[আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ইতিহাস: United Nations Educational, Scientific and Cultural Organisation বা UNESCO-র তরফে জানানো হয়েছে, ১৯০৯ সালে ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হয়। নারী শ্রমিকদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সেই বছর এই দিনটি পালন করা হয়েছিল। পরে রাশিয়াতেও ১৯১৭ সাল থেকে এই দিনটি পালিত হতে থাকে একই কারণ মাথায় রেখে। তবে রাশিয়াতেই প্রথম বার এই দিনটি পালিত হয় ৮ মার্চ। তার পর থেকে সেটিই রীতি হয়ে গিয়েছে। বছরের এই দিনটিকেই আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে সকলের তরফে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের গুরুত্ব: লিঙ্গবৈষম্য দূর করার জন্য এই দিনটি পালিত হয়। এখনও সারা পৃথিবীতেই সমাজের বেশির ভাগ জায়গায় লিঙ্গবৈষম্য বর্তমান রয়েছে। পুরুষরা এখনও বহু ক্ষেত্রে বেশি মাত্রায় সুবিধা ভোগ করেন। আর সেই কারণেই এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বৃপূর্ণ। শিল্প-সাহিত্য-সহ সব ধরনের ক্ষেত্রে এবং সমাজের সমস্ত কাজে মহিলাদের অবদানকে স্বীকৃতি দিতেই এই দিনটি পালিত হয়।
জাতিসংঘ 2024 সালের থিম হিসাবে মনোনীত করেছে ‘নারীতে বিনিয়োগ: অগ্রগতি ত্বরান্বিত করুন’ অর্থনৈতিক ক্ষমতাহীনতা মোকাবেলায় ফোকাস করে, যেখানে এই বছরের প্রচারের থিম হল ‘অন্তর্ভুক্তি অনুপ্রাণিত করা।’ ]
(Courtesy : Google)
*******************************************
বর্তমান যুগে নারীরা লেখাপড়া, শিক্ষা-সংস্কৃতি, কর্মক্ষেত্রে, অভিযানে, বিজ্ঞান গবেষণায় প্রভৃতি কোন ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নেই। এমন অনেক নারীদের কথা আপনারা জানেন, আমিও জানি। আবার এ-ও দেখেছি, বাহ্য জগতের সবক্ষেত্রে কৃতি নারীদের অন্তর্জগতের হাহাকার। মনের মত সন্তান না পাওয়ার জ্বালায়, সন্তানকে মনের মত করে মানুষ করতে না পারার জ্বালায়, থ্যালাসেমিয়া, স্কিজোফ্রেনিয়া, লিউকোমিয়া প্রভৃতি নামের দুরারোগ্য ব্যাধির জ্বালায় জ্বলতে গিয়ে জীবনের সুখ-শান্তির অনুভূতিটা হারিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছে।—যেন, ‘সব আছে তবু নেই’। মাতৃত্ব-পিয়াসী একজন সন্তানহীনা নারীর যে কি কষ্ট, কি বেদনা, তা ভুক্তভোগী ভিন্ন কেউ উপলব্ধি করতে পারবে না। একটি সন্তান পেতে সব-রকমের চিকিৎসা করার পরও যখন সন্তান-লাভে ব্যর্থ হয়, তখন অনেক টাকা খরচ করে গর্ভ ভাড়া নেয়, দত্তক সন্তান নেয়।—এমন অনেক কিছু করেন। ওই সব সমস্যার স্রষ্টাও কিন্তু নারী। ‘আত্মানং বিদ্ধি।’-র শিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে সব কিছুকে জেনেছে, নিজেকে জানতে পারেনি। নিজের নারীত্বের-পূর্ণতার বিষয়ে জানা হয়ে ওঠেনি।
নারী হতে জন্মে জাতি। নারীই গৃহ, সমাজ ও রাষ্ট্রের ধাত্রী ও পালয়িত্রী। প্রাকৃতিক নিয়মে একজন নারীর চরম পরিণতি মাতৃত্বে। মুখে আমরা যতই নারী-স্বাধীনতার কথা বলি না কেন, এক্ষেত্রে কিন্তু পুরুষের উপর নির্ভরশীল হতেই হয়। (অবশ্য লেসবিয়ান আদর্শে বিশ্বাসীদের কথা আলাদা। তারা অবশ্যই ব্যতিক্রমী।) সেই পুরুষটি মাতৃত্বকামী নারীর তুলনায় শারীরিক-মানসিক-আত্মিকভাবে যত উন্নত হবে,— স্বাস্থ্যবান হবে, ভালো চরিত্রের হবে, নারীটির দাম্পত্য জীবন তত সুখের হবে, সন্তানও ভালো হবে। এটাই তো স্বাভাবিক নিয়ম। তাই নয় কি? আর সেগুলো পেতে গেলে বর্ণে, বংশে, বয়সে, স্বাস্থে, শিক্ষায়-দীক্ষায়—সবদিক থেকে উন্নত সম-বিপরীত সত্তার একটা পুরুষকে, ভাবী সন্তানটির বাবাকে খুঁজে নিতে হবে, বিবাহের মাধ্যমে। বিবাহ মানে পুরুষের সত্তাকে বিশেষরূপে বহন করা। যে পুরুষটির কাছে নারীত্বকে সমর্পণ করে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে। তাই নির্ঝঞ্ঝাট সুখের দাম্পত্য জীবন পেতে গেলে, ভালো সন্তানের মা হতে গেলে, লেখাপড়া শেখার পাশাপাশি, কুমারী অবস্থা থেকেই একটা পরিকল্পনা করে নিতে হবে। কারণ প্রত্যেক নারীই চায় তার সন্তানটি সুস্থ থাকুক, ভালো হোক, কৃতী হোক। সেগুলো তো আর রেডিমেড পাওয়া যাবে না, আর স্টেজ মেক-আপও দেয়া যাবে না। নিয়ম মেনে অনুশীলন করতে হবে। মা-কেই মেপে মেপে সঞ্চয় করতে হবে ভবিষ্যতের সন্তানের ভালামন্দের সব উপকরণ। মা মানে মেপে দেওয়া। সন্তানের ভালো-মন্দ মেপে দেয় বলেই মা। ভাবী মায়ের চলন-চরিত্র দ্বারা প্রভাবিত হয় নারী-জননকোষ, অপত্য-কোষ। সেইজন্যই সন্তান ধারন-পালন-লালন-এর জন্য আবশ্যিক প্রত্যঙ্গগুলোকে সযত্নে মেপে মেপে লালন-পালন করতে হবে, সংরক্ষণ করতে হবে ভবিষ্যতের সন্তানের মঙ্গলের জন্য। তা না করে ‘হেটেরো-সেক্সুয়াল’ কমপ্লেক্সের প্রলোভনে পড়ে ওগুলোকে যদি আম-পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করে ফেলা হয়, তাহলে তো ভাবী সন্তানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। যার জন্য সংরক্ষিত জিনিস, আত্মঘাতী উদারতার বশে অন্যকে ভাগ দেবার অপরাধে। এজন্য রোগ-ভোগেও ভুগতে হয়। Oncologist, Gynaecologist, Sexologist, Psychologist-দের শরণাপন্ন হতে হয়। নারী-দিবসকে প্রচার মাধ্যমে আনার জন্য ‘স্যানিটারি ন্যাপকিন’-এর ভেন্ডিং মেশিনগুলো ওই সমস্যা থেকে নারীদের কতখানি মুক্তি দেবে ! বরং পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে, সনাতনী নিয়মে সাত্তিক চলন চরিত্রায়িত করে ঋতুধর্ম পালন করেছেন যে-সব নারীরা, তাঁরা ওইসব সমস্যা থেকে মুক্ত।
নারীত্বের বিশুদ্ধতা সংরক্ষিত করে সুসন্তান লাভ করা বিষয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘জন্মকথা’ কবিতায় লিখছেন—
খোকা মাকে শুধায় ডেকে, ‘এলেম আমি কোথা থেকে
কোনখেনে তুই কুড়িয়ে পেলি আমারে ?’
মা শুনে কয় হেসে কেঁদে খোকারে তার বুকে বেঁধে—
‘ইচ্ছা হয়ে ছিলি মনের মাঝারে।।
ছিলি আমার পুতুল খেলায়, ভোরে শিবপূজার বেলায়
তোরে আমি ভেঙেছি আর গড়েছি।
তুই আমার ঠাকুরের মনে ছিলি পূজার সিংহাসনে,
তাঁরি পূজায় তোমার পূজা করেছি।।
আমার চিরকালের আশায়, আমার সকল ভালোবাসায়,
আমার মায়ের দিদিমায়ের পরাণে,
পুরানো এই মোদের ঘরে গৃহদেবীর কোলের ’পরে
কতকাল যে লুকিয়ে ছিলি কে জানে।।’
একটু বোধি-তাৎপর্য দিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, কবিগুরু তাঁর ওই কবিতায় জেনেটিক্সের, ইউজেনিক্সের, সুরত-সম্বেগের চরম এক তত্ত্বের অবতারণা করেছেন।
একটা উন্নত প্রজাতির আমগাছ লাগাতে গেলেও কিছু প্লান-প্রোগ্রাম নিতে হয়। আগে থেকে জমি নির্বাচন করতে হয়, উপযুক্ত সার দিয়ে জমি তৈরি করতে হয়, তারপর মাটির উপযুক্ত বীজ বা চারা বসাতে হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় বর্তমান যুগের বেশিরভাগ লেখাপড়া শিখতে যাওয়া নারীরা, পুরুষের সাথে পা-মিলিয়ে, গলা-মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ‘হোক-কলরব’ আন্দোলনে পারদর্শী হলেও, নিজের আত্ম-বিস্তারের জন্য আবশ্যিক আত্ম-সম্পোষণ, আত্ম-সংরক্ষণ করার জন্য নির্দিষ্ট নারীত্বের অস্তিত্ব রক্ষার জমিটুকুকে সংরক্ষণ করা বিষয়ে উদাসীন। যারফলে কালেক্রমে মনুষ্যত্ব সম্পন্ন অসৎ-নিরোধে তৎপর সন্তান থেকে সভ্যতা বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব রামকৃষ্ণদেব, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নেতাজী সুভাষচন্দ্র প্রমুখ মনীষীদের জন্মদাত্রীগণ ক্যাম্পাসে, অফিসে, মিটিংয়ে, মিছিলে কোন ‘কলরব’ না করেই, সনাতনী নারীধর্ম পালন করে রত্নগর্ভা হয়েছিলেন। ভারতীয় কৃষ্টি প্রদত্ত প্রকৃষ্ট-গতির পথ ভুলে, তথাকথিত প্রগতির নামে ছুটে চলা নারীবাদিরা বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে দেখতে পারেন।
পরিবারকে উন্নতি বা অবনতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী প্রধানতঃ নারী। কথায় আছে, ‘সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে। গুণবান পতি যদি থাকে তার সনে।।’ আদর্শ একজন পুরুষের সাহচর্যে নারীর হাতেই গড়ে ওঠে আদর্শ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র। নারীই হচ্ছে জাতির বল ও ভরসা। লক্ষী নারীদের উপরেই রয়েছে মহান জাতি গঠনের বিরাট দায়িত্ব। মহান আদর্শকে চরিত্রায়িত করে নারী যদি পরিবারকে সুন্দর ও সার্থক করে সাজিয়ে তুলতে পারে তবেই জগত-সংসার সুখের হয়। আদর্শ জাতি গঠন করার দায়িত্ব নারীদের উপর থাকার জন্য তাদের শিশুকাল থেকেই ভালো মা হবার সাধনায় অগ্রসর হতে হবে। নারী জীবনের বিভিন্ন পর্যায় আছে। ওই পর্যায়গুলো ভগ্নি, বধূ, স্ত্রী, জায়া, জননী ও গৃহিনী ও জননীত্ব। ওগুলোকে সমৃদ্ধ নারীরাই করতে পারেন, পুরুষেরা নয়। স্নেহ, মায়া, মমতা ও ভালবাসার দ্বারা পূর্ণ নারীর হৃদয়। নারীরা ইচ্ছা করলেই তাঁর অন্তর্নিহিত বিভিন্ন শক্তির দ্বারা জাগিয়ে তুলতে পারেন বিশ্বকে। নারীর মধ্যে সুপ্তভাবে থাকা গুণরাজিকে ইচ্ছে করলেই ব্যক্ত করা যায় ভালোবাসা বা ভালোতে বাস করার বিজ্ঞানসম্মত পাঠ নিয়ে। যারা প্রকৃত অর্থে বিজ্ঞানকে মানতে আগ্রহী, তাদের নারীত্বকে সমৃদ্ধ করার উদ্দেশ্যে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রদত্ত কিছু জ্ঞানের কথা পরিবেশন করছি। চিন্তা-ভাবনা করে দেখে ভালো লাগলে মানবেন, না-হয় মানবেন না।
যদিও বেভুল-তালে চলতে অভ্যস্ত নারীবাদিরা সহজে মেনে নিতে চাইবেন না শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জীবনীয় অনুশাসন বিধিগুলোকে, তথাপি তাঁর নিদেশগুলো তুলে ধরলাম। বলা যায় না, আপনাদের মধ্যে কেউ না কেউ জেনে-বুঝে মননশীলতায় স্থান দিয়ে কাজে লাগাতে চেষ্টা করতেও তো পারেন। সেই আশা নিয়ে।
।। নারী-জীবনকে সার্থক করার আদর্শ শিক্ষা বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতবাদ ।।
ছেলেমেয়ে এক-যোগেতে
করলে পড়াশোনা
পড়ার সাথে বাড়ে প্রায়ই
কামের উপাসনা।
কুমারী একটু বড় হলেই
পুরুষ ছুঁতে নেই,
যথা সম্ভব এর পালনে
উন্নয়নের খেই ।
পরের বাবা পরের দাদা
পরের মামা বন্ধু যত
এদের বাধ্যবাধকতায়
সম্বন্ধটি যাহার যত
অনুরোধ আর উপরোধে
ব্যস্ত সারা নিশিদিন
কামুক মেয়ে তাকেই জানিস
গুপ্ত কামে করছে ক্ষীণ ।
বিয়ের আগে পড়লে মেয়ে
অন্য পুরুষে ঝোঁকের মন
স্বামীর সংসার পরিবার
করতে নারে প্রায়ই আপন ।।
পুরুষ নষ্টে যায় না রে জাত
নারী নষ্টে জাত কুপোকাত ।
নারী হতে জন্মে জাতি
থাকলে জাত তবেই জাতি ।
না মানালে হবেই ক্ষতি ।
ওই ক্ষতি থেকে আমাদের মুক্তির সোপান-পথ দেখালেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।
সত্যম্-শিবম্-সুন্দরম্। সত্যই শিব, শিবই সুন্দর। সত্য মানে অস্তিত্ব। পরিবেশের সব অস্তিত্বের পালন-পোষণ করে এই সুন্দর পৃথিবীর সুন্দরত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার বাস্তব প্রক্রিয়ার নাম শিবপূজা। পূজা মানে সম্বর্দ্ধনা—সম্যকরূপে বর্দ্ধনার পথে চলা।
শিব একাধারে সার্থক যোগী, সন্ন্যাসী, নটরাজ। আবার গৃহস্থরূপে দেবী পার্বতীর স্বামী। গণেশ এবং কার্তিক দুই পুত্রের পিতা। সে-সব দিকগুলো বিচার করে শিবকে যোগ, ধ্যান ও শিল্পকলার দেবতা মনে করা হয়। কিছু গবেষণায় জানা যায় শিব নাকি চিকিৎসা বিদ্যার জনক ছিলেন। কৃষিবিদ্যার আবিষ্কারকও ছিলেন। নট-নটীরা শিবকে নটরাজ বলে পূজা করেন। রামায়ণে বর্ণিত, সংস্কৃতে রচিত শিব-বন্দনার ‘তাণ্ডব-স্তোত্র’ আর্য্যকৃষ্টিতে বন্দিত। পরমপুরুষ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর ভাববাণীতে বলেছেন।—‘‘তাণ্ডব-স্তোত্র মুখস্থ করিস্, এ্যাজমা সারবে।’’
শিবের পূজা বা আরাধনার নিমিত্ত যতগুলো প্রতিষ্ঠিত মন্দির রয়েছে, সে-সব মন্দিরগুলোতে শিবলিঙ্গকেই পূজা করা হয়। শিবলিঙ্গের সৃষ্টির বিষয়ে শাস্ত্রগুলোতে নানা মতভেদ রয়েছে। সবগুলোতেই রিরংসার নীলজল মেশানো আছে। সেগুলো থেকে নারদ পঞ্চরাত্রে বর্ণিত কাহিনী যেন একটু ফিকে, গ্রহণযোগ্য। নারদ পঞ্চরাত্র মতে শিব-পার্বতির প্রথম মিলনের সম্মিলিত তেজ থেকে উৎপন্ন হয় শিবলিঙ্গ। শিবলিঙ্গ-এর বেষ্টনীকে বলে গৌরীপট্ট। গৌরীপট্ট শিবলিঙ্গের আধার, জগতের যোনি। যোনি-সম্ভূত সৃষ্টি প্রকরণের প্রতীক হিসেবে মানা হয় শিবলিঙ্গকে। এর অন্তর্নিহিত অর্থ, পুরুষেরা শিবলিঙ্গকে প্রতীক রূপে মেনে, শিবের ন্যায় আদর্শ পিতা হবার নিমিত্ত তাদের প্রজন্ম সৃষ্টির উপাঙ্গ জননেন্দ্রিয়কে ব্যবহার করবেন, আর নারীরা গৌরীপট্টকে প্রতীক রূপে মেনে, গৌরীর ন্যায় আদর্শ মাতা হবার নিমিত্ত প্রজন্ম সৃষ্টির উপাঙ্গ জননেন্দ্রিয়কে ব্যবহার করবেন।
আমাদের ভারতীয় আধ্যাত্মবাদের সাথে শিব অনেকটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামেও একটা না একটা শিবমন্দির দেখা যায়। যারা দৈনন্দিন জীবনে আর্যকৃষ্টির নিত্যকর্ম পদ্ধতির সদাচার, বর্ণাশ্রমধর্ম পালনে অভ্যস্ত নয়, তারাও সোমবার, শ্রাবণ মাস, চৈত্র মাস-এর পার্বনের দিনগুলোতে শিবলিঙ্গে ফুল-জল-বেলপাতা দিয়ে তথাকথিত পুজো করেন। শ্রাবণ মাস শিবের জন্মমাস হিসেবে পালন করেন অনেক ভক্ত। বাঁকে করে জল নিয়ে প্রতিষ্ঠিত শিবমন্দিরগুলোতে গিয়ে অনেক কসরৎ করে শিবলিঙ্গে জল ঢালতে যান। তাদের সেবা করার জন্য রাস্তার ধারে ধারে প্যাণ্ডেল করে, তারস্বরে মাইক বাজানো হয়। অনেক সাধকেরা আবার ‘ভোলে-ব্যোম’ ধ্বনি দিয়ে গঞ্জিকা, ভাঙ্-এর মৌতাতে শিবত্ব লাভ করতে চান। টিভি সিরিয়ালগুলোতেও শিবকে সিদ্ধিখোর, গাঁজাখোর হিসেবে তুলে ধরা হয়। শিব ছিলেন একজন পরমবৈষ্ণব, সিদ্ধ-পুরুষ, তাঁকে সিদ্ধিখোর, গাঁজাখোর না বানালেই কি চলছিল না!
তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া চলে আমাদের হিন্দু নারীদের শিবরাত্রির উপবাসকে। শুনেছি অনূঢ়া বা কুমারী মেয়েরা শিবের মতো স্বামী পাবার আশায় (অবশ্য বাস্তবে আমাদের কল্পনার শিবের মত,—বাঘছাল পরে, গলায় সাপ জড়িয়ে, ষণ্ডের পিঠে চেপে, কোন পুরুষ যদি স্বামীরূপে উপস্থিত হয়, তখন কি হবে?), কুমার পুরুষেরা (যদিও সংখ্যায় অনেক কম) গৌরীর মতো স্ত্রী লাভের আশায় শিবরাত্রির উপবাস করেন। আর বিবাহিতা মহিলারা কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীর ন্যায় সন্তান লাভ করে সুখে-শান্তিতে ঘর-সংসার করার আশায় শিবরাত্রির উপবাস করেন।
ওই আশাগুলোকে পূরণ করতে হলে শুধুমাত্র শিবরাত্রির উপবাস করলেই তো আর হবে না। উপ মানে নিকটে, বাস মানে অবস্থান। শিব-পার্বতীর আদর্শে নিত্য অবস্থান করতে হবে। আর সেজন্য সদগুরু গ্রহণ করতে হবে। শাস্ত্রানুসারে গুরু গ্রহণ না করা পর্যন্ত কোন দেবদেবীর পূজা করার অধিকার জন্মায় না।
পুরাণ অনুসারে গিরিরাজ দুহিতা উমা ছোটবেলা থেকেই ভক্তিমতী। শিবের ভক্ত। পণ করেছেন, শিবকে ছাড়া অন্য কাউকেই বিয়ে করবেন না। বাবা-মা-পরিজনেরা কত করে বোঝাল, শিবকে বিয়ে করলে আর কষ্টের শেষ শেষ থাকবে না। বাপের বয়সী, কাজকর্ম করে না। নারায়ণের ভুতের বেগার খেটে মরে। (অর্থাৎ, নারায়ণী-বার্তা যাজন করে প্রাণী নামক ভুতদের উন্নয়ন করে বেড়ান।) তথাপি উমা কিন্তু কারোর কথায় কান না দিয়ে, সৎ-স্বভাবে পরান পাগল, জ্ঞানবৃদ্ধ, বয়োবৃদ্ধ শিবকেই পতিত্বে বরণ করেন।
উমা বা পার্বতী, স্বামীকে মাথায়, অর্থাৎ জীবনের কেন্দ্রে রেখে, স্বামীর মনোবৃত্ত্যানুসারিনী স্ত্রী হয়ে সুসন্তানের মা হয়েছেন, মা হয়েছেন আমাদের, জগতের। উমা-মাকে আমরা দেবীর চাইতে অনেকটা বেশি করে ঘরের মেয়ে হিসেবে বরণ করে নিয়েছি। এই মর্ত্তধামের প্রতিটি ঘর তাঁর বাপের বাড়ি। তাই বাস্তব জীবন-চলনায় যদি শিব-গৌরীর ন্যায় আমাদের ভালোবাসার পবিত্র দাম্পত্যের পূজা-জাত কন্যারূপী সন্তানটিকে উমার মত করে, পুত্ররূপী সন্তানটিকে শিবের মত করে সৃষ্টি করতে পারি, তা হলেই তো ষোল-কলায় পূর্ণ হবে আমাদের শিব আরাধনা।
অবক্ষয় আমাদের দরজায় যতই কড়া নাড়াক না কেন লর্ড মেকলে সাহেবের দাক্ষিণ্যের দৌলতে আমাদের সমাজে শিক্ষিত হবার প্রবণতার হার কিন্তু ক্রমশঃ বর্দ্ধমান। আর্য্য-হিন্দু কৃষ্টির দশবিধ সংস্কারভুক্ত চূড়াকরণ, উপনয়ন প্রমুখ জীবনীয় সংস্কার ভুলে গেলেও মুখে বুলি ফুটতে না ফুটতেই সন্তান-সন্ততিদের লেখাপড়া শেখাতে এতটুকু কার্পণ্য করি না আমরা। এ বিষয়ে বাবাদের চাইতে মায়েদের আগ্রহ একটু বেশীই। লেখাপড়া শেখাতে স্কুলে ভর্তি করে, একাধিক প্রাইভেট টিউটর রাখে, পাশাপাশি হোম-ওয়ার্ক না করতে পারলে ‘মাথা ফাটিয়ে ঘিলু বার করে দেব, মেরে ফেলব, কেটে ফেলব’ ইত্যাদি বিশেষণের শাসনবাক্যে যুগধর্মের শিক্ষায় সন্তানদের শিক্ষিত করতে মায়েরা যেভাবে পরিশ্রম করে চলেছেন তার তুলনা হয় না! লেখাপড়া মানেই বিদ্যার্জন করা। বিদ্যার্জন করতে স্কুল, টিচার, বই-খাতা-কলম ইত্যাদি আনুসঙ্গিকের পাশাপাশি বিদ্যাদেবীর আরাধনাটাও আবশ্যিক! তাই উত্তরায়ন-সংক্রান্তি পরবর্তী শুক্লা-পঞ্চমী বা শ্রীপঞ্চমী তিথিকে কেন্দ্র করে ঘরে-ঘরে, বিদ্যালয়ে-বিদ্যালয়ে, পাড়ার ক্লাবে, রাস্তাঘাটে সরস্বতী পুজোর সাড়া পড়ে যায়। এমনিতে একটু বেলা পর্যন্ত শুয়ে থাকা পড়ুয়ারাও সেদিন সকাল-সকাল উঠে নিম-হলুদ মেখে স্নান সেরে নেয়। (নিম-হলুদ মাখলে শরীরের রোগ-প্রতিরোধী শক্তি বৃদ্ধি পায়।) তারপর সেজেগুজে যে-যেখানে সুবিধা পায় আগেভাগে অঞ্জলি দেবার কাজটা সেরে নিতে বিদ্যাদাত্রী সরস্বতীর প্রতিকৃতির সামনে কঠিন বিষয়ের বইপত্রগুলো জমা দিয়ে অপেক্ষায় থাকে কতক্ষণে পুরুতঠাকুর অঞ্জলি দেবার জন্য ডাকবেন। অঞ্জলি দেওয়া শেষ করে সরস্বতী-ঠাকুরের কাছে পাশ করার আর্জিটা জানিয়ে, প্রসাদ খেয়ে পুজোর মুখ্যপর্বটা শেষ করে গৌণপর্বে প্রবেশ করে। কচিকাচারা পরিজনদের হাতধরা হয়ে, কিশোর-কিশোরীরা বন্ধু-বান্ধবদের সাথে বিদ্যালয়ে যায়, খাওয়া-দাওয়া হয়। খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুড়ি ওড়ানো, দল বেঁধে ঘুরে ঘুরে প্রতিমা দেখে বেড়ানো। বড় হয়ে ওঠার সোপানে পা-রাখা হেটেরো-সেক্সুয়াল কমপ্লেক্সের অবদানের টেস্টোটেরন হরমোন-প্রপীড়িত ওভারস্মার্ট ছাত্ররা, ফলিকল-স্টিমুল্যাটিং হরমোন-প্রপীড়িত ওভারস্মার্ট ছাত্রীরা পছন্দের জনকে প্রপোজ করার সুযোগ খোঁজে, কেউ আবার একটু ঘনিষ্ট সান্নিধ্য পেতে চায় ভ্যালেনটাইন-উইক কালচারে সমৃদ্ধ হতে। সকাল থেকেই মাইকে চটুল গান বাজছে পাড়ায়, রাতে হবে মাংস-ভাতের পিকনিক। শুধু পাড়াতেই নয় সরকার পরিপোষিত অনেক প্রাথমিক বিদ্যোলয়েও (যেখানে হিন্দু শাস্ত্রমতে বিদ্যালাভের পরিপন্থী, অভক্ষ্য ডিম সহযোগে ছাত্রদের মিড-ডে মিল খাওয়ান হয়।) পুজোর দিনটির পবিত্রতা বজায় রেখে পরেরদিন মাংস-ভাতের পিকনিক করা হয়েছে। আসছে বছর আবার হবে!—কি হবে ?
‘‘ওঁ ভদ্রকাল্যৈ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈ নমো নমঃ।
বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ-বিদ্যাস্থান্যেভ্যঃ এব চ।। ……’’ পুরোহিতের বলা ইত্যাদি মন্ত্র অনুসরণ করে পুষ্পাঞ্জলি দিতে হবে।
‘‘জয় জয় দেবী চরাচর সারে কুচযুগ শোভিত মুক্তাহারে।
বীণা রঞ্জিত পুস্তক হস্তে ভগবতী ভারতি দেবী নমোহস্তুতে।।
(কোন পণ্ডিত উক্ত মন্ত্র রচনা করেছিলেন আমি জানি না । তবে এটুকু বুঝি, যে স্তনযুগল মাতৃত্বকে সমৃদ্ধ করার জন্য সৃষ্ট, বৃত্তিতন্ত্রীদের সুড়সুড়ি দিতে তাকে মুক্তার হারের আভরণে সজ্জিত না করলেই ভাল করতেন। কারণ বিদ্যালাভ মস্তিকের মেধানাড়ীতে সুপ্ত মানবিক-সাত্ত্বিক গুণের অনুশীলনে সম্পাদিত হয়, বক্ষ-সৌন্দর্যের সজ্জিত বিজ্ঞাপনে নয়।)
ওঁ সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে।
বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্বি বিদ্যাং দেহী নমোহস্তুতে।।’’— পুরোহিতের বলা ইত্যাদি মন্ত্র অনুসরণ করে প্রণাম জানাতে হবে। …….তারপর সেই,—খাওয়া-দাওয়া, হৈ-হুল্লোর— ছোটদের বড় হবার রিহার্সাল, বড়দের নস্টালজিয়ার স্মৃতিচারণ ……. আসছে বছর আবার হবে!
ওইসব উচ্চারিত মন্ত্র অনুযায়ী দেবী সরস্বতীই বিদ্যাদাত্রী, তাকে সাধনা করতে পারলেই বিদ্যার সিলেবাস বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ জ্ঞাত হওয়া যাবে। খুব ভালো কথা। সাধনা দিয়েই তো সিদ্ধি পেতে হবে।
* * * * * *
মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী আমরা যা বলি বা সংকল্প করি বাস্তবে তা যদি না করি স্নায়ুমন্ডলীতে জটিলতার সৃষ্টি হয়, আধ্যাত্মিক জগতে যাকে অনাগত প্রারব্ধ কর্মফল বলে। অথচ আমাদের শিক্ষকেরা এই পূজার দিনটিতে অঞ্জলিমন্ত্র, প্রণামমন্ত্র আওড়ানো ব্যতীত বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ শিক্ষা বিষয়ে ছাত্রদের উৎসাহ না দিয়ে প্রচলিত সিলেবাসের বিষয়ভিত্তিক খাতাবই কেনা, নোট কেনা, কোচিং-করানোর দিকে উৎসাহ দেয়। বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ জিনিসটা যে কি বেশিরভাগ পড়ুয়ারা জানেই না, অথচ শিক্ষার আবশ্যিক বিষয় জ্ঞানে বাধ্যতামূলকভাবে বছর-বছর আবৃত্তি করে চলে, সরস্বতী পূজার দিনটিতে। এর নাম দ্বন্দ্বীবৃত্তি, অর্থাৎ মুখে যা বলছি, কাজে তা করছি না। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতে যা মহাপাপের কারণ।
* * * * * *
সংস্কৃত বিদ্ִ ধাতু থেকে বেদ এবং বিদ্যা শব্দের উৎপত্তি। যার অর্থ জ্ঞান, বিচরণা, অস্তিত্ব, প্রাপ্তি। বিদ্যা লাভ যার হয়, অস্তিত্ব বজায় রাখার জ্ঞান তার হয়। তার বিচারশক্তি হয়, জীবনচলনায় ভালটাকে বেছে নিয়ে সে এগিয়ে চলে মূল প্রাপ্তি বা গন্তব্যের দিকে। যার চরম ঈশ্বরপ্রাপ্তি। ভাষাবিদ জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস মহোদয় কৃত অভিধানানুসারে, ‘‘যদ্দারা ব্রহ্ম হতে ব্রহ্মান্ড পর্য্যন্ত যাবতীয় পদার্থের সত্যবিজ্ঞান লাভ হইয়া যথাযোগ্য উপকার প্রাপ্ত হওয়া যায় তাহাই বিদ্যা ; যদ্দারা অক্ষর পুরুষকে জানা যায়।’’ ওই বিদ্যায় বিদ্বান হয়ে ছাত্রদের জানাবার কাজটি যিনি করেন তিনি শিক্ষক বা আচার্য্য।
বেদ বা জ্ঞান-এর দুটো দিক, আধ্যাত্মিক ও জাগতিক। যা জানলে মানুষের জীবনের পূর্ণতা লাভ হয়, বিদ্যা লাভ হয়। বেদের বিদ্যা দু প্রকার পরা ও অপরা। শিক্ষা (phonetics), কল্প, ব্যাকরণ, ছন্দ, জ্যোতির্বিদ্যা (astronomy) ও নিরুক্ত (শব্দতত্ত্ব) ইত্যাদি নামের বেদের ৬টি শাখার নাম বেদাঙ্গ। সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ্ নামে বেদকে চারভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। যার অন্ত ভাগের নাম বেদান্ত বা উপনিষদ। ‘আত্মানং বিদ্ধি’ (Know Thyself,— who am ‘I’ ?) অর্থাৎ নিজেকে জানার চেষ্টার পাঠক্রমকে বলা হয়েছে পরাবিদ্যা। পরাবিদ্যার পাঠক্রমে আমাদের শিক্ষক আর্য-ঋষিগণ বলেছেন, ‘‘যস্তু সর্বাণি ভূতান্যাত্মন্যেবানুপশ্যতি।/সর্বভূতেষু চাত্মানং ততো ন বিজুগুপ্সতে।।’’ (ঈশোপনিষদ) অর্থাৎ, যিনি নিজের আত্মাকেই সর্বাত্মারূপে উপলব্ধি করেন, তিনি কাহাকেও ঘৃণা করেন না। সর্বভূতে নিজেকে, নিজের মধ্যে সর্বভূতকে উপলব্ধি করেন। কেননাক, আর্য্য হিন্দু শাস্ত্রমতে আমরা মানুষেরা ঐহিক জগতে দ্বৈত ভাবে অসম্পৃক্ত হয়েও সেই এক পরমাত্মার সাথে সম্পৃক্ত।
আবার তৈত্তরীয় উপনিষদের বিদ্যা দানের শান্তি পাঠে রয়েছে, ‘‘ওঁ সহ নাববতু। সহ নৌ ভুনক্তু। সহ বীর্য করবাবহৈ। তেজস্বি নাবধীতমস্তু মা বিদ্বিষাবহৈ। ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।।’’ যার মর্মার্থ হলো, আমরা (আচার্য্য ও বিদ্যার্থী উভয়ে) সহমত হয়ে চলব, প্রকৃতির উপাদান সকলে স-মান (Equitable) ভাবে ভাগ করে জীবন ধারণ করব। কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করব না। আর অপরাবিদ্যার বিষয় ছিল জাগতিক শিক্ষা, যা ৬৪ কলা বিদ্যার মধ্যে নিহিত ছিল। (অন্তরাসীজন ৬৪ কলাবিদ্যার সিলেবাস জানতে আগ্রহী হলে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস মহোদয়ের অভিধানে ‘কলা’ সবিশেষ পাঠ করে দেখতে পারেন। তা হলেই বুঝতে পারবেন বিদ্যা কাকে বলে।) পরাবিদ্যার শিক্ষকদের বলা হতো আচার্য্য আর অপরাবিদ্যার শিক্ষকদের উপাচার্য্য (তৈত্তিরীয় উপনিষদ)। বর্তমানের শিক্ষা ব্যবস্থায় সরস্বতী আরাধনা মন্ত্রক্তো বেদ-বেদান্ত-বেদান্তের সাথে বাস্তব সখ্যতা না থাকলেও বিদ্যার সাথে সম্পৃক্ত আচার্য্য এবং উপাচার্য্য শব্দদ্বয়কে এখনো বিদায় দেওয়া যায় নি।
* * * * * *
আমাদের বর্তমান যুগ যে যুক্তিবাদী সে কথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি অস্বীকার করবেন না আশাকরি। যেমন, সন্তানের হয়ে মা খেলে সন্তানের পেট ভরবে না। ছাত্রের হয়ে শিক্ষক লেখাপড়া করলে ছাত্র পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে না। তেমনি বিদ্যালাভের জন্য বিহিত সাধনা না করে পুরোহিতের বলে দেওয়া দেবী সরস্বতীর অঞ্জলিমন্ত্র আওড়ালে বিদ্যার্থীদের বিদ্যা বা ঈপ্সিত ফললাভ হবে কি ?
অবশ্য পুরোহিতও জানেন না ফললাভের বিষয় সম্পর্কে। যদি জানতেন প্রতিমা-বিসর্জন মন্ত্রে বলতেন না—ওঁ আবাহনং ন জানামি, নৈব জানামি পূজনম্। বিসর্জনং ন জানামি ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি ।–অর্থাৎ আমি আবাহনও জানিনা, বিসর্জনও জানিনা, আমাকে ক্ষমা করুন। (দ্রঃ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)
বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী পূজ্য-প্রতিমা চঞ্চল চিত্তের ধারণের জন্য একটি অবলম্বন। প্রতিমাকে ব্রহ্মের রূপ কল্পনা করে উপাসনা, সংযম, সাত্তিক আহার, সাত্তিক বিহার ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে পূজা করা হয়।–যাতে পূজক বা উপাসক মনসংযোগ দ্বারা প্রতিমাকে হৃদয়ে ধারণ করে প্রতিমার গুণে গুণান্বিত হতে পারে। এই হলো প্রতিমা পূজার মূল কথা।
* * * * * *
আমাদের আলোচ্য দেবী সরস্বতী প্রতিমার চরণ পদ্মের উপর ন্যস্ত, এর দ্বারা সৃষ্টির বিবর্ত্তনের কথা রূপকে বর্ণিত হয়েছে। মা সরস্বতী হংসের উপর উপবিষ্ট। হংস পরমাত্মার প্রতীক। বীণা থেকে নাদ বা ধ্বনি উৎপন্ন হয়, তাই বীণা সুরত-শব্দযোগের প্রতীক । পুস্তক বা গ্রন্থ বিদ্যা অর্জনের মাধ্যমের প্রতীক। দেবীর শুক্লবর্ণ সাত্তিকতার প্রতীক। পদ্ম, হংস, বীনা, পুস্তকাদি সজ্জিত শ্বেতবসনা দেবী সরস্বতীর উপাসনার বিষয় তাহলে বিদ্যা, ব্রহ্ম, পরব্রহ্ম, সৃষ্টিতত্ত্ব ইত্যাদি হওয়া উচিত। প্রতিমার অলঙ্কারের ওই গুণগুলোর সিলেবাস জানার পরে তো উপাসনার দ্বারা গুণান্বিত হবার প্রশ্ন! সেই সিলেবাসগুলো দেবী সরস্বতী কোন্ পুস্তকে, কোন্ সংহিতায় লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন, সে বিষয়ে বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকা কোথাও কিছু বলে গেছে কিনা আমি জানি না। যদি কেউ জানেন দয়া করে জানালে বাধিত হব। তবে এটুকু জেনেছি, পরব্রহ্মের ব্যক্ত-প্রতীক ‘‘শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা’’ —‘‘তমসার পার অচ্ছেদ্যবর্ণ মহান পুরুষ ইষ্টপ্রতীকে আবির্ভূত’’ হয়েছেন যিনি, তিনি ওই সব বিষয়ের খুঁটিনাটি জানেন এবং সবাইকে জানিয়েও দিয়েছেন বিবিধ স্মৃতি এবং শ্রুতি বাণীর মাধ্যমে। যিনি মানুষের জীবনের বেঁচে থাকা ও বৃদ্ধি পাওয়ার জীবন্ত আদর্শ স্বরূপ। যিনি পঞ্চবর্হি ও সপ্তার্চ্চি মাধ্যমে সব দেবতার, সব আরাধনার, সব পূজার, সব বিদ্যার সূত্র সন্নিবেশিত করেছেন। যাঁর উপাসনা বাদ দিয়ে কোন পুতুল পূজা করে কোন কিছুই জ্ঞাত হওয়া সম্ভব নয়। তাঁর নাম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। যারজন্য সদদীক্ষার শুভ মুহূর্তে ‘‘ওঁ ব্রহ্ম পরব্রহ্ম ও কুলমালিক ……’’ মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে বাহ্যপূজার বিষয়ে উল্লেখ্য পরব্রহ্ম-এর প্রকৃত তত্ত্বকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।
* * * * * *
বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী সততা, সংযম, ন্যায়নীতি ইত্যাদি মানবিক গুণগুলোর প্রবহমানতাকে বৎসারান্তিক নবীকরণ করার জন্যই বাহ্যপূজা বা মূর্তিপূজা উদযাপনের উদ্দেশ্য। বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সরস্বতী পূজাই শুধু নয়, সব পূজার নামে হুজুগে মেতে আহার-বিহারে একটু বেশী করে অসংযমী হয়ে পড়ি আমরা। নাহলে সরস্বতী পূজা উপলক্ষ্যেও মাংসের দোকানে লাইন পড়ে যায়, যা হিন্দু শাস্ত্রে অভক্ষ্য, নিষিদ্ধ খাবার। যা খেলে আয়ুক্ষয় হয়। হিন্দুদের প্রামাণ্য গ্রন্থ মনু সংহিতা অনুযায়ী ‘মাং’ মানে আমাকে ‘স’ মানে সে, অর্থাৎ আমাকে সে খেলে আমিও তাকে খাব। আর আমরা ধর্ম পালনের অজুহাতে, পূজার অজুহাতে শাস্ত্রবিরোধী আচরণ করে হিন্দুত্বের বড়াই করতে চাইছি। এরফলে অহিন্দুরা আমাদের ওপর আঙুল তুলতে সাহস পাচ্ছে।
* * * * * *
ভাষা-বিজ্ঞান অনুযায়ী পূজা মানে পূরণ করা, সম্বর্দ্ধিত করা। যে আচার-আচরণ সাত্তিক জীবন-বর্দ্ধনার অভাবকে পূরণ করে, পরিবেশের জৈবাজৈব সবকিছুকে সম্যকরূপে বর্দ্ধিত করে, তার নাম পূজা। ‘শ্রেয়-সৃজনী সংহতি ও সমাবেশ’ যা, তার নাম উৎসব। আর যে আচার-আচরণ জীবনবৃদ্ধিকে নন্দিত করে তার নাম আনন্দ। এখন প্রশ্ন, আমাদের প্রচলিত পূজা, উৎসবের উদযাপন বৃহত্তর পরিবেশকে কতখানি নন্দিত করে ‘পূজা’ শব্দের যথার্থতাকে উপহার দিতে পেরেছে ? –এইসব বিষয়ে সত্তাপিয়াসী চিন্তাশীলদের চিন্তা করে দেখা উচিত। বিশেষ করে যাঁরা কুসংস্কার বিরোধী রূপে নিজেদের বোধ ও বোধিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান।
* * * * * *
পূজা বিষয়ে হিন্দুদের প্রামাণ্য গ্রন্থগুলো কি বিধান রেখে গেছে, বাহ্য-পূজাবাদীদের তা একবার জেনে নেওয়া দরকার।
‘মহানির্ব্বাণতন্ত্র’ নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ
‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ।
অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’
ওই মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ‘ভারতে বিবেকানন্দ’ গ্রন্থের ৩৩৬ পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট। ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’
‘‘যে-ব্যক্তি সর্ব্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে।’’ –শ্রীমদ্ভাগবত। ৩-২৯-২২
“ঈশ্বরঃ সর্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জ্জুন তিষ্ঠতি।
ভ্রাময়ন্ সর্ব্বভূতানি যন্ত্ররূঢ়ানি মায়য়া।।“
–গীতা, ১৮। ৬৫
“যিনি এই সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার নিজের স্বধর্মানুরূপ নিষ্কাম কর্মাচরণ দ্বারা (বাক্য বা ফুলজল দ্বারা নহে) পূজা করিয়া মানুষ সিদ্ধি লাভ করে । স্বধর্মানুরূপ (বর্ণানুগ সত্তাধর্ম পালন) নিষ্কাম কর্মই পরমেশ্বরের পূজার ডালি ।” (গীতা ১৮।৪৬)
“যে ব্যক্তি সর্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ প্রতিমার পূজা করে, সে ভস্মে হোম করে ।“ (শ্রীমদ্ভাগবত ৩।২৯।২২)
* * * * * *
তাই একটা প্রশ্ন স্বভাবতঃই জাগে, বিদ্যার্জনের জন্য আমরা যদি বাহ্যপূজার ডালি সাজিয়ে দেবী সরস্বতীর উপর সত্যিসত্যিই নির্ভরশীল হতে পারতাম, তাঁকে বিশ্বাস করতাম, তাঁর প্রতি নিষ্ঠা থাকত, তাহলে বিদ্যা লাভের জন্য তাঁকে নিয়েই পড়ে থাকতাম। প্রভূত অর্থ ব্যয় করে, একে-ওকে ধরাধরি করে স্কুল-কলেজে ভর্তি হয়ে, বিষয় ভিত্তিক প্রাইভেট টিউটরের কাছে টুইশন নিতে যেতাম না, পরীক্ষার হলে অসদুপায়ের আশ্রয় নিতাম না। কারণ, এ-তো দ্বন্দ্বীবৃত্তি, বিশ্বাসকে অপমান করা। অবশ্য না করে উপায়ও তো নাই! বর্তমানের মোবাইল প্রীতির যুগে, প্রতিমা-পূজায় বিশ্বাসী এমন কি কাউকে পাওয়া যাবে,— যিনি পুরোহিতকে কিছু দক্ষিণা দিয়ে তার সাধের মোবাইলের প্রতিকৃতি বা প্রতিমার পুজো করিয়ে মোবাইলের সব ফিচার উপভোগ করতে পারবে, ডাউনলোড-আপলোড করতে পারবে, হোয়াটস্ অ্যাপে ছবি পাঠাতে পারবে? প্রতিমা-পূজায় বিশ্বাসী এমন কোন মেয়ে পাওয়া যাবে, যে তার পছন্দের বর-এর ছবি বা কাট্-আউট পুজো করিয়ে মা হতে পারবে, সুখের দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করতে পারবে? যদি পারে তাহলে পুরোহিতকে দক্ষিণা দিয়ে সরস্বতী প্রতিমার পূজা করিয়ে বিদ্যা লাভ সম্ভব! নচেৎ কোন পুতুল পুজো করার আগে একটু বোধ-বিবেককে কাজে লাগাতে হবে।
* * * * * *
বাস্তব বোধের দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে বিচার-বিবেচনা করলে দেখা যাবে, সরস্বতী পূজার ওই মন্ত্রগুলোই শুধু নয়, আমাদের সব কথাই বাক্ হয়ে স্ফূরিত হয় বলে সরস্বতী বাগ্দেবী রূপে কল্পিত হয়েছেন। অতএব যুক্তি বা বিজ্ঞান অনুযায়ী দেবী সরস্বতী মেধানাড়ীতে সুপ্ত, কণ্ঠে এবং কলমে ব্যক্ত। একাগ্রতার অনুশীলনে মেধানাড়ী জাগ্রত না করতে পারলে, অর্থাৎ স্মৃতি যদি কাজ না করে মুখস্থ বলা যাবে না, লেখাও যাবে না। মেধানাড়ী ধ্রুবাস্মৃতির কাজ করে। উপনিষদে বর্ণিত আছে, আহার শুদ্ধৌ সত্ত্বাশুদ্ধিঃ, সত্ত্বাশুদ্ধৌ ধ্রুবাস্মৃতি …… । তাই, বিদ্যা লাভ করতে হলে মেধানাড়ীকে জাগ্রত রাখতে হবে। আর, মেধানাড়ীকে জাগ্রত রাখতে হলে সদাচার এবং বর্ণাশ্রমানুগ জীবন-যাপন—আহার-বিহার, জৈবিক তাগিদ পূরণ, জীবিকার্জন ইত্যাদি ইত্যাদি আহরণসমূহকে শুদ্ধ রাখতে হবে খেয়ালখুশীর প্রবৃত্তি-পরায়ণতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে।
বেদবিৎ আচার্য্যের বিধানকে উপেক্ষা করে শিক্ষার নামে, বিদ্যার নামে প্রবৃত্তি-পরায়ণতার বিধি-ব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থায় বা সরস্বতীর মূর্তি পূজা করে যদি প্রকৃত বিদ্যা লাভ হতে পারতো, তাহলে তথাকথিত বিদ্যালয়গুলো থেকে অনেক অসৎ-নিরোধী আদর্শবান, বিদ্বান, শ্রদ্ধাবান, চরিত্রবান মানুষের সৃষ্টি হতে পারতো। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উপাচার্যকে ঘেরাও করে ‘হোক কলরব’ সংগঠিত হতো না। ‘মা বিদ্বিষাবহৈ’-এর দেশের বিদ্যালয়ে ছাত্র-রাজনীতির নামে মানুষের প্রতি মানুষের বিদ্বেষ দেখতে হতো না। এসব উল্লেখ করার কারণ, বর্তমানে দুর্নিতীপরায়ণ মানুষদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যাঁরা একসময় বিদ্যাদেবীর আরাধনা করে সমাবর্তন মাধ্যমে আচার্য্য বা উপাচার্য্য স্বাক্ষরিত বিদ্বান আখ্যা বা শংসাপত্র বা ডিগ্রী নিয়েছেন! তাঁদের কি বিদ্বান বলা যাবে ?
অথচ এই ভারতবর্ষের রত্নাকর দস্যু সরস্বতীর কোন মূর্তি-পূজা না করেই, আহত-নাদ মর্যাদা-পুরুষোত্তম ‘রাম’-নামের (ম-রা, ম-রা, ম-রা ……..=রাম) সাধন করে দেবী সরস্বতীকে মেধানাড়ীতে জাগ্রত করে হয়েছিলেন বাল্মীকি।
* * * * * *
একদা তমসা নদী থেকে স্নান সেরে ফিরছিলেন। এক তরুশাখে ক্রৌঞ্চ-জুটি পরস্পর খেলছিল। এক ব্যাধ পুরুষ পাখিটিকে তীর মেরে হত্যা করলে স্ত্রী পাখিটি করুণ বিলাপ করতে থাকে। বাল্মীকি বিচলিত হয়ে ‘কোনদিন প্রতিষ্ঠা পাবে না’ বলে ব্যাধকে অভিসম্পাত করেন। সেই অভিশাপ বাণী স্বতঃস্ফূর্ত শ্লোকবদ্ধ হয়ে নির্গত হয়েছিল :–‘‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতী সমাঃ/যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকম্ অবধী কামমোহিতম্।’’ এই শ্লোকটিকে পৃথিবীর সারস্বত সাধকেরা আদি শ্লোক বলে মান্য করেন। অতএব, সারস্বত সাধনার মূল বিষয় মস্তিষ্কে সুপ্ত থাকা মেধানাড়ী বা স্মৃতিবাহী চেতনার জাগরণ।
* * * * * *
মেধানাড়ীকে জাগ্রত করতে হলে লাগে অনাহত-নাদ বা সৎমন্ত্র সাধন। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের বিদ্বান করার জন্য দীক্ষার মাধ্যমে আজ্ঞাচক্রে অনাহত-নাদের সৎমন্ত্র সাধন, স্বতঃ-অনুজ্ঞার অনুশাসন এবং সদাচার মাধ্যমে আমাদের মেধানাড়ীকে জাগ্রত করার সহজ উপায় দান করেই ক্ষান্ত হন নি, ‘নিয়তং স্মৃতিচিদযুতে’-বাণীতে স্বস্ত্যয়নী ব্রতের মন্ত্রের মাধ্যমে স্মৃতিবাহী চেতনাকে জাগ্রত করার বিধান দিয়ে দেবী সরস্বতীর আরাধনার নিমিত্ত স্থায়ী একটা আসন পেতে দিলেন। যা’তে আমরা প্রতিনিয়ত সরস্বতী পূজায় ব্যাপৃত থাকতে পারি। আমরা একটু চেষ্টা করলেই সেই বিধিগুলোকে অনুশীলন মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে দেবী সরস্বতীকে সম্বর্দ্ধিত করে, প্রকৃত অর্থে পূজা করে নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ,পবিত্র হতে পারব, বিদ্বান হতে পারব।
এবার আমরা একটু দেখে নেব বর্তমান বেদবিৎ আচার্য্য শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সরস্বতী বিষয়ে কি নিদান রেখে গেছেন।
‘‘বিকাশ-ব্যাকুল গতিই যাঁর সংস্থিতি—
তিনিই সরস্বতী,
আর, বাক্ বা শব্দই
যাঁর সত্তা—
তিনিই বাগ্দেবী;
তাই, যিনিই বাগ্দেবী
তিনিই সরস্বতী। ২ ।
বাস্তব উপলব্ধিসম্ভূত
সার্থক অন্বিত-সঙ্গতিশীল জ্ঞানকেই
বিদ্যা বলে। ৩ ।
সার্থক সর্ব্বসঙ্গতিশীল জ্ঞানই
বিজ্ঞান,
আর, তা’ই বেদ,
প্রজ্ঞাও তা’ই। ১০ ।’’
(সংজ্ঞা সমীক্ষা)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রদত্ত উপরোক্ত বাণীতে এটুকু বোঝা গেল যে সরস্বতী আরাধনার মাধ্যম বাক্ বা শব্দ সাধন। শ্রীশ্রীঠাকুর ভাব-সমাধিতে বাক্ বা শব্দের সন্ধান দিতে গিয়ে ব্যক্ত করলেন,—‘‘নাম-নামী অভেদ, ….. স্থূলে আমার প্রকাশ, সূক্ষ্মে আমার বাস।’’ মহাগ্রন্থ পুণ্যপুঁথির উক্ত বাণীকে স্বীকার করলে বাক্ বা শব্দের অস্তিত্বের আধারও শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। এবং সব দেবতার সমাহারে সৃষ্ট একমাত্র তিনিই ভগবানের অখন্ড সাকার মূর্তি। তিনি ইষ্ট, তিনি ধ্যেয়, তিনি জ্ঞেয় এবং তিনিই পূজ্য। তাঁর আদর্শ মেনে চলে ইষ্টপূজা করতে পারলে সব দেবতার পূজা করা হয়।
আপনারা আমার শ্রীপঞ্চমীর প্রণাম নেবেন। জয়গুরু বন্দে পুরুষোত্তমম্!
[ভারতবর্ষের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শাসন ক্ষমতা অধিকার করার জন্য অনেক রাজনৈতিক দল থাকা সত্ত্বেও “আর্য্যমহাসভা” নামের রাজনৈতিক দল গঠন করার প্রয়োজন রয়েছে কেন, তার সমর্থনে আমাদের বক্তব্য।]
আমাদের কথা
।। আর্য্য মহাসভা রাজনৈতিক দল কেন প্রয়োজন ।।
[ভারতবর্ষের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শাসন ক্ষমতা অধিকার করার জন্য অনেক রাজনৈতিক দল থাকা সত্ত্বেও “আর্য্যমহাসভা” নামের রাজনৈতিক দল গঠন করার প্রয়োজন রয়েছে কেন, তার সমর্থনে আমাদের বক্তব্য।]
* * *
আমরা সাধারণ জনগণেরা পলিটিক্যাল সায়েন্স বা রাষ্ট্র বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্ব ও তথ্য বিষয়ে পারদর্শী না হলেও এটুকু অন্ততঃ বুঝি, যে নীতিবিধির সাহায্যে রাষ্ট্রের জনগণ দুটো খেয়েপড়ে সুখে-শান্তিতে নিরাপদে বসবাস করতে পারে তার জন্যই রাজনীতি। সেই রাজনীতির নিয়ামক মানুষ। ভারত রাষ্ট্র সেই মানুষদের প্রজা নামে পরিচিত করিয়েছেন বলেই আমরা গণ প্রজাতন্ত্রী ভারতবর্ষের নাগরিক বা প্রজা হিসেবে পরিচিত। আমাদের ভারতবর্ষে এই প্রজারাই রাষ্ট্র নির্মাণের একক। ভারতের নিজস্ব অর্থশাস্ত্র, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে।
‘‘সুখস্য মূলম্ ধর্মঃ।
ধর্মস্য মূলম্ অর্থঃ।
অর্থস্য মূলম্ রাষ্ট্রম্।
রাষ্ট্রস্য মূলম্ ইন্দ্রিয়-বিজয়ম্।
ইন্দ্রিয়-বিজয়স্য মূলম্ জ্ঞানবৃদ্ধসেবয়া।
জ্ঞানবৃদ্ধসেবয়া বিজ্ঞানম্।।”
অর্থাৎ, সুখের মূলে ধর্ম। ধর্মের মূলে অর্থ। অর্থ বলতে এখানে শুধু টাকাপয়সার কথা বলা হয়নি, পুরুষার্থের চতুর্বর্গ—বর্ণাশ্রম এবং চতুরাশ্রমধর্ম পালন করার বিষয়ে বলা হয়েছে। প্রজাদের পরমার্থ লাভের বিষয়ে অবহিত করার জন্য রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। রাষ্ট্রের কাজ হলো প্রজাদের ধর্মপথে, অর্থাৎ ন্যায়ের পথে পরিচালিত করা। তাই রাষ্ট্র গঠন করতে হবে ইন্দ্রিয়বিজয়ী প্রজাদের দ্বারা। ইন্দ্রিয়জাত অনিয়ন্ত্রিত লোভ, কাম, ক্রোধ, হিংসা ইত্যাদি সুখ-শান্তির পরিপন্থী। আধ্যাত্মিক অনুশাসন ব্যতীত ইন্দ্রিয়বিজয়ী হওয়া সম্ভব নয়। ইন্দ্রিয়বিজয়ী হতে হলে জ্ঞানবৃদ্ধের সেবা করতে হবে, অনুশাসন মেনে চলতে হবে। ইন্দ্রিয়ের ওপর আধিপত্য বা নিয়ন্ত্রণ যাঁর আছে তিনিই জ্ঞানবৃদ্ধ। সদগুরু হলেন সেই জ্ঞানবৃদ্ধ। সদগুরুর দীক্ষা নিয়ে আদর্শানুগ জীবন যাপন করতে পারলেই বিশেষ জ্ঞান লাভ হবে। জড় ও চৈতন্য (matter and spirit) বিষয়ক বিজ্ঞান জানা যাবে।
উপরোক্ত বিধিসমূহ পালন করে প্রকৃষ্ট জাতক বা ‘প্রজা’ সৃষ্টির প্রবহমানতাকে রক্ষা করে চলাই ছিল আর্য্য ভারতের আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্য।
**************************
সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ প্রাণী মানুষ চায় সারা জীবন ধরে সুখে শান্তিতে বেঁচে থাকতে। শুধু মানুষ কেন, গাছপালা, পোকামাকড়, জন্তু-জানোয়ার—সবাই বেঁচে থাকতে চায়, বৃদ্ধি পেতে চায়। যে যে নিয়ম পালন করলে সুস্থভাবে বাঁচা যায়, বৃদ্ধি পাওয়া যায় সেই প্রক্রিয়ার নাম জীবনের ধর্ম পালন করা। কিন্তু বাস্তবে তো সবাই চিরকাল বেঁচে থাকতে পারে না, একদিন না একদিন জীবনের অবসান হয়। তথাপি বুদ্ধিমান মানুষ অন্যায়, অধর্ম করে, বিবেক-বিরোধী কর্ম করে অসুখ, অশান্তিকে আবাহন করে এটাই সবচাইতে আশ্চর্যের।
মানুষ ব্যতীত অন্যান্য প্রাণীরা সহজাত প্রবৃত্তি মাধ্যমে জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, মানুষ বুদ্ধি দ্বারা জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। অরণ্যবাসী, গুহাবাসী মানুষ একসময় কাঁচা ফলমূল, মাংস ইত্যাদি খেয়ে প্রাণ ধারণ করত। ক্রমে আগুনের ব্যবহার, পশুপালন, কৃষিকাজ শিখে আস্তানা তৈরি করে, গৃহ নির্মাণ করে ক্রমোত্তরণের সিঁড়ি বেয়ে আজকের আধুনিক যুগের সভ্যতার সভ্য হতে পেরেছে।
বেঁচে থাকার প্রশ্নে মনুষ্যেতর প্রাণীরা এই আধুনিক বৈজ্ঞানিক যুগেও প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। যেমন, পরিযায়ী পাখিরা অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে টিঁকে থাকতে নদনদী, পাহাড়, পর্বত, সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আমাদের দেশে আসে জৈবিক তাগিদ পূরণের জন্য।—আবার ফিরে যায় চরৈবেতির পথ ধরে। ওদের জন্য কোন রাজনৈতিক দল, কোন সরকার, কোন সংগঠন নির্দিষ্ট রুট ম্যাপ, আশ্রয়-শিবির, খাদ্যের ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিছুই করে কি-না আমার জানা নেই। তবে আমার জানা মতে, প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে ওরা জীবন যাপন করে বলেই তেমন একটা অসুখী নয়, অকালমৃত্যুও হয় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের মত কিছু সভ্য মানুষদের অসভ্যতার জন্য ওদের সুখ-শান্তি ব্যহত হয়।
অপরপক্ষে, ‘ভোলেবাবা পার করেগা’ ধ্বনি সহযোগে যে-সব মানুষেরা বাঁকে করে জলঘট নিয়ে বিশেষ-বিশেষ লগনে শিবালয়ের শিবলিঙ্গে জল নিবেদন করতে যান, তাঁদের সেবা দেবার জন্য প্যাণ্ডেল করে, মাইক বাজিয়ে, রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় সংগঠনগুলো কতইনা তৎপর থাকেন! শ্রাবন মাসে রাস্তার ধারে ধারে প্যাণ্ডেলে প্যাণ্ডেলে ছয়লাপ হয়ে যায়! সেবার ডালি দিয়ে কে কাকে টেক্কা দেবে সেই প্রতিযোগিতা সুরু হয়ে যায়! যারা চাক্ষুস করতে চান, একটু কষ্ট করে শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবার বি. টি. ধরে ডানলপ থেকে ব্যারাকপুর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করলেই উপলব্ধি করতে পারবেন। শ্রীরামপুরের মাহেশের রথের মেলাতে গেলেও সেবার প্রতিযোগিতা অবলোকন করতে পারবেন। সত্যিই, না দেখলে বোঝা যেত না যে, মানুষ মানুষের জন্য কত সেবা-ই না করতে পারেন!
