** ইষ্টভৃতি মানে ইষ্ট নীতির ভরণ।
ইষ্ট ভরণ পিতৃপোষণ
পরিস্থিতির উন্নয়ন
এই না করে
যাই না করিস
অধঃপাতেই তোর চলন। **
**********************
কমন সেন্স
নিবেদনে — তপন দাস
**********************
পরম কারুণিক ঈশ্বর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষকে সবকিছু দিয়ে পূর্ণরূপে তৈরি করেছেন, স্বাধিকার দিয়েছেন। যা দিয়ে মানুষ ইচ্ছে করলে মরতে পারে, মারতে পারে, আবার বাঁচতে পারে, বাঁচাতেও পারে। আমরা কোন কারণে যদি একটু ভুল করে বসি, সাথে সাথে আমাদের অভিভাবকেরা, প্রিয়জনেরা, বন্ধুবান্ধবেরা উপদেশ দিয়ে বলতে সুরু করে দেবেন, তুমি একটু কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করতে পারলে না! অবশ্য যারা এই কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করতে বলেন, তারাও অ্যাপ্লাই করতে গিয়ে কেন জানি বেসামাল হয়ে পড়েন। নইলে সুস্থভাবে বাঁচার জন্য, আহার, নিদ্রা, অপত্যোৎপাদনের জৈবধর্ম পালন করতে এত কেরামতি করতে হয়। আমরা যদি জৈবিক তাগিদগুলোকে ওই কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম তাহলে তো স্বর্গে অর্থাৎ সুখে বাস করতে পারতাম। এত দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করতে হতো না। যেমন, বাঁচতে হলে খেতে হয়, সেই খাওয়াটা যদি সত্তাপোষণী না হয়ে প্রবৃত্তিপোষণী হয় তাহলে অসুখ হবেই। সাধারণভাবে সিদ্ধ ভাত খেয়েও তৃপ্তির ঢেকুর তোলা যায়, আবার পাঁচতারা হোটেলের দামী খাবার খেয়ে অতৃপ্তির ঢেকুর তুলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। এ বিষয়ে ঠাকুর বেশ সাবধানী ছিলেন। আশ্রম পত্তনের প্রথম যুগে, বিদ্বজ্জন ভদ্রলোকদের মানদণ্ডে যা খুবই সাধারণ মানের খাবার—নাম লাবসি, সেই লাবসি একবেলা করে খেয়ে দিনে-রাতে প্রায় আঠার ঘণ্টা পরিশ্রমের কাজ করতেন। ওই নিয়ম মেনে প্রায় আঠার বছর পর্যন্ত আশ্রমিকদের রোগ-ভোগ-অকালমৃত্যু হয়নি। সেই সময় জনশ্রুতি ছিল, “অনুকূল ঠাকুরের আশ্রমে রোগব্যাধি ঢুকতে ভয় পায়।’’ পরবর্তীকালে ভিটামিন, প্রোটিন ইত্যাদি খাদ্যগুণের দোঁহাই দিয়ে কিছু কর্তা-ব্যক্তিরা ঠাকুরের বিধিকে অমান্য করে আনন্দবাজারে জিভের স্বাদের খাবার পরিবেশন করার ব্যবস্থা করলে আশ্রমিকদের অসুখ-বিসুখ হতে সুরু করে।
তাই খাওয়ার ব্যাপারে আমরা যদি ঠাকুরের দেওয়া ‘‘পেটের জন্য জীবন নয়কো,/জীবনের জন্য পেট/তাই জীবন—/পেটকে জীবন্ত করে রাখ।’’ বাণীর কমন সেন্সটাকে অ্যাপ্লাই করে সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার গ্রহণে অভ্যস্ত হতে পারি তাহলে আমাদের অভাবও ঘুচে যাবে, অসুখ-বিসুখ থেকেও বেঁচে যাব।
।। অধিক ভোজন প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতবাদ ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর—যা’ প্রয়োজন তার চাইতে বেশী খেলেই তো তার চাপ আমাদের Stomach, Nerves, Heart (পেট, স্নায়ু, হৃদয়) ইত্যাদিকে বইতে হবে। কিন্তু আপনি-আমি তো Sperm ও ova–র product (শুক্র ও ডিম্বের ফল)—একটা limited energy (সীমিত শক্তি) নিয়ে জন্মেছি, আর তাই নিয়ে চলেছি। এই life-potency (জীবনীশক্তি)-কেই বলে আয়ু, এই