।। মহালয় বা মহান আলয়ের শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।
নিবেদনে—তপন দাস
*************************
সত্যি বলতে কি, অনিয়ন্ত্রিত প্রবৃত্তি-পরায়ণতার মোহে পড়ে, জীবদ্দশায় পিতা-মাতাকে গৃহ-দেবতা জ্ঞানে সেবা করতে না-পারা সন্তানেরাও কিন্তু মহালয়ার দিনটিতে বিদেহী পিতা-মাতা, পিতৃপুরুষ, মাতৃপুরুষদের তর্পণ মাধ্যমে স্মরণ করেন।
আশ্বিন মাসের অমাবস্যা তিথিতে পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের সূচনার দিনটি মহালয়া। কথিত আছে পিতৃযান বা পিতৃলোক থেকে আত্মারা মর্ত্ত্যলোকের মহান আলয়ে সম্মিলিত হন, সেই বিশ্বাসে পিতৃ-মাতৃহারা আর্য্য হিন্দুরা তাঁদের তৃপ্তির জন্য তিল-জলসহ মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক বিগত ঊর্দ্ধতন পিতৃ-মাতৃ পুরুষদের গোত্র উল্লেখ করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন,—যাতে তাঁরা লিঙ্গদেহের নিরাশ্রয়, নিরালম্ব, বায়ুভূতের কষ্টদায়ক ভোগ কাটিয়ে অচিরেই পিণ্ডদেহ ধারণ করতে পারেন।—সাথে ‘আব্রহ্মভুবনল্লোকা’ মন্ত্রে সকল জীবের তৃপ্তির প্রার্থনা জানান হয়। এক্ষেত্রে স্মরণে রাখা উচিত বংশে যদি সগোত্রে এবং প্রতিলোম বিবাহ হয়, তাহলে কোন মন্ত্রে, কোন দানে, পিতৃ পুরুষদের আত্মা তৃপ্ত হবে না। তাই পিতৃমাতৃ তর্পণ সার্থক করতে হলে জীবদ্দশাতেই পিতামাতাকে গৃহদেবতা জ্ঞানে সেবা করতে হবে। প্রতিলোম-বিলাসী, দশবিধ সংস্কার পালনে উদাসীন হলে চলবে না।
।। প্রচলিত পিতৃতর্পণ বিধি ।।
পিতৃতর্পণ—গোত্র সম্বন্ধ ও নাম উল্লেখ পূর্বক মন্ত্রপাঠ করিয়া পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ, মাতামহ, প্রমাতামহ, বৃদ্ধপ্রমাতামহ, মাতা, পিতামহী, প্রপিতামহী এই নয়জনের প্রত্যেককে যথাক্রমে তিন তিন অঞ্জলি জল দিবেন এবং মন্ত্রও তিনবার পাঠ করিবেন। মাতামহী, প্রমাতামহী ও বৃদ্ধপ্রমাতামহী ও তিনজনকে একবার মন্ত্র পাঠ করিয়া এক এক অঞ্জলি জল দিবেন। পিতামহ হইতে বৃদ্ধ প্রমাতামহী পর্যন্ত একাদশ পুরুষের মধ্যে কেহ জীবিত থাকিলে বা প্রেতাবস্থায় থাকিলে তাঁহাদের ত্যাগ করিয়া তাঁহার উপরিতন পুরুষকে ধরিয়া একাদশ সংখ্যা পূরণ করিয়া লইতে হইবে।
১. যজুর্বেদীয় বিপ্রদের প্রণালী যথা—
‘ওঁ’ উর্জং বহন্তীরমৃতং ঘৃতং পয়ঃ কীলালং পরিশ্রুতং স্বধাস্থ তর্পয়ত মে পিতৃন।
বিষ্ণুরোম —– গোত্র পিতরমুক দেবশর্মন তৃপ্যস্বৈতৎ সতিলোদকংত্যুভং স্বধা (৩বার)।
এই ভাবে গোত্র উল্লেখ করে ১. পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ, বৃদ্ধ প্রপিতামহ, ২. মাতামহ, প্রমাতামহ, বৃদ্ধ প্রমাতামহ, ৩. পিতামহী, প্রপিতামহী, বৃদ্ধ প্রমাতামহী, ৪. মাতামহী, প্রমাতামহী, বৃদ্ধ প্রমাতামহী প্রমুখদের নামের সাথে দেবশর্মন যোগ করে উপরোক্ত মন্ত্র পাঠ করে তিল দান করতে হবে।