মানুষকে সুখে-শান্তিতে রাখার জন্য (নিন্দুকেরা বলেন, ভোট পাবার জন্য।) রাজ্য সরকার ‘দুয়ারে সরকার’-এর মাধ্যমে খয়রাতি সাহায্যের বিভিন্ন নামের প্রকল্প চালু করেছেন। তথাপিও কেন জানি সরকার সব মানুষদের সুখে, শান্তিতে রাখতে পারছেন না! অসুখ, অশান্তি, দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, হিংসা প্রভৃতি সমস্যায় জেরবার হয়ে জনগণ থানা, পুলিশ, কোর্ট, হাসপাতাল, রাজনৈতিক নেতাদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে বাধ্য হচ্ছে! এসব সমস্যার কারণ কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত প্রবৃত্তি। মানুষের দেহে বিরাজমান বন্ধুরূপী শত্রু লোভ, কাম, ক্রোধ, মদ, মোহ, মাৎসর্য ইত্যাদির লাগামহীন পরিচর্যা। সব অশান্তির মূল কারণ ষড়রিপু। সেই ষড়রিপুর মুখে লাগাম পড়াবার মতো কোন প্রকল্প রাজনৈতিক দলগুলো গ্রহণ করছে না। করতে পারলে মানুষকে সৎ-এর বা সত্তার পথে পরিচালিত করে আত্মনির্ভর হতে শেখানো যেত। মানুষকে সুখী করা যেত। লাগামহীন ভোগের চাহিদায় সুড়সুড়ি দিয়ে মানুষকে কখনোই সুখী করা যায় না। অথচ দেখুন, সুকুমার রায়ের কালজয়ী রচনা ‘রাজার অসুখ’-এর চালচুলোহীন ভিখারীটা কেমন চাহিদাশূন্য হয়ে নিজেকে রাজার চাইতেও সুখী প্রমাণ করে ছেড়েছেন।
সুখের বিপরীতে বাস করে দুঃখ। চাওয়াটা না পাওয়াই দুঃখ। সব দুঃখের কারণ কিন্তু প্রবৃত্তি-পোষণী চাহিদার বাড়বাড়ন্ত। যাকে আমরা অভাব বলতে অভ্যস্ত। হাজার চাহিদা পূরণ করেও মানুষের অভাবজনীত দুঃখ দূর করা যায় না,—যতক্ষণ না মানুষ ওই অভাবের ভাবটাকে মন থেকে তাড়িয়ে দিতে পারবে। কোন রাজার বা রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়া ছাড়াই রাজার অসুখের ভিখারিটা মন থেকে অভাবের ভাবটাকে তাড়াতে পেরেছিলেন বলেই তিনি প্রকৃত সুখী হতে পেরেছিলেন।
মানুষ মানুষকে সুখী করার জন্য, সুখী দেখার জন্য এখনো ভাবে। নইলে ‘ভাল থাকবেন’ বলে যবনিকা টানতেন না আলাপচারিতার অন্তে, বিদায় লগ্নের প্রাক্কালে। ভাল থাকার ইচ্ছে আছে বলেইনা ‘হ্যাভ এ গুড ডে’, ‘সী ইউ অ্যাগেইন’ ইত্যাদি শুভেচ্ছা সম্বোধনগুলো আমরা আয়ত্ত করেছি।
সরলার্থ—সকলে সুখী হোন, নিরোগ হোন এবং শান্তি লাভ করুন, কেউ যেন দুঃখ ভোগ লাভ না করে।।
মন্ত্র সমৃদ্ধ মঙ্গলাচারণের শুভেচ্ছাবার্তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
কে চায় না? সবাই তো সুখি হতে চায়, সবাই তো শান্তি চায়, সবাই তো নীরোগ থাকতে চায়। কিন্তু অ-সুখকে পাশ কাটিয়ে সুখি কিভাবে হতে হয়, অশান্তিকে পাশ কাটিয়ে কিভাবে শান্তি পেতে হয়, দুষ্ট মনকে শিষ্ট করে কিভাবে নীরোগ থাকতে হয়, তা হয়তো সকলে জানেন না।
উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, অঋণী, অপ্রবাসী, দিনান্তে একবার যে শাকান্ন খেয়ে জীবন ধারণ করেন, সে-ই প্রকৃত সুখী। শুধু কথার কথা নয়, নবদ্বীপের পণ্ডিত রামনাথ তর্কসিদ্ধান্ত, যাঁকে সবাই বুনো রামনাথ বলে জানতেন। তিনি তো প্রয়োজনে তেঁতুলপাতার ঝোল, আর মোটা চালের ভাত খেয়েই বিনে মাইনেতে শিক্ষকতা করতেন, সংস্কৃতে গ্রন্থ রচনা করতেন, কোন দান বা খয়রাতি সাহায্য না নিয়েই বেশ নীরোগ দেহ নিয়ে সুখে, শান্তিতে জীবন কাটিয়ে বোদ্ধা সমাজে অমর হয়ে আছেন।
মহাভারতে ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা নামক পর্বাধ্যায়ে বর্ণিত সুখের বিষয়টা আরও আরও বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হয়েছে। মহাবীর অর্জুনকে যে সুখের সন্ধান দিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ, নিম্নোক্ত শ্লোক বর্ণিত জ্ঞানের মাধ্যমে।
नास्ति बुद्धिरयुक्तस्य न चायुक्तस्य भावना। न चाभावयतः शान्तिरशान्तस्य कुतः सुखम्।। 2.66।। “নাস্তি বুদ্ধিরযুক্তস্য ন চাযুক্তস্য ভাবনা।” ন চাভাবয়তঃ শান্তিরশান্তস্য কুতঃ সুখম্।। —অর্থাৎ, পরমপিতার সাথে যোগযুক্ত নয় এমন অযুক্তের বুদ্ধি হয় না, ফলে বাঁচার ভাবনা ভাবতে পারে না, শান্ত হতে পারে না, শান্তি পায় না, (কোন অবস্থায় সাম্যহারা না হওয়াই শান্তি।) আর অশান্ত যে, সে সুখের সন্ধান পাবে কোত্থেকে?
এই শ্লোকের মাধ্যমে আমরা সুখের রাজ্যে পৌঁছবার একটা সিঁড়ির সন্ধান পেলাম। বুদ্ধি থাকলেই হবে না। বুদ্ধি কোন উচ্চ আদর্শে যোগযুক্ত হলেই বাঁচার ভাবনা ভাবতে পারে, ফলে শান্ত হয়, শান্তি পায়, যার ফলে প্রকৃত সুখ আস্বাদন করতে পারেন। এথেকে বোঝা গেল যে, স্থিতধীসম্পন্ন না হলে সুখী হওয়া যায় না। স্থিতধীসম্পন্ন হতে গেলে ভালো বুদ্ধিদাতার শরণাপন্ন হতে হয়। সেই বুদ্ধিদাতা ছিলেন পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ।
আমরা, বুদ্ধিমান মানুষেরা প্রচলিত অনেক মতবাদ না মানলেও ধর্মগ্রন্থ হিসেবে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাকে কিন্তু স্বীকৃতি দিয়েছি। কোন মন্দিরে, কোন আশ্রমে নয়, কুরুক্ষেত্র নামের বিস্তৃত ধর্মক্ষেত্র প্রাঙ্গনে যার উদ্ভব। কুরু-পাণ্ডবদের রাজ্য-বিবাদ বা রাজনীতির টানাপোড়েনের চরম মীমাংসার পথ খুঁজে নেয় দুর্যোধন, যুদ্ধের মাধ্যমে। যুদ্ধ যাতে না হয় বৃষ্ণিবংশীয় শ্রীকৃষ্ণ নিজে থেকে উদ্যোগ নিয়ে মীমাংসা করার চেষ্টা করেছিলেন। পঞ্চ পাণ্ডবদের বসবাসের জন্য মাত্র ৫ খানা গ্রাম চেয়েছিলেন। রাজী হননি কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র পুত্র দুর্যোধন। পণ করেছিলেন, ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’। যার ফলস্বরূপ ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রের প্রাঙ্গনে যুদ্ধের আয়োজন হয়েছিল।
কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে যুযুধান কৌরব ও পাণ্ডব দুইপক্ষের সৈন্য সমাবেশ হয়েছে। পাণ্ডব পক্ষের প্রধান যোদ্ধা তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন, তাঁর রথের সারথী শ্রীকৃষ্ণকে উভয় পক্ষের সৈন্যদের মাঝখানে রথ স্থাপন করতে বললেন। শ্রীকৃষ্ণ রথটি চালিয়ে নিয়ে উভয় পক্ষের সৈন্যদের মাঝখানে রাখলেন। তখন অর্জুন উভয় পক্ষের সেনাদলের মধ্যে পিতৃব্য, পিতামহ, আচার্য্য, মাতুল, ভ্রাতা, পুত্র, পৌত্র, শ্বশুর, মিত্র ও শুভাকাংক্ষীদের দেখতে পেয়ে, শুধু রাজত্ব ফিরে পাবার জন্য তো নয়ই, ত্রিভুবনের বিনিময়েও আপনজনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে রাজী নয়, স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন শ্রীকৃষ্ণকে। প্রমাদ গুনলেন শ্রীকৃষ্ণ। যার ওপর ভরসা করে ধর্ম সংস্থাপন করার পরিকল্পনা করেছেন, সেই মহাবীর অর্জুন কিনা শেষমেষ যুদ্ধবিমুখ! তীরে এসে তরী ডোবাতে চাইছে! পরিস্থিতি সামাল দিতে পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বর্ণাশ্রমানুগ ক্ষাত্রধর্ম পালন করতে উৎসাহিত করার জন্য বলেন, এই ঘোর সংঙ্কটময় যুদ্ধস্থলে যারা জীবনের প্রকৃত মূল্য বোঝে না, সেই সব অনার্যের মতো শোকানল তোমার হৃদয়ে কিভাবে প্রজ্জ্বলিত হল? এই ধরনের মনোভাব তোমাকে স্বর্গলোকে উন্নীত করবে না, পক্ষান্তরে তোমার সমস্ত যশরাশি বিনষ্ট করবে। এই সম্মান হানিকর ক্লীবত্বের বশবর্তী হয়ো না৷ এই ধরনের আচরণ তোমার পক্ষে অনুচিত। এই যুদ্ধে নিহত হলে তুমি স্বর্গ লাভ করবে, আর জয়ী হলে পৃথিবী ভোগ করবে৷ অতএব যুদ্ধের জন্য দৃঢ়সংকল্প হয়ে উত্থিত হও।—এইসব তত্ত্বকথা বিফল হবার পরে শ্রীকৃষ্ণ বলতে বাধ্য হলেন, আসলে তোমার বুদ্ধি বিপর্য্যয় হয়েছে বলে তুমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছ, তোমার অশান্ত হৃদয় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
যুদ্ধক্ষেত্রে রথে উপবিষ্ট হয়ে উপরোক্ত (২/৬৬) শ্লোকের মাধ্যমে দ্রোণাচার্য্য, কৃপাচার্য্য নামের বিখ্যাত শিক্ষাগুরুদের শিষ্য, মহাবীর, মহারথী, মহা-সংযমী, ব্রহ্মচারী অর্জুনকে অস্থিরবুদ্ধিসম্পন্ন বললেন, ভগবানের সাথে যোগযুক্ত নয় বলে। আর যোগযুক্ত হতে হলে গুরুকরণ করতে হবে। মহাবীর অর্জুনের শিক্ষাগুরু থাকলেও ইষ্টগুরু ছিল না।
“(ইষ্ট)গুরুই ভগবানের সাকার মূর্তি, আর তিনিই absolute (অখন্ড)।”
বর্তমান ইষ্টগুরু শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলছেনঃ
শিক্ষাগুরু থাক না অনেক
শিখো যেমন পার
ইষ্টগুরু একই কিন্তু
নিষ্টাসহ ধর।
জীবনচলনার জাগতিক বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনে যিনি বা যাঁরা সাহায্য করেন তারা হলেন শিক্ষাগুরু। পিতামাতা থেকে স্বভাব পাই বলে তাঁরা হলেন স্বভাবগুরু। আর জীবননদীর ঘুর্ণিপাক থেকে বাঁচাবার কৌশল যিনি শেখাতে পারেন অর্থাৎ অন্তর্যামীকে উপলব্ধি করাতে যিনি পারেন তিনি ইষ্টগুরু বা সদগুরু। এই গুরুই হলেন ভগবানের সাকার মূর্তি। তিনিই absolute (অখণ্ড)। ইষ্টগুরু গ্রহণ করলে মানুষ স্থিতধী হয়ে ব্যক্তিসত্তার অখণ্ড বিন্যাসকে বজায় রেখে নিজসত্তাকে উপলব্ধি করতে পারে। তখন শান্তি এবং সুখ দাস হয়ে সেবা করে। মহাবীর অর্জুন দীক্ষার মাধ্যমে ইষ্টগুরুর সাথে যোগযুক্ত ছিলেন না বলেই শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে গীতার জ্ঞানের সাহায্যে সুখের পথের সন্ধান দিয়েছিলেন। গীতা যদি ধর্মগ্রন্থ হয়, তাহলে বলতে হয়, ধর্মনীতিই অর্জুনকে প্রকৃত রাজনীতি শিখিয়েছিল।
মনুষ্য দেহধারী পরমপিতা, পুরুষোত্তম, সদগুরু, বা ভগবানের সাথে যোগযুক্ত না হয়ে যেমন ধর্ম পালন করা সম্ভব নয়, তেমনি রাজনীতি শেখাও সম্ভব নয়। সনাতন ধর্মের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ঈশ্বর এক, ধর্ম এক, প্রেরিতপুরুষগণ সেই এক-এরই বার্তাবাহী। এই তত্ত্বজ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করতে হলে শ্রীকৃষ্ণরূপী জীবন্ত সদগুরুর চিরন্তনী নিদেশ—
সর্বধর্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ॥ (গীতা ১৮ অধ্যায় ৬৬তম শ্লোক)
অর্থাৎ, জীবনকে ধারণ করার জন্য ধর্মের নামে প্রচলিত সব নীতিবিধি পরিত্যাগ করে কেবল আমার শরণাগত হও। আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করবো। এই বাণী মেনে চলতে হবে।
মানবজাতির মনুষ্যত্বের প্রবহমানতাকে সমৃদ্ধ করতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতা গ্রন্থের ৪র্থ অধ্যায়ের ৭ম থেকে ৯ম শ্লোকে সব-যুগের সকল মনুষ্যদের জন্য এক স্পষ্ট নির্দেশিকা, গাইডলাইন দিয়ে বলেছেন—
যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভ্যূত্থান হয়, তখন আমি দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করে সাধুদের পরিত্রাণ করে ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে অবতীর্ণ হই। যিনি সাধনা দ্বারা আমার এই প্রকার দিব্য জন্ম ও কর্ম যথাযথভাবে জানেন, তাঁকে আর দেহত্যাগ করার পর পুণরায় জন্মগ্রহণ করতে হয় না, তিনি আমার নিত্য ধাম লাভ করেন।
উপরোক্ত বাণী সকল যুগের মানুষদের জন্য চূড়ান্ত পথ নির্দেশ। যখন যে রূপে পুরুষোত্তমের আবির্ভাব হবে, তখন সেই রূপের শরণাপন্ন হতে হবে, ভজনা করতে হবে।
যখন যিনি পুরুষোত্তমরূপে অবতীর্ণ হন, তিনিই তখন জীবন্ত বেদ, সংহিতা, পুরাণ। ওই সূত্র অনুসারে রামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীস্ট, হজরত রসুল, চৈতন্যদেব, শ্রীরামকৃষ্ণদেব সকল গুরুদের গুরু সদগুরুরূপে স্বীকৃতি পান। অর্থাৎ স্থান-কাল-পরিবেশ অনুযায়ী যখন যিনি যেখানেই অবতীর্ণ হন না কেন, তাঁর মধ্যে পূর্ব পূর্ব গুরুদের জীবন্ত অনুভব করা যাবে। পূর্ববর্তীদের প্রকৃত আদর্শ খুঁজে পাওয়া যাবে। যাকে আমরা বর্তমানের সফটওয়ারের ভাষায়, অ্যাপ্লিকেশন বা অ্যাপস্-এর ভাষায় আপডেট বলি। যারমধ্যে অ্যাপ্লিকেশনের সূত্রপাত থেকে সুরু করে সর্বশেষ সংস্করণের নবীকরণের তথ্য মজুত থাকে। আমি যদি আমার মোবাইলের অ্যাপ্লিকেশনগুলো আপডেট না করি তাহলে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারব না। যারা আপডেটেড্, তারাই লক্-ডাউনের সময় অন-লাইন কাজকর্ম করে অনেক কিছু সামাল দিতে পেরেছেন। সবকিছু সামাল দিতে গেলে আপডেটেড হতে হবে সবক্ষেত্রে। ব্যাকডেটেড থেকে কিছু সামাল দেওয়া যায় না। অথচ আমরা অজ্ঞতাবশে নিজেদের ধারণ করার প্রশ্নে, অর্থাৎ ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে ব্যাকডেটেড হয়ে আছি। তাই তো বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনকূলচন্দ্র আমাদের সচেতন করে দিতে বললেন—“ভারতের অবনতি (degeneration) তখন-থেকেই আরম্ভ হয়েছে, যখন-থেকে ভারতবাসীর কাছে অমূর্ত্ত ভগবান অসীম হ’য়ে উঠেছে—ঋষি বাদ দিয়ে ঋষিবাদের উপাসনা আরম্ভ হয়েছে।
ভারত! যদি ভবিষ্যৎ-কল্যাণকে আবাহন করতে চাও, তবে সম্প্রদায়গত বিরোধ ভুলে জগতের পূর্ব্ব-পূর্ব্ব গুরুদের প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হও—আর তোমার মূর্ত্ত ও জীবন্ত গুরু বা ভগবানে আসক্ত (attached) হও,—আর তাদেরই স্বীকার কর—যারা তাঁকে ভালবাসে। কারণ, পূর্ব্ববর্তীকে অধিকার করিয়াই পরবর্ত্তীর আবির্ভাব।” (সত্যানুসরণ)
কথাপ্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন—“বর্ত্তমান যিনি, তাঁকে ধরলেই তাঁর মধ্যে সব পাওয়া যায়। ………. রামচন্দ্রকে যে ভালবাসে সে যদি শ্রীকৃষ্ণকে না ধরে তবে বুঝতে হবে তার রামচন্দ্রেও ভালবাসা নেই, ভালবাসা আছে তার নিজস্ব সংস্কারে।” (আঃ প্রঃ ২১ খণ্ড, ইং তাং ৩১-১২-১৯৫২)
* * *
ইষ্টগুরু নিদেশিত সদাচার এবং বর্ণাশ্রমধর্মকে অগ্রাহ্য করে তথাকথিত ধার্মিক হতে চাওয়া সখা অর্জুনকে প্রকৃত ধার্মিকে রূপান্তরিত করার জন্য পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ অর্জুন বিষাদ যোগ, সাংখ্য যোগ, কর্ম যোগ, জ্ঞান-কর্ম-সন্ন্যাস যোগ, কর্ম-সন্ন্যাস যোগ, আত্ম-সংযম যোগ, জ্ঞান-বিজ্ঞান যোগ, অক্ষর-পরব্রহ্ম যোগ, রাজ-বিদ্যা-রাজ-গুহ্য যোগ, বিভূতি যোগ, বিশ্বরূপ-দর্শন যোগ, ভক্তি যোগ, ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ-বিভাগ যোগ, গুণত্রয়-বিভাগ যোগ, পুরুষোত্তম যোগ, দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগ যোগ, শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ যোগ ও মোক্ষ-সন্ন্যাস যোগ ইত্যাদি নামাঙ্কিত অষ্টাদশ প্রকৃতির যোগ-এর সাহায্যে পরমাত্মিক শক্তির সাথে যোগযুক্ত করেন।
অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে সখাজ্ঞানে ভালবাসতেন, ভরসা করতেন, কিন্তু তাঁর ‘মানুষীতনুআশ্রিতম্ ভূত-মহেশ্বর’ রূপের পরিচয়, পুরুষোত্তমীয় শক্তির পরিচয় তিনি বুঝতে পারেন নি। তা যদি বুঝতেন, পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণকে তাঁর রথের সারথী হতে বলতে পারতেন না। আর তিনি যদি অর্জুনের সারথী না হতেন, আমরা, জগৎ-সারথী প্রোক্ত সুখে-শান্তিতে বেঁচে থাকার চাবিকাঠি-স্বরূপ মানব জীবনের প্রকৃত সংবিধান শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পেতাম না। তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার জ্ঞান পেয়ে শ্রীকৃষ্ণকে ইষ্টগুরু রূপে বরণ করে তাঁর আদর্শ মেনে কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। ক্ষাত্র জনোচিত স্বধর্ম বা বৃত্তিধর্ম পালন করে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন। জয়লাভ করতে পেরেছিলেন জীবনযুদ্ধে। অতএব, প্রবৃত্তিপরায়ণতার বুদ্ধি যতক্ষণ না ইষ্টগুরুর আদর্শের সাথে যোগযুক্ত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত সুখি হওয়া যে সম্ভব নয় তা প্রমাণিত সত্য, যদি শ্রীকৃষ্ণের গীতা গ্রন্থকে আমরা মান্য করি।
* * *
সম্মানীয় পাঠক, এতক্ষণে বেশ বিরক্ত হয়েছেন বুঝতে পারছি। হয়তো ভাবছেন, একটা রাজনৈতিক পার্টির কথা বলতে গিয়ে ধর্মচর্চা সুরু করে দিয়েছেন! ধর্ম আর রাজনীতিকে এক করে ফেলতে চাইছেন!
আচ্ছা একটা কথা বলুন তো, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যদি ধর্মগ্রন্থ হয়, তাহলে তার উৎপত্তি কি রাজনীতিকে কেন্দ্র করে নয়? কৌরব-পাণ্ডবদের রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্যই তো কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হয়েছিল। ওই যুদ্ধক্ষেত্রকে কেন্দ্র করেই তো শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার উৎপত্তি। আবার ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনকে যদি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বলে মানেন, সেই রাজনীতির প্রেরণা ছিল শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার আদর্শ। ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ-এর বন্দে মাতরম্ স্তোত্র-ও কিন্তু শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার আদর্শের অনুসরণে সৃষ্টি হয়েছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবীদের কাছে একটা করে গীতা গ্রন্থ থাকত। তাই ধর্ম ও রাজনীতি বিষয়ে কোন মন্তব্য করার আগে একটু ভেবেচিন্তে করতে হবে।
ভুললে চলবে না যে, ‘‘কর্ম্মণ্যেবাধিকারেস্তু মা ফলেষু কদাচন।…….’’ ––কর্মেই তোমার অধিকার ফলে নয়। ––শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই বাণীর অনুপ্রেরণায় নবযুগের অভিমন্যু ক্ষুদিরাম, দেশরক্ষার ধর্ম পালন করতে গিয়ে ফাঁসির আসামী হয়েছিলেন। ‘‘ন জায়তে ম্রিয়তে কদাচিৎ…….বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়………নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ।…….’’। বাণীর অমৃত আদর্শে স্থিতপ্রজ্ঞ, মৃত্যুঞ্জয়ী ক্ষুদিরাম হাসিমুখে ফাঁসির দড়ির মালা পড়েছিলেন গলায়। একটা ক্ষুদিরামের আত্মাহুতি জন্ম দিয়েছিল হাজারো ক্ষুদিরামের। ফাঁসির রজ্জু আর ইংরেজ রাজশক্তির বুলেটের আলিঙ্গনে জীবনের জয়গান গাইতে গাইতে অকালে হাসিমুখে বিদায় নিয়েছিল আর্য্য ভারতের উত্তরাধিকারের স্বপ্নদেখা কতশত বীর ভারত-সন্তানেরা। অবশেষে একদিন গ্যালন গ্যালন রক্তের বিনিময়ে আমরা ফিরে পেয়েছিলাম আমাদের জাতীয় উত্তরাধিকার। অপূর্ণ, খণ্ডিত। তথাকথিত ধর্মের সুড়সুড়িতে দ্বিজাতি-তত্ত্বের ভিত্তিতে অখণ্ড ভারতবর্ষ হিন্দুস্তান, পাকিস্তান আখ্যা পেয়েছিল। কিন্তু পূর্ব পশ্চিমে প্রসারিত ভারতমাতার কর্তিত দুটো বাহুর ক্ষত আজও শুকলো না। সৃষ্ট হলো জাতীয় ম্যালিগন্যাণ্ট সমস্যার। সব কিছুর কারণ কিন্তু ধর্মকে আড়াল করে ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতাকে প্রাধান্য দেওয়া।
* * *
‘পলিটিক্স মানেই—
পূর্ত্তনীতি বা পূর্য্যনীতি
অর্থাৎ, যে-সৎনীতির অনুশাসন ও অনুসরণে
পূরণ ও পালন করা যায়—
এবং বিরুদ্ধকে আবৃত করে
নিরোধ করা যায়—
এ ব্যষ্টিতেও যেমন, সমষ্টিতেও তেমনি;
আর, যাতে তা হয় নাকো—
তা পূর্ত্তনীতি বা পূর্য্যনীতি নয়।’ (শাশ্বতী, বাণীসংখ্যা ১৭৫)
রাজনীতি মানে পূর্তনীতি। যে নীতি সকলের অভাব পূরণ করে, সবাইকে অভীষ্ট মঙ্গল প্রতিষ্ঠায় পোষণ দিয়ে সব্বাইকে প্রীতির বাঁধনে আবদ্ধ করে সংহতির প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ, সেই নীতির নাম রাজনীতি। সবাইকে প্রীতির বাঁধনে বাঁধতে গেলে একটা উচ্চ জীবন্ত-আদর্শ থাকতে হবে। সেই আদর্শের অভাব বলেই আজ রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির বাসা! যারা জনগণের সেবা করবেন সেই জন প্রতিনিধিদের সেবা করার জন্য, মন্ত্রীদের সেবা করার জন্য, নিরাপত্তার দেবার জন্য যদি রাজকোষ থেকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হয়! তাহলে কি জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগনের শাসন প্রক্রিয়ায় একটা প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিচ্ছে না! যিনি জনগণের সেবা করবেন তিনি যদি সবসময় নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থাকতে অভ্যস্ত হন, তাহলে অন্যদের নিরাপত্তা দেবেন কিভাবে? সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা উপলব্ধি করবেন কিভাবে? যেমন ধরুন, রেলমন্ত্রী যদি নিরাপত্তার ঘেরাটোপ ছেড়ে, ছদ্মবেশে সাধারণ যাত্রী সেজে মাঝে মাঝে সাধারণ ট্রেনগুলোতে যাতায়াত করতে পারেন, তাহলে প্রকৃত সমস্যা উপলব্ধি করে সমস্যার বাস্তব সমাধান করতে পারবেন। তবে সমস্যা কিন্তু বিরাজ করছে আমাদের শাসন-সংহিতায়। যোগ্য মানুষকে যোগ্য স্থানে কাজে লাগাবার ব্যবস্থা আমাদের সংবিধানে যদি থাকত, তাহলে যোগ্যতার মাপকাঠিতে মন্ত্রী করা হতো। যেমন, রেলের চৌহদ্দি সম্পর্কে যার কোন ধারণা নেই, রেলের টেকনোলজির সাথে যার কোন পরিচয় নেই, তিনি হয়ে যান রেলমন্ত্রী! শরীর বিদ্যা, চিকিৎসা বিদ্যার সাথে যার পরিচয় নেই, তিনি হয়ে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী! অথচ একজন সাধারণ নাগরিককে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রেল বিভাগে, স্বাস্থ্য বিভাগে নিয়োগ করা হয়! (নিয়োগ দুর্নীতি ব্যতীত।) আবার নির্বাচন কমিশন উপ-নির্বাচনের নামে দেশের অনেক অর্থ অপচয় করেন। ফলে সত্যমেব জয়তে-এর নীতিবাক্য বাস্তবে বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে!
অক্টোবর ২০২১-এ অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গের একটা উপ-নির্বাচনের উদাহরণ দিলে জিনিসটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। যেমন, খড়দহ বিধানসভার প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে উপ-নির্বাচন হবে, তারজন্য কালীঘাটের বিধায়ককে পদত্যাগ করিয়ে তাকে খড়দহে প্রার্থী করা হলো, কালীঘাটে আর একটা উপ-নির্বাচন করানো হলো! এই যে, নিষ্প্রয়োজনে আর একটা উপ-নির্বাচনের ব্যয়ভার বহন করা হলো, অর্থ অপচয় করা হলো, এটা কি ‘‘Of the people, by the people, for the people—জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন।’’-এর উদাহরণ হতে পারে?
‘মেরা ভারত মহান’ শ্লোগান দিতে যে-সব জন-প্রতিনিধিরা গর্ব বোধ করেন, প্রাচীন ভারতের শাসনতন্ত্র প্রসঙ্গে তাঁদের একটু জেনে রাখা ভাল।
প্রাচীন ভারতের শাসনতন্ত্র প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলছেন—আর্য্যদের যে কী জিনিস ছিলো তা’ কল্পনায়ই আনা যায় না। Cabinet formed (মন্ত্রীপরিষদ গঠন) হ’ত বিপ্র, ক্ষত্রিয়, বৈশ্যদের প্রধানদের নিয়ে। প্রধানের প্রধান, তাদের প্রধান, এইরকমভাবে একটা সুন্দর gradation (পর্য্যায়) ছিলো। যারা যত বেশীকে পূরণ করতো তারা তত বড় প্রধান। প্রধান মন্ত্রী সর্ব্বদা ঠিক হ’য়েই থাকতো, উপযুক্ত লোক নির্ব্বাচন নিয়ে কোন গণ্ডগোল উপস্থিত হ’তো না। অন্যদেশ ভারতবর্ষকে আক্রমণ করার সাহসই পেতো না। সব জাতটা দারুণ compact (সংহত) থাকতো। অনুলোম বিয়ে থাকার দরুন সারা জাতটা যেন দানা বেঁধে থাকতো, আর এতে evolution–এর (ক্রমোন্নতির) সুবিধা হ’তো—যথাক্রমে পাঁচ, সাত ও চৌদ্দপুরুষ ধরে ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের ভিতর যদি Brahmanic instinct (ব্রহ্মণ্য-সংস্কার) দেখা যেতো—তাদের বিপ্র ক’রে দেওয়া হ’তো। উন্নতির পথ সব দিক থেকে খোলা ছিল। আগের কালে টাকা দিয়ে একজনের সামাজিক position (অবস্থান) ঠিক করা হ’তো না। কারও হয়তো ৫০ লাখ টাকা আছে, কিন্তু কেউ হয়তো পাঁচ টাকায় সংসার চালাচ্ছে—অথচ instinct (সহজাত-সংস্কার) বড়—সে-ই বড় ব’লে গণ্য হ’তো। Instinct, habit, behaviour, activity (সংস্কার, অভ্যাস, ব্যবহার ও কর্ম)—এইগুলিই ছিল মাপকাঠি। Learning (লেখাপড়া)-কে কখনও শিক্ষা বলা হ’তো না। চরিত্রগত না হ’লে তথাকথিত পাণ্ডিত্যের কোন মূল্য দেওয়া হ’তো না। সব সময় লক্ষ্য ছিল—জ্ঞান, গুণ যাতে জন্মগত সংস্কার ও সম্পদে পরিণত হয়। বর্ণাশ্রমধর্ম্ম এত সূক্ষ্ম, উন্নত ও বৈজ্ঞানিক ব্যাপার যে অনেকে এর অন্তর্নিহিত তথ্য বুঝতে না পেরে একে বৈষম্যমূলক বলে মনে করে—এর চেয়ে বড় ভুল আর নেই। যারা বিজ্ঞানসম্মত বর্ণাশ্রমধর্ম্মকে বিপর্য্যস্ত করবার উদ্দেশ্যে generous pose (উদারতার ভঙ্গী) নিয়ে inferior (অসমর্থ)-দের ক্ষেপিয়ে তোলে, তারা সমাজের মহাশত্রু। শ্রীরামচন্দ্র শম্বুকের প্রতি কঠোর হয়েছিলেন—কারণ, শম্বুকের movement (আন্দোলন)-টা বর্ণাশ্রম-ধর্ম্মের বিরুদ্ধে একটা passionate raid (প্রবৃত্তি-প্ররোচিত অভিযান) বই আর-কিছু নয়। (আলোচনা প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড, ৩২শে জৈষ্ঠ্য, বৃহস্পতিবার, ১৩৪৬, ইং ১৫। ৬। ১৯৩৯)
* * *
ইদানীং রাম নামের জয়ধ্বনিতে ভারতের আকাশ-বাতাস মুখরিত। রামমন্দিরে প্রাণ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে আমরা ভারতীয় প্রজাগণ আর্য্যকৃষ্টির রামরাজত্বকে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখতে সুরু করেছি। এবার অসৎ-নিরোধী তৎপরতার সাথে দুর্নীতিপরায়ণ রাবনদের বিনাশ করা সম্ভব হবে। সেই রামচন্দ্রের রাজ্য শাসন প্রণালী সম্পর্কে সামান্য কিছু কথা জেনে নিলে পাঠক অনেকটাই সমৃদ্ধ হবেন আশাকরি।
বনবাসে থাকার সময় রামচন্দ্র ভরতকে রাজকার্য পরিচালনা বিষয়ে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন—“….. তুমি গুণী ও যোগ্য ব্যক্তিকে বহু-মান প্রদর্শন করে থাক তো? বীর, বিদ্বান, জিতেন্দ্রিয়, সদ্বংশজ, ইঙ্গিতজ্ঞ লোকদের মন্ত্রীপদে প্রতিষ্ঠিত করেছ তো? তুমি তাদের সঙ্গে মন্ত্রণা কর তো? তোমাদের মন্ত্রণা লোকের মধ্যে প্রকাশ হয়ে পড়ে না তো? তুমি যথাসময়ে শয্যাত্যাগ কর তো? রাত্রিশেষে অর্থলাভের চিন্তা কর তো? তুমি সহস্র মূর্খ পরিত্যাগ করেও একজন বিদ্বানকে সংগ্রহ করতে চেষ্টা কর তো? অযোগ্য লোককে যোগ্যস্থানে ও যোগ্য লোককে অযোগ্য স্থানে নিয়োগ কর না তো? যে-সব অমাত্য উৎকোচ গ্রহণ করেন না, যাদের পিতৃপুরুষ যোগ্যতার সঙ্গে অমাত্যের কাজ করেছেন, যারা ভিতরে-বাইরে পবিত্র—সেই সব শ্রেষ্ঠ অমাত্যকে শ্রেষ্ঠ কাজে নিযুক্ত করেছ তো? রাজ্যমধ্যে কোন প্রজা অযথা উৎপীড়িত হয় না তো? শত্রুকে পরাস্ত করতে পটু সাহসী, বিপৎকালে ধৈর্য্যশালী, বুদ্ধিমান, সৎকুলজাত, শুদ্ধাচারী, অনুরক্ত ব্যক্তিকে সেনাপতি করেছ তো? বিশেষ নৈপুণ্য যাদের আছে, তাদের তুমি পুরস্কৃত ও সম্মানিত করে থাক তো? প্রত্যেকের প্রাপ্য বেতন সময়মত দিয়ে থাক তো? রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তিবর্গ তোমার প্রতি অনুরক্ত আছেন তো? তোমার কার্য্যসিদ্ধির জন্য তাঁরা মিলিত হয়ে প্রাণ পর্য্যন্ত দিতে প্রস্তুত আছেন তো? বিদ্বান, প্রত্যুৎপন্নমতি, বিচক্ষণ এবং তোমার জনপদের অধিবাসীকেই দৌত্যকার্য্যে নিযুক্ত করেছ তো? স্বরাজ্যে ও পররাজ্যে প্রধান-প্রধান পদের অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের সম্বন্ধে জ্ঞাতব্য সংবাদ চরগণদ্বারা অবগত থাক তো? চরগণ পরস্পর-বিরোধী তথ্য পরিবেষণ করলে তার কারণ নির্ণয় করে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা করে থাক তো? প্রজাগণ সুখে আছে তো? তারা দিন-দিন স্ব-স্ব কর্ম করে সমৃদ্ধ হচ্ছে তো? তোমার আয় বেশী, ব্যয় কম হচ্ছে তো? ধনাগার অর্থশূন্য হচ্ছে না তো? অপরাধীদের ধনলোভে ছেড়ে দেওয়া হয় না তো? তুমি সাম, দান, ভেদ ও দণ্ডের প্রয়োগ যথাস্থানে করে থাক তো? তুমি ইন্দ্রিয়গণকে জয় করতে সচেষ্ট থাক তো? অগ্নি, জল, ব্যাধি, দুর্ভিক্ষ ও মড়ক এই পাঁচ রকমের দৈববিপদের প্রতিকারের জন্য তুমি যত্নশীল থাক তো? সন্ধি-বিগ্রহাদি যথাস্থানে প্রয়োগ কর তো?… ইত্যাদি ইত্যাদি। (আঃ প্রঃ ৫ম খণ্ড, ইং তাং ২-৪-১৯৪৪)
উপরোক্ত কথাগুলো রাম রাজত্বের অনুশাসনবাদের কিয়দংশ মাত্র। তাই রাম-রাজত্ব প্রতিষ্ঠা-পিয়াসী জন-প্রতিনিধিদের উচিত হবে, রামচন্দ্রের সভার ন্যায় একজন আদর্শ সভাসদরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। এবং তা’ বাস্তবায়িত করতে হলে, আদর্শ প্রজাপালকের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। সরকারী কোষাগার থেকে সাধারণভাবে বেঁচে থাকার প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা যাবে না। শুনেছি, শ্রীরামচন্দ্রের শ্বশ্রুপিতা রাজর্ষি জনক নিজের জীবন ধারণের জন্য রাজকোষ থেকে এক কপর্দকও গ্রহণ করতেন না। বর্তমান শাসনতন্ত্রের পরিকাঠামো অনুযায়ী জন-প্রতিনিধিদের জন্য বরাদ্দ সুবিধা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে রাম-রাজত্ব প্রতিষ্ঠার চিন্তা অধরাই থেকে যাবে। জনগণকে স্ব স্ব আত্মমর্যাদায় সুখে রাখতে হলে জন-প্রতিনিধিগণদের বিলাস-ব্যসন সুখ-সুবিধার কথা ভুলতে হবে, নীতিপরায়ণ হতে হবে, সর্বোপরি যথার্থ ধার্মিক হতে হবে। সেদিকে দৃষ্টি দিলে তবে কাজের কাজ কিছুটা হবে। স্বমহিমায় বিরাজমান থাকবে সত্যমেব জয়তে-এর জাতীয় নীতি।
ভারতবর্ষের রাষ্ট্র ব্যবস্থার গৌরবের প্রবহমানতাকে রক্ষা করতে হলে উপরোক্ত ওই বিধানসমূহকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।
* * *
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর অনুসারীদের মধ্যে সাম্য, মৈত্রী ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য বললেন, “কখনও নিন্দা কর না, কিন্তু অসত্যের প্রশ্রয় দিও না। নিন্দা করতে হয় তো করবে সাক্ষাতে।”
অর্থাৎ, অস্তিত্ব ধ্বংসকারী লোককে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না, অথচ তার সম্পর্কে অন্যের কাছে নিন্দাও করা যাবে না। এই দুই এর মধ্যে এক মিলনসেতু রচনা করে বিরোধহীন দুর্বার নিরোধ গড়ে তুলতে বললেন। আর যদি এড়িয়ে, গা বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করি তা হলেও বিপদ। “তুমি তোমার, নিজ পরিবারের, দেশের ও দশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দায়ী।”—বাণীর মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতি রক্ষার দায়িত্ব দিয়ে দিলেন। অথচ, বাস্তবে, সমাজ ও রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতি রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত জনপ্রতিনিধিগণদের প্রচারের মাধ্যমে, মিটিং-মিছিলে, আলোচনায় নিন্দামন্দের প্রতিযোগিতা দেখতে শুনতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। নিন্দা-মন্দ ছাড়া, তারা যেন কথা বলতেও শেখেনি। “নিন্দা-কুৎসা ক’রে কা’রও/হয় না শুভ অনুষ্ঠান,/মিষ্টি কথায় শিষ্ট চালই/উদ্বোধনার উপাদান।”—এই শিক্ষা যার আছে, তিনি কখনও নিন্দার আশ্রয় গ্রহণ করবেন না। নীতিহীন রাজনীতির টানাপোড়েনে, পারস্পরিক নিন্দা-মন্দ দিয়ে আক্রমণের ফলে উত্তরোত্তর সামাজিক অবক্ষয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
উপরোক্ত নিদেশ-বাণীর বাস্তবায়ন ব্যতীত রাজনীতিকে সার্থক করা যাবে না।
এবার, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্ররাজনীতির ব্যর্থতা প্রসঙ্গে ইংরেজী ভাষায় কি বললেন একটু জেনে নেওয়া যাক।—
POLITICS WEEPS ALONG
When the sufferers, the distressed
and the misfortunated
are not managed
to get rid of
the heinous, foul breathing of evil
by the service and solace of the noble,
and are not obliged by them—
Politics weeps along !
(THE MESSAGE, VOL. I, by Shree Shree Thakur Anukulchandra)
* * *
যাঁরা ধর্ম ও রাজনীতি নিয়ে প্রচার মাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করেন তাঁদের জেনে রাখা উচিত, গণপ্রজাতন্ত্রী আধুনিক ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভের ধর্মচক্র আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ধর্মকে রক্ষা করে চলার কর্তব্যকে। আমাদের রাষ্ট্রীয় মন্ত্র মূণ্ডক উপনিষদ থেকে প্রাপ্ত ‘সত্যমেব জয়তে’ স্মরণ করিয়ে দেয় উপনিষদীয় আচার্য্য অনুসরণের শাশ্বত অবলম্বনকে। রাষ্ট্রের কর্ণধার রাষ্ট্রপতিসহ মন্ত্রীবর্গ প্রত্যেকেই ঈশ্বরের নামে শপথ গ্রহণ করে, ঈশ্বরের প্রতিভূ জীবগণের কল্যাণ সাধনে ব্রতী হয়। ঈশ্বরের প্রতিনিধি স্বরূপ জাগতিক ন্যায়দণ্ডধারী বিচারকেরা ধর্মাধিকরণ পরিচয়ে বন্দিত। বিচারালয়কে বলা হয় ন্যায়ালয় বা ধর্মস্থান। এ থেকে বোঝা গেল, ন্যায় এবং ধর্ম দুটি শব্দ সমার্থক।
ভারতীয় রাজনীতির অনুশাসনের সাম, দান, ন্যায়, দণ্ড, নীতি ও ভেদ-এর রাজধর্ম রক্ষার পবিত্র কর্তব্যে যা’তে এতটুকু অন্যায়, অধর্ম প্রবেশ করতে না পারে তার জন্যই ওইসব মহাভারতীয় নীতির অনুসরণ। বিধিবৎ প্রকৃষ্ট-জাতক সৃষ্টি করে প্রজা পালনের স্বার্থেই ওই অনুশাসনকে আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে প্রজাপালনের পবিত্র দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাজনৈতিক দলেরা। সেই সুবাদে রাজনৈতিক দলের জন-প্রতিনিধিরা নিজেদের দেশসেবক বলে পরিচয় দেন। ভোটে জিতে দেশ সেবার অধিকার অর্জনের প্রতিযোগিতায় জিততে অনেক রাজনৈতিক দল আবার হিংসার আশ্রয় নেয়, রক্ত ঝরে, জনগণ ঘরছাড়া হয়! এ ধরণের নোংরা রাজনীতির অপসারণের জন্যই আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
দেশের সেবা করতে হলে প্রথমেই যুগ পুরুষোত্তমের আদর্শ অনুযায়ী ব্যক্তি-চরিত্র নির্মাণের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। ভালো মানুষ জন্মাতে হবে। যে বিধি মেনে, ভালো ফসল, ভালো ফল, ভালো গোরু, ভালো কুকুর জন্মানো হয় সেই বিধিকে অগ্রাহ্য করছে ভারতের সংবিধান! ২১ বছরের ছেলে হলেই ১৮ বছরের ঊর্ধের মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে! জাত, বর্ণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা কোন কিছুর গুরুত্ব দেওয়া হয় না! বিজ্ঞানসম্মত সেইসব বিষয়ে সবাইকে সচেতন করার জন্য আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
যে রাষ্ট্র কৃষি পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে, পশু উৎপাদনের ক্ষেত্রে উন্নত জাত, বংশ, গোত্র, বিচার করে; বিশ্বাসঘাতক সন্ত্রাসবাদী দমনে প্রভূত অর্থ ব্যয় করে শুদ্ধ জন্মের প্রশংসা পত্র প্রাপ্ত পে-ডিগ্রীড অ্যালশেসিয়ান, জোবারম্যান ইত্যাদি সমৃদ্ধ জাতের কুকুর আমদানী করে;—অসংখ্য স্ট্রীট ডগ্দের অবহেলিত, দলিত হিসেবে মর্যাদা না দিয়ে! সেই রাষ্ট্র ব্যবস্থাই মানুষের জন্মটাকে অশুদ্ধ করার জন্য বর্ণাশ্রমানুগ শ্রেণীবিন্যস্ত ভারতীয় সমাজ বিধানকে অমর্যাদা করে যেমন খুশি তেমন বিয়ের এবং বিবাহ-বিচ্ছেদের ছাড়পত্র দিয়ে জাতিকে ভয়ানক সর্বনাশের পথে এগিয়ে দিচ্ছে–-অথচ জাত-পাতের নামে সংরক্ষণ, ভাতা চালু রেখেছে! এই বিষয়গুলো যথার্থভাবে অবগত করাবার জন্য আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
* * *
জনগণের জৈবিক তাগিদ পূরণের জন্য আর কিছু না হোক, অন্ন, বস্ত্র, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থানের তো যোগান দিতে হবে। আর তারজন্য প্রথমেই প্রয়োজন বিশুদ্ধ, সুস্থ একটা পরিবেশ। দেশসেবকেরা বিষয়টি নিয়ে যদি ভাবতেন তাহলে সত্যের পরিপন্থী অসত্য, অন্যায়, অধর্ম প্রশ্রয় পেত না। মহান নাগরিক সৃষ্টির গুরুত্বকে উপেক্ষা করে মহানগরের বিস্তার প্রাধান্য পেত না। সবুজায়ন বিনষ্ট করে নগরায়নের বাড়বাড়ন্ত হতে পারতো না! সর্বত্র দূষণ বিস্তার লাভ করতে পারত না। এ বিষয়ে সকলকে অবগত করার জন্য আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
বেঁচে থাকা নিয়ে আমরা যে যতই আস্ফালন করি না কেন, মূলতঃ, প্রকৃতির অকৃপণ দান বায়ু, জল, মাটি, সূর্যালোক প্রভৃতি মৌলিক অজৈব উপাদানের উপর আমাদের বেঁচে থাকা নির্ভর করে। শুধু মানুষ নয়, প্রোটোভাইরাস, ভাইরাস, ব্যাক্টেরিয়া, প্যারাসাইট, শ্যাওলা, উদ্ভিদ থেকে মনুষ্যেতর প্রাণী সকলের সুস্থভাবে বেঁচে থাকা ওই অজৈব উপাদান বা পঞ্চ মহাভূতের উপর নির্ভরশীল। তাহলে দেশসেবার প্রথম কাজ হবে অসৎ নিরোধী তৎপরতার সাথে জৈবাজৈব প্রাকৃতিক পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখা। তারপর পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যার অনুশাসন মেনে নানাভাষা, নানামত, নানা পরিধানের মানুষের বৈশিষ্ট্য টিঁকিয়ে রাখার চেষ্টা। মহান ভারতের রাজর্ষি জনক ওই বিধি মেনে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন (সূত্র : মহাভারত, বনপর্ব)। সে বিষয়ে সবাইকে অবগত করার জন্য আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
* * *
আর্য্য হিন্দু সমাজে বর্ণ সংখ্যা চার, জাতি প্রায় তিন হাজারেরও বেশী। প্রাচীন ভারতে নতুন কোন জাতির সন্ধান পাওয়া গেলে ঐ জাতির গুণ ও কর্ম অনুসারে উপযুক্ত বর্ণে স্থান করে দেওয়া হত। তৎকালিন সমাজ ব্যবস্থায় কুলোচিত জীবিকার মাধ্যমে জাত্যুৎকর্ষে উন্নীত বা জাত্যাপকর্ষে অপনীত হওয়ার এক সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছিল। নাগরিকদের বৈশিষ্ট্যের পালন এবং পোষণ করত রাষ্ট্র। সত্ত্বগুণে ব্রাহ্মণ, সত্ত্বমিশ্রিত রজোগুণে ক্ষত্রিয়, রজঃমিশ্রিত তমোগুণে বৈশ্য এবং তমঃ গুণাধিকারে শূদ্রাদি বর্গ নির্ণয়দ্বারা শ্রেণী-বিন্যস্ত সমাজ সংগঠন নির্মাদ্ধারিত হতো। সমাজ ব্যবস্থায় শূদ্রের কর্ম বা বৃত্তিধর্ম ছিল শিল্পকর্ম ও সেবা; বৈশ্যের কৃষি, বাণিজ্য, গোরক্ষা; ক্ষত্রিয়েরা সমাজকে, পরিবেশকে পোষণ, প্রীতিচর্য্যা, বাহুবল দিয়ে ক্ষত থেকে ত্রাণ করার রক্ষাধর্ম পালন করতেন এবং ব্রাহ্মণদের ব্রহ্মচর্য্য, তপস্যা, মন্ত্র ও সত্য নিদ্ধারিত করা ছিল। রাজশক্তি বংশপরাস্পরায় সকল প্রজাদের বৃত্তিধর্মে নিয়োজিত করতেন। বৃত্তিহরণ স্বীকৃত ছিল না। ফলে অশিক্ষা, কুশিক্ষার বেকার সমস্যা ছিল না।
রাজর্ষি জনকের রাজ্যে কোন প্রজার কোনরূপ অভিযোগ ছিলনা রাজার বিরুদ্ধে। সকলেই গুণোচিত কর্মের এবং যোগ্যতার মর্যাদা পেতেন। দুষ্কর্মের জন্য দুষ্কৃতিরা উপযুক্ত শাস্তি পেত। সুকর্মের জন্য পুরস্কৃত হত।
ঠিক সেইভাবে, রাজর্ষি জনকের ন্যায় অসৎ নিরোধী তৎপরতার সাথে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করতে হবে। রাম-রাজত্ব না হোক, অন্ততঃ গৌরবময় গুপ্ত সাম্রাজ্যকে ফিরিয়ে আনতে হলে ভারতীয় শাসন সংহিতায় বা সংবিধানে ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ করতে হবে। সংবিধানের প্রচলিত ধারা ধর্ম এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়কে একাকার করে ফেলে ‘ধর্ম-নিরপেক্ষতাবাদ’,––অর্থাৎ রাষ্ট্র ধর্মের অনুবর্তী নয়’-এর মতবাদকে প্রতিষ্ঠা দেয়, তখন কি মনে হয় না যে, আমরা জাতীয়তাবাদের আদর্শের প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েও এক বিপর্য্যয়ী বোধ-দ্বারা পরিচালিত হয়ে পরস্পর বিরোধী আচরণ করে চলেছি ! যার ফলে ধর্মের নামে জীবন-বিরোধী অধর্মের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে রাষ্ট্রের অনুমোদন ক্রমে। এ জন্যই আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
* * *
শাস্ত্র বা বিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুযায়ী, যে নীতি-বিধি পদার্থের অস্তিত্ব রক্ষার সহায়ক তাই তো ধর্ম। অথবা বলা যায়, পদার্থের স্বকীয়তা ধারণ করে রাখে যা’ তাই ধর্ম। ধর্ম পালন করলেই পদার্থ টিঁকে থাকবে, নচেৎ থাকবে না। সেই ধর্মের অনুবর্তী না থাকার মানে, জীবন ধারণের শাশ্বত বিধিকে অস্বীকার করা। সংসদ প্রকাশিত ইংরেজী অভিধানে religion অর্থে বলা হয়েছে, ‘It is an action, one is bound to do.’ সেই ধর্মের আবার পক্ষ আর নিরপেক্ষ কি? ঈশ্বর যেমন এক এবং অদ্বিতীয়, ধর্মও তেমনই এক অদ্বিতীয়। এর কোন প্রকার হয় না। হিন্দুধর্ম, মুসলমান ধর্ম এগুলো সম্প্রদায়গত ধর্মীয় মতবাদ। প্রকৃত ধার্মিক তাঁরা, তাঁরা, মনুষ্যত্বের প্রকাশে এবং বিকাশে বিশ্বাসী, সাম্প্রদায়িক হানাহানিতে নয়। বেদ, গীতা, কোরান, বাইবেল প্রভৃতি ধর্মীয় পুস্তকগুলিতে মনুষ্যত্বের উত্তরণের বিধান পরিবেশিত হয়েছে। রামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীষ্ট, হজরত রসুল প্রমুখ পুরুষোত্তমগণ কোথাও বিভেদ সৃষ্টি করে যান নি, সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও সংহতির সুস্থ সমাবেশ গঠনের কথা বলেছেন।
বেঁচে থাকার জন্য আবশ্যিক অজৈব উপকরণ বায়ু, জল, মাটি ইত্যাদির যদি ধর্ম থাকতে পারে, এবং তা’ যদি বিজ্ঞানের বইতে পাঠ্য হতে পারে, তাহলে মানুষের কি ধর্ম নেই? মনুষ্যত্ব প্রকাশের মাধ্যমেই তো মানুষ ধার্মিকতার পরিচয় দেয়। মানুষের মনুষ্যত্বের অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার নীতিবিধি-সমন্বিত ভারতের নিজস্ব সংহিতাগুলোর বিধানসমূহ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের সংহিতায় স্থান পাবে না কেন, প্রজাদের শিক্ষা দিতে পাঠ্য করা হবে না কেন? এ জন্যই আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
* * *
ধর্ম সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলছেন :
ইংরেজি ভাষায় বলা ধর্মের উক্ত আদর্শ কি জীবনবিরোধী কোন তাৎপর্য্য বহন করছে, না কোন ধর্ম প্রবক্তাদের, রাজনৈতিক-প্রবক্তাদের মতবাদের এতটুকু বিরোধিতা প্রকাশ করেছে ?
বর্তমান যুগ-পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সাধারণ জনদের বোঝাবার জন্য আরও সহজ ভাষায় বললেন, ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম বলে জানিস তাকে। ধর্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম না-রে।’ ওই সম্প্রদায় নিরপেক্ষ সমন্বয় বার্তাবহ বাণীকে গুরুত্ব না দিয়ে, রাষ্ট্র, ধর্মের নামে, শাস্ত্র বহির্ভূত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তি পরায়ণতার আস্ফালনকে, কতগুলো অনিত্য, অসার, অবৈজ্ঞানিক, পরিবেশ দূষক, পৌত্তলিক কু-সংস্কারকে যদি ‘ধর্ম’ নামে প্রতিষ্ঠা দিতে চায়, তা’ কি বিচক্ষণতার পরিচায়ক হবে, না ভারতবর্ষের কৃষ্টির পরিপূরক হবে? ওই ভুলের বোঝা কি আমাদের চিরদিন বইতে হবে? আমাদের বুদ্ধি, বোধ কি নিরেটই থেকে যাবে?
রাষ্ট্রের সৃষ্টিই তো প্রজাদের অধর্ম বা দুর্নীতি থেকে মুক্ত করে ধার্মিক, অর্থাৎ সু-নীতি পরায়ণ করে তোলার জন্য। সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দলগুলো যদি ওই মহান কর্তব্য ভুলে তার প্রজাবর্গকে, তাদের পিতৃ-পিতামহের আদর্শ অনুসারী ধর্ম-পরায়ণ, কৃষ্টি-পরায়ণ হতে উৎসাহ না দিয়ে, প্রবৃত্তি-পরায়ণতায় উৎসাহ দেয়, সেটা ভারতবর্ষের জাতীয় উত্তরাধিকারত্বের অস্তিত্বকে বিপন্ন করার বার্তা ভিন্ন আর কিছু নয়।
‘‘প্রজা মানেই হচ্ছে—
প্রকৃষ্টরূপে জাত—
সর্ব্বসম্ভাব্য উদ্বর্দ্ধনী সার্থকতায় ;
আর প্রকৃষ্ট জন্ম পেতে হলেই চাই—
প্রজনন পরিশুদ্ধি—
সর্ব্ব-সম্ভাব্যতার বৈধানিক সংস্থিতিতে. …. ’’
(‘সম্বিতী’ গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)
* * *
।। গণ প্রজাতন্ত্রী ভারতবর্ষের সেকাল-একাল ।।
মূণ্ডক উপনিষদের পবিত্র মন্ত্র ‘সত্যমেব জয়তে’-এর আদর্শকে সম্বল করে ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দের ১৫ই আগস্ট গণ প্রজাতন্ত্রী আধুনিক ভারতবর্ষের যাত্রা সুরু হলেও ‘‘Of the people, by the people, for the people—জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন।’’-এর লক্ষ্যে রচিত কতগুলো বিধিবদ্ধ নিয়ম, শাসন সংহিতা বা সংবিধান ১৯৫০ খ্রীস্টাব্দের ২৬শে জানুয়ারী স্বীকৃতি লাভ করে, যে দিনটাকে ‘প্রজাতন্ত্র দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।
আর্য্যশাস্ত্র মুন্ডক উপনিষদ-এর প্রথম খণ্ড (3.1.6) থেকে গৃহীত মন্ত্র‘সত্যমেব জয়তে’ ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের জাতীয় আদর্শ। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে পণ্ডিত মদন মোহন মালব্য ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি থাকার সময় এই মন্ত্রটিকে জাতীয় রাজনীতিতে নিয়ে এসে জনপ্রিয় করেন। এটি ভারতের জাতীয় নীতিবাক্য হিসাবে গৃহীত হয়েছিল 26 জানুয়ারী 1950, যেদিন ভারত একটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। ‘সত্যমেব জয়তে’-এর অর্থ হলো সত্যেরই জয় হয়। এটি ভারতীয় জাতীয় প্রতীক অশোক স্তম্ভ-এর গোড়ায় দেবনাগরী লিপিতে খোদাই করা হয়েছে। সমস্ত ভারতীয় মুদ্রা এবং জাতীয় নথির একপাশে খোদাই করা আছে।
সত্যের আশ্রয়ে ‘আমরা করবো জয়’ এই ছিল আমাদের প্রতিজ্ঞা, তারজন্য খোদাই করা হয়েছিল। (সূত্রঃ উইকিপিডিয়া) ‘সত্যমেব জয়তে’-এর সীলমোহর হাতে পেয়ে অসত্যের পথে চলার জন্য নয়।
সত্য বিষয়ে মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য বলছেন, “সত্যং ভূতহিতং প্রোক্তং ন যথার্থাভিভাষণম্।” অর্থাত্ যা প্রাণীদের পক্ষে মঙ্গলকর তাই সত্য। অহিতকর যথার্থ সত্য নয়।
‘সত্যমেব জয়তে’-র আধিকারিকেরা এই সত্য পথ অবলম্বন করে প্রকৃত সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেই জয় হবে সত্যের। অর্থের লোভ, আত্মপ্রতিষ্ঠার মোহের কাছে ‘সত্যমেব জয়তে’-র সীলমোহর ধারকেরা যদি বিবেককে বন্ধক রেখে আত্মবিক্রয় করতে থাকে তাহলে মনুষ্যত্বের অবক্ষয় প্রতিরোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। ভারতীয় কৃষ্টির ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে সব সত্তা প্রেমীদের।
সত্য মানে অস্তিত্ব। যার অস্তিত্ব আছে যার বিকাশ আছে তাই সত্য (real)। ঋষি প্রদর্শিত এই সত্যের পথই আর্য্য ভারতবর্ষের মূলধন। আমাদের আদর্শ ছিল– ‘আত্মানং বিদ্ধি’, নিজেকে জানো, know thyself, ‘আত্মবৎ সর্বভূতেষু, মাতৃবৎ পরদারেষু, লোষ্ট্রবৎ পরদ্রব্যেষু।’ সকলকে নিজসত্তার প্রতীক মনে কর, মেয়েদের নিজের মায়ের প্রতিরূপ ভেবে শ্রদ্ধা কর, অন্যের জিনিসকে মাটির ঢেলার মত দ্যাখ। ‘মা গৃধ’, লোভ কর না। তথাপি ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের প্রজাগণ কেন সত্যভ্রষ্ট হচ্ছে, ভেবে দেখার প্রয়োজন নেই?
আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি, ‘প্রজা’ শব্দের অর্থ প্রকৃষ্ট জাতক। আর তন্ত্র মানে কতগুলো বিধিবদ্ধ নিয়ম বা system।
প্রজাতন্ত্রের মর্মার্থ হচ্ছে, যে তন্ত্র বা system মেনে আদর্শ প্রজা নির্মাণ, পালন, পোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে রাষ্ট্রের সংহতি রক্ষায় প্রযত্নশীল থেকে পরম রাষ্ট্রিক সমবায়ের লক্ষ্যে এগিয়ে চলা যায়। ভারতের ব্রহ্মসূত্র, মহাকাব্য, বেদ, উপনিষদ, সংহিতা, আদর্শপুরুষ শ্রীরামচন্দ্র ও শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ বলে যা কিছু বর্তমান,—সবকিছুই ওই ‘সত্যমেব জয়তে’-এর আদর্শের উপরেই প্রতিষ্ঠিত।
কতিপয় রাজনৈতিক নেতারা মহান ভারতের ওইসব বিধিকে আড়াল করে প্রবৃত্তি-পরিপোষিত শিক্ষায় প্রজাতন্ত্রী ভারতবর্ষের প্রজাদের শিক্ষিত করতে চাইছে। ফলে সন্ত্রাসবাদ, ভ্রষ্টাচার, যৌন-ব্যভিচার ক্রমবর্দ্ধমান। এর কারণ ‘সত্যমেব জয়তে’ কে বাস্তবে মূর্ত করে তোলার মত কোন ইন্দ্রিয়জয়ী সৎপুরুষের জীবন্ত আদর্শ অনুসরণ করছে না রাষ্ট্র। ফলে দেশে মহানগরের বাড়বাড়ন্ত হলেও মনুষ্যত্বের পরিচয় সম্পন্ন ‘পিতামাতার সুজননের সুসন্তান, সন্তানের সুমাতা-সুপিতা, সমাজের সুবন্ধু, রাষ্ট্রের সুনাগরিক’ এমন মহান নাগরিকের সংখ্যা ক্রমশঃ যেন অবলুপ্তির পথে।
ওই অবলুপ্তি থেকে সভ্যতাকে বাঁচাতে, বর্তমান সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানবৃদ্ধ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সভ্যতাকে সংকট থেকে মুক্ত করতে নিদান দিলেন :
“শাসন-সংস্থা যেমনই হোক,
যাতেই মাথা ঘামাও না,
যৌন-ব্যাপার শুদ্ধ না হলে
দেশের জীবন টিঁকবে না।” (অনুশ্রুতি)
‘সত্যমেব জয়তে’-এর আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত প্রজাতন্ত্রের প্রবহমানতা টিঁকিয়ে রাখতে হলে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিতে হবে আদর্শ প্রজা সৃষ্টির মাধ্যম, সুবিবাহ ও সুপ্রজননের ওপর। সুপ্রজননের দায়িত্ব মেয়েদের। মেয়েই তো মা হয়। মায়ের শুদ্ধতার ওপর নির্ভর করে সন্তানের শুদ্ধতা। বিধিমাফিক সেই মায়েদের শুদ্ধতা রক্ষা করার ব্যবস্থা না করতে পারলে শুদ্ধ প্রজা সৃষ্টি হবে না। বিপন্ন হবে প্রজাতন্ত্র! এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন করতে আর্য্য মহাসভা রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
যদিও বর্তমান পুরুষোত্তম এ বিষয়ে আমাদের সচেতন করতে বাণীর মাধ্যমে বললেন–
“দেশের অবনতির
প্রথম পদক্ষেপই হ’চ্ছে—
মেয়েদের উচ্ছৃঙ্খলতা,
পারিবারিক সঙ্গতির প্রতি
বিদ্রূপাত্মক অবহেলা,—
যা’ দেশের শুভদৃষ্টিটাও
ভেঙ্গেচুরে চুরমার করে
সর্ব্বনাশকে আমন্ত্রণ ক’রে থাকে;
তাই বলি,
মেয়েরা যেন
তাদের পবিত্রতা হ’তে
এতটুকুও স্খলিত না হয়,
ব্যবস্থা ও বিধানগুলি
এমনতরই বিনায়িত করে
তাদের ভিতর সঞ্চারিত করে তোল;
তুমি যদি দেশের স্বস্তিকামীই হও—
এদিক থেকে
তোমার দৃষ্টি ও কৃতিচর্য্যার
একটুও অবহেলা যেন না থাকে,
স্বস্তিই হ’চ্ছে
শান্তির শুভ আশীর্ব্বাদ,
আর, স্বস্তি মানেই হ’চ্ছে
সু-অস্তি—”
(বাণী সংখ্যা ৩৭৩)
* * *
প্রজা সৃষ্টি বা ব্যক্তি নির্মাণের সহজ উপায় প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন, “আর্য্যকৃষ্টির মধ্যে তো আছে তারই কলা-কৌশল। তার জন্য প্রথমে চাই good breeding (ভাল জন্ম)। ভাল জন্ম হ’তে গেলে পিতা-মাতার instinct (জন্মগত সংস্কার) ভাল হওয়া চাই এবং তাদের বিয়েও সব দিক দিয়ে মিল ক’রে হওয়া চাই। তারপর পারিবারিক চালচলন এমন হওয়া চাই, যাতে ছেলে-মেয়েরা গোড়া থেকেই সৎ দৃষ্টান্ত দেখে ভাল হওয়ার অনুপ্রেরণা পায়। পারিবারিক শিক্ষা যদি ভাল না হয়, তাহ’লে পুঁথিগত শিক্ষা যতই হোক না কেন, তাতে মানুষের habits, behaviour (অভ্যাস, ব্যবহার) adjusted (সুনিয়ন্ত্রিত) হয় না।
তারপর চাই সদ্গুরুর কাছে দীক্ষিত হ’য়ে শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠাসহকারে তাঁর নির্দ্দেশ মেনে চলা।
শিক্ষা-ব্যবস্থাও এমন হওয়া দরকার, যাতে প্রত্যেকে তার বৈশিষ্ট্যের উপর দাঁড়িয়ে চৌকষ হ’য়ে উঠতে পারে। স্বতঃদায়িত্বে environment (পরিবেশ)-এর প্রয়োজন কে কতখানি পূরণ ক’রে চলতে পারে, অপরের জীবনীয় স্বার্থকে কে কতখানি বাস্তবে নিজের স্বার্থ ক’রে তুলতে পারে, মোট কথায় সেইটেই শিক্ষার বড় তকমা। আর জীবিকার ব্যবস্থা যথাসম্ভব বর্ণবৈশিষ্ট্যানুগ ও স্বাধীন হওয়া দরকার। উপার্জ্জনের অন্য যে-কোন পথই থাক, cottage-industry (কুটিরশিল্প) ও agriculture (কৃষি) সব পরিবারেই কিছু না কিছু থাকা চাই। আর চাই গো-পালন। জীবিকার জন্য যদি পরের দাসত্ব করতে না হয় বা dishonesty (অসাধুতা) করতে না হয়, তাহ’লে কিন্তু মানুষ অনেকখানি ঠিক থাকে।
আর চাই ভাল-ভাল ঋত্বিক্, অধ্বর্য্যু, যাজক। তারা তাদের উন্নত চরিত্র, সেবা ও যাজনের ভিতর-দিয়ে সারা দেশের মানুষকে সত্তাপোষণী চলনে অভ্যস্ত ক’রে তুলবে, ধর্ম্ম, ইষ্ট, কৃষ্টির ভিত্তিতে integrated (সংহত) ক’রে তুলবে। সঙ্গে-সঙ্গে দেখবে, অসৎ অর্থাৎ সত্তাপরিপন্থী রকমগুলি যাতে দানা বেঁধে উঠতে না-পারে। Simultaneously (যুগপৎ) এই সবগুলির দিকে নজর দিয়ে যদি চলা যায়, তাহ’লে দেশের আবহাওয়াই বদলে যাবে। তখন মানুষের ভাল হবার সম্ভাবনাই বেশী থাকবে। খারাপ যারা থাকবে, তারাও উপযুক্ত শাসন-তোষণ ও প্রেরণার ভিতর-দিয়ে অনেকখানি ঠিক হ’য়ে উঠবে।
Bad instinct (খারাপ সংস্কার)-ওয়ালা progeny (সন্ততি) যাতে সমাজে বাড়তে না পারে, তার ব্যবস্থা না করলেই নয়।
সেইজন্য আমি proper marriage (উপযুক্ত বিবাহ)-এর উপর অতো জোর দিই। ঐ জায়গায় হাত না দিলে সব programme (কর্ম্মসূচী)-ই fail করবে (অকৃতকার্য্য হবে)।
আমি মুখ্যু মানুষ, আমার কথার তো দাম নেই। কিন্তু দাসীর কথা বাসি হলি কামে লাগবি।
যথার্থ মর্যাদায় প্রজাতন্ত্রকে বাস্তবায়িত করতে হলে যুগ-পুরুষোত্তমের আদর্শকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল সৃষ্টি করার প্রয়োজন আছে। বর্তমান রাজনৈতিক দলের সাথে সচেতন ব্যক্তি যারা যুক্ত আছেন, তারা কিন্তু পার্টির সব দুর্নীতি মেনে নিতে পারেন না। তাদের পথ দেখাতে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন আমার গুরুদেবের একটা বাণী। “রাজনীতি বলে তায়/পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যায়/সংহতি আনে যায়।” যে নীতি সকলের অভাব পূরণ করে, সবাইকে অভীষ্ট মঙ্গল প্রতিষ্ঠায় পোষণ দিয়ে সব্বাইকে প্রীতির বাঁধনে আবদ্ধ করে সংহতির প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ, সেই নীতির নাম রাজনীতি। এ জন্যই আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
* * *
সকলের অভাব পূরণ যিনি বা যারা করবেন তাদের বৈশিষ্ট্যপালী হতে হবে। বৈশিষ্ট্য মানে বিশিষ্টতা। বৈচিত্র্যময় ভারতবর্ষের নানাভাষা, নানামত, নানা পরিধানসমৃদ্ধ বিশিষ্টতার পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যা দ্বারা সংহতির প্রতিষ্ঠা যিনি করতে পারবেন তিনি হতে পারবেন একজন আদর্শ রাজনীতিবিদ।
যেমন, একজন গোপালক বা রাখাল বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের গোরু—ষাড়, বলদ, গাভী, দামড়া, বকনা নামের বিবিধ বৈশিষ্ট্যের গোরুর পাল নিয়ে মাঠে চড়াতে যায়। একটা ছোট লাঠি বা পাচনের সাহায্যে সে গোরুর পাল্-কে পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যা দ্বারা সংহত রেখে আবার গোধূলি বেলায় গোয়ালে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। যেমন, একজন চাষী তার বিভিন্ন জমির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য মেনে ভূমিকে কর্ষণ করেন বা চাষ দেন। জমির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ‘জো’ বুঝে বীজ বপন করেন, চারা রোপন করেন। তারপর উপযুক্ত জলসেচ, সার, কীটনাশক, পাহারা দিয়ে পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যা দ্বারা ফসল উৎপাদন করেন। দুঃখের বিষয় বর্তমানের রাজনীতির নেতারা সে বিষয়ে কোন গুরুত্ব আরোপ করছেন না। এ জন্যই আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
* * *
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতে, বৈশিষ্ট্য মানে—তদনুপাতিক organic adjustment (বৈধানিক বিন্যাস)। তার আবার (group) গুচ্ছ আছে। এইগুলিকে বলা হয় বর্ণ, এর কোনটাই আমরা নষ্ট করতে চাই না। নষ্ট করা মানে যুগ যুগ ধরে, তিল তিল করে, যা গড়ে উঠেছে তা হারান। ন্যাংড়া আম আছে, ফজলি আম আছে আরো কত রকমের আম আছে। এর একটা জাত যদি নষ্ট করে ফেলি তাহলে তা’ আর ফিরে পাব না—হারাব চিরতরে। সেকি ভালো? ফজলি আমের মধ্যে তো আর ন্যাংড়া আমের স্বাদ পাব না। তাই যেন আমরা বুঝে চলি। (আলোচনা প্রসঙ্গে, ১৬শ খণ্ড, পৃঃ ১০৯)
আমাদের ভারতের গ্রামীন অর্থনীতি কৃষি ও গোপালনের উপর নির্ভরশীল। ভালো কৃষকেরা কখনোই যেমন খুশি তেমনভাবে, নিজের খেয়ালখুশি মত চাষ করেন না। সরকারী কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে জমি অনুযায়ী উন্নত জাতের বীজ বপন করেন, চারা রোপন করেন। গোপালন ক্ষেত্রেও তাই। সরকারী পশু পালন বিভাগের বিজ্ঞানীদের পরামর্শ মেনে গাভীর জাতের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সম-বিপরীত উন্নত জাতের ষাঁড়ের বীজ দিয়ে উন্নত জাতের সুস্থ, সবল বাচ্চা উৎপাদন করেন। অথচ, ওই পদ্ধতি মেনে সুস্থ মানব-শিশু সৃষ্টির বিষয়ে রাষ্ট্র উদাসীন। এ জন্যই আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
আমরাও দৈনন্দিন জীবন-যাপনে সকলেই কিছু-না-কিছু বৈশিষ্ট্যের পালন-পোষণ করেই থাকি। সচেতন ব্যক্তি মাত্রেই বাজার থেকে ভালো জাতের বা কোয়ালিটির আলু, বেগুন, পটল, মুলো, আম, চাল, ডাল, চা কিনতে অভ্যস্ত। এমন কোন সুস্থ মানুষ নেই যে উদারতার নামে হিমসাগর আমের দাম দিয়ে আঁশযুক্ত টোকো আঁটিসার আম কিনে আনবেন? মিনিকীট, বাঁশকাঠি, গোবিন্দভোগ, দেরাদুন রাইসের দাম দিয়ে রেশন দোকানে প্রদত্ত মোটা চাল কিনে আনবেন?
এ থেকে প্রমাণিত হলো গাছপালা, পশুপাখি সবকিছুর জাত, বর্ণ আছে। জীব বিজ্ঞানের পুস্তকেও জাতি, প্রজাতি, বর্ণ, গোত্র-এর উল্লেখ আছে। তাহলে মানুষের কি নেই? অবশ্যই আছে। মানুষ তো সব জাতহীন হয়ে যায় নি? তবে হ্যাঁ, জাতের নামে বজ্জাতি চলছে—শিডিউলড, আন-শিডিউলড, ট্রাইব নিয়ে ধান্দাবাজি করতে গিয়ে সহজাত-সংস্কারের বৈশিষ্ট্যটাকে নাকাল হতে হচ্ছে! অন্যায়, অধর্ম করে, অন্যের বৃত্তি হরণ করে টাকা উপার্জন করতে গিয়ে এক অসম অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করে চলেছি আমরা। ফলে অর্থ, অনর্থ সৃষ্টি করে চলেছে ! এর অবসানের জন্যই আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
* * *
বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, দরিদ্র এবং দারিদ্র সীমার নীচে ইত্যাদি অর্থনৈতিক মানদণ্ডে বিভাজিত। যার সাথে বর্ণানুগ কর্মের কোন সম্পর্ক নেই। ফলে, তথাকথিত একজন নিম্ন বর্ণের মানুষও কালোয়ারী, দালালি, সিণ্ডিকেট, প্রমোটারী ইত্যাদি বৃত্তি মাধ্যমে প্রভূত টাকা রোজগার করার সুযোগ পাচ্ছে। উচ্চ-বিত্তধারী হয়ে অপরাপর উচ্চবর্ণকে চাকর রেখে, দরিদ্র অথচ গুণীজনদের দাবিয়ে রেখে সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারছে! এক মেকী উদার অর্থনীতির প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বংশানুক্রমিক গুণ ও কর্মের যোগ্যতার মানদণ্ডকে শিথিল করে সংরক্ষণ প্রথা মাধ্যমে এক পরস্পর বিরোধী শ্রেণী-বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তথাকথিত শিক্ষিত লোকেরা বর্ণাশ্রম না বুঝলেও সুবিধা আদায় করার লক্ষ্যে SC/ST/OBC বুঝতে শিখেছে। ফলে সামগ্রিকভাবে ‘ওয়ার্ক কালচার’ নষ্ট হয়ে এক অসম অর্থনৈতিক বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারী, বেসরকারী, সংগঠিত, অসংগঠিত কর্ম সংস্থানে আকাশ-পাতাল বৈষম্য। এর কারণ গোড়ায় গলদ! ব্যক্তিসত্তার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ভুলে বড় হতে গিয়ে প্রকারান্তরে নিজেদের অস্তিত্বকে ম্যালিগন্যাণ্ট স্তরে বিপন্ন করে চলেছি। এর অবসান প্রয়োজন। এ জন্যই আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন। * * *
বর্ণাশ্রম অনুযায়ী যোগ্যতাসম্পন্ন ব্রাহ্মণেরা আচার্য্যপদে, উপাচার্য্যপদে অধিষ্ঠিত হয়ে অধ্যাপনা করতেন, শিক্ষাদানের মাধ্যমে ছাত্রদের সন্তোষ বিধান করতে পারলেই গ্রহণ করতেন শ্রদ্ধার্ঘ্যের দক্ষিণা। হাতীবাগান, হাওড়া, ভাটপাড়া, বারানসী, রাজস্থান এবং কাশ্মীরের কিছু কিছু পণ্ডিতেরা বর্তমানেও টোল বা গুরুকুল মাধ্যমে ওই প্রথা জীইয়ে রেখেছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ‘আশ্রমের রূপ ও বিকাশ’ প্রবন্ধ এবং কালজয়ী ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শতাব্দীর মৃত্যু’ উপন্যাস ভারতীয় শিক্ষার অপমৃত্যুর এক জীবন্ত দলিল স্বরূপ।
আর্য্যকৃষ্টির ভারতবর্ষে, শিক্ষাদান এবং শিক্ষাগ্রহণ দুইই ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধার উপরে প্রতিষ্ঠিত। “প্রণিপাতেন, পরিপ্রশ্নেন, সেবয়া”, –-আচার্য্য বা শিক্ষকের প্রতি প্রকৃষ্টরূপে আনতি প্রকাশ দ্বারা প্রশ্নের মাধ্যমে, সেবার মাধ্যমে অজানাকে জেনে নিজেকে সমৃদ্ধ করতেন। জানার তত্ত্ব এবং তথ্য ছিল, “অসতো মা সদগময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যুর্মামৃতম্ গময়” – অসৎ হতে সৎ-এ অবস্থান করে, অন্ধকার থেকে আলোর লক্ষ্যে এগিয়ে, মৃত্যুময় জগতের মধ্যে থেকেও যেন অমৃত আহরণ করতে পারি। এই গন্তব্যের লক্ষ্যে পরিচালিত। ওই গন্তব্যে পৌঁছতে “আত্মবৎ সর্বভূতেষু, মাতৃবৎ পরদারেষু, লোষ্ট্রবৎ পরদ্রব্যেষু”––সকল প্রাণীকে নিজের মত করে ভালবাসব, সকল মেয়েদের নিজের মায়ের মত সম্মান করব, অন্যের জিনিসকে রাস্তায় পরিত্যক্ত ঢিলের মত মনে করব। “মা গৃধ”—লোভ সম্বরন করব।—ইত্যাদি ছিল ভারতীয় শিক্ষার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। ‘মেরা ভারত মহান’ শ্লোগানে সমৃদ্ধ আধিকারিকেরা ‘সত্যমেব জয়তে’-র সীলমোহর দিয়ে ওই বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাকে নষ্ট করে শিক্ষকদের মাস মাইনের চাকর করার ফলে শিক্ষা আজ ব্যবসায়ে পরিণত। শিক্ষাঙ্গনে ‘আমরা ওরা’ বিভেদের শিক্ষার সাথে পরিপোষিত হচ্ছে অসদাচার, ভ্রষ্টাচার, দুর্নীতি, হিংসার শিক্ষা! এ জন্যই আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
***** প্রাচীন ভারতের আদর্শ রাজন্যবর্গ প্রজাগণকে বংশানুক্রমিক কৌলিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে, কর্মানুগত শাসনে রেখে কর্মচ্যুত বা বেকারদের স্ব স্ব বৈশিষ্ট্যানুপাতিক কর্মে নিযুক্ত করতেন। যাতে বর্ণাশ্রম ধর্ম বিনষ্ট হয়ে প্রজাগণ সঙ্করদোষে দুষ্ট না হয়। প্রজা সঙ্করদোষে দুষ্ট হলে সমাজে ভীষণাকৃতি, বামন, কুব্জ, স্থূল মস্তিষ্ক সম্পন্ন, ক্লীব, অন্ধ, বধির, অপরাধপ্রবণ মানুষের সৃষ্টি হয়। (দ্রঃ বিষ্ণুপুরাণ) ওই শিক্ষার ধারা লুপ্ত করার ফলে সমাজের পারস্পরিক সংহতি, শান্তি, সমৃদ্ধি লোপ পেতে সুরু করেছে।
বর্তমানে জীবিকা এবং পেশাগত শ্রেণী বিন্যাসের অন্তর্ভূক্ত বৃহদায়তন, মাঝারি, ক্ষুদ্র শিল্পপতি, বাণিজ্যজীবী, পাইকারী, খুচরা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ফেরিওয়ালা, আমলা, ডাক্তার, নার্স, আয়া, বিউটিশিয়ান, উকিল, ইঞ্জিনীয়ার, শিক্ষক, করনিক, এজেণ্ট, পাইলট, ড্রাইভার, মেকানিক, অপারেটরর্স, বাইণ্ডার, প্রিন্টার, কম্পোজিটর, ওয়েল্ডার, টার্নার, ফিটার, উইভার, ইলেকট্রিশিয়ান, ইলেক্ট্রনিকস্ ওয়ার্কার, কম্প্যুটার ওয়ার্কার, কার্পেন্টার, কন্ট্রাকটর, প্রমোটার, নির্মাণকর্মী, শ্রমজীবী ইত্যাদি আরো আরো অনেক বৃত্তিতে, কর্মে নিযুক্তরা বেশীরভাগই বর্ণাশ্রম অনুসারী বৃত্তিতে রত নয়। ফলে এক অসম অর্থনৈতিক বণ্টন ব্যবস্থা রাষ্টে বিদ্যমান। কর্মক্ষেত্রে উপযুক্ত জন্মগত সংস্কার (instinct)কে উপযুক্ত মর্যাদা না দেবার জন্য সার্বিকভাবে কর্মসংস্কৃতিতে বিপর্য্যয় নেমে এসেছে। সমান কর্মে সমান মজুরী, সমান সম্মান না পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট জনের মানসিক স্বাস্থ্য বিপন্ন হচ্ছে।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, (আমাদের) বর্ণাশ্রমের মধ্যে un-employment (বেকার সমস্যা) বলে জিনিস ছিল না, তা’তে বৃত্তিহরণ ছিল মহাপাপ, প্রত্যেকে স্ব-স্ব বর্ণোচিত কর্ম করতো, প্রত্যেকে প্রত্যেকের সহযোগী ও পরিপূরণী হ’তো। (আঃ প্রঃ ১ম খণ্ড, পৃঃ ৭৯)
আমার মনে হয়, বর্ণাশ্রমটা যদি ঠিকভাবে জাগিয়ে তোলা যায়, তবে অনেক কিছু গোল চুকে যায়। (আঃ প্রঃ ১ম খণ্ড, পৃঃ ৭৯)
বর্ণাশ্রমকে মেনে চলার জন্য একটা সময়ে ভারতবর্ষের প্রতিটি গ্রাম স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। উপার্জনের জন্য পরিযায়ী হতে হতো না।
।। শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত বর্ণাশ্রমের বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা ।।
শরৎদা জিজ্ঞাসা করলেন—‘চাতুর্ব্বণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকৰ্ম্মাবিভাগশঃ’–এর মানে কী। এটা কি গোড়া থেকে আছে ? শ্রীশ্রীঠাকুর—হ্যাঁ, ভিতরে যেমন instinct (সহজাত সংস্কার বা গুণ) থাকে, কৰ্ম্মও তদনুযায়ী হয়। দুনিয়ার দুটো জিনিস ঠিক অবিকল বা একরকম দেখতে পাবেন না। প্রত্যেকটি যা-কিছুর একটা বিশিষ্টতা আছে— তা যেমন রূপে তেমন গুণে। একই বাপ-মায়ের পাঁচটি সন্তান পাঁচরকম হয়। কারণ, উপগতির সময় নারী, পুরুষকে যখন যেমন প্রেরণা দেয়, পুরুষের ভিতরকার তেমনতর জিনিসই তখন বেরোয়। স্ব-অয়ন-স্যূত বৃত্ত্যাভিধ্যান তপস্যায় গতি ও অস্তি অধিজাত হয়েছে। সেখানে স্ব হচ্ছে যেন পুরুষ, sperm. (বীজ), বৃত্তি যেন প্রকৃতি ovum (ডিম্বকোষ), আর অভিধ্যান হলো cohesive affinity. (যোগাবেগ)। প্রকৃতির বিভিন্ন প্রেরণায় একই পুরুষের ভিতর থেকে বিভিন্ন গুণের সৃষ্টি হ’লো। যত রকমের গুণই থাক না কেন, তার Grand division (প্রধান বিভাগ) ঐ চার বর্ণের মধ্যেই রয়েছে। শুধু মানুষের জন্যই নয়, জীব-জগতের সব স্তরেই চাতুর্ব্বর্ণ রয়েছে, সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গেই বর্ণ ঢুকে গেছে। প্রথম থেকেই তা instinct হিসাবে থাকে। Environment (পারিপার্শ্বিক) এর মধ্যে তা প্রকাশিত হয়। Generation after generation (বংশ পরম্পরায়) সেই ধারা চলে।
শরতদা— বর্ণ যদি প্রধানতঃ গুণগত ব্যাপার, তাহলে hereditary varna (বংশানুক্রমিক বর্ণ) মানবার প্রয়োজন কী?
শ্রীশ্রীঠাকুর—তাহলে তো বেশ বুঝেছেন দেখছি! গুণটা আসছে কোত্থেকে? সেও তো ঐ জন্মসূত্র থেকে। আপনার জৈবী বিধানকে বাদ দিয়ে আপনার কোন গুণ বা কৰ্ম্মক্ষমতা নেই। হাওয়ার উপর কিছু দাঁড়ায় না। গুণ ও কৰ্ম্মক্ষমতা শরীর, স্নায়ু, কোষ chromosome, gene ইত্যাদিকে আশ্রয় করেই অবস্থান করে। সেগুলি বংশানুক্রমিকতার সূত্র বেয়েই তো নেমে আসে, যাকে বলে immortal neckless of germ-cell (বীজ কোষের অবিনশ্বর মালা।)
শরৎদা—বর্ণধৰ্ম্ম ঠিক ভাবে পালন করতে গেলে তো মানুষ বর্ণোচিত কৰ্ম্ম ছাড়া অন্য কাজ করতে পারবে না। কিন্তু কোন মানুষের অন্য বর্ণের কৰ্ম্মে যদি বিশেষ প্রতিভা থাকে এবং তা যদি সে না করতে পারে, তাহলে তো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শ্রীশ্রীঠাকুর—মানুষ জীবিকার বর্ণোচিত কৰ্ম্ম ছাড়া করতে পারবে না—এক আপদ্ধর্ম ছাড়া। তাছাড়া কোন কৰ্ম্মানুশীলনে মানুষের কোন বাধা নেই। বর্ণাতীত কৰ্ম্মে যার বিশেষ প্রতিভা থাকে, বর্ণোচিত কর্মেও সে অপটু হয় না। সেই কৰ্ম্ম দিয়ে জীবিকা আহরণ করে বাদবাকী সময় সে তার প্রতিভার স্ফূরণ এবং তদনুযায়ী লোক সেবায় ব্যয় করতে পারে। তার বিনিময় সে কিছু চাইবে না, কিন্তু তার সেবায় প্রীত হয়ে স্বতঃস্বেচ্ছ আগ্রহে প্রীতি অবদান স্বরূপ কেউ যদি তাকে কিছু দেয়, তা গ্রহণ করতে তার কোন বাধা নেই। কিংবা রাষ্ট্রের তরফ থেকেও যদি তাকে কোন পুরস্কার দেয় তাও সে গ্রহণ করতে পারে। প্রত্যেকে যদি বর্ণোচিত কর্মনিরত থাকে, কেউ কারও বৃত্তিহরণ না করে তাহলে বেকার সমস্যা জিনিসটাই আসতে পারে না। অযথা প্রতিযোগিতা জিনিসটাও বন্ধ হয়ে যায়। পারস্পরিক সহযোগিতা ও নির্ভরশীলতা বেড়ে যায়। বংশপরম্পরায় একই কৰ্ম্ম করার ফলে প্রত্যেকের দক্ষতা ও যোগ্যতাও বেড়ে যায়। প্রত্যেকে স্ব স্ব কৰ্ম্ম করায় সর্ব্বতোমুখী সুষম উৎপাদন ও সেবা পরিবেষণের একটা স্বাভাবিক ব্যবস্থা স্বতঃই গজিয়ে ওঠে। কোন বর্ণের বিশিষ্ট সেবার অভাবে, তারা এবং অন্যান্য বর্ণ অপুষ্ট থাকে না। সামাজিক শৃঙ্খলা অব্যাহতভাবেই এগিয়ে চলে। তাই আমাদের বাপ, বড়বাপ, ঋষি, মহাপুরুষরা যে বিধান করে গেছেন, তা একটু তলিয়ে বুঝতে চেষ্টা করবেন। অদূরদর্শিতা ও হীনত্ববুদ্ধি থেকে দুনিয়ার অনেক আন্দোলনই হয়েছে, কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান কিছু হয় নি, সব ব্যাপার মানুষের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং বার বার বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য্য হয়ে উঠছে। এর আছে সুসঙ্গত ব্যক্তিবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানকে আশ্রয় করার মধ্যে। এই বিজ্ঞানের নামই বর্ণাশ্রম,এবং আমাদের ঋষি-মহাপুরুষরাই এই প্রাকৃতিক বেদবিজ্ঞানের দ্রষ্টা, আবিষ্কর্তা ও প্রতিষ্ঠাতা। (আলোচনা প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড / ১৭৩-১৭৪ পৃঃ)
শ্রীশ্রীঠাকুর কথাপ্রসঙ্গে বললেন—যে যে-কোন ধৰ্ম্মাবলম্বীই হোক না কেন, তার বংশে যদি প্রতিলোম সংমিশ্রণ না হয়ে থাকে, তবে তার বংশানুক্রমিক জীবিকা, অভ্যাস, আচার, ব্যবহার অনুপাতিক তার বর্ণ নিরূপণ করে বর্ণাশ্রমের বিধি অনুযায়ী তাকে পরিচালিত করা যেতে পারে। বর্ণাশ্রম একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাপার; এটা সার্ব্বজনীন। সহজাত সংস্কার বিন্যাস এবং বৈধী বিবাহের ভিতর দিয়ে বংশানুক্রমিক বৈশিষ্ট্যগুলিকে ধারাবাহিকতায় অক্ষুণ্ণ রেখে বংশপরম্পরায় প্রগতিপন্ন করে তোলাই হচ্ছে এর মূল কথা। পৃথিবীর প্রত্যেকটি সমাজকে যদি এমন বিধিবদ্ধভাবে সাজিয়ে তোলা যায়—তাদের বৈশিষ্ট্যের আপূরণী করে, তবে বিহিত অনুলোমক্রমে পারস্পরিক পরিণয় নিবদ্ধও সৃষ্টি করা যেতে পারে। পূরয়মান এক আদর্শ ও অনুলোম বিবাহ যেমন একটা জাতকে একগাট্টা করে তোলে, তেমনি করে তা সমগ্র বিশ্বকেও সংহত ও ঐক্যবদ্ধ করে তুলতে পারে—পারস্পরিক বৈশিষ্ট্যানুগ সংহতি নিয়ে। পরমপিতার দয়ায় বিশ্বশান্তির এই যা এৎফাক বের হয়েছে, এ একেবারে চরম এফাক, এখন তোরা মাথায় নিয়ে করলেই হয়। (আলোচনা প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড, পৃঃ ৮৯-৯০) আমাদের বুঝটাকে পাকা করে দিতে একই বিষয় তিনি নানাভাবে উপস্থাপনা করে গেছেন যাতে আমরা ‘না বোঝার’ অজুহাত না দিতে পারি। তাই তিনি অনুশ্রুতি-র ছড়াবাণীতে
বিষয়টাকে আরো একটু প্রাঞ্জল করে তুলে ধরলেনঃ বর্ণাশ্রমী নয়কো যা’রা আৰ্য্যকৃষ্টি মেনে চলে কিম্বা আৰ্য্যকৃত হ’য়ে বর্ণাশ্রম প্রার্থী হ’লে গুণ বঞ্চনা-সক্রিয়তায় বংশক্রমে ব্যক্তিগত অনুক্রমে যথাবর্ণে করবি তা’রে সুসংহত।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র উপরোক্ত বাণীর মাধ্যমে বাহ্য জাতিভেদ প্রথার মূলোৎপাটন করে মানুষকে ভারতীয় বর্ণাশ্রমানুগ বিধানে স্ব-স্ব বৈশিষ্ট্যে প্রতিষ্ঠিত করলেন। মানুষের জাত বা সহজাত সংস্কার এবং তাদের জৈবিক তাগিদগুলো প্রবৃত্তির কবলে পড়ে মনুষ্যত্বের অপলাপী কর্মে লিপ্ত যাতে না হতে পারে, বিধিবৎ নীতি প্রণয়ণ করে বিহিত ব্যবস্থায় মানুষের মনুষ্যত্ব রক্ষা করা, রাজনীতির নির্দিষ্ট কর্ম।—সে বিষয়ে উদাসীন রাজনৈতিক জন প্রতিনিধিগণ ! এ জন্যই আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
* * *
শান্তি-মৈত্রী-ঐক্য প্রতিষ্ঠার পথ-নির্দেশ
নৃতাত্ত্বিক গঠনের বৈশিষ্ট্যানুযায়ী মানুষকে আল্পাইন, ব্রাকিসেফাল, মেডিটেরিয়ান, মঙ্গোলয়েড, নর্ডিক, নিগ্রোয়েড প্রভৃতি নামে শ্রেণী বিভাজন করা হয়েছে। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর সহজাত সংস্কার গুণ ও কর্মভিত্তিক বর্ণাশ্রম বিভাজনকে সমৃদ্ধ করেছিলেন আর্য্য ঋষিরা। শাস্ত্রে গুণ এবং কর্ম দেখে বর্ণ নিরূপণ করার বিধান রয়েছে। সত্ত্ব গুণে বিপ্র। সত্ত্ব মিশ্রিত রজোগুণে ক্ষত্রিয়। রজোমিশ্রিত তমোগুণে বৈশ্য এবং তমোগুণাধিকারে শূদ্র চিহ্নিত করা হয়েছিল। এবং তদনুযায়ী কর্ম নির্ধারিত হয়েছিল। প্রাকৃতিক নিয়মে সকলেই স্ব স্ব বৈশিষ্ট্যে শ্রেষ্ঠত্বের স্থান অধিকার করে আছে।
এ বিষয়ে একটা সুন্দর ছড়া আছে।
“শূদ্রই তো জাতির চাকা
বৈশ্য জোগায় দেশের টাকা,
ক্ষত্রিয়েরা রাজার জাত
সবার পূরণ বিপ্র ধাত।
বিপ্র যদি জাগত আবার
বিজয়গুরু মত্ততায়,
দেশটা কি আর চ’লত উধাও
সর্ব্বনাশা ব্যর্থতায় ?
ক্ষত্র যারা কায়েত হয়ে
চলছে বেভুল ঝিমিয়ে মাথা,
তা’রা যদি উঠত জেগে
চ’লত করা অসৎ যা তা’?
বৈশ্য বণিক বিশাল আয়ে
বিভব দেশে দিত যদি,
অভাব কি আর ঢুকত দেশে
হা-হুতাশে নিরবধি?
শুদ্র যদি শুচির গানে
সেবামুখর ধৃতিচর্য্যায়—
চ’লত, তবে রুখত কে তা’র
কৃতিমুখর কৃষ্টিসেবায়?
জাতিগত বৰ্ণই হ’ল
সংস্কারের গুণধারা
দুর্বল সবল যাই হোক্ না
সেই চলনে চলে তারা।
বিপ্র-ক্ষত্রিয়-বৈশ্য-শূদ্রের
বর্ণগত বিশেষ আচার
রুদ্ধ ক’রে ভাঙ্গেই যে-জন
ব্যতিক্রমী সত্তা তার।”
মানুষের বোধে উপরোক্ত সহজ-সাধারণ, অথচ প্রয়োগ ক্ষেত্রে অসাধারণ বিষয়গুলো প্রবেশ করাবার জন্য আর্য্য মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
* * *
জ্ঞানী, বিজ্ঞানী, সমাজতত্ত্ববিদ্, মনস্তত্ত্ববিদ প্রমুখ পণ্ডিত ব্যক্তিদের বোঝাবার জন্য আরও বিস্তারিত ভাবে বললেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র।
” …… আর্য্য জাতির uphill motion-এর (উর্ধগামী গতির) acceleration (ত্বরান্বিত করা)-ই হ’চ্ছে front-(সম্মুখে) ব্রাহ্মণ আর back-এ (পিছনে) শূদ্র। চাতুর্বর্ণ্য বিভাগ কতকটা আমাদের body system-এর (শরীর বিধানের) মতন। শূদ্র হ’চ্ছে এই whole system-এর (সমুদয় বিধানের) carrier (বাহক) এবং supporter (সহায়ক), যা’র উপর ভর দিয়ে এই সমাজদেহ চলছে। বৈশ্যদের function (কর্তব্য) হ’ল সমাজদেহকে সুস্থ রাখা by the supply of proper nutrition and food (যথোপযুক্ত পুষ্টি এবং খাদ্য সরবরাহ দ্বারা)। বৈশ্যশক্তি এই function discharge (কর্তব্য সম্পাদন) করতে যেদিন পরাঙ্মুখ হ’ল, সেদিন এই সমাজদেহ ভেঙ্গে পড়লো। Stomach (পাকস্থলী) যদি boycott (অসহযোগ) করে, আমাদের body-system-এর (শরীর বিধানের) যে অবস্থা হয় তাই হ’ল। এই বৈশ্যশক্তি যদি আবার জাগে এবং legs, heart ও brain-কে (পা, হৃৎপিন্ড ও মস্তিষ্ককে) proper nutrition supply করে (উপযুক্ত পুষ্টি যোগায়), তবে আবার সমাজদেহ জেগে উঠবে। Body system-এর মধ্যে heart (হৃৎপিন্ড) যেমন, সমাজদেহের মধ্যে ক্ষত্রিয় তেমন। Heart-এর মধ্যে দু’রকম cells (কোষ) আছেঃ (১) white cells (সাদা কোষ) (২) Red cells (লাল কোষ)। Red cells-এর (লাল কোষের) কাজ হ’চ্ছে body-কে fit (কার্যক্ষম) রাখা এবং maintain (পরিপোষণ) করা by the proper distribution of red blood (লাল রক্ত উপযুক্ত ভাবে বিতরণ দ্বারা); এবং white cells-এর (সাদা কোষের) কাজ হ’চ্ছে body-কে protect (রক্ষা) করা। ক্ষত্রিয়ত্বের মধ্যে এই দু’টি function (কার্য) আছে; একটি সমাজদেহকে fit (কার্যক্ষম) রাখা ও maintain (প্রতিপালন) করা, আর একটি disease-এর (রোগের) হাত থেকে protect (রক্ষা) করা। কিন্তু এই দুই blood-এর supply (যোগান) নির্ভর করছে stomach-এর (পাকস্থলীর) উপর। সমাজদেহের brain (মস্তিষ্ক) হ’চ্ছেন ব্রাহ্মণ (বিপ্র), যাঁদের working (কার্যতা) নির্ভর করছে ক্ষত্রিয়শক্তি বৈশ্যশক্তি এবং শূদ্রশক্তির উপর। তাঁরা যেমন-তেমন এই তিন শক্তির নিকট support and help (সাহায্য ও সহানুভূতি) পা’চ্ছেন, তেমন-তেমন এই তিনকে regulate, control (নিয়মিত ও আয়ত্ত) করতে পারছেন। এই চারিশক্তির মধ্যে কেহই ছোট-বড় নয়। একটা harmony (সমন্বয়) ও co-ordination-এর (সমবায়ের) যোগে এদের মধ্যে একযোগে একতানে কাজ হ’চ্ছে। কিন্তু body এর মধ্যে brain-এর স্থান যেমন সর্বোচ্চ এবং সর্ব উচ্চে থাকাটা legs, stomach ও heart-এর existence-এর পক্ষে নিতান্ত দরকার, তেমন ব্রাহ্মণকে উচ্চ place দেওয়াতে, যে উচ্চতা তাঁ’র মধ্যে inherent (স্বাভাবিক) হ’য়ে আছে, অন্যান্য বর্ণ চলতে পারছে ঠিকমত তাঁরই guidance-এ (নির্দেশে)। Head-কে বড় স্বীকার করা যেমন body-র অন্যান্য অঙ্গের পক্ষে লজ্জার নয়, বরং পরম গৌরবের, তেমনি অন্যান্য বর্ণের পক্ষে ব্রাহ্মণকে বড় ব’লে মানা তাঁদের বাঁচা-বাড়ার পক্ষে নিতান্ত প্রয়োজনীয়। Superior (শ্রেয়)-এর উপর শ্রদ্ধা রে’খে যদি তুমি সমাজকে পুনর্গঠন করতে লেগে যাও,তবে সে সমাজ টিঁকবে-তার growth (বৃদ্ধি) হবে healthy.” (ব্রজগোপাল দত্তরায় প্রণীত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, তৃতীয় খণ্ড, পৃঃ-৬৮-৬৯)
উপরোক্ত বাণী থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, বর্ণাশ্রমের বিন্যস্ত বিভাজন আমাদের শরীর বিধানেও বিদ্যমান। বর্ণাশ্রমানুগ বিধান অনুযায়ী শূদ্র বর্ণ শ্রমশিল্প, কারিগরি বিদ্যার সেবার মাধ্যমে সব বর্ণকে সাহায্য করবেন। শরীর বিধানে আমাদের পদযুগল দেহটাকে বয়ে নিয়ে বেড়ায় তাই পদযুগলকে শূদ্র বর্ণের সাথে তুলনা করা হয়েছে। বৈশ্যরা কৃষি ও বাণিজ্যের সেবা দ্বারা সকলের উদরপূর্তি করছেন। সেই উদরকে বয়ে বেড়াচ্ছে জানু বা জঙ্ঘা। তাই জঙ্ঘা বৈশ্যত্বের প্রতীক। ক্ষত্রিয়রা বাহুবল দ্বারা অসৎ নিরোধ করে সমাজকে রক্ষা করেন। শরীর বিধানে বাহু আমাদের দেহটাকে বিপদ-আপদ থেকে আগলায়, ক্ষত থেকে ত্রাণ করে, তাই বাহুকে ক্ষত্রিয় বর্ণের সাথে তুলনা করা হয়েছে। বিপ্র বর্ণ বোধ ও বোধির পরামর্শ দিয়ে সকল বর্ণকে বর্ণধর্ম পালন করার শিক্ষা দেয়, বর্ণানুগ কর্মে উৎসাহিত করে বিন্যস্ত সমাজ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের মস্তিষ্ক বিবেক, বিচার-বুদ্ধি দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সমগ্র দেহটাকে পরিচালনা করে, তাই মাথাকে বিপ্র বর্ণের সাথে তুলনা করা হয়েছে। এইভাবে দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিন্যস্ত মেলবন্ধনে দেহটাকে সুস্থভাবে পরিচালিত করতে সাহায্য করে। ছোটবড়ো কেউ নয়। যে যার বৈশিষ্ট্যে শ্রেষ্ঠ। ওই শাশ্বত প্রাকৃতিক নিয়মকে অগ্রাহ্য করে কেউ যদি মাথার কাজ পা-কে দিয়ে, পায়ের কাজ মাথাকে দিয়ে করাতে যায় তাহলে দেহটাই রক্ষা করা যাবে না। তেমনি বিন্যস্ত সমাজ ব্যবস্থা রক্ষার স্বার্থে আর্য্য ঋষিরা প্রতিটি বর্ণের জন্য নির্দিষ্ট কর্ম ও আইডেনটিটি বা স্মারক চিহ্নের বিধান দিয়েছেন। শ্বেত বর্ণে বিপ্র, লোহিত বর্ণে ক্ষত্রিয়, হরিদ্রা বর্ণে বৈশ্য এবং সবুজ বর্ণে শূদ্র চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই জীবনীয় বৈশিষ্ট্যসমূহ ধারণ করার করার বিধির নাম ধর্ম। ধর্মকে রক্ষা করার জন্য রাজনীতি। শ্রীমদ্ভগবতগীতা যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বর্ণাশ্রম বিধায়িত বিন্যস্ত সমাজের ওই চারটি বর্ণের চিহ্ন সাদা, লাল, হলুদ ও সবুজ। বর্তমান পুরুষোত্তম যাকে আর্য্যকৃষ্টির স্মারক পতাকা তথা জাতীয় পতাকা হিসেবে নির্দিষ্ট করেছেন।—সেই পতাকার অনুসরণে আমরা দলীয় পতাকা নির্বাচন করেছি।
পতাকা সম্বন্ধে পরম দয়াল বললেন– “আমার মনে হয়, আমাদের জাতীয় পতাকা তিনরঙা না হ’য়ে, চাররঙা হওয়া উচিত। চতুর্ব্বর্ণের চারটি রঙ। তার মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের একখানা হাত দেওয়া থাকবে। হাতে থাকবে সুদর্শন।
দেবীদা প্রশ্ন করলেন—প্রত্যেক বর্ণের রঙ তো আলাদা হবে?
