সব তীর্থ বার-বার/গঙ্গাসাগর একবার

সব তীর্থ বার-বার

গঙ্গাসাগর একবার।

সব তীর্থ বার-বার

গঙ্গাসাগর একবার।

নিবেদনে—তপন দাস

——————————————-

এই তীর্থ স্নানটি এক সময়ে এতোই দুর্গম স্থানে অবস্থিত ছিলো যে অন্যান্য তীর্থের মতো সব সময় বা ইচ্ছামতো যাওয়া সম্ভব হতো না। নদীনালা, বন-জঙ্গল অতিক্রম করে যেতে হতো। তা ছাড়া চোর, ডাকাত ও জলদস্যুর ভয় তো ছিলই, এমনকি বন্য জন্তুর আক্রমণে মৃত্যুও পর্যন্ত ঘটত। সাগর দ্বীপটা শহর কলকাতা থেকে বেশ অনেকটা দূরে। আগে যানবাহনের তেমন সুবন্দোবস্ত ছিলো না। ইদানিং যানবাহনের প্রভুত উন্নতি হয়েছে। তৈরী হয়েছে প্রচুর রাস্তা ঘাট।

পূর্বে এই দ্বীপে যাতায়াতের জন্য নদীপথ বা জলাপথ ছিলো এক মাত্র ভরসা। বর্তমানের উন্নত যানবাহনের যুগেও জলপথে নৌকা, ভটভটি, লঞ্চ, ভেসেল, কুরুজ যোগে যাতায়াত চলছে। পৌষ মাসের একেবারে শেষ মকর সংক্রান্তির দিনে লক্ষ-লক্ষ নরনারী প্রচণ্ড শীতের দাপট উপেক্ষা করেও হাজির হয় এই সাগর সঙ্গমে। আজকাল অনেকেই যাচ্ছেন বত্‍সরের যে কোনো সময়ে। বলা যায় আগে মতো সেই ভয়াবহ দুর্গমতা আর নেই। প্রতিদিন নিত্য নতুন মানুষের পদার্পণে সাগর দ্বীপ এর তীর্থ স্নানটি কোলাহল মুখর হয়ে উঠে। তাই সারা বছর এখন অনেক জমজমাট।

তীর্থ স্নানের সন্নিকটে গড়ে উঠেছে জেলা প্রশাসনের সার্কিট হাউস, যুব আবাস, জেলা পরিষদ ভবন, দোকানপাট, হোটেল আরও কতো কি!

ভারত সেবাশ্রমের বিশাল বাড়ি ও অনেক ধর্মশালা গড়ে উঠেছে এই দ্বীপে। সরকারের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে সুন্দর বৃহত্‍ মন্দির। এই দুর্গম স্নানে মহা ঋষি কপিল মুনির আশ্রম ছিলো। মুনিবর এখানে সাধনা করতেন। সাগর দ্বীপে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী পৌষ সংক্রান্তির পুণ্যলগ্নে স্নান করেন। এই মেলার অধীনে তিন শতাধিক বিঘা জমি রয়েছে। ভরা কোটালে সাগর এর জলোচ্ছ্বাস থেকে বাঁচাতে এক তলার সমান উঁচু থাম ওয়ালা বাড়ি তৈরী হয়েছে।

এই বাড়িটি কপিল মুনির মন্দির এখানে আছে ভগীরথের কোলে মা গঙ্গা, বীর হনুমান, সিংহবাহিনী, বিশালক্ষী ও ইন্দ্রদেব।

এক কালে সাগর দ্বীপ ছিলো ১৭০ বর্গ মাইলের এক সমৃদ্ধ জনপথ। ১৬৮৮ সালে সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচছাসে প্রায় দু লক্ষ মানুষ সমুদ্রে ভেসে যায়। সেই থেকে দ্বীপটি বহু কাল জনহীন হয়ে পড়ে। ইতিহাস ৪৩০ খ্রিস্টাব্দে রানী সত্যভামা প্রথম কপিল মুনির মন্দিরটি তৈরী করেন। সেই মন্দিরটি বিলীন হয়ে যাবার পর আরও ছয়টি মন্দির তৈরী হয়, পরে বিলীন হয়ে যায়। বর্তমান মন্দিরটি আদি মন্দির স্থল থেকে প্রায় ২ কিমি দূরে অবস্থিত। বর্তমানে এই কপিল মুনির মন্দির সংলগ্ন এলাকায় প্রভূত উন্নতি হয়েছে। কাকদ্বীপ, নামখানা ব্যতীত ডায়মণ্ড হারবার থেকে ক্রুজে করে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় গঙ্গাসাগরে।

***************************

উইকিপিডিয়া অনুসারে গঙ্গা ভারত ও বাংলাদেশে প্রবাহিত একটি আন্তর্জাতিক

নদী। এই নদী ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের জাতীয় নদী। গঙ্গার দৈর্ঘ্য ২,৭০৪

কিমি (১,৬৮০ মা); উৎসস্থল পশ্চিম হিমালয়ে ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যে।

দক্ষিণ ও পূর্বে গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গা

মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। এক্ষেত্রে এর দুটি ধারা বা শাখা লক্ষনীয়– একটি

ফারাক্কা বাঁধ থেকে এসে ভাগীরথী ও হুগলী নদী নামে মূলত দক্ষিণে প্রবাহিত

হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে; অপরটি বাংলাদেশ সীমান্তে মহানন্দার সঙ্গে মিলিত

হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে পদ্মা নামে গোয়ালন্দ পর্যন্ত প্রবাহিত

হয়েছে। পদ্মাকে মূলত গঙ্গার প্রধান শাখানদী বলা হয়। তবে ঐতিহাসিক

কারণবশত এর অববাহিকাকেও গাঙ্গেয় বদ্বীপের অন্তর্গত বিবেচনা করা হয়।

জলপ্রবাহের ক্ষমতা অনুযায়ী গঙ্গা বিশ্বের প্রথম ২০টি নদীর একটি।

গাঙ্গেয় অববাহিকার জনসংখ্যা ৪০ কোটি এবং জনঘনত্ব ১,০০০ জন/বর্গমাইল (৩৯০

/কিমি২)। এটিই বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নদী অববাহিকা।

গঙ্গা হিন্দুদের কাছে পবিত্র নদী। তারা এই নদীকে গঙ্গা দেবীজ্ঞানে পূজা

করেন। (পূজা মানে সম্বর্দ্ধনা, অথচ আমরা তথাকথিত অমূর্ত মূর্তিপূজার নামে

পূজাবশিষ্ট বর্জ্য গঙ্গায় নিক্ষেপ করে গঙ্গাকে দূষিত করে চলেছি! যা সনাতন ধর্মনীতির বিরোধী।) গঙ্গার

ঐতিহাসিক গুরুত্বও অপরিসীম। একাধিক পূর্বতন প্রাদেশিক ও সাম্রাজ্যিক

রাজধানী (যেমন পাটলিপুত্র, কনৌজ, কাশী, এলাহাবাদ, মুর্শিদাবাদ, মুঙ্গের,

নবদ্বীপ ও কলকাতা) এই নদীর তীরেই অবস্থিত।

পরিবেশ বিভাগের রিপোর্ট অনুসারে গঙ্গা বিশ্বের পাঁচটি সবচেয়ে দূষিত নদীর

একটি। বারাণসীর কাছে এই নদীতে ফেসাল কলিফর্মের পরিমাণ ভারত সরকারের

নির্ধারিত সীমার চেয়ে একশো গুণ বেশি। গঙ্গাদূষণ শুধুমাত্র গঙ্গাতীরে

বসবাসকারী কয়েক কোটি ভারতীয়দেরই ক্ষতি করছে না, ১৪০টি মাছের প্রজাতি,

৯০টি উভচর প্রাণীর প্রজাতি ও ভারতের জাতীয় জলচর প্রাণী গাঙ্গেয়

শুশুক-এরও ক্ষতি করছে।গঙ্গাদূষণ রোধে গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান নামে একটি

পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতি, প্রযুক্তিগত অদক্ষতা, সুষ্ঠু

পরিবেশ পরিকল্পনার অভাব, ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য ও বিশ্বাস এবং ধর্মীয়

সংগঠনগুলোর অসহযোগিতার কারণে এই প্রকল্প ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।কিন্তু

বর্তমানে সরকারের তৎপরতায় গঙ্গা নদী অনেকটাই দূষণমুক্ত হয়েছে এবং

ভবিষ্যতে পুরো নদী দূষণ মুক্ত হবে, সেই আশা রাখা যায়।

দেবপ্রয়াগ, অলকানন্দা (ডানে) ও ভাগীরথী (বাঁয়ে) নদীর সঙ্গমস্থল, এখান

থেকে মূল গঙ্গা নদীর শুরু।

ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের গাড়োয়াল অঞ্চলে গঙ্গার উৎস অঞ্চল।

মূল গঙ্গা নদীর উৎসস্থল ভাগীরথী ও অলকানন্দা নদীর সঙ্গমস্থল। হিন্দু

সংস্কৃতিতে ভাগীরথীকেই গঙ্গার মূল প্রবাহ বলে মনে করা হয়। যদিও

অলকানন্দা নদীটি দীর্ঘতর। অলকানন্দার উৎসস্থল নন্দাদেবী, ত্রিশূল ও কামেট

শৃঙ্গের বরফগলা জল। ভাগীরথীর উৎস গোমুখের গঙ্গোত্রী হিমবাহ (উচ্চতা ৩,৮৯২ মি (১২,৭৬৯ ফুট))।

গঙ্গার জলের উৎস অনেকগুলো ছোট নদী। এর মধ্যে ছয়টি দীর্ঘতম ধারা এবং

গঙ্গার সঙ্গে তাদের সঙ্গমস্থলগুলোকে হিন্দুরা পবিত্র মনে করে। এই ছয়টি

ধারা হল অলকানন্দা, ধৌলীগঙ্গা, নন্দাকিনী, পিণ্ডার, মন্দাকিনী ও ভাগীরথী।

পঞ্চপ্রয়াগ নামে পরিচিত পাঁচটি সঙ্গমস্থলই অলকানন্দার উপর অবস্থিত।

এগুলি হল বিষ্ণুপ্রয়াগ (যেখানে ধৌলীগঙ্গা অলকানন্দার সঙ্গে মিশেছে),

নন্দপ্রয়াগ (যেখানে নন্দাকিনী মিশেছে), কর্ণপ্রয়াগ (যেখানে পিণ্ডার

মিশেছে), রুদ্রপ্রয়াগ (যেখানে মন্দাকিনী মিশেছে) এবং সবশেষে দেবপ্রয়াগ

যেখানে ভাগীরথী ও অলকানন্দার মিলনের ফলে মূল গঙ্গা নদীর জন্ম হয়েছে।

হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে গঙ্গার দৈর্ঘ্য ২৫০ কিলোমিটার (১৬০ মা)।

হৃষীকেশের কাছে গঙ্গা হিমালয় ত্যাগ করে তীর্থশহর হরিদ্বারে গাঙ্গেয়

সমভূমিতে পড়েছে। হরিদ্বারে একটি বাঁধ তৈরি করে গঙ্গা খালের মাধ্যমে

গঙ্গার জল উত্তরপ্রদেশের দোয়াব অঞ্চলে জলসেচের জন্য পাঠানো হয়ে থাকে।

এদিকে গঙ্গার মূলধারাটি হরিদ্বারের আগে সামান্য দক্ষিণ-পশ্চিমমুখী হলেও

হরিদ্বার পেরিয়ে তা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বাঁক নিয়েছে।

এরপর গঙ্গা কনৌজ, ফারুকাবাদ ও কানপুর শহরের ধার দিয়ে একটি

অর্ধ-বৃত্তাকার পথে ৮০০-কিলোমিটার (৫০০ মা) পার হয়েছে। এই পথেই রামগঙ্গা

(বার্ষিক জলপ্রবাহ ৫০০ মি৩/সে (১৮,০০০ ঘনফুট/সে)) গঙ্গায় মিশেছে।[২২]

এলাহাবাদের ত্রিবেণী সঙ্গমে যমুনা নদী গঙ্গায় মিশেছে। সঙ্গমস্থলে যমুনার

আকার গঙ্গার চেয়েও বড়। যমুনা গঙ্গায় ২,৯৫০ মি৩/সে (১,০৪,০০০ ঘনফুট/সে)

জল ঢালে, যা উভয় নদীর যুগ্মপ্রবাহের জলধারার মোট ৫৮.৫%।

এখান থেকে গঙ্গা পূর্ববাহিনী নদী। যমুনার পর গঙ্গায় মিশেছে কাইমুর

পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন নদী তমসা (বার্ষিক জলপ্রবাহ ১৯০ মি৩/সে (৬,৭০০

ঘনফুট/সে))। তারপর মিশেছে দক্ষিণ হিমালয়ে উৎপন্ন নদী গোমতী (বার্ষিক

জলপ্রবাহ ২৩৪ মি৩/সে (৮,৩০০ ঘনফুট/সে))। তারপর গঙ্গায় মিশেছে গঙ্গার

বৃহত্তম উপনদী ঘর্ঘরা (বার্ষিক জলপ্রবাহ ২,৯৯০ মি৩/সে (১,০৬,০০০

ঘনফুট/সে))। ঘর্ঘরার পর দক্ষিণ থেকে গঙ্গার সঙ্গে মিশেছে শোন (বার্ষিক

জলপ্রবাহ ১,০০০ মি৩/সে (৩৫,০০০ ঘনফুট/সে)), উত্তর থেকে মিশেছে গণ্ডকী

(বার্ষিক জলপ্রবাহ ১,৬৫৪ মি৩/সে (৫৮,৪০০ ঘনফুট/সে)) ও কোশী (বার্ষিক

জলপ্রবাহ ২,১৬৬ মি৩/সে (৭৬,৫০০ ঘনফুট/সে))। কোশী , ঘর্ঘরা ও যমুনার পর

গঙ্গার তৃতীয় বৃহত্তম উপনদী। এলাহাবাদ থেকে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ পর্যন্ত।

গঙ্গা বারাণসী, পাটনা, গাজীপুর, ভাগলপুর, মির্জাপুর, বালিয়া, বক্সার,

সৈয়দপুর ও চুনার শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ভাগলপুরে নদী

দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্ব দিকে বইতে শুরু করেছে। পাকুড়ের কাছে গঙ্গার

ঘর্ষণক্ষয় শুরু হয়েছে। এরপর গঙ্গার প্রথম শাখানদী ভাগীরথী-হুগলির জন্ম,

যেটি দক্ষিণবঙ্গে গিয়ে হয়েছে হুগলি নদী। বাংলাদেশ সীমান্ত পেরোনোর কিছু

আগে হুগলি নদীতে গড়ে তোলা হয়েছে ফারাক্কা বাঁধ। এই বাঁধ ও ফিডার খালের

মাধ্যমে জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে হুগলি নদীকে আপেক্ষিকভাবে পলিমুক্ত রাখা

হয়। ভাগীরথী ও জলঙ্গী নদীর সঙ্গমের পর হুগলি নদীর উৎপত্তি। এই নদীর বহু

উপনদী রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় উপনদীটি হল দামোদর নদ (দৈর্ঘ্য্য

৫৪১ কিমি (৩৩৬ মা) অববাহিকার আয়তন ২৫,৮২০ কিমি২ (৯,৯৭০ মা২))। হুগলি

নদী সাগর দ্বীপের কাছে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে।

ঋক্ বেদে (১০৷৭৬।৫ ) গঙ্গা ও অন্য কয়েকটি নদীর স্তব আছে । গঙ্গার স্তব ঋক্

বেদে একবার মাত্র। গঙ্গা মকরবাহিনী শুক্লবর্ণাচতুর্ভূজা। এক হাতে একটি

পাত্র ও এক হাতে পদ্মফুল। জ্যৈষ্ঠ শুক্লাদশমীতে এর পূজা হয়। এই দিনে গঙ্গা

স্নানে দশ রকম পাপ নষ্ট হয়, তাই এই তিথির নাম দশহরা । গঙ্গার জল স্নানে

পানে ও স্পর্শে পুণ্য এনে দেয় ৷ গঙ্গাতীরে বাস ও মৃত্যু গৌরব জনক। মৃতের

দগ্ধাবশিষ্ট অস্থি গঙ্গা জলে দেওয়ার নিয়ম আছে। গঙ্গার মাহাত্ম্য হিসাবে

কাহিনীর সীমা নাই । (সূত্র : পৌরাণিকা)

অদ্বৈত বেদান্তবাদের প্রবক্তা আচার্য্য শঙ্কর—

দেবি! সুরেশ্বরি! ভগবতি! গংগে ত্রিভুবনতারিণি তরলতরংগে ।

শংকরমৌলিবিহারিণি বিমলে মম মতিরাস্তাং তব পদকমলে ॥ 1 ॥

ভাগীরথিসুখদায়িনি মাতস্তব জলমহিমা নিগমে খ্যাতঃ ।

নাহং জানে তব মহিমানং পাহি কৃপাময়ি মামজ্ঞানম্ ॥ 2 ॥

হরিপদপাদ্যতরংগিণি গংগে হিমবিধুমুক্তাধবলতরংগে ।

দূরীকুরু মম দুষ্কৃতিভারং কুরু কৃপয়া ভবসাগরপারম্ ॥ 3 ॥

তব জলমমলং যেন নিপীতং পরমপদং খলু তেন গৃহীতম্ ।

মাতর্গংগে ত্বয়ি যো ভক্তঃ কিল তং দ্রষ্টুং ন যমঃ শক্তঃ ॥ 4 ॥

পতিতোদ্ধারিণি জাহ্নবি গংগে খংডিত গিরিবরমংডিত ভংগে ।

ভীষ্মজননি হে মুনিবরকন্যে পতিতনিবারিণি ত্রিভুবন ধন্যে ॥ 5 ॥

কল্পলতামিব ফলদাং লোকে প্রণমতি যস্ত্বাং ন পততি শোকে ।

পারাবারবিহারিণি গংগে বিমুখযুবতি কৃততরলাপাংগে ॥ 6 ॥

তব চেন্মাতঃ স্রোতঃ স্নাতঃ পুনরপি জঠরে সোপি ন জাতঃ ।

নরকনিবারিণি জাহ্নবি গংগে কলুষবিনাশিনি মহিমোত্তুংগে ॥ 7 ॥

পুনরসদংগে পুণ্যতরংগে জয জয জাহ্নবি করুণাপাংগে ।

ইংদ্রমুকুটমণিরাজিতচরণে সুখদে শুভদে ভৃত্যশরণ্যে ॥ 8 ॥

রোগং শোকং তাপং পাপং হর মে ভগবতি কুমতিকলাপম্ ।

ত্রিভুবনসারে বসুধাহারে ত্বমসি গতির্মম খলু সংসারে ॥ 9 ॥

অলকানংদে পরমানংদে কুরু করুণামযি কাতরবংদ্যে ।

তব তটনিকটে যস্য নিবাসঃ খলু বৈকুংঠে তস্য নিবাসঃ ॥ 10 ॥

বরমিহ নীরে কমঠো মীনঃ কিং বা তীরে শরটঃ ক্ষীণঃ ।

অথবাশ্বপচো মলিনো দীনস্তব ন হি দূরে নৃপতিকুলীনঃ ॥ 11 ॥

ভো ভুবনেশ্বরি পুণ্যে ধন্যে দেবি দ্রবমযি মুনিবরকন্যে ।

গংগাস্তবমিমমমলং নিত্যং পঠতি নরো যঃ স জযতি সত্যম্ ॥ 12 ॥

যেষাং হৃদযে গংগা ভক্তিস্তেষাং ভবতি সদা সুখমুক্তিঃ ।

মধুরাকংতা পংঝটিকাভিঃ পরমানংদকলিতললিতাভিঃ ॥ 13 ॥

গংগাস্তোত্রমিদং ভবসারং বাংছিতফলদং বিমলং সারম্ ।

শংকরসেবক শংকর রচিতং পঠতি সুখীঃ তব ইতি চ সমাপ্তঃ ॥ 14 ॥

ইতি উক্ত গঙ্গা-স্তোত্রম্-এর বন্দনা মাধ্যমে গঙ্গাকে বিবিধ বিভূষণে ভূষিত

করে শঙ্করাচার্য্য অমর হয়ে আছেন।

এই স্তোত্রে সর্বত্রই গঙ্গাকে সম্বোধন করে কবি তাঁর স্তুতি করেছেন। দেবী

গঙ্গা সুরেশ্বরী, ত্রিভুবনের ত্রাণকর্ত্রী, দেবাদিদেব শংকরের জটায় আবদ্ধ

থেকে হয়েছেন ‘শংকরমৌলিবিহারিণী’ এবং তিনিই পবিত্র তরঙ্গবিশিষ্টা

চিরপ্রবাহিনী স্রোতস্বিনী গঙ্গা।

তিনি ভগীরথ কর্তৃক স্বর্গ থেকে আনীতা হয়ে ‘ভাগীরথী‘ নামে প্রবাহিতা।

ইনিই শ্রীবিষ্ণুর চরণ থেকে নির্গত হয়ে ‘হরিপাদপদ্মতরঙ্গিণী‘ হয়েছেন।

দেবী গঙ্গাই ‘জাহ্নবী’ রূপে পরিচিতা কারণ জহ্নু মুনি গঙ্গাকে গ্রাস করে

পরে তাঁর কর্ণ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। ইনিই ছিলেন শাপভ্রষ্ট অষ্টবসু

ভীষ্মের জননী।

দেবী গঙ্গা কল্পলতার মতো ফলদায়িনী, সমুদ্র বিহারিণী, দেববধূগণ কর্তৃক

কটাক্ষে দৃষ্ট হয়ে থাকেন।

ইনিই নরকত্রাণকর্ত্রী, কলুষ বিনাশিনী, সর্বদা সুখদায়িনী,

মঙ্গলপ্রদায়িনী, আর্তজনের সেবক জনের আশ্রয়দাত্রী।

ইনিই উজ্জ্বল অঙ্গ বিশিষ্টা, ত্রিভুবন শ্রেষ্ঠা, কৃপাকটাক্ষময়ী। দেবরাজ

ইন্দ্র ও গঙ্গার চরণে চিরপ্রণত।

পরমানন্দ স্বরূপিণী, আর্তুজনের বন্দিতা, স্বর্গের অলকানন্দা যেন জ্ঞানহীন

শংকরের প্রতি করুণাঘন দৃষ্টিতে দেখেন।

তাঁর পবিত্র ধারায় স্নাত হয়ে যারা জন্মরহিত হয়, তাঁর তটে বাস করে যারা

বৈকুণ্ঠের শান্তি ভোগ করে যেন তাঁরা গঙ্গার কৃপাদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত না

হন।

তিনি যেন তাঁদের রোগ শোক তাপ পাপ কুমতি দূর করে সুমতি দেন, গঙ্গাদেবীর

মাহাত্ম্য বর্ণনায় সেই প্রার্থনা জানিয়েছেন কবি শংকরাচার্য।

শ্রীচৈতন্যদেব মহাপ্রভুর জন্মভূমি ও কর্মভূমি ছিল নবদ্বীপ গঙ্গাতীরে। ঠাকুর

শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সাধনভূমিও দক্ষিণেশ্বর গঙ্গা তীরেই। শাস্ত্রমতে, উভয়

সাধনভূমির ভূমিভাগ ছিল কূর্ম পৃষ্ঠাকৃতির এবং রম্য পুষ্পশোভিত।

বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রেরও জন্মভূমি ও কর্মভূমি

ছিল ভাগিরথী-গঙ্গার মূল প্রবাহ পদ্মা তীরের পাবনা জেলার হিমাইতপুরে।

গঙ্গানদীর সৃষ্টি ও সাগরমেলার সূত্রপাতের কাহিনী

কথিত আছে দানবীর রাজা হরিশচন্দ্রের বংশে সগর নামে একজন খুব বিখ্যাত রাজা

ছিলেন। আর তাঁর ছিল ষাট হাজার একজন পুত্র। সেই সগর রাজা ঠিক করলেন তিনি

অশ্বমেধ যজ্ঞ করবেন। সেই মতো একটি ঘোড়ার কপালে জয়-পতাকা লিখে তিনি

ছেড়ে দিলেন বিশ্ব ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। অপেক্ষা করতে লাগলেন ঘোড়াটি কবে

দেশ-বিদেশ ঘুরে ফিরে আসবে তারপর যজ্ঞ করে ইন্দ্রত্ব লাভ করবেন।

ওদিকে দেবরাজ ইন্দ্র ওই যজ্ঞের সংবাদ শুনে ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি

ভাবলেন, রাজা যদি রাজচক্রবর্তী হয়ে পুরো স্বর্গটাই চেয়ে বসেন, তখন কী হবে, তাই তিনি ফন্দি করে যজ্ঞের ঘোড়াটি পাতালে কপিল মুনির আশ্রমে বেঁধে রেখে এলেন।

ওদিকে ঘোড়াটিকে অনুসরণ করছিলেন রাজার ষাট হাজার পুত্র। (!) হঠাৎ ঘোড়াটি নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেই তাকে খুঁজতে শুরু করে দিলেন। আর খুঁজতে খুঁজতে তাঁরা পৌঁছে গেলেন কপিল মুনির আশ্রমে। ঘোড়াটিকে সেখানে দেখতে পেয়ে ক্রোধান্ধ হয়ে মুনিকে মারতে লাগলেন। মুনি যত বলেন ‘আমি ধ্যান করছিলাম, আমি জানি না

একে এখানে কে রেখে গেছে । ওঁর কথায় কর্ণপাত না করে সবাই মিলে আরও বেশি

করে মারতে লাগলেন। শেষে মুনি রেগে গিয়ে ক্রোধাবিষ্ট লোচনে তাঁদের দিকে

তাকাতেই তাঁরা সবাই ভষ্ম হয়ে গেলেন।

ওই সংবাদ পাওয়া মাত্র সগরের এক নাতি পাতালে গিয়ে মুনির পা ধরে

কান্নাকাটি শুরু করলেন। তাঁর চোখের জল দেখে মুনির মায়া হল। তিনি তখন

তাঁকে বললেন তোমার পৌত্র গিয়ে যদি স্বর্গ থেকে গঙ্গাকে নিয়ে আসতে পারে

তবে গঙ্গা দেবীর পবিত্র স্পর্শে এরা আবার জীবন ফিরে পাবে।

তিনি ফিরে এসে সব কথা খুলে বলতে তাঁর পৌত্র ভগীরথ তপস্যা করতে রাজি হয়ে গেলেন। হাজার বছর ধরে তিনি এমন তপস্যা করলেন যে বিষ্ণু খুশি হয়ে তাঁর হাতে একটি শঙ্খ দিয়ে বললেন, তুমি শঙ্খ বাজিয়ে আগে আগে যাও, গঙ্গা

দেবী তোমার পিছনে পিছনে পৃথিবীতে যাবেন।

কথামতো ভগীরথ শঙ্খ বাজাতে বাজাতে চললেন, আর পিছনে গঙ্গা। কিন্তু মুশকিল

হল স্বর্গ থেকে মর্ত্যে অবতরন করার সময়। গঙ্গার গতি এতটাই বেড়ে গেল

যে, সেই গতিতে পৃথিবী ধ্বংস

হবার উপক্রম। তাই সেই গতি ধারণ করার জন্য ভগীরথ শিবের তপস্যা শুরু করলেন।

শিব তপস্যায় তুষ্ট হয়ে জটা খুলে মাথা পেতে

দাঁড়ালেন। গঙ্গাও তাঁর মাথায় পড়লেন। অমনি পৃথিবী কেঁপে উঠল।

আসলে গঙ্গা চেয়েছিলেন তাঁর স্রোতে মহাদেবকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবেন। গঙ্গার মনের

কথা বুঝে তাঁর অহংকার চূর্ণ করতে শিব তাঁকে জটায় আবদ্ধ করলেন। সেই দেখে

ভগীরথ পড়লেন বিপদে। তিনি আবার তপস্যা শুরু করলেন। মহাদেব তাতে খুশি হয়ে

গঙ্গাকে দিলেন ছেড়ে। অমনি গঙ্গা কল-কল রবে পৃথিবীতে বইতে শুরু করলেন।

কিছুদূর গিয়েই জহ্নুমুনির আশ্রম। সেখানে তিনি তপস্যায় মগ্ন ছিলেন। গঙ্গার

স্রোতে তার আশ্রম গেল ভেসে। অমনি তিনি রেগে গিয়ে সমস্ত গঙ্গার

জল পান করে ফেললেন। এই দেখে ভগীরথ আবার পড়লেন চিন্তায়। তিনি মুনিকে

সাধ্যসাধনা করলেন। মুনিও তার কথায় খুশি হয়ে নিজের জানু চিরে গঙ্গাকে মুক্ত

করে দিলেন। এইজন্যই গঙ্গার আরেক নাম জাহ্নবী।

এরপর গঙ্গার স্রোত পৃথিবী অতিক্রম করে গিয়ে পড়ল পাতালে সগর মুনির

ছেলেদের ভষ্মের উপর। অমনি তাঁরা কপিল মুনির কথামতো আবার জীবন ফিরে পেলেন।

এইভাবে গঙ্গার জলে সগর-বংশ উদ্ধার হয়েছিল বলে হিন্দুরা গঙ্গাকে অতি

পবিত্র মনে করেন।

কিংবদন্তী অনুসারে মা গঙ্গা যখন ভগবান শিবের জটা থেকে পৃথিবীতে

পৌঁছেছিলেন তখন তিনি ভগীরথকে অনুসরণ করেছিলেন এবং কপিল মুনির আশ্রমে

গিয়ে সমুদ্রে যোগ দিয়েছিলেন সেই দিনটি ছিল মকর সংক্রান্তির দিন। রাজা

সগরের ষাট হাজার অভিশপ্ত পুত্ররা মা গঙ্গার পবিত্র জলের প্রবাহে

পুণর্জীবন লাভ করেছিলেন। সেই ঘটনার স্মরণে এই গঙ্গা নদীর সাগরের সাথে

মিলন স্থলটি

গঙ্গাসাগর তীর্থ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। সেই কাহিনীর স্মৃতিতে সেই

