প্রজাতন্ত্র দিবসের ভাবনা

।। প্রসঙ্গ : ভারতবর্ষের প্রজাতন্ত্র ও তাঁর জনগণের শাসনতন্ত্রের অবস্থান ।।

নিবেদনে—তপন দাস

*************************************************************

[ উইকিপিডিয়া অনুসারে, ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সাফল্যের পর 1947 সালের 15 আগস্ট ভারত ব্রিটিশ রাজ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে । স্বাধীনতা ভারতীয় স্বাধীনতা আইন 1947 (10 এবং 11 জিও 6 সি 30), যুক্তরাজ্যের সংসদের একটি আইন যা ব্রিটিশ ভারতকে ব্রিটিশ কমনওয়েলথ (পরবর্তীতে কমনওয়েলথ অফ নেশনস) এর দুটি নতুন স্বাধীন আধিপত্যে বিভক্ত করে। ভারত একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে পরিণত হয় ষষ্ঠ জর্জ রাষ্ট্রপ্রধান এবং আর্ল মাউন্টব্যাটেন গভর্নর-জেনারেল হিসেবে । যদিও দেশটির এখনও স্থায়ী সংবিধান ছিল না; পরিবর্তে এর আইনগুলি সংশোধিত ঔপনিবেশিক ভারত সরকার আইন 1935- এর উপর ভিত্তি করে ছিল ।

29 আগস্ট 1947-এ, ডক্টর বি. আর. আম্বেদকরকে চেয়ারম্যান করে একটি স্থায়ী সংবিধান প্রণয়নের জন্য একটি খসড়া কমিটি নিয়োগের জন্য একটি রেজোলিউশন পাঠানো হয়েছিল। কমিটি কর্তৃক একটি খসড়া সংবিধান প্রণয়ন করা হয় এবং 4 নভেম্বর 1947 তারিখে গণপরিষদে জমা দেওয়া হয়। সংবিধান গৃহীত হওয়ার পূর্বে বিধানসভা দুই বছর, 11 মাস এবং 17 দিনব্যাপী পাবলিক অধিবেশনে 166 দিনের জন্য মিলিত হয়। 24 জানুয়ারী 1950 তারিখে, অনেক আলোচনা ও কিছু পরিবর্তনের পর পরিষদের 308 জন সদস্য দলিলের দুটি হাতে লেখা কপি (একটি হিন্দিতে এবং একটি ইংরেজিতে) স্বাক্ষর করেন। দুই দিন পর, ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০, এটি সমগ্র দেশে কার্যকর হয়। যেখানে ভারতের স্বাধীনতা দিবস ব্রিটিশ শাসন থেকে তার স্বাধীনতা উদযাপন করে, প্রজাতন্ত্র দিবসটি তার সংবিধান কার্যকর হওয়ার উদযাপন করে। একই দিনে, ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ ভারতের ইউনিয়নের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার প্রথম মেয়াদ শুরু করেন। নতুন সংবিধানের অন্তর্বর্তীকালীন বিধানের অধীনে গণপরিষদ ভারতের সংসদে পরিণত হয়।]

* * *

দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে খণ্ডিত গণপ্রজাতন্ত্রী আধুনিক ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ধর্মকে রক্ষা করে চলার কর্তব্যকে। আমাদের রাষ্ট্রীয় মন্ত্র ‘সত্যমেব জয়তে’ স্মরণ করিয়ে দেয় উপনিষদীয় আচার্য্য অনুসরণের শাশ্বত অবলম্বনকে। রাষ্ট্রের কর্ণধার রাষ্ট্রপতিসহ মন্ত্রীবর্গ প্রত্যেকেই ঈশ্বরের নামে শপথ গ্রহণ করে ঈশ্বরের প্রতিভূ জীবগণের কল্যাণ সাধনে ব্রতী হয়। ঈশ্বরের প্রতিনিধি স্বরূপ জাগতিক ন্যায়দণ্ডধারী বিচারকেরা ধর্মাধিকরণ নামে চিহ্নিত। বিচারালয়কে বলা হয় ধর্মস্থান।—কেন?

ভারতীয় অনুশাসনের সাম, দান, ন্যায়, দণ্ড, নীতি ও ভেদ-এর রাজধর্ম রক্ষার পবিত্র কর্তব্যে যাতে এতটুকু অন্যায়, অধর্ম প্রবেশ করতে না পারে তার জন্যই ওইসব মহাভারতীয় নীতির অনুসরণ। বিধিবৎ প্রকৃষ্ট-জাতক সৃষ্টি করে ধর্ম পালনের স্বার্থেই ওই অনুশাসনকে আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি। রাজনীতির জন-প্রতিনিধিরা পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যার জীবনবৃদ্ধির নীতিসমূহ পালন যাতে হয় সেটা দেখবে। অসৎ নিরোধী তৎপরতার সাথে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালিত হবে। তথাপি যখন ভারতীয় শাসন সংহিতা বা সংবিধান ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ না করে, ধর্ম এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়কে এক করে ফেলে ‘ধর্ম-নিরপেক্ষতাবাদ’,––অর্থাৎ রাষ্ট্র ধর্মের অনুবর্তী নয়’-এর মতবাদকে প্রতিষ্ঠা দেয়, তখন কি মনে হয় না, আমরা জাতীয়তাবাদের আদর্শের প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েও এক পরস্পর বিরোধী আচরণ করে চলেছি !

যে নীতি-বিধি পদার্থের অস্তিত্ব রক্ষার সহায়ক তাই তো ধর্ম। পদার্থের স্বকীয়তা ধারণ করে রাখার সহায়ক যা’ তাই ধর্ম। ধর্ম পালন করলেই পদার্থ টিঁকে থাকবে, নচেৎ থাকবে না। সংসদ প্রকাশিত ইংরেজী অভিধানে ধর্মের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘It is an action, one is bound to do.’ সেই ধর্মের আবার পক্ষ আর নিরপেক্ষ কি? বেঁচে থাকার অজৈব উপকরণ বায়ু, জল, মাটি ইত্যাদির যদি ধর্ম থাকতে পারে, এবং তা’ যদি বিজ্ঞানের বইতে পাঠ্য হতে পারে, তাহলে মানুষের কি ধর্ম নেই? মনুষ্যত্ব প্রকাশের মাধ্যমেই তো মানুষ ধার্মিকতার পরিচয় দেয়। মানুষের মনুষ্যত্বের অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার নীতিবিধি-সমন্বিত ভারতের নিজস্ব সংহিতাগুলোর বিধানসমূহ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের সংহিতায় স্থান পাবে না কেন, প্রজাদের শিক্ষা দিতে পাঠ্য করা হবে না কেন?

‘‘প্রজা মানেই হচ্ছে—

প্রকৃষ্টরূপে জাত—

সর্ব্বসম্ভাব্য উদ্বর্দ্ধনী সার্থকতায় ;

আর প্রকৃষ্ট জন্ম পেতে হলেই চাই—

প্রজনন পরিশুদ্ধি—

সর্ব্ব-সম্ভাব্যতার বৈধানিক সংস্থিতিতে. …. ’’

(‘সম্বিতী’ গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)

প্রজা কথাটি আসিয়াছে প্র-পূর্ব্বক জন্-ধাতু হইতে। প্র মানে perfectly, আর জন্ ধাতু মানে to grow. তাই বলা হইয়াছে “প্রজা কথায় আছে–to grow perfectly instinct with life.” (Nana-Prasange, 2nd part, page 50)

যে জনগণ বা প্রজারা মানুষের সেবা করার অধিকার পেতে ভোটে জেতার জন্য বুথ দখল করে, ছাপ্পা ভোট দেয়, ব্যালট চুরি করে, ব্যালটবক্স চুরি করে, ভোটারদের হুমকি দেয়, প্রার্থীকে মারধোর করে, আশ্রয়হীন করে, বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, হত্যা পর্যন্ত করতে কুণ্ঠিত হয় না!—তারা কি ধরণের প্রজা ? তারা জন-প্রতিনিধি হয়ে জনগণের কি ধরণের সেবা করবে ?—এ বিষয়ে ভাবনা করার সময় কি হয়নি!

প্রকৃষ্ট জাতক বা প্রজার জন্মদাত্রী হচ্ছে নারী। সেই নারী যদি ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টিতে পূজ্যা মাকালী, মাদুর্গা, দেবী লক্ষ্মী, দেবী সরস্বতীর ন্যায় শুদ্ধ, বুদ্ধ, পবিত্রতায় সমৃদ্ধ না হয়ে প্রবৃত্তি-প্ররোচিত চলনে অভ্যস্ত হয়, তাহলে প্রকৃষ্ট জাতক বা প্রজা সৃষ্টি কিভাবে সম্ভব হবে? রাষ্ট্র-নেতাদের এ বিষয়ে দৃষ্টিপাত করার কি প্রয়োজন নেই? তারা যদি নজর দিতেন টিভি, সিনেমা, ইণ্টারনেটের মাধ্যমে দর্শকাম, শ্রুতকাম বারতা প্রচারিত হয়ে অবৈধ স্পর্শকামে পরিণতি লাভ করতে পারত না। প্রজা সৃষ্টির মূল আধান দূষিত হতে পারত না।

রাষ্ট্র-নেতারা প্রবৃত্তি-পোষণী নারী-স্বাধীনতার নামে ওই মুখ্য বিষয়ে গুরুত্ব না দিলেও যুগ-পুরুষোত্তমের দিব্যদৃষ্টি থেকে এই মূল বিষয়টাও কিন্তু এড়িয়ে যেতে পারে নি।

এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর সুস্পষ্ট মতবাদ প্রকাশ করে গেছেন।

“দেশের অবনতির

প্রথম পদক্ষেপই হ’চ্ছে—

মেয়েদের উচ্ছৃঙ্খলতা,

পারিবারিক সঙ্গতির প্রতি

বিদ্রূপাত্মক অবহেলা,—

যা’ দেশের শুভদৃষ্টিটাও

ভেঙ্গেচুরে চুরমার করে

সর্ব্বনাশকে আমন্ত্রণ ক’রে থাকে;

তাই বলি,

মেয়েরা যেন

তাদের পবিত্রতা হ’তে

এতটুকুও স্খলিত না হয়,

ব্যবস্থা ও বিধানগুলি

এমনতরই বিনায়িত করে

তাদের ভিতর সঞ্চারিত করে তোল;

তুমি যদি দেশের স্বস্তিকামীই হও—

এদিক থেকে

তোমার দৃষ্টি ও কৃতিচর্য্যার

একটুও অবহেলা যেন না থাকে,

স্বস্তিই হ’চ্ছে

শান্তির শুভ আশীর্ব্বাদ,

আর, স্বস্তি মানেই হ’চ্ছে

সু-অস্তি—

ভাল থাকা।”

(বিধান-বিনায়ক, বাণী সংখ্যা ৩৭৩)

* * *

মূণ্ডক উপনিষদের পবিত্র মন্ত্র ‘সত্যমেব জয়তে’-এর আদর্শকে সম্বল করে ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দের ১৫ই আগস্ট গণ প্রজাতন্ত্রী ভারতবর্ষের যাত্রা সুরু হলেও ‘‘Of the people, by the people, for the people—জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন।’’-এর লক্ষ্যে রচিত কতগুলো বিধিবদ্ধ নিয়ম, শাসন সংহিতা বা সংবিধান ১৯৫০ খ্রীস্টাব্দের ২৬শে জানুয়ারী স্বীকৃতি লাভ করে, যে দিনটাকে ‘প্রজাতন্ত্র দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।

প্রজা শব্দের অর্থ প্রকৃষ্ট জাতক। আর তন্ত্র মানে কতগুলো বিধিবদ্ধ নিয়ম বা system। প্রজাতন্ত্রের মর্মার্থ হচ্ছে, যে তন্ত্র বা system মেনে আদর্শ প্রজা নির্মাণ, পালন, পোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে রাষ্ট্রের সংহতি রক্ষায় প্রযত্নশীল থেকে পরম রাষ্ট্রিক সমবায়ের লক্ষ্যে এগিয়ে চলা যায়। ভারতের ব্রহ্মসূত্র, মহাকাব্য, বেদ, উপনিষদ, সংহিতা, আদর্শপুরুষ শ্রীরামচন্দ্র ও শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ বলে যা কিছু বর্তমান,—সবকিছুই ওই ‘সত্যমেব জয়তে’-এর আদর্শের উপরেই প্রতিষ্ঠিত।

সত্য মানে অস্তিত্ব। যার অস্তিত্ব আছে যার বিকাশ আছে তাই সত্য (real)। ঋষি প্রদর্শিত এই সত্যের পথই আর্য্য ভারতবর্ষের মূলধন। আমাদের আদর্শ ছিল– ‘আত্মানং বিদ্ধি’, নিজেকে জানো, know thyself, ‘আত্মবৎ সর্বভূতেষু, মাতৃবৎ পরদারেষু, লোষ্ট্রবৎ পরদ্রব্যেষু।’ সকলকে নিজসত্তার প্রতীক মনে কর, মেয়েদের নিজের মায়ের প্রতিরূপ ভেবে শ্রদ্ধা কর, অন্যের জিনিসকে মাটির ঢেলার মত দ্যাখ। ‘মা গৃধ’, লোভ কর না। তথাপি ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের প্রজাগণ, নেতা-মন্ত্রী-জনপ্রতিনিধিগণ কেন সত্যভ্রষ্ট হচ্ছে, ভেবে দেখার প্রয়োজন নেই? নির্বাচনের নামে প্রহসন, উপ-নির্বাচনের নামে অযথা অর্থের অপব্যয় কি চলতেই থাকবে? প্রজাতন্ত্রের আঁতুড়ঘরটাই যদি অসত্যের সংক্রমণে সংক্রামিত হয়ে পড়ে তাহলে প্রজারা সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাবে কোন্ প্রতিষেধকে?—সত্যের পূজারীদের ভেবে দেখার কি কোন প্রয়োজন নেই? এই বিষয়টাকেও উপেক্ষা করেন নি শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। তিনি বিধান-বিনায়ক গ্রন্থের বাণীতে বলছেন—

“যখনই দেখবে—

শাসকমণ্ডলী ও প্রতিষ্ঠাবান ব্যক্তিরা

সৎ-এর পীড়নে

দুষ্কৃতকারীদের সাহায্য করতে ব্যগ্র,

এবং তাদের উদ্ধত ক’রে তুলবার

সরঞ্জাম সরবরাহে ব্যাপৃত—

প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে,—

বুঝে নিও—

সেই দেশ

সেই জনপদ

সেই সাম্রাজ্য

অধঃপাতের দিকে ক্ষিপ্র চলৎশীল; … (সংক্ষিপ্ত)”

* * *

ব্রহ্মসূত্র থেকে জাত ভারতের নিজস্ব সংবিধান কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে।

‘‘সুখস্য মূলম্ ধর্মম্,

ধর্মস্য মূলম্ রাষ্ট্রম্,

রাষ্ট্রস্য মূলম্ অর্থম্,

অর্থস্য মূলম্ ইন্দ্রিয়-বিজয়ম্,

ইন্দ্রিয়-বিজয়স্য মূলম্ জ্ঞানবৃদ্ধসেবয়া,

জ্ঞানবৃদ্ধসেবয়া বিজ্ঞানম্।।”

অর্থাৎ সুখী হতে হলে ধর্ম পালন করতে হবে। প্রকৃত ধার্মিক হতে হলে পুরুষার্থের চতুর্বর্গ সমন্বিত আশ্রমধর্ম (বর্ণাশ্রম এবং চতুরাশ্রম) পালন করতে হবে। সঠিকভাবে আশ্রমধর্ম পালন করার স্বার্থে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী প্রজাদের দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী হবার জন্য গুরু গ্রহণ করতে হবে। গুরুর আদেশ-নিদেশ পালন করলে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করা যাবে। তবেই জীবনে সুখী হওয়া যাবে। এই হলো ভারতবর্ষের সনাতনী ধর্মের মূল কথা।

ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টি অনুসারে, ‘‘যেনাত্মন্ স্তথান্যেষাং জীবনংবর্দ্ধাঞ্চপি ধ্রীয়তে য স ধর্ম্মঃ।’’ অর্থাৎ, অন্যের বাঁচা এবং বৃদ্ধি পাওয়াকে অক্ষুন্ন রেখে, মানুষ বাঁচার জন্য, বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য যা’ যা’ করে, তাই ধর্ম। ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। ধর্ম আচরণের মাধ্যমে পালন করার জিনিস, অনুভব করার জিনিস, যা’তে প্রতিটি সত্তা তার অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করতে পারে, তার অনুশীলন করা। অথচ বাস্তব চিত্রটার সাথে মেলানো যাচ্ছে না ধর্মকে। বর্তমানে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্মের নামে চলছে বাহ্যপূজা, পৌত্তলিকতার প্রকাশ, হৈ-চৈ, প্রকাশ্যে প্রাণীহত্যা, পরিবেশ-দূষণ, রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায়। রাস্তা আটক করে, চাঁদার জুলুম করে, জনজীবন বিপর্যস্ত করে, তারস্বরে মাইক বাজিয়ে, বাজি ফাটিয়ে, অবধ্য, নিরীহ প্রাণীদের হত্যা করে ধর্ম উদযাপন করার বিধি কোন মহাপুরুষ, কোন সাধক, কোন নবী, কোন ঋষি, প্রবর্তন করেছেন কি? যদি না করে থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রের কর্তব্য সব সম্প্রদায়কে প্রকৃত ধর্ম পালনে উৎসাহিত করা। ধর্মের নামে বিধি-বহির্ভূত অসদাচারের অনুষ্ঠানের উদযাপনকে কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা।

ওইসব বিধি, নিয়ম বা সংবিধান পালন করে প্রকৃষ্ট জাতক বা প্রজা সৃষ্টির প্রবহমানতাকে রক্ষা করে চলাই ছিল আর্য্য ভারতের আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্য।

রাষ্ট্রের সৃষ্টিই তো প্রজাদের অধর্ম বা দুর্নীতি থেকে মুক্ত করে ধার্মিক, অর্থাৎ সু-নীতি পরায়ণ করে তোলার জন্য। সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দলগুলো যদি ওই মহান কর্তব্য ভুলে তার প্রজাবর্গকে, তাদের পিতৃ-পিতামহের আদর্শ অনুসারী ধর্ম-পরায়ণ, কৃষ্টি-পরায়ণ হতে উৎসাহ না দিয়ে, প্রবৃত্তি-পরায়ণতায় উৎসাহ দেয়, সেটা ভারতবর্ষের জাতীয় উত্তরাধিকারত্বের অস্তিত্বকে বিপন্ন করার বার্তা ভিন্ন আর কিছু নয়। প্রজাতন্ত্রের প্রবহমানতাকে রক্ষা করতে হলে মহানগরের প্রসার করার পূর্বে মহান নাগরিক (প্রকৃষ্ট জাতক/প্রজা/জনগণ) সৃষ্টি করার উপর সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিতে হবে।—যেমনভাবে প্রকৃষ্ট জাতের কৃষি উৎপাদন, প্রকৃষ্ট জাতের গোরু, কুকুর ইত্যাদি উৎপাদনে গুরুত্ব আরোপ করে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ। ওই পদ্ধতি অবলম্বন ব্যতিত মানবিক চরিত্রের অবক্ষয় প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না।

* * *

May be an image of text that says "আর্য ভারতবর্ষ আমার জ্ঞান গরিমা গরবিনী"

প্রসঙ্গঃ রাম মন্দির

প্রসঙ্গ : রামমন্দিরের প্রাণ প্রতিষ্ঠা ও গণপ্রজাতন্ত্রী ভারতবর্ষের ভবিষ্যত।

নিবেদনে—তপন দাস

*****************************************

২০২৪ খ্রীস্টাব্দের ২২শে জানুয়ারি  তারিখটি এক ঐতিহাসিক দিন হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকবে ভারতের ইতিহাসের কালাধারে। অবশেষে সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে বহুদিনের প্রতীক্ষিত রাম মন্দিরের প্রাণ প্রতিষ্ঠার মাহেন্দ্রক্ষণ সমাগত।  মর্যাদা পুরুষোত্তম রামচন্দ্রের আদর্শে বিশ্বাসী অনুগামীদের মিলনস্থলের কেন্দ্র স্বরূপ এই রামমন্দির। অচেতন,  পদার্থে নির্মিত মন্দির প্রাঙ্গনে সমবেত হবেন চেতনাসম্পন্ন মানুষেরা,  সচ্চিদানন্দ-বিগ্রহের অধিকারী মানুষেরা তাদের দেহমনকে মর্যাদা পুরুষোত্তম রামচন্দ্রের পূত-পবিত্র আদর্শের অনুসরণে প্রবৃত্তিজাত লোভ-কাম-ক্রোধাদি ষড়রিপুকে বশ করে নিজ-নিজ দেহমন্দিরকে বিনির্মাণ করে সত্তাশ্রয়ী চলনে অভ্যস্ত হবেন। মর্যাদা পুরুষোত্তম রামচন্দ্রের ন্যায় অসৎনিরোধে তৎপর হবেন। ভারতবর্ষে আবার পুণঃ প্রতিষ্ঠা পাবে রামরাজত্ব। যে রামরাজত্বের ক্যাবিনেট চালাতেন বশিষ্ঠাদি স্থিতপ্রজ্ঞ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ঋষিগণ। বর্ণাশ্রম, চতুরাশ্রম, দশবিধ সংস্কার আদর্শের অনুসরণে—ভারতবর্ষে যা’ ‘ঋষিবাদ’ (ঋষিদের দ্বারা প্রবর্তিত অনুশাসনবাদ।) নামে প্রতিষ্ঠিত। ঋষিবাদের মূল সংবিধানের নাম ‘ব্রহ্মসূত্র’।

       ব্রহ্মসূত্র-এর ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে বেদ, উপনিষদ, অষ্টাদশ সংহিতা। ব্রহ্মসূত্র থেকে জাত ভারতের নিজস্ব সংবিধান কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে।
‘‘সুখস্য মূলম্ ধর্মম্,
ধর্মস্য মূলম্ রাষ্ট্রম্,
রাষ্ট্রস্য মূলম্ অর্থম্,
অর্থস্য মূলম্ ইন্দ্রিয়-বিজয়ম্,
ইন্দ্রিয়-বিজয়স্য মূলম্ জ্ঞানবৃদ্ধসেবয়া,
জ্ঞানবৃদ্ধসেবয়া বিজ্ঞানম্।।”
       অর্থাৎ সুখী হতে হলে ধর্ম পালন করতে হবে। প্রকৃত ধার্মিক হতে হলে পুরুষার্থের চতুর্বর্গ সমন্বিত আশ্রমধর্ম (বর্ণাশ্রম এবং চতুরাশ্রম) পালন করতে হবে। সঠিকভাবে আশ্রমধর্ম পালন করার স্বার্থে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী প্রজাদের দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী হবার জন্য গুরু গ্রহণ করতে হবে। গুরুর আদেশ-নিদেশ পালন করলে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করা যাবে। তবেই জীবনে সুখী হওয়া যাবে। এই হলো ভারতবর্ষের সনাতনী ধর্মের মূল কথা। ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টি অনুসারে, ‘‘যেনাত্মন্ স্তথান্যেষাং জীবনংবর্দ্ধাঞ্চপি ধ্রীয়তে য স ধর্ম্মঃ।’’ অর্থাৎ, অন্যের বাঁচা এবং বৃদ্ধি পাওয়াকে অক্ষুন্ন রেখে, মানুষ বাঁচার জন্য, বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য যা’ যা’ করে, তাই ধর্ম। ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। ধর্ম আচরণের মাধ্যমে পালন করার জিনিস, অনুভব করার জিনিস, যা’তে প্রতিটি সত্তা তার অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করতে পারে, তার অনুশীলন করা। অথচ বাস্তব চিত্রটার সাথে মেলানো যাচ্ছে না ধর্মকে। বর্তমানে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্মের নামে চলছে বাহ্যপূজা, পৌত্তলিকতার প্রকাশ, হৈ-চৈ, প্রকাশ্যে প্রাণীহত্যা, পরিবেশ-দূষণ, রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায়। রাস্তা আটক করে, চাঁদার জুলুম করে, জনজীবন বিপর্যস্ত করে, তারস্বরে মাইক বাজিয়ে, বাজি ফাটিয়ে, অবধ্য, নিরীহ প্রাণীদের হত্যা করে ধর্ম উদযাপন করার বিধি কোন মহাপুরুষ, কোন সাধক, কোন নবী, কোন ঋষি, প্রবর্তন করেছেন কি? যদি না করে থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রের কর্তব্য সব সম্প্রদায়কে প্রকৃত ধর্ম পালনে উৎসাহিত করা। ধর্মের নামে বিধি-বহির্ভূত অসদাচারের অনুষ্ঠানের উদযাপনকে কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা যদি না যায় মর্যাদা পুরুষোত্তম রামচন্দ্রের আদর্শের অসম্মান করা হবে। 

  *   *   *                              

ঋষি বশিষ্ঠ সৌম্যাবতার রামচন্দ্রকে পুরুষোত্তমরূপে চিনতে পেরে রামচন্দ্রকে ঋষিদেরও ঋষি বলে মান্যতা দেন। ঋষিদের সিদ্ধান্তে তখন থেকে পুরুষোত্তমকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয় নব্য-ঋষিবাদ বা পুরুষোত্তমবাদ। যখন যিনি পুরুষোত্তমরূপে অবতীর্ণ হন, তিনিই তখন জীবন্ত বেদ, সংহিতা, পুরাণ। ওই সূত্র অনুসারে রামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীস্ট, হজরত রসুল, চৈতন্যদেব, শ্রীরামকৃষ্ণদেব সকল গুরুদের গুরু সদগুরুরূপে স্বীকৃতি পান। অর্থাৎ স্থান-কাল-পরিবেশ অনুযায়ী যখন যিনি যেখানেই অবতীর্ণ হন না কেন, তাঁর মধ্যে পূর্ব পূর্ব গুরুদের জীবন্ত অনুভব করা যাবে। পূর্ববর্তীদের প্রকৃত আদর্শ খুঁজে পাওয়া যাবে। যাকে আমরা বর্তমানের সফটওয়ারের ভাষায়, অ্যাপ্লিকেশন বা অ্যাপস্-এর ভাষায় আপডেট বলি। অ্যাপ্লিকেশনের সূত্রপাত থেকে শুরু করে সর্বশেষ সংস্করণের নবীকরণের তথ্য মজুত থাকে। আমি যদি আমার মোবাইলের অ্যাপ্লিকেশনগুলো আপডেট না করি তাহলে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারব না। যারা আপডেটেড্, তারাই লক্-ডাউনের সময় অন-লাইন কাজকর্ম করে অনেক কিছু সামাল দিতে পেরেছেন। সবকিছু সামাল দিতে গেলে আপডেটেড হতে হবে সবক্ষেত্রে। ব্যাকডেটেড থেকে কিছু সামাল দেওয়া যায় না। অথচ আমরা অজ্ঞতাবশে নিজেদের ধারণ করার প্রশ্নে, অর্থাৎ ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে ব্যাকডেটেড হয়ে আছি। তাই তো বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনকূলচন্দ্র আমাদের সচেতন করে দিতে বললেন—“ভারতের অবনতি (degeneration) তখন-থেকেই আরম্ভ হয়েছে, যখন-থেকে ভারতবাসীর কাছে অমূর্ত্ত ভগবান অসীম হ’য়ে উঠেছে—ঋষি বাদ দিয়ে ঋষিবাদের উপাসনা আরম্ভ হয়েছে।

ভারত! যদি ভবিষ্যৎ-কল্যাণকে আবাহন করতে চাও, তবে সম্প্রদায়গত বিরোধ ভুলে জগতের পূর্ব্ব-পূর্ব্ব গুরুদের প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হও—আর তোমার মূর্ত্ত ও জীবন্ত গুরু বা ভগবানে আসক্ত (attached) হও,—আর তাদেরই স্বীকার কর—যারা তাঁকে ভালবাসে। কারণ, পূর্ব্ববর্তীকে অধিকার করিয়াই পরবর্ত্তীর আবির্ভাব।” (সত্যানুসরণ)

কথাপ্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন—“বর্ত্তমান যিনি, তাঁকে ধরলেই তাঁর মধ্যে সব পাওয়া যায়। ………. রামচন্দ্রকে যে ভালবাসে সে যদি শ্রীকৃষ্ণকে না ধরে তবে বুঝতে হবে তার রামচন্দ্রেও ভালবাসা নেই, ভালবাসা আছে তার নিজস্ব সংস্কারে। (আঃ প্রঃ ২১ খণ্ড, ইং তাং ৩১-১২-১৯৫২)

যারা ভারতের ভবিষ্যত কল্যাণকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়ে রামমন্দিরে প্রাণ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়েছেন তাঁদের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে বিনীত নিবেদন,  তারা যদি বাস্তব কর্মে রামচন্দ্রের আদর্শ প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হন তাহলে আর ধর্মের নামে শাস্ত্রবর্ণিত অধমাধম বাহ্যপূজা নিয়ে মাতামাতি বন্ধ হয়ে যাবে। ডিজে বাজিয়ে আধুনিক নাচন নেচে দেবদেবী-মহাপুরুষদের নাম নিয়ে তারস্বরের  ধ্বনিতে চীৎকার শুনতে হবে না। তাদের ব্যবহারে রামচন্দ্রের সৌম্যভাবের চরিত্রের অসৎনিরোধী প্রতিফলন পাওয়া যাবে। তাদের চলন, গমন, ব্যবহারের পবিত্রতা দেখে তথাকথিত নাস্তিকেরাও এক-একটা চলন্ত মন্দির মনে করে মনে মনে প্রণাম করবে।

                   *   *   *                           

সৌম্যাবতার মর্যাদাপুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্র ছিলেন সত্যের পূজারী অথচ অসৎ নিরোধী। তৎকালীন যুগের অচ্ছুৎ অনার্য্যদের আর্য্যীকৃত করে আর্য্য-অনার্য্যদের মেলবন্ধন করলেন।অনার্য্য গুহক চণ্ডালকে করলেন মিত্র, আবার অকালমৃত্যুর দ্যোতক বর্ণাশ্রম-বিদ্বেষী প্রতিলোমাচারী বন্ধুবর শম্বুবকে দিলেন চরম শাস্তি। মায়াবী রাবণ যখন কিছুতেই সীতাকে বশে আনতে পারছিলেন না তখন সভাসদেরা রাবণকে বলেছিলেন, রামরূপ ধারণ করে গেলেই তো সীতাকে সহজেই বশীভূত করতে পারেন। উত্তরে রাবণ বলেছিলেন, ওই রূপ স্মরণ করলেই আমার সব পাপ-প্রবৃত্তি মুছে গিয়ে আমি এক অন্য মানুষ হয়ে যাই। তথাপি প্রবৃত্তির ঊর্দ্ধে উঠে ওই বোধটাকে ধরে রাখতে পারল না, ফলে রামচন্দ্রের হাতে হত হতে হল। অথচ বিভীষণ রামচন্দ্রের আদর্শে প্রলুব্ধ হয়ে রাবণকে ত্যাগ করলেন।

শুধু তাড়িত-পীড়িত মানুষদেরই নয়, প্রভু রামচন্দ্র পশুপাখিদের ভাষাও বুঝতেন। তাই তারাও প্রভু রামচন্দ্রের কাছে সুবিধা-অসুবিধার কথা জানাতে পারতেন। রাম-রাজত্বে পশু-পাখিরাও সুখে-শান্তিতে বাস করতেন। ওই নিয়মের ব্যত্যয় হবার ফলে, সেই রাম রাজত্বের সময় একটা কুকুর এসেছিল মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রের কাছে বিচারপ্রার্থী হয়ে। সভায় উপস্থিত ছিলেন ভৃগু, আঙ্গিরস, কুৎস, কাশ্যপ, বশিষ্ঠ প্রমুখ সভাসদগণ। কুকুরের অভিযোগ শুনে, বিচার প্রেক্ষিতে সভাসদদের সম্বোধন করে শ্রীরামচন্দ্র বলেছিলেনঃ

न सा सभा यत्र न सन्ति वृद्धाः

वृद्धा न ते ये न वदन्ति धर्मम् ।

नासौ धर्मो यत्र न सत्यमन्ति

न तत् सत्यं यच्छलेनानुविद्धम् ।।

(Ye sabhai briddha nei ta sabha e noi. Yara dharmmasamgata kotha bolena tara briddha noi. yate satya nei ta dharmma noi, yate chhol aachhe ta satya noi.