ঠাকুর—নিশ্চয়ই। উপরে সাদা, তার নীচে লাল, তার নীচে হলুদ এবং সবুজ। এই রকম থাকবে। (দীপরক্ষী ৫ম খণ্ড, পৃঃ ১৯)
।। ‘আর্য্য’ শব্দের বিশেষত্ব ।।
‘আর্য্য’ শব্দটি মূলতঃ গুণবাচক। যাঁরা বর্ণাশ্রম, চতুরাশ্রম পরিপূরণী দশবিধ সংস্কারে সংস্কৃত হতেন তাঁদেরই আর্য্য অভিধায় ভূষিত করা হতো। তাঁরাই ক্রমে আর্য্য জাতিভুক্ত হয়েছিলেন। বর্তমান যুগধর্মে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যেমন সম্বোধনে ‘স্যর’, ‘ম্যাডাম’ শব্দ ব্যবহার করা হয়, সেসময় সদাচারী বর্ণাশ্রমানুগজীবন যাপন কারীদের উদ্দেশ্যে ‘আর্য্য’, ‘আর্য্যপুত্র’, ‘আর্য্যা’ ইত্যাদি সম্বোধনসূচক শব্দ ব্যবহৃত হতো। এই ব্যবস্থা সকলের জন্য, এখানে সাম্প্রদায়িকতার কোন স্থান নেই। এ বিষয়ে বর্তমান পুরুষোত্তম এক যুগান্তকারী বিধান দিলেন।
মঙ্গোলীয় নিগ্রো যারা
দ্রাবিড়ী কোল ম্লেচ্ছাবধি
আর্য্যীকৃত হলেই তারা
আর্য্যদেরই সুসন্ততি।
যুগ পুরুষোত্তমের আদর্শকে স্বীকার করলেই আর্য্যীকৃত হওয়া যায়। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন, “পঞ্চবর্হিঃ যা’রা স্বীকার করে, আর সপ্তার্চ্চি অনুসরণ করে, তারা যেই হোক আর যা’ই হোক– আর্য্য বা আর্য্যীকৃত । ৬০১ । (শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৭)
এবার পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চিঃ-র অনুশাসন বিষয়ে জেনে নেওয়া যাক।
।। পঞ্চবর্হিঃ ।।
১। একমেবাদ্বিতীয়ং শরণম্।
২। পূর্ব্বেষামাপূরয়িতারঃ প্রবুদ্ধা ঋষয় শরণম্।
৩। তদ্বর্ত্মানুবর্ত্তিনঃ পিতরঃ শরণম্।
৪। সত্তানুগুণা বর্ণাশ্রমাঃ শরণম্।
৫। পূর্ব্বাপূরকো বর্ত্তমানঃ পুরুষোত্তমঃ শরণম্ ।
এতদেবার্য্যায়ণম্, এষ এব সদ্ধর্ম্মঃ,
এতদেব শাশ্বতং শরণ্যম্।’’
১। এক অদ্বিতীয়ের শরণ লইতেছি।
২। পূর্ব্বপূরণকারী প্রবুদ্ধ ঋষিগণের শরণ লইতেছি।
৩। তাঁহাদের পথ অনুসরণকারী পিতৃপুরুষগণের শরণ লইতেছি।
ইহাই আর্য্যপথ, ইহাই সদ্ধর্ম্ম, আর ইহাই চিরন্তন শরণযোগ্য।
“আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে গেল সেইদিন যেদিন থেকে আমরা পঞ্চবর্হির মূল নির্দ্দেশ অবজ্ঞা করতে শুরু করলাম। তখন থেকে আমরা অপরের খোরাক হলাম কিন্তু নিজেদের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখে পরকে আপন ক’রে নেবার সামর্থ্য হারিয়ে ফেললাম।”
পঞ্চবর্হিঃ এবং সপ্তার্চ্চিঃ-র অনুশাসনকে অগ্রাহ্য করে দেশ ও জাতির মধ্যে সাম্য, মৈত্রী ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর সম্বিতী গ্রন্থে বলছেন—
মতবাদ যাই হোক না,—
আর, যে-কোন সম্প্রদায়ই হোক,
যা’ মুখ্যতঃ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’কে
স্বীকার করেনিকো—
কোন-না-কোন রকমে,—
তা’ কখনও অনুসরণ করতে যেও না,
তা’ কিন্তু জঘন্য—অসম্পূর্ণ,
সত্তা-সম্বর্দ্ধনার পরিপন্থী তা’;
আর, ঐ ‘পঞ্চবর্হিঃ’ ও ‘সপ্তার্চ্চিঃ’ই হ’চ্ছে
সেই রাজপথ—
যা’কে স্বীকার ও গ্রহণ করে চললে
ক্রমশঃই তুমি সার্থকতায় সমুন্নত হ’তে পার। ২৩৪
এই বাণী বর্ণ, সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকলকে মনুষ্যত্বে উত্তরণের পথ দেখিয়েছে। এখন মানা, না-মানা যার যার নিজস্ব ব্যাপার! আর্য্য মহাসভা রাজনৈতিক দল সকলের কাছে এই সত্য পৌঁছে দেবার জন্য দায়বদ্ধ।
‘‘হিন্দু মুসলমানের নামে নাক সিটকায়, মুসলমান হিন্দুদের নামে নাক সিটকায়—তার মানে তারা ভগবানকে, ধর্মকে, প্রেরিতকে ভালবাসে না। আর্য্যরা মানে এক অদ্বিতীয়কে, পূর্বতন ঋষি মহাপুরুষদিগকে, তারা মানে পূর্বপুরুষকে ও জন্মগত বিশিষ্ট গুণসম্পদকে। অর্থাৎ বর্ণধর্মকে, সর্ব্বোপরি তারা মানে বৈশিষ্ট্যপালী আপূরয়মান যুগপুরুষোত্তমকে। এগুলি মালার মত গাঁথা আছে। যাদের দেখার চোখ আছে ও দেখতে চায়, তারাই দেখতে পায়। বেদ, কোরান, বাইবেল ঘেঁটে দেখ, সব জায়গায় ঐ একই জিনিস রকমারি ভাবে পাবে। অন্ততঃ ওগুলির উল্টো কথা পাবে না। কোরাণে স্পষ্ট করে আছে পিতৃপুরুষকে স্বীকার করার কথা। আমি ইসলামের ভক্ত হলে আমার নাম গোলাম সোফান হবে কেন? অনুকূল চক্রবর্তীই তো থাকা উচিত। কারণ, খোদাতায়ালা যেমন সকলের, রসুল যেমন সকলের, ইসলামও তেমনি সকলের। মুসলমানের মধ্যেও বংশগত আভিজাত্য ও বৈশিষ্ট্যকে শ্রদ্ধা দিয়ে চলার কথা আছে। ওর ভিতর দিয়েই তো বর্ণধর্মের মূল তাৎপর্য্য-সম্বন্ধে সমর্থন পাওয়া যায়। আজ আমরা বৈশিষ্ট্যকে নষ্ট করতে চাই কেন ? রসূলের কি তেমন কোন কথা আছে ? আর নিজেদের বৈশিষ্ট্যকে যদি বজায় রাখতে চাই, তবে অপরের বৈশিষ্ট্য যাতে বজায় থাকে সেদিকেও লক্ষ্য রাখা লাগে। অপরের বৈশিষ্ট্য ভাঙ্গার প্রবৃত্তিকে প্রশ্রয় দিলে, কালে-কালে নিজের বৈশিষ্ট্য ভাঙ্গার পথই প্রশস্ত হয়।
আমি বলি, আমি যদি হযরতকে ভালবাসি এবং তাঁর নীতিবিধি মেনে চলি, তবে আমি হিন্দু থাকব না কেন ? পরমপিতার পথে চলতে গিয়ে পিতৃপরিচয় খোয়াতে হবে কেন ? আমি তো বুঝি হিন্দুও আর্য্য, মুসলমানও আর্য্য। উভয়ের পন্থা ও গন্তব্য এক। হযরত পূর্ববর্তীকে মানেন, পরবর্তীকে মানার ইঙ্গিতও তিনি দিয়ে গেছেন, তিনি যা মানেন আমরা যদি তা না মানি, তার মানে আমরা তাঁকে মানি না। মুসলমান পীরের কাছ থেকে দীক্ষা নেয়া লাগে, হিন্দুরও গুরুর কাছ থেকে দীক্ষা নেওয়া লাগে, সে একই কথা। শুধু ভাষা আলাদা। কতকগুলি নীতি আছে, দেশকাল, পাত্র, নির্ব্বিশেষে সর্ব্বত্র সর্বদা সবার পালনীয়, আবার কতকগুলি আছে বিশেষ-বিশেষ ব্যক্তির বিশেষ-বিশেষ অবস্থায় ও দেশকালে পালনীয়। এই দুটোর মধ্যে গুলিয়ে ফেলতে নেই। Fundamental (মৌলিক) ও universal (সার্ব্বজনীন) জিনিস হল—এক অদ্বিতীয়কে মানা, পূর্বতন ঋষি-মহাপুরুষকে মানা, পিতৃপুরুষকে মানা, বৈশিষ্ট্য মানা, পূরয়মান যুগপুরুষোত্তমকে অনুসরণ করে চলা। তুমি হিন্দুই হও বা মুসলমানই হও, এগুলি যদি না মান, তুমি হিন্দুও নও, মুসলমানও নও, এককথায় তুমি ম্লেচ্ছদলভুক্ত, ম্লেচ্ছ মানে যারা সংস্কৃতির উল্টো চলে। আর যে এগুলিকে মেনে চলে সে যে সম্প্রদায়ের লোক হোক না কেন, তাকে তুমি কখনও কাফের বলতে পার না। কাফের মানে যে ধর্মবিরোধী চলায় চলে। সাম্প্রদায়িক বিরোধের প্রশ্রয় না দিয়ে, ধর্মবিরুদ্ধ চলনের বিরুদ্ধে আমাদের জেহাদ ঘোষণা করা লাগে। তাই করা লাগে যাতে প্রতি প্রত্যেকে ঈশ্বরপ্রেমী হয়ে ওঠে, ধর্মপ্রবুদ্ধ হয়ে ওঠে। এ দায় হিন্দু-মুসলমান সকলেরই মিলিত দায়। তাই, এই কাজে হিন্দুর মুসলমানকে সাহায্য করা উচিত, মুসলমানেরও হিন্দুর সাহায্য করা উচিত। আমি বুঝি, সৎসঙ্গ যেমন হিন্দুর, তেমনি মুসলমানের, তেমনি বৌদ্ধের, তেমনি খ্রিষ্টানের, তেমনি অন্যান্য সকলের। সব মানুষই পরমপিতার, তা তারা জানুক বা না-জানুক, মানুক বা না-মানুক।
(আঃ প্রঃ একাদশ খন্ড, ইং ১৭-০৩-১৯৪৮)
আমি বুঝিনা–কোন হিন্দু শুচিশুদ্ধভাবে মসজিদে যেয়ে প্রার্থনা করতে পারবে না কেন, আবার একজন সদাচারী মুসলমান হিন্দুর প্রার্থনা-মন্দিরে বসে প্রার্থনা করতে পারবে না কেন ! ভগবান মানুষকে তার language (ভাষা) দিয়ে চেনেন না, তিনি চেনেন তাকে তার feeling (বোধ) ও activity (কর্ম্ম) দিয়ে। (আঃ প্রঃ ৯ম খণ্ড)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন—হজরত যীশু, হজরত মহম্মদ আমাদেরও prophet (প্রেরিতপুরুষ)। আর্য্যধারা যদি জীবন্ত থাকত, তা’হলে হজরত যীশু, হজরত মহম্মদ হয়তো একাদশ অবতার, দ্বাদশ অবতার ব’লে পরিগণিত হ’তেন। Anti-Biblism (বাইবেল-বিরোধী), Anti-Quranism (কোরাণ-বিরোধী), Anti-Vedism (বেদ-বিরোধী)-এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তার নিরাকরণ করতে হবে। শাক্ত বিপ্র এবং বৈষ্ণব বিপ্র-পরিবারে যেমন বিয়ে-সাদির কোন নিষেধ নেই—সৌর বিপ্র ও গাণপত্য বিপ্রে যেমন বিয়ে চলতে পারে, ইষ্ট, কৃষ্টি ও পিতৃপুরুষের ঐতিহ্যবাহী রসুল-ভক্ত বিপ্র, বুদ্ধভক্ত বিপ্র, খ্রীষ্টভক্ত বিপ্রের সঙ্গেও তেমনি বিধিমাফিক বিয়ে-থাওয়া হ’তে পারে—এতে কোন বাধা নেই। কারণ, স্বধর্ম্ম ও কৃষ্টি-নিষ্ঠ থেকে যে-কোন পূরয়মাণ মহাপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধানতি নিয়ে চলা ধর্ম্মের পরিপন্থী তো নয়ই বরং পরিপোষক। তবে প্রত্যেকটি বিয়ের ব্যাপারে খুব হিসাব ক’রে চলতে হবে, যাতে কোন রকমের ব্যত্যয়ী কিছু বা প্রতিলোম-সংস্রব না ঘটে। (আলোচনা প্রসঙ্গে ১ম খণ্ড, ২। ৭। ১৯৪০)
* * *
পরিশেষে বলতে চাই, সত্যের পথে চলতে পিয়াসী “সত্যমেব জয়তে”-এর সীলমোহর এর অধিকারী হতে চাওয়া সকল দেশসেবক পার্টির সদস্যদের কিছু নির্দিষ্ট আদর্শের অনুসরণ করে চলা উচিত। সাত্তিক ব্যক্তি চরিত্র নির্মাণ না করে, সদাচারী না হয়ে কখনোই মানুষের সেবা করে মনুষ্যত্বের জাগরণ ঘটানো সম্ভবপর নয়। তাই ব্যক্তি চরিত্র নির্মাণকল্পে কতগুলো বিধান মেনে চলতে হবে সবাইকে। যদি মানুষের মত মানুষ হয়ে মানুষের সেবা করতে চাই।
একজন মানুষের শারীরিক-মানসিক বিধানকে সুস্থ রাখতে হলে অভক্ষ্যভোজী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুনাদি তামসিক আহার করা যাবে না। করলে স্বাস্থ্য ক্ষুণ্ণ হবে। অগম্যাগামী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ প্রতিলোম, সগোত্র এবং সপিণ্ড সম্বন্ধীয়দের সাথে অবিধি পূর্বক ধর্মবিরুদ্ধ বিবাহের মাধ্যমে কামাচার করা যাবে না, করলে নীরোগ সুসন্তানের জনক-জননী হওয়া যাবে না। স্মৃতিকে নিশ্চল রাখতে শারিরীক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক সদাচার পালন করতে হবে। অসৎ পথ বর্জন করতে হবে। কদাচারী প্রদত্ত আহার ও পানীয় গ্রহণ করা যাবে না। করলে সংক্রামিত হবার আশঙ্কা থাকবে। এই আবশ্যিক জ্ঞানগুলো জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেবার জন্যই আর্য্য মহাসভা রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
আমাদের জীবধর্মের এক আবশ্যিক জৈবিক তাগিদ হলো আহার বা খাদ্য। যদিও ব্যাপক অর্থে আহার মানে আহরণ। যার মধ্যে সবকিছুই আছে। খাওয়া-দাওয়া, শোয়া-বসা, চলাফেরা, কথাবার্তা, কাজকর্ম, তথাকথিত প্রেম-ভালবাসা, বিয়ে করা, বাবা-মা হওয়া ইত্যাদি। আমাদের উপনিষদের ঋষিরা ওই সবগুলোকে একত্রিত করে ‘আহার’ নামকরণ করে বললেন, ‘‘আহারশুদ্ধৌ সত্তাশুদ্ধিঃ, সত্তাশুদ্ধৌ ধ্রুবাস্মৃতিঃ …… ’’—অর্থাৎ জীবন ধারণের নিমিত্ত আহরণগুলো শুদ্ধ হলে সত্তা শুদ্ধি হয়, সত্তা শুদ্ধি হলে স্মৃতি নিশ্চল হয়। স্মৃতি নিশ্চল হলে জাতিস্মর হওয়া যায়। জীবনভূমির এপার-ওপার নিরীক্ষণ করা যায়। যারা দেশসেবক হবেন, তারা যদি আদর্শ চলন-চরিত্র দিয়ে আত্মশুদ্ধির পথে চলতে অভ্যস্ত না হন, দেশের নাগরিকদের কোন সম্পদের উপহার দেবেন ? তাই প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সদস্যদের বিশুদ্ধ চলন-চরিত্রের ওপর নির্ভর করছে ভারতের উজ্জ্বল ভবিষ্যত। এবং ওই দৃষ্টান্তই ভারতকে মহান ভারতের শিরোপায় অধিষ্ঠিত করবে ভবিষ্যতে। এ বিষয়ে জীবন পিয়াসী সকল মানুষকে ভেবে দেখতে হবে। কোন ধর্মীয় মতবাদ প্রবৃত্তি-প্ররোচিত অশুদ্ধ আহার-বিহার-অনাচারকে সমর্থন করেনি।
আহার বিষয়ে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের বাণী
সর্বশ্রেষ্ঠ আর্য্য হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ মহাভারতের অনুশাসনপর্ব—১১৪ অধ্যায়ে বলা হয়েছে–
“যে ব্যক্তি মোহ প্রভাবে পুত্র-মাংস-তুল্য অন্যজীবের মাংস ভক্ষণ করে, সে অতি জঘন্য প্রকৃতির এবং তার সেই জীবহিংসা বহুবিধ পাপযোনিতে জন্মগ্রহণ করবার একমাত্র কারণ বলে নির্দিষ্ট হয়।’’
শুধু হিন্দু মতেই নয়, কোন ধর্মীয় মতবাদে জীবহত্যা স্বীকৃত নয়। কোরানে, আর্য্য হিন্দু-শাস্ত্রে এবং পুরুষোত্তমদের বাণীতে কোথাও ‘বলিদান’ বা ‘কোরবাণী’-র নামে প্রাণী হত্যার অনুমোদন নেই।
“আল্লার নিকট তাহার মাংস ও তাহার রক্ত কখন পৌঁছে না বা তিনি তাহা ইচ্ছা করেন না। বরং তোমরা অসৎকর্ম্ম হইতে নিজেকে রক্ষা কর ইহাই তিনি ইচ্ছা করেন। তিনি আমাদের অধীনে থাকিয়া কার্য্যনির্বাহের জন্য পশু সৃষ্টি করিয়াছেন—সেজন্য তোমরা খোদার নিকট নম্র ও নিরীহ হইতে শিক্ষালাভ করিবে। এই সৎপথ-প্রাপ্তির অর্থাৎ সৎ-শিক্ষার জন্যই খোদা এই ব্যবস্থা করিয়াছেন। যাহারা অন্যের মঙ্গল সাধন করে, তাহাদের মঙ্গল করিয়া থাকেন ……..” (কোর-আণ—২২ হজ ৩৭ র, ৫)
“বাসোপযোগী গৃহ, গুপ্তস্থান রক্ষা করিবার উপযুক্ত বস্ত্র, এবং শুষ্ক-রুটি ও পানীয় ব্যতীত মানব-সন্তানের অন্য কোন জিনিসের উপর অধিকার নাই ।” (–হাদিস তিরমিজি)
“একটু পানি এবং কয়েকটি খর্জ্জুরে তাঁহার ক্ষুধার নিবৃত্তি হইত । হজরত মোহাম্মদ একাধারে ধর্ম্ম-প্রবর্ত্তক, মহাকর্মী এবং সন্ন্যাসী ছিলেন ।” (ইসলামের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৯)
ভগবান বুদ্ধদেব বলেছেন, “আমি কখনই কাউকে মাংস খাওয়ার অনুমোদন করি নি, করি না এবং করব না।” (লঙ্কাবতার সূক্ত)
প্রভু যিশু বলেন, “তুমি হত্যা করিও না” । (এক্সোডাস – 20:13)
“যে একটি ষাড়কে হত্যা করলো, সে যেন একটি মানুষকে হত্যা করলো।” (ইসা – 66:33)
উক্ত অনুশাসনবাদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যে নিজেকে পরমেশ্বরের সন্তান বা খোদাতাল্লার বান্দা মনে করবেন তিনি কখনই কোন প্রাণী হত্যা করবেন না এবং প্রাণীর রক্ত-মাংসে ক্ষুধার নিবৃত্তি করবেন না।
প্রত্যেকের মানসিক অবস্থা-অনুযায়ী তার থেকে একটা Radiation (বিকিরণ) নির্গত হয়, সেই Radiation (বিকিরণ) আবার অন্যকে Influence (প্রভাবিত) করে । সেই জন্য শুধু খাওয়া কেন, সবাইকে সব সময় ছোঁয়াও ভাল নয়। বিশেষতঃ মানুষ যখন সাধন-ভজন ব্রত প্রায়শ্চিত্ত ইত্যাদি নিয়ে ব্যাপৃত থাকে। এগুলি কোন কুসংস্কারের কথা নয়। সাদা চোখে দেখা যায়। আবার সূক্ষ্ম যন্ত্র আবিষ্কার করলে তাতেই ধরা পড়তে পারে।
(শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, আঃ প্রঃ-৩/২৮০)
* * *
“…… আমরা আমাদের নিজেদের কৃষ্টির ধার না ধেরে পরের পরাক্রমে অভিভূত হয়ে চলছি। তাই, আমরা যত আন্দোলনই করি, একটা bastard thinking (জারজ) চিন্তা নিয়ে চলি।” (আলোচনা-প্রসঙ্গে ২১ খণ্ড, পৃঃ ৮১)
তাই—
আর্য্যকৃষ্টি অনুযায়ী রাষ্ট্রকে অবহিত করার জন্য
।। ‘বিধান বিনায়ক’ গ্রন্থ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিদেশ।।
“তোমরা
শাসন-সংস্থায় পদক্ষেপ করবার সাথে-সাথেই
কী দায়িত্বের কর্ণধার হ’য়ে পদক্ষেপ ক’রছ—বোধিদীপনা নিয়ে
কুশলকৌশলী সমীক্ষ অনুচর্য্যার সম্বেগ-সহ
তা’ স্মৃতিপটে জাগরূক রাখতে যত্নবান হয়ো,
আর, শ্রেয়নিষ্ঠায় অচ্যুত থেকে
হৃদ্য বৈধী ব্যক্তিত্বে
অটুট হ’য়ে যাতে থাকতে পার,—
তাই ক’রে চ’লো
সমস্ত প্রবৃত্তিকে শ্রেয়ার্থ-সংহত ক’রে;
১। প্রথমেই নজর রেখো
বিবাহ ও সুজনন-সংস্কারের উপর,
শ্রেয়কুল-সংস্কৃতি-সম্ভূত কন্যা
যাতে অশ্রেয়
বা অপকৃষ্ট-সংস্কৃতি-সম্পন্ন কুলে
অর্পিত না হয়—
তা’র সুব্যবস্থা ক’রো ;
কন্যার কুল-সংস্কৃতি ও চারিত্রিক সঙ্গতি
যেন বর বা পুরুষের
কুল-সংস্কৃতি ও চরিত্রের অনুপোষণী হয় ;
পণ বা যৌতুক-লালসার অপসারণে
লক্ষ্য রেখো,
পুরুষের সুকেন্দ্রিকতা
ও নারীর সতীত্বের উপর ভিত্তি করে
তোমাদের গৃহ, সমাজ ও গণ যেন
উদ্বর্দ্ধনমুখর হ’য়ে চলে ;
প্রথমেই এ-কথা বলার উদ্দেশ্য এই—
সুজনন যদি না হয়,
যে-নিয়ন্ত্রণের দ্বারা জাতক
শ্রেয় জৈবী-সংস্থিতি পেয়ে
আয়ু, মেধা, বল,
সুসঙ্গত চরিত্র এবং গুণবৈশিষ্ট্য নিয়ে কৰ্ম্মানুপ্রেরণায় যোগ্য হ’য়ে ওঠে,—
তা’ যদি না ক’রতে পার,
রাষ্ট্র-সংহতি ও রাষ্ট্রসত্তার সম্বর্দ্ধনা
দিন-দিনই ঘোর তমসাবৃত
ও নিথর হ’য়ে উঠতে থাকবেই কি থাকবে; প্রাকৃতিক বিজ্ঞানকে অবহেলা করে
যে-বিজ্ঞানেরই অবতারণা কর না কেন,
তা’ কখনও সহজ, সলীল, শুভসন্দীপী
হ’য়ে উঠতে পারবেই না,
অমনতর অবান্তর কল্পনাও
একটা মূঢ়তা মাত্র ;
তাই, শুধুমাত্র বর্ণাশ্রমের নীতিবিধিকে
দক্ষচক্ষুতে সুনিয়ন্ত্রিত ক’রে চ’লতে পারলেই
রাষ্ট্র-সংস্থা সৎ-সম্বদ্ধ হ’য়ে চ’লতে পারে,—
প্রাচীন শাস্ত্রে এ-কথা বহুল কীৰ্ত্তিত হ’য়ে আছে,
তাই, রাষ্ট্র-সংস্থার প্রধান করণীয়ই হচ্ছে
বর্ণাশ্রমের ধারণ ও সংরক্ষণ।
২। কৃষি-ব্যাপারে
বীজ ও ভূমির সুসঙ্গতির প্রতি লক্ষ্য রেখো,
যে-ভূমিতে যে-বীজের ফলন
পুষ্ট ও অধিক হ’য়ে ওঠে,
তা’র সুব্যবস্থা ক’রো,
কৃষি সম্বন্ধীয় চলনসই তত্ত্বগুলিতে
মানুষ যা’তে শিক্ষা লাভ করে—
তা’র ব্যবস্থা
ও যথাসম্ভব তা’তে প্রেরণাসম্বুদ্ধ করে
কৃষি-ব্যাপারে
লোককে এমনতর ব্যাপৃত রাখ,—
যাতে ক্রমশঃই
নানা জাতীয় ফসলের প্রাচুর্য্য ঘটে ওঠে,
আর, শাসন-সংস্থার সুব্যবস্থ পরিচালনে
পূর্ত্তবিভাগ, নদী-সংস্কার, সেচ
ও বনব্যবস্থার সুনিয়ন্ত্রণে
তা’দিগকে কৃষিকৰ্ম্মে
যথাসম্ভব সব দিক-দিয়ে সাহায্য ক’রো,
যাতে খাদ্য-বিষয়ে পরমুখাপেক্ষী না-থেকে
দেশ স্বাবলম্বী তো হ’য়ে ওঠেই,
বরং উদ্বৃত্ত খাদ্যবণ্টনে
অন্যের অভাবকেও দূরীভূত ক’রতে পারে।
৩। মানুষের সম্বেগকে
এমন উদ্দীপ্ত ক’রে তোল,
যা’তে তা’রা যোগ্যতায় অভিদীপ্ত হ’য়ে ওঠে,
এবং পারদর্শিতা, বোধ ও শ্রমনিয়োজনে
দেশ ও বিদেশের প্রয়োজনে
শিল্পের উন্নতি করতে পারে—
কুটীরশিল্পের সম্প্রসারণে
সবিশেষ লক্ষ্য রেখে—–
যাতে অধিকাংশ পরিবারই
শিল্প পরিচর্য্যায় ব্যাপৃত হ’য়ে ওঠে,
আর, ঐ জাতীয় সমস্ত ব্যাপারের জন্য
যে-যে উপকরণের প্রয়োজন
তা’ বিহিত ত্বরিতভাবে সরবরাহ কর– শিল্পোপযোগী যন্ত্রপাতি ও শক্তি সরবরাহকে
সহজ, সুগম ও ব্যাপক ক’রে তু’লে;
সঙ্গে সঙ্গে যানবাহন ও যোগাযোগের
বিহিত ব্যবস্থা কর,
যাতে কেউ
জীবনচর্য্যার যোগ্যতর পরিচর্য্যায়
কোন দিক-দিয়ে কোনরকমে
ব্যাহত না হয় ;
বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে,–
শ্রমিকরা যা’তে ধনিকের উপচয়ী হয়,
এবং ধনিকরা যা’তে
শ্রমিকদের সত্তাপোষণী হয়,
আর, যোগ্যতায় অভিদীপ্ত হ’য়ে
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে
শ্রমিকরা যাতে স্বাবলম্বী হ’য়ে ওঠে—
নিজের পরিবারকে শ্রমনিকেতন ক’রে
সম্পদে উদ্ভিন্ন হ’য়ে।
৪। ব্যবসা-বাণিজ্য-নিয়ন্ত্রণ
এমনই শুভ, সহজ,
অনুচৰ্য্যাদীপক হওয়া উচিত,
যা’র ফলে বা যে-নিয়ন্ত্রণে
মানুষ এতটুকুও অভাব বোধ না করে,
বরং যোগ্যতা ও প্রাচুর্য্যে উচ্ছল হ’য়ে ওঠে;
দেশে যা’ জন্মে, তা’র সহজ পরিবেষণ
ও জীবন-চলনার পক্ষে যা’ নিতান্তই প্রয়োজনীয়,
অথচ দেশে পাওয়া যায় না—
বিদেশ হ’তে এমনতর দ্রব্যাদির
শীঘ্র ও সহজ আমদানি
এমনতরভাবে
যা’তে মূল্য-বাহুল্যে
মানুষ পীড়িত না হ’য়ে ওঠে,
বা কেউ তা’র অভাবে সঙ্কটাপন্ন হ’য়ে
জীবন না হারায়,——
অতীব তৎপরতা নিয়ে
তীক্ষ্ণ চক্ষুর দিব্য বিবেচনায়
তা’র সমাধান হওয়া একান্তই সমীচীন—
অবান্তর গণবিক্ষোভের অবসরই যাতে না থাকে
এমনতরভাবে;
কৃষি ও শিল্পের উপচয়ী উৎপাদন ও বণ্টন
এবং বাণিজ্য ও বৈদেশিক অর্থ-বিনিময়ের
লাভজনক সুপ্রসারই হ’চ্ছে
অর্থনীতির মূল ভিত্তি,
আবার, কৃষিই এ-সবের মেরুদণ্ড,
যা’দের কৃষি অব্যবস্থ——
অনটনও তা’দের অপরিহার্য্য,
তা’দের পরশোষী না হ’য়ে উপায়ই থাকে না ।
৫। শিক্ষাকে একানুধ্যায়ী আদর্শে
অনুচর্য্যী ধৰ্ম্মের ভিত্তিতে
সুসঙ্গত সত্তাপোষণী ক’রে তোল,
যা’তে কোন শিক্ষাই
অন্য যা’-কিছুর সাথে
সঙ্গতির তাল রেখে
সম্বুদ্ধ সম্বর্দ্ধনায়
বাস্তব যোগ্যতার উৎক্রমণে
উদ্গতি লাভ ক’রতে না-পেরে—
বৃথা ও বিচ্ছিন্ন হ’য়ে না ওঠে ;
শ্রদ্ধোষিত অন্তরাসী হ’য়ে
প্রতিপ্রত্যেকে যা’তে শিক্ষানুবৰ্ত্তনায়
উচ্ছল চলনে চ’লতে পারে, –
তা’র জন্য যথাবিহিত পরিবেশ সৃষ্টি কর ;
শিক্ষকদিগকে ঐ অমনতর শিক্ষার
মূর্ত্তপ্রতীক হ’য়ে উঠতে হবে,
তাঁরা যদি সুকেন্দ্রিক, একানুধ্যায়ী
সশ্রদ্ধ না হ’য়ে ওঠেন—
অন্তরাসী সম্বেগ-সম্বুদ্ধ হ’য়ে—
ছাত্রেরাও সুসঙ্গত হয়ে উঠবে না তাঁতে,
অন্তরাসী হবে না,
যা’র ফলে, শিক্ষা
একটা শাতনী পটভূমিতে
আবর্ত্তিত হয়ে উঠবে ;
শিক্ষার সাথে
বৈধানিক দক্ষতা ও শক্তি
এমনতর সূক্ষ্ম, সবেগ
ও কৰ্ম্মঠ হয়ে ওঠা চাই,
যা’র ফলে, মানুষ
কোন ব্যাপারের সম্মুখীন হ’লেই
মুহূর্ত্তে সেগুলি উপলব্ধি ক’রতে পারে,
ন্যায়-অন্যায়, ভাল-মন্দ, সৎ-অসৎকে
দেশকালপাত্র ও অবস্থার ভিতরেও
ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্ত্তমানের সঙ্গতি নিয়ে
লহমায় বেছে নিতে পারে ।
৬। গবেষণা কেন্দ্রগুলিকে দেশের
দীপালী-বীক্ষণাগার ক’রে তুলতে হবে,
সুসঙ্গত সত্তাপোষণী সমাচার
যা’তে সুদূরপ্রসারী পরীক্ষায়
সুনিশ্চয়ী তাৎপর্য্যে
সবার কাছে উপস্থিত হয়,
যা’র পরিপালনে তারা জীবন ও সম্বৃদ্ধিতে
আরো হ’তে আরোতর উদ্বর্দ্ধনায়
নিয়ত চলৎনশীল থাকতে পারে—
আদর্শ ও ধর্ম্মের ভিত্তিতে
নিটোলভাবে দাঁড়িয়ে—
তা’র ব্যবস্থা ক’রতে হবে।
৭। তোমাদের স্বাস্থ্য অভিযান যেন
গ্রামের কানায় কানায় উপস্থিত হয়,
সদাচার ও স্বাস্থ্য-নীতিগুলিতে
প্রতিটি ব্যষ্টি যেন পারদর্শী হয়ে ওঠে,
ঔষধ, পথ্য, চিকিৎসা ও বৈদ্যের
যেন এতটুকু অভাব না ঘটে,
তোমাদের গণজীবন
স্বাস্থ্যে, বীর্য্যে
অযুত-আয়ু হ’য়ে
বীৰ্য্যবান যোগ্যতা নিয়ে
তাদের অস্তিকে স্বস্তি-বিকিরণে
যেন বিকীর্ণ ক’রে তোলে,—
হৃদ্য হ’য়ে, তৃপ্তিপ্রদ হ’য়ে
মধুদীপনার রশ্মিজাল বিচ্ছুরণে
অস্তিত্বের সামগানে
সম্বৃদ্ধ ক’রতে পারে সবাইকে ।
৮। শান্তিরক্ষক-বিভাগ ও সৈন্য-বিভাগ
সুষ্ঠু সন্দীপনায়
আদর্শপ্রাণ ধৰ্ম্মানুগ ভিত্তিতে
অসৎ-নিরোধী হ’য়ে
যা’তে প্রতিপ্রত্যেকের আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে,
সে-বিষয়ে বিশেষ লক্ষ্য রেখো,
ব্যতিক্রমে
বিশেষ ব্যবস্থা অবলম্বন করো;
নিরাপত্তা যেখানে সন্দেহের
নিরোধও সেখানে অব্যর্থভাবে প্রয়োজন—
ক্ষিপ্র তৎপরতায় ;
আর, শান্তিরক্ষক ও সৈন্য-বিভাগের
প্রতিপ্রত্যেকে যেন
একানুধ্যায়ী, ধৰ্ম্মপ্রদীপ্ত
সৌকৰ্য্য-সমন্বিত ঐ শাসন সংস্থার
স্বভাব-যাজী হ’য়ে ওঠে–
বাক্য, ব্যবহার ও কর্ম্মের সুসঙ্গতির তালে,
যার ফলে, প্রত্যেকটি মানুষ
উপলব্ধি ও উপভোগ করতে পারে
ঐ শাসন-সংস্থা
তাদের কাছে কতখানি শ্রেয় বা প্রিয়,
সবাই যেন একটা আসান ও আশা পায়,
শাস্তিকেও তারা যেন
স্বস্তি ব’লে আলিঙ্গন ক’রতে পারে।
৯। গুপ্তচর-বিভাগকে
এমনতর ক্ষিপ্র, দক্ষ, নিপুণ, বিশ্বস্ত ও তৎপর
ক’রে তুলতে হবে—
আপ্রাণ শ্রেয়ার্থ-অভিদীপনা-নিবদ্ধ করে,
যেন তারা যাই করুক না কেন
শ্রেয়ার্থকে
কিছুতেই বিসৰ্জ্জন দিতে না পারে,
তাদের জীবনমূল
যেন এতই ধর্মভিত্তিতে প্রোথিত থাকে যে,
তাকে উল্লঙ্ঘন করা তাদের পক্ষে
দুর্ভাবনীয় ব্যাপার হ’য়ে দাঁড়ায়;
তা’দের চক্ষু, কর্ণ, জিহবা,
নাসিকা, ত্বক্ ইত্যাদিকে
এতই তীক্ষ্ণ ও নির্ভুল বোধপ্রবণ ক’রে তুলতে হবে,—
যা’তে তা’রা স্বতঃই
বিচক্ষণ বোধ-তাৎপৰ্য্যশীল হয়ে ওঠে,
তাদের উপস্থিতবুদ্ধি, বাক্য-বিন্যাস
এমনতর ক’রে তুলতে হবে–
যাতে কোন বিষয়ে তাদের বিবরণ
বাস্তবতারই বাক্-ছবি হ’য়ে ওঠে,
তাদের ধারণাগুলিকে
এমনতর সুস্থ ধৃতি-প্রবণ ক’রে তুলতে হবে—
যাতে বিবরণে
কোনমাত্র ব্যতিক্রম না হয়,
অযথা অপকৃষ্ট-ধারণাদুষ্ট হয়ে
বা বাস্তব বিষয়ের অসাক্ষাৎকারে
তাদের প্রদত্ত কোন বিবরণের দ্বারা
কেউ যেন
অযথাভাবে আক্রান্ত বা বিমর্দ্দিত না হয়,
আবার, আলস্য বা প্রবৃত্তি-প্রলুব্ধ হয়ে
তাদের ক্ষিপ্র নৈপুণ্য
এতটুকুও যেন বিকম্পিত না হয়ে ওঠে,
দুষ্ট পরিবেশ বেষ্টিত হয়েও
তাদের এমনতর
উপস্থিতবুদ্ধির তালিমসম্পন্ন হওয়া উচিত—
যাতে তারা
যে-কোন অবস্থায় পড়ুক না কেন,
সে-ব্যুহ ভেদ ক’রে ফিরে আসা
তাদের পক্ষে হস্তামলকবৎ হ’য়ে ওঠে,
তারা যেন
সাহস ও প্রত্যয়ে অভিদীপ্ত হয়ে চলে,
দেবপ্রভ চরিত্র,
শাতন-ভেদী ইন্দ্রিয় ও বোধি-সমন্বিত যে যত,—
সেই তত শ্রেয়,
দক্ষ, পারদর্শী, কর্ম্মপটু হ’য়ে থাকে,
নিষ্ঠা, সহ্য, ধৈর্য্য, অধ্যবসায়
ও কৰ্ম্মপটু তীব্রবীর্য্যী বোধায়নী সন্ধিৎসাই হচ্ছে
তাদের প্রিয় সম্পদ ;
গুপ্তচর-বিভাগ ছাড়া
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও উৎকর্ষ-অভিধ্যায়িতার জন্য
উপযুক্ত সন্ধানী বিভাগেরও প্রয়োজন,
যা’রা দক্ষ, কর্ম্মপটু, সুসন্ধিৎসু
নিপুণ অভিধ্যায়িতা নিয়ে
ক্ষিপ্র তৎপরতার সহিত
রাষ্ট্রের সম্পদ ও আপদকে
সম্যকভাবে নির্দ্ধারণ ক’রে
চতুর বৈধী-তৎপরতায়
উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণে
আপদকে নিরাকরণ ক’রে
সম্পদকে সুবর্দ্ধিত ক’রে তুলতে পারে,
উক্ত বিভাগে সত্তাপোষণী ধৰ্ম্মানুগ সুনিষ্ঠ একানুধ্যায়ী তাৎপর্য্যবান
পটু, শ্রমপ্রিয়, ধীমান কর্মীর নিয়োগও
একান্ত প্রয়োজন ।
১০। বিচারালয়ে বিচারক
ঐ সশ্রদ্ধ ধৰ্ম্মানুগ
একানুধ্যায়িতা নিয়ে
যেন এমনতর
বিচার ও সুশাসন-তৎপর হ’য়ে ওঠেন,–
যা’তে সব্যষ্টি প্রত্যেকটি গণগুচ্ছই
তাঁ’তে আস্থাসম্পন্ন, তৃপ্ত ও সন্দীপ্ত হ’য়ে
শাসন-সংস্থায় আত্মনিয়োগ করে,
তা’র সৌকর্য্যে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠে—
স্বাভাবিক স্বতঃ-সন্দীপনায় ।
১১। কর্মচারী নিয়োগ-ব্যাপারে
প্রথমেই দেখা উচিত
সসংস্কৃতি তা’র কুল ও বংশ,
দেখতে হবে
মাতৃকুলই হোক বা পিতৃকুলই হোক—
তাতে কোনরকম অশ্রেয় বা অবৈধ
বিক্ষেপ আছে কিনা,
কারণ, তা’ থাকলে,
সে যত বড়ই দক্ষ
ও বোধিবীৰ্য্যবান হোক না কেন,
অবিশ্বস্ত হওয়ার ঝোঁক তা’তে
কিছু-না-কিছু থাকবেই ;
আবার, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধি
যেন একমাত্র বিচার্য্য না হ’য়ে ওঠে,
বিশ্বস্ত, দক্ষ, বীৰ্য্যবান,
কর্ম্মঠ পারদর্শিতাকে ভিত্তি ক’রেই
নির্বাচন-বিচার চালানো যুক্তিসঙ্গত,
তা’র সাথে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের তকমা থাকে—
সে তো ভালই,
তা’ ছাড়া
স্বাস্থ্য, মনোবল, সাহস, বোধিদক্ষতা
অনুবৰ্ত্তিতা, উপস্থিতবুদ্ধি,
সুসঙ্গত ক্ষিপ্র চিন্তাসঙ্গতি,
সুসিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা,
নির্ভুল ও ক্ষিপ্র সম্পাদনী
তৎপরতা ইত্যাদি দেখা
অতীব সমীচীন ;
এগুলি দেখতে হবে,
যে যে-পদের প্রার্থী
তা’র উপযোগিতা-অনুপাতিক—
জৈবী-সঙ্গতিকে ভিত্তি করে।
১২। স্বরাষ্ট্র ও বৈদেশিক দপ্তরকে
এমনতরই সাবুদ ক’রে তুলতে হবে,
যাতে স্বরাষ্ট্র ও বিদেশের
সুসঙ্গত পারস্পরিক অনুচৰ্য্যায়
কোথাও এতটুকু অবিবেকী অসামঞ্জস্য না থাকে,
তা’রা বান্ধবতায় সুনিবন্ধ হয়ে ওঠে—
পারস্পরিকতায়,
রাষ্ট্রসত্তা ও স্বার্থকে অব্যাহত রেখে,
সত্তাপোষণী ধৰ্ম্ম, কৃষ্টি
ও আদর্শানুগ রাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্যকে
অটুট রেখে,
সম্ভ্রমাত্মক অনুবেদনী আনতির সহিত ;
বৈদেশিক বান্ধবতা যেন অচ্ছেদ্য থাকে,
কোনপ্রকার কূটকৌশলই যেন
ঐ বান্ধবতাকে ছিন্ন করতে না পারে,
তাদিগকে এমনতর ক’রে তোল
যাতে তারা তোমার রাষ্ট্রীয় সত্তার সংরক্ষণ
ও তৎপরিপন্থী যা’-কিছুর নিরাকরণে
অপরিহার্য্যভাবে
সক্রিয় স্বতঃ-অনুধ্যায়ী হয়ে ওঠে।
১৩। আবার, ঐ আদর্শকে রূপায়িত ক’রতে
রাষ্ট্রদূতও তেমনতরভাবে
নিয়োগ করো,
রাষ্ট্রসত্তায় স্বার্থবান, সদ্বংশজ, বিদ্বান,
সুসঙ্গত বোধিপরায়ণ,
উপস্থিতবুদ্ধিসম্পন্ন, নীতিজ্ঞ, মিষ্টভাষী,
ধৰ্ম্ম, কৃষ্টি ও আদর্শে অচ্যুত সুনিষ্ঠ,
কৌটিল্য-অভিজ্ঞ, ইঙ্গিতজ্ঞ, মর্ম্মজ্ঞ,—
মোক্তা কথায়
এই জাতীয় জন্ম ও গুণবিশিষ্ট
শ্রেয়ার্থপরায়ণ লোকই কিন্তু
দৌত্যের উপযুক্ত পাত্র,
বিসদৃশ, বিশৃঙ্খল যা’,
আদর্শ, ধৰ্ম্ম ও কৃষ্টি-সমন্বিত
রাষ্ট্রসত্তা ও স্বার্থকে
ব্যাহত করে, খাটো করে,
বা নিন্দা করে যা’,—
সুযুক্তিপূর্ণ তথ্য-সমন্বিত
বাক্য, ব্যবহারের ভিতর-দিয়ে
তাকে নিয়শ্রিত করে
রাষ্ট্রসত্তা ও স্বার্থকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে,—
এমনতর উপস্থিতবুদ্ধি নিয়ন্ত্রিত-ধী-সমন্বিত
কূট-কৃতি পরিচর্য্যাসম্পন্ন ব্যক্তিই
দৌত্য-ব্যাপারে বাঞ্ছনীয় ।
১৪। প্রচার-প্রাচুর্য্য এতই হওয়া উচিত—
যাতে দেশের আদর্শ, দেশের কৃষ্টি,
দেশের বিবর্ত্তনী পদক্ষেপ,
বিদেশের প্রত্যেককেই
মুগ্ধ ও আন্দোলিত ক’রে তোলে—
উন্নয়ন-অনুশীলনী সম্বেগে,—
সবাই শ্রদ্ধাবন্ত হয়ে ওঠে
তোমার দেশের গণ ও ব্যষ্টিতে;
ধৰ্ম্মের মূলসূত্র যা’,
আদর্শ, কৃষ্টি এবং সত্তাপোষণী নীতি যেগুলি—
সে-সবগুলি বিহিতভাবে উদ্ভিন্ন করে
সঞ্চারিত ক’রে, নিয়মন ক’রে
যাতে প্রত্যেকটি ব্যষ্টি
তদ্ভাবান্বিত হয়ে ওঠে
একত্বানুধাবনী তাৎপর্য্যে,
পারস্পরিক বৈশিষ্টপোষণী সশ্রদ্ধ পরিচর্য্যায়,
বাক্যে, ব্যবহারে, চলনে,—
তার বিহিত ব্যবস্থা করা নিতান্তই সমীচীন,
আর, ঐ সমীচীনতার অবহেলা
যতই বেশী হ’য়ে ওঠে,
একানুধ্যায়ী সংহতি-স্বাতন্ত্র্য
পারস্পরিক সহযোগিতা
যোগ্যতা-অভিদীপ্ত বিবৰ্ত্তনী অনুপ্রাণনা
ক্রমশঃই অপলাপের দিকে
চ’লতে থাকে ততই,
তখন সত্তাতান্ত্রিকতার বদলে আসে—
প্রবৃত্তির ব্যভিচারী পরিক্রমা,
দুর্ব্বুদ্ধির উদগ্র লেলিহান সম্বেগ,
যা’ নিজের সত্তাকেই আয়বাদ দিয়ে
পরিশোষণ করে
তারই উপভোগ্য উপকরণ-সংগ্রহে
আগ্রহবিধুর হ’য়ে ওঠে,
এই হচ্ছে শাতনী সঞ্চলন,—
ব্যষ্টি, গণ ও রাষ্ট্রকে
সৰ্ব্বনাশে সমাধিগ্রস্ত করার
আত্মঘাতী আবেগ—
যা’ গণবিদ্রোহের সৃষ্টি ক’রে তোলে ।
১৫। শাসন-সংস্থা নিজে
তা’র প্রতিটি কর্মচারী-সহ
যথাসম্ভব একানুধ্যায়িতার সহিত
পরার্থপরতার সম্বেগ নিয়ে
কৃতি-অধ্যুষিত সন্দীপনায়
যেন রাষ্ট্রের প্রতিটি ব্যষ্টিকে দেখা-শোনা করেন,
তা’ ছাড়া, নিয়মিতভাবে নগর—
বিশেষতঃ পল্লী-পরিদর্শন,
লোকের সুখদুঃখ, অভাব-অভিযোগের তথ্য গ্রহণ,
তন্নিরাকরণী যোগ্যতা-সন্দীপী আলোচনা,
অযথা অবান্তর ব্যয়বাহুল্যের
সঙ্কোচ ও সুনিয়মন,
এবং বিশেষ বিষয়ে বিহিত স্থানে
আপূরণী সাহায্য-দানের
এমনতর ব্যবস্থা যেন করেন
যার ফলে
প্রতিপ্রত্যেকের বোধে
উপস্থাপিত হয় যে,—
শাসন-সংস্থা তা’র প্রতিটি ব্যষ্টি-সহ
তাদের কাছে কতখানি আত্মীয়ভাবাপন্ন;
এটা একটা অপরিহার্য্য করণীয়।
১৬। করধার্য্য এমনি ক’রে করো,—
যাতে মানুষের কর
তোমার শাসন-সংস্থার
সহায় হ’য়ে ওঠে,
সম্বর্দ্ধনার শক্তি হয়ে ওঠে,
তোমার কর যেন
মানুষের করকেই আলিঙ্গন করে,
আবার মানুষের যোগ্যতা
ও আন্তরিক আগ্রহ
কর্ম্মদীপ্ত হয়ে
যেন এমনতর উপচয়ী হ’য়ে ওঠে,—
এবং তোমাদের পালন পরিচর্য্যায়
এমনতরই সম্বুদ্ধ ও সম্বৃদ্ধ হ’য়ে ওঠে—
যা’র ফলে, প্রতিটি গণের
আগ্রহ-উদ্দীপ্ত অবদানে
তোমাদের রাজকোষ
উচ্ছল চলনায় চলতে থাকে,
আর, তা’র ব্যবহারও যেন এমনতর হয়—
যাতে ঐ কোষ অবাধভাবে
উপচয়ী চলনে চলতে পারে
এবং ব্যয়টাই যেন উপচয়ের কারণ হয়ে ওঠে;
রাজকোষ যেখানে অপটু,
গণযোগ্যতাকে সম্বেগে প্রবুদ্ধ করে
উৎপাদন-হারকেই প্রবুদ্ধ করে তোল—
ক্রমচলনের ভিতর-দিয়ে,
আর, রাজকোষকে উচ্ছল করে
তুলতে চেষ্টা কর—
সমবেত সানুকম্পী পরিচর্য্যায় ;
গণসত্তার নিরাপত্তার জন্য
আয়ের একদশমাংশ সংরক্ষিত ক’রে
অন্যায্য-ব্যয়-সঙ্কোচে
ন্যায্য নিয়ন্ত্রণে
গণ-নিরাপত্তাকে অটুট ক’রে তোল,
আর, গণসত্তা-পোষণ ও প্রবর্দ্ধনের জন্য
‘যা’ প্রয়োজন
‘তা’ ঐ নয়-দশমাংশের ভিতর
নিষ্পন্ন করতে চেষ্টা কর;
যতক্ষণ পর্য্যন্ত কোন উৎপাদন
তেমনতর প্রাচুর্য্যে উপস্থিত না হয়—
যা’র ফলে, নিরাপত্তার ব্যয়
ঐ উপচিত ভাণ্ডার থেকেই
সচ্ছল হ’য়ে ওঠে,
ততদিন শ্রমপটুতাকে উপেক্ষা না ক’রে
উৎপাদনকে আরো-আরো
সম্বুদ্ধ করে তুলো;
তাতে তোমার রাষ্ট্রসত্তাও
পরাক্রমশীল হয়ে উঠবে।
১৭। নিজের দেশের দুর্ব্বলতা যেগুলি আছে,
সেগুলির সংস্কারে
জাতিকে সবল করে তুলতে হবে,
অনটনের অপনোদনে
দেশকে প্রাচুর্য্যে উদ্ভিন্ন করে তুলতে হবে,
অপটু যারা তা’দিগকে পটুত্বে
প্রকৃষ্ট করে তুলতে হ’বে,
যারা অপলাপের কোলে অবশায়িত
তাদিগকে উদ্গতিশীল করে তুলতে হবে,
সৎ-কে আরো আরোতে
উদ্দীপ্ত করে তুলতে হবে—
বৈধী বৈশিষ্ট্যপালী বিবৰ্ত্তন-পদক্ষেপী ক’রে সুকেন্দ্রিকতায় সুনিবদ্ধ করে।
১৮। অবিশ্বস্ততা ও কৃতঘ্নতাকে
উপযুক্ত উপায়ে
নিরোধ করবেই কি ক’রবে—
ক্ষিপ্র তৎপরতায়,
যা’র ফলে, মানুষের ঐ প্রবৃত্তি
বৃদ্ধিপর না হ’য়ে
ক্রমশঃই সঙ্কুচিত হয়ে
অপলাপে নিঃশেষ হয়ে ওঠে,
যেখানে দেখবে
অসৎ যা’, বিরোধী যা’
আদর্শ, ধৰ্ম্ম, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি-বিধ্বংসী যা’
নিয়তই ক্রুর ও সাংঘাতিকভাবে
তোমার সংস্থা ও সত্তার
অপঘাতী হয়ে চলেছে,—
সুদৃঢ় প্রস্তুতি নিয়ে
তাকে অনতিবিলম্বেই নিরোধ ক’রতে
একটুকুও ত্রুটি ক’রো না,
বিলম্বে তাকে হয়তো আয়ত্তে আনা
সুকঠিনই হয়ে উঠতে পারে;
সম, দান, ভেদ ও দণ্ডের প্রতি
বিশেষ বিবেচনা
ও অনুধ্যায়ী বিচারণার সহিত
যেখানে যখন যেমনটি প্রয়োজন
সত্তাসম্বর্দ্ধনা ও অসৎ-নিরোধে
সেখানে তেমনতরই
যথাসম্ভব প্রস্বস্তির আবহাওয়া নিয়ে
তা নিষ্পাদন করতে
একটুও অবহেলা করো না;
সাম-দানে যদি সমস্যা সমাধান লাভ করে
তবে ভেদ সৃষ্টি করতে যেও না,
ভেদেই যেখানে তা নিরাকৃত হয়
সেখানে দণ্ড দিতে যেও না;
কিন্তু দণ্ড যেখানে অপরিহার্য্য হয়ে উঠেছে
সেখানে দণ্ডকে ত্যাগ করো না,
আবার, কোথাও প্রয়োজন হ’লে
যুগপৎ চতুঃ-পন্থাই অবলম্বন করতে পার;
ফলকথা, অবৈধ যা’, অসৎ যা’,
অন্যায় যা’,
তা’ যেন ভীত, ত্রস্ত শ্রদ্ধাবনত হ’য়ে থাকে
তোমাদের শাসন-নিয়ন্ত্রণের ফলে।
১৯। সর্ব্বোপরি, তোমাদের শাসন-সংস্থা যেন
বৈশিষ্ট্যপোষণী লোকপালী সংস্থা
ও সুসঙ্গত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের পরিপোষণে
যত্নবান্ হয়,
বৈশিষ্ট্যপালী আপূরয়মাণ বিজ্ঞ-মহানদের প্রতি
বিশেষ সম্ভ্রম ও অনুচর্য্যা নিয়ে চলে,
আর, শাসন-সংস্থার পরিচালকবর্গ যেন
দেশের পূরয়মাণ ধৰ্ম্ম-প্রবক্তা যাঁরা
তঁৎসংশ্রয়ে উপস্থিত হয়ে
সশ্রদ্ধ আগ্রহে
উন্মুখ আপ্রাণতা নিয়ে
আলাপ-আলোচনার ভিতর-দিয়ে
তাঁদের দূরদর্শী উপদেশ ও অনুশাসন-গ্রহণ
ও তৎপ্রবর্ত্তনায় মনোযোগী হন,
এতে শাসন সংস্থা স্বতঃই
অভ্যুদয়ী কল্যাণের পথে চলতে পারবে ।
২০। এইতো গেল সেগুলি—
মোটা কথায় যা আমার ইয়াদে আসে ;
তবে আরো মনে হয়,
শাসন-পরিষদ বা শাসন-সংস্থার বাহিরে
সব সময়ই এমনতর একজন প্রাজ্ঞ বহুদর্শী
ইষ্ট, কৃষ্টি ও ধর্মের অনুচর্য্যাপরায়ণ
বৈশিষ্ট্যপালী আপূরয়মাণ
কেউ যদি থাকেন,
যিনি ঐ শাসন-সংস্থার
সমস্ত নিয়মন ও পরিচালনে
নিয়ত লক্ষ্য রেখে
বাষ্টিগত ও সমষ্টিগতভাবে
লোকের অভিধ্যায়ী প্রয়োজনগুলিকে
অবলোকন করে থাকেন—
সম্যক্ তাৎপর্যে অভিগমনশীল হ’য়ে
সুসঙ্গত সূত্রকে অনুভব করে—
শ্রদ্ধাবনত অন্তঃকরণে
আগ্রহদীপনার সহিত
বোধায়নী পরিচর্য্যায়
পরিপ্রশ্ন ও সেবার দ্বারা
আলোচনায়
সমস্ত ব্যাপারগলিকে অনুধাবন করে
যখন যে-ব্যাপারে যেমন প্রয়োজন
তাঁর মত
ও কুশলকৌশলী নিয়মনের মন্ত্রণা নিয়ে—
তা’ পূৰ্ত্তনীতি সম্বন্ধেই হো’ক
আর, কৌটিল্য-সম্বন্ধীয়ই হো’ক,
নিজদিগকে তদনুপাতিক
সংস্থ ক’রে চ’লতে পারলে
শাসন-সংস্থা
আরও সুষ্ঠু, সুকেন্দ্রিক
ও সুন্দর হয়ে উঠতে পারে
অচ্যুত আদর্শাভিগমনে ;
কারণ, যা’রা দাবা খেলে,—
নিজেদের দুরাগ্রহ ঔৎসুক্য-বশতঃ
তাদের বোধদর্শিতা
অনেকখানি অবসন্ন হ’য়ে ওঠে,
ঐ কুশলকৌশলী তাৎপর্য্য-পরায়ণ
বোধিসম্পন্ন পৃষ্ঠপোষকের ইঙ্গিত
তখন সাফল্যের দিকেই নিয়ে যায়,
আমার বৃদ্ধি ও বিবেচনা-মাফিক
শাসন-সংস্থার বাহিরে
এমনতর একজন
মানুষের প্রয়োজন অপরিহার্য্য—
যদিও সব ক্ষেত্রে, সব সময়ে
এমনতর লোক পাওয়া দুষ্কর;
আর, এমনতর লোক থাকুন আর নাই থাকুন—
শাসন-সংস্থার বাইরে
সব সময়
এমন শক্তিশালী নাগরিক সংস্থার প্রয়োজন,
যে-সংস্থা
নাগরিকদের ভিতর থেকে
ইষ্ট, কৃষ্টি ও ধৰ্ম্ম-অনুশাসন-সম্বুদ্ধ
শ্রেয়-কুল-সম্ভূত
আদর্শপ্রাণ সৰ্ব্বসঙ্গত বোধসম্ভারসম্পন্ন
বেদ-বিজ্ঞানবিৎ,
কৰ্ম্মপ্রাজ্ঞ,
বৈশিষ্ট্যপালী-আপূরয়মাণ-শ্রেয়নিষ্ঠ
সভ্য দ্বারা সুসংহিত হবে,
সুনিবদ্ধ হ’য়ে রইবে,—
যা’রা ধর্ম্মানুগ অস্তিবৃদ্ধির নিয়মনে
গণজীবনকে
যেমনতরভাবে নিয়ন্ত্রিত করা উচিত
তা’ তো করবেনই,
আরো, শাসন-সংস্থার
যে-কোন বিধি প্রণয়ন করতে হলে
তাঁদের অনুমতি ছাড়া
তা ঐ বিধান-সভায়
উত্থাপিত হতে পারবে না;
পরিস্থিতি, দেশকালপাত্র ও প্রয়োজন-অনুপাতিক এমনতর ব্যবস্থা যদি না হয়,
পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রবর্তিত এই পবিত্র ধ্বনির মাধ্যমে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীস্টানাদি সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অবতার পুরুষদের বন্দনা করা হয়।
প্রায় শতবর্ষ অতিক্রান্ত। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র শিক্ষাক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন শ্বাপদ-সঙ্কুল এক গন্ডগ্রাম হিমাইতপুরে, তপোবন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা মাধ্যমে।
একজন ছাত্র ও একজন শিক্ষক নিয়ে অস্থায়ী এক কুটিরে সূচনা হয় তপোবন বিদ্যালয়ের। দেখতে দেখতে বাংলাসহ বিহার, আসাম, ব্রহ্মদেশ থেকে শিক্ষার্থী সমবেত হতে লাগল। ইংরেজ সরকারের নির্ধারিত পাঠ্যক্রম অনুশীলনের পাশাপাশি অধ্যাপক ও ছাত্ররা দিনরাত ইঁট টেনে, লোহা টেনে, কাঠ কেটে, মিস্ত্রীর কাজে যোগান দিয়ে, কঠোর পরিশ্রম করে গড়ে তোলে বিদ্যালয় গৃহ ও ছাত্রাবাস। বাংলা ও ইংরেজীর অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন বারো-তেরো বছরের ছেলেদের সাধারণ জ্ঞানের উপর ভিত্তি করেই ভর্ত্তি করে নেওয়া হত ম্যাট্রিক পরীক্ষার তিন বছরের পাঠ্যক্রমে । অঙ্ক, বিজ্ঞান, সাহিত্য এবং সিলেবাসভিত্তিক পড়াশোনার সাথে সাথে আশ্রমের ঘরদোর পরিস্কার, বাসনমাজা, কাপড়কাচা, তরিতরকারির বাগান করা, উৎপন্ন ফসল হাটে বিক্রি করা, কুটির শিল্পে বিভিন্ন কাজ শেখা, ছোটখাট অসুখ-বিসুখ সারিয়ে তোলার টোটকা চিকিত্সা-বিদ্যা শেখা, নানাবিধ খেলাধুলা, সাঁতার শেখা, কুস্তি লড়া, নিয়মিত নামধ্যান, প্রার্থনা ইত্যাদিও শেখান হত বিদ্যার্থীদের। প্রতিটি ছাত্রই কৃতিত্বের সাথে পাশ করে সাবলম্বী হত। পরিবার, পরিজনদের বোঝা না হয়ে তাদের বোঝা অক্লেশে বহন করতে পারত।
তখন গ্রাম বাংলায় নারী শিক্ষার তেমন একটা চল ছিল না। ঠাকুর, আশ্রমে সমাগত সব বয়সের নিরক্ষরা, স্বাক্ষরা মায়েদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন। তারা সংসারের সবকিছু সামলে খেয়ে, না খেয়ে, ঠাকুরের বিশেষ তত্ত্বাবধানে উক্ত তিনবছরের (দশ বছরের সিলেবাসকে তিন বছরে সংক্ষিপ্ত করছিলেন ঠাকুর।) পাঠ্যক্রমে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। ভুষণদা, রত্নেশ্বরদা, ঈষদাদা, পঞ্চাননদা প্রমুখ কৃতিমান প্রাতঃ-স্মরণীয় শিক্ষকদের প্রচেষ্টায় প্রথাগত লেখাপড়া শিক্ষার সাথে সাথে ইষ্টগুরু নিযুক্ত বিভাগীয় শিক্ষাগুরুদের সাহচর্য্যে উক্ত মায়েরা রাত জেগে ইঁট কাটা, পাওয়ার হাউসের জন্য পদ্মা থেকে জল আনা থেকে শুরু করে বাগিচা পরিচর্যা, খাদ্যবিজ্ঞান, পুষ্টিবিজ্ঞান, টোটকা চিকিত্সা, সুপ্রজনন বিজ্ঞান, ধাত্রী বিদ্যা, সংগীত, নৃত্য, অভিনয়, আত্মরক্ষার কৌশল, ইত্যাদিও শিখতেন,– যা’ বর্তমানের প্রগতি-নারীবাদীরা যদি আয়ত্ব করতে পারেন, নিজ নিজ প্রকৃতির বৈশিষ্ট্যকে উচ্ছল করে প্রকৃত অর্থে ‘প্রগতি’ শব্দের প্রকৃষ্ট গতিকে আবাহন করতে পারবেন। গড়ে তুলতে পারবেন নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। পরমশিক্ষক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র এক দেবজাতি গঠনের নিমিত্ত পরা-অপরা বিদ্যার সব রসদ রেখে গেছেন। উক্ত গৌরবময় দিনগুলি ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্র মন্দিরগুলোতে যুগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটা করে তপোবন বিদ্যালয় গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ বিষয়ে শ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদ শোভনলাল মুখোপাধ্যায় একটা পাঠ্যক্রমের রূপরেখা তৈরি করেছেন। সেটা পাঠ করে অন্তরাসীজন তাঁদের মূল্যবান পরামর্শ দিয়ে বাধিত করবেন। জয়গুরু ও প্রণাম।
———-
Biology Syllabus of Class V & VI Condenced course (Tapovan)
উদ্ভিদ জগৎ : কান্ড, পাতা, ফুল, ফল, বীজ
কান্ড—কাণ্ডের কার্য, প্রকারভেদ প্রকৃতি অনুসারে এবং বিশেষ কার্য অনুযায়ী।
পাতা—পাতার কার্য, প্রকারভেদ গঠন অনুযায়ী, শিরা বিন্যাস অনুযায়ী পাতা পরিবর্তিত হয়ে জল সঞ্চয় করে আবার কীটপতঙ্গ শিকার করে।
মূল—মূলের কার্য, মূলের প্রকারভেদ, মূলের পরিবর্তন, স্থানিক, অস্থানিক, পত্রাশ্রয়ী মূল (পাথরকুচি ) মূলের বৈশিষ্ট্য মূল ও কাণ্ডের পার্থক্য।
ফুল—ফুলের অংশ সমূহ ও কাজ। ফুল একটি রূপান্তরিত বিটপ। জবা, ধুতুরা, মটর, বক, রজনীগন্ধ্যা ও কুমড়োফুল। বিভিন্ন বীজের গঠন বৈশিষ্ট্য ও চিত্র ছবি সহযোগে।
ফলের শ্রেণীবিন্যাস—ফলের প্রস্থচ্ছেদ কেটে দেখা। আম, তাল, পেঁপে, শশা, আপেল, বেগুন, কাঁঠাল, ডুমুর ও বেল এবং গুচ্ছিত ফল। একবীজপত্রী, দ্বিবীজপত্রী, ব্যক্তবিজী, গুপ্তবীজী। জলজ উদ্ভিদ- ভাসমান এবং নিম্নস্থ ।
কয়েকটি উদ্ভিদ সম্পর্কে আলোচনা—ধান, গম, ভুট্টা, তিল, আলু, করলা, উচ্ছে, নিম, বাসক, তুলসী,, কালমেঘ, খেজুর, তাল, নারকেল, আঙ্গুর, কামরাঙ্গা, হরিতকি, আমলকি, বেল, সর্ষে, রেপসিড, সূর্যমুখী, পাতিলেবু প্রভৃতি। ব্রততী ও তার আকর্ষ, ক্যাকটাস, অর্কিড, সুবর্ণলতা এবং থানকুনি ও তার উপকারিতা।
কয়েকটি প্রাণী তাদের ফাইলাম বা পর্ব অনুযায়ী ভাগ করেতিনটিবা চারটি উদাহরণ সহযোগে চিত্র বা ভিডিওবা প্রত্যক্ষ দেখানোর ব্যবস্থা করা।
টিনেফোরা , আর্থপোডা, মোলাস্কা , কর্ডটা, আকাইনোকর্ডাটা প্রভৃতি গুলিকে উদাহরণ ও ছবি সহযোগে বোঝাতে হবে I
ব্যাকটেরিয়া ভাইরাসের গঠন প্রকৃতি বৈশিষ্ট্য, ক্ষতিকারক ক্ষমতা, উপকারী ও অপকারী ভূমিকা, ব্যাক্টেরিওফাজ এর গঠন ও কাজ, বিশেষ বিশেষ রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের নাম ও তার প্রতিকার।
কয়েকটি বিশেষ প্রাণীদেরগঠন ও বৈশিষ্ট্য পায়রা, গিনিপিগ, ব্যাঙ, মাছ, শামুক, সাপ, কুমির, বাঘ , ভাল্লুক, মাংকি, মশা, আরশোলা, রেশম কীট। বিজ্ঞানসম্মত নাম
কলা ও কলাতন্ত্র—প্রাণী কলা, উদ্ভিদ কলা, জাইলেম, ফ্লোয়েম, ভাজক কলা, স্থায়ী কলা, নিবেদিত কলা এদের বৈশিষ্ট্য গঠন এবং কাজ ভাল করে বোঝাতে হবে। প্রাণীদের দেহ গঠনে অংশ গ্রহণকারী কলা যেমন আবরণী কলা যোগ কলা পেশীকলা স্নায়ুকলা প্রভৃতির ইংরেজি নাম সহ ছবি সহযোগে শেখাতে হবে।
পেশীও পেশী তন্ত্র—গুরুত্বপূর্ণ পেশী ও তার গঠন কমপক্ষে ২০ টি নাম ছবি অবস্থান ও কাজ সরেখ, অরেখ ঐচ্ছিক অনৈচ্ছিক এবং হৃৎপেশী ( With video and picture )
অস্থি—গুরুত্বপূর্ণ অস্থিসমূহ ও তাদের কাজ I হাড় চিড় খেলে কি করা উচিত, কোথায় লোহিত রক্ত কণিকা উৎপন্ন হয়, গুরুত্বপূর্ণ প্রধান প্রধান অস্থির অবস্থান ও কাজ মডেল এবং ছবি দিয়ে শেখাতে হবে।
খাদ্য—শর্করা প্রোটিন ফ্যাট –ভিটামিন ( ভিটামিনের উৎস এবং অভাব জনিত রোগ সমূহ) এনজাইম এদের বিভাগ সমূহ চার্ট এর মাধ্যমে ছবির মাধ্যমে দৈনন্দিন জীবনে যে গুলিকে দেখতে পাই ভালো ভাবে শেখাতে হবে। ঠাকুরের খাদ্য বিষয়ক চিন্তা ভাবনা গুলিকে এই চ্যাপ্টারের মাধ্যমে ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে কিভাবে খাদ্যের পুষ্টিমূল্য অধিক পরিমানে পেতে পারি তার প্লানিং করতে হবে। এক-শর্করা (Mono saccharide) দ্বিশর্করা গ্লুকোজ ফ্রুকটোজ ল্যাকটোজ গ্লাটজে মল্টোজ নিয়ে আলোচনা করা হবে। অত্যাবশ্যকীয় এমাইনো অ্যাসিড যেগুলি আমাদের শরীর তারই করতে পারেনা বলে জানা আছে সেগুলির নাম ভালভাবে মুখস্ত করIতে হবে I বিভিন্ন ধরণের ফ্যাট ও তার বিশ্লেষণ করে দেখাতে পারলে ভালো হয় I প্রাণীজ ফ্যাট উদ্ভিজ্জ ফার ও তেল কোন গুলি সেগুলি র ব্যবহার শেখাতে হবে I কোলেস্টেরোল ডিপোজিট কেন হয় ছবি সহযোগে আলোচনা করতে হবে।
বিভিন্ন তন্ত্র (System)ে—বিভিন্ন তন্ত্র সম্বন্ধে ধারণা তৈরি করার জন্য চিত্র, এনিমেশন, ভিডিও ক্লিপিং এর সাহায্যে পৌষ্টিক তন্ত্র, শ্বসন তন্ত্র, রেচন তন্ত্র, সংবহন তন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র এবং বিশেষ কয়েকটি অঙ্গ সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে হবে। এগুলির ড্রইং প্রাকটিস করাতে হবে।
হৃৎপিন্ড এর গঠন কার্যপ্রণালীবা কার্য কৌশল—সিস্টোল ডায়াস্টোল, পালস রেট, কি সেটা বোঝাতে হবে। মুক্ত সংবহন ও বদ্ধ সংবহন কি এটা কাদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায় তা দেখাতে হবে।
Biology Syllabus of class IX For (Tapovon Vidyalaya)
Photosynthesis (সালোকসংশ্লেষ) -Concept of Photosynthesis-place or region of photosynthesis-Components of photosynthesi(Water,carbon di oxide and chlorophil)colourful particle- active part of spectrum in photosynthesis.Mechanism of Photosynthesis-Ligh dependent and independent phase-Significane of photosynthesis- Steps of Photosynthsis with charts Traping of solar energy in Food.
Respiration and Respiratory organ—site of respiratory organ in plants (Stomata, lenticels and Pneumetafore) with picture (help of projector) Respiratory organs of some animals ( Fish, Coackroach and Man). Breathing of human lungs of man (with help of picture and model) Aerobic and Anaerobic respiration of animals. Fermentation and its economic importance. Steps of Respiration with charts. Significance of Respiration.
Excreation (রেচন)- Conception of excreation-Excreation procedure of some plants – Importancy of plant excreation and its economic value.-Excreation of Animals-Excreatory organs of animals and its product –Disadvantage of excreatory particles in human body. Kidney and its supporting organs in human body- Structure of Nefron with picture Role of Nefron in producing excreation- Precaution of Thakur Anukul Chandra at the time of urine emission – all the saying in this matter must be included.
Movement & Walking (চলন ও গমন) – various Tactics of animals at the time of moving ( From Microbes to Man)-Different procedure of Moving of Plants and its organ – Objectives of moving – Helpful muscle of man during moving or walking . Organ which is helpful to movement of various plant and animals with picture ( Tactic , Tropic and Nastic, Geotropic Movement with practical demonstration).
Conception of Immunity (অনাক্রম্যতা) –Antigen, antibody and immune response. Vaccination and its importance in man. Disease making Microbes and its property, activity and remedy.
Some important Cycle Carbon Cycle, Nitrogen Cycle, Oxygen cycle with chart
Ecosystem-Elements of Ecosystem. Food chain and network of food in ecosystem
Importance of conservation- Water conservation- Forest conservation and Wild animal conservation and its importane. Some dimished of about to dimished animals.
Definition of Environment – Barimondol watercycle Air cycle. Pollution of air water, sound and soil.
Syllabus of Class X (for Tapovon Vidyalaya)
স্নায়ুতন্ত্র -সংজ্ঞা স্নায়ুতন্ত্রের কাজ , স্নায়বিক পথ ,স্নায়ুকোষ নিউরোগ্লিয়া এবং নিউরোনের বিভিন্ন অংশ , নিউরোনের প্রকারভেদ Sensory neurone and motor neurone coordination of Motor and sensory neurone – Opinion of Thakur in this regard ( Hard woking practice of student is helpful). Adjustor neurone – synapse (প্রান্তসন্নিকর্ষ)-brain and spinal chord –different part of brains ( with the help of Brain Model and picture)-cerbral cortex, Thalamus hypothalamus –Brain Pons- cerebellum Dedula oblongata C.S.F. –Reflex Action Reflex Arc –Inborn reflex –acquired reflex- Eye , Tongue, Nose , Ear and skin and their related cells. (Model and picture must be used)
হরমোন – সংজ্ঞা হরমোন ও উৎসেচকের সঙ্গে পার্থক্য। Characteristic of plant hormone –Types of plant hormone –Cytokinin , Gibbarelin, Auxin withe their chemical formula functions. Synthetic/artificial hormone- role an application in Agriculture by man. Characteristics of animal hormone. Human endocrine gland and its function-source –target tissue – lackness of hormone and its disease.
