তাহলে সৎসঙ্গের নীতি ও আদর্শ নিয়ে এত
দলাদলি, ভেদাভেদ হবার কোন সুযোগই থাকত না। তাঁরা যদি তাঁদের মধ্যে
ঠাকুরত্বকে জাগ্রত রাখার সদিচ্ছা পোষণ করতেন, তাহলে ইষ্টগুরু পুরুষোত্তম
প্রদত্ত নিত্যকর্মের আবশ্যিক অনুশাসন, যেমন আহ্বানী, আচমণ, পুরুষোত্তম
বন্দনা, আর্য্য-সন্ধ্যা, পঞ্চবর্হিঃ ও সপ্তার্চ্চিঃ মন্ত্রগুলো
প্রার্থনা থেকে বাদ দিয়ে ‘প্রার্থনা-সময়সূচী’-র প্রচার করে নিত্য
প্রার্থনা নামের পরাকাষ্ঠা দেখাতেন না। ঠাকুরের রচিত ইষ্টভৃতির মন্ত্র
“ইষ্টভৃতির্ময়াদেব কৃতা প্রীতৈ তব প্রভো। ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু
পারিপার্শ্বিকাঃ॥” বাদ দিয়ে অন্য মন্ত্র চালু করা হতো না! এ বিষয়েও তিনি
আমাদের সচেতন করে দিতে বলে গেছেন—
মতবাদ যাই হোক না,—
আর, যে-কোন সম্প্রদায়ই হোক,
যা’ মুখ্যতঃ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’কে
স্বীকার করেনিকো—
কোন-না-কোন রকমে,—
তা’ কখনও অনুসরণ করতে যেও না,
তা’ কিন্তু জঘন্য—অসম্পূর্ণ,
সত্তা-সম্বর্দ্ধনার পরিপন্থী তা’ ;
আর, ঐ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’ই হ’চ্ছে
সেই রাজপথ—
যা’কে স্বীকার ও গ্রহণ ক’রে চললে
ক্রমশঃই তুমি সার্থকতায় সমুন্নত হ’তে পার। ২৩৪ । (সম্বিতী)
ওই বাণী অনুসারে আপনারা জঘন্য পথে চলছেন চলুন। তাই বলে আমাকেও কি
চলতে হবে? দেখুন দাদা, ঠাকুরের বলা বাণীকে অমান্য করে, ঠাকুর-বিরোধী চলনে
চলার অধিকার আপনার বা আপনাদের যেমন আছে, তেমনি মান্য করার অধিকার তো
আমার থাকা উচিত। তাই আমার একটা অনুরোধ আপনাদের বিচারে কোন গোষ্ঠীদ্বারা
ঘোষিত বা নির্বাচিত আচার্য্যদেব(গণ) যদি সবই হয়, তাঁরাই যদি আপনাদের
একমাত্র উপাস্য হয়, তাহলে শ্রীশ্রীঠাকুরের নাম না নিয়ে, তাঁর প্রতিকৃতি
না রেখে, আপনাদের আচার্য্যদেবের প্রতিকৃতির উপাসনা করুন,—আমার কোন
আপত্তি নেই, কিন্তু ঠাকুরের নামে মন্দির করে, ঠাকুরবাড়ি নাম দিয়ে ঠাকুরের
আদর্শবিরোধী চলনে চলতে দেখলে প্রতিবাদ হবেই। আমরা শ্রীশ্রীঠাকুরের
কৃষ্টিসন্তান, আমাদের উপর তিনি কাতর আবেদনে কিছু দায়িত্ব দিয়ে গেছেন—
‘‘আর্য্যকৃষ্টির যা’ ব্যাঘাত
খড়্গে তোরা কর নিপাত। ভণ্ড ঠগী দেখবে যেথায়
করো সামাল সবায়,
কেউ যেন না ঠকে পড়ে
ওদের ভাঁওতায়।’’
‘‘বড়খোকাই হো’ক—, মণিই হো’ক—বা কাজলই হো’ক— বা আপনারাই
হোন— আপনাদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই আমি আশা করি যে আপনারা নিজেদের
জীবনে ও চরিত্রে আমাকে বহন ক’রে নিয়ে বেড়াবেন এবং অন্যের কাছেও আমাকে
পৌঁছে দেবেন—অবিকৃতভাবে, অবশ্য প্রত্যেকে তার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী। আর
আমাকে বহন করা ও পৌঁছে দেওয়া মানে, আমার mission (আদর্শ ও উদ্দ্যেশ্য)-কে
বহন করা ও পৌঁছে দেওয়া, আর আমার mission (আদর্শ ও উদ্দেশ্য) মানে সকলের
mission (আদর্শ ও উদ্দেশ্য)। জীবনীয় প্রতিটি যা’-কিছুর ইষ্টানুগ
সত্তাসম্বর্দ্বনাই আমার mission (আদর্শ ও উদ্দেশ্য)।’’ (আ. প্র. ৩/১৭. ১.
