৭৯তম স্বাধীনতা দিবসের শ্রদ্ধাঞ্জলি

।। ভারতবর্ষের ৭৯তম স্বাধীনতা দিবসের ভাবনা ।।
^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^
একদিকে সমুদ্র, আর একদিকে হিমালয় পর্বতমালা দ্বারা বেষ্টিত, গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, দৃষদ্বতীর পূত-পবিত্র বারিধারায় বিধৌত ভূখণ্ড বৃহত্তর আর্যাবর্তের পবিত্র আশ্রম-ধর্মানুগ অনুশাসিত ভারতবর্ষ নামক জনপদ তাঁর স্বকীয় সত্তার স্বাধীনতা কেন শক-হুন-পাঠান-মোগল-ইংরেজ প্রমুখ নামের আগ্রাসীদের দ্বারা বিপন্ন হয়েছিল, তা’ নিয়ে অনেকানেক মতবাদ থাকলেও শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতে ঋষির অনুশাসন অনুশীলন বাদ দিয়ে অমূর্ত আদর্শকে অসীম জ্ঞানে উপাসনা করার কারণে আমরা আমাদের সত্তাকে বিসর্জন দিয়েছি।
অবশেষে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের রক্তক্ষয়ী আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আমরা ফিরে পাই খণ্ডিত স্বাধীনতা ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই আগস্ট, আনুষ্ঠানিকভাবে। অনেক ওঠাপড়া টানাপোড়েন সাথে নিয়ে ৭৮টি বছর পাড়ি দিয়ে ৭৯তম বছরে পদার্পণ করল আমাদের গণ প্রজাতন্ত্রী ভারত রাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস। সেই সূত্রে গণপ্রজাতন্ত্রী আধুনিক ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ধর্মকে রক্ষা করে চলার কর্তব্যকে। রাষ্ট্রীয় মন্ত্র 'সত্যমেব জয়তে' স্মরণ করিয়ে দেয় উপনিষদীয় আচার্য অনুসরণের শাশ্বত অবলম্বনকে স্মরণ করিয়ে দেয় "আত্মবৎ সর্বভূতেষু মাতৃবৎ পরদারেষু, লোষ্ট্রবৎ পরদ্রব্যেষু....."-এর আদর্শের কথা। রাষ্ট্রের কর্ণধার রাষ্ট্রপতিসহ মন্ত্রীবর্গ প্রত্যেকেই ঈশ্বরের নামে শপথ গ্রহণ করে ঈশ্বরসৃষ্ট জীবগণের কল্যাণ সাধনে ব্রতী হয়। ঈশ্বরের প্রতিভূস্বরূপ জাগতিক ন্যায়দণ্ডধারী বিচারকেরা ধর্মাধিকরণ নামে চিহ্নিত। বিচারালয়কে বলা হয় ধর্মস্থান। তথাপি স্বাধীনতা দিবসের দিনেও প্রাণী-হত্যার ছাড়পত্র কেন নিরীহ প্রাণীগুলোর সুস্থভাবে বেঁচে থাকার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষ !---এ প্রশ্নের জবাব দেবে কে?

স্বাধীনতা মানে সু-এর অধীনতা, সত্তার অধীনতা। স্বাধীন যে, সে কখনোই স্বেচ্ছাচারী হয়ে কোন সত্তাবিধ্বংসী অসৎ কাজ তো করবেই না বরং সে অসৎ নিরোধে তৎপর হবে। মানুষ যখন প্রবৃত্তির অধীনতা থেকে মুক্তি পেতে পরমপিতাকে আশ্রয় করে বিবেককে অবলম্বন করে চলতে শেখে তখনই সে প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করে। তখন সে অন্যায়, অধর্ম, দুর্নীতি, ভ্রষ্টাচারকে আশ্রয় করে “সত্যমেব জয়তে”র সীলমোহরের দখল নিতে চাইবে না, উৎকোচ নিয়ে ন্যায়কে অন্যায়, অন্যায়কে ন্যায় বানাবার জন্য “সত্যমেব জয়তে”র সীলমোহরের ব্যবহার করবে না। অসৎ বলে ওগুলোকে ঘৃণা করবে। মেয়েদের মাতৃভাবে দেখবে। কামনার বস্তু রূপে নয়। নারীরা নির্যাতনের শিকার হবে না। কি ঘরে কি বাইরে, কোন অসতের সাথে অন্যায়ের সাথে আপোষ করবে না।

ভারতীয় অনুশাসনের সাম, দান, ন্যায়, দণ্ড, নীতি ও ভেদ-এর রাজধর্ম রক্ষার পবিত্র কর্তব্যে যাতে এতটুকু অন্যায়, অধর্ম প্রবেশ করতে না পারে তার জন্যই ওইসব মহাভারতীয় নীতির অনুসরণ। বিধিবৎ প্রকৃষ্ট-জাতক সৃষ্টি করে প্রজা পালনের স্বার্থেই ওই অনুশাসনকে আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি। তথাপি যখন ভারতীয় শাসন সংহিতা বা সংবিধান ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ না করে, ধর্ম এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়কে এক করে ফেলে ‘ধর্ম-নিরপেক্ষতাবাদ’ –অর্থাৎ রাষ্ট্র ধর্মের অনুবর্তী নয়’-এর মতবাদকে প্রতিষ্ঠা দেয়, তখন কি মনে হয় না, আমরা জাতীয়তাবাদের আদর্শের প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েও এক পরস্পর বিরোধী আচরণ করে চলেছি।

বর্তমান যুগ-পুরুষোত্তম কথিত ধর্মের যুগান্তকারী সংজ্ঞা ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম বলে জানিস তাকে। ধর্মে সবাই বাঁচে বাড়ে/ সম্প্রদায়টা ধর্ম না-রে। সমন্বয় বার্তাবহ বাণীকে গুরুত্ব না দিয়ে ধর্মের নামে ভারতীয় সংহিতার নীতি বহির্ভূত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তি পরায়ণতার আস্ফালনকে, কতগুলো অনিত্য, অসার, পৌত্তলিক কু-সংস্কারকে যদি ‘ধর্ম’ নামে প্রতিষ্ঠা দিতে চাই, তা’ কি বিচক্ষণতার পরিচায়ক হবে, না ভারতবর্ষের কৃষ্টির পরিপুরক হবে? ওই ভুলের বোঝা কি আমাদের চিরদিন বইতে হবে? আমাদের বুদ্ধি বোধ কি নিরেটই থেকে যাবে?

যে নীতি-বিধি পদার্থের অস্তিত্ব রক্ষার সহায়ক তাই তো ধর্ম। পদার্থের স্বকীয়তা ধারণ করে রাখার সহায়ক যা’ তাই ধর্ম। ধর্ম পালন করলেই পদার্থ টিঁকে থাকবে, নচেৎ থাকবে না। সংসদ প্রকাশিত ইংরেজী অভিধানে ধর্মের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘It is an action, one is bound to do.’ সেই ধর্মের আবার পক্ষ আর নিরপেক্ষ কি? বেঁচে থাকার অজৈব উপকরণ বায়ু জল মাটি ইত্যাদির যদি
ধর্ম থাকতে পারে এবং তা যদি বিজ্ঞানের বইতে পাঠ্য হতে পারে, তাহলে মানুষের অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার নীতিবিধি-সমন্বিত ভারতের নিজস্ব সংহিতাগুলোর বিধানসমূহ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের সংহিতায় স্থান পাবে না কেন, প্রজাদের শিক্ষা দিতে পাঠ্য করা হবে না কেন? রাষ্ট্রের সৃষ্টিই তো প্রজাদের অধর্ম বা দুর্নীতি থেকে মুক্ত করে ধার্মিক, অর্থাৎ সু-নীতি পরায়ণ করে তোলার জন্য। সেই রাষ্ট্র যদি তার প্রজাবর্গকে, তাদের পিতৃ-পিতামহের আদর্শ অনুসারী ধর্ম-পরায়ণ, কৃষ্টি-পরায়ণ হতে উৎসাহ না দিয়ে, প্রবৃত্তি পরায়ণতায় উৎসাহ দেয়, সেটা ভারতবর্ষের জাতীয় উত্তরাধিকারত্বের অস্তিত্বকে বিপন্ন করার বার্তা ভিন্ন আর কিছু নয়। আর্য্য ভারতবর্ষের আদি সংবিধান ব্রহ্মসূত্র'-এর নবীন সংস্করণ 'কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র'

অনুযায়ী— “সুখস্য মূলম্ ধৰ্ম্মম্ / ধৰ্ম্মস্য মূলম্ অর্থম্ / অর্থস্য মূলম্ রাষ্ট্রম্ / রাষ্ট্রস্য মূলম্ ইন্দ্রিয় বিজয়ম্ / ইন্দ্রিয় বিজয়স্য মূলম্ জ্ঞানবৃদ্ধ সেবয়া / জ্ঞানবৃদ্ধ সেবয়া বিজ্ঞানম্।”
—অর্থাৎ সুখী হতে হলে ধর্ম পালন করতে হবে। প্রকৃত ধার্মিক হতে হলে পুরুষার্থের চতুর্বর্গ সমন্বিত আশ্রমধর্ম পালন করতে হবে। নির্বিঘ্নে আশ্রমধর্ম পালন করার জন্য রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী প্রজাদের দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী হবার জন্য গুরু গ্রহণ করতে হবে। গুরুর আদেশ-নির্দেশ পালন করলে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করা যাবে। জীবনের অনুসঙ্গ ত্রিতাপ-জ্বালা প্রতিহত করে জীবনে সুখী হওয়া যাবে। সত্তার অধীন হয়ে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হওয়া যাবে।
———

কমন সেন্স

** ইষ্টভৃতি মানে ইষ্ট নীতির ভরণ।
ইষ্ট ভরণ পিতৃপোষণ
পরিস্থিতির উন্নয়ন
এই না করে
যাই না করিস
অধঃপাতেই তোর চলন। **
**********************
কমন সেন্স
নিবেদনে — তপন দাস
**********************
পরম কারুণিক ঈশ্বর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষকে সবকিছু দিয়ে পূর্ণরূপে তৈরি করেছেন, স্বাধিকার দিয়েছেন। যা দিয়ে মানুষ ইচ্ছে করলে মরতে পারে, মারতে পারে, আবার বাঁচতে পারে, বাঁচাতেও পারে। আমরা কোন কারণে যদি একটু ভুল করে বসি, সাথে সাথে আমাদের অভিভাবকেরা, প্রিয়জনেরা, বন্ধুবান্ধবেরা উপদেশ দিয়ে বলতে সুরু করে দেবেন, তুমি একটু কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করতে পারলে না! অবশ্য যারা এই কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করতে বলেন, তারাও অ্যাপ্লাই করতে গিয়ে কেন জানি বেসামাল হয়ে পড়েন। নইলে সুস্থভাবে বাঁচার জন্য, আহার, নিদ্রা,  অপত্যোৎপাদনের জৈবধর্ম পালন করতে এত কেরামতি করতে হয়। আমরা যদি জৈবিক তাগিদগুলোকে ওই কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম তাহলে তো স্বর্গে অর্থাৎ সুখে বাস করতে পারতাম। এত দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করতে হতো না।  যেমন, বাঁচতে হলে খেতে হয়, সেই খাওয়াটা যদি সত্তাপোষণী না হয়ে প্রবৃত্তিপোষণী হয় তাহলে অসুখ হবেই। সাধারণভাবে সিদ্ধ ভাত খেয়েও তৃপ্তির ঢেকুর তোলা যায়, আবার পাঁচতারা হোটেলের দামী খাবার খেয়ে অতৃপ্তির ঢেকুর তুলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। এ বিষয়ে ঠাকুর বেশ সাবধানী ছিলেন। আশ্রম পত্তনের প্রথম যুগে, বিদ্বজ্জন ভদ্রলোকদের মানদণ্ডে যা খুবই সাধারণ মানের খাবার—নাম লাবসি, সেই লাবসি একবেলা করে খেয়ে দিনে-রাতে প্রায় আঠার ঘণ্টা পরিশ্রমের কাজ করতেন। ওই নিয়ম মেনে প্রায় আঠার বছর পর্যন্ত  আশ্রমিকদের রোগ-ভোগ-অকালমৃত্যু হয়নি। সেই সময় জনশ্রুতি ছিল, “অনুকূল ঠাকুরের আশ্রমে রোগব্যাধি ঢুকতে ভয় পায়।’’ পরবর্তীকালে ভিটামিন, প্রোটিন ইত্যাদি খাদ্যগুণের দোঁহাই দিয়ে কিছু কর্তা-ব্যক্তিরা ঠাকুরের বিধিকে অমান্য করে আনন্দবাজারে জিভের স্বাদের খাবার পরিবেশন করার ব্যবস্থা করলে আশ্রমিকদের অসুখ-বিসুখ হতে সুরু করে।  
  তাই খাওয়ার ব্যাপারে আমরা যদি ঠাকুরের দেওয়া ‘‘পেটের জন্য জীবন নয়কো,/জীবনের জন্য পেট/তাই জীবন—/পেটকে জীবন্ত করে রাখ।’’ বাণীর  কমন সেন্সটাকে অ্যাপ্লাই করে সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার গ্রহণে অভ্যস্ত হতে  পারি তাহলে আমাদের অভাবও ঘুচে যাবে, অসুখ-বিসুখ থেকেও বেঁচে যাব।

।। অধিক ভোজন প্রসঙ্গে  শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতবাদ ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর—যা’ প্রয়োজন তার চাইতে বেশী খেলেই তো তার চাপ আমাদের Stomach, Nerves, Heart (পেট, স্নায়ু, হৃদয়) ইত্যাদিকে বইতে হবে। কিন্তু আপনি-আমি তো Sperm ও ova–র product (শুক্র ও ডিম্বের ফল)—একটা limited energy (সীমিত শক্তি) নিয়ে জন্মেছি, আর তাই নিয়ে চলেছি। এই life-potency (জীবনীশক্তি)-কেই বলে আয়ু, এই আয়ু যদি অযথা অপব্যয় করি—এ তো ফুরোবেই, শরীর দুর্বল হবেই—তা’ হয়তো বহু পরে টের পাওয়া যায়। পঞ্চাশ বছর বয়সে শরীরের উপর অত্যাচার করা সত্ত্বেও হয়তো আপনার ক্ষতি করে না, ষাট বছর বয়সে আপনি হয়তো দেখবেন আশি বছরে আপনার শরীর যতখানি অপটু ও জীর্ণ হতো, তাই হয়ে গেছে। অনিয়মের effect (ফল) তো আছে। (আলোচনা প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড, ৫ই ভাদ্র, বুধবার, ১৩৪৭, ইং ২১।৮।১৯৪০)

।।  আমিষ-আহারের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক রুচি প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বিধান ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর—ওটাকে বিকৃত রুচিও বলা যায়। একটা মানুষকে হত্যা করলে সে যেমন ব্যথা বোধ করে, একটা জীবকে হত্যা করলে সেও তেমনি করে। জিহ্বার একটু সুখের জন্য আমার মত রক্ত-মাংস-বিশিষ্ট একটা প্রাণীকে মেরে ফেলতে দ্বিধা বোধ করব না, এ কেমন কথা? আমার মনে হয়, প্রত্যেকটি জীবই যেন এক-একটি স্বল্প মানুষ। নরহত্যার কথায় আঁতকে উঠি আর জীব হত্যার বেলায় গায়ে বাধে না, আমাদের বোধবৃত্তি যদি এমনতর প্রবৃত্তি-আবিল, স্থূল, হৃদয়হীন ও সহানুভূতিহীন হয়, তবে প্রবৃত্তি-স্বার্থের খাতিরে প্রয়োজন হ’লে মানুষের উপর আক্রমণ চালাতেও আমাদের আটকাবে না। তাই বলি—না খেলেই হ’লো। ‘Let them enjoy their little day’ (তাদের স্বল্প জীবন তারা ভোগ করুক)। তাদের সুখ-দুঃখ আছে, তারাও ভাল চায়, তাদেরও মন আছে, তাদের কেন কষ্ট দেবে? শুনেছি দুম্বার পাছার দিকে মেদবৃদ্ধি হয়। সেই মাংস কেটে নিলে সে বেশ আরাম পায়। ওতে তার কোন ক্ষতি হয় না। ঐ মাংস খেলে প্রাণী হত্যা হয় না বটে, কিন্তু আমিষ-আহারের কুফল যা’ তা’ ফলতে কসুর করে না। আমি যা’ জানি নিরামিষ আহার শরীর, মন সব দিক-দিয়েই শ্রেয়।  (আঃ প্রঃ ৮ম খণ্ড, ৫.৬.১৯৪৬)

“সদাচারী নয়কো যে জন
ইষ্ট বিহীন রয়,
তাহার হাতে পান ও ভোজন
বিষ বহনই হয় ।”