বংশগতি সংজ্ঞা প্রকরণ (Variation) মিউটেশন আলীল বংশগতির একক লোকাস Monohybrid and dihybrid Cross– Homozygous and Hetarozygus অপত্য জনু প্রকট ও প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্য ফেনোটাইপ জেনোটাইপ ইমাস্কুলাশন Reasons behind Mendel’s success -মেন্ডেলের পরীক্ষা ও মেন্ডেলের বংশগতির সূত্ত্র দ্বিশঙ্কর(Doouble cross) জনন পরীক্ষার ছক সহ চেকার বোর্ড। Sex determination process in man কয়েকটি জীন গত রোগ , থ্যালাসেমিয়া , হিমোফিলিয়া , বর্ণান্ধতা। লাল সবুজ এবং নীল বর্ণান্ধতা I
জননও বৃদ্ধি concept of reproduction – mode of reproduction –Plasmodium, Yeast hydra , spirogyra , planeria – artificial Vegitative propogation Pollination Agent of cross pollination Fertilization and development of a new plant .( Flow chart & picture is needed) conception of growth and development .Example of plants and animals like butterfly mosquito and frog etc.
অভিযোজন এবং অভিব্যক্তি- some example of Adaptation 1)Morphological 2)Physiological 3)Behaviouial.
Theory of Lamerk- Theory of Charls Darwin and its explanation –Evidence for the theory of evolution- comparative anatomy –example of Horse and (other animals if possible) Homologues and analogues organs. নিষ্ক্রিয় অঙ্গ I
জীব বৈচিত্র্য ও সংরক্ষণ Diversity in producing food.-drug and medicine maintenance of ecological balance –climate control -economic importance – influence on art and literature-Food chain. Biodiversity hot spot and loss of biodiversity-our role Conservation conception and implementation.
পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্য- different type ( Air, Water, Soil and sound) of pollution and its
effect on human body.
প্রসঙ্গঃ তপোবন বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম
R.S.
Mathematics Syllabus of Class V-VI For Tapovon Vidyalaya
It must be shaped for Condensed form with help of various teaching method
1. দেখার মধ্য দিয়ে শেখা ( ঘড়ি দেখা , ঘনবস্তু দেখা ইত্যাদি )
2. গ্রামের জনসংখ্যা তুলনা ও গণনা করা I
3. দেশলাই কাঠি দিয়ে খেলার মধ্য দিয়ে যোগ বিয়োগ সমান চিহ্ন বা বর্গমূল শেখানো I
4. চৌবাচ্চার জল নিয়ে খেলা করতে করতে বিয়োগ বা ভাগ শেখানো I
5. ভাগ শেখা – লজেন্স ভাগ করা মিষ্টি ভাগ করা – গোটা বা অখন্ড জিনিসকে ভাগ করা -রং করার মধ্য দিয়ে ভাগ শেখানো -পাউরুটি বিস্কুট বা কেক ভাগ করতে শেখানো I
6. মেট্রিক পদ্ধতি (এটি প্রাচীন কালে আমাদের দেশে প্রচলিত ছিল এর জন্য আমরা ফ্রান্স এর কাছে ঋণী নই এটা বোঝানো)I
7. শতকরা I Percentage
8. একশত পর্যন্ত রোমান সংখ্যা সমস্ত সংখ্যা কে রোমান দিয়ে প্রকাশ করার অসুবিধা I
9. ঘনবস্তুর জ্যামিতিক ধারণা I
10. গসাগু ও ল সা গু I
11 রেখা রশ্মি বিন্দু ও চলরাশি সম্পর্কে ধারণা I
12. সাত বা আটটি সংখ্যার ধারণা – ভগ্নাংশের গুন্ ভাগ I
13. ক্ষেত্রফল , পরিসীমা সম্পর্কে ধারণা I
14. জ্যামিতিক বক্স দিয়ে ড্রইং I
15. বর্গমূল I
16. সময়ের পরিমান I
17. বৃত্ত
18. অনুপাত ধারণা I
19. প্রতিসাম্য I
20. ঘনবস্তুকে বিভিন্ন ভাবে দেখা I
21. নিয়ন্ত্রিত সংখ্যা ও সংখ্যা রেখা I
22. তথ্য সাজানো ও বিচার I
R.S.
Mathematics Syllabus Class VII-VIII
For Tapovon Vidyalaya condensed Form
1.পূর্ণ সংখ্যার যোগ বিয়োগ ও গুন্ ভাগ ।
2.মূলদ সংখ্যার ধারণা আসন্ন মান বীজ গাণিতিক রাশি মালার যোগ বিয়োগ গুন্ ভাগ।
3.ভগ্নাংশের বর্গমূল। 24. সমান্তরাল সরলরেখা অঙ্কন।
4.ঘনফল নির্ণয়। 25. প্রদত্ত সরলরেখাকে সমান পাঁচটি বা তিনটি ভাগে বিভক্তকরন।
5.সময় – দূরত্ত্ব 26. সর্বসমতার ধারণা।
6.সময় ও 27. আয়তক্ষেত্রের বা বর্গক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল।
7.ত্রৈরাশিক পদ্ধতি। 28. জ্যামিতিক প্রমান
8.শতকরা পদ্ধতি। 29. সমীকরণ গঠন ও সমাধান।
9.অনুপাত ও সমানুপাত ব্যস্তনুপাত। 30 চতুর্ভূজ অঙ্কন।
Mathematics Syllabus of Class IX- Xfor Tapovon Bidyalaya Page-1
বাস্তব সংখ্যা (P&B) স্বাভাবিক সংখ্যা অখন্ড সংখ্যা পূর্ণ সংখ্যা ,মূলদ সংখ্যা , অমূলদ সংখ্যা , বাস্তব সংখ্যা ও বীজগাণিতিক সংখ্যার ধারণা ,বাস্তব সংখ্যার দশমিকে প্রকাশ বাস্তব সংখ্যাকে সংখ্যা রেখায় স্থাপন ,বাস্তব সংখ্যার স্বতঃসিদ্ধ গুলির ধারণা এবং ব্যবহার এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান।
সূচক (P&B)- সূচক সম্বন্ধে ধারণা, সূচকের সূত্রাবলি n তম মূল -লগারিদম Scientific standard of a number নিধIন (ধনাত্মক ) সূচক ও মূল ঘাতের ধারণ। পূর্ণ সংখ্যা ভগ্নাংশ সূচকের ধারণা , সূচকের মৌলিক নিয়মাবলী ও তার প্রয়োগ।
রৈখিকসহসমীকরণ (P,T&B)- দুই চল বিশিষ্ট রৈখিক সহ সমীকরণের সমাধান ( অপনয়ন,তুলনামূলক , পরিবর্ত ও বজ্রগুনন পদ্ধতি ) রৈখিক সহসমীকরণের সাহায্যে বাস্তব সমস্যা সমাধান।
লগারিদম (P&B) Characteristic of common Log সাধারণ লগের অংশক(mantisa) প্ৰয়োজনীয়তা -সংজ্ঞা সাধারণ লগারিদম ও স্বাভাবিক লগারিদমের ধারণা, লগারিদমের ধর্মাবলী সাধারণসা লগারিদমের প্রয়োগ।
দ্বিঘাত করণী (P) করণীর শ্রেণীবিভাগ -সরল যৌগিক পূর্ণ করণী , মিশ্র সদৃশ এবং অনুবন্ধ করণী, হরের করণী নিরসন এবং করণীর ধর্ম।
অনুপাতও সমানুপাত ব্যস্ত অনুপাত , মিশ্র অনুপাত, দ্বৈত অনুপাত ( Duplicate Ratio,Tiplicate Ratio, Sub duplicate ratio, sub triplicate ratio. Differrent Types of operation একান্তর প্রক্রিয়া (Alternedo) ব্যস্ত প্রক্রিয়া (invertendo) , যোগভাগ প্রক্রিয়া Compendo-Dividendo) ও সংযোজন (addition)
সেট ফাংশন (Bang) Tabular method and Builder method- Finite Infinite and nul sets-set of sets সেট সমূহের সেট Subset, Superset, difference of Two sets, complement of set,union of two set,Intersection of set,symmetric difference of two sets , Venn diagram.
ভেদ (P)- চলরাশি ও ধ্রুবরাশি , সরলভেদ ও যৌগিক ভেদ , ব্যস্তভেদ যৌগিক ভেদের উপপাদ্য
বীজগণিতীয় ভগ্নাংশও সূত্রাবলি সমতুল ভগ্নাংশ সাধারণ হর বিশিষ্ট ভগ্নাংশ বীজগণিতীয় ভগ্নাংশএর যোগ বিয়োগ ও সরলীকরণ।
R.S.
Mathematics Syllabus of Class IX- Xfor Tapovon Bidyalaya Page 2
লাভ ও ক্ষতি (P &T) ক্রয়মূল্য বিক্রয়মূল্য লাভ ক্ষতি ধার্যমূল্য ক্রয়মূল্যের উপর শতকরা লাভ বা ক্ষতি , বিক্রয়মূল্যের উপর শতকরা লাভ বা ক্ষতি , ছাড় সমতুল্য ছাড় সম্পর্কে ধারণা এবং প্রয়োগ ।
বৃত্ত (P,T& B) Introduction of Circles and related terms –angle subtended by a chord at a point –Perpendicular form the centre of a chord –Circle through three points –Equal chords and their distance from the centre. Angle subtended an arc of a circle , perimeter and area of a circle
ত্রিভুজ (P,T&B) Triangle (Tribhuj) Introduction – Criteria for congruence of triangles –some properties of triangle-Inequality of triangle-Heron’s formula about Area – This is called Bhramagupta formula.
লম্ব বৃত্তাকার চোঙ (P) Right circular cylinderভূমি বক্রতল উচ্চতা সমগ্রতলের ক্ষেত্রফল – পার্শ্ব তলের ক্ষেত্রফল ঘনফল বা আয়তন I
ইউ ক্লিড জ্যামিতি (T) a) Introduction b) Euclid’s Definitions c)Axioms & Postulates
পীথাগোরাস (P & B) পীথাগোরাস পীথাগোরাসের উপপাদ্য এবং এর প্রমান পীথাগোরাসের বিপরীত উপপাদ্য * শতপথ ব্রাহ্মণ প্রাচীন হিন্দু প্রায় একশ বৎসরপূর্বে লেখা বই য়ের শুলভসূত্রে প্রায় অনুরূপ প্রমান আছে।
কোনও রেখা( B & T) ছেদক জোড়া সমান্তরাল সরলরেখা বক্র রেখা বিভিন্ন ধরণের কোন একান্তর অনুরূপ বিপ্রতীপ বৃত্তস্থ কোন পরিধিস্থ কোন সূক্ষকোণ স্থূল কোন প্রবৃদ্ধ কোন ইত্যাদি
গোলক (P) গোলকের আয়তন বা ঘনফল -বক্রতলের ক্ষেত্রফল অর্ধ গোলকের আয়তন ও সমগ্রতলের ক্ষেত্রফল। গোলককে জলে ডুবিয়ে গোলকের আয়তন বার করা।
ত্রিকোণমিতি ও ব্যবহার ( P, T, B) কোন সম্পর্কে ধারণা -ধনাত্মক ও ঋণাত্মক কোন -ষষ্ঠিক ও বৃত্তিও পদ্ধতির দ্বারা কোণের পরিমাপ 300,450,600 & 900 এর মান সকল ও related সুত্রাবলী – problem on Hight and distance I
ঘনবস্তু তল এবং ঘনফল (P, T) surface area of a combination of solid – Volumes of a combination of solid. Conversation of solid from one shape to another(সমকোণী চৌপল শঙ্কু, প্রিসম) cylinder .
Mathematics syllabus of Class IX & X (for Tapovon vidyalaya) Page -3
বৃত্তস্থ চতুর্ভূজ বৃত্তস্থ চতুর্ভুজের কোন গুলি পরস্পর সম্পূরক ব্যাস ছাড়া অন্য কোন জ্যা এর বৃটের উপর ছেদবিন্দু গুলি যোগ করলে যেটি পাওয়া যায় তা একটি ট্রাপিজিয়াম বৃত্তস্থ সামন্তরিক অবশ্য ই আয়তক্ষেত্র। কোন বৃত্তস্থ চতুর্ভুজের একটি বহু বর্ধিত করলে এবং ওপর কোণের সমদ্বিখণ্ডক বৃত্তের উপর মিলিত হবে I
স্পর্শক বৃত্তের তির্যক স্পর্শক ও সাধারণ স্পর্শক স্পর্শক সংক্রান্ত উপপাদ্য কোন বৃত্তের বহিঃস্থ বিন্দু থেকে কেবলমাত্র দুটি স্পর্শক টানা যায়।
সম্পাদ্য Consturction related to equal area , construction of circumcircle(পরিবৃত্ত অন্তর্বৃত্ত অঙ্কন) and in circle division of line segment Scope of construction –step of construction
শঙ্কু (P) Right circular cone ভূমি -পার্শ্ব তল শীর্ষ -উচ্চতা-ঘনফল পার্শ্ব তলের ক্ষেত্রফল সমগ্রতলের ক্ষেত্রফল সংক্ষিপ্ত ও দীর্ঘ উত্তর ভিত্তিক সমাধান ।
রাশি বিজ্ঞান (P & T) Tally mark- Introduction –cllection of Data permukation of Data and graphically representation –measure of Control –Tendency- Mean Mode Median and group data and barograph –frequency volume palygen.
স্থানাঙ্ক জ্যামিতি (P & T) সরলরেখা বৃত্ত অধিবৃত্তের সমীকরণ -সরল রেখাংশের অন্তবিভক্ত ও বহির্বিভক্ত( internal and External division of straight line) -তিনটি প্রদত্ত বিন্দুর সংযোগে উৎপন্ন ত্রিভুজাকার ক্ষেত্রে র ক্ষেত্রফল -চতর্ভুজের ক্ষেত্রফল – তিনটি প্রদত্ত বিন্দুর সমরেখ হওয়ার শর্ত।
লেখচিত্র (P) সমকোণী কার্টেজিও তল ও স্থানাঙ্কের ধারণা -বিন্দুর স্থানাঙ্কের ধারণা ও কার্টেজিও তোলে একটি বিন্দু স্থাপনের ধারণা -একচল ও দ্বিচল (x,y) বিশিষ্ট একঘাতের সমীকরণের ধারণা এবং তাদের লেখচিত্র অঙ্কন -লেখচিত্রের মাধ্যমে ৰৈখিক সমীকরণের সমাধান -অসংখ্য সমাধান ও সমাধান সম্ভব নয় এই ধারণা Iসামন্তিরিকের ধর্মাবলী চতুর্ভূজ , ট্রাপিজিয়াম ,সামন্তরিক , আয়তক্ষেত্র বর্গক্ষেত্র ও রম্বসের ধারণা -যে কোনো সামান্তরিকের বিপরীত বাহূ গুলির দৈর্ঘ্ সমান , বিপরীত কোণদ্বয়ের পরিমান সমান , প্রতিটি কর্ন সামন্তরিককে দুটি সর্বসম ত্রিভুজে বিভক্ত করে প্রমান । Types of Quadrilateral / parallegram- the Midpoint Theorem .
সরল ও জটিলসুদ কষা (P) মূলধন সবৃদ্ধিমুল সুদের হার , সময় এবং এর সূত্র i= (P.R.T)/100 Compund Interest and its formula.
উৎপাদকে বিশ্লেষণ (P) মধ্যপদ বিশ্লেষণ শূন্য পদ্ধতি, (Type a2-b2, a3+b3, a3-b3, a3+b3+c3 +3abc) ভগ্নাংশ টাইপের অংক গুলিও করতে হবে i
অসমীকরণও অসমীকরণের লেখচিত্র
Partnership Business and Mixture
।। প্রসঙ্গঃ তপোবন বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম ।।
R.S.
একটি subject এর সঙ্গে ওপর subject এর কিসম্পর্কএবংতার সঙ্গেজীবনের সঙ্গে তার কি সম্পর্ক
লোহা Iron (Fe)
লৌহযুগ কখন থেকে শুরু -লোহার ব্যবহার লোহার বিভিন্ন উপাদান – ঋগ্বেদে লোহার উল্লেখ আছে কিনা
তক্ষশীলার রাজা অম্ভি আলেকজান্ডার কে উর্জ লোহা উপঢৌকন দিয়েছিল – দিল্লীর কুতুবমিনারের নিকটবর্তী স্থানে অবস্থিত গুপ্তযুগের লৌহ স্তম্ভ আজ ও অক্ষত আছে বিশ্বের কাছে এটি এক বিস্ময় Iইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্ক History related
প্রাচীন ভারতে কোথায় কোথায় লোহা পাওয়া যেত বলে জানা গেছে -বর্তমানে ভারতে ভারতে কোথায় কোথায় এটি পাওয়া যায় – লৌহ উৎপাদনে ভারতের স্থান – পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য লৌহখনি অঞ্চল I ভূগোলেরসঙ্গে সম্পর্ক Geography Related
লোহার বিভিন্ন খনিজ পদার্থ সমূহ -লোহার সঙ্গে জল ও এসিড ক্ষারের বিক্রিয়া -লোহার মরিচ ধরা – মরিচের জন্য অর্থনৈতিক ক্ষতি – লোহার মরিচা প্রতিরোধ কৌশল – কয়েকটি লৌহ ঘটিত যৌগ লোহার সঙ্গে অন্য পদার্থের মিশ্রনে স্টিল তৈরি কৌশল রসায়নের সঙ্গে সম্পর্ক Chemistry Related
লোহার ঘনত্ব , গলনাঙ্ক , তাপ্ ও তড়িৎ পরিবাহিতা , লোহার চুম্বকে পরিণত হওয়ার ক্ষমতা (চুম্বক ধর্ম)-লোহাকে কিভাবে ভাসানো যেতে পারে – লোহার কাঠিন্য (hardness)-রধানকো (p)- সিমেন্ট লোহার সম্মিলিত শক্তি – ফেরো- কংক্রিট -উল্কা পিন্ডের মধ্যে লোহার অবস্থান I পদার্থবিদ্যাসম্পর্কPhysics Related
উদ্ভিদদেহে লোহার অভাব , প্রাণীদেহে লোহার অভাব (এনেমিয়া )- ল্যাটেরাইট মাটিতে লোহার উপস্থিতি এবং তার জন্য উদ্ভিদের উপর প্রভাব – মাইক্রো এলিমেন্ট বা ম্যাক্রো এলিমেন্টসে লোহার অবস্থান এবং অভাবজনিত কারণ -লোহা পাওয়া যায় কোন কোন খাদ্যে I জীববিদ্যা সম্পর্কিত Biology Related
লবন খাদ্য লবন – বিভিন্ন প্রকার লবন – লবণের গঠন -রক সল্ট -রক সল্টের খনি কোথায় আছে এবং উৎপত্তি -ভারতবর্ষে রক সল্ট এবং খাদ্য লবণের উৎপাদন কেন্দ্র -(Gujrat) কচ্ছ ও কাথিয়ার অঞ্চল – জর্ডান এবং ইস্রায়েল সীমান্তে অবস্থিত ডেড সি I পৃথিবীর বৃহত্তম মার্কিন যুক্তরাষ্টের হ্রদের নিচে রক সল্টের খনি-ভারতবর্ষ নুন উৎপাদনে তৃতীয় স্থানাধিকারী I
ইতিহাস সম্পর্কিত History Related
ব্রিটিশ রাজত্বে লবন সত্যাগ্রহ -মহাত্মা গান্ধীর ডান্ডি অভিযান – আলেকজান্ডার এর ঘোড়া কর্তৃক খনির আবিষ্কার বর্তমান পাকিস্তানের এর অবস্থিতি I
জীব বিদ্যা সম্পর্কিত Biology
মানব শরীরে নুনের প্ৰয়োজনীয়তা -শারীরবৃত্তিয় শুস্ক মৃত্তিকা -লবণাম্বু উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য – কৃষিতে লোনা মাটির অসুবিধা -কোন ধরণের ফসল লোনা মাটিতে তৈরি করা সম্ভব – ORS নুন চিনি শরবত , স্যালাইন তৈরি করতে ব্যবহার I একদা জেল বন্দিদের নুন না খেতে দিয়ে মারা হত I
পদার্থবিদ্যা সম্পর্কিত Physics Related
নুন ও বরফ মিশিয়ে হিঁম মিশ্রণ প্রস্তুতি – তাপমাত্রার অবনয়ন – বাষ্পায়ন পদ্ধতির সাহায্য নিয়ে সমুদ্রজল থেকে নুন প্রস্তুতি – দ্রবণ দ্রাব ও দ্রাবক এ নুনের ব্যবহার এবং দ্রাব্যতা – তাপমাত্রার প্রভাব I
রসায়ন সম্পর্কিত Chemistry Related
তড়িৎ বিশ্লেষণে নুনের ব্যবহার – তড়িৎ পরিবাহী হিসাবে নুন জলের ব্যবহার বিভিন্ন পদার্থের সঙ্গে NaCl এর বিক্রিয়া – নুন কেন জল কেটে যায় ?
ইস্ট সম্পর্কিত Shri shri Thakur Related
Jews, Shinto, ও Buddhist ধর্মে নুনের ব্যবহার – মহাপুরুষরা আমাদের জীবনে সল্ট স্বরূপ Iখাদ্যের পুষ্টিমূল্য ঠিক রাখতে তরকারিতে কখন নুন দেওয়া উচিত এ সম্পর্কে শ্রী শ্রীঠাকুরের উপদেশ বিশদ ভাবে আলোচনI I
চিনি /গুড়/ শর্করা
জীববিদ্যা সম্পর্কিত Biology Related
Photosynthesis process এর দ্বারা simple শর্করা তৈরি -এগুলি পরে কিভাবে গ্লুকোজ এবং ফ্রুক্টোস এ পরিণত হয় ?
ইতিহাস সম্পর্কিত History Related
প্রাচীন কালে আরব বণিকদের তথ্য থেকে জানা যায় যে ভারতবর্ষ গুড় উৎপন্ন করতো এবং export করত অনেকে এও মনে করেন যে গুড় থেকে বাংলার রাজধানী গৌড়ের নাম সৃষ্টি হয়েছে I হিন্দু প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ এ এর নাম Khand বাল্যঅবস্থায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় খাদ্য ছিল ননী ও মিছরি I
পদার্থবিদ্যা সম্পর্কিত Physics Related
চিনির কেলাস সম্পর্কিত আলোচনা – জলে চিনির দ্রাব্যতা –
রসায়ন সম্পর্কিত Chemistry Related
চিনির রাসায়নিক নাম – একে ভাঙলে গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোস পোয়া যায় – চিনি থেকে ক্যারামেলপ্রস্তুতি -কারামেলের এর ব্যবহার –Invert Syrup preparation and application.-Chemical Reaction with H2SO4.
চিনি উৎপাদক বস্তু সমূহ বিট ,আখ, খেজুর রস, তাল রস – এগুলি থেকে কেমন করে গুড় বা চিনি তৈরি করা হয়
জীববিদ্যা সম্পর্কিত Biology Related
মানব শরীরে চিনির অপকারিতা (Diabetis)-ইস্টের কার্যকারিতা তে চিনির প্রভাব- Diabetis এড়াতে মানুষের করণীয় I
ভূগোল সম্পর্কিত Geography Related
পশ্চিম ঘাট পর্বতমালার কাছে উৎপাদিত চিনির মিষ্টত্ব অনেক বেশি -ভার বর্ষের ইক্ষু উৎপাদক অঞ্চল সমূহ – ইক্ষু উৎপাদনে ভারতের স্থান – বর্তমান ভারতের চিনি কল গুলির সমস্যা
ইস্ট সম্পর্কিত Shri shri Thakur Related
তিল দ্বারা প্রস্তুত বিভিন্ন খাদ্য দ্রব্য ( তিলের নাড়ু গুড় দিয়ে বানানো ) খাবার প্রয়োজনীয়তা-চিনির মিষ্টতা নিয়ে ঠাকুরের বাণী–“চিনি শুধু মিষ্টি নয় / বিষঅমৃত হয়, /করণ কারণ দেখে/ তাহার করিস পরিচয় I”
Bangladesh Board
CBSE/ Tripura Board
West Bengal Board
1
বল ও সরলযন্ত্র VI
কার্য এবং শক্তি IX
সমূহ স্পর্শ ছাড়া ক্রিয়া শীল
বল ও গতির সূত্রাবলী IX
বল ও চাপ VIII
শক্তির উৎস সমূহ X
2
শব্দের কথা VIII
শব্দ IX
শব্দ IX
3
আলোর ঘটনা VI
আলো -প্রতিফলন প্রতিসরণ X
ভৌত পরিবেশের মধ্যে আলো VIII
4
শক্তির ব্যবহার
Work and Energy IX
পরিবেশ বান্ধব শক্তি VII
Source of Energy X
5
অম্ল-ক্ষার- লবন VIII
Acid- Base -Salt VII & X
Acid- Base -Salt IX
6
বিদ্যুৎ ও চুম্বক ঘটনা VII
Electricity X
চল তড়িৎ VIII, IX, X
বর্তনী ও চল বিদ্যুৎ VIII
Magnetic Effect of Electric
VI, VII & X
7
গতি
Motion & Equation
বল ও শক্তির প্রাথমিক ধারণা
Friction
8
তাপ
তাপ- তাপমাত্রা
তাপের ঘটনা সমূহ
9
পরমাণুর গঠন
Atom Molecule and
পরমাণু
রাসায়নিক বিক্রিয়া VIII
chemical Reaction
10
পৃথিবী ও মহাকর্ষ VIII
Gravitation IX
****
সৌরজগৎ ও আমাদের পৃথিবী VII
মহাকাশ ও উপগ্রহ VIII
11
পারিপার্শ্বিক পরিবর্তন ও
Chemical and Physical Change
****
বিভিন্ন ঘটনা VII
VII
12
***
Periodic Classification
****
of Elements VI & X
13
****
****
তড়িৎ ও সমযোজী বন্ধন
14
জলবায়ু পরিবর্তন VII
Air Water Soil IX
জল IX
15
মিশ্রণ VI
Solution IX
মিশ্রনের উপাদান পৃথকীকরণ IX
16
****
Carbon and its compound X
Bangladesh Board
CBSE/ Tripura Board
West Bengal Board
17
Fibre and Fabrics VI & IX
18
প্রাকৃতিক পরিবেশ ও দূষণ VII
Waste Water Story VII
19
Metal and Non Metal VII & X
ধাতুবিদ্যা X
20
পদার্থের গঠন
পদার্থের বৈশিষ্ট্য ও
পরিবেশ গঠনে পদার্থের ভূমিকা VII
বাহ্যিক প্রভাব
মৌলিক যৌগিক ও মিশ্র পদার্থ VI
পরিবেশ গঠনে পদার্থের ভূমিকা
21
গ্যাসের আচরণ X
কয়েকটি গ্যাস
22
স্থির তড়িৎ
জারণ বিজারণ
তড়িৎবিশ্লেষণ
R.S.
Sound Chapter (শব্দ) ( তপোবন বিদ্যালয়েরজন্য)
Phy.Science Class IX – X
শব্দের উৎপত্তি – ঠাকুরের বক্তব্য বিজ্ঞানবিভূতি – শব্দই পরম ব্রহ্ম – From Bible – In the beginning there was word, word was with God and the word is God.
2. .শব্দের বিস্তার (Propagation of Sound ) Drawing & animation needed
3. শব্দের বিস্তারের জন্য মাধ্যম প্রয়োজন Expermiment needed either practical or Audio Video –
Beljar and bell experiment in vaccum.
4. শব্দ তরঙ্গ ও তার নান রকম দিক-(longitudinal waves –Spring wave –Type of water
waves Etc.)
5. শব্দ তরঙ্গের বৈশিষ্ট্য ( Geometrical and Graphical Representation)
6. Unit of Frequency of Sound and Practical demonastration of Sonnometer and Tuning Fork
7. Conception of High and Low pitch sound
8. Speed of sound in different media.
9. Reflection of Sound Practical demonastration ( Just like Light), Echo(প্রতিধ্বনি) application
of sound in Auditorium –Revibration- echo in our daily life.
10. Ultra Sound and its Function & application in Human body . Bat emmited sound.Sonner
Used for measurement of Sea depth .
11. Structure of Human Ear ( Picture and model and animation needed)
12. সুরযুক্ত শব্দ ও সুরযুক্ত শব্দের বৈশিষ্ট্য সমূহ ( in Details ) Related Formula(সূত্র)
R.S.
Electricity Chapter ( তপোবন বিদ্যালয়েরজন্য)
Phy.Science Class IX – X
Electric Current – Flow of electron and direction of current Electric current in Conductor and conductor type. Good Conductor and Bad conductor.
Voltage Difference Establishment of V= IR equation with Ohom’s law. Limitation of Ohom’s Law.Resistivity of various materials.Temperature dependence of Resistivity.
Conditions that effects on resistance Some Definition –Area. Length,and P (রধানকো)
Seris and parallel combination of resistance and its application in our daily life. Kirchoffes Rule.
Cells ( various Type and its function )E.M.F and inernal resistance. Electrode of Cells and Electrolysis used in the cell Daniel Cell- simple Voltaic cell – Theory of Nurst disadvantage of simple voltaic cell. Lechlance Cell- Standard Cell- Western Cadmium Cell –Ni –Cd Cell which is used in our mobile.
Heating effect of electricity- (application of heating effect of electricity in our daily life al our domestic appliance).
A.C. and D.C. its advantage and disadvantage Their difference. Equation of A.C. Current.
Measurement of Electricity (Voltmeter, Ammeter and multimeter with practical demonostration ) only measurement will learn.
Unit of domestic or Industrial current and its calculation KW/h
Frequency of Electric Current.
Magnetic Line due to electric current – solenoid –Flemmings Left hand Rule and right Hand rule –Amperes swimming rule. নদী, খাল, পুকুরে স্নান করতে গিয়ে আম্পিয়ারের সন্তরণ সূত্র শেখানো সম্ভব I
Magnetic effect of Electricity
Magnetic effect of electric current – concept of Electric Field.- Orested Experiments.
Electro Magnetic Induction – Faraday’s law.
Effect of magnetic Field on Current carrying Current.
Moving Coil Galvanometer – Ammeter and Voltmeter and its Function- How it works?
L-C-R series circuit Resonance.
A.C. Generator and Transformer Its function Making of simple DC transformer 12V.
Ampere’s Law and its application
“সাঁতার কাটা, গাছে চড়া
কৃষিকাজ আর রন্ধন ,
এ না জানলে ছেলে তোমায়
করতে হবে ক্রন্দন I” Shri Shri Thakur Anukulchadra Motto
আলো Light ( তপোবন বিদ্যালয়েরজন্য)
Phy.Science Class IX – X
1. আলো আলো সরলরেখায় গমন করে – রশ্মি – রশ্মিগুচ্ছ কী- কোনার্কের সূর্য মন্দির – দীর্ঘতমা মুনির সাতটি ঘোড়ার
কথা বলে সাতটি রশ্মির কথা বলা I
সমান্তরাল , অপসারী , অভিসারী ( Divergent Convergent ) রশ্মিগুচ্ছ এবং এদের ব্যবহার I ছায়া , প্রচ্ছায়া এবং
উপচ্ছায়া (বিস্তৃত আলোক উৎসের ক্ষেত্রে ) প্রাকটিক্যাল demonostration needed .
আলোর প্রতিফলন ( সমতল দর্পন , বক্রতল দর্পন ) প্রাকৃতিক ঘটনাবলী – নীল আকাশ – রক্তিম সূর্য্য I সুকুমার রায় এর বিখ্যাত কবিতা ” বলতো ওরে বুড়ো , কেন এমন নীল দেখা যায় ওই আকাশের চুড়ো ” প্রসঙ্গ টেনে আনা যেতে পারে I
বর্ণালী বর্ণালীর উৎপত্তি প্রিজম দিয়ে – রামধনু – নিউটনের চাকতি – দুটি প্রিজম দিয়ে সাদা আলো ভেঙে ফেলে আবার সাদা আলো সৃষ্টি করা I
আলোর প্রভাব গাছের সালোক সংশ্লেষে আলোর ভূমিকা – উদ্ভিদের চলন নিয়ন্ত্রণ ( Biology )- ফুল ফোটা I Photoelectric Cell আলোর ব্যবহার( Physics).
প্রতিবিম্ব কেমন করে কোথায় প্রতিবিম্ব তৈরি হয় ? লেন্স ও দর্পনের মাধ্যমে কেমন ধরণের প্রতিবিম্ব তৈরি হয় – সদ বিম্ব , অসদ বিম্ব সোজা বা উল্টো ভালো করে প্রাক্টিকালের মাধ্যমে শেখাতে হবে I উত্তল ও অবতল দর্পন ও লেন্সের ব্যবহার – প্রতিফলন ও প্রতিসরণের Geometrical representation এর ড্রইং I বাস্তব জীবনে উত্তল ও অবতল দর্পন ও লেন্সের ব্যবহার I
কৌণিক দর্শন – পার্শ্বীয় প্রতিফলন – দর্পনের বিভিন্ন ব্যবহার – দোকানে , সাবমেরিনে, সেলুনে ইত্যাদি Iপেরিস্কোপের গঠন ও বর্ণনা প্রিজম ও দর্পন উভয় জিনিসের সাহায্যে পেরিস্কোপ তৈরি করা যায় I
প্রতিসরণের সূত্রাবলি ও তার প্রমান ( Practically ) Refractometer এর সাহায্যে অনেক স্বচ্ছ তরলের Purity বের করা সম্ভব যেমন সর্ষের তেল , রেপসিড তেল ইত্যাদি I
প্রতিফলন – অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন ছবি সহ – সংকট কোন প্রাকৃতিক ও কৃত্তিম উদাহরণ – কচুপাতায় জল শিশির বিন্দু ডায়মন্ড এর উজ্জ্বলতা
মরীচিকা – উৎপত্তির কারণ ছবি সহযোগে – শীত প্রধান দেশের মরীচিকা , মরুভূমির মরীচিকা
নরওয়ে দেশের arrora – মেরু প্রদেশে I
10 লেন্স লেন্সের সাহায্যে বিবর্ধন ( Magnify ) ফোকাস দূরত্ব নির্ণয় এবং এর সম্পর্কিত সূত্র (
Practical )
মানব চক্ষু — Iris , pupil ,lense & Retina . বিভিন্ন ফোকাসে বিভিন্ন ধরণের (size ) – চশমার কাজ – চশমার
power –Diaptor I Eye sight problem and its Remedy.
R.S.
কার্য-ক্ষমতাওশক্তি ( তপোবন বিদ্যালয়েরজন্য)
Phy.Science Class IX – X
বিজ্ঞানের ভাষায় কার্য কী ? কার্য ক্ষমতা ও শক্তির সম্পর্ক এবং একক গাণিতিক উপস্থাপনা I শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর ছড়াতে
ক্ষমতা কে মানুষের দক্ষতার সঙ্গে জুড়ে দিয়ে অন্য মাত্রা দিয়েছেন I ক্ষমতায় যে দীন, সুষ্ঠুকর্মা হলেও জানিস / ক্ষমতায় সে হীন I
Gravitational unit and absolute unit of Work – কার্য ও গতিশক্তির ধারণা -স্থিতি শক্তি-স্প্রিঙের স্থিতিশক্তি -যান্ত্রিক শক্তির
সংরক্ষণ -শক্তির সংরক্ষণ সূত্র -শক্তির বিভিন্ন রূপ – সংঘর্ষ (collision ) এবং এর প্রভাবে শক্তির স্থানান্তর
নিউটনের গতিসূত্র – ভরবেগ ত্বরণ বা মন্দন P = mf সূত্রের প্রতিষ্ঠা I গতিজাড্য ও স্থিতি জাড্য ( উদাহরণ সহযোগে দৈনন্দিন জীবনে
প্রয়োগ জানতে বা অজান্তে করে থাকি এটা বোঝাতে হবে ) – নৌকা , বন্দুক ছোড়ার ঘটনা দিয়ে নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্র ভালোভাবে
বোঝাতে হবে
যন্ত্রের সংজ্ঞা- সরল যন্ত্র – লিভার -বিভিন্ন শ্রেণীর লিভার (1st ,2nd and 3rd) ও তার ব্যবহার (আমাদের দৈনন্দিন জীবনে)
লিভারের যান্ত্রিক সুবিধা
অভিকর্ষজ ত্বরণ Potential Energy – W = mgh সমীকরণ প্রতিষ্ঠা স্থিতিশক্তি ও গতিশক্তির পার্থক্য I
Kinetic & Ptential Energy কে হবে সাইকেল চালানো , পাল তোলা নৌকো , Weight Lifting , খেলনা দম দেওয়া গাড়ি, Rubber
Band, ধনুক বা গুলতি, দিয়ে ভাল করে বোঝা তে হবে I
Matter ও Energy ভর ও শক্তি সম্পর্কিত ঠাকুরের আলোচনা গুলি বিজ্ঞান বিভূতি ও অন্যান্য বইয়ের সাহায্য নিয়ে তুলে ধরতে হবে
Rest & Motion
Newton’s law of motion and its explanation.
Inertia of Mass- speed – Velocity –Acceleration ,Establishment of Equation P= m.f
Rest and Motion – Rest Inertia- Motion Inertia With examples( Running Train , Static ball in card board.
Velocity Time Graph- Establish thease Equation of V=U+ft , S=Ut+1/2ft2 and V2=U2 -2fs and Mathematical problem.
Some practical examples (i.e. Kicking the football, Two opposite side Spring balance,Recoiling of Gun after firing and jumping from Boat.
R.S.
Acid , Base and Salt( তপোবন বিদ্যালয়েরজন্য)
Phy.Science Class IX – X
Old Definition of Acid new definition of acid.Type of acid and its source some example . Properties of Acid – Identification of acid effect on Litmus paper – strong and weak acid – some important Properties – Indicator – Titration with Base-pH value and its colour indication- ph of various food and soil and others as possible – Handling of pH Meter and its application.
Preparation of some important Acid in laboratory and in Industry. Acid which are generate in our human body (i.e Lactic Acid, HCl, Picric Acid, Uric Acid)
Base- definition of base and its properties- some strong and weak base – Reaction with Acid and its product. Preparation of some bases in Lab and industry. Litmus effect pH value and colour indication- indicator effect –Saliva and lemon juice Testing by pH paper-Red Cabbage leaf and termaric Reaction, cold Drinks , carrot juice, Tomatoe juice coffee etc .
Acid and Base Reaction with some metals and its product. ( Salt preparation )Reaction of matalic Oxides with Acids- Reaction of Non metallic Oxide with base.
Proces of mixing of water with strong Acid and Strong Base.
Definition of Salt Catagory of salt and its application in our human life
মৌমাছির হুল এবং বিছুটি পাতা প্রকৃতিজাত কয়েকটি অম্ল vinegar, tentul tomatoe orange
ক্ষার জাতীয় কয়েকটি পদার্থ সাবান ডিটারজেন্ট
R.S.
Magnetism চুম্বক ধর্ম( তপোবন বিদ্যালয়েরজন্য)
Phy.Science Class IX – X
চুম্বকের প্রাচীন ইতিহাস – কণাদের সুশ্রুতের গ্রন্থে ও বৈশেষিক দর্শনে এর উল্লেখ আছে কিনা দেখতে হবে -বর্তমানে চুম্বক বলতে কি বোঝায় – চুম্বক মেরু – চুম্বক ধর্ম চুম্বক দৈর্ঘ্য- উদাসীন বিন্দু – চৌম্বক বলরেখা- সূচি চুম্বকের সাহায্যে চৌম্বক বলরেখার অঙ্কন (প্রাকটিক্যাল ) -চুম্বকের আকর্ষণ ও বিকর্ষণ (প্রাকটিক্যাল) ও দিগদর্শী ধর্ম I
বার ম্যাগনেট – অশ্বক্ষুর চুম্বক -elbow magnet – চুম্বক শলাকা -সুচী চুম্বকের ব্যবহার – চুম্বক মেরুর আকর্ষণ ও বিকর্ষণ সংক্রান্ত কুলম্বের সূত্র I
চৌম্বক ক্ষেত্র – চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রাবল্য ও একক ওরস্টেড – চৌম্বক আবেশের ইলেক্ট্রনিক ব্যাখ্যা – ওয়েবার ইউংয়ের আণবিক তত্ব – চুম্বকন বলের পরিমাপ (P ) লৌহচুর্ণ দিয়ে চৌম্বক বলরেখার রেখাচিত্র অঙ্কন I
N-S এবং S-N বিভিন্ন অবস্থানে বলরেখার চিত্র -চৌম্বক বলরেখার সংজ্ঞা- চৌম্বক পর্দা – চুম্বকন শক্তির পরিমাপ ও একক – চৌম্বক প্রবেশ্যতা বা ভেদ্যতা -চৌম্বক গ্রাহীতা (H , B & I Term গুলির সঙ্গে পরিচয় ও সম্পর্ক I
অষচৌম্বক , পরশচৌম্বক এবং তীরসচৌম্বক কি উদাহরণ সহ- হিস্টোরোসিস লুপ – বিভিন্ন উন্নত মানের সংকর ধাতুর চুম্বক এবং তাদের অনুপাত
R.S.
তাপ (Heat )তপোবন বিদ্যালয়ের জন্য
Phy.Science Class IX – X
তাপ কী ? What is Temperature? What is its relation ? তাপের উদ্ভব বা সৃষ্টি কিভাবে সম্ভব – প্রাকৃতিক ও মানব সৃষ্ট – তাপ ও তাপমাত্রার সম্পর্ক – তাপমাত্রা কিভাবে পরিমাপ করা হয় তিনটি স্কেলের পারস্পরিক সম্পর্ক ( practically )
তাপ সঞ্চালন পদ্ধতিগুলি এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে -পরিবহন-পরিচলন-বিকিরণ (রান্না ঘরে রান্নার সময়কালীন ঘটনা দিয়ে পরিবহন পরিচলন এবং বিকিরণ বোঝাতে হবে ) – ইনজেন হজের তাপ পরিবহনের পরীক্ষা টি করে দেখাতে হবে I
তাপ একটি তরঙ্গ- সূর্য থেকে কিভাবে তাপ পৃথিবীতে আসে -সেটি বোঝাতে হবে -তাপের গাণিতিক সূত্র H = mst প্রতিষ্ঠা – আপেক্ষিক তাপ(s ) কি ?
What is Heat? What is Temperature? What is its relation ? Unit of Heat and Temprature How we can measure Temperature in three different Scale (0C , 0F & 0K) – relation of centigrade and Farenhite Scale
Vaporization and Boiling বাষ্পায়ন ও স্ফূটন এবং নুন তৈরি করতে বাষ্পায়নের ব্যবহার- প্রতিদিনের জীবনে বাষ্পায়নের প্রভাব
Heat is one kind of Energy –It can convert to another form of energy (i.e sound, electricity magnetism by us.
আমাদের প্রতিদিন ঘটনা সমূহের মধ্যে কোথায় কোথায় তাপের উদ্ভব হয় ? সাইকেলে হাওয়া দেবার সময় পাম্পার এর নিচের দিকে, হাতুড়ির উপরে পেরেক দিয়ে আঘাত করা – হাতে হাত ঘষা -দেশলাই কাঠি ঘষে জ্বালা – গ্যাস ওভেনে -পলিথিন পুড়িয়ে ইত্যাদি কারণ সহ ব্যাখ্যা
জলসম কি ? ক্যালরিমিটারের মূল নীতি ( practically দেখানো )
বিভিন্ন ধরণের থার্মোমিটার তাদের গঠন ও কার্যপ্রণালী – উর্ধ স্থিরাঙ্ক নিম্ন স্থিরাঙ্ক – সেন্টগ্রেড ও ফারেন হাইট স্কেলের পারস্পরিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং paractically সেটি মেলানো I থার্মোমিটারে পারদ এবং আলকোহোল ব্যবহারের সুবিধা ও অসুবিধা- পরম শূন্য তাপমাত্রা বলতে কে বোঝায় I
তাপের বিভিন্ন ক্রিয়া –Biological Effect, Chemical effect, cementing effect Geographical Effect on rock and mountaion(আবহবিকার ),Melting effect, effect on germination, Microbiological growth , Physical effect with various examples. আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সুপরিবাহী ও কুপরিবাহী পদার্থের প্রভাব খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে -দৈনন্দিন জীবনে Hot and Cold things and its effect কখন আমরা Heat loss হতে দি আর কখন Heat Gain করতে চাই I জ্বর হলে শরীর গরম হয় কেন – আবার আমাদের শরীর ঠান্ডা হয়ে আসে কেন – এগুলি কি নির্দেশ করে ? শীতের দেশে বরফের তলায় মাছ বেঁচে থাকার কারণ – জলের স্ফূটন দ্বারা বাষ্প তৈরি এবং এর দ্বারা স্টিম ইঞ্জিনের কাজ করা এর সিরিঞ্জ ( মডেল তৈরি করতে হবেইনজেকশন কেপিস্টনহিসাবে ব্যবহার করে ) Thermoflask & working principle.
প্রাচীন কাল থেকে মৌলের ব্যবহার -হরপ্পা মহেঞ্জোদড়ো তে প্রাপ্ত উদাহরণ -আমাদের বেড বা সংস্কৃতগ্রন্থে বিভিন্ন ধাতুর উল্লেখ ও ব্যবহার I মহাভারতে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষে ধৃতরাষ্ট্রের সামনে লোহার ভীমের (নকল ) প্রদর্শন প্রমান করে লোহার ব্যবহার মহাভারতের যুগে বর্তমান ছিল – অন্যান্য দেশে ধাতুর ব্যবহার ও উল্লেখ সম্বন্ধে ধারনা I
গুজরাটের লোথাল বন্দর থেকে তামা এক্সপোর্ট করা হত–তাম্রলিপ্ত বন্দর এবং এর পটভূমিকা -তামার সংকর ধাতু – ক্ষিতি -অপ- তেজ – মরুৎ -ব্যোম ভারতীয়রা আগে জানতো না গ্রিকেরা আগে জানতো – কে কাদের কাছ থেকে শিখেছিল কিছু মৌল পদার্থের আবিষ্কারের ইতিহাস I
Early attempts at the classification of elements and its symbol– attempts of earlier periodic table -Present basis for the classification of various elements –Modern periodic Table ( Chart must be needed) How periodic table shows the trend of properties of various elements ( It should be done very perfectly) মৌলিক পদার্থের বিভিন্ন ধর্মের পুনরাবৃত্তি I
প্রধান প্রধান মৌলিক পদার্থের নাম – অ্যাটমিক নাম্বার -প্রতীক চিহ্ন – মৌলের অনু গুলি এক -পরমানুক না বহু-পরমানুক – পিরিয়ডিক টেবিলে হাইড্রোজেনের স্থান ক্ষার ধাতু গুলির সাথে –Periodic Table এ বিভিন্ন গ্রুপগুলির আলোচনা special ভাবে শেখাতেহবে -simple conception about s,p,d,f block elements and its periodicity.
তেজস্ক্রিয় মৌল এবং এর অন্তর্নিহিত কারণ এবং উৎপন্ন রশ্মির ধর্মাবলি harmful effect ( Alfa,
Bita এবং Gama ray ) Fusion & Fission নিষ্ক্রিয় গ্যাসীয় মৌল সমূহ এবং এগুলির নিষ্ক্রিয়তার কারণ I
সম্পর্কে ধারণা I British Scientist Robert Moseley his life his prediction and His Law.
R.S.
Static Electricity( তপোবন বিদ্যালয়েরজন্য)
Physc. Science Class IX – X
Generation of Static Electricity rubbing by Glass-Ebonite-plastic polythin
Effect of moisture in rubbing to generate static electricity. ঘর্ষণে আদ্রর্তা র প্রভাব
Experiment of ebonite and poshomer cap ( Practial Demonestration)
Static electric induction স্থির তড়িৎ আবেশ দুটি পরিবাহীকে একসঙ্গে বিপরীত আধানে আহিতকরণ
আবেশ দ্বারা আহিত করন I
তড়িৎ বীক্ষণ যন্ত্র – ফ্যারাডের বরফ পাত্র পরীক্ষা -এর গঠন ও কার্যকৌশল I
দুই তড়িত্বাধানের মধ্যে পারস্পরিক বলের সূত্র – কুলম্ব সূত্র – আধানের ব্যবহারিক একক এবং একক আধানের ধারণা –e.m.f. e.s.u. relation between e.s.u. & volt
Thunder lightning conductor – action of pointed end of a conductor and electric wind .
ধারক এবং ধারকত্ব তড়িৎ ফ্লাস্ক -তড়িৎ দ্বিমেরু -তড়িৎ ক্ষেত্র তড়িৎ ক্ষেত্র রেখা -সমান্তরাল পত্ ধারক ধারাকে সঞ্চিত শক্তি I
List of Rubbing Material that can generate static electricity. 1.পশম বা উল 2. কাঁচ 3. কাগজ 4.রেশম বা সিল্ক 5.কাঠ 6. মানুষের দেহ 7. ধাতব পদার্থ 8. Ebonite 9. গালা 10 আম্বার (Amber) 11. রজন 12.সেলুলয়েড I
Structure of Atom (পরমাণুর গঠন)
Physc. Science Class IX – X
পরমাণুর গঠন -ডেমোক্রিটাস -লুফিপিয়াস ঋষি কনাদের কন্সেপশন -What is atom? How big are atom ?Symbol some important molecule? What is ion?
রাদারফোর্ড ,নিলস-বর NeilsBhor) এবং থমসন এর মডেল I
প্রত্যেক মডেলের সমালোচনা -ইলেক্ট্রন প্রোটন ও নিউট্রন -ইলেক্ট্রনের অবস্থান কক্ষপথ -কয়েকটি মৌলের ছবি দিয়ে বোঝানো -যোজ্যতা (valency, Atomic Number, Atomic weight Moleculer weight, Molecules , Isotop Isobar.
Law of Chemical Combination- law of constant proportion .
Writing chemical formula and reaction. Moleconcept- Avogadro Constant(6.023 X1023 ) atomic mass scale in respect of Carbon.
Types of Chemical reaction (সংযোজন , বিয়োজন ,প্রতিস্থাপন) –Balancing of chemical Reaction .
R.S.
জারণ ও বিজারণ( তপোবন বিদ্যালয়েরজন্য)
Chemistry Class IX – X
জারণ ও বিজারণের কয়েকটি সহজ উদাহরণ and Definition of Oxidation and Reduction
গ্যাসীয় জারক দ্রব্য O2, O3, Fl, Cl, NO2.
তরল জারক দ্রব্য HNO3 , Conc. H2 SO4 , H2 O2 ,Br2.
কঠিন জারক দ্রব্যে KMnO4 , K 2Cr 2 O7
গ্যাসীয় বিজারক দ্রব্য H2 ,H2S , SO2 , CO2 .
তরল বিজারক দ্রব্য নাইট্রাস অ্যাসিড, HBr, HI.
কঠিন বিজারক দ্রব্য Carbon (C) & SnCl2
সালোক সংশ্লেষ তার সঙ্গে জারণ বিজারণের সম্পর্ক I
জারণ রোধ করতে আমরা গ্রিল রং করাই-চিপসের কোম্পানি গুলি চিপসের জারণ রোধ করার জন্য নাইট্রোজেন ভরে রাখে I
মৌল হিসাবে কার্বন – কার্বনের প্রাকৃতিক উৎস – কার্বনের প্রকারভেদ – চারটি বন্ডে যুক্ত হওয়ার ক্ষমতা – অন্তর্বর্তী কোন – কার্বনের আইসোটোপ কার্বন ও অক্সিজেনের যৌগ – CO2 & CO কে – বায়ুতে CO2 এর পরিমান I
Chemical bonding – Electrovalent or ionic bond formation – Factor s influencing the formation of ionic bond – The relation between ionic bond and periodic Table- Variable electrovalency and its causes- Electronegetivity – lattice energy – some compound Na Cl, LiO2, MgO,CaO, Na2S & Mg F2 .
Covalent Bond Formation of NH3 ,N2 , C 2H 2 ,& CO2 – Resonance Variable Valancy.(i.e. Cl exhibits the vallency of 1,3,5,7 respectively).
Saturated Bond and Unstaturated Bond of Carbon Compound ( some Examples including Fat , ethelene & acetelene .
Saturated Bond and Unstaturated Bond of Carbon Compound ( some Examples including Fat , ethelene & acetelene.
Deviation of Octate Rule and Fajan’s Rule.
R.S,
Organic Compound ( তপোবন বিদ্যালয়েরজন্য)
CHEMISTRY Class IX – X
Modern definition or organic chemistry-difference between inorganic and organic chemistry .Importance of Organic Chemistry- Source of organic Chemistry- characteristic of Carbon atom- জৈব যৌগ সংখ্যায় বেশি হওয়ার কারণ-Classification of Organic compound ( Tree Chart needed)
Organic Functional Group (i.e. aldehyde,Ketone, Halladies Alcohol & acid etc.)- Homologous Series and its general formula and its functional group- chain length and root word (i.e C3– Propen, C4 – Buten, C5– Penten, C6– Hexen Etc.)
Prefix root and word suffix- Conception of IUPAC name.
Conception of Saturated and Unsaturated organic compound, specially on Fat, C 2H 2 , CH .
Some Examples of CH4,C2H6,C2H5OH, CH3OH,HCHO,CH3CHO,CH3COOH, HCOOH and its use also. Conception on petroleum Coal Tar and some Aromatics compound and its use .
GaseousState
Characteristic of Gases
Brownian movement of gas- cause of pressure on the container wall.
Boyle’s Law- Pressure –volume Law and its condition- verification of Boyel’s law
Charls Law – Volume – Temperature Law- verification of Charls Law. (Equation of both Law).
Avogado’s Law -avagadro’s Number and its importance-
Ideal Gas Equation PV = n RT and its problem solve ( Mathematical problem)
Diffusion of Gass- Dalton’s Law of Pressure.
Colloidal Solution
What is colloid ? preparation and properties of colloids- hydrophilic and hydrophobic.- Some Examples of ColloidTyndal effect and its example ( Head light of Train)
Application of colloid Chemistry ( Formation of Delta, Blood, Milk. Tail of Commets)
R.S.
পদার্থও মিশ্রণ ( তপোবন বিদ্যালয়েরজন্য)
পদার্থ কাকে বলে : ক্ষিতি , অপ তেজ , মরুৎ ও ব্যোম কী এ সম্পর্কে প্রাচীন ঋষিদের ধারণা -পদার্থ , মৌলিক পদার্থ ,যৌগিক পদার্থ ও মিশ্র পদার্থ – মিশ্র ও যৌগিক পদার্থের কয়েকটি বৈশিষ্টের পার্থক্য Method of separation of the constituents of Mixture 1) Decantationআস্রাবন , 2) Filteration পরিস্রাবন 3) Distillationপাতন 4) Sublimationঊর্ধ্বপাতন 5) Crystalisatin কেলাসন 6) Fractional Crystalisation আংশিক কেলাসন I এগুলির প্রাকটিক্যাল দেখাতে পারলে ছাত্ররা জীবনে ভুলবে না
ধাতু কল্প -পদার্থের বৈশিষ্ট্য -পদার্থের বিভিন্ন অবস্থা (৪-৫ থ স্টেজ) কঠিন -তরল- গ্যাস-প্লাজমা -পদার্থের ভৌত ধর্ম 1) State 2) Odour 3) Colour 4) Weight 5) Dimension 6) Volumme 7) Density 8) Taste 9) Solvency 10)Magnetic property 11) Melting or Boiling point.
Factors upon which physical properties of matter depend 1) Heat 2) Pressure3) Electricity 4) Presence of other materials (Catalyst)
Effects of Heat on solid- Rail line-Ring ball Expansion-Bi metal strip-Practical application of the expansion of solid due to heat –Expansion of liquid due to heat-Expansion of Gas due to heat –bottle cork experiment.
[ উইকিপিডিয়া অনুসারে, ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সাফল্যের পর 1947 সালের 15 আগস্ট ভারত ব্রিটিশ রাজ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে । স্বাধীনতা ভারতীয় স্বাধীনতা আইন 1947 (10 এবং 11 জিও 6 সি 30), যুক্তরাজ্যের সংসদের একটি আইন যা ব্রিটিশ ভারতকে ব্রিটিশ কমনওয়েলথ (পরবর্তীতে কমনওয়েলথ অফ নেশনস) এর দুটি নতুন স্বাধীন আধিপত্যে বিভক্ত করে। ভারত একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে পরিণত হয় ষষ্ঠ জর্জ রাষ্ট্রপ্রধান এবং আর্ল মাউন্টব্যাটেন গভর্নর-জেনারেল হিসেবে । যদিও দেশটির এখনও স্থায়ী সংবিধান ছিল না; পরিবর্তে এর আইনগুলি সংশোধিত ঔপনিবেশিক ভারত সরকার আইন 1935- এর উপর ভিত্তি করে ছিল ।
29 আগস্ট 1947-এ, ডক্টর বি. আর. আম্বেদকরকে চেয়ারম্যান করে একটি স্থায়ী সংবিধান প্রণয়নের জন্য একটি খসড়া কমিটি নিয়োগের জন্য একটি রেজোলিউশন পাঠানো হয়েছিল। কমিটি কর্তৃক একটি খসড়া সংবিধান প্রণয়ন করা হয় এবং 4 নভেম্বর 1947 তারিখে গণপরিষদে জমা দেওয়া হয়। সংবিধান গৃহীত হওয়ার পূর্বে বিধানসভা দুই বছর, 11 মাস এবং 17 দিনব্যাপী পাবলিক অধিবেশনে 166 দিনের জন্য মিলিত হয়। 24 জানুয়ারী 1950 তারিখে, অনেক আলোচনা ও কিছু পরিবর্তনের পর পরিষদের 308 জন সদস্য দলিলের দুটি হাতে লেখা কপি (একটি হিন্দিতে এবং একটি ইংরেজিতে) স্বাক্ষর করেন। দুই দিন পর, ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০, এটি সমগ্র দেশে কার্যকর হয়। যেখানে ভারতের স্বাধীনতা দিবস ব্রিটিশ শাসন থেকে তার স্বাধীনতা উদযাপন করে, প্রজাতন্ত্র দিবসটি তার সংবিধান কার্যকর হওয়ার উদযাপন করে। একই দিনে, ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ ভারতের ইউনিয়নের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার প্রথম মেয়াদ শুরু করেন। নতুন সংবিধানের অন্তর্বর্তীকালীন বিধানের অধীনে গণপরিষদ ভারতের সংসদে পরিণত হয়।]
* * *
দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে খণ্ডিত গণপ্রজাতন্ত্রী আধুনিক ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ধর্মকে রক্ষা করে চলার কর্তব্যকে। আমাদের রাষ্ট্রীয় মন্ত্র ‘সত্যমেব জয়তে’ স্মরণ করিয়ে দেয় উপনিষদীয় আচার্য্য অনুসরণের শাশ্বত অবলম্বনকে। রাষ্ট্রের কর্ণধার রাষ্ট্রপতিসহ মন্ত্রীবর্গ প্রত্যেকেই ঈশ্বরের নামে শপথ গ্রহণ করে ঈশ্বরের প্রতিভূ জীবগণের কল্যাণ সাধনে ব্রতী হয়। ঈশ্বরের প্রতিনিধি স্বরূপ জাগতিক ন্যায়দণ্ডধারী বিচারকেরা ধর্মাধিকরণ নামে চিহ্নিত। বিচারালয়কে বলা হয় ধর্মস্থান।—কেন?
ভারতীয় অনুশাসনের সাম, দান, ন্যায়, দণ্ড, নীতি ও ভেদ-এর রাজধর্ম রক্ষার পবিত্র কর্তব্যে যাতে এতটুকু অন্যায়, অধর্ম প্রবেশ করতে না পারে তার জন্যই ওইসব মহাভারতীয় নীতির অনুসরণ। বিধিবৎ প্রকৃষ্ট-জাতক সৃষ্টি করে ধর্ম পালনের স্বার্থেই ওই অনুশাসনকে আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি। রাজনীতির জন-প্রতিনিধিরা পূরণ, পোষণ, প্রীতিচর্য্যার জীবনবৃদ্ধির নীতিসমূহ পালন যাতে হয় সেটা দেখবে। অসৎ নিরোধী তৎপরতার সাথে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালিত হবে। তথাপি যখন ভারতীয় শাসন সংহিতা বা সংবিধান ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ না করে, ধর্ম এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়কে এক করে ফেলে ‘ধর্ম-নিরপেক্ষতাবাদ’,––অর্থাৎ রাষ্ট্র ধর্মের অনুবর্তী নয়’-এর মতবাদকে প্রতিষ্ঠা দেয়, তখন কি মনে হয় না, আমরা জাতীয়তাবাদের আদর্শের প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েও এক পরস্পর বিরোধী আচরণ করে চলেছি !
যে নীতি-বিধি পদার্থের অস্তিত্ব রক্ষার সহায়ক তাই তো ধর্ম। পদার্থের স্বকীয়তা ধারণ করে রাখার সহায়ক যা’ তাই ধর্ম। ধর্ম পালন করলেই পদার্থ টিঁকে থাকবে, নচেৎ থাকবে না। সংসদ প্রকাশিত ইংরেজী অভিধানে ধর্মের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘It is an action, one is bound to do.’ সেই ধর্মের আবার পক্ষ আর নিরপেক্ষ কি? বেঁচে থাকার অজৈব উপকরণ বায়ু, জল, মাটি ইত্যাদির যদি ধর্ম থাকতে পারে, এবং তা’ যদি বিজ্ঞানের বইতে পাঠ্য হতে পারে, তাহলে মানুষের কি ধর্ম নেই? মনুষ্যত্ব প্রকাশের মাধ্যমেই তো মানুষ ধার্মিকতার পরিচয় দেয়। মানুষের মনুষ্যত্বের অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার নীতিবিধি-সমন্বিত ভারতের নিজস্ব সংহিতাগুলোর বিধানসমূহ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের সংহিতায় স্থান পাবে না কেন, প্রজাদের শিক্ষা দিতে পাঠ্য করা হবে না কেন?