*****************************
২. ঋগ্বেদীয় বিপ্রগণ—“বিষ্ণুরোম্ অমুকগোত্রঃ পিতরম্ অমুক দেবশর্মানম্ তর্পয়ামি এতৎ সতিলোদকং তস্মৈ স্বধা নমঃ।” (কেহ বা স্বধানমন্তর্পয়ামি বলেন) এইরূপ বাক্যে পিতামহাদি পুরুষগণকে তর্পণ করিয়া অমুক গোত্রাং মাতরং অমুকীদেবীং তর্পয়ামি এতৎ সতিলোদকং তস্যৈ স্বধা নমঃ (কেহ বা স্বধানমস্তপয়ামি) এই বাক্যে মাত্রাদি স্ত্রীগণকে তর্পণ করিবে।
৩. সামবেদীয় বিপ্রগণ—বিষ্ণুরোম অমুকগোত্রঃ পিতা অমুক দেবশর্মা তৃপ্যতামেতৎ সতিলোদকং তস্মৈ স্বধা নমঃ এইরূপ বাক্যে পিতামহাদি পুরুষগণকে তর্পণ করিয়া অমুকগোত্রা মাতা অমুকীদেবী তৃপ্যতামেতৎ সতিলোদকঃ তস্যৈ স্বধা এইরূপ বাক্যে মাতা প্রভৃতি স্ত্রীলোকগণকে তর্পণ করিবে।
৪. শূদ্রেরা— যজুর্ব্বেদীয় প্রণালীতে তর্পণ করিবেন। ‘ওঁঁ’ স্থলে ‘নমঃ’, দেবশর্মন, স্থানে দাস এবং দেবী স্থানে দাসী বলিবেন; ‘স্বধা’ স্থলে ‘নমঃ’ বলিবেন।
৫. ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যরা ‘দেবশর্মন’ ‘স্থলে যথাক্রমে ‘দেববর্মন’ ও ‘গুপ্ত’ বলিবেন। সমর্থ হইলে পিতৃব্য ভ্রাতা মাতুল বিমাতা ভগিনী পিতৃস্বসা মাতৃস্বসা শ্বশুর শ্বাশুড়ী ও সপিণ্ড প্রভৃতিকে এক এক অঞ্জলি জলদ্বারা তর্পণ করিবে।
(সূত্র : বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)
——————————————–
পণ্ডিতদের মতে মহালয়ার দিনে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করে দেবতা ও ব্রাহ্মণদের উদ্দেশ্যে খাদ্যদ্রব্যাদি উৎসর্গ করা প্রকৃতপক্ষে পিতৃপুরুষের ঋণস্বীকার ছাড়া আর কিছুই নয় ।
ভারতকোষ গ্রন্থে চিন্তাহরণ চক্রবর্তী মহালয়াকে ‘পিতৃপুরুষের উৎসবের আধার’ বলেছেন। লয় প্রাপ্তি অর্থাত চন্দ্রের লয় হয় এই অমাবস্যা তিথিতে আর দর্শণশাস্ত্র মতে আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়ের সূক্ষাতিসূক্ষ্ম অনুভূতিগুলি অর্থাত পরমাত্মার রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ-শব্দ এই মহতাদির লয় হয় । তাঁরা তৃপ্ত হন তর্পণের দ্বারা । জাগতিক অনুভূতিগুলি থেকে মুক্ত হয়ে আত্মারা পরমানন্দে ফিরে যান স্বর্গলোকে। পিতৃপুরুষেরা নাকি এই সময়ে পরলোক থেকে ইহলোকে আসেন জল ও পিণ্ডলাভের আশায়। শাস্ত্রজ্ঞের অভিমতে, প্রয়াত পিতৃপুরুষদের জল-পিণ্ড প্রদান করে তাঁদের ‘তৃপ্ত’ করার উদ্দেশ্যেই এই তর্পণ ।
পণ্ডিত সতীনাথ পঞ্চতীর্থের মতে মহালয়ায় যে তর্পণ করা হয়, তা শুধুই পিতৃপুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেব তর্পণ, ঋষি তর্পণ, দিব্য-পিতৃ তর্পণ ইত্যাদির সঙ্গে থাকে রাম ও লক্ষ্মণ তর্পণ এবং জগতে সকল প্রয়াতকে জলদানের মাধ্যমে তৃপ্ত করার কথা বলা আছে। এমনকি জন্ম-জন্মান্তরে যাঁদের আত্মীয়-বন্ধু কেউ কোথাও নেই এরূপ সকল প্রয়াতকে জলদান করে তাঁদের আত্মার তৃপ্তি সাধন করা যায়।
