।। “আর্য্য মহাসভা” — পরমরাষ্ট্রিক সমবায় সমিতি গঠনের পরিকল্পনা ।।
নিবেদনে—তপন দাস
******************************
[শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর ভাগবত আন্দোলনের সদস্যদের উদ্দেশ্যে এক যুগান্তকারী বাণীতে বললেন, ‘‘ঘটে ঘটে ইষ্টস্ফূরণ যখনই তোর হবে,/ব্রহ্ম-বোধের প্রথম ধাপটি ঠিক পাবি তুই তবে।’’ অর্থাৎ, পঞ্চ-মহাভূত বেষ্টিত বৃহত্তর পরিবেশের জৈবাজৈব যা’-কিছু আছে সব-কিছুর মধ্যে ইষ্ট স্ফূরণের বা মঙ্গল প্রতিষ্ঠার ভাবে ভাবিত হয়ে চলতে পারলে তবেই তুমি ব্রহ্মবোধ বা ধর্মবোধের সোপানপথের প্রথম ধাপের সন্ধান পাবে। তারপর সোপানপথ বেয়ে ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের আবশ্যিক পালনীয় প্রাথমিক বিষয়সমূহ— অভক্ষ্যভোজী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুনাদি তামসিক আহার করা যাবে না। যারা করেন, আর্য্য হিন্দুমতে তাদের অভক্ষ্যভোজী বলা হয়েছে। অগম্যাগামী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ যারা প্রতিলোম, সগোত্র এবং সপিণ্ড সম্বন্ধীয়দের সাথে অবিধি পূর্বক ধর্মবিরুদ্ধ বিবাহের মাধ্যমে কামাচার করে, হিন্দুমতে তাদের অগম্যাগামী বলা হয়েছে। এরা কদাচারী, এদের প্রদত্ত আহার ও পানীয় অশুদ্ধ। (দ্রঃ সম্বিতী)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের শিষ্য হতে হলে ঊষানিশায় মন্ত্রসাধন করতে হবে, চলাফেরায় নাম জপ করতে হবে। আহ্বানীসহ সন্ধ্যা ও প্রার্থনা, ইষ্টভৃতি (ইষ্টনীতির ভরণ), কমপক্ষে ৩ বার শবাসন প্রভৃতির নিত্য-সাধন করতে হবে। বর্ণধর্মানুযায়ী সদাচারী হতে হবে। বর্ণাশ্রম মেনে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে, বৃত্তিহরণ করা চলবে না। ‘পঞ্চবর্হিঃ’ এবং ‘সপ্তার্চ্চিঃ’-র বিধান মেনে চলতে হবে, সকলকেই। ওই নিয়মাবলী, ওই বিধিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমের নাম দীক্ষা গ্রহণ করা।
যাঁরা এস. পি. আর., পি. আর. উপাধির বলে দীক্ষা সঞ্চারণা করেন, তাঁরা যজমানদের দিয়ে ‘‘এই দীক্ষা গ্রহণ করিয়া আমি সর্বান্তকরণে শপথ করিতেছি যে—মানুষের জীবন ও বৃদ্ধির পরম উদ্ধাতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রকে প্রতিষ্ঠা করাই এইক্ষণ হইতেই আমার জীবনের যজ্ঞ হউক। ……’’ ইত্যাদি উচ্চারণ করিয়ে সংকল্প-শপথ গ্রহণ করান। এবং দীক্ষাপত্রের ২টি স্তবকে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। এর উদ্দেশ্য যজমান যা’তে ঠাকুরের আদর্শ মেনে চলে তারজন্য একেবারে পাকাপোক্ত ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থাপত্র স্বয়ং শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত। দীক্ষাদাতার কর্তব্য, দীক্ষা গ্রহিতাকে শ্রীশ্রীঠাকুরের উপরোক্ত আদর্শের বিষয়ে সম্যকভাবে অবগত করিয়ে দীক্ষা দান করা। তা’ না করিয়ে দীক্ষাদাতা যদি তড়িঘড়ি করে যেনতেন প্রকারেণ মন্ত্র দিয়ে সই-সাবুদ করিয়ে নেয়, তাহলেই মুশকিল। কপটাচার এবং দ্বন্দ্বীবৃত্তি দোষে দুষ্ট হতে হবে। শ্রীশ্রীঠাকুর কপট ব্যক্তিদের ধর্ম্মরাজ্যে প্রবেশের অধিকার দেন নি (সত্যানুসরণ)। আর দ্বন্দ্বীবৃত্তির জন্য কোন প্রায়শ্চিত্ত নেই (আঃ প্রঃ ২য় খণ্ড, ৬ই পৌষ, রবিবার, ১৩৪৮/ইং ২১-১২-৪১)। অথচ দীক্ষা সঞ্চারণার ক্ষেত্রে সেই প্রবহমানতা চলছে। যারফলে বেশিরভাগ দীক্ষিতগণ মনে করেন, সকালবেলা উঠে ঠাকুরের নামে পয়সা রাখা, শুক্রবার নিরামিষ খেলেই শ্রীশ্রীঠাকুরের শিষ্য হওয়া যায়। অথচ, সত্যানুসরণ গ্রন্থের প্রথমেই তিনি এ বিষয়ে সাবধান বাণী দিয়ে রেখেছেন। “অর্থ, মান, যশ ইত্যাদি পাওয়ার আশায় আমাকে ঠাকুর সাজিয়ে ভক্ত হ’য়ো না, সাবধান হও—ঠকবে ; তোমার ঠাকুরত্ব না জাগলে কেহ তোমার কেন্দ্রও নয়, ঠাকুরও নয়—ফাঁকি দিলেই পেতে হবে তা’।” অর্থাৎ, আমার মধ্যে যদি তাঁর আদর্শের প্রকাশ না হয়। প্রবৃত্তির চাহিদা অনুযায়ী অর্থ, মান, যশ ইত্যাদি চাহিদার পূর্তি করতে গিয়ে তাঁর প্রদত্ত বিধি অমান্য করে চলি। ইষ্টনীতির ব্যতিক্রমী চলনে চলে ঠাকুরত্বকে জাগাতে ব্যর্থ হই, তাহলে তিনি আমার কেন্দ্রও নন, ঠাকুরও নন, আমার ভালো-মন্দের দায়িত্ব তাঁর নেই। একেবারে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছেন।
সেই হিসেবে বিচার করে দেখলে দেখা যাবে, তাঁর আদর্শ মেনে চলেন যাঁরা, যজনসিদ্ধ যাঁরা, একমাত্র তাঁদেরই অধিকার রয়েছে, যাজন করার, প্রচার করার। অথচ, আমরা এসব মূল বিষয়টিকে উপেক্ষা করে, অনেক কিছুতে, যথা, সদাচার, বর্ণাশ্রম, ঠাকুরের বলা পরিচ্ছদ, ইত্যাদিতে ছাড় দিয়ে, নিয়মের শিথিল করে অধিবেশন করে চলেছি। সেই বিষয়ে সকলকে সচেতন হবে, নচেৎ কপটাচার ও দ্বন্দীবৃত্তি দোষে দুষ্ট হতে হবে।]
* * *
বলতে দ্বিধা নেই, আমি ব্যক্তিটি দ্বন্দ্বীবৃত্তি-দোষে দুষ্ট। আমার কথায়-কাজে মিল নেই। আমি ব্যক্তিটি নিয়মিত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র রচিত প্রার্থনা করতে অভ্যস্ত হলেও প্রার্থনার মাধ্যমে উচ্চারিত মন্ত্রগুলোর প্রকৃষ্টরূপে অর্থ মনন করে সেই অনুযায়ী বাস্তব-চলনায় চলতে আমি চেষ্টা করিনি। যেমন, প্রার্থনা মন্ত্রের ‘পুরুষোত্তম বন্দনা’ স্তবকে “……..ব্যক্তি-দম্পতি-গৃহ-সমাজ-রাষ্ট্রোদ্ধারণে যজন-যাজনেষ্টভৃতি-স্বস্ত্যয়নী-প্রবর্ত্তকম্ প্রাচ্য-প্রতীচ্য-নিয়ন্ত্রণে বর্ণাশ্রমানুশাসকম্ আর্য্য-চিরায়ণম্!
আৰ্য্যকৃষ্টিতূর্য্যধ্বনিত-পল্লীনিকেতনম্ আর্য্যভূমিধূলিপাবনচিদানন্দকম্ সকলশিল্পবিজ্ঞানযুতং পূর্ণং পুরাণং পরাৎপরকম্! ……… ” দীর্ঘদিন ধরে উচ্চারণ করা সত্বেও ওই মন্ত্রের মর্মস্থলে প্রবেশ করার চেষ্টা করিনি। যেমন চেষ্টা করিনি সৎসঙ্গ অধিবেশন অন্তে উচ্চারিত—
“আর্য্যস্থান পিতৃস্থান
উচ্চ সবার পূর্য্যমান।
অমর রহুক আর্য্যবাদ
জাগুক উঠুক আর্য্যজাত।
ফুলিয়ে তোল দুলিয়ে তোল
তাথৈ তালে আর্য্যরোল।
আর্য্যকৃষ্টির যা ব্যাঘাত
খড়্গে তোরা কর নিপাত।”—ইত্যাদি
আহ্বান ধ্বনিগুলোর ভাবার্থ বা মর্মার্থের বাস্তবায়ন নিয়ে—এ আমার অযোগ্যতা! আমি যুগধর্মের হাতছানির কবলে পড়ে আর্য্যকৃষ্টি সম্পর্কে কোন পরিচ্ছন্ন ধারণাও এতদিন ধরে অর্জন করতে পারিনি।
কোন্ ভাগ্যবলে একদিন শ্রীশ্রীঠাকুরের ‘সম্বিতী’ গ্রন্থের একটি বাণী—
“বর্ণাশ্রম ভারতীয় বৈশিষ্ট্যানুপাতিক
আর্য্যকৃষ্টি-পরিরক্ষণের এক প্রকৃষ্ট দুর্গ,
ভারতীয় আর্য্যেরা যে এখনও আছেন–
তা’র ঐতিহ্য ও কৃষ্টির কঙ্কালকে
গোঁড়া-আগলানিতে আগলে ধ’রে
তা’র কারণ ঐ বর্ণাশ্রম,
যতটুকু ভেঙ্গেছ ওকে
ভাঙ্গাও পড়েছ তেমনি ;
যদি পার পরিমার্জিত কর,
উজ্জীবিত ক’রে তোল,
বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে,
বাঁচবে এখনও, আর দুনিয়াকে বাঁচাবে;
আর যদি ভাঙ্গ, হারাবে,–
সাবাড় হবে নিজেরাও।” ৪৫৫।
বাণীটি আমাকে একটা ধাক্কা দিয়ে আর্য্যকৃষ্টি সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখায়। ভাবতে ভাবতে সমাধানী সূত্র খুঁজে পেয়ে যাই আলোচনা প্রসঙ্গে গ্রন্থের ৮ম খণ্ডে।
শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন— আদর্শ নিষ্ঠার ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে ব্যক্তি-বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য নিয়ে সহজাত সংস্কার-অনুযায়ী জীবিকা অর্জ্জন ক‘রে, সুবিবাহ ও সুজননে ক্রমোন্নত হ’য়ে সেবায় সমাজকে সমুন্নত ক’রে, সব্যষ্টি সমষ্টির সুকেন্দ্রিক ক্রমবিবর্ত্তনই আর্য্যকৃষ্টির মূল কথা।
(আঃ প্রঃ ৮/১৮৪)
ভাবতে ভাবতে ভাবনার বিস্তারে বোধে ধরা দিল, ‘আর্য্য’ শব্দটি গুণবাচক। যাঁরা বর্ণাশ্রম, চতুরাশ্রম পরিপূরণী দশবিধ সংস্কারে সংস্কৃত হতেন তাঁদেরই আর্য্য অভিধায় ভূষিত করা হতো । তাঁরাই ক্রমে আর্য্য জাতিভুক্ত হয়েছিলেন। বর্তমান যুগধর্মে সম্মানিত ব্যক্তিদের যেমন সম্বোধনে ‘স্যর’, ‘ম্যাডাম’ শব্দ ব্যবহার করা হয়, সেসময় সদাচারী বর্ণাশ্রমানুগজীবন যাপন কারীদের উদ্দেশ্যে ‘আর্য্য’, ‘আর্য্যপুত্র’, ‘আর্য্যা’ ইত্যাদি ব্যবহৃত হতো। শ্রীশ্রীঠাকুর সেই হৃত গৌরব পরিশীলিত রূপে প্রতিষ্ঠা করতে ‘পঞ্চবর্হি’ এবং ‘সপ্তার্চ্চি’র প্রবর্তন করলেন দৈনন্দিন প্রার্থনামন্ত্রে। আমাদের ব্রাত্যদোষ মুক্ত করে প্রকৃত আর্য্যরূপে প্রতিষ্ঠিত করতে। ‘আর্য্যকৃষ্টি’ নামক গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। তাই, প্রকৃত আর্য্য হতে হলে যুগ পুরুষোত্তমের সাথে সংযুক্ত হয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে তদগতিসম্পন্ন জীবনচলনায় অভ্যস্ত হতে হবেই। এছাড়া কোন পথ নেই।
* * *
অবতার বরিষ্ঠমাত্রেই পূর্বাপূর্ব অবতারদের পরিপূরণকারী হন, পূর্ববর্তীদের আচার্য্যজ্ঞানে মান্য করেন এবং করান। দৈনন্দিন প্রার্থনার পুরুষোত্তম বন্দনা স্তবকে ‘‘……মৎস্য-কূৰ্ম্ম-কোল-নৃসিংহ-বামন শরীরম্ রাম-কৃষ্ণ-বুদ্ধ-যীশু-মোহম্মদ রূপায়িতম্ চৈতন্য-রামকৃষ্ণানুকূলং পূর্ব্বর্তনীপূরণম্ শাশ্বতং বৰ্ত্তমানম্।…….’’ উচ্চারণ করিয়ে আমাদের পূর্ববর্তী আচার্য্যদের প্রণাম করতে শেখালেন। এই হচ্ছে আচার্য্য-পরম্পরাকে স্মরণ-মনন করার প্রকৃত শিক্ষা।