প্রাচীন কাল থেকে এখানে প্রতি বছর মকর সংক্রান্তিতে গঙ্গাসাগরে মেলার

আয়োজন করা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে এই শুভ দিনে স্নান করলে পুণ্য লাভ

হয়।

তথ্যঋণঃ পৌরাণিকা, উইকিপিডিয়া ও গোগুল।

May be an image of 5 people

  · 

Shared with Publ

বিপন্ন উত্তরাধিকার

** স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিবস স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য **

।। বিপন্ন উত্তরাধিকার ।।

নিবেদনে—তপন দাস

****************************************

‘‘অভাবে পরিশ্রান্ত মনই ধর্ম্ম বা ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা করে, নতুবা করে না।’’

পরম প্রেমময় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র লিখিত সত্যানুসরণের চিরন্তন ওই বাণীর অমোঘ টানে নরেন দত্ত গেলেন পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের দরবারে––জাগতিক অর্থাভাব ঘোচাতে। অন্তর্যামী ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব দেবোপম চরিত্রের উত্তরাধিকারীকে সচেতন করিয়ে দিলেন, আত্মসুখ নয়, ভারতবর্ষের শাশ্বত দর্শন, ‘‘বহুজন হিতায় চ, বহুজন সুখায় চ’’-এর আদর্শের উত্তরাধিকারী হয়ে পরমার্থ লাভ করার জন্য তোমাকে আত্ম নিবেদন করতে হবে।

শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ঐশী শক্তিতে শক্তিমান হয়ে নরেন্দ্রনাথ হলেন বিবেকানন্দ। এঁকে দিলেন মহান ভারতবর্ষের পূর্ণাঙ্গ এক চিত্র। শিকাগো ধর্ম্ম মহাসভার ক্যানভাসে।

‘আব্রহ্মস্তম্বভৃদ্ধাতা’––তৃণলতা থেকে ব্রহ্ম, সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বার্তাবহ বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, সংহিতা, পুরুষোত্তমবাদ নিয়ে বিশ্বজনমানস নতুন করে ভাবতে শুরু করলো। হৃত উত্তরাধিকার ফিরে পেতে ভারতবর্ষ ‘‘উত্তিষ্ঠত জাগ্রত, প্রাপ্য বরান্ নিবোধত।।’’ মন্ত্রে আবার নতুন করে জেগে উঠলো।………

‘‘কর্ম্মণ্যেবাধিকারেস্তু মা ফলেষু কদাচন।…….’’ ––কর্মেই তোমার অধিকার ফলে নয়। ––শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার আদর্শ আঁকড়ে নবযুগের অভিমন্যু ক্ষুদিরাম, দেশরক্ষার ধর্ম পালন করতে গিয়ে ফাঁসির আসামী হলেন। ‘‘ন জায়তে ম্রিয়তে কদাচিৎ…….বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়………নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ।…….’’। বাণীর অমৃত আদর্শে স্থিতপ্রজ্ঞ, মৃত্যুঞ্জয়ী ক্ষুদিরাম হাসিমুখে ফাঁসির দড়ির মালা পড়লেন গলায়। একটা ক্ষুদিরামের আত্মাহুতি জন্ম দিল হাজারো ক্ষুদিরামের। ফাঁসিরজ্জু আর ইংরেজ রাজশক্তির বুলেটের আলিঙ্গনে জীবনের জয়গান গাইতে গাইতে অকালে হাসিমুখে বিদায় নিল উত্তরাধিকারের স্বপ্নদেখা কতশত বীর ভারত-সন্তানেরা। অবশেষে একদিন গ্যালন গ্যালন রক্তের বিনিময়ে আমরা ফিরে পেলাম উত্তরাধিকার। অপূর্ণ, খণ্ডিত। অখণ্ড ভারতবর্ষ হিন্দুস্তান, পাকিস্তান আখ্যা পেল। কিন্তু পূর্ব পশ্চিমে প্রসারিত ভারতমাতার কর্তিত দুটো বাহুর ক্ষত আজও শুকলো না। সৃষ্ট হলো জাতীয় ম্যালিগন্যাণ্ট সমস্যার। বর্তমান যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের প্রদত্ত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার নিমিত্ত রক্ষাকবচ ‘পপুলেশন এক্সচেঞ্জ’ বিধি না মানার জন্য।

তা’ সমস্যা যতই থাকুক, তথাপি জাতীয়তাবাদের পরিচয়ের নিরিখে আমরা ভারতবাসী। আর্য্যজাতির বংশধর। বাল্মীকি, বেদব্যাস আমাদের জাতীয় কবি। রাম, কৃষ্ণ, চৈতন্য, রামকৃষ্ণ প্রমুখ আর্য্য ভারতবর্ষের জাতীয় মানবতাবাদের পূজারী পুরুষোত্তমগণের সাথে ‘‘দিবে আর নিবে মেলাবে মিলিবে’’-র আদর্শ মেনে বুদ্ধ, যীশু, হজরত রসুলকেও দ্রষ্টাপুরুষরূপে চিহ্নিত করিয়ে দিলেন বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। জাতীয় জীবনে সাম্প্রদায়িক সমন্বয়ের বাস্তব সেতুবন্ধন রচিত না হলেও, ভারতীয় হিন্দু, ভারতীয় মুসলমান, ভারতীয় খৃষ্টান, ভারতীয় বৌদ্ধ, ভারতীয় শিখ প্রত্যেকেই যে আর্য্যজাতির বংশধর আমরা বুঝতে শিখলাম, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের কাছে আনত হয়ে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আসমুদ্র হিমাচল পর্যন্ত বিস্তৃত ভারতবর্ষের মহিমা বন্দনা করলেন ‘আর্য্য ভারতবর্ষ আমার জ্ঞান-গরিমা-গরবিনী …….’ সঙ্গীতের ছন্দে।

এই সবকিছু নিয়েই তো আমরা জোর গলায় বলতে পারছি, ‘মেরা ভারত মহান, India is great.’ আচ্ছা ওই শ্লোগানগুলো বলার সাথে সাথে করার যদি মিল না থাকে, ইতিহাসে আমাদের পরিচয় কি হবে? ভারতীয় ঐতিহ্য, ভারতীয় কৃষ্টি, ভারতীয় অনুশাসনের উত্তরাধিকার আমরা প্রকৃত অর্থে বহন করে চলছি কি?

গণপ্রজাতন্ত্রী আধুনিক ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ধর্মকে রক্ষা করে চলার কর্তব্যকে। রাষ্ট্রীয় মন্ত্র ‘সত্যমেব জয়তে’ স্মরণ করিয়ে দেয় উপনিষদীয় আচার্য অনুসরণের শাশ্বত অবলম্বনকে। রাষ্ট্রের কর্ণধার রাষ্ট্রপতিসহ মন্ত্রীবর্গ প্রত্যেকেই ঈশ্বরের নামে শপথ গ্রহণ করে ঈশ্বরের প্রতিভূ জীবগণের কল্যাণ সাধনে ব্রতী হয়। ঈশ্বরের প্রতিনিধি স্বরূপ জাগতিক ন্যায়দণ্ডধারী বিচারকেরা ধর্মাধিকরণ নামে চিহ্নিত। বিচারালয়কে বলা হয় ধর্মস্থান। কেন?

ভারতীয় অনুশাসনের সাম, দান, ন্যায়, দণ্ড, নীতি ও ভেদ-এর রাজধর্ম রক্ষার পবিত্র কর্তব্যে যাতে এতটুকু অন্যায়, অধর্ম প্রবেশ করতে না পারে তার জন্যই ওইসব মহাভারতীয় নীতির অনুসরণ। বিধিবৎ প্রকৃষ্ট-জাতক সৃষ্টি করে প্রজা পালনের স্বার্থেই ওই অনুশাসনকে আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি। তথাপি যখন ভারতীয় শাসন সংহিতা বা সংবিধান ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ না করে, ধর্ম এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়কে এক করে ফেলে ‘ধর্ম-নিরপেক্ষতাবাদ’,––অর্থাৎ রাষ্ট্র ধর্মের অনুবর্তী নয়’-এর মতবাদকে প্রতিষ্ঠা দেয়, তখন কি মনে হয় না, আমরা জাতীয়তাবাদের আদর্শের প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েও এক পরস্পর বিরোধী আচরণ করে চলেছি !

বর্তমান যুগ-পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কথিত ধর্মের যুগান্তকারী সংজ্ঞা ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম বলে জানিস তাকে। ধর্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম না-রে।’ সমন্বয় বার্তাবহ বাণীকে গুরুত্ব না দিয়ে ধর্মের নামে, ভারতীয় সংহিতার নীতি বহির্ভূত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তি পরায়ণতার আস্ফালনকে, কতগুলো অনিত্য, অসার, পৌত্তলিক কু-সংস্কারকে যদি ‘ধর্ম’ নামে প্রতিষ্ঠা দিতে চাই, তা’ কি বিচক্ষণতার পরিচায়ক হবে, না ভারতবর্ষের কৃষ্টির পরিপূরক হবে? ওই ভুলের বোঝা কি আমাদের চিরদিন বইতে হবে? আমাদের বুদ্ধি, বোধ কি নিরেটই থেকে যাবে?

যে নীতি-বিধি পদার্থের অস্তিত্ব রক্ষার সহায়ক তাই তো ধর্ম। পদার্থের স্বকীয়তা ধারণ করে রাখার সহায়ক যা’ তাই ধর্ম। ধর্ম পালন করলেই পদার্থ টিঁকে থাকবে, নচেৎ থাকবে না। সংসদ প্রকাশিত ইংরেজী অভিধানে ধর্মের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘It is an action, one is bound to do.’ সেই ধর্মের আবার পক্ষ আর নিরপেক্ষ কি? বেঁচে থাকার অজৈব উপকরণ বায়ু, জল, মাটি ইত্যাদির যদি ধর্ম থাকতে পারে, এবং তা’ যদি বিজ্ঞানের বইতে পাঠ্য হতে পারে, তাহলে মানুষের কি ধর্ম নেই? মনুষ্যত্ব প্রকাশের মাধ্যমেই তো মানুষ ধার্মিকতার পরিচয় দেয়। মানুষের মনুষ্যত্বের অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার নীতিবিধি-সমন্বিত ভারতের নিজস্ব সংহিতাগুলোর বিধানসমূহ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের সংহিতায় স্থান পাবে না কেন, প্রজাদের শিক্ষা দিতে পাঠ্য করা হবে না কেন?

রাষ্ট্রের সৃষ্টিই তো প্রজাদের অধর্ম বা দুর্নীতি থেকে মুক্ত করে ধার্মিক, অর্থাৎ সু-নীতি পরায়ণ করে তোলার জন্য। সেই রাষ্ট্র যদি তার প্রজাবর্গকে, তাদের পিতৃ-পিতামহের আদর্শ অনুসারী ধর্ম-পরায়ণ, কৃষ্টি-পরায়ণ হতে উৎসাহ না দিয়ে, প্রবৃত্তি-পরায়ণতায় উৎসাহ দেয়, সেটা ভারতবর্ষের জাতীয় উত্তরাধিকারত্বের অস্তিত্বকে বিপন্ন করার বার্তা ভিন্ন আর কিছু নয়।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র নির্মাণের পক্ষপাতি ছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘‘আমি চাই—প্রেরিতদের স্বীকার ও অনুসরণ, তাঁদের মধ্যে ভেদ না করা, বর্তমান প্রেরিত পুরুষের মধ্যে পূর্বতনদের পরিপূরণ অনুধাবন করা. পিতৃকৃষ্টি ও ঐতিহ্যের অনুসরণ, বর্ণাশ্রমের অনুপালন, দশবিধ সংস্কারের প্রবর্তন, যজন যাজন ইষ্টভৃতি স্বস্ত্যয়নী ও সদাচারের অনুষ্ঠান, বিহিত শিক্ষা, উদ্ভাবনী সেবানুসন্ধিৎসু কৃষি শিল্প বাণিজ্য ও বিজ্ঞান, জাতির স্বাস্থ্য আয়ু ও কর্মশক্তির পুনরুদ্ধার, আপদ ও অসৎনিরোধী ব্যবস্থা ও নিরাপত্তার প্রস্তুতি, পারস্পরিক সহযোগিতা ইষ্টানুগ সংহতি, বড়কে ছোট করা নয় ছোটকে বড় করে তোলা, ব্যাক্তিস্বাতন্ত্র্য ও সামাজিক তথা রাষ্ট্রিক কল্যাণের সমন্বয় সাধন—এক কথায় প্রয়োজনীয় যা-কিছুর সত্তাসম্বর্ধনী বিন্যাস ও উন্নয়ন।’’ (আলোচনা-প্রসঙ্গে, ৪র্থ খণ্ড)

আর্য্য ভারতবর্ষের আদি সংবিধান ‘ব্রহ্মসূত্র’-এর নবীন সংস্করণ ‘কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র’ অনুযায়ী–-

‘‘সুখস্য মূলম্ ধর্ম্মম্

ধর্ম্মস্য মূলম্ অর্থম্

অর্থস্য মূলম্ রাষ্ট্রম্

রাষ্ট্রস্য মূলম্ ইন্দ্রিয় বিজয়ম্

ইন্দ্রিয় বিজয়স্য মূলম্ জ্ঞানবৃদ্ধ সেবয়া

জ্ঞানবৃদ্ধ সেবয়া বিজ্ঞানম্।’’

অর্থাৎ সুখী হতে হলে ধর্ম পালন করতে হবে। প্রকৃত ধার্মিক হতে হলে পুরুষার্থের চতুর্বর্গ সমন্বিত আশ্রমধর্ম (বর্ণাশ্রম এবং চতুরাশ্রম) পালন করতে হবে। সঠিকভাবে আশ্রমধর্ম পালন করার স্বার্থে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী প্রজাদের দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী হবার জন্য গুরু গ্রহণ করতে হবে। গুরুর আদেশ-নিদেশ পালন করলে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করা যাবে। তবেই জীবনে সুখী হওয়া যাবে। এই হলো ভারতবর্ষের ধর্মের মূল কথা।

ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টি অনুসারে, ‘‘যেনাত্মন্ স্তথান্যেষাং জীবনংবর্দ্ধাঞ্চপি ধ্রীয়তে য স ধর্ম্মঃ।’’ অর্থাৎ, অন্যের বাঁচা এবং বৃদ্ধি পাওয়াকে অক্ষুন্ন রেখে, মানুষ বাঁচার জন্য, বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য যা’ যা’ করে, তাই ধর্ম। ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। ধর্ম আচরণের মাধ্যমে পালন করার জিনিস, অনুভব করার জিনিস, যা’তে প্রতিটি সত্তা তার অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করতে পারে, তার অনুশীলন করা।

অথচ বাস্তব চিত্রটার সাথে মেলানো যাচ্ছে না ধর্মকে। বর্তমানে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্মের নামে চলছে বাহ্যপূজা, পৌত্তলিকতার প্রকাশ, হৈ-চৈ, প্রকাশ্যে প্রাণীহত্যা, পরিবেশ-দূষণ, রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায়। রাস্তা আটক করে, চাঁদার জুলুম করে, জনজীবন বিপর্যস্ত করে, তারস্বরে মাইক বাজিয়ে, বাজি ফাটিয়ে, অবধ্য, নিরীহ প্রাণীদের হত্যা করে ধর্ম উদযাপন করার বিধি কোন মহাপুরুষ, কোন সাধক, কোন নবী, কোন ঋষি, প্রবর্তন করেছেন কি? যদি না করে থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রের কর্তব্য সব সম্প্রদায়কে প্রকৃত ধর্ম পালনে উৎসাহিত করা। ধর্মের নামে বিধি-বহির্ভূত অসদাচারের অনুষ্ঠানের উদযাপনকে কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা।

ভারতের আর্য্য-ঋষিগণ, অবতার-বরিষ্ঠগণ প্রত্যেকেই সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির উপাসনার কথা বলেছেন ধর্মের নামে, পূজার নামে। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আরও একটু সহজ করে দিয়ে বললেন, ‘‘ধর্ম্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম্ম না-রে। অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম্ম বলে জানিস্ তাকে। পূর্বতনে মানে না যারা/জানিস্ নিছক ম্লেচ্ছ তা’রা।’’ ‘‘পূজা-আর্চ্চা মানেই কিন্তু /দৈবগুণ যা সেধে নেওয়া। হাতে-কলমে মক্স করে/বাস্তবে তার রূপটি দেওয়া।।’’ ইত্যাদি ছড়াবাণীগুলো সহজ, সরল, ওজস্বী আবেদনে সমৃদ্ধ হলেও একটা নির্দিষ্ট গণ্ডীর ভাষা-ভাষীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ওই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দিতে তিনি বললেন, ‘Upholding urge of existence is Dharmma.’ বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্তা বা অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করে উৎকর্ষতায় রক্ষা করার নাম ধর্ম। তথাপিও আমরা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতার, কু-সংস্কারের, অজ্ঞানতার আবরণ ভেদ করে শুদ্ধ আমিটাকে বের করতে ব্যর্থ হলাম। তথাকথিত ইনটেলেকচ্যুয়াল হওয়া সত্বেও ধর্মের নামে ফুল, বেলপাতা, ধূপবিহীন ধূপকাঠি, ফল-মিষ্টান্নাদির অঢেল আয়োজনে, মাইক বাজিয়ে, শব্দবাজির আওয়াজ দিয়ে পরিবেশবিদদের চিন্তার বলিরেখায় ভাঁজ ফেলে দিতে ইন্ধন যোগাচ্ছি। আর আমাদের গর্বের রবীন্দ্রনাথ আমাদের দ্বিচারিতা দেখে কষ্ট পাচ্ছেন আর ভাবছেন, যে মানুষগুলো ‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তলে’ ইত্যাদি ছন্দের ডালি সাজিয়ে ভক্তির আবেদন জানায়, তারাই আবার পূজার নামে কু-সংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে বিশ্বাত্মাকে দূষিত করে চলেছে।

আমাদের বর্তমান যুগ যে যুক্তিবাদী সে কথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি অস্বীকার করবেন না আশাকরি। যেমন, সন্তানের হয়ে মা খেলে সন্তানের পেট ভরবে না। ছাত্রের হয়ে শিক্ষক লেখাপড়া করলে ছাত্র পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে না।–তেমনি প্রচলিত পূজার আয়োজকদের হয়ে কোন পুরোহিত পূজা করলে আয়োজকদের কিছু ফললাভ হবে কি ?

অবশ্য পুরোহিতও জানেন না ফললাভের বিষয় সম্পর্কে। যদি জানতেন বিসর্জন মন্ত্রে বলতেন না—ওঁ আবাহনং ন জানামি, নৈব জানামি পূজনম্। বিসর্জনং ন জানামি ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি (পরমেশ্বর)।–-অর্থাৎ আমি আবাহনও জানিনা, বিসর্জনও জানিনা, আমাকে ক্ষমা করুন। (দ্রঃ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)

বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী পূজ্য-প্রতিমা চঞ্চল চিত্তের ধারণের জন্য একটি অবলম্বন। প্রতিমাকে ব্রহ্মের রূপ কল্পনা করে উপাসনা, সংযম, সাত্তিক আহার, সাত্তিক বিহার ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে পূজা করা হয়।–-যাতে পূজক বা উপাসক মনসংযোগ দ্বারা প্রতিমাকে হৃদয়ে ধারণ করে প্রতিমার গুণে গুণান্বিত হতে পারে। এই হলো প্রতিমা পূজার মূল কথা।

পূজা বিষয়ে মহানির্ব্বাণতন্ত্র নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ

‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ।

অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’

মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ভারতে বিবেকানন্দ গ্রন্থের ৩৩৬ পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট। ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’

আমরা এমনই অধম যে, ধর্মের নামে প্রাণী হত্যা পর্যন্ত করতে আমাদের বিবেকে বাধে না। আমাদের প্রামাণ্য হিন্দু শাস্ত্রে কোথাও প্রাণী হত্যার অনুমোদন নেই। উপনিষদে ‘আত্মবৎ সর্ব্বভূতেষু’ মন্ত্রে প্রতিটি প্রাণের স্পন্দনকে রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। ‘মাতৃবৎ পরদারেষু’ মন্ত্রে সকল নারীদের মায়ের মত দেখতে বলা হয়েছে। ‘লোষ্ট্রবৎ পরদ্রব্যেষু’ মন্ত্রে অন্যের সম্পদকে মাটির ঢেলার মত দেখতে বলা হয়েছে। রাষ্ট্রের কর্ণধারগণ যদি ওইটুকুও মেনে চলতেন এবং প্রজাদের চলতে উৎসাহিত করতেন, তাহলেও আমাদের উত্তরাধিকার নিয়ে গর্ব করা যেত।

সর্বশ্রেষ্ঠ হিন্দু ধর্মগ্রন্থ মহাভারতের অনুশাসনপর্ব ১১৪ অধ্যায়ে বলা হয়েছে—

“যে ব্যক্তি মোহ প্রভাবে পুত্র-মাংস-তুল্য অন্যজীবের মাংস ভক্ষণ করে, সে অতি জঘন্য প্রকৃতির এবং তার সেই জীবহিংসা বহুবিধ পাপযোনিতে জন্মগ্রহণ করবার একমাত্র কারণ বলে নির্দিষ্ট হয়।“

শুধু হিন্দু মতেই নয়, কোন ধর্মীয় মতবাদে জীবহত্যা স্বীকৃত নয়।

কোরানে, আর্য্য হিন্দু-শাস্ত্রে এবং পুরুষোত্তমদের বাণীতে কোথাও ‘বলিদান’ বা ‘কোরবাণী’-র নামে প্রাণী হত্যার অনুমোদন নেই।

‘কোরবাণী’ কথাটির উৎপত্তি আরবীর ‘কুরবান’ থেকে। ‘কুরবান’ মানে উৎসর্গ, বলি। আবার বলি মানে দান। তন, মন, ধন কর কুরবানী অর্থাৎ কায়, মন, ধন পরমেশ্বরের জন্য উৎসর্গ কর। এই আত্মোৎসর্গ বা আত্ম-বলিদানই প্রকৃত বলি বা কোরবাণী।

মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ আল-কোরানে বলা হয়েছে, “এদের মাংস আর রক্ত আল্লাহর কাছে পৌছায় না, কিন্তু তোমার ভক্তি তার কাছে পৌছায়।” (সুরা ২১/৩৭)

“আল্লার নিকট তাহার মাংস ও তাহার রক্ত কখন পৌঁছে না বা তিনি তাহা ইচ্ছা করেন না। বরং তোমরা অসৎকর্ম্ম হইতে নিজেকে রক্ষা কর ইহাই তিনি ইচ্ছা করেন। তিনি আমাদের অধীনে থাকিয়া কার্য্যনির্বাহের জন্য পশু সৃষ্টি করিয়াছেন—সেজন্য তোমরা খোদার নিকট নম্র ও নিরীহ হইতে শিক্ষালাভ করিবে। এই সৎপথ-প্রাপ্তির অর্থাৎ সৎ-শিক্ষার জন্যই খোদা এই ব্যবস্থা করিয়াছেন। যাহারা অন্যের মঙ্গল সাধন করে, তাহাদের মঙ্গল করিয়া থাকেন ……..” (কোর-আণ—২২ হজ ৩৭ র, ৫) অথচ কোরবানীর নামে অবাধে নিরীহ পশুদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়!

ভগবান বুদ্ধদেব বলেছেন, “আমি কখনই কাউকে মাংস খাওয়ার অনুমোদন করি নি, করি না এবং করব না।” (লঙ্কাবতার সূক্ত)

প্রভু যিশু বলেন, “তুমি হত্যা করিও না” । (এক্সোডাস – 20:13)

“যে একটি ষাড়কে হত্যা করলো, সে যেন একটি মানুষকে হত্যা করলো।” (ইসা – 66:33)

উক্ত অনুশাসনবাদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যে নিজেকে পরমেশ্বরের সন্তান বা খোদাতাল্লার বান্দা মনে করবেন তিনি কখনই কোন প্রাণীকে ব্যথা দেবেন না, হত্যা করবেন না এবং প্রাণীর রক্ত-মাংসে ক্ষুধার নিবৃত্তি করবেন না।

ধর্ম পালনের জন্য নির্দিষ্ট ওইসব অনুশাসনাবলী মেনে চলা স্বভাবতই নাগরিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। রাষ্ট্রের কর্ণধারগণ যদি ওই নাগরিক কর্তব্য পালনে উদাসীন হয়ে ধর্মের নামে ‘যেমন খুশি তেমন’ উৎসব উদযাপনের ছাড়পত্র দেয়, প্রাণীহত্যা বন্ধ করতে তৎপর না হয়, পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে সচেষ্ট না হয়—তাহলে, তথাকথিত ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষজন ধর্মের নামে প্রবৃত্তি-প্ররোচিত অধর্মের আচরণ করার সুযোগ পেয়ে যায়, পরিবেশ দূষণ হয়, জনজীবন বিপর্যস্ত হয়।

* * *

আমরা আমাদের ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদে আর্য্যজাতির মহান গ্রন্থ ‘মহাভারত’-কে স্বীকৃতি দিয়েছি। সেই স্বীকৃতির অধিকারে স্বীকৃতি পেয়েছে ‘শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতা’। সেই সূত্রে স্বীকার করে নিতে হয় মহান রাজনীতিবিদ্ পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণকে। স্বীকার করে নিতে হয় ‘শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতা’ প্রদত্ত––‘গতির্ভর্ত্তা প্রভুঃ প্রেষ্ঠ ঈশ্বরঃ পুরুষোত্তমঃ।/আব্রহ্মস্তম্বভৃদ্ধাতা সদগুরুস্ত্বং নমহোস্তুতে।।’ বাণীর শাশ্বত বার্তাকে। অতএব, আমাদের প্রকৃত উত্তরাধিকার প্রাপ্তির সূত্রই হলো সদগুরুর দীক্ষা গ্রহণ করে তাঁর নীতি-নিদেশ মেনে চলা। তাঁর আদর্শের প্রতি আনতি সম্পন্ন হয়ে চলা।

আমরা ‘মেরা ভারত মহান’ বলে চিৎকার করবো অথচ ভারতীয় কৃষ্টির ধারা অনুসরণ করবো না, পরিপালন করবো না, প্রচার করবো না, তা’-তো হতে পারে না! যদি আমরা সত্যিসত্যিই ওই মহান অনুশাসন মেনে নিতাম তাহলে কি ভারতীয় টিভিতে, সিনেমাতে, পুস্তকে, রাস্তাঘাটে ভারতীয় কৃষ্টির অনুশাসন পরিপন্থী, প্রবৃত্তি-প্ররোচিত স্পর্শকাম, দর্শকাম, শ্রুতিকাম, হিংসা-দ্বেষ প্রদর্শিত এবং প্রচারিত হয়ে মনুষ্যত্বকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারতো? ওইসব প্রবৃত্তি-প্ররোচিত আদর্শের কবলে পড়ে আমরা ভুলতে বসেছি আমাদের জাতীয় আদর্শ, আমাদের প্রকৃত উত্তরাধিকারের তত্ত্বকে।

চিদানন্দ সম্পদের অধিকারী আমার, আপনার, আমাদের প্রাথমিক পরিচয় কি, একটু ভেবে বলুন তো? না, না, নার্ভাস হবার কিছু নেই। এককথায় এর উত্তর যে ‘মানুষ’, তা’ প্রগতিশীল, প্রতিক্রিয়াশীল প্রত্যেকেই স্বীকার করবেন। আর এ-ও স্বীকার করবেন যে, আমরা আকাশ থেকে শিলাবৃষ্টির সাথে একদিন হঠাৎ এই মহীতলে পতিত হইনি কোন গ্রহান্তরের প্রাণী হিসেবে। অযোনী-সম্ভূতও নয়। আমরা প্রত্যেকেই মাতৃদেবীর গর্ভবাসকাল শেষ করে অপত্যপথে, না হয় নিম্ন-উদরচেরা হয়ে পৃথিবীর আলো-হাওয়ার সাথে পরিচিত হয়েছি। পুরুষ-পরম্পরাগত জৈবী-সত্তার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দেহ-মন-প্রাণ নিয়ে। প্রত্যেকের বৈশিষ্ট্য আলাদা আলাদা। যেহেতু পৃথক পৃথক বংশের ধারা নিয়ে আমরা জন্মেছি। এই তথ্যকে অস্বীকার করলে জীব-বিজ্ঞানকেও অস্বীকার করতে হয়।

বিজ্ঞানের মানদণ্ডে, পিতৃ-মাতৃ বংশের ধারার সাথে নিজেদের অর্জিত দোষ-গুণ মিলেমিশে তৈরি genetic code Meiotic cell division-এ বিভাজিত হয়ে প্রস্তুতি নেয় উত্তর পুরুষ সৃষ্টির। মায়ের আকুতি, ভাবাবেগ সম্বর্দ্ধিত Ectoplasmic body বা লিঙ্গ-শরীর বা আত্মা আশ্রয় গ্রহণ করে পিতার পুং-জননকোষের কোষাণুপুঞ্জে। দৈবরূপী বীজকে পুরুষাকাররূপী প্রকৃতি বা ডিম্বাণু করে বরণ। পিতার এবং মাতার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সংস্করণ, দুটি অর্দ্ধ কোষাণু (y+x, or, x+x chromosome) এক হয়ে সৃষ্ট হয় একটি পূর্ণাঙ্গ কোষ। একটা প্রজন্মের ভ্রূণ। পিতামাতার আত্ম-প্রতিলিপির প্রতিনিধি স্বরূপ।

কোন ভ্রূণ বিস্তৃতি লাভ করে জীবনবাদের গান গেয়ে যায়। কেউ ধ্বংসকে ডেকে আনে। কেউ ঝরে যায় অকালে। আমরা কেউ চাই না আমাদের উত্তরাধিকার অকালে ঝরে যাক, বিকৃত হয়ে জন্মাক। তবুও জন্মে যায় আমাদের অজ্ঞতার জন্য। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জাগতিক সম্পদ, ভোগের উপকরণ ম্লাণ হয়ে যায় যদি থ্যালাসেমিয়া, স্কিজোফ্রেনিয়া, হিমোফিলিয়ার ন্যায় দুরারোগ্য বংশগত রোগে আক্রান্ত হয় চিদানন্দ শক্তির অংশ কোনো উত্তরপুরুষ।

বিকৃত উত্তরাধিকার সমস্যা সৃষ্টির মূলে কিন্তু আমরাই। ভারতীয় বর্ণাশ্রমধর্ম্ম, ভারতীয় দশবিধ সংস্কারের অনুশাসন না মেনে তথাকথিত প্রগতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে সংগতি রাখতে পারিনা জীবনধর্মের সাথে। ফলে বিপর্যয় এসে যায় ব্যষ্টি, সমষ্টি এবং রাষ্ট্র জীবনে।

আমাদের জাতীয় জীবনের উত্তরাধিকারকে সুরক্ষিত রাখতে আমাদের ভারতীয় ঋষিগণ ‘বর্ণাশ্রম ধর্ম্ম’, ‘দশবিধ সংস্কার’ নামে কতগুলো জীবনীয় সংস্কার প্রবর্তন করেছিলেন। বর্তমানের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী প্রগতিবাদীরা ওইসব বিধান শুনে যারা মনে মনে ‘বিজ্ঞানের যুগে কুসংস্কার’ শীর্ষক সমালোচনার জন্য তৈরি হচ্ছেন, তাদের জন্য গুটি কয়েক বিজ্ঞানের তথ্য নিবেদন করছি Davidson’s Practice of Medicine, 16th edition, Genetic Factor of Disease Chapter থেকে।

“In survey carried out in Edinburgh a few years ago, no less than 50% of childhood deaths could be attributed to genetic disease. The contribution of genetic factors to mortality and morbidity in adults is mere difficult to assess but is also increasing.”…..

