।। কোনটা খাব, আমিষ না নিরামিষ।। আসলে আমিষ বা প্রোটিন ছাড়া কোন খাদ্য নেই। তাই আমিষ-বিহীন নিরামিষ খাদ্যের ধারণার উৎপত্তি সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই। তথাপিও শিরোনাম দিয়েছি বলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। অনেকে মনে করেন মাছ-মাংস একমাত্র প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য। বিষয়টি কিন্তু তা’ নয়। উদ্ভিজ্জ খাদ্যে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার অপ্রতুল নয়। যারা মনে করেন, মাছ-মাংস ব্যতীত মানবদেহ সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারে না, তারাও জানেন যে, মৃত্যু পথযাত্রী রোগীকে বাঁচাবার জন্য যে তরল শিরার মাধ্যমে প্রবেশ করানো হয় তার মধ্যে উদ্ভিজ্জ উপাদান বিদ্যমান থাকে, মাছ-মাংসের উপাদান থাকে না। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, মাছ-মাংস ইত্যাদি প্রাণীজ খাদ্য ব্যতীত উদ্ভিজ্জ খাদ্যের সাহায্যে মানুষ সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকতে পারে। এমন অনেক প্রমাণ রয়েছে।
।। মৎস্য মাংস আহারে অপকারিতা সম্পর্কিত কিছু তথ্য ।। মহাভারতের অনুশাসন পর্ব্বে—১১৪ ও ১১৫ অধ্যায়ে—“মাংস আহার অবিধি” ব’লে উল্লেখ করা হয়েছে। মাছ-মাংস খেলে যে জাত্ যায়–তা নয়। উহা খেতে নিষেধ করার কারণ এই যে— উহা খেলে দেহের ভিতর একটা টকসিন নামক বিষ সৃষ্টি হয়, তাতে দেহের অনিষ্ট করে। মস্তিষ্কের কোষগুলিকে চঞ্চল করে তােলে এবং অবসাদগ্রস্ত করে। কাজেই সাধনার বিঘ্ন হয়, নাম ও ধ্যান ভাল হয় না এবং মন বহির্ম্মুখী হয়। তা ছাড়া আর একটা বিশেষ কথা এই যে মানুষের দেহের cells—কোষগুলি হ’লাে animal cells—জৈব-কোষ। আর আমরা যদি অপর animal cells—জৈবকোষ (মাছ-মাংসাদি) ভােজন করি, তাহলে বাহিরের animal cells—জৈবকোষগুলি ভিতরে গিয়ে ভিতরের animal cells—জৈবকোষগুলিকে attack (আক্রমণ) করে—একটা বিরােধ উপস্থিত করে। তার ফলে দেহের কোষগুলি—যা পুষ্ট ও পূর্ণ (developed ও complete) হতে—মনে করুন ৫০ বৎসর লাগতাে—তা ধাক্কা খেয়ে হয়তাে ৩০ বৎসরের মধ্যেই পুষ্ট ও পূর্ণ হ’য়ে গেল, সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয় আরম্ভ হ’লাে। এই ক্ষয় আরম্ভ হ’তাে কিন্তু ৫০ বৎসর পরে। কাজেই এখানে ২০ বৎসর পরমায়ু ক’মে গেল—এই বুঝতে হবে। আপাত দৃষ্টিতে মাছ, মাংস, আহারে দেহের পুষ্টতা দেখা গেলেও উহার পরিণাম খারাপ। মহাত্মা কবীর বলেছেন:— “তিলভর কি মচ্ছি খায়কর কোটী গজ দে দান। কাশী করবট লে মরে তােভী নরক নিদান।।” অর্থাৎ তিল প্রমাণ মৎস্য ভক্ষণ ক’রে যদি কোটি কোটি গজ দান করে এবং কাশী ও দ্বারকা প্রভৃতি স্থানে দেহ ত্যাগ করে, তাহলেও নরক গমন করতে হয়। আমরা ব্যবহারিক জীবনে দেখতে পাই যে কোন শুভকাৰ্য্য (বিবাহ, উপনয়ন, ব্রত, পূজা ও শ্রাদ্ধাদি) করবার সময় অন্ততঃপক্ষে একদিনের জন্যও সংযম করতে হয়, নিরামিষ হবিষ্যান্ন আহার করতে হয়। তাহলে নিজের আত্মার কল্যাণ অপেক্ষা আর শ্রেষ্ঠ শুভকাৰ্য্য কি আছে? আত্মার কল্যাণের জন্যই তাে সাধনা, ধ্যান ও ভজনাদি। তা প্রত্যহই—এমনকি সদাসর্ব্বদা করা প্রয়ােজন তাহলে এই শুভকার্য্যের জন্য প্রত্যহই সংযম আবশ্যক। তা ছাড়া আমরা যা আহার করি, তা নিজ নিজ ইষ্টকে নিবেদন ক’রে খাওয়ার বিধি। সেক্ষেত্রে মৎস্য মাংসাদি অপবিত্র বস্তু কি ক’রে ইষ্টকে নিবেদন করবে? শাস্ত্রে আছে অনিবেদিত কোন কিছু ভােজন বিষ্ঠা-ভােজন তুল্য। আমিষ দ্রব্য নিবেদন করা চলে না, সুতরাং খাওয়াও উচিৎ নয়। পশু, পক্ষী ও মৎস্যাদির মাংস আহার যে মনুষ্য দেহের অনুপযুক্ত, সে সম্বন্ধে কতকগুলি পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিকের মত নিম্নে উদ্ধৃত করা হলাে। (১) “The natural food of man judging form his structure consists of fruits, roots and vegetable.” Prof. Baron Cuvier– মানুষের দেহের গঠনাদি দ্বারা দেখা যায় যে ফল-মূল শাকাদিই তার স্বাভাবিক খাদ্য। (২) “No physiologist would dispute with those who maintain that man ought to live on vegetarian diet.” Dr. Spencer Thompson—কোন শরীর-তত্ত্ববিদ্ আপত্তি করতে পারেন না যে উদ্ভিদ-ভােজনই মানুষের কর্ত্তব্য। (৩) “Certainly man was never made to be a carnivorous animal.”—Prof. Ray—কিছুতেই মানুষ মাংসাশী জীবরূপে সৃষ্ট হয় নাই। (😎 “It is a vulgar error to regard meat in any form is necessary to life.”-Sir Henry Thompson—ইহা একটি ভ্রান্ত ও হীন ধারণা যে দেহরক্ষার জন্য মাংসাদি ভােজন আবশ্যক। (৫) “We can maintain that science & practice prove that vegetables and fruits can in every sense take the place of meat, even all of animal products.”—Dr. Alfed J. H. Crespi—আমরা সমর্থন করতে পারি যে বিজ্ঞান ও ব্যবহারের দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে ফল-মূল সব রকমে মাংস, দুগ্ধ ও ঘৃত প্রভৃতি সর্ব্ববিধ জৈবাহারের স্থান অধিকার করে। (৬) ডাক্তার আলেকজাণ্ডার হেগ্ এম.ডি., এফ.আর.সি.এস. বলেন যে—গবেষণা দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে উদ্ভিদ দ্বারা সহজে দেহ তাে রক্ষা হয়েই থাকে, উপরন্তু উহা সর্ব্বপ্রকারে শ্রেয়স্কর, যেহেতু ইহাতে দেহ, মনের উচ্চ শক্তি সমূহের স্ফূর্ত্তি হয়ে থাকে। (৭) ডাক্তার ই, গুডেল স্মিথ বলেন যে, যে-কোন প্রকার কাৰ্য্যে হােক, মাংসাশী অপেক্ষা উদ্ভিদভােজী বেশী পরিশ্রম ক’রতে অনায়াসে সমর্থ। মাংসাশীর মত তারা সৰ্ব্বদা রােগ ভােগ করে না এবং ক্ষুধা, তৃষ্ণা সহ্য করবার শক্তিও আছে। এক বেলা আহার না জুটলেও তাদের দেহে কোন গােলযােগ উপস্থিত হয় না। (৮) নিউ-ইয়র্কের ডাক্তার বোল উইভিল্ বলেন যে—সকল প্রকার আমিষের মধ্যেই শরীর-পুষ্টির অনুকূল লাবণিক পদার্থ এবং ধাতব পদার্থের কতকটা অভাব আছে, প্রকৃতপক্ষে আমিষ অতি অপদার্থ জিনিষ। কেবল রােগের আকর এবং আবর্জ্জনার মত অখাদ্য। ডিম মানুষের স্বাভাবিক খাদ্য নহে। বাসি সিদ্ধ মাংস কুকুরের আহারের উপযুক্ত নয়। আমিষ আহারে স্নায়বিক দৌর্ব্বল্য ঘটে। যে-সকল রোগে আমাদের আংশিকভাবে বা সম্পূর্ণরূপে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে এবং যে-সকল রোগে রক্তসঞ্চালন ক্রিয়ায় ব্যাঘাত করে। আহার বিষয়ে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের বাণী
**মানুষ তাহার খাদ্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করুক | নিশ্চয়ই আমি সুবর্ষণে বারিবর্ষণ করিয়াছি। তৎপর আমি ভুলকে সুবিদারণে বিদীর্ণ করিয়াছি, পরে তার মধ্যে শস্য উৎপাদন করিয়াছি এবং আঙ্গুর ও শাক-সবজি এবং জয়তুন ও খর্জুর এবং নিবিড় উদ্যান সমূহ এবং ফল ও তার, উহা তোমার জন্য ও তােমাদের পশু সমূহের জন্য উপকারী। (আল-কোরান সুরা আবাসা’র ২৪-৩২ আয়াত।) **পৃথিবী পৃষ্ঠের শাক- পাতা ফলমূল মানুষের জন্য উৎকৃষ্ট ও স্বাভাবিক খাদ্য। (বাইবেল) **কায়িক দুষ্কার্য -প্রাণী হত্যা, চুরি, ব্যাভিচার পরিত্যাগ করিয়া কায়িক কুশল সাধন করিবে। (ত্রিপিটক) **অপুত্রক রাজা বিম্বিসা পুত্র লাভের আশায় সহস্র ছাগ বলি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে বুদ্ধদেব তার প্রতিরোধ করেন। (বুদ্ধচরিত) **কাঁচা কিমা রান্না মাংস আহার করে যারা / ভ্রুণ হত্যায় পাপে জেনাে ধ্বংস হবে তারা। । (অথর্ববেদ-৪-৬-২৩) **বৈদিক যুগের প্রথম দিকে মাংসাহারের প্রচলন থাকলেও পরে প্রাণী হত্যা ও মাংসাহার খুব কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ হয়। **প্রাণী হত্যাকারী কিম্বা হত্যার অনুমােদক/ ক্রেতা-বিক্রেতা-রাধুনী আর পরিবেশক আহার করে আহার করায় সর্বকালে যারা / হত্যার দায়ে অপরাধী বিশ্বমাঝে তারা। (মনু সংহিতা ৫-৫১) **আমি তােমাদের দুইটি শস্য খাইতে নিষেধ করিতেছি একটি পিয়াজ অপরটি রসুন। (হাদীস) ** যে কেহ পিঁঁয়াজ রসুন ভক্ষন করিবে তাহারা যেন আমাদের মসজিদের সমীপবর্তী না হয়। *আল হাদিস, মিশকাত শরীফ।) **মহানবী (সাঃ) এর নিকট কিছু মাংস আনা হলে তিনি তার ঘ্রাণ পেয়ে বললেন, ইহা তোমার কোন বন্ধুর নিকট লইয়া যাও এবং খাও, কেননা আমি এমন জনের সহিত আলাপ করি যাহার সহিত তােমরা আলাপ কর না। (হাদীস, বােশারী ও মােসলেম) ** মনে রাখিও আমাদের (পশুর) রক্ত মাংস আল্লাহর কাছে কখনো পৌঁছাবে না, কিন্তু তোমাদের সংগম সততা অবশ্যই পৌঁছাবে। (কুরআন ২২/৩৭) **কু-দৃষ্টিকারীর খাদ্য ভোজন করিও না, তাদের সুস্বাদু ভক্ষ্যে লালসা করিও না; কেননা সে অন্তরে যেমন ভাবে, নিজেও তেমনি। সে তােমাকে বলে, তুমি ভােজন পান কর, কিন্তু তাহার চিত্ত তােমার সহবৰ্ত্তী নয়। (বাইবেল) **বেনামাজীর (সাধনশীল নয় এমন ব্যক্তির) হাতে খাদ্য গ্রহণ করিও না। (আল হাদীস) **বিষয়ীর অন্ন খাইলে মলিন হয় মন। (শ্রীশ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু।) **জিহ্বার লালসে জীব ইতিউতি ধায় শিশ্নোদর পরায়ন কৃষ্ণ নাহি পায়। (শ্রীশ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু।) অন্নে জানিস মন বয় অন্ন মাফিক প্রবৃত্তি হয়। (শ্রীশ্রীঠাকুর অনুুকূলচন্দ্র।) সদাচারী নয়কো যে জন ইষ্ট বিহীন রয় পান ও ভোজন তাহার হাতে বিষ বহনই হয়। (শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র) **প্রত্যেকের মানসিক অবস্থা-অনুযায়ী তার থেকে একটা Radiation (বিকিরণ) নির্গত হয়, সেই Radiation (বিকিরণ) আবার অন্যকে Influence (প্রভাবিত) করে । সেই জন্য শুধু খাওয়া কেন, সবাইকে সব সময় ছোঁয়াও ভাল নয়। বিশেষতঃ মানুষ যখন সাধন-ভজন ব্রত প্রায়শ্চিত্ত ইত্যাদি নিয়ে ব্যাপৃত থাকে। এগুলি কোন কুসংস্কারের কথা নয়। সাদা চোখে দেখা যায়। আবার সূক্ষ্ম যন্ত্র আবিষ্কার করলে তাতেই ধরা পড়তে পারে। (শ্রীশ্রীঠাকুর অনুুকূলচন্দ্র, আঃ প্রঃ-৩/২৮০)
** আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য **
।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের আলোকে আদর্শ কন্যা-সন্তান নির্মাণ ।।
[বিশ্বজুড়ে মেয়েরা তাদের শিক্ষা, তাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা এবং হিংসাবিহীন জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। প্রতিবন্ধী মেয়েরা সহায়তা এবং পরিষেবাগুলি পাওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বাধার সম্মুখীন হচ্ছে,’ রাষ্ট্রসংঘের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে এই কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারকরা বিনিয়োগ করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন যা মেয়েদের দ্বারা অনুভূত বৈষম্য মোকাবেলা করবে। এই দিনটি পালনের ইতিহাস: ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদ ১১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক কন্যা সন্তান দিবস হিসাবে ঘোষণা করে। যাতে সারা বিশ্বে মেয়েদের অধিকার এবং মেয়েরা যে অনন্য চ্যালেঞ্জগুলির মুখোমুখি হয় সেটিকেই স্বীকৃতি দেয়। আন্তর্জাতিক কন্যা সন্তান দিবসের তাৎপর্য: সারা বিশ্বে মেয়েরা যে সমস্যাগুলির সম্মুখীন হন, যেমন শিক্ষা, পুষ্টি, জোরপূর্বক বাল্যবিবাহ, আইনি অধিকার এবং চিকিৎসার অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা না থাকা— এই জাতীয় সমস্যা সম্পর্কে সকলকে সচেতন করে। প্রতি বছর দিনটির থিম পরিবর্তিত হয়। রাষ্ট্রসংঘের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘এখন সময় এসে গিয়েছে, মেয়েদের কাজ, তাঁদের অধিকার সম্পর্কে আমাদের সকলের দায়বদ্ধ হতে হবে। তাঁদের নেতৃত্বে বিশ্বাস রাখতে হবে।’ এটিই সব মিলিয়ে এই দিনটির গুরুত্ব।] (সূত্রঃ গুগল)
কোন দার্শনিক তত্ত্ব না জানলেও চলবে। প্রাকৃতিক নিয়মে একটি মেয়ের চরম প্রাপ্তি ভালো সন্তানের মা হওয়া। তাই শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রতিটি কন্যা সন্তানকে আদর্শ মা হবার উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে, অবলা নয়, সবলারূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন । নারীর সতীত্বই নারীকে সবলা করে তোলে। তাই তিনি কত আশা নিয়ে কন্যাদের উদ্দেশ্য করে বললেন— ‘‘মেয়ে আমার, তোমার সেবা, তোমার চলা, তোমার চিন্তা, তোমার বলা পুরুষ-জনসাধারণের ভিতর যেন এমন একটা ভাবের সৃষ্টি করে— যা’তে তারা অবনতমস্তকে, নতজানু হ’য়ে সসম্ভ্রমে, ভক্তিগদগদ কন্ঠে— ‘মা আমার,— জননী আমার’! ব’লে মুগ্ধ হয়, বুদ্ধ হয়, তৃপ্ত হয়.কৃতার্থ হয়,— তবেই তুমি মেয়ে. —তবেই তুমি সতী।’’ অর্থাৎ প্রতিটি মেয়েকে শ্রদ্ধা-আকর্ষণী চরিত্রে অধিষ্ঠিত করতে চাইলেন। সাথে সাথে একটা কুমারী মেয়ের বাস্তব চলনের মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়ে বললেন —
“তুমি মানুষের মায়ের মত আপনার হইতে চেষ্টা কর,— তাহা কথায়, সেবায় ও ভরসায়, কিন্তু মেশায় নয়; দেখিবে— কতই তোমার হইয়া যাইতেছে। ১ । (নারীর নীতি) * * * *
আমরা যে, যা বলিনা কেন, একটা মেয়ের চরম প্রাপ্তি সার্থক মাতৃত্বে। আমার ব্যক্তিগত ভাবনায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সে-বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করলেই কন্যা-দিবস উদযাপন যথার্থতায় সার্থক হবে।
বর্তমান যুগে মেয়েরা লেখাপড়া, শিক্ষা-সংস্কৃতি, কর্মক্ষেত্রে, অভিযানে, বিজ্ঞান গবেষণায় প্রভৃতি কোন ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নেই। এমন অনেক নারীদের কথা আপনারা জানেন, আমিও জানি। আবার এ-ও দেখেছি, বাহ্য জগতের সবক্ষেত্রে কৃতি নারীদের অন্তর্জগতের হাহাকার। মনের মত সন্তান না পাওয়ার জ্বালায়, সন্তানকে মনের মত করে মানুষ করতে না পারার জ্বালায়, থ্যালাসেমিয়া, স্কিজোফ্রেনিয়া, লিউকোমিয়া প্রভৃতি নামের দুরারোগ্য ব্যাধির জ্বালায় জ্বলতে গিয়ে জীবনের সুখ-শান্তির অনুভূতিটা হারিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছে।—যেন, ‘সব আছে তবু নেই’। মাতৃত্ব-পিয়াসী একজন সন্তানহীনা নারীর যে কি কষ্ট, কি বেদনা, তা ভুক্তভোগী ভিন্ন কেউ উপলব্ধি করতে পারবে না। একটি সন্তান পেতে সব-রকমের চিকিৎসা করার পরও যখন সন্তান-লাভে ব্যর্থ হয়, তখন অনেক টাকা খরচ করে গর্ভ ভাড়া নেয়, দত্তক সন্তান নেয়।—এমন অনেক কিছু করেন। ওই সব সমস্যার স্রষ্টাও কিন্তু নারী। ‘আত্মানং বিদ্ধি।’-র শিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে সব কিছুকে জেনেছে, নিজেকে জানতে পারেনি। নিজের নারীত্বের-পূর্ণতার বিষয়ে জানা হয়ে ওঠেনি। প্রাকৃতিক নিয়মে নারী হতে জন্মে জাতি। নারীই গৃহ, সমাজ ও রাষ্ট্রের ধাত্রী ও পালয়িত্রী। প্রাকৃতিক নিয়মে একজন নারীর চরম পরিণতি মাতৃত্বে। মুখে আমরা যতই নারী-স্বাধীনতার কথা বলি না কেন, এক্ষেত্রে কিন্তু পুরুষের উপর নির্ভরশীল হতেই হয়। (অবশ্য লেসবিয়ান আদর্শে বিশ্বাসীদের কথা আলাদা। তারা অবশ্যই ব্যতিক্রমী।) সেই পুরুষটি মাতৃত্বকামী নারীর তুলনায় শারীরিক-মানসিক-আত্মিকভাবে যত উন্নত হবে,— স্বাস্থ্যবান হবে, ভালো চরিত্রের হবে, নারীটির দাম্পত্য জীবন তত সুখের হবে, সন্তানও ভালো হবে। এটাই তো স্বাভাবিক নিয়ম। তাই নয় কি? আর সেগুলো পেতে গেলে বর্ণে, বংশে, বয়সে, স্বাস্থে, শিক্ষায়-দীক্ষায়—সবদিক থেকে উন্নত সম-বিপরীত সত্তার একটা পুরুষকে, ভাবী সন্তানটির বাবাকে খুঁজে নিতে হবে, বিবাহের মাধ্যমে। বিবাহ মানে পুরুষের সত্তাকে বিশেষরূপে বহন করা। যে পুরুষটির কাছে নারীত্বকে সমর্পণ করে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে। তাই নির্ঝঞ্ঝাট সুখের দাম্পত্য জীবন পেতে গেলে, ভালো সন্তানের মা হতে গেলে, লেখাপড়া শেখার পাশাপাশি, কুমারী অবস্থা থেকেই একটা পরিকল্পনা করে নিতে হবে। কারণ প্রত্যেক নারীই চায় তার সন্তানটি সুস্থ থাকুক, ভালো হোক, কৃতী হোক। সেগুলো তো আর রেডিমেড পাওয়া যাবে না, আর স্টেজ মেক-আপও দেয়া যাবে না। নিয়ম মেনে অনুশীলন করতে হবে। মা-কেই মেপে মেপে সঞ্চয় করতে হবে ভবিষ্যতের সন্তানের ভালামন্দের সব উপকরণ। মা মানে মেপে দেওয়া। সন্তানের ভালো-মন্দ মেপে দেয় বলেই মা। ভাবী মায়ের চলন-চরিত্র দ্বারা প্রভাবিত হয় নারী-জননকোষ, অপত্য-কোষ। সেইজন্যই সন্তান ধারন-পালন-লালন-এর জন্য আবশ্যিক প্রত্যঙ্গগুলোকে সযত্নে মেপে মেপে লালন-পালন করতে হবে, সংরক্ষণ করতে হবে ভবিষ্যতের সন্তানের মঙ্গলের জন্য। তা না করে ‘হেটেরো-সেক্সুয়াল’ কমপ্লেক্সের প্রলোভনে পড়ে ওগুলোকে যদি আম-পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করে ফেলা হয়, তাহলে তো ভাবী সন্তানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। যার জন্য সংরক্ষিত জিনিস, আত্মঘাতী উদারতার বশে অন্যকে ভাগ দেবার অপরাধে। এজন্য রোগ-ভোগেও ভুগতে হয়। Oncologist, Gynaecologist, Sexologist, Psychologist-দের শরণাপন্ন হতে হয়।