RAMAYAN, 3/33)

‘‘ন সা সভা যত্র ন সন্তি বৃদ্ধাঃ

বৃদ্ধা ন তে যে ন বদন্তি ধর্মম্।

নাসৌ ধর্মো যত্র ন সত্যমন্তি

ন তৎ সত্যং যচ্ছলেনানুবিদ্ধম্।। (বাল্মীকি রামায়ণ ৩/৩৩)

—যে সভায় বৃদ্ধ নেই তা সভাই নয়। যারা ধর্মসঙ্গত কথা বলে না তারা বৃদ্ধ নয়। যাতে সত্য নেই তা ধর্ম নয়। যাতে ছল আছে তা সত্য নয়। অর্থাৎ, যেখানে ছলনা আছে, কপটতা আছে, সেখানে ধর্ম নেই।

যাইহোক, রাম-রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীরামচন্দ্র তো নয়ই, শ্রীরামচন্দ্রের পিতা রাজা দশরথও কোনদিন ছলনার আশ্রয় গ্রহণ করেন নি। তাঁরই রাজত্বে লোকালয় থেকে দূরে, সরযূ নদীর তীরে কুটির বেধেছিলেন বৈশ্য কুলোদ্ভব অন্ধমুনি, শূদ্রা অন্ধ স্ত্রীকে নিয়ে। তাদের একমাত্র চক্ষুষ্মান সন্তান যজ্ঞদত্ত বা সিন্ধুমুনি গোধূলি বেলায় জল আনতে গেছেন সরযূ নদী থেকে। এক মত্তহাতীর উপদ্রব থেকে প্রজাদের রক্ষা করার মানসে মৃগয়ায় গেছেন রাজা দশরথ। তাঁর ঈপ্সিত মত্তহাতীর উদ্দেশ্যে শব্দভেদী বাণ ছোঁড়েন। বাণে বিদ্ধ হয় কলসীতে জল ভরতে থাকা সিন্ধুমুনি।

কলসীতে জল-ভরার অনু-কার শব্দের সাথে হাতীর জলপান করার অনু-কার শব্দের হুবহু মিল রয়েছে। যারফলে অনধাবনতা বশতঃ এক মারাত্মক ভুল করে ফেলেছিলেন রাজা দশরথ। বাণবিদ্ধ যন্ত্রণাকাতর সিন্ধুমুনির আর্তনাদে তাঁর ভুল ভাঙে। সিন্ধুমুনির অনুরোধে বিদ্ধ বানটাকে খুলে নিলে সিন্ধুমুনি মারা যান। রাজা দশরথ জলপূর্ণ কলসী সাথে নিয়ে অন্ধমুনির কুটিরে যান। অকপটে স্বীকার করেন সব অপরাধের কথা। সদ্য সন্তানহারা অন্ধ দম্পতিকে আজীবন পিতৃ-মাতৃ জ্ঞানে রক্ষণাবেক্ষণ করে ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন। সিন্ধু মুনির অন্ত্যেষ্টিও করেন তিনি। তথাপি রাজা দশরথকে অভিশাপ দিয়ে পুত্রশোকে সহধর্মিনীসহ দেহত্যাগ করেন অন্ধমুনি। সেই অভিশাপেই পুত্র শোকেই রাজা দশরথের অকালমৃত্যু হয়েছিল। এই হচ্ছে ভারতবর্ষের ধর্ম পালনের উদাহরণ।

নির্জন স্থান। প্রত্যক্ষদর্শী কেউ ছিল না। সাক্ষী দেবারও কেউ ছিল না। রাজা দশরথ যদি কপটাচারী হতেন, ছলনার আশ্রয় নিতেন, অনায়াসেই সিন্ধুমুনির বিপন্ন-অস্তিত্বের প্রাণহীন দেহটাকে ফেলে রেখে চলে যেতে পারতেন। গায়ে পড়ে অভিশাপও কুড়োতে হতো না। কিন্তু পারেন নি সত্যের জন্য, বিবেকের জন্য, বিবেকের দংশন থেকে মুক্তি পাবার জন্য। তাই, মনের অনুগমন না করে বিবেককে অবলম্বন করে চলার নামই ধর্মপথে চলা। ধর্মের সাথে অস্তিত্বের সম্পর্ক, অস্তিত্বকে ধারণ করে রাখার সম্পর্ক।

মাননীয় নরেন্দ্র মোদিজীর নেতৃত্বাধীন বর্তমানের বিজেপি সরকার ধর্মের নামে, ‘জয় শ্রীরাম’ শ্লোগানকে আঁকড়ে বিপুল জন সমর্থন পেয়েছেন। মর্যাদা পুরুষোত্তম রামচন্দ্রের আদর্শে বিশ্বাসী ভারতের নির্বাচকগণ ‘রাম-রাজত্বের’ ন্যায় এক স্বচ্ছ, নির্মল শাসনতন্ত্রের আশায় ভোট দান করেছেন। অতএব রামচন্দ্রের নাম-মাহাত্ম্যের জোরে যে শাসনতন্ত্রের অধিকার অর্জন করেছেন যে জন-প্রতিনিধিরা, তাদের ক্যাবিনেট যদি রামচন্দ্রের গুরু ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠের আদর্শের আলোকে আলোকিত না হয়,—সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হয়,—জন-প্রতিনিধিগণ যদি রাম-রাজত্বের পরিপন্থী বিলাস-ব্যসন ত্যাগ করে, আত্ম-প্রতিষ্ঠার মোহ ত্যাগ করে, সাত্ত্বিক-চলনে সাধারণভাবে চলতে অভ্যস্ত না হয়,—তাঁরা কখনোই ঈপ্সিত রাম-রাজত্ব ফিরিয়ে আনতে পারবে না।

বনবাসে থাকার সময় রামচন্দ্র ভরতকে রাজকার্য পরিচালনা বিষয়ে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন—“….. তুমি গুণী ও যোগ্য ব্যক্তিকে বহু-মান প্রদর্শন করে থাক তো? বীর, বিদ্বান, জিতেন্দ্রিয়, সদ্বংশজ, ইঙ্গিতজ্ঞ লোকদের মন্ত্রীপদে প্রতিষ্ঠিত করেছ তো? তুমি তাদের সঙ্গে মন্ত্রণা কর তো? তোমাদের মন্ত্রণা লোকের মধ্যে প্রকাশ হয়ে পড়ে না তো? তুমি যথাসময়ে শয্যাত্যাগ কর তো? রাত্রিশেষে অর্থলাভের চিন্তা কর তো? তুমি সহস্র মূর্খ পরিত্যাগ করেও একজন বিদ্বানকে সংগ্রহ করতে চেষ্টা কর তো? অযোগ্য লোককে যোগ্যস্থানে ও যোগ্য লোককে অযোগ্য স্থানে নিয়োগ কর না তো? যে-সব অমাত্য উৎকোচ গ্রহণ করেন না, যাদের পিতৃপুরুষ যোগ্যতার সঙ্গে অমাত্যের কাজ করেছেন, যারা ভিতরে-বাইরে পবিত্র—সেই সব শ্রেষ্ঠ অমাত্যকে শ্রেষ্ঠ কাজে নিযুক্ত করেছ তো? রাজ্যমধ্যে কোন প্রজা অযথা উৎপীড়িত হয় না তো? শত্রুকে পরাস্ত করতে পটু সাহসী, বিপৎকালে ধৈর্য্যশালী, বুদ্ধিমান, সৎকুলজাত, শুদ্ধাচারী, অনুরক্ত ব্যক্তিকে সেনাপতি করেছ তো? বিশেষ নৈপুণ্য যাদের আছে, তাদের তুমি পুরস্কৃত ও সম্মানিত করে থাক তো? প্রত্যেকের প্রাপ্য বেতন সময়মত দিয়ে থাক তো? রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তিবর্গ তোমার প্রতি অনুরক্ত আছেন তো? তোমার কার্য্যসিদ্ধির জন্য তাঁরা মিলিত হয়ে প্রাণ পর্য্যন্ত দিতে প্রস্তুত আছেন তো? বিদ্বান, প্রত্যুৎপন্নমতি, বিচক্ষণ এবং তোমার জনপদের অধিবাসীকেই দৌত্যকার্য্যে নিযুক্ত করেছ তো? স্বরাজ্যে ও পররাজ্যে প্রধান-প্রধান পদের অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের সম্বন্ধে জ্ঞাতব্য সংবাদ চরগণদ্বারা অবগত থাক তো? চরগণ পরস্পর-বিরোধী তথ্য পরিবেষণ করলে তার কারণ নির্ণয় করে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা করে থাক তো? প্রজাগণ সুখে আছে তো? তারা দিন-দিন স্ব-স্ব কর্ম করে সমৃদ্ধ হচ্ছে তো? তোমার আয় বেশী, ব্যয় কম হচ্ছে তো? ধনাগার অর্থশূন্য হচ্ছে না তো? অপরাধীদের ধনলোভে ছেড়ে দেওয়া হয় না তো? তুমি সাম, দান, ভেদ ও দণ্ডের প্রয়োগ যথাস্থানে করে থাক তো? তুমি ইন্দ্রিয়গণকে জয় করতে সচেষ্ট থাক তো? অগ্নি, জল, ব্যাধি, দুর্ভিক্ষ ও মড়ক এই পাঁচ রকমের দৈববিপদের প্রতিকারের জন্য তুমি যত্নশীল থাক তো? সন্ধি-বিগ্রহাদি যথাস্থানে প্রয়োগ কর তো? ? ? ইত্যাদি ইত্যাদি। (আঃ প্রঃ ৫ম খণ্ড, ইং তাং ২-৪-১৯৪৪)

উপরোক্ত বিধানগুলো রাম রাজত্বের অনুশাসনবাদ। তাই রাম-রাজত্ব প্রতিষ্ঠা-পিয়াসী জন-প্রতিনিধিদের উচিত হবে, রামচন্দ্রের সভার ন্যায় একজন আদর্শ সভাসদরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। এবং তা’ বাস্তবায়িত করতে হলে, আদর্শ প্রজাপালকের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। সরকারী কোষাগার থেকে সাধারণভাবে বেঁচে থাকার প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা যাবে না। বর্তমান শাসনতন্ত্রের পরিকাঠামো অনুযায়ী জন-প্রতিনিধিদের জন্য বরাদ্দ সুবিধা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে রাম-রাজত্ব প্রতিষ্ঠার চিন্তা অধরাই থেকে যাবে। জনগণকে স্ব স্ব আত্মমর্যাদায় সুখে রাখতে হলে জন-প্রতিনিধিগণদের বিলাস-ব্যসন সুখ-সুবিধার কথা ভুলতে হবে, নীতিপরায়ণ হতে হবে, সর্বোপরি যথার্থ ধার্মিক হতে হবে। সেদিকে দৃষ্টি দিলে তবে কাজের কাজ কিছুটা হবে।

রাম রাজত্বকে বাস্তবায়িত করতে হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর ক্যাবিনেটকে এ বিষয়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।তাহলেই সার্থক হবে মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রের মন্দিরের প্রাণ প্রতিষ্ঠা সমারোহ।  

সবাই আমার প্রণাম জানবেন। জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!

tapanspr@gmail.com

——-

 

** পূর্বতনীপূরণম্ শাশ্বত বর্ত্তমানম্ ** পুরুষোত্তম চৈতন্যদেবের সংক্ষিপ্ত লীলাকথা ।।

                                       *     *     *
         চৈতন্যদেবের  স্নেহধন্য  মুরারী গুপ্ত সংস্কৃত  ভাষায় যে লীলা কাহিনী রচনা করেছিলেন সেই গ্রন্থ ‘মুরারী গুপ্তের করচা’ নামে সুপ্রসিদ্ধ। মহাপ্রভুর  বিশেষ স্নেহভাজন, যাঁকে তিনি ‘কবিকর্ণপুর’ আখ্যা দিয়েছিলেন তাঁর নাম ছিল পরমানন্দ। তিনি সংস্কৃত ভাষায় ‘চৈতন্যচরিতামৃতম্’  নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। চৈতন্যদেবের লীলাবসান পরবর্তীকালে তথ্য সংগ্রহভিত্তিক বাংলা ভাষায় ‘চৈতন্যভাগবত’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন বৃন্দাবন দাস। সমসাময়িক কালে কবি লোচন দাস ‘চৈতন্যমঙ্গল’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন। পরবর্তীকালে কবি জয়ানন্দও ‘চৈতন্যমঙ্গল’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন। ওইসব জীবনীগ্রন্থ থেকে বৃন্দাবনের গোস্বামীগণ নাকি পরিপূর্ণরূপে চৈতন্যদেবকে আস্বাদন করতে পারেন নি, তাই রূপ গোস্বামীর শিষ্য বর্ধমান জেলার ঝামটপুরের বিখ্যাত বৈদ্য, অকৃতদার কৃষ্ণদাস কবিরাজকে নতুন করে এক জীবনীগ্রন্থ রচনা করতে উদ্বুদ্ধ করলে তিনি পূর্ববর্তী জীবনীকারদের গ্রন্থ এবং অন্যান্য সংস্কৃত গ্রন্থের সাহায্য নিয়ে নয় বছর ধরে ‘শ্রীশ্রীচৈতন্য চরিতামৃত’ শিরোনামে গ্রন্থটি রচনা করেন। যে গ্রন্থটি বৈষ্ণব মহলে প্রামাণ্য রূপে স্বীকৃত হলেও সবক্ষেত্রে ঘটনাপঞ্জীর সন-তারিখ উল্লেখিত হয়নি। গবেষকগণও সকল ঘটনাপঞ্জীর সন-তারিখ নিয়ে একমত হতে পারেন নি। তাই আমিও বিভিন্ন গ্রন্থ পঠন-পাঠন ও গুগল সার্চ করা তথ্যভিত্তিক  আনুমানিক সন-তারিখ উল্লেখ করেছি মাত্র।     
                                      ********   
  নিমাই পণ্ডিত, বৈষ্ণব-পণ্ডিত বংশে জন্ম নিয়ে শিক্ষা-সংস্কৃতির পীঠস্থানের পণ্ডিত পরিবেশে বড় হয়ে উঠলেও তৎকালিন নবদ্বীপে আচার্য্য শঙ্করের মায়াবাদের সিদ্ধান্তবাগীশদের শুষ্ক জ্ঞানচর্চা, শাক্ত মতবাদের পৌত্তলিকতার পঞ্চ-ম-কারের এবং বৈষ্ণব, শৈব, কিশোরীভজা, কর্তাভজা, পরকীয়া সাধনা ইত্যাদি সহজীয়া মতবাদের উপাসনার প্রাবল্যের মধ্যে সনাতন ধর্মের প্রচারক প্রকৃত বৈষ্ণবেরা প্রায় উপেক্ষিতই ছিলেন। শাক্তরা সুযোগ পেলেই বৈষ্ণবদের নানাভাবে যাতনা দিতেন, এমনকি ধর্মের নামে পশুবলি দিয়ে পশুর মাংস বাড়িতে ফেলে আসতেন।
বিষ্ণুর উপাসক বৈষ্ণবেরা  নবদ্বীপের শ্রীবাস পণ্ডিতের আঙিনায়  মিলিত হয়ে   কীর্তন করতেন। আর শান্তিপুরের কমলাক্ষ মিশ্রের আঙিনায় বৈষ্ণবদের মিলনমেলা বসতো। বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণের উপাসক তৎকালিন বৈষ্ণব প্রধানগণ যথা, শ্রীনিবাস, শুক্লাম্বর, শ্রীমান, মুকুন্দ, বিশ্বরূপ প্রমুখ ভক্তগণ, সেকালের সাধকশ্রেষ্ঠ বৈষ্ণবাচার্য কমলাক্ষ মিশ্র (অদ্বৈত মহাপ্রভু)-এর কাছে তাদের অন্তরের বেদনার কথা বলতেন। অদ্বৈত মহাপ্রভু মথুরার গর্গাচার্যের ন্যায় সনাতন ধর্মের দীনতা থেকে ভক্তদের রক্ষা করতে গঙ্গাজল আর তুলসীমঞ্জুরির নিত্য সেবায় শ্রীকৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা জানাতেন। পণ্ডিতদের মতে মূলতঃ অদ্বৈত মহাপ্রভুর আরাধনায় শ্রীবিষ্ণু শুদ্ধাত্মা শচীদেবীর মাধ্যমে নিমাই রূপে ধরাধামে অবতীর্ণ হন।
                                        ******
        বালক নিমাইয়ের চপলতা এবং তীক্ষ্ণ পাণ্ডিত্যের  কাছে ম্লাণ হতে সুরু করে তার্কিক পণ্ডিতদের, শাক্ত পণ্ডিতদের, (অ)বৈষ্ণব পণ্ডিতদের ভ্রান্ত ধারণার পাণ্ডিত্য। তাঁদের দেখলেই শাস্ত্রের ধাঁধাঁ আর ব্যাকরণের ফাঁকি জিগ্যেস করতেন। একদিন ‘‘ওঁ সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম’’—মতবাদের তার্কিক পণ্ডিতকে শিক্ষা দিতে তার ভাতে প্রস্রাব করে দেন নিমাই,  পণ্ডিত রেগে গিয়ে মারতে এলে নিমাই বলেন, আমার চপলতার জন্য দু’-ঘা মারবেন না হয়, তবুও আমি করজোড়ে  বলছি, ব্রহ্মময় জগতে সবই যদি ব্রহ্ম, তবে আপনার ভাতে, আর আমার মুতে ব্রহ্ম কি নেই ! আপনার বিচারে ভাতের ব্রহ্ম আর মুতের ব্রহ্ম কি আলাদা? আলাদাই যদি হয়ে থাকে তাহলে আর আজ থেকে আপনার ওই সিদ্ধান্ত বদলে ফেলতে হবে। তবে আমার বুঝ মতে, ব্রহ্ম কারণ, জীব কার্য। ব্রহ্ম পূর্ণ, জীব অংশ। ব্রহ্ম উপাস্য, জীব উপাসক। ব্রহ্ম আর জীব সত্তায় অভেদ, স্বাদে পৃথক।
ব্রহ্মবিজ্ঞতা নিমাইয়ের মুখ থেকে ব্রহ্মকথা শুনে পণ্ডিত তখন বুঝতে পারেন ব্রহ্মের বিশিষ্টতা, বিশিষ্ট অদ্বৈতবাদের তত্ত্ব। 

                                          *     *     *
        কিশোর নিমাই  যখন টোলে ছাত্র পড়াতেন, সেই সময় কাশ্মীরের বিখ্যাত পণ্ডিত কেশবাচার্য দিগ্বিজয় করতে বেড়িয়ে  ভারতের  সব বিখ্যাত পণ্ডিতদের  তর্কযুদ্ধে পরাজিত করে অনেক শিষ্য ও বাহনসহ  নবদ্বীপে আসেন। নবদ্বীপের স্মার্ত্ত-পণ্ডিতগণ সুযোগ বুঝে নিমাই পণ্ডিতকে জব্দ করতে পণ্ডিত কেশবাচার্যকে নিমাইয়ের কাছে পাঠান। নিমাইয়ের কাছে গিয়ে কেশবাচার্য বলেন, তুমিই বুঝি নিমাই  পণ্ডিত?               
        নিমাই যথোচিত মর্যাদার সাথে প্রণাম জানিয়ে বলেন, আজ্ঞে, লোকেরা বলেন, কিন্তু আমি নিজেকে পণ্ডিত মনে করি না, শিষ্যদের কিছু পাঠদান করার চেষ্টা করি মাত্র।
—তা’ কি পড়াও?
—কলাপ।
—‘কলাপ’! ও তো শিশুপাঠ্য!
—ওই শিশুপাঠ্যই সঠিক পড়াতে পারছি কি-না, জানি না।
—তাহলে তো আর তোমার সাথে তর্ক করা চলে না!
—শুনেছি আপনি ভারত বিখ্যাত পণ্ডিত, আপনার সাথে তর্ক করার স্পর্দ্ধা যেন না হয়। শুনেছি আপনি সরস্বতী-মাতার  বরপুত্র। মুখে মুখে শ্লোক রচনা করেন। অনুগ্রহ করে যদি কিছু নিবেদন করেন, শুনে ধন্য হতাম।
—বলো, কি শুনতে চাও?
—সুরধনী গঙ্গার পবিত্র ধারা বয়ে চলেছে, সে বিষয়ে যদি  কিছু নিবেদন করেন। নিমাই বিনীতভাবে বলেন।
পণ্ডিত কেশবাচার্য তৎক্ষণাৎ শত-শ্লোক রচনা দ্বারা গঙ্গার বন্দনা করে গর্বভরে নিমাইকে জিগ্যেস করেন, কি হে নিমাই পণ্ডিত! এতক্ষণ ধরে গঙ্গার মহিমা যা’ বর্ণনা করলাম, কিছু বুঝলে?
নিমাই বিনীতভাবে বললেন, আপনার রচনার অর্থ আপনি না বোঝালে বোঝে কার সাধ্য?
নিমাইয়ের বিনীত ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে কেশবাচার্য বলেন, বলো, কোন্ শ্লোকটা বুঝতে চাও?
নিমাই কেশবাচার্য পণ্ডিতের তাৎক্ষণিক রচনা থেকে—   
‘‘মহত্ত্বং গঙ্গায়াঃ সততমিদমাভাতি নিতরাং,
যদেষা শ্রীবিষ্ণোশ্চরণকমলোৎপত্তিসুভগা।
দ্বিতীয় শ্রীলক্ষ্মীরিব সুরনরৈরর্চ্চ্যচরণা,
ভবানীভর্ত্তুর্ষা শিরসি বিভবত্যদ্ভুতগুণা॥’’ (চৈঃ চঃ আদিলীলা, পৃঃ ১২৬)
শ্লোকটি আবৃত্তি করে তার ভাবার্থ জানতে চাইলে পণ্ডিত কেশবাচার্য আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন, প্রায় ঝড়ের গতিতে বলা শ্লোক থেকে তুমি এই একটি শ্লোক কণ্ঠস্থ করলে কিভাবে?
নিমাই বিনীতভাবে বলেন, আপনি দৈববলে যেমন মাতা সরস্বতীর বরপুত্র, কবি, আমিও তেমনি একজন শ্রুতিধর।
নিমাইয়ের উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে কেশবাচার্য বলেন, তাহলে শোন, এই শ্লোকের ভাবার্থ হচ্ছে—‘‘গঙ্গা, শ্রীবিষ্ণুর চরণকমল থেকে উৎপন্ন হওয়ার কারণে সৌভাগ্যবতী। দ্বিতীয়া শ্রীলক্ষ্মীর ন্যায় দেব ও মানবেরা যাঁর  চরণ-পূজায় রত এবং যিনি  ভবানীপতি  মহাদেবের মস্তকে বিরাজমানা হওয়ার জন্য অদ্ভুত গুণশালিনী হয়েছেন, সেই গঙ্গার এই মহত্ত্ব সর্বদাই নিশ্চিতরূপে প্রত্যক্ষীভূত হয়ে আছে।—বলো, আর কি জানতে চাও?’’
—এবার শ্লোকের  দোষ-গুণ বলুন।
—বেদসদৃশ গুণসম্পন্ন অনুপ্রাসযুক্ত উপমারূপ শ্লোকে কোন দোষ নেই, সম্পূর্ণ নির্দোষ। তোমার ব্যাকরণের অলঙ্কার জ্ঞান থাকলে তো তুমি দোষ-গুণ বুঝবে?
—যথার্থই বলেছেন। আমি  অলঙ্কার না পড়লেও শুনেছি তো, তা’ থেকেই  মনে হচ্ছে আপনার শ্লোক দোষযুক্ত।
—তোমার স্পর্দ্ধা তো কম নয়! ‘কলাপ’ আর ‘ফাঁকি’ পড়া বিদ্যা দিয়ে তুমি আমার শ্লোকের দোষ ধরতে চাও?
—প্রভু, আপনি আমার প্রতি  রুষ্ট  হবেন না, আমার ন্যায়   অর্বাচীন কি আপনার রোষের উপযুক্ত? মার্জনা  করবেন, আমি কিন্ত্তু আপনার রচনায় ৫টি দোষ খুঁজে পেয়েছি, যদি অনুমতি  করেন, তাহলে এক-এক করে বর্ণনা করি।
শিষ্যসামন্ত, স্থানীয়  বিদ্বজ্জনের সামনে এমন কথা কেউ যে কোনদিন বলবে ভাবতেই  পারেন নি কেশবাচার্য,  তথাপি তর্কশাস্ত্রের নিয়ম মেনে নিমাইকে বলার জন্য অনুমতি দিলে নিমাই বলেন—-
পঞ্চ দোষ এই শ্লোকে পঞ্চ অলঙ্কার।
ক্রমে আমি কহ শুন করহ বিচার॥
অবিমৃষ্ট বিধেয়াংশ  দুই ঠাঞি চিন।
বিরুদ্ধমতি ভগ্নক্রম পুনরাত্ত দোষ তিন॥
গঙ্গার মহত্ত্ব  শ্লোকের মূল বিধেয়।
ইদং শব্দে  অনুবাদ পশ্চাৎ  অবিধেয়॥
বিধেয়  আগে কহি পাছে কহিলে অনুবাদ।
এই লাগি শ্লোকের অর্থ করিয়াছে  বাদ॥
……………………………………………………
গঙ্গাতে কমল জন্মে সবার সুবোধ।
কমলে গঙ্গার জন্ম অত্যন্ত বিরোধ॥
ইহা বিষ্ণু পাদপদ্মে গঙ্গার  উৎপত্তি।
বিরোধালঙ্কার  ইহা মহা চমৎকৃতি॥
ঈশ্বর অচিন্ত্য শক্ত্যে গঙ্গার প্রকাশ।
ইহাতে বিরোধ নাহি বিরোধ আভাষ॥
গঙ্গার মহত্ত্ব সাধ্য সাধন তাহার।
বিষ্ণুপাদোৎপত্তি অনুমান অলঙ্কার॥
স্থূল এই পঞ্চ দোষ পঞ্চ অলঙ্কার।
সূক্ষ্ম বিচারিলে যদি আছয়ে অপার॥ (চৈঃ চঃ আদিলীলা, পৃঃ ১২৭-১২৯)
—-হে পণ্ডিতপ্রবর! ‘‘আপনি বিধেয়  অর্থাৎ জ্ঞাত  আগে  বলে পরে অনুবাদ অর্থাৎ অজ্ঞাত বলেছেন। এরফলে শ্লোকের অনুবাদ ঘটেছে, মূল অর্থ বাদ পড়েছে। ‘দ্বিতীয় শ্রীলক্ষ্মী’ রচনায় ‘দ্বিতীয়’ শব্দ বিধেয়, সমাসে গৌণ হওয়াতে শব্দার্থ ক্ষয় হয়ে শব্দটি অপ্রাধান্য রূপে নির্দিষ্ট হয়েছে। ‘ভব’ অর্থে মহাদেব বোঝালে ‘ভবানী’  অর্থে মহাদেবের স্ত্রীকে বোঝায়। এবং ভবানীর  ভর্তা বললেও মহাদেবকে বোঝায়।  ‘ভবানীভর্ত্তুর্ষা’ শব্দের প্রয়োগে ‘ভবানীর ভর্তা’-র অর্থ হয়, ভবের পত্নী যে ভবানী তার ভর্তা, যেন ভব ব্যতিরেকে আর একজন ভর্তা বোঝায়, তাই  ওই শব্দের প্রয়োগ  বিরুদ্ধমতিকারক। শ্রী অর্থে লক্ষ্মী বা শোভাময়ী বোঝায়। এক্ষেত্রে ‘শ্রীলক্ষ্মী’ প্রয়োগে পুনরুক্তবদাভাস অলঙ্কার হয়েছে। আপনি  ‘শ্রীবিষ্ণুর চরণ-কমলে গঙ্গার  জন্ম’ বোঝাতে চেয়ে ‘কমলে গঙ্গার জন্ম’ বলে ফেলে প্রচলিত সত্যের সাথে বিরোধ করে ফেলেছেন, যদিও তা বিরোধাভাস মাত্র, তাই বিরোধাভাস-অলঙ্কারের প্রয়োগ হয়েছে। ‘গঙ্গার এই মহিমা সর্বদা নিশ্চিতরূপে দেদীপ্যমান, যেহেতু এই গঙ্গা শ্রীবিষ্ণুর চরণকমল হইতে উৎপন্ন হওয়ার কারণে অত্যন্ত সৌভাগ্যবতী।’—এখানে গঙ্গার মহত্ত্বের সাধন ও সাধ্য দুই-ই পরিলক্ষিত হয়। ওই অনুমান অলঙ্কারের প্রয়োগের ফলে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব জড়ীভূত হয়ে গেল।’’
নিমাই পণ্ডিতের বলা ব্যাখ্যান শুনে কেশবাচার্য আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলেন, শাস্ত্র না পড়ে, অলঙ্কার না পড়ে আমার শ্লোকের এইরূপ ব্যাখ্যা তুমি কিভাবে করলে?
উত্তরে নিমাই পণ্ডিত বলেন, শাস্ত্রের বিচার আমি জানি না, মাতা সরস্বতী যা’ বলান, তাই বলি। আপনি মহাপণ্ডিত, কবি শিরোমণি, আপনি দুঃখ করবেন না। আপনার শিষ্য মনে করে আমার কিশোর-সুলভ চপলতা ক্ষমা করে দেবেন। আজ চলুন বাসায় ফিরে যাই, কাল আবার মিলিত হয়ে আপনার কাছে শাস্ত্রের বিচার শুনব।

এই মতে নিজ গৃহে গেলা  দুই জন।
কবি রাত্রে কৈল সরস্বতী আরাধন॥
সরস্বতী রাত্রে তারে উপদেশ কৈল।
সাক্ষাৎ ঈশ্বর করি প্রভুরে জানিল॥
প্রাতে আসি প্রভুপদে লইল শরণ।
প্রভু কৃপা কৈল তার খণ্ডিল বন্ধন॥
ভাগ্যবন্ত দিগ্বিজয়ী সফল জীবন।
বিদ্যাবলে পায় মহাপ্রভুর  চরণ॥ 

কাশ্মীরি পণ্ডিত নিমাই পণ্ডিতের মধ্যে ষড়ৈশ্বর্য্যের প্রকাশ উপলব্ধি করতে পেরে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তারপর থেকে নবদ্বীপের পণ্ডিতসমাজে শুধু নয়, ভারতবর্ষের পণ্ডিতসমাজে নিমাই পণ্ডিত একজন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।
                                          ********   
নিমাই পণ্ডিত পিতৃদেবের পিণ্ডদান করতে গয়ায় গিয়ে ঈশ্বরপুরীর কাছে দীক্ষা নেবার পর পাণ্ডিত্য ছেড়ে ভক্তিরসে নিজেকে জারিত করলেন। শ্রীবাস অঙ্গনের বৈষ্ণব সভায় যোগদান করে কীর্তনানন্দে মেতে ওঠেন। কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা চৈতন্যদেব আর্য্যকৃষ্টি বিরোধী বৌদ্ধ-তান্ত্রিকতার পৌত্তলিকদের, শুষ্ক জ্ঞানচর্চাকারী তর্কবাগীশদের, তামসিক ধর্মাচ্ছন্নদের উদ্দেশ্যে পথ-নির্দেশ করলেন ‘হরেরাম হরেকৃষ্ণ’  কীর্তনের ফরমূলার মাধ্যমে।––তোমার পাপ, তাপ হরণ করতে, প্রবৃত্তির পাপ-তাপের জ্বালা জুড়াতে, সবকিছু ছেড়ে শ্রীরামচন্দ্রের আদর্শ, শ্রীকৃষ্ণের আদর্শের অনুসরণ কর।   
 তৎকালিন হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রাধান্য থাকা সত্বেও তিনি  হরেকৃষ্ণ কীর্তনের মাধ্যমে ক্ষত্রিয় বংশজাত রামচন্দ্র এবং কৃষ্ণের জীবন্ত আদর্শে সবাইকে অনুপ্রাণিত করতে চাইলেন। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অবতারবাদের আদর্শ  মেনে। 

                                   *         *         * 

কীর্তনগান বাঙালি কবিদের এক অভিনব সৃষ্টি। কৃত্ ধাতু থেকে এসেছে কীর্তন। কৃত্ শব্দের অর্থ প্রশংসা। কীর্তন মানে কীর্তি আলাপন। কীর্তিকর কোন আদর্শের স্মরণ, মনন, গুণ বর্ণন কীর্তনের মূল উদ্দেশ্য। যা’ শ্রবণেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রবেশ করে মানুষের সাত্তিক গুণকে প্রকাশ করতে সাহায্য করে। তাই, মানুষকে সহজে প্রভাবিত করতে, কীর্তন এক সহজ প্রচার মাধ্যম।
কীর্তি-আলাপন দু’-ভাবেই হতে পারে। কথার আদান-প্রদান মাধ্যমে এবং সুরে, ছন্দে, নৃত্যে, যন্ত্রানুষঙ্গের ঐকতানের প্রকাশের মাধ্যমে।
প্রাক চৈতন্যযুগে, খ্রীঃ ১২ শতকে রচিত, শ্রীকৃষ্ণকে নায়ক করে, হ্লাদিনী শক্তিস্বরূপা রাধাকে একজন পরকীয়া নারী রূপে চিত্রণ করে কিছু অশাস্ত্রীয় আদিরসাত্মক পরকীয়া কাহিনী দিয়ে সাজানো,  কবি জয়দেব গোস্বামী  বিরচিত ‘গীতগোবিন্দম্ কাব্য’ বাংলার কীর্তনের প্রকৃত উৎস।
এ বিষয়ে  হিন্দুধর্মের এনসাইক্লোপিডিয়া, ‘পৌরাণিকা’র রচয়িতা অমল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন— (দ্রঃ গীতগোবিন্দ) ‘‘রামায়ণ ও মহাভারতের কট্টর পটভূমিতে ব্লু-বুক হিসাবে বর্ষবরদের চরম ও পরম পরিতৃপ্তি দিয়েছিল; তন্ত্রাভিলাষী সমাজে তন্ত্রগুলি চেতন ও অবচেতন মনকে যেমন তৃপ্তি দেয়।’’ কবি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্যের মূল্যায়ন বিষয়ে বলছেন—‘‘গীতগোবিন্দে সুড়সুড়ি আছে আর আছে দুষ্পাচ্য যৌনতা।  ….. সহজিয়া জয়দেব আবিল, অপাঠ্য।’’ রাধা সন্দর্ভে বলছেন— ‘‘…. রাধাবাদ শক্তিবাদেরই একটি ধারা; রাসলীলা নিরোধ ব্যবহারের বিশুদ্ধ বিজ্ঞাপন। তন্ত্রের মানসকন্যা রাধা। রস ও রতির মিলন বৈষ্ণব তত্ত্ব; সাধক ও ভৈরবীর সম্ভোগ শাক্ত তত্ত্ব এবং বজ্রযানে বজ্র ও পদ্মের মিলন এ  সবগুলিই তান্ত্রিক তত্ত্ব; বজ্রযানে তাই বলা হয়েছে বুদ্ধত্বং যোষিৎ-যোনিপ্রতিষ্ঠিতম্। ….. ভাগবতে  রাধা নাই। …. ভাগবত ও বিষ্ণু  পুরাণে রাসলীলা আছে কিন্তু রাধা নাই। ….. ’’
তথাপি রাধার মানবী অস্তিত্ব কিছু-কিছু অ-বৈষ্ণবদের রিরংসায় বাসা বেঁধেছিল। সেই বিকৃত ধারার বাসাটাকে ভাঙতে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যদেব নিজেকে রাধা-কৃষ্ণের যুগলরূপ বলে প্রচার করলেন। যাতে ধর্মের অজুহাতে ধর্মবিরুদ্ধ পরকীয়া-প্রীতি প্রশ্রয় না পায়। তাই তিনি রাধাকে নারীদেহে নয়, সুরত-সম্বেগের ধারায় অন্বেষণ করতে পথ দেখালেন।  রাধাকৃষ্ণের যুগলধারার আদর্শে, পরকীয়া-প্রীতির আদর্শে গড়ে ওঠা তৎকালিন প্রচলিত কীর্তনের ধারাটাকে গীতা গ্রন্থে বর্ণিত—
“যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লাণির্ভবতি ভারতঃ।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মনম্ সৃজাম্যহম্॥   
পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম্ ।
ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ॥”–এর সূত্র মেনে,—অর্থাৎ ‘‘ঈশ্বর এক, ধর্ম এক, প্রেরিতগণ বিভিন্ন নামে সেই এক-এরই বার্তাবাহী’’র সনাতনী ধারা বা সনাতন ধর্মকে সংস্থাপিত করলেন।  শ্রীরামচন্দ্র এবং শ্রীকৃষ্ণের আদর্শকে সামনে রেখে।  হরেকৃষ্ণ, হরেরাম প্রচার মাধ্যমে। এর ফলে পরকীয়া-তত্ত্বের সহজীয়া মতবাদীরা বৈষ্ণবীয় মূলস্রোতে ফিরে আসার সুযোগ পেল এবং পৌত্তলিকতার নাগপাশ থেকে সনাতন ধর্মকে উদ্ধার করে এক সর্বজনীন রূপ দিলেন। মূলতঃ শ্রীকৃষ্ণকে কেন্দ্র করে। নিজেকে অন্তরালে রেখে।