“…..Several extensive studies have shown that among the offspring of consanguineous matings there is an increase of perinatal mortality rate together with an increased frequency of both congenital abnormalities and mental retardation………”

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ওই তথ্য অনুযায়ী বর্তমান বিশ্বে শতকরা ৫০টি শিশু মৃত্যুর কারণ পোলিও নয়, উত্তরাধিকারে প্রাপ্ত জেনেটিক ডিজিজ। বিসদৃশ যৌনমিলনজাত ওই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবার একমাত্র উপায় হিসেবে বলা হয়েছে, বিশ্বস্ত বংশে সদৃশ বিবাহ এবং সুপ্রজনন নীতির পরিপালন।––যা’ ভারতীয় বর্ণাশ্রমধর্ম ও দশবিধ সংস্কার পালনের মধ্যে নিহিত রয়েছে। বর্ণাশ্রমধর্ম ও দশবিধ সংস্কার পালনের মাধ্যমে প্রতিটি বংশের কুলপঞ্জীর মর্যাদা রক্ষা করে যারা নির্মল, নিষ্কলুষ উত্তরাধিকারীদের সৃষ্টি করতে পারবেন, তাদের বংশধরগণ দুরারোগ্য ব্যাধি এবং অকাল মৃত্যুর কবল থেকে সুরক্ষিত থাকবেই। নচেৎ উত্তরাধিকারীদের নিয়ে নানা সমস্যায় জর্জরিত হতে হবে।

তাই বলছিলাম কি, সদগুরুর দীক্ষা নিয়ে, বিধিবৎ বৃত্তি নিয়ন্ত্রণ মাধ্যমে তাঁর প্রদত্ত সংস্কারে সংস্কৃত হতে পারলে উত্তরাধিকারে পাওয়া বিকৃত রূপটাকে সযত্নে পরিহার করে, বৃদ্ধি পেতে না দিয়ে, উত্তরাধিকারে পাওয়া ভালোটুকুকে সুস্থ পরিষেবা দিয়ে যদি একটা সুস্থ প্রজন্ম উপহার দিয়ে যেতে পারি ভারতমাতাকে, তবেই বোধহয় মানুষ হিসেবে সঠিক পরিচয় রেখে যেতে পারবো। তাই নয় কি?

‘ভারাক্রান্ত হৃদয়ের যা’ কিছু মলিনতা’ ইষ্টীপূত প্রবাহে ধুয়েমুছে রত্নগর্ভার আধার স্বরূপিণী কল্যাণীয়া মায়েরা, গুরুর নিদেশ মেনে, স্বামীর মনোবৃত্ত্যানুসারিণী হয়ে চলতে পারলেই হয়তো অচিরেই আগমন হতে পারে শুদ্ধাত্মাদের।

‘শুদ্ধাত্মাদের’ জন্ম দিয়ে জাতীয় উত্তরাধিকার রক্ষার দায়িত্ব কি শুধু মেয়েদের, ছেলেদের কি কোন দায়িত্বই নেই? ––বর্তমান প্রজন্মের কল্যাণীয়া মায়েদের মনে এই প্রশ্নটা জাগা স্বাভাবিক। হ্যাঁ, ছেলেদের অবশ্যই দায়িত্ব আছে,––

‘ইষ্ট ঝোঁকে ছুটলে পুরুষ প্রজ্ঞা অনুপমা

স্বামীর ঝোঁকে ছুটলে নারী শ্রেষ্ঠ ছেলের মা।’

পুরুষদের ইষ্টনিষ্ঠ হতে হবে, পূরণকারী হতে হবে, ‘‘প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী। প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ এমনতর ভাবতে হয়।’’-–বাণীকে মেনে চলতে হবে। এবং সে দায়িত্ব স্বয়ং বিধাতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রই দিয়েছেন। কিন্তু মায়েদের উপর দায়িত্ব একটু বেশি করে দিয়েছেন।

‘‘নারী হতে জন্মে জাতি

বৃদ্ধি লভে সমষ্টিতে

নারী আনে বৃদ্ধি ধারা

নারী হতেই বাঁচাবাড়া

পুরুষেতে টানটী যেমন

মূর্ত্তি পায় তা সন্ততিতে ।

অভ্যাস ব্যবহার যেমনতর

সন্তানও পাবি তেমনতর।

স্বামীতে যার যেমনি রতি

সন্তানও পায় তেমনি মতি ।

স্বামীর প্রতি যেমনি টান

ছেলেও জীবন তেমনি পান ।

যে ভাবেতে স্বামীকে স্ত্রী

করবে উদ্দীপিত

সেই রকমই ছেলে পাবে

তেমনি সঞ্জীবিত ।”

‘‘মা হ’লো মাটির মত। মা যদি স্বামীগতপ্রাণা হয়, নিজের প্রবৃত্তির উপর তার যে নেশা, তা’ থেকে যদি তার স্বামীনেশা প্রবলতর হয়, স্বামীকে খুশি করার জন্য নিজের যে কোন খেয়াল যদি সে উপেক্ষা করতে পারে, তাহ’লে তা’র ব্যক্তিত্বের একটা এককেন্দ্রিক রূপান্তর হয়। একে বলে সতীত্ব। তা’ থেকে তা’র শরীরের ভিতরকার অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিগুলির ক্ষরণ ঠিকমত হয় এবং সেগুলি আবার সত্তাপোষণী হয়। এইগুলি গর্ভস্থ সন্তানের শরীর-মনের ভাবী সুসঙ্গত বিকাশের পক্ষে যে-সব সারী উপাদান প্রয়োজন, সেগুলি সরবরাহ করে। এইসব ছেলেমেয়ে মাতৃভক্ত হয়, পিতৃভক্ত হয়, গুরুভক্ত হয়, সংযত হয়, দক্ষ হয়, লোকস্বার্থী হয়, চৌকস হয়, এরা সাধারনতঃ মোটামুটি সুস্থ, সবল ও দীর্ঘায়ুও হয়।’’ (আলোচনা প্রসঙ্গে পঞ্চদশ খণ্ড/৭৩)

বর্তমান যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ওই সঞ্জীবনী মন্ত্রের বাস্তব প্রয়োগে আমাদের ঘরের মেয়েরা যদি উপযুক্ত বরণীয় বর-কে বরণ করে আদর্শ বধূ, মনোবৃত্ত্যানুসারিনী স্ত্রী, আদর্শ জায়া হয়ে তাদের ভাবী সন্তানদের ভালোমন্দ পরিমাপিত করে গর্ভে ধারণ করতে পারেন, তা হলেই জন্ম নেবে সুস্থ দাম্পত্যের সুস্থ শিশু। এবং সেই সন্তানদের সদাচারের প্রলেপনে আধো কথার সময় থেকেই করে করিয়ে সদগুণের শিক্ষা ধরিয়ে দিতে পারেন,— তা হলেই সংরক্ষণ করা যাবে আমাদের আর্য্য ভারতবর্ষের জাতীয় উত্তরাধিকার।

প্রহ্লাদ, ব্যাসদেব, কৌটিল্য, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্রের ন্যায় কত-শত বিখ্যাত মনীষীদের শুদ্ধাত্মাদের লিঙ্গশরীর সেই আশায় পথ চেয়ে বসে আছেন। উপযুক্ত মা পেতে। এক বুক আশা নিয়ে, পথ চেয়ে বসে রয়েছেন মানুষ-পাগল পরমপিতাও। তাঁকে শুদ্ধাত্মার ডালির উপহার কে দেবে, সে-তো এক-একজন কয়াধু, সত্যবতী, কৌশল্যা, দেবকী, চন্নেশ্বরী, শচীমাতা, চন্দ্রমণি দেবী, ভুবনেশ্বরী দেবী, মাতা মনোমোহিনী দেবী, প্রভাবতী দেবীর ন্যায় প্রমুখ মায়েদের দ্বারাই সম্ভব। আমাদের আর্য্য ভারতবর্ষের উত্তরাধিকারের দায়িত্ব মায়েদেরই তো নিতে হবে। পরমপিতা যে পথ চেয়ে বসে আছেন আপনাদের দেওয়া উপহার পেতে।

সব্বাইকে জয়গুরু প্রণাম! সব্বাই ভালো থাকবেন, ভালো রাখবেন।

© tapandasd ©

––––

বর্ষবিদায়-বর্ষবরণ

।। প্রসঙ্গ : বর্ষবিদায়-বর্ষবরণ।।

নিবেদনে—তপন দাস

**************************

“অসতো মা সদ্গময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়।” (আমরা যেন অসতের মধ্যে থেকেও যেন সৎ থাকতে পারি। অন্ধকারের মধ্যে থেকেও যেন জ্যোতি দর্শন করতে পারি। মৃত্যুর মধ্যে থেকেও যেন অমৃত আহরণ করতে পারি।) এই হচ্ছে আমাদের ভারতীয় কৃষ্টির আদর্শ। সেই আদর্শের কথা ভুলে আমরা বিদায় দিতে চলেছি খৃস্টীয় 2023তম বছরকে। আমাদের করা অনিষ্ট ও ইষ্ট কর্মের জাবেদা খাতার খতিয়ান গুপ্ত চিত্রের ফোল্ডারে জমা রেখে আমরা বরণ করতে চলেছি খৃস্টীয় 2024তম বছ‍রকে। কোভিড-এর পুণরাগমন আশঙ্কার ভ্রূকুটির কথা মাথায় রেখে, লাগামহীন বেলেল্লাপনায় লাগাম দিতে প্রশাসনকে তৎপর থাকতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত স্বাস্থ্যের সংজ্ঞা মেনে, স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে এবছরও যদি অন্যান্য বছরের মতো বর্ষবরণের নামে নাচাগানা, স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর অভক্ষ্য ভোজনের খানাপিনা, অপসংস্কৃতির হৈহুল্লোরের বেলেল্লাপনা চলে,—তাহলে বুঝতে হবে, আমাদের দেশে প্রকৃষ্ট রূপে শাসিত সংস্কৃতিপরায়ণ প্রশাসক নেই। যারা আমাদের সবদিক থেকে দূষণমুক্ত নতুন বছর শুধু নয়, উপহার দেবেন এক বিশুদ্ধ প্রশাসন! তবে আমরা আশাবাদী, প্রশাসনের শাসনের ভয়ে যেন অপসংস্কৃতি দূর হয়, বিজ্ঞানীদের নির্দেশ মেনে পরিবেশ দূষণ বন্ধ হয়। আমাদের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা শয়তান যেন লোভ, ঈর্ষা, দ্বেষ, হিংসার হাতছানি ভুলে সবাইকে নিয়ে জীবনবর্দ্ধনের পথে এগিয়ে চলতে পারে। পরমপিতার ঈপ্সিত পরমরাষ্ট্রিক সমবায়ের লক্ষ্যে। তবেই সার্থক হবে বর্ষবরণের উৎসব। আচ্ছা, বাঙ্গালী হয়ে বাংলা বর্ষবরণের ক্ষেত্রে আমাদের উৎসাহ কেন ম্লান হয়ে যায়? একটা প্রশ্ন। পরিশেষে, খ্রীষ্টিয় বর্ষ-বিদায় এবং বর্ষ-বরণের প্রণাম জানিয়ে ইতি টানলাম। জয়গুরু।

খ্রীস্টাব্দ ২০২৩কে বিদায় ও ২০২৪কে বরণ স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য

।। খ্রীস্টাব্দ ২০২৩কে বিদায় ও ২০২৪কে বরণ স্মরণে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত সৎসঙ্গের ঋদ্ধি-তপনার ঋত্বিক সম্মেলন বনাম যুগধর্মের উৎসব ।।

নিবেদনে—তপন দাস

****************************************

কালের নিয়মে পল, দণ্ড, কলা, মুহূর্ত, প্রহর ইত্যাদি দিয়ে শুরু করে পৃথিবীর আহ্নিক গতিকে ১ অহোরাত্র ধরা হয়। ৩০ অহোরাত্রে ২ পক্ষ বা ১ মাস। ৬ মাসে ১ অয়ন। ২ অয়নে ১ বর্ষ। অপরপক্ষে উত্তরায়নে দেবতাদের ১ দিন, দক্ষিণায়নে ১ রাত। দেবতাদের ১ বছর সমান মানুষের ৩৬০ বছর ধরা হয়। বায়ুপুরাণে সৌর, সৌম্য, নাক্ষত্র এবং সাবন নামে চার প্রকার সময় নিরূপণ মাসের উল্লেখ আছে। ৩০ সূর্যোদয়ে সাবনমাস। সূর্যের রাশি পরিবর্তনে হয় সৌরমাস। কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ থেকে শুক্লপক্ষের পূর্ণিমা পর্যন্ত চান্দ্রমাস। চন্দ্রের নক্ষত্র ভোগকালকে বলা হয় নাক্ষত্রমাস। ৫ সৌরবর্ষে ১ নৈসর্গিক যুগ। (কোনো একটিমাসের আবর্তন কালকে একক ধরে নৈসর্গিক যুগের গণনা শুরু করা যেতে পারে।) ১ হাজার নৈসর্গিক যুগে ১ কল্প। সপ্তর্ষিরা ১০০ বছর করে এক একটি নক্ষত্রে কেন্দ্রীভূত থাকে। ২৭টি নক্ষত্র ভোগকাল ২৭০০ বছর—একটি সপ্তর্ষিযুগ। এই সপ্তর্ষিযুগের গণনা প্রাচীন ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল। ভারতের অন্যতম জ্যোতির্বিদ আর্য্যভট্ট নক্ষত্রাদির সাথে মেষরাশির অবস্থানকে কেন্দ্র করে কল্যব্দের সূচনা করেন ৩১০১ খৃঃ পূঃকে একক ধরে। সেই হিসেব এবং রাশির অবস্থান ধরে উত্তরায়নে ভীষ্মের দেহত্যাগ এর হিসেব কষে ২১৪২ খৃঃ পূঃ কে শ্রীকৃষ্ণের জন্মবর্ষ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

আমরা যে খৃষ্টাব্দ বলি এটা হচ্ছে গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডার। এটা একটি সৌর সন। নানা পরিবর্তন, পরিমার্জন, পরিবর্ধন, বিবর্তন এবং যোগ-বিয়োজনের মধ্য দিয়ে এ বর্তমান কাঠামো লাভ করেছে। উল্লেখ্য সৌর সনের সাথে ঋতুর সঙ্গে সম্পর্ক থাকে। বর্ষপঞ্জিকা প্রচলন অল্প পরিসরে প্রাচীন সুমের সভ্যতায় পরিলক্ষিত হয়। তবে মিশরীয় সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীনতম সৌর ক্যালেন্ডার উদ্বোধন করে বলে জানা যায়। প্রাচীন মিশরীয় ক্যালেন্ডার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, খৃস্টপূর্ব ৪২৩৬ অব্দ থেকে ক্যালেণ্ডার ব্যবহার গ্রহণ করে। রোমানরা তাদের প্রথম ক্যালেণ্ডার লাভ করে গ্রীকদের কাছ থেকে। রোমানদের প্রাচীন ক্যালেণ্ডারে মাস ছিল ১০টি এবং তারা বর্ষ গণনা করতো ৩০৪দিনে। মধ্য শীত মৌসুমের ৬০ দিন তারা বর্ষ গণনায় আনতো না। রোমানদের বর্ষ গণনার প্রথম মাস ছিল মার্চ। তখন ১লা মার্চ পালিত হতো নববর্ষ উৎসব। শীত মৌসুমে ৬০ দিন বর্ষ গণনায় না আনার কারণে বর্ষ গণনায় যে দুটি মাসের ঘাটতি থাকতো তা পূরণ করবার জন্য তাদের অনির্দিষ্ট দিন-মাসের দ্বারস্থ হতে হতো। এই সব নানা জটিলতার কারণে জনসাধারণের মধ্যে তখন ক্যালেণ্ডার ব্যবহার করার প্রবণতা একেবারেই ছিল না। রোমের উপাখ্যান খ্যাত প্রথম সম্রাট রমুলাসই আনুমানিক ৭৩৮ খৃস্টপূর্বাব্দে রোমান ক্যালেন্ডার চালু করার চেষ্টা করেন। পরবর্তীকালে রোমান সম্রাট নূমা ১০ মাসের সঙ্গে আরো দুটো মাস যুক্ত করেন। সে দুটো মাস হচ্ছে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি। তিনি জানুয়ারিকে প্রথম মাস ও ফেব্রুয়ারিকে শেষ মাস হিসাবে যুক্ত করেন। জানুয়ারি মাস ধার্য করা হয় ২৯ দিনে এবং ফেব্রুয়ারি মাস ধার্য করা হয় ২৮ দিন। এ ছাড়াও তিনি মারসিডানাস নামে অতিরিক্ত একটি মাসেরও প্রবর্তন করেন। এই মারসিডানাস মাস গণনা করা হতো ২২ দিনে। এই অতিরিক্ত মাসটি গণনা করা হতো এক বছর অন্তর ফেব্রুয়ারি মাসের ২৩ ও ২৪ তারিখের মাঝখানে। খৃস্টপূর্ব ৪৩২ অব্দে সম্রাট নূমা কর্তৃক প্রবর্তিত মাসের হিসেব পরিমার্জন ও পরিবর্তন করা হয়। পরবর্তীকালে রোমানরা চার বছর অন্তর লীপ ইয়ারের হিসেব প্রবর্তন করে। এ হিসেবেও এক বছরের সঙ্গে অন্য বছরের দিন সংখ্যার হেরফের হতে থাকে। চার বছর অন্তর অতিরিক্ত একটি দিন যোগ করলে দেখা যেতো দিনের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সীজার মিশরীয় ক্যালেন্ডার রোমে চালু করেন। তিনি জ্যোতির্বিদদের পরামর্শে খৃস্টপূর্ব ৪৬ অব্দে সেই বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের মাঝখানে ৬৭ দিন এবং ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে ২৩ দিন এই মোট ৯০ দিন যুক্ত করে ক্যালেণ্ডার সংস্কার করেন। এই ক্যালেন্ডার জুলিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত হয়। এই ক্যালেন্ডারে মার্চ, মে, কুইন্টিলিস (জুলাই) ও অক্টোবর দিন সংখ্যা ৩১ দিন, অপরদিকে জানুয়ারি ও সেক্সটিনিস (আগস্ট) মাসের সঙ্গে দুইদিন যুক্ত করে ৩১ দিন করা হয়। ফেব্রুয়ারি মাস ২৮ দিনেই গণনা হতে থাকে। তবে প্রতি চার বছর অন্তর একদিন যুক্ত করা হয়। জুলিয়াস সীজারের নামানুসারে প্রাচীন কুইন্টিলিস মাসের নাম বদলিয়ে রাখা হয় জুলাই। ৪৪ খৃস্ট পূর্বাব্দের ১৫ মার্চ জুলিয়াস সীজার রোমনগরে নিহত হন। অন্যদিকে সম্রাট অগাস্টাসের নামানুসারে সেক্সটিনিস মাসের নাম পাল্টিয়ে অগাস্ট করা হয়। মিশরীয়রা সৌর বর্ষ গণনা করতো ৩৬৫ দিনে। কিন্তু জুলিয়াস সীজারের সংস্কারের ফলে তা তিনশ’ সাড়ে পঁয়ষট্টি দিনে এসে দাঁড়ায়। তখন থেকে বর্ষপঞ্জিতে ১ মার্চের পরিবর্তে ১ জানুয়ারীতে নববর্ষ প্রচলন হয়। খৃষ্টাব্দের সংখ্যাকে ৪ দিয়ে ভাগ করলে যদি মিলে যায়, তবে সে বছর ফ্রেব্র“য়ারী মাস ২৮ দিনের পরিবর্তে ২৯ দিন হবে। । যীশুখৃস্টের জন্ম বছর থেকে গণনা করে ডাইওনীসিয়াম এক্সিগুয়াস নামক একখৃস্টান পাদরী ৫৩২ অব্দ থেকে খৃস্টাব্দের সূচনা করেন। ১৫৮২ খৃস্টাব্দে রোমের পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরী জ্যোতির্বিদগণের পরামর্শে জুলিয়ান ক্যালেণ্ডার সংশোধন করেন। তার নির্দেশে ১৫৮২ খৃস্টাব্দের অক্টোবর ১০ দিন বাদ দেয়া হয়, ফলে ঐ বছরের ৫ তারিখকে ১৫ তারিখ করা হয়। পোপ গ্রেগরী ঘোষণা করেন যে, যেসব শত বর্ষীয় অব্দ ৪০০ দ্বারা বিভক্ত হবে সেসব শতবর্ষ লিপ ইয়ার হিসাবে গণ্য হবে। পোপ গ্রেগরীর বর্ষপঞ্জি সংস্কারের পর থেকে রোমান বর্ষপঞ্জি পন্ডিতদের কাছে গ্রেগরীয়ান বর্ষপঞ্জি হিসাবে খ্যাত হয়েছে। কিন্তু এ সংস্কার মানুষ সহজে মেনে নেয়নি। ইউরোপের দেশে দেশে এ নিয়ে চলছিল দীর্ঘদিনের বাদ-প্রতিবাদ। তদুপরি খৃষ্টানদের রোমের ‘ক্যাথলিক’ বনাম ‘প্রোটেসটেন্ট’ বিরোধের কারণে গ্রেগরীয়ান সংস্কার গ্রহণে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছিল। অবশেষে ১৭৫২ সালে ইংল্যান্ডে ১৯১২ সালে চীনে ও আলবেনিয়াতে, ১৯১৮ সালে রাশিয়াতে ও ১৯২৭ সালে তুরস্কে সরকারীভাবে গ্রেগরীয়ান বর্ষপঞ্জি গৃহীত হয়। যীশুখৃষ্টের নামের সঙ্গে রোমানদের ধারাবাহিক বর্ষ গণনা বা খৃষ্টাব্দ অপেক্ষাকৃত পরবর্তীকালের সংযোজন। যীশুখৃষ্টের মৃত্যুর ৭৫০ বছর পরে রোমেন খৃষ্টান পাদ্রীগণ ধারাবাহিক বর্ষ হিসাবে যীশুর স্মরণে পশ্চাদ গণনার মাধ্যমে খৃষ্টাব্দ চালু করেন। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী যীশুর জন্ম-বর্ষকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ‘খৃষ্টাব্দ’ চালু হয়েছে। সে হিসাবে বলা চলে যীশুখৃষ্টের জন্ম হয়েছিল ২০০৭ বছর আগে। আসলে কিন্তু তা নয়। যীশুর জন্ম বর্ষ পাবার জন্য প্রচলিত খৃষ্টাব্দের সঙ্গে আরও ৪ বছর যোগ করতে হবে। সম্ভবত তাঁর মৃত্যুবরণের ৭৫০ বছর পরে ‘খৃষ্টাব্দ’ চালু করার সময় রোমান পাদ্রীগণ প্রকৃত তথ্য খুঁজে পেতে ভুল করেছিলেন। তাছাড়া এ মহাপুরুষের প্রকৃত জন্মদিন বা তারিখ সম্পর্কেও বিভ্রান্তি রয়েছে। আজকাল সারা বিশ্বব্যাপী ২৫ ডিসেম্বর যীশুর জন্মদিন বা বড়দিন পালিত হয়। এক সময়ে খৃষ্টান পাদ্রীগণ জানুয়ারী মাসে যীশুর জন্মদিন পালন করতেন, তারও আগে ২০ মে তারিখ জন্মদিন উদযাপিত হত। ১ জানুয়ারী রোমান বর্ষপঞ্জির নববর্ষ; এদিনে খৃষ্টীয় সনের খৃষ্টাব্দের নববর্ষ শুরু হয়। কমবেশী সারাবিশ্বে দিবসটির একটি আবেদন রয়েছে। আমরা ১ জানুয়ারী থেকে নতুন ক্যালেন্ডার ব্যবহার করি। এই গ্রেগরীয়ান নূতন বছর বা খৃষ্টীয় সনকে ইংরেজি বর্ষপঞ্জি তথা ইংরেজি সন বলার প্রবণতা দেখা যায়। অনেকেই ১ জানুয়ারিকে ইংরেজি নববর্ষ হিসাবে চিহ্নিত করেন। অথচ ইংরেজি বর্ষপঞ্জি বা ইংরেজি সন বলতে প্রকৃত প্রস্তাবে কিছুই নেই। (সূত্র : সংগৃহীত)

***************************************

গণনার হিসেবের তারতম্য হলেও, দিনরাত-মাস-বছর হয়েই চলেছে আদিকাল থেকে প্রাকৃতিক নিয়মে। দিন-মাস-বছর আসে যায়, রেখে যায় কিছু স্মৃতি মনের মণিকোঠায়। ওইসব স্মৃতির মালাগুলোকে স্মৃতিবাহীচেতনার ভল্টে অনন্তকাল জমা করে রাখার জন্য আর্য্য-ঋষিরা প্রতিটি মুহূর্তের জীবন ধারণের আহরণকে শুদ্ধি করার মাধ্যমে ধ্রুবাস্মৃতির সন্ধান দিয়ে গেছেন। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র স্বস্ত্যয়ণী ব্রতের “নিয়তং স্মৃতিচিদযুতে” মন্ত্রে যাকে সমৃদ্ধ করেছেন। কেননা, যে মুহূর্ত চলে যাবে তা আর ফিরে আসবে না। চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা সমৃদ্ধ সবুজ গ্রহ পৃথিবীর প্রতিটি মুহূর্তকেই যাতে চিরনবীনতায় আস্বাদন করতে পারি, উপভোগ করতে পারি সেজন্যই আর্য্য সভ্যতার ঊষা লগনে পরমপিতার প্রতিভূ আর্য্য ঋষিগণ ‘‘মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ……..’’ মন্ত্রে বন্দনা করে বসুন্ধরার মধুময় পরিবেশকে রক্ষা অর্থাৎ পূজা করতে শিখিয়েছিলেন। পূজা শব্দের অর্থ সম্বর্দ্ধনা। যেমন যেমন আচরণে পরিবেশের অজৈব উপাদানসমূহকে রক্ষা করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া যায় তাই ছিল আর্য্য ভারতের পূজা, যজ্ঞ, হোম বা উৎসবের তাৎপর্য্য ।

আমরা যে ৩৩ কোটি দেবতার কথা শুনেছি সে সংখ্যাটা বাস্তবে ৩৩,০০০০০০০ নয়, শুধুই ৩৩। কোটি অর্থে piece বোঝান হয়েছে, যথা, জীবকোটি, ঈশ্বরকোটি শব্দ একক অর্থে ব্যবহৃত হয়।

এই সবুজ গ্রহের জীবকূলের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জৈবাজৈব রসদের যোগানদাতার মূল মালিক সূর্য। সূর্যের আর এক নাম আদিত্য। আদিত্য মানে দেবতা, দেদীপ্যমান যা’ তাকে দেবতা বলে। পৃথিবী, অন্তরীক্ষ ও দ্যুলোকের প্রতিটি স্থানে ১১টি করে বেঁচে থাকার আবশ্যিক উপাদান সরবরাহকারী দেদীপ্যমান উৎস রয়েছে। প্রাকৃতিক ওই ৩৩টি বা ৩৩কোটি উৎসকে রক্ষা করার প্রশ্নে আমরা প্রবৃত্তি পরবশ হয়ে যাতে দুর্বৃত্ত না হই তারজন্য উপনিষদের ঋষিরা স্মরণ করিয়ে দিলেন ‘আত্মানং বিদ্ধি’-র কথা। —পরমপিতার সন্তান তুমি, নিজেকে জানো, নিজের প্রতিরূপ মনে করে পরিবেশকে বাঁচাও, নিজে বাঁচ। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’—জীবনবিধ্বংসী আচরণ ত্যাগ করে জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলো। ‘মা গৃধ’—লোভ করো না। সদাচার এবং বর্ণাশ্রম মেনে চলো। পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে নিজে সমৃদ্ধ হও। এই ছিল ভারতবর্ষের বিধি-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠনের, ধর্মের, পূজার বা উৎকৃষ্ট প্রসবকারী আচরণ বা উৎসব উদযাপনের নিত্যবাস্তব রূপ। যার উপর প্রতিষ্ঠিত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৎসঙ্গ আন্দোলন। আমাদের নিত্য সাধনার আর্য্য-সন্ধ্যা বন্দনায় যা’ অনুশীলন করতে শিখিয়েছেন যুগ-বিধায়ক পরমবিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। অথচ আমাদের সৎসঙ্গের লোগো-বাহকেরা সেগুলোকে বাদ দিলন। “সত্যমেব জয়তের” ধারকেরা, ওই মহান মন্ত্রের ধ্বজাধারীরা সেইসব পবিত্র কর্তব্য ভুলে, বিজ্ঞানীদের সচেতন-বার্তাকে অগ্রাহ্য করে উৎসব পালনের নামে লোভাদি প্রবৃত্তি-পরায়ণতার উচ্ছৃঙ্খলতাকে উস্কে দিয়ে প্রাকৃতিক এবং আত্মিক পরিবেশকে যে হারে দূষিত করে চলেছি তা কতখানি উৎকৃষ্ট প্রসব করে উৎসব শব্দটিকে সমৃদ্ধ করবে সে হিসেব কষবে কবে সত্যমেব জয়তের আধিকারিকেরা?