নারীত্বের বিশুদ্ধতা সংরক্ষিত করে সুসন্তান লাভ করা বিষয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘জন্মকথা’ কবিতায় লিখছেন— খোকা মাকে শুধায় ডেকে, ‘এলেম আমি কোথা থেকে কোনখেনে তুই কুড়িয়ে পেলি আমারে ?’ মা শুনে কয় হেসে কেঁদে খোকারে তার বুকে বেঁধে— ‘ইচ্ছা হয়ে ছিলি মনের মাঝারে।। ছিলি আমার পুতুল খেলায়, ভোরে শিবপূজার বেলায় তোরে আমি ভেঙেছি আর গড়েছি। তুই আমার ঠাকুরের মনে ছিলি পূজার সিংহাসনে, তাঁরি পূজায় তোমার পূজা করেছি।। আমার চিরকালের আশায়, আমার সকল ভালোবাসায়, আমার মায়ের দিদিমায়ের পরাণে, পুরানো এই মোদের ঘরে গৃহদেবীর কোলের ’পরে কতকাল যে লুকিয়ে ছিলি কে জানে।।’
একটু বোধি-তাৎপর্য দিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, কবিগুরু তাঁর ওই কবিতায় জেনেটিক্সের, ইউজেনিক্সের, সুরত-সম্বেগের চরম এক তত্ত্বের অবতারণা করেছেন। একটা উন্নত প্রজাতির আমগাছ লাগাতে গেলেও কিছু প্লান-প্রোগ্রাম নিতে হয়। আগে থেকে জমি নির্বাচন করতে হয়, উপযুক্ত সার দিয়ে জমি তৈরি করতে হয়, তারপর মাটির উপযুক্ত বীজ বা চারা বসাতে হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় বর্তমান যুগের বেশিরভাগ লেখাপড়া শিখতে যাওয়া নারীরা, পুরুষের সাথে পা-মিলিয়ে, গলা-মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ‘হোক-কলরব’ আন্দোলনে পারদর্শী হলেও, নিজের আত্ম-বিস্তারের জন্য আবশ্যিক আত্ম-সম্পোষণ, আত্ম-সংরক্ষণ করার জন্য নির্দিষ্ট নারীত্বের অস্তিত্ব রক্ষার জমিটুকুকে সংরক্ষণ করা বিষয়ে উদাসীন। যারফলে কালেক্রমে মনুষ্যত্ব সম্পন্ন অসৎ-নিরোধে তৎপর সন্তান থেকে সভ্যতা বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব রামকৃষ্ণদেব, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নেতাজী সুভাষচন্দ্র প্রমুখ মনীষীদের জন্মদাত্রীগণ ক্যাম্পাসে, অফিসে, মিটিংয়ে, মিছিলে কোন ‘কলরব’ না করেই, সনাতনী নারীধর্ম পালন করে রত্নগর্ভা হয়েছিলেন। ভারতীয় কৃষ্টি প্রদত্ত প্রকৃষ্ট-গতির পথ ভুলে, তথাকথিত প্রগতির নামে ছুটে চলা নারীবাদিরা বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে দেখতে পারেন।
পরিবারকে উন্নতি বা অবনতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী প্রধানতঃ নারী। কথায় আছে, ‘সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে। গুণবান পতি যদি থাকে তার সনে।।’ আদর্শ একজন পুরুষের সাহচর্যে নারীর হাতেই গড়ে ওঠে আদর্শ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র। নারীই হচ্ছে জাতির বল ও ভরসা। লক্ষী নারীদের উপরেই রয়েছে মহান জাতি গঠনের বিরাট দায়িত্ব। মহান আদর্শকে চরিত্রায়িত করে নারী যদি পরিবারকে সুন্দর ও সার্থক করে সাজিয়ে তুলতে পারে তবেই জগত-সংসার সুখের হয়। আদর্শ জাতি গঠন করার দায়িত্ব নারীদের উপর থাকার জন্য তাদের শিশুকাল থেকেই ভালো মা হবার সাধনায় অগ্রসর হতে হবে। নারী জীবনের বিভিন্ন পর্যায় আছে। ওই পর্যায়গুলো ভগ্নি, বধূ, স্ত্রী, জায়া, জননী ও গৃহিনী ও জননীত্ব। ওগুলোকে সমৃদ্ধ নারীরাই করতে পারেন, পুরুষেরা নয়। স্নেহ, মায়া, মমতা ও ভালবাসার দ্বারা পূর্ণ নারীর হৃদয়। নারীরা ইচ্ছা করলেই তাঁর অন্তর্নিহিত বিভিন্ন শক্তির দ্বারা জাগিয়ে তুলতে পারেন বিশ্বকে। নারীর মধ্যে সুপ্তভাবে থাকা গুণরাজিকে ইচ্ছে করলেই ব্যক্ত করা যায় ভালোবাসা বা ভালোতে বাস করার বিজ্ঞানসম্মত পাঠ নিয়ে।
আমাদের ঘরের কন্যা মা উমা-র বাপের বাড়িতে আগমনকে কেন্দ্র করে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার আয়োজন অনেকগুণ বৃদ্ধি পেলেও, অনেক মাতামাতি হলেও, দেবীদুর্গার দশপ্রহরণধারী আদর্শ কিন্তু আমাদের চরিত্রে তেমন রেখাপাত করতে পারেনি। যদি করতো, কন্যারূপী দুর্গা মায়েরা অসুররূপী পুরুষদের লালসার স্বীকার হতে পারত না। একটা মেয়ে কিভাবে দুর্গাশক্তিকে আয়ত্ত করে আত্মরক্ষায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে, যুগধর্ম সেই শিক্ষায় মেয়েদের শিক্ষিত করতে ব্যর্থ হয়েছে! পুরুষ-সাধারণ, মেয়ে-সাধারণকে কামনার বস্তু হিসেবে না ভেবে, দেবী দুর্গাজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখবে, সেই শিক্ষার প্রচলন করা হয়নি। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কিন্তু ঘরে ঘরে সেই শিক্ষার বীজ বপন করলেন দীক্ষার মাধ্যমে।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র নারীর মধ্যে দেবী দুর্গার আসন পেতে দিতে অনুশ্রুতির বাণীতে বললেন : “শার্দ্দুলেরে বাহন করে সাপের ফণার মালা পরে কালবোশেখী ঝঞ্ঝাবেগে ছোটরে নারী ছোটরে ছোট্ । দত্যিদানার নীচ বাহানা আর্য্যাবর্তে দিয়ে হানা ঘূর্ণিপাকের বেতাল গাঁথায় হুলিয়ে ভুলিয়ে দিচ্ছে চোট্ । দশ প্রহরণ দশ হাতে ধর বক্ষবিদরি ধ্বংসি ইতর সূর্য্যরাগী বজ্রতেজে আর্য্যনারী শত্রু টোট্ ।” তিনি নারীকে অবলা নয় সবলারূপে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন । নারীর সতীত্বই নারীকে সবলা করে তোলে। তাই তিনি কত আশা নিয়ে বললেন— সতীর তেজে ঝলসে দে মা নিঠুর কঠোর অন্ধকারে মদনভস্ম বহ্নিরাগে বৃত্তি-রিপু দে ছারখারে । প্রণবতালে ইষ্টমন্ত্র ঝঙ্কারি তোল সকলতন্ত্রে বিষাণ হাঁকে রুদ্র দোলায় বজ্রে হানি মৃত্যুদ্বারে ।
শুধুমাত্র কন্যাদের জন্যই নয়, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র পুরুষ-সাধারণের উদ্দেশ্যে সত্যানুসরণ গ্রন্থে বললেন, “প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী। প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয়।” এবং পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, “স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যেজন, তাহার হয় না ভবের বন্ধন মোচন। স্ত্রী চিন্ময়ী মা ।” তিনি নারী-সাধারণকে মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েই ক্ষান্ত হন নি, স্ত্রীকেও চিন্ময়ী মা জ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শেখালেন । কারণ, স্ত্রীর মাধ্যমে স্বামী নিজেকে জন্মান, তাই স্ত্রীকে জায়া বলা হয়েছে । আর্য্য বিধির গর্ভাধান কালে স্ত্রীর নাভিমূল স্পর্শ করে “প্রসীদ মা জগজ্জননী” মন্ত্রে অভিষিক্ত করে স্ত্রীর গর্ভে নিজেকে প্রবেশ করাতে হয় । প্রজা-সৃষ্টি প্রকরণের কি অপূর্ব ব্যঞ্জনা । যৌন জীবনে পুরুষদের শিব, আর নারীদের দুর্গা জ্ঞানে অভিষিক্ত করে কাম (lust) কে আসুরিক প্রবৃত্তির কবল থেকে মুক্ত করে দৈবীপ্রেমে (love) রূপান্তরিত করলেন । শ্রীশ্রীঠাকুর মেয়েদের মা এবং ছেলেদের দাদা সম্বোধনের বিধান প্রবর্তন করে নারীপুরুষের সুপ্ত যৌন সম্বেগের রাশ টেনে ধরলেন। ঘরে ঘরে বাস্তব কন্যা বা মাতৃপূজার এক স্থায়ী আসন প্রতিষ্ঠা করলেন। সেই আসনকে পবিত্র-আচরণে শুদ্ধ রাখতে কন্যার মায়েদের এ বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে । গুরুত্ব দিতে হবে নিজ-নিজ মেয়েদের পবিত্রতার দিকে । যুগধর্মের প্রভাব থেকে মুক্ত করে শ্রীশ্রীঠাকুরের নারীর নীতি, নারীর পথে, দেবী-সূক্ত ইত্যাদি গ্রন্থের বিধান অনুসারে মেয়ে যা’তে বয়সে, বর্ণে, বংশে, স্বাস্থ্যে, শিক্ষায় তুলনামূলক সমবিপরীত বৈশিষ্ট্যের সমুন্নত বরণীয় পুরুষকে বরণ করে একজন আদর্শ বধূ, মনোবৃত্যানুসারিনী স্ত্রী, জায়া, পরিমাপনি মা হয়ে শুদ্ধাত্মার জন্ম দিতে পারে । আজকের মেয়েই তো ভবিষ্যতে মা হবে। আদর্শ মা হতে গেলে বর্তমানের মায়েরা তাদের কন্যাদের অবশ্যই শেখাবেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের নিম্নোক্ত নিদেশ-বাণীগুলো।
“ছেলেমেয়ে এক-যোগেতে করলে পড়াশোনা পড়ার সাথে বাড়ে প্রায়ই কামের উপাসনা। কুমারী একটু বড় হলেই পুরুষ ছুঁতে নেই, যথা সম্ভব এর পালনে উন্নয়নের খেই । পরের বাবা পরের দাদা পরের মামা বন্ধু যত এদের বাধ্যবাধকতায় সম্বন্ধটি যাহার যত অনুরোধ আর উপরোধে ব্যস্ত সারা নিশিদিন কামুক মেয়ে তাকেই জানিস গুপ্ত কামে করছে ক্ষীণ । বিয়ের আগে পড়লে মেয়ে অন্য পুরুষে ঝোঁকের মন স্বামীর সংসার পরিবার করতে নারে প্রায়ই আপন ।। পুরুষ নষ্টে যায় না রে জাত নারী নষ্টে জাত কুপোকাত । নারী হতে জন্মে জাতি থাকলে জাত তবেই জাতি ।” যুগধর্মের প্রভাবের আকর্ষণে ওই বিধান উপেক্ষা করলে হবেই ক্ষতি। কারণ, “নারী হইতেই জাতি জন্মে ও বৃদ্ধি পায়, তাই নারী যেমন ব্যষ্টির জননী তেমনই সমষ্টিরও ;– আর, এই নারী যেমন ভাবে আবিষ্ট থাকিয়া যেমন করিয়া পুরুষকে উদ্দীপ্ত করে পুরুষ হইতে সেই ভাবই নারীতে জন্মগ্রহণ করে ; তাই, নারী মানুষকে প্রকৃতিতে মূর্ত্ত ও পরিমিত করে বলিয়া জীব ও জগতের মা ;–তাহ’লেই বুঝিও– মানুষের উন্নতি নারীই নিরূপিত করিয়া দেয় ; তাই নারীর শুদ্ধতার উপরই জাতির শুদ্ধতা, জীবন ও বৃদ্ধি নির্ভর করিতেছে– বুঝিও, নারীর শুদ্ধতা জাতির পক্ষে কতখানি প্রয়োজনীয়!” ১৭৬ । (চলার সাথী গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী) হে কন্যারূপী মেয়েরা! ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক ভাবনায় তোমাদের দেবীজ্ঞানে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। তাই তো কুমারী পূজা না করলে দেবীর পূজা ও হোম সফল হয় না। শক্তির আরাধনার নামে আদর্শ নারীশক্তির প্রতীক স্বরূপা দুর্গা, কালী, জগদ্ধাত্রী এবং বাসন্তী পূজার আয়োজন হয়ে চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। যার উদ্দ্যেশ্য চিন্ময়ী নারীদেরও আমরা যেন আদ্যাশক্তির প্রতীক মনে করে পরমার্থ দর্শন ও পরমার্থ অর্জন করতে অভ্যস্ত হই, শ্রদ্ধা জানাই, নারীকে যেন কামনার, ভোগের বস্তু মনে না করি, নারীকে ভোগ্যা নয়, পূজ্যা রূপে স্বীকৃত দেবার জন্যই কুমারী পূজা। আদ্যাশক্তির প্রতীক নারীরা যদি রুষ্ট হয় তাহলে সৃষ্টির ছন্দে পতন অবশ্যম্ভাবী। ওই আদর্শকে সমাজজীবনে প্রতিষ্ঠা দিতে মূর্ত্তিপূজার পাশাপাশি তন্ত্রশাস্ত্রকারেরা দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য দেবীজ্ঞানে কুমারী পূজারও প্রচলন করেছিলেন। ফলহারিনী কালীপূজার রাতে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নিজের স্ত্রীকে ষোড়শীজ্ঞানে পূজা করেছিলেন। সেই আদর্শকে পাথেয় করে তোমাদের কন্যা-জীবন সার্থক হোক—আদর্শ অনুচলনের সার্থক চলায় গার্গী, মৈত্রেয়ী, অপালা, লোপামুদ্রা, খনা, সীতা, দ্রৌপদীর মতো প্রাতঃ স্মরণীয়া প্রণম্যা হয়ে ধন্য করো আর্য্য স্তন্যদায়িনী মাতা ভারতবর্ষকে। প্রার্থনা জানাই পিতার পিতা পরমপিতা সমীপে। জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!
।। ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ ।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রদত্ত নিত্য অনুসর্তব্য ছড়াবাণী—- “অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে ধর্ম্ম বলে জানিস্ তা’কে।”-র মধ্যে ইষ্টভৃতির মূল তত্ত্ব সুপ্ত।—জীবনবাদের মূল কথা। অর্থাৎ আমার বাঁচা অন্যের ওপর নির্ভরশীল। এখানে অন্য বলতে আমার পারিপার্শ্বিক। পারিপার্শ্বিক মানে পরিবেশ। সব কিছু বেঁচে থাকার উৎস পরিবেশের অজৈব— ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ , ব্যোম ও তেজ ইত্যাদি উপাদান পঞ্চ মহাভূতকে বাঁচিয়ে না রাখলে জীবজন্তু, গাছপালা, মানুষ কিছুই বাঁচতে পারবে না। তাই প্রথম ইষ্ট কর্ম হচ্ছে আমি ব্যক্তিটির দ্বারা যেন পরিবেশের জৈবাজৈব কোন কিছু ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে চলা। অন্যের বেঁচে থাকা এবং বৃদ্ধি পাওয়াকে ব্যাহত করে আমি যদি বাঁচার রসদ বা উপকরণ সংগ্রহ করি, তাহলে ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ করা হবে। আমার বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু প্রয়োজন, ঠিক ততটুকু পরিবেশ থেকে নিতে হবে। জীবন ধারণের আহরণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গ্রহণ করলেই জীবন বৃদ্ধির বিরুদ্ধাচরণ করা হবে। যার জন্য শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, বাঁচতে নরের যা’ যা’ লাগে/তাই দিয়ে তো ধর্ম জাগে। অপচয় করাটাও অধর্ম। ধারণ-পালনের বিপরীতে ক্রিয়াশীল। যাকে পাপ বলা হয়েছে। আমরা সেই কাজটাও করে ফেলি ধর্ম পালনের নামে। নিজেদের খেয়াল চরিতার্থ করার জন্য অন্যকে মেরে ধর্ম পালন করি। ইষ্ট পূজার নামে, উৎসবের নামে ফুলের নৈবেদ্য সাজিয়ে ফুলের জীবনগুলো নষ্ট করে ফেলি! উৎসবের মূল সূত্র সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির প্রাণনে, ব্যাপনে, বর্দ্ধনের ফর্মূলাকে পাশ কাটিয়ে! অথচ যাঁর পুজো করছি, যাঁর উৎসব করছি, তিনি কিন্তু ফুল ছিঁড়তে নিষেধ করেছেন। বলেছেন, ওদের ক্ষুদ্র জীবনটাকে উপভোগ করতে দাও। Let them enjoy their little days. এসব ছোটখাটো জিনিস উপেক্ষা করলে কিন্তু ধার্মিক হওয়া যাবে না। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের অনুশাসন মেনে। তাই, বাস্তব চলনায় ইষ্ট অর্থাৎ মঙ্গল কর্মের ভরণ, পরিপূরণ বাদ দিয়ে ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞ পালন সম্ভব নয়। ইষ্ট মানে পূর্ত। পূর্ত মানে পরিবেশ। পরিবেশের রক্ষণাবেক্ষণ বাদ দিয়ে টাকার মাপকাঠিতে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ইষ্টভৃতি করা যায় না। * * * সৎসঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কথিত ‘সৎসঙ্গ চায় মানুষ’ বাণীতে বর্ণিত সৎসঙ্গের আদর্শের সাথে, ‘ইষ্টভৃতি’ শব্দের মর্মার্থের সাথে পরিচিত নাহলেও ‘ইষ্টভৃতি’ নামের সাথে বেশীরভাগ সংঘকেন্দ্রিক জনেরা যেমন পরিচিত, তেমনি সাধারণ লোকেরা শ্রীশ্রীঠাকুরের নামে টাকাপয়সা রাখা এবং নির্দিষ্ট সংস্থায় জমা দেওয়াকেই ‘ইষ্টভৃতি’ মনে করেন। অনেকানেক দীক্ষিত জনেরা শুক্রবার বাদে অন্যান্য দিন মাছ-মাংস-পেঁয়াজ-রসুনাদি অভক্ষ্য ভোজন করেন, বর্ণাশ্রমধর্মের প্রতি মুখ ফিরিয়ে বৃত্তিহরণ কর্মাদি করেন, প্রতিলোম-বিবাহ বিলাসে অগম্যাগামী হয়েও গর্ব করে বলেন, ‘আমি রোজ ১০/২০/৩০ ……… টাকা করে ইষ্টভৃতি করি।’ শ্রীশ্রীঠাকুর অসদুপায়ে উপার্জন (সদাচার এবং বর্ণাশ্রম বিধি না মেনে যে উপার্জন।) দিয়ে ইষ্টভৃতি করার নিদেশ কোথাও দেন নি। তিনি বলেন,— “সত্য পথে চললে রোজগার বেশি হয়। সাধু রোজগার হয়। ……. ফাঁকির পয়সা আর ভালোবাসার পয়সায় ঢের তফাৎ। ফাঁকির পয়সা খেলে শরীর-মন প্রবৃত্তিঝোঁকা হয়। সাত্বত সম্বেগ স্তিমিত হতে থাকে।” (আঃ প্রঃ ১৫শ খণ্ড, পৃঃ ১৯৭)