শ্রীশ্রীঠাকুরের পূর্ববর্তী আচার্য্য ‘‘যেই রাম সেই কৃষ্ণ, এক দেহে রামকৃষ্ণ’’ রূপে এসে বিভিন্ন ধর্মমতের মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য স্থাপনের জন্য গীর্জায় গিয়ে যীশুর, মসজিদে গিয়ে রসুলের আরাধনা করেছিলেন। তিনি লোকশিক্ষার জন্য বহু ধর্মীয় মতবাদের গুরুদের কাছে দীক্ষাও নিয়েছিলেন গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুন্ন রেখেই। তথাপিও সাধারণ মানুষেরা মনের মণিকোঠায় জমে থাকা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ একেবারে মুছে ফেলতে পারে নি। এবার অনুকূলচন্দ্র রূপে এসে ‘‘ঈশ্বর এক, ধর্ম এক, প্রেরিতগণ সেই এক-এরই বার্তাবাহী’’ বাণীর মর্মার্থ বোঝাতে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে ভেদাভেদ ঘোচাতে, এক অভিনব ব্যবস্থা করেছিলেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপনের জন্য কুষ্টিয়ার ভক্তদের শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীবুদ্ধ, প্রভু যীশু, হজরত রসুল, শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ প্রমুখ পূর্ববর্তী অবতার-বরিষ্ঠদের জন্মোৎসব পালন করতে উৎসাহিত করেছিলেন। ঠাকুরের নির্দেশ মেনে কুষ্টিয়ার ভক্তরা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের থেকে শুরু করে সাধারণ অনুরাগীদের শ্রদ্ধার সাথে আমন্ত্রণ জানিয়ে আলাপ-আলোচনা-কথকতা ও অন্নব্যঞ্জনাদির সেবার ব্যবস্থা করতেন। ওইভাবে পূর্বাপূর্ব অবতার বরিষ্ঠদের জন্মোৎসব পালন করার ফলে সারা কুষ্টিয়ায় এক অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে গিয়েছিল। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে শ্রদ্ধা-প্রীতির বন্ধন গড়ে উঠেছিল।
পুরুষোত্তমগণের প্রধান বৈশিষ্ট্য, তাঁরা সম্বেগসিদ্ধ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হন। আত্মপ্রচার না করে সমাগতদিগের বৈশিষ্ট্যের পালন ও পোষণ করেন। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের কাছে শ্রীরামচন্দ্রের ভক্ত গেলে তিনি আলাপ-আলোচনায় শ্রীরামচন্দ্রের, শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত গেলে শ্রীকৃষ্ণের, বুদ্ধদেবের ভক্ত গেলে বুদ্ধদেবের, প্রভু যীশুর ভক্ত গেলে প্রভু যীশুর, রসুল ভক্ত গেলে হজরত মহম্মদের, চৈতন্যদেবের ভক্ত গেলে চৈতন্যদেবের, শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্ত গেলে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের গুণগান করে তাঁদের ইষ্টানুরাগ বাড়িয়ে দিতেন। তাঁরা তাঁদের ঈপ্সিত ইষ্টকে খুঁজে পেতেন পূর্বতন পূরয়মান বর্তমান পুরুষোত্তমের মধ্যে। অনুরূপভাবে প্রভু যীশুখ্রীষ্টের ভক্ত রে. আর্চার হাউজারম্যান, ই. জে. স্পেনসার প্রমুখ যীশুখ্রীস্টের ভক্তগণ, খলিলুর রহমান প্রমুখ হজরত রসুলের ভক্তগণ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মধ্যে তাঁদের আরাধ্য নবী, প্রফেট, পরমপিতা পুরুষোত্তমকে খুঁজে পেয়ে সারাটা জীবন তাঁর সান্নিধ্যে কাটিয়ে সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত সমন্বয়ী ধর্মাদর্শ প্রচার করে গেছেন।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, ‘‘একজন সত্যকার হিন্দু, একজন সত্যকার মুসলমান, একজন সত্যিকার খ্রীষ্টান—পরমপিতার চোখে এরা সবাই সমান। …… প্রকৃত ধার্ম্মিক যারা তারাই সমাজের গৌরব।
একজন খ্রীষ্টানের প্রথম যীশুখ্রীষ্টকে ভালবাসা উচিত এবং তাঁর মাধ্যমে সব প্রেরিতপুরুষকে ভালবাসা উচিত। একজন হিন্দুর শ্রীকৃষ্ণকে বা যে-প্রেরিতপুরুষকে সে অনুসরণ করে তাঁকে ভালবাসা উচিত এবং তাঁর মাধ্যমে অন্য সব প্রেরিত পুরুষকে ভালবাসা উচিত। কোন প্রেরিত পুরুষকে ভালবাসা মানে তিনি যেমন ছিলেন, সেইভাবে তাঁকে বোঝা। আমাদের সুবিধা অনুযায়ী তাঁর মতের বিকৃত ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। যদি কেউ বলে—যীশুকে নয়, আামি মা মেরীকে ভালবাসি, তাহলে সে মা মেরীকে ভালবাসে কি না, তা সন্দেহযোগ্য। (সূত্রঃ আ. প্র. ১১ খণ্ড, ইং তাং ৭. ২. ১৯৪৮)
* * *
জীবনবাদের বাদী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর প্রতিষ্ঠিত সৎসঙ্গের আদর্শ এবং উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে বলেছেন—
‘‘সৎসঙ্গ চায় মানুষ,
ঈশ্বরই বল
খোদাই বল
ভগবান্ বা God–ই বল
অস্তিত্বই বল—
ভূত ও মহেশ্বর যিনি এক—তাঁরই নামে
সে বোঝে না হিন্দু
সে বোঝে না খ্রীষ্টান
সে বোঝে না মুসলমান
সে বোঝে না বৌদ্ধ
সে বোঝে প্রতি প্রত্যেকে তাঁরই সন্তান,
সে আনত করে তুলতে চায়
সকলকে সেই একে,
সে পাকিস্তানও বোঝে না
হিন্দুস্তানও বোঝে না
রাশিয়াও বোঝে না
চায়নাও বোঝে না
ইউরোপ, আমেরিকাও বোঝে না–
সে চায় মানুষ,
সে চায় প্রত্যেকটি লোক
সে হিন্দুই হোক
মুসলমানই হোক
খ্রীষ্টানই হোক
বৌদ্ধই হোক
বা যেই যা হোক না কেন
যেন সমবেত হয় তাঁরই নামে
পঞ্চবর্হির উদাত্ত আহবানে—
অনুসরণে—পরিপালনে
পরিপূরণে উৎসৃজী উপায়নে
পারস্পরিক সহৃদয়ী সহযোগিতায়
শ্রমকুশল উদ্বর্দ্ধনী চলনে
যাতে খেটেখুটে প্রত্যেকে
দুটো খেয়ে-পরে বাঁচতে পারে
সত্তা স্বাতন্ত্র্যকে বজায় রেখে
সম্বর্দ্ধনার পথে চলে,
প্রত্যেকটি মানুষ যেন বুঝতে পারে
প্রত্যেকেই তার,
কেউ যেন না বুঝতে পারে
সে অসহায়, অর্থহীন, নিরাশ্রয়,
প্রত্যেকটি লোক যেন বুক ফুলিয়ে
বলতে পারে
আমি সবারই—
আমার সবাই—
সক্রিয় সাহচর্য্যী অনুরাগোন্মাদনায় ,
সে চায় একটা পরম রাষ্ট্রীক সমবায়
যাতে কারও সৎ-সম্বর্দ্ধনায়
এতটুকু ত্রুটি না থাকে
অবাধ হয়ে চলতে পারে প্রতিপ্রত্যেকে
এই দুনিয়ার বুকে
এক সহযোগিতায়
আত্মোন্নয়নী শ্রমকুশল
সেবা সম্বর্দ্ধনা নিয়ে
পারস্পরিক পরিপূরণী সংহতি উৎসারণায়
উৎকর্ষী অনুপ্রেরণায় সন্দীপ্ত হয়ে
সেই আদর্শ পুরুষে
সার্থক হতে সেই এক—অদ্বিতীয়ে।’’ (ধৃতি–বিধায়না, ১ম খণ্ড)
বৈচিত্রের মাঝে ঐক্য প্রতিষ্ঠার সর্বজনীনতায় সমৃদ্ধ ওই আবেদন অগ্রাহ্য করে তৎকালিন প্রবৃত্তি-পীড়িত কতিপয় উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে দেশভাগ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে চাইলে মানবসভ্যতার এক পরম বিস্ময় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র জ্ঞান গরিমায় গরবিনী আর্য্য ভারতবর্ষের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য উদ্যোগী হয়েছিলেন। মুসলিম লীগ ও হিন্দু মহাসভার নেতাদের সাথে কথা বলেছেন সাম্প্রদায়িকতার ব্যাধি নিরসনের জন্য। হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে পরামর্শ দিয়েছিলেন ‘হিন্দু মহাসভা’র নাম বদলে ‘আর্য্য মহাসভা’ রাখতে। মুসলমানরাও আর্য্য। তাদেরও আর্য্য মহাসভার সদস্য করতে হবে। ইসলাম মতবাদের প্রকৃত তথ্য জানার জন্য আরবী শিখে কোরান পাঠ করতে হবে। (শ্রীশ্রীঠাকুর সে ব্যবস্থাও করেছিলেন পাবনা আশ্রমে। যার ফলশ্রুতিতে আমরা উপহার পেয়েছি ‘ইসলাম প্রসঙ্গে’ নামক এক প্রামাণ্য গ্রন্থ।) মুসলীম লীগ যদি ইসলাম বিরোধী কিছু করে ‘প্রীভি কাউন্সিলে’ (ব্রিটিশ ভারতের সর্বোচ্চ আদালত।) শত শত কেস করতে হবে মহানবীর আদর্শের বিকৃতি প্রতিরোধ করতে। আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ করার জন্য হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে মুসলমানদের, মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে হিন্দুদের স্থানান্তর করে সাম্প্রদায়িক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। এই যদি করে ফেলতে পারেন দেখবেন দেশ ভাগ হবে না। এজন্য টাকার অভাব হবে না। বড় বড় জমিদারদের বোঝান। তাদের সাহায্যে এ কাজ আপনি করতে পারবেন । অত বড় বাবার ছেলে আপনি। আমি আমার সব কিছু দিয়ে আপনাকে সহায়তা করব। আমাদের চেষ্টার ত্রুটিতে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে যদি দেশ ভাগ হয়, তা’তে হিন্দু মুসলমান উভয়ের ক্ষতির সম্ভাবনা। শ্রীশ্রীঠাকুর হিন্দু-মুসলমানের ভারসাম্য ঠিক রাখার জন্য দেশ নেতাদের এবং বড় বড় জমিদারদের সাথে আলাপ-আলোচনা যেমন করেছেন, তেমনি নিজ-উদ্যোগে বাংলা থেকে পারশবদের এবং বিহার থেকে হৈ-হৈ ক্ষত্রিয়দের পাবনাতে এনে বসতি স্থাপন এবং কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করেছিলেন, জীবন-পিয়াসী মানুষদের সব রকমের স্বস্তি দেবার জন্য ‘স্বস্তিসেবক বাহিনী’ তৈরি করিয়েছিলেন। প্রবর্তন করেছিলেন স্বস্ত্যয়ণী ব্রতের ও ইষ্টভৃতি মহাযজ্ঞের।—তথাপিও দেশভাগ আটকানো যায়নি!