আয়ু যদি অযথা অপব্যয় করি—এ তো ফুরোবেই, শরীর দুর্বল হবেই—তা’ হয়তো বহু পরে টের পাওয়া যায়। পঞ্চাশ বছর বয়সে শরীরের উপর অত্যাচার করা সত্ত্বেও হয়তো আপনার ক্ষতি করে না, ষাট বছর বয়সে আপনি হয়তো দেখবেন আশি বছরে আপনার শরীর যতখানি অপটু ও জীর্ণ হতো, তাই হয়ে গেছে। অনিয়মের effect (ফল) তো আছে। (আলোচনা প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড, ৫ই ভাদ্র, বুধবার, ১৩৪৭, ইং ২১।৮।১৯৪০)
।। আমিষ-আহারের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক রুচি প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বিধান ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর—ওটাকে বিকৃত রুচিও বলা যায়। একটা মানুষকে হত্যা করলে সে যেমন ব্যথা বোধ করে, একটা জীবকে হত্যা করলে সেও তেমনি করে। জিহ্বার একটু সুখের জন্য আমার মত রক্ত-মাংস-বিশিষ্ট একটা প্রাণীকে মেরে ফেলতে দ্বিধা বোধ করব না, এ কেমন কথা? আমার মনে হয়, প্রত্যেকটি জীবই যেন এক-একটি স্বল্প মানুষ। নরহত্যার কথায় আঁতকে উঠি আর জীব হত্যার বেলায় গায়ে বাধে না, আমাদের বোধবৃত্তি যদি এমনতর প্রবৃত্তি-আবিল, স্থূল, হৃদয়হীন ও সহানুভূতিহীন হয়, তবে প্রবৃত্তি-স্বার্থের খাতিরে প্রয়োজন হ’লে মানুষের উপর আক্রমণ চালাতেও আমাদের আটকাবে না। তাই বলি—না খেলেই হ’লো। ‘Let them enjoy their little day’ (তাদের স্বল্প জীবন তারা ভোগ করুক)। তাদের সুখ-দুঃখ আছে, তারাও ভাল চায়, তাদেরও মন আছে, তাদের কেন কষ্ট দেবে? শুনেছি দুম্বার পাছার দিকে মেদবৃদ্ধি হয়। সেই মাংস কেটে নিলে সে বেশ আরাম পায়। ওতে তার কোন ক্ষতি হয় না। ঐ মাংস খেলে প্রাণী হত্যা হয় না বটে, কিন্তু আমিষ-আহারের কুফল যা’ তা’ ফলতে কসুর করে না। আমি যা’ জানি নিরামিষ আহার শরীর, মন সব দিক-দিয়েই শ্রেয়। (আঃ প্রঃ ৮ম খণ্ড, ৫.৬.১৯৪৬)
“সদাচারী নয়কো যে জন
ইষ্ট বিহীন রয়,
তাহার হাতে পান ও ভোজন
বিষ বহনই হয় ।”
জীবনকে অমৃতের স্নাতক রূপে গড়ে তুলতে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কথিত অমৃতনিষ্যন্দি স্বরূপ উপরোক্ত বাণীটি মেনে চলা আমাদের একান্ত কর্তব্য । বাণীটির মর্মার্থ হলো এই যে, অসদাচারী লোকের দেওয়া অন্ন এবং পানীয় বিষতুল্য । অতএব গ্রহণ করা যাবে না । শাস্ত্র নির্দেশ মেনে শ্রীশ্রীঠাকুর অভক্ষ্য ভোজী, অগম্যা গামী এবং বহনৈষ্ঠিক যারা (পঞ্চবর্হি এবং সপ্তার্চ্চি অনুসরণ করে চলে না ।) তাদের অসদাচারী বলেছেন । মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুন, মাদকসেবী এবং বর্ণধর্ম অপলাপী, অসত্ উপায়ী প্রদত্ত ভোজ্য অভক্ষ্য, অর্থাত্ খাওয়া যাবে না ।
ঋতুমতী, মৈথুনে অনিচ্ছুক, শারিরীক এবং মানসিকভাবে অপরিচ্ছন্ন, অপ্রিয় বাদিনী, উচ্চ বয়সের, উচ্চ বর্ণের, উচ্চ বংশের, রোগগ্রস্তা, হীনাঙ্গী, গর্ভিনী, বিদ্বেষী, ঈর্ষা পরায়ণ, হিংসা পরায়ণা স্ত্রীদের অগম্যা বলা হয়েছে ।
খাওয়ার পর ঘুম আর একটা জৈবিক তাগিদ। সেই ঘুম যদি প্রবৃত্তির কবলে পড়ে আমাদের চেতনা কেড়ে নেয় তাহলেও বিপদের সম্ভাবনা। পুণ্য-পুঁথি গ্রন্থে ঠাকুর যা’কে মরণের সমতুল বলেছেন। আর তাছাড়া স্বতঃ-অনুজ্ঞার প্রতিজ্ঞা ‘চিরচেতন’ পালন না করার জন্য দ্বন্দ্বীবৃত্তিও হয়। ঘুমের বিষয়ে ঠাকুরের স্পষ্ট নিদেশ, ‘‘ঘুমিও তুমি ততটুকুই/অবসাদ না আসে/চেতন থাকাই বর বিধাতার/জড়ত্ব যায় নাশে।’’