প্রথমে তাম্রপাত্রে কৃষ্ণ তিল এবং অন্য আরেকটি তাম্রকুন্ডে তর্পণের জল ফেলতে থাকে ব্রতী । মন্ত্রোচ্চারণের দ্বারা প্রথমে সে তার জল নিয়ে পৌঁছে যায় দেবলোকে…ওঁ ব্রহ্মা, ওঁ বিষ্ণু, ওঁ রুদ্র, ওঁ প্রজাপতিস্তৃপত্যাম্। তারপর ঋষিলোকে সপ্ত ঋষিকে প্রণতি পূর্বক তর্পণের দ্বারা তৃপ্ত করে।
দেবলোক, ঋষিলোকের পর “এতত্ সতিলোগঙ্গোদকং ওঁ যমায় নমঃ’ …এই বলে মন্ত্রোচ্চারণ করে যমতর্পণ । এবার মহাভারতের সত্যবাদী জিতেন্দ্রিয় ভীষ্ম পিতামহের তর্পণ, রামতর্পণ এবং সবশেষে স্বর্গত আত্মীয় পরিজনের নামে জলদান করার রীতি এই তর্পণে।
এ থেকে জানা গেল ওইদিন মৃত আত্মাদের উদ্দেশ্যে তর্পণ বা শ্রাদ্ধ করা হয়। এরসাথে কোন দেবী-আরাধনার সম্পর্ক নেই। তাছাড়া কোন দেবীর এমন কোন জীবন্ত আদর্শ পাওয়া যায় না, যেখানে জীবাত্মার গতি-প্রকৃতি বর্ণিত হয়ছে। জীবাত্মা, পরমাত্মার সন্ধান বেদে, উপনিষদে পাওয়া গেলেও পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ গীতা গ্রন্থে বিশদে বর্ণনা করেছেন। সেখানেও আমরা কোন দেবীর যোগ খুঁজে পাই না।
হিন্দুদের প্রামাণ্য স্মৃতিগ্রন্থ মনু সংহিতার বিধান অনুযায়ী আর্য্য হিন্দুদের ব্রহ্মযজ্ঞ, দেবযজ্ঞ, ঋষিযজ্ঞ, পিতৃযজ্ঞ ও নৃযজ্ঞ ইত্যাদি নামের পঞ্চ মহাযজ্ঞ নিত্য পালন করতে হয়। বিশ্বাত্মার অন্তর্ভূক্ত সকলের মঙ্গল স্থাপনের লক্ষ্যে বাস্তব কর্মের নিত্য-উদযাপনের যে বিধান বিদ্যমান তার মধ্যে পিতৃ-মাতৃ যজ্ঞ অন্যতম। অথচ আমরা, তথাকথিত হিন্দুরা, সেসব ভুলে এই একটি দিন বিগত আত্মাদের স্মরণ করে হিন্দুত্ব রক্ষা করতে চেষ্টা করছি। উক্ত ব্রাত্যদোষ থেকে মুক্তি পাবার বিধান দিলেন যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, পঞ্চ মহাযজ্ঞের এক উন্নত সংস্করণ করলেন ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ পালনের বিধানের মাধ্যমে।
শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত ইষ্টভৃতি নিবেদন মন্ত্রের “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপারর্শ্বিকাঃ ।।” উচ্চারণ করার সাথে সাথে বৃহত্তর পারিপার্শ্বিকের জীবনবৃদ্ধির দায়ভারের শপথ নিতে হয় আমাদের। সব অবস্থাতে বাস্তব কর্মে পিতামাতা, পরিজনদের সেবার সাথে বৃহত্তর পরিবেশের জৈবাজৈব সবকিছুকে পালন-পোষণে সমৃদ্ধ করে রাখার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সার্থক হয় পঞ্চ-মহাযজ্ঞ বা ইষ্টভৃতি পালন। ইষ্ট বা পূর্ত কর্মের বাস্তব অনুশীলন বাদ দিয়ে, শুধুমাত্র সকালে উঠে টাকা-পয়সা নিবেদন করে মাসে মাসে পছন্দের সংস্থাকে পাঠানোই কিন্তু “ইষ্টভৃতি” নয়!
