।। দূষণ নিয়ন্ত্রণ দিবস স্মরণে নিবেদন ।।
[2রা ডিসেম্বর, 1984-এর ভয়ঙ্কর রাতে, ভোপালে ইউনিয়ন কার্বাইড ইন্ডিয়া লিমিটেড কীটনাশক প্ল্যান্ট থেকে একটি গ্যাস লিক হওয়ার ফলে হাজার হাজার মানুষ মারা যায় এবং অর্ধ মিলিয়নেরও বেশি লোক আক্রান্ত হয়। এই বিপর্যয় শিল্প অবহেলার গুরুতর পরিণতি এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে । জাতীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ দিবস এই ইভেন্টের স্মরণ হিসাবে কাজ করে এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের বিপর্যয় এড়াতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার গুরুত্বের উপর জোর দেয়।
- সচেতনতা এবং শিক্ষা: এই দিনটি ক্রমবর্ধমান দূষণের মাত্রা সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এবং তাদের কার্বন পদচিহ্নগুলি হ্রাস করার পদ্ধতি এবং অনুশীলনগুলি সম্পর্কে জনসাধারণকে শিক্ষিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি তথ্য প্রচারের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসাবে কাজ করে, একটি আরও পরিবেশ সচেতন সমাজকে উত্সাহিত করে৷
- পলিসি রিইনফোর্সমেন্ট: এটি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি উপলক্ষ যাতে তারা নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাগুলিকে পুনর্বিবেচনা করে, যাতে শিল্পগুলি পরিবেশগতভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ অনুশীলনগুলি মেনে চলে। দিবসটি শিল্পগুলিকে তাদের পরিবেশগত প্রভাব হ্রাস করে টেকসই এবং সবুজ প্রযুক্তি গ্রহণ করার আহ্বান জানায়।
- জনসাধারণের সম্পৃক্ততা: এই দিনে বিভিন্ন কর্মসূচি, কর্মশালা এবং প্রচারণার মাধ্যমে জনসাধারণকে দূষণ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের জন্য নিযুক্ত ও উৎসাহিত করা হয়। পরিবেশ নীতির সফল বাস্তবায়নের জন্য এই ধরনের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের উপর প্রভাব
দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব বহুগুণ। বায়ু দূষণের ফলে শ্বাসযন্ত্রের রোগ, হৃদরোগ, এমনকি ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। জল দূষণ জলজ জীবনকে প্রভাবিত করে এবং দূষিত জল গ্রহণ করলে মানুষের জন্য উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে। মাটি দূষণ কৃষিকে প্রভাবিত করে, যার ফলে ফসলের ফলন এবং গুণমান হ্রাস পায়।
তদ্ব্যতীত, অনিয়ন্ত্রিত দূষণ বিশ্ব উষ্ণায়নে অবদান রাখে, যা অনিয়মিত আবহাওয়ার ধরণ, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির দিকে পরিচালিত করে। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধি এবং কৃষি উৎপাদনশীলতা হ্রাসের সাথে অর্থনৈতিক প্রভাবগুলিও উল্লেখযোগ্য। - কঠোর প্রবিধান: ভারতের জন্য কঠোর দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রবিধান থাকা অপরিহার্য। নিয়মিত পরিদর্শন, খেলাপিদের জন্য জরিমানা এবং সবুজ অনুশীলনের জন্য প্রণোদনা কার্যকর হতে পারে।