১৯৪২)
‘‘মানুষ, গোরু, পোকা-মাকড়, এমনকি একটা পিঁপড়া পর্য্যন্ত বাঁচতে
চায়। মরতে চায় না কেউ। আমিও না। কিন্তু মানুষের শরীর চিরকাল থাকে না, এও
ঠিক। তাই আমি বেঁচে থাকতে চাই আপনাদের মধ্যে। আপনারাই আমাকে ব’য়ে নিয়ে
বেড়াবেন যুগ যুগ ধরে, ………….. আমাকে এইভাবে বাঁচিয়ে রাখার
দায়িত্ব আপনারা গ্রহণ করুন। নইলে আমার কথাগুলি প্রাণ পাবে না। সেগুলি
শূন্যে হাহাকার করে ফিরবে।’’ (আ. প্র. খণ্ড ১৮, পৃঃ ২৫০)
এবার আমার প্রশ্ন, আপনাদের আচার্য্যদেব শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ
পালনের মৌলিক ব্যাপারটা তো বিকৃত করে রেখেছেনই, আদর্শ প্রচারের জন্য কি
কি করেছেন?
—কেন, কত মন্দির তৈরি করেছেন, গণদীক্ষা দেওয়া চলছে।
— ঠিক বলেছেন, মন্দির অবশ্যই হয়েছে বা হচ্ছে তা’ কিন্তু ঠাকুরের
ঈপ্সিত মন্দির নয়, আপনাদের আচার্যদেবদের ঈপ্সিত।
—এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত কোন প্রামাণ্য তথ্য দেখাতে পারবেন?
—তাহলে মনোযোগ দিয়ে শুনুন—মন্দির, শ্রীমন্দির ও সৎসঙ্গ
বিহার-এর গঠনতন্ত্র প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন—‘‘সব
মন্দিরই শ্রীমন্দির। জায়গায় জায়গায় মন্দির বা সৎসঙ্গ বিহার ঠিক করা ভাল,
যাতে লোকে meet (সাক্ষাৎ) করতে পারে। সেখান থেকে মানুষকে সবভাবে infuse
(উদ্বুদ্ধ) করতে হবে। ধর্ম্ম কী, কৃষ্টি কী, সদাচার কী, বিবাহের নীতি
কী, যোগ্যতার অনুশীলন কিভাবে করতে হয়, সেবানুচর্য্যার ভিতর দিয়ে সবাই
পারস্পরিকভাবে সম্বন্ধান্বিত হয় কিভাবে ইত্যাদি কথা সেখান থেকে চারাতে
হবে। মানুষকে practically educated (বাস্তবভাবে শিক্ষিত) করে তুলতে হবে।
তাছাড়া মানুষের জন্য যতখানি যা করা যায় তাও বাস্তবভাবে করতে হবে
মন্দিরগুলিকে কেন্দ্র করে। মন্দির থাকলে, ঋত্বিক থাকবে, dispensary
(চিকিৎসাকেন্দ্র), হাসপাতাল, গবেষণাগার, তপোবনের শাখা ইত্যাদি থাকবে।
হয়তো ঐ মন্দিরগুলিই এক একটা university (বিশ্ববিদ্যালয়) বা সর্ব্বতোমুখী
শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।’’ (আলোচনা-প্রসঙ্গে, ২১ খণ্ড, পৃঃ ৩১, ৪ঠা
বৈশাখ, ১৩৫৯, বৃহস্পতিবার, ইং ১৭-০৪-১৯৫২) এই বইটাও কিন্তু আপনারা
প্রকাশ করেছেন। এবার বলুন কি বলবেন, ঠাকুরের ঈপ্সিত মন্দির আপনারা কোথায়
কোথায় করেছেন?