 ‘অবতার নাহি কহে, আমি অবতার।’ তথাপি ধরা পড়ে গেলেন বৈষ্ণবাচার্য সাধক অদ্বৈত মহাপ্রভুর কাছে। অদ্বৈত মহাপ্রভুকে ফাঁকি দিতে পারলেন না। তাঁর সাধনার কাছে ধরা পড়ে গেলেন। নিত্যানন্দ মহাপ্রভুও বুঝতে পেরে  গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুকে কৃষ্ণের নব-কলেবর রূপে প্রচার করতে শুরু করলেন।
                       *         *         *
আসলে সমগ্র জগতের প্রাণনশক্তি বা প্রাণপঙ্ক বা প্রটোপ্লাজমকে পরমাত্মিক শক্তি বলা হয়, যা বিশ্ব ব্যাপিয়া বিদ্যমান, ‘‘যিনি সর্ব্ব ও প্রত্যেকের ভিতর বিশেষভাবে পরিব্যাপ্ত’’ তিনিই বিষ্ণু।  যে পুরোহিতগণ প্রতিমা পূজা করেন, তাঁরাও সর্বাগ্রে ‘ওঁ শ্রীবিষ্ণু’ মন্ত্রে আচমন করেন। সর্বকালের  শ্রেষ্ঠ পুরোহিত রঘুবংশের কৌলগুরু বশিষ্ঠদেব শ্রীরামচন্দ্রকে ‘‘ওঁ নারায়ণঃ পরাবেদা নারায়ণঃ পরাক্ষরঃ।/নারায়ণঃ পরামুক্তি নারায়ণঃ পরাগতিঃ॥’’ মন্ত্রে স্বস্তিবাচন করার সময় শ্রীরামচন্দ্রের মধ্যে পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণকে উপলব্ধি করলে তিনি নারায়ণের পরিবর্তে রামচন্দ্র শব্দ বসিয়ে মন্ত্রটিকে পরিমার্জিত করেন। নররূপী নারায়ণ পুরুষোত্তম রামচন্দ্রকে কেন্দ্র করে সবাইকে ধর্ম পালন করতে উদ্বুদ্ধ করলেন।   অনুরূপভাবে কৃষ্ণনামের প্রচারক শ্রীগৌরাঙ্গদেবের মধ্যে বিষ্ণুত্ব বা কৃষ্ণত্ব-এর পরিপূর্ণতা সাধনদ্বারা উপলব্ধি করা মাত্রই নিত্যানন্দ প্রভু ‘‘ভজ গৌরাঙ্গ কহ গৌরাঙ্গ লহ গৌরাঙ্গের নাম রে …. ।’’ ‘‘প্রভু নিত্যানন্দ কহে দন্তে তৃণ ধরি। আমারে কিনিয়া লহ ভজ গৌরহরি॥ ইত্যাদি স্বস্তিবাচনে গীতার অবতারবাদকে সম্মান জানালেন। তৎকালিন পুরুষোত্তম চৈতন্যদেবকে কেন্দ্র করে সবাইকে চলতে বললেন। এই হচ্ছে সাজা-গুরুদের কবল থেকে সনাতন বৈষ্ণবধর্মের ধারাকে নবীকরণ মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখার ফরমূলা।  গীতা গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণ বিষয়টিকে স্পষ্ট করে বিধৃত করেছেন।     
                *         *         *
অবতার-তত্ত্বের ধারা অনুসারে অবতার বরিষ্ঠ শ্রীরামচন্দ্র ছিলেন সত্যের পূজারী অথচ অসৎ নিরোধী। তৎকালীন যুগের অচ্ছুৎ অনার্য্যদের আর্য্যীকৃত করে আর্য্য-অনার্য্যদের মেলবন্ধন করলেন। অনার্য্য গুহক চণ্ডালকে করলেন মিত্র, আবার অকালমৃত্যুর দ্যোতক বর্ণাশ্রম-বিদ্বেষী প্রতিলোমাচারী বন্ধুবর শম্বুককে দিলেন চরম শাস্তি। ব্রাহ্মণ ঔরসজাত  রাবণ  যখন কিছুতেই সীতাকে বশে আনতে পারছিলেন না তখন সভাসদেরা মায়াবী-রাবণকে বলেছিলেন, আপনি রামরূপ ধারণ করে গেলেই তো সীতাকে সহজেই বশীভূত করতে পারেন। উত্তরে রাবণ বলেছিলেন, ওই রূপ স্মরণ করলেই আমার সব পাপ-প্রবৃত্তি মুছে গিয়ে আমি এক অন্য মানুষ হয়ে যাই। তথাপি প্রবৃত্তির ঊর্দ্ধে উঠে ওই বোধটাকে ধরে রাখতে পারল না, ফলে রামচন্দ্রের হাতে হত হতে হল। অথচ বিভীষণ রামচন্দ্রের আদর্শে প্রলুব্ধ হয়ে রাবণকে ত্যাগ করলেন।
        এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ……রাবণ তো আদর্শবান ছিল না। রামচন্দ্রকে দেখে সে একেবারে বিগলিত হয়ে গেল। রামচন্দ্রের ঊর্দ্ধে তার আর কেউ নেই। ভ্রাতার প্রতি কর্তব্যের চাইতে তার ইষ্টানুরাগই প্রবল। ভীষ্ম কিন্তু কেষ্টঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি নিয়েও, কর্তব্যবোধে কৌরবের পক্ষ ছাড়তে পারেন নি। তা কিন্তু ঠিক হয়নি। ইষ্টের জন্য, সত্যের জন্য, অন্য যে-কোন কর্তব্য ত্যাগ করতে হবে, যদি সে কর্তব্য ইষ্টের পথে অন্তরায় হয়। ‘‘সর্ব্বধর্ম্মান পরিত্যজ্য  মামেকং শরণং ব্রজ’’ । (আ. প্র. 21/2.6.1952)
……শ্রীরামচন্দ্রের খুব strong group (শক্তিমান দল) ছিল। হনুমান, সুগ্রীব, জাম্বুবান, অঙ্গদ, নল, নীল এরা সবাই ছিল একটা strong unit (শক্তিমান গুচ্ছ)। রামচন্দ্রের সাথে ওদের একজন না-একজন থাকতই। এক সময় বিভীষণকে সন্দেহ করেছিল লক্ষণ।  বিভীষণ তাতে বলেছিল, ‘আমি জানি তোমরা আমাকে সন্দেহ করবে। কারণ, আমি রাবণের ভাই। আমি ভাই হয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে  treachery (বিশ্বাসঘাতকতা) করেছি। কিন্তু করেছি অসৎ-এর বিরুদ্ধে। হজরত রসুলের  group-ও (দলও) খুব  strong (শক্তিমান) ছিল। তিনি বেঁচে থাকতে-থাকতেই অনেকখানি ভূখণ্ডের king (রাজা) হয়েছিলেন। (দীপরক্ষী 2/26.7.1956)
রাজাকে কতখানি প্রজাস্বার্থী হতে হবে সেইটেই রামচন্দ্র দেখিয়েছেন। প্রজা প্রাণের চাইতেও বেশী না হলে রাজা হওয়া যায় না। …….সীতাও ছিলেন রামচন্দ্রের আদর্শে উৎসর্গীকৃত। আর এই ছিল আমাদের আর্য্যবিবাহের তাৎপর্য্য। (আ. প্র. 20/9. 8. 1951)
        অবতার বরিষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ‘‘শ্রীকৃষ্ণ সব সময়েই চেষ্টা করেছেন যুদ্ধবিগ্রহ avoid (পরিহার) করতে, কিন্তু তাঁর environment (পরিবেশ) তাঁকে সে scope (সুযোগ) দিল না। আর শ্রীকৃষ্ণের যুদ্ধ—মৃত্যুকে মারবার জন্য। Gangrene-affected part of the body (শরীরের দুষ্টক্ষতযুক্ত স্থান) আমরা যেমন কেটে ফেলি জীবন বাঁচাবার জন্য, তিনিও তেমনি মৃত্যু ও মারণের মূর্ত্ত প্রতীকস্বরূপ যারা ছিল তাদের মেরেছিলেন সমগ্র সমাজকে বাঁচাবার জন্য। (আ. প্র. খণ্ড ১, ৪. ১২. ১৯৪১)
        …… শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে বুঝিয়ে দিলেন যে devil (শয়তান) যদি রাজত্ব করে, তবে অর্জ্জুনের ঈপ্সিত ধর্ম্ম, জাতি, কুল, মান কিছুই রক্ষা পাবে না। তাই devil (শয়তান)-কে demolish (ধ্বংস) করা লোকমঙ্গলের জন্যই অপরিহার্য্য। এর মধ্যে দ্বেষ-হিংসার বালাই নেই। বরং অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধকে এড়িয়ে চলার বুদ্ধির পিছনে আছে দুর্ব্বলতা।’’ (আ. প্র. খণ্ড ৬, ৬. ১২. ১৯৪৫)   
কেষ্টদা (ভট্টাচার্য্য) প্রশ্ন করেন– গীতায় শ্রীকৃষ্ণ প্রথমে আত্মতত্ত্ব সম্বন্ধে এক বিরাট দার্শনিক আলোচনার অবতারণা করে তারপর ক্ষত্রিয়ের করণীয় নির্দ্দেশ করলেন অর্জুনকে। ওভাবে বললেন কেন ?
শ্রীশ্রীঠাকুর– Divine Philosophy ( ভাগবত দর্শন ) দিয়ে শুরু করে তা থেকে Concrete – এ ( বাস্তবে ) আসলেন। আত্মিক ধর্ম প্রত্যেকে পালন করতে হয় তার Instinctive activity ( সহজাত সংস্কার-সম্মত কর্ম ) এর ভিতর দিয়ে। অর্জ্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ যা বলেছিলেন তার মর্ম্ম হল — You are a Kshatriya, born with Kshatriya instincts. And you must do your instinctive duty with all elevating urge ( তুমি ক্ষাত্র সংস্কার নিয়ে জাত ক্ষত্রিয়। এবং উন্নয়নী আকুতি নিয়ে তোমাকে অবশ্যই তোমার সহজাত সংস্কার-সম্মত কর্তব্য পালন করতে হবে )। অর্জ্জুন পন্ডিত কিনা তাই কেষ্টঠাকুর ঐভাবে অর্জ্জুনকে তাঁর বক্তব্য বলেছিলেন। Philosophy ( দর্শন ) না বললে অর্জ্জুন ধরত না।
(আলোচনা প্রসঙ্গে, ১১দশ খন্ড, (ইং ২০-০৫-১৯৪৮)
        রামচন্দ্র এবং শ্রীকৃষ্ণ উভয়েই বৈষ্ণবধর্মের বা সনাতন ধর্মের মূল কাঠামো সদাচার এবং বর্ণাশ্রমকে রক্ষা এবং প্রতিষ্ঠা করার জন্যই জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। চৈতন্যদেবও ভারতীয় কৃষ্টির মূল, বর্ণধর্ম, আশ্রমধর্ম  পালন করার পর লোকশিক্ষার জন্য সন্ন্যাস নিয়েছিলেন। তিনি বাস্তব জীবনে অসৎ-নিরোধে তৎপর ছিলেন। বর্ণাশ্রম বিরোধী  কোন প্রতিলোম বিবাহ পর্যন্ত হতে দেন নি।  দোর্দন্ডপ্রতাপ জমিদারের দুষ্কৃত ভাইপো মাধবের কবল থেকে চন্দনের বাগদত্তা চুয়াকে পার্ষদদের সাহায্যে চন্দনকে দিয়েই হরণ করিয়ে স্বয়ং পৌরহিত্য করে উপযুক্ত পাত্রে পাত্রস্থ করেছেন।     (সূত্রঃ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত, চুয়াচন্দন উপন্যাস)
                  *        *         *
বাংলার বিশুদ্ধ কীর্তন-আন্দোলনের পথিকৃৎ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তিনি স্বভাবজ পাণ্ডিত্যের মাধ্যমে নবদ্বীপের স্মার্ত্ত পণ্ডিতদের, ভারতখ্যাত কাশ্মীরি-পণ্ডিতের দর্প চূর্ণ করেছেন। তিনি তামসিক গুণসম্পন্ন সমাজের প্রতিনিধি জগাই-মাধাইদের প্রেম দিয়ে সাত্তিক গুণের উদ্বোধন করেছেন। সনাতন ধর্ম বিদ্বেষী চাঁদ কাজীদের হরিনাম সংকীর্তনের মাধ্যমে চরমবার্তা দিয়ে তমোগুণ নাশ করে ইসলামের বিকৃতি প্রচারকে নস্যাৎ করে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বাহ্য জাতিভেদের বেড়াজাল অগ্রাহ্য করে, যবন হরিদাসের ভক্তিকে মর্যাদা দিয়ে ভক্ত হরিদাসে রূপান্তর করেছেন। তৎকালিন ভারতের বিখ্যাত তাত্ত্বিক পণ্ডিতদের, যেমন রায় রামানন্দ, প্রকাশানন্দ সরস্বতী, সার্ব্বভৌম প্রভৃতিদের ভুল ভাঙাতে তথ্যসমৃদ্ধ বাচনিক কীর্তি—
‘‘চণ্ডালোহপি দ্বিজশ্রেষ্ঠ হরিভক্তি পরায়ণঃ।’’
‘‘মুচি যদি ভক্তিসহ ডাকে কৃষ্ণধনে।
কোটি নমস্কার করি তাহার চরণে॥’’—-প্রকাশ মাধ্যমে আপামর সবাইকে সনাতন ধর্মে উদ্বুদ্ধ করেছেন। 
এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ‘‘চৈতন্যদেবও জগাই-মাধাইয়ের উপর কেমন উগ্রভাব ধারণ করে তাদের অন্তরে ত্রাস ও অনুতাপ জাগিয়ে তবে প্রেম দেখিয়ে তাদের অন্তর জয় করেছিলেন। তাদের উগ্রদম্ভ, দর্প ও প্রবৃত্তি-উন্মত্ততাকে স্তব্ধ না করে, আয়ত্তে না এনে গোড়ায় প্রেম দেখাতে গেলে সে-প্রেম তারা ধরতে পারত না। হয়তো ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করত।’’  
(আ. প্র. ৯/২৭. ১২. ১৯৪৬)     
      প্রকাশানন্দ সরস্বতী, সার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্য প্রমুখগণ বৈদান্তিক পণ্ডিত ছিলেন। তাঁদের পাণ্ডিত্য বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন,—- বৈদান্তিক ভাব মানে record of experience (জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার দলিল)। ওরা হয়তো achieve (আয়ত্ত) করার পথ ঠিক অবলম্বন করেননি, সেইটে চৈতন্য মহাপ্রভু ধরিয়ে দিয়েছেন। ভক্তি লাগেই, ভক্তিপথ সহজ, সুষ্ঠু, accurate (যথাযথ), ভক্তির রাস্তা দিয়েই যেতে হয়, তার সঙ্গে বৈশিষ্ট্যানুযায়ী ঝোঁক থাকেই। অদ্বৈতবাদেও গুরুভক্তির উপর জোর দেওয়া আছে। নইলে এগোন যায় না। তাই আছে— ‘অদ্বৈতং ত্রিষু লোকেষু নাদ্বৈতং গুরুনা সহ’। নির্ব্বিকল্প সমাধিতে অদ্বৈতভূমিতে সমাসীন হ’লে জ্ঞান, জ্ঞেয়, জ্ঞাতা লয় পেয়ে যায়। তখন মানুষ বোধস্বরূপ হ’য়ে থাকে, সে অবস্থা মুখে বলা যায় না। অন্য সময় সে মানুষেরও সেব্য-সেবকভাব নিয়ে থাকা স্বাভাবিক! আমি না থাকলে তুমি থাকে না, তুমি না থাকলে আমি থাকে না। জীবজগতের সঙ্গে ব্যবহারে যে আমি-তুমি রূপ দ্বৈতভাব থাকে, তখনও তার মধ্যে একটা একাত্মবোধের চেতনা খেলা ক’রে বেড়ায়। ইষ্টই যে সব-কিছু হ’য়ে আছেন, এই স্মৃতি লেগে থাকে। আত্মাই কই আর ব্রহ্মই কই, তার মূর্ত্ত বিগ্রহ হলেন ইষ্ট। মানুষ যখন ইষ্টসর্ব্বস্ব হয়, ইষ্টপ্রীত্যর্থে ছাড়া যখন সে একটা নিঃশ্বাসও ফেলে না, তখনই সে একই সঙ্গে ভক্তিযোগ, কর্ম্মযোগ ও জ্ঞানযোগে সিদ্ধ হ’য়ে ওঠে। কর্ম্মযোগ, জ্ঞানযোগ যাই বল, ভক্তির সঙ্গে যোগ না থাকলে কাজ হয় না, সব যোগই আসে ভক্তিযোগ থেকে— 
      “বহুনাং জন্মনামন্তে জ্ঞানবান্ মাং প্রপদ্যতে, বাসুদেবঃ সর্ব্বমিতি স মহাত্মা সুদুর্লভঃ”। এই জ্ঞানী একাধারে জ্ঞানী, ভক্ত ও কর্ম্মী। গোড়া থেকেই অদ্বৈতবাদ mathematically (গাণিতিকভাবে) সম্ভব হ’তে পারে, practically (বাস্তবে) সম্ভব হয় কমই। (আলোচনা প্রসঙ্গে, ত্রয়োদশ খণ্ড, তাং ১-৮-১৯৪৮)

                   *        *         * 

চৈতন্যদেব অসি নয়, তীর-ধনুক-বল্লম লাঠি দিয়েও নয়—খোল, করতালাদি বাদ্যযন্ত্রের অনুষঙ্গে ‘হরেরাম হরেকৃষ্ণ’ নামকীর্তনের মাধ্যমে এক ধর্মীয় প্লাবন সৃষ্টি করেছিলেন। ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ অতিক্রম করে,  পুরুষার্থের পঞ্চম-বর্গ প্রেমের সাহায্যে সাম্প্রদায়িক কায়েমী-স্বার্থীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ভাগবত আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে ভাগবত ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্ণাশ্রমানুগ সামাজিক বিন্যাসকে সমৃদ্ধ করতে সর্ববর্ণে হরিনাম প্রচার করে বাহ্য জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন।  কিছু স্বার্থান্বেষী স্মার্ত্ত-পণ্ডিতদের অভিসন্ধিমূলক অভিযোগের ভিত্তিতে তৎকালিন শাসক চাঁদকাজী হরিনাম সঙ্কীর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। শ্রীবাস অঙ্গনের কীর্তনের আসরে গিয়ে বৈষ্ণবদের ওপর অত্যাচার করে, শ্রীখোল ভেঙ্গে দেয়। শান্ত মহাপ্রভু ওই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে কোন বিরোধ না করেই দুর্বার নিরোধ করেছিলেন।  ১৪টি কীর্তনদল সংগঠিত করে  উদ্দাম কীর্তন করতে করতে চাঁদকাজির বাড়িতে যান। চাঁদকাজী ভয় পেয়ে গেলে মহাপ্রভু তাকে আশ্বস্ত করতে কৃষ্ণপ্রেমের কথা বলেন। হরিনাম-সংকীর্তনের উপযোগিতা বিষয়ে বিস্তৃত ব্যাখ্যা করেন। তার পরে আপনকরা ভাব নিয়ে বলেন, তুমি আমার মামার গ্রামের লোক হবার সুবাদে তুমি আমার মামা হও, মামা হয়ে ভাগ্নের প্রতি এমন কঠোর হয়ো না। কীর্তন বন্ধ করার আদেশ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত আমরা তোমার বাড়ী ছেড়ে যাচ্ছি না।  ধর্ম প্রতিষ্ঠার কর্তব্যে অটল মহাপ্রভুর কীর্তন আন্দোলনের কাছে আনুগত্য স্বীকার করতে বাধ্য হয় চাঁদকাজি। তিনিও মহাপ্রভুর সাথে গলা মিলিয়ে হরিনাম সঙ্কীর্তন করেন। সবাইকে হরিনাম সঙ্কীর্তন করতে আদেশ জারী করেন।
      চৈতন্য আজ্ঞায় স্থির হইল কীর্তন 
      কহে আপনার তত্ত্ব করিয়া গর্জন।
      কলিযুগে মুঞি কৃষ্ণ নারায়ন
      মুঞি সেই ভগবান দেবকীনন্দন।।
      অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড কোটি মাঝে মুই নাথ
      যত গাও সেই মুঞি তোরা মোর দাস।।’’
     (শ্রীচৈতন্য ভাগবত পৃষ্ঠা ১৪৬, মধ্যখণ্ড ৮ম অধ্যায়।)
“গৌড়েশ্বর নবাবের দৌহিত্র চাঁদকাজী কে ভগবান শ্রীমন্ মহাপ্রভুর কৃপা”– (৩)
* প্রভু কহে – প্রশ্ন লাগি আইলাম তোমার স্থানে।
কাজী কহে-আজ্ঞা কর যে তোমার মনে।। ১৪৬
অনুবাদ :- শ্রীমন্ মহাপ্রভু বললেন, মামা! আমি আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করার জন্য আপনার বাড়িতে এসেছি।
তার উত্তরে চাঁদকাজী বললেন – হ্যা, তোমার মনে কি প্রশ্ন আছে তা তুমি বল।
* প্রভু কহে – গোদুগ্ধ খাও গাভী তোমার মাতা।
বৃষ অন্ন উপজায় তাতে তেঁহো পিতা।। ১৪৭
অনুবাদ :- শ্রীমন্ মহাপ্রভু বললেন – আপনি গরুর দুধ খান; সেই সূত্রে গাভী হচ্ছে আপনার মাতা। আর বৃষ অন্ন উৎপাদন করে, যা খেয়ে আপনি জীবন ধারন করেন; সেই সূত্রে সে আপনার পিতা।
* পিতা মাতা মারি খাও এবা কোন্ ধর্ম।
কোন্ বলে কর তুমি এমত বিকর্ম।। ১৪৮
অনুবাদ :- যেহেতু বৃষ ও গাভী আপনার পিতা ও মাতা, তা হলে তাদের হত্যা করে তাদের মাংস খান কি করে ? এটি কোন্ ধর্ম ? কার বলে আপনি এই পাপকর্ম করছেন ?
* কাজী কহে – তোমার যৈছে বেদ পুরাণ।
তৈছে আমার শাস্ত্র কেতাব কোরাণ।। ১৪৯
অনুবাদ :- কাজী উত্তর দিলেন, তোমার যেমন বেদ, পুরাণ আদি শাস্ত্র রয়েছে, তেমনই আমাদের শাস্ত্র হচ্ছে কোরান।
* সেই শাস্ত্রে কহে প্রবৃত্তি নিবৃত্তি মার্গ-ভেদ।
নিবৃত্তি-মার্গে জীব মাত্র বধের নিষধ।। ১৫০
অনুবাদ :- কোরন অনুসারে উন্নতি সাধনের দুটি পথ রয়েছে – প্রবৃত্তিমার্গ ও নিবৃত্তিমার্গ। নিবৃত্তিমার্গে জীবহত্যা নিষিদ্ধ।
* প্রবৃত্তি-মার্গে গোবধ করিতে বিধি হয়।
শাস্ত্র আজ্ঞায় বধ কৈলে নাহি পাপ ভয়।। ১৫১
অনুবাদ :- প্রবৃত্তিমার্গে গোবধ অনুমোন করা হয়েছে। শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে যদি বধ করা হয়, তাহলে কোনম পাপ হয় না।
* তোমার বেদেতে আছে গোবধের বাণী।
অতএব গোবধ করে বড় বড় মনি।। ১৫২
অনুবাদ :- চাঁদকাজী শ্রীমন্ মহাপ্রভু বললেন – তোমার বৈদিক শাস্ত্রে গোবধের নির্দেশ রয়েছে। সেই শাস্ত্র-নির্দেশের বলে বড় বড় মুনিরা গোমেধ-যজ্ঞ করেছিলেন।
* প্রভু কহে – বেদে কহে গোবধ নিষেধে।
অতএব হিন্দুমাত্র না করে গোবধে।। ১৫৩
অনুবাদ :- চাঁদকাজীর উক্তি খণ্ডন করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন – বেদে স্পষ্টভাবে গোবধ নিষধ করা হয়েছে। তাই যে কোন হিন্দু, তা তিনি যেই হোন না কেন, কখনোও গোবধ করেন না।
* জীয়াইতে পারে যদি তবে মারে প্রাণী।
বেদ-পুরাণে আছে হেন আজ্ঞাবাণী।। ১৫৪
অনুবাদ :- বেদ ও পুরাণে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, কেউ যদি কোন প্রাণীকে নবজীবন দান করতে পারে, তাহলে গবেষণার উদ্দ্যেশে সে প্রাণী মারতে পারে।
* অতএব জরদগব মারে মুনিগণ।
বেদমন্ত্রে শীঘ্র করে তাহার জীবন।। ১৫৫
অনুবাদ :- তাই মুনি-ঋষিরা অতি বৃদ্ধ জরদগব (জরাগ্রস্ত বা বৃদ্ধ) পশুদের কখনও কখনও মেরে, বৈদিক মন্ত্রের সাহায্যে তাদের নবজীবন দান করতেন। 
* জরদগব হঞা যুবা হয় আর বার।
তাতে তার বধ নহে হয় উপকার।। ১৫৬
অনুবাদ :- এই ধরনের জরদগব (জরাগ্রস্ত বা বৃদ্ধ) পশুদের যখন এভাবেই নবজীবন দান করা হত, তাতে তাদের তাতে তাদের বধ করা হত না, পক্ষান্তরে তাদের মহা উপকার সাধন করা হত।
* কলিকালে তৈছে শক্তি নাহিক ব্রাহ্মণে।
অতএব গোবধ কেহো না করে এখনে।। ১৫৭
অনুবাদ :- পূর্বে মহা শক্তিশালী ব্রাহ্মণেরা বৈদিক মন্ত্রের সাহায্য এই ধরনের কার্য্য সাধন করতে পারতেন, কিন্তু এখন এই কলিযুগে সেই রকম শক্তিশালি কোন ব্রাহ্মণই নেই। তাই গাভী ও বৃষদের নবজীবন দান করার যে গোমেধ-যোজ্ঞ, তা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।
* তোমরা জীয়াইতে নার বধ মাত্র সার।
নরক হৈতে তোমার নাহিক নিস্তার।। ১৫৮
অনুবাদ :- তোমরা মুসলমানেরা পশুকে নবজীবন দান করতে পার না, তোমারা কেবল হত্যা করতেই পার। তাই তোমরা নরকগামী হচ্ছ; সেখান থেকে তোমরা কোনভাবেই নিস্তার পাবে না।
* গরুর যতেক রোম, তত সহস্র বৎসর।
গোবধী রৌরব মধ্যে পচে নিরন্তর।। ১৫৯
অনুবাদ :- গরুর শরীরে যত লোম আছে তত হাজার বছর গোহত্যাকারী রৌরব নামক নরকে অকল্পনীয় দুঃখ-যন্ত্রণা ভোগ করে।
* তোমাসভার শাস্ত্রকর্তা-সেহো ভ্রান্ত হৈল।
না জানি শাস্ত্রের মর্ম ঐছে আজ্ঞা দিল।। ১৬০
অনুবাদ :- তোমাদের শাস্ত্রে বহু ভুলভ্রান্তি রয়েছে। শাস্ত্রের মর্ম না জেনে, সে সমস্ত শাস্ত্রর প্রণয়নকারীরা এমন ধরনের নির্দেশ দিয়েছে, যাতে যুক্তি বা বুদ্ধির দ্বারা বিচারের কোন ভিত্তি নেই এবং প্রমাণও নেই।
* শুনি স্তব্ধ হৈল কাজী না স্ফুরে বাণী।
বিচারিয়া কহে কাজী পরাভব মানি।। ১৬১
অনুবাদ :- শ্রীমন্ মহাপ্রভুর এই কথা শুনে কাজীর সমস্ত যুক্তি স্তব্ধ হল, তিনি আর কিছু বলতে পারলেনা। এভাবেই পরাজয় স্বীকার করে কাজী বিচারপূর্বক বললেন—
* তুমি যে কহিলে পণ্ডিত সেই সত্য হয়।
আধুনিক আমার শাস্ত্র, বিচার-সহ নয়।। ১৬২
অনুবাদ :- নিমাই পণ্ডিত! তুমি যা বললে তা সবই সত্য। আমাদের শাস্ত্র আধুনিক এবং তাই তার নির্দশগুলি দার্শনিক বিচার বা যুক্তিসঙ্গত নয়।
* কল্পিত আমার শাস্ত্র আমি সব জানি।
জাতি-অনুরোধে তবু সেই শাস্ত্র মানি।। ১৬৩
অনুবাদ :- আমি জানি যে, আমাদের শাস্ত্র বহু ভ্রান্ত্র ধারনা ও কল্পনায় পূর্ণ, তবুও যেহেতু আমি মুসলমান, তাই সম্প্রদায়ের খাতিরে আমি সেগুলি স্বীকার করি।
(শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত সপ্তদশ পরিচ্ছেদ।)

সনাতন ধর্মকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করতে এত কিছু করা সত্বেও  নবদ্বীপের কিছু স্মার্ত্ত পণ্ডিতেরা মহাপ্রভুর বিরোধিতা করেছেন।  তাই তিনি অনিচ্ছা সত্বেও বাধ্য হয়ে বৈষ্ণব আন্দোলনকে নবদ্বীপে বা নদীয়াতে সীমাবদ্ধ না রেখে ভারতব্যাপী বিস্তার করার মানসে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নামে ভুষিত হয়ে লোক-সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পরিব্রাজক হয়ে বেরিয়ে পড়েন।

         “সন্ন্যাস লইনু যবে ছন্ন হইল মন।
        কী কাজ সন্ন্যাসে মোর প্রেম প্রয়োজন॥”—এই বাণীর মধ্যে যা’ স্পষ্টরূপে প্রকাশিত।
                                   *         *         *   

        চৈতন্যদেবের লীলাবসান পরবর্তীকালে কিছু প্রবৃত্তিমার্গী অনুগামীরা চৈতন্যদেব কথিত অবতারবাদের মূলমন্ত্র—
        “আত্মেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা তারে বলি কাম।
        কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা, ধরে প্রেম নাম।
        কামের তাৎপর্য্য নিজ সম্ভোগ কেবল।
        কৃষ্ণসুখ তাৎপর্য্য প্রেম মহাবল।।” 

একটু বোধী তাৎপর্যে বিচার করলে দেখা যাবে, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-র আদর্শের অনুশাসন অনুশীলন ভিন্ন “কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা” উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। 
         ‘‘কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা’’-র সদাচার, বর্ণাশ্রম ও চতুরাশ্রম-ধর্মের তাৎপর্য্য বোঝার চেষ্টা না করে,  কৃষ্ণের আদর্শ চরিত্রগত করার অনুশীলন না করে, সাধনদ্বারা চৈতন্যদেবের পরবর্তী অবতারকে অন্বেষণ না করে, প্রবৃত্তি পরবশতার “আত্মেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা”-কে গুরুত্ব দিলেন তথাকথিত শ্রীকৃষ্ণ-চৈতন্য-প্রেমীরা।  শ্রীকৃষ্ণের সাথে রাধাকে জুড়ে নিয়ে মুখে ‘কৃষ্ণ-কৃষ্ণ’ বলে খোল-করতাল সহযোগে কীর্তন করতে অভ্যস্ত হলেন।  রাধা-কৃষ্ণের পরকীয়া প্রীতির সহজিয়া গোষ্ঠী তৈরি করে সগোত্র এবং প্রতিলোম বিবাহাদি সমর্থন করে আশ্রমধর্মকে অশ্রদ্ধা করেছেন। ফলে বিকৃত হয়েছে শ্রীকৃষ্ণ-চৈতন্যদেবের আদর্শ।  যার প্রবহমানতা বর্তমানেও বিদ্যমান। চৈতন্যদেব প্রদত্ত ‘শিক্ষাষ্টক’ উপদেশামৃত, যার মধ্যে ‘রাধা’ নামের উল্লেখ পর্যন্ত নেই, ওই উপেদেশামৃতকে গুরুত্বের সাথে বিচার-বিশ্লেষণ না করেই ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থেও রাধাকে মানবী রূপে চিত্রিত করা হয়েছে।  রাধাকে কৃষ্ণের বল্লভা বলা হয়েছে। বল্লভা শব্দের অর্থ প্রণয়িণী। যে কৃষ্ণকে সবকিছুর স্রষ্টা মনে করেন যারা, যে কৃষ্ণ অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখান বলে প্রচার করা হয়, সেই কৃষ্ণের প্রাণধন, প্রাণশক্তি বা জীবনীশক্তির উৎস একজন নারী ! ভাবা যায় !  না মেনে নেওয়া যায় ? যদি রাধাকে কৃষ্ণের একজন ভক্ত হিসাবে দেখাতেন, তাহলে মেনে নেওয়া  যেত।
রাধা সহ ক্রীড়ারস বৃদ্ধির কারণ। 
আর সব  গোপীগণ রাসোপকরণ॥
কৃষ্ণের বল্লভা রাধা কৃষ্ণ প্রাণধন।
তাঁহা বিনু সুখ হেতু নহে গোপীগণ॥ (চৈঃ চঃ পৃঃ ৬৪)   
শুধু তাই নয়, শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে গবেষণা করেন যারা, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাকে নিয়ে গবেষণা করেন যারা, তারাও পার্থসারথী কৃষ্ণের আদর্শকে পাশ কাটিয়ে, বর্ণাশ্রমধর্মকে উপেক্ষা করে, বাঁশী হাতে নিয়ে রাধাকে জড়িয়ে ধরা রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তির উপাসনা করেন। ‘আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সঙ্ঘ’, সংক্ষেপে ইসকনের ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথি স্মরণে জন্মাষ্টমীর দিনটিতেও রাধাকে সাথে রাখেন, যেন রাধাকে সাথে নিয়েই কৃষ্ণ জন্মেছিলেন! 

        বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন—‘‘শুনেছি ভাগবতে রাধা ব’লে গোপিনী নেই। আমি বুঝি, রাধা মানে সেরা সৃষ্টি-রচয়িতা শক্তি। শব্দের থেকেই সব। কতরকমের শব্দ শোনা যায়। ওঁ-অনুভূতির পূর্বে দারুণ বম্ বম্ বম্ শব্দ হয়। দুনিয়াটা যেন ফেটে চৌচির হ’য়ে যাবে। কিছু থাকবে না, সব ধ্বংস হ’য়ে যাবে। সত্তাকেও বিলুপ্ত ক’রে দেবে। এমন শব্দ, সব যেন টুকরো টুকরো হ’য়ে, রেণু রেণু হ’য়ে উড়ে যাবে। সে কী ভীষণ অবস্থা! ভয় বলি, সত্তার ভয় যে কী তখন বোঝা যায়! সত্তা বুঝি এই মুহূর্তে গুঁড়িয়ে দিল। তখন বোঝা যায় দয়ালের দয়া, যে দয়ায় টিকে আছি এই দুনিয়ায়। ওঁ-অনুধাবনে রং আসে। রং-এ মনোনিবেশ করলে পিকলু বাঁশীর মত শব্দ হয়। দোল আসে। এক অবস্থায় motion and cessation (গতি এবং বিরতি)-এর মত বোধ হয়। স্বামীর অনুভূতি যেন to and from (একেবার সামনে একবার পেছনে হচ্ছে)-এমনতর বোধ করা যায়।  ইলেকট্রিক ব্যাটারি দিলে যেমন শব্দ পাওয়া যায় না, ভিতরে বোধ হয়, রাধাও ঐ রকম সত্তা দিয়ে মানুষ হয়। শেষ দিকে আসে একটা পরম শান্ত অবস্থা।
        আমাদের এই সৎনাম সব মন্ত্রের বীজস্বরূপ। সব বীজের সত্তা হ’লো কম্পন। আর কম্পনের গঠনতন্ত্র অনুভব করা যায় এই নামের মধ্যে। রেডিওর যেমন শর্ট ওয়েভ, মিডিয়াম ওয়েভ এবং নানা মিটার আছে, অনুভূতির রাজ্যেও সেই রকম সব আছে। এগুলি ফালতু কথা না, এগুলির সত্তা আছে। যে সাধন করে সেই বুঝতে পারে। হ্রীং ক্রীং ইত্যাদির স্তরে-স্তরে কত শব্দ এবং তার সঙ্গে-সঙ্গে জ্যোতি ভেসে ওঠে। আর একটা কথা, পরীক্ষা করতে গেলে সদগুরুকে ধরা যায় না। কামনা নিয়ে গেলেও তাঁকে পাওয়া হয় না। কামনা ত্যাগ ক’রে ধরলে তখন তাঁকে পাওয়া যায়। কামনা নিয়ে তাঁতে যুক্ত হ’তে গেলে কামনার সঙ্গে যুক্ত হই, তাঁতে যুক্ত হ’তে পারি না। নিষ্কামের কথা কয়, তার মানে গুরুই আমার একমাত্র কাম্য হবেন, অন্য কোন কামনা থাকবে না। তখনই তাঁকে পাওয়া যাবে।’’
            (আ. প্র. ১৫শ খণ্ড, পৃঃ ২০০-২০১ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী)

তাই বাধ্য হয়ে এ-যুগের শ্রীকৃষ্ণ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র   বিকৃতাচারী ধর্মের ধ্বজাধারীদের উদ্দেশ্যে বললেন—
      “ভগবান, ইষ্ট বা ধর্ম্মের মৌখিক স্তুতির ভিতর-দিয়ে যা’রা ধর্ম্মবিরোধী কাজ করে, তা’রা হ’ল সব চাইতে বড় শয়তানের দূত–প্রকৃষ্ট লোক-দূষক। ১২৫ । (শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭)’’
‘‘অনেকে শ্রীকৃষ্ণকে মানে, গীতা মানে, অথচ বর্ণাশ্রম মানে না। গীতার কে কি ব্যাখ্যা করেছেন সেই দোহাই দেয়। কিন্তু গীতার বক্তা শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও বাণী দেখে চতুর্বর্ণ সম্বন্ধে তাঁর মত আমরা কি বুঝি? এ সম্বন্ধে কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না, গীতা শ্রীকৃষ্ণের জীবনেই জীবন্তভাবে পরিস্ফুট। গীতায় প্রত্যেক বর্ণের স্বভাবজ কর্ম সম্বন্ধে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে।  (আ. প্র. ১৪/১১৮)
কেষ্টঠাকুরের জীবনটা দেখেন, ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত সবাই তাঁকে পুরুষোত্তমজ্ঞানে পূজা করতেন, কিন্তু তাঁর এত বিয়ের মধ্যে একটাও বামুনের মেয়ে নেই। সমাজ-সংস্থিতির  জন্য তিনি বর্ণাশ্রমের বিধান কাঁটায়-কাটায় মেনে গেছেন। (আ. প্র. ৭/৫০)’’
                                     *         *         *

      যারা শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে গবেষণা করেন, তাদের তো জানা উচিত যে, শ্রীকৃষ্ণ, বৃহত্তর রাষ্ট্রকে অধর্মের গ্যাংগ্রীন থেকে বাঁচাতেই সুকৌশলে কংস, জরাসন্ধ, শিশুপাল, শাল্ব কৌরবাদির ন্যায় আততায়ীরূপী গ্যাংগ্রীনদের অপারেশন করেছিলেন।—হিংসাকে হিংসা দ্বারা প্রতিরোধ করে অহিংসার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন! কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সনাতনী আর্য্যকৃষ্টির মূলতত্ত্ব, সদাচার ও বর্ণাশ্রমধর্মভিত্তিক পরমরাষ্ট্রিক সমবায়।
        শ্রীকৃষ্ণের লীলাবসান পরবর্তী শ্রীকৃষ্ণের গীতা-আদর্শের প্রচারক ঋত্বিক সংঘ সক্রিয় থাকার ফলে প্রজাগণ সহজাত-সংস্কার অনুযায়ী সবাই জীবিকা অর্জন করতেন। কেহ কাহারো বৃত্তি-হরণ করতেন না। সকলে আর্য্যকৃষ্টির বিবাহাদি দশবিধ সংস্কার মেনে চলতেন। জনন বিপর্যয় হয় নি, আশ্রমধর্ম ঠিক ছিল। ফলে তিন হাজার বছর পর্যন্ত বৃহত্তর আর্যাবর্তে আগ্রাসন করতে সাহস পায়নি অধার্মিক দুষ্কৃতিরা ! যখন থেকে বর্ণাশ্রম-ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের শিক্ষা ভুলে, প্রবৃত্তিরূপী শয়তানের প্ররোচনার ফাঁদে পড়ে আমরা  ক্লীব হয়েছি, তখন থেকে আমরা আগ্রাসনের শিকার হয়েছি। বোধ বিপর্য্যয়ের কারণে, সনাতন ধর্মের অনুশাসন ভুলে, এক আত্মঘাতী উদারতা দেখাতে গিয়ে শক-হুণ-পাঠান-মোগলদের স্বাগত জানিয়েছি। তারা সুযোগ পেয়ে আমাদের জাতীয়তাবোধ, জাতীয়কৃষ্টি অবদলিত করেছে! অনেকদিন পরে, যখন আগ্রাসনের চরম বিপর্যয়, তখন ইংরেজদের অপশাসন থেকে আর্যাবর্তকে মুক্ত করতে আমরা মেরুদণ্ড সোজা করে ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করলাম। সেই শ্রীকৃষ্ণের গীতার আদর্শকে অবলম্বন করে।
        “যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লাণির্ভবতি ভারতঃ।
        অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মনম্ সৃজাম্যহম্।।
        পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম্ ।
        ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ।।”—বাণীর অনুসরণে।
     গীতার ওই সূত্র অবলম্বনে, চৈতন্যদেব ‘‘যেই রাম সেই কৃষ্ণ, এক দেহে রামকৃষ্ণ’’ রূপে এসে আমাদের ভুল ভাঙিয়ে দিলেন। গীর্জায় গিয়ে যীশুর, মসজিদে গিয়ে রসুলের আরাধনা করলেন। পঞ্চমুণ্ডির আসন সাজিয়ে কোনো তান্ত্রিক-গুরু বসালেন তো বসে পড়লেন। তিনি লোকশিক্ষার জন্য বহু ধর্মীয় মতবাদের  গুরুদের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুন্ন রেখেই। তিনি দক্ষিণেশ্বরে পূজারী হয়ে এসেও প্রচলিত পূজা-পদ্ধতি অনুসরণ করেন নি। মৃন্ময়ী জগন্মাতাকে প্রাণবন্ত করে দেখালেন এবং কালী মায়ের আদেশক্রমে নিজে খেয়ে মাকে খাওয়ালেন। ফলহারিনী কালী পূজার শুভলগ্নে সারদাদেবীকে আরাধনা করে চিন্ময়ী মাতৃশক্তিকে আদ্যাশক্তি রূপে শ্রদ্ধা করতে শেখালেন।  ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব শিষ্য নরেন্দ্রনাথকে শেখালেন,  ভারতবর্ষের শাশ্বত দর্শন, ‘‘বহুজন হিতায় চ, বহুজন সুখায় চ’’-এর আদর্শের উত্তরাধিকারী হয়ে পরমার্থ লাভ করার জন্য তোমাকে আত্ম নিবেদন করতে হবে।
        শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ঐশী শক্তিতে শক্তিমান হয়ে নরেন্দ্রনাথ হলেন বিবেকানন্দ। এঁকে দিলেন মহান ভারতবর্ষের পূর্ণাঙ্গ এক চিত্র। শিকাগো ধর্ম্ম মহাসভার ক্যানভাসে।
        ‘আব্রহ্মস্তম্বভৃদ্ধাতা’–তৃণলতা থেকে ব্রহ্ম, সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বার্তাবহ বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, সংহিতা, পুরুষোত্তমবাদ নিয়ে বিশ্বজনমানস নতুন করে ভাবতে শুরু করলো।  সনাতন ধর্মের হৃত উত্তরাধিকার ফিরে পেতে ভারতবর্ষ উপনিষদের ‘‘উত্তিষ্ঠত জাগ্রত, প্রাপ্য বরান্ নিবোধত।।’’ মন্ত্রে আবার নতুন করে জেগে উঠলো।………
        ‘‘কর্ম্মণ্যেবাধিকারেস্তু মা ফলেষু কদাচন।…….’’ ––কর্মেই তোমার অধিকার ফলে নয়। ––শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতার ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার আদর্শ আঁকড়ে নবযুগের অভিমন্যু ক্ষুদিরাম, দেশরক্ষার ধর্ম পালন করতে গিয়ে ফাঁসির আসামী হলেন। ‘‘ন জায়তে ম্রিয়তে কদাচিৎ…….বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়………নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ।…….’’। বাণীর অমৃত আদর্শে স্থিতপ্রজ্ঞ, মৃত্যুঞ্জয়ী ক্ষুদিরাম হাসিমুখে ফাঁসির দড়ির মালা পড়লেন গলায়। একটা ক্ষুদিরামের আত্মাহুতি জন্ম দিল হাজারো ক্ষুদিরামের। ফাঁসিরজ্জু আর ইংরেজ রাজশক্তির বুলেটের আলিঙ্গনে জীবনের জয়গান গাইতে গাইতে অকালে হাসিমুখে বিদায় নিল উত্তরাধিকারের স্বপ্নদেখা কতশত বীর ভারত-সন্তানেরা।
স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম শহীদ ক্ষুদিরাম ‘গীতা’-বর্ণিত ‘‘হতো বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং/জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম্’’-এর বাণীর অনুসরণে অমরত্ব লাভের অনুশাসন মেনে মৃত্যু বরণ করে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মৃত্যুঞ্জয়ী হতে শিখিয়েছিলেন। গীতা গ্রন্থের সেইসব বীরগাঁথা ভুলে  আমরা তাঁর ঋণ শোধ করছি, ‘কৃষ্ণ করলেই লীলা, আমরা করলেই বীলা’ গানের ডালি সাজিয়ে! যদিও ওই গান রচনা করার সাহস আমরাই দিয়েছি,—যারা ধর্মের ধ্বজা ধরে প্রবৃত্তিকে পোষণ দিয়ে চলেছি।–-পার্থসারথী শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমদ্ভাগবতগীতার আদর্শ ভুলে, হ্লাদিনি শক্তিরূপিনী রাধা-তত্ত্ব ভুলে, মনগড়া প্রবৃত্তি-প্ররোচিত মানবী রাধা, শ্রীকৃষ্ণের মামীর সাথে পরকীয়া কামুক-রূপে, গোপিনীদের বস্ত্রহরণকারী-রূপে শ্রীকৃষ্ণকে চিত্রিত করে!
      ‘রাই জাগো রাই জাগো বলে শুক-সারি বলে, কত নিদ্রা যাওগো রাধে শ্যাম-নাগরের কোলে।…..’ এবং ‘রাই জাগোরে, জাগো শ্যামের মনমোহিনী বিনোদিনী রাই/শ্যাম অঙ্গে অঙ্গ দিয়া আছোরে রাই ঘুমাইয়া তোমার কি লোকলজ্জা নাই….’ ওই প্রভাতী গান দুটো বৈষ্ণব মহলে শুধু নয়, কীর্তন হিসেবেও সমাদৃত, জনপ্রিয়। গান দুটোর ভাষা বিশ্লেষণ করে একবার দেখুন।
শাস্ত্র অনুযায়ী আর্য্য হিন্দুদের ব্রাহ্মমুহূর্তে শয্যাত্যাগ করে ঈশ্বরোপাসনা করতে হয়। আর প্রাকৃতিক নিয়মে ব্রাহ্মমুহূর্ত কালে সব পাখিরা জেগে যায়। স্বভাবতই শুক-সারি পাখি জেগে গিয়েছে। রাধা তখনো নাগর কৃষ্ণের অঙ্কশায়িনী হয়ে শুয়ে আছে। নগরবাসীরা যদি জানতে পারে তাহলে লজ্জায় পড়তে হবে। তাই শুক-সারী পাখি ওদের ভাষার  জাগরণী গান গেয়ে রাধাকে সাবধান করে দিচ্ছেন। আর কৃষ্ণ ভক্তেরা ভালোমন্দ বিচার না করে, ওই গানকেই জাগরণীর জন্য আদর্শ গান হিসেবে নির্বাচন করে গেয়ে চলেছেন। এবার বিচার করে দেখুন, কাম-রসাত্মক চটুল কথায় প্রভাতী সুর লাগিয়ে শ্রীকৃষ্ণের নামে ওই আরাধনা আর্য্যকৃষ্টি বিরোধী  প্রবৃত্তি-প্ররোচিত পরদারাসক্ত ব্যতীত কোন্ আধ্যাত্মিক আবেদনে সমৃদ্ধ ? ওইসব জাগরণী গান শুনে, এবং কবি জয়দেব বিরচিত গীতগোবিন্দের ছত্রে ছত্রে বর্ণিত কামবিলাসী, ‘দেহি পদপল্লব মুদারম্’ বলে রাধার মানভঞ্জন করা,  পরকীয়া নিয়ে ব্যস্ত শ্রীকৃষ্ণের কীর্তিকলাপ পড়ে, যদি কোন তথাকথিত নাস্তিক্যবাদী শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রে কালিমালিপ্ত করে, —সেই ধর্মবিরোধী, ইষ্টবিরোধী প্রচারের জন্য দায়ী কারা?
শ্রীকৃষ্ণ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ‘‘ ……..  ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এলেন। ব্রাহ্মণ্যধর্ম্ম অর্থাৎ বৃদ্ধির ধর্ম্ম প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি প্রাণপাত করলেন। অথচ ব্রাহ্মণকুলতিলক দ্রোণাচার্য্যই তাঁর বিরুদ্ধে গেলেন। ভীষ্ম অন্নের কৃতজ্ঞতার দোহাই দিয়ে কৌরবপক্ষে গেলেন। কিন্তু যে-অন্ন তিনি খেয়েছিলেন সে-অন্নের অর্দ্ধেক মালিক পাণ্ডবরা। যা হোক, ধর্ম্ম কোথায়, ন্যায় কোথায়, লোকহিত কোথায়, কৌরবপক্ষ তা না বোঝার ফলে যুদ্ধ অনিবার্য্য হয়ে উঠলো। এতসব বিপর্য্যয় সত্ত্বেও কেষ্টঠাকুর ঘরে-ঘরে ঋত্বিক, অধ্বর্য্যু, যাজক পাঠিয়ে লোকের মনন ও চলনের ধারা দিলেন বদলে। করলেন ধর্ম্মের সংস্থাপনা। বুদ্ধদেব আসবার পর বৌদ্ধভিক্ষুরা দেশ ছেয়ে ফেললো, যার পরিণাম অশোক। অশোকের ভুলত্রুটি যাই থাক, শোনা যায়, অমনতর সম্রাট ও অমনতর সাম্রাজ্য নাকি কমই হয়েছে। রসুল আসার পর ইসলামের যাজনের ঢেউ কী রকম উঠেছিল তা কারও অজানা নয়। বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, মুসলমান সবাই তাদের যাজনের রেশটা কম-বেশী ধরে রেখেছে। প্রচারক আছে, প্রচেষ্টা আছে। অবশ্য, আচরণহীন প্রচারণায় যতটুকু হতে পারে ততটুকুই হচ্ছে। তবু মানুষের কানের ভিতর কথাগুলি ঢুকছে। কিন্তু আমাদের ঘরে ঘরে হানা দেবার কেউ নেই। তারা কেউ জুটলো না। অথচ হুজুগ করার এত লোক জুটছে। হুজুগ করে দল বেঁধে জেলে গেলে তাতে মানুষ কতখানি গড়ে  উঠবে তা বুঝতে পারি না। (আ. প্র. ৮ম খণ্ড, ২৬. ০৬. ১৯৪৬)
“আলেকজাণ্ডারের আগে পর্য্যন্ত কোন আক্রমণকারী আমাদের দেশে ঢুঁ মেরে কিছু করতে পারেনি । অশোকের Buddhism (বৌদ্ধবাদ)-এর পর থেকে বর্ণাশ্রম ভেঙ্গে পড়ে এবং সেই থেকেই সমাজ ও জাতি দুর্ব্বল হয়ে পড়ে । বুদ্ধদেব গৃহীর জন্য বর্ণাশ্রম রক্ষা করতে বলেছেন । আর ভিক্ষু, শ্রমণ ইত্যাদির বেলায় ওটার ওপর জোর দেননি । আর, সে ক্ষেত্রে ওর প্রয়োজনও ছিল না । কারণ, ভিক্ষু বা শ্রমণদের কোন যৌন সংশ্রব ছিল না । কিন্তু ভিক্ষুণীপ্রথা প্রবর্তনে সে বাঁধনও ভেঙে গেল । বুদ্ধদেব যে স্বর্ণযুগ আনতে চেয়েছিলেন তা আর সম্ভব হ’ল না ।”
(আ. প্র. ২১/৬. ৮. ১৯৫২)   
                   *       *         *

        আর একবার কৃষ্ণকথায় ফিরে আসছি। বিচার করে দেখব, কৃষ্ণ-রাধার  আজগুবী তত্ত্বের অস্তিত্ব আদৌ আছে কি-না।
পণ্ডিতদের মতে কংসের দূত হয়ে মহামতি অক্রুর, বলরামসহ শ্রীকৃষ্ণকে বৃন্দাবন থেকে মথুরায় নিয়ে যান কংস আয়োজিত ধনুর্যজ্ঞে অংশগ্রহণ করাতে। কংসের উদ্দেশ্য ছিল শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করার। পরিবর্তে শ্রীকৃষ্ণ  অত্যাচারী কংস-মামাকে হত্যা করে পিতামহ উগ্রসেনকে রাজ্য প্রত্যর্পণ করেন। তারপর ঘোর আঙ্গিরসের সান্নিধ্যে পরাবিদ্যা এবং সান্দিপনী কাশ্যের সান্নিধ্যে অপরাবিদ্যা লাভ করেন আর বৃন্দাবনে ফিরে যান নি। 
        পণ্ডিতদের এই সাক্ষ্য থেকে প্রমাণিত, শ্রীকৃষ্ণ ১১ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে কংসকে বধ করেন। অথচ  বেশীরভাগ কৃষ্ণভক্তগণ বৃন্দাবন লীলার,  রাসলীলার নামে যে যুবক কৃষ্ণকে মানবী রাধার সাথে যুগলবন্দী করে পরকীয়া কামুক রূপে চিত্রিত করে চলেছেন, সে কৃষ্ণ  কোন কৃষ্ণ? সে কি বৃষ্ণিসিংহ দেবকীনন্দন, না অন্য  কেউ ? সে কি গীতার প্রবক্তা পার্থসারথী, না অন্য কেউ? কারণ, বৈষ্ণবদের প্রামাণ্য গ্রন্থ ভাগবতে রাধা-কৃষ্ণের ওইসব অবৈধ পরকীয়া-লীলার কোন কাহিনী লিপিবদ্ধ নেই। অথচ কৃষ্ণের প্রচারকেরা গীতার কথা বলেন, ভাগবতের কথা বলেন, অথচ আয়ান ঘোষের ঘরণী রাধাকে শ্রীকৃষ্ণের সাথে এক অবৈধ সম্পর্কের সাথে জুড়ে নিয়ে কৃষ্ণনাম করতে গিয়ে  শ্রীকৃষ্ণের যে বদনাম করে চলেছেন, সেটাও তাদের বোধে ধরা পড়ে না, এমনই ধার্মিক তা’রা !
কৃষ্ণকে একমাত্র ভগবান বলে মানেন যারা, তারা আবার শ্রীকৃষ্ণের সাথে রাধারও উপাসনা  করেন, কোন্ যুক্তিতে? তাদের অনেকেই আবার শ্রীকৃষ্ণের নব-কলেবর জ্ঞানে চৈতন্যদেবের প্রতিকৃতির উপাসনাও করেন। তা’রা বলেন, চৈতন্যদেব রাধা-কৃষ্ণের যুগল অবতার। খুব ভাল কথা। তাই যদি হয়, তাহলে তো একঅঙ্গে দুই-রূপ  যুগল অবতার-স্বরূপ চৈতন্যদেবেরই আরাধনা করতে হয়। আলাদা করে রাধা-কৃষ্ণের যুগলমূর্তির আরাধনার প্রয়োজন নেই। কারণ গীতার বাণী ‘‘তেষাং জ্ঞানী নিত্যযুক্ত একভক্তি র্বিশিষ্যতে।’’ (৭ম অধ্যায়) অনুসারে পুরুষোত্তম ব্যতীত একাধিক আদর্শকে মনে স্থান দিলেও ব্যভিচার করা হয়, যা ইষ্টলাভের বা ঈশ্বরলাভের পথে অন্তরায়। ইসকন ভক্তদের এ বিষয়টা একবার ভেবে দেখা উচিত। কারণ, আমরা জীবনপিয়াসী যারা, তারা যদি এভাবে জীবনদেবতার অপমান করে চলি, আমাদের জীবন কিভাবে  সমৃদ্ধ হবে?     
এ বিষয়ে বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, ‘‘চৈতন্যদেবের দ্বৈতবাদ নয়, দ্বৈতভাব। মূলতঃ সকলের বাদই অদ্বৈত, কারণ, একের উপরই দাঁড়িয়ে আছে যা-কিছু, আদিতে এক ছা়ড়া দুই নেই। একেরই স্থূল, সূক্ষ্ম, কারণ নানাস্তর ও অভিব্যক্তি আছে। কিন্তু ভক্তিই তাঁকে লাভ করার সহজ পথ। ভক্তির মধ্যে দ্বৈতভাব এসে পড়ে, ভক্ত নিজের সত্তা না হারিয়ে ভগবানকে ভজনা করে চলে। ভক্তির সঙ্গে আবার কর্ম্ম ও জ্ঞান অচ্ছ্যেদ্যভাবে জড়ান। একেরই বিচিত্র প্রকাশ বলে সব সমন্বয় হয়েই আছে।’’   (আ. প্র. ১৩/৩১.৭.১৯৪৮)
        “ধর্ম্ম মানে বাঁচাবাড়ার বিজ্ঞান। যে-কোন মহাপুরুষই তার প্রবক্তা হউন না কেন, তাতে ধর্ম্মের কোন পরিবর্তন হয় না; ধর্ম্ম চিরকালই এক। হিন্দুর ধর্ম্ম যা, মুসলমানের ধর্ম্মও তাই; প্রত্যেক ধর্মমতের লোকই ঈশ্বরপন্থী। আর, সেই ঈশ্বর একজন ছাড়া দুইজন নন। তাঁর প্রেরিত বাণীবাহক যাঁরা, তাঁরাও একই সত্যের উদ্গাতা—একই পথের পথিক—নানা কলেবরে একই সত্তা। তাই ধর্ম্ম মানুষকে মিলিত ছাড়া বিচ্ছিন্ন করে না। ধর্ম্মের থেকে চ্যুত হলেই সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে বিভেদ-বিরোধের সৃষ্টি হয়। হিন্দু যদি প্রকৃত হিন্দু হয়, মুসলমান যদি প্রকৃত মুসলমান হয়, তারা বান্ধববন্ধনে আবদ্ধ হতে বাধ্য; বাপকে যে ভালবাসে, সে কখনও ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ হতে পারে না। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের উপাস্যই এক ও অদ্বিতীয়; তাই সম্প্রদায়গুলি ভাই-ভাই ছাড়া আর কি? মানুষের সহজ বুদ্ধিতে সবই ধরা পড়ে; গোলমাল করে দূরভিসন্ধিপ্রসূত অপব্যাখ্যা ও অপযাজন। ধর্ম্ম যদি বিপন্ন হয়ে থাকে, তবে সবচাইতে বেশী বিপন্ন হয়েছে, এমনতর  অপযাজকদের হাতে। প্রত্যেক ধর্ম্মমতের আসল রূপটি তুলে ধরতে হবে সাধারণ লোকের কাছে; তাহলে দুষ্টলোকের জারীজুরি খাটবে না। হিন্দুর যেমন হিন্দুত্বের বিকৃতি বরদাস্ত করা উচিত নয়, তেমনি উচিত নয় ইসলামের বিকৃতি বরদাস্ত করা। মুসলমানেরও তেমনি উচিত নয় ইসলাম ও হিন্দুত্বের আদর্শকে ক্ষুণ্ণ হতে দেওয়া। কোন ধর্ম্মাদর্শকে ক্ষুণ্ণ হতে দেওয়া মানে শয়তানের সাগরেদি করা। আমাদের নিজেদের যেমন ধর্ম্মপরায়ণ হয়ে উঠতে হবে—পরিবেশকেও তেমনি ধর্ম্মপরায়ণ করে তুলতে হবে—প্রত্যেককে তার বৈশিষ্ট্য ও ধর্ম্মাদর্শ অনুযায়ী। হিন্দু যেমন গীতা পড়বে, তেমনি কোরাণ-বাইবেলও পড়বে; মুসলমান যেমন কোরাণ পড়বে, তেমনি গীতা বাইবেলও পড়বে। প্রত্যকে চেষ্টা করবে বাস্তব আচরণে স্বধর্মনিষ্ঠ হতে এবং অন্যকেও সাহায্য করবে ও প্রেরণা জোগাবে অমনতর হয়ে উঠতে।
        এমনতর হতে থাকলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সৌহার্দ্দ্য গড়ে তুলতে কদিন লাগে? আমি তো বুঝি, হিন্দুত্বের প্রতিষ্ঠা যেমন আমার দায়, ইসলাম ও খ্রীষ্টধর্ম প্রভৃতির প্রতিষ্ঠাও তেমনি আমারই দায়। আমার পরিবেশের প্রত্যেকে তার মত করে যদি ঈশ্বরপরায়ণ না হয়ে ওঠে, আদর্শপ্রেমী না হয়ে ওঠে, ধর্ম্মনিষ্ঠ না হয়ে ওঠে, তাহলে তো আমারই সমূহ বিপদ। পরিবেশকে বাদ দিয়ে আমার ধর্ম্ম করা অর্থাৎ বাঁচাবাড়ার পথে চলা তো সম্ভব নয়।”                                       (আ. প্র. ৯/২. ১০. ১৯৪৭) 
        “……শুনেছি রসুল পূর্বতনকে মানার কথা যেমন বলেছেন তেমনি আবার বলেছেন—যদি কোন হাবসী ক্রীতদাসও তোমাদের কোরাণ অনুসারে পরিচালিত করেন, তবে তোমরা তাঁর আদেশ পালন করে চলো। আর এটা ঠিক জেনো—কোরাণ, বেদ, বাইবেল, গীতা ইত্যাদির মধ্যে যেমন কোন বিরোধ নেই, বৈশিষ্ট্যপালী, আপূরয়মান মহাপুরুষ, তা তিনি পরবর্তী যে যুগেই আবির্ভূত হউন, তাঁর বাণীর মধ্যে কোরাণ, বেদ, বাইবেল, গীতার পরিপন্থী কোন কথা থাকে না, বরং থাকে যুগোপযোগী পরিপূরণ। তাই পরবর্তীর মধ্যে আমরা পূর্ববর্তীকে আরো করে পাই। একই ঈশ্বরপ্রেরণার প্রবাহই তো যুগ-যুগ ধরে বয়ে চলে আরো আরোতর অভিব্যক্তি নিয়ে প্রয়োজন ও পরিস্থিতির পরিপূরণে। সৃষ্টি যতদিন থাকবে, ততদিন এ ধারা চলতেই থাকবে।”                                     (শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, আ. প্র./ ১১/৭.৫.১৯৪৮)

চৈতন্যদেবের পরবর্তী আবির্ভাব প্রসঙ্গে  শ্রীচৈতন্য ভাগবত গ্রন্থে বর্ণনা রয়েছে—
        এইমত আর আছে দুই অবতার
        সঙ্কীর্তন আনন্দ রূপ হইবে আমার।।
        তাহাতেও তুমি সব এই মত রঙ্গে
        সঙ্কীর্তন করিবা মহাসুখে আমা সঙ্গে।।
        (শ্রীচৈতন্য ভাগবত পৃষ্ঠা ১৪৩, মধ্যখণ্ড ষড়বিংশ অধ্যায়।)
        অথচ বেশিরভাগ চৈতন্য অনুগামীরা গোঁসাই সাজলেন, কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষা দিয়ে বেড়ালেন, অথচ সাধনা দিয়ে চৈতন্যদেবের নব-কলেবর শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে  মেনে নিলেন না। তেমনি বেশিরভাগ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ভক্তরা শ্রীরামকৃষ্ণের পরবর্তী অবতার শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রকে অন্বেষণ করতে সাধন করলেন না। ফলে ধর্মের গ্লাণি থেকেই গেল।
       ১৮৮৬ ইংরাজী নববর্ষের দিনে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের কল্পতরু হবার সংবাদ শুনে ভক্তরা সমবেত হয়েছিলেন কাশীপুরের উদ্যানবাটীতে।  নিজেদের মনোবাসনা পূর্ণ করতে। অবশেষে অসুস্থ শ্রীরামকৃষ্ণদেব দর্শন দিলেন ভক্তদের। সমবেত ভক্তদের উপদেশ দিয়ে বললেন, তোমাদের চৈতন্য হোক।
        শ্রীরামকৃষ্ণদেব জীবনের শেষপ্রান্তে বলেছিলেন, এবারে সব জ্ঞান পার্ষদদের দিচ্ছিনা। শীঘ্রই আবার আমাকে আসতে হবে। ঈশান কোণে, গরীব ব্রাহ্মণের ঘরে। তখন যারা না আসবে তাদের মুক্তি হতে অনেক দেরি হবে।
        শ্রীরামকৃষ্ণদেব ১৮৮৬তে ইহলীলা সম্বরন করে ১৮৮৮তে আবির্ভূত হন অনুকূলচন্দ্র রূপ নিয়ে।  শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র অবতারে পরিপূর্ণ চৈতন্য দিতে চরমতত্ত্ব দিয়ে গেলেন।  চৈতন্য লাভের সহজপন্থা দিলেন দৈনন্দিন স্বতঃ-অনুজ্ঞা অনুশীলনের মাধ্যমে। অজর-অমর-চিরচেতন মন্ত্রে।     
যারা চৈতন্যদেবকে বা শ্রীরামকৃষ্ণ দেবকে পেতে ইচ্ছুক, তাদের কাছে বিনীত অনুরোধ, শ্রীকৃষ্ণের সর্বশেষ অবতার বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সাধন-পদ্ধতি প্রাণমন দিয়ে সাধনা করলেই আপনাদের অভীষ্ট ইষ্টদেব ধরা দেবেন মেধানাড়ীতে। যে সূত্র তিনি শ্রীকৃষ্ণ অবতারে দিয়ে রেখেছিলেন— ‘‘বহূনি মে ব্যতীতানি……………..ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জ্জন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জ্জুন।। (শ্রীমদ্ভগবদগীতা চতুর্থোহধ্যায়, ৫—৯ শ্লোক)
সবাইকে ইষ্টরঙে রঞ্জিত হবার আবেদন জানিয়ে, জানাই শ্রদ্ধা, ভক্তি, প্রণাম ও জয়গুরু! অভিবাদন।  বন্দে পুরুষোত্তমম্! ধ্বনী দিয়ে নিত্য হতে লীলায়, লীলা হতে নিত্যে আগম-নিগমকারী পূর্বাপূর্ব সব পুরুষোত্তমদের লীলা স্মরণ করে ইতি টানলাম।  আমাদের সকলের ‘চৈতন্য হোক’। ধর্মের বিকৃত ধারা যেন আমাদের স্পর্শ করতে না পারে।
                                               ——–

সব তীর্থ বার-বার/গঙ্গাসাগর একবার

সব তীর্থ বার-বার

গঙ্গাসাগর একবার।

সব তীর্থ বার-বার

গঙ্গাসাগর একবার।

নিবেদনে—তপন দাস

——————————————-

এই তীর্থ স্নানটি এক সময়ে এতোই দুর্গম স্থানে অবস্থিত ছিলো যে অন্যান্য তীর্থের মতো সব সময় বা ইচ্ছামতো যাওয়া সম্ভব হতো না। নদীনালা, বন-জঙ্গল অতিক্রম করে যেতে হতো। তা ছাড়া চোর, ডাকাত ও জলদস্যুর ভয় তো ছিলই, এমনকি বন্য জন্তুর আক্রমণে মৃত্যুও পর্যন্ত ঘটত। সাগর দ্বীপটা শহর কলকাতা থেকে বেশ অনেকটা দূরে। আগে যানবাহনের তেমন সুবন্দোবস্ত ছিলো না। ইদানিং যানবাহনের প্রভুত উন্নতি হয়েছে। তৈরী হয়েছে প্রচুর রাস্তা ঘাট।

পূর্বে এই দ্বীপে যাতায়াতের জন্য নদীপথ বা জলাপথ ছিলো এক মাত্র ভরসা। বর্তমানের উন্নত যানবাহনের যুগেও জলপথে নৌকা, ভটভটি, লঞ্চ, ভেসেল, কুরুজ যোগে যাতায়াত চলছে। পৌষ মাসের একেবারে শেষ মকর সংক্রান্তির দিনে লক্ষ-লক্ষ নরনারী প্রচণ্ড শীতের দাপট উপেক্ষা করেও হাজির হয় এই সাগর সঙ্গমে। আজকাল অনেকেই যাচ্ছেন বত্‍সরের যে কোনো সময়ে। বলা যায় আগে মতো সেই ভয়াবহ দুর্গমতা আর নেই। প্রতিদিন নিত্য নতুন মানুষের পদার্পণে সাগর দ্বীপ এর তীর্থ স্নানটি কোলাহল মুখর হয়ে উঠে। তাই সারা বছর এখন অনেক জমজমাট।

তীর্থ স্নানের সন্নিকটে গড়ে উঠেছে জেলা প্রশাসনের সার্কিট হাউস, যুব আবাস, জেলা পরিষদ ভবন, দোকানপাট, হোটেল আরও কতো কি!

