জীবন-মৃত্যুর রহস্য

** “মরোনা, মেরোনা, পার তো মৃত্যুকে অবলুপ্ত কর।” **
(শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী।)

।। জীবন-মৃত্যুর রহস্য ।।


শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২য় অধ্যায়ে সাংখ্য-যোগে আত্মা সম্বন্ধে যে জ্ঞান আমরা পাই।
ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্
নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোঽয়ং পুরাণো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ৷৷ ২০ ॥
অনুবাদঃ আত্মার কখনও জন্ম হয় না বা মৃত্যু হয় না, অথবা পুনঃ পুনঃ তাঁর উৎপত্তি বা বৃদ্ধি হয় না। তিনি জন্মরহিত, শাশ্বত, নিত্য এবং পুরাতন হলেও চিরনবীন। শরীর নষ্ট হলেও আত্মা কখনও বিনষ্ট হয় না।।

বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়
নবানি গৃহ্ণাতি নরোঽপরাণি।
তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্য
ন্যানি সংযাতি নবানি দেহী ৷৷ ২২ ৷৷

অনুবাদঃ মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, দেহীও তেমনই জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে নতুন দেহ ধারণ করেন।

নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ ।
ন চৈনং ক্লেদয়ন্ত্যাপো ন শোষয়তি মারুতঃ ।। ২৩ ৷৷

অনুবাদঃ আত্মাকে অস্ত্রের দ্বারা কাটা যায় না, আগুনে পোড়ানো যায় না, জলে ভেজানো যায় না, অথবা হাওয়াতে শুকানোও যায় না।

অচ্ছেদ্যোঽয়মদাহ্যোঽয়মক্লেদ্যোঽশোষ্য এব চ। নিত্যঃ সর্বগতঃ স্থাণুরচলোঽয়ং সনাতনঃ ৷৷ ২৪৷

অনুবাদঃ এই আত্মা অচ্ছেদ্য, অদাহ্য, অক্লেদ্য ও অশোষ্য। তিনি চিরস্থায়ী, সর্বব্যাপ্ত, অপরিবর্তনীয়, অচল ও সনাতন।

অব্যক্তোঽয়মচিন্ত্যোঽয়মবিকাৰ্যোঽয়মুচ্যতে ৷৷
তস্মাদেবং বিদিত্বৈনং নানুশোচিতুমর্হসি ৷৷ ২৫ ৷৷

অনুবাদঃ এই আত্মা অব্যক্ত, অচিন্ত্য ও অবিকারী বলে শাস্ত্রে উক্ত হয়েছে। অতএব এই সনাতন স্বরূপ অবগত হয়ে দেহের জন্য তোমার শোক করা উচিত নয়।
(স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, পুরুষোত্তম উবাচ এতো সব তত্ত্ব জানা সত্ত্বেও আমরা মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তি কামনা করি সেটা কতটা যুক্তিযুক্ত?)


What is “DEATH POINT”?
শ্রীশ্রীঠাকুর অমনি বললেন—অশ্বিনীদা, regular সাধন যে করে তার আর মৃত্যুভয় থাকে না। সে জীবন্তে ম’রে দেখে, death point এত বেশী দূর নয় যে কিছুকাল regular সাধন করলে তাহা না feel করা যায়। কিন্তু যে তাহা একবার feel করেই আবার সাধন ছেড়ে দেয় তারও কিন্তু অসুখে ভুগে মরতে হয়। আর, যে তা’ feel করেও regular সাধন করতে থাকে, তার শরীরধ্বংসকারী অসুখ হলে ইচ্ছায় মনকে শরীর থেকে তুলে নিয়ে death point সহজে pass করে; বড় একটা কষ্ট পায় না—অভ্যাস রাখতে হয়। তবে একবারও যে জীবন্তে তা’ feel করছে সেও রােগে ভুগতে-ভুগতে সেই point-এর কাছে গেলে তার সেই সংস্কার জেগে ওঠে এবং সেও তখন তাতে concentrate করে ভাল idea-তে absorbed হয়ে (যথা সদ্গুরুধ্যান ইত্যাদি) দেহত্যাগ করে; ফলে সদগতি হয়। আর, যার অভ্যাস আছে, সে তাে কতবার death point অনুভব করে ফিরে আসছে, সে অসুখে বেশী ভােগে না; সে-রকম দেখলে তাে ঐ point-এ concentrate করে সদগুরুর ধ্যানে absorbed হয়ে শরীর ছাড়লে। Death-টা হচ্ছে। কর্মসংস্কারগত একটা idea-তে বেশী absorbed হ’য়ে এই ব্যক্তিত্ববােধ হারান। এই আমি অশ্বিনী রূপে যে আমিত্ব-বােধ এর সঙ্গে সম্বন্ধরাহিত্য, এই আমিত্বের সঙ্গে যে connecting links আছে তাহা cut off হয়ে যায়। যে idea-টা তকালে predominant থাকে তাতে absorbed হয়ে যেন তাহাই আমি—এইভাবে তন্ময় হয়ে এই আমিত্বকে বিস্মৃত হওয়া। একপ্রকার লয় আর কি। সাধকেরও লয় বহুবার ঘটবার মত হয়, উচ্চ-উচ্চ ধামে (plane-এ) যখন গতি হয়, তখন তাতে absorbed হয়ে লয় হয়। যে যত তীব্র সাধক, সে লয় তত রক্ষা করে-করে উচ্চ হতে উচ্চতর লােকে যায়। আর, যেখানে গিয়ে লয় এসে যায়, সেই তার খতম।
(অমিয়বাণী পৃঃ 106)


Psychical attachment বা ভক্তি যোগের মাধ্যমে সহজ ভাবে relax mood এ বডি stiff না করে মেরুদন্ড, ঘাড়, মাথা শক্ত না করে আজ্ঞা চক্রে বা তেসরা তিলে দুই ভ্রূর মাঝখানে একটু ভিতরের দিকে কোন pressure না দিয়ে নিঃশ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক রেখে মনস্থির করে খুব rhythmic ভাবে তালে তালে বীজমন্ত্র মানসজপ ও তদ্ বিষয়ক অর্থ ও ইষ্টস্বার্থ সহ ইষ্টকে একাগ্র চিত্তে ধ্যান করাটাই হচ্ছে শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত রাজ যোগের সহজ প্রক্রিয়া। এর সাথে সদাচার খুব জরুরি। বিশেষ করে মানসিক সদাচার ও আধ্যাত্মিক সদাচার। মনে কোন হিংসা বিদ্বেষ প্রতিহিংসা, জিঘাংসা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি রাখা চলবে না। তাহলে মন চঞ্চল হবে ও ধ্যানে বিঘ্ন ঘটবে। মন একাগ্র ও স্থির হতে চাইবে না। brain cell ও nervous system এ pressure পড়বে। sub conscious layer এ অর্থাৎ মনের গভীরে প্রবেশ করার ব্যাঘাত ঘটবে। তাড়াহুড়ো করা যাবেনা। আর কি হবে, কি পাবো, এই ভাবনা রাখা যাবেনা। কে কি করছে, বা করছেন না, ওটা দেখতে গেলে চলবে না। মন বিকেন্দ্রিক হয়ে যেতে পারে। তারপর ষটচক্র ভেদ পঞ্চভূত তত্ত্ব দর্শন বিভিন্ন স্তরের বীজমন্ত্রের sound ও light ও অধিষ্ঠাত্রী দেবদেবী দর্শন, শব্দকে অনুসরণ ও অনুসন্ধান এই উচ্চ স্তরের ব্যাপারগুলি ক্রমে ক্রমে আসবে সাধকের সংস্কার ও সাধনার একাগ্রতা অনুযায়ী। তারপর “ধাম ধাম নিরখত চলে পাওয়ে নিজ ঘর বাসা।” এখন এইগুলি কখন কার হবে তা পরমপিতাই জানেন। এইগুলি ধীরে ধীরে হওয়া মানেই হচ্ছে তার মস্তিষ্ক কোষের ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষন। যাতে তার সহজ অন্তর্দৃষ্টি, দূরদৃষ্টি, ভবিষ্যৎ দৃষ্টির, সূক্ষ্মচিন্তা ও পরিণাম দর্শীতা বেড়ে গিয়ে বাস্তব ক্ষেত্রে সমাধানী বোধ কাজ করে। সূক্ষ জগৎ সম্বন্ধে একটি অনুভূতি আসে। এই রকম বৈশিষ্ট্য ও সংস্কার অনুযায়ী হয়। ঠাকুর যোগ ও তন্ত্রের যত রকম সাধন পদ্ধতি আছে তার অদ্ভুত সমন্বয় করে এই যুগে সবচেয়ে সহজ শ্রেষ্ঠ রাজ যোগের বিধান দিয়েছেন। যোগ ও তন্ত্রের সব কঠিন ও বিপদজনক পদ্ধতি কে বাদ দিয়ে। এটা যার যার নিজের অভ্যাসের ব্যাপার। কাউকে দেখানোর কিছু নেই। যার আয়ত্ত হবে তার নিজেরই লাভ সাথে তার দ্বারা অপরের ও প্রেরণা সন্দীপ্ত লাভ। সবারই ইষ্টানুগ সিদ্ধি লাভ হোক, তাঁর রাতুল চরনে এই প্রার্থনা জানাই।


নামধ্যান ও সাধনকালে স্মরণীয়।।
শ্রীশ্রীঠাকুর প্রসঙ্গতঃ বললেন– নামধ্যানে nerve-system ( স্নায়ুতন্ত্র) strengt-hened ( শক্তিশালী) ও abler (সমর্থতর) হয়। হঠাৎ মাত্রা খুব চড়িয়ে দিতে নেই। Gradually (ক্রমশ) বাড়াতে হয়।স্নায়ুবিধান শান্ত থাকে এমনতর খাদ্য খেতে হয়, যেমন butter (মাখন), milk (দুধ), honey (মধু), plantain (কলা)। Association-ও (সঙ্গও) তপস্যার অনুকূল হওয়া চাই। নামধ্যানে nervous system (স্নায়ুতন্ত্র) অত্যন্ত sensitive ও recepetive (সাড়াপ্রবণ ও গ্রহণমুখর) হয়, Just like a powerful Camera (ঠিক একটি শক্তিশালী ক্যামেরার মত) যা’ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জিনিষ ধ’রে নিতে পারে। আ. প্র. ১৫/ ১৭.২.১৯৪৯ ;


"Contraction, Stagnation, Expansion. এমনি ক'রে এক-একটা মণ্ডল তৈরী হ’চ্ছে। সোঽহংপুরুষ পর্য্যন্ত চৈতন্যের সৃষ্টি।

Integration of ‘I’. Universal consciousness of ‘I’.
জগতের যাবতীয় জিনিস তাই অমন ক’রে পরিবর্তন হচ্ছে। একটা আণবিক প্রসারণ—এর চরমেই সঙ্কোচন, তাই মৃত্যু ক্ষতি নয়। তাই জগতের প্রত্যেক-প্রত্যেক জাতির আয়ু-সংখ্যা ঐরূপে নির্দ্ধারিত হয়। চেতন আমির ধারা, তাই সবের ভিতর চেতনা। অখণ্ডের চেতনা প্রত্যেক শরীরের ভিতর। সব কুড়িয়ে আন্ দিকিনি একবার।
(ভাববাণী, ৬৩তম দিবস, ২৯শে কার্ত্তিক, ১৩২৪)


** জড় ও চৈতন্য matter আর spirit প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতবাদ এবং তার সমর্থনে বিজ্ঞান। **


প্রশ্ন৷ তবে matter আর spirit—জড় আর চৈতন্য কি আলাদা নয় ?

শ্রীশ্রীঠাকুর । আমি বুঝি স্থূলের behind-এ যে কারণ আছে, যার effect স্থূল—তাই তার Spirit.*

*(“I make no difference between matter and spirit. They are differens degrees of fineness of the same thing. The one is becoming, the other through ascent and descent.”

‘My Philosophy of Industry’, P. 17-Henry Ford

“To see the universe from the physical or from the spiritual point of view is not considering something different, it is looking at the world by the two opposite ends.”

‘Pythagoras & The Delphic Mysteries’—Ednard Schare)

প্রশ্ন। যেমন বরফের পেছনে জল ?

শ্রীশ্রীঠাকুর। এই৷

প্রশ্ন। এগুলি তো স্থূলচক্ষে দেখা যায়— আমি এগুলির কথা বলিতেছি না। ইহার পশ্চাতে যাহা আছে—যেমন মানুষ মরিয়া কোথায় গেল—সেখানে সে করে কী, খায় কী ?—এসব সম্বন্ধে আপনার কোন অভিজ্ঞতা আছে কি?

শ্রীশ্রীঠাকুর। মরার আগে মানুষ কী ছিল তাহা জানিতে হইবে। মানুষটা আসিল কেমন করিয়া— মানুষ কতকগুলি idea-র সমষ্টি—সেই idea বাহিরের কতকগুলি জিনিসে attached হইয়া

পড়ে ৷

প্রশ্ন। কেমন?

শ্রীশ্রীঠাকুর ৷ ‘জায়া’ মানে পুরুষ যাহাতে জন্মে।*

(*”পতিঃ ভাৰ্য্যাং সম্প্রবিশ্য গর্ভো ভূত্বেহ জায়তে । জায়ায়াস্তদ্ধি জায়াত্বং যদস্যাং জায়তে পুনঃ ।।”
(মনু সংহিতা ৯।৯)

পুরুষ জন্মে কি করিয়া ? – যদি সে আবার জন্মিল, তবে বাঁচিয়া থাকিল কি করিয়া ?— তাহার মানেই হইতেছে পুরুষ যে-ভাবে অনুপ্রাণিত থাকে—জায়াতে যাইয়া তাহা মূর্ত্ত এবং প্রাণযুক্ত হয়। তারপর প্রসূত হইলে যে-ভাবে প্রাণ পাইয়া জন্মিল অর্থাৎ সন্তান—ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরই তাহার পারিপার্শ্বিক— বিশেষতঃ মা—তাহাকে নানাপ্রকারে সংঘাত করিতে লাগিল। ‘সংঘাত’ মানে impulse-এর প্রেরণা। তাহার ফলে মস্তিষ্কে ক্রমে-ক্রমে sen sation-এর ভিতর-দিয়া সেই impulse-গুলি recorded হইতে থাকিল। এমনি করিয়া ক্রমান্বয়ে শিশু শরীরে এবং ভাবে পুষ্ট হইতে লাগিল। তাহা হইলে যে-ভাবগুলি পিতা হইতে প্রাণ পাইয়া মায়ের ভিতর মূর্ত্ত হইয়া জন্মিল, পারিপার্শ্বিকের ভিতর হইতে নানা রকমের সংঘাতের ভিতর-দিয়া শিশু সেইগুলি সার্থক করিতে চলিল। এক-রকম ধরিতে গেলে তাহা সার্থক করাই যেন মানুষের life-এর mission—জীবনের ব্রত।**

(**”The mysterious fusion operates slowly but with perfect wisdom— organ by organ, fibre by fibre. Finally, a terrible pang compresses it in a voice; a bloody convulsion tears it from the mother soul and fastens it down into a throbbing palpitating body. The child is born, a pitiful image of earth, and he cries aloud with fright. The memory of the celestial regions has returned to the occult depths of the Unconscious; it will only be revived either by knowledge or by pain, by love or by death. Accordingly, the law of incarnation and disincarnation unfolds to us the real meaning of life and death.” —‘Pythagoras and the Delphic Mysteries’

“Terrestrial birth is death from the spiritual point of view and death is a celestial resurrection. The alternation of both lives is necessary for the development of the soul, and each of them is at once the consequence and the explanation of the other. Whosoever is imbued with these truths is at the very heart of the mysteries, at the centre of initiation.”

“I felt that order and progress were present in the mystery of life. I know that we continue to accumulate experience and continue to grow. (Aldeath). We are not all scrapped. The real thing, character, is not scrapped —the Queen Bee in the complicated hive which constitutes the individual. You may call it the master cell or you may call it the soul. The body by its instincts, the soul by its intuition, remember and utilise the experience of previous lives. But this is not essential; it is the essence, the gist, the results of experience that are valuable and remain with us.”
—Henry Ford)
(নানা-প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড থেকে সংকলিত।)

প্রশ্ন। ‘মুক্তি’ মানে কী?
শ্রীশ্রীঠাকুর। ‘মুক্তি’ মানে annihilation নয়কো,— বৃত্তি-ভেদ। আর, যাঁর বা যাঁদের যতটুকু এই বৃত্তিভেদ হইয়াছে, তিনি তিনি বা তাঁরই ততটুকু fit for every serviceable position to the environment হবেন। আর, এই ভেদ হইয়াছে— এমনতর বৃত্তির সংস্পর্শে পারিপার্শ্বিক যতই attached হয়, ততই পারিপার্শ্বিকের বৃত্তিগুলি adjusted হয়, আত্মপ্রসাদ লাভ করে— তাই, তাঁদের কাছে surrender মানুষকে মহীয়ান্, গরীয়ান্, জ্ঞানবান্ ও প্রেমিক করিয়া তোলে! তাই, মুক্তির তাৎপর্য্যই এইখানে— অর্থাৎ environment আমাদিগকে তার মত ক’রে বিশ্লিষ্ট ও বিভক্ত করিতে পারে না। প্রত্যেকের হইয়াও তাঁর বৈশিষ্ট্য অটুট থাকে; তাই সুতোর চারিদিকে যেমন মিছরির crystal-গুলি দানা বাঁধে, environment-ও তাদের চারিদিকে অমনতর একটা দানা বাঁধিয়া থাকে— as if সব নিয়ে যেন একটা person. তাই, তাঁতে মানুষের কাছে ভগবত্তার উদ্বোধন হয়—তাঁকে ভগবান্ বলে। এই জন্যই বোধহয় বৈষ্ণবেরা বলেন—ভগবান্ই একমাত্র পুরুষ, তা’-ছাড়া আর-সব প্রকৃতি।

(নানা-প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড থেকে সংকলিত।)

tapanspr@gmail.com

বর্ষ বিদায় বর্ষ বরণ

।। খ্রীস্টাব্দ ২০২৫কে বিদায় ও ২০২৬কে বরণ, তথা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত সৎসঙ্গের ঋদ্ধি-তপনার ঋত্বিক সম্মেলন বনাম যুগধর্মের উৎসব স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।


বর্তমানে প্রচলিত সময় পরিমাপক একক সেকেণ্ড, মিনিট, ঘণ্টা ইত্যাদির পূর্বে, পুরাকালে, পল, দণ্ড, কলা, মুহূর্ত, প্রহর প্রভৃতি কালনির্ণয় সূচক দিয়ে পৃথিবীর আহ্নিক গতিকে ১ অহোরাত্র ধরা হতো। ৩০ অহোরাত্রে ২ পক্ষ বা ১ মাস। ৬ মাসে ১ অয়ন। ২ অয়নে ১ বর্ষ। অপরপক্ষে উত্তরায়নে দেবতাদের ১ দিন, দক্ষিণায়নে ১ রাত। দেবতাদের ১ বছর সমান মানুষের ৩৬০ বছর ধরা হয়। বায়ুপুরাণে সৌর, সৌম্য, নাক্ষত্র এবং সাবন নামে চার প্রকার সময় নিরূপণ মাসের উল্লেখ আছে। ৩০ সূর্যোদয়ে সাবনমাস। সূর্যের রাশি পরিবর্তনে হয় সৌরমাস। কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ থেকে শুক্লপক্ষের পূর্ণিমা পর্যন্ত চান্দ্রমাস। চন্দ্রের নক্ষত্র ভোগকালকে বলা হয় নাক্ষত্রমাস। ৫ সৌরবর্ষে ১ নৈসর্গিক যুগ। (কোনো একটিমাসের আবর্তন কালকে একক ধরে নৈসর্গিক যুগের গণনা শুরু করা যেতে পারে।) ১ হাজার নৈসর্গিক যুগে ১ কল্প। সপ্তর্ষিরা ১০০ বছর করে এক একটি নক্ষত্রে কেন্দ্রীভূত থাকে। ২৭টি নক্ষত্র ভোগকাল ২৭০০ বছর—একটি সপ্তর্ষিযুগ। এই সপ্তর্ষিযুগের গণনা প্রাচীন ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল। ভারতের অন্যতম জ্যোতির্বিদ আর্য্যভট্ট নক্ষত্রাদির সাথে মেষরাশির অবস্থানকে কেন্দ্র করে কল্যব্দের সূচনা করেন ৩১০১ খৃঃ পূঃকে একক ধরে। সেই হিসেব এবং রাশির অবস্থান ধরে উত্তরায়নে ভীষ্মের দেহত্যাগ এর হিসেব কষে ২১৪২ খৃঃ পূঃ কে শ্রীকৃষ্ণের জন্মবর্ষ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
আমরা যে খৃষ্টাব্দ বলি এটা হচ্ছে গ্রেগরীয়ান ক্যালেণ্ডার। এটা একটি সৌর সন। নানা পরিবর্তন, পরিমার্জন, পরিবর্ধন, বিবর্তন এবং যোগ-বিয়োজনের মধ্য দিয়ে এ বর্তমান কাঠামো লাভ করেছে। উল্লেখ্য সৌর সনের সাথে ঋতুর সঙ্গে সম্পর্ক থাকে। বর্ষপঞ্জিকা প্রচলন অল্প পরিসরে প্রাচীন সুমের সভ্যতায় পরিলক্ষিত হয়। তবে মিশরীয় সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীনতম সৌর ক্যালেণ্ডার উদ্বোধন করে বলে জানা যায়। প্রাচীন মিশরীয় ক্যালেণ্ডার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, খৃস্টপূর্ব ৪২৩৬ অব্দ থেকে ক্যালেণ্ডার ব্যবহার গ্রহণ করে। রোমানরা তাদের প্রথম ক্যালেণ্ডার লাভ করে গ্রীকদের কাছ থেকে। রোমানদের প্রাচীন ক্যালেণ্ডারে মাস ছিল ১০টি এবং তারা বর্ষ গণনা করতো ৩০৪দিনে। মধ্য শীত মৌসুমের ৬০ দিন তারা বর্ষগণনায় আনতো না। রোমানদের বর্ষ গণনার প্রথম মাস ছিল মার্চ। তখন ১লা মার্চ পালিত হতো নববর্ষ উৎসব। শীত মৌসুমে ৬০ দিন বর্ষ গণনায়না আনার কারণে বর্ষ গণনায় যে দুটি মাসের ঘাটতি থাকতো তা পূরণ করবার জন্য তাদের অনির্দিষ্ট দিন-মাসের দ্বারস্থ হতে হতো। এই সব নানা জটিলতার কারণে জনসাধারণের মধ্যে তখন ক্যালেণ্ডার ব্যবহার করার প্রবণতা একেবারেই ছিল না। রোমের উপাখ্যান খ্যাত প্রথম সম্রাট রমুলাসই আনুমানিক ৭৩৮ খৃস্টপূর্বাব্দে রোমান ক্যালেন্ডার চালু করার চেষ্টা করেন। পরবর্তীকালে রোমান সম্রাট নূমা ১০ মাসের সঙ্গে আরো দুটো মাস যুক্ত করেন। সে দুটো মাস হচ্ছে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি। তিনি জানুয়ারিকে প্রথম মাস ও ফেব্রুয়ারিকে শেষ মাস হিসাবে যুক্ত করেন। জানুয়ারি মাস ধার্য করা হয় ২৯ দিনে এবং ফেব্রুয়ারি মাস ধার্য করা হয় ২৮ দিন। এ ছাড়াও তিনি মারসিডানাস নামে অতিরিক্ত একটি মাসেরও প্রবর্তন করেন। এই মারসিডানাস মাস গণনা করা হতো ২২ দিনে। এই অতিরিক্ত মাসটি গণনা করা হতো এক বছর অন্তর ফেব্রুয়ারি মাসের ২৩ ও ২৪ তারিখের মাঝখানে। খৃস্টপূর্ব ৪৩২ অব্দে সম্রাট নূমা কর্তৃক প্রবর্তিত মাসের হিসেব পরিমার্জন ও পরিবর্তন করা হয়। পরবর্তীকালে রোমানরা চার বছর অন্তর লীপ ইয়ারের হিসেব প্রবর্তন করে। এ হিসেবেও এক বছরের সঙ্গে অন্য বছরের দিন সংখ্যার হেরফের হতে থাকে। চার বছর অন্তর অতিরিক্ত একটি দিন যোগ করলে দেখা যেতো দিনের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সীজার মিশরীয় ক্যালেন্ডার রোমে চালু করেন। তিনি জ্যোতির্বিদদের পরামর্শে খৃস্টপূর্ব ৪৬ অব্দে সেই বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের মাঝখানে ৬৭ দিন এবং ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে ২৩ দিন এই মোট ৯০ দিন যুক্ত করে ক্যালেণ্ডার সংস্কার করেন। এই ক্যালেন্ডার জুলিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত হয়। এই ক্যালেন্ডারে মার্চ, মে, কুইন্টিলিস (জুলাই) ও অক্টোবর দিন সংখ্যা ৩১ দিন, অপরদিকে জানুয়ারি ও সেক্সটিনিস (আগস্ট) মাসের সঙ্গে দুইদিন যুক্ত করে ৩১ দিন করা হয়। ফেব্রুয়ারি মাস ২৮ দিনেই গণনা হতে থাকে। তবে প্রতি চার বছর অন্তর একদিন যুক্ত করা হয়। জুলিয়াস সীজারের নামানুসারে প্রাচীন কুইন্টিলিস মাসের নাম বদলিয়ে রাখা হয় জুলাই। ৪৪ খৃস্ট পূর্বাব্দের ১৫ মার্চ জুলিয়াস সীজার রোমনগরে নিহত হন। অন্যদিকে সম্রাট অগাস্টাসের নামানুসারে সেক্সটিনিস মাসের নাম পাল্টিয়ে অগাস্ট করা হয়। মিশরীয়রা সৌর বর্ষ গণনা করতো ৩৬৫ দিনে। কিন্তু জুলিয়াস সীজারের সংস্কারের ফলে তা তিনশ’ সাড়ে পঁয়ষট্টি দিনে এসে দাঁড়ায়। তখন থেকে বর্ষপঞ্জিতে ১ মার্চের পরিবর্তে ১ জানুয়ারীতে নববর্ষ প্রচলন হয়। খৃষ্টাব্দের সংখ্যাকে ৪ দিয়ে ভাগ করলে যদি মিলে যায়, তবে সে বছর ফ্রেব্রুয়ারী মাস ২৮ দিনের পরিবর্তে ২৯ দিন হবে। । যীশুখৃস্টের জন্ম বছর থেকে গণনা করে ডাইওনীসিয়াম এক্সিগুয়াস নামক একখৃস্টান পাদরী ৫৩২ অব্দ থেকে খৃস্টাব্দের সূচনা করেন। ১৫৮২ খৃস্টাব্দে রোমের পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরী জ্যোতির্বিদগণের পরামর্শে জুলিয়ান ক্যালেণ্ডার সংশোধন করেন। তার নির্দেশে ১৫৮২ খৃস্টাব্দের অক্টোবর ১০ দিন বাদ দেয়া হয়, ফলে ঐ বছরের ৫ তারিখকে ১৫ তারিখ করা হয়। পোপ গ্রেগরী ঘোষণা করেন যে, যেসব শত বর্ষীয় অব্দ ৪০০ দ্বারা বিভক্ত হবে সেসব শতবর্ষ লিপ ইয়ার হিসাবে গণ্য হবে। পোপ গ্রেগরীর বর্ষপঞ্জি সংস্কারের পর থেকে রোমান বর্ষপঞ্জি পন্ডিতদের কাছে গ্রেগরীয়ান বর্ষপঞ্জি হিসাবে খ্যাত হয়েছে। কিন্তু এ সংস্কার মানুষ সহজে মেনে নেয়নি। ইউরোপের দেশে দেশে এনিয়ে চলছিল দীর্ঘদিনের বাদ-প্রতিবাদ। তদুপরি খৃষ্টানদের রোমের ‘ক্যাথলিক’ বনাম ‘প্রোটেসটেন্ট’ বিরোধের কারণে গ্রেগরীয়ান সংস্কার গ্রহণে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছিল। অবশেষে ১৭৫২ সালে ইংল্যান্ডে ১৯১২ সালে চীনে ও আলবেনিয়াতে, ১৯১৮ সালে রাশিয়াতে ও ১৯২৭ সালে তুরস্কে সরকারীভাবে গ্রেগরীয়ান বর্ষপঞ্জি গৃহীত হয়। যীশুখৃষ্টের নামের সঙ্গে রোমানদের ধারাবাহিক বর্ষ গণনা বা খৃষ্টাব্দ অপেক্ষাকৃত পরবর্তীকালের সংযোজন। যীশুখৃষ্টের দেহত্যাগের ৭৫০ বছর পরে রোমের খৃষ্টান পাদ্রীগণ ধারাবাহিক বর্ষ হিসাবে যীশুর স্মরণে পশ্চাদ গণনার মাধ্যমে খৃষ্টাব্দ চালু করেন। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী যীশুর জন্ম বর্ষকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ‘খৃষ্টাব্দ’ চালু হয়েছে। সে হিসাবে বলা চলে যীশুখৃষ্টের জন্ম হয়েছিল ২০০৭ বছর আগে। আসলে কিন্তু তা নয়। যীশুর জন্ম বর্ষ পাবার জন্য প্রচলিত খৃষ্টাব্দের সঙ্গে আরও ৪ বছর যোগ করতে হবে। সম্ভবত তাঁর মৃত্যুবরণের ৭৫০ বছর পরে ‘খৃষ্টাব্দ’ চালু করার সময় রোমান পাদ্রীগণ প্রকৃত তথ্য খুঁজে পেতে ভুল করেছিলেন। তাছাড়া এ মহাপুরুষের প্রকৃত জন্মদিন বা তারিখ সম্পর্কেও বিভ্রান্তি রয়েছে। আজকাল সারা বিশ্বব্যাপী ২৫ ডিসেম্বর যীশুর জন্মদিন বা বড়দিন পালিত হয়। এক সময়ে খৃষ্টান পাদ্রীগণ জানুয়ারী মাসে যীশুর জন্মদিন পালন করতেন, তারও আগে ২০ মে তারিখ জন্মদিন উদ্যাপিত হত। ১ জানুয়ারী রোমান বর্ষপঞ্জির নববর্ষ; এদিনে খৃষ্টীয় সনের খৃষ্টাব্দের নববর্ষ শুরু হয়। কমবেশী সারাবিশ্বে দিবসটির একটি আবেদন রয়েছে। আমরা ১ জানুয়ারী থেকে নতুন ক্যালেণ্ডার ব্যবহার করি। এই গ্রেগরীয়ান নূতন বছর বা খৃষ্টীয় সনকে ইংরেজি বর্ষপঞ্জি তথা ইংরেজি সন বলার প্রবণতা দেখা যায়। অনেকেই ১ জানুয়ারিকে ইংরেজি নববর্ষ হিসাবে চিহ্নিত করেন। অথচ ইংরেজি বর্ষপঞ্জি বা ইংরেজি সন বলতে প্রকৃত প্রস্তাবে কিছুই নেই। (সূত্র : সংগৃহীত)