যাইহোক, থেমে থাকলো তো আর চলবে না, চরৈবেতি-র নিদেশ
মেনে এগিয়ে যেতেই হবে ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যে।

খ্রীষ্টাব্দের 2023তম বর্ষের স্মৃতিমেদুর আশা-হতাশা,
চাওয়া-পাওয়া, সুখ-দুঃখ,

মিলন-বিচ্ছেদ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, প্রেম-হিংসার
জাবেদা খাতার সঞ্চয় জমা

রেখে সম্মুখের দিকে এগিয়ে চলার মাহেন্দ্রক্ষণ
সমাগত। সমাগত পরমপুরুষ

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রবর্তিত ঋত্বিক
অধিবেশন মাধ্যমে আমরা প্রস্তুত
2024তম বর্ষ-এর নতুন সূর্যকে স্বাগত জানাতে।

প্রাণের প্রাণ-স্পন্দন টিঁকিয়ে রাখার উৎস, আমাদের এই সবুজ
গ্রহের

অভিভাবক, সকল শক্তির উৎস জ্যোতির্ময় সূর্যের
তেজোময় দীপ্তিতে আমরা যেন

সকল প্রকার কলুষতা ত্যাগ করে দীপ্তিমান চরিত্রের
অধিকারী হতে পারি।

আমাদের মনুষ্যত্ব যেন দূষিত না হয়। আকাঙ্খার মোহে
পড়ে আমরা যেন আমাদের

পঞ্চ-মহাভূত সম্ভূত পরিবেশকে দূষিত না করি।
ভিনগ্রহের প্রাণীরা যেন

পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ-প্রাণীদের দিকে আঙুল
উঁচিয়ে বলতে না পারে
,
যে

আমরা অসভ্য, ভোগবাদের জোয়ারে ভাসতে গিয়ে সুস্থভাবে
বেঁচে থাকার
, বাঁচিয়ে

রাখার অনুকূল পরিবেশকে বিনষ্ট করছি। তাহলে সেটা বড়
লজ্জার ব্যাপার হবে।

হে অন্তর্যামী পরমপিতা! তুমি আমাদের শুভবুদ্ধি দাও, আমরা যেন সমাগত

2024-এর নতুন সূর্যের কিরণে স্নাত হয়ে নতুন
প্রাণ
, নতুন সুর, নতুন গান,

নতুন ঊষা, নতুন আলোর নবীনতায় নতুন বছরকে
সম্বর্দ্ধিত করতে পারি। কেটে যাক

আমাদের সব বিষাদ, সব আতঙ্ক— পরমপিতার আশীষধারায়
এসে যাক হর্ষ
, শুভ হোক 2024-এর
খ্রীষ্টিয় নববর্ষ।

আগন্তুক ব্যাধির নবীন সংস্করণের ভয়ে ভীত না হয়ে, আধ্যাত্মিক,
আধিদৈবিক ও আধিভৌতিকাদি ত্রিতাপ জ্বালায় সদাচারের ইষ্টবারি সিঞ্চন
করে
একদিন-প্রতিদিনেরচিরনবীন
সূর্যালোকের নবীন ছটায় পরমপিতার অনুশাসনের

আশীষধারায় অজর, অমর, চিরচেতনতার
সাধনাকে আপ্ত করে আমরা যেন

ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যের চরৈবেতিতে নিরবচ্ছিন্ন
থাকতে

পারি।—বর্ষবিদায়-বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে সীমায়িত
না থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর

অনুকূলচন্দ্রের দিব্য-নিদেশের দিনচর্যার আঙ্গিকে—

‘‘ঊষার রাগে উঠবি জেগে শৌচে শীতল হবি,

সন্ধ্যা-আহ্নিক জপ সাধনায় ঈশের আশিস লবি,

কুতুহলে পড়শি ঘুরে দেখবি সযতনে,

আছে কেমন কোথায় কে জন মন দিবি রক্ষণে,

তারপরেতে বাড়ী এসে শৌচে যথাযথ

গৃহস্হালীর উন্নয়নী অর্জ্জনে হরত,

স্নানটি সেরে আহ্নিক করে ক্ষুধামতন খাবি,

একটু চলে বিশ্রাম নিয়ে আগুয়ানে ধাবি,

এমনি তালে সচল চালে চলে সন্ধ্যা এলে,

শৌচে শুদ্ধ হয়ে করিস আহ্নিক হৃদয় ঢেলে,

উন্নয়নের আমন্ত্রনী গল্প-গুজব শীলে,

হৃষ্টমনে আলোচনায় কাটাস সবাই মিলে,

পড়শী দিগের অভাব-নালিশ থাকেই যদি কিছু

তার সমাধান যেমন পারিস করিস লেগে পিছু,

করন-চলন ধরন-ধারন যজন যাজন কিবা

সকল কাজেই ইষ্টস্বার্থে চলিস রাত্রি-দিবা,

আদর-সোহাগ উদ্দীপনী কথায় কাজে ঝুঁকে,

স্বার্থ-কেন্দ্র সবার হবি ধরবি ইষ্টমুখে,

বিশ্রামেরই সময় গা-টি ঘুমল হয়ে এলে,

ইষ্ট-চলন মনন নিয়ে ঘুমে গা দিস ঢেলে।’’

(অনুশ্রুতি গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্রের বাণী)-র আলোকে

বছরের প্রতিটি দিন হয়ে উঠুক অমৃত-তপনার
উৎসব—খ্রীষ্টিয় নববর্ষ
2024-কে

স্বাগত-স্মরণের প্রাক্কালে এই প্রার্থনা জানাই
পরমপিতার রাতুল চরণে।

 

এ বিষয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। পরমপুরুষের নিদেশ মেনে মানব সভ্যতাকে যদি
“পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চি”-র অনুশাসনবাদের অনুশীলনে পরিচালনা করা না
যায়
, তাহলে
আমাদের এই সবুজ গ্রহের বাসিন্দারা অচিরেই বিপন্ন হয়ে পড়বে। সচেতন মানুষেরা একটু
ভেবে দেখবেন। জয়গুরু। সবাই আমার প্রণাম নেবেন। বন্দে পুরুষোত্তমম্!

 

ধনতেরাস কি ও কেন

** ধন্তেরাস্ কি ধনবৃদ্ধির জন্য পালিত হয়? আর ১৪ শাক কেনই বা খায়? জানুন। **

নিবেদনে—তপন দাস

************************

ধনতেরস সোনার গয়না নয়, আয়ুর্বেদ ঔষধ কেনার দিন। ধন্বন্তরী নামে কাশীতে এক রাজা ছিলেন। তিনি তার রাজত্বের বাইরে গিয়েও আয়ুর্বেদ প্রচার করেন। তার প্রচারেই আয়ুর্বেদ আমাদের দেশে এতো প্রসিদ্ধ। তাই আয়ুর্বেদ মহৌষধের কথা উঠলেই স্মরণ করা হয় ধন্বন্তরীর নাম।

তিনি আশ্বিন মাসের কৃষ্ণ ত্রয়োদশী তিথিতে জন্ম গ্রহণ করেন, তাই তখন থেকেই আয়ুর্বেদ প্রেমিকরা তাঁর জন্ম তিথি ধন্বন্তরী ত্রয়োদশী হিসাবে পালন করে। হিন্দিতে এটাকে ধন্বন্তরী তেরস বা সংক্ষেপে ধনতেরস বলে। এর সাথে ধন বা অর্থের কোনো সম্পর্ক নেই।

সেই বৃত্তান্ত স্মরণে রেখে অনেকেই ধনতেরসে তাঁর পূজা করে থাকেন। সবচেয়ে বড়ো কথা, ভারত সরকারের ‘আয়ুশ’ মন্ত্রক এই দিনটিকেই ‘জাতীয় আয়ুর্বেদ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

ধন্বন্তরী জন্মেছিলেন ত্রয়োদশী তিথির শেষ লগ্নে। চতুর্দশীর শুরুতে। তাই ধন্বন্তরীর মতো আয়ুর্বেদকে মর্যাদা দিতে চতুর্দশী তিথিতে বিশেষ ভেষজ গুণযুক্ত চোদ্দটি শাক খেয়ে শরীরে প্রাকৃতিক ভ্যাক্সিন প্রবেশ করানো হয়। যাকে আমরা ১৪ শাক খাওয়া বলে থাকি। অনেকেই এই দিনে চোদ্দ শাক খেয়ে থাকে।

May be an image of text that says "ভূত চতুর্দশীর চৌদ্দ শাক ওল কেউ বেতো সর্ষে নিম SSA জয়ন্তী শাঞ্চে হেলেএঞা পলতা শৌলফ কালকাসুন্দে গুলঞ্চ ভাঁটপাতা শুষণী"

All reactions:

7Sumana Bhattacharya, Utpala Roy Tumpa and 5 others

।। শক্তির আরাধনা ও কালীপূজা।।

শক্তি মানে সমর্থ হওয়া, আর আরাধনা মানে আয়ত্ত করা। সাত্তিক দৈবীশক্তির বিহিত প্রয়োগে মানুষ কাঙ্খিত জীবনবৃদ্ধির পথে অগ্রসর হতে এবং হওয়াতে পারে। আবার, প্রবৃত্তির আসুরিক শক্তির অবিহিত প্রয়োগে সপার্ষদ জীবনহানির পথে অগ্রসর হওয়াটাও স্বাভাবিক।–রাবন, দুর্যোধন যার সহজ দৃষ্টান্ত।

শুম্ভ-নিশুম্ভদের অবস্থাও তাই হয়েছিল। প্রবৃত্তির শক্তির দম্ভের যবনিকা পতন ঘটালেন আদ্যাশক্তির প্রতীকস্বরূপা নারীশক্তি মাকালী। তাই হ্লাদিনী শক্তিরূপিনী নারী জাতিকে আদ্যাশক্তির প্রতীক জ্ঞানে সম্মান, শ্রদ্ধা বা পূজা (সম্বর্দ্ধনা) না করলে পুরুষের শক্তি খর্ব হয়।

আমরা যে মা-কালীর পূজা করি, তিনি তো দিগম্বরী! বাস্তবে আমরা সকলেই আমাদের দিগম্বরী মায়েদের অপত্য পথ বেয়ে একদা ভূমিষ্ট হয়েছিলাম। ভারতীয় আর্য্য মনীষা যে পথকে যজ্ঞকুণ্ড, যজ্ঞবেদী বলে বর্ণনা করেছেন, শুধুমাত্র কাম ভোগের যন্ত্রস্বরূপ নয়! সৃষ্টি প্রকরণের আগম-নিগম দ্বার। অতএব যে যোনী আমার জন্মস্থান, যে স্তনযুগলের অমৃতধারা পান করে আমি শক্তিশালী হয়েছি, সেই যোনী এবং সেই স্তনযুগল তো আমার শক্তির আরাধনার প্রতীকস্বরূপ!—এই ভাবে ভাবিত না হতে পারলে মা কালীর সাধনা করা সম্ভব না!

আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় পুরুষোত্তম শ্রীরামকৃষ্ণ, সাধক রামপ্রসাদ প্রমুখগণ প্রচলিত তন্ত্রমতের পঞ্চ ম-কারের পূজা-পদ্ধতিকে অগ্রাহ্য করেই শুধু শুদ্ধাভক্তি দিয়েই মা-কালীকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। আর শ্রীরামকৃষ্ণদেব তো ফলহারিণী কালী পূজার পুণ্য লগ্নে সারদা দেবীকে সাত্তিক শুদ্ধাভক্তির উপাচারে সারদাদেবীকে পূজা করে চিন্ময়ী নারী শক্তিকে আদ্যাশক্তি রূপে প্রতিষ্ঠিত করলেন! মাতৃ-সাধনাকে ধরে রাখতে ঠাকুর কামিনী-কাঞ্চন থেকে তফাত্—তফাত্—খুব তফাত্ থাকতে বলেছেন।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সত্যানুসরণে বললেন, “প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী । প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয় ।”

এবং পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, “স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যে-জন, তাহার হয় না ভবের বন্ধন মোচন । স্ত্রী চিন্ময়ী মা ।”

তিনি নারী-সাধারণকে মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েই ক্ষান্ত হন নি, স্ত্রীকেও চিন্ময়ী মা জ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শেখালেন । কারণ, স্ত্রীর মাধ্যমে স্বামী নিজেকে জন্মান, তাই স্ত্রীকে জায়া বলা হয়েছে । আর্য্য বিধির গর্ভাধান কালে স্ত্রীর নাভিমূল স্পর্শ করে “প্রসীদ মা জগজ্জননী” মন্ত্রে অভিষিক্ত করে স্ত্রীর গর্ভে নিজেকে প্রবেশ করাতে হয় । আর্য্য ভারতের প্রজা-সৃষ্টি প্রকরণের কি অপূর্ব ব্যঞ্জনা । যৌন জীবনে পুরুষদের শিব, আর নারীদের শক্তি জ্ঞানে অভিষিক্ত করে কাম (lust) কে আসুরিক প্রবৃত্তির কবল থেকে মুক্ত করে দৈবীপ্রেমে (love) রূপান্তরিত করলেন । ব্যবহারিক ক্ষেত্রের বাস্তব জীবনে শুদ্ধভাবের কালী পূজা করতে শেখালেন। তাই, পুরুষ এবং নারী সাধারনকে প্রবৃত্তি-প্ররোচিত শিক্ষার অঙ্গন থেকে মুক্ত করে, এই সত্তাধর্মী ব্যবহারিক কালীপূজার তুক না শেখাতে পারলে কিছুতেই ট্রিট্ করা যাবে না কুতসিত যৌবন-উন্মত্ততার ফলস্বরূপ নারী নির্যাতন, ডিভোর্স, ধর্ষণ নামের সামাজিক ব্যাধিদের! যে নারীশক্তি শুম্ভ-নিশুম্ভকে দমন করেছিলেন, সেই নারীরা যদি অসুর-পুরুষদের কামনার বলি হয় এর চাইতে সভ্যতার সংকটের আর কিছু হতে পারে না!

তাই আসুন আমরা আমাদের অন্তরের কালিমা থেকে নিজেদের মুক্ত করে যথার্থতায় সার্থক করে তুলি সমাগত কালী পূজাকে।

‘পূজা’ মানে তো সত্তা বা অস্তিত্বের অভাব পূরণ করার সম্বর্দ্ধিত করার একটা মাধ্যম । এর সাথে সাধনা, উপাসনা, সংযম জড়িয়ে আছে । যাতে আমরা সুস্থ শরীর, সুস্থ মানসিকতা অর্জন করে পরিবেশকে বাঁচিয়ে রেখে নিজেরা সুস্থভাবে বাঁচতে পারি, বৃদ্ধি পেতে পারি । কালিপুজোর অজুহাতে বাজি, শব্দবাজি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে আকাশ, বাতাস, ইন্দ্রিয়সকল কলুষিত করার অনুষ্ঠান কোন অস্তিত্বের পরিপোষক ? কোন শাস্ত্র, কোন মহাপুরুষ পূজার নামে এ ধরণের অবৈজ্ঞানিক তাণ্ডবের বিধি দিয়েছেন ? ‘সত্যমেব জয়তে’র আধিকারিকেরা জানালে বাধিত থাকবো ।

“খাওয়া-দাওয়া, বাজী পোড়ানো,

অঢেল ঢালা আয়োজনে,

পূজা সার্থক হয় না,

বিনা দৈব গুণের সংসাধনে ।

(শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)

পূজা ও ধর্ম্ম

।। পূজা ও ধর্ম্ম ।।
নিবেদনে—তপন দাস
***********************************
আমাদের প্রচলিত ধারণায় প্রচলিত পূজা হচ্ছে ধর্ম পালনের একটা মাধ্যম। তথাকথিত পুরোহিত বা ঠাকুর মহাশয়ের ফর্দ মেনে, একটু দর কষাকষি করে উপকরণ সংগ্রহ করে এনে দিলেই হলো। (লাইট, মাইক, প্যাণ্ডেল, থিম, বাজি-বাজনা ইত্যাদি ফর্দ-অন্তর্ভূক্ত কিনা বলতে পারব না।) আয়োজকের প্রতিনিধি হয়ে দেবদেবীকে তুষ্ট করবেন তথাকথিত পুরোহিত মহোদয়। আহুত, অনাহুত, রবাহুত দর্শকেরা আয়োজনের বিচার-বিশ্লেষণ করবেন। এইরকম একটা আয়োজনকে আমরা পুজো বলতে অভ্যস্ত।
বাস্তবে, শব্দার্থ এবং মর্মার্থ অনুযায়ী পূজা মানে সম্বর্ধনা। পূজ্য চরিত্রের গুণ অনুশীলন করে নিজেকে সম্বর্ধিত করা। আর ধর্ম মানে ধারণ করা। নিজের এবং অপরের অস্তিত্বের ধারক, পালক ও পোষক হবার জন্য যা যা করা হয়, তাই ধর্ম। জীবনবর্দ্ধনার অপচয়ী অনিত্যকে ত্যাগ করে, জীবনবর্দ্ধনার উপচয়ী নিত্য-এর উপাসনা করা, আরাধনা করা। যার যার, তার তার, পালনীয়। কোনো ভায়া-মিডিয়া দিয়ে হবে না। যার ক্ষিদে তাকেই খেতে হবে, ক্ষুধার্তের হয়ে অন্য কেউ খেলে ক্ষুধার্তের কি পেট ভরবে? অথচ আমরা এই কাজটাই করে চলেছি। যাঁর পুজোর নামে মেতে উঠছি, তাঁর আদর্শ কি, তাও জানিনা, কিভাবে অনুশীলন করতে হয়, তাও করি না। আমাদের কাজ চাঁদা দেওয়া, নতুন পোশাক পরা, ধুপহীন ধুপকাঠি, ফল-মিষ্টি মণ্ডপে দিয়ে প্রতিমার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে সমস্যার সমাধান চাওয়া। আর খাওয়া দাওয়া, ভিড় ঠেলে চেঁচামেচি, মাইকের আওয়াজ, হৈ-হট্টগোলকে সাথী করে এ প্যাণ্ডেল থেকে ও প্যাণ্ডেলে পর্যটন করা! ব্যস্!
*****************************************
যাইহোক এবার একটু গভীরে প্রবেশ করার চেষ্টা করি।
ভারতের আর্য্য-ঋষিগণ, অবতার-বরিষ্ঠগণ প্রত্যেকেই সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির
উপাসনার কথা বলেছেন ধর্মের নামে, পূজার নামে। বর্তমান পুরুষোত্তম
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আরও একটু সহজ করে দিয়ে বললেন, ‘‘ধর্ম্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম্ম না-রে। অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম্ম
বলে জানিস্ তাকে। পূর্বতনে মানে না যারা/জানিস্ নিছক ম্লেচ্ছ তা’রা।’’
‘‘পূজা-আর্চ্চা মানেই কিন্তু /দৈবগুণ যা সেধে নেওয়া। হাতে-কলমে মক্স
করে/বাস্তবে তার রূপটি দেওয়া।।’’
ইত্যাদি ছড়াবাণীগুলো সহজ, সরল, ওজস্বী
আবেদনে সমৃদ্ধ হলেও একটা নির্দিষ্ট গণ্ডীর ভাষা-ভাষীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
ওই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দিতে বললেন,
‘Upholding urge of existence is Dharmma.’ বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্তা বা
অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করে উৎকর্ষতায় রক্ষা করার নাম ধর্ম। তথাপিও
আমরা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতার, কু-সংস্কারের, অজ্ঞানতার আবরণ ভেদ করে
শুদ্ধ আমিটাকে বের করতে ব্যর্থ হলাম। তথাকথিত ইনটেলেকচ্যুয়াল হওয়া সত্বেও
ধর্মের নামে ফুল, বেলপাতা, ধূপবিহীন ধূপকাঠি, ফল-মিষ্টান্নাদির অঢেল
আয়োজনে, মাইক বাজিয়ে, শব্দবাজির আওয়াজ দিয়ে পরিবেশবিদদের চিন্তার
বলিরেখায় ভাঁজ ফেলে দিতে ইন্ধন যোগাচ্ছি। আর আমাদের গর্বের রবীন্দ্রনাথ
আমাদের দ্বিচারিতা দেখে কষ্ট পাচ্ছেন আর ভাবছেন, যে মানুষগুলো ‘তোমার
পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার
তলে’ ইত্যাদি ছন্দের ডালি সাজিয়ে ভক্তির আবেদন জানায়, তারাই আবার পূজার
নামে কু-সংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে বিশ্বাত্মাকে দূষিত করে চলেছে।
আমাদের বর্তমান যুগ যে যুক্তিবাদী সে কথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি
অস্বীকার করবেন না আশাকরি। যেমন, সন্তানের হয়ে মা খেলে সন্তানের পেট ভরবে
না। ছাত্রের হয়ে শিক্ষক লেখাপড়া করলে ছাত্র পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে
না।–তেমনি প্রচলিত পূজার আয়োজকদের হয়ে কোন পুরোহিত পূজা করলে আয়োজকদের
কিছু ফললাভ হবে কি ?
অবশ্য পুরোহিতও জানেন না ফললাতের বিষয় সম্পর্কে। যদি জানতেন বিসর্জন
মন্ত্রে বলতেন না—ওঁ আবাহনং ন জানামি, নৈব জানামি পূজনম্। বিসর্জনং ন
জানামি ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি (পরমেশ্বর)।–অর্থাৎ আমি আবাহনও জানিনা,
বিসর্জনও জানিনা, আমাকে ক্ষমা করুন। (দ্রঃ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)
বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী পূজ্য-প্রতিমা চঞ্চল চিত্তের
ধারণের জন্য একটি অবলম্বন। প্রতিমাকে ব্রহ্মের রূপ কল্পনা করে উপাসনা,
সংযম, সাত্তিক আহার, সাত্তিক বিহার ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে পূজা
করা হয়।–যাতে পূজক বা উপাসক মনসংযোগ দ্বারা প্রতিমাকে হৃদয়ে ধারণ করে
প্রতিমার গুণে গুণান্বিত হতে পারে। এই হলো প্রতিমা পূজার মূল কথা।
এ থেকে এটুকু বোঝা গেল যে সততা, সংযম, ন্যায়নীতি ইত্যাদি মানবিক
গুণগুলোর প্রবহমানতাকে বৎসারান্তিক নবীকরণ করার মাধ্যম বাহ্য-পূজা
উদযাপনের উদ্দেশ্য। অথচ বাঙালীর সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার আয়োজন
বিশ্লেষণ করলে এর বিপরীত চিত্রটাই আমাদের বোধে ধরা পড়ে।
বিজ্ঞানের বিধি অনুযায়ী একটা নির্ভুল অংক কষতে গেলেও একটা শান্ত পরিবেশ
প্রয়োজন, একাগ্রতার প্রয়োজন। কিন্তু পূজার নামে, বেশীরভাগ
পূজা-প্রাঙ্গনগুলোতে ঢাকের আওয়াজ, মাইকের আওয়াজ, আয়োজকদের অহংকারের
আওয়াজে কোন সুস্থ মানুষের একটি ঘণ্টার জন্যও একাগ্রভাবে, স্থিরচিত্তে বসে
থাকতে পারার কথা নয়! অবশ্য দেবদেবীর ব্যাপারটা আলাদা। মাটির পুতুল বলেই
আমাদের সব অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করতে পারে! তাই কবিগুরুর ভাষার ‘তোমার
পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’ বাণীগুলো এক নির্মম সত্যের বার্তা দেয় না
কি ?
বাঙালিদের মানস-দেবী মা দুর্গা। ‘যা দেবি সর্বভূতেষু’ মন্ত্রে যাঁর
অস্তিত্বের স্বরূপ প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ দেবী সর্বভূতের প্রাণশক্তি
স্বরূপা, সর্বভূতে দেবী অধিষ্ঠিতা। এবার প্রশ্ন, যে দেবী সর্বভূতে
অধিষ্ঠিতা সেই পঞ্চ-মহাভূত পরিপোষিত স্বেদজ, ক্লেদজ, অণ্ডজ, জরায়ুজ-জাত
ভূতগুলোকে, বেঁচে থাকার জৈবাজৈব আবশ্যিক উপাদানগুলোকে দেবীর প্রতিভূ মনে
করে সম্বর্দ্ধিত না করে, সুস্থভাবে টিঁকিয়ে রাখার চেষ্টা না করে, কোন
যুক্তিতে মাটির প্রতিমা পূজার নামে প্রাণী হত্যা করে, নানাভাবে পরিবেশকে
দূষিত করার জন্য কোটি কোটি টাকা অপচয় করা হয়!
ভাষা-বিজ্ঞান অনুযায়ী পূজা মানে পূরণ করা, সম্বর্দ্ধিত করা। যে
আচার-আচরণ পরিবেশের সাত্তিক জীবন-বর্দ্ধনার অভাবকে পূরণ করে, জৈবাজৈব
সবকিছুকে সম্যকরূপে বর্দ্ধিত করে, তার নাম পূজা। উৎকৃষ্ট প্রসব করে যা,
তার নাম উৎসব। আর যে আচার-আচরণ জীবনবৃদ্ধিকে নন্দিত করে তার নাম আনন্দ।
এখন প্রশ্ন, আমাদের প্রচলিত পূজা, উৎসবের উদযাপনকে কেন্দ্র করে আনন্দের
প্রকাশ বৃহত্তর পরিবেশকে কতখানি নন্দিত করে ‘পূজা’ শব্দের যথার্থতাকে
উপহার দিতে পেরেছে ? –এইসব বিষয়ে সত্তাপিয়াসী চিন্তাশীলদের চিন্তা করে
দেখা উচিত। বিশেষ করে যাঁরা কুসংস্কার বিরোধী রূপে নিজেদের বোধ ও বোধিকে
প্রতিষ্ঠিত করতে চান।
বাহ্য পূজাবাদীদের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী পূজা শুরুর আগে মৃন্ময়ী
মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। আয়োজকদের বিশ্বাস, পুরোহিতের
মন্ত্রবলে নিষ্প্রাণ মূর্তিগুলো প্রাণবন্ত হয়। তর্কের খাতিরে বিষয়টাকে
সত্য বলে যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে একটা প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে,
জীববিজ্ঞান অনুযায়ী জীবন্ত প্রাণীদের চলন, গমন, ইত্যাদি অভিব্যক্তি থাকা
আবশ্যিক। অতএব বিজ্ঞানসম্মত কারণেই পুরোহিতের মন্ত্রবলে দুর্গাঠাকুরের
চালচিত্রের জীবন্ত দেবদেবী, অসুর, সিংহ, ময়ূর, সাপ, পেঁচা, ইঁদুরেরা নিজ
নিজ অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে। কেউ চুপচাপ স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে পারবে
না। ফলে শুরু হয়ে যাবে মহিষাসুর মর্দিনীর বাস্তব উপস্থাপনা। অসুর,
দুর্গাকে আক্রমণ করবে, সিংহ গর্জন করতে করতে দেবীকে নিয়ে অসুরের দিকে
ধাবিত হবে, বাহনসহ অন্যান্য দেবদেবীরাও যোগদান করবে যুদ্ধে।–এবার
প্রশ্ন–ওই অবস্থায় পুরোহিত, আয়োজকেরা, ভক্তেরা, উদ্বোধন করতে আসা
সেলিব্রিটিরা, নেতা-মন্ত্রীরা কোন পক্ষে যোগদান করবেন? দেবীর পক্ষে না
অসুরের পক্ষে ?
আর একটা প্রশ্ন, যে পুরোহিত আদ্যিকালের দেবদেবীদের কল্পিত মাটির
মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম, তিনি মানুষের প্রাণহীন দেহে আরো
সহজে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন বা পারা উচিত। কারণ, বিজ্ঞান মতে,
মাটির মধ্যে থাকা অণু-পরমাণুর তুলনায় সদ্য মৃতদেহের অণু-পরমাণু বেশী
সক্রিয় থাকে, বেশী জীবন্ত থাকে। মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী সরকারের স্বাস্থ্য
বিভাগ এ বিযয়টা নিয়ে ভেবে দেখতে পারেন। তাহলে অনেক অকালমৃত্যু সহজে রোধ
করা যাবে।
সনাতন ধর্মীয় মতবাদ অনুযায়ী মানুষ অমৃতের পুত্র, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’
বলা হয়েছে। সেই মানুষ যাতে দশবিধ-সংস্কারে সংস্কৃত হয়ে প্রকৃষ্ট জাতক বা
প্রজা হয়, অকালে নিষ্প্রাণ না হয়, সন্ত্রাসবাদী না হয়, রেপ-কেসের আসামী
না হয়, নারীদের মা-দুর্গার প্রতীক জ্ঞানে সম্মান জানায়, ‘অসতো মা সদ্গময়,
তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়’-এর আদর্শ অনুসরণে সমৃদ্ধ
হয়,–সমাজের পুরোভাগে থেকে, ওইসব বিষয়ে মানুষকে সচেতন করে পরিবেশের
হিতসাধন যাঁরা করতেন তাঁদের বলা হতো পুরোহিত।
সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পুরোহিত ঋষি বশিষ্ঠ রামচন্দ্রের রাজসভায়
অকালমৃত্যু-দেহে প্রাণ সঞ্চার করার স্পর্দ্ধা দেখান নি। বিজ্ঞান-যুগের
পুরোহিতেরা যদি পুতুলে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন, মৃতদেহেও পারা
উচিত! যদি না পারেন, ততঃ কিম্!
ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি, ‘পূজা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সম্বর্দ্ধনা।
পূজ্য ব্যক্তিত্বের গুণে গুণান্বিত হয়ে নিজেকে এবং পরিবেশকে সম্বর্দ্ধিত
করা। এতদিন ধরে হাজার-হাজার দুর্গাপূজা করে আমাদের চিন্ময়ী নারীরা
কতখানি সমৃদ্ধ হয়েছে মা দুর্গার আদর্শ চরিত্রের চরিত্রায়নে ? আমাদের
চিন্ময় পুরুষেরা নারী সাধারণকে কতটা মা-দুর্গার প্রতীক মনে করে শ্রদ্ধা
করতে বা পূজা করতে শিখেছে ? আমরা সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির পথে কতটা এগিয়েছি?
আমাদের কতখানি দুর্গতি নাশ হয়েছে? আমাদের সার্বিক জীবন-চলনা দুর্গ-সম
পরিরক্ষিত হয়েছে কতটা?—তথ্য জানার অধিকার বলে এ বিষয়ে জানতে চাওয়াটা
নিশ্চয়ই অপরাধ হবে না! যদিও প্রচলিত তথ্য এর বিপরীত মত প্রকাশ করে চলেছে
দীর্ঘদিন ধরে। পূজাকে কেন্দ্র করে সাত্তিকতা বৃদ্ধি না পেলেও, তামসিকতা
বেড়ে যায় বহুগুণ। পুজোকে কেন্দ্র করে ভক্তদের অনিত্য দেহটাকে
পূজা-বিপরীত সাধের নানা বেশভূষায় সাজিয়ে দিতে বিকিকিনির পসরা সাজিয়ে
যারা বসেন, তারা কি পূজা-সদৃশ সততার দৃষ্টান্ত উপহার দেন সমাজকে ? পূজাই
যদি উদ্দেশ্য তবে ইভটিজিং, আদমটিজিং কেন হবে ? অপরাধ কেন বৃদ্ধি পাবে ?
দূষণ কেন বৃদ্ধি পাবে পূজাকে কেন্দ্র করে ?— এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে
?
দুর্গাপূজার বিষয়টাকে বাস্তববোধে চিন্তা করলে দেখা যাবে, আমাদের আলোচ্য
মা-দুর্গা পূজ্য তাঁর চরিত্রগুণে। মা দুর্গার সমার্থক, মা উমাকে আমরা
কন্যা জ্ঞান করি। তাইতো ফি বছর কৈলাস থেকে নিয়ে আসি। যদিও তাঁকে আনতে এবং
দিতে কে বা কারা যান। কোন রুটে দোলায়, নৌকায়, ঘোটকে এবং গজে যাতায়াত
করেন, সে খবর দেবার দায়িত্ব তথ্যাধিকারীদের, আমার নয়! তবে বাস্তবে মৃৎশিল্পীর কাছ থেকে মণ্ডপে আনা এবং মণ্ডপ থেকে জলাশয়ের বিসর্জনে নেওয়ার সময় পূজাসম সাত্তিকভাব পরিলক্ষিত হয় না।