- প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন: সবুজ প্রযুক্তি গ্রহণ করা, যেমন নবায়নযোগ্য শক্তির উত্স, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং টেকসই কৃষি অনুশীলন, উল্লেখযোগ্যভাবে দূষণ কমাতে পারে।
- জনসাধারণের অংশগ্রহণ: সম্প্রদায়, এনজিও এবং ব্যক্তিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। বৃক্ষ রোপণ, বর্জ্য পৃথকীকরণ, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করা এবং পানির অপচয় কমানো সহজ কিন্তু কার্যকর উপায় যা নাগরিকদের অবদান রাখতে পারে।
- বিশ্বব্যাপী সহযোগিতা: দূষণ একটি বিশ্বব্যাপী সমস্যা। দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতামূলক প্রচেষ্টা কার্যকরভাবে দূষণ মোকাবেলায় ভাগ করা জ্ঞান, সম্পদ এবং প্রযুক্তির দিকে পরিচালিত করতে পারে।
- অবিচ্ছিন্ন শিক্ষা: স্কুল, কলেজ এবং পাবলিক প্ল্যাটফর্মগুলিকে পরিবেশগত শিক্ষা, সংরক্ষণের মূল্যবোধ এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে টেকসই জীবনযাপনকে একীভূত করা উচিত।
উপসংহারে, জাতীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ দিবস শুধু স্মরণের দিন নয়, কর্মের আহ্বান। এটি দূষণ মোকাবেলা, আমাদের পরিবেশ রক্ষা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যত নিশ্চিত করার জরুরি প্রয়োজনের ওপর জোর দেয়।
ভারত, তার বিশাল জনসংখ্যা এবং দ্রুত শিল্পায়ন সহ, একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আজকে করা পছন্দগুলি ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া পরিবেশগত উত্তরাধিকার নির্ধারণ করবে।
এই দিনটি আমাদের দায়িত্ব এবং ভারতকে আরও সবুজ, পরিচ্ছন্ন এবং স্বাস্থ্যকর জাতি হিসাবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সম্মিলিত প্রচেষ্টার স্মারক হিসাবে পরিবেশন করুন।]
।। এ বিষয়ে করণীয় কর্তব্য ।।
দূষণ নিয়ন্ত্রণে আমাদের ভূমিকা হলো দৈনন্দিন জীবনে কিছু সহজ অভ্যাস পরিবর্তন করা, যেমন— গণপরিবহন ব্যবহার করা, বর্জ্য পৃথকীকরণ করা, বিদ্যুৎ ও জল ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া এবং প্লাস্টিক ও অন্যান্য দূষণকারী পদার্থ ব্যবহার কমানো। এছাড়াও, ‘3Rs’ ধারণা, অর্থাৎ হ্রাস (reduce), পুনর্ব্যবহার (reuse) এবং পুনর্ব্যবহার (recycle) করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের ভূমিকা
‘3Rs’ নীতি অনুসরণ: বর্জ্য উৎপাদন কমানো (reduce), জিনিসপত্র পুনরায় ব্যবহার করা (reuse) এবং রিসাইকেল করা (recycle)।
যাতায়াত: ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন (যেমন বাস, ট্রেন) ব্যবহার করা।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: বর্জ্যকে সঠিকভাবে পৃথক করা এবং একটি সঠিক পদ্ধতিতে তা নিষ্পত্তি করা।