‘‘প্রজা মানেই হচ্ছে—
প্রকৃষ্টরূপে জাত—
সর্ব্বসম্ভাব্য উদ্বর্দ্ধনী সার্থকতায় ;
আর প্রকৃষ্ট জন্ম পেতে হলেই চাই—
প্রজনন পরিশুদ্ধি—
সর্ব্ব-সম্ভাব্যতার বৈধানিক সংস্থিতিতে. …. ’’
(‘সম্বিতী’ গ্রন্থ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী)
প্রজা কথাটি আসিয়াছে প্র-পূর্ব্বক জন্-ধাতু হইতে। প্র মানে perfectly, আর জন্ ধাতু মানে to grow. তাই বলা হইয়াছে “প্রজা কথায় আছে–to grow perfectly instinct with life.” (Nana-Prasange, 2nd part, page 50)
যে জনগণ বা প্রজারা মানুষের সেবা করার অধিকার পেতে ভোটে জেতার জন্য বুথ দখল করে, ছাপ্পা ভোট দেয়, ব্যালট চুরি করে, ব্যালটবক্স চুরি করে, ভোটারদের হুমকি দেয়, প্রার্থীকে মারধোর করে, আশ্রয়হীন করে, বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, হত্যা পর্যন্ত করতে কুণ্ঠিত হয় না!—তারা কি ধরণের প্রজা ? তারা জন-প্রতিনিধি হয়ে জনগণের কি ধরণের সেবা করবে ?—এ বিষয়ে ভাবনা করার সময় কি হয়নি!
প্রকৃষ্ট জাতক বা প্রজার জন্মদাত্রী হচ্ছে নারী। সেই নারী যদি ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টিতে পূজ্যা মাকালী, মাদুর্গা, দেবী লক্ষ্মী, দেবী সরস্বতীর ন্যায় শুদ্ধ, বুদ্ধ, পবিত্রতায় সমৃদ্ধ না হয়ে প্রবৃত্তি-প্ররোচিত চলনে অভ্যস্ত হয়, তাহলে প্রকৃষ্ট জাতক বা প্রজা সৃষ্টি কিভাবে সম্ভব হবে? রাষ্ট্র-নেতাদের এ বিষয়ে দৃষ্টিপাত করার কি প্রয়োজন নেই? তারা যদি নজর দিতেন টিভি, সিনেমা, ইণ্টারনেটের মাধ্যমে দর্শকাম, শ্রুতকাম বারতা প্রচারিত হয়ে অবৈধ স্পর্শকামে পরিণতি লাভ করতে পারত না। প্রজা সৃষ্টির মূল আধান দূষিত হতে পারত না।
রাষ্ট্র-নেতারা প্রবৃত্তি-পোষণী নারী-স্বাধীনতার নামে ওই মুখ্য বিষয়ে গুরুত্ব না দিলেও যুগ-পুরুষোত্তমের দিব্যদৃষ্টি থেকে এই মূল বিষয়টাও কিন্তু এড়িয়ে যেতে পারে নি।
এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর সুস্পষ্ট মতবাদ প্রকাশ করে গেছেন।
“দেশের অবনতির
প্রথম পদক্ষেপই হ’চ্ছে—
মেয়েদের উচ্ছৃঙ্খলতা,
পারিবারিক সঙ্গতির প্রতি
বিদ্রূপাত্মক অবহেলা,—
যা’ দেশের শুভদৃষ্টিটাও
ভেঙ্গেচুরে চুরমার করে
সর্ব্বনাশকে আমন্ত্রণ ক’রে থাকে;
তাই বলি,
মেয়েরা যেন
তাদের পবিত্রতা হ’তে
এতটুকুও স্খলিত না হয়,
ব্যবস্থা ও বিধানগুলি
এমনতরই বিনায়িত করে
তাদের ভিতর সঞ্চারিত করে তোল;
তুমি যদি দেশের স্বস্তিকামীই হও—
এদিক থেকে
তোমার দৃষ্টি ও কৃতিচর্য্যার
একটুও অবহেলা যেন না থাকে,
স্বস্তিই হ’চ্ছে
শান্তির শুভ আশীর্ব্বাদ,
আর, স্বস্তি মানেই হ’চ্ছে
সু-অস্তি—
ভাল থাকা।”
(বিধান-বিনায়ক, বাণী সংখ্যা ৩৭৩)
* * *
মূণ্ডক উপনিষদের পবিত্র মন্ত্র ‘সত্যমেব জয়তে’-এর আদর্শকে সম্বল করে ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দের ১৫ই আগস্ট গণ প্রজাতন্ত্রী ভারতবর্ষের যাত্রা সুরু হলেও ‘‘Of the people, by the people, for the people—জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন।’’-এর লক্ষ্যে রচিত কতগুলো বিধিবদ্ধ নিয়ম, শাসন সংহিতা বা সংবিধান ১৯৫০ খ্রীস্টাব্দের ২৬শে জানুয়ারী স্বীকৃতি লাভ করে, যে দিনটাকে ‘প্রজাতন্ত্র দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।
প্রজা শব্দের অর্থ প্রকৃষ্ট জাতক। আর তন্ত্র মানে কতগুলো বিধিবদ্ধ নিয়ম বা system। প্রজাতন্ত্রের মর্মার্থ হচ্ছে, যে তন্ত্র বা system মেনে আদর্শ প্রজা নির্মাণ, পালন, পোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে রাষ্ট্রের সংহতি রক্ষায় প্রযত্নশীল থেকে পরম রাষ্ট্রিক সমবায়ের লক্ষ্যে এগিয়ে চলা যায়। ভারতের ব্রহ্মসূত্র, মহাকাব্য, বেদ, উপনিষদ, সংহিতা, আদর্শপুরুষ শ্রীরামচন্দ্র ও শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ বলে যা কিছু বর্তমান,—সবকিছুই ওই ‘সত্যমেব জয়তে’-এর আদর্শের উপরেই প্রতিষ্ঠিত।
সত্য মানে অস্তিত্ব। যার অস্তিত্ব আছে যার বিকাশ আছে তাই সত্য (real)। ঋষি প্রদর্শিত এই সত্যের পথই আর্য্য ভারতবর্ষের মূলধন। আমাদের আদর্শ ছিল– ‘আত্মানং বিদ্ধি’, নিজেকে জানো, know thyself, ‘আত্মবৎ সর্বভূতেষু, মাতৃবৎ পরদারেষু, লোষ্ট্রবৎ পরদ্রব্যেষু।’ সকলকে নিজসত্তার প্রতীক মনে কর, মেয়েদের নিজের মায়ের প্রতিরূপ ভেবে শ্রদ্ধা কর, অন্যের জিনিসকে মাটির ঢেলার মত দ্যাখ। ‘মা গৃধ’, লোভ কর না। তথাপি ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের প্রজাগণ, নেতা-মন্ত্রী-জনপ্রতিনিধিগণ কেন সত্যভ্রষ্ট হচ্ছে, ভেবে দেখার প্রয়োজন নেই? নির্বাচনের নামে প্রহসন, উপ-নির্বাচনের নামে অযথা অর্থের অপব্যয় কি চলতেই থাকবে? প্রজাতন্ত্রের আঁতুড়ঘরটাই যদি অসত্যের সংক্রমণে সংক্রামিত হয়ে পড়ে তাহলে প্রজারা সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাবে কোন্ প্রতিষেধকে?—সত্যের পূজারীদের ভেবে দেখার কি কোন প্রয়োজন নেই? এই বিষয়টাকেও উপেক্ষা করেন নি শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। তিনি বিধান-বিনায়ক গ্রন্থের বাণীতে বলছেন—
“যখনই দেখবে—
শাসকমণ্ডলী ও প্রতিষ্ঠাবান ব্যক্তিরা
সৎ-এর পীড়নে
দুষ্কৃতকারীদের সাহায্য করতে ব্যগ্র,
এবং তাদের উদ্ধত ক’রে তুলবার
সরঞ্জাম সরবরাহে ব্যাপৃত—
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে,—
বুঝে নিও—
সেই দেশ
সেই জনপদ
সেই সাম্রাজ্য
অধঃপাতের দিকে ক্ষিপ্র চলৎশীল; … (সংক্ষিপ্ত)”
* * *
ব্রহ্মসূত্র থেকে জাত ভারতের নিজস্ব সংবিধান কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে।
‘‘সুখস্য মূলম্ ধর্মম্,
ধর্মস্য মূলম্ রাষ্ট্রম্,
রাষ্ট্রস্য মূলম্ অর্থম্,
অর্থস্য মূলম্ ইন্দ্রিয়-বিজয়ম্,
ইন্দ্রিয়-বিজয়স্য মূলম্ জ্ঞানবৃদ্ধসেবয়া,
জ্ঞানবৃদ্ধসেবয়া বিজ্ঞানম্।।”
অর্থাৎ সুখী হতে হলে ধর্ম পালন করতে হবে। প্রকৃত ধার্মিক হতে হলে পুরুষার্থের চতুর্বর্গ সমন্বিত আশ্রমধর্ম (বর্ণাশ্রম এবং চতুরাশ্রম) পালন করতে হবে। সঠিকভাবে আশ্রমধর্ম পালন করার স্বার্থে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী প্রজাদের দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী হবার জন্য গুরু গ্রহণ করতে হবে। গুরুর আদেশ-নিদেশ পালন করলে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করা যাবে। তবেই জীবনে সুখী হওয়া যাবে। এই হলো ভারতবর্ষের সনাতনী ধর্মের মূল কথা।
ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টি অনুসারে, ‘‘যেনাত্মন্ স্তথান্যেষাং জীবনংবর্দ্ধাঞ্চপি ধ্রীয়তে য স ধর্ম্মঃ।’’ অর্থাৎ, অন্যের বাঁচা এবং বৃদ্ধি পাওয়াকে অক্ষুন্ন রেখে, মানুষ বাঁচার জন্য, বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য যা’ যা’ করে, তাই ধর্ম। ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। ধর্ম আচরণের মাধ্যমে পালন করার জিনিস, অনুভব করার জিনিস, যা’তে প্রতিটি সত্তা তার অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করতে পারে, তার অনুশীলন করা। অথচ বাস্তব চিত্রটার সাথে মেলানো যাচ্ছে না ধর্মকে। বর্তমানে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্মের নামে চলছে বাহ্যপূজা, পৌত্তলিকতার প্রকাশ, হৈ-চৈ, প্রকাশ্যে প্রাণীহত্যা, পরিবেশ-দূষণ, রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায়। রাস্তা আটক করে, চাঁদার জুলুম করে, জনজীবন বিপর্যস্ত করে, তারস্বরে মাইক বাজিয়ে, বাজি ফাটিয়ে, অবধ্য, নিরীহ প্রাণীদের হত্যা করে ধর্ম উদযাপন করার বিধি কোন মহাপুরুষ, কোন সাধক, কোন নবী, কোন ঋষি, প্রবর্তন করেছেন কি? যদি না করে থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রের কর্তব্য সব সম্প্রদায়কে প্রকৃত ধর্ম পালনে উৎসাহিত করা। ধর্মের নামে বিধি-বহির্ভূত অসদাচারের অনুষ্ঠানের উদযাপনকে কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা।
ওইসব বিধি, নিয়ম বা সংবিধান পালন করে প্রকৃষ্ট জাতক বা প্রজা সৃষ্টির প্রবহমানতাকে রক্ষা করে চলাই ছিল আর্য্য ভারতের আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্য।
রাষ্ট্রের সৃষ্টিই তো প্রজাদের অধর্ম বা দুর্নীতি থেকে মুক্ত করে ধার্মিক, অর্থাৎ সু-নীতি পরায়ণ করে তোলার জন্য। সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দলগুলো যদি ওই মহান কর্তব্য ভুলে তার প্রজাবর্গকে, তাদের পিতৃ-পিতামহের আদর্শ অনুসারী ধর্ম-পরায়ণ, কৃষ্টি-পরায়ণ হতে উৎসাহ না দিয়ে, প্রবৃত্তি-পরায়ণতায় উৎসাহ দেয়, সেটা ভারতবর্ষের জাতীয় উত্তরাধিকারত্বের অস্তিত্বকে বিপন্ন করার বার্তা ভিন্ন আর কিছু নয়। প্রজাতন্ত্রের প্রবহমানতাকে রক্ষা করতে হলে মহানগরের প্রসার করার পূর্বে মহান নাগরিক (প্রকৃষ্ট জাতক/প্রজা/জনগণ) সৃষ্টি করার উপর সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিতে হবে।—যেমনভাবে প্রকৃষ্ট জাতের কৃষি উৎপাদন, প্রকৃষ্ট জাতের গোরু, কুকুর ইত্যাদি উৎপাদনে গুরুত্ব আরোপ করে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ। ওই পদ্ধতি অবলম্বন ব্যতিত মানবিক চরিত্রের অবক্ষয় প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না।
প্রসঙ্গ : রামমন্দিরের প্রাণ প্রতিষ্ঠা ও গণপ্রজাতন্ত্রী ভারতবর্ষের ভবিষ্যত।
নিবেদনে—তপন দাস
*****************************************
২০২৪ খ্রীস্টাব্দের ২২শে জানুয়ারি তারিখটি এক ঐতিহাসিক দিন হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকবে ভারতের ইতিহাসের কালাধারে। অবশেষে সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে বহুদিনের প্রতীক্ষিত রাম মন্দিরের প্রাণ প্রতিষ্ঠার মাহেন্দ্রক্ষণ সমাগত। মর্যাদা পুরুষোত্তম রামচন্দ্রের আদর্শে বিশ্বাসী অনুগামীদের মিলনস্থলের কেন্দ্র স্বরূপ এই রামমন্দির। অচেতন, পদার্থে নির্মিত মন্দির প্রাঙ্গনে সমবেত হবেন চেতনাসম্পন্ন মানুষেরা, সচ্চিদানন্দ-বিগ্রহের অধিকারী মানুষেরা তাদের দেহমনকে মর্যাদা পুরুষোত্তম রামচন্দ্রের পূত-পবিত্র আদর্শের অনুসরণে প্রবৃত্তিজাত লোভ-কাম-ক্রোধাদি ষড়রিপুকে বশ করে নিজ-নিজ দেহমন্দিরকে বিনির্মাণ করে সত্তাশ্রয়ী চলনে অভ্যস্ত হবেন। মর্যাদা পুরুষোত্তম রামচন্দ্রের ন্যায় অসৎনিরোধে তৎপর হবেন। ভারতবর্ষে আবার পুণঃ প্রতিষ্ঠা পাবে রামরাজত্ব। যে রামরাজত্বের ক্যাবিনেট চালাতেন বশিষ্ঠাদি স্থিতপ্রজ্ঞ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ঋষিগণ। বর্ণাশ্রম, চতুরাশ্রম, দশবিধ সংস্কার আদর্শের অনুসরণে—ভারতবর্ষে যা’ ‘ঋষিবাদ’ (ঋষিদের দ্বারা প্রবর্তিত অনুশাসনবাদ।) নামে প্রতিষ্ঠিত। ঋষিবাদের মূল সংবিধানের নাম ‘ব্রহ্মসূত্র’।
ব্রহ্মসূত্র-এর ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে বেদ, উপনিষদ, অষ্টাদশ সংহিতা। ব্রহ্মসূত্র থেকে জাত ভারতের নিজস্ব সংবিধান কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে। ‘‘সুখস্য মূলম্ ধর্মম্, ধর্মস্য মূলম্ রাষ্ট্রম্, রাষ্ট্রস্য মূলম্ অর্থম্, অর্থস্য মূলম্ ইন্দ্রিয়-বিজয়ম্, ইন্দ্রিয়-বিজয়স্য মূলম্ জ্ঞানবৃদ্ধসেবয়া, জ্ঞানবৃদ্ধসেবয়া বিজ্ঞানম্।।” অর্থাৎ সুখী হতে হলে ধর্ম পালন করতে হবে। প্রকৃত ধার্মিক হতে হলে পুরুষার্থের চতুর্বর্গ সমন্বিত আশ্রমধর্ম (বর্ণাশ্রম এবং চতুরাশ্রম) পালন করতে হবে। সঠিকভাবে আশ্রমধর্ম পালন করার স্বার্থে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী প্রজাদের দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী হবার জন্য গুরু গ্রহণ করতে হবে। গুরুর আদেশ-নিদেশ পালন করলে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করা যাবে। তবেই জীবনে সুখী হওয়া যাবে। এই হলো ভারতবর্ষের সনাতনী ধর্মের মূল কথা। ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টি অনুসারে, ‘‘যেনাত্মন্ স্তথান্যেষাং জীবনংবর্দ্ধাঞ্চপি ধ্রীয়তে য স ধর্ম্মঃ।’’ অর্থাৎ, অন্যের বাঁচা এবং বৃদ্ধি পাওয়াকে অক্ষুন্ন রেখে, মানুষ বাঁচার জন্য, বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য যা’ যা’ করে, তাই ধর্ম। ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। ধর্ম আচরণের মাধ্যমে পালন করার জিনিস, অনুভব করার জিনিস, যা’তে প্রতিটি সত্তা তার অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করতে পারে, তার অনুশীলন করা। অথচ বাস্তব চিত্রটার সাথে মেলানো যাচ্ছে না ধর্মকে। বর্তমানে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্মের নামে চলছে বাহ্যপূজা, পৌত্তলিকতার প্রকাশ, হৈ-চৈ, প্রকাশ্যে প্রাণীহত্যা, পরিবেশ-দূষণ, রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায়। রাস্তা আটক করে, চাঁদার জুলুম করে, জনজীবন বিপর্যস্ত করে, তারস্বরে মাইক বাজিয়ে, বাজি ফাটিয়ে, অবধ্য, নিরীহ প্রাণীদের হত্যা করে ধর্ম উদযাপন করার বিধি কোন মহাপুরুষ, কোন সাধক, কোন নবী, কোন ঋষি, প্রবর্তন করেছেন কি? যদি না করে থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রের কর্তব্য সব সম্প্রদায়কে প্রকৃত ধর্ম পালনে উৎসাহিত করা। ধর্মের নামে বিধি-বহির্ভূত অসদাচারের অনুষ্ঠানের উদযাপনকে কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা যদি না যায় মর্যাদা পুরুষোত্তম রামচন্দ্রের আদর্শের অসম্মান করা হবে।
* * *
ঋষি বশিষ্ঠ সৌম্যাবতার রামচন্দ্রকে পুরুষোত্তমরূপে চিনতে পেরে রামচন্দ্রকে ঋষিদেরও ঋষি বলে মান্যতা দেন। ঋষিদের সিদ্ধান্তে তখন থেকে পুরুষোত্তমকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয় নব্য-ঋষিবাদ বা পুরুষোত্তমবাদ। যখন যিনি পুরুষোত্তমরূপে অবতীর্ণ হন, তিনিই তখন জীবন্ত বেদ, সংহিতা, পুরাণ। ওই সূত্র অনুসারে রামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীস্ট, হজরত রসুল, চৈতন্যদেব, শ্রীরামকৃষ্ণদেব সকল গুরুদের গুরু সদগুরুরূপে স্বীকৃতি পান। অর্থাৎ স্থান-কাল-পরিবেশ অনুযায়ী যখন যিনি যেখানেই অবতীর্ণ হন না কেন, তাঁর মধ্যে পূর্ব পূর্ব গুরুদের জীবন্ত অনুভব করা যাবে। পূর্ববর্তীদের প্রকৃত আদর্শ খুঁজে পাওয়া যাবে। যাকে আমরা বর্তমানের সফটওয়ারের ভাষায়, অ্যাপ্লিকেশন বা অ্যাপস্-এর ভাষায় আপডেট বলি। অ্যাপ্লিকেশনের সূত্রপাত থেকে শুরু করে সর্বশেষ সংস্করণের নবীকরণের তথ্য মজুত থাকে। আমি যদি আমার মোবাইলের অ্যাপ্লিকেশনগুলো আপডেট না করি তাহলে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারব না। যারা আপডেটেড্, তারাই লক্-ডাউনের সময় অন-লাইন কাজকর্ম করে অনেক কিছু সামাল দিতে পেরেছেন। সবকিছু সামাল দিতে গেলে আপডেটেড হতে হবে সবক্ষেত্রে। ব্যাকডেটেড থেকে কিছু সামাল দেওয়া যায় না। অথচ আমরা অজ্ঞতাবশে নিজেদের ধারণ করার প্রশ্নে, অর্থাৎ ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে ব্যাকডেটেড হয়ে আছি। তাই তো বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনকূলচন্দ্র আমাদের সচেতন করে দিতে বললেন—“ভারতের অবনতি (degeneration) তখন-থেকেই আরম্ভ হয়েছে, যখন-থেকে ভারতবাসীর কাছে অমূর্ত্ত ভগবান অসীম হ’য়ে উঠেছে—ঋষি বাদ দিয়ে ঋষিবাদের উপাসনা আরম্ভ হয়েছে।
ভারত! যদি ভবিষ্যৎ-কল্যাণকে আবাহন করতে চাও, তবে সম্প্রদায়গত বিরোধ ভুলে জগতের পূর্ব্ব-পূর্ব্ব গুরুদের প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হও—আর তোমার মূর্ত্ত ও জীবন্ত গুরু বা ভগবানে আসক্ত (attached) হও,—আর তাদেরই স্বীকার কর—যারা তাঁকে ভালবাসে। কারণ, পূর্ব্ববর্তীকে অধিকার করিয়াই পরবর্ত্তীর আবির্ভাব।” (সত্যানুসরণ)
কথাপ্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন—“বর্ত্তমান যিনি, তাঁকে ধরলেই তাঁর মধ্যে সব পাওয়া যায়। ………. রামচন্দ্রকে যে ভালবাসে সে যদি শ্রীকৃষ্ণকে না ধরে তবে বুঝতে হবে তার রামচন্দ্রেও ভালবাসা নেই, ভালবাসা আছে তার নিজস্ব সংস্কারে। (আঃ প্রঃ ২১ খণ্ড, ইং তাং ৩১-১২-১৯৫২)
যারা ভারতের ভবিষ্যত কল্যাণকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়ে রামমন্দিরে প্রাণ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়েছেন তাঁদের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে বিনীত নিবেদন, তারা যদি বাস্তব কর্মে রামচন্দ্রের আদর্শ প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হন তাহলে আর ধর্মের নামে শাস্ত্রবর্ণিত অধমাধম বাহ্যপূজা নিয়ে মাতামাতি বন্ধ হয়ে যাবে। ডিজে বাজিয়ে আধুনিক নাচন নেচে দেবদেবী-মহাপুরুষদের নাম নিয়ে তারস্বরের ধ্বনিতে চীৎকার শুনতে হবে না। তাদের ব্যবহারে রামচন্দ্রের সৌম্যভাবের চরিত্রের অসৎনিরোধী প্রতিফলন পাওয়া যাবে। তাদের চলন, গমন, ব্যবহারের পবিত্রতা দেখে তথাকথিত নাস্তিকেরাও এক-একটা চলন্ত মন্দির মনে করে মনে মনে প্রণাম করবে।
* * *
সৌম্যাবতার মর্যাদাপুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্র ছিলেন সত্যের পূজারী অথচ অসৎ নিরোধী। তৎকালীন যুগের অচ্ছুৎ অনার্য্যদের আর্য্যীকৃত করে আর্য্য-অনার্য্যদের মেলবন্ধন করলেন।অনার্য্য গুহক চণ্ডালকে করলেন মিত্র, আবার অকালমৃত্যুর দ্যোতক বর্ণাশ্রম-বিদ্বেষী প্রতিলোমাচারী বন্ধুবর শম্বুবকে দিলেন চরম শাস্তি। মায়াবী রাবণ যখন কিছুতেই সীতাকে বশে আনতে পারছিলেন না তখন সভাসদেরা রাবণকে বলেছিলেন, রামরূপ ধারণ করে গেলেই তো সীতাকে সহজেই বশীভূত করতে পারেন। উত্তরে রাবণ বলেছিলেন, ওই রূপ স্মরণ করলেই আমার সব পাপ-প্রবৃত্তি মুছে গিয়ে আমি এক অন্য মানুষ হয়ে যাই। তথাপি প্রবৃত্তির ঊর্দ্ধে উঠে ওই বোধটাকে ধরে রাখতে পারল না, ফলে রামচন্দ্রের হাতে হত হতে হল। অথচ বিভীষণ রামচন্দ্রের আদর্শে প্রলুব্ধ হয়ে রাবণকে ত্যাগ করলেন।
শুধু তাড়িত-পীড়িত মানুষদেরই নয়, প্রভু রামচন্দ্র পশুপাখিদের ভাষাও বুঝতেন। তাই তারাও প্রভু রামচন্দ্রের কাছে সুবিধা-অসুবিধার কথা জানাতে পারতেন। রাম-রাজত্বে পশু-পাখিরাও সুখে-শান্তিতে বাস করতেন। ওই নিয়মের ব্যত্যয় হবার ফলে, সেই রাম রাজত্বের সময় একটা কুকুর এসেছিল মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রের কাছে বিচারপ্রার্থী হয়ে। সভায় উপস্থিত ছিলেন ভৃগু, আঙ্গিরস, কুৎস, কাশ্যপ, বশিষ্ঠ প্রমুখ সভাসদগণ। কুকুরের অভিযোগ শুনে, বিচার প্রেক্ষিতে সভাসদদের সম্বোধন করে শ্রীরামচন্দ্র বলেছিলেনঃ
न सा सभा यत्र न सन्ति वृद्धाः
वृद्धा न ते ये न वदन्ति धर्मम् ।
नासौ धर्मो यत्र न सत्यमन्ति
न तत् सत्यं यच्छलेनानुविद्धम् ।।
(Ye sabhai briddha nei ta sabha e noi. Yara dharmmasamgata kotha bolena tara briddha noi. yate satya nei ta dharmma noi, yate chhol aachhe ta satya noi.
—যে সভায় বৃদ্ধ নেই তা সভাই নয়। যারা ধর্মসঙ্গত কথা বলে না তারা বৃদ্ধ নয়। যাতে সত্য নেই তা ধর্ম নয়। যাতে ছল আছে তা সত্য নয়। অর্থাৎ, যেখানে ছলনা আছে, কপটতা আছে, সেখানে ধর্ম নেই।
যাইহোক, রাম-রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীরামচন্দ্র তো নয়ই, শ্রীরামচন্দ্রের পিতা রাজা দশরথও কোনদিন ছলনার আশ্রয় গ্রহণ করেন নি। তাঁরই রাজত্বে লোকালয় থেকে দূরে, সরযূ নদীর তীরে কুটির বেধেছিলেন বৈশ্য কুলোদ্ভব অন্ধমুনি, শূদ্রা অন্ধ স্ত্রীকে নিয়ে। তাদের একমাত্র চক্ষুষ্মান সন্তান যজ্ঞদত্ত বা সিন্ধুমুনি গোধূলি বেলায় জল আনতে গেছেন সরযূ নদী থেকে। এক মত্তহাতীর উপদ্রব থেকে প্রজাদের রক্ষা করার মানসে মৃগয়ায় গেছেন রাজা দশরথ। তাঁর ঈপ্সিত মত্তহাতীর উদ্দেশ্যে শব্দভেদী বাণ ছোঁড়েন। বাণে বিদ্ধ হয় কলসীতে জল ভরতে থাকা সিন্ধুমুনি।
কলসীতে জল-ভরার অনু-কার শব্দের সাথে হাতীর জলপান করার অনু-কার শব্দের হুবহু মিল রয়েছে। যারফলে অনধাবনতা বশতঃ এক মারাত্মক ভুল করে ফেলেছিলেন রাজা দশরথ। বাণবিদ্ধ যন্ত্রণাকাতর সিন্ধুমুনির আর্তনাদে তাঁর ভুল ভাঙে। সিন্ধুমুনির অনুরোধে বিদ্ধ বানটাকে খুলে নিলে সিন্ধুমুনি মারা যান। রাজা দশরথ জলপূর্ণ কলসী সাথে নিয়ে অন্ধমুনির কুটিরে যান। অকপটে স্বীকার করেন সব অপরাধের কথা। সদ্য সন্তানহারা অন্ধ দম্পতিকে আজীবন পিতৃ-মাতৃ জ্ঞানে রক্ষণাবেক্ষণ করে ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন। সিন্ধু মুনির অন্ত্যেষ্টিও করেন তিনি। তথাপি রাজা দশরথকে অভিশাপ দিয়ে পুত্রশোকে সহধর্মিনীসহ দেহত্যাগ করেন অন্ধমুনি। সেই অভিশাপেই পুত্র শোকেই রাজা দশরথের অকালমৃত্যু হয়েছিল। এই হচ্ছে ভারতবর্ষের ধর্ম পালনের উদাহরণ।
নির্জন স্থান। প্রত্যক্ষদর্শী কেউ ছিল না। সাক্ষী দেবারও কেউ ছিল না। রাজা দশরথ যদি কপটাচারী হতেন, ছলনার আশ্রয় নিতেন, অনায়াসেই সিন্ধুমুনির বিপন্ন-অস্তিত্বের প্রাণহীন দেহটাকে ফেলে রেখে চলে যেতে পারতেন। গায়ে পড়ে অভিশাপও কুড়োতে হতো না। কিন্তু পারেন নি সত্যের জন্য, বিবেকের জন্য, বিবেকের দংশন থেকে মুক্তি পাবার জন্য। তাই, মনের অনুগমন না করে বিবেককে অবলম্বন করে চলার নামই ধর্মপথে চলা। ধর্মের সাথে অস্তিত্বের সম্পর্ক, অস্তিত্বকে ধারণ করে রাখার সম্পর্ক।
মাননীয় নরেন্দ্র মোদিজীর নেতৃত্বাধীন বর্তমানের বিজেপি সরকার ধর্মের নামে, ‘জয় শ্রীরাম’ শ্লোগানকে আঁকড়ে বিপুল জন সমর্থন পেয়েছেন। মর্যাদা পুরুষোত্তম রামচন্দ্রের আদর্শে বিশ্বাসী ভারতের নির্বাচকগণ ‘রাম-রাজত্বের’ ন্যায় এক স্বচ্ছ, নির্মল শাসনতন্ত্রের আশায় ভোট দান করেছেন। অতএব রামচন্দ্রের নাম-মাহাত্ম্যের জোরে যে শাসনতন্ত্রের অধিকার অর্জন করেছেন যে জন-প্রতিনিধিরা, তাদের ক্যাবিনেট যদি রামচন্দ্রের গুরু ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠের আদর্শের আলোকে আলোকিত না হয়,—সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হয়,—জন-প্রতিনিধিগণ যদি রাম-রাজত্বের পরিপন্থী বিলাস-ব্যসন ত্যাগ করে, আত্ম-প্রতিষ্ঠার মোহ ত্যাগ করে, সাত্ত্বিক-চলনে সাধারণভাবে চলতে অভ্যস্ত না হয়,—তাঁরা কখনোই ঈপ্সিত রাম-রাজত্ব ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
বনবাসে থাকার সময় রামচন্দ্র ভরতকে রাজকার্য পরিচালনা বিষয়ে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন—“….. তুমি গুণী ও যোগ্য ব্যক্তিকে বহু-মান প্রদর্শন করে থাক তো? বীর, বিদ্বান, জিতেন্দ্রিয়, সদ্বংশজ, ইঙ্গিতজ্ঞ লোকদের মন্ত্রীপদে প্রতিষ্ঠিত করেছ তো? তুমি তাদের সঙ্গে মন্ত্রণা কর তো? তোমাদের মন্ত্রণা লোকের মধ্যে প্রকাশ হয়ে পড়ে না তো? তুমি যথাসময়ে শয্যাত্যাগ কর তো? রাত্রিশেষে অর্থলাভের চিন্তা কর তো? তুমি সহস্র মূর্খ পরিত্যাগ করেও একজন বিদ্বানকে সংগ্রহ করতে চেষ্টা কর তো? অযোগ্য লোককে যোগ্যস্থানে ও যোগ্য লোককে অযোগ্য স্থানে নিয়োগ কর না তো? যে-সব অমাত্য উৎকোচ গ্রহণ করেন না, যাদের পিতৃপুরুষ যোগ্যতার সঙ্গে অমাত্যের কাজ করেছেন, যারা ভিতরে-বাইরে পবিত্র—সেই সব শ্রেষ্ঠ অমাত্যকে শ্রেষ্ঠ কাজে নিযুক্ত করেছ তো? রাজ্যমধ্যে কোন প্রজা অযথা উৎপীড়িত হয় না তো? শত্রুকে পরাস্ত করতে পটু সাহসী, বিপৎকালে ধৈর্য্যশালী, বুদ্ধিমান, সৎকুলজাত, শুদ্ধাচারী, অনুরক্ত ব্যক্তিকে সেনাপতি করেছ তো? বিশেষ নৈপুণ্য যাদের আছে, তাদের তুমি পুরস্কৃত ও সম্মানিত করে থাক তো? প্রত্যেকের প্রাপ্য বেতন সময়মত দিয়ে থাক তো? রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তিবর্গ তোমার প্রতি অনুরক্ত আছেন তো? তোমার কার্য্যসিদ্ধির জন্য তাঁরা মিলিত হয়ে প্রাণ পর্য্যন্ত দিতে প্রস্তুত আছেন তো? বিদ্বান, প্রত্যুৎপন্নমতি, বিচক্ষণ এবং তোমার জনপদের অধিবাসীকেই দৌত্যকার্য্যে নিযুক্ত করেছ তো? স্বরাজ্যে ও পররাজ্যে প্রধান-প্রধান পদের অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের সম্বন্ধে জ্ঞাতব্য সংবাদ চরগণদ্বারা অবগত থাক তো? চরগণ পরস্পর-বিরোধী তথ্য পরিবেষণ করলে তার কারণ নির্ণয় করে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা করে থাক তো? প্রজাগণ সুখে আছে তো? তারা দিন-দিন স্ব-স্ব কর্ম করে সমৃদ্ধ হচ্ছে তো? তোমার আয় বেশী, ব্যয় কম হচ্ছে তো? ধনাগার অর্থশূন্য হচ্ছে না তো? অপরাধীদের ধনলোভে ছেড়ে দেওয়া হয় না তো? তুমি সাম, দান, ভেদ ও দণ্ডের প্রয়োগ যথাস্থানে করে থাক তো? তুমি ইন্দ্রিয়গণকে জয় করতে সচেষ্ট থাক তো? অগ্নি, জল, ব্যাধি, দুর্ভিক্ষ ও মড়ক এই পাঁচ রকমের দৈববিপদের প্রতিকারের জন্য তুমি যত্নশীল থাক তো? সন্ধি-বিগ্রহাদি যথাস্থানে প্রয়োগ কর তো? ? ? ইত্যাদি ইত্যাদি। (আঃ প্রঃ ৫ম খণ্ড, ইং তাং ২-৪-১৯৪৪)
উপরোক্ত বিধানগুলো রাম রাজত্বের অনুশাসনবাদ। তাই রাম-রাজত্ব প্রতিষ্ঠা-পিয়াসী জন-প্রতিনিধিদের উচিত হবে, রামচন্দ্রের সভার ন্যায় একজন আদর্শ সভাসদরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। এবং তা’ বাস্তবায়িত করতে হলে, আদর্শ প্রজাপালকের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। সরকারী কোষাগার থেকে সাধারণভাবে বেঁচে থাকার প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা যাবে না। বর্তমান শাসনতন্ত্রের পরিকাঠামো অনুযায়ী জন-প্রতিনিধিদের জন্য বরাদ্দ সুবিধা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে রাম-রাজত্ব প্রতিষ্ঠার চিন্তা অধরাই থেকে যাবে। জনগণকে স্ব স্ব আত্মমর্যাদায় সুখে রাখতে হলে জন-প্রতিনিধিগণদের বিলাস-ব্যসন সুখ-সুবিধার কথা ভুলতে হবে, নীতিপরায়ণ হতে হবে, সর্বোপরি যথার্থ ধার্মিক হতে হবে। সেদিকে দৃষ্টি দিলে তবে কাজের কাজ কিছুটা হবে।
রাম রাজত্বকে বাস্তবায়িত করতে হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর ক্যাবিনেটকে এ বিষয়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।তাহলেই সার্থক হবে মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রের মন্দিরের প্রাণ প্রতিষ্ঠা সমারোহ।
সবাই আমার প্রণাম জানবেন। জয়গুরু! বন্দে পুরুষোত্তমম্!
* * * চৈতন্যদেবের স্নেহধন্য মুরারী গুপ্ত সংস্কৃত ভাষায় যে লীলা কাহিনী রচনা করেছিলেন সেই গ্রন্থ ‘মুরারী গুপ্তের করচা’ নামে সুপ্রসিদ্ধ। মহাপ্রভুর বিশেষ স্নেহভাজন, যাঁকে তিনি ‘কবিকর্ণপুর’ আখ্যা দিয়েছিলেন তাঁর নাম ছিল পরমানন্দ। তিনি সংস্কৃত ভাষায় ‘চৈতন্যচরিতামৃতম্’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। চৈতন্যদেবের লীলাবসান পরবর্তীকালে তথ্য সংগ্রহভিত্তিক বাংলা ভাষায় ‘চৈতন্যভাগবত’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন বৃন্দাবন দাস। সমসাময়িক কালে কবি লোচন দাস ‘চৈতন্যমঙ্গল’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন। পরবর্তীকালে কবি জয়ানন্দও ‘চৈতন্যমঙ্গল’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন। ওইসব জীবনীগ্রন্থ থেকে বৃন্দাবনের গোস্বামীগণ নাকি পরিপূর্ণরূপে চৈতন্যদেবকে আস্বাদন করতে পারেন নি, তাই রূপ গোস্বামীর শিষ্য বর্ধমান জেলার ঝামটপুরের বিখ্যাত বৈদ্য, অকৃতদার কৃষ্ণদাস কবিরাজকে নতুন করে এক জীবনীগ্রন্থ রচনা করতে উদ্বুদ্ধ করলে তিনি পূর্ববর্তী জীবনীকারদের গ্রন্থ এবং অন্যান্য সংস্কৃত গ্রন্থের সাহায্য নিয়ে নয় বছর ধরে ‘শ্রীশ্রীচৈতন্য চরিতামৃত’ শিরোনামে গ্রন্থটি রচনা করেন। যে গ্রন্থটি বৈষ্ণব মহলে প্রামাণ্য রূপে স্বীকৃত হলেও সবক্ষেত্রে ঘটনাপঞ্জীর সন-তারিখ উল্লেখিত হয়নি। গবেষকগণও সকল ঘটনাপঞ্জীর সন-তারিখ নিয়ে একমত হতে পারেন নি। তাই আমিও বিভিন্ন গ্রন্থ পঠন-পাঠন ও গুগল সার্চ করা তথ্যভিত্তিক আনুমানিক সন-তারিখ উল্লেখ করেছি মাত্র। ******** নিমাই পণ্ডিত, বৈষ্ণব-পণ্ডিত বংশে জন্ম নিয়ে শিক্ষা-সংস্কৃতির পীঠস্থানের পণ্ডিত পরিবেশে বড় হয়ে উঠলেও তৎকালিন নবদ্বীপে আচার্য্য শঙ্করের মায়াবাদের সিদ্ধান্তবাগীশদের শুষ্ক জ্ঞানচর্চা, শাক্ত মতবাদের পৌত্তলিকতার পঞ্চ-ম-কারের এবং বৈষ্ণব, শৈব, কিশোরীভজা, কর্তাভজা, পরকীয়া সাধনা ইত্যাদি সহজীয়া মতবাদের উপাসনার প্রাবল্যের মধ্যে সনাতন ধর্মের প্রচারক প্রকৃত বৈষ্ণবেরা প্রায় উপেক্ষিতই ছিলেন। শাক্তরা সুযোগ পেলেই বৈষ্ণবদের নানাভাবে যাতনা দিতেন, এমনকি ধর্মের নামে পশুবলি দিয়ে পশুর মাংস বাড়িতে ফেলে আসতেন। বিষ্ণুর উপাসক বৈষ্ণবেরা নবদ্বীপের শ্রীবাস পণ্ডিতের আঙিনায় মিলিত হয়ে কীর্তন করতেন। আর শান্তিপুরের কমলাক্ষ মিশ্রের আঙিনায় বৈষ্ণবদের মিলনমেলা বসতো। বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণের উপাসক তৎকালিন বৈষ্ণব প্রধানগণ যথা, শ্রীনিবাস, শুক্লাম্বর, শ্রীমান, মুকুন্দ, বিশ্বরূপ প্রমুখ ভক্তগণ, সেকালের সাধকশ্রেষ্ঠ বৈষ্ণবাচার্য কমলাক্ষ মিশ্র (অদ্বৈত মহাপ্রভু)-এর কাছে তাদের অন্তরের বেদনার কথা বলতেন। অদ্বৈত মহাপ্রভু মথুরার গর্গাচার্যের ন্যায় সনাতন ধর্মের দীনতা থেকে ভক্তদের রক্ষা করতে গঙ্গাজল আর তুলসীমঞ্জুরির নিত্য সেবায় শ্রীকৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা জানাতেন। পণ্ডিতদের মতে মূলতঃ অদ্বৈত মহাপ্রভুর আরাধনায় শ্রীবিষ্ণু শুদ্ধাত্মা শচীদেবীর মাধ্যমে নিমাই রূপে ধরাধামে অবতীর্ণ হন। ****** বালক নিমাইয়ের চপলতা এবং তীক্ষ্ণ পাণ্ডিত্যের কাছে ম্লাণ হতে সুরু করে তার্কিক পণ্ডিতদের, শাক্ত পণ্ডিতদের, (অ)বৈষ্ণব পণ্ডিতদের ভ্রান্ত ধারণার পাণ্ডিত্য। তাঁদের দেখলেই শাস্ত্রের ধাঁধাঁ আর ব্যাকরণের ফাঁকি জিগ্যেস করতেন। একদিন ‘‘ওঁ সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম’’—মতবাদের তার্কিক পণ্ডিতকে শিক্ষা দিতে তার ভাতে প্রস্রাব করে দেন নিমাই, পণ্ডিত রেগে গিয়ে মারতে এলে নিমাই বলেন, আমার চপলতার জন্য দু’-ঘা মারবেন না হয়, তবুও আমি করজোড়ে বলছি, ব্রহ্মময় জগতে সবই যদি ব্রহ্ম, তবে আপনার ভাতে, আর আমার মুতে ব্রহ্ম কি নেই ! আপনার বিচারে ভাতের ব্রহ্ম আর মুতের ব্রহ্ম কি আলাদা? আলাদাই যদি হয়ে থাকে তাহলে আর আজ থেকে আপনার ওই সিদ্ধান্ত বদলে ফেলতে হবে। তবে আমার বুঝ মতে, ব্রহ্ম কারণ, জীব কার্য। ব্রহ্ম পূর্ণ, জীব অংশ। ব্রহ্ম উপাস্য, জীব উপাসক। ব্রহ্ম আর জীব সত্তায় অভেদ, স্বাদে পৃথক। ব্রহ্মবিজ্ঞতা নিমাইয়ের মুখ থেকে ব্রহ্মকথা শুনে পণ্ডিত তখন বুঝতে পারেন ব্রহ্মের বিশিষ্টতা, বিশিষ্ট অদ্বৈতবাদের তত্ত্ব।
* * * কিশোর নিমাই যখন টোলে ছাত্র পড়াতেন, সেই সময় কাশ্মীরের বিখ্যাত পণ্ডিত কেশবাচার্য দিগ্বিজয় করতে বেড়িয়ে ভারতের সব বিখ্যাত পণ্ডিতদের তর্কযুদ্ধে পরাজিত করে অনেক শিষ্য ও বাহনসহ নবদ্বীপে আসেন। নবদ্বীপের স্মার্ত্ত-পণ্ডিতগণ সুযোগ বুঝে নিমাই পণ্ডিতকে জব্দ করতে পণ্ডিত কেশবাচার্যকে নিমাইয়ের কাছে পাঠান। নিমাইয়ের কাছে গিয়ে কেশবাচার্য বলেন, তুমিই বুঝি নিমাই পণ্ডিত? নিমাই যথোচিত মর্যাদার সাথে প্রণাম জানিয়ে বলেন, আজ্ঞে, লোকেরা বলেন, কিন্তু আমি নিজেকে পণ্ডিত মনে করি না, শিষ্যদের কিছু পাঠদান করার চেষ্টা করি মাত্র। —তা’ কি পড়াও? —কলাপ। —‘কলাপ’! ও তো শিশুপাঠ্য! —ওই শিশুপাঠ্যই সঠিক পড়াতে পারছি কি-না, জানি না। —তাহলে তো আর তোমার সাথে তর্ক করা চলে না! —শুনেছি আপনি ভারত বিখ্যাত পণ্ডিত, আপনার সাথে তর্ক করার স্পর্দ্ধা যেন না হয়। শুনেছি আপনি সরস্বতী-মাতার বরপুত্র। মুখে মুখে শ্লোক রচনা করেন। অনুগ্রহ করে যদি কিছু নিবেদন করেন, শুনে ধন্য হতাম। —বলো, কি শুনতে চাও? —সুরধনী গঙ্গার পবিত্র ধারা বয়ে চলেছে, সে বিষয়ে যদি কিছু নিবেদন করেন। নিমাই বিনীতভাবে বলেন। পণ্ডিত কেশবাচার্য তৎক্ষণাৎ শত-শ্লোক রচনা দ্বারা গঙ্গার বন্দনা করে গর্বভরে নিমাইকে জিগ্যেস করেন, কি হে নিমাই পণ্ডিত! এতক্ষণ ধরে গঙ্গার মহিমা যা’ বর্ণনা করলাম, কিছু বুঝলে? নিমাই বিনীতভাবে বললেন, আপনার রচনার অর্থ আপনি না বোঝালে বোঝে কার সাধ্য? নিমাইয়ের বিনীত ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে কেশবাচার্য বলেন, বলো, কোন্ শ্লোকটা বুঝতে চাও? নিমাই কেশবাচার্য পণ্ডিতের তাৎক্ষণিক রচনা থেকে— ‘‘মহত্ত্বং গঙ্গায়াঃ সততমিদমাভাতি নিতরাং, যদেষা শ্রীবিষ্ণোশ্চরণকমলোৎপত্তিসুভগা। দ্বিতীয় শ্রীলক্ষ্মীরিব সুরনরৈরর্চ্চ্যচরণা, ভবানীভর্ত্তুর্ষা শিরসি বিভবত্যদ্ভুতগুণা॥’’ (চৈঃ চঃ আদিলীলা, পৃঃ ১২৬) শ্লোকটি আবৃত্তি করে তার ভাবার্থ জানতে চাইলে পণ্ডিত কেশবাচার্য আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন, প্রায় ঝড়ের গতিতে বলা শ্লোক থেকে তুমি এই একটি শ্লোক কণ্ঠস্থ করলে কিভাবে? নিমাই বিনীতভাবে বলেন, আপনি দৈববলে যেমন মাতা সরস্বতীর বরপুত্র, কবি, আমিও তেমনি একজন শ্রুতিধর। নিমাইয়ের উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে কেশবাচার্য বলেন, তাহলে শোন, এই শ্লোকের ভাবার্থ হচ্ছে—‘‘গঙ্গা, শ্রীবিষ্ণুর চরণকমল থেকে উৎপন্ন হওয়ার কারণে সৌভাগ্যবতী। দ্বিতীয়া শ্রীলক্ষ্মীর ন্যায় দেব ও মানবেরা যাঁর চরণ-পূজায় রত এবং যিনি ভবানীপতি মহাদেবের মস্তকে বিরাজমানা হওয়ার জন্য অদ্ভুত গুণশালিনী হয়েছেন, সেই গঙ্গার এই মহত্ত্ব সর্বদাই নিশ্চিতরূপে প্রত্যক্ষীভূত হয়ে আছে।—বলো, আর কি জানতে চাও?’’ —এবার শ্লোকের দোষ-গুণ বলুন। —বেদসদৃশ গুণসম্পন্ন অনুপ্রাসযুক্ত উপমারূপ শ্লোকে কোন দোষ নেই, সম্পূর্ণ নির্দোষ। তোমার ব্যাকরণের অলঙ্কার জ্ঞান থাকলে তো তুমি দোষ-গুণ বুঝবে? —যথার্থই বলেছেন। আমি অলঙ্কার না পড়লেও শুনেছি তো, তা’ থেকেই মনে হচ্ছে আপনার শ্লোক দোষযুক্ত। —তোমার স্পর্দ্ধা তো কম নয়! ‘কলাপ’ আর ‘ফাঁকি’ পড়া বিদ্যা দিয়ে তুমি আমার শ্লোকের দোষ ধরতে চাও? —প্রভু, আপনি আমার প্রতি রুষ্ট হবেন না, আমার ন্যায় অর্বাচীন কি আপনার রোষের উপযুক্ত? মার্জনা করবেন, আমি কিন্ত্তু আপনার রচনায় ৫টি দোষ খুঁজে পেয়েছি, যদি অনুমতি করেন, তাহলে এক-এক করে বর্ণনা করি। শিষ্যসামন্ত, স্থানীয় বিদ্বজ্জনের সামনে এমন কথা কেউ যে কোনদিন বলবে ভাবতেই পারেন নি কেশবাচার্য, তথাপি তর্কশাস্ত্রের নিয়ম মেনে নিমাইকে বলার জন্য অনুমতি দিলে নিমাই বলেন—- পঞ্চ দোষ এই শ্লোকে পঞ্চ অলঙ্কার। ক্রমে আমি কহ শুন করহ বিচার॥ অবিমৃষ্ট বিধেয়াংশ দুই ঠাঞি চিন। বিরুদ্ধমতি ভগ্নক্রম পুনরাত্ত দোষ তিন॥ গঙ্গার মহত্ত্ব শ্লোকের মূল বিধেয়। ইদং শব্দে অনুবাদ পশ্চাৎ অবিধেয়॥ বিধেয় আগে কহি পাছে কহিলে অনুবাদ। এই লাগি শ্লোকের অর্থ করিয়াছে বাদ॥ …………………………………………………… গঙ্গাতে কমল জন্মে সবার সুবোধ। কমলে গঙ্গার জন্ম অত্যন্ত বিরোধ॥ ইহা বিষ্ণু পাদপদ্মে গঙ্গার উৎপত্তি। বিরোধালঙ্কার ইহা মহা চমৎকৃতি॥ ঈশ্বর অচিন্ত্য শক্ত্যে গঙ্গার প্রকাশ। ইহাতে বিরোধ নাহি বিরোধ আভাষ॥ গঙ্গার মহত্ত্ব সাধ্য সাধন তাহার। বিষ্ণুপাদোৎপত্তি অনুমান অলঙ্কার॥ স্থূল এই পঞ্চ দোষ পঞ্চ অলঙ্কার। সূক্ষ্ম বিচারিলে যদি আছয়ে অপার॥ (চৈঃ চঃ আদিলীলা, পৃঃ ১২৭-১২৯) —-হে পণ্ডিতপ্রবর! ‘‘আপনি বিধেয় অর্থাৎ জ্ঞাত আগে বলে পরে অনুবাদ অর্থাৎ অজ্ঞাত বলেছেন। এরফলে শ্লোকের অনুবাদ ঘটেছে, মূল অর্থ বাদ পড়েছে। ‘দ্বিতীয় শ্রীলক্ষ্মী’ রচনায় ‘দ্বিতীয়’ শব্দ বিধেয়, সমাসে গৌণ হওয়াতে শব্দার্থ ক্ষয় হয়ে শব্দটি অপ্রাধান্য রূপে নির্দিষ্ট হয়েছে। ‘ভব’ অর্থে মহাদেব বোঝালে ‘ভবানী’ অর্থে মহাদেবের স্ত্রীকে বোঝায়। এবং ভবানীর ভর্তা বললেও মহাদেবকে বোঝায়। ‘ভবানীভর্ত্তুর্ষা’ শব্দের প্রয়োগে ‘ভবানীর ভর্তা’-র অর্থ হয়, ভবের পত্নী যে ভবানী তার ভর্তা, যেন ভব ব্যতিরেকে আর একজন ভর্তা বোঝায়, তাই ওই শব্দের প্রয়োগ বিরুদ্ধমতিকারক। শ্রী অর্থে লক্ষ্মী বা শোভাময়ী বোঝায়। এক্ষেত্রে ‘শ্রীলক্ষ্মী’ প্রয়োগে পুনরুক্তবদাভাস অলঙ্কার হয়েছে। আপনি ‘শ্রীবিষ্ণুর চরণ-কমলে গঙ্গার জন্ম’ বোঝাতে চেয়ে ‘কমলে গঙ্গার জন্ম’ বলে ফেলে প্রচলিত সত্যের সাথে বিরোধ করে ফেলেছেন, যদিও তা বিরোধাভাস মাত্র, তাই বিরোধাভাস-অলঙ্কারের প্রয়োগ হয়েছে। ‘গঙ্গার এই মহিমা সর্বদা নিশ্চিতরূপে দেদীপ্যমান, যেহেতু এই গঙ্গা শ্রীবিষ্ণুর চরণকমল হইতে উৎপন্ন হওয়ার কারণে অত্যন্ত সৌভাগ্যবতী।’—এখানে গঙ্গার মহত্ত্বের সাধন ও সাধ্য দুই-ই পরিলক্ষিত হয়। ওই অনুমান অলঙ্কারের প্রয়োগের ফলে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব জড়ীভূত হয়ে গেল।’’ নিমাই পণ্ডিতের বলা ব্যাখ্যান শুনে কেশবাচার্য আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলেন, শাস্ত্র না পড়ে, অলঙ্কার না পড়ে আমার শ্লোকের এইরূপ ব্যাখ্যা তুমি কিভাবে করলে? উত্তরে নিমাই পণ্ডিত বলেন, শাস্ত্রের বিচার আমি জানি না, মাতা সরস্বতী যা’ বলান, তাই বলি। আপনি মহাপণ্ডিত, কবি শিরোমণি, আপনি দুঃখ করবেন না। আপনার শিষ্য মনে করে আমার কিশোর-সুলভ চপলতা ক্ষমা করে দেবেন। আজ চলুন বাসায় ফিরে যাই, কাল আবার মিলিত হয়ে আপনার কাছে শাস্ত্রের বিচার শুনব।
এই মতে নিজ গৃহে গেলা দুই জন। কবি রাত্রে কৈল সরস্বতী আরাধন॥ সরস্বতী রাত্রে তারে উপদেশ কৈল। সাক্ষাৎ ঈশ্বর করি প্রভুরে জানিল॥ প্রাতে আসি প্রভুপদে লইল শরণ। প্রভু কৃপা কৈল তার খণ্ডিল বন্ধন॥ ভাগ্যবন্ত দিগ্বিজয়ী সফল জীবন। বিদ্যাবলে পায় মহাপ্রভুর চরণ॥
কাশ্মীরি পণ্ডিত নিমাই পণ্ডিতের মধ্যে ষড়ৈশ্বর্য্যের প্রকাশ উপলব্ধি করতে পেরে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তারপর থেকে নবদ্বীপের পণ্ডিতসমাজে শুধু নয়, ভারতবর্ষের পণ্ডিতসমাজে নিমাই পণ্ডিত একজন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। ******** নিমাই পণ্ডিত পিতৃদেবের পিণ্ডদান করতে গয়ায় গিয়ে ঈশ্বরপুরীর কাছে দীক্ষা নেবার পর পাণ্ডিত্য ছেড়ে ভক্তিরসে নিজেকে জারিত করলেন। শ্রীবাস অঙ্গনের বৈষ্ণব সভায় যোগদান করে কীর্তনানন্দে মেতে ওঠেন। কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা চৈতন্যদেব আর্য্যকৃষ্টি বিরোধী বৌদ্ধ-তান্ত্রিকতার পৌত্তলিকদের, শুষ্ক জ্ঞানচর্চাকারী তর্কবাগীশদের, তামসিক ধর্মাচ্ছন্নদের উদ্দেশ্যে পথ-নির্দেশ করলেন ‘হরেরাম হরেকৃষ্ণ’ কীর্তনের ফরমূলার মাধ্যমে।––তোমার পাপ, তাপ হরণ করতে, প্রবৃত্তির পাপ-তাপের জ্বালা জুড়াতে, সবকিছু ছেড়ে শ্রীরামচন্দ্রের আদর্শ, শ্রীকৃষ্ণের আদর্শের অনুসরণ কর। তৎকালিন হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রাধান্য থাকা সত্বেও তিনি হরেকৃষ্ণ কীর্তনের মাধ্যমে ক্ষত্রিয় বংশজাত রামচন্দ্র এবং কৃষ্ণের জীবন্ত আদর্শে সবাইকে অনুপ্রাণিত করতে চাইলেন। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অবতারবাদের আদর্শ মেনে।
* * *
কীর্তনগান বাঙালি কবিদের এক অভিনব সৃষ্টি। কৃত্ ধাতু থেকে এসেছে কীর্তন। কৃত্ শব্দের অর্থ প্রশংসা। কীর্তন মানে কীর্তি আলাপন। কীর্তিকর কোন আদর্শের স্মরণ, মনন, গুণ বর্ণন কীর্তনের মূল উদ্দেশ্য। যা’ শ্রবণেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রবেশ করে মানুষের সাত্তিক গুণকে প্রকাশ করতে সাহায্য করে। তাই, মানুষকে সহজে প্রভাবিত করতে, কীর্তন এক সহজ প্রচার মাধ্যম। কীর্তি-আলাপন দু’-ভাবেই হতে পারে। কথার আদান-প্রদান মাধ্যমে এবং সুরে, ছন্দে, নৃত্যে, যন্ত্রানুষঙ্গের ঐকতানের প্রকাশের মাধ্যমে। প্রাক চৈতন্যযুগে, খ্রীঃ ১২ শতকে রচিত, শ্রীকৃষ্ণকে নায়ক করে, হ্লাদিনী শক্তিস্বরূপা রাধাকে একজন পরকীয়া নারী রূপে চিত্রণ করে কিছু অশাস্ত্রীয় আদিরসাত্মক পরকীয়া কাহিনী দিয়ে সাজানো, কবি জয়দেব গোস্বামী বিরচিত ‘গীতগোবিন্দম্ কাব্য’ বাংলার কীর্তনের প্রকৃত উৎস। এ বিষয়ে হিন্দুধর্মের এনসাইক্লোপিডিয়া, ‘পৌরাণিকা’র রচয়িতা অমল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন— (দ্রঃ গীতগোবিন্দ) ‘‘রামায়ণ ও মহাভারতের কট্টর পটভূমিতে ব্লু-বুক হিসাবে বর্ষবরদের চরম ও পরম পরিতৃপ্তি দিয়েছিল; তন্ত্রাভিলাষী সমাজে তন্ত্রগুলি চেতন ও অবচেতন মনকে যেমন তৃপ্তি দেয়।’’ কবি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্যের মূল্যায়ন বিষয়ে বলছেন—‘‘গীতগোবিন্দে সুড়সুড়ি আছে আর আছে দুষ্পাচ্য যৌনতা। ….. সহজিয়া জয়দেব আবিল, অপাঠ্য।’’ রাধা সন্দর্ভে বলছেন— ‘‘…. রাধাবাদ শক্তিবাদেরই একটি ধারা; রাসলীলা নিরোধ ব্যবহারের বিশুদ্ধ বিজ্ঞাপন। তন্ত্রের মানসকন্যা রাধা। রস ও রতির মিলন বৈষ্ণব তত্ত্ব; সাধক ও ভৈরবীর সম্ভোগ শাক্ত তত্ত্ব এবং বজ্রযানে বজ্র ও পদ্মের মিলন এ সবগুলিই তান্ত্রিক তত্ত্ব; বজ্রযানে তাই বলা হয়েছে বুদ্ধত্বং যোষিৎ-যোনিপ্রতিষ্ঠিতম্। ….. ভাগবতে রাধা নাই। …. ভাগবত ও বিষ্ণু পুরাণে রাসলীলা আছে কিন্তু রাধা নাই। ….. ’’ তথাপি রাধার মানবী অস্তিত্ব কিছু-কিছু অ-বৈষ্ণবদের রিরংসায় বাসা বেঁধেছিল। সেই বিকৃত ধারার বাসাটাকে ভাঙতে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যদেব নিজেকে রাধা-কৃষ্ণের যুগলরূপ বলে প্রচার করলেন। যাতে ধর্মের অজুহাতে ধর্মবিরুদ্ধ পরকীয়া-প্রীতি প্রশ্রয় না পায়। তাই তিনি রাধাকে নারীদেহে নয়, সুরত-সম্বেগের ধারায় অন্বেষণ করতে পথ দেখালেন। রাধাকৃষ্ণের যুগলধারার আদর্শে, পরকীয়া-প্রীতির আদর্শে গড়ে ওঠা তৎকালিন প্রচলিত কীর্তনের ধারাটাকে গীতা গ্রন্থে বর্ণিত— “যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লাণির্ভবতি ভারতঃ। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মনম্ সৃজাম্যহম্॥ পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম্ । ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ॥”–এর সূত্র মেনে,—অর্থাৎ ‘‘ঈশ্বর এক, ধর্ম এক, প্রেরিতগণ বিভিন্ন নামে সেই এক-এরই বার্তাবাহী’’র সনাতনী ধারা বা সনাতন ধর্মকে সংস্থাপিত করলেন। শ্রীরামচন্দ্র এবং শ্রীকৃষ্ণের আদর্শকে সামনে রেখে। হরেকৃষ্ণ, হরেরাম প্রচার মাধ্যমে। এর ফলে পরকীয়া-তত্ত্বের সহজীয়া মতবাদীরা বৈষ্ণবীয় মূলস্রোতে ফিরে আসার সুযোগ পেল এবং পৌত্তলিকতার নাগপাশ থেকে সনাতন ধর্মকে উদ্ধার করে এক সর্বজনীন রূপ দিলেন। মূলতঃ শ্রীকৃষ্ণকে কেন্দ্র করে। নিজেকে অন্তরালে রেখে।