অনিমেষদার প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারলেন না সুভাসদা।
তাই কিছুক্ষণ থেমে অনিমেষদাই বললেন, দেখুন দাদা, শ্রীশ্রীঠাকুর
মূলতঃ মানবদেহটাকেই শ্রীবিগ্রহ মন্দির করে গড়ে তুলতে বলেছেন। আমাদের
মনগড়া মন্দির-নির্মাণ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন—‘‘আমার নামে দেখবে
অনেক মন্দির হবে | কিন্তু আমার ইচ্ছা করে তোমাদের হৃদয়টা, চলমান জীবনটা
আমার জাগ্রত মন্দির হোক | এবং আমাকে তোমরা সর্বত্র বয়ে নিয়ে বেড়াও | ধর্ম
মানুষের জীবনের মধ্যে না থাকলে, আচরণের মধ্যে না থাকলে, ধর্মসঙ্ঘ থাকা
সত্ত্বেও ধর্ম লোপ পায় | এবার সে ব্যাপারটা ঘটতে দিও না | আমার কথাগুলি
মনে রেখো | এবং আমার কথাগুলি পৃথিবীর লোকে যাতে জানতে পারে, সময়মত তার
ব্যবস্থা ক’রে যেও | কে কখন উপযুক্ত লোক আসবে, ঠিক কি? তবে আমার কাজটা
হ’লো ঈশ্বরকোটি পুরুষের কাজ | যুগে যুগে তারা আসে | ঈশ্বর ছাড়া আর কিছুই
তাদের মজাতে পারে না |’’
‘‘আমি নগণ্য মানুষ, কিন্তু পরমপিতা আমাকে দিয়ে যা বলালেন, যা
করালেন, মনুষ্যসমাজ তার উপর না দাঁড়ালে, সব জ্ঞানগুণ সত্ত্বেও পৃথিবী
মারামারি, হানাহানি, কাটাকাটির হাত থেকে রেহাই পাবে না। মানুষের সব শক্তি
নিয়োজিত হবে সপরিবেশ আত্মহননে এবং জীবনের ভিত্তিভূমির ধ্বংসসাধনে। আমার
বিশ্বাস, তোমরা যদি না কর, হয়ত বাইরের লোক এসে এ কাজ করবে। তোমরা যেই হও
আর যাই হও না, বিকৃত হ’লে এ কাজ করবার অধিকার ও
যোগ্যতা হারিয়ে ফেলবে। কামিনী-কাঞ্চনাসক্ত কতকগুলি ওঁছা লোক তোমাদের কাছে
ভীড় জমাবে এবং আত্মস্বার্থের জন্য পরস্পর শকুনের মত কামড়াকামড়ি করবে।
সৎসঙ্গে একদিন বৃষ্টির জলের মত টাকাবৃষ্টি হবে। সেই দিনই সৎসঙ্গের
বিপদের দিন। ঐশ্বর্য ও ক্ষমতায় মাথা ঠিক থাকে খুব কম লোকেরই। যারা মনে
করে ঐশ্বর্য্য ও শক্তি পরমপিতার, তিনিই মালিক, আমি এর
অছিমাত্র, কাজলের ঘরে থাকা সত্ত্বেও তাদের গায়ে কালি লাগে না। নইলে মুস্কিল আছে।’’
(‘আলোচনা-প্রসঙ্গে’-র সংকলক প্রফুল্ল কুমার দাস, এম.এ, প্রতি-ঋত্বিক প্রণীত
‘স্মৃতি-তীর্থে’ গ্রন্থের পৃষ্ঠা ১০২-১০৫ থেকে নির্বাচিত বাণী।)
শ্রীশ্রীঠাকুরকে যদি মেনেই থাকেন তাহলে ঠাকুরের নিদেশ মেনে চলা
উচিত। তাহলে কোন্ নিদেশ মেনে আপনাদের আচার্য্যদেব(গণ) ঠাকুরের নামে একের
পর এক মন্দির নির্মাণ করে ইষ্ট প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে আত্ম প্রতিষ্ঠা করে
চলেছেন!—এর কি উত্তর দেবেন বলুন?