গণনার হিসেবের তারতম্য হলেও, দিনরাত-মাস-বছর হয়েই চলেছে আদিকাল থেকে প্রাকৃতিক নিয়মে। দিন-মাস-বছর আসে যায়, রেখে যায় কিছু স্মৃতি মনের মণিকোঠায়। ওইসব স্মৃতির মালাগুলোকে স্মৃতিবাহীচেতনার ভল্টে অনন্তকাল জমা করে রাখার জন্য আর্য্য-ঋষিরা প্রতিটি মুহূর্তের জীবন ধারণের আহরণকে শুদ্ধি করার মাধ্যমে ধ্রুবাস্মৃতির সন্ধান দিয়ে গেছেন। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র স্বস্ত্যয়ণী ব্রতের “নিয়তং স্মৃতিচিদযুতে” মন্ত্রে যাকে সমৃদ্ধ করেছেন। কেননা, যে মুহূর্ত চলে যাবে তা আর ফিরে আসবে না। চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা সমৃদ্ধ সবুজ গ্রহ পৃথিবীর প্রতিটি মুহূর্তকেই যাতে চিরনবীনতায় আস্বাদন করতে পারি, উপভোগ করতে পারি সেজন্যই আর্য্য সভ্যতার ঊষা লগনে পরমপিতার প্রতিভূ আর্য্য ঋষিগণ ‘‘মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ……..’’ মন্ত্রে বন্দনা করে বসুন্ধরার মধুময় পরিবেশকে রক্ষা অর্থাৎ পূজা করতে শিখিয়েছিলেন। পূজা শব্দের অর্থ সম্বর্দ্ধনা। যেমন যেমন আচরণে পরিবেশের অজৈব উপাদানসমূহকে রক্ষা করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া যায় তাই ছিল আর্য্য ভারতের পূজা, যজ্ঞ, হোম বা উৎসবের তাৎপর্য্য ।
আমরা যে ৩৩ কোটি দেবতার কথা শুনেছি সে সংখ্যাটা বাস্তবে ৩৩,০০০০০০০ নয়, শুধুই ৩৩। কোটি অর্থে piece বোঝান হয়েছে, যথা, জীবকোটি, ঈশ্বরকোটি শব্দ একক অর্থে ব্যবহৃত হয়।
এই সবুজ গ্রহের জীবকূলের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জৈবাজৈব রসদের যোগানদাতার মূল মালিক সূর্য। সূর্যের আর এক নাম আদিত্য। আদিত্য মানে দেবতা, দেদীপ্যমান যা’ তাকে দেবতা বলে। পৃথিবী, অন্তরীক্ষ ও দ্যুলোকের প্রতিটি স্থানে ১১টি করে বেঁচে থাকার আবশ্যিক উপাদান সরবরাহকারী দেদীপ্যমান উৎস রয়েছে। প্রাকৃতিক ওই ৩৩টি বা ৩৩কোটি উৎসকে রক্ষা করার প্রশ্নে আমরা প্রবৃত্তি পরবশ হয়ে যাতে দুর্বৃত্ত না হই তারজন্য উপনিষদের ঋষিরা স্মরণ করিয়ে দিলেন ‘আত্মানং বিদ্ধি’-র কথা। —পরমপিতার সন্তান তুমি, নিজেকে জানো, নিজের প্রতিরূপ মনে করে পরিবেশকে বাঁচাও, নিজে বাঁচ। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’—জীবনবিধ্বংসী আচরণ ত্যাগ করে জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলো। ‘মা গৃধ’—লোভ করো না। সদাচার এবং বর্ণাশ্রম মেনে চলো। পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে নিজে সমৃদ্ধ হও। এই ছিল ভারতবর্ষের বিধি-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠনের, ধর্মের, পূজার বা উৎকৃষ্ট প্রসবকারী আচরণ বা উৎসব উদযাপনের নিত্যবাস্তব রূপ। যার উপর প্রতিষ্ঠিত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৎসঙ্গ আন্দোলন। আমাদের নিত্য সাধনার আর্য্য-সন্ধ্যা বন্দনায় যা’ অনুশীলন করতে শিখিয়েছেন যুগ-বিধায়ক পরমবিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। অথচ আমাদের সৎসঙ্গের লোগো-বাহকেরা সেগুলোকে বাদ দিলন। “সত্যমেব জয়তের” ধারকেরা, ওই মহান মন্ত্রের ধ্বজাধারীরা সেইসব পবিত্র কর্তব্য ভুলে, বিজ্ঞানীদের সচেতন-বার্তাকে অগ্রাহ্য করে উৎসব পালনের নামে লোভাদি প্রবৃত্তি-পরায়ণতার উচ্ছৃঙ্খলতাকে উস্কে দিয়ে প্রাকৃতিক এবং আত্মিক পরিবেশকে যে হারে দূষিত করে চলেছি তা কতখানি উৎকৃষ্ট প্রসব করে উৎসব শব্দটিকে সমৃদ্ধ করবে সে হিসেব কষবে কবে সত্যমেব জয়তের আধিকারিকেরা?
যাইহোক, থেমে থাকলো তো আর চলবে না, চরৈবেতি-র নিদেশ মেনে এগিয়ে যেতেই হবে ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যে।
খ্রীষ্টাব্দের ২০২৫তম বর্ষের জাবেদা খাতায় লিপিবদ্ধ হওয়া মানবসভ্যতা-বিরোধী, অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, রেপ, হত্যা, ধর্ম প্রতিষ্ঠার অজুহাতে হত্যা—ইত্যাদি ইত্যাদি অমানবিক স্মৃতির সাথে জুড়ে গেল আর এক অকল্পনীয় বিভীষিকাময় স্মৃতি—বাংলাদেশে নির্মম হিন্দু হত্যা-কাণ্ড! বছরের শেষ প্রান্তে এসে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের ঘৃণ্য রাজনীতি, ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে, কোরান-বিরোধী, নবীর আদর্শ-বিরোধী অধার্মিক-বিধিতে, যেভাবে ওই দেশের ভূমিপুত্র হিন্দুদের প্রতি অত্যাচার চালাচ্ছে,—তা যেন কিছুতেই ক্যালেণ্ডারের পুরানো পাতার মত ছিঁড়ে ফেলা গেল না।—মন থেকে মুছে ফেলা যাবে না পশ্চিম বাংলা জুড়ে মানবতা-বিধ্বংসী সত্তাহিংসদের বাড়বাড়ন্ত—বিস্তার!
তথাপি, আশা-হতাশা, চাওয়া-পাওয়া, সুখ-দুঃখ, মিলন-বিচ্ছেদ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, প্রেম-হিংসার জাবেদা খাতার সঞ্চয় জমা রেখে সম্মুখের দিকে এগিয়ে চলার মাহেন্দ্রক্ষণ সমাগত। সমাগত পরমপুরুষ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রবর্তিত ঋত্বিক অধিবেশন মাধ্যমে আমরা প্রস্তুত ২০২৬তম বর্ষ-এর নতুন সূর্যকে স্বাগত জানাতে।
প্রাণের প্রাণ-স্পন্দন টিঁকিয়ে রাখার উৎস, আমাদের এই সবুজ গ্রহের
অভিভাবক, সকল শক্তির উৎস জ্যোতির্ময় সূর্যের তেজোময় দীপ্তিকে পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কৃত স্তব—
“হে সূর্য্য !
হে আমাদের
জীবন ও বৃদ্ধির উদগাতা !
আবশ্যকীয় যজ্ঞ !
হে মহান্
আচরণপ্রতিষ্ঠ
শ্রেষ্ঠ যজ্ঞকর্ত্তৃগণ !
আমাদের অনভিধ্যাত
অসাঙ্গযজ্ঞকৃত
অভিনিঃসৃত পাপ হইতে
রক্ষা করুন !
আমরা আমাদের
প্রবৃত্তিস্বার্থ-সম্পাদন-প্রলুব্ধ হইয়া
অহোরাত্রিতে
আদর্শবিমুখ-ইন্দ্রিয়-বশবর্ত্তিতায়
মন,
বাক্য,
হস্ত, পদ,
উদর ও শিশ্নদ্বারা
যে সমস্ত
জীবন-ক্ষয়কারী
দুরিতকর্ম্ম করিয়াছি,
আলোক
তাহা
অবলুপ্ত করিয়া দিউক,—
এই আমি—
আমাকে
পরম-অমৃত-যোনিসম্ভূত
ধ্বান্তারি
সূর্য্য-জ্যোতিতে আহুতি দিলাম !”-এর বন্দনা-মন্ত্রে নিত্যদিন নন্দিত হয়ে
আমরা যেন
সকল প্রকার কলুষতা ত্যাগ করে দীপ্তিমান চরিত্রের অধিকারী হতে পারি।
আমাদের মনুষ্যত্ব যেন দূষিত না হয়। আকাঙ্খার মোহে পড়ে আমরা যেন আমাদের
পঞ্চ-মহাভূত সম্ভূত পরিবেশকে দূষিত না করি। ভিনগ্রহের প্রাণীরা যেন
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ-প্রাণীদের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলতে না পারে, যে
আমরা অসভ্য, ভোগবাদের জোয়ারে ভাসতে গিয়ে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার, বাঁচিয়ে
রাখার অনুকূল পরিবেশকে বিনষ্ট করছি। তাহলে সেটা বড় লজ্জার ব্যাপার হবে।
হে অন্তর্যামী পরমপিতা! তুমি আমাদের শুভবুদ্ধি দাও, আমরা যেন “পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চি”-র আদর্শে মানব সভ্যতাকে জীবন-বাদের পথ প্রদর্শন করতে পারি।
সমাগত
২০২৬-এর নতুন সূর্যের কিরণে স্নাত হয়ে
নতুন প্রাণ, নতুন সুর, নতুন গান,
নতুন ঊষা,
নতুন আলোর নবীনতায় নতুন বছরকে সম্বর্দ্ধিত করতে পারি।
কেটে যাক
আমাদের সব বিষাদ, সব আতঙ্ক—
পরমপিতার আশীষধারায় এসে যাক হর্ষ, শুভ হোক ২০২৬-এর খ্রীষ্টিয় নববর্ষ।
আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক ও আধিভৌতিকাদি ত্রিতাপ জ্বালায় সদাচারের ইষ্টবারি সিঞ্চন করে ‘একদিন-প্রতিদিনের’ চিরনবীন সূর্যালোকের নবীন ছটায় পরমপিতার অনুশাসনের
আশীষধারায় অজর, অমর, চিরচেতনতার সাধনাকে আপ্ত করে আমরা যেন
ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যের চরৈবেতিতে নিরবচ্ছিন্ন থাকতে
পারি।—
বর্ষবিদায়-বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে সীমায়িত না থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্রের দিব্য-নিদেশের দিনচর্যার—
‘‘ঊষার রাগে উঠবি জেগে শৌচে শীতল হবি,
সন্ধ্যা-আহ্নিক জপ সাধনায় ঈশের আশিস লবি,
কুতুহলে পড়শি ঘুরে দেখবি সযতনে,
আছে কেমন কোথায় কে জন মন দিবি রক্ষণে,
তারপরেতে বাড়ী এসে শৌচে যথাযথ
গৃহস্হালীর উন্নয়নী অর্জ্জনে হ’ রত,
স্নানটি সেরে আহ্নিক করে ক্ষুধামতন খাবি,
একটু চলে বিশ্রাম নিয়ে আগুয়ানে ধাবি,
এমনি তালে সচল চালে চলে সন্ধ্যা এলে,
শৌচে শুদ্ধ হয়ে করিস আহ্নিক হৃদয় ঢেলে,
উন্নয়নের আমন্ত্রনী গল্প-গুজব শীলে,
হৃষ্টমনে আলোচনায় কাটাস সবাই মিলে,
পড়শী দিগের অভাব-নালিশ থাকেই যদি কিছু
তার সমাধান যেমন পারিস করিস লেগে পিছু,
করন-চলন ধরন-ধারন যজন যাজন কিবা
সকল কাজেই ইষ্টস্বার্থে চলিস রাত্রি-দিবা,
আদর-সোহাগ উদ্দীপনী কথায় কাজে ঝুঁকে,
স্বার্থ-কেন্দ্র সবার হবি ধরবি ইষ্টমুখে,
বিশ্রামেরই সময় গা-টি ঘুমল হয়ে এলে,
ইষ্ট-চলন মনন নিয়ে ঘুমে গা দিস ঢেলে।’’
(অনুশ্রুতি গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)-র আলোকে
বছরের প্রতিটি দিন হয়ে উঠুক অমৃত-তপনার উৎসব—খ্রীষ্টিয় নববর্ষ ২০২৬-কে
স্বাগত-স্মরণের প্রাক্কালে এই প্রার্থনা জানাই পরমপিতার রাতুল চরণে।

বিদায়-বরণ

।। প্রসঙ্গ : বর্ষবিদায়-বর্ষবরণ।।


“অসতো মা সদ্গময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়।” (আমরা যেন অসতের মধ্যে থেকেও যেন সৎ থাকতে পারি। অন্ধকারের মধ্যে থেকেও যেন জ্যোতি দর্শন করতে পারি। মৃত্যুর মধ্যে থেকেও যেন অমৃত আহরণ করতে পারি।) এই হচ্ছে আমাদের ভারতীয় কৃষ্টির আদর্শ। সেই আদর্শের কথা স্মরণ করে আমরা বিদায় দিতে চলেছি খৃস্টীয় 2025তম বছরকে। আমাদের করা অনিষ্ট ও ইষ্ট কর্মের জাবেদা খাতার খতিয়ান গুপ্ত চিত্রের ফোল্ডারে জমা রেখে আমরা বরণ করতে চলেছি খৃস্টীয় 2026তম বছ‍রকে। ওদিকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে জঙ্গি-সংগঠনগুলো যেভাবে ইসলাম-বিরোধী, ধর্ম-বিরোধী, মানবতা-বিরোধী উন্মাদনায় উপ-মহাদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে চলেছে, তার প্রতিরোধ করতে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। বর্ষবিদায়-বর্ষবরণের উৎসবের নামে লাগামহীন বেলেল্লাপনায় লাগাম দিতে প্রশাসনকে তৎপর থাকতে হবে। বর্ষবরণের নামে নাচাগানা, স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর অভক্ষ্য ভোজনের খানাপিনা, অপসংস্কৃতির হৈহুল্লোরের বেলেল্লাপনায় যদি রাশ টেনে ধরা না যায়,—তাহলে বুঝতে হবে, আমাদের দেশে প্রকৃষ্ট রূপে শাসিত সংস্কৃতিপরায়ণ প্রশাসক নেই। যারা আমাদের সবদিক থেকে দূষণমুক্ত নতুন বছর শুধু নয়, উপহার দেবেন এক বিশুদ্ধ প্রশাসন! তবে আমরা আশাবাদী, প্রশাসনের শাসনের ভয়ে সন্ত্রাসীরা সংযত হবে, অপসংস্কৃতি দূর হবে, বিজ্ঞানীদের নির্দেশ মেনে পরিবেশ দূষণ বন্ধ হবে। তবে ভয় হচ্ছে, আমাদের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা বন্ধুরূপী শত্রু কাম, ক্রোধ, লোভ, ঈর্ষা, দ্বেষ, হিংসা-দের নিয়ে। ওদের হাতছানির মোহমুক্ত হয়ে অসৎনিরোধী তৎপরতায় সবাইকে নিয়ে জীবনবর্দ্ধনের পথে এগিয়ে চলতে পারলেই প্রতিষ্ঠা পাবে শান্তি, সুখ, সমৃদ্ধি। পরমপিতার ঈপ্সিত পরমরাষ্ট্রিক সমবায়ের লক্ষ্যে। তবেই সার্থক হবে বর্ষবরণের উৎসব।
আচ্ছা, বাঙ্গালী হয়ে বাংলা বর্ষবরণের ক্ষেত্রে আমাদের উৎসাহ কেন ম্লান হয়ে যায়?—একটা প্রশ্ন!
যাইহোক, পরিশেষে, খ্রীষ্টিয় 2025তম বর্ষকে বিদায় এবং 2026তম বর্ষকে বরণের উৎসবকে স্বাগত জানিয়ে ইতি টানলাম।
জয়গুরু, প্রণাম।
সবাই যথা-বিধায় পরমাত্মিক শক্তিকে সম্বর্দ্ধিত করে ভালো থাকবেন।
বন্দে পুরুষোত্তমম্!

বড়দিনের বড়কথা

।। বড়দিনের বড়কথা : প্রভু যীশুখ্রীস্ট আবির্ভাব স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি ।।


অবতার বরিষ্ঠমাত্রেই পূর্বাপূর্ব অবতারদের পরিপূরণকারী হন। ‘‘যেই রাম সেই কৃষ্ণ, এক দেহে রামকৃষ্ণ’’ রূপে এসে বিভিন্ন ধর্মমতের মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য স্থাপনের জন্য গীর্জায় গিয়ে যীশুর, মসজিদে গিয়ে রসুলের আরাধনা করেছিলেন। তিনি লোকশিক্ষার জন্য বহু ধর্মীয় মতবাদের গুরুদের কাছে দীক্ষাও নিয়েছিলেন গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুন্ন রেখেই। তথাপিও সাধারণ মানুষেরা মনের মণিকোঠায় জমে থাকা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ একেবারে মুছে ফেলতে পারে নি। এবার অনুকূলচন্দ্র রূপে এসে ‘‘ঈশ্বর এক, ধর্ম এক, প্রেরিতগণ সেই এক-এরই বার্তাবাহী’’ বাণীর মর্মার্থ বোঝাতে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে ভেদাভেদ ঘোচাতে, এক অভিনব ব্যবস্থা করেছিলেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপনের জন্য কুষ্টিয়ার ভক্তদের শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীবুদ্ধ, প্রভু যীশু, হজরত রসুল, শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ প্রমুখ পূর্ববর্তী অবতার-বরিষ্ঠদের জন্মোৎসব পালন করতে উৎসাহিত করেছিলেন। ঠাকুরের নির্দেশ মেনে কুষ্টিয়ার ভক্তরা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের থেকে শুরু করে সাধারণ অনুরাগীদের শ্রদ্ধার সাথে আমন্ত্রণ জানিয়ে আলাপ-আলোচনা-কথকতা ও অন্নব্যঞ্জনাদির সেবার ব্যবস্থা করতেন। ওইভাবে পূর্বাপূর্ব অবতার বরিষ্ঠদের জন্মোৎসব পালন করার ফলে সারা কুষ্টিয়ায় এক অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে গিয়েছিল। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে শ্রদ্ধা-প্রীতির বন্ধন গড়ে উঠেছিল।

পুরুষোত্তমগণের প্রধান লক্ষণ তাঁরা সম্বেগসিদ্ধ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হন। আত্মপ্রচার না করে সমাগতদিগের বৈশিষ্ট্যের পালন ও পোষণ করেন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের কাছে শ্রীরামচন্দ্রের ভক্ত গেলে তিনি আলাপ-আলোচনায় শ্রীরামচন্দ্রের, শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত গেলে শ্রীকৃষ্ণের, বুদ্ধদেবের ভক্ত গেলে বুদ্ধদেবের, প্রভু যীশুর ভক্ত গেলে প্রভু যীশুর, রসুল ভক্ত গেলে হজরত মহম্মদের, চৈতন্যদেবের ভক্ত গেলে চৈতন্যদেবের, শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্ত গেলে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের গুণগান করে তাঁদের ইষ্টানুরাগ বাড়িয়ে দিতেন। তাঁরা তাঁদের ঈপ্সিত ইষ্টকে খুঁজে পেতেন পূর্বতন পূরয়মান বর্তমান পুরুষোত্তমের মধ্যে। অনুরূপভাবে প্রভু যীশুখ্রীষ্টের ভক্ত রে. আর্চার হাউজারম্যান, ই. জে. স্পেনসার প্রমুখ যীশুখ্রীস্টের ভক্তগণ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মধ্যে তাঁদের আরাধ্য দেবতাকে খুঁজে পেয়ে সারাটা জীবন তাঁর সান্নিধ্যে কাটিয়ে তাঁর সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত সমন্বয়ী ধর্মাদর্শ প্রচার করে গেছেন।
দেওঘরে, এক বড়দিনের সন্ধ্যা-প্রার্থনান্তে প্রণম্য স্পেনসারদা ঠাকুরকে প্রণাম করার পর ঠাকুর বললেন, আজ গীর্জায় যাবে না প্রেয়ার করতে ? উত্তরে স্পেনসারদা বলেছিলেন, দীর্ঘকাল গীর্জায় গিয়েও প্রভুর সাক্ষাৎ পাইনি, আপনার মধ্যে আমার আরাধ্য-দেবতা যীশুকে খুঁজে পেয়েছি, তারপরেও গীর্জায় যেতে হবে ?
উত্তরে ঠাকুর বলেছিলেন, পূর্বতনীদের প্রতি শ্রদ্ধানতি জানাতেই হয়।
স্পেনসারদা আর দ্বিরুক্তি না করে গীর্জায় চলে যান, সারারাত গীর্জায় থেকে প্রত্যুষে ফিরে আসেন ঠাকুর-বাংলোয়। ঠাকুর যেন তাঁর প্রত্যাগমনের অপেক্ষায়ই ছিলেন। স্পেনসারদা প্রণাম করে বললেন, আপনি আমার সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবসান করে দিলেন আজ। প্রভু-যীশুর ধ্যান করতে করতে আজ আবার প্রমাণ পেয়ে গেলাম আপনিই বর্তমান যীশু। আবার প্রমাণ পেয়ে গেলাম আপনার বলা সেই বাণীগুলোর—“All the Prophets of the past converge and are awakened in living Guru of the age. It is through our love for the lover of Christ that we can love Christ.” (পূর্বতন প্রেরিতগণ জীবন্ত যুগুরুর মধ্যে কেন্দ্রীভূত ও জাগ্রত থাকেন। খ্রীষ্ট-প্রেমীর প্রতি ভালবাসার ভিতর-দিয়েই আমরা যীশুখ্রীষ্টকে ভালবাসতে পারি।) (আঃ প্রঃ দশম খণ্ড, ০৮. ০১. ১৯৪৮)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, ‘‘একজন সত্যকার হিন্দু, একজন সত্যকার মুসলমান, একজন সত্যিকার খ্রীষ্টান—পরমপিতার চোখে এরা সবাই সমান। …… প্রকৃত ধার্ম্মিক যারা তারাই সমাজের গৌরব।
একজন খ্রীষ্টানের প্রথম যীশুখ্রীষ্টকে ভালবাসা উচিত এবং তাঁর মাধ্যমে সব প্রেরিতপুরুষকে ভালবাসা উচিত। একজন হিন্দুর শ্রীকৃষ্ণকে বা যে-প্রেরিতপুরুষকে সে অনুসরণ করে তাঁকে ভালবাসা উচিত এবং তাঁর মাধ্যমে অন্য সব প্রেরিত পুরুষকে ভালবাসা উচিত। কোন প্রেরিত পুরুষকে ভালবাসা মানে তিনি যেমন ছিলেন, সেইভাবে তাঁকে বোঝা। আামাদের সুবিধা অনুযায়ী তাঁর মতের বিকৃত ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। যদি কেউ বলে—যীশুকে নয়, আামি মা মেরীকে ভালবাসি, তাহলে সে মা মেরীকে ভালবাসে কি না, তা সন্দেহযোগ্য। (সূত্রঃ আ. প্র. ১১ খণ্ড, ইং তাং ৭. ২. ১৯৪৮)
প্রভু যীশু তাঁর অনুগামীদের উদ্দেশ্যে চরম ত্যাগ ও নির্ভরতার কথা বলেছেন।–-
পাখীদের বাসা আছে, শেয়ালের গর্ত আছে, কিন্তু তোমাদের মাথা গোঁজবার স্থান থাকবে না, কোন কিছুরই সংস্থান থাকবে না। ঈশ্বরের উপর নির্ভর করে নিঃস্ব ও চাহিদাশূণ্য হয়ে তোমরা শুধু মানুষের মঙ্গল করে চলবে, নিজেদের জন্য কোন ভাবনা রাখবে না। ঈশ্বরের দয়ায় যখন যেমন জোটে, তাতেই সন্তুষ্ট থাকবে।
অধ্যাপক ও ফরীশীগণ ব্যভিচারে লিপ্ত এক নারীকে ধরে এনে শ্রীযীশুর কাছে সমর্পণ করে বিচার প্রার্থনা করে বলে, ‘‘হে গুরু এই স্ত্রী লোকটি ব্যভিচার ক্রিয়ায় ধরা পড়েছে। মোশি এমন লোককে পাথর মারার আজ্ঞা দিয়েছেন, আপনার বিচারে কি বলেন।” যীশু নীরব; মাথা নীচু করে কেবল পায়ের আঙ্গুল দিয়ে ভূমিতে কী লিখে চলেছেন। ফরীশীগণ বার-বার জিজ্ঞাসা করায় তিনি মাথা উঁচু করে বললেন, “তোমাদের মধ্যে যে নিষ্পাপ সেই প্রথমে একে পাথর মারুক।”
“He that is without sin among you, let him first cast a stone at her.”
(St John, 8:7.)
তিনি আবার মাথা নীচু করে লিখতে থাকেন ভূমিতে পায়ের আঙ্গুল দিয়ে। কিছুক্ষণ নীরবে গেলে, যীশু মাথা উঁচু করে দেখলেন, স্ত্রীলোকটি ছাড়া আর কেউ নেই। তিনি স্ত্রীলোকটিকে বললেন, “হে নারী তোমার অভিযোগকারীগণ কোথায়, তারা কেহ কি তোমায় দোষী করে নি‍?’’
নারী কহিল—“না প্রভু, কেহ করে নি।” যীশু বললেন, “আমিও তোমাকে দোষী করি না, যাও আর কখনো এ মুহূর্ত হতে কোন রকম পাপ কর্ম করবে না।’’
“Neither do I condemn thee, go, and sin no more.” (St, John.8:11)

ওই মা-টি যীশুর প্রেমের পরশে স্নাত হয়ে সাধ্বী হয়েছিলেন, যাঁর নাম ছিল মেরী ম্যাগডিলিনী । তাঁর প্রেমের পরশে মাছ-ধরা জেলেরা মানুষ-ধরা সাধকে পরিণত হয়েছিলেন।
প্রভু যীশু ব্যভিচারের বিরুদ্ধে, অনাচারের বিরুদ্ধে, পৌত্তিলকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে সবাইকে সনাতনী ঈশ্বরপ্রেমে অভিষিক্ত করতে চাইলেন। তাঁর সত্তাপ্রেমী আবেদন প্রবৃত্তি-প্রেমীদের সহ্য হলো না, ফলস্বরূপ তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ হতে হলো। মানবতার শত্রু হলো জুডাস।
প্রভু যীশুর ক্রুশারোহণের পর সব ভক্তগণ যখন ভয়ে গা ঢাকা দিয়েছিলেন তখন মেরী ম্যাগডিলিনী জীবনের মায়া তুচ্ছ করে প্রভু যীশুর সন্ধানে ঘর ছেড়ে পথে বেড়িয়েছিলেন। পথে-প্রান্তরে, ঝোপে-জঙ্গলে, গুহায়-কন্দরে, পাহাড়ে-পর্বতে, পাথরের কোণে সর্বত্র তাঁকে খুঁজে বেড়িয়েছেন। সেই সন্ত্রাসের রাজ্যে ভক্তদের ভেঙ্গে পড়া মনোবল পুণরায় জাগিয়ে তুলেছিলেন তিনি।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন—যীশুখ্রীষ্টের ভক্তদের মধ্যে মেরী ম্যাগডিলিনির সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। She love Lord for his own sake ( সে প্রভুকে তাঁর জন্যই ভালবাসত)। তার মত unexpectant, selfless love (প্রত্যাশাশূন্য, নিঃস্বার্থ ভালবাসা) আর কারো ছিল কিনা জানি না। আজ ভগবান যীশুর কত ভক্তের কথা শোনা যায়। কত saint (সন্ত)-এর কথা শোনা যায়। কিন্তু আমার মনে হয়, যীশুর অনুরাগীদের মধ্যে সর্ব্বাগ্রে নাম করা উচিত তার। ……. চরম দু:সময়ে যখন কেউ ছিল না যীশুর পাশে, প্রত্যেকে ভয়ে আত্মগোপন ক’রে চলছিল, তখন একমাত্র সে-ই প্রাণের মায়া ত্যাগ ক’রে বেপরোয়া হ’য়ে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়েছিল যীশুর জন্য পাগল হ’য়ে। কেউ-কেউ বলে নাকি—যীশুর প্রতি তার যে ভালবাসা ছিল, তা ছিল lustful (কামনালিপ্সু)। হয়তো তা’ lustful (কামনালিপ্সু)-ই ছিল। কিন্তু সমগ্র সত্তার প্রতিটি অণুপরমাণু দিয়ে অমন ক’রে আর কেউ বোধ হয় যীশুর অস্তিত্ব ও স্বস্তি কামনা করেনি। Her whole soul and entire being was bequeathed to Chirst and that was the holiest of love ( তার সমগ্র আত্মা, সমগ্র সত্তা যীশুকে সমর্পিত হয়েছিল এবং তার প্রেম ছিল পবিত্রতম)। ভালবাসা এমন পবিত্র জিনিস যে তাতে প্রিয়তমের কথা ছাড়া অন্য কোন কথা মনে পড়ে না। “রূপ লাগি
আঁখি ঝুরে, গুনে মন ভোর, প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর”—এমনতর হয়।
অনুরাগের বাতি যার
নয়নকোণে জ্বলেছে,
সে না সর্ব্বস্ব তেয়াগিয়া
গুরুকে সার করেছে।
ম্যাগডিলিনি-এর মধ্যে ছিল এই প্রাণ-উপচান অনুরাগ। আবার ছিল প্রচন্ড নির্ভীকতা ও পরাক্রম। আমি যত ভাবি ততই আমার শ্রদ্ধা হয়। (আ. প্র. ৯/১১. ১১. ১৯৪৭)
যীশুর ক্রুশবিদ্ধের কথা উঠলে, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র করুণ কণ্ঠে ছলছল নেত্রে বললেন, –‘‘সেদিন যেমন যীশু crucified (ক্রুশবিদ্ধ) হয়েছিলেন, আজকের দিনেও সেই যীশু তেমনি করে crucified (ক্রুশবিদ্ধ) হয়ে চলেছেন মানুষের হাতে। এই পাপের নিবৃত্তি না হলে মানুষের নিস্তার নেই। নিস্তারের একমাত্র পথ হলো মূর্ত্ত ত্রাতা যিনি তাঁকে sincerely follow (অকপটভাবে অনুসরণ) করা। তাহলে আমাদের ভুল-ত্রুটিগুলি ধীরে ধীরে শুধরে যাবে। ঠিকপথে চলতে শুরু না করলে, ভুলপথে চলার অভ্যাস আরো মজ্জাগত হবে তার chain reaction (শ্রেণীবদ্ধ প্রতিক্রিয়া) চলতে থাকবে।’’ (আ. প্র. ২৫. ০১. ১৯৪৮)
১৯৪৮ সালের বড়দিনের সকালে হাউজারম্যানদা প্রণাম করে উঠতে-না-উঠতেই শ্রীশ্রীঠাকুর আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললেন—আজকে আমাদের তাঁরই দিন, যিনি দুনিয়ায় এসেছিলেন দুনিয়ার দুঃখ ঘোচাতে—সেই Divine the Great–এর (দিব্য মহাপুরুষের) জন্মদিন—যাঁকে আামরা বিদায় দিয়েছি দুঃখে, কষ্টে, যন্ত্রণায়, অনাদরে, অপঘাতে।
একটু পরে শ্রীশ্রীঠাকুর ইংরাজীতে ঐ ভাব অবলম্বনে বাণী দিলেন—
This day is verily the day of Him Who is ours,
Who came on earth
To remove the misery of the world,
The birthday of that Divine the Great
Whom we have seen off
In sorrows, sufferings, woe and anguish
In uncared negligence
And bleeding tyranny.
বাণীটি বলে শ্রীশ্রীঠাকুর বিষাদগম্ভীর হয়ে গেলেন, তাঁর চোখ দুটি ছলছল।
(আঃ প্রঃ ১৫ খণ্ড, ২৫. ১২. ১৯৪৮)
বিষাদগম্ভীর আমরাও। বড়দিন উদযাপন প্রবৃত্তি পরায়ণতার আনন্দের জোয়ারে ভেসে যাওয়ার দিন নয়। বড়দিনের স্মৃতি স্মরণে রেখে প্রতি দিনগুলি প্রভু যীশুর আদর্শের পরিপূরণকারী বর্তমান পুরুষোত্তমের আদর্শের অনুসরণে আমরা যদি আমাদের ছোট আমি-টাকে বড় করে ব্যাপ্তির লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করি, তাহলে ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্তকরণ, হিংসা, বিবাহ-বিচ্ছেদ, ভ্রষ্টাচার এভাবে ব্যাপ্তি লাভ করতে পারবে না বোধহয়। সবাইকে বাঁচিয়ে নিজেকে বাঁচাবার এই একমাত্র পথ।


কেন এতো হিংসা!

।। কেন এতো হিংসা।।


ভাববাণী
চত্বারিংশত্তম দিবস
৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯১৭

“আবার তুমি এসেছ?… তবে কেন হিংসা, তবে কেন রক্তচক্ষু? তবে কেন শান্তির অভাব? তুমি তো রক্ত দিয়েছ, তুমি তো ক্ষমা প্রার্থনা করেছ? তবে আবার কেন ভাইয়ে-ভাইয়ে এত বিসম্বাদ? তবে আবার কেন রাজবিদ্বেষ? তুমি প্রাণ দিয়েছ, শান্তি দিয়েছ, অমৃত দিয়েছ, তবে আবার কেন এত?… তুমি ধর। তোমার ব্যথা আছে আর বুক নাই? তুমি শান্তি দিতে জান, তোমার বুকে প্রেম আছে, তুমি বিষকে অমৃত ক’রে দিতে পার। তবে আবার এস। ঐ যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিতে যাচ্ছে, ব’লে যাচ্ছে—‘তুমি আবার এস, আমরা তোমার সন্তান, রক্ত দিয়ে যাচ্ছি। তোমার আর এবার রক্ত দিতে হবে না।’ ১

যখন গো-খানায় গরু হত্যা করে, যখন যূপকাষ্ঠে ছাগ বলি দেয়, তখন তারাও তোমার পানে দুটি চক্ষু চেয়ে বলে, “আবার এস।” ২

তুমি যীশু, প্রাণের বার্তাবহ, অমৃতের সন্তান, প্রেমের উৎস … না, না,
… তা ক’রো, হ্যাঁ। ৩

(পরমপিতার ওই আহ্বান কি ব্যর্থ হবে!)


ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে, বাংলাভাষায় রচিত বিখ্যাত গানের কলি, “মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য” নস্টালজিয়ার সিড়ি বেয়ে যাঁদের স্মৃতি অধিকার করে আছে, সেইসব বুদ্ধিজীবিরা, সমাজ-বিজ্ঞানীরা, কি জবাব দেবেন পশ্চিমবঙ্গের নোংরা রাজনীতি কেন্দ্রিক হিংসা, নারী-নির্যাতন, মৃত্যুর খবর শুনে! কতটা বোধ-বিপর্য্যয় হলে “পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যার” পবিত্র নীতিকে পাশ কাটিয়ে নীতিহীন রাজনীতির ক্ষমতা দখলে রাখার জন্য বিরোধী মতবাদীদের হত্যা পর্যন্ত করতে পারে! আবার যার প্রমাণ পাওয়া গেল ! যা' সংশ্লিষ্ট "সত্যমেব জয়তে" সম্বলিত সীলমোহরের আধিকারিকদের পরিহাস করে যেন বলতে চাইছে, তোমরা কতখানি সৎ তোমাদের বিবেকের কাছে একবার জিগ্যেস করে দেখো তো! ** হিংসার উৎপত্তি ** বুদ্ধিজীবিগণ, সমাজবিজ্ঞানীরা, মনোবিদেরা এর কি ব্যাখ্যা দেবেন জানিনা, তবে যুগত্রাতা বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র হিংসার কারণ প্রসঙ্গে বলছেন, অহঙ্কার থেকে হিংসার উৎপত্তি। “অহঙ্কার আসক্তি এনে দেয় ; আসক্তি এনে দেয় স্বার্থবুদ্ধি ; স্বার্থবুদ্ধি আনে কাম ; কাম হতেই ক্রোধের উৎপত্তি ; আর, ক্রোধ থেকেই আসে হিংসা।’’ তাহলে বোঝা গেল, হিংসার মূল কারণ অহঙ্কার। অহঙ্কারের উৎপত্তি প্রবৃত্তি-পরায়ণতা থেকে। আর সেই প্রবৃত্তি-পরায়ণতার চালক লোভ, কাম, ক্রোধ, মদ, মোহ ও মাৎসর্য্য নামের ষড়রিপু, দেহরথের ৬টা ঘোড়ার লাগাম, দেহরথের সারথী ইষ্টগুরুর হাতে সঁপে দিতে পারলে একেবারে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। আর সেই ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন দিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। আমি অক্রোধী, আমি অমানী, আমি নিরলস ... ইত্যাদি মন্ত্রে “স্বতঃ-অনুজ্ঞা”-র নিত্য অনুশীলনের বিধানের মাধ্যমে। হিংসাকে প্রতিরোধ করার জন্য এর চাইতে উপযুক্ত কোন নিদান আছে কি-না আমার জানা নেই।

যুগ-বিধায়ক বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র “প্রাচ্য-প্রতীচ্য নিয়ন্ত্রণে বর্ণাশ্রমানুশাসকম্ আর্য্য চিরায়নম্।” সূত্র-মন্ত্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্তরে এক হিংসামুক্ত সুবিন্যস্ত পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠন করার সূত্র দিলেন।সেই অমোঘ বিধানকে পাশ কাটিয়ে হিংসার প্রতিবিধানের জন্য থানা, পুলিশ, মিলিটারী, কোর্ট, সংশোধনাগার প্রভৃতির ব্যবস্থা করেও হিংসা দমন করতে পারছেন না রাষ্ট্র পরিচালকেরা। তাই যদি পারত তাহলে, জন-প্রতিনিধি হয়ে দেশ-সেবকের অধিকার অর্জনের মাধ্যম, নির্বাচনের ন্যায় একটা সরল প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আমাদের হিংসা এবং হিংসার পরিণতি মৃত্যুর মিছিল দেখতে হতো না! এ কেমন রাজনীতি? এ কেমন গণতন্ত্র ? ছিঃ!
* * *
যুগ-বিধায়ক বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বিধান অনুযায়ী হিংসাকে দূর করতে হলে ভক্তির চাষ দিতে হবে। ভক্তির সংজ্ঞায় তিনি বলছেন, ‘‘সৎ-এ নিরবচ্ছিন্ন সংলগ্ন থাকার চেষ্টাকেই ভক্তি বলে।’’ তাহলে সৎ-এ নিরবচ্ছিন্ন সংলগ্ন থাকার চেষ্টা করার জন্য ভাবী পিতামাতাকে সদগুরুর আদর্শ গ্রহণ করতে হবে। তারপর পরমপিতা প্রদত্ত দিব্য বিবাহ-সংস্কারে সংস্কৃত হয়ে শুদ্ধাত্মাকে আকর্ষণ করে প্রহ্লাদের ন্যায় দিব্য ভক্ত সন্তানের জন্ম দিতে হবে। ভারতের নিজস্ব সংবিধান কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে এর সমর্থন আছে। বর্তমানের চিকিৎসা বিজ্ঞানও এর সমর্থন করেছে। সুস্থ দম্পতির সুস্থ দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে সুস্থ মানবের জন্ম দেওয়ার বিধান দিয়ে। এ ব্যতীত জন্মগত দুরারোগ্য শারিরীক এবং মানসিক ব্যাধি প্রতিরোধের অন্য কোন চিকিৎসা নেই। (Ref. DAVIDSON’S PRACTICE OF MEDICINE/Genetic Factor of Disease)
রাষ্ট্রের অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার বোর্ডের কর্ণধারেরা বিশ্বস্ত, সুস্থ পে-ডিগ্রীড কুকুরের, ঘোড়ার জন্ম নিয়ে গবেষণা করলেও মানুষের বেলায় উদাসীন। একুশ বছরের ছেলে আর আঠারো বছরের মেয়ে হলেই হলো। বংশ, বর্ণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা—কোন কিছুই না দেখে স্পেশ্যাল ম্যারেজ অ্যাক্টের সাহায্যে বিয়ে করতে পারবে, আবার বনিবনা না হলে ডিভোর্সও করতে পারবে! এখন তো আবার বিয়ে না করেও লিভ-টুগেদার আইনের সাহায্যে সন্তানের মা হতে পারা যায়। যার দৃষ্টান্ত লোকসভার প্রাক্তন সদস্যা নুসরত জাহান। রাষ্ট্রের জন-প্রতিনিধিরা যদি সুস্থ দাম্পত্যের প্রজনন বিজ্ঞানকে অসম্মান করতে পারেন, সেখানে সাধারণ নাগরিকগণ আরো বেশি সুযোগ পেয়ে যাবে লাগামহীন যৌন-জীবন যাপন করার! পরমপিতার অশেষ করুণায় আমাদের গ্রামীন ভারতবর্ষের তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষগুলো এখনো কোন-না-কোনভাবে ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা, পিতামাতায় ভক্তি রেখে বিবাহ সংস্কারের অনুশাসন মেনে চলছে বলে প্রিয়জনের দ্বারা প্রিয়জনদের হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা সমাজে বিস্তার লাভ করতে পারছে না। তবে, রাষ্ট্র ব্যবস্থা যদি এখনই ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুরুত্ব না দেয়, স্বভাববিধ্বংসী প্রতিলোম জাতকদের জন্ম বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাহলে অচিরেই হিংসা আমন্ত্রিত হবে ঘরে ঘরে!
হিংসা প্রতিরোধের জন্য যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র একেবারে সমস্যার মূলে হাত দিয়ে বললেন, “ভক্তি এনে দেয় জ্ঞান ; জ্ঞানেই সর্বভূতে আত্মবোধ হয় ; সর্বভূতে আত্মবোধ হলেই আসে অহিংসা ; আর, অহিংসা হতেই প্রেম। তুমি যতটুকু যে-কোন একটির অধিকারী হবে, ততটুকু সমস্তগুলির অধিকারী হবে।’’
একেবারে অঙ্কের হিসেব। আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি-ইচ্ছার ‘ছোট-আমি’-টার অহঙ্কারের লাগামটাকে যদি ভক্তির মুঠো দিয়ে কষে না ধরা যায় তাহলে ধাপে-ধাপে হিংসার আশ্রয়ে পৌঁছে যাবে। যার পরিণতি অস্বাভাবিক মৃত্যু। আর যদি জীবন নামক রথের চালক ছ’-টা ঘোড়ার (ষড়রিপু) লাগাম জীবন-রথের সারথি স্বরূপ ইষ্টগুরুর হাতে সমর্পণ করা যায়, তাহলে, সরল প্রাণ, মধুর বচন, আর বুকভরা প্রেমের ডালি দিয়ে সবাইকে আপন করে নেওয়া যায়। একটা পিপীলিকারও ব্যথা নিরাকরণের জন্য প্রাণ কাঁদে।
আবার যে হিংসা মৃত্যুর দ্যোতক তাকে শক্ত হাতে দমন করতে হলে হিংসা দিয়েই করতে হবে। হিংসাকে হিংসা দ্বারা জয় করার নাম অহিংসা। যেমন দুষ্টক্ষত বা গ্যাংগ্রীন থেকে শরীরকে বাঁচাতে হলে আক্রান্ত অংশটিকে কেটে বাদ দিতে হয়। বাদ না দিলে দেহকে বাঁচান যায় না। তেমনি সমাজ রক্ষা, রাষ্ট্র রক্ষা করতে হলে অনুরূপ নীতির অনুসরণ না করতে পারলে সমাজ-রাষ্ট্রের অঙ্গে পচন ধরে যাবে, রাষ্ট্রের সত্তাটাই মারা পড়বে।
আর্য্য ভারতের মা কালী শুম্ভ-নিশুম্ভকে, মা দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে, শ্রীরামচন্দ্র রাবনকে বধ করে ওই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। অযথা কাউকে হত্যা করেন নি। অযথা কাউকে হত্যা না করে পার্থসারথি শ্রীকৃষ্ণ মামা কংসের পাঠান অসুর-রাক্ষস নামক সত্তাহিংস জিঘাংসা বৃত্তিধারীদের হত্যা করেছিলেন। অপকৌশলী অসৎ সাম্রাজ্যবাদী কংসকে হত্যা করে, উগ্রসেনকে কারাগার থেকে মুক্ত করে তাঁকে পুণরায় রাজ্যে অভিষিক্ত করেছিলেন। ধর্মপথভ্রষ্ট অসৎ আগ্রাসনী জরাসন্ধকে হত্যা করে জরাসন্ধের পুত্র সহদেবকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিয়েছিলেন। সব হিংসার মূল উৎপাটন করে, এক পরম রাষ্ট্রীক সমবায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধ সংগঠিত করে জীবনবাদের জয়গান গেয়েছিলেন। ভবিষ্যত প্রজন্মকে জীবনবাদী হবার জন্য উপহার দিয়ে গেলেন শ্রীমদ্ভবদ্গীতা। আমাদের রাষ্ট্রীয় স্তোস্ত্র “বন্দে মাতরম্” ধ্বনির উৎস শ্রীমদ্ভবদ্গীতা। একদা শ্রীমদ্ভবদ্গীতা গ্রন্থকে আদর্শ মেনে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছিল। সেসব মহান ইতিহাস ভুলে গণতান্ত্রিক পথে রাজনীতি করতে গিয়ে হিংসাশ্রয়ী হয়ে আমরা যদি ভারতমাতার সন্তানদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলি, ভারতমাতা সেই অপমান কতদিন মুখ বুঁজে সহ্য করবেন?
আমরা আবার গীতা গ্রন্থের স্রষ্টা পার্থসারথী শ্রীকৃষ্ণের আশ্রয়ে ফিরে যাব। শ্রীকৃষ্ণ পরবর্তী বহির্ভারতের বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীষ্ট, হজরত রসুল প্রমুখ পুরুষোত্তমগণও আর্য্য ভারতীয় ওই শ্বাশ্বত নীতির অনুসরণ করেছেন মানব সভ্যতাকে বাঁচাতে। তাঁরা আগ্রাসন করতে, ধর্মান্তকরণ করতে, অযথা কাউকে হিংসা করতে কোথাও কি বলেছেন? তবে কেন এত হিংসা? কেন এত জিঘাংসা? ওই হিংস্র জিঘাংসাকে যদি কঠোর হাতে দমন করতে এগিয়ে না আসেন জীবনপিয়াসী শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তথা রাষ্ট্র নায়কেরা, তাহলে মানবতার অপমৃত্যুর কালো ছায়া মানব সভ্যতার অঙ্গে ক্রমে ক্রমে গ্যাংগ্রীন উৎপাদন করবে নিকট ভবিষ্যতে। অসৎ নিরোধে তৎপর না হয়ে, অসৎকে প্রশ্রয় দিয়ে রাষ্ট্রের পবিত্র মন্ত্র “সত্যমেব জয়তে” সম্বলিত সীলমোহরের আধিকারিক হওয়াটা যেমন ভণ্ডামি, তেমনই অসৎ নিরোধে উদাসীন থেকে সৎসঙ্গী সেজে ভক্ত হওয়াটাও কিন্তু ভণ্ডামী! সকলের কথা বলতে পারব না, সেই দিক দিয়ে বিচার করতে গেলে আমি নিজে কিন্তু ভণ্ড। ভক্ত হতে গেলে ঠাকুরত্বকে জাগাতে হবে চরিত্রে। সেটা যখন জাগাতে ব্যর্থ হয়েছি, তাহলে আমি ভণ্ড ছাড়া আর কি! তাই ভণ্ডামি ত্যাগ করে আমাকেও গুটি কেটে খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে পড়তে হবে, পরিস্থিতিকে সামাল দিতে। পরিস্থিতিকে এড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারব না।
ইষ্টভরণ, পিতৃপোষণ
পরিস্থিতির উন্নয়ন,
এ না ক’রে যাই করিস্ না
অধঃপাতেই তোর চলন। ২ ।
(অনুশ্রুতি, ১ম খণ্ড)
ইষ্টপ্রোক্ত উদ্ধৃত বাণীর অধঃপতন থেকে ব্যক্তিসত্তাকে, সংঘ-সত্তাকে বাঁচাতে হলে অসৎ-নিরোধে তৎপর হতেই হবে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র “ব্যক্তি-দম্পতি-গৃহ-সমাজ-রাষ্ট্র উদ্ধার”-কল্পে, যজন-যাজন-ইষ্টভৃতি-স্বস্ত্যয়ণী প্রবর্তন করছেন। সেকথা বিস্মরণ হলে ইষ্টাদর্শের অপলাপ করা হবে। জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!

দুর্নীতি বিরোধী দিবস স্মরণে

।। আন্তর্জাতিক দুর্নীতি বিরোধী দিবস স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।।


[সমাজ-বিজ্ঞানীদের মতে দুর্নীতি হলো একধরনের অসততা বা ফৌজদারি অপরাধ যা এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দ্বারা সংঘটিত হয় যাদের কর্তৃত্বের পদে নিযুক্ত করা হয় এবং অবৈধ সুবিধা অর্জন করে অথবা নিজের লাভের জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার করে।
আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস দুর্নীতি বিরোধী জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ৩১ অক্টোবর ২০০৩ তারিখে জাতিসংঘের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কনভেনশন পাস হওয়ার পর থেকে প্রতি বছর ৯ ডিসেম্বর এই দিনটি পালন করা হয়। তথাপিও দুর্নীতির বাড়বাড়ন্ত! কেন? সে বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করব।]


সুনীতি বা দুর্নীতি মানুষের মন-মানসিকতার বহির্প্রকাশ হলেও এর উৎস অনেক গভীরে। থানা-পুলিশ-সেনা-সংশোধনাগারের আয়োজন থাকা সত্ত্বেও, সার্বিকভাবে দুর্নীতি মুক্ত মানব-সভ্যতা গড়ে তুলতে পারছি না আমরা। যার প্রতিচ্ছবি আমরা প্রতিনিয়ত দেখতে পাচ্ছি রাজনীতিতে, শিক্ষাঙ্গনে, সমাজে, রাষ্ট্রে, পররাষ্ট্রে। এর কারণ, মানব-সৃজনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ত্রুটি বিচ্যুতি। প্রাকৃতিক নিয়মে দোঁহে মিলে এক, এক থেকে বহুতে পরিণত হওয়ার লগনে কখনো কামনা-তাড়িত জৈবিক তাগিদের বশে কামজ সন্তানের স্রষ্টা, অথবা পবিত্র গর্ভাধান সংস্কার পালনের মাধ্যমে পিতামাতার সম্মিলিত একতানতার সুরত-সম্বেগে আত্মজ সন্তানের স্রষ্টারূপী পিতামাতার মাধ্যমে প্রবিষ্ট জীবাত্মা, পিতামাতার দোষ-গুণ নিয়েই গর্ভের মাধ্যমে পিণ্ডদেহ ধারণ করে, যার নাম সহজাত সংস্কার (instinct)। সুনীতি-দুর্নীতি ওই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আমাদের সন্তানেরা উত্তরাধিকারে লাভ করে থাকে। পরিবেশগত শিক্ষা দিয়ে সহজাত সংস্কার মাধ্যমে প্রাপ্ত দোষ-গুণ সংশোধন করা বেশ মুশকিল! যারজন্য উত্তরাধিকারে প্রাপ্ত দুরারোগ্য সব জেনেটিক ডিজিজের কারণে আমাদের সন্তানদের কষ্ট পেতে হয়, অকালে চলে যেতে হয় পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে। আমরা যদি আমাদের সুচেতনা দিয়ে বৈধী বিবাহের মাধ্যমে, বৈধী সুপ্রজনন নীতি মেনে আদর্শ পিতামাতা হতে পারতাম, তাহলেই সব সমস্যার মূলোৎপাটন করা সহজ হত। সবকিছুই আমাদের কমন সেন্স-এর অভাবের কারণে হয়ে চলেছে।
* * *
আমরা যা’তে আমাদের কমন সেন্সকে কাজে লাগিয়ে, আমাদের চেতনাকে সুনীতি পরায়ণ করে জীবনকে দুর্নীতি মুক্ত করতে পারি সেই জন্যই
পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণদেব ভক্তদের উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের চৈতন্য হোক!”
বলেছিলেন, কিন্তু দিয়ে যেতে পারেন নি, দেবার জন্য শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র রূপে অবতীর্ণ হয়ে
দিলেন চৈতন্য লাভ মন্ত্র—
স্বতঃ-অনুজ্ঞা (auto-suggestion) মাধ্যমে।
“আমি অক্রোধী
আমি অমানী
আমি নিরলস
কাম-লোভজিৎ-বশী
আমি ইষ্টপ্ৰাণ
সেবাপটু
অস্তি-বৃদ্ধি-যাজন-জৈত্র
পরমানন্দ
উদ্দীপ্ত শক্তি-সংবৃদ্ধ
তোমারই সন্তান
প্রেমপুষ্ট, চির-চেতন,
অজর, অমর
আমায় গ্রহণ কর,
প্ৰণাম লও ।”
গুরু প্রদত্ত উক্ত অনুজ্ঞার সাহায্যে নিজেই নিজেকে আদেশ ক’রে অন্তঃস্থ চৈতন্যের জাগরণ ঘটানো যায়। দুর্নীতির কারক বন্ধুরূপী শত্রু লোভ, কাম, ক্রোধাদি বৃত্তিগুলোর লাগাম টেনে নিজেকে নিজেই দুর্নীতিমুক্ত রাখা যায়। কোন শাসকের প্রয়োজন হয় না। তাই যারা দুর্নীতি মুক্ত সমাজের কামনা করেন, তাদের সৎ আদর্শের অনুচচলনে অনুপ্রাণিত হয়ে জীবনকে গঠন করতে হবে।
সৎ আদর্শের প্রবক্তা পিতার পিতা পরমপিতা
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের দুর্নীতির ছায়া থেকে মুক্তি দিতে বাণী দিয়ে বললেন—
ইষ্ট ভরণ পিতৃপোষণ
পরিস্থিতির উন্নয়ন
এই না করে
যাই না করিস
অধঃপাতেই তোর চলন।
পরম কারুণিক ঈশ্বর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষকে সবকিছু দিয়ে পূর্ণরূপে তৈরি করেছেন, স্বাধিকার দিয়েছেন। যা দিয়ে মানুষ ইচ্ছে করলে মরতে পারে, মারতে পারে, আবার বাঁচতে পারে, বাঁচাতেও পারে। আমরা কোন কারণে যদি একটু ভুল করে বসি, সাথে সাথে আমাদের অভিভাবকেরা, প্রিয়জনেরা, বন্ধুবান্ধবেরা উপদেশ দিয়ে বলতে সুরু করে দেবেন, তুমি একটু কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করতে পারলে না! অবশ্য যারা এই কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করতে বলেন, তারাও অ্যাপ্লাই করতে গিয়ে কেন জানি বেসামাল হয়ে পড়েন। নইলে সুস্থভাবে বাঁচার জন্য, আহার, নিদ্রা, অপত্যোৎপাদনের জৈবধর্ম পালন করতে এত কেরামতি করতে হয়। দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে টাকা রোজগার করতে হয়! জেল খাটতে হয়!
আমরা যদি জৈবিক তাগিদগুলোকে ওই কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম তাহলে তো স্বর্গে অর্থাৎ সুখে বাস করতে পারতাম। এত দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করতে হতো না। যেমন, বাঁচতে হলে খেতে হয়, সেই খাওয়াটা যদি সত্তাপোষণী না হয়ে প্রবৃত্তিপোষণী হয় তাহলে অসুখ হবেই। সাধারণভাবে সিদ্ধ ভাত খেয়েও তৃপ্তির ঢেকুর তোলা যায়, আবার পাঁচতারা হোটেলের দামী খাবার খেয়ে অতৃপ্তির ঢেকুর তুলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়।
তাই খাওয়ার ব্যাপারে আমরা যদি ঠাকুরের দেওয়া ‘‘পেটের জন্য জীবন নয়কো,/জীবনের জন্য পেট/তাই জীবন—/পেটকে জীবন্ত করে রাখ।’’ বাণীর কমন সেন্সটাকে অ্যাপ্লাই করে সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার গ্রহণে অভ্যস্ত হতে পারি তাহলে আমাদের অভাবও ঘুচে যাবে, অসুখ-বিসুখ থেকেও বেঁচে যাব। দুর্নীতির কবলে পড়ে থানা, পুলিশ, আদালত, জেলখানার খপ্পরে পড়তে হবে না।
আমরা নিজেরা নীতিহীনতাকে আশ্রয় করে যতই ভগবানের নাম করি না কেন, ‘‘ভগবান আমাদের বাঁচাতে পারেন না, ভগবানের উপর আমাদের যে টান ঐ টানটাই বাঁচায়।’’
‘‘কেউ কারও যম নয়রে, তোর যম তুই।’’
God (ঈশ্বর)-এর opposite pole (বিপরীত মেরু) হ’ল Satan (শয়তান) যা’ disintegrate (বিশ্লিষ্ট) করে। ভগবানের প্রতি বিমুখ হ’য়ে, তাঁকে অস্বীকার করে, তাঁর বিরুদ্ধ যা’ তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে, তাকে প্রাধান্য দিয়ে চলার স্বাধীনতাটুকু মানুষের আছে। এই স্বাধীনতার উপর তিনি হস্তক্ষেপ করেন না। তিনি যেমন ইচ্ছাময়, প্রত্যেকটা মানুষকে তেমনি ইচ্ছাময় করে ছেড়ে দিয়েছেন। যে ইচ্ছাময় যেমন ইচ্ছা করে, সে ইচ্ছাময় তেমন হয়, তেমন পায়—বিধির অনুবর্তনে। পরমপিতা বিশ্ববিধাতা, আর, আামরা হলাম স্ব-স্ব ভাগ্য-বিধাতা। স্রষ্টার বেটা সেও এক স্বতন্ত্র স্রষ্টা। যার প্রাণে যেমন চায়, সে তেমনি সৃষ্টির মালিক হয়।’’ (আ. প্র. ১০ম খণ্ড/ ৮. ১. ৪৮)
আমরা যখন স্ব-স্ব ভাগ্য-বিধাতা, তখন ওইসব দুরাবস্থা থেকে রেহাই পেতে হলে একমাত্র উপায় হচ্ছে বিশ্ববিধাতা পরমপিতার বলা আদেশ-নিদেশ মেনে কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে আমাদের স্ব-স্ব ভাগ্য-বিধাতার কর্তব্যটুকু পালন করে যাওয়া, সকলকে পালন করতে উৎসাহিত করা— মনুষ্যত্বের মূল বুনিয়াদকে রক্ষা করতে হলে।
দুর্নীতির আতুড়ঘর হচ্ছে যৌনজীবন। ওই যৌন জীবনের সিড়ি বেয়ে একজন পুরুষ আদর্শ পিতা এবং একজন নারী আদর্শ মাতার পরিচয় বহন করে সুখ্যাত হতে পারে, আবার কুখ্যাতও হতে পারে । অথচ ওই সিড়ি-চরার বিষয়ে আমরা সবচাইতে বেশী উদাসীন। ভাল বাবা হবার জন্য আদর্শ চরিত্র গঠনের দিকে গুরুত্ব না দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করার জন্য যেনতেনপ্রকারেণ টাকা রোজগার করার দিকেই আমাদের ঝোঁক বেশি। টাকার খনির সন্ধান পেয়েও নানারকম অশান্তি, দুঃখ, মনস্তাপ, অবসাদে ভুগতে হয়। থানা, পুলিশ, উকিল, ডাক্তার, রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারস্থ হতে হয়। আমরা যদি একটু বিচার করে দেখি তাহলে দেখা যাবে, সন্তানের শিক্ষার জন্য টাকা দিয়ে বই কেনা যায়, নামী স্কুলে ভর্তি করানো যায়, অনেক টিউটর রাখা যায় কিন্তু মেধা কেনা যায় না, বিদ্যা কেনা যায় না। মেধা এবং বিদ্যা পিতৃ-মাতৃদত্ত উপহার, যা জন্মগত সংস্কারে নিহিত থাকে। মেধা এবং বিদ্যা, মা, বাবার কাছ থেকে নিয়ে যেমন যেমন মেপে দেন তাই সন্তানে মূর্ত হয়। টাকা দিয়ে গৃহ নির্মাণ করা যায় কিন্তু উপযুক্ত গৃহিনী না হলে গৃহসুখ পাওয়া যায় না। টাকা দিয়ে ওষুধ কেনা যায়, স্বাস্থ্য কেনা যায় না, স্বাস্থ্য যদি কেনাই যেত তাহলে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া থ্যালাসেমিয়াদি রোগগুলো থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া যেত। স্বাস্থ্য পিতামাতার অবদান, জন্মগত সমৃদ্ধির বিষয়। এবার একটু হিসেব করে দেখুনতো, টাকা উপার্জনের দিকে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ বিষয়ক গুরু প্রদত্ত বিদ্যাকে উপার্জন করে মনুষ্যত্ব নির্মাণের দিকে গুরুত্ব দিলে অতি সহজেই সুখের জীবন লাভ করা যায় না কি? আর দুর্নীতি থেকে মুক্তি পেতে চাইলে, সুনীতিপরায়ণ আচার্য্য অনুসরণে ব্যক্তি, দম্পতি, গৃহ ও সমাজজীবনকে নিয়ন্ত্রিত করতে হবে। তাহলেই দুর্নীতি মুক্ত রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব! “নান্যপন্থাঃ বিদ্যতে হয়নায়।”

জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!

tapanspr@gmail.com

“Common sense is the most uncommon things in this world.”
—Shree Shree Thakur Anukulchandra

আত্ম শুদ্ধির পথ

।। আচার্য্য পরম্পরা ।‌।
[ভালোই সব চলছিল। সৎসঙ্গ নিয়ে বেশ আনন্দেই মেতে ছিলাম। হঠাৎ তালটা যেন
কেটে গেল। দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রম থেকে প্রকাশিত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র
লিখিত ‘সত্যানুসরণ’ নামক গ্রন্থের ৪৫তম সংস্করণের ৬৫তম পাতার প্রথম
অনুচ্ছেদের বাণীর উপদেশটা আমাকে বেশ বিপাকে ফেলে দিয়েছে। আমার নাম দিবাকর
বৈদ্য। আমি অকপটে সব ‘খ্যাপন’ করলাম। দয়া করে আমার কথাগুলো একটু
শুনবেন। বলা যায় না, আপনাদেরও কাজে লেগে যেতে পারে।]
* * *
একজন দাদা, নাম অনিমেষ চৌধুরী। দেখা হলেই ‘জয়গুরু’ দিয়ে সম্ভাষণ
করেন। ভালো-মন্দ খোঁজখবর নেন। মাঝে-মাঝে ঠাকুরের কথা বলেন। বাড়িতে যেতে
বলেন। একদিন সন্ধ্যা-প্রার্থনার আগে ওঁর বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম।
ভাবলাম, ওনার বাড়ীতেই না-হয় আজকের প্রার্থনাটা করে নেব। উনি দু’জন মা’কে
নিয়ে বসে তখন ধ্যান করছিলেন। পরে জেনেছিলাম ওই দু-জনা ছিলেন ওঁর স্ত্রী
ও কন্যা। সামনে ঠাকুরের একটা মাত্র প্রতিকৃতি। আমার উপস্থিতি বুঝতে পেরে
বসতে বললেন। অনিচ্ছা সত্বেও বসলাম। অনিচ্ছা সত্বেও বলতে বাধ্য হলাম,
কারণ, ওনার বাড়িতে ঠাকুরের ফটো ছাড়া জগজ্জননী বড়মা, শ্রীশ্রীবড়দা,
বর্তমান আচার্য্যদেব পূজ্যপাদ বাবাইদা, পূজ্যপাদ অবিনবাবু-দের কোন
ছবি নেই।— যা’ কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারছিলাম না। আচার্য্য-পরম্পরাকে
যে বা যারা মানে না, তারা ‘ইষ্টদ্রোহী’, আমি তাদের সঙ্গ সবসময় এড়িয়ে চলার
চেষ্টা করি। তেমন শিক্ষাই পেয়েছি আমাদের ঋত্বিক দাদাদের কাছ থেকে। নতুন
পরিচয়, তাই আগে থেকে বুঝতে পারিনি, যে দাদাটি ইষ্টদ্রোহী।
আচার্য্য-পরম্পরা মানে না। মনে যাইহোক, ভদ্রতার খাতিরে মুখে বললাম,
দাদা, সময় তো পার হয়ে গেল, প্রার্থনা করবেন না।
—‘এই তো করবো।’ বলেই উঠে দাঁড়ালেন।
পাশে বসে থাকা মায়েদের দিকে ইশারা করতেই শঙ্খধ্বনি, হুলুধ্বনি বেজে
উঠল। অমনি দাদাটি ডান হাতটি উপরে তুলে, বাম হাতটিকে ঝুলন্ত রেখে কি-সব
বলতে লাগল। সবটা মনে নেই। তবে প্রথমদিকের শব্দগুলো— তমসার পার
অচ্ছেদ্যবর্ণ মহান পুরুষ … গোছের এইরকম কিছু। (যা আমাদের উপাসনা বইতে
লেখা আছে দেখেছি।) তারপর প্রার্থনা শুরু করলেন। প্রথম দুটো বিনতির পর
‘গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু’ না করে আবার কীসব বলতে শুরু করলেন। বাংলা আর
সংস্কৃতে। তারপর শুরু করলেন ‘গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু’। তারপর আবার
কতগুলো সংস্কৃত মন্ত্র আওড়াতে লাগলেন।—যা আমি কোনদিন কোন সৎসঙ্গ
অধিবেশনে করতে দেখিনি। আমার ধৈর্য্যের, রাগের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছিল। তবুও
কৌতুহল বশে নিজেকে সংযত করে নিলাম। ওনার মনগড়া প্রার্থনা শেষে আমাকে
সত্যানুসরণ-এর একটি নির্দিষ্ট অংশ থেকে পাঠ করতে বললেন, আমি পাঠ
করলাম—‘‘কোন-কিছু ‘আজ বুঝেছি আবার কাল বুঝা যায় না—হেঁয়ালি’ ইত্যাদি
ব’লে শৃগাল সেজো না—কারণ, ইতর জন্তুরাও যা’ বোঝে তা’ ভোলে না। তাই, এই
প্রকার বলাটাই দুষ্ট বা অস্থির-বুদ্ধির পরিচায়ক।’’
আমার পড়া শেষ হতেই উনি ‘চলার সাথী’ গ্রন্থ থেকে ‘সন্ধ্যা ও প্রার্থনা’ অংশটি পাঠ করলেন। পাঠ শেষ করে আমাকে একটা কীর্তন করতে বললে,
আমি কিছুটা অনিচ্ছা সত্বেও ‘জয় রাধে রাধে’ কীর্তনটা করলাম। কীর্তনটা শেষ
হলে উনি আমার খুব প্রশংসা করে বললেন, খুব ভাল লাগল তোমার
কীর্তন,—‘ছাড়োরে মন কপট চাতুরি, বদনে বলো হরি হরি!’—কি অপূর্ব কথা!
তাই না ভাই ?—তারপর যেন অনেকটা আক্ষেপের সুরেই বললেন, ‘কোথায় আর পারলাম
কপটতা ত্যাগ করে ধর্মরাজ্যে প্রবেশ করতে!’ —ঠিক আছে! তাহলে ধ্বনি দিয়ে
দি। কি বলো?
আমার সম্মতি পেয়ে উনি ‘বন্দে পুরুষোত্তমম্! বন্দে আর্য্য পিতৃন!
বন্দে মাতৃবর্গান্! বন্দেহংকৃষ্টি দৈবতান্!— ইত্যাদি ধ্বনি দিয়ে
প্রার্থনা-পর্বের ইতি টানলেন। বড়মা এবং আচার্য্যদেব-দের নামে কোন ধ্বনি
দিলেন না। আমার মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। —এ তো অন্যায়! অন্যায়কে
প্রশ্রয় দেওয়াও তো অন্যায়। তাই আমি সহ্য করতে না পেরে বলেই
বসলাম,—দাদা! আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি ?
—অনায়াসে করতে পার।
—আপনি চলার সাথী থেকে ‘সন্ধ্যা ও প্রার্থনা’-র বাণীটা পড়লেন, অথচ
আপনি প্রার্থনার সময়সূচী মেনে প্রার্থনাটা করলেন না। আর প্রার্থনাটাকেও
বিকৃত করে করলেন। যেগুলো ঠাকুর করতে মানা করে গেছেন। আর একটা কথা, আপনি
আপনার বাড়ীতে শ্রীশ্রীবড়মা, শ্রীশ্রীবড়দা, শ্রীশ্রীআচার্য্যদেব, পূজনীয় অবিনবাবুদের কোন ছবি রাখেন নি, তাঁদের নামে কোন ধ্বনিও
দিলেন না!—কেন, জানতে পারি কি?
আমার কথা শুনে হা-হা করে হেসে উঠে বললেন, তোমার কথাটা ঠিক সোনার
পাথরবাটির মত হয়ে গেল না-কি?
—তার মানে?
—তার মানে হলো এই, শ্রীশ্রীঠাকুর চলার সাথী গ্রন্থে ‘সন্ধ্যা ও প্রার্থনা’ শিরোনামে যে বাণীটি লিপিবদ্ধ করেছেন, তার মধ্যে তিনি তাঁর
রচিত ‘আর্য্যসন্ধ্যা’ ও ‘প্রার্থনা’-র কথা বলেছেন। উক্ত প্রার্থনার
অস্তিত্ব যেখানে বিলুপ্ত করা হয়েছে, সেখানে প্রার্থনা না করে
প্রার্থনার-সময়সূচী দিয়ে কি হবে? আর ইষ্টাসনে সদগুরু ছাড়া অন্যান্য ছবি
রাখতে গেলে তো সত্যানুসরণ থেকে ‘‘গুরুই ভগবানের সাকার মূর্ত্তি, আর তিনিই
Absolute (অখণ্ড)।’’—লেখাটি বাদ দিতে হবে।
—প্রার্থনার অস্তিত্ব বিলুপ্ত করা হয়েছে মানে!— আপনি কি বোঝাতে
চাইছেন? দেওঘরে, অসংখ্য কেন্দ্র-মন্দিরগুলোতে সকাল-সন্ধ্যায় তাহলে কি
করা হয়?
—যা করা হয় সেগুলো শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র রচিত এবং নিদেশিত
প্রার্থনা নয়। তুমি এ বিষয়ে যদি জানতে চাও, প্রার্থনা বিষয়ক প্রামাণ্য
গ্রন্থ ঋত্বিগাচার্য্য প্রণীত ‘অনুসৃতি’ এবং ‘সৎসঙ্গ পাব্লিশিং প্রকাশিত
‘প্রার্থনা’ শিরোনামের গ্রন্থটি ভাল করে পড়ে নিও।
—দেখুন ওসব পড়ার আমার দরকার নেই। ওসব এখন অচল। আমরা
আচার্য্যদেবের নির্দেশে ‘উপাসনা’ বইটাকে মেনে চলি। উপাসনা বইয়ের প্রথমেই
লেখা আছে ১৯৬৫ সালে শ্রীশ্রীঠাকুর ওসব বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন।
আমার কথা শুনে দাদাটি ‘হো-হো’ করে আবার পাগলের মত হেসে উঠে বলল,
তোমার কথার উত্তরটা ঠাকুর সত্যানুসরণের ৬৫ সংখ্যক পাতায় দিয়েছেন, যেটা
আজকে তুমি পাঠ করলে। আমার প্রতি রাগ না করে, বাড়িতে গিয়ে বাণীটা ভাল করে
বোঝার চেষ্টা করবে।
যাইহোক, লোকটার ব্যবহারে আন্তরিকতার সুর ছিল। ফেরার সময় আমাকে ৫টা
ফল এবং কিছু ভ্রাতৃভোজ্যও দেয়। আমি স্থান ত্যাগ করে বাড়ি না ফিরে আমাদের
কেন্দ্র-মন্দিরে চলে যাই। এ বিষয়ে একটা হেস্তনেস্ত করার জন্য। ভাগ্য ভাল, দেখা
পেয়ে যাই সুভাষ সরকারদার। প্রবীণ ঋত্বিক-দেবতা। ঠাকুর দেখা মানুষ,
আচার্য্যদেবের কাছের লোক, তাঁর কাছে গিয়ে ঘটনাটা খুলে বলি। তিনি সব শুনে
বললেন, ঠিক আছে তুমি বাড়ি চলে যাও, দেখি কি করা যায়।
* * *
তারপর বেশিদিন কাটেনি। সুভাষদার সাথে সৎসঙ্গ সেরে ফিরছিলাম।
ভাগ্যক্রমে দেখা হয়ে যায় অনিমেষদার সাথে। আমি সুভাসদার সাথে অনিমেষদার
পরিচয় করিয়ে দিলে, সুভাষদা অনিমেষদাকে বলেন আপনি আমাদের গুরুভাই অথচ
মন্দিরে আপনাকে দেখি না, কি ব্যাপার?
—‘আমি কি ওখানে ভণ্ডামি করতে যাব?’ অনিমেষদার অনভিপ্রেত উত্তর
শুনে সুভাষদা বলেন—ভণ্ডামি বলছেন কেন, আমরা কি ওখানে ভণ্ডামি করছি?
—ওটা আমার কথা নয়, ঠাকুরের কথা।
—ঠাকুরের কথা! প্রমাণ দিতে পারবেন?
—অবশ্যই। তবে রাস্তায় নয়, বাড়িতে চলুন, ঠাকুরের বই খুলে প্রমাণ দেব।
—দেখুন, এখন তো আপনার বাড়িতে যাওয়া সম্ভব না, বরং কাল সকালে
প্রেয়ারের আগে মন্দিরে আসুন, প্রেয়ারের পর না হয় যুক্তিতর্ক করা যাবে।
—দেখুন, মনে কিছু করবেন না, আবার আমাকে অপ্রিয় কথা বলতে বাধ্য করলেন।
—এমন কি বললাম, যাতে আপনাকে অপ্রিয় কথা বলতে হবে?
—ওই যে প্রেয়ারের কথা বললেন না, আপনারা কি প্রেয়ার করেন, যে
প্রেয়ার করতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন!
—এ আপনি কি বলছেন! দেওঘর থেকে নির্ধারিত প্রেয়ারের সময়সূচী মেনে
রীতিমত মাইকের মাধ্যমে আমাদের মন্দিরে প্রেয়ার করা হয়, আপনি বলছেন, আমরা
প্রেয়ার করি না! আপনি প্রমাণ করতে পারবেন তো?
—অবশ্যই।
—তাহলে কাল আসুন আপনার প্রমাণপত্র সব নিয়ে।