শ্রীশ্রীঠাকুরকে প্ৰশ্ন করা হয়েছিল আপনি ইষ্টভৃতির উপর এত জোর দেন, কিন্তু কেউ যদি জেলে আটকা পড়ে এবং সেখানে কোন সুযোগ না পায়, তখন কী করবে? শ্রীশ্রীঠাকুর—ভাতের গ্রাসটা দেবে, ভাত যদি না পায় তবে জল নিবেদন করবে, জল যদি না পায় তবে সীতা যেমন বালির পিণ্ডি দিছিলেন, অগত্যা সেই রকমভাবে বালি বা মাটি দিয়ে ইষ্টভৃতি করবে, তা’ও যদি না পায়, পরমপিতার দান বাতাস তো কেউ কেড়ে নিতে পারবে না, আর সর্বশেষে মানস-উপচারে নিবেদন তো আছেই। সেখানেও চেষ্টা করতে হবে সক্রিয়ভাবে ইষ্টের ইচ্ছা পরিপূরণের ভিতর দিয়ে যাতে তাঁকে তৃপ্ত ও তুষ্ট করা যায়। (আলোচনা প্রসঙ্গে ৪র্থ, ২৬। ১২। ১৯৪২, পৃষ্ঠা ২০২) উপরোক্ত বাণীতে বোঝা গেল যে, টাকা-পয়সা নয়, ইষ্টের ইচ্ছা পরিপূরণ করা ইষ্টভৃতির মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। যা পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চি-র অনুশাসনের মধ্যে নিহিত রয়েছে। যুক্তি অনুযায়ী ওই অনুশাসন যারা মানছেন না, তারা তাহলে ইষ্টভৃতি করছেন না। আমরা আমাদের প্রিয়জনের জন্য কোন কিছু কিনলে সেরা বা শ্রেষ্ঠ জিনিসটাই কিনি। এ বিষয়ে কারো কোন দ্বিমত থাকতে পারে না। তাহলে আমরা যাঁকে আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ আদর্শ মনে করি, সেই প্রিয়পরম প্রেষ্ঠকেও শ্রেষ্ঠ জিনিস নিবেদন করতে হয়। তাই ইষ্টভৃতিকে যারা সবচাইতে বেশি গুরুত্ব দেন, তাদের অবশ্যই শ্রেষ্ঠ ইষ্টভৃতি বিষয়টা জেনে রাখা উচিত। শ্রেষ্ঠ ইষ্টভৃতি প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন।— “ঈশ্বর-অনুধ্যায়িতা নিয়ে গণহিতী অনুচর্য্যায় তাদের যে অনুগ্রহ-অবদান অর্জ্জন কর, সেই অবদান হ’তে শ্রদ্ধানুস্যূত অন্তঃকরণে স্বতঃস্বেচ্ছায় তোমার ইষ্টকে যা নিবেদন কর, তাই-ই কিন্তু তোমার শ্রেষ্ঠ ইষ্টভৃতি।” (ধৃতি-বিধায়না, ১ম খণ্ড, বাণী সংখ্যা ৩০৬) * * *
‘ঈশ্বর অনুধ্যায়িতা’……..বাণীর নিদেশ ব্যতীত ইষ্টভৃতি বাস্তবায়িত হয় না। ইষ্টভৃতির নামে শুধুমাত্র ইষ্টের প্রীতির জন্য, কাউকে পীড়িত না করে, নিজে পীড়িত না হয়ে বর্ণানুগ কর্মের সেবা মাধ্যমে আহরিত অর্থ ‘দিন গুজরানী আয়’। এই *‘দিন গুজরানী আয়’-কেই ইষ্টভৃতির অর্ঘ্য হিসেবে নিবার্চিত করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর। ওই নিদেশ অনুসারে ইষ্টার্ঘ্য আহরণ করার মধ্যেই প্রীতি, মৈত্রী ও ঐক্যের বীজ বপন করে দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন আর্য্যকৃষ্টির সদাচার এবং বর্ণাশ্রম ধর্মকে। ওই ইষ্টার্ঘ্য ইষ্টকে দিতে হবে। তিনি তা দিয়ে PHILANTHROPICAL WORK বা সব্যষ্টি সমষ্টির মধ্যে ভাগবত ঐক্য স্থাপন দ্বারা গণহিতৈষণা কর্ম করবেন। ইষ্টভৃতির দাতা এবং গ্রহীতার মেলবন্ধনে গড়ে উঠবে পরম রাষ্ট্রিক সমবায়। এই ছিল শ্রীশ্রীঠাকুরের পরিকল্পনা। পরিবেশের সকলকে নিয়ে বাঁচা এবং বৃদ্ধি পাওয়ার বাস্তুতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক বিন্যাস-ব্যবস্থার সরলীকরণ অবদান ইতিপূর্বে পরিলক্ষিত হয়নি।—মানবসভ্যতার সার্বিক উত্তরণের জন্য। সেই উদ্দেশ্যে স্থাপন করেছিলেন ফিলানথ্রপি কার্যালয়। মাসান্তে ওই অর্ঘ্য প্রেরিত হত ইষ্টসকাশে। ইষ্টের নামে প্রেরিত ওই অর্ঘ্য গৃহীত হতো ফিলানথ্রপিতে। ইষ্টভৃতি পাঠাবার পর দুজনকে ভ্রাতৃভোজ্য দিতে হয়। এর মাধ্যমে পারস্পরিক প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করলেন। দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে চাইলেন। ইষ্টভৃতি গ্রহীতারা এ বিষয়টিকে ইষ্টানুগ-বোধ দিয়ে বিবেচনা করলে কিছুটা কাজের কাজ হবে।
*”দিন গুজরানী আয় থেকে কর ইষ্টভৃতি আহরণ, জলগ্রহণের পূর্ব্বেই তা’ করিস্ ইষ্টে নিবেদন ; নিত্য এমনি নিয়মিত যেমন পারিস ক’রেই যা’ মাসটি যবে শেষ হবে তুই *ইষ্টস্থানে পাঠাস্ তা’ ; ইষ্টস্থানে পাঠিয়ে দিয়ে আরো দু’টি ভুজ্যি রাখিস্, গুরুভাই বা গুরুজনের দু’জনাকে সেইটি দিস্ ; পাড়া-পড়শীর সেবার কাজে রাখিস কিন্তু কিছু আরো, উপযুক্ত আপদগ্রস্তে দিতেই হ’বে যেটুকু পার ; এসবগুলির আচরণে ইষ্টভৃতি নিখুঁত হয়– এ না-ক’রে ইষ্টভৃতি
জানিস্ কিন্তু পূর্ণ নয়।”
*ইষ্টস্থান বলতে শুধু ইষ্ট বা প্রিয়পরমের বসতবাটিই নয়। ইষ্টস্থান মানে, যেখানে থেকে আমরা মঙ্গল-অভিগমনে চলি। সে-হিসেবে পরমপিতার এই সারা দুনিয়াটাই ইষ্টস্থানে পরিণত হ’তে পারে। (আলোচনা প্রসঙ্গে, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ইং ১৮-১০-১৯৪৫)
ইষ্টভৃতি নিবেদন করার পর শ্রীশ্রীঠাকুর নিম্নোক্ত বাণীর মাধ্যমে অগ্নিহোত্র করতে নিদেশ দিলেন। “তুমি যখন তোমার ইষ্টে বা আচার্য্যে ইষ্টার্ঘ্য বা ইষ্টভৃতি নিবেদন কর, সে নিবেদন-সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই শ্রদ্ধোৎসারিণী অন্তঃকরণে অন্তর-আবেগ নিয়ে বল — “হে দেবতা ! হে আমার আচার্য্য ! হে আমার প্রিয়পরম ! আমি আমার শ্রদ্ধাকে তোমাকে আহূতি দিতেছি।” —ইহাই অগ্নিহোত্রের তাৎপর্য্য, কারণ, অগ্নিই হ’চ্ছেন ইষ্টদেবতা ও ব্রহ্মবিৎ আচার্য্যের প্রতীক, তা’দেরই অগ্নিমুখ বলা হয়, তাই অগ্নিহোত্র নিত্য করণীয়, কখনই পরিত্যাজ্য নয়। ১৫ । (ধৃতি-বিধায়না ১ম খন্ড)
শ্রীশ্রীঠাকুর পথের কড়ি গ্রন্থে ইষ্টভৃতির বিষয়ে বললেন : ❝ইষ্টভৃতি মানে হ’চ্ছে—সাংসারিক কোন কর্মে হস্তক্ষেপ করিবার পূর্ব্বেই ইষ্টপোষণার্থ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ পূর্ব্বক অন্ততঃ নিজের আহার্য্য পরিমিত ভোজ্য নিবেদন করা।❞ * * * “ইষ্টভৃতি ভোজ্যই রীতি অনুকল্পে জোটে যা’ বিনিময়ে তাই পাওয়া যায় এমনি দিয়ে রাখিস্ তা।”
শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত ইষ্টভৃতি নিবেদন মন্ত্রের ‘‘ইষ্টভৃতির্ম্ময়াদেব কৃতাপ্রীত্যৈ তবো প্রভো, ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ।’’ উচ্চারণ করার সাথে সাথে বৃহত্তর পারিপার্শ্বিকের জীবনবৃদ্ধির দায়ভারের শপথ নিতে হয় আমাদের। সব অবস্থাতে বাস্তব কর্মে বৃহত্তর পরিবেশের জৈবাজৈব সবকিছুকে পালন-পোষণে সমৃদ্ধ করে রাখার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সার্থক হয় ইষ্টভৃতি পালন। ইষ্টাদর্শের পঞ্চবর্হিঃ ও সপ্তার্চ্চি-র বিধি মেনে শারিরীক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক সদাচার পালনে, ইষ্টপ্রোক্ত বিধি অনুসরণ করে বিবাহ ও সুপ্রজনন নীতি পালনে অভ্যস্ত না হতে পারলে—‘আমি ইষ্টভৃতি করি’ এই কথা বলা বোধহয় সমীচীন হবে না। ইষ্টভৃতি করা মানে, বাস্তবে ইষ্টনীতি মেনে চলা, ইষ্টনীতির ভরণ করা।
যদিও ইষ্টভৃতি প্রচলনের পূর্বে সত্যানুসরণের “তুমি তোমার, নিজ পরিবারের, দেশের ও দশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দায়ী।”—বাণী-মাধ্যমে অনুরূপ দায়ভার দিয়েই রেখেছিলেন ব্যষ্টি ও সমষ্টি উন্নয়নের দিকে লক্ষ্য রেখে। এ তো গেল ইষ্টভৃতি আহরণ ও নিবেদনপর্ব। এর পর রয়েছে প্রেরণপর্ব। প্রেরণ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর স্পষ্ট নিদেশ দিয়ে বলেছেন : ইষ্টভৃতি ইষ্টকেই দিস্ করিসনা তা’য় বঞ্চনা। অন্যকে তা’ দিলেই জানিস আসবে বিপাক গঞ্জনা ।। অর্থাৎ ইষ্টভৃতি ইষ্টেরই প্রাপ্য, অন্য কারও নয়। ওই অর্ঘ্য দিয়ে ইষ্টকর্ম করা হবে। ইষ্টকর্ম মানে পূর্ত্তকর্ম। যা প্রকৃত ইষ্টভৃতির মন্ত্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপার্শ্বিকাঃ ।।” এর সরলার্থ খুব সহজ। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুযায়ী সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন বর্দ্ধনার বিধি মেনে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে চলেন যিনি এমন গুরুভাই-ই প্রকৃত ইষ্টভ্রাতা।––যাঁর আপদে-বিপদে সাধ্যানুগ সাহায্য করতে হবে। ভূত মানে,—ক্ষিতি, অপ্, মরুৎ, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা পরিবেশের অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। উক্ত উপাদানসমূহকে সমৃদ্ধ রাখার জন্য আর্য্যদের বাস্তব পূর্ত্ত-কর্মের মাধ্যমে নিত্য পঞ্চ-মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করতে হতো সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধিকে অক্ষুণ্ণ রাখতে। শ্রীশ্রীঠাকুর ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের মাধ্যমে ওই প্রক্রিয়াকে নবীকরণ করলেন। শ্রীশ্রীঠাকুর হিমাইতপুরে সপারিপার্শ্বিক জীবন বৃদ্ধিদ আশ্রম সংগঠনের মাধ্যমে, ইষ্টভৃতি প্রবর্তনের পূর্বেই ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আমাদেরও তাই করতে হবে, বাস্তবে। ইষ্টের অবর্তমানে, ইষ্টাদর্শের পরমরাষ্ট্রিক সমবায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অবিচল থেকে দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ, কৃষি ও শিল্পের বাস্তবায়ন করতে নিবেদিত-প্রাণ যিনি, তিনিই ইষ্টার্ঘ্য গ্রহণের উপযুক্ত ব্যক্তি। এ বিষয়ে পরম দয়ালের সুস্পষ্ট নির্দেশ :- “আগত যিনি, উপস্থিত যিনি— তাঁর বিগতিতে বা তিরোভাবে তাঁর বংশে যদি তাঁ’তে অচ্যুত—সশ্রদ্ধ—আনতি-সম্পন্ন, প্রবুদ্ধ-সেবাপ্রাণ, তঁৎবিধি ও নীতির সুষ্ঠু পরিচারক ও পরিপালক, সানুকম্পী-চর্য্যানিরত, সমন্বয়ী সামঞ্জস্য-প্রধান, পদনির্লোভ, অদ্রোহী, শিষ্ট-নিয়ন্ত্রক, প্রীতিপ্রাণ—এমনতর কেউ থাকেন— তাঁরই অনুগমন ক’রো, কিম্বা তা’ও যদি না পাও— তবে, তাঁর কৃষ্টি-সন্ততির ভিতর অমনতর গুণসম্পন্ন যিনি তাঁরই অনুগমন ক’র পারম্পর্য্যে— যতক্ষণ আবার আগতের অভ্যুত্থান না হয়, ঠকবে না— শিষ্ট-সমন্বয়ে সম্বর্দ্ধনাও পাবে।” ৩৯ । (সম্বিতী)
১) তাঁতে অচ্যুত-সশ্রদ্ধ-আনতিসম্পন্ন, ২) প্রবুদ্ধ-সেবাপ্রাণ, ৩) তঁৎবিধি ও নীতির সুষ্ঠু পরিচারক ও পরিপালক, ৪) সানুকম্পী-চর্য্যানিরত, ৫) সমন্বয়ী-সামঞ্জস্য প্রধান, ৬) পদনির্লোভ, ৭) অদ্রোহী, ৮) শিষ্ট নিয়ন্ত্রক, ৯) প্রীতিপ্রাণ। তাঁর সন্তান-সন্ততিগণের মধ্যে এই নয়টি বিশেষ গুণসম্পন্ন যিনি—অভাবে তাঁর কৃষ্টি সন্ততির অর্থাৎ শিষ্যবর্গের মধ্যে অমন গুণ সম্পন্ন যিনি তাঁরই অনুগমন কর !”
উক্ত বাণীর সরলার্থ,—যিনি অর্থ-মান-যশ ইত্যাদির নাগপাশ থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিজের চরিত্রে ঠাকুরত্বকে জাগ্রত করেছেন, তাঁকে কেন্দ্র করে চলতে হবে, তাঁকেই ইষ্টার্ঘ্য দিতে হবে। অন্যথায় বিপাক-গঞ্জনাকে মেনে নিতে হবে। ওই বাণীর মর্মার্থ অনুযায়ী ১. ইষ্ট পরিবারের সব সদস্যরা মিলে যাঁকে উপযুক্ত নির্বাচন করবেন তাঁকে কেন্দ্র করে চলতে হবে। ২. ইষ্ট পরিবারের সদস্যরা যদি অমনতর গুণসম্পন্ন উপযুক্ত কাউকে নির্বাচিত না করতে পারেন তাহলে কৃষ্টিসন্তানদের মধ্য থেকে নির্বাচিত করতে হবে এবং তাঁর অনুগমন করে কেন্দ্রায়িত চলনে চলতে হবে।—অন্যথায় শ্রীশ্রীঠাকুরের নিদেশ অনুযায়ী বিপাক-গঞ্জনাকে মেনে নিতে হবে। এই বাণীতে বংশানুক্রমিক জ্যেষ্ঠ-পরম্পরার বিষয় কিন্তু উল্লেখ করেন নি। ———————
।। লক্ষী মানে শ্রী, লক্ষ্মীর সম্মান রক্ষা কিভাবে করতে হবে ।। “যে বংশে ভগিনী ও গৃহস্থের স্ত্রী (নারীকূল) পুরুষদের কৃতকর্মের জন্য দুঃখিনী হয়, সেই বংশ অতি শীঘ্র ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। আর যে বংশে স্ত্রীলোকেরা সন্তুষ্ট থাকে, সেই বংশ নিশ্চিতভাবেই শ্রীবৃদ্ধি লাভ করে”। (মনুসংহিতা ৩/৫৭)
‘লক্ষ্মী’ মানে শ্রী আর এই ‘শ্রী’ কথা আসিয়াছে সেবা করা হইতে; তুমি যথোপযুক্তভাবে তোমার সংসার ও সংসারের পারিপার্শ্বিকের, যেখানে যতটা সম্ভব, বাক্য, ব্যবহার, সহানুভূতি, সাহায্য দ্বারা অন্যের অবিরোধভাবে মঙ্গল করিতে চেষ্টা করিও, তোমার লক্ষ্মী-আখ্যা খ্যাতিমন্ডিত হইবে— দেখিও। ৩৫ । (নারীর নীতি)
দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে মাদুর্গার সাথে লক্ষ্মীদেবীও পূজিতা হন। তথাপিও দুর্গাপূজার অঙ্গনগুলোতে দুর্গাদেবীর কন্যাজ্ঞানে লক্ষ্মীদেবীর পৃথকভাবে আর একবার পূজা করা হয় কোজাগরি পূর্ণিমাতে, কেন বলতে পারব না। মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী হিন্দু-গৃহস্থদের ঘরে ঘরে পট, প্রতিমা, কলাবৌ, আখবৌ ইত্যাদির মাধ্যমে তথাকথিত পুরোহিত নামের মূর্তি-পূজারীদের এনে পূজা করার রীতি প্রচলিত। অনেক পরিবার আবার লক্ষ্মী-পূজার দিনে নিয়ম মেনে মৎসাহারে রসনা তৃপ্তি করেন। কিন্তু কে, কোন লক্ষ্মীদেবীকে পুজো করেন, তা আমি বলতে পারব না। তবে এটা ঠিক, ‘লাভানাং শ্রেয় আরোগ্যম্’ অর্থাৎ লাভের মধ্যে শ্রেষ্ঠ লাভ হলো আরোগ্য লাভ।-এর তত্ত্ব না জেনেই হয়তো ধন-সম্পদ লাভের আশায় বন্ধ্যাপূজা স্বরূপ ‘চলন-হারা চরণ-পূজা’—লক্ষ্মীপূজার আয়োজন করেন। ‘গিভ অ্যাণ্ড টেক’ পলিসি মেনে। শাস্ত্রমতে মা লক্ষ্মীর অপর নাম শ্রী। ঋক্ ও অন্যান্য সংহিতাতে লক্ষ্মী নাই কিন্তু শ্রী আছেন। অন্যান্য বেদে লক্ষ্মী বা শ্রী শব্দ দেবী অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। বৌধায়ন ধর্মসূত্রে, শুক্ল যজুর্বেদে ও তৈত্তিরীয় আরণ্যকে শ্রী-কে দেবী বলা হয়েছে। মহাভারত অনুসারে সমুদ্র মন্থনে উৎপন্ন শ্রী-কে লক্ষ্মী বলা হয়েছে। মহাভারত ও পুরাণে বিষ্ণুর শক্তি বা স্ত্রীর নাম লক্ষ্মী। (সূত্রঃ পৌরাণিকা)
লক্ষ্মীদেবী যিনিই হোন না কেন, আমরা ‘লক্ষ্মী’ শব্দটিকে মনেপ্রাণে মেনে নিয়েছি। একটা মেয়ের চালচলন. বাক্, ব্যবহার সত্তানুরঞ্জনী হলে আমরা লক্ষ্মী মেয়ে বলি। আবার অসুস্থ কাউকে দেখলে, অসুন্দর কিছু দেখলে মুখ দিয়ে অজান্তেই ‘শ্রীহীন’ শব্দটি বেরিয়ে আসে। তাহলে দেখা যাচ্ছে শরীরে, মনে, প্রাণে, সামাজিকতায়, বাক-ব্যবহারে সমৃদ্ধ মানুষকে আমরা শ্রীবৃদ্ধিসম্পন্ন বা লক্ষ্মীমন্ত মানুষ বলি। শ্রী লাভ মানেই লক্ষ্মী লাভ। এই শ্রী লাভ করতে হলে শ্রী লাভের বিধি বা নিয়ম মেনে চলতে হবে। শ্রী লাভের বিধি না মেনে যদি লক্ষ্মী লাভ হতো তাহলে বছর বছর লক্ষ্মীমূর্তির পূজা করে গৃহলক্ষ্মীরা ডিভোর্স নিয়ে গৃহহীন হতো না। সন্তানেরা থ্যালাসেমিয়া, হিমোফিলিয়া প্রভৃতি নামের দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগতো না। বছর বছর লক্ষ্মীপূজা করা মায়েদের সন্তানদের অকালমৃত্যু হতো না।
ভগবানের আর এক বিধি। সুস্থ জীবন-যাপনের বিধি বা নিয়মাবলী যিনি দিতে পারেন তিনি হলেন আদর্শ ভগবান। শাস্ত্রমতে ষড়ৈশ্বর্য্যশালী শ্রীমন্ডিত মহাজ্ঞানী মহাজন রক্তমাংসের মানুষকে, নারায়ণ-স্বরূপ নরশ্রেষ্ঠ উত্তম পুরুষকে সদগুরু বা জীবন্ত ভগবান বলা হয়েছে। একমাত্র তিনিই পারেন আমাদের শ্রীমণ্ডিত করে তোলার বিধি দান করতে। সব দেবতার সমাহার স্বরূপ বর্তমানের নররূপী নারায়ণ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের প্রকৃত অর্থে শ্রীমণ্ডিত করে তোলার জন্য দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ, কৃষি ও শিল্পের প্রবর্তন করলেন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, ‘‘করা যদি থাকে, তবে সঙ্গে থাকে লক্ষ্মী। লক্ষ্মী কথার মানে আলোচনা, দর্শন. জ্ঞান, চিহ্নী-করণ ইত্যাদি। এগুলি না থাকলে লক্ষ্মী পাওয়া যায় না।’’ (আঃ প্রঃ ৭ম খণ্ড, ২১. ০৩. ১৯৪৬)
নররূপী নারায়ণের ওই বিধান উপেক্ষা করে, তথাকথিত প্রচলিত লক্ষ্মীপূজা করে প্রকৃত অর্থে লক্ষ্মী লাভ অসম্ভব।
চলনহারা চরণপূজা বন্ধ্যাপূজা সেই জানিস আদর্শেতে অটুট চলন বর্দ্ধনা তোর তাই মানিস । আজ কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা । সংসারের সার্বিক শ্রীবৃদ্ধি কামনায় আমরা ঘরে ঘরে লক্ষ্মীপূজা করি । প্রথাগত লক্ষীপূজা করা সত্বেও আমরা আমাদের অভাব দূর করতে পারছি না । শান্তির অভাব, সুখের অভাব, ধৈর্য্য, সহ্য, স্থিতধী থাকার অভাব, টাকাপয়সার অভাবে আমরা জেরবার । অভাব থেকে ‘অ’-কে বাদ দিতে হলে সদগুরুর ভাবের সাথে ভাব করতে হয় । শ্রীশ্রীঠাকুর সেই ‘ভাব’ অর্জনের নিদানে বললেন ‘লক্ষ্মী’ মানে শ্রী, শ্রী মানে সেবা, আর পূজা মানে বর্দ্ধনা। দেবী লক্ষ্মীরূপিণী গৃহিনীরা সদাচার পালন করে কীর্ত্তি, শ্রী, বাক্, স্মৃতি, মেধা, ধৃতি ও ক্ষমা-র ভাবে সিদ্ধ হতে পারলেই লাভ হবে লক্ষ্মী । নারায়ণের প্রতীকস্বরূপ স্বামীকে, সংসারকে, পরিবেশকে, সদাচারী সেবায় সন্তুষ্ট করতে পারলেই শ্রীবৃদ্ধি হয়ে লক্ষ্মী লাভ হবে । তাড়ালেও যেতে চাইবে না । অসদাচারে ঘরের গৃহিনী নিজেকে অশুদ্ধ করলে সংসার হয় লক্ষ্মীছাড়া । সদাচারে বাঁচে বাড়ে লক্ষ্মী বাধা তার ঘরে । * tapanspr@gmail.com
“অস্তিত্বের নাই উপাসনা সে-ও কি সতী সে-ও কি সৎ সবাই কি তাই হয়ে আছে বেঁচে থেকেও মৃতবৎ!”
“অস্তিত্বের নাই উপাসনা সে-ও কি সতী সে-ও কি সৎ সবাই কি তাই হয়ে আছে বেঁচে থেকেও মৃতবৎ!”