আর গণদীক্ষার কথা বলেছিলেন তো? তাহলে শুনুন—ঠাকুরের মতে, দীক্ষা
হলো, কোন আদর্শকে সঞ্চারণা করার মাধ্যম। ঠাকুরের মূল আদর্শ—ঈশ্বর এক,
ধর্ম এক, প্রেরিত-পুরুষ সেই এক-এরই বার্তাবাহী-র বার্তায় সবাইকে উদ্বুদ্ধ
করা। দীক্ষার মাধ্যমে নাম-ধ্যান, শবাসন, থানকুনি পাতা সেবন, সত্তাপোষণী
নিরামিষ আহার গ্রহণ, পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চিঃ-র অনুশাসন মেনে সদাচার
এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন যাপন বিষয়ে উপদেশ দান এবং নিয়মনাগুলো শিখিয়ে
দেওয়া। ওই নিয়মনাকে স্বীকৃতি দান করার মাধ্যম হল ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ
পালন—যা দীক্ষাপত্রে উল্লেখ থাকে। এর জন্য কম করে ৩০ মিনিট সময় লাগা
উচিত। অথচ গণদীক্ষার নামে যে ভাবে, যে হারে দীক্ষা দেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে
তা নিয়ে একটা কর্মশালার মাধ্যমে সমীক্ষা চালালেই দেখা যাবে, তথাকথিত
বেশিরভাগ দীক্ষিতগণ, ইষ্টাসনে একাধিক ফটো রেখে তার সামনে বসে বিনতি করা
(যদিও তা’ সংখ্যায় নগণ্য), ইষ্টভৃতি এবং আচার্য্যভৃতির নামে পয়সা রাখা
এবং মাস গেলে ‘উপযোজনা কেন্দ্রে’ পৌঁছে দেওয়া ভিন্ন কিছুই তারা জানে না।
শ্রীশ্রীঠাকুরের জীবদ্দশায় একসাথে শতাধিক লোককে বসিয়ে দীক্ষা দান
করার কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনার কথা জানা যায় নি। তৎকালিন ঋত্বিক দেবতারাও
ছিলেন শ্রদ্ধা আকর্ষণী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তথাপিও শ্রীশ্রীঠাকুরকে
আক্ষেপ করে বলতে হয়েছিল, —‘‘বৃত্তিতে তেল মালিশ করে বা
স্বার্থপ্রত্যাশাকে উসকে দিয়ে মানুষকে দীক্ষিত করতে নেই। তা’তে মানুষ
asset (সম্পদ) হয় না।’’ (আ. প্র. ৫ম খন্ড, ২৯. ১২. ১৯৪৩)
—‘‘দ্যাখেন, (বীরেন ভট্টাচার্য্যের প্রতি) আজকাল আপনারা কতলোক
দীক্ষা দিচ্ছেন, কিন্তু তার বেশীরভাগই বাজারী। ……ধর্ম্ম বলতে আমি যে
সর্ব্বতোমুখী সঙ্গতিশীল কেন্দ্রানুগ কর্ম্মময় সার্থক জীবনের কথা বলি, তা
অনেকেরই মাথায় ঢোকে না। ভাবে, আমাকে দিয়ে পরকালের পথ করে নেবে। কিন্তু
পরিবার, দেশ, সমাজ, জাতি ও জগতকে …..দুনিয়াটাকে স্বর্গ করে তুলবে সে
কথা আর ভাবে না।’’ (আলোচনা প্রসঙ্গে ৩য় খণ্ড, ১৩ই চৈত্র, শনিবার, ১৩৪৮,
ইং ২৮। ৩। ১৯৪২)
পরিবার, দেশ, সমাজ, জাতি ও জগতকে …..দুনিয়াটাকে স্বর্গ করে