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের মধ্যে আর্য্যত্বকে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বললেনঃ
“পঞ্চবর্হি যা’রা স্বীকার করে, আর সপ্তার্চ্চি অনুসরণ করে, তারা যেই হোক আর যা’ই হোক– আর্য্য বা আর্য্যীকৃত । ৬০১ ।
(শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৭)
এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন—
“আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে গেল সেইদিন যেদিন থেকে আমরা পঞ্চবর্হির মূল নির্দ্দেশ অবজ্ঞা করতে শুরু করলাম । তখন থেকে আমরা অপরের খোরাক হলাম কিন্তু নিজেদের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখে পরকে আপন ক’রে নেবার সামর্থ্য হারিয়ে ফেললাম ।” (আঃ প্রঃ ১১।১০০)
“পঞ্চবর্হি ও সপ্তার্চ্চিই হ’চ্ছে সেই রাজপথ–যা’কে স্বীকার ও গ্রহণ ক’রে চললে ক্রমশঃই তুমি সার্থকতায় সমুন্নত হ’তে পার । ২৩৪ ।
(সম্বিতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ১২১)
সামগ্রিকভাবে হিন্দুদের কথা বাদ দিলেও, ইষ্ট প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়ে সদদীক্ষা গ্রহণকারী তথাকথিত সৎসঙ্গী-গণেরাও পঞ্চবর্হি ও সপ্তার্চ্চি-র অনুশাসনের অনুশীলনে উদাসীন! তবুও তারা নাকি সৎসঙ্গী!
সর্বশাস্ত্রসার গীতা গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ইষ্টকে নিবেদন না করে আহার (আহরণ) করলে চোর হতে হয়। এই বিধিও নিত্য তর্পনের অন্তর্গত। অতএব হিন্দু হতে গেলে সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার গ্রহণ এবং বর্ণধর্ম পালন আবশ্যিক। নচেৎ, আহার (আহরণ) নিবেদন না করার অপরাধে চোর হতে হবে।
শ্রীশ্রীঠাকুর তাই আমাদের আহার্য্য গ্রহণের পূর্বে নিবেদন করার বিধান দিলেন। খাবার সময় নিবেদন-ভূমিতে খাদ্য এবং জল দিয়ে বলতে হয়—”পরলোকগত পিতৃ-মাতৃ পুরুষ, আত্মীয়স্বজন, গুরুভাই ও আব্রহ্মস্তম্ব প্রত্যেকে যেন অন্ন পাকে পরিতৃপ্ত হয়ে, সন্দীপ্ত হয়ে জীবন-যশ ও বৃদ্ধিতে পরিপোষিত হয়ে স্মৃতিবাহী চেতনা লাভ করে, পরমপিতা তোমারই চরণে যেন সার্থকতা লাভ করে।”–এইভাবে গণ্ডুষ করতে হয়।
শ্রীশ্রীঠাকুর নিদেশিত উক্ত বিধান মেনে চললে আত্মশুদ্ধি হয়, দেহাতীত হলে নিরালম্ব বায়ুভূতে কষ্ট পেতে হয় না।