।। পূজা ও ধর্ম ।।
পূজা মানে সম্বর্ধনা, পূজ্য চরিত্রের গুণ অনুশীলন করে নিজেকে সম্বর্ধিত করা। আর ধর্ম মানে ধারণ করা। নিজের এবং অপরের অস্তিত্বের ধারক, পালক ও পোষক হবার জন্য যা যা করা হয়, তাই ধর্ম। অনিত্যকে ত্যাগ করে নিত্য-এর উপাসনা করা, আরাধনা করা। যার যার, তার তার, পালনীয়। কোনো ভায়া-মিডিয়া দিয়ে হবে না। যার ক্ষিদে তাকেই খেতে হবে, ক্ষুধার্তের হয়ে অন্য কেউ খেলে ক্ষুধার্তের কি পেট ভরবে? ছাত্রের হয়ে শিক্ষক পরীক্ষা দিলে কি তা’ গ্রহণযোগ্য হয়! অথচ পুজোর নামে আমরা এই কাজটাই করে চলেছি। যাঁর পুজোর নামে মেতে উঠছি, তাঁর আদর্শ কি, তাও জানিনা, সাধন-ভজন কিভাবে অনুশীলন করতে হয়, তাও জানি না। আমাদের কাজ চাঁদা তোলা / চাঁদা দেওয়া, মৃৎশিল্পীর কাছ থেকে মূর্তি আনা, নতুন পোশাক পরা, ধুপহীন ধুপকাঠি, ফল-মিষ্টি মণ্ডপে দিয়ে প্রতিমার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে, পুরোহিতের মাধ্যমে পুষ্পাঞ্জলি (যদিও সকলে পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে পারেন না, দূর থেকেই প্রণাম সেরে নেয়।) দিয়ে “রূপং দেহি, ধনং দেহি, যশ দেহি ….”—অর্থ-মান-যশ ইত্যাদি সমস্যার সমাধান চাওয়া। আর চব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় আদি লোভনীয় তামসিক, রাজসিক খাওয়া দাওয়া নিয়ে মেতে ওঠা! ভিড় ঠেলে চেঁচামেচি, মাইকের আওয়াজ, হৈ-হট্টগোলকে সাথী করে এ প্যাণ্ডেল থেকে ও প্যাণ্ডেলে পর্যটন করা! বিয়ে যেমন-তেমন হোক না কেন! দৈনন্দিন জীবন চলনায় সিঁদুরকে আপনার করে না নিলেও, স্ত্রী ধর্মের স্বাধ্বী-চলার প্রতীক-স্বরূপ সিঁথির সিঁদুর অক্ষয় রাখার মানসে দশমীতে সিঁদুর খেলা, বিসর্জনে হৈচৈ করা, একটু হার্ড-সফ্ট ড্রিঙ্কসের সাহায্যে মায়ের বিসর্জনের বিরহ-বেদনা ভোলার চেষ্টা করা!।—ইত্যাদি ইত্যাদি হচ্ছে আমাদের মত সাধারণ মানুষের পুজো।—ব্যস্! আসছে বছর আবার হবে! এই হলো পূজার নামে মেতে ওঠা সংখ্যাগরিষ্ঠ মা দুর্গার ভক্তদের পূজা বিষয়ে অভিব্যক্তি। কতিপয় জীবন পিয়াসী মানুষেরা পূজাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় কৃষ্টির চৌষট্টি কলার অন্তর্ভুক্ত সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি ইত্যাদি কলা-শিল্প পরিবেশন করে ভারতীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে ধরে রাখার চেষ্টা করেন।
যাইহোক এবার একটু গভীরে প্রবেশ করার চেষ্টা করি।
ভারতের আর্য্য-ঋষিগণ, অবতার-বরিষ্ঠগণ প্রত্যেকেই সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির উপাসনার কথা বলেছেন ধর্মের নামে, পূজার নামে। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আরও একটু সহজ করে দিয়ে বললেন, ‘‘ধর্ম্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম্ম না-রে। অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম্ম বলে জানিস্ তাকে। পূর্বতনে মানে না যারা/জানিস্ নিছক ম্লেচ্ছ তা’রা।’’ ‘‘পূজা-আর্চ্চা মানেই কিন্তু /দৈবগুণ যা সেধে নেওয়া। হাতে-কলমে মক্স করে/বাস্তবে তার রূপটি দেওয়া।।’’ ইত্যাদি ছড়াবাণীগুলো সহজ, সরল, ওজস্বী আবদনে সমৃদ্ধ হলেও একটা নির্দিষ্ট গণ্ডীর ভাষা-ভাষীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ওই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দিতে বললেন, ‘Upholding urge of existence is Dharmma.’ বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্তা বা অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করে উৎকর্ষতায় রক্ষা করার নাম ধর্ম। তথাপিও আমরা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতার, কু-সংস্কারের, অজ্ঞানতার আবরণ ভেদ করে শুদ্ধ আমিটাকে বের করতে ব্যর্থ হলাম। তথাকথিত ইনটেলেকচ্যুয়াল হওয়া সত্বেও ধর্মের নামে ফুল, বেলপাতা, ধূপবিহীন ধূপকাঠি, ফল-মিষ্টান্নাদির অঢেল আয়োজনে, মাইক বাজিয়ে, শব্দবাজির আওয়াজ দিয়ে পরিবেশবিদদের চিন্তার বলিরেখায় ভাঁজ ফেলে দিতে ইন্ধন যোগাচ্ছি। আর আমাদের গর্বের রবীন্দ্রনাথ আমাদের দ্বিচারিতা দেখে কষ্ট পাচ্ছেন আর ভাবছেন, যে মানুষগুলো ‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তলে’ ইত্যাদি ছন্দের ডালি সাজিয়ে ভক্তির আবেদন জানায়, তারাই আবার পূজার নামে কু-সংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে বিশ্বাত্মাকে দূষিত করে চলেছে। আমাদের বর্তমান যুগ যে যুক্তিবাদী সে কথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি অস্বীকার করবেন না আশাকরি। যেমন, সন্তানের হয়ে মা খেলে সন্তানের পেট ভরবে না। ছাত্রের হয়ে শিক্ষক লেখাপড়া করলে ছাত্র পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে না।–তেমনি প্রচলিত পূজার আয়োজকদের হয়ে কোন পুরোহিত পূজা করলে আয়োজকদের কিছু ফললাভ হবে কি ? অবশ্য পুরোহিতও জানেন না ফললাতের বিষয় সম্পর্কে। যদি জানতেন বিসর্জন মন্ত্রে বলতেন না—ওঁ আবাহনং ন জানামি, নৈব জানামি পূজনম্। বিসর্জনং ন জানামি ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি (পরমেশ্বর)।–অর্থাৎ আমি আবাহনও জানিনা, বিসর্জনও জানিনা, আমাকে ক্ষমা করুন। (দ্রঃ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা) বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী পূজ্য-প্রতিমা চঞ্চল চিত্তের ধারণের জন্য একটি অবলম্বন। প্রতিমাকে ব্রহ্মের রূপ কল্পনা করে উপাসনা, সংযম, সাত্তিক আহার, সাত্তিক বিহার ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে পূজা করা হয়।–যাতে পূজক বা উপাসক মনসংযোগ দ্বারা প্রতিমাকে হৃদয়ে ধারণ করে প্রতিমার গুণে গুণান্বিত হতে পারে। এই হলো প্রতিমা পূজার মূল কথা। এ থেকে এটুকু বোঝা গেল যে সততা, সংযম, ন্যায়নীতি ইত্যাদি মানবিক গুণগুলোর প্রবহমানতাকে বৎসারান্তির নবীকরণ করার মাধ্যম বাহ্য-পূজা উদযাপনের উদ্দেশ্য। অথচ বাঙালীর সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার আয়োজন বিশ্লেষণ করলে এর বিপরীত চিত্রটাই আমাদের বোধে ধরা পড়ে। বিজ্ঞানের বিধি অনুযায়ী একটা নির্ভুল অংক কষতে গেলেও একটা শান্ত পরিবেশ প্রয়োজন, একাগ্রতার প্রয়োজন। কিন্তু পূজার নামে, বেশীরভাগ পূজা-প্রাঙ্গনগুলোতে ঢাকের আওয়াজ, মাইকের আওয়াজ, আয়োজকদের অহংকারের আওয়াজে কোন সুস্থ মানুষের একটি ঘণ্টার জন্যও একাগ্রভাবে, স্থিরচিত্তে বসে থাকতে পারার কথা নয়! অবশ্য দেবদেবীর ব্যাপারটা আলাদা। মাটির পুতুল বলেই আমাদের সব অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করতে পারে! তাই কবিগুরুর ভাষার ‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’ বাণীগুলো এক নির্মম সত্যের বার্তা দেয় না কি ? বাঙালিদের মানস-দেবী মা দুর্গা। ‘যা দেবি সর্বভূতেষু’ মন্ত্রে যাঁর অস্তিত্বের স্বরূপ প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ দেবী সর্বভূতের প্রাণশক্তি স্বরূপা, সর্বভূতে দেবী অধিষ্ঠিতা। এবার প্রশ্ন, যে দেবী সর্বভূতে অধিষ্ঠিতা সেই পঞ্চ-মহাভূত পরিপোষিত স্বেদজ, ক্লেদজ, অণ্ডজ, জরায়ুজ-জাত ভূত(ভৌত, জীবন)গুলোকে, বেঁচে থাকার জৈবাজৈব আবশ্যক উপাদানগুলোকে দেবীর প্রতিভূ মনে করে সম্বর্দ্ধিত না করে, সুস্থভাবে টিঁকিয়ে রাখার চেষ্টা না করে, কোন যুক্তিতে মাটির প্রতিমা পূজার নামে প্রাণী হত্যা করে, নানাভাবে পরিবেশকে দূষিত করার জন্য কোটি কোটি টাকা অপচয় করা হয়! ভাষা-বিজ্ঞান অনুযায়ী পূজা মানে পূরণ করা, সম্বর্দ্ধিত করা। যে আচার-আচরণ পরিবেশের সাত্তিক জীবন-বর্দ্ধনার অভাবকে পূরণ করে, জৈবাজৈব সবকিছুকে সম্যকরূপে বর্দ্ধিত করে, তার নাম পূজা। উৎকৃষ্ট প্রসব করে যা, তার নাম উৎসব। আর যে আচার-আচরণ জীবনবৃদ্ধিকে নন্দিত করে তার নাম আনন্দ। এখন প্রশ্ন, আমাদের প্রচলিত পূজা, উৎসবের উদযাপনকে কেন্দ্র করে আনন্দের প্রকাশ বৃহত্তর পরিবেশকে কতখানি নন্দিত করে ‘পূজা’ শব্দের যথার্থতাকে উপহার দিতে পেরেছে ? –এইসব বিষয়ে সত্তাপিয়াসী চিন্তাশীলদের চিন্তা করে দেখা উচিত। বিশেষ করে যাঁরা কুসংস্কার বিরোধী রূপে নিজেদের বোধ ও বোধিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। বাহ্য পূজাবাদীদের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী পূজা শুরুর আগে মৃন্ময়ী মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। আয়োজকদের বিশ্বাস, পুরোহিতের মন্ত্রবলে নিষ্প্রাণ মূর্তিগুলো প্রাণবন্ত হয়। তর্কের খাতিরে বিষয়টাকে সত্য বলে যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে একটা প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, জীববিজ্ঞান অনুযায়ী জীবন্ত প্রাণীদের চলন, গমন, ইত্যাদি অভিব্যক্তি থাকা আবশ্যিক। অতএব বিজ্ঞানসম্মত কারণেই পুরোহিতের মন্ত্রবলে দুর্গাঠাকুরের চালচিত্রের জীবন্ত দেবদেবী, অসুর, সিংহ, ময়ূর, সাপ, পেঁচা, ইঁদুরেরা নিজ নিজ অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে। কেউ চুপচাপ স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে পারবে না। ফলে শুরু হয়ে যাবে মহিষাসুর মর্দিনীর বাস্তব উপস্থাপনা। অসুর, দুর্গাকে আক্রমণ করবে, সিংহ গর্জন করতে করতে দেবীকে নিয়ে অসুরের দিকে ধাবিত হবে, বাহনসহ অন্যান্য দেবদেবীরাও যোগদান করবে যুদ্ধে।–এবার প্রশ্ন–ওই অবস্থায় পুরোহিত, আয়োজকেরা, ভক্তেরা, উদ্বোধন করতে আসা সেলিব্রিটিরা, নেতা-মন্ত্রীরা কোন পক্ষে যোগদান করবেন? দেবীর পক্ষে না অসুরের পক্ষে ? আর একটা প্রশ্ন, যে পুরোহিত আদ্যিকালের দেবদেবীদের কল্পিত মাটির মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম, তিনি মানুষের প্রাণহীন দেহে আরো সহজে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন বা পারা উচিত। কারণ, বিজ্ঞান মতে, মাটির মধ্যে থাকা অণু-পরমাণুর তুলনায় সদ্য মৃতদেহের অণু-পরমাণু বেশী সক্রিয় থাকে, বেশী জীবন্ত থাকে। মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ এ বিযয়টা নিয়ে ভেবে দেখতে পারেন। তাহলে অনেক অকালমৃত্যু সহজে রোধ করা যাবে। সনাতন ধর্মীয় মতবাদ অনুযায়ী মানুষ অমৃতের পুত্র, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ বলা হয়েছে। সেই মানুষ যাতে দশবিধ-সংস্কারে সংস্কৃত হয়ে প্রকৃষ্ট জাতক বা প্রজা হয়, অকালে নিষ্প্রাণ না হয়, সন্ত্রাসবাদী না হয়, রেপ-কেসের আসামী না হয়, নারীদের মা-দুর্গার প্রতীক জ্ঞানে সম্মান জানায়, ‘অসতো মা সদ্গময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়’-এর আদর্শ অনুসরণে সমৃদ্ধ হয়,—সমাজের পুরোভাগে থেকে, ওইসব বিষয়ে মানুষকে সচেতন করে পরিবেশের হিতসাধন যাঁরা করতেন তাঁদের বলা হতো পুরোহিত। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পুরোহিত ঋষি বশিষ্ঠ রামচন্দ্রের রাজসভায় অকালমৃত্যু-দেহে প্রাণ সঞ্চার করার স্পর্দ্ধা দেখান নি। বিজ্ঞান-যুগের পুরোহিতেরা যদি পুতুলে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন, মৃতদেহেও পারা উচিত! যদি না পারেন, ততঃ কিম্! ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি, ‘পূজা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সম্বর্দ্ধনা। পূজ্য ব্যক্তিত্বের গুণে গুণান্বিত হয়ে নিজেকে এবং পরিবেশকে সম্বর্দ্ধিত করা। এতদিন ধরে হাজার-হাজার দুর্গাপূজা করে আমাদের চিন্ময়ী নারীরা কতখানি সমৃদ্ধ হয়েছে মা দুর্গার আদর্শ চরিত্রের চরিত্রায়নে ? আমাদের চিন্ময় পুরুষেরা নারী সাধারণকে কতটা মা-দুর্গার প্রতীক মনে করে শ্রদ্ধা করতে বা পূজা করতে শিখেছে ? আমরা সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির পথে কতটা এগিয়েছি? আমাদের কতখানি দুর্গতি নাশ হয়েছে? আমাদের সার্বিক জীবন-চলনা দুর্গ-সম পরিরক্ষিত হয়েছে কতটা?—তথ্য জানার অধিকার বলে এ বিষয়ে জানতে চাওয়াটা নিশ্চয়ই অপরাধ হবে না! যদিও প্রচলিত তথ্য এর বিপরীত মত প্রকাশ করে চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। পূজাকে কেন্দ্র করে সাত্তিকতা বৃদ্ধি না পেলেও, তামসিকতা বেড়ে যায় বহুগুণ। পুজোকে কেন্দ্র করে ভক্তদের অনিত্য দেহটাকে পূজা-বিপরীত সাধের নানা বেশভূষায় সাজিয়ে দিতে বিকিকিনির পসরা সাজিয়ে যারা বসেন, তারা কি পূজা-সদৃশ সততার দৃষ্টান্ত উপহার দেন সমাজকে ? পূজাই যদি উদ্দেশ্য তবে ইভটিজিং, আদমটিজিং কেন হবে ? নারী নির্যাতন, দাম্পত্য কলহ, ডিভোর্স, যৌন অপরাধ কেন বৃদ্ধি পাবে ? দূষণ কেন বৃদ্ধি পাবে পূজাকে কেন্দ্র করে ?— এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে ? দুর্গাপূজার বিষয়টাকে বাস্তববোধে চিন্তা করলে দেখা যাবে, আমাদের আলোচ্য মা-দুর্গা পূজ্য তাঁর চরিত্রগুণে। মা দুর্গার সমার্থক, মা উমাকে আমরা কন্যা জ্ঞান করি। তাইতো ফি বছর কৈলাস থেকে নিয়ে আসি। যদিও তাঁকে আনতে এবং দিতে কে বা কারা যান। কোন রুটে দোলায়, নৌকায়, ঘোটকে এবং গজে যাতায়াত করেন, সে খবর দেবার দায়িত্ব তথ্যাধিকারীদের, আমার নয়! তবে আমি এবং আমরা দশভুজার চাইতেও দ্বিভুজা উমাকে বেশী পছন্দ করি বলেই না উমাকে নিয়ে কতই না আগমনী গানের ডালি সাজিয়ে তাঁকে বরণ করে নিতে চাই। কামনা করি, ঘরে ঘরে উমার মত আদর্শ মেয়ে যেন জন্মায়। উমাই তো আমাদের মা দুর্গা! ভারতেই শুধু নয়, সারা বিশ্বের সংস্কৃত মনীষায় নারীজাতির আদর্শরূপে স্বীকৃত, পূজিত। স্বীকৃতি পাবেনই না বা কেন, পূজিত হবেনই না বা কেন,–কারো কান-ভাঙানিতে কান না দিয়ে পরমভক্ত-পরমজ্ঞানী শিবকে পতিরূপে বরণ করে, স্বামীর মনোবৃত্ত্যানুসারিণী স্ত্রী হয়ে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীদের ন্যায় কৃতি সন্তানদের জননী হয়েছেন। তিনি একজন আদর্শ সংসারী নারী হয়েও অসৎ নিরোধী তৎপর,—অশুভ শক্তিকে সমুচিত দণ্ড দেবার জন্য রণসাজে সজ্জিত হয়েছেন। পশুরাজকে করেছেন বাহন। পারস্পরিক শত্রু খাদ্য-খাদক সম্পর্কের পেঁচা-ইঁদুর, ময়ুর-সাপকে মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ করেছেন। দুটি হাত দিয়েই বৃহত্তর সংসারের দশদিক সামলাতেন। তাই তো তিনি দ্বিভূজা হয়েও দশ ইন্দ্রিয়কে বশ করে হতে পেরেছেন দশভূজা। তাই তো তিনি দশপ্রহরণধারিণী। তাই তো তিনি পূজ্য। –এহেন চরিত্র ‘দেবী’ জ্ঞানে, ‘জগজ্জননী’ জ্ঞানে স্বীকৃতি তো পাবেনই। তাই তো আমাদের ঋষিরা দেবতাদের সম্মিলিত শক্তিতে সৃষ্ট দেবী দুর্গা কাত্যায়ন অঙ্গনে মহিষাসুরকে বধ করার পর তাঁর প্রদর্শিত শক্তিকে দৃষ্টান্ত স্বরূপ চিরস্থায়ী একটা আদর্শে রূপ দিয়েছিলেন। দেবী দুর্গাকে স্ত্রীজাতির এক আদর্শ প্রতীক রূপে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁরা দেবী দুর্গার ওই অসৎ-নিরোধী তৎপরতাকে দৃষ্টান্ত বূপে তুলে ধরে নারীসাধারণকে দেবী রূপে, জগন্মাতা রূপে মর্যাদা দিয়েছেন, কামিনীরূপে নয়। তাইতো বর্তমানেও সম্ভ্রান্ত হিন্দু নারীদের মধ্যে দেবী পদবি প্রচলিত। ঋষিরা ছিলেন বিজ্ঞানী। তাই তো তাঁরা দুর্গাপূজার বিধান দিলেন বাস্তব অনুশাসনের মাধ্যমে। আত্মবিস্তার কল্পে গর্ভাধান-সংস্কারের সময় স্বামী, নিজের স্ত্রীকে জগন্মাতা জ্ঞানে স্ত্রীর নাভিমূল স্পর্শ করে বলবেন, প্রসীদ মা জগজ্জননী,—হে জগন্মাতার প্রতীকস্বরূপা চিন্ময়ী মা, তুমি প্রসন্ন হয়ে আমাকৃত গর্ভাধান মাধ্যমে দেদীপ্যমান আত্মাকে আকর্ষণ কর।–ওই স্বীকৃতির মাধ্যমে স্ত্রীকেও মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েছেন, কামিনীজ্ঞানে নয়। এর কারণ, স্বামী, স্ত্রীর মাধ্যমে নিজেকে জন্মান, তাই তিনি জায়া। জীববিজ্ঞান অনুসারে প্রজনন-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আত্ম-প্রতিলিপি গঠন করা হয়। পুরুষ-বীজ ধারণ করে, বীজের প্রতিলিপি গঠন করে ভূমি-স্বরূপা নারী। জনন করেন বলে জননী। তাই কৃষকেরা ফসল ফলাতে জমি কর্ষণ করে, কর্ষণ মানে আকর্ষণ, যাতে জমি বীজ থেকে ভালো সন্তান (ফসল) আকর্ষণ করতে পারে। জমি অনুযায়ী উপযুক্ত শুদ্ধ-বীজ বপনের আগে ভূমিকে আগাছা মুক্ত করে, সার দেয়, জল দেয়, জমি জননক্ষম হলে জো বুঝে বীজ বোনে।–জমিকে মাতৃজ্ঞানে পোষণ দিয়ে ভূমিকে পূজা করে—যাতে জমি বীজের অন্তর্নিহিত সত্তাকে ভালোভাবে পুষ্ট করতে পারে, বীজের সত্তাকে ধারণ করে আদর্শ মা হয়ে ভালো ফসল ফলাতে পারে। ফসল ফলাতে যদি গর্ভাধান প্রক্রিয়া থাকতে পারে, মানুষ ফলাতে তো আরও বেশী বিধি-নিয়ম থাকা উচিত! আমাদের ঋষিরা ছিলেন প্রকৃত বিজ্ঞানী। বিজ্ঞান শব্দটিও উপনিষদ থেকে উৎপত্তি হয়েছে। তাই ঋষিরা নারীদের জগন্মাতাজ্ঞানে ব্যবহার (treat) করতে, শ্রদ্ধা (honour) করতে শিখিয়েছেন।–যার নাম প্রকৃত পূজা। যার মাধ্যমে স্বভাবের স্ফূরণ হয়ে সব অভাবের পূরণ হয়। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন, “Accident-এ (আকস্মিকভাবে) যা’ জন্মে, তা বুনো, বিহিত সুফলপ্রদ চাষে যা’ জন্মে তা’ পুণো (পুণ্য)। প্রবৃত্তি লালসায় অবিধিপূর্বক উপগতি হয়ে যে সন্তান জন্মে, তার চরিত্রের কোন ঠিক ঠিক থাকে না। গর্ভাধান সংস্কারের ভিতর দিয়ে উন্নত চিন্তাপ্রসূত বিধিমাফিক পবিত্র যে জন্ম, তার রকমই আলাদা। ঘরে ঘরে ভগবান জন্মে। তেমনি ছিল আমাদের বিধান।’’ (আঃ প্রঃ ১৮/১৩) অতএব আমাদের ঘরের মা দুর্গারা যেদিন আবার ঘরে ঘরে ভগবান জন্মাতে পারবেন সেদিন সার্থক হবে আমাদের দুর্গাপূজা।
দুর্গাপূজার বাস্তবতা তুলে ধরতে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেনঃ “....যে মৃন্ময় মূর্ত্তি আমরা পূজা করি— কল্পনায় প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করে,-- তিনি দশভূজা, দশপ্রহরণ-ধারিণী— ঐ আমাদের মায়েরই প্রতীক— আমাদের ঘরে ঘরে যে মা অধিষ্ঠিতা তাঁরই বিনায়িত সুসঙ্গত প্রতীক; তাই ঐ মায়ের পূজা মানেই হচ্ছে— যে মা আমার, যে মা তোমার, যে মা ঘরে ঘরে দুর্গা হয়ে অধিষ্ঠিতা, দুর্গতিনাশিনী হয়ে দশপ্রহরণ ধারণ করে সন্তান-সংরক্ষণায় নিয়োজিতা,
সেই মায়েরই পূজা;………..” (আশীষ বাণী, ৬২/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)
“মা আমাদের দশভুজা, প্রতি ঘরে ঘরে যদিও তাঁকে দ্বিভুজাই দেখতে পাই, তিনি দশদিক্ আবরিত করে রেখেছেন— তাঁর স্নেহ-উৎসারিত স্বস্তি-উৎসারিণী উদাত্ত অনুচর্য্যায়, কায়মনোবাক্যে প্রতিটি কর্ম্মের ভিতর-দিয়ে ব্যষ্টির পথে সমষ্টিকে আন্দোলিত করে, সাত্বত উৎসর্জ্জনায় আপূরিত করে সবাইকে, কৃতি-উদ্দীপনার অনুপ্রেরণায়— তাই মা আমার দশভূজা;……” (আশীষ বাণী, ৫৯/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)
“পূজা মানেই হল বর্দ্ধনা। (আঃ প্রঃ ১২-১২-১৯৪১) আমি আপনার পূজা করছি মানে, আপনার গুণ চিন্তা করছি এবং নিত্য অনুশীলনের মাধ্যমে ঐ গুণগুলি আমার চরিত্রগত করে তুলছি, আমার ভিতরে বাড়িয়ে তুলছি। স্তব করি মানে গুণ বর্ণনা করি। তা কিন্তু শুধু মুখে বা মনে-মনে করলেই হবে না, প্রতিদিনকার অভ্যাস ও অনুশীলনের ভিতর দিয়ে ঐ গুণগুলি আমার চরিত্রে মূর্ত্ত করে তোলা চাই।’’ (দীপরক্ষী ৪/১৮২)
পূজা কেমন করে করতে হবে, এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কি বলেছেন, একবার জেনে নেওয়া যাক। “দেবতার পূজা-অর্চনা করতে গেলে আগে ইষ্টের ভাব অন্তরে জাগ্রত করে সেই ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে, দেবতার স্মরণ মনন করতে হয়। তাঁকে স্মরণ করা মানে—তাঁর চলন-চরিত্র ও গুণ গরিমা স্মৃতিতে এনে অনুশীলনের ভিতর দিয়ে আয়ত্ব করা। চরণ-পূজা মানে চলন পূজা। ইষ্টের চলনাকে নিজের জীবনে আয়ত্ত ক’রে ঐ চলনের প্রসারতা ও সম্বর্দ্ধনা যদি না ঘটাই বাস্তবে, তাহলে তাঁর চরণ-পূজা সার্থক হয় না। আমরা ফাঁকতালে কাম সারতে চাই, কিন্তু বিধি বড় কঠিন বান্দা, কোন চালাকি চলে না তাঁর কাছে।” (আ. প্র. ২৯. ১২. ১৯৪২) “প্রশ্ন। হিন্দুরা দেবদেবীর পূজা করেন কিন্তু মুসলমানেরা একমাত্র খোদাতায়ালার পূজা ক’রে থাকেন। হজরত ত’ ছবি ও পুতুল-পূজা একেবারেই নিষেধ ক’রে গেছেন, কিন্তু আপনি এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য করছেন কেমন-ক’রে ? শ্রীশ্রীঠাকুর । ধর্ম্ম-আচরণের দিক দিয়ে হজরত রসুলও যা’ ব’লে গেছেন, আর্য্যদের ধর্ম্মশাস্ত্র চিরকালই ঋষির নিদেশরূপে তাই বহন ক’রে আসছে। আর্য্য-ধর্ম্মশাস্ত্র ছবি বা পুতুল-পূজা এমনতর বিকট তাচ্ছিল্যের সহিত নিরস্ত করতে ঘোষণা ক’রেছেন—এমন-কি অধমাধম বলতেও ক্ষান্ত হন নি। তবে আর্য্য-ঋষিদের প্রত্যেক মানুষকে উন্নতির পথে নিয়ন্ত্রণ করবার এমনতর একটা ঝোঁক ছিল—যা-নাকি হজরত রসুলের ভিতর দেখেত পাওয়া যায়–………..” (ইসলাম-প্রসঙ্গে/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র/পৃঃ ২৮-২৯) ‘‘ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ, ভক্ত রামপ্রসাদ, সাধক রামকৃষ্ণ, সর্ব্বানন্দ ঠাকুর প্রভৃতি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ প্রতিমা পূজা করেছেন বটে, তাঁদের ঐ পূজার পিছনে ছিল গুরু-পূজা, ইষ্ট-আরাধনা ; ঐ প্রতিমার পরিকল্পনার ভেতর দিয়ে ছিল অশেষ ও অঢেলভাবে ইষ্টানুরক্তি। তাই, ঐ অধম অবলম্বনও তাঁদিগকে অধমভাবে আটকে রাখতে পারে নি। তাঁদের ঐ চলনার পথে একটা সময় এসেছিল, তখন তাঁদের ঐ প্রতিমা তাঁদের দর্শনের সম্মুখে আর ও-রকম ছিল না। ভগবান রামকৃষ্ণদেবেরও শোনা গিয়েছে—তাঁর এমনতর সময় এসেছিল, যখন মূর্ত্তি-টুর্ত্তি তাঁর সাধনার পথে বাধাই সৃষ্টি করতো। তিনি এমন-কি তাঁর ঘরে যে-সমস্ত ছবি-টবি ছিল, সেগুলিকেও সরিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি না-কি এই বলেছিলেন—‘মেয়েরা ততদিন পুতুলখেলা করে, যতদিন তার বে’ না হয়, স্বামী-সহবাস না করে।’ সাধক রামপ্রসাদ তাঁর স্বরচিত গানের ভেতরেই তো বলেছেন— ‘‘ধাতু-পাষাণ মাটির মূর্ত্তি কাজ কি রে তোর আরাধনে তুই মনোময় প্রতিমা গড়ি’ বসা হৃদি-পদ্মাসনে।।’’ এমন কত কি যে আছে, তার ইয়ত্তা নেই।’’ (—শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, কথা প্রসঙ্গে, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৭৬, ১৭-১০-১৩৪২) এবার আমরা এক়টু দেখে দেখে নেব, পূজা প্রসঙ্গে ‘মেরা ভারত মহান’-এর
অন্যান্য মহানেরা এবং মহান গ্রন্থগুলো কি নিদেশ রেখে গেছেন। পূজা বিষয়ে মহানির্ব্বাণতন্ত্র নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ ‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ। অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’ মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ভারতে বিবেকানন্দ গ্রন্থের ৩৩৬
প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে।’’ –শ্রীমদ্ভাগবত। ৩-২৯-২২ “ঈশ্বরঃ সর্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জ্জুন তিষ্ঠতি। ভ্রাময়ন্ সর্ব্বভূতানি যন্ত্ররূঢ়ানি মায়য়া।।“ --গীতা, ১৮।৬৫ "যিনি এই সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার নিজের স্বধর্মানুরূপ
নিষ্কাম কর্মাচরণ দ্বারা (বাক্য বা ফুলজল দ্বারা নহে) পূজা করিয়া মানুষ সিদ্ধি লাভ করে । স্বধর্মানুরূপ (বর্ণানুগ সত্তাধর্ম পালন) নিষ্কাম কর্মই পরমেশ্বরের পূজার ডালি । (গীতা ১৮।৪৬) তাই, শাস্ত্র বর্ণিত অধমের চাইতেও অধম পূজায় মেতে উঠে আমাদের যাতে
ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে না হয়, তাই, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের নিত্য বাস্তব দুর্গাপূজার পূজারী করে তুলতে সৎসঙ্গীদের নিত্যপাঠ্য ‘সত্যানুসরণ’ নামক মহাগ্রন্থে নারীকে জগজ্জননী জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত করতে নিদেশ দিয়ে বললেন, ‘‘প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী । প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয় ।’’ এবং পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, ‘‘স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যে-জন, তাহার হয় না ভবের বন্ধন মোচন । …..স্ত্রী চিন্ময়ী মা।’’—এই শিক্ষার ধারাকে বাস্তবায়িত করার নাম প্রকৃত দুর্গাপূজা । শ্রীশ্রীঠাকুর শুধু পুরুষদেরই প্রতিনিয়ত দুর্গাপূজা করার বিধান দিয়েই
ক্ষান্ত হননি, নারী-সাধারণের মধ্যেও দেবী দুর্গার এক স্থায়ী আসন পেতে দিতে অনুশ্রুতির বাণীতে বললেন— ‘‘শার্দ্দুলেরে বাহন করে সাপের ফণার মালা পরে কালবোশেখী ঝঞ্ঝাবেগে ছোটরে নারী ছোটরে ছোট্ । দত্যিদানার নীচ বাহানা আর্য্যাবর্তে দিয়ে হানা ঘূর্ণিপাকের বেতাল গাঁথায় হুলিয়ে ভুলিয়ে দিচ্ছে চোট্ । দশ প্রহরণ দশ হাতে ধর বক্ষবিদরি ধ্বংসি ইতর সূর্য্যরাগী বজ্রতেজে আর্য্যনারী শত্রু টোট্ ।” তিনি নারীকে অবলা নয়, সবলারূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন । নারীর সতীত্বই নারীকে সবলা করে তোলে। তাই তিনি কত আশা নিয়ে বললেন— ‘‘সতীর তেজে ঝলসে দে মা নিঠুর কঠোর অন্ধকারে মদনভস্ম বহ্নিরাগে বৃত্তি-রিপু দে ছারখারে । প্রণবতালে ইষ্টমন্ত্র ঝঙ্কারি তোল সকলতন্ত্রে বিষাণ হাঁকে রুদ্র দোলায় বজ্রে হানি মৃত্যুদ্বারে।’’ মা দুর্গার আদর্শে অনুরঞ্জিত উক্ত বাণীগুলো যাতে তার সন্তানদের মননশীলতায় মা দুর্গার তাই আসুন, পূজার নামে অনিত্য-বস্তুর প্রতিযোগিতায় না মেতে, সব দেবতার সমাহার-স্বরূপ যুগ-পুরুষোত্তমের বিধি মেনে, মা দুর্গার নিত্য-সিদ্ধ দেদীপ্যমান আদর্শের আলোকে, আমাদের ঘরের মেয়েরা যাতে রাষ্ট্রপূজার অর্ঘ্যস্বরূপ সুজননে সুসন্তানের উপহার সাজিয়ে, শক্তিরূপিণী-দশপ্রহরণধারিণী সাজে সজ্জিত হয়ে নরাসুরদের কিভাবে দমন করে অস্তিত্ব রক্ষার পূজার পূজারী হতে পারে,— সেই চেষ্টায় যত্নবান হই। জয়গুরু ! বন্দে পুরুষোত্তমম্!