  • * *
    মন্দিরের কাছে বাড়ী হবার সুবাদে প্রায় প্রতিদিনই মন্দিরে গিয়ে
    সকালের প্রার্থনাটা করি। সেদিন প্রার্থনা শেষে দেখি অনিমেষদা এসেছেন।
    সুভাষদা ওনাকে নিয়ে গিয়ে বসালেন।
    এবার বলুন আপনার বক্তব্য। ঠাকুরের বলা অনুযায়ী আমরা যে ভণ্ডামি করছি,
    প্রেয়ার করছি না, প্রমাণ করে দেখান।
    অনিমেষদা সত্যানুসরণ গ্রন্থটি বের করে বলেন, আপনারা এই বইটিকে যদি
    মানেন, তাহলে দেখুন ৩১ পৃষ্ঠায় রয়েছে, ‘‘গুরুই ভগবানের সাকার মূর্ত্তি,
    আর তিনিই Absolute (অখণ্ড)।’’ আবার ৫৭ পৃষ্ঠায় ঠাকুর আত্ম-প্রচারকদের
    ভণ্ড বলেছেন।
    —ঠাকুর, আত্ম-প্রচারকদের ভণ্ড বলেছেন, আমরা তো আর আত্ম-প্রচারক নই!
    —গুরুর পাশে শিষ্যদের ছবি রেখে প্রচার করা কি সত্য প্রচারের নামে
    আত্ম-প্রচার করা নয়?— আপনারা প্রার্থনার নামে দয়ালবাগ সৎসঙ্গের যে
    বিনতি করেন, সেই বিনতিতে বলেন :
    “তুম্ বিন কোই সমরথ নহী জাসে মাঁগু দানা”
    “রাধাস্বামী গুরু সমরথ তুম বিনা আউর্ ন দুসরা ।”
    আবার বিশ্বসারতন্ত্রম্ গ্রন্থের গুরু বন্দনায় বলি—
    “গুরোঃ পরতরং নাস্তি…..”
    “কেবলং জ্ঞানমূর্ত্তিম্ ।”
    ওই মন্ত্রগুলো একমাত্র গুরুকে উদ্দেশ্য করেই যদি বলা হয়ে থাকে তাহলে
    গুরুর আসনের পাশে কি গুরুর শিষ্যদের ছবি রাখা যায়? একটা প্রাইমারি
    স্কুলেও হেড্ স্যরের চেয়ারের একটা আলাদা মর্যাদা থাকে, আপনারা
    দাদা-প্রীতির নামে সে মর্যাদাটুকুও ক্ষুণ্ণ করে চলেছেন, এগুলোকে কি
    আত্মপ্রচার বলে না?
    সুভাষদাকে নিরুত্তর থাকতে দেখে অনিমেষদা বললেন, আপনারা যারা
    ঠাকুরের সাথে ঠাকুরের শিষ্যদের প্রচার করতে গিয়ে তাদের প্রতিকৃতিরও পূজা
    করছেন, তা ভণ্ডামি নয় কি? এই গেল ভণ্ডামির উত্তর। এরপর রয়েছে প্রেয়ার।
    এই দেখুন সৎসঙ্গ পাব্লিশিং প্রকাশিত ২ খানি গ্রন্থ। এটি শ্রীশ্রীঠাকুরের
    ইংরেজী ভাষায় লিখিত ‘লর্ডস্ প্রেয়ার’। ভাল করে দেখে বলুন তো এই প্রেয়ার
    আপনারা করেন কি-না?’
    সুভাষদা বইটা নেড়েচেড়ে দেখে বললেন, ‘না, করি না’।
    —‘তাহলে দেখুন ‘প্রেয়ার’ না করেই মিথ্যা প্রেয়ারের গর্ব করে
    চলেছেন। ঠাকুরের ভাষায় এর নাম দ্বন্দ্বীবৃত্তি। সবচাইতে বড় পাপ। ঠিক আছে,
    ইংরেজীর কথা বাদই না হয় দিলাম, প্রেয়ার-এর বাংলা প্রার্থনা। বাংলা ভাষায় ঠাকুরের লেখা ‘প্রার্থনা’
    নামে একটা বই আছে এবং সেই বইটাও সৎসঙ্গ পাব্লিশিং থেকে প্রকাশিত। হিমাইতপুরে প্রথমে প্রথমে প্রকাশিত হয়। দেওঘরে প্রথম
    প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে। ভাল করে দেখুন তো, এই বইয়ের নিদেশ মেনে আপনারা
    প্রার্থনা করেন কি-না?’
    সুভাষদা বইটা ভাল করে নেড়েচেড়ে দেখে বললেন, ‘না, করি না’।—তবে এই
    প্রার্থনা করতে তো ঠাকুরই নিষেধ করে গেছেন ১৯৬৫ সালে, উপাসনা বইতে যা
    স্পষ্ট করে লেখা রয়েছে।
    —মনে কিছু করবেন না দাদা, যাকে আমরা ঠাকুর বলে মানি, সেই তিনিই
    যদি তাঁর রচিত প্রার্থনা করতে নিষেধ করেন, তাহলে তাঁর নাম করে দীক্ষার
    সঞ্চারণা করাও তো আর একটা ভণ্ডামি! কোন সাবজেক্ট নেই, সিলেবাস নেই অথচ
    ধরে ধরে এনে ছাত্র ভর্তি! কোন বুদ্ধিমান মানুষ কি মেনে নেবেন? আপনি যদি
    সত্যি-সত্যিই নিজেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের শিষ্য বলে মনে করেন
    তাহলে একটা কাজ অবশ্যই করা উচিত, আপনাদের আচার্য্যদেবকে বলে সত্যানুসরণ গ্রন্থ
    থেকে ‘‘কোন-কিছু ‘আজ বুঝেছি আবার কাল বুঝা যায় না—হেঁয়ালি’ ইত্যাদি
    ব’লে শৃগাল সেজো না—কারণ, ইতর জন্তুরাও যা’ বোঝে তা’ ভোলে না। তাই, এই
    প্রকার বলাটাই দুষ্ট বা অস্থির-বুদ্ধির পরিচায়ক।’’ এই অংশটা বাদ দিতে বলে
    বলে দিন।
    —কেন, প্রার্থনার সাথে সত্যানুসরণের বাণীর সম্পর্ক কি?
    —কারণ, পুরুষোত্তম যদি অভ্রান্ত হয়েই থাকেন, তাঁর নিদেশিত কোন
    বিধির পরিবর্তন তিনি কখনোই করেন না, কেউ করুক, তা-ও তিনি অনুমোদন করেন
    না, এমনকি কাউকে পরিবর্তন করার অধিকারও দেন না। তাই তিনি সত্যানুসরণের ওই
    বাণীতে বললেন, ‘ইতর জন্তুরাও যা’ বোঝে তা’ ভোলে না।’ তাই আমার তো মনে হয়,
    ঠাকুর তাহলে ভুল করে ওই বাণীটা দিয়েছিলেন, না হলে আপনারা তাঁর রচিত এবং
    নিদেশিত আহ্বানী, সন্ধ্যা ও প্রার্থনা-র সবটা বাদ দিয়ে, তাঁর নিদেশকে
    অমান্য করার ধৃষ্টতা দেখাতে পারতেন না!
    —দেখুন, আপনি আমাদের যতই যুক্তি দেখান, আমাদের ভোলাতে পারবেন না।
    এতক্ষণে বুঝতে পারলাম, আপনারা ঠাকুরের নির্দেশের আচার্য্য-পরম্পরা মানেন
    না। সে আপনারা না মানুন, আমরা কিন্তু আচার্য্যদেবের নির্দেশের বাইরে এক
    পা-ও চলতে রাজী নই।
    —খুব ভাল কথা, আপনি আমাকে বললেন, ‘‘আপনারা ঠাকুরের নির্দেশের
    আচার্য্য-পরম্পরা মানেন না।’’ একটা প্রশ্নের উত্তর দিন তো, আপনারা
    উপাসনা, অধিবেশন বা সৎসঙ্গ করার সময় আসনে আচার্য্য-পরম্পরার নামে বা আচার্য্য-পরম্পরার
    অজুহাতে যাঁদের প্রতিকৃতি রাখেন, তাঁদের দেওয়া কোন প্রার্থনা, উপাসনা
    করেন কি?—নিশ্চয়ই না। অতএব আপনারা যে পদ্ধতিতে আচার্য্য-পরম্পরা মেনে চলছেন, ওইভাবে
    মেনে চলার কথা ঠাকুর কোথায় বলেছেন, তাঁর বলা প্রামাণ্য শ্রুতিবাণী থেকে
    প্রমাণ দেখাতে পারবেন?
    কেন জানি সুভাষদা কোন উত্তর দিতে পারলেন না দেখে অনিমেষদা বললেন,
    অভিধান মতে আচরণসিদ্ধ ব্যক্তিকেই ‘আচার্য্য’ বলে। যিনি যে বিষয়ের
    আচার্য্য হবেন, তাঁকে সে বিষয়ে আচরণসিদ্ধ হতে হবে। যেমন, আমরা নিউটন,
    আর্কিমিডিস, আইনস্টাইন প্রমুখ বিজ্ঞান-আচার্য্যদের কেউ দেখিনি। তাঁরা
    বিগত হবার পর তাঁদের আবিষ্কৃত সূত্র বা জ্ঞানের সাথে পরিচিত হই তাঁদের
    লিখে রাখা বইয়ের মাধ্যমে, তাঁদের বংশধরদের মাধ্যমে নয়। সেই বইগুলো বাজারে
    সহজলভ্য হলেও আমরা বই পড়ে সেগুলো নিজে নিজে আয়ত্ত করতে পারি না বলেই
    শিক্ষকদের মাধ্যমে শিখতে হয়। এবার কোন শিক্ষক যদি ওই বিজ্ঞান-আচার্য্যদের
    মূল সূত্রগুলো বাদ দিয়ে ভুল শেখাতে শুরু করেন এবং প্রতিপত্তির জোরে
    বংশানুক্রমিকভাবে জ্যেষ্ঠ-সন্তান-পরম্পরা চালাতে থাকে, মূলসূত্র জানা কোন
    ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছাত্র কি তা মেনে নেবেন?
    —তা কি করে হয়!
    —তাই যদি না হয়, তাহলে আপনারা কোন্ হিসেবে শ্রীশ্রীঠাকুর
    অনুকূলচন্দ্রের মূলসূত্র অর্থাৎ আদর্শকে সযত্নে পরিহার করা শ্রীশ্রীঠাকুর
    অনুকূলচন্দ্রের জ্যেষ্ঠ সন্তান পূজনীয় অমরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এবং
    পরবর্তী বংশানুক্রমিকভাবে জ্যেষ্ঠ-সন্তান-পরম্পরাদের ছবি পুজো করতে শুরু
    করেছেন? এঁরা কিসের আচার্য্য এবং কোন্ আচরণ দ্বারা আপনাদের শ্রীশ্রীঠাকুর
    অনুকূলচন্দ্রের অবিকৃত আদর্শ অনুসরণ বিষয়ে শিক্ষিত করেছেন বা করছেন?
    —দেখুন কিসের সাথে কিসের তুলনা করছেন? আমাদের দেশে আচার্য্য প্রথা কুলগুরু প্রথা কি চালু নেই?
    —আপনি যখন বলছেন, থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু ঠাকুর এ বিষয়ে কোন
    বাণীতে কি বলে গেছেন, সে সম্পর্কে যদি কিছু জানা থাকে বলুন।
    —না, ওগুলো আমার শোনা কথা, কোন বাণীতে কি বলে গেছেন তা বলতে পারব
    না। তবে—
    “ইষ্টগুরু পুরুষোত্তম
    প্রতীক গুরু বংশধর,
    রেতঃ শরীরে সুপ্ত থেকে
    জ্যান্ত তিনি নিরন্তর।”
    এই বাণীটা যদি ঠাকুরের দেওয়া হয় তাহলে বংশধররা কি প্রতীক-গুরু নয়?
    —অবশ্যই। তাহলে তো আপনাদের আচার্য্যদেবদের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে যে!
    —তার মানে?
    —তার মানে অতি সহজ। সত্যানুসরণ গ্রন্থের শুরুতেই তা লিপিবদ্ধ করা আছে।—
    “ভারত! যদি ভবিষ্যৎ-কল্যাণকে আবাহন ক’রতে চাও, তবে সম্প্রদায়গত বিরোধ ভুলে
    জগতের পূর্ব্ব-পূর্ব্ব গুরুদের প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হও—আর তোমার মূর্ত ও জীবন্ত গুরু বা ভগবানে আসক্ত (attached) হও, —আর তাদেরই স্বীকার কর—যারা তাঁকে ভালবাসে। কারণ, পূর্ব্ববর্ত্তীকে অধিকার করিয়াই পরবর্ত্তীর আবির্ভাব।” এই হচ্ছে প্রকৃত আচার্য্য পরম্পরার মূল সূত্র।
    শ্রীশ্রীঠাকুরের ওই আক্ষেপ-বাণী শতবর্ষ অতিক্রম করলেও আমরা তাঁর আবেদনকে বাস্তবায়িত করতে ব্যর্থ হয়েছি। ব্যর্থ হয়েছি অবিকৃতভাবে পুরুষোত্তমের আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে সাধারণ জনমানসে!
    তার পরও যদি “ইষ্টগুরু পুরুষোত্তম প্রতীক……” বাণীকে আঁকড়ে ধরে চলতে চান তাহলে তো মুশকিল!
    কারণ—শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র
    পূর্বাপূর্ব অবতার বরিষ্ঠদের তাঁর পূর্বাচার্য্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের পূর্বাচার্য্য শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীস্ট, হজরত মহম্মদ, চৈতন্যদেব,
    রামকৃষ্ণদেব-দের রেত-শরীরের সাথে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের পরিবারের কি কোন সম্পর্ক
    আছে?
    —তা’ কি করে থাকবে! তাছাড়া চৈতন্যদেব ও রামকৃষ্ণদেবের তো কোন সন্তানই ছিল না।
    —ঠিক তাই। তাহলে চৈতন্যদেবের পূর্ববর্তী পুরুষোত্তম যিনি ছিলেন
    বলে আপনার মনে হয়, তাঁর সর্বশেষ বংশধরদের মধ্যে প্রতীক গুরু খুঁজে দীক্ষা নিয়ে ধর্ম পালন করা উচিত। তাই নয় কি? তা করতে পারা কি আপনাদের দ্বারা সম্ভব হবে?
  • * *
    পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের পবিত্র সৎসঙ্গ আন্দোলন অব্যাহত রাখতে
    তাঁর স্পষ্ট নিদেশ দেওয়া আছে—‘‘আগত যিনি, উপস্থিত যিনি, তাঁর বিগতিতে বা তিরোভাবে তাঁর বংশে যদি তাঁতে অচ্যুত সশ্রদ্ধ আনতিসম্পন্ন, প্রবুদ্ধ সেবাপ্রাণ, তৎবিধি ও নীতির সুষ্ঠু পরিচারক ও পরিপালক, সানুকম্পী চর্য্যানিরত, সমন্বয়ী সামঞ্জস্য প্রধান, পদনির্লোভ, অদ্রোহী, শিষ্ট-নিয়ন্ত্রক, প্রীতিপ্রাণ—এমনতর কেউ থাকেন, তাঁরই অনুগমন করো—কিংবা তাও যদি না পাও—তবে তাঁর কৃষ্টি সন্ততির ভিতর অমনতর গুণসম্পন্ন যিনি তাঁরই অনুগমন করো পারম্পর্য্যে—যতক্ষণ আবার আগতের অভ্যুত্থান না হয়, ঠকবে না—শিষ্ট সমন্বয়ে সম্বর্দ্ধনাও এই পাবে।’’ (সম্বিতী, আদর্শ, ৩৯)
    তাঁর বিগতি পরবর্তী উপরোক্ত ওই বাণীকে অবলম্বন না করে তড়িঘড়ি আচার্য্য সেজে সৎসঙ্গের অধিকার গ্রহণ করলেন কোন্ যুক্তিতে?—
    * * *
    সুভাষদাকে নিরুত্তর থাকতে দেখে অনিমেষদা বলেন, তা যদি না হয়, তাহলে
    ওই বাণীর উপর ভিত্তি করে আচার্য্য-পরম্পরার নামে কুলগুরুগিরির ব্যবসা
    চালানো থেকে অবিলম্বে বিরত হওয়া উচিত।
    শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুসারে পিতা থেকে পুত্র জন্মায়। পুত্র,
    পিতার অছি (trustee) মাত্র। যে পুত্র পিতার অছি-কে বহন করে সমৃদ্ধ করে
    তাকেই পিতার আদর্শ পুত্র বলবে সবাই। তাই বলে পুত্র কখনো পিতা হতে পারে
    না। তাই যদি হতো বিশ্বশ্রবা ঋযির পুত্র বিভীষণকে আদর্শ পুত্র না বলে
    রাবনকে তো বলতে পারতেন শ্রীশ্রীঠাকুর। আপনারা ওই বাণীকে ভিত্তি করে,
    ঠাকুরের মূল আদর্শ বাদ দিয়ে বংশানুক্রমিকভাবে জ্যেষ্ঠ-সন্তান-পরম্পরার
    চতুর্থ পুরুষকে পর্যন্ত ঠাকুর বানিয়ে ছেড়েছেন। অথচ ঠাকুরের প্রথম
    বংশধরদের মধ্যে সর্বশেষ সন্তান—পূজনীয় কাজলদা যখন জীবিত ছিলেন, তাঁকে আপনারা যদি বংশধর বলে গণ্য
    করতেন, এবং আপনারা সত্যিই যদি উপরের ওই বাণীকে মর্যাদা দিতেন তাহলে
    সর্বাগ্রে তাঁকে উপযুক্ত সম্মান দিয়ে, তাঁর মতামত নিয়ে নিদেশিত বাণীর উপযুক্তকে কীলকেন্দ্রে বসাতেন। অন্যথায় উপযুক্ত কৃষ্টি সন্তানকে। যুক্তিসঙ্গত যা’, তা’ না করে
    আপনারা মনগড়া আচার্য্য-পরম্পরায় মেতে উঠে সৎসঙ্গের মূল আচার্য্যের
    অনুশাসনকে নিকেশ করে দিলেন! ইতিহাস কি আপনাদের কোনদিন ক্ষমা করবে?
    শাস্ত্রের ব্যাখ্যা অনুযায়ী পরাবিদ্যায় আচরণসিদ্ধ ব্রহ্মজ্ঞ
    ইষ্টগুরুকে আচার্য্য এবং অপরাবিদ্যায় আচরণসিদ্ধ শিক্ষাগুরুকে উপাচার্য্য
    বলা হয়। বীরশ্রেষ্ঠ অর্জুনের কৃপাচার্য্য, দ্রোণাচার্য্য, ধৌম্য নামে
    তিনজন উপ-আচার্য্য থাকা সত্বেও পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণকে আচার্য্য পদে বরণ
    না করা পর্য্যন্ত তিনি দুর্বলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারেন নি।
    শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রও পূর্ববর্তী পুরুষোত্তমদের আচার্য্য হিসেবে
    মেনে চলতেন। এবং মেনে চলতে বলেছেন। তাঁর বলা অনুযায়ী—
    সত্তার মূলই হ’ল আত্মা,
    আর, এই আত্ম-সমীক্ষুই আত্মবিৎ—
    আর, তিনিই আচার্য্য ;
    তদন্বিতবৃত্তি ও তৎসমাহিতচিত্ত যিনি—
    তিনিই বোধ করেন তাঁ’কে অখণ্ড সচ্চিদানন্দ—
    আত্মার মূর্ত্ত প্রতীক। ৩৩১ । (সম্বিতী)
    পুরুষোত্তম আসেন যখন
    ইষ্ট, আচার্য্য তিনিই গুরু,
    তিনি সবার জীবন-দাঁড়া
    তিনিই সবার জীবন-মেরু।
    তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর ওই নিদেশ অমান্য করা শুরু হয়েছিল বলেই তিনি
    অমান্যকারীদের উদ্দেশ্যে বাণী দিয়ে বললেন—
    আচার্য্য ছেড়ে আচার্য্য ধরলি
    মূর্খতাতে দিলি পা,
    জ্ঞানের বুকে মারলি ছুরি
    লাভ হ’ল তোর ধৃষ্টতা।
    আর কুলগুরু অর্থাৎ কৌলগুরু-পরম্পরার কথা যদি বলেন, তাহলে
    শুনুন—আর্য্যকৃষ্টির রক্ষক সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পুরোহিত রঘুবংশের
    কৌলগুরু ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠদেব শ্রীরামচন্দ্রকে ‘‘ওঁ নারায়ণঃ পরাবেদা
    নারায়ণঃ পরাক্ষরঃ।/নারায়ণঃ পরামুক্তি নারায়ণঃ পরাগতিঃ॥’’ মন্ত্রে
    স্বস্তিবাচন করার সময় শ্রীরামচন্দ্রের মধ্যে পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণকে
    উপলব্ধি করলে তিনি নারায়ণের পরিবর্তে রামচন্দ্র শব্দ বসিয়ে মন্ত্রটিকে
    পরিমার্জিত করেন। নররূপী নারায়ণ পুরুষোত্তম রামচন্দ্রকে কেন্দ্র করে
    সবাইকে ধর্ম পালন করতে উদ্বুদ্ধ করলেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর
    বললেন—-গুরু মানেই সদগুরু–আচার্য্য। গুরু-পুরুষোত্তমই সচ্চিদানন্দের
    মূর্ত্ত বিগ্রহ, তিনিই রূপায়িত ঈশ্বর প্রেরণা, তিনিই আত্মিক শক্তির
    প্রোজ্জ্বল প্রকাশ, অস্তিবৃদ্ধির পরম অমৃতপথ। দুনিয়ার যত দ্বন্দ্বের মাঝে
    অন্বয়ী সার্থকতার সারকেন্দ্র তিনিই। তাঁকে ভালবেসে, তাঁর ইচ্ছা পরিপূরণ
    ক’রে, তদনুগ আত্মনিয়ন্ত্রণে, তাঁরই সঙ্গ, সাহচর্য্য ও সেবার ভিতর-দিয়ে
    মানুষ ঈশীস্পর্শ লাভে ধন্য হয়। আর গুরু-পুরুষোত্তমকে direct (সরাসরি)
    যারা না পায়, তারা তঁদনুবর্ত্তী আচার্য্য-পরম্পরার ভিতর দিয়ে তাঁর ভাবটাই
    কিছু না কিছু পায়।…….. (আঃ প্রঃ ১/৪. ১২. ১৯৪১) তাঁর অবর্তমানে তাঁর আদর্শের ধারার প্রবহমানতা রক্ষা করার জন্য তঁদনুবর্ত্তী আচার্য্য-পরম্পরা বজায় রাখতে আচার্য্য হবার যোগ্যতাও
    নির্ধারণ করে বাণী দিলেন।
    ‘‘চরিত্র ও চর্য্যার
    নিষ্ঠা-বিনায়িত ইষ্টার্থবাহী
    বাস্তব সঙ্গতিশীল
    সার্থক অনুচলন যা’র নাই—
    বাক্য ও ব্যবহারে উদ্ভিন্ন হ’য়ে,—
    সে কিন্তু আচার্য্য হ’তে পারে না ;
    আচার্য্য হওয়ার ন্যূনতম ভূমিই এই। ১৯ ।’’ (আদর্শ-বিনায়ক)
    উপরোক্ত বাণীতে কোথাও কি তাঁর বংশধরদের কথা, জ্যেষ্ঠ-পরম্পরার কথা
    উল্লেখ করেছেন? তথাপি ওই নিদেশ-বাণীকে যদি আপনাদের আচার্য্যদেব মানতেন
    এবং সব্বাইকে মানাতে উৎসাহিত করতেন, তাহলে সৎসঙ্গের নীতি ও আদর্শ নিয়ে এত
    দলাদলি, ভেদাভেদ হবার কোন সুযোগই থাকত না। তাঁরা যদি তাঁদের মধ্যে
    ঠাকুরত্বকে জাগ্রত রাখার সদিচ্ছা পোষণ করতেন, তাহলে ইষ্টগুরু পুরুষোত্তম
    প্রদত্ত নিত্যকর্মের আবশ্যিক অনুশাসন, যেমন আহ্বানী, আচমণ, পুরুষোত্তম
    বন্দনা, আর্য্য-সন্ধ্যা, পঞ্চবর্হিঃ ও সপ্তার্চ্চিঃ মন্ত্রগুলো
    প্রার্থনা থেকে বাদ দিয়ে ‘প্রার্থনা-সময়সূচী’-র প্রচার করে নিত্য
    প্রার্থনা নামের পরাকাষ্ঠা দেখাতেন না। ঠাকুরের রচিত ইষ্টভৃতির মন্ত্র
    “ইষ্টভৃতির্ময়াদেব কৃতা প্রীতৈ তব প্রভো। ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু
    পারিপার্শ্বিকাঃ॥” বাদ দিয়ে অন্য মন্ত্র চালু করা হতো না! এ বিষয়েও তিনি
    আমাদের সচেতন করে দিতে বলে গেছেন—
    মতবাদ যাই হোক না,—
    আর, যে-কোন সম্প্রদায়ই হোক,
    যা’ মুখ্যতঃ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’কে
    স্বীকার করেনিকো—
    কোন-না-কোন রকমে,—
    তা’ কখনও অনুসরণ করতে যেও না,
    তা’ কিন্তু জঘন্য—অসম্পূর্ণ,
    সত্তা-সম্বর্দ্ধনার পরিপন্থী তা’ ;
    আর, ঐ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’ই হ’চ্ছে
    সেই রাজপথ—
    যা’কে স্বীকার ও গ্রহণ ক’রে চললে
    ক্রমশঃই তুমি সার্থকতায় সমুন্নত হ’তে পার। ২৩৪ । (সম্বিতী)
    ওই বাণী অনুসারে আপনারা জঘন্য পথে চলছেন চলুন। তাই বলে আমাকেও কি
    চলতে হবে? দেখুন দাদা, ঠাকুরের বলা বাণীকে অমান্য করে, ঠাকুর-বিরোধী চলনে
    চলার অধিকার আপনার বা আপনাদের যেমন আছে, তেমনি মান্য করার অধিকার তো
    আমার থাকা উচিত। তাই আমার একটা অনুরোধ আপনাদের বিচারে কোন গোষ্ঠীদ্বারা
    ঘোষিত বা নির্বাচিত আচার্য্যদেব(গণ) যদি সবই হয়, তাঁরাই যদি আপনাদের
    একমাত্র উপাস্য হয়, তাহলে শ্রীশ্রীঠাকুরের নাম না নিয়ে, তাঁর প্রতিকৃতি
    না রেখে, আপনাদের আচার্য্যদেবের প্রতিকৃতির উপাসনা করুন,—আমার কোন
    আপত্তি নেই, কিন্তু ঠাকুরের নামে মন্দির করে, ঠাকুরবাড়ি নাম দিয়ে ঠাকুরের
    আদর্শবিরোধী চলনে চলতে দেখলে প্রতিবাদ হবেই। আমরা শ্রীশ্রীঠাকুরের
    কৃষ্টিসন্তান, আমাদের উপর তিনি কাতর আবেদনে কিছু দায়িত্ব দিয়ে গেছেন—
    ‘‘আর্য্যকৃষ্টির যা’ ব্যাঘাত
    খড়্গে তোরা কর নিপাত। ভণ্ড ঠগী দেখবে যেথায়
    করো সামাল সবায়,
    কেউ যেন না ঠকে পড়ে
    ওদের ভাঁওতায়।’’
    ‘‘বড়খোকাই হো’ক—, মণিই হো’ক—বা কাজলই হো’ক— বা আপনারাই
    হোন— আপনাদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই আমি আশা করি যে আপনারা নিজেদের
    জীবনে ও চরিত্রে আমাকে বহন ক’রে নিয়ে বেড়াবেন এবং অন্যের কাছেও আমাকে
    পৌঁছে দেবেন—অবিকৃতভাবে, অবশ্য প্রত্যেকে তার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী। আর
    আমাকে বহন করা ও পৌঁছে দেওয়া মানে, আমার mission (আদর্শ ও উদ্দ্যেশ্য)-কে
    বহন করা ও পৌঁছে দেওয়া, আর আমার mission (আদর্শ ও উদ্দেশ্য) মানে সকলের
    mission (আদর্শ ও উদ্দেশ্য)। জীবনীয় প্রতিটি যা’-কিছুর ইষ্টানুগ
    সত্তাসম্বর্দ্বনাই আমার mission (আদর্শ ও উদ্দেশ্য)।’’ (আ. প্র. ৩/১৭. ১.
    ১৯৪২)
    ‘‘মানুষ, গোরু, পোকা-মাকড়, এমনকি একটা পিঁপড়া পর্য্যন্ত বাঁচতে
    চায়। মরতে চায় না কেউ। আমিও না। কিন্তু মানুষের শরীর চিরকাল থাকে না, এও
    ঠিক। তাই আমি বেঁচে থাকতে চাই আপনাদের মধ্যে। আপনারাই আমাকে ব’য়ে নিয়ে
    বেড়াবেন যুগ যুগ ধরে, ………….. আমাকে এইভাবে বাঁচিয়ে রাখার
    দায়িত্ব আপনারা গ্রহণ করুন। নইলে আমার কথাগুলি প্রাণ পাবে না। সেগুলি
    শূন্যে হাহাকার করে ফিরবে।’’ (আ. প্র. খণ্ড ১৮, পৃঃ ২৫০)
    এবার আমার প্রশ্ন, আপনাদের আচার্য্যদেব শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ
    পালনের মৌলিক ব্যাপারটা তো বিকৃত করে রেখেছেনই, আদর্শ প্রচারের জন্য কি
    কি করেছেন?
    —কেন, কত মন্দির তৈরি করেছেন, গণদীক্ষা দেওয়া চলছে।
    —ঠিক বলেছেন, মন্দির অবশ্যই হয়েছে বা হচ্ছে তা’ কিন্তু ঠাকুরের
    ঈপ্সিত মন্দির নয়, আপনাদের আচার্য্যদেবদের ঈপ্সিত।
    —এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত কোন প্রামাণ্য তথ্য দেখাতে পারবেন?
    —তাহলে মনোযোগ দিয়ে শুনুন—মন্দির, শ্রীমন্দির ও সৎসঙ্গ
    বিহার-এর গঠনতন্ত্র প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন—‘‘সব
    মন্দিরই শ্রীমন্দির। জায়গায় জায়গায় মন্দির বা সৎসঙ্গ বিহার ঠিক করা ভাল,
    যাতে লোকে meet (সাক্ষাৎ) করতে পারে। সেখান থেকে মানুষকে সবভাবে infuse
    (উদ্বুদ্ধ) করতে হবে। ধর্ম্ম কী, কৃষ্টি কী, সদাচার কী, বিবাহের নীতি
    কী, যোগ্যতার অনুশীলন কিভাবে করতে হয়, সেবানুচর্য্যার ভিতর দিয়ে সবাই
    পারস্পরিকভাবে সম্বন্ধান্বিত হয় কিভাবে ইত্যাদি কথা সেখান থেকে চারাতে
    হবে। মানুষকে practically educated (বাস্তবভাবে শিক্ষিত) করে তুলতে হবে।
    তাছাড়া মানুষের জন্য যতখানি যা করা যায় তাও বাস্তবভাবে করতে হবে
    মন্দিরগুলিকে কেন্দ্র করে। মন্দির থাকলে, ঋত্বিক থাকবে, dispensary
    (চিকিৎসাকেন্দ্র), হাসপাতাল, গবেষণাগার, তপোবনের শাখা ইত্যাদি থাকবে।
    হয়তো ঐ মন্দিরগুলিই এক একটা university (বিশ্ববিদ্যালয়) বা সর্ব্বতোমুখী
    শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।’’
    (আলোচনা-প্রসঙ্গে, ২১ খণ্ড, পৃঃ ৩১, ৪ঠা
    বৈশাখ, ১৩৫৯, বৃহস্পতিবার, ইং ১৭-০৪-১৯৫২) এই বইটাও কিন্তু আপনারা
    প্রকাশ করেছেন। এবার বলুন কি বলবেন, ঠাকুরের ঈপ্সিত মন্দির আপনারা কোথায়
    কোথায় করেছেন?
    অনিমেষদার প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারলেন না সুভাষদা।
    তাই কিছুক্ষণ থেমে অনিমেষদাই বললেন, দেখুন দাদা, শ্রীশ্রীঠাকুর
    মূলতঃ মানবদেহটাকেই শ্রীবিগ্রহ মন্দির করে গড়ে তুলতে বলেছেন। আমাদের
    মনগড়া মন্দির-নির্মাণ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন—‘‘আমার নামে দেখবে
    অনেক মন্দির হবে | কিন্তু আমার ইচ্ছা করে তোমাদের হৃদয়টা, চলমান জীবনটা
    আমার জাগ্রত মন্দির হোক | এবং আমাকে তোমরা সর্বত্র বয়ে নিয়ে বেড়াও | ধর্ম
    মানুষের জীবনের মধ্যে না থাকলে, আচরণের মধ্যে না থাকলে, ধর্মসঙ্ঘ থাকা
    সত্ত্বেও ধর্ম লোপ পায় | এবার সে ব্যাপারটা ঘটতে দিও না | আমার কথাগুলি
    মনে রেখো | এবং আমার কথাগুলি পৃথিবীর লোকে যাতে জানতে পারে, সময়মত তার
    ব্যবস্থা ক’রে যেও | কে কখন উপযুক্ত লোক আসবে, ঠিক কি? তবে আমার কাজটা
    হ’লো ঈশ্বরকোটি পুরুষের কাজ | যুগে যুগে তারা আসে | ঈশ্বর ছাড়া আর কিছুই
    তাদের মজাতে পারে না |’’
    ‘‘আমি নগণ্য মানুষ, কিন্তু পরমপিতা আমাকে দিয়ে যা বলালেন, যা
    করালেন, মনুষ্যসমাজ তার উপর না দাঁড়ালে, সব জ্ঞানগুণ সত্ত্বেও পৃথিবী
    মারামারি, হানাহানি, কাটাকাটির হাত থেকে রেহাই পাবে না। মানুষের সব শক্তি
    নিয়োজিত হবে সপরিবেশ আত্মহননে এবং জীবনের ভিত্তিভূমির ধ্বংসসাধনে। আমার
    বিশ্বাস, তোমরা যদি না কর, হয়ত বাইরের লোক এসে এ কাজ করবে। তোমরা যেই হও
    আর যাই হও না, বিকৃত হ’লে এ কাজ করবার অধিকার ও
    যোগ্যতা হারিয়ে ফেলবে। কামিনী-কাঞ্চনাসক্ত কতকগুলি ওঁছা লোক তোমাদের কাছে
    ভীড় জমাবে এবং আত্মস্বার্থের জন্য পরস্পর শকুনের মত কামড়াকামড়ি করবে।
    সৎসঙ্গে একদিন বৃষ্টির জলের মত টাকাবৃষ্টি হবে। সেই দিনই সৎসঙ্গের
    বিপদের দিন। ঐশ্বর্য্য ও ক্ষমতায় মাথা ঠিক থাকে খুব কম লোকেরই। যারা মনে
    করে ঐশ্বর্য্য ও শক্তি পরমপিতার, তিনিই মালিক, আমি এর
    অছিমাত্র, কাজলের ঘরে থাকা সত্ত্বেও তাদের গায়ে কালি লাগে না। নইলে মুস্কিল আছে।’’
    (‘আলোচনা-প্রসঙ্গে’-র সংকলক প্রফুল্ল কুমার দাস, এম.এ, প্রতি-ঋত্বিক প্রণীত
    ‘স্মৃতি-তীর্থে’ গ্রন্থের পৃষ্ঠা ১০২-১০৫ থেকে নির্বাচিত বাণী।)
    শ্রীশ্রীঠাকুরকে যদি মেনেই থাকেন তাহলে ঠাকুরের নিদেশ মেনে চলা
    উচিত। তাহলে কোন্ নিদেশ মেনে আপনাদের আচার্য্যদেব(গণ) ঠাকুরের নামে একের
    পর এক মন্দির নির্মাণ করে ইষ্ট প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে আত্ম প্রতিষ্ঠা করে
    চলেছেন!—এর কি উত্তর দেবেন বলুন?
    আর গণদীক্ষার কথা বলেছিলেন তো? তাহলে শুনুন—ঠাকুরের মতে, দীক্ষা
    হলো, কোন আদর্শকে সঞ্চারণা করার মাধ্যম। ঠাকুরের মূল আদর্শ—ঈশ্বর এক,
    ধর্ম এক, প্রেরিত-পুরুষ সেই এক-এরই বার্তাবাহী-র বার্তায় সবাইকে উদ্বুদ্ধ
    করা। দীক্ষার মাধ্যমে নাম-ধ্যান, শবাসন, থানকুনি পাতা সেবন, সত্তাপোষণী
    নিরামিষ আহার গ্রহণ, পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চিঃ-র অনুশাসন মেনে সদাচার
    এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন যাপন বিষয়ে উপদেশ দান এবং নিয়মনাগুলো শিখিয়ে
    দেওয়া। ওই নিয়মনাকে স্বীকৃতি দান করার মাধ্যম হল ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ
    পালন—যা দীক্ষাপত্রে উল্লেখ থাকে। এর জন্য কম করে ৩০ মিনিট সময় লাগা
    উচিত। অথচ গণদীক্ষার নামে যে ভাবে, যে হারে দীক্ষা দেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে
    তা নিয়ে একটা কর্মশালার মাধ্যমে সমীক্ষা চালালেই দেখা যাবে, তথাকথিত
    বেশিরভাগ দীক্ষিতগণ, ইষ্টাসনে একাধিক ফটো রেখে তার সামনে বসে বিনতি করা
    (যদিও তা’ সংখ্যায় নগণ্য), ইষ্টভৃতি এবং আচার্য্যভৃতির নামে পয়সা রাখা
    এবং মাস গেলে ‘উপযোজনা কেন্দ্রে’ পৌঁছে দেওয়া ভিন্ন কিছুই তারা জানে না।
    শ্রীশ্রীঠাকুরের জীবদ্দশায় একসাথে শতাধিক লোককে বসিয়ে দীক্ষা দান
    করার কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনার কথা জানা যায় নি। তৎকালিন ঋত্বিক দেবতারাও
    ছিলেন শ্রদ্ধা আকর্ষণী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তথাপিও শ্রীশ্রীঠাকুরকে
    আক্ষেপ করে বলতে হয়েছিল, —‘‘বৃত্তিতে তেল মালিশ করে বা
    স্বার্থপ্রত্যাশাকে উসকে দিয়ে মানুষকে দীক্ষিত করতে নেই। তা’তে মানুষ
    asset (সম্পদ) হয় না।’’ (আ. প্র. ৫ম খন্ড, ২৯. ১২. ১৯৪৩)
    —‘‘দ্যাখেন, (বীরেন ভট্টাচার্য্যের প্রতি) আজকাল আপনারা কতলোক
    দীক্ষা দিচ্ছেন, কিন্তু তার বেশীরভাগই বাজারী। ……ধর্ম্ম বলতে আমি যে
    সর্ব্বতোমুখী সঙ্গতিশীল কেন্দ্রানুগ কর্ম্মময় সার্থক জীবনের কথা বলি, তা
    অনেকেরই মাথায় ঢোকে না। ভাবে, আমাকে দিয়ে পরকালের পথ করে নেবে। কিন্তু
    পরিবার, দেশ, সমাজ, জাতি ও জগতকে …..দুনিয়াটাকে স্বর্গ করে তুলবে সে
    কথা আর ভাবে না।’’ (আলোচনা প্রসঙ্গে ৩য় খণ্ড, ১৩ই চৈত্র, শনিবার, ১৩৪৮,
    ইং ২৮। ৩। ১৯৪২)
    পরিবার, দেশ, সমাজ, জাতি ও জগতকে …..দুনিয়াটাকে স্বর্গ করে
    তোলার জন্য একদা দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রম থেকে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল,
    আলোচনা পত্রিকার, মাঘ সংখ্যার, ১৫০ পৃষ্ঠা থেকে তার একটা ক্ষুদ্র চিত্র
    তুলে ধরছি।
    “সৎসঙ্গের বর্তমান সর্বপ্রধান লক্ষ্যবস্তু হইল বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার,
    দেশীয় ঔষধপত্র প্রস্তুতের রসায়ণাগার ও কারখানা, হাসপাতাল, প্রসূতিসদন,
    বালক-বালিকাদের শিক্ষার জন্য উচ্চ বিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্র,
    কুটির-শিল্প ভবন, কৃষিপরীক্ষা-ক্ষেত্র প্রভৃতি স্থাপন পূর্বক পাবনার
    ন্যায় একটি আদর্শ পল্লী-উন্নযন কেন্দ্রের পুণঃ প্রতিষ্ঠা করা। প্রসঙ্গতঃ
    ইহা উল্লেখযোগ্য যে, অতীতের সেই পাবনা-সৎসঙ্গ পল্লী সংগঠনের উজ্জল
    আদর্শরূপে অদ্যাপি সারা ভারতে প্রসিদ্ধ হইয়া আছে. আর শুধুমাত্র বিহারেই
    নয়, পরন্তু ভারতের সকল প্রদেশেই এইরূপ আদর্শ কেন্দ্র স্থাপন করাই
    সৎসঙ্গের অভিলাষ।
    শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি আবাসিক পল্লী-বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন
    পূর্বক শ্রীশ্রীঠাকুরের পরিকল্পনাগুলির বাস্তব রূপায়নের উচ্চাকাঙ্খাও
    সৎসঙ্গ পোষণ করিয়া চলিয়াছে।……” (আলোচনা, মাঘ, ১৩৬৫/পৃঃ ১৫০)
    উক্ত দলিল থেকে প্রাপ্ত সংবাদে এটুকু বোঝা গেল যে, পাবনার হিমাইতপুর
    আশ্রমে শ্রীশ্রীঠাকুর যথেষ্ট প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে যে-সব
    কর্ম-প্রতিষ্ঠানসমূহ গড়ে তুলেছিলেন, তদনুরূপ কেন্দ্র ভারতের প্রতিটি
    প্রদেশে স্থাপন করা হবে। এবং একটি শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা
    হবে,—যা শ্রীশ্রীঠাকুরের এক অন্যতম ইচ্ছা।
    এবার দেখে নেওয়া যাক পাবনার হিমাইতপুর-আশ্রমের কর্ম-প্রতিষ্ঠানসমূহের এক
    সংক্ষিপ্ত বিবরণ।
    অখ্যাত পল্লী হিমায়েতপুরে বায়ু থেকে বিদ্যুত উত্পাদন করে পরম বিস্ময়
    সৃষ্টি করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। গড়ে তুলেছিলেন—তপোবন ও মাতৃ বিদ্যালয়—যা
    শিক্ষাক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। কলকাতা
    বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত মনোমোহিনী ইনষ্টিউট অফ সায়েন্স এণ্ড টেকনোলজি
    নামের বিজ্ঞান কলেজ। কেমিক্যাল ওয়ার্কসের জীবনদায়ী ঔষধসমূহ দেশে এবং
    বিদেশে সমাদৃত হয়েছিল।
    বৈদ্যুতিক এবং যন্ত্রশিল্পের আধুনিক সব ধরণের কাজ হতো ইলেকট্রিকাল ও
    মেকানিক্যাল ওয়ার্কসপে। যথা,–ঢালাই, ঝালাই, লেদের কাজ, ডাইস,
    ইলেক্ট্রোপ্লেটিং, ইলেক্ট্রিক্যাল ফিটিং, আরমেচার, ব্যাটারি প্লেট তৈরি ও
    মেরামত, ডায়নামো মেরামত ইত্যাদি। ছিল—ময়দার কল, আটার কল, চালের কল, তেলের
    কল, চিনির কল, মেডিকেটেড ওয়াটার মেশিন, স্পাইস পাউডারিং, সুতার গুটি
    তৈরি, টেলারিং, বোতাম তৈরি, গ্লাস ব্লোয়িং, পটারী ওয়ার্কস্, বেকারী,
    লজেন্স তৈরি, গ্রোসারী প্রোডাক্ট ইত্যাদির শিল্প। ছিল—কার্ডবোর্ড
    কারখানা, স্টীমলণ্ড্রী, কটন ইণ্ডাস্ট্রিজ, হোশিয়ারী শিল্প, ব্যাঙ্ক,
    ইঞ্জিনীয়ারিং ওয়ার্কস্, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র, স্বাস্থ্য বিভাগ,
    গৃহনির্মাণ বিভাগ, কলাকেন্দ্র, প্রেস (যেখানে বাংলা, হিন্দী, সংস্কৃত,
    উর্দু, আরবী, ফারসী হরফের কাজ হতো, দেশ ভাগের পর পাকিস্তান সরকার জবরদখল
    করে ঢাকাতে নিয়ে যায়।), পাব্লিশিং হাউস, ফিলানথ্রপি, মাতৃসঙ্ঘ ইত্যাদি।
    (তথ্যসূত্রঃ ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনী গ্রন্থ)
    শুধু আশ্রমবাসীরাই নয়, জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায়-ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে সকলেই
    ওইসব প্রতিষ্ঠানের সুলভ সেবা পেতেন। তথাপিও পাকিস্তান সরকার ওই সর্বজনীন
    কল্যাণধর্মী প্রতিষ্ঠানসমূহ দখল করে কেন বিনষ্ট করেছিলেন তার উত্তর আমার
    জানা নেই।
    যেমন জানা নেই, আলোচনা পত্রিকাতে বর্ণিত শ্রীশ্রীঠাকুরের একান্ত
    ইচ্ছাগুলোর বাস্তবায়ন দেওঘর সৎসঙ্গ কর্তৃপক্ষ করেছেন কি-না। যদি করে
    থাকেন কোথায় করেছেন, তার উদাহরণ দিন। ওই ইষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দেখার পর
    আপনার সাথে গলা মিলিয়ে ‘আচার্য্যদেব কি! —জয়!’ ধ্বনি দিয়ে
    জীবনটাকে ধন্য করব। না, না, আপনার এক্ষুনি জানাতে হবে না, আপনাকে এক মাস
    সময় দিচ্ছি। আশাকরি এই সময়ের মধ্যে আপনি সব তথ্য সংগ্রহ করে আমাকে
    জানাতে পারবেন। আর যদি অনিবার্য্য কোন কারণে জানাতে না পারেন, তাহলে
    পরমপিতার একটা ভয়াল বাণী শুনে নিন।
    সবাই ক্ষমা পাবে—
    তা’ তা’রা যেমনতর অপরাধেই
    অপরাধী হোক না কেন,
    কিন্তু ক্ষমা পাবে না তারাই—
    যা’রা পবিত্র সত্তাকে
    অবমানিত করে,
    অবলাঞ্ছিত করে,
    —তা’ কখনও নয়।
    (ধৃতি-বিধায়না, ২য় খণ্ড, বাণী সংখ্যা ১১৬)
  • * *
    যদিও অনিমেষদা, সুভাষদাকে কথাগুলো বলেছিলেন। তবুও কেন জানি আমার ভয়
    ভয় করছে। দেওঘরের আচার্য্যদেবদের পাল্লায় পড়ে এ কোন্ বিপদে আবার পড়লাম!
    আমার আবার কিছু হবে না তো! আমি ক্ষমা পাব তো ? হে দয়াল! তুমি রক্ষা কোরো।