জীবনকে অমৃতের স্নাতক রূপে গড়ে তুলতে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কথিত অমৃতনিষ্যন্দি স্বরূপ উপরোক্ত বাণীটি মেনে চলা আমাদের একান্ত কর্তব্য । বাণীটির মর্মার্থ হলো এই যে, অসদাচারী লোকের দেওয়া অন্ন এবং পানীয় বিষতুল্য । অতএব গ্রহণ করা যাবে না । শাস্ত্র নির্দেশ মেনে শ্রীশ্রীঠাকুর অভক্ষ্য ভোজী, অগম্যা গামী এবং বহনৈষ্ঠিক যারা (পঞ্চবর্হি এবং সপ্তার্চ্চি অনুসরণ করে চলে না ।) তাদের অসদাচারী বলেছেন । মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুন, মাদকসেবী এবং বর্ণধর্ম অপলাপী, অসত্‍ উপায়ী প্রদত্ত ভোজ্য অভক্ষ্য, অর্থাত্‍ খাওয়া যাবে না ।
ঋতুমতী, মৈথুনে অনিচ্ছুক, শারিরীক এবং মানসিকভাবে অপরিচ্ছন্ন, অপ্রিয় বাদিনী, উচ্চ বয়সের, উচ্চ বর্ণের, উচ্চ বংশের, রোগগ্রস্তা, হীনাঙ্গী, গর্ভিনী, বিদ্বেষী, ঈর্ষা পরায়ণ, হিংসা পরায়ণা স্ত্রীদের অগম্যা বলা হয়েছে ।
খাওয়ার পর ঘুম আর একটা জৈবিক তাগিদ। সেই ঘুম যদি প্রবৃত্তির কবলে পড়ে আমাদের চেতনা কেড়ে নেয় তাহলেও বিপদের সম্ভাবনা।  পুণ্য-পুঁথি গ্রন্থে ঠাকুর যা’কে মরণের সমতুল বলেছেন। আর তাছাড়া স্বতঃ-অনুজ্ঞার প্রতিজ্ঞা ‘চিরচেতন’ পালন না করার জন্য দ্বন্দ্বীবৃত্তিও হয়। ঘুমের বিষয়ে ঠাকুরের স্পষ্ট নিদেশ, ‘‘ঘুমিও তুমি ততটুকুই/অবসাদ না আসে/চেতন থাকাই বর বিধাতার/জড়ত্ব যায় নাশে।’’
শুচিবস্ত্রে পবিত্র বিছানায় শোবার আয়োজন করতে হয়। বিছানায় গা এলিয়ে দেবার পূর্বে নামধ্যানের মাধ্যমে সারাদিনের কাজকর্মের আত্মবিশ্লেষণ করতে হয়। ‘আমি একজন সৎসঙ্গী। দীক্ষা গ্রহণের সাথে সাথে ঘটে-ঘটে ইষ্টস্ফূরণের দায়িত্ব নিয়েছি। আমি কারো সাথে কথার খেলাপ করিনি তো? কোন কপটতার আশ্রয় নিইনি তো?  ঠাকুরের বলা অনুযায়ী অর্থ, মান, যশের আশা ছেড়ে সব্বাইকে ‘ভগবান জ্ঞানে ভালবেসে’  ঠাকুরত্ব প্রাপ্তির গন্তব্যের লক্ষ্যে ঠিক ঠিক চলতে পারছি তো?  আমার দ্বারা সৎ-এ, ইষ্টনীতির সান্নিধ্যে নিরবচ্ছিন্ন সংযুক্ত থাকাটা কতখানি ব্যাহত হলো ? কেন ব্যাহত হলো? ইষ্টভরণ এবং পিতৃপোষণের জন্য সদাচার এবং বর্ণাশ্রম অনুযায়ী চলে, কাউকে পীড়িত না করে, নিজে পীড়িত না হয়ে বর্ণানুগ কর্মের সেবার বিনিময়ে দিন গুজরানী আয় ঠিক ঠিক করতে পারছি তো?  ‘সপ্তার্চ্চি’ এবং ‘পঞ্চবর্হির’ ১২টি নীতি ঠিক ঠিক পালন করতে চেষ্টা করছি তো? আমার আকাঙ্খানদীর স্রোতের ধারার কামিনী-কাঞ্চনের আসক্তি ইষ্ট প্রতিষ্ঠার অনুকূলে সত্তাপোষণী করতে পারছি তো? সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে অন্তরায় যা কিছু  নিয়ন্ত্রণ, সামঞ্জস্য, সমাধান তৎপর থেকে বিরোধহীন দুর্বার নিরোধ করার চেষ্টায় যত্নবান ছিলাম তো? আমার বাক্, ব্যবহার, কর্ম কারো অপ্রীতির কারণ হয়নি তো?’—ইত্যাদি ইত্যাদি ইষ্টপ্রতিষ্ঠামূলক ভাবনাগুলোকে স্মরণ-মনন করতে করতে আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে সারাদিনের কর্মটাকে অন্তর্দেবতা পরমপিতার কাছে জবাবদিহি করে আপডেট করে শুতে পারলে কর্মের বন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হয়।  অজপা নামের নেশাটাকে বাঁচিয়ে রাখতে ঘুমের মধ্যেও নাম জপ করার অভ্যাস করে ফেলতে পারলে স্বতঃ-অনুজ্ঞার  ‘চিরচেতন’ অনুজ্ঞা পালন করা সহজ হয়ে যাবে। আমরা নিদ্রাজয়ী হতে পারব। প্রত্যুষে ‘ঊষার রাগে’ শয্যা ত্যাগ করে শুরু করতে হবে মন্ত্র সাধন, জাগতিক-আধ্যাত্মিক মেলবন্ধনটাকে ঠিক রাখতে। দিনচর্যার কাজকর্মগুলোকে নিখুঁত করার জন্য শ্রীশ্রীঠাকুরেরর এ এক অমোঘ অবদান।  
    
আর এক জৈবিক তাগিদের নাম যৌনজীবন। ওই যৌন জীবনের সিড়ি বেয়ে  একজন পুরুষ  আদর্শ পিতা এবং  একজন নারী আদর্শ মাতার পরিচয় বহন করে সুখ্যাত হতে পারে, আবার কুখ্যাতও হতে পারে । অথচ ওই সিড়ি-চড়ার বিষয়ে আমরা সবচাইতে বেশী উদাসীন। ভাল বাবা হবার জন্য আদর্শ চরিত্র গঠনের দিকে গুরুত্ব না দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করার জন্য যেনতেনপ্রকারেণ টাকা রোজগার করার দিকেই আমাদের ঝোঁক বেশি। টাকার খনির সন্ধান পেয়েও নানারকম অশান্তি, দুঃখ, মনস্তাপ, অবসাদে ভুগতে হয়। থানা, পুলিশ, উকিল, ডাক্তার, রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারস্থ হতে হয়।  আমরা যদি একটু বিচার করে দেখি তাহলে দেখা যাবে, সন্তানের শিক্ষার জন্য টাকা দিয়ে বই কেনা যায়, নামী স্কুলে ভর্তি করানো যায়, অনেক টিউটর রাখা যায় কিন্তু মেধা কেনা যায় না, বিদ্যা কেনা যায় না। মেধা এবং বিদ্যা পিতৃ-মাতৃদত্ত উপহার, যা জন্মগত সংস্কারে নিহিত থাকে। মেধা এবং বিদ্যা, মা, বাবার কাছ থেকে নিয়ে যেমন যেমন মেপে দেন তাই সন্তানে মূর্ত হয়। টাকা দিয়ে গৃহ নির্মাণ করা যায় কিন্তু উপযুক্ত গৃহিনী না হলে গৃহসুখ পাওয়া যায় না। টাকা দিয়ে ওষুধ কেনা যায়, স্বাস্থ্য কেনা যায় না, স্বাস্থ্য যদি কেনাই যেত তাহলে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া থ্যালাসেমিয়াদি  রোগগুলো থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া যেত। স্বাস্থ্য পিতামাতার অবদান, জন্মগত সমৃদ্ধির বিষয়। এবার একটু হিসেব করে দেখুনতো, টাকা উপার্জনের দিকে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ বিষয়ক গুরু প্রদত্ত বিদ্যাকে উপার্জন করে মনুষ্যত্ব নির্মাণের দিকে গুরুত্ব দিলে অতি সহজেই সুখের জীবন লাভ করা যায় না কি?     

এ বিষয়ে শরৎদা (হালদার) শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে জানতে চেয়ে প্রশ্ন করেছিলেন—Heredity (বংশগতি) ও environment (পারিপার্শ্বিক)-এর মধ্যে কোনটি prominent (প্রধান)?
শ্রীশ্রীঠাকুর—মানুষ heredity (বংশগতি) থেকে পায় instinct (সহজাত-সংস্কার), environment (পারিপার্শ্বিক) দেয় তাকে nurture (পোষণ)। ছেলে জন্মাতে যেমন বাপ-মা দুই-ই লাগে, মানুষের জীবনে তেমনি heredity (বংশগতি),  environment (পারিপার্শ্বিক) দুটো factor (জিনিস)-ই লাগে। পরিবেশের মধ্যে অনেক কিছুই থাকে, কিন্তু মানুষ সাধারণতঃ তার instinct (সহজাত-সংস্কার) অনুযায়ীই Pick up (গ্রহণ) করে। প্রত্যেকের specific instinct (বিশিষ্ট সংস্কার) পোষণ পায় যা’তে তেমনতর পারিবেশিক বিন্যাস যত হয় ততই ভাল।
(আলোচনা প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড, ৩।১২।১৯৪১)

ওই instinct (সহজাত-সংস্কার) ও environment (পারিপার্শ্বিক)-এর উপর ভিত্তি করেই সভ্যতার প্রাতঃ স্মরণীয় মনীষীবৃন্দের জনক-জননীরা সকলের কাছেই নন্দিত । আবার ভ্রষ্টাচারীর, সন্ত্রাসবাদীর, ধর্ষকের পিতামাতারা সমাজের চোখে নিন্দিত ।
শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই নয়, মনুষ্যেতর প্রাণীদের ক্ষেত্রেও ওই বিধি প্রযোজ্য। সরকারী পুলিশ বা মিলিটারীদের প্রয়োজনে একটা কুকুর, একটা ঘোড়া কিনতে গেলেও ওই instinct (সহজাত-সংস্কার) ও environment (পারিপার্শ্বিক)-এর  কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে পেডিগ্রি অর্থাৎ বাবা-মায়ের বিশুদ্ধ বংশানুক্রমিকতার শংসাপত্রের সমৃদ্ধির গুরুত্ব বিচার করে কেনে । সেক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া জাতির নামে সংরক্ষণের উদারতা দেখিয়ে বংশমর্যাদাহীন  কুকুর, ঘোড়া কেনে না । শুধু তাই নয়, একটা ভালো গোরুর বাচ্চা তৈরির জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করে বিদেশ থেকে উন্নত জাতের ষাঁড়ের শুক্রাণু কিনে সুপ্রজনন করার ব্যবস্থা করে সরকার,  রাস্তায় ঘোরা ষাঁড়গুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে !
কৃষিক্ষেত্রেও তাই । উন্নত ফসলের জন্য ভালো জাতের সংরক্ষিত বীজ শোধন করে, বীজ অনুযায়ী উপযুক্ত উর্বর জমিতে ‘জো’ (fertile enrichment of soil quality.) বুঝে বপন করতে পরামর্শ দেওয়া হয় । একজন আদর্শ কৃষক কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে বাস্তব পরিচর্যার মাধ্যমে বিশুদ্ধ বীজ, বিশুদ্ধ জমিতে বিনিয়োগ করে উন্নত জাতের ফসল পাবার জন্য ।  টবে একটা ফুল গাছ লাগাতে গেলেও আমরা বীজ অনুযায়ী মাটির সাথে মেলবন্ধন করে বপন করি।

প্রাণী সম্পদ, কৃষি সম্পদ বিকাশের ক্ষেত্রে জৈবিক সম্পদের বিহিত বিনিয়োগ করে বুদ্ধিমান মানুষেরাই । অথচ এই বুদ্ধিমান মানুষেরাই ওই জৈবী সম্পদকে অপচয়ীভাবে বিনিয়োগ করে নিজেদের কমন সেন্সকে অপমান করছে ।
আমরা অনেক সময় কামুক পুরুষদের ‘কুকুরের চাইতেও অধম’ বলে গাল দিয়ে অযথা কুকুরদের অপমান করে বসি। কারণ, কুকুরেরা প্রজনন ঋতু ভিন্ন অন্ন সময় নারী-পুরুষেরা একত্রে সহবাস করা সত্বেও যৌন-মিলনে প্রবৃত্ত হয় না। এ বিষয়ে কুকুরেরা মানুষদের তুলনায় অনেক সংযমী। শুধু কুকুর নয়, মনুষ্যেতর  কোন মেরুদণ্ড প্রাণীই বংশ বিস্তার ব্যতীত যৌন মিলনে প্রবৃত্ত হয় না। আর আমরা বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষেরা কি করছি, কতটুকু কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে জৈবিক তাগিদকে সফল বিনিয়োগ করছি, মনের ভল্ট থেকে সেই হিসেবের খাতা বের করে যার যার নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করলেই উত্তরটা পেয়ে যাব।   
  মহান ভারতের মহান চরিত্র দুর্গা, লক্ষী, সরস্বতী, সীতা, সাবিত্রী প্রমুখ নারীদের আদর্শ ভুলে প্রকৃতি প্রদত্ত জৈবী সম্পদকে যৌবন গরবে গরবিনী প্রবৃত্তিতাড়িত একজন নারী,–নিজের নারীত্বকে দর্শকামে, স্পর্শকামে, শ্রুতকামে, পণ্য করে পুরুষের সুপ্ত কামনাকে জাগিয়ে লাম্পট্য, ব্যভিচারকে পুষ্ট করতে পারে, প্রভূত অনিত্য সম্পদের মালকিন হতে পারে, কিন্তু ভালো মা হয়ে নিত্য-জীবনে আদর্শ নারীর খেতাব অর্জন করতে পারবে না। উনো জমিতেই দুনো ফসল ফলে, বুনো জমিতে নয় । পুরুষের ক্ষেত্রেও তাই । পুর্ব পুরুষের জীবনধারা প্রবাহিত বীর্য্যকে ব্যভিচার, ধর্ষণ, স্বমেহন আর কন্ডোমে অপবিনিয়োগ করে ধর্মবিরুদ্ধ কামসেবার ইন্দ্রিয়-লালসায় বিনিয়োগ করে দুষ্ট প্রবৃত্তিকে তুষ্ট করতে গি়য়ে   যৌনব্যাধি, মানসিক কষ্ট, বিবেক-দংশন, সামাজিক ছি! ছি! লাভ করতে পারবে, ভালো বাবার গৌরব অর্জন করতে পারবে না। বীজ শুদ্ধ না হলে ফসলও অশুদ্ধ হবে ।
আমাদের কাম-প্রবৃত্তি নামক জৈবিক তাগিদকে নিয়ন্ত্রণ করতে বৃত্ত্যাধীশ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র নারী-সাধারণকে মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েই ক্ষান্ত হন নি,  নিজের স্ত্রীকেও  চিন্ময়ী মা জ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শেখালেন । কারণ, স্ত্রীর মাধ্যমে স্বামী নিজেকে জন্মান, তাই স্ত্রীকে জায়া বলা হয়েছে । আমাদের আর্য্য বিধির গর্ভাধান কালে স্ত্রীর নাভিমূল স্পর্শ করে “প্রসীদ মা জগজ্জননী” মন্ত্রে অভিষিক্ত করে স্ত্রীর গর্ভে নিজেকে প্রবেশ করাতে হয় । প্রজা-সৃষ্টি প্রকরণের কি অপূর্ব ব্যঞ্জনা । যৌন জীবনে পুরুষদের শিব, আর নারীদের দুর্গা জ্ঞানে অভিষিক্ত করে কাম (lust) কে আসুরিক প্রবৃত্তির কবল থেকে মুক্ত করে দৈবীপ্রেমে (love) রূপান্তরিত করলেন আর্য্য-ঋষিরা। ওই জীবনীয় বিধিকে মেনে চলার মধ্য দিয়েই সার্থক হয় শিবপূজা, দুর্গাপূজা।  

  শ্রীশ্রীঠাকুর পুরুষ সাধারণকে কাম উপভোগ বিষয়ে মিতব্যয়ী হবার উদ্দেশ্যে বলছেন,–“…….প্রত্যেকটা sperm ( শুক্রাণু)-ই micro-cosmic form-এ (ক্ষুদ্রাকারে) এক-একটা being (জীব), ও নষ্ট করা মানে micro-cosmic form-এর (ক্ষুদ্রাকারের) একটা মানুষ মেরে ফেলা । আমাদের বোধশক্তি ও মমত্ববোধ জাগলে…… নিজের সুখের জন্য, ইন্দ্রিয়-পরিতৃপ্তির জন্য লক্ষ-লক্ষ শুক্রাণু নষ্ট ক’রে অতোগুলো soul (আত্মা)-কে মারতে পারবো না ।….. তাই প্রজননকল্পে ছাড়া অন্য কারণে শুক্রাণু যথাসম্ভব নষ্ট না করাই উচিত । তুমি-আমি সবই তো ঐ living sperm (জীবন্ত শুক্রাণু), প্রত্যেকে ওরই ওপর দাঁড়িয়ে গজিয়েছে, ওই আজ কত কথা কইছে, ঘুরছে, ফিরছে, হাতি-ঘোড়া মারছে । তুমি যে-দশা পছন্দ কর না, অনর্থক সে-দশায় ওদের ফেলবে ? ওরা যে তুমিই !” (আ. প্র. ১/১. ১২. ১৯৪১)
তিনি তাঁর নারীর নীতির বিধানে কুমারী মেয়েদের উদ্দেশ্যে বললেন—  
‘‘মেয়ে আমার,
তোমার সেবা, তোমার চলা,
  তোমার চিন্তা, তোমার বলা
পুরুষ-জনসাধারণের ভিতর
যেন এমন একটা ভাবের সৃষ্টি করে—
যা’তে তারা
অবনতমস্তকে, নতজানু হ’য়ে
সসম্ভ্রমে,
ভক্তিগদগদ কন্ঠে—
‘মা আমার,— জননী আমার’! ব’লে
মুগ্ধ হয়, বুদ্ধ হয়, তৃপ্ত হয়.কৃতার্থ হয়,—
তবেই তুমি মেয়ে.
—তবেই তুমি সতী!’’   