ভারত সেবাশ্রমের বিশাল বাড়ি ও অনেক ধর্মশালা গড়ে উঠেছে এই দ্বীপে। সরকারের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে সুন্দর বৃহত্‍ মন্দির। এই দুর্গম স্নানে মহা ঋষি কপিল মুনির আশ্রম ছিলো। মুনিবর এখানে সাধনা করতেন। সাগর দ্বীপে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী পৌষ সংক্রান্তির পুণ্যলগ্নে স্নান করেন। এই মেলার অধীনে তিন শতাধিক বিঘা জমি রয়েছে। ভরা কোটালে সাগর এর জলোচ্ছ্বাস থেকে বাঁচাতে এক তলার সমান উঁচু থাম ওয়ালা বাড়ি তৈরী হয়েছে।

এই বাড়িটি কপিল মুনির মন্দির এখানে আছে ভগীরথের কোলে মা গঙ্গা, বীর হনুমান, সিংহবাহিনী, বিশালক্ষী ও ইন্দ্রদেব।

এক কালে সাগর দ্বীপ ছিলো ১৭০ বর্গ মাইলের এক সমৃদ্ধ জনপথ। ১৬৮৮ সালে সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচছাসে প্রায় দু লক্ষ মানুষ সমুদ্রে ভেসে যায়। সেই থেকে দ্বীপটি বহু কাল জনহীন হয়ে পড়ে। ইতিহাস ৪৩০ খ্রিস্টাব্দে রানী সত্যভামা প্রথম কপিল মুনির মন্দিরটি তৈরী করেন। সেই মন্দিরটি বিলীন হয়ে যাবার পর আরও ছয়টি মন্দির তৈরী হয়, পরে বিলীন হয়ে যায়। বর্তমান মন্দিরটি আদি মন্দির স্থল থেকে প্রায় ২ কিমি দূরে অবস্থিত। বর্তমানে এই কপিল মুনির মন্দির সংলগ্ন এলাকায় প্রভূত উন্নতি হয়েছে। কাকদ্বীপ, নামখানা ব্যতীত ডায়মণ্ড হারবার থেকে ক্রুজে করে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় গঙ্গাসাগরে।

***************************

উইকিপিডিয়া অনুসারে গঙ্গা ভারত ও বাংলাদেশে প্রবাহিত একটি আন্তর্জাতিক

নদী। এই নদী ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের জাতীয় নদী। গঙ্গার দৈর্ঘ্য ২,৭০৪

কিমি (১,৬৮০ মা); উৎসস্থল পশ্চিম হিমালয়ে ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যে।

দক্ষিণ ও পূর্বে গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গা

মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। এক্ষেত্রে এর দুটি ধারা বা শাখা লক্ষনীয়– একটি

ফারাক্কা বাঁধ থেকে এসে ভাগীরথী ও হুগলী নদী নামে মূলত দক্ষিণে প্রবাহিত

হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে; অপরটি বাংলাদেশ সীমান্তে মহানন্দার সঙ্গে মিলিত

হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে পদ্মা নামে গোয়ালন্দ পর্যন্ত প্রবাহিত

হয়েছে। পদ্মাকে মূলত গঙ্গার প্রধান শাখানদী বলা হয়। তবে ঐতিহাসিক

কারণবশত এর অববাহিকাকেও গাঙ্গেয় বদ্বীপের অন্তর্গত বিবেচনা করা হয়।

জলপ্রবাহের ক্ষমতা অনুযায়ী গঙ্গা বিশ্বের প্রথম ২০টি নদীর একটি।

গাঙ্গেয় অববাহিকার জনসংখ্যা ৪০ কোটি এবং জনঘনত্ব ১,০০০ জন/বর্গমাইল (৩৯০

/কিমি২)। এটিই বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নদী অববাহিকা।

গঙ্গা হিন্দুদের কাছে পবিত্র নদী। তারা এই নদীকে গঙ্গা দেবীজ্ঞানে পূজা

করেন। (পূজা মানে সম্বর্দ্ধনা, অথচ আমরা তথাকথিত অমূর্ত মূর্তিপূজার নামে

পূজাবশিষ্ট বর্জ্য গঙ্গায় নিক্ষেপ করে গঙ্গাকে দূষিত করে চলেছি! যা সনাতন ধর্মনীতির বিরোধী।) গঙ্গার

ঐতিহাসিক গুরুত্বও অপরিসীম। একাধিক পূর্বতন প্রাদেশিক ও সাম্রাজ্যিক

রাজধানী (যেমন পাটলিপুত্র, কনৌজ, কাশী, এলাহাবাদ, মুর্শিদাবাদ, মুঙ্গের,

নবদ্বীপ ও কলকাতা) এই নদীর তীরেই অবস্থিত।

পরিবেশ বিভাগের রিপোর্ট অনুসারে গঙ্গা বিশ্বের পাঁচটি সবচেয়ে দূষিত নদীর

একটি। বারাণসীর কাছে এই নদীতে ফেসাল কলিফর্মের পরিমাণ ভারত সরকারের

নির্ধারিত সীমার চেয়ে একশো গুণ বেশি। গঙ্গাদূষণ শুধুমাত্র গঙ্গাতীরে

বসবাসকারী কয়েক কোটি ভারতীয়দেরই ক্ষতি করছে না, ১৪০টি মাছের প্রজাতি,

৯০টি উভচর প্রাণীর প্রজাতি ও ভারতের জাতীয় জলচর প্রাণী গাঙ্গেয়

শুশুক-এরও ক্ষতি করছে।গঙ্গাদূষণ রোধে গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান নামে একটি

পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতি, প্রযুক্তিগত অদক্ষতা, সুষ্ঠু

পরিবেশ পরিকল্পনার অভাব, ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য ও বিশ্বাস এবং ধর্মীয়

সংগঠনগুলোর অসহযোগিতার কারণে এই প্রকল্প ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।কিন্তু

বর্তমানে সরকারের তৎপরতায় গঙ্গা নদী অনেকটাই দূষণমুক্ত হয়েছে এবং

ভবিষ্যতে পুরো নদী দূষণ মুক্ত হবে, সেই আশা রাখা যায়।

দেবপ্রয়াগ, অলকানন্দা (ডানে) ও ভাগীরথী (বাঁয়ে) নদীর সঙ্গমস্থল, এখান

থেকে মূল গঙ্গা নদীর শুরু।

ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের গাড়োয়াল অঞ্চলে গঙ্গার উৎস অঞ্চল।

মূল গঙ্গা নদীর উৎসস্থল ভাগীরথী ও অলকানন্দা নদীর সঙ্গমস্থল। হিন্দু

সংস্কৃতিতে ভাগীরথীকেই গঙ্গার মূল প্রবাহ বলে মনে করা হয়। যদিও

অলকানন্দা নদীটি দীর্ঘতর। অলকানন্দার উৎসস্থল নন্দাদেবী, ত্রিশূল ও কামেট

শৃঙ্গের বরফগলা জল। ভাগীরথীর উৎস গোমুখের গঙ্গোত্রী হিমবাহ (উচ্চতা ৩,৮৯২ মি (১২,৭৬৯ ফুট))।

গঙ্গার জলের উৎস অনেকগুলো ছোট নদী। এর মধ্যে ছয়টি দীর্ঘতম ধারা এবং

গঙ্গার সঙ্গে তাদের সঙ্গমস্থলগুলোকে হিন্দুরা পবিত্র মনে করে। এই ছয়টি

ধারা হল অলকানন্দা, ধৌলীগঙ্গা, নন্দাকিনী, পিণ্ডার, মন্দাকিনী ও ভাগীরথী।

পঞ্চপ্রয়াগ নামে পরিচিত পাঁচটি সঙ্গমস্থলই অলকানন্দার উপর অবস্থিত।

এগুলি হল বিষ্ণুপ্রয়াগ (যেখানে ধৌলীগঙ্গা অলকানন্দার সঙ্গে মিশেছে),

নন্দপ্রয়াগ (যেখানে নন্দাকিনী মিশেছে), কর্ণপ্রয়াগ (যেখানে পিণ্ডার

মিশেছে), রুদ্রপ্রয়াগ (যেখানে মন্দাকিনী মিশেছে) এবং সবশেষে দেবপ্রয়াগ

যেখানে ভাগীরথী ও অলকানন্দার মিলনের ফলে মূল গঙ্গা নদীর জন্ম হয়েছে।

হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে গঙ্গার দৈর্ঘ্য ২৫০ কিলোমিটার (১৬০ মা)।

হৃষীকেশের কাছে গঙ্গা হিমালয় ত্যাগ করে তীর্থশহর হরিদ্বারে গাঙ্গেয়

সমভূমিতে পড়েছে। হরিদ্বারে একটি বাঁধ তৈরি করে গঙ্গা খালের মাধ্যমে

গঙ্গার জল উত্তরপ্রদেশের দোয়াব অঞ্চলে জলসেচের জন্য পাঠানো হয়ে থাকে।

এদিকে গঙ্গার মূলধারাটি হরিদ্বারের আগে সামান্য দক্ষিণ-পশ্চিমমুখী হলেও

হরিদ্বার পেরিয়ে তা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বাঁক নিয়েছে।

এরপর গঙ্গা কনৌজ, ফারুকাবাদ ও কানপুর শহরের ধার দিয়ে একটি

অর্ধ-বৃত্তাকার পথে ৮০০-কিলোমিটার (৫০০ মা) পার হয়েছে। এই পথেই রামগঙ্গা

(বার্ষিক জলপ্রবাহ ৫০০ মি৩/সে (১৮,০০০ ঘনফুট/সে)) গঙ্গায় মিশেছে।[২২]

এলাহাবাদের ত্রিবেণী সঙ্গমে যমুনা নদী গঙ্গায় মিশেছে। সঙ্গমস্থলে যমুনার

আকার গঙ্গার চেয়েও বড়। যমুনা গঙ্গায় ২,৯৫০ মি৩/সে (১,০৪,০০০ ঘনফুট/সে)

জল ঢালে, যা উভয় নদীর যুগ্মপ্রবাহের জলধারার মোট ৫৮.৫%।

এখান থেকে গঙ্গা পূর্ববাহিনী নদী। যমুনার পর গঙ্গায় মিশেছে কাইমুর

পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন নদী তমসা (বার্ষিক জলপ্রবাহ ১৯০ মি৩/সে (৬,৭০০

ঘনফুট/সে))। তারপর মিশেছে দক্ষিণ হিমালয়ে উৎপন্ন নদী গোমতী (বার্ষিক

জলপ্রবাহ ২৩৪ মি৩/সে (৮,৩০০ ঘনফুট/সে))। তারপর গঙ্গায় মিশেছে গঙ্গার

বৃহত্তম উপনদী ঘর্ঘরা (বার্ষিক জলপ্রবাহ ২,৯৯০ মি৩/সে (১,০৬,০০০

ঘনফুট/সে))। ঘর্ঘরার পর দক্ষিণ থেকে গঙ্গার সঙ্গে মিশেছে শোন (বার্ষিক

জলপ্রবাহ ১,০০০ মি৩/সে (৩৫,০০০ ঘনফুট/সে)), উত্তর থেকে মিশেছে গণ্ডকী

(বার্ষিক জলপ্রবাহ ১,৬৫৪ মি৩/সে (৫৮,৪০০ ঘনফুট/সে)) ও কোশী (বার্ষিক

জলপ্রবাহ ২,১৬৬ মি৩/সে (৭৬,৫০০ ঘনফুট/সে))। কোশী , ঘর্ঘরা ও যমুনার পর

গঙ্গার তৃতীয় বৃহত্তম উপনদী। এলাহাবাদ থেকে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ পর্যন্ত।

গঙ্গা বারাণসী, পাটনা, গাজীপুর, ভাগলপুর, মির্জাপুর, বালিয়া, বক্সার,

সৈয়দপুর ও চুনার শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ভাগলপুরে নদী

দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্ব দিকে বইতে শুরু করেছে। পাকুড়ের কাছে গঙ্গার

ঘর্ষণক্ষয় শুরু হয়েছে। এরপর গঙ্গার প্রথম শাখানদী ভাগীরথী-হুগলির জন্ম,

যেটি দক্ষিণবঙ্গে গিয়ে হয়েছে হুগলি নদী। বাংলাদেশ সীমান্ত পেরোনোর কিছু

আগে হুগলি নদীতে গড়ে তোলা হয়েছে ফারাক্কা বাঁধ। এই বাঁধ ও ফিডার খালের

মাধ্যমে জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে হুগলি নদীকে আপেক্ষিকভাবে পলিমুক্ত রাখা

হয়। ভাগীরথী ও জলঙ্গী নদীর সঙ্গমের পর হুগলি নদীর উৎপত্তি। এই নদীর বহু

উপনদী রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় উপনদীটি হল দামোদর নদ (দৈর্ঘ্য্য

৫৪১ কিমি (৩৩৬ মা) অববাহিকার আয়তন ২৫,৮২০ কিমি২ (৯,৯৭০ মা২))। হুগলি

নদী সাগর দ্বীপের কাছে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে।

ঋক্ বেদে (১০৷৭৬।৫ ) গঙ্গা ও অন্য কয়েকটি নদীর স্তব আছে । গঙ্গার স্তব ঋক্

বেদে একবার মাত্র। গঙ্গা মকরবাহিনী শুক্লবর্ণাচতুর্ভূজা। এক হাতে একটি

পাত্র ও এক হাতে পদ্মফুল। জ্যৈষ্ঠ শুক্লাদশমীতে এর পূজা হয়। এই দিনে গঙ্গা

স্নানে দশ রকম পাপ নষ্ট হয়, তাই এই তিথির নাম দশহরা । গঙ্গার জল স্নানে

পানে ও স্পর্শে পুণ্য এনে দেয় ৷ গঙ্গাতীরে বাস ও মৃত্যু গৌরব জনক। মৃতের

দগ্ধাবশিষ্ট অস্থি গঙ্গা জলে দেওয়ার নিয়ম আছে। গঙ্গার মাহাত্ম্য হিসাবে

কাহিনীর সীমা নাই । (সূত্র : পৌরাণিকা)

অদ্বৈত বেদান্তবাদের প্রবক্তা আচার্য্য শঙ্কর—

দেবি! সুরেশ্বরি! ভগবতি! গংগে ত্রিভুবনতারিণি তরলতরংগে ।

শংকরমৌলিবিহারিণি বিমলে মম মতিরাস্তাং তব পদকমলে ॥ 1 ॥

ভাগীরথিসুখদায়িনি মাতস্তব জলমহিমা নিগমে খ্যাতঃ ।

নাহং জানে তব মহিমানং পাহি কৃপাময়ি মামজ্ঞানম্ ॥ 2 ॥

হরিপদপাদ্যতরংগিণি গংগে হিমবিধুমুক্তাধবলতরংগে ।

দূরীকুরু মম দুষ্কৃতিভারং কুরু কৃপয়া ভবসাগরপারম্ ॥ 3 ॥

তব জলমমলং যেন নিপীতং পরমপদং খলু তেন গৃহীতম্ ।

মাতর্গংগে ত্বয়ি যো ভক্তঃ কিল তং দ্রষ্টুং ন যমঃ শক্তঃ ॥ 4 ॥

পতিতোদ্ধারিণি জাহ্নবি গংগে খংডিত গিরিবরমংডিত ভংগে ।

ভীষ্মজননি হে মুনিবরকন্যে পতিতনিবারিণি ত্রিভুবন ধন্যে ॥ 5 ॥

কল্পলতামিব ফলদাং লোকে প্রণমতি যস্ত্বাং ন পততি শোকে ।

পারাবারবিহারিণি গংগে বিমুখযুবতি কৃততরলাপাংগে ॥ 6 ॥

তব চেন্মাতঃ স্রোতঃ স্নাতঃ পুনরপি জঠরে সোপি ন জাতঃ ।

নরকনিবারিণি জাহ্নবি গংগে কলুষবিনাশিনি মহিমোত্তুংগে ॥ 7 ॥

পুনরসদংগে পুণ্যতরংগে জয জয জাহ্নবি করুণাপাংগে ।

ইংদ্রমুকুটমণিরাজিতচরণে সুখদে শুভদে ভৃত্যশরণ্যে ॥ 8 ॥

রোগং শোকং তাপং পাপং হর মে ভগবতি কুমতিকলাপম্ ।

ত্রিভুবনসারে বসুধাহারে ত্বমসি গতির্মম খলু সংসারে ॥ 9 ॥

অলকানংদে পরমানংদে কুরু করুণামযি কাতরবংদ্যে ।

তব তটনিকটে যস্য নিবাসঃ খলু বৈকুংঠে তস্য নিবাসঃ ॥ 10 ॥

বরমিহ নীরে কমঠো মীনঃ কিং বা তীরে শরটঃ ক্ষীণঃ ।

অথবাশ্বপচো মলিনো দীনস্তব ন হি দূরে নৃপতিকুলীনঃ ॥ 11 ॥

ভো ভুবনেশ্বরি পুণ্যে ধন্যে দেবি দ্রবমযি মুনিবরকন্যে ।

গংগাস্তবমিমমমলং নিত্যং পঠতি নরো যঃ স জযতি সত্যম্ ॥ 12 ॥

যেষাং হৃদযে গংগা ভক্তিস্তেষাং ভবতি সদা সুখমুক্তিঃ ।

মধুরাকংতা পংঝটিকাভিঃ পরমানংদকলিতললিতাভিঃ ॥ 13 ॥

গংগাস্তোত্রমিদং ভবসারং বাংছিতফলদং বিমলং সারম্ ।

শংকরসেবক শংকর রচিতং পঠতি সুখীঃ তব ইতি চ সমাপ্তঃ ॥ 14 ॥

ইতি উক্ত গঙ্গা-স্তোত্রম্-এর বন্দনা মাধ্যমে গঙ্গাকে বিবিধ বিভূষণে ভূষিত

করে শঙ্করাচার্য্য অমর হয়ে আছেন।

এই স্তোত্রে সর্বত্রই গঙ্গাকে সম্বোধন করে কবি তাঁর স্তুতি করেছেন। দেবী

গঙ্গা সুরেশ্বরী, ত্রিভুবনের ত্রাণকর্ত্রী, দেবাদিদেব শংকরের জটায় আবদ্ধ

থেকে হয়েছেন ‘শংকরমৌলিবিহারিণী’ এবং তিনিই পবিত্র তরঙ্গবিশিষ্টা

চিরপ্রবাহিনী স্রোতস্বিনী গঙ্গা।

তিনি ভগীরথ কর্তৃক স্বর্গ থেকে আনীতা হয়ে ‘ভাগীরথী‘ নামে প্রবাহিতা।

ইনিই শ্রীবিষ্ণুর চরণ থেকে নির্গত হয়ে ‘হরিপাদপদ্মতরঙ্গিণী‘ হয়েছেন।

দেবী গঙ্গাই ‘জাহ্নবী’ রূপে পরিচিতা কারণ জহ্নু মুনি গঙ্গাকে গ্রাস করে

পরে তাঁর কর্ণ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। ইনিই ছিলেন শাপভ্রষ্ট অষ্টবসু

ভীষ্মের জননী।

দেবী গঙ্গা কল্পলতার মতো ফলদায়িনী, সমুদ্র বিহারিণী, দেববধূগণ কর্তৃক

কটাক্ষে দৃষ্ট হয়ে থাকেন।

ইনিই নরকত্রাণকর্ত্রী, কলুষ বিনাশিনী, সর্বদা সুখদায়িনী,

মঙ্গলপ্রদায়িনী, আর্তজনের সেবক জনের আশ্রয়দাত্রী।

ইনিই উজ্জ্বল অঙ্গ বিশিষ্টা, ত্রিভুবন শ্রেষ্ঠা, কৃপাকটাক্ষময়ী। দেবরাজ

ইন্দ্র ও গঙ্গার চরণে চিরপ্রণত।

পরমানন্দ স্বরূপিণী, আর্তুজনের বন্দিতা, স্বর্গের অলকানন্দা যেন জ্ঞানহীন

শংকরের প্রতি করুণাঘন দৃষ্টিতে দেখেন।

তাঁর পবিত্র ধারায় স্নাত হয়ে যারা জন্মরহিত হয়, তাঁর তটে বাস করে যারা

বৈকুণ্ঠের শান্তি ভোগ করে যেন তাঁরা গঙ্গার কৃপাদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত না

হন।

তিনি যেন তাঁদের রোগ শোক তাপ পাপ কুমতি দূর করে সুমতি দেন, গঙ্গাদেবীর

মাহাত্ম্য বর্ণনায় সেই প্রার্থনা জানিয়েছেন কবি শংকরাচার্য।

শ্রীচৈতন্যদেব মহাপ্রভুর জন্মভূমি ও কর্মভূমি ছিল নবদ্বীপ গঙ্গাতীরে। ঠাকুর

শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সাধনভূমিও দক্ষিণেশ্বর গঙ্গা তীরেই। শাস্ত্রমতে, উভয়

সাধনভূমির ভূমিভাগ ছিল কূর্ম পৃষ্ঠাকৃতির এবং রম্য পুষ্পশোভিত।

বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রেরও জন্মভূমি ও কর্মভূমি

ছিল ভাগিরথী-গঙ্গার মূল প্রবাহ পদ্মা তীরের পাবনা জেলার হিমাইতপুরে।

গঙ্গানদীর সৃষ্টি ও সাগরমেলার সূত্রপাতের কাহিনী

কথিত আছে দানবীর রাজা হরিশচন্দ্রের বংশে সগর নামে একজন খুব বিখ্যাত রাজা

ছিলেন। আর তাঁর ছিল ষাট হাজার একজন পুত্র। সেই সগর রাজা ঠিক করলেন তিনি

অশ্বমেধ যজ্ঞ করবেন। সেই মতো একটি ঘোড়ার কপালে জয়-পতাকা লিখে তিনি

ছেড়ে দিলেন বিশ্ব ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। অপেক্ষা করতে লাগলেন ঘোড়াটি কবে

দেশ-বিদেশ ঘুরে ফিরে আসবে তারপর যজ্ঞ করে ইন্দ্রত্ব লাভ করবেন।

ওদিকে দেবরাজ ইন্দ্র ওই যজ্ঞের সংবাদ শুনে ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি

ভাবলেন, রাজা যদি রাজচক্রবর্তী হয়ে পুরো স্বর্গটাই চেয়ে বসেন, তখন কী হবে, তাই তিনি ফন্দি করে যজ্ঞের ঘোড়াটি পাতালে কপিল মুনির আশ্রমে বেঁধে রেখে এলেন।

ওদিকে ঘোড়াটিকে অনুসরণ করছিলেন রাজার ষাট হাজার পুত্র। (!) হঠাৎ ঘোড়াটি নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেই তাকে খুঁজতে শুরু করে দিলেন। আর খুঁজতে খুঁজতে তাঁরা পৌঁছে গেলেন কপিল মুনির আশ্রমে। ঘোড়াটিকে সেখানে দেখতে পেয়ে ক্রোধান্ধ হয়ে মুনিকে মারতে লাগলেন। মুনি যত বলেন ‘আমি ধ্যান করছিলাম, আমি জানি না

একে এখানে কে রেখে গেছে । ওঁর কথায় কর্ণপাত না করে সবাই মিলে আরও বেশি

করে মারতে লাগলেন। শেষে মুনি রেগে গিয়ে ক্রোধাবিষ্ট লোচনে তাঁদের দিকে

তাকাতেই তাঁরা সবাই ভষ্ম হয়ে গেলেন।

ওই সংবাদ পাওয়া মাত্র সগরের এক নাতি পাতালে গিয়ে মুনির পা ধরে

কান্নাকাটি শুরু করলেন। তাঁর চোখের জল দেখে মুনির মায়া হল। তিনি তখন

তাঁকে বললেন তোমার পৌত্র গিয়ে যদি স্বর্গ থেকে গঙ্গাকে নিয়ে আসতে পারে

তবে গঙ্গা দেবীর পবিত্র স্পর্শে এরা আবার জীবন ফিরে পাবে।

তিনি ফিরে এসে সব কথা খুলে বলতে তাঁর পৌত্র ভগীরথ তপস্যা করতে রাজি হয়ে গেলেন। হাজার বছর ধরে তিনি এমন তপস্যা করলেন যে বিষ্ণু খুশি হয়ে তাঁর হাতে একটি শঙ্খ দিয়ে বললেন, তুমি শঙ্খ বাজিয়ে আগে আগে যাও, গঙ্গা

দেবী তোমার পিছনে পিছনে পৃথিবীতে যাবেন।

কথামতো ভগীরথ শঙ্খ বাজাতে বাজাতে চললেন, আর পিছনে গঙ্গা। কিন্তু মুশকিল

হল স্বর্গ থেকে মর্ত্যে অবতরন করার সময়। গঙ্গার গতি এতটাই বেড়ে গেল

যে, সেই গতিতে পৃথিবী ধ্বংস

হবার উপক্রম। তাই সেই গতি ধারণ করার জন্য ভগীরথ শিবের তপস্যা শুরু করলেন।

শিব তপস্যায় তুষ্ট হয়ে জটা খুলে মাথা পেতে

দাঁড়ালেন। গঙ্গাও তাঁর মাথায় পড়লেন। অমনি পৃথিবী কেঁপে উঠল।

আসলে গঙ্গা চেয়েছিলেন তাঁর স্রোতে মহাদেবকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবেন। গঙ্গার মনের

কথা বুঝে তাঁর অহংকার চূর্ণ করতে শিব তাঁকে জটায় আবদ্ধ করলেন। সেই দেখে

ভগীরথ পড়লেন বিপদে। তিনি আবার তপস্যা শুরু করলেন। মহাদেব তাতে খুশি হয়ে

গঙ্গাকে দিলেন ছেড়ে। অমনি গঙ্গা কল-কল রবে পৃথিবীতে বইতে শুরু করলেন।

কিছুদূর গিয়েই জহ্নুমুনির আশ্রম। সেখানে তিনি তপস্যায় মগ্ন ছিলেন। গঙ্গার

স্রোতে তার আশ্রম গেল ভেসে। অমনি তিনি রেগে গিয়ে সমস্ত গঙ্গার

জল পান করে ফেললেন। এই দেখে ভগীরথ আবার পড়লেন চিন্তায়। তিনি মুনিকে

সাধ্যসাধনা করলেন। মুনিও তার কথায় খুশি হয়ে নিজের জানু চিরে গঙ্গাকে মুক্ত

করে দিলেন। এইজন্যই গঙ্গার আরেক নাম জাহ্নবী।

এরপর গঙ্গার স্রোত পৃথিবী অতিক্রম করে গিয়ে পড়ল পাতালে সগর মুনির

ছেলেদের ভষ্মের উপর। অমনি তাঁরা কপিল মুনির কথামতো আবার জীবন ফিরে পেলেন।

এইভাবে গঙ্গার জলে সগর-বংশ উদ্ধার হয়েছিল বলে হিন্দুরা গঙ্গাকে অতি

পবিত্র মনে করেন।

কিংবদন্তী অনুসারে মা গঙ্গা যখন ভগবান শিবের জটা থেকে পৃথিবীতে

পৌঁছেছিলেন তখন তিনি ভগীরথকে অনুসরণ করেছিলেন এবং কপিল মুনির আশ্রমে

গিয়ে সমুদ্রে যোগ দিয়েছিলেন সেই দিনটি ছিল মকর সংক্রান্তির দিন। রাজা

সগরের ষাট হাজার অভিশপ্ত পুত্ররা মা গঙ্গার পবিত্র জলের প্রবাহে

পুণর্জীবন লাভ করেছিলেন। সেই ঘটনার স্মরণে এই গঙ্গা নদীর সাগরের সাথে

মিলন স্থলটি

গঙ্গাসাগর তীর্থ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। সেই কাহিনীর স্মৃতিতে সেই

প্রাচীন কাল থেকে এখানে প্রতি বছর মকর সংক্রান্তিতে গঙ্গাসাগরে মেলার

আয়োজন করা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে এই শুভ দিনে স্নান করলে পুণ্য লাভ

হয়।

তথ্যঋণঃ পৌরাণিকা, উইকিপিডিয়া ও গোগুল।

May be an image of 5 people

  · 

Shared with Publ

বিপন্ন উত্তরাধিকার

** স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিবস স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য **

।। বিপন্ন উত্তরাধিকার ।।

নিবেদনে—তপন দাস

****************************************

‘‘অভাবে পরিশ্রান্ত মনই ধর্ম্ম বা ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা করে, নতুবা করে না।’’

পরম প্রেমময় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র লিখিত সত্যানুসরণের চিরন্তন ওই বাণীর অমোঘ টানে নরেন দত্ত গেলেন পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের দরবারে––জাগতিক অর্থাভাব ঘোচাতে। অন্তর্যামী ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব দেবোপম চরিত্রের উত্তরাধিকারীকে সচেতন করিয়ে দিলেন, আত্মসুখ নয়, ভারতবর্ষের শাশ্বত দর্শন, ‘‘বহুজন হিতায় চ, বহুজন সুখায় চ’’-এর আদর্শের উত্তরাধিকারী হয়ে পরমার্থ লাভ করার জন্য তোমাকে আত্ম নিবেদন করতে হবে।

শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ঐশী শক্তিতে শক্তিমান হয়ে নরেন্দ্রনাথ হলেন বিবেকানন্দ। এঁকে দিলেন মহান ভারতবর্ষের পূর্ণাঙ্গ এক চিত্র। শিকাগো ধর্ম্ম মহাসভার ক্যানভাসে।

‘আব্রহ্মস্তম্বভৃদ্ধাতা’––তৃণলতা থেকে ব্রহ্ম, সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বার্তাবহ বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, সংহিতা, পুরুষোত্তমবাদ নিয়ে বিশ্বজনমানস নতুন করে ভাবতে শুরু করলো। হৃত উত্তরাধিকার ফিরে পেতে ভারতবর্ষ ‘‘উত্তিষ্ঠত জাগ্রত, প্রাপ্য বরান্ নিবোধত।।’’ মন্ত্রে আবার নতুন করে জেগে উঠলো।………

‘‘কর্ম্মণ্যেবাধিকারেস্তু মা ফলেষু কদাচন।…….’’ ––কর্মেই তোমার অধিকার ফলে নয়। ––শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার আদর্শ আঁকড়ে নবযুগের অভিমন্যু ক্ষুদিরাম, দেশরক্ষার ধর্ম পালন করতে গিয়ে ফাঁসির আসামী হলেন। ‘‘ন জায়তে ম্রিয়তে কদাচিৎ…….বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়………নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ।…….’’। বাণীর অমৃত আদর্শে স্থিতপ্রজ্ঞ, মৃত্যুঞ্জয়ী ক্ষুদিরাম হাসিমুখে ফাঁসির দড়ির মালা পড়লেন গলায়। একটা ক্ষুদিরামের আত্মাহুতি জন্ম দিল হাজারো ক্ষুদিরামের। ফাঁসিরজ্জু আর ইংরেজ রাজশক্তির বুলেটের আলিঙ্গনে জীবনের জয়গান গাইতে গাইতে অকালে হাসিমুখে বিদায় নিল উত্তরাধিকারের স্বপ্নদেখা কতশত বীর ভারত-সন্তানেরা। অবশেষে একদিন গ্যালন গ্যালন রক্তের বিনিময়ে আমরা ফিরে পেলাম উত্তরাধিকার। অপূর্ণ, খণ্ডিত। অখণ্ড ভারতবর্ষ হিন্দুস্তান, পাকিস্তান আখ্যা পেল। কিন্তু পূর্ব পশ্চিমে প্রসারিত ভারতমাতার কর্তিত দুটো বাহুর ক্ষত আজও শুকলো না। সৃষ্ট হলো জাতীয় ম্যালিগন্যাণ্ট সমস্যার। বর্তমান যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের প্রদত্ত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার নিমিত্ত রক্ষাকবচ ‘পপুলেশন এক্সচেঞ্জ’ বিধি না মানার জন্য।

তা’ সমস্যা যতই থাকুক, তথাপি জাতীয়তাবাদের পরিচয়ের নিরিখে আমরা ভারতবাসী। আর্য্যজাতির বংশধর। বাল্মীকি, বেদব্যাস আমাদের জাতীয় কবি। রাম, কৃষ্ণ, চৈতন্য, রামকৃষ্ণ প্রমুখ আর্য্য ভারতবর্ষের জাতীয় মানবতাবাদের পূজারী পুরুষোত্তমগণের সাথে ‘‘দিবে আর নিবে মেলাবে মিলিবে’’-র আদর্শ মেনে বুদ্ধ, যীশু, হজরত রসুলকেও দ্রষ্টাপুরুষরূপে চিহ্নিত করিয়ে দিলেন বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। জাতীয় জীবনে সাম্প্রদায়িক সমন্বয়ের বাস্তব সেতুবন্ধন রচিত না হলেও, ভারতীয় হিন্দু, ভারতীয় মুসলমান, ভারতীয় খৃষ্টান, ভারতীয় বৌদ্ধ, ভারতীয় শিখ প্রত্যেকেই যে আর্য্যজাতির বংশধর আমরা বুঝতে শিখলাম, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের কাছে আনত হয়ে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আসমুদ্র হিমাচল পর্যন্ত বিস্তৃত ভারতবর্ষের মহিমা বন্দনা করলেন ‘আর্য্য ভারতবর্ষ আমার জ্ঞান-গরিমা-গরবিনী …….’ সঙ্গীতের ছন্দে।

এই সবকিছু নিয়েই তো আমরা জোর গলায় বলতে পারছি, ‘মেরা ভারত মহান, India is great.’ আচ্ছা ওই শ্লোগানগুলো বলার সাথে সাথে করার যদি মিল না থাকে, ইতিহাসে আমাদের পরিচয় কি হবে? ভারতীয় ঐতিহ্য, ভারতীয় কৃষ্টি, ভারতীয় অনুশাসনের উত্তরাধিকার আমরা প্রকৃত অর্থে বহন করে চলছি কি?

গণপ্রজাতন্ত্রী আধুনিক ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ধর্মকে রক্ষা করে চলার কর্তব্যকে। রাষ্ট্রীয় মন্ত্র ‘সত্যমেব জয়তে’ স্মরণ করিয়ে দেয় উপনিষদীয় আচার্য অনুসরণের শাশ্বত অবলম্বনকে। রাষ্ট্রের কর্ণধার রাষ্ট্রপতিসহ মন্ত্রীবর্গ প্রত্যেকেই ঈশ্বরের নামে শপথ গ্রহণ করে ঈশ্বরের প্রতিভূ জীবগণের কল্যাণ সাধনে ব্রতী হয়। ঈশ্বরের প্রতিনিধি স্বরূপ জাগতিক ন্যায়দণ্ডধারী বিচারকেরা ধর্মাধিকরণ নামে চিহ্নিত। বিচারালয়কে বলা হয় ধর্মস্থান। কেন?