তাই তো শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন, “আপুরমান ইষ্টে কারও যদি প্রকৃত টান জন্মে, এবং তাই নিয়ে যদি সে বিগত হয় তবে সে মহান জীবন লাভ করবেই। আবার এ জীবনে যে যতই হোমরা-চোমরা হোক না কেন, সে যদি সুকেন্দ্রিক না হয়, প্রবৃত্তিই যদি তার জীবনের নিয়ামক হয়, তবে ঐ বিচ্ছিন্ন বিকেন্দ্রিকতা তার মৃত্যুকালীন ভাবভূমি ও পরজন্মকে যে অপগতিতে অপকৃষ্ট করে তুলবে, তাতে সন্দেহ কমই।” (আঃ প্রঃ ১১/১৮.০৩.১৯৪৮)
তাই তর্পন, পিতৃপক্ষ, দেবীপক্ষ, দেবী আরাধনা, দেবতা আরাধনা, পূজা তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা একমাত্র ইষ্টকেন্দ্রিক চলনে চলতে অভ্যস্ত হতে পারব। জীবাত্মায় বিশ্বাত্মার উপলব্ধি নিয়ে আত্ম-পূজায় সার্থক হতে পারব।–আজ্ঞাচক্রে ইষ্টের ভাব নিয়ে মহাচেতন সমুত্থানের পথে পাড়ি জমাতে পারব!
——————————————-
বিদেহী আত্মাদের সাথে যোগসূত্র রচনার উদ্দেশ্যে মহাভারতে পুরুষোত্তম কেন্দ্রিক জীবন চলনাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতা যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কোন দেব-দেবীর সাহায্য ছাড়াই ভক্ত যতীশ ঘোষ, ভক্ত নফর ঘোষ প্রমুখ বিদেহী-ভক্তদের লিঙ্গ-শরীরের সাথে বার্তালাপ করেছেন। এগুলো প্রামাণ্য সত্য।
শ্রীশ্রীঠাকুর পিণ্ডদেহ এবং লিঙ্গদেহের গতিপ্রকৃতি সকলের সামনে সহজভাবে উপস্থাপন করেছেন। তার দু-একটা উদাহরণ তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
*****************************************
যোগন—মরার সময় কিভাবে বুঝতে পারবো কোন্ দেশে বা যাচ্ছি আর কিরকমই বা হ’চ্ছে?
শ্রীশ্রীঠাকুর–চিত্রগুপ্তের কথা শুনেছেন তো? সারাজীবনের কার্য্য ও চিন্তার চিত্র মৃত্যুকালে মূর্ত্তিমান হ’য়ে একে- একে দেখা দেয়, তারপর সব চিত্র গুপ্ত হ’য়ে গেলে light (জ্যোতি) দেখা যায়। যাদের সেই জ্যোতির সঙ্গে পরিচয় আছে ( অর্থাৎ মৃত্যুকালের পূর্ব্বেও যারা সাধন দ্বারা সেই জ্যোতি দর্শন করেছে) তাদের সে-সময় ভয় হয় না; তারা তাই ধ’রে ব’সে থাকে, আর সদগুরু সেই জ্যোতির মধ্যে এসে দাঁড়ান, তখন পরিচয় হ’য়ে যায়। আর ভয় থাকে না।
যোগেন -আচ্ছা, মরার সময় ভয় পায় কি? এই যে সব যমদূতের বিকট চেহারা দর্শনে ভয় পাবার কথা শুনা যায়, তা’ সত্য নাকি?
শ্রীশ্রীঠাকুর—মনের ভাব সব মৃত্যুকালে এক- একটা form ( আকার) নিয়ে তো সম্মুখে আসে। ধরুন, কোনও স্ত্রীলোকের প্রতি খারাপ নজর যদি থাকে, তবে মরার সময় ঐ খারাপ ভাবটা form নিয়ে সামনে আসবে, আর, খারাপ ভাব যে form নেবে তা’ মনোহর তো হবে না, বিকটই হবে, কাজেই তা’ দেখে ভয় হ’তেই পারে।
যোগেন—আচ্ছা, সদগুরু ধরায় অবতীর্ণ হ’লে যারা তাঁকে আশ্রয় করে তারা কি সকলেই মুক্ত হয়?