।। হিমাইতপুর থেকে দেওঘরে আগমনের প্রেক্ষাপট ।।
পরিবেশের সকল সম্প্রদায়ের মানুষদের নিয়ে পরমরাষ্ট্রিক সমবায় গঠনের লক্ষ্যে, অখ্যাত পল্লী হিমাইতপুরে বায়ু থেকে বিদ্যুত উৎপাদন করে পরম বিস্ময় সৃষ্টি
করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। গড়ে তুলেছিলেন—তপোবন ও মাতৃ বিদ্যালয়—যা
শিক্ষাক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। গড়ে তুলেছিলেন
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত ‘মনোমোহিনী ইনষ্টিউট অফ সায়েন্স এণ্ড
টেকনোলজি’ নামের বিজ্ঞান কলেজ। কেমিক্যাল ওয়ার্কসের জীবনদায়ী ঔষধসমূহ
দেশে এবং বিদেশে সমাদৃত হয়েছিল। বৈদ্যুতিক এবং যন্ত্রশিল্পের আধুনিক সব
ধরণের কাজ হতো ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল ওয়ার্কসপে। যথা,–ঢালাই,
ঝালাই, লেদের কাজ, ডাইস, ইলেক্ট্রোপ্লেটিং, ইলেক্ট্রিক্যাল ফিটিং,
আরমেচার, ব্যাটারি প্লেট তৈরি ও মেরামত, ডায়নামো মেরামত ইত্যাদি।
ছিল—ময়দার কল, আটার কল, চালের কল, তেলের কল, চিনির কল, মেডিকেটেড ওয়াটার
মেশিন, স্পাইস পাউডারিং, সুতার গুটি তৈরি, টেলারিং, বোতাম তৈরি, গ্লাস
ব্লোয়িং, পটারী ওয়ার্কস্, বেকারী, লজেন্স তৈরি, গ্রোসারী প্রোডাক্ট
ইত্যাদির শিল্প। ছিল—কার্ডবোর্ড কারখানা, স্টীমলণ্ড্রী, কটন
ইণ্ডাস্ট্রিজ, হোশিয়ারী শিল্প, ব্যাঙ্ক, ইঞ্জিনীয়ারিং ওয়ার্কস্,
বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র, স্বাস্থ্য বিভাগ, গৃহনির্মাণ বিভাগ, কলাকেন্দ্র,
প্রেস (যেখানে বাংলা, হিন্দী, সংস্কৃত, উর্দু, আরবী, ফারসী হরফের কাজ
হতো, দেশ ভাগের পর পাকিস্তান সরকার জবরদখল করে ঢাকাতে নিয়ে যায়।),
পাব্লিশিং হাউস, ফিলানথ্রপি, মাতৃসঙ্ঘ ইত্যাদি।
পরিবেশের জন্য এতকিছু করা সত্বেও আশ্রমের ভেতরে-বাইরে উপকৃত মানুষেরাই
ঠাকুরের সাথে শত্রুতা করেই চলেছিল, এমনকি ঠাকুরকে অপহরণ করতে চেয়েছিল,
বিষ প্রয়োগ করে মারতেও চেয়েছিল। খুন হয় আশ্রমের কর্মী, তপোবনের ছাত্র।
পিতৃ-বিয়োগ, দেশবন্ধু-বিয়োগ, মাতৃ-বিয়োগ, আবাল্যের সাথী নফর ঘোষ, অনন্ত
মহারাজ, কিশোরীমোহন-দের বিয়োগ-ব্যথায় ব্যথাহারী হলেন ব্যথিত।
১৩৫৩ সালের প্রথম দিকে মুসলিম লীগের ‘ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে’ ঘোষিত হবার সাথে সাথে কলকাতায় যে পৈশাচিক হত্যালীলা হয়েছিল (গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস্) সে সংবাদ শুনে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন ঠাকুর। দেশ-নেতাদের আগাম সতর্ক করা সত্ত্বেও, প্রতিরোধী-ব্যবস্থাপত্র
দেওয়া সত্ত্বেও তাঁরা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি। বিপন্ন দেশবাসীদের
রক্ষা করতে না পারার বেদনায় বিপর্যস্ত তিনি। বেড়ে গেল রক্তচাপ, হয়ে
পড়লেন অসুস্থ। খবর শুনে পাবনার বিশিষ্ট মুসলমান নেতৃবৃন্দ ঠাকুরকে দেখতে
আসেন, পাবনায় সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াতে দেবেন না বলে আশ্বস্ত করেন।
একটু সুস্থ বোধ করেন, আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঠাকুরের প্রিয়, কলকাতার
বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ গুপ্ত প্রয়োজনীয় ঔষধ এবং সম্পূর্ণ বিশ্রামের
ব্যবস্থাপত্র দিয়ে যান। বাঁধের ধারে নিভৃত নিবাসের মনোরম পরিবেশে ঠাকুরের
বিশ্রামের ব্যবস্থা করেন ঋত্বিগাচার্য্য। চাপমুক্ত রাখতে দর্শনার্থীদের
প্রবেশ নিষেধ করে দেন। কিন্তু ঠাকুর রাজী হন না। মনের কথা, প্রাণের ব্যথা
নিয়ে যারা যারা আসবে, তাদের তিনি কিছুতেই ফেরাতে নারাজ। আগন্তুকদের
দুঃখ-বেদনার কথা শুনতে শুনতে আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন। সংবাদ পেয়ে ডাঃ গুপ্ত
আসেন, ঠাকুরকে দূরে কোথাও বায়ু পরিবর্তনের জন্য নিয়ে যাবার পরামর্শ দেন।
অবশেষে আশ্রম কর্তৃপক্ষ ঠাকুরকে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
ঠাকুর বিহার প্রদেশের দেওঘরে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
“৩০শে আগষ্ট (১৯৪৬) শ্রীশ্রীঠাকুর পাবনা শহরের হিন্দু-মুসলমান নেতৃবর্গকে
ডেকে অনুমতি চান দেওঘর যাওয়ার. তখন সবার কাছ থেকে, বিশেষতঃ মুসলিম নেতা
হাকিম সাহেবের কাছে অনুমতি নেন ও কথা কাড়িয়ে নেন যাতে তিনি আশ্রমের
সামগ্রিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রসঙ্গতঃ ঠাকুর বলেন—হাকিম সাহেব! এখন
আমার বাইরে যাবার সময় নয়। আমার মার নামে– ‘মনমোহিনী ইনস্টিটিউট্ অফ্
সায়েন্স য়্যাণ্ড টেকনোলজি’ কলকাতা ইউনিভার্সিটির অধীনে নূতন কলেজ হয়েছে
আমার। কলেজ এবং ইউনিভার্সিটির পরিকল্পনা আমার আজন্মের। সেই সুযোগ হাতে
এসে গেছে আমার। কেষ্টদা (ভট্টাচার্য্য) হচ্ছেন কলেজের প্রিন্সিপাল।
কেষ্টদা সঙ্গে না থাকলে তো আমি কানা, তাই কেষ্টদাকে সঙ্গে নিয়ে যাব। আমার
এই বাচ্চা প্রিন্সিপাল থাকবে প্রফুল্ল দাস। বাচ্চা দেখালে কি হয়, এলেম
আছে। আপনি ওকে দেখবেন যাতে আমার মার নামের বিজ্ঞান কলেজ ভাল করে চলে।
হাকিম সাহেব বললেন—আপনি নিশ্চিন্ত মনে যান। কখনও কোনও অসুবিধা হলে
বঙ্কিমবাবু (রায়) ও প্রফুল্লবাবু যেন আমাদের জানান। ফোনে একটা খবর পেলেও
যা করার করতে পারি। খোদাতালার দয়ায় আপনি সুস্থ হয়ে সদলবলে তাড়াতাড়ি
ফিরে আসুন। আপনি ফিরে আসা না পর্য্যন্ত আমরা শান্তি পাব না।
পরিবেশটা তখন আবেগে ও মমতায় থরথর করে কাঁপছে। শ্রীশ্রীঠাকুরের চক্ষু
অশ্রুভারাক্রান্ত। বেদনাহত দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন সবার পানে। পূজনীয় খেপুদার
বাইরের ঘরে বসে এই ঐতিহাসিক শেষ বৈঠক।“ (তথ্যসূত্রঃ কুমারকৃষ্ণ
ভট্টাচার্য্য প্রণীত মহামানবের সাগরতীরে/১ম/৩)
ঠাকুরের নির্দেশমত, “রওনা হলেন সুশীলচন্দ্র, সঙ্গে রাজেন্দ্রনাথ ও
বীরেন্দ্রলাল। কলকাতা এসে ভোলানাথ সরকারের সঙ্গে রাজেন্দ্রনাথ আপ্রাণ
চেষ্টা করে ৩১শে আগষ্ট বগী রিজার্ভ করলেন। ঠিক হল ১লা সেপ্টেম্বর সকালে
ঈশ্বরদী থেকে আসাম মেলের সঙ্গে বগী দেওয়া হবে। ৩১শে আগষ্ট আশ্রমে পৌঁছে
রাজেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জানালেন সমস্ত সংবাদ। বীরেন্দ্রলাল মিত্রকে সঙ্গে
নিয়ে সুশীলচন্দ্র ৩১শে আগষ্ট রাত্রে রওনা হলেন দেওঘরে বাড়ী ঠিক করার
জন্য। আশ্রমে বিদ্যুত বেগে প্রস্তুতি পর্ব্ব চলতে থাকলো। খবর রাখা হল বিশেষ
গোপনে, যাতে জনসমুদ্র এসে কেঁদে কেটে ঠাকুরের মত বদলে না ফেলে। পূজনীয়
বড়দা বিভিন্ন বিভাগের কর্ম্মীদের দিলেন যথোপযুক্ত উপদেশ ও
নির্দ্দেশাদি—যাতে তাঁদের অনুপস্থিতি কালেও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয় সমস্ত
কাজ। নির্দ্ধারিত দিনে যথাসময়ে রওনা হলেন শ্রীশ্রীঠাকুর আশ্রম
ছেড়ে—সঙ্গে ঠাকুর পরিবারের সবাই, শ্রীশ্রীঠাকুরের পরিচর্য্যাকারিগণ
প্রত্যেকে নিজ নিজ পরিবারবর্গসহ, সপরিবারে স-সহচর ঋত্বিগাচার্যদেব,
রাজেন্দ্রনাথ এবং আশ্রমের আরও কতিপয় বিশিষ্ট কর্মী। বিষণ্ণ বদনে যাত্রা
করলেন শ্রীশ্রীঠাকুর—অত্যন্ত কষ্ট হচ্ছে তাঁর প্রিয়জনদের ছেড়ে
যেতে—ছেড়ে যেতে জনক-জননীর পবিত্র স্মৃতিতীর্থ। ব্যথাতুর চিত্তে সজল
নেত্রে নির্ব্বাক নিস্তব্ধ হয়ে পাষাণ মূর্ত্তির মত দাঁড়িয়ে থাকল
আশ্রমবাসী নরনারী—আবাল-বৃদ্ধ-শিশু-যুবা ঠাকুরের এই ঐতিহাসিক যাত্রাপথের
দিকে তাকিয়ে। সূচনা হল পুরুষোত্তমের নবতর দ্বারকা-লীলার।” (তথ্যসূত্রঃ
শ্রীমৎ আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী ও সৎসঙ্গ আন্দোলন, পৃঃ ১৪৩)
“এর আগেও কয়েকবার শ্রীশ্রীঠাকুরের বায়ু-পরিবর্তনের জন্য বাইরে যাওয়ার কথা
হয়েছিল । কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানা কারণে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। এবারেও শেষ
পর্যন্ত তাঁর যাওয়া হবে কিনা তা নিয়েও সংশয় ছিল। কিন্তু ১লা সেপ্টেম্বর
সকালে মাতৃমন্দিরের সামনে গিয়ে দেখি শ্রীশ্রীঠাকুর যাওয়ার জন্য প্রস্তুত
হচ্ছেন। তাঁকে ঈশ্বরদী ষ্টেশনে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ী প্রস্তুত। বেলা
দশটা নাগাদ তিনি রওনা হবেন। শ্রীশ্রীঠাকুর গাড়ীতে ওঠার আগে তাঁর পিতা ও
মাতার প্রতিকৃতির সামনে প্রণাম নিবেদন করলেন। তারপর আশ্রম প্রাঙ্গণে