tapanspr@gmail.com

দূষণ নিয়ন্ত্রণ

।। দূষণ নিয়ন্ত্রণ দিবস স্মরণে নিবেদন ।।


[2রা ডিসেম্বর, 1984-এর ভয়ঙ্কর রাতে, ভোপালে ইউনিয়ন কার্বাইড ইন্ডিয়া লিমিটেড কীটনাশক প্ল্যান্ট থেকে একটি গ্যাস লিক হওয়ার ফলে হাজার হাজার মানুষ মারা যায় এবং অর্ধ মিলিয়নেরও বেশি লোক আক্রান্ত হয়। এই বিপর্যয় শিল্প অবহেলার গুরুতর পরিণতি এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে । জাতীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ দিবস এই ইভেন্টের স্মরণ হিসাবে কাজ করে এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের বিপর্যয় এড়াতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার গুরুত্বের উপর জোর দেয়।

  1. সচেতনতা এবং শিক্ষা: এই দিনটি ক্রমবর্ধমান দূষণের মাত্রা সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এবং তাদের কার্বন পদচিহ্নগুলি হ্রাস করার পদ্ধতি এবং অনুশীলনগুলি সম্পর্কে জনসাধারণকে শিক্ষিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি তথ্য প্রচারের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসাবে কাজ করে, একটি আরও পরিবেশ সচেতন সমাজকে উত্সাহিত করে৷
  2. পলিসি রিইনফোর্সমেন্ট: এটি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি উপলক্ষ যাতে তারা নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাগুলিকে পুনর্বিবেচনা করে, যাতে শিল্পগুলি পরিবেশগতভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ অনুশীলনগুলি মেনে চলে। দিবসটি শিল্পগুলিকে তাদের পরিবেশগত প্রভাব হ্রাস করে টেকসই এবং সবুজ প্রযুক্তি গ্রহণ করার আহ্বান জানায়।
  3. জনসাধারণের সম্পৃক্ততা: এই দিনে বিভিন্ন কর্মসূচি, কর্মশালা এবং প্রচারণার মাধ্যমে জনসাধারণকে দূষণ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের জন্য নিযুক্ত ও উৎসাহিত করা হয়। পরিবেশ নীতির সফল বাস্তবায়নের জন্য এই ধরনের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
    স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের উপর প্রভাব
    দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব বহুগুণ। বায়ু দূষণের ফলে শ্বাসযন্ত্রের রোগ, হৃদরোগ, এমনকি ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। জল দূষণ জলজ জীবনকে প্রভাবিত করে এবং দূষিত জল গ্রহণ করলে মানুষের জন্য উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে। মাটি দূষণ কৃষিকে প্রভাবিত করে, যার ফলে ফসলের ফলন এবং গুণমান হ্রাস পায়।
    তদ্ব্যতীত, অনিয়ন্ত্রিত দূষণ বিশ্ব উষ্ণায়নে অবদান রাখে, যা অনিয়মিত আবহাওয়ার ধরণ, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির দিকে পরিচালিত করে। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধি এবং কৃষি উৎপাদনশীলতা হ্রাসের সাথে অর্থনৈতিক প্রভাবগুলিও উল্লেখযোগ্য।
  4. কঠোর প্রবিধান: ভারতের জন্য কঠোর দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রবিধান থাকা অপরিহার্য। নিয়মিত পরিদর্শন, খেলাপিদের জন্য জরিমানা এবং সবুজ অনুশীলনের জন্য প্রণোদনা কার্যকর হতে পারে।
  5. প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন: সবুজ প্রযুক্তি গ্রহণ করা, যেমন নবায়নযোগ্য শক্তির উত্স, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং টেকসই কৃষি অনুশীলন, উল্লেখযোগ্যভাবে দূষণ কমাতে পারে।
  6. জনসাধারণের অংশগ্রহণ: সম্প্রদায়, এনজিও এবং ব্যক্তিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। বৃক্ষ রোপণ, বর্জ্য পৃথকীকরণ, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করা এবং পানির অপচয় কমানো সহজ কিন্তু কার্যকর উপায় যা নাগরিকদের অবদান রাখতে পারে।
  7. বিশ্বব্যাপী সহযোগিতা: দূষণ একটি বিশ্বব্যাপী সমস্যা। দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতামূলক প্রচেষ্টা কার্যকরভাবে দূষণ মোকাবেলায় ভাগ করা জ্ঞান, সম্পদ এবং প্রযুক্তির দিকে পরিচালিত করতে পারে।
  8. অবিচ্ছিন্ন শিক্ষা: স্কুল, কলেজ এবং পাবলিক প্ল্যাটফর্মগুলিকে পরিবেশগত শিক্ষা, সংরক্ষণের মূল্যবোধ এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে টেকসই জীবনযাপনকে একীভূত করা উচিত।
    উপসংহারে, জাতীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ দিবস শুধু স্মরণের দিন নয়, কর্মের আহ্বান। এটি দূষণ মোকাবেলা, আমাদের পরিবেশ রক্ষা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যত নিশ্চিত করার জরুরি প্রয়োজনের ওপর জোর দেয়।
    ভারত, তার বিশাল জনসংখ্যা এবং দ্রুত শিল্পায়ন সহ, একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আজকে করা পছন্দগুলি ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া পরিবেশগত উত্তরাধিকার নির্ধারণ করবে।
    এই দিনটি আমাদের দায়িত্ব এবং ভারতকে আরও সবুজ, পরিচ্ছন্ন এবং স্বাস্থ্যকর জাতি হিসাবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সম্মিলিত প্রচেষ্টার স্মারক হিসাবে পরিবেশন করুন।]

।। এ বিষয়ে করণীয় কর্তব্য ।।
দূষণ নিয়ন্ত্রণে আমাদের ভূমিকা হলো দৈনন্দিন জীবনে কিছু সহজ অভ্যাস পরিবর্তন করা, যেমন— গণপরিবহন ব্যবহার করা, বর্জ্য পৃথকীকরণ করা, বিদ্যুৎ ও জল ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া এবং প্লাস্টিক ও অন্যান্য দূষণকারী পদার্থ ব্যবহার কমানো। এছাড়াও, ‘3Rs’ ধারণা, অর্থাৎ হ্রাস (reduce), পুনর্ব্যবহার (reuse) এবং পুনর্ব্যবহার (recycle) করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের ভূমিকা
‘3Rs’ নীতি অনুসরণ: বর্জ্য উৎপাদন কমানো (reduce), জিনিসপত্র পুনরায় ব্যবহার করা (reuse) এবং রিসাইকেল করা (recycle)।
যাতায়াত: ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন (যেমন বাস, ট্রেন) ব্যবহার করা।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: বর্জ্যকে সঠিকভাবে পৃথক করা এবং একটি সঠিক পদ্ধতিতে তা নিষ্পত্তি করা।
শক্তি সাশ্রয়: বাড়ির বা অফিসের লাইট, ফ্যান এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারের সময় সাশ্রয় করা।
প্লাস্টিক বর্জন: প্লাস্টিক এবং অন্যান্য অপচনশীল বর্জ্য উৎপাদন ও ব্যবহার কমানো।
বৃক্ষরোপণ: গাছ লাগানো এবং সবুজায়ন বাড়ানো, কারণ গাছ বাতাসকে বিশুদ্ধ করতে সাহায্য করে।
সচেতনতা তৈরি: পরিবার, বন্ধু এবং সমাজে দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

আইন মেনে চলা: দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত সরকারি আইন ও নিয়মকানুন মেনে চলা। (সংগৃহীত)

।। পরিবেশের এবং মনুষ্যত্বের দূষণ প্রতিরোধে করণীয় কর্তব্য ।।


বিশ্ব-প্রকৃতির পরম দান, পঞ্চ-মহাভূত—ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-এর অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই পৃথিবী নামক সবুজ গ্রহটি। নগর-সভ্যতার ধারক-বাহকেরা আসুরিক ক্ষমতার বলে, ভোগবাদের ছাড়পত্রের বলে, আদর্শহীনতার বলে ভারতীয় ধর্মের অঙ্গীভূত পঞ্চ-মহাযজ্ঞ, সদাচার এবং বর্ণাশ্রমকে বিদায় জানিয়ে বসুন্ধরার পরিবেশকে যে ধ্বংসাত্মক পথে এগিয়ে দিয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘নাসা’-র গবেষণা। উদ্বেগ প্রকাশ করে গিয়েছিলেন কবিগুরু, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর’-এর প্রতিবাদী বাণীতে।
ভারতবর্ষের বৃহত্তম নদী গঙ্গাকে আমরা মা বলি, যাঁর পূত স্রোতধারায় স্নাত হয়ে পবিত্র হই, সেই মায়ের শরীরে নগর-সভ্যতার পুর-বিভাগ যখন পরিকল্পিতভাবে পূতিগন্ধ ক্লেদ নিক্ষেপ করে, ধর্মের ধ্বজাধারীরা তথাকথিত পূজা-পার্বনের বর্জ্য নিক্ষেপ করে পুণ্য অর্জন করে, তখন মনে হয় না যে আমরা কোন উন্নত সভ্যতার সভ্য, প্রগতি বাদের বাদী, আর্য্য সংস্কৃতির ধারক বাহক ধার্মিক।
পরিবেশ সম্বর্দ্ধনার সেই পরম অনুশীলন কি ভাবে বিকৃত হয়েছে সে বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই। বরং বসুন্ধরার পরিবেশকে রক্ষা করার ব্রতে কিভাবে ব্রতী হওয়া যায় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের উপদেশ মেনে আমাদের প্লাস্টিক-সভ্যতার কর্ণধারেরা যাতে পরিবেশ বান্ধবের ভূমিকা গ্রহণ করেন। রাষ্ট্র নায়কেরা যা’তে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, ভূমিদূষণ, ভূ-স্তরদূষণ, জলদূষণ প্রতিরোধ করে গ্লোবাল-ওয়ার্মিং বা বিশ্ব-উষ্ণায়ন-ভ্রূকুটি থেকে সভ্যতাকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হন, সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে, জনমত গঠন করতে হবে, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের লাগামহীন ভোগের চাহিদা মেটাতে যে হারে ভূ-গর্ভস্থ তেল, গ্যাস, কয়লা, বিবিধ আকরিক উত্তোলন করতে গিয়ে ভূ-স্তরের অবক্ষয়কে আহ্বান করে চলেছি, ধ্বংস করে চলেছি ‘রেন ফরেস্ট’কে। এর বিরুদ্ধে সরব না হলে কোন মূল্যেই বাঁচানো যাবে না মানব সভ্যতাকে!
আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর পূর্বে পরম বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরব হয়েছিলেন এই ভয়াবহ পরিস্থিতি প্রতিরোধ মানসে। প্রাতঃ-স্মরণীয় পদার্থবিজ্ঞানী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যকে উৎসাহ দিয়ে হিমাইতপুরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র। বিজ্ঞান-বিষয়ক অত্যাশ্চর্য্য বহুকিছুর সাথে সন্ধান দিয়েছিলেন সহজলভ্য আবহাওয়া বিদ্যুতের। ভূ-গর্ভস্থ প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন পরবর্তী শূন্যগর্ভ অবস্থাকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে কিভাবে পুণঃ-পূর্ণকরণ বা রিফিলিং করলে ভূ-স্তরের ক্ষতি হবে না সে বিষয়েও তিনি বলে গেছেন। তাঁর প্রদত্ত ওইসব ফরমূলাকে বাস্তবায়িত করতে পারলে ভূ-স্তরকে বিনষ্ট না করে, পরিবেশকে দূষিত না করেই প্রাকৃতিক দৌ-শক্তিকে কাজে লাগিয়ে শক্তি-সম্পদে সমৃদ্ধ হতে পারত আমাদের সভ্যতা।
আমরা জানি, ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। আমাদের অস্তিত্বের ধারক, পালক-পোষক পরমাপ্রকৃতির পঞ্চ-মহাভূত। উক্ত পঞ্চ-মহাভূতের অজৈব উপাদানের সমাহারে পুষ্টি পেয়ে প্রাণপঙ্ক মাত্রেরই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ পরিবেশ এই বসুন্ধরা—নীল-সবুজ গ্রহ। ধারণ করতে হবে ওই প্রাকৃতিক উপাদানসমূহকে, ওঁদের বিনাশ করলে আমরাও বিনাশ হবো। নচেৎ বিশুদ্ধ জলের বোতলের মত অক্সিজেন সিলিণ্ডার পিঠে বয়ে ঘুরতে হবে একদিন নিকট ভবিষ্যতে।
পল-বিপল, দণ্ড-প্রহর, অহোরাত্র, আহ্নিকগতি, বার্ষিকগতির দিনরাত, মাস, বছর হয়েই চলেছে আদিকাল থেকে, প্রাকৃতিক নিয়মে। দিন-মাস-বছর আসে যায়, রেখে যায় কিছু স্মৃতি মনের মণিকোঠায়। ওই স্মৃতির মালাগুলোকে স্মৃতিবাহীচেতনার ভল্টে অনন্তকাল জমা করে রাখার জন্য আর্য্য-ঋষিরা প্রতিটি মুহূর্তের জীবন ধারণের আহরণ শুদ্ধির মাধ্যমে ধ্রুবাস্মৃতির সন্ধান দিয়ে গেছেন ‘‘আহারশুদ্ধৌ সত্তাশুদ্ধি, সত্তাশুদ্ধৌ ধ্রুবাস্মৃতি’’ মন্ত্রে । শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র স্বস্ত্যয়ণী ব্রতের ‘নিয়তং স্মৃতিচিদয়ুতে’ মন্ত্রে য়াকে সমৃদ্ধ করেছেন। য়ে মুহূর্ত চলে যাবে তা আর ফিরে আসবে না। চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা সমৃদ্ধ সবুজ গ্রহ পৃথিবীর প্রতিটি মুহূর্তকেই যাতে চিরনবীনতায় আস্বাদন করতে পারি, উপভোগ করতে পারি সেজন্যই আর্য্য সভ্যতার ঊষা লগনে পরমপিতার প্রতিভূ আর্য্য ঋষিগণ ‘‘মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ……..’’ মন্ত্রে বন্দনা করে বসুন্ধরার মধুময় পরিবেশকে রক্ষা অর্থাৎ পূজা করতে শিখিয়েছিলেন। পূজা শব্দের অর্থ পূরণ করা, সম্বর্দ্ধনা, সম্যকভাবে বর্দ্ধনার লক্ষ্যে এগিয়ে চলা। যেমন-যেমন আচরণে, পরিবেশের অজৈব উপাদানসমূহকে রক্ষা করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া যায় তাই ছিল আর্য্য ভারতের পূজা, যজ্ঞ, হোম, উৎসবের তাৎপর্য্য।
আমরা যে ৩৩ কোটি দেবতার কথা শুনেছি সে সংখ্যাটা ৩৩,০০০০০০০ নয়, শুধুই ৩৩। কোটি অর্থে (piece) বোঝান হয়েছে, যথা, জীবকোটি, ঈশ্বরকোটি একক অর্থে ব্যবহৃত হয়।
বাস্তবে আমাদের এই সবুজ গ্রহের জীবকূলের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জৈবাজৈব রসদের যোগানদাতার মূল মালিক সূর্য। সূর্যর আর এক নাম আদিত্য। আদিত্য মানে দেবতা। দেদীপ্যমান যা তাকে দেবতা বলে। দেবতা মানে দ্যুতি বিশিষ্ট সত্তা। সব দেবতাই মূলতঃ পরব্রহ্মের প্রতীক। যেমন পৃথিবীর অধিপতি অগ্নি, অন্তরীক্ষে ইন্দ্র বা বায়ু ও দ্যুলোকে সূর্য। পৃথিবী, অন্তরীক্ষ এবং দ্যুলোক-এর প্রতিটি স্থানে ১১টি করে বেঁচে থাকার আবশ্যিক উপাদান সরবরাহকারী দেদীপ্যমান উৎস রয়েছে। উক্ত ৩৩টি জীবনীয় উৎস-সমূহকে দেবতা বলা হয়েছে উপনিষদে।
বৃহদারণ্যক উপনিষদ (৩য় অধ্যায়, ৯ম ব্রাহ্মণ)-এর ঋষি শাকল্য, ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য সমীপে দেবতার সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি অষ্টবসু, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্যাদি ৩১ সংখ্যক দ্যুতিবিশিষ্ট প্রাকৃতিক সত্তা এবং ইন্দ্র ও প্রজাপতি মিলিয়ে ৩৩ সংখ্যক দেবতার উল্লেখ করেছিলেন। ওই ৩৩ কোটি (33 pieces) দেদীপ্যমান উৎসসমূহকে রক্ষা করার প্রশ্নে আমরা প্রবৃত্তি পরবশ হয়ে যাতে দুর্বৃত্ত না হই তারজন্য উপনিষদের ঋষিগণ ‘আত্মানং বিদ্ধি’-র শপথ বাক্যের পাঠ দিলেন।—পরমপিতার সন্তান তুমি, নিজেকে জানো, নিজের প্রতিরূপ মনে করে পরিবেশকে বাঁচাও, নিজে বাঁচ। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’—জীবনবিধ্বংসী আচরণ ত্যাগ করে জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলো। ‘মা গৃধ’—লোভ করো না। সদাচার এবং বর্ণাশ্রম মেনে চলো। পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে নিজে সমৃদ্ধ হও। এই ছিল ভারতবর্ষের বিধি-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠনের, ধর্মের, পূজার, উৎসবের বাস্তব রূপ। ওই হৃত-গৌরব যুগোপযোগী করে পুণঃ-প্রতিষ্ঠিত করে গেলেন সব দেবতার সমাহারের প্রতীকস্বরূপ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। যার প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয় তাঁর প্রদত্ত ‘আর্য্য সন্ধ্যা’ প্রার্থনা মন্ত্রে।
আমরা, ভারত রাষ্ট্রের অধিবাসীরা ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের পবিত্র মন্ত্র মূণ্ডকোপনিষদের ‘সত্যমেব জয়তে’-র মধ্যে নিহিত সত্যের সন্ধান করার চেষ্টা করতে হবে। ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টি রক্ষার পবিত্র কর্তব্য ভুলে, ধর্মের নামে কতগুলো কু-সংস্কারে, আর বিজ্ঞানের নামে ভোগবাদে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছি। অথচ বিশ্বের পরিবেশ বিজ্ঞানীরা প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে, ভারতীয় পঞ্চ-মহাযজ্ঞের বিধানকে, সমাজ বিজ্ঞানীরা সমাজ-বন্ধনের দৃঢ়তার অবক্ষয় রোধে, শ্রেণী-বিন্যস্ত বর্ণাশ্রমানুগ সমাজ ব্যবস্থার বিধানকে এবং প্রজনন বিজ্ঞানীরা সুস্থ মানবজাতি গঠনের জন্য সুবিবাহ ও সুপ্রজনন বিধিকে মেনে চলতে পরামর্শ দিয়েছেন।
বেদ-উপনিষদ-গীতা. ঋষি এবং মহাপুরুষদের নিদেশে কোথাও প্রচলিত পূজার নামে, অনিত্য বস্তুর উপাসনার নামে, হৈ-হুল্লোর করে পরিবেশ দূষণ করার অনুমোদন নেই। ব্যক্তি চরিত্র গঠনের নিমিত্ত সাধন-ভজন-আরাধনা বাদ দিয়ে যে তন্ত্রমতে আমরা পরিবেশ দূষণ করতে প্রতিমা পূজায় মেতে উঠি, সেই তন্ত্র-ই প্রতিমা পূজাকে ‘‘বাহ্যপূজা অধমাধম’’ বলে বর্ণনা করেছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও, ‘‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’’ ছন্দের ডালিতে প্রতিমা পূজার অসারতার বার্তা রেখে গেছেন।
বসুন্ধরার পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, এক বিপ্লব নিয়ে এলেন। ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে, ধর্ম বলে জানিস তাকে। বাঁচা-বাড়ার মর্ম যা, ঠিকই জানিস ধর্ম তা। Upholding urge of existence is Dharma.’……..ইত্যাদি বাণীর মাধ্যমে। অতএব, চাঁদার জুলুম, ফুল, বেলপাতা, ধূপহীন ধূপকাঠি, নৈবেদ্য, দশ-(অ)কর্মার ফর্দ, ঢাক, ঢোল, বাজি, হৈ-হুল্লোর, তার শব্দে মাইকের ডালি দিয়ে নয়— তোমাকে ধার্মিক হতে হলে আগে পরিবেশকে বাঁচাতে হবে। সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বাস্তব কর্মে ব্রতী হতে হবে। পরিবেশ হিতৈষী হতে হবে, তবেই তুমি ভারতীয় মতের ‘ধার্মিক’ অভিধায় ভূষিত হতে পারবে।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের অনুগামীদের নিত্য ইষ্টভৃতি করতে হয়। ইষ্টভৃতি মানে ইষ্ট কর্মের ভরণ। ইষ্টকর্ম মানে পূর্ত্তকর্ম—পরিবেশের উপাদানকে,পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখার বাস্তব কর্ম। যা প্রকৃত ইষ্টভৃতির মন্ত্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ ।” এর সরলার্থ খুব সহজ। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুযায়ী সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন বর্দ্ধনার বিধি মেনে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে চলেন যিনি, এমন গুরুভাই-ই প্রকৃত ইষ্টভ্রাতা।–যাঁর আপদে-বিপদে সাধ্যানুগ সাহায্য করতে হবে। ভূত মানে,–ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা পরিবেশের অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। সেগুলোকে প্রাণ পণ করে রক্ষা করতে হবে। প্রতিনিয়ত এই শপথ মেনে চলার নাম ইষ্টভৃতি। অতএব প্রতিটি আমি যদি প্রকৃত ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের যাজ্ঞিক হবার শপথ পালন করতে পারি তাহলেই অনেকাংশে রক্ষা করা যাবে সুজলা-সুফলা-মলয়জ-শীতল বসুন্ধরার পরিবেশকে।
এ যুগের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমাদের সচেতন করে দিতে বাণী দিয়ে বললেনঃ
‘‘ইষ্টভরণ, পিতৃপোষণ,
পরিস্থিতির উন্নয়ন,
এ না করে, যাই না করিস
অধঃপাতেই তোর চলন।’’
ওই অধঃপতন থেকে মধুময় বসুন্ধরার পরিবেশকে, মানব সভ্যতাকে, মানবতার অপমৃত্যুকে রক্ষা করতে কৃপা পরবশ হয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর ‘পঞ্চবর্হি’ এবং ‘সপ্তার্চ্চি’ পালনের অনুশাসন দিলেন। দলীয় প্রীতির কবলে পড়ে মৃত্যুকে অবলুপ্ত করার সেই অনুশাসন বিধিকে অবজ্ঞা করার স্পর্দ্ধা যেসব তথাকথিত সৎসঙ্গীরা দেখাচ্ছেন, তাদের অধঃপতনকে প্রতিরোধ করতে হলে, তাদেরও সামিল করতে হবে উক্ত ইষ্ট-ভরণের অনুশাসন পালনে। তা যদি না করি আমরাও কিন্তু বঞ্চিত হব ‘ইষ্ট ভরণের’ পবিত্র কর্ম থেকে।
জয়গুরু, বন্দে পুরুষোত্তমম্!