।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দৃষ্টিতে বাস্তব ইষ্টপূজা ।। ইষ্ট স্বার্থ ও প্রতিষ্ঠার অনুকূলে প্রবৃত্তি ও চাহিদাগুলিকে নিয়ন্ত্রিত ক’রে সত্ অর্থাত্ ইষ্টানুকূল জীবনবৃদ্ধিদ যা’-কিছু চিন্তাকে বাস্তবতায় পরিণত করবার প্রচেষ্টার সঙ্গে যথাযথ সেবা ও যাজনে পারিপার্শ্বিককে আকৃষ্ট ও উদ্বুদ্ধ ক’রে প্রতি প্রত্যেককে ইষ্টে অনুরক্ত ক’রে তোলাই হচ্ছে প্রকৃত ইষ্টপূজা।২৪ —পথের কড়ি
tapanspr@gmail.com
।
দুর্গাপূজার বাস্তবতা তুলে ধরতে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেনঃ
“….যে মৃন্ময় মূর্ত্তি আমরা পূজা করি— কল্পনায় প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করে,– তিনি দশভূজা, দশপ্রহরণ-ধারিণী— ঐ আমাদের মায়েরই প্রতীক— আমাদের ঘরে ঘরে যে মা অধিষ্ঠিতা তাঁরই বিনায়িত সুসঙ্গত প্রতীক; তাই ঐ মায়ের পূজা মানেই হচ্ছে— যে মা আমার, যে মা তোমার, যে মা ঘরে ঘরে দুর্গা হয়ে অধিষ্ঠিতা, দুর্গতিনাশিনী হয়ে দশপ্রহরণ ধারণ করে সন্তান-সংরক্ষণায় নিয়োজিতা, সেই মায়েরই পূজা;………..” (আশীষ বাণী, ৬২/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)
“মা আমাদের দশভুজা, প্রতি ঘরে ঘরে যদিও তাঁকে দ্বিভুজাই দেখতে পাই, তিনি দশদিক্ আবরিত করে রেখেছেন— তাঁর স্নেহ-উৎসারিত স্বস্তি-উৎসারিণী উদাত্ত অনুচর্য্যায়, কায়মনোবাক্যে প্রতিটি কর্ম্মের ভিতর-দিয়ে ব্যষ্টির পথে সমষ্টিকে আন্দোলিত করে, সাত্বত উৎসর্জ্জনায় আপূরিত করে সবাইকে, কৃতি-উদ্দীপনার অনুপ্রেরণায়— তাই মা আমার দশভূজা;……” (আশীষ বাণী, ৫৯/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)
“পূজা মানেই হল বর্দ্ধনা। (আঃ প্রঃ ১২-১২-১৯৪১) আমি আপনার পূজা করছি মানে, আপনার গুণ চিন্তা করছি এবং নিত্য অনুশীলনের মাধ্যমে ঐ গুণগুলি আমার চরিত্রগত করে তুলছি, আমার ভিতরে বাড়িয়ে তুলছি। স্তব করি মানে গুণ বর্ণনা করি। তা কিন্তু শুধু মুখে বা মনে-মনে করলেই হবে না, প্রতিদিনকার অভ্যাস ও অনুশীলনের ভিতর দিয়ে ঐ গুণগুলি আমার চরিত্রে মূর্ত্ত করে তোলা চাই।’’ (দীপরক্ষী ৪/১৮২)
পূজা কেমন করে করতে হবে, এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কি বলেছেন, একবার জেনে নেওয়া যাক। “দেবতার পূজা-অর্চনা করতে গেলে আগে ইষ্টের ভাব অন্তরে জাগ্রত করে সেই ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে, দেবতার স্মরণ মনন করতে হয়। তাঁকে স্মরণ করা মানে—তাঁর চলন-চরিত্র ও গুণ গরিমা স্মৃতিতে এনে অনুশীলনের ভিতর দিয়ে আয়ত্ব করা। চরণ-পূজা মানে চলন পূজা। ইষ্টের চলনাকে নিজের জীবনে আয়ত্ত ক’রে ঐ চলনের প্রসারতা ও সম্বর্দ্ধনা যদি না ঘটাই বাস্তবে, তাহলে তাঁর চরণ-পূজা সার্থক হয় না। আমরা ফাঁকতালে কাম সারতে চাই, কিন্তু বিধি বড় কঠিন বান্দা, কোন চালাকি চলে না তাঁর কাছে।” (আ. প্র. ২৯. ১২. ১৯৪২) “প্রশ্ন। হিন্দুরা দেবদেবীর পূজা করেন কিন্তু মুসলমানেরা একমাত্র খোদাতায়ালার পূজা ক’রে থাকেন। হজরত ত’ ছবি ও পুতুল-পূজা একেবারেই নিষেধ ক’রে গেছেন, কিন্তু আপনি এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য করছেন কেমন-ক’রে ? শ্রীশ্রীঠাকুর । ধর্ম্ম-আচরণের দিক দিয়ে হজরত রসুলও যা’ ব’লে গেছেন, আর্য্যদের ধর্ম্মশাস্ত্র চিরকালই ঋষির নিদেশরূপে তাই বহন ক’রে আসছে। আর্য্য-ধর্ম্মশাস্ত্র ছবি বা পুতুল-পূজা এমনতর বিকট তাচ্ছিল্যের সহিত নিরস্ত করতে ঘোষণা ক’রেছেন—এমন-কি অধমাধম বলতেও ক্ষান্ত হন নি। তবে আর্য্য-ঋষিদের প্রত্যেক মানুষকে উন্নতির পথে নিয়ন্ত্রণ করবার এমনতর একটা ঝোঁক ছিল—যা-নাকি হজরত রসুলের ভিতর দেখেত পাওয়া যায়–………..” (ইসলাম-প্রসঙ্গে/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র/পৃঃ ২৮-২৯) ‘‘ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ, ভক্ত রামপ্রসাদ, সাধক রামকৃষ্ণ, সর্ব্বানন্দ ঠাকুর প্রভৃতি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ প্রতিমা পূজা করেছেন বটে, তাঁদের ঐ পূজার পিছনে ছিল গুরু-পূজা, ইষ্ট-আরাধনা ; ঐ প্রতিমার পরিকল্পনার ভেতর দিয়ে ছিল অশেষ ও অঢেলভাবে ইষ্টানুরক্তি। তাই, ঐ অধম অবলম্বনও তাঁদিগকে অধমভাবে আটকে রাখতে পারে নি। তাঁদের ঐ চলনার পথে একটা সময় এসেছিল, তখন তাঁদের ঐ প্রতিমা তাঁদের দর্শনের সম্মুখে আর ও-রকম ছিল না। ভগবান রামকৃষ্ণদেবেরও শোনা গিয়েছে—তাঁর এমনতর সময় এসেছিল, যখন মূর্ত্তি-টুর্ত্তি তাঁর সাধনার পথে বাধাই সৃষ্টি করতো। তিনি এমন-কি তাঁর ঘরে যে-সমস্ত ছবি-টবি ছিল, সেগুলিকেও সরিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি না-কি এই বলেছিলেন—‘মেয়েরা ততদিন পুতুলখেলা করে, যতদিন তার বে’ না হয়, স্বামী-সহবাস না করে।’ সাধক রামপ্রসাদ তাঁর স্বরচিত গানের ভেতরেই তো বলেছেন— ‘‘ধাতু-পাষাণ মাটির মূর্ত্তি কাজ কি রে তোর আরাধনে তুই মনোময় প্রতিমা গড়ি’ বসা হৃদি-পদ্মাসনে।।’’ এমন কত কি যে আছে, তার ইয়ত্তা নেই।’’ (—শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, কথা প্রসঙ্গে, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৭৬, ১৭-১০-১৩৪২)
এবার আমরা এক়টু দেখে দেখে নেব, পূজা প্রসঙ্গে ‘মেরা ভারত মহান’-এর অন্যান্য মহানেরা এবং মহান গ্রন্থগুলো কি নিদেশ রেখে গেছেন।
পূজা বিষয়ে মহানির্ব্বাণতন্ত্র নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ ‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ। অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’
মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ভারতে বিবেকানন্দ গ্রন্থের ৩৩৬ পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট। ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’
‘‘যে-ব্যক্তি সর্ব্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে।’’ –শ্রীমদ্ভাগবত। ৩-২৯-২২
“ঈশ্বরঃ সর্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জ্জুন তিষ্ঠতি। ভ্রাময়ন্ সর্ব্বভূতানি যন্ত্ররূঢ়ানি মায়য়া।।“ –গীতা, ১৮।৬৫ “যিনি এই সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার নিজের স্বধর্মানুরূপ নিষ্কাম কর্মাচরণ দ্বারা (বাক্য বা ফুলজল দ্বারা নহে) পূজা করিয়া মানুষ সিদ্ধি লাভ করে । স্বধর্মানুরূপ (বর্ণানুগ সত্তাধর্ম পালন) নিষ্কাম কর্মই পরমেশ্বরের পূজার ডালি । (গীতা ১৮।৪৬)
তাই, শাস্ত্র বর্ণিত অধমের চাইতেও অধম পূজায় মেতে উঠে আমাদের যাতে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে না হয়, তাই, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের নিত্য বাস্তব দুর্গাপূজার পূজারী করে তুলতে সৎসঙ্গীদের নিত্যপাঠ্য ‘সত্যানুসরণ’ নামক মহাগ্রন্থে নারীকে জগজ্জননী জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত করতে নিদেশ দিয়ে বললেন, ‘‘প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী । প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয় ।’’ এবং পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, ‘‘স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যে-জন, তাহার হয় না ভবের বন্ধন মোচন । …..স্ত্রী চিন্ময়ী মা।’’—এই শিক্ষার ধারাকে বাস্তবায়িত করার নাম প্রকৃত দুর্গাপূজা ।
শ্রীশ্রীঠাকুর শুধু পুরুষদেরই প্রতিনিয়ত দুর্গাপূজা করার বিধান দিয়েই ক্ষান্ত হননি, নারী-সাধারণের মধ্যেও দেবী দুর্গার এক স্থায়ী আসন পেতে দিতে অনুশ্রুতির বাণীতে বললেন— ‘‘শার্দ্দুলেরে বাহন করে সাপের ফণার মালা পরে কালবোশেখী ঝঞ্ঝাবেগে ছোটরে নারী ছোটরে ছোট্ । দত্যিদানার নীচ বাহানা আর্য্যাবর্তে দিয়ে হানা ঘূর্ণিপাকের বেতাল গাঁথায় হুলিয়ে ভুলিয়ে দিচ্ছে চোট্ । দশ প্রহরণ দশ হাতে ধর বক্ষবিদরি ধ্বংসি ইতর সূর্য্যরাগী বজ্রতেজে আর্য্যনারী শত্রু টোট্ ।” তিনি নারীকে অবলা নয়, সবলারূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন । নারীর সতীত্বই নারীকে সবলা করে তোলে। তাই তিনি কত আশা নিয়ে বললেন— ‘‘সতীর তেজে ঝলসে দে মা নিঠুর কঠোর অন্ধকারে মদনভস্ম বহ্নিরাগে বৃত্তি-রিপু দে ছারখারে । প্রণবতালে ইষ্টমন্ত্র ঝঙ্কারি তোল সকলতন্ত্রে বিষাণ হাঁকে রুদ্র দোলায় বজ্রে হানি মৃত্যুদ্বারে।’’ মা দুর্গার আদর্শে অনুরঞ্জিত উক্ত বাণীগুলো যাতে তার সন্তানদের মননশীলতায় মা দুর্গার তাই আসুন, পূজার নামে অনিত্য-বস্তুর প্রতিযোগিতায় না মেতে, সব দেবতার সমাহার-স্বরূপ যুগ-পুরুষোত্তমের বিধি মেনে, মা দুর্গার নিত্য-সিদ্ধ দেদীপ্যমান আদর্শের আলোকে, আমাদের ঘরের মেয়েরা যাতে রাষ্ট্রপূজার অর্ঘ্যস্বরূপ সুজননে সুসন্তানের উপহার সাজিয়ে, শক্তিরূপিণী-দশপ্রহরণধারিণী সাজে সজ্জিত হয়ে নরাসুরদের কিভাবে দমন করে অস্তিত্ব রক্ষার পূজার পূজারী হতে পারে,— সেই চেষ্টায় যত্নবান হই। জয়গুরু ! বন্দে পুরুষোত্তমম্! *************************************** ।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দৃষ্টিতে বাস্তব ইষ্টপূজা ।। ইষ্ট স্বার্থ ও প্রতিষ্ঠার অনুকূলে প্রবৃত্তি ও চাহিদাগুলিকে নিয়ন্ত্রিত ক’রে সত্ অর্থাত্ ইষ্টানুকূল জীবনবৃদ্ধিদ যা’-কিছু চিন্তাকে বাস্তবতায় পরিণত করবার প্রচেষ্টার সঙ্গে যথাযথ সেবা ও যাজনে পারিপার্শ্বিককে আকৃষ্ট ও উদ্বুদ্ধ ক’রে প্রতি প্রত্যেককে ইষ্টে অনুরক্ত ক’রে তোলাই হচ্ছে প্রকৃত ইষ্টপূজা।২৪ —পথের কড়ি __________________________________________ tapanspr@gmail.com
** ২রা সেপ্টেম্বর ১৯৪৬ খৃস্টাব্দ দিনটির স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি ** ।। প্রত্যাগমনহীন আগমন ।। জ্ঞান গরিমায় গরবিনী আর্য্য ভারতবর্ষের অখণ্ডতা রক্ষার কথা জনে জনে বলেছেন । মুসলিম লীগ ও হিন্দু মহাসভার নেতাদের সাথে কথা বলেছেন সাম্প্রদায়িকতার ব্যাধি নিরসনের জন্য । হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে পরামর্শ দিয়েছিলেন হিন্দু মহাসভার নাম বদলে আর্য্য মহাসভা রাখতে । মুসলমানরাও আর্য্য । তাদেরও আর্য্য মহাসভার সদস্য করতে হবে । আরবী শিখে কোরান পাঠ করতে হবে । লীগ যদি ইসলাম বিরোধী কিছু করে প্রীভি কাউন্সিলে শত শত কেস করতে হবে মহানবীর আদর্শ বাঁচাতে । আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে মুসলমানদের, মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে হিন্দুদের স্থানান্তর করে সাম্প্রদায়িক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে । এই যদি করে ফেলতে পারেন দেখবেন দেশ ভাগ হবে না । এজন্য টাকার অভাব হবে না । বড় বড় জমিদারদের বোঝান । তাদের সাহায্যে এ কাজ আপনি করতে পারবেন । অত বড় বাবার ছেলে আপনি । আমি আমার সব কিছু দিয়ে আপনাকে সহায়তা করব । আমাদের চেষ্টার ত্রুটিতে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে যদি দেশ ভাগ হয়, তা’তে হিন্দু মুসলমান উভয়ের ক্ষতির সম্ভাবনা ।
কথাচ্ছলে পবিত্র বাইবেলের অনেকানেক বাণীর উপমা দিতেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র । প্রভু যীশুর একটি বাণী, “Be a Philanthropist, you will see all are philanthropist.” (লোকহিতৈষী হও, দেখবে সকলেই লোকহিতৈষী হয়েছে ।)-কে বাস্তবায়নের মহাসুযোগ এসে গেছে হাতের সামনে । আর্য্যকৃষ্টির বর্ণাশ্রমানুগ মহান ঐতিহ্যের অনুশাসনের নবীকরণ করে বৃহত্তর আর্যাবর্তের লোকেদের সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ এক রাষ্ট্রের মধ্যে নিরাপদে রাখার প্রচেষ্টায় দৈনন্দিন জীবনে পঞ্চমহাযজ্ঞের প্রবর্তন করলেন ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের মাধ্যমে। যার উদ্দেশ্য ছিল ইষ্টভরণ, পিতৃপোষণ, পরিস্থিতির উন্নয়ন । অর্থাত্ ইষ্ট ঈপ্সিত মঙ্গল কর্মের মাধ্যমে বৃহত্তর পরিবেশকে রক্ষা করে পিতৃপুরুষের গৌরবকে অক্ষুণ্ণ রাখার শপথ গ্রহণ ।
আর্য্য শাস্ত্র মনু সংহিতায় বর্ণিত “ইদং স্বস্ত্যয়ন” সু অস্তি অয়ন (সুন্দরের বা সৎ-এর বিদ্যমানতাকে ধারণ করে রাখার পথ।) মন্ত্রকে নবীকরণ করতে প্রবর্তন করলে স্বস্ত্যয়নী ব্রতবিধির। যদিও স্বস্ত্যয়নীর প্রবর্তন করেন প্রথমে, ১৯৩৭ খ্রীস্টাব্দে । ইষ্টভৃতি ১৯৩৮ খ্রীস্টাব্দে ।
সত্সঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী মর্মার্থের সাথে পরিচিত নাহলেও ‘স্বস্ত্যয়নী’র তুলনায় ‘ইষ্টভৃতি’ নামের সাথে বেশীরভাগ সংঘকেন্দ্রিক জনেরা যেমন পরিচিত, তেমনি সাধারণ লোকেরা ঠাকুরের নামে টাকাপয়সা রাখার মাধ্যম হিসেবে ‘ইষ্টভৃতি’ শব্দকে জানেন । তাই ‘ইষ্টভৃতি’-অপলাপী অনুচিত কর্ম করে ফেলেছি । এজন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি । যাইহোক ‘ইষ্টভৃতি’কে উপস্থাপনা করার চেষ্টা করে, পরে ‘স্বস্ত্যয়নী’ নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব । শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাষায়— “ঈশ্বর-অনুধ্যায়িতা নিয়ে গণহিতী অনুচর্য্যায় তাদের যে অনুগ্রহ-অবদান অর্জ্জন কর, সেই অবদান হ’তে শ্রদ্ধানুস্যূত অন্তঃকরণে স্বতঃস্বেচ্ছায় তোমার ইষ্টকে যা নিবেদন কর, তাই-ই কিন্তু তোমার শ্রেষ্ঠ ইষ্টভৃতি।” (ধৃতি-বিধায়না, ১ম খণ্ড, বাণী সংখ্যা ৩০৬) অর্থাত্, বর্ণানুগ কর্মের সেবার মাধ্যমে, বৃহত্তর পরিবেশে, ঘটে ঘটে ইষ্ট স্ফূরণের বা মঙ্গল প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত থাকার বিনিময়ে অযাচিত প্রাপ্ত অর্থ বা সম্পদকে বলা হয়েছে অনুগ্রহ অবদান । তা থেকে শ্রদ্ধার্ঘ্য স্বরূপ ইষ্টের উদ্দেশ্যে নিবেদন করতে হবে । এর মাধ্যমে জাতপাত ও সম্প্রদায়ের নামে পারস্পরিক অনৈক্য, ঘৃণা-বিদ্বেষ দূরীভূত হবে। যেহেতু ঈশ্বর-জ্ঞানে সেবা করে তার হিতসাধন করতে হবে, যার নামকরণ করলেন, ‘গণহিতী অনুচর্য্যা’। এরফলে বৈশিষ্ট্যের পালন ও পোষণের মাধ্যমে আর্য্য বিধানের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। পারস্পরিক সেবা-কর্মে নিয়োজিত থাকার জন্য বেকার সমস্যার সমাধান হবে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পারস্পরিক ঐকতানিক সমন্বয়ে সমৃদ্ধ হবার পাশাপাশি পরমরাষ্ট্রিক সমবায় প্রতিষ্ঠা পাবে। “জীবে প্রীতি বিতরণ করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।” এই হল ঈশ্বর অনুধ্যায়িতার স্বরূপ । বর্ণানুগ কর্ম এবং ঈশ্বর অনুধ্যায়িতা ব্যতীত ইষ্টভৃতি বাস্তবায়িত হয় না।