শক্তি সাশ্রয়: বাড়ির বা অফিসের লাইট, ফ্যান এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারের সময় সাশ্রয় করা।
প্লাস্টিক বর্জন: প্লাস্টিক এবং অন্যান্য অপচনশীল বর্জ্য উৎপাদন ও ব্যবহার কমানো।
বৃক্ষরোপণ: গাছ লাগানো এবং সবুজায়ন বাড়ানো, কারণ গাছ বাতাসকে বিশুদ্ধ করতে সাহায্য করে।
সচেতনতা তৈরি: পরিবার, বন্ধু এবং সমাজে দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
আইন মেনে চলা: দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত সরকারি আইন ও নিয়মকানুন মেনে চলা। (সংগৃহীত)
।। পরিবেশের এবং মনুষ্যত্বের দূষণ প্রতিরোধে করণীয় কর্তব্য ।।
বিশ্ব-প্রকৃতির পরম দান, পঞ্চ-মহাভূত—ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-এর অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই পৃথিবী নামক সবুজ গ্রহটি। নগর-সভ্যতার ধারক-বাহকেরা আসুরিক ক্ষমতার বলে, ভোগবাদের ছাড়পত্রের বলে, আদর্শহীনতার বলে ভারতীয় ধর্মের অঙ্গীভূত পঞ্চ-মহাযজ্ঞ, সদাচার এবং বর্ণাশ্রমকে বিদায় জানিয়ে বসুন্ধরার পরিবেশকে যে ধ্বংসাত্মক পথে এগিয়ে দিয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘নাসা’-র গবেষণা। উদ্বেগ প্রকাশ করে গিয়েছিলেন কবিগুরু, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর’-এর প্রতিবাদী বাণীতে।
ভারতবর্ষের বৃহত্তম নদী গঙ্গাকে আমরা মা বলি, যাঁর পূত স্রোতধারায় স্নাত হয়ে পবিত্র হই, সেই মায়ের শরীরে নগর-সভ্যতার পুর-বিভাগ যখন পরিকল্পিতভাবে পূতিগন্ধ ক্লেদ নিক্ষেপ করে, ধর্মের ধ্বজাধারীরা তথাকথিত পূজা-পার্বনের বর্জ্য নিক্ষেপ করে পুণ্য অর্জন করে, তখন মনে হয় না যে আমরা কোন উন্নত সভ্যতার সভ্য, প্রগতি বাদের বাদী, আর্য্য সংস্কৃতির ধারক বাহক ধার্মিক।
পরিবেশ সম্বর্দ্ধনার সেই পরম অনুশীলন কি ভাবে বিকৃত হয়েছে সে বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই। বরং বসুন্ধরার পরিবেশকে রক্ষা করার ব্রতে কিভাবে ব্রতী হওয়া যায় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের উপদেশ মেনে আমাদের প্লাস্টিক-সভ্যতার কর্ণধারেরা যাতে পরিবেশ বান্ধবের ভূমিকা গ্রহণ করেন। রাষ্ট্র নায়কেরা যা’তে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, ভূমিদূষণ, ভূ-স্তরদূষণ, জলদূষণ প্রতিরোধ করে গ্লোবাল-ওয়ার্মিং বা বিশ্ব-উষ্ণায়ন-ভ্রূকুটি থেকে সভ্যতাকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হন, সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে, জনমত গঠন করতে হবে, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের লাগামহীন ভোগের চাহিদা মেটাতে যে হারে ভূ-গর্ভস্থ তেল, গ্যাস, কয়লা, বিবিধ আকরিক উত্তোলন করতে গিয়ে ভূ-স্তরের অবক্ষয়কে আহ্বান করে চলেছি, ধ্বংস করে চলেছি ‘রেন ফরেস্ট’কে। এর বিরুদ্ধে সরব না হলে কোন মূল্যেই বাঁচানো যাবে না মানব সভ্যতাকে!
আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর পূর্বে পরম বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরব হয়েছিলেন এই ভয়াবহ পরিস্থিতি প্রতিরোধ মানসে। প্রাতঃ-স্মরণীয় পদার্থবিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যকে উৎসাহ দিয়ে হিমাইতপুরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র। বিজ্ঞান-বিষয়ক অত্যাশ্চর্য্য বহুকিছুর সাথে সন্ধান দিয়েছিলেন সহজলভ্য আবহাওয়া বিদ্যুতের। ভূ-গর্ভস্থ প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন পরবর্তী শূন্যগর্ভ অবস্থাকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে কিভাবে পুণঃ-পূর্ণকরণ বা রিফিলিং করলে ভূ-স্তরের ক্ষতি হবে না সে বিষয়েও তিনি বলে গেছেন। তাঁর প্রদত্ত ওইসব ফরমূলাকে বাস্তবায়িত করতে পারলে ভূ-স্তরকে বিনষ্ট না করে, পরিবেশকে দূষিত না করেই প্রাকৃতিক দৌ-শক্তিকে কাজে লাগিয়ে শক্তি-সম্পদে সমৃদ্ধ হতে পারত আমাদের সভ্যতা।
আমরা জানি, ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। আমাদের অস্তিত্বের ধারক, পালক-পোষক পরমাপ্রকৃতির পঞ্চ-মহাভূত। উক্ত পঞ্চ-মহাভূতের অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই বসুন্ধরা—নীল-সবুজ গ্রহ। ধারণ করতে হবে ওই প্রাকৃতিক উপাদানসমূহকে, ওঁদের বিনাশ করলে আমরাও বিনাশ হবো। নচেৎ বিশুদ্ধ জলের বোতলের মত অক্সিজেন সিলিণ্ডার পিঠে বয়ে ঘুরতে হবে একদিন নিকট ভবিষ্যতে।
পল-বিপল, দণ্ড-প্রহর, অহোরাত্র, আহ্নিকগতি, বার্ষিকগতির দিনরাত, মাস, বছর হয়েই চলেছে আদিকাল থেকে, প্রাকৃতিক নিয়মে। দিন-মাস-বছর আসে যায়, রেখে যায় কিছু স্মৃতি মনের মণিকোঠায়। ওই স্মৃতির মালাগুলোকে স্মৃতিবাহীচেতনার ভল্টে অনন্তকাল জমা করে রাখার জন্য আর্য্য-ঋষিরা প্রতিটি মুহূর্তের জীবন ধারণের আহরণ শুদ্ধির মাধ্যমে ধ্রুবাস্মৃতির সন্ধান দিয়ে গেছেন ‘‘আহারশুদ্ধৌ সত্তাশুদ্ধি, সত্তাশুদ্ধৌ ধ্রুবাস্মৃতি’’ মন্ত্রে । শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র স্বস্ত্যয়ণী ব্রতের ‘নিয়তং স্মৃতিচিদয়ুতে’ মন্ত্রে য়াকে সমৃদ্ধ করেছেন। য়ে মুহূর্ত চলে যাবে তা আর ফিরে আসবে না। চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা সমৃদ্ধ সবুজ গ্রহ পৃথিবীর প্রতিটি মুহূর্তকেই যাতে চিরনবীনতায় আস্বাদন করতে পারি, উপভোগ করতে পারি সেজন্যই আর্য্য সভ্যতার ঊষা লগনে পরমপিতার প্রতিভূ আর্য্য ঋষিগণ ‘‘মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ……..’’ মন্ত্রে বন্দনা করে বসুন্ধরার মধুময় পরিবেশকে রক্ষা অর্থাৎ পূজা করতে শিখিয়েছিলেন। পূজা শব্দের অর্থ পূরণ করা, সম্বর্দ্ধনা, সম্যকভাবে বর্দ্ধনার লক্ষ্যে এগিয়ে চলা। যেমন-যেমন আচরণে, পরিবেশের অজৈব উপাদানসমূহকে রক্ষা করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া যায় তাই ছিল আর্য্য ভারতের পূজা, যজ্ঞ, হোম, উৎসবের তাৎপর্য্য।
আমরা যে ৩৩ কোটি দেবতার কথা শুনেছি সে সংখ্যাটা ৩৩,০০০০০০০ নয়, শুধুই ৩৩। কোটি অর্থে (piece) বোঝান হয়েছে, যথা, জীবকোটি, ঈশ্বরকোটি একক অর্থে ব্যবহৃত হয়।