নারীর নীতির ওই বিধান না মানার ফলে, কিছুদিন পূর্বে, একজন আর্য্যহিন্দু নারী ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে পিটার মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব খান্না এবং ইন্দ্রাণীর মেয়ে শিনার বাবা সিদ্ধার্থ দাস সাম্প্রতিককালে সংবাদ শিরোনাম দখল করে নিয়েছে। সংবাদের বিষয়বস্তু সকলেই জানেন। ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায় মা হয়ে মেয়েকে বোন বলে পরিচয় দেয়, অপত্য স্নেহ ভুলে মা হয়ে মেয়েকে হত্যা করে! ওদিকে এক ব্যাঙ্ক অফিসার কামের মোহে পরকীয়া করতে গিয়ে বেসামাল হয়ে কামিনীকে, কামিনীর মেয়েকে কেটে টুকরো টুকরো করে হুগলী নদীতে ফেলতে গিয়ে ধরা পড়ে! প্রবৃত্তির রিংরসার আঠায় আটকে গিয়ে যাদের এখন দুর্দশার জীবন কাটাতে হচ্ছে! ওই দুর্বিসহ জীবন থেকে নিস্তার পেতে বাস্তব সব পদক্ষেপ নেবার পাশাপাশি ওরা অবশ্যই ভগবানেরও শরণাপন্ন হচ্ছে। আমরা সৎসঙ্গীরা নিয়ম করে  অধিবেশনে অধিবেশনে সৎ-অসৎ নির্বিশেষে সকলের মঙ্গল কামনার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা জানাই। সেই রীতির অনুসরণে  আমিও বলতে চাই, ভগবান ওদের ওই দুর্বিসহ জীবন থেকে মুক্ত করুন।
না, পরমপিতা আমার আর্জি নাকচ করে দিয়ে বললেন,  ‘‘ভগবান আমাদের বাঁচাতে পারেন না, ভগবানের উপর আমাদের যে টান ঐ টানটাই বাঁচায়।’’
‘‘কেউ কারও যম নয়রে, তোর যম তুই।’’ 
God (ঈশ্বর)-এর opposite pole (বিপরীত মেরু) হ’ল Satan (শয়তান) যা’ disintegrate (বিশ্লিষ্ট) করে। ভগবানের প্রতি বিমুখ হ’য়ে, তাঁকে অস্বীকার করে, তাঁর বিরুদ্ধ যা’ তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে, তাকে প্রাধান্য দিয়ে চলার স্বাধীনতাটুকু মানুষের আছে। এই স্বাধীনতার উপর তিনি হস্তক্ষেপ করেন না। তিনি যেমন ইচ্ছাময়, প্রত্যেকটা মানুষকে তেমনি ইচ্ছাময় করে ছেড়ে দিয়েছেন। যে ইচ্ছাময় যেমন ইচ্ছা করে, সে ইচ্ছাময় তেমন হয়, তেমন পায়—বিধির অনুবর্তনে। পরমপিতা বিশ্ববিধাতা, আর, আামরা হলাম স্ব-স্ব ভাগ্য-বিধাতা। স্রষ্টার বেটা সেও এক স্বতন্ত্র স্রষ্টা। যার প্রাণে যেমন চায়, সে তেমনি সৃষ্টির মালিক হয়।’’ (আ. প্র. ১০ম খণ্ড/ ৮. ১. ৪৮) 
আমরা যখন স্ব-স্ব ভাগ্য-বিধাতা, তখন ওইসব দুরাবস্থা থেকে রেহাই পেতে হলে একমাত্র উপায় হচ্ছে বিশ্ববিধাতা পরমপিতার বলা আদেশ-নিদেশ মেনে কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে আমাদের স্ব-স্ব ভাগ্য-বিধাতার কর্তব্যটুকু পালন করে যাওয়া, সকলকে পালন করতে উৎসাহিত করা—  মনুষ্যত্বের মূল বুনিয়াদকে রক্ষা করতে হলে।
জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!
আমরা যেন প্রকৃত  ইষ্টভৃতি পরায়ণ হয়ে পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠন করতে পারি।
“Common sense is the most uncommon things in this world.”             
—Shree Shree Thakur Anukulchandra
————————————————
tapanspr@gmail.com

আমাদের শিব আরাধনা

** “ভোলে বাবা পার করেগা” **

।। আমাদের শিব-আরাধনা।।


সারা শ্রাবণ মাস জুড়ে “ভোলে বাবা পার করেগা” শ্লোগানে মুখরিত হয় চারিদিক। শিব ভক্তগণ জলপূর্ণ ঘট নিয়ে ছোটে শিবমন্দির প্রাঙ্গণে। ভোলে বাবা কিভাবে আমাদের পার করবে, জেনে নেবার চেষ্টা করি। আমরা স্থূল দেহ ধারণ করে এই মর্ত্ত্যভূমিতে লীলা করছি, এপারে আছি। এই দেহত্যাগ করেন লিঙ্গশরীর নিয়ে যেখানে যাব, সেটাই ওপার। দেহ-ধারণের রোগ-শোক-ব্যাধি-জরা থেকে মুক্তি পেলেই ‘ভোলেবাবা পার করেগা’ শ্লোগান সার্থক রূপ নেবে।—স্মৃতিবাহী চেতনা নিয়ে পরপারে যেতে পারব। এজন্য লাগে সাধনা। দেহধর্মের জৈবিক তাগিদ যথাযথ পালন না করে পারাপার হওয়া সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন হয় দীক্ষা-শিক্ষা। দীক্ষা-শিক্ষা ব্যতীত জৈবিক ধর্ম পালন করা যায় না। জৈবিক ধর্ম পালন করার কায়দা না জানলে শরীর-মন-আত্মাকে জানা যায় না। ‘আত্মানং বিদ্ধি’র সোপানে চলতে না শিখতে পারলে পারাপার হওয়া তো যাবে না! যেমন, কোন কারণে হাত অসার হলে অন্যের সাহায্যে খাবার খেতে হয়। তাই এপারের পিণ্ডদেহের সব কর্মফল সাথে নিয়ে লিঙ্গদেহ ওপারে যাবে। তাই “সাধন করনা চাহিরে মনুয়া, ভজন করনা চাহি।…..”


।। অতঃ সাধন-ভজন কথন ।।
ওঁ নমঃ শিবায় শান্তায় কারণত্রয় হেতবে।
নিবেদয়ামি চাত্মানং ত্বং গতি পরমেশ্বর।।
সত্যম্-শিবম্-সুন্দরম্। সত্যই শিব, শিবই সুন্দর। সত্য মানে অস্তিত্ব। পরিবেশের সব অস্তিত্বের পালন-পোষণ করে এই সুন্দর পৃথিবীর সুন্দরত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার বাস্তব প্রক্রিয়ার নাম শিবপূজা। পূজা মানে সম্বর্দ্ধনা—সম্যকরূপে বর্দ্ধনার পথে চলা।
শিব একাধারে সার্থক যোগী, সন্ন্যাসী, নটরাজ। আবার গৃহস্থরূপে দেবী পার্বতীর স্বামী। গণেশ এবং কার্তিক দুই পুত্রের পিতা। সে-সব দিকগুলো বিচার করে শিবকে যোগ, ধ্যান ও শিল্পকলার দেবতা মনে করা হয়। কিছু গবেষণায় জানা যায় শিব নাকি চিকিৎসা বিদ্যার জনক ছিলেন। কৃষিবিদ্যার আবিষ্কারকও ছিলেন। নট-নটীরা শিবকে নটরাজ বলে পূজা করেন। রামায়ণে বর্ণিত, সংস্কৃতে রচিত শিব-বন্দনার ‘তাণ্ডব-স্তোত্র’ আর্য্যকৃষ্টিতে বন্দিত। পরমপুরুষ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর ভাববাণীতে বলেছেন।—‘‘তাণ্ডব-স্তোত্র মুখস্থ করিস্, এ্যাজমা সারবে।’’
শিবের পূজা বা আরাধনার নিমিত্ত যতগুলো প্রতিষ্ঠিত মন্দির রয়েছে, সে-সব মন্দিরগুলোতে শিবলিঙ্গকেই পূজা করা হয়। শিবলিঙ্গের সৃষ্টির বিষয়ে শাস্ত্রগুলোতে নানা মতভেদ রয়েছে। সবগুলোতেই রিরংসার নীলজল মেশানো আছে। সেগুলো থেকে নারদ পঞ্চরাত্রে বর্ণিত কাহিনী যেন একটু ফিকে, গ্রহণযোগ্য। নারদ পঞ্চরাত্র মতে শিব-পার্বতির প্রথম মিলনের সম্মিলিত তেজ থেকে উৎপন্ন হয় শিবলিঙ্গ। শিবলিঙ্গ-এর বেষ্টনীকে বলে গৌরীপট্ট। গৌরীপট্ট শিবলিঙ্গের আধার, জগতের যোনি। যোনি-সম্ভূত সৃষ্টি প্রকরণের প্রতীক হিসেবে মানা হয় শিবলিঙ্গকে। এর অন্তর্নিহিত অর্থ, পুরুষেরা শিবলিঙ্গকে প্রতীক রূপে মেনে, শিবের ন্যায় আদর্শ পিতা হবার নিমিত্ত তাদের প্রজন্ম সৃষ্টির উপাঙ্গ জননেন্দ্রিয়কে ব্যবহার করবেন, আর নারীরা গৌরীপট্টকে প্রতীক রূপে মেনে, গৌরীর ন্যায় আদর্শ মাতা হবার নিমিত্ত প্রজন্ম সৃষ্টির উপাঙ্গ জননেন্দ্রিয়কে ব্যবহার করবেন।
আমাদের ভারতীয় আধ্যাত্মবাদের সাথে শিব অনেকটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামেও একটা না একটা শিবমন্দির দেখা যায়। যারা দৈনন্দিন জীবনে আর্যকৃষ্টির নিত্যকর্ম পদ্ধতির সদাচার, বর্ণাশ্রমধর্ম পালনে অভ্যস্ত নয়, তারাও সোমবার, শ্রাবণ মাস, চৈত্র মাস-এর পার্বনের দিনগুলোতে শিবলিঙ্গে ফুল-জল-বেলপাতা দিয়ে তথাকথিত পুজো করেন। শ্রাবণ মাস শিবের জন্মমাস হিসেবে পালন করেন অনেক ভক্ত। বাঁকে করে জল নিয়ে প্রতিষ্ঠিত শিবমন্দিরগুলোতে গিয়ে অনেক কসরৎ করে শিবলিঙ্গে জল ঢালতে যান। (যদিও বিখ্যাত শিব মন্দিরগুলোতে প্রত্যক্ষভাবে জল ঢালা যায় না, দূর থেকে ছুঁড়ে দিতে হয়!)
তাদের সেবা করার জন্য রাস্তার ধারে ধারে প্যাণ্ডেল করে, তারস্বরে মাইক বাজানো হয়। অনেক সাধকেরা আবার ‘ভোলে-ব্যোম’ ধ্বনি দিয়ে গঞ্জিকা, ভাঙ্-এর মৌতাতে শিবত্ব লাভ করতে চান। টিভি সিরিয়ালগুলোতেও শিবকে সিদ্ধিখোর, গাঁজাখোর হিসেবে তুলে ধরা হয়। শিব ছিলেন একজন পরমবৈষ্ণব, সিদ্ধ-পুরুষ, তাঁকে সিদ্ধিখোর, গাঁজাখোর না বানালেই কি চলছিল না!
তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া চলে আমাদের হিন্দু নারীদের শিবরাত্রির উপবাসকে। শুনেছি অনূঢ়া বা কুমারী মেয়েরা শিবের মতো স্বামী পাবার আশায় (অবশ্য বাস্তবে আমাদের কল্পনার শিবের মত,—বাঘছাল পরে, গলায় সাপ জড়িয়ে, ষণ্ডের পিঠে চেপে, কোন পুরুষ যদি স্বামীরূপে উপস্থিত হয়, তখন কি হবে?), কুমার পুরুষেরা (যদিও সংখ্যায় অনেক কম) গৌরীর মতো স্ত্রী লাভের আশায় শিবরাত্রির উপবাস করেন। আর বিবাহিতা মহিলারা কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীর ন্যায় সন্তান লাভ করে সুখে-শান্তিতে ঘর-সংসার করার আশায় শিবরাত্রির উপবাস করেন।
ওই আশাগুলোকে পূরণ করতে হলে শুধুমাত্র শিবরাত্রির উপবাস করলেই তো আর হবে না। উপ মানে নিকটে, বাস মানে অবস্থান। শিব-পার্বতীর আদর্শে নিত্য অবস্থান করতে হবে। আর সেজন্য সদগুরু গ্রহণ করতে হবে। শাস্ত্রানুসারে গুরু গ্রহণ না করা পর্যন্ত কোন দেবদেবীর পূজা করার অধিকার জন্মায় না।
পুরাণ অনুসারে গিরিরাজ দুহিতা উমা ছোটবেলা থেকেই ভক্তিমতী। শিবের ভক্ত। পণ করেছেন, শিবকে ছাড়া অন্য কাউকেই বিয়ে করবেন না। বাবা-মা-পরিজনেরা কত করে বোঝাল, শিবকে বিয়ে করলে আর কষ্টের শেষ শেষ থাকবে না। বাপের বয়সী, কাজকর্ম করে না। নারায়ণের ভুতের বেগার খেটে মরে। (অর্থাৎ, নারায়ণী-বার্তা যাজন করে প্রাণী নামক ভুতদের উন্নয়ন করে বেড়ান।) তথাপি উমা কিন্তু কারোর কথায় কান না দিয়ে, সৎ-স্বভাবে পরান পাগল, জ্ঞানবৃদ্ধ, বয়োবৃদ্ধ শিবকেই পতিত্বে বরণ করেন।

উমা বা পার্বতী, স্বামীকে মাথায়, অর্থাৎ জীবনের কেন্দ্রে রেখে, স্বামীর মনোবৃত্ত্যানুসারিনী স্ত্রী হয়ে সুসন্তানের মা হয়েছেন, মা হয়েছেন আমাদের, জগতের। উমা-মাকে আমরা দেবীর চাইতে অনেকটা বেশি করে ঘরের মেয়ে হিসেবে বরণ করে নিয়েছি। এই মর্ত্ত্যধামের প্রতিটি ঘর তাঁর বাপের বাড়ি। তাই বাস্তব জীবন-চলনায় যদি শিব-গৌরীর ন্যায় আমাদের ভালোবাসার পবিত্র দাম্পত্যের পূজা-জাত কন্যারূপী সন্তানটিকে উমার মত করে, পুত্ররূপী সন্তানটিকে শিবের মত করে সৃষ্টি করতে পারি, তা হলেই তো ষোল-কলায় পূর্ণ হবে আমাদের শিব আরাধনা।

tapanspr@gmail.com

বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস

** বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস **
।। আজকের ভাবনাকে বাস্তবায়িত করতে নিত্য দিনের জন্য পালন করার শপথ নিতে হবে ।।
আজ “বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস ২৮শে জুলাই পালিত হয় এবং এটি স্বীকার করে যে একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি হল একটি সুস্থ পরিবেশ। এই সচেতনতা দিবসের উদ্দেশ্য হল আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা ।”
কিন্তু দুঃখের বিষয়, ভোটের রাজনীতিতে জয়লাভ করা অপ্রকৃতস্থ জন-প্রতিনিধিরা, যারা প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব বোঝে না, কেবল বোঝে, প্রকৃতি ধ্বংস করে অবৈধ নির্মাণ কার্যে সীলমোহর দিয়ে টাকা রোজগার করা। তাদের সচেতনতা বাড়াবে কে বা কারা?
* * *
মহাভারতের বনপর্বে বকরূপী ধর্ম যুধিষ্ঠিরকে অনেক প্রশ্নের মধ্যে একটা প্রশ্ন করেছিলেন, সব চাইতে আশ্চর্যের বিষয় কি ?
উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, মৃত্যু অবশ্যাম্ভাবী জেনেও মানুষ ন্যায়, নীতি, ধর্ম বিসর্জন দিয়ে চিরদিন বেঁচে থাকতে চায় এটাই সব চাইতে আশ্চর্যের বিষয় ।
তাই, আমরা, ঠাকুরের মানুষেরা যেন ওইসব পথের পথিক না হই । প্রবৃত্তিধর্মী অসৎ পথ অবলম্বন করে যদি চিরজীবি হওয়া যেত তাহলে না হয় অসৎ পথের আশ্রয় অবলম্বন করার সার্থকতা থাকত।
আর একটা প্রশ্ন ছিল—পথ কি?
তার উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, বেদ বিভিন্ন, স্মৃতি বিভিন্ন, এমন মুনি নেই যাঁর মত ভিন্ন নয়। ধর্মের তত্ত্ব গুহায় নিহিত, অতএব মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথ (আদর্শ) বলে গেছেন তাই হচ্ছে একমাত্র পন্থা। বর্তমান পুরুষোত্তম পরমপিতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র হলেন, সেই মহাজ্ঞানী,মহাজন।
তাই আমাদের বাঁচতে হবে পরমপিতার খুশির জন্য, মরতেও হবে পরমপিতার খুশির জন্য—মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার লক্ষ্যে, ‘তৃষ্ণার একান্ত নির্বান— মহাচেতন সমুত্থান।’ বাণীকে সম্মান জানাতে।
* * ‌*
বিশ্ব প্রকৃতির স্বরূপ নির্দেশক
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন (ভাববাণী,
ষট্ পঞ্চাশত্তম দিবস, ২রা শ্রাবণ, ১৩২৪)

‘‘সে একটা অব্যক্ত পরমানন্দ,—নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ,—প্রাণের
প্রাণ,—জগতের জগৎ—অণুর অণু,—সে একটা বলা যায় না রে। যখন ‘ছিল না’র
সত্তা ছিল, কাল আসে নাই, যখন শব্দ ছিল, যখন সূর্য্যের-চাদের সৃষ্টি হয়
নাই, তখন এক বিরাট ধ্বনি সোহহং পুরুষ ভেদ ক’রে সৃষ্টি করতে চ’লে এল—সেই
ওম্। শব্দে, সূক্ষ্ম মায়াতে, ব্রাহ্মী মায়াতে, হ্লাদিনী শক্তিতে
ঘাত-প্রতিঘাতে সে ধারা বাধা পেল, তখনই সৃষ্টি,—ব্রহ্মা, বিষ্ণু,
মহেশ্বর—সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ—ত্রিধারা। বিরাট গতিতে শব্দ চলতে লাগল, তখন
প্রাণ স্থির হয় নাই—তখন সৃষ্টি হ’ল আকাশ ….. বায়ু ….. কাল নির্দেশ
ক’রে চলল—তখন সৃষ্টি তেজ—সেই শক্তি। গতি চলছিল আবার চলবে, তাই দিয়ে
বিরাট্ জলখণ্ড! তেজ ও জলখণ্ড যখন উপর-গতি ধরতে না পেরে আপন গতিতে চলতে
লাগল, তখন সৃষ্টি হ’ল জড়। আবার, এই ঘাত-প্রতিঘাতে সৃষ্টি হ’ল দেবতা,
কিন্নর, জীব-জগৎ। এখন আমি কী? সত্তা কোথায় আমার ? আমি কি ক্ষিতি, অপ্,
তেজ, মরুৎ, ব্যোম ? আমি কি সেই বিরাট্— ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর? আমি
কি সেই সোহহং ধারার সুরত শব্দ? সেই সোহহং পুরুষ, সোহহং পরমাত্মা, কি সেই
সেই অনামি পুরুষ? কে বলবে আমার সত্তা কোথায়? দ্যাখ্ আমি কি? আমার
অস্তিত্ব কোথায়? আমি স্ত্রী, পুরুষ, ক্লীব, আমি যা-কিছু সব,—আবার আমি
কিছু নয়। কিছু নয় সেই আমি কত সৃষ্টি করেছে! কত ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর,
কৃষ্ণ, বুদ্ধ, কত আল্লা-খোদা, যিশু,—কোটি-কোটি অবতার। আমি সব
হ’য়েছিলাম,—সব হ’চ্ছে আমার অবিরাম গতি। আমার কারণসত্তা না জেনে যদি
আমার কর্মসত্তা জান ..…।’’ ১
আপনি মিশে যাচ্ছে, আপনি চলছে—তাহাকেই বলে প্রকৃতি। আমি
পরমকারণ। অনন্ত কোটি দেবতা, ইন্দ্র, চন্দ্র, বায়ু, বরুণ, ব্রহ্মজ্যোতিঃ,
শ্রীকৃষ্ণের অঙ্গজ্যোতিঃ, সেই পরমপুরুষ শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীকৃষ্ণের সত্তা,
সত্ত্ব, আমিই সব। আমি সেই দয়ালদেশ, ব্রহ্মদেশ, পিণ্ডদেশ। আমি সেই
বৃন্দাবন, আমি কৃষ্ণ, রাধা, গোপ, গোপী; আমার আরতি করে চন্দ্র, সূর্য্য,
তারকা, কোটি-কোটি গগন সব আমারই লীলা, আমারই প্রকট, আমারই জন্য আমারই
ফাঁদ, আর কিছু নয়। …………
* * *