ইষ্টভৃতির নামে শুধুমাত্র ইষ্টের প্রীতির জন্য কাউকে পীড়িত না করে নিজে পীড়িত না হয়ে বর্ণানুগ কর্মের সেবা মাধ্যমে আহরিত অর্থ ‘দিন গুজরানী আয়’-কেই ইষ্টভৃতির অর্ঘ্য হিসেবে নিবার্চিত করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর । ওই নির্দেশ অনুসারে ইষ্টার্ঘ্য আহরণ করার মধ্যেই প্রীতি, মৈত্রী ও ঐক্যের বীজ বপন করে দিয়েছেন । প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন আর্য্যকৃষ্টির সদাচার এবং বর্ণাশ্রম ধর্মকে । ওই ইষ্টার্ঘ্য ইষ্টকে দিতে হবে । তিনি তা দিয়ে PHILANTHROPICAL WORK বা সব্যষ্টি সমষ্টির মধ্যে ভাগবত ঐক্য স্থাপন দ্বারা গণহিতৈষণা কর্ম করবেন । ইষ্টভৃতির দাতা এবং গ্রহীতার মেলবন্ধনে গড়ে উঠবে পরম রাষ্ট্রিক সমবায় । এই ছিল ঠাকুরের পরিকল্পনা । সেই উদ্দেশে স্থাপন করেছিলেন ফিলানথ্রপি কার্যালয় । মাসান্তে ওই অর্ঘ্য পাঠাতে হবে ইষ্টসকাশে । ইষ্টের নামে প্রেরিত ওই অর্ঘ্য গৃহীত হতো ফিলানথ্রপিতে । পাঠাবার পর দুজনকে ভ্রাতৃভোজ্য দিতে হবে । এর মাধ্যমে প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করলেন । দেশের অর্থনীতিকে করলেন সমৃদ্ধ । শ্রীশ্রীঠাকুর অনুশ্রুতি গ্রন্থে ইষ্টভৃতির বিষয়ে বললেন : “দিন গুজরানী আয় থেকে কর ইষ্টভৃতি আহরণ, জলগ্রহণের পূর্ব্বেই তা’ করিস্ ইষ্টে নিবেদন ; নিত্য এমনি নিয়মিত যেমন পারিস ক’রেই যা’ মাসটি যবে শেষ হবে তুই ইষ্টস্থানে পাঠাস্ তা’ ; ইষ্টস্থানে পাঠিয়ে দিয়ে আরো দু’টি ভুজ্যি রাখিস্, গুরুভাই বা গুরুজনের দু’জনাকে সেইটি দিস্ ; পাড়া-পড়শীর সেবার কাজে রাখিস কিন্তু কিছু আরো, উপযুক্ত আপদগ্রস্তে দিতেই হ’বে যেটুকু পার ; এসবগুলির আচরণে ইষ্টভৃতি নিখুঁত হয়– এ না-ক’রে ইষ্টভৃতি জানিস্ কিন্তু পূর্ণ নয় ।” ইষ্টভৃতিকেন্দ্রিক পূর্বোক্ত বাণীর মাধ্যমেও পরিস্ফূট হয়েছে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধিদ ভাগবত ঐক্যের পরমবার্তা । শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত ইষ্টভৃতি নিবেদন মন্ত্রের “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপারর্শ্বিকাঃ ।।” উচ্চারণ করার সাথে সাথে বৃহত্তর পারিপার্শ্বিকের জীবনবৃদ্ধির দায়ভারের শপথ নিতে হয় আমাদের । সব অবস্থাতে বাস্তব কর্মে বৃহত্তর পরিবেশের জৈবাজৈব সবকিছুকে পালন-পোষণে সমৃদ্ধ করে রাখার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সার্থক হয় ইষ্টভৃতি পালন । যদিও ইষ্টভৃতি প্রচলনের পূর্বে সত্যানুসরণের “তুমি তোমার, নিজ পরিবারের, দেশের ও দশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দায়ী ।” বাণীতে অনুরূপ দায়ভার দিয়েই রেখেছিলেন ব্যষ্টি ও সমষ্টি উন্নয়নের দিকে লক্ষ্য রেখে । এ তো গেল ইষ্টভৃতি আহরণ ও নিবেদনপর্ব । এর পর রয়েছে প্রেরণপর্ব । প্রেরণ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর স্পষ্ট নির্দেশ করে দিয়ে বলেছেন : ইষ্টভৃতি ইষ্টকেই দিস করিসনা তায় বঞ্চনা । অন্যকে তা দিলেই জানিস আসবে বিপাক গঞ্জনা ।। অর্থাত্ ইষ্টভৃতি ইষ্টেরই প্রাপ্য, অন্য কারও নয়। ওই অর্ঘ্য দিয়ে ইষ্টকর্ম করা হবে। ইষ্টকর্ম মানে পূর্ত্তকর্ম। যা প্রকৃত ইষ্টভৃতির মন্ত্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। “…..ইষ্টভ্রাতৃভূতযজ্ঞৈস্তৃপ্যন্তু পারিপারর্শ্বিকাঃ ।।” এর সরলার্থ খুব সহজ। শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ অনুযায়ী সদাচার, এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন বর্দ্ধনার বিধি মেনে সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধির পথে চলমান এমন গুরুভাই-ই প্রকৃত ইষ্টভ্রাতা।–যাঁর আপদে-বিপদে সাধ্যানুগ সাহায্য করতে হবে। ভূত মানে,–ক্ষিতি, অপ্, মরুত্, ব্যোম ও তেজ-আদি সৃষ্টি-প্রকরণের পঞ্চ-মহাভূত, যা পরিবেশের অজৈব উপাদান, যার সাহায্য ব্যতীত জৈব প্রাণপঙ্ক (protoplasm) বাঁচতে পারে না। উক্ত উপাদানসমূহকে সমৃদ্ধ রাখার জন্য আর্য্যদের বাস্তব পূর্ত্ত-কর্মের মাধ্যমে নিত্য পঞ্চ-মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করতে হতো সপারিপার্শ্বিক জীবনবৃদ্ধিকে অক্ষুণ্ণ রাখতে। শ্রীশ্রীঠাকুর ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের মাধ্যমে ওই প্রক্রিয়াকে নবীকরন করলেন। শ্রীশ্রীঠাকুর হিমায়েতপুর আশ্রম সংগঠনের মাধ্যমে ইষ্টভৃতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আমাদেরও তাই করতে হবে। ইষ্টের অবর্তমানে ইষ্টাদর্শের পরমরাষ্ট্রিক সমবায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দীক্ষা, শিক্ষা, বিবাহ, কৃষি ও শিল্পের বাস্তবায়ন করতে যিনি সক্ষম তিনিই ইষ্টার্ঘ্য গ্রহণের উপযুক্ত ব্যক্তি।–যাঁর মধ্যে ঠাকুরত্ব জাগ্রত থাকতে হবে।–সেই ব্যক্তিটিকে সংহত চরিত্র, বোধিসম্পন্ন, সানুকম্পী চর্য্যানিরত, সমন্বয়ী সামঞ্জস্য-প্রধান, পদনির্লোভ, অদ্রোহী, শিষ্ট-নিয়ন্ত্রক, প্রীতিপ্রাণ হতে হবে। এক-কথায় যাঁর মধ্যে ঠাকুরত্ব জাগ্রত তাঁকেই ইষ্টার্ঘ্য দিতে হবে। অন্যথায় বিপাক-গঞ্জনাকে মেনে নিতে হবে। আমাদের প্রবৃত্তির সব বিপাক এবং গঞ্জনা থেকে মুক্ত করতেই– স্বস্ত্যয়নী মুক্তি আনে/রাষ্ট্রসহ প্রতি জনে.—বাণীর ভরসা দিয়ে পঞ্চনীতি সমন্বিত স্বস্ত্যয়নী ব্রতের প্রবর্তন করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। ১. শ্রীবিগ্রহের মন্দির ভেবে যত্ন করিস শরীরটাকে, সহনপটু সুস্থ রাখিস বিধিমাফিক পালিস তাকে ; ২. প্রবৃত্তি তোর যখন যেমন যেভাবেই উঁকি মারুক, ইষ্টস্বা্র্থ প্রতিষ্ঠাতে ঘুরিয়ে দিবি তার্ সে ঝোঁক। ৩. যে-কাজে যা ভাল বলে আসবে মনে তত্ক্ষণা্ত্ হাতে-কলমে করবি রে তা রোধ করে দার সব ব্যাঘাত। ৪. পাড়াপড়শীর বাঁচা-বাড়ায় রাখিস রে তুই স্বার্থটান, তাদের ভালয় চেতিয়ে তুলিস ইষ্টানুগ করে প্রাণ। ৫. নিজের সেবার আগেই রোজই শক্তি মত যেমন পারিস, ইষ্ট অর্ঘ্য ভক্তিভরে শুচিতে নিবেদন করিস ; এই নিয়মে নিত্যদিন প্রতি কাজেই সর্ব্বক্ষণ স্বস্ত্যয়নীর নিয়মগুলি পালিস দিয়ে অটুট মন ; ত্রিশটি দিন পুরে গেলে মাসিক অর্ঘ্য সদক্ষিণায় ইষ্টভোজ্য পাঠিয়ে বাকি মজুত রাখবি বর্দ্ধনায় ; চিরজীবন এমনি করে ইষ্টস্থানে হয় নিরত, তাকেই বলে স্বস্ত্যয়নী সবার সেরা মহান ব্রত। এই বাণী থেকে একটা জিনিস স্পষ্ট হলো, যে জড়-পদার্থে নির্মিত মন্দিরের পরিবর্তে নিজ-নিজ দেহটাকেই শ্রীবিগ্রহ মন্দির জ্ঞানে পবিত্রতার সাথে রক্ষা করতে হবে, যেহেতু এই দেহের মধ্যেই পরমাত্মার আবাস। ভোগ, দুর্ভোগ, উপভোগ, মুক্তি, পরামুক্তি, পরাগতি সবকিছুই এই দেহের মধ্যেই। যা নাই ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে এই দেহভাণ্ডে। আমাদের আর্য্য শাস্ত্রাদিতেও একথার উল্লেখ রয়েছে। শ্রীশ্রীঠাকুর জীবাত্মার মধ্যে সুপ্ত পরমাত্মাকে জাগাতে বলেছেন নামের মাধ্যমে। ৫টি কর্মেন্দ্রিয়, ৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয়, মন, বিবেক, জীবাত্মা, পরমাত্মাদির সমন্বয়ে সৃষ্টি এই দেহমন্দিরকে পবিত্র রাখার, সুস্থ-স্বস্থ রাখার ভাগবত-বিধির পালন-পদ্ধতি সহজভাবে বিধায়িত করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর এই ব্রতের মাধ্যমে। তিনি কোনদিন ভুলেও তাঁর মন্দির নির্মাণের কথা বলেন নি। কথা-প্রসঙ্গে গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনাও করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর। তথাপিও কেন জানি আমরা বহুনৈষ্ঠিক-মন্দিরকেন্দ্রিক হয়ে স্বস্ত্যয়নী-বিধি অপলাপী চলনে চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। যাইহোক, স্বস্ত্যয়নীর পঞ্চম নীতিতে দৈনন্দিন অর্ঘ্য নিবেদনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জমা অর্ঘ্য থেকে সদক্ষিনায় ৩টাকা (১৯৩৭ খ্রীষ্টাব্দের ৩টাকা, বর্তমানে কত হতে পারে আন্দাজ করে নিতে হবে। ) ইষ্ট-সকাশে পাঠিয়ে অবশিষ্ট নিজের কাছে মজুত রেখে তা দিয়ে ইষ্টোত্তর সম্পত্তি করতে হবে। ওইসব সম্পত্তির আয়ের এক-পঞ্চমাংশ সেবায়েত হিসাবে ব্রতধারী ভোগ করতে পারবে, কিন্তু রাষ্ট্র বিপন্ন হলে ওইসব সম্পত্তি রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতি রক্ষার্থে বিনিয়োগ হবে। শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে প্রেরিত ইষ্টার্ঘ্য থেকে একটি পয়সাও তিনি নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করেন নি। আদর্শ রাষ্ট্রের মডেল হিসেবে হিমাইতপুর আশ্রমকে গড়ে তুলতে এবং রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতি রক্ষার কাজে ব্যয় করেছেন। তৎকালীন নেতৃবর্গ কথা দেওয়া সত্বেও শ্রীশ্রীঠাকুরের নির্দেশিত পথে দেশের ঐক্য ও সংহতি রক্ষায় আত্মনিয়োগ করেন নি, তিনি কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেননি। পাবনা সংলগ্ন সব্বাইকে সেদিন রক্ষা করেছিলেন। ১৩৫০ সালের মহা-দুর্ভিক্ষের সময়েও আশেপাশের গ্রামের কাউকে অনাহারে মরতে দেন নি। স্বস্ত্যয়নীর ইষ্টোত্তর জমি এবং সোনার বিনিময়ে মাটি কিনে রাখা জমির ফসল দিয়ে রক্ষা করেছিলেন বৃহত্তর পাবনার ক্ষুধাপীড়িত মানুষদের। তথাপিও আশ্রমের ভেতরে-বাইরের উপকৃত মানুষেরাই ঠাকুরের শত্রুতা করেই চলেছিল। খুন হল আশ্রমের কর্মী, তপোবনের ছাত্র, পিতৃ-বিয়োগ, দেশবন্ধু-বিয়োগ, মাতৃ-বিয়োগ, আবাল্যের সাথী মহারাজ-কিশোরীমোহন-দের বিয়োগ-ব্যথায় ব্যথাহারী হলেন ব্যথিত। * * * ১৩৫৩ সালের প্রথম দিকে মহানবী হজরত রাসুলুল্লাহর আদর্শের পরিপন্থী মুসলিম লীগের জেহাদি-আহ্বান ‘ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে‘ ঘোষিত হবার সাথে সাথে কলকাতায় যে পৈশাচিক হত্যালীলা হয়ে গেল সে সংবাদ শুনে অস্থির হয়ে উঠলেন ঠাকুর। দেশ-নেতাদের আগাম সতর্ক করা সত্ত্বেও, প্রতিরোধী-ব্যবস্থাপত্র দেওয়া সত্ত্বেও তাঁরা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি। বিপন্ন দেশবাসীদের রক্ষা করতে না পারার বেদনায় বিপর্যস্ত তিনি। বেড়ে গেল রক্তচাপ, হয়ে পড়লেন অসুস্থ। খবর শুনে পাবনার বিশিষ্ট মুসলমান নেতৃবৃন্দ ঠাকুরকে দেখতে আসেন, পাবনায় সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াতে দেবেন না বলে আশ্বস্ত করেন। একটু সুস্থ বোধ করেন, আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঠাকুরের প্রিয় কলকাতার বিশিষ্ট চিকিত্সক ডাঃ গুপ্ত প্রয়োজনীয় ঔষধ এবং সম্পূর্ণ বিশ্রামের ব্যবস্থাপত্র দিয়ে যান। বাঁধের ধারে নিভৃত নিবাসের মনোরম পরিবেশে ঠাকুরের বিশ্রামের ব্যবস্থা করেন ঋত্বিগাচার্য্য। চাপমুক্ত রাখতে দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষেধ করে দেন। কিন্তু ঠাকুর রাজী হন না। মনের কথা, প্রাণের ব্যথা নিয়ে যারা যারা আসবে, তাদের তিনি কিছুতেই ফেরাতে নারাজ। আগন্তুকদের দুঃখ-বেদনার কথা শুনতে শুনতে আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন। সংবাদ পেয়ে ডাঃ গুপ্ত আসেন, ঠাকুরকে দূরে কোথাও বায়ু পরিবর্তনের জন্য নিয়ে যাবার পরামর্শ দেন। অবশেষে আশ্রম কর্তৃপক্ষ ঠাকুরকে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ঠাকুর বিহার প্রদেশের দেওঘরে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। “৩০শে আগষ্ট (১৯৪৬) শ্রীশ্রীঠাকুর পাবনা শহরের হিন্দু-মুসলমান নেতৃবর্গকে ডেকে অনুমতি চান দেওঘর যাওয়ার. তখন সবার কাছ থেকে, বিশেষতঃ মুসলিম নেতা হাকিম সাহেবের কাছে অনুমতি নেন ও কথা কাড়িয়ে নেন যাতে তিনি আশ্রমের সামগ্রিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রসঙ্গতঃ ঠাকুর বলেন—হাকিম সাহেব! এখন আমার বাইরে যাবার সময় নয়। আমার মার নামে– ‘মনমোহিনী ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স য়্যাণ্ড টেকনোলজি‘ কলকাতা ইউনিভার্সিটির অধীনে নূতন কলেজ হয়েছে আমার। কলেজ এবং ইউনিভার্সিটির পরিকল্পনা আমার আজন্মের। সেই সুযোগ হাতে এসে গেছে আমার। কেষ্টদা (ভট্টাচার্য্য) হচ্ছেন কলেজের প্রিন্সিপাল। কেষ্টদা সঙ্গে না থাকলে তো আমি কানা. তাই কেষ্টদাকে সঙ্গে নিয়ে যাব। আমার এই বাচ্চা প্রিন্সিপাল থাকবে প্রফুল্ল দাস। বাচ্চা দেখালে কি হয়, এলেম আছে। আপনি ওকে দেখবেন যাতে আমার মার নামের বিজ্ঞান কলেজ ভাল করে চলে। হাকিম সাহেব বললেন—আপনি নিশ্চিন্ত মনে যান। কখনও কোনও অসুবিধা হলে বঙ্কিমবাবু (রায়) ও প্রফুল্লবাবু যেন আমাদের জানান। ফোনে একটা খবর পেলেও যা করার করতে পারি। খোদাতালার দয়ায় আপনি সুস্থ হয়ে সদলবলে তাড়াতাড়ি ফিরে আসুন। আপনি ফিরে আসা না পর্য্যন্ত আমরা শান্তি পাব না। পরিবেশটা তখন আবেগে ও মমতায় থরথর করে কাঁপছে। শ্রীশ্রীঠাকুরের চক্ষু অশ্রুভারাক্রান্ত. বেদনাহত দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন সবার পানে. পূজনীয় খেপুদার বাইরের ঘরে বসে এই ঐতিহাসিক শেষ বৈঠক.“ (তথ্যসূত্রঃ কুমারকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য প্রণীত মহামানবের সাগরতীরে/১ম/৩) ঠাকুরের নির্দেশমত, “রওনা হলেন সুশীলচন্দ্র, সঙ্গে রাজেন্দ্রনাথ ও বীরেন্দ্রলাল। কলকাতা এসে ভোলানাথ সরকারের সঙ্গে রাজেন্দ্রনাথ আপ্রাণ চেষ্টা করে ৩১শে আগষ্ট বগী রিজার্ভ করলেন। ঠিক হল ১লা সেপ্টেম্বর সকালে ঈশ্বরদী থেকে আসাম মেলের সঙ্গে বগী দেওয়া হবে. ৩১শে আগষ্ট আশ্রমে পৌঁছে রাজেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জানালেন সমস্ত সংবাদ। বীরেন্দ্রলাল মিত্রকে সঙ্গে নিয়ে সুশীলচন্দ্র ৩১শে আগষ্ট রাত্রে রওনা হলেন দেওঘরে বাড়ী ঠিক করার জন্য। আশ্রমে বিদ্যুত বেগে প্রস্তুতি পর্ব্ব চলতে থাকলো. খবর রাখা হল বিশেষ গোপনে, যাতে জনসমুদ্র এসে কেঁদে কেটে ঠাকুরের মত বদলে না ফেলে। পূজনীয় বড়দা বিভিন্ন বিভাগের কর্ম্মীদের দিলেন যথোপযুক্ত উপদেশ ও নির্দ্দেশাদি—যাতে তাঁদের অনুপস্থিতি কালেও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয় সমস্ত কাজ। নির্দ্ধারিত দিনে যথাসময়ে রওনা হলেন শ্রীশ্রীঠাকুর আশ্রম ছেড়ে—সঙ্গে ঠাকুর পরিবারের সবাই, শ্রীশ্রীঠাকুরের পরিচর্য্যাকারিগণ প্রত্যেকে নিজ নিজ পরিবারবর্গসহ, সপরিবারে স-সহচর ঋত্বিগাচার্যদেব, রাজেন্দ্রনাথ এবং আশ্রমের আরও কতিপয় বিশিষ্ট কর্মী. বিষণ্ণ বদনে যাত্রা করলেন শ্রীশ্রীঠাকুর—অত্যন্ত কষ্ট হচ্ছে তাঁর প্রিয়জনদের ছেড়ে যেতে—ছেড়ে যেতে জনক-জননীর পবিত্র স্মৃতিতীর্থ. ব্যথাতুর চিত্তে সজল নেত্রে নির্ব্বাক নিস্তব্ধ হয়ে পাষাণ মূর্ত্তির মত দাঁড়িয়ে থাকল আশ্রমবাসী নরনারী—আবাল-বৃদ্ধ-শিশু-যুবা ঠাকুরের এই ঐতিহাসিক যাত্রাপথের দিকে তাকিয়ে. সূচনা হল পুরুষোত্তমের নবতর দ্বারকা-লীলার.” (তথ্যসূত্রঃ শ্রীমত্ আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী ও সত্সঙ্গ আন্দোলন, পৃঃ ১৪৩) “এর আগেও কয়েকবার শ্রীশ্রীঠাকুরের বায়ু-পরিবর্তনের জন্য বাইরে যাওয়ার কথা হয়েছিল । কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানা কারণে যাওয়া হয়ে ওঠেনি । এবারেও শেষ পর্যন্ত তাঁর যাওয়া হবে কিনা তা নিয়েও সংশয় ছিল । কিন্তু ১লা সেপ্টেম্বর সকালে মাতৃমন্দিরের সামনে গিয়ে দেখি শ্রীশ্রীঠাকুর যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন । তাঁকে ঈশ্বরদী ষ্টেশনে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ী প্রস্তুত । বেলা দশটা নাগাদ তিনি রওনা হবেন । শ্রীশ্রীঠাকুর গাড়ীতে ওঠার আগে তাঁর পিতা ও মাতার প্রতিকৃতির সামনে প্রণাম নিবেদন করলেন । তারপর আশ্রম প্রাঙ্গণে মন্দিরে গিয়ে হুজুর মহারাজ এবং সরকার সাহেবের প্রতিকৃতির সামনে প্রণাম নিবেদন করলেন । …..তাঁর চোখে জল । চোখের জল ফেলতে ফেলতে ফেলতে তিনি মোটরে উঠলেন । ….চোখের জল ফেলতে ফেলতে তিনি জন্মভূমি থেকে শেষ যাত্রা করেছিলেন ।” (তথ্যসূত্রঃ কুমারকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য প্রণীত মহামানবের সাগরতীরে/১ম/৩-৪) “২রা সেপ্টেম্বর বেলা ১০টা নাগাদ শ্রীশ্রীঠাকুর বৈদ্যনাথধাম স্টেশনে পৌঁছলেন । সঙ্গে পরিবার-পরিজন, পার্ষদগণ এবং সেবকগণ । তাঁর বাসের জন্য প্রথমে ‘বড়াল-বাংলো’ বাড়ীটি ভাড়া নেওয়া হয় । পরে ‘ওয়েস্ট এণ্ড হাউস’ (মনোমোহিনী ধাম), গোলাপবাগ, রঙ্গনভিলা , অশোক-আশ্রম, হিলস ওয়ে , শশধর-স্মৃতি (শিবতীর্থ), দাস-ভিলা, প্রসন্ন-প্রসাদ প্রভৃতি বাড়ী ভাড়া করা হয় । রঙ্গনভিলায় শ্রীশ্রীঠাকুরের মধ্যমভ্রাতা পূজনীয় প্রভাসচন্দ্র চক্রবর্তী (ক্ষেপুকাকা) হিলস ওয়েতে শ্রীশ্রীঠাকুরের কনিষ্ঠ ভ্রাতা পূজনীয় শ্রীকুমুদরঞ্জন চক্রবর্তী (বাদলকাকা) এবং গোলাপবাগে পূজ্যপাদ বড়দা সপরিবারে বাস করতে থাকেন ।” (মহামানবের সাগরতীরে, ১ম পৃঃ ৪) শ্রীশ্রীঠাকুরের দেওঘর আগমনের সংবাদ জানতে পেরে, নিরাপত্তার কারণে, পূর্ববঙ্গের অনেক সত্সঙ্গী পরিবার ভিটেমাটি ছেড়ে ঠাকুরের শরণাপন্ন হন । ওদিকে, ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতির থাবায় ১৯৪৭ এর ১৫ আগষ্ট দ্বিজাতি-তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে দেশবিভাগের ফলে আরো ছিন্নমূল সত্সঙ্গী পরিবারের দল দেওঘরে চলে আসেন । দেওঘরে ঠাকুর নবাগত । নিজেই পরিবার পরিজনদের নিয়ে প্রভূত কষ্ট স্বীকার করে ভাড়া বাড়ীতে থাকেন । নিদারুণ অর্থকষ্টের মধ্যেও প্রশাসন বা সমাজসেবী সংস্থাদের কাছ থেকে সাহায্য না নিয়ে, কাউকে বিব্রত না করে, আত্মত্যাগী ইষ্টভ্রাতাদের সাহায্যে দুর্গতদের আশ্রয়দান ও ভরণপোষণ করেছিলেন । শ্রীশ্রীঠাকুর সর্বহারাদের যোগ্যতাহারা হতে দিলেন না । “বাস্তুহারা হওয়া নিদারুণ কিন্তু যোগ্যতাহারা হওয়া সর্বনাশা, এই যোগ্যতাকে সর্ব্বাঙ্গসুন্দর ক’রে অর্জ্জন করতে হলেই আদর্শে কেন্দ্রায়িত হতেই হবে সক্রিয়তায়, …তাই আজ যারা বাস্তুহারা সর্ব্বনাশের ঘনঘটা যাদের চারিদিকেই ঘিরে ধরেছে আগ্রহ আকুল কণ্ঠে তাদের বলি….. সাবধান থেকো, যোগ্যতাকে হারিও না, এই যোগ্যতা যদি থাকে লাখ হারানকে অতিক্রম ক’রে বহু পাওয়ার আবির্ভাব হতে পারে বিধিমাফিক শ্রমকুশল সৌকর্য্যে……” (সূত্রঃ মহামানবের সাগরতীরে ১ম\১৫) সেদিন যারা ঠাকুরের উক্ত নিদেশ অমান্য করে খয়রাতি সাহায্য গ্রহণ করেছিলেন, তারা হয়েছিলেন সংকুচিত, আর, যাঁরা ঠাকুরের নিদেশ মেনে চলেছিলেন তাঁরা জীবনের কল্যাণপ্রবাহকে প্রসারিত করতে পেরেছিলেন । যাইহোক, দেওঘরে আগত উদ্বাস্তুদের আশ্রয়, ভরণপোষণ, চিকিত্সাদি পরিষেবার ব্যবস্থা করতে অনেক বাড়ী ভাড়া করতে হয়েছিল শ্রীশ্রীঠাকুরকে । যা ক্রমে ক্রমে সত্সঙ্গ প্রতিষ্ঠানের রূপ পরিগ্রহ করে । তিলে তিলে গড়ে তোলা হিমাইতপুরের ঐতিহ্যমণ্ডিত সেই আশ্রম শত্রু সম্পত্তি ঘোষণা করে পাকিস্তান সরকার দখল করে নেয়।