শুচিবস্ত্রে পবিত্র বিছানায় শোবার আয়োজন করতে হয়। বিছানায় গা এলিয়ে দেবার পূর্বে নামধ্যানের মাধ্যমে সারাদিনের কাজকর্মের আত্মবিশ্লেষণ করতে হয়। ‘আমি একজন সৎসঙ্গী। দীক্ষা গ্রহণের সাথে সাথে ঘটে-ঘটে ইষ্টস্ফূরণের দায়িত্ব নিয়েছি। আমি কারো সাথে কথার খেলাপ করিনি তো? কোন কপটতার আশ্রয় নিইনি তো? ঠাকুরের বলা অনুযায়ী অর্থ, মান, যশের আশা ছেড়ে সব্বাইকে ‘ভগবান জ্ঞানে ভালবেসে’ ঠাকুরত্ব প্রাপ্তির গন্তব্যের লক্ষ্যে ঠিক ঠিক চলতে পারছি তো? আমার দ্বারা সৎ-এ, ইষ্টনীতির সান্নিধ্যে নিরবচ্ছিন্ন সংযুক্ত থাকাটা কতখানি ব্যাহত হলো ? কেন ব্যাহত হলো? ইষ্টভরণ এবং পিতৃপোষণের জন্য সদাচার এবং বর্ণাশ্রম অনুযায়ী চলে, কাউকে পীড়িত না করে, নিজে পীড়িত না হয়ে বর্ণানুগ কর্মের সেবার বিনিময়ে দিন গুজরানী আয় ঠিক ঠিক করতে পারছি তো? ‘সপ্তার্চ্চি’ এবং ‘পঞ্চবর্হির’ ১২টি নীতি ঠিক ঠিক পালন করতে চেষ্টা করছি তো? আমার আকাঙ্খানদীর স্রোতের ধারার কামিনী-কাঞ্চনের আসক্তি ইষ্ট প্রতিষ্ঠার অনুকূলে সত্তাপোষণী করতে পারছি তো? সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে অন্তরায় যা কিছু নিয়ন্ত্রণ, সামঞ্জস্য, সমাধান তৎপর থেকে বিরোধহীন দুর্বার নিরোধ করার চেষ্টায় যত্নবান ছিলাম তো? আমার বাক্, ব্যবহার, কর্ম কারো অপ্রীতির কারণ হয়নি তো?’—ইত্যাদি ইত্যাদি ইষ্টপ্রতিষ্ঠামূলক ভাবনাগুলোকে স্মরণ-মনন করতে করতে আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে সারাদিনের কর্মটাকে অন্তর্দেবতা পরমপিতার কাছে জবাবদিহি করে আপডেট করে শুতে পারলে কর্মের বন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হয়। অজপা নামের নেশাটাকে বাঁচিয়ে রাখতে ঘুমের মধ্যেও নাম জপ করার অভ্যাস করে ফেলতে পারলে স্বতঃ-অনুজ্ঞার ‘চিরচেতন’ অনুজ্ঞা পালন করা সহজ হয়ে যাবে। আমরা নিদ্রাজয়ী হতে পারব। প্রত্যুষে ‘ঊষার রাগে’ শয্যা ত্যাগ করে শুরু করতে হবে মন্ত্র সাধন, জাগতিক-আধ্যাত্মিক মেলবন্ধনটাকে ঠিক রাখতে। দিনচর্যার কাজকর্মগুলোকে নিখুঁত করার জন্য শ্রীশ্রীঠাকুরেরর এ এক অমোঘ অবদান।
আর এক জৈবিক তাগিদের নাম যৌনজীবন। ওই যৌন জীবনের সিড়ি বেয়ে একজন পুরুষ আদর্শ পিতা এবং একজন নারী আদর্শ মাতার পরিচয় বহন করে সুখ্যাত হতে পারে, আবার কুখ্যাতও হতে পারে । অথচ ওই সিড়ি-চড়ার বিষয়ে আমরা সবচাইতে বেশী উদাসীন। ভাল বাবা হবার জন্য আদর্শ চরিত্র গঠনের দিকে গুরুত্ব না দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করার জন্য যেনতেনপ্রকারেণ টাকা রোজগার করার দিকেই আমাদের ঝোঁক বেশি। টাকার খনির সন্ধান পেয়েও নানারকম অশান্তি, দুঃখ, মনস্তাপ, অবসাদে ভুগতে হয়। থানা, পুলিশ, উকিল, ডাক্তার, রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারস্থ হতে হয়। আমরা যদি একটু বিচার করে দেখি তাহলে দেখা যাবে, সন্তানের শিক্ষার জন্য টাকা দিয়ে বই কেনা যায়, নামী স্কুলে