তবে যাঁরা একটু সাত্তিক ভাবাপন্ন, তাঁরা
দশভুজার চাইতেও দ্বিভুজা উমাকে বেশী পছন্দ করেন বলেই না উমাকে নিয়ে কতই না
আগমনী গানের ডালি সাজিয়ে তাঁকে বরণ করে নিতে চায়। কামনা করি, ঘরে ঘরে
উমার মত আদর্শ মেয়ে যেন জন্মায়। উমাই তো আমাদের মা দুর্গা! ভারতেই শুধু
নয়, সারা বিশ্বের সংস্কৃত মনীষায় নারীজাতির আদর্শরূপে স্বীকৃত, পূজিত।
স্বীকৃতি পাবেনই না বা কেন, পূজিত হবেনই না বা কেন,–কারো কান-ভাঙানিতে
কান না দিয়ে পরমভক্ত-পরমজ্ঞানী শিবকে পতিরূপে বরণ করে, স্বামীর
মনোবৃত্যানুসারিণী স্ত্রী হয়ে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীদের ন্যায়
কৃতি সন্তানদের জননী হয়েছেন। তিনি একজন আদর্শ সংসারী নারী হয়েও অসৎ
নিরোধী তৎপর,–অশুভ শক্তিকে সমুচিত দণ্ড দেবার জন্য রণসাজে সজ্জিত
হয়েছেন। পশুরাজকে করেছেন বাহন। পারস্পরিক শত্রু খাদ্য-খাদক সম্পর্কের
পেঁচা-ইঁদুর, ময়ুর-সাপকে মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ করেছেন। দুটি হাত দিয়েই
বৃহত্তর সংসারের দশদিক সামলাতেন। তাই তো তিনি দ্বিভূজা হয়েও দশ
ইন্দ্রিয়কে বশ করে হতে পেরেছেন দশভূজা। তাই তো তিনি দশপ্রহরণধারিণী। তাই
তো তিনি পূজ্য। –এহেন চরিত্র ‘দেবী’ জ্ঞানে, ‘জগজ্জননী’ জ্ঞানে স্বীকৃতি
তো পাবেনই। তাই তো আমাদের ঋষিরা দেবতাদের সম্মিলিত শক্তিতে সৃষ্ট দেবী
দুর্গা কাত্যায়ন অঙ্গনে মহিষাসুরকে বধ করার পর তাঁর প্রদর্শিত শক্তিকে
দৃষ্টান্ত স্বরূপ চিরস্থায়ী একটা আদর্শে রূপ দিয়েছিলেন। দেবী দুর্গাকে
স্ত্রীজাতির এক আদর্শ প্রতীক রূপে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁরা দেবী দুর্গার ওই
অসৎ-নিরোধী তৎপরতাকে দৃষ্টান্ত বূপে তুলে ধরে নারীসাধারণকে দেবী রূপে,
জগন্মাতা রূপে মর্যাদা দিয়েছেন, কামিনীরূপে নয়। তাইতো বর্তমানেও
সম্ভ্রান্ত হিন্দু নারীদের মধ্যে দেবী পদবি প্রচলিত। ঋষিরা ছিলেন
বিজ্ঞানী। তাই তো তাঁরা দুর্গাপূজার বিধান দিলেন বাস্তব অনুশাসনের
মাধ্যমে। আত্মবিস্তার কল্পে গর্ভাধান-সংস্কারের সময় স্বামী, নিজের
স্ত্রীকে জগন্মাতা জ্ঞানে স্ত্রীর নাভিমূল স্পর্শ করে বলবেন, প্রসীদ মা
জগজ্জননী,–হে জগন্মাতার প্রতীকস্বরূপা চিন্ময়ী মা, তুমি প্রসন্ন হয়ে
আমাকৃত গর্ভাধান মাধ্যমে দেদীপ্যমান আত্মাকে আকর্ষণ কর।–ওই স্বীকৃতির
মাধ্যমে স্ত্রীকেও মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েছেন, কামিনীজ্ঞানে নয়।
এর কারণ, স্বামী, স্ত্রীর মাধ্যমে নিজেকে জন্মান, তাই তিনি জায়া।
জীববিজ্ঞান অনুসারে প্রজনন-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আত্ম-প্রতিলিপি গঠন করা
হয়। পুরুষ-বীজ ধারণ করে, বীজের প্রতিলিপি গঠন করে ভূমি-স্বরূপা নারী। জনন
করেন বলে জননী। তাই কৃষকেরা ফসল ফলাতে জমি কর্ষণ করে, কর্ষণ মানে আকর্ষণ,
যাতে জমি বীজ থেকে ভালো সন্তান (ফসল) আকর্ষণ করতে পারে। জমি অনুযায়ী
উপযুক্ত শুদ্ধ-বীজ বপনের আগে ভূমিকে আগাছা মুক্ত করে, সার দেয়, জল দেয়,
জমি জননক্ষম হলে জো বুঝে বীজ বোনে।–জমিকে মাতৃজ্ঞানে পোষণ দিয়ে ভূমিকে
পূজা করে—যাতে জমি বীজের অন্তর্নিহিত সত্তাকে ভালোভাবে পুষ্ট করতে পারে,
বীজের সত্তাকে ধারণ করে আদর্শ মা হয়ে ভালো ফসল ফলাতে পারে। ফসল ফলাতে যদি
গর্ভাধান প্রক্রিয়া থাকতে পারে, মানুষ ফলাতে তো আরও বেশী বিধি-নিয়ম থাকা
উচিত! আমাদের ঋষিরা ছিলেন প্রকৃত বিজ্ঞানী। বিজ্ঞান শব্দটিও উপনিষদ থেকে
উৎপত্তি হয়েছে। তাই ঋষিরা নারীদের জগন্মাতাজ্ঞানে ব্যবহার (treat) করতে,
শ্রদ্ধা (honour) করতে শিখিয়েছেন।–যার নাম প্রকৃত পূজা। যার মাধ্যমে
স্বভাবের স্ফূরণ হয়ে সব অভাবের পূরণ হয়।
এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন, “Accident-এ (আকস্মিকভাবে) যা’ জন্মে, তা
বুনো, বিহিত সুফলপ্রদ চাষে যা’ জন্মে তা’ পুণো (পুণ্য)। প্রবৃত্তি লালসায়
অবিধিপূর্বক উপগতি হয়ে যে সন্তান জন্মে, তার চরিত্রের কোন ঠিক ঠিক থাকে
না। গর্ভাধান সংস্কারের ভিতর দিয়ে উন্নত চিন্তাপ্রসূত বিধিমাফিক পবিত্র
যে জন্ম, তার রকমই আলাদা। ঘরে ঘরে ভগবান জন্মে। তেমনি ছিল আমাদের
বিধান।’’ (আঃ প্রঃ ১৮/১৩) অতএব আমাদের ঘরের মা দুর্গারা যেদিন আবার ঘরে
ঘরে ভগবান জন্মাতে পারবেন সেদিন সার্থক হবে আমাদের দুর্গাপূজা।
দুর্গাপূজার বাস্তবতা তুলে ধরতে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেনঃ
“….যে মৃন্ময় মূর্ত্তি
আমরা পূজা করি—
কল্পনায় প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করে,–
তিনি দশভূজা,
দশপ্রহরণ-ধারিণী—
ঐ আমাদের মায়েরই প্রতীক—
আমাদের ঘরে ঘরে
যে মা অধিষ্ঠিতা
তাঁরই বিনায়িত সুসঙ্গত প্রতীক;
তাই ঐ মায়ের পূজা মানেই হচ্ছে—
যে মা আমার,
যে মা তোমার,
যে মা ঘরে ঘরে
দুর্গা হয়ে অধিষ্ঠিতা,
দুর্গতিনাশিনী হয়ে
দশপ্রহরণ ধারণ করে
সন্তান-সংরক্ষণায় নিয়োজিতা,
সেই মায়েরই পূজা;………..”
(আশীষ বাণী, ৬২/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)
“মা আমাদের দশভুজা,
প্রতি ঘরে ঘরে
যদিও তাঁকে
দ্বিভুজাই দেখতে পাই,
তিনি
দশদিক্ আবরিত করে রেখেছেন—
তাঁর স্নেহ-উৎসারিত
স্বস্তি-উৎসারিণী উদাত্ত অনুচর্য্যায়,
কায়মনোবাক্যে
প্রতিটি কর্ম্মের ভিতর-দিয়ে
ব্যষ্টির পথে
সমষ্টিকে আন্দোলিত করে,
সাত্বত উৎসর্জ্জনায়
আপূরিত করে সবাইকে,
কৃতি-উদ্দীপনার অনুপ্রেরণায়—
তাই মা আমার দশভূজা;……”
(আশীষ বাণী, ৫৯/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)
“পূজা মানেই হল বর্দ্ধনা। (আঃ প্রঃ ১২-১২-১৯৪১)
আমি আপনার পূজা করছি মানে, আপনার গুণ চিন্তা করছি এবং নিত্য অনুশীলনের
মাধ্যমে ঐ গুণগুলি আমার চরিত্রগত করে তুলছি, আমার ভিতরে বাড়িয়ে তুলছি।
স্তব করি মানে গুণ বর্ণনা করি। তা কিন্তু শুধু মুখে বা মনে-মনে করলেই
হবে না, প্রতিদিনকার অভ্যাস ও অনুশীলনের ভিতর দিয়ে ঐ গুণগুলি আমার
চরিত্রে মূর্ত্ত করে তোলা চাই।’’ (দীপরক্ষী ৪/১৮২)
।। পূজা কেমন করে করতে হবে ।।
“দেবতার পূজা-অর্চনা করতে গেলে আগে ইষ্টের ভাব অন্তরে জাগ্রত করে সেই
ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে, দেবতার স্মরণ মনন করতে হয়। তাঁকে স্মরণ করা
মানে—তাঁর চলন-চরিত্র ও গুণ গরিমা স্মৃতিতে এনে অনুশীলনের ভিতর দিয়ে
আয়ত্ব করা। চরণ-পূজা মানে চলন পূজা। ইষ্টের চলনাকে নিজের জীবনে আয়ত্ত
ক’রে ঐ চলনের প্রসারতা ও সম্বর্দ্ধনা যদি না ঘটাই বাস্তবে, তাহলে তাঁর
চরণ-পূজা সার্থক হয় না। আমরা ফাঁকতালে কাম সারতে চাই, কিন্তু বিধি বড়
কঠিন বান্দা, কোন চালাকি চলে না তাঁর কাছে।” —শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্র
(আ. প্র. ২৯. ১২. ১৯৪২)
“প্রশ্ন। হিন্দুরা দেবদেবীর পূজা করেন কিন্তু মুসলমানেরা একমাত্র
খোদাতায়ালার পূজা ক’রে থাকেন। হজরত ত’ ছবি ও পুতুল-পূজা একেবারেই নিষেধ
ক’রে গেছেন, কিন্তু আপনি এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য করছেন কেমন-ক’রে ?
শ্রীশ্রীঠাকুর । ধর্ম্ম-আচরণের দিক দিয়ে হজরত রসুলও যা’ ব’লে গেছেন,
আর্য্যদের ধর্ম্মশাস্ত্র চিরকালই ঋষির নিদেশরূপে তাই বহন ক’রে আসছে।
আর্য্য-ধর্ম্মশাস্ত্র ছবি বা পুতুল-পূজা এমনতর বিকট তাচ্ছিল্যের সহিত
নিরস্ত করতে ঘোষণা ক’রেছেন—এমন-কি অধমাধম বলতেও ক্ষান্ত হন নি। তবে
আর্য্য-ঋষিদের প্রত্যেক মানুষকে উন্নতির পথে নিয়ন্ত্রণ করবার এমনতর একটা
ঝোঁক ছিল—যা-নাকি হজরত রসুলের ভিতর দেখেত পাওয়া যায়–………..”
(ইসলাম-প্রসঙ্গে/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র/পৃঃ ২৮-২৯)
‘‘ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ, ভক্ত রামপ্রসাদ, সাধক রামকৃষ্ণ, সর্ব্বানন্দ
ঠাকুর প্রভৃতি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ প্রতিমা পূজা করেছেন বটে, তাঁদের ঐ
পূজার পিছনে ছিল গুরু-পূজা, ইষ্ট-আরাধনা ; ঐ প্রতিমার পরিকল্পনার ভেতর
দিয়ে ছিল অশেষ ও অঢেলভাবে ইষ্টানুরক্তি। তাই, ঐ অধম অবলম্বনও তাঁদিগকে
অধমভাবে আটকে রাখতে পারে নি। তাঁদের ঐ চলনার পথে একটা সময় এসেছিল, তখন
তাঁদের ঐ প্রতিমা তাঁদের দর্শনের সম্মুখে আর ও-রকম ছিল না। ভগবান
রামকৃষ্ণদেবেরও শোনা গিয়েছে—তাঁর এমনতর সময় এসেছিল, যখন
মূর্ত্তি-টুর্ত্তি তাঁর সাধনার পথে বাধাই সৃষ্টি করতো। তিনি এমন-কি তাঁর
ঘরে যে-সমস্ত ছবি-টবি ছিল, সেগুলিকেও সরিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি না-কি এই
বলেছিলেন—‘মেয়েরা ততদিন পুতুলখেলা করে, যতদিন তার বে’ না হয়,
স্বামী-সহবাস না করে।’ সাধক রামপ্রসাদ তাঁর স্বরচিত গানের ভেতরেই তো
বলেছেন—
‘‘ধাতু-পাষাণ মাটির মূর্ত্তি
কাজ কি রে তোর আরাধনে
তুই মনোময় প্রতিমা গড়ি’
বসা হৃদি-পদ্মাসনে।।’’
এমন কত কি যে আছে, তার ইয়ত্তা নেই।’’
(–শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, কথা প্রসঙ্গে, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৭৬, ১৭-১০-১৩৪২)
এবার আমরা এক়টু দেখে দেখে নেব, পূজা প্রসঙ্গে ‘মেরা ভারত মহান’-এর
অন্যান্য মহানেরা এবং মহান গ্রন্থগুলো কি নিদেশ রেখে গেছেন।
পূজা বিষয়ে মহানির্ব্বাণতন্ত্র নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ
‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ।
অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’
মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ভারতে বিবেকানন্দ গ্রন্থের ৩৩৬
পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট।
ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’
‘‘যে-ব্যক্তি সর্ব্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ
প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে।’’ –শ্রীমদ্ভাগবত। ৩-২৯-২২
“ঈশ্বরঃ সর্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জ্জুন তিষ্ঠতি।
ভ্রাময়ন্ সর্ব্বভূতানি যন্ত্ররূঢ়ানি মায়য়া।।“
–গীতা, ১৮।৬৫
“যিনি এই সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার নিজের স্বধর্মানুরূপ
নিষ্কাম কর্মাচরণ দ্বারা (বাক্য বা ফুলজল দ্বারা নহে) পূজা করিয়া মানুষ
সিদ্ধি লাভ করে । স্বধর্মানুরূপ (বর্ণানুগ সত্তাধর্ম পালন) নিষ্কাম কর্মই
পরমেশ্বরের পূজার ডালি । (গীতা ১৮।৪৬)
“যে ব্যক্তি সর্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ প্রতিমার
পূজা করে, স (শ্রীমদ্ভাগবত ৩।২৯।২২)
পূজা বিষয়ে মহানির্ব্বাণতন্ত্র নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ
‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ।
অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’
মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ভারতে বিবেকানন্দ গ্রন্থের ৩৩৬
পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট।
ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’
তাই, শাস্ত্র বর্ণিত অধমের চাইতেও অধম পূজায় মেতে উঠে আমাদের যাতে
ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে না হয়, তাই, শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্র আমাদের নিত্য বাস্তব দুর্গাপূজার পূজারী করে তুলতে
সৎসঙ্গীদের নিত্যপাঠ্য ‘সত্যানুসরণ’ নামক মহাগ্রন্থে নারীকে জগজ্জননী
জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত করতে নিদেশ দিয়ে বললেন, ‘‘প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী ।
প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয় ।’’ এবং
পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, ‘‘স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যে-জন, তাহার হয়
না ভবের বন্ধন মোচন । …..স্ত্রী চিন্ময়ী মা।’’—এই শিক্ষার ধারাকে
বাস্তবায়িত করার নাম প্রকৃত দুর্গাপূজা ।
শ্রীশ্রীঠাকুর শুধু পুরুষদেরই প্রতিনিয়ত দুর্গাপূজা করার বিধান দিয়েই
ক্ষান্ত হননি, নারী-সাধারণের মধ্যেও দেবী দুর্গার এক স্থায়ী আসন পেতে
দিতে অনুশ্রুতির বাণীতে বললেন—
‘‘শার্দ্দুলেরে বাহন করে
সাপের ফণার মালা পরে
কালবোশেখী ঝঞ্ঝাবেগে
ছোটরে নারী ছোটরে ছোট্ ।
দত্যিদানার নীচ বাহানা
আর্য্যাবর্তে দিয়ে হানা
ঘূর্ণিপাকের বেতাল গাঁথায়
হুলিয়ে ভুলিয়ে দিচ্ছে চোট্ ।
দশ প্রহরণ দশ হাতে ধর
বক্ষবিদরি ধ্বংসি ইতর
সূর্য্যরাগী বজ্রতেজে
আর্য্যনারী শত্রু টোট্ ।”
তিনি নারীকে অবলা নয়, সবলারূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন । নারীর সতীত্বই
নারীকে সবলা করে তোলে। তাই তিনি কত আশা নিয়ে বললেন—
‘‘সতীর তেজে ঝলসে দে মা
নিঠুর কঠোর অন্ধকারে
মদনভস্ম বহ্নিরাগে
বৃত্তি-রিপু দে ছারখারে ।
প্রণবতালে ইষ্টমন্ত্র
ঝঙ্কারি তোল সকলতন্ত্রে
বিষাণ হাঁকে রুদ্র দোলায়
বজ্রে হানি মৃত্যুদ্বারে।’’
মা দুর্গার আদর্শে অনুরঞ্জিত উক্ত বাণীগুলো যাতে তার সন্তানদের মননশীলতায়
মা দুর্গার
তাই আসুন, পূজার নামে অনিত্য-বস্তুর প্রতিযোগিতায় না মেতে, সব দেবতার
সমাহার-স্বরূপ যুগ-পুরুষোত্তমের বিধি মেনে, মা দুর্গার নিত্য-সিদ্ধ
দেদীপ্যমান আদর্শের আলোকে, আমাদের ঘরের মেয়েরা যাতে রাষ্ট্রপূজার
অর্ঘ্যস্বরূপ সুজননে সুসন্তানের উপহার সাজিয়ে,
শক্তিরূপিণী-দশপ্রহরণধারিণী সাজে সজ্জিত হয়ে নরাসুরদের কিভাবে দমন করে
অস্তিত্ব রক্ষার পূজার পূজারী হতে পারে,– সেই চেষ্টায় যত্নবান হই।
জয়গুরু ! বন্দে পুরুষোত্তমম্!
***************************************

পূজা ও ধর্ম

।। পূজা ও ধর্ম ।।

নিবেদনে—তপন দাস

***********************************

আমাদের প্রচলিত ধারণায় প্রচলিত পূজা হচ্ছে ধর্ম পালনের একটা মাধ্যম। তথাকথিত পুরোহিত বা ঠাকুর মহাশয়ের ফর্দ মেনে, একটু দর কষাকষি করে উপকরণ সংগ্রহ করে এনে দিলেই হলো। (লাইট, মাইক, প্যাণ্ডেল, থিম, বাজি-বাজনা ইত্যাদি ফর্দ-অন্তর্ভূক্ত কিনা বলতে পারব না।) আয়োজকের প্রতিনিধি হয়ে দেবদেবীকে তুষ্ট করবেন তথাকথিত পুরোহিত মহোদয়। আহুত, অনাহুত, রবাহুত দর্শকেরা আয়োজনের বিচার-বিশ্লেষণ করবেন। এইরকম একটা আয়োজনকে আমরা পুজো বলতে অভ্যস্ত।

বাস্তবে, শব্দার্থ এবং মর্মার্থ অনুযায়ী পূজা মানে সম্বর্ধনা। পূজ্য চরিত্রের গুণ অনুশীলন করে নিজেকে সম্বর্ধিত করা। আর ধর্ম মানে ধারণ করা। নিজের এবং অপরের অস্তিত্বের ধারক, পালক ও পোষক হবার জন্য যা যা করা হয়, তাই ধর্ম। জীবনবর্দ্ধনার অপচয়ী অনিত্যকে ত্যাগ করে, জীবনবর্দ্ধনার উপচয়ী নিত্য-এর উপাসনা করা, আরাধনা করা। যার যার, তার তার, পালনীয়। কোনো ভায়া-মিডিয়া দিয়ে হবে না। যার ক্ষিদে তাকেই খেতে হবে, ক্ষুধার্তের হয়ে অন্য কেউ খেলে ক্ষুধার্তের কি পেট ভরবে? অথচ আমরা এই কাজটাই করে চলেছি। যাঁর পুজোর নামে মেতে উঠছি, তাঁর আদর্শ কি, তাও জানিনা, কিভাবে অনুশীলন করতে হয়, তাও করি না। আমাদের কাজ চাঁদা দেওয়া, নতুন পোশাক পরা, ধুপহীন ধুপকাঠি, ফল-মিষ্টি মণ্ডপে দিয়ে প্রতিমার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে সমস্যার সমাধান চাওয়া। আর খাওয়া দাওয়া, ভিড় ঠেলে চেঁচামেচি, মাইকের আওয়াজ, হৈ-হট্টগোলকে সাথী করে এ প্যাণ্ডেল থেকে ও প্যাণ্ডেলে পর্যটন করা! ব্যস্!

*****************************************

যাইহোক এবার একটু গভীরে প্রবেশ করার চেষ্টা করি।

ভারতের আর্য্য-ঋষিগণ, অবতার-বরিষ্ঠগণ প্রত্যেকেই সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির

উপাসনার কথা বলেছেন ধর্মের নামে, পূজার নামে। বর্তমান পুরুষোত্তম

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আরও একটু সহজ করে দিয়ে বললেন, ‘‘ধর্ম্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম্ম না-রে। অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম্ম

বলে জানিস্ তাকে। পূর্বতনে মানে না যারা/জানিস্ নিছক ম্লেচ্ছ তা’রা।’’

‘‘পূজা-আর্চ্চা মানেই কিন্তু /দৈবগুণ যা সেধে নেওয়া। হাতে-কলমে মক্স

করে/বাস্তবে তার রূপটি দেওয়া।।’’

ইত্যাদি ছড়াবাণীগুলো সহজ, সরল, ওজস্বী

আবদনে সমৃদ্ধ হলেও একটা নির্দিষ্ট গণ্ডীর ভাষা-ভাষীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

ওই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দিতে বললেন,

‘Upholding urge of existence is Dharmma.’ বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্তা বা

অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করে উৎকর্ষতায় রক্ষা করার নাম ধর্ম। তথাপিও

আমরা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতার, কু-সংস্কারের, অজ্ঞানতার আবরণ ভেদ করে

শুদ্ধ আমিটাকে বের করতে ব্যর্থ হলাম। তথাকথিত ইনটেলেকচ্যুয়াল হওয়া সত্বেও

ধর্মের নামে ফুল, বেলপাতা, ধূপবিহীন ধূপকাঠি, ফল-মিষ্টান্নাদির অঢেল

আয়োজনে, মাইক বাজিয়ে, শব্দবাজির আওয়াজ দিয়ে পরিবেশবিদদের চিন্তার

বলিরেখায় ভাঁজ ফেলে দিতে ইন্ধন যোগাচ্ছি। আর আমাদের গর্বের রবীন্দ্রনাথ

আমাদের দ্বিচারিতা দেখে কষ্ট পাচ্ছেন আর ভাবছেন, যে মানুষগুলো ‘তোমার

পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার

তলে’ ইত্যাদি ছন্দের ডালি সাজিয়ে ভক্তির আবেদন জানায়, তারাই আবার পূজার

নামে কু-সংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে বিশ্বাত্মাকে দূষিত করে চলেছে।

আমাদের বর্তমান যুগ যে যুক্তিবাদী সে কথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি

অস্বীকার করবেন না আশাকরি। যেমন, সন্তানের হয়ে মা খেলে সন্তানের পেট ভরবে

না। ছাত্রের হয়ে শিক্ষক লেখাপড়া করলে ছাত্র পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে

না।–তেমনি প্রচলিত পূজার আয়োজকদের হয়ে কোন পুরোহিত পূজা করলে আয়োজকদের

কিছু ফললাভ হবে কি ?