বিশ্ব-প্রকৃতি রক্ষার স্বার্থে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, এক বিপ্লব নিয়ে এলেন। ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে, ধর্ম বলে জানিস তাকে। বাঁচা-বাড়ার মর্ম যা, ঠিকই জানিস ধর্ম তা। Upholding urge of existence is Dharma.’……..ইত্যাদি বাণীর মাধ্যমে। অতএব, চাঁদার জুলুম, ফুল, বেলপাতা, ধূপহীন ধূপকাঠি, নৈবেদ্য, দশ-(অ)কর্মার ফর্দ, ঢাক, ঢোল, বাজি, হৈ-হুল্লোর, তার শব্দে মাইকের ডালি দিয়ে নয়— তোমাকে ধার্মিক হতে হলে আগে প্রকৃতিকে বাঁচাতে হবে। সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বাস্তব কর্মে ব্রতী হতে হবে। পরিবেশ হিতৈষী হতে হবে, তবেই তুমি ভারতীয় মতের ‘ধার্মিক’ অভিধায় ভূষিত হতে পারবে।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের অনুগামীদের নিত্য ইষ্টভৃতি করতে হয়। ইষ্টভৃতি মানে ইষ্ট কর্মের ভরণ। ইষ্টকর্ম মানে পূর্ত্তকর্ম—প্রকৃতির উপাদানকে,পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখার বাস্তব কর্ম। যা প্রকৃত ইষ্টভৃতির মন্ত্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ ।” এর সরলার্থ খুব সহজ। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুযায়ী সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন বর্দ্ধনার বিধি মেনে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে চলেন যিনি, এমন গুরুভাই-ই প্রকৃত ইষ্টভ্রাতা।–যাঁর আপদে-বিপদে সাধ্যানুগ সাহায্য করতে হবে। ভূত মানে,–ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা প্রকৃতির অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। সেগুলোকে প্রাণ পণ করে রক্ষা করতে হবে। অর্থাৎ আমার দ্বারা যেন প্রকৃতির বায়ু, জল, মাটি, দূষিত না হয়, ধর্ষিত না হয়। আমার দ্বারা যেন নিষ্প্রয়োজনে কোন গাছ, কোন প্রজাতি, কোন পারিপার্শ্বিক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। প্রতিনিয়ত এই শপথ মেনে চলার নাম ইষ্টভৃতি। অতএব প্রতিটি আমি যদি প্রকৃত ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের যাজ্ঞিক হবার শপথ পালন করতে পারি তাহলেই অনেকাংশে রক্ষা করা যাবে সুজলা-সুফলা-মলয়জ-শীতল বসুন্ধরার প্রকৃতিকে।
এ যুগের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমাদের সচেতন করে দিতে বাণী দিয়ে বললেনঃ
‘‘ইষ্টভরণ, পিতৃপোষণ,
পরিস্থিতির উন্নয়ন,
এ না করে, যাই না করিস
অধঃপাতেই তোর চলন।’’
ওই অধঃপতন থেকে মধুময় বসুন্ধরার প্রকৃতিকে রক্ষা করতে কৃপা-পরবশ হয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের ‘পঞ্চবর্হি’ এবং ‘সপ্তার্চ্চি’ পালনের অনুশাসন দিলেন। দলীয় প্রীতির কবলে পড়ে বিশ্ব-প্রকৃতিকে রক্ষার সেই অনুশাসন বিধিকে অজ্ঞতার বিকৃত ধারনা নিয়ে, অবজ্ঞা করার স্পর্দ্ধা যেসব তথাকথিত সৎসঙ্গীরা দেখাচ্ছেন, তাদের অধঃপতনকে প্রতিরোধ করতে হলে, তাদেরও সামিল করতে হবে উক্ত ইষ্ট-ভরণের অনুশাসন পালনে। তা যদি না করি আমরাও কিন্তু বঞ্চিত হব ‘ইষ্ট ভরণের’ পবিত্র কর্ম থেকে। ইষ্টভৃতি বাস্তবায়নের শপথকে পালন করা যাবে না।—কারণ, “তুমি ঠিক ঠিক জেনো যে, তুমি তোমার, নিজ পরিবারের, দশের এবং দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দায়ী।”—এই বাণীতে আমাদের সব্বাইকে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন। সেই দায়িত্ব তো আর অস্বীকার করা যাবে না!
জয়গুরু, বন্দে পুরুষোত্তমম্!

WORLD POPULATION DAY 2025

।। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ দিবসের ভাবনা ।।


[সম্মিলিত জাতিপুঞ্জে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৮৯ খ্রীস্টাব্দ থেকে প্রতি বছরের ১১ জুলাইয়ের দিনটিকে ‘বিশ্ব-জনসংখ্যা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। আলোচিত হয় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য রক্ষা, মানবাধিকার, লিঙ্গ সমতা প্রভৃতি গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে। বর্তমান ভারতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি অসহিষ্ণুতা, খুন-জখম, রাহাজানি, ধর্ষণ, সন্ত্রাসবাদ, পরিবেশ দূষণ প্রভৃতি জাতীয় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অরণ্য ধ্বংস, বৃক্ষ নিধন করে অপরিকল্পিতভাবে নগরায়নের ফলে, প্রাকৃতিক উপাদানসমূহ অপব্যবহারের ফলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। একদিকে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর একদিকে ভূগর্ভের জলস্তর নেমে যাচ্ছে। অপরিকল্পিত সংরক্ষণের ফলে, বণ্টনের ফলে প্রতুল খাদ্যশষ্য থাকা সত্বেও অনাহারে, অর্ধাহারে মানুষ বাস করছে। অপরিকল্পিত অধিকার দানের ফলে কেহ প্রচুর সম্পদের মালিক, কেহ ভিখারি। ওইসব সঙ্কটের মূলে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে দায়ী করলে ভুল হবে, বরং দায়ী কু-জনদের সংখ্যাধিক্য, সু-জনদের সংখ্যা লঘুতা। সে বিষয়ে আলোকপাত করার ক্ষুদ্র প্রয়াস এই প্রবন্ধ। ভুল-ত্রুটি সংশোধনের পরামর্শ দিলে বাধিত থাকব।]