মন্দিরে গিয়ে হুজুর মহারাজ এবং সরকার সাহেবের প্রতিকৃতির সামনে প্রণাম
নিবেদন করলেন। …..তাঁর চোখে জল। চোখের জল ফেলতে ফেলতে ফেলতে তিনি মোটরে
উঠলেন। ….চোখের জল ফেলতে ফেলতে তিনি জন্মভূমি থেকে শেষ যাত্রা
করেছিলেন।” (তথ্যসূত্রঃ কুমারকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য প্রণীত মহামানবের সাগরতীরে/১ম/৩-৪)
“২রা সেপ্টেম্বর বেলা ১০টা নাগাদ শ্রীশ্রীঠাকুর বৈদ্যনাথধাম স্টেশনে
পৌঁছলেন। সঙ্গে পরিবার-পরিজন, পার্ষদগণ এবং সেবকগণ। তাঁর বাসের জন্য
প্রথমে ‘বড়াল-বাংলো’ বাড়ীটি ভাড়া নেওয়া হয়। পরে ‘ওয়েস্ট এণ্ড হাউস’
(মনোমোহিনী ধাম), গোলাপবাগ, রঙ্গনভিলা , অশোক-আশ্রম, হিলস ওয়ে ,
শশধর-স্মৃতি (শিবতীর্থ), দাস-ভিলা, প্রসন্ন-প্রসাদ প্রভৃতি বাড়ী ভাড়া করা
হয়। রঙ্গনভিলায় শ্রীশ্রীঠাকুরের মধ্যমভ্রাতা পূজনীয় প্রভাসচন্দ্র
চক্রবর্তী (ক্ষেপুকাকা) হিলস্ ওয়েতে শ্রীশ্রীঠাকুরের কনিষ্ঠ ভ্রাতা
পূজনীয় শ্রীকুমুদরঞ্জন চক্রবর্তী (বাদলকাকা) এবং গোলাপবাগে পূজ্যপাদ বড়দা
সপরিবারে বাস করতে থাকেন।” (মহামানবের সাগরতীরে, ১ম পৃঃ ৪)
শ্রীশ্রীঠাকুরের দেওঘর আগমনের সংবাদ জানতে পেরে, নিরাপত্তার কারণে,
পূর্ববঙ্গের অনেক সৎসঙ্গী পরিবার ভিটেমাটি ছেড়ে ঠাকুরের শরণাপন্ন হন।
ওদিকে, ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতির থাবায় ১৯৪৭ এর ১৫ আগষ্ট
দ্বিজাতি-তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে দেশবিভাগের ফলে আরো ছিন্নমূল সৎসঙ্গী
পরিবারের দল দেওঘরে চলে আসেন। দেওঘরে ঠাকুর নবাগত। নিজেই পরিবার পরিজনদের
নিয়ে প্রভূত কষ্ট স্বীকার করে ভাড়া বাড়ীতে থাকেন। নিদারুণ অর্থকষ্টের
মধ্যেও প্রশাসন বা সমাজসেবী সংস্থাদের কাছ থেকে সাহায্য না নিয়ে, কাউকে
বিব্রত না করে, আত্মত্যাগী ইষ্টভ্রাতাদের সাহায্যে দুর্গতদের আশ্রয়দান ও
ভরণপোষণ করেছিলেন।
।। দেশভাগ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকুলচন্দ্রের আক্ষেপ ।।
‘‘চেষ্টা করেছিলাম প্রাণপণ যাতে হিমাইতপুর না ছাড়তে হয়, কিন্তু অত্যাচারিত হলাম ভীষণ, পারলাম না কিছুতেই। বাড়ী আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিল, মানুষ খুন করে ফেল্ল। ওখানকার সব লোকের বিরুদ্ধতার জন্য পারলাম না। সকলের ভাল করতে গিয়ে আমি একেবারে জাহান্নামে গেলাম।’’
‘‘আমরা হিন্দুরাই পাকিস্তানের স্রষ্টা। আমরা আরো চেষ্টা করেছি, যাতে আমরা সকলে মুসলমান হয়ে যাই। আমরা মুসলমান মেয়ে বিয়ে করতে পারি না। কিন্তু মুসলমানরা হিন্দুর মেয়ে বিয়ে করতে পারে। আমরা materialise করেছি তাই যাতে পাকিস্তান হয়, আর materialise করি নাই তা যাতে পাকিস্তান না হয়।….. কিন্তু আগে যদি হায়দ্রাবাদের দিক থেকে বাংলায় হিন্দুদের নিয়ে আসা যেতো, তবে পাকিস্তান হতো না। কিন্তু তা তো হলো না। পাকিস্তান হওয়ায়
হিন্দু মুসলমান উভয়েরই কী ভীষণ ক্ষতিই না হল। …….. ’’ (ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থ, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৯৪)
* * *
।। খণ্ডিত ভারতবর্ষ ও তাঁর জনগণের শাসনতন্ত্রের অবস্থান ।।
দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে খণ্ডিত গণপ্রজাতন্ত্রী আধুনিক ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ধর্মকে রক্ষা করে চলার কর্তব্যকে। আমাদের রাষ্ট্রীয় মন্ত্র ‘সত্যমেব জয়তে’ স্মরণ করিয়ে দেয় উপনিষদীয় আচার্য্য অনুসরণের শাশ্বত অবলম্বনকে। রাষ্ট্রের কর্ণধার রাষ্ট্রপতিসহ মন্ত্রীবর্গ প্রত্যেকেই ঈশ্বরের নামে শপথ গ্রহণ করে ঈশ্বরের প্রতিভূ জীবগণের কল্যাণ সাধনে ব্রতী হয়। ঈশ্বরের প্রতিনিধি স্বরূপ জাগতিক ন্যায়দণ্ডধারী বিচারকেরা ধর্মাধিকরণ নামে চিহ্নিত। বিচারালয়কে বলা হয় ধর্মস্থান।—কেন?
ভারতীয় অনুশাসনের সাম, দান, ন্যায়, দণ্ড, নীতি ও ভেদ-এর রাজধর্ম রক্ষার পবিত্র কর্তব্যে যাতে এতটুকু অন্যায়, অধর্ম প্রবেশ করতে না পারে তার জন্যই ওইসব মহাভারতীয় নীতির অনুসরণ। বিধিবৎ প্রকৃষ্ট-জাতক সৃষ্টি করে ধর্ম পালনের স্বার্থেই ওই অনুশাসনকে আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি। রাজনীতির জন-প্রতিনিধিরা পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যার জীবনবৃদ্ধির নীতিসমূহ পালন যাতে হয় সেটা দেখবে। অসৎ নিরোধী তৎপরতার সাথে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালিত হবে। তথাপি যখন ভারতীয় শাসন সংহিতা বা সংবিধান ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ না করে, ধর্ম এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়কে এক করে ফেলে ‘ধর্ম-নিরপেক্ষতাবাদ’,––অর্থাৎ রাষ্ট্র ধর্মের অনুবর্তী নয়’-এর মতবাদকে প্রতিষ্ঠা দেয়, তখন কি মনে হয় না, আমরা জাতীয়তাবাদের আদর্শের প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েও এক পরস্পর বিরোধী আচরণ করে চলেছি !
যে নীতি-বিধি পদার্থের অস্তিত্ব রক্ষার সহায়ক তাই তো ধর্ম। পদার্থের স্বকীয়তা ধারণ করে রাখার সহায়ক যা’ তাই ধর্ম। ধর্ম পালন করলেই পদার্থ টিঁকে থাকবে, নচেৎ থাকবে না। সংসদ প্রকাশিত ইংরেজী অভিধানে ধর্মের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘It is an action, one is bound to do.’ সেই ধর্মের আবার পক্ষ আর নিরপেক্ষ কি? বেঁচে থাকার অজৈব উপকরণ বায়ু, জল, মাটি ইত্যাদির যদি ধর্ম থাকতে পারে, এবং তা’ যদি বিজ্ঞানের বইতে পাঠ্য হতে পারে, তাহলে মানুষের কি ধর্ম নেই? মনুষ্যত্ব প্রকাশের মাধ্যমেই তো মানুষ ধার্মিকতার পরিচয় দেয়। মানুষের মনুষ্যত্বের অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার নীতিবিধি-সমন্বিত ভারতের নিজস্ব সংহিতাগুলোর বিধানসমূহ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের সংহিতায় স্থান পাবে না কেন, প্রজাদের শিক্ষা দিতে পাঠ্য করা হবে না কেন?
বর্তমান যুগ-পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কথিত ধর্মের যুগান্তকারী সংজ্ঞা ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম বলে জানিস তাকে। ধর্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম না-রে।’ ওই সম্প্রদায় নিরপেক্ষ সমন্বয় বার্তাবহ বাণীকে গুরুত্ব না দিয়ে ধর্মের নামে, ভারতীয় সংহিতার নীতি বহির্ভূত ডিজে বাজানো, বাজী ফাটানো, মদ্যপান প্রভৃতি প্রবৃত্তি পরায়ণতার আস্ফালনকে, কতগুলো অনিত্য, অসার পৌত্তলিকতার কু-সংস্কারকে যদি ‘ধর্ম’ নামে প্রতিষ্ঠা দিতে চাই, তা’ কি বিচক্ষণতার পরিচায়ক হবে, না ভারতবর্ষের কৃষ্টির পরিপূরক হবে? ওই ভুলের বোঝা কি আমাদের চিরদিন বইতে হবে? আমাদের বুদ্ধি, বোধ কি নিরেটই থেকে যাবে?
রাষ্ট্রের সৃষ্টিই তো প্রজাদের অধর্ম বা দুর্নীতি থেকে মুক্ত করে ধার্মিক, অর্থাৎ সু-নীতি পরায়ণ করে তোলার জন্য। সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দলগুলো যদি ওই মহান কর্তব্য ভুলে তার প্রজাবর্গকে, তাদের পিতৃ-পিতামহের আদর্শ অনুসারী ধর্ম-পরায়ণ, কৃষ্টি-পরায়ণ হতে উৎসাহ না দিয়ে, প্রবৃত্তি-পরায়ণতায় উৎসাহ দেয়, সেটা ভারতবর্ষের জাতীয় উত্তরাধিকারত্বের অস্তিত্বকে বিপন্ন করার বার্তা ভিন্ন আর কিছু নয়।
‘‘প্রজা মানেই হচ্ছে—
প্রকৃষ্টরূপে জাত—
সর্ব্বসম্ভাব্য উদ্বর্দ্ধনী সার্থকতায় ;
আর প্রকৃষ্ট জন্ম পেতে হলেই চাই—
প্রজনন পরিশুদ্ধি—
সর্ব্ব-সম্ভাব্যতার বৈধানিক সংস্থিতিতে. …. ’’
(‘সম্বিতী’ গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)
প্রজা কথাটি আসিয়াছে প্র-পূর্ব্বক জন্-ধাতু হইতে । প্র মানে perfectly, আর জন্ ধাতু মানে to grow. তাই বলা হইয়াছে “প্রজা কথায় আছে–to grow perfectly instinct with life.” (Nana-Prasange, 2nd part, page 50)
যে জনগণ বা প্রজারা মানুষের সেবা করার অধিকার পেতে ভোটে জেতার জন্য বুথ দখল করে, ছাপ্পা ভোট দেয়, ব্যালট চুরি করে, ব্যালটবক্স চুরি করে, ভোটারদের হুমকি দেয়, প্রার্থীকে মারধোর করে, আশ্রয়হীন করে, বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, হত্যা পর্যন্ত করতে কুণ্ঠিত হয় না!—তারা কি ধরণের প্রজা ? তারা জন-প্রতিনিধি হয়ে জনগণের কি ধরণের সেবা করবে ?