শ্রীশ্রীঠাকুরের দেওঘর আগমনের সংবাদ জানতে পেরে, নিরাপত্তার কারণে, পূর্ববঙ্গের অনেক সৎসঙ্গী পরিবার ভিটেমাটি ছেড়ে ঠাকুরের শরণাপন্ন হন। ওদিকে, ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতির থাবায় ১৯৪৭ এর ১৫ আগষ্ট দ্বিজাতি-তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে দেশবিভাগের ফলে আরো ছিন্নমূল সৎসঙ্গী পরিবারের দল দেওঘরে চলে আসেন। দেওঘরে ঠাকুর নবাগত। নিজেই পরিবার পরিজনদের নিয়ে প্রভূত কষ্ট স্বীকার করে ভাড়া বাড়ীতে থাকেন। নিদারুণ অর্থকষ্টের মধ্যেও প্রশাসন বা সমাজসেবী সংস্থাদের কাছ থেকে সাহায্য না নিয়ে, কাউকে বিব্রত না করে, আত্মত্যাগী ইষ্টভ্রাতাদের সাহায্যে দুর্গতদের আশ্রয়দান ও ভরণপোষণ করেছিলেন।
।। দেশভাগ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকুলচন্দ্রের আক্ষেপ ।। ‘‘চেষ্টা করেছিলাম প্রাণপণ যাতে হিমাইতপুর না ছাড়তে হয়, কিন্তু অত্যাচারিত হলাম ভীষণ, পারলাম না কিছুতেই। বাড়ী আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিল, মানুষ খুন করে ফেল্ল। ওখানকার সব লোকের বিরুদ্ধতার জন্য পারলাম না। সকলের ভাল করতে গিয়ে আমি একেবারে জাহান্নামে গেলাম।’’ ‘‘আমরা হিন্দুরাই পাকিস্তানের স্রষ্টা। আমরা আরো চেষ্টা করেছি, যাতে আমরা সকলে মুসলমান হয়ে যাই। আমরা মুসলমান মেয়ে বিয়ে করতে পারি না। কিন্তু মুসলমানরা হিন্দুর মেয়ে বিয়ে করতে পারে। আমরা materialise করেছি তাই যাতে পাকিস্তান হয়, আর materialise করি নাই তা যাতে পাকিস্তান না হয়।….. কিন্তু আগে যদি হায়দ্রাবাদের দিক থেকে বাংলায় হিন্দুদের নিয়ে আসা যেতো, তবে পাকিস্তান হতো না। কিন্তু তা তো হলো না। পাকিস্তান হওয়ায় হিন্দু মুসলমান উভয়েরই কী ভীষণ ক্ষতিই না হল। …….. ’’ (ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থ, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৯৪) * * *
ফলে শ্রীশ্রীঠাকুর নবোদ্যমে প্রতিষ্ঠা করেন কেমিক্যাল ওয়ার্কস, তপোবন বিদ্যালয়, কুটিরশিল্প, প্রেস, প্রকাশনা বিভাগ, হাসপাতাল, যতি আশ্রম প্রভৃতি। শ্রীশ্রীঠাকুরের জনকল্যাণমুখী কর্ম প্রচেষ্টার বাস্তব রূপায়নের আলোচনা পত্রিকায় প্রকাশিত নিম্ন প্রদত্ত তথ্য পাঠ করলেই বোঝা যাবে শ্রীশ্রীঠাকুরের সুদূরপ্রসারী কল্যাণ প্রতিষ্ঠার প্রতিচ্ছবি । “সত্সঙ্গের বর্তমান সর্বপ্রধান লক্ষ্যবস্তু হইল বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার, দেশীয় ঔষধপত্র প্রস্তুতের রসায়ণাগার ও কারখানা, হাসপাতাল, প্রসূতিসদন, বালক-বালিকাদের শিক্ষার জন্য উচ্চ বিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্র, কুটির-শিল্প ভবন, কৃষিপরীক্ষা-ক্ষেত্র প্রভৃতি স্থাপন পূর্বক পাবনার ন্যায় একটি আদর্শ পল্লী-উন্নযন কেন্দ্রের পুণঃ প্রতিষ্ঠা করা । প্রসঙ্গতঃ ইহা উল্লেখযোগ্য যে, অতীতের সেই পাবনা-সত্সঙ্গ পল্লী সংগঠনের উজ্জল আদর্শরূপে অদ্যাপি সারা ভারতে প্রসিদ্ধ হইয়া আছে. আর শুধুমাত্র বিহারেই নয়, পরন্তু ভারতের সকল প্রদেশেই এইরূপ আদর্শ কেন্দ্র স্থাপন করাই সত্সঙ্গের অভিলাষ। শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি আবাসিক পল্লী-বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন পূর্বক শ্রীশ্রীঠাকুরের পরিকল্পনাগুলির বাস্তব রূপায়নের উচ্চাকাঙ্খাও সত্সঙ্গ পোষণ করিয়া চলিয়াছে।……” (আলোচনা, মাঘ, ১৩৬৫/পৃঃ ১৫০) উক্ত দলিল থেকে প্রাপ্ত সংবাদে এটুকু বোঝা গেল যে, পাবনা আশ্রমে শ্রীশ্রীঠাকুর যথেষ্ট প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে যে-সব কর্ম-প্রতিষ্ঠানসমূহ গড়ে তুলেছিলেন, তদনুরূপ কেন্দ্র ভারতের প্রতিটি প্রদেশে স্থাপন করা হবে। এবং একটি শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে,—যা শ্রীশ্রীঠাকুরের এক অন্যতম ইচ্ছা। সৎসঙ্গী-সাধারণের জ্ঞাতার্থে পাবনার প্রেরিততীর্থ হিমাইতপুর তপুর-আশ্রমের কর্ম-প্রতিষ্ঠানসমূহের এক সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করছিঃ— অখ্যাত পল্লী হিমাইতপুরে বায়ু থেকে বিদ্যুত উৎপাদন করে পরম বিস্ময় সৃষ্টি করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। গড়ে তুলেছিলেন—তপোবন ও মাতৃ বিদ্যালয়—যা শিক্ষাক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত মনোমোহিনী ইনষ্টিউট অফ সায়েন্স এণ্ড টেকনোলজি নামের বিজ্ঞান কলেজ।–যার পরিচয় ইতিপূর্বে পেয়েছি। কেমিক্যাল ওয়ার্কসের জীবনদায়ী ঔষধসমূহ দেশে এবং বিদেশে সমাদৃত হয়েছিল। বৈদ্যুতিক এবং যন্ত্রশিল্পের আধুনিক সব ধরণের কাজ হতো ইলেকট্রিকাল ও মেকানিক্যাল ওয়ার্কসপে। যথা,–ঢালাই, ঝালাই, লেদের কাজ, ডাইস, ইলেক্ট্রোপ্লেটিং, ইলেক্ট্রিক্যাল ফিটিং, আরমেচার, ব্যাটারি প্লেট তৈরি ও মেরামত, ডায়নামো মেরামত ইত্যাদি। ছিল—ময়দার কল, আটার কল, চালের কল, তেলের কল, চিনির কল, মেডিকেটেড ওয়াটার মেশিন, স্পাইস পাউডারিং, সুতার গুটি তৈরি, টেলারিং, বোতাম তৈরি, গ্লাস ব্লোয়িং, পটারী ওয়ার্কস্, বেকারী, লজেন্স তৈরি, গ্রোসারী প্রোডাক্ট ইত্যাদির শিল্প। ছিল—কার্ডবোর্ড কারখানা, স্টীমলণ্ড্রী, কটন ইণ্ডাস্ট্রিজ, হোশিয়ারী শিল্প, ব্যাঙ্ক, ইঞ্জিনীয়ারিং ওয়ার্কস্, বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র, স্বাস্থ্য বিভাগ, গৃহনির্মাণ বিভাগ, কলাকেন্দ্র, প্রেস (যেখানে বাংলা, হিন্দী, সংস্কৃত, উর্দু, আরবী, ফারসী হরফের কাজ হতো, দেশ ভাগের পর পাকিস্তান সরকার জবরদখল করে ঢাকাতে নিয়ে যায়।), পাব্লিশিং হাউস, ফিলানথ্রপি, মাতৃসঙ্ঘ ইত্যাদি। (তথ্যসূত্রঃ ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনী গ্রন্থ) শুধু আশ্রমবাসীরাই নয়, জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায়-ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে সকলেই ওইসব প্রতিষ্ঠানের সুলভ সেবা পেতেন। তথাপিও পাকিস্তান সরকার ওই সর্বজনীন কল্যাণধর্মী প্রতিষ্ঠানসমূহ দখল করে কেন বিনষ্ট করেছিলেন তার উত্তর আমার জানা নেই। যেমন জানা নেই, আলোচনা পত্রিকাতে বর্ণিত শ্রীশ্রীঠাকুরের ইচ্ছার বাস্তবায়ন দেওঘর সত্সঙ্গ কর্তৃপক্ষ করেছেন কি-না।—জানালে বাধিত হব। কারণ, ইষ্টভৃতি মানে ইষ্টভরণ, ইষ্টভৃতির অর্ঘ্যাদি ইষ্টকর্মে,—ঠাকুরের ইচ্ছার পূর্ত্তিতে ব্যবহৃত হবে, এবং সেটাই স্বাভাবিক! তবে এটুকু জানতে পেরেছি, ঠাকুরকে প্রীত করার, সুস্থ রাখার অজুহাতে শনির দশা কাটাবার ব্যবস্থা করা হয়, যাগযজ্ঞ করা হয়, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখান হয়। “কিন্তু যা করলে তিনি সুস্থ থাকেন এবং তাঁর মন প্রফুল্ল থাকে সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়নি। তাঁর আবাল্যের স্বপ্ন শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, যাজন-পরিক্রমার জন্য গাড়ী সংগ্রহ, গঙ্গা-দারোয়া পরিকল্পনা, হাসপাতাল স্থাপন, দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ প্রভৃতি বিষয়ে কর্তৃপক্ষের প্রচেষ্টা আন্তরিক ছিল না।……… ” (তথ্যসূত্রঃ কুমারকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য প্রণীত মহামানবের সাগরতীরে/২য়/৩২৭) চির-অতন্দ্র পুরুষোত্তম মৃতলোকের অনেক বেদনা নিয়ে অমৃতলোকে প্রত্যাবর্তন করেছেন। তাঁর “দেবভিক্ষা– ওগো ভিক্ষা দাও!– ঝাঁঝাল ঝঞ্ঝার পিশাচী জৃম্ভন শুরু হয়েছে, বাতুল ঘুর্ণি বেভুল স্বার্থে কলঙ্ক কুটিল ব্যবচ্ছেদ সৃষ্টি করতে আরম্ভ করে দিয়েছে, প্রেত-কবন্ধ-কলুষ কৃষ্টিকে বেতাল আক্রমণে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে, অবদলিত কৃষ্টি অজচ্ছল অশ্রুপাতে ভিক্ষুকের মতো তাঁরই সন্তানের দ্বারে নিরর্থক রোদনে রুদ্যমান, অলক্ষ্মী-অবশ প্রবৃত্তি-শাসিত বেদস্মৃতি– ঐ দেখ–মর্মান্তিকভাবে নিষ্পেষিত, ত্রস্ত দোধুক্ষিত দেবতা আজ নতজানু–তোমাদেরই দ্বারে তোমাদেরই প্রাণের জন্য তোমাদেরই প্রাণভিক্ষায় তোমাদেরই সত্তার সম্বর্দ্ধনার জন্য ব্যাকুল হয়ে ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়াচ্ছেন ; কে আছ এমন দরদী আর্য্য-আত্মজ সন্তান!– তাঁকে মানুষ ভিক্ষা দেবে, তাঁকে অর্থ ভিক্ষা দেবে— সব হৃদয়ের সবটুকু উত্সর্গ করে তোমাদেরই জন্য সেই দেবোজ্জল প্রচেষ্টাকে সার্থক করে তুলতে ? যদি থাক কেউ ওগো ধী-ধুরন্ধর উত্সর্গপ্রাণ নিরাশী নির্ম্মম! এস,–উত্সর্গ কর–আত্মাহুতি দাও– জীবন নিঙড়ানো যা-কিছু সঙ্গতি তাঁকে দিয়ে সার্থক হয়ে ওঠ, নিজেকে বাঁচাও, মানুষকে বাঁচাও, কৃষ্টিকে বাঁচাও ; আর, বাঁচাও দুর্দ্দশাদলিত মহা-ঐশ্বর্য্যশালিনী আর্য্যস্তন্যদায়িনী, পরম-পবিত্রা ভিখারিণী মাতা ভারতবর্ষকে, ধন্য হও, নন্দিত হও, ঈশ্বরের অজচ্ছল আশীর্ব্বাদকে মাথা পেতে লও, শান্ত হও, শান্তি দাও, অস্তি ও অভ্যুত্থানকে অনন্তের পথে অবাধ করে রাখ ; স্বস্তি! স্বস্তি! স্বস্তি!
(১৯৪৬ খৃস্টাব্দের প্রথম দিকে হিমায়েতপুরে নিজহস্তে লিপিবদ্ধ করেন, এই ‘দেবভিক্ষা’ বাণী, পরবর্তীতে চর্য্যা-সূক্ত গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়!)-র” ঝুলি ভরাতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি! তবে আশা রাখি “অনুকূল সদাবিভুঃ পদ্মনাভঃ মনপ্রভু”-র অনুগামী ইষ্টস্বার্থপ্রতিষ্ঠাপরায়ণ ঋদ্ধসেনানীদের দিয়ে তিনি তাঁর কাজ ঠিক করিয়ে নেবেন—পুণঃ প্রতিষ্ঠিত হবে তাঁর পুণ্য জন্মভূমি পরমতীর্থ হিমায়েতপুরের হৃত গৌরব!—দেশে ও বিদেশে।
নারী ও পুরুষ উভয়ের সংঘাতে যখন উভয়ে নিজ-নিজ বৈশিষ্ট্যে উদ্দাম ও অবাধ হয়, উভয়ের উভয়ের প্রতি আকর্ষণ যেখানে উভয়কে মূঢ় করিয়া না তুলিয়া উদ্বুদ্ধ হইয়া আদর্শে আপ্রাণ হইয়া ওঠে—তেমনতর প্রকৃতি ও পুরুষেই ভগবান মূর্ত্ত হইয়া আবির্ভূত হন, আর, জীব ও জগৎকে সংবৃদ্ধির পথে আকর্ষণ করিয়া অমৃতকে পরিবেশন করেন ! ১৮৪। (চলার সাথী)
* * * দাস, চলভাষ ৭০০৩৪১০০৭৬ * * *
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত সৎসঙ্গ আন্দোলন সন্তমত, বৈদিক মত এবং পূর্বাপূর্ব অবতারবরিষ্ঠ পুরুষোত্তমগণকে মেনে চলার শিক্ষা দিয়েছে। আগ্রা সৎসঙ্গের বিনতীর মাধ্যমে সন্ত-মতবাদকে, শ্রীশ্রীঠাকুর রচিত এবং প্রবর্তিত আহ্বানী, আচমন, আর্য্যসন্ধ্যা, পঞ্চবর্হিঃ, সপ্তার্চ্চি বৈদিক-মতবাদকে এবং পুরুষোত্তম বন্দনার মাধ্যমে পূর্বাপূর্ব অবতার-বরিষ্ঠদের আদর্শকে মান্যতা দিয়ে এক সর্বজনীন উপাসনা, প্রার্থনা প্রবর্তন করেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। কেন জানিনা, দেওঘর সৎসঙ্গের কর্ণধারগণ ওই সর্বজনীন প্রার্থনাকে অস্বীকার করে ইষ্টগুরুর আদর্শকে অবমাননা করছেন। * * * “মৎস্য-কূৰ্ম্ম-কোল-নৃসিংহ-বামন শরীরম্ রাম-কৃষ্ণ-বুদ্ধ-যীশু-মোহম্মদ রূপায়িতম্ চৈতন্য-রামকৃষ্ণানুকূলং পূর্ব্বর্তনীপূরণম্ শাশ্বতং বৰ্ত্তমানম্।”-এর প্রবক্তা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সন্ত-সদগুরু পরম্পরা প্রসঙ্গে বলছেন, “……….. বুদ্ধদেব যে স্থানে উঠিয়া নির্বাক ছিলেন, শঙ্কর সেখানে পরমাত্মা খাড়া করিলেন। শঙ্করের পর রামানুজ, রামানুজের পরেই কবীর, নানক প্রভৃতি বহু সাধুর ভারতে প্রায় সর্বত্রই অভ্যুত্থান হয়। তারপর চৈতন্য, তারপর খৃষ্টধর্মের ঢেউ—তাহার ফলে রামমোহন প্রভৃতি। তারপর রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ। এই যে বিরাট, বহু কালব্যাপী বহু ধর্ম মতের আবির্ভাব ও সমাজ সংস্কারের প্রচেষ্টা— সমস্তই শ্রীকৃষ্ণ তত্ত্বেরই practical application বলা যাইতে পারে। তত্ত্ব হিসাবে বিশেষ নূতন কিছুই হয় নাই। একই বহুৎ তত্ত্বেরই নানা অংশ নানা মহাত্মার মধ্য দিয়া সমাজ শরীরের উপর দেশ কাল ভেদে ও মানুষের যোগ্যতা ও প্রয়োজনানুসারে পরীক্ষিত হইয়াছে। কিন্তু তাহার সঙ্গে সঙ্গে নূতন এক চরম তত্ত্বের সূচনাও দেখা দিয়াছিল কবীর প্রভৃতি কয়েক জনের মধ্যে। বলিতে গেলে রামচন্দ্রের তত্ত্বের পরে শ্রীকৃষ্ণই নূতন বৃহত্তর তত্ত্ব আনয়ন করেন। আবার শ্রীকৃষ্ণের পরে এই যুগেই ব্যাপকতর তত্ত্বের আবির্ভাব। আর সে তত্ত্ব শ্রীকৃষ্ণ, কবীর প্রভৃতির মধ্য দিয়া ক্রমশঃ আবির্ভূত হইয়াছে। এই নূতন তত্ত্বের speciality হচ্ছে এই যে, অন্যান্য মহাত্মার তত্ত্বের ন্যায় ইহার গ্লানি হওয়া অসম্ভব, কারণ এই মত কাহাকেও বাদ দিয়া নয়। যে কেহ যে অবস্থায়ই থাকুক না কেন, কিছুই বাদ না দিয়া এই মত গ্রহণ করিতে পারে। কেউ হয়ত ভুল করতে পারে (এই মতের Catholicity দেখে ), কিন্তু এ মত তাহাতে কোন রকমেই affected হবে না। (সূত্রঃ ঋত্বিগাচার্য্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য প্রণীত দিনপঞ্জী প্রথম খন্ড।)
যাইহোক, সাধক রামানুজ পরবর্তী সন্তমতের সাধক কবীরদাস জন্মেছিলেন 1440C বারানসীতে। তিনিই প্রথম আমাদের সৎ মন্ত্রের রহস্য ভেদ করে বলেছিলেনঃ “কবীর ধারা অগমকী সদগুরু দয়ী লখায়, উলট তাহি সুমিরন করে স্বামী সংগ লাগায়।” অর্থাৎ ধারা উল্টে স্বামী যোগ করে জপ করতে নিদেশ দিলেন। সন্ত কবীরের পর গুরু নানক জন্মগ্রহণ করেন 15. 4. 1469 C পঞ্জাব প্রদেশের তালবণ্ডীতে। তিনিও ওই সত্যনাম প্রচার করেছেন। গুরু নানকের পর আগ্রাতে ২৪শে আগস্ট ১৮১৮ তে জন্মগ্রহণ করেন শিবদয়াল সিং, তিনি স্বামীজী মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ১৫ জুন ১৮৭৮ আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। পরবর্তী গুরু হন রায় সালিগ রাম। তিনি ১৪ মার্চ, ১৮২৯ আগ্রার পীপল মাণ্ডিতে জন্মগ্রহণ করেন। ৬ ডিসেম্বর ১৮৯৮তে আগ্রাতেই দেহত্যাগ করেন। তিনি হুজুর মহারাজ নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ওই সৎনাম সাধন করে চরম ও পরম পথের সন্ধান পান। তিনি তাঁর গুরু স্বামীজী মহারাজের অনুমতি ক্রমে ওই সৎনাম সর্বসাধারণে প্রচার করেন। পরবর্তী গুরু হন পণ্ডিত ব্রহ্মশঙ্কর মিশ্র। ২৮শে মার্চ, ১৮৬১ তে ব্রাহ্মণ পরিবারে, বারানসীতে জন্মগ্রহণ করেন। ১২ অক্টোবর ১৯০৭ সালে দেহত্যাগ করেন। তিনি মহারাজ সাহেব নামে খ্যাত ছিলেন। মহারাজ সাহেব দেহত্যাগের পূর্বে একটি কাউন্সিল গঠন করে বাবু কামতা প্রসাদ ওরফে সরকার সাহেবকে পরবর্তী গুরু রূপে নির্বাচন করেন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরকার সাহেবকে সন্ত বলে উল্লেখ করেছেন, ভাববাণীতে। অন্তর্ধানের পর আগ্রা সৎসঙ্গের প্রধান গুরু হন সরকার সাহেব। পুরুষোত্তম জননী মাতা মনোমোহিনী দেবী হুজুর মহারাজের দীক্ষিত ছিলেন। হুজুর মহারাজ বিগত হবার পর সরকার সাহেবের কাছে মা তাঁর ছেলের সম্পর্কে জানালে সরকার সাহেব “মেরা কাম ফতে।” বলে দেহ ত্যাগ করেন। পুরুষোত্তমরূপী সদগুরু অবতীর্ণ হয়েছেন জানতে পারে সাধ্যায়ী গুরু তাঁর দায়িত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন। সরকার সাহেব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গাজীপুরে। তারপর থেকেই মাতা মনোমোহিনী দেবী সন্তমতের সৎনামে দীক্ষা দিতে শুরু করেছিলেন। মাতা মনোমোহিনী দেবী তাঁর গুরুদেব সাধক পুরুষ হুজুর মহারাজের কাছ থেকে যে বিনতী প্রার্থনা করতে শিখেছিলেন, সেই শিক্ষার ধারাটাকে প্রাধান্য দিয়ে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন পাবনার সৎসঙ্গ আন্দোলন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র পুরুষোত্তম রূপে স্বীকৃত হবার পরও আগ্রা সৎসঙ্গের ধারায় (যে ধারায় বীজমন্ত্রের উচ্চারণ স্বীকৃত, বীজমন্ত্রের মাধ্যমেই পারস্পরিক সম্ভাষণ প্রচলিত। আর্য্যকৃষ্টির দশবিধ সংস্কার অবহেলিত।) পাবনা সৎসঙ্গকে পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন বলেই আগ্রা সৎসঙ্গের বিনতী-র শিক্ষা দেওয়া হয় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের অনুসারীদের। যার ফলে, আজও বিনতীর মাধ্যমে বীজমন্ত্র উচ্চারিত হয়ে চলেছে। নিত্য সাধ্যায়ের জন্য আবশ্যিক, শ্রীশ্রীঠাকুর রচিত ‘জাগরণী’ সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দীক্ষিতরা যতটা না জানে, তার চেয়ে বেশি মানে মাতা মনোমোহিনী দেবী রচিত তাঁর গুরুদেবের প্রশ্বস্তির প্রভাতী গীতি ‘প্রভাত যামিনী উদিত দিনমনি’-কে। পরবর্তীকালে দৈনন্দিন জীবনে আর্য্যকৃষ্টিকে উপস্থাপিত করতে শ্রীশ্রীঠাকুর যে আর্য্যসন্ধ্যা ও প্রার্থনা মন্ত্র রচনা করেছিলেন, মাতা মনোমোহিনী দেবী সেই প্রার্থনাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন, ‘‘সন্ধ্যা মন্ত্রটা মা মারা যাবার তিনদিন আগে লেখা হয়। মা শুনে বড় খুশি হয়েছিলেন। সেইজন্য ও জিনিসটার উপর আমার খুব প্রীতি আছে। মা শুনেছিলেন তাই ওটা আমার অর্ঘ্য হয়ে আছে।’’ (আঃ প্রঃ ২১ খণ্ড, ৭. ১১. ১৯৫২)