  • * *
    প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ভুপেন হাজারিকা মহোদয়ের গাওয়া বিখ্যাত গানের একটি কলি,
    ‘আমি দেখেছি অনেক গগণচুম্বী অট্টালিকার সারি
    তার ছায়াতে দেখেছি অনেক গৃহহীন নরনারী।’— ভীষণ মনে পরছে দিনটির স্মরণে।
    বিদেশের কথা বলতে পারবো না, তবে আমাদের দেশে অনেক অট্টালিকা রয়েছে, যে অট্টালিকার ছাদগুলো আশ্রয় দেবার মতো মাথা খুঁজে পায় না। বিশাল বাড়িঘর, একটিই মাত্র ছেলে, বিদেশে থাকে। বৌ আর একটা বাচ্চা নিয়ে ওখানেই সেটেল্ড। মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে কালেভদ্রে বেড়াতে এলে ঘরের ছাদগুলো মাথা পায়। নইলে স্বামী-স্ত্রী দু-জনাতেই থাকেন বিশাল বিশাল বাড়িতে। আবার যাদের নির্দিষ্ট কোন মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, দু-বেলা দু-মুঠো খাওয়ার সংস্থান নেই, লোকের কাছে যাচ্ঞা করে, পরিত্যক্ত, উচ্ছিষ্ঠ খাবার সংগ্রহ করে উদরপূর্তি করে। তারাও ঠিক খুঁজে খুঁজে কোন অট্টালিকার কার্ণিশের তলায়, রেলওয়ে প্লাটফর্মে, ফুটপাথের রেলিং-এ দড়ি বেঁধে প্লাস্টিকের ছাদ রচনা করে, জন্ম-নিয়ন্ত্রণের চিন্তা না করে ৩-৪টে বাচ্চাকাচ্চাসহ রোগ-শোক-ব্যাধি-জরাকে সাথি করে দিব্যি শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা কাটিয়ে দিচ্ছে। সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ণ দপ্তর যদি এ বিষয়ে একটু নজর দিত, তাহলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বিষয়টি সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারতো।
    জনসংখ্যার অর্থ মানুষের সংখ্যা। মুখে যতই বলিনা কেন, ‘মানুষ সব সমান’, বাস্তবে তো তা’ হতে পারে না। আমাদের কোষে থাকা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ক্রোমোজোমগুলোও সব সমান নয়, আলাদা আলাদা। অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো ‘হোমো স্যাপিয়েন্স’ বা ‘মানবজাতি’-রও পৃথক পৃথক নৃ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আছে। নর্ডিক, মঙ্গোলয়েড, অস্ট্রালয়েড, নিগ্রোয়েড ইত্যাদি ইত্যাদি। পৃথক পৃথক বংশ, বর্ণ, গোত্র বৈশিষ্ট্যও আছে। প্রতিটি মানুষের মধ্যে আবার দোষ-গুণ, ভালোমন্দ আছে। শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতাতে ‘গুণত্রয়বিভাগযোগ’ নামক অধ্যায়ে সাত্ত্বিক, রাজসিক, তামসিক নামের তিন প্রকার গুণসম্পন্ন মানুষের কথা বলা হয়েছে। আবার ‘দৈবাসুরসম্পদ্বিভাগযোগ’ নামক অধ্যায়ে মানুষের দৈবীভাব এবং অসুরভাবের মানুষের উল্লেখ করা হয়েছে। ভালো মানুষদের মধ্যে দৈবীভাব এবং সত্ত্বগুণের প্রাধান্য রয়েছে। যে মানুষেরা সহানুভূতি-প্রবণ নিজের সত্তার প্রতীক মনে করে সবাই দেখে। মেয়েদের কামুক দৃষ্টিতে না দেখে, মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখে। উপযুক্ত সেবা বা সার্ভিস দিয়ে ন্যায্য পথে উপার্জন করে। অন্যের রোজগারে ভাগ বসায় না। কাট্ মানি, কমিশন, ঘুষ খায় না। একটা আদর্শের অনুসারী হয়ে চলে। পিঠ বাঁচাতে, পেট বাঁচাতে আপোষরফা করে না। দল বদল করে না। রাজনীতির নামে দুর্নীতি করে না, বুথ দখল করে না, পার্টিকে জেতাতে হিংস্র হয়ে ওঠে না। প্রবৃত্তির স্বার্থের হানি হলে মানুষ খুন করতেও পিছপা হয় না। ওই মানুষগুলোকে আমরা অসুর-ভাবের মানুষ বলতে পারি। যারা পরিবার, সমাজ, পরিবেশ রাষ্ট্রকে নানাভাবে অশান্ত করছে। ভালো মানুষদের প্রয়োজনীয় অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান থেকে বঞ্চিত করে নিজেরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ সংগ্রহ করছে, বিনষ্ট করছে। আপনি-আমি ওই মানুষগুলোকে সমাজের, দেশের শত্রু মনে করলে কি হবে, দলীয় রাজনীতিতে এদের কিন্তু খুব কদর। ওই ধরণের মানুষগুলোর বংশ বাড়তে না দিয়ে, ওদের জন্ম নিয়ন্ত্রণ করে যদি দৈবীসম্পদের মানুষের জন্ম বাড়ানো যায়, তাহলেই তো সহজেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়। কিন্তু করবেটা কে? যে প্রজাতন্ত্রের কাঠামোর মাধ্যমে নীতি নির্ধারণ করা হবে, আইন প্রণয়ন করা হবে, সেই প্রজাতন্ত্রের আঁতুড়ঘরটাই তো অশুদ্ধ। অসুর-ভাবের সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষেরাই তো ‘জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন’-দণ্ড হাতে নেবে! নইলে ভোটের জন্য পুলিশ, মিলিটারী, বোমা, আগ্নেয়াস্ত্র, হিংসা, খুন, জখম, কোটি কোটি টাকার অপচয় হয়! যারা দেশের সেবায় ব্রতী হবে, সেই জন-প্রতিনিধিদের পুষতে প্রচুর অর্থের অপচয় হয়!
    অপরাধ স্বীকার করে নিয়ে বলতে হয়, করার দায়িত্বটা ছিল, প্রত্যেকটি ‘আমি’র। আমার, আপনার, সকল সৎসঙ্গীদের। আমরা হলাম ব্যর্থ। ‘‘তুমি তোমার, নিজ পরিবারের, দেশের ও দশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দায়ী।’’ বাণীটা সত্যানুসরণেই থেকে গেল। ‘পরমরাষ্ট্রিক সমবায়’ এখনো গঠন করা গেল না।
    যাকগে, ওসব ব্যাপার আপনারা সবাই জানেন। আমরা এবার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টাকে একবার বাস্তবভাবে বোঝার চেষ্টা করি।
    এমন অনেক দম্পতি আছে, যারা বাস্তব জীবনে কোয়ালিটি প্রোডাক্টের পক্ষপাতী হলেও বাবা-মা হবার বেলায় উদারচেতা—কোয়াণ্টিটি বাড়াতে ব্যস্ত!—‘জীব দিয়েছেন যিনি, আহার যোগাবেন তিনি!’—দর্শনে বিশ্বাসী!
    তবে, আধুনিক যুগের একজন চিন্তাশীল মানুষ কখনোই নিজের দাম্পত্য জীবনে জনসংখ্যা বাড়াতে চান না, চাইবেনও না। একটা-দুটো সুস্থ সন্তান জন্মাতে পারলেই তাদের পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু সুস্থ সন্তান কামনা করলেই তো আর সুস্থ সন্তান অর্ডার দিয়ে পাওয়া যাবে না। এজন্য সুস্থ পাত্র-পাত্রী প্রয়োজন। সুস্থ বিয়ের প্রয়োজন। সুস্থ দম্পতির প্রয়োজন। সুস্থ পরিকল্পনার প্রয়োজন। সর্বোপরি সুস্থতা কাকে বলে, তা জানার প্রয়োজন। তাই নয় কি?
    সুস্থতা বিষয়ে আমরা বেশী কিছু না জানলেও ‘স্বাস্থ্যই সম্পদ’ এই আপ্ত বাক্যটি আমরা প্রায় সকলেই জানি। সেই স্বাস্থ্য সম্পর্কে স্বাস্থ্যের সর্বময় কর্তা ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’ কি বলেন, সেটা সকলের জানা দরকার আছে। বিশেষ করে জীবন পিয়াসী মানুষদের। সুস্থ যদি থাকতে চান এবং আপনার প্রিয়জনকে যদি সুস্থ রাখতে চান তাহলে এবার সংজ্ঞাটি মনোযোগ সহকারে পড়ুন এবং বোঝার চেষ্টা করুন।
    As per World Health Organisation–”Health is a state of complete physical, mental and social well-being, and not merely an absence of disease or infirmity.”
    The Sign of Physical Health : “…………a good complexion, a clean skin, bright eyes, lustrous hair with a body well clothed with firm flesh, not too fat, a sweet breath, a good appetite, sound sleep, regular activity of bowels and bladder, and smooth, easy, coordinated bodily movements. All the organs of the body are of unexceptional size and function ‘normally’; all the special senses are intact; the resting pulse rate, blood pressure and excercise tolerance are all within the range of ‘normality’ for the individual’s age and sex….”
    The Sign of Mental Health : “…….feel satisfied with himself. He feels happy, calm and cheerful. There are no conflicts within himself. He is well adjusted. He accepts criticism and is not easily upset. He understands the emotional needs of others, and tries to be considerate. He has good self-control; he is not overcome by emotion; he is not dominated by fear, anger, love, jealousy, guilt or worries. He faces problems and tries to solve them intelligently.”
    The Sign of Social Health : “He is at peace with others and is able to feel himself as a part of a group and is able to maintain socially considerate behaviour.”
    Sign of Positive Health : “A person should be able to express as completely as possible the potentialities of his genetic heritage.” (Source : Preventive and Social Medicine by PARK)
    Mentioned all types regulated by positive health. Positive health depends on genetical instinct. A good instinct depends on good breeding. Good breeding depends on healthy couple, those who are physically, mentally and spiritually sound and sane.
    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞায় আমরা জানতে পারলাম, শুধু নীরোগ থাকলেই হবে না, —শারীরিক, মানসিক, এবং আত্মিকভাবে স্বচ্ছন্দ ব্যক্তিকেই সুস্থ বলা যাবে। অতএব সার্বিকভাবে সুস্থ থাকতে হলে সুস্থ শরীর, মন, আত্মার অধিকারী হতে হবে। উক্ত সংজ্ঞার পরিপূরক যারা নয়, তারা অসুস্থ। সেই অসুস্থরা যদি সন্তান জন্মাবার অধিকার পায় তাহলে অসুস্থ প্রজন্ম সৃষ্টি হবে। সুস্থ একটা প্রজন্ম তৈরি করতে হলে সংজ্ঞার পরিপূরক সুস্থ দম্পতির যৌথ প্রচেষ্টায় একটা সুস্থ শিশু সৃষ্টি হবে। তারজন্য বিবাহার্থে সুস্থ জুটি নির্বাচন করতে হবে। এছাড়া শুধুমাত্র ওষুধপত্রের চিকিৎসায় সকলকে স্বাস্থ্যের অধিকারী করা যাবে না। তাই বিয়ের আগে পাত্রপাত্রীর স্বাস্থ্যের বিষয়েও আমাদের ভাবতে হবে।
    সার্বিকভাবে ভাল স্বাস্থ্যের সন্তান পেতে হলে সংজ্ঞা অনুযায়ী স্বাস্থ্য নির্ণয়ের সাথে সাথে blood ABO Rh & genetic counseling করে নিলে ভাল হয় । সগোত্রে (same blood line)- এ বিয়ে হলে albinism, alkaptonuria নামের রোগ হয়। Schizophrenia, thalassaemia সহ অনেক দুরারোগ্য ব্যাধি আছে যা উত্তরাধিকারে সন্তান পেয়ে থাকে। মেয়েদের বেশি বয়সে বিয়ে হলে ‘mongolism’ নামের বিকৃত সন্তান জন্মাবার সম্ভাবনা থাকে।
  • * *
    আধুনিক যুগে প্রতিটি সচেতন মানুষই আর কিছু না হোক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে হুঁশিয়ার। লোকসান যাতে না হয় সে বিষয়ে সদা সতর্ক থাকেন। বাজার থেকে আলু, বেগুন, পটল, মুলো কিনতে গেলেও, কোয়াণ্টিটি না দেখে ভালো কোয়ালিটির, ভালো জাতের জিনিস কেনে। লাভালাভ বিবেচনা করেন। ঠকতে চান না। বিশেষ জ্ঞানকে কাজে লাগান। অথচ সেই মানুষেরাই অন্তঃস্থিত দৈবাসুর (প্রবৃত্তি এবং সত্তা) প্রকৃতিকে সঠিক বিনিয়োগে ম্যানেজ করতে ব্যর্থ হন। একজন পুরুষের সার্বিক উন্নতির চরম পরিণতি সফল পিতৃত্বে, একজন নারীর মাতৃত্বে। পিতৃত্ব এবং মাতৃত্ব অর্জনের নির্দিষ্ট উপাঙ্গও প্রকৃতি আমাদের দিয়েছেন, যার সফল বিনিয়োগে একজন আদর্শ পিতা, একজন আদর্শ মাতার পরিচয় বহন করে সুখ্যাত হতে পারি, আবার অসফল বিনিয়োগে কুখ্যাতও হতে পারি। সভ্যতার প্রাতঃ স্মরণীয় মনীষীবৃন্দের জনক-জননীরা সকলের কাছেই বন্দিত। আবার ভ্রষ্টাচারীর, সন্ত্রাসবাদীর, ধর্ষকের পিতামাতারা সমাজের চোখে নিন্দিত।
    শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই নয়, মনুষ্যেতর প্রাণীদের ক্ষেত্রেও ওই বিধি কঠোরভাবে প্রযোজ্য।
    সরকারী প্রয়োজনে একটা কুকুর কিনতে গেলেও পেডিগ্রি অর্থাৎ বাবা-মায়ের বিশুদ্ধ বংশানুক্রমিকতার শংসাপত্রের সমৃদ্ধির গুরুত্ব বিচার করে প্রভূত মুল্য ব্যয় করে কেনে। এক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া জাতির নামে উদারতা দেখিয়ে রাস্তার কুকুর দিয়ে কাজ চালায় না। একটু খোঁজ নিলে জানতে পারবেন দেশরক্ষার স্বার্থে যে কুকুরগুলোকে ব্যবহার করা হয়, ওদের কি পদ্ধতিতে প্রজনন করান হয়। ওইসব কুকুরীদের সতীত্ব রক্ষা হয়। নিম্ন শ্রেণীর কোন কুকুরদের সাথে মিশতে দেওয়া হয় না। কোন অসুস্থ কুকুর-কুকুরীদের দিয়ে বাচ্চা উৎপাদন করা হয় না। একটা ভালো গোরুর বাচ্চা তৈরির জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করে উন্নত জাতের ষাঁড়ের শুক্রাণু কিনে সুপ্রজনন করার ব্যবস্থা করে সরকার, রাস্তায় ঘোরা ষাঁড়গুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে!
    কৃষিক্ষেত্রেও তাই। উন্নত ফসলের জন্য ভালো জাতের সংরক্ষিত বীজ শোধন করে, বীজ অনুযায়ী উপযুক্ত উর্বর জমিতে ‘জো’ বুঝে বপন করতে পরামর্শ দেওয়া হয়। একজন আদর্শ কৃষক বাস্তব পরিচর্যার মাধ্যমে বিশুদ্ধ বীজ, বিশুদ্ধ জমিতে বিনিয়োগ করে উন্নত জাতের ফসল পাবার জন্য।
    প্রাণী সম্পদ, কৃষি সম্পদ বিকাশের ক্ষেত্রে জৈবিক সম্পদের বিহিত বিনিয়োগ করে বুদ্ধিমান মানুষেরাই। অথচ এই বুদ্ধিমান মানুষেরাই ওই জৈবী সম্পদকে অপচয়ীভাবে বিনিয়োগ করে নিজেদের বিশেষ জ্ঞানকে অপমান করছে। মহান ভারতের মহান চরিত্র দুর্গা, লক্ষী, সরস্বতী, সীতা, সাবিত্রী প্রমুখ নারীদের আদর্শ ভুলে প্রকৃতি প্রদত্ত জৈবী সম্পদকে যৌবন গরবে গরবিনী প্রবৃত্তিতাড়িত একজন নারী,–নিজের নারীত্বকে দর্শকামে, স্পর্শকামে, শ্রুতকামে, পণ্য করে পুরুষের সুপ্ত কামনাকে জাগিয়ে লাম্পট্য, ব্যভিচারকে পুষ্ট করতে পারে, প্রভূত অনিত্য সম্পদের মালকিন হতে পারে, কিন্তু ভালো মা হয়ে নিত্য-জীবনে আদর্শ নারীর খেতাব অর্জন করতে পারবে না। উনো জমিতেই দুনো ফসল ফলে, বুনো জমিতে নয়। পুরুষের ক্ষেত্রেও তাই। পুর্ব পুরুষের জীবনধারা প্রবাহিত বীর্য্যকে ব্যভিচার, ধর্ষণ, স্বমেহন আর কন্ডোমে অপবিনিয়োগ করে ধর্মবিরুদ্ধ কামসেবার ইন্দ্রিয়-লালসায় বিনিয়োগ করে দুষ্ট প্রবৃত্তিকে তুষ্ট করতে গি়য়ে যৌনব্যাধি, মানসিক কষ্ট, বিবেক-দংশন, সামাজিক ছি! ছি! লাভ করতে পারবে, ভালো বাবার গৌরব অর্জন করতে পারবে না। বীজ শুদ্ধ না হলে ফসলও অশুদ্ধ হবে।
    তাই সব কিছুর পূর্বে ভালো মানুষের জন্ম যাতে হয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে মেয়েদের। বর্ণ, বংশ, অভ্যাস, ব্যবহার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সবকিছু মিলিয়ে দেখে সম-বিপরীত সত্তার একজন উন্নত পুরুষকে বর হিসেবে নির্বাচন করে বিয়ে করতে হবে। তাহলেই ভালো সন্তানের মা হতে পারবে।
    বিয়েটা যাতে নিখুঁত হয়, সে বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, “বিয়ের প্রথম উদ্দেশ্যই হ’লো genetic enrichment ( জননগত সমৃদ্ধি)। এইটে হ’ল first and foremost (প্রথম এবং প্রধান)। তার পরের জিনিস হ’ল cultural enrichment (কৃষ্টিগত সমৃদ্ধি)। তাই বর-কনের বংশগত ও ব্যক্তিগত আচার, ব্যবহার, কর্মের সঙ্গতি আছে কিনা তা’ দেখা লাগে। আবার চাই physical enrichment (শরীরগত সমৃদ্ধি)। ….Genetic asset কার কেমনতর তা’ না বুঝে বিয়ে থাওয়ার সম্বন্ধ করা ভাল নয়।”
    Genetic assetকে গুরুত্ব না দেবার ফলেই বর্তমান পৃথিবীতে শতকরা প্রায়
    40টি অকাল মৃত্যুর কারণ কিছু দুরারোগ্য বংশগত ব্যাধি। যা সন্তানেরা উত্তরাধিকারে পায়। যা কোন চিকিৎসাতে সারানো যায় না। প্রতিরোধ করার একমাত্র উপায় সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা দুরারোগ্য বংশগত রোগমুক্ত বিশ্বস্ত বংশে বিবাহ করার নিদান দিয়েছেন। অতএব ওইসব দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে পরমপুরুষ নিদেশিত সুবিবাহ ও সুপ্রজনন বিধি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রজন্মের সুখশান্তি উত্থান-পতন সবকিছুর মূলভিত্তি হলো বিবাহ সংস্কার। সেই বিবাহ যদি শুধু যৌন লালসার এবং লিভ টুগেদার-এর কেন্দ্রবিন্দু হয় তাহলে কোনদিনও অসুখবিসুখ অকালমৃত্যু, সন্ত্রাসবাদ, শোষণবাদ থেকে সভ্যতাকে স্বস্তি দিতে পারবে না ডাক্তার, উকিল, পুলিশ, মিলিটারি, সংশোধনাগার, হাসপাতালের প্রচলিত ব্যবস্থাপনা। বিশ্বাসঘাতক মানুষদের সনাক্ত করতে শুদ্ধ জন্মের শংসাপত্র প্রাপ্ত ভাল জাতের বিশ্বাসী কুকুর (pedigreed dog) আমদানি করতে আগ্রহী যে রাষ্ট্র, সেই রাষ্ট্র ব্যবস্থা দৈবগুণসম্পন্ন বিশ্বাসী মানুষ সৃষ্টি করার মহান আর্যবিধিকে উপেক্ষা করে, যেমন খুশি তেমন বিয়ের মাধ্যমে কু-জন জননের অনুমোদন দিয়েছে! এই ব্যবস্থার পরিবর্তন না করতে পারলে দেশের কোন সমস্যার সমাধান হওয়া সম্ভব নয়।
  • * *
    নারী হতে জন্মে জাতি। নারীই গৃহ, সমাজ ও রাষ্ট্রের ধাত্রী ও পালয়িত্রী। প্রাকৃতিক নিয়মে একজন নারীর চরম পরিণতি মাতৃত্বে। মুখে আমরা যতই নারী-স্বাধীনতার কথা বলি না কেন, এক্ষেত্রে কিন্তু পুরুষের উপর নির্ভরশীল হতেই হয়। (অবশ্য মা হতে না চাওয়া লেসবিয়ান আদর্শে বিশ্বাসীদের কথা আলাদা। তারা অবশ্যই ব্যতিক্রমী।) সেই পুরুষটি মাতৃত্বকামী নারীর তুলনায় শারীরিক-মানসিক-আত্মিকভাবে যত উন্নত হবে,— স্বাস্থ্যবান হবে, ভালো চরিত্রের হবে, নারীটির দাম্পত্য জীবন তত সুখের হবে, সন্তানও ভালো হবে। এটাই তো স্বাভাবিক নিয়ম। তাই নয় কি? আর সেগুলো পেতে গেলে বর্ণে, বংশে, বয়সে, স্বাস্থ্যে, শিক্ষায়-দীক্ষায়—সবদিক থেকে উন্নত সম-বিপরীত সত্তার একটা পুরুষকে,— ভাবী সন্তানটির বাবাটিকে খুঁজে নিতে হবে, বিবাহের মাধ্যমে। বিবাহ করে নারী। পুরুষ করে উদ্বাহ। বিবাহ মানে পুরুষের সত্তাকে বিশেষরূপে বহন করা। যে পুরুষটির কাছে নারীত্বকে সমর্পণ করে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে। তাই নির্ঝঞ্ঝাট সুখের দাম্পত্য জীবন পেতে গেলে, ভালো সন্তানের মা হতে গেলে, লেখাপড়া শেখার পাশাপাশি, কুমারী অবস্থা থেকেই একটা পরিকল্পনা করে নিতে হবে, প্রস্তুতি নিতে হবে। কারণ প্রত্যেক নারীই চায় তার সন্তানটি সুস্থ থাকুক, ভালো হোক, কৃতী হোক। সেগুলো তো আর রেডিমেড পাওয়া যাবে না, আর স্টেজ মেক-আপও দেয়া যাবে না। নিয়ম মেনে অনুশীলন করতে হবে। মা-কেই মেপে মেপে সঞ্চয় করতে হবে ভবিষ্যতের সন্তানের ভালোমন্দের সব উপকরণ। মা মানে মেপে দেওয়া। সন্তানের ভালো-মন্দ মেপে দেয় বলেই মা। ভাবী মায়ের চলন-চরিত্র দ্বারা প্রভাবিত হয় নারীর-জননকোষ, অপত্য-কোষ। সেইজন্যই সন্তান ধারন-পালন-লালন-এর জন্য আবশ্যিক প্রত্যঙ্গগুলোকে (স্তন ও অপত্যপথ) সযত্নে মেপে মেপে লালন-পালন করতে হবে, সংরক্ষণ করতে হবে ভবিষ্যতের সন্তানের মঙ্গলের জন্য। তা না করে, যুগধর্মের বশবর্তী হয়ে ‘হেটেরো-সেক্সুয়াল’ কমপ্লেক্সের প্রলোভনে পড়ে ওগুলোকে যদি আম-পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করে ফেলা হয়, তাহলে তো ভাবী সন্তানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। যার জন্য সংরক্ষিত জিনিস, আত্মঘাতী উদারতার বশে অন্যকে ভাগ দেবার অপরাধে। এজন্য রোগ-ভোগেও ভুগতে হয়। Oncologist, Gynaecologist, Sexologist, Psychologist-দের শরণাপন্ন হতে হয়।
    বর্তমান যুগে নারীরা লেখাপড়া, শিক্ষা-সংস্কৃতি, কর্মক্ষেত্রে, অভিযানে, বিজ্ঞান গবেষণায় প্রভৃতি কোন ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নেই। এমন অনেক নারীদের কথা আপনারা জানেন, আমিও জানি। আবার এ-ও দেখেছি, বাহ্য জগতের সবক্ষেত্রে কৃতি নারীদের অন্তর্জগতের হাহাকার। মনের মত সন্তান না পাওয়ার জ্বালায়, সন্তানকে মনের মত করে মানুষ করতে না পারার জ্বালায়, থ্যালাসেমিয়া, স্কিজোফ্রেনিয়া, লিউকোমিয়া প্রভৃতি নামের দুরারোগ্য ব্যাধির জ্বালায় জ্বলতে গিয়ে জীবনের সুখ-শান্তির অনুভূতিটা হারিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছে।—যেন, ‘সব আছে তবু নেই’। মাতৃত্ব-পিয়াসী একজন সন্তানহীনা নারীর যে কি কষ্ট, কি বেদনা, তা ভুক্তভোগী ভিন্ন কেউ উপলব্ধি করতে পারবে না। একটি সন্তান পেতে সব-রকমের চিকিৎসা করার পরও যখন সন্তান-লাভে ব্যর্থ হয়, তখন অনেক টাকা খরচ করে গর্ভ ভাড়া নেয়, দত্তক সন্তান নেয়।—এমন অনেক কিছু করেন। ওই সব সমস্যার স্রষ্টাও কিন্তু নারী। ‘আত্মানং বিদ্ধি।’ (know thyself বা নিজেকে জানা)-র শিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে সব কিছুকে জেনেছে, জানতে পারেনি নিজেকে। নিজের নারীত্বের-পূর্ণতার বিষয়ে জানা হয়ে ওঠেনি।
    একটা উন্নত প্রজাতির কোন গাছ লাগাতে গেলেও কিছু প্লান-প্রোগ্রাম নিতে হয়। আগে থেকে জমি নির্বাচন করতে হয়, উপযুক্ত সার দিয়ে জমি তৈরি করতে হয়, তারপর মাটির উপযুক্ত বীজ বা চারা বসাতে হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় বর্তমান যুগের বেশিরভাগ লেখাপড়া শিখতে যাওয়া নারীরা, পুরুষের সাথে পা-মিলিয়ে, গলা-মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ‘হোক-কলরব’ আন্দোলনে পারদর্শী হলেও, নিজের আত্ম-বিস্তারের জন্য আবশ্যিক আত্ম-সম্পোষণ, আত্ম-সংরক্ষণ করার জন্য নির্দিষ্ট নারীত্বের অস্তিত্ব রক্ষার জমিটুকুকে সংরক্ষণ করা বিষয়ে উদাসীন। যারফলে কালেক্রমে মনুষ্যত্ব সম্পন্ন অসৎ-নিরোধে তৎপর সন্তান থেকে সভ্যতা বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব রামকৃষ্ণদেব, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নেতাজী সুভাষচন্দ্র প্রমুখ মনীষীদের জন্মদাত্রীগণ ক্যাম্পাসে, অফিসে, মিটিংয়ে, মিছিলে কোন ‘কলরব’ না করেই, সনাতনী নারীধর্ম পালন করে রত্নগর্ভা হয়েছিলেন। ভারতীয় কৃষ্টি প্রদত্ত প্রকৃষ্ট-গতির পথ ভুলে, তথাকথিত প্রগতির নামে ছুটে চলা নারীবাদিরা বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে দেখতে পারেন।
    জগতের সকল অশান্তির সুতিকাগৃহ হচ্ছে যৌন বিকৃতি। ভালকরে খোঁজ নিলে দেখা যাবে সব গণ্ডগোলের জন্ম হয় অনিয়ন্ত্রিত যৌনতা থেকে। অবৈধ যৌন-সংশ্রব মস্তিস্কে এমন সংস্থিতি এনে দেয় যার অভিভূতিকে অতিক্রম করা দুরূহ হয়ে ওঠে। তাই তো শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের সাবধান করে বাণী দিলেন।
    যোনি যোগে ঢুকলে পাপ,
    রোখাই কঠিন তাহার দাপ।
    শাসন সংস্থা যেমনই হোক
    যাতেই মাথা ঘামাও না,
    যৌন-জীবন শুদ্ধ না হলে
    দেশের জীবন টিঁকবে না।
    ব্যষ্টি-চরিত্র যৌনজীবন
    ব্যভিচার যেথা উচ্ছলা
    জনজীবন সে দেশে প্রায়ই
    চরিত্র দোষের পিচ্ছলা;
    অন্তরালে অদৃষ্ট তখন
    ভাসতে থাকে চোখের জলে
    আপদ তখন বিপদ নিয়ে
    সবার পিছু পিছু চলে।
    জনন-বিভ্রাট যেই এলো রে
    ক্রমে ক্রমে রাষ্ট্র ছেঁয়ে
    লাখ ঐশ্বর্য্য থাক না কেন
    আপদ সেথায় যাবেই বেয়ে।
    পরিবারকে উন্নতি বা অবনতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী প্রধানতঃ নারী। কথায় আছে, ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে। গুণবান পতি যদি থাকে তার সনে।।’ আদর্শ একজন পুরুষের সাহচর্যে নারীর হাতেই গড়ে ওঠে আদর্শ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র। নারীই হচ্ছে জাতির বল ও ভরসা। লক্ষী নারীদের উপরেই রয়েছে মহান জাতি গঠনের বিরাট দায়িত্ব। মহান আদর্শকে চরিত্রায়িত করে নারী যদি পরিবারকে সুন্দর ও সার্থক করে সাজিয়ে তুলতে পারে তবেই জগত-সংসার সুখের হয়। আদর্শ জাতি গঠন করার দায়িত্ব নারীদের উপর থাকার জন্য তাদের শিশুকাল থেকেই ভালো মা হবার সাধনায় অগ্রসর হতে হবে। নারী জীবনের বিভিন্ন পর্যায় আছে। ওই পর্যায়গুলো ভগ্নি, বধূ, স্ত্রী, জায়া, জননী ও গৃহিনী ও জননীত্ব। ওগুলোকে সমৃদ্ধ নারীরাই করতে পারেন, পুরুষেরা নয়। স্নেহ, মায়া, মমতা ও ভালবাসার দ্বারা পূর্ণ নারীর হৃদয়। নারীরা ইচ্ছা করলেই তাঁর অন্তর্নিহিত বিভিন্ন শক্তির দ্বারা জাগিয়ে তুলতে পারেন বিশ্বকে। সুসন্তান উপহার দিয়ে। যেমনটি দিয়েছিলেন হিরণ্যকশিপুর পত্নী কয়াধু, প্রহ্লাদকে জন্ম দিয়ে।
    কু-জনদের জন্ম নিরোধ করে, কিভাবে সু-জনদের মা হওয়া যায়, সেই শিক্ষায় নারীদের শিক্ষিত করার জন্য শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ‘নারীর নীতি’, ‘নারীর পথে’, ‘দেবীসূক্ত’, ‘বিবাহ-বিধায়না’ শিরোনামের গ্রন্থরাজির উপহার রেখে গেছেন। সেই উপহারের ডালিগুলোকে কাজে লাগাতে পারলে শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণজনিত সমস্যা নয়, জগতের সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।
    পরিশেষে বিশ্বশান্তির আহ্বায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের একটি বাণী পাঠকদের উপহার দিয়ে যবনিকা টানলাম। জয়গুরু! প্রণাম! বন্দে পুরুষোত্তমম্! tapanspr@gmail.com
    ——
    ** জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ভাবনা **
    ।। লক্ষ্মী নারী ।।
    সংকলক—তপন দাস