শ্রীশ্রীঠাকুর—হ্যাঁ, যারা তাঁকে প্রকৃতই আশ্রয় করে, তাঁর উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে, তাদের সকলকেই তিনি মুক্তি দেন। (অমিয়বাণী, পৃষ্ঠা, ১৫)
** মরো না, মেরো না, যদি পার মৃত্যুকে অবলুপ্ত কর **
।। প্রসঙ্গ মৃত্যু : –অমিয়বাণী গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী ।।
অশ্বিনীকুমার বিশ্বাস—আচ্ছা, যাদের সদগুরু লাভ হয়েছে তারা তো
মৃত্যুকালে সদগুরুর সাক্ষাৎ পাবে? তারফলে তারা তৎক্ষণাৎ মুক্ত হবে? যদি
তা না হয় তবে সাক্ষাৎ পাওয়ায় লাভ কি?
শ্রীশ্রীঠাকুর—এখানে জীবন্মুক্ত না হয়ে যারা মরবে তারা মৃত্যুকালে
সদগুরুর সাক্ষাৎ পেয়ে এই লাভবান হবে যে, একাকী অনির্দ্দিষ্ট পথে যাবার
জন্য ভয় পাবে না, আধারে ঘুরবে না, তাঁর আশ্রয় পেয়ে তৎকালে ভীত হবে না, আর
এ-জীবনে যতদূর উন্নত হয়েছিল, যেরূপ জীবন পেলে তারপর থেকে কাজ করতে পারে,
সেইরূপ জন্মলাভ করবে। যে-সমস্ত অসৎ কর্মফল ছিল তা ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তদ্
দরুন নিম্নতর যোনিতে জন্মাতে হবে না। ওরূপ মানুষ ম’রে মানব ছাড়া অন্য
জন্ম তো পাবেই না, বরং মানবের মধ্যে উন্নত চরিত্রের মানব হ’য়ে জন্মাবে।
* * *
মৃত্যু সম্বন্ধে বলিতেছেন-“Hundred twenty years-এ যে মৃত্যু সেইটাই natural। তার পূর্বে যে সমস্ত মৃত্যু হয়, সেগুলো unnatural। ব্যক্তিগত সাধনা দ্বারা, উন্নত প্রণালীর চিকিৎসা দ্বারা লোকের এই অকালমৃত্যু control করা যায়। মৃত্যুতে cells-এর পরিবর্তন হয়, অর্থাৎ একরকমের cells আর এক রকমের cells-এ transformed হয়, কিন্তু প্রত্যেক cell-এরই consciousness আছে। এই হিসেবে মৃত্যু আর কিছুই নয় কেবল diffusion of crystallised consciousness—cell এর জড়ীভূত এক individual consciousness হারিয়ে cell-এর consciousness গুলি ছড়িয়ে যাওয়া। একটা idea-য় যেন cell গুলি দানা বেঁধে থাকে। মৃত্যুতে cell-এর disintegration হয়। সেই আত্মার উপলব্ধি যার হয়েছে তার জন্ম নাই, মৃত্যু নাই—এটা real; আর আমাদের কাছে পূর্বজন্ম পরজন্ম অস্তিত্বহীন, মিথ্যা, কারণ, আমরা আত্মার সঙ্গে নিজেদের এখনও identified করিনি বলে, আত্মাই যে নানা ঘূর্ণিপাক সৃষ্টি করে করে জীবন-মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চলছে তা বুঝিনা এবং অনুভব করি না।”
যতীনদা—“তা হলে তো আমাদের পূর্বজন্ম, পরজন্ম নেই। তবে আর শ্রাদ্ধাদির কি প্রয়োজন ?”