‘অবতার নাহি কহে, আমি অবতার।’ তথাপি ধরা পড়ে গেলেন বৈষ্ণবাচার্য সাধক অদ্বৈত মহাপ্রভুর কাছে। অদ্বৈত মহাপ্রভুকে ফাঁকি দিতে পারলেন না। তাঁর সাধনার কাছে ধরা পড়ে গেলেন। নিত্যানন্দ মহাপ্রভুও বুঝতে পেরে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুকে কৃষ্ণের নব-কলেবর রূপে প্রচার করতে শুরু করলেন। * * * আসলে সমগ্র জগতের প্রাণনশক্তি বা প্রাণপঙ্ক বা প্রটোপ্লাজমকে পরমাত্মিক শক্তি বলা হয়, যা বিশ্ব ব্যাপিয়া বিদ্যমান, ‘‘যিনি সর্ব্ব ও প্রত্যেকের ভিতর বিশেষভাবে পরিব্যাপ্ত’’ তিনিই বিষ্ণু। যে পুরোহিতগণ প্রতিমা পূজা করেন, তাঁরাও সর্বাগ্রে ‘ওঁ শ্রীবিষ্ণু’ মন্ত্রে আচমন করেন। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পুরোহিত রঘুবংশের কৌলগুরু বশিষ্ঠদেব শ্রীরামচন্দ্রকে ‘‘ওঁ নারায়ণঃ পরাবেদা নারায়ণঃ পরাক্ষরঃ।/নারায়ণঃ পরামুক্তি নারায়ণঃ পরাগতিঃ॥’’ মন্ত্রে স্বস্তিবাচন করার সময় শ্রীরামচন্দ্রের মধ্যে পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণকে উপলব্ধি করলে তিনি নারায়ণের পরিবর্তে রামচন্দ্র শব্দ বসিয়ে মন্ত্রটিকে পরিমার্জিত করেন। নররূপী নারায়ণ পুরুষোত্তম রামচন্দ্রকে কেন্দ্র করে সবাইকে ধর্ম পালন করতে উদ্বুদ্ধ করলেন। অনুরূপভাবে কৃষ্ণনামের প্রচারক শ্রীগৌরাঙ্গদেবের মধ্যে বিষ্ণুত্ব বা কৃষ্ণত্ব-এর পরিপূর্ণতা সাধনদ্বারা উপলব্ধি করা মাত্রই নিত্যানন্দ প্রভু ‘‘ভজ গৌরাঙ্গ কহ গৌরাঙ্গ লহ গৌরাঙ্গের নাম রে …. ।’’ ‘‘প্রভু নিত্যানন্দ কহে দন্তে তৃণ ধরি। আমারে কিনিয়া লহ ভজ গৌরহরি॥ ইত্যাদি স্বস্তিবাচনে গীতার অবতারবাদকে সম্মান জানালেন। তৎকালিন পুরুষোত্তম চৈতন্যদেবকে কেন্দ্র করে সবাইকে চলতে বললেন। এই হচ্ছে সাজা-গুরুদের কবল থেকে সনাতন বৈষ্ণবধর্মের ধারাকে নবীকরণ মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখার ফরমূলা। গীতা গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণ বিষয়টিকে স্পষ্ট করে বিধৃত করেছেন। * * * অবতার-তত্ত্বের ধারা অনুসারে অবতার বরিষ্ঠ শ্রীরামচন্দ্র ছিলেন সত্যের পূজারী অথচ অসৎ নিরোধী। তৎকালীন যুগের অচ্ছুৎ অনার্য্যদের আর্য্যীকৃত করে আর্য্য-অনার্য্যদের মেলবন্ধন করলেন। অনার্য্য গুহক চণ্ডালকে করলেন মিত্র, আবার অকালমৃত্যুর দ্যোতক বর্ণাশ্রম-বিদ্বেষী প্রতিলোমাচারী বন্ধুবর শম্বুককে দিলেন চরম শাস্তি। ব্রাহ্মণ ঔরসজাত রাবণ যখন কিছুতেই সীতাকে বশে আনতে পারছিলেন না তখন সভাসদেরা মায়াবী-রাবণকে বলেছিলেন, আপনি রামরূপ ধারণ করে গেলেই তো সীতাকে সহজেই বশীভূত করতে পারেন। উত্তরে রাবণ বলেছিলেন, ওই রূপ স্মরণ করলেই আমার সব পাপ-প্রবৃত্তি মুছে গিয়ে আমি এক অন্য মানুষ হয়ে যাই। তথাপি প্রবৃত্তির ঊর্দ্ধে উঠে ওই বোধটাকে ধরে রাখতে পারল না, ফলে রামচন্দ্রের হাতে হত হতে হল। অথচ বিভীষণ রামচন্দ্রের আদর্শে প্রলুব্ধ হয়ে রাবণকে ত্যাগ করলেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ……রাবণ তো আদর্শবান ছিল না। রামচন্দ্রকে দেখে সে একেবারে বিগলিত হয়ে গেল। রামচন্দ্রের ঊর্দ্ধে তার আর কেউ নেই। ভ্রাতার প্রতি কর্তব্যের চাইতে তার ইষ্টানুরাগই প্রবল। ভীষ্ম কিন্তু কেষ্টঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি নিয়েও, কর্তব্যবোধে কৌরবের পক্ষ ছাড়তে পারেন নি। তা কিন্তু ঠিক হয়নি। ইষ্টের জন্য, সত্যের জন্য, অন্য যে-কোন কর্তব্য ত্যাগ করতে হবে, যদি সে কর্তব্য ইষ্টের পথে অন্তরায় হয়। ‘‘সর্ব্বধর্ম্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ’’ । (আ. প্র. 21/2.6.1952) ……শ্রীরামচন্দ্রের খুব strong group (শক্তিমান দল) ছিল। হনুমান, সুগ্রীব, জাম্বুবান, অঙ্গদ, নল, নীল এরা সবাই ছিল একটা strong unit (শক্তিমান গুচ্ছ)। রামচন্দ্রের সাথে ওদের একজন না-একজন থাকতই। এক সময় বিভীষণকে সন্দেহ করেছিল লক্ষণ। বিভীষণ তাতে বলেছিল, ‘আমি জানি তোমরা আমাকে সন্দেহ করবে। কারণ, আমি রাবণের ভাই। আমি ভাই হয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে treachery (বিশ্বাসঘাতকতা) করেছি। কিন্তু করেছি অসৎ-এর বিরুদ্ধে। হজরত রসুলের group-ও (দলও) খুব strong (শক্তিমান) ছিল। তিনি বেঁচে থাকতে-থাকতেই অনেকখানি ভূখণ্ডের king (রাজা) হয়েছিলেন। (দীপরক্ষী 2/26.7.1956) রাজাকে কতখানি প্রজাস্বার্থী হতে হবে সেইটেই রামচন্দ্র দেখিয়েছেন। প্রজা প্রাণের চাইতেও বেশী না হলে রাজা হওয়া যায় না। …….সীতাও ছিলেন রামচন্দ্রের আদর্শে উৎসর্গীকৃত। আর এই ছিল আমাদের আর্য্যবিবাহের তাৎপর্য্য। (আ. প্র. 20/9. 8. 1951) অবতার বরিষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ‘‘শ্রীকৃষ্ণ সব সময়েই চেষ্টা করেছেন যুদ্ধবিগ্রহ avoid (পরিহার) করতে, কিন্তু তাঁর environment (পরিবেশ) তাঁকে সে scope (সুযোগ) দিল না। আর শ্রীকৃষ্ণের যুদ্ধ—মৃত্যুকে মারবার জন্য। Gangrene-affected part of the body (শরীরের দুষ্টক্ষতযুক্ত স্থান) আমরা যেমন কেটে ফেলি জীবন বাঁচাবার জন্য, তিনিও তেমনি মৃত্যু ও মারণের মূর্ত্ত প্রতীকস্বরূপ যারা ছিল তাদের মেরেছিলেন সমগ্র সমাজকে বাঁচাবার জন্য। (আ. প্র. খণ্ড ১, ৪. ১২. ১৯৪১) …… শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে বুঝিয়ে দিলেন যে devil (শয়তান) যদি রাজত্ব করে, তবে অর্জ্জুনের ঈপ্সিত ধর্ম্ম, জাতি, কুল, মান কিছুই রক্ষা পাবে না। তাই devil (শয়তান)-কে demolish (ধ্বংস) করা লোকমঙ্গলের জন্যই অপরিহার্য্য। এর মধ্যে দ্বেষ-হিংসার বালাই নেই। বরং অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধকে এড়িয়ে চলার বুদ্ধির পিছনে আছে দুর্ব্বলতা।’’ (আ. প্র. খণ্ড ৬, ৬. ১২. ১৯৪৫) কেষ্টদা (ভট্টাচার্য্য) প্রশ্ন করেন– গীতায় শ্রীকৃষ্ণ প্রথমে আত্মতত্ত্ব সম্বন্ধে এক বিরাট দার্শনিক আলোচনার অবতারণা করে তারপর ক্ষত্রিয়ের করণীয় নির্দ্দেশ করলেন অর্জুনকে। ওভাবে বললেন কেন ? শ্রীশ্রীঠাকুর– Divine Philosophy ( ভাগবত দর্শন ) দিয়ে শুরু করে তা থেকে Concrete – এ ( বাস্তবে ) আসলেন। আত্মিক ধর্ম প্রত্যেকে পালন করতে হয় তার Instinctive activity ( সহজাত সংস্কার-সম্মত কর্ম ) এর ভিতর দিয়ে। অর্জ্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ যা বলেছিলেন তার মর্ম্ম হল — You are a Kshatriya, born with Kshatriya instincts. And you must do your instinctive duty with all elevating urge ( তুমি ক্ষাত্র সংস্কার নিয়ে জাত ক্ষত্রিয়। এবং উন্নয়নী আকুতি নিয়ে তোমাকে অবশ্যই তোমার সহজাত সংস্কার-সম্মত কর্তব্য পালন করতে হবে )। অর্জ্জুন পন্ডিত কিনা তাই কেষ্টঠাকুর ঐভাবে অর্জ্জুনকে তাঁর বক্তব্য বলেছিলেন। Philosophy ( দর্শন ) না বললে অর্জ্জুন ধরত না। (আলোচনা প্রসঙ্গে, ১১দশ খন্ড, (ইং ২০-০৫-১৯৪৮) রামচন্দ্র এবং শ্রীকৃষ্ণ উভয়েই বৈষ্ণবধর্মের বা সনাতন ধর্মের মূল কাঠামো সদাচার এবং বর্ণাশ্রমকে রক্ষা এবং প্রতিষ্ঠা করার জন্যই জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। চৈতন্যদেবও ভারতীয় কৃষ্টির মূল, বর্ণধর্ম, আশ্রমধর্ম পালন করার পর লোকশিক্ষার জন্য সন্ন্যাস নিয়েছিলেন। তিনি বাস্তব জীবনে অসৎ-নিরোধে তৎপর ছিলেন। বর্ণাশ্রম বিরোধী কোন প্রতিলোম বিবাহ পর্যন্ত হতে দেন নি। দোর্দন্ডপ্রতাপ জমিদারের দুষ্কৃত ভাইপো মাধবের কবল থেকে চন্দনের বাগদত্তা চুয়াকে পার্ষদদের সাহায্যে চন্দনকে দিয়েই হরণ করিয়ে স্বয়ং পৌরহিত্য করে উপযুক্ত পাত্রে পাত্রস্থ করেছেন। (সূত্রঃ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত, চুয়াচন্দন উপন্যাস) * * * বাংলার বিশুদ্ধ কীর্তন-আন্দোলনের পথিকৃৎ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তিনি স্বভাবজ পাণ্ডিত্যের মাধ্যমে নবদ্বীপের স্মার্ত্ত পণ্ডিতদের, ভারতখ্যাত কাশ্মীরি-পণ্ডিতের দর্প চূর্ণ করেছেন। তিনি তামসিক গুণসম্পন্ন সমাজের প্রতিনিধি জগাই-মাধাইদের প্রেম দিয়ে সাত্তিক গুণের উদ্বোধন করেছেন। সনাতন ধর্ম বিদ্বেষী চাঁদ কাজীদের হরিনাম সংকীর্তনের মাধ্যমে চরমবার্তা দিয়ে তমোগুণ নাশ করে ইসলামের বিকৃতি প্রচারকে নস্যাৎ করে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বাহ্য জাতিভেদের বেড়াজাল অগ্রাহ্য করে, যবন হরিদাসের ভক্তিকে মর্যাদা দিয়ে ভক্ত হরিদাসে রূপান্তর করেছেন। তৎকালিন ভারতের বিখ্যাত তাত্ত্বিক পণ্ডিতদের, যেমন রায় রামানন্দ, প্রকাশানন্দ সরস্বতী, সার্ব্বভৌম প্রভৃতিদের ভুল ভাঙাতে তথ্যসমৃদ্ধ বাচনিক কীর্তি— ‘‘চণ্ডালোহপি দ্বিজশ্রেষ্ঠ হরিভক্তি পরায়ণঃ।’’ ‘‘মুচি যদি ভক্তিসহ ডাকে কৃষ্ণধনে। কোটি নমস্কার করি তাহার চরণে॥’’—-প্রকাশ মাধ্যমে আপামর সবাইকে সনাতন ধর্মে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এ বিষয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ‘‘চৈতন্যদেবও জগাই-মাধাইয়ের উপর কেমন উগ্রভাব ধারণ করে তাদের অন্তরে ত্রাস ও অনুতাপ জাগিয়ে তবে প্রেম দেখিয়ে তাদের অন্তর জয় করেছিলেন। তাদের উগ্রদম্ভ, দর্প ও প্রবৃত্তি-উন্মত্ততাকে স্তব্ধ না করে, আয়ত্তে না এনে গোড়ায় প্রেম দেখাতে গেলে সে-প্রেম তারা ধরতে পারত না। হয়তো ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করত।’’ (আ. প্র. ৯/২৭. ১২. ১৯৪৬) প্রকাশানন্দ সরস্বতী, সার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্য প্রমুখগণ বৈদান্তিক পণ্ডিত ছিলেন। তাঁদের পাণ্ডিত্য বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন,—- বৈদান্তিক ভাব মানে record of experience (জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার দলিল)। ওরা হয়তো achieve (আয়ত্ত) করার পথ ঠিক অবলম্বন করেননি, সেইটে চৈতন্য মহাপ্রভু ধরিয়ে দিয়েছেন। ভক্তি লাগেই, ভক্তিপথ সহজ, সুষ্ঠু, accurate (যথাযথ), ভক্তির রাস্তা দিয়েই যেতে হয়, তার সঙ্গে বৈশিষ্ট্যানুযায়ী ঝোঁক থাকেই। অদ্বৈতবাদেও গুরুভক্তির উপর জোর দেওয়া আছে। নইলে এগোন যায় না। তাই আছে— ‘অদ্বৈতং ত্রিষু লোকেষু নাদ্বৈতং গুরুনা সহ’। নির্ব্বিকল্প সমাধিতে অদ্বৈতভূমিতে সমাসীন হ’লে জ্ঞান, জ্ঞেয়, জ্ঞাতা লয় পেয়ে যায়। তখন মানুষ বোধস্বরূপ হ’য়ে থাকে, সে অবস্থা মুখে বলা যায় না। অন্য সময় সে মানুষেরও সেব্য-সেবকভাব নিয়ে থাকা স্বাভাবিক! আমি না থাকলে তুমি থাকে না, তুমি না থাকলে আমি থাকে না। জীবজগতের সঙ্গে ব্যবহারে যে আমি-তুমি রূপ দ্বৈতভাব থাকে, তখনও তার মধ্যে একটা একাত্মবোধের চেতনা খেলা ক’রে বেড়ায়। ইষ্টই যে সব-কিছু হ’য়ে আছেন, এই স্মৃতি লেগে থাকে। আত্মাই কই আর ব্রহ্মই কই, তার মূর্ত্ত বিগ্রহ হলেন ইষ্ট। মানুষ যখন ইষ্টসর্ব্বস্ব হয়, ইষ্টপ্রীত্যর্থে ছাড়া যখন সে একটা নিঃশ্বাসও ফেলে না, তখনই সে একই সঙ্গে ভক্তিযোগ, কর্ম্মযোগ ও জ্ঞানযোগে সিদ্ধ হ’য়ে ওঠে। কর্ম্মযোগ, জ্ঞানযোগ যাই বল, ভক্তির সঙ্গে যোগ না থাকলে কাজ হয় না, সব যোগই আসে ভক্তিযোগ থেকে— “বহুনাং জন্মনামন্তে জ্ঞানবান্ মাং প্রপদ্যতে, বাসুদেবঃ সর্ব্বমিতি স মহাত্মা সুদুর্লভঃ”। এই জ্ঞানী একাধারে জ্ঞানী, ভক্ত ও কর্ম্মী। গোড়া থেকেই অদ্বৈতবাদ mathematically (গাণিতিকভাবে) সম্ভব হ’তে পারে, practically (বাস্তবে) সম্ভব হয় কমই। (আলোচনা প্রসঙ্গে, ত্রয়োদশ খণ্ড, তাং ১-৮-১৯৪৮)
* * *
চৈতন্যদেব অসি নয়, তীর-ধনুক-বল্লম লাঠি দিয়েও নয়—খোল, করতালাদি বাদ্যযন্ত্রের অনুষঙ্গে ‘হরেরাম হরেকৃষ্ণ’ নামকীর্তনের মাধ্যমে এক ধর্মীয় প্লাবন সৃষ্টি করেছিলেন। ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ অতিক্রম করে, পুরুষার্থের পঞ্চম-বর্গ প্রেমের সাহায্যে সাম্প্রদায়িক কায়েমী-স্বার্থীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ভাগবত আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে ভাগবত ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্ণাশ্রমানুগ সামাজিক বিন্যাসকে সমৃদ্ধ করতে সর্ববর্ণে হরিনাম প্রচার করে বাহ্য জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। কিছু স্বার্থান্বেষী স্মার্ত্ত-পণ্ডিতদের অভিসন্ধিমূলক অভিযোগের ভিত্তিতে তৎকালিন শাসক চাঁদকাজী হরিনাম সঙ্কীর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। শ্রীবাস অঙ্গনের কীর্তনের আসরে গিয়ে বৈষ্ণবদের ওপর অত্যাচার করে, শ্রীখোল ভেঙ্গে দেয়। শান্ত মহাপ্রভু ওই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে কোন বিরোধ না করেই দুর্বার নিরোধ করেছিলেন। ১৪টি কীর্তনদল সংগঠিত করে উদ্দাম কীর্তন করতে করতে চাঁদকাজির বাড়িতে যান। চাঁদকাজী ভয় পেয়ে গেলে মহাপ্রভু তাকে আশ্বস্ত করতে কৃষ্ণপ্রেমের কথা বলেন। হরিনাম-সংকীর্তনের উপযোগিতা বিষয়ে বিস্তৃত ব্যাখ্যা করেন। তার পরে আপনকরা ভাব নিয়ে বলেন, তুমি আমার মামার গ্রামের লোক হবার সুবাদে তুমি আমার মামা হও, মামা হয়ে ভাগ্নের প্রতি এমন কঠোর হয়ো না। কীর্তন বন্ধ করার আদেশ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত আমরা তোমার বাড়ী ছেড়ে যাচ্ছি না। ধর্ম প্রতিষ্ঠার কর্তব্যে অটল মহাপ্রভুর কীর্তন আন্দোলনের কাছে আনুগত্য স্বীকার করতে বাধ্য হয় চাঁদকাজি। তিনিও মহাপ্রভুর সাথে গলা মিলিয়ে হরিনাম সঙ্কীর্তন করেন। সবাইকে হরিনাম সঙ্কীর্তন করতে আদেশ জারী করেন। চৈতন্য আজ্ঞায় স্থির হইল কীর্তন কহে আপনার তত্ত্ব করিয়া গর্জন। কলিযুগে মুঞি কৃষ্ণ নারায়ন মুঞি সেই ভগবান দেবকীনন্দন।। অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড কোটি মাঝে মুই নাথ যত গাও সেই মুঞি তোরা মোর দাস।।’’ (শ্রীচৈতন্য ভাগবত পৃষ্ঠা ১৪৬, মধ্যখণ্ড ৮ম অধ্যায়।) “গৌড়েশ্বর নবাবের দৌহিত্র চাঁদকাজী কে ভগবান শ্রীমন্ মহাপ্রভুর কৃপা”– (৩) * প্রভু কহে – প্রশ্ন লাগি আইলাম তোমার স্থানে। কাজী কহে-আজ্ঞা কর যে তোমার মনে।। ১৪৬ অনুবাদ :- শ্রীমন্ মহাপ্রভু বললেন, মামা! আমি আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করার জন্য আপনার বাড়িতে এসেছি। তার উত্তরে চাঁদকাজী বললেন – হ্যা, তোমার মনে কি প্রশ্ন আছে তা তুমি বল। * প্রভু কহে – গোদুগ্ধ খাও গাভী তোমার মাতা। বৃষ অন্ন উপজায় তাতে তেঁহো পিতা।। ১৪৭ অনুবাদ :- শ্রীমন্ মহাপ্রভু বললেন – আপনি গরুর দুধ খান; সেই সূত্রে গাভী হচ্ছে আপনার মাতা। আর বৃষ অন্ন উৎপাদন করে, যা খেয়ে আপনি জীবন ধারন করেন; সেই সূত্রে সে আপনার পিতা। * পিতা মাতা মারি খাও এবা কোন্ ধর্ম। কোন্ বলে কর তুমি এমত বিকর্ম।। ১৪৮ অনুবাদ :- যেহেতু বৃষ ও গাভী আপনার পিতা ও মাতা, তা হলে তাদের হত্যা করে তাদের মাংস খান কি করে ? এটি কোন্ ধর্ম ? কার বলে আপনি এই পাপকর্ম করছেন ? * কাজী কহে – তোমার যৈছে বেদ পুরাণ। তৈছে আমার শাস্ত্র কেতাব কোরাণ।। ১৪৯ অনুবাদ :- কাজী উত্তর দিলেন, তোমার যেমন বেদ, পুরাণ আদি শাস্ত্র রয়েছে, তেমনই আমাদের শাস্ত্র হচ্ছে কোরান। * সেই শাস্ত্রে কহে প্রবৃত্তি নিবৃত্তি মার্গ-ভেদ। নিবৃত্তি-মার্গে জীব মাত্র বধের নিষধ।। ১৫০ অনুবাদ :- কোরন অনুসারে উন্নতি সাধনের দুটি পথ রয়েছে – প্রবৃত্তিমার্গ ও নিবৃত্তিমার্গ। নিবৃত্তিমার্গে জীবহত্যা নিষিদ্ধ। * প্রবৃত্তি-মার্গে গোবধ করিতে বিধি হয়। শাস্ত্র আজ্ঞায় বধ কৈলে নাহি পাপ ভয়।। ১৫১ অনুবাদ :- প্রবৃত্তিমার্গে গোবধ অনুমোন করা হয়েছে। শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে যদি বধ করা হয়, তাহলে কোনম পাপ হয় না। * তোমার বেদেতে আছে গোবধের বাণী। অতএব গোবধ করে বড় বড় মনি।। ১৫২ অনুবাদ :- চাঁদকাজী শ্রীমন্ মহাপ্রভু বললেন – তোমার বৈদিক শাস্ত্রে গোবধের নির্দেশ রয়েছে। সেই শাস্ত্র-নির্দেশের বলে বড় বড় মুনিরা গোমেধ-যজ্ঞ করেছিলেন। * প্রভু কহে – বেদে কহে গোবধ নিষেধে। অতএব হিন্দুমাত্র না করে গোবধে।। ১৫৩ অনুবাদ :- চাঁদকাজীর উক্তি খণ্ডন করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন – বেদে স্পষ্টভাবে গোবধ নিষধ করা হয়েছে। তাই যে কোন হিন্দু, তা তিনি যেই হোন না কেন, কখনোও গোবধ করেন না। * জীয়াইতে পারে যদি তবে মারে প্রাণী। বেদ-পুরাণে আছে হেন আজ্ঞাবাণী।। ১৫৪ অনুবাদ :- বেদ ও পুরাণে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, কেউ যদি কোন প্রাণীকে নবজীবন দান করতে পারে, তাহলে গবেষণার উদ্দ্যেশে সে প্রাণী মারতে পারে। * অতএব জরদগব মারে মুনিগণ। বেদমন্ত্রে শীঘ্র করে তাহার জীবন।। ১৫৫ অনুবাদ :- তাই মুনি-ঋষিরা অতি বৃদ্ধ জরদগব (জরাগ্রস্ত বা বৃদ্ধ) পশুদের কখনও কখনও মেরে, বৈদিক মন্ত্রের সাহায্যে তাদের নবজীবন দান করতেন। * জরদগব হঞা যুবা হয় আর বার। তাতে তার বধ নহে হয় উপকার।। ১৫৬ অনুবাদ :- এই ধরনের জরদগব (জরাগ্রস্ত বা বৃদ্ধ) পশুদের যখন এভাবেই নবজীবন দান করা হত, তাতে তাদের তাতে তাদের বধ করা হত না, পক্ষান্তরে তাদের মহা উপকার সাধন করা হত। * কলিকালে তৈছে শক্তি নাহিক ব্রাহ্মণে। অতএব গোবধ কেহো না করে এখনে।। ১৫৭ অনুবাদ :- পূর্বে মহা শক্তিশালী ব্রাহ্মণেরা বৈদিক মন্ত্রের সাহায্য এই ধরনের কার্য্য সাধন করতে পারতেন, কিন্তু এখন এই কলিযুগে সেই রকম শক্তিশালি কোন ব্রাহ্মণই নেই। তাই গাভী ও বৃষদের নবজীবন দান করার যে গোমেধ-যোজ্ঞ, তা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। * তোমরা জীয়াইতে নার বধ মাত্র সার। নরক হৈতে তোমার নাহিক নিস্তার।। ১৫৮ অনুবাদ :- তোমরা মুসলমানেরা পশুকে নবজীবন দান করতে পার না, তোমারা কেবল হত্যা করতেই পার। তাই তোমরা নরকগামী হচ্ছ; সেখান থেকে তোমরা কোনভাবেই নিস্তার পাবে না। * গরুর যতেক রোম, তত সহস্র বৎসর। গোবধী রৌরব মধ্যে পচে নিরন্তর।। ১৫৯ অনুবাদ :- গরুর শরীরে যত লোম আছে তত হাজার বছর গোহত্যাকারী রৌরব নামক নরকে অকল্পনীয় দুঃখ-যন্ত্রণা ভোগ করে। * তোমাসভার শাস্ত্রকর্তা-সেহো ভ্রান্ত হৈল। না জানি শাস্ত্রের মর্ম ঐছে আজ্ঞা দিল।। ১৬০ অনুবাদ :- তোমাদের শাস্ত্রে বহু ভুলভ্রান্তি রয়েছে। শাস্ত্রের মর্ম না জেনে, সে সমস্ত শাস্ত্রর প্রণয়নকারীরা এমন ধরনের নির্দেশ দিয়েছে, যাতে যুক্তি বা বুদ্ধির দ্বারা বিচারের কোন ভিত্তি নেই এবং প্রমাণও নেই। * শুনি স্তব্ধ হৈল কাজী না স্ফুরে বাণী। বিচারিয়া কহে কাজী পরাভব মানি।। ১৬১ অনুবাদ :- শ্রীমন্ মহাপ্রভুর এই কথা শুনে কাজীর সমস্ত যুক্তি স্তব্ধ হল, তিনি আর কিছু বলতে পারলেনা। এভাবেই পরাজয় স্বীকার করে কাজী বিচারপূর্বক বললেন— * তুমি যে কহিলে পণ্ডিত সেই সত্য হয়। আধুনিক আমার শাস্ত্র, বিচার-সহ নয়।। ১৬২ অনুবাদ :- নিমাই পণ্ডিত! তুমি যা বললে তা সবই সত্য। আমাদের শাস্ত্র আধুনিক এবং তাই তার নির্দশগুলি দার্শনিক বিচার বা যুক্তিসঙ্গত নয়। * কল্পিত আমার শাস্ত্র আমি সব জানি। জাতি-অনুরোধে তবু সেই শাস্ত্র মানি।। ১৬৩ অনুবাদ :- আমি জানি যে, আমাদের শাস্ত্র বহু ভ্রান্ত্র ধারনা ও কল্পনায় পূর্ণ, তবুও যেহেতু আমি মুসলমান, তাই সম্প্রদায়ের খাতিরে আমি সেগুলি স্বীকার করি। (শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত সপ্তদশ পরিচ্ছেদ।)
সনাতন ধর্মকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করতে এত কিছু করা সত্বেও নবদ্বীপের কিছু স্মার্ত্ত পণ্ডিতেরা মহাপ্রভুর বিরোধিতা করেছেন। তাই তিনি অনিচ্ছা সত্বেও বাধ্য হয়ে বৈষ্ণব আন্দোলনকে নবদ্বীপে বা নদীয়াতে সীমাবদ্ধ না রেখে ভারতব্যাপী বিস্তার করার মানসে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নামে ভুষিত হয়ে লোক-সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পরিব্রাজক হয়ে বেরিয়ে পড়েন।
“সন্ন্যাস লইনু যবে ছন্ন হইল মন। কী কাজ সন্ন্যাসে মোর প্রেম প্রয়োজন॥”—এই বাণীর মধ্যে যা’ স্পষ্টরূপে প্রকাশিত। * * *
চৈতন্যদেবের লীলাবসান পরবর্তীকালে কিছু প্রবৃত্তিমার্গী অনুগামীরা চৈতন্যদেব কথিত অবতারবাদের মূলমন্ত্র— “আত্মেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা তারে বলি কাম। কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা, ধরে প্রেম নাম। কামের তাৎপর্য্য নিজ সম্ভোগ কেবল। কৃষ্ণসুখ তাৎপর্য্য প্রেম মহাবল।।”
একটু বোধী তাৎপর্যে বিচার করলে দেখা যাবে, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-র আদর্শের অনুশাসন অনুশীলন ভিন্ন “কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা” উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। ‘‘কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা’’-র সদাচার, বর্ণাশ্রম ও চতুরাশ্রম-ধর্মের তাৎপর্য্য বোঝার চেষ্টা না করে, কৃষ্ণের আদর্শ চরিত্রগত করার অনুশীলন না করে, সাধনদ্বারা চৈতন্যদেবের পরবর্তী অবতারকে অন্বেষণ না করে, প্রবৃত্তি পরবশতার “আত্মেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা”-কে গুরুত্ব দিলেন তথাকথিত শ্রীকৃষ্ণ-চৈতন্য-প্রেমীরা। শ্রীকৃষ্ণের সাথে রাধাকে জুড়ে নিয়ে মুখে ‘কৃষ্ণ-কৃষ্ণ’ বলে খোল-করতাল সহযোগে কীর্তন করতে অভ্যস্ত হলেন। রাধা-কৃষ্ণের পরকীয়া প্রীতির সহজিয়া গোষ্ঠী তৈরি করে সগোত্র এবং প্রতিলোম বিবাহাদি সমর্থন করে আশ্রমধর্মকে অশ্রদ্ধা করেছেন। ফলে বিকৃত হয়েছে শ্রীকৃষ্ণ-চৈতন্যদেবের আদর্শ। যার প্রবহমানতা বর্তমানেও বিদ্যমান। চৈতন্যদেব প্রদত্ত ‘শিক্ষাষ্টক’ উপদেশামৃত, যার মধ্যে ‘রাধা’ নামের উল্লেখ পর্যন্ত নেই, ওই উপেদেশামৃতকে গুরুত্বের সাথে বিচার-বিশ্লেষণ না করেই ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থেও রাধাকে মানবী রূপে চিত্রিত করা হয়েছে। রাধাকে কৃষ্ণের বল্লভা বলা হয়েছে। বল্লভা শব্দের অর্থ প্রণয়িণী। যে কৃষ্ণকে সবকিছুর স্রষ্টা মনে করেন যারা, যে কৃষ্ণ অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখান বলে প্রচার করা হয়, সেই কৃষ্ণের প্রাণধন, প্রাণশক্তি বা জীবনীশক্তির উৎস একজন নারী ! ভাবা যায় ! না মেনে নেওয়া যায় ? যদি রাধাকে কৃষ্ণের একজন ভক্ত হিসাবে দেখাতেন, তাহলে মেনে নেওয়া যেত। রাধা সহ ক্রীড়ারস বৃদ্ধির কারণ। আর সব গোপীগণ রাসোপকরণ॥ কৃষ্ণের বল্লভা রাধা কৃষ্ণ প্রাণধন। তাঁহা বিনু সুখ হেতু নহে গোপীগণ॥ (চৈঃ চঃ পৃঃ ৬৪) শুধু তাই নয়, শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে গবেষণা করেন যারা, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাকে নিয়ে গবেষণা করেন যারা, তারাও পার্থসারথী কৃষ্ণের আদর্শকে পাশ কাটিয়ে, বর্ণাশ্রমধর্মকে উপেক্ষা করে, বাঁশী হাতে নিয়ে রাধাকে জড়িয়ে ধরা রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তির উপাসনা করেন। ‘আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সঙ্ঘ’, সংক্ষেপে ইসকনের ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথি স্মরণে জন্মাষ্টমীর দিনটিতেও রাধাকে সাথে রাখেন, যেন রাধাকে সাথে নিয়েই কৃষ্ণ জন্মেছিলেন!
বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন—‘‘শুনেছি ভাগবতে রাধা ব’লে গোপিনী নেই। আমি বুঝি, রাধা মানে সেরা সৃষ্টি-রচয়িতা শক্তি। শব্দের থেকেই সব। কতরকমের শব্দ শোনা যায়। ওঁ-অনুভূতির পূর্বে দারুণ বম্ বম্ বম্ শব্দ হয়। দুনিয়াটা যেন ফেটে চৌচির হ’য়ে যাবে। কিছু থাকবে না, সব ধ্বংস হ’য়ে যাবে। সত্তাকেও বিলুপ্ত ক’রে দেবে। এমন শব্দ, সব যেন টুকরো টুকরো হ’য়ে, রেণু রেণু হ’য়ে উড়ে যাবে। সে কী ভীষণ অবস্থা! ভয় বলি, সত্তার ভয় যে কী তখন বোঝা যায়! সত্তা বুঝি এই মুহূর্তে গুঁড়িয়ে দিল। তখন বোঝা যায় দয়ালের দয়া, যে দয়ায় টিকে আছি এই দুনিয়ায়। ওঁ-অনুধাবনে রং আসে। রং-এ মনোনিবেশ করলে পিকলু বাঁশীর মত শব্দ হয়। দোল আসে। এক অবস্থায় motion and cessation (গতি এবং বিরতি)-এর মত বোধ হয়। স্বামীর অনুভূতি যেন to and from (একেবার সামনে একবার পেছনে হচ্ছে)-এমনতর বোধ করা যায়। ইলেকট্রিক ব্যাটারি দিলে যেমন শব্দ পাওয়া যায় না, ভিতরে বোধ হয়, রাধাও ঐ রকম সত্তা দিয়ে মানুষ হয়। শেষ দিকে আসে একটা পরম শান্ত অবস্থা। আমাদের এই সৎনাম সব মন্ত্রের বীজস্বরূপ। সব বীজের সত্তা হ’লো কম্পন। আর কম্পনের গঠনতন্ত্র অনুভব করা যায় এই নামের মধ্যে। রেডিওর যেমন শর্ট ওয়েভ, মিডিয়াম ওয়েভ এবং নানা মিটার আছে, অনুভূতির রাজ্যেও সেই রকম সব আছে। এগুলি ফালতু কথা না, এগুলির সত্তা আছে। যে সাধন করে সেই বুঝতে পারে। হ্রীং ক্রীং ইত্যাদির স্তরে-স্তরে কত শব্দ এবং তার সঙ্গে-সঙ্গে জ্যোতি ভেসে ওঠে। আর একটা কথা, পরীক্ষা করতে গেলে সদগুরুকে ধরা যায় না। কামনা নিয়ে গেলেও তাঁকে পাওয়া হয় না। কামনা ত্যাগ ক’রে ধরলে তখন তাঁকে পাওয়া যায়। কামনা নিয়ে তাঁতে যুক্ত হ’তে গেলে কামনার সঙ্গে যুক্ত হই, তাঁতে যুক্ত হ’তে পারি না। নিষ্কামের কথা কয়, তার মানে গুরুই আমার একমাত্র কাম্য হবেন, অন্য কোন কামনা থাকবে না। তখনই তাঁকে পাওয়া যাবে।’’ (আ. প্র. ১৫শ খণ্ড, পৃঃ ২০০-২০১ থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দিব্যবাণী)
তাই বাধ্য হয়ে এ-যুগের শ্রীকৃষ্ণ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বিকৃতাচারী ধর্মের ধ্বজাধারীদের উদ্দেশ্যে বললেন— “ভগবান, ইষ্ট বা ধর্ম্মের মৌখিক স্তুতির ভিতর-দিয়ে যা’রা ধর্ম্মবিরোধী কাজ করে, তা’রা হ’ল সব চাইতে বড় শয়তানের দূত–প্রকৃষ্ট লোক-দূষক। ১২৫ । (শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭)’’ ‘‘অনেকে শ্রীকৃষ্ণকে মানে, গীতা মানে, অথচ বর্ণাশ্রম মানে না। গীতার কে কি ব্যাখ্যা করেছেন সেই দোহাই দেয়। কিন্তু গীতার বক্তা শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও বাণী দেখে চতুর্বর্ণ সম্বন্ধে তাঁর মত আমরা কি বুঝি? এ সম্বন্ধে কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না, গীতা শ্রীকৃষ্ণের জীবনেই জীবন্তভাবে পরিস্ফুট। গীতায় প্রত্যেক বর্ণের স্বভাবজ কর্ম সম্বন্ধে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। (আ. প্র. ১৪/১১৮) কেষ্টঠাকুরের জীবনটা দেখেন, ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত সবাই তাঁকে পুরুষোত্তমজ্ঞানে পূজা করতেন, কিন্তু তাঁর এত বিয়ের মধ্যে একটাও বামুনের মেয়ে নেই। সমাজ-সংস্থিতির জন্য তিনি বর্ণাশ্রমের বিধান কাঁটায়-কাটায় মেনে গেছেন। (আ. প্র. ৭/৫০)’’ * * *
যারা শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে গবেষণা করেন, তাদের তো জানা উচিত যে, শ্রীকৃষ্ণ, বৃহত্তর রাষ্ট্রকে অধর্মের গ্যাংগ্রীন থেকে বাঁচাতেই সুকৌশলে কংস, জরাসন্ধ, শিশুপাল, শাল্ব কৌরবাদির ন্যায় আততায়ীরূপী গ্যাংগ্রীনদের অপারেশন করেছিলেন।—হিংসাকে হিংসা দ্বারা প্রতিরোধ করে অহিংসার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন! কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সনাতনী আর্য্যকৃষ্টির মূলতত্ত্ব, সদাচার ও বর্ণাশ্রমধর্মভিত্তিক পরমরাষ্ট্রিক সমবায়। শ্রীকৃষ্ণের লীলাবসান পরবর্তী শ্রীকৃষ্ণের গীতা-আদর্শের প্রচারক ঋত্বিক সংঘ সক্রিয় থাকার ফলে প্রজাগণ সহজাত-সংস্কার অনুযায়ী সবাই জীবিকা অর্জন করতেন। কেহ কাহারো বৃত্তি-হরণ করতেন না। সকলে আর্য্যকৃষ্টির বিবাহাদি দশবিধ সংস্কার মেনে চলতেন। জনন বিপর্যয় হয় নি, আশ্রমধর্ম ঠিক ছিল। ফলে তিন হাজার বছর পর্যন্ত বৃহত্তর আর্যাবর্তে আগ্রাসন করতে সাহস পায়নি অধার্মিক দুষ্কৃতিরা ! যখন থেকে বর্ণাশ্রম-ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের শিক্ষা ভুলে, প্রবৃত্তিরূপী শয়তানের প্ররোচনার ফাঁদে পড়ে আমরা ক্লীব হয়েছি, তখন থেকে আমরা আগ্রাসনের শিকার হয়েছি। বোধ বিপর্য্যয়ের কারণে, সনাতন ধর্মের অনুশাসন ভুলে, এক আত্মঘাতী উদারতা দেখাতে গিয়ে শক-হুণ-পাঠান-মোগলদের স্বাগত জানিয়েছি। তারা সুযোগ পেয়ে আমাদের জাতীয়তাবোধ, জাতীয়কৃষ্টি অবদলিত করেছে! অনেকদিন পরে, যখন আগ্রাসনের চরম বিপর্যয়, তখন ইংরেজদের অপশাসন থেকে আর্যাবর্তকে মুক্ত করতে আমরা মেরুদণ্ড সোজা করে ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করলাম। সেই শ্রীকৃষ্ণের গীতার আদর্শকে অবলম্বন করে। “যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লাণির্ভবতি ভারতঃ। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মনম্ সৃজাম্যহম্।। পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম্ । ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ।।”—বাণীর অনুসরণে। গীতার ওই সূত্র অবলম্বনে, চৈতন্যদেব ‘‘যেই রাম সেই কৃষ্ণ, এক দেহে রামকৃষ্ণ’’ রূপে এসে আমাদের ভুল ভাঙিয়ে দিলেন। গীর্জায় গিয়ে যীশুর, মসজিদে গিয়ে রসুলের আরাধনা করলেন। পঞ্চমুণ্ডির আসন সাজিয়ে কোনো তান্ত্রিক-গুরু বসালেন তো বসে পড়লেন। তিনি লোকশিক্ষার জন্য বহু ধর্মীয় মতবাদের গুরুদের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুন্ন রেখেই। তিনি দক্ষিণেশ্বরে পূজারী হয়ে এসেও প্রচলিত পূজা-পদ্ধতি অনুসরণ করেন নি। মৃন্ময়ী জগন্মাতাকে প্রাণবন্ত করে দেখালেন এবং কালী মায়ের আদেশক্রমে নিজে খেয়ে মাকে খাওয়ালেন। ফলহারিনী কালী পূজার শুভলগ্নে সারদাদেবীকে আরাধনা করে চিন্ময়ী মাতৃশক্তিকে আদ্যাশক্তি রূপে শ্রদ্ধা করতে শেখালেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব শিষ্য নরেন্দ্রনাথকে শেখালেন, ভারতবর্ষের শাশ্বত দর্শন, ‘‘বহুজন হিতায় চ, বহুজন সুখায় চ’’-এর আদর্শের উত্তরাধিকারী হয়ে পরমার্থ লাভ করার জন্য তোমাকে আত্ম নিবেদন করতে হবে। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ঐশী শক্তিতে শক্তিমান হয়ে নরেন্দ্রনাথ হলেন বিবেকানন্দ। এঁকে দিলেন মহান ভারতবর্ষের পূর্ণাঙ্গ এক চিত্র। শিকাগো ধর্ম্ম মহাসভার ক্যানভাসে। ‘আব্রহ্মস্তম্বভৃদ্ধাতা’–তৃণলতা থেকে ব্রহ্ম, সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বার্তাবহ বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, সংহিতা, পুরুষোত্তমবাদ নিয়ে বিশ্বজনমানস নতুন করে ভাবতে শুরু করলো। সনাতন ধর্মের হৃত উত্তরাধিকার ফিরে পেতে ভারতবর্ষ উপনিষদের ‘‘উত্তিষ্ঠত জাগ্রত, প্রাপ্য বরান্ নিবোধত।।’’ মন্ত্রে আবার নতুন করে জেগে উঠলো।……… ‘‘কর্ম্মণ্যেবাধিকারেস্তু মা ফলেষু কদাচন।…….’’ ––কর্মেই তোমার অধিকার ফলে নয়। ––শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতার ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার আদর্শ আঁকড়ে নবযুগের অভিমন্যু ক্ষুদিরাম, দেশরক্ষার ধর্ম পালন করতে গিয়ে ফাঁসির আসামী হলেন। ‘‘ন জায়তে ম্রিয়তে কদাচিৎ…….বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়………নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ।…….’’। বাণীর অমৃত আদর্শে স্থিতপ্রজ্ঞ, মৃত্যুঞ্জয়ী ক্ষুদিরাম হাসিমুখে ফাঁসির দড়ির মালা পড়লেন গলায়। একটা ক্ষুদিরামের আত্মাহুতি জন্ম দিল হাজারো ক্ষুদিরামের। ফাঁসিরজ্জু আর ইংরেজ রাজশক্তির বুলেটের আলিঙ্গনে জীবনের জয়গান গাইতে গাইতে অকালে হাসিমুখে বিদায় নিল উত্তরাধিকারের স্বপ্নদেখা কতশত বীর ভারত-সন্তানেরা। স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম শহীদ ক্ষুদিরাম ‘গীতা’-বর্ণিত ‘‘হতো বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং/জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম্’’-এর বাণীর অনুসরণে অমরত্ব লাভের অনুশাসন মেনে মৃত্যু বরণ করে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মৃত্যুঞ্জয়ী হতে শিখিয়েছিলেন। গীতা গ্রন্থের সেইসব বীরগাঁথা ভুলে আমরা তাঁর ঋণ শোধ করছি, ‘কৃষ্ণ করলেই লীলা, আমরা করলেই বীলা’ গানের ডালি সাজিয়ে! যদিও ওই গান রচনা করার সাহস আমরাই দিয়েছি,—যারা ধর্মের ধ্বজা ধরে প্রবৃত্তিকে পোষণ দিয়ে চলেছি।–-পার্থসারথী শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমদ্ভাগবতগীতার আদর্শ ভুলে, হ্লাদিনি শক্তিরূপিনী রাধা-তত্ত্ব ভুলে, মনগড়া প্রবৃত্তি-প্ররোচিত মানবী রাধা, শ্রীকৃষ্ণের মামীর সাথে পরকীয়া কামুক-রূপে, গোপিনীদের বস্ত্রহরণকারী-রূপে শ্রীকৃষ্ণকে চিত্রিত করে! ‘রাই জাগো রাই জাগো বলে শুক-সারি বলে, কত নিদ্রা যাওগো রাধে শ্যাম-নাগরের কোলে।…..’ এবং ‘রাই জাগোরে, জাগো শ্যামের মনমোহিনী বিনোদিনী রাই/শ্যাম অঙ্গে অঙ্গ দিয়া আছোরে রাই ঘুমাইয়া তোমার কি লোকলজ্জা নাই….’ ওই প্রভাতী গান দুটো বৈষ্ণব মহলে শুধু নয়, কীর্তন হিসেবেও সমাদৃত, জনপ্রিয়। গান দুটোর ভাষা বিশ্লেষণ করে একবার দেখুন। শাস্ত্র অনুযায়ী আর্য্য হিন্দুদের ব্রাহ্মমুহূর্তে শয্যাত্যাগ করে ঈশ্বরোপাসনা করতে হয়। আর প্রাকৃতিক নিয়মে ব্রাহ্মমুহূর্ত কালে সব পাখিরা জেগে যায়। স্বভাবতই শুক-সারি পাখি জেগে গিয়েছে। রাধা তখনো নাগর কৃষ্ণের অঙ্কশায়িনী হয়ে শুয়ে আছে। নগরবাসীরা যদি জানতে পারে তাহলে লজ্জায় পড়তে হবে। তাই শুক-সারী পাখি ওদের ভাষার জাগরণী গান গেয়ে রাধাকে সাবধান করে দিচ্ছেন। আর কৃষ্ণ ভক্তেরা ভালোমন্দ বিচার না করে, ওই গানকেই জাগরণীর জন্য আদর্শ গান হিসেবে নির্বাচন করে গেয়ে চলেছেন। এবার বিচার করে দেখুন, কাম-রসাত্মক চটুল কথায় প্রভাতী সুর লাগিয়ে শ্রীকৃষ্ণের নামে ওই আরাধনা আর্য্যকৃষ্টি বিরোধী প্রবৃত্তি-প্ররোচিত পরদারাসক্ত ব্যতীত কোন্ আধ্যাত্মিক আবেদনে সমৃদ্ধ ? ওইসব জাগরণী গান শুনে, এবং কবি জয়দেব বিরচিত গীতগোবিন্দের ছত্রে ছত্রে বর্ণিত কামবিলাসী, ‘দেহি পদপল্লব মুদারম্’ বলে রাধার মানভঞ্জন করা, পরকীয়া নিয়ে ব্যস্ত শ্রীকৃষ্ণের কীর্তিকলাপ পড়ে, যদি কোন তথাকথিত নাস্তিক্যবাদী শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রে কালিমালিপ্ত করে, —সেই ধর্মবিরোধী, ইষ্টবিরোধী প্রচারের জন্য দায়ী কারা? শ্রীকৃষ্ণ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন, ‘‘ …….. ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এলেন। ব্রাহ্মণ্যধর্ম্ম অর্থাৎ বৃদ্ধির ধর্ম্ম প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি প্রাণপাত করলেন। অথচ ব্রাহ্মণকুলতিলক দ্রোণাচার্য্যই তাঁর বিরুদ্ধে গেলেন। ভীষ্ম অন্নের কৃতজ্ঞতার দোহাই দিয়ে কৌরবপক্ষে গেলেন। কিন্তু যে-অন্ন তিনি খেয়েছিলেন সে-অন্নের অর্দ্ধেক মালিক পাণ্ডবরা। যা হোক, ধর্ম্ম কোথায়, ন্যায় কোথায়, লোকহিত কোথায়, কৌরবপক্ষ তা না বোঝার ফলে যুদ্ধ অনিবার্য্য হয়ে উঠলো। এতসব বিপর্য্যয় সত্ত্বেও কেষ্টঠাকুর ঘরে-ঘরে ঋত্বিক, অধ্বর্য্যু, যাজক পাঠিয়ে লোকের মনন ও চলনের ধারা দিলেন বদলে। করলেন ধর্ম্মের সংস্থাপনা। বুদ্ধদেব আসবার পর বৌদ্ধভিক্ষুরা দেশ ছেয়ে ফেললো, যার পরিণাম অশোক। অশোকের ভুলত্রুটি যাই থাক, শোনা যায়, অমনতর সম্রাট ও অমনতর সাম্রাজ্য নাকি কমই হয়েছে। রসুল আসার পর ইসলামের যাজনের ঢেউ কী রকম উঠেছিল তা কারও অজানা নয়। বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, মুসলমান সবাই তাদের যাজনের রেশটা কম-বেশী ধরে রেখেছে। প্রচারক আছে, প্রচেষ্টা আছে। অবশ্য, আচরণহীন প্রচারণায় যতটুকু হতে পারে ততটুকুই হচ্ছে। তবু মানুষের কানের ভিতর কথাগুলি ঢুকছে। কিন্তু আমাদের ঘরে ঘরে হানা দেবার কেউ নেই। তারা কেউ জুটলো না। অথচ হুজুগ করার এত লোক জুটছে। হুজুগ করে দল বেঁধে জেলে গেলে তাতে মানুষ কতখানি গড়ে উঠবে তা বুঝতে পারি না। (আ. প্র. ৮ম খণ্ড, ২৬. ০৬. ১৯৪৬) “আলেকজাণ্ডারের আগে পর্য্যন্ত কোন আক্রমণকারী আমাদের দেশে ঢুঁ মেরে কিছু করতে পারেনি । অশোকের Buddhism (বৌদ্ধবাদ)-এর পর থেকে বর্ণাশ্রম ভেঙ্গে পড়ে এবং সেই থেকেই সমাজ ও জাতি দুর্ব্বল হয়ে পড়ে । বুদ্ধদেব গৃহীর জন্য বর্ণাশ্রম রক্ষা করতে বলেছেন । আর ভিক্ষু, শ্রমণ ইত্যাদির বেলায় ওটার ওপর জোর দেননি । আর, সে ক্ষেত্রে ওর প্রয়োজনও ছিল না । কারণ, ভিক্ষু বা শ্রমণদের কোন যৌন সংশ্রব ছিল না । কিন্তু ভিক্ষুণীপ্রথা প্রবর্তনে সে বাঁধনও ভেঙে গেল । বুদ্ধদেব যে স্বর্ণযুগ আনতে চেয়েছিলেন তা আর সম্ভব হ’ল না ।” (আ. প্র. ২১/৬. ৮. ১৯৫২) * * *
আর একবার কৃষ্ণকথায় ফিরে আসছি। বিচার করে দেখব, কৃষ্ণ-রাধার আজগুবী তত্ত্বের অস্তিত্ব আদৌ আছে কি-না। পণ্ডিতদের মতে কংসের দূত হয়ে মহামতি অক্রুর, বলরামসহ শ্রীকৃষ্ণকে বৃন্দাবন থেকে মথুরায় নিয়ে যান কংস আয়োজিত ধনুর্যজ্ঞে অংশগ্রহণ করাতে। কংসের উদ্দেশ্য ছিল শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করার। পরিবর্তে শ্রীকৃষ্ণ অত্যাচারী কংস-মামাকে হত্যা করে পিতামহ উগ্রসেনকে রাজ্য প্রত্যর্পণ করেন। তারপর ঘোর আঙ্গিরসের সান্নিধ্যে পরাবিদ্যা এবং সান্দিপনী কাশ্যের সান্নিধ্যে অপরাবিদ্যা লাভ করেন আর বৃন্দাবনে ফিরে যান নি। পণ্ডিতদের এই সাক্ষ্য থেকে প্রমাণিত, শ্রীকৃষ্ণ ১১ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে কংসকে বধ করেন। অথচ বেশীরভাগ কৃষ্ণভক্তগণ বৃন্দাবন লীলার, রাসলীলার নামে যে যুবক কৃষ্ণকে মানবী রাধার সাথে যুগলবন্দী করে পরকীয়া কামুক রূপে চিত্রিত করে চলেছেন, সে কৃষ্ণ কোন কৃষ্ণ? সে কি বৃষ্ণিসিংহ দেবকীনন্দন, না অন্য কেউ ? সে কি গীতার প্রবক্তা পার্থসারথী, না অন্য কেউ? কারণ, বৈষ্ণবদের প্রামাণ্য গ্রন্থ ভাগবতে রাধা-কৃষ্ণের ওইসব অবৈধ পরকীয়া-লীলার কোন কাহিনী লিপিবদ্ধ নেই। অথচ কৃষ্ণের প্রচারকেরা গীতার কথা বলেন, ভাগবতের কথা বলেন, অথচ আয়ান ঘোষের ঘরণী রাধাকে শ্রীকৃষ্ণের সাথে এক অবৈধ সম্পর্কের সাথে জুড়ে নিয়ে কৃষ্ণনাম করতে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণের যে বদনাম করে চলেছেন, সেটাও তাদের বোধে ধরা পড়ে না, এমনই ধার্মিক তা’রা ! কৃষ্ণকে একমাত্র ভগবান বলে মানেন যারা, তারা আবার শ্রীকৃষ্ণের সাথে রাধারও উপাসনা করেন, কোন্ যুক্তিতে? তাদের অনেকেই আবার শ্রীকৃষ্ণের নব-কলেবর জ্ঞানে চৈতন্যদেবের প্রতিকৃতির উপাসনাও করেন। তা’রা বলেন, চৈতন্যদেব রাধা-কৃষ্ণের যুগল অবতার। খুব ভাল কথা। তাই যদি হয়, তাহলে তো একঅঙ্গে দুই-রূপ যুগল অবতার-স্বরূপ চৈতন্যদেবেরই আরাধনা করতে হয়। আলাদা করে রাধা-কৃষ্ণের যুগলমূর্তির আরাধনার প্রয়োজন নেই। কারণ গীতার বাণী ‘‘তেষাং জ্ঞানী নিত্যযুক্ত একভক্তি র্বিশিষ্যতে।’’ (৭ম অধ্যায়) অনুসারে পুরুষোত্তম ব্যতীত একাধিক আদর্শকে মনে স্থান দিলেও ব্যভিচার করা হয়, যা ইষ্টলাভের বা ঈশ্বরলাভের পথে অন্তরায়। ইসকন ভক্তদের এ বিষয়টা একবার ভেবে দেখা উচিত। কারণ, আমরা জীবনপিয়াসী যারা, তারা যদি এভাবে জীবনদেবতার অপমান করে চলি, আমাদের জীবন কিভাবে সমৃদ্ধ হবে? এ বিষয়ে বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, ‘‘চৈতন্যদেবের দ্বৈতবাদ নয়, দ্বৈতভাব। মূলতঃ সকলের বাদই অদ্বৈত, কারণ, একের উপরই দাঁড়িয়ে আছে যা-কিছু, আদিতে এক ছা়ড়া দুই নেই। একেরই স্থূল, সূক্ষ্ম, কারণ নানাস্তর ও অভিব্যক্তি আছে। কিন্তু ভক্তিই তাঁকে লাভ করার সহজ পথ। ভক্তির মধ্যে দ্বৈতভাব এসে পড়ে, ভক্ত নিজের সত্তা না হারিয়ে ভগবানকে ভজনা করে চলে। ভক্তির সঙ্গে আবার কর্ম্ম ও জ্ঞান অচ্ছ্যেদ্যভাবে জড়ান। একেরই বিচিত্র প্রকাশ বলে সব সমন্বয় হয়েই আছে।’’ (আ. প্র. ১৩/৩১.৭.১৯৪৮) “ধর্ম্ম মানে বাঁচাবাড়ার বিজ্ঞান। যে-কোন মহাপুরুষই তার প্রবক্তা হউন না কেন, তাতে ধর্ম্মের কোন পরিবর্তন হয় না; ধর্ম্ম চিরকালই এক। হিন্দুর ধর্ম্ম যা, মুসলমানের ধর্ম্মও তাই; প্রত্যেক ধর্মমতের লোকই ঈশ্বরপন্থী। আর, সেই ঈশ্বর একজন ছাড়া দুইজন নন। তাঁর প্রেরিত বাণীবাহক যাঁরা, তাঁরাও একই সত্যের উদ্গাতা—একই পথের পথিক—নানা কলেবরে একই সত্তা। তাই ধর্ম্ম মানুষকে মিলিত ছাড়া বিচ্ছিন্ন করে না। ধর্ম্মের থেকে চ্যুত হলেই সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে বিভেদ-বিরোধের সৃষ্টি হয়। হিন্দু যদি প্রকৃত হিন্দু হয়, মুসলমান যদি প্রকৃত মুসলমান হয়, তারা বান্ধববন্ধনে আবদ্ধ হতে বাধ্য; বাপকে যে ভালবাসে, সে কখনও ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ হতে পারে না। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের উপাস্যই এক ও অদ্বিতীয়; তাই সম্প্রদায়গুলি ভাই-ভাই ছাড়া আর কি? মানুষের সহজ বুদ্ধিতে সবই ধরা পড়ে; গোলমাল করে দূরভিসন্ধিপ্রসূত অপব্যাখ্যা ও অপযাজন। ধর্ম্ম যদি বিপন্ন হয়ে থাকে, তবে সবচাইতে বেশী বিপন্ন হয়েছে, এমনতর অপযাজকদের হাতে। প্রত্যেক ধর্ম্মমতের আসল রূপটি তুলে ধরতে হবে সাধারণ লোকের কাছে; তাহলে দুষ্টলোকের জারীজুরি খাটবে না। হিন্দুর যেমন হিন্দুত্বের বিকৃতি বরদাস্ত করা উচিত নয়, তেমনি উচিত নয় ইসলামের বিকৃতি বরদাস্ত করা। মুসলমানেরও তেমনি উচিত নয় ইসলাম ও হিন্দুত্বের আদর্শকে ক্ষুণ্ণ হতে দেওয়া। কোন ধর্ম্মাদর্শকে ক্ষুণ্ণ হতে দেওয়া মানে শয়তানের সাগরেদি করা। আমাদের নিজেদের যেমন ধর্ম্মপরায়ণ হয়ে উঠতে হবে—পরিবেশকেও তেমনি ধর্ম্মপরায়ণ করে তুলতে হবে—প্রত্যেককে তার বৈশিষ্ট্য ও ধর্ম্মাদর্শ অনুযায়ী। হিন্দু যেমন গীতা পড়বে, তেমনি কোরাণ-বাইবেলও পড়বে; মুসলমান যেমন কোরাণ পড়বে, তেমনি গীতা বাইবেলও পড়বে। প্রত্যকে চেষ্টা করবে বাস্তব আচরণে স্বধর্মনিষ্ঠ হতে এবং অন্যকেও সাহায্য করবে ও প্রেরণা জোগাবে অমনতর হয়ে উঠতে। এমনতর হতে থাকলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সৌহার্দ্দ্য গড়ে তুলতে কদিন লাগে? আমি তো বুঝি, হিন্দুত্বের প্রতিষ্ঠা যেমন আমার দায়, ইসলাম ও খ্রীষ্টধর্ম প্রভৃতির প্রতিষ্ঠাও তেমনি আমারই দায়। আমার পরিবেশের প্রত্যেকে তার মত করে যদি ঈশ্বরপরায়ণ না হয়ে ওঠে, আদর্শপ্রেমী না হয়ে ওঠে, ধর্ম্মনিষ্ঠ না হয়ে ওঠে, তাহলে তো আমারই সমূহ বিপদ। পরিবেশকে বাদ দিয়ে আমার ধর্ম্ম করা অর্থাৎ বাঁচাবাড়ার পথে চলা তো সম্ভব নয়।” (আ. প্র. ৯/২. ১০. ১৯৪৭) “……শুনেছি রসুল পূর্বতনকে মানার কথা যেমন বলেছেন তেমনি আবার বলেছেন—যদি কোন হাবসী ক্রীতদাসও তোমাদের কোরাণ অনুসারে পরিচালিত করেন, তবে তোমরা তাঁর আদেশ পালন করে চলো। আর এটা ঠিক জেনো—কোরাণ, বেদ, বাইবেল, গীতা ইত্যাদির মধ্যে যেমন কোন বিরোধ নেই, বৈশিষ্ট্যপালী, আপূরয়মান মহাপুরুষ, তা তিনি পরবর্তী যে যুগেই আবির্ভূত হউন, তাঁর বাণীর মধ্যে কোরাণ, বেদ, বাইবেল, গীতার পরিপন্থী কোন কথা থাকে না, বরং থাকে যুগোপযোগী পরিপূরণ। তাই পরবর্তীর মধ্যে আমরা পূর্ববর্তীকে আরো করে পাই। একই ঈশ্বরপ্রেরণার প্রবাহই তো যুগ-যুগ ধরে বয়ে চলে আরো আরোতর অভিব্যক্তি নিয়ে প্রয়োজন ও পরিস্থিতির পরিপূরণে। সৃষ্টি যতদিন থাকবে, ততদিন এ ধারা চলতেই থাকবে।” (শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, আ. প্র./ ১১/৭.৫.১৯৪৮)
চৈতন্যদেবের পরবর্তী আবির্ভাব প্রসঙ্গে শ্রীচৈতন্য ভাগবত গ্রন্থে বর্ণনা রয়েছে— এইমত আর আছে দুই অবতার সঙ্কীর্তন আনন্দ রূপ হইবে আমার।। তাহাতেও তুমি সব এই মত রঙ্গে সঙ্কীর্তন করিবা মহাসুখে আমা সঙ্গে।। (শ্রীচৈতন্য ভাগবত পৃষ্ঠা ১৪৩, মধ্যখণ্ড ষড়বিংশ অধ্যায়।) অথচ বেশিরভাগ চৈতন্য অনুগামীরা গোঁসাই সাজলেন, কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষা দিয়ে বেড়ালেন, অথচ সাধনা দিয়ে চৈতন্যদেবের নব-কলেবর শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে মেনে নিলেন না। তেমনি বেশিরভাগ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ভক্তরা শ্রীরামকৃষ্ণের পরবর্তী অবতার শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রকে অন্বেষণ করতে সাধন করলেন না। ফলে ধর্মের গ্লাণি থেকেই গেল। ১৮৮৬ ইংরাজী নববর্ষের দিনে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের কল্পতরু হবার সংবাদ শুনে ভক্তরা সমবেত হয়েছিলেন কাশীপুরের উদ্যানবাটীতে। নিজেদের মনোবাসনা পূর্ণ করতে। অবশেষে অসুস্থ শ্রীরামকৃষ্ণদেব দর্শন দিলেন ভক্তদের। সমবেত ভক্তদের উপদেশ দিয়ে বললেন, তোমাদের চৈতন্য হোক। শ্রীরামকৃষ্ণদেব জীবনের শেষপ্রান্তে বলেছিলেন, এবারে সব জ্ঞান পার্ষদদের দিচ্ছিনা। শীঘ্রই আবার আমাকে আসতে হবে। ঈশান কোণে, গরীব ব্রাহ্মণের ঘরে। তখন যারা না আসবে তাদের মুক্তি হতে অনেক দেরি হবে। শ্রীরামকৃষ্ণদেব ১৮৮৬তে ইহলীলা সম্বরন করে ১৮৮৮তে আবির্ভূত হন অনুকূলচন্দ্র রূপ নিয়ে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র অবতারে পরিপূর্ণ চৈতন্য দিতে চরমতত্ত্ব দিয়ে গেলেন। চৈতন্য লাভের সহজপন্থা দিলেন দৈনন্দিন স্বতঃ-অনুজ্ঞা অনুশীলনের মাধ্যমে। অজর-অমর-চিরচেতন মন্ত্রে। যারা চৈতন্যদেবকে বা শ্রীরামকৃষ্ণ দেবকে পেতে ইচ্ছুক, তাদের কাছে বিনীত অনুরোধ, শ্রীকৃষ্ণের সর্বশেষ অবতার বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সাধন-পদ্ধতি প্রাণমন দিয়ে সাধনা করলেই আপনাদের অভীষ্ট ইষ্টদেব ধরা দেবেন মেধানাড়ীতে। যে সূত্র তিনি শ্রীকৃষ্ণ অবতারে দিয়ে রেখেছিলেন— ‘‘বহূনি মে ব্যতীতানি……………..ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জ্জন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জ্জুন।। (শ্রীমদ্ভগবদগীতা চতুর্থোহধ্যায়, ৫—৯ শ্লোক) সবাইকে ইষ্টরঙে রঞ্জিত হবার আবেদন জানিয়ে, জানাই শ্রদ্ধা, ভক্তি, প্রণাম ও জয়গুরু! অভিবাদন। বন্দে পুরুষোত্তমম্! ধ্বনী দিয়ে নিত্য হতে লীলায়, লীলা হতে নিত্যে আগম-নিগমকারী পূর্বাপূর্ব সব পুরুষোত্তমদের লীলা স্মরণ করে ইতি টানলাম। আমাদের সকলের ‘চৈতন্য হোক’। ধর্মের বিকৃত ধারা যেন আমাদের স্পর্শ করতে না পারে। ——–
এই তীর্থ স্নানটি এক সময়ে এতোই দুর্গম স্থানে অবস্থিত ছিলো যে অন্যান্য তীর্থের মতো সব সময় বা ইচ্ছামতো যাওয়া সম্ভব হতো না। নদীনালা, বন-জঙ্গল অতিক্রম করে যেতে হতো। তা ছাড়া চোর, ডাকাত ও জলদস্যুর ভয় তো ছিলই, এমনকি বন্য জন্তুর আক্রমণে মৃত্যুও পর্যন্ত ঘটত। সাগর দ্বীপটা শহর কলকাতা থেকে বেশ অনেকটা দূরে। আগে যানবাহনের তেমন সুবন্দোবস্ত ছিলো না। ইদানিং যানবাহনের প্রভুত উন্নতি হয়েছে। তৈরী হয়েছে প্রচুর রাস্তা ঘাট।
পূর্বে এই দ্বীপে যাতায়াতের জন্য নদীপথ বা জলাপথ ছিলো এক মাত্র ভরসা। বর্তমানের উন্নত যানবাহনের যুগেও জলপথে নৌকা, ভটভটি, লঞ্চ, ভেসেল, কুরুজ যোগে যাতায়াত চলছে। পৌষ মাসের একেবারে শেষ মকর সংক্রান্তির দিনে লক্ষ-লক্ষ নরনারী প্রচণ্ড শীতের দাপট উপেক্ষা করেও হাজির হয় এই সাগর সঙ্গমে। আজকাল অনেকেই যাচ্ছেন বত্সরের যে কোনো সময়ে। বলা যায় আগে মতো সেই ভয়াবহ দুর্গমতা আর নেই। প্রতিদিন নিত্য নতুন মানুষের পদার্পণে সাগর দ্বীপ এর তীর্থ স্নানটি কোলাহল মুখর হয়ে উঠে। তাই সারা বছর এখন অনেক জমজমাট।
তীর্থ স্নানের সন্নিকটে গড়ে উঠেছে জেলা প্রশাসনের সার্কিট হাউস, যুব আবাস, জেলা পরিষদ ভবন, দোকানপাট, হোটেল আরও কতো কি!