নারী হইতেই জাতি জন্মে ও বৃদ্ধি পায়, তাই নারী যেমন ব্যষ্টির জননী তেমনই সমষ্টিরও ;– আর, এই নারী যেমন ভাবে আবিষ্ট থাকিয়া যেমন করিয়া পুরুষকে উদ্দীপ্ত করে পুরুষ হইতে সেই ভাবই নারীতে জন্মগ্রহণ করে ; তাই, নারী মানুষকে প্রকৃতিতে মূর্ত্ত ও পরিমিত করে বলিয়া জীব ও জগতের মা ;–তাহ’লেই বুঝিও– মানুষের উন্নতি নারীই নিরূপিত করিয়া দেয় ; তাই নারীর শুদ্ধতার উপরই জাতির শুদ্ধতা, জীবন ও বৃদ্ধি নির্ভর করিতেছে– বুঝিও, নারীর শুদ্ধতা জাতির পক্ষে কতখানি প্রয়োজনীয় ! ১৭৬ ।’’
(চলার সাথী গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী)

।। রথযাত্রা ও আমরা ।।

** রথযাত্রা ও আমরা **
এবার পশ্চিমবঙ্গের সমুদ্র সৈকত দীঘার জগন্নাথদেবের মন্দিরকে কেন্দ্র করে রথযাত্রার আগে থেকেই প্রসাদ বিতরণ সুরু হয়ে গেছে—রেশন দোকান এবং জন প্রতিনিধিদের মাধ্যমে।

প্রসাদ=প্র + √ সদ্ + অ। অর্থাৎ , ইন্দ্রিয় মাধ্যমে যা গ্রহণ করলে অন্তর শুদ্ধ, বুদ্ধ, পবিত্র ও প্রসারিত হয়। শরীর, মন, প্রাণ হৃষ্ট হয় তাই প্রসাদ। যদিও আমরা দেবী-দেবতার, সাধু-মহাপুরুষ, গুরুদেবের উদ্দেশ্যে নিবেদিত খাদ্যদ্রব্যকে সাধারণত প্রসাদ বলে জানি এবং মানি। তাই বলে যেমন-তেমন খাদ্যবস্তু প্রসাদ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়, সাত্ত্বিক খাদ্যদ্রব্য হতে হবে। একমাত্র আস্ত টাটকা-তাজা সুস্থ ফলই সাত্ত্বিক খাদ্যদ্রব্য হিসেবে বিবেচিত।

ফল ব্যতীত পক্কান্ন প্রসাদ দিতে হলে প্রসাদ প্রস্তুতকারিকে এবং প্রসাদ পরিবেশনকারিকেও সদদীক্ষায় দীক্ষিত এবং সাত্ত্বিক চলনে সিদ্ধ হতে হবে।
স্বয়ং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন…………….
“বিষয়ীর অন্ন খাইলে মলিন হয় মন,
মলিন মন হৈলে, নহে কৃষ্ণের স্মরণ।।

                       * * *

প্রসাদ পরিবেশন করার যোগ্যতা :
সাত্ত্বিক আহার গ্রহণকারী দীক্ষিত ভক্তদের দ্বারা প্রসাদ প্রস্তুত এবং পরিবেশন করা উচিত। উভয়কেই সুস্থ, শুদ্ধচিত্ত, পবিত্র, নম্র এবং পরিচ্ছন্ন হতে হবে।
                          * * *
যাইহোক, সবাইকে শুভ রথযাত্রার আগাম যথাযথ শ্রদ্ধা, ভক্তি ও প্রণাম জানিয়ে সবিনয় নিবেদন—-
জগন্নাথদেবকে কেন্দ্র করে বা জগন্নাথদেবের নামে যে রথযাত্রা উৎসব পালিত হয় সেই রথ-যানে তিনজন উপবিষ্ট থাকেন—জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা।

এই জগন্নাথদেবকে আমরা শ্রীকৃষ্ণ নামে জানি, বলরাম হলেন তাঁর দাদা আর সুভদ্রা হলেন বোন বা ভগ্নী। কোন এক সময়ে পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ দাদা ও বোনকে নিয়ে সেইসময়ের শ্রেষ্ঠ চক্রযান রথ-এ আসীন হয়ে মাসীর বাড়িতে গিয়েছিলেন। এই হচ্ছে রথযাত্রার প্রতিপাদ্য বিষয়।

পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণের ভগ্নী সুভদ্রা পিত্রালয়ে (দ্বারকা) এলে তিনি দুই দাদার কাছে নগর ভ্রমণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তখন কৃষ্ণ ও বলরাম সুভদ্রার সঙ্গে রথে করে ঘুরতে বের হন। তার পর থেকেই না কি রথযাত্রা আয়োজিত হয়ে আসছে।

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের পাশে গুন্ডিচা মন্দিরে কৃষ্ণের মাসিবাড়ি। (দ্বারকা থেকে পুরীতে!) তাঁদের মাসি তিন ভাই-বোনকেই বাড়ি আসার আমন্ত্রণ জানান। তার পরই রথযাত্রা করে কৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রা ১০ দিনের জন্য মাসির বাড়ি ঘুরতে যান।

অন্য এক কাহিনি অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণের তিরোভাবের পর তাঁর শব দ্বারকা নগরী নিয়ে আসা হলে ভাইয়ের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ বলরাম তাঁর মরদেহ নিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এ দেখে সুভদ্রাও সমুদ্রে ঝাঁপ দেন। এই সময়কালে পুরীর রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন স্বপ্ন দেখেন যে, শ্রীকৃষ্ণের শরীর সমুদ্রে ভাসছে। শ্রীকৃষ্ণের বিশাল প্রতিমা ও মন্দির তৈরির স্বপ্নাদেশ পান তিনি। কৃষ্ণের সঙ্গে সঙ্গে বলরাম, সুভদ্রার কাঠের মূর্তি তৈরির স্বপ্ন পান তিনি। কৃষ্ণের অবশিষ্টাংশ বা হাড় সেই প্রতিমার পিছনে ছিদ্র করে রাখা হয়, এমনও স্বপ্নাদেশ দেওয়া হয় রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে। তার পরই পুরীর মন্দির তৈরি করা হয়। বিশ্বকর্মা শুরু করেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার কাঠের মূর্তি তৈরির কাজ। কিন্তু তাঁর শর্ত পূর্ণ না-হওয়ায় তিনি মূর্তি অসম্পূর্ণ রেখেই অন্তর্ধান হয়ে যান। রাজা সেই মূর্তির মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের অস্থি রেখে স্থাপন করে দেন।

প্রবাদ যাইহোক, “যেনাত্মন্ স্তথান্যেষাং জীবনংবর্দ্ধনাঞ্চপী ধ্রীয়তে স ধর্ম্ম।” (অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম বলে জানিস্ তা’কে।)— পু্রুষোত্তম প্রদত্ত ধর্মের এই সংজ্ঞা মেনে ধর্ম লাভ নাই বা হোক রথযাত্রার সাথে এক আবেগ, উন্মাদনা, নস্টালজিয়া, দীর্ঘদিন ধরে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

আর ধর্ম অর্জন যদি করতে হয়, তাহলে কিন্তু প্রভু জগন্নাথ পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের নিদেশ মেনে চলতেই হবে।

পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের শ্রেষ্ঠ অবদান যদি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা হয়, উক্ত গীতা গ্রন্থে উক্ত হয়েছে “কর্মে তোমার অধিকার, ফলে নয়।” অর্থাৎ বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বলা অনুযায়ী “করাই পাওয়ার জননী, না করে যে পেতে চায়/দুঃখ তার পিছে ধায়।” সেই শ্রীকৃষ্ণের স্নানযাত্রার দৃশ্য দর্শনে মুক্তি লাভ হয়, এ ধরণের আজগুবি কাহিনী প্রচারণাও গীতা বিরোধী কাজ। আর এই কাহিনীর প্রেক্ষাপটে শ্রীকৃষ্ণকে রাধা নামের নারীর প্রতি বিশেষ প্রণয় প্রকাশ করা হয়েছে। সেটাও শ্রীকৃষ্ণের গীতা এবং ভাগবত বিরোধী কাজ। তাই কোনকিছু প্রচার করার পূর্বে বিশেষভাবে ভেবে দেখা উচিত। আমি যা করছি, তা কি ধর্মসঙ্গত? যাইহোক এবার একটু শ্রীকৃষ্ণের কথা জানা যাক। পণ্ডিতদের গবেষণা থেকে প্রমাণিত, (সূত্র : ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র রচিত শ্রীকৃষ্ণ চরিত্র।) শ্রীকৃষ্ণ ১১ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে কংসকে বধ করেন। অথচ বেশীরভাগ কৃষ্ণভক্তগণ বৃন্দাবন লীলার, রাসলীলার নামে যে যুবক কৃষ্ণকে মানবী রাধার সাথে যুগলবন্দী করে পরকীয়া কামুক রূপে চিত্রিত করে চলেছেন, সে কৃষ্ণ কোন কৃষ্ণ? সে কি বৃষ্ণিসিংহ দেবকীনন্দন, না অন্য কেউ ? সে কি গীতার প্রবক্তা পার্থসারথী, না অন্য কেউ? কারণ, বৈষ্ণবদের প্রামাণ্য গ্রন্থ ভাগবতে রাধা-কৃষ্ণের ওইসব অবৈধ পরকীয়া-লীলার কোন কাহিনী লিপিবদ্ধ নেই। অথচ কৃষ্ণের প্রচারকেরা গীতার কথা বলেন, ভাগবতের কথা বলেন, অথচ আয়ান ঘোষের ঘরণী রাধাকে শ্রীকৃষ্ণের সাথে এক অবৈধ সম্পর্কের সাথে জুড়ে নিয়ে কৃষ্ণনাম করতে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণের যে বদনাম করে চলেছেন, সেটাও তাদের বোধে ধরা পড়ে না, এমনই ধার্মিক তা’রা ! বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন—‘‘শুনেছি ভাগবতে রাধা ব'লে গোপিনী নেই। আমি বুঝি, রাধা মানে সেরা সৃষ্টি-রচয়িতা শক্তি। শব্দের থেকেই সব। কতরকমের শব্দ শোনা যায়। ওঁ-অনুভূতির পূর্বে দারুণ বম্ বম্ বম্ শব্দ হয়। দুনিয়াটা যেন ফেটে চৌচির হ'য়ে যাবে। কিছু থাকবে না, সব ধ্বংস হ'য়ে যাবে। সত্তাকেও বিলুপ্ত ক'রে দেবে। এমন শব্দ, সব যেন টুকরো টুকরো হ'য়ে, রেণু রেণু হ'য়ে উড়ে যাবে। সে কী ভীষণ অবস্থা! ভয় বলি, সত্তার ভয় যে কী তখন বোঝা যায়! সত্তা বুঝি এই মুহূর্তে গুঁড়িয়ে দিল। তখন বোঝা যায় দয়ালের দয়া, যে দয়ায় টিকে আছি এই দুনিয়ায়। ওঁ-অনুধাবনে রং আসে। রং-এ মনোনিবেশ করলে পিকলু বাঁশীর মত শব্দ হয়। দোল আসে। এক অবস্থায় motion and cessation (গতি এবং বিরতি)-এর মত বোধ হয়। স্বামীর অনুভূতি যেন to and from (একেবার সামনে একবার পেছনে হচ্ছে)-এমনতর বোধ করা যায়। ইলেকট্রিক ব্যাটারি দিলে যেমন শব্দ পাওয়া যায় না, ভিতরে বোধ হয়, রাধাও ঐ রকম সত্তা দিয়ে মানুষ হয়। শেষ দিকে আসে একটা পরম শান্ত অবস্থা। আমাদের এই সৎনাম সব মন্ত্রের বীজস্বরূপ। সব বীজের সত্তা হ'লো কম্পন। আর কম্পনের গঠনতন্ত্র অনুভব করা যায় এই নামের মধ্যে। রেডিওর যেমন শর্ট ওয়েভ, মিডিয়াম ওয়েভ এবং নানা মিটার আছে, অনুভূতির রাজ্যেও সেই রকম সব আছে। এগুলি ফালতু কথা না, এগুলির সত্তা আছে। যে সাধন করে সেই বুঝতে পারে। হ্রীং ক্রীং ইত্যাদির স্তরে-স্তরে কত শব্দ এবং তার সঙ্গে-সঙ্গে জ্যোতি ভেসে ওঠে। আর একটা কথা, পরীক্ষা করতে গেলে সদগুরুকে ধরা যায় না। কামনা নিয়ে গেলেও তাঁকে পাওয়া হয় না। কামনা ত্যাগ ক'রে ধরলে তখন তাঁকে পাওয়া যায়। কামনা নিয়ে তাঁতে যুক্ত হ'তে গেলে কামনার সঙ্গে যুক্ত হই, তাঁতে যুক্ত হ'তে পারি না। নিষ্কামের কথা কয়, তার মানে গুরুই আমার একমাত্র কাম্য হবেন, অন্য কোন কামনা থাকবে না। তখনই তাঁকে পাওয়া যাবে।’’ (আ. প্র. ১৫শ খণ্ড, পৃঃ ২০০-২০১ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী)

।। পুরীর জগন্নাথদেব প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।

শ্রীশ্রীঠাকুর— ………. “পুরীতে জগন্নাথের মন্দিরে যদি যাও, তাহ’লে দেখতে পাবে জগন্নাথের হাত নেই। জগন্নাথ জনে-জনে হাত বিলিয়ে নিজে হাতহীন হ’য়ে ব’সে আছেন। আমাদের উপর তাঁর কোন হাত নেই। কিন্তু যেই আমরা তাঁকে আমাদের
হাত দু’খানি দিয়ে নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধ’রবো অমনি আমরা তাঁর হাতে চ’লে যাব। তখন তাঁর ইচ্ছায় আমরা চালিত ক’রবো নিজেদের। এমনি ক’রেই আমরা সেই মঙ্গলের অধিকারী হবো— যে-মঙ্গল তিনি আমাদের দিতে চান”।
(আলোচনা প্রসঙ্গে, নবম খণ্ড, ৫/৯/১৯৪৭)

শ্রীশ্রীঠাকুর— জগন্নাথদেবের যে মন্দির আছে ওখানে, তা’ ছিল একটা culture–এর (কৃষ্টির) কেন্দ্র। সে যে কত আগের থেকে ছিল তার ঠিক পাওয়া যায় না। চৈতন্যদেবের সময় থেকে না, তারও আগে থেকে। ওখানে একটা বিরাট culture
(কৃষ্টি) ছিল। তার সাক্ষী দিচ্ছে জগন্নাথদেবের মন্দির, ভুবনেশ্বরের মন্দির, কোনারকের মন্দির। ………. জগন্নাথদেবের ভোগের মধ্যে আছে পান্তাভাত। পান্তাভাতে যথেষ্ট পরিমাণে বি-ভিটামিন থাকে। ওতে একটা flavor (মৃদু গন্ধ)
থাকে, ওটা health–এর (স্বাস্থ্যের) পক্ষে খুব উপকারী। পান্তাভাত, কলা, দই—খুব উপকারী অথবা পান্তাভাত, কাঁচালঙ্কা আর নুন।”
(দীপরক্ষী, ১ম খণ্ড, ২৭মে ১৯৫৩)

।। রথযাত্রা উপলক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ-এর ‘ভক্তিভাজন’ ।।
রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম–

ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম ।

পথ ভাবে ‘আমি দেব’, রথ ভাবে ‘আমি’.

মূর্তি ভাবে ‘আমি দেব’–

হাসে অন্তর্যামী ।।
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

।। অন্তর্যামী অধিষ্ঠিত রথকে চালাব কেমন করে ।।

आत्मानं रथिनं विद्धि शरीरंरथमेवतु ।

वुद्धिं तु सारथिं विद्धि मनः प्रग्रहमेव च ।।

(कठ उपनिषद 3/57)

উপনিষদ অনুযায়ী মানবদেহকে রথের সাথে তুলনা করা হয়েছে । এই দেহরথকে চালায় ছটি ঘোড়া বা ষড়রিপু । বাস্তবে যে কোন ঘোড়াকে চালনা করে একজন সহিস বা সারথি । সারথির লাগাম নিয়ন্ত্রণের উপর দক্ষতা যদি না থাকে ঘোড়া তার সওয়ারকে না জানি কোন অকুল গরল পাথারে নিয়ে চলে যাবে । তাই আমাদের দেহরথের ঘোড়াগুলোর প্রগ্রহ বা লাগামকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সদগুরু রুপী একজন উপযুক্ত সারথির দরকার । যেমনটা ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ, মহাবীর অর্জুনের রথের সারথি । তেমনিভাবে আমাদের দেহরথটাকে যদি চালাতে পারি সার্থক হবে আমাদের রথ চালনা উত্‍সব রথযাত্রা । নান্যপন্থা বিদ্যতে হয়নায় ।

প্রচলিত রথযাত্রার যাত্রী হয়েও আমরা যারা ত্রিতাপ জ্বালায় জ্বলছি, আমাদের দেহরথটাকে ঈশ্বরপ্রাপ্তির নির্দিষ্ট গন্তব্য পথে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছি, এ-যুগের শ্রীকৃষ্ণ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সেইসব বিকৃতাচারী ধর্মের ধ্বজাধারীদের উদ্দেশ্যে বললেন—
“ভগবান, ইষ্ট বা ধর্ম্মের মৌখিক স্তুতির ভিতর-দিয়ে যা’রা ধর্ম্মবিরোধী কাজ করে, তা’রা হ’ল সব চাইতে বড় শয়তানের দূত–প্রকৃষ্ট লোক-দূষক। ১২৫ । (শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭)’’
‘‘অনেকে শ্রীকৃষ্ণকে মানে, গীতা মানে, অথচ বর্ণাশ্রম মানে না। গীতার কে কি ব্যাখ্যা করেছেন সেই দোহাই দেয়। কিন্তু গীতার বক্তা শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও বাণী দেখে চতুর্বর্ণ সম্বন্ধে তাঁর মত আমরা কি বুঝি? এ সম্বন্ধে কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না, গীতা শ্রীকৃষ্ণের জীবনেই জীবন্তভাবে পরিস্ফুট। গীতায় প্রত্যেক বর্ণের স্বভাবজ কর্ম সম্বন্ধে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। (আ. প্র. ১৪/১১৮)
গীতোক্ত সেই কর্ম বাদ দিয়ে, আহারশুদ্ধি, সত্তাশুদ্ধি, প্রজনন-শুদ্ধির বিধান উপেক্ষা করে আবেগ-প্রবণ হয়ে রথযাত্রার নামে, রথের রশি ধরে টানার উন্মাদনায় মেতে উঠে জীবনকে কতটুকু নন্দিত করা যাবে? কতখানি ধর্ম লাভ হবে?—সে হিসেব কষার কি প্রয়োজন নেই?
জয়গুরু। বন্দে পুরুষোত্তমম্!