শ্রীশ্রীঠাকুর—“Individual consciousness cell consciousness-এ বিকীর্ণ হয়ে পড়ে। বহু cell চতুর্দিকে তাদের consciousness নিয়ে বিচ্ছুরিত হয়, এক জটিল আমিত্ব ভেঙ্গে খান খান হয়ে বহু কোষের বহু, আমিত্বে পরিণত হয়, আর তাই মৃত্যু। আমরা যে শ্রাদ্ধাদি করি তাতে আমাদের idea প্রসারিত হয়। তাতে ভাবজগতে idea-র জগতে ঝঙ্কার তোলে। Idea-র পুষ্টি sympathetic idea-তেই। তাই শ্রাদ্ধে উপনিষদাদির উচ্চভাবের স্মৃতিকে জাগরণ করা হয়।” (চির-স্মরণীয় ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ২য় খণ্ড, পৃঃ ৪৫)
আত্মা, ‘অত’’ ধাতু ‘মন্’ করে হয়েছে। ‘অত’ মানে নিয়তগতিশীল হওয়া। আত্মা কি ? আত্মা চিরচঞ্চল। Nerve-এর মধ্য দিয়ে vital energyর যে flow তাই আত্মা। দেখা যায় vital energy-তে হয় বাইরের জগতের impression বা photograph। তাই বলে, আত্মা হতে হয় মন। আর তাই মন নিয়তচঞ্চল। Vital current-এর break আর make করছে যা, তাই মন । মন তা হলে কিছুতেই স্থির হতে পারে না।
(চির-স্মরণীয় ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ২য় খণ্ড, পৃঃ ১১৩)
************************
শ্রীশ্রীঠাকুর —চিত্রগুপ্তের কথা শুনেছেন তো? সারাজীবনের কার্য্য ও চিন্তার চিত্র মৃত্যুকালে মূর্ত্তিমান হ’য়ে একে- একে দেখা দেয়, তারপর সব চিত্র গুপ্ত হ’য়ে গেলে light (জ্যোতি) দেখা যায়। যাদের সেই জ্যোতির সঙ্গে পরিচয় আছে ( অর্থাৎ মৃত্যুকালের পূর্ব্বেও যারা সাধন দ্বারা সেই জ্যোতি দর্শন করেছে) তাদের সে-সময় ভয় হয় না; তারা তাই ধ’রে ব’সে থাকে, আর সদগুরু সেই জ্যোতির মধ্যে এসে দাঁড়ান,তখন পরিচয় হ’য়ে যায়। আর ভয় থাকে না।
যোগেন (প্রশ্ন কর্তা) —আচ্ছা, মরার সময় ভয় পায় কি? এই যে সব যমদূতের বিকট চেহারা দর্শনে ভয় পাবার কথা শুনা যায়, তা’ সত্য নাকি?
শ্রীশ্রীঠাকুর — মনের ভাব সব মৃত্যুকালে এক-একটা form ( আকার) নিয়ে তো সম্মুখে আসে। ধরুন, কোনও স্ত্রীলোকের প্রতি খারাপ নজর যদি থাকে, তবে মরার সময় ঐ খারাপ ভাবটা form নিয়ে সামনে আসবে, আর, খারাপ ভাব যে form নেবে তা’ মনোহর তো হবে না, বিকটই হবে, কাজেই তা’ দেখে ভয় হ’তেই পারে।
যোগেন — আচ্ছা, সদগুরু ধরায় অবতীর্ণ হ’লে যারা তাঁকে আশ্রয় কর তারা কি সকলেই মুক্ত হয়?