প্রকৃষ্ট জাতক বা প্রজার জন্মদাত্রী হচ্ছে নারী। সেই নারী যদি ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টিতে পূজ্যা মাকালী, মাদুর্গা, দেবী লক্ষ্মী, দেবী সরস্বতীর ন্যায় শুদ্ধ, বুদ্ধ, পবিত্রতায় সমৃদ্ধ না হয়ে প্রবৃত্তি-প্ররোচিত চলনে অভ্যস্ত হয়, তাহলে প্রকৃষ্ট জাতক বা প্রজা সৃষ্টি কিভাবে সম্ভব হবে? রাষ্ট্র-নেতাদের এ বিষয়ে দৃষ্টিপাত করার কি প্রয়োজন নেই? তারা যদি নজর দিতেন টিভি, সিনেমা, ইণ্টারনেটের মাধ্যমে দর্শকাম, শ্রুতকাম বারতা প্রচারিত হয়ে অবৈধ স্পর্শকামে পরিণতি লাভ করতে পারত না। প্রজা সৃষ্টির মূল আধান দূষিত হতে পারত না।
রাষ্ট্র-নেতারা প্রবৃত্তি-পোষণী নারী-স্বাধীনতার নামে ওই মুখ্য বিষয়ে গুরুত্ব না দিলেও যুগ-পুরুষোত্তমের দিব্যদৃষ্টি থেকে এই মূল বিষয়টাও কিন্তু এড়িয়ে যেতে পারে নি।
এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর সুস্পষ্ট মতবাদ প্রকাশ করে গেছেন।
“দেশের অবনতির
প্রথম পদক্ষেপই হ’চ্ছে—
মেয়েদের উচ্ছৃঙ্খলতা,
পারিবারিক সঙ্গতির প্রতি
বিদ্রূপাত্মক অবহেলা,—
যা’ দেশের শুভদৃষ্টিটাও
ভেঙ্গেচুরে চুরমার করে
সর্ব্বনাশকে আমন্ত্রণ ক’রে থাকে;
তাই বলি,
মেয়েরা যেন
তাদের পবিত্রতা হ’তে
এতটুকুও স্খলিত না হয়,
ব্যবস্থা ও বিধানগুলি
এমনতরই বিনায়িত করে
তাদের ভিতর সঞ্চারিত করে তোল;
তুমি যদি দেশের স্বস্তিকামীই হও—
এদিক থেকে
তোমার দৃষ্টি ও কৃতিচর্য্যার
একটুও অবহেলা যেন না থাকে,
স্বস্তিই হ’চ্ছে
শান্তির শুভ আশীর্ব্বাদ,
আর, স্বস্তি মানেই হ’চ্ছে
সু-অস্তি—
ভাল থাকা।”
(বিধান-বিনায়ক, বাণী সংখ্যা ৩৭৩)
* * *
মূণ্ডক উপনিষদের পবিত্র মন্ত্র ‘সত্যমেব জয়তে’-এর আদর্শকে সম্বল করে ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দের ১৫ই আগস্ট গণ প্রজাতন্ত্রী ভারতবর্ষের যাত্রা সুরু হলেও ‘‘Of the people, by the people, for the people—জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন।’’-এর লক্ষ্যে রচিত কতগুলো বিধিবদ্ধ নিয়ম, শাসন সংহিতা বা সংবিধান ১৯৪৯ খ্রীস্টাব্দের ২৬শে জানুয়ারী স্বীকৃতি লাভ করে, যে দিনটাকে ‘প্রজাতন্ত্র দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। প্রজা শব্দের অর্থ প্রকৃষ্ট জাতক। আর তন্ত্র মানে কতগুলো বিধিবদ্ধ নিয়ম বা system।
প্রজাতন্ত্রের মর্মার্থ হচ্ছে, যে তন্ত্র বা system মেনে আদর্শ প্রজা নির্মাণ, পালন, পোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে রাষ্ট্রের সংহতি রক্ষায় প্রযত্নশীল থেকে পরম রাষ্ট্রিক সমবায়ের লক্ষ্যে এগিয়ে চলা যায়। ভারতের ব্রহ্মসূত্র, মহাকাব্য, বেদ, উপনিষদ, সংহিতা, আদর্শপুরুষ শ্রীরামচন্দ্র ও শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ বলে যা কিছু বর্তমান,—সবকিছুই ওই ‘সত্যমেব জয়তে’-এর আদর্শের উপরেই প্রতিষ্ঠিত।
সত্য মানে অস্তিত্ব। যার অস্তিত্ব আছে যার বিকাশ আছে তাই সত্য (real)। ঋষি প্রদর্শিত এই সত্যের পথই আর্য্য ভারতবর্ষের মূলধন। আমাদের আদর্শ ছিল– ‘আত্মানং বিদ্ধি’, নিজেকে জানো, know thyself, ‘আত্মবৎ সর্বভূতেষু, মাতৃবৎ পরদারেষু, লোষ্ট্রবৎ পরদ্রব্যেষু।’ সকলকে নিজসত্তার প্রতীক মনে কর, মেয়েদের নিজের মায়ের প্রতিরূপ ভেবে শ্রদ্ধা কর, অন্যের জিনিসকে মাটির ঢেলার মত দ্যাখ। ‘মা গৃধ’, লোভ কর না। তথাপি ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের প্রজাগণ, নেতা-মন্ত্রী-জনপ্রতিনিধিগণ কেন সত্যভ্রষ্ট হচ্ছে, ভেবে দেখার প্রয়োজন নেই? নির্বাচনের নামে প্রহসন, উপ-নির্বাচনের নামে অযথা অর্থের অপব্যয় কি চলতেই থাকবে? প্রজাতন্ত্রের আঁতুড়ঘরটাই যদি অসত্যের সংক্রমণে সংক্রামিত হয়ে পড়ে তাহলে প্রজারা সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাবে কোন্ প্রতিষেধকে?—সত্যের পূজারীদের ভেবে দেখার কি কোন প্রয়োজন নেই? এই বিষয়টাকেও উপেক্ষা করেন নি শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। তিনি বিধান-বিনায়ক গ্রন্থের বাণীতে বলছেন—
“যখনই দেখবে—
শাসকমণ্ডলী ও প্রতিষ্ঠাবান ব্যক্তিরা
সৎ-এর পীড়নে
দুষ্কৃতকারীদের সাহায্য করতে ব্যগ্র,
এবং তাদের উদ্ধত ক’রে তুলবার
সরঞ্জাম সরবরাহে ব্যাপৃত—
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে,—
বুঝে নিও—
সেই দেশ
সেই জনপদ
সেই সাম্রাজ্য
অধঃপাতের দিকে ক্ষিপ্র চলৎশীল; … (সংক্ষিপ্ত)”
* * *
ব্রহ্মসূত্র থেকে জাত ভারতের নিজস্ব সংবিধান কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে।
‘‘সুখস্য মূলম্ ধর্মম্,
ধর্মস্য মূলম্ রাষ্ট্রম্,
রাষ্ট্রস্য মূলম্ অর্থম্,
অর্থস্য মূলম্ ইন্দ্রিয়-বিজয়ম্,
ইন্দ্রিয়-বিজয়স্য মূলম্ জ্ঞানবৃদ্ধসেবয়া,
জ্ঞানবৃদ্ধসেবয়া বিজ্ঞানম্।।”
অর্থাৎ সুখী হতে হলে ধর্ম পালন করতে হবে। প্রকৃত ধার্মিক হতে হলে পুরুষার্থের চতুর্বর্গ সমন্বিত আশ্রমধর্ম (বর্ণাশ্রম এবং চতুরাশ্রম) পালন করতে হবে। সঠিকভাবে আশ্রমধর্ম পালন করার স্বার্থে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী প্রজাদের দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী হবার জন্য গুরু গ্রহণ করতে হবে। গুরুর আদেশ-নিদেশ পালন করলে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করা যাবে। তবেই জীবনে সুখী হওয়া যাবে। এই হলো ভারতবর্ষের সনাতনী ধর্মের মূল কথা। ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টি অনুসারে, ‘‘যেনাত্মন্ স্তথান্যেষাং জীবনংবর্দ্ধাঞ্চপি ধ্রীয়তে য স ধর্ম্মঃ।’’ অর্থাৎ, অন্যের বাঁচা এবং বৃদ্ধি পাওয়াকে অক্ষুন্ন রেখে, মানুষ বাঁচার জন্য, বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য যা’ যা’ করে, তাই ধর্ম। ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। ধর্ম আচরণের মাধ্যমে পালন করার জিনিস, অনুভব করার জিনিস, যা’তে প্রতিটি সত্তা তার অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করতে পারে, তার অনুশীলন করা। অথচ বাস্তব চিত্রটার সাথে মেলানো যাচ্ছে না ধর্মকে। বর্তমানে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্মের নামে চলছে বাহ্যপূজা, পৌত্তলিকতার প্রকাশ, হৈ-চৈ, প্রকাশ্যে প্রাণীহত্যা, পরিবেশ-দূষণ, রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায়। রাস্তা আটক করে, চাঁদার জুলুম করে, জনজীবন বিপর্যস্ত করে, তারস্বরে মাইক বাজিয়ে, বাজি ফাটিয়ে, অবধ্য, নিরীহ প্রাণীদের হত্যা করে ধর্ম উদযাপন করার বিধি কোন মহাপুরুষ, কোন সাধক, কোন নবী, কোন ঋষি, প্রবর্তন করেছেন কি? যদি না করে থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রের কর্তব্য সব সম্প্রদায়কে প্রকৃত ধর্ম পালনে উৎসাহিত করা। ধর্মের নামে বিধি-বহির্ভূত অসদাচারের অনুষ্ঠানের উদযাপনকে কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা।
ওইসব বিধি, নিয়ম বা সংবিধান পালন করে প্রকৃষ্ট জাতক বা প্রজা সৃষ্টির প্রবহমানতাকে রক্ষা করে চলাই ছিল আর্য্য ভারতের আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্য।
* * *
।। প্রাচীন আর্য্য-ভারতের শাসন-সংস্থা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতবাদ ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর—আর্য্যদের যে কী জিনিস ছিলো তা’ কল্পনায়ই আনা যায় না। Cabinet formed (মন্ত্রীপরিষদ গঠন) হ’ত বিপ্র, ক্ষত্রিয়, বৈশ্যদের প্রধানদের নিয়ে। প্রধানের প্রধান, তাদের প্রধান, এইরকমভাবে একটা সুন্দর gradation (পর্য্যায়) ছিলো। যারা যত বেশীকে পূরণ করতো তারা তত বড় প্রধান। প্রধানমন্ত্রী সর্ব্বদা ঠিক হ’য়েই থাকতো, উপযুক্ত লোক নির্ব্বাচন নিয়ে কোন গণ্ডগোল উপস্থিত হ’তো না। অন্যদেশ ভারতবর্ষকে আক্রমণ করার সাহসই পেতো না। সব জাতটা দারুণ compact (সংহত) থাকতো। অনুলোম বিয়ে থাকার দরুন সারা জাতটা যেন দানা বেঁধে থাকতো, আর এতে evolution–এর (ক্রমোন্নতির) সুবিধা হ’তো—যথাক্রমে পাঁচ, সাত ও চৌদ্দপুরুষ ধরে ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের ভিতর যদি Brahmanic instinct (ব্রহ্মণ্য-সংস্কার) দেখা যেতো—তাদের বিপ্র ক’রে দেওয়া হ’তো। উন্নতির পথ সব দিক থেকে খোলা ছিল। আগের কালে টাকা দিয়ে একজনের সামাজিক position (অবস্থান) ঠিক করা হ’তো না। কারও হয়তো ৫০ লাখ টাকা আছে, কিন্তু কেউ হয়তো পাঁচ টাকায় সংসার চালাচ্ছে—অথচ instinct (সহজাত-সংস্কার) বড়—সেই বড় ব’লে গণ্য হ’তো। Instinct, habit, behaviour, activity (সংস্কার, অভ্যাস, ব্যবহার ও কর্ম)—এইগুলিই ছিল মাপকাঠি। Learning (লেখাপড়া)-কে কখনও শিক্ষা বলা হ’তো না। চরিত্রগত না হ’লে তথাকথিত পাণ্ডিত্যের কোন মূল্য দেওয়া হ’তো না। সব সময় লক্ষ্য ছিল—জ্ঞান, গুণ যাতে জন্মগত সংস্কার ও সম্পদে পরিণত হয়। বর্ণাশ্রমধর্ম্ম এত সূক্ষ্ম, উন্নত ও বৈজ্ঞানিক ব্যাপার যে অনেকে এর অন্তর্নিহিত তথ্য বুঝতে না পেরে একে বৈষম্যমূলক বলে মনে করে—এর চেয়ে বড় ভুল আার নেই। যারা বিজ্ঞানসম্মত বর্ণাশ্রমধর্ম্মকে বিপর্য্যস্ত করবার উদ্দেশ্যে generous pose (উদারতার ভঙ্গী) নিয়ে inferior (অসমর্থ)-দের ক্ষেপিয়ে তোলে, তারা সমাজের মহাশত্রু। শ্রীরামচন্দ্র শম্বুকের প্রতি কঠোর হয়েছিলেন—কারণ, শম্বুকের movement (আন্দোলন)-টা বর্ণাশ্রম-ধর্ম্মের বিরুদ্ধে একটা passionate raid (প্রবৃত্তি-প্ররোচিত অভিযান) বই আর-কিছু নয়। (আলোচনা প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড, ৩২শে জৈষ্ঠ্য, বৃহস্পতিবার, ১৩৪৬, ইং ১৫।৬।১৯৩৯)
***
গণপ্রজাতন্ত্রী স্বাধীন ভারতবর্ষ ১৯৪৯ খ্রীস্টাব্দের ২৬শে জানুয়ারী ‘সত্যমেব জয়তে’র আদর্শকে মাথায় নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, যাকে আমরা আজও রাষ্ট্রের পবিত্র মন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে রেখেছি। তথাপি ওইসব বিধিকে আড়াল করে প্রবৃত্তি-পরিপোষিত শিক্ষায় প্রজাতন্ত্রী ভারতবর্ষের প্রজাদের শিক্ষিত করতে চাইছি। ফলে সন্ত্রাসবাদ, ভ্রষ্টাচার, যৌন-ব্যভিচার ক্রমবর্দ্ধমান। এর কারণ ‘সত্যমেব জয়তে’ কে বাস্তবে মূর্ত করে তোলার মত কোন ইন্দ্রিয়জয়ী সৎপুরুষের জীবন্ত আদর্শ অনুসরণ করছে না রাষ্ট্র। ফলে দেশে মহানগরের বাড়বাড়ন্ত হলেও মনুষ্যত্বের পরিচয় সম্পন্ন ‘পিতামাতার সুজননের সুসন্তান, সন্তানের সুমাতা-সুপিতা, সমাজের সুবন্ধু, রাষ্ট্রের সুনাগরিক’ এমন মহান নাগরিকের সংখ্যা ক্রমশঃ যেন অবলুপ্তির পথে।
তাই তো বর্তমান সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানবৃদ্ধ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সভ্যতাকে সংকট থেকে মুক্ত করতে নিদান দিলেন :
“শাসন-সংস্থা যেমনই হোক,
যাতেই মাথা ঘামাও না,
যৌন-ব্যাপার শুদ্ধ না হলে
দেশের জীবন টিঁকবে না।”
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রদত্ত উক্ত সাবধান বাণীটি আমাকে খুবই পীড়া দেয়। এ বিষয়ে আপনাদেরও একটু ভেবে দেখতে হবে, যদি সুস্থভাবে বাঁচতে চান।
বর্তমান সমাজের চিন্তাশীল ব্যক্তিরা পেটের অসুখ থেকে বাঁচতে অরক্ষিত জলপান করে না, সুরক্ষিত, পরিশ্রুত, বোতল বন্দী শুদ্ধ জল পান করে। কাটা ফল খায় না। অরক্ষিত কোর্মা, কোপ্তা, পোলাও, বিরিয়ানীর মতো যুগধর্ম স্বীকৃত দামী দামী খাবার ছেড়ে সুরক্ষিত ডাল-ভাতেই সন্তুষ্ট থাকে। উল্টোপাল্টা খেয়ে শরীর খারাপ করার রিস্ক নিতে চায় না। একটা সার্বজনীন মতবাদ সৃষ্টি হয়েছে যে, অরক্ষিত নয়, সুরক্ষিত জিনিষ দিয়েই জৈবিক তাগিদ পূরণ করতে হবে নিজের সত্তাকে দূষণ মুক্ত রাখতে। তাইতো বর্তমানে কারো ছোঁয়া স্পর্শদোষ বিকীরিত, ব্লেড, সিরিঞ্জ, তোয়ালে, রুমাল, গামছা ইত্যাদি ব্যবহার করে না। স্বাস্থ্যসম্মত বিধি মেনে চলে। কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয়, সেই সমাজেরা ছেলেরা যদি রক্ষণশীলতার মর্যাদা না দেয়। খোলামেলা স্পর্শ-দোষে দুষ্ট নারী সংসর্গ প্রয়াসী হয় তার কপালে জোটে অশেষ দুঃখ। এইডস্ সহ নানাবিধ যৌনরোগ, মনোবিকারের শিকার হতে হয়। আর অনিয়ন্ত্রিত চলনের অভ্যাসের জন্য ধর্ষণে অভিযুক্ত হলে তো কথাই নেই!