YOGA Day

।। আন্তর্জাতিক যোগ-দিবসের শ্রদ্ধাঞ্জলি : যোগের সাথে যোগাযোগ ।।
***
অবশেষে হতাশার মাঝে একটু আশার সঞ্চার হলো জীবনপিয়াসী মানুষের মনে। ভাষা,
সম্প্রদায়, সাদা-কালো, ধনী-দরিদ্র ভেদাভেদ ভুলে দেশের গণ্ডী পেরিয়ে
আন্তর্জাতিক স্তরে স্থান করে নিয়েছে যোগ-সাধনা। আসন, ন্যাস, প্রাণায়াম
অভ্যাসে শরীর-মন-আত্মাকে একযোগে বাধতে ফি-বছর ২১শে জুন, উদযাপিত হয়ে
চলেছে আন্তর্জাতিক যোগ-দিবস। আপন-আপন আঙ্গিকে জৈন, বৌদ্ধ, খ্রীশ্চান,
মুসলমান প্রভৃতি সম্প্রদায়, নিজেদের মত করে যোগ-কে উপস্থাপনা করলেও
যোগ-শাস্ত্রের মৌলিকত্বের দাবিদার ভারতবর্ষ। ইতিপূর্বে ভারত সরকারের পক্ষ
থেকে Ministry of AYUSH, আন্তর্জাতিক যোগ-দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে এক
সর্বজনীন বার্তাও দিয়েছে—
“Yoga is not about exercise but to discover the sense of oneness with
ourselves, the world and nature.
Yoga is an invaluable gift of ancient Indian tradition. It embodies
unity of mind and body, thought and action; restraint and fulfillment,
harmony between man and nature and a holistic approach to health and
well-being.” —Ministry of AYUSH, Govt. of India
বৈদিক যুগে মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য তাঁর বিদূষী স্ত্রী মৈত্রেয়ীকে যোগ
সম্পর্কে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন—সংযোগো যোগ ইত্যুক্তো
জীবাত্মাপরমাত্মনোঃ।। —জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার সংযোগ স্থাপনের
মাধ্যম যোগ।
মহর্ষি পতঞ্জলি যোগ-কে চিত্তবৃত্তি নিরোধের মাধ্যম বলে উল্লেখ করেছেন।
যোগঃ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধঃ।
ভারতের অগ্নিপুরানে মন এবং আত্মার মিলনের মাধ্যম হিসেবে যোগকে উল্লেখ করা
হয়েছে। শৈবরা জীবের সাথে শিবের, বৈষ্ণবেরা জীবের সাথে পুরুষোত্তমের
মিলনের মাধ্যম হিসেবে যোগকে ব্যবহার করেন। সহজিয়া তান্ত্রিকেরা শিব ও
শক্তির মিলন, সহজিয়া বৈষ্ণবেরা রাধা ও কৃষ্ণের মিলন এবং সহজীয়া বৌদ্ধরা
প্রজ্ঞা ও উপায়ের মিলনের মাধ্যম হিসেবে যোগ-কে ব্যবহার করেন।

পরমপুরুষ শ্রীকৃষ্ণ যোগকে “যোগঃ কর্ম্ম সুকৌশলম্’’ বলে বর্ণনা করেছেন। পরমপিতার কাছে প্রার্থনা, আমরা সকলে যেন পরমপিতার সাথে যোগযুক্ত থেকে হিংসা ভুলে সবাইকে আপন করে নিতে পারি।

tapanspr@gmail.com

INTERNATIONAL YOGA DAY

** বিশ্ব যোগ দিবসের শ্রদ্ধার্ঘ্য **
।। যোগীর সাথে যোগাযোগ ‘‘যোগাৎ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধঃ’’ ।।
(পর্ব – ১)


‘যোগী’ বিষয়ে বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন,

“যোগী মানেই বুঝবেন—যে যুক্ত, যার যোগ আছে অর্থাৎ কিছু বা কাহাতেও টান
আছে,—এক-কথায় আসক্ত, কোন-কিছু বা কাহাতেও আসক্ত! আসক্তি থাকলে ভাবা,
করা, কওয়ায় মানুষের যেমন-যেমন যা’-যা’ হয়, তাই করাই হচ্ছে যোগী বা যুক্ত
বা অনুরক্ত মানুষের লক্ষণ। ……তাই, শাস্ত্রে যেখানেই যোগ বলে কথা আছে
সেখানেই বুঝতে হবে, সে-কথা বাস্তব কিছুতে যুক্ত হওয়ারই কথা। আর, এই যোগ
হলেই মানুষের চিত্তবৃত্তিনিরোধ হতে সুরু করে, কারণ, যাতে আমার টান যত
বেশী, আমার সাধারণ প্রবৃত্তিই হয় আমার সমস্ত বৃত্তি দিয়ে তাকে উপভোগ
করি—আর তার বাধা যেগুলি, সেগুলিকে এমনতরভাবে বিনিয়ে আমার এই উপভোগের
পথের কোনরকম বাধা না সৃষ্টি করে বরং তার সাহায্য করে এমনতরভাবে
নিয়ন্ত্রিত করতে একটা স্বতঃ-উৎসারিত ঝোঁক আমাদের থাকেই। তাই শাস্ত্রে আছে
“যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ’’। (কথাপ্রসঙ্গে, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৩)

।। যোগীর সাথে যোগাযোগ ‘‘যোগাৎ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধঃ’’ ।।
*
(পর্ব – ২)
আধ্যাত্মিক চেতনায় একনিষ্ঠ না হলে যোগের সাথে নিত্য-যুক্ত থাকা যায় না।
সে বিষয়েও শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের সচেতন করার জন্য বললেন, ‘‘গীতায় আছে,
‘তেষাং জ্ঞানী নিত্যযুক্ত একভক্তির্বিশিষ্যতে’………একভক্তি না হলে
হবে না । পঁচিশ ঠাকুর করলেই মুস্কিল, বহু-নৈষ্ঠিক যারা তাদের জীবনে কোন
সঙ্গতি থাকে না, তারা আস্তে আস্তে পাগলাটে হয়ে ওঠে । বহু-নৈষ্ঠিক মানে
মূলতঃ তার কিছুতেই নিষ্ঠা নেই, নিষ্ঠা আছে রকমারি প্রবৃত্তি-স্বার্থে,
তাই আত্মনিয়ন্ত্রণ বলে জিনিসটা তাদের জীবনে ঘটে ওঠে না, ফলে অভিজ্ঞতা বা
জ্ঞানের উন্মেষ হয় না । ভক্তি ছাড়া, একানুরক্তি ছাড়া জ্ঞান ফোটে না ।
…..একভক্তি যার আছে… তার জ্ঞানের নাড়ী হয় টনটনে । কথায় বলে
প্রহ্লাদমার্কা ছেলে. ……আগুনে, জলে, পাহাড়ে, পর্ব্বতে, অন্তরীক্ষে
কোথাও ডরায় না ।…. তাই ভক্তির চাইতে বড় কামনার বস্তু আর নেই ……।’’
( আ. প্র. ২য় খন্ড, ২০. ১২.


।। যোগীর সাথে যোগাযোগ ‘‘যোগাৎ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধঃ’’ ।। (পর্ব – ৩)
নিজেকে যোগযুক্ত রাখতে শ্রীশ্রীঠাকুর সর্বদা সচেতন থাকতেন। একদিন একটা
সুপুরীর টুকরো মুখে দিতে গিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে নীচে পড়ে যায়। ঠাকুর খাট
থেকে নেমে সুপুরীর টুকরোটাকে খুঁজে পিকদানিতে ফেলে হাত ধুয়ে খাটে উঠে
বসেন। আর একটা সুপুরীর টুকরো মুখে দেন। সামান্য এক টুকরো সুপুরী, তা-ও
আবার খুঁজে নিয়ে ফেলে দিলেন। এই সামান্য কাজটা তো যে কেউ করতে পারত, তার
জন্য খাট থেকে নেমে কষ্ট করে সুপুরী খুঁজতে গিয়ে অমূল্য সময় নষ্ট করার
পেছনে কোন লাভজনক যুক্তির খোঁজ না পেয়ে উপস্থিত যুক্তিবাদীরা অনুযোগ করলে
ঠাকুর বলেছিলেন, তোমাদের হিসাবে আমি বেকুব, আমার হিসাবে আমি কিন্তু
চালাক। আমার হাতের সাথে মুখের স্নায়বিক যোগসূত্র ছিন্ন হবার ফলে আমি
যোগভ্রষ্ট হই, সুপুরীটা নীচে পড়ে যায়। প্রারব্ধ কর্মফলে ওই অপারগতা যাতে
যোগ না হয় তাই একটু সময নষ্ট করে নিজের ত্রুটি নিজেই সংশোধন করে নিলাম।


।। যোগীর সাথে যোগাযোগ ‘‘যোগাৎ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধঃ’’ ।। (পর্ব – ৪)
যোগ বোঝাতে গিয়ে ঠাকুর একদিন গল্পচ্ছলে বলেছিলেন, এক গোয়ালার অনেকগুলো
গোরু ছিল। ওই গোরুগুলোর দুধ এবং দুগ্ধজাত ছানা, দৈ, ঘোল, মাখন, ঘি নিজেরা
খেত, পাড়াপড়শীদেরও দিত। গোয়ালার বয়স হওয়াতে ছেলেকে একদিন একটা পাঁচন হাতে
দিয়ে গোরু চরাবার ভার দেয়। ছেলে মাঠে নিয়ে গোরুগুলোকে চরতে দিয়ে দেখল,
একটা পাঁচনের লাঠি দিয়ে কিছুতেই গোরুগুলোকে বাগে আনতে পারছে না।
এদিক-ওদিক চলে যাচ্ছে। তাই সে ভাবল, একটা পাঁচন দিয়ে সব গোরু সামলানো
যাবে না। সে তখন একমনে এক-একটা গোরুর জন্য আলাদা আলাদা পাঁচন বানাতে
শুরু করলো। পাঁচন বানানো শেষ করে গোরু সামলাতে গিয়ে দেখে নির্দিষ্ট
স্থানের কাছাকাছি গোরুগুলো নেই, চরতে চরতে অনেক দূরে দূরে জঙ্গলে চলে
গেছে। ওদিকে বেলা গড়িয়ে গোধূলি-প্রায়। ছেলে নিরুপায় হয়ে কাঁদতে কাঁদতে
বাবাকে গিয়ে সব কথা খুলে বললে বাবা কোন তিরস্কার না করে ছেলেকে বুঝিয়ে
বলেন, “বাপু, এক পাঁচনেই লাখ গোরু ঠেকানো যায়। যার যেমন দরকার, তেমনতর
ঠক্কর মারলেই তো হয়! তোমার এই অতিবুদ্ধি সব বেসামাল করে ফেলেছে।’’
(কথাপ্রসঙ্গে, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৪) অবশেষে বাবার কাছ থেকে গোরুর বৈশিষ্ট্য
অনুযায়ী ঠক্কর মারার কায়দা শিখে ওই এক পাঁচনের সাহায্যেই গোরুগুলোকে
বাগে আনতে শিখে যায়।
ওই ঠোক্কর মারার কায়দা যিনি শেখাতে পারেন তিনিই ঠাকুর, তিনিই যোগসিদ্ধ
গুরু। যোগসিদ্ধ গুরুর কাছ থেকে কাকে, কখন, কতটুকু ঠোক্কর কিভাবে মারতে
হবে সেই কায়দা একবার শিখে নিতে পারলে আমাদের বিশৃঙ্খল ইন্দ্রিয়গুলোকে
একমুখী আসক্তির সাথে যুক্ত করে যোগ-কে উপলব্ধি করা যায়। তাহলে পালের
গোরুগুলো পালেই থাকবে, বেশী কায়দা করতে গেলে গোরুগুলো পালছাড়া হয়ে যাবে।


।। যোগীর সাথে যোগাযোগ ‘‘যোগাৎ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধঃ’’ ।। (পর্ব – ৫)
যোগসিদ্ধ গুরু শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর নিত্যলীলায় যোগশাস্ত্রে
বর্ণিত আসন-মুদ্রাদি তিনি কোন কালেই অভ্যাস করেন নি। তিনি ছোটবেলা থেকেই
নামধ্যান করতেন। তিনি তাঁর ভাগবত আন্দোলন কীর্তন দিয়ে শুরু করেছিলেন।
কীর্তন করতে করতে সমাধিস্থ হতেন। সেই সময় যোগশাস্ত্রে বর্ণিত সকল ধরণের
আসন-মুদ্রাদি অবলীলায় করতেন। তিনি কীর্তনের মাধ্যমে অনেকানেক পালছাড়াদের
পালে ভেড়ালেন। তারা আবার যাতে পালছাড়া না হয়ে পড়ে তারজন্য কাজে মাতিয়ে
দিয়ে গড়ে তুললেন ভারতীয় আর্য্য ভাবধারার নিদর্শন স্বরূপ এক আদর্শ
প্রতীকী রাষ্ট্র—হিমাইতপুর সত্সঙ্গ আশ্রমে। ব্যক্তি, দম্পতি, গৃহ, সমাজ
ও রাষ্ট্র জীবনকে শুদ্ধ-বুদ্ধ-পবিত্র করে এক যোগে বাধতে দীক্ষা, শিক্ষা,
বিবাহ, কৃষি ও শিল্পের নবীকরণ করলেন।
শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাগবত আন্দোলনের কীর্তনযুগের সাধকেরা কীর্তনের এবং
নামের শক্তি সঞ্চারণা করে রোগ-শোক-ব্যাধি-জরা-য় জর্জরিত,
প্রবৃত্তি-পীড়িত মানুষদের স্বাভাবিক জীবনে অধিষ্ঠিত করে অমৃতের সন্ধান
দিয়েছিলেন। অনুরূপভাবে তাণ্ডবনৃত্যে কীর্তন, আর নিয়ম করে নামধ্যান করতে
পারলে নিজেকে এবং পরিবেশকে সবদিক দিয়ে যে সুস্থ রাখা সম্ভব, তা বলাই
বাহল্য।
জীবাত্মাকে পরমাত্মার সাথে প্রতিনিয়ত যোগযুক্ত রাখতে শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর
অনুগামীদের একটা ছোট্ট নিদেশ-বাণীতে সব বুঝিয়ে দিলেন।
ঊষা-নিশায় মন্ত্রসাধন
চলাফেরায় জপ
যথাসময়ে ইষ্টনিদেশ
মূর্ত্ত করাই তপ।
মন্ত্র সাধনের জন্য সকাল-সন্ধ্যায় নিয়ম করে ধ্যানাভ্যাস করা। প্রতিবার
ধ্যানান্তে ‘আমি অক্রোধী, আমি অমানী’ ইত্যাদি স্বতঃ-অনুজ্ঞার অর্থগুলোকে
আয়ত্ত করতে পারলে প্রবৃত্তির নিগ্রহ থেকে সহজেই মুক্তি লাভ করা যায়।
ধ্যান করার পর দিগন্তের দিকে, সবুজের দিকে তাকালে চক্ষুর দৃষ্টি ভাল
থাকে। চলাফেরায়, কাজেকর্মে, শয়নে-স্বপনে ইষ্টে অনুরাগ সমন্বিত হ’য়ে নামজপ
করার অভ্যাসে পরমাত্মিক শক্তির স্বারূপ্য লাভ হয়। নিয়মিত শবাসন করলে
হৃদরোগ হবার আশঙ্কা থাকে না। নিয়মিত থানকুনি পাতা খেলে শরীর বিধানের
রেচনক্রিয়া সুস্থ থাকে। সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার, মাসান্তে কমকরে একটি
দিন, হবিষ্যান্ন গ্রহণ, পাতিত্য কর্ম থেকে ত্রাণ পেতে শিশু প্রাজাপত্য,
প্রাজাপত্য এবং মহাসান্তপন ব্রত পালনে শরীর-মনের অসঙ্গতি দূর হয়, শরীর
নিরোগ থাকে।
নাম জপ করা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন—নাম করলে অনেক সময় জ্বর কমেও
যায়। কারণ, ব্যাকটেরিয়াগুলি পুড়ে যায়। রোগীর শরীর ছুঁয়ে নাম করলে
তাতেও রোগ ভাল হয়। ঐ জন্য কুষ্টিয়াতে একটা দালানে ত্রিশটা bed (শয্যা)
ছিল। রাধারমণ প্রভৃতি ছিল। রোগী আসলে শুশ্রূষা করত, ছুঁয়ে নাম করত। ডবল
নিউমোনিয়া ৩/৪ দিনে, এমনকি রাতারাতি সেরে যেত।
(সুত্র—আলোচনা প্রসঙ্গে ১৮ খণ্ড)