অবশ্য পুরোহিতও জানেন না ফললাতের বিষয় সম্পর্কে। যদি জানতেন বিসর্জন

মন্ত্রে বলতেন না—ওঁ আবাহনং ন জানামি, নৈব জানামি পূজনম্। বিসর্জনং ন

জানামি ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি (পরমেশ্বর)।–অর্থাৎ আমি আবাহনও জানিনা,

বিসর্জনও জানিনা, আমাকে ক্ষমা করুন। (দ্রঃ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)

বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী পূজ্য-প্রতিমা চঞ্চল চিত্তের

ধারণের জন্য একটি অবলম্বন। প্রতিমাকে ব্রহ্মের রূপ কল্পনা করে উপাসনা,

সংযম, সাত্তিক আহার, সাত্তিক বিহার ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে পূজা

করা হয়।–যাতে পূজক বা উপাসক মনসংযোগ দ্বারা প্রতিমাকে হৃদয়ে ধারণ করে

প্রতিমার গুণে গুণান্বিত হতে পারে। এই হলো প্রতিমা পূজার মূল কথা।

এ থেকে এটুকু বোঝা গেল যে সততা, সংযম, ন্যায়নীতি ইত্যাদি মানবিক

গুণগুলোর প্রবহমানতাকে বৎসারান্তিক নবীকরণ করার মাধ্যম বাহ্য-পূজা

উদযাপনের উদ্দেশ্য। অথচ বাঙালীর সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার আয়োজন

বিশ্লেষণ করলে এর বিপরীত চিত্রটাই আমাদের বোধে ধরা পড়ে।

বিজ্ঞানের বিধি অনুযায়ী একটা নির্ভুল অংক কষতে গেলেও একটা শান্ত পরিবেশ

প্রয়োজন, একাগ্রতার প্রয়োজন। কিন্তু পূজার নামে, বেশীরভাগ

পূজা-প্রাঙ্গনগুলোতে ঢাকের আওয়াজ, মাইকের আওয়াজ, আয়োজকদের অহংকারের

আওয়াজে কোন সুস্থ মানুষের একটি ঘণ্টার জন্যও একাগ্রভাবে, স্থিরচিত্তে বসে

থাকতে পারার কথা নয়! অবশ্য দেবদেবীর ব্যাপারটা আলাদা। মাটির পুতুল বলেই

আমাদের সব অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করতে পারে! তাই কবিগুরুর ভাষার ‘তোমার

পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’ বাণীগুলো এক নির্মম সত্যের বার্তা দেয় না

কি ?

বাঙালিদের মানস-দেবী মা দুর্গা। ‘যা দেবি সর্বভূতেষু’ মন্ত্রে যাঁর

অস্তিত্বের স্বরূপ প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ দেবী সর্বভূতের প্রাণশক্তি

স্বরূপা, সর্বভূতে দেবী অধিষ্ঠিতা। এবার প্রশ্ন, যে দেবী সর্বভূতে

অধিষ্ঠিতা সেই পঞ্চ-মহাভূত পরিপোষিত স্বেদজ, ক্লেদজ, অণ্ডজ, জরায়ুজ-জাত

ভূতগুলোকে, বেঁচে থাকার জৈবাজৈব আবশ্যিক উপাদানগুলোকে দেবীর প্রতিভূ মনে

করে সম্বর্দ্ধিত না করে, সুস্থভাবে টিঁকিয়ে রাখার চেষ্টা না করে, কোন

যুক্তিতে মাটির প্রতিমা পূজার নামে প্রাণী হত্যা করে, নানাভাবে পরিবেশকে

দূষিত করার জন্য কোটি কোটি টাকা অপচয় করা হয়!

ভাষা-বিজ্ঞান অনুযায়ী পূজা মানে পূরণ করা, সম্বর্দ্ধিত করা। যে

আচার-আচরণ পরিবেশের সাত্তিক জীবন-বর্দ্ধনার অভাবকে পূরণ করে, জৈবাজৈব

সবকিছুকে সম্যকরূপে বর্দ্ধিত করে, তার নাম পূজা। উৎকৃষ্ট প্রসব করে যা,

তার নাম উৎসব। আর যে আচার-আচরণ জীবনবৃদ্ধিকে নন্দিত করে তার নাম আনন্দ।

এখন প্রশ্ন, আমাদের প্রচলিত পূজা, উৎসবের উদযাপনকে কেন্দ্র করে আনন্দের

প্রকাশ বৃহত্তর পরিবেশকে কতখানি নন্দিত করে ‘পূজা’ শব্দের যথার্থতাকে

উপহার দিতে পেরেছে ? –এইসব বিষয়ে সত্তাপিয়াসী চিন্তাশীলদের চিন্তা করে

দেখা উচিত। বিশেষ করে যাঁরা কুসংস্কার বিরোধী রূপে নিজেদের বোধ ও বোধিকে

প্রতিষ্ঠিত করতে চান।

বাহ্য পূজাবাদীদের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী পূজা শুরুর আগে মৃন্ময়ী

মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। আয়োজকদের বিশ্বাস, পুরোহিতের

মন্ত্রবলে নিষ্প্রাণ মূর্তিগুলো প্রাণবন্ত হয়। তর্কের খাতিরে বিষয়টাকে

সত্য বলে যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে একটা প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে,

জীববিজ্ঞান অনুযায়ী জীবন্ত প্রাণীদের চলন, গমন, ইত্যাদি অভিব্যক্তি থাকা

আবশ্যিক। অতএব বিজ্ঞানসম্মত কারণেই পুরোহিতের মন্ত্রবলে দুর্গাঠাকুরের

চালচিত্রের জীবন্ত দেবদেবী, অসুর, সিংহ, ময়ূর, সাপ, পেঁচা, ইঁদুরেরা নিজ

নিজ অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে। কেউ চুপচাপ স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে পারবে

না। ফলে শুরু হয়ে যাবে মহিষাসুর মর্দিনীর বাস্তব উপস্থাপনা। অসুর,

দুর্গাকে আক্রমণ করবে, সিংহ গর্জন করতে করতে দেবীকে নিয়ে অসুরের দিকে

ধাবিত হবে, বাহনসহ অন্যান্য দেবদেবীরাও যোগদান করবে যুদ্ধে।–এবার

প্রশ্ন–ওই অবস্থায় পুরোহিত, আয়োজকেরা, ভক্তেরা, উদ্বোধন করতে আসা

সেলিব্রিটিরা, নেতা-মন্ত্রীরা কোন পক্ষে যোগদান করবেন? দেবীর পক্ষে না

অসুরের পক্ষে ?

আর একটা প্রশ্ন, যে পুরোহিত আদ্যিকালের দেবদেবীদের কল্পিত মাটির

মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম, তিনি মানুষের প্রাণহীন দেহে আরো

সহজে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন বা পারা উচিত। কারণ, বিজ্ঞান মতে,

মাটির মধ্যে থাকা অণু-পরমাণুর তুলনায় সদ্য মৃতদেহের অণু-পরমাণু বেশী

সক্রিয় থাকে, বেশী জীবন্ত থাকে। মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী সরকারের স্বাস্থ্য

বিভাগ এ বিযয়টা নিয়ে ভেবে দেখতে পারেন। তাহলে অনেক অকালমৃত্যু সহজে রোধ

করা যাবে।

সনাতন ধর্মীয় মতবাদ অনুযায়ী মানুষ অমৃতের পুত্র, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’

বলা হয়েছে। সেই মানুষ যাতে দশবিধ-সংস্কারে সংস্কৃত হয়ে প্রকৃষ্ট জাতক বা

প্রজা হয়, অকালে নিষ্প্রাণ না হয়, সন্ত্রাসবাদী না হয়, রেপ-কেসের আসামী

না হয়, নারীদের মা-দুর্গার প্রতীক জ্ঞানে সম্মান জানায়, ‘অসতো মা সদ্গময়,

তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়’-এর আদর্শ অনুসরণে সমৃদ্ধ

হয়,–সমাজের পুরোভাগে থেকে, ওইসব বিষয়ে মানুষকে সচেতন করে পরিবেশের

হিতসাধন যাঁরা করতেন তাঁদের বলা হতো পুরোহিত।

সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পুরোহিত ঋষি বশিষ্ঠ রামচন্দ্রের রাজসভায়

অকালমৃত্যু-দেহে প্রাণ সঞ্চার করার স্পর্দ্ধা দেখান নি। বিজ্ঞান-যুগের

পুরোহিতেরা যদি পুতুলে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন, মৃতদেহেও পারা

উচিত! যদি না পারেন, ততঃ কিম্!

ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি, ‘পূজা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সম্বর্দ্ধনা।

পূজ্য ব্যক্তিত্বের গুণে গুণান্বিত হয়ে নিজেকে এবং পরিবেশকে সম্বর্দ্ধিত

করা। এতদিন ধরে হাজার-হাজার দুর্গাপূজা করে আমাদের চিন্ময়ী নারীরা

কতখানি সমৃদ্ধ হয়েছে মা দুর্গার আদর্শ চরিত্রের চরিত্রায়নে ? আমাদের

চিন্ময় পুরুষেরা নারী সাধারণকে কতটা মা-দুর্গার প্রতীক মনে করে শ্রদ্ধা

করতে বা পূজা করতে শিখেছে ? আমরা সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির পথে কতটা এগিয়েছি?

আমাদের কতখানি দুর্গতি নাশ হয়েছে? আমাদের সার্বিক জীবন-চলনা দুর্গ-সম

পরিরক্ষিত হয়েছে কতটা?—তথ্য জানার অধিকার বলে এ বিষয়ে জানতে চাওয়াটা

নিশ্চয়ই অপরাধ হবে না! যদিও প্রচলিত তথ্য এর বিপরীত মত প্রকাশ করে চলেছে

দীর্ঘদিন ধরে। পূজাকে কেন্দ্র করে সাত্তিকতা বৃদ্ধি না পেলেও, তামসিকতা

বেড়ে যায় বহুগুণ। পুজোকে কেন্দ্র করে ভক্তদের অনিত্য দেহটাকে

পূজা-বিপরীত সাধের নানা বেশভূষায় সাজিয়ে দিতে বিকিকিনির পসরা সাজিয়ে

যারা বসেন, তারা কি পূজা-সদৃশ সততার দৃষ্টান্ত উপহার দেন সমাজকে ? পূজাই

যদি উদ্দেশ্য তবে ইভটিজিং, আদমটিজিং কেন হবে ? অপরাধ কেন বৃদ্ধি পাবে ?

দূষণ কেন বৃদ্ধি পাবে পূজাকে কেন্দ্র করে ?— এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে

?

দুর্গাপূজার বিষয়টাকে বাস্তববোধে চিন্তা করলে দেখা যাবে, আমাদের আলোচ্য

মা-দুর্গা পূজ্য তাঁর চরিত্রগুণে। মা দুর্গার সমার্থক, মা উমাকে আমরা

কন্যা জ্ঞান করি। তাইতো ফি বছর কৈলাস থেকে নিয়ে আসি। যদিও তাঁকে আনতে এবং

দিতে কে বা কারা যান। কোন রুটে দোলায়, নৌকায়, ঘোটকে এবং গজে যাতায়াত

করেন, সে খবর দেবার দায়িত্ব তথ্যাধিকারীদের, আমার নয়! তবে আমি এবং আমরা

দশভুজার চাইতেও দ্বিভুজা উমাকে বেশী পছন্দ করি বলেই না উমাকে নিয়ে কতই না

আগমনী গানের ডালি সাজিয়ে তাঁকে বরণ করে নিতে চাই। কামনা করি, ঘরে ঘরে

উমার মত আদর্শ মেয়ে যেন জন্মায়। উমাই তো আমাদের মা দুর্গা! ভারতেই শুধু

নয়, সারা বিশ্বের সংস্কৃত মনীষায় নারীজাতির আদর্শরূপে স্বীকৃত, পূজিত।

স্বীকৃতি পাবেনই না বা কেন, পূজিত হবেনই না বা কেন,–কারো কান-ভাঙানিতে

কান না দিয়ে পরমভক্ত-পরমজ্ঞানী শিবকে পতিরূপে বরণ করে, স্বামীর

মনোবৃত্যানুসারিণী স্ত্রী হয়ে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীদের ন্যায়

কৃতি সন্তানদের জননী হয়েছেন। তিনি একজন আদর্শ সংসারী নারী হয়েও অসৎ

নিরোধী তৎপর,–অশুভ শক্তিকে সমুচিত দণ্ড দেবার জন্য রণসাজে সজ্জিত

হয়েছেন। পশুরাজকে করেছেন বাহন। পারস্পরিক শত্রু খাদ্য-খাদক সম্পর্কের

পেঁচা-ইঁদুর, ময়ুর-সাপকে মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ করেছেন। দুটি হাত দিয়েই

বৃহত্তর সংসারের দশদিক সামলাতেন। তাই তো তিনি দ্বিভূজা হয়েও দশ

ইন্দ্রিয়কে বশ করে হতে পেরেছেন দশভূজা। তাই তো তিনি দশপ্রহরণধারিণী। তাই

তো তিনি পূজ্য। –এহেন চরিত্র ‘দেবী’ জ্ঞানে, ‘জগজ্জননী’ জ্ঞানে স্বীকৃতি

তো পাবেনই। তাই তো আমাদের ঋষিরা দেবতাদের সম্মিলিত শক্তিতে সৃষ্ট দেবী

দুর্গা কাত্যায়ন অঙ্গনে মহিষাসুরকে বধ করার পর তাঁর প্রদর্শিত শক্তিকে

দৃষ্টান্ত স্বরূপ চিরস্থায়ী একটা আদর্শে রূপ দিয়েছিলেন। দেবী দুর্গাকে

স্ত্রীজাতির এক আদর্শ প্রতীক রূপে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁরা দেবী দুর্গার ওই

অসৎ-নিরোধী তৎপরতাকে দৃষ্টান্ত বূপে তুলে ধরে নারীসাধারণকে দেবী রূপে,

জগন্মাতা রূপে মর্যাদা দিয়েছেন, কামিনীরূপে নয়। তাইতো বর্তমানেও

সম্ভ্রান্ত হিন্দু নারীদের মধ্যে দেবী পদবি প্রচলিত। ঋষিরা ছিলেন

বিজ্ঞানী। তাই তো তাঁরা দুর্গাপূজার বিধান দিলেন বাস্তব অনুশাসনের

মাধ্যমে। আত্মবিস্তার কল্পে গর্ভাধান-সংস্কারের সময় স্বামী, নিজের

স্ত্রীকে জগন্মাতা জ্ঞানে স্ত্রীর নাভিমূল স্পর্শ করে বলবেন, প্রসীদ মা

জগজ্জননী,–হে জগন্মাতার প্রতীকস্বরূপা চিন্ময়ী মা, তুমি প্রসন্ন হয়ে

আমাকৃত গর্ভাধান মাধ্যমে দেদীপ্যমান আত্মাকে আকর্ষণ কর।–ওই স্বীকৃতির

মাধ্যমে স্ত্রীকেও মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েছেন, কামিনীজ্ঞানে নয়।

এর কারণ, স্বামী, স্ত্রীর মাধ্যমে নিজেকে জন্মান, তাই তিনি জায়া।

জীববিজ্ঞান অনুসারে প্রজনন-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আত্ম-প্রতিলিপি গঠন করা

হয়। পুরুষ-বীজ ধারণ করে, বীজের প্রতিলিপি গঠন করে ভূমি-স্বরূপা নারী। জনন

করেন বলে জননী। তাই কৃষকেরা ফসল ফলাতে জমি কর্ষণ করে, কর্ষণ মানে আকর্ষণ,

যাতে জমি বীজ থেকে ভালো সন্তান (ফসল) আকর্ষণ করতে পারে। জমি অনুযায়ী

উপযুক্ত শুদ্ধ-বীজ বপনের আগে ভূমিকে আগাছা মুক্ত করে, সার দেয়, জল দেয়,

জমি জননক্ষম হলে জো বুঝে বীজ বোনে।–জমিকে মাতৃজ্ঞানে পোষণ দিয়ে ভূমিকে

পূজা করে—যাতে জমি বীজের অন্তর্নিহিত সত্তাকে ভালোভাবে পুষ্ট করতে পারে,

বীজের সত্তাকে ধারণ করে আদর্শ মা হয়ে ভালো ফসল ফলাতে পারে। ফসল ফলাতে যদি

গর্ভাধান প্রক্রিয়া থাকতে পারে, মানুষ ফলাতে তো আরও বেশী বিধি-নিয়ম থাকা

উচিত! আমাদের ঋষিরা ছিলেন প্রকৃত বিজ্ঞানী। বিজ্ঞান শব্দটিও উপনিষদ থেকে

উৎপত্তি হয়েছে। তাই ঋষিরা নারীদের জগন্মাতাজ্ঞানে ব্যবহার (treat) করতে,

শ্রদ্ধা (honour) করতে শিখিয়েছেন।–যার নাম প্রকৃত পূজা। যার মাধ্যমে

স্বভাবের স্ফূরণ হয়ে সব অভাবের পূরণ হয়।

এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন, “Accident-এ (আকস্মিকভাবে) যা’ জন্মে, তা

বুনো, বিহিত সুফলপ্রদ চাষে যা’ জন্মে তা’ পুণো (পুণ্য)। প্রবৃত্তি লালসায়

অবিধিপূর্বক উপগতি হয়ে যে সন্তান জন্মে, তার চরিত্রের কোন ঠিক ঠিক থাকে

না। গর্ভাধান সংস্কারের ভিতর দিয়ে উন্নত চিন্তাপ্রসূত বিধিমাফিক পবিত্র

যে জন্ম, তার রকমই আলাদা। ঘরে ঘরে ভগবান জন্মে। তেমনি ছিল আমাদের

বিধান।’’ (আঃ প্রঃ ১৮/১৩) অতএব আমাদের ঘরের মা দুর্গারা যেদিন আবার ঘরে

ঘরে ভগবান জন্মাতে পারবেন সেদিন সার্থক হবে আমাদের দুর্গাপূজা।

দুর্গাপূজার বাস্তবতা তুলে ধরতে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেনঃ

“….যে মৃন্ময় মূর্ত্তি

আমরা পূজা করি—

কল্পনায় প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করে,–

তিনি দশভূজা,

দশপ্রহরণ-ধারিণী—

ঐ আমাদের মায়েরই প্রতীক—

আমাদের ঘরে ঘরে

যে মা অধিষ্ঠিতা

তাঁরই বিনায়িত সুসঙ্গত প্রতীক;

তাই ঐ মায়ের পূজা মানেই হচ্ছে—

যে মা আমার,

যে মা তোমার,

যে মা ঘরে ঘরে

দুর্গা হয়ে অধিষ্ঠিতা,

দুর্গতিনাশিনী হয়ে

দশপ্রহরণ ধারণ করে

সন্তান-সংরক্ষণায় নিয়োজিতা,

সেই মায়েরই পূজা;………..”

(আশীষ বাণী, ৬২/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)

“মা আমাদের দশভুজা,

প্রতি ঘরে ঘরে

যদিও তাঁকে

দ্বিভুজাই দেখতে পাই,

তিনি

দশদিক্ আবরিত করে রেখেছেন—

তাঁর স্নেহ-উৎসারিত

স্বস্তি-উৎসারিণী উদাত্ত অনুচর্য্যায়,

কায়মনোবাক্যে

প্রতিটি কর্ম্মের ভিতর-দিয়ে

ব্যষ্টির পথে

সমষ্টিকে আন্দোলিত করে,

সাত্বত উৎসর্জ্জনায়

আপূরিত করে সবাইকে,

কৃতি-উদ্দীপনার অনুপ্রেরণায়—

তাই মা আমার দশভূজা;……”

(আশীষ বাণী, ৫৯/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)

“পূজা মানেই হল বর্দ্ধনা। (আঃ প্রঃ ১২-১২-১৯৪১)

আমি আপনার পূজা করছি মানে, আপনার গুণ চিন্তা করছি এবং নিত্য অনুশীলনের

মাধ্যমে ঐ গুণগুলি আমার চরিত্রগত করে তুলছি, আমার ভিতরে বাড়িয়ে তুলছি।

স্তব করি মানে গুণ বর্ণনা করি। তা কিন্তু শুধু মুখে বা মনে-মনে করলেই

হবে না, প্রতিদিনকার অভ্যাস ও অনুশীলনের ভিতর দিয়ে ঐ গুণগুলি আমার

চরিত্রে মূর্ত্ত করে তোলা চাই।’’ (দীপরক্ষী ৪/১৮২)

।। পূজা কেমন করে করতে হবে ।।

“দেবতার পূজা-অর্চনা করতে গেলে আগে ইষ্টের ভাব অন্তরে জাগ্রত করে সেই

ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে, দেবতার স্মরণ মনন করতে হয়। তাঁকে স্মরণ করা

মানে—তাঁর চলন-চরিত্র ও গুণ গরিমা স্মৃতিতে এনে অনুশীলনের ভিতর দিয়ে

আয়ত্ব করা। চরণ-পূজা মানে চলন পূজা। ইষ্টের চলনাকে নিজের জীবনে আয়ত্ত

ক’রে ঐ চলনের প্রসারতা ও সম্বর্দ্ধনা যদি না ঘটাই বাস্তবে, তাহলে তাঁর

চরণ-পূজা সার্থক হয় না। আমরা ফাঁকতালে কাম সারতে চাই, কিন্তু বিধি বড়

কঠিন বান্দা, কোন চালাকি চলে না তাঁর কাছে।” —শ্রীশ্রীঠাকুর

অনুকূলচন্দ্র

(আ. প্র. ২৯. ১২. ১৯৪২)

“প্রশ্ন। হিন্দুরা দেবদেবীর পূজা করেন কিন্তু মুসলমানেরা একমাত্র

খোদাতায়ালার পূজা ক’রে থাকেন। হজরত ত’ ছবি ও পুতুল-পূজা একেবারেই নিষেধ

ক’রে গেছেন, কিন্তু আপনি এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য করছেন কেমন-ক’রে ?

শ্রীশ্রীঠাকুর । ধর্ম্ম-আচরণের দিক দিয়ে হজরত রসুলও যা’ ব’লে গেছেন,

আর্য্যদের ধর্ম্মশাস্ত্র চিরকালই ঋষির নিদেশরূপে তাই বহন ক’রে আসছে।

আর্য্য-ধর্ম্মশাস্ত্র ছবি বা পুতুল-পূজা এমনতর বিকট তাচ্ছিল্যের সহিত

নিরস্ত করতে ঘোষণা ক’রেছেন—এমন-কি অধমাধম বলতেও ক্ষান্ত হন নি। তবে

আর্য্য-ঋষিদের প্রত্যেক মানুষকে উন্নতির পথে নিয়ন্ত্রণ করবার এমনতর একটা

ঝোঁক ছিল—যা-নাকি হজরত রসুলের ভিতর দেখেত পাওয়া যায়–………..”

(ইসলাম-প্রসঙ্গে/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র/পৃঃ ২৮-২৯)

‘‘ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ, ভক্ত রামপ্রসাদ, সাধক রামকৃষ্ণ, সর্ব্বানন্দ

ঠাকুর প্রভৃতি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ প্রতিমা পূজা করেছেন বটে, তাঁদের ঐ

পূজার পিছনে ছিল গুরু-পূজা, ইষ্ট-আরাধনা ; ঐ প্রতিমার পরিকল্পনার ভেতর

দিয়ে ছিল অশেষ ও অঢেলভাবে ইষ্টানুরক্তি। তাই, ঐ অধম অবলম্বনও তাঁদিগকে

অধমভাবে আটকে রাখতে পারে নি। তাঁদের ঐ চলনার পথে একটা সময় এসেছিল, তখন

তাঁদের ঐ প্রতিমা তাঁদের দর্শনের সম্মুখে আর ও-রকম ছিল না। ভগবান

রামকৃষ্ণদেবেরও শোনা গিয়েছে—তাঁর এমনতর সময় এসেছিল, যখন

মূর্ত্তি-টুর্ত্তি তাঁর সাধনার পথে বাধাই সৃষ্টি করতো। তিনি এমন-কি তাঁর

ঘরে যে-সমস্ত ছবি-টবি ছিল, সেগুলিকেও সরিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি না-কি এই

বলেছিলেন—‘মেয়েরা ততদিন পুতুলখেলা করে, যতদিন তার বে’ না হয়,

স্বামী-সহবাস না করে।’ সাধক রামপ্রসাদ তাঁর স্বরচিত গানের ভেতরেই তো

বলেছেন—

‘‘ধাতু-পাষাণ মাটির মূর্ত্তি

কাজ কি রে তোর আরাধনে

তুই মনোময় প্রতিমা গড়ি’

বসা হৃদি-পদ্মাসনে।।’’

এমন কত কি যে আছে, তার ইয়ত্তা নেই।’’

(–শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, কথা প্রসঙ্গে, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৭৬, ১৭-১০-১৩৪২)

এবার আমরা এক়টু দেখে দেখে নেব, পূজা প্রসঙ্গে ‘মেরা ভারত মহান’-এর

অন্যান্য মহানেরা এবং মহান গ্রন্থগুলো কি নিদেশ রেখে গেছেন।

পূজা বিষয়ে মহানির্ব্বাণতন্ত্র নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ

‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ।

অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’

মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ভারতে বিবেকানন্দ গ্রন্থের ৩৩৬

পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট।

ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’

‘‘যে-ব্যক্তি সর্ব্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ

প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে।’’ –শ্রীমদ্ভাগবত। ৩-২৯-২২

“ঈশ্বরঃ সর্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জ্জুন তিষ্ঠতি।

ভ্রাময়ন্ সর্ব্বভূতানি যন্ত্ররূঢ়ানি মায়য়া।।“

–গীতা, ১৮।৬৫

“যিনি এই সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার নিজের স্বধর্মানুরূপ

নিষ্কাম কর্মাচরণ দ্বারা (বাক্য বা ফুলজল দ্বারা নহে) পূজা করিয়া মানুষ

সিদ্ধি লাভ করে । স্বধর্মানুরূপ (বর্ণানুগ সত্তাধর্ম পালন) নিষ্কাম কর্মই

পরমেশ্বরের পূজার ডালি । (গীতা ১৮।৪৬)

“যে ব্যক্তি সর্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ প্রতিমার

পূজা করে, স (শ্রীমদ্ভাগবত ৩।২৯।২২)

পূজা বিষয়ে মহানির্ব্বাণতন্ত্র নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ

‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ।

অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’

মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ভারতে বিবেকানন্দ গ্রন্থের ৩৩৬

পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট।

ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’

তাই, শাস্ত্র বর্ণিত অধমের চাইতেও অধম পূজায় মেতে উঠে আমাদের যাতে

ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে না হয়, তাই, শ্রীশ্রীঠাকুর

অনুকূলচন্দ্র আমাদের নিত্য বাস্তব দুর্গাপূজার পূজারী করে তুলতে

সৎসঙ্গীদের নিত্যপাঠ্য ‘সত্যানুসরণ’ নামক মহাগ্রন্থে নারীকে জগজ্জননী

জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত করতে নিদেশ দিয়ে বললেন, ‘‘প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী ।

প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয় ।’’ এবং

পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, ‘‘স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যে-জন, তাহার হয়

না ভবের বন্ধন মোচন । …..স্ত্রী চিন্ময়ী মা।’’—এই শিক্ষার ধারাকে

বাস্তবায়িত করার নাম প্রকৃত দুর্গাপূজা ।

শ্রীশ্রীঠাকুর শুধু পুরুষদেরই প্রতিনিয়ত দুর্গাপূজা করার বিধান দিয়েই

ক্ষান্ত হননি, নারী-সাধারণের মধ্যেও দেবী দুর্গার এক স্থায়ী আসন পেতে

দিতে অনুশ্রুতির বাণীতে বললেন—

‘‘শার্দ্দুলেরে বাহন করে

সাপের ফণার মালা পরে

কালবোশেখী ঝঞ্ঝাবেগে

ছোটরে নারী ছোটরে ছোট্ ।

দত্যিদানার নীচ বাহানা

আর্য্যাবর্তে দিয়ে হানা

ঘূর্ণিপাকের বেতাল গাঁথায়

হুলিয়ে ভুলিয়ে দিচ্ছে চোট্ ।

দশ প্রহরণ দশ হাতে ধর

বক্ষবিদরি ধ্বংসি ইতর

সূর্য্যরাগী বজ্রতেজে

আর্য্যনারী শত্রু টোট্ ।”

তিনি নারীকে অবলা নয়, সবলারূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন । নারীর সতীত্বই

নারীকে সবলা করে তোলে। তাই তিনি কত আশা নিয়ে বললেন—

‘‘সতীর তেজে ঝলসে দে মা

নিঠুর কঠোর অন্ধকারে

মদনভস্ম বহ্নিরাগে

বৃত্তি-রিপু দে ছারখারে ।

প্রণবতালে ইষ্টমন্ত্র

ঝঙ্কারি তোল সকলতন্ত্রে

বিষাণ হাঁকে রুদ্র দোলায়

বজ্রে হানি মৃত্যুদ্বারে।’’

মা দুর্গার আদর্শে অনুরঞ্জিত উক্ত বাণীগুলো যাতে তার সন্তানদের মননশীলতায়

মা দুর্গার

তাই আসুন, পূজার নামে অনিত্য-বস্তুর প্রতিযোগিতায় না মেতে, সব দেবতার

সমাহার-স্বরূপ যুগ-পুরুষোত্তমের বিধি মেনে, মা দুর্গার নিত্য-সিদ্ধ

দেদীপ্যমান আদর্শের আলোকে, আমাদের ঘরের মেয়েরা যাতে রাষ্ট্রপূজার

অর্ঘ্যস্বরূপ সুজননে সুসন্তানের উপহার সাজিয়ে,

শক্তিরূপিণী-দশপ্রহরণধারিণী সাজে সজ্জিত হয়ে নরাসুরদের কিভাবে দমন করে

অস্তিত্ব রক্ষার পূজার পূজারী হতে পারে,– সেই চেষ্টায় যত্নবান হই।

জয়গুরু ! বন্দে পুরুষোত্তমম্!