ভারত সেবাশ্রমের বিশাল বাড়ি ও অনেক ধর্মশালা গড়ে উঠেছে এই দ্বীপে। সরকারের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে সুন্দর বৃহত্ মন্দির। এই দুর্গম স্নানে মহা ঋষি কপিল মুনির আশ্রম ছিলো। মুনিবর এখানে সাধনা করতেন। সাগর দ্বীপে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী পৌষ সংক্রান্তির পুণ্যলগ্নে স্নান করেন। এই মেলার অধীনে তিন শতাধিক বিঘা জমি রয়েছে। ভরা কোটালে সাগর এর জলোচ্ছ্বাস থেকে বাঁচাতে এক তলার সমান উঁচু থাম ওয়ালা বাড়ি তৈরী হয়েছে।
এই বাড়িটি কপিল মুনির মন্দির এখানে আছে ভগীরথের কোলে মা গঙ্গা, বীর হনুমান, সিংহবাহিনী, বিশালক্ষী ও ইন্দ্রদেব।
এক কালে সাগর দ্বীপ ছিলো ১৭০ বর্গ মাইলের এক সমৃদ্ধ জনপথ। ১৬৮৮ সালে সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচছাসে প্রায় দু লক্ষ মানুষ সমুদ্রে ভেসে যায়। সেই থেকে দ্বীপটি বহু কাল জনহীন হয়ে পড়ে। ইতিহাস ৪৩০ খ্রিস্টাব্দে রানী সত্যভামা প্রথম কপিল মুনির মন্দিরটি তৈরী করেন। সেই মন্দিরটি বিলীন হয়ে যাবার পর আরও ছয়টি মন্দির তৈরী হয়, পরে বিলীন হয়ে যায়। বর্তমান মন্দিরটি আদি মন্দির স্থল থেকে প্রায় ২ কিমি দূরে অবস্থিত। বর্তমানে এই কপিল মুনির মন্দির সংলগ্ন এলাকায় প্রভূত উন্নতি হয়েছে। কাকদ্বীপ, নামখানা ব্যতীত ডায়মণ্ড হারবার থেকে ক্রুজে করে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় গঙ্গাসাগরে।
***************************
উইকিপিডিয়া অনুসারে গঙ্গা ভারত ও বাংলাদেশে প্রবাহিত একটি আন্তর্জাতিক
নদী। এই নদী ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের জাতীয় নদী। গঙ্গার দৈর্ঘ্য ২,৭০৪
কিমি (১,৬৮০ মা); উৎসস্থল পশ্চিম হিমালয়ে ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যে।
দক্ষিণ ও পূর্বে গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গা
মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। এক্ষেত্রে এর দুটি ধারা বা শাখা লক্ষনীয়– একটি
ফারাক্কা বাঁধ থেকে এসে ভাগীরথী ও হুগলী নদী নামে মূলত দক্ষিণে প্রবাহিত
হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে; অপরটি বাংলাদেশ সীমান্তে মহানন্দার সঙ্গে মিলিত
হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে পদ্মা নামে গোয়ালন্দ পর্যন্ত প্রবাহিত
হয়েছে। পদ্মাকে মূলত গঙ্গার প্রধান শাখানদী বলা হয়। তবে ঐতিহাসিক
কারণবশত এর অববাহিকাকেও গাঙ্গেয় বদ্বীপের অন্তর্গত বিবেচনা করা হয়।
জলপ্রবাহের ক্ষমতা অনুযায়ী গঙ্গা বিশ্বের প্রথম ২০টি নদীর একটি।
গাঙ্গেয় অববাহিকার জনসংখ্যা ৪০ কোটি এবং জনঘনত্ব ১,০০০ জন/বর্গমাইল (৩৯০
/কিমি২)। এটিই বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নদী অববাহিকা।
গঙ্গা হিন্দুদের কাছে পবিত্র নদী। তারা এই নদীকে গঙ্গা দেবীজ্ঞানে পূজা
করেন। (পূজা মানে সম্বর্দ্ধনা, অথচ আমরা তথাকথিত অমূর্ত মূর্তিপূজার নামে
পূজাবশিষ্ট বর্জ্য গঙ্গায় নিক্ষেপ করে গঙ্গাকে দূষিত করে চলেছি! যা সনাতন ধর্মনীতির বিরোধী।) গঙ্গার
ঐতিহাসিক গুরুত্বও অপরিসীম। একাধিক পূর্বতন প্রাদেশিক ও সাম্রাজ্যিক
রাজধানী (যেমন পাটলিপুত্র, কনৌজ, কাশী, এলাহাবাদ, মুর্শিদাবাদ, মুঙ্গের,
নবদ্বীপ ও কলকাতা) এই নদীর তীরেই অবস্থিত।
পরিবেশ বিভাগের রিপোর্ট অনুসারে গঙ্গা বিশ্বের পাঁচটি সবচেয়ে দূষিত নদীর
একটি। বারাণসীর কাছে এই নদীতে ফেসাল কলিফর্মের পরিমাণ ভারত সরকারের
নির্ধারিত সীমার চেয়ে একশো গুণ বেশি। গঙ্গাদূষণ শুধুমাত্র গঙ্গাতীরে
বসবাসকারী কয়েক কোটি ভারতীয়দেরই ক্ষতি করছে না, ১৪০টি মাছের প্রজাতি,
৯০টি উভচর প্রাণীর প্রজাতি ও ভারতের জাতীয় জলচর প্রাণী গাঙ্গেয়
শুশুক-এরও ক্ষতি করছে।গঙ্গাদূষণ রোধে গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান নামে একটি
পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতি, প্রযুক্তিগত অদক্ষতা, সুষ্ঠু
পরিবেশ পরিকল্পনার অভাব, ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য ও বিশ্বাস এবং ধর্মীয়
সংগঠনগুলোর অসহযোগিতার কারণে এই প্রকল্প ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।কিন্তু
বর্তমানে সরকারের তৎপরতায় গঙ্গা নদী অনেকটাই দূষণমুক্ত হয়েছে এবং
ভবিষ্যতে পুরো নদী দূষণ মুক্ত হবে, সেই আশা রাখা যায়।
দেবপ্রয়াগ, অলকানন্দা (ডানে) ও ভাগীরথী (বাঁয়ে) নদীর সঙ্গমস্থল, এখান
থেকে মূল গঙ্গা নদীর শুরু।
ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের গাড়োয়াল অঞ্চলে গঙ্গার উৎস অঞ্চল।
মূল গঙ্গা নদীর উৎসস্থল ভাগীরথী ও অলকানন্দা নদীর সঙ্গমস্থল। হিন্দু
সংস্কৃতিতে ভাগীরথীকেই গঙ্গার মূল প্রবাহ বলে মনে করা হয়। যদিও
অলকানন্দা নদীটি দীর্ঘতর। অলকানন্দার উৎসস্থল নন্দাদেবী, ত্রিশূল ও কামেট
তাঁর পবিত্র ধারায় স্নাত হয়ে যারা জন্মরহিত হয়, তাঁর তটে বাস করে যারা
বৈকুণ্ঠের শান্তি ভোগ করে যেন তাঁরা গঙ্গার কৃপাদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত না
হন।
তিনি যেন তাঁদের রোগ শোক তাপ পাপ কুমতি দূর করে সুমতি দেন, গঙ্গাদেবীর
মাহাত্ম্য বর্ণনায় সেই প্রার্থনা জানিয়েছেন কবি শংকরাচার্য।
শ্রীচৈতন্যদেব মহাপ্রভুর জন্মভূমি ও কর্মভূমি ছিল নবদ্বীপ গঙ্গাতীরে। ঠাকুর
শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সাধনভূমিও দক্ষিণেশ্বর গঙ্গা তীরেই। শাস্ত্রমতে, উভয়
সাধনভূমির ভূমিভাগ ছিল কূর্ম পৃষ্ঠাকৃতির এবং রম্য পুষ্পশোভিত।
বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রেরও জন্মভূমি ও কর্মভূমি
ছিল ভাগিরথী-গঙ্গার মূল প্রবাহ পদ্মা তীরের পাবনা জেলার হিমাইতপুরে।
গঙ্গানদীর সৃষ্টি ও সাগরমেলার সূত্রপাতের কাহিনী
কথিত আছে দানবীর রাজা হরিশচন্দ্রের বংশে সগর নামে একজন খুব বিখ্যাত রাজা
ছিলেন। আর তাঁর ছিল ষাট হাজার একজন পুত্র। সেই সগর রাজা ঠিক করলেন তিনি
অশ্বমেধ যজ্ঞ করবেন। সেই মতো একটি ঘোড়ার কপালে জয়-পতাকা লিখে তিনি
ছেড়ে দিলেন বিশ্ব ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। অপেক্ষা করতে লাগলেন ঘোড়াটি কবে
দেশ-বিদেশ ঘুরে ফিরে আসবে তারপর যজ্ঞ করে ইন্দ্রত্ব লাভ করবেন।
ওদিকে দেবরাজ ইন্দ্র ওই যজ্ঞের সংবাদ শুনে ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি
ভাবলেন, রাজা যদি রাজচক্রবর্তী হয়ে পুরো স্বর্গটাই চেয়ে বসেন, তখন কী হবে, তাই তিনি ফন্দি করে যজ্ঞের ঘোড়াটি পাতালে কপিল মুনির আশ্রমে বেঁধে রেখে এলেন।
ওদিকে ঘোড়াটিকে অনুসরণ করছিলেন রাজার ষাট হাজার পুত্র। (!) হঠাৎ ঘোড়াটি নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেই তাকে খুঁজতে শুরু করে দিলেন। আর খুঁজতে খুঁজতে তাঁরা পৌঁছে গেলেন কপিল মুনির আশ্রমে। ঘোড়াটিকে সেখানে দেখতে পেয়ে ক্রোধান্ধ হয়ে মুনিকে মারতে লাগলেন। মুনি যত বলেন ‘আমি ধ্যান করছিলাম, আমি জানি না
একে এখানে কে রেখে গেছে । ওঁর কথায় কর্ণপাত না করে সবাই মিলে আরও বেশি
করে মারতে লাগলেন। শেষে মুনি রেগে গিয়ে ক্রোধাবিষ্ট লোচনে তাঁদের দিকে
তাকাতেই তাঁরা সবাই ভষ্ম হয়ে গেলেন।
ওই সংবাদ পাওয়া মাত্র সগরের এক নাতি পাতালে গিয়ে মুনির পা ধরে
কান্নাকাটি শুরু করলেন। তাঁর চোখের জল দেখে মুনির মায়া হল। তিনি তখন
তাঁকে বললেন তোমার পৌত্র গিয়ে যদি স্বর্গ থেকে গঙ্গাকে নিয়ে আসতে পারে
তবে গঙ্গা দেবীর পবিত্র স্পর্শে এরা আবার জীবন ফিরে পাবে।
তিনি ফিরে এসে সব কথা খুলে বলতে তাঁর পৌত্র ভগীরথ তপস্যা করতে রাজি হয়ে গেলেন। হাজার বছর ধরে তিনি এমন তপস্যা করলেন যে বিষ্ণু খুশি হয়ে তাঁর হাতে একটি শঙ্খ দিয়ে বললেন, তুমি শঙ্খ বাজিয়ে আগে আগে যাও, গঙ্গা
দেবী তোমার পিছনে পিছনে পৃথিবীতে যাবেন।
কথামতো ভগীরথ শঙ্খ বাজাতে বাজাতে চললেন, আর পিছনে গঙ্গা। কিন্তু মুশকিল
হল স্বর্গ থেকে মর্ত্যে অবতরন করার সময়। গঙ্গার গতি এতটাই বেড়ে গেল
যে, সেই গতিতে পৃথিবী ধ্বংস
হবার উপক্রম। তাই সেই গতি ধারণ করার জন্য ভগীরথ শিবের তপস্যা শুরু করলেন।
শিব তপস্যায় তুষ্ট হয়ে জটা খুলে মাথা পেতে
দাঁড়ালেন। গঙ্গাও তাঁর মাথায় পড়লেন। অমনি পৃথিবী কেঁপে উঠল।
আসলে গঙ্গা চেয়েছিলেন তাঁর স্রোতে মহাদেবকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবেন। গঙ্গার মনের
কথা বুঝে তাঁর অহংকার চূর্ণ করতে শিব তাঁকে জটায় আবদ্ধ করলেন। সেই দেখে
ভগীরথ পড়লেন বিপদে। তিনি আবার তপস্যা শুরু করলেন। মহাদেব তাতে খুশি হয়ে
‘‘অভাবে পরিশ্রান্ত মনই ধর্ম্ম বা ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা করে, নতুবা করে না।’’
পরম প্রেমময় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র লিখিত সত্যানুসরণের চিরন্তন ওই বাণীর অমোঘ টানে নরেন দত্ত গেলেন পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের দরবারে––জাগতিক অর্থাভাব ঘোচাতে। অন্তর্যামী ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব দেবোপম চরিত্রের উত্তরাধিকারীকে সচেতন করিয়ে দিলেন, আত্মসুখ নয়, ভারতবর্ষের শাশ্বত দর্শন, ‘‘বহুজন হিতায় চ, বহুজন সুখায় চ’’-এর আদর্শের উত্তরাধিকারী হয়ে পরমার্থ লাভ করার জন্য তোমাকে আত্ম নিবেদন করতে হবে।
শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ঐশী শক্তিতে শক্তিমান হয়ে নরেন্দ্রনাথ হলেন বিবেকানন্দ। এঁকে দিলেন মহান ভারতবর্ষের পূর্ণাঙ্গ এক চিত্র। শিকাগো ধর্ম্ম মহাসভার ক্যানভাসে।
‘আব্রহ্মস্তম্বভৃদ্ধাতা’––তৃণলতা থেকে ব্রহ্ম, সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির বার্তাবহ বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, সংহিতা, পুরুষোত্তমবাদ নিয়ে বিশ্বজনমানস নতুন করে ভাবতে শুরু করলো। হৃত উত্তরাধিকার ফিরে পেতে ভারতবর্ষ ‘‘উত্তিষ্ঠত জাগ্রত, প্রাপ্য বরান্ নিবোধত।।’’ মন্ত্রে আবার নতুন করে জেগে উঠলো।………
‘‘কর্ম্মণ্যেবাধিকারেস্তু মা ফলেষু কদাচন।…….’’ ––কর্মেই তোমার অধিকার ফলে নয়। ––শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার আদর্শ আঁকড়ে নবযুগের অভিমন্যু ক্ষুদিরাম, দেশরক্ষার ধর্ম পালন করতে গিয়ে ফাঁসির আসামী হলেন। ‘‘ন জায়তে ম্রিয়তে কদাচিৎ…….বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়………নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ।…….’’। বাণীর অমৃত আদর্শে স্থিতপ্রজ্ঞ, মৃত্যুঞ্জয়ী ক্ষুদিরাম হাসিমুখে ফাঁসির দড়ির মালা পড়লেন গলায়। একটা ক্ষুদিরামের আত্মাহুতি জন্ম দিল হাজারো ক্ষুদিরামের। ফাঁসিরজ্জু আর ইংরেজ রাজশক্তির বুলেটের আলিঙ্গনে জীবনের জয়গান গাইতে গাইতে অকালে হাসিমুখে বিদায় নিল উত্তরাধিকারের স্বপ্নদেখা কতশত বীর ভারত-সন্তানেরা। অবশেষে একদিন গ্যালন গ্যালন রক্তের বিনিময়ে আমরা ফিরে পেলাম উত্তরাধিকার। অপূর্ণ, খণ্ডিত। অখণ্ড ভারতবর্ষ হিন্দুস্তান, পাকিস্তান আখ্যা পেল। কিন্তু পূর্ব পশ্চিমে প্রসারিত ভারতমাতার কর্তিত দুটো বাহুর ক্ষত আজও শুকলো না। সৃষ্ট হলো জাতীয় ম্যালিগন্যাণ্ট সমস্যার। বর্তমান যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের প্রদত্ত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার নিমিত্ত রক্ষাকবচ ‘পপুলেশন এক্সচেঞ্জ’ বিধি না মানার জন্য।
তা’ সমস্যা যতই থাকুক, তথাপি জাতীয়তাবাদের পরিচয়ের নিরিখে আমরা ভারতবাসী। আর্য্যজাতির বংশধর। বাল্মীকি, বেদব্যাস আমাদের জাতীয় কবি। রাম, কৃষ্ণ, চৈতন্য, রামকৃষ্ণ প্রমুখ আর্য্য ভারতবর্ষের জাতীয় মানবতাবাদের পূজারী পুরুষোত্তমগণের সাথে ‘‘দিবে আর নিবে মেলাবে মিলিবে’’-র আদর্শ মেনে বুদ্ধ, যীশু, হজরত রসুলকেও দ্রষ্টাপুরুষরূপে চিহ্নিত করিয়ে দিলেন বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। জাতীয় জীবনে সাম্প্রদায়িক সমন্বয়ের বাস্তব সেতুবন্ধন রচিত না হলেও, ভারতীয় হিন্দু, ভারতীয় মুসলমান, ভারতীয় খৃষ্টান, ভারতীয় বৌদ্ধ, ভারতীয় শিখ প্রত্যেকেই যে আর্য্যজাতির বংশধর আমরা বুঝতে শিখলাম, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের কাছে আনত হয়ে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আসমুদ্র হিমাচল পর্যন্ত বিস্তৃত ভারতবর্ষের মহিমা বন্দনা করলেন ‘আর্য্য ভারতবর্ষ আমার জ্ঞান-গরিমা-গরবিনী …….’ সঙ্গীতের ছন্দে।
এই সবকিছু নিয়েই তো আমরা জোর গলায় বলতে পারছি, ‘মেরা ভারত মহান, India is great.’ আচ্ছা ওই শ্লোগানগুলো বলার সাথে সাথে করার যদি মিল না থাকে, ইতিহাসে আমাদের পরিচয় কি হবে? ভারতীয় ঐতিহ্য, ভারতীয় কৃষ্টি, ভারতীয় অনুশাসনের উত্তরাধিকার আমরা প্রকৃত অর্থে বহন করে চলছি কি?
গণপ্রজাতন্ত্রী আধুনিক ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ধর্মকে রক্ষা করে চলার কর্তব্যকে। রাষ্ট্রীয় মন্ত্র ‘সত্যমেব জয়তে’ স্মরণ করিয়ে দেয় উপনিষদীয় আচার্য অনুসরণের শাশ্বত অবলম্বনকে। রাষ্ট্রের কর্ণধার রাষ্ট্রপতিসহ মন্ত্রীবর্গ প্রত্যেকেই ঈশ্বরের নামে শপথ গ্রহণ করে ঈশ্বরের প্রতিভূ জীবগণের কল্যাণ সাধনে ব্রতী হয়। ঈশ্বরের প্রতিনিধি স্বরূপ জাগতিক ন্যায়দণ্ডধারী বিচারকেরা ধর্মাধিকরণ নামে চিহ্নিত। বিচারালয়কে বলা হয় ধর্মস্থান। কেন?
ভারতীয় অনুশাসনের সাম, দান, ন্যায়, দণ্ড, নীতি ও ভেদ-এর রাজধর্ম রক্ষার পবিত্র কর্তব্যে যাতে এতটুকু অন্যায়, অধর্ম প্রবেশ করতে না পারে তার জন্যই ওইসব মহাভারতীয় নীতির অনুসরণ। বিধিবৎ প্রকৃষ্ট-জাতক সৃষ্টি করে প্রজা পালনের স্বার্থেই ওই অনুশাসনকে আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি। তথাপি যখন ভারতীয় শাসন সংহিতা বা সংবিধান ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ না করে, ধর্ম এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়কে এক করে ফেলে ‘ধর্ম-নিরপেক্ষতাবাদ’,––অর্থাৎ রাষ্ট্র ধর্মের অনুবর্তী নয়’-এর মতবাদকে প্রতিষ্ঠা দেয়, তখন কি মনে হয় না, আমরা জাতীয়তাবাদের আদর্শের প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েও এক পরস্পর বিরোধী আচরণ করে চলেছি !
বর্তমান যুগ-পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কথিত ধর্মের যুগান্তকারী সংজ্ঞা ‘অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম বলে জানিস তাকে। ধর্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম না-রে।’ সমন্বয় বার্তাবহ বাণীকে গুরুত্ব না দিয়ে ধর্মের নামে, ভারতীয় সংহিতার নীতি বহির্ভূত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তি পরায়ণতার আস্ফালনকে, কতগুলো অনিত্য, অসার, পৌত্তলিক কু-সংস্কারকে যদি ‘ধর্ম’ নামে প্রতিষ্ঠা দিতে চাই, তা’ কি বিচক্ষণতার পরিচায়ক হবে, না ভারতবর্ষের কৃষ্টির পরিপূরক হবে? ওই ভুলের বোঝা কি আমাদের চিরদিন বইতে হবে? আমাদের বুদ্ধি, বোধ কি নিরেটই থেকে যাবে?
যে নীতি-বিধি পদার্থের অস্তিত্ব রক্ষার সহায়ক তাই তো ধর্ম। পদার্থের স্বকীয়তা ধারণ করে রাখার সহায়ক যা’ তাই ধর্ম। ধর্ম পালন করলেই পদার্থ টিঁকে থাকবে, নচেৎ থাকবে না। সংসদ প্রকাশিত ইংরেজী অভিধানে ধর্মের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘It is an action, one is bound to do.’ সেই ধর্মের আবার পক্ষ আর নিরপেক্ষ কি? বেঁচে থাকার অজৈব উপকরণ বায়ু, জল, মাটি ইত্যাদির যদি ধর্ম থাকতে পারে, এবং তা’ যদি বিজ্ঞানের বইতে পাঠ্য হতে পারে, তাহলে মানুষের কি ধর্ম নেই? মনুষ্যত্ব প্রকাশের মাধ্যমেই তো মানুষ ধার্মিকতার পরিচয় দেয়। মানুষের মনুষ্যত্বের অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার নীতিবিধি-সমন্বিত ভারতের নিজস্ব সংহিতাগুলোর বিধানসমূহ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের সংহিতায় স্থান পাবে না কেন, প্রজাদের শিক্ষা দিতে পাঠ্য করা হবে না কেন?
রাষ্ট্রের সৃষ্টিই তো প্রজাদের অধর্ম বা দুর্নীতি থেকে মুক্ত করে ধার্মিক, অর্থাৎ সু-নীতি পরায়ণ করে তোলার জন্য। সেই রাষ্ট্র যদি তার প্রজাবর্গকে, তাদের পিতৃ-পিতামহের আদর্শ অনুসারী ধর্ম-পরায়ণ, কৃষ্টি-পরায়ণ হতে উৎসাহ না দিয়ে, প্রবৃত্তি-পরায়ণতায় উৎসাহ দেয়, সেটা ভারতবর্ষের জাতীয় উত্তরাধিকারত্বের অস্তিত্বকে বিপন্ন করার বার্তা ভিন্ন আর কিছু নয়।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ধর্মপ্রাণ রাষ্ট্র নির্মাণের পক্ষপাতি ছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘‘আমি চাই—প্রেরিতদের স্বীকার ও অনুসরণ, তাঁদের মধ্যে ভেদ না করা, বর্তমান প্রেরিত পুরুষের মধ্যে পূর্বতনদের পরিপূরণ অনুধাবন করা. পিতৃকৃষ্টি ও ঐতিহ্যের অনুসরণ, বর্ণাশ্রমের অনুপালন, দশবিধ সংস্কারের প্রবর্তন, যজন যাজন ইষ্টভৃতি স্বস্ত্যয়নী ও সদাচারের অনুষ্ঠান, বিহিত শিক্ষা, উদ্ভাবনী সেবানুসন্ধিৎসু কৃষি শিল্প বাণিজ্য ও বিজ্ঞান, জাতির স্বাস্থ্য আয়ু ও কর্মশক্তির পুনরুদ্ধার, আপদ ও অসৎনিরোধী ব্যবস্থা ও নিরাপত্তার প্রস্তুতি, পারস্পরিক সহযোগিতা ইষ্টানুগ সংহতি, বড়কে ছোট করা নয় ছোটকে বড় করে তোলা, ব্যাক্তিস্বাতন্ত্র্য ও সামাজিক তথা রাষ্ট্রিক কল্যাণের সমন্বয় সাধন—এক কথায় প্রয়োজনীয় যা-কিছুর সত্তাসম্বর্ধনী বিন্যাস ও উন্নয়ন।’’ (আলোচনা-প্রসঙ্গে, ৪র্থ খণ্ড)
আর্য্য ভারতবর্ষের আদি সংবিধান ‘ব্রহ্মসূত্র’-এর নবীন সংস্করণ ‘কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র’ অনুযায়ী–-
‘‘সুখস্য মূলম্ ধর্ম্মম্
ধর্ম্মস্য মূলম্ অর্থম্
অর্থস্য মূলম্ রাষ্ট্রম্
রাষ্ট্রস্য মূলম্ ইন্দ্রিয় বিজয়ম্
ইন্দ্রিয় বিজয়স্য মূলম্ জ্ঞানবৃদ্ধ সেবয়া
জ্ঞানবৃদ্ধ সেবয়া বিজ্ঞানম্।’’
অর্থাৎ সুখী হতে হলে ধর্ম পালন করতে হবে। প্রকৃত ধার্মিক হতে হলে পুরুষার্থের চতুর্বর্গ সমন্বিত আশ্রমধর্ম (বর্ণাশ্রম এবং চতুরাশ্রম) পালন করতে হবে। সঠিকভাবে আশ্রমধর্ম পালন করার স্বার্থে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী প্রজাদের দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইন্দ্রিয় বিজয়ী হবার জন্য গুরু গ্রহণ করতে হবে। গুরুর আদেশ-নিদেশ পালন করলে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করা যাবে। তবেই জীবনে সুখী হওয়া যাবে। এই হলো ভারতবর্ষের ধর্মের মূল কথা।
ভারতীয় আর্য্যকৃষ্টি অনুসারে, ‘‘যেনাত্মন্ স্তথান্যেষাং জীবনংবর্দ্ধাঞ্চপি ধ্রীয়তে য স ধর্ম্মঃ।’’ অর্থাৎ, অন্যের বাঁচা এবং বৃদ্ধি পাওয়াকে অক্ষুন্ন রেখে, মানুষ বাঁচার জন্য, বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য যা’ যা’ করে, তাই ধর্ম। ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। ধর্ম আচরণের মাধ্যমে পালন করার জিনিস, অনুভব করার জিনিস, যা’তে প্রতিটি সত্তা তার অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করতে পারে, তার অনুশীলন করা।
অথচ বাস্তব চিত্রটার সাথে মেলানো যাচ্ছে না ধর্মকে। বর্তমানে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্মের নামে চলছে বাহ্যপূজা, পৌত্তলিকতার প্রকাশ, হৈ-চৈ, প্রকাশ্যে প্রাণীহত্যা, পরিবেশ-দূষণ, রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায়। রাস্তা আটক করে, চাঁদার জুলুম করে, জনজীবন বিপর্যস্ত করে, তারস্বরে মাইক বাজিয়ে, বাজি ফাটিয়ে, অবধ্য, নিরীহ প্রাণীদের হত্যা করে ধর্ম উদযাপন করার বিধি কোন মহাপুরুষ, কোন সাধক, কোন নবী, কোন ঋষি, প্রবর্তন করেছেন কি? যদি না করে থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রের কর্তব্য সব সম্প্রদায়কে প্রকৃত ধর্ম পালনে উৎসাহিত করা। ধর্মের নামে বিধি-বহির্ভূত অসদাচারের অনুষ্ঠানের উদযাপনকে কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা।
ভারতের আর্য্য-ঋষিগণ, অবতার-বরিষ্ঠগণ প্রত্যেকেই সপরিবেশ জীবনবৃদ্ধির উপাসনার কথা বলেছেন ধর্মের নামে, পূজার নামে। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আরও একটু সহজ করে দিয়ে বললেন, ‘‘ধর্ম্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে/সম্প্রদায়টা ধর্ম্ম না-রে। অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে/ধর্ম্ম বলে জানিস্ তাকে। পূর্বতনে মানে না যারা/জানিস্ নিছক ম্লেচ্ছ তা’রা।’’ ‘‘পূজা-আর্চ্চা মানেই কিন্তু /দৈবগুণ যা সেধে নেওয়া। হাতে-কলমে মক্স করে/বাস্তবে তার রূপটি দেওয়া।।’’ ইত্যাদি ছড়াবাণীগুলো সহজ, সরল, ওজস্বী আবেদনে সমৃদ্ধ হলেও একটা নির্দিষ্ট গণ্ডীর ভাষা-ভাষীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ওই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দিতে তিনি বললেন, ‘Upholding urge of existence is Dharmma.’ বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্তা বা অস্তিত্বকে ধারণ এবং পালন করে উৎকর্ষতায় রক্ষা করার নাম ধর্ম। তথাপিও আমরা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতার, কু-সংস্কারের, অজ্ঞানতার আবরণ ভেদ করে শুদ্ধ আমিটাকে বের করতে ব্যর্থ হলাম। তথাকথিত ইনটেলেকচ্যুয়াল হওয়া সত্বেও ধর্মের নামে ফুল, বেলপাতা, ধূপবিহীন ধূপকাঠি, ফল-মিষ্টান্নাদির অঢেল আয়োজনে, মাইক বাজিয়ে, শব্দবাজির আওয়াজ দিয়ে পরিবেশবিদদের চিন্তার বলিরেখায় ভাঁজ ফেলে দিতে ইন্ধন যোগাচ্ছি। আর আমাদের গর্বের রবীন্দ্রনাথ আমাদের দ্বিচারিতা দেখে কষ্ট পাচ্ছেন আর ভাবছেন, যে মানুষগুলো ‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি’, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তলে’ ইত্যাদি ছন্দের ডালি সাজিয়ে ভক্তির আবেদন জানায়, তারাই আবার পূজার নামে কু-সংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে বিশ্বাত্মাকে দূষিত করে চলেছে।
আমাদের বর্তমান যুগ যে যুক্তিবাদী সে কথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি অস্বীকার করবেন না আশাকরি। যেমন, সন্তানের হয়ে মা খেলে সন্তানের পেট ভরবে না। ছাত্রের হয়ে শিক্ষক লেখাপড়া করলে ছাত্র পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে না।–তেমনি প্রচলিত পূজার আয়োজকদের হয়ে কোন পুরোহিত পূজা করলে আয়োজকদের কিছু ফললাভ হবে কি ?
অবশ্য পুরোহিতও জানেন না ফললাভের বিষয় সম্পর্কে। যদি জানতেন বিসর্জন মন্ত্রে বলতেন না—ওঁ আবাহনং ন জানামি, নৈব জানামি পূজনম্। বিসর্জনং ন জানামি ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি (পরমেশ্বর)।–-অর্থাৎ আমি আবাহনও জানিনা, বিসর্জনও জানিনা, আমাকে ক্ষমা করুন। (দ্রঃ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা)
বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মত অনুযায়ী পূজ্য-প্রতিমা চঞ্চল চিত্তের ধারণের জন্য একটি অবলম্বন। প্রতিমাকে ব্রহ্মের রূপ কল্পনা করে উপাসনা, সংযম, সাত্তিক আহার, সাত্তিক বিহার ইত্যাদি ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে পূজা করা হয়।–-যাতে পূজক বা উপাসক মনসংযোগ দ্বারা প্রতিমাকে হৃদয়ে ধারণ করে প্রতিমার গুণে গুণান্বিত হতে পারে। এই হলো প্রতিমা পূজার মূল কথা।
পূজা বিষয়ে মহানির্ব্বাণতন্ত্র নামক তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ
‘‘উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবশ্চ মধ্যমঃ।
অধমস্তপোজপশ্চ বাহ্যপূজাহধমাধমঃ।।’’
মহানির্ব্বাণতন্ত্রকে সমর্থন করে ভারতে বিবেকানন্দ গ্রন্থের ৩৩৬ পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘সকলস্থলে ব্রহ্মদর্শন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট। ধ্যান মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্যপূজা অধমেরও অধম।’’
আমরা এমনই অধম যে, ধর্মের নামে প্রাণী হত্যা পর্যন্ত করতে আমাদের বিবেকে বাধে না। আমাদের প্রামাণ্য হিন্দু শাস্ত্রে কোথাও প্রাণী হত্যার অনুমোদন নেই। উপনিষদে ‘আত্মবৎ সর্ব্বভূতেষু’ মন্ত্রে প্রতিটি প্রাণের স্পন্দনকে রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। ‘মাতৃবৎ পরদারেষু’ মন্ত্রে সকল নারীদের মায়ের মত দেখতে বলা হয়েছে। ‘লোষ্ট্রবৎ পরদ্রব্যেষু’ মন্ত্রে অন্যের সম্পদকে মাটির ঢেলার মত দেখতে বলা হয়েছে। রাষ্ট্রের কর্ণধারগণ যদি ওইটুকুও মেনে চলতেন এবং প্রজাদের চলতে উৎসাহিত করতেন, তাহলেও আমাদের উত্তরাধিকার নিয়ে গর্ব করা যেত।
সর্বশ্রেষ্ঠ হিন্দু ধর্মগ্রন্থ মহাভারতের অনুশাসনপর্ব ১১৪ অধ্যায়ে বলা হয়েছে—
“যে ব্যক্তি মোহ প্রভাবে পুত্র-মাংস-তুল্য অন্যজীবের মাংস ভক্ষণ করে, সে অতি জঘন্য প্রকৃতির এবং তার সেই জীবহিংসা বহুবিধ পাপযোনিতে জন্মগ্রহণ করবার একমাত্র কারণ বলে নির্দিষ্ট হয়।“
শুধু হিন্দু মতেই নয়, কোন ধর্মীয় মতবাদে জীবহত্যা স্বীকৃত নয়।
কোরানে, আর্য্য হিন্দু-শাস্ত্রে এবং পুরুষোত্তমদের বাণীতে কোথাও ‘বলিদান’ বা ‘কোরবাণী’-র নামে প্রাণী হত্যার অনুমোদন নেই।
‘কোরবাণী’ কথাটির উৎপত্তি আরবীর ‘কুরবান’ থেকে। ‘কুরবান’ মানে উৎসর্গ, বলি। আবার বলি মানে দান। তন, মন, ধন কর কুরবানী অর্থাৎ কায়, মন, ধন পরমেশ্বরের জন্য উৎসর্গ কর। এই আত্মোৎসর্গ বা আত্ম-বলিদানই প্রকৃত বলি বা কোরবাণী।
মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ আল-কোরানে বলা হয়েছে, “এদের মাংস আর রক্ত আল্লাহর কাছে পৌছায় না, কিন্তু তোমার ভক্তি তার কাছে পৌছায়।” (সুরা ২১/৩৭)
“আল্লার নিকট তাহার মাংস ও তাহার রক্ত কখন পৌঁছে না বা তিনি তাহা ইচ্ছা করেন না। বরং তোমরা অসৎকর্ম্ম হইতে নিজেকে রক্ষা কর ইহাই তিনি ইচ্ছা করেন। তিনি আমাদের অধীনে থাকিয়া কার্য্যনির্বাহের জন্য পশু সৃষ্টি করিয়াছেন—সেজন্য তোমরা খোদার নিকট নম্র ও নিরীহ হইতে শিক্ষালাভ করিবে। এই সৎপথ-প্রাপ্তির অর্থাৎ সৎ-শিক্ষার জন্যই খোদা এই ব্যবস্থা করিয়াছেন। যাহারা অন্যের মঙ্গল সাধন করে, তাহাদের মঙ্গল করিয়া থাকেন ……..” (কোর-আণ—২২ হজ ৩৭ র, ৫) অথচ কোরবানীর নামে অবাধে নিরীহ পশুদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়!
ভগবান বুদ্ধদেব বলেছেন, “আমি কখনই কাউকে মাংস খাওয়ার অনুমোদন করি নি, করি না এবং করব না।” (লঙ্কাবতার সূক্ত)
প্রভু যিশু বলেন, “তুমি হত্যা করিও না” । (এক্সোডাস – 20:13)
“যে একটি ষাড়কে হত্যা করলো, সে যেন একটি মানুষকে হত্যা করলো।” (ইসা – 66:33)
উক্ত অনুশাসনবাদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যে নিজেকে পরমেশ্বরের সন্তান বা খোদাতাল্লার বান্দা মনে করবেন তিনি কখনই কোন প্রাণীকে ব্যথা দেবেন না, হত্যা করবেন না এবং প্রাণীর রক্ত-মাংসে ক্ষুধার নিবৃত্তি করবেন না।
ধর্ম পালনের জন্য নির্দিষ্ট ওইসব অনুশাসনাবলী মেনে চলা স্বভাবতই নাগরিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। রাষ্ট্রের কর্ণধারগণ যদি ওই নাগরিক কর্তব্য পালনে উদাসীন হয়ে ধর্মের নামে ‘যেমন খুশি তেমন’ উৎসব উদযাপনের ছাড়পত্র দেয়, প্রাণীহত্যা বন্ধ করতে তৎপর না হয়, পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে সচেষ্ট না হয়—তাহলে, তথাকথিত ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষজন ধর্মের নামে প্রবৃত্তি-প্ররোচিত অধর্মের আচরণ করার সুযোগ পেয়ে যায়, পরিবেশ দূষণ হয়, জনজীবন বিপর্যস্ত হয়।
* * *
আমরা আমাদের ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদে আর্য্যজাতির মহান গ্রন্থ ‘মহাভারত’-কে স্বীকৃতি দিয়েছি। সেই স্বীকৃতির অধিকারে স্বীকৃতি পেয়েছে ‘শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতা’। সেই সূত্রে স্বীকার করে নিতে হয় মহান রাজনীতিবিদ্ পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণকে। স্বীকার করে নিতে হয় ‘শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতা’ প্রদত্ত––‘গতির্ভর্ত্তা প্রভুঃ প্রেষ্ঠ ঈশ্বরঃ পুরুষোত্তমঃ।/আব্রহ্মস্তম্বভৃদ্ধাতা সদগুরুস্ত্বং নমহোস্তুতে।।’ বাণীর শাশ্বত বার্তাকে। অতএব, আমাদের প্রকৃত উত্তরাধিকার প্রাপ্তির সূত্রই হলো সদগুরুর দীক্ষা গ্রহণ করে তাঁর নীতি-নিদেশ মেনে চলা। তাঁর আদর্শের প্রতি আনতি সম্পন্ন হয়ে চলা।
আমরা ‘মেরা ভারত মহান’ বলে চিৎকার করবো অথচ ভারতীয় কৃষ্টির ধারা অনুসরণ করবো না, পরিপালন করবো না, প্রচার করবো না, তা’-তো হতে পারে না! যদি আমরা সত্যিসত্যিই ওই মহান অনুশাসন মেনে নিতাম তাহলে কি ভারতীয় টিভিতে, সিনেমাতে, পুস্তকে, রাস্তাঘাটে ভারতীয় কৃষ্টির অনুশাসন পরিপন্থী, প্রবৃত্তি-প্ররোচিত স্পর্শকাম, দর্শকাম, শ্রুতিকাম, হিংসা-দ্বেষ প্রদর্শিত এবং প্রচারিত হয়ে মনুষ্যত্বকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারতো? ওইসব প্রবৃত্তি-প্ররোচিত আদর্শের কবলে পড়ে আমরা ভুলতে বসেছি আমাদের জাতীয় আদর্শ, আমাদের প্রকৃত উত্তরাধিকারের তত্ত্বকে।
চিদানন্দ সম্পদের অধিকারী আমার, আপনার, আমাদের প্রাথমিক পরিচয় কি, একটু ভেবে বলুন তো? না, না, নার্ভাস হবার কিছু নেই। এককথায় এর উত্তর যে ‘মানুষ’, তা’ প্রগতিশীল, প্রতিক্রিয়াশীল প্রত্যেকেই স্বীকার করবেন। আর এ-ও স্বীকার করবেন যে, আমরা আকাশ থেকে শিলাবৃষ্টির সাথে একদিন হঠাৎ এই মহীতলে পতিত হইনি কোন গ্রহান্তরের প্রাণী হিসেবে। অযোনী-সম্ভূতও নয়। আমরা প্রত্যেকেই মাতৃদেবীর গর্ভবাসকাল শেষ করে অপত্যপথে, না হয় নিম্ন-উদরচেরা হয়ে পৃথিবীর আলো-হাওয়ার সাথে পরিচিত হয়েছি। পুরুষ-পরম্পরাগত জৈবী-সত্তার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দেহ-মন-প্রাণ নিয়ে। প্রত্যেকের বৈশিষ্ট্য আলাদা আলাদা। যেহেতু পৃথক পৃথক বংশের ধারা নিয়ে আমরা জন্মেছি। এই তথ্যকে অস্বীকার করলে জীব-বিজ্ঞানকেও অস্বীকার করতে হয়।
বিজ্ঞানের মানদণ্ডে, পিতৃ-মাতৃ বংশের ধারার সাথে নিজেদের অর্জিত দোষ-গুণ মিলেমিশে তৈরি genetic code Meiotic cell division-এ বিভাজিত হয়ে প্রস্তুতি নেয় উত্তর পুরুষ সৃষ্টির। মায়ের আকুতি, ভাবাবেগ সম্বর্দ্ধিত Ectoplasmic body বা লিঙ্গ-শরীর বা আত্মা আশ্রয় গ্রহণ করে পিতার পুং-জননকোষের কোষাণুপুঞ্জে। দৈবরূপী বীজকে পুরুষাকাররূপী প্রকৃতি বা ডিম্বাণু করে বরণ। পিতার এবং মাতার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সংস্করণ, দুটি অর্দ্ধ কোষাণু (y+x, or, x+x chromosome) এক হয়ে সৃষ্ট হয় একটি পূর্ণাঙ্গ কোষ। একটা প্রজন্মের ভ্রূণ। পিতামাতার আত্ম-প্রতিলিপির প্রতিনিধি স্বরূপ।
কোন ভ্রূণ বিস্তৃতি লাভ করে জীবনবাদের গান গেয়ে যায়। কেউ ধ্বংসকে ডেকে আনে। কেউ ঝরে যায় অকালে। আমরা কেউ চাই না আমাদের উত্তরাধিকার অকালে ঝরে যাক, বিকৃত হয়ে জন্মাক। তবুও জন্মে যায় আমাদের অজ্ঞতার জন্য। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জাগতিক সম্পদ, ভোগের উপকরণ ম্লাণ হয়ে যায় যদি থ্যালাসেমিয়া, স্কিজোফ্রেনিয়া, হিমোফিলিয়ার ন্যায় দুরারোগ্য বংশগত রোগে আক্রান্ত হয় চিদানন্দ শক্তির অংশ কোনো উত্তরপুরুষ।
বিকৃত উত্তরাধিকার সমস্যা সৃষ্টির মূলে কিন্তু আমরাই। ভারতীয় বর্ণাশ্রমধর্ম্ম, ভারতীয় দশবিধ সংস্কারের অনুশাসন না মেনে তথাকথিত প্রগতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে সংগতি রাখতে পারিনা জীবনধর্মের সাথে। ফলে বিপর্যয় এসে যায় ব্যষ্টি, সমষ্টি এবং রাষ্ট্র জীবনে।
আমাদের জাতীয় জীবনের উত্তরাধিকারকে সুরক্ষিত রাখতে আমাদের ভারতীয় ঋষিগণ ‘বর্ণাশ্রম ধর্ম্ম’, ‘দশবিধ সংস্কার’ নামে কতগুলো জীবনীয় সংস্কার প্রবর্তন করেছিলেন। বর্তমানের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী প্রগতিবাদীরা ওইসব বিধান শুনে যারা মনে মনে ‘বিজ্ঞানের যুগে কুসংস্কার’ শীর্ষক সমালোচনার জন্য তৈরি হচ্ছেন, তাদের জন্য গুটি কয়েক বিজ্ঞানের তথ্য নিবেদন করছি Davidson’s Practice of Medicine, 16th edition, Genetic Factor of Disease Chapter থেকে।
“In survey carried out in Edinburgh a few years ago, no less than 50% of childhood deaths could be attributed to genetic disease. The contribution of genetic factors to mortality and morbidity in adults is mere difficult to assess but is also increasing.”…..
“…..Several extensive studies have shown that among the offspring of consanguineous matings there is an increase of perinatal mortality rate together with an increased frequency of both congenital abnormalities and mental retardation………”
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ওই তথ্য অনুযায়ী বর্তমান বিশ্বে শতকরা ৫০টি শিশু মৃত্যুর কারণ পোলিও নয়, উত্তরাধিকারে প্রাপ্ত জেনেটিক ডিজিজ। বিসদৃশ যৌনমিলনজাত ওই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবার একমাত্র উপায় হিসেবে বলা হয়েছে, বিশ্বস্ত বংশে সদৃশ বিবাহ এবং সুপ্রজনন নীতির পরিপালন।––যা’ ভারতীয় বর্ণাশ্রমধর্ম ও দশবিধ সংস্কার পালনের মধ্যে নিহিত রয়েছে। বর্ণাশ্রমধর্ম ও দশবিধ সংস্কার পালনের মাধ্যমে প্রতিটি বংশের কুলপঞ্জীর মর্যাদা রক্ষা করে যারা নির্মল, নিষ্কলুষ উত্তরাধিকারীদের সৃষ্টি করতে পারবেন, তাদের বংশধরগণ দুরারোগ্য ব্যাধি এবং অকাল মৃত্যুর কবল থেকে সুরক্ষিত থাকবেই। নচেৎ উত্তরাধিকারীদের নিয়ে নানা সমস্যায় জর্জরিত হতে হবে।
তাই বলছিলাম কি, সদগুরুর দীক্ষা নিয়ে, বিধিবৎ বৃত্তি নিয়ন্ত্রণ মাধ্যমে তাঁর প্রদত্ত সংস্কারে সংস্কৃত হতে পারলে উত্তরাধিকারে পাওয়া বিকৃত রূপটাকে সযত্নে পরিহার করে, বৃদ্ধি পেতে না দিয়ে, উত্তরাধিকারে পাওয়া ভালোটুকুকে সুস্থ পরিষেবা দিয়ে যদি একটা সুস্থ প্রজন্ম উপহার দিয়ে যেতে পারি ভারতমাতাকে, তবেই বোধহয় মানুষ হিসেবে সঠিক পরিচয় রেখে যেতে পারবো। তাই নয় কি?
‘ভারাক্রান্ত হৃদয়ের যা’ কিছু মলিনতা’ ইষ্টীপূত প্রবাহে ধুয়েমুছে রত্নগর্ভার আধার স্বরূপিণী কল্যাণীয়া মায়েরা, গুরুর নিদেশ মেনে, স্বামীর মনোবৃত্ত্যানুসারিণী হয়ে চলতে পারলেই হয়তো অচিরেই আগমন হতে পারে শুদ্ধাত্মাদের।
‘শুদ্ধাত্মাদের’ জন্ম দিয়ে জাতীয় উত্তরাধিকার রক্ষার দায়িত্ব কি শুধু মেয়েদের, ছেলেদের কি কোন দায়িত্বই নেই? ––বর্তমান প্রজন্মের কল্যাণীয়া মায়েদের মনে এই প্রশ্নটা জাগা স্বাভাবিক। হ্যাঁ, ছেলেদের অবশ্যই দায়িত্ব আছে,––
‘ইষ্ট ঝোঁকে ছুটলে পুরুষ প্রজ্ঞা অনুপমা
স্বামীর ঝোঁকে ছুটলে নারী শ্রেষ্ঠ ছেলের মা।’
পুরুষদের ইষ্টনিষ্ঠ হতে হবে, পূরণকারী হতে হবে, ‘‘প্রত্যেকের মা-ই জগজ্জননী। প্রত্যেক মেয়েই নিজের মায়ের বিভিন্নরূপ এমনতর ভাবতে হয়।’’-–বাণীকে মেনে চলতে হবে। এবং সে দায়িত্ব স্বয়ং বিধাতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রই দিয়েছেন। কিন্তু মায়েদের উপর দায়িত্ব একটু বেশি করে দিয়েছেন।
‘‘নারী হতে জন্মে জাতি
বৃদ্ধি লভে সমষ্টিতে
নারী আনে বৃদ্ধি ধারা
নারী হতেই বাঁচাবাড়া
পুরুষেতে টানটী যেমন
মূর্ত্তি পায় তা সন্ততিতে ।
অভ্যাস ব্যবহার যেমনতর
সন্তানও পাবি তেমনতর।
স্বামীতে যার যেমনি রতি
সন্তানও পায় তেমনি মতি ।
স্বামীর প্রতি যেমনি টান
ছেলেও জীবন তেমনি পান ।
যে ভাবেতে স্বামীকে স্ত্রী
করবে উদ্দীপিত
সেই রকমই ছেলে পাবে
তেমনি সঞ্জীবিত ।”
‘‘মা হ’লো মাটির মত। মা যদি স্বামীগতপ্রাণা হয়, নিজের প্রবৃত্তির উপর তার যে নেশা, তা’ থেকে যদি তার স্বামীনেশা প্রবলতর হয়, স্বামীকে খুশি করার জন্য নিজের যে কোন খেয়াল যদি সে উপেক্ষা করতে পারে, তাহ’লে তা’র ব্যক্তিত্বের একটা এককেন্দ্রিক রূপান্তর হয়। একে বলে সতীত্ব। তা’ থেকে তা’র শরীরের ভিতরকার অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিগুলির ক্ষরণ ঠিকমত হয় এবং সেগুলি আবার সত্তাপোষণী হয়। এইগুলি গর্ভস্থ সন্তানের শরীর-মনের ভাবী সুসঙ্গত বিকাশের পক্ষে যে-সব সারী উপাদান প্রয়োজন, সেগুলি সরবরাহ করে। এইসব ছেলেমেয়ে মাতৃভক্ত হয়, পিতৃভক্ত হয়, গুরুভক্ত হয়, সংযত হয়, দক্ষ হয়, লোকস্বার্থী হয়, চৌকস হয়, এরা সাধারনতঃ মোটামুটি সুস্থ, সবল ও দীর্ঘায়ুও হয়।’’ (আলোচনা প্রসঙ্গে পঞ্চদশ খণ্ড/৭৩)
বর্তমান যুগ-বিধায়ক শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ওই সঞ্জীবনী মন্ত্রের বাস্তব প্রয়োগে আমাদের ঘরের মেয়েরা যদি উপযুক্ত বরণীয় বর-কে বরণ করে আদর্শ বধূ, মনোবৃত্ত্যানুসারিনী স্ত্রী, আদর্শ জায়া হয়ে তাদের ভাবী সন্তানদের ভালোমন্দ পরিমাপিত করে গর্ভে ধারণ করতে পারেন, তা হলেই জন্ম নেবে সুস্থ দাম্পত্যের সুস্থ শিশু। এবং সেই সন্তানদের সদাচারের প্রলেপনে আধো কথার সময় থেকেই করে করিয়ে সদগুণের শিক্ষা ধরিয়ে দিতে পারেন,— তা হলেই সংরক্ষণ করা যাবে আমাদের আর্য্য ভারতবর্ষের জাতীয় উত্তরাধিকার।
প্রহ্লাদ, ব্যাসদেব, কৌটিল্য, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্রের ন্যায় কত-শত বিখ্যাত মনীষীদের শুদ্ধাত্মাদের লিঙ্গশরীর সেই আশায় পথ চেয়ে বসে আছেন। উপযুক্ত মা পেতে। এক বুক আশা নিয়ে, পথ চেয়ে বসে রয়েছেন মানুষ-পাগল পরমপিতাও। তাঁকে শুদ্ধাত্মার ডালির উপহার কে দেবে, সে-তো এক-একজন কয়াধু, সত্যবতী, কৌশল্যা, দেবকী, চন্নেশ্বরী, শচীমাতা, চন্দ্রমণি দেবী, ভুবনেশ্বরী দেবী, মাতা মনোমোহিনী দেবী, প্রভাবতী দেবীর ন্যায় প্রমুখ মায়েদের দ্বারাই সম্ভব। আমাদের আর্য্য ভারতবর্ষের উত্তরাধিকারের দায়িত্ব মায়েদেরই তো নিতে হবে। পরমপিতা যে পথ চেয়ে বসে আছেন আপনাদের দেওয়া উপহার পেতে।