ভর্তি করানো যায়, অনেক টিউটর রাখা যায় কিন্তু মেধা কেনা যায় না, বিদ্যা কেনা যায় না। মেধা এবং বিদ্যা পিতৃ-মাতৃদত্ত উপহার, যা জন্মগত সংস্কারে নিহিত থাকে। মেধা এবং বিদ্যা, মা, বাবার কাছ থেকে নিয়ে যেমন যেমন মেপে দেন তাই সন্তানে মূর্ত হয়। টাকা দিয়ে গৃহ নির্মাণ করা যায় কিন্তু উপযুক্ত গৃহিনী না হলে গৃহসুখ পাওয়া যায় না। টাকা দিয়ে ওষুধ কেনা যায়, স্বাস্থ্য কেনা যায় না, স্বাস্থ্য যদি কেনাই যেত তাহলে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া থ্যালাসেমিয়াদি রোগগুলো থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া যেত। স্বাস্থ্য পিতামাতার অবদান, জন্মগত সমৃদ্ধির বিষয়। এবার একটু হিসেব করে দেখুনতো, টাকা উপার্জনের দিকে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ বিষয়ক গুরু প্রদত্ত বিদ্যাকে উপার্জন করে মনুষ্যত্ব নির্মাণের দিকে গুরুত্ব দিলে অতি সহজেই সুখের জীবন লাভ করা যায় না কি?
এ বিষয়ে শরৎদা (হালদার) শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে জানতে চেয়ে প্রশ্ন করেছিলেন—Heredity (বংশগতি) ও environment (পারিপার্শ্বিক)-এর মধ্যে কোনটি prominent (প্রধান)?
শ্রীশ্রীঠাকুর—মানুষ heredity (বংশগতি) থেকে পায় instinct (সহজাত-সংস্কার), environment (পারিপার্শ্বিক) দেয় তাকে nurture (পোষণ)। ছেলে জন্মাতে যেমন বাপ-মা দুই-ই লাগে, মানুষের জীবনে তেমনি heredity (বংশগতি), environment (পারিপার্শ্বিক) দুটো factor (জিনিস)-ই লাগে। পরিবেশের মধ্যে অনেক কিছুই থাকে, কিন্তু মানুষ সাধারণতঃ তার instinct (সহজাত-সংস্কার) অনুযায়ীই Pick up (গ্রহণ) করে। প্রত্যেকের specific instinct (বিশিষ্ট সংস্কার) পোষণ পায় যা’তে তেমনতর পারিবেশিক বিন্যাস যত হয় ততই ভাল।
(আলোচনা প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড, ৩।১২।১৯৪১)
ওই instinct (সহজাত-সংস্কার) ও environment (পারিপার্শ্বিক)-এর উপর ভিত্তি করেই সভ্যতার প্রাতঃ স্মরণীয় মনীষীবৃন্দের জনক-জননীরা সকলের কাছেই নন্দিত । আবার ভ্রষ্টাচারীর, সন্ত্রাসবাদীর, ধর্ষকের পিতামাতারা সমাজের চোখে নিন্দিত ।
শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই নয়, মনুষ্যেতর প্রাণীদের ক্ষেত্রেও ওই বিধি প্রযোজ্য। সরকারী পুলিশ বা মিলিটারীদের প্রয়োজনে একটা কুকুর, একটা ঘোড়া কিনতে গেলেও ওই instinct (সহজাত-সংস্কার) ও environment (পারিপার্শ্বিক)-এর কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে পেডিগ্রি অর্থাৎ বাবা-মায়ের বিশুদ্ধ বংশানুক্রমিকতার শংসাপত্রের সমৃদ্ধির গুরুত্ব বিচার করে কেনে । সেক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া জাতির নামে সংরক্ষণের উদারতা দেখিয়ে বংশমর্যাদাহীন কুকুর, ঘোড়া কেনে না । শুধু তাই নয়, একটা ভালো গোরুর বাচ্চা তৈরির জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করে বিদেশ থেকে উন্নত জাতের ষাঁড়ের শুক্রাণু কিনে সুপ্রজনন করার ব্যবস্থা করে সরকার, রাস্তায় ঘোরা ষাঁড়গুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে !
কৃষিক্ষেত্রেও তাই । উন্নত ফসলের জন্য ভালো জাতের সংরক্ষিত বীজ শোধন করে, বীজ অনুযায়ী উপযুক্ত উর্বর জমিতে ‘জো’ (fertile enrichment of soil quality.) বুঝে বপন করতে পরামর্শ দেওয়া হয় । একজন আদর্শ কৃষক কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে বাস্তব পরিচর্যার মাধ্যমে বিশুদ্ধ বীজ, বিশুদ্ধ জমিতে বিনিয়োগ করে উন্নত জাতের ফসল পাবার জন্য । টবে একটা ফুল গাছ লাগাতে গেলেও আমরা বীজ অনুযায়ী মাটির সাথে মেলবন্ধন করে বপন করি।
প্রাণী সম্পদ, কৃষি সম্পদ বিকাশের ক্ষেত্রে জৈবিক সম্পদের বিহিত বিনিয়োগ করে বুদ্ধিমান মানুষেরাই । অথচ এই বুদ্ধিমান মানুষেরাই ওই জৈবী সম্পদকে অপচয়ীভাবে বিনিয়োগ করে নিজেদের কমন সেন্সকে অপমান করছে ।
আমরা অনেক সময় কামুক পুরুষদের ‘কুকুরের চাইতেও অধম’ বলে গাল দিয়ে অযথা কুকুরদের অপমান করে বসি। কারণ, কুকুরেরা প্রজনন ঋতু ভিন্ন অন্ন সময় নারী-পুরুষেরা একত্রে সহবাস করা সত্বেও যৌন-মিলনে প্রবৃত্ত হয় না। এ বিষয়ে কুকুরেরা মানুষদের তুলনায় অনেক সংযমী। শুধু কুকুর নয়, মনুষ্যেতর কোন মেরুদণ্ড প্রাণীই বংশ বিস্তার ব্যতীত যৌন মিলনে প্রবৃত্ত হয় না। আর আমরা বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষেরা কি করছি, কতটুকু কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে জৈবিক তাগিদকে সফল বিনিয়োগ করছি, মনের ভল্ট থেকে সেই হিসেবের খাতা বের করে যার যার নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করলেই উত্তরটা পেয়ে যাব।
মহান ভারতের মহান চরিত্র দুর্গা, লক্ষী, সরস্বতী, সীতা, সাবিত্রী প্রমুখ নারীদের আদর্শ ভুলে প্রকৃতি প্রদত্ত জৈবী সম্পদকে যৌবন গরবে গরবিনী প্রবৃত্তিতাড়িত একজন নারী,–নিজের নারীত্বকে দর্শকামে, স্পর্শকামে, শ্রুতকামে, পণ্য করে পুরুষের সুপ্ত কামনাকে জাগিয়ে লাম্পট্য, ব্যভিচারকে পুষ্ট করতে পারে, প্রভূত অনিত্য সম্পদের মালকিন হতে পারে, কিন্তু ভালো মা হয়ে নিত্য-জীবনে আদর্শ নারীর খেতাব অর্জন করতে পারবে না। উনো জমিতেই দুনো ফসল ফলে, বুনো জমিতে নয় । পুরুষের ক্ষেত্রেও তাই । পুর্ব পুরুষের জীবনধারা প্রবাহিত বীর্য্যকে ব্যভিচার, ধর্ষণ, স্বমেহন আর কন্ডোমে অপবিনিয়োগ করে ধর্মবিরুদ্ধ কামসেবার ইন্দ্রিয়-লালসায় বিনিয়োগ করে দুষ্ট প্রবৃত্তিকে তুষ্ট করতে গি়য়ে যৌনব্যাধি, মানসিক কষ্ট, বিবেক-দংশন, সামাজিক ছি! ছি! লাভ করতে পারবে, ভালো বাবার গৌরব অর্জন করতে পারবে না। বীজ শুদ্ধ না হলে ফসলও অশুদ্ধ হবে ।