বাস্তবে আমাদের এই সবুজ গ্রহের জীবকূলের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জৈবাজৈব রসদের যোগানদাতার মূল মালিক সূর্য। সূর্যর আর এক নাম আদিত্য। আদিত্য মানে দেবতা। দেদীপ্যমান যা তাকে দেবতা বলে। দেবতা মানে দ্যুতি বিশিষ্ট সত্তা। সব দেবতাই মূলতঃ পরব্রহ্মের প্রতীক। যেমন পৃথিবীর অধিপতি অগ্নি, অন্তরীক্ষে ইন্দ্র বা বায়ু ও দ্যুলোকে সূর্য। পৃথিবী, অন্তরীক্ষ এবং দ্যুলোক-এর প্রতিটি স্থানে ১১টি করে বেঁচে থাকার আবশ্যিক উপাদান সরবরাহকারী দেদীপ্যমান উৎস রয়েছে। উক্ত ৩৩টি জীবনীয় উৎস-সমূহকে দেবতা বলা হয়েছে উপনিষদে।
বৃহদারণ্যক উপনিষদ (৩য় অধ্যায়, ৯ম ব্রাহ্মণ)-এর ঋষি শাকল্য, ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য সমীপে দেবতার সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি অষ্টবসু, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্যাদি ৩১ সংখ্যক দ্যুতিবিশিষ্ট প্রাকৃতিক সত্তা এবং ইন্দ্র ও প্রজাপতি মিলিয়ে ৩৩ সংখ্যক দেবতার উল্লেখ করেছিলেন। ওই ৩৩ কোটি (33 pieces) দেদীপ্যমান উৎসসমূহকে রক্ষা করার প্রশ্নে আমরা প্রবৃত্তি পরবশ হয়ে যাতে দুর্বৃত্ত না হই তারজন্য উপনিষদের ঋষিগণ ‘আত্মানং বিদ্ধি’-র শপথ বাক্যের পাঠ দিলেন।—পরমপিতার সন্তান তুমি, নিজেকে জানো, নিজের প্রতিরূপ মনে করে পরিবেশকে বাঁচাও, নিজে বাঁচ। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’—জীবনবিধ্বংসী আচরণ ত্যাগ করে জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলো। ‘মা গৃধ’—লোভ করো না। সদাচার এবং বর্ণাশ্রম মেনে চলো। পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে নিজে সমৃদ্ধ হও। এই ছিল ভারতবর্ষের বিধি-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠনের, ধর্মের, পূজার, উৎসবের বাস্তব রূপ। ওই হৃত-গৌরব যুগোপযোগী করে পুণঃ-প্রতিষ্ঠিত করে গেলেন সব দেবতার সমাহারের প্রতীকস্বরূপ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। যার প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয় তাঁর প্রদত্ত ‘আর্য্য সন্ধ্যা’ প্রার্থনা মন্ত্রে।
আমরা, ভারত রাষ্ট্রের অধিবাসীরা ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের পবিত্র মন্ত্র মূণ্ডকোপনিষদের ‘সত্যমেব জয়তে’-র মধ্যে নিহিত সত্যের সন্ধান করার চেষ্টা করতে হবে। ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টি রক্ষার পবিত্র কর্তব্য ভুলে, ধর্মের নামে কতগুলো কু-সংস্কারে, আর বিজ্ঞানের নামে ভোগবাদে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছি। অথচ বিশ্বের পরিবেশ বিজ্ঞানীরা প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে, ভারতীয় পঞ্চ-মহাযজ্ঞের বিধানকে, সমাজ বিজ্ঞানীরা সমাজ-বন্ধনের দৃঢ়তার অবক্ষয় রোধে, শ্রেণী-বিন্যস্ত বর্ণাশ্রমানুগ সমাজ ব্যবস্থার বিধানকে এবং প্রজনন বিজ্ঞানীরা সুস্থ মানবজাতি গঠনের জন্য সুবিবাহ ও সুপ্রজনন বিধিকে মেনে চলতে পরামর্শ দিয়েছেন।
বেদ-উপনিষদ-গীতা. ঋষি এবং মহাপুরুষদের নিদেশে কোথাও প্রচলিত পূজার নামে, অনিত্য বস্তুর উপাসনার নামে, হৈ-হুল্লোর করে পরিবেশ দূষণ করার অনুমোদন নেই। ব্যক্তি চরিত্র গঠনের নিমিত্ত সাধন-ভজন-আরাধনা বাদ দিয়ে যে তন্ত্রমতে আমরা পরিবেশ দূষণ করতে প্রতিমা পূজায় মেতে উঠি, সেই তন্ত্র-ই প্রতিমা পূজাকে ‘‘বাহ্যপূজা অধমাধম’’ বলে বর্ণনা করেছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও, ‘‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’’ ছন্দের ডালিতে প্রতিমা পূজার অসারতার বার্তা রেখে গেছেন।