ভারতীয় অনুশাসনের সাম, দান, ন্যায়, দণ্ড, নীতি ও ভেদ-এর রাজধর্ম রক্ষার পবিত্র কর্তব্যে যাতে এতটুকু অন্যায়, অধর্ম প্রবেশ করতে না পারে তার জন্যই ওইসব মহাভারতীয় নীতির অনুসরণ। বিধিবৎ প্রকৃষ্ট-জাতক সৃষ্টি করে প্রজা পালনের স্বার্থেই ওই অনুশাসনকে আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি। তথাপি যখন ভারতীয় শাসন সংহিতা বা সংবিধান ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ না করে, ধর্ম এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়কে এক করে ফেলে ‘ধর্ম-নিরপেক্ষতাবাদ’,––অর্থাৎ রাষ্ট্র ধর্মের অনুবর্তী নয়’-এর মতবাদকে প্রতিষ্ঠা দেয়, তখন কি মনে হয় না, আমরা জাতীয়তাবাদের আদর্শের প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েও এক পরস্পর বিরোধী আচরণ করে চলেছি !

বর্তমান যুগ-পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কথিত ধর্মের যুগান্তকারী সংজ্ঞা ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম বলে জানিস তাকে। ধর্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম না-রে।’ সমন্বয় বার্তাবহ বাণীকে গুরুত্ব না দিয়ে ধর্মের নামে, ভারতীয় সংহিতার নীতি বহির্ভূত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তি পরায়ণতার আস্ফালনকে, কতগুলো অনিত্য, অসার, পৌত্তলিক কু-সংস্কারকে যদি ‘ধর্ম’ নামে প্রতিষ্ঠা দিতে চাই, তা’ কি বিচক্ষণতার পরিচায়ক হবে, না ভারতবর্ষের কৃষ্টির পরিপূরক হবে? ওই ভুলের বোঝা কি আমাদের চিরদিন বইতে হবে? আমাদের বুদ্ধি, বোধ কি নিরেটই থেকে যাবে?

যে নীতি-বিধি পদার্থের অস্তিত্ব রক্ষার সহায়ক তাই তো ধর্ম। পদার্থের স্বকীয়তা ধারণ করে রাখার সহায়ক যা’ তাই ধর্ম। ধর্ম পালন করলেই পদার্থ টিঁকে থাকবে, নচেৎ থাকবে না। সংসদ প্রকাশিত ইংরেজী অভিধানে ধর্মের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘It is an action, one is bound to do.’ সেই ধর্মের আবার পক্ষ আর নিরপেক্ষ কি? বেঁচে থাকার অজৈব উপকরণ বায়ু, জল, মাটি ইত্যাদির যদি ধর্ম থাকতে পারে, এবং তা’ যদি বিজ্ঞানের বইতে পাঠ্য হতে পারে, তাহলে মানুষের কি ধর্ম নেই? মনুষ্যত্ব প্রকাশের মাধ্যমেই তো মানুষ ধার্মিকতার পরিচয় দেয়। মানুষের মনুষ্যত্বের অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার নীতিবিধি-সমন্বিত ভারতের নিজস্ব সংহিতাগুলোর বিধানসমূহ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের সংহিতায় স্থান পাবে না কেন, প্রজাদের শিক্ষা দিতে পাঠ্য করা হবে না কেন?

রাষ্ট্রের সৃষ্টিই তো প্রজাদের অধর্ম বা দুর্নীতি থেকে মুক্ত করে ধার্মিক, অর্থাৎ সু-নীতি পরায়ণ করে তোলার জন্য। সেই রাষ্ট্র যদি তার প্রজাবর্গকে, তাদের পিতৃ-পিতামহের আদর্শ অনুসারী ধর্ম-পরায়ণ, কৃষ্টি-পরায়ণ হতে উৎসাহ না দিয়ে, প্রবৃত্তি-পরায়ণতায় উৎসাহ দেয়, সেটা ভারতবর্ষের জাতীয় উত্তরাধিকারত্বের অস্তিত্বকে বিপন্ন করার বার্তা ভিন্ন আর কিছু নয়।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র নির্মাণের পক্ষপাতি ছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘‘আমি চাই—প্রেরিতদের স্বীকার ও অনুসরণ, তাঁদের মধ্যে ভেদ না করা, বর্তমান প্রেরিত পুরুষের মধ্যে পূর্বতনদের পরিপূরণ অনুধাবন করা. পিতৃকৃষ্টি ও ঐতিহ্যের অনুসরণ, বর্ণাশ্রমের অনুপালন, দশবিধ সংস্কারের প্রবর্তন, যজন যাজন ইষ্টভৃতি স্বস্ত্যয়নী ও সদাচারের অনুষ্ঠান, বিহিত শিক্ষা, উদ্ভাবনী সেবানুসন্ধিৎসু কৃষি শিল্প বাণিজ্য ও বিজ্ঞান, জাতির স্বাস্থ্য আয়ু ও কর্মশক্তির পুনরুদ্ধার, আপদ ও অসৎনিরোধী ব্যবস্থা ও নিরাপত্তার প্রস্তুতি, পারস্পরিক সহযোগিতা ইষ্টানুগ সংহতি, বড়কে ছোট করা নয় ছোটকে বড় করে তোলা, ব্যাক্তিস্বাতন্ত্র্য ও সামাজিক তথা রাষ্ট্রিক কল্যাণের সমন্বয় সাধন—এক কথায় প্রয়োজনীয় যা-কিছুর সত্তাসম্বর্ধনী বিন্যাস ও উন্নয়ন।’’ (আলোচনা-প্রসঙ্গে, ৪র্থ খণ্ড)

আর্য্য ভারতবর্ষের আদি সংবিধান ‘ব্রহ্মসূত্র’-এর নবীন সংস্করণ ‘কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র’ অনুযায়ী–-

‘‘সুখস্য মূলম্ ধর্ম্মম্

ধর্ম্মস্য মূলম্ অর্থম্

অর্থস্য মূলম্ রাষ্ট্রম্

রাষ্ট্রস্য মূলম্ ইন্দ্রিয় বিজয়ম্

ইন্দ্রিয় বিজয়স্য মূলম্ জ্ঞানবৃদ্ধ সেবয়া

জ্ঞানবৃদ্ধ সেবয়া বিজ্ঞানম্।’’

অর্থাৎ সুখী হতে হলে ধর্ম পালন করতে হবে। প্রকৃত ধার্মিক হতে হলে পুরুষার্থের চতুর্বর্গ সমন্বিত আশ্রমধর্ম (বর্ণাশ্রম এবং চতুরাশ্রম) পালন করতে হবে। সঠিকভাবে আশ্রমধর্ম পালন করার স্বার্থে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী প্রজাদের দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী হবার জন্য গুরু গ্রহণ করতে হবে। গুরুর আদেশ-নিদেশ পালন করলে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করা যাবে। তবেই জীবনে সুখী হওয়া যাবে। এই হলো ভারতবর্ষের ধর্মের মূল কথা।

ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টি অনুসারে, ‘‘যেনাত্মন্ স্তথান্যেষাং জীবনংবর্দ্ধাঞ্চপি ধ্রীয়তে য স ধর্ম্মঃ।’’ অর্থাৎ, অন্যের বাঁচা এবং বৃদ্ধি পাওয়াকে অক্ষুন্ন রেখে, মানুষ বাঁচার জন্য, বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য যা’ যা’ করে, তাই ধর্ম। ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। ধর্ম আচরণের মাধ্যমে পালন করার জিনিস, অনুভব করার জিনিস, যা’তে প্রতিটি সত্তা তার অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করতে পারে, তার অনুশীলন করা।

অথচ বাস্তব চিত্রটার সাথে মেলানো যাচ্ছে না ধর্মকে। বর্তমানে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্মের নামে চলছে বাহ্যপূজা, পৌত্তলিকতার প্রকাশ, হৈ-চৈ, প্রকাশ্যে প্রাণীহত্যা, পরিবেশ-দূষণ, রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায়। রাস্তা আটক করে, চাঁদার জুলুম করে, জনজীবন বিপর্যস্ত করে, তারস্বরে মাইক বাজিয়ে, বাজি ফাটিয়ে, অবধ্য, নিরীহ প্রাণীদের হত্যা করে ধর্ম উদযাপন করার বিধি কোন মহাপুরুষ, কোন সাধক, কোন নবী, কোন ঋষি, প্রবর্তন করেছেন কি? যদি না করে থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রের কর্তব্য সব সম্প্রদায়কে প্রকৃত ধর্ম পালনে উৎসাহিত করা। ধর্মের নামে বিধি-বহির্ভূত অসদাচারের অনুষ্ঠানের উদযাপনকে কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা।

ভারতের আর্য্য-ঋষিগণ, অবতার-বরিষ্ঠগণ প্রত্যেকেই সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির উপাসনার কথা বলেছেন ধর্মের নামে, পূজার নামে। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আরও একটু সহজ করে দিয়ে বললেন, ‘‘ধর্ম্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম্ম না-রে। অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম্ম বলে জানিস্ তাকে। পূর্বতনে মানে না যারা/জানিস্ নিছক ম্লেচ্ছ তা’রা।’’ ‘‘পূজা-আর্চ্চা মানেই কিন্তু /দৈবগুণ যা সেধে নেওয়া। হাতে-কলমে মক্স করে/বাস্তবে তার রূপটি দেওয়া।।’’ ইত্যাদি ছড়াবাণীগুলো সহজ, সরল, ওজস্বী আবেদনে সমৃদ্ধ হলেও একটা নির্দিষ্ট গণ্ডীর ভাষা-ভাষীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ওই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দিতে তিনি বললেন, ‘Upholding urge of existence is Dharmma.’ বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্তা বা অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করে উৎকর্ষতায় রক্ষা করার নাম ধর্ম। তথাপিও আমরা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতার, কু-সংস্কারের, অজ্ঞানতার আবরণ ভেদ করে শুদ্ধ আমিটাকে বের করতে ব্যর্থ হলাম। তথাকথিত ইনটেলেকচ্যুয়াল হওয়া সত্বেও ধর্মের নামে ফুল, বেলপাতা, ধূপবিহীন ধূপকাঠি, ফল-মিষ্টান্নাদির অঢেল আয়োজনে, মাইক বাজিয়ে, শব্দবাজির আওয়াজ দিয়ে পরিবেশবিদদের চিন্তার বলিরেখায় ভাঁজ ফেলে দিতে ইন্ধন যোগাচ্ছি। আর আমাদের গর্বের রবীন্দ্রনাথ আমাদের দ্বিচারিতা দেখে কষ্ট পাচ্ছেন আর ভাবছেন, যে মানুষগুলো ‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তলে’ ইত্যাদি ছন্দের ডালি সাজিয়ে ভক্তির আবেদন জানায়, তারাই আবার পূজার নামে কু-সংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে বিশ্বাত্মাকে দূষিত করে চলেছে।

আমাদের বর্তমান যুগ যে যুক্তিবাদী সে কথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি অস্বীকার করবেন না আশাকরি। যেমন, সন্তানের হয়ে মা খেলে সন্তানের পেট ভরবে না। ছাত্রের হয়ে শিক্ষক লেখাপড়া করলে ছাত্র পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে না।–তেমনি প্রচলিত পূজার আয়োজকদের হয়ে কোন পুরোহিত পূজা করলে আয়োজকদের কিছু ফললাভ হবে কি ?

অবশ্য পুরোহিতও জানেন না ফললাভের বিষয় সম্পর্কে। যদি জানতেন বিসর্জন মন্ত্রে বলতেন না—ওঁ আবাহনং ন জানামি, নৈব জানামি পূজনম্। বিসর্জনং ন জানামি ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি (পরমেশ্বর)।–-অর্থাৎ আমি আবাহনও জানিনা, বিসর্জনও জানিনা, আমাকে ক্ষমা করুন। (দ্রঃ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)

বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী পূজ্য-প্রতিমা চঞ্চল চিত্তের ধারণের জন্য একটি অবলম্বন। প্রতিমাকে ব্রহ্মের রূপ কল্পনা করে উপাসনা, সংযম, সাত্তিক আহার, সাত্তিক বিহার ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে পূজা করা হয়।–-যাতে পূজক বা উপাসক মনসংযোগ দ্বারা প্রতিমাকে হৃদয়ে ধারণ করে প্রতিমার গুণে গুণান্বিত হতে পারে। এই হলো প্রতিমা পূজার মূল কথা।

পূজা বিষয়ে মহানির্ব্বাণতন্ত্র নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ

‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ।

অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’

মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ভারতে বিবেকানন্দ গ্রন্থের ৩৩৬ পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট। ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’

আমরা এমনই অধম যে, ধর্মের নামে প্রাণী হত্যা পর্যন্ত করতে আমাদের বিবেকে বাধে না। আমাদের প্রামাণ্য হিন্দু শাস্ত্রে কোথাও প্রাণী হত্যার অনুমোদন নেই। উপনিষদে ‘আত্মবৎ সর্ব্বভূতেষু’ মন্ত্রে প্রতিটি প্রাণের স্পন্দনকে রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। ‘মাতৃবৎ পরদারেষু’ মন্ত্রে সকল নারীদের মায়ের মত দেখতে বলা হয়েছে। ‘লোষ্ট্রবৎ পরদ্রব্যেষু’ মন্ত্রে অন্যের সম্পদকে মাটির ঢেলার মত দেখতে বলা হয়েছে। রাষ্ট্রের কর্ণধারগণ যদি ওইটুকুও মেনে চলতেন এবং প্রজাদের চলতে উৎসাহিত করতেন, তাহলেও আমাদের উত্তরাধিকার নিয়ে গর্ব করা যেত।

সর্বশ্রেষ্ঠ হিন্দু ধর্মগ্রন্থ মহাভারতের অনুশাসনপর্ব ১১৪ অধ্যায়ে বলা হয়েছে—

“যে ব্যক্তি মোহ প্রভাবে পুত্র-মাংস-তুল্য অন্যজীবের মাংস ভক্ষণ করে, সে অতি জঘন্য প্রকৃতির এবং তার সেই জীবহিংসা বহুবিধ পাপযোনিতে জন্মগ্রহণ করবার একমাত্র কারণ বলে নির্দিষ্ট হয়।“

শুধু হিন্দু মতেই নয়, কোন ধর্মীয় মতবাদে জীবহত্যা স্বীকৃত নয়।

কোরানে, আর্য্য হিন্দু-শাস্ত্রে এবং পুরুষোত্তমদের বাণীতে কোথাও ‘বলিদান’ বা ‘কোরবাণী’-র নামে প্রাণী হত্যার অনুমোদন নেই।

‘কোরবাণী’ কথাটির উৎপত্তি আরবীর ‘কুরবান’ থেকে। ‘কুরবান’ মানে উৎসর্গ, বলি। আবার বলি মানে দান। তন, মন, ধন কর কুরবানী অর্থাৎ কায়, মন, ধন পরমেশ্বরের জন্য উৎসর্গ কর। এই আত্মোৎসর্গ বা আত্ম-বলিদানই প্রকৃত বলি বা কোরবাণী।

মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ আল-কোরানে বলা হয়েছে, “এদের মাংস আর রক্ত আল্লাহর কাছে পৌছায় না, কিন্তু তোমার ভক্তি তার কাছে পৌছায়।” (সুরা ২১/৩৭)

“আল্লার নিকট তাহার মাংস ও তাহার রক্ত কখন পৌঁছে না বা তিনি তাহা ইচ্ছা করেন না। বরং তোমরা অসৎকর্ম্ম হইতে নিজেকে রক্ষা কর ইহাই তিনি ইচ্ছা করেন। তিনি আমাদের অধীনে থাকিয়া কার্য্যনির্বাহের জন্য পশু সৃষ্টি করিয়াছেন—সেজন্য তোমরা খোদার নিকট নম্র ও নিরীহ হইতে শিক্ষালাভ করিবে। এই সৎপথ-প্রাপ্তির অর্থাৎ সৎ-শিক্ষার জন্যই খোদা এই ব্যবস্থা করিয়াছেন। যাহারা অন্যের মঙ্গল সাধন করে, তাহাদের মঙ্গল করিয়া থাকেন ……..” (কোর-আণ—২২ হজ ৩৭ র, ৫) অথচ কোরবানীর নামে অবাধে নিরীহ পশুদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়!

ভগবান বুদ্ধদেব বলেছেন, “আমি কখনই কাউকে মাংস খাওয়ার অনুমোদন করি নি, করি না এবং করব না।” (লঙ্কাবতার সূক্ত)

প্রভু যিশু বলেন, “তুমি হত্যা করিও না” । (এক্সোডাস – 20:13)

“যে একটি ষাড়কে হত্যা করলো, সে যেন একটি মানুষকে হত্যা করলো।” (ইসা – 66:33)

উক্ত অনুশাসনবাদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যে নিজেকে পরমেশ্বরের সন্তান বা খোদাতাল্লার বান্দা মনে করবেন তিনি কখনই কোন প্রাণীকে ব্যথা দেবেন না, হত্যা করবেন না এবং প্রাণীর রক্ত-মাংসে ক্ষুধার নিবৃত্তি করবেন না।

ধর্ম পালনের জন্য নির্দিষ্ট ওইসব অনুশাসনাবলী মেনে চলা স্বভাবতই নাগরিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। রাষ্ট্রের কর্ণধারগণ যদি ওই নাগরিক কর্তব্য পালনে উদাসীন হয়ে ধর্মের নামে ‘যেমন খুশি তেমন’ উৎসব উদযাপনের ছাড়পত্র দেয়, প্রাণীহত্যা বন্ধ করতে তৎপর না হয়, পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে সচেষ্ট না হয়—তাহলে, তথাকথিত ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষজন ধর্মের নামে প্রবৃত্তি-প্ররোচিত অধর্মের আচরণ করার সুযোগ পেয়ে যায়, পরিবেশ দূষণ হয়, জনজীবন বিপর্যস্ত হয়।

* * *

আমরা আমাদের ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদে আর্য্যজাতির মহান গ্রন্থ ‘মহাভারত’-কে স্বীকৃতি দিয়েছি। সেই স্বীকৃতির অধিকারে স্বীকৃতি পেয়েছে ‘শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতা’। সেই সূত্রে স্বীকার করে নিতে হয় মহান রাজনীতিবিদ্ পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণকে। স্বীকার করে নিতে হয় ‘শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতা’ প্রদত্ত––‘গতির্ভর্ত্তা প্রভুঃ প্রেষ্ঠ ঈশ্বরঃ পুরুষোত্তমঃ।/আব্রহ্মস্তম্বভৃদ্ধাতা সদগুরুস্ত্বং নমহোস্তুতে।।’ বাণীর শাশ্বত বার্তাকে। অতএব, আমাদের প্রকৃত উত্তরাধিকার প্রাপ্তির সূত্রই হলো সদগুরুর দীক্ষা গ্রহণ করে তাঁর নীতি-নিদেশ মেনে চলা। তাঁর আদর্শের প্রতি আনতি সম্পন্ন হয়ে চলা।

আমরা ‘মেরা ভারত মহান’ বলে চিৎকার করবো অথচ ভারতীয় কৃষ্টির ধারা অনুসরণ করবো না, পরিপালন করবো না, প্রচার করবো না, তা’-তো হতে পারে না! যদি আমরা সত্যিসত্যিই ওই মহান অনুশাসন মেনে নিতাম তাহলে কি ভারতীয় টিভিতে, সিনেমাতে, পুস্তকে, রাস্তাঘাটে ভারতীয় কৃষ্টির অনুশাসন পরিপন্থী, প্রবৃত্তি-প্ররোচিত স্পর্শকাম, দর্শকাম, শ্রুতিকাম, হিংসা-দ্বেষ প্রদর্শিত এবং প্রচারিত হয়ে মনুষ্যত্বকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারতো? ওইসব প্রবৃত্তি-প্ররোচিত আদর্শের কবলে পড়ে আমরা ভুলতে বসেছি আমাদের জাতীয় আদর্শ, আমাদের প্রকৃত উত্তরাধিকারের তত্ত্বকে।

চিদানন্দ সম্পদের অধিকারী আমার, আপনার, আমাদের প্রাথমিক পরিচয় কি, একটু ভেবে বলুন তো? না, না, নার্ভাস হবার কিছু নেই। এককথায় এর উত্তর যে ‘মানুষ’, তা’ প্রগতিশীল, প্রতিক্রিয়াশীল প্রত্যেকেই স্বীকার করবেন। আর এ-ও স্বীকার করবেন যে, আমরা আকাশ থেকে শিলাবৃষ্টির সাথে একদিন হঠাৎ এই মহীতলে পতিত হইনি কোন গ্রহান্তরের প্রাণী হিসেবে। অযোনী-সম্ভূতও নয়। আমরা প্রত্যেকেই মাতৃদেবীর গর্ভবাসকাল শেষ করে অপত্যপথে, না হয় নিম্ন-উদরচেরা হয়ে পৃথিবীর আলো-হাওয়ার সাথে পরিচিত হয়েছি। পুরুষ-পরম্পরাগত জৈবী-সত্তার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দেহ-মন-প্রাণ নিয়ে। প্রত্যেকের বৈশিষ্ট্য আলাদা আলাদা। যেহেতু পৃথক পৃথক বংশের ধারা নিয়ে আমরা জন্মেছি। এই তথ্যকে অস্বীকার করলে জীব-বিজ্ঞানকেও অস্বীকার করতে হয়।

বিজ্ঞানের মানদণ্ডে, পিতৃ-মাতৃ বংশের ধারার সাথে নিজেদের অর্জিত দোষ-গুণ মিলেমিশে তৈরি genetic code Meiotic cell division-এ বিভাজিত হয়ে প্রস্তুতি নেয় উত্তর পুরুষ সৃষ্টির। মায়ের আকুতি, ভাবাবেগ সম্বর্দ্ধিত Ectoplasmic body বা লিঙ্গ-শরীর বা আত্মা আশ্রয় গ্রহণ করে পিতার পুং-জননকোষের কোষাণুপুঞ্জে। দৈবরূপী বীজকে পুরুষাকাররূপী প্রকৃতি বা ডিম্বাণু করে বরণ। পিতার এবং মাতার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সংস্করণ, দুটি অর্দ্ধ কোষাণু (y+x, or, x+x chromosome) এক হয়ে সৃষ্ট হয় একটি পূর্ণাঙ্গ কোষ। একটা প্রজন্মের ভ্রূণ। পিতামাতার আত্ম-প্রতিলিপির প্রতিনিধি স্বরূপ।

কোন ভ্রূণ বিস্তৃতি লাভ করে জীবনবাদের গান গেয়ে যায়। কেউ ধ্বংসকে ডেকে আনে। কেউ ঝরে যায় অকালে। আমরা কেউ চাই না আমাদের উত্তরাধিকার অকালে ঝরে যাক, বিকৃত হয়ে জন্মাক। তবুও জন্মে যায় আমাদের অজ্ঞতার জন্য। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জাগতিক সম্পদ, ভোগের উপকরণ ম্লাণ হয়ে যায় যদি থ্যালাসেমিয়া, স্কিজোফ্রেনিয়া, হিমোফিলিয়ার ন্যায় দুরারোগ্য বংশগত রোগে আক্রান্ত হয় চিদানন্দ শক্তির অংশ কোনো উত্তরপুরুষ।

বিকৃত উত্তরাধিকার সমস্যা সৃষ্টির মূলে কিন্তু আমরাই। ভারতীয় বর্ণাশ্রমধর্ম্ম, ভারতীয় দশবিধ সংস্কারের অনুশাসন না মেনে তথাকথিত প্রগতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে সংগতি রাখতে পারিনা জীবনধর্মের সাথে। ফলে বিপর্যয় এসে যায় ব্যষ্টি, সমষ্টি এবং রাষ্ট্র জীবনে।

আমাদের জাতীয় জীবনের উত্তরাধিকারকে সুরক্ষিত রাখতে আমাদের ভারতীয় ঋষিগণ ‘বর্ণাশ্রম ধর্ম্ম’, ‘দশবিধ সংস্কার’ নামে কতগুলো জীবনীয় সংস্কার প্রবর্তন করেছিলেন। বর্তমানের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী প্রগতিবাদীরা ওইসব বিধান শুনে যারা মনে মনে ‘বিজ্ঞানের যুগে কুসংস্কার’ শীর্ষক সমালোচনার জন্য তৈরি হচ্ছেন, তাদের জন্য গুটি কয়েক বিজ্ঞানের তথ্য নিবেদন করছি Davidson’s Practice of Medicine, 16th edition, Genetic Factor of Disease Chapter থেকে।

“In survey carried out in Edinburgh a few years ago, no less than 50% of childhood deaths could be attributed to genetic disease. The contribution of genetic factors to mortality and morbidity in adults is mere difficult to assess but is also increasing.”…..

“…..Several extensive studies have shown that among the offspring of consanguineous matings there is an increase of perinatal mortality rate together with an increased frequency of both congenital abnormalities and mental retardation………”

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ওই তথ্য অনুযায়ী বর্তমান বিশ্বে শতকরা ৫০টি শিশু মৃত্যুর কারণ পোলিও নয়, উত্তরাধিকারে প্রাপ্ত জেনেটিক ডিজিজ। বিসদৃশ যৌনমিলনজাত ওই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবার একমাত্র উপায় হিসেবে বলা হয়েছে, বিশ্বস্ত বংশে সদৃশ বিবাহ এবং সুপ্রজনন নীতির পরিপালন।––যা’ ভারতীয় বর্ণাশ্রমধর্ম ও দশবিধ সংস্কার পালনের মধ্যে নিহিত রয়েছে। বর্ণাশ্রমধর্ম ও দশবিধ সংস্কার পালনের মাধ্যমে প্রতিটি বংশের কুলপঞ্জীর মর্যাদা রক্ষা করে যারা নির্মল, নিষ্কলুষ উত্তরাধিকারীদের সৃষ্টি করতে পারবেন, তাদের বংশধরগণ দুরারোগ্য ব্যাধি এবং অকাল মৃত্যুর কবল থেকে সুরক্ষিত থাকবেই। নচেৎ উত্তরাধিকারীদের নিয়ে নানা সমস্যায় জর্জরিত হতে হবে।

তাই বলছিলাম কি, সদগুরুর দীক্ষা নিয়ে, বিধিবৎ বৃত্তি নিয়ন্ত্রণ মাধ্যমে তাঁর প্রদত্ত সংস্কারে সংস্কৃত হতে পারলে উত্তরাধিকারে পাওয়া বিকৃত রূপটাকে সযত্নে পরিহার করে, বৃদ্ধি পেতে না দিয়ে, উত্তরাধিকারে পাওয়া ভালোটুকুকে সুস্থ পরিষেবা দিয়ে যদি একটা সুস্থ প্রজন্ম উপহার দিয়ে যেতে পারি ভারতমাতাকে, তবেই বোধহয় মানুষ হিসেবে সঠিক পরিচয় রেখে যেতে পারবো। তাই নয় কি?

‘ভারাক্রান্ত হৃদয়ের যা’ কিছু মলিনতা’ ইষ্টীপূত প্রবাহে ধুয়েমুছে রত্নগর্ভার আধার স্বরূপিণী কল্যাণীয়া মায়েরা, গুরুর নিদেশ মেনে, স্বামীর মনোবৃত্ত্যানুসারিণী হয়ে চলতে পারলেই হয়তো অচিরেই আগমন হতে পারে শুদ্ধাত্মাদের।

‘শুদ্ধাত্মাদের’ জন্ম দিয়ে জাতীয় উত্তরাধিকার রক্ষার দায়িত্ব কি শুধু মেয়েদের, ছেলেদের কি কোন দায়িত্বই নেই? ––বর্তমান প্রজন্মের কল্যাণীয়া মায়েদের মনে এই প্রশ্নটা জাগা স্বাভাবিক। হ্যাঁ, ছেলেদের অবশ্যই দায়িত্ব আছে,––

‘ইষ্ট ঝোঁকে ছুটলে পুরুষ প্রজ্ঞা অনুপমা

স্বামীর ঝোঁকে ছুটলে নারী শ্রেষ্ঠ ছেলের মা।’

পুরুষদের ইষ্টনিষ্ঠ হতে হবে, পূরণকারী হতে হবে, ‘‘প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী। প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ এমনতর ভাবতে হয়।’’-–বাণীকে মেনে চলতে হবে। এবং সে দায়িত্ব স্বয়ং বিধাতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রই দিয়েছেন। কিন্তু মায়েদের উপর দায়িত্ব একটু বেশি করে দিয়েছেন।

‘‘নারী হতে জন্মে জাতি

বৃদ্ধি লভে সমষ্টিতে

নারী আনে বৃদ্ধি ধারা

নারী হতেই বাঁচাবাড়া

পুরুষেতে টানটী যেমন

মূর্ত্তি পায় তা সন্ততিতে ।

অভ্যাস ব্যবহার যেমনতর

সন্তানও পাবি তেমনতর।

স্বামীতে যার যেমনি রতি

সন্তানও পায় তেমনি মতি ।

স্বামীর প্রতি যেমনি টান

ছেলেও জীবন তেমনি পান ।

যে ভাবেতে স্বামীকে স্ত্রী

করবে উদ্দীপিত

সেই রকমই ছেলে পাবে

তেমনি সঞ্জীবিত ।”

‘‘মা হ’লো মাটির মত। মা যদি স্বামীগতপ্রাণা হয়, নিজের প্রবৃত্তির উপর তার যে নেশা, তা’ থেকে যদি তার স্বামীনেশা প্রবলতর হয়, স্বামীকে খুশি করার জন্য নিজের যে কোন খেয়াল যদি সে উপেক্ষা করতে পারে, তাহ’লে তা’র ব্যক্তিত্বের একটা এককেন্দ্রিক রূপান্তর হয়। একে বলে সতীত্ব। তা’ থেকে তা’র শরীরের ভিতরকার অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিগুলির ক্ষরণ ঠিকমত হয় এবং সেগুলি আবার সত্তাপোষণী হয়। এইগুলি গর্ভস্থ সন্তানের শরীর-মনের ভাবী সুসঙ্গত বিকাশের পক্ষে যে-সব সারী উপাদান প্রয়োজন, সেগুলি সরবরাহ করে। এইসব ছেলেমেয়ে মাতৃভক্ত হয়, পিতৃভক্ত হয়, গুরুভক্ত হয়, সংযত হয়, দক্ষ হয়, লোকস্বার্থী হয়, চৌকস হয়, এরা সাধারনতঃ মোটামুটি সুস্থ, সবল ও দীর্ঘায়ুও হয়।’’ (আলোচনা প্রসঙ্গে পঞ্চদশ খণ্ড/৭৩)

বর্তমান যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ওই সঞ্জীবনী মন্ত্রের বাস্তব প্রয়োগে আমাদের ঘরের মেয়েরা যদি উপযুক্ত বরণীয় বর-কে বরণ করে আদর্শ বধূ, মনোবৃত্ত্যানুসারিনী স্ত্রী, আদর্শ জায়া হয়ে তাদের ভাবী সন্তানদের ভালোমন্দ পরিমাপিত করে গর্ভে ধারণ করতে পারেন, তা হলেই জন্ম নেবে সুস্থ দাম্পত্যের সুস্থ শিশু। এবং সেই সন্তানদের সদাচারের প্রলেপনে আধো কথার সময় থেকেই করে করিয়ে সদগুণের শিক্ষা ধরিয়ে দিতে পারেন,— তা হলেই সংরক্ষণ করা যাবে আমাদের আর্য্য ভারতবর্ষের জাতীয় উত্তরাধিকার।

প্রহ্লাদ, ব্যাসদেব, কৌটিল্য, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্রের ন্যায় কত-শত বিখ্যাত মনীষীদের শুদ্ধাত্মাদের লিঙ্গশরীর সেই আশায় পথ চেয়ে বসে আছেন। উপযুক্ত মা পেতে। এক বুক আশা নিয়ে, পথ চেয়ে বসে রয়েছেন মানুষ-পাগল পরমপিতাও। তাঁকে শুদ্ধাত্মার ডালির উপহার কে দেবে, সে-তো এক-একজন কয়াধু, সত্যবতী, কৌশল্যা, দেবকী, চন্নেশ্বরী, শচীমাতা, চন্দ্রমণি দেবী, ভুবনেশ্বরী দেবী, মাতা মনোমোহিনী দেবী, প্রভাবতী দেবীর ন্যায় প্রমুখ মায়েদের দ্বারাই সম্ভব। আমাদের আর্য্য ভারতবর্ষের উত্তরাধিকারের দায়িত্ব মায়েদেরই তো নিতে হবে। পরমপিতা যে পথ চেয়ে বসে আছেন আপনাদের দেওয়া উপহার পেতে।

সব্বাইকে জয়গুরু প্রণাম! সব্বাই ভালো থাকবেন, ভালো রাখবেন।

© tapandasd ©

––––

বর্ষবিদায়-বর্ষবরণ

।। প্রসঙ্গ : বর্ষবিদায়-বর্ষবরণ।।

নিবেদনে—তপন দাস

**************************

“অসতো মা সদ্গময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়।” (আমরা যেন অসতের মধ্যে থেকেও যেন সৎ থাকতে পারি। অন্ধকারের মধ্যে থেকেও যেন জ্যোতি দর্শন করতে পারি। মৃত্যুর মধ্যে থেকেও যেন অমৃত আহরণ করতে পারি।) এই হচ্ছে আমাদের ভারতীয় কৃষ্টির আদর্শ। সেই আদর্শের কথা ভুলে আমরা বিদায় দিতে চলেছি খৃস্টীয় 2023তম বছরকে। আমাদের করা অনিষ্ট ও ইষ্ট কর্মের জাবেদা খাতার খতিয়ান গুপ্ত চিত্রের ফোল্ডারে জমা রেখে আমরা বরণ করতে চলেছি খৃস্টীয় 2024তম বছ‍রকে। কোভিড-এর পুণরাগমন আশঙ্কার ভ্রূকুটির কথা মাথায় রেখে, লাগামহীন বেলেল্লাপনায় লাগাম দিতে প্রশাসনকে তৎপর থাকতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত স্বাস্থ্যের সংজ্ঞা মেনে, স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে এবছরও যদি অন্যান্য বছরের মতো বর্ষবরণের নামে নাচাগানা, স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর অভক্ষ্য ভোজনের খানাপিনা, অপসংস্কৃতির হৈহুল্লোরের বেলেল্লাপনা চলে,—তাহলে বুঝতে হবে, আমাদের দেশে প্রকৃষ্ট রূপে শাসিত সংস্কৃতিপরায়ণ প্রশাসক নেই। যারা আমাদের সবদিক থেকে দূষণমুক্ত নতুন বছর শুধু নয়, উপহার দেবেন এক বিশুদ্ধ প্রশাসন! তবে আমরা আশাবাদী, প্রশাসনের শাসনের ভয়ে যেন অপসংস্কৃতি দূর হয়, বিজ্ঞানীদের নির্দেশ মেনে পরিবেশ দূষণ বন্ধ হয়। আমাদের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা শয়তান যেন লোভ, ঈর্ষা, দ্বেষ, হিংসার হাতছানি ভুলে সবাইকে নিয়ে জীবনবর্দ্ধনের পথে এগিয়ে চলতে পারে। পরমপিতার ঈপ্সিত পরমরাষ্ট্রিক সমবায়ের লক্ষ্যে। তবেই সার্থক হবে বর্ষবরণের উৎসব। আচ্ছা, বাঙ্গালী হয়ে বাংলা বর্ষবরণের ক্ষেত্রে আমাদের উৎসাহ কেন ম্লান হয়ে যায়? একটা প্রশ্ন। পরিশেষে, খ্রীষ্টিয় বর্ষ-বিদায় এবং বর্ষ-বরণের প্রণাম জানিয়ে ইতি টানলাম। জয়গুরু।