আমাদের কাম-প্রবৃত্তি নামক জৈবিক তাগিদকে নিয়ন্ত্রণ করতে বৃত্ত্যাধীশ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র নারী-সাধারণকে মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েই ক্ষান্ত হন নি, নিজের স্ত্রীকেও চিন্ময়ী মা জ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শেখালেন । কারণ, স্ত্রীর মাধ্যমে স্বামী নিজেকে জন্মান, তাই স্ত্রীকে জায়া বলা হয়েছে । আমাদের আর্য্য বিধির গর্ভাধান কালে স্ত্রীর নাভিমূল স্পর্শ করে “প্রসীদ মা জগজ্জননী” মন্ত্রে অভিষিক্ত করে স্ত্রীর গর্ভে নিজেকে প্রবেশ করাতে হয় । প্রজা-সৃষ্টি প্রকরণের কি অপূর্ব ব্যঞ্জনা । যৌন জীবনে পুরুষদের শিব, আর নারীদের দুর্গা জ্ঞানে অভিষিক্ত করে কাম (lust) কে আসুরিক প্রবৃত্তির কবল থেকে মুক্ত করে দৈবীপ্রেমে (love) রূপান্তরিত করলেন আর্য্য-ঋষিরা। ওই জীবনীয় বিধিকে মেনে চলার মধ্য দিয়েই সার্থক হয় শিবপূজা, দুর্গাপূজা।
শ্রীশ্রীঠাকুর পুরুষ সাধারণকে কাম উপভোগ বিষয়ে মিতব্যয়ী হবার উদ্দেশ্যে বলছেন,–“…….প্রত্যেকটা sperm ( শুক্রাণু)-ই micro-cosmic form-এ (ক্ষুদ্রাকারে) এক-একটা being (জীব), ও নষ্ট করা মানে micro-cosmic form-এর (ক্ষুদ্রাকারের) একটা মানুষ মেরে ফেলা । আমাদের বোধশক্তি ও মমত্ববোধ জাগলে…… নিজের সুখের জন্য, ইন্দ্রিয়-পরিতৃপ্তির জন্য লক্ষ-লক্ষ শুক্রাণু নষ্ট ক’রে অতোগুলো soul (আত্মা)-কে মারতে পারবো না ।….. তাই প্রজননকল্পে ছাড়া অন্য কারণে শুক্রাণু যথাসম্ভব নষ্ট না করাই উচিত । তুমি-আমি সবই তো ঐ living sperm (জীবন্ত শুক্রাণু), প্রত্যেকে ওরই ওপর দাঁড়িয়ে গজিয়েছে, ওই আজ কত কথা কইছে, ঘুরছে, ফিরছে, হাতি-ঘোড়া মারছে । তুমি যে-দশা পছন্দ কর না, অনর্থক সে-দশায় ওদের ফেলবে ? ওরা যে তুমিই !” (আ. প্র. ১/১. ১২. ১৯৪১)
তিনি তাঁর নারীর নীতির বিধানে কুমারী মেয়েদের উদ্দেশ্যে বললেন—
‘‘মেয়ে আমার,
তোমার সেবা, তোমার চলা,
তোমার চিন্তা, তোমার বলা
পুরুষ-জনসাধারণের ভিতর
যেন এমন একটা ভাবের সৃষ্টি করে—
যা’তে তারা
অবনতমস্তকে, নতজানু হ’য়ে
সসম্ভ্রমে,
ভক্তিগদগদ কন্ঠে—
‘মা আমার,— জননী আমার’! ব’লে
মুগ্ধ হয়, বুদ্ধ হয়, তৃপ্ত হয়.কৃতার্থ হয়,—
তবেই তুমি মেয়ে.