***************************************

Like

Comment

Share

মহালয়া

।। মহালয় বা মহান আলয় ।।
নিবেদনে—তপন দাস


পণ্ডিতদের মতে মহালয়ার দিনে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করে দেবতা ও ব্রাহ্মণদের উদ্দেশ্যে খাদ্যদ্রব্যাদি উৎসর্গ করা প্রকৃতপক্ষে পিতৃপুরুষের ঋণস্বীকার ছাড়া আর কিছুই নয় ।

ভারতকোষ গ্রন্থে চিন্তাহরণ চক্রবর্তী মহালয়াকে ‘পিতৃপুরুষের উৎসবের আধার’ বলেছেন। লয় প্রাপ্তি অর্থাত চন্দ্রের লয় হয় এই অমাবস্যা তিথিতে আর দর্শণশাস্ত্র মতে আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়ের সূক্ষাতিসূক্ষ্ম অনুভূতিগুলি অর্থাত পরমাত্মার রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ-শব্দ এই মহতাদির লয় হয় । তাঁরা তৃপ্ত হন তর্পণের দ্বারা । জাগতিক অনুভূতিগুলি থেকে মুক্ত হয়ে আত্মারা পরমানন্দে ফিরে যান স্বর্গলোকে। পিতৃপুরুষেরা নাকি এই সময়ে পরলোক থেকে ইহলোকে আসেন জল ও পিণ্ডলাভের আশায়। শাস্ত্রজ্ঞের অভিমতে, প্রয়াত পিতৃপুরুষদের জল-পিণ্ড প্রদান করে তাঁদের ‘তৃপ্ত’ করার উদ্দেশ্যেই এই তর্পণ ।

পণ্ডিত সতীনাথ পঞ্চতীর্থের মতে মহালয়ায় যে তর্পণ করা হয়, তা শুধুই পিতৃপুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেব তর্পণ, ঋষি তর্পণ, দিব্য-পিতৃ তর্পণ ইত্যাদির সঙ্গে থাকে রাম ও লক্ষ্মণ তর্পণ এবং জগতে সকল প্রয়াতকে জলদানের মাধ্যমে তৃপ্ত করার কথা বলা আছে। এমনকি জন্ম-জন্মান্তরে যাঁদের আত্মীয়-বন্ধু কেউ কোথাও নেই এরূপ সকল প্রয়াতকে জলদান করে তাঁদের আত্মার তৃপ্তি সাধন করা যায়।

প্রথমে তাম্রপাত্রে কৃষ্ণ তিল এবং অন্য আরেকটি তাম্রকুন্ডে তর্পণের জল ফেলতে থাকে ব্রতী । মন্ত্রোচ্চারণের দ্বারা প্রথমে সে তার জল নিয়ে পৌঁছে যায় দেবলোকে…ওঁ ব্রহ্মা, ওঁ বিষ্ণু, ওঁ রুদ্র, ওঁ প্রজাপতিস্তৃপত্যাম্‌। তারপর ঋষিলোকে সপ্ত ঋষিকে প্রণতি পূর্বক তর্পণের দ্বারা তৃপ্ত করে।
দেবলোক, ঋষিলোকের পর “এতত্‌ সতিলোগঙ্গোদকং ওঁ যমায় নমঃ’ …এই বলে মন্ত্রোচ্চারণ করে যমতর্পণ । এবার মহাভারতের সত্যবাদী জিতেন্দ্রিয় ভীষ্ম পিতামহের তর্পণ, রামতর্পণ এবং সবশেষে স্বর্গত আত্মীয় পরিজনের নামে জলদান করার রীতি এই তর্পণে।


এ থেকে জানা গেল ওইদিন মৃত আত্মাদের উদ্দেশ্যে তর্পণ বা শ্রাদ্ধ করা হয়। এরসাথে কোন দেবী-আরাধনার সম্পর্ক নেই। তাছাড়া কোন দেবীর এমন কোন জীবন্ত আদর্শ পাওয়া যায় না, যেখানে জীবাত্মার গতি-প্রকৃতি বর্ণিত হয়ছে। জীবাত্মা, পরমাত্মার সন্ধান বেদে, উপনিষদে পাওয়া গেলেও পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ গীতা গ্রন্থে বিশদে বর্ণনা করেছেন। সেখানেও আমরা কোন দেবীর যোগ খুঁজে পাই না।
মহাভারতে পুরুষোত্তম কেন্দ্রিক জীবন চলনাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কোন দেবীর সাহায্য ছাড়াই ভক্ত যতীশ ঘোষ, ভক্ত নফর ঘোষ প্রমুখদের লিঙ্গ- শরীরের সাথে বার্তালাপ করেছেন। এগুলো প্রামাণ্য সত্য।
শ্রীশ্রীঠাকুর পিণ্ডদেহ এবং লিঙ্গদেহের গতিপ্রকৃতি সকলের সামনে সহজভাবে উপস্থাপন ক‍রেছেন। তার দু-একটা উদাহরণ তুলে ধরার চেষ্টা করছি।


যোগন -” মরার সময় কিভাবে বুঝতে পারবো কোন্ দেশে বা যাচ্ছি আর কিরকমই বা হ’চ্ছে? “

শ্রীশ্রীঠাকুর – চিত্রগুপ্তের কথা শুনেছেন তো? সারাজীবনের কার্য্য ও চিন্তার চিত্র মৃত্যুকালে মূর্ত্তিমান হ’য়ে একে- একে দেখা দেয়, তারপর সব চিত্র গুপ্ত হ’য়ে গেলে light (জ্যোতি) দেখা যায়। যাদের সেই জ্যোতির সঙ্গে পরিচয় আছে ( অর্থাৎ মৃত্যুকালের পূর্ব্বেও যারা সাধন দ্বারা সেই জ্যোতি দর্শন করেছে) তাদের সে-সময় ভয় হয় না; তারা তাই ধ’রে ব’সে থাকে, আর সদগুরু সেই জ্যোতির মধ্যে এসে দাঁড়ান, তখন পরিচয় হ’য়ে যায়। আর ভয় থাকে না।

যোগেন -আচ্ছা, মরার সময় ভয় পায় কি? এই যে সব যমদূতের বিকট চেহারা দর্শনে ভয় পাবার কথা শুনা যায়, তা’ সত্য নাকি?

শ্রীশ্রীঠাকুর – মনের ভাব সব মৃত্যুকালে এক- একটা form ( আকার) নিয়ে তো সম্মুখে আসে। ধরুন, কোনও স্ত্রীলোকের প্রতি খারাপ নজর যদি থাকে, তবে মরার সময় ঐ খারাপ ভাবটা form নিয়ে সামনে আসবে, আর, খারাপ ভাব যে form নেবে তা’ মনোহর তো হবে না, বিকটই হবে, কাজেই তা’ দেখে ভয় হ’তেই পারে।

যোগেন – আচ্ছা, সদগুরু ধরায় অবতীর্ণ হ’লে যারা তাঁকে আশ্রয় করে তারা কি সকলেই মুক্ত হয়?

শ্রীশ্রীঠাকুর – হ্যাঁ, যারা তাঁকে প্রকৃতই আশ্রয় করে, তাঁর উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে, তাদের সকলকেই তিনি মুক্তি দেন।

(অমিয়বাণী, পৃষ্ঠা -১৫
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)

** মরো না, মেরো না, যদি পার মৃত্যুকে অবলুপ্ত কর **
।। প্রসঙ্গ মৃত্যু : –অমিয়বাণী গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী ।।
অশ্বিনীকুমার বিশ্বাস—আচ্ছা, যাদের সদগুরু লাভ হয়েছে তারা তো
মৃত্যুকালে সদগুরুর সাক্ষাৎ পাবে? তারফলে তারা তৎক্ষণাৎ মুক্ত হবে? যদি
তা না হয় তবে সাক্ষাৎ পাওয়ায় লাভ কি?
শ্রীশ্রীঠাকুর—এখানে জীবন্মুক্ত না হয়ে যারা মরবে তারা মৃত্যুকালে
সদগুরুর সাক্ষাৎ পেয়ে এই লাভবান হবে যে, একাকী অনির্দ্দিষ্ট পথে যাবার
জন্য ভয় পাবে না, আধারে ঘুরবে না, তাঁর আশ্রয় পেয়ে তৎকালে ভীত হবে না, আর
এ-জীবনে যতদূর উন্নত হয়েছিল, যেরূপ জীবন পেলে তারপর থেকে কাজ করতে পারে,
সেইরূপ জন্মলাভ করবে। যে-সমস্ত অসৎ কর্মফল ছিল তা ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তদ্
দরুন নিম্নতর যোনিতে জন্মাতে হবে না। ওরূপ মানুষ ম’রে মানব ছাড়া অন্য
জন্ম তো পাবেই না, বরং মানবের মধ্যে উন্নত চরিত্রের মানব হ’য়ে জন্মাবে।


মৃত্যু সম্বন্ধে বলিতেছেন-“Hundred twenty years-এ যে মৃত্যু সেইটাই natural। তার পূর্বে যে সমস্ত মৃত্যু হয়, সেগুলো unnatural। ব্যক্তিগত সাধনা দ্বারা, উন্নত প্রণালীর চিকিৎসা দ্বারা লোকের এই অকালমৃত্যু control করা যায়। মৃত্যুতে cells-এর পরিবর্তন হয়, অর্থাৎ একরকমের cells আর এক রকমের cells-এ transformed হয়, কিন্তু প্রত্যেক cell-এরই consciousness আছে। এই হিসেবে মৃত্যু আর কিছুই নয় কেবল diffusion of crystallised consciousness—cell এর জড়ীভূত এক individual consciousness হারিয়ে cell-এর consciousness গুলি ছড়িয়ে যাওয়া। একটা idea-য় যেন cell গুলি দানা বেঁধে থাকে। মৃত্যুতে cell-এর disintegration হয়। সেই আত্মার উপলব্ধি যার হয়েছে তার জন্ম নাই, মৃত্যু নাই—এটা real; আর আমাদের কাছে পূর্বজন্ম পরজন্ম অস্তিত্বহীন, মিথ্যা, কারণ, আমরা আত্মার সঙ্গে নিজেদের এখনও identified করিনি বলে, আত্মাই যে নানা ঘূর্ণিপাক সৃষ্টি করে করে জীবন-মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চলছে তা বুঝিনা এবং অনুভব করি না।”

যতীনদা—“তা হলে তো আমাদের পূর্বজন্ম, পরজন্ম নেই। তবে আর শ্রাদ্ধাদির কি প্রয়োজন ?”

শ্রীশ্রীঠাকুর—“Individual consciousness cell consciousness-এ বিকীর্ণ হয়ে পড়ে। বহু cell চতুর্দিকে তাদের consciousness নিয়ে বিচ্ছুরিত হয়, এক জটিল আমিত্ব ভেঙ্গে খান খান হয়ে বহু কোষের বহু, আমিত্বে পরিণত হয়, আর তাই মৃত্যু। আমরা যে শ্রাদ্ধাদি করি তাতে আমাদের idea প্রসারিত হয়। তাতে ভাবজগতে idea-র জগতে ঝঙ্কার তোলে। Idea-র পুষ্টি sympathetic idea-তেই। তাই শ্রাদ্ধে উপনিষদাদির উচ্চভাবের স্মৃতিকে জাগরণ করা হয়।” (চির-স্মরণীয় ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ২য় খণ্ড, পৃঃ ৪৫)

আত্মা, ‘অত’’ ধাতু ‘মন্’ করে হয়েছে। ‘অত’ মানে নিয়তগতিশীল হওয়া। আত্মা কি ? আত্মা চিরচঞ্চল। Nerve-এর মধ্য দিয়ে vital energyর যে flow তাই আত্মা। দেখা যায় vital energy-তে হয় বাইরের জগতের impression বা photograph। তাই বলে, আত্মা হতে হয় মন। আর তাই মন নিয়তচঞ্চল। Vital current-এর break আর make করছে যা, তাই মন । মন তা হলে কিছুতেই স্থির হতে পারে না।

(চির-স্মরণীয় ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত জীবনীগ্রন্থের ২য় খণ্ড, পৃঃ ১১৩)


শ্রীশ্রীঠাকুর —চিত্রগুপ্তের কথা শুনেছেন তো? সারাজীবনের কার্য্য ও চিন্তার চিত্র মৃত্যুকালে মূর্ত্তিমান হ’য়ে একে- একে দেখা দেয়, তারপর সব চিত্র গুপ্ত হ’য়ে গেলে light (জ্যোতি) দেখা যায়। যাদের সেই জ্যোতির সঙ্গে পরিচয় আছে ( অর্থাৎ মৃত্যুকালের পূর্ব্বেও যারা সাধন দ্বারা সেই জ্যোতি দর্শন করেছে) তাদের সে-সময় ভয় হয় না; তারা তাই ধ’রে ব’সে থাকে, আর সদগুরু সেই জ্যোতির মধ্যে এসে দাঁড়ান,তখন পরিচয় হ’য়ে যায়। আর ভয় থাকে না।

যোগেন (প্রশ্ন কর্তা) —আচ্ছা, মরার সময় ভয় পায় কি? এই যে সব যমদূতের বিকট চেহারা দর্শনে ভয় পাবার কথা শুনা যায়, তা’ সত্য নাকি?

শ্রীশ্রীঠাকুর — মনের ভাব সব মৃত্যুকালে এক-একটা form ( আকার) নিয়ে তো সম্মুখে আসে। ধরুন, কোনও স্ত্রীলোকের প্রতি খারাপ নজর যদি থাকে, তবে মরার সময় ঐ খারাপ ভাবটা form নিয়ে সামনে আসবে, আর, খারাপ ভাব যে form নেবে তা’ মনোহর তো হবে না, বিকটই হবে, কাজেই তা’ দেখে ভয় হ’তেই পারে।

যোগেন — আচ্ছা, সদগুরু ধরায় অবতীর্ণ হ’লে যারা তাঁকে আশ্রয় কর তারা কি সকলেই মুক্ত হয়?

শ্রীশ্রীঠাকুর — হ্যাঁ, যারা তাঁকে প্রকৃতই আশ্রয় করে, তাঁর উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে, তাদের সকলকেই তিনি মুক্তি দেন।

(সূত্র : অমিয়বাণী, পৃষ্ঠা-১৫)

জন্ম ও মৃত্যুর আগম-নিগম-এর স্বরূপ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেনঃ “সম্বেগ জীবের বা মানুষের মধ্যে gene-এর (জনির) ভিতর দিয়ে যে pitch-এ (স্তরে) ওঠে, মরে যাওয়ার সময় psycho-plasm-এ (মানস দেহে) engraved ( মুদ্রিত) হয়ে থাকে সেই pitch-এ wave-এর (তরঙ্গের) আকারে। মিলনেচ্ছু sperm-এর (শুক্রকীটের) ভিতর সেই জাতীয় সম্বেগ সৃষ্টি হলে tuning (সঙ্গতি) হয় এবং মৃত ব্যক্তি পুনরায় শরীর গ্রহণ করার সুযোগ পায়। জন্ম ও মৃত্যুর এটাই revolving process (ঘুর্ণায়মান পদ্ধতি)।” (আ. প্র. ২১/১০৭) *মৃত্যুর স্বরূপ প্রসঙ্গে* শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন : “আমাদের consciousness (চেতনা) ধৃতি যেটা, যা’ নিয়ে আমরা থাকি, সেটা হ’ল সম্বেগ। যে-সম্বেগ দ্বারা আমরা বাঁচি, বাড়ি, সেটা যদি কোন কারণে blocked হয়ে যায় তাহলে আমরা

মরে যাই।” “আপূরয়মান ইষ্টে কারও যদি প্রকৃত টান জন্মে, এবং তাই নিয়ে যদি সে বিগত হয় তবে সে মহান জীবন লাভ করবেই। আবার, এ জীবনে যে যতই হোমরা-চোমরা হোক না কেন, সে যদি সুকেন্দ্রিক না হয়, প্রবৃত্তিই যদি তার জীবনের নিয়ামক হয়, তবে ঐ বিচ্ছিন্ন বিকেন্দ্রিকতা তার মৃত্যুকালীন ভাবভূমি ও পরজন্মকে যে অপগতিতে অপকৃষ্ট ক’রে তুলবে, তা’তে সন্দেহ কমই।” (আঃপ্রঃ ১/ ১৯.১১.১৯১৪)

শ্রীশ্রীঠাকুর কথাপ্রসঙ্গে বললেন—”মানুষের আত্মা যেমন অমর, নিষ্ঠাও তেমনি অমর। আমরা যে অমৃত-অমৃত করি, তার চাবিকাঠি হ’ল ইষ্টনিষ্ঠা। ইষ্টনিষ্ঠা যেই একজনকে পেয়ে বসে, তখন এক-একটা প্রবৃত্তির সিন্দুকের ডালা খুলে যেতে থাকে এবং বিভিন্ন প্রবৃত্তি ইষ্টমুখী অর্থাৎ একমুখী হ’তে থাকে। তখন বােঝা যায় কামের স্বরূপ কী, ক্রোধের স্বরূপ কী, লােভ-মােহ- মাৎসর্য্যের স্বরূপ কী! এবং এগুলির প্রত্যেকটির সপরিবেশ নিজের সত্তাপােষণী বিনিয়ােগ করা যায় কিভাবে। তখন মানুষ প্রবৃত্তির হাতে গিয়ে পড়ে না, বরং প্রবৃত্তিগুলি তার হাতে খেলার পুতুলের মত হয়ে দাঁড়ায়। বেফাঁস চলন বন্ধ হয়ে যায়। এইভাবে মানুষের ভিতরে অখণ্ড ব্যক্তিত্বের প্রতিষ্ঠা হয়। সে প্রাজ্ঞ হয়ে ওঠে। বােধিসত্ত্ব হয়ে ওঠে।”

আলোচনা-প্রসঙ্গে
উনবিংশ খন্ড
ইং ১৭.৪.১৯৫০


এখানে কোন দেবীর সাহায্য গ্রহণ করেন নি শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। অতএব পুরুষোত্তমের দৃষ্টি দিয়ে আমাদের সবকিছু দেখতে হবে।

HISTORY OF SATSANG PABNA

** সৎসঙ্গের পুরানো সেই দিনের কথা **

ভক্তপ্রবর ধীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর নিবন্ধ
একটি অবিস্মরণীয় মুহূর্ত

(যুগপ্রহরী, ৫ম বর্ষ ১ম সংখ্যা, মাঘ ১৩৭৯)

।। পাবনাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের অবদান।।                             [এই নিবন্ধের লেখক ভক্তপ্রবর ধীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, যাঁর যাজনে উদ্বুদ্ধ হয়ে সৎমন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন ঋত্বিগাচার্য্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য মহোদয়। লেখাটি ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র গ্রন্থ-এর ২য় খণ্ড থেকে সংগৃহীত।]

———————————————————————————————–

সেই ইংরেজী ১৯২৫ খৃষ্টাব্দের কথা। হিন্দু মুসলমানের দাঙ্গায় তখন বাংলার মাটী রক্তাক্ত। পাবনা জেলার লোক-সংখ্যার ৭৫ ভাগ মুসলমান। বাদ বাকী অন্য ধর্মাবলম্বী—তন্মধ্যে  হিন্দুর সংখ্যা খুবই অল্প। নগণ্য সংখ্যক হিন্দুদের মধ্যে কোন সংহতি নাই । প্রভাব ও প্রতিপত্তির মোহে হিন্দুগণ পরপর বিদ্বিষ্ট। ঈর্ষান্বিত হিন্দুগণ প্রতিদ্বন্দ্বী হিন্দুকে পর্যুদস্ত করবার জন্য মুসলমানগণের সাহায্য নিতেও দ্বিধা বোধ করেন না। মুসলমান দ্বারা কোন হিন্দু নারীর নারীত্বের লাঞ্ছনা হলেও হিন্দু প্রতিবেশী ক্ষুব্ধ হওয়া তো পরের কথা বরং সেই লাঞ্ছনার সুযোগ নিয়ে সেই গৃহস্থকে কি করে আরও বিপদে ফেলা যায় সে চেষ্টাতেও কুণ্ঠিত নন। সংখ্যালঘিষ্ঠ হিন্দুগণের আত্মরক্ষার জন্য যেখানে তাঁদের সংহতির একান্ত প্রয়োজন—ঈর্ষার নীচতায় সেখানে তাঁরা পরস্পর বিদ্বিষ্ট। 

এই নিকৃষ্টতম পরিবেশে মহামানব শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের  আবির্ভাব। বাংলার প্রতি জেলায় জাতিধর্ম নির্বিশেষে অগণিত নরনারী তাঁর চরণাশ্রয়ে অভিনব চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে উঠল। প্রেমের বন্ধনে তারা হল একাত্ম।

ক্রমে ক্রমে বহু বিদ্বজ্জন, বরেণ্য নেতাগণ, বৈজ্ঞানিক ও শিল্পবিদ মনীষিগণের আগমনে হিমাইতপুর সৎসঙ্গবাটী মুখর হয়ে উঠল। অত্যল্পকাল মধ্যেই সেই জঙ্গলাকীর্ণ শ্বাপদসঙ্কুল আশ্রমবাটী হর্ম্যসঙ্কুল নগরে হল পরিণত। নানাবিধ শিল্পবাটী, বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার, বিদ্যায়তন প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের জন্য সৎসঙ্গ আশ্রমের পরিধি বিস্তৃত হয়ে চলল। শ্রী ও সম্পদে এই তীর্থ অভিনব সৌন্দর্যে হল প্রস্ফুটিত। বাংলার লক্ষ লক্ষ নরনারী শ্রীগুরু  দয়ালের জয়গানে হল মুখরিত। পাবনা জেলাতেও কিছু-সংখ্যক হিন্দু এই মহামন্ত্রে হলেন দীক্ষিত।

কিন্তু ঈর্ষা যাঁদের সহজাত, প্রভাব ও প্রতিপত্তির মোহ যাঁদের মনুষ্যত্ব বা বিবেককে পীড়িত করে রেখেছে — তাঁদের পক্ষে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ঐশী প্রভাব সহ্যের বাইরে! তাঁরা এই মহামানবের দেবচরিত্রের উপর নানাবিধ কলঙ্ক আরোপ করে তাঁর ও সৎসঙ্গের অপপ্রচারে হয়ে উঠলেন উন্মত্ত। বাংলার জেলায় জেলায় আশ্রমের অপপ্রচারের তাঁরা এজেন্সী খুলে দিলেন। তাঁদের মাত্রাতিরিক্ত নিন্দাবাদে কিন্তু বাংলার জনসাধারণ শ্রীশ্রীঠাকুরের বিষয়ে অতিশয় অনুসন্ধিৎসু হয়ে অবশেষে দীক্ষা গ্রহণ করে ধন্য হলেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস মহাশয় শ্রীশ্রীঠাকুরকে বলেছিলেন–‘আমি আপনার এতো নিন্দা শুনেছি যে তাতেই ধরে নিয়েছিলাম যে—এখানেই মিলবে সত্যের সন্ধান। এটা আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা।’

হিন্দু-মুসলমান সংঘর্ষ পল্লীগ্রামে তখনো বিস্তৃত হয় নি। পাবনার আতঙ্ক কেবল শহরেই সীমাবদ্ধ। আশ্রম-বিদ্বেষী হিন্দুগণের মনে এই সময়ে আশ্রমকে অবলুপ্ত করবার এক চক্রান্ত উঠল জেগে। এই সংঘর্ষের সুযোগে তাঁরা গ্রামস্থ মুসলমানগণকে আশ্রম আক্রমণের জন্য প্ররোচনা দিতে তৎপর হয়ে উঠলেন।

কিন্তু হিমাইতপুরের দরিদ্র মুসলমানগণ আশ্রমের দ্বারাই প্রতিপালিত, শ্রমের বিনিময়েই তাদের গ্রাসাচ্ছাদন। উপরন্তু অসুখে বিসুখে বিনা পয়সায় তাদের চিকিৎসা, পূজা পার্বণে তাদের পরিবারবর্গের সকলকেই পরিচ্ছদাদি বিতরণ, দায়-অদায়ে অর্থ সাহায্য হোত এই আশ্রম থেকেই। সর্বোপরি . শ্রীশ্রীঠাকুরের উপর তাদের শ্রদ্ধা ছিল নিবিড়। আশ্রমের ধ্বংস-সাধন ছিল তাদের  স্বপ্নেরও অগোচর ।

আশ্রম-বিদ্বেষী হিন্দুগণ মুসলমানদের দিয়ে এই সংঘর্ষের সুযোগে আশ্রমের অবলুপ্তি ঘটাবার জন্য হয়ে পড়লেন উন্মত্ত। তাঁরা গ্রামস্থ মুসলমানদের একত্রিত করে গোপনে গোপনে উত্তেজিত করে তুলতে লাগলেন।

গ্রাম্য মুসলমানদের তাঁরা বোঝালেন—‘অনুকূলঠাকুর যে ভাবে এই হিমাইতপুর গ্রামে হিন্দু বসবাস আরম্ভ করাচ্ছেন, বাংলার নানাস্থানের বিত্তবান ও প্রভাবশালী হিন্দুরা যেভাবে এখানে স্থায়ী ঘরবাড়ী নির্মাণ করে আশ্রমের আয়তন বিস্তৃত করে চলেছে তাতে এখানে হিন্দুর সংখ্যা বেড়ে গিয়ে দরিদ্র মুসলমানদের এই গ্রাম থেকে উৎখাত হতে হবে। মুসলমানদের কল্যাণের জন্যই আশ্রম ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। আর যত নষ্টের মূল ঐ অনুকূল ঠাকুরকে নিকেশ করে সৎসঙ্গের একান্ত সমাধির প্রয়োজন।

আরও একটা কথা—আশ্রমে যাঁরা আছেন তাঁরা সকলেই সম্পন্ন ঘরের সস্তান। তাঁদের স্ত্রী-কন্যাগণ অভিজাত বংশসম্ভূতা। এই আক্রমণের সুযোগে আশ্রমবাসীদের ধনসম্পদ আর অনন্যা সুন্দরীদের অবাধ লুণ্ঠনেরও সুবিধা হবে।’

স্বল্পবুদ্ধি গ্রাম্য মুসলমানগণ হিমাইতপুরের হিন্দুগণের অসার বক্তৃতায় হয়ে পড়ল অভিভূত। আশ্ৰম আক্রমণের সুযোগ-সন্ধানে তারা রইল প্রতীক্ষায়। সে সুযোগ অচিরেই তাদের উপস্থিত হল অপ্রত্যাশিতভাবে।

আমাদের পরম পূজনীয়া  বড়মায়ের এক সহোদরার অন্তিমকালে তাঁর তিনটি শিশু সন্তানের ভার দিয়ে গেলেন বড়মায়ের হাতে। সেই তিনটি সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠ পুত্র সন্তানটির সেদিন অকালে হল প্রাণবিয়োগ। তার ডাক নাম ছিল পচা। শব নীত হল শ্মশানে । নফরদা শবদাহের কাষ্ঠ প্রভৃতি নিয়ে গেলেন সেখানে । 

এই গ্রাম্য শ্মশানটি ছিল আশ্রমের অনতিদূরে পূর্বদিকে। বাঁধের উপর থেকে বেশ দেখা যায়। শবদাহের উদ্যোগপর্ব যখন চলছে সেই সময় কতিপয় অতিপরিচিত ঐ গ্রামেরই মুসলমান যুবক এসে দাহকার্য নিষেধ করে বললে যে, সে স্থানটি শ্মশান নয়, তাদের কবর স্থান। সুতরাং দাহকার্য সে স্থানে চলবে না। বিস্মিত শববাহিগণের প্রতিবাদে মুসলমান যুবকগণ অধিকতর উত্তেজিত হ’য়ে নফরদাকে প্রহারে করল জর্জরিত। যারা নফরদার তত্ত্বাবধানে আশ্রমের কাজে এতোদিন একান্ত অনুগত ছিল তারাই আজ তাঁকে প্রহারে করল জর্জরিত।