tapanspr@gmail.com

পাবনা সৎসঙ্গ আশ্রমের ইতিহাস

** সৎসঙ্গের পুরানো সেই দিনের কথা**
।। পাবনাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের অবদান।।
[এই নিবন্ধের লেখক ভক্তপ্রবর ধীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, যাঁর যাজনে উদ্বুদ্ধ হয়ে সৎমন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন ঋত্বিগাচার্য্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য মহোদয়। লেখাটি ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র গ্রন্থ-এর ২য় খণ্ড থেকে সংগৃহীত।]
সেই ইংরেজী ১৯২৫ খৃষ্টাব্দের কথা। হিন্দু মুসলমানের দাঙ্গায় তখন বাংলার মাটী রক্তাক্ত। পাবনা জেলার লোক-সংখ্যার ৭৫ ভাগ মুসলমান । বাদ বাকী অন্য ধর্মাবলম্বী—তন্মধ্যে হিন্দুর সংখ্যা খুবই অল্প। নগণ্য সংখ্যক হিন্দুদের মধ্যে কোন সংহতি নাই । প্রভাব ও প্রতিপত্তির মোহে হিন্দুগণ পরপর বিদ্বিষ্ট। ঈর্ষান্বিত হিন্দুগণ প্রতিদ্বন্দ্বী হিন্দুকে পর্যুদস্ত করবার জন্য মুসলমানগণের সাহায্য নিতেও দ্বিধা বোধ করেন না। মুসলমান দ্বারা কোন হিন্দু নারীর নারীত্বের লাঞ্ছনা হলেও হিন্দু প্রতিবেশী ক্ষুব্ধ হওয়া তো পরের কথা বরং সেই লাঞ্ছনার সুযোগ নিয়ে সেই গৃহস্থকে কি করে আরও বিপদে ফেলা যায় সে চেষ্টাতেও কুণ্ঠিত নন। সংখ্যালঘিষ্ঠ হিন্দুগণের আত্মরক্ষার জন্য যেখানে তাঁদের সংহতির একান্ত প্রয়োজন—ঈর্ষার নীচতায় সেখানে তাঁরা পরস্পর বিদ্বিষ্ট।
এই নিকৃষ্টতম পরিবেশে মহামানব শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আবির্ভাব। বাংলার প্রতি জেলায় জাতিধর্ম নির্বিশেষে অগণিত নরনারী তাঁর চরণাশ্রয়ে অভিনব চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে উঠল। প্রেমের বন্ধনে তারা হল একাত্ম।ক্রমে ক্রমে বহু বিদ্বজ্জন, বরেণ্য নেতাগণ, বৈজ্ঞানিক ও শিল্পবিদ মনীষিগণের আগমনে হিমাইতপুর সৎসঙ্গবাটী মুখর হয়ে উঠল। অত্যল্পকাল মধ্যেই সেই জঙ্গলাকীর্ণ শ্বাপদসঙ্কুল আশ্রমবাটী হর্ম্যসঙ্কুল নগরে হল পরিণত। নানাবিধ শিল্পবাটী, বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার, বিদ্যায়তন প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের জন্য সৎসঙ্গ আশ্রমের পরিধি বিস্তৃত হয়ে চলল। শ্রী ও সম্পদে এই তীর্থ অভিনব সৌন্দর্যে হল প্রস্ফুটিত। বাংলার লক্ষ লক্ষ নরনারী শ্রীগুরু দয়ালের জয়গানে হল মুখরিত। পাবনা জেলাতেও কিছু-সংখ্যক হিন্দু এই মহামন্ত্রে হলেন দীক্ষিত।
কিন্তু ঈর্ষা যাঁদের সহজাত, প্রভাব ও প্রতিপত্তির মোহ যাঁদের মনুষ্যত্ব বা বিবেককে পীড়িত করে রেখেছে — তাঁদের পক্ষে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ঐশী প্রভাব সহ্যের বাইরে! তাঁরা এই মহামানবের দেবচরিত্রের উপর নানাবিধ কলঙ্ক আরোপ করে তাঁর ও সৎসঙ্গের অপপ্রচারে হয়ে উঠলেন উন্মত্ত। বাংলার জেলায় জেলায় আশ্রমের অপপ্রচারের তাঁরা এজেন্সী খুলে দিলেন। তাঁদের মাত্রাতিরিক্ত নিন্দাবাদে কিন্তু বাংলার জনসাধারণ শ্রীশ্রীঠাকুরের বিষয়ে অতিশয় অনুসন্ধিৎসু হয়ে অবশেষে দীক্ষা গ্রহণ করে ধন্য হলেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস মহাশয় শ্রীশ্রীঠাকুরকে বলেছিলেন—‘আমি আপনার এতো নিন্দা শুনেছি যে তাতেই ধরে নিয়েছিলাম যে—এখানেই মিলবে সত্যের সন্ধান। এটা আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা।’
হিন্দু – মুসলমান সংঘর্ষ পল্লীগ্রামে তখনো বিস্তৃত হয় নি। পাবনার আতঙ্ক কেবল শহরেই সীমাবদ্ধ। আশ্রম-বিদ্বেষী হিন্দুগণের মনে এই সময়ে আশ্রমকে অবলুপ্ত করবার এক চক্রান্ত উঠল জেগে। এই সংঘর্ষের সুযোগে তাঁরা গ্রামস্থ মুসলমানগণকে আশ্রম আক্রমণের জন্য প্ররোচনা দিতে তৎপর হয়ে উঠলেন।
কিন্তু হিমাইতপুরের দরিদ্র মুসলমানগণ আশ্রমের দ্বারাই প্রতিপালিত, শ্রমের বিনিময়েই তাদের গ্রাসাচ্ছাদন। উপরন্তু অসুখে বিসুখে বিনা পয়সায় তাদের চিকিৎসা, পূজা পার্বণে তাদের পরিবারবর্গের সকলকেই পরিচ্ছদাদি বিতরণ, দায়-অদায়ে অর্থ সাহায্য হোত এই আশ্রম থেকেই। সর্বোপরি . শ্রীশ্রীঠাকুরের উপর তাদের শ্রদ্ধা ছিল নিবিড়। আশ্রমের ধ্বংস-সাধন ছিল তাদের স্বপ্নেরও অগোচর ।
আশ্রম-বিদ্বেষী হিন্দুগণ মুসলমানদের দিয়ে এই সংঘর্ষের সুযোগে আশ্রমের অবলুপ্তি ঘটাবার জন্য হয়ে পড়লেন উন্মত্ত। তাঁরা গ্রামস্থ মুসলমানদের একত্রিত করে গোপনে গোপনে উত্তেজিত করে তুলতে লাগলেন।
গ্রাম্য মুসলমানদের তাঁরা বোঝালেন—‘অনুকূলঠাকুর যে ভাবে এই হিমাইতপুর গ্রামে হিন্দু বসবাস আরম্ভ করাচ্ছেন, বাংলার নানাস্থানের বিত্তবান ও প্রভাবশালী হিন্দুরা যেভাবে এখানে স্থায়ী ঘরবাড়ী নির্মাণ করে আশ্রমের আয়তন বিস্তৃত করে চলেছে তাতে এখানে হিন্দুর সংখ্যা বেড়ে গিয়ে দরিদ্র মুসলমানদের এই গ্রাম থেকে উৎখাত হতে হবে। মুসলমানদের কল্যাণের জন্যই আশ্রম ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। আর যত নষ্টের মূল ঐ অনুকূল ঠাকুরকে নিকেশ করে সৎসঙ্গের একান্ত সমাধির প্রয়োজন।
আরও একটা কথা—আশ্রমে যাঁরা আছেন তাঁরা সকলেই সম্পন্ন ঘরের সস্তান। তাঁদের স্ত্রী-কন্যাগণ অভিজাত বংশসম্ভূতা। এই আক্রমণের সুযোগে আশ্রমবাসীদের ধনসম্পদ আর অনন্যা সুন্দরীদের অবাধ লুণ্ঠনেরও সুবিধা হবে।’
স্বল্পবুদ্ধি গ্রাম্য মুসলমানগণ হিমাইতপুরের হিন্দু গণের অসার বক্তৃতায় হয়ে পড়ল অভিভূত। আশ্ৰম আক্রমণের সুযোগ-সন্ধানে তারা রইল প্রতীক্ষায়। সে সুযোগ অচিরেই তাদের উপস্থিত হল অপ্রত্যাশিতভাবে।
আমাদের পরম পূজনীয়া বড়মায়ের এক সহোদরার অন্তিমকালে তাঁর তিনটি শিশু সন্তানের ভার দিয়ে গেলেন বড়মায়ের হাতে। সেই তিনটি সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠ পুত্র সন্তানটির সেদিন অকালে হল প্রাণবিয়োগ। তার ডাক নাম ছিল পচা। শব নীত হল শ্মশানে । নফরদা শবদাহের কাষ্ঠ প্রভৃতি নিয়ে গেলেন সেখানে ।
এই গ্রাম্য শ্মশানটি ছিল আশ্রমের অনতিদূরে পূর্বদিকে। বাঁধের উপর থেকে বেশ দেখা যায়। শবদাহের উদ্যোগপর্ব যখন চলছে সেই সময় কতিপয় অতিপরিচিত ঐ গ্রামেরই মুসলমান যুবক এসে দাহকার্য নিষেধ করে বললে যে, সে স্থানটি শ্মশান নয়, তাদের কবর স্থান। সুতরাং দাহকার্য সে স্থানে চলবে না। বিস্মিত শববাহিগণের প্রতিবাদে মুসলমান যুবকগণ অধিকতর উত্তেজিত হ’য়ে নফরদাকে প্রহারে করল জর্জরিত। যারা নফরদার তত্ত্বাবধানে আশ্রমের কাজে এতোদিন একান্ত অনুগত ছিল তারাই আজ তাঁকে প্রহারে করল জর্জরিত।
বাঁধের উপর থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর পরিস্থিতি দেখে আদেশ করে পাঠালেন শব আশ্রমে ফিরিয়ে আনতে। নির্বিচারে তাঁর আদেশ হল প্রতিপালিত, শব নিয়ে আসা হল আশ্রমে । এইখানেই পরিসমাপ্তি হওয়া উচিত ছিল ঐ পরিস্থিতির। কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মুসলমানগণ অন্যান্য মুসলমানগণকে উত্তেজিত করে তুলল এই বলে যে, আশ্রমবাসিগণ তাদের কবরস্থানকে শ্মশান বানিয়ে সেইখানে কাফেরের শবদাহ করতে চায় গায়ের জোরে। পাবনা শহরের সেই উত্তেজনার মুহূর্তে এই রটনায় মুসলমানগণ হল ক্ষিপ্তপ্রায়। তারা দলে দলে এসে সমবেত হতে লাগল সেই শ্মশানভূমিতে—আশ্ৰম আক্রমণ করে উপযুক্ত প্রতিশোধ নিতে। পাবনা শহরে হিন্দুগৃহ আক্রমণের কোন সুযোগ না পেয়ে তাদের আক্রোশ ছিল প্রবল। এখানে কোন পুলিশ প্রহরা না থাকাতে নিরীহ আশ্রমবাসীদের উপর তাদের প্রতিশোধ-স্পৃহা হল প্রবল। ‘আল্লা হো আকবর’ ধ্বনিতে স্তব্ধ শ্মশানভূমি হল মুখরিত — হিন্দু-নিধনের উল্লাসে।
আশ্রমের আজ মহাতঙ্কের দিন। মৃত্যুর বিভীষিকায় সকলেই বিহ্বল। আতঙ্কিত জননীগণের জন্যই সকলের চিন্তা, কখন কার হৃৎস্পন্দন স্তব্ধ হয়ে যায় সেই ভয়ে। অনন্ত মহারাজ, গোঁসাইদা, কিশোরীদা সকলেই ব্যস্ত হলেন জননীগণের সাহসসঞ্চারে। এদিকে পুরুষগণ ব্যস্ত হলেন পা, কুড়ুল, লাঠি প্রভৃতি সংগ্রহে।
শ্রীশ্রীঠাকুর সম্পূর্ণ একাকী। তাঁর ভাবগম্ভীর মৌন মূর্তির সন্নিকটে কারো যাওয়ার সাধ্য নাই। কি যেন এক অব্যক্ত নিষেধবাণী তাঁর শ্রীমুখকান্তিতে উদ্ভাসিত। সমস্ত দিন তিনি কখনো মায়ের কটেজের বারাণ্ডায়, কখনো বা সেই শ্মশানভূমি পরিদর্শন মানসে বাঁধের উপর অস্থিরভাবে পদচারণা করছেন।
বেলা গেল গড়িয়ে। বর্ষাকালের বেলা কিছু বোঝা যায় না, আকাশও মেঘাচ্ছন্ন। শ্মশান থেকে আশ্রমের রাস্তাটী পদ্মার স্ফীত জলে নিমজ্জিত। যে সময়ের কথা বলছি সে সময়টা ছিল বোধ হয় ১৯২৫ সালের শ্রাবণ মাস। আশ্রমের সম্মুখভাগে বাঁধ পর্যন্ত কারো উপস্থিতি শ্রীশ্রীঠাকুর পছন্দ করছেন না বরং নিষেধ করে দিলেন। শেষে স্বয়ং এসে দাঁড়ালেন সেই শ্মশানের দিকে বাঁধের উপর । এমন স্থানে দাঁড়ালেন যে আক্রমণকারীদের প্রথম বলি হবেন তিনিই । স্থির দৃষ্টে চেয়ে আছেন ক্রুদ্ধ মুসলমান জনতার দিকে। মুর্তি নিশ্চল—দৃষ্টি উদাস, নির্ভরতায় একাত নির্ভয়।
তিনি আদেশ করে পাঠালেন যেন কারো কাছে কোন অস্ত্র বা হাতিয়ার না থাকে। আসন্ন মৃত্যুর এই চরম মুহুর্তে অস্ত্র পরিত্যাগের এই আদেশে সৎসঙ্গিগণ হলেন বিচলিত। ডাঃ যতীন রায়, মনোহর বসু, প্রভৃতি কতিপয় বিশিষ্ট ভক্ত ক্ষুব্ধ অন্তরে কেষ্টদাকে বললেন ।—
“কেষ্টদা ! ঠাকুরের এ কী রকম আদেশ! ঐ সব দুর্বৃত্ত পিশাচদের প্রধান লক্ষ্যই হলেন তিনি। ঐ হিংস্র পশুর দলের তীক্ষ্ণধার ছুরিকায় তাঁর দেবদেহ হবে রুধিরালিপ্ত, আর আমরা থাকব নীরব দর্শকের ভূমিকায় দূর ব্যবধানে ! দেহে প্রাণ থাকা পর্যন্ত তাদের বাধা দিতে পারব না। না, না, এ হতে পারে না। হাতিয়ার আমরা ত্যাগ করব না।’ কেষ্টদা বললেন,’কী বলছেন আপনারা! এই অন্তিম মুহূর্তে তাঁর আদেশ বর্ণে বর্ণে প্রতিপালিত না হলে আমরাই হব তাঁর এবং আমাদের নিধনের কারণ। তাঁর দিকে চেয়ে দেখুন, কী একান্ত নির্ভরতায় তিনি নির্ভয় । আমাদেরও বলে দিলেন—মামেকং শরণং ব্রজ।’ কেষ্টদা (ভট্টাচার্য্য)র এই একটা মাত্র কথায় সকলের সম্বিৎ এলো ফিরে। নির্ভরতায় সকলেই হল মরণজয়ী নির্ভীক । সকল কণ্ঠে ধ্বনিত হল— “মামেকং শরণং ব্রজ।” মৃত্যুভয় সকলের অন্তর থেকে হল অন্তর্হিত।
ক্রমে সন্ধ্যার অন্ধকার এলো ঘনিয়ে। অটল ভাইকে শ্রীশ্রীঠাকুর আদেশ করলেন, হুজুর মহারাজের মন্দিরের সুউচ্চ চূড়ায় একগাছি লম্বা বাঁশ বেঁধে তারই ডগায় একটা হাজার বাতির বৈদ্যুতিক আলো জ্বেলে দিতে।
তখন আশ্রমে আমাদের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। অটল ভাই অচিরে তাঁর আদেশ প্রতিপালন করে বহুদূর পর্যন্ত করে দিল আলোকিত । আশ্রম আগমনের রাস্তাটী জলে নিমজ্জিত থাকাতে হয়ে আছে যেমন পিচ্ছিল তেমনি কর্দমাক্ত। শ্রীশ্রীঠাকুরের দয়ায় আক্রমণকারীদের আগমনপথ হয়ে গেল বেশ সুগম।
সমস্ত দিনের প্রস্তুতির পর আততায়িগণ আশ্রমের পথে হল অগ্রসর । মুহুর্মূহু আকাশ বাতাস হল মুখরিত ‘আল্লা হো আকবর’ ধ্বনিতে। স্রোতের মত ভেসে আসছে তাদের উল্লাসের কোলাহল। কিন্তু পথের পিচ্ছিলতায় তাদের গতি হল মন্থর ।
লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে আশ্রমবাসিগণ উৎকণ্ঠিত অন্তরে রদ্ধশ্বাসে অপেক্ষমাণ। সর্বনাশা মুহূর্ত আসছে ঘনিয়ে। বহুদিনের ঘটনা—স্মৃতির অন্তরালে ঝাপসা হয়ে গেলেও সে দিনের সেই রোমাঞ্চ কেউ ভুলতে পারবে না।
তারা আসছে অতি সন্তর্পণে পা টিপে টিপে, আছাড়ের আঘাত বাঁচিয়ে। অপরের জীবন হননে যারা উন্মত্ত—নিজের সামান্য আঘাতটুকুতেও তারা এমনই সতর্ক। ধীরে ধীরে তারা হল উপস্থিত আশ্রমের বাঁধের কাছে। আশ্রম বাটিকার সম্মুখভাগ উজ্জ্বল আলোকে উদ্ভাসিত। জনবহুল আশ্রমপ্রাঙ্গণে জনমানবের চিহ্নমাত্র নাই। কোলাহলমুখর আশ্রমে আজ মরণের স্তব্ধতা। সম্মুখভাগে দণ্ডায়মান দিব্যকান্তি শ্রীশ্রীঠাকুরের নিশ্চল মূর্তি— একাকী, সম্পূর্ণ অরক্ষিত।
এই বিসদৃশ পরিবেশ সন্দৰ্শনে অনিশ্চিত বিপদাশঙ্কায় আততায়িগণ হল নিশ্চল । পশ্চাতের জনতা ঠেলছে অগ্রবর্তী জনতাকে, কিন্তু অগ্রবর্তী জনতা দ্বিধাগ্রস্ত। এইখানে তাদের চলছে একটা হুড়োহুড়ি, একটা জটলা, একটা কোলাহল ।
আক্রমণকারীদের দ্বিধাগ্রস্ত নিশ্চলতা আর কতক্ষণই বা স্থায়ী হবে। ক্ষণকাল মধ্যেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়বে ঐ দেবদেহের উপর। কম্পিত অন্তর আশ্রমবাসিগণের শ্বাসরুদ্ধ, বিস্ফারিত নয়নের অপলক দৃষ্টি ঐ দেবদেহে নিবদ্ধ। সর্বনাশা মুহূর্তের ব্যবধান আর কতটকুই বা । চেতনার আর সাড়া নাই কোন দেহে—সম্বিৎহারা ভক্তবৃন্দ নিস্পন্দ ।কিন্তু এ কী! পিছনে এ কিসের শব্দ ! ছ্যাব্-ছ্যাব্ -ছ্যাব্। প্রায় দশ-বার জন গুর্খা মিলিটারী কুইক মার্চে এসে শ্রীশ্রীঠাকুরকে জানালো অভিবাদন— মিলিটারী কায়দায়। পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল বন্দুক উদ্যত করে আততায়ীদের দিকে। অপেক্ষায় রহিল শ্রীশ্রীঠাকুরের আদেশের জন্য।
অকস্মাৎ এই মিলিটারীর আবির্ভাবে সোরগোল পড়ে গেল আততায়িগণের মধ্যে। সকলের মুখে, মিলিটারী, মিলিটারী, পালাও পালাও । পরের প্রাণ হননের উল্লাসে যারা ছিল উন্মত্ত নিজের প্রাণের মমতায় তারা হল দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য। পথের কাদায় হল কর্দমাক্ত, আছাড় খেয়ে ভাঙ্গলো কারো হাত পা, নিজেদের অস্ত্রশস্ত্রে কেউ বা হল ক্ষতবিক্ষত — প্রাণরক্ষার-ব্যাকুলতায় ভ্রূক্ষেপের সময় নাই কারো। নিমেষের মধ্যেই সেই দল হল উধাও।
মিলিটারীগণ সমস্ত আশ্রম নিরীক্ষণ করে শ্রীশ্রীঠাকুরকে অভিবাদন জানিয়ে চলে গেল ।
আশ্রমবাসিগণের উৎকণ্ঠায় অবসন্ন মনে এতক্ষণে এলো প্রশান্তির স্বাচ্ছন্দ্য। সকলের মুখে ফুটে উঠল মুক্তির আনন্দ।
কিন্তু হঠাৎ ঐ মিলিটারীর আবির্ভাব এবং অন্তর্ধান প্রশ্নটা জেগে রইল সকলের মনে। পরে শ্রীশ্রীঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন—
‘কমু ক্যামনে, কনে থেকে এলো তারা’। প্রশ্নের জবাব আজো মেলেনি ।
সারাদিনব্যাপী আশ্রমের সেই চরম উৎকণ্ঠার সময় হিমাইতপুরের চক্রান্তকারী হিন্দু বাসিন্দাগণ উৎকর্ণ হয়ে স্ব-স্ব গৃহেই আছেন তাঁদের মনোরথ-সিদ্ধির আনন্দে। আশ্রম থেকে ওই বুঝি ভেসে আসছে মুহুর্মূহু অন্তিম আর্তনাদ ৷ মোক্ষম আঘাতের সার্থক চরিতার্থতায় সন্তুষ্ট অন্তরে তাঁরা নিশ্চিত। তাঁদের চক্রান্তের অব্যর্থ স্বপ্নে আজ তাঁরা গর্বিত।—পাবনা · শহরবাসী হিন্দুগণেরও স্বস্তিবোধ স্বতঃস্ফূর্ত। তাঁরাও চরম সংবাদের আশায় অপেক্ষমাণ।
কিন্তু শয়তানী চক্র ব্যর্থতায় হল ম্রিয়মাণ।
রাত্রি তখন বোধ হয় দশটা। পাবনা শহর থেকে উচ্চপদস্থ পুলিস কর্মচারি-গণ আশ্রমে হলেন উপস্থিত। শহর থেকে হিমাইতপুরের ব্যবধান মাত্র দু’মাইল । সৎসঙ্গের মত বিখ্যাত ধর্ম প্রতিষ্ঠানের আক্রমণ-সংবাদ পাবনার ঘরে ঘরে পড়েছে ছড়িয়ে। দলে দলে মুসলমান আসছে শহর থেকে এই গ্রামে। পুলিস কর্তৃপক্ষের তা না জানার কথা নয় । সমস্ত দিন ধরেই যেখানে চলছে প্রস্তুতি সেখানে তাদের বাধা দেবার সময় তো যথেষ্ট ছিল, কিন্তু তারা সমস্ত দিন রইলেন নিষ্ক্রিয়। পাবনার পুলিশ কর্মচারিগণ প্রায় সকলেই মুসলমান-সম্প্রদায়ভুক্ত। হয়ত সম্প্রদায়গত নীচতায় তাদেরও অন্তর ছিল কলুষিত। এখন বোধ হয় এসেছেন হতাহতের সংখ্যা ও সম্পত্তি লুঠতরাজের পরিমাণ ইত্যাদির তথ্য সংগ্রহে। যাই হোক, তাঁরা এসে উপস্থিত হলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে। এই ঘটনার সূত্রপাতের কথায় বললেন, এ কী অন্যায় আবদার, শ্মশানে শবদাহ হবে না ? আমরা উপস্থিত থেকে শবদাহ করিয়ে যাব। শব নিয়ে চলনে শ্মশানে। শ্রীশ্রীঠাকুর সহাস্যে বললেন, আপনাদের উপস্থিতিতে শবের দাহ হতে পারে বটে, কিন্তু তাতে কি ভ্রান্ত প্রতিবাসীদের মনের দাহ প্রশমিত হবে ? শবদাহ আশ্রমের মধ্যেই হবে— আপনারা সে জন্য চিন্তিত হবেন না।
পাবনার পুলিশ কর্মচারীদের সঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুরের বোধ হয় এই প্রথম পরিচয়। তাঁরা মুগ্ধ হয়ে গেলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের কথার সারবত্তায়। পুলিস-সুপার বললেন, এমন লোকের নিধন সাধনে যারা উদ্যত হয় তাদের উচিতমত শিক্ষার প্রয়োজন। আপনি অনুগ্রহ করে তাদের নামগুলো আমাদের দিন— আমরা তাদের উচিতমত শিক্ষা দেব।
একটু বিনীত হাসি হেসে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন, শারীরিক শাস্তি দিয়ে কি মানুষের পরিবর্তন করা যায় ? আমার শাসন হল ক্ষমার—ভালবাসার। এই অপ্রত্যাশিত উক্তিতে পুলিশ কর্মচারিগণ হলেন অধিকতর সশ্রদ্ধ।বললেন, আপনার সম্বন্ধে আমাদের পূর্বধারণার সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে। আপনি হিন্দুদের যাই হোন না কেন— আমাদের পীর। আশ্রমের কেশাগ্র যাতে স্পর্শ করতে কেউ সাহস না পায় সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি থাকবে। প্রলয়ের বিধ্বংসী দুর্যোগের পর আশ্রমে ফিরে এলো প্রশান্তির আনন্দ । একমাত্র শরণ শ্রীশ্রীঠাকুরের উপর সকলের শ্রদ্ধা নিবিড় হয়ে উঠল।
কথায় বলে, খাল কেটে কুমীর আনা । এখন পাবনাতে হয়েছে তাই। ঈর্ষান্বিত হিমাইতপুর-গ্রামবাসী হিন্দুগণের আশ্রম আক্রমণের প্ররোচনায় পাবনার উন্নত মুসলমানগণ এখন ঝাঁপিয়ে পড়ল গ্রামাঞ্চলের দিকে। পাবনা শহরে ইংরাজ কর্তৃপক্ষের শাসনে তাদের অবাধ উচ্ছৃঙ্খলতায় বাধা পেয়ে তারা গ্রামাঞ্চলের হিন্দু-নিধনে হল উন্মত্ত। বহু হিন্দু গৃহস্থ এখানে মুসলমান প্রতিবেশী দ্বারা পরিবেষ্টিত। প্রতিবেশিসুলভ সখ্য থাকা সত্ত্বেও তাদের পক্ষে প্রতিবেশী হিন্দুদের রক্ষার জন্য বহিরাগত মুসলমান ভাইদের বাধা দেবার কোন উপায় নাই। গ্রামের মুসলমান মণ্ডলগণেরও তাদের বাধা দানের সামর্থ্য নাই ।
… দিনের পর দিন সুদূর গ্রামাঞ্চল থেকে মর্মান্তিক ঘটনাবলীর সংবাদ শোনা গেল। ইতিমধ্যে হিমাইতপুর গ্রামের মুসলমানগণের অর্থাগমকেন্দ্র আশ্রমে অর্থোপার্জনের কোন উপায় না থাকাতে দুর্বিষহ দুর্দশার মধ্যেই তাদের চলেছে উপবাস। ক্রমে তারা প্ররোচনাদাতা হিন্দু অধিবাসীদের উপর হয়ে পড়ল ক্রুদ্ধ। গুজব শোনা গেল হিমাইতপুর গ্রামটাও আক্রান্ত হবে। ঈর্ষাপ্রসূত কর্মফল এখন হিমাইতপুর গ্রামের হিন্দুদের হবে ভোগ করতে। তাঁরা সকলেই হয়ে পড়লেন আতঙ্কিত। পাবনা শহর তখনো উত্তপ্ত — সুতরাং সেখানেও তাঁরা নিরাপদ নন—আবার ভিন্ন পল্লীতে ততোধিক দুরবস্থা। যাঁরা গ্রামস্থ মুসলমানগণকে আশ্রমধ্বংসের প্ররোচনা দিয়েছিলেন তাঁরা অত্যন্ত বিপন্ন বোধে অবশেষে হলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের শরণাপন্ন । বললেন, আজ আমরা সকলেই বিপদাপন্ন। হিমাইতপুর গ্রাম নাকি আক্রান্ত হবে। ছেলেপুলে নিয়ে যাই বা কোথায় ? আশ্রমে তবু পুলিশ প্রহরা আছে। আর কোথাও তো নিরাপদ মনে করি না । এখানে আমাদের একটা আশ্রয় দিতে হবে। এইজন্য আমরা এলাম ।
শ্রীশ্রীঠাকুর অত্যন্ত সহানভূতির সঙ্গে তাদের বক্তব্য শুনে বললেন, ‘শুধু আপনারা বিপন্ন নন । বিপন্ন আজ সমস্ত গ্রামাঞ্চল । পাবনার সকল হিন্দু আজ অসহায় । সকলের কথাই ভাবতে হবে।’ হিমাইতপুরের হিন্দুগণ শ্রীশ্রীঠাকুরের কথা উপলব্ধি করতে না পেরে তাঁকে ভুল বুঝলেন। তাঁরা মনে করলেন হিন্দু জনসাধারণের জন্য তাঁর প্রাণ কাঁদছে এই বলে তাঁদের আবেদন তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন। মনঃক্ষুণ্ণ হয়েই তাঁরা নিলেন বিদায় ।
গ্রামাঞ্চলের অসহায় হিন্দুদের জন্য শ্রীশ্রীঠাকুর ছিলেন খুবই উদ্বিগ্ন। সেদিন সকালেই তিনি শ্রদ্ধেয় কিশোরীদা আর আকুদাকে আদেশ দিলেন পাবনার গ্রামাঞ্চলের মুসলমান মোড়লদের কাছে সেইদিনই তাদের আমন্ত্রণ করে আশ্রমে নিয়ে আসতে !
আদেশ প্রাপ্তিমাত্র তাঁরা দুজন বহির্গত হলেন এই আদেশ প্রতিপালনে। সে সময়ে মুসলমান অধ্যুষিত জনপদ পরিক্রমা সাক্ষাৎ মৃত্যুর নামান্তর। কিন্তু শ্রীশ্রীঠাকুরের কণ্ঠনিঃসৃত আদেশই তাঁদের কর্ম । কারো সাধ্য নাই সেই রক্ষা-কবচ ভেদ করে তাঁদের কোন অনিষ্ট সাধন করতে পারে। তাঁরা নির্ভয়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরের মণ্ডলগণকে শ্রীশ্রীঠাকুরের আমন্ত্রণ বিজ্ঞাপিত করে চলেছেন। অকুতোভয় এই দুজন সম্মানীয় ব্যক্তির সাহসিকতায় মণ্ডলগণ হলেন মুগ্ধ। তাঁরা শ্রীশ্রীঠাকুরের উপর বরাবরই সশ্রদ্ধ। আমন্ত্রণ গ্রহণে তাঁরা আগ্রহী হলেন বটে, কিন্তু অন্তরায় হল মৌলভী-ভীতি। কারণ এ সময়ে যদি মৌলভীগণ জানতে পারেন যে তাঁরা শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে গেছেন পরামর্শে’র জন্য, তাহলে তাঁদের প্রাণসংশয়। অবশেষে ঠিক হল যে তাঁরা শেষ রাত্রের গভীরে সকলের অজ্ঞাতসারে আশ্রমে উপস্থিত হবেন। শ্রীশ্রীঠাকুরের উপদেশ শোনবার জন্য ।
মণ্ডলগণ একে একে আশ্রমে হলেন সমবেত। সৎসঙ্গ মন্দিরের বড় ঘরটায় তাঁদের সমাবেশের স্থান ছিল নির্দিষ্ট। সেই স্বল্পবিদ্য গ্রাম্য মণ্ডলগণেরসমাবেশে করুণাঘনবিগ্রহ শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর আসনে হলেন সমাসীন। তাঁর ব্যথাতুর মুখমণ্ডলের বর্ণনার ভাষা নাই ।
হন্তার মুষ্টিবদ্ধ তীক্ষ্মধার সংহারিকার মুখে আক্রান্তের আসন্ন মৃত্যুর বিভীষিকার ভয়ার্ত মুখখানি কি দেখেছেন ? দেখেছেন কি, ‘আমায় মেরো না, আমায় বাঁচাও—বাঁচাও’ বলে সে মুখে প্রাণভিক্ষার কী ব্যাকুল আবেদন ? যদি না দেখে থাকেন তাহলে আসুন মণ্ডলগণের এই নিশীথ-পরিবেশে। দেখুন শ্রীশ্রীঠাকুরের শ্রীমুখমণ্ডলে অসহায় হিন্দুগণের নিষ্ঠুরতম হত্যার সে কী পুঞ্জীভূত বেদনা বিগলিত ধারায় ঝরে পড়ছে তাঁর নয়নে! জীবনরক্ষার কী কাতর আবেদনের আকুতি ফুটে উঠছে তাঁর বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে। এ দৃশ্যে পাষাণেরও হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যায়। আবেগাপ্লুত কম্পিত কণ্ঠের সেই প্রাণবন্ত ভাষণটী কালের ব্যবধানে যদিও এখন ঝাপসা হয়ে গেছে তবু যতটকু স্মৃতিপথে টেনে আনতে পারি তাই সংক্ষেপে এখানে উদ্ধৃত করে যাই। ভাষণটী সংক্ষেপতঃ এইরূপে।—
“জীবনকে রক্ষা করে চলাই খোদার সৃষ্ট জীবমাত্রেরই সহজ ধর্ম । রক্ষার এই প্রচেষ্টা তার দুর্নিবার, নতুবা তার অস্তিত্বই থাকে না। শিশু ভূমিষ্ঠ হয়েই কেঁদে ওঠে প্রাণহানির আশঙ্কায়। যতই সে বড় হয়— জ্ঞান ও বুদ্ধিকে সজাগ করে রাখে জীবনটাকে ধরে রাখতে। খোদার আশীর্বাদপূত সেই জীবনের অস্তিত্বকে হননের উল্লাসে যারা নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে তারা শয়তানের সহচর তাতে সন্দেহ নাই। খোদার সৃষ্টিকে শয়তান ধ্বংস করতে চায়, তাতেই তার উল্লাস। জিঘাংসার উন্মত্ততায় শয়তানের সহচরগণ হয় নিষ্ঠুর, হিংস্রতায় তারা হয়ে ওঠে দুর্মদ। প্রাণরক্ষার কাতর আবেদনে জাগায় না কোন সাড়া— দয়া, স্নেহ, মমতা প্রভৃতি সুকুমার বৃত্তিগুলো তাদের মধ্যে নিরেট হয়ে যায়। এই সব হিংস্র পশুর দল যে জাতির মধ্যে গঙ্গাতে থাকে পরস্পর হানাহানিতে সে জাতি নিঃশেষ হয়ে যায়।
প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করলেই— সে নেবে তার প্রতিশোধ । উন্মত্ত হয়ে আমি আজ যা করব ভবিষ্যতে তাই তোলা থাকবে আমারই জন্য। খোদার দুনিয়ায় অবিচার নাই ।”
বিগলিত-অন্তর মণ্ডলগণ সাশ্রুলোচনে শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে করজোড়ে প্রতিজ্ঞা করলেন যে তাঁরা জীবন দিয়েও হিন্দু ভাইদের রক্ষা করবেন।
রাত্রির শেষযামে মণ্ডলগণ গেলেন চলে, পরদিন থেকেই পরিস্থিতির হল অদ্ভুত পরিবর্তন । আশ্রম থেকে পাকশী পর্যন্ত প্রায় ষোল মাইল ব্যাপী অঞ্চলে আর কোন অপ্রীতিকর সংবাদ পাওয়া যায়নি। হিন্দুমেধযজ্ঞের হল পরিসমাপ্তি। পাবনা শহরও হল শান্ত ।
কিন্তু হিমাইতপুর গ্রামের মুসলমানদের দুর্দশার আর অন্ত নাই । তাদের অর্থাগমের একমাত্র স্থান সৎসঙ্গ আশ্রম, সেখানে মুখ দেখানোর পথ নাই। গ্রামস্থ হিন্দুগণের ত সহানুভূতি তারা হারিয়েছে ।
আবার আশ্রম আক্রমণ-জনিত অপরাধে তারা যে দায়রা সোপর্দ হবে না তা কে বলতে পারে ? মোট কথা ধনে প্রাণে পুত্র পরিবার সহ তারা এখন মরতে বসেছে। কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত, মার্জনার কোন পথই খোলা নেই তাদের।
সে দিন সকালে অনন্ত মহারাজ গ্রামের পথ দিয়ে চলেছেন এক বাড়ীতে রোগী দেখতে। পথিমধ্যে ঘিরে ধরল বুভুক্ষিত মুসলমানগণ। ক্ষীণকণ্ঠেতারা বললে, ডাক্তার বাবু ! আমাগো মারি ফ্যালায়ে দ্যান। পাবনার ভাষায় তাদের বক্তব্য হল, তারা যে পাপকর্ম করেছে তার মার্জনা নাই। সারা জীবন তাদের জেলে পচতে হবে, পোলাপান অর্থাৎ ছেলে-পিলে গুলোর কি হবে সেই ভাবনা। তারা তো না খেতে পেয়ে শুকিয়ে মরে যাবে। তাদের প্রার্থনা ছেলেগুলোকে ঠাকুর যেন দেখেন। করে নি। তারা তো কোন অপরাধ করে নি।
বিশীর্ণদেহ গ্রামস্থ মুসলমানদের কাতর প্রার্থনায় মহারাজের চক্ষু সজল হয়ে উঠল, তিনি বললেন,’তোরা সকলে মিলে তাঁর কাছে ক্ষমা চা গা। তোদের অপরাধ তিনি মার্জনা করেছেন। পুলিশ তোদের শাস্তি দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি বললেন, ওরা যে আমার আশ্রিত। ওদের শাস্তি হলে ওদের পরিবারবর্গের সকলেই মরে যাবে।’
অনুতপ্ত মুসলমানগণ শ্রীশ্রীঠাকুরের অশেষ করুণার সংবাদে বিগলিত অন্তরে তাঁর পুরোভাগে লুটিয়ে পড়ে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে তাদের কৃতকর্মের জন্য চাহিল মার্জনা।
করুণাময় ঠাকুর তাদের আশস্ত করে বললেন,’অমন কাম আর কখ্খনো করিস নে বুঝলি তো ? কাল সকাল থেকে আশ্রমের কাজে লেগে যা। আর কিছু টাকা মহারাজের কাছ থেকে নিয়ে ছেলেপেলেগুলোকে বাঁচিয়ে তোল্। পরে না হয় খেটে শোধ করে দিস।’
জীবনবেদই যাঁর বেদ, সর্বপ্রকার দুঃখদুর্দশা থেকে মানবের উদ্ধারসাধনই যাঁর সাধনা আপামরে মৃত্যুঞ্জয়ী মহামন্ত্রদানে যিনি মুক্তহস্ত, তাঁর অপার করুণায় হিন্দুগণ সে যাত্রা হলেন নির্বিঘ্ন, নারীগণের মর্যাদা হল নিরাপদ, সকলের উৎকণ্ঠা-আতঙ্কের হল অবসান। কিন্তু তবু কি মানুষে দেয় তার সামান্যতম কৃতজ্ঞতার পরিচয়। ———