—তবেই তুমি সতী!’’
নারীর নীতির ওই বিধান না মানার ফলে, কিছুদিন পূর্বে, একজন আর্য্যহিন্দু নারী ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে পিটার মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব খান্না এবং ইন্দ্রাণীর মেয়ে শিনার বাবা সিদ্ধার্থ দাস সাম্প্রতিককালে সংবাদ শিরোনাম দখল করে নিয়েছে। সংবাদের বিষয়বস্তু সকলেই জানেন। ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায় মা হয়ে মেয়েকে বোন বলে পরিচয় দেয়, অপত্য স্নেহ ভুলে মা হয়ে মেয়েকে হত্যা করে! ওদিকে এক ব্যাঙ্ক অফিসার কামের মোহে পরকীয়া করতে গিয়ে বেসামাল হয়ে কামিনীকে, কামিনীর মেয়েকে কেটে টুকরো টুকরো করে হুগলী নদীতে ফেলতে গিয়ে ধরা পড়ে! প্রবৃত্তির রিংরসার আঠায় আটকে গিয়ে যাদের এখন দুর্দশার জীবন কাটাতে হচ্ছে! ওই দুর্বিসহ জীবন থেকে নিস্তার পেতে বাস্তব সব পদক্ষেপ নেবার পাশাপাশি ওরা অবশ্যই ভগবানেরও শরণাপন্ন হচ্ছে। আমরা সৎসঙ্গীরা নিয়ম করে অধিবেশনে অধিবেশনে সৎ-অসৎ নির্বিশেষে সকলের মঙ্গল কামনার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা জানাই। সেই রীতির অনুসরণে আমিও বলতে চাই, ভগবান ওদের ওই দুর্বিসহ জীবন থেকে মুক্ত করুন।
না, পরমপিতা আমার আর্জি নাকচ করে দিয়ে বললেন, ‘‘ভগবান আমাদের বাঁচাতে পারেন না, ভগবানের উপর আমাদের যে টান ঐ টানটাই বাঁচায়।’’
‘‘কেউ কারও যম নয়রে, তোর যম তুই।’’
God (ঈশ্বর)-এর opposite pole (বিপরীত মেরু) হ’ল Satan (শয়তান) যা’ disintegrate (বিশ্লিষ্ট) করে। ভগবানের প্রতি বিমুখ হ’য়ে, তাঁকে অস্বীকার করে, তাঁর বিরুদ্ধ যা’ তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে, তাকে প্রাধান্য দিয়ে চলার স্বাধীনতাটুকু মানুষের আছে। এই স্বাধীনতার উপর তিনি হস্তক্ষেপ করেন না। তিনি যেমন ইচ্ছাময়, প্রত্যেকটা মানুষকে তেমনি ইচ্ছাময় করে ছেড়ে দিয়েছেন। যে ইচ্ছাময় যেমন ইচ্ছা করে, সে ইচ্ছাময় তেমন হয়, তেমন পায়—বিধির অনুবর্তনে। পরমপিতা বিশ্ববিধাতা, আর, আামরা হলাম স্ব-স্ব ভাগ্য-বিধাতা। স্রষ্টার বেটা সেও এক স্বতন্ত্র স্রষ্টা। যার প্রাণে যেমন চায়, সে তেমনি সৃষ্টির মালিক হয়।’’ (আ. প্র. ১০ম খণ্ড/ ৮. ১. ৪৮)
আমরা যখন স্ব-স্ব ভাগ্য-বিধাতা, তখন ওইসব দুরাবস্থা থেকে রেহাই পেতে হলে একমাত্র উপায় হচ্ছে বিশ্ববিধাতা পরমপিতার বলা আদেশ-নিদেশ মেনে কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে আমাদের স্ব-স্ব ভাগ্য-বিধাতার কর্তব্যটুকু পালন করে যাওয়া, সকলকে পালন করতে উৎসাহিত করা— মনুষ্যত্বের মূল বুনিয়াদকে রক্ষা করতে হলে।
জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!
আমরা যেন প্রকৃত ইষ্টভৃতি পরায়ণ হয়ে পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠন করতে পারি।
“Common sense is the most uncommon things in this world.”
—Shree Shree Thakur Anukulchandra
————————————————
tapanspr@gmail.com