তোলার জন্য একদা দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রম থেকে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল,
আলোচনা পত্রিকার, মাঘ সংখ্যার, ১৫০ পৃষ্ঠা থেকে তার একটা ক্ষুদ্র চিত্র
তুলে ধরছি।
“সৎসঙ্গের বর্তমান সর্বপ্রধান লক্ষ্যবস্তু হইল বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার,
দেশীয় ঔষধপত্র প্রস্তুতের রসায়ণাগার ও কারখানা, হাসপাতাল, প্রসূতিসদন,
বালক-বালিকাদের শিক্ষার জন্য উচ্চ বিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্র,
কুটির-শিল্প ভবন, কৃষিপরীক্ষা-ক্ষেত্র প্রভৃতি স্থাপন পূর্বক পাবনার
ন্যায় একটি আদর্শ পল্লী-উন্নযন কেন্দ্রের পুণঃ প্রতিষ্ঠা করা। প্রসঙ্গতঃ
ইহা উল্লেখযোগ্য যে, অতীতের সেই পাবনা-সৎসঙ্গ পল্লী সংগঠনের উজ্জল
আদর্শরূপে অদ্যাপি সারা ভারতে প্রসিদ্ধ হইয়া আছে. আর শুধুমাত্র বিহারেই
নয়, পরন্তু ভারতের সকল প্রদেশেই এইরূপ আদর্শ কেন্দ্র স্থাপন করাই
সৎসঙ্গের অভিলাষ।
শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি আবাসিক পল্লী-বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন
পূর্বক শ্রীশ্রীঠাকুরের পরিকল্পনাগুলির বাস্তব রূপায়নের উচ্চাকাঙ্খাও
সৎসঙ্গ পোষণ করিয়া চলিয়াছে।……” (আলোচনা, মাঘ, ১৩৬৫/পৃঃ ১৫০)
উক্ত দলিল থেকে প্রাপ্ত সংবাদে এটুকু বোঝা গেল যে, পাবনার হিমাইতপুর
আশ্রমে শ্রীশ্রীঠাকুর যথেষ্ট প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে যে-সব
কর্ম-প্রতিষ্ঠানসমূহ গড়ে তুলেছিলেন, তদনুরূপ কেন্দ্র ভারতের প্রতিটি
প্রদেশে স্থাপন করা হবে। এবং একটি শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা
হবে,—যা শ্রীশ্রীঠাকুরের এক অন্যতম ইচ্ছা।
এবার দেখে নেওয়া যাক পাবনার হিমাইতপুর-আশ্রমের কর্ম-প্রতিষ্ঠানসমূহের এক
সংক্ষিপ্ত বিবরণ।
অখ্যাত পল্লী হিমায়েতপুরে বায়ু থেকে বিদ্যুত উত্পাদন করে পরম বিস্ময়
সৃষ্টি করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। গড়ে তুলেছিলেন—তপোবন ও মাতৃ বিদ্যালয়—যা
শিক্ষাক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত মনোমোহিনী ইনষ্টিউট অফ সায়েন্স এণ্ড টেকনোলজি
নামের বিজ্ঞান কলেজ। কেমিক্যাল ওয়ার্কসের জীবনদায়ী ঔষধসমূহ দেশে এবং
বিদেশে সমাদৃত হয়েছিল।
বৈদ্যুতিক এবং যন্ত্রশিল্পের আধুনিক সব ধরণের কাজ হতো ইলেকট্রিকাল ও
মেকানিক্যাল ওয়ার্কসপে। যথা,–ঢালাই, ঝালাই, লেদের কাজ, ডাইস,
ইলেক্ট্রোপ্লেটিং, ইলেক্ট্রিক্যাল ফিটিং, আরমেচার, ব্যাটারি প্লেট তৈরি ও