আচার্য্য পরম্পরা

।। আচার্য্য পরম্পরা ।‌।
[ভালোই সব চলছিল। সৎসঙ্গ নিয়ে বেশ আনন্দেই মেতে ছিলাম। হঠাৎ তালটা যেন
কেটে গেল। দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রম থেকে প্রকাশিত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র
লিখিত ‘সত্যানুসরণ’ নামক গ্রন্থের ৪৫তম সংস্করণের ৬৫তম পাতার প্রথম
অনুচ্ছেদের বাণীর উপদেশটা আমাকে বেশ বিপাকে ফেলে দিয়েছে। আমার নাম দিবাকর
বৈদ্য। আমি অকপটে সব ‘খ্যাপন’ করলাম। দয়া করে আমার কথাগুলো একটু
শুনবেন। বলা যায় না, আপনাদেরও কাজে লেগে যেতে পারে।]
* * *
একজন দাদা, নাম অনিমেষ চৌধুরী। দেখা হলেই ‘জয়গুরু’ দিয়ে সম্ভাষণ
করেন। ভালো-মন্দ খোঁজখবর নেন। মাঝে-মাঝে ঠাকুরের কথা বলেন। বাড়িতে যেতে
বলেন। একদিন সন্ধ্যা-প্রার্থনার আগে ওঁর বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম।
ভাবলাম, ওনার বাড়ীতেই না-হয় আজকের প্রার্থনাটা করে নেব। উনি দু’জন মা’কে
নিয়ে বসে তখন ধ্যান করছিলেন। পরে জেনেছিলাম ওই দু-জনা ছিলেন ওঁর স্ত্রী
ও কন্যা। সামনে ঠাকুরের একটা মাত্র প্রতিকৃতি। আমার উপস্থিতি বুঝতে পেরে
বসতে বললেন। অনিচ্ছা সত্বেও বসলাম। অনিচ্ছা সত্বেও বলতে বাধ্য হলাম,
কারণ, ওনার বাড়িতে ঠাকুরের ফটো ছাড়া জগজ্জননী বড়মা, শ্রীশ্রীবড়দা,
বর্তমান আচার্য্যদেব পূজ্যপাদ বাবাইদা, পূজ্যপাদ অবিনবাবু-দের কোন
ছবি নেই।— যা’ কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারছিলাম না। আচার্য্য-পরম্পরাকে
যে বা যারা মানে না, তারা ‘ইষ্টদ্রোহী’, আমি তাদের সঙ্গ সবসময় এড়িয়ে চলার
চেষ্টা করি। তেমন শিক্ষাই পেয়েছি আমাদের ঋত্বিক দাদাদের কাছ থেকে। নতুন
পরিচয়, তাই আগে থেকে বুঝতে পারিনি, যে দাদাটি ইষ্টদ্রোহী।
আচার্য্য-পরম্পরা মানে না। মনে যাইহোক, ভদ্রতার খাতিরে মুখে বললাম,
দাদা, সময় তো পার হয়ে গেল, প্রার্থনা করবেন না।
—‘এই তো করবো।’ বলেই উঠে দাঁড়ালেন।
পাশে বসে থাকা মায়েদের দিকে ইশারা করতেই শঙ্খধ্বনি, হুলুধ্বনি বেজে
উঠল। অমনি দাদাটি ডান হাতটি উপরে তুলে, বাম হাতটিকে ঝুলন্ত রেখে কি-সব
বলতে লাগল। সবটা মনে নেই। তবে প্রথমদিকের শব্দগুলো— তমসার পার
অচ্ছেদ্যবর্ণ মহান পুরুষ … গোছের এইরকম কিছু। (যা আমাদের উপাসনা বইতে
লেখা আছে দেখেছি।) তারপর প্রার্থনা শুরু করলেন। প্রথম দুটো বিনতির পর
‘গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু’ না করে আবার কীসব বলতে শুরু করলেন। বাংলা আর
সংস্কৃতে। তারপর শুরু করলেন ‘গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু’। তারপর আবার
কতগুলো সংস্কৃত মন্ত্র আওড়াতে লাগলেন।—যা আমি কোনদিন কোন সৎসঙ্গ
অধিবেশনে করতে দেখিনি। আমার ধৈর্য্যের, রাগের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছিল। তবুও
কৌতুহল বশে নিজেকে সংযত করে নিলাম। ওনার মনগড়া প্রার্থনা শেষে আমাকে
সত্যানুসরণ-এর একটি নির্দিষ্ট অংশ থেকে পাঠ করতে বললেন, আমি পাঠ
করলাম—‘‘কোন-কিছু ‘আজ বুঝেছি আবার কাল বুঝা যায় না—হেঁয়ালি’ ইত্যাদি
ব’লে শৃগাল সেজো না—কারণ, ইতর জন্তুরাও যা’ বোঝে তা’ ভোলে না। তাই, এই
প্রকার বলাটাই দুষ্ট বা অস্থির-বুদ্ধির পরিচায়ক।’’
আমার পড়া শেষ হতেই উনি ‘চলার সাথী’ গ্রন্থ থেকে ‘সন্ধ্যা ও প্রার্থনা’ অংশটি পাঠ করলেন। পাঠ শেষ করে আমাকে একটা কীর্তন করতে বললে,
আমি কিছুটা অনিচ্ছা সত্বেও ‘জয় রাধে রাধে’ কীর্তনটা করলাম। কীর্তনটা শেষ
হলে উনি আমার খুব প্রশংসা করে বললেন, খুব ভাল লাগল তোমার
কীর্তন,—‘ছাড়োরে মন কপট চাতুরি, বদনে বলো হরি হরি!’—কি অপূর্ব কথা!
তাই না ভাই ?—তারপর যেন অনেকটা আক্ষেপের সুরেই বললেন, ‘কোথায় আর পারলাম
কপটতা ত্যাগ করে ধর্মরাজ্যে প্রবেশ করতে!’ —ঠিক আছে! তাহলে ধ্বনি দিয়ে
দি। কি বলো?
আমার সম্মতি পেয়ে উনি ‘বন্দে পুরুষোত্তমম্! বন্দে আর্য্য পিতৃন!
বন্দে মাতৃবর্গান্! বন্দেহংকৃষ্টি দৈবতান্!— ইত্যাদি ধ্বনি দিয়ে
প্রার্থনা-পর্বের ইতি টানলেন। বড়মা এবং আচার্য্যদেব-দের নামে কোন ধ্বনি
দিলেন না। আমার মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। —এ তো অন্যায়! অন্যায়কে
প্রশ্রয় দেওয়াও তো অন্যায়। তাই আমি সহ্য করতে না পেরে বলেই
বসলাম,—দাদা! আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি ?
—অনায়াসে করতে পার।
—আপনি চলার সাথী থেকে ‘সন্ধ্যা ও প্রার্থনা’-র বাণীটা পড়লেন, অথচ
আপনি প্রার্থনার সময়সূচী মেনে প্রার্থনাটা করলেন না। আর প্রার্থনাটাকেও
বিকৃত করে করলেন। যেগুলো ঠাকুর করতে মানা করে গেছেন। আর একটা কথা, আপনি
আপনার বাড়ীতে শ্রীশ্রীবড়মা, শ্রীশ্রীবড়দা, শ্রীশ্রীআচার্য্যদেব, পূজনীয়
বাবাইবাবা, পূজনীয় অবিনবাবুদের কোন ছবি রাখেন নি, তাঁদের নামে কোন ধ্বনিও
দিলেন না!—কেন, জানতে পারি কি?
আমার কথা শুনে হা-হা করে হেসে উঠে বললেন, তোমার কথাটা ঠিক সোনার
পাথরবাটির মত হয়ে গেল না-কি?
—তার মানে?
—তার মানে হলো এই, শ্রীশ্রীঠাকুর চলার সাথী গ্রন্থে ‘সন্ধ্যা ও প্রার্থনা’ শিরোনামে যে বাণীটি লিপিবদ্ধ করেছেন, তার মধ্যে তিনি তাঁর
রচিত ‘আর্য্যসন্ধ্যা’ ও ‘প্রার্থনা’-র কথা বলেছেন। উক্ত প্রার্থনার
অস্তিত্ব যেখানে বিলুপ্ত করা হয়েছে, সেখানে প্রার্থনা না করে
প্রার্থনার-সময়সূচী দিয়ে কি হবে? আর ইষ্টাসনে সদগুরু ছাড়া অন্যান্য ছবি
রাখতে গেলে তো সত্যানুসরণ থেকে ‘‘গুরুই ভগবানের সাকার মূর্ত্তি, আর তিনিই
Absolute (অখণ্ড)।’’—লেখাটি বাদ দিতে হবে।
—প্রার্থনার অস্তিত্ব বিলুপ্ত করা হয়েছে মানে!— আপনি কি বোঝাতে
চাইছেন? দেওঘরে, অসংখ্য কেন্দ্র-মন্দিরগুলোতে সকাল-সন্ধ্যায় তাহলে কি
করা হয়?
—যা করা হয় সেগুলো শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র রচিত এবং নিদেশিত
প্রার্থনা নয়। তুমি এ বিষয়ে যদি জানতে চাও, প্রার্থনা বিষয়ক প্রামাণ্য
গ্রন্থ ঋত্বিগাচার্য্য প্রণীত ‘অনুসৃতি’ এবং ‘সৎসঙ্গ পাব্লিশিং প্রকাশিত
‘প্রার্থনা’ শিরোনামের গ্রন্থটি ভাল করে পড়ে নিও।
—দেখুন ওসব পড়ার আমার দরকার নেই। ওসব এখন অচল। আমরা
আচার্য্যদেবের নির্দেশে ‘উপাসনা’ বইটাকে মেনে চলি। উপাসনা বইয়ের প্রথমেই
লেখা আছে ১৯৬৫ সালে শ্রীশ্রীঠাকুর ওসব বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন।
আমার কথা শুনে দাদাটি ‘হো-হো’ করে আবার পাগলের মত হেসে উঠে বলল,
তোমার কথার উত্তরটা ঠাকুর সত্যানুসরণের ৬৫ সংখ্যক পাতায় দিয়েছেন, যেটা
আজকে তুমি পাঠ করলে। আমার প্রতি রাগ না করে, বাড়িতে গিয়ে বাণীটা ভাল করে
বোঝার চেষ্টা করবে।
যাইহোক, লোকটার ব্যবহারে আন্তরিকতার সুর ছিল। ফেরার সময় আমাকে ৫টা
ফল এবং কিছু ভ্রাতৃভোজ্যও দেয়। আমি স্থান ত্যাগ করে বাড়ি না ফিরে আমাদের
কেন্দ্র-মন্দিরে চলে যাই। এ বিষয়ে একটা হেস্তনেস্ত করার জন্য। ভাগ্য ভাল, দেখা
পেয়ে যাই বিভাস সরকারদার। প্রবীণ ঋত্বিক-দেবতা। ঠাকুর দেখা মানুষ,
আচার্য্যদেবের কাছের লোক, তাঁর কাছে গিয়ে ঘটনাটা খুলে বলি। তিনি সব শুনে
বললেন, ঠিক আছে তুমি বাড়ি চলে যাও, দেখি কি করা যায়।