খ্রীস্টাব্দ ২০২৩কে বিদায় ও ২০২৪কে বরণ স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য

।। খ্রীস্টাব্দ ২০২৩কে বিদায় ও ২০২৪কে বরণ স্মরণে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত সৎসঙ্গের ঋদ্ধি-তপনার ঋত্বিক সম্মেলন বনাম যুগধর্মের উৎসব ।।

নিবেদনে—তপন দাস

****************************************

কালের নিয়মে পল, দণ্ড, কলা, মুহূর্ত, প্রহর ইত্যাদি দিয়ে শুরু করে পৃথিবীর আহ্নিক গতিকে ১ অহোরাত্র ধরা হয়। ৩০ অহোরাত্রে ২ পক্ষ বা ১ মাস। ৬ মাসে ১ অয়ন। ২ অয়নে ১ বর্ষ। অপরপক্ষে উত্তরায়নে দেবতাদের ১ দিন, দক্ষিণায়নে ১ রাত। দেবতাদের ১ বছর সমান মানুষের ৩৬০ বছর ধরা হয়। বায়ুপুরাণে সৌর, সৌম্য, নাক্ষত্র এবং সাবন নামে চার প্রকার সময় নিরূপণ মাসের উল্লেখ আছে। ৩০ সূর্যোদয়ে সাবনমাস। সূর্যের রাশি পরিবর্তনে হয় সৌরমাস। কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ থেকে শুক্লপক্ষের পূর্ণিমা পর্যন্ত চান্দ্রমাস। চন্দ্রের নক্ষত্র ভোগকালকে বলা হয় নাক্ষত্রমাস। ৫ সৌরবর্ষে ১ নৈসর্গিক যুগ। (কোনো একটিমাসের আবর্তন কালকে একক ধরে নৈসর্গিক যুগের গণনা শুরু করা যেতে পারে।) ১ হাজার নৈসর্গিক যুগে ১ কল্প। সপ্তর্ষিরা ১০০ বছর করে এক একটি নক্ষত্রে কেন্দ্রীভূত থাকে। ২৭টি নক্ষত্র ভোগকাল ২৭০০ বছর—একটি সপ্তর্ষিযুগ। এই সপ্তর্ষিযুগের গণনা প্রাচীন ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল। ভারতের অন্যতম জ্যোতির্বিদ আর্য্যভট্ট নক্ষত্রাদির সাথে মেষরাশির অবস্থানকে কেন্দ্র করে কল্যব্দের সূচনা করেন ৩১০১ খৃঃ পূঃকে একক ধরে। সেই হিসেব এবং রাশির অবস্থান ধরে উত্তরায়নে ভীষ্মের দেহত্যাগ এর হিসেব কষে ২১৪২ খৃঃ পূঃ কে শ্রীকৃষ্ণের জন্মবর্ষ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

আমরা যে খৃষ্টাব্দ বলি এটা হচ্ছে গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডার। এটা একটি সৌর সন। নানা পরিবর্তন, পরিমার্জন, পরিবর্ধন, বিবর্তন এবং যোগ-বিয়োজনের মধ্য দিয়ে এ বর্তমান কাঠামো লাভ করেছে। উল্লেখ্য সৌর সনের সাথে ঋতুর সঙ্গে সম্পর্ক থাকে। বর্ষপঞ্জিকা প্রচলন অল্প পরিসরে প্রাচীন সুমের সভ্যতায় পরিলক্ষিত হয়। তবে মিশরীয় সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীনতম সৌর ক্যালেন্ডার উদ্বোধন করে বলে জানা যায়। প্রাচীন মিশরীয় ক্যালেন্ডার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, খৃস্টপূর্ব ৪২৩৬ অব্দ থেকে ক্যালেণ্ডার ব্যবহার গ্রহণ করে। রোমানরা তাদের প্রথম ক্যালেণ্ডার লাভ করে গ্রীকদের কাছ থেকে। রোমানদের প্রাচীন ক্যালেণ্ডারে মাস ছিল ১০টি এবং তারা বর্ষ গণনা করতো ৩০৪দিনে। মধ্য শীত মৌসুমের ৬০ দিন তারা বর্ষ গণনায় আনতো না। রোমানদের বর্ষ গণনার প্রথম মাস ছিল মার্চ। তখন ১লা মার্চ পালিত হতো নববর্ষ উৎসব। শীত মৌসুমে ৬০ দিন বর্ষ গণনায় না আনার কারণে বর্ষ গণনায় যে দুটি মাসের ঘাটতি থাকতো তা পূরণ করবার জন্য তাদের অনির্দিষ্ট দিন-মাসের দ্বারস্থ হতে হতো। এই সব নানা জটিলতার কারণে জনসাধারণের মধ্যে তখন ক্যালেণ্ডার ব্যবহার করার প্রবণতা একেবারেই ছিল না। রোমের উপাখ্যান খ্যাত প্রথম সম্রাট রমুলাসই আনুমানিক ৭৩৮ খৃস্টপূর্বাব্দে রোমান ক্যালেন্ডার চালু করার চেষ্টা করেন। পরবর্তীকালে রোমান সম্রাট নূমা ১০ মাসের সঙ্গে আরো দুটো মাস যুক্ত করেন। সে দুটো মাস হচ্ছে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি। তিনি জানুয়ারিকে প্রথম মাস ও ফেব্রুয়ারিকে শেষ মাস হিসাবে যুক্ত করেন। জানুয়ারি মাস ধার্য করা হয় ২৯ দিনে এবং ফেব্রুয়ারি মাস ধার্য করা হয় ২৮ দিন। এ ছাড়াও তিনি মারসিডানাস নামে অতিরিক্ত একটি মাসেরও প্রবর্তন করেন। এই মারসিডানাস মাস গণনা করা হতো ২২ দিনে। এই অতিরিক্ত মাসটি গণনা করা হতো এক বছর অন্তর ফেব্রুয়ারি মাসের ২৩ ও ২৪ তারিখের মাঝখানে। খৃস্টপূর্ব ৪৩২ অব্দে সম্রাট নূমা কর্তৃক প্রবর্তিত মাসের হিসেব পরিমার্জন ও পরিবর্তন করা হয়। পরবর্তীকালে রোমানরা চার বছর অন্তর লীপ ইয়ারের হিসেব প্রবর্তন করে। এ হিসেবেও এক বছরের সঙ্গে অন্য বছরের দিন সংখ্যার হেরফের হতে থাকে। চার বছর অন্তর অতিরিক্ত একটি দিন যোগ করলে দেখা যেতো দিনের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সীজার মিশরীয় ক্যালেন্ডার রোমে চালু করেন। তিনি জ্যোতির্বিদদের পরামর্শে খৃস্টপূর্ব ৪৬ অব্দে সেই বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের মাঝখানে ৬৭ দিন এবং ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে ২৩ দিন এই মোট ৯০ দিন যুক্ত করে ক্যালেণ্ডার সংস্কার করেন। এই ক্যালেন্ডার জুলিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত হয়। এই ক্যালেন্ডারে মার্চ, মে, কুইন্টিলিস (জুলাই) ও অক্টোবর দিন সংখ্যা ৩১ দিন, অপরদিকে জানুয়ারি ও সেক্সটিনিস (আগস্ট) মাসের সঙ্গে দুইদিন যুক্ত করে ৩১ দিন করা হয়। ফেব্রুয়ারি মাস ২৮ দিনেই গণনা হতে থাকে। তবে প্রতি চার বছর অন্তর একদিন যুক্ত করা হয়। জুলিয়াস সীজারের নামানুসারে প্রাচীন কুইন্টিলিস মাসের নাম বদলিয়ে রাখা হয় জুলাই। ৪৪ খৃস্ট পূর্বাব্দের ১৫ মার্চ জুলিয়াস সীজার রোমনগরে নিহত হন। অন্যদিকে সম্রাট অগাস্টাসের নামানুসারে সেক্সটিনিস মাসের নাম পাল্টিয়ে অগাস্ট করা হয়। মিশরীয়রা সৌর বর্ষ গণনা করতো ৩৬৫ দিনে। কিন্তু জুলিয়াস সীজারের সংস্কারের ফলে তা তিনশ’ সাড়ে পঁয়ষট্টি দিনে এসে দাঁড়ায়। তখন থেকে বর্ষপঞ্জিতে ১ মার্চের পরিবর্তে ১ জানুয়ারীতে নববর্ষ প্রচলন হয়। খৃষ্টাব্দের সংখ্যাকে ৪ দিয়ে ভাগ করলে যদি মিলে যায়, তবে সে বছর ফ্রেব্র“য়ারী মাস ২৮ দিনের পরিবর্তে ২৯ দিন হবে। । যীশুখৃস্টের জন্ম বছর থেকে গণনা করে ডাইওনীসিয়াম এক্সিগুয়াস নামক একখৃস্টান পাদরী ৫৩২ অব্দ থেকে খৃস্টাব্দের সূচনা করেন। ১৫৮২ খৃস্টাব্দে রোমের পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরী জ্যোতির্বিদগণের পরামর্শে জুলিয়ান ক্যালেণ্ডার সংশোধন করেন। তার নির্দেশে ১৫৮২ খৃস্টাব্দের অক্টোবর ১০ দিন বাদ দেয়া হয়, ফলে ঐ বছরের ৫ তারিখকে ১৫ তারিখ করা হয়। পোপ গ্রেগরী ঘোষণা করেন যে, যেসব শত বর্ষীয় অব্দ ৪০০ দ্বারা বিভক্ত হবে সেসব শতবর্ষ লিপ ইয়ার হিসাবে গণ্য হবে। পোপ গ্রেগরীর বর্ষপঞ্জি সংস্কারের পর থেকে রোমান বর্ষপঞ্জি পন্ডিতদের কাছে গ্রেগরীয়ান বর্ষপঞ্জি হিসাবে খ্যাত হয়েছে। কিন্তু এ সংস্কার মানুষ সহজে মেনে নেয়নি। ইউরোপের দেশে দেশে এ নিয়ে চলছিল দীর্ঘদিনের বাদ-প্রতিবাদ। তদুপরি খৃষ্টানদের রোমের ‘ক্যাথলিক’ বনাম ‘প্রোটেসটেন্ট’ বিরোধের কারণে গ্রেগরীয়ান সংস্কার গ্রহণে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছিল। অবশেষে ১৭৫২ সালে ইংল্যান্ডে ১৯১২ সালে চীনে ও আলবেনিয়াতে, ১৯১৮ সালে রাশিয়াতে ও ১৯২৭ সালে তুরস্কে সরকারীভাবে গ্রেগরীয়ান বর্ষপঞ্জি গৃহীত হয়। যীশুখৃষ্টের নামের সঙ্গে রোমানদের ধারাবাহিক বর্ষ গণনা বা খৃষ্টাব্দ অপেক্ষাকৃত পরবর্তীকালের সংযোজন। যীশুখৃষ্টের মৃত্যুর ৭৫০ বছর পরে রোমেন খৃষ্টান পাদ্রীগণ ধারাবাহিক বর্ষ হিসাবে যীশুর স্মরণে পশ্চাদ গণনার মাধ্যমে খৃষ্টাব্দ চালু করেন। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী যীশুর জন্ম-বর্ষকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ‘খৃষ্টাব্দ’ চালু হয়েছে। সে হিসাবে বলা চলে যীশুখৃষ্টের জন্ম হয়েছিল ২০০৭ বছর আগে। আসলে কিন্তু তা নয়। যীশুর জন্ম বর্ষ পাবার জন্য প্রচলিত খৃষ্টাব্দের সঙ্গে আরও ৪ বছর যোগ করতে হবে। সম্ভবত তাঁর মৃত্যুবরণের ৭৫০ বছর পরে ‘খৃষ্টাব্দ’ চালু করার সময় রোমান পাদ্রীগণ প্রকৃত তথ্য খুঁজে পেতে ভুল করেছিলেন। তাছাড়া এ মহাপুরুষের প্রকৃত জন্মদিন বা তারিখ সম্পর্কেও বিভ্রান্তি রয়েছে। আজকাল সারা বিশ্বব্যাপী ২৫ ডিসেম্বর যীশুর জন্মদিন বা বড়দিন পালিত হয়। এক সময়ে খৃষ্টান পাদ্রীগণ জানুয়ারী মাসে যীশুর জন্মদিন পালন করতেন, তারও আগে ২০ মে তারিখ জন্মদিন উদযাপিত হত। ১ জানুয়ারী রোমান বর্ষপঞ্জির নববর্ষ; এদিনে খৃষ্টীয় সনের খৃষ্টাব্দের নববর্ষ শুরু হয়। কমবেশী সারাবিশ্বে দিবসটির একটি আবেদন রয়েছে। আমরা ১ জানুয়ারী থেকে নতুন ক্যালেন্ডার ব্যবহার করি। এই গ্রেগরীয়ান নূতন বছর বা খৃষ্টীয় সনকে ইংরেজি বর্ষপঞ্জি তথা ইংরেজি সন বলার প্রবণতা দেখা যায়। অনেকেই ১ জানুয়ারিকে ইংরেজি নববর্ষ হিসাবে চিহ্নিত করেন। অথচ ইংরেজি বর্ষপঞ্জি বা ইংরেজি সন বলতে প্রকৃত প্রস্তাবে কিছুই নেই। (সূত্র : সংগৃহীত)

***************************************

গণনার হিসেবের তারতম্য হলেও, দিনরাত-মাস-বছর হয়েই চলেছে আদিকাল থেকে প্রাকৃতিক নিয়মে। দিন-মাস-বছর আসে যায়, রেখে যায় কিছু স্মৃতি মনের মণিকোঠায়। ওইসব স্মৃতির মালাগুলোকে স্মৃতিবাহীচেতনার ভল্টে অনন্তকাল জমা করে রাখার জন্য আর্য্য-ঋষিরা প্রতিটি মুহূর্তের জীবন ধারণের আহরণকে শুদ্ধি করার মাধ্যমে ধ্রুবাস্মৃতির সন্ধান দিয়ে গেছেন। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র স্বস্ত্যয়ণী ব্রতের “নিয়তং স্মৃতিচিদযুতে” মন্ত্রে যাকে সমৃদ্ধ করেছেন। কেননা, যে মুহূর্ত চলে যাবে তা আর ফিরে আসবে না। চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা সমৃদ্ধ সবুজ গ্রহ পৃথিবীর প্রতিটি মুহূর্তকেই যাতে চিরনবীনতায় আস্বাদন করতে পারি, উপভোগ করতে পারি সেজন্যই আর্য্য সভ্যতার ঊষা লগনে পরমপিতার প্রতিভূ আর্য্য ঋষিগণ ‘‘মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ……..’’ মন্ত্রে বন্দনা করে বসুন্ধরার মধুময় পরিবেশকে রক্ষা অর্থাৎ পূজা করতে শিখিয়েছিলেন। পূজা শব্দের অর্থ সম্বর্দ্ধনা। যেমন যেমন আচরণে পরিবেশের অজৈব উপাদানসমূহকে রক্ষা করে সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া যায় তাই ছিল আর্য্য ভারতের পূজা, যজ্ঞ, হোম বা উৎসবের তাৎপর্য্য ।

আমরা যে ৩৩ কোটি দেবতার কথা শুনেছি সে সংখ্যাটা বাস্তবে ৩৩,০০০০০০০ নয়, শুধুই ৩৩। কোটি অর্থে piece বোঝান হয়েছে, যথা, জীবকোটি, ঈশ্বরকোটি শব্দ একক অর্থে ব্যবহৃত হয়।

এই সবুজ গ্রহের জীবকূলের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জৈবাজৈব রসদের যোগানদাতার মূল মালিক সূর্য। সূর্যের আর এক নাম আদিত্য। আদিত্য মানে দেবতা, দেদীপ্যমান যা’ তাকে দেবতা বলে। পৃথিবী, অন্তরীক্ষ ও দ্যুলোকের প্রতিটি স্থানে ১১টি করে বেঁচে থাকার আবশ্যিক উপাদান সরবরাহকারী দেদীপ্যমান উৎস রয়েছে। প্রাকৃতিক ওই ৩৩টি বা ৩৩কোটি উৎসকে রক্ষা করার প্রশ্নে আমরা প্রবৃত্তি পরবশ হয়ে যাতে দুর্বৃত্ত না হই তারজন্য উপনিষদের ঋষিরা স্মরণ করিয়ে দিলেন ‘আত্মানং বিদ্ধি’-র কথা। —পরমপিতার সন্তান তুমি, নিজেকে জানো, নিজের প্রতিরূপ মনে করে পরিবেশকে বাঁচাও, নিজে বাঁচ। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’—জীবনবিধ্বংসী আচরণ ত্যাগ করে জীবনবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলো। ‘মা গৃধ’—লোভ করো না। সদাচার এবং বর্ণাশ্রম মেনে চলো। পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে নিজে সমৃদ্ধ হও। এই ছিল ভারতবর্ষের বিধি-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠনের, ধর্মের, পূজার বা উৎকৃষ্ট প্রসবকারী আচরণ বা উৎসব উদযাপনের নিত্যবাস্তব রূপ। যার উপর প্রতিষ্ঠিত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৎসঙ্গ আন্দোলন। আমাদের নিত্য সাধনার আর্য্য-সন্ধ্যা বন্দনায় যা’ অনুশীলন করতে শিখিয়েছেন যুগ-বিধায়ক পরমবিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। অথচ আমাদের সৎসঙ্গের লোগো-বাহকেরা সেগুলোকে বাদ দিলন। “সত্যমেব জয়তের” ধারকেরা, ওই মহান মন্ত্রের ধ্বজাধারীরা সেইসব পবিত্র কর্তব্য ভুলে, বিজ্ঞানীদের সচেতন-বার্তাকে অগ্রাহ্য করে উৎসব পালনের নামে লোভাদি প্রবৃত্তি-পরায়ণতার উচ্ছৃঙ্খলতাকে উস্কে দিয়ে প্রাকৃতিক এবং আত্মিক পরিবেশকে যে হারে দূষিত করে চলেছি তা কতখানি উৎকৃষ্ট প্রসব করে উৎসব শব্দটিকে সমৃদ্ধ করবে সে হিসেব কষবে কবে সত্যমেব জয়তের আধিকারিকেরা?

যাইহোক, থেমে থাকলো তো আর চলবে না, চরৈবেতি-র নিদেশ
মেনে এগিয়ে যেতেই হবে ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যে।

খ্রীষ্টাব্দের 2023তম বর্ষের স্মৃতিমেদুর আশা-হতাশা,
চাওয়া-পাওয়া, সুখ-দুঃখ,

মিলন-বিচ্ছেদ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, প্রেম-হিংসার
জাবেদা খাতার সঞ্চয় জমা

রেখে সম্মুখের দিকে এগিয়ে চলার মাহেন্দ্রক্ষণ
সমাগত। সমাগত পরমপুরুষ

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রবর্তিত ঋত্বিক
অধিবেশন মাধ্যমে আমরা প্রস্তুত
2024তম বর্ষ-এর নতুন সূর্যকে স্বাগত জানাতে।

প্রাণের প্রাণ-স্পন্দন টিঁকিয়ে রাখার উৎস, আমাদের এই সবুজ
গ্রহের

অভিভাবক, সকল শক্তির উৎস জ্যোতির্ময় সূর্যের
তেজোময় দীপ্তিতে আমরা যেন

সকল প্রকার কলুষতা ত্যাগ করে দীপ্তিমান চরিত্রের
অধিকারী হতে পারি।

আমাদের মনুষ্যত্ব যেন দূষিত না হয়। আকাঙ্খার মোহে
পড়ে আমরা যেন আমাদের

পঞ্চ-মহাভূত সম্ভূত পরিবেশকে দূষিত না করি।
ভিনগ্রহের প্রাণীরা যেন

পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ-প্রাণীদের দিকে আঙুল
উঁচিয়ে বলতে না পারে
,
যে

আমরা অসভ্য, ভোগবাদের জোয়ারে ভাসতে গিয়ে সুস্থভাবে
বেঁচে থাকার
, বাঁচিয়ে

রাখার অনুকূল পরিবেশকে বিনষ্ট করছি। তাহলে সেটা বড়
লজ্জার ব্যাপার হবে।

হে অন্তর্যামী পরমপিতা! তুমি আমাদের শুভবুদ্ধি দাও, আমরা যেন সমাগত

2024-এর নতুন সূর্যের কিরণে স্নাত হয়ে নতুন
প্রাণ
, নতুন সুর, নতুন গান,

নতুন ঊষা, নতুন আলোর নবীনতায় নতুন বছরকে
সম্বর্দ্ধিত করতে পারি। কেটে যাক

আমাদের সব বিষাদ, সব আতঙ্ক— পরমপিতার আশীষধারায়
এসে যাক হর্ষ
, শুভ হোক 2024-এর
খ্রীষ্টিয় নববর্ষ।

আগন্তুক ব্যাধির নবীন সংস্করণের ভয়ে ভীত না হয়ে, আধ্যাত্মিক,
আধিদৈবিক ও আধিভৌতিকাদি ত্রিতাপ জ্বালায় সদাচারের ইষ্টবারি সিঞ্চন
করে
একদিন-প্রতিদিনেরচিরনবীন
সূর্যালোকের নবীন ছটায় পরমপিতার অনুশাসনের

আশীষধারায় অজর, অমর, চিরচেতনতার
সাধনাকে আপ্ত করে আমরা যেন

ঈশ্বরপ্রাপ্তির গন্তব্যের চরৈবেতিতে নিরবচ্ছিন্ন
থাকতে

পারি।—বর্ষবিদায়-বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে সীমায়িত
না থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর

অনুকূলচন্দ্রের দিব্য-নিদেশের দিনচর্যার আঙ্গিকে—

‘‘ঊষার রাগে উঠবি জেগে শৌচে শীতল হবি,

সন্ধ্যা-আহ্নিক জপ সাধনায় ঈশের আশিস লবি,

কুতুহলে পড়শি ঘুরে দেখবি সযতনে,

আছে কেমন কোথায় কে জন মন দিবি রক্ষণে,

তারপরেতে বাড়ী এসে শৌচে যথাযথ

গৃহস্হালীর উন্নয়নী অর্জ্জনে হরত,

স্নানটি সেরে আহ্নিক করে ক্ষুধামতন খাবি,

একটু চলে বিশ্রাম নিয়ে আগুয়ানে ধাবি,

এমনি তালে সচল চালে চলে সন্ধ্যা এলে,

শৌচে শুদ্ধ হয়ে করিস আহ্নিক হৃদয় ঢেলে,

উন্নয়নের আমন্ত্রনী গল্প-গুজব শীলে,

হৃষ্টমনে আলোচনায় কাটাস সবাই মিলে,

পড়শী দিগের অভাব-নালিশ থাকেই যদি কিছু

তার সমাধান যেমন পারিস করিস লেগে পিছু,

করন-চলন ধরন-ধারন যজন যাজন কিবা

সকল কাজেই ইষ্টস্বার্থে চলিস রাত্রি-দিবা,

আদর-সোহাগ উদ্দীপনী কথায় কাজে ঝুঁকে,

স্বার্থ-কেন্দ্র সবার হবি ধরবি ইষ্টমুখে,

বিশ্রামেরই সময় গা-টি ঘুমল হয়ে এলে,

ইষ্ট-চলন মনন নিয়ে ঘুমে গা দিস ঢেলে।’’

(অনুশ্রুতি গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্রের বাণী)-র আলোকে

বছরের প্রতিটি দিন হয়ে উঠুক অমৃত-তপনার
উৎসব—খ্রীষ্টিয় নববর্ষ
2024-কে

স্বাগত-স্মরণের প্রাক্কালে এই প্রার্থনা জানাই
পরমপিতার রাতুল চরণে।

 

এ বিষয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। পরমপুরুষের নিদেশ মেনে মানব সভ্যতাকে যদি
“পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চি”-র অনুশাসনবাদের অনুশীলনে পরিচালনা করা না
যায়
, তাহলে
আমাদের এই সবুজ গ্রহের বাসিন্দারা অচিরেই বিপন্ন হয়ে পড়বে। সচেতন মানুষেরা একটু
ভেবে দেখবেন। জয়গুরু। সবাই আমার প্রণাম নেবেন। বন্দে পুরুষোত্তমম্!

 

ধনতেরাস কি ও কেন

** ধন্তেরাস্ কি ধনবৃদ্ধির জন্য পালিত হয়? আর ১৪ শাক কেনই বা খায়? জানুন। **

নিবেদনে—তপন দাস

************************

ধনতেরস সোনার গয়না নয়, আয়ুর্বেদ ঔষধ কেনার দিন। ধন্বন্তরী নামে কাশীতে এক রাজা ছিলেন। তিনি তার রাজত্বের বাইরে গিয়েও আয়ুর্বেদ প্রচার করেন। তার প্রচারেই আয়ুর্বেদ আমাদের দেশে এতো প্রসিদ্ধ। তাই আয়ুর্বেদ মহৌষধের কথা উঠলেই স্মরণ করা হয় ধন্বন্তরীর নাম।

তিনি আশ্বিন মাসের কৃষ্ণ ত্রয়োদশী তিথিতে জন্ম গ্রহণ করেন, তাই তখন থেকেই আয়ুর্বেদ প্রেমিকরা তাঁর জন্ম তিথি ধন্বন্তরী ত্রয়োদশী হিসাবে পালন করে। হিন্দিতে এটাকে ধন্বন্তরী তেরস বা সংক্ষেপে ধনতেরস বলে। এর সাথে ধন বা অর্থের কোনো সম্পর্ক নেই।

সেই বৃত্তান্ত স্মরণে রেখে অনেকেই ধনতেরসে তাঁর পূজা করে থাকেন। সবচেয়ে বড়ো কথা, ভারত সরকারের ‘আয়ুশ’ মন্ত্রক এই দিনটিকেই ‘জাতীয় আয়ুর্বেদ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

ধন্বন্তরী জন্মেছিলেন ত্রয়োদশী তিথির শেষ লগ্নে। চতুর্দশীর শুরুতে। তাই ধন্বন্তরীর মতো আয়ুর্বেদকে মর্যাদা দিতে চতুর্দশী তিথিতে বিশেষ ভেষজ গুণযুক্ত চোদ্দটি শাক খেয়ে শরীরে প্রাকৃতিক ভ্যাক্সিন প্রবেশ করানো হয়। যাকে আমরা ১৪ শাক খাওয়া বলে থাকি। অনেকেই এই দিনে চোদ্দ শাক খেয়ে থাকে।

May be an image of text that says "ভূত চতুর্দশীর চৌদ্দ শাক ওল কেউ বেতো সর্ষে নিম SSA জয়ন্তী শাঞ্চে হেলেএঞা পলতা শৌলফ কালকাসুন্দে গুলঞ্চ ভাঁটপাতা শুষণী"

All reactions:

7Sumana Bhattacharya, Utpala Roy Tumpa and 5 others

।। শক্তির আরাধনা ও কালীপূজা।।

শক্তি মানে সমর্থ হওয়া, আর আরাধনা মানে আয়ত্ত করা। সাত্তিক দৈবীশক্তির বিহিত প্রয়োগে মানুষ কাঙ্খিত জীবনবৃদ্ধির পথে অগ্রসর হতে এবং হওয়াতে পারে। আবার, প্রবৃত্তির আসুরিক শক্তির অবিহিত প্রয়োগে সপার্ষদ জীবনহানির পথে অগ্রসর হওয়াটাও স্বাভাবিক।–রাবন, দুর্যোধন যার সহজ দৃষ্টান্ত।

শুম্ভ-নিশুম্ভদের অবস্থাও তাই হয়েছিল। প্রবৃত্তির শক্তির দম্ভের যবনিকা পতন ঘটালেন আদ্যাশক্তির প্রতীকস্বরূপা নারীশক্তি মাকালী। তাই হ্লাদিনী শক্তিরূপিনী নারী জাতিকে আদ্যাশক্তির প্রতীক জ্ঞানে সম্মান, শ্রদ্ধা বা পূজা (সম্বর্দ্ধনা) না করলে পুরুষের শক্তি খর্ব হয়।

আমরা যে মা-কালীর পূজা করি, তিনি তো দিগম্বরী! বাস্তবে আমরা সকলেই আমাদের দিগম্বরী মায়েদের অপত্য পথ বেয়ে একদা ভূমিষ্ট হয়েছিলাম। ভারতীয় আর্য্য মনীষা যে পথকে যজ্ঞকুণ্ড, যজ্ঞবেদী বলে বর্ণনা করেছেন, শুধুমাত্র কাম ভোগের যন্ত্রস্বরূপ নয়! সৃষ্টি প্রকরণের আগম-নিগম দ্বার। অতএব যে যোনী আমার জন্মস্থান, যে স্তনযুগলের অমৃতধারা পান করে আমি শক্তিশালী হয়েছি, সেই যোনী এবং সেই স্তনযুগল তো আমার শক্তির আরাধনার প্রতীকস্বরূপ!—এই ভাবে ভাবিত না হতে পারলে মা কালীর সাধনা করা সম্ভব না!

আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় পুরুষোত্তম শ্রীরামকৃষ্ণ, সাধক রামপ্রসাদ প্রমুখগণ প্রচলিত তন্ত্রমতের পঞ্চ ম-কারের পূজা-পদ্ধতিকে অগ্রাহ্য করেই শুধু শুদ্ধাভক্তি দিয়েই মা-কালীকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। আর শ্রীরামকৃষ্ণদেব তো ফলহারিণী কালী পূজার পুণ্য লগ্নে সারদা দেবীকে সাত্তিক শুদ্ধাভক্তির উপাচারে সারদাদেবীকে পূজা করে চিন্ময়ী নারী শক্তিকে আদ্যাশক্তি রূপে প্রতিষ্ঠিত করলেন! মাতৃ-সাধনাকে ধরে রাখতে ঠাকুর কামিনী-কাঞ্চন থেকে তফাত্—তফাত্—খুব তফাত্ থাকতে বলেছেন।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সত্যানুসরণে বললেন, “প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী । প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয় ।”

এবং পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, “স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যে-জন, তাহার হয় না ভবের বন্ধন মোচন । স্ত্রী চিন্ময়ী মা ।”

তিনি নারী-সাধারণকে মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েই ক্ষান্ত হন নি, স্ত্রীকেও চিন্ময়ী মা জ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শেখালেন । কারণ, স্ত্রীর মাধ্যমে স্বামী নিজেকে জন্মান, তাই স্ত্রীকে জায়া বলা হয়েছে । আর্য্য বিধির গর্ভাধান কালে স্ত্রীর নাভিমূল স্পর্শ করে “প্রসীদ মা জগজ্জননী” মন্ত্রে অভিষিক্ত করে স্ত্রীর গর্ভে নিজেকে প্রবেশ করাতে হয় । আর্য্য ভারতের প্রজা-সৃষ্টি প্রকরণের কি অপূর্ব ব্যঞ্জনা । যৌন জীবনে পুরুষদের শিব, আর নারীদের শক্তি জ্ঞানে অভিষিক্ত করে কাম (lust) কে আসুরিক প্রবৃত্তির কবল থেকে মুক্ত করে দৈবীপ্রেমে (love) রূপান্তরিত করলেন । ব্যবহারিক ক্ষেত্রের বাস্তব জীবনে শুদ্ধভাবের কালী পূজা করতে শেখালেন। তাই, পুরুষ এবং নারী সাধারনকে প্রবৃত্তি-প্ররোচিত শিক্ষার অঙ্গন থেকে মুক্ত করে, এই সত্তাধর্মী ব্যবহারিক কালীপূজার তুক না শেখাতে পারলে কিছুতেই ট্রিট্ করা যাবে না কুতসিত যৌবন-উন্মত্ততার ফলস্বরূপ নারী নির্যাতন, ডিভোর্স, ধর্ষণ নামের সামাজিক ব্যাধিদের! যে নারীশক্তি শুম্ভ-নিশুম্ভকে দমন করেছিলেন, সেই নারীরা যদি অসুর-পুরুষদের কামনার বলি হয় এর চাইতে সভ্যতার সংকটের আর কিছু হতে পারে না!