অপরপক্ষে, সেই সমাজের মেয়েরা যদি কাম নামক জৈবিক তাগিদ প্রবৃত্তির তাড়নার কাছে নতিস্বীকার করে বসনে-ভুষণে, আচার-আচরণে পণ্যরূপে যৌবনকে প্রজ্ঞাপিত করে নিজেদের অরক্ষিত করে, কামুক পুরুষদের কাম-বিকীরণে সত্তাকে দুষ্ট করে, এবং একাধিক পুরুষদের প্রোফাইল স্মৃতির ফোল্ডারে জমা করে,—তার দুর্গতির আর শেষ নেই। মা হওয়ার সময় স্বামীকেন্দ্রিক হতে পারবে না। কারণ, মা হতে গেলে একটা পুরুষই লাগে, একাধিক নয়। অথচ নিজেকে অরক্ষিত রাখার কারণে পাড়ার, রাস্তার, কলেজের, আপিসের একাধিক পছন্দের পুরুষ স্মৃতিতে ভীড় জমাবে এবং সেই সম্মিলিত মানসিকতার psycho-somatic disordered সন্তান জন্ম নেবে! এ বিষয়ে সতর্ক না হলে দুর্গতির আর ইতি হবে না কোনদিন!
আর্য্যকৃষ্টির ‘সত্যমেব জয়তে’-এর আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত প্রজাতন্ত্রের প্রবহমানতা টিঁকিয়ে রাখতে হলে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিতে হবে আদর্শ প্রজা সৃষ্টির মাধ্যম, সুবিবাহ ও সুপ্রজননের ওপর। বর্তমান রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় যে বিষয়টি উপেক্ষিত।
তাই প্রকৃত অর্থে প্রজাতন্ত্রকে বাস্তবায়িত করতে হলে শ্রীশ্রীঠাকুর কথিত আর্য্যকৃষ্টির আদর্শকে মুখ্য করে আর্য্য মহাসভা নামে এক পরমরাষ্ট্রিক সমবায় সমিতি গঠন করার প্রয়োজন আছে ‘মেরা ভারত মহান’, ‘India is great.’ অভিধায় ভূষিত জাতীয়তাবাদকে টিঁকিয়ে রাখার স্বার্থে।
* * *
।। গুরুকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদী চলনে কিভাবে চলতে হবে ।।
কেষ্টদা (ঋত্বিগাচার্য্য)— ম্যাগডুগাল বলেছেন, কৃষ্টিগত আদর্শ, আচার, অনুষ্ঠান, শ্রদ্ধা, আভিজাত্যবোধ ইত্যাদি যদি না থাকে, তবে জাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে।
শ্রীশ্রীঠাকুর—যদি এখনও সাবধান না হই , ফিরে না দাঁড়াই, আমাদেরও হয়তো তাই হবে। যখন মানুষের দেওয়ার থাকে না, শুধু নেয়, তখন সে captive(বন্দী) হ’য়ে পড়ে। আগে পুরুষোত্তমকে কেন্দ্র করে সবকিছু পরিচালনা করার রীতি ছিল। তাই বলত ‘সর্ববদেবময়ো গুরুঃ’। তিনিই প্রভু তিনিই সর্বোত্তম পরিপুরক তাঁকে বাদ দিলে নানা-বাদ প্রধান হয়। মানুষ সুকেন্দ্রিক হ’তে পারে না। ছন্নতা এসে পড়ে। নানা জিনিস ঠেসে ধরে। বুদ্ধদেব যখন এসেছিলেন তখন সাহিত্য, শিল্প, সমাজ, — সব জাগলো সব দিক দিয়ে। শ্রীকৃষ্ণ যখন এসেছিলেন তখনও তাই হ’য়েছিল। তিনিই ছিলেন সব যা-কিছুর প্রাণ-প্রেরণা । ঐ প্রেরণা সব যা-কিছুতে স্ফুরিত ক’রে তুলেছিল তার বৈশিষ্ট্য-অনুযায়ী। আমরা যদি পুরুষোত্তমকে না চাই, তাহ’লে নানা জিনিসের উপাসনা ক’রে পরমপদ লাভ করতে পারি না। আমাদের চলতে হবে পুরুষোত্তমকে কেন্দ্র ক’রে।
(আলোচনা-প্রসঙ্গে ১৯ই অগ্রহায়ণ ১৩৬০)
পুরুষোত্তমকে কেন্দ্র করে জাতি গঠন করতে হলে প্রচলিত রাজনীতিতে সংশোধন আনা প্রয়োজন সর্বাগ্রে, জাতীয়তাবাদের স্বার্থে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র রাজনীতির সংজ্ঞায় বলেছেন— “রাজনীতি বলে তায়/পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যায়/সংহতি আনে যায়।” যে নীতি সকলের অভাব পূরণ করে, সবাইকে অভীষ্ট মঙ্গল প্রতিষ্ঠায় পোষণ দিয়ে সব্বাইকে প্রীতির বাঁধনে আবদ্ধ করে সংহতির প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ, সেই নীতির নাম রাজনীতি। তাহলে রাজনীতির সেবকদের সংজ্ঞা-নির্দিষ্ট গুণের অধিকারী হতে হবে। সকলের অভাব পূরণ যিনি বা যারা করবেন তাদের বৈশিষ্ট্যপালী হতে হবে। বৈশিষ্ট্য মানে বিশিষ্টতা। যুক্তি অনুযায়ী ওই বিশিষ্টতার পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যা দ্বারা সংহতির প্রতিষ্ঠা যিনি করতে পারবেন তিনি হতে পারবেন রাজনীতিবিদ। বর্তমান দলীয় রাজনীতিতে যা এক বিরল চরিত্র। অপরাধ দমনের স্বার্থে টেণ্ডার দিয়ে ভালো জাতের বিশ্বাসী কুকুর আমদানি করা সম্ভব হলেও সৎ-এর পূজারী বিশ্বাসী ভালো মানুষ আমদানি করা সম্ভব কি? ভালো জাতের কুকুরের মতো, ভালো জাতের মানুষকেও বিধিমাফিক জন্মাতে হয়।
* * *
একজন গোপালক বা রাখাল বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের গোরু—ষাড়, বলদ, গাভী, দামড়া, বকনা নামের গোরুর পাল নিয়ে মাঠে চড়াতে যায়। একটা ছোট লাঠি বা পাচনের সাহায্যে সে গোরুর পালকে পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যা দ্বারা সংহত রেখে আবার গোধূলি বেলায় গোয়ালে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। তেমনি একজন চাষী তার বিভিন্ন জমির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য মেনে ভূমিকে কর্ষণ করেন বা চাষ দেন। জমির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ‘জো’ বুঝে বীজ বপন করেন, চারা রোপন করেন। তারপর উপযুক্ত জলসেচ, সার, কীটনাশক, পাহারা দিয়ে পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যা দ্বারা ফসল উৎপাদন করেন। সমাজবদ্ধ মানুষের জন্য কি ওই শাশ্বত নীতি প্রযোজ্য নয়?
* * *
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতে, বৈশিষ্ট্য মানে—তদনুপাতিক organic adjustment (বৈধানিক বিন্যাস)। তার আবার (group) গুচ্ছ আছে। এইগুলিকে বলা হয় বর্ণ, এর কোনটাই আমরা নষ্ট করতে চাই না। নষ্ট করা মানে যুগ যুগ ধরে, তিল তিল করে, যা গড়ে উঠেছে তা হারান। ন্যাংড়া আম আছে, ফজলি আম আছে আরো কত রকমের আম আছে। এর একটা জাত যদি নষ্ট করে ফেলি তাহলে তা’ আর ফিরে পাব না—হারাব চিরতরে। সেকি ভালো? ফজলি আমের মধ্যে তো আর ন্যাংড়া আমের স্বাদ পাব না। তাই যেন আমরা বুঝে চলি।
(আলোচনা প্রসঙ্গে, ১৬শ খণ্ড, পৃঃ ১০৯)
আমাদের ভারতের গ্রামীন অর্থনীতি কৃষি ও গোপালনের উপর নির্ভরশীল। ভালো কৃষকেরা কখনোই যেমন খুশি তেমনভাবে, নিজের খেয়ালখুশি মত চাষ করেন না। সরকারী কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে জমি অনুযায়ী উন্নত জাতের বীজ বপন করেন, চারা রোপন করেন। গোপালন ক্ষেত্রেও তাই। সরকারী পশু পালন বিভাগের বিজ্ঞানীদের পরামর্শ মেনে গাভীর জাতের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সম-বিপরীত উন্নত জাতের ষাঁড়ের বীজ দিয়ে উন্নত জাতের সুস্থ, সবল বাচ্চা উৎপাদন করেন। সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ পুলিশ, মিলিটারী বিভাগে অপরাধী সনাক্ত করতে জন্মগত সমৃদ্ধ ভালো জাতের কুকুরের বাচ্চা সংগ্রহ করে। ওদের জাতিগত বৈশিষ্ট্যের পালন এবং পোষণ করার জন্য অনেক টাকা খরচ করে ট্রেনার রাখে, রাস্তার কুকুরের বাচ্চাদের নিয়ে এসে ট্রেনিং দেয় না! জন্মগত যোগ্যকে যোগ্য মর্যাদা দেয়। মানুষের মত সংরক্ষণের নামে জন্মগত অযোগ্যকে বিশেষ মর্যাদা দেয় না!