।। যোগীর সাথে যোগাযোগ ‘‘যোগাৎ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধঃ’’ ।। (পর্ব – ৬)
আমাদের আর্য্যহিন্দু-শাস্ত্র এবং যোগশাস্ত্র অনুসারে সূর্যোদয়ের পর
শয্যাত্যাগ করলে পাতিত্যদোষে দুষ্ট হতে হয়। এবং প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ
উপবাসী থাকার নিদেশ দেওয়া আছে। শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের ওই পাতিত্যদোষ থেকে
মুক্ত করে নিয়ত যোগযুক্ত রাখতে দিনচর্যার এক সহজ নিদেশ দিলেন অনুশ্রুতি
গ্রন্থের বাণীতে।
ঊষার রাগে উঠবি জেগে শৌচে শীতল হবি,
সন্ধ্যা–আহ্নিক জপ সাধনায় ঈশের আশিস লবি।
কুতুহলে পড়শি ঘুরে দেখবি সযতনে,
আছে কেমন কোথায় কে জন মন দিবি রক্ষণে।
তারপরেতে বাড়ী এসে শৌচে যথাযথ,
গৃহস্হালীর উন্নয়নী অর্জ্জনে হ’ রত।
স্নানটি সেরে আহ্নিক করে ক্ষুধামতন খাবি,
একটু চলে বিশ্রাম নিয়ে আগুয়ানে ধাবি।
এমনি তালে সচল চালে চলে সন্ধা এলে,
শৌচে শুদ্ধ হয়ে করিস আহ্নিক হৃদয় ঢেলে।
উন্নয়নের আমন্ত্রনী গল্প-গুজব শীলে,
হৃষ্টমনে আলোচনায় কাটাস সবাই মিলে।
পড়শী দিগের অভাব-নালিশ থাকেই যদি কিছু,
তার সমাধান যেমন পারিস করিস লেগে পিছু।
করন-চলন ধরন-ধারন যজন যাজন কিবা,
সকল কাজেই ইষ্টস্বার্থে চলিস রাত্রি-দিবা।
আদর-সোহাগ উদ্দীপনী কথায় কাজে ঝুঁকে,
স্বার্থ-কেন্দ্র সবার হবি ধরবি ইষ্টমুখে।
বিশ্রামেরই সময় গা-টি ঘুমল হয়ে এলে,
ইষ্ট-চলন মনন নিয়ে ঘুমে গা দিস ঢেলে।
(অনুশ্রুতি গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)
শ্রীশ্রীঠাকুর আহ্বানীসহ পূর্ণাঙ্গ প্রার্থনা মন্ত্রে আচমন, বাংলা সমবেত
প্রার্থনা ও বাংলা সমবেত প্রার্থনার অবশিষ্টাংশ সন্দর্ভে কতগুলো সহজ আসন
এবং প্রাণায়ামের নিদেশ রেখে গেছেন। সেই নিদেশ মেনে আমরা যদি সঠিক অনুশীলন
করতে পারি তাহলে সহজ-যোগে ব্যাধিমুক্ত হয়ে পরমাত্মার সাথে যোগযুক্ত থাকতে
পারব। (দ্রঃ ঋত্বিগাচার্য্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য প্রণীত অনুসৃতি,
যতি-ঋত্বিক শ্রীশরত্চন্দ্র হালদার প্রণীত যুগবাণী এবং সত্সঙ্গ পাব্লিশিং
কর্তৃক প্রকাশিত প্রার্থনা শিরোনামের গ্রন্থাবলী।)
।। যোগীর সাথে যোগাযোগ ‘‘যোগাৎ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধঃ’’ ।।
(পর্ব – ৭)
শ্রীশ্রীঠাকুরের এক অনন্য দৈবী অবদানের নাম ইষ্টভৃতি। ইষ্টের প্রীতির
জন্য কাউকে পীড়িত না করে, নিজে পীড়িত না হয়ে, বর্ণানুগ কর্মের সেবার
মাধ্যমে, বৃহত্তর পরিবেশে, ঘটে ঘটে ইষ্ট স্ফূরণের বা মঙ্গল প্রতিষ্ঠার
কাজে নিয়োজিত থাকার বিনিময়ে অযাচিত প্রাপ্ত অর্থ বা সম্পদকে বলা হয়েছে
অনুগ্রহ অবদান । ওই অনুগ্রহ অবদানকে ঠাকুর ‘দিন গুজরানী আয়’ অভিধায় ভূষিত
করেছেন। ওই ‘দিন গুজরানী আয়’-এর অগ্রভাগ প্রতিদিন পানাহার করার পূর্বে
ইষ্ট-নীতি ভরণের শপথ করে নিবেদন করার নাম ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ। যা
নিখুঁতভাবে পালন করলে শরীর-মন-আত্মার অসঙ্গতি দূর হয়। আর্য্যকৃষ্টির
সদাচার এবং বর্ণাশ্রম ধর্ম রক্ষিত হয়।
শ্রীশ্রীঠাকুরের আর একটি অনন্য দৈবী অবদানের নাম স্বস্ত্যয়নী ব্রত।
প্রবৃত্তির সব বিপাক এবং গঞ্জনা থেকে মুক্ত করে আমাদের স্মৃতিবাহী চেতনায়
সমৃদ্ধ রাখতে প্রবর্তন করলেন পঞ্চনীতি সমন্বিত স্বস্ত্যয়নী ব্রতের।
জড়-পদার্থে নির্মিত মন্দিরের পরিবর্তে নিজ-নিজ দেহটাকেই শ্রীবিগ্রহ
মন্দির জ্ঞানে পবিত্রতার সাথে রক্ষা করতে নিদেশ দিয়েছেন এই ব্রতের
মাধ্যমে, যেহেতু এই দেহের মধ্যেই রয়েছে পরমাত্মার আবাসস্থল। ভোগ,
দুর্ভোগ, উপভোগ, মুক্তি, পরামুক্তি, পরাগতি সবকিছুই এই দেহের মধ্যেই। যা
নাই ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে এই দেহভাণ্ডে। আমাদের আর্য্য শাস্ত্রাদিতেও
একথার উল্লেখ রয়েছে। শ্রীশ্রীঠাকুর জীবাত্মার মধ্যে সুপ্ত পরমাত্মাকে
জাগাতে বলেছেন নামের মাধ্যমে। ৫টি কর্মেন্দ্রিয়, ৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয়, মন,
বিবেক, জীবাত্মা, পরমাত্মাদির সমন্বয়ে সৃষ্টি এই দেহমন্দিরকে পবিত্র
রাখার, সুস্থ-স্বস্থ রাখার ভাগবত-বিধির পালন-পদ্ধতি সহজভাবে বিধায়িত
করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর এই ব্রতের মাধ্যমে।


।। যোগীর সাথে যোগাযোগ ‘‘যোগাৎ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধঃ’’ ।। (পর্ব – ৮)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রবর্তিত যজন, যাজন, ইষ্টভৃতি,
স্বস্ত্যয়নী, সদাচারাদি নিখুঁতভাবে পালন করার নাম ইষ্টকর্ম। ইষ্টকর্ম
ব্যতীত কর্ম অনিষ্টকর্ম। সেই ইষ্টকর্মে যুক্ত থাকলে সহজেই যোগসিদ্ধ হওয়া
যায়।
কাম-আবেশে স্ত্রী-পুরুষে
যেমন করে উপভোগ,
ইষ্টকাজে বাস্তবতায়
তেমনি হলে তবেই যোগ। সব প্রবৃত্তি রত থাকে ইষ্টকর্ম লয়ে, সেই তো যোগী, সে-ই সন্ন্যাসী কাল নত যার ভয়ে। কালাধীশ ঠাকুরের চাহিদামত ইষ্টকর্ম করে একবার যোগী হতে পারলে চিরতরে

নিশ্চিন্ত, কালের কবলে পড়ে ভীত হতে হবে না, কাল হবে যোগীর অধীন।
পরিশেষে জীবনপিয়াসী মানুষদের কাছে, ইষ্টপ্রাণ দাদা ও মায়েদের কাছে
পরমপিতার এই দীন সন্তানের কাতর আবেদন, আমরা যেন নিত্য ইষ্টকর্মের মাধ্যমে
পরমপিতার সাথে যোগযুক্ত থেকে পরিবেশের সব্বাইকে জীবনের জয়গানে যুক্ত করে

নিতে পারি। সবাই যেন মুক্তকণ্ঠে বলতে পারে, ‘আমি সবার, আমার সবাই।’

dast9674@gmail.com

এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ……..

** দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের তিরোধান দিবস স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য **
।। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ-এর শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সান্নিধ্য লাভ।।
বাংলা ১৩৩১ এর জ্যৈষ্ঠ মাস। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কলকাতার মাণিকতলার বাড়িতে, সাথে রয়েছেন মাতা মনোমোহিনী দেবী। বিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য দেশবন্ধুকে সাথে করে নিয়ে এসেছেন ঠাকুরের কাছে। দেশবন্ধু তখন অসুস্থ ছিলেন । ঠাকুরের সাথে প্রাথমিক আলাপচারিতার পর ঠাকুর দেশবন্ধুকে কিছুদিন বিশ্রাম নিতে পরামর্শ দিলেন দেশবন্ধু বলেন,—‘‘এমন একটা লোক নেই, যার উপরে কাজের দায়িত্ব দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত মনে বিশ্রাম নিতে পারি। উত্তরে ঠাকুর বলেন,—এমন লোক যদি আজও তৈরি হয়ে না থাকে, তাহলে একা দাশদা (ঠাকুর ওই নামে সম্বোধন করতেন।) কি দেশের স্বাধীনতা নিয়ে আসতে পারবেন ? আর যদি পারেনও, সে স্বাধীনতা কি টিঁকবে ?
দেশবন্ধু করনীয় কর্তব্য বিষয়ে জানতে চাইলে ঠাকুর উত্তরে বলেন, ‘‘আগে দেশের মানুষ তৈরি করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে আদর্শ মানুষ, আদর্শ পরিবার, আদর্শ পল্লী, আদর্শ সমাজ। তা’ না হলে স্বাধীনতা এলেও তাতে বিপদই সৃষ্টি হবে। ………… দেশের সমাজটা একেবারে rotten (পচা) হয়ে গেছে। ঘরে ঘরে অশান্তি, দাম্পত্য সুখ নাই, শিশুমৃত্যু—আজকাল বিবাহই ঠিকমত হচ্ছে না তো ভাল ছেলে কি-করে হবে! দাশ-দা, সমাজকে যদি সংস্কার করতে পারেন তবে অসম্ভব নয় যে কুড়ি-পঁচিশ বৎসরের মধ্যে এমন সব যুবক পাবেন যারা দেশের কর্মীর অভাব দূর করে দেবে।’’
শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ, কৃষি ও শিল্পের সংস্কারের কথা, পল্লী সংগঠনের কথা শুনে উদ্বুদ্ধ হন। ঠাকুর আদেশক্রমে মাতা মনোমোহিনী দেবীর কাছে দীক্ষা প্রার্থী হন। প্রথমটায় মাতা মনোমোহিনী দেবী দীক্ষা দিতে রাজী হন নি। অবশেষে দেশবন্ধুর নিষ্ঠা দেখে দীক্ষা দান করেন ১৯২৪ সালের ১৪ই মে।
দেশবন্ধুর অনুরোধক্রমে ঠাকুরের আদেশে কর্মযোগী সুশীলচন্দ্র বসু দেশবন্ধুর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। হিমাইতপুরের আশ্রমের বিভিন্ন কর্মযজ্ঞে সাহায্য করেন। অসুস্থ অবস্থায় ১৯২৫ সালের ১১ই মে তিনি স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ ও কন্যাগণসহ হিমাইতপুর আশ্রমে আসেন। তিন-চারদিন ধরে ঠাকুরের সাথে দেশ গঠনের বিষয়ে বিভিন্ন আলোচনা করে উৎফুল্ল হন, সুস্থ বোধ করেন। বিশ্রামের জন্য ঠাকুর তাঁকে আশ্রমে থেকে যেতে বলেন। নানা অছিলায় দার্জিলিং  যাওয়াটা বন্ধ করার চেষ্টা করেন। তিনি রাজীও ছিলেন।  কিন্তু বিধি বাম হয়। বিধাতার বিধিকে অগ্রাহ্য করে ডাক্তারের পরামর্শে এবং পরিজনদের অনুরোধের তাগিদে অবশেষে দার্জিলিং যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ঠাকুরের কাছে একজন বিশ্বস্ত আপ্ত সহায়ক চান। ঠাকুর আশ্রমকর্মী মনোহরচন্দ্র বসুকে মনোনীত করেন। পুত্র, পুত্রবধূ ও কন্যাদের আশ্রমে রেখে বাসন্তী দেবী ও মনোহরচন্দ্র বসুকে সাথে নিয়ে দার্জিলিং যান বিশ্রাম নিতে।
১৯২৫ সালের ১৬ই জুন দার্জিলিং-এর ‘Step Aside’ বাড়ীতে তাঁর বিশ্রামের পরিসমাপ্তি ঘটে। চিরবিদায়ের আগে তিনি পুত্র চিররঞ্জনের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘‘ভোম্বল! আমি পাবনা যাব।’’ পাবনা যাওয়া আর হলো না। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। বেঁচে রইলেন আমাদের মনের মণিকোঠায়। ‘দেশবন্ধু’ নামে।
(সূত্র : সুশীলচন্দ্র বসু বিরচিত ‘মানসতীর্থ পরিক্রমা’)

।। পিতৃ দিবসের শ্রদ্ধাঞ্জলি ।।*********************    “পিতা স্বর্গ পিতা ধর্ম            পিতাই তপের নন্দনা,     পিতৃপ্রীতি চারিয়ে আনে            সব দেবতার বন্দনা।”     “আরোধ্যদেব পিতাকে          তুমি নিত্য কর নমস্কার,    জ্ঞানদাতা তিনিই জেনো         শিবরূপেতে তিনি তোমার।”                  “পিতা যেন স্বর্গ তোমার            ধৃতিসত্তা পিতাই যে,    সব তপেরই গোড়া পিতা            সার্থকতা তাঁ’র মাঝে।”     “জন্মদাতা পিতা যিনি             প্রণত হ’য়ে তাঁহার পায়,     সব দেবতার আধান তিনি         রাখ ধ’রে তাঁয় নিশ্চয়তায়।”                          পিতামাতার সংবেদন,                             মূর্ত্ত স্বস্তি, মূর্ত্ত জ্ঞান                         ইষ্টের যে মুখরিত                                 বুঝবি হ’লে ইষ্টপ্রাণ। দেখ্ না তোরা পিতৃভক্তি      জীবন কেমন করে উছল ,ভরদুনিয়া পিতার তপে     বোধবিবেকে করে উজল।                            জগৎপাতার প্রতীক পিতা                                 ঐ পিতাতে আত্মরতি,                            থাকে যদি মলয়স্রোতা                                  বাড়েই বুদ্ধি বিবেক-মতি।(অনুশ্রুতি ৩য়‌ খন্ড থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্য বাণী।)                  *              *             *পিতামাতার সু-সন্তান, সন্তানের সু-পিতা, সু-মাতা, স্বামীর সু-স্ত্রী, স্ত্রীর সু-স্বামী, সমাজের সু-বন্ধু এবং রাষ্ট্রের সু-নাগরিক রূপে একটা মানুষ যদি পরিচিতি লাভ করতে পারে তাহলেই তাঁকে একজন আদর্শ মানুষ বলা যেতে পারে। এই আদর্শ মানুষ যত জন্মাবে ততই পৃথিবী নামক সবুজ গ্রহটিকে সুস্থ রাখা যাবে। আমাদের ঈপ্সিত আদর্শ মানুষ পেতে গেলে একজন আদর্শ পিতার যেমন প্রয়োজন, আবার সেই পিতাকে একজন আদর্শ পিতা হতে হলে পিতারপিতা পরমপিতার আদর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত একজন জায়া-র (অর্থাৎ যার মাধ্যমে পিতা, পুত্ররূপে জন্মাবেন।)  প্রয়োজন। আর তারজন্য প্রয়োজন যুগ পুরুষোত্তমের বিধি মেনে বিবাহ ও সুপ্রজনন সংস্কারে গুরুত্ব দেওয়া। যেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় একটা আদর্শ পেডিগ্রীড কুকুর তৈরির জন্য! সেই গুরুত্বটুকু মেনে পিতা হবার প্রক্রিয়া পালন করার শপথ নিতে পারলেই সার্থক হবে পিতৃদিবস পালন।  তাই শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ‘‘…..পরমপিতা বিশ্ববিধাতা, আর, আমরা হলাম আমাদের স্ব-স্ব ভাগ্যবিধাতা। স্রষ্টার বেটা সেও এক স্বতন্ত্র স্রষ্টা। যার প্রাণে যেমন চায়, সে তেমনি সৃষ্টির মালিক হয়।’’ (আ. প্র. ১০ম খণ্ড, পৃঃ ৩৭)******************************      দেহ ধারণ এবং দেহ ত্যাগ এই দুইয়ের মাঝে জীবন নামের প্রবাহ কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল তা’ নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত। সৃষ্টিতত্ত্ব অনুসারে পিতার পিতা পরমপিতা লীলার প্রয়োজনে এক থেকে বহুতে পরিণত হতে গিয়ে যে সূক্ষাতিসূক্ষ্ম স্পন্দনের সৃষ্টি হয়েছিল তার নাম অনাহত নাদ বা আদিধ্বনি বা প্রণব। সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী মানুষ ব্রহ্মবিদ্ আচার্য্য মাধ্যমে ‘আত্মানং বিদ্ধি’-র মার্গ অনুসরণ করে  ‘মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়’ মৃত্যু হতে অমৃত আহরণ করতেন । জীবাত্মাকে বিলীন করে দিতেন পরমাত্মায় ।  সোনার তাল থেকে তৈরী গয়নাটাকে ব্যবহার করে আবার ফিরিয়ে দিতেন সেই সোনার তালে । পরমপিতা হলেন সকলের পিতা, আর আমরা হলাম আমাদের স্ব স্ব ভাগ্যবিধাতা ।  সংকোচন (contraction), স্থিতি (stagnation) ও প্রসারণ (expansion)-এর লীলায়িত ছন্দের বিধায়িত নিয়মে আমরা প্রত্যেকেই এক একজন স্রষ্টা । নারী-পুরুষের সম্মিলিত জনন ক্রিয়াকালিন  কোষ বিভাজন মাধ্যমে সংকুচিত ডিম্বাণু (ovum) ও  শুক্রাণু (sperm) নামের  দুটি ভিন্ন সত্তা একটি কোষে এক হয়ে গর্ভে স্থিত হয় । পুণরায় কোষ বিভাজন মাধ্যমে প্রসারিত  হয় । ক্রমান্বয়ে সৃষ্টি হতে থাকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ । গর্ভবাসের স্থিতিকাল উত্তীর্ণ হলে ভূমিষ্ট হয় । শুরু হয় জীবন যাপনের পালা । শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্দ্ধক্যের পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রার ছান্দিক শকটে চড়ে ‘মহাচেতন সমুত্থানের’ গন্তব্যে পৌঁছান অথবা মাঝপথে নেমে পড়া, নির্ভর করে স্রষ্টা পিতামাতার উপর । স্রষ্টা পিতামাতা যেমন ভাবের (দৈবাসুর ভাব) আত্মাকে আকর্ষণ করে, তদনুরূপ আয়ু লাভ করে সন্তান । আবার উক্ত সন্তানের আত্মা যে ভাব নিয়ে বিগত হবে, সেই ভাব  নিয়েই ওই আত্মাকে পিণ্ডদেহ ধারণ করতে হবে । এই হ’ল জীবন-মৃত্যুর আগম-নিগমের চরম সত্য। পিতা থেকে প্রাপ্ত ইহজন্মের সার্থকতা  প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন, “আপূরমান ইষ্টে কারও যদি টান জন্মে, এবং তাই নিয়ে যদি সে বিগত হয় তবে সে মহান জীবন লাভ করবেই । আবার, এ জীবনে যে যতই হোমরা-চোমরা হোক না কেন, সে যদি সুকেন্দ্রিক না হয়, প্রবৃত্তিই যদি তার জীবনের নিয়ামক হয়, তবে ঐ বিচ্ছিন্ন বিকেন্দ্রিকতা তার মৃত্যুকালীন ভাবভূমি ও পরজন্মকে যে অপগতিতে অপকৃষ্ট ক’রে তুলবে, তা’তে সন্দেহ কমই । (আ. প্র. ১ম খণ্ড ১৯. ১১. ১৯৪১)তাই, আমরা যে যতটুকু পিতার পিতা পরমপিতার আদর্শ মেনে স্বীয় পিতামাতাকে গৃহ-দেবতা জ্ঞানে মেনে চলতে পারব, পিতৃ-দিবসকে জীবনে সার্থক করে তুলতে পারব, সে ততটুকু। জয়গুরু। বন্দে পুরুষোত্তমম্!———