বসুন্ধরার পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, এক বিপ্লব নিয়ে এলেন। ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে, ধর্ম বলে জানিস তাকে। বাঁচা-বাড়ার মর্ম যা, ঠিকই জানিস ধর্ম তা। Upholding urge of existence is Dharma.’……..ইত্যাদি বাণীর মাধ্যমে। অতএব, চাঁদার জুলুম, ফুল, বেলপাতা, ধূপহীন ধূপকাঠি, নৈবেদ্য, দশ-(অ)কর্মার ফর্দ, ঢাক, ঢোল, বাজি, হৈ-হুল্লোর, তার শব্দে মাইকের ডালি দিয়ে নয়— তোমাকে ধার্মিক হতে হলে আগে পরিবেশকে বাঁচাতে হবে। সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বাস্তব কর্মে ব্রতী হতে হবে। পরিবেশ হিতৈষী হতে হবে, তবেই তুমি ভারতীয় মতের ‘ধার্মিক’ অভিধায় ভূষিত হতে পারবে।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের অনুগামীদের নিত্য ইষ্টভৃতি করতে হয়। ইষ্টভৃতি মানে ইষ্ট কর্মের ভরণ। ইষ্টকর্ম মানে পূর্ত্তকর্ম—পরিবেশের উপাদানকে,পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখার বাস্তব কর্ম। যা প্রকৃত ইষ্টভৃতির মন্ত্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ ।” এর সরলার্থ খুব সহজ। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুযায়ী সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন বর্দ্ধনার বিধি মেনে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে চলেন যিনি, এমন গুরুভাই-ই প্রকৃত ইষ্টভ্রাতা।–যাঁর আপদে-বিপদে সাধ্যানুগ সাহায্য করতে হবে। ভূত মানে,–ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা পরিবেশের অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। সেগুলোকে প্রাণ পণ করে রক্ষা করতে হবে। প্রতিনিয়ত এই শপথ মেনে চলার নাম ইষ্টভৃতি। অতএব প্রতিটি আমি যদি প্রকৃত ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের যাজ্ঞিক হবার শপথ পালন করতে পারি তাহলেই অনেকাংশে রক্ষা করা যাবে সুজলা-সুফলা-মলয়জ-শীতল বসুন্ধরার পরিবেশকে।
এ যুগের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমাদের সচেতন করে দিতে বাণী দিয়ে বললেনঃ
‘‘ইষ্টভরণ, পিতৃপোষণ,
পরিস্থিতির উন্নয়ন,
এ না করে, যাই না করিস
অধঃপাতেই তোর চলন।’’
ওই অধঃপতন থেকে মধুময় বসুন্ধরার পরিবেশকে, মানব সভ্যতাকে, মানবতার অপমৃত্যুকে রক্ষা করতে কৃপা পরবশ হয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর ‘পঞ্চবর্হি’ এবং ‘সপ্তার্চ্চি’ পালনের অনুশাসন দিলেন। দলীয় প্রীতির কবলে পড়ে মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার সেই অনুশাসন বিধিকে অবজ্ঞা করার স্পর্দ্ধা যেসব তথাকথিত সৎসঙ্গীরা দেখাচ্ছেন, তাদের অধঃপতনকে প্রতিরোধ করতে হলে, তাদেরও সামিল করতে হবে উক্ত ইষ্ট-ভরণের অনুশাসন পালনে। তা যদি না করি আমরাও কিন্তু বঞ্চিত হব ‘ইষ্ট ভরণের’ পবিত্র কর্ম থেকে।
জয়গুরু, বন্দে পুরুষোত্তমম্!
tapanspr@gmail.com