।। আর্য্য সন্ধ্যা ও প্রার্থনার গুরুত্ব প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।। শ্রীশ্রীঠাকুর। আর্য্যদের জীবনের তপস্যা একটা প্রধান অঙ্গ ছিল, এবং করলে এখনও আছে। তাই, প্রত্যেক individual সাংসারিক গোলমালকে এড়িয়ে যতক্ষণ তপস্যায় নিরত থাকতে পারতেন, ততক্ষণ থাকতেন। তাই, congregation-হিসাবে বিজ্ঞান, দর্শন এবং ধৰ্ম্ম পুস্তিকাদির আলোচনা-ছাড়া তেমনতর কোন প্রার্থনার ব্যবস্থা ছিল ব’লে শোনা যায় না। তবে অনেক আগে সামগানের কথা শোনা যায়, আরও এখনও কীর্ত্তনের ‘চল’ আছে! তবে আমার মনে হয়, আমাদের সন্ধ্যামন্ত্র (দ্রঃ ‘প্রার্থনা’ নামাঙ্কিত পুস্তক, সৎসঙ্গ পাবলিশিং হাউস, দেওঘর।) যা’ আছে গায়ত্রী, প্রাণায়াম বাদ দিয়ে—সেগুলি congregational (সমবেত) প্রার্থনা-হিসাবে চলতে পারে। ভাবের প্রতি নজর রেখে অর্থবোধ নিয়ে ঐগুলি পাঠ বা আবৃত্তিতে এবং একটা পাঠের পর চোখ বুজে একটু চিন্তায়, মন—এমন-কি শরীর পর্য্যন্ত কেমনতর হ’য়ে ওঠে, কিছুদিন একটু করলেই হাতে-হাতে বোধ করতে পারা যায়। ভাবের সহিত ঐ শব্দগুলি উচ্চারণে এতই তীব্রতা ও enlightenment এনে দেয় যা’তে নাকি পারিপার্শ্বিক-সহ সমস্ত জীবনটাই কেমনতর জীবনে মুহূর্তে যেন উদ্বুদ্ধ হ’য়ে ওঠে। গায়ত্রী ও প্রাণায়াম বাদ এই জন্য বললাম—ইহা জপ চিন্তার সহিত meditation-এর জন্য, তাই উহা নিরিবিলি হ’য়ে করতে পারলেই ভাল।
প্রশ্ন। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র—সকলেরই পালনীয় এমন কোন সার্ব্বজনীন প্রার্থনা বা সন্ধ্যা সবারই জন্যে চলতে পারে নাকি? সন্ধ্যা যা’ যা’ আছে তা’ তো শূদ্র পালন করতে পারে না, আর, ওর ভিতর জড়ের পূজো আছে—যেমন জল, সূর্য্য ইত্যাদি।
শ্রীশ্রীঠাকুর। Enlightened আর্য্যরা জড়ের পূজা নিয়ে কখনই বেকুবের মতন ব্যাপৃত ছিলেন না। সূর্য্য, বাতাস, জল ইত্যাদি সেই পরমপুরুষের দান—যা’ প্রতিনিয়তই আমাদের জীবন ও বৃদ্ধিকে invigorate ও accelerate করছে। তাদের উপলক্ষ্য ক’রে সেই almighty-তে কৃতজ্ঞতার সহিত আকৃষ্ট বা মুগ্ধ হতেন। আর, যে-প্রার্থনার কথা পূর্ব্বে বলেছি তা’ congregation-এর মধ্যে সবাই—ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, এমন-কি শূদ্রও—অবলীলাক্রমে করতে পারেন। (নানা প্রসঙ্গে, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১৫২-১৫৩) * * * শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে কারো কাছে দীক্ষা গ্রহণ না করলেও বার বার তিনি বলেছেন, ‘আমার মা-ই যেন সরকার সাহেব, হুজুর মহারাজ ও অন্যান্য অন্যান্য মহাপুরুষদের প্রতীক—মা-ই আমার আদর্শ—মা-ই আমার জীবত্ব।’ তথাপি তিনি সরকার সাহেবকে নিজের গুরু হিসেবে এবং হুজুর মহারাজকে মাতৃদেবীর গুরু হিসেবে মান্য করতেন, তাঁদের প্রতিকৃতিতে প্রণাম নিবেদন করতেন।
।। সার্বজনীন সমবেত প্রার্থনা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।। শ্রীশ্রীঠাকুর। আর্য্যদের জীবনের তপস্যা একটা প্রধান অঙ্গ ছিল, এবং করলে এখনও আছে। তাই, প্রত্যেক individual সাংসারিক গোলমালকে এড়িয়ে যতক্ষণ তপস্যায় নিরত থাকতে পারতেন, ততক্ষণ থাকতেন। তাই, congregation-হিসাবে বিজ্ঞান, দর্শন এবং ধৰ্ম্ম পুস্তিকাদির আলোচনা-ছাড়া তেমনতর কোন প্রার্থনার ব্যবস্থা ছিল ব’লে শোনা যায় না। তবে অনেক আগে সামগানের কথা শোনা যায়, আরও এখনও কীর্ত্তনের ‘চল’ আছে! তবে আমার মনে হয়, আমাদের সন্ধ্যামন্ত্র (দ্রঃ ‘প্রার্থনা’ নামাঙ্কিত পুস্তক, সৎসঙ্গ পাবলিশিং হাউস, দেওঘর।) যা’ আছে গায়ত্রী, প্রাণায়াম বাদ দিয়ে—সেগুলি congregational (সমবেত) প্রার্থনা-হিসাবে চলতে পারে। ভাবের প্রতি নজর রেখে অর্থবোধ নিয়ে ঐগুলি পাঠ বা আবৃত্তিতে এবং একটা পাঠের পর চোখ বুজে একটু চিন্তায়, মন—এমন-কি শরীর পর্য্যন্ত কেমনতর হ’য়ে ওঠে, কিছুদিন একটু করলেই হাতে-হাতে বোধ করতে পারা যায়। ভাবের সহিত ঐ শব্দগুলি উচ্চারণে এতই তীব্রতা ও enlightenment এনে দেয় যা’তে নাকি পারিপার্শ্বিক-সহ সমস্ত জীবনটাই কেমনতর জীবনে মুহূর্তে যেন উদ্বুদ্ধ হ’য়ে ওঠে। গায়ত্রী ও প্রাণায়াম বাদ এই জন্য বললাম—ইহা জপ চিন্তার সহিত meditation-এর জন্য, তাই উহা নিরিবিলি হ’য়ে করতে পারলেই ভাল।
প্রশ্ন। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র—সকলেরই পালনীয় এমন কোন সার্ব্বজনীন প্রার্থনা বা সন্ধ্যা সবারই জন্যে চলতে পারে নাকি? সন্ধ্যা যা’ যা’ আছে তা’ তো শূদ্র পালন করতে পারে না, আর, ওর ভিতর জড়ের পূজো আছে—যেমন জল, সূর্য্য ইত্যাদি।
শ্রীশ্রীঠাকুর। Enlightened আর্য্যরা জড়ের পূজা নিয়ে কখনই বেকুবের মতন ব্যাপৃত ছিলেন না। সূর্য্য, বাতাস, জল ইত্যাদি সেই পরমপুরুষের দান—যা’ প্রতিনিয়তই আমাদের জীবন ও বৃদ্ধিকে invigorate ও accelerate করছে। তাদের উপলক্ষ্য ক’রে সেই almighty-তে কৃতজ্ঞতার সহিত আকৃষ্ট বা মুগ্ধ হতেন। আর, যে-প্রার্থনার কথা পূর্ব্বে বলেছি তা’ congregation-এর মধ্যে সবাই—ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, এমন-কি শূদ্রও—অবলীলাক্রমে করতে পারেন। (নানা প্রসঙ্গে, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১৫২-১৫৩)
অবতার বরিষ্ঠমাত্রেই পূর্বাপূর্ব অবতারদের পরিপূরণকারী হন। তাই তো তিনি ‘‘যেই রাম সেই কৃষ্ণ, এক দেহে রামকৃষ্ণ’’ রূপে এসে আমাদের ভুল ভাঙিয়ে দিলেন। গীর্জায় গিয়ে যীশুর, মসজিদে গিয়ে রসুলের আরাধনা করলেন। পঞ্চমুণ্ডির আসন সাজিয়ে কোনো তান্ত্রিক-গুরু বসালেন তো বসে পড়লেন। তিনি লোকশিক্ষার জন্য বহু ধর্মীয় মতবাদের গুরুদের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুন্ন রেখেই। তিনি দক্ষিণেশ্বরে পূজারী হয়ে এসেও প্রচলিত পূজা-পদ্ধতি অনুসরণ করেন নি। মৃন্ময়ী জগন্মাতাকে প্রাণবন্ত করে দেখালেন এবং কালী মায়ের আদেশক্রমে নিজে খেয়ে মাকে খাওয়ালেন। ফলহারিনী কালী পূজার শুভলগ্নে সারদাদেবীকে আরাধনা করে চিন্ময়ী মাতৃশক্তিকে আদ্যাশক্তি রূপে শ্রদ্ধা করতে শেখালেন।
“ভগবান রামকৃষ্ণদেবেরও শোনা গিয়েছে—তাঁর এমনতর সময় এসেছিল, যখন মূর্ত্তি-টুর্ত্তি তাঁর সাধনার পথে বাধাই সৃষ্টি করতো। তিনি এমন-কি তাঁর ঘরে যে-সমস্ত ছবি-টবি ছিল, সেগুলিকেও সরিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি না-কি এই বলেছিলেন—‘মেয়েরা ততদিন পুতুলখেলা করে, যতদিন তার বে’ না হয়, স্বামী-সহবাস না করে।”
“শ্রীরামকৃষ্ণদেব ছিলেন তখনকার সময়ের Living Ideal (জীবন্ত আদর্শ)। এই Ideal (আদর্শ-পুরুষ) যখনই যেখানে এসেছেন, তাঁদের মধ্যে সঙ্গতি আছেই। কারণ, সকলেই এক ঈশ্বরের অবতার। ঈশ্বর তো আর দু’জন নয়। আর, ঈশ্বর এক বলে ধর্ম্মও এক। তাই, শ্রীরামকৃষ্ণ কখনও কারো ধর্মমতের নিন্দা করেন নি।” (দীপরক্ষী ৪/৩০. ১১. ১৯৫৮)
শ্রীরামকৃষ্ণঠাকুর বলেছেন,—‘‘চারাগাছ বেড়া দিয়ে রাখতে হয়। চারাগাছ বলতে আমি বুঝি সদ্গুরু, সৎনাম ও সৎসঙ্গ। মানুষ যদি অল্প বয়স থেকে সদগুরু গ্রহণ করে সৎনামের অনুশীলন নিয়ে সৎসঙ্গে অর্থাৎ জীবনবৃদ্ধিদ ভাল পরিবেশের ভিতর বাস করে, তাহলেই তার জীবন অনায়াসে সুগঠিত হতে পারে। মানুষের জীবন যদি কোন সৎ-এ সুনিবদ্ধ না হয়, তাহলে সে যে নানা আবর্তে পড়ে হাবুডুবু খাবে, সে-বিষয়ে কি আর কোন সংশয় আছে ?’’ (আ. প্র. ৫/১০. ৫. ১৯৪৩)
শ্রীকৃষ্ণের জন্ম দ্বাপর ২৮শ কৃষ্ণাষ্টমী সিংহমাসে মধ্যরাতে জয়ন্তী শবরীতে বিজয় মুহূর্তে । পিতা বসুদেব মাতা দেবকী । নামকরণ এবং উপনয়ন গর্গাচার্য্যের তত্বাবধানে ।পরাবিদ্যার আচার্য্য ঘোর আঙ্গিরস । অপরাবিদ্যার আচার্য্য সান্দপণী কাশ্য । রুক্মিণী, জাম্ববতী, কালিন্দী, মিত্রবিন্দা, সত্যা, ভদ্রা ,লক্ষণা, এবং সত্যভামা নাম্নী অষ্টমহিষী । অসত্ নিরোধে তত্পর ধর্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা অবতার বরিষ্ঠ পুরুষোত্তমের গীতার আদর্শে আলোকিত হোক বিশ্ব । প্রার্থনা জানাই পরমপিতার রাতুল চরণে । * * * “ধর্ম্ম যেখানে বিপাকী বাহনে ব্যর্থ অর্থে ধায়, তখনি প্রেরিত আবির্ভূত হন পাপী পরিত্রাণ পায়।” শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের উপরোক্ত বাণীর সাথে শ্রীকৃষ্ণ প্রদত্ত “যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লাণির্ভবতি ভারতঃ। অভ্যুত্থানম্ অধর্মস্য তদাত্মনম্ সৃজাম্যহম্।। পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশয়চ দুষ্কৃতাম্ । ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ।।” প্রায় সমার্থক বাণীটির যুগোপযোগী সংস্করণ করেছেন বর্তমান পুরুষোত্তম । শ্রীকৃষ্ণ যুগ সংস্কারের প্রয়োজনে দুষ্কৃতি বা পাপীদের বিনাশের কথা বলেছেন আর ঠাকুর পাপীদের পরিত্রাণের কথা বলেছেন । এইটুকুই পার্থক্য । শ্রীকৃষ্ণ, বৃহত্তর রাষ্ট্রকে অধর্মের গ্যাংগ্রীন থেকে বাঁচাতে ধর্ম নামের মলম লাগিয়ে বিফল হবার পর সুকৌশলে কংস, জরাসন্ধ, শিশুপাল, শাল্ব কৌরবাদির ন্যায় আততায়ীরূপী গ্যাংগ্রীনদের অপারেশন করেছিলেন ।–হিংসাকে হিংসা দ্বারা প্রতিরোধ করে অহিংসার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন! কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বর্ণাশ্রমধর্মভিত্তিক পরমরাষ্ট্রিক সমবায় । শ্রীকৃষ্ণের পরবর্তী ঋত্বিক সংঘ সক্রিয় থাকার ফলে জনন বিপর্যয় হয় নি । ফলে তিন হাজার বছর পর্যন্ত বৃহত্তর আর্যাবর্তে আগ্রাসন করতে সাহস পায়নি দুষ্কৃতিরা ! যখন থেকে বর্ণাশ্রম-ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের শিক্ষা ভুলে প্রবৃত্তির অধীনস্থ ক্লীব হয়েছি, তখন থেকে আমরা আগ্রাসনের শিকার হয়েছি । আগ্রাসনের চরম বিপর্যয় ইংরেজ অপশাসন থেকে আর্যাবর্তকে মুক্ত করতেও সম্বল ছিল শ্রীকৃষ্ণের গীতার আদর্শ ! স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম শহীদ ক্ষুদিরাম ‘গীতা’-বর্ণিত ‘‘হতো বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং/জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম্’’-এর অমরত্বের মহান আদর্শে ফাঁসি বরণ করে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মৃত্যুঞ্জয়ী হতে শিখিয়েছিলেন। সেইসব বীরগাঁথা ভুলে আমরা তাঁর ঋণ শোধ করছি,‘ কৃষ্ণ করলেই লীলা, আমরা করলেই বীলা’ গানের ডালি সাজিয়ে! যদিও ওই গান রচনা করার সাহস আমরাই দিয়েছি,–যারা ধর্মের ধ্বজা ধরে প্রবৃত্তিকে পোষণ দিয়ে চলেছি।–পার্থসারথী শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমদ্ভাগবতগীতার আদর্শ ভুলে, হ্লাদিনি শক্তিরূপিনী রাধা-তত্ত্ব ভুলে, মনগড়া প্রবৃত্তি-প্ররোচিত মানবী রাধা, শ্রীকৃষ্ণের মামীর সাথে পরকীয়া কামুক-রূপে, গোপিনীদের বস্ত্রহরনকারী-রূপে শ্রীকৃষ্ণকে চিত্রিত করে! ‘রাই জাগো রাই জাগো বলে শুক-সারি বলে, কত নিদ্রা যাওগো রাধে শ্যাম-নাগরের কোলে। শ্যাম অঙ্গে অঙ্গ দিয়া আছোরে রাই ঘুমাইয়া তোমার কি লোকলজ্জা নাই….’ ইত্যাদি চটুল কথায় প্রভাতী সুর লাগিয়ে বৈষ্ণবীয় শ্রীকৃষ্ণ আরাধনা আর্য্যকৃষ্টি বিরোধী প্রবৃত্তি-প্ররোচিত পরদারাসক্ত ব্যতীত কোন্ আধ্যাত্মিক আবেদনে সমৃদ্ধ ? ওইসব জাগরণী গান শুনে, এবং কবি জয়দেব বিরচিত গীতগোবিন্দের ছত্রে ছত্রে বর্ণিত কামবিলাসী পরকীয়া শ্রীকৃষ্ণের কীর্তিকলাপ পড়ে, যদি কোন তথাকথিত নাস্তিক্যবাদী শ্রীকৃষ্ণের চরিত্র কালিমালিপ্ত করে,– সেই ধর্মবিরোধী, ইষ্টবিরোধী প্রচারের জন্য দায়ী কারা ? পণ্ডিতদের মতে কংসের দূত হয়ে মহামতি অক্রুর বলরামসহ শ্রীকৃষ্ণকে বৃন্দাবন থেকে মথুরায় নিয়ে যান কংস আয়োজিত ধনুর্যজ্ঞে অংশগ্রহণ করাতে। কংসের উদ্দেশ্য ছিল শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করার। পরিবর্তে শ্রীকৃষ্ণ অত্যাচারী কংস-মামাকে হত্যা করে পিতামহ উগ্রসেনকে রাজ্য প্রত্যর্পণ করেন। তারপর ঘোর আঙ্গিরসের সান্নিধ্যে পরাবিদ্যা এবং সান্দিপনী কাশ্যের সান্নিধ্যে অপরাবিদ্যা লাভ করেন। পণ্ডিতদের এই সাক্ষ্য থেকে প্রমাণিত শ্রীকৃষ্ণ ১১ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে কংসকে বধ করেন। অথচ বেশীরভাগ কৃষ্ণভক্তগণ বৃন্দাবন লীলার, রাসলীলার নামে কিশোর শ্রীকৃষ্ণকে মানবী রাধার সাথে যুগলবন্দী করে শ্রীকৃষ্ণকে পরকীয়া কামুক রূপে চিত্রিত করে চলেছেন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতে, রাসলীলা ভগবানের সাথে ভক্তের কেন্দ্রায়িত ছন্দায়িত নিত্যলীলার প্রদর্শণী। এই কেন্দ্রায়িত চলন একটা এ্যাটমের মধ্যেও আছে—রাসলীলা যেন এ্যাটমের মধ্যেকার নিত্য-গতিশীলতার ও সুকেন্দ্রিক অনুচলনের প্রতীক। রাস মানে ধ্বনি, ধ্বনিতে বিহার করেন যিনি, তিনি রাসবিহারী। শব্দযোগেই তাঁর অবস্থান। শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর লীলাসঙ্গী অশ্বিনীদাকে বলেছিলেন, ‘‘ভাগবতের একটা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা লিখতে পারেন ? লোকে প্রকৃত ভাবটা হারিয়ে ফেলে কেবল লীলা বা রূপকের দিকটা নিয়ে আছে । মুখে বলে নিত্য বৃন্দাবন, নিত্য লীলা, নিত্য রাস হচ্ছে, কিন্তু তার ভেদ জানে কয় জন? আর, যেটাকে সাধারণতঃ নিত্য বলে, সেটাকেও রূপকথার একটা ছাযার মত কল্পনা ক’রে রেখেছে। কথার ব্যুৎপত্তিগত অর্থের দিকে দৃষ্টি করলেও অনেকটা বোঝা যায়। যেমন রাস মানে ধ্বনি, রাস-বিহারী অর্থাৎ রাসে,ধ্বনিতে বিহার করেন যিনি। Creation (সৃষ্টি)-এর sound-theory (নাদ-সিদ্ধান্ত), শব্দ-ব্রহ্ম এসে পড়েছে নাকি? রাধ্-ধাতু অর্থে নিষ্পন্ন করা বুঝায়। রাধা অর্থাৎ যিনি সব নিষ্পন্ন করেন, সেই শক্তি। তিনি আবার ব্রজেশ্বরী, ব্রজ-ধাতু অর্থে গমন করা—গতিশীলা। ব্রজেশ্বরী রাধা অর্থে সর্ব্বশ্রেষ্ঠা গতিশীলা নিষ্পন্নকারিণী শক্তি, অর্থাৎ আদি শব্দ-ধারা sound-current. চৈতন্য ধারা বা spirit-current. শ্রীকৃষ্ণ নিত্যলীলা করছেন, গোপীরা সেই আকর্ষণরাজের রাসে—ধ্বনিতে আকৃষ্ট হ’য়ে তাঁর দিকে ছুটছে,—জীবজগৎ তাঁর দিকেই যাচ্ছে। একটু hint (আভাস) দেওয়া রইল; ভাগবতাদি দেখে চেষ্টা করলে মাথা খুলে যেতে পারে, আর বোধহয় লিখতেও পারেন।’’ (অমিয়বাণী ২৯শে অগ্রহায়ণ, রবিবার, ১৩২৪) শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র শ্রীকৃষ্ণ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘শ্রীকৃষ্ণ সব সময়েই চেষ্টা করেছেন যুদ্ধবিগ্রহ avoid (পরিহার) করতে, কিন্তু তাঁর environment (পরিবেশ) তাঁকে সে scope (সুযোগ) দিল না। আর শ্রীকৃষ্ণের যুদ্ধ---মৃত্যুকে মারবার জন্য। Gangrene-affected part of the body (শরীরের দুষ্টক্ষতযুক্ত স্থান) আমরা যেমন কেটে ফেলি জীবন বাঁচাবার জন্য, তিনিও তেমনি মৃত্যু ও মারণের মূর্ত্ত প্রতীকস্বরূপ যারা ছিল তাদের মেরেছিলেন সমগ্র সমাজকে বাঁচাবার জন্য। (আ. প্র. খণ্ড ১, ৪. ১২. ১৯৪১) ,,,,,,শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে বুঝিয়ে দিলেন যে devil (শয়তান) যদি রাজত্ব করে, তবে অর্জ্জুনের ঈপ্সিত ধর্ম্ম, জাতি, কুল, মান কিছুই রক্ষা পাবে না। তাই devil (শয়তান)-কে demolish (ধ্বংস) করা লোকমঙ্গলের জন্যই অপরিহার্য্য। এর মধ্যে দ্বেষ-হিংসার বালাই নেই। বরং অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধকে এড়িয়ে চলার বুদ্ধির পিছনে আছে দুর্ব্বলতা।’’ (আ. প্র. খণ্ড ৬, ৬. ১২. ১৯৪৫)
এ-যুগের শ্রীকৃষ্ণ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বিকৃতচারী-পাপীদের পরিত্রাণ উদ্দেশ্যে বললেন– “ভগবান, ইষ্ট বা ধর্ম্মের মৌখিক স্তুতির ভিতর-দিয়ে যা’রা ধর্ম্মবিরোধী কাজ করে, তা’রা হ’ল সব চাইতে বড় শয়তানের দূত–প্রকৃষ্ট লোক-দূষক । ১২৫ । (শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭) পরিশেষে, সকলের কাছে নিবেদন, বর্তমানের এই দুঃসময়ে যে গুরুদেবের সাধনা করুন, সেই সাধনার মাধ্যমে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা গ্রন্থের অবতার তত্ত্বের বাণী অনুধাবন করে সন্ধান করতে হবে শ্রীকৃষ্ণের নব-কলেবরকে, এবং তাঁর নিদেশবাণী মেনে চলতে পারলে প্রকৃত ধর্ম পথে চলা যাবে, পৌঁছনো যাবে ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যে। জয়গুরু! প্রণাম। সবাইকে।