মেরামত, ডায়নামো মেরামত ইত্যাদি। ছিল—ময়দার কল, আটার কল, চালের কল, তেলের
কল, চিনির কল, মেডিকেটেড ওয়াটার মেশিন, স্পাইস পাউডারিং, সুতার গুটি
তৈরি, টেলারিং, বোতাম তৈরি, গ্লাস ব্লোয়িং, পটারী ওয়ার্কস্, বেকারী,
লজেন্স তৈরি, গ্রোসারী প্রোডাক্ট ইত্যাদির শিল্প। ছিল—কার্ডবোর্ড
কারখানা, স্টীমলণ্ড্রী, কটন ইণ্ডাস্ট্রিজ, হোশিয়ারী শিল্প, ব্যাঙ্ক,
ইঞ্জিনীয়ারিং ওয়ার্কস্, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র, স্বাস্থ্য বিভাগ,
গৃহনির্মাণ বিভাগ, কলাকেন্দ্র, প্রেস (যেখানে বাংলা, হিন্দী, সংস্কৃত,
উর্দু, আরবী, ফারসী হরফের কাজ হতো, দেশ ভাগের পর পাকিস্তান সরকার জবরদখল
করে ঢাকাতে নিয়ে যায়।), পাব্লিশিং হাউস, ফিলানথ্রপি, মাতৃসঙ্ঘ ইত্যাদি।
(তথ্যসূত্রঃ ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনী গ্রন্থ)
শুধু আশ্রমবাসীরাই নয়, জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায়-ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে সকলেই
ওইসব প্রতিষ্ঠানের সুলভ সেবা পেতেন। তথাপিও পাকিস্তান সরকার ওই সর্বজনীন
কল্যাণধর্মী প্রতিষ্ঠানসমূহ দখল করে কেন বিনষ্ট করেছিলেন তার উত্তর আমার
জানা নেই।
যেমন জানা নেই, আলোচনা পত্রিকাতে বর্ণিত শ্রীশ্রীঠাকুরের একান্ত
ইচ্ছাগুলোর বাস্তবায়ন দেওঘর সৎসঙ্গ কর্তৃপক্ষ করেছেন কি-না। যদি করে
থাকেন কোথায় করেছেন, তার উদাহরণ দিন। ওই ইষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দেখার পর
আপনার সাথে গলা মিলিয়ে ‘আচার্য্যদেব কি! —জয়!’ ধ্বনি দিয়ে মানব
জীবনটাকে ধন্য করব। না, না, আপনার এক্ষুনি জানাতে হবে না, আপনাকে এক মাস
সময় দিচ্ছি। আশাকরি এই সময়ের মধ্যে আপনি সব তথ্য সংগ্রহ করে আমাকে
জানাতে পারবেন। আর যদি অনিবার্য্য কোন কারণে জানাতে না পারেন, তাহলে
পরমপিতার একটা ভয়াল বাণী শুনে নিন।
সবাই ক্ষমা পাবে—
তা’ তা’রা যেমনতর অপরাধেই
অপরাধী হোক না কেন,
কিন্তু ক্ষমা পাবে না তারাই—
যা’রা পবিত্র সত্তাকে
অবমানিত করে,
অবলাঞ্ছিত করে,
—তা’ কখনও নয়।
(ধৃতি-বিধায়না, ২য় খণ্ড, বাণী সংখ্যা ১১৬) * * *
যদিও অনিমেষদা, সুভাসদাকে কথাগুলো বলেছিলেন। তবুও কেন জানি আমার ভয়
ভয় করছে। দেওঘরের আচার্য্যদেবদের পাল্লায় পড়ে এ কোন্ বিপদে আবার পড়লাম!
আমার আবার কিছু হবে না তো! আমি ক্ষমা পাব তো ? হে দয়াল! তুমি রক্ষা কোরো।


tapanspr@gmail.com