বাঁধের উপর থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর পরিস্থিতি দেখে আদেশ করে পাঠালেন শব আশ্রমে ফিরিয়ে আনতে। নির্বিচারে তাঁর আদেশ হল প্রতিপালিত, শব নিয়ে আসা হল আশ্রমে। এইখানেই পরিসমাপ্তি হওয়া উচিত ছিল ঐ পরিস্থিতির। কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মুসলমানগণ অন্যান্য মুসলমানগণকে উত্তেজিত করে তুলল এই বলে যে, আশ্রমবাসিগণ তাদের কবরস্থানকে শ্মশান বানিয়ে সেইখানে কাফেরের শবদাহ করতে চায় গায়ের জোরে। পাবনা শহরের সেই উত্তেজনার মুহূর্তে এই রটনায় মুসলমানগণ হল ক্ষিপ্তপ্রায়। তারা দলে দলে এসে সমবেত হতে লাগল সেই শ্মশানভূমিতে—আশ্ৰম আক্রমণ করে উপযুক্ত প্রতিশোধ নিতে। পাবনা শহরে হিন্দুগৃহ আক্রমণের কোন সুযোগ না পেয়ে তাদের আক্রোশ ছিল প্রবল। এখানে কোন পুলিশ প্রহরা না থাকাতে নিরীহ আশ্রমবাসীদের উপর তাদের প্রতিশোধ-স্পৃহা হল প্রবল। ‘আল্লা হো আকবর’ ধ্বনিতে স্তব্ধ শ্মশানভূমি হল মুখরিত — হিন্দু-নিধনের উল্লাসে।

আশ্রমের আজ মহাতঙ্কের দিন। মৃত্যুর বিভীষিকায় সকলেই বিহ্বল। আতঙ্কিত জননীগণের জন্যই সকলের চিন্তা, কখন কার হৃৎস্পন্দন স্তব্ধ হয়ে যায় সেই ভয়ে। অনন্ত মহারাজ, গোঁসাইদা, কিশোরীদা সকলেই ব্যস্ত হলেন জননীগণের সাহসসঞ্চারে। এদিকে পুরুষগণ ব্যস্ত হলেন পা, কুড়ুল, লাঠি প্রভৃতি সংগ্রহে।

শ্রীশ্রীঠাকুর সম্পূর্ণ একাকী। তাঁর ভাবগম্ভীর মৌন মূর্তির সন্নিকটে কারো যাওয়ার সাধ্য নাই। কি যেন এক অব্যক্ত নিষেধবাণী তাঁর শ্রীমুখকান্তিতে উদ্ভাসিত। সমস্ত দিন তিনি কখনো মায়ের কটেজের বারাণ্ডায়, কখনো বা সেই শ্মশানভূমি পরিদর্শন মানসে বাঁধের উপর অস্থিরভাবে পদচারণা করছেন।

বেলা গেল গড়িয়ে। বর্ষাকালের বেলা কিছু বোঝা যায় না, আকাশও মেঘাচ্ছন্ন। শ্মশান থেকে আশ্রমের রাস্তাটী পদ্মার স্ফীত জলে নিমজ্জিত। যে সময়ের কথা বলছি সে সময়টা ছিল বোধ হয় ১৯২৫ সালের শ্রাবণ মাস। আশ্রমের সম্মুখভাগে বাঁধ পর্যন্ত কারো উপস্থিতি শ্রীশ্রীঠাকুর পছন্দ করছেন না বরং নিষেধ করে দিলেন। শেষে স্বয়ং এসে দাঁড়ালেন সেই শ্মশানের দিকে বাঁধের উপর । এমন স্থানে দাঁড়ালেন যে আক্রমণকারীদের প্রথম বলি হবেন তিনিই । স্থির দৃষ্টে চেয়ে আছেন ক্রুদ্ধ মুসলমান জনতার দিকে। মুর্তি নিশ্চল—দৃষ্টি উদাস, নির্ভরতায় একাত নির্ভয়।

তিনি আদেশ করে পাঠালেন যেন কারো কাছে কোন অস্ত্র বা হাতিয়ার না থাকে। আসন্ন মৃত্যুর এই চরম মুহুর্তে  অস্ত্র পরিত্যাগের এই আদেশে সৎসঙ্গিগণ হলেন বিচলিত। ডাঃ যতীন রায়, মনোহর বসু, প্রভৃতি কতিপয় বিশিষ্ট ভক্ত ক্ষুব্ধ অন্তরে কেষ্টদাকে বললেন ।—

“কেষ্টদা ! ঠাকুরের এ কী রকম আদেশ! ঐ সব দুর্বৃত্ত পিশাচদের প্রধান লক্ষ্যই হলেন তিনি। ঐ হিংস্র পশুর দলের তীক্ষ্ণধার ছুরিকায় তাঁর দেবদেহ হবে রুধিরালিপ্ত, আর আমরা থাকব নীরব দর্শকের ভূমিকায় দূর ব্যবধানে ! দেহে প্রাণ থাকা পর্যন্ত তাদের বাধা দিতে পারব না। না, না, এ হতে পারে না। হাতিয়ার আমরা ত্যাগ করব না।’ 

কেষ্টদা বললেন,

‘কী বলছেন আপনারা! এই অন্তিম মুহূর্তে  তাঁর আদেশ বর্ণে বর্ণে প্রতিপালিত না হলে আমরাই হব তাঁর এবং আমাদের নিধনের কারণ। তাঁর দিকে চেয়ে দেখুন, কী একান্ত নির্ভরতায় তিনি নির্ভয় । আমাদেরও বলে দিলেন—

মামেকং শরণং ব্রজ।’ 

কেষ্টদা (ভট্টাচার্য্য)র এই একটা মাত্র কথায় সকলের সম্বিৎ এলো ফিরে। নির্ভরতায় সকলেই হল মরণজয়ী নির্ভীক । সকল কণ্ঠে ধ্বনিত হল— “মামেকং শরণং ব্রজ।” মৃত্যুভয় সকলের অন্তর থেকে হল অন্তর্হিত।

ক্রমে সন্ধ্যার অন্ধকার এলো ঘনিয়ে। অটল ভাইকে শ্রীশ্রীঠাকুর আদেশ করলেন, হুজুর মহারাজের মন্দিরের সুউচ্চ চূড়ায় একগাছি লম্বা বাঁশ বেঁধে তারই ডগায় একটা হাজার বাতির বৈদ্যুতিক আলো জ্বেলে দিতে।

তখন আশ্রমে আমাদের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। অটল ভাই অচিরে তাঁর আদেশ প্রতিপালন করে বহুদূর পর্যন্ত করে দিল আলোকিত । আশ্রম আগমনের রাস্তাটী জলে নিমজ্জিত থাকাতে হয়ে আছে যেমন পিচ্ছিল তেমনি কর্দমাক্ত। শ্রীশ্রীঠাকুরের দয়ায় আক্রমণকারীদের আগমনপথ হয়ে গেল বেশ সুগম।

সমস্ত দিনের প্রস্তুতির পর আততায়িগণ আশ্রমের পথে হল অগ্রসর । মুহুর্মূহু  আকাশ বাতাস হল মুখরিত ‘আল্লা হো আকবর’ ধ্বনিতে। স্রোতের মত ভেসে আসছে তাদের উল্লাসের কোলাহল। কিন্তু পথের পিচ্ছিলতায় তাদের গতি হল মন্থর ।

লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে আশ্রমবাসিগণ উৎকণ্ঠিত অন্তরে রদ্ধশ্বাসে অপেক্ষমাণ। সর্বনাশা মুহূর্ত আসছে ঘনিয়ে। বহুদিনের ঘটনা—স্মৃতির অন্তরালে ঝাপসা হয়ে গেলেও সে দিনের সেই রোমাঞ্চ কেউ ভুলতে পারবে না।

তারা আসছে অতি সন্তর্পণে পা টিপে টিপে, আছাড়ের আঘাত বাঁচিয়ে। অপরের জীবন হননে যারা উন্মত্ত—নিজের সামান্য আঘাতটুকুতেও তারা এমনই সতর্ক। ধীরে ধীরে তারা হল উপস্থিত আশ্রমের বাঁধের কাছে। আশ্রম বাটিকার সম্মুখভাগ উজ্জ্বল আলোকে উদ্ভাসিত। জনবহুল আশ্রমপ্রাঙ্গণে জনমানবের চিহ্নমাত্র নাই। কোলাহলমুখর আশ্রমে আজ মরণের স্তব্ধতা। সম্মুখভাগে দণ্ডায়মান দিব্যকান্তি শ্রীশ্রীঠাকুরের নিশ্চল মূর্তি— একাকী, সম্পূর্ণ  অরক্ষিত।

এই বিসদৃশ পরিবেশ সন্দৰ্শনে অনিশ্চিত বিপদাশঙ্কায় আততায়িগণ হল নিশ্চল। পশ্চাতের জনতা ঠেলছে অগ্রবর্তী জনতাকে, কিন্তু অগ্রবর্তী জনতা দ্বিধাগ্রস্ত। এইখানে তাদের চলছে একটা হুড়োহুড়ি, একটা জটলা, একটা কোলাহল।

আক্রমণকারীদের দ্বিধাগ্রস্ত নিশ্চলতা আর কতক্ষণই বা স্থায়ী হবে। ক্ষণকাল মধ্যেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়বে ঐ দেবদেহের উপর। কম্পিত অন্তর আশ্রমবাসিগণের শ্বাসরুদ্ধ, বিস্ফারিত নয়নের অপলক দৃষ্টি ঐ দেবদেহে নিবদ্ধ। সর্বনাশা মুহূর্তের ব্যবধান আর কতটকুই বা।  চেতনার আর সাড়া নাই কোন দেহে—সম্বিৎহারা ভক্তবৃন্দ নিস্পন্দ ।

কিন্তু এ কী! পিছনে এ কিসের শব্দ ! ছ্যাব্-ছ্যাব্ -ছ্যাব্। প্রায় দশ-বার জন গুর্খা মিলিটারী কুইক মার্চে এসে শ্রীশ্রীঠাকুরকে জানালো অভিবাদন— মিলিটারী কায়দায়। পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল বন্দুক উদ্যত করে আততায়ীদের দিকে। অপেক্ষায় রহিল শ্রীশ্রীঠাকুরের আদেশের জন্য।

অকস্মাৎ এই মিলিটারীর আবির্ভাবে সোরগোল পড়ে গেল আততায়িগণের মধ্যে। সকলের মুখে, মিলিটারী, মিলিটারী, পালাও পালাও । পরের প্রাণ হননের উল্লাসে যারা ছিল উন্মত্ত নিজের প্রাণের মমতায় তারা হল দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য। পথের কাদায় হল কর্দমাক্ত, আছাড় খেয়ে ভাঙ্গলো কারো হাত পা, নিজেদের অস্ত্রশস্ত্রে কেউ বা হল ক্ষতবিক্ষত — প্রাণরক্ষার-ব্যাকুলতায় ভ্রূক্ষেপের সময় নাই কারো। নিমেষের মধ্যেই সেই দল হল উধাও।

মিলিটারীগণ সমস্ত আশ্রম নিরীক্ষণ করে শ্রীশ্রীঠাকুরকে অভিবাদন জানিয়ে চলে গেল ।

আশ্রমবাসিগণের উৎকণ্ঠায় অবসন্ন মনে এতক্ষণে এলো প্রশান্তির স্বাচ্ছন্দ্য। সকলের মুখে ফুটে উঠল মুক্তির আনন্দ। 

কিন্তু হঠাৎ ঐ মিলিটারীর আবির্ভাব এবং অন্তর্ধান প্রশ্নটা জেগে রইল সকলের মনে। পরে শ্রীশ্রীঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন—

‘কমু ক্যামনে, কনে থেকে এলো তারা’। 

প্রশ্নের জবাব আজো মেলেনি । 

সারাদিনব্যাপী আশ্রমের সেই চরম উৎকণ্ঠার সময় হিমাইতপুরের চক্রান্তকারী হিন্দু বাসিন্দাগণ উৎকর্ণ হয়ে স্ব-স্ব গৃহেই আছেন তাঁদের মনোরথ-সিদ্ধির আনন্দে। আশ্রম থেকে ওই বুঝি ভেসে আসছে মুহুর্মূহু অন্তিম আর্তনাদ ৷ মোক্ষম আঘাতের সার্থক চরিতার্থতায় সন্তুষ্ট অন্তরে তাঁরা নিশ্চিত। তাঁদের চক্রান্তের অব্যর্থ স্বপ্নে আজ তাঁরা গর্বিত।—পাবনা · শহরবাসী হিন্দুগণেরও স্বস্তিবোধ স্বতঃস্ফূর্ত। তাঁরাও চরম সংবাদের আশায়  অপেক্ষমাণ।

কিন্তু শয়তানী চক্র ব্যর্থতায় হল ম্রিয়মাণ।

রাত্রি তখন বোধ হয় দশটা। পাবনা শহর থেকে উচ্চপদস্থ পুলিস কর্মচারি-গণ আশ্রমে হলেন উপস্থিত। শহর থেকে হিমাইতপুরের ব্যবধান মাত্র দু’মাইল । সৎসঙ্গের মত বিখ্যাত ধর্ম প্রতিষ্ঠানের আক্রমণ-সংবাদ পাবনার ঘরে ঘরে পড়েছে ছড়িয়ে। দলে দলে মুসলমান আসছে শহর থেকে এই গ্রামে। পুলিস কর্তৃপক্ষের তা না জানার কথা নয় । সমস্ত দিন ধরেই যেখানে চলছে প্রস্তুতি সেখানে তাদের বাধা দেবার সময় তো যথেষ্ট ছিল, কিন্তু তারা সমস্ত দিন রইলেন নিষ্ক্রিয়। পাবনার পুলিশ কর্মচারিগণ প্রায় সকলেই মুসলমান-সম্প্রদায়ভুক্ত। হয়ত সম্প্রদায়গত নীচতায় তাদেরও অন্তর ছিল কলুষিত। এখন বোধ হয় এসেছেন হতাহতের সংখ্যা ও সম্পত্তি লুঠতরাজের পরিমাণ ইত্যাদির তথ্য সংগ্রহে। 

     যাই হোক, তাঁরা এসে উপস্থিত হলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে। এই ঘটনার সূত্রপাতের কথায় বললেন, এ কী অন্যায় আবদার, শ্মশানে শবদাহ হবে না ? আমরা উপস্থিত থেকে শবদাহ করিয়ে যাব। শব নিয়ে চলেন শ্মশানে। 

শ্রীশ্রীঠাকুর সহাস্যে বললেন, আপনাদের উপস্থিতিতে শবের দাহ হতে পারে বটে, কিন্তু তাতে কি ভ্রান্ত প্রতিবাসীদের মনের দাহ প্রশমিত হবে ? শবদাহ আশ্রমের মধ্যেই হবে— আপনারা সে জন্য চিন্তিত হবেন না।

পাবনার পুলিশ কর্মচারীদের সঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুরের বোধ হয় এই প্রথম পরিচয়। তাঁরা মুগ্ধ হয়ে গেলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের কথার সারবত্তায়। পুলিস-সুপার বললেন, এমন লোকের নিধন সাধনে যারা উদ্যত হয় তাদের উচিতমত শিক্ষার প্রয়োজন। আপনি অনুগ্রহ করে তাদের নামগুলো আমাদের দিন— আমরা তাদের উচিতমত শিক্ষা দেব।

একটু বিনীত হাসি হেসে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন, শারীরিক শাস্তি দিয়ে কি মানুষের পরিবর্তন করা যায় ? আমার শাসন হল ক্ষমার—ভালবাসার। 

এই অপ্রত্যাশিত উক্তিতে পুলিশ কর্মচারিগণ হলেন অধিকতর সশ্রদ্ধ। বললেন, আপনার সম্বন্ধে আমাদের পূর্বধারণার সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে। আপনি হিন্দুদের যাই হোন না কেন— আমাদের পীর। আশ্রমের কেশাগ্র যাতে স্পর্শ করতে কেউ সাহস না পায় সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি থাকবে। 

প্রলয়ের বিধ্বংসী দুর্যোগের পর আশ্রমে ফিরে এলো প্রশান্তির আনন্দ । একমাত্র শরণ শ্রীশ্রীঠাকুরের উপর সকলের শ্রদ্ধা নিবিড় হয়ে উঠল।

কথায় বলে, খাল কেটে কুমীর আনা । এখন পাবনাতে হয়েছে তাই। ঈর্ষান্বিত হিমাইতপুর-গ্রামবাসী হিন্দুগণের আশ্রম আক্রমণের প্ররোচনায় পাবনার উন্নত মুসলমানগণ এখন ঝাঁপিয়ে পড়ল গ্রামাঞ্চলের দিকে। পাবনা শহরে ইংরাজ কর্তৃপক্ষের শাসনে তাদের অবাধ উচ্ছৃঙ্খলতায় বাধা পেয়ে তারা গ্রামাঞ্চলের হিন্দু-নিধনে হল উন্মত্ত। বহু হিন্দু গৃহস্থ এখানে মুসলমান প্রতিবেশী দ্বারা পরিবেষ্টিত। প্রতিবেশিসুলভ সখ্য থাকা সত্ত্বেও তাদের পক্ষে প্রতিবেশী হিন্দুদের রক্ষার জন্য বহিরাগত মুসলমান ভাইদের বাধা দেবার কোন উপায় নাই। গ্রামের মুসলমান মণ্ডলগণেরও তাদের বাধা দানের সামর্থ্য নাই ।

দিনের পর দিন সুদূর গ্রামাঞ্চল থেকে মর্মান্তিক ঘটনাবলীর সংবাদ শোনা গেল। ইতিমধ্যে হিমাইতপুর গ্রামের মুসলমানগণের অর্থাগমকেন্দ্র আশ্রমে অর্থোপার্জনের কোন উপায় না থাকাতে দুর্বিষহ দুর্দশার মধ্যেই তাদের চলেছে উপবাস। ক্রমে তারা প্ররোচনাদাতা হিন্দু অধিবাসীদের উপর হয়ে পড়ল ক্রুদ্ধ।  গুজব শোনা গেল হিমাইতপুর গ্রামটাও আক্রান্ত হবে। ঈর্ষাপ্রসূত কর্মফল এখন হিমাইতপুর গ্রামের হিন্দুদের হবে ভোগ করতে। তাঁরা সকলেই হয়ে পড়লেন আতঙ্কিত। পাবনা শহর তখনো উত্তপ্ত—সুতরাং সেখানেও তাঁরা নিরাপদ নন—আবার ভিন্ন পল্লীতে ততোধিক দুরবস্থা। যাঁরা গ্রামস্থ মুসলমানগণকে আশ্রমধ্বংসের প্ররোচনা দিয়েছিলেন তাঁরা অত্যন্ত বিপন্ন বোধে অবশেষে হলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের শরণাপন্ন । বললেন, আজ আমরা সকলেই বিপদাপন্ন। হিমাইতপুর গ্রাম নাকি আক্রান্ত হবে। ছেলেপুলে নিয়ে যাই বা কোথায় ? আশ্রমে তবু পুলিশ প্রহরা আছে। আর কোথাও তো নিরাপদ মনে করি না । এখানে আমাদের একটা আশ্রয় দিতে হবে। এইজন্য আমরা এলাম ।

শ্রীশ্রীঠাকুর অত্যন্ত সহানভূতির সঙ্গে তাদের বক্তব্য শুনে বললেন, ‘শুধু আপনারা বিপন্ন নন । বিপন্ন আজ সমস্ত গ্রামাঞ্চল। পাবনার সকল হিন্দু আজ অসহায়। সকলের কথাই ভাবতে হবে।’ হিমাইতপুরের হিন্দুগণ শ্রীশ্রীঠাকুরের কথা উপলব্ধি করতে না পেরে তাঁকে ভুল বুঝলেন। তাঁরা মনে করলেন হিন্দু জনসাধারণের জন্য তাঁর প্রাণ কাঁদছে এই বলে তাঁদের আবেদন তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন। মনঃক্ষুণ্ণ   হয়েই তাঁরা নিলেন বিদায়।

গ্রামাঞ্চলের অসহায় হিন্দুদের জন্য শ্রীশ্রীঠাকুর ছিলেন খুবই উদ্বিগ্ন। সেদিন সকালেই তিনি শ্রদ্ধেয় কিশোরীদা আর আকুদাকে আদেশ দিলেন পাবনার গ্রামাঞ্চলের মুসলমান মোড়লদের কাছে সেইদিনই তাদের আমন্ত্রণ করে আশ্রমে নিয়ে আসতে!

আদেশ প্রাপ্তিমাত্র তাঁরা দুজন বহির্গত হলেন এই আদেশ প্রতিপালনে। সে সময়ে মুসলমান অধ্যুষিত জনপদ পরিক্রমা সাক্ষাৎ মৃত্যুর নামান্তর। কিন্তু শ্রীশ্রীঠাকুরের কণ্ঠনিঃসৃত আদেশই তাঁদের কর্ম । কারো সাধ্য নাই সেই রক্ষা-কবচ ভেদ করে তাঁদের কোন অনিষ্ট সাধন করতে পারে। তাঁরা নির্ভয়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরের মণ্ডলগণকে শ্রীশ্রীঠাকুরের আমন্ত্রণ বিজ্ঞাপিত করে চলেছেন। অকুতোভয় এই দুজন সম্মানীয় ব্যক্তির সাহসিকতায় মণ্ডলগণ হলেন মুগ্ধ। তাঁরা শ্রীশ্রীঠাকুরের উপর বরাবরই সশ্রদ্ধ। আমন্ত্রণ গ্রহণে তাঁরা আগ্রহী হলেন বটে, কিন্তু অন্তরায় হল মৌলভী-ভীতি। কারণ এ সময়ে যদি মৌলভীগণ জানতে পারেন যে তাঁরা শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে গেছেন পরামর্শের জন্য, তাহলে তাঁদের প্রাণসংশয়। অবশেষে ঠিক হল যে তাঁরা শেষ রাত্রের গভীরে সকলের অজ্ঞাতসারে  আশ্রমে উপস্থিত হবেন। শ্রীশ্রীঠাকুরের উপদেশ শোনবার  জন্য । 

মণ্ডলগণ একে একে আশ্রমে হলেন সমবেত। সৎসঙ্গ মন্দিরের বড় ঘরটায় তাঁদের সমাবেশের স্থান ছিল নির্দিষ্ট। সেই স্বল্পবিদ্য গ্রাম্য মণ্ডলগণের সমাবেশে করুণাঘনবিগ্রহ শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর আসনে হলেন সমাসীন। তাঁর ব্যথাতুর মুখমণ্ডলের বর্ণনার ভাষা নাই ।

হন্তার মুষ্টিবদ্ধ তীক্ষ্মধার সংহারিকার মুখে আক্রান্তের আসন্ন মৃত্যুর বিভীষিকার ভয়ার্ত মুখখানি কি দেখেছেন ? দেখেছেন কি, ‘আমায় মেরো না, আমায় বাঁচাও—বাঁচাও’ বলে সে মুখে প্রাণভিক্ষার কী ব্যাকুল আবেদন ? যদি না দেখে থাকেন তাহলে আসুন মণ্ডলগণের এই নিশীথ-পরিবেশে। দেখুন শ্রীশ্রীঠাকুরের শ্রীমুখমণ্ডলে অসহায় হিন্দুগণের নিষ্ঠুরতম হত্যার সে কী পুঞ্জীভূত বেদনা বিগলিত ধারায় ঝরে পড়ছে তাঁর নয়নে! জীবনরক্ষার কী কাতর আবেদনের আকুতি ফুটে উঠছে তাঁর বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে। এ দৃশ্যে পাষাণেরও হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যায়। আবেগাপ্লুত কম্পিত কণ্ঠের সেই প্রাণবন্ত ভাষণটী কালের ব্যবধানে যদিও এখন ঝাপসা হয়ে গেছে তবু যতটকু স্মৃতিপথে টেনে আনতে পারি তাই সংক্ষেপে এখানে উদ্ধৃত করে যাই। ভাষণটী সংক্ষেপতঃ এইরূপে।—

“জীবনকে রক্ষা করে চলাই খোদার সৃষ্ট জীবমাত্রেরই সহজ ধর্ম। রক্ষার এই প্রচেষ্টা তার দুর্নিবার, নতুবা তার অস্তিত্বই থাকে না। শিশু ভূমিষ্ঠ  হয়েই কেঁদে ওঠে প্রাণহানির আশঙ্কায়। যতই সে বড় হয়— জ্ঞান ও বুদ্ধিকে সজাগ করে রাখে জীবনটাকে ধরে রাখতে। খোদার আশীর্বাদপূত সেই জীবনের অস্তিত্বকে হননের উল্লাসে যারা নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে তারা শয়তানের সহচর তাতে সন্দেহ নাই। খোদার সৃষ্টিকে শয়তান ধ্বংস করতে চায়, তাতেই তার উল্লাস। জিঘাংসার উন্মত্ততায় শয়তানের সহচরগণ হয় নিষ্ঠুর, হিংস্রতায় তারা হয়ে ওঠে দুর্মদ। প্রাণরক্ষার কাতর আবেদনে জাগায় না কোন সাড়া— দয়া, স্নেহ, মমতা প্রভৃতি সুকুমার বৃত্তিগুলো তাদের মধ্যে নিরেট হয়ে যায়। এই সব হিংস্র পশুর দল যে জাতির মধ্যে গজাতে থাকে পরস্পর হানাহানিতে সে জাতি নিঃশেষ হয়ে যায়।

প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করলেই— সে নেবে তার প্রতিশোধ । উন্মত্ত হয়ে আমি আজ যা করব ভবিষ্যতে তাই তোলা থাকবে আমারই জন্য। খোদার দুনিয়ায় অবিচার নাই।”

বিগলিত-অন্তর মণ্ডলগণ সাশ্রুলোচনে শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে করজোড়ে প্রতিজ্ঞা করলেন যে তাঁরা জীবন দিয়েও হিন্দু ভাইদের রক্ষা করবেন।

রাত্রির শেষযামে মণ্ডলগণ গেলেন চলে, পরদিন থেকেই পরিস্থিতির হল অদ্ভুত পরিবর্তন । আশ্রম থেকে পাকশী পর্যন্ত প্রায় ষোল মাইল ব্যাপী অঞ্চলে আর কোন অপ্রীতিকর সংবাদ পাওয়া যায়নি। হিন্দুমেধযজ্ঞের হল পরিসমাপ্তি। পাবনা শহরও হল শান্ত ।

কিন্তু হিমাইতপুর গ্রামের মুসলমানদের দুর্দশার আর অন্ত নাই। তাদের অর্থাগমের একমাত্র স্থান সৎসঙ্গ আশ্রম, সেখানে মুখ দেখানোর পথ নাই। গ্রামস্থ হিন্দুগণের ত সহানুভূতি তারা হারিয়েছে ।

আবার আশ্রম আক্রমণ-জনিত অপরাধে তারা যে দায়রা সোপর্দ হবে না তা কে বলতে পারে ? মোট কথা ধনে প্রাণে পুত্র পরিবার সহ তারা এখন মরতে বসেছে। কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত, মার্জনার কোন পথই খোলা নেই তাদের।

সে দিন সকালে অনন্ত মহারাজ গ্রামের পথ দিয়ে চলেছেন এক বাড়ীতে রোগী দেখতে। পথিমধ্যে ঘিরে ধরল বুভুক্ষিত মুসলমানগণ। ক্ষীণকণ্ঠে তারা বললে, ডাক্তার বাবু ! আমাগো মারি ফ্যালায়ে দ্যান। 

পাবনার ভাষায় তাদের বক্তব্য হল, তারা যে পাপকর্ম করেছে তার মার্জনা নাই। সারা জীবন তাদের জেলে পচতে হবে, পোলাপান অর্থাৎ ছেলে-পিলে গুলোর কি হবে সেই ভাবনা। তারা তো না খেতে পেয়ে শুকিয়ে মরে যাবে। তাদের প্রার্থনা ছেলেগুলোকে ঠাকুর যেন দেখেন। তারা তো কোন অপরাধ করে নি।

বিশীর্ণদেহ গ্রামস্থ মুসলমানদের কাতর প্রার্থনায় মহারাজের চক্ষু সজল হয়ে উঠল, তিনি বললেন, ‘তোরা সকলে মিলে তাঁর কাছে ক্ষমা চা গা। তোদের অপরাধ তিনি মার্জনা করেছেন। পুলিশ তোদের শাস্তি  দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি বললেন, ওরা যে আমার আশ্রিত। ওদের শাস্তি হলে ওদের পরিবারবর্গের সকলেই মরে যাবে।’

অনুতপ্ত মুসলমানগণ শ্রীশ্রীঠাকুরের অশেষ করুণার সংবাদে বিগলিত অন্তরে তাঁর পুরোভাগে লুটিয়ে পড়ে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে তাদের কৃতকর্মের জন্য চাহিল মার্জনা।

করুণাময় ঠাকুর তাদের আশস্ত করে বললেন,

‘অমন কাম আর কখ্খনো করিস নে বুঝলি তো ? কাল সকাল থেকে আশ্রমের কাজে লেগে যা। আর কিছু টাকা মহারাজের কাছ থেকে নিয়ে ছেলেপেলেগুলোকে বাঁচিয়ে তোল্। পরে না হয় খেটে শোধ করে দিস।’

জীবনবেদই যাঁর বেদ, সর্বপ্রকার দুঃখদুর্দশা থেকে মানবের উদ্ধারসাধনই যাঁর সাধনা আপামরে মৃত্যুঞ্জয়ী মহামন্ত্রদানে যিনি মুক্তহস্ত, তাঁর অপার করুণায় হিন্দুগণ সে যাত্রা হলেন নির্বিঘ্ন, নারীগণের মর্যাদা হল নিরাপদ, সকলের উৎকণ্ঠা-আতঙ্কের হল অবসান। কিন্তু তবু কি মানুষে দেয় তার সামান্যতম কৃতজ্ঞতার পরিচয়।

                                 ———