তাই আসুন আমরা আমাদের অন্তরের কালিমা থেকে নিজেদের মুক্ত করে যথার্থতায় সার্থক করে তুলি সমাগত কালী পূজাকে।

‘পূজা’ মানে তো সত্তা বা অস্তিত্বের অভাব পূরণ করার সম্বর্দ্ধিত করার একটা মাধ্যম । এর সাথে সাধনা, উপাসনা, সংযম জড়িয়ে আছে । যাতে আমরা সুস্থ শরীর, সুস্থ মানসিকতা অর্জন করে পরিবেশকে বাঁচিয়ে রেখে নিজেরা সুস্থভাবে বাঁচতে পারি, বৃদ্ধি পেতে পারি । কালিপুজোর অজুহাতে বাজি, শব্দবাজি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে আকাশ, বাতাস, ইন্দ্রিয়সকল কলুষিত করার অনুষ্ঠান কোন অস্তিত্বের পরিপোষক ? কোন শাস্ত্র, কোন মহাপুরুষ পূজার নামে এ ধরণের অবৈজ্ঞানিক তাণ্ডবের বিধি দিয়েছেন ? ‘সত্যমেব জয়তে’র আধিকারিকেরা জানালে বাধিত থাকবো ।

“খাওয়া-দাওয়া, বাজী পোড়ানো,

অঢেল ঢালা আয়োজনে,

পূজা সার্থক হয় না,

বিনা দৈব গুণের সংসাধনে ।

(শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)

পূজা ও ধর্ম্ম

।। পূজা ও ধর্ম্ম ।।
নিবেদনে—তপন দাস
***********************************
আমাদের প্রচলিত ধারণায় প্রচলিত পূজা হচ্ছে ধর্ম পালনের একটা মাধ্যম। তথাকথিত পুরোহিত বা ঠাকুর মহাশয়ের ফর্দ মেনে, একটু দর কষাকষি করে উপকরণ সংগ্রহ করে এনে দিলেই হলো। (লাইট, মাইক, প্যাণ্ডেল, থিম, বাজি-বাজনা ইত্যাদি ফর্দ-অন্তর্ভূক্ত কিনা বলতে পারব না।) আয়োজকের প্রতিনিধি হয়ে দেবদেবীকে তুষ্ট করবেন তথাকথিত পুরোহিত মহোদয়। আহুত, অনাহুত, রবাহুত দর্শকেরা আয়োজনের বিচার-বিশ্লেষণ করবেন। এইরকম একটা আয়োজনকে আমরা পুজো বলতে অভ্যস্ত।
বাস্তবে, শব্দার্থ এবং মর্মার্থ অনুযায়ী পূজা মানে সম্বর্ধনা। পূজ্য চরিত্রের গুণ অনুশীলন করে নিজেকে সম্বর্ধিত করা। আর ধর্ম মানে ধারণ করা। নিজের এবং অপরের অস্তিত্বের ধারক, পালক ও পোষক হবার জন্য যা যা করা হয়, তাই ধর্ম। জীবনবর্দ্ধনার অপচয়ী অনিত্যকে ত্যাগ করে, জীবনবর্দ্ধনার উপচয়ী নিত্য-এর উপাসনা করা, আরাধনা করা। যার যার, তার তার, পালনীয়। কোনো ভায়া-মিডিয়া দিয়ে হবে না। যার ক্ষিদে তাকেই খেতে হবে, ক্ষুধার্তের হয়ে অন্য কেউ খেলে ক্ষুধার্তের কি পেট ভরবে? অথচ আমরা এই কাজটাই করে চলেছি। যাঁর পুজোর নামে মেতে উঠছি, তাঁর আদর্শ কি, তাও জানিনা, কিভাবে অনুশীলন করতে হয়, তাও করি না। আমাদের কাজ চাঁদা দেওয়া, নতুন পোশাক পরা, ধুপহীন ধুপকাঠি, ফল-মিষ্টি মণ্ডপে দিয়ে প্রতিমার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে সমস্যার সমাধান চাওয়া। আর খাওয়া দাওয়া, ভিড় ঠেলে চেঁচামেচি, মাইকের আওয়াজ, হৈ-হট্টগোলকে সাথী করে এ প্যাণ্ডেল থেকে ও প্যাণ্ডেলে পর্যটন করা! ব্যস্!
*****************************************
যাইহোক এবার একটু গভীরে প্রবেশ করার চেষ্টা করি।
ভারতের আর্য্য-ঋষিগণ, অবতার-বরিষ্ঠগণ প্রত্যেকেই সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির
উপাসনার কথা বলেছেন ধর্মের নামে, পূজার নামে। বর্তমান পুরুষোত্তম
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আরও একটু সহজ করে দিয়ে বললেন, ‘‘ধর্ম্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম্ম না-রে। অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম্ম
বলে জানিস্ তাকে। পূর্বতনে মানে না যারা/জানিস্ নিছক ম্লেচ্ছ তা’রা।’’
‘‘পূজা-আর্চ্চা মানেই কিন্তু /দৈবগুণ যা সেধে নেওয়া। হাতে-কলমে মক্স
করে/বাস্তবে তার রূপটি দেওয়া।।’’
ইত্যাদি ছড়াবাণীগুলো সহজ, সরল, ওজস্বী
আবেদনে সমৃদ্ধ হলেও একটা নির্দিষ্ট গণ্ডীর ভাষা-ভাষীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
ওই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দিতে বললেন,
‘Upholding urge of existence is Dharmma.’ বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্তা বা
অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করে উৎকর্ষতায় রক্ষা করার নাম ধর্ম। তথাপিও
আমরা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতার, কু-সংস্কারের, অজ্ঞানতার আবরণ ভেদ করে
শুদ্ধ আমিটাকে বের করতে ব্যর্থ হলাম। তথাকথিত ইনটেলেকচ্যুয়াল হওয়া সত্বেও
ধর্মের নামে ফুল, বেলপাতা, ধূপবিহীন ধূপকাঠি, ফল-মিষ্টান্নাদির অঢেল
আয়োজনে, মাইক বাজিয়ে, শব্দবাজির আওয়াজ দিয়ে পরিবেশবিদদের চিন্তার
বলিরেখায় ভাঁজ ফেলে দিতে ইন্ধন যোগাচ্ছি। আর আমাদের গর্বের রবীন্দ্রনাথ
আমাদের দ্বিচারিতা দেখে কষ্ট পাচ্ছেন আর ভাবছেন, যে মানুষগুলো ‘তোমার
পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার
তলে’ ইত্যাদি ছন্দের ডালি সাজিয়ে ভক্তির আবেদন জানায়, তারাই আবার পূজার
নামে কু-সংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে বিশ্বাত্মাকে দূষিত করে চলেছে।
আমাদের বর্তমান যুগ যে যুক্তিবাদী সে কথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি
অস্বীকার করবেন না আশাকরি। যেমন, সন্তানের হয়ে মা খেলে সন্তানের পেট ভরবে
না। ছাত্রের হয়ে শিক্ষক লেখাপড়া করলে ছাত্র পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে
না।–তেমনি প্রচলিত পূজার আয়োজকদের হয়ে কোন পুরোহিত পূজা করলে আয়োজকদের
কিছু ফললাভ হবে কি ?
অবশ্য পুরোহিতও জানেন না ফললাতের বিষয় সম্পর্কে। যদি জানতেন বিসর্জন
মন্ত্রে বলতেন না—ওঁ আবাহনং ন জানামি, নৈব জানামি পূজনম্। বিসর্জনং ন
জানামি ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি (পরমেশ্বর)।–অর্থাৎ আমি আবাহনও জানিনা,
বিসর্জনও জানিনা, আমাকে ক্ষমা করুন। (দ্রঃ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)
বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী পূজ্য-প্রতিমা চঞ্চল চিত্তের
ধারণের জন্য একটি অবলম্বন। প্রতিমাকে ব্রহ্মের রূপ কল্পনা করে উপাসনা,
সংযম, সাত্তিক আহার, সাত্তিক বিহার ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে পূজা
করা হয়।–যাতে পূজক বা উপাসক মনসংযোগ দ্বারা প্রতিমাকে হৃদয়ে ধারণ করে
প্রতিমার গুণে গুণান্বিত হতে পারে। এই হলো প্রতিমা পূজার মূল কথা।
এ থেকে এটুকু বোঝা গেল যে সততা, সংযম, ন্যায়নীতি ইত্যাদি মানবিক
গুণগুলোর প্রবহমানতাকে বৎসারান্তিক নবীকরণ করার মাধ্যম বাহ্য-পূজা
উদযাপনের উদ্দেশ্য। অথচ বাঙালীর সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার আয়োজন
বিশ্লেষণ করলে এর বিপরীত চিত্রটাই আমাদের বোধে ধরা পড়ে।
বিজ্ঞানের বিধি অনুযায়ী একটা নির্ভুল অংক কষতে গেলেও একটা শান্ত পরিবেশ
প্রয়োজন, একাগ্রতার প্রয়োজন। কিন্তু পূজার নামে, বেশীরভাগ
পূজা-প্রাঙ্গনগুলোতে ঢাকের আওয়াজ, মাইকের আওয়াজ, আয়োজকদের অহংকারের
আওয়াজে কোন সুস্থ মানুষের একটি ঘণ্টার জন্যও একাগ্রভাবে, স্থিরচিত্তে বসে
থাকতে পারার কথা নয়! অবশ্য দেবদেবীর ব্যাপারটা আলাদা। মাটির পুতুল বলেই
আমাদের সব অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করতে পারে! তাই কবিগুরুর ভাষার ‘তোমার
পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’ বাণীগুলো এক নির্মম সত্যের বার্তা দেয় না
কি ?
বাঙালিদের মানস-দেবী মা দুর্গা। ‘যা দেবি সর্বভূতেষু’ মন্ত্রে যাঁর
অস্তিত্বের স্বরূপ প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ দেবী সর্বভূতের প্রাণশক্তি
স্বরূপা, সর্বভূতে দেবী অধিষ্ঠিতা। এবার প্রশ্ন, যে দেবী সর্বভূতে
অধিষ্ঠিতা সেই পঞ্চ-মহাভূত পরিপোষিত স্বেদজ, ক্লেদজ, অণ্ডজ, জরায়ুজ-জাত
ভূতগুলোকে, বেঁচে থাকার জৈবাজৈব আবশ্যিক উপাদানগুলোকে দেবীর প্রতিভূ মনে
করে সম্বর্দ্ধিত না করে, সুস্থভাবে টিঁকিয়ে রাখার চেষ্টা না করে, কোন
যুক্তিতে মাটির প্রতিমা পূজার নামে প্রাণী হত্যা করে, নানাভাবে পরিবেশকে
দূষিত করার জন্য কোটি কোটি টাকা অপচয় করা হয়!
ভাষা-বিজ্ঞান অনুযায়ী পূজা মানে পূরণ করা, সম্বর্দ্ধিত করা। যে
আচার-আচরণ পরিবেশের সাত্তিক জীবন-বর্দ্ধনার অভাবকে পূরণ করে, জৈবাজৈব
সবকিছুকে সম্যকরূপে বর্দ্ধিত করে, তার নাম পূজা। উৎকৃষ্ট প্রসব করে যা,
তার নাম উৎসব। আর যে আচার-আচরণ জীবনবৃদ্ধিকে নন্দিত করে তার নাম আনন্দ।
এখন প্রশ্ন, আমাদের প্রচলিত পূজা, উৎসবের উদযাপনকে কেন্দ্র করে আনন্দের
প্রকাশ বৃহত্তর পরিবেশকে কতখানি নন্দিত করে ‘পূজা’ শব্দের যথার্থতাকে
উপহার দিতে পেরেছে ? –এইসব বিষয়ে সত্তাপিয়াসী চিন্তাশীলদের চিন্তা করে
দেখা উচিত। বিশেষ করে যাঁরা কুসংস্কার বিরোধী রূপে নিজেদের বোধ ও বোধিকে
প্রতিষ্ঠিত করতে চান।
বাহ্য পূজাবাদীদের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী পূজা শুরুর আগে মৃন্ময়ী
মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। আয়োজকদের বিশ্বাস, পুরোহিতের
মন্ত্রবলে নিষ্প্রাণ মূর্তিগুলো প্রাণবন্ত হয়। তর্কের খাতিরে বিষয়টাকে
সত্য বলে যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে একটা প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে,
জীববিজ্ঞান অনুযায়ী জীবন্ত প্রাণীদের চলন, গমন, ইত্যাদি অভিব্যক্তি থাকা
আবশ্যিক। অতএব বিজ্ঞানসম্মত কারণেই পুরোহিতের মন্ত্রবলে দুর্গাঠাকুরের
চালচিত্রের জীবন্ত দেবদেবী, অসুর, সিংহ, ময়ূর, সাপ, পেঁচা, ইঁদুরেরা নিজ
নিজ অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে। কেউ চুপচাপ স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে পারবে
না। ফলে শুরু হয়ে যাবে মহিষাসুর মর্দিনীর বাস্তব উপস্থাপনা। অসুর,
দুর্গাকে আক্রমণ করবে, সিংহ গর্জন করতে করতে দেবীকে নিয়ে অসুরের দিকে
ধাবিত হবে, বাহনসহ অন্যান্য দেবদেবীরাও যোগদান করবে যুদ্ধে।–এবার
প্রশ্ন–ওই অবস্থায় পুরোহিত, আয়োজকেরা, ভক্তেরা, উদ্বোধন করতে আসা
সেলিব্রিটিরা, নেতা-মন্ত্রীরা কোন পক্ষে যোগদান করবেন? দেবীর পক্ষে না
অসুরের পক্ষে ?
আর একটা প্রশ্ন, যে পুরোহিত আদ্যিকালের দেবদেবীদের কল্পিত মাটির
মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম, তিনি মানুষের প্রাণহীন দেহে আরো
সহজে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন বা পারা উচিত। কারণ, বিজ্ঞান মতে,
মাটির মধ্যে থাকা অণু-পরমাণুর তুলনায় সদ্য মৃতদেহের অণু-পরমাণু বেশী
সক্রিয় থাকে, বেশী জীবন্ত থাকে। মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী সরকারের স্বাস্থ্য
বিভাগ এ বিযয়টা নিয়ে ভেবে দেখতে পারেন। তাহলে অনেক অকালমৃত্যু সহজে রোধ
করা যাবে।
সনাতন ধর্মীয় মতবাদ অনুযায়ী মানুষ অমৃতের পুত্র, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’
বলা হয়েছে। সেই মানুষ যাতে দশবিধ-সংস্কারে সংস্কৃত হয়ে প্রকৃষ্ট জাতক বা
প্রজা হয়, অকালে নিষ্প্রাণ না হয়, সন্ত্রাসবাদী না হয়, রেপ-কেসের আসামী
না হয়, নারীদের মা-দুর্গার প্রতীক জ্ঞানে সম্মান জানায়, ‘অসতো মা সদ্গময়,
তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়’-এর আদর্শ অনুসরণে সমৃদ্ধ
হয়,–সমাজের পুরোভাগে থেকে, ওইসব বিষয়ে মানুষকে সচেতন করে পরিবেশের
হিতসাধন যাঁরা করতেন তাঁদের বলা হতো পুরোহিত।
সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পুরোহিত ঋষি বশিষ্ঠ রামচন্দ্রের রাজসভায়
অকালমৃত্যু-দেহে প্রাণ সঞ্চার করার স্পর্দ্ধা দেখান নি। বিজ্ঞান-যুগের
পুরোহিতেরা যদি পুতুলে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন, মৃতদেহেও পারা
উচিত! যদি না পারেন, ততঃ কিম্!
ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি, ‘পূজা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সম্বর্দ্ধনা।
পূজ্য ব্যক্তিত্বের গুণে গুণান্বিত হয়ে নিজেকে এবং পরিবেশকে সম্বর্দ্ধিত
করা। এতদিন ধরে হাজার-হাজার দুর্গাপূজা করে আমাদের চিন্ময়ী নারীরা
কতখানি সমৃদ্ধ হয়েছে মা দুর্গার আদর্শ চরিত্রের চরিত্রায়নে ? আমাদের
চিন্ময় পুরুষেরা নারী সাধারণকে কতটা মা-দুর্গার প্রতীক মনে করে শ্রদ্ধা
করতে বা পূজা করতে শিখেছে ? আমরা সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির পথে কতটা এগিয়েছি?
আমাদের কতখানি দুর্গতি নাশ হয়েছে? আমাদের সার্বিক জীবন-চলনা দুর্গ-সম
পরিরক্ষিত হয়েছে কতটা?—তথ্য জানার অধিকার বলে এ বিষয়ে জানতে চাওয়াটা
নিশ্চয়ই অপরাধ হবে না! যদিও প্রচলিত তথ্য এর বিপরীত মত প্রকাশ করে চলেছে
দীর্ঘদিন ধরে। পূজাকে কেন্দ্র করে সাত্তিকতা বৃদ্ধি না পেলেও, তামসিকতা
বেড়ে যায় বহুগুণ। পুজোকে কেন্দ্র করে ভক্তদের অনিত্য দেহটাকে
পূজা-বিপরীত সাধের নানা বেশভূষায় সাজিয়ে দিতে বিকিকিনির পসরা সাজিয়ে
যারা বসেন, তারা কি পূজা-সদৃশ সততার দৃষ্টান্ত উপহার দেন সমাজকে ? পূজাই
যদি উদ্দেশ্য তবে ইভটিজিং, আদমটিজিং কেন হবে ? অপরাধ কেন বৃদ্ধি পাবে ?
দূষণ কেন বৃদ্ধি পাবে পূজাকে কেন্দ্র করে ?— এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে
?
দুর্গাপূজার বিষয়টাকে বাস্তববোধে চিন্তা করলে দেখা যাবে, আমাদের আলোচ্য
মা-দুর্গা পূজ্য তাঁর চরিত্রগুণে। মা দুর্গার সমার্থক, মা উমাকে আমরা
কন্যা জ্ঞান করি। তাইতো ফি বছর কৈলাস থেকে নিয়ে আসি। যদিও তাঁকে আনতে এবং
দিতে কে বা কারা যান। কোন রুটে দোলায়, নৌকায়, ঘোটকে এবং গজে যাতায়াত
করেন, সে খবর দেবার দায়িত্ব তথ্যাধিকারীদের, আমার নয়! তবে বাস্তবে মৃৎশিল্পীর কাছ থেকে মণ্ডপে আনা এবং মণ্ডপ থেকে জলাশয়ের বিসর্জনে নেওয়ার সময় পূজাসম সাত্তিকভাব পরিলক্ষিত হয় না।

তবে যাঁরা একটু সাত্তিক ভাবাপন্ন, তাঁরা
দশভুজার চাইতেও দ্বিভুজা উমাকে বেশী পছন্দ করেন বলেই না উমাকে নিয়ে কতই না
আগমনী গানের ডালি সাজিয়ে তাঁকে বরণ করে নিতে চায়। কামনা করি, ঘরে ঘরে
উমার মত আদর্শ মেয়ে যেন জন্মায়। উমাই তো আমাদের মা দুর্গা! ভারতেই শুধু
নয়, সারা বিশ্বের সংস্কৃত মনীষায় নারীজাতির আদর্শরূপে স্বীকৃত, পূজিত।
স্বীকৃতি পাবেনই না বা কেন, পূজিত হবেনই না বা কেন,–কারো কান-ভাঙানিতে
কান না দিয়ে পরমভক্ত-পরমজ্ঞানী শিবকে পতিরূপে বরণ করে, স্বামীর
মনোবৃত্যানুসারিণী স্ত্রী হয়ে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীদের ন্যায়
কৃতি সন্তানদের জননী হয়েছেন। তিনি একজন আদর্শ সংসারী নারী হয়েও অসৎ
নিরোধী তৎপর,–অশুভ শক্তিকে সমুচিত দণ্ড দেবার জন্য রণসাজে সজ্জিত
হয়েছেন। পশুরাজকে করেছেন বাহন। পারস্পরিক শত্রু খাদ্য-খাদক সম্পর্কের
পেঁচা-ইঁদুর, ময়ুর-সাপকে মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ করেছেন। দুটি হাত দিয়েই
বৃহত্তর সংসারের দশদিক সামলাতেন। তাই তো তিনি দ্বিভূজা হয়েও দশ
ইন্দ্রিয়কে বশ করে হতে পেরেছেন দশভূজা। তাই তো তিনি দশপ্রহরণধারিণী। তাই
তো তিনি পূজ্য। –এহেন চরিত্র ‘দেবী’ জ্ঞানে, ‘জগজ্জননী’ জ্ঞানে স্বীকৃতি
তো পাবেনই। তাই তো আমাদের ঋষিরা দেবতাদের সম্মিলিত শক্তিতে সৃষ্ট দেবী
দুর্গা কাত্যায়ন অঙ্গনে মহিষাসুরকে বধ করার পর তাঁর প্রদর্শিত শক্তিকে
দৃষ্টান্ত স্বরূপ চিরস্থায়ী একটা আদর্শে রূপ দিয়েছিলেন। দেবী দুর্গাকে
স্ত্রীজাতির এক আদর্শ প্রতীক রূপে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁরা দেবী দুর্গার ওই
অসৎ-নিরোধী তৎপরতাকে দৃষ্টান্ত বূপে তুলে ধরে নারীসাধারণকে দেবী রূপে,
জগন্মাতা রূপে মর্যাদা দিয়েছেন, কামিনীরূপে নয়। তাইতো বর্তমানেও
সম্ভ্রান্ত হিন্দু নারীদের মধ্যে দেবী পদবি প্রচলিত। ঋষিরা ছিলেন
বিজ্ঞানী। তাই তো তাঁরা দুর্গাপূজার বিধান দিলেন বাস্তব অনুশাসনের
মাধ্যমে। আত্মবিস্তার কল্পে গর্ভাধান-সংস্কারের সময় স্বামী, নিজের
স্ত্রীকে জগন্মাতা জ্ঞানে স্ত্রীর নাভিমূল স্পর্শ করে বলবেন, প্রসীদ মা
জগজ্জননী,–হে জগন্মাতার প্রতীকস্বরূপা চিন্ময়ী মা, তুমি প্রসন্ন হয়ে
আমাকৃত গর্ভাধান মাধ্যমে দেদীপ্যমান আত্মাকে আকর্ষণ কর।–ওই স্বীকৃতির
মাধ্যমে স্ত্রীকেও মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েছেন, কামিনীজ্ঞানে নয়।
এর কারণ, স্বামী, স্ত্রীর মাধ্যমে নিজেকে জন্মান, তাই তিনি জায়া।
জীববিজ্ঞান অনুসারে প্রজনন-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আত্ম-প্রতিলিপি গঠন করা
হয়। পুরুষ-বীজ ধারণ করে, বীজের প্রতিলিপি গঠন করে ভূমি-স্বরূপা নারী। জনন
করেন বলে জননী। তাই কৃষকেরা ফসল ফলাতে জমি কর্ষণ করে, কর্ষণ মানে আকর্ষণ,
যাতে জমি বীজ থেকে ভালো সন্তান (ফসল) আকর্ষণ করতে পারে। জমি অনুযায়ী
উপযুক্ত শুদ্ধ-বীজ বপনের আগে ভূমিকে আগাছা মুক্ত করে, সার দেয়, জল দেয়,
জমি জননক্ষম হলে জো বুঝে বীজ বোনে।–জমিকে মাতৃজ্ঞানে পোষণ দিয়ে ভূমিকে
পূজা করে—যাতে জমি বীজের অন্তর্নিহিত সত্তাকে ভালোভাবে পুষ্ট করতে পারে,
বীজের সত্তাকে ধারণ করে আদর্শ মা হয়ে ভালো ফসল ফলাতে পারে। ফসল ফলাতে যদি
গর্ভাধান প্রক্রিয়া থাকতে পারে, মানুষ ফলাতে তো আরও বেশী বিধি-নিয়ম থাকা
উচিত! আমাদের ঋষিরা ছিলেন প্রকৃত বিজ্ঞানী। বিজ্ঞান শব্দটিও উপনিষদ থেকে
উৎপত্তি হয়েছে। তাই ঋষিরা নারীদের জগন্মাতাজ্ঞানে ব্যবহার (treat) করতে,
শ্রদ্ধা (honour) করতে শিখিয়েছেন।–যার নাম প্রকৃত পূজা। যার মাধ্যমে
স্বভাবের স্ফূরণ হয়ে সব অভাবের পূরণ হয়।
এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন, “Accident-এ (আকস্মিকভাবে) যা’ জন্মে, তা
বুনো, বিহিত সুফলপ্রদ চাষে যা’ জন্মে তা’ পুণো (পুণ্য)। প্রবৃত্তি লালসায়
অবিধিপূর্বক উপগতি হয়ে যে সন্তান জন্মে, তার চরিত্রের কোন ঠিক ঠিক থাকে
না। গর্ভাধান সংস্কারের ভিতর দিয়ে উন্নত চিন্তাপ্রসূত বিধিমাফিক পবিত্র
যে জন্ম, তার রকমই আলাদা। ঘরে ঘরে ভগবান জন্মে। তেমনি ছিল আমাদের
বিধান।’’ (আঃ প্রঃ ১৮/১৩) অতএব আমাদের ঘরের মা দুর্গারা যেদিন আবার ঘরে
ঘরে ভগবান জন্মাতে পারবেন সেদিন সার্থক হবে আমাদের দুর্গাপূজা।
দুর্গাপূজার বাস্তবতা তুলে ধরতে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেনঃ
“….যে মৃন্ময় মূর্ত্তি
আমরা পূজা করি—
কল্পনায় প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করে,–
তিনি দশভূজা,
দশপ্রহরণ-ধারিণী—
ঐ আমাদের মায়েরই প্রতীক—
আমাদের ঘরে ঘরে
যে মা অধিষ্ঠিতা
তাঁরই বিনায়িত সুসঙ্গত প্রতীক;
তাই ঐ মায়ের পূজা মানেই হচ্ছে—
যে মা আমার,
যে মা তোমার,
যে মা ঘরে ঘরে
দুর্গা হয়ে অধিষ্ঠিতা,
দুর্গতিনাশিনী হয়ে
দশপ্রহরণ ধারণ করে
সন্তান-সংরক্ষণায় নিয়োজিতা,
সেই মায়েরই পূজা;………..”
(আশীষ বাণী, ৬২/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)
“মা আমাদের দশভুজা,
প্রতি ঘরে ঘরে
যদিও তাঁকে
দ্বিভুজাই দেখতে পাই,
তিনি
দশদিক্ আবরিত করে রেখেছেন—
তাঁর স্নেহ-উৎসারিত
স্বস্তি-উৎসারিণী উদাত্ত অনুচর্য্যায়,
কায়মনোবাক্যে
প্রতিটি কর্ম্মের ভিতর-দিয়ে
ব্যষ্টির পথে
সমষ্টিকে আন্দোলিত করে,
সাত্বত উৎসর্জ্জনায়
আপূরিত করে সবাইকে,
কৃতি-উদ্দীপনার অনুপ্রেরণায়—
তাই মা আমার দশভূজা;……”
(আশীষ বাণী, ৫৯/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র)
“পূজা মানেই হল বর্দ্ধনা। (আঃ প্রঃ ১২-১২-১৯৪১)
আমি আপনার পূজা করছি মানে, আপনার গুণ চিন্তা করছি এবং নিত্য অনুশীলনের
মাধ্যমে ঐ গুণগুলি আমার চরিত্রগত করে তুলছি, আমার ভিতরে বাড়িয়ে তুলছি।
স্তব করি মানে গুণ বর্ণনা করি। তা কিন্তু শুধু মুখে বা মনে-মনে করলেই
হবে না, প্রতিদিনকার অভ্যাস ও অনুশীলনের ভিতর দিয়ে ঐ গুণগুলি আমার
চরিত্রে মূর্ত্ত করে তোলা চাই।’’ (দীপরক্ষী ৪/১৮২)
।। পূজা কেমন করে করতে হবে ।।
“দেবতার পূজা-অর্চনা করতে গেলে আগে ইষ্টের ভাব অন্তরে জাগ্রত করে সেই
ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে, দেবতার স্মরণ মনন করতে হয়। তাঁকে স্মরণ করা
মানে—তাঁর চলন-চরিত্র ও গুণ গরিমা স্মৃতিতে এনে অনুশীলনের ভিতর দিয়ে
আয়ত্ব করা। চরণ-পূজা মানে চলন পূজা। ইষ্টের চলনাকে নিজের জীবনে আয়ত্ত
ক’রে ঐ চলনের প্রসারতা ও সম্বর্দ্ধনা যদি না ঘটাই বাস্তবে, তাহলে তাঁর
চরণ-পূজা সার্থক হয় না। আমরা ফাঁকতালে কাম সারতে চাই, কিন্তু বিধি বড়
কঠিন বান্দা, কোন চালাকি চলে না তাঁর কাছে।” —শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্র
(আ. প্র. ২৯. ১২. ১৯৪২)
“প্রশ্ন। হিন্দুরা দেবদেবীর পূজা করেন কিন্তু মুসলমানেরা একমাত্র
খোদাতায়ালার পূজা ক’রে থাকেন। হজরত ত’ ছবি ও পুতুল-পূজা একেবারেই নিষেধ
ক’রে গেছেন, কিন্তু আপনি এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য করছেন কেমন-ক’রে ?
শ্রীশ্রীঠাকুর । ধর্ম্ম-আচরণের দিক দিয়ে হজরত রসুলও যা’ ব’লে গেছেন,
আর্য্যদের ধর্ম্মশাস্ত্র চিরকালই ঋষির নিদেশরূপে তাই বহন ক’রে আসছে।
আর্য্য-ধর্ম্মশাস্ত্র ছবি বা পুতুল-পূজা এমনতর বিকট তাচ্ছিল্যের সহিত
নিরস্ত করতে ঘোষণা ক’রেছেন—এমন-কি অধমাধম বলতেও ক্ষান্ত হন নি। তবে
আর্য্য-ঋষিদের প্রত্যেক মানুষকে উন্নতির পথে নিয়ন্ত্রণ করবার এমনতর একটা
ঝোঁক ছিল—যা-নাকি হজরত রসুলের ভিতর দেখেত পাওয়া যায়–………..”
(ইসলাম-প্রসঙ্গে/শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র/পৃঃ ২৮-২৯)
‘‘ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ, ভক্ত রামপ্রসাদ, সাধক রামকৃষ্ণ, সর্ব্বানন্দ
ঠাকুর প্রভৃতি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ প্রতিমা পূজা করেছেন বটে, তাঁদের ঐ
পূজার পিছনে ছিল গুরু-পূজা, ইষ্ট-আরাধনা ; ঐ প্রতিমার পরিকল্পনার ভেতর
দিয়ে ছিল অশেষ ও অঢেলভাবে ইষ্টানুরক্তি। তাই, ঐ অধম অবলম্বনও তাঁদিগকে
অধমভাবে আটকে রাখতে পারে নি। তাঁদের ঐ চলনার পথে একটা সময় এসেছিল, তখন
তাঁদের ঐ প্রতিমা তাঁদের দর্শনের সম্মুখে আর ও-রকম ছিল না। ভগবান
রামকৃষ্ণদেবেরও শোনা গিয়েছে—তাঁর এমনতর সময় এসেছিল, যখন
মূর্ত্তি-টুর্ত্তি তাঁর সাধনার পথে বাধাই সৃষ্টি করতো। তিনি এমন-কি তাঁর
ঘরে যে-সমস্ত ছবি-টবি ছিল, সেগুলিকেও সরিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি না-কি এই
বলেছিলেন—‘মেয়েরা ততদিন পুতুলখেলা করে, যতদিন তার বে’ না হয়,
স্বামী-সহবাস না করে।’ সাধক রামপ্রসাদ তাঁর স্বরচিত গানের ভেতরেই তো
বলেছেন—
‘‘ধাতু-পাষাণ মাটির মূর্ত্তি
কাজ কি রে তোর আরাধনে
তুই মনোময় প্রতিমা গড়ি’
বসা হৃদি-পদ্মাসনে।।’’
এমন কত কি যে আছে, তার ইয়ত্তা নেই।’’
(–শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, কথা প্রসঙ্গে, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৭৬, ১৭-১০-১৩৪২)
এবার আমরা এক়টু দেখে দেখে নেব, পূজা প্রসঙ্গে ‘মেরা ভারত মহান’-এর
অন্যান্য মহানেরা এবং মহান গ্রন্থগুলো কি নিদেশ রেখে গেছেন।
পূজা বিষয়ে মহানির্ব্বাণতন্ত্র নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ
‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ।
অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’
মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ভারতে বিবেকানন্দ গ্রন্থের ৩৩৬
পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট।
ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’
‘‘যে-ব্যক্তি সর্ব্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ
প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে।’’ –শ্রীমদ্ভাগবত। ৩-২৯-২২
“ঈশ্বরঃ সর্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জ্জুন তিষ্ঠতি।
ভ্রাময়ন্ সর্ব্বভূতানি যন্ত্ররূঢ়ানি মায়য়া।।“
–গীতা, ১৮।৬৫
“যিনি এই সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার নিজের স্বধর্মানুরূপ
নিষ্কাম কর্মাচরণ দ্বারা (বাক্য বা ফুলজল দ্বারা নহে) পূজা করিয়া মানুষ
সিদ্ধি লাভ করে । স্বধর্মানুরূপ (বর্ণানুগ সত্তাধর্ম পালন) নিষ্কাম কর্মই
পরমেশ্বরের পূজার ডালি । (গীতা ১৮।৪৬)
“যে ব্যক্তি সর্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ প্রতিমার
পূজা করে, স (শ্রীমদ্ভাগবত ৩।২৯।২২)
পূজা বিষয়ে মহানির্ব্বাণতন্ত্র নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ
‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ।
অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’
মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ভারতে বিবেকানন্দ গ্রন্থের ৩৩৬
পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট।
ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’
তাই, শাস্ত্র বর্ণিত অধমের চাইতেও অধম পূজায় মেতে উঠে আমাদের যাতে
ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে না হয়, তাই, শ্রীশ্রীঠাকুর
অনুকূলচন্দ্র আমাদের নিত্য বাস্তব দুর্গাপূজার পূজারী করে তুলতে
সৎসঙ্গীদের নিত্যপাঠ্য ‘সত্যানুসরণ’ নামক মহাগ্রন্থে নারীকে জগজ্জননী
জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত করতে নিদেশ দিয়ে বললেন, ‘‘প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী ।
প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ, এমনতর ভাবতে হয় ।’’ এবং
পুণ্যপুঁথি গ্রন্থে বললেন, ‘‘স্ত্রীতে কামিনীবুদ্ধি করে যে-জন, তাহার হয়
না ভবের বন্ধন মোচন । …..স্ত্রী চিন্ময়ী মা।’’—এই শিক্ষার ধারাকে
বাস্তবায়িত করার নাম প্রকৃত দুর্গাপূজা ।
শ্রীশ্রীঠাকুর শুধু পুরুষদেরই প্রতিনিয়ত দুর্গাপূজা করার বিধান দিয়েই
ক্ষান্ত হননি, নারী-সাধারণের মধ্যেও দেবী দুর্গার এক স্থায়ী আসন পেতে
দিতে অনুশ্রুতির বাণীতে বললেন—
‘‘শার্দ্দুলেরে বাহন করে
সাপের ফণার মালা পরে
কালবোশেখী ঝঞ্ঝাবেগে
ছোটরে নারী ছোটরে ছোট্ ।
দত্যিদানার নীচ বাহানা
আর্য্যাবর্তে দিয়ে হানা
ঘূর্ণিপাকের বেতাল গাঁথায়
হুলিয়ে ভুলিয়ে দিচ্ছে চোট্ ।
দশ প্রহরণ দশ হাতে ধর
বক্ষবিদরি ধ্বংসি ইতর
সূর্য্যরাগী বজ্রতেজে
আর্য্যনারী শত্রু টোট্ ।”
তিনি নারীকে অবলা নয়, সবলারূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন । নারীর সতীত্বই
নারীকে সবলা করে তোলে। তাই তিনি কত আশা নিয়ে বললেন—
‘‘সতীর তেজে ঝলসে দে মা
নিঠুর কঠোর অন্ধকারে
মদনভস্ম বহ্নিরাগে
বৃত্তি-রিপু দে ছারখারে ।
প্রণবতালে ইষ্টমন্ত্র
ঝঙ্কারি তোল সকলতন্ত্রে
বিষাণ হাঁকে রুদ্র দোলায়
বজ্রে হানি মৃত্যুদ্বারে।’’
মা দুর্গার আদর্শে অনুরঞ্জিত উক্ত বাণীগুলো যাতে তার সন্তানদের মননশীলতায়
মা দুর্গার
তাই আসুন, পূজার নামে অনিত্য-বস্তুর প্রতিযোগিতায় না মেতে, সব দেবতার
সমাহার-স্বরূপ যুগ-পুরুষোত্তমের বিধি মেনে, মা দুর্গার নিত্য-সিদ্ধ
দেদীপ্যমান আদর্শের আলোকে, আমাদের ঘরের মেয়েরা যাতে রাষ্ট্রপূজার
অর্ঘ্যস্বরূপ সুজননে সুসন্তানের উপহার সাজিয়ে,
শক্তিরূপিণী-দশপ্রহরণধারিণী সাজে সজ্জিত হয়ে নরাসুরদের কিভাবে দমন করে
অস্তিত্ব রক্ষার পূজার পূজারী হতে পারে,– সেই চেষ্টায় যত্নবান হই।
জয়গুরু ! বন্দে পুরুষোত্তমম্!
***************************************