আমরাও দৈনন্দিন জীবন-যাপনে সকলেই কিছু-না-কিছু বৈশিষ্ট্যের পালন-পোষণ করেই থাকি। সচেতন ব্যক্তি মাত্রেই বাজার থেকে ভালো জাতের বা কোয়ালিটির আলু, বেগুন, পটল, মুলো, আম, চাল, ডাল, চা কিনতে অভ্যস্ত। এমন কোন সুস্থ মানুষ নেই যে উদারতার নামে হিমসাগর আমের দাম দিয়ে আঁশযুক্ত টোকো আঁটিসার আম কিনে আনবেন। মিনিকীট, বাঁশকাঠি, গোবিন্দভোগ, দেরাদুন রাইসের দাম দিয়ে রেশন দোকানে প্রদত্ত মোটা চাল কিনে আনবেন।
এ থেকে প্রমাণিত হলো গাছপালা, পশুপাখি সবকিছুর জাত, বর্ণ আছে। জীব বিজ্ঞানের পুস্তকেও জাতি, প্রজাতি, বর্ণ, গোত্র-এর উল্লেখ আছে। তাহলে মানুষের কি নেই? অবশ্যই আছে। মানুষ তো সব জাতহীন হয়ে যায় নি! সহজাত সংস্কারের প্রবহমানতা টিঁকিয়ে রাখতে হলে বিবাহ ও সুপ্রজনন মাধ্যমে রাখতে হবে। সংবিধানে মানবসম্পদ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন এর বিজ্ঞানসম্মত মাধ্যম আর্য্য বিবাহনীতিকে গুরুত্ব না দিয়ে, সংরক্ষণ প্রথা অবৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ প্রথা জীইয়ে রাখতে জাতের নামে বজ্জাতি চলছে!—শিডিউলড, আন-শিডিউলড, ট্রাইব নিয়ে দলীয় রাজনীতি করতে গিয়ে জনগণের সহজাত-সংস্কারের বৈশিষ্ট্যটাকে নাকাল হতে হচ্ছে ! মানুষের সহজাত সংস্কার এবং তাদের জৈবিক তাগিদগুলো প্রবৃত্তির কবলে পড়ে মনুষ্যত্বের অপলাপ যাতে না হতে পারে, বিহিত ব্যবস্থায় রক্ষা করা বা রাখালী করা ভারতীয় রাজনীতির নির্দিষ্ট কর্ম ছিল। বর্তমান পরিস্থিতিকে সামলাতে হলে বর্তমান পুরুষোত্তম প্রদত্ত সংবিধান ‘বিধান-বিনায়ক’ গ্রন্থের নিদেশ মেনে বিধিবৎ নীতি প্রণয়ণ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করার প্রয়োজন আছে। শ্রীশ্রীঠাকুরের অনুকূলচন্দ্রের ইষ্ট, ধর্ম্ম ও সঙ্ঘ নীতির আদর্শ অনুযায়ী এই ইষ্টকর্ম করার জন্য উদ্যোগী হতে হবে ইষ্টার্ঘ্য গ্রহীতাদের।
* * *
নৃতাত্ত্বিক গঠনের বৈশিষ্ট্যানুযায়ী মানুষকে আল্পাইন, ব্রাকিসেফাল, মেডিটেরিয়ান, মঙ্গোলয়েড, নর্ডিক, নিগ্রোয়েড প্রভৃতি নামে শ্রেণী বিভাজন করা হয়েছে। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর সহজাত সংস্কার গুণ ও কর্মভিত্তিক বর্ণাশ্রম বিভাজনকে সমৃদ্ধ করেছিলেন আর্য্য ঋষিরা। শাস্ত্রে গুণ এবং কর্ম দেখে বর্ণ নিরূপণ করার বিধান রয়েছে। সত্ত্ব গুণে বিপ্র। সত্ত্ব মিশ্রিত রজোগুণে ক্ষত্রিয়। রজোমিশ্রিত তমোগুণে বৈশ্য এবং তমোগুণাধিকারে শূদ্র চিহ্নিত করা হয়েছিল। এবং তদনুযায়ী কর্ম নির্ধারিত হয়েছিল। সকলেই স্ব স্ব বৈশিষ্ট্যে শ্রেষ্ঠত্বের স্থান অধিকার করে আছে।
শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন—“শূদ্রই তো জাতির চাকা/বৈশ্য জোগায় দেশের টাকা,/ক্ষত্রিয়েরা রাজার জাত/সবার পূরণ বিপ্র ধাত।”
।। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রদত্ত বিজ্ঞানসম্মত উদাহরণ ।।
” …… আর্য্য জাতির uphill motion-এর (উর্ধগামী গতির) acceleration (ত্বরান্বিত করা)-ই হ’চ্ছে front-(সম্মুখে) ব্রাহ্মণ আর back-এ (পিছনে) শূদ্র। চাতুর্বর্ণ্য বিভাগ কতকটা আমাদের body system-এর (শরীর বিধানের) মতন। শূদ্র হ’চ্ছে এই whole system-এর (সমুদয় বিধানের) carrier (বাহক) এবং supporter (সহায়ক), যা’র উপর ভর দিয়ে এই সমাজদেহ চলছে। বৈশ্যদের function (কর্তব্য) হ’ল সমাজদেহকে সুস্থ রাখা by the supply of proper nutrition and food (যথোপযুক্ত পুষ্টি এবং খাদ্য সরবরাহ দ্বারা)। বৈশ্যশক্তি এই function discharge (কর্তব্য সম্পাদন) করতে যেদিন পরাঙ্মুখ হ’ল, সেদিন এই সমাজদেহ ভেঙ্গে পড়লো। Stomach (পাকস্থলী) যদি boycott (অসহযোগ) করে, আমাদের body-system-এর (শরীর বিধানের) যে অবস্থা হয় তাই হ’ল। এই বৈশ্যশক্তি যদি আবার জাগে এবং legs, heart ও brain-কে (পা, হৃৎপিন্ড ও মস্তিষ্ককে) proper nutrition supply করে (উপযুক্ত পুষ্টি যোগায়), তবে আবার সমাজদেহ জেগে উঠবে। Body system-এর মধ্যে heart (হৃৎপিন্ড) যেমন, সমাজদেহের মধ্যে ক্ষত্রিয় তেমন। Heart-এর মধ্যে দু’রকম cells (কোষ) আছেঃ (১) white cells (সাদা কোষ) (২) Red cells (লাল কোষ)। Red cells-এর (লাল কোষের) কাজ হ’চ্ছে body-কে fit (কার্যক্ষম) রাখা এবং maintain (পরিপোষণ) করা by the proper distribution of red blood (লাল রক্ত উপযুক্ত ভাবে বিতরণ দ্বারা); এবং white cells-এর (সাদা কোষের) কাজ হ’চ্ছে body-কে protect (রক্ষা) করা। ক্ষত্রিয়ত্বের মধ্যে এই দু’টি function (কার্য) আছে; একটি সমাজদেহকে fit (কার্যক্ষম) রাখা ও maintain (প্রতিপালন) করা, আর একটি disease-এর(রোগের) হাত থেকে protect(রক্ষা) করা। কিন্তু এই দুই blood-এর supply (যোগান) নির্ভর করছে stomach-এর (পাকস্থলীর) উপর। সমাজদেহের brain (মস্তিষ্ক) হ’চ্ছেন ব্রাহ্মণ (বিপ্র), যাঁদের working (কার্যতা) নির্ভর করছে ক্ষত্রিয়শক্তি বৈশ্যশক্তি এবং শূদ্রশক্তির উপর। তাঁরা যেমন-তেমন এই তিন শক্তির নিকট support and help (সাহায্য ও সহানুভূতি) পা’চ্ছেন, তেমন-তেমন এই তিনকে regulate, control (নিয়মিত ও আয়ত্ত) করতে পারছেন। এই চারিশক্তির মধ্যে কেহই ছোট-বড় নয়। একটা harmony (সমন্বয়) ও co-ordination-এর (সমবায়ের) যোগে এদের মধ্যে একযোগে একতানে কাজ হ’চ্ছে। কিন্তু body এর মধ্যে brain-এর স্থান যেমন সর্বোচ্চ এবং সর্ব উচ্চে থাকাটা legs, stomach ও heart-এর existence-এর পক্ষে নিতান্ত দরকার, তেমন ব্রাহ্মণকে উচ্চ place দেওয়াতে, যে উচ্চতা তাঁ’র মধ্যে inherent (স্বাভাবিক) হ’য়ে আছে, অন্যান্য বর্ণ চলতে পারছে ঠিকমত তাঁরই guidance-এ (নির্দেশে)। Head-কে বড় স্বীকার করা যেমন body-র অন্যান্য অঙ্গের পক্ষে লজ্জার নয়, বরং পরম গৌরবের, তেমনি অন্যান্য বর্ণের পক্ষে ব্রাহ্মণকে বড় ব’লে মানা তাঁদের বাঁচা-বাড়ার পক্ষে নিতান্ত প্রয়োজনীয়। Superior (শ্রেয়)-এর উপর শ্রদ্ধা রে’খে যদি তুমি সমাজকে পুনর্গঠন করতে লেগে যাও,তবে সে সমাজ টিঁকবে-তার growth (বৃদ্ধি) হবে healthy.” (ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, তৃতীয় খণ্ড, পৃঃ-৬৮-৬৯)
উপরোক্ত বাণী থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, বর্ণাশ্রমের বিন্যস্ত বিভাজন আমাদের শরীর বিধানেও বিদ্যমান। আমাদের পদযুগল দেহটাকে বয়ে নিয়ে বেড়ায় তাই শূদ্র বর্ণের সাথে তুলনা করা হয়েছে। বৈশ্যরা কৃষি ও বাণিজ্য দ্বারা সকলের উদরপূর্তি করছে। সেই উদরকে বয়ে বেড়াচ্ছে জানু বা জঙ্ঘা। জঙ্ঘা বৈশ্যত্বের প্রতীক। বাহুর শক্তি আমাদের দেহটাকে বিপদ-আপদ থেকে আগলায়, ক্ষত থেকে ত্রাণ করে, তাই ক্ষত্রিয় বর্ণের সাথে তুলনা করা হয়েছে। আমাদের মস্তিষ্ক বিবেক, বিচার-বুদ্ধি দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সমগ্র দেহটাকে পরিচালনা করে, তাই মাথাকে বিপ্র বর্ণের সাথে তুলনা করা হয়েছে। এইভাবে দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিন্যস্ত মেলবন্ধনে দেহটাকে সুস্থভাবে পরিচালিত করতে সাহায্য করে। ওই শাশ্বত প্রাকৃতিক নিয়মকে অগ্রাহ্য করে কেহ যদি মাথার কাজ পা-কে দিয়ে, পায়ের কাজ মাথাকে দিয়ে করাতে যায় তাহলে দেহটাই রক্ষা করা যাবে না। তেমনি বিন্যস্ত সমাজ ব্যবস্থা রক্ষার স্বার্থে আর্য্য ঋষিরা প্রতিটি বর্ণের জন্য নির্দিষ্ট কর্ম ও আইডেনটিটি বা স্মারক চিহ্নের বিধান দিয়েছেন। শ্বেত বর্ণে বিপ্র, লোহিত বর্ণে ক্ষত্রিয়, পীত বর্ণে বৈশ্য এবং নীল বর্ণে শূদ্র চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই জীবনীয় বৈশিষ্ট্যসমূহ ধারণ করার করার বিধির নাম ধর্ম। ধর্মকে রক্ষা করার জন্য রাজনীতি। শ্রীমদ্ভগবতগীতা যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বর্ণাশ্রম বিধায়িত বিন্যস্ত সমাজের ওই চারটি বর্ণের চিহ্ন শ্বেত, লোহিত, পীত ও নীল। বর্তমান পুরুষোত্তম যাকে আর্য্যকৃষ্টির স্মারক পতাকা হিসেবে নির্দিষ্ট করেছেন।—সেই পতাকার অনুসরণে পতাকা নির্বাচন করতে হবে।
।। আর্য্য শব্দের বিশেষত্ব ।।
‘আর্য্য’ শব্দটি গুণবাচক। যাঁরা বর্ণাশ্রম, চতুরাশ্রম পরিপূরণী দশবিধ সংস্কারে সংস্কৃত হতেন তাঁদেরই আর্য্য অভিধায় ভূষিত করা হতো । তাঁরাই ক্রমে আর্য্য জাতিভুক্ত হয়েছিলেন। বর্তমান যুগধর্মে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যেমন সম্বোধনে ‘স্যর’, ‘ম্যাডাম’ শব্দ ব্যবহার করা হয়, সেসময় সদাচারী বর্ণাশ্রমানুগজীবন যাপন কারীদের উদ্দেশ্যে ‘আর্য্য’, ‘আর্য্যপুত্র’, ‘আর্য্যা’ ইত্যাদি সম্বোধনসূচক শব্দ ব্যবহৃত হতো। এই ব্যবস্থা সকলের জন্য প্রযোজ্য ছিল। যার দৃষ্টান্ত জন্ম পরিচয়হীন জাবালা-সত্যকাম-এর ব্রহ্মচর্য্যাশ্রমে প্রবেশের অধিকার। এখানে জাতপাত, ধনীগরীব, সম্প্রদায়ের কোন স্থান নেই। এ বিষয়ে বর্তমান পুরুষোত্তম এক যুগান্তকারী বিধান দিলেন।
মঙ্গোলীয় নিগ্রো যারা
দ্রাবিড়ী কোল ম্লেচ্ছাবধি
আর্য্যীকৃত হলেই তারা
আর্য্যদেরই সুসন্ততি।
বর্ণাশ্রমী নয়কো যা’রা
আর্য্যকৃষ্টি মেনে চলে
কিম্বা আর্য্যকৃত হয়ে
বর্ণাশ্রম প্রার্থী হ’লে
গুণ বঞ্চনা-সক্রিয়তায়
বংশক্রমে ব্যক্তিগত
অনুক্রমে যথাবর্ণে
করবি তারে সুসংহত।
উপরোক্ত বাণীসমূহের মাধ্যমে শ্রীশ্রীঠাকুর বাহ্য জাতপাতকে ভেদাভেদের গণ্ডী থেকে উদ্ধার করে বৈশিষ্ট্যানুপাতিক গুণ ও কর্মের বিভাগ মেনে বর্ণাশ্রমভুক্ত করার বিধান দিলেন।