  • * *
    তারপর বেশিদিন কাটেনি। সুভাসদার সাথে সৎসঙ্গ সেরে ফিরছিলাম।
    ভাগ্যক্রমে দেখা হয়ে যায় অনিমেষদার সাথে। আমি সুভাসদার সাথে অনিমেষদার
    পরিচয় করিয়ে দিলে, সুভাসদা অনিমেষদাকে বলেন আপনি আমাদের গুরুভাই অথচ
    মন্দিরে আপনাকে দেখি না, কি ব্যাপার?
    —‘আমি কি ওখানে ভণ্ডামি করতে যাব?’ অনিমেষদার অনভিপ্রেত উত্তর
    শুনে সুভাসদা বলেন—ভণ্ডামি বলছেন কেন, আমরা কি ওখানে ভণ্ডামি করছি?
    —ওটা আমার কথা নয়, ঠাকুরের কথা।
    —ঠাকুরের কথা! প্রমাণ দিতে পারবেন?
    —অবশ্যই। তবে রাস্তায় নয় বাড়িতে চলুন, ঠাকুরের বই খুলে প্রমাণ দেব।
    —দেখুন, এখন তো আপনার বাড়িতে যাওয়া সম্ভব না, বরং কাল সকালে
    প্রেয়ারের আগে মন্দিরে আসুন, প্রেয়ারের পর না হয় যুক্তিতর্ক করা যাবে।
    —দেখুন, মনে কিছু করবেন না, আবার আমাকে অপ্রিয় কথা বলতে বাধ্য করলেন।
    —এমন কি বললাম, যাতে আপনাকে অপ্রিয় কথা বলতে হবে?
    —ওই যে প্রেয়ারের কথা বললেন না, আপনারা কি প্রেয়ার করেন, যে
    প্রেয়ার করতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন!
    —এ আপনি কি বলছেন! দেওঘর থেকে নির্ধারিত প্রেয়ারের সময়সূচী মেনে
    রীতিমত মাইকের মাধ্যমে আমাদের মন্দিরে প্রেয়ার করা হয়, আপনি বলছেন, আমরা
    প্রেয়ার করি না! আপনি প্রমাণ করতে পারবেন তো?
    —অবশ্যই।
    —তাহলে কাল আসুন আপনার প্রমাণপত্র সব নিয়ে।
  • * *
    মন্দিরের কাছে বাড়ী হবার সুবাদে প্রায় প্রতিদিনই মন্দিরে গিয়ে
    সকালের প্রার্থনাটা করি। সেদিন প্রার্থনা শেষে দেখি অনিমেষদা এসেছেন।
    বিভাসদা ওনাকে নিয়ে গিয়ে বসালেন।
    এবার বলুন আপনার বক্তব্য। ঠাকুরের বলা অনুযায়ী আমরা যে ভণ্ডামি করছি,
    প্রেয়ার করছি না, প্রমাণ করে দেখান।
    অনিমেষদা সত্যানুসরণ গ্রন্থটি বের করে বলেন, আপনারা এই বইটিকে যদি
    মানেন, তাহলে দেখুন ৩১ পৃষ্ঠায় রয়েছে, ‘‘গুরুই ভগবানের সাকার মূর্ত্তি,
    আর তিনিই Absolute (অখণ্ড)।’’ আবার ৫৭ পৃষ্ঠায় ঠাকুর আত্ম-প্রচারকদের
    ভণ্ড বলেছেন।
    —ঠাকুর, আত্ম-প্রচারকদের ভণ্ড বলেছেন, আমরা তো আর আত্ম-প্রচারক নই!
    —গুরুর পাশে শিষ্যদের ছবি রেখে প্রচার করা কি সত্য প্রচারের নামে
    আত্ম-প্রচার করা নয়?— আপনারা প্রার্থনার নামে দয়ালবাগ সৎসঙ্গের যে
    বিনতি করেন, সেই বিনতিতে বলেন :
    “তুম্ বিন কোই সমরথ নহী জাসে মাঁগু দানা”
    “রাধাস্বামী গুরু সমরথ তুম বিনা আউর্ ন দুসরা ।”
    আবার শঙ্করাচার্য্য রচিত গুরু বন্দনায় বলি—
    “গুরোঃ পরতরং নাস্তি…..”
    “কেবলং জ্ঞানমূর্ত্তিম্ ।”
    ওই মন্ত্রগুলো একমাত্র গুরুকে উদ্দেশ্য করেই যদি বলা হয়ে থাকে তাহলে
    গুরুর আসনের পাশে কি গুরুর শিষ্যদের ছবি রাখা যায়? একটা প্রাইমারি
    স্কুলেও হেড্ স্যরের চেয়ারের একটা আলাদা মর্যাদা থাকে, আপনারা
    দাদা-প্রীতির নামে সে মর্যাদাটুকুও ক্ষুণ্ণ করে চলেছেন, এগুলোকে কি
    আত্মপ্রচার বলে না?
    সুভাসদাকে নিরুত্তর থাকতে দেখে অনিমেষদা বললেন, আপনারা যারা
    ঠাকুরের সাথে ঠাকুরের শিষ্যদের প্রচার করতে গিয়ে তাদের প্রতিকৃতিরও পূজা
    করছেন, তা ভণ্ডামি নয় কি? এই গেল ভণ্ডামির উত্তর। এরপর রয়েছে প্রেয়ার।
    এই দেখুন সৎসঙ্গ পাব্লিশিং প্রকাশিত ২ খানি গ্রন্থ। এটি শ্রীশ্রীঠাকুরের
    ইংরেজী ভাষায় লিখিত ‘লর্ডস্ প্রেয়ার’। ভাল করে দেখে বলুন তো এই প্রেয়ার
    আপনারা করেন কি-না?’
    সুভাসদা বইটা নেড়েচেড়ে দেখে বললেন, ‘না করি না’।
    —‘তাহলে দেখুন ‘প্রেয়ার’ না করেই মিথ্যা প্রেয়ারের গর্ব করে
    চলেছেন। ঠাকুরের ভাষায় এর নাম দ্বন্দ্বীবৃত্তি। সবচাইতে বড় পাপ। ঠিক আছে,
    ইংরেজীর কথা বাদই না হয় দিলাম, প্রেয়ার-এর বাংলা প্রার্থনা। বাংলা ভাষায় ঠাকুরের লেখা ‘প্রার্থনা’
    নামে একটা বই আছে এবং সেই বইটাও সৎসঙ্গ পাব্লিশিং থেকে প্রকাশিত। হিমাইতপুরে প্রথমে প্রথমে প্রকাশিত হয়। দেওঘরে প্রথম
    প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে। ভাল করে দেখুন তো, এই বইয়ের নিদেশ মেনে আপনারা
    প্রার্থনা করেন কি-না?’
    সুভাসদা বইটা ভাল করে নেড়েচেড়ে দেখে বললেন, ‘না, করি না’।—তবে এই
    প্রার্থনা করতে তো ঠাকুরই নিষেধ করে গেছেন ১৯৬৫ সালে, উপাসনা বইতে যা
    স্পষ্ট করে লেখা রয়েছে।
    —মনে কিছু করবেন না দাদা, যাকে আমরা ঠাকুর বলে মানি, সেই তিনিই
    যদি তাঁর রচিত প্রার্থনা করতে নিষেধ করেন, তাহলে তাঁর নাম করে দীক্ষার
    সঞ্চারণা করাও তো আর একটা ভণ্ডামি! কোন সাবজেক্ট নেই, সিলেবাস নেই অথচ
    ধরে ধরে এনে ছাত্র ভর্তি! কোন বুদ্ধিমান মানুষ কি মেনে নেবেন? আপনি যদি
    সত্যি-সত্যিই নিজেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের শিষ্য বলে মনে করেন
    তাহলে একটা কাজ অবশ্যই করা উচিত, আপনাদের আচার্য্যদেবকে বলে সত্যানুসরণ
    থেকে ‘‘কোন-কিছু ‘আজ বুঝেছি আবার কাল বুঝা যায় না—হেঁয়ালি’ ইত্যাদি
    ব’লে শৃগাল সেজো না—কারণ, ইতর জন্তুরাও যা’ বোঝে তা’ ভোলে না। তাই, এই
    প্রকার বলাটাই দুষ্ট বা অস্থির-বুদ্ধির পরিচায়ক।’’ এই অংশটা বাদ দিতে বলে
    বলে দিন।
    —কেন, প্রার্থনার সাথে সত্যানুসরণের বাণীর সম্পর্ক কি?
    —কারণ, পুরুষোত্তম যদি অভ্রান্ত হয়েই থাকেন, তাঁর নিদেশিত কোন
    বিধির পরিবর্তন তিনি কখনোই করেন না, কেউ করুক, তা-ও তিনি অনুমোদন করেন
    না, এমনকি কাউকে পরিবর্তন করার অধিকারও দেন না। তাই তিনি সত্যানুসরণের ওই
    বাণীতে বললেন, ‘ইতর জন্তুরাও যা’ বোঝে তা’ ভোলে না।’ তাই আমার তো মনে হয়,
    ঠাকুর তাহলে ভুল করে ওই বাণীটা দিয়েছিলেন, না হলে আপনারা তাঁর রচিত এবং
    নিদেশিত আহ্বানী, সন্ধ্যা ও প্রার্থনা-র সবটা বাদ দিয়ে, তাঁর নিদেশকে
    অমান্য করার ধৃষ্টতা দেখাতে পারতেন না!
    —দেখুন, আপনি আমাদের যতই যুক্তি দেখান, আমাদের ভোলাতে পারবেন না।
    এতক্ষণে বুঝতে পারলাম, আপনারা ঠাকুরের নির্দেশের আচার্য্য-পরম্পরা মানেন
    না। সে আপনারা না মানুন, আমরা কিন্তু আচার্য্যদেবের নির্দেশের বাইরে এক
    পা-ও চলতে রাজী নই।
    —খুব ভাল কথা, আপনি আমাকে বললেন, ‘‘আপনারা ঠাকুরের নির্দেশের
    আচার্য্য-পরম্পরা মানেন না।’’ একটা প্রশ্নের উত্তর দিন তো, আপনারা
    উপাসনা, অধিবেশন বা সৎসঙ্গ করার সময় আসনে আচার্য্য-পরম্পরার নামে বা
    অজুহাতে যাঁদের প্রতিকৃতি রাখেন, তাঁদের দেওয়া কোন প্রার্থনা, উপাসনা
    করেন কি?—অতএব আপনারা যে পদ্ধতিতে আচার্য্য-পরম্পরা মেনে চলছেন, ওইভাবে
    মেনে চলার কথা ঠাকুর কোথায় বলেছেন, তাঁর বলা প্রামাণ্য শ্রুতিবাণী থেকে
    প্রমাণ দেখাতে পারবেন?
    কেন জানি সুভাসদা কোন উত্তর দিতে পারলেন না দেখে অনিমেষদা বললেন,
    অভিধান মতে আচরণসিদ্ধ ব্যক্তিকেই ‘আচার্য্য’ বলে। যিনি যে বিষয়ের
    আচার্য্য হবেন, তাঁকে সে বিষয়ে আচরণসিদ্ধ হতে হবে। যেমন, আমরা নিউটন,
    আর্কিমিডিস, আইনস্টাইন প্রমুখ বিজ্ঞান-আচার্য্যদের কেউ দেখিনি। তাঁরা
    বিগত হবার পর তাঁদের আবিষ্কৃত সূত্র বা জ্ঞানের সাথে পরিচিত হই তাঁদের
    লিখে রাখা বইয়ের মাধ্যমে, তাঁদের বংশধরদের মাধ্যমে নয়। সেই বইগুলো বাজারে
    সহজলভ্য হলেও আমরা বই পড়ে সেগুলো নিজে নিজে আয়ত্ত করতে পারি না বলেই
    শিক্ষকদের মাধ্যমে শিখতে হয়। এবার কোন শিক্ষক যদি ওই বিজ্ঞান-আচার্য্যদের
    মূল সূত্রগুলো বাদ দিয়ে ভুল শেখাতে শুরু করেন এবং প্রতিপত্তির জোরে
    বংশানুক্রমিকভাবে জ্যেষ্ঠ-সন্তান-পরম্পরা চালাতে থাকে, মূলসূত্র জানা কোন
    ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছাত্র কি তা মেনে নেবেন?
    —তা কি করে হয়!
    —তাই যদি না হয়, তাহলে আপনারা কোন্ হিসেবে শ্রীশ্রীঠাকুর
    অনুকূলচন্দ্রের মূলসূত্র অর্থাৎ আদর্শকে সযত্নে পরিহার করা শ্রীশ্রীঠাকুর
    অনুকূলচন্দ্রের জ্যেষ্ঠ সন্তান পূজনীয় অমরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এবং
    পরবর্তী বংশানুক্রমিকভাবে জ্যেষ্ঠ-সন্তান-পরম্পরাদের ছবি পুজো করতে শুরু
    করেছেন? এঁরা কিসের আচার্য্য এবং কোন্ আচরণ দ্বারা আপনাদের শ্রীশ্রীঠাকুর
    অনুকূলচন্দ্রের অবিকৃত আদর্শ অনুসরণ বিষয়ে শিক্ষিত করেছেন বা করছেন?
    —দেখুন কিসের সাথে কিসের তুলনা করছেন? আমাদের দেশে আচার্য্য প্রথা কুলগুরু প্রথা কি চালু নেই?
    —আপনি যখন বলছেন, থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু ঠাকুর এ বিষয়ে কোন
    বাণীতে কি বলে গেছেন, সে সম্পর্কে যদি কিছু জানা থাকে বলুন।
    —না, ওগুলো আমার শোনা কথা, কোন বাণীতে কি বলে গেছেন তা বলতে পারব
    না। তবে—
    “ইষ্টগুরু পুরুষোত্তম
    প্রতীক গুরু বংশধর,
    রেতঃ শরীরে সুপ্ত থেকে
    জ্যান্ত তিনি নিরন্তর।”
    এই বাণীটা যদি ঠাকুরের দেওয়া হয় তাহলে বংশধররা কি প্রতীক-গুরু নয়?
    —অবশ্যই। তাহলে তো আপনাদের আচার্য্যদেবদের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে যে!
    —তার মানে?
    —তার মানে অতি সহজ। সত্যানুসরণ গ্রন্থের শুরুতেই তা লিপিবদ্ধ করা আছে।—
    “ভারত! যদি ভবিষ্যৎ-কল্যাণকে আবাহন ক’রতে চাও, তবে সম্প্রদায়গত বিরোধ ভুলে
    জগতের পূর্ব্ব-পূর্ব্ব গুরুদের প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হও—আর তোমার মূর্ত ও জীবন্ত গুরু বা ভগবানে আসক্ত (attached) হও, —আর তাদেরই স্বীকার কর—যারা তাঁকে ভালবাসে। কারণ, পূর্ব্ববর্ত্তীকে অধিকার করিয়াই পরবর্ত্তীর আবির্ভাব।” এই হচ্ছে প্রকৃত আচার্য্য পরম্পরার মূল সূত্র।
    শ্রীশ্রীঠাকুরের ওই আক্ষেপ-বাণী শতবর্ষ অতিক্রম করলেও আমরা তাঁর আবেদনকে বাস্তবায়িত করতে ব্যর্থ হয়েছি। ব্যর্থ হয়েছি অবিকৃতভাবে পুরুষোত্তমের আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে সাধারণ জনমানসে!
    তার পরও যদি “ইষ্টগুরু পুরুষোত্তম প্রতীক……” বাণীকে আঁকড়ে ধরে চলতে চান তাহলে তো মুশকিল!
    কারণ— শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র
    পূর্বাপূর্ব অবতার বরিষ্ঠদের তাঁর পূর্বাচার্য্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের পূর্বাচার্য্য শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীস্ট, হজরত মহম্মদ, চৈতন্যদেব,
    রামকৃষ্ণদেব-দের রেত-শরীরের সাথে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের পরিবারের কি কোন সম্পর্ক
    আছে?
    —তা’ কি করে থাকবে! তাছাড়া চৈতন্যদেব ও রামকৃষ্ণদেবের তো কোন সন্তানই ছিল না।
    —ঠিক তাই। তাহলে চৈতন্যদেবের পূর্ববর্তী পুরুষোত্তম যিনি ছিলেন
    বলে আপনার মনে হয়, তাঁর সর্বশেষ বংশধরদের মধ্যে প্রতীক গুরু খুঁজে দীক্ষা নিয়ে ধর্ম পালন করা উচিত। তাই নয় কি? তা করতে পারা কি আপনাদের দ্বারা সম্ভব হবে?
  • * *
    পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের পবিত্র সৎসঙ্গ আন্দোলন অব্যাহত রাখতে
    তাঁর স্পষ্ট নিদেশ দেওয়া আছে—‘‘আগত যিনি, উপস্থিত যিনি, তাঁর বিগতিতে বা তিরোভাবে তাঁর বংশে যদি তাঁতে অচ্যুত সশ্রদ্ধ আনতিসম্পন্ন, প্রবুদ্ধ সেবাপ্রাণ, তৎবিধি ও নীতির সুষ্ঠু পরিচারক ও পরিপালক, সানুকম্পী চর্য্যানিরত, সমন্বয়ী সামঞ্জস্য প্রধান, পদনির্লোভ, অদ্রোহী, শিষ্ট-নিয়ন্ত্রক, প্রীতিপ্রাণ—এমনতর কেউ থাকেন, তাঁরই অনুগমন করো—কিংবা তাও যদি না পাও—তবে তাঁর কৃষ্টি সন্ততির ভিতর অমনতর গুণসম্পন্ন যিনি তাঁরই অনুগমন করো পারম্পর্য্যে—যতক্ষণ আবার আগতের অভ্যুত্থান না হয়, ঠকবে না—শিষ্ট সমন্বয়ে সম্বর্দ্ধনাও এই পাবে।’’ (সম্বিতী, আদর্শ, ৩৯)
    তাঁর বিগতি পরবর্তী উপরোক্ত ওই বাণীকে অবলম্বন না করে তড়িঘড়ি আচার্য্য সেজে সৎসঙ্গের অধিকার গ্রহণ করলেন কোন্ যুক্তিতে?—
    * * *
    সুভাসদাকে নিরুত্তর থাকতে দেখে অনিমেষদা বলেন, তা যদি না হয়, তাহলে
    ওই বাণীর উপর ভিত্তি করে আচার্য্য-পরম্পরার নামে কুলগুরুগিরির ব্যবসা
    চালানো থেকে অবিলম্বে বিরত হওয়া উচিত।
    শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুসারে পিতা থেকে পুত্র জন্মায়। পুত্র,
    পিতার অছি (trustee) মাত্র। যে পুত্র পিতার অছি-কে বহন করে সমৃদ্ধ করে
    তাকেই পিতার আদর্শ পুত্র বলবে সবাই। তাই বলে পুত্র কখনো পিতা হতে পারে
    না। তাই যদি হতো বিশ্বশ্রবা ঋযির পুত্র বিভীষণকে আদর্শ পুত্র না বলে
    রাবনকে তো বলতে পারতেন শ্রীশ্রীঠাকুর। আপনারা ওই বাণীকে ভিত্তি করে,
    ঠাকুরের মূল আদর্শ বাদ দিয়ে বংশানুক্রমিকভাবে জ্যেষ্ঠ-সন্তান-পরম্পরার
    চতুর্থ পুরুষকে পর্যন্ত ঠাকুর বানিয়ে ছেড়েছেন। অথচ ঠাকুরের প্রথম
    বংশধরদের মধ্যে একমাত্র জীবিত সন্তান—পূজনীয় কাজলদা যখন জীবিত ছিলেন তাঁকে আপনারা বংশধর বলে গণ্য
    করতেন না। আপনারা সত্যিই যদি উপরের ওই বাণীকে মর্যাদা দিতেন তাহলে
    সর্বাগ্রে তাঁর পুত্রকে সম্মান দিয়ে, তাঁর মতামত নিয়ে নিদেশিত বাণীর উপযুক্তকে কীলকেন্দ্রে বসাতেন। অন্যথায় উপযুক্ত কৃষ্টি সন্তানকে। যুক্তিসঙ্গত যা’, তা’ না করে
    আপনারা মনগড়া আচার্য্য-পরম্পরায় মেতে উঠে সৎসঙ্গের মূল আচার্য্যের
    অনুশাসনকে নিকেশ করে দিলেন! ইতিহাস কি আপনাদের কোনদিন ক্ষমা করবে?
    শাস্ত্রের ব্যাখ্যা অনুযায়ী পরাবিদ্যায় আচরণসিদ্ধ ব্রহ্মজ্ঞ
    ইষ্টগুরুকে আচার্য্য এবং অপরাবিদ্যায় আচরণসিদ্ধ শিক্ষাগুরুকে উপাচার্য্য
    বলা হয়। বীরশ্রেষ্ঠ অর্জুনের কৃপাচার্য্য, দ্রোণাচার্য্য, ধৌম্য নামে
    তিনজন উপ-আচার্য্য থাকা সত্বেও পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণকে আচার্য্য পদে বরণ
    না করা পর্য্যন্ত তিনি দুর্বলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারেন নি।
    শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রও পূর্ববর্তী পুরুষোত্তমদের আচার্য্য হিসেবে
    মেনে চলতেন। এবং মেনে চলতে বলেছেন। তাঁর বলা অনুযায়ী—
    সত্তার মূলই হ’ল আত্মা,
    আর, এই আত্ম-সমীক্ষুই আত্মবিৎ—
    আর, তিনিই আচার্য্য ;
    তদন্বিতবৃত্তি ও তৎসমাহিতচিত্ত যিনি—
    তিনিই বোধ করেন তাঁ’কে অখণ্ড সচ্চিদানন্দ—
    আত্মার মূর্ত্ত প্রতীক। ৩৩১ । (সম্বিতী)
    পুরুষোত্তম আসেন যখন
    ইষ্ট, আচার্য্য তিনিই গুরু,
    তিনি সবার জীবন-দাঁড়া
    তিনিই সবার জীবন-মেরু।
    তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর ওই নিদেশ অমান্য করা শুরু হয়েছিল বলেই তিনি
    অমান্যকারীদের উদ্দেশ্যে বাণী দিয়ে বললেন—
    আচার্য্য ছেড়ে আচার্য্য ধরলি
    মূর্খতাতে দিলি পা,
    জ্ঞানের বুকে মারলি ছুরি
    লাভ হ’ল তোর ধৃষ্টতা।
    আর কুলগুরু অর্থাৎ কৌলগুরু-পরম্পরার কথা যদি বলেন, তাহলে
    শুনুন—আর্য্যকৃষ্টির রক্ষক সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পুরোহিত রঘুবংশের
    কৌলগুরু ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠদেব শ্রীরামচন্দ্রকে ‘‘ওঁ নারায়ণঃ পরাবেদা
    নারায়ণঃ পরাক্ষরঃ।/নারায়ণঃ পরামুক্তি নারায়ণঃ পরাগতিঃ॥’’ মন্ত্রে
    স্বস্তিবাচন করার সময় শ্রীরামচন্দ্রের মধ্যে পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণকে
    উপলব্ধি করলে তিনি নারায়ণের পরিবর্তে রামচন্দ্র শব্দ বসিয়ে মন্ত্রটিকে
    পরিমার্জিত করেন। নররূপী নারায়ণ পুরুষোত্তম রামচন্দ্রকে কেন্দ্র করে
    সবাইকে ধর্ম পালন করতে উদ্বুদ্ধ করলেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর
    বললেন—-গুরু মানেই সদগুরু–আচার্য্য। গুরু-পুরুষোত্তমই সচ্চিদানন্দের
    মূর্ত্ত বিগ্রহ, তিনিই রূপায়িত ঈশ্বর প্রেরণা, তিনিই আত্মিক শক্তির
    প্রোজ্জ্বল প্রকাশ, অস্তিবৃদ্ধির পরম অমৃতপথ। দুনিয়ার যত দ্বন্দ্বের মাঝে
    অন্বয়ী সার্থকতার সারকেন্দ্র তিনিই। তাঁকে ভালবেসে, তাঁর ইচ্ছা পরিপূরণ
    ক’রে, তদনুগ আত্মনিয়ন্ত্রণে, তাঁরই সঙ্গ, সাহচর্য্য ও সেবার ভিতর-দিয়ে
    মানুষ ঈশীস্পর্শ লাভে ধন্য হয়। আর গুরু-পুরুষোত্তমকে direct (সরাসরি)
    যারা না পায়, তারা তঁদনুবর্ত্তী আচার্য্য-পরম্পরার ভিতর দিয়ে তাঁর ভাবটাই
    কিছু না কিছু পায়।…….. (আঃ প্রঃ ১/৪. ১২. ১৯৪১) তাঁর অবর্তমানে তাঁর আদর্শের ধারার প্রবহমানতা রক্ষা করার জন্য তঁদনুবর্ত্তী আচার্য্য-পরম্পরা বজায় রাখতে আচার্য্য হবার যোগ্যতাও
    নির্ধারণ করে বাণী দিলেন।
    ‘‘চরিত্র ও চর্য্যার
    নিষ্ঠা-বিনায়িত ইষ্টার্থবাহী
    বাস্তব সঙ্গতিশীল
    সার্থক অনুচলন যা’র নাই—
    বাক্য ও ব্যবহারে উদ্ভিন্ন হ’য়ে,—
    সে কিন্তু আচার্য্য হ’তে পারে না ;
    আচার্য্য হওয়ার ন্যূনতম ভূমিই এই। ১৯ ।’’ (আদর্শ-বিনায়ক)
    উপরোক্ত বাণীতে কোথাও কি তাঁর বংশধরদের কথা, জ্যেষ্ঠ-পরম্পরার কথা
    উল্লেখ করেছেন? তথাপি ওই নিদেশ-বাণীকে যদি আপনাদের আচার্য্যদেব মানতেন
    এবং সব্বাইকে মানাতে উৎসাহিত করতেন, তাহলে সৎসঙ্গের নীতি ও আদর্শ নিয়ে এত
    দলাদলি, ভেদাভেদ হবার কোন সুযোগই থাকত না। তাঁরা যদি তাঁদের মধ্যে
    ঠাকুরত্বকে জাগ্রত রাখার সদিচ্ছা পোষণ করতেন, তাহলে ইষ্টগুরু পুরুষোত্তম
    প্রদত্ত নিত্যকর্মের আবশ্যিক অনুশাসন, যেমন আহ্বানী, আচমণ, পুরুষোত্তম
    বন্দনা, আর্য্য-সন্ধ্যা, পঞ্চবর্হিঃ ও সপ্তার্চ্চিঃ মন্ত্রগুলো
    প্রার্থনা থেকে বাদ দিয়ে ‘প্রার্থনা-সময়সূচী’-র প্রচার করে নিত্য
    প্রার্থনা নামের পরাকাষ্ঠা দেখাতেন না। ঠাকুরের রচিত ইষ্টভৃতির মন্ত্র
    “ইষ্টভৃতির্ময়াদেব কৃতা প্রীতৈ তব প্রভো। ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু
    পারিপার্শ্বিকাঃ॥” বাদ দিয়ে অন্য মন্ত্র চালু করা হতো না! এ বিষয়েও তিনি
    আমাদের সচেতন করে দিতে বলে গেছেন—
    মতবাদ যাই হোক না,—
    আর, যে-কোন সম্প্রদায়ই হোক,
    যা’ মুখ্যতঃ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’কে
    স্বীকার করেনিকো—
    কোন-না-কোন রকমে,—
    তা’ কখনও অনুসরণ করতে যেও না,
    তা’ কিন্তু জঘন্য—অসম্পূর্ণ,
    সত্তা-সম্বর্দ্ধনার পরিপন্থী তা’ ;
    আর, ঐ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’ই হ’চ্ছে
    সেই রাজপথ—
    যা’কে স্বীকার ও গ্রহণ ক’রে চললে
    ক্রমশঃই তুমি সার্থকতায় সমুন্নত হ’তে পার। ২৩৪ । (সম্বিতী)
    ওই বাণী অনুসারে আপনারা জঘন্য পথে চলছেন চলুন। তাই বলে আমাকেও কি
    চলতে হবে? দেখুন দাদা, ঠাকুরের বলা বাণীকে অমান্য করে, ঠাকুর-বিরোধী চলনে
    চলার অধিকার আপনার বা আপনাদের যেমন আছে, তেমনি মান্য করার অধিকার তো
    আমার থাকা উচিত। তাই আমার একটা অনুরোধ আপনাদের বিচারে কোন গোষ্ঠীদ্বারা
    ঘোষিত বা নির্বাচিত আচার্য্যদেব(গণ) যদি সবই হয়, তাঁরাই যদি আপনাদের
    একমাত্র উপাস্য হয়, তাহলে শ্রীশ্রীঠাকুরের নাম না নিয়ে, তাঁর প্রতিকৃতি
    না রেখে, আপনাদের আচার্য্যদেবের প্রতিকৃতির উপাসনা করুন,—আমার কোন
    আপত্তি নেই, কিন্তু ঠাকুরের নামে মন্দির করে, ঠাকুরবাড়ি নাম দিয়ে ঠাকুরের
    আদর্শবিরোধী চলনে চলতে দেখলে প্রতিবাদ হবেই। আমরা শ্রীশ্রীঠাকুরের
    কৃষ্টিসন্তান, আমাদের উপর তিনি কাতর আবেদনে কিছু দায়িত্ব দিয়ে গেছেন—
    ‘‘আর্য্যকৃষ্টির যা’ ব্যাঘাত
    খড়্গে তোরা কর নিপাত। ভণ্ড ঠগী দেখবে যেথায়
    করো সামাল সবায়,
    কেউ যেন না ঠকে পড়ে
    ওদের ভাঁওতায়।’’
    ‘‘বড়খোকাই হো’ক—, মণিই হো’ক—বা কাজলই হো’ক— বা আপনারাই
    হোন— আপনাদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই আমি আশা করি যে আপনারা নিজেদের
    জীবনে ও চরিত্রে আমাকে বহন ক’রে নিয়ে বেড়াবেন এবং অন্যের কাছেও আমাকে
    পৌঁছে দেবেন—অবিকৃতভাবে, অবশ্য প্রত্যেকে তার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী। আর
    আমাকে বহন করা ও পৌঁছে দেওয়া মানে, আমার mission (আদর্শ ও উদ্দ্যেশ্য)-কে
    বহন করা ও পৌঁছে দেওয়া, আর আমার mission (আদর্শ ও উদ্দেশ্য) মানে সকলের
    mission (আদর্শ ও উদ্দেশ্য)। জীবনীয় প্রতিটি যা’-কিছুর ইষ্টানুগ
    সত্তাসম্বর্দ্বনাই আমার mission (আদর্শ ও উদ্দেশ্য)।’’ (আ. প্র. ৩/১৭. ১.
    ১৯৪২)
    ‘‘মানুষ, গোরু, পোকা-মাকড়, এমনকি একটা পিঁপড়া পর্য্যন্ত বাঁচতে
    চায়। মরতে চায় না কেউ। আমিও না। কিন্তু মানুষের শরীর চিরকাল থাকে না, এও
    ঠিক। তাই আমি বেঁচে থাকতে চাই আপনাদের মধ্যে। আপনারাই আমাকে ব’য়ে নিয়ে
    বেড়াবেন যুগ যুগ ধরে, ………….. আমাকে এইভাবে বাঁচিয়ে রাখার
    দায়িত্ব আপনারা গ্রহণ করুন। নইলে আমার কথাগুলি প্রাণ পাবে না। সেগুলি
    শূন্যে হাহাকার করে ফিরবে।’’ (আ. প্র. খণ্ড ১৮, পৃঃ ২৫০)
    এবার আমার প্রশ্ন, আপনাদের আচার্য্যদেব শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ
    পালনের মৌলিক ব্যাপারটা তো বিকৃত করে রেখেছেনই, আদর্শ প্রচারের জন্য কি
    কি করেছেন?
    —কেন, কত মন্দির তৈরি করেছেন, গণদীক্ষা দেওয়া চলছে।
    — ঠিক বলেছেন, মন্দির অবশ্যই হয়েছে বা হচ্ছে তা’ কিন্তু ঠাকুরের
    ঈপ্সিত মন্দির নয়, আপনাদের আচার্যদেবদের ঈপ্সিত।
    —এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত কোন প্রামাণ্য তথ্য দেখাতে পারবেন?
    —তাহলে মনোযোগ দিয়ে শুনুন—মন্দির, শ্রীমন্দির ও সৎসঙ্গ
    বিহার-এর গঠনতন্ত্র প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন—‘‘সব
    মন্দিরই শ্রীমন্দির। জায়গায় জায়গায় মন্দির বা সৎসঙ্গ বিহার ঠিক করা ভাল,
    যাতে লোকে meet (সাক্ষাৎ) করতে পারে। সেখান থেকে মানুষকে সবভাবে infuse
    (উদ্বুদ্ধ) করতে হবে। ধর্ম্ম কী, কৃষ্টি কী, সদাচার কী, বিবাহের নীতি
    কী, যোগ্যতার অনুশীলন কিভাবে করতে হয়, সেবানুচর্য্যার ভিতর দিয়ে সবাই
    পারস্পরিকভাবে সম্বন্ধান্বিত হয় কিভাবে ইত্যাদি কথা সেখান থেকে চারাতে
    হবে। মানুষকে practically educated (বাস্তবভাবে শিক্ষিত) করে তুলতে হবে।
    তাছাড়া মানুষের জন্য যতখানি যা করা যায় তাও বাস্তবভাবে করতে হবে
    মন্দিরগুলিকে কেন্দ্র করে। মন্দির থাকলে, ঋত্বিক থাকবে, dispensary
    (চিকিৎসাকেন্দ্র), হাসপাতাল, গবেষণাগার, তপোবনের শাখা ইত্যাদি থাকবে।
    হয়তো ঐ মন্দিরগুলিই এক একটা university (বিশ্ববিদ্যালয়) বা সর্ব্বতোমুখী
    শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।’’ (আলোচনা-প্রসঙ্গে, ২১ খণ্ড, পৃঃ ৩১, ৪ঠা
    বৈশাখ, ১৩৫৯, বৃহস্পতিবার, ইং ১৭-০৪-১৯৫২) এই বইটাও কিন্তু আপনারা
    প্রকাশ করেছেন। এবার বলুন কি বলবেন, ঠাকুরের ঈপ্সিত মন্দির আপনারা কোথায়
    কোথায় করেছেন?
    অনিমেষদার প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারলেন না সুভাসদা।
    তাই কিছুক্ষণ থেমে অনিমেষদাই বললেন, দেখুন দাদা, শ্রীশ্রীঠাকুর
    মূলতঃ মানবদেহটাকেই শ্রীবিগ্রহ মন্দির করে গড়ে তুলতে বলেছেন। আমাদের
    মনগড়া মন্দির-নির্মাণ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন—‘‘আমার নামে দেখবে
    অনেক মন্দির হবে | কিন্তু আমার ইচ্ছা করে তোমাদের হৃদয়টা, চলমান জীবনটা
    আমার জাগ্রত মন্দির হোক | এবং আমাকে তোমরা সর্বত্র বয়ে নিয়ে বেড়াও | ধর্ম
    মানুষের জীবনের মধ্যে না থাকলে, আচরণের মধ্যে না থাকলে, ধর্মসঙ্ঘ থাকা
    সত্ত্বেও ধর্ম লোপ পায় | এবার সে ব্যাপারটা ঘটতে দিও না | আমার কথাগুলি
    মনে রেখো | এবং আমার কথাগুলি পৃথিবীর লোকে যাতে জানতে পারে, সময়মত তার
    ব্যবস্থা ক’রে যেও | কে কখন উপযুক্ত লোক আসবে, ঠিক কি? তবে আমার কাজটা
    হ’লো ঈশ্বরকোটি পুরুষের কাজ | যুগে যুগে তারা আসে | ঈশ্বর ছাড়া আর কিছুই
    তাদের মজাতে পারে না |’’
    ‘‘আমি নগণ্য মানুষ, কিন্তু পরমপিতা আমাকে দিয়ে যা বলালেন, যা
    করালেন, মনুষ্যসমাজ তার উপর না দাঁড়ালে, সব জ্ঞানগুণ সত্ত্বেও পৃথিবী
    মারামারি, হানাহানি, কাটাকাটির হাত থেকে রেহাই পাবে না। মানুষের সব শক্তি
    নিয়োজিত হবে সপরিবেশ আত্মহননে এবং জীবনের ভিত্তিভূমির ধ্বংসসাধনে। আমার
    বিশ্বাস, তোমরা যদি না কর, হয়ত বাইরের লোক এসে এ কাজ করবে। তোমরা যেই হও
    আর যাই হও না, বিকৃত হ’লে এ কাজ করবার অধিকার ও
    যোগ্যতা হারিয়ে ফেলবে। কামিনী-কাঞ্চনাসক্ত কতকগুলি ওঁছা লোক তোমাদের কাছে
    ভীড় জমাবে এবং আত্মস্বার্থের জন্য পরস্পর শকুনের মত কামড়াকামড়ি করবে।
    সৎসঙ্গে একদিন বৃষ্টির জলের মত টাকাবৃষ্টি হবে। সেই দিনই সৎসঙ্গের
    বিপদের দিন। ঐশ্বর্য ও ক্ষমতায় মাথা ঠিক থাকে খুব কম লোকেরই। যারা মনে
    করে ঐশ্বর্য্য ও শক্তি পরমপিতার, তিনিই মালিক, আমি এর
    অছিমাত্র, কাজলের ঘরে থাকা সত্ত্বেও তাদের গায়ে কালি লাগে না। নইলে মুস্কিল আছে।’’
    (‘আলোচনা-প্রসঙ্গে’-র সংকলক প্রফুল্ল কুমার দাস, এম.এ, প্রতি-ঋত্বিক প্রণীত
    ‘স্মৃতি-তীর্থে’ গ্রন্থের পৃষ্ঠা ১০২-১০৫ থেকে নির্বাচিত বাণী।)
    শ্রীশ্রীঠাকুরকে যদি মেনেই থাকেন তাহলে ঠাকুরের নিদেশ মেনে চলা
    উচিত। তাহলে কোন্ নিদেশ মেনে আপনাদের আচার্য্যদেব(গণ) ঠাকুরের নামে একের
    পর এক মন্দির নির্মাণ করে ইষ্ট প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে আত্ম প্রতিষ্ঠা করে
    চলেছেন!—এর কি উত্তর দেবেন বলুন?
    আর গণদীক্ষার কথা বলেছিলেন তো? তাহলে শুনুন—ঠাকুরের মতে, দীক্ষা
    হলো, কোন আদর্শকে সঞ্চারণা করার মাধ্যম। ঠাকুরের মূল আদর্শ—ঈশ্বর এক,
    ধর্ম এক, প্রেরিত-পুরুষ সেই এক-এরই বার্তাবাহী-র বার্তায় সবাইকে উদ্বুদ্ধ
    করা। দীক্ষার মাধ্যমে নাম-ধ্যান, শবাসন, থানকুনি পাতা সেবন, সত্তাপোষণী
    নিরামিষ আহার গ্রহণ, পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চিঃ-র অনুশাসন মেনে সদাচার
    এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন যাপন বিষয়ে উপদেশ দান এবং নিয়মনাগুলো শিখিয়ে
    দেওয়া। ওই নিয়মনাকে স্বীকৃতি দান করার মাধ্যম হল ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ
    পালন—যা দীক্ষাপত্রে উল্লেখ থাকে। এর জন্য কম করে ৩০ মিনিট সময় লাগা
    উচিত। অথচ গণদীক্ষার নামে যে ভাবে, যে হারে দীক্ষা দেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে
    তা নিয়ে একটা কর্মশালার মাধ্যমে সমীক্ষা চালালেই দেখা যাবে, তথাকথিত
    বেশিরভাগ দীক্ষিতগণ, ইষ্টাসনে একাধিক ফটো রেখে তার সামনে বসে বিনতি করা
    (যদিও তা’ সংখ্যায় নগণ্য), ইষ্টভৃতি এবং আচার্য্যভৃতির নামে পয়সা রাখা
    এবং মাস গেলে ‘উপযোজনা কেন্দ্রে’ পৌঁছে দেওয়া ভিন্ন কিছুই তারা জানে না।
    শ্রীশ্রীঠাকুরের জীবদ্দশায় একসাথে শতাধিক লোককে বসিয়ে দীক্ষা দান
    করার কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনার কথা জানা যায় নি। তৎকালিন ঋত্বিক দেবতারাও
    ছিলেন শ্রদ্ধা আকর্ষণী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তথাপিও শ্রীশ্রীঠাকুরকে
    আক্ষেপ করে বলতে হয়েছিল, —‘‘বৃত্তিতে তেল মালিশ করে বা
    স্বার্থপ্রত্যাশাকে উসকে দিয়ে মানুষকে দীক্ষিত করতে নেই। তা’তে মানুষ
    asset (সম্পদ) হয় না।’’ (আ. প্র. ৫ম খন্ড, ২৯. ১২. ১৯৪৩)
    —‘‘দ্যাখেন, (বীরেন ভট্টাচার্য্যের প্রতি) আজকাল আপনারা কতলোক
    দীক্ষা দিচ্ছেন, কিন্তু তার বেশীরভাগই বাজারী। ……ধর্ম্ম বলতে আমি যে
    সর্ব্বতোমুখী সঙ্গতিশীল কেন্দ্রানুগ কর্ম্মময় সার্থক জীবনের কথা বলি, তা
    অনেকেরই মাথায় ঢোকে না। ভাবে, আমাকে দিয়ে পরকালের পথ করে নেবে। কিন্তু
    পরিবার, দেশ, সমাজ, জাতি ও জগতকে …..দুনিয়াটাকে স্বর্গ করে তুলবে সে
    কথা আর ভাবে না।’’ (আলোচনা প্রসঙ্গে ৩য় খণ্ড, ১৩ই চৈত্র, শনিবার, ১৩৪৮,
    ইং ২৮। ৩। ১৯৪২)
    পরিবার, দেশ, সমাজ, জাতি ও জগতকে …..দুনিয়াটাকে স্বর্গ করে
    তোলার জন্য একদা দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রম থেকে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল,
    আলোচনা পত্রিকার, মাঘ সংখ্যার, ১৫০ পৃষ্ঠা থেকে তার একটা ক্ষুদ্র চিত্র
    তুলে ধরছি।
    “সৎসঙ্গের বর্তমান সর্বপ্রধান লক্ষ্যবস্তু হইল বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার,
    দেশীয় ঔষধপত্র প্রস্তুতের রসায়ণাগার ও কারখানা, হাসপাতাল, প্রসূতিসদন,
    বালক-বালিকাদের শিক্ষার জন্য উচ্চ বিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্র,
    কুটির-শিল্প ভবন, কৃষিপরীক্ষা-ক্ষেত্র প্রভৃতি স্থাপন পূর্বক পাবনার
    ন্যায় একটি আদর্শ পল্লী-উন্নযন কেন্দ্রের পুণঃ প্রতিষ্ঠা করা। প্রসঙ্গতঃ
    ইহা উল্লেখযোগ্য যে, অতীতের সেই পাবনা-সৎসঙ্গ পল্লী সংগঠনের উজ্জল
    আদর্শরূপে অদ্যাপি সারা ভারতে প্রসিদ্ধ হইয়া আছে. আর শুধুমাত্র বিহারেই
    নয়, পরন্তু ভারতের সকল প্রদেশেই এইরূপ আদর্শ কেন্দ্র স্থাপন করাই
    সৎসঙ্গের অভিলাষ।
    শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি আবাসিক পল্লী-বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন
    পূর্বক শ্রীশ্রীঠাকুরের পরিকল্পনাগুলির বাস্তব রূপায়নের উচ্চাকাঙ্খাও
    সৎসঙ্গ পোষণ করিয়া চলিয়াছে।……” (আলোচনা, মাঘ, ১৩৬৫/পৃঃ ১৫০)
    উক্ত দলিল থেকে প্রাপ্ত সংবাদে এটুকু বোঝা গেল যে, পাবনার হিমাইতপুর
    আশ্রমে শ্রীশ্রীঠাকুর যথেষ্ট প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে যে-সব
    কর্ম-প্রতিষ্ঠানসমূহ গড়ে তুলেছিলেন, তদনুরূপ কেন্দ্র ভারতের প্রতিটি
    প্রদেশে স্থাপন করা হবে। এবং একটি শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা
    হবে,—যা শ্রীশ্রীঠাকুরের এক অন্যতম ইচ্ছা।
    এবার দেখে নেওয়া যাক পাবনার হিমাইতপুর-আশ্রমের কর্ম-প্রতিষ্ঠানসমূহের এক
    সংক্ষিপ্ত বিবরণ।
    অখ্যাত পল্লী হিমায়েতপুরে বায়ু থেকে বিদ্যুত উত্পাদন করে পরম বিস্ময়
    সৃষ্টি করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। গড়ে তুলেছিলেন—তপোবন ও মাতৃ বিদ্যালয়—যা
    শিক্ষাক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। কলকাতা
    বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত মনোমোহিনী ইনষ্টিউট অফ সায়েন্স এণ্ড টেকনোলজি
    নামের বিজ্ঞান কলেজ। কেমিক্যাল ওয়ার্কসের জীবনদায়ী ঔষধসমূহ দেশে এবং
    বিদেশে সমাদৃত হয়েছিল।
    বৈদ্যুতিক এবং যন্ত্রশিল্পের আধুনিক সব ধরণের কাজ হতো ইলেকট্রিকাল ও
    মেকানিক্যাল ওয়ার্কসপে। যথা,–ঢালাই, ঝালাই, লেদের কাজ, ডাইস,
    ইলেক্ট্রোপ্লেটিং, ইলেক্ট্রিক্যাল ফিটিং, আরমেচার, ব্যাটারি প্লেট তৈরি ও
    মেরামত, ডায়নামো মেরামত ইত্যাদি। ছিল—ময়দার কল, আটার কল, চালের কল, তেলের
    কল, চিনির কল, মেডিকেটেড ওয়াটার মেশিন, স্পাইস পাউডারিং, সুতার গুটি
    তৈরি, টেলারিং, বোতাম তৈরি, গ্লাস ব্লোয়িং, পটারী ওয়ার্কস্, বেকারী,
    লজেন্স তৈরি, গ্রোসারী প্রোডাক্ট ইত্যাদির শিল্প। ছিল—কার্ডবোর্ড
    কারখানা, স্টীমলণ্ড্রী, কটন ইণ্ডাস্ট্রিজ, হোশিয়ারী শিল্প, ব্যাঙ্ক,
    ইঞ্জিনীয়ারিং ওয়ার্কস্, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র, স্বাস্থ্য বিভাগ,
    গৃহনির্মাণ বিভাগ, কলাকেন্দ্র, প্রেস (যেখানে বাংলা, হিন্দী, সংস্কৃত,
    উর্দু, আরবী, ফারসী হরফের কাজ হতো, দেশ ভাগের পর পাকিস্তান সরকার জবরদখল
    করে ঢাকাতে নিয়ে যায়।), পাব্লিশিং হাউস, ফিলানথ্রপি, মাতৃসঙ্ঘ ইত্যাদি।
    (তথ্যসূত্রঃ ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনী গ্রন্থ)
    শুধু আশ্রমবাসীরাই নয়, জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায়-ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে সকলেই
    ওইসব প্রতিষ্ঠানের সুলভ সেবা পেতেন। তথাপিও পাকিস্তান সরকার ওই সর্বজনীন
    কল্যাণধর্মী প্রতিষ্ঠানসমূহ দখল করে কেন বিনষ্ট করেছিলেন তার উত্তর আমার
    জানা নেই।
    যেমন জানা নেই, আলোচনা পত্রিকাতে বর্ণিত শ্রীশ্রীঠাকুরের একান্ত
    ইচ্ছাগুলোর বাস্তবায়ন দেওঘর সৎসঙ্গ কর্তৃপক্ষ করেছেন কি-না। যদি করে
    থাকেন কোথায় করেছেন, তার উদাহরণ দিন। ওই ইষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দেখার পর
    আপনার সাথে গলা মিলিয়ে ‘আচার্য্যদেব কি! —জয়!’ ধ্বনি দিয়ে মানব
    জীবনটাকে ধন্য করব। না, না, আপনার এক্ষুনি জানাতে হবে না, আপনাকে এক মাস
    সময় দিচ্ছি। আশাকরি এই সময়ের মধ্যে আপনি সব তথ্য সংগ্রহ করে আমাকে
    জানাতে পারবেন। আর যদি অনিবার্য্য কোন কারণে জানাতে না পারেন, তাহলে
    পরমপিতার একটা ভয়াল বাণী শুনে নিন।
    সবাই ক্ষমা পাবে—
    তা’ তা’রা যেমনতর অপরাধেই
    অপরাধী হোক না কেন,
    কিন্তু ক্ষমা পাবে না তারাই—
    যা’রা পবিত্র সত্তাকে
    অবমানিত করে,
    অবলাঞ্ছিত করে,
    —তা’ কখনও নয়।
    (ধৃতি-বিধায়না, ২য় খণ্ড, বাণী সংখ্যা ১১৬)           *  * *
    যদিও অনিমেষদা, সুভাসদাকে কথাগুলো বলেছিলেন। তবুও কেন জানি আমার ভয়
    ভয় করছে। দেওঘরের আচার্য্যদেবদের পাল্লায় পড়ে এ কোন্ বিপদে আবার পড়লাম!
    আমার আবার কিছু হবে না তো! আমি ক্ষমা পাব তো ? হে দয়াল! তুমি রক্ষা কোরো।

tapanspr@gmail.com