শ্রীশ্রীঠাকুর — হ্যাঁ, যারা তাঁকে প্রকৃতই আশ্রয় করে, তাঁর উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে, তাদের সকলকেই তিনি মুক্তি দেন।
(সূত্র : অমিয়বাণী, পৃষ্ঠা-১৫)
জন্ম ও মৃত্যুর আগম-নিগম-এর স্বরূপ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেনঃ “সম্বেগ জীবের বা মানুষের মধ্যে gene-এর (জনির) ভিতর দিয়ে যে pitch-এ (স্তরে) ওঠে, মরে যাওয়ার সময় psycho-plasm-এ (মানস দেহে) engraved ( মুদ্রিত) হয়ে থাকে সেই pitch-এ wave-এর (তরঙ্গের) আকারে। মিলনেচ্ছু sperm-এর (শুক্রকীটের) ভিতর সেই জাতীয় সম্বেগ সৃষ্টি হলে tuning (সঙ্গতি) হয় এবং মৃত ব্যক্তি পুনরায় শরীর গ্রহণ করার সুযোগ পায়। জন্ম ও মৃত্যুর এটাই revolving process (ঘুর্ণায়মান পদ্ধতি)।” (আ. প্র. ২১/১০৭)
*মৃত্যুর স্বরূপ প্রসঙ্গে* শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন : “আমাদের consciousness (চেতনা) ধৃতি যেটা, যা’ নিয়ে আমরা থাকি, সেটা হ’ল সম্বেগ। যে-সম্বেগ দ্বারা আমরা বাঁচি, বাড়ি, সেটা যদি কোন কারণে blocked হয়ে যায় তাহলে আমরা
মরে যাই।”
“আপূরয়মান ইষ্টে কারও যদি প্রকৃত টান জন্মে, এবং তাই নিয়ে যদি সে বিগত হয় তবে সে মহান জীবন লাভ করবেই। আবার, এ জীবনে যে যতই হোমরা-চোমরা হোক না কেন, সে যদি সুকেন্দ্রিক না হয়, প্রবৃত্তিই যদি তার জীবনের নিয়ামক হয়, তবে ঐ বিচ্ছিন্ন বিকেন্দ্রিকতা তার মৃত্যুকালীন ভাবভূমি ও পরজন্মকে যে অপগতিতে অপকৃষ্ট ক’রে তুলবে, তা’তে সন্দেহ কমই।” (আঃ প্রঃ ১/ ১৯.১১.১৯১৪)
শ্রীশ্রীঠাকুর কথাপ্রসঙ্গে বললেন—”মানুষের আত্মা যেমন অমর, নিষ্ঠাও তেমনি অমর। আমরা যে অমৃত-অমৃত করি, তার চাবিকাঠি হ’ল ইষ্টনিষ্ঠা। ইষ্টনিষ্ঠা যেই একজনকে পেয়ে বসে, তখন এক-একটা প্রবৃত্তির সিন্দুকের ডালা খুলে যেতে থাকে এবং বিভিন্ন প্রবৃত্তি ইষ্টমুখী অর্থাৎ একমুখী হ’তে থাকে। তখন বোঝা যায় কামের স্বরূপ কী, ক্রোধের স্বরূপ কী, লোভ-মোহ- মাৎসর্য্যের স্বরূপ কী! এবং এগুলির প্রত্যেকটির সপরিবেশ নিজের সত্তাপোষণী বিনিয়োগ করা যায় কিভাবে। তখন মানুষ প্রবৃত্তির হাতে গিয়ে পড়ে না, বরং প্রবৃত্তিগুলি তার হাতে খেলার পুতুলের মত হয়ে দাঁড়ায়। বেফাঁস চলন বন্ধ হয়ে যায়। এইভাবে মানুষের ভিতরে অখণ্ড ব্যক্তিত্বের প্রতিষ্ঠা হয়। সে প্রাজ্ঞ হয়ে ওঠে। বোধিসত্ত্ব হয়ে ওঠে।”
(আলোচনা-প্রসঙ্গে, উনবিংশ খণ্ড, ইং ১৭. ৪. ১৯৫০)
—————————————————————–
· নিরালম্ব, নিরাশ্রয়, বায়ুভূতে অবস্থানরত লিঙ্গদেহীদের উদ্দেশ্যে প্রণতি জানাই। শুভ-সংস্কারী পিণ্ডদেহী মায়েদের সাধনায় আপনারা যেন পিণ্ডদেহ ধারণ করে এই মহান আলয়ে আবার ফিরে আসতে পারেন। পরমপিতার রাতুল চরণে সেই প্রার্থনা জানাই। সবাইকে জয়গুরু ও প্রণাম জানাই। আমরা যেন অমৃত জীবনের অধিকারী হতে পারি।বিনয়াবনত—তপন দাস