শ্রীশ্রীঠাকুর মৌখিক বিধান দিয়েই ক্ষান্ত হননি, দৈনন্দিন দিনচর্য্যায় পঞ্চবর্হিঃ ও সপ্তার্চ্চি প্রার্থনা বিধির মাধ্যমে ব্রাত্যদোষ কাটিয়ে আর্য্য বা আর্য্যীকৃত হবার অধিকার দিলেন।
“পঞ্চবর্হিঃ যা’রা স্বীকার করে, আর সপ্তার্চ্চি অনুসরণ করে, তারা যেই হোক আর যা’ই হোক– আর্য্য বা আর্য্যীকৃত। ৬০১ । (শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৭)
মানব সভ্যতাকে আর্য্যকৃষ্টিতে সমৃদ্ধ করতে পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চি-র অনুশাসন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্য অবদান।
।। পঞ্চবর্হিঃ ।।
১। একমেবাদ্বিতীয়ং শরণম্।
২। পূর্ব্বেষামাপূরয়িতারঃ প্রবুদ্ধা ঋষয় শরণম্।
৩। তদ্বর্ত্মানুবর্ত্তিনঃ পিতরঃ শরণম্।
৪। সত্তানুগুণা বর্ণাশ্রমাঃ শরণম্।
৫। পূর্ব্বাপূরকো বর্ত্তমানঃ পুরুষোত্তমঃ শরণম্ ।
এতদেবার্য্যায়ণম্, এষ এব সদ্ধর্ম্মঃ,
এতদেব শাশ্বতং শরণ্যম্।’’
।। বঙ্গানুবাদ ।।
১। এক এবং অদ্বিতীয়ের শরণ লইতেছি।
২। পূর্ব্বপূরণকারী প্রবুদ্ধ ঋষিগণের শরণ লইতেছি।
৩। তাঁহাদের পথ অনুসরণকারী পিতৃপুরুষগণের শরণ লইতেছি।
৪। অস্তিত্বের গুণপরিপোষক বর্ণাশ্রমের শরণ লইতেছি।
৫। পূর্ব্ব-পূরণকারী বর্ত্তমান পুরুষোত্তমের শরণ লইতেছি।
ইহাই আর্য্যপথ, ইহাই সদ্ধর্ম্ম, আর ইহাই চিরন্তন শরণযোগ্য।
।। পঞ্চবর্হিঃ-র গুরুত্ব প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ।।
“আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে গেল সেইদিন যেদিন থেকে আমরা পঞ্চবর্হির মূল নির্দ্দেশ অবজ্ঞা করতে শুরু করলাম। তখন থেকে আমরা অপরের খোরাক হলাম কিন্তু নিজেদের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখে পরকে আপন ক’রে নেবার সামর্থ্য হারিয়ে ফেললাম।” (আঃ প্রঃ ১১। ১০০)
।। সপ্তার্চ্চিঃ ।।
১। নোপাস্যমন্যদ্ ব্রহ্মণো ব্রহ্মৈকমেবাদ্বিতীয়ম্।
২। তথাগতাস্তদ্বার্ত্তিকা অভেদাঃ।
৩। তথাগতাগ্র্যোহি বর্ত্তমানঃ পুরুষোত্তমঃ
পূর্ব্বেষামাপূরয়িতা বিশিষ্ট-বিশেষ বিগ্রহঃ।
৪। তদনুকূলশাসনং হ্যনুসর্ত্তব্যন্নেতরৎ।
৫। শিষ্টাপ্তবেদপিতৃপরলোকদেবাঃ শ্রদ্ধেয়া নাপোহ্যাঃ।
৬। সদাচারা বর্ণাশ্রমানুগজীবনবর্দ্ধনা নিতং পালনীয়াঃ।
৭। বিহিতসবর্ণানুলোমাচারাঃ পরমোৎকর্ষ হেতবঃ
স্বভাবপরিদ্ধংসিনস্তু প্রতিলোমাচারাঃ।’’
।। বঙ্গানুবাদ ।।
১। ব্রহ্ম ভিন্ন আর কেহ উপাস্য নহে, ব্রহ্ম এক–অদ্বিতীয়।
২। তথাগত তাঁর বার্ত্তাবহগণ অভিন্ন।
৩। তথাগতগণের অগ্রণী বর্ত্তমান পুরুষোত্তম, পূর্ব্ব-পূর্ব্বগণের পূরণকারী বিশিষ্ট বিশেষ বিগ্রহ।
৪। তাঁহার অনুকূল শাসনই অনুসরণীয়—তাহা ভিন্ন অন্য কিছু অনুসরণীয় নহে।
৫। ঋষি-অনুশাসিত প্রামাণ্য জ্ঞান, পিতৃপুরুষ, পরলোক, দেবতাগণ শ্রদ্ধেয়— অবহেলার যোগ্য নহে।
৬। বর্ণাশ্রমের অনুকূল বাঁচাবাড়ার পরিপোষক সদাচার-সমূহ-নিত্যপালনীয়।
৭। বিহিত সবর্ণ ও অনুলোমক্রমিক (বিবাহাদি) আচারসমূহ পরম উৎকর্ষের কারণ— প্রতিলোম-আচার স্বভাব-ধ্বংসকারী।
।। মানব জীবনে ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’ অনুশাসনের গুরুত্ব ।।
শ্রীশ্রীঠাকুর সম্বিতী গ্রন্থে বলছেন—
মতবাদ যাই হোক না,—
আর, যে-কোন সম্প্রদায়ই হোক,
যা’ মুখ্যতঃ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’কে
স্বীকার করেনিকো—
কোন-না-কোন রকমে,—
তা’ কখনও অনুসরণ করতে যেও না,
তা’ কিন্তু জঘন্য—অসম্পূর্ণ,
সত্তা-সম্বর্দ্ধনার পরিপন্থী তা’;
আর, ঐ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’ই হ’চ্ছে
সেই রাজপথ—
যা’কে স্বীকার ও গ্রহণ করে চললে
ক্রমশঃই তুমি সার্থকতায় সমুন্নত হ’তে পার। ২৩৪
এই বাণী বর্ণ, সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকলকে মনুষ্যত্বে উত্তরণের পথ দেখিয়েছে। আর্য্যীকৃত হতে চাইলে মানতেই হবে। তথাকথিত স্বঘোষিত আচার্য্য-পরম্পরা পন্থীরা যদি নিজেদের সৎসঙ্গী মনে করেন, আর শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত “সৎ-এ সংযুক্তির সহিত তদ্-গতিসম্পন্ন যারা তা’রাই সৎসঙ্গী আর, তা’দের মিলনক্ষেত্রই হ’ল সৎসঙ্গ।”—বাণীটিকে স্বীকার করেন, তাহলে না মেনে কিন্তু উপায় নেই। কারণ ওই বাণীকে দৈনন্দিন সাধনায় স্থান না দিয়ে সৎ-এ সংযুক্তি এবং তদ্-গতিসম্পন্ন হওয়া অসম্ভব!
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার বাস্তব উদাহরণঃ
“ধর্ম্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে
সম্প্রদায়টা ধর্ম্ম না রে।।”
আমি বুঝিনা–কোন হিন্দু শুচিশুদ্ধভাবে মসজিদে যেয়ে প্রার্থনা করতে পারবে না কেন, আবার একজন সদাচারী মুসলমান হিন্দুর প্রার্থনা-মন্দিরে বসে প্রার্থনা করতে পারবে না কেন ! ভগবান মানুষকে তার language (ভাষা) দিয়ে চেনেন না, তিনি চেনেন তাকে তার feeling (বোধ) ও activity (কর্ম্ম) দিয়ে। (আঃ প্রঃ ৯ম খণ্ড)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন—হজরত যীশু, হজরত মহম্মদ আমাদেরও prophet (প্রেরিতপুরুষ)। আর্য্যধারা যদি জীবন্ত থাকত, তা’হলে হজরত যীশু, হজরত মহম্মদ হয়তো একাদশ অবতার, দ্বাদশ অবতার ব’লে পরিগণিত হ’তেন। Anti-Biblism (বাইবেল-বিরোধী), Anti-Quranism (কোরাণ-বিরোধী), Anti-Vedism (বেদ-বিরোধী)-এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তার নিরাকরণ করতে হবে। শাক্ত বিপ্র এবং বৈষ্ণব বিপ্র-পরিবারে যেমন বিয়ে-সাদির কোন নিষেধ নেই—সৌর বিপ্র ও গাণপত্য বিপ্রে যেমন বিয়ে চলতে পারে, ইষ্ট, কৃষ্টি ও পিতৃপুরুষের ঐতিহ্যবাহী রসুল-ভক্ত বিপ্র, বুদ্ধভক্ত বিপ্র, খ্রীষ্টভক্ত বিপ্রের সঙ্গেও তেমনি বিধিমাফিক বিয়ে-থাওয়া হ’তে পারে—এতে কোন বাধা নেই। কারণ, স্বধর্ম্ম ও কৃষ্টি-নিষ্ঠ থেকে যে-কোন পূরয়মাণ মহাপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধানতি নিয়ে চলা ধর্ম্মের পরিপন্থী তো নয়ই বরং পরিপোষক। তবে প্রত্যেকটি বিয়ের ব্যাপারে খুব হিসাব ক’রে চলতে হবে, যাতে কোন রকমের ব্যত্যয়ী কিছু বা প্রতিলোম-সংস্রব না ঘটে। (আলোচনা প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড, ২। ৭। ১৯৪০)
একটা সভ্যতাকে স্বমহিমায় টিঁকিয়ে রাখতে হলে আর্য্যকৃষ্টির সুবিবাহ ও সুপ্রজনন বিধির প্রয়োগ মাধ্যমে প্রকৃষ্ট জাতক সৃষ্টি, বৈশিষ্ট্যের পালন-পোষণ মাধ্যমে ব্যক্তি নির্মাণ সর্বাগ্রে প্রয়োজন। বর্তমান পুরুষোত্তম যজন, যাজন, ইষ্টভৃতি, স্বস্ত্যয়ণী ও সদাচার প্রভৃতি পঞ্চনীতি পালনের মাধ্যমে ব্যক্তি, দম্পতি, গৃহ, সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের মাধ্যমে এক পরমরাষ্ট্রিক সমবায় প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন। বর্ণাশ্রম ধর্ম্মের অনুশাসন মাধ্যমে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে বললেন। মানব সভ্যতাকে রক্ষা করতে চাইলে যুগ-পুরুষোত্তমের বিধানকে মানতে এবং মানাতে সৎসঙ্গীদের সচেষ্ট হতে হবে। সৎসঙ্গী মানে সকলের অস্তিত্বের সঙ্গী। শুধুমাত্র তথাকথিত সৎসঙ্গ নামাঙ্কিত সঙ্ঘপ্রীতি-প্রাধান্য অধিবেশন ও উৎসবে আবদ্ধ থাকলে তা বাস্তবায়িত হবার নয়।
ইষ্ট বা পুরুষোত্তম কথিত নীতিবিধি মেনে চলার নাম ধর্ম পালন। ইষ্ট বা পুরুষোত্তম নির্দিষ্ট ধর্ম পালনে সবাইকে উৎসাহিত ও একত্রিত করার জন্য সঙ্ঘ গঠন। তাই, বড়-আমি স্বরূপ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করার স্বার্থে, ব্যষ্টি ছোট-আমিদের সঙ্ঘপ্রীতির গুটি কেটে বেরিয়ে এসে মহাসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠায় নিবেদিতপ্রাণ হতে হবে।
** প্রস্তাবিত আর্য্য মহাসভা নামের পরমরাষ্ট্রিক সমবায় সমিতির সদস্যদের আবশ্যিক পালনীয় প্রাথমিক বিষয়সমূহ **
অভক্ষ্যভোজী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুনাদি তামসিক আহার করা যাবে না। অগম্যাগামী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ প্রতিলোম, সগোত্র এবং সপিণ্ড সম্বন্ধীয়দের সাথে অবিধি পূর্বক ধর্মবিরুদ্ধ বিবাহের মাধ্যমে কামাচার করা যাবে না। শারিরীক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক সদাচার পালন করতে হবে। অসৎ পথ বর্জন করতে হবে। কদাচারী প্রদত্ত আহার ও পানীয় গ্রহণ করা যাবে না।
* * *
আমাদের জীবধর্মের এক আবশ্যিক জৈবিক তাগিদ হলো আহার বা খাদ্য। যদিও
ব্যাপক অর্থে আহার মানে আহরণ। যার মধ্যে সবকিছুই আছে। খাওয়া-দাওয়া,
শোয়া-বসা, চলাফেরা, কথাবার্তা, কাজকর্ম, তথাকথিত প্রেম-ভালবাসা, বিয়ে
করা, বাবা-মা হওয়া ইত্যাদি। আমাদের উপনিষদের ঋষিরা ওই সবগুলোকে একত্রিত
করে আহার নামকরণ করে বললেন, ‘‘আহারশুদ্ধৌ সত্তাশুদ্ধিঃ, সত্তাশুদ্ধৌ ধ্রুবাস্মৃতিঃ …… ’’—অর্থাৎ জীবন ধারণের নিমিত্ত আহরণগুলো শুদ্ধ হলে সত্তা শুদ্ধি হয়, সত্তা শুদ্ধি হলে স্মৃতি নিশ্চল হয়। স্মৃতি নিশ্চল হলে জাতিস্মর হওয়া যায়। জীবনভূমির এপার-ওপার নিরীক্ষণ করা যায়। যারা দেশসেবক হবেন, তারা যদি আদর্শ চলন-চরিত্র দিয়ে আত্মশুদ্ধির পথে চলতে অভ্যস্ত না হন, দেশের নাগরিকদের কোন সম্পদের উপহার দেবেন? তাই প্রতিটি সদস্যদের বিশুদ্ধ চলন-চরিত্রের ওপর নির্ভর করছে ভারতের উজ্জ্বল ভবিষ্যত। এবং ওই দৃষ্টান্তই ভারতকে মহান ভারতের শিরোপায় অধিষ্ঠিত করবে ভবিষ্যতে। ইষ্টস্বার্থপ্রতিষ্ঠাপন্ন জীবনপিয়াসী সব্বাইকে বিষয়টা নিয়ে ভাবতে অনুরোধ করছি।
জয়গুরু ও প্রণামান্তে—
তাঁরই একান্ত দীন